সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হাদীসের ভবিষ্যদ্বাণী

পরিপূর্ণ নিরাপত্তার যুগ

হযরত খাব্বাব (রা) বলেন, একদিন নবী পাক (সা) কা’বা ঘরের ছায়ায় বসেছিলেন। আমি তাঁর কাছে হাযির হয়ে বললাম হে আল্লাহর রসূল! যুলুম-অত্যাচারের আর অন্ত নেই। আপনি কি আল্লাহর দরবারে দোয়া করছেন না?

এ কথা শুনে তাঁর মুখমণ্ডল আরক্ত হল এবং তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বে যাঁরা ঈমানদার ছিলেন তাঁদের ওপর এর চেয়ে ঢের বেশী যুলুম হয়েছে। লোহার চিরুণী দিয়ে তাদের মাংস ছিন্নভিন্ন করা হত, তাঁদের মাথার ওপর করাত রেখে চিরে ফেলা হত, তথাপি তাঁরা সত্যদ্বীন থেকে সরে পড়েনি। নিশ্চতরূপে জেনে রাখ যে, আল্লাহ এ কাজ সম্পন্ন করেই ছাড়বেন। অবশেষে এমন এক সময় আসবে যখন এক ব্যক্তি সানআ’ থেকে হাজারা মাউত পর্যণ্ত নির্ভয়ে সফর করবে এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে তার ভয় করার থাকবে না কিন্তু তোমরা বড্ডো তাড়াহুড়ো করছ।–(বুখারী)

আরব ও অনারবের ওপর জয়লাভের শর্ত

আবু তালেব নবী মুহাম্মদ (সা)-কে ডেকে বললেন, ভাইপো! এই দেখ, তোমার জাতির লোকেরা আমার কাছে এসেছে। তাদের ইচ্ছা, তুমি একটি ইনসাফপূর্ণ কথায় তাদের সাথে একমত হওয়। এতে করে তোমার ও তাদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ শেষ হয়ে যাবে। তারপর আবু তালেব কুরাইশ সর্দারদের প্রস্তাব নবীর কাছে রাখলেন। জবাবে নবী (সা) বললেন, চাচা! আমি তো তাদের সামনে এমন এক বাণী পেশ করছি তা মেনে নিলে সমগ্র আরব তাদের অধীন হবে এবং অন্যান্য দেশ কর দিতে থাকবে।

নবীর একথা বিভিন্ন রাবী বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। একটি বর্ণনা নিম্নরূপঃ

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৪ পৃষ্ঠায়)

অন্য একটি বর্ণনায়ঃ

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৪ পৃষ্ঠায়)

অন্য এক বর্ণনা

য় দেখা যায়, নবী (সা) আবু তালেবের পরিবর্তে কুরাইশদেরকে সম্বোধন ধরে করে বলেনঃ

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৪ পৃষ্ঠায়)

অন্যত্রঃ

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৪ পৃষ্ঠায়)

এসব শাব্দিক পার্থক্য সত্ত্বেও সকল বর্ণনার মর্ম একই। অর্থাৎ নবী পাক (সা) তাদেরকে বললেন, আমি তোমাদের সামতে এমন এক বাণী পেশ করছি যা গ্রহণ করলে তোমরা আবর ও আজমের মালিক হয়ে পড়বে। এখন বল দেখি, তোমরা যাকে ইনসাফপূর্ণ কথা বলছ, সেটা ভাল না, না আমারটা অধিকতর ভাল? তোমাদের মঙ্গল কি এ কালেমা গ্রহণের মধ্যে আছে না এমনটি মধ্যে যে তোমরা যে অবস্থায় আছ আমি তোমাদেরকে সে অবস্থায় থাকতে দিব এবং নিজে আপন খোদার বন্দেগী করতে থাকব?

