সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

কুরআনের ভবিষ্যদ্বানী

উজ্জ্বল ভবিষ্যত

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৯ পৃষ্ঠায়)

আল্লাহ তায়ালা নবী (সা)-কে এ সুসংবাদ এমন সময়ে দিয়েছিলেন –যখন মুষ্টিমেয় লোক তাঁর সাথে ছিলেন। গোটা জাতি ছিল তাঁর বিরোধী। বাহ্যত সাফল্যের কোনো দূরতম লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল না। ইসলামের প্রদীপ মক্কাতেই টিম টিম করে জ্বলছিল। তা নিভিয়ে দেয়ার জন্যে চারদিকে ঝড় বইছিল। সে সময়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে বলেন, এ প্রাথমিক অবস্থায় যে বাধা-বিপত্তি আসছে তাতে দমে যাবে না। পরবর্তী সময়কালটা এখন থেকে ভাল প্রমাণিত হবে। তোমার মান-সম্মান ও মর্যাদা বাড়তেই থাকবে এবং প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার লাভ করতে থাকবে। আর এ ওয়াদা শুধু দুনিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে এ ওয়াদাও করা হচ্ছে যে, আখেরাতে যে মর্যাদা তোমার হবে তা দুনিয়ার মর্যাদা থেকে অনেক গুণে বেশী।

তাবারানী ‘আওসাতে’ এবং বায়হাকী ‘দালায়েলে’ ইবনে আব্বাসের রেওয়ায়েত নকল করেছেন, নবী (সা) বলেনঃ আমার পরে আমার উম্মত যেসব সাফল্যের অধিকারী হবে তা সবই আমার সামনে পেশ করা হয়। তাতে আমি সন্তুষ্ট হই। অতপর আল্লাহ তায়ালা এ এরশাদ করেন, আখেরাত তোমার জন্যে দুনিয়া থেকে ভাল হবে।

দ্বীন বিজয়ী হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪০৯ পৃষ্ঠায়)

“শীগগীর তোমার প্রভু তোমাকে এত দেবেন যে, তুমি পরিতৃপ্ত হয়ে যাবে”।

অর্থাৎ দিতে যদিও কিছুটা বিলম্ব হবে –কিন্তু সে সময় বেশী দূরে নয় যখন তোমার প্রভু তোমার ওপর তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণ করবেন এবং তুমি তাতে পরিতৃপ্তি লাভ করবে। এ প্রতিশ্রুতি নবীর জীবনেই এভাবে পালিত হয় যে, আরবের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে উত্তরে রোম সাম্রাজ্যের মাস সীমান্ত ও পারস্য সাম্রাজ্যের ইরাক সীমান্ত পর্যন্ত এবং পূর্বে পারস্য উপসাগর থেকে পশ্চিমে লোহিত সাগর পর্যন্ত সমগ্র ভূখণ্ড তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে। আরব ইতিহাসে এই সর্বপ্রথম এ ভূখণ্ডটি আইন-শৃঙ্খলার অধীন হয়ে পড়ে। যে শক্তিই এর সংঘর্ষে এসেছে সে-ই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে। যে দেশে মুশরিক ও আহলে কিতাবগণ তাদের মিথ্যা বাণী সমুন্নত রাখার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, তার সর্বত্র কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ’ গুঞ্জরিত হলো। মানুষের মস্তকই শুধু অবনত হলো না, তাদের হৃদয় মনও বশীভূত হলো। তাদের আকীদা-বিশ্বাসে, কাজে-কর্মে এক বিরাট বিপ্লব সাধিত হলো। জাহেলিয়াতের আঁধারে আচ্ছন্ন একটি জাতি মাত্র তেইশ বছরে এমনভাবে বদলে গেল যে, ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল। তারপর নবী পাক (সা)-এর প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন এতটা অর্জন করলো যে, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের অধিকাংশ স্থানে তা ছড়িয়ে পড়লো। অতপর দুনিয়ার প্রতিটি কোণে তার প্রভাব বিস্তার লাভ করলো। এসব কিছু তো আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে দুনিয়ার বুকেই দিলেন। আর আখেরাতে যা দিবেন তা ধারণার অতীত।

এ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার কুদরত ও হিকমতের বহিঃপ্রকাশ যে, একটা অজ্ঞ-অসভ্য জাতির মধ্যে তিনি এমন এক মহান নবী পয়দা করলেন যাঁর শিক্ষা ও পথনির্দেশ এতটা বিপ্লবাত্মক এবং বিশ্বজনীন আদর্শের ধারক-বাহক যে, সমগ্র মানব জাতি মিলে একটি মাত্র উম্মত বা দল হতে পারে। তারপর হর-হামেশা সেই আদর্শ থেকে পথনির্দেশ পেতে পারে। কোনো ভূয়া বা কপট ব্যক্তি যতোই চেষ্টা করুক না কেন, এ মর্যাদা কিছুতেই লাভ করতে পারে না। আরবের মতো অনুন্নত দেশ তো দূরের কথা, দুনিয়ার কোনো বিরাট জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান ব্যক্তিরও এমন সাধ্য ছিল না যে, একটা জাতির আকৃতি-প্রকৃতি এভাবে একেবারে পাল্টে দিতে পারতো এবং তারপর এমন এক সার্বিক আদর্শ তাদের সামনে তুলে ধরতো যার ভিত্তিতে গোটা মানব গোষ্ঠী একটি মাত্র উম্মতে রূপান্তরিত হয়ে একটি জীবন বিধান (দ্বীন) ও একটি সভ্যতার বিশ্বজনীন ব্যবস্থা চিরদিনের জন্যে পরিচালনা করতে সক্ষম হতো। এ একটি মোজেযা যা আল্লাহর কুদরতে সংঘটিত হয়েছে এবং একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই তাঁর সূক্ষ্ম ও দূরদর্শী জ্ঞানের ভিত্তিতে যে ব্যক্তি, দেশ বা জাতিকে তিনি চান এ কাজের জন্যে মনোনীত করেন। এর জন্যে যদি কেউ মনে পীড়া বোধ করে তা করুক তাতে কিছু যায় আসে না।

উৎকৃষ্ট যুগের নিশ্চয়তা দান

সূরায়ে আদ্দোহার বিষয়বস্তু হচ্ছে নবীকে সান্ত্বনা দেয়া এবং অহীর ধারাবাহিকতা রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নবী যে কনোকষ্ট ভোগ করছিলেন তা দূর রকা, প্রথমেই উজ্জ্বল দিবস এবং শান্ত রাতের কসম করে নবীকে নিশ্চয়তা দেয়া হলো যে, তাঁর প্রভু তাঁকে কিছুতেই ত্যাগ করেননি এবং তাঁর ওপর অসন্তুষ্টও হননি। তারপর নবকে সুসংবাদ দেয়া হল যে, ইসলামী দাওয়াতের প্রথম পর্যায়ে যেসব অসুবিদার সম্মুখীন তিনি হয়েছেন তা সমায়িক মাত্র। প্রত্যেক আগতকালটা পূর্ববর্তীকাল থেকে ভাল হতে থাকবে এবং অবিলম্বেই আল্লাহ তাঁর ওপরে এমন অনুগ্রহ-অনুকম্পা বর্ষণ করবেন যে, তিনি খুশী হবেন। এ হচ্ছে এমন সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বানী যা পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়েছে। অথচ যে সময়ে এ ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, তখন এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি যে, মক্কার যে অসহায় লোকটি জাতির জাহেলিয়াতের মুকাবিলায় সংগ্রাম মুখর তার এমন বিস্ময়কর সাফল্য অর্জত হবে।

তারপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-কে বলেন, কি কারনে তোমার মনে এ আশঙ্কা জন্মালো যে, আমি তোমাকে পরিত্যাগ করেছি এবং তোমার প্রতি আমি নারাজ হয়েছি? আমি তো তোমার জন্মলগ্ন থেকেই তোমার প্রতি ক্রমাগত অনুগ্রহই করে আসছি। তুমি এতীম হয়ে জন্মগ্রহণ করলে এবং আমি তোমার প্রতিপালন ও দেখাশুনার সুন্দর ব্যবস্থাপনা করে দিলাম। তোমার সঠিক পথ জানা ছিল না। আমি তোমাকে পথ দেখালাম। তুমি ছিলে বিত্তহীন তোমাকে বিত্তশালী বানালাম। এসব কিছু এটাই প্রমাণ করে যে, প্রথম থেকেই তোমর প্রতি আমর নজর ছিল এবং স্থায়ীভাবে তুমি আমার অনুগ্রহ-অনুকম্পার মধ্যেই ছিলে।

বোঝা অপসারণের অর্থ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪১১ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) আমি কি তোমার জন্যে তোমর বক্ষ প্রসারিত করে দেইনি? এবং আমি তোমর ওপর থেকে যে ভারি বোঝা নামিয়ে দিয়েছি যা তোমার কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছিল”।–(সূরা আলাম নাশরাহঃ ১-৩)

তফসরকারদের কেউ কেউ এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, জাহেলিয়াতের যুগে নবী করীম (সা) এমন কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি করে ফেলেছিলেন যার জন্যে তিনি খুবই চিন্তা ভারাক্রান্ত ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা এ আয়াত নাযিল করে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন যে, তিনি তাঁর সে ত্রুটি মাফ করে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের মতে এ অর্থ করা নেহাত ভুল। প্রথমতঃ শব্দটির অবশ্যম্ভাবী অর্থ গুনাহ-ত্রুটি-বিচ্যুতি নয়। বরং এ শবেরদ অর্থ ভারি বোঝাও। অতএব এ শব্দটির অযথা কদর্য অর্থ গ্রহণের কোনো কারণ থাকতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ নবী পাকের নবুয়াত পূর্ব জীবন এমন পূত-পবিত্র ছিল যে, বিরুদ্ধবাদীদের কাছে তা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। বস্তুত কাফেরদেরকে সম্বোধন করে নবীকে দিয়ে এ কথা বলিয়ে দেয়া হলোঃ

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪১১ পৃষ্ঠায়)

“আমি এ কুরআন পেশ করার আগে তোমাদের মধ্যে একটা জীবন অতিবাহিত করেছি”।–(সূরা ইউনুসঃ ১৬)

নবী পাক (সা)-এ ধরনের কোনো লোকই ছিলেন না যে, গোপনে তিনি কোনো গুনাহ কের ফেলেছেন-(মায়াযাল্লাহ)। এমনটি হয়ে থাকলে তা আল্লাহ তায়ালার অজানা থাকতো না এবং কেউ গোপন কলঙ্ক বহন করে থাকলে তা তিনি জাতির সামনে বিনা দ্বিধায় এ কথা বলে দিতে পারতেন যেমন সূরায়ে ইউনুসের ওপরে বর্ণিত আয়াতে তিনি বলে দিয়েছেন। অতএব এ আয়াতে শব্দটির সঠিক অর্থ হচ্ছে বোঝা। অর্থাৎ দুঃখ কষ্ট, চিন্তা-ভাবনার বোঝা। আপন জাতির অজ্ঞতা-মূর্খতা দেখে তাঁর অনুভূতিশীল স্বভাব-প্রকৃতির ওপরে দুঃখ ও দুশ্চিন্তার বোঝা বেড়ে চলছিল। চারিত্রিক কলুষতা ও নগ্নতা চারদিকে বিরাজ করছিল। সমাজে যুলুম এবং ক্রিয়াকলাপে দ্বন্দ্ব-ফাসাদ সাধারণ বস্তুতে পরিণত হয়েছিল। ক্ষমতাসীনের বাড়াবাড়িতে ক্ষমতাহনি নিষ্পেষিত হচ্ছিল। শিশু-বালিকাদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হচ্ছিল। একটি গোত্র অপর গোত্রের ওপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসতো। কখনো কখনো এ গোত্রীয় কলহ শত শত বছর ধরে চলতো। জান-মাল ইজ্জত-আব্রু কারও নিরাপদ ছিল না যতোক্ষণ না তার পেছনে কোনো শক্তিশালী দল ছিল। এসব অবস্থা দেখে নবী পাক (সা) মর্মপীড়া ভোগ করছিলেন। কিন্তু এ অধঃপতন দূর করার কোনো পথ তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এ মর্মপিড়ার বিরাট বোঝা তার কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছিল। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে হেদায়াতের পথ দেখিয়ে এ বোঝা তাঁর ওপর থেকে সরিয়ে দেন। অতপর নবুয়াতের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারলেন যে, -তাওহীদ, রেসালাত ও আখেরাতের ওপর ঈমানই মানবজীবনের যাবতীয় সমস্যার সমাধান। এর দ্বারাই জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের সংস্কার সংশোধনের পথ সুগম করা যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালার এ পথ নির্দেশ নবী পাক (সা)-এর সকল বোঝা লাঘব করে দেয় এবং তিনি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েন যে, এ পথেই শুধু আরবের নয় গোটা দুনিয়ায় অথঃপতন ও বিপর্যয় রোধ করা যেতে পারে।

রফয়ে যিকর

(আরবী********************************************পিডিএফ ৪১২ পৃষ্ঠায়)

