সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ১২ – কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে প্রাচ্যবিদগনের তাত্ত্বিক অসাধুতা

[ইসলাম, কুরআন এবং রসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবন চরিতের ব্যাপারে পাশ্চাত্যের এই প্রাচ্যবিশারদগণ যে রচনাসমূহ তৈরী করেছে, তার মধ্যে অসংখ্য আজেবাজে এবং অযৌক্তিক কথা জুড়ে দিয়েছে। যেগুলোকে গবেষণার সুন্দর নামের আড়ালে প্রচারও করা হয়েছে। এই নামকাওয়াস্তে গবেষণার আওতায় উইলিয়াম মূরের ন্যায় মধ্যমপন্থী লেখকের লেখায় পর্যন্ত নবী (সা) এবং ইসলাম সম্পর্খে এ ধরনের হাস্যকর কথা পাওয়া যায়। যে সম্পর্কে নিরপেক্ষ মেযাজের পাঠকের দৃষ্টিতে প্রাচ্যবিদদের সকল জ্ঞান-গবেষণা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এ সমস্ত ব্যাপক ভিত্তিক গবেষণা কর্মের প্রথম লকষ্য ছিল কুসেডের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মন-মানসিকতার অধীনে খৃষ্টানদেরকে ইসলামের প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্যে সংকীর্ণ জাতীয়তার প্রাচীর দাঁড় করিয়ে আড়াল সৃষ্টি করা। এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, ইসলাম সম্পর্খে অজ্ঞ লোকদেরকে, ইসলামের ব্যাপারে ভ্রান্ত ধারনা দেয়া এবং তাদেরকে সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করা। এসব সত্ত্বেও প্রাচ্য বিশারদগণ আমাদের আধুনিক শ্রেণীর জন্যে এক শতাব্দীকাল ধরে ইসলাম ও নবী (সা)-এর জীবন-চরিত সম্পর্কে শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। আর ইসলাম সম্পর্কে অনভিজ্ঞ লোকরো এদের লেখা পড়ে পড়ে এমন এমন সন্দেহের মধ্যে লিপ্ত হয়েছে এবং এমন এমন আপত্তি নিজেদের দ্বীনের বিরুদ্ধে খোদ নিজেরাই তুলেছে যে, প্রত্যেক সত্যানুরাগীর জন্যে এর মধ্যে তাজ্জব বনে যাওয়া এবং এ থেকে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

এই গ্রন্থের সম্মানিত লেখক এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহের মধ্যে ইসলামের ভাস্যকর হিসেবে ইসলামী জ্ঞানের ক্ষেত্রে যে ব্যাপক পুনর্বিন্যাসের কাজ করেছেন এর মধ্যে কোথাও কোথাও প্রাচ্যবিদগণের লেখার মধ্যে আপত্তি তোলা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। সত্যকে বিকৃতকারী এ সকল গবেষকদের ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করা ব্যতিরেকে মুসলিম জাতির আধুনিক শিক্ষিত সমাজকে ইসলামের সঠিক উৎস পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভবপর নয়।

অতএব নবী (সা)-এর জীবন-চরিত রচনার ক্ষেত্রে বিজ্ঞ লেখক নিজস্ব লেখার মধ্যে যেখানে যেখানে প্রাচ্যবিদগণের ত্রুটি-বিচ্যুতির দিকে আঙ্গুলি-সংকেত করেছেন এবং এর মধ্যে যতদুর আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, এর প্রয়োজনীয় অংশবিশেষ এ অধ্যায়ে সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

এ অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত বিষয়বস্তুসমূহ অধ্যয়ন করার প্রাক্কালে পাঠকবর্গ যেন এদিকে খেয়াল রাখেন যে, প্রাচ্যবিদগণ ইসলাম এবং নবী (সা) সম্পর্কে যে ভুল করেছেন এবং নানা ধরনের ভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন, ঐগুলোর সবকিচুর চুলচেরা বিশ্লেষণ লেখক করেননি। কেননা শুধুমাত্র প্রাচ্যবিদগণের সমস্ত্র রচনাকে বিষয়বস্তু করে কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্রনথ অথবা প্রবন্ধ রচনা করা হয়নি। শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় স্থানে সুযোগ-সুবিধা মত আলোচনা করা হয়েছে। রসূল (সা)-এর জীবনী সম্পর্কে প্রাচ্যবদগনের আরও অসংখ্য আপত্তির জবাব বিভিন্ন অধ্যায়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যদিও আপত্তিকারকদের ভাষ্য তুলে ধরা হয়নি।

এখানে এ কথা সুস্পষ্ট করে দেয়া জরুরী যে, এ অধ্যয়ের বিষয়বস্তুর সম্পর্কে এ সমস্যা আমাদের জন্যে খুবই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে, এটা গ্রন্থের কোন অংশে সন্নিবেশিত হবে। চিন্তা-ভাবনার পরে আমরা এটাকেও মৌলিক বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত করেছি। কেননা এ খণ্ডের অন্যান্য প্রবন্ধসমূহের এই গুরুত্ব রয়েছে যে, নবীর জীবন-চরিত্রকে বুঝার জন্যে এর অধ্যয়ন একান্ত জরুরী, সে ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদগণের লেখার ওপরে এ নিবন্ধের অধ্যয়ন দ্বারা ঐ সমস্ত বাধাসমূহ অপসারণ করবে যা সীরাতকে বুঝবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এ অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদ খুবই সংক্ষিপ্ত কিন্তু ব্যাপক অর্থবোধক। শুধুমাত্র কয়েকটি বাক্যের এই অনুচ্ছেদকে এ জন্যে আলাদা করা হয়েছে যাতে বিজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গী সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টির  মধ্যে আসে।–(সংকলকদ্বয়)]

