সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

s1

সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সাইয়েদ আবুল  আ’লা মওদুদী

অনুবাদঃ আব্বাস আলী খান


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

সূচনা

 وَإِن مِن أُمَّةٍ إِلّا خَلا فيها نَذيرٌ

“এমন কোন জাতি ছিল না যাদের মধ্যে কোন সাবধানকারী আগমন করেনি”।

-(সূরা ফাতেহাঃ ২৪)

وَلَقَد بَعَثنا فى كُلِّ أُمَّةٍ رَسولًا أَنِ اعبُدُوا اللَّهَ وَاجتَنِبُوا الطّٰغوتَ

“এবং আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন পয়গম্বর পাঠিয়েছি, যিনি এই বলে আহবান জানিয়েছেন, আল্লাহর বন্দেগী কর এবং তাগুতের আনুগত্য থেকে দূরে থাক”।

-(সূরা আন নাহলঃ ৩৬)

هٰذا نَذيرٌ مِنَ النُّذُرِ الأولىٰ

“পূর্ববর্তী ভীতি প্রদর্শনকারীদের মধ্যে ইনি একজন ভীতি প্রদর্শনকারী”।

-(সূরা আন নাজমঃ ৫৬)

إِنَّكَ لَمِنَ المُرسَلينَ

“(হে মুহাম্মদ) তুমি অবশ্যই একজন রসূল”। -(সূরা ইয়াসীন)

قُل ما كُنتُ بِدعًا مِنَ الرُّسُلِ

“(হে মুহাম্মদ) বল, আমি কোন অভিনব রসূল তো নই”।

-(সূরা আল আহকাফঃ ৯)

وَما مُحَمَّدٌ إِلّا رَسولٌ قَد خَلَت مِن قَبلِهِ الرُّسُلُ

“মুহাম্মদ একজন রসূল ব্যতীত কিছু নন এবং তার আগেও অনেক রসূল অতীত হয়ে গেছেন”। -(সূরা আলে ইমরানঃ ১৪৪

قولوا ءامَنّا بِاللَّهِ وَما أُنزِلَ إِلَينا وَما أُنزِلَ إِلىٰ إِبرٰهۦمَ وَإِسمٰعيلَ وَإِسحٰقَ وَيَعقوبَ وَالأَسباطِ وَما أوتِىَ موسىٰ وَعيسىٰ وَما أوتِىَ النَّبِيّونَ مِن رَبِّهِم لا نُفَرِّقُ بَينَ أَحَدٍ مِنهُم وَنَحنُ لَهُ مُسلِمونَ

فَإِن ءامَنوا بِمِثلِ ما ءامَنتُم بِهِ فَقَدِ اهتَدَوا ۖ  o

“বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপরে এবং ঐ শিক্ষার ওপরে যা আমাদের ওপরে নাযিল করা হয়েছে এবং ঐ শিক্ষার ওপরে যা নাযিল করা হয়েছিল ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাঁদের সন্তানদের ওপরে এবং যা কিছু দেয়া হয়েছিল মূসা, ঈসা এবং অন্যান্য নবীগণের ওপর তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে, তার ওপরেও ঈমান এনেছি। তাদেঁর মধ্যে আমরা কোন পার্থক্য নির্ণয় করি না এবং আমরা আল্লাহর অনুগত। অতএব এরাও যদি এভাবে ঈমান আনে যেমন তোমরা এনেছ, তাহলে তারাও সরল-সঠিক পথে রয়েছে বলা যাবে”।

-(সূরা আল বাকারাহঃ ১৩৬-১৩৭)।

لَقَد مَنَّ اللَّهُ عَلَى المُؤمِنينَ إِذ بَعَثَ فيهِم رَسولًا مِن أَنفُسِهِم يَتلوا عَلَيهِم ءايٰتِهِ وَيُزَكّيهِم وَيُعَلِّمُهُمُ الكِتٰبَ وَالحِكمَةَ وَإِن كانوا مِن قَبلُ لَفى ضَلٰلٍ مُبينٍ

“প্রকৃতপক্ষে ঈমান আনয়নকারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট মেহেরবানী যে, তিনি তাদের জন্য স্বয়ং তাদেরই মধ্য থেকে এমন এক রসূলের উত্থান ঘটিয়েছেন যিতি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ পড়ে শুনান, তাদের তাযকিয়া বা মুদ্ধি করেন, তাদেরকে কিতাব এবং হিকমত শিক্ষা দেন। অন্যথায় তারা তো সুস্পষ্ট গুমরাহির মধ্যে পড়ে ছিল”। -(সূরা আলে ইমরানঃ ১৬৪)।

 اليَومَ يَئِسَ الَّذينَ كَفَروا مِن دينِكُم فَلا تَخشَوهُم وَاخشَونِ ۚ اليَومَ أَكمَلتُ لَكُم دينَكُم وَأَتمَمتُ عَلَيكُم نِعمَتى وَرَضيتُ لَكُمُ الإِسلٰمَ دينًا ۚ

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামত তোমাদের ওপর উজাড় করে দিলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলাম জীবনবিধান মনোনিত করলাম”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ৩)

 

تَاللَّهِ لَقَد أَرسَلنا إِلىٰ أُمَمٍ مِن قَبلِكَ فَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيطٰنُ أَعمٰلَهُم فَهُوَ وَلِيُّهُمُ اليَومَ وَلَهُم عَذابٌ أَليمٌ

وَما أَنزَلنا عَلَيكَ الكِتٰبَ إِلّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِى اختَلَفوا فيهِ ۙ وَهُدًى وَرَحمَةً لِقَومٍ يُؤمِنونَ

 “খোদার কসম, হে মুহাম্মদ, আমরা তোমার পূর্বে বিভিন্ন উম্মতের জন্য হেদায়েত পাঠিয়েছি। কিন্তু তারপর শয়তান তাদের দুষ্কৃতিকে তাদের জন্যে আনন্দদায়ক বানিয়ে দিয়েছে। আজ সে-ই তাদের অভিভাবক হয়ে পড়েছে এবং তারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির উপযোগী হয়েছে। এবং আমরা তোমার উপর এ কিতাব নিছক এ জন্যে নাযিল করেছি যে, তুমি তাদের কাছে ঐ সত্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরো –যা নিয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। আর  এ জন্যেও ঐ কিতাব নাযিল করেছি যাতে করে এ হেদায়েত এবং রহমত হতে পারে তাদের জন্যে যারা এর আনুগত্য স্বীকার করে”।

-(সূরা আন নাহলঃ ৬৩-৬৪)

يٰأَهلَ الكِتٰبِ قَد جاءَكُم رَسولُنا يُبَيِّنُ لَكُم كَثيرًا مِمّا كُنتُم تُخفونَ مِنَ الكِتٰبِ وَيَعفوا عَن كَثيرٍ ۚ قَد جاءَكُم مِنَ اللَّهِ نورٌ وَكِتٰبٌ مُبينٌ

يَهدى بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضوٰنَهُ سُبُلَ السَّلٰمِ وَيُخرِجُهُم مِنَ الظُّلُمٰتِ إِلَى النّورِ بِإِذنِهِ وَيَهديهِم إِلىٰ صِرٰطٍ مُستَقيمٍ

 “হে আহলে কিতাব! তোমাদের নিকটে আমাদের রসূল এসে গেছেন, যিনি তোমাদের সামনে সেসব বহু কথা খুলে বলেন যা তোমরা কিতাবের মধ্য থেকে গোপন করো এবং অনেক কিছু তিনি মাফ করে দেন। তোমাদের নিকটে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলোক এবং একটি সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে যার মাধ্যমে তিনি ঐসব লোককে নিরাপত্তা ও শাস্তির পথ দেখান, যারা তাঁর পছন্দ মোতাবেক চলে এবং তিনি তার ইচ্ছানুযায়ী তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন এবং সঠিক পথে তাদেরকে পরিচালিত করেন”। -(সূরা মায়েদাহঃ ১৫-১৬)।

يٰأَيُّهَا النَّبِىُّ إِنّا أَرسَلنٰكَ شٰهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذيرًا

وَداعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذنِهِ وَسِراجًا مُنيرًا

 “হে নবী! আমরা তোমাকে সাক্ষ্য ও সুসংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শনকারী এবং আল্লাহর নির্দেশে তাঁর দিকে আহবানকারী হিসেবে এবং একটি উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে প্রেরণ করেছি”। -(সূরা আল আহযাবঃ ৪৫-৪৬)।

يَأمُرُهُم بِالمَعروفِ وَيَنهىٰهُم عَنِ المُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبٰتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيهِمُ الخَبٰئِثَ وَيَضَعُ عَنهُم إِصرَهُم وَالأَغلٰلَ الَّتى كانَت عَلَيهِم ۚ فَالَّذينَ ءامَنوا بِهِ وَعَزَّروهُ وَنَصَروهُ وَاتَّبَعُوا النّورَ الَّذى أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولٰئِكَ هُمُ المُفلِحونَ

“সে (রসূল) তাদেরকে নেকীর আদেশ করে, পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, তাদের জন্য পাক জিনিস হালাল করে এবং নাপাক জিনিস হারাম করে। আর তাদের ওপর থেকে সেসব বোঝা নামিয়ে দেয় এবং এসব বন্ধ কর্তন করে যার দ্বারা তারা অবনমিত ও শৃঙ্খলিত ছিল। অতএব যারা তার ওপর ঈমান আনবে, তার সাহায্য সহযোগিহতা করবে এবং ঐ নূর অনুসরণ করবে যা তার সাথে নাযিল করা হয়েছে তারাই সাফল্য লাভ করবে”। -(সূরা আল আরাফঃ ১৫৭)।

إِنّا أَنزَلنا إِلَيكَ الكِتٰبَ بِالحَقِّ لِتَحكُمَ بَينَ النّاسِ بِما أَرىٰكَ اللَّهُ ۚ وَلا تَكُن لِلخائِنينَ خَصيمًا

“হে মুহাম্মদ! আমরা সত্যসহ এ কিতাব তোমার ওপর নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি আল্লাহর বর্ণিত পদ্ধতিতে লোকের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করতে পার এবং যেন খেয়ানতকারীদের উুিকল না হয়ে পড়”। -(সূরা আন নিসাঃ ১০৫)।

هُوَ الَّذى أَرسَلَ رَسولَهُ بِالهُدىٰ وَدينِ الحَقِّ لِيُظهِرَهُ عَلَى الدّينِ كُلِّهِ ۚ

“আল্লাহ তায়ালাই সেই সত্তা যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়েত এবং দ্বীনে হকসহ পাঠিয়েছেন, যাতে করে তিনি এ দ্বীনে হক বা সত্য জীবন বিধানকে যাবতীয় জীবন বিধানের ওপর বিজয়ী করতে পারেন”। -(সূরা আল ফাতাহঃ ২৮)।

قُل يٰأَيُّهَا النّاسُ إِنّى رَسولُ اللَّهِ إِلَيكُم جَميعًا الَّذى لَهُ مُلكُ السَّمٰوٰتِ وَالأَرضِ ۖ لا إِلٰهَ إِلّا هُوَ يُحيۦ وَيُميتُ ۖ فَـٔامِنوا بِاللَّهِ وَرَسولِهِ النَّبِىِّ الأُمِّىِّ الَّذى يُؤمِنُ بِاللَّهِ وَكَلِمٰتِهِ وَاتَّبِعوهُ لَعَلَّكُم تَهتَدونَ

“হে মুহাম্মদ! বলে দাও –হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের জন্যে আল্লাহর রসূল, যে আল্লাহর আসমান ও যমীনের বাদশাহীর মালিক, যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, যিনি জীবন ও মৃত্যুর মালিক। অতএব ঈমান আন আল্লাহর ওপর এবং তাঁর সেই উম্মী রসূলের ওপর যে খোদা ও তাঁর নির্দেশনাবলীর ওপর বিশ্বাস রাখে।

وَأوحِىَ إِلَىَّ هٰذَا القُرءانُ لِأُنذِرَكُم بِهِ وَمَن بَلَغَ ۚ

“এবং বল, আমার প্রতি এ কুরআন অহীর মাধ্যমে পাঠন হয়েছে যাতে করে এর মাধ্যমে তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এ পৌঁছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি”।

ما كانَ مُحَمَّدٌ أَبا أَحَدٍ مِن رِجالِكُم وَلٰكِن رَسولَ اللَّهِ وَخاتَمَ النَّبِيّۦنَ ۗ

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নয় কিন্তু সে আল্লাহর রসূল এবং নবীগণের ধারাবাহিকতা সমাপ্তকারী”। -(সূরা আল আহযাবঃ ৪০)।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

উপক্রমনিকা

আল্লাহ তায়ালার অশেষ শুকরিয়া যে, যে বিরাট কাজে হাত দেয়া হয়েছিল তা বহুলাংশে সম্পন্ন হয়েছে এবং আশা করা যায় যে, তাঁরই সাহায্যে অবশিষ্ট কাজটুকুও সম্পন্ন হবে।

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর সাথে আমার যে দলগত সম্পর্ক, তার থেকে একেবারে আলাদা হয়ে যদি নিষ্ঠার সাথে তাঁর দ্বীনী খেদমতের প্রতি নজর দেয়া হয়, তাহলে কোন অন্ধ শ্রদ্ধাবোধ ব্যতিরেকেই এ অনুভূতি জাগে যে, এ যুগে যে ধরনের শক্তিশালী যুক্তি প্রমাণেল সাথে নতুন প্রকাশভংগীতে এবং যেমন বিশদভাবে তিনি ইসলামের মৌল সত্যতা ও তার পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সুস্পষ্ট করে তুরে ধরেছেন, তার দৃষ্টান্ত কালের সুদূর দিগন্তেও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, যে অবদান রেখেছেন তার থেকে অসংখ্য লোকের জীবনের পট-পরিবর্তন হয়েছে। আর এ মহান কাজ মাওলানার জন্যে আখেরাতের বিরাট মূলধন হয়ে রয়েছে।

মাওলানার সাথে পরিচিত হবার পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর সাথে আমার আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে তার জন্যে আমার একান্ত বাসনা এই যে, মাওলানা প্রজ্ঞা ও চিন্তাধারার প্রচার ও প্রসারের জন্যে বিভিন্ন বর্ণনাভঙ্গী অবলম্বন করা হোক। সেই সাথে মাওলানা ব্যক্তিত্ব, তাঁর সুনাম ও সম্পাদিত কাজকর্মকে আমার ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির কাজে লাগাব –এ ধরনের মানসিকতার ঊর্ধ্বেও আমি রয়েছি।

আজ থেকে দশ-বার বছর আগের কথা। মাওলানা মওদূদী সাহেবের কামরায় আমরা কয়েকজন অন্তরঙ্গ বন্ধু বসে আলাপ করছিলাম। প্রসঙ্গক্রমে আমি বললাম যে, যদি মাওলানা ভাল মনে করেন তাহলে তাঁর প্রবন্ধাদী থেকে জীবন চরিত কংকলন করা যায়। এতে আমার বন্ধুটি এ কাজের দায়িত্ব তাঁকে দেয়ার জন্যে অনুরোধ জানায়। আমি তাতে রাজি হলাম। কিন্তু কয়েখ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন আমার বন্ধুটি এ কাজের সুযোগ পেলেন না, তখন আমি তাঁর অনুমতি নিয়ে পুনরায় বিষয়টি মাওলানার নিকটে উত্থাপন করলাম। মাওলানা এ প্রস্তাবিত বিষয় ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে কাজ করার জন্যও মোটামুটি কিছু সদুপদেশ দেন।

অবশেষে কাজ শুরু করার পর মনে হল নিজের পক্ষ থেকে একটা গবেষণামূলক গ্রন্থ প্রণয়ন করার চেয়ে মাওলানার গোটা সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে মূল-বচন সংগ্রহ করে গ্রন্থ সংকলনের কাজ বড় কঠিন ও শ্রমসাপেক্ষ। কারণ তাফহীমুল কুরআনের ছ’খণ্ড ছাড়াও তার বহু সাহিত্য অধ্যয়ন, তার থেকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও উপযোগী মূল-বচন চিহ্নিত করা, অতপর তার অনুলিপি তৈরী করা এবং সর্বশেষে সেগুলোকে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদভুক্ত করা, বিভিন্ন শিরোনামে বিন্যস্ত করা প্রভৃতি কাজগুলো এতো দুরূহ ছিল যে, বারবার হিম্মত হারিয়ে ফেলতাম এবং মনে করতাম এ বিরাট পরিকল্পনার বাস্তবায়ন আমর সাধ্যের অতীত।

সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, এ কাজে আমার বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধবের সাহায্য-সহযোগিতা লাভ করেছি। বিশেষ করে মাওলানা আবদুল ওয়াকিল আলীভী এম.এ. প্রায় দেড় বছল ধরে আমার সাথে এমনভাবে কাজ করেছেন যে, এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এ কাজে সবচেয়ে বেশী অবদান তাঁরই ছিল।

নীরবে দেড়-দু’বছর অক্লান্ত পরিশ্রমে কাজটি শেষ হবার পর যখন তা মাওলানার সামনে পেশ করা হল তখন তিনিও বিস্ময়বোধ করলেন যে, নবী মুস্তফা (সা)-এর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর জীবন চরিত সম্পর্কে এত উপকরণ তিনি তাঁর প্রবন্ধাদিতে সঞ্চিত করে রেখেছেন। আমাদের মতো অধম লোকের হাতে প্রায় তিন খণ্ড গ্রন্থের প্রাথমিক সংকলন সমাপ্ত হয়েছে দেখে মাওলানাও সন্তোষ প্রকাশ করেন। মৌল আলোচনা, নবুয়াতের মর্যাদা, অহীর ব্যবস্থাপনা, নবীপাকের আগমন, নবীপূর্ব যুগের পরিবেশ পরিস্থিতি, যে জাতিকে সম্বোধন করে দাওয়াত পেশ করা হয়েছে তাদের এবং অন্যান্য বিভিন্ন দলের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে। দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচিত হয়েছে নবী মুস্তপঅ (সা)-এর জন্ম থেকে মদীনায় নিজরত পর্যন্ত সময়কালের ঘটনাবলী, তৃতীয় খণ্ডে আলোচনা করা হয়েছে মদীনায় অতিবাহিত নবীপাকের আন্দোলন-জীবনের চরম মুহূর্তগুলো। চতুর্থ খণ্ড সংকলন বাকী আছে। তার মধ্যে থাকবে নবী (সা)-এর সংস্কার কার্যাবলী, শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবনের বিভিন্ন বিভাগের সূচিত পরিবর্তনের চিত্র। আল্লাহ তায়ালা যেন এ খণ্ড সমাপ্ত করার তাওফিকও আমাদেরকে দান করেন।

গ্রন্থটি এমনভাবে সংকলিত করা হয়েছে যে, মাওলানার প্রবন্ধাবলী ও বিভিন্ন মূল বচনকে বিভিন্ন শিরোনামায় সুবিন্যস্ত করা হয়েছে, বিষয়বস্তুর বাঁধন মজবুত করা হয়েছে, যার ফলে প্রয়োজনীয় জ্ঞাতব্য বিষয়সমূঞ পর্যায়ক্রমে দৃষ্টিগোচর হয়। অল্প কিছু স্থান এমন আছে যেখানে সংকলকদ্বয়কে নিজের পক্ষ থেকৈ অথবা অন্য কোন গ্রন্থ থেকে কিছু কথা সন্নিবেশিত করতে হয়েছে এবং তার বরাতও উল্লেখ করা হয়েছে। টীকা দু’ধরনের আছে। এক-যা গ্রন্থাকারের মূল প্রবন্ধে সন্নিবেশিত। দুই- যা সংকলদ্বয়ের পক্ষ থেকে সংযোজিত করা হয়েছে। এ দু’ধরনের টীকা আলাদা আলাদাভাবে লিখিত হয়েছে। বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে গ্রন্থকারের প্রবন্ধ থেকে যেসব উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে, গ্রন্থের শেষে একত্রে তার উল্লেখ করা হয়েছে।

আনন্দের বিষয় এই যে, মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী তাঁর অসুস্থতা ও ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের এ সংকলন আগাগোড়া পড়ে স্থানে স্থানে সংশোধনও করেছেন এবং তাঁর কিছু মূল-বচন সংযোজনের জন্যে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। এসব সত্ত্বেও এ গ্রন্থ সংকলনে কোথাও কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়ে গেলে তার জন্যে আমরাই দায়ী হবো।

এখন আমরা যা কিছুই করেছি এবং যেমনভাবেই করেছি তার জন্যে দোয়া করি যেন আল্লাহ তা কবুল করে নেন এবং পাঠকগণ এর থেকে হেদায়েতের আলোক-রশ্মি লাভ করেন। পাঠকবর্গের নিকটে আমরা এ আবেদনও জানাই যে, কোথাও কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি লক্ষ্য করলে অথবা কোন কিছুর পরিপর্ধন প্রয়োজন মনে করলে আমাদেরকে অবহিত করে বাধিত করবেন। আমরা ইনশাআল্লাহ পরবর্তী সংস্করণে তাঁদের প্রস্তাব-পরামর্শকে অগ্রাধিকার দেব এবং গ্রন্থখানিকে অধিকতর ভাল করার চেষ্টা করব।

-নঈম সিদ্দিকী

 

সংকলকদ্বয়ের কথা

প্রথম খণ্ড সমএর্ক বলে রাখা দরকার যে, এতে দুনিয়াদী আলোচ্য বিষয়ৈর নামে শ্রদ্ধেয় মাওলানার ঐ সব প্রবন্ধ বক্তৃতা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি সংগৃহীত করা হয়েছে যা একদিকে নবুয়াতের পদমর্যাদা, অহীর ব্যবস্থাপনা, দ্বীন সম্পর্কে ধারণা ও অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয়ের ওপর আলোকপাত করে এবং অপরদিকে নবী (সা)-এর আবির্ভাবকাল এবং পূর্ববর্তী সভ্যতার ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্ফুট করে। এ আলোচনা যদিও সরাসরি সীরাতপাক সম্পর্কিত ঘটনাবলী উপস্থাপিত করেনা, তথাপি নবীপাক (সা)-এর ব্যক্তিত্ব, তাঁর পদমর্যাদা এবং তাঁর সর্বাত্মক সংগ্রাম উপলব্ধির এ সহায়ক হবে। এ জন্যে আমরা প্রয়োজন বোধ করেছি যে, তাঁর জীবনচরিত অধ্যয়ন করার পূর্বে পাঠকবর্গ এসব পথ-নির্দেশক আলোচনার সাথে পরিচিত হবেন। -সংকলকদ্বয়।

 

০০০

ইসলাম প্রকৃতপক্ষে সেই আন্দোলনের নাম যা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণা-বিশ্বাসের ওপরে মানব-জীবনের গোটা প্রাসাদ নির্মাণ করতে চায়। এ আন্দোলন অতি প্রাচীনকাল তেকে একই ভিত্তির ওপরে এবং একই পদ্ধতিতে চলে আসছে। এর নেতৃত্ব তাঁরা দিয়েছেন, যাঁদেরকে আল্লাহ তায়ালার নবী-রসূল বলা হয়। আমাদেরকে যদি এ আন্দোলন পরিচালনা করতে হয়, তাহলে অনিবার্যরূপে সেসব নেতৃবৃন্দের কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ এছাড়া অন্য কোন কর্মপদ্ধতি এ বিশেষ ধরনের আন্দোলনের জন্যে না আছে, আর না হতে পারে। এ সম্পর্কে যখন আমরা আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ)-এর পদাংক অনুসন্ধানের চেষ্টা করি, তখন আমরা বিরাট অনুবিধার সম্মুখীন হই। প্রাচীনকালে যেসব নবী তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন, তাঁদের কাজকর্ম সম্পর্কে আমরা বেশী কিছু জানতে পারি না। কুরআনে কিছু সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু তার থেকে গোটা পরিকল্পনা উদ্ধার করা যায় না। বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে হযরত ঈসা (আ)-এর কিছু অনির্ভরযোগ্য বাণী পাওয়া যায় যা কিছু পরিমাণে একটি দিকের ওপর আলোকপাত করে এবং তা হলো এই যে, ইসলামী আন্দোলন তার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে কিবাবে পরিচালনা করা যায় এবং কি কি সমস্যার সম্মুখীন তাকে হতে হয়। কিন্তু হযরত ঈসা (আ)-কে পরবর্তী পর্যায়ের সম্মুখীন হতে হয়নি এবং সে সম্পর্কে কোন ইঙ্গিতও পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে একটিমাত্র স্থান থেকে আমরা সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ পথ-নির্দেশ পাই এবং তা হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সা)-এর জীবন। তাঁর দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন তাঁর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণে নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে এ পথের চড়াই-উৎরাই সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার জন্যে তাঁর দিকে প্রত্যাবতন করতে আমরা বাধ্য। ইসলামী আন্দোলনের সকল নেতৃবৃন্দের মধ্যে শুধু নবী মুহাম্মদ (সা)-ই একমাত্র নেতা যাঁর জীবনে আমরা এ আন্দোলনের প্রাথকিম দাওয়াত থেকে শুরু করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এবং অতপর রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-পদ্ধীত পর্যন্ত এক একটি পর্যায় ও এক একটি দিকের পূর্ণ বিবরণ এবং অতি নির্ভরযোগ্য বিবরণ আমরা জানতে পারি।

গ্রন্থকারের ভূমিকা

সকল যুগে মানুষ ইসলামের নিয়ামত মাত্র দু’টি উপায়ে লাভ করেছে। এক –আল্লাহর কালাম। দুই –নবীগণকে আল্লাহ তায়ালা শুধু তাঁর বাণী পৌঁছিয়ে দেয়ার এবং তা শিক্ষা ও উপলব্ধি করার মাধ্যম হিসেবেই পাঠাননি। বরং সেই সাথে তাঁদেরকে বাস্তব নেতৃত্বদান ও পথপ্রদর্শনের নির্দেশও দিয়েছেন, যাতে করে তাঁরা আল্লাহর বাণীর সঠিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্যে মানুষ ও সমাজের সংস্কার সংশোধন করতে পারেন এবং বিকৃত সমাজব্যবস্থার সংশোধন করে একটি সৎ ও সুষ্ঠু সমাজ পুনর্গঠিত করে দেখান

এ দু’টি বিষয় চিরকাল এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে, একটিকে অন্যটি থেকে আলাদা করে না মানুষ দ্বীনের সঠিক জ্ঞান লাভ করতে পেরেছে, আর না সে হেদায়াত লাভ করতে পেরেছে। আল্লাহর কিতাবকে নবী থেকে আলাদা করলে তা এক কাণ্ডারীবিহীন তরী হয়ে পড়বে। একজন অনভিজ্ঞ মুসাফির তা নিয়ে জীবন সমুদ্রে যতই ঘুরাফেরা করুক না কেন, গন্তব্যস্থলে কিছুতেই পৌঁছাতে পারবে না আবার নবীকে আল্লাহর কিতাব থেকে আলাদা করুন, তাহলে খোদার পথ পাওয়ার পরিবর্তে মানুষ অখোদাকে খোদা বানাবার বিপদ থেকে কিছুতেই বাঁচতে পারবে না। এ  উভয় পরিণাম পূর্ববর্তী জাতিসমূহ ভোগ করেছে। হিন্দু জাতি তাদের ধর্মপ্রবর্তকদের জীবন-চরিত বিলুপ্ত করেছে এবং শুধু ধর্মগ্রন্থ নিয়ে ক্ষান্ত হয়ে বসে পড়েছে। পরিণাম এই হয়েছে যে, ধর্মগ্রন্থগুলোও তারা বিলুপ্ত করে দিয়েছে। খৃষ্টানগণ কিতাবকে উপেক্ষা করে নবীর আঁচল ও তাঁর ব্যক্তিত্বকে ঘিরে ধরে রইল। পরিণামে তারা আল্লাহর নবীকে আল্লাহর পুত্র, বরং স্বয়ং আল্লাহ বানিয়ে ছাড়ল।

অতীতকালের ন্যায় এ আধুনিক যুগেও মানুষকে ইসলামের নিয়ামত লাভ করতে হলে দু’টি মাধ্যমই অবলম্বন করতে হবে যা আবহমানকাল থেকে চলে আসছে। এক. আল্লাহর কালাম যা একমাত্র কুরআন পাকের আকারেই পাওয়া যেতে পারে। দুই. নবীর আদর্শ যা এখন শুধুমাত্র আরবের নবী মুহাম্মদ (সা)-এর জীবন চরিতের মধ্যেই সংরক্ষিত আছে। পূর্বের ন্যায় আজও যদি ইসলামের সঠিক জ্ঞানলাভ করতে হয় তাহলে তার একমাত্র পন্থা এই যে, কুরআনকে বুঝতে হবে নবী মুহাম্মদ (সা) থেকে এবং নবী মুহা্ম্মদ (সা) কে বুঝতে হবে কুরআন থেকে। এ দু’টিকে একে অপরের  সাহায্যে যে ব্যক্তিই বুঝতে পেরেছে, সে-ই ইসলামকে বুঝতে পেরেছে। অন্যথায় সে দ্বীন উপলব্ধি করা থেকে বঞ্চিত রইল এবং পরিণামে হেদায়াত থেকেও বঞ্চিত রইল।

তারপর কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ (সা) উভয়ের উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও বিশেষ কাজ যেহেতু একই, সে জন্যে সে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কতটুকু হৃদয়ঙ্গম করা যায় তার উপরই সবকিছু নির্ভর করছে। এ বিষয়টি উপেক্ষা করলে দেখা যাবে যে, কুরআন কতকগুলো, শব্দ ও বাক্যের সমষ্টি এবং নবীর জীবন-চরিত কতকগুলো ঘটনার সমাবেশ বৈ আর কিছু নয়। এবং ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও তথ্য অনুসন্ধানের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে নবী পাকের ব্যক্তিসত্তা ও বর্তমান যুগ সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করা যেতে পারে কিন্তু দ্বীনের প্রাণশক্তি উপলব্ধি করা যাবে না কারণ, এ উপলব্ধি কুরআনের নিছক মূল বচন ও ঘটনাপঞ্জীর সাথে নয় বরং ঐ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত যার জন্যে কুরআন নাযিল হয়েছিল এবং যার পতাকা বহনের জন্যে নবী আবির্ভূত হয়েছিলেন। এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা যতটা স্বচ্ছ ও সঠিক হবে, কুরআন ও নবীর জীবন চরিত সম্পর্কে ধারণা ততটা সঠিক হবে। আর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা ভ্রান্ত হলে কুরআন ও নবী সম্পর্কে ধারণা ভ্রান্ত হতে বাধ্য।

এটা অতি সত্য যে, কুরআন এবং নবী-চরিত মহাসমুদ্রের ন্যায়। কেউ যদি চায় যে, সে এসবের সকল অর্থ, মর্ম, মঙ্গল ও বরকত লাভ করবে, সে কিছুতেই তা পারবে না। অবশ্যি যতটুকু চেষ্টা করা যেতে পারে তাহল এই যে, সাধ্যমত যত বেশী জ্ঞান তার থেকে লাভ করা যায় এবং তার আলোকে দ্বীনের প্রাণশক্তি যতটা উপলব্ধি করা যায়।

আল্লাহ তায়ালার অসীম দয়ার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে, কুরআন পাক উপলব্ধি করাবার যতটুকু চেষ্টা ও শক্তি আমার ছিল তা কাজে লাগাবার জন্যে তিনি তাফহীমুল কুরআন সমাপ্ত করার তওফীক আমাকে দিয়েছেন। তারপর আমার একান্ত বাসনা ছিল যে, নবী পাকের জীবন-চরিতের উপর কলম ধরি। কিন্তু প্রথম কাজটি সমাধা করতে আমার জীবনের ত্রিশটি বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এরপর আমার আর এমন শক্তি নেই যে, দ্বিতীয় কাজে হাত দেই, হাত দিতে না পারায় বেদনাটা আমার মনে সর্বদা খচ খচ করছিল, এমন সময় জনাব নঈম সিদ্দিকী ও জনাব আবদুল ওয়াকিল আলভী আমার বিভিন্ন গ্রন্থাদি ও প্রবন্ধাদি থেকে সীরাতের এ সংকলন সমষ্টি আমার সামনে পেশ করলেন। আমি তখন অবাক হয়ে গেলাম যে, এ বিরাট বিষয়ের উপর আমার লেখার মধ্যে এত উপকরণ ছিল। সাথে সাথে তাঁদের এ অক্লান্ত শ্রমের জন্যে তাঁদেরকে স্বতস্ফূর্ত আন্তরিক মুবারকবাদ জানালাম এবং তাঁদের জন্যে দোয়ায়ে খায়েরও করলাম। এ জন্যে যে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা এ উপকরণগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে সেগুলোকে তাঁরা যথাযথভাবে সংকলিত করেছেন। যদিও এ উপকরণে সমষ্টি সীরাতের উপর একটি চূড়ান্ত গ্রন্থ প্রণয়নের জন্যে যথেষ্ট নয়, তথাপি এ সংকলনে যেসব বিষয় সন্নিবেশিত করা হয়েছে তা ইনশাআল্লাহ, নবীপাক (সা)-এর ব্যক্তিত্ব ও তাঁর বিরাট অবদান উপলব্ধি করার সহায়ক হবে।

অবশ্যি এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এ গ্রন্থে যা কিছু সংযোজিত করা হয়েছে তা আমার গ্রন্থ ও প্রবন্ধ পাঠকগণের ইতিপূর্বেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং চর্বিত চর্বনণ মানুষের কাছে ভালও লাগে না। কিন্তু এ গ্রন্থের পাঠক নিজেই অনুভব করবেন যে, যে কথাগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছিল এবং যা বিগত ত্রিশ-চল্লিশ বছরে বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে লেখা হয়েছিল, সেগুলো এ গ্রন্থে একত্রে সংকলনের আকারে রয়েছে, বিক্ষিত প্রবন্ধাদি অধ্যয়নে সে উপকারিতা পাওয়া যায় না

আল্লাহ পাকের কাছে এ দোয়াই করি যেন এ গ্রন্থটি তাঁর বান্দাহদের হেদায়াতের এবং আখেরাতে আমার প্রতিদানের উপায় হয়।

-আবুল আ’লা

লাহোর

১৯শে যিলকদ, ১৩৯২ হিজরী

২৫শে ডিসেম্বর, ১৯৭২ খৃষ্টাব্দ

নবুয়াতের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে কিছু মৌলিক তত্ত্ব

অধ্যায় ১ : নবুয়াতের মর্মকথা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

মানবতার জন্যে আল্লাহর পথনির্দেশ

বিশ্বজাহাদের প্রভু, সমগ্র পৃথিবী, আকাশ ও সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা, মালিক ও শাসনকর্তা, তাঁর সুবিশাল সাম্রাজ্যের এ অংশে –যাকে আমরা পৃথিবী বলে জানি –মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাকে জানার, চিন্তা করার ও বুঝবার শক্তি দিয়েছেন। ভাল ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা দিয়েছেন। যাঁচাই-বাঁছাই-নির্বাচন করার ও ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন। নিজের এখতিয়ার খাটাবার অধিকার দান করেছেন। মোটকথা, এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন দান করে তাকে পৃথিবীতে নিজের খলীফা বা প্রতিনিধির পদে অধিষ্ঠিত করেছেন।

বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এ পদে অধিষ্ঠিত করার সময় তার মনে ভালভাবে এ কথা বদ্ধমূল করে দিয়েছিলেন যে, তিনিই মানুষ ও সমগ্র বিশ্বজগতের একমাত্র মালিক, সমল আনুগত্যের অধিকারী ও শাসনকর্তা! তাঁর এ সাম্রাজ্যে মানুষ স্বাধীন নয়, অন্য কারও অধীনও নয় বরং তিনি ছাড়া আর কেউ মানুষের আনুগত্য, দাসত্ব, বন্দেগী ও পূজা-উপাসনা লাভর অধিকারীও নয়। দুনিয়ার এ জীবনে মানুষকে স্বাধীন ক্ষমতা দিয়ে পাঠান হচ্ছে টিকই, কিন্তু আসলে তার জন্য পরীক্ষার একটি সময়কাল। তাদের কৃতকর্মসমূহ বিচার করে তাদের মধ্যে কে পরক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে আর কে ব্যর্থকাম হয়েছে সে সিদ্ধান্ত তিনিই গ্রহণ করবেন। মানুষের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি একমাত্র এটি হবে যে, তারা আল্লাহকে তাদের একমাত্র মাবুদ, উপাস্য ও শাসনকর্তা বলে মেনে নেবে। তিনি যে বিধান দেবেন সে অনুযায়ী দুনিয়ায় কাজ করবে এবং দুনিয়াকে পরীক্ষাগার মনে করে এ চেতনা সহকারে জীবনযাপন করবে যে শেষ বিচারের সময় সফলকাম হওয়াই হচ্ছে তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে এ থেকে ভিন্নতর প্রত্যেকটি দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়াই হচ্ছে তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে এ থেকে ভিন্নতর প্রত্যেকটি দৃষ্টিভঙ্গিই হবে ভ্রান্তির শিকার। যদি মানুষ প্রথম দৃষ্টিভঙ্গীটি অবলম্বন করে (যা অবলম্বন করার স্বাধীনতাও তাদের রয়েছে। তাহলে দুনিয়ায় তাদের বিপর্য ও অশাস্তির সম্মুখীন হতে হবে এবং দুনিয়ার জীবন শেষ করে আখেরাতের জীবনে পদার্পণ করার পর নিক্ষিপ্ত হবে চিরন্তন দুঃখ, মর্মবেদনা ও বিপদের গর্তে –যার নাম জাহান্নাম।

‘মুসলিম’ (অনুগত) হয়ে থাকার নির্দেশ

বিশ্বজগতের প্রভু মানুষকে পৃথিবীতে অনুগত হয়ে বাস করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ধরনের আদি মানুষ আদম (আ) ও হাওয়া এবং তাঁদের সন্তান-সন্তুতিদেরকে পৃথিবীতে কিভাবে কাজ করতে হবে সে পথও দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এ প্রথম মানুষ তাঁর সৃষ্টিলগ্নে মূর্খতা ও অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলেন না, বরং পৃথিবীতে পূর্ণ আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে আল্লাহ তাঁর জীবনের সূচনা করেছিলেন। তিনি সত্য অবগত ছিলেন। তাঁকে তাঁর জীবন যাপন করার বিধানও দান করা হয়েছিল আর জীবন পদ্ধতি ছিল আল্লাহর আনুগত্য (অর্থাৎ ইসলাম) এবং তিনি নিজের সন্তানদেরকে আল্লাহর অনুগত (মুসলিম) হয়ে পৃথিবীতে বসবাস করার শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিলেন।

 

সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতি

কিন্তু পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মানুষ ধীরে ধীরে সঠিক জীবন পদ্ধতি (দ্বীন) থেকে বিচ্যুত হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। গাফলতি ও অবহেলা করে তারা এ জীবন পদ্ধীত বিলুপ্ত করে বসে এবং অসৎ মনোভাব ও দুষ্ট কার্যকলাপের মাধ্যমে একে বিকৃতও করে ফেলে। পৃথিবী ও আকাশের বিভিন্ন মানবিক, অমানবিক, কাল্পনিক ও বস্তুসত্তাকে তারা আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অংশীদারে পরিণত করে। আল্লাহ প্রদত্ত সত্য জ্ঞানের মধ্যে তারা বিভিন্ন রকমের কল্পনা, ভাববাদ, মতাদর্শ ও দর্শনের মিশ্রণ ঘটিয়ে নিজেদের প্রবৃত্তি, ঝোঁক প্রবণতা ও একদেশদর্শী মনোভাব অনুযায়ী এমন জীবনবিধান তৈরী করে নেয় যার ফলে আল্লাহর জমিন যুলুমে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আল্লাহ মানুষকে যে সীমিত স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন তারপর এটা কি করে হতে পারে যে তিনি নিজের সৃষ্টিক্ষমতা ব্যবহার করে বিপথগামী লোকদেরকে জোর করে সঠিক পথের দিকে ঘুরিয়ে দেবেন? আর তিনি মানুষের বিভিন্ন গোত্র ও জাতিকে পৃথিবীতে কাজ করার জন্যে যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তারপর বিদ্রোহ দেখা দেয়ার সাথে সাথেই তিনি সকল মানুষকে ধ্বংস করে দেবেন –এটাও ঠিক হয় না। মানব সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই মানুষের স্বায়ত্তশাসন ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে নির্ধারিত সময়কালের মধ্যে মানুষের পথ-প্রদর্শনের দায়িত্বও তিনি নিয়েছেন। কাজেই নিজের ওপরে আরোপিত এ দায়িত্ব পালনের জন্যে তিনি মানুষের মধ্য থেকেই এমন সব লোকদেরকে ব্যবহার করা শুরু করলেন যাঁরা তাঁর ওপর ঈমান রাখতেন এবং তাঁর ইচ্ছা ও আদেশের অনুগত ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে তাঁর প্রতিনিধি বানালেন। তাদের কাছে নিজের বাণী পাঠালেন। তাঁদেরকে সত্য জ্ঞান দান করলেন। সঠিক ও নির্ভুল জীবনবিধান দান করলেন। পথভ্রষ্ট আদম সন্তানদেরকে সঠিক পথের দিকে আহবান জানাবার জন্যে তাদেরকে নিযুক্ত করলেন।

আল্লাহর এ নিয়োজিত পয়গম্বরগণ বিভিন্ন দেশ ও জাতির মধ্যে আবির্ভূত হতে থাকেন। হাজার হাজার বছর ধরে তাদের আগমন চলতে থাকে। সংখ্যায়ও তাঁরা ছিলেন অগণিত। তাদের সবার দ্বীন ছিল একই। অর্থাৎ সেই সত্য-সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী ও জীবনবিধান যা প্রথম দিনেই মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। তারা সবাই একই হেদায়াত বা পথের অনুসারী ছিলেন। অর্থাৎ তারা ছিলেন চরিত্র, নৈতিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির সেই প্রাথমিক ও চিরন্তন নীতির অনুসারী, যা সৃষ্টির প্রারম্ভেই মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছিল। তাদের সবার একই মিশন ছিল। তাদের মিশন ছিল নিজেদের গোত্র ও জাতিকে এই দ্বীন ও হেদায়াতের দিকে আহবান করা অতপর যারা আহবান গ্রহণ করে নেবে তাদেরকে সংগঠিত করে এমন একটি উম্মত ও দলে পরিণত করা যে নিজে আল্লাহর আইনের অনুগত হবে এবং দুনিয়ায়ও আল্লাহর আইনের আনুগত্য কায়েম করবে এবং এ আইনের বিরোধিতা রোধ করার জন্যে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এ পয়গম্বরগণ প্রত্যেকেই নিজেদের মানবতার জন্যে আল্লাহর পথনির্দেশ

যুগে যথাযথভাবে তাঁদের ওপর আরোপিত মিশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সবসময় দেখঅ গেছে বিপুলসংখ্যক লোক তাঁদের আহবান গ্রহণ করতে সম্মত হয়নি। আর যারা এ আহবান গ্রহণ করে মুসলিম উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারাও ধীরে ধীরে নিজেরাই বিকৃত হতে থাকে। এমনটি তাদের মধ্যে কোন কোন উম্মত আল্লাহর হেদায়াতকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে বসে এবং অনেকে আল্লাহর বাণীর মধ্যে নিজেদের পক্ষ থেকে পরিবর্ধন ও বিকৃতি ঘটিয়ে তার চেহারাই বদলে দেয়।

অবশেষে বিশ্বজগতের প্রভু আরব দেশে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠিয়ে দেন ঐ একই দায়িত্ব দিয়ে যে দায়িত্ব দিয়ে তিনি ইতিপূর্বে অতীত নবীগণকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আহবান জানালেন সাধারণ মানুষকে এবং অতীত নবীগণের পথভ্রষ্ট অনুসারীদেরকেও। সবাইকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্য পথের দিকে আহবান জানানো, সবার নিকট নতুন করে আল্লাহর হেদায়াত পৌঁছিয়ে দেয়া এবং যারা এ পথ ও হেদায়াত গ্রহণ করবে তাদেরকে এমন একটি উম্মতে পরিণত করা তাঁর দায়িত্ব ছিল যারা একদিকে আল্লাহর হেদায়াতের ভিত্তিতে নিজেদের জীবন ব্যবস্থা কায়েম করবে এবং অন্যদিকে দুনিয়াবাসীদের সংশোধনের জন্যেও প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।

নবুয়াত ও আদি চুক্তি

(আরবী****************** পিডিএফ ২৯ পৃষ্ঠায়)

“আর [হে নবী (সা)]! লোকদেরকে সে সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দাও যখন তোমার প্রভু বনি আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরকে বের করেছিলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী বানিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেনঃ ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’ তার জবাব দিয়েছিলঃ ‘হাঁ অবশ্যি আপনি আমাদের প্রভু। আমরা এ কথার সাক্ষ্য দিচ্ছি’। এটা আমি এ জন্যে করেছিলান যে, তোমরা কিয়ামতের দিন যেন এ কথা বলতে না পারঃ ‘আমরা তো এ কথা জানতাম না’। অথবা এ কথা না বলতে পারঃ ‘শিরকের সূচনা তো আমাদের বাপ-দাদারা আমাদের পূর্বে করেছিলেন আর আমরা পরে তাদের বংশে জন্মেছি। অতপর আপনি কি আমাদেরকে এমন ভুলের জন্যে পাকড়াও করছেন যা বিভ্রান্ত লোকেরা করেছিল”।

-(সূরা আল আরাফঃ ১৭২-১৭৩}

সৃষ্টির আদি যুগে আদমের সমস্ত বংশধরদের নিকট থেকে যে উদ্দেশ্যে স্বীকৃতি আদায় করা হয়েছিল এ আয়াতে তা বলা হয়েছে। সে উদ্দেশ্যটি হচ্ছে, যেসব মানুষ আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করবে, তাদের এ অপরাধের জন্যে তারা নিজেরাই পুরোপুরি দায়ী বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে নিজেদের সাফাই গাইতে গিয়ে তারা না জানার ওজর পেশ করার সুযোগ পাবে না এবং নিজেদের ভুলের দায়-দায়িত্ব পূর্ববর্তী বংশধরদের ওপর চাপিয়ে নিজেদেরকে দায়িত্বমুক্তও করতে পারবে না। অন্য কথায়, জন্মলগ্নের এই আদি শপথ ও চুক্তিটিকে আল্লাহ তায়ালা এ কথার দলিল হিসেবে গণ্য করেছেন যে, আল্লাহর একমাত্র ইলাহ এবং একমাত্র রব ও প্রভু হবার সাক্ষ্য প্রত্যেকটি মানুষই ব্যক্তিগত ভাবে নিজের মদ্যে বহন করে আসছে এবং একমাত্র এ জন্যেই কোন ব্যক্তি পরিপূর্ণ অজ্ঞতার মধ্যে অথবা বিভ্রান্ত পরিবেশে লালিত পালিত হবার কারণে নিজের ভুল ও পথভ্রষ্টতার দায়িত্ব থেকে নিজেকে পরিপূর্ণরূপে মুক্ত করতে পারবে –এ কথাবলা ভুল হবে।

এখন প্রশ্ন দেখা দেয়, যদি এই আদি চু্ক্তিটি যথার্থই কার্যকর হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের চেতনা ও স্মৃতিতে এটি সংরক্ষিত আছে কি? আমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি কি এ কথা জানে যে, সৃষ্টির পূর্বলগ্নে তাকে তার আল্লাহর সামনে পেশ করা হয়েছিল এবং তাকে ‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই’ এ প্রশ্ন করা হয়েছিল আর সে জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল? জবাব যদি না সূচক হয়ে থাকে তাহলে যে শপথের স্মৃতি আমাদের চেতনা থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে তাকে কেমন করে আমাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে?

এর জবাবে বলা যায়, মানুষের চেতনা ও স্মৃতিতে যদি ঐ চুক্তি ও শপথের চিহ্ন তাজা রাখার ব্যবস্থা করা হতো, তাহলে মানুষকে দুনিয়ার বর্তমান পরীক্ষাগারে পাঠানো আদতেই অর্থহীন হয়ে যেত। কারণ প্রশ্ন আউট করার পরে সত্যিই এ ধরনের পরীক্ষার কোন অর্থই থাকত না। কাজেই স্মৃতি ও চেতনায় এর চিহ্ন তাজা হয়নি ঠিকই কিন্তু অবচেতন মনে (Sub-conscious mind) ও অনুভূতিতে (Intuition) তা অবশ্যই সংরক্ষিত আছে। আমাদের অন্যান্য অনুভূতি ও অবচেতনালব্ধ জ্ঞানের যা অবস্থা এর অবস্থাও তাই। মানুষ আজ পর্যন্ত সভ্যতা, সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও লেনদেনের ক্ষেত্রে যা কিছু অর্জন করতে পেরেছে তার সবটুকুর সম্ভাবনা আসলে মানুষের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। বাইরের শক্তি ও ভেতরের শক্তিগুলো মিলে যা কিছু করতে সক্ষম হয়েছে তা কেবল এতটুকুই যে, যা প্রচ্ছন্ন ছিল তাকে কার্যত উপস্থিত করেছে। এ কথা সত্য, মানুষের মধ্যে যে বস্তু-বিষয়টির সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন নেই কোন শিক্ষা, অনুশীলনী, পরিবেমের প্রভাব ও আভ্যন্তরীন শক্তি তার মধ্যে কোন ক্রমেই সেটির জন্ম দিতে পারে না। অনুরূপভাবে এ শক্তিগুলো হাজার চেষ্টা করেও মানুষের মধ্যে মানুষের মধ্যে যে বস্তু-বিষয়গুলোর সম্ভাবনা প্রচ্ছন্ন রয়েছে তাদের একটিও চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন করার ক্ষমতা রাখে না। বড় জোর তারা এতটুকু করতেপারে সবরকমের বিকৃতি, বিচ্যুতি ও বিপথগামিতার পরও এ বস্তু বিষয়টি ভেতরে প্রচ্ছন্ন থাকবে, আত্মপ্রকাশ করার জন্যে শক্তি প্রয়োগ করতে থাকবে এবং বাইরের আকর্ষণ ও আবেদনের জবাব দেবার জন্যে নিজেকে সর্বদা প্রস্তুত রাখবে। আমি আগেই বলেছি আমাদের সব রকমের অনুভূতি ও অবচেতনালব্ধ জ্ঞানের ব্যাপারে এই একই কথা বলা যায়ঃ

ওপরে বর্ণিত সবকিছুই আমাদের মধ্যে সক্রিয়ভাবে বিদ্যমান রয়েছে এবং কার্যত আমাদের থেকে যা কিছু প্রকাশ পায় তার মাধ্যমেই আমরা ওগুলোর অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রমাণ পাই।

এস সবগুলোর আত্মপ্রকাশের জন্যে বাইরে থেকে স্মরণ করিয়ে দেয়া, শিক্ষা ও অনুশীলনীর প্রয়োজন। যা কিছু আমাদের থেকে আত্মপ্রকাশ করে তা আসলে বাইরের মানবতার জন্যে আল্লাহর পথনির্দেশ।

আবেদনের জবাব। আর এ জবাবগুলো আসে আমাদের মধ্যকার ক্রিয়াশীল অস্তিত্বগুলোর পক্ষ থেকে।

ভেতরের ভ্রান্ত প্রবৃত্তি ও বাইরের ভ্রান্ত প্রতিক্রিয়া এ সবগুলোকে দমিত, প্রচ্ছন্ন, বিকৃত করে নিশ্চিহ্ন প্রায় করতে পারে কিন্তু পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে পারে না। এ কারণে আভ্যন্তরীন অনুভূতি ও বাইরের প্রচেষ্টা উভয়েরই মাধ্যমে সংশোধন ও পরিবর্তন (Conversion) সম্ভবপর।

এ বিশ্বজগতে আমাদের আসল মর্যাদা ও বিশ্ব জগতের স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে যে অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানের অধিকারী আমরা হয়েছি তার অবস্থাও ঠিক এই একই পর্যায়ের।

এর অস্তিত্বের প্রমাণ হচ্ছে এই যে, মানব জীবনের সকল যুগে, সর্বকালে, সর্বদেশে প্রত্যেকটি লোকালয়ে বংশ, গোত্র ও ব্যষ্টি মানুষের মধ্যে এর উৎপত্তি ও বিকাশ দেখা যায়। কোন যুগে, কালে দুনিয়ার কোন শক্তি একে বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়নি।

যখনই এটি আমাদের জীবনে বাস্তবতঃ কার্যকর হয়েছে তখনই সুফল দানে সক্ষম হয়েছে। এটিই এর সত্যানুযায়ী হবার প্রমাণ।

এর উৎপত্তি, আত্মপ্রকাশ ও বাস্তব আকৃতি লাভের জন্যে সবসময় বাইরের একটি আবেদনের প্রয়োজন দেখা গেছে। এ জন্যেই আল্লাহর নবীগণ আসমানী গ্রন্থসমূহ ও তাদের অনুসারী সত্যের আহবায়কগণ সবাইকে দেখা গেছে এই একই কার্য স্মপাদনে তৎপর। তাই কুরআনে তাদেরকে মুযাক্কির (যে স্মরণ করিয়ে দেয়), যিকির (স্মরণ), তাযকিরাহ (স্মৃতি) এবং তাদের কাজকে কাযতীর (স্মরণ করিয়ে দেয়া) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, নবীগণ, আসমানী গ্রন্থসমূহ ও সত্যের আহবায়কগণ মানুষের মধ্যে কোন নতুন বস্তু বিষয় সৃষি।ট করেন না বরং তাদের আভ্যন্তরদেশে পূর্ব থেকে যে বস্তু বিষয়টি বিদ্যমান ছিল তাকে বিকশিত ও সজীব করেন মাত্র।

নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায়

বড় বড় শহরে আমরা দেখি বৈদ্যুতিক শক্তির সাহায্যে শত শত কল-কারখানা চলছে। ট্রাম ও রেলগাড়ি চলছে। রাতে অকস্মাৎ হাজার হাজার বাতি জ্বলে ওঠে, গরমের সময় ঘরে গরে মাথার ওপর পাখা ঘোরে। কিন্তু এসব ঘটনা দেখে আমরা একটুও অবাক হই না। এসব জিনিসের উজ্জ্বল ও গতিশীল হবার পেছনে যে কারণ রয়েছে, সে ব্যাপারেও আমাদের মধ্যে কোন দ্বিমত দেখা যায় না। এর কারণ কি? এর কারন, যেসব তারের সাথে এ বাতিগুলো সংযুক্ত হয়েছে সেগুলা আমরা স্বচক্ষে দেখি। এ তারগুলো যে বিজলী ঘরের সাথে সংযুক্ত তার অবস্থাও আমরা জানি। আমরা এও জানি, ঐ ইঞ্জিনিয়ার বিজলীর কাজ করছে। আর এ উৎপাদিত শক্তিটির সাহায্যে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে। কাজেই বিজলীর চিহ্ন দেখে তার কার্যকারণ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে কোন প্রকার মতবৈষম্য দেখা না দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, এ কার্যকারণগুরোর সমগ্র পর্যায় আমাদের অনুভূতির অন্তর্ভূক্ত এবং আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। মনে করুন এ বাতিগুলো জ্বলে উঠত, পাখাগুলো বন বন করে ঘুতর, ট্রাম ও রেলগাড়ী ছুটে চলত, কল-কারখানা ও মেশিনের চাকা ঘুরত কিনউত যে তারগুলোর সাহায্যে এসবগুলোর মধ্যে বিজলী সরবরাহ করা হয় সেগুরো অদৃশ্য থাকত, বিজলী ঘরও আমাদের অনুভূতির নাগালের বাইরে থাকত, বিজলী ঘরে যারা কাজ করছে তাদের শক্তির সাহায্যে এ কারখানাটি পরিচালনা করছে, এ কথাও আমরা জানতে পারতাম না, তাহলে এ অবস্থায় বিদ্যুতের ঐ চিহ্নগুলো দেখে আমাদের মন কি নিশ্চিত হত? সে সময় ঐ চিহ্নগুলোর কার্যকারণের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে ঐকমত্য থাকত কি? বলা বাহুল্য, এর জবাব নেতিবাচকই হবে। কেন? কারণ যখন চিহ্নগুলোর কার্যকারণ প্রচ্ছন্ন থাকে এবং কারো পক্ষে তা জানা সম্ভব হয় না, তখন মনে বিস্ময়ের সাথে অস্তিরতার সৃষ্টি হওয়া, মস্তিষ্ক ও বুদ্ধিবৃত্তির এই সুগভীল রহস্যের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওা এবং এ রহস্যটি সম্পর্কে ধারণা, অনুমান ও মতামত বিভিন্ন হওয়া একান্তই স্বাভাবিক ব্যাপার।

কথাটি আরো একটু স্পষ্ট করে বলা যাক। ইতিপূর্বে যে বিষয়টি নিছক অনুমান করা হয়েছিল, মেনে নিলাম বাস্তবে ও কার্যত সেটির অস্তিত্ব রয়েছে। অর্থাৎ সত্যিই হাজার হাজার লাখো লাখো বিজলী বাতি জ্বলছে, লাখো লাখো-বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরছে, গাড়ী ছুটে চলছে, কারখঅনা ও মেশিনের চাকা ঘুরে চলছে কিন্তু সেগুলোর মধ্যে কোন শক্তি কাজ করছে এবং তা আসছেই বা কোথা থেকে সে কথা জানার কোন মাধ্যমই আমাদের কাছে নেই। লোকেরা এ চিহ্নগুলো দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েছে।

নানানজনের নানান মত

এসবের কারণ অনুসন্ধানে অনেকেই বুদ্ধির ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে। কেউ বল, এগুলো নিজে নিজেই জ্বলে উঠেছে, নিজে নিজেই চলছে। এদের অস্তিত্বের বাইরে এমন কোন বস্তু নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায় নেই যা এদেরকে বা গতি দান করেছে। কেউ বলে, যেসব উপাদানে এগুলো গঠিত হয়েছে সেগুলোর গঠন প্রকৃতিই এসবের মধ্যে আলো ও গতির অবস্থা সৃষ্টি করে দিয়েছে। কারো মতে, এ বস্তু জগতের আড়ালে একদল দেবতা আছে তাদের কেউ বাতি জ্বালায় কেউ ট্রাম ও রেলগাড়ি চালায়, কেউ পাখা ঘুরায়, কেউ কারখানা ও মেশিনের চাকা ঘুরায়। আবার, একদল লোক এ ব্যাপারে চিন্তা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, অবশেষে তারা নিজেদের অক্ষমতা প্রকাশ করে বলতে শুরু করেছে আমাদের বুদ্ধি এ তেলেসমাতির গভীরে প্রবেশ করতে অক্ষম। আমরা কেবল এতটুকুই জানি যতটুকু আমরা দেখতে ও অনুভব করতে পারি। এর চাইতে বেশী কিছু আমরা বুঝি না। আর যা কিছু আমরা বুঝি না তাকে আমরা সত্য বলি না আমার মিথ্যাও বলতে পারি না।

এসব লোক নিজেদের মধ্যে বিরোধে লিপ্ত। কিন্তু নিজেদের চিন্তার স্বপক্ষে এবং অন্যের চিন্তার বিপক্ষে তাদের প্রত্যেকের কাছে ধারণা, অনুমান ও কল্পনা ছাড়া জ্ঞানের অন্য কোন মাধ্যম নেই।

 

একটি স্বতন্ত্র দাবী

এ মতবিরোধ চলছিল এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বলেন, তোমাদের সব অভিমত রেখে দাও, আমার কাছে জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম আছে যা তোমাদের নেই। সেই মাধ্যম থেকে আমি জানে পেরেছি এসব বাতি, পাখা, ঘড়ি, কারখানা ও মেশিন কতিপয় অদৃশ্য তারের সাথে সংযুক্ত, যেগুলো তোমরা অনুভব করছ না। একটি বড় বিদ্যুৎ ঘর থেকে এ তারগুলোর মধ্যে শক্তি সরবরাহ করা হচ্ছে যা আলো ও গতির আকারে আত্মপ্রকাশ করছে। এ বিদ্যুৎ ঘরে বিরাট যন্ত্রপাতি আছে। অসংখ্য কর্মচারী ও কারিগর সেগুলো পরিচালনা করছে। আর এরা সবাই একজন বড় ইঞ্জিনিয়ারের অধীন। ইঞ্জিনিয়ার তাঁর নিজের জ্ঞান ও শক্তির সাহায্যে ব্যবস্থাটা কায়েম করেছেন। তাঁলই নির্দেশ ও পরিচালনাধীনে এসব কাজ চলছে।

এরপর আর এক ব্যক্তি আসেন। তিনিও ঐ একই কথা একই প্রকার দাবী সহকারে পেশ করতে থাকেন। অতপর তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ব্যক্তি আসেন। তাঁরাও পূর্ববর্তীদের ন্যায় একই কথা একইভাবে বলতে থাকেন। তারপর আগমনকারীদের একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা চলতে থাকে। এমনকি তাঁদের সংখ্যা শত ও হাজারের অংক পেরিয়ে লাখের অংকে পৌঁছে যায়। তাঁরা সবাই ঐ একই কথা একই দাবী সহকারে পেশ করতে থাকেন। স্থান-কাল-অবস্থার পার্থক্য সত্বেও তাঁদের কথা ও দাবীর মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা যায়নি। তাঁরা সবাই বলেন, আমাদের নিকট জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম আছে যা সাধারণ লোকের নিকট নেই। তাদের সবাইকে পাগল আখ্যা দেয়া হয় বিভিন্ন প্রকার জুলুম-নির্যাতন তাদেরকে জর্জরিত করা হয়। নিজেদের দাবী প্রত্যাহার করার জন্যে তাদেরকে সর্ব প্রকারে বাধ্য করা হয় কিন্তু তাঁরা সবাই নিজেদের দাবীর ওপর অবিচল থাকেন এবং দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদেরকে নিজেদের স্থান থেকে এক চুল পরিমাণও হঁটাতে পারেনি। এই দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে তাঁদের আরো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তাঁরা কেউ মিথ্যাবাদী, চোর, আত্মসাৎকারী, দুষ্কৃতিকারী, জালেম ও হারামখোর ছিলেন না। তাদের বিরোধী ও শত্রুরাও একথা স্বীকার করে। তাঁরা সবাই পবিত্র, কলুষমুক্ত ও অসাধারণ সচ্চরিত্রের অধিকারী মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার ও সদাচরণের ক্ষেত্রে সমগ্র মানব জাতির মধ্যে তারা একক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁদের মধ্যে পাগলামির কোন লক্ষণও দেখা যায় না, বরং বিপরীত পক্ষে তাঁরা উন্নত নৈতিক চরিত্র, আত্মিক পরিশুদ্ধি, পার্থিব বিষয়াবলির উপস্থাপন করা তো দূরের কথা বিশ্বের বড় বড় জ্ঞানী, পণ্ডিত তাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞগণ তার গূঢ় রহস্য ও সূক্ষ্ম তত্ত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্যে নিজেদের সারাজীবন ব্যয় করেন।

বিবেক-বুদ্ধির আদালতে

একদিকে বিভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী মিথ্যা প্রতিপন্নকারীর দল এবং অন্যদিকে একক দাবীদারগণের দল। বিবেক-বুদ্ধির আদালতে উভয় দলের মোকদ্দমা পেশ করা হয়। বিচারক হিসেবে বিবেক-বুদ্ধির দায়িত্ব হচ্ছে প্রথম নিজের মর্যাদা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে, তারপর উভয়পক্ষের অবস্থা অনুধাবন করে উভয়ের তুলনামূলক পর্যালোচনার পর কার কথা অগ্রগণ্য সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বিচারকের নিজের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আসল ব্যাপার জানার কোন মাধ্যম তার নেই। তিনি নিজে সত্য সম্পর্কে অবগত নন। তাঁর সামনে আছে কেবলমাত্র উভয় পক্ষের বক্তব্য, যুক্তি-প্রমাণ, তাদের ব্যক্তিগত অবস্থা এবং বাইরের চিহ্ন ও নিদর্শনাবলী। অনুসন্ধানীর দৃষ্টিতে এগুলো করতে হবে। কিন্তু অধিকতর সম্ভাবনার বেশী অন্য কোন সিদ্ধান্ত তিনি দিতে পারেন না। কারণ তাঁর টেবিলে যা কিছু তথ্য বিবরণী আছে তার ভিত্তিতে প্রকৃত সত্যের দ্বারোঘটন করা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়। দু’পক্ষের মধ্যে এক পক্ষের বক্তব্যকে তিনি অগ্রাধিকার দিতে পারেন কিন্তু চূড়ান্ত নিশ্চয়তা সহকারে কোন পক্ষের বক্তব্যকে সত্য ও কোন পক্ষের বক্তব্যকে মিথ্যা বলতে পারেন না।

মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের অবস্থা

মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের অবস্থা হচ্ছেঃ

একঃ সত্য সম্পর্কে তাদের মতামত বিভিন্ন। কোন একটি বিষয়েও তাদের মধ্যে মতৈক্য নেই। এমনকি এই মতবাদের অনুসারী দলের ব্যক্তির মধ্যেও অনেক সময় মতবিরোধ দেখা যায়।

দুইঃ তারা নিজেরাই স্বীকার করে যে, তাদের কাছে জ্ঞানের কোন অনন্য মাধ্যম নেই। তাদের প্রত্যেকটি দল বড় জোর এ দাবীই পেশ করছে যে, তার অনুমান অন্যের নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায় তুলনায় বেশী শক্তিশালী কিন্তু তারা সবাই নিজেদের অনুমানকে অনুমান বলে স্বীকার করে।

তিনঃ জর অনুমানের ওপর তাদের বিশ্বাস, ঈমান ও প্রত্যয় অবিচল বিশ্বাসের পর্যায়ভুক্ত নয়। তাদের মধ্যে মত পরিবর্তনের অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। প্রায়ই দেখা গেছে, তাদের এক ব্যক্তি গতকাল পর্যন্ত অত্যন্ত জোরেশোরে যে মতটি পেশ করছিল, আজ সে নিজেই তার সেই মতের বিরোধিতা করছে এবং অন্য একটি মত পেশ করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স,বুদ্ধি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের মত পরিবর্তন হতে দেখা দেছে।

চারঃ একক দাবীদারদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ব্যাপারে তাদের কাছে একটি ই মাত্র যুক্তি রয়েছে, তা হচ্ছে এই যে, নিজেদের দাবীর স্বপক্ষে তাদের কাছে কোন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তারা সেই অদৃশ্য তার দেখানে পারেনি যেগুলোর ব্যাপারে তাদের দাবী ছিল যে, সেগুলোর সাথে বাতি ও পাখা সংযুক্ত রয়েছে। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যুতের অস্তিতত্বের প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাতে পারেনি। তারা কাউকে বিদ্যুত ঘর দেখানে পারেনি। সেখানকার যন্ত্রপাতি ও মেশিনগুলো দেখানে পারেনি। এমনটি ইঞ্জিনিয়ারের সাথেও কাউকে দেখা-সাক্ষাত করাতে পারেনি। তাহলে কেমন করে তাদের দাবীকে সত্য বলে মেনে নেয়া যায়?