“এবং তোমর জন্যে তোমার যিকিরের আওয়াজ বুলন্দ করে দিয়েছি”।

এ কথা এমন এক সময়ে বলা হয়েছিল যখন কেউ এ কথা চিন্তাই করতে পারতো না যে, যে ব্যক্তির সাথে মাত্র গুটি কয়েক লোক রয়েছে এবং মক্কা শহরেই যারা সীমাবদ্ধ, সে ব্যক্তির আওয়াজ কিভাবে সমগ্র দুনিয়ায় বুলন্দ হতে পারে এবং কেমন করে এক অসাধারণ সুখ্যাতি তাঁর ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এ অবস্থাতেই তার নবীকে এ সুসংবাদ দিলেন এবং আশ্চর্যজনক পন্থায় তা কার্যে পরিণত করলেন। নবীর স্মরণ বা আওয়াজ ঘরে গরে পৌঁছাবার কাজ তিনি (আল্লাহ) স্বয়ং নবীর দুশমনদের দ্বারাই শুরু করলেন। মক্কার কাফেরগণ নবীকে বিপদে ফেলার জন্যে যে পন্থা অবলম্বন করেছিল তার মধ্যে একটা এই ছিল যে, হজ্জের সময় যখন গোটা আরবের লোক দলে দলে মক্কায় পৌঁছত, তখন কাফেরদের এক একটি প্রতিনিধিদল হাজীদের শিবিরে শিবিরে হাযির হতো এবং তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলতো, “মুহাম্মদ নামে একটি মারাত্মক লোক মানুষের ওপর এমন এমন যাদু করছে। পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিভে সৃষ্টি করছে। অতএব তার থেকে সাবধান হয়ে থাকবে”। এধরনের প্রচারণা তারা ঐসব লোকের কাছেও করত যারা হজ্জ ছাড়া অন্যান্য দিনে শুধু জিয়ারতের জন্যে অথবা কোনো ব্যবহা উপলক্ষে মক্কা আসতো। এভাবে যদিও তারা নবী পাক (সা)-এর কুৎসা রটনা করতো কিন্তু তার ফল এই হতো যে, আরবের গ্রামে-গঞ্জে তাঁর নাম পৌঁছে যায়। এভাবে দুশমনেরা মক্কার নিভৃত স্থান থেকে নবীর নাম সারা দেশের সকল গোত্রের কাছে পরিচিত করে দেয়। তারপর স্বাভাবিকভাবেই লোক জানতে চাইল, সে লোকটি কে, কি বলে, কেমন লোক সে, কারা তার যাদুর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে এবং যাদুর কোন ধরনের ক্রিয়াই বা তাদের ওপর হচ্ছে। মক্কার কাফেরদের প্রচারণা যতোই বাড়তে থাকলো, মানুষের মনে এসব জিজ্ঞাসাও বেড়ে চলরো। এ জিজ্ঞাসা ও উৎসুক্যের ফলে নবীর চরিত্র ও আচার আচরণ লোকে জানতে পারলো। তারা কুরআন শুনে বুঝতে পারলো কোন ধরনের শিক্ষঅ নবী মানুষকে দিচ্ছিলেন। তারা দেখলো যে, যে জিনিসকে যাদু বলা হচ্ছে তার দ্বারা প্রভাবিত লোকের জীবন ধারায় সাধারণ আরববাসীদের থেকে কোন ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এর ফলে নবীর সুৎসা তাঁর সুনাম-সুখ্যাতিতে পরিণত হতে লাগলো। অতপর হিজরতের সময় আসতে আসতে এমন অবস্থা হলো যে, দূর ও নিকটের আরব গোত্রগুলোর মধ্যে কিছু লোক নবী ও তাঁর দাওয়াতের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়েনি। এ হচ্ছে হুজুর পাকের চর্চাচ বুলন্দ হওয়ার প্রথম পর্যায়। অতপর হিজরতের পর দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ সময়ে একদিকে মুনাফিক দল, ইহুদী এবং সমগ্র আরবের মুশরিকগণ নবী (সা)-এর কুৎসা রটনায় উঠে-পড়ে লেগেছিল অপরদিকে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র খোদাপুরস্তি ও খোদাভীতি, চারিত্রিক পবিত্রতা, সুন্দর সমাজব্যবস্থা, ন্যায়পরায়ণতা, সাম্য, ধনিকদের উদারহস্তে দান, গরীবদের তত্ত্বাবধান, চুক্তির সংরক্ষণ, লেন-দেন ও কায়কারবারে  সততা প্রভৃতির এমন এক দৃষ্টান্ত পেশ করছিল যা মানুষের হৃদয় জয় করে চলেছিল। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে দুশমনরা নবীর ক্রমবর্ধমান প্রভাব মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে আহলে ঈমানদের যে জামায়াত তৈরী হয়েছিল, তাঁরা তাঁদের বশ্যতা স্বীকার করে। দশ বছরের মধ্যে হুজুর পাকের চর্চা ও মহিমা এতটা বুলন্দও সমুন্নত হয়ে পড়লো যে, বিরোধীরা যে দেশে তাকে বদনাম করার জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল সে দেশের সর্বত্র ‘আশ হাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ’-এর বাণী গুঞ্জরিত হলো।

অতপর তৃতীয় পর্যায় শুরু হলো খেলাফতে রাশেদার যুগ থেকে, যখন নবী পাক (সা)-এর পবিত্র নাম সারা দুনিয়ায় বুলন্দ হতে লাগলো। এর ধারাবাহিকতা আজ পর্যন্ত বেড়েই চলেছে এবং ইনশাআল্লাহ কেয়ামত পর্যন্ত বেড়েই চলবে। আজ দুনিয়ায় এমন কোনো স্থান নেই যেখানে মুসলমানদের কোনো বস্তি নেই এবং পাঁচবার আযানের মাধ্যমে উচ্চস্বরে মুহাম্মদ (সা)-এর রেসালাতের ঘোষণা করা হয় না, নামাযের মধ্যে নবীর প্রতি দরূদ পড়া হয় না এবং জুমুআর খুৎবার মধ্যে তাঁর মঙ্গল কামনা করে নাম স্মরণ করা হয় না। বছরের বার মাসের মধ্যে কোনো দিন এবং দিনের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে এমন কোনো সময় নেই –যখন দুনিয়ার কোথাও না কোথাও নবী পাক (সা)-এর মুবারক যিকির করা হয় না। এ কুরআনের সত্যতার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, যখন নবুয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছিলেন (আরবী********) তখন কেউই এ ধারণা করতে পারেনি যে, তাঁর এই (আরবী********) (তাঁর নাম ও যিকির বুলন্দ হওয়া) এমন মর্যাদার সাথে এবং ব্যাপকভাবে হতে থাকবে। আর সাঈদ খুদরী (রা)-এর বর্ণিত হাদীসে আছে –নবী (সা) বলেছেন, জিবরাঈল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার এবং আপনার রব জিজ্ঞেস করেন কিভাবে তিনি আপনার নাম ও যিকির বুলন্দ করেন। নবী (সা) বলেন, আল্লাহ পাকই তা ভালো জানেন। জিবরাঈল বলেন, আল্লাহ এরশাদ করেন, যখন আমার যিকির করা হয় তখন আমার সাথে তোমারও (নবীর) যিকির করা হবে –(ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতিম, মুসনাদে আবু ইয়ালা, ইবনুল মুনযের ইবনে হাব্বান, ইবনে মারদুইয়া, আবু নঈম)। পরবর্তীকালের গোটা ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে।

শরহে সদর

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৩ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) আমি কি তোমাকে বক্ষ উন্মুক্ত করে দেইনি?”-(সূরা আলাম নাশরাহঃ ১)

এ প্রশ্ন দিয়ে কথা শুরু এবং পরের কথা থেকে প্রকাশ হচ্ছে যে, ইসলামী দাওয়াত শুরু করার সাথে সাথে যেসব বাধাবিপত্তির সম্মুখীন রসূলুল্লহা (সা) হয়েছিলেন, তার জন্যে সে সময়ে তিনি খুবই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। এ অবস্থায় তাঁকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে নবী! আমি কি তোমার ওপর এই এই অনুগ্রহ করিনি? তারপরও এসব বাধাবিপত্তির জন্যে তুমি উদ্বিগ্ন হচ্ছ কেন? বক্ষ উন্মুক্ত করা শব্দটি কুরআন মজীদে যে যে স্থঅনে ব্যবহার করা হয়েছে তা লক্ষ্য করলে জানা যায় যে, তার দু’টি অর্থ।

একঃ (আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৪ পৃষ্ঠায়)

“অতএব যাকে আল্লাহ তায়ালা হেদায়াত দানের ইচ্ছা করেন, ইসলামের জন্যে তার বক্ষ উন্মুক্ত করে দেন”।–(সূরা আল আনআমঃ ১২৫)

দুইঃ (আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৪ পৃষ্ঠায়)

“যার বক্ষ আল্লাহ, ইসলামের জন্যে খুলে দিয়েছেন, সে তার রবের পক্ষ থেকে একটি আলোকের ওপর চলছে”।–(সূরা আয যুমারঃ ২২)

এ দু’টি স্থানে শরহে সদরের মর্ম হলো সকল প্রকার মানসিক অস্থিরতা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থেকে মুক্ত হয়ে এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া যে, ইসলামের পথই অকাট্য সত্য এবং ঐসব আকীদা-বিশ্বাস, নৈতিক মূলনীতি, তাহযিব ও তামাদ্দুন, আদেশ-নিষেধ ও পথনির্দেশ একেবারে অভ্রান্ত যা ইসলাম পেশ করেছে। সূরা শূয়ারার ১২-১৩ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত মূসা (আ)-কে নবুয়াতের মহান দায়িত্বে নিয়োজিত করার পর ফেরাউনে ও তার রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম-সংঘর্ষ করার নির্দেশ যখন দেয়া হয়, তখন মূসা (আ) আরজ করেনঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৪ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার রব! আমার ভয় হচ্ছে লোকে আমাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং আমার বক্ষ সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে”।–(সূরা শুয়ারাঃ ১২-১৩)

সূরা ত্বাহার ২৫-২৬ আয়াতে বলা হয়েছে, সে সময়ে হযরত মূসা (আ) আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করলেনঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৪ পৃষ্ঠায়)

“আমার রব! আমার বক্ষ আমার জন্যে খুলে দিন এবং আমার কাজ আমার জন্যে সহজ করে দিন”।

এখানে বক্ষের সংকীর্ণতার অর্থ এই যে, নবুয়াতের মতো বিরাট গুরুভার বহন করার জন্যে এবং একাকী দুর্দান্ত কুফরী শক্তির বিরুদ্ধে সংঘাত-সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার জন্যে সাহস সৃষ্টি হচ্ছিল না। আর শরহে সদরের অর্থ মানুষের মনোবল বেড়ে যাওয়া। কোনো বিরাট অভিযান পরিচালনা এবং বড়ো কঠিন কাজ সমাধা করতে পশ্চাদপদ না হওয়া এবং নবুয়াতের মতো বিরাট দায়িত্ব পালনে সাহস সৃষ্টি হওয়া।

চিন্তা করলে বুঝতে পারা যায় যে, এ আয়াতে রসূলুল্লাহ (সা)-এর বক্ষ খুলে দেয়ার মধ্যে এ দু’টি অর্থই নিহিত রয়েছে। প্রথম অর্থের দিক দিয়ে এর তাৎপর্য এই যে, নবুয়াতের আগে রসূলুল্লাহ (সা) আরবের পৌত্তলিক, নাসারা ইহুদী ও অগ্নিপূজকদের ধর্মগুলোকে ভ্রান্ত মনে করতেন এবং আরবের কিছু তাওহীদ পন্থীদের মধ্যে যে একমুখিতা দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল তার প্রতিও তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ এ একটা অস্পষ্ট আকীদা ছিল যার মধ্যে সত্য-সঠিক পথেল কোনো বিশদ বিবরণ ছিল না। কিন্তু সঠিক পথ কোনটা এ যখন তাঁর জানা ছিল না সে জন্যে তিনি এক মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন।ফ অতপর নবুয়াত (সিরাতুল মুস্তাকীম) তাঁর সামনে খুলে দিলেন –যার ফলে তাঁর মনে এক প্রশান্তি ও নিশ্চিন্ততা ফিরে এলো।

দ্বিতীয় অর্থের তাৎপর্য এই যে, নবুয়াত দানের সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালা নবীকে সে সাহস, উৎসাহ-উদ্দীপনা, দৃঢ় সংকল্প ও মনের প্রসারতা দান করেন যা এ বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্যে প্রয়োজন ছিল। তিনি এমন এক ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী হলেন যা তিনি ছাড়া অন্য কোনো মানুষ হৃদয়ে স্থান হতে পারে না। তিনি এমন দূরদর্শী জ্ঞান লাভ করলেন –যা ব্যাপক অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা দূর করে শান্তি স্থাপন করতে সক্ষম। ফলে তিনি এতোটা যোগ্যতা অর্জন করলেন যে, জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি চরম উচ্ছৃংখল সমাজে কোনো উপায়-উপাদান ও দৃশ্যত কোনো সহায়ক শক্তির সাহায্য ব্যতিরেকে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ইসলামের ধ্বজাবাহীরূপে বিরোধিতা ও শত্রুতার ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবিলা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। এ পথে যতোই দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদ এসেছে তা তিনি ধৈর্যের সাথে মাথা পেতে নিয়েছেন। কোনো শক্তি তাঁকে তাঁর লক্ষ পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। শরহে সদরের এ অমূল্য সম্পদ যখন আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দান করেছেন, তখন কাজের সূচনালগ্নে এসব বাধা-বিপত্তি দেখে তিনি হিম্মত হারাবেন কেন?