প্রাচ্যবিদগণের অযৌক্তিক কর্মপদ্ধতি

এসব অসৎ প্রকৃতির লোক কোনো গবেষণা ও তত্ত্বানুসন্ধানের পূর্বে নিজেই সিদ্ধান্ত করে নেয়, কুরআনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কোনো গ্রন্থ বলে স্বীকার করা চলবে না। অতএব কোথাও না কোথাও থেকে দলিল-প্রমাণ তালাশ করে এনে তারা বলে যে, নবী মুহাম্মদ (সা) কুরআনের নাম করে যেসব কথা বলেছেন তা অমুক স্থান থেকে চুরি করা প্রবন্ধ ও তথ্যাবলী বৈ কিছু না। এ তত্ত্বানুসন্ধান পদ্ধতিতে তারা এতটা নির্লজ্জতার সাথে শঠতার প্রশ্রয় নিয়ে সারা দুনিয়া মাথায় তুলে নেয় যে, তা দেখে স্বতঃ স্ফুর্তভাবে ঘৃণার সঞ্চার হয় এবং লোককে বাধ্য হয়ে বলতে হয়, এরই নাম যদি জ্ঞান-গবেষণা হয় তাহলে অভিসম্পাত সে জ্ঞানের ওপর এবং অভিসম্পাত সে গবেষণার ওপর।

সন্যাসী বাহিরার কাহিনী

 

(আরবী***************************************পিডিএফ ৪৫৬ পৃষ্ঠায়)

“যারা নবী (সা)-এর কথা শুনতে অস্বীকার করেছে তারা বলে যে, এ ফুরকান একটা মনগড়া জিনিস –এ ব্যক্তি নিজে এটা বানিয়েছে এবং অন্যকিছু লোক এ কাজে তাকে সাহায্য করেছে। তারা যা বলছে তা বিরাট যুলুম এবং মিথ্যা। তারা বলে যে, এ প্রাচীন লোকের লিখিত জিনিস যা এ ব্যক্তি নকল করিয়ে নেয় এবং সকাল-সন্ধ্যায় তা শুনান হয়। হে মুহাম্মদ! তাদেরকে বল, একে নাযিল করেছেণ এমন এক সত্তা যিনি আসমান ও যমীনের রহস্য জানেন। আসলে তিনি বড় ক্ষমাশীল ও দয়ালু”।–(সূরা আল ফুরকানঃ ৪-৬)

এ হল সেই অভিযোগ যা এ যুগের প্রাচ্যবিদগণ কুরআনের বিরুদ্ধে উত্থাপন করে থাকে।

নবী (সা)-এর জাতি অভিযোগ করেনি কেন?

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নবী (সা)-এর সমসাময়িক দুশমনদের মধ্যে কেউ এ কথা বলেনি, “তুমি ছোটবেলায় যখন সন্ন্যাসী বাহিরার সাক্ষাৎ করেছিলে তখন এসব কিছু তার কাছ থেকে শিখে নিয়েছিল”। তারা এ কথাও বলেছি, “তুমি যৌবনকালে যখন ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাতায়াত করতে তখন তুমি সে সময়ে খৃষ্টান পাদরি-সন্ন্যাসী ও ইহুদী রিব্বীদের নিকটে এসব জ্ঞান অর্জন করেছিলে”। তারা এসব কথা এ জন্যে বলেনি যে, এসব ভ্রমণের আগাগোড়া অবস্থা তাদের জানা ছিল। এ ভ্রমণ তাঁর একাকী হয়নি বরং আপন কাফেলার সাথে হয়েছে। তাদের জানা ছিল যে, যদি কারও নিকট থেকে কিছু শিখে আসার অভিযোগ তারা করে তাহলে তাদের নিজ শহরেরই শত শত লোক তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলবে। তাছাড়া মক্কার প্রতিটি সাধারণ মানুষ তাদেরকে বলত, “এ লোক যদি বার-তের বছর বয়সেই বাহিরার নিকট থেকে এসব জ্ঞানলাভ করেছিল, তাহলে সে তো আর বাইরে কোথাও বসবাস করত না বরং আমাদের মধ্যেই বসবাস করত। তাহলে কি কারণ থাকতে পারে যে, তার চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তার এসব জ্ঞান গোপন রাখা হয়েছিল এবং এ সময়ের মধ্যে তার মুখ থেকে একটি শব্দও এমন বেরুল না যে, তার মধ্যে এ ধরনের কোনো জ্ঞান আছে?”

এটাই ছিল মূল কারণ যার জন্যে মক্কার কাফেরগণ এত বড় সাংঘাতিক মিথ্যা কথা বলতে সাহস করেনি। এ কাজটা হয়ত তারা পরবর্তীকালের অধিকতর নির্লজ্জ লোকদের দায়িত্বে ছেড়ে দিয়েছিল।

মক্কার কাফেরদের অভিযোগ কি ছিল?

তারা যেসব কথা বলত তা নবুয়াত পূর্বকাল সম্পর্কে নয়, বরং নবুয়াতের দাওয়াত দেয়ার কাল সম্পর্কে। আরা বলত, “এ লোক নিরক্ষর। স্বয়ং লেখাপড়া করে কোনো জ্ঞান লাভ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ আগে তো কিছুই শিক্ষা করেননি। আজ তাঁর মুখ থেকে যেসব কথা বেরুচ্ছে বিগত চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তার কোনোটিই তাঁর জানা ছিল না। তাহলে এখন এসব জ্ঞান তাঁর কোথা থেকে আসছে? তাঁর জ্ঞানের উৎস তাহলে নিশ্চয়ই পূর্ববর্তী লোকের বই-পুস্তক হবে। রাতের বেলায় সেসব বইয়ের উদ্ধৃতি গোপনে তরজমা এবং নকল করান হচ্ছে। এগুলো কারও দ্বারা তিনি পড়িয়ে নেন এবং মনে করে রেখে দিনের বেলায় আমাদেরকে শুনাচ্ছেন”।

কিছু বর্ণণা সূত্রে জানতে পারা যায় যে, তারা এ ব্যাপারে কিছু লোকের নামও করত যারা আহলে কিতাব ছিল, লেখাপড়া জানত এবং মক্কায় বাস করত। তাদের নাম-আদ্দাস (হুয়াইতিব বিন আবদুল উয্যার মুক্তিপ্রাপ্ত দাস), ইয়াসার (আলা বিন আল হাযরামীর মুক্তিপ্রাপ্ত দাস) এবং যাবর (আমের বিন রাবিয়ার মুক্তিপ্রাপ্ত দাস)।