একক দাবীদারগণের অবস্থা

অন্যদিকে একক দাবীদারগণের অবস্থা হচ্ছেঃ

একঃ তাঁরা সবাই ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাদের দাবীর যাবতীয় মৌলিক বিষয়ে তাদের মধ্যে পূর্ণ ঐকমত্য বিরাজিত।

দুইঃ তাদের ঐক্যবদ্ধ দাবী হচ্ছে আমাদের কাছে জ্ঞানের এমন একটি মাধ্যম আছে যা সাধারণ লোকদের কাছে নেই।

তিনঃ তাদের একজনও বলেনি যে, আন্দাজ অনুমান বা ধারণা কল্পনার ভিত্তিতে তারা এ কথা বলছেন। বরং তারা সবাই সর্বসম্মতভাবে বলেন যে, ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে, তার কর্মচারীরা তাদের কাছে আসে, তিনি তাদেরকে নিজের কারখানা ভ্রমণ করিয়ে সবকিছু দেখিয়ে দিয়েছেন। কাজেই তাদের বক্তব্য হচ্ছে তারা যা কিছু বলছেন অনুমান ও কল্পনার ভিত্তিতে নয়, যথার্থ তত্ত্বজ্ঞান ও পূর্ণ বিশ্বাসের ভিত্তিতে বলছেন।

চারঃ তাদের একজনও নিজেদের বর্ণনার মধ্যে এক চুল পরিমাণ পরিবর্তন করেছেন, এমন কোন নজীর নেই। তাদের প্রত্যেকেই জীবনের প্রথম থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একই কথা বলে এসেছে।

পাঁচঃ তাদের চরিত্র যারপরনাই পবিত্র ও কলুষমুক্ত। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, শঠতা ও প্রতারণার চিহ্নও সেখানে নেই। যারা জীবনের সমস্ত ব্যাপারে সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ তারা মাত্র এই একটি ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মিথ্যা বলবে এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই।

ছয়ঃ এ দাবী করার পেছনে তাদের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে, এ কথাও প্রমাণিত নয়। তাদের অধিকাংশই এ দাবীর কারণে চূড়ান্ত পর্যায়ের কষ্ট ও নির্যাতন ভোগ করেন, বিপদের সম্মুখীন হন, কারাযন্ত্রণা ভোগ করেন, শারীরিক নির্যাতনে জর্জরিত হন, দেশ থেকে বিতাড়িত হন। অনেককে হত্যাও করা হয়। এমনকি কাউকে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের সমাগম দেখা যায়নি। কাজেই কোন প্রকার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের অভিযোগে তাদেরকে অভিযুক্ত করা যায় না। বরং এহেন চরম অবস্থায় তাদের নিজেদের একক দাবীর ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকা এ কথাই প্রমাণ করে যে, নিজেদের সত্যবাদিতার ওপর তাদের আস্থা ও প্রত্যয় ছিল পর্বত প্রমাণ। তাদের প্রত্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, নিজেদের প্রাণ রক্ষার জন্যেও তাদের কেউ নিজের দাবী প্রত্যাহার করেননি।

সাতঃ তাদের পাগল ও বুদ্ধিলোপ হবারও কোন প্রমাণ নেই্। জীবনের সকল ব্যাপারে দেখা গেছে তারা সবাই চূড়ান্ত পর্যায়ের জ্ঞানী ও স্থির বুদ্ধির অধিকারী। তাদের বিরোধিরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাহলে কেমন করে মেনে নেয়া যেতে পারে যে, বিমেষ করে এই একটি ব্যাপারেই তারা পাগলামির শিকার হয়েছিলেন? আর বিষয়টির গুরুত্বও দেখতে হবে। এটি তাদের জন্যে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর জন্যে সারা দুনিয়ার মানুষের মুকাবিলা করেছিলেন এবং সংগ্রাম করেছিলেন বছরের পর বছর ধরে। এটি ছিল তাদের সমস্ত জ্ঞানগর্ত শিক্ষার মূল যার প্রতি বহু মিথ্যা প্রতিপন্নকারীরও স্বীকৃতি রয়েছে।

আটঃ তারা নিজেরা কোনদিন এ কতা বলেননি যে, ইঞ্জিনিয়ার বা তার কর্মচারীদের সঙ্গে তোমাদের সাক্ষাত করিয়ে দেবে। অথবা তার গোপন ও অদৃশ্য কারখানা তোমাদেরকে দেখাতে পারি বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে নিজেদের দাবী প্রমাণ করতে পারি। তারা নিজেরাই এ বিষয়টিকে ‘গায়েব’ বা অদৃশ্য আখ্যা দেন। এ বিষয়ে তারা বলেন, আমাদের ওপর আস্থা রাখো এবং আমরা যা কিছু বলি তা মেনে নাও।

বিবেক-বুদ্ধির আদালতের রায়

দু’পক্ষের অবস্থা ও বক্তব্য পর্যালোচনা করার পর আদালত এবার নিজের রায় প্রদান করে। তার রায়ে বলা হয়, কতিপয় চিহ্ন ও নিদর্শন দেখে তাদের ভেতরের কার্যকারণ অনুসন্ধান উভয় পক্ষই করেছেন এবং প্রত্যেকেই নিজের মত ব্যক্ত করেছেন। আপাত দৃষ্টিতে উভয় পক্ষের মত একই রকম মনে হয়। কারণ প্রথমতঃ তাদের কারো মত বুদ্ধিবিরোধী নয়। অর্থাৎ বুদ্ধির আইনের প্রেক্সিতে তাদের কারো মত সম্পর্কে এ কথা বলা যেতে পারে না যে, তার নির্ভুল হওয়া অসম্ভব। দ্বিতীয়তঃ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা প্রত্যক্ষ দর্শনের মাধ্যমে তাদের কারোর মতের নির্ভুলতা প্রমাণ করা যেতে পারে না। প্রথম পক্ষের অন্তর্ভুক্ত নবুয়াতের ব্যাপারে বিবেক বুদ্ধির রায়।

কোন দল নিজের মতবাদের স্বপক্ষে এমন কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পেশ করতে পারে না যার ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে প্রত্যেক ব্যক্তিই বাধ্য হয়। দ্বিতীয় পক্ষও এর ক্ষমতা রাখে না এবং তারা এর দাবীদারও নয়। কিন্তু আরও গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করার পর এমন কতকগুরো বিষয় দৃষ্টিগোচর হয় যার ভিত্তিতে সমস্ত মতবাদের মধ্যে দ্বিতীয় পক্ষের মতবাদটিই অগ্রগণ্য মনে হয়।

প্রথমতঃ বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশের এত অধিকসংখ্যক লোকের একটি মতবাদের সমর্থনে এমন ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসা একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হয়। তারা সবাই এক বাক্যে একই দাবী করে চলেছেন যে, তাদের নিকট একটি অসাধারণ জ্ঞানের মাধ্যম রয়েছে এবং ঐ মাধ্যমের সাহায্যে তারা সবাই বাইরের চিহ্ন ও নিদর্শনগুলোর আভ্যন্তরীণ কার্যকারণ জেনে নিয়েছেন। এ বিষয়টি তাদের এ দাবীর সত্যতা মেনে নেয়ার দিকে আমাদেরকে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে আমরা দেখি, তারা সবাই যে তথ্য পেশ করেছেন তার মধ্যে সামান্যতম বিরোধও নেই এবং তাদের বিকৃত তথ্য বুদ্ধি বিরোধীও নয়। আবার কিছু লোকের মধ্যে থাকে না তা বুদ্ধির আইনে কোনক্রমেই অসম্ভব গণ্য হতে পারে না।

দ্বিতীয়তঃ বাইরের নিদর্শনগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করলে দ্বিতীয় পক্ষের মতবাদটিই নির্ভুল বলে অধিকতর বিশ্বাস জন্মে। কারণ বাতি, পাখা, গাড়ী ও কারখানা প্রভৃতি নিজে নিজেই উজ্জ্বল বা গতিশীল হয়নি। যতি তাই হতো তাহরে উজ্জ্বল ও গতিশীল হওয়া তাদের নিজেদের ইচ্চাধীন হত। কিন্তু তা দেখা যাচ্ছে না অথবা তাদের আলো ও গতি যেসব উপাদান দিয়ে তারা গঠিত সেগুলার অবশ্যম্ভাবী ফল নয়। কারণ যখন তারা উজ্জ্বল ও গতিশীল থাকে না তখনও তাদের গঠনাকৃতির মধ্যে এ উপাদানগুলোই মওজুদ থাকে। আবার তারা পৃথক বাতিতে আলো না থাকলে পাখাও চলে না, ট্রাম গাড়ী থেকে যায় এবং কারখানার চাকাও ঘোরে না। কাজেই বাইরের নিদর্শনগুলোর ব্যাখ্যার ব্যাপারে প্রথম পক্ষ যতগুলো মতবাদ পেশ করেছিলেন বুদ্ধি ও যুক্তির সাথে তাদের কোন দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। এখানে এ কথাটিই অধিকতর নির্ভুল বলে মনে হয় যে, এসব নিদর্শনের মধ্যে কোন একটি শক্তি সক্রিয় রয়েছে এবং তার প্রান্তভাগ এমন একজন জ্ঞানী ও শক্তিশালীর হাতে রয়েছে যিনি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার অধীনে এ শক্তিকে বিভিন্ন নিদর্শনের মধ্যে ব্যবহার করছেন।

আর সংশয়বাদীদের বক্তব্য যে, এ কথা তাদের বুদ্ধির অগম্য এবং যা তাদের বুদ্ধি অগম্য তারা তাকে সত্য বা মিথ্যা কিছুই বলতে পারে না –এ কথার জবাবে বলা যায়, বুদ্ধির বিচারে তাও যথার্থ প্রতিপন্ন হয় না। কারণ শ্রোতা কোন ঘটনা শুনে তা বুঝতে পারার ওপরে ঘটনাটির ঘটনা হওয়া নির্ভর করে না। ঘটনাটি সংঘটিত হবার ব্যাপারটির স্বীকৃতি দানের জন্য নির্ভরযোগ্য ও ধারাবাহিক বহু সাক্ষ্যই যথেষ্ট। যদি আমাদের কাছে কয়েকজন নির্ভরযোগ্য লোক এসে বলে, আমরা পশ্চিম দেশে লোকদেরকে লোহার গাড়ীতে চড়ে বাতাসে উড়ে বেড়াতে দেখেছি এবং আমরা লণ্ডনে বসে নিজের কানে আমেরিকার গান শুনেছি, তাহলে এ ক্ষেত্রে আমরা কেবল এতটুকু দেখব যে, লোকগুরো মিথ্যুক ও পরিহাসকারী নয় তো? এ ধরনের কথা বলার সাথে তাদের কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নেই তো? তাদের মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেনি তো? যদি এ কথা প্রমাণ হয়ে যায় যে, মিথ্যুক, পরিহাসকারী বা পাগল নয় এবং এ ব্যাপারটির সাথে তাদের কোন স্বার্থ জড়িত নেই, উপরন্তু যদি আমরা দেখি, বহু সত্যনিষ্ট ও বুদ্ধিমান লোক কোনো প্রকার মতদ্বৈততা ছাড়াই পূর্ণ আত্মনির্ভরশীলতা সহকারে এ কথা বলে যাচ্ছে, তাহলে অবশ্যি আমরা তা মেনে নেবো। এখন লোহার তৈরী গাড়ীর বাতাসে উড়ে চলার বা কোনো প্রকার বাস্তব মাদ্রম ছাড়াই এক জায়গায় গান হাজার মাইল দূরে অন্য জায়গায় শ্রুত হবার ব্যাপারটি আমাদের বোধগম্য হলেই বা কি আর না হলেই বা কি?

এ ব্যাপারে এটিই হচ্ছে বিবেক-বুদ্ধির সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিশ্বাস ও প্রত্যয়ের অবস্থা, যাকে ঈমান বলা হয় এভাবে সৃষ্টি হয় না। এ জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে অনুভূতির। এ জন্যে মনের ভেতর থেকে এমন একটি আওয়াজের প্রয়োজন যা মিথ্যা, সংশয় ও দোদল্যমান অবস্থার অবসান সূচিত করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দেবেঃ লোকদের যাবতীয় আন্দাজ-অনুমান মিথ্যা। সত্য হচ্ছে একমাত্র সেই কথাটির যা সত্যবাদী লোকেরা নিজেদের আন্দান-অনুমানের ভিত্তিতে নয় বরং প্রত্যয় দীপ্ত জ্ঞান ও গভীর অন্তরদৃষ্টির ভিত্তিতে বিবৃত করেছেন।

নবুয়াতের প্রয়োজন ও তাৎপর্য

মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন

(আরবী****************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“আর সোজা পথ বলে দেয়ার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর, যেখানে বাঁকা পথও  রয়েছে”।

তাওহীদ, রহমত ও আল্লাহর সমগ্র ‘রবুবিয়াতের’ স্বপক্ষে যুক্তি পেশ করতে গিয়ে এখানে ইঙ্গিতে নবুয়াতের স্বপক্ষে যুক্তিও পেশ করা হয়েছে। এ যুক্তির সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছেঃ

দুনিয়ার মানুষের জন্যে চিন্তা ও কর্মের বহুবিধ পথ সম্ভবপর এবং বাস্তবে তা রয়েছেও। বলা বাহুল্য একই সময় এসব পথের প্রত্যেকটির সত্য হতে পারে না। সত্য মাত্র একটিই হয়ে থাকে। একমাত্র সঠিক জীবন পদ্ধতি তাই হতে পারে যা নির্ভুল জীবন দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এ নির্ভুল মতাদর্শ ও সঠিক পথটি জানা প্রত্যেকটি মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বরং এটিই আসল মৌলিক প্রয়োজন। একটি উচ্চ পর্যায়ের জীব হবার কারণে মানুষের যে সমস্ত বস্তুর প্রয়োজন হয় অন্যান্য যাবতীয় বস্তু তার কেবলমাত্র সেই প্রয়োজনগুলোই পূরণ করে কিন্তু এটি এমন একটি প্রয়োজন যা মানুষ হিসেবে তার জন্য অপরিহার্য এ প্রয়োজনটি পূরণ না হবার অর্থই হচ্ছে মানুষের সমগ্র জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে।

এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে, যে খোদা মানুষকে অস্তিত্ব দান করার পূর্বে তার জন্যে এতসব উপকরণ ও সাজসরঞ্জাম যোগাড় করে রেখেছেন এবং তাকে অস্তিত্ব দান করার পর তার জৈব জীবনের প্রত্যেকটি প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে এত নিখুঁতভাবে ব্যাপক পর্যায়ে ব্যবস্থা করেছেন, তিনি মানুষের জীবনের সবচেয়ে এই বড় প্রয়োজন ও আসল প্রয়োজনটি পূরণ করার ব্যবস্থা করেননি, এ কথা কি কল্পনা করা যেতে পারে?

নবুয়াতের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাটি সম্পন্ন করা হয়েছে। যদি কেউ নবুয়াতকে অস্বীকার করতে চান তাহলে মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ আর কি ব্যবস্থা করেছেন –একথা অবিশ্যি তাকে বলতে হবে। এর জবাবে এ কথা বলে কেউ নিষ্কৃতি পেতে পারেন না যে, পথ অনুসন্ধান করার জন্যে আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি দিয়ে রেখেছেন। কারণ মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তা পূর্বেই অসংখ্য পথ আবিস্কার করে রেখেছে। এটি তার সরল-সঠিক-সোজা পথের নির্ভুল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। অন্যদিকে এ কথা বলাও সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের পথ প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থাই করেননি। কারন আল্লাহর ব্যাপারে বোধ হয় এর চেয়ে বড় কুধারণা আর কিছুই হতে পারে না যে, জীব হিসেবে আমাদের প্রতিপালন, বুদ্ধি ও বিকাশ সাধনের পুরোপুরি ব্যবস্থা তিনি করেছেন কিনউত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার কোন ব্যবস্থাই তিনি করেননি বরং এক্ষেত্রে আমাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দিয়েছে।

বাধ্যতামূলক হেদায়াতের পরিবর্তে ইসলামী হেদায়াত

(আরবী**************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করতেন”।

-(সূরা আন নাহলঃ ৯)

অর্থাৎ যদিও আল্লাহ তায়ালার পক্ষে তাঁর এ দায়িত্ব (বা তিনি নিজে মানুষজাতির হেদায়েতের জন্য নিকের ওপর ন্যস্ত করেছেন) এমনভাবে আদায় করা সম্ভব ছিল, যার ফলে অন্যান্য স্বাধীন ক্ষমতাহীন সৃষ্টির ন্যায় সমস্ত মানুষকে জন্মগতভাবে প্রদপ্রদর্শন করা যেত, কিন্তু একটি আল্লাহর ইচ্ছা মত ভুল নির্বিশেষে যে কোন পথ অবলম্বন করার স্বাধীনতা রাখে। এই স্বাধীনতা ব্যবহার করার জন্য তাকে জ্ঞানের মাধ্যমে দান করা হয়েছে। বুদ্ধি ও চিন্তার ক্ষমতা দান করা হয়েছে। ইচ্ছা ও সংকল্পের শক্তি দান করা হয়েছে। নিজের ভেতরের ও বাইরের অসংখ্য বস্তু ব্যবহার করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এ সঙ্গে ভেতরে বাইরে সর্বত্র এমন অসংখ্য কার্যকারণ রেখে দেয়া হয়েছে যা তার জন্যে সৎপথ লাভ ও পথভ্রষ্ট উভয়েরই কারণ হতে পারে। তাকে জন্মগতভাবে সৎপথ অবলম্বনকারী বানিয়ে দিলে এসব কিছুই অর্থহীন হয়ে যেত। তাহলে উন্নতির উচ্চতম শিখরে আরোহন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হত না, যা কেবলমাত্র স্বাধীনতার যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমেই সে লাভ করতে পারে। তাই মানুষের হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ তায়ালা বাধ্যতামূলক হেদায়াতের পন্থা পরিহার করে নবুয়াত ও রিসালাতের পন্থা অবলম্বন করেছেন এভাবে মানুষের স্বাধীনতা বহাল থাকবে, তার পরীক্ষার উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে এবং সরল-সোজা-সৎপথও যুক্তিগত উপায়ে তার সামনে পেশ করা হবে।

 

বৈষয়িক ও নৈতিক জীবনে সৎপথের নিদর্শনের প্রয়োজন

(আরবী**************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“তিনি পৃথিবীতে পথনির্দেশকারী চিহ্নসমূহ রেখে দিয়েছেন এবং তারকার সাহায্যেও লোকেরা পথের সন্ধান পায়”। -(সূরা আন নাহলঃ ১৬)।

অর্থাৎ আল্লাহ সমস্ত পৃথিবীটাকে একই ধরনের তৈরী করেননি। বরং পৃথিবীর প্রত্যেক এলাকাকে বিভিন্ন প্রকারের ও বিশেষ নিদর্শনাদি (Land Marks) দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। এর ফলে মানুষ বিভিন্নভাবে উপকৃত হচ্ছে। নিজের পথ ও গন্তব্য চিনে নিতে পারছে। এটি এর বিভিন্ন প্রকার উপকারের অন্যতম। আল্লাহ এ নিয়ামত ও দানটির যথার্থ মূল্য মানুষ একমাত্র তখনই অনুধাবন করতে পারে যখন তার এমন কোন মরুময় এলাকায় যাওয়ার সুযোগ হয় যেখানে এ ধরনের বিশিষ্ট কোন চিহ্নই দেখতে পাওয়া যায় না। ফলে পথ ভুল করার ভয়ে মানুষ সবসময় উৎকণ্ঠিত থাকে। সামুদ্রিক সফরে মানুষ আল্লাহর এ মহান দানটির মূল্য ও মর্যাদা আরও বেশী করে অনুভব করতে পারে। কারণ সেখানে আদতে কোন পথের চিহ্নই থাকে না। কিন্তু মরুভূমি ও সমুদ্রের মধ্যও আল্লাহ মানুষের পথপ্রদর্শনের একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্তা করে রেখেছেন। সে ব্যবস্থাটি হচ্ছে, আকাশের তারকারাজি, যার সাহায্যে মানুষ প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজ  পর্যন্ত নিজের পথের সন্ধান লাভ করে যাচ্ছে।

এখানে আবার তাওহীদ, রহম ও ‘নবুবিয়াত’ স্বপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতে গিয়ে রিসালাতের প্রমাণের প্রতিও সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ আয়াতটি পড়ার সময় মন স্বতস্ফুর্তভাবে এ বিষয়বস্তুর প্রতি ঝুঁকে পড়ে যে, যে আল্লাহ মানুষের বৈষয়িক জীবনের পথ নির্দেশের এত ব্যাপক ব্যবস্থা করেছেন তিনি কি মানুষের নৈতিক জীবন সম্পর্কে এতই উদাসীন থাকেন? মানুষের নৈতিক জীবনের সামান্যতম পথনির্দেশ দেবার প্রয়োজনও তিনি বোধ করেন না? বলা বাহুল্য, বৈষয়িক জীবনের পথ ভুল করার ক্ষতি যত বড়ই হোক না কেন নৈতিক জীবনে এ ধরনের ভুলের ক্ষতি থেকে তা অনেক গুণে কম। আবার যে করুণাময় মহান আল্লহা মানুষের কল্যাণের প্রতি এত তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন যে পাহাড়ের মধ্য দিয়েও তাদের জন্যে পথ তৈরী করে রেখেছেন, বিরাট বিস্তীর্ণ ধুধু প্রান্তরের মধ্যেও নিশানী দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মরুভূমি ও সমুদ্রের মধ্যে দিক ভুল করার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে আকাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন, তাঁর সম্পর্কে কেমন করে এ কুধারণা পোষণ করা যেতে পারে যে, তিনি মানুষের নৈতিক কল্যাণের জন্যে কোন পথের সন্ধান দেননি? আর সে পথকে সুস্পষ্ট করার জন্যে কোন নিশানী দাঁড় করিয়ে রাখেননি এবং কোন আলো জ্বালিয়ে তাকে উজ্জ্বল করেননি?

মানুষের জন্যে সচেতন প্রথনির্দেশের গুরুত্ব

(আরবী**************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“মূসা ফেরাউনকে জবাব দিলেনঃ আমাদের রব হচ্ছেন তিনি যিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে তার গঠনাকৃতি দান করেছেন অতপর তাকে পথনির্দেশ দিয়েছেন”। -(তা-হাঃ ৫০)

অর্থাৎ দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুর আকার, আকৃতি, শক্তি, সামর্থ, গুণ, বৈশিষ্ট্য, সবকিছু তিনিই দান করেছেন। যে আকার-আকৃতি লাভ করে হাত দুনিয়ার কাজ করার উপযোগী হতে পারে সেই আকার-আকৃতি দিয়ে তাকে তৈরী করেছেন। পা-কেও তিনি তার উপযোগী আকৃতি দান করেছেন। মানুষ, পশু, উদ্ভীদ, জড় পদার্থ, বাতাস, পানি, আলো ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার বস্তু যে ধরনের আকৃতি লাভ করে পৃথিবীতে নিজেদের অংশের কাজ যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারে তা তিনি তাদেরকে দান করেছেন।

আবার তিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে কেবল তার বিশেষ আকৃতি দান করেই ছেড়ে দেননি বরং এই সঙ্গে তাদরে চলার জন্যে পথনির্দেশও দিয়েছেন। দুনিয়ার এমন কোন বস্তুর সন্ধান পাওয়া যাবে না যে ব্স্তুটি তৈরী করে তাকে বিশেষ আকৃতি দান করার পর তার দেহ সৌষ্ঠবের মাধ্যমে কাজ করে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করার পদ্ধতি তিনি তাকে শেখাননি। কানকে শোনার ও চোখকে দেখার কাজ তিনিই শিখিয়েছে। মাছকে সাঁতার কাটার, পাখিকে উড়ার, গাছকে ফুল ও ফল দেবার এবং মাটিকে উদ্ভিদ, শাক-সবজি ও ফসল দান করার শিক্ষা তিনিই দিয়েছেন। এক কথায় বলা যায়, তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রত্যেকটি বস্তুর কেবলমাত্র স্রষ্টাই নন, তাদের শিক্ষক এবং পথপ্রদর্শকও।

উপরন্তু এ ছোট্ট একটি বাক্যের মধ্যে হযরত মূসা (আ) ইঙ্গিতে রিসালাতের যুক্তিও পেশ করেছেন। অবশ্য ফেরাউন তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। তাঁর যুক্তির মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আল্লাহ সমগ্র বিশ্বজগতের পথপ্রদর্শক, তিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে তার অবস্থা ও প্রয়োজন অনুসারে পথ দেখাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বব্যাপী পথনির্দেশকের মর্যাদার অপরিহার্য দাবী হচ্ছে এই যে, তিনি মানুষের সচেতন জীবনে তার পথপ্রদর্শনের জন্যে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করবেন না যা মাছ ও পাখির জন্য উপযোগী হতে পারে। এর সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতি হচ্ছে, একজন সচেতন মানুষ তাঁর পক্ষ থেকে সমস্ত মানুষকে পথ দেখাবার জন্য নিযুক্ত হবেন। তিনি মানুষের বুদ্ধি, জ্ঞান ও সচেতনতার প্রতি আবেদন জানিয়ে তাদেরকে সোজা পথ দেখাবেন।

নবুয়াত কি?

দুনিয়ার জীবন যাপনের মানুসের যেসব জিনিসের প্রয়োজন, আল্লাহ নিজেই সেসবের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিশু ভূমিষ্ঠ হবার সময় তার প্রয়োজনীয় যাবতীয় বস্তু সঙ্গে দিয়েই তাকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেখার জন্যে তাকে দেয়া হয় চোখ, শোনার জন্যে কান, ঘ্রাণ ও শ্বাস নেবার জন্যে নাক, অনুভব করার জন্যে শরীরের ত্বকের মধ্যে স্পর্শানুভূতি, চলাফেরা করার জন্যে পা, কাজ করার জন্যে হাত, চিন্তা করার জন্যে মস্তিষ্ক এবং এমনি আরও অসংখ্য জিনিস তার প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বাহ্নেই তার ছোট্ট দেহটির সঙ্গে জড়িয়ে রেখে দেয়া হয়। তারপর দুনিয়ার মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই জীবন ধারনের জন্যে এতসব বস্তু সে লাভ করে যা গণনা করেও শেষ করা যায় না। আলো, বাতাস, উত্তাপ, পানি, মাটি সবকিছু তার জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়। মায়ের বুকে দুধের ধারা আগে থেকেই তার জন্যে প্রবাহিত রাখা হয়। মা, বাপ, আত্মীয়-স্বজন এমনকি অন্যদের হৃদয়েও তার জন্যে স্নেহ-প্রীতির ফল্গুধারা প্রবাহিত করা হয়, এর সাহায্যেই সে লালিত-পালিত হয়। অতপর সে যত বড় হতে থাকে সেই অনুসারে দিনের পর দিন তার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্যে সবরকম বস্তু সে লাভ করতে থাকে। অবস্থা দেখে মনে হয় পৃথিবী ও আকাশের সমস্ত শক্তি যেন তার লালন-পালন ও সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে।

দুনিয়ায় কাজ করার জন্যে যে পরিমাণ যোগ্যতার প্রয়োজন সকল মানুষকে তা দান করা হয়েছে। দৈহিক শক্তি, বুদ্ধি-বিবেক, বাকশক্তি এবং এ ধরনের আরও বহুতর যোগ্যতা কমবেশী প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিধ্যমান। কিন্তু এখানে আল্লাহ একটি সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। সমস্ত যোগ্যতা সকল প্রকার মানুসকে সমানভাবে দান করেননি। এমনকি কররে কেউ কারও মুখাপেক্ষী হত না। কেউ কারও পরোয়া করতো না। এ জন্যে আল্লাহ সমস্ত মানুষের সামষ্টিক প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যাবতীয় যোগ্যতার সৃষ্টি মানুষদের মধ্যেই করেছেন ঠিকই ক্নিতু এমনভাবে করেছেন যার ফলে এক একজনকে এক একটি যোগ্যতা বেশী করে দিয়েছেন। কেউ কারও তুলনায় শারীরিক পরিশ্রমের শক্তি বেশী লাভ করে। অনেক লোকের মধ্যে জন্মগতভাকে কোন বিশেষ পেশা বা শিল্পের যোগ্যতা বেশী থাকে এবং অন্যেরা থাকে তা থেকে বঞ্চিত। অনেক লোকের মধ্যে বুদ্ধি জ্ঞান অন্যের তুলনায় বেশী থাকে। অনেকে হয় জন্মগত সেনাপতি। অনেকের মধ্যে শাসন কর্তৃত্বে বিশেষ যোগ্যতা থাকে। অতেকে অসাধারণ বাগ্মীতার শক্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। অনেকের মধ্যে থাকে জন্মগত অসাধারণ লেখনী শক্তি। এমন অনেক ব্যক্তি দেখা গেছে যারা অংকে খুব পাকাপোক্তা। এমনকি এ বিষয়ের জঠিলতম প্রশ্নগুরোর সমাধান তারা এমনভাবে করে যা অন্যের কল্পনাতীত। এক ব্যক্তি অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিস আবিস্কার করে। তার আবিস্কারে বিশ্ববাসী স্তম্বিত হয়। আবার এক ব্যক্তিকে দেখা যায় আইনে অসাধারণ পারদর্শী। বছরের পর বছর চিন্তা-ভাবনা করার পর আইনের যেসব জঠিলতম বিষয় অনুধাবন করা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না, সে এক নজরেই তার গভীর তলদেশে পৌঁছে যায়। এসব যোগ্যতা আল্লাহ প্রদত্ত। কোনো ব্যক্তি নিজের চেষ্টায় নিজের মধ্যে এসব যোগ্যতা –[ এখানে অসাধারণ যোগ্যতাসমূহের কথা বলা হয়েছে। মানুসের সাধারণ যোগ্যতাগুলো শিক্ষা অনুশীলন ও অভ্যাসের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করতে পারে। আর অসাধারণ যোগ্যতাগুলো অনেক সময় কোন প্রকার অনুশীলন ছাড়াই এবং সামান্য নাম মাত্র অনুশীলনের মাদ্রমে আত্মপ্রকাম করে। এক্ষেত্রে উন্নত শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে সেগুলোর বিকাশ সাধরেন চেষ্টা করলে তা এক দৃষ্টান্তমূলক উন্নতমানে পৌঁছে যায়। -(সম্পাদক বৃন্দ)] সৃষ্টি করতে পারে না। এমনকি শিক্ষঅ ও অনুশীলনের সাহায্যেও এসব সৃষ্টি করা সম্ভবপর হয় না। আসরে এগুলো হচ্ছে জন্মগত যোগ্যতা; আল্লাহ নিজের সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন।

মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্যে যেসব যোগ্যতার বেশী প্রয়োজন হয় সেগুলো বেশী সংখ্যক মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়। আর যেগুলোর প্রয়োজন যত কম সেগুলা সৃষ্টি করা হয় তত কমসংখ্যক মানুষের মধ্যে। সৈনিক বহু জন্মগ্রহণ করে। কৃষক, কর্মকার, তাঁতি এবং এ ধরনের অন্যান্য কাজের যোগ্রতাসম্পন্ন লোক বহুসংখ্যক জন্মলাভ করে। কিন্তু তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতাসম্পন্ন এবং রাজনীতি ও সেনাপতির যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব লোকের সংখ্যা দেখা যায় আরও কম। কারণ তাদের অবদান শত শত বছর ধরে চলে এবং  ফরে মানব সমাজ তাদের ন্যায় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনবোধ করে না।

মানুষের জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন

চিন্তার বিষয় হচ্ছে, দুনিয়ার মানুষের জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে কেবল এ প্রয়োজনগুলোই তো যথেষ্ট নয়। মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র প্রকৌশলী, অংকবিদ, বৈজ্ঞানিক, আইনবিদ, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পেশার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের জন্মই তো যথেষ্ট নয়। এসবের চেয়ে আর একটি বড় প্রয়োজন মানুষের কাছে। আর তা হচ্ছে মানুষের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তির জন্ম হতে হবে যে মানুষকে দেখাবে আল্লাহর পথ। অন্য লোকদের কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র এতটুকুন জানানো যে, দুনিয়ায় মানুষের জন্রে কি কি বস্তু আছে এবং সেগুরো কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিরও প্রয়োজন যিনি মানুষকে একথা জানাবেন যে, মানুষকে কার জন্যে সৃষ্টি কর হয়েছে, দুনিয়ায় কে তাকে এতসব সাজসরঞ্জাম দিয়েছে এবং সেই দাতার ইচ্ছা কি –যে ইচ্ছা অনুযায়ী দুনিয়ায় জীবনযাপন করে সে নিশ্চিত ও চিরন্তন সাফল্য লাভ করতে পারে? এটি হচ্ছে মানুষের আসল, সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বুদ্ধি এ কথা মানতে প্রস্তুত নয় যে, আমাদের ক্ষুদ্রতম প্রয়োজনও যে আল্লাহ পূর্ণ করার ব্যবস্থা করেছেন তিনি আমাদের এতবড় একটি প্রয়োজন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছেন। এটা কখনই সম্ভব নয়।

রসূলগণের মর্যাদা

অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পে পারদর্শী লোকের যেমন একটি বিশেষ মন-মস্তিষ্ক ও বিশেষ ধরনের প্রকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে অনুরূপভাবে নবীও একটি বিশেষ প্রকৃতি নিযে দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

একজন স্বভাব কবির কবিতা আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি কাব্য ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতা নিয়ে জন্মলাভ করেছেন। কারণ অন্য লোকের হাজার চেষ্টা করলেও তার তো কবিতা লিখতে পারবে না। অনুরূপ একজন স্বভাব বাগ্মী, জন্মগত লেখক, জন্মগত আবিষ্কারক এবং জন্মগত নেতাকেও তাদের কার্যাবলীর মাধ্যমে সহজেই চিনে নেয়া যায়। কারণ তাদের প্রত্যেকেই নিজের নিজের কাজে এমন অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ দেয় যা অন্যদের দ্বারা সম্ভব নয়। নবীর অবস্থাও অনুরূপ। তাঁর মন-মস্তিষ্কে এমন সব কথার উদয় করেন যা তিনি ছাড়া অন্য কোনো মানুষের পক্সে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাঁর দৃষ্টি স্বতঃস্ফুর্তভাবে এমন সব সূক্ষ্ম কথার গভীরে প্রবেশ করে যেখানে বছরের পর বছর গবেষণা করার পরও অন্যদের দৃষ্টি পৌঁছে না। তিনি যা কিছু বলেন আমাদের বুদ্ধি তা গ্রহন করে নেয় এবং আমাদের মন তার সাক্ষ্য প্রদান করে, অবশ্যি এমনটিই হওয়া উচিত। দুনিয়ার কথা সত্য প্রমাণিত হয়। কিন্তু আমরা নিজেরা ঐ ধরনের কথা বলতে চাইরেও বলতে পারি না্ উপরন্তু তাঁর প্রকৃতি এতই পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয় যার ফলে প্রত্যেকটি ব্যাপারেই তিনি সত্যনিষ্ঠ ও ভদ্রজনোচিত পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি কখনও ভুল কথা বলেন না। কোনো খারাপ কাজ করেন না। সবসময় সুকৃতি ও সত্যনিষ্ঠার শিক্ষা দিয়ে যান। অন্যকে যা কিছু বলেন নিজে তার ওপর আমল করে দেখিয়ে দেন। তিনি নিজে যা কিছু বলেন কাজের সময় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন এমনটি তাঁর জীবনে কোনো দিন দেখা যায়নি। তাঁর কথায় ও কাজে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নিহিত থাকে না। অন্যের ভালোর জন্যে তিনি নিজের ক্ষতি করেন এবং নিজের ভালোর জন্যে অন্যের ক্ষতি করেন না। তাঁর সমগ্র জীবন গঠিত হয় সত্যতা, ভদ্রতা, মানসিক পবিত্রতা, উন্নত চিন্তা ও উচ্চ পর্যায়ের মানবতার আদর্শে। দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও তাঁর মধ্যে কোন ত্রুটি দেখা যাবে না। এসব কিছু দেকে পরিস্কার চিনে নেয়া যায় যে, এ ব্যক্তি আল্লাহর সাচ্চা নবী।

নবীর আনুগত্য

কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর সত্য নভী হিসেবে জানার পর তাঁর কথা মানা, তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর পদ্ধতি অনুযায়ী জীবনযাপন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কোন ব্যক্তিকে নবী বরে স্বীকার করার পর তাঁর কথা না মানা সম্পূর্ণ বুদ্ধিবিরোধী কাজ। কারণ নবী বলে মেনে নেবার অর্থই হচ্ছে আমরা এ কথা স্বীকার করে নিলাম যে, তিনি যা কিছু বলছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলছেন এবং যা কিছু করছেন আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী করছেন। কাজে এখন আমরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কথা বা কাজ কখনও সত্য হতে পারে না। কাজেই কাউকে নবী বরে মেনে নেবার পর তাঁর কথা কথাকেও নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া এবং তাঁর নির্দেশ মাথা পেতে নেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ নির্দেশের মৌল তাৎপর্য ও সুফল আমাদের বোধগম্য হওয়া না হওয়ার প্রশ্নই এক্ষেত্রে অবাস্তর। নবীর পক্ষ থেকে যে কথা বলা হয় তা যে নবী কথিত এটিই তাঁর সত্য হওয়া তাঁর মধ্যে সব রকমের জ্ঞান-বিজ্ঞান, কল্যাণ ও সুফল নিহিত থাকার যথেষ্ট প্রমান্ যদি তাঁর কোনো কথার তাৎপর্য আমাদের বোধগম্য না হয় তাহলে এর অর্থ এ নয় যে সে কথার মধ্যে গলদ রয়ে গেছে, বরং এর অর্থ হচ্ছে আমাদের বুদ্ধি ও অনুধাবন শক্তির মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছে।

যে ব্যক্তি কোনো শিল্প-বিশেষজ্ঞ নয় সে ঐ শিল্পের সূক্ষ্মতম বিষয়গুলো  বুঝতে সক্ষম হবে না। কিন্তু শিল্প-বিশেষজ্ঞের কথা যদি সে কেবল এ জন্যে না মানে যে তা তার বোধগম্য হচ্ছে না, তাহলে এটা তার প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করার পর তার কাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা হয় এবং তার কাজে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হয় না। কাজেই সবাই সব কাজে বিশেষজ্ঞ হতে পারে না এবং দুনিয়ার সব বিষয় ও কাজ বুঝার ক্ষমতাও সবার নেই। কোনো ব্যক্তি শিল্প-বিশেষজ্ঞ কিনা কেবল এতটুকুই আমাদের দেখা উচিত এবং এ ব্যাপারে পূর্ণ-নিশ্চিন্ততা অর্জনের জন্যেই আমাদের বুদ্ধি-জ্ঞান ও সর্বপ্রকার সতর্কতা নিয়োজিত হতে হবে। তারপর যখন আমরা জেনে নেই যে, সে একজন ভাল শিল্প-বিশেষজ্ঞ তখন তার কাজের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা উচিত। অতপর তার কাজে হস্তক্ষেপ করা এবং প্রতি পদে পদে একথা বলা যে, প্রথমে আমাকে এটা বুঝিয়ে দাও, না হরে আমি মেনে নিতে প্রস্তুত নই –এটাকে বুদ্ধিমত্তা নয়, নিরেট নির্বুদ্ধিতা বলা যায়। কোনো উকিলের ওপর মামলার ভার দেবার পর তার সাথে এভাবে বিতর্ক করতে থাকলে সে যে এ ধরনের মক্কেলকে তার চেম্বার থেকে বের করে দেবে এতে সন্দেহ নেই। কোনো ডাক্তারের নিকট তার প্রত্যেকটি প্রেসক্রিপশনের কারণ ও যুক্তি জানতে চাইরে সে সংশ্লিষ্ট রোগীর চিকিৎসাই ছেড়ে দেবে। ধর্মের ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। আমাদের আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে। আল্লাহর ইচ্ছে অনুযায়ী জীবনযাপন করার পদ্ধতি কি তা আমরা জানতে চাই। এসব জানার মাধ্যম আমাদের কাছে নেই। কাজেই আল্লাহর সাচ্চা নবীর সন্ধান করা আমাদের কর্তব্য হয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে নবীর সন্ধান করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে। কারন এমন কোনো ব্যক্তিকে যদি আমরা নভী মেনে নেই যে আসলে নবী নয়, তাহলে সে আমাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করবে কিন্তু ভালভাবে যাঁচাই পর্যালোচনার পর যখন কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর সাচ্চা নবী বলে আমাদের প্রত্যয় জন্মাবে তখন তাঁর ওপর আমাদের পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে হবে এবং তাঁর প্রত্যেক নির্দেশ পালন করতে হবে।

নবীদের ওপর ঈমান আনার প্রয়োজন

যখন আমরা এ কথা জানতে পারি যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর নবী যে পথের সন্ধান দেন সেটিই একমাত্র সত্য ও সোজা পথ, তখন এ কথাও স্বতঃস্ফুর্তভাবে আমাদের বোধগম্য হয় যে, নবীর ওপর ঈমান আনা, তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা সকল মানুষের জন্য অপরিহার্য এবং যে ব্যক্তি নবীর পথ পরিহার করে নিজের বুদ্ধি-জ্ঞানের সাহায্যে কোনো পথ বের করবে সে নিশ্চয়ই পথভ্রষ্ট হবে।

এ ব্যাপারে লোকের মারাত্মক ধরনের ভুল করে থাকে। অনেক লোক নবীদের সত্যতা স্বীকার করে কিন্তু তাদের ওপর ঈমান আনে না এবং তাদের আনুগত্যও করে না। এরা কেবল কাফের নয়, নির্বোধও। যারা জেনে বুঝে মিথ্যার অনুসার হয় তাদের চেয়ে বড় নির্বোধ আর কে হতে পারে?

অনেকে বলে, আমাদের নবীর আনুগত্য করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাই নিজেদের বুদ্ধির সাহায্যে সত্যপথ জেনে নিতে পারি। এটাও একটা বিরাট ভুল। জ্যামিতি পাঠক মাত্রই জানে, এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দু পর্যন্ত সরল রেখা মাত্র একটি হতে পারে। এছাড়া যত রেখাই টানা হোক না কেন তা সবগুলোই হয় বক্ররেখা হবে আর নয়তো ঐ দ্বিতীয় বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছাবেই না। সত্যপথ যাকে ইসলামের পরিভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম (অর্থাৎ সোজা পথ) বলা হয় তার অবস্থাও অনুরূপ। এ পথ মানুষ থেকে শুরু হয়ে আল্লাহ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। জ্যামিতির উল্লেখিত সূত্র অনুসারে এ পথ একটিই হতে পারে। এ  একটি পথ ছাড়া বাকি যতগুলো পথ হবে তা হবে বক্র রেখা অথবা তা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবে না্ এখন একটু সোজা পথটির ওপর চিন্তা কর যাক। সোজা পথটি তো নবী বাতলে দিয়েছেন। এছাড়া দ্বিতীয় কোনো সিরাতুল মুস্তাকীম বা সোজা পথ হতেই পারে না। এ একমাত্র পথটি বাদ দিয়ে যে ব্যক্তি নিজেই কোনো পথের সন্ধান করবে সে অবশ্যি দু’টি অবস্থার মধ্যে যে কোন একটির সম্মুখীণ হবে। আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার কোনো পথই সে পাবে না অথবা পেলেও তা হবে অনেক বাঁকা পথ, যা সরল রেখা না হয়ে হবে বক্র রেখা। প্রথম অবস্থাটিতে তার ধ্বংস তো সুস্পষ্ট। আর দ্বিতীয় অবস্থাটিতে তার নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে কোনো প্রকার সংশয়ের অবকাশই থাকতে পারে না। একটি ইতর প্রাণীও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার সময় বাঁকা পথ ছেড়ে সোজা পথ ধরে। অথচ সৃষ্টির সেরা বুদ্ধিমান সুচতুর মানুষটির ব্যাপার সত্যিই দেকার মতো। আল্লাহর একজন সৎ বান্দাহ তাকে সোজা পথ দেখাচ্ছে আর সে বলে চলছেঃ না, তোমার দেখানো পথে আমি চলবই না, আমি বাঁকা পথগুলোতেই এগিয়ে যাব, এভাবে পথ ভুল করতে থাকব এবং আমার গন্তব্যের সন্ধান করে যেতে থাকব।

এটা এমন একটা কাজ সত্য কথা যা প্রথম দৃষ্টিতেই যে কোন ব্যক্তি বুঝতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে বুঝা যাবে যে, নবীর ওপর ঈমান আনতে অস্বীকার করে কোনো ব্যক্তি আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবার সোজা বা বাঁকা কোনো পথই পেতে পারে না। কারণ যে ব্যক্তি সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির কথা মেনে নিতে পারছে না তার মস্তিষ্কে এমন কোনো গলদ দেখা দিয়েছে যার ফলে সে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তার জ্ঞান-বুদ্ধির অভাব হতে পারে, তার মনে অহংকার বাসা বাঁধতে পারে, তার প্রকৃতিই এমন বক্র হতে পারে যার ফলে সৎ ও সত্যতার বাণী গ্রহণ করতে তার মন প্রস্তুত হয় না সে বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণের মদ্যে ডুবে থাকতে পারে ফলে আগে থেকেই রেওয়াজ হিসেবে যেসব কথা চলে আসছে সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কথা মানতে প্রস্তুত হয় না অথবা সে প্রবৃত্তির দাস হতে পারে এবং নবীর শিক্ষা মেনে নিতে এ জন্য অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারে যে, এরপরে অবৈধ ও পাক কাজ করার স্বাধীনতা সে হারিয়ে ফেলবে। এ কারণগুলোর মধ্যে থেকে যে কোন একটি কারণও যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যায় তাহলে তার পক্ষে আল্লাহর পথের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আর যদি কোনো একটি কারণও তার মধ্যে না থাকে তাহলে একজন সাচ্চা, সৎ ও নিষ্কলুষ ব্যক্তি একজন সাচ্চা নবীর শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে, এটা একেবারেই অসম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়ে থাকেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার ও তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশও আল্লাহ দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি নবীর প্রতি ঈমান আনে না সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। মানুষ যে সরকারের প্রজা সেই সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রমাসক নিযুক্ত হবে তাকে অবশ্য তার আনুগত্য করতে হবে। যদি সে ঐ ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে তাহলে এর অর্থ দাঁড়াবে সে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। সরকারকে মেনে নেয়া এবং তার নিযুক্ত প্রশাসককে না মানা –দু’টো কথা সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী। আল্লাহ ও তার প্রেরিত নবীর দৃষ্টান্তটিও অনুরূপ পর্যায়ের। আল্লাহ মানুষের আসল বাদশাহ। তিনি যে ব্যক্তিকে পাঠিয়েছেন মানুসকে পথ দেখার জন্য এবং তার আনুগত্য করার হুকুম দিয়েছেন তাঁকে নবী বলে স্বীকার করা এবং সবার আনুগত্য ত্যাগ করে একমাত্র তাঁর আনুগত্য করা প্রত্যেকটি মানুসের কর্তব্য। যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে সে অবশ্যি অস্বীকারকারী –কাফের। এ ক্ষেত্রে তার আল্লাহকে মেনে নেয়া বা না মানা সবই অর্থহীন।

এক নজরে নবুয়াতের ধারাবাহিকতার ইতিহাস

মানব জাতির মধ্যে কিভাবে নবীদের আগমন শুরু হল এবং কিভাবে উন্নতি করতে করতে শেষ নবী ও শ্রেষ্টতম নবীর ওপর এ ধারা শেষ হল, এবার আমরা সে আলোচনায় প্রবৃত্ত হব।

আল্লাহ সর্বপ্রথম একজন মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর সে মানুষটি থেকে জোড়া সৃষ্টি করেন। অতপর ঐ জোড়ার বংশধারা চালু করেন। শত শত হাজার হাজার বছর ধরে তা চলতে চলতে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে যত মানুষ জন্ম নিয়েছে সবাই ঐ প্রথম জোড়াটির সন্তান। সকল জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনা ধারা এক বাক্যে এ কথা ঘোষণা করে যে, একজন মানুষ থেকেই মানব জাতির বংশধারার সূচনা হয়। বিজ্ঞানের অনুসন্ধান থেকেও এ কথা প্রমাণ হয়নি যে, পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথক মানুষ তৈরী করা হয়েছিল। বরং অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক এ ধারণা পোষণ করেন যে, প্রথমে একজন মানুষই জন্মে থাকবে এবং দুনিযার যেখানেই যত মানুষ পাওয়া যায় সবাই ঐ একজন মানুষেরই সন্তান।

ঐ প্রথম মানুষটিকে আমাদের ভাষায় আদম (আ) বলা হয়। এ থেকেই ‘আদম সন্তান’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হয় মানুষ জাতি। আল্লাহ হযরত আদম (আ)-কে করেন প্রথম নবী। নিজের সন্তানদেরকে ইসলামের শিক্ষাদান করার জন্যে তাঁকে নির্দেশ দেন। অর্থাৎ তাদেরকে এ কথা জানাবার নির্দেশ দেনঃ তোমাদের ও সারা দুনিয়ার প্রভু হচ্ছেন এক আল্লাহ। তোমাদেরকে একমাত্র তাঁরই বন্দেগী করতে হবে। একমাত্র তাঁর সামনে মাথানত করবে। তাঁর কাছে সাহায্য চাইবে। তাঁরই ইচ্ছা অনুযায়ী দুনিয়ায় সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবন যাবন করবে। এভাবে চলরে তোমরা পরিণামে বিপুর পুরস্কার লাভ করবে। আর তাঁর আনুগত্য থেকে সরে আসরে ভয়াবহ শাস্তির অধিকারী হবে। হযরত আদম (আ)-এর সন্তানদের মধ্যে যারা ছিল ভাল ও সৎ তারা পিতার নির্দেশিত সোজা পথে চলতে থাকে কিন্তু যারা অসৎ ছির তারা এ পথ ত্যাগ করে। ধীরে ধীরে সব রকমের অন্যায় ও দুষ্কৃতি জন্ম নেয়। কেউ চাঁদ, সূর্য ও তারকার পূজা করতে থাকে। কেউ বৃক্ষ, পশু ও নদ-নদীর উপাসনায় মগ্ন হয়। আবার অনেকে মনে করতে থাকে বায়ু, পানি, অগ্নি, রোগ, সুস্থতা এবং প্রকৃতির অন্যান্য শক্তিগুলোর আল্লাহ পৃথক। কাজেই এদের প্রত্যেকটিকে পূজা করা উচিত। তাহরে সবার আল্লাহ খুশী হয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে। এ ধরনের মুর্খতার কারণে শিরক ও মূর্তিপূজার বিভিন্ন ধারার প্রচলন হয়, যার ফলে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ঘটে। এ সময় হযরত আদম (আ)-এর বংশধররা দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন বিভিন্ন জাতির উদ্ভব হয়েছিল। প্রত্যেক জাতি নিজের জন্যে একটা নতুন ধর্ম তৈর করে নিয়েছিল। প্রত্যেকের রসম-রেওয়াজ, রীতিনীতি আলাদা ছিল। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষ তার আদি পিতা হযরত আদম (আ) তাঁর সন্তানদেরকে যে বিধি-বিধান শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তাও ভুলে যায়। লোকেরা নিজেদের প্রবৃত্তির আনুগত্য শুরু করে দেয়। সব রকমের খারাপ রীতিনীতির প্রচলন শুরু হয়ে যায়। সব ধরনের অজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তার প্রসার ঘটে। ভাল ও মন্দের পার্থক্য করার ব্যাপারে মানুষ ভুল করতে থাকে। অনেক খারাপ জিনিসকে ভাল মনে করে নেয়া হয় এবং অনেক ভাল জিনিসকে খারাপ মনে করে নেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটি নবুয়াতের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বর্ণনা করেঃ

(আরবী*********************************পিডিএফ ৪৯ পৃষ্ঠায়)

“শুরুতে সব মানুষ একই পথে চলছিল। (তারপর এ অবস্থা অব্যাহত থাকল না এবং মতবিরোধ দেখা দিল) অতপর আল্লাহ নবী পাঠালেন। তাঁরা ছিলেন (সত্য-সোজা পথ অবলম্বনকারীদের জন্যে) সুসংবাদদানকারী এবং (বক্র-ভুল পথ অবলম্বনের পরিণাম সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শনকার। তাঁদের সাথে নাযিল করেন সত্য গ্রন্থ। যাতে সত্যের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল সে সম্পর্কে ফায়সালা করা যায়। আর এ মতবিরোধ দেখা দেবার কারণ এটা নয় যে, শুরুতে তাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছিল। তারা সুস্পষ্ট হেদায়াত লাভের পর নিছক এক কারণে সত্যকে ছেড়ে বিভিন্ন পথে পা বাড়িয়েছিল যে তারা নিজেদের মধ্যে যুলুম ও বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিল।–[“শুরুতে সব মানুষ একই পথে চলছিলো” এরপর মতবিরোধের উল্লেখ উহ্য রয়ে গেছে। আয়াতের শেষে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে ] –(সূরা আল বাকারাঃ ২১৩)।

অজ্ঞ লোকেরা নিজেদের ধারণা ও কল্পনার ভিত্তিতে ‘ধর্মের’ ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেন, শিরকের অন্ধকারময় আবর্তে মানুষের ধর্মীয় জবিনের সূত্রপাত হয় অতপর ধারাবাহিক বিবর্তনের মাধ্যমে এ অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং আলোর রেখা উজ্জ্বল হতে থাকে। এভাবে অবশেষে মানুষ তাওহীদ বা এক আল্লাহর ধারণায় উপনীত হয়। কুরআন এর সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য পরিবেশন করে বলছে, দুনিয়ার পরিপূর্ণ আলোকে মানুষের দীর্ঘদিন পর্যন্ত আদমের বংশধররা সত্য-সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং একই দলভুক্ত থাকে। অতপর লোকেরা নতুন নতুন পথ বের করতে থাকে এবং বিভিন্ন পদ্ধতির উদ্ভাবন করে। তাদেরকে সত্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি বলে তারা এমনটি করেছিল তা নয়্ বরং এর কারণ ছিল এই যে, সত্য জানা সত্ত্বেও অনেক লোক নিজের বৈধ অধিকারের চেয়ে বেশী লাভ ও সুবিধা আদায় করতে চাচ্ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে যুলুম, নিপীড়ন ও বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে আগ্রহশীল ছিল। এ ত্রুটিগুলো দূর করার জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী পাঠাতে শুরু করলেন। এ নবীগণ প্রত্যেকে নিজেদের নামে এক একটি নতুন ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং এক একটি উম্মত গড়ে তুলবেন –এ জন্যে তাদেরকে পাঠানো হয়নি। বরং তাঁদেরকে পাঠাবার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তাঁরা মানুষের সামনে এ হারিয়ে যাওয়া সত্য পথটি আবার সুস্পষ্ট করে তুলে ধরবেন, তাদেরকে পুনর্বার একটি উম্মতে পরিণত করবেন।

নবীদের কাজ

নবীগণ প্রত্যেকেই তাঁদের নিজেদের জাতিকে ভুলে যাওয়া পাঠ স্মরণ করিয়ে দেন। তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদাত করার শিক্ষা দান করেন। শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে তাদেরকে দূরে রাখেন। তাদের জাহেলী ও অজ্ঞতাপূর্ণ রসম ও রীতি-রেওয়াজগুলো রহিত করেন। আল্লহার ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনযাপন করার পদ্ধতি শেখান এবং নির্ভুল ও সঠিক আইনের প্রচলন করে তা মেনে চলার নির্দেশ দেন। বাংলা-পাক-ভারত, চীন, ইরাক, ইরান, মিসর, আফ্রিকা, ইউরোপ তথা দুনিয়ার এমন কোন দেশ নেই যেখানে আল্লাপর পক্ষ থেকে কোন সত্র নবী আসেননি। তাঁদের সবার ধর্ম ছিল এক। আমাদের নিজেদের ভাষায় এ ধর্মকে আমরা ‘ইসলাম’ বরে থাকি।–[সাধারণত লোকেরা এ ভুল ধারণা পোষণ করে যে, ইসলামের সূচনা হয়েছে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে, এমনকি তাঁকে ইসলাম প্রবর্তক পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে। আসলে এটা একটা বড় রকমের ভুল ধারণা। মনের পাতা থেকে এ ধারনা একেবারেই মুছে ফেলতে হবে। একথা ভালোভাবে জেনে নেয়া উচিত যে, ইসলামই হচ্ছে সর্বকারে সর্ব দেশে মানবজাতির একমাত্র ও আসল ধর্ম এবং দুনিয়ার যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে যত নবী এসেছেন সবাই এ ধর্মটিরই বার্তা বহন করে এসেছেন।–(গ্রন্থকার)] তবে প্রত্রেকের শিক্ষা পদ্ধতি ও জীবন যাপনের আইন-কানুন কিছুটা বিভিন্ন ছিল। প্রত্যেক জাতির মধ্যে যেসব মূর্খতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অনাচার ছড়িয়ে পড়েছিল সেুগলো খতম করার ওপর জোর দেয়া হয়। যেসব ভ্রান্ত চিন্তাদারার প্রচলন চির সেগুলো সংশোধনের প্রতি বেশী নজর দেয়া হয়। সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে জাতিরা যখন প্রথমিক পর্যায়ে ছিল তখন তাদেরকে সহজ সরল শিক্ষা ও শরীয়ত দান করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে যেমন তারা উন্নতির পথে এগিয়ে গেছে তেমনি শিক্ষা ও শরয়িতকেও ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর করা হয়েছে। কিন্তু এ বিরোধ ছিল কেবলমাত্র বাহ্যিক চেহারা-আকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আত্মা ও প্রাণ ছিল সবার এক। অর্থাৎ সবার আকীদা-বিশ্বাস ছিল তাওহীদ নির্ভর এবং আমল বা কর্ম ছিল সততা, সুকৃতি, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আখেরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের ওপর প্রত্যয় নির্ভর।

নবীদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হয়

নবীদের সাথে লোকেরা অদ্ভুত ব্যবহার করে। প্রথমে তাঁদেরকে দৈহিক কষ্ট দেয়া হয়। তাদের সদুপদেশ মানতে অস্বীকার করা হয়। অনেককে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয় অনেককে হত্যা করা হয়। অনেকে সারা জীবন ধরে শিক্ষা ও উপদেশ দানের পর মাত্র পাঁচ দশজন লোককে সত্য ধর্মের অনুসারী করতে সক্ষম হন। কিন্তু আল্লাহর এ প্রিয় বান্দাগণ নিরলস পরিশ্রম করে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। এমনকি এক সময় তাঁদের শিক্ষা প্রভাব বিস্তার করে। অনেক বড় বড় জাতি তাঁদের অনুসারী হয়। অতপর মানুষের পথভ্রষ্টতা নতুন রূপ ধারণ করে। নবীদের ইন্তেকালের পর তাঁদের উম্মতরা তাঁদের শিক্ষার মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে। আল্লাহর নিকট থেকে তাঁরা যে গ্রন্থগুলো আনেন উম্মতরা তার মধ্যে সব রকমের চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটায়। ইবাদতের নতুন নতুন পথ উদ্ভাবন করে। অনেকে নিজেরাই নিজেদের নবীর পূজা শুরু করে। অনেকে নিজেদের নবীদেরকে আল্লাহর অবতার (অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই মানুষের বেশ ধরে নেমে এসেছেন) গণ্য করে। অনেকে নিজেদের নবীকে আল্লাহর পুত্র আখ্যা দেয়। অনেকে তাদের নকীকে আল্লাহর কর্তৃত্বের ও সার্বভৌমত্বে অংশীদার বলে ঘোষণা করে। এভাবে বিভিন্ন পন্থায় মানুষের অদ্ভুত ও বিকলাঙ্গ মানসিকতার প্রকাশ ঘটতে থাকে। যাঁরা মূর্তি ভাংতে এসেছিলেন এবং মূর্তি ভেংগেছিলেন তাঁদের মূর্তি গড়ে মানুষ পূজা করতে থাকে। তারপর এ নবীগণ তাঁদের উম্মতদেরকে যে শরীয়াত দিয়ে গিয়েছিরেন তাকেও বিভিন্ন প্রকারে বিকৃত করা হয়। সব রকমের জাহেলী রীতিনীতি, মুখরোচক গল্প ও মিথ্যা বর্ণনা তার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। তার মধ্যে কি কি বিষয় মিশ্রিত করেছে-[নবীদের উম্মতরা এভাবেই নিজেদের আসল ধর্মকে (অর্থাৎ ইসলাম) বিকৃত করে নতুন নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটায়। দুনিয়ার বুকে বিভিন্ন নামে আজ এগুলোরই অস্তিত্ব বিরাজিত। যেমন হযরত ঈসা (আ) যে ধর্মের শিক্ষা দিয়েছিলেন তা আসলে ইসলাম ছিল কিন্তু তাঁর অনুসারীরা নিজেরাই হযরত ঈসাকে খোদা বানিয়ে নিয়েছে এবং তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা ও শরীয়াতের সাথে নিজেদের মনগড়া অনেক কথা মিশিয়ে দিয়ে এক নতুন ধর্ম তৈরী করেছে, যা আজ খৃষ্ট ধর্ম নামে দুনিয়ায় পরিচিত।–(গ্রন্থকার)] তা জানার কোনো উপায়ই থাকেনি। নবীদের জীবনের অবস্থাও লোকদের বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে এমনভাবে হারিয়ে গেছে যে, তাদের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কিছুই পাওয়া যায় না।

তবুও নবীদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। সব রকমের মিশ্রণ সত্ত্বেও প্রত্যেক জাতির মদ্রে কিছু না কিছু সত্য রয়ে গেছে। আল্লাহর চিন্তা ও আখেরাতের জীবনের চিন্তা প্রত্যেক জাতির মধ্যে কোনো না কোনো পযৃায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সৎবৃত্তি, সততা, ন্যায় ও নৈতিকতা কতিপয় মূলনীতি সাধারণভাবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সমস্ত জাতি ও গোত্রের নবীগণ আলাদা আরাদাভাবে নিজেদের জাতিদেরকে এমনভাবে তৈরী করে গেছেন যার ফরে সারা দুনিয়ার বর্ণ-গোত্র-জাতি নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বমানবতার উপযোগী একটি বিশ্ব-ধর্মের শিক্ষা বিস্তার করা সম্ভবপর হয়।

নবীদের দাওয়াত ও মর্যাদা

কুরআন অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, একের পর এক নবী আসছেন এবং তাঁদের জাতিদেরকে সবাই একই দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেনঃ

(আরবী*********************************পিডিএফ ৫২ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার জাতির লোকেরা, আল্লাহর বন্দগী করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই”।

ব্যবিলনে অথবা সাদুমে, মাদায়েনে অথবা হিজার এলাকায়, নীল নদ উপত্যকায় বা দুনিয়ার যে কোন দেশে, খৃষ্টপূর্ব চল্লিম শতক থেকে দশ শতকে বা তার পরে দুনিয়ার দাস, স্বাধীন, অনুন্নত বা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে উন্নতির উচ্চ শিখরে উন্নীত জাতিদের মধ্যে যখনই যেখানেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নবী এসেছেন তিনি মানুষকে একই দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁদের সবার দাওয়াত ছিলঃ আল্লাহর বন্দেগী করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ (যথার্থ মাবুদ বা খোদা) নেই। হযরত ইবরাহীম (আ) নিজের জাতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, যতক্ষণ তোমরা এ মূলনীতিকে স্বীকৃতি না দেবে ততক্ষণ তোমাদের ও আামর মধ্যে কোনো প্রকার সহযোগিতা সম্ভবপর নয়।

(আরবী*********************************পিডিএফ ৫২ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ যে পর্যন্ত তোমরা এক আল্লাহর ওপর ঈমান না আন সে পর্যন্ত তোমাদের ও আমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ চলতে থাকবে এবং হযরত মূসা (আ) ফেরাউনের নিকট গিয়ে (আরবী******) (বনি ইসরাইলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও)-এ দাবী পেশ করার পূর্বে ঘোষণা করেন (আরবী*******) (আমি বিশ্বজগতের প্রভুম নিকট থেকে প্রেরিত) এবং (আরবী********) (মূসা বলেন তুমি কি পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির জন্যে প্রস্তুত এবং আমি কি তোমাকে তোমার প্রভুর পথ দেখাবো যাতে করে তুমি তাঁকে ভয় কর?) এর দাওয়াত দেন এবং তাকে জানিয়ে দেন যে, তুমি রব ও প্রভু নও বরং যিতি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সবাইকে জীবন যাপনের পদ্ধীত শিখিয়েছেন তিনিই রব এবং প্রভু। (আরবী********) (তিনিই আমাদের রব ও প্রভু যিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে আকৃতি দান করেছেন অতপর তার চলার পথ নির্ধারণ করেছেন।)-[অর্থাৎ হযরত মূসা (আ) ও হযরত হারুন (আ) একই দায়িত্ব পালন করেন, যা পালন করেন হযরত নূহ (আ) থেকে নিয়ে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) পর্যন্ত অন্যান্য নবীগণ। আর এ দায়িত্ব ছিল লোকদেরকে একথা জানানো ও বুঝানো যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুর আলামীনকে নিজেদের রব ও প্রভু বলে স্বীকার করো এবং এ জীবনের পরে যে জীবন আসছে সেখানে তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজেদের যুগের নবীগণ প্রদত্ত তাওহীদ ও আখেরাতে বিশ্বাসের দাওয়াত গ্রহণ এবং তারই ভিত্তিতে নিজের জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরই নির্ভরশীল।–(গ্রন্থকার)] হযরত ঈসা (আ)-এর জাতি রোমানদের শাসনাধীনে পরাধীন জীবনযাপন করছিল। কিন্তু তিনি বনি ইসরাইল ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন জাতিকে রোমান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার আমন্ত্রণ জানাননি। বরং তিনি লোকদেরকে দাওয়াত দেন যে, (আরবী***********) (বস্তুত আল্লাহ আমার ও তোমাদের রব। কাজেই তাঁর ইবাদান করো, এটিো সোজা-সরল পথ)। বলাবাহুল্য কুরআনে বর্ণিত এ ঘটনাবলী অন্য কোনো জগতের নয় বরং যে পৃথিবীতে আমাদের বাস সেই মাটির পৃথিবীরই ঘটনা এবং আমাদের ন্যায় রক্ত-মাংসের মানুষদের সাথে এ ঘটনা সম্পর্কিত। এ কথা বলার এখানে কোনো সুযোগই নেই যে –যেসব দেশে ও যেসব জাতির মধ্যে নবীদের আগমন হয়েছিল তাদের কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা ছিল না এবং এ সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে তাদেরকে আকৃষ্ট করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যখন ইসলামী আন্দোলনের প্রত্যেকটি নেতা, প্রত্যেক দেশে ও প্রত্যেক যুগে সর্বপ্রকার সামকি ও স্থানীয় সমস্যা উপেক্ষা করে একটি মাত্র সমস্যাকে সামনে রেখেছেন এবং এরি পেছনে নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছেন, তখন আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, তাঁদের নিকট এটিই ছিল সমস্ত সমস্যার মূল এবং এ সমস্যাটির সমাধানের ওপর তাঁরা জীবনের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সমাধান নির্ভরশীল বলে মনে করতেন।

হযরত ঈসা (আ) বনি ইসরাইলকে সম্বোধন করে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্যে এভাবে বর্ণনা করেনঃ

(আরবী*********************************পিডিএফ ৫৩ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদরে ওপর কিচু জিনিস হারাম করে দেয়া হয়েছে সেগুলোকে হালাল করে দেয়ার জন্যে আমি এসেছি। দেখ, তোমাদের রবের নিকট থেকে আমি তোমাদের জন্যে নিদর্শন নিয়ে এসেছি। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ আমর রব এবং তোমাদেরও রব। কাজেই তোমরা তাঁর বন্দেগী করো, এটিই সোজা-সরল পথ”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৫০-৫১)

এ থেকে জানা গেল অন্যান্য সকল নবীর ন্যায হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের মূল বক্তব্যও ছিল তিনটি বিষয়।–[হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। কারণ, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্বে তিনি ছিলেন শেষ নবী এবং তাঁর বাণী, বক্তব্য ও দাওয়াতকে পুরোপুরি বিকৃত করা হয়েছে।–(সংকলক)]

একঃ সার্বভৌমত্ব যা একমাত্র আল্লাহর জন্যে স্বীকৃত। এ জন্যে বন্দেগী তাঁর জন্যে নিবেদিত এবং তাঁরই আনুগত্যের ভিত্তিতে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সমগ্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

দুইঃ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকের প্রতিনিধি হিসেবে নবীর আদেশ মেনে চলতে হবে।

তিনঃ মানুষের জীবনে হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধের সীমারেখা একমাত্র আল্লাহর আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে অন্যদের প্রতিষ্ঠিত আইন বাতিল করা হবে।–[সূরা আলে ইমরানের ৫১ নং আয়াত দ্রষ্টব্যঃ (আরবী******** ৫৪ পৃষ্ঠার টীকায়)]

আসলে হযরত ঈসা (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত মুহাম্মদ (সা) ও অন্যান্য নবীগণের দাওয়াতের মধ্যে তিলাগ্র পার্থক্য নেই। যারা বিভিন্ন নবীর মিশন বিভিন্ন বলে মনে করেছেন এবং উদ্দেশ্য ও প্রকৃতির দিক দিয়ে তাঁদের মিশনের মধ্যে পার্থক্য করেছেন তাঁরা মারাত্মক ভুল করেছেন। সমগ্র সৃষ্টিজগতের সর্বশয় কর্তার নিয়োগপত্র নিয়ে তাঁর প্রজাগনের নিকট যিনিই আসবেন তাঁর আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে, তিনি প্রজাদেরকে নাফরমানি ও স্বায়ত্ব শাসন পরিচারনা করা থেকে বিরত রাখবেন, তাঁর সাথে কাউকে শরকি করতে (অর্থাৎ সার্বভৌম শাসন ক্ষমতার ব্যাপারে কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকের সাথে অংশীদার করা এবং নিজের আনুগত্য ও ইবাদাত-বন্দেগীকেও উভয়ের জন্যে বন্টন করে দেয়া) নিসেধ করবেন এবং একমাত্র আসল প্রবুর বন্দেগী; আনুগত্য, পূজা, উপাসনা ও নির্দেশ মেনে চলার দাওয়াত দেবেন।

কুরআন মজীদে নবীদের আগমনের উদ্দেশ্যকে অন্যভাবেও বর্ণনা করা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৪ পৃষ্ঠায়)

“এ রসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল এ জন্যে যে, তাঁদেরকে পাঠাবার পর লোকদের নিকট আল্লাহর মোকাবিলায় কোনো কিছু বলার না থাকে।–(সূরা আন নিসাঃ ১৬৫)

অর্থাৎ এসব রসূলদেরকে পাঠাবার একটিই মাত্র উদ্দেশ্য ছিল। সেটি ছিল এই যে, আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির সামনে তাঁর যুক্তি-প্রমাণকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে চাচ্ছিলেন, যাতে শেষ বিচারের দিনে কোনো পথভ্রষ্ট অপরাধী এ কথা বলার সুযোগ না পায় যে, আমরা অনবহিত ছিলাম এবং আপনি আমাদেরকে সত্য ও আসল ব্যাপার সম্পর্কে অবহিত করার কোনো ব্যবস্থা করেননি। এ উদ্দেম্যে আল্লাহ দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এ নবীগণ বিপুর সংখ্যক মানুসের নিকট সত্য জ্ঞান পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পরও মানুষের জন্যে আসমানী গ্রন্তসমূহ রেখে গেছেন। এ গ্রন্থগুরোর মধ্য থেকে প্রতিযুগে মানুষের সত্য-সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্যে কোনো না কোনো গ্রন্থ অবশ্যি দুনিয়ার বুকে রয়ে গেছে। কাজেই এরপরও কোনো ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়ে থাকরে সেজন্যে আল্লাহ ও তাঁর নবীগণ অভিযুক্ত হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই অভিযুক্ত হবে। কারণ তার নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছেছিল কিন্তু সে তা গ্রহণ করেনি। অথবা সেসব লোক এ জন্যে অভিযুক্ত হবে যারা সত্য-সঠিক পথ জানতো কিন্তু আল্লাহর বান্দাদেরকে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত দেখেও তারা তাদেরকে সত্য-সঠিক পথের সন্ধান দেয়নি।

নবী ও রসূলগণ সত্যের আহবায়ক হওয়ার সাথে সাথে আনুগত্য লাভের অধিকারীও হন। যেমন কুরআনে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৫ পৃষ্ঠায়)

“আমি যে রসূলই পাঠিয়েছি তা এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে তাঁর আনুগত্য করতে হবে”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬৪)

অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল এ জন্যে আসেন না যে, কেবল তাঁর রিসালাতের ওপর ঈমান আনতে হবে অতপর ইচ্ছামতো অন্য কারো আনুগত্য করলে চলবে। বরং রসূল আসার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই যে, জীবন যাপনের জন্যে যে বিধান তিনি আনেন, দুনিয়ার যাবতীয় বিধান ত্যাগ করে একমাত্র সেই বিধানেরই আনুগত্য করতে হবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যেসব নির্দেশ দেন দুনিয়ার সমস্ত নির্দেশ ত্যাগ করে একমাত্র সেগুলোই কার্যকর করতে হবে। যে ব্যক্তি এভাবে রসূলের আনুগত্য করে না তার রসূলকে নিছক রসূল মেনে নেয়ার কোন অর্থ নেই।

দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালানোও নবীগনের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৫ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ নিজের রসূলকে হেদায়াত ও সত্যদ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, অন্য সমস্ত দ্বীনের ওপর তাকে বিজয়ী করার জন্যে”।–(সূরা আত তাওবাঃ ৩৩)

মূল আয়াতে ‘আদ-দ্বীন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অনুবাদে আমি লিখেছি ‘সমস্ত দ্বীন’। আসলে দ্বীন শব্দটিকে আরবী ভাষায় এমন জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রতিষ্টাকারীকে সনদ ও অণুসরণযোগ্য বরে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করা হয়। কাজেই এ আয়াতে রসূল আগমনের যে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, তিনি আাল্লাহর পক্ষ থেকে যে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন এনেছেন দুনিয়ার অন্যান্য সমস্ত দ্বীন তথা পদ্ধতি ও ব্যবস্থার ওপর তাকে বিজয়ী করতে হবে। অন্য কথায় বলা যায়, রসূলকে কখনো এ উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় না যে, তিনি যে জীবন ব্যবস্থা নিয়ে আসেন তা অন্য কোন জীবন ব্যবস্থায় অধীন ও তার নিকট বিজিত হয়ে তার প্রদত্ত সুযোগসুবিধার মধ্যে মাথা গুঁজে ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটাবেন। বরং তিনি আসেন পৃথিবী ও আকাশের বাদশাহের প্রতিনিধি হয়ে। তিনি নিজের বাদশাহের সত্য ব্যবস্থাকে বিজয়ী দেখতে চান। দুনিয়ায় যদি অন্য কোন জীবন ব্যবস্থার প্রচলন থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যি আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থার অধীনে তার দেয়া সুযোগ-সুবিধা ক’টি নিয়ে মাথা গুঁজে থাকতে হবে, যেমন হয় জিজিয়া আদায় করার ক্ষেত্রে যিম্মীদের জীবন ব্যবস্থার অবস্থা।

বিপর্যয় দূর করাই নবীদের কাজ

মানুষ যখন আল্লাহর আনুগত্য পরিহার করে নিজের নফসের বা অন্যদের আনুগত্য শুরু করে এবং আল্লাহর হেদায়েত ও পথনির্দেম অমান্য করে অন্যের মনগড়া নীতি, আইন ও বিধানের ভিত্তিতে নিজের নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কাঠামো তৈরী করে তখন দুনিয়ার বুকে আসল বিপর্যয় দেখা দেয়, যার ফলে বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতির সৃষ্টি হয়। এ বিপর্যয় রোধ ও ত্রুটি-বিচ্যুতির সংশোধনই কুরআনের উদ্দেশ্য। এ সংগে কুরআন এ সত্যটিরও দ্বারোদঘাটন করে যে, বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিপর্যয় আসল নয় এবং সততা, সৎবৃত্তি ও সৎকর্মশীলতাই হচ্ছে আসল এবং নিছক মানুষের মূর্খতা, অজ্ঞতা ও বাড়াবাড়ির কারণে বিপর্যয় সাময়িকভাবে তার ওপর চেপে বসে। অন্যকথায বলা যায়, দুনিয়ার মানুষের জীবন মূর্খতা, অজ্ঞতা, বর্বরতা, শির্ক, বিদ্রোহ ও নৈতিক অরাজকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি এবং এগুলো দূর করার জন্যে পরে পর্যায়ক্রমে সংশোধনের কাজ শুরু হয়নি। বরং প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন শুরু হয় সততা ও সৎকর্মশীলতার মাধ্যমে এবং পরবর্তীকালে অসৎ লোকেরা নিজেদের নির্বুদ্দিতা ও দুষ্কর্মের মাধ্যমে এই পবিত্র ব্যবস্থাটিকে পংকিল ও আবিলতাময় করতে থাকে। এই বিপর্যয় দূর করে মানুসের জীবন ব্যবস্থাকে নতুন করে সংশোধন করে দেয়ার জন্যে আল্লাহ যুগে যুগে নবীদেরকে পাঠাতে থাকেন। নবীগণ প্রতি যুগে মানুষকে এই একই দাওয়াত দিয়ে এসেছেন যে, যে সততা, সৎবৃত্তি ও সৎকর্মশীলতার ওপর বিশ্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে তার মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে বিরত-[এ ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভংগী বিবর্তনবাদীদের দৃষ্টিভংগী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিবর্তনবাদীরা একটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তাধারার ভিত্তিতে এ মতবাদের জন্ম দিয়েছে যে, মানুষ অন্ধকার থেকে বের হয়ে পর্যায়ক্রমে আলোকের দিকে এসেছে। তার জীবনের শুরুতে ছিল বিকৃতি ও বাঙন। তারপর ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে তা সুগঠিত হতে যাচ্ছে। বিপরীত পক্ষে কুরআন বলছে, আল্লাহ পূর্ণ আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে ছিলেন এবং একটি কল্যাণময় ব্যবস্থার মাধ্যমে তার জীবনের সূচনা করেছিলেন। অতপর মানুষ নিজেই শয়তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর বার বার অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং এ কল্যাণময় ব্যবস্থাকে বার বার বিকৃত করেছে। মানুষকে এ অন্ধকার থেকে আলোকের পথে আনার এবং বিকৃতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার দাওয়াত দেয়ার জন্যে আল্লাহ যুগে যুগে তাঁর নবীগণকে পাঠিয়েছেন।] থাক।

নবুয়াতের দাবীর মধ্যে একথা প্রচ্ছন্ন রয়ে গেছে যে, নভী মানুষের সমগ্র জীবন ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তিত করে দিতে চান। নিসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত। কোনো ব্যক্তি যখন নিজেকে বিশ্বজগতের প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে পেশ করেন তখন এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে এ কথা স্বীকৃত হয় যে, তিনি মানুষের নিকট নিজের জন্যে পরিপূর্ণ আনুগত্যের দাবী করেন। কারণ বিশ্বজগতের প্রভুর প্রতিনিধি কখনো অন্য কারো অধীন প্রজা ও তার অনুগত হয়ে থাকার জন্যে আসেন না। বরং তিনি আসেন সবাইকে অনুগত করার ও তাদের শাসক ও রক্ষণা-বেক্ষণকারী হবার জন্যে। এক্ষেত্রে কোন কাফেরের শাসন কর্তৃত্বের মর্যাদা স্বীকার করে নেয়া তাঁর রিসালাতের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

রসূল পাঠাবার উদ্দেশ্য

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৬ পৃষ্ঠায়)

“(আর এটা আমি এ জন্যে করেছি যে,) এমন যেন না নয় যে, তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের ফলে যখন তাদের ওপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তারা একথা বলতে না পারেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট কোন রসূল পাঠাওনি কেন? (রসূল পাঠালে) আমরা তোমার আয়াতের অনুসারী হতাম এবং ঈমানদারদের অন্তুর্ভুক্ত হতাম”।–(সূরা আল কাসাসঃ ৪৭)

কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ কথাটিকেই রসূল প্রেরণের কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনের এ বর্ণনার প্রেক্ষিতে যদি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, এ উদ্দেম্রে সবসময় সকল স্থানেই একজন রসূল আসা উচিত, তাহরে ভুল করা হবে। কারণ যতদিন দুনিয়ায় কোনো রসূলের বাণী অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে এবং সাধারণ মানুষের নিকট তা পৌঁছুবার মাধ্যমও বিদ্যমান থাকে ততদিন কোনো নতুন রসূলের প্রয়োজন থাকে না। তবে যদি আগের বাণীর মধ্যে কোনো প্রকার বৃদ্ধি বা কোনো নতুন বাণী পাঠাবার প্রয়োজন হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে নতুন রসুলের আগমন ঘটে। কোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতা হারিয়ে বসে তাহলে সেখানে লোকদের পক্ষে অবশ্যি এ ধরনের ওজর পেশ করার সুযোগ আসে যে, তাদের জন্যে হক ও বাতিলের মদ্যে পার্থক্য অবগত করাবার এবং সঠিক পথ বাতলে দেবার কোনো ব্যবস্থা আদৌ ছিল না, এ অবস্থায সত্য-সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া তাদের পক্ষে কেমন করে সম্ভবপর ছিল? এ ওজর দূর করার জন্যে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালা নবী পাঠিয়ে থাকেন। ফলে এর পরে যে ব্যক্তি ভুল পথ অবলম্বন করবে তার ভুলের জন্যে তাকেই দায়ী করা সম্ভব হবে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল এ জন্যে আসেন না যে, কেবল তাঁর রিসালাতের ওপর ঈমান আনতে হবে অতপর নিজের ইচ্ছামত অন্য কারো আনুগত্য করলে চলবে। বরং রসূল আসার উদ্দেশ্যই এ হয়ে থাকে (যেমন ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে) যে, জীবনযাপনের জন্যে যে বিধান তিনি নিয়ে আসেন অন্য সমস্ত জীবনবিধান ত্যাগ করে একমাত্র সেই জীবনবিধান অবলম্বন করতে হবে এবং রসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ দান করেন অন্য সব নির্দেশ উপেক্ষা করে একমাত্র সেই নির্দেশ পালন করতে হবে। রসূলকেই মেনে নেবার পর কোনো ব্যক্তি যদি এ কাজ না করে তাহলে তার রসূলকে মানাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ফায়সালার সময়ের পূর্বে রসূলদের আগমন

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৭ পৃষ্ঠায়)

“রসূলদেরকে আমি সুসংবাদ দান ও সতর্ক করার কার্য সম্পাদন করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পাঠাই না কিন্তু কাফেরদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা বাতিলের অস্ত্র নিয়ে হককে বিজিত দেখাবার চেষ্টা করে এবং তারা আমার আয়াতগুলো এবং তাদেরকে যেসব বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে সেগুলোকে বিদ্রুপ করে”। -(সূরা কাহাফঃ ৫৬)

অর্থাৎ ফায়সারার সময় আসার পূর্বে লোকদেরকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ভাল ও অমান্য করার মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়ার জন্যেই আমি রসূল পাঠাই।

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৮ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর নিকট ইসলামই একমাত্র দ্বীন। যাদেরকে কিতাব দান করা হয়েছিল তাদের পক্ষে এই দ্বীনকে বাদ দিয়ে অন্যান্য পথ অবলম্বন করার এ ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না যে, তাদের নিকট জ্ঞাস এসে যাবার পর তারা পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করার জন্যে এমনটি করেছিল”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৯)

এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ার যেখানে যখনই কোনো রসূল এসেছেন তিনি দ্বীন ইসলামের বাণী বহন করে এনেছেন এবং দুনিয়ার কোনো জাতির মধ্যে ভাষায় যখনই কোনো কিতাব নাযিল হয়েছে তা ইসলামেরই শিক্ষা দান করেছে। এ আসল দ্বীনকে বিকৃত করে এবং এর মধ্যে হ্রাস-বৃদ্ধি করে মানব জাতির মধ্যে যে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে তার কারণ এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, লোকেরা নিজেদের বৈধ অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে আরো অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থ লাভ করতে চাচ্ছিল। এ জন্যে তারা নিজেদের খেয়াল খুশীমত আসল দ্বীনের আকীদা-বিশ্বাস মূলনীতি ও বিধানের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে।

নবীগণ একই দ্বনের পতাকাবাহী

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৮ পৃষ্ঠায়)

“আর তারা নিজেদের মধ্যে নিজেদের দ্বীনকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল, তাদের সবাইকে পিরে আসতে হবে আমার দিকে”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৯৩)

দুনিয়ায় যত নবীর আগমন ঘটেছে সবাই ছিরেন এই দ্বীনের পতাকাবাহী। সেই আসল দ্বীনটির মর্মকথা ছিল, মানুষের রব ও প্রতিপালক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ এবং একমাত্র তারই উপাসনা ও বন্দেগী করা উচিত। পরবর্তীকালে যতগুলো ধর্মের উদ্ভব হয় সবই ঐ আসল দ্বীনটির বিকৃত রূপ। কেউ তার থেকে একটি কথা নিয়েছে, কেউ অন্য একটি কথা নিয়েছে। কেউ তার একটি বিষয় উঠিয়ে নিয়েছে।, কেউ অন্য একটি বিষয়। তারপর তার সাথে নিজেদের পক্ষ থেকে অনেক কিছুই মিশিয়ে দিয়েছে। এভাবে অসংখ্য নবীগণই তাদরকে শতধা বিভক্ত করেছেন, তাহলে একে একটি নির্জলা মিথ্যাই বলা যেতে পারে। কেবলমাত্র এ ধর্মগুলোর বিভিন্ন চেহারা এবং বিভিন্ন যুগে ও দেশে এদেরে বিভিন্ন নবীর সাথে সংশ্লিষ্ট থকা একথা প্রমাণ করে না যে, ধর্মগুলোর এ বিভিন্নতা নবীদের সৃষ্ট। এক আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কোন প্রভুর বন্দেগী করা শিক্ষা দিতে পারেন না।

নবুয়াত লাভের পূর্বে নবীগনের চিন্তাধারা

কুরআন মজীদ থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী অবতরণের পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞান রাখতেন তা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের তুলনায় কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন হতো না। অহী অবতরণের পূর্বে তাঁদের নিকট জ্ঞানের এমন কোনো মাধ্যম ছিল না যা অন্যদের নিকট ছিল না। তাই কুরআন বলে, (আরবী*******) “তুমি জানতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি”। (আশশুরাঃ ৫২) (আরবী*********) “আর আল্লাহ তোমাকে পেলেন পথহারা হিসেবে তারপর তোমাকে পথের সন্ধান দিলেন”।

এর সাথে কুরআন আমাদেরকে একথাও জানায় যে, অন্যান্য লোকের জ্ঞান ও উপলব্ধির যেসব সাধারণ মাধ্যমের অধিকারী নবীগণ নবুয়াত লাভের পূর্বে সেগুলোর সাহায্যেই অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনার স্তর অতিক্রম করে যান। অহীর আগমন তাঁদের অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানকে শক্তিশালী করে দেয়। পূর্বে তাঁদের মন যেসম সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে আসছিল অহী সেগুলোর সত্য হবার ব্যাপারে নিশ্চিত ও চূড়ান্ত সাক্ষ্য প্রদান করে। এবং সে সত্যগুরোর সাথে তাঁদের প্রত্যক্ষ ও চাক্ষুষ পরিচয় ঘটিয়ে দেয়, যার ফলে তাঁরা পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে দুনিয়ার সামনে সেগুলোর সাক্ষ্য দিতে পারেন। সূরা হুদে এ বিষয়বস্তুটি একাধিকবার বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে রসূলে করীম (সা) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৯ পৃষ্ঠায়)

“তারপর কি সেই ব্যক্তি যে পূর্বেই তার রবের পক্ষ থেকে একটি উজ্জ্বল প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল (অর্থাৎ বুদ্ধিগত ও প্রকৃতিগত হেদায়াতের অধিকারী ছিল) অতপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষীও তার নিকট এল (অর্থাৎ কুরআন) এবং এর পূর্বে মূসার কিতাবও পথপ্রদর্শক ও রহমত হিসেবে বিদ্যমান ছিল (এ সত্যটির ব্যাপারে কি তারা সন্দেহ পোষণ করতে পারে?)”।–(সূরা হুদঃ ১৭)

অতপর এ বিষয়বস্তুটি আবার তৃতীয় রুকূ’তে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের মুখে এভাবে ব্যক্ত হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৯ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার জাতির লোকেরা চিন্তা কর, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি উজ্জ্বল প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে থাকি এবং তারপর তিনি নিজের পক্ষ থেকে আমার ওপর রহমতও (অহী ও নবুয়াত) বর্ষণ করে থাকেন আর সে বস্তু তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কি জোরপূর্বক তা তোমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেব?”-(সূরা হুদঃ ২৮)

আবার ষষ্ঠ রুকূ’তে হযরত সালেহ (আ) এবং অষ্টম রুকূ’তে হযরত শো’আইব (আ) এই একই বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি করেছেন। এ থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অহীর মাধ্যমে বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি করেছেন। এ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অহীর মাধমে সরাসরি সত্যজ্ঞান লাভ করার পূর্বে নবীগণ চিন্তা-গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের প্রকৃতিগত যোগ্যতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে (ওপরের আয়াতে যাকে (আরবী********) বলা হয়েছে) তাওহীদ ও আখেরাত তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করতেন। সত্যের গভীরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাঁদের এ সাফল্য আল্লাহ প্রদত্ত (আরবী) নয় বরং এটি হতো তাঁদের সোপার্জিত (আরবী***)। এরপর আল্লাহ তাঁদেরকে অহীর জ্ঞান দান করতেন। এটি সোপার্জিত নয় একটি হতো আল্লাহ প্রদত্ত।

এ প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলীর পর্যবেক্ষণ, চিন্তা, গবেষণা সাধারণ জ্ঞানের (Commonsense) ব্যবহার দার্শনিকদের আন্দাজ, অনুমান ও অনুধ্যান (Speculation) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। এ জিনিসটি ব্যবহারের দিকে কুরআন মজীদ নিজেই প্রত্রেকটি মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কুরআন বার বার বলেছে, চোখ খুলে আল্লাহর প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলো দেখ এবং তা থেকে নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা কর।

রসূলের ইলমে গায়েব

যতটুকু ইলমে গায়েব বা অদৃশ্য জ্ঞান মানুষকে পৌঁছিয়ে দেয়া আল্লাহর উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র ততটুকু ইলমে গায়েব রসূলদেরকে দান করা হয়েছিল –এ ধারণা ভুল। এ ধারণা কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট বর্ণনার পরিপন্থী। কুরআন মজীদে হযরত ইয়াকুব (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, নিজের ছেলেদেরকে তিনি বলেছেনঃ (আরবী*******) “আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন সব বিষয় জানি যা তোমরা জান না”।–(সূরা ইউসুফঃ ১১)

এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, বিভিন্ন জাতির ওপর শাস্তি প্রেরণের পূর্বে তাদের নবীদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু তাঁরা শাস্তি আসার সময়ও তার বিস্তারিত অবস্থা সম্পর্কে নিজেদের জাতিদেরকে অবহিত করেননি। হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে এত পূর্বে শাস্তির কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, তিনি সে সময়ের মধ্যে জাহাজ বানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের জাতিকে এ কথা বলেননি যে, তাদের ওপর বন্যার শাস্তি আসছে। আবার হাদীস থেকেও একথা জানা যায় যে, রসূলে করীম (সা)-কে গায়েবের এমন সব অবস্থা জানানো হয়েছিল যা তিনি উম্মতকে জানিয়ে যাননি। একবার এক ভাষণে রসূরে করীম (সা) বলেনঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৬০ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মত! আল্লাহর কছম, আমি যা জেনেছি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে তোমরা খুব কমই হাসতে এবং বেশী করে কাঁদতে”।–(বুখারীঃ সাদকা ফিল কাসূফ অধ্যায়)

আর এক সময় রসূলে করীম (সা) বলেনঃ (আরবী**********) “আমি তোমাদেরকে পেছনে ঠিক তেমনিভাবে দেখি যেমন সামনে দেখি”।–(বুখারীঃ আযমাতু ইমামিন নাস অধ্যায়)।

মোটকথা এমনি আরো বহু হাদীস ও আয়াত থেকে একথা জানা যায় যে, রসূলদের মাধ্যমে যে পরিমাণ গায়েবের ইলম বান্দাদের নিকট পৌঁছেছে তার চাইতে অনেক বেশী পরিমাণে গায়েবের ইলম তাদেরকে দান করা হয়েছিল। স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিও এ কথাই সমর্থন করে। কারণ গায়েবের যে ব্যাপারটুকু ঈমান ও আকীদার সাথে সম্পর্কিত কেবলমাত্র সেটুকু জানাই সাধারন মানুষের প্রয়োজন। কিন্তু রসূলদের কেবলমাত্র এতটুকু গায়েবের ইলম জানলে চলে না। তাঁদের আরো বহু কিছু জানার প্রয়োজন হয় যা রিসালাতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের জন্যে সহায়ক হয়।যেমন রাষ্ট্রের নীতি ও গোপন রহস্য সম্পর্কে এক বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত উপ-রাষ্ট্রপ্রধান ও গভর্ণরদের জানা থাকা প্রয়োজন। এ রহস্যগুরো সাধারণ প্রজাদের নিকট জানাজানি হয়ে গেলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তেমনিভাবে আল্লাহর রাজ্য ব্যবস্থাপনারও বহু গোপন রহস্য আছে যেগুলো জানেন কেবলমাত্র আল্রাহর বিশেষ প্রতিনিধি ও তাঁর রসূলগণ। সাধারণ প্রজা অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা সে সবের বিন্দুবিসর্গও জানে না। এ গায়েবের ইলম রসূলদেরকে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্যে এর কোনো প্রয়োজন নেই এবং তারা এটি বরদাশত করারও ক্ষমতা রাখে না। অতি সংক্ষেপে এতটুকু বলা হয় যে, নবীর ইলম আল্লাহর ইলম থেকে কম এবং সাধারণ মানুষের ইলম থেকে বেশী হয়। তবে এ ইলমের পরিমাণ কতটুকু? কত বেশী বা কত কম? অবশ্যি এবাবে একে পরিমাপ করার মতো কোনো যন্ত্র আমাদের কাছে নেই।

নবীদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি

মানুসের সমাজে নবীগণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক মর্যাদার অধিকারী। একজন সাধারন মানুষের জীবনে সাধারণ একটি ঘটনা বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু ঐ একই ঘটনা নবীর জীবনে সংঘটিত হলে তা আইনে পরিণত হয়। এজন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদের জীবনের প্রতিটি ঘটনার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়। যার ফলে তাঁদের সামান্যতম কোনো পদক্ষেপ এবং তাঁদের কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজও আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিকূলে সংঘটিত হতে পারে না। নবী যদি কখনো এমন কোনো কাজ করেও থাকেন তাহলে সংগে সংগে তা সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী আইন ও তার মূলনীতিগুলো কেবলমাত্র আল্লাহর কিতাবেই নয় বরং নবীর উত্তম জীবনাদর্শ হিসেবেও মানুষের নিকট পৌঁছে যাবে এবং এমন সামান্যতম বস্তুও তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না যা আল্লাহর ইচ্ছার অনুসারী নয়।

প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ

নবীগণের মধ্যে থেকে প্রত্যেককে আল্লাহ তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী পৃথিবী ও আকাশের পরিচালন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়েছেন এবং জড় ও অদৃশ্য জগতের মধ্যবর্তী পর্দা সরিয়ে দিয়ে এমন সব গোপন তত্ত্বেরও চাক্ষুষ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যেগুলোর ওপডর সাধারণ মানুষকে ঈমান বিলগায়েব আনার আহবান জানাবার জন্যে তাঁরা নিযুক্ত হয়েছিলেন। এভাবে দার্শনিকদের থেকে তাঁদের মর্যাদা পৃথক সত্তার চিহ্নিত হয়ে গেছে। দার্শনিকরা আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে থাকেন। তাঁরা যদি নিজেদের অবস্থা ও মর্যাদা সঠিক অবগত হতেন তাহলে কখনো নিজেদের কোনো মতের সত্যতার সাক্ষ্য দিতেন না। বিপরীতপক্ষে নবীগণ প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই সব কথা বলে থাকেন। তাঁরা মানুষের সামনে এভাবে সাক্ষ্য দিতে পারেনঃ আমরা যা কিছু বলছি তা আমারা ভালভাবে জাতি এবং আমরা তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি।

অস্বাভাবিক শক্তি –[নবীদের অস্বাভাবিক শক্তি ও যোগ্যতা এবং তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্পর্কে “ব্যক্তি ও নবী হিসেবে রসূরে করীমের মর্যাদা” অধ্যায়ের “রিসালাত ও তার বিধান” অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।]

(আরবী****************** পিডিএফ ৬২ পৃষ্ঠায়)

“যখন এ কাফেলা (মিসর থেকে) রওয়ানা হলো, তখন তাদের পিতা (কেনানে স্বগৃহে বসে) বললেনঃ আমি ইউসুফের খোশবু অনুভব করছি তোমরা (গৃহের বাসিন্দারা) যেন আবার এ কথা না বলে বসো যে, বুড়ো হয়ে গিয়ে আমার মতিভ্রম ঘটেছে”।–(সূরা ইউসুফঃ ৯৪)

এ থেকে নবীদের অস্বাভাবিক শক্তি আন্দাজ করা যেতে পারে। কাফেলা হযরত ইউসুফ (আ)-এর জামা নিয়ে সবেমাত্র মিসর থেকে যাত্রা করেছে এমন সময় শত শত মাইল দূরে বসে হযরত ইয়াকুব (আ) তার গন্ধ পেয়ে গেছেন। কিন্তু এ থেকে একথাও জানা যায় যে, এ শক্তি নবীদের নিজস্ব ছিল না। আল্লাহ তাঁদেরকে এ শক্তি দান করেছিলেন। তবে আল্লাহ যখন এবং যে পরিমাণ চাইতেন একমাত্র তখনই তাঁরা সেই পরিমাণ এ শক্তি কাজে লাগাতে পারতেন। হযরত ইউসুফ (আ) বছরের পর বছর মিসরে থাকলেন ক্নিতু হযরত ইয়াকুব (আ) কখনো তাঁর খোশবু পেলেন না। আর এখন তাঁর জামা মিসর থেকে চলা শুরু হবার সাথে সাথে হঠাৎ হযরত ইয়াকুব (আ)-এর ঘ্রাণ শক্তি এত বেড়ে গেলো যে, তিনি তার খোশবু পেতে লাগলেন।

নবীদের মানবিক সত্তা

পূর্ববর্তী সকল নবীই মানুষ-[নবীদের মানবিক সত্তা ও বিষয়বস্তুর উপর পরবর্তী আলোচনা একটি অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয়েছে।] ছিলেন। তাঁরা আল্লাহর কোনো অভিনব সৃষ্টি ছিলেন না। একজন মুনষকে রসূল বানিয়ে পাঠানো একটা ইতিহাসের কোনো অভিনব ঘটনা নয়।

মুহাম্মদ (সা) এখন যে কাজ করছেন পূববর্তী নবীগণও ঐ একই কাজের জন্যে এসেছিলেন্ মুহাম্মদ (সা)-এর ন্যায় তাঁদের মিশন ও শিক্ষা একই ছিল। নবীদের সাথে আল্লাহ বিশেষ ব্যবহার করেছেন। তাঁদের ওপর বড় বড় বিপদ এসেছে। বছরের পর বছর তাঁরা বিপদের মধ্যে অবস্থান করেছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁদের ওপর বিপদ এসেছে আবর শত্রুরাও তাঁদেরকে বিপদে ফেলেছে। কিন্তু অবশেষে তাঁদের জন্যে এসেছে দো’য়া কুবল করেছেন। তাঁদের কষ্ট দূর করেছেন। তাঁদের শত্রুদেরকে পরাজিত করেছেন এবং অলৌকিকভাবে তাঁদেরকে সাহায্য দান করেছেন।

আল্লাহর প্রিয় ও মনঃপূত হওয়া সত্ত্বেও এবং তাঁর পক্ষ থেকে বড় বড় বিস্ময়কর শক্তি লাভ করার পরও তাঁরা ছিলেন আল্লাহর বান্দাহ ও মানুষ। তাঁদের একজনও খোদায়ী ক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন না।

নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ

নবীরাও মানুষ। কোনো মানুষই মু’মিনের জন্যে নির্ধারিত পূর্ণমানে সর্বক্ষণ অবস্থান করার ক্ষমতা রাখে না। কোনো কোনো সময় কোনো নাজুক আবেগময় পরিস্থিতিতে নবীর ন্যায় শ্রেষ্ঠতম মানুষও সামান্যতম সময়ের জন্যে নিজের মানবিক দুর্বলতার নিকট হার মানেন। কিন্তু যখনই তিনি অনুভব করেন বা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর মধ্যে এ অনুভূতি সৃষ্টি করানো হয় যে, তিনি আকাংখিত মানের নীচে চলে যাচ্ছেন, তখনই তিনি তওবা করেন। নিজের ভুলের সংশোধন করার ব্যাপারে তিনি এক মুহুর্তের জন্যেও ইতস্ততঃ করেন না। হযরত নূহ (আ)-এর চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে যে, তাঁর যুবক পুত্র তাঁর চোখের সামনে অথৈ পানির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য তিনি চোখ দিয়ে দেখছেন, দৃশ্যের ভয়াবহতায় তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু যখনই আল্লাহ তাঁকে সতর্ক করে দিলেন যে, যে পুত্র হককে ত্যাগ করে বাতিলকে আঁকড়ে ধরেছে তাকে কেবলমাত্র নিজের ঔরসজাত বরে নিজের মনে করা নিছক একটি জাহেলী আবেগ নির্ধারিত চিন্তাধারার দিকে ফিরে এলেন।

নবীর নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ এ নয় যে, তাঁর নিকট থেকে গুনাহ ও ভুল করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, এমন কি তাঁর দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হওয়ার কোন সম্ভাবনাই আই নেই। বরং এর অর্থ হচ্ছে, নবী গুনাহ করার ক্ষমতা রাখেন কিন্তু যাবতীয় মানবিক গুণাবলী, মানবিক আবেগ, অনুভূতি ও ইচ্ছা-অভিলাষের অধিকারী হওয়ার পরও তিনি এমনই সৎ ও খোদাভীরু হন যে, কখনো জেনে বুঝে গুনাহের সংকল্প করেন না। তাঁর বিবেকের মধ্যে নিজের প্রতিপালকের এত বিরাট ও শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ মওজুদ থাকে যার মোকাবিলায় তাঁর প্রবৃত্তির আকাংখা কখনো সফলকাব হতে পারে না। এর পরও তাঁর অজ্ঞাতে যদি কখনো কোনো ভুল হয়েও যায় তাহলে সংগে সংগেই আল্লাহ প্রকাশ্য অহীর মাধ্যমে তাঁর সংশোধন করে দেন। কারণ তাঁর পদঙ্খলন মাত্র এক ব্যক্তির পদঙ্খলন নয় বরং একটি উম্মতের পদঙ্খলন। তিনি সত্যপথ থেকে এক চুল পরিমাণ সরে গেলে সারা দুনিয়া গোমরাহীর পথে কয়েক মাইল দূরে এগিয়ে যায়।

নবীদের গুণাবলী সম্পর্কিত কতিপয় আয়াত

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৩ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কিতাবে ইবরাহীমের কথা বর্ণনা কর নিশ্চয়ই সে ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি ও একজন নবী”-(সূরা মরিয়মঃ ৪১)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৩ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কিতাবে মূসার কথা আলোচনা কর। সে ছিল একজন মনঃপূত ব্যক্তি এবং একজন রসূল-নবী। আর আমি তাকে ডাক দিয়েছি তূরের ডান দিক থেকে এবং গোপন আলাপের মাধ্যমে তাকে নৈকট্য দান করেছি”।–(সূরা মরিয়মঃ ৫১-৫২)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৩ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কিতাব ইসমাঈলের কথা আলোচনা কর। তিনি ছিলেন ওয়াদা পূরণকারী এবং একজন রসূল-নবী। তিনি নিজের পরিবার-পরিজনকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন এবং নিজের রবের নিকট তিনি ছিলেন একজন পছন্দনীয় মানুষ। আর এ কিতাবে আলোচনা কর ইদরিসের কথা। অবশ্যি তিনি ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি ও নবী এবং আমি তাকে উন্নত স্থানে উঠিয়েছিলাম”।–(সূরা মরিয়মঃ ৫৪-৫৭)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“এ নবীগণকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেন, এরা ছিলেন আদমের বংশজাত আর তাদের বংশজত আর তামের বংশজাত যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং ইবরাহীমের বংশজাত ও ইসরাইলের বংশজাত আর এরা তাদের অন্তর্গত ছিল যাদেরকে আমি হেদায়াত দান করেছিলাম এবং নির্বাচিত করেছিলাম। তাদের অবস্থা ছিল এই যে, যখন রহমানের আয়াত তাদেরকে শুনানো হতো তখন তারা কান্নারত অবস্থায় সিজদায় ঝুঁকে পড়তো”।–(সূরা মরিয়মঃ ৫৮)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“আর এর পূর্বে আমি ইবরাহীমকে বিবেক-বুদ্ধি দান করেছিলাম এবং আমি তাকে খুব ভাল করেই জানতাম”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৫১)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“আর আ মি তাকে ও লূতকে বাঁচিয়ে এমন ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে গেলাম যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্যে বরকত রেখেছি। আর আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকুব দান করেছি তার ওপর আরো অতিরিক্ত এবং তাদের প্রত্যেককে বানিয়েছি সৎ। আর আমি তাদেরকে নেতৃত্বের আসন দিয়েছি, যারা আমার হুকুমে পথ দেখায় এবং আমি তাদেরকে অহীর মাধ্যমে সৎকাজের, নামায কায়েম করার ও যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। আর তারা ছিল আমার ‘ইবাদাতকারী’।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭১-৭১)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“আর লূতকে আমি হুকুম ও তত্ত্বজ্ঞান দান করেছি এবং তাকে সেই জনপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছি যার লোকেরা বদকাজ করতো। আসলে তারা অত্যন্ত খারাপ পর্যায়ের ফাসেক জাতি ছিল। লূতকে আমি আমার রহমত দান করেছি, এ জন্যে যে, সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭৪-৭৫)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৫ পৃষ্ঠায়)

“আর এই একই নিয়ামত আমি নূহকে দান করেছি। স্মরণ করুন, এসবের আগে সে আমাকে ডেকেছিল আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ও তার পরিবারবর্গকে বিরাট মর্ম-বেদনা থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম আর সেই জাতির মোকাবিলায় তাকে সাহায্য করেছিলাম যে আমার আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। তারা ছিল অত্যন্ত বদ লোক। কাজেই তাদের সবাইকে আমি জলমগ্ন করেছিলাম”।

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৫ পৃষ্ঠায়)

“আর দাউদ ও সুলাইমানকে আমি এই নিয়ামতই দান করেছি। সে সময়খার কথা স্মরণ কর যখন তারা দু’জন একটি ক্ষেতের মামলার মীমাংসা করছিল, যার মধ্যে রাতের বেলা অন্য লোকদের ছাগল ঢুকে পড়েছিল। আর আমি নিজেই তাদের বিচার দেখছিলাম। সে সময় আমি সুলাইমানকে সঠিক বিচার শিখিয়ে দিয়েছিলাম। অথচ দু’জনকে আমি সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি ও ইলম দান করেছিলাম। আর দাউদের সাথে আমি পাহাড় ও পক্ষীকূলকে বাধ্যানুগত করে দিয়েছিলাম, যারা তাসবীহ করতো। এ কাজটি আমিই করেছিলাম। আর তোমাদের উপকারার্থেই আমি তাকে বর্ম তৈরী করার শিল্পকারিতা শিখিয়েছিলাম, যাতে তোমাদেরকে পরস্পরের আঘাত থেকে রক্ষা করা যায়। তাহলে তোমরা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হলে? আর সুলাইমানের জন্যে আমি দ্রুতগতিসম্পন্ন বাতাসকে বাধ্যানুগত করে দিয়েছিলাম, যা তার হুকুমে প্রবাহিত হতো এমন ভূখণ্ডের দিকে যার মধ্যে আমি বরকত রেখেছিলাম। এবং আমি সব জিনিসের জ্ঞান রাখি। আর শয়তাদের মধ্য থেকে এমন অনেককে তার অনুগত করে দিয়েছিলাম যারা তার জন্যে ডুবুরির কাজ করতো এবং এছাড়া অন্য কাজও করতো। আমিই ছিলাম এদের সবার রক্ষণাবেক্ষণকারী”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭৮-৮২)

এ প্রসঙ্গে হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলাইমান (আ)-এর এ বিশেষ ঘটনার উল্লেখের পেছনে একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তা হচ্ছে, এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করানো যে, নবী ও আল্লাহর পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক শক্তি ও যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নবীগণ আসলে মানুষই ছিলেন। খোদায়ী ক্ষমতার নামগন্ধও তাঁদের মধ্যে ছিল না। এ মামলায় অহীর মাধ্যমে হযরত দাউদ (আ)-কে সাহায্য করা হয়নি এবং তিনি রায় দেবার ব্যাপারে ভুল করে ফেলেছিলেন। হযরত সুলাইমান (আ)-কে সাহায্য করা হলো। ফলে তিনি সঠিক রায় দিলেন। অথচ তাঁরা উভয়েই নবী ছিলেন। তাঁদের দু’জনের যেসব গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো বর্ণনার উদ্দেশ্যও হচ্ছে এ কথা বুঝানো যে, এগুলো ছিল আল্লাহ প্রদত্ত গুনাবলী এবং এ ধরনের গুণাবলী কাউকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দেয় না।

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৬ পৃষ্ঠায়)

“আর এই বস্তুই (বিবেক-বুদ্ধি এবং বিচার শক্তি ও জ্ঞানের নিয়ামত) আমি আইয়ুবকে দিয়েছিলাম। স্মরণ কর যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিলেন, ‘আমি রোগাক্রান্ত হয়েছি এবং তুমি সবচেয়ে বেশী করুণাশীল’। আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিয়েছিলাম। আর তাকে কেবলমাত্র তার পরিবার-পরিজন দান করেছিলাম তাই নয় বরং এই সংগে সমসংখ্যায় আরো দিয়েছিলাম আমার নিজের বিশেষ রহমত এবং এ জন্যে যে, এটা একটা শিক্ষণীয় বিষয় হবে ইবাদাতকারীদের জন্যে”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৩-৮৪)

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৬ পৃষ্ঠায়)

“আর এই একই নিয়ামত ইসমাঈল, ইদরিস ও যুলকিফলকেও দিয়েছিলাম। এরা সবাই ছিল সরকারী এবং এদেরকে আমি নিজেই রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম কেননা তারা ছিল সৎকর্মশীল”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৫-৮৬)

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৬ পৃষ্ঠায়)

“আর মৎসধারীকেও আমি আমার দানে ভূষিত করেছিলাম এবং মনে করেছিল আমি তাকে পাকড়াও করবো না। অবশেষে সে অন্ধকারের মধ্য থেকে ডেকে বলেছিলামঃ ‘তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, তোমর সত্তা পবিত্র, নিঃসন্দেহে আমি অপরাধ করেছি’। তখনই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং মর্মবেদনা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম এবং এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্দার করে থাকি”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৭-৮৮)

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৭ পৃষ্ঠায়)

“আর যাকারিয়াকে, যখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিলঃ ‘হে আমর প্রতিপালক! আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ো না আর তুমি হচ্ছ সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী’। কাজেই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ইয়াহইয়া দান করেছিলাম আর তার স্ত্রীকে তার জন্যে ত্রুটিমুক্ত করে দিয়েছিলাম। তারা সৎকাজে তৎপরতা দেখাত এবং আমাকে ডাকতো ভীতি ও আগ্রহ সহকারে আর আমার সামনে নত ছিল”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৯-৯০)

হযরত যাকারিয়া (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এ কথা বুঝানো যে, এই নবীগণ সবাই ছিলেন নিছক আল্লাহর বান্দাহ ও মানুষ। তাঁদের মধ্যে খোদায়ীর নাম-গন্ধও ছিল না। অন্যদেরকে সন্তান দান করার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না, বরং তাঁরা নিজেরাই আল্লাহর নিকট সন্তান ভিক্ষা চাইতেন। হযরত ইউনুস (আ)-এর উল্লেক করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, একজন মহিমান্বিত নবীর বিরাট ব্যক্তিত্ব সত্ত্বেও ভুল করার সাথে সাথেই তাঁকে পাকড়াও করা হয়েছে। আর যখন তিনি নিজের প্রতিপালক প্রভুর সামনে নত হয়েছেন তাঁর প্রতি অস্বাভাবিক করুণাও প্রকাশ করা হয়েছে। তাকে মাছের পেট থেকে জীবন্ত অবস্থায় বের করে আনা হয়েছে। হযরত আইয়ুব (আ)-এর প্রসঙ্গে টানার উদ্দেশ্যই হচ্ছে একথা জানানো যে, বিপদাক্রান্ত হওয়া নবীদের জন্যে কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আর নবী যখন বিপদে এবং রোগে আক্রান্ত হন তা থেকে উদ্ধারের জন্যে আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করেন। তাঁরা অন্যকে রোগমুক্ত করতে পারেন না। বরং বিপরীত পক্ষে তাঁরা আল্লাহর নিকট রোগমুক্তি চান। উপরন্তু এসব বর্ণনার আর একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বাস্তব সত্যটিকে প্রতিষ্ঠিত করা যে, নবীদের সকলেই তাওহীদকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং এক আল্লহ ছাড়া আর কারোর সামনে নিজেদের প্রয়োজনের অবতারণা করতেন না। অন্যদিকে এ কতা প্রকাশ করাও এর উদ্দেশ্যের অন্তর্গত যে, আল্লাহ সবসময় তাঁর নবীদেরকে সাহায্য করেছেন অস্বাভাবিকভাবে। শুরুতে তাঁরা যতই পরীক্ষার সম্মুখীন হন না কেন, অবশেষে অলৌকিকভাবে তাঁদের দোয়া কবুল হয়েছে ও পূর্ণতা লাভ করেছে।

অধ্যায়ঃ ২ – অহী

অহীর অর্থ, রূপ ও প্রকারভেদ

শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

অহীর অর্থ হচ্ছে ইশারা করা, ইঙ্গিত করা, মনের মধ্যে কোনো কথা নিক্ষেপ করা গোপনে কোনো কথা বলা বা বাণী পাঠানো। অহীর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে ‘ত্বরিত ইশারা’ এবং ‘গোপন ইশারা’। অর্থাৎ এমন ইশারা যা ত্বরিত বেগে করা হয় এবং এমনভাবে করা হয় যার ফলে তা কেবলমাত্র যে করে এবং যাকে করে তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না। এ শব্দটিকে পারিভাষিক অর্থে এমন হেদায়াতের জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে যা বিদ্যুৎ শিখার ন্যায় আল্লাহর পক্ষ তেকে তাঁর কোনো বান্দার মনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়।

কারও নিকট আল্লাহর স্বয়ং উপস্থিত বা তাঁর নিকট কারও উপস্থিত হয়ে এবং তাঁর সামনাসামনি অবস্থান করে তাঁর সাথে কথা বলার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। তিনি জ্ঞানী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। মানব সমাজের হেদায়াত বা তাদেরকে পথ দেখাবার জন্যে যখনই তিনি কোনো বান্দার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চান তাঁর ইচ্ছার পথে কোনো বাধা, কোনো প্রকার অসুবিধা দেখা দিতে পারে না। নিজের জ্ঞানের মাধ্যমে এ কাজের জন্যে তিনি অহীর পথ অবলম্বন করেন।

অহীর প্রকারভেদ

‘অহী’ শব্দটি যদিও বর্তমানে কেবল নবীগণের নিকট প্রেরিত অহীর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে কিন্তু কুরআনে এ পারিভাষিক পার্থক্যটি দেখা যায় না। কুরআনের বর্ণনা অনুসারে আকাশের ওপরও অহী নাযিল হয় এবং সেই অনুযায়ী তার সমগ্র ব্যবস্থা পরিচালিত হয় (আরবী**********) জমিরেন ওপরও অহী নাযিল হয়, যার ইঙ্গিতে কার বিলম্ব না করেই সে নিজের কাহিনী শুনতে থাকে (আরবী******) ফেরেশতাদের ওপরও অহী নাযিল হয় এবং সে অনুযায়ী তারা কাজ করে (আরবী***********) মৌমাছিদেরকেও তাদের সমস্ত কাজ অহীর (প্রাকৃতির শিক্ষা) মাধ্যমে শেখানো হয়। যেমন সূরা নাহালের ৬৮নং আয়াতে বলা হয়েছে। অবশ্যি এ অহী কেবল মৌমাছি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। পানিতে মাছের সাঁতরে বেড়ানো, শূন্যে পাখীদের উড়ে বেড়ানো এবং সদ্যজাত শিশুর দুধ পান করা –এসব শিক্ষা আল্লাহর অহীর মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আবার চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা-অনুসন্ধান ছাড়াই একজন মানুষ যে সঠিক কৌশল, নির্ভুল রায় অথবা চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ লাভ করে তাও এ অহীর অন্তর্ভুক্ত (আরবী**********) এ অহী থেকে কোন মানুষও বঞ্চিত নয়। দুনিয়ায় যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে, মানুষের কল্যাণার্তে যতগুরো নতুন নতুন বস্তু-বিষয় উদ্ভাবিত হয়েছে, বড় বড় চিন্তাশীল, রাষ্ট্রনায়ক, বিজেতা ও লেখকগণ যে সমস্ত বিরাট ও মহৎ কার্য সম্পাদন করেছেন সে সবের মধ্যে এই অহীর কার্যকারিতা দেখা যায়। বরং সাধারণ মানুষ দিনরাত এ ব্যাপারে বহুতর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় বসে বসেই মনের মধ্যে একটি কথার উদয় হয় অথবা মাথায় কোন নতুন কৌশল ও বুদ্ধি গজায় বা স্বপ্নের মধ্যে কিছু দেখা যায় এবং পরবর্তী অভিজ্ঞতায় সেটি একটি সঠিক পথ নিদেৃশ বলে প্রমাণিত হয়, যা অদৃশ্য থেকৈ তাকে দেয়া হয়েছিল। এই বহুবিধ অহীর মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের অহী নবী-রসূলগণের ওপর অবতীর্ণ হতো অন্যান্য অহীর সাথে এর পার্থক্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে যাঁর উপর অহী অবতীর্ণ হয় তিনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এ অহী অবতীর্ণ হচ্ছে। এ অহী আল্লাহর পক্স থেকে অবতীর্ণ হওয়ার ওপর তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস থাকে। এ ধরনের অহীর মধ্যে থাকে আকীদা-বিশ্বাস, বিধি-বিধান, আইন-কানুন এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিধি-নির্দেশ। নবীর মাধ্যমে মানব জাতিকে পথ দেখানোই হয় এর উদ্দেশ্য।

ভুল ধারণা

সূরা শু’রার (আরবী*******) আয়াতে যে অহীর মাধ্যমে সমস্ত আসমানি গ্রন্থ নবীগণের নিকট পৌঁছেছে তার আগমনের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর একজন ফেরেশতার মাধ্যমে রসূলগণের নিকট অহী পাঠান। কেউ কেউ এ আয়াতটির ভুল মর্ম গ্রহণ করে এর অর্থ করেছেনঃ ‘আল্লাহ কোনো রসূল পাঠান যিনি তাঁর নির্দেশে সাধারণ মানুষদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছিয়ে দেন’। কিন্তু কুরএনর এ (আরবী**********) (অতপর সে অর্থাৎ ফেরেশতা অহী অবতীর্ণ করে অথবা পৌঁছায় –তাঁরই নির্দেশে যা কিছূ তিনি চান)। তাঁদের এ অর্থকে সুস্পষ্টরূপে ভুল প্রমাণ করে। সাধারণ মানুষের সামনে নবীদের তাবলীগকে কুরআনের কোথাও ‘অহী’ বলা হয়নি এবং আরবী ভাষায়ও মানুষের প্রকাশ্যে আলোচনাকে ‘অহী’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করার কোন অবকাশই নেই। অহীর আভিধানিক অর্থই হচ্ছে গোপন ও দ্রুত ইশারা। আরবী ভাষা সম্পর্কে নেহাত অজ্ঞ ব্যক্তিই নবীদের তাবলীগের প্রতিশব্দ হিসেবে এ শব্দটি ব্যবহার করতে পারে।