কুরাইশদের রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতা

নবী (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, যতদিন কুরাইশগণ তাদের চরিত্র উন্নত রাখবে এবং সামষ্টিকভাবে দ্বীনের ধ্বজা বহন করতে থাকবে, আর তাদের মধ্যে দু’জনও যদি সত্যের জন্যে সংগ্রামশীল পাওয়া যায়, তাহলে শাসন ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে।

নবী (সা)-এর এ ধারণা এতটা সত্য ছিল যে, তার পরে কয়েক শতক পর্যন্ত ইতিহাসে তাঁর সত্যতার প্রমাণ পেশ করতে থাকে। কুরাইশ গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব এমন চির যে, খেলাফতে রাশেদার যুগে চারজন খলীফা এ গোত্রই সরবরাহ করে এবং জানা কথা যে, তাঁদের বিকল্প কোনো ব্যক্তিত্ব তখন সমগ্র আরব ভূমিতে ছিল না। অতপর এ গোত্রই প্রসিদ্ধ উমাইয়া শাসন কায়েম করে। এ গোত্রই আব্বাসীয় শাসনের পত্তন করে। স্পেনে বিরাট শাসন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা এবং মিসরে ফাতেমীয় শাসন এ গোত্রেরই অবদান।

জিহাদ অব্যাহত থাকবে

আমার উম্মতের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চলতে থাকবে। কোনো ন্যায় বিচারকের ন্যায় বিচার অথবা অত্যাচারীর তা বন্ধ করতে পারবে না। এ প্রাণশক্তিই হর-হামেশা ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনে প্রেরণা সঞ্চার করে এসেছে। এ প্রাণশক্তিই পরিবেশের ভয়াবহ চিত্রের সামনে নতি স্বীকার করা থেকে সৎকর্মশীলরেদকে (সালেহীন) বিরত রেখেছে।

মুসলমানের অধঃপতন ইহুদী ও খৃষ্টানদের মতোই হবে

নবীপাক (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো যা হাদীসে বর্নিত হয়েছে তার মধ্যে একটি এই যে, মুসলমানগণ অবশেষে ইহুদী ও খৃষ্টানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকবে। তারা যে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, মুসলমানরাও তা-ই করবে। এমনকি তারা যদি কেউ আ্পন মায়ের সাথে ব্যভিচার করে, তাহলে মুসলমানদের মধ্যেও এমন লোকের আবির্ভাব হবে যাদের দ্বারা এ অপরাধ সংঘটিত হবে।–[গ্রন্থকার নবী পাক (সা)-এর এরশাদ অন্য এক সূত্রে নিম্নরূপ বর্ণনা করেনঃ নবী (সা) বলেন, তোমরাও পূর্ববর্তী উম্মতদের আচার-আচরণ অবলম্ন করবে। এমনকি তারা যদি গোসাপের গর্তে প্রবেশ করে, তোমরাও তা-ই করবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রসূল! আপনি কি ইহুদী-নাসারাদের কথা বলছেন। নবী জবাবে বলেন, হ্যাঁ, নবীর এ শুধু সতর্কবাণী নয়, বরং নবীর উম্মতের মধ্যে অধঃপতন কোন কোন পথে এসেছে এবং কিবাবে তার প্রকাশ ঘটেছে, খোদা প্রদত্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে নবী পাক তা জানতেন।]

মিল্লাতের ভবিষ্যৎ ইতিহাসের রূপরেখা

যদিও এসব ভবিষ্যদ্বাণী মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, মুস্তাদরাক প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে প্রচুর পরিমাণে দেখতে পাওয়া যায়, ইমাম শাতবী মুওয়াফেকাত এবং মাওলানা ইসমঈল শহীদ (র) মনসবে ইমামতে যেসব বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন তার উদ্ধৃতি এখানে নিরর্থক হবে নাঃ

