সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

দাজ্জাল ও তার আবির্ভাব

দাজ্জালের আবির্ভাবের সময়কাল নির্দিষ্ট নেই

দাজ্জাল সম্পর্কে যত হাদীস নবী (সা) থেকে বর্ণিত আছে, তার বিষয়বস্তুর ওপর সামগ্রিকভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবী পাক (সা)-কে এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছিল তা শুধু এতটুকু পর্যন্ত যে, এক বড় জালেম দাজ্জাল আবির্ভূত হবে। তার এ সংজ্ঞা হবে সে এসব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হবে। কিন্তু নবীকে এ কথা বলা হয়নি যে, কখন সে আবির্ভূত হবে, কোথায় হবে এবং সে কি তার জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেছে, না পরবর্তী কোনো সময়ে জন্মগ্রহণ করবে।

নবী (সা)-এর বিভিন্ন অনুমান

এ বিষয়ে নবী (সা) থেকে যেসব কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে তার বিষয়বস্তুর গরমিল এবং তাঁর বাচন-ভঙ্গিতে এটাই সুস্পষ্ট হয় যে, তিনি এসব কথা অহীর ভিত্তিতে নয় বরং অনুমান করে বলেছেন। কখনও তিনি এ ধারণা পোষণ করেছেন যে, দাজ্জাল খোরাশান থেকে বেরুবে, কখনও বলেছেন ইস্পাহান থেকে। আবার কখনও বলেছেণ সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তী স্থান থেকে। যে ইহুদী বালক সম্ভবত দ্বিতীয় বা তৃতীয় হিজরীতে মদীনায় জন্মগ্রহণ করে, তার সম্পর্কে এ সন্দেহ পোষণ করেন যে, সম্ভবত এ-ই দাজ্জাল হবে। শেষ একটি বর্ণনায় আছে যে, নবম হিজরীতে ফিলিস্তিনের একজন খৃষ্টান পাদ্রী তামিমদারী এসে ইসলাম কবুল করে এবং নবীর কাছে একটা কাহিনী বর্ণনা করে। তা এই যে, সে একবার সমুগ্র ভ্রমণে (সম্ভবত রোম সাগর অথবা আরব সাগর) এক জনবসতিহীন দ্বীপে পৌঁছে। সেখানে একটি অদ্ভূত লোকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সে বলে যে, সে স্বয়ং দাজ্জাল। নবী (সা) তার এ বর্ণনা ভুল মনে করার কোনো কারণ দেখলেন না কিন্তু তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বললেন, “তার কথা মত দাজ্জাল রোম সাগর অথবা আরব সাগরে আছে বলতে হয় কিন্তু আমার ধারণা সে পূর্বদিক থেকে বেরুবে”।

নবী পাকের এরশাদের দু’টো অংশ

এসব বিভিন্ন বর্ণনার ওপর সামগ্রিকভাবে যদি কেউ দৃষ্টিপাত করেন এবং তিনি যদি হাদীস শাস্ত্র এবং দ্বীনের মূলনীতি সম্পর্কে অবহিত থাকেন, তাহলে তাঁর এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে, এ ব্যাপারে নবী পাক (সা)-এর কথাগুলো দু’অংশে বিভক্ত।

প্রথম অংশ এই যে, দাজ্জালের আবির্ভাব অবশ্যই হবে, তার এই সংজ্ঞা হবে এবং সে ফেৎনা সৃষ্টি করবে। এ একেবারে অতি নিশ্চিত সংবাদ যা রসূল (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে দিয়েছেন। এ বিষয়ে বর্ণনাগুলোর মধ্যে কোনো গরমিল নেই।

দ্বিতীয় অংশের আলাদা মর্যাদা

দ্বিতীয় অংশ এই যে, দাজ্জাল কোথায় এবং কখন আবির্ভূত হবে এবং সে ব্যক্তি কে? এ সম্পর্কে বর্ণনা শুধু বিভিন্ন ধরনে্ই নয়, বরং তার মধ্যে সন্দেহ রয়েছে এবং অনুমানভিত্তিক শব্দ প্রয়োগও করা হয়েছে। যেমন ধরুন, ইবনে সাইয়াদ সম্পর্কে নবী (সা) হযরত ওমরকে বলছেন, দাজ্জাল যদি এই হয় তাহলে তার হত্যাকারী তুমি নও। আর যদি সে তা না হয় তাহলে একজন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যিম্মীকে হত্যা করার অধিকার তোমার নেই। অথবা যেমন এক হাদীসে নবী করীম (সা) বলেন, যে যদি আমার জীবদ্দশায় এসে পড়ে তাহলে আমি তার মুকাবিলা করব। আর আমার পরে এলে আমার প্রভু তো প্রত্যেক মুমিনের সমর্থক ও সাহায্যকারী।