বিভিন্ন প্রকার অহী সম্পর্কে আরও কিছু কথা

এক প্রকার অহীকে বলা যেতে পারে জিবিল্লী বা তাবিয়ী (প্রাকৃতিক) অহী। এর মাধ্যমে আল্লাহ প্রত্যেক সৃষ্ট জীবকে তার কাজ শিখিয়ে দেন। এ অহী মানুষের চেয়ে বেশী পশু-পাখীর ওপর এবং সম্ভবতঃ তারও চেয়ে বেশী উদ্ভিদ ও জড় পদার্তের ও পর অবতীর্ণ হয়। দ্বিতীয় প্রকারের অহীকে ‘জুযয়ী’ (আংশিক) অহী বলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে জীবন সংক্রান্ত বিষয়াবলীর মধ্য থেকে কোন কৌশল শিক্ষা দেন। এ অহীটি প্রতিদিন সাধারণ মানুষের ওপর অবতীর্ণ হয়। দুনিয়ার যত বড় বড় আবিষ্কার সবই এই অহীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়। বড় বড় তাত্বিক উদ্ভাবনে এই অহী মদদ যোগায়। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পেছনে এরই কার্যকারিতা দেখা যায়। দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই হঠাৎ একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে গেছে এবং ইতিহাসের গতি প্রবাহের ওপর তা একটি সিদ্ধান্তকরী প্রভাব বিস্তার করেছে। এ ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল হযরত মূসার মায়ের ওপর। এ দু’ধরনের অহী থেকে আলাদা আর এক প্রকার আচে যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে গায়েবের (অদৃশ্য জগতের) নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত করেন এবং জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁকে হেদায়াত দান করেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি এ জ্ঞান ও হেদায়াত সাধারণ মানুষের নিকট পৌঁছাবেন এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের পথে আনবেন। এ অহী একমাত্র নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়। কুরআন থেকে পরিস্কার জানা যায়, এ ধরনের জ্ঞানের নাম ইরকা, ইলহাম, কাশফ বা পারিভাষিক অর্থে অহী –যাই রাখা হোক না কেন, আম্বিয়া ও রসূল ছাড়া কাউকেই তা দেয়া হয় না। এ পর্যায়ের জ্ঞান নবীদেরকে এমনভাবে দেয়া হয় যার ফলে তাঁরা পূর্ণ বিশ্বাসস্থাপন করতে সক্ষম হন যে, এ জ্ঞানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, শয়তাদের অনুপ্রবেশ থেকে এটি সম্পুর্ণ সংরক্ষিত এবং নিজেদের চিন্তা, কল্পনা ও প্রবৃত্তির প্রভাব থেকেও তা পুরোপুরি মুক্ত। উপরন্তু শরীয়াতের পক্ষ থেকে এ জ্ঞানটিই অকাট্য প্রমাণ রূপে বিবেচিত। এর আনুগত্য করা প্রত্যেকটি মানুষের জন্যে ফরয এবং সমস্ত মানুষকে এর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দেয়ার দায়িত্বেই নবীগণ নিয়োজিত হন। আবার এ অহীর ও পর ঈমান আনা পরকালীন মুক্তির অপরিহার্য শর্ত এবং একে উপেক্ষা করা চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের দিকে নির্দেশ করে।

নবীগণ ছাড়া অন্য কোনো মানুষকে যদি এই তৃতীয় ধরনের অহীর কোনো অংশ দান করা হয় তাহলে তা এমন অস্পষ্ট ইঙ্গিতের পর্যায়ে থাকে যাকে পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্যে নবুয়াতের অহীর আলোকের সাহায্য গ্রহণ করা (অর্থাৎ তাকে কুরআন ও সুন্নাহর ওপর পেশ করে তার ভ্রান্ত ও অভ্রান্ত হওয়ার ব্যাপারটি যাচাই করা এবং অভ্রান্ত হলে তার উদ্দেশ্য নির্ণয় করা) অপরিহার্য হয়। যে ব্যক্তি নিজের ইলহামকে হেদায়াতের একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম মনে করে এবং নবুয়াতের অহীর মানদণ্ডে তাকে যাচাই না করেই নিজে সেই অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করে এবং অন্যদেরকে তার অনুসরণ করার আহবান জানায়, শরীয়াতের দৃষ্টিতে তার এহেন কাজের কোন বৈধতা স্বীকৃত হতে পারে না। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ সত্যটিকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে সূরা জ্বিনের শেষ আয়াতে  এ বিষয়টিকে সব রকমের আড়ষ্ঠতা ও অস্পষ্টতা মুক্ত করে বিকৃত করা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৩ পৃষ্ঠায়)

“তিনি (আল্লাহ) গায়েব (অদৃশ্য) সম্পর্কে জ্ঞাত। নিজের গায়েব সম্পর্কে কাউকেও জ্ঞাত করেন না, তবে একমাত্র সেই রসূলকে জ্ঞাত করেন যাকে তিনি গায়েবের কোনো জ্ঞান দানের জন্যে পছন্দ করেন। তখন তিনি তার সামনে পেছনে সংরক্ষক নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি জানতে পারেন যে, তারা নিজেদের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছে। আর তিনি তাদের সমগ্র পরিবেশ ঘিরে আছেন এবং প্রত্যেকটি বস্তু গুণে রেখেছেন”।–(সূরা জ্বিনঃ ২৭-২৮)

মুসলমানদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ সৎ ব্যক্তি ও উন্নত পর্যায়ের সমাজ সংস্কারক তাঁদেরকে কেন নবীর সমপর্যায়ের কাশফ ও ইলহাম দেয়া হয়নি এবং কেন তাঁদেরকে এর চেয়ে নিম্নমানের এক ধরনের অনুগত কাশফ ও ইলহাম দেয়া হয়েছে, একটুখানি চিন্তা করলে সহজেই এর কারণ অনুধাবন করা যায়। প্রথমটি না দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, এটিই নবী ও সাধারণ উম্মতের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা নির্দেশ করে। এ সীমারেখা কোনো-ক্রমেই উঠিয়ে দেয়া যেতে পারে না। আর দ্বিতীয়টি দেয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, যাঁরা নবীর পর তাঁর কাজকে জারী রাখার প্রচেষ্টা চালান। তাঁরা অবশ্যি দ্বীনের প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথনির্দেশ লাভের মুখাপেক্ষী হন। অবশ্যি অবচেতনভাবে দ্বীনের প্রত্যেকটি একনিষ্ঠ ও নির্ভুল চিন্তার অধিকারী খাদেমকে এ জিনিসটি দান করা হয়। আর যদি কাউকে সচেতনভাবে এটি দান করা হয়, তাহলে তা হবে অবশ্যি আল্লাহর পুরস্কার।

স্বপ্নের মধ্যে অহী

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৪ পৃষ্ঠায়)

“ছেলেটি যখন তার সাথে ছুটাছুটি করার বয়সে উপনীত হল তখন (একদিন) ইবরাহীম তাকে বললঃ পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন তুমি বল এ ব্যাপারে তুমি কি মনে কর। সে বললঃ আব্বাজান, আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে আপনি তা করে ফেলুন”।–(সূরা আস সাফফাতঃ ১০২)

এ শব্দগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, নবী-পুত্র পিতার স্বপ্নকে নিছক স্বপ্ন মনে করেননি বরং আল্লাহর নির্দেশ মনে করেছিলেন। আর যদি যথার্থই এটি আল্লহার নির্দেশ না হ’ত। তাহলে অবশ্যই আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বা অন্তত ইশারা ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতেন যে, ইবরাহীম পুত্র ভুলে এটিকে আল্লাহর নির্দেশ মনে করে নিয়েছে। কিন্তু এ আয়াতের পূর্বে বা পরের আলোচনায় এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত নেই। এ জন্যে ইসলামে এ আকীদার উদ্ভব হয়েছে যে, নবীদের স্বপ্ন নয় না বরং তা হয় এক ধরনের অহী। বলা বাহুল্য যে কথার ভিত্তিতে আল্লাহর শরীয়াতের মধ্যে এতবড় একটি মূলনীতি অনুপ্রবেশ করতে পারে সেটি যদি যথার্থ হ’ত তাহলে আল্লাহ অবশ্য তার প্রতিবাদ করতেন আল্লাহ এমন কোন ভুল করতে পারেন একথা তাদের পক্ষে মেনে নেয়া কোনোক্রমেই সমার্থক নয় যারা কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে স্বীকার করে।

মৌমাছির প্রতি অহী

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৪ পৃষ্ঠায়)

“আর দেখ, তোমার প্রতিপালক মৌমাছির প্রতি এই মর্মে অহী অবতীর্ণ করেছেন যে, পাহাড়গুলোর মধ্যে নিজেদের ঘর তৈরী কর”।–(সূরা আন নাহালঃ ৬৮)

অহীর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গোপন ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত। ইঙ্গিতকারী ও যার প্রতি ইঙ্গিত করা হয় তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ তা অনুভব করে না। এই সঙ্গতিপূর্ণ অর্থের প্রেক্ষিতে এ শব্দটি ‘ইলকা’ (মনের মধ্যে কথা নিক্ষেপ করা) ও ইলহাম (গোপন শিক্ষা ও নির্দেশ দান) অর্থে ব্যবহার হয়। আল্লাহ তাঁল সৃষ্টিকে যে শিক্ষা দেন তা যেহেতু কোন শিক্ষায়তনে দেয়া হয় না বরং এমন সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে দেয়া হয় যার ফলে বাহ্যতঃ একজন শিক্ষা দান করে ও অন্যজন শিক্ষা গ্রহণ করে এমনটি দেখা যায় না, তাই কুরআনে একে অহী, ইলহাম ও ইলকা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে এ তিনটি শব্দ তিনটি পৃথক পারিভাষিক রূপ গ্রহণ করেছে। অহী শব্দটি কেবলমাত্র নবীদের জন্যে এবং ইলহাম অলী আউলিয়া ও বিশেষ বুজর্গানের জন্যে ব্যবহার হয় আর ইলকা তুলনামূলকভাবে সাধারনের জন্যে।

মূসার মায়ের প্রতি অহী

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

 “সে সময়ের কথা স্মরণ কর যখন আমি তোমার মাকে ইঙ্গিত করেছিলাম এমন ইঙ্গিত যা অহীর মাধ্যমেই করা হয়”।–(সূরা তা-হাঃ ৩৮)

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

“আমি মূসার মাকে ইশারা করলাম, তাকে দুধ পান করাও। তারপর যখন তার প্রাণের ভয় দেখা দেয় তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর”।–(সূরা আল কাসাসঃ৭)

অর্থাৎ আল্লাহর ইশারায় হযরত মূসা (আ)-এর মা এ কাজ করেছিলেন এবং আল্লাহর পূর্বাহ্নেই তাঁকে ভরসা দিয়েছিলেন যে, এ পথ অবলম্বন করলে কেবল তোমার সন্তানের প্রাণ রক্ষা পাবে না বরং আমি সন্তানকে তোমার কোলে ফিরিয়ে আনব এবং তোমার ছেলে হবে পরবর্তীকালে আমার রসূল।

শয়তাদের অহী নিজেদের সাথীদের প্রতি

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

“শয়তানরা তাদের সঙ্গীদের মনের মধ্যে সংশয় ও সন্দেহ নিক্ষেপ করে, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়”।–(সূরা আনআমঃ ১২১)

রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর অহী কোন অভিনব ঘটনা নয়

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! আমি তোমার নিকট ঠিক তেমনিভাবে অহী পাঠিয়েছি যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের নিকট পাঠিয়েছিলাম। আর আমি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইয়াকুবের সন্তানদের ওপরও অহী নাযিল করেছিলাম”।

-(সূরা আন নিসাঃ ১৬৩)

একথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে জানিয়ে দেয়া যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোনো নতুন জিনিস আনেননি যা ইতিপূর্বে আর কেউ আনেনি। তিনি একথা দাবী করেননি যে, দুনিয়ার সামনে এ সর্বপ্রথম তিনিই একটি নতুন জিনিস পেশ করেছেন বরং পূর্ববর্তী সকল নবী জ্ঞানের যে উৎস থেকে হেদায়াত লাভ করেছিলেন তিনিও সেই একই উৎস থেকে হেদায়াত লাভ করেছেন। আর দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় যে সকল নবীর আবির্ভাব ঘটেছে তারা সর্বদা যে সকল সত্য ও ন্যায়ের বাণী পেশ করে এসেছেন তিনিও সেই একই সত্য ও ন্যায়ের বাণীর পুনরাবৃত্তি করেছেন মাত্র।

রসুলুল্লাহ (সা)-এর ওপর কুরআনের অহী অবতীর্ণ হওয়া

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৬ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কুরআন অহীর মাধ্যমে আমার নিকট পাঠানো হয়েছে, যাতে তোমাদেরকে এবং আর যাদের নিকট এটি পৌঁছে তাদের সবাইকে সতর্ক করে দিতে পারি”।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৬ পৃষ্ঠায়)

“যখন তাদেরকে আমর সুস্পষ্ট কথা শুনিয়ে দেয়া হয় তখন যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না তারা বলে, এটির বদলে অন্য কোনো কুরআন আন অথবা এর মধ্যে কিছু রদবদল করে নাও। হে মুহাম্মদ! এদেরকে বলে দাও, এর মধ্যে আমর নিজের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার পরিবর্তন করা আমার কাজ নয়, আমি কেবলমাত্র সেই অহীর অনুগত যা আমার নিকট আসে”।–(সূরা ইউনুসঃ১৫)

এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর “আমি এ কিতাবের রচয়িতা নই। বরং অহীর মাধ্যমে এটি আমার নিকট এসেছে এবং এর মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করার অদিকারই আমার নেই” –এ কথা সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। উপরন্তু এ কথাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ ব্যাপারে সমঝোতা করার কোন সম্ভাবনাই নেই। গ্রহণ করতে হলে সমগ্র দ্বীনকে হুবহু যেমনটি আছে ঠিক তেমনটি গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় তা প্রত্যখ্যান করতে হবে।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৬ পৃষ্ঠায়)

 “কাজেই হে নবী, এমন যেন না হয় যে, তুমি ঐ জিনসগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি ত্যাগ করবে যা তোমার প্রতি অহী হিসেবে অবতীর্ণ করা হচ্ছে এবং তা থেকে তোমর হৃদয় সংকুচিত হয়ে যাবে”।–(সূরা হুদঃ১২)

অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তিকে মূল্য দেয়া যে হবে সৎ এবং যে ধৈর্য, দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে ন্যায়, সততা ও সৎকর্মশীলতার পথে চলবে। কাজেই যে ধরনের সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, অবহেলা, বিদ্রুপ ও কটাক্ষ এবং যে ধরনের মূর্খতা প্রসূত আপত্তি ও প্রশ্নের মাধ্যমে তোমর মোকাবিলা করা হচ্ছে তার কারণে তোমর দৃঢ়তা ও অবিচলতার মধ্যে যেন কোনো প্রকার পার্থক্য সূচিত না হয়। অহীর মাধ্যমে তোমার সামনে  যসত্য সুস্পষ্ট করা হয়েছে তার প্রকাশ ও ঘোষণা এবং তার পক্ষ থেকে দাওয়াত দেয়ার ব্যাপারে তোমার কোনো প্রকার ইতস্ততঃ না করা এবং ভীত ও সংকুচিত না হওয়া উচিত। তোমার মনে যেন কখনও  এ ধরনের চিন্তার উদ্রেকই না হয় যে, লোকেরা উমুক কথাটি শোনার সাথে সাথেই যখন বিদ্রুপবান নিক্ষেপ করতে থাকে তখন তা লোকদের সামনে উত্থাপন করিই বা কেমন করে। আর উমুক সত্যটি শোনার জন্যে যখন একেবারে প্রস্তুতই নয় তখন তা তাদের সামনে প্রকাশ করিই বা কেমন করে। কেউ মানুক বা না মানুক তুমি যাকে সত্য বলে জান তাকে কোনো প্রকার কমবেশী না করে নির্ভীক কণ্ঠে বলে যেতে থাকো। পরে যা কিছু হবে বা ঘটবে তা সম্পূর্ণ তো আল্লাহর হাতে।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! এগুরো গায়েবের খবর। অহরি মাধ্যমে আমি এগুলো তোমার নিকট অবতীর্ণ করছি। এর আগে তুমি এগুলো জানতে না এবং তোমার জাতিও জানত না”।–(সূরা হুদঃ ৪৯)

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“আলিফ-লাম-র। এগুলো সেই কিতাবের আয়াত যে নিজের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। আমি তা নাযিল করেছি কুরআন রূপে আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা (আরববাসীরা) তা ভালভাবে বুঝতে পার। হে মুহাম্মদ! আমি এ কুরআনকে তোমর নিকট অহী অবতীর্ণ করে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে তত্ত ও তথ্য তোমার নিকট বর্ণনা করেছি”।–(সূরা ইউসুফঃ ১-২)

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! এ কাহিনী গায়েবের খবরের অন্তর্ভুক্ত যা আমি তোমার ওপর অহী হিসেবে অবতীর্ণ করছি। আর তুমি তখন উপস্থিত ছিলে না যখন ইউসুফের ভাইয়েরা নিজেদের মধ্যে এক জোট হয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল”।–(সূরা ইউসুফঃ ১০২)।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! এভাবেই আমি তোমাকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির মধ্যে যাদের পূর্বে আরও বহু জাতি অতিক্রান্ত হয়েছে, যাতে তুমি তাদেরকে এমন বাণী শোনাও যা আমি তোমার ওপর অহীর মাধ্যমে নাযিল করছি এমন অবস্থায় যখন তারা নিজেদের করুণাময়ের কুফরী করছে”।–(সূরা আর রা’দঃ ৩০)।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অহী অবতীর্ণ হওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি

কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“কোনো মানুষের অবস্থা এমন নয় যে, আল্লাহ তার সাথে সামনাসামনি কথা বলবেন। তবে তাঁর কথা হয় অহী (ইশারা) হিসেবে বা পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোনো বাণীবাহক (ফেরেশতা) পাঠান আর সে তাঁর নির্দেশক্রমে যা কিছু তিনি চান অহীর মাধ্যমে নাযিল করেন। নিসন্দেহে তিনি শ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী”।–(আশ শূরাঃ ৫১)

কুরআন ও হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সা)-কে এ তিনটি পদ্ধতিতেই হেদায়াত দান করা হয়।

একঃ হাদীসের বর্ণনায় হযরত আয়েশার যে বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তা থেকে জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর অহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। (বুখারী ও মুসলিম)। পরবর্তী পর্যায়েও এ ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ ছিল হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা)-এর বহু স্বপ্নের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেগুলোর মাধ্যমে তাঁকে শিক্ষাদান করা হয় বা কোনো কথা জানান হয়। কুরআন মজীদেও তাঁর একটি স্বপ্নের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।–সূরা আল ফাতহঃ ২৭)। এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, উমুক কথাটি আমার দিললে নিক্ষেপ করা হয়েছে, আমাকে জানান হয়েচে অথবা আমাকে এ হুকুম দেয়া হয়েছে বা আমাকে এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এ ধরনের সমস্ত বিষয় প্রথম প্রকারের অহীর অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে কুদসীর অধিকাংশই এ শ্রেণীভুক্ত।

দুইঃ মি’রাজের সময় রসূলুল্লাহ (সা)-কে দ্বিতীয় প্রকারের অহী দান করা হয়। বিভিন্ন নির্ভুল হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা)-কে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের নির্দেশ দেয়া এবং এ নিয়ে তাঁর বারবার আবেদন-নিবেদন করার ঘটনা যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে পরিস্কার জানা যায় যে, সে সময় আল্লাহ ও তাঁর বান্দাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে ঠিক তেমনি কথাবার্তা হয়েছিল যেমন তূর পাহাড়ে হযরত মূসা (আ) ও আল্লাহর মধ্যে হয়েছিল।

তিনঃ তৃতীয় প্রকারের অহী সম্পর্কে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠানো হতো। সূরা বাকারার ৯৭ ও সূরা শূ’আরার ১৯২ থেকে ১৯৫ পর্যন্ত আয়াতে কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি কথা

রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর বিভিন্ন উপায়ে অহী আসত। আল্লামা ইবনে কাইয়েম তাঁর ‘যাদুল মা’আদ’ গ্রন্থে নিম্নোক্তভাবে এর বিস্তারিত বর্ণনা পেশ করেছেনঃ

একঃ সত্য স্বপ্নঃ এটি ছিল রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর অহী নাযিলের প্রাথমিক অবস্থা। তিনি যেসব স্বপ্ন দেখতেন তা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট ছিল।

দুইঃ তাঁর দিলের মধ্যে ফেরেশতা একটি কথা বদ্ধমূল করে দিত। অথচ তাকে দেখতে পেতেন না। উদাহরণ স্বরূপ একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়, যাতে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, রুহুল কুদুস (জিবরাঈল) আমার মনের মধ্যে এ কথা নিক্ষেপ করেছে (অথবা ফুঁকে দিয়েছে) যে নিজের অংশের সম্পূর্ণ রেজেক লাভ না করা পর্যন্ত কোনো প্রাণী মরবে না। কাজেই আল্লাহকে ভয় করে কাজ কর এবং খাদ্য সংগ্রহের জন্যে ভাল পদ্ধতি অবলম্বন কর। আর খাদ্য লাভের ক্ষেত্রে বিলম্ব দেখে তুমি যেন আল্লহার নাফরমানীর মাধ্যমে তা সংগ্রহে উদ্যোগী হয়ো না। কারণ আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে (অর্থাৎ তাঁর পুরস্কার) তা কেবল তাঁর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমেই অর্জন করা যেতে পারে।

তিনঃ ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণ করে তাঁর সামনে এসে কথা বলত এবং ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে থাকত যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার কথা পুরোপুরি মনের মধ্যে গেঁথে নিতে না পারতেন। অবস্থায় কখনও সাহাবাগণ ঐ ফেরেশতাকে দেখে নিয়েছেন।

চারঃ অহী নাযিল হবার পূর্বে তাঁর কানে একটা ঘন্টা বাজতে থাকত এবং এ সঙ্গে ফেরেশতাও কথাব লতে থাকত। এটিই ছিল অহী নাযিলের কঠিনতম পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে অহী নাযিলের সময় প্রচণ্ড শীতের দিনেও রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ত। তখন তিনি উটের পিঠে চড়ে থাকলে বোজার ভারে উট বসে পড়ত। একবার তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রা)-এর উরুতে মাথা রেখে শুয়েছিলেন এমন সময় অহী নাযিল হতে থাকে। হযরত যাদেয় (রা)-এর উরুতে এত বেশী চাপ পড়ে যে, তা ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়।

পাঁচঃ আল্লাহ যে আকৃতিতে ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি সেই আসল আকৃতিতে তাকে দেখতেন। তারপর আল্লাহ যা কিছু হুকুম করতেন তা তাঁর ওপর অহীর আকারে নাযিল করতেন।

ছয়ঃ সরাসরি আল্লাহ তাঁর ওপর অহী নাযিল করেন। তিনি মি’রাজে আসমানে গেলে এ কার্য সংঘটিত হয়। আল্লাহ সেখানে নামায ফরয করেন এবং অন্যান্য কথাও বলেন।

সাতঃ ফেরেশতাদের মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহ তাঁর সাথে আলাপ করেন। যেমন মূসা আলাইহিস সালামের সাথে করেছিলেন। হযরত মূসা (আ)-এর এ মর্যাদা কুরআন  থেকে প্রমাণিত। আর রসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যাপারে এর উল্লেখ মিরাজ সংক্রান্ত হাদীসে পাওয়া যায়।

এ ছাড়াও কেউ কেউ আর একটি উপায়ও বর্ণনা করেছেন। তা হচ্ছে, “আল্লাহ অন্তরাল বিহীন অবস্থায় তাঁর সাথে কথা বলেছেন। এটা হচ্ছে তাদের বক্তব্য যারা বিশ্বাস করেন রসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহকে দেখেছিলেন। কিন্তু এ প্রশ্নে পূববর্তী ও পরবর্তী আলেমগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে”।–(যাদুল মা’আদঃ ১ম খণ্ড, ২৪-২৫ পৃঃ)।

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী তাঁর ইতকান গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সম্পূর্ণ একটি অধ্যায় এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন। তাঁর আলোচনার সংক্ষিপ্ত সার নীচে দেয়া হলঃ

“চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবী হলে প্রথম তিন বছর ইসরাফীল তাঁর শিক্ষা প্রশিক্ষণের কাজে নিযুক্ত থাকেন। তাঁর মাধ্যমে কুরআনের কোনো অংশ নাযিল হয়নি। অতপর জিবরাঈল অহী আনার কাজে নিযুক্ত হন। তিনি ২০ বছর পর্যন্ত কুরআন আনতে থাকেন। নিম্নোক্তভাবে অহী আসতে থাকে।

একঃ কানে ঘন্টা বাজতে থাকতো, তারপর ফেরেশতার ধ্বনি ভেসে আসতো। এ পদ্ধতির সুবিধে ছিল এই যে, ঘন্টা ধ্বনির সাথে সাথেই রসূলুল্লাহ (সা) সব দিক থেকে দৃষ্টি ও মন ফিরিয়ে এনে একমাত্র ফেরেশতার ধ্বনির প্রতি মনোনিবেশ করতে পারতেন। রসূলুল্রাহ (সা) বলেন, এ পদ্ধতিটি ছিল তাঁর জন্যে সবচেয়ে কঠিন।

দুইঃ তাঁর মনে ও দিলে একটি কথা বদ্ধমূল করে দেয়া হত, যেমন তিনি নিজে বলেছেন।

তিনঃ ফেরেশতা মানুসের বেশ ধরে এসে তাঁর সাথে কথা বলতো নবী করীম (সা) বলেন, অহীল এ পদ্ধতি আমার জন্যে সবচেয়ে সহজ ও হালকা হত।

চারঃ ফেরেশতা স্বপ্নের মধ্যে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলত।

পাঁচঃ আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শয়নে বা জাগরণে যে কোনো অবস্থায় সরাসরি কথা বলতেন।

আল্লাহর অহী হবার ব্যাপারে কুরআনে চ্যালেঞ্জ

নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বের চল্লিশ বছরের জীবনে রসূলুল্লাহ (সা) এমন কোনো শিক্ষা, অনুশীলন ও সংসর্গ লাভ করেননি যার ফলে তিনি তথ্যের বিপুল ভাণ্ডার লাভ করতে পারতেন, যার ঝর্ণাধারা নবুয়াত দাবীর সাথে সাথে হঠাৎ তাঁর কণ্ঠ থেকে প্রবাহিত হতে শুরু হয়েছিল। এখন কুরআনের একের পর এক সূরায় যেসব বিষয়ের আলোচনা আসছিল লোকেরা ইতিপূর্বে কোনোদিন তাঁকে সেসব বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করতে, আলোচনা করতে এবং ঐ ধরনের চিন্তাধারা প্রকাশ করতে দেখেনি। এমনকি এই চল্লিশ বছর বয়ঃসীমার কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং কোনো নিকটাত্মীয়ও তাঁর চালচলন ও কথাবার্তায় এমন কোনে জিনিস অনুভব করেনি যাকে ঐ মহান দাওয়াতের ভূমিকা বা পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তাঁর নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত নয় বরং বাইর থেকে তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮০ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! তুমি সে সময় পশ্চিম কোণে উপস্থিত ছিলে না যখন আমি মূসাকে শরীয়াতের এ ফরমান দিয়েছিলাম। এবং তুমি তা প্রত্যক্ষও করনি। বরং তারপর (তোমার যুগ পর্যন্ত) আমি বহু বংশের উত্থান ঘটিয়েছি এবং তাদের ওপর বহু যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। তুমি মাদায়েনবাসীদের মধ্যেও উপস্থিত ছিলে না যাতে তাদেরকে আর তুমি তূরের পার্শ্বদেশেও সে সময় ছিলে না, যখন আমি (মূসাকে প্রথমবার) আহবান করেছিলাম। কিন্তু এ হচ্ছে তোমার রবের রহমত (যে তোমাকে এ তথ্য সরবহার করা হচ্ছে) যাতে তুমি তাদেরকে সতর্ক করতে পার, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। এর ফলে তাদের জ্ঞান ফিরে আসতে পারে”।

-(সূরা আর কাসাসঃ ৪৪-৪৬)

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়াতের প্রমাণ স্বরূপ এ তিনটি কথা পেশ করা হয়েছে। যে সময় এ কথাগুরো বলা হয়েছিল সে সময় মক্কার সরদারগণ ও সাধারণ কাফের সমাজ কোনো না কোনো প্রকারে তাঁকে অ-নবী এবং নাউযুবিল্লাহ নবুয়াতের মিথ্যা দাবীদার প্রমাণ করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিল। তাদেরকে সাহায্য করার জন্যে ছিল হেজাযের বিভিন্ন স্থানে ইহুদী ওলামা ও ঈসায়ী যাজক সমাজ। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহাশূন্য থেকে এসে এ কুরআন শুনাচ্ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেম মক্কারই অধিবাসী। তাঁর জীবনের কোনো একটি দিকও তাঁর নিজের শহরের ও গোত্রের লোকদের দৃষ্টির অগোচরে ছিল না। এ কারণেই মক্কা, হেজায ও সারা আরব উপদ্বীপের কোনো এক ব্যক্তিও আজদের প্রাচ্যবিদদের ন্যায় এ ধরনের বাজে কথা বলার সাহস করেনি। যদিও মিথ্যা বলার ও মনগড়া দাবী উপস্থাপন করার ব্যাপারে তারা এদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না কিন্তু দিনদুপুরে এ ধরনের ডাহা মিথ্যা তারা কেমন করেই বা বলতে পারত, যা এক মুহুর্তের জন্যেও কেউ বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল না। তারা কেমন করেই বা বলত, হে মুহাম্মদ, তুমি উমুক ইহুদী আলেম ও খৃষ্টান যাজকদের নিকট থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করে এনেছো। কারণ এ উদ্দেশ্যে সারাদেশ থেকে তারা কোনো এক ব্যক্তির নামও উচ্চারণ করতে পারত না। এ প্রসঙ্গে তারা কারোর নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা প্রমাণ হয়ে যেত যে, রসূলুল্লাহ (সা) তার কাছ থেকে কোনো তথ্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য গ্রন্থাদির একটি বিরাট লাইব্রেরী তোমার নিকট আছে। উক্ত লাইব্রেরীর সংরক্ষিত পুস্তকাদির সাহায্যে তুমি এসব বক্তৃতা দিয়ে চলছ। কারণ লাইব্রের তো দূরের কথা, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারে কাছে কোথাও একটি কাগজের টুকরাও তারা বের করতে পারত না যাতে এ তথ্যগুলো লিখিত রয়েছে। মক্কার ছেলে-বুড়ো সবাই জানত যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লেখাপড়া জানেন না। কেউ এ কথাও বলতে পারত না যে, তিনি কয়েকজন দোভাষী রেখেছিলেন, তারা হিব্রু, ল্যাটিন ও সুরইয়ানী ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদির অনুবাদ করে তাঁকে দিত। এমনকি তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে

নির্লজ্জ ব্যক্তিও এ দাবী করার সাহস রাখত না যে, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের কোনো খৃষ্টান পাদ্রী বা ইহুদী আলেমের সাথে কোনো আলোচনা করে থাকতেন, তাহলে রোমান সরকার তিলকে তাল বানিয়ে সটান অপপ্রচারে নেমে পড়ত এবং এ কথা প্রচার করতে একটুও দ্বিধা করত না যে, নাউযুবিল্লাহ মুহাম্মদ সবকিছু এখান থেকেই শিখে নিয়ে মক্কায় গিয়ে নবীর ভেক ধরেছিল। কাজেই দেখা যাচ্ছে, যে যুগে কুরআনের চ্যালেঞ্জ মুশরিক-কুরাইশদের জন্যে মৃত্যুর পয়গাম বহন করে আনত এবং তাকে মিথ্যা সপ্রমান করার প্রয়োজনীয়তা বর্তমান যুগের প্রাচ্যবিদদের তুলনায় তাদের জন্যে ছিল অনেক বেশী, সে যুগে কোনো এক ব্যক্তি কোথাও থেকে এমন কোনো কথ্য সংগ্রহ করে আনতে পারেনি, যা থেকে একথা প্রমাণ করা যায় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অহী ছাড়া ঐ তথ্যাবলী সংগ্রহ করার দ্বিতীয় কোনো মাধ্যম ছিল এবং সে মাধ্যমটিকে তারা চিহ্নিত করতেও সক্ষম হয়েছিল।

এ কথাও জেনে রাখা উচিত যে, কুরআন মাত্র এই এক জায়গায় এ চ্যালেঞ্জ করেনি। বরং বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কাহিনী বিবৃতি করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮২ পৃষ্ঠায়)

“এ হচ্ছে গায়েবের খবর, যা আমি তোমাকে দিচ্ছি অহীর মাধ্যমে। তুমি তাদের আশেপপাশে কোথাও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা মরিয়মের লালন পালন কে করবে এ ব্যাপারটি স্থিরিকৃত করার জন্যে লটারী করছিল। আর তুমি তখনও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা ঝগড়া করছিল”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৪৪)।

হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮২ পৃষ্ঠায়)

“এ হচ্ছে গায়েবের খবর, যা আমি অহীর মাধ্যমে তোমাকে জানাচ্ছি। তুমি তাদের (অর্থাৎ ইউসুফের ভাইদের) আশেপাশে কোথাও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিল এবং যখন তারা নিজেদের কৌশল খাটাচ্ছিল”।

অনুরূপভাবে হযরত নূহের বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮২ পৃষ্ঠায়)

“এ হচ্ছে গায়েবের খবর, যা আমি অহীর মাধ্যমে তোমাকে জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তুমি ও তোমার জাতি এ সম্পর্কে কিছুই জানতে না”।–(সূরা হুদঃ ৪৯)।

এ বিষয়টি বারবার উল্লেখ করায় এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কুরআন মজীদে নিজের আল্লাহর কিতাব হবার এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আল্লাহর রসূল হবার স্বপক্ষে যেসব বড় বড় প্রমাণ পেশ করে আসছিল তার মধ্যে একটি প্রমাণ ছিল এইযে, শত শত হাজার হাজার বছর আগেকার ঘটনাবলীর যে বিস্তারিত বিবরণ একজন নিরক্ষর ব্যক্তির মুখে শ্রুত হচ্ছে, অহ ছাড়া তাঁর এ তথ্য-জ্ঞানের দ্বিতীয় কোনো মাধ্যম তাঁর কাছে নেই। যেসব কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমসাময়িক লোকেরা তাঁকে আল্লাহর সত্য নবী এবং তাঁর ওপর অহী অবতীর্ণ হয় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল এটি ছিল সেই গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর অন্যতম। সে যুগে ইসলাম আন্দোলনের বিরুদ্ধবাদীদের জন্যে এ চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়া কত যে বেশী গুরুত্বের অধিকারী ছিল এবং এর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্যে তারা কোনো প্রকার চেষ্টার ত্রুটি করেনি, একথা যে কেউ সহজেই অনুমান করতে পারে। উপরন্তু এ কথাও সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে, এ চ্যালেঞ্জের মধ্যে যদি সামান্য কোনো প্রকার দুর্বলতা থাকত তাহলে একে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যে এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সংগ্রহ করা সমকালীন লোকদের পক্ষে মোটেই কঠিন ছিল না।

বৃষ্টির সাথে অহীর তুলনা

কুরআনের দু’টি স্থানে নবী করীম (সা)-এর ওপর অবতীর্ণ রহমতের বারিধারার সাথে তুলনা করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়ঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৩ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন আর প্রত্যেক নদী-নালা নিজের গ্রহণ ক্ষমতা অনুযায়ী তাকে গ্রহণ করে প্রবাহিত হয়েছে”।–(সূরা আর রা’আদঃ ১৭)

এ উপমায় রসূলুল্লাহর ওপর অবতীর্ণ অহীকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে আর ঈমান আনয়নকারী ভারসাম্যপূর্ণ অধিকারী লোকদেরকে তুলনা করা হয়েছে এমন সব নদী-নালার সাথে যেগুলো রহমতের বারিধারার কানায় কানায় ভরপুর হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষীয়তরা যে হৈ-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে রেখেছিল তাকে এমন ফেনাপুঞ্জ ও খড়কুটোর সাথে তুলনা করা হয়েছে যা সর্বদা বন্যার প্রবাহের সাথে পানির উপরিভাবে উঠে এসে বিপুর গর্জন সহকারে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দেয়।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৩ পৃষ্ঠায়)

“তুমি কি দেখছ না, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তার বদৌলতে ভূমি সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে?”-(সূরা আল হাজ্বঃ ৬৩)

এখানেও বাহ্যিক অর্থের একটি ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে। বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে নিছক আল্রাহর কুদরাত বর্ণনা করা। কিন্তু এর মধ্যে যে সুক্ষ্ম ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে তা হচ্ছে, আল্লাহ যে বৃষ্টিবর্ষণ করেন তার একটি ফোঁটা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই যেমন তোমরা দেখতে পাও শুষ্ক অনাবাদি জমিতে হঠা৭ চতুর্দিকে সবুজের সমরোহ, ঠিক তেমনি আজ অহীর আকারে আল্লাহর রহমতের যে বারিধারা বর্ষিত হচ্ছে তা শিঘ্রই তোমাদের সামনে এমনই একটি দৃশ্যের অবতারনা করবে। অর্থাৎ আরবের এ শুষ্ক অনুর্বর মরু এলাকা শিঘ্রই জ্ঞান, নৈতিকতা, চরিত্র ও সৎ সংস্কৃতির এমন এক গুলবাগে পরিণত হবে ইতিপূর্বে মানবেতিহাসে যার কোনো নজীর ছিল না।

রসূলের ওপর অবতীর্ণ অহী আল্লাহর রহমত

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৩ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার জাতি! ভেবে দেখ, আমি রবের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট সাক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলাম, তারপর তিনি নিজের পক্ষ থেকে আমার ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেছেন”।–(সূরা হুদঃ ২৮)

এ কথাটিই আগের রুকূ’তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্রামের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে আমি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহর নিশানীসমূহ দেখে তাওহীদের নিগূঢ় তত্ত্বের মর্মোদ্ধার করেছিলাম। তারপর আল্লাহ নিজের রহমত (অর্থাৎ অহী) আমার ওপর বর্ষণ করলেন এবং আমার মন-প্রাণ পূর্ব থেকে যেসব সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে আসছিল তিনি  আমাকে সরাসরি সেগুরোর জ্ঞানদান করলেন। এ থেকে এ কথাও জানা গেল যে, নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বে প্রত্যেক নবী নিজের চিন্তা, অনুসন্ধান ও নিরীক্ষার মাধ্যমে গায়েবের ওপর ঈমান লাভ করতেন। অতপর আল্লাহ তাঁদেরকে নবুয়াতের মর্যাদা দান করার সময় প্রত্যক্ষ বা চাক্ষুষ ঈমান দান করতেন।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৪ পৃষ্ঠায়)

“সালেহ বললোঃ হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা কি একতা চিন্তা করছ, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট সাক্ষ্য রাখতাম এবং তিনি আমার ওপর তাঁর রহমতও বর্ষণ করতেন”।–(সূরা হুদঃ ৬৩)।

রসূলের অহীর জন্যে রূহ শব্দের ব্যবহার

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৪ পৃষ্ঠায়)

“তিনি এই রূপ বা প্রাণসত্তাকে নিজের যে বান্দার ওপর চান নিজের হুকুমে ফেরেশতাদের মাধ্যমে নাযিল করে দেন (এ হেদায়াত সহকারে যে, লোকদেরকে) জানিয়ে দাও, আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন মাবুদ নেই, কাজেই তোমরা আমাকে ভয় কর”।–(সূরা আন নাহলঃ ২)

ওপরে বর্ণিত রূহের অর্থ নবুয়াতের প্রাণসত্তা, যাতে ভরপুর হয়ে নবী কাজ করেন ও কথা বলেন। এ অহী ও নবুয়াতের প্রাণসত্তা নৈতিক জীবনে এমনি এক গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী যেমন পার্থিব জীবনে প্রাণের গুরুত্ব ও মর্যাদাঃ এ জন্যে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ অর্থ প্রকাশের জন্যে রূহঃ (প্রাণসত্তা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৪ পৃষ্ঠায়)

“এরা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। (এদেরকে) বলে দাও, রূহ আসে আমার রবের হুকুমে। কিন্তু তোমরা জ্ঞানের অতি অল্প অংশই লাভ করছ”।

-(সূরা বনি ইসরাইলঃ ৮৫)

সাধারণভাবে মনে করা হয়, এখানে রূহ অর্থ প্রাণ। অর্থাৎ লোকেরা রসূলুল্লাহ (সা)-কে জীবন প্রাণের তাৎপর্য জানার জন্যে প্রশ্ন করেছিল। আর এর জবাবে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহর হুকুমে আসে। কিন্তু এ অর্থ মেনে নিতে আমি একেবারেই প্রস্তুত নই। কারণ একমাত্র পূর্বাপর আলোচনা পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ আয়াতটিকে একটি পৃথক ও একক বাক্যরূপে গ্রহণ করার পরই এ অর্থ করা সম্ভব। অন্যথায় যে প্রসঙ্গের আলোচনা এখানে চলছিল তার মধ্যে রেখে বিচার করলে রূহকে প্রাণশব্দের প্রতিশব্দ অর্থে গ্রহণ করায় বিপত্তি দেখা দেবে অনেক বেশী। বাক্যের মধ্যে মারাত্মক অসংলগ্নতা দেখা দেবে। যেখানে পূর্ববর্তী তিনটি আয়াতে কুরআনকে বর্ণনা করা হয়েছে রোগ মুক্তির ব্যবস্থাপত্র হিসেবে এবং কুরআন অস্বীকারকারীদেরকে জালেম, অকৃতজ্ঞ ও আল্লাহর দান অস্বীকারকারীরূপে চিত্রিত করা হয়েছে এবং যেখানে আবর পরের আয়াতগুলোতে কুরআনের আল্লাহর কালাম হবার স্বপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, সেখানে জীবদের মধ্যে প্রাণসঞ্জার হয় আল্লাহর হুকুমে –এ ধরনের বাক্য হঠাৎ মাঝখানে কিভাবে আসতে পারে? এর কোনো যক্তিসঙ্গ কারণ অনুধাবন করতে আমি অক্ষম।

বাক্যের পূর্বাপর আলোচনা পরস্পরাকে সামনে রেখে বিচার করলে পরিস্কার অনুভূত হবে যে, এখানে রূহ অর্থ ‘অহী’ অথবা ‘অহী বহনকারী ফেরেশতা’ ছাড়া অন্যকিছুই হতে পারে না। আসলে মুশরিকদের প্রশ্ন ছিল, তোমরা এ কুরআন কোথায় থেকে আনছো? এর জবাবে আল্লাহ বললেনঃ হে মুহাম্মদ! তোমাকে লোকেরা রূহ অর্থাৎ কুরআনের উৎস বা কুরআন লাভের মাধ্যম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তাদেরকে জানিয়ে দাও, এ রূহ আসে আমার রবের নির্দেশে। কিন্তু তোমরা এত স্বল্প পরিমাণ জ্ঞান রাখো, যার ফলে তোমরা মানুষের মুখের কথা ও আল্লাহর অহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত কথার পার্থক্য বুঝতে পারো না এবং আল্লাহর কালাম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে থাকো যে, কোনো মানুস এ কালাম তৈরী করছে।

এ ব্যাখ্যা কেবল এ জন্যেই অগ্রগণ্য নয় যে, পূর্বাপর বক্তব্যের সাথে আয়াতের সম্পর্ক এখানে এ ব্যাখ্যাই দাবী করে বরং কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানেও এ বিষয়বস্তুটি প্রায় এই একই শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা মুমিনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৫ পৃষ্ঠায়)

“তিনি নিজের হুকুমে নিজের যে বান্দার ওপর চান রূহ নাযিল করেন, যাতে লোকদেরকে একত্রিত হবার দিনটি সম্পর্কে অবহিত করতে পারেন”।–(আয়াতঃ ১৫)

এবং সূরা শূরায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৫ পৃষ্ঠায়)

“আর এভাবেই আমি তোমার দিকে নিজের হুকুমে একটি রূহ পাঠালাম, তুমি জানতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি”।–(সূরা শূরাঃ ৫২)

পূর্ববর্তী মনীষীগণের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা), কাতাদাহ (রা) ও হাসান বসরী (রা) এই তাফসীর বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর এ বক্তব্যটি কাতাদার বরাত দিয়ে ইবনে আব্বাসের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। কিন্তু তিনি একটি অদ্ভূত কথা লিখেছেন যে, ইবনে আব্বাস এ কথাটি গোপনে বর্ণনা করতেন। রহুল মা’আনী তাফসীর গ্রন্থের লেখক হাসানও কাতাদার এ কতাটি উদ্ধৃতি করেছেন যে, “রূহ বলতে জিবরাঈল (আ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর প্রশ্ন ছিল, তিনি কেমন করে নাযিল হন এবং কেমন করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে অহী নাযিল হয়।

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৫ পৃষ্ঠায়)

“আর এভাবে (হে মুহাম্মদ)! আমি নিজের হুকুমে একটি রূহ তোমর দিকে পাঠিয়ে দিয়েছি”।–(সূরা আশ শূরাঃ ৫২)

রূহ বলতে এখানে অহী বা এমন শিক্ষাকে বুঝানো হয়েছে যা অহীর মাধ্যমে রসূলুল্লাহ (সা)-কে দান করা হয়েছিল।

অহী হিসেবে অবতীর্ণ বাণীর পক্ষে যুক্তি-প্রমাণাদি

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যে বাণী অবতীর্ণ হয় তা মূলত আল্লাহরই বাণী। এ সত্যটি প্রমাণ করার জন্যে কুরআনের সাক্ষ্য হিসেবে চারটি কথা পেশ করা হয়েছে।

একঃ এ গ্রন্থটি বিপুল কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি সাধনার্থে এতে সর্বোত্তম নীতি সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে আছে নির্ভুল আকীদা-বিশ্বাসের শিক্ষা। সৎকাজের উদ্দীপনা সৃষ্টি ও উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী অবলম্বনের নির্দেশ এর অঙ্গীভূত। পুত-পবিত্র জীবনযাপনের বিধান এর বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে মূর্খতা, স্বার্থান্ধতা, সংকীর্ণতা, যুলুম, অন্যায়, অশ্লীলতা ও অন্যান্য অসৎ কাজ –যেগুলো তোমরা পবিত্র আসমানী কিতাবগুলোর মধ্যে স্তূপিকৃত করে রেখে দিয়েছো –সেসব থেকে এ গ্রন্থটি সম্পূর্ণ মুক্ত।

দুইঃ এর আগে আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব হেদায়াতনামা এসেছিল এ গ্রন্থটি তার থেকে আলাদা কোনো হেদায়াত পেশ করে না। বরং সেই আগের গ্রন্থগুলোর মধ্যে যা কিছু পেশ করা হয়েছিল তার সত্যতা প্রমাণ করে বা তার প্রতি সমর্থন যোগায়।

তিনঃ প্রত্যেক যুগে যে উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানী গ্রন্থগুরো নাযিল করা হয়েছিল এ গ্রন্থটিও সেই একই উদ্দেম্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ উদ্দেশ্যটি ছিল গাফেল লোকদেরকে সজাগ করে দেয়া এবং ভুল ও বক্র পথে অগ্রসর হবার পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে অবগত করানো।

চারঃ এ গ্রন্থটি তার দাওয়াতের মাধ্যমে দুনিয়াপূজারী ও প্রবৃত্তির দাসদেরকে একত্রিত করেনি। বরং এমন সব লোকদেরকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ করেছে, যাদের দৃষ্টি পার্থিব জীবনের সংকীর্ণ সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আবার এ গ্রন্থের প্রভাবে তাদের মধ্যে এমন এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে যার সবচেয়ে বড় চিহ্ন হচ্ছে, মানব জাতির মধ্যে আল্লাহ পরস্তির দিক দিয়ে তারা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। কোনো ভণ্ড ও মিথ্যুকের লেখা গ্রন্থ যা সে নিজে রচনা করে আল্লাহর রচিত বলে দাবী করার মতো জঘন্যতম অপরাধ করার দুঃসাহস করে কি কোনো দিন এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ও ফলাফলের অধিকারী হতে পারে।

অধ্যায়ঃ ৩ – নবুয়াতে মুহাম্মদী (সা)-এর প্রয়োজন ও তার প্রমাণ

পূর্ববর্তী নবীগণের পরে রসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রেরন করার কারণ

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৯ পৃষ্ঠায়)

“আর প্রকৃতপক্ষে অতীদের লোকদের পরে যাদেরকে কিতাবের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তারা তার পক্ষ থেকে অস্বস্তিকর সন্দেহের মধ্যে পড়ে রয়েছে”। -(সূরা আশ শূরাঃ ১৪)

প্রত্যেক নবী ও তাঁর নিকটবর্তী তাবেয়ীগণের যুগে অতিক্রান্তের পর পরবর্তী বংশধরদের নিকট আল্লাহর কিতাব পৌঁছলে তারা আস্থা ও প্রত্যয়ের সাথে তা গ্রহণ করেনি। বরং সে সম্পর্কে তারা ভীষণ রকমের সংশয় ও মানসিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে বহুবিধ কারণ ছিল। তাওরাত ও ইঞ্জীলের ব্যাপারে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা অধ্যয়নের পর আমরা এ কারণগুলো অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারি। পূর্ববর্তী বংশধররা এ কিতাব দু’টিকে তাদের আসল ভাষা ও বর্ণনা অপরিবর্তিত রেখে এবং মূল কালামের সাথে ব্যাখ্যা, ইতিহাস, কানে শুনা বিভিন্ন বর্ণনা ও ফকীহগণ উদ্ভাবিত আনুসংগিক বিষয়াবলীর আকারে মানুষের কথাও মিশ্রিত করে দেয়। তাদের অনুবাদগুলোকে এতবেশী ছড়ায় যার ফলে মূল অদৃশ্য হয়ে যায় এবং কেবল অনুবাদগুলোই লোক সমক্ষে থেকে যায়। এগুলোর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতাও এমনভাবে নষ্ট করে দেয়া হয় যার ফলে আজ কোনো ব্যক্তি পূর্ণ প্রত্যয় সহকারে এ কথা বলতে পারে না যে, হযরত ঈসা (আ) বা হযরত মূসা (আ)-এর ওপর দুনিয়াবাসীদের জন্যে যে কিতাব নাযিল করা হয়েছিল তার হাতে যে কিতাবটি রয়েছে সেটিও সেই আসল কিতাব। তাদের নেতৃবর্গ ও মনীষীবৃন্দ মাঝে মাঝে ধর্ম, আল্লাহ, দর্শন, আইন, দেহ, আত্মা ও সমাজ সম্পর্কে এমন সব আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন এবং এমন সব চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন যার গোলক ধাঁধাঁয় আটকা পড়ে হাজারো জটিল পথগুলোর মধ্য থেকে সত্যের সরল সোজা পথটি বেছে নেয়া মানুষের জন্যে অসম্ভব রকমের কঠিন হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে আল্লাহর কিতাবও তার আসল আকৃতিতে ও নির্ভরযোগ্য অবস্থায় বিদ্যমান ছিল না। কাজেই লোকদের জন্যে এমন কোন নির্ভযোগ্য সূত্রের দিকেও দৃষ্টিপাত করা সম্ভব ছিল না, যা হককে বাতিল থেকে আলাদা করার জন্যে তাদেরকে সাহায্য করতে পারতো।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, আরব ভূখণ্ডে হযরত হুদ (আ) ও হযরত সালেহ (আ)-এর মাধ্যমে সর্বপ্রথম সত্য দ্বীনের দাওয়াত এসে পৌঁছেছিল। এটা ছিল প্রাক ঐতিহাসিক যুগের ঘটনা। তাপর এলেন হযরত ইবরাহীম (আ) ও ইসমাঈল (আ)। তাঁরা এসেছিলেন রসূলে করীম (সা)-এর আড়াই হাজার বছর আগে। তাঁদের পরে এবং রাসূলে করীম (সা)-এর পূর্বে আরব ভূখণ্ডে যে সর্বশেষ নবী এসেছিলেন তিনি ছিলেন হযরত শোআইব আলাইহিস সালাম।

আরববাসীরা পূর্ব থেকেই একজন নবীর দাবী জানিয়ে আসছিল

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“এরা বড় বড় কসম খেয়ে বলতো যদি কোনো সতর্ককারী তাদের এখানে আসতো, তাহলে তারা দুনিয়ার সকল জাতির চেয়ে বেশী সত্যপথাবলম্বী হতো”।

-(সূরা আল ফাতেরঃ ৪২)

রসূলে করীম (সা)-এর নবুয়াত লাভের পূর্বে ইহুদী ও খৃষ্টানদের বিকৃত নৈতিক অবস্থা দেখে আরবের লোকেরা সাধারণভাবে এবং কুরাইশরা বিশেষভাবে এ কথা বলতো।

অনুরূপভাবে সূরা আন’আমে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“এ কিতাব আসার পর এখন তোমরা এ কথা বলতে পারো না যে, আমাদের আগের দু’টি দলকে তো কিতাব দেয়া হয়েছিল আর তারা কি পড়তো বা পড়াতো তা আমাদের জানা ছিল না। আর এখন তোমরা এ বাহানাবাজীও করতে পারো না যে, আমাদের ওপর কিতাব নাযিল করা হলে আমরা তাদের চেয়ে বেশী সত্যপথাবলম্বী প্রমাণিত হতাম”।–(সূরা আল আন’আমঃ ১৫৬-১৫৭)

সূরা আস সাফফাতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“এরা প্রথমে একথা বলে বেড়াতো যে, হায় আমাদের কাছে যদি সেই ‘যিকর’ থাকতো যা আগের জাতিরা লাভ করেছিল তাহলে আমরা আল্লাহর একান্ত নিষ্ঠাবান বান্দাই হতাম”।–(সূরা আস সাফফাতঃ ১৬৭-১৬৯)

একটি উজ্জ্বল প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল (তার নিজেদের কুফরী থেকে) বিরত থাকার লোক ছিল না, যতক্ষণ না তাদের নিকট উজ্জ্বল প্রমাণ আসে (অর্থাৎ) আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল আসেন যিনি পবিত্র সহীফা পড়ে শুনান”।–(সূরা আল বাইয়েনাহঃ ১-২)

অর্থাৎ একটি উজ্জ্বল প্রমাণ এসে তাদেরকে কুফরীর প্রত্যেকটি অবস্থার ভ্রান্তি ও তার সত্য বিরোধী হবার বিষয়টি বুঝিয়ে দেবে এবং সরল ও নির্ভুল পথটি সুস্পষ্টভাবে ও যুক্তিসংগত পদ্ধতিতে তাদের সামনে তুলে ধরবে, এ ছাড়া কুফরীর অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার দ্বিতীয় কোনো পথ তাদের কাছে ছিল না। এর অর্থ এ নয় যে, এই সুস্পষ্ট প্রমাণটি এসে গেলেই তারা সবাই কুফরী পরিহার করবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে এ প্রমাণটির অবর্তমানে তাদের পক্ষে এ অবস্থাটির প্রভাব এড়িয়ে বের হয়ে আসা কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। আর এখন এর আগমনের পরও তাদের মধ্য থেকে যারা কুফরীর ওপর অবিচল থাকবে তার জন্যে তারা নিজেরাই দায়ী হবে। এপর তারা আল্লাহর নিকট এ বলে অভিযোগ করতে পারবে না যে, তাদের হেদায়াতের জন্যে তিনি কোনো ব্যবস্থা করেননি। কুরআন মজীদে এ কথাটি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরা আন নাহল-এ বলা হয়েছে (আরবী******) “সোজা পথ দেখানো আল্লহার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত”।–(৯ আয়াত) সূরা আল লাইল-এ বলা হয়েছে (আরবী*******) “পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার”।–(১২ আয়াত)

(আরবী******************************পিডিএফ ৯১ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী) আমি তোমর দিকে অহী নাযিল করেছি যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের প্রতি নাযিল করেছিলাম। এ রসূলদেরকে সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারীদের দায়িত্ব দেয়া হয়, যাতে রসূলদের আগমনের পর লোকদের জন্যে আল্লাহর নিকট কোনো ওজর-আপত্তি পেম করা সম্ভব না হয়”।–(সূরা আন নিসাঃ ১৬৩-১৬৫)

(আরবী******************************পিডিএফ ৯১ পৃষ্ঠায়)

“হে আহলে কিতাব! রসূলদের আগমনের ধারাবাহিকতা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর তোমাদের নিকট আমার রসূল এসে গেছেন সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্যে। যাতে তোমরা এ কথা না বলতে পারো যে, তোমাদের কাছে কোনো সুসংবাদদাতা ও কতর্ককারী আসেননি। কাজেই দেখ, এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসে গেছে”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ১৯)

(আরবী******************************পিডিএফ ৯১ পৃষ্ঠায়)

“পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল সত্য পথের বর্ণনা সুস্পষ্ট হবার পরই তাদের মধ্যে বিভেদ এসেছিল”।–(সূরা আল বাইয়েনাহঃ ৪)

অর্থাৎ ইতিপূর্বে আহলে কিতাবগণ নানাপ্রকার গোমরাহীর শিকার হয়ে নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়েছে। আল্লাহ তাদের পথনির্দেশের জন্যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাঠাবার ব্যাপারে কোনো প্রকার প্রচেষ্টার ত্রুটি করেছেন বলেই তাদের এই দশা হয়েছে তা নয়। বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশ আসার পর তারা এ নীতি অবলম্বন করেছিল। তাই তাদের গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার জন্যে তারা নিজেরাই দায়ী ছিল। কারণ তাদের নিকট সত্যকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছিল। অনুরূপভাবে বর্তমানে যেহেতু তাদের গ্রন্থগুলো অবিকৃত নেই, সেগুলো নির্ভুল শিক্ষা সম্বলিত নয়, তাই আল্লাহ একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে নিজের একজন রসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর মাধ্যমে নির্ভুল শিক্ষা সম্বলিত পবিত্র ও অবিকৃত গ্রন্থ দান করে তাদের নিকট সত্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। কাজেই এর পরও যদি তারা বিভেদে লিপ্ত থাকে তাহলে তার সমস্ত দায়িত্ব তাদের নিজেদের ওপর বর্তাবে। আল্লাহকে তারা কোনো প্রকারে দায়ী করতে পারবে না। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ কথা বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ দেখুন সূরা বাকারাহ ২১৩ ও ২৫৩ আয়াত, আলে ইমরান ১৯ আয়াত, মায়েদাহ ১৬-১৮ আয়াত। এ সংগে তাফহীমুল কুরএন সংশ্লিষ্ট সূরাগুলোর ব্যাখ্যা প্রসংগে আমি যে টীকা সংযোজন করেছি সেগুলো এক নজর দেখে নিলে বিষয়টি বুঝতে আরও সহজ হবে।

রসূল পাঠাবার অবশ্যি প্রয়োজন ছিল। কারণ মুশরিক, আহলি কিতাব নির্বিশেষে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যে ধরনের কুফরীতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল তা থেকে তাদের বের হয়ে আসা একজন নবীর সহযোগিতা ছাড়া কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। তাদের এমন একজন নবীর সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল যাঁর নিজের অস্তিত্বই হবে তাঁর রিসালাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ। তিনি মানুষের সামনে আল্লাহর কিতাবকে আসল, অবিকৃত ও নির্ভুল অবস্থায় উপস্থি করবেন। ইতিপূর্বেকার আসমানী গ্রন্থগুলোতে যেসব বাতিলের মিশ্রণ ঘটেছিল সেসব থেকে এ গ্রন্থটি হবে মুক্ত। এ গ্রন্থটিতে ঘটবে কেবলমাত্র সঠিক, নির্ভুল ও যথার্থ সত্য শিক্ষার সমাবেশ।

নবী প্রেরণের স্থান নির্বাচন

পৃথিবীর মানচিত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে নজরেই ধরা পড়বে যে, সারা দুনিয়ার পয়গম্বরীর জন্যে পৃথিবীর বুকে আরব ভূখণ্ডের চেয়ে উপযোগী দ্বিতীয় আর কোনো স্থান নেই এবং হতেও পারে না। এ দেশটি এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের একেবারে মধ্যস্থলে অবস্থিত। ইউরোপও এখান থেকে অনেক নিকটে। বিশেষ করে সে যুগে ইউরোপের সুসভ্য জাতিগুলোর অধিকাংশের বসতি ছিল এ মহাদেশটির দক্ষিণ অংশে। আর এ অঞ্চলটি আরবের ঠিক ততটা নিকটবর্তী ছিল যেমন ছিল তৎকালীন হিন্দুস্তান।

সেকালের ইতিহাস পড়লেও জানা যাবে, এ নবুয়াতের জন্যে সে যুগে আরব জাতির চেয়ে উপযোগী আর কোনো জাতিই ছিল না। অন্য বড় বড় জাতিরা নিজদের শক্তি-প্রভাব-প্রতিপত্তির চূড়ান্ত প্রকাশের পর নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে আরব জাতি ছিল নতুন প্রাণ বন্যায় ভরপুর। সভ্যতা সংস্কৃতির উন্নতির ফলে অন্যান্য জাতির অভ্যাস ও প্রকৃতি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আরব তখনো পর্যন্ত কোনো উন্নত সভ্যতার স্পর্শ থেকে দূরে ছিল। যার ফলে এ জাতিটি বিলাসী, আরামপ্রিয় ও নিকৃষ্ট স্বভাবের অধিকারী ছিল না। ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের আরব সমকালীন সভ্য জাতিগুলোর কুপ্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। সভ্যতার আলো থেকে বহুদূরে অবস্থানরত একটি জাতির মধ্যে যতগুলো মৌলিক মানবিক সৎগুণ থাকতে পারে তার সবগুলোই তাদের মধ্যে ছিল। তারা ছিল সাহসী, নির্ভীক, দানশীল, ওয়াদা পালনকারী, স্বাধীন চিন্তাবৃত্তির অধিকারী ও স্বাধীনচেতা। তারা অন্র কোনো জাতির অধীনতাপাশে আবদ্ধ ছিল না। নিজের মর্যাদা রক্ষার্থে প্রাণ দিয়ে দেয়া তাদের জন্যে ছিল অত্যন্ত সহজ। সরল ও অনাড়ম্ব জীবন প্রণালীই ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য। বিলাসিতা ও আরামপ্রিয়তার সাথে কোন সম্পর্কই তাদের ছিল না। নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অনেকগুলো অসৎগুণও ছিল। কারণ আড়াই হাজার বছর থেকে তাদের এলাকায় কোনো নবী আগমন হয়নি।–[হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর যুগ ছিল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। মাঝখানের এ দীর্ঘ সময়ে আরবে আর কোন নবী জন্মেনি।] এমন কোনো জননায়কের আবির্ভাবও সেখানে হয়নি যিনি তাদের স্বভাব-চরিত্র সংমোধন করে তাদেরকে একটি সুসভ্য জাতিরূপে গড়ে তুলতে পারতেন। শত শত বছর ধরে দিগন্ত প্রসারী ধূ ধূ মরুভূমির বুকে মুক্ত স্বাধীন জীবন যাপন করার কারণে তাদের মধ্যে অজ্ঞতা ও মূর্খতা বিস্তার লাভ করেছিল। তাদের মূর্খতা জমাট বেঁধে এমন শক্ত পাষাণে পরিণত হয়েছিল যে, সে পাসাণ ঘষে মসৃণ করে তাদেরকে মানুষ বানানো কোনো সাধারণ মানুষের কাজ ছিল না। কিন্তু এই সঙ্গে তাদেরম মধ্যে অবশ্যি এমন যোগ্যতা ছিল যার ফলে কোনো অসাধারণ ব্যক্তি তাদের সংশোধন করে দিলে এবং তাঁর শিক্ষার প্রভাবে কোনো উন্নত জীবনাদর্শে উদ্ধুদ্ধ হলে সারা দুনিয়াকে তারা ওলট-পালট করে দিতে পারতো। বিশ্ব নবীর শিক্ষাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে এমনি জীবন রসে পরিপূর্ণ, যৌবনোদ্দীপন্ত শক্তিশালী জাতির প্রয়োজন ছিল।

এরপর ভাষার আলোচনায় আসলেও দেখা যাবে আরবী ভাষার বৈশিষ্ট্য সহজে চোখে পড়ার মত। এ ভাষাটি এবং এর সাহিত্য অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে, উন্নত চিন্তাকে সহজভাবে প্রকাশ করার, আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়গুলো বর্ণনা করার এবং মনের গভীরে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এর চেয়ে উপযোগী আর কোনো ভাষাই নেই। অন্তর্নিহিত প্রচণ্ড শক্তির জোরে হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে তা বিদ্ধ হয় তীরের মত। আর তারা মাধুর্য হয় তুলনাবিহীন। মনে হয় যেন রস উপচিয়ে পড়ছে। সুরের লহরীতে হৃদয়-মন আপ্লুত হয়। কুরআনের ন্যায় কিতাবের জন্যে এমনি একটি ভাষার প্রয়োজন ছিল।

কাজেই বিশ্বনবীর জন্যে আরবের ন্যায় একটি দেশকে নির্বাচিত করার পেছনে আল্লাহর বিরাট উদ্দেশ্য কার্যকর ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

অজ্ঞ জাতির জন্যে সর্বোত্তম নেতা

একটি জাতি শত শত বছর থেকে অজ্ঞতা, মূর্খতা, দুর্দমা ও অবনতির অতল গহবরে মেনে যাচ্ছিল। তারপর অকস্মাৎ একদিন তার ওপর বর্ষিত হল মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ। তার মধ্যে তিনি জন্ম দিলেন তাদের শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম নেতার। তাদেরকে অজ্ঞতার অতলান্ত গহবর থেকে উঠাবার জন্যে ঐ নেতার ওপর অবতীর্ণ করলেন নিজের বাণী।তাদেরকে গাফলতির নিদ্রা থেকে জাগ্রত করা এবং অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের আচ্ছন্নতা মুক্ত করে সত্য-সুন্দর নির্ভুল জীবনের পথে এগিয়ে চলতে সাহায্য করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

কিন্তু জাতির মূর্খ লোকেরা এবং তাদের স্বার্থান্ধ উপজাতীয় সরদাররা নেতার পেছনে উঠেপড়ে লাগে। তাঁকে ব্যর্থ করার জন্যে তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সময় এগিয়ে যেতে থাকে। এমনকি একদিন তারা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ বলেন, তোমাদের বোকামির কারণে আমি কি তোমাদের সংস্কার প্রচেষ্টা রুদ্ধ করে দেবো? উপদেশ প্রদানের এ ধারাবাহিকতা বন্ধ করে দেবো? আর অবনতির যে অতল গহবরে তোমরা নিমজ্জিত ছিরে সেখানে তোমাদেরকে পড়ে থাকতে দেব? এটাই কি আমার রহমতের দাবী হওয়া উচিত বলে তোমরা মনে কর? তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহর অনুগ্রহকে প্রত্যাখ্যান করা এবং হক সামনে এসে যাওয়ার পরও বাতিলকে আঁকড়ে ধরার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর পরিণাম কি হতে পারে?

রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ

কিছুক্ষণের জন্যে চোখ দু’টি বন্ধ করে একবার চিন্তার জগতে বিচরণ করুন। এক হাজার চারশ’ বছর আগের পৃথিবীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখুন। তখনকার পৃথিবীর অবস্থাটা কেমন ছিল?

চৌদ্দশ’ বছর আগের পৃথিবী

সে সময় পৃথিবীর মানুষের পরস্পরের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদানের উপায়-উপকরণ ছিল অতি অল্প। দেশ ও জাতির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম ছিল অত্যন্ত সীমিত। মানুষের জানার পরিধি ছিল অতি সংকীর্ণ। তার চিন্তা ছিল বড়ই অপরিপক্ক। তার মনোরাজ্যে ছিল কুসংস্কার ও ভীতির রাজত্ব। অজ্ঞানতার সূচীভেদ্য অন্ধকারের বুকে জ্ঞানের রেখাটি ছিল ক্ষীণতর। আঁধার সমুদ্রের পর্বত প্রমান ঢেউগুলোকে সরিয়ে আলোর তরংগটি এগিয়ে যাচ্ছিল অতি কষ্টে। সেদিনের পৃথিবীতে টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, রেডিও, রেলগাড়ি ও উড়োজাহাজের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আজকের মত গ্রন্থ প্রকাশনালয় ও ছাপাখানার সন্দান পাওয়া যেত না। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন প্রকার শিক্ষায়তনের প্রাচুর্য ছিল না। তখন খবরের কাগজ ও সাময়িকী কোনো ব্যাপকতর ব্যবস্থা ছিল না। সে যুগের এজন পণ্ডিতের জানার পরিধি কোনো কোকো ক্ষেত্রে আজকের যুগের একজন সাধারণ লোকের তুলনায়ও কম রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান ছিল। সে যুগের একজন অত্যন্ত স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী ব্যক্তিও আজকের একজ সেকেলের চিন্তার অধিকারী ব্যক্তির চেয়ে অধিক সেকেলে চিন্তার ধারক ছিল। আজকের যুগে যেসব কথা সবাই জানে সে যুগের বছরের পর বছর পরিশ্রম, অনুসন্ধান গবেষণার পর বহু কষ্টে তা জানা সম্ভব হত। আজকের যুগের একটি ছোট্ট শিশু জ্ঞানোদয়ের প্রথম মুহুর্তেই তার চারপাশ থেকে যেসব খবর অনায়াসে জেনে নেয় সেগুলোর জন্যে সে যুগে শত শত মাইল সফর করতে হত। এমনকি অনেক সময় ঐ সামান্য তথ্যটুকু আহরণ করার জন্যে সারা জীবন সাধনা করতে হত। আজকের যুগে যেসব বিষয়কে কুসংস্কার ও উদ্ভট পৌরাণিক গালগল্প মনে করা হয় সে যুগে সেগুলোই ছিল “সত্য”। যেসব কাজকে আজকের যুগে অশালীন ও বর্বর বলা তয় সেগুলোই ছিল সে যুগে সাধারণ কাজ। আজ মানুষের বিবেক যেসব পদ্দতিতে ঘৃণা করে সে যুগের নৈতিকতায় সেগুলো কেবল বৈধই ছিল না বরং এর বিপরীত আর কোনো পদ্ধতি হতে পারে –এ কথা কেউ কল্পনাই করতে পারতো না। অলৌকিক বিষয়ের প্রতি মানুষের মোহ এত বেশী ছিল যে, কোনো বস্তু-বিষয় যতক্ষণ না অতিপ্রাকৃতিক, অসাধারণ ও সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হত, ততক্ষণ মানুষ তার সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে প্রস্তুতই হত না। এমনকি মানুষ নিজেকে নিতান্ত দীন, হীন ও তুচ্ছ মনে করত। যার ফলে কোনো মানুষের ওলিআল্লাহ হওয়া বা কোনো ওলিআল্লাহর মানুষ হওয়া তাদের নিকট ছিল অচিন্তনীয় ও কল্পনার অতীত।

আরব দেশের অবস্থা

এই অন্ধকার যুগে পৃথিবীর একটি অংশে অন্ধকার আরও ঘনীভূত ছিল। সে যুগের সভ্যতার মানদণ্ডে দুনিয়ার যেসব দেশ সুসব্য বলে পরিচিত ছিল তাদের মধ্যবর্তী এলাকায় আর বদেশটি সবার থেকে আলাদা হয়ে নিরালায় একাকী অবস্থান করছিল। তার চারপাশে ইরান, রোম ও মিসরে জ্ঞান, শিল্প, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কিছু আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। কিন্তু বিপুলায়তন মরু সমুদ্রগুলো আরবকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। আরব সওদাগরেরা মরুভূমির জাহাজ উটের পিঠে চড়ে মাসের পর মাস সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সেসব দেশে ব্যবসা করতে যেতেন। তারা কেবল পণ্য বিনিময় করেই চলে আসতো। জ্ঞান ও সব্যতার কোনো আলো সংগে করে আনত না। তাদের দেশে কোনো শিক্ষায়তন ছিল না। পাঠাগার ছিল অকল্পনীয়। দেশের জনগণের মধ্যে ছিল না জ্ঞানের চর্চা বা জ্ঞান ও শিল্পের প্রতি কোনো প্রকার আগ্রহ। সারা দেশে হাতে গোণা কয়েকজন লোক পড়ালেখা জানত। কিন্তু তাদেরও লেখাপড়ার পরিধি এতই সীমিত ছিল যে, সে যুগের জ্ঞান ও শিল্পের সাথে তারা চিল একেবারেই অপরিচিত। নিঃসন্দেহে তাদের ভাষাটি ছিল উন্নত পর্যায়ের এবং যে কোন উন্নত চিন্তাকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতাও তার চিল। তাদের মধ্যে উন্নত পর্যায়ের সাহিত্য রুচিরও অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু তাদের সাহিত্যের যতটুকু আমরা জানতে পেরেছি, তা থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে, তাদের জানার পরিধি ছিল অত্যন্ত সীমিত। সভ্যতা সংস্কৃতিতে তাদের স্থান ছিল সর্বনিম্নে। কুসংস্কারে তারা কিভাবে আচ্ছন্ন ছিল। তাদের চিন্তা ও স্বভাব প্রকৃতি ছিলমূর্খতা ও বর্বরতার নগ্ন প্রকাশ। তাদের নৈতিক চিন্তা ছিল একেবারেই বস্তাপচা আস্তাকুঁড়ের সামগ্রী।

সেখানে কোনো নিয়মিত শাসন, শৃংখলা, আইন ও সরকার ছিল না। প্রত্যেক উপজাতি ছিল স্বাধীন। জঙ্গলের আইনই ছিল সেখানে একমাত্র আইন। একজন আরব বেদুঈন এ কথা কোনোক্রমে বুঝতে পারত না যে, যে লোকটি তার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নয় তাকে কেনো মেরে ফেলা হতেব না এবং তার ধন-সম্পদ কেনো হস্তগত করা হবে না?

তারা ছিল নৈতিকতা, শালীনতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির নেহাতই নিম্ন পর্যায়ের ও অস্বচ্ছ চিন্তাধারার অধিকারী। পাক-নাপাক, জায়েয-নাজায়েজ, শালীন-অশালীন ইত্যাদির পার্থক্যের সাথে তারা প্রায় অপরিচিত ছিল। তাদের জীবনধারা ছিল বড়ই কলুষতাময়। তাদের চাল-চলন ছিল নিতান্তই বর্বর ও অমানবিক। ব্যভিচার করা, জুয়া খেলা, মদ পান, রাহাজানি, হত্যা, লুণ্ঠন ছিল তাদের জীবনের নিত্যকার কাজ। তারা একজন অন্যজনের সামনে নির্দ্বিধায় উলঙ্গ হয়ে যেত। তাদের মেয়েরাও উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তওয়াফ করত। কোনো ব্যক্তি যেন তার জামাতা না হতে পারে নিছক এই জাহেলী বশবর্তী হয়ে তারা নিজেদের শিশু কন্যাকে স্বহস্তে জীবিত কবর দিত। তারা পিতার মৃত্যুর পর নিজেদের বিমাতাকে বিয়ে করত। খাওয়া-দাওয়া, লেবাস-পোশাক ও পাক-পরিচ্ছন্নতার সামান্য ছোটখাটো রীতি পদ্ধতিও তারা জানত না।

ধর্মের ব্যাপারে সমকালীন বিশ্বের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতার তারাও সমান অংশীদার ছিল। মূর্তি পূজা, জ্বিন-ভূত, নক্ষত্র পূজা, মোটকথা এক আল্লাহর ইবাদাত ছাড়া সমকালীন বিশ্বের যত প্রকারের পূজার প্রচলন ছিল সবগুলোতেই তারা লিপ্ত ছিল। প্রাচীন যুগের নবীগণ ও তাঁদের শিক্ষা সম্পর্কে কোনো সঠিক জ্ঞান তাদের নিকট ছিল না। হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ) তাদের প্রপিতা এতটুকু তারা জানত ঠিকই কিন্তু তাদের পিতা-পুত্রের ধর্ম কি ছিল এবং তারা কার ইবাদাত করত তা তাদের জানা ছিল না। আদ ও সামুদ জাতির কাহিনীও তারা শুনেছিল। কিন্তু আরব ঐতিহাসিকরা তাদের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা পড়ার পর কোথাও হযরত সালেহ (আ) ও হযরত হুদ (আ)-এর শিক্ষার কোনো নামগন্ধ পাওয়া যাবে না। ইহুদী ও ঈসায়ীদের মাধ্যমে তারা বনী ইসরাঈলের নবীদের কাহিনীও জেনেছিল। কিন্তু সেগুলো কেমনতর কাহিনী ছিল তা জানার জন্য শুধুমাত্র মুসরিম মুফাসসিরগণ লিখিত তফসীর গ্রন্থগুলোয় উদ্ধৃত ইসরাঈলী বর্ণনাগুলো ঘাটলেই বুঝা যাবে। এথেকে জানা যাবে আরববাসীরা এবং বনী ইসরাইলীরা যে নবীদের সম্পর্কে অবগত ছিল তাঁরা কোন ধরনের মানুষ ছিলেন। এই সঙ্গে নবুয়াত সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারাও যে কেমন নিম্নপর্যায়ে ছিল তাও জানা যাবে।

সামনে এলেন এক ব্যক্তি

এ সময় এ দেশে জন্ম হল এক ব্যক্তির। শৈশবেই মা, বাপ ও দাদার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলেন তিনি। তাই এহেন শোচনীয় অবস্থায় একটি আরব শিশু স্বাভাবিকভাবে যে শিক্ষা লাভ করতে পারত তাও তিনি পেলেন না। বুদ্ধি-জ্ঞান হবার পর বেদুইন ছেলেদের সাথে ছাগল চরাতে বের হলেন। যৌবনে পৌঁছে ব্যবসায়ে নেমে পড়লেন। চলাফেরা ওঠাবসা সব ঐ আরবদের সাথে –যাদের অবস্থা একটু আগেই বলে এসেছি। শিক্ষার নামগন্ধই নেই সেখানে। এমনকি সামান্য পড়া লেখাটুকুই তারা জানে না। কোনো শিক্ষিত পণ্ডিত লোকের অস্তিত্বই ছিল না। কয়েকবার আরবের বাইরে যাবার সুযোগ তাঁর হয়েছিল কিন্তু এ সফর কেবলমাত্র সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর তাও ছিল সে যুগের আর দশটি আর কাফেলার মত নেহাতই ব্যবসায়িক সফর। ধরা যাক এ ধরনের সফরের মধ্যে যদি তিনি কিছু জ্ঞান ও সভ্যতার নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করেও থাকেন এবং কিছু জ্ঞানী, গুণী ও সুসভ্য লোকের সাক্ষাত পেয়েও থাকেন তাহলেও এ ধরনের বিক্ষিপ্ত সাক্ষাতকার  ও পর্যবেক্ষণে কোনো মানুষের জীবন গড়ে ওঠে না। এগুলো কোনো ব্যক্তির এপর এত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় না, যার ফলে তিনি নিজের সমাজ-পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও আলাদা হয়ে এক উন্নততর জগতে পৌঁছে যাবেন, যেখানে পৌঁছে যাবার পর তার সাতে তার পরিবেশের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হবে না। এভাবে এমন পর্যায়ের কোনো জ্ঞান অর্জন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না যা একজন অশিক্ষিত বেদুইনকে কোনো একটি দেশের নয়, সারা দুনিয়ার এবং কোনো এক যুগের নয়, সমস্ত যুগের নেতৃত্বে সমাসীন করে। বাইরের লোকদের থেকে তিনি যদি কোনো রকমের তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করেও থাকেন, তাহলে সে সময় দুনিয়ায় যে তথ্য কারো জানা ছিল না, ধর্ম-নৈতিকতা-সভ্যতা-সংস্কৃতির যে চিন্তাধারা ও নীতির কোথাও কোনো অস্তিত্ব ছিল না, এবং মানব চরিত্রের যে আদর্শ তদানীন্তন দুনিয়ার কোথাও বিদ্যমান ছিল না, তা লাভ করার কোনো উপায়ই ছিল না।

তাঁর কর্মকাণ্ড

শুধু আরবের নয়, সারা দুনিয়ার অবস্থা ও পরিবেশ সামনে রাখতে হবে। তাহলে দেখা যাবে, এ ব্যক্তি যাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে শৈশব অতিবাহিত করেন, যাদের সাথে হেসে-খেলে কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেন, যাদের সাথে দিনরাত মেলা-মেশা ও লেনদেন করতে থাকেন, শুরু থেকেই স্বভাবে-চরিত্রে-অভ্যাসে-আচরণে তাদের সবার থেকে আলাদা। তিনি কখনো মিথ্যা বলেন না। সমস্ত জাতি তাঁর সত্যনিষ্ঠার সাক্ষ্য দেয়। তিনি কখনো মিথ্যা বলেছেন তাঁর ঘোরতর শত্রুও কোন দিন অপবাদ দেয়নি। তিনি কাউকে কটুকথা বলেননি। তাঁর মুখ থেকে কেউ কোনো দিন গালি বা অশ্লীল কথা শুনেনি। তিনি লোকদের সাথে সব রকমের কায়কারবার করেন কিন্তু কখনো তাঁকে কারো সাথে তিক্ততা সৃষ্টি, কথা কাটাকাটি বা ঝগড়া করতে দেখা যায়নি। তাঁর কথায় কঠোরতার পরিবর্তে দেখা যায় মাধুর্য। আর এ মাধুর্যে এমন আন্তরিকতার প্রলেপ ছিল যার ফলে যেই তাঁর সাথে মেশে সেই তাঁর ভক্তে-অনুরক্তে পরিণত হয়। তিনি কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। কারও অধিকার হরণ করেননি। বছরের পর বছর ব্যবসা করার পরও তিনি অবৈধভাবে কারও একটি পয়সাও হস্তগত করেননি। যেসব লোকের সাথে তিনি লেনদেন করেন তারা সবাই তাঁর বিশ্বস্ততার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখত। সমস্ত জাতি তাঁকে ‘আল-আমীন’ –বিশ্বাসী আখ্যা দেয়। শত্রুরাও তাদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর নিকট আমানত রাখত নির্দ্বিধায়। তিনি সেগুলো হেফাজত করতেন পূর্ণ আস্থা সহকারে। নির্লজ্জ লোকদের মধ্যে তিনি এমন লজ্জাশীলতার পরিচয় দেন যে, জ্ঞান হবার পর থেকে কেউ তাঁকে কোনো দিন উলঙ্গ হতে দেখেনি। চারদিকের অসচ্চরিত্র লোকদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ পূত চরিত্রের নমুনা পেশ করেন। কেউ কোনো দিন তাঁকে কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত থাকতে দেখেনি। মদ ও জুয়ার ধারেকাছেও তিনি কোনো দিন যাননি। অশালীন লোকদের মধ্যে তিনি চরম শালীনতার পরিচয় দেন। সব রকমের অপকর্ম ও অশ্লীল কাজকে ঘৃণা করতেন এবং তাঁর সব কাজে পবিত্রতা ও শালীনতার ছাপ সুস্পষ্ট থাকত। পাষাণ হৃদয় মরুচারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন মূর্তিমান কোমল হৃদয়। প্রত্যেকের অভাব-দুঃখে দেখা যেত তাঁকে সহযোগী হিসেবে। এতিম ও বিধবাদের সাহায্য করতেন। পথচারী ও মুসাফিরদের আথিথেয়তা করতেন। কাউকে তিনি কষ্ট দেননি। বরং অন্যের জন্যে নিজে কষ্টভোগ করতেন। বর্বর বেদুইনদের মধ্যে তিনি ছিলেন একান্ত শান্তিপ্রিয়। নিজের জাতির মধ্যে দাঙ্গা ও রক্তপাত দেখে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। গোত্রীয় ও উপজাতীয় যুদ্ধ থেকে নিজে সরে থাকেন এবং বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যে সন্ধি ও আপোষ করার জন্যে সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মূর্তিপূজারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন চরম ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতির অধিকারী। পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে এমন কোনো জিনিস তিনি খুঁজে পাননি যার পূজা করা যেতে পারে। কোনো সৃষ্টির সামনে তাঁর মাথা নত হয়নি। পূজার প্রসাদ্ তিনি গ্রহণ করতেন না। তিনি স্বতঃস্ফুর্তভাবে শির্ক ও সৃষ্টি-পূজাকে ঘৃণা করতেন।

এ সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে এ ব্যক্তিকে এমন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দেখা যায়, যেন মনে হয় নিকষ কালো আঁধারের বুকে একটি উজ্জ্বল প্রদীপ আলো বিকিরণ করে যাচ্ছে অথবা পাথরের স্তূপের মধ্যে একটি মহামূল্যবান রত্ন চমকাচ্ছে।

মানসিক ও আত্মীক পরিবর্তন

প্রায় চল্লিশ বছরকাল এ ধরনের পূত-পবিত্র ভদ্র জীবন যাপন করার পর তাঁর জীবনে আসে এক বিপ্লব। চারদিকের ঘনায়মান নিচ্ছিদ্র অন্ধকার দেখে তিনি সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেন। অজ্ঞতা, অসচ্চরিত্রতা, অসৎকর্মশীলতা, নৈরাজ্য, বিশৃংখলা, শিকৃ ও মূর্তিপূজার এ ভয়ংকর সমুদ্র থেকে তিনি বের হয়ে আসতে চান। এ পরিবেশে কোনো একটি বস্তুও তাঁর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে হয়নি। সবার থেকে আলাদা হয়ে জনবসতি থেকে দূরে পাহাড়ের একান্তে বসে চিন্তা করতে থাকেন তিনি। নির্জনে গভীরে প্রশান্তির মধ্যে কেটে যায় একাধারে কয়েকদিন। রোজা রেখে নিজের আত্মা-মন-মস্তিষ্ককে আরো বেশী পাক-পবিত্র করেন। তিনি চিন্তা-ভাবনা করে যেতে থাকেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। এমন কোনো আলোর সন্ধান করতে থাকেন, যা এ চারদিকের ঘনায়মান আঁধার দূর করতে সক্ষম। এমন কোনো শক্তি অর্জনের প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন, যা এই বিপথে পারিচালিত বিশ্বকে ভেঙ্গে-চুরে আবার নতুন করে গড়তে ও সুসজ্জিত করতে পারে।

বিপ্লবের বাণী

অকস্মাৎ তাঁর অবস্থার মধ্যে দেখা দেয় বিরাট পরিবর্তন। তাঁর মনে হঠাৎ এমন এক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে আগে কোথাও যার লেশমাত্রও ছিল না। ইতিপূর্বে তাঁর মধ্যে যে শক্তির কোনো চিহ্নই ছিল না অকস্মাৎ তা কোথা থেকে এসে তাঁর সমগ্র সত্তাকে ভরে দেয়। গুহার নির্জনতা ছেড়ে তিনি বের হয়ে আসেন। হাজির হন নিজের জাতির সামনে। তাদেরকে বলতে থাকেন, তোমরা এ যেসব মূর্তির পূজা করে চলছো এগুলোর কোনো প্রভাব ক্ষমতা নেই। এদের পূজা কর না। এমন কোনো মানুষ, গাছ, পাথর, আত্মা এবং কোনো নক্ষত্র নেই যার পূজা ও আরাধনা করা যেতে পারে, যার সামনে মাথা নত করা যেতে পারে এবং যার আনুগত্য করা যেতে পারে। এ চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী এ নক্ষত্র এবং এ পৃথিবী ও আকাশের মধ্যকার যাবতীয় বস্তু এক আল্লাহর সৃষ্টি। তিনিই তোমাদেরকে এবং সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই জীবন দান করেন। মৃত্যু দান করার ক্ষমতাও একমাত্র তাঁরই হাতে। একমাত্র তাঁরই বন্দেগী কর। তাঁর হুকুমে মেনে চল। তাঁর সামনে মাথা নত কর। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, লুণ্ঠন, হত্যা, যুলুম-নির্যাতন যা তোমরা করে চলছো –সব গুণাহের কাজ। এগুরো পরিহার কর। আল্লাহ এসব পছন্দ করেন না। সত্য কথা বল। ইনসাফ কর। কাউকে হত্যা কর না। কারো ধন-সম্পদ লুঠ কর না। কিছু নিলে ন্যায়সঙ্গতভাবে নাও। কিছু দিলে ন্যায়সঙ্গতভাবে দাও। তোমরা সবাই মানুষ। সব মানুষ সমান। সাঞ্ছনার কলংক চিহ্ন কপালে এঁকে কেউ জন্মেনি। আবার সম্মান ও মর্যাদার মুকুট মাথায় দিয়েও কেউ দুনিয়ায় পদার্পণ করেনি। শেষ্ঠত্ব, সম্মান ও আভিজাত্য বংশের মধ্যে নিহিত নেই। এগুলো নিহিত রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য, সৎকর্মশীলতা ও পবিত্রতার মধ্যে। যে আল্লাহকে ভয় করে সে সৎকর্মশীল ও পবিত্র। সে শ্রেষ্ঠতম মানব সন্তান। অন্যথায় সে কিছুই নয়। মৃত্যুর পর তোমাদের সবাইকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। এমন আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে যিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন। তোমরা তাঁর কাছ থেকে কিছুই লুকাতে পারবে না। এ কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে তিনি তোমাদের পরিণাম নির্ধারণ করবেন। সেই যথার্থ ন্যায় বিচারকের কাছে কোনো রকম সুপারিশ বা উৎকোচ কাজে লাগবে না। তিনি কারও বংশ পরিচয় নেবেন না। সেখানে একমাত্র ঈমান ও সৎকাজের কথা জিজ্ঞেস করা হবে। যার কাছে এ সম্পদ থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যার কাছে এর কিছুই থাকবে না সে ব্যর্থতার ডালি মাথায় করে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ইহাই ছিল সেই পয়গাম যা তিনি গুহা থেকে নিয়ে এসেছিলেন।

জাতির প্রতিক্রিয়া

অজ্ঞ জাতি তাঁর শত্রু হয়ে যায়। তাঁকে গালাগালি করতে থাকে। তাঁর ওপর পাথর নিক্সেপ করে। একদিন দু’দিন নয়, একাধারে তের বছর তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। অবশেষে তাঁকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করে। তাঁকে শুধু দেশান্তরী করেই ক্ষান্ত হয়নি, যেখানে গিয়ে তিনি আশ্রয় নেন সেখানেও তারা তাঁর পেচনে ধাওয়া করে। তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দেয়। সমগ্র আরবদেশকে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দেয়। পূর্ণ আট বছর ধরে তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চারাতে থাকে। এসব কষ্ট তিনি হাসিমুখে বরদাশত করে যান কিন্তু নিজের সংকল্প ও মিশন থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হন না।

জাতি তাঁর শত্রু হল কেন? এখানে কি জমি ও ভূখণ্ড দখলের কোনো ব্যাপার ছিল? কোনো রক্তের প্রতিশোধের প্রশ্ন ছিল? তিনি কি তাদের কাছে কোনো পার্থিব বস্তুর দাবী জানাচ্ছিলেন? না, তা নয়। সমস্ত বিরোধের মূলে ছিল –তিনি আল্লাহর ইবাদান, সততা, সত্যনিষ্ঠা ও সৎকর্মশীলতার শিক্ষা দিচ্ছেন কেন? মূর্তি পূজা, শির্ক ও অসৎকর্মের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন কেন? পূজারী ও পুরোহিতদের নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানছেন কেন? সরদারদের সরদারীর বিভ্রম থেকে জনগণকে সতর্ক করছেন কেন? মানুষের পরস্পরের মধ্য থেকে উচ্চ-নীচের ভেদাভেদ খতম করতে চাচ্ছেন কেন? গোত্র ও বংশ প্রীতিকে জাহেলিয়োত বলে গণ্য করেছেন কেন? তাঁর জাতি বলে চলছিল, তুমি যা কিছু বলছ, সব আমাদের জাতীয় পদ্ধতি ও বংশীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী, কাজেই এসব পরিত্যাগ কর, নয়তো আমরা তোমার জীবন ধারণ কঠিন করে দেব।

কষ্ট সহ্য কেন

ঐ ব্যক্তি এতসব কষ্ট সহ্য করলেন কেন? তাঁর জাতি তাঁকে বাদশাহী দান করতে প্রস্তুত চিল। সম্পদের স্তূত তাঁর পদতলে জমা করতে চাইছিল। তবে এ জন্যে শর্ত ছিল, তাঁকে ঐ শিক্ষাগুরো পরিত্যাগ করতে হবে। কিন্তু তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের শিক্ষার বিনিময়ে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হওা পছন্দ করেন। এসব মেনে নেন কেন? তাঁর জাতির লোকের সৎকর্মশীল ও আল্লাহর অনুগত হয়ে যাওয়ার মধ্যে তাঁর নিজের কি কোন স্বার্থ ছিল? এর মধ্যে কি তাঁর বৃহত্তর কোনো স্বার্থ নিহিত ছিল,যার মোকাবিলায় নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, অর্থ-সম্পদ ও আয়েশ-আরামের লোভ ছিল নিতান্তই তুচ্ছ? অথবা এমন কোনো লাভের সন্ধান এখানে ছিল যার জন্যে এক ব্যক্তি একাধিক্রমে একশ’ বছর ধরে কঠোরতম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে প্রস্তুত হতে পারে? এক ব্যক্তি নিজের কোনো স্বার্থে নয় বরং অন্যের স্বার্থে ও কল্যাণার্থে নিজে কষ্ট স্বীকার করে যাবেন –মানব জাতির জন্যে সৎবৃত্তি, ত্যাগ ও সহানুভূতির এর চেয়ে উন্নততর আর কোনো আদর্শের কথা চিন্তা করা যায় কি? যাদের কল্যাণার্থে তিনি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারাই তাঁকে গৃহহারা ও দেশান্তরী করে। বিদেশেও তারা তাঁর পেছনে ধাওয়া করে। এতসব সত্ত্বেও তিনি তাদের কল্যাণ কামনা থেকে বিরত হন না।

কোনো মিথ্যাবাদী কোনো ভিত্তিহীন বিষয়ের জন্যে কি এ ধরনের বিপদ সহ্য করতে পারে? নিছক আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে কাজ শুরু করে কোনো ব্যক্তি নিজের সংকল্পে এতটা দৃঢ় ও অবিচল থাকতে পারে কি যার ফলে তার ওপর বিপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লেও সারা দেশ ও সারা দুনিয়া তার বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লাগলেও এবং দুনিয়ার বৃহত্তম সেনাবাহিনী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও সে নিজের সংকল্প থেকে এক চুল পরিমাণ সরে যেতে রাজি হয় না? এ অবিচলতা ও দৃঢ় সংকল্পই এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, নিজের সত্যতার ওপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। যদি তার মনে এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ ও সংশয় থাকতো তাহলে একাধিক্রমে একুশ বছর বিপদের পর বিপদের মোকাবিলা করা তার পক্ষে সম্ভবপর হত না।

এ ছিল তাঁর অবস্থার পরিবর্তনের একটি দিক। এর অপর দিকটি ছিল এর চেয়েও বিস্ময়কর।

অবস্থার পরিবর্তনের অপর দিক

চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাধারণ আবরদের মতই একজন আরব। এ সময় এ সওদাগরটিকে একজন অসাধারণ বাগ্মী হিসেবে কেউ জানত না। কেউ তাঁকে দেখেনি ধর্ম, নৈতিকতা, দর্শন, আইন, রাজনীতি ও সমাজনীতির ওপর আলোচনা করতে। তাঁর কাছ থেকে কেউ শুনেনি আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানী গ্রন্থাবলী, পূর্ববর্তী নবী ও উম্মতগণ এবং কিয়ামত, মৃত্যু পরের জীবন ও জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে একটি কথাও। তিনি লোকদের সাতে অত্যন্ত সদ্ব্যবহার করতেন, তাঁর চালচলন ছিল অত্যন্ত শালীন ও মধুর এবং যুগের শ্রেষ্ঠ উন্নত নৈতিক চরিত্রেরও তিনি অধিকারী ছিলেন –এ কথা ঠিক। কিন্তু চল্লিশ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তার মধ্যে এমন কোনো অস্বাভাবিক বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি যার ফলে লোকেরা এ ধারণা করতে পারতো যে, এবার তিনি একটা কিছু হয়ে যাবেন। এ পর্যন্ত লোকেরা তাঁকে একজন নীরব শান্তিপ্রিয় এবং অত্যন্ত ভদ্র ও শালীন ব্যক্তি হিসেবেই জান। কিন্তু চল্লিশ বছর পর তিনি যখন বের হলেন একটি গুহা থেকে, তখন অকস্মাৎ দেখা গেল তাঁর চেহারাই বদলে গেচে।

একন তিনি একটি বিস্ময়কর বাণী শুনাচ্ছিলেন। এ বাণী শুনে সমস্ত আরববাসী অভিভূত হয়ে গেল। এর অন্তরভেদী প্রভাবের ফলে এর ঘোরতর শত্রুও নিছক এটি শুনতেও ভয় পাচ্ছিল; এ বাণী একবার কানে পড়লে কি জাতি কখন মনের মধ্যে গেঁথে বসবে, এ ভয়েই তারা ছিল ভীত-সন্ত্রস্ত। এর অলংকারিত্ব ও বর্ণনা মাধুর্য ছিল তুলনাবিহীন। তদানীন্তন আরবের বড় বড় কবি, বাগ্মী ও ভাষাতত্বের দাবীদারদের উপস্থিতিতে এ বাণী সমগ্র আরববাসীদের সামনে চ্যালেঞ্জ দিল এবং বার বার এ চ্যালেঞ্জ দিল যে, তোমরা সবাই মিরে এর যে কো একটি বাক্যের মতো বাক্য রচনা করে আন। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার সাহস কেউ দেখাতে পারলো না। এমন অতুলনীয় বাণী কোনো আরব কোনো দিন শুনেইনি।

এখন রাতারাতি তিনি একজন অতুলনীয় জ্ঞানী, অসাধারণ সমাজ সংস্কারক ও নৈতিক চরিত্র গঠক, একজন বিস্ময়কর রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রণেতা, একজন উন্নত পর্যায়ের বিচারক ও নজীরবিহীন সিপাহসালার রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। সেই নিরক্ষর মরুচারী এমন সব জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কথা বলে যেতে লাগলেন, যা ইতিপূর্বে কেউ বলেনি এবং এর পরেও বলতে পারেনি। এ নিরক্ষর ব্যক্তিটি আল্লাহ এবং অদৃশ্য জগতের ও পর পরন নিশ্চিন্তে বক্তৃতা করে যেতে থাকলেন। জাতিদের ইতিহাস থেকে বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতদের দর্শন শুনাতে থাকলেন, প্রাচীন সংস্কারকদের কার্যাবলী বিশ্লেষণ, পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের সমালোচনা ও জাতিদের বিরোধ নিষ্পন্ন করতে থাকলেন। চরিত্র, নৈতিকতা, শালীনতা ও সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে লাগলেন।

তিনি সমাজ-সংস্কৃতি, অর্থ ব্যবস্থা, পারস্পরিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করলেন। এমন উচ্চাঙ্গের আইন রচনা করলেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী গুণী ও পণ্ডিত সমাজ বছরের পর বছর বরং সারা জীবন গবেষণা ও অনুসন্ধানের পরই যার অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন। আর দুনিয়ার পরীক্ষা-নিরক্ষা যতই এগিয়ে যেতে থাকলো ততই এর সত্য উজ্জ্বলতর হয়ে ধরা দিতে থাকলো।

এ নীরব শান্তিপ্রিয় সওদাগরটি জীবনে কোনো দিন তরবারি চালাননি, কোনো দিন সামরিক শিক্ষা পাননি, এমনকি জীবনে মাত্র একটি যুদ্ধে একজন নীরব দর্শক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি একজন বীর সৈনিক হয়ে গেলেন। সংকটপূর্ণ মহাসমর ক্ষেত্রে কোনোদিন তার পা একচুলও নড়েনি। তিনি এখন একজন মহাপরাক্রমশালী সেনানায়ক হয়ে গেলেন। মাত্র নয় বছরের মধ্যে সমস্ত আরব দেশ জয় করে ফেললেন। তিনি এখন একজন শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক ও সমরবিদ হয়ে গেলেন। তাঁর সৃষ্ট সামরিক সংগঠন ও যুদ্ধ প্রেরণার প্রভাবে কপর্দকহীন ও যুদ্দ সরঞ্জামের অভাব পীড়িত আরবরা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের দু’টি বৃহৎ শক্তিকে পর্যুদস্ত করে দিল।

এ নির্জনবাস শান্তিপ্রিয় মানুষটির মধ্যে চল্লিশটি বছর পর্যন্ত কেউ রাজনীতিত-প্রিয়তার গন্ধ পায়নি। হঠাৎ আজ তিনি বিরাট সংস্কারক ও রাষ্ট্রনায়করূপে আবির্ভূত হলেন। তেইশ বছরের মধ্যে বার লক্ষ বর্গমাইল এলাকায় বিস্তৃত মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশৃংখল, যুদ্ধপ্রিয়, মূর্খ, অরাজক, অসভ্য বর্বর, পরস্পর দ্বন্দ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশৃংখল, যুদ্ধপ্রিয়, মূর্খ, অরাজক, অসভ্য বর্বর, পরস্পর দ্বন্দ্বে সদা লিপ্ত উপজাতিদেরকে আধুনিক সভ্যতার স্পর্শ থেকে দূরে রেলগাড়ী, টেলিফোন, রেডিও ও মুদ্রণযন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়াই এক ধর্ম, এক সংস্কৃতি, এক আইন ও এক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীন করে দিলেন। তিনি তাদের চিন্তাধারার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তাদের চরিত্র বদলে দিলেন। তাদের শালীনতা বিবর্জিত জীবনধারাকে উন্নত শ্রেণীর শালীনতায় পরিপূর্ণ করে দিলেন। তাদের বর্বরতা ও অসভ্যতাকে পরিশীলিত নাগরিক জীবনে রূপান্তরিত করলেন। তাদের অসৎবৃত্তি ও অসৎ চরিত্রকে রূপান্তরিত করলেন সৎবৃত্তি, তাকওয়া ও উন্নত নৈতিক চরিত্রে। তাদের অরাজকতা ও নৈরাজ্যকে চূড়ান্ত পর্যায়ের আইনানুগত্য ও নেতার নির্দেশ পালনে সর্বাধিক তৎপর সুশৃংখল জীবন ধারায় পরিবর্তিত করলেন। এ জাতিটি এমনই বন্ধ্যা ছিল যে, শত শত বছরে এর উদরে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির জন্ম হয়নি। কিন্তু এ নির্জনবাসী মানুষটি তাকে এমনই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের উদ্ভব হল। দুনিয়াবাসীকে দ্বীন ও নৈতিকতার শিক্ষা দান করার জন্যে তারা দুনিয়ার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লেন।

নৈতিক কর্মপদ্ধতি

এ কাজ তিনি যুলুম, নির্যাতন, ধোঁকা ও প্রতারণার মাধ্যমে সম্পন্ন করেননি। বরং করেচিলেন হৃদয়জয়ী সদ্ব্যবহার, ভদ্রতা ও মনোমুগ্ধকর শিক্ষার মাধ্যমে। সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করেন। স্নেহ ও অনুগ্রহের দ্বারা মন বিগলিত করেন। ইনসাফ ও ন্যায়ের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। সত্য ও সততা থেকে কখনো এক চুলও সরে যাননি। যুদ্ধক্ষেত্রে কারও সাথে প্রতারণা করেননি। নিজের প্রাণের শত্রুদের ওপরও যুলুম করেননি। যুদ্ধক্ষেত্রে কারও সাথে প্রতারণা করেননি। নিজের প্রাণের শত্রুদের ওপরও যুলুম করেননি। যারা ছিল তাঁর রক্তপিপাসু, যারা তাঁকে প্রস্তরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল, তাঁকে জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে সমগ্র আরবকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল, এমনকি শত্রুতা ও আক্রোশের আতিশয্যে তাঁর চাচার কলিজা বের করে চিবিয়েছিল, তাদের ওপর বিজয় লাভ করার পরও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের সাথে অন্যায় ব্যবহারের কারণে তিনি কারও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।

এসব সত্ত্বেও তাঁর আত্মসংযম ছিল তুলনাবিহীন। পার্থিব স্বার্থের প্রতি তাঁর নির্মোহ এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, সারা দেশের বাদশাহ হবার পরও তিনি আগের মতো ফকিরই রয়ে গেলেন। ঘাস-পাতার ছাউনিতে থাকতেন। চাটাই ছিল বিছানা। মোটা পোশাক পরতেন। গরীবের খাবার খেতেন। অনেক সময় অনাহারে থাকতেন। সারারাত আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। দরিদ্র ও বিপদগ্রস্তদের সাহায্য ও সেবা করতেন। একজন শ্রমিকের মতো কায়িক পরিশ্রম করতে ইতস্তত করতেন না কখনো। শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর মধ্যে রাজকীয় শান-শওকত বিত্তশালীদের জৌলুস ও বড়লোকদের অহংকারের সামান্যতম গন্ধ পাওয়া যায়নি। একজন সাধারণ লোকের মতো তিনি সবার সাথে মেলামেশা করতেন। তাদের বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্টে শরকি হতেন। সাধারণ লোকদের মধ্যে এমনভাবে বসতেন যাতে বাইরে থেকে আগত লোকের পক্ষে ঐ মাহফিলে জাতির নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ত। এত বিরাট ব্যক্তি হবার পরও সামান্য নগণ্য লোকদের সাথে এমন ব্যবহার করতেন যেন মনে হত তারাও তাঁরই মত। সারাজীবন সংগ্রাম সাধনার পর তিনি নিজের জন্যে কিছুই রেখে যাননি। নিজের সমগ্র পরিত্যক্ত সম্পত্তি জাতির জন্যে ওয়া্কফ করে গেছেন। নিজের অনুসারীদের ওপর নিজের বা নিজের সন্তানদের কিছু মাত্র অধিকার কায়েম করেননি। এমনকি ভবিষ্যতে তাঁর অনুসারীরা সমস্ত যাকাত তাঁর সন্তানদেরকেই না দিয়ে দেয় এ ভয়ে নিজের সন্তানদেরকে যাকাত গ্রহণ করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছেন।

আধুনিক যুগের নির্মাতা

এ মহান ব্যক্তির মহান কার্যাবলীর শেষ নেই। তাঁর উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা লাভ করার জন্যে বিশ্ব ইতিহাসের ওপর সামগ্রিকভাবে এবার নজর দিতে হবে। সেখানে দেখা যাবে আরব মরুর এ নিরক্ষর ব্যক্তিটি, চৌদ্দশ’ বছর আগে অন্ধকার যুগে যার জন্ম, আসলে আধুনিক যুগের প্রতিষ্ঠাতা ও সারা দুনিয়ার নেতা। তিনি কেবল তাদের নেতা নন যারা তাঁকে নেতা বলে মানে বরং তাদেরও নেতা যারা তাঁকে নেতা বলে মানে না। তাদের এ অনুভূতিই নেই যে, যার বিরুদ্ধে তারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে তাঁর নেতৃত্ব কিভাবে তাদের চিন্তাধারা, জীবন পদ্ধতি, কর্মনীতি এবং তাদের আধুনিক যুগের প্রাণ সত্তায় জড়িত রয়েছে।

এ ব্যক্তিই বিশ্ববাসীর চিন্তাধারার মোড় পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তাদেরকে ভাববাদিতা, কুসংস্কার, বিস্ময়কর বস্তুর পূজা ও বৈরাগ্যবাদ থেকে যুক্তিবাদ, বাস্তববাদ ও যথার্থ আল্লাহ ভীতি ভিত্তিক ধার্মিকতার দিকে ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি অনুভূত অলৌকিক ঘটনাবলীর দাবী উত্থাপনকার বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক অলৌকিকত্বকে অনুধাবন করার এবং তাকেই সত্যের মানদণ্ড হিসেবে মেনে নেবার প্রবণতার জন্ম দিয়েছেন। তিনি প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রমের মধ্যে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন অনুসন্ধানকারীদের চোখ খুলে দিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক নিদর্শনসমূহের (Natural Phenomena) মধ্যে আল্লাহর নিদর্শন দেখার অভ্যাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি কল্পনা বিলাসীদেরকে অনুধ্যানের (Speculation) পরিবর্তে যুক্তিবাদিতা, চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও গভেষণার পথে অগ্রসর করেছেন। তিনি মানুষকে জানিয়েছেন বুদ্ধি ও অনুভূতির পার্থক্যকারী সীমারেখা। বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মাবাদের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। ধর্মের সাথে জ্ঞান ও কর্মের এবং জ্ঞান ও কর্মের সাথে ধর্মের সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। ধর্মীয় শক্তির সাহায্যে দুনিয়ায় বৈজ্ঞানিক শক্তি এবং বৈজ্ঞানিক সাহায্যে যথার্থ ধার্মিকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি পূজা ও শির্কের ভিত্তিমূল উৎপাটিত করেছেন এবং জ্ঞান-শক্তি বরে তাওহীদ বিশ্বাসকে এমন মজবুদ করে কায়েম করেছেন যার ফলে মুশরিক ও মূর্তিপূজারীদের ধর্ম ও একাত্মবাদের রঙ্গে রঙ্গীন হতে বাধ্য হয়েছে। তিনি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার মৌলিক ধারণাগুলোই বদলে দিয়েছেন। যারা বৈরাগ্য ও কৃচ্ছ্রসাধনাকে যথার্থ নৈতিকতা মনে করতো, যাদের মতে দেহ ও প্রবৃত্তির হক আদায় করলে এবং পার্থিব জীবনের বিষয়াবলীতে অংশ নিলে আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পরকালীন মুক্তি সম্ভব নয়, তাদেরকে তিনিই সমাজ-সংস্কৃতি ও পার্থিব কর্মজীবনের মধ্যে নৈতিকতার মাহাত্ম্য, আধ্যাত্মিকতার উন্নতি ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তিনিই মানুষকে তার যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা সম্পকেৃ অবগত করেছেন। যারা ভগবান, অবতার ও আল্লাহর পুত্রকে ছাড়া অন্য কাউকে হেদায়াতদানকারী ও নেতা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না তাদেরকে তিনিই জানিয়েছেন যে, তাদেরই মতো মানুষ আসমানী সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি ও বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর খলীফঅ হতে পারে। যারা প্রত্যেক শক্তিশালী ব্যক্তিকে নিজেদের খোদা মনে করতো তাদেরকে তিনিই বুঝিয়েছেন যে, মানুস নিছক মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোন ব্যক্তি জন্মগতভাবে পবিত্রতা, শাসন কর্তৃত্ব ও প্রভুত্বের অধিকার নিয়ে আসেনি। কেউ অপবিত্রতা, গোলামী, দাসত্ব ও অধীনতার কলংক নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনি। এ শিক্ষাই বিশ্বে মানবতার একাত্মতা, সাম্য, গণতন্ত্র ও চিন্তার স্বাধীনতার জন্মদাতা।

চিন্তাধারার জগত থেকে বাইরে আসরে দেখা যাবে এ নিরক্ষর ব্যক্তির নেতৃত্বের বাস্তব ও কার্যকর ফলশ্রুতি দুনিয়ার আইন, পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যাপক ও সীমাহীন। নৈতিকতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি শালীনতা, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতার অসংখ্য নীতি ও পদ্ধতি আর শিক্ষা থেকে বের হয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি যে সামাজিক বিধি প্রবর্তন করেছিলেন সারা দুনিয়া তাকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে এবং এখনো গ্রহণ করে চলেছে। তিনি যে অর্থনৈতিক বিধান দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে দুনিয়ার বহু অর্থনৈতিক আন্দোলনের উদ্বব হয়েছে ও এখানে হচ্ছে। তিনি যে রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তার মাধ্যমে আজ পর্যন্ত দুনিয়ার রাজনৈতিক চিন্তাদারায় কতগুলো বিপ্লব সংঘটিত হয়ে গেছে এবং এখনো হয়ে চলছে। ইনসাফ ও আইনের যেসব মূলনীতি তিনি রচনা করেছিলেন, সেগুরো বিশ্বের বিচার ব্যবস্থা ও আইন চিন্তাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এখনো তার প্রভাব নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। যুদ্ধ, সন্ধি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুসভ্য রীতি ও ব্যবস্থা বাস্তবে তিনিই প্রবর্তন করেছিলেন। যুদ্ধের আবার কোনো সুসভ্য রীতি ও নীতি থাকতে পারে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে মানবতার ভিত্তিতে সম্পর্ক কায়েম ও লেনদেন হতে পারে, তাঁর পূর্বে দুনিয়া এ সম্পর্কে অবগতই ছিল না।

সমস্ত উন্নত গুণের সমাহার

বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে এ অত্যাশ্চর্য ব্যক্তিটির উন্নত ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এত বেশী সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল যে, শুরু থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আগত ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে –যাদেরকে লোকেরা মনীষী (Heroes) আখ্যায়িত করেছে –তাঁর মোকাবিলায় দাঁড় করালে তাঁর সামনে তাদেরকে খুদে বামুনটি মনে হবে। বিশ্ব মনীষীবৃন্দের মধ্যে একজনও এমন নেই যার শ্রেষ্ঠ উন্নত গুণাবলী জীবনের একটি বা দু’টি বিভাগ ছাড়িয়ে আরো বিস্তৃত হতে সক্ষম হয়েছে। তাদের কেউ কেউ মতবাদ পেশ করেছেন কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা তার ছিল না। কেউ কর্মে সুপটু কিন্তু চিন্তায় দুর্বল। কারও কর্তৃত্ব রাজনৈতিক গুণাবলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কেউ নিছক সামরিক কৃতিত্বের অধিকারী। কারও দৃষ্টি সমাজ জীবনের একটি দিকের এত গভীরে প্রসারিত যার ফলে অন্য দিকগুরো সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হয়েছে। কেউ নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার পথে এগিয়ে গেছেন আর অর্থনীতি ও রাজনীতিকে একেবারেই উপেক্ষা করেছেন। কেউ অর্থনীতি ও রাজনীতির পথে এগিয়েছেন এবং নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে একেবারেই দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন। মোটকথা ইতিহাসে কেবল এক তরফা মনীষীই দেখা যায়। কিন্তু এই ব্যক্তিই এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম। তাঁর মধ্যে সমস্ত গুণাবলীই একত্রিত হয়েছে। তিনি নিজেই দার্শনিক ও পণ্ডিত। নিজের দর্শনকে তিনি নিজেই বাস্তব জীবনে কার্যকর করেন। তিনি রাষ্ট্রনায়ক আবার সমরনায়কও। তিনি আইন প্রণেতা আবার নৈতিকতার শিক্ষকও। অন্যদিকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতাও। তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হয় মানুষের জীবনের সমস্ত দিকের ওপর, জীবনের ছোট ছোট বিষয়কেও তা উপেক্ষা করে না। পানাহারের আদব ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতার পদ্ধতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে তিনি বিধান ও নির্দেশ দেন। নিজের মতবাদের ভিত্তিতে একটি সভ্যতার (Civilization) জন্ম দেন এবং জীবনের বিভিন্ন বিভাগে নির্ভুল ভারসাম্য (equilibrium) কায়েম করেন। কোথাও প্রান্তিকতার নামগন্ধই পাওয়া যায় না। এ ধরনের সর্ভগুণের অধিকার দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির নাম ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

পরিবেশের ঊর্ধ্বে

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের একজনও এমন নেই যিনি কমবেশী নিজের পরিবেশের সৃষ্টি নন। কিন্তু এ ব্যক্তিটির অবস্থা সবার থেকে আলাদা। তাঁর পরিবেশ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সামান্যতমও প্রভাব বিস্তার করেনি। কোনো যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে এ কথা প্রমাণ করা সম্ভব হবে না যে, আরবের ক্ষেত্র ও পরিবেশ সে সময় ঐতিহাসিকভাবে এমন এক ব্যক্তির জন্মদানের জন্যে প্রস্তুত ছিল। অনেক টেনে হিঁচড়ে বড়জোর এতটুকু বলা যায় যে, ঐতিহাসিক কারণে আরবে সেকালে এমনি একজন নেতার প্রয়োজন ছিল। তিনি উপজাতীয় বিশৃংখলা ও অরাজকতা খতম করে তাদেরকে এক জাতিত্বের শৃংখলে আবদ্ধ করতেন এবং দেশের পর দেশ জয় করে আরববাসীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধনের পথ প্রশস্ত করতেন। অর্থাৎ এমন একজন জাতীয়তাবাদী আরব নেতা, যিনি হতেন সেকালের সবরকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যুলুম, নির্যাতন, রক্তপাত, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা তথা সম্ভাব্য যাবতীয় কৌশল খাটিয়ে নিজের জাতিকে সমৃদ্ধিশালী করতেন। একটি সাম্রাজ্য গঠন করে নিজের অনুন্নত দেশবাসীর জন্যে রেখে যেতেন। এ ছাড়া সে যুগের আরব ইতিহাসের আর কোনো চাহিদাই প্রমাণ করা যাবে না। হেগেলের ইতিহাস দর্শন ও মার্কসের ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার দৃষ্টিতে বড় জোর এ কথা বলা যেতে পারে যে, আরবের তদানীন্তন পরিবেশে জাত গঠন ও সাম্রাজ্য স্থাপন করার যোগ্যতাসম্পন্ন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়ার প্রয়োজন ছিল অথবা আবির্ভাব হওয়া সম্ভবপর ছিল। কিন্তু আসলে যা ঘটে গেল হেগেলীয় ও মার্কসীয় দর্শন তার কি ব্যাখ্যা দেবে? সে সময় এ পরিবেশে এমন এক ব্যক্তির জন্ম হলো যিনি সর্বোত্তম নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছেন, মানবতাকে সুসজ্জিত ও সুসংগঠিত করেছেন। যার দৃষি।ট বংশ-গোত্র-জাতি-দেশের সীমানা পেরিয়ে সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্যে একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরী করেছেন। যিনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রনৈতিক বিধি-বিধান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কল্পনার জগতে নয় বাস্তবে নৈতিক ভিত্ততে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দিয়েছেন এবং আধ্যাত্মিক ও বস্তুবাদের এমন ভারসাম্য মিশ্রণ ঘটিয়েছেন যা সেদিনের ন্যায় আজও জ্ঞান ও বিচক্ষণতার শ্রেষ্ঠতম কৃতিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এমন এক ব্যক্তিত্বকে কি তদানীন্তন আরবের জাহেলী পরিবেশের সৃষ্টি বলা যেতে পারে।

ইতিহাস স্রষ্টা

এ ব্যক্তি কেবল তার পরিবেশের সৃষ্টি নয় বরং তাঁর কার্যাবলী বর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই তিনি স্থান-কালের সীমানা ও প্রভাব মুক্ত। তাঁর দৃষ্টি সময় ও অবস্থার বাঁধন ছিন্ন করে শতাব্দী ও সহস্রাব্দের (Millenniuns) সীমানা পেরিয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছে। তিনি মানুসকে দেখেছেন সকল যুগ ও পরিবেশের আলোকে। এই সংগে তার জীবন যাবনের জন্যে এমন সব নৈতিক ও কার্যকর নির্দেশ দিয়েছেন, যা সর্বাবস্থায় যথাযথভাবে খাপ খেয়ে যায়। ইতিহাস যাদেরকে প্রাচীনদের তালিকাভুক্ত করেছে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। তাঁর যথার্থ পরিচয় কেবল এভাবে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি তাদের যুগের শ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন সবার থেকে আলাদা ও বৈশিষ্ট্যময়। তিনি মানবতার এমন নেতা ছিলেন যাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসের চলমান ধারার সাথে গতিশীল (March) হয় এবং প্রত্যেক যুগে তেমনি আধুনিক দেখা যায় তার পূর্বের যুগে ছিল।

যাদেরকে ঢালাওভাবে ইতিহাস স্রষ্টা বলা হয়ে থাকে তারা আসলে ইতিহাসের সৃষ্টি। মানবতার সমগ্র ইতিহাসে প্রকৃত ইতিহাস স্রষ্টা মাত্র এই একজনই পাওয়া যাবে। ইতিহাসে যারাই বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সে সময় আগে থেকেই বিপ্লবের উপাদানগুলো তৈরী হচ্ছিল। এ উপাদানগুলোই তাদের চাহিদামত বিপ্লবের দিক ও পত নির্ণয় করছিল। বিপ্লবী নেতা এ ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা পালন করেছেন? তিনি অবস্থা ও পরিবেশের চাহিদাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্যে এমন একজন অভিনেতার ভূমিকা পালন করেছেন যার জন্য মঞ্চ ও অভিনয়ের যাবতীয় কাজ আগে থেকেই তৈর ও নির্দিষ্ট হয়েই ছিল। কিন্তু ইতিহাস ও বিপ্লব সৃষ্টিকারীদলের মধ্যে তিনি একাই ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর জন্যে বিপ্লবের উপাদান ও কারণগুলো অনুপস্থিত ছিল। সেক্ষেত্রে তিনি নিজেই বিপ্লবের উপাদান ও কারণগুলো উদ্ভাবন ও প্রস্তুত করেন। যেখানে লোকদের মধ্যে বিপ্লবের প্রাণসত্তা ও কার্যকর যোগ্যতা পাওয়া যেতো না সেখানে তিনি নিজের প্রচেষ্টায় বিপ্লব সৃষ্টির উপযোগী জনশক্তি গড়ে তোলেন। নিজের প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বকে দ্রবীভূত করে হাজার হাজার লোকের মনের মধ্যে ঢেলে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিজের মনের মতো বানিয়ে নিয়েছেন। তার ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তিই বিপ্লবের যাবতীয় উপাদান তৈরী, তার আকৃতি ও প্রকৃতি নির্ধারণ করেছে এবং নিজের সংকল্পের জোরে তিনি অবস্থার গতি পরিবর্তন করে তাকে নিজের অভীষ্টপথে পরিচালিত করেছেন। এমনি একজন ইতিহাস স্রষ্টা এবং এ ধরনের বিপ্লবী দুনিয়ার কোথাও কোনো যুগে পাওয়া গেছে কি?

পরিপূর্ণ সত্যনিষ্ঠা

চৌদ্দশো বছরের আগের অন্ধকার পৃথিবীতে, আরবের মতো একটি ঘনান্ধকার দেশের এ প্রত্যন্ত প্রদেশে একজন মরুচারী নিরক্ষর মেষপালক ও ব্যবসায়ীর মধ্যে অকস্মাৎ এত বিপুল পরিমাণ জ্ঞান, আলো, শক্তি ও উন্নত গুণাবলী এবং এত উন্নত পর্যায়ের অনুশীলিত শক্তির পাহাড় সৃষ্টি হবার কি উপায় ছিল? বলা হয় এগুলো সবই তাঁর মন ও মস্তিষ্কের সৃষ্টি। আমি বলবো, এগুলি যদি তাঁর মন ও মস্তিষ্কের সৃষ্টি থাকে, তাহলে তাঁর উচিত ছিল নবুয়াতের নয়, খোদায়ীর দাবী করা। যদি তিনি সত্যিই এমন দাবী করতেন তাহলে তাঁর মতো সর্ব গুণান্বিত ব্যক্তিকে খোদা বলে মেনে নিতে এক ধরনের লোকেরা মোটেই অস্বীকার করতো না। কারণ তারা ইতিপূর্বে রামকে খোদা বানিয়েছে, শ্রী কৃঞ্চকে ভগবান বলে মেনে নিতে ইতস্ততঃ করেনি, গৌতম বুদ্ধকে নিজেরাই খোদার আসনে বসিয়েছে, ঈসা আলাইহিস সালামকে স্বেচ্ছায় আল্লাহর পুত্র বানিয়েছে, তারা অগ্নি, পানি এবং বায়ুরও পূজা করেছে। কিন্তু তিনি নিজে কি বলেছেন তা সত্যিই প্রণিধানযোগ্র। তিনি নিজের এ সমস্ত গুণের জন্যে কোনো প্রকার কৃতিত্বের দাবীদার নন। তিনি বলেন, আমি একজন মানুষ, তোমাদের মতো মানুষ। আমার যা কিছু আছে তার কোনোটাই আমার নিজের নয়, সবই আল্লারহ এবং সবই তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে দান করা হয়েছে। আমি যে বাণী এনেছি, সমগ্র বিশ্বমানবতা যার নজীর আনতে অক্ষম, তাও আমার নিজের নয়, আমার বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্রতার ফলশ্রুতি নয়। এর প্রত্যেকটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে এসেছে। এ জন্যে একমাত্র আল্লাহ প্রশংসা লাভের যোগ্য। আমি যা কিছু কৃতিত্ব দেখিয়েছি, যা কিছু আইন প্রণয়ন করেছি, যা কিছু নীতি-নৈতিকতা মানুষকে শিখিয়েছি, তার মধ্যে কোনো একটিও আমি নিজে তৈরী করিনি। নিজের ব্যক্তিগত যোগ্যতা থেকে কোনো কিছু পেশ করার শক্তি আমার নেই। প্রত্যেকটি ব্যাপারেই আমি আল্লাহর নেতৃত্ব ও নির্দেশ দানের মুখাপেক্ষী। ওদিক থেকে যা ইংগিত আসে আমি তা-ই বলি এবং তা-ই করি।

কী বিস্ময়কর সত্য! কেমন অত্যাশ্চর্য আমানতদারী ও সত্যবাদিতা! মিথ্যুকরা বড় হবার জন্যে অন্যদের শ্রেষ্ঠ কার্যাবলীকে নিজেদের কৃতিত্বের খাতায় লিখিয়ে নিতে একটুও ইতস্ততঃ করে না। অথচ সেগুরোর মূলের সন্ধান পেতে মোটেই বেগ পেতে হয় না। কিন্তু এ ব্যক্তি এমন সব গুণাবলীকেও নিজের বলে দাবী করছেন না যেগুলোকে নিজের কৃতিত্ব বললে কেউ মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারতো না। কারণ সেগুলোর মূলের সন্ধান করার কোনো উপায়ই কারো জানা নেই। সত্যবাদিতার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি কোনো একটি অত্যন্ত গোপন উৎস থেকে এমন নজীরবিহীন গুণাবলী লাভ করেছেন এবং তিনি নির্দ্ধিধায় নিজের আসল উৎসের সন্ধান জানিয়ে দিচ্ছেন তাঁর চেয়ে বড় সত্যবাদী আর কে হতে পারে? তাঁকে আমরা সত্যবাদী বলবো না তো আর কাকে বলবো?

হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতের স্বপক্ষে কুরআনের যুক্তি

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি-[নবুয়াতে মুহাম্মদী সম্পর্কে কুরআনে যে আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক সন্নিবেশিত হয়েছে তা এত ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী যে, একটিমাত্র নিবন্ধে তা সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কুরআনের যুক্তি-তর্কের যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মওলানা মওদূদী নিবন্ধে তা সম্পূর্ণরূপে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তা ছাড়া কুরএনর যুক্তি-তর্কের যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ মওলানা মওদূদী করেছেন, তাকে একত্র করলে সেটা একটা আলাদা পুস্তকের রূপ নেবে। এসব দিক বিবেচনা করে আমরা কয়েকটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি নিয়ে মাওলানার সংক্ষিপ্ত আলোচনাকে এখানে উদ্ধৃত্ত করছি।–(সংকলক)]

কুরআনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১০৯ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী। তুমি এর আগে কোনো বই-কিতাব পড়তেও না এবং নিজ হাতে লিখতেও না। তা যদি হতো তাহলে বাতিলপন্থীরা সন্দেহে পড়ে যেতে পারতো। আসলে এ হলো জ্ঞানীদের অন্তরে উজ্জ্বল নিদর্শনাবলী”।–(সূরা আল আনকাবুতঃ ৪৮-৪৯)

এ আয়াতে বর্ণিত যুক্তির মূল সূত্র এই যে, হযরত (সা) নিরপেক্ষ ছিলেন। তার দেশবাসী, আত্মীয়-স্বজন,পরিবার-পরিজন ও স্বগোত্রীয় লোকেরা হযরতকে ভূমিষ্ঠ হওয়া থেকে ‘যৌবনকাল’ পর্যন্ত স্বচক্ষে দেখেছে। তিনি যে সারা জীবনে কোনো বই পড়েননি এবং কখনো কলম ধরেননি, তা তারা ভাল করেই জানতো।

হযরত (সা)-এর নিরক্ষর হওয়াটাই নবুয়াতের প্রমাণ

তিনি যে নিরপেক্ষ ছিলেন সেই বাস্তব ব্যাপারটার উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেনঃ এ থেকে স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীনকালের আসমান কিতাবসমূহের শিক্ষা, সাবেক নবীদের জীবনকাহিনী, অতীতের বিভিন্ন ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস, আদিম জাতিসমূহের ইতিবৃত্ত এবং অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সংক্রান্ত যে গভীর ও বিস্তৃত জ্ঞানরাশী এ নিরপেক্ষ নবীর মুখ দিয়ে বের হচ্ছে, তা অহী ছাড়া আর কোন উপায়ে তার আয়ত্ত হওয়া সম্ভব ছিল না। তাঁর যদি লেখাপড়া জানা থাকতো এবং লোকেরা তাকে বই-কিতাব পড়তে এবং গবেষণা ও তত্বানুসন্ধান করতে দেখে থাকতো তাহলে বাতিলপন্থী লোকদের এমন সন্দেহ করার একটা ভিত্তি হয়তো থাকতো যে, এ বিপুল জ্ঞানসম্ভার অহীর মাধ্যমে না হয়ে লেখাপড়া ও জ্ঞানান্বেষণের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু নবীর নিরেট নিরপেক্ষতা এ ধরনের কোনো সন্দেহের আদৌ কোনো অবকাশ থাকতে দেয়নি।–[কুরআনের এরূপ দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা ও নিখুঁত যুক্তি প্রদর্শনের পরও যারা হযরত (সা)-কে শিক্ষিত প্রমাণ করার চেষ্টা করে তাদের ধৃষ্টতায় অবাক না হয়ে পারা যায় না। অথচ একানে কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় হযরত (সা)-এর নিরক্ষকরতাকে তার নবুয়াতের স্বপক্ষে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। যেসব রেওয়ায়াতের ওপর নির্ভর করে বলা হয় যে, হযরত (সা) শিক্ষিত ছিলেন বা পরে লেখাপড়া শিখেছেন। প্রথমতঃ তা গোড়াতেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যোগ্য। কেননা কুরআনরে পরিপন্থী কোনো রেওয়ায়াত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তা ছাড়া সেগুলো এত দুর্বল যে, সেগুলোকে যুক্তির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণই করা যায় না। এর মধ্যে একটা হলো হোদায়বিয়ার সন্ধি সংক্রান্ত বুখারীর বর্ণনা। এতে বলা হয়েছে যে, সন্ধির চুক্তি লেখার সময় মক্কার কাফেরদের প্রতিনিধি হযরত (সা)-কে বললেন, মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ থেকে ‘রসূলুল্লাহ’ কেটে দিয়ে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদ) লিখে দাও। হযরত আলী ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কাটতে রাজী হলেন না। তখন হযরত (সা) সন্ধি পত্রটা তার হাত থেকে নিয়ে নিজেই ঐ শব্দটা কেটে দিলেন এবং ‘মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ’ লিখে দিলেন। সাহাবী বারা ইবনে আজেবের বরাত দিয়ে বর্ণিত এই হাদীসটা বুখারীর চার জায়গায় এবং মুসলিমে দু’জায়গায় উদ্ধৃত হয়েছে এবং প্রত্যেক জায়গায় এর পার্থক্য রয়েছে। এক বুখারীর সন্ধিসংক্রান্ত অধ্যায়ে এক বর্ণনার ভাষা এ রকমঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১১০ পৃষ্ঠায়)

“হযরত রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-কে বললেনঃ এ কথাটা কেটে দাও। হযরত আলী (রা) বললেন, ওটা আমি কাটতে পারবো না। অবশেষে হযরত নিজ হাতেই তা কেটে দিলেন।

দুইঃ বুখারীর অন্য রেওয়ায়াতের ভাষা এ রকমঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১১০ পৃষ্ঠায়)

“অতপর হযরত আলী (রা)-কে তিনি বললেন! রসূলুল্লাহ শব্দটা কেটে দাও। আলী (রা) বললেনঃ না, খোদার কছম, আপনার নাম আমি কখনো কাটবো না। অতপর হযরত (সা) সন্ধি পত্র নিয়ে নিলেন এবং তাতে লিখলেনঃ এটা আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদের সম্পাদিত চুক্তি”।

তিনঃ বারা ইবনে আজেবের বরার দিয়ে জিজিয়া অধ্যায়ে সন্তিবেশিত হয়েছে বুখারীর তৃতীয় বর্ণনা। তাতে বলা হয়েছেঃ (আরবী*****************পিডিএফ ১১০পৃষ্ঠায়)

“হযরত (সা) নিজে লিখেতে জানতেন না। তিনি হযরত আলী (রা)-কে বললেন ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কেটে দাও। হযরত আলী (রা) বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি ওটা কখনো কাটবো না তখন হযরত (সা) বললেনঃ তাহলে যেখানে শব্দটা লেখা আছে, সে জায়গাটা আমাকে দেখিয়ে দাও। তিনি হযরত (সা)-কে জায়গাটা দেখালেন। তখন হযরত (সা) নিজ হাতে শব্দটা কেটে দিলেন।

চারঃ বুখারীর চতুর্থ বর্ণতা সন্নিবেশিত হয়েছে কিতাবুল মাগাজীতে (যুদ্ধ-বিগ্রহ সংক্রান্ত অধ্যায়) সেটা এইঃ

(আরবী*****************পিডিএফ ১১০ পৃষ্ঠায়)

“তখণ হযরত (সা) সন্ধিপত্র হাতে নিলেন। অথচ তিনি লিখতে পারতেন না। তিনি লিখলেনঃ এটা আবদুল্লাহর ছেলে মুহাম্মদের সম্পাদিত চুক্তি”।

পাঁচঃ বারা ইবনে আজেব থেকে মুসলিমের কিতাবুল জিহাদে আরো একটা বর্ণনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, হযরত আলী (রা) অস্বীকার করায় হযরত নিজ হাতে ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কেটে দেন।

ছয়ঃ মুসলিম শরীফের অপর রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে যে, হযরত আলী (রা)-কে রসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘রসূলুল্লাহ’ শব্দটা কোথায় আমাকে দেখিয়ে দাও। হযরত আলী (রা) জায়গাটা দেখালেন। তখন হযরত সেই শব্দটা কেটে দিয়ে সেখানে লিখলেন ‘আবদুল্লাহ’র ছেলে। রেওয়ায়াত সমূহের ভাষায় এ তারতম্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মাঝখানের বর্ণনাকারীর হযরত বারা ইবনে আজেবের বক্তব্য অবিকলভাবে উদ্ধৃত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এ ‘আবদুল্লাহ’ শব্দটা হযরত নিজ হাতেই লিখেছিলেন। আসল ঘটনা এমনও হয়ে থাকতে পারে যে, হযরত আলী (রা) যখন ‘রাসূলুল্লাহ’ শব্দটা কাটতে অস্বীকার করেন তখন হযরত সেই জায়গা কোটতা হা হযরত আলী (রা)-এর কাছে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ে নিজ হাতে কেটে দেন এবং তারপর হযরত আলী (রা) বা অন্য কোনো লেখককে দিয়ে “ইবনে আবদুল্লাহ” লিখিয়ে নিয়েছেন। অন্যান্য রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, হয়ত আলী ও মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা) ও দু’জন লেখন সন্ধিপত্র লেখার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। (ফাতহুল বারী, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ২১৭) সুতরাং একজন লেখক যে কাজ করতে রাজী হননি, সে কাজ অন্য লেখককে দিয়ে করিয়ে  নেয়া হয়ে থাকলে সেটা বিচিত্র কিছু নয়।

মুজাহেদের বরাত দিয়ে ইবনে আবি শায়বা ও আমর ইবনে মায়বার উদ্ধৃত অন্য একটি বর্ণনার ভিত্তিতে হযরত রসূলুল্লাহ (সা) লেখাপড়া জানতেন বলে দাবী করা হয়ে থাকে। সেই বর্ণনাটি এইঃ (আরবী*****************পিডিএফ ১১১ পৃষ্ঠায়)

“হযরত রসূলুল্লাহ (সা) ইন্তেকালের পূর্বে লেখাপড়া শিখে নিয়েছিলেন”। কিন্তু সনদের বিচারে এ বর্ণনা খুবই দুর্বল। হাফেজ ইবনে কাছীর এ বর্ণনাকে ভিত্তিহীন ও দুর্বল আখ্যায়িত করেছেন। দ্বিতীয়তঃ হযরত (সা) যদি সত্যিই পরবর্তীকালে লেখাপড়া শিখে থাকতেন তাহলে কথাটা ব্যাপক জানাজানি হত। অনেক ছাহাবী এর বর্ণনা দিতেন, হযরত (সা) কার কার কাছ থেকে লেখাপড়া শিখলেন তাও প্রকাশ পেত। কিন্তু একমাত্র আওন ইবনে আবদুল্লাহ ছাড়া আর কেউ এ বর্ণনা দেননি। আওনের কাছ থেকে এটা জানতে পারেন মুজাহিদ। আওনও ছাহাবী নন, একজন তাবেয়ী (সাহাবীদের অব্যাবহিত উত্তর পুরুষ) এবং তিনিও নিশ্চিত করে জানাননি যে, কোন ছাহাবী বা ছাহাবীদের কাছ থেকে তিনি এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এদিক থেকেও এ বর্ণনায় দুর্বলতা স্পষ্ট। এমন দুর্বল বর্ণনার ভিত্তিতে বাস্তব ঘটনাকে খণ্ডনকারী কোনো বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।]

একজন নিরক্ষর মানুষের কুরআনের মতো একখানা কিতাব এনে দেয়া এবং বাহ্যতঃ কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই অসাধারণ প্রতিভা ও পরিপক্ষতার পরিচয় দেয়া নিসন্দেহে অস্বাভাবিক ব্যাপার। জ্ঞানী ও চক্ষুষ্মান লোকদের জন্যে এগুলো ঐ নিরক্ষর ব্যক্তির নবুয়াতের উজ্জ্বলতম নিদর্শন-[“ব্যক্তির কষ্টি পাথরে নবুয়াতে মুহাম্মদী” শীর্ষক নিবন্ধেও এ যুক্তি আলোচিত হয়েছে। তবে সেখানে কুরআনের যুক্তি বিশ্লেষণ না করেই বিষয়টি তুলে ধরা হয়েচে।–(সংকলক)।] দুনিয়ার যে কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবনী পর্যালোচনা করে দেখা হোক, তার ব্যক্তিত্ব গঠনে ও তার প্রতিভার বিকাশের যে কার্যকারণ নিহিত থাকে তার পরিবেশেই সে কার্যকারণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তার ব্যক্তিত্ব গঠনের উপাদানগুলো ও তার পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে সুস্পষ্ট মিল পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তিত্বে যে বিস্ময়কর গুণাবলী খুঁজে পাওয়া যায় না। আরবীয় সমাজে তো নয়ই। আশপাশের যেসব দেশের সাথে আরবদের সম্পর্ক ছিল, তাদের সমাজের কোনো দূরবর্তী পরিবেশেও হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যক্তিত্বের উপাদানগুলোর সাথে সামান্য মিল আছে –এমন উপাদানের সন্ধান মেলে না। এ বাস্তব সত্যের প্রেক্ষাপটেই উপরোল্লিখিত নিদর্শনের সমাবেশ ঘটেছে।–[এখানে কুরআন যেসব অভিযোগকারীদের জবাব দিচ্ছে, যারা মহানবী (সা)-এর নবুয়াতকে মেনে নিয়ে নিতে পূর্বশর্ত হিসেবে মোজিজা দেখানো দাবী করত।–(সংকলক)] অজ্ঞ লোকেরা তাঁর ভেতরে কোনো নির্দশনের সন্ধান না পেলেও কিছু আসে যায় না। তবে যাঁরা জ্ঞানী, তাঁরা এসব নিদর্শন দেখে বুঝতে পেরেছেন যে, তিনি এ অভূতপূর্ব প্রতিভার অধিকারী, তিনি একজন নবী ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

(আরবী*****************পিডিএফ ১১২ পৃষ্ঠায়)

“তারা বলে থাকে যে, এ ব্যক্তির ওপর তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিদর্শনাবলী নেমে এল না কেন? তুমি বলঃ নিদর্শনাবলী কেবল আল্লাহর কাছেই থাকে। আমি কেবল পুংখানুপুংখভাবে সতর্ক করতে এসেছি। আমি যে, তোমার কাছে কিতাব নাযিল করেছি এবং তা পড়ে পড়ে তাদেরকে শোনানো হচ্ছে –এটা কি তাদের যথেষ্ট নয়? বস্তুত এতে রয়েছে করুণা এবং মুমিনদের জন্যে উপদেশ”।–(সূরা আল আনকাবুতঃ ৫০-৫১)

অর্থাৎ নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও তোমার ওপর কুরআনরে মত একখানা কিতাব নাযিল হওয়াটাই কি একটা বড় মো’জেজা নয়? এটাই কি তোমার নবুয়াতের ওপর ঈমান আনার জন্যে যথেষ্ট নয়? এরপরও কি আর কোনো মো’জেযার প্রয়োজন থেকে যায়? অন্যান্য মো’জেযার ধরণ আলাদা। সেগুরো যারা দেখেছে কেবল তাদের কাছেই তা পড়িয়ে শোনানো হচ্ছে এবং হবে। তোমরা সবসময় তা দেখতে পার।

নবুয়াত-পূর্ব জীবনকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন

(আরবী*****************পিডিএফ ১১২ পৃষ্ঠায়)

“আমি ইতিপূর্বে একটা অংশ তোমাদের সাথেই কাটিয়েছি”।–(সূরা ইউনুছঃ ১৬)

কুরাইশ পৌত্তলিকদের ধারণা ছিল যে, কুরআন মুহাম্মদ (সা)-এর একটা মনগড়া রচনা। একে তিনি অহেতুক আল্লাহ প্রদত্ত বলে চালিয়ে দিতে চাচ্ছেন। অপর দিকে মুহাম্মদ (সা)-এর দাবী ছিল এই যে, এটা তাঁর রচনা করা কিতাব নয় বরং আল্লাহর তরফ থেকে অহীযোগে তাঁর কাছে এসেছে। ওপরের আয়াতটা পৌত্তলিকদের ঐ ধঅরণা খণ্ডনে এবং হযরতের এ দাবীর সমর্থনে একটা শক্তিশালী যুক্তি পেশ করেছে। অন্যান্য যুক্তি-প্রমাণ না হয় বাদই গেল। কিন্তু হযরত (সা)-এর বাস্তব জীবনটা তো তাদের চোখের সামনেই রয়েছে। নবুয়াতের আগে তিনি পুরো চল্লিশটা বছর তাদের সাথেই কাটিয়েছেন। তাদেরই শহরে জন্মেছেন। কৈশর-যৌবন পেরিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন তাদেরই চোখের সামনে। তাঁর ওঠা-বসা, থাকা-খাওয়া, মেলামেশা, লেন-দেন, বিয়ে-শাদী ইত্যাদি যাবতীয় সামাজিক সম্পর্ক তাদের সাথেই ছিল। তাঁর জীবনের কোনো ব্যাপারই তাদের অজানা বা অগোচর ছিল না। এমন জানাশোনা ও চাক্ষুষ প্রমাণের চেয়ে অকাট্য প্রমাণ আর কি হতে পারে! তাঁর এ জীবন দু’টো জিনিস অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল এবং প্রত্যেক মক্কাবাসীই তা জানতো।

প্রথমতঃ নবুয়াতের আগের পুরো চল্লিশ বছরের জীবনে তিনি এমন কোনো শিক্ষাদীক্ষা বা সাহচর্য পাননি –যার মধ্যে নবুয়াতের দাবী করার অব্যাবহিত পরে তিনি যে বহুমুখী জ্ঞানের পরিচয় দেন তার কোনো উৎস খুজেঁ পাওয়া যায়। কুরআনের সূরাগুলোতে যেসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে আলোচিত হয়েছে, কুরআন নাযিলের আগে তাঁকে কখনো সেসব বিষয়ে মাথা ঘামাতে, কথা বলতে ও মতামত প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। এমনকি চল্লিশ বছরে পদার্পণ করা মাত্রই হঠাৎ তিনি যে দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন, তার কোনো আয়োজন বা প্রস্তুতির কোনো চিহ্ন তাঁর চালচলন ও কথা বার্তায় পুরো চল্লিশ বছরের মধ্যেও তাঁর কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু বা ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনের চোখে পড়েনি। এ থেকে স্পষ্টতঃই প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তাঁর মস্তিষ্কের ফসল নয় বরং বাইরে কোথাও তার উৎপত্তি ঘটেছে এবং তা তাঁর ভেতরে আমদানি হয়েছে। কেননা মানুষের মস্তিষ্ক জীবনের কোনো স্তরে গিয়ে হঠাৎ কোনো জিনিস উপস্থাপিত করতে সক্ষম নয়। যে স্তরে গিয়েই কেনো কিছু উপস্থাপিত করুক না কেন, তার পূর্ববর্তী স্তরে তার প্রস্তুতি ও বিকাশ বৃদ্ধির লক্ষণসমূহ দেখা যাবেই। এ জন্যেই মক্কার কোনো কোনো চতুর লোক বুঝতে পেরেছিল যে, কুরআনের উৎপত্তি হযরত (সা)-এর মস্তিষ্ক থেকে ঘটেছে –এমন কথা বলা একেবারেই বালখিলাতার শামিল হবে। তাই তারা ভোল পাল্টিয়ে বলতে শুরু করে দিল যে, নেপথ্যে অন্য কোনো ব্যক্তি অবশ্যই রয়েছে যে মুহাম্মদ (সা)-কে এসব কথা শিখিয়ে দেয়। কিন্তু এ কথা আগেকার কথার চেয়েও বাজে কথা সাব্যস্ত হল। কেননা মক্কা তো দূরের কথা, সারা আরবে এম যোগ্যতার অধিকারী মানুষ একজনও ছিল না। যাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলা চলে যে, অমুক এসব বাণী রচনা করেছে বা রচনা করতে সক্ষম। আসলে এমন যোগ্যতা যার থাকে সে কোনো সমাজেই অজানা অচেনা থাকতে পারে না।

হযরত (সা)-এর নবুয়াত পূর্ব জীবনের দ্বিতীয় উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্যটা এই ছিল যে, মিথ্যা, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি, ঠকামি, হীনতা ও ইতরামির পর্যায়ের কোনো দোষ নামমাত্রও তাঁর চরিত্রে পাওয়া যেত না। গোটা সমাজে এমন কথা বলার মত কেউ ছিল না যে, এ দীর্ঘ চল্লিশ বছরের মেলামেশাকালে তাঁর আচরণে এ জাতীয় কোনো দোষত্রুটি দেখতে পেয়েছে। বরঞ্চ যে ব্যক্তিই তাঁর সংস্পর্শে এসেছে সে তাঁকে একজন পরম সত্যবাদী ন্যায়পরায়ণ, সচ্চরিত্র ও বিশ্বস্ত মানুষ হিসেবেই দেখেছে। নবুয়াতের মাত্র পাঁচ বছর আগেই কা’বা শরীফ মেরামতকালে এক প্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটে। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ কালোপাথর সরিয়ে যথাস্থানে কে নিয়ে রাখবে, তাই নিয়ে কুরাইশ বংশের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। শেষ পর্যন্ত তারা এ বলে আপোষ রফা করে যে, কাল সকালে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম হেরেম শরীফে ঢুকবে তাকেই সালিস মানা হবে। পরদিন দেখা গেল হেরেম শরীফে মুহাম্মদ (সা)-ই প্রথম প্রবেশ করেছেন। তাঁকে দেখা মাত্রই হৈ-চৈ করে উঠলোঃ “এ তো সেই ন্যায়পরায়ণ মানুষটা! আমরা রাজী। এ হলো মুহাম্মদ!” এভাবে নবীর পদে নিয়োগের আগেই আল্লাহ গোটা কুরাইশ বংশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ন্যায়পরায়ণতার স্বপক্ষে সাক্ষ্য নিয়ে নেন। এরপর সেই ‘আল আমীন’ আর কখনো অন্যায় ও অসত্যের আশ্রয় নিতে পারেন, তা ভাবার অবকাশ কি করে থাকতে পারে? যে ব্যক্তি সারা জীবনে কখনো কোনো সামান্য ব্যাপারেও মিথ্যার আশ্রয় নেননি ধোঁকাবাজি-ফেরববাজি করেননি, সে হঠাৎ করে নিজের মনগড়া কয়টা কথা মানুষকে শুনিয়ে দিয়ে তাকে আল্লাহর কথা বলে চালিয়ে দেয়ার মত এত বড় মিথ্যা এবং এমন ভয়ঙ্কর প্রতারণার আশ্রয় নিতে আরম্ভ করে হেবে, এটা কি করে সম্ভব?

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৪ পৃষ্ঠায়)

“আর হে মুহাম্মদ! এভাবেই আমি তোমার কাছে আপন নির্দেশে একটা রূহ অহী করে পাঠিয়েছি। তা না হলে কিতাব কি আর ঈমান কাকে বলে, সে সম্পর্কে তুমি কিছুই জানতে না”।–(সূরা আশ শূরাঃ ৫২)

বস্তুত নবুয়াত পাওয়ার আগে কখনো হযরত রসূলুল্লাহ (সা) কল্পনাও করতে পারেননি যে, কোনো একখানা কিতাব তাঁর পাওয়া উচিত বা পাওয়া আসন্ন। এমনকি আসমানী কিতাবসমূহ ও তার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তাঁর আদৌ কিছু জানাই ছিল না। অনুরূপভাবে আল্লাহর উপর তাঁর ঈমান ছিল সত্য। কিন্তু তিনি জানতেন না যে, সেই সাথে ফেরেশতা, নবুয়াত, আসমানী কিতাব ও আখেরাত সম্পর্কেও অনেক কিছু বিশ্বাস করতে হয়। মক্কাবাসীর কাছেও তাঁর নবুয়াতের ঘোষণা ছিল একেবারেই আকস্মিক ও অভাবনীয়। সেই আকস্মিক ঘোষণার আগে তাঁর মুখে কেউ কখনো আল্লাহর কিতাব বা অমুক অমুক জিনিসের ওপর ঈমান আনা উচিত বলে কোনো কথা শুনেছে, এমন সাক্ষ্য কেউ দিতে সমর্থ ছিল না। বলা বাহুল্য, কোনো ব্যক্তি যদি আগে থেকে নিজে নিজে নবী সাজার আয়োজন করতে থাকে তবে সে তাঁর নবুয়াত নিয়ে এত উদাসীন হতে পারে না যে, চল্লিশ বছর ধরে যারা তাঁর সাথে দিনরাত মেলামেশা করে তারা তাঁর মুখ থেকে কিতাব ও ঈমান সম্পর্কে একটা কথাও শুনবে না আর ঠিক চল্লিশ বছর পূর্ণ হতেই হঠাৎ ঐসব বিষয়ে সে অনর্গল বক্তৃতা দিতে শুরু করবে।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৪ পৃষ্ঠায়)

“তোমার ওপর কিতাব নাযিল করা হবে –এটা তুমি কখনো আশা করতে পারনি। শুধুমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহেই (তা নাযিল হয়েছে) সুতরাং কাফেরদের সাহায্যকারী হয়ো না”।–(সূরা কাসাসঃ ৮৬) মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতের প্রমাণ হিসেবে এ কথা বলা হচ্ছে। হযরত মূসা (আ)-এর ব্যাপারটাই আগে দেখা যাক। তিনি যে নবী হতে যাচ্ছেন এবং একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হতে চলেছেন, তা তিনি ঘূর্ণাক্ষরেও জানতেন না। নবী হওয়ার ইচ্ছা বা আকাংখা তো দূরের কথা, তার সম্ভাবনার ধারণাও তাঁর মনের কোণে কখনোও উঁকি মারেনি। হঠাৎ রাস্তা থেকে ডেকে এনে তাঁকে নবী বানানো হয় এবং তাঁকে দিয়ে এমন বিস্ময়কর কাজ সম্পন্ন করা হয় যার সাথে তাঁর অতীত জীবনের কোনো সাদৃশ্য ছিল না। অবিকল এটাই ঘটেছিল মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনের কোনো সাদৃশ্য ছিল না। অবিকল এটাই ঘটেছিল মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনে। হেরার গুহা থেকে নবুয়াতের ঘোষণা নিয়ে নেমে আসার একদিন আগে পর্যন্ত তাঁর জীবনধারা কি রকম ছিল, তিনি কি কাজ করতেন এবং কি ধরনের কথাবার্তা বলতেন, কি বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন এবং তাঁর তৎপরতা ও প্রবণতা কি ধরনের ছিল, মক্কার লোকেরা তা ভালো করেই জানতো। তাঁর জীবনের ঐ অংশটা পুরোপুরিভাবেই সততা, সত্যবাদিতা বিশ্বস্ততা ও সচ্চারিত্রতার জ্বলন্ত নিদর্শন ছিল সে কথা সত্য। তা ছিল একজন অতিশয় ভদ্র, নিতান্ত শান্তিপ্রিয় ও নিরীহ, ওয়াদা ও চুক্তি অটল, অন্যের অধিকার ও পাওনা দিয়ে দেয়ার ব্যাপরে অত্যন্ত যত্নবান এবং অসাধারণ পরোপকারী ব্যক্তির জীবন। এগুলো তাঁর জীবনের প্রধানতম এবং অসাধারণ গুরুত্ববহ বৈশিষ্ট্য ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর ভেতরে এমন কোনো জিনিসের অস্তিত্ব ছিল না যা দেখে কারও কল্পনায়ও আসতে পারে যে, এ সাধু-সজ্জ্বন লোকটি অতি শীঘ্রই নবুয়াতের দাবী করে বসবেন। তাঁর সাথে যারা ঘনিষ্ট যোগাযোগ রাখতো, যারা তাঁর আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বা বন্ধু-বান্ধব ছিল, তাদের মধ্যে কেউ বলতে পারত না যে, তিনি আগে থেকেই নবী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হেরা গুহার সেই আলোড়ন সৃষ্টিকারী মুহূর্তটার পর পরই আকস্মিকভাবে তিনি যেসব বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন শুরু করেছিলেন, সেসব বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে যে বিশেষ ধরনের ভাষা পরিভাষা ও শব্দ শুনতে আরম্ভ করে তা আগে কেউ তাঁর কাছে শোনেনি। কখনো তিনি কোনো ওয়াজ-নসিহত বা বক্তৃতা করতে দাঁড়াননি। কখনো কোনো আন্দোলন বা দাওয়াত নিয়েও মাঠে নামেননি। তাঁর কোনো তৎপরতা থেকে এমন আভাসও পাওয়া যায়নি যে, তিনি সামাজিক জীবনের সমস্যাবলীর সমাধান অথবা ধর্মীয় বা নৈতিক সংস্কারের কোনো কর্মসূচী হাতে নেয়ার পরিকল্পনা করছেন। সেই বিপ্লবাত্ম মুহুর্তটার একদিন আগে পর্যন্ত যিনি নিজের সন্তানাদি নিয়ে হাসিখুশীভাবে সময় কাটান, অতিথির যত্ন করেন, গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করেন, আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদাচার করেন এবং সময় সময় নিভৃতে গিয়ে ইবাদাত করেন। এমন একজন নিরীহ ভদ্রলোকের সহসা দুনিয়া কাঁপানো এক ঘোষণা দিয়ে জনতার সামনে হাজির হওয়া, এক বিপ্লবাত্মক দাওয়াত দিতে শুরু করা, এক অতুলনীয় সাহিত্য সম্ভার সৃষ্টি করা এবং সারা দুনিয়ার প্রচলিত মত ও পথ থেকে আলাদা এক অভিনব জীবন দর্শন, চিন্তা-পদ্ধতি এবং এক নতুন নৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নিয়ে উপস্থিত হওয়া নিঃসন্দেহে একটা অতীব চাঞ্চল্যকর ও অসাধারণ ঘটনা। একজন মানুষের পদ্ধতি বা আয়োজন এবং কোনো স্বেচ্ছাভিত্তিক উদ্যোগ বা চেষ্টার ফলে তা কখনো দেখা দিতে পারে না। কারণ এ ধরনের যে কোন চেষ্টা, উদ্যোগ-আয়োজন বা প্রস্তুতিকে অনিবার্যভাবে ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনের স্তরসমূহ অতিক্রম করেই অগ্রসর হতে হবে। আর সেসব স্তরসমূহ অতিক্রম করেই অগ্রসর হতে হবে। আর সেসব স্তর কখনো কোনো মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী-সহচরদের কাছ থেকে গোপন থাকতে পারে না। হযরত (সা)-এর জীবন যদি এসব স্তর অতিক্রম করে এগুতো তাহলে মক্কায় শত শত লোক বলে উঠতোঃ আমরা জানতাম লোকটা একদিন কোনো না কোনো চাঞ্চল্যকর দাবী তুলবেই। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, মক্কাবাসী হযরত (সা)-এর বিরুদ্ধে আর যত অভিযোগই করুক –এ অভিযোগটা কখনো উত্থাপন করেনি।

পক্ষান্তরে হযরত (সা) নিজে যে নবুয়াত লাভে ইচ্ছুক, তার প্রত্যাশী বা তার জন্যে অপেক্ষমান ছিলেন না, বরং সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয়ভাবে হঠাৎ এ ব্যাপারটার সম্মুখীন হন, অহীর সূচনাকালীন অবস্থার বিবরণ সম্বলিত হাদীসগুলোতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। জিবরাঈল (আ)-এর সাথে প্রথম দেখা হওয়া এবং সূরা আলাকের প্রথম ক’টা আয়াত নাযিলের মাধ্যমে নবুয়াতের উদ্বোধন সম্পন্ন হওয়ার পর হযরত (সা) হেরা গুহা থেকে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ী উপস্থিত হন। অতপর পরিবার-পরিজনকে বলেনঃ “আমাকে ঢেকে দাও। আমাকে ঢেকে দাও”। কিছুক্ষণ পর যখন ভয় পাওয়ার অবস্থা একটু কেটে গেল, তখন তাঁর জীবনসঙ্গিনী খাদিজা (রা)-কে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে বললেনঃ “আমার আশংকা হচ্ছে যে, মরে যাবো”। খাদিজা (রা) তৎক্ষনাৎ বললেনঃ “কখনো নয়। আল্লাহ আপনাকে কখনো কষ্টে ফেলবেন না। আপনি আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করে থাকেন, অসহায় ও কপর্দহীনকে সাহায্য করেন, অতিথির সমাদর করেন এবং প্রত্যেক ভালো কাজে সহযোগিতা করার জন্যে প্রস্তুত থাকেন। তারপর তিনি হযরত (সা)-কে ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা ছিলেন খাদিজা (রা)-এর চাচাতো ভাই এবং আহলে কিতাবের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি। তিনি হযরত (সা)-এর কাছে সমস্ত ঘটনার বিবরণ শুনে নির্বিকারভাবে বলেনঃ “বলেন কি? এরা আমাকে এখান থেকে বের করে দেবে নাকি?” হযরত (সা) বললেনঃ “বলেন কি? এরা আমাকে এখান থেকে বের করে দেবে নাকি?” ওয়ারাকা জবাব দেনঃ “হ্যাঁ, আপনি যে জিনিস নিয়ে এসেছেন, অতীতে তা নিয়ে যখনই কেউ এসেছে, অমনি দেশবাসী তার শত্রু হয়ে গেছে”।

একজন সাদাসিদে মানুষ যখন অপ্রত্যাশিতভাবে এক অত্যন্ত অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ঘটনার সম্মুখীন হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই তার যে ভাবান্তর ঘটনে পারে, এ ঘটনাটার মধ্যে তার একটা নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে। হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর যদি আগে থেকেই নবী হওয়ার মতলব থাকতো নিজের সম্পর্কে যদি ভাবতেন যে, তাঁর মত মানুষের নবী হওয়া উচিত, আর সেই নবুয়াতের অপেক্ষায় নিভৃত ধ্যান মগ্ন হয়ে এ ভাবনায় অস্থির থাকতেন যে, কখন ফেরেশতা আসবে এবং তাঁর কাছে বার্তা বয়ে আনবে, তাহলে হেরা গুহার ঘটনাটা তিনি খুশীতে লাফিয়ে উঠতেন, আনন্দ ও গর্বে উৎফুল্ল হয়ে পাহাড় থেকে নেমে সোজা জনগনের কাছে পৌঁছে যেতেন এবং বড় গলায় নিজের নবুয়াতের কথা ঘোষণা করে দিতেন। কিন্তু কোথায় সেই খুশী আর কোথায় সেই বড় গলা! তিনি সেখানে হলেন অতপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন। মন একটু শান্ত হলে স্ত্রীকে কানে কানে সব কথা বললেন। তিনি জানালেন, ‘আজ হেরা গুহায় নির্জনে আমি এ দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম। জানি না আমার কি হবে। আমর জীবন বিপন্ন মনে হচ্ছে”। নবুয়াতের একজন উমেদারের যে প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা, এটা যে তা থেকে কতখানি ভিন্ন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বামীর জীবন, তাঁর স্বভাব ও চিন্তাধারা সম্পর্কে স্ত্রীর চেয়ে বেশী কেউ জানতে পারে না। তাঁর যদি আগে থেকে জানা থাকতো যে, স্বামী নবুয়াতের অভিলাষী এবং কখন ফেরেশতা আসবে, তার অপেক্ষায় সর্বদা প্রহর গুণছেন, তাহলে হযরত খাদিজা (রা) এ ধরনের জবাব দিতেন না। দিতেন অন্য রকম। তিনি বলতেন, ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন? এতদিন ধরে যে জিনিসের সাধ ছিল তা হাতে পেয়েছেন। এখন যান, পীর-মুরিদীর ব্যবসা জুড়ে দিন। নজরনেয়াজ যা আসবে, তার রক্ষণাবেক্ষণের প্রস্তুতি আমি নিচ্ছি। কিন্তু পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে হযরত (সা)-এর জীবনের যে পরিচয় তিনি পেয়েছিলেন তার পরিপ্রেক্ষিতে এক মুহুর্তের মধ্যেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এমন সৎ ও নিঃস্বার্থ মানুষের কাছে আর যেই আসুক, শয়তান আসতে পারে না কিংবা আল্লাহ তাঁকে কোনো কঠিন মুসিবতেও ফেলতে পারেন না। বস্তুত তিনি যা দেখেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য।

ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের অবস্থাও ছিল সেই রকম। তিনি তাঁদের পর ছিলেন না। হযরত (সা)-এর জ্ঞাতি এবং খুবই ঘনিষ্ঠ শ্যালক ছিলেন। একজন খৃষ্টান পণ্ডিত হিসেবে নবুয়াত, কিতাব ও অহ কাকে বলে তা তিনি জানতেন এবং কৃত্রিম ও মনগড়া জিনিস থেকে আসল জিনিস বেছে বের করার ক্ষমতা রাখতেন। বয়সে হযরত (সা)-এর চেয়ে কয়েক বছরের বড় হওয়ায় শৈশব থেকে তাঁর পুরো জীবনটা তিনি দেখেছিলেন। তিনিও তাঁর মুখে হেরার ঘটনা শুনে তৎক্ষণাৎ বলে দিলেনঃ এই আগন্তুক নিশ্চয়ই সেই ফেরেশতা যিনি হযরত মূসা (আ)-এর কাছে অহী নিয়ে আসতেন। কেননা এখানেও হযরত মূসা (আ)-এর মত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সম্পূর্ণ নিখুঁত ও নিষ্কলুষ চরিত্রের একজন সাদাসিদে মানুষ। সর্বতোভাবে স্বচ্ছ ও মুক্ত মন তাঁর। তাঁর মধ্যে নবুয়াতের অভিলাষ থাকা তো দূরের কথা নবুয়াত লাভের কল্পনাও তিনি কখনো করেননি। সহসা তিনি সম্পূর্ণ সজ্ঞান ও সচেতন অবস্থায় প্রকাশ্যে এ অভূতপূর্ব ঘটনার সম্মুখীন হন। এ জন্যেই ওয়ারাকা কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হন যে, এখানে প্রবৃত্তির কোনো প্রবঞ্চনা বা শয়তানের কোনো প্রতারণার হাত নেই। বরং চির চেনা এ সৎ সত্যবাদী মানুষটা নিজের ইচ্ছা বা অভিলাষমুক্ত অবস্থায় যা দেখেছে তা ঠিকই দেখেছে, প্রকৃত সত্যের দর্শনই সে লাভ করেছে। ওয়ারাকা এ সিদ্ধান্ত চিল গাণিতিক হিসেবের মতই নির্ভুল ও অকাট্য।

বস্তুত নবুয়াত পূর্ব জীবনের সর্বাত্মক সততা, সত্যবাদিতা ও নিরেট নিরক্ষরতার প্রেক্ষাপটে এমন আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিতভাবে অহী নাযিল হওয়া নবুয়াতের সত্যতার এমন এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ, যাকে অস্বীকার করা যে কোনো বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষে অসম্ভব। কুরআনে একাধিক স্থানে একে নবুয়াতের প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। যেমন সূরা ইউনুসে আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৭ পৃষ্ঠায়)

 “হে নবী! তুমি বলঃ আল্লাহর ইচ্ছা না হলে আমি তোমাদেরকে কখনো এ কুরআন পড়ে শোনাতে পারতাম না এবং এর খবরও তোমাদেরকে দিতে পারতাম না। জীবনের একটা (উল্লেখযোগ্য) অংশ তো আমি তোমাদের ভেতরেই কাটিয়েছি। এতটুকু কথাও কি তোমরা বুঝতে পার না?”-(আয়াতঃ ১৬)

সূরা আশ শূরায় আল্লাহ বলেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৪ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী! তুমি আদৌ জানতে না কিতাব কি জিনিস আর ঈমান কাকে বলে। তবে এই অহীকে আমি একটা জ্যোতিতে পরিণত করেছি। এ জ্যোতি দিয়ে আ নিজের বান্দাদের মধ্যে যাকে খুশী সঠিক পথের সন্ধান দেই”।–(আয়াতঃ ৫২)

তাফহীমুল কুরআন সূরা ইউনুছ, টীকা-২১, আনকাবুত টীকা-৮৮*৯২, শূরা টীকা ৮৪তে এ সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র নিষ্কলুষ জীবন, সাহাবায়ে কেরামের চরিত্রের ওপর তাঁর শিক্ষা-দীক্ষার বিস্ময়কর প্রভাব এবং কুরআনের উচ্চাঙ্গ আলোচ্য বিষয়সমূহ –এসব অত্যন্ত উজ্জ্বল নিদর্শন। যে ব্যক্তি নবীদের জীবনবৃত্তান্ত এবং আসমানী কিতাবসমূহের শিক্ষা সন্দেহ পোষন করা অত্যন্ত কঠিন।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৮ পৃষ্ঠায়)

“(তিনি) আল্লাহর পক্ষ হতে প্রেরিত এমন এক দূত, যিনি পবিত্র গ্রন্থসমূহ পড়ে শুনান। সেসব গ্রন্থে রয়েছে সত্য ও সঠিক রচনাবলী”।–(সূরা বাইয়েনাঃ ২-৩)

এখানে রসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যক্তি সত্তাকে একটা উজ্জ্বল প্রমাণ বলে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা তাঁর নবুয়াতের পূর্বাপর জীবন, নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও কুরআনের মত গ্রন্থ উপস্থাপন, তাঁর শিক্ষা ও সাহচর্যের প্রভাবে মুমিনদের জীবনে অস্বাভাবিক বিপ্লব দেখা দেয়া, সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত আকীদা-বিশ্বাস, অত্যন্ত নিখুঁত ও পরিচ্ছন্ন ইবাদাত, উৎকৃষ্টতম নির্মল চরিত্র এবং মানবজীবনের জন্যে সর্বোত্তম নীতিমারা ও বিধান শিক্ষা দান। হযরত (সা)-এর কথা ও কাজে পরিপূর্ণ সংগতি ও সামঞ্জস্য এবং সব রকমের বিরোধিতা ও বাধাবিপত্তির মোকাবিলায় অটুঁট মনোবল ও অবিচল নিষ্ঠা নিয়ে নিজের দাওয়াতের কাজ অব্যাহত রাখা –এসব অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর আল্লাহর রসূল হওয়ার সুস্পষ্ট নিদর্শন।

কুরআন একটা অলৌকিক রচনা এবং নবুয়াতের প্রমাণ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১১৮ পৃষ্ঠায়)

“নিসন্দেহে বিশ্ব প্রতিপালকের কাছ থেকেই এ কিতাব নাযিল হয়েছে। তারা কি বরে যে, এটা ঐ ব্যক্তির মনগড়া জিনিস? না। বরং এটা তোমার প্রতিপালকের পক্ষ তেকে আসা পরম সত্য”।–(সূরা আস-সাজদাহঃ ২-৩)

এখানে শুধু এ কথা বলা হয়নি যে, এ কিতাব বিশ্ব প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আরো জোর দিয়ে সেই সাথে বলা হয়েছে, নিসন্দেহে এটা আল্লাহর কিতাব। এটা যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া কিতাব, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। এ নিশ্চয়তাসূচক বাক্যটাকে কুরআন অবতারণের বাস্তব প্রেক্ষাপটে এবং স্বয়ং কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনার আলোকে যদি পড়ে দেখা হয় তাহলে বুঝা যাবে যে, এতে একই সাথে একটিা দাবী উত্থাপন এবং তার প্রমাণ দেখানো হয়েছে। যে মক্কাবাসীর সামনে এ দাবী উত্থাপন করা হয়েছে, তাদের কাছে এ প্রমাণ অজানা ছিল না। যিনি এ কিতাব পড়ে শোনালেন তার গোটা জীবন কিভাবে পড়ে শোনানোর আগের ও পরের জীবন দু’টোই তাদের জানা। এ কিতাবের যে ভাষা ও বাচনভঙ্গী তার সাথে মুহাম্মদ (সা)-এর নিজের ভাষা ও বাচনভঙ্গীর সুস্পষ্ট পার্থক্য তারা দেখতে পেত। তারা পরিষ্কার বুঝতে পারত যে, একই ব্যক্তির দুই রকম বাচনভঙ্গী এত ব্যবধানসহ হতে পারে না। তারা এ কিতাবের পরম অলৌকিক সাহিত্য-সন্দৌর্য লক্ষ্য করছিল। এবং আরবের সমস্ত কবি সাহিত্যিক যে এর সমকক্ষ সাহিত্য সৃষ্টি করতে অক্ষম, তা একই ভাষাভাষী হওয়ার কারণে তারা দিব্য চোখেই দেখতে পাচ্ছিল।–[কুরআনকে উপস্থাপন করাই হয়েছে এই চ্যালেঞ্জ দিয়েঃ (আরবী**** টীকায়) “পার তো এর সমকক্ষ একটা সূরা নিয়ে এস”। এ চ্যালেঞ্জ কুরআনের অলৌকিকত্বকে আরো বেশী সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। এ চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে অক্ষম প্রতিপক্ষ নীরবে স্বীকার করে নিয়েছিল যে, এ সাহিত্য মানব রচিত নয়। কুরআনের এই অলৌকিকত্বকে আল্লাহ হযরত (সা)-এর নবুয়াতের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।–(সংকলক বৃন্দ)] আরবের কবি-সাহিত্যিক, বক্তা ও ধর্মযাজকদের ভাষা এবং কুরআনের ভাষার মধ্যে যে কত বড় পার্থক্য এবং কুরআনে বর্ণিত বিষয়বস্তু যে কত উচ্চমানের তাও তাদের অজানা ছিল না। একজন মিথ্যাদাবীদারের সাহিত্যে ও কাজে যে স্বার্থপরতা নিহিত থাকে, কুরআনের সাহিত্য ও তার বাহকের দাওয়াতে সে স্বার্থ পরতার নামগন্ধও তারাদেখতে পায়নি। অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগিয়েও তাঁরা খুঁজে বের করতে সমর্থ ছিল না নবুয়াতের দাবী করে হযরত (সা) নিজের, নিজ পরিবারের, গোত্রের বা জাতির দাওয়াতের দিকে জাতির মধ্য থেকে কি ধরনের লোকেরা আকৃষ্ট হচ্ছে এবং এবং তাদের জীবনে কত বড় বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে, তা তারা স্বচক্ষেই দেখতে পাচ্ছিল। এসব কিছুই ছিল নবুয়াতের দাবীর স্বপক্ষে একটা অকাট্য প্রমাণ। এ পটভূমিতে শুধু এ কথা বলাই যথেষ্ট ছিল যে, এ কিতাব রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকেই যে নাযিল হয়েছে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

বিশ্বনবী সম্পর্কে তাওরাত ও ইঞ্জিলের ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত ঈসা (আ)-এর গুরুত্বপূর্ণ উক্তি

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১২০ পৃষ্ঠায়)

“মরিয়মের ছেলে ঈসার কথাটা মনে কর। তিনি বলেছিলেনঃ হে ইসরাঈলের বংশধর! আমি তোমাদের কাছে রসূলরূপে প্রেরিত হয়েছি। আমার আগে যে তাওরাত এসে রয়েছে, আমি তার সত্যতা ঘোষণা করতে এসেছি”।–(সূরা আছ-ছাফঃ৬)

এ কথাটার তিন রকম ব্যাখ্যা হতে পারে এবং তিনটি ব্যাখ্যাই সঠিক। প্রথম ব্যাখ্যা এই যে, আমি কেনো আলাদা ও অভিনব ধর্ম নিয়ে আসিনি। হযরত মূসা (আ) যে ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন আমিও সেটাই নিয়ে এসেছি। আমি তাওরাতকে খণ্ডন করতে আসিনি বরং তাকে সমর্থন ও তার সত্যতা ঘোষণা করছি। আল্লাহর প্রত্যেক রসূলেরই চিরন্তন রীতি পূর্ববর্তী রসূলের সমর্থন করা ও তার সত্যতা ঘোষণা করা। আমিও সেই রীতি মেনে চলছি। সুতরাং আমার রসূল হওয়াকে স্বীকার করে নিতে তোমাদের ইতস্ততঃ করার কোনো কারণ নেই।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যা এই যে, তাওরাতে আমার রসূল হয়ে আসা সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে আমার রিসালাত দ্বারা তা সত্যায়িত বা পূর্ণ হয়েছে। সুতরাং আমার বিরোধিতা করার পরিবর্তে তোমাদের বরং এ বলে আমাকে স্বাগত জানানো উচিত যে, আগেকার নবীরা যে নবীর আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন সে নব এসে গেছে।

কুরআনের আলোচ্য কথাটাকে এর পরবর্তী কথার সাথে মিলিয়ে পড়লে এর তৃতীয় যে ব্যাখ্যা দাঁড়ায় তা হলো এই যে, আমি আল্লাহর রসূল আহমদ (সা)-এর শুভাগমন সম্পর্কে তাওরাতের দেয়া ভবিষ্যদ্বাণীকে সত্য বলে ঘোষণা করছি এবং নিজেও তাঁর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করছি। হযরত মূসা (আ) স্বজাতিকে সম্বোধন করে বিশ্বনবীর আবির্ভাব সম্পর্কে যে আগম সুসংবাদ দিয়েছিলেন, এ তৃতীয় ব্যাখ্যার আলোকে হযরত ঈসা (আ)-এর এ উক্তি সেই সুসংবাদেরই সমর্থন ও সত্যায়নের শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

তাওরাতের সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী

জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত সেই ভাষণে মূসা (আ) বলেনঃ “তোমার প্রভু তোমার জন্যে তোমারই মধ্য থেকে অর্থাৎ তোমারই ভাইদের মধ্য থেকে আমার মত একজন নবীর আবির্ভাব ঘটাবেন। তোমরা তাঁর কথা শুন। ‘হাওরেবে’ থাকাকালে সম্মেলনের দিন তুমি তোমার প্রভুর কাছে যে, আবেদন জানিয়েছিলে, সে অনুসারেই এ আবির্ভাব ঘটবে। তুমি বলেছিলেঃ আমার প্রভুর সম্বোধন যেন আমাকে আর শুনতে না নয় আর এমন ভয়াবহ আগুনও দেখতে না হয় যার দরুন আমার মরারও ফুসরত হয় না। প্রভু আমাকে বলেছেন, ওরা যা বলে ঠিকই বলে। আমি তাদের জন্যে তাদের ভাইদের মধ্যে থেকে একজন নবী পাঠাবো, আমার কথাই তাঁর মুখ দিয়ে প্রচারিত করবো এবং আমি যা বলতে বলবো সে শুধু তাই বলবে। সে আমার নাম নিয়ে আমার যে কথাগুলো বলবে তা যে, শুনবে না আমি তার কাছ থেকে তার হিসেব নেব”।–(ব্যতিক্রম পস্তুক, অধ্যায় ১৮, আয়াত ১৫-১৯)

এটা তাওরাতের সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী। মুহাম্মদ (সা) ছাড়া আর কারও বেলায় এটা খাটে না। এতে হযরত মূসা (আ) তাঁর জাতিকে আল্লাহর এ প্রতিশ্রুতি জানিয়ে দিচ্ছেন যে, “আমি তোমার জন্যে তোমার ভাইদের মধ্য থেকে একজন নবী পাঠাবো। এটা জানা কথা যে, একটা জাতির ‘ভাইয়েরা’ বলতে সে জাতিরই কোনো পরিবার বা গোত্র বুঝায় না। জাতির ভাই বলতে সেই জাতির সমবংশীয় অন্য একটা জাতিকে বুঝায়। এ কতার মর্ম যদি এ হতো যে, বনী ইসরাঈলের মধ্য থেকেই কোনো নবীর আবির্ভাব ঘটবে তাহলে বলা হত ‘আমি তোমাদের জন্যে স্বয়ং তোমাদের মধ্য হতেই একজন বী পাঠাবো’। সুতরাং বনী ইসরাঈলের ভাই অর্থ অনিবার্যভাবে বনী ইসমাঈলই হতে পারে। কেননা সেটা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর হওয়ার কারণে নবী ইসরাঈলের সমবংশীয়। তাছাড়া এ ভবিষ্যদ্বাণী বনী ইসরাঈলের কোনো নবীর ওপর যে প্রযোজ্য হতে পারে না তার আরো একটা কারণ রয়েছে। সেটা এই যে, হযরত মূসা (আ)-এর পর বনী ইসরাঈলে একজন নবী আসেননি, বহুসংখ্যক নবী এসেছেন। সারা বাইবেলে সেই নবীদের বিবরণ রয়েছে।

এ ভবিষ্যদ্বাণীর আরো একটা বিষয় লক্ষণীয়। যে নবী আসবেন তিনি হযরত মূসা (আ)-এর মতোই নবী হবেন। বলাবাহুল্য, এর অর্থ আকার-আকৃতি বা জীবনেতিহাসের সাদৃম্য নয়। কেননা এদিক দিয়ে কোনো ব্যক্তিই অন্য ব্যক্তির মতো হয় না। শুধু মাত্র নবী হওয়ার দিক দিয়ে সাদৃশ্য এ দ্বারা বুঝায় না। কেননা হযরত মূসা (আ)-এর পরে যত নবী এসেছেন, তাদের সাথে এদিক দিয়ে সাদৃশ্য ছিল। তাই হযরত মূসা (আ)-এর মত হওয়ার বৈশিষ্ট্যের দাবীদার কোনো বিশেষ একজন নবী হতে পারেন না। সাদৃশ্যের এ দু’টো দিক সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তের পর সাদৃশ্যের যে দিকটা অবশিষ্ট থাকে এবং যা পরবর্তী নবীর বৈশিষ্ট্য বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য, সেটা হলো, শুধু পৃথক শরীয়াত তথা পৃথক আইন ব্যবস্থা। যে নবী আসবেন তিনি হযরত মূসা (আ)-এর মত আরাদা আইন ব্যবস্তা নিয়ে আসবেন –এটাই তার ভবিষ্যদ্বাণীর মর্মকথা। মুহাম্মদ (সা) ছাড়া আর কেউ এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী নন। কেননা তার আগে বনী ইসরাঈলের যত নবী এসেছেন তারা হযরত মূসা (আ)-এর আনীত আইন ব্যবস্থারই অনুসারী ছিলেন। আলাদা আইন ব্যবস্থা নিয়ে কেউ আসেননি।

তাওরাতের উক্তির এ ব্যাখ্যার যৌক্তিকতা পরবর্তী উক্তি থেকে আরো বেশী করে প্রতিপন্ন হয়। “হাওরেবে থাকাকালে সম্মেলনের দিন তুমি তোমার প্রভুর কাছে যে আবেদন জানিয়েছিলেন সে অনুসারেই ঐ নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তুমি বলেছিলেঃ আমার প্রভুর সম্বোধন যেন আমাকে আর শুনতে না হয় আর এমন ভয়াবহ আগুনও আর দেখতে না হয় –যার দরুন আমার মরারও ফুরসত হয় না। প্রভূ আমাকে বলেছেনঃ ওরা যা বলে ঠিকই বলে। আমি তাদের জন্যে তাদের বাইদের মধ্য থেকেই এজন নবী পাঠাবো। আমার কথাই তার মুখ দিয়ে প্রচারিত করবো। আমি যা বলতে বলবো সে শুধু তাই বলবে”। হযরত মূসা (আ)-কে সর্বপ্রথম শরীয়াতের বিধান দেয়া হয় যে আবেদনের কথা এখানে বলা হয়েছে, তার তাৎপর্য এই যে, ভবিষ্যতে যদি আমাদেরকে কোনো শরীয়াত তথা আইন ব্যবস্থা দেয়া হয় তাহলে সেই ভয়ংকর অবস্থায় যেন দেয়া না হয় যে অবস্থার বিবরণ কুরআনেও আছে, বাইবেলেও আছে। (দেখুন সূরা বাকারাহঃ আয়াত ৫৫, ৫৬, ৬৩; সূরা আরাফঃ আয়াত ১৫৫-১৭১; বাইবেল নির্গমন পুস্তক ১৯:১৭-১৮)-এর জবাবে হযরত মূসা (আ) বনী ইসরাইলকে জানান যে, আল্লাহ তোমাদের এব আবেদন মঞ্জুর করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আমি তাদের জন্যে এমন নবী পাঠাবো যার মুখ দিয়ে আমার কথা প্রচার করবো। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আইন ব্যবস্থা দেয়ার সময় হাওরেব পাহাড়ের উপত্যকায় যে ভয়াবহ অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল তা আর হবে না। বরং এখন যে নবীকে এ দায়িত্ব দেয়া হবে তাকেই শুধু আল্লাহর বাণী কণ্ঠস্থ করিয়ে দেয়া হবে এবং তিনি তা মানুষকে শুনিয়ে দেবেন। এ সুস্পষ্ট ঘোষণাটা একটু তলিয়ে দেখলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সা)-ই এ ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব লক্ষ্য। হযরত মূসার পর স্বতন্ত্র শরীয়াতের অধিকারী কেবল তিনিই হয়েছিলেন। হাওরেব পাহাড়ের পাদদেশে শরীয়াত প্রদানের সময় বনী ইসরাঈলীদের যে বড় গণ-জমায়েত হয়েছিল, মুহাম্মদ (সা)-কে শরীয়াত প্রদান করার সময় তেমন কোনো সম্মেলন হয়নি। আর সেখানে যে ধরনের অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল, শরীয়াতের নির্দেশ জারী করার সময় তেমন অবস্থা আর কখনো হয়নি।

ইঞ্জিলে নবুয়াতে মুহাম্মদী সুসংবাদ

হযরত ঈসা (আ) নবুয়াতে মুহাম্মদীর যে সুসংবাদ দেন কুরআনে তার উল্লেখ এভাবে করা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১২২ পৃষ্ঠায়)

“মরিয়মের ছেলে ঈসার সেই কথাটা মনে কর। তিনি বলেছিলেনঃ হে ইসরাঈলদের বংশধর! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রসূল হয়ে এসেছি। আমি সেই তাওরাতের সত্যতা স্বীকারকারী যা আগে থেকেই এসে রয়েছে। আর আমার পরে আহমদ নামক যে রসূল আসবেন তার সুসংবাদ দিতে এসেছি”।–(সূরা আছ ছাফঃ ৬)

এটা কুরআনের একটা গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এ আয়াত নিয়ে ইসলাম বিরোধীরা অনেক বাকবিতণ্ডা করেছে। আবার অপরাধমূলক অপব্যাখ্যার চেষ্টাও করেছে। কেননা এতে বলা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ) হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর নাম পরিস্কারভাবে উল্লেখ করে তাঁর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন।–[এ ছাড়াও সামগ্রিকভাবে বাইবেলের নানা জায়গায় হযরত (সা)-এর আগমনের ভবিষদ্বাণী রয়েছে। এ সম্পর্কে কুরআনে এক কথায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী********* টীকায়)

“আহলে কিতাব তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে তাঁর কথা লিখিত দেখতে পায়”।–(সূরা আ’রাফঃ ১৪৭)

উদাহরণ স্বরূপ তাওরাত ও ইঞ্জিলের নিম্নলিখিত স্থানগুলোতে মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে পূর্বাভাস লক্ষ্যণীয়। ব্যতিক্রম পুস্তক, অধ্যায় ১৮, আয়াত ১৫-১৯’ মথি পুস্তক, অধ্যায় ২১, আয়াত ৩৩-৪৬; যোহন পুস্তক, অধ্যায় ১, আয়াত ১০-২১; যোহন পুস্তক, অধ্যায় ১৪, আয়াত, ১৫-১৭, ২৫-৩০; যোহন অধ্যায় ১৫, আয়াত ২৫,২৬; যোহন অধ্যায় ১৬, আয়াত ৭-১৫। ৭৭-গ্রন্থকার ও সংকলক বৃন্দ।] এ জন্যে এ বিষয়টা নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

একঃ “মুহাম্মদ” ও “আহমদ”: এ আয়াতে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নাম আহমদ উল্লেখ করা হয়েছে। আহমদের দুই অর্থঃ সর্বাধিক প্রশংসাকারী ও সর্বাদিক প্রশংসিত মানুষের মধ্যে সর্বাধিক প্রশংসনীয়। বিশুদ্ধ হাদীস থেকে জানা যায় যে, এটাও হযরত (সা)-এর অন্যতন নাম ছিল। মুসলিম ও আবু দাউদ তিয়ালিসীর হাদীস গ্রন্থে হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা)-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, হযরত (সা) বলেছেনঃ (আরবী********) “আমি মুহাম্মদ, আমি আহমদ এবং আমি হাশের (সমবেদকারী) এ মর্মে হযরত জোবাইর ইবনে মোতয়েমের সূত্রে বর্ণিত একাধিক হাদীস ইমাম মালেক, বুখারী, মুসলিক, দারামী ‘তিরমিজী’ নাসায়ী নিজ নিজ হাদীসগ্রন্থে উদ্ধৃত করেছেন। হযরত (সা)-এর এ নাম সাহাবীদের মধ্যেও প্রচলিত ও জানা ছিল। হাসসান বিন সাবিতের কবিতায় একটি চরণ নিম্নরূপঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১২৩ পৃষ্ঠায়)

“কল্যাণময় আহমদের ওপর আল্লাহ, তার আরশের চারপাশে ভীড় করে থাকা ফেরেশতারা এবং পবিত্র ব্যক্তিগণ দরূদ পাঠিয়েছেন”। ইতিহাস থেকেও জানা যায়, হযরত মুহাম্মদ (সা) শুধু এ নামেই পরিচিত ছিলেন না বরং তাঁর আহমদ নামও সকলের জানা ছিল। আরব জাতির সমগ্র সাহিত্য ভাণ্ডারে হযরত (সা)-এর আগে আর কেউ আহমদ নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায় না। আর হযরত (সা)-এর পরে অসংখ্য রোকের নাম আহমদ ও গোলাম আহমদ রাখা হয়েছে। নবুয়াত যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র উম্মদের কাছে যে এ নামটা সুপরিচিত ও সুবিদিত রয়েছে, সেটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এ নাম যদি হযরত (সা)-এর না হতো তাহলে যারা নিজেদের ছেলেদের নাম গোলাম আহমদ রেখেছে, তারা সেই ছেলেদেরকে কোন আহমদের গোলাম বলে মনে করেন?

দুইঃ হযরম মসিহ, হযরত ইলিয়াস (আ) এবং “সেই নবী”: যোহনের (ইউহান্না) ইঞ্জিল সাক্ষী যে হযরত ঈসা (আ)-এর আগমনের সময় বনী ইসরাঈল তিন ব্যক্তির প্রতিক্ষায় ছিল। তাঁরা হলেন, মসিহ, ইলিয়াহ (অর্থাৎ হযরত ইলিয়াস (আ)-এর পুনরার্বিভাব) এবং ‘সেই নবী’।

“এবং ইউহান্না [হযরত ইয়াহিয়া (আ)] সাক্ষ্য দেন যে ইহুদীরা যখন জেরুজালেম থেকে তার কাছে যাজকদের পাঠিয়ে জিজ্ঞাসা করে যে, তুমি কে, তখন তিনি স্বীকার করলেন, অস্বীকার করলেন না। তিনি স্বীকার করলেন যে, আমি মসিহ নই। তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো, তাহলে তুমি কে? তুমি কি ইলিয়াহ? তিনি বলেন, না। হবে কি তুমি ‘সেই নবী’? তিনি জবাব দিলেন, না। তখন তারা বললোত, তাহলে তুমি কে? তিনি বললেন, আমি মরুভূমিতে একজন আহবায়কের এ আহবান যে, তুমি আল্লাহর পথ সুগম কর। তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলো যে, তুমি যদি মসিহ না হয়ে থাকে, ইলিয়াহও না হয়ে থাক এবং সেই নবীও না হয়ে থাক তবে নবুয়্যত দাবী কর কেন?-(১:১৯-২৫)

এ কথাগুরো থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝা যায় যে, হযরত মসীহ (আ) (ঈসা) এবং হযরত ইলিয়াস (আ) ছাড়াও বনী ইসরাইল আরো একজন নবীর অপেক্ষায় ছির এবং সে নবী হযরত ইয়াহিয়া (আ) নন। সেই নবী যে আসবেন এ বিশ্বাস বনী ইসরাঈলের মধ্যে এত প্রচলিত ছিল যে, শুধু ‘সেই নবী’ বললেই সবাই বুঝে নিত। “যার আগাম খবর তাওরাতে দেয়া হয়েছে” এ কথা না বললেও চলতো। এ থেকে আরও জানা গেল যে, যে নবী সম্পর্কে তারা ইশারা-ইঙ্গিত করছিল তার আগমন অকাট্যভাবে প্রমাণিত ছিল। কেননা হযরত ইয়াহিয়া (আ)-কে যখন এসব প্রশ্ন করা হয় তখন তিনি এ কথা বলেননি যে, আর তো কোনো নবীই আসবেন না। তোমরা কোন নবীর কথা জিজ্ঞাসা করছ?