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৬ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদের দ্বীনের সূচনা নবুয়াত এবং রহমত থেকে। আল্লাহ যতদিন চাইবেন এটাকে অক্ষুণ্ণ রাখবেন। অতপর তিনি তার অবসান ঘটাবেন এবং নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত-[নবী (সা) এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আমার পরে খেলাফত ৩০ বছর চলবে এবং তারপর বাদশাহী কায়েম হবে। খেলাফতের মুদ্দৎ ৪১ হিজরীর রবিউল আউয়ালে শেষ হযরত হাসান (রা) মাবিয়া (রা)-এর স্বপক্ষে খেলাফত থেকে সরে পড়েন।–(গ্রন্থকার)] চলবে যতদিন তিনি চাইবেন। তারপর নিকৃষ্ট ধরনের বাদশাহী চলতে থাকবে যতনি আল্লাহ চাইবেন। আল্লাহর ইচ্ছায় এটারও অবসান হবে। তারপর অত্যাচারী শাসকদের শাসন কায়েম হবে। যতদিন আল্লাহ চাইবেন ততদিন তা চলতে থাকবে। তারপর আল্লাহ তায়ালা তার পরিসমাপ্তি ঘটাবেন”।

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৬ পৃষ্ঠায়)

“অতপর নবুয়াতের পদ্ধতির সেই খেলাফত হবে –যা মানুষের মধ্যে নবীর সুন্নত অনুযায়ী আমল করবে এবং ইসলাম যমীনে প্রতিষ্ঠিত হবে। এ শাসন ব্যবস্থায় আসমানবাসীও খুশী হবে এবং দুনিয়াবাসীও। আসমান প্রাণ খুলে তার বরকতসমূহ বর্ষণ করতে থাকবে এবং যমীন তার গর্ভস্থ সবকিছু বাইরে নিক্ষেপ করবে”।

আমি বলতে পারি না, সনদের দিক দিয়ে এ রেওয়ায়াতগুলো কি মর্যাদা। কিন্তু অর্থের দিক দিয়ে দেখতে গেলে এ ধরনের আর যত বর্ণনা আছে তার সাথে এগুলো সামঞ্জস্যশীল। এতে ইতিহাসের পাঁচটি পর্যায়ের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তিনটি অতীত হয়েছে এবং চতুর্থটি চলছে। অবশেষে যে পঞ্চম পর্যায়টির ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, সে সম্পর্কে সব রকম লক্ষণ তো এই দেখা যাচ্ছে যে, মানব ইতিহাস দ্রুত সেদিকেই ছুটছে। মানুষের তৈরী সকল প্রকার ‘ইজমা’ পরীক্ষিত হয়েছে। এগুলো নৈরাশ্যজনকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষের এ ছাড়া আর গত্যন্তর নেই যে, তারা মরিয়া হয়ে ইসলামের দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে।

আমীর, ওমরা ও শাসকদের নৈতিক অধঃপতন

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৬ পৃষ্ঠায়)

“আমার পরে কিছু লোক শাসন ক্ষমতার অধিকারী হবে। তাদের মিথ্যাচারীতায় যারা সহযোগিতা করবে এবং অত্যাচারে যারা সাহায্য করবে তারা আমার নয় এবং আমি তাদের নই।–(নাসায়ী)।

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৭ পৃষ্ঠায়)

“অতি সত্বর তোমাদের ওপর এমন লোক শাসক হবে যাদের হাতে তোমাদের জীবিকার চাবিকাঠি থাকবে। তারা তোমাদের সাথে কথা বলবে তখন মিথ্যা বলবে এবং কাজ করলে মন্দ কাজ করবে। তাদের মন্দকাজের প্রশংসা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে ঘোষণা না করলে তারা তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ তারা বরদাশত করে তাদের সামনে সত্যকে তুলে ধর। তারা যদি সীমা অতিক্রম করে এবং কাউকে কতল করা হয়, তাহলে সে হবে শহীদ”।–(কানযুল ওম্মাল)

দ্বীন পুনর্জাগরণের ধারাবাহিকতা

(আরবী*************) (যারা তাদের জন্যে তাদের দ্বীনকে সজীব করবে)-এ হাদীসের ব্যাখ্যা।