এ দ্বিতীয় অংশের দ্বীনি এবং মৌলিক মর্যাদা তা নয় এবং হতে পারে না যা প্রথম অংশের। যে ব্যক্তি এ অংশের খুঁটিনাটি বিষয় ইসলামী আকায়েদের মধ্যে শামিল করে সে ভুল করে, বরং তার প্রত্যেক অংশের সত্যতার দাবী করাও ঠিক নয়। ইবনে সাইয়াদের প্রতি নবীর সন্দেহ হয়েছিল এবং তিনি মনে করেছিলেন সম্ভবত সে-ই দাজ্জাল। হযরত ওমর তো কসম খেয়েই বললেন যে, সে-ই দাজ্জাল কিন্তু সে মুসলমান হল, হারামাইনে বাস করল, ইসলামের প্রতি বিশ্বাসী থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল এবং মুসলমানগণ তার জানাযার নামায পড়ল। এখন বলুন, আজ পর্যন্ত ইবনে সাইয়াদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করার কোনো অবকাশটা রইল? তামিমদারীর বর্ণনা সে সময়ে প্রায় সত্য বলে মনে করা হয়েছিল। তামিমদারী সাড়ে তেরশ’ বছর আগে যাকে বন্দী অবস্থায় দেখেছিল, এ সুদীর্ঘকালের মধ্যে তার আবির্ভূত না হওয়া কি এ কথা প্রমানের জন্যে যথেষ্ট নয় যে, তার দাজ্জাল হওয়ার সংবাদ তামিমিদারীকে দিয়েছিল তা সত্য ছিল না? নবী পাকের যামানায়ই তার এ সন্দেহ ছিল যে, হয়ত তাঁর জীবদ্দশাতেই অথবা তাঁর অনতিকাল পরেই দাজ্জালের আবির্ভাব হবে। কিন্তু এটা কি সত্য নয় যে, সাড়ে তেরশ’ বছর অতীত হয়ে গেল এবং এখন পর্যন্ত দাজ্জাল এল না এখন এসব কিছু ইসলামী আকায়েদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে তা নকল ও বর্ণনা করা না ইসলামের সঠিক প্রতিনিধিত্ব আর না হাদীসেরই সঠিক জ্ঞান বলা যেতে পারে। আমি আগেই বলেছি যে, এ ধরনের ব্যাপারসমূহে যদি কোনো কথা নবীর আন্দাজ-অনুমান অথবা আশংকা অনুযায়ী বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে তা নবুাতের মর্যাদার জন্যে কিছুতেই হানিকর হয় না। এতে নবীর নিষ্পাপ হওয়ার ধারনার ওপরও কোনো আঘাত আসে না। আর এসব বিষয়ের ওপর ঈমান আনার জন্যে শরীয়াতও আমাদেরকে বাধ্য করেনি। এ মৌলিক তত্ত্ব নবী (সা) তারখেজুর গাছের জোড়া সংক্রান্ত হাদীসটিতে ব্যাখ্যা করেছেন।

নবীর নিজস্ব ব্যাখ্যা থেকে পথনির্দেশ

নবীর কোন্ কথা তাঁর ধারণাপ্রসূত, কোটি তাঁর ব্যক্তিগত অভিমত এবং কোনটি খোদা প্রদত্তজ্ঞানের ভিত্তিতে তা অনেক সময়ে তাঁর নিজস্ব ব্যাখ্যায় প্রকাশ পেয়েছে। আবর অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকেও তা জানা যায়। যেমন দাজ্জাল সম্পর্কিত হাদীসটির কথাই ধরা যাক। এতে নবীর নিজস্ব ব্যাখ্যায় জানা যায় যে, দাজ্জাল আবির্ভাবের স্থান, কাল এবং তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো জ্ঞান তাকে দেয়া হয়নি। ইবনে সাইয়াদ সম্পর্কে তাঁর সন্দেহ এতখানি প্রকট ছিল যে, তাঁর সামনেই হযরত ওমর (রা) কসম করে তাকে দাজ্জাল বলে ফেললেন। নবী তার প্রতিবাদ করেননি কিন্তু হযরত ওমর যখন তাকে কতল করার অনুমতি চাইলেন তখন নবী (সা) বললেনঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪৫১ পৃষ্ঠায়)