তিনঃ যোহনের ইঞ্জিলের বক্তব্যঃ এবার যোহনের (ইউহান্না বা ইয়াহিয়া) ইঞ্জিলে ১৪শ’ অধ্যায় থেকে ১৬শ’ অধ্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীগুরো দেখুনঃ

“এবং আমি পিতার কাছে আবেদন করবো যেন তোমাদের জন্যে আর একজন সাহায্যকারী পাঠান যিনি তোমাদের সাথে অনন্তকাল পর্যন্ত থাকবেন, অর্থাৎ সত্যের আত্মা, যাঁকে দুনিয়াবাসী অর্জন করতে পারে না। কেননা তারা তাকে দেখতেও পায় না চিনেও না তোমরা তাঁকে চিন। কেকনা তিনি তোমাদের সঙ্গেই থাকেন এবং তোমাদের মধ্যেই আছেন”।–(১৪:১৬-১৭)

“আমি এ কথাগুলো তোমাদের সাতে থেকেই তোমাদের বলেছি। কিন্তু সাহায্যকারী অর্থাৎ মহিমান্বিত আত্মা যাঁকে পিতা আমার নামে পাঠাবেন তিনি তোমাদের সব কথা শিখাবেন। আর আমি যা কিচু তোমাদেরকে বলেছি তিনি সেসব তোমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেবেন”।–(১৪-২৫-২৬)

‘এরপর আমি তোমাদেরকে বেশী কথা বলবো না। কেননা দুনিয়ার নেতা আসছেন। আমার মধ্যে তাঁর কোনো কিছুই নেই”।–(১৪:৩০)

“কিন্তু যখন সেই সাহায্যকার আসবেন যাঁকে আমি পিতার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে পাঠাবো অর্থাৎ সত্যের আত্মা –যা পিতার কাছ থেকে প্রকাশিত হয় –তখন তিনি আমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন”।=(১৫:২৬)

“কিন্তু আমি তোমাদের সত্য বলছি যে, আমার চলে যাওয়া তোমাদের জন্যে কল্যাণকর কেননা আমি যদি না যাই তবে সেই সাহায্যকারী আসবেন না। কিন্তু আমি যদি যাই তবে তাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দেবো”।–(১৬:৭)

“তোমাদেরকে আমার আরো অনেক কথা বলার আছে। কিন্তু তখন তোমরা তা সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু যখন তিনি অর্থাৎ সত্যের আত্মা আসবেন তখন তোমাদেরকে সমস্ত সত্যের পথ দেখাবেন। কেননা তিনি মনগড়া কথা বলবেন না। কেবল যা শুনবেন তাই বলবেন এবং তেমাদেরকে ভবিষ্যতের খবর জানাবেন। তিনি আমার পরাক্রম প্রকাশ করবেন। কেননা আমার কাছ থেকে পেয়েই তিনি তোমাদেরকে খবর জানাবেন। পিতার যা কিছু রয়েছে তা সবই আমার। এ জন্যেই আমি বললাম যে তিনি আমার কাছ থেকে জানবেন এবং তোমাদেরকে খবর জানাবেন”।–(১৬:১২-১৫_

চারঃ উপরোক্ত ভবিষ্যদ্বাণী গুলোর তাৎপর্যঃ উপরোক্ত কথাগুলোর সঠিক মর্ম উপলব্ধি করতে হলে প্রথমে জানা দরকার যে, হযরত ঈসা (আ) ও তার সমসাময়িক ফিলিস্তিনবাসী আরামী ভাষার আঞ্চলিক রূপ সুরিয়ানীতে কথা বলতেন। হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের দুই-আড়াইশো বছর আগেই সেলুকী রাজবংশের শাসনকালে ঐ অঞ্চল থেকে ইবরানী ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তার জায়গায় সুরিয়ানী ভাষা চালু হয়। এ কথা সত্য যে, সেলুকী ও তার পরবর্তী রোম সম্রাটদের শাসনের প্রভাবে এ এলাকায় গ্রীস ভাষারও অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। কিন্তু সেটা একটা বিশেষ শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যারা সরকারী প্রশাসনে বিভিন্ন পদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা হতে চায় এবং সে জন্যে অতিমাত্রায় গ্রীসঘেষা হয়ে গেছে, কেবল তারাই গ্রীসভাষা চর্চা করতো। ফিলিস্তিনের সাধারণ রোকেরা সুরিয়ানীর একটা বিশেষ আঞ্চলিক কথা ভাষা ব্যবহার করতো। সে ভাষা আজকার দামেষ্ক অঞ্চলে প্রচলিত সুরিয়ানী থেকে ভিন্ন রকমের ছিল। ফিলিস্তিনবাসী গ্রীস ভাষা সম্পর্কে এত অজ্ঞ ছিল যে, ৭০ খৃষ্টাব্দে জেরুজালেম দখন করার পর রোমক সেনাপতি তাইতুস যখন জেরুজালেমবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষন দেন তখন সুরিয়ানী ভাষায় তার অনুবাদ করতে হয়েছিল। এ থেকে বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ) তার শিষ্যদেরকে যা কিছু বলে ছিলেণ তা সুরিয়ানী ভাষাতেই বলেছিলেন।

দ্বিতীয় যে কথা জানা দরকার তা হলো এই যে, বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত চারটে ইঞ্জিরের সব ক’টাই হযরস ঈসা (আ)-এর তীরোভাবের পর খৃষ্টধর্ম গ্রহণকারী গ্রীস ভাষাভাষীদের লেখা। হযরত ঈসা (আ)-এর কথা ও কার্যকরাপের বিবরণ সুরিয়ানী ভাষাভাষী খৃষ্টানদের কাছ থেকে তাদের গোচরে আসে এবং তা লিখিতভাবে নয় –মৌখিক বর্ণনার আকারে তাদের কাছে পৌঁছে। এসব সুরিয়ানী বর্ণনাগুলোকে তারা ভাষান্তরিত করে লিপিবদ্ধ করে রাখে। এর মধ্যে কোনো একটা ইঞ্জিলও ৭০ খৃষ্টাব্দের আগের লেখা নয়। বিশেষত যোহনের ইঞ্জিল হযরত ঈসা (আ)-এর এক শতাব্দী পর সম্ভবত মধ্য এশিয়ার আফসুস নগরীতে বসে লেখা হয়। তাছাড়া যে গ্রীস ভাষায় এ ইঞ্জিলগুরো প্রথম লেখা হয় তার কোনো আসল কপি রক্ষিত নেই। ছাপাখানা আবিস্কারের আগের যতগুলো গ্রীক পাণ্ডুলিপি বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করা হয়েছে, তার কোনো একটাও চতুর্থ শতকের আগের নয়। এ জন্যে তিনশো বছরের মধ্যে ঐ ইঞ্জিলগুলোতে কত কি রদবদল হয়ে গেছে, তা বলা কঠিন। তাছাড়া খৃষ্টানরা ইঞ্জিলগুলোতে নিজেদের ইচ্ছামত রদবদল করাকে যেভাবে বৈধ মনে করে আসছে, তাতে করে ব্যাপারটা আরো বেশী সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইনসাইক্লোপেডিয়া বৃটেনিকার “বাইবেল” শীর্ষক নিবন্ধের লেখক বলেনঃ

“ইঞ্জিলগুরোতে ইচ্ছাকৃতভাবে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। যেমন কোনো কোনো জায়গায় অন্য কোনো উৎস থেকে অনেকখানি কথা হুবহু ইঞ্জিলের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হয়েছে। …..এসক পরিবর্তন ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে। যারা মূল গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে কোথাও কোনো কথা পেয়েছে এবং যে কথা গ্রন্থের মান উন্নত করে বা তাকে আরো শিক্ষাবহ করে তোলে, তাকে গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করার অধিকার নিজেদের রয়েছে বলে মনে করতে অভ্যস্ত ছিল তারাই এ ধরনের পরিবর্তন করছে। বেশ কিছু বাড়তি কথা দ্বিতীয় শতাব্দীতেই সংযোজিত হয়েছিল। হবে সেগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল তা জানা যায়নি”।

এ প্রেক্ষাপটে ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ)-এর যে কথাগুরো আমরা পাই তা অবিকলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছিল কিনা এবং তাকে কোনো রদবদল ঘটেছে কিনা, নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এই যে, ফিলিস্তিনে মুসলমানদের দখল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও প্রায় তিনশো বছর পর্যন্ত সেখানকার খৃষ্টানদের ভাষা সুরিয়ানী ছিল। খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীতে সুরিয়ানীর বদলে আরবী চালু হয়। এ সুরিয়ানী ভাষাভাষী ফিলিস্তিনবাসীর মাধ্যমে খৃষ্টীয় ধর্ম সম্পর্কে প্রথম তিন শতাব্দীর মুসলমান পণ্ডিতগণ যে তত্যাদি লাভ করেন, তা যারা সুরিয়ানী থেকে গ্রীক অতপর গ্রীক থেকে ল্যাটিন ভাষায় দফায় দফায় ভাষান্তরিত তথ্য লাভ করেছেন তাদের তুলনায় অধিকতর নির্ভরযোগ্য। কেননা হযরত ঈসা (আ)-এর মুখ নিঃসৃত আসল সুরিয়ানী কথাগুরো তাদের কাছে অবিকৃত অবস্থায় থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশী।

পাঁচঃ তিনি সারা দুনিয়ার নেতা হবেনঃ উপরোক্ত অনস্বীকার্য তথ্যগুলোর আলোকে এ কথা বিবেচনা করা দরকার যে, যোহনের ইঞ্জিলের উল্লিখিত উক্তিগুলোতে হযরত ঈসা (আ) তাঁর পরে আগমনকারী এক নবীর খবর দিচ্ছেন। তাঁর সম্পর্কে তিনি বলেন যে, তিনি সারা দুনিয়ার নেতা হবেন ‘অনন্তকাল তিনি থাকবেন’ সত্যের সকল পথ তিনি দেখাবেন, এবং স্বয়ং তাঁর [হযরত ঈসা (আ)-এর] পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। যোহনের এ উক্তিগুলোতে ‘মহিমান্বিত আত্মা’, ‘সত্যের আত্মা’ প্রভৃতি শব্দ উল্লেখ করে আসল বক্তব্যকে জটিল করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ উক্তিগুলোকে গভীর মনোযোগের সাথে পড়লে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, যে আগমনকারীর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে তা কোনো আত্মা নয়, বরং একজন মানুষ এবং এক বিশেষ ব্যক্তি। সে ব্যক্তির শিক্ষা হবে বিশ্বজনীন, সর্বব্যাপী এবং কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী। সে বিশেষ ব্যক্তির জন্যে উর্দূ অনুবাদ ‘মদদগার’ (সাহায্যকারী) শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। খৃষ্টানরা জোর দিয়ে বলে থাকেন যে, সেটা হলো Paracletus তবে এর মর্ম উদ্ধারে খোদ খৃষ্টান পণ্ডিতেরাই বিভ্রাটে পড়েছেন। মূল গ্রীক ভাষায় Paraclete শব্দ একাধিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যথাঃ কোনো জায়গার দিকে ডাকা, সাহায্যের জন্যে ডাকা, ভয় দেখানো বা হুশিয়ার করা, উদ্ধুদ্ধ করা, অনুপ্রাণিত করা, মিনতি করা, ফরিয়াদ করা, প্রার্থনা করা। তাছাড়া এ শব্দটার হেলেনিক (Helenic) অর্থও রয়েছে একাধিক। যথাঃ সান্ত্বনা দেয়া, শান্ত করা, উৎসাক দেয়া। বাইবেলে এ শব্দটা যেখানে ব্যবহৃত হয়েছে সেসব জায়গায় এর কোনো অর্থই খাপ খায় না। বাইবেল বিশারদ ওরাইজেন (Origen) কোথাও এর অনুবাদ করেছেন Consolator কোথাও Deprecator কিন্তু বাইবেলের অন্যান্য টীকাকার উভয় অনুবাদ নাকচ করে দিয়েছেন। কেননা প্রথমতঃ এ অর্থ গ্রীস ব্যাকরণের দৃষ্টিতে শুদ্ধ নয়। দ্বিতীয়তঃ যেসব বাক্যে এ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে সেখানে এ অর্থ অচল। অন্য কয়েকজন অনুবাদক এর অনুবাদ করেছেন Teacher। অথচ গ্রীস ভাষার প্রয়োগ থেকে এ অর্থটাও গ্রহণ করা যায় না। তারতোলিয়ান ও আগস্টাইন এর অনুবাদ করেছেন Advocate, অন্যান্যরা কেউবা অনুবাদ করেছেন Assistant, কেউবা Comforter, আবার কেউবা Consoler, (দেখুন ইনসাইক্লোপেডিয়া অব বাইবেলিকাল লিটারেচারঃ প্যারাক্লেটস শব্দ)।

এখন মজার ব্যাপার এই যে, গ্রীক ভাষাতেই আর একটা শব্দ রয়েছে, এর Pariclytos-অর্থ ‘প্রশংসিত’। এটা অবিকল ‘মুহাম্মদ’ এর প্রতিশব্দ। উচ্চারণে Paractetus-এর সাথে এ শব্দের চমৎকার সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়। যেসব খৃষ্টীয় পণ্ডিত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে নিজেদের খেয়ালখুশী মত অবাধে রদবদল করতে অভ্যস্ত ছিলেন, তারা যোহনের বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর এ শব্দটাকে নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসের বিপরীত দেখে তার বানানে এই একটু খানি হেরফের দিয়ে থাকলে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। এটা পরীক্ষা করে দেখার জন্যে যোহনের লেখা আদি গ্রীক ইঞ্জিল কোথাও নেই যে, তাতে এ দু’টো শব্দের মধ্যে আসলে কোনটা ব্যবহার করা হয়েছিল তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

ছয়ঃ মুনহামান্নাঃ কিন্তু যোহন গ্রীক ভাষায় আসলে কোন শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন তা জানতে পারলেও এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া যেত না। কেননা তিনি যা-ই লিখুন সেটাও অনুবাদ ছাড়া আর কিছু ছিল না। আমরা আগেই বলেছি, হযরত ঈসা (আ)-এর ভাষা ছিল ফিলিস্তিনী সুরিয়ানী। তাই তিনি নিজের ভবিষ্যদ্বাণীতে যে শব্দই ব্যবহার করে থাকেন না কেন, তা সুরিয়ানী শব্দই হওয়ার কথা। সৌভাগ্যবশতঃ সেই মূল সুরিয়ানী শব্দটা আমরা ইবনে হিশামের সিরাত গ্রন্থে পেয়েছি। সেই সাথে এর গ্রীক প্রতিশব্দ কি তাও আমর ইবনে হিশাম থেকে জানতে পেরেছি। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের সূত্রের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম ইউহান্নাস (ইউহান্না তথা যোহন) এর ইঞ্জিলের ১৫শ’ অধ্যায়ের ২৩শ’ থেকে ২৭শ’ আয়াত এবং ১৬শ’ অধ্যায়ের ১ম আয়াতের পূর্ণ অনুবাদ উদ্ধৃত করেছেন। তাতে গ্রীক ‘ফারাক্লিত’ শব্দের পরিবর্তে সুরিয়ানী ভাষার সুনহামান্না শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অতপর ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশাম তার এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সুরিয়ানী শব্দ মুনহামান্নার অর্থ আরবীতে মুহাম্মদ ও গ্রীক ভাষায় প্যারাক্লেটাস।–(ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃঃ ২৪৮)।

উল্লেখ্য যে, ঐতিহাসিক দিক থেকে নবম শতাব্দী পর্যন্ত সুরিয়ানীই ছিল ফিলিস্তিনবাসীর সাধারণ ভাষা। এ অঞ্চলটা ৭ম শতাব্দীর প্রথমার্ধ থেকেই ইসলামী শাসনাধীন ছিল। ইবনে ইসহাক ৭৬৮ খৃষ্টাব্দে এবং ইবনে হিশাম ৮২৮ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। অর্থাৎ উভয়ের আমলেই ফিলিস্তিনের খৃষ্টানরা সুরিয়ানী ভাষায় কথা বরতো এবং তাদের উভয়ের পক্ষেই নিজ দেশের খৃষ্টান অধিবাসীদের সাথে যোগাযোগ করতে কোনোই অসুবিধা ছিল না। তাছাড়া সে সময়ে লক্ষ লক্ষ গ্রীকভাষাভাষী খৃষ্টানও মুসলিম অধিকৃত এলাকাগুলোতে বসবাস করতো। এ জন্যে গ্রীক কোন শব্দ সুরিয়ানী ভাষার কোন শব্দের সমার্থক, তা জানাও তাদের পক্ষে কঠিন ছিল না। এখন যদি ইবনে ইসহাকের উদ্ধৃত অনুবাদে সুরিয়ানী শব্দ মুনহামান্না ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং ইবনে ইসহাক বা ইবনে হিশাম যদি তার এই ব্যাক্যা করে থাকেন যে, আরবতে এর প্রতিশব্দ মুহাম্মদ এবং গ্রীক ভাষায় প্যারাক্লেটাস, তাহলে হযরত ঈসা (আ) মুহাম্মদ (সা)-এর নাম উচ্চারণ করে তাঁরই আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকে না। সেই সাথে এ কথাও জানা হয়ে যায় যে, যোহনের গ্রীক ইঞ্জিলে আসলে Pariclytos শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে খৃষ্টীয় পণ্ডিতগণ তাকে Pariclytos শব্দ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে খৃষ্টীয় পণ্ডিতগণ তাকে Pariclytos এ পরিবর্তিত করে দিয়েছেন।

সাতঃ নাজ্জাসীর সাক্ষ্যঃ এর চেয়েও পুরানো ঐতিহাসিক প্রমাণ হলো আবিসিনিয়ার হিজরতের ঘটনা সংক্রান্ত হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-এর বর্ণনা। নাজ্জাসী যখন আবিসিনিয়ায় আগত মুসলিম মোহাজেরদেরকে দরবারে ডাকলেন এবং আবু তালেবের ছেলে হযরত জাফর (র)-এর মুখে রসূলুল্লাহ (সা)-এর শিক্ষা ও আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ শুনলেন তখন বললেনঃ

(আরবী******************************************পিডিএফ ১২৭ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদেরকে এবং যে মহানব্যক্তির নিকট থেকে তোমরা এসেছ তাঁকে মুবারকবাদ জানাই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রসূল। তিনি সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে আমরা ইঞ্জিলে উল্লেখ করেছিলেন”। বিভিন্ন হাদীসে হযরত জাফর (রা) এবং উম্মে সালমা (রা) থেকেও এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, খৃষ্টীয় ৭ম শতাব্দীর সেই সূচনাকালেই নাজ্জাসী জানতেন যে হযরত ঈসা (আ) একজন নবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। এ থেকে আরো জানা যায় যে, ইঞ্জিলে ভবিষ্যতে সেই নবীর এমন স্পষ্ট পরিচয় দেয়া ছিল যার কারণে মুহাম্মদ (সা)-ই যে সেই নবী, তা বুঝতে নাজ্জাসীর কিছুমাত্র ইতস্ততঃ করতে হয়নি। তবে যোহনের ইঞ্জিলের মাধ্যমেই নাজ্জাসী হযরত ঈসা (আ)-এর এই ভষ্যিদ্বাণীর কথা জানতে পেরেছিলেন, না সে সময়ে এ কথা জানার আর কোনো মাধ্যম ছিল তা এই বর্ণনা থেকে জানা যায় না।

আটঃ বারনাবাসের ইঞ্জিলঃ যে চারটে ইঞ্জিলকে খৃষ্টীয় গীর্জা নির্ভরযোগ্য ও স্বীকৃত ইঞ্জিল (Council gospels) বলে স্থির রেখেছে আসলে যে চার ইঞ্জিল হযরত মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী জানার তো নয়ই, এমনকি খোদ হযরত ঈসা (আ)-এর জীবন বৃত্তান্ত এবং তাঁর প্রকৃত শিক্ষা ও নীতি কি ছিল তা জানারও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম নয়। বরং খৃষ্টীয় গীর্জা যাকে বে-আইনী ও সন্দেহভাজন ইঞ্জিল বলে আখ্যায়িত করে থাকে সেই বারনাবাসের ইঞ্জিলেই এর অধিকতর নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত মাধ্যম। খৃষ্টানরা এ কিতাবখানিকে গোপন রাখার জন্যে অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে। শত শত বছর যাবত এটা দুনিয়া থেকে লুপ্ত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে এর ইটালীয় অনুবাদের মাত্র একটা কপি পোপ সিক্সটাসের (Sixtus) লাইব্রেরীতে ছিল। তবে সেটা কাউকে পড়ার অনুমতি দেয়া হতো না। ১৮শ’ শতাব্দীর প্রথম দিকে তা জনটোল্যাণ্ড নামক এক ব্যক্তির হাতে পড়ে। তারপর তা একজন থেকে আর একজনের কাছে হস্তগত হতে হতে ১৭৩৮ সালে ভিযেনার ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরীতে উপনীত হয়। ১৯০৭ সালে অক্সফোর্ডের ক্লেরিগুন প্রেস থেকে সেই অনুলিপির ইংরেজী অনুবাদ ছাপা হয়। কিন্তু ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বোধ হয় খৃষ্টান জগৎ বুঝতে পেরেছিল যে, এ কিতাব হযরত ঈসা (আ)-এর নামে প্রবর্তিত ধর্মটার মূলোচ্ছেদ করতে চলেছে। এ জন্যে সেই ছাপানো অনুলিপিগুলো বিশেষ ফন্দি করে উধাও করে দেয়া হয়। অতপর সে ইঞ্চিলখানা আর প্রকাশিত হতে পারেনি। একই ইটালীয় অনুলিপির স্পেনীয় ভাষান্তরিত আর একটা কপি ১৮শ’ শতাব্দীতে কোথাও কোথাও পাওয়া যেত। জর্জ সেল তার ইংরেজী অনুদিত কুরআনের ভূমিকায় ঐ অনুলিীপর কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেটা কোথাও উধাও করে দেয়া হয়। আজ তারও কোনো হদীস নেই। আমি অক্সফোর্ড থেকে প্রকাশিত ইংরেজী অনুবাদের একটা ফটোস্টেট কপি দেখবার সুযোগ পেয়েছি এবং তা পুংখানুপুংখ পড়ে দেখেছি। আমার অনুভূতি এই যে, এটা একটা অমূল্য সম্পদ। কিন্তু খৃষ্টানরা কেবল জিদ ও হঠকারিতার বশে তা থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত রেখেছে।

খৃষ্টীয় বই-পুস্তকে যেখানেই এ ইঞ্জিরের প্রসঙ্গ এসেছে, একে ভূয়া ও বানোয়াট এবং সম্ভবতঃ কোনো মুসলমান তা রচনা করে মিথ্যামিথ্যি বারনাবাসের নামে চালিয়ে দিয়েছে এই বলে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে কিন্তু এটা একটা নির্জলা মিথ্যা কথা। এ ইঞ্জিলের স্থানে স্থানে মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে পরিস্কার ভাবিষ্যদ্বাণী (১২৯ পৃষ্ঠার প্রথম লাইনে লেখা অস্পষ্ট আছে**********************) এ মিথ্যাচারের আশ্রয় নেয়া হয়েছে। প্রথমতঃ এ ইঞ্জিল পড়লেই স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ কিতাব কখনো মুসলমান কর্তৃক রচিত হতে পারে না। দ্বিতীয়তঃ এটা কোনো মুসলমানের রচিত হয়ে থাকলে মুসলিম সমাজে এর ব্যাপক প্রচলন হতো এবং মুসলিম বিদ্বানদের বই-পুস্তকে এর বহু উল্লেখ থাকতো। কিনউত বাস্তব অবস্থা এই যে, জর্জ সেলের ইংরেজী অনুদিত (১২৯ পৃষ্ঠার ৪র্থ লাইনের শেষের দিকে লেখা অস্পষ্ট******) ভূমিকা প্রকাশের আগে মুসলমানদের জানাই ছিল না যে, এমন একটা ইঞ্জিলের কখনো অস্তিত্ব ছিল। তাবারী, ইয়াকুবী, মাসউদা, আলবেরুনী, ইবনে হামজা, ইবনে তাইমিয়া প্রমুখ গ্রন্থকারগণ মুসলমানদের মধ্যে খৃষ্টীয় ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে বিশেষ ব্যুৎপত্তির অধিকারী ছিলেন। অথচ এদের কারো রচনায় খৃষ্টীয় ধর্মমত সংক্রান্ত আলোচনা প্রসঙ্গে বারনাবাসের ইঞ্জিল সম্পর্কে সামান্যতম আভাস-ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। মুসলিম জাহানের লাইব্রেরীগুলোতে যেসব বই-কিতাব মজুদ ছিল, তার বিশ্বস্ততম তালিকা হলো ইবনে নাদিমের ‘আলফিহরিস্ত’ এবং হাজী খলিফার ‘কাশফুজ জুনুন’। অথচ এ দু’টোতেও তার কোনো উল্লেখ নেই। উনবিংশ শতকের আগে পর্যন্ত কোনো মুসলিম পণ্ডিত বারনাবাসের ইঞ্জিলের নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। এর মিথ্যা হওয়ার তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই যে, হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্মেরও ৭৫ আগে পোপ প্রথম গ্লাসিয়াসের আমলে খারাপ আকীদা-বিশ্বাস সম্বলিত ও বিভ্রান্তিকর ধর্মগ্রন্থসমূহের যে তালিকা তৈরী করা হয় এবং একটা যাজকীয় ফতোয়ার মাধ্যমে যা পড়া নিষিদ্ধ করা হয়, বারনাবাসের ইঞ্জিলও তার অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রশ্ন ওঠে যে, সে সময় এ ভূয়া ইঞ্জিল তৈরী করতে মুসলমান কোত্থেকে এসেছিল?

নয়ঃ বারনাবাসের ইঞ্জিল কিঃ বারনাবাসের ইঞ্জিল থেকে হযরত রসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো উদ্ধৃত করার আগে এ ইঞ্জিলের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেয়া দরকার যাতে করে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায় এবং খৃষ্টানরা এ ইঞ্জিলের ওপর এত বিরূপ কেন তাও বুঝা যায়।

যে চারটি ইঞ্জিলকে আইনসম্মত ও বিশ্বস্ত বলে বাইবেলের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তার কোনো একটারও লেখক হযরত ঈসা (আ)-এর সাহাবী ছিলেন না। এমন কি হযরত ঈসা (আ)-এর সাহাবীদের কাছ থেকৈ তথ্য সংগ্রহ করে কিতাব শামিল করা হয়েছে –এমন দাবীও কোনো ইঞ্জিলের লেখক করেননি। তারা কোন কোন সূত্রে সথ্য সংগ্রহ করেছেন তারও কোনো বর্ণনা তারা দেননি। ফলে যাদের কাছ থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করেছেন তারা স্বয়ং বর্ণিত রচনাবলীর দর্শক ও কথাগুলোর শ্রোতা ছিলেন, না অন্য কোনো মাধ্যমে তা তাদের গোচলে এসেছে সেটা জানা যায় না। পক্ষান্তরে বারনাবাসের ইঞ্জিলের লেখক বলেন যে, আমি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রবীণতম ১২জন সহচরের অন্যতম। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর সাথে ছিলাম এবং যা আমি নিজ কানে শুনেছি ও যা নিজ চোখে দেখেছি এ কিতাবে তাই লিপিবদ্ধ করছি। শুদু তাই নয়। গ্রন্থের উপসংহারে তিনি বলেনঃ দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়র সময় হযরত ঈসা (আ) আমাকে বলেছিলেন যে, তাঁর সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করা এবং প্রকৃত ঘটনাগুলো মানুষকে জানানো আমার দায়িত্ব।

এ বারনাবাস কে? বাইবেলের কর্ম-পুস্তকে এ  নামের সাইপ্রাসীয় ইহুদী বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তির কথা বার বার উল্লেখিত হয়েছে। খৃষ্টধর্মের প্রচার ও প্রসারে এবং হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীদের সাহায্য-সহযোগিতায় তার অবদানের খুবই প্রশংসা করা হয়েছে। তবে সে কখন খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে তা কোথাও বলা হয়নি এবং প্রবীণতম ১২জন সহচরের যে তালিকা তিনটে ইঞ্জিলে দেয়া হয়েছে, তাতেও তার নাম নেই। তাই বাইবেলের সেই বারনাবাসই এ ইঞ্জিলের রচয়িতা না আর কেউ, তা বলা সম্ভব নয়। মথি ও মিরকাস ১ সহচরের যে তালিকা দিয়েছেন, তার সাথে বারনাবাসের দেয়া তালিকার মাত্র দু’টো নামে গরমিল। তার একজন হলো তুমা। বারনাবাস এর বদলে নিজের নাম দিয়েছে। দ্বিতীয় জন শামউন কানানী। বারনাবাস এর জায়গায় ইহুদাহ ইবনে ইয়াকুবের নাম উল্লেখ করেছে। লূকের ইঞ্জিলে এ দ্বিতীয় নামটাও রয়েছে। এ জন্যে যদি অনুমান করা হয় যে, পরে কোনো এক সময় শুধু বারনাবাসকে ১২ সহচরের তালিকা থেকৈ বের করার জন্যে তুমার নাম ঢুকিয়ে দেয়অ হয়েছে তবে তা ভুল হবে না। কেননা এতে করে বারনামাসে ইঞ্জিলকে উপেক্ষা করার পথ সুগম হবে। বস্তুত ধর্মীয় গ্রন্থসমূহে এ ধরনের হেরফের বা খৃষ্টীয় পণ্ডিতদের দৃষি।টতে কোনো অবৈধ কাজ ছিল না।

বারনাবাসের এ ইঞ্জিলকে যদি কেউ বিদ্বেষমুক্ত মন নিয়ে উদার দৃষ্টিতে পড়ে এবং প্রচলিত চার ইঞ্জিলের সাথে মিলিয়ে দেখে তাহলে এটাকে ঐ চার ইঞ্জিলের চেয়ে বহুগুণে শ্রেষ্ঠ মনে না করে পারবে না। এতে হযরত ঈসা (আ)-এর জীবনবৃত্তান্ত আরো বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সে বর্ণনাভঙ্গী থেকে মনে হয়, কেউ সেখানে সত্যি সত্যি সব ঘটনা স্বচক্ষে দেখছিল এবং সেসব ঘটনায় সে স্বয়ং কোনো না কোনো ভাবে জড়িত ছিল। চার ইঞ্জিলের খাপছাড়া কাহিনীগুলোর তুলনায় এর ঐতিহাসিক বিবরণ অধিকতর সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত। এতে করে ঘটনা পরস্পরাকে বুঝতেও আরো বেশী সুবিধা হয়। হযরত ঈসা (আ)-এর উপদেশগুলোও এ ইঞ্জিলে অন্য চারটি ইঞ্জিল অপেক্ষা অনেক বেশী স্পষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলে ধরা হয়েছে। তাওহীদের শিক্ষা, শির্ক খণ্ডন, আল্লাহর গুণাবলী ও ইবাদাতের প্রেরণা এবং মহৎ চারিত্রিক গুণাবলী সংক্রান্ত আলোচনাগুলো এতে খুবই জোরদার, যুক্তিসমৃদ্দ ও বিস্তারিত। যেসব শিক্ষাপ্রদ উপমার প্রেক্ষাপটে হযরত ঈসা (আ) এসব আলোচনা করেছেন, তার এক শতাংশও অন্য চারটি ইঞ্জিলে নেই। হযরত ঈসা (আ) তাঁর শিষ্যদেরকে কিরূপ বিচক্ষণতা ও নৈপুণ্যের সাথে আল্লহার দ্বীনের শিক্ষা ও তার বাস্তব প্রশিক্ষণ দিতেন সেটাও খুবই বিস্তারিতভাবে জানা যায় এবং এ ইঞ্জিল থেকে। হযরত ঈসা (আ)-এর ভাষা, বর্ণনাভঙ্গী এবং স্বভাব-প্রকৃতি সম্পর্কে যার কিছুমাত্র জানা আছে, সে এ ইঞ্জিল পড়ে মানতে বাধ্য হবে যে, এটা পরবর্তী কোনো লোকের মনগড়া কাহিনী নয় বরং এতে হযরত ঈসা (আ) নিজের আসল স্বরূপ প্রচলিত চার ইঞ্জিল অপেক্ষা অনেক বেশী স্পষ্ট করে তুলে ধরেন। আর চার ইঞ্জিল তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে যে পরস্পর বিরোধিতা দেখা যায়, এ ইঞ্জিলে তার নামগন্ধও নেই।

এ ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ)-এর জীবনবৃত্তান্ত ও তাঁর উপদেশমালা যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তা যথার্থ একজন নবীর জীবন ও শিক্ষার মতই মনে হয়। তিনি নিজেকে একজন বী হিসেবে পেশ করেছেন। অতীতের সকল নবী ও কিতাবের সত্যতা ঘোষনা করেছেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, নবীদের শিক্ষা ছাড়া সত্যোপলব্ধির আর কোনো পথ নেই। যে ব্যক্তি নবীদেরকে উপেক্ষা করে সে আসলে আল্লাহকেই উপেক্ষা করে। তিনি তাওহীদ, রিসালাত ও আখেরাত সম্পর্কে অন্য সকল নবীর অনুরূপ আকিতা-বিশ্বাসই প্রচার করেছেন। নামায, রোযা ও যাকাতের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর নামায সম্পর্কে বারনাবাস বারংবার যে বর্ণনা দিয়েছেন তা থেকে জানা যায় যে, আমাদের এ যুগের মতই তিনি ফযর, যোহর, আসর, মাগরেব, এশা ও তাহাজ্জুদের সময়ে নামায পড়তেন এবং সবসময়ই নামাযের আগে ওজু করতেন। অন্যন্য নবীদের সাথে সাথে তিনি হযরত দাঊদ (আ) এবং সোলায়মান (আ)-কেও নবী বলে ঘোষণা করেন। অথচ ইহুদী ও খৃষ্টানরা এ দু’জনকে নবীদের তালিকার বাইরে রেখে দিয়েছে। এ ইঞ্জিল অনুসারে হযরত ইসমাঈল (আ)-কে তিনি জবীহ (যিনি জবাই হয়ে কুরবানী হতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন) বলে স্বীকার করেছেন এবং জনৈক ইহুদী পণ্ডিতকে স্বীকার করিয়ে ছাড়েন যে, নবী ইসরাঈল অনর্থক হযরত ইসহাক (আ)-কে জবীহ সাব্যস্ত করতে গিয়ে ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে। অথচ আসলে হযরত ইসমাঈল (আ)-ই জবীহ। আখেরাত, কেয়ামত ও বেহেশত-দোযখ সম্পর্কে তাঁর যে শিক্ষা এ ইঞ্জিলে ব্যক্ত হয়েছে, তা কুরআনের শিক্ষারই কাছাকাছি।

দশঃ খৃষ্টানরা বারনাবাসের ইঞ্জিলের বিরোধী কেনঃ বারনাবাসের ইঞ্জিলে ঘন ঘন রসূলুল্লাহ (সা)-এর আগমনের সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী থাকাই এর প্রতি খৃষ্টানদের বিরূপ হয়ে ওঠার একমাত্র কারণ নয়। কেননা তারা হযরত (সা)-এর জন্মের অকেন আগেই ইঞ্জিলকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এর প্রতি তাদের অসন্তোষের আসল কারণ কি তা বুঝতে হলে একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

হযরত ঈসা (আ)-এর প্রাথমিক অনুসারীরা তাঁকে শুধু নবী মানতো। তাঁরা হযরত মূসা (আ)-এর আনীত আইন ব্যবস্থার (শরীয়াত) অনুসরণ করতো। আকীদা, ইবাদাত ও বিধি-নিষেধের ব্যাপারে তারা বনী ইসরাঈলের অন্যান্যদের থেকে নিজেদেরকে বিচ্ছিন্ন মনে করতো না। ইহুদীদের সাথে তাদের শুধু এতটুকু মতভেদ ছিল যে, তারা হযরত ঈসা (আ)-কে নবী মানার সাথে সাথে মসীহ (বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন নবী) বলেও মানতো। কিন্তু ইহুদীরা তাকে মসীহ বলে মানতে চাইতো না। পরে যখন সেন্টপল এ দলভুক্ত হন তখন তিনি রোমক, গ্রীক এবং অন্যান্য অ-ইহুদী ও অ-ইসরাইলীদের মধ্যেও এ ধর্মপ্রচার করতে শুরু করে দেন এবং এ উদ্দেশ্যে তিনি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রচারিত ধর্মের আকীদা, বিধিনিষেধ ও মূলনীতি পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ অভিনব এক ধর্ম তৈর করেন। এ ব্যক্তি কখনো হযরত ঈসা (আ)-এর সাহচযর্য পাননি। বরং তার জীবদ্দশায় তাঁর কট্টর বিরোধী ছিলেন। এবং তাঁর ইন্তেকালের পর কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁর সহচরদের দুশমন ছিলেন। তারপর যখন এ দলে ঢুকে তিনি একটা নতুন ধর্ম বানাতে শুরু কররেন তখনও তিনি হযরত ঈসা (আ)-এর কোনো উক্তিকে এর ভিত্তি হিসেবে মানুষের সামনে তুরে ধরেননি। কেবল নিজের খেয়াল ও কল্পনাকে তার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন। এ নতুন ধর্ম তৈরীর পেছনে তার শুধু এ উদ্দেশ্য নিহিত ছিল যে, এমন একটা ধর্ম হওয়া দরকার যা দুনিয়ার সমস্ত অ-ইহুদীরা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে। তিনি ঘোষণা করেন যে, হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীরা ইহুদী শরীয়াতের সমস্ত বিধিনিষেদ থেকে মুক্ত। পানাহারের ব্যাপারে তিনি হালাল-হারামের ভেদাভেদ বিলুপ্ত করেন। অ-ইহুদীরা যে জিনিসটা বিশেষভাবে অপছন্দ করতো সেই খাতনার প্রথা রহিত করেন। এমনকি হযরত ঈসা (আ) একজন উপাস্য ও আল্লাহর ছেলে এবং ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করে তিনি সমগ্র মানবজাতির আজন্ম পাপের প্রায়শ্চিত করেছেন –এ কথা বিশ্বাস করাকে তিনি ঈমানী কর্তব্য বলে নির্দেশ করেন। কেননা মোশরেকরা এসবের দিকেই ঝোঁকপ্রবণ হয়ে থাকে। হযরত ঈসা (আ)-এর প্রবীণতম সহচরগণ এসব নয়া আমদানী করা ধ্যানধারণার কঠোর বিরোধিতা করেন। কিন্তু সেন্টপল একবার যে দরজা খোরেন সে খোলা দরজা দিয়ে অ-ইহুদী খৃষ্টানদের এক বিরাট ও প্রবল জনস্রোত খৃষ্টধর্মে ঢুকে পড়ে। ঐ মুষ্টিমেয় সংখ্যক রোক কোনোক্রমেই সে জনস্রোতকে রোধ করতে পারেনি। তবুও খৃষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর শেষ নাগদ হযরত ঈসা (আ)-কে উপাস্য মানতো না এমন লোকের সংখ্যা নেহাৎ কম ছিল না। কিন্তু চতুর্থ শতাব্দীর প্রথম দিকে (৩৫২খৃঃ) নিকাইয়ার (Nicaea) পরিষদ সেন্টপলের সাম্রাজ্য খৃষ্টান হয়ে যায়। সিজার থিওডোসিয়াসের আমলে এ ধর্মমত সাম্রাজ্যের সরকারী ধর্মে পরিনত হয়। এর পর রাষ্ট্রীয়ধর্মের পরিপন্থী সমস্ত বই-পুস্তক যে প্রত্যাখ্যাত হবে এবং এ ধর্মমতের অনুসারী বই-পুস্তকই যে গ্রহণযোগ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক। ৩৬৭ খৃষ্টাব্দে সর্বপ্রথম আথানাসিয়াস (Athanasius)-এর এক চিঠিতে গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত বই-পুস্তকের একটা তালিকা ঘোষণা করা হয়। অতপর ৩৮২ খৃষ্টাব্দে পোপ ডামাসিয়াসের (Damasius)-এর সভাপতিত্বে একটা পরিষদ এ তালিকার মঞ্জুরী দেন। অতপর পঞ্চম শতাব্দীর শেষভাগে পোপ গ্লাসিয়াস (Gelasius) এ তালিকাকে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেয়ার সাথে সাথে প্রত্যাখ্যাত বই-পুস্তকেরও একটা তালিকা ঘোষণা করেন। অথচ সেন্টপল প্রচারিত যে ধর্ম বিশ্বাসের ভিত্তিতে ধর্মগ্রন্থগুলোর গ্রহণযোগ্য ও অগ্রহণযোগ্য হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল, সেসব আকীদা-বিশ্বাসের কোনো একটারও শিক্ষা হযরত ঈসা (আ) নিজে দিয়েছেন বলে কোনো খৃষ্টান পণ্ডিত কখনো দাবী করতে পারেনি। এমনকি গ্রহণযোগ্য ধর্মগ্রন্থগুলোর মধ্যে যে ক’টা ইঞ্জিল রয়েছে, তার মধ্যেও হযরত ঈসা (আ)-এর নিজের কোনো কথা থেকে এসব ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি সমর্থন পাওয়া যায় না। বারনাবাসের ইঞ্জিল খৃষ্টবাদ সংক্রান্ত এই সরকারী আকীদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী হওয়ার কারণেই প্রত্যাখ্যাত হয়। এর লেখক গ্রন্থের শুরুতেই ঐ গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্য এরূপ বর্ণনা করেনঃ “যারা শয়তাদের প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে ইয়াসু’কে আল্লাহর ছেলে বলে আখ্যায়িত করে তাদের ভ্রান্তধারণা খণ্ডন করা, যারা খাতনাকে নিষ্প্রয়োজন মনে করে এবং হারাম খাদ্যকে হালাল করে দেয় তাদেরও সংশোধন করা। সেন্টপলও এ শয়তানী প্রবঞ্চনার একজন অন্যতম শিকার”। বারনাবাস বলেনঃ হযরত ঈসা (আ)-এর জীবিতাবস্থায় তাঁর মোজযাগুলো দেখে সর্বপ্রথম অংশীবাদী রোমক সৈন্যদের মধ্য কেউবা তাকে খোদা, কেউবা খোদার পুত্র বলতে আরম্ভ করে দেয়। ক্রমে তা সংক্রামক ব্যাধির মত সমগ্র বনী ইসরাইলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে হযরত ঈসা (আ) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হন। তিনি নিজের সম্পর্কে এ ভুল ধারনার বারংবার কঠোর প্রতিবাদ করেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় নিজে যাওয়ার পরিবর্তে শিষ্যদের পাঠান এবং তার দোয়ায় শিষ্যদের দ্বারাও স্বয়ং হযরত ঈসা (আ)-এর মত মোজেযা সংঘটিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল যে, লোকেরা যেন মোজেযা সংগঠনকারীকে খোদা বা খোদার ছেলে মনে করা থেকে বিরত থাকে। এ প্রসঙ্গে বারনাবাস ঐ ভ্রান্ত ও আকীদার বিরুদ্ধে হযরত ঈসা (আ)-এর দেয়া সুদীর্ঘ ভাষণগুলোকে উদ্ধৃত করেছেন এবং এই বিভ্রান্তি ও গোমরাহী ছড়িয়ে পড়ায় হযরত ঈসা (আ) কতখানি বিব্রত বোধ করতেন বিভিন্ন জায়গায় তা ব্যক্ত করেছেন। হযরত ঈসা (আ)-এর ক্রুশে বিদ্ধ হয়ে ইন্তেকাল করা সম্পর্কে সেন্টপল যে মতবাদ প্রচার করেছেন, বারনাবাস সুস্পষ্টভাবে তা খণ্ডন করেন। তিনি নিজের চোখে দেখা ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন যে, ইহুদা স্ক্রিউতি যখন ইহুদীদের প্রধান ধর্মযাজকের কাছ থেকে ঘুষ খেয়ে হযরত ঈসা (আ)-কে ধরিয়ে দেয়ার জন্যে সিপাইদের সাথে করে নিয়ে আসে তখন আল্লাহর হুকুমে চারজন ফেরেশতা তাঁকে ওপরে তুলে নিয়ে যায়। সেই সাথে স্বয়ং ইহুদী স্ক্রিউতির আকৃতি ও গলার স্বর অবিকল হযরত ঈসা (আ)-এর মত করে দেয়া হয়। ফলে হযরত ঈসা (আ)-এর পরিবর্তে সে নিজেই ক্রুশবিদ্ধ হয়। এবাবে বারনাবাসের ইঞ্জিল সেন্টপলের গড়া খৃষ্ট ধর্মের ভিত্তিই চুরমার করে দেয় এবং কুরআনের বর্ণনাকে পুরোপুরি সমর্থন করে। অথচ কুরআন নাযিল হওয়ার একশো পনেরো বছর আগেই বরনাবাসের ইঞ্জিলে এসব কথা প্রকাশিত হয় এবং সে কারণেই তাকে খৃষ্টীয় ধর্মযাজকরা প্রত্যাখ্যান করে।

এগারঃ বারনাবাসের ইঞ্জিলের বিস্তারিত ভবিষ্যদ্বাণীঃ এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বারনাবাসের ইঞ্জিল আসলে প্রচলিত চার ইঞ্জিলের চেয়ে অধিকতর বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিল। এতে হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষা, জীবনবৃত্তান্ত ও উক্তিসমূহের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। এ ইঞ্জিল দ্বারা নিজেদের ভ্রান্ত আকীদা-বিশ্বাসকে সংশোধন করা ও হযরত ঈসা (আ)-এর প্রকৃত শিক্ষা অবগত হওয়ায় যে দুর্লভ সুযোগ খৃষ্টানরা পেয়েছিল, তা শুধুমাত্র জিদ ও হঠকারিতার বসে তারা হারিয়ে ফেলে। বস্তুত এটা তাদের চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়। যা হোক, বারনাবাস হযরত রসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) এর যেসব ভবিষ্যদ্বাণী হযরত ঈসা (আ)-কে কোথাও হযরত (সা)-এর নাম উচ্চারণ করতে দেখা যায়, কোথাও তিনি শুধু ‘রসূলুল্লাহ’ বলেন, কোথাও ‘মসী’ শব্দ প্রয়োগ করেন, কোথাও তাকে ‘প্রশংসনীয়’ (Admirable) বলে অভিহিত করেন, আবার কোথাও পরিস্কারভাবে ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’র সমার্থক বাক্য উচ্চারণ করেন। এ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোর সব ক’টা উদ্ধৃত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা তার সংখ্যা এতবেশী এবং কোথাও কোথাও তা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ও পূর্বাপর বর্ণনার সাতে যুক্ত হয়ে এতটা বিরাট আকার ধারণ করেছে যে, তার সবগুলো একত্র করলে বেশ একটা মস্তবড় গ্রন্থ হয়ে যেতে পারে। আমি এখানে নমুনাস্বরূপ তার কয়েকটা মাত্র উদ্ধৃত করছিঃ

“আল্লাহর প্রেরিত নবীদের সংখ্যা ছিল এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার। তাঁরা সবাই সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্টভাবে কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমার পরে আসবেন সকল নবী ও পূণ্যাত্মাদের আলোকবর্তিকা। নভীদের যেসব কথায় অস্পষ্টতা ছিল তিনি তা সুস্পষ্ট করে দেবেন। কেননা তিনি আল্লাহর রসূল”।–(অধ্যায়ঃ ১৭)

“ফারিসী ও লাভীরা বললঃ তুমি যদি মসীহ, ইলিয়াস বা অন্য কোনো নবীও না হয়ে থাক, তাহলে নতুন আদর্শ শিক্ষা দাও কেন এবং নিজেকে মসীহের চেয়েও বড় করে জাহির কর কেন? ইয়াসু [হযরত ঈসা (আ)] জবাব দিলেনঃ আল্লাহ যেসব মোজেযা আমার দ্বারা প্রকাশ করেন তা থেকে পরিস্কার বুঝা যায় যে, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন আমি কেবল তাই বলি। নচেৎ আসলে আমি নিজেকে তাঁর (মসীহের) চেয়ে বড় বলে গণ্য করার যোগ্য মনে করি না, যেমন তোমরা বলছ। আমি আল্লাহর সেই রসূলের মোজার বাঁধন বা জুতোর ফিতে খুলে দেয়ারও যোগ্য নই –যাকে তোমরা মসীহ বলে থাক। তিনি আমার আগের সৃষ্টি অথচ আসবেন আমার পরে। তিনি সত্য বাণী নিয়ে আসবেন যাতে তাঁর ধর্মের বিস্তৃতির কোনো সীমা না থাকে”।–(অধ্যায়ঃ ৪২)।

“আমি তোমাদেরকে সুনিশ্চিতভাবে বলছিঃ এ যাবত যে নবীই এসেছেন, তিনি কেবল একটা জাতির জন্যে আল্লাহর করুণা নিদর্শন হয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন। এ জন্যে সেসব নবীর বাণী যে জাতির কাছে তারা প্রেরিত তাদের বাইরে ছড়ায়নি। কিন্তু আল্লাহর রসূল (সা) যখন আসবেন তখন আল্লাহ বলতে গেলে তাঁকে নিজের হাতের মোহর দিয়ে দেবেন। ফলে তাঁর শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত দুনিয়ার সকল জাতিকে তিনি আল্লাহর রহমত পৌঁছিয়ে দেবেন এবং মুক্তির পথ দেখাবেন। খোদাবিমুখ লোকদের ওপর তিনি পরাক্রান্ত ও ক্ষমতাশালী হয়ে আসবেন এবং পৌত্তলিকতাকে তিনি এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করবেন যে, শয়তান অস্থির হয়ে উঠবে”। [এরপর শিষ্যদের সাথে এক দীর্ঘ কথোপকথনে হযরত ঈসা (আ) সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, তিনি হযরত ইসমাঈল (আ)-এর বংশধরের মধ্য থেকে আবির্ভুত হবেন]।–(অধ্যায়ঃ ৪৩)।

“এ জন্যেই তোমাদেরকে আমি বলি যে, আল্লাহর সে রসূল এমন এক প্রদীপ্ত জ্যোতি, যাঁর কাছ থেকে আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি বস্তু আনন্দ লাভ করবে। কেননা বুদ্ধিমত্তা ও উপদেশ, প্রজ্ঞা এবং শক্তি, ভয় ও ভালবাসা, দৃঢ়তা এবং সংযম এগুলো হবে তাঁর চরিত্রের ভূষণ ও প্রেরণার উৎস। তিনি হবেন দানশীল ও দয়া, ন্যায়বিচার, খোদাভীতি এবং ভদ্রতা ও সহিষ্ণুতার উজ্জীবনী শক্তিতে বলীয়ান। আল্লাহ তাঁর অন্য যেসব সৃষ্টিকে এসব গুণে ভূষিত করেছেন, তিনি এসব গুণ তাদের তিনগুণ পেয়েছেন। তাঁর আবির্ভাবের যুগটা যে কত কল্যাণময় হবে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তোমরা নিশ্চিত জেনে রাখ, আমি তাঁকে দেখেছি এবং তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছি যেমন প্রত্যেক নবীই তাঁকে দেখেছেন ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তাঁর আত্মার প্রতি দৃষ্টিপাত করা মাত্রই আল্লাহ তাঁকে নবুয়াত দান করলেন। আমি যখন তাঁকে দেখলাম, তখন আমার আত্মা প্রশান্তিতে ভরে উঠল। তখন বললাম, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ তোমর সহায় হোন এবং আমাকে তোমার জুতোর ফিতে বাঁধার যোগ্য করে দিন। কেননা আমি এতটুকু মর্যাদা পেলেও একজন বড় নবী ও আল্লাহর একজন পূণ্যাত্মায় পরিগণিত হব”।–(অধ্যায়ঃ ৪৪)

“আমি চলে যাওয়ায় তোমরা মর্মাহত হয়ো না এবং ভীত হয়ো না। কেননা আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করিনি। বরং আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা খোদা –যিনি তোমাদেরকেও সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। আর আমার কথা ভাবছো? আমি এ সময়ে দুনিয়ায় এসেছি দুনিয়াবাসীর মুক্তির দিশারী সেই রসূলে খোদার জন্যে পথ সুগম করতে। …..ইন্দিরিয়াস বলল, “হে ওস্তাদ! আমাদেরকে তাঁর নিদর্শন জানিয়ে দাও যেন আমরা তাঁকে চিনতে পারি’ ইয়াসু জবাব দিলেনঃ তোমাদের জীবিতকালে তিনি আসবেন না। তোমাদের কিছুকাল পরে আসবেন। তিনি এমন সময় আসবেন যখন ইঞ্জিল বিকৃত হয়ে যাওয়ার দরুন কোনো রকম ত্রিশ জন মুমিন অবশিষ্ট থাকবে। সে অবস্থায় আল্লাহর দুনিয়ার ওপর করুণা করবেন। তিনি আপন রসূলকে পাঠাবেন যার মাথার ওপর সাদা মেঘ ছায়া ফেলবে এবং তা দিয়েই তাঁকে আল্লাহর মনোনীত বান্দা বলে চেনা যাবে। তাঁর মাধ্যমে দুনিয়াবাসী আল্লাহর সঠিক পরিচয় লাভ করবে। তিনি খোদাবিমুখ লোকদের প্রবল শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবেন এবং দুনিয়া থেকে পৌত্তলিকতাকে নির্মূল করবেন। আমি এ জন্যে খুবই আনন্দিত। কেননা তাঁর মাধ্যমে আমাদের খোদার যথার্থ পরিচয় পাওয়া যাবে, তাঁর মহিমা ঘোষিত হবে এবং দুনিয়াবাসী জানবে যে, আমি যা বলেছি সত্য ও সঠিক বলেছি। আমাকে যারা মানুষের চেয়ে বড় কিছু মনে করবে তাদের থেকে তিনি প্রতিশোধ গ্রহন করবেন। ….তিনি এমন সত্যতা নিয়ে আসবেন যা অন্য সব নবীর আনীত সত্যতা থেকে অধিকতর সুস্পষ্ট”।–(অধ্যায়ঃ ৭২)।

“আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করা হয়েছিল জেরুজালেমে সোলায়মানের মসজিদে –অন্য কোথাও নয়। তবে আমার কথা বিশ্বাস কর যে, সেদিন একদিন আসবে যখন খোদা অন্য একটা শহরে তাঁর রহমত বর্ষণ করবেন। তারপর সব জায়গায় তার সঠিক ইবাদাত সম্ভব হবে এবং আল্লাহ আপন অনুগ্রহে সব জায়গায় সত্যিকার নামায কবুল করবেন। ……আমি আসলে ইসরাঈলের বংশধরের কাছে ত্রানকর্তা নবী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি কিন্তু আমার পরে খোদার প্রেরিতমসীহ আসবেন সারা দুনিয়াবাসীর কাছে। তাঁরই জন্যে এই সমগ্র দুনিয়াটা তৈরী করেছে। তখন সারা দুনিয়ায় আল্লাহর ইবাদাত চলবে এবং তাঁর রহমত বর্ষিত হবে”।–(অধ্যায়ঃ ৮৩)।

“(ইয়াসু প্রধান যাজককে বললেন) সেই চিরঞ্জীব খোদার কসম যার জন্যে আমি প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত রয়েছি –দুনিয়ার সকল জাতি যে মসীহের জন্যে অপেক্ষমান, আমি সে মসীহ নই। আমাদের পিতা ইবরাহীমের কাছে আল্লাহ সেই মসীহ সম্পর্কে এ বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ‘তোমার সন্তানের অসিলায় দুনিয়ার সকল জাতি বরকত লাভ করবে’। (আবির্ভাব অধ্যায়ঃ ২২:১৮)। কিন্তু আল্লাহ যখন আমাকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাবেন তখন শয়তান আবার এমন বিদ্রোহ করবে যে দুরাচার লোকেরা আমাকে খোদা ও খোদার ছেলে বলে মানবে। সে কারণে আমার কথা ও শিক্ষাগুলো এতদূর বিকৃত করে দেয়া হবে যে ত্রিশজন মুমিন অবশিষ্ট থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। সেই সময় আল্লাহ দুনিয়ার ওপর করুণা করবেন এবং সেই রসূলকে পাঠাবেন যাঁর জন্যে তিনি দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তিনি দক্ষিণ দিক থেকে প্রবল শক্তি নিয়ে আসবেন এবং মূর্তিগুলোকে মূর্তিপূজারী সমেত ধ্বংস করে দেবেন। যে ক্ষমতার দাপট নিয়ে শয়তান মানুষের ওপর জেঁকে বসেছে, তিনি তা শয়তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবেন। তাঁর ওপর যারা ঈমান আনবে, তিনি তাদের মুক্তির জন্যে আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে আসবেন। যারা তাঁর কথা মত চলে তারাই ভাগ্যবান”।–(অধ্যায়ঃ ১৬)।

“প্রদান যাজক জিজ্ঞেস করলেনঃ আল্লাহর সেই রসূলের পরও কি আর কোনো নবী আসবে? ইয়াসু বললেনঃ যথার্থ নবী আর আসবেন না। তবে অনেক মিথ্যা নবী আসবে। আমি সে জন্যে খুবই উদ্বিগ্ন। কেননা আল্লাহর ন্যায়সঙ্গত ফয়সালার কারণে শয়তান তাদেরকে মাঠে নামাবে এবং তারা আামার ইঞ্জিলের পর্দায়ে নিজেদেরকে লুকাবে”।–(অধ্যায়ঃ ১৭)

“প্রধান ধর্মযাজক জিজ্ঞেস করলঃ সেই মসীহ কি নামে পরিচিত হবেন এবং তাঁর আবির্ভাব কোন কোন নিদর্শন দেখে বুঝা যাবে? ইয়াসু বললেনঃ সেই মসীহের নাম ‘প্রশংসনীয়’। কেননা আল্লাহ যখন তার আত্মাকে সৃষ্টি করেন তখন তাঁর এ নাম তিনি নিজেই রাখেন এবং সেখানে তাঁকে একটা ঊর্ধ-জাগতিক মর্যাদায় রাখা হয়। আল্লাহ তখন তাঁকে বলেনঃ হে মুহাম্মদ! তুমি অপেক্ষা কর। কেননা তোমারই জন্যে আমি বেহেশত, দুনিয়া এবং আরও বহু কিছু সৃষ্টি করব এবং তোমাকে সেসব উপহার দেব। অতপর যে ব্যক্তি তোমার জন্যে কল্যাণ কামনা করবে তার কল্যাণ সাধিত হবে আর যে ব্যক্তি তোমার ওপর অভিসম্পাৎ পাঠাবে তার ওপর অভিসম্পাৎ পাঠান হবে। যখন তোমাকে আমি দুনিয়ায় পাঠাব তখন আমি তোমাকে ত্রাণকর্তা নবী হিসেবে পাঠাব। তোমার কথাই সত্য হবে। আকাশ এবং পৃথিব অটল থাকবে না। কিন্তু তোমর দ্বীন অটল থাকবে। তাঁর পবিত্র নাম হর মুহাম্মদ।–(অধ্যায়ঃ ৯৭)।

বারনাবাস লিখেছেন যে, একবার শিষ্যদের কাছে হযরত ঈসা (আ) বলেন, আমরই একজন শিষ্য ইহুদা স্ক্রিউতি আমাকে ত্রিশটি মুদ্রার বিনিময়ে শত্রুদের কাছে বিক্রি করে দেবে। অতপর হযরত ঈসা (আ) বলেনঃ

“আমি নিশ্চিত যে, এরপর যে ব্যক্তি আমাকে বিক্রি করবে, আমার নামে তাকেই হত্যা করা হবে। কেননা আল্লাহ আমাকে পৃথিবীর ওপরে তুরে নেবেন এবং সেই বিশ্বাসঘাতকের চেহারা এমনভাবে পাল্টে দেবেন যে প্রত্যেকে মনে করবে আমিই সেই ব্যক্তি। তবুও তার অপমৃত্যু ঘটার পর কিছুদিন যাবত আমারই অবমাননা করা হবে কিন্তু যখন আল্লাহর পবিত্র রসূল মুহাম্মদ আসবেন তখন আমার সে দুর্নাম ঘুচে যাবে। আমি সেই মসীহের সত্যতা ঘোষণা করেছি বলেই আল্লাহ এ ব্যবস্থা করবেন। আমাকে এ পুরস্কার দেবেন যে, আমি যে জীবিত আছি এবং ঐ অপমৃত্যুর সাথে আমার যে কোন সম্পর্ক নেই সে কথা লোকেরা জানতে পারবে।–(অধ্যায়ঃ ১১৩)।

[শিষ্যদেরকে হযরত ঈসা (আ) বললেনঃ] “আমি নিশ্চিতভাবে তোমাদের বলছি যে, মূসার কিতাব থেকে সত্যকে যদি মুছে ফেলা না হত তাহলে আল্লাহ আমাদের পিতা দাউদকে আর একখানা কিতাব দিতেন না। আর যদি দাউদের কিতাবকে বিকৃত করা না হত তাহলে আল্লাহ আমাকে ইঞ্জিল দিতেন না। কেননা আমাদের খোদা পরিবর্তনশীল নন। তাই সবাইকে তিনি একই কথা বলেছেন। সুতরাং যখন আল্লাহর রসূল আসবেন তখন খোদাবিমুখ লোকের দ্বারা কলুষিত আমার কিতাবকে তিনি কলুষমুক্ত করবেন”।–(অধ্যায়ঃ ১২৪)।

দু’টি সন্দেহের জবাব

সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত এ ভবিষ্যদ্বাণীগুলোতে মাত্র তিনটি জিনিস এমন রয়েছে যা বাহ্য দৃষ্টিতে কিছু সংশয়ের সৃষ্টি করে। প্রথমতঃ এ উদ্ধৃতিগুলোতে এবং বারনাবাসের ইঞ্জিলের আরও বহু স্থানে হযরত ঈসা (আ) নিজের মসীহ হওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়তঃ শুধু এ উদ্ধৃতিগুলোতেই নয়, বরং বারনাবাসের ইঞ্জিলের আরও বহু জায়গায় হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-এর আসল আরবী নাম ‘মুহাম্মদ’ (সা) লেখা হয়েছে। অথচ ভবিষ্যতের কোনো নবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়ে তার আসল নাম উল্লেখ করা নবীদের প্রচলিত রীতি নয়। তৃতীয়তঃ এতে হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-কে সমীহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

প্রথম সন্দেহের জবাব এই যে, শুধু সন্দেহের জবাব এই যে, শুধু বারনাবাসের ইঞ্জিরেই নয়, লূকের ইঞ্জিলেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ঈসা (আ) তাঁকে মসীহ বলতে শিষ্যদেরকে নিষেধ করেছিলেন। লূকের (৯:২০-২১) উদ্ধৃতি লক্ষণীয়ঃ

“তিনি তাদেরকে বললেনঃ কিন্তু তোমরা আমাকে কি বল? পিটার্স বললেনঃ আল্লাহর মসীহ। তখন তিনি তাদেরকে কড়া আদেশ দিলেন যে, এ কথা কাউকে বল না”।