বাহ্যত বেশ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ মনে হয়। অহীর বাদী প্রত্যাখ্যান করার জন্যে জ্ঞানের উৎনসকে চিহ্নিত করে দেয়ার চেয়ে আর কোন অভিযোগ এত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে? কিন্তু মানুষ একনজরেই অবাক হয়ে পড়ে যে, এ অভিযোগের জবাবে কোনো দলিল-প্রমাণ পেশ করা হয়নি। বরং এ কথা বলেই প্রসঙ্গ শেষ করে দেয়া হচ্ছে যে, সত্যের ওপর সুস্পষ্ট অবিচার করা হচ্ছে। মিথ্যার ঝড় সৃষ্টি করা হচ্ছে। এত সেই খোদার বাণী যিনি আসমান ও যমীনের রহস্য অবগত আছেন।

এটা কি বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে, চরম বিরোধিতার পরিবেশে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ করা হচ্ছে আর তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে? সত্যিই কি তাদের অভিযোগ এতখানি গুরুত্বহীন ছিল যে, তার জবাবে শুধু মিথ্যা এবং অবিচার বলাই যথেষ্ট ছিল? তাহলে এর কারণই বা কি যে, এ সংক্ষিপ্ত জবাবের পর জনসাধারণ কোনো বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট জবাব দাবী করেনি, নও-মুসলিমদের মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেকও হয়নি, আর বিরোধীদের মধ্যেও কেউ এ কথা বলতে সাহস করেনি, “দেখলে আমাদের এ বিরাট অভিযোগের জবাব দেয়ার মুরাদ হল না বলে শুধু ‘মিথ্যা ও অবিচার’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হল?”

যে পরিবেশে ইসলাম বিরোধিরা এ অভিযোগ উত্থাপন করেছিল সেখান থেকেই আমরা এর সমাধান পেয়ে যাচ্ছি।

[এ সমাধানের জন্যে গ্রন্থকার নিম্নের পর্যালোচনা লিপিবদ্ধ করেছেন।–(সংকলকদ্বয়)

প্রথম পর্যালোচনা

যেসব জালেম একটি একটি করে মুসলমানদের ওপর মারধর করে তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলত এবং যাদের সম্পর্কে তারা বলত যে, পুরাতন বই-পুস্তকের অনুবাদ করে করে তারা নবী মুহাম্মদ (সা)-কে মুখস্থ করিয়ে দিত, তাদের এবং নবীর বাড়ীতে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে সেসব মালপত্র বের করে এনে জনসাধারণকে দেখান তাদের পক্ষে মোটেই কষ্টকর ছিল না। এ গোপন কাজ চলাকালেই তাদের ওপর হামলা চালিয়ে লোকজন ডেকে তারা বলতে পারত, “দেখ দেখ এখানে নবুয়াতের প্রস্তুতি চলছে”। যারা হযরত বেলাল (রা)-কে উত্তপ্ত বালুকারাশির ওপর শায়িত রাখতে পারত, কোনো আইন-কানুনই তাদের কাজের কোনো প্রতিবন্ধক ছিল না এবং এরূপ করে তারা নবুয়াতে মুহাম্মদীর ‘আশংকা’ চিরতরে নির্মূল করতে পারত কিন্তু তারা শুধু মৌখিক অভযোগ প্রতিবাদই করত এবং এক দিনের জন্যেও তারা উপরোক্ত সিদ্ধান্তকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

দ্বিতীয় পর্যালোচনা

অনুবাদ করে শুনানোর ব্যাপারে তারা যেসব লোকের নাম করত, তারা কোনো বাইরের লোক ছিল না বরং মক্কা শহরেরই অধিবাসী ছিল। তাদের যোগ্যতাও কারও কাছে গোপন ছিল না। সামান্য বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকই লক্ষ্য করত যে, নবী মুহাম্মদ (সা) যা পেশ করেছেন তা কোন উচ্চ স্তরের জিনিস, তা কত উচ্চাঙ্গের ভাষা, কত মর্যাদার্পূণ সাহিত্য, বাণী কত শক্তিশালী এবং চিন্তাধারা ও বক্তব্য কত উচ্চস্তরের। আর তারা কোন স্তরের লোক যাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে যে, মুহাম্মদ (সা) তাদের কাছ থেকেই এসব শিখে আসছেন। এ কারনে কেউ তাদের অভিযোগের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেয়নি। প্রত্যেকেই মনে করত যে, এ ধরনের অভিযোগ করে তারা মনের ঝাল মিটাচ্ছে। আর যারা এসব লোক সম্পর্কে কিছু জানত না তারা অন্তত এটুকু চিন্তা তো করতে পারত যে, এসব লোকের যদি এতটাই যোগ্যতা থাকত তাহলে তারা নিজেদেরই প্রদীপ কেন জ্বালাল না? অপরের প্রদীপে তেল সরবরাহ করার তাদের কি প্রয়োজন ছিল? আর তাও এমন সংগোপনে যে এ কাজের সুখ্যাতির কোনো অংশও তাদের ভাগ্যে জুটবে না?