এ এমন এক বিষয় যার সুসংবাদ দিয়েছেন সত্য সংবাদদাতা নবীপাক (সা) এবং তা আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে আবু হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে।

(আরবী*****************************পিডিএফ ৪৩৭ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক শতকের মাথায় এমন লোকের আবির্ভাব ঘটাবেন যারা তাদের জন্যে তাদের দ্বীনকে সজীব করবে”।

কিন্তু এ হাদীস থেকে কিছু লোক ‘তাজদীদ’ এবং ‘মুজাদ্দিদের’ একেবারে এক ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেছেন। তাঁরা (আরবী********) এর অর্থ নিয়েছেন শতাব্দীর শুরু অথবা শেষ। এবং (আরবী****************) –এর এ মর্ম নিয়েছেন যে, ইতি অবশ্যই কোনো এক ব্যক্তি হবেন। এর ভিত্তিতে তাঁরা তাজদীদে দ্বীনের কাজও করেছেন। অথচ (আরবী*********) শাব্দিক থঅর্ মাথা এবং শতাব্দীর মাথায় কোনো ব্যক্তির উত্থানের সুস্পষ্ট মর্ম এই যে, তিনি তাঁর যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তাধারা এবং কর্মকাণ্ডের গতিধারার ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করবেন। (আরবী********) শব্দটি আরবী ভাষায় এক ও বহু উভয় বচনেই ব্যবহৃত হয়। অতএব (আরবী*******) থেকে এক ব্যক্তি এবং বহু ব্যক্তি উভয় অর্থই করা যেতে পারে। এর অর্থ গোটা প্রতিষ্ঠান এবং দলও হতে পারে। নবীপাক (সা) যে সুসংবাদ দিয়েছেন তার সুস্পষ্ট মর্ম এইযে, ইনশাআল্লাহ ইসলামী ইতিহাসের কোনো শতাব্দীতেই এমন সব লোকের অভাব হবে না যাঁরা জাহেলিয়াতের ঝড়-তুফানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন এবং ইসলামকে তাঁর সত্যিকাররূপে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম করতে থাকবেন। এটা জরুরী নয় যে, এক শতাব্দীতে মুজাদ্দিদ একই ব্যক্তি হবেন। একই শতাব্দীর মধ্যে বিভিন্ন লোক এবং দল এ খেদমত করতে পারেন। এটাও কোনো কথা নয় যে, সমগ্র দুনিয়ার জন্যে একজন মাত্র মুজাদ্দিদ হবেন। একই সময়ে বহুদেশে বহু লোক তাজদীদে দ্বীনের কাজ করতে পারেন। এটাও জরুরী নয় যে, এ ব্যাপারে যিনিই যতটুকু খেদমত করবেন,তাঁকেই মুজাদ্দিদের মর্যাদায় ভূষিত করা হবে। মুজাদ্দিদের মর্যাদা ও উপাধি একমাত্র ঐসব ব্যক্তিকে দেয়া যায় যাঁরা তাজদীদে দ্বীন বা দ্বীনের পুনর্জাগরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে বিরাট ও মহান অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের প্রকাশ

একটি হাদীসে আছে –“অতি শীগগির আমার উম্মত বাহাত্তর ফের্কায় বিভক্ত হয়ে পড়বে। তার মধ্যে একটি মাত্র আখেরাতে নাযাত লাভ করবে। তারা ঐসব লোক হবে যারা আমার সাহাবীদের অনুসরণ করবে”।

হাদীসগুলোতে মুসলমানদের মধ্যে বিভিন্ন ফেতনা সৃষ্টি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব ফেতনা থেকে দূরে থাকার জন্যে সতর্ক করে দেয়অই এসবের লক্ষ্য।