কোনো কোনো তাফসীরকার শরহে সদরকে বিদীর্ণকরণ অর্থে গ্রহণ করেছেন এবং এ আয়াতকে বক্ষবিদীর্ণের অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন –যা হাদীসের আলোকে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ হাদীসের বর্ণনাগুলোর ওপরই নির্ভরশীল। কুরআন থেকে এ প্রমাণ করার চেষ্টা ঠিক হবে না। আরবী ভাষার দিক দিয়ে শরহে সদরকে শক্কে-সদর বা বক্ষবিদীর্ণ করার অর্থে কিছুতেই গ্রহণ করা যেতে পারে না। আল্লামা আলুসী তাঁর রহুল মায়ানীতে বলেনঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৫ পৃষ্ঠায়)

“বিশেষজ্ঞদের নিকটে এ আয়াতে –‘শরহ’কে ‘শক্কে’র অর্থে গ্রহণ করা একটি দুর্বল সিদ্ধান্ত”।

কাওসারের সুসংবাদ

নবুয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে নবী করীম (সা) যখন চরম অসুবিধার সম্মুখীন হন, গোটা জাতি শত্রুতায় উঠেপড়ে লাগে, পথে প্রতিবন্ধকতার পাহাড় দাঁড়িয়ে যায়, চারদিকে বিরোধিতার তুফান চলতে থাকে এবং নবী ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের সাফল্যের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না, সে সময়ে নবীকে সান্ত্বনা দেবার জন্যে এবং সাহস ও উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন আয়াত নাযিল করেন। সূরা দোহাতে এরশাদ হয়ঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৬ পৃষ্ঠায়)

“অবশ্য অবশ্যই পরবর্তী সময়কাল (প্রত্যেক পরবর্তী সময়কাল) পূর্ব থেকে ভালো হবে এবং তোমার প্রভু তোমাকে ঐসব কিছু দেবেন –যাতে তুমি সন্তুষ্ট হবে”।

আলাম নাশরাহতে আল্লাহ বলেনঃ (আরবী**********) “বরং আমি তোমার নামের স্মরণ বুলন্দ করে দিয়েছি”। অর্থাৎ দুশমন সারা দেশে তোমার বদনাম করে বেড়াচ্ছে –কিন্তু আমি তোমার নাম উজ্জল করার ও তেমার প্রসিদ্ধিলাভের ব্যবস্থাপনা করে দিয়েছি।

অতপর বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৬ পৃষ্ঠায়)

“বস্তুত সংকীর্ণতার সাথে প্রশান্তিও আছে, অবশ্যই সংকীর্ণতার সাথে প্রশান্ততা আছে”।

-অর্থাৎ এ সময়ে অবস্থা খব কঠিন বলে অধীর হয়ো না। অবলিম্বেই বিপদ-মসিবদের সময় শেষ হয়ে যাবে এবং সাফল্য এসে পড়বে”।

এ অবস্থাতেই সূরা কাওসার নাযিল করে আল্লাহ নবী পাক (সা)-কে সান্ত্বনা দেন। তার সাথে বিরুদ্ধবাদীদের ধ্বংসেরও ভবিষ্যদ্বাণী করেন। কুরাইশ কাফেরগণ বলতো যে, মুহাম্মদ (সা) গোটা জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁর অবস্থা এখন একজন সহায়-সম্বল ও বন্ধুহীন মানুষের মতো। একরামার রেওয়ায়াতে আছে, যখন হুজুর পাককে নবী বানানো হয়, এবং যখন তিনি কুরাইশতেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন, তখন তারা বলতে লাগলো, (আরবী*******) (ইবনে জারীর)। অর্থাৎ মুহাম্মদ তাঁর জাতি থেকে এমনভাবে বিচ্ছিন্ন যেন একটি গাছ তার মূল থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আশা করা যায় যে, কিছুদিন পরে সে শুকিয়ে মাটিতে লয় হয়ে যাবে। মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, মক্কার সর্দার আস বিন ওয়ায়েল সাহমীর কাছে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর কথা বললে সে বলতো, “আরে, ছেড়ে দাও তার কথা। সে তো ছিন্নমূল (আবতার)। তাঁর তো ছেলে পেলেও নেই। মরে গেলে নাম নেবার কেউ থাকবে না”।

শামির বিন আতিয়া বলে যে, উকবা বিন আবি মুয়াইতও নবী সম্পর্কে এ ধরনের উক্তি করতো।–(ইবনে জারীর)

ইবনে আব্বাস বলেন, একবার মদীনার ইহুদী সর্দার কা’ব বিন আশরাফ মক্কায় এলে কুরাইশ সর্দারগণ তাকে বলেঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৬ পৃষ্ঠায়)

“একবার এ ছেলেটির দিকে দেখ না, সে তো সমাজ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন অথচ বলে যে, সে নাকি আমাদের চেয়ে ভালো, অথচ আমরা হজ্জ করি, কা’বা ঘরের খেদমত করি এবং হাজীদের পানিও পান করিয়ে থাকি”।–(বাযযার) এ ঘটনা সম্পর্কে একরামার রেওয়ায়াত হচ্ছেঃ কুরাইশরা হুজুর পাক (সা)-এর (আরবী********) শব্দগুলো ব্যবহার করতো। তার অর্থঃ দুর্বল সহায়-সম্বল ও বন্ধুহীন এবং যে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে (ইবনে জারীর)। ইবনে সা’দ এবং ইবনে আসাকের রেওয়ায়াতঃ হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী করীম (সা)-এর বড়ো সাহেবজাদা ছিলেন কাসেম (রা)। তাঁর ছোটো হযরত যয়নব (রা) তাঁর ছোটো হযরত আবদুল্লাহ (রা)।অতপর পর পর তিন মেয়ে হযরত উম্মে কুলসুম (রা), হযরত ফাতেমা (রা) এবং হযরত রুকাইয়া (রা)। এদের মধ্যে প্রথমে হযরত কাসেম (রা) একেন্তাল করেন এবং তারহপর হযরত আবদুল্লাহ (রা) এন্তেকাল করেন। এ কথা শুনে আস বিন ওয়ায়েল বলে, তাঁর বংশ খতম হয়ে গেল। এখন তিনি আবতার অর্থাৎ তাঁর মূল ছিন্ন হয়ে গেল। কোনো কোনো রেওয়ায়াতে আস-এর এ অতিরিক্ত উক্তি আছেঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪১৭ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ মুহাম্মদ আবতার (ছিন্নমূল)। তাঁর কোনো পুত্র-সন্তান নেই যে, তার স্থলাভিষিক্ত হবে। মৃত্যুর পর তার নাম দুনিয়া থেকে মুছে যাবে। তখন তোমরা তাঁর থেকে নিষ্কৃতি লাভ করবে। আবদ বিন হুমাইদ ইবনে আব্বাস (রা) যে রেওয়ায়াত বর্ণণা করেন তার থেকে জানা যায় যে, হুজুরের সাহেবজাদা আবদুল্লাহর ইন্তেকালের পর আবু জেহেলও এ ধরনের মন্তব্য করে। শামের বিন আতিয়া থেকে ইবনে আবু হাতেম রেওয়ায়াত করেনঃ হুজুর (সা)-এর পুত্রশোকের সময় ওকবা বিন আবু মুয়াইতও এ ধরনের নীচ মানসিকতার পরিচয় দেয়। আতা বলেন, হুজুর (সা)-এর দ্বিতীয় পুত্র এন্তেকাল হওয়ার পর হুজুরের অতি নিকট প্রতিবেশী ও চাচা আবু লাহাব দৌড়ে গিয়ে মুশরিকদেরকে এ সুসংবাদ দেয়ঃ (আরবী********) আজ  রাতে মুহাম্মদ একেবারে পুত্রহীন হয়ে পড়লো।

এ ছিল সেই হৃদয় বিদারক অবস্থা –যখন সূরা কাওসার নাযিল হয়। কুরাইশ কাফেরগণ নবীর ওপর এ জন্যে ক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, তিনি একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করতেন এবং তাদের শির্কের প্রকাশ্যে খণ্ডন করতেন। এ কারণেই নবী হওয়ার পূর্বে গোটা জাতির মধ্যে তাঁর যে মর্যাদা ছিল তার থেকে তারা তাঁকে বঞ্চিত করলো। তাকে যেন আপন গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাইরে নিক্ষেপ করলো। তাঁর মুষ্টিমেয় সঙ্গী-সাথীও ছিলেন সহায়-সম্বল ও বন্ধহীন। তাঁরাও নির্যাতিত হচ্ছিলেন। এমন অবস্থায় পর পর পুত্র শোকের পাহাড় নবী পাকের ওপর ভেঙ্গে পড়ে। এহেন বিপদের সময় বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, গোত্র ও জ্ঞাতি গোষ্ঠীর লোক ও প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে সহানুভূতি তো দূরের কথা তারা বরং আনন্দউল্লাসে ফেটে পড়ে। তারা এমন এমন মন্তব্য করতে থাকে –যা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। অথচ তিনি আপন পর সকলের সাথে সর্বদা সদ্ব্যবহার করেছেন। তাই আল্লাহ তায়ালা এ ক্ষুদ্রতম সূরাটিতে এমন এক সুসংবাদ দিয়েছেন যা দুনিয়ার কোনো মানুষকে কখনো দেয়া হয়নি। এই সাথে এ সিদ্ধান্তও শুনিয়ে দেয়া হলো যে, তাঁর বিরোধিতাকারীগণই ছিন্নমূল হয়ে পড়বে।

‘আবতার’ শব্দটি ‘বাতার থেকে উদ্ভূত যার অর্থ কর্তন করা। কিন্তু পরিভাষায় এ ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। নামাযে যে রাকায়াতের সাথে অন্য কোনো রাকায়াত পড়া হয় না হাদীসে তাকে ‘রুতায়রা’ বলা হয়েছে। আর একটি হাদীসে আছেঃ (আরবী**********************) প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আল্লাহর প্রশংসা ব্যতিরেকে শুরু করা হলে তাহবে ‘আবতার’। অর্থাৎ তার মূল ছিন্ন হবে। সে কাজ সুদৃঢ় হবে না এবং তার পরিণাম ভাল হবে না। যে ব্যক্তি ব্যর্থকাম হয় তাকেও ‘আবতার’ বলে। উপায়-উপাদান থেকে বঞ্চিত ব্যক্তিকে ‘আবতার’ বলা হয়। যার মঙ্গলের কোনো সম্ভাবনানেই এবং যার সাফল্যের সকল আশাই নির্মূল হয়েছে, সেও ‘আবতার’। যে তার আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একেবারে একাকী হয়ে পড়েছে সেও ‘আবতার’। যার কোনো সন্তান-সন্ততি নেই অথবা হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করেছে –তার জন্যে ‘আবতার’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। কারণ তারপরে তার নাম নেবার আর কেউ থাকে না এবং তার নাম-নিশানা মুছে যায়। প্রায় এসব অর্থেই কুরাইশ কাফেরগণ নবী করীম (আ)-কে আবতার বলতো। এটা ছিল না তাদের কথার জবাবে কোনো কথা। বরং প্রকৃতপক্ষে এ ছিল কুরআনের বড়ো গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বানী –যা অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হয়। যে সময়ের এ ভবিষ্যদ্বানী, তখন তো লোকে নবীকেই ‘আবতার’ মনে করো। এবং ধারণাই করা যেতো না যে, কিভাবে কুরাইশদের বড়ো বড়ো সর্দারগণ আবতার হয়ে পড়বে। কারণ শুধু মক্কাতেই নয় –সারা আরবের প্রসিদ্ধ ব্যক্তি তারা ছিল, ছিল সফলকাম। ধন-দৌলত, সন্তান-সন্ততি প্রভৃতি নিয়ামতের অধিকারী তারা ছিল। সারা দেশে তাদের প্রতিনিধি ছিল, তাদের সাহায্যকারী বন্ধু-বান্ধব ছিল। তারা ছিল ব্যবসা বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকারী। হজ্জের ব্যবস্থাপনা তাদের হাতে ছিল বলে সকল আরব গোত্রের সাথে তাদের ব্যাপক সম্বন্ধ-সম্পর্ক ছিল। কিন্তু কয়েক বৎসর অতীত হতে না হতেই অবস্থার পরিবর্তন হয়ে গেল। এমন এক সময় ছিল যখন খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশগন বহু আরব ও ইহুদী গোত্রগুলো নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে এবং নবী পাক (সা)-কে শহরেরপাশে খন্দক নির্মাণ করে প্রতিরোধ করতে হয়। তখন কুরাইশদের কোনো সমর্থক সাহায্যকারী কেউ ছিল না এবং তাদেরকে অসহায় অবস্থায় অস্ত্র সম্বরণ করতে হয়। তারপর এক বছরের মধ্যে গোটা আরব নবীর মুষ্ঠির মধ্যে এসে যায়। দেশের দূর-দূরান্তর ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে দলে দলে লোক এসে নবীর হাতে বায়আত করতে থাকে। তাঁর দুশমন একেবারে বন্ধুহীন হয়ে পড়ে। তারপর তাদের নাম ও নিশানা এমনভাবে মুছে যায় যে, তাদের সন্তান-সন্ততি দুনিয়ায় বেঁচে থাকলেও তাদের মধ্যে কেউ এ কথা জানে না যে, তারা আবু জেহেল, আবু লাহাব,আস বিন ওয়ায়েল অথবা ওকবা বিন আবি মুয়াইত প্রভৃতি ইসলাম দুশমনদের সন্তান। আর জানলেও তারা স্বীকার করতে রাজী নয় যে, তাদের পূর্বপুরুষ এসব লোক ছিল। পক্ষান্তরে রসূলুল্লাহ (সা)-এর সন্তানদের প্রতি আজ সমগ্র দুনিয়া থেকে দরূদ ও সালাম পাঠ করা হয়। কোটি কোটি মুসলমান নবীর বংশ ও তাঁর সাহাবীদের বংশের সাথে সম্পর্কের জন্যে গৌরব ও সম্মানবোধ করে। কেউ সাইয়েদ, কেউ উলুবী, কেউ আব্বাসী, হাশেমী, সিদ্দিকী, ফারুকী, ওসমানী, যুবায়রী অথবা আনসারী। কিন্তু আবু জেহেল অথবা লাহাবী কোনো নাম শুনতে পাওয়া যায় না। ইতিহাস এ কথা প্রমাণিত করেছে যে, ‘আবতার’ নবী পাক (সা) ছিলেন না, বরং তাঁর দুশমন ছিল ‘আবতার’ এবং এখনো আছে।[(আরবী********) এখানে (আরবী******) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার উৎপত্তি (আরবী******) থেকে। যার অর্থ হিংসা ও শত্রুতা যার কারণে অন্যের প্রতি অসদাচরণ করা। কুরআনের অন্য এক স্থানে বলা হয়েছেঃ (আরবী********) এবং (হে মুসলমানগণ) কোনো দলের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে এতটা বাড়াবাড়ি করতে না দেয় যে, তোমরা অন্যায় করে বস। অতএব (আরবী*******) এর প্রত্যেক ঐ ব্যক্তি যে রসূলুল্লাহ (সা) –এর শত্রুতায় এতটা অন্ধ হয়ে পড়েছে যে, তাঁর বদনাম করে, তাঁর বিরুদ্ধে কটুক্তি করে, তাঁকে লাঞ্ছিত করে এবং নানা ধরনের গালি দিয়ে মনের ঝাল মিটাবে।]