তৃতীয় পর্যালোচনা

এ ব্যাপারে যেসব মুক্তিপ্রাপ্ত দাসের নাম করা হচ্ছিল তারা তো বহিরাগত ছিল না। আরবের উপজাতীয় জীবনে কোনো ব্যক্তিই কোনো না  কোদনো শক্তিশালী গোত্রের সহযোগিতা ছাড়া বেঁচে থাকতে পারত না। মুক্ত হওয়ার পরও সে দাস তার পূর্বতন প্রভুর তত্ত্বাবধানেই থাকত। তার প্রভুর সমর্থনই সমাজে তার জীবন ধারণের সম্বল ছিল। এখন কথা এই যে, নবী মুহাম্মদ (স) যদি এসব মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের বদৌলতেই (মায়াযাল্লাহ) একটা মিথ্যা নবুয়াতের দোকান চালিয়ে থাকেন, তাহলে এসব লোক তো কোনো আন্তরিকতার সাথে ও সদুদ্দেশ্যে এ ষড়যন্ত্রে নবীর অংশীদার হতে পারত না। শেষ পর্যন্ত তারা এ ব্যক্তির আন্তরিক সহকর্মী ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারত যিনি রাতের বেলায় তাদের কাছে কিছু শিখে এসে দিনের বেলা সকলের সামনে এ কথা বলে বেড়াতেন যে, খোদার পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অহী নাযিল হয়েছে এ জন্যে কোনো প্রলোভন অথবা স্বার্থের জন্যেই এ কাজে তাদের সহযোগিতা সম্ভব ছিল কিন্তু কোন বিবেকবান ব্যক্তি এ কথা চিন্তা করতে পারে যে, এসব লোক নিজেদেরে অভিভাবকদের অসন্তুষ্ট করে এ ষড়যন্ত্রের নবী মুহাম্মদ (সা)-এর অংশীদার হয়েছিল? যে ব্যক্তি ছিলেন গোটা জাতির কাছে অভিশপ্ত ও ধিকৃত এবং গোটা জাতির শত্রুতার শিকার, কোন প্রলোভনে এ লোকগুলো তাঁর সাথে মিলিত হয়েছিল? এ বিপন্ন লোকটি থেকে কোন স্বার্থসিদ্ধির আশায় তারা তাদের অভিভাবক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ক্ষতিটা স্বীকার করে নিয়েছিল? তারপর এটাও চিন্তা করার বিষয় যে, মারধর করে তাদের কাছ থেকে ষড়যন্ত্রের স্বীকারোক্তি করে নেয়ার সুযোগও তো এসব অভিভাবকদের ছিল। তারা এ সুযোগের সদ্ব্যবহার কেন করেনি এবং গোটা জাতি কেন ঐসব দাস থেকে এ স্বীকারোক্তি করায়নি যে, তাদের কাছে শিখে নিয়েই এ ব্যক্তি নবুয়াতের দোকান জমজমাট করেছিল?

চতুর্থ পর্যালোচনা

সবচেয়ে বড় মজার কথা এই যে, তারা সকলেই নবী মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর ঈমান আনে এবং তাঁর প্রতি এমন অনুপম ভক্তি-শ্রদ্ধা পোষণ করে যেমন পোষণ করতেন সাহাবায়ে কেরাম (রা)। এটা কি সম্ভব যে, ভুয়া এবং ষড়যন্ত্রমূলক নবুয়াতের (মায়াযাল্লাহ) ওপর শুধু ঈমানই আনল না, বরং গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধাসহকারে ঈমান আনল ঐসব লোক যারা তাঁর ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ করেছিল? আর মনে করুন যদি তা সম্ভবও হত তাহলে ঈমানদারদের দলে নিশ্চয়ই তাদের বিশেষ মর্যাদা হত। এ কি করে সম্ভব ছিল যে, নবুয়াতের ব্যবসা চলবে আদ্দাস, ইয়াসার এবং যাবরের বদৌলতে, আর নবী (সা)-এর দক্ষিণ হস্ত থাকবেন আবুবকর (রা), ওমর (রা) এবং আবু ওবায়দাহ (রা)?

আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, যদি কিছু লোকের সাহায্যেই রাতের বেলা বসে বসে এ ব্যবসায় উপকরণাদি তৈরি করা হত তাহলে যায়েদ বিন হারেসা (রা), আলী ইবনে আবু তালেব (রা), আবুবকর সিদ্দিক (রা) এবং অন্যান্য সাহাবীদের কাছে এ কথা কি করে গোপন থাকত যারা দিন-রাত ছায়ার মত নবী মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে থাকতেন?

এ অভিযোগ যাদেরই কানে যেত তারা এর কোনোই মূল্য দিত না। এ জন্যে এটাকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ মনে করে তার জবাব দেয়ার জন্যে কুরআনে উল্লেখ করা হয়নি। বরং উল্লেখ করা হয়েছিল এ কথা বলার জন্যে যে, এরা কতটা অন্ধ হয়ে সত্যের বিরোধিতা করত এবং কতখানি মিথ্যাচার ও অবিচারের জন্যে বদ্ধপরিকর হয়েছিল।

কুরআনের তিনটি কাহিনী আলোচনা

প্রাচ্যবিদগণ কুরআনের তিনটি কাহিনীর তত্ত্বাবধান করে এ অভিযোগ করেছেণ যে, নবী মুহাম্মদ (সা) তথ্যগুলো অন্য কোথাও থেকে সংগ্রহ করে নিজের পক্ষ থেকে পেশ করেছেন।

এসব প্রাচ্যবিদগণের অভিযোগ-আপত্তি বর্ণনা করার পুর্বে ঐসব কাহিনী জেনে রাখা দরকার। নতুবা সামনের আলোচনা বুঝতে কষ্ট হবে। -(সংকলকদ্বয়)

একঃ হযরত মূসা (আ)-এর নদীসঙ্গম ভ্রমণ

 

(আরবী***************************************পিডিএফ ৪৬০ পৃষ্ঠায়)

“(তাদেরকে ঐ কাহিনী শুনিয়ে দাও) যখন মূসা (আ) তাঁর খাদেমকে বললেন, আমি আমার সফর শেষ করব না যতক্ষণ না দু’টি নদীর সঙ্গমস্থলে পৌঁছব। নতুবা দীর্ঘকাল ধরে আমি চলতেই থাকব”।–(সূরা আল কাহফঃ ৬০)