মাহদীর আবির্ভাব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী

মাহদীর আবির্ভাব সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায়, হাদীস যাঁচাইকারীগণ এ ব্যাপারে এমন কড়াকড়ি করেছেন যে, তাঁদের একটি দল এ কথা স্বীকারই করেন না যে, ইমাম মাহদীর আবির্ভাব হবে। আসমাউর-রেজালের (হাদীস বর্ণনাকারী-পরম্পরা) যাঁচাই পর্যালোচনায় জানতে পারা যায় যে, এসব হাদীসের অধিকাংশ রাবী (বর্ণনাকারী) শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। ইতিহাস পাঠ করলেও জানা যায় যে, প্রত্যেক দল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্বার্থে এসব হাদীস ব্যবহার করেছে এবং নিজেদের কোনো ব্যক্তির ওপর মাহদী সম্পর্কে বর্ণিত আলামতগুলো আরোপ করার চেষ্টা করেছে।

বর্ণনাগুলোর মধ্যে সত্য ও মনগড়া উপাদান

উপরোক্ত কারণে আমি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, মাহদীর আবির্ভাব সম্পর্কিত বর্ণনা গুলো সত্য। কিন্তু বিশদ বর্ণনায় যেসব কথা বলা হয়েছে তার বেশীর ভাগ সম্ভবত মনগড়া। স্বার্থান্বেষীগণ নবীর প্রকৃত এরশাদের সাথে অতিরিক্ত এমন বিষয় সংযোজন করেছে। বিভিন্ন সময়ে যেসব লোক প্রতিশ্রুত-[হাদীসে যে ‘মাহদী’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার প্রতিই লক্ষ্য করা যাক। নবী মাহদী শব্দ ব্যবহার করেছেন যার অর্থ ‘হেদায়াতপ্রাপ্ত’। ‘হাদী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। মাহদী প্রত্যেক সর্দার, নেতা ও আমীর হতে পারেন যিনি সত্য পথের ওপর অবিচল থাকেন। ‘আল মাহদী’ বড় জোর অধিকতর বৈশিষ্ট্যের সাথে ব্যবহৃত হয়ে থাকবে –যার উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে আগমনকারী কোনো ব্যক্তির মধ্যে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপুর্ণ মর্যাদার প্রকাশ হওয়া। সে বিশেষ মর্যাদা এভাবে হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নবীর পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত খেলাফত বিনষ্ট হওয়ার পর অত্যাচার-অবিচারে দুনিয়া জর্জরিত হবে এবং তারপর আগমনকারী ব্যক্তি নতুন করে নবীর পদ্ধতিতে খেলাফত কায়েম করবেন এবং দুনিয়া সুবিচারে পূর্ণ হবে। এ হল আসল কথা যার জন্যে সে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করার লক্ষ্যে ‘মাহদী’ শব্দের পূর্বে (আরবী*******) যোগ করা হয়েছে। কিন্তু এ কথা মনে করলে ভুল হবে যে, মাহদী নামের দ্বারা দ্বীনের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট পদ সৃষ্টি করা হয়েছে যার ঈমান আনা মনে করলে ভুল হবে যে, মাহদী নামের দ্বারা দ্বীনের মধ্যে কোনো বিশিষ্ট পদ সৃষ্টি করা হয়েছে যার ঈমান আনা নবীদের ওপর ঈমান আনার অনুরূপ এবং তাঁর আনুগত্য করা নাযাত, ইসলাম এবং ঈমানের শর্ত হয়ে পড়বে। মাহীদ কোনো নিষ্পাপ সত্তা হবে এ ধারণার সপক্ষে হাদীসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে না। আসলে নবী ব্যতীত অন্য কোনো লোকের নিষ্পাপ হওয়ার ধারণাটা শিয়া সম্প্রদায়ের। কুরআন এবং সুন্নাতে এর কোনো দলীল প্রমাণ নেই।] মাহদীর মিথ্যা দাবী করেছে তাদের সাহিত্যাবলীতে দেখা যায় যে, তাদের সৃষ্ট অরাজকতার পেছনে এসব বর্ণনা উপাদান হিসেবে কাজ করেছে।