কাওসারের সুসংবাদের পারলৌকিক দিক

হাউযে কাওসার সম্পর্কে নবী (সা) যা বলেছেন তা নিম্নরূপঃ

একঃ কেয়ামতের প্রচণ্ড দিনে প্রত্যেকে যখন তৃষ্ণায় ছটফট করতে থাকবে, তখন হাউযে কাওসার নবী করীম (সা)-কে দান করা হবে। নবীর উম্মত হাউযের নিকটে নবীর সাথে মিলিত হয়ে হাউয থেকে পানি পান করে পরিতৃপ্ত হবে। সকলের আগে নবী পাক সেখাতে উপস্থিত হয়ে মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করবেন। নবী বলেন, (আরবী*************) ‘এ এমন এক হাউয বা চৌবাচ্চা যেখানে কেয়ামতের দিনে আমার উম্মত গিয়ে পৌছবে’ (মুসলিম, আবু দাউদ)। (আরবী*********) ‘আমি তোমাদের সকলের আগে হাউযের কাছে পৌঁছে যাব’।–(বুখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪১৯ পৃষ্ঠায়)

“আমি তোমাদের আগে সেখানে পৌঁছব এবং তোমাদের জন্যে সাক্ষ্য দেব। খোদার কসম –আমি আমার হাউয এখন দেখতে পাচ্ছি”।–(বুখারী)

একবার নবী আনসারদেরকে সম্বোধন করে বলেনঃ

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪১৯ পৃষ্ঠায়)

“আমার পরে তোমরা স্বার্থপরতা ও স্বজনপ্রীতির সম্মুখীন হবে। তখন তোমরা ধৈর্য ধারন করবে। অতপর আমার সাথে হাউযে কাওসারে এসে মিলিত হবে”।–(বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি)

(আরবী**********) ‘কেয়ামতের দিনে আমি হাউযের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করব’ (মুসলিম)। হযরত আবু বারযাহ আসলামী (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি হাউয সম্পর্কে নবী (সা)-এর কাছে কিছু শুনেছেন কি? তিনি বলেন, একবার দু’বার তিনবার, চারবার নয় –বহুবার শুনেছি। যে এটাকে মিথ্যা মনে করবে, আল্লাহ তাকে তার পানি থেকে বঞ্চিত করবেন। -(আবু দাউদ)

উবায়দুল্লাহ বিন যিয়্যাদ হাউয সম্পর্কিত বর্ণনাগুলোকে মিথ্যা মনে করতো। এমনকি সে আবু বারযা আসলামী (রা), বারা বিন আযেব (রা) এবং আয়েয বিন আমর (রা)-এর সকল বর্ণনা মিথ্যা বলেছে। অবশেষে আবু সাবরা একটি বিবরণ বের করে আনেন যা তিনি আমর বিন আসের নিকটে শূন্যে লিপিবদ্ধ করেন। তার মধ্যে নবী পাক (সা)-এর এ কথা লিখিত ছিলঃ (আরবী********) ‘মনে রেখো, আমার সাথে তোমাদের সাক্ষাতের স্থান হচ্ছে হাউযে কাওসার’।–(মুসনাদে আহমদ)

দুইঃ এ হাউযের প্রশস্ততা সম্পর্কে বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বিভিন্ন বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ রেওয়ায়াতে এ কথা আছে যে, এর দৈর্ঘ্য আয়লা (ইসরাঈলের বর্তমান পোতাশ্রয় আয়লাত) থেকে ইয়ামেনের সানআ পর্যন্ত অথবা আয়ালা থেকে আদান পর্যন্ত অথবা আম্মান থেকে আদন পর্যন্ত। তার প্রস্থ আয়লা থেকে হুজফা (জেন্দা এবং রাবেগের মধ্যবর্তী স্থান) পর্যন্ত (বুখারী, আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, মুসলিম, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)।

এর থেকে অনুমান করা যায় যে, বর্তমান লোহিত সাগরকেই হয়ত হাউযে কাওসারে পরিণত করা হবে। আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে ভাল জানেন।

তিনঃ এ হাউয সম্পর্কে নবী বলেন, বেহেশতের কাওসার নামক নদী থেকে পানি এনে এ হাউযে ঢালা হবে। (আরবী**********) অন্যত্র (আরবী*************) অর্থাৎ বেহেশত থেকৈ দু’টি নালা এর সাথে সংযুক্ত করা হবে পানি সরবরাহ করার জন্যে (মুসলিম)

আর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে (আরবী********************) ‘বেহেশতের নাহরে কাওসার থেকে একটি নালা এ হাউযের দিকে খুলে দেয়া হবে’।–(মুসনাদে আহমদ)

চারঃ নবী করীম (সা) এর বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, এর পানি দুধ অথবা চান্দি থেকে সাদা, বরফ থেকে অধিক ঠাণ্ডা এবং মধু থেকে অধিকতর মিষ্টি। তার তলদেশের মাটি মিশক থেকে অধিকতর সুগন্ধ। তার ওপরে আকাশের তারার ন্যায় অসংখ্য কুঁজো রক্ষিত থাকবে। যে ব্যক্তি একবার এ পানি পান করবে তার কোনো দিন আর পিপাসা লাগবে না। এর থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত থাকবে সে কোনো দিন পরিতৃপ্ত হবে না। সামান্য শাব্দিক গরমিলসহ এ কথা বহু হাদীসে বর্ণিত হয়েছে (বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ, আবু দাউদ)।

পাঁচঃ এ সম্পর্কে নবী করীম (সা) বার বার লোকদেরকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা আমার রীতিনীতি পরিবর্তন করবে, তাদেরকে এ হাউয থেকে দূরে রাখা হবে এবং তাদেরকে এখানে আসতে দেয়া হবে না। আমি বলবো যে, এরা আমার সঙ্গী-সাথী। তখন বলা হবে, আপনার জানা নেই যে, তারা আপনার কর কি করেছিল। তারপর আমিও তাদের প্রতিরোধ করব এবং বলব –তোমরা দূরে সরে যাও। একথা বহু রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে (বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ)।

ইবনে মাজাহ এ বিষয়ে যে হাদীস বর্ণনা করেছে তার ভাষা বড় মর্মান্তিক।

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২০ পৃষ্ঠায়)

“মনে রেখ, তোমাদের পূর্বেই আমি হাউযে পৌঁছে যাব। অন্যান্য উম্মত থেকে তোমাদেরকে নিয়ে আমার উ্ম্মত অধিকসংখ্যক হবে বলি আমি গর্ববো করব। সাবধান থেকো, কিছু লোককে আমি ছাড়িয়ে আনব এবং কিছু লোক আমার থেকে ছাড়িয়ে নেয়া হবে। তখন আমি বলব, পরওয়ারদেগার! এরা তো আমার সাহাবী। তিনি বলবেন, তুমি জান না তোমার পরে তারা কি ধরনের কাজ করেছে”।–ইবনে মাজাহ বলেন, এ কথাগুলো নবী আরাফাতের খুৎবার মধ্যে বলেছিল।

ছয়ঃ এমনিভাবে হুযুর (সা) তাঁর আপন সময়কাল থেকে কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী মুসলমানরেদকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, যারাই আমার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে চলবে এবং আমার রীতিনীতি পরবির্তন করবে, তাদেরকে হাউয থেকে বহিস্কৃত করা হবে। আমি বলব, হে আমার রব! এরা তো আমার। এরা আমার উ্ম্মত। তার জবাবে বলা হবে, আপনার জানা নেই যে, আপনার পর তারা কি কি পরিবর্তন করেছে এবং উল্টো পথে চলেছে। নবী বলেন, তারপর আমি তাদের প্রতিরোধ করব এবং হাউযের কাছে আসতে দিব না।

এ বিষয়ের ওপর বহু প্রার্থনা হাদীসে পাওয়া যায়।–(বুখারী, মুসলিম, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ দ্রষ্টব্য)

এ হাউযের বর্ণনা পঞ্চাশজন সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে। পূর্ববর্তী ইসলামী মনীষীগণ এ হাউযকে হাউযে কাওসারই মনে করেছেন। ইমাম বুখারী তাঁর কিতাবুর রেকাকের শেষ অধ্যায়ে শিরোনাম দিয়েছেনঃ (আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২১ পৃষ্ঠায়)

হযরত আনাস (রা)-এর একটি রেওয়ায়াতে এ বিশ্লেষণ রয়েছে যে, নবী পাক (সা) কাওসার সম্পর্কে বলেনঃ (আরবী*************) এ হলো সেই হাউয যেখানে আমার উম্মত সমবেত হবে।

বেহেশতে কাওসার নামক যে স্রোতস্বিনী রসূলুল্লাহ (সা)-কে দান করা হবে তার বিবরণও বহু হাদীসে রয়েছে। হযরত আনাস (রা) থেকেও বহু বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে –যাতে তিনি বলেন, মেরাজের রাতে নবীকে বেহেশতে ভ্রমণ করানো হয়েছিল। এ সময়ে তিনি একটি নদী দেখতে পান –যার তীর হীরকখচিত কোব্বা নির্মিত ছিল। তার তলার মাটি মিশকের মতো সুগন্ধ। হুযুর (সা) জিবরাইল অথবা সঙ্গের ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করেন –ওটা কি। জবাবে বলা হয়, এ হচ্ছে নহরে কাওসার –যা আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দান করেছেন।–(মুসনাদে আহমদ, বুখারী, মুসলিম, আবু দ্উদ, তিরমিযি প্রভৃতি)।