এ পর্যায়ে এ কাহিনী বর্ণনা করার উদ্দেশ্য হল, কাফের এবং মুসলমান উভয়কেই একটা নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত করা। তাহলো এই যে, বাহ্যত দুনিয়াতে যা কিছু হতে দেখা যায়, তার থেকৈ বিলকুল একটা ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কারণ আল্লাহ তায়ালা যে গূঢ় রহস্য সামনে রেখে কাজ করেন তা দর্শকের চোখে ধরা পড়ে না। যালেমদের ক্রমোন্নতি হওয়া এবং নিরপরাধ লোকের দুঃখ-কষ্ট হওয়া, পাপিষ্ট লোকের ওপর সম্পদের বারিধারা বর্ষিত হওয়া এবং সৎকর্মশীলদের বিপদের সম্মুখীন হওয়া, পাপাচারীদের আরাম-আয়েশ উপভোগ এবং ধর্মপরায়ণদের দুরাবস্থা –এ এমন এক দৃশ্য যা প্রতিদিন মানুষের চোখের সামনে প্রকাশিত হয়। মানুষ এসবের রহস্য জানে না বলে সাধারণত মনের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব এমনকি ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়। যালেম-অবিশ্বাসী তার থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, দুনিয়াটা একটা নৈরাজ্যের লীলাক্ষেত্র। এর কোনো মালিক বা রাজা-বাদশাহ নেই। থাকলেও সে অকর্মণ্য। এখানে যে যা খুশী তাই করে। জিজ্ঞেস করার কেউ নেই। যে মুমিন নড়বড়ে হয়ে যায়। এরূপ অবস্থায় হযরত মূসা (আ)-কে আল্লাহ তায়ালা তাঁর কর্ম রহস্যের আবরণ উন্মোচন করে কিছু আলোকচ্ছটা দেখিয়ে দিলেন যাতে করে তিনি বুঝতে পারেন যে, দুনিয়ার দিবারাত্র যা কিছু হচ্ছে তা কিভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে হচ্ছে। আর কিভাবে ঘটনাপুঞ্জের বাহ্যদিকটা তার আভ্যন্তরীণ দিক থেকে আলাদা ধরনের।

কাহিনীর বিশদ বিবরণ

হযরত মূসা (আ)-এর এ ঘটনা কখন এবং কোথায় ঘটেছিল তার কোনো ব্যাখ্যা কুরআনে নেই। অবশ্য হাদীসে আওফীর একটা বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি ইবনে আব্বাসের একটা উক্তি উদ্ধৃত করে বলেন যে, এ ঘটনা সে সময়ে ঘটেছিল যখন হযরত মূসা (আ) ফেরাউনের ধ্বংসের পর মিসরে তাঁর জাতিকে পুনর্বাসিত করেছিলেন কিন্তু বুখারী এবং অন্যান্য গ্রন্থে ইবনে আব্বাসের যে জোরদার বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে তা ওপরের বর্ণনা

( পিডিএফ ৪০১ পৃষ্ঠায় মানচিত্র রয়েছে**********************************************************)

হযরত মূসা ও খিজির (আ)-এর কিসসা সংক্রান্ত মানচিত্র

সমর্থন করে না। অন্য কোনো সূত্রেও এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, ফেরাঊনের ধ্বংসের পর হযরত মূসা (আ) মিসরে কোন সময় অবস্থান অবস্থান করেছিলেন। বরং কুরআন সুস্পষ্ট করে বলে যে, মিসর থেকে বহির্গমনের পর তাঁর গোটা জীবন সাইনা এবং তাইমা উপত্যকায় অতিবাহিত হয়েছে। এ জন্যে এ বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য আমরা যখন এ কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণের প্রতি লক্ষ্য করি তখন দু’টি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি এই যে, হযরত মূসা (আ)-কে তাঁর নবুয়াতের প্রাথমিক পর্যায়ে এসব পর্যবেক্ষণ করান হয়েছিল। কারণ নবুয়াতের প্রারম্ভেই নবীগণের এ ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষনের প্রয়োজন হয়।

দ্বিতীয় এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর এ ধরনের পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন সে সময়ে হয়েছিল যখন বনী ইসরাঈল মিসরে ঠিক সেই অবস্থায় সম্মুখীন হয়েছিল –যেমন মুসলমানগণ মক্কায় হয়েছিলেন। আমাদের ধারণা এ দু’টি কারণেই (প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই জানেন) এ ঘটনা ঐ সময়ে ঘটেছিল যখন মিসরে বনী ইসরাঈলের ওপর ফেরাউনের যুলুম-নিষ্পেষণ চলছিল এবং কুরাইশ সর্দারদের মত ফেরাউন এবং তার সভাসদবৃন্দ তাদের ওপর কোনো শাস্তি না আসার কারণে মনে করেছিল যে, তাদের ওপরে এমন কেউ নেই যে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ঠিক তেমনি মক্কার মজলুম মুসলমানদের মত মিসরের মজলুম মুসলমান অধীল হয়ে জিজ্ঞেস করছিল, “হে খোদা! এসব যালেমদের জন্যে সুখ-সম্পদ এবং আমাদের জন্যে বিপদ মসিবত আর কত দিন?” এমনকি মূসা (আ) পর্যন্ত বলে উঠলেনঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ৪৬২ পৃষ্ঠায়)

“হে পরোয়ারদেগার! তুমি ফেরাউন এবং তার সভাসদগণকে পার্থিবজীবনে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি এবং ধন-সম্পদ দিয়ে ভূষিত করেছ। হে খোদা! তা কি এ জন্যে করেছ যে, তারা দুনিয়াকে পথভ্রষ্ট করবে?”

আমার এ ধারণ যদি সত্য হয় তাহলে এ কথা মনে করা যেতে পারে যে, সম্ভবত হযরত মূসা (আ)-এর এ সফর সুদান অভিমুখে ছিল এবং দু’নদীর সঙ্গমস্থল বলতে সে স্থানকে বুঝায়, যেখানে বর্তমান খার্তুম শহরের সন্নিকট নীল নদের দু’টি শাখা ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়েছে।

তালমুদের বর্ণনা

বাইবেল এ ঘটনার ব্যাপারে একেবারে নীরব। অবশ্য তালমুদে এ বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু এ ঘটনাকে মূসা (আ)-এর পরিবর্তে রাব্বি ইয়াহুহানান বিন লাবীর সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। বর্ণনার এরূপ আছে যে, এ ঘটনা যখন ঘটে তখন উক্ত রাব্বি হযরত ইলিয়াম (আ)-এর সাথে ছিলেন যাঁকে জীবিতাবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার পর ফেরেশতাদের সাথে ছিলেন যাঁকে জীবিতাবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার পর ফেরেশতাদের সাথে ছিলেন যাঁকে জীবিতাবস্থায় দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেয়ার পর ফেরেশতাদের সাথে শামিল করা হয়। তারপর তাঁকে দুনিয়ার পরিচালনার কাজে নিয়োগ করা হয়।

(The Talmud Selections By H. Polano, pp 313-16).