নবীর ববিষ্যদ্বাণীর প্রকাশভঙ্গি

আমি নবীপাক (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের প্রতি যতদূর চিন্তা-ভাবনা করে দেখেছি তাতে মাহদীর আবির্ভাব সম্পর্কে হাদীসগুলোতে যে ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়, নবীর বর্ণনাভঙ্গী তেমন ছিল না। তিনি অবশ্যি প্রধান প্রধান আলামতগুলো বর্ণনা করতেন কিন্তু খুঁটিনাটি বর্ণনা করা তাঁর পদ্ধতি ছিল না।

সংশ্লিষ্ট রেওয়ায়াতগুলোর গরমিল

যখন এসব বর্ণনাগুলোকে একত্র করে একটি অপরটির সাথে মিলিয়ে দেখা হয়, তখন তাদের মধ্যে বেশীরভাগই গরমিল দেখা যায়। উপরন্তু বনী ফাতেমা, বনী আব্বাস এবং বনী উমাইয়া দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের পূর্ণ ইতিহাস যাঁদের সামনে রয়েছে এবং তাঁরা যখন সুস্পষ্ট দেখতে পাননি এ দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে লিপ্ত দলগুলোর প্রত্যেকের স্বপক্ষে বিভিন্ন রেওয়ায়াত বিদ্যমান রয়েছে এবং রাবীদের (বর্ণনাকারী) মধ্যেও অধিকাংশ এমন যে, তাঁরা কোনো না কোনো একটি দলের সাথে সংশ্লিষ্ট, তখন হাদীসে বর্ণিত সকল খুঁটিনাটি বর্ণনা মেনে নেয়া তাদের জন্যে মুশকিল হয়ে পড়ে। যেমন ওসবের মধ্যে কোনো কোনোটায় কাল পতাকা (আরবী**********) উল্লেখ আছে। ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, কাল পতাকা বনী আব্বাসের প্রতীক ছিল। উপরন্তু ইতিহাস থেকে এটাও জানতে পারা যায় যে, এ ধরনের হাদীস পেশ করেকের আব্বাসীয় খলিফা মাহদীকে প্রতিশ্রুত মাহদী প্রমাদণ করার চেষ্টা চলতে থাকে।

কামেল মুজাদ্দিদের মর্যাদা

ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে জানা যায় যে, আজ পর্যন্ত কোনো কামেল-মুজাদ্দিদ জন্মগ্রহণ করেননি। হযরত ওমর বিন আবদুল আযীয এ মর্যাদার অধিকারী হতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তিনি সাফল্য লাভ করতে পারেননি। তাঁর পরে যত মুজাদ্দিদ জন্মগ্রহণ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকে কোনো বিশেষ বিভাগের অথবা কয়েকটি বিভাগে কাজ করেছেন। কামেল মুজাদ্দিদের স্থান এখনও শূন্য আছে কিন্তু বিবেক চায় প্রকৃতি দাবী করে এবং দুনিয়ার গতিধারাও সে দাবী পেশ করছে যে, এমন একজন ‘লীডার’ জন্মগ্রহণ করুন। তিনি এ যুগেই জন্মগ্রহণ করুন অথবা কালের বহু আবর্তন-বিবর্তনের পরে করুন, তাঁরই নাম হবে ‘আল ইমামুল মাহদী’ যার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বানী নবীপাক (সা)-এর পবিত্র মুখে করা হয়েছে।