হযরত আনাস (রা) বলেন, এক ব্যক্তি নবীকে জিজ্ঞেস করলো কাওকার কি? তদুত্তরে নবী বলেন, এ একটি নহর যা আল্লাহ আমাকে বেহেশতে দান করেছেন। তার মাটি মিশকের মতো সুবাসিত, পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধু থেকে মিষ্টি (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী)। ইবনে জারীর মুসনাদে আহমদের আর একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, হুযুর (সা) নহরে কাওসারের গুণ বর্ণনা করে বলেন, তার তলায় পাথরের পরিবর্তে মণি-মাণিক্য সজ্জিত রাখা আছে। ইবনে ওমর (রা) বলেন, নবী পাক (সা) বলেছেন, কাওসার বেহেশতের একটি নহর বা নদী। তার তীর স্বর্ণনির্মিত। এ মণি-মাণিক্যের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। অর্থাৎ প্রস্তুরখণ্ডের স্থনে সেখানে হীরা ও মণি-মাণিক্য পড়ে রয়েছে। তার মাটি মিশক থেকে বেশী সুগন্ধি। তার পানি দুধ থেকে বেশী সাসা, বরফ থেকে বেশী ঠাণ্ডা এবং মধু থেকে বেশী মিষ্টি। (মুসনাদে আহমদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে আবি হাতিম, দারেমী, আবু দাউদ, ইবনুল মুনযের, ইবনে মারদুইয়া, ইবনে আবি শায়বাহ)। উসামা বি যায়েদ (রা) বলেন, একবার নবী (সা) হযরত হামযা (রা)-এর গৃহে তশরিফ নিয়ে যান। তিনি ঘরে ছিলেন না। তাঁর স্ত্রী হুযুরের মেহমানদারি করেন। তিনি বলেন, আমার স্বামী আমাকে বলেছেন যে, বেহেশতে আপনাকে একটি নহর দান করা হয়েছে যার নাম কাওসার। তদুত্তরে নবী বলেন, হাঁ ঠিক তার মাটি ইয়াকুত ও বিভিন্ন মণি-মাণিক্যের তৈরী। এসব বর্ণনা ছাড়াও সাহাবা এবং তাবেঈনের বহু সংখ্যক উক্তি হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে –যাতে কাওসার বলতে বেহেশতের এ নদী বা নহরকে মনে করা হয়েছে এবং তার ঐসব গুণাবলীই বলা হয়েছে যা ওপরে বর্ণিত হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত আনাস বিন মালেক (রা), হযরত আয়েশা (রা), মুজাহিদ এবং আবুল আলীয়ার উক্তি মুসনাতে আহমদ, বুখারী, তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে মারদুইয়া, ইবনে জারীর, ইবনে আবি শায়বাহ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবু লাহাবের ভয়াবহ পরিণাম

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২২ পৃষ্ঠায়)

“আবু লাহাবের হাত ভেঙে গেছে এবং সে বিফল মনোরথ হয়েছে”।

কোনো কোনো তাফসীরকার (আরবী****************) –এর অর্থ করেছেন ‘ভেঙে যাক আবু লাহাবের হাত’ এবং (আরবী****************) –এর অর্থ করেছেন, ‘সে ধ্বংস হয়ে যাক’ অথবা ‘সে ধ্বংস হয়েছে’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ কোনো বদদোয়া বা অভিসম্পাত নয় যা তাকে দেয়াহয়েছিল। বরং এ ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণী যার জন্যে ভবিষ্যতে সংঘঠিত হবে এমন কিছকে অতীত ক্রিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। তার হওয়াটা এত নিশ্চিত যে, যেন তা হয়েই গেছে। প্রকৃতক্ষে তা হয়েছিলও যা ক’বছর আগে এ সূরায় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। হাত ভেঙে যাওয়ার অর্থ শরীরের অংশ হাত ভেঙে যাওয়া নয়। বরং কোনো লোকের ঐসব কাজে বিফল মনোরথ হওয়া –যার জন্যে সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। আবু লাহাব রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইসলামী দাওয়াত নস্যাৎ করে দেয়ার জন্যে সকল শক্তি নিয়োজিত করে। কিন্তু এ সূরা নাযিল হওয়ার সাত-আট বছর যেতে না যেতেই বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের অধিকাংশ নেতৃবৃন্দ নিহত হয় যারা নবীর শত্রুতা সাধনে আবু লাহাবের সহযোগী ছিল। তাদের এ পরাজয়ের সংবাদ যখন মক্কায় পৌঁছলো তখন আবু লাহাব এতটা মর্মাহত হলো যে, সাত দিনের বেশী বেঁচে থাকবে পারলো না। তার মৃত্যুটাও ছিল বিরাট শিক্ষণীয়। সে Malignant Pastule রোগে আক্রান্ত হয় যার জন্যে তার পরিবারের লোকজন তাকে ফেলে রেখে সরে পড়েছিল। কারণ তার এ সাংঘাতিক ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে আতঙ্কিত ছিল। মৃত্যুর পর তিন দিন পর্যন্ত তার কাছে কেউ গেল না। তার লাশ পচে দুর্গন্ধময় হয়ে গেল। এ নিয়ে লোকে তার ছেলেদেরকে তিরস্কার করতে লাগলো, তখন তারা কয়েকজন হাবশীকে দিয়ে তার লাশ উঠিয়ে তাদের দ্বারা দাফন করে। এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, একটা গর্ত খনন করে কাঠের সাহায্যে লাশ গর্তে নিক্ষেপ করা হয় এবং তার ওপর মাটি পাথর চাপা দেয়া হয়। তার অতিরিক্ত ও পরিপূর্ণ পরাজয় আর একদিক দিয়ে হয় এবং তা এই যে, যে দ্বীনের পথ রুদ্ধ করার জন্যে সে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল, তার সন্তানগণ সে দ্বীন গ্রহণ করে। সর্বপ্রথম তার কন্যা দুররাহ মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় পৌঁছে এবং ইসলাম গ্রহণ করে। অতপর মক্কা বিজয়ের সময়ে তার উভয় পুত্র ওতবা এবং মুয়াত্তাব হযরত আব্বাস (রা)-এর মধ্যস্থতায় নবী (সা)-এর সামনে হাযির হয় এবং ঈমান আনার পর নবী (সা)-এর হাতে বায়আত করে।

নবীকে বহিস্কার করার জন্যে মক্কাবাসীদের শাস্তি

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২২ পৃষ্ঠায়)

“এ ভূখণ্ড থেকে তোমাকে উৎখাত করে এখান থেকে বহিস্কার করার জন্যে তারা বদ্ধপরিকর হয়েছিল। কিন্তু যদি তারা এরূপ করে তাহলে তোমার পরে স্বয়ং তারা এখানে বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না”।–(বনী ইসরাঈলঃ ৭৬)

এ সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী যদিও সে সময় একটা হুমকি মনে করা হচ্ছিল কিন্তু দশ এগারো বছরের মধ্যে তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য পরিণত হয়। এ সূরা নাযিল হওয়ার এক বছর পরে নবী (সা)-কে তারা মক্কা থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। তারপর আট বছরের বেশিকাল অতিবাহিত না হতেই তিনি বিজয়ীর বেশে মক্কা প্রবেশ করেন। তারপর দু’বছরের মধ্যেই সমস্ত আরব ভূখণ্ডে মুশরিকদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। যারাই তখন আরবে অবস্থান করছিল মুসলমান হিসেবেই করছিল। মুশরিকদের কোনো স্থানই সেখানে ছিল না।

কুরাইশ দলের পরাজয়

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৩ পৃষ্ঠায়)

“অতি শীগগির এ দল পরাজয়বরণ করবে এবং তাদেরকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করতে দেখা যাবে”।–(সূরা আল কামারঃ ৪৫)

হিজরতের পাঁচ বছর আগে এ সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, যে কুরাইশ দল নিজের শক্তির গর্বে ধরাকে সরা জ্ঞান করতো তারা শীগগির মুসলমানদের নিকটে পরাজয়বরণ করবে। কেউ তখন এ ধারণাই করতে পারতো না যে, অদূর ভবিষ্যতে কিভাবে এ বিপ্লব সাধিত হবে। মুসলমানদের দূরবস্থা এমন ছিল যে, তাদের একদল দেশ ত্যাগ করে আবিসিনিয়ায় হিজরত করে এবং অবশিষ্ট ঈমানদার শেয়াবে-আবি তালেবের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়েছিল। কুরাইশগণ তাঁদের সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে পর্বত গুহায় তাঁদেরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল বলে তাঁরা অনাহারে মরছিলেন। এ অবস্থায় কে এ ধারণা করতে পারতো যে,সাত বছরের মধ্যে পট পরিবর্তন হয়ে যাবে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা)-এর শাগরিদ একরামার বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ওমর (রা) বলেন, যখন সূরা কামারের এ আয়াত নালি হয় তখন আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম যে, এ আবার কোন দল যে, পরাজিত হবে। কিন্তু বদরের যুদ্ধে যখন কাফেরগণ পরাজিত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন দেখলাম যে, আল্লাহর রসূল (সা) যুদ্ধের পোশাক পরিহিত অবস্থায় সামনের দিকে এগুচ্ছিলেন এবং তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এ কথাগুলো বেরিয়ে আসছিলঃ

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৩ পৃষ্ঠায়)

“তখন আমি বুঝলাম যে, এটাই হচ্ছে সেই পরাজয় যার সংবাদ আগে দেয়া হয়েছিল”।–(ইবনে জারীর ইবনে আবি হাতিম)

মক্কা বিজিত হবে

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৩ পৃষ্ঠায়)

“আমাদের সেনাগণ অবশ্যই বিজয়ী হবে”।–(সূরা আস সাফফাতঃ ১৭৩)

অর্থাৎ কুরাইশ কাফেরগণ অল্পকাল মধ্যেই নিজেদের পরাজয় এবং তোমাদের বিজয় সচক্ষে দেখতে পাবে। যেমনভাবে বলা হয়েছিল তেমনিই ঘটলো। এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার চৌদ্দ-পনেরো বছর পরেই মক্কার কাফেরগণ নবী (সা)-কে বিজয়ের বেশে মক্কা প্রবেশ করতে নিজ চোখে দেখতে পেলো। অতপর কয়েক বছর পর তারা এটাও দেখলো যে, ইসলাম শুধু মক্কার ওপরেই নয় –রোম ও ইরান সাম্রাজ্যের ওপর আধিপত্য বিস্তার করলো।

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৪ পৃষ্ঠায়)

এ স্থান বলতে মক্কার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ যে স্থানে এসব লোক (কুরাইশ কাফেরগণ) বড় বড় কথা বলছে, সেখানেই তারা একদিন পরাজয়বরণ করবে। এখানেই তাদের জন্যে সে সময় আসবে যখন তারা নতশিরে নবীর সামনে দাঁড়াবে যাঁকে আজ তারা হেয় মনে করে নবী বলে মেনে নিতে অস্বীকার করছে।

কুরআনের দাওয়াত চারদিকে অবশ্যই ছড়িয়ে পড়বে

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৪ পৃষ্ঠায়)

“অতি শীগগিরে আমি তাদেরকে ঊর্ধ্বজগতে ও তাদের আপন সত্তার মধ্যে আমার নিদর্শন দেখাবো। অতপর তাদের কাছে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কুরআন প্রকৃতপক্ষে এক মহাসত্য”।–(সূরা হা-মীম আস-সাজদাহঃ ৫৩)

অর্থাৎ অবিলম্বে তারা আপন চোখে দেখতে পাবে যে, এ কুরআনের দাওয়াত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এরা স্বয়ং তার সামনে নতশির।সে সময়ে তারা বুঝতে পারবে যে, আজ যা কিছু তাদেরকে বলা হচ্ছে এবং যা তারা মানতে অস্বীকার করছে তা একেবারে সত্য।

কিছু লোক প্রশ্ন তুলছে যে, কোনো দাওয়াতের বিজয়ী হওয়া এবং বিরাট বিরাট এলাকা জয় করে নেয়া তার সত্য হওয়ার প্রমাণ হয়। বাতিল দাওয়াতও চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার অনুসারীগণও দেশের পর দেশ জয় করে চলে।