সম্ভবত মিসর থেকে বহির্গমনের আগের ঘটনাগুলোর মত এ ঘটনাটিও বনী ইসরাঈলের বই-পুস্তকে সঠিকভাবে রক্ষিত হয়নি এবং কয়েক শতক পরে কাহিনীর অংশবিশেষ তারা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে জুড়ে দিয়েছে। তালমুদের এ বর্ণনায় প্রভাবিত হয়ে মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ বলে ফেললেন যে, এখানে মূসা বলতে নবী হযরত মূসা (আ) নন অন্য কোনো মূসা হবে কিন্তু না তালমুদের প্রতিটি বর্ণনাকে সঠিক ইতিহাস বলে গণ্য করা যায়, আর না এ ধারণা করার কোনো সঙ্গত কারণ থাকতে পারে যে কুরআনে কোনো এক অজ্ঞাত মূসার উল্লেখ এভাবে করা হয়েছে। আবার যখন নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলোতে হযরত ওবাই বিন কায়াবের বর্ণনায় দেখা যায় যে, স্বয়ং নবী করীম (সা) এ কাহিনীর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মূসা বলতে বনি ইসরাঈলের নবী হযতর মূসা (আ)-কেই বুঝিয়েছেন, তখন কোনো মুসলমানের জন্যে তালমুদের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রাচ্যবিদগণ নিজেদের স্বভাব অনুযায়ী কুরআনের এ কাহিনীরও উৎস অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন এবং তিনটি ঘটনা চিহ্নিত করে বলেছেন যে, নবী মুহাম্মদ (সা) এসব থেকে নকল করেই এ কাহিনী তৈরী করেছেন এবং দাবী করেছেন যে, তাঁর ওপরে এ অহীর মাধ্যমে নাযিল হয়েছে। তিনটির মধ্যে একটি হল গিলগামিশ কাহিনী, দ্বিতীয়টি সুরইয়ানীর সেকেন্দরনামা এবং তৃতীয়টি ওপরে বর্ণিত ইহুদীদের বর্ণনা।

প্রাচ্যবিদদের জেরা করার জন্যে চারটি প্রশ্ন

তাদের নিকটে নিম্নের মাত্র চারটি প্রশ্নের জবাব তলব করলেই তাদের বিদ্বেষাত্মক অপপ্রচারের মুখোস খুরে যাবেঃ

একঃ আপনাদের এর কি দলিল-প্রমাণ আছে যে, কুরআনের সাথে মিলে যায় এমন কিছু কথা দু’চারটি প্রাচীন গ্রন্থে দেখেই আপনারা দাবী করে বসছেন যে কুরআনের বর্ণনা এগুলো থেকে নেয়া হয়েছে?

দুইঃ বিভিন্ন ভাষায় যত বই-পুস্তককে আপনারা কুরআনের কাহিনী ও বর্ণনার উৎস বলে নির্ধারণ করেছেন, সেগুলোর তালিকা তৈরী করলে একটা লাইব্রেরীর তালিকায় পরিণত হবে। এ ধরনের কোনো লাইব্রেরী তখন মক্কায় ছিল? তারপর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদকগণ কি বসে বসে নবী মুহাম্মদ (সা) যে আরবের বাইরে দু’তিনটি সফর করেছেন তার ওপর নির্ভর করেই যদি আপনারা এমন বলে থাকেন তাহলে প্রশ্ন এই যে, ব্যবসা উপলক্ষে ঐসব সফরে তিনি কতগুলো লাইব্রেরী নকল বা মুখস্থ করে এসেছিলেন? আর নবুয়াত ঘোষণার একদিন পূর্বে পর্যন্ত তাঁর কথাবার্তায় ঐসব জ্ঞান লাভের কোনো ইঙ্গিত যে পাওয়া যায়নি, তারই বা কারণ কি?

তিনঃ মক্কার কাফের, ইহুদী এবং খৃষ্টানগণ, আপনাদেরই মতো অনুসন্ধান করছিল যে, নবী মুহাম্মদ (সা) এ কথাগুলো কোথা থেকে নিয়ে আসছেন। তিনি চুরি করাকথা বলছিলেন এটা তাঁর সমসাময়িকদের ধরতে না পারার কি কারণ ছিল? তাদেরকে তো বারবার চ্যালেঞ্জ করে বলা হচ্ছিল যে, এ কুরআন খোদার পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। অহী ছাড়া এর অন্য কোনো উৎস নেই। এ কথা বলা হচ্ছিল, “তোমরা যদি তাকে মানুষেরই কথা বলছ, তাহলে প্রমাণ করে দেখাও যে মানুষ এমন কথা বলতে পারে”। এ চ্যালেঞ্জ নবী (সা)-এর সমসাময়িক দুশমনদের কোমর ভেঙ্গে দিয়েছিল। কিন্তু তারা এমন একটি উৎসও চিহ্নিত করতে পারেনি সেখান থেকে কুরআন উৎসারিত হওয়ার কথা কোনো বিবেকসম্পন্ন লোকের বিশ্বাস করা তো দূরের কথা, সন্দেহও পোষণ করতে পারত।

এখন প্রশ্ন এই যে, সমসাময়িক লোকেরা এ তত্ত্ব উদঘাটনে ব্যর্থ হল কেন এবং তের-চৌদ্দশ’ বছর পর আজ ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীগণ এ ব্যাপারে এ সাফল্য লাভ করলেন কি করে?