আজকাল মানুষ অজ্ঞতাবশত এ নামটি শুনে নাক সিঁটকায়। তাদের অভিযোগ, কোনো আগমনকারী মানুষের প্রতিক্ষায় অজ্ঞ লোকেরা কর্মপ্রবণতা হারিয়ে ফেলেছে। এ জন্যে তাদের অভিমত এই যে, তথ্য সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে অজ্ঞ লোক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তা কোনো তথ্যই আদতে নয়। উপরন্তু তারা বলে, সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে গায়েবী মহাপুরুষ আগমরেন ধারণা পাওয়া যায়। অতএব এসব কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু আমি মনে করি, খাতামুন্নবিয়্যীনের মতো পূর্ববর্তী নবীগণও যদি তাঁদের জাতিকে এ সুসংবাদ দিয়ে থাকেন যে, মানবজাতির পার্থিব জীবন শেষ হবার পূর্বে ইসলাম একবার সমগ্র দুনিয়ার দ্বীন হবে এবং তা যদ কুসংস্কার না হয়, তাহলে মানব রচিত যাবতীয় ‘ইজম’ ব্যর্থ হওয়ার পর ধ্বংসোন্মুখ মানুষ আল্লাহ-রচিত মতবাদের স্মরণাপন্ন হতে বাধ্য হবে এবং এ নিয়ামত মানুষ লাভ করবে এমন এক মহান নেতার বদৌলতে যিনি নবীগণের পন্থায় কাজ করে ইসলামকে তার প্রকৃতরূপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত করবেন –তাহলে এ কথা বললে তা কুসংস্কার হবে কেন? খুব সম্ভব, নবীগণের মুখ থেকে কথাটা দুনিয়ার অন্যান্য জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং অজ্ঞ লোকেরা এর প্রকৃত মর্ম বিকৃত করে তাকে কুসংস্কারের রূপ দিয়েছে।

মাহদী সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা

কতিপয় নতুনত্বপন্থী আছে যারা ইমাম মাহদীর আবির্ভাব স্বীকারই করে না। মুসলমানদের মধ্যে আবার যাঁরা ইমাম মাহদীর আবির্ভাব স্বীকার করেন, তাঁরাও ভ্রান্ত ধারণার দিক দিয়ে প্রথমোক্ত দলের পেছনে নন। তারা মনে করেন, ইমাম মাহদী লেবাস-পোশাকে সেকেলে ধরনের মৌলভী ও সুফীদের মত হবেন। হঠাৎ একদিন তসবিহ হাতে মাদ্রাসা অথবা খানকার হুজরা থেকে আবির্ভূত হবেন। সঙ্গে সঙ্গে ‘আমি মাহদী’ বলে ঘোষণা করবেন। আলেম-পীর-দরবেশগণ কেতাব-পত্র নিয়ে হাযির হবেন এবং কেতাবে বর্ণিত আলামত ও হুলিয়া মুতাবেক তাকে যাঁচাই করে চিনে ফেলবেন। অতপর বায়আত হবে এবং জিহাদের ঘোষণা হবে। চিল্লায়রত দরবেশ এবং সকল প্রাচীন পন্থী বুযর্গান তাঁর পতাকাতলে সমবেত হবেন। নিছক শর্ত পূরণ করার জন্যে তরবারী ব্যবহার করা হবে কিন্তু আসলে সমুদয় কাজকর্ম বরকত এবং রূহানী শক্তিতে সমাধা করা হবে। ফুঁক-ফাঁক এবং অযিফা ইত্যাদির মাধ্যমে যুদ্ধ জয় করা হতে থাকবে। যে কাফেরের ওপর ইমাম মাহদীর নযর পড়বে, সে তৎক্ষনাৎ ছটফট করতে করতে প্রাণত্যাগ করবে। নিছক বদদোয়াতে ট্যাংক, বোমারু বিমান বিকল হয়ে পড়বে।