আসলে বিষয়টির সামগ্রিক দিকের ওপর গভীর মনোনিবেশ না করে তার বাহ্যিক দিকের ওপর এ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নবী করীম (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ইসলামের যে আশ্চর্য ধরনের বিজয় লাভ হয়েছিল তা নিছক এ অর্থে আল্লাহর নিদর্শন ছিল না যে, মুসলমানগণ দেশের পর দেশ জয় করেছিল। বরং এ অর্থে যে, এ বিজয় অন্যান্য বিজয়ের মতো ছিল না। অন্যান্য বিজয়ের অবস্থা এই যে, কোনো ব্যক্তি, পরিবার অথবা জাতি বিজয় লাভের পর বিজিতদের জীবন ও ধন-সম্পদের মালিক হয়ে বসে এবং খোদার যমীন যুলুম অত্যাচারে ভরে যায়। পক্ষান্তরে ইসলামের বিজয় তার সাথে বয়ে এনেছিল এক বিরাট ধর্মীয়, নৈতিক, মানসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং তাহযিব-তামাদ্দুন সম্পর্কিত বিপ্লব। এ বিপ্লবের প্রভাব যেখানেই পৌঁছেছে, মানুষের সর্বোত্তম গুণাবলীর বিকাশ ঘটছে এবং অসৎ গুণাবলী দমিত হয়েছে। দুনিয়া যেসব গুণাবলী সংসার ত্যাগী দরবেশ এবং নীরবে আল্লাহ আল্লাহ যিকিরকারীদের মধ্যে দেখতে চেয়েছিল এবং কখনো এ চিন্তা করতে পারেনি যে, দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালনাকারীদের মধ্যেও এসব গুণাবলী পাওয়া যেতে পারে। সেসব চারিত্রিক গুণাবলী এ বিপ্লবের বদৌলতে দেখতে পাওয়া গেল শাসকের রাজনীতিতে, আদালতের সুবিচার, সেনানায়কদের যুদ্ধ ও বিজয় লাভে, কর আদায়কারীদের মধ্যে, বিরাট বিরাট ব্যবসায় মালিকদের মধ্যে। এ বিপ্লব তার প্রতিষ্ঠিত সমাজে সাধারণ মানুষের চরিত্র, কর্মকুশলতা ও পবিত্রতার দিক দিয়ে এতো উন্নীত করে যে, অন্যান্য সমাজের প্রখ্যাত ব্যক্তিগণও নিম্নস্তরের মনে হয়েছে। ইসলাম মানুষকে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের শৃঙ্খলামুক্ত করে বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও যুক্তিসঙ্গত চিন্তাভাবনা ও কাজের রাজপথে এনে দিয়েছে। অন্যান্য সমাজ ব্যব্থা যেসব সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ের কোনো চিন্তা-ভাবনাই করে না, ইসলাম তার চিকিৎসার সুব্যবস্থা করেছে। অথবা তারা চিকিৎসার চিন্তা করলেও এ ব্যাপারে সফলকাম হতে পারেনি। যেমন ধরুন, বর্ণ, বংশ, মাতৃভূমি, ভাষা প্রভৃতির ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ, একই সমাজে শ্রেণী বিভাগ এবং তাদের মধ্যে উঁচু-নীচের পার্থক্য, ছুঁৎমার্গ, আইনগত অধিকার এবং ব্যবহারিক সামাজিকতায়, সাম্যের অভাব, নারীর লাঞ্ছনাময় জীবন এবং মৌলিক অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিতকরণ, অপরাধের আধিক্য, মদ এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্যাদির সাধারণ প্রচলন, সরকারের সমালোচনার ঊর্ধে থাকা, মৌলিক অধিকার থেকে জনগণকেও বঞ্চিত রাখা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চুক্তির অবমাননা, যুদ্ধে পৈশাচিক আচরণ এবং এ ধরনের বিভিন্ন প্রকারের ব্যাধি, স্বয়ং আরব ভূ-খণ্ডে এ বিপ্লব দেখতে দেখতে অরাজকতার স্থানে খোদাভীতি ওপবিত্রতা, অন্যায়-অবিচারের স্থানে সুবিচার, অপবিত্রতা ওঅসভ্যতার স্থলে পবিত্রতা ও সভ্যতা, অজ্ঞতার স্থলে জ্ঞান লাভ, বংশানুক্রমিক দ্বন্দ্ব কলহের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব ও প্রেম ভালবাসা সৃষ্টি করল। উপরন্তু যে জাতির লোক আপন গোত্রীয় নেতৃত্বের বেশী কিছু চিন্তাও করতে পারতোনা, তাদেরকে দুনিয়ার নেতৃত্ব দান করা হলো। এসব ছিল সেসব নিদর্শন –যা ঐ বংশধরগণ তাদের আপন চোখে দেখতে পেয়েছিল যাদেরকে সম্বোধন করে নবী (সা) প্রথমে এ আয়াত পড়ে শুনিয়েছিলেন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা এ নিদর্শনাবলী ক্রমাগত দেখিয়ে চলেছেন। মুসলমানগণ তাদের পতন যুগেও চরিত্রের যে মহত্ব প্রদর্শণ করেছে তার ধারে কাছেও তারা পৌঁছতে পারেনি –যারা সভ্যতা ও ভদ্রতার ধারক-বাহক বলে গর্ব করে বেড়াচ্ছে। ইউরোপীয় জাতিসমূহ আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়া এবং স্বয়ং ইউরোপের বিজিত জাতিসমূহের সাথে যে উৎপীড়নমূলক আচরণ করেছে, মুসলমানদের ইতিহাসের কোনো কালেও তার নজীর পেশ করা যাবে না। এ শুধুমাত্র কুরআন পাকেরই বরকত যা মুসলমানদের মধ্যে এতোটা মনুষ্যত্বেোধ সৃষ্টি করেছিল যে, তারা বিজয়ী হওয়ার পরও ততটা অত্যাচারী হিসেবে দেখা গেছে এবং এখনো দেখা যাচ্ছে। কারো চোখ থাকলে সে দেখুক যে, স্পেনে মুসলনামগণ কয়েকশ’ বছর শাসন করেছে কিন্তু সে সময়ে খৃষ্টানদের সাথে তারা কোন ধরনের আচরণ করেছ। তারপর খৃষ্টানরা যখন সেখানে ক্ষমতা লাভ করলো তখন তারা মুসলমানদেরসাথে কি ব্যবহার করেছে। ভারতে আটশ’ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেও মুসলমানগণ হিন্দুদের সাথে কোন ধরনের আচরণ করেছে। আর এখন হিন্দু সেখানে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মুসলমানদের সাথে কি ব্যবহার করছে। ইহুদীদের সাথে বিগত তেরশ’ বছর মুসলমানদের আচরণ কি ছিল। আর এখন ফিলিস্তিনে তারা মুসলমানদের সাথে কোন ধরনের আচরণ করছে।

নবী পাকের জন্যে উচ্চ মর্যাদা

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৬ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী!) নিশ্চিত জেনে রাখ যে, যিনি এ কুরআন তোমার ওপরে ফরয করেছেন তিমি তোমাকে এক সর্বোৎকৃষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছাবেন”।–(সূরা কাসাসঃ ৮৫)

আসল শব্দগুলো হচ্ছে (আরবী*********) তোমাকে একটি ‘মায়াদের’ দিকে ফিরিয়ে দিবেন। মায়াদ (আরবী******) এর আভিধানিক অর্থ এমন স্থান যেদিকে সর্বশেষে মানুষকে প্রত্যাবর্তন করতে হয়। এ পদটি Indefinite (অনির্দিষ্ট) হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় স্বভাবতঃই তার মর্ম এই হয় যে, স্থানটি অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন। কোনো কোনো তফসীরকার তার অর্থ করেছেন বেহেশত। কিন্তু একে বেহেশতের সাথে নির্দিষ্ট করে দেয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং একে সাধারণ অর্তে ব্যবহার করেছেন –তাই হতে দেয়া উচিত যাতে করে এ স্থানের প্রতিশ্রুতি দুনিয়া এবং আখেরাতের জন্যে প্রযোজ্য হতে পারে। আলোচ্য বিষয়ের পূর্ব প্রসঙ্গও এটাই দাবী করে যে, শুধু আখেরাতেই নয় বরং দুনিয়াতেও নবী মুস্তফা (সা)-কে শেষ পর্যন্ত বিরাট মর্যাদা দানের প্রতিশ্রুতি হিসেবে এটাকে মনে করতে হবে। মক্কার কাফেরদের যে কথার ওপরে ৫৭ আয়াত থেকে এ পর্যন্ত ক্রমাগত যে আলোচনা চলে আসছে তাতে তারা বলেছিল, ‘হে মুহাম্মদ (সা) তুমি তোমার সাথে আমাদেরকেও নিয়ে ডুবতে চাচ্ছ। যদি আমরা তোমাকে সমর্থন করি এবং তোমার দ্বীন গ্রহণ করি তাহলে আবর ভূ-খণ্ডে আমাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে’। তার জবাবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে বলেন, ‘হে নবী! যে খোদা এ কুরআনের পতাকাবাহী হওয়ার দায়িত্ব তোমার ওপর অর্পণ করেছেন, তিনি তোমাকে ধ্বংস করবেন না। বরং তোমাকে এমন মর্যাদায় ভূষিত করবেন যার ধারণাও এ লোকেরা করতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালা কয়েক বছর পরই এ দুনিয়ার বুকেই তাদের চোখের সামনে নবী (সা)-কে সমগ্র আরব ভূখণ্ডের একচ্ছত্র আধিপত্য দান করে দেখিয়ে দিলেন যে, তাঁকে প্রতিরোধ করার কোনো শক্তিই টিকে থাকতে পারল না এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দ্বীনেরও কোনো স্থান সেখানে রইলো না। সমগ্র আরব ভূখণ্ডে এমন এক ব্যক্তির একচ্ছত্র বাদশাহী কায়েম হয়েছে যে, তার প্রতিদ্বন্দ্বি কেউ ছিল না এবং মানুষ শুধু তার রাজনৈতিক আধিপত্যই মেনে নেয়নি বরং সে ব্যক্তি সকল দ্বীনের অবসান ঘটিয়ে গোটা জাতিকে তার দ্বীনের অনুসারী বানিয়েছে আরবের ইতিহাসে ইতিপূর্বে এমন কোনো নজীর ছিল না।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর জন্যে মাকামে মাহমুদ

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪২৬ পৃষ্ঠায়)

“অতি শীগগির তোমার প্রভু তোমাকে ‘মাকামে মাহমুদে’ অধিষ্ঠিত করবেন”।

অর্থাৎ দুনিয়া ও আখেরাতে তোমাকে এমন মর্যাদায় ভূষিত করবেন যেখানে তুমি হবে সমগ্র সৃষ্টির প্রশংসিত। চারদিক থেকে তোমার প্রতি প্রশংসা ও শ্রদ্ধা করা হবে এবং তোমার সত্তা একটি প্রশংসনীয় সত্তায় পরিণত হবে। আজ তোমার বিরুদ্ধবাদীরা তোমার অভ্যর্থনা করে গালি ও বর্ৎসনা দ্বারা এবং সারা দেশে তোমর দুর্নাম করার জন্যে মিথ্যা অভিযোগের ঝড় সৃষ্টি করে রেখেছে। কিন্তু সে সময় বেশী দূরে নয়, যখন দুনিয়ায় তোমার প্রশংসার গুঞ্জরণ শুনা যাবে এবং আখেরাতেও তুমি সকল সৃষ্টির দ্বারা প্রশংসিত হবে। কেয়ামতের দিনে শাফায়াতকারী হিসেবে নবী মুস্তাফা (সা)-এর মর্যাদা লাভ তাঁর মাহমুদিয়াতের (প্রশংসিত হওয়ার) একটা অংশ।

পরাজিত রোম সাম্রাজ্যের জন্যে জয়লাভের সুসংবাদ

সূরা রুমের প্রাথমিক আয়াতগুলোতে যে ভবিষ্যদ্বানী করা হয়েছে তা করআন আল্লাহর কালাম হওয়ার এবং মুহাম্মদ মুস্তফা (সা) আল্লাহর সত্য নবী হওয়ার সুস্পষ্ট সাক্ষ্যগুলোর অন্যতম। এ কথা বুঝতে হলে সে সময়ের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর প্রতি নজর দেয়া বিশেষ প্রয়োজন যা এ সূরার আয়াতগুলোর সাথে সম্পৃক্ত।

নবী মুস্তফা (সা)-এর নবুাতের আট বছর পূর্বের ঘটনা এই যে, রোম সম্রাট মরিসের (Marice) বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয় এবং ফোকাস (Phicas) নামে জনৈক ব্যক্তি সিংহাসনে আরোহন করে। সে ব্যক্তি সম্রাটের চোখের সামনে তাঁর পাঁচ পুত্রকে হত্যা করে। অতপর পিতাকে হত্যা করে পিতা-পুত্রের ছিন্ন মস্তকগুলো কনস্ট্যান্টিনোপলে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখে। তার ক’দিন পর তার স্ত্রী এবং তিন কন্যাকেও হত্যা করা হয়। এ ঘটনারপর ইরান সম্রাট খসরু পারভেজ রোম সাম্রাজ্যে আক্রমণ করার নৈতিক অজুহাত পেয়ে গেলেন। মরিস তাঁর শুভাকাঙ্খী ছিলেন এবং তাঁর সাহায্য সহযোগিতায় পারভেজ ইরানের সিংহাসন লাভ করেন। পারভেজ তাঁকে পিতার মতো মনে করতেন। এ জন্যে তিনি ঘোষণা করেন যে, হানাদার ফোকাস তাঁর পিতৃতুল্য মরিস ও তাঁর পরিবারের প্রতি যে পৈশাচিক আচরণ করেছে তিনি তাঁর প্রতিশোধ নেবেন। ৬০৩ খৃষ্টাব্দে তিনি রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং এভাবে এশিয়া মাইনরের এডিসা (বর্তমান উর্ফা) পর্যন্ত এবং অন্যদিকে সিরিয়ার হালব ও এন্তাকিয়া পর্যন্ত পৌঁছেন। রোমীয় শাসকগণ যখন দেখলো যে, ফোকাস দেশ রক্ষা করতে পারছে না তখন তারা আফ্রিকার গভর্নরের কাছে সাহায্যপ্রার্থী হলো। সে তার পুত্র হেরাক্লিয়াসকে (Heraclius) একটা শক্তিশালী বাহিনী সহ কনস্ট্যান্টিনোপলে পাঠিয়ে দিল। সে পৌচামাত্র ফোকাসকে সিংহাসনচ্যুত করলো। তার স্থলে হেরাক্লিয়াসকেই রোমের কায়সার বা শাসক বানানো হলো। ক্ষমতালাভের পর সে ফোকাসের সাথে ঠিক ঐরূপ আচরণ করলো –যেমন ফেকাস মরিসের প্রতি করেছিল। এ হলো ৬১০ খৃষ্টাব্দের ঘটনা এবং ঠিক এ বছরই নবী মুহাম্মদ (সা)-কে নবুয়াতের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছিল।