“যদি সে দাজ্জালই হয় তাহলে তাকে তুমি আয়ত্তে আনতে পারবে না। আর যদি সে তা না হয়, তার হত্যায় তোমার কোনো মঙ্গল নেই”।–(মুসলিম, দাজ্জাল

প্রসঙ্গ)

আর একটি হাদীসে নবী (সা) দাজ্জালের উল্লেক করতে গিয়ে বলেনঃ

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪৫১ পৃষ্ঠায়)

“সে যদি আমার জীবদ্দশায় বের হয় তাহলে আমি তার মুকাবিলা করব। আর যদি আমার অবর্তশানে বের হয় তাহলে প্রত্যেকে তার নিজের পক্ষ থেকে তার মুকাবিলা করবে। আল্লাহ আমার পরে প্রত্যেক মুসলমানের রক্ষক”।–(মুসলিম, দাজ্জাল প্রসঙ্গ)

তামিমদারী তার সামুদ্রিক ভ্রমণকালে দাজ্জালের সাথে সাক্ষাতের কাহিনী যখন নবী (সা)-কে শুনাল, তখন তিনি তা স্বীকার করেও নেননি অথবা মিথ্যাও মনে করেননি। বরং বললেনঃ (আরবী*********************************************************)

“তামিমের বর্ণনা আমার ভাল লেগেছে। আমি দাজ্জাল সম্পর্কে তোমাদেরকে যেসব কথা বলি তার সাথে এর মিল আছে”। তারপর নবী (সা) কথা আর একটু বাড়িয়ে বলেনঃ (আরবী**********************************************************)

“না বরং সে শাস সাগর অথবা ইয়েমেনের সাগরে আছে। না, বরং পূর্বদিকে”। এসব বর্ণনা স্বয়ং তাদের তাৎপর্য পরিস্কার করে দিচ্ছে।

আম্মার বিন ইয়াসেরের হত্যার ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত আম্মার (রা) সম্পর্কে নবী পাক (সা)-এর নিম্নোক্ত ইরশাদ সাহাবীদের মধ্যে সর্বজনবিদিত ছিল এবং অনেক সাহাবী তা নবীর মুখেই শুনেছেনঃ (আরবী*****************) “তোমাকে একটি বিদ্রোহী দল কতল করবে”।–[মুসনাদে আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি, নাসায়ী, তাবরানী, বায়হাকী, মুসনাদে আবু দাউদ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থগুলোতে হযরত আবু সাঈস খুদরী, আবু কাতাদাহ আনসারী, উম্মে সালমা, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আবদুল্লাহ বিন আমর বিন আস, আবু হুরায়রা, ওসমান বিন আফফান, হুযায়ফাহ, আবু আইয়ুব, আবু রাফে, খুযায়মাহ বিন সাবেত, আমর বিন আস, আবুল ইউসর, আম্মার বিন আসের (রা আনহুম) এবং অন্যান্য অনেক সাহাবী থেকে এ বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। ইবনে সা’দও তাবাকাতে কয়েক সূত্রে এটা নকল করেছেন।]

ইবনে আবদুর বরর আল ইস্তিয়াবে লিখেছেন যে, নবী (সা) থেকে এ কথা পরম্পরা ক্রমে বর্ণিত হয়েছে যে, আম্মার বিন ইয়াসীর (রা)-কে বিদ্রোহী দল কতল করবে এবং এ বিশুদ্ধতম হাদীসগুলোর মধ্যে একটি।

কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার দশটি আলামত

মুসলিম বিন হুযায়ফাহ বিন আসিদ আল-গিফারী থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী পাক (সা) –এর ইরশাদ হচ্ছেঃ কেয়ামত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি আলামত দেখতে পাবে –ধুয়া, দাজ্জাল, দাব্বাতুল আরদ, পশ্চিম দিকে থেকে সূর্যোদয়, ঈসা বিন মরিয়ামের অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুদের প্রাদুর্ভাব, তিনটি বড় বড় ভূমিধস (Land Slide) প্রথমটি পূর্বে, দ্বিতীয়টি পশ্চিমে এবং তৃতীয়টি আরবে। সর্বশেষে এক ভয়াবহ আগুন উঠে মানুষকে হাশরের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। (অর্থাৎ তারপরই কেয়ামত হবে)। আর একটি হাদীসে ইয়াজুজ-মাজুজের উৎপাত প্রাদুর্ভাবের উল্লেখ করে নবী (সা) বলেন, সে সময় কেয়ামত এতটা নিকটবর্তী হবে যেমন আসন্ন প্রসবা নারী যে বলতে পারে না কোন মুহুর্তে তার সন্তান হবে রাতে না দিনে।

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪৫২ পৃষ্ঠায়)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.