চারঃ শেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই যে, এ সম্ভাবনাও তো আছে যে, কুরআন আল্লাহর অবতীর্ণ গ্রন্থ এবং সে অতীত যুগের সেসব ঘটনার সঠিক খবর দেয় যা কয়েক শতকে মৌখিক বর্ণনার আকারে বিকৃত হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছেছে এবং গালগল্পে পরিণত হয়েছে। কোন যুক্তিসঙ্গত দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে এ সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া হল? কেন এই একটি মাত্র সম্ভাবনাকেই আলোচনা ও তত্ত্বানুসন্ধানের ভিত্তি বানান হল যে, কুরআনের কাহিনী রচনা করা হয়েছে ঐসব ঘটনা থেকেই যা মৌখিক বর্ণনার আকারে গালগল্প হিসেবে লোকের কাছে বিদ্যমান? ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং শত্রুতা ব্যতীত এর অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে কি?

এ প্রশ্নগুলোর প্রতি গভীর মনোনিবেশ করলে এ সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে হয় যে, প্রাচ্যবিদগণ ‘জ্ঞানার্জনের’ নামে যা কিছু উপস্থাপিত করেছেন –তা প্রকৃতপক্ষে কোনো জ্ঞানান্বেষণকারী লক্ষ্যণীয় নয়।

দুইঃ ফেরাঊনের মূসা (আ)-কে হত্যা করার সংকল্প

(আরবী****************************************পিডিএফ ৪৬৪ পৃষ্ঠায়)

“একদিন ফেরাঊন তার সভসদগণকে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মূসাকে হত্যা করছি এবং সে তার খোদাকে ডেকে দেখুক”।–(সূরা মু’মিনঃ ২৬)।

এ আয়াত থেকে ৪৫ আয়াত পর্যন্ত যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে তা বনী ইসরাঈলের ইতিহাসের একটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। যা তারা বিলকুল ভুলে বসে আছে। বাইবেল এবং তালমুদে এ ঘটনার কোনো্ উল্লেখ নেই। তাদের অন্যান্য বর্ণনাতেও এর কোনো নামনিশানা পাওয়া যায় না। একমাত্র কুরআনের মাধ্যমে সমগ্র দুনিয়া জানতে পেরেছে যে, ফেরাঊন এবং মূসা (আ)-এর দ্বন্দ্ব চলাকালে এ ঘটনা ঘটেছিল।

সত্যের দাওয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে এ কাহিনীর গুরুত্ব

ইসলাম এবং কুরআনের প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ পোষণ করে না এমন প্রতিটি মানুষ এ কাহিনী পাঠ করলে অবশ্যই অনুভব করবে যে, ইসলামী দাওয়াতের দৃষ্টিকোণ থেকে এ কাহিনী অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এটা ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না যে, হযরত মূসা (আ)-এর বক্তিত্ব, তাঁর প্রচার এবং তাঁর দ্বারা সংঘটিত অলৌকিক ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে স্বয়ং ফেরাঊনের পরিষদগণের মধ্যেকেউ মনে মনে ঈমান এনে থাকবে এবং মূসা (আ)-কে হত্যা করার জন্যে ফেরাঊনকে উদ্যত দেখে তারা নীরব থাকতে পারেনি। কিন্তু পাশ্চাত্যের প্রাচ্যবিদগণ জ্ঞান ও তত্ত্বানুসন্ধানের গালভরা দাবী করা সত্ত্বেও অন্ধ বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে যে কুরআনের সুস্পষ্ট সত্যতাকে ঢাকার চেষ্টা করছেন তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না। ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম গ্রন্থে ‘মূসা’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রবন্ধকার এ কাহিনী সম্পর্কে বলেনঃ “ফেরাউনের দরবারের জনৈক মুসলমান মূসা (আ)-কে রক্ষা করার চেষ্টা করেন”।–কুরআনের এ কাহিনী সুস্পষ্ট নয় (সূরা ৪০: আয়াত ২৮)। হাগ্গাদায় বর্ণিত কাহিনীর সাথে কি আমরা এর তুলনা করব যেখানে বলা হয়েছে যে, হিথ্রো ফেরাঊনের দরবারে ক্ষমা ও উদারতা প্রদর্শনের পরামর্শ দিয়েছিল?

তত্ত্বানুসন্ধানের দাবীদারদের বিভ্রান্তি সৃষ্টি

তত্ত্বানুসন্ধানের দাবীদারগণ যেন এটা একেবারে সিদ্ধান্ত করে নিয়েছেন যে, কুরআনের প্রতিটি কথার ভুল ধরতেই হবে। কুরআনের কোনো কথার ভুল ধরার কোনো ভিত্তি যদি পাওয়া না যায় তাহলে অন্তত এতটুকু বিভ্রান্তি তো ছড়াতে হবে যে, কথাটা পরিস্কার নয়। অতপর পাঠকদের মনে ক্রমশ এ সন্দেহের সৃষ্টি করতে হবে যে, মূসা (আা)-এর জন্মের পূর্বে হাগ্গাদায় হিথ্রোর যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে তা কোথাও থেকে নবী মুহাম্মদ (সা) শুনে নিয়েছেন এবং তা এরূপ আকারে বর্ণনা করে দিয়েছেন। এ হচ্ছে জ্ঞানাসুন্ধানের ধরন যা এসব লোক ইসলাম, কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে অবলম্বন করেছেন।

তিনঃ আসহাবে কাহাফের কাহিনী গুহায় অবস্থানকাল সম্পর্কে প্রতিবাদ

কোনো কোনো প্রাচ্যবিদ এ ঘটনাকে আসহাবে কাহাফের কাহিনীর অনুরূপ বলে মেনে নিতে এ জন্যে অস্বীকার করেন যে, কুরআনে তাদের গুহায় অবস্থানের মুদ্দৎকাল তিনশ’ নয় বছর বলা হয়েছে কিন্তু এ সূরার ২৫ নং টীকায় আমরা বিশ্লেষণ করেছি যে, ২৫ আয়াতে আসহাবে কাহাফের মুদ্দৎকাল যে তিনশ’ এবং তিনশ’ নয় বছর বলা হয়েছে তা আমাদের ধারণা মতে লোকের উক্তি –আল্লাহ তায়ালার উক্তি নয়। তার প্রমাণ এই যে, পরবর্তী আয়াতে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং বলছেনঃ “বল, আল্লাহই ভাল জানেন তারা কতকাল গুহায় অবস্থান করেছিল”। আল্লাহ নিজে যদি তিনশ’ নয় বছরের কথা উল্লেখ করতেন তাহলে এ কথা বলার কোনো অর্থ হয় না। এ যুক্তিতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এ ব্যাখ্যাই গ্রহণ করেছেন যে, এ আল্লাহর উক্তি নয়, বরং মানুষের উক্তি।