খসরু পারভেজ যে নৈতিক অজুহাতে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ফোকাসের সিংহাসনচ্যুতি ও হত্যার পর তা শেষ হয়ে গেল। তাঁর যুদ্ধের উদ্দেশ্য যদি ফোকাসের অত্যাচার উৎপীড়নের প্রতিশোধ নেয়াই হতো, তাহলে তার নিহত হওয়ার পর নব নিযুক্ত কায়সারের (হেরাক্লিয়াস) সাথে তাঁর সন্ধি করা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি যুদ্ধ অব্যাহত রাখরেন। ঈসায়ীদের যে সম্প্রদায়গুলোকে (নাস্তুরী, ইয়াকুবী প্রভৃতি) সরকারী গীর্জা নাস্তিক বলে আখ্যায়িত করে তাদের ওপর বছরের পর বছর ধরে উৎপীড়ন চালিয়ে আসছিল তারা মজুসী আক্রমণকারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়লো এবং ইহুদীরাও মজুসীদের সাথে হাত মিলালো। এমনকি খসরু পারভেজের সেনাবাহিনীতে যোগদানকারী ইহুদীদের সংখ্যা ছাব্বিশ হাজারে পৌঁছলো।

হেরাক্লিয়াস এ প্লাবণ রুখতে পারলো না। সিংহাসনে আরোহণ করা মাত্র তার কাছে সংবাদ পৌঁছলো, এন্তেকাফিয়া ইরানীদের হস্তগত হয়েছে। তারপর ৬১৩ খৃষ্টাব্দে ইরানীগণ দামেস্ক জয় করে। পর বছর বায়তুল মাকদেস জয় করে ইরানীগণ খৃষ্টানদের ওপর ধ্বংসলীলা শুরু করে। এ শহরে নব্বই হাজার খৃষ্টানকে হত্যা করা হয়। তাদের সবচেয়ে পবিত্র গীর্জা কানিসাতুল কেয়ামতাহ সমাধিস্তমভ (Holy Sepllulchre) ধ্বংস করা হয়। প্রকৃত ক্রস বা দণ্ডকাষ্ঠ, যে সম্পর্কে খৃষ্টানদের এ বিশ্বাস ছিল যে, এর ওপরেই যীশু খৃষ্ট জীবন দিয়েছিলেন। ইরানী মজুসীগণ তা ছিনিয়ে নিয়ে মাদায়েনে পাঠিয়ে দেয়। ক্ষমতাসীন পাদরী যাকারিয়া অপহৃত হন এবং শহরের সকল বড় বড় গীর্জাগুলো ধ্বংস করা হয়। এ বিজয় খসরু পারভেজকে কতখানি মদমত্ত করেছিল তার স্বাক্ষর বহন করে একখানি পত্র যা তিনি বায়তুল মাকদেস থেকে হেরাক্লিয়াসের কাছে পাঠান। তাতে তিনি বলেনঃ

“সকল খোদার বড় খোদা, সমগ্র জাহানের মালিক খসরুর পক্ষ থেকে ঐ হীন ও কাণ্ডজ্ঞানহীন বান্দা হেরাক্লিয়াসের প্রতি তুই বলিস যে, তোর খোদার ওপর তোর ভরসা আছে। তাহলে কেন তোর খোদা আমার হাত থেকে জেরুজালের রক্ষা করলো না?

এ বিজয়ের পর এক বছরের মধ্যেই ইরানী সেনাবাহিনী জর্দান, ফিলিস্তিন এবং সিনাই উপত্যকার গোটা অঞ্চলের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে মিসর সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে গেল। এ ছিল এমন  এক সময় যখন মক্কায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ আর একিট সংগ্রাম চলছিল। এখানে তাওহীদের ধ্বজাধারীগণ নবী মুহাম্মদ (সা)-এর নেতৃত্বে এবং মুশরিকগণ কুরাইশ সর্দারদের অধীন থেকে অপরের সাথে সংগ্রামরত ছিল। অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছলো যে, ৬১৫ খৃষ্টাব্দে মুসলমানদের একটি বিরাট দল নিজ নিজ ঘর-বাড়ী ছেড়ে আবিসিনিয়ার একটি খৃষ্টান রাজ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। আবিসিনিয়া ছিল রোমের বন্ধুরাষ্ট্র। সে সময়ে রোমের ওপর ইরানীদের বিজয়ের চর্চা সকলের মুকেই শুনা যেতো। মক্কায় মুশরিকগণ আনন্দে নাচতো এবং মুসলমানদেরকে বলতো, দেখ, ইরানের অগ্নি উপাসকগণ বিজয় লাভ করছে এবং অহী ও রেসালাতে বিশ্বাসীগণ পরাজয়ের পর পরাজয় বরণ করছে। এমনি আমরা আরবের প্রতিমা-পূজকগণ তোমাদের দ্বীনকে নির্মূল করে দিব”।

এরূপ পরিস্থিতিতে কুরআন পাকের এ সূরা নাযিল হয়।তাতে এ ভবিষ্যদ্বানী করে বলা হচ্ছে যে, নিকটস্থ ভূখণ্ডে রোমীয়গণ পরাজিত হয়েছে। কিন্তু তাদের পরাজয়ের পর কয়েক বছরের মধ্যে তারা বিজয়ী হবে। সেটা এমন একদিন হবে যে, আল্লাহ তায়ালার দেয়া বিজয়ে মুসলমানগণ খুশী হবে।

এ কথার মধ্যে দু’টি ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। একঃ রোমীয়গণ বিজয় লাভ করবে। দুইঃ মুসলমানদেরও সে সময়ে বিজয়সূচিত হবে। দৃশ্যতঃ সুদূর ভবিষ্যতেও এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না যে, এ দু’টি ভবিষ্যদ্বানীর মধ্যে কোনো একটিও কয়েক বছরের মধ্যে সফল হবে। একদিকে ছিল মুষ্টিমেয় মুসলমান যারা মক্কায় নিষ্পেষিত-নির্যাতিত হচ্ছিল এবং এ ভবিষ্যদ্বানীর পর আট বছর পর্যন্ত তাদের বিজয় লাভ করার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না। অন্যদিকে রোমীয়দের পরাজয় দিন দিন বেড়ে চলছিল। ৬১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত গোটা মিসর ইরানীদের হস্তগত হয় এবং মজুসী সেনাগণ তারাবেলিস (ত্রিপলী) সীমান্ত পর্যন্ত তাদের পতাকা উড্ডীন করে। এশিয়া, মাইনর পর্যন্ত ইরানী সেনাগণ রোমীয়দের ওপর আক্রমণ চালায় এবং তাদের অবশিষ্ট বাহিনী বস্ফোরাসের তীরভূমিতে উপনীত নয়। ৬১৭ খৃষ্টাব্দে তারা কনস্ট্যান্টিনোপলের সম্মুখস্থ খালেকদুন (Chalecdon) বর্তমান কাজীকুই দখল করে বসে। রোমের কায়সার ইরানের খসরুর নিকটে তার দূত প্রেরণ করে সবিনয়ে জানায় যে, সে যে কোন মূল্যে সন্ধি করতে রাজী আছে। কিন্তু জবাবে খসরু বলেন, আমি কায়সারকে কিছুতেই শা্ন্তিতে থাকতে দিব না যতোক্ষণ না সে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে আমার সামনে হাযির হয় এবং ক্রশবিদ্ধ খোদাকে পরিত্যাগ করে অগ্নি খোদার বন্দেগী কবুল করে। অবশেষে খসরু এতটা পরাজয়মনা হয়ে পড়ে যে, কনস্ট্যান্টিনোপল ছেড়ে কার্থেজ (বর্তমান তিউনিস) চলে যেতে মনস্থ করে। ঐতিহাসিক গীবনের ভাষায়, কুরআন মজীদের এ ভবিষ্যদ্বানীর পর সাত আট বছর পর্যন্ত এমন অবস্থা বিরাজ করছিল যে, কেউ এ ধারণাই করতে পারতো না যে, রোমীয়গণ ইরানের ওপর বিজয়ী হবে। বিজয়ী হওয়া তো দূরের কথা, সে সময় পর্যন্ত কেউ এ আশা করতে পারেনি যে, এ রাজ্যটি জীবিত থাকবে।–[Gilbon-Decline & Fall of the Roman Empire, Vol. 2, p. 788. Modern Library Ner York.]

কুরআনের এ আয়াতগুলো যখন নাযিল হয় তখন মক্কার কাফেরগণ এ নিয়ে খুব বিদ্রূপ-উপহাস করতে থাকে। উবাই বিন খালফ হযরত আবু বকর (রা)-এর সাথে বাজি রেখে বলল, “যদি তিন বছরের মধ্যে রোমীয়গণ বিজয়ী হয় তো আমি দশ উট দিব, অন্যথায় দশ উট তোমাকে দিতে হবে। এ বাজি রাখার খবর নবী (সা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন, কুরআনে (আরবী********************) শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়ে ছে এবং আরবী ভাষায় এর মেয়াদ দশের মধ্যে হয়্ এ জন্যে দশ বছরের মধ্যে সময়কালের শর্ত কর এবং উটের সংখ্যা বাড়িয়ে একশ’ কর।

অতপর হযরত আবু বকর উবায়ের সাথে পুনরায় দেখা করেন এবং নতুন করে এ শর্ত স্থিরীকৃত হল যে, দশ বছরের মধ্যে যার কথা মিথ্যা প্রমাণিত হবে তাকে একশ’ উট দিতে হবে।

৬২২ খৃষ্টাব্দে নবী করীম (সা) হিজরত করে মদীনা গমন করেন। ওদিকে কায়সার হেরাক্লিয়াস চুপে চুপে কনস্ট্যন্টিনোপল থেকে কৃষ্ণসাগরের পথে তারাবজুনের দিকে যাত্রা করে এবং পেছন দিক থেকে ইরানীদের ওপর আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এ প্রতি-আক্রমণের প্রস্তুতির জন্যে কায়সার গীর্জার নিকট অর্থ সাহায্য চাইলো এবং খৃষ্টীয় গীর্জার সর্বপ্রধান ধর্মাধ্যক্ষ সার্জিয়াস (Serjius) খৃষ্টবাদকে মজুসীবাদ থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে গীর্জায় উপঢৌকনস্বরূপ সঞ্চিত ধন-সম্পদ সুদে ঋণ দান করেন। হেরাক্লিয়াস ৬২৩ খৃষ্টাব্দে আরমেনিয়া থেকৈ তার আক্রমণ শুরু করে এবং পর বছর ৬২৪ খৃষ্টাব্দে আযারবাইজানে প্রবেশ করে জরথুস্ত্রের জন্মস্থান উরমিয়া ধ্বংস করে দেয় এবং ইরানীদের অগ্নিউপাসনা মন্দির ধূলিসাৎ করে। খোদার কুদরতের লীলা এই যে, একই বছরে বদর প্রান্তরে প্রথমবার মুসলমানগণ কাফেরদের ওপর চূড়ান্ত বিজয় লাভ করেন। এভাবে সূরায়ে রোমে বর্ণিত উভয় ভবিষ্যদ্বাণী দশ বচর অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বে একই সাথে কার্যকর হয়।

অতপর রোমীয় সৈন্যগণ ইরানীদেরকে ক্রমাগত পরাভূত করতে থাকে। নিনওয়ার চূড়ান্ত যুদ্ধে (৬২৭ খৃঃ) তারা ইরানী সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দেয়। তারপর ইরানী বাদশাহদের বাসস্থান দাস্তগির্দ (দাস্তেরাতুল মিলক) ধ্বংস করেদেয়া হয় এবং রোমীয়গণ সম্মুখে অগ্রসর হয়ে টেসিফুনের (Ctesiphin) সম্মুখে উপনীত হয় যা সেকালে ইরানের রাজধানী ছিল। ৬২৮ খৃষ্টাব্দে খসরু পারভেজের বিরুদ্ধে পারিবারিক বিদ্রোহ শুরু হয় এবং তাঁকে বন্দী করা হয়। তাঁর চোখের সামতে তাঁর আঠার জন সন্তানকে হত্যা করা হয়। কিছুদিন পর কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। এ বছরেই হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয় –যাকে কুরআন ‘বিরাট বিজয়’ বলে অভিহিত করে। এ বছরেই খসরু পারভেজের পুত্র দ্বিতীয় কোব্বাদ অধিকৃত যাবতীয় রোমীয় অঞ্চল ইরানের দখলমুক্ত করে এবং আদিক্রশ প্রত্যাবর্তন করে রোমীয়দের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়। ৬২৯ খৃষ্টাব্দে ‘পবিত্র ক্রুশ’ সস্থানে রাখার উদ্দেশ্যে স্বয়ং কাসার বায়তুল মাকদেস গমন করে। এ বছরেই নবীপাক (সা) কাযা ওমরাহ আদায় করার জন্যে হিজরতের পর প্রথম মক্কায় প্রবেশ করেন।