মাহদী সম্পর্কে গ্রন্থকারের ধারণা

ইমাম মাহদীর আবির্ভাব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ঐরূপ যেমন বর্ণনা করা হল। কিন্তু আমি যা বুঝেছি তা বিলকুল এর বিপরীত। আমার মনে হয় আগমনকারী তাঁর যুগের নেতা হবেন। যুগের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর তাঁর গবেষণামূলক দূরদর্শিতা থাকবে। জীবনের যাবতীয় জটিল সমস্যাবলী তিনি উপলব্ধি করবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তামূলক রাষ্ট্র, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক কলাকৌশলের দিক দিয়ে গোটা দুনিয়ার ওপর তিনি তাঁর প্রভাব বিস্তার করবেন। তাঁর যগের সকল অভিনবত্বের শীর্ষে তিনি আরোহন করবেন। আমার আশংকা হয় যে, তাঁর নতুনত্বের বিরুদ্ধে মৌলভী ও সূফী সাহেবান হৈচৈ শুরু করবেন। আমি এটাও মনে করি না যে, দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষ থেকে একেবারে ভিন্ন ধরনের হবেন যে, তাঁকে দেখলেই চিনে ফেলা যাবে। উপরন্তু এটাও আমি মনে করি না যে, নিজেকে মাহদী বলে তিনি ঘোষনা করবেন। সম্ভবত তার নিজরেও জানা থাকবে না যে,তিনি প্রতিশ্রুত মাহদী। এমনও হতে পারে যে, তাঁর মৃত্যুর পর দুনিয়াবাসী জানতে পারবে যে, নবুয়াতের পদ্ধতিতে খেলাফত প্রতিষ্ঠাতা তিনিই ছিলেন, যাঁর সুসংবাদ জানান হয়েছিল।

মাহদী হওয়াটা দাবী করার বস্তু নয়

পূর্বে ইঙ্গিত করেছি যে, নবী ছাড়া অন্য কারও এমন পদমর্যাদা নেই যে, দাবী করে কাজের সূচনা করবেন। নবী ছাড়া অন্য কেউ জানতেও পারেন না যে, কোন কাজের জন্যে তাঁকে নিয়োজিত করা হয়েছে। মাহদী হওয়াটা দাবী করার জিনিস নয়, করে দেখিয়ে যাওয়ার জিনিস। এ ধরনের দাবী যারা করেন এবং যারা তাদের ওপর ঈমান আনেন, উভয়েই আমার মতে ইলমের স্বল্পতা এবং মনের নীচতার প্রমাণ দেন।

মাহদীর কাজের ধরন

মাহদীর কাজের ধরন সম্পর্কে আমার যে ধারনা তা এসব ভদ্রলোকের ধারণা থেকে আলাদা। এ কাজের জন্যে কাশপ, কারামাত, ইলহাম, চিল্লা, মুরাকাবা, মুশাহাদা প্রভৃতি কোনো স্থান আছে বলে আমার চোখে পড়ে না। আমি মনে করি কোনো বিপ্লবী নেতাকে যেমন দুনিয়ায় বিরাট সংগ্রাম-সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়, তেমনি মাহদীকেও হতে হবে। তিনি খাঁটি ইসলামের ভিত্তিতে একটা নতুন চিন্তার ক্ষেত্র বা পথ (School of Thought) সৃষ্টি করবেন। মানসিকতার পরিবর্তন সাধন করবেন। একটা বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলবেন যা একসাথে তামাদ্দুনিকও হবে এবং রাজনৈতিকও। জাহিলিয়াত তার সমগ্র শক্তি দিয়ে তা নির্মূল করার চেষ্টা করবে কিন্তু অবশেষে তিনি জাহেলী শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত করে একটা শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করবেন। তার মধ্যে একদিকে সঞ্চারিত ইসলামের প্রাণশক্তি এবং অপরদিকে বৈজ্ঞানিক উন্নতি চরমে পৌঁছুবে। যেমন হাদীসে এরশাদ করা হয়েছে, তাঁর শাসনব্যবস্থায় আসমানবাসীও সন্তুষ্ট হবে এবং দুনিয়াবাসীও। আসমান প্রাণ খুলে তার বরকতসমূহ বর্ষণ করতে থাকবে এবং যমীন তাঁর গর্ভ থেকে সকল সম্পদ বাইরে নিক্ষেপ করবে।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.