গীবনের ধৃষ্টতা

সুরিয়ানী বর্ণনা এবং কুরআনের বর্ণনার মধ্যে কিছু ছোটখাট মতপার্থক্য আছে যার ভিত্তিতে গীবন নবী মুহাম্মদ (সা)-এর ওপর ‘অজ্ঞতার’ অভিযোগ আরোপ করেছেন। অথচ যে বর্ণনার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি এতটা ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছেন, সে সম্পর্কে তিনি স্বয়ং জানেন যে, এ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ত্রিশ-চল্লিশ বছর পর সিরিয়াবাসী এক ব্যক্তি এ ঘটনার বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মৌখিক বর্ণনা এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছতে তার মধ্যে কিছু না কিছু গরমিল হয়েই থাকে। এ ধরনের বর্ণনা সম্পর্কে এমন ধারণা করা যে, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য এবং তার কোনো অংশে মতবিরোধ হওয়া কুরআনেরই ভুল, এ কথা ঐসব হঠকারী লোকেরই শোভা পায় যারা ধর্মীয় বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে জ্ঞান-বিবেকের সাধারণ দাবী উপেক্ষা করে।

ঈসায়ী লেখকদের সাক্ষ্য

এ কাহিনীর প্রাচীনতম সাক্ষ্য পাওয়া যায় সিরিয়ার জেমস সরোজী নামক জনৈক খৃষ্টান পাদ্রীর উপদেশবাণী থেকে যা সুরিয়ানী ভাষায় লিপিদ্ধ। এ ব্যক্তি গুহাবাসীদের মৃত্যুর কয়েক বছর পর ৪৫২ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৪৭৪ খৃষ্টাব্দের নিকটবর্তীকালে তাঁর এ উপদেশবাণী রচনা করেন। এ উপদেশবাণীতে তিনি এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দান করেছেন। এ সুরিয়ানী বর্ণনাই একদিকে প্রাথমিক যুগের তাফসীরকারকদের হস্তগত হয় যা ইবনে জারীর তাবারী বিভিন্ন সূত্রে তাঁর তাফসীরে উদ্ধৃত করেছেন। অন্যদিকে এ বর্ণনা ইউরোপবাসীরও হস্তগত হয় এবং তা গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয় এবং তার ভাষ্য প্রকাশিত হয়। গীবন তাঁর ‘রোম সাম্রাজ্যের পতনের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের ত্রিবিংশ অধ্যায়ে ‘সাতজন নিদ্রিত ব্যক্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধে উপরোক্ত সূত্র থেকে এ কাহিনীর যে বিবরণ দিয়েছেন তা আমাদের তাফসীরকারকদের বর্ণনার সাথে এতটা মিলে যায় যে, মনে হয় উভয় কাহিনী একই উৎস থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে শাসকের অত্যাচার-উৎপীড়ন থেকে আত্মরক্ষার জন্যে আসহাবে কাহাফ গিরি-গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন আমাদের তাফসীরকারকগণ তার নাম দাকইয়ানুস বা দাময়ুস বলেন। আর গীবন বলেন,তার নাম ছিল কায়সার ডেসিয়াস (Decius) যে ২৪৯ খৃঃ থেকে ২৫১ খৃঃ পর্যন্ত রোম সাম্রাজ্যের শাসক ছির এবং হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীদের ওপরে নির্যাতন করার জন্যে তার শাসনকাল কলংকিত ছিল। যে শহরে এ ঘটনা ঘটে আমাদের তাফসীরকারকগণ তার নাম এফসুস বলেছেন। আর গীবন বলেছেন এফসিস (Ephesus)। এ ছিল এশিয়া মাইনরের পশ্চিম তীরে অবস্তিত রোমীয়দের বিরাট শহর ও পোতাশ্রয়। তার ভগ্নাবশেষ বর্তমান তুরস্কের স্মার্না শহরের ত্রিশ-চল্লিশ মাইল দক্ষিণে এখনও দেখা যায়। অতপর যে শাসকের রাজত্বকালে আসহাবে কাহাফ ঘুম থেকে জাগরিত হন, আমাদের তাফসীরকারগণের মতে তার নাম ছিল তিনযুসিস এবং গীবনের মতে কায়সার দ্বিতীয় থিওডোসিয়াস (Theodosius)। সে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করার পর ৪০৮ খৃঃ থেকে ৪৫০ খৃঃ পর্যন্ত রোমের কায়সার ছিল দু’টি বর্ণনার সাদৃশ্য এতখানি ছিল যে, গুহাবাসী জাগরিত হবার পর যাকে খাদ্য ক্রয়ের জন্যে বাজারে পাঠান হয়েছিল তার নাম তাফসীরকারকগণ ইয়ামলিখা বলেন এবং গীবন বলেন ইযালিখাস (Jamblichus)।

দু’টি ভিন্নমুখী বর্ণণার মধ্যে সামঞ্জস্য

কাহিনীর বিস্তারিত বিবরণ দু’টি বর্ণনার একই রকম যার সারসংক্ষেপ এই যে, কায়সার, ডেসিয়াসের শাসনকালে যখন ঈসায়ীদের ওপর ভয়ানক নির্যাতন চলছিল, তখন এ সাতজন যুবক একটি গিরি-গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করে। অতপর কায়সার থিওডোসিয়াসের রাজত্বের ৩৮তম বছরে (অর্থাৎ ৪৪৫ খৃঃ অথবা ৪৪৬ খৃঃ) তারা ঘুম থেকে জাগরিত হয়। এ সময়ে গোটা রোমীয় সাম্রাজ্য হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারী হয়ে পড়েছিল। এ হিসেবে তাদের গুহায় অবস্থানকাল দাঁড়ায় প্রায় ১৯৬ বছর।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.