এরপর কারো মনে সন্দেহের কণামাত্র রইল না যে, কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য ছিল। আরবের বহুসংখ্যক মুশরিক এর ওপর ঈমান আনে। ওবাই বিন খালফের ওয়ারিশগণকে বাজিতে হারার পর তার শর্ত পালনের জন্যে হযরত আবু বকর (রা)-এর হাতে একশ’ উট অর্পন করতে হয়। এসব উট নিয়ে আবু বকর নবীর কাছে হাযির হন। নবী এসব উট সদকা করে দিতে বলেন। শর্ত এমন সময় হয়েছিল যখন শরীয়াতে জুয়া হারাম করা হয়নি। এখন হারাম হওয়ার নির্দেশ এসেছিল। এ জন্যে হরবী (যুদ্ধরত) কাফেরদের সম্পদ গ্রহণের অনুমতি দেয়া হলেও নির্দেশ হল যে, তা নিজে ব্যবহার না করে সদকা করে দেয়া হোক।

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪৩০ পৃষ্ঠায়)

“এবং সেদিন এমন একদিন হবে যেদিন আল্লাহ প্রদত্ত বিজয়ের জন্যে মুসলমানগণ আনন্দে উল্লসিত হবে”।–(সূরা আর রোমঃ ৪)

ইবনে আব্বাস (রা), আবু সাঈদ খুদরী (রা), সুফিয়ান সাওরী, সুদ্দী প্রমুখ মনীষীগণ বলেছেন যে, ইরানীদের ওপর রোমীয়দের বিজয় এবং বদরে মুশরিকদের ওপরে মুসলমানদের বিজয় একই বছরে হয়েছিল। এ জন্যে মুসলমানদের দ্বিগুণ আনন্দ হয়েছিল। এ কথা ইরান এবং রোমের ইতিহাস দ্বারাও প্রমাণিত। ৬২৪ খৃষ্টাব্দে বদর যুদ্ধ হয়েছিল, এ বছরেই রোমের কায়সার জরথুস্ত্রের জন্মস্থান ধ্বংস করেছিল এবং ইরানের সর্ববৃহৎ অগ্নি-উপাসনা মন্দির ধূলিসাৎ করে।

ফেরাঊনের লাশ সংরক্ষণ

[এ কুরআনের বিরাট ভবিষ্যদ্বাণী যা নবী মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াত এবং কুরআনের সত্যতার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ। যে সময়ে কুরআনের এ ভবিষ্যদ্বাণী শ্রুতিগোচর হয়, তখন পর্যন্ত মিসরের ফেরাউনদের কবর ও লাশগুলোর অবস্থা জানা যায় নি। মমি ঘরগুলোতে প্রবেশ এবং ফেরাউনদের কবর ও তাবুত উন্মুক্ত করার কাজ সাম্প্রতিকালে হয়েছে। ১৯০৭ খৃষ্টাব্দের পূর্বে কারও এ কথা জানা ছিল না যে, হযরত মূসার সমসাময়িক ফেরাউন ডুবে মরার পর তার লাশ রক্ষিত আছে কি নেই। তিন হাজার বছরের অধিককালের প্রাচীন ঘটনা সম্পর্কে সম্প্রতি যে তথ্য উদঘাটিত হয়েছে তাতে কুরআন যে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে তার প্রমাণ কুরআন অবিশ্বাসকারীদের কাছে উপস্থাপিত করা হয়েছে।]

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪৩০ পৃষ্ঠায়)

“এখন তো আমরা শুধু তোমার লাশ রক্ষা করব যাতে করে পরবর্তী বংশধরদের জন্যে তা একটা শিক্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে রয়ে যায়”।–(সূরা ইউনুসঃ ৯২)।

সিনাই উপত্যকায় পশ্চিম তীরে এখনও সে স্থান বিদ্যমান আছে যেখানে ফেরাউনের লাশ ভাসমান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এ স্থানকে এখন জাবালে ফেরাউন বলা হয়। তার নিকটে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ আছে। স্থানীয় অধিবাসীরা তাকে ফেরাউনের হাম্মাম বলে। এর অবস্থান আবু যায়নামার কয়েক মাইল উত্তরে ওপর দিকে। ফেরাউনের লাশ এখানে পড়েছিল বলে স্থানীয় অধিবাসীগণ স্থানটিকে চিহ্নিত করে রেখেছে।

জলমগ্ন হয়ে মৃত্যুবরণকারী ফেরাউন যদি সে ব্যক্তিই হয় যাকে সম্প্রতিকালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুসন্ধানের ফলে হযরত মূসা (আ)-এর সমসাময়িক বলা হয়েছে, তাহলে তার লাশ এখন কায়রোর যাদুঘরে দেখতে পাওয়া যাবে। ১৯০৭ খৃষ্টাব্দে স্যার গ্যাফটন এলিট স্মিত যখন তার মমি থেকে আবরণ উন্মোচন করেন, তখন তার লাশের ওপর জমাট বাঁদা লবণ দেখতে পাওয়া যায় এবংএটা তার সাগরের লবণাক্ত পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার সুস্পষ্ট নিদর্শন।

(আরবী************************) অর্থাৎ “আমরা তো শিক্ষণীয় নিদর্শনাদি দেখাতেই থাকব যদিও অধিকাংশ মানুষের অবস্থা এই যে, বড় বড় শিক্ষণীয় নিদর্শন দেখেও তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না”।

ইয়াজুজ মাজুজের বিশ্বব্যাপী হামলা

ইয়াজুজ বলতে রুম এবং উত্তর চীনের ঐসব উপজাতীয়দেরকে বুঝায় যারা তাতারি, মঙ্গোলী, হুন, সিথিয়ান প্রভৃতি নামে অভিহিত। প্রাচীনকাল থেকে তারা সভ্যতামণ্ডিত দেশগুলোতে হামলা চালাত। উপরন্তু জানা যায় যে, তাদের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্যে কাফকাযের দক্ষিণাঞ্চলে দরবন্দ এবং দারিয়ালের প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। কারণ তাঁদের আক্রমণের গতি যখন তখন এশিয়া এবং ইউরোপের উভয় দিকে প্রবাহিত হত। বাইবেলে (জন্মবৃত্তান্ত, অধ্যায় ১০) তাদেরকে হযরত নূহের পুত্র ইয়াফেসের বংশধর বলা হয়েছে। মুসলিম ঐতিহাসিকগণও তাই বলেছেন। হাযাকিয়েলের গ্রন্থে (অধ্যায় ৩৮, ৩৯) তাদেরকে রুশ, তোবল (বর্তমান তোবালিস্ক) এবং মিসক (বর্তমান মস্কো) অঞ্চলের অধিবাসী বলা হয়েছে। ইসরাঈলী ঐতিাহিসক ইউসিফোস তাদেরকে সিথিয়ান জাতির বলেছেন। যাদের আবাসস্থল কৃষ্ণসাগরের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ছিল। জেরুমের বর্ণনা মতে, মাজুজ ককেশিয়ার উত্তরে খাজার সাগরের নিকটে বসতি স্থাপন করে।

তাদেরকে উন্মুক্ত করে দেয়ার অর্থ এই যে, তারা পৃথিবীবাসীদের ওপর এমনভাবে হামলা শুরু করবে যেন কোনো হিংস্র পশুকে হঠাৎ কোনো বদ্ধ খাঁচা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ‘সত্য প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়েছে’ কথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এদিকে করা হচ্ছে যে, ইয়াজুজ-মাজুজের এ বিশ্বব্যাপী আক্রমণ-উপদ্রব আখেরী যামানায় হবে এবং তারপর অতি সত্ত্বরই কেয়ামত হবে। নবী (সা)-এর নিম্ন ভবিষ্যদ্বাণীও এ অর্থকে আরও জোরদার করে যা ইমাম মুসলিম হুযায়ফা বিন আসিদ আল গিফারিরর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তা হল এই যে, “কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা তার আগে দশটি আলামত দেখতে পাবে। যেমন, ধূমরাশি, দাজ্জাল, দাব্বাতুল আরদ, পশ্চিমাকাশে সূর্যোদয়, ঈসা বিন মরিয়মের অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজের হামলা-উপদ্রব, তিনটি বড় বড় ভূমি ধস (Land slides –একটি প্রাচ্যে, দ্বিতীয়টি পাশ্চাত্যে এবং তৃতীয়টি আরবে) এবং সর্বশেষে ইয়েমেন থেকে একটি ভয়ানক অগ্নি উত্থিত হয়ে মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে (অর্থাৎ কেয়ামত সংগঠিত হবে)। অন্য একটি হাদীসে ইয়াজুজ-মাজুজের হামলা প্রসঙ্গে নবী (সা) বলেন, পূর্ণ গর্ভবতী নারীর সন্তান প্রসব যেমন অত্যাসন্ন হয় এবং তার জানা থাকে না কোন মুহুর্তে দিনে না রাতে তার প্রসব হবে ঠিক তেমনি সে সময় কেয়ামত ততটা অতি আসন্ন হয়ে পড়বে।

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪৩২ পৃষ্ঠায়)

কিন্তু ইয়াজুজ ও মাজুজ উভয়ে একত্র হয়ে দুনিয়ায় তাদের আক্রমণ-উপদ্রব শুরু করবে কিনা একথা কুরআন এবং হাদীস থেকৈ সুস্পষ্ট করে বলা যায় না। এমনও হতে পারে যে, কেয়ামতের নিকটবর্তীকালে তারা একে অপরের ওপরে আক্রমণ করতে থাকবে এবং তাদের যুদ্ধ একটা বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের রূপ ধারণ করবে।

ইহুদীদের লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা

(আরবী******************) সম্পর্কে আমার বিশ্বাস এই যে, তা হতে থাকবে কেয়ামতের পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত। এতে করে ফিলিস্তিনে ইসরাঈলীদের বর্তমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কিছু যায় আসে না। প্রথমত ইহুদী জাতি সম্পর্কে সামষ্টিকভাবে এ আয়াতটি প্রযোজ্য। তাদের এক এক ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের ওপর এ আয়াতের মর্ম প্রযোজ্য নয়। দ্বিতীয়ত আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকে কেয়ামত পর্যন্ত গোটা জাতি হিসেবে তারা যে অবস্থায় জীবনযাপন করবে এ হলো তারই এক বর্ণনা। এর অর্থ এই নয় যে, এ সুদীর্ঘকালের মধ্যে দুনিয়ার কোথাও অল্পকালের জন্যেও তারা শাসন ক্ষমতার অধিকারী হবে না। আসলে এ আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করতে হলে ইহুদী জাতির সেই ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকেফহাল হতে হতে যা হযরত ঈসা (আ) এর পর থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে। সেই ইতিহাস এবং সমষ্টিগতভাবে দুনিয়ায় তাদের যে বর্তমান অবস্থা তা গভীরভাবে লক্ষ্য করলে কুরআন পাকের নিম্নোক্ত বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়ঃ

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪৩২ পৃষ্ঠায়)

“এবং যখন তোমার প্রভু ঘোষণা করে দিলেন যে, তিনি কেয়ামত পর্যন্ত তাদের ওপর কোনো না কোনো ব্যক্তিকে শাসক বানিয়ে দেবেন যে, তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবে”।–(সূরা আল  আরাফঃ ১৬৭)।

(আরবী*****************************************পিডিএফ ৪৩২ পৃষ্ঠায়)

“তাদের ওপর লাঞ্ছনা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এবং যেখানেই তাদেরকে পাওয়া যাবে (সেখানেই তারা এ লাঞ্ছনার বোঝা বহন করবে)। অবশ্যি কোথঅও যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং মানুষের পক্ষ থেকে রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা তারা পায়, সে অন্য কথা”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১১২)।

তাদের গোটা ইতিহাস এ কথাই বলে যে, কখনও কখনও দুনিয়ার কোথাও এমন এক শক্তি আত্মপ্রকাশ ঘটেছে যে, ইহুদীদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এবং বহিষ্কৃত করেছে। আর কোথাও যদি তারা নিরাপদে থেকে থাকে, তো সেটা তাদের ক্ষমতাবলে নয়, বরং আল্লাহ প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে কোনো মানব গোষ্ঠীর সাহায্য-সহযোগিতায় স্থাপিত হয়েছে এবং বিদ্যমান আছে। এ সহযোগিতা যেদিন বন্ধ হবে সেদিন ইসরাঈলের কি দশা হয় তা দুনিয়া দেখতে পাবে। আমার ধারণা, আল্লাহ তায়ালা এ জাতিকে নির্মূল করতে চান না, বরং একটা শিক্ষণীয় নিদর্শন হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে চান। এ জাতির ওপর ক্রমাগত যদি নির্যাতন-নিষ্পেষণ চলতে থাকত, তাহলে তারা দুনিয়ার বুক থেকে বহু পূর্বেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। আল্লাহ তায়ালা তার আপন হিকমতের দ্বারা এ জাতিকে টিকিয়ে রাখার এ ব্যবস্থা করেছেন যে, কোথাও তাদেরকে পিটানো হচ্ছে, তা কোথাও আশ্রয় মিলে যাচ্ছে। এভাবে তারা বিগত আড়াই হাজার বছল ধরে না জীবিত না মৃত (আরবী********************) এ অবস্থায় দুনিয়ার বুকে টিকে আছে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.