এর কারণ হয়ত এই ছিল যে, বনী ইসরাঈল যে মসীহের অপেক্ষায় ছিল তার সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল যে, তিনি তরবারীর জোরে শত্রুদের পরাস্ত করবেন। এ জন্যে হযরত ঈসা (আ) বললেন যে, আমি সে মসীহ নই বরং তিনি আমার পরে আসবেন।

দ্বিতীয় সন্দেহের জবাব এই যে, বারনাবাসের ইঞ্জিলের যে ইটালীর অনুবাদ বর্তমানে দুনিয়ায় পাওয়া যায় তাতে অবশ্যই হযরত (সা)-এর নাম মুহাম্মদ লেখা রয়েছে। কিন্তু এ কিতাব কোন কোন ভাষা থেকে অনুবাদের পর অনুবাদের মাধ্যমে ইটালীয় বাষায় উপনীত হয়েছে, তা কেউ জানে না। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, বারনাবাসের মূল ইঞ্জিল সুরিয়ানী ভাষাতেই হওয়ার কথা। কেননা সেটা হযরত ঈসা (আ) ও তার সহচরদের ভাষা ছিল। সেই আসল কিতাব পাওয়া গেলে দেখা যেত যে তাতে হযরত (সা)-এর নাম কি লেখা হয়েছে। তা যখন পাওয়া যাচ্ছে না তখন কেবল এটুকু অনুমান করা যেতে পারে যে, আসলে হযরত ঈসা (আ) হয়ত ‘মুনহামান্না’ শব্দটাই ব্যবহার করে থাকবেন। যোহনের ইঞ্জিল থেকে ইবনে ইসহাকের যে বর্ণনার বরাত আমরা ইতিপূর্বে দিয়েছি, তাতেও এ শব্দটারই উল্লেখ পাওয়া গেছে। হযরত ঈসা (আ) কর্তৃক মুনহামান্না শব্দ ব্যবহৃত হওয়ার পর বিভিন্ন অনুবাদক তার অনুবাদ করেছেন। আর ভবিষ্যদ্বাণীতে উল্লেখিত ভাবী নবীর নাম অবিকল ‘মুহাম্মদ’ শব্দেরই সমর্থক দেখে পরবর্তীকালের কোন অনুবাদক হয়ত এ নামটাই লিখে দিয়েছেন। তাই বলে এ নামটা পরিস্কারভাবে লেখা থাকাতেই এরূপ সন্দেহ করা চলে না যে, বারনাবাসের গোটা ইঞ্জিলটাই কোন মুসলমানের বানোয়াট রচনা।

তৃতীয় সন্দেহের জবাব এই যে, ‘মসীহ’ শব্দটা একটা ইসরাইলী পরিভাষা। পবিত্র কুরআনে এটা সুনির্দিষ্টভাবে হযরত ঈসা (আ)-এর নামে ব্যবহৃত হওয়ার কারণ শুধু এই যে, ইহুদীরা তাকে ‘মসীহ’ বলে স্বীকার করত না। নচেত এটা কুরআনের পরিভাষাও নয় এবং কুরআনের কোথাও একে ইসরাঈলী পরিভাষার সমার্থক শব্দ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়নি। সুতরাং হযরত ঈসা (আ) যদি রসূলুল্লাহ (সা)-এর নামে মসীহ শব্দ প্রয়োগ করে থাকেন এবং কুরআনে তা না করা হয়ে থাকে তবে তার অর্থ এ দাঁড়ায় না যে, বারনাবাসের ইঞ্জিল হযরত (সা)-কে এমন একটা বিশেষণে ভূষিত করছে যা কুরআন অস্বীকার করে। আসলে বনী ইসরাঈলের প্রাচীন রীতি ছিল এই যে, কোনো জিনিস বা ব্যক্তিকে যখন কোন ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট করে দেয়া হত তখন সেই জিনিসের ওপর বা সেই ব্যক্তির মাথায় তেল মর্দন করে তাকে পবিত্র (Consecrate) করা হত। ইবরানী ভাসায় এই তেল মর্দনকে ‘মসহ’ বলা হত এবং যার ওপর মর্দন করা হত তাকে বলা হত ‘মসীহ’। ইবাদাতগাহের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে এভাবে তৈল মর্দন করে ইবাদাতগাহের নামে ওয়াকফ করে দেয়া হত। যাজকদেরকে যাজকতার কাজে নিয়োগ করার সময়ও এভাবে ‘মসহ’ করা হত। রাজা বা নবীও যখন আল্লাহর তরফ থেকে রাজত্ব বা নবুয়াতের পদে মনোনীত হতেন তখন তাকে ‘মসহ’ করা হত। বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে বনী ইসরাঈলে একাধিক ‘মসীহ’ আবির্ভূত হতে দেখা যায়। হযরত হারুন (আ) যাজক হিসেবে মসীহ ছিলেন। হযরত মূসা (আ) যাজক ও নবী হিসেবে, তালুত রাজা হিসেবে, হযরত দাউদ (আ) রাজা ও নবী হিসেবে, মালিক ছাদাক রাজা ও যাজক হিসেবে এবং হযরত আল-ইয়াসা নবী হিসেবে মসীহ ছিলেন। পরে অবশ্য কাউকে নিয়োগ করার ব্যাপারে তেল মর্দনের বাধ্যবাধকতা ছিল না। কেবল আল্লাহর মনোনীত হওয়াই মসীহ হওয়ার শাসিল ছিল। উদাহরণ স্বরূপ এক –সম্রাট পুস্তকের ১৯শ’ অধ্যায়ে উল্লেখ রয়েছে যে, আল্লাহ হযরত ইলিয়াস (আ)-কে (ইলিয়াহ) নির্দেশ দেন, হাজাইলকে মসহ কর যেন এরেমের রাজা হয়, নিমসির ছেলে ইয়ানুকে মসহ কর যেন ইসরাঈলের রাজা নয় এবং আল-ইয়াসকে মসহ কর যেন তোমর জায়গায় নবী হয়। এঁদের কারও মাথায় তেল মর্দন করা হয়নি। কেবল আল্লাহর তরফ থেকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেয়াতেই মসহ করা হয়ে গিয়েছিল। সুতরাং ইসরাঈলীদের ধারণা অনুসারে ‘মসীহ’ আসলে ‘আল্লাহ’ কর্তৃক নিযুক্ত’ শব্দের সমার্থক। এ অর্থেই হযরত ঈসা (আ) হযরত রসূলুল্লাহ (সা)-কে মসীহ বলে অভিহিত করেছিলেন। (মসীহ শব্দের ইসরাইলী তাৎপর্যের ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন সাইক্লোপেডিয় অব বাইবেলিকাল লিটারেচার, ‘মেসিয়াহ’ শব্দ)।

অধ্যায়ঃ ৪- বিশ্বনেতা

বিশ্বনেতা

(সারা দুনিয়ার সার্বজনীন উত্তরাধিকার)

-[এটা একটা বেতার ভাষণ। দেশ বিভাগের কয়েক বছর আগে ১৯৪১ সালে অল ইণ্ডিয়া রেডিও থেকে এটা প্রচার করা হয়। এ ভাষণের শ্রোতা শুধু মুসলমান ছিল না। হিন্দু, শিখ, খৃষ্টান এবং পারসিকরাও ছিল।–(সংকলকবৃন্দ)]

আমরা মুসলমানরা হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে বিশ্বনেতা বলে থাকি। সরল ভাষায় এর অর্থ হল দুনিয়ার সরদার। হিন্দী ভাষায় এর অনুবাদ হবে জগতগুরু। ইংরেজিতে Leader of the world দৃশ্যতঃ এটা একটা বিরাট উপাধি। তবে যে মহান ব্যক্তিকে এ উপাধি দেয়া হয়েছে তাঁর কর্মকাণ্ড সত্যিই এমন যে তাঁকে বিশ্বনেতা বললে এতটুকু অতিরঞ্জিত হবে না। বরং একেবারে তা হবে বাস্তব সত্য।

চিন্তা করে দেখুন, কোনো ব্যক্তিকে দুনিয়ার নেতা বরে মেনে নেয়ার পয়লা শর্ত এই যে, তিন কখনো বিশেষ জাতি বর্ণ বা শ্রেণীর কল্যাণের জন্যে নয় বরং সারা দুনিয়ার মানুষের কল্যাণেল জন্যে কাজ করেছেন। একজন দেশপ্রেমিক বা জাতীয়তাবাদী নেতা আপন জাতির সেবা করেছেন বলে তাঁকে যত খুশী শ্রদ্ধা জানাতে পারেন কিন্তু আপনি যদি তার দেশ ও জাতির লোক না হন তাহলে তিনি কিছুতেই আপনার নেতা হতে পারে না। যে ব্যক্তির সমস্ত ভালবাসা, মঙ্গল কামনা ও সমস্ত জনকল্যাণমূলক তৎপরতা কেবল চীন স্পেন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, তার সাথে একজন ভারতবাসীর কি সম্পর্ক যে তাকে নেতা বলে মেনে নেবে? সে যদি নিজের জাতিকে অন্যান্য জাতির চেয়ে উত্তম মনে করে এবং অন্যান্য জাতির লোক তাকে ঘৃণা করতে বাধ্য হবে। সকল জাতির লোক কোনো এক ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা বলে মানতে পারে কেবল তখন, যখন তিনি সকল মানুষ ও সকল জাতিকে একচোখে দেখেন, সকলের সমান কল্যাণকামী হন এবং হিতকামনায় কিছুতেই এক জাতিকে অন্য জাতির ওপর প্রাধান্য দেন না।

সারা দুনিয়ার মানুষের নেতা হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত এই যে, তাঁর দেয়া আদর্শ ও মূল নীতিসমূহ যেন সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে পথপ্রদর্শক হয় এবং তাতে মানব জীবনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান নিহিত থাকে। নেতা শব্দের মানেই হল দিশারী বা পথপ্রদর্শক। নেতার প্রয়োজন এ জন্যেই হয় যে, কোন পথে চললে কল্যাণ ও মঙ্গল হবে তা তিনি দেখাবেন। কাজেই যিনি সারা বিশ্বের মানুষকে তাদের সবার কল্যাণের পথ বলে দিতে পারেন তিনিই বিশ্বনেতা।

বিশ্বনেতা হওয়ার তৃতীয় অপরিহার্য শর্ত হল, তার পথনির্দেশনা যেন কোনো বিশেষ সময় বা কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ না হয়, বরং সকল অবস্থায় ও সকল যুগে তার উপযোগিতা ও স্বার্থকতা একই রকম থাকে, একই রকম নির্ভুল ও সঠিক সাব্যস্ত হয় এবং একই রকম অনুকরণযোগ্য হয়। যে নেতার নেতৃত্ব এক সময়ে উপযোগী ও অন্য সময় অনুপযোগী হয় –এক সময় চালু এবং অন্য সময়ে অচল হয়ে যায়, তাঁকে বিশ্বনেতা বলা যায় না। বিশ্বনেতা শুধুমাত্র তিনিই হতে পারেন যাঁর নেতৃত্ব ততদিন কার্যকর থাকবে বিশ্বজগত যতদিন টিকে থাকবে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে জরুরী শর্ত এই যে, তিনি যেন শুধু আদর্শ দিয়েই ক্ষান্ত না থাকেন বরং নিজের দেয়া আদর্শকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করে দেখিয়ে দেন এবং তার ভিত্তিতে একটা প্রাণবন্ত ও জাগ্রত সমাজ গঠন করেন। কেবল আদর্শ দিয়েই যিনি কর্তব্য সমাধা করেন তিনি বড়জোর একজন চিন্তাবিদ হতে পারেন; নেতা হতে পারেন না। নেতা হতে হলে আদর্শকে বাস্তবায়িত করে দেখিয়ে দেয়া অপরিহার্য।

এবার দেখা যাক, যে ব্যক্তিকে আমরা বিশ্বনেতা বলে থাকি, এ চারটি শর্ত তাঁর মধ্যে কতদূর পূর্ণ রয়েছেঃ

প্রথমে পয়লা শর্ত নিয়ে ভেবে দেখুন। হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনী পড়ে দেখরে এক নজরেই বুঝতে পারা যায় যে, এ কোনো জাতীয়তাবাদী বা দেশপ্রেমিকের জীবনী নয় –বরং একজন মানবপ্রেমিক ও একটা বিশ্বজনীন মতবাদের প্রবক্তার জীবনী। তাঁর দৃষ্টিতে সকল মানুষ চিল সমান। কোনো বিশেষ বংশ, শ্রেণী, জাতি, বর্ণ অথবা দেশের বিশেষ স্বার্থ নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতেন না। ধনী-গরীব, বড়লোক-ছোটলোক, সাদা-কালো, আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, আর্য-অনার্য এসবের কোনো ভেদাভেদ তিনি মানতেন না। এসবকে তিনি একই মানব জাতির সদস্য মনে করতেন। তাঁর মুখ থেকে সারাজীবনেও এমন একটা শব্দ বা বাক্যও কেউ শোনেনি আর জীবনে তিনি এমন একটা কাজও কখনো করেননি যার দ্বারা সন্দেহ হতে পারে যে সমগ্র মানবজাতির পরিবর্তে একটা বিশেষ মানব শ্রেণীর স্বার্থের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এ কারণেই তাঁর জীবিতকালেই আরবদের মত হাবশী, ইরানী, রোমক, মিসরীয় এবং ইসরাঈলীরাও তার সহযোগী ও সহকর্মী হয়। আর তাঁর ইন্তিকালের পর পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে প্রত্যেক বর্ণ ও সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে তাদের স্বজাতির মতই নিজেদের নেতারূপে গ্রহণ করেছে। তাঁর সেই নির্বেজাল মানবতাবাদের কল্যাণেই আজ  একজন সুদূর ভারতবাসীর-[এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ভাষণ যখন প্রচারিত হয় তখন ভারত বিভক্ত হয়নি।–(সংকলকবৃন্দ)] মুখেও লোকে সহস্রাধিক বছর পূর্বে আরবে জন্মগ্রহণকারী সেই মানুষটির প্রশংসা শুনতে পায়।

এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় শর্ত দু’টো একত্রে বিচার করা যাক। হযরত মুহাম্মদ (সা) বিশেষ জাতি ও বিশেষ দেশসমূহের সাময়িক ও আঞ্চলিক সমস্যাবলী নিয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করেননি। তার পরিবর্তে তিনি দুনিয়ার মানবজাতির যেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা, তার সমাধানে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। কেননা সেই বড় সমস্যাটার সমাধান হলেই সকল মানুষের যাবতীয় খুঁটিনাটি সমস্যার আপনাআপনিই সবাধান হয়ে যায়। সেই বড় সমস্যাটা হলো এইঃ

“বিশ্বজগতের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা প্রকৃতপক্ষে যে নীতি অনুসারে চলছে, মানুষের জীবনের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাও ঠিক সেই নীতি অনুসারেই চলা উচিত। কেননা মানুষ বিশ্বজগতেরই একটা অংশ যদি সমষ্টির বিরুদ্ধে চলে তাহলে বিপর্যয় ও বিশৃংখলা অনিবার্য হয়ে পড়ে”।

এ কথাটা ভাল করে বুঝবার সহজ পন্থা হচ্চে, নিজের দৃষ্টিকে একটু প্রসারিত করে স্থান ও কালের গণ্ডীর বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। গোটা পৃথিবীটার ওপর ব্যাপকভাবে নজর দিয়ে কল্পনা করতে হবে, সৃষ্টির আদিকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে অনন্তকাল পর্যন্ত দুনিয়ায় বসবাসকারী সকল মানুস যেন চোখের সামনে রয়েছে। তারপর ভাবতে হবে, মানুষের জীবনে যত আপদ-বালাই ও বিপর্যয় আসে, বা আসতে পারে, তার মূল কারণ কি এবং কি হতে পারে। এ প্রশ্ন নিয়ে যতই চিন্তা করা যাবে এবং যত বিচার-বিশ্লেষণ ও গবেসণা করা যাবে, তার একটা উত্তরই পাওয়া যাবে।

সে উত্তর হলঃ

“স্রষ্টার বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ ও অবাধ্যতাই সমস্ত বিপদ-আপদ ও বিপর্যয়-বিশৃংখলার মূল কারণ”।

কেননা স্রষ্টার অবাধ্য হওয়ার পর মানুষের সামনে দু’টো পথ খোলা থাকে। এ দু’টোর কোনো না কোনো একটা সে গ্রহণ না করে পারে না। হয় সে নিজেকে স্বেচ্ছাচার ও দায়িত্বহীন ভেবে যা খুশী তাই করে এবং এ কারণে সে হয়ে যায় যালেম। অথবা সে স্রষ্টা বাদে অন্যান্য শক্তির আনুগত্য করে এবং এতে করে দুনিয়াতে অসংখ্য রকমের বিপর্যয়-বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার উদ্ভব ঘটে। উভয় অবস্থাতেই এমন খারাপ পরিণতি দেখা দেয় কেন? এর সরল ও সুস্পষ্ট জবাব এই যে, এ করম করা যেহেতু বাস্তবতার পরিপন্থী, তাই অনিবার্যভাবেই এর খারাপ পরিণতি দেখা দেয়। এ বিশ্বজগত বাস্তাবিকপক্ষে খোদারই সাম্রাজ্য। পৃথিবী, সূর্য, চাঁদ, বাতাস, পানি, আলো –এসব কিছুরই মালিক তিনি। মানুষ তাঁর এ সাম্রাজ্যে জন্মগত প্রজা ও দাস (Born Subject)। এ গোটা সাম্রাজ্য যে নিয়েমে চলছে, তারই একটা অংশ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ যদি সেই নিয়মের বিরুদ্ধে চলে তাহলে তার এ আচরণের ধ্বংসাত্মক পরিণতি দেখা দেয়া অবশ্যম্ভাবী। সে যদি মনে করে যে, তার ওপর কোনো কর্তৃত্বাশীল সত্তা নেই এবং কারও কাছে সে দায়ীও নয়, তবে তার এ ধারণা হবে প্রকৃত অবস্থার পরিপন্থী। তাই সে যখস স্বেচ্ছাচারী হয়ে দায়িত্বহীনভাবে কাজ করে এবং নিজের জীবন কোন নিয়মে চারাবে তা সে নিজেই ঠিক করে, তখন অনিবার্যভাবে তার ফল খারাপ হয়ে দেখা দেয়। ঠিক একইভাবে স্রষ্টা ছাড়া অন্য কাউকে ক্ষমতাশালী ও কর্তৃত্বশীল মেনে নেয়া, তাকে বয় করা বা তার কাছ থেকে কিছু লাভ করার লালসা পোষণ করা এবং তার প্রভুত্ব ও কর্তৃত্বের সামনে মাথা নত করাও প্রকৃত সত্যের পরিপন্থী। কেননা আসলেই স্রষ্টা ছাড়া আর কেউ এ মর্যাদার অধিকারী নয়। তাই এর ফলাফলও বিষময় ও পৃতিবী জুড়ে যে সত্যিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, তার সামনে মানুষকে মাতা নত করতে হবে, নিজের আমিত্ব ও স্বকীয়তা তার সামনে বিসর্জন দিতে হবে। আনুগত্য ও দাসত্বকে শুধুমাত্র তার জন্যে নির্দিষ্ট করতে হবে এবং নিজের জীবনের নীতি ও বিধান নিজে নিজেই রচনা করা বা অন্যের দ্বারা রচিত করার পরিবর্তে সেই কর্তৃত্বের মারিকের কাছ থেকেই নিতে হবে।

মানব জীবনের জন্যে মুহাম্মদ (সা) এ মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাবই পেশ করেন। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বন্ধন থেকে এ মুক্ত পৃথিবীতে যেখানে মানুষের বসতি রয়েছে। এ একটা মাত্র সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা তাদের জীবনের সমস্ত বিকল ও বিশৃঙ্খল তৎপরতা শুধরে দিতে পারে। এ প্রস্তাবনা অতীত ও ভবিষ্যতের বন্ধন থেকেও মুক্ত। দেড় হাজার বছর আগে এটা যতখানি বিশুদ্ধ ও কার্যকর ছিল ততখানি আজও আছে এবং দশ হাজার বছর পরেও থাকবে।

এখন রইল সর্বশেষ শর্তটি। এ এক ঐতিহাসিক সত্য যে, মুহাম্মদ (সা) শুধু একটা কাল্পনিক আদর্শের রূপরেখা পেশ করেই ক্ষান্ত হননি বরং সেই রূপরেখার ভিত্তিতে একটা জীবন্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি ২৩ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে লাখ লাখ মানুষকে খোদার কর্তৃত্বের অনুগত ও বাধ্য হতে উদ্ধুদ্ধ করেছেন। তাদেরকে আপন প্রবৃত্তির দাসত্ব এবং খোদা ছাড়া অন্যান্য সত্তার আনুগত্য থেকে মুক্ত করেছেন। অতপর তাদেরকে সংঘবদ্ধ করে খোদার একক আনুগত্য ও দাসত্বের ভিত্তিতে একটা নতুন নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পত্তন করেছেন। এভাবে সারা দুনিয়ার মানুষকে তিনি বাস্তব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেয়া নীতি ও কর্মসূচী অনুসারে কি ধরনের জীবনধারার তুলনায় কত ভাল, কত পবিত্র ও কত ন্যায়নিষ্ঠ।

এ হল নবী মুহাম্মদ (সা)-এর সুমহান অবদান। এ অবদান রেখে গেছেন বলেই তাঁকে আমরা বিশ্বনেতা বা সারা দুনিয়ার সরদার বলে মানি। তাঁর এ অবদান কোনো বিশেষ জাতির জন্যে ছিল না, ছিল সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত উত্তরাধিকার। এতে কারও অধিকার কারও চেয়ে কম বা বেশী নয়। এ উত্তরাধিকার থেকে যে কেউ লাভবান হতে পারে। এর বিরুদ্ধে কারও বিদ্বেষ পোষণের কি কারণ থাকতে পারে তা আমি বুঝি না।

সরওয়ারে আলমের প্রকৃত অবদান

-[এটা দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত একটা বেতার ভাষণ।]

এ কথা সারা দুনিয়ার মানুষ জানে যে, আল্লাহর মনোনিত যে দলটি আদিম যুগ থেকে মানুষকে আল্লাহর ইবাদাত, আনুগত্য এবং সৎ চরিত্রের শিক্ষা দেয়ার জন্যে যুগে যুগে আবির্ভূত হয়ে এসেছে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা) সে দলেরই একজন।। এক আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব এবং পরিচ্ছন্ন নৈতকি জীবন যাপনের যে শিক্ষা চিরদিন দুনিয়ার নবীগণ ও মুনি-ঋষিগণ দিয়ে এসেছেন, হযরত (সা)ও সেই শিক্ষাই দিয়েছেন। তিনি খোদা সম্পর্কে কোনো অভিনব তত্ত্ব পেশ করেননি এবং পূর্ববর্তী নবীরা নৈতিকতার যে শিক্ষা দিয়েছেন তা থেকে আলাদা অভিনব কোনো চরিত্রের শিক্ষাও তিনি দেননি। তা যখন দেননি তখন স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে, তাঁর সেই আসল অবদানটা কি –যার জন্যে আমরা তাঁকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানব বলে অভিহিত করে থাকি? এ প্রশ্নের উত্তর এই যে, নবী মুহাম্মদের পূর্বে মানুষ খোদার অস্তিত্ব ও একত্ব সম্পর্কে অবশ্যই অবগত ছিল। তবে এ দার্শনিক তত্ত্বের সাথে মানুষের চরিত্রের সম্পর্ক কি তা তাদের জানা চিল না। তবে সে সময় চরিত্রের উত্তম মূলনীতিগুলো সম্পর্কে কি তা তাদের জানা ছিল না। তবে সে সময় চরিত্রের উত্তম মূলনীতিগুলো সম্পর্কে মানুষ ওয়াকিফহাল ছিল কিন্তু জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব চারিত্রিক মূলনীতির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন কিবাবে হওয়া উচিত তা কারও ভাল করে জানা ছিল না। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, চারিত্রিক মূলনীতি ও মানুষের বাস্তব জীবন এ তিনটি জিনিস ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এর একটার সাথে অন্যটার কোনো বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র, কোনো নিবিড় সম্পর্ক এবং কোনো কার্যকর বন্ধন ছিল না। হযরত মুহাম্মদ (সা) এ তিনটি জিনিসকে একটা একক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসেন। এ তিনটির সমন্বয়ে তিনি একটা পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও তামাদ্দুন গড়ে তোলেন। সে সভ্যতা ও তামাদ্দুনের রূপরেখা তিনি শুধু কল্পনার জগতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং তিনি বাস্তব জগতেও তা কায়েম করে রেখেছেন।

ঈমান একটা কর্মোদ্দীপক শক্তি

নবী মুহাম্মদ (সা) বলেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান শুধু একটা দার্শনিক তত্ত্ব মেনে নেয়ার নাম নয়, বরং সে ঈমান আপন উৎপত্তিগত দিক দিযে স্বভাবতই এক বিশেষ ধরনের চরিত্র দাবী করে। মানুষের বাস্তব জীবনের আচরণে এ চরিত্রের প্রতিফলন ঘটা উচিত। ঈমান একটা বীজস্বরূপ। মানুষের মনে যখনই সে বীজ অংকুরিত হয় তখনই আপন স্বভাবের তাগিতে সে একটা বিশেষ ধরনের কর্মজীবনের গাছ জন্মাতে শুরু করে দেয়। সে গাছের কাণ্ড থেকে আরম্ভ করে প্রতিটা শাখা-প্রশাখা ও পত্র-পল্লবে ঐ বীজ থেকে নির্গত জীবনরস সঞ্চারিত হয়। মাটিতে আমের আঁটি রোপন করলে তা থেকে লেবু গাছ হওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি মানুষের মনে আল্লাহর দাসত্বের বীজ রোপন করা হবে এবং তা থেকে চরিত্রহীনতায় কলুষিত বস্তুবাদী জীবন গড়ে উঠবে এটাও সম্ভব নয়। আল্লাহর আনুগত্য ও দাসত্ব থেকে যে চরিত্রের উৎপত্তি হয় তা এবং শিরক, নাস্তিকতা বা বৈরাগ্যবাদ থেকে যে চরিত্র গড়ে উঠে তা সমান হতে পারে না। মানব জীবন সংক্রান্ত এসব মতবাদের মেজাজ ও স্বভাব প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রত্যেকটার প্রকৃতি অন্যটা থেকে আলাদা ধরনের চরিত্র দাব করে।

সারা জীবনের জন্যে খোদাপুরস্তির চরিত্র

খোদার আনুগত্য থেকে যে চরিত্র সৃষ্টি হয় তা শুধু বিশেষ অলী-দরবেশ শ্রেণীর জন্যেই নির্দিষ্ট নয় যে, শুধুমাত্র খানকা ও ধ্যান-তপস্যার নির্জন কক্ষেই সে চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ হতে পারবে, বরং ব্যাপকভাবে সমগ্র মানব জীবনে ও তার প্রতিটি দিকে সে চরিত্রের প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়। একজন ব্যবসায়ী যদি খোদাভক্ত হয় তাহলে তার ব্যবসায়ে খোদাভীতিমূলক চরিত্রের প্রকাশ না ঘটার কোনো কারণ নেই। একজন বিচারক যদি খোদাভক্ত হয় তাহলে আদালতের বিচারকক্ষে এবং একজন পুলিশ কনস্টেবল যদি খোদাভক্ত হয় তাহলে থানায় বা ফাঁড়িতে তার কাছ থেকে খোদাবিমুখ চরিত্র জাহির হবে –এমনটা আশা করা যেতে পারে না। এমনিভাবে কোনো জাতি যদি খোদাভীরু ও খোদা প্রেমিক হয় তাহলে তাদের নগর বা পৌর জীবনে, রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এবং যুদ্ধে ও সন্ধিতে খোদানুগত্যমূলক চরিত্রের প্রকাশ ঘটা স্বাভাবিক। নতুবা সে জাতির আল্লাহর প্রতি ঈমান থাকার কোনো অর্থ হতে পারে না।

নবী মুহাম্মদের (সা)-এর শিক্ষা

এখন কথা হচ্ছে এই যে, খোদাপুরস্তি কোন ধরনের চরিত্র দাবী করে এবং মানুষের বাস্তব জীবনে এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক ধ্যান-ধারণায় সে নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশ কিভাবে হতে পারে, তা এমন এক ব্যাপক আলোচ্য বিষয় যা সংক্ষিপ্ত আলোচনায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। তবে আমি নমুনা হিসেবে হযরত (সা)-এর কয়েকটা বাণী উদ্ধৃত করছি। এ বাণীগুলো থেকে বুঝা যাবে হযরত (সা) যে জীবনব্যবস্থা দিয়ে গেছেন তাতে ঈমান আমল ও আখলাকের মধ্যে কত সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে। হযরত (সা) বলেনঃ

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৬ পৃষ্ঠায়)

“ঈমানের অনেক শাখা রয়েছে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ না মানা হল এর মূল। আর শেষ শাখা হল পথ থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরিয়ে দেয়া। আর লজ্জাও ঈমানের একটা বিভাগ”।

(আরবী******) “শরীর ও পোশাকের পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক”।

 

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৬ পৃষ্ঠায়)

“মুমিন হল সেই ব্যক্তি যার থেকে লোকের জান-মালের কোনো আশংকা থাকে না”।

 

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৬ পৃষ্ঠায়)

“যার মধ্যে আমানতদারী ও বিশ্বস্ততা নেই তার ঈমান নেই এবং যে ব্যক্তি ওয়াদা ঠিক রাখে না তার ধর্ম নেই”।

 

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৬ পৃষ্ঠায়)

“যখন ভাল কাজে তোমার আনন্দ হবে এবং মন্দ কাজে অনুশোচনা হবে তখন (বুঝবে যে) তুমি ঈমানদার”।

 

(আরবী*********) ধৈর্য ও উদারতাকেই ঈমান বলা হয়”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“সর্বোত্তম ঈমানদারী হল এই যে, তোমার শত্রুতা ও মিত্রতা হবে আল্লাহর ওয়াস্তে, তোমার মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হতে থাকবে এবং তুমি নিজের জন্যে যা পছন্দ কর অন্যের জন্যেও তাই পছন্দ করবে। আর নিজের জন্যে যা অপছন্দ কর অন্যের জন্যেও অপছন্দ করবে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“মুমিনদের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ঈমান হল সেই ব্যক্তির যার স্বভাব-চরিত্র সবচেয়ে ভাল এবং যে আপন পরিবার-পরিজনের সাথে সবচেয়ে বেশী সদাচরণ করে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে তার উচিত অতিথির যত্ন করা, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়া। আর যদি তার কিছু বলতেই হয় তবে যেন ভাল কথা বলে অথবা যেন চুপ থাকে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“মুমিন কখনও অপবাদ ও অভিসম্পাতকারী, অশ্লীল ও কটুভাষী হয় না”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“মু’মিন আর সবকিছুই হতে পারে কিন্তু আত্মসাৎকারী ও মিথ্যাবাদী হতে পারে না”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর কছম সে মু’মিন নয়! আল্লাহর কসম সে মু’মিন নয়!! যার অনিষ্ট থেকে প্রতিবেশী নিরাপদ নয়”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“প্রতিবেশী অভুক্ত থাকতে যে নিজে পেট ভরে খায় সে মুমিন নয়”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি তা সংযত করে আল্লাহ তার মনকে ঈমান ও নিশ্চিন্ততায় পরিপূর্ণ করে দেন”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৭ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি লোক দেখান নামায পড়ে সে শিরক করে, যে ব্যক্তি লোক দেখান রোযা রাখে সে শিরক করে এবং যে ব্যক্তি লোক দেখান দান-খয়রাত করে সেও শিরক করে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“চারটি দোষ যার ভেতরে থাকে সে পুরোপুরি মোনাফেক। আমানত খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং ঝগড়া করতে গিয়ে সীমা ছাড়িয়ে যায়”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া এত বড় গুনাহ যে, তা শিরকের কাছাকাছি পৌঁছে যায়”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য বজায় রাখতে গিয়ে নিজের প্রবৃত্তির সাথে লড়াই করে সে-ই হল আসল মুজাহিদ। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো ত্যাগ করে সে-ই হল আসল মুহাজির”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“তোমরা কি জান কারা কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম আল্লাহর ছায়ায় স্থান পাবে? শ্রোতারা বলল, আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলই ভাল জানেন। তখন হযরত (সা) বললেন, যাদের সামনে সত্য পেশ করা হলে তা গ্রহণ করে, অধিকার দাবী করলে মুক্ত মনে তা দিয়ে দেয়, আর নিজেদের ব্যাপারে যেমন ফায়সারা তারা কামতা করত, অন্যদের বেলায়ও তেমনি ফায়সালা করে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“তোমরা আমাকে ছয়টা জিনিসের নিশ্চয়তা দিলে আমি তোমাদেরকে বেহেশতের নিশ্চয়তা দেব। কথা বললে সত্য বলবে, ওয়াদা করলে তা পূর্ণ করবে, তোমাদের কারও কাছে আমানত রাখা হলে তা পালন করবে ব্যভিচার থেকে দূরে থাকবে, কুদৃষ্টি থেকে নিজেকে রক্ষা করবে এবং যুলুম থেকে নিবৃত্ত থাকবে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“ধোঁকাবাজ, কৃপন ও দান করে যে বলে বেড়ায় এ ধরনের রোক বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৮ পৃষ্ঠায়)

“হারাম খাদ্য তৈরী গোশত বেহেশতে যাবে না। যে গোশত হারাম খাদ্যের দ্বারা প্রতিপালিত তার জন্যে আগুন বা জাহান্নামই উপযোগী”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যক্তি দোষমুক্ত জিনিস বিক্রি করে এবং খরিদ্দারকে তার দোষের কথা জানিয়ে দেয় না, তার ওপর আল্লাহ ক্রুদ্ধ থাকেন এবং ফেরশতারা তাকে অভিসম্পাত দিতে থাকে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“কোনো ব্যক্তি যদি বারবার জীবনধারণ করে ও বারবার আল্লাহর পথে শহীদ হয় তথাপি সে বেহেশতে যেতে পারবে না যদি সে তার ঋন পরিশোধ না করে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“পুরুষ কিংবা স্ত্রী যে হোক না কেন জীবনের ষাট বছরও যদি আল্লাহর আনুগত্য করে কাটায় কিন্তু মৃত্যু ঘনিয়ে এলেও কারও হক নষ্ট করে ওছিয়ত করে, তাহলে উভয়ের দোযখে যাওয়া অবধারিত”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“অধীনস্থদের সাথে খারাপ আচরণাকরীরা বেহেশতে যাবে না”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“রোযা, নামায ও দান-খয়রাতের চেয়েও ভাল কাজ কি জান? সেটা হল পারস্পরিক বিরোধের নিষ্পত্তি করে দেয়া। আর পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করা এমন মারাত্মক কাজ যে, তার দ্বারা মানুষকে সমস্ত নেক কাজ নষ্ট হয়ে যায়”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“প্রকৃতপক্ষে নিঃস্ব তাকে বরে যে কেয়ামতের দিন প্রচুর পরিমাণ নামায, রোযা ও যাকাত সাথে নিয়ে আসবে কিন্তু সেই সাথে কাউকে গালী দিয়ে এসেছে, কাউকে অপবাদ দিয়ে এসেছে, কারও মাল আত্মসাৎ করে এসেছে, কারও রক্তপাত করে এসেছে কিংবা কাউকে প্রহার করে এসেছে। অতপর খোদা তার এক একটি নেকী ঐসব মজলুমদের মধ্যে বন্টন করেন। তারপরও তার ঋণ পরিশোধ হল না বলে তাদের গোনাহ তার ওপর চাপান হল এবং তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হল”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৪৯ পৃষ্ঠায়)

“নাযাত থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না –যদি সে মন্দ কাজের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা করে নিজের মনকে নিশ্চিত না করে”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৫০ পৃষ্ঠায়)

“যে ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর জন্যে জিনিসপত্র আটকে রাখে সে অভিশপ্ত”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৫০ পৃষ্ঠায়)

“মূল্য বৃদ্ধির আশায় যে ব্যক্তি ৪০ দিন খাদ্যদ্রব্য আটকে রাখে, তার সাথে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই”।

(আরবী******************************************পিডিএফ ১৫০ পৃষ্ঠায়)

“খাদ্যদ্রব্য চল্লিম দিন আটকে রাখার পর যদি কেউ তা দান করেও দেয়, তবুও আটকে রাখার গুনাহ মাফ হবে না।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর বহু উক্তির মধ্যে কয়েকটি পেশ করা হল। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, হযরত (সা) ঈমানের সাথে চরিত্রের এবং চরিত্রের সাথে জীবনের সকল বিভাগের সম্পর্ক কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইতিহাস পাঠক মাত্রেই জানেন যে, হযরত (সা)-এর এসব উক্তি কেবল কথার কথাই ছিল না, বরং বাস্তব জগতে একটি গোটা দেশের তামাদ্দুনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে তিনি তারই ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। এই হচ্ছে তাঁর সেই বিরাট অবদান যার জন্যে তিনি মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা।

অধ্যায়ঃ ৫ – খতবে নবুয়াত

খতবে নবুয়াতের তাৎপর্য ও তার যুক্তি

 

খতবে নবুযাতের নির্ভুল ব্যাখ্যা

যতদিন পর্যন্ত মানুষের সভ্যতা-সংস্কৃতি এমন এক সীমায় উপনীত হয়নি, যাতে করে কোনো নবীর বাণী ব্যাপকভাবে সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং এমন কোনো মানবগোষ্ঠীর উদ্বব হয়নি যারা নবীর বাণী, তাঁর শিক্ষা ও চারিত্রিক আদর্শ সংরক্ষিত করে তাকে বিশ্বের সকল এলাকায় ছড়িয়ে দিতে পারে, ততদিন পর্যন্ত নবুয়াতের ধারাবাহিকতা জারী থাকে। বিভিন্ন দেশে ও জাতির মধ্যে নবী প্রেরিত হতে থাকেন। কিন্তু যখন একদিকে মানব সভ্যতা-সংস্কৃতির যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়, যার ফলে একজন নবীর বাণী দুনিয়া জোড়া রূপ নিতে সক্ষম হয় এবং অন্যদিকে সত্য-নির্দেশ গ্রহণকারী এমন একটি মানবগোষ্ঠী সংগঠিত হয় যে, আল্লাহর কিতাব এবং কিতাব বহনকারী নবীর জীবন ও তাঁর পূর্ণাঙ্গ কার্যকর নেতৃত্বকে অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত করার যোগ্যতা অর্জন করে, তখন নবুয়াতের দায়িত্ব পালন করার জন্যে আর কোনো নবী প্রেরণের প্রয়োজন-[যারা খতবে নবুয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মানবিক জ্ঞানের জন্যে এর প্রয়োজন নেই বলে দাবী করে, তারা আসলে নবুয়াতের ধারাবাহিকতার অবমাননা ও তার ওপর আক্রমণ চালায়। এ ব্যাখ্যার অর্থ দাঁড়ায়ঃ জ্ঞানের একটি বিশেষ অবস্থা পর্যন্তই নবীর এ হেদায়াতের প্রয়োজন হয়, এরপর মানুষ নবীর নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী থাকে না।-লেখক] থাকেনি।

রসূলে করীম (সা)-এর পূর্বের যুগের বিশেষ অবস্থা

প্রথমদিকে প্রত্যেক জাতির মধ্যে আলাদা আলাদা নবী আসতেন। তাদের শিক্ষা তাদের জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। এর কারণ সে সময় দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি পরস্পর থেকে আলাদা ছিল। তাদের মধ্যে বেশী মেলামেশা ছিল না। প্রত্যেক জাতি যেন তার নিজের স্বদেশের সীমার মধ্যে বন্দী ছিল। এ অবস্থায় কোনো সাধারণ শিক্ষা সকল জাতির মধ্যে বিস্তার লাভ করা কঠিন ছিল। এছাড়া বিভিন্ন জাতির অবস্থাও সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। অজ্ঞতা ছিল অনেক বেশী। এ অজ্ঞতার কারণে আকীদা-বিশ্বাস ও চরিত্রের মধ্যে যেসব ত্রুটি জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন স্থানে তার আকৃতি ছিল বিভিন্ন। এ জন্যে প্রয়োজন যেসব ক্রটি জন্ম নিয়েছিল বিভিন্ন স্থানে তার আকৃতি ছিল বিভিন্ন। এ জন্যে প্রয়োজন ছিল আল্লাহর নবী প্রত্যেক জাতিকে পৃথক শিক্ষা ও হেদায়াত দেবেন, ধীরে ধীরে ভুল চিন্তাগুলো নির্মূল করে চিন্তাগুলো ছড়াবেন, জাহেলী পদ্ধতি বর্জন করে ধীরে ধীরে তাদেরকে উন্নত পর্যায়ের আইন মেনে চলা শেখাবেন এবং শিশুদেরকে যেভাবে শিক্ষা দিয়ে ও পরিচর্যা করে গড়ে তোলা হয় তাদেরকেও ঠিক তেমনিভাবে গড়ে তুলবেন। আল্লাহ জানেন, এভাবে জাতিদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে কত হাজার বছর শেষ হয়ে গেছে। যা হোক উন্নতি লাভ করতে করতে একদিন সে সময়টি এসে গেল যখন মানবজাতি শৈশবাবস্থায় সীমা পেরিয়ে সাবালকত্বের বয়সে পৌঁছে গেল। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরির উন্নতির সাথে সাথে জাতিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। চীন-জাপান থেকে নিয়ে ইউরোপ-আফ্রিকার দূরবর্তী দেশগুলো পর্যন্ত নৌ-চলাচল ও স্থলপথে সফর শুরু হয়ে গেল। অধিকাংশ জাতির মধ্যে বর্ণমালার প্রচলন হল। জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারলাভ করল এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে চিন্তা ও জ্ঞানচর্চার আদান-প্রদান শুরু হল। বড় বড় দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার জন্ম হল। তারা বিরাট-বিশাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে কয়েকটি দেশ ও জাতিকে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীন করল। এভাবে মানবজাতির পূর্বের বংশধরদের মধ্যে যে ব্যবধান, দূরত্ব ও বিচ্ছেদ ছিল তা ধীরে ধীরে কম হতে থাকল। এখন সমগ্র বিশ্বের জন্যে ইসলামের একক শিক্ষা ও একক শরীয়ান পাঠানোর মতো পরিবেশ সৃষ্টি হল। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে মানুষের অবস্থার এতটা উন্নতি সাধিত হয়েছিল যে, তারা নিজেরাই একটি সবার উপযোগী একক ধর্ম প্রত্যাশা করছিল। বৌদ্ধধর্ম যদিও কোনো পূর্ণাঙ্গ ধর্ম ছিল না এবং সেখানে মাত্র কয়েকটি নৈতিক বিধানেরই অস্তিত্ব ছিল, তবুও তা ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে একদিকে চীন-মঙ্গোলিয়া ও জাপান পর্যন্ত এবং অন্যদিকে আফগানিস্তান ও বুখারা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। বৌদ্ধধর্ম প্রচারকরা এ ধর্ম প্রচার করতে করতে বহু দূরদেশে গিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল। এর কয়েকশ’ বছর পর ঈসায়ী ধর্মের আবির্ভাব হল। হযরত ঈসা (আ) ইসলামের শিক্ষা নিয়ে এলেও তাঁর তিরোধানের পর ঈসায়ী ধর্ম নামে একটি পঙ্গু ও বিকৃত ধর্ম তৈরী করে নেয়া হল। ঈসায়ীরা এ ধর্মটি ছড়িয়ে দিল ইরান থেকে নিয়ে ইউরোপের অতি দূরদেশ পর্যন্ত। এসব ঘটনা সুস্পষ্টভাবে একথা প্রকাশ করছে যে, তদানীন্তন বিশ্ব স্বতঃস্ফুর্তভাবে একটি বিশ্বধর্মের প্রত্যাশা করছিল। এ জন্যে নিজেকে এতটা প্রস্তুত করে নিয়েছিল যে, তখনও পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল ধর্ম না পাওয়অ গেলেও সে অপরিপক্ক ও অসম্পূর্ণ ধর্মগুলোকেই মান জাতির মধ্যে ছড়ানো শুরু করে দিল।

দ্বীনের পূর্ণতা ও খতমে নবুয়াত

এ সময় সারা দুনিয়ায় ও সারা দুনিয়ার মানব জাতির জন্যে একজন নবী অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে আরব দেশে পাঠানো হল; তাঁকে ইসলামের পরিপূর্ণ শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ আইন দান করে সারা দুনিয়ায় তা ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব অর্পন করা হয়।

তাই নিসন্দেহে বর্তমান যুগে মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষা ও কুরআন মজীদ ছাড়া ইসলামের সত্য-সরল পথ জানার দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। মুহাম্মদ (সা) সমগ্র মানবজাতির জন্যে আল্লাহর নবী। নবীর সিলসিলা বা ধারাবাহিকতা তাঁর ওপর খতম করে দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষের জন্যে যে পরিমাণ নির্দেশ ও বিধান দান করতে চাচ্ছিলেন তা সব তাঁর এ শেষ নবীর মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন আল্লাহর এ শেষ নবীর ওপর ঈমান আনা সত্যসন্ধানী ও আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে ইচ্ছুক প্রত্যেকটি ব্যক্তির জন্যে অপরিহার্য। তিনি যে শিক্ষা দিয়েছেন তা মেনে চলা এবং যে পদ্ধতি শিখিয়েছেন তা অনুসরণ করা তাদের অপরিহার্য কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

খতমে নবুয়াতের প্রমাণ

নবুয়াতের তাৎপর্য অনুধাবনকারী ব্যক্তির জন্যে এ কথা উপলব্ধি করা মোটেই কঠিন নয় যে, নবীর জন্ম প্রতিনিদন হয় না এবং প্রত্যেক জাতির মধ্যে সমসময় একজন নবী থাকা অপরিহার্য নয়। নবীর শিক্ষা ও হেদায়াতের জীবনই হচ্ছে নবীর জীবন। যতদিন তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত বেঁচে থাকেন। আগের নবীদের যুগ শেষ হয়ে গেছে। কারণ তাঁরা যে শিক্ষা দিয়েছিলেন লোকেরা তা বিকৃত করে ফেলেছে। যেসব গ্রন্থ তাঁর এনেছিল সেগুলোর একটিও আজ তাদের আসল অবস্থায় নেই। তাঁদের অনুসারীরাও আজ এ দাবী করতে পারবে না যে, তাদের নবী যে গ্রন্থ এনেছিলেন তা আসল ও অবিকৃত অবস্থায় তাদের নিকট আছে। তারা নিজেদের নবীদের জীবন চরিতও বিস্মৃত হয়েছে। আগের নবীদের কোনো একজনেরও জীবনের নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য ঘটনাবলী আজ কোথাও পাওয়া যায় না। এমনকি তাঁরা কোন যুগে কোথায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং কি কাজ করেছিলেন তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাঁরা কোথায় জীবনযাপন করেছিলেন এবং কি কাজ করেছিলেন তাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাঁরা কোথায় জীবনযাপন করেছিলেন, কি শিক্ষা দিয়েছিলেণ এবং কোন সব কথা ও কাজ থেকে মানুষকে বিরত রেখেছিলেন এ কথাও নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিন্তু মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াতের যুগ এখনও চলছে। কারণ তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াত জীবিত রয়েছে। তিনি যে কুরআন দিয়েছিলেণ তা তার আসল শব্দাবলীসহ অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান আছে। তার মধ্যে কোথাও একটি হরফের হেরফের হয়নি। একটি নোকতা বা জের-জবরের ওলট-পালট হয়নি। তাঁর জীবনের ঘটনাবলী, তাঁর কথা ও কর্ম সবকিছু যথাযথভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। চৌদ্দশ’ বছর অতীত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ইতিহাসে আজো এসবের চেহারা এতই সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল যেন আমরা স্বচক্ষে হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে দেখছি। দুনিয়ায় কোনো ব্যক্তির জীবন রসূল করীম (সা)-এর ন্যায় এতবেশী সংরক্ষিত নয়। আমরা আমাদের জীবনের প্রত্যেকটি ব্যাপারে সবসময় রসূলে করীম (সা)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারি। রসূলে করীম (সা)-এর পর অন্য কোনো নবীর প্রয়োজন না থাকার এটিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

একজন নবীর পর আর একজন নবী আসার কেবল তিনটি মাত্র কারন হতে পারে।

এক. প্রথম নবীর শিক্ষা বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং তাকে পুনর্বার পেশ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

দুই. প্রথম নবীর শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ নয় এবং তার মধ্যে সংশোধন ও পরিবর্ধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

তিন. প্রথম নবীর শিক্ষা একটি বিশেষ জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং অন্য জাতিদের জন্যে আর একজন পৃথম নবীর প্রয়োজন।–[চতুর্থ কারণ হিসেবে আর একটি কারণও দেখানো যেতে পারে। সেটি হচ্ছে, এক নবীর উপস্তিতিতে তাঁর সাহায্যের জন্যে আর একজন নবীও পাঠানো যায়। কিন্তু আমি এ কারণটির উল্লেখ করিনি। কারণ কুরআন মজীদে এরমাত্র দু’টি দৃষ্টান্ত দেয়া হয়েছে। ঐ দু’টি ব্যতিক্রমধর্মী দৃষ্টান্ত থেকে সাহায্যকারী নবী পাঠাবার কোনো সাধারণ নিয়ম আল্লহার নিকটে আছে বলে সিদ্ধান্ত করা যায় না।–গ্রন্থকার]

একঃ হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর শিক্ষা ও হেদায়াত জীবিত আছে। তাঁর দ্বীন কি ছিল, তিনি কি হেদায়াত নিয়ে এসেছিলেন, কোন্ ধরনের জীবন পদ্ধতির প্রচলন করেছিলেন এবং কোন পদ্ধতিগুলো তিন খতম করার ও বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন, যে কোন সময় তা জানা যেতে পারে। এ বিষয়গুলো জানার উপায় পুরোপুরি সংরক্ষিত রয়েছে। কাজেই তাঁর শিক্ষা ও হেদায়াতগুলো যখন তখন সেগুলোকে নতুন করে উপস্থাপিত করার জন্যে কোনো নবী আসার প্রয়োজন নেই।

দুইঃ রসূলে করীম (সা)-এর মাধ্যমে দুনিয়াকে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের শিক্ষা দান করা হয়েছে। এখন আর তার মধ্যে কিছু কমানো বাড়ানোর প্রয়োজন নেই এবং তার মধ্যে এমন কোনো অভাব বা কমতিও নেই, যা পূরণ করার জন্যে কোনো নবী আসার প্রয়োজন হয়। কাজেই দ্বিতীয় কারণটিও দূর হয়ে গেল।

তিনঃ রসূলে করীম (সা)-কে কোনো বিশেষ জাতির জন্যে নয় বরং সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে নবী বানিয়ে পাঠানো হয়েছে। সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্যে তাঁর শিক্ষা যথেষ্ট। ফলে তৃতীয় কারণটিও দূর হয়ে গেল।

এ জন্যেই রসূলে করীম (সা)-কে খাতামুন নাবীয়ীন বা শেষ নবী বলা হয়েছে। অর্থাৎ নবুয়াতের ধারাবাহিকতা তিনি পর্যন্ত এসে শেষ হয়ে গেছে। এখন দুনিয়ার জন্যে আর কোনো নবীর প্রয়োজন নেই বরং এর পরিবর্তে এমন সব লোকের প্রয়োজন যারা রসূলে করীম (সা)-এর পথে নিজেরা চলবেন ও অন্যদেরকেও চালাবেন, তাঁর শিক্ষা অনুধাবন করবেন, তার ওপর আমর করবেন এবং যে আইন নিয়ে তিনি দুনিয়ায় এসেছিলেন সারা দুনিয়ায় তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠিত করবেন।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে হেদায়াতের উপায়

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী, আমি সমগ্র মানব জাতির জন্যে তোমাকে সুসংবাদকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে পাঠিয়েছি কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না”।–(সূরা আস সাবাঃ ২৮)

এর অর্থ হলো,  তুমি কেবল এ শহর, এ দেশ বা এ যুগের লোকদের জন্যে নও, বরং কিয়ামত পর্যন্ত সারা দুনিয়ার মানুষ ও জাতির জন্যে প্রেরিত হয়েছ কিন্তু তোমার সমকালীন দেশবাসীরা তোমার মর্যাদা ও কদর বুঝে না। তাদের কাছে যে কত বড় মহান মহিমান্বিত ব্যক্তিকে পাঠান হয়েছে এ অনুভূতি তাদের নেই। নবী করীম (সা)-কে কেবল নিজের দেশ ও নিজের যুগের জন্যে পাঠান হয়নি বরং কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্যে তাঁকে পাঠান হয়েছে এ কথা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আর আমার প্রতি এ কুরআন অহী হিসে পাঠান হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটি পৌঁছে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে নবী বলে দাওঃ হে লোকেরা, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রসূল”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আর আমি তোমকে কেবলমাত্র সমগ্র বিশ্বের রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“তিনি মহান বরকতপূর্ণ যিনি নিজের বান্দার ওপর কুরআন নাযিল করেছেন, যাতে তিনি হতে পারেন সমগ্র বিশ্বের জন্যে সতর্ককারী”।–(সূরা আল ফুরকানঃ১)।

রসূলে করীম (সা) নিজেও এ একই বক্তব্য বিভিন্ন হাদীসে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আমাকে সাদা-কালো নির্বিশেসে সকলের জন্যে পাঠানো হয়েছে”।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আমাকে সাধারণভাবে সমগ্র মানব জাতির জন্যে পাঠান হয়েছে। অথচ আমার আগে প্রত্যেক নবীকে কেবল তাঁর নিজের জাতির জন্যেই পাঠান হয়েছিল”।–(আবদুল্লাহ ইবনে উমর বর্ণিত, মুসনাদে আহমদ থেকে)।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“প্রথমে প্রত্যেক নবীকে বিশেষ জাতির কাছে পাঠানো হত আর আমাকে পাঠান হয়েছে সমগ্র মানব জাতির কাছে”।–(বুখারী ও মুসলিম থেকে, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত)।

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“আমাকে নবী করে পাঠানো সাথে কিয়ামতের সম্পর্ক ঠিক এমনি –একথা বলে রসূলুল্লাহ (সা) নিজের হাতের দু’টো আঙ্গুল উঠালেন”।–(বুখারী ও মুসলিম)।

এ কথার অর্থ হচ্ছে, যেমন এ দু’টো আঙ্গুলের তৃতীয় কোনো আঙ্গুলের অন্তরাল নেই, তেমনি আমার ও কিয়ামতের দশ্যে নবুয়াতের কোনো অন্তরাল নেই। আমার পরেই কিয়ামত আসছে। কিয়ামত পর্যন্ত আমিই নবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকব।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদদানকারী ও ভীতিপ্রদর্শনকারী

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“তোমাকে তো আমি হকের সাথে পাঠিয়েছি সুসংবাদদানকারী ও ভীতি প্রদর্শনাকরীরূপে। আর এমন কোনো জাতি নেই যার মধ্যে কোনো সতর্ককারী পাঠান হয়নি”।–(সূরা ফাতেরঃ ২৪)।

প্রথম আয়াতটির অর্থ হচ্ছে, হে নবী! মানুষকে সতর্ক করে দেয়া ছাড়া তোমার আর কোনো কাজ নেই। এরপরও যদি কারও টনক না নড়ে এবং সে গোমরাহীর অতলে ডুবতে থাকে তাহলে তোমার ওপর তার কোনো দায়িত্ব নেই। অন্ধদেরকে দেখাবার এবং বধিরদেরকে শোনাবার দায়িত্ব তোমাকে দেয়া হয়নি।

দ্বিতীয় আয়াতে যে কথা বলা হয়েছে তা কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত হয়েছে। তার মূল বক্তব্য হচ্ছে, দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চে এমন কোনো জাতির অভ্যুদ্বয় হয়নি যার হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ তায়ালা কোনো নবী পাঠাননি। সূরা আর রা’আদের ৭ম আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী******) সূরা আল হিজরের ১০ম আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী***********)। সূরা আল নাহলের ৩৬ আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী*****)। সূরা আশ শূ’আরার ২০৮ আয়াতে বলা হয়েছে (আরবী*******) কিন্তু এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি থেকে বাঁচার জন্যে দু’টি কথা অবশ্যি বুঝে নিতে হবে। এক, একজন নবীর দাওয়াত যে এলাকা পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে সে এলকার লোকদের জন্যে তিনিই যথেষ্ট। কাজেই প্রত্যেক জনবসতি ও প্রত্যেক গোত্রের জন্যে যে পৃথক পৃথক নভী পাঠাতে হবে এমন কোনো কথা নেই। দুই, একজন নবীর দাওয়াত ও হেদায়াতের নিদর্শন এবং তাঁর নেতৃত্বের পদাংক যতদিন দুনিয়ায় সংরক্ষিত থাকবে ততদিন কোনো নতুন নবীর প্রয়োজন হয় না। জাতির প্রত্যেক পুরুষের জন্যে পৃথক করে নবী পাঠাবারও প্রয়োজন নেই।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে আল্লাহর রহমত

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে এটা আসলে পৃথিবীবাসীদের জন্যে আমার রহমত”।–(সূরা আল  আম্বিয়াঃ ১০৭)

এ আয়াতটির আর একটি অনুবাদ এও হতে পারেঃ “আমি তোমাকে পৃথিবীবাসীদের জন্যে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি। উভয় অবস্থায়ই এর প্রকৃত অর্থ হচ্চে, রসূলে করীম (সা)-এর আগমন প্রকৃতপক্ষে মানবজাতির জন্যে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ। কারণ তিনি এসে সুপ্ত দুনিয়াকে জাগ্রত করেন। তাকে হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করার জ্ঞানদান করেন। সর্বোপরি তাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জাতিয়ে দেন, কোনটি ধ্বংসের পথ এবং কোনটি শান্তি ও নিরাপত্তার পথ। মক্কার কাফেররা রসূলে করীম (সা)-এর নবুয়াতকে নিজেদের জন্যে বিপদ ও কষ্টের কারণ মনে করত। তারা বলত, এ ব্যক্তি আমাদের জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, নখ থেকে গোশত ছাড়িয়ে আলাদা করে দিয়েছে। এর জবাবে বলা হয়ঃ হে নির্বোধের দল, তোমরা যাকে বিপদ মনে করছ সে আসলে তোমাদের জন্যে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ।

সমগ্র মানবজাতির জন্যে রসূল

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৫৬ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ বলে দাও। হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সবার জন্যে সেই আল্লাহর রসূল হিসেবে এসেছি যিনি পৃথিবী ও আকাশেল শাসন কর্তৃত্বের মালিক”।–(সূরা আল আরাফঃ ১৫৮)। “প্রত্যেক উম্মতের জন্যে একজন রসূল আছেন”।–(সূরা আল ইউনুসঃ ৪৭)।

‘উম্মত’ শব্দটি এখানে শুধুমাত্র জাতির প্রতিশব্দ হিসেবে আনা হয়নি বরং একজন রসূলের আগমনের পর তাঁর দাওয়াত যতগুলো লোকের কাছে পৌঁছে যায় তারা সবাই তাঁর উম্মত, এ অর্তে শব্দটি এখানে ব্যবহৃত হয়েছে। তাছাড়া এ জন্যে রসূলের জীবিত থাকা এবং তাদের মধ্যে সশরীরে অবস্থান করার কোনো প্রয়োজন নেই বরং রসূলের তিরোধানের পরেও যতদিন তাঁর শিক্ষা জীবিত থাকে এবং যতদিন প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে –তিনি আসলে কোন বিষয়ের শিক্ষা দেন তা জানার পথ খোলা থাকে, ততদিন দুনিয়ার সমস্ত অধিবাসী তাঁর উম্মত গণ্য হবে। সামনের আলোচনায় যে বিধানের কথা বলা হয়েছে তা তাদের ওপর কার্যকর হবে। এ প্রেক্ষিতে মুহাম্মদ (সা)-এর আগমনের পর সারা দুনিয়ার মানুষ তাঁর উম্মত এবং ততক্ষণ পর্যন্ত তারা তাঁর উম্মত থাকবে যতক্ষণ কুরআন নির্ভুল ও অবিকৃত অবস্থায় বিরাজ করবে। তাই আয়াতে বলা হয়নি “প্রত্যেক জাতির জন্যে একজন রসূল আছেন” বরং বলা হয়েছে “প্রত্যেক উম্মতের জন্যে একজন রসূল আছেন”।

আল্লাহ প্রত্যেক জনবসতিতে একজন নবী পাঠাবার পরিবর্তে সারা দুনিয়ার জন্যে হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে নবী বানিয়ে পাঠিয়েছেন।

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“আমি চাইলে প্রত্যেক জনবসতিতে এক একজন ভীতি-প্রদর্শনকারী পাঠিয়ে দিতাম”।–(সূরা আল ফুরকানঃ ৫১)

অর্থাৎ এ কাজটা আমার ক্ষমতার বাইরে ছিল। আমি চাইলে সব জায়গায় নবীর আবির্ভাব ঘটাতে পারতাম। কিন্তু তা না করে আমি সারা দুনিয়ার জন্যে একজন নবী পাঠিয়েছি। একটি সূর্য যেমন সারা দুনিয়ার জন্যে যথেষ্ট তেমনি এই একটি মাত্র হেদায়াতের সূর্য সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে যথেষ্ট।

কুরআন মজীদে রসূলে করীম (সা)-কে ‘সতর্ককারী’, ‘জ্ঞাতকারী’ এবং ‘গাফলতি’ ও গোমরাহীর অনিষ্ঠকর পরিণতির ভীতিপ্রদর্শনকারী’ উপাদি দেয়া হয়েছে। এই সঙ্গে তাঁকে সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে ভীতিপ্রদর্শনকারী’ উপাধি দেয়া হয়েছে। এই সঙ্গে তাকেঁ সারা দুনিয়ার মানুষের জন্যে ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, কুরআনের দাওয়াত ও মুহাম্মদ (সা)-এর রিসালাত কোনো একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্যে নয় বরং সারা দুনিয়ার জন্যে। কেবলমাত্র নিজের যুগের জন্যে নয় বরং আগত সমস্ত যুগের জন্যে। এ বিষয়বস্তুটি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে।

যেমনঃ

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“হে মানবজাতি, আমি তেমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রসূল হয়ে এসেছি”।

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“আমার নিকট এ কুরআন পাঠানো হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি আর যাদের কাছে এটি পৌঁছেছে তাদেরকে”। -(সূরা আল আন’আমঃ ১৯)

“আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদদানকারী ও ভীতিপ্রদর্শনকারী করে পাঠিয়েছি”।–(সূরা আস সাবাঃ ২৮)

হাদীসে এ বিষয়টিকে আরও সুস্পষ্ট করে রসূলুল্লাহ (সাঃ) বারবার বলেছেনঃ (আরবী***********) “আমাকে সাদা-কালো নির্বিশেষে সবার কাছে পাঠান হয়েছে”। তিনি আরো বলেছেনঃ (আরবী**************)

 “ইতিপূর্বে একজন নবীকে বিশেষ করে তাঁর জাতির জন্যে পাঠান হত আর আমাকে পাঠান হয়েছে সাধারণভাবে সমগ্র মানবজাতির জন্যে”।–(বোখারী ও মুসলিম)।

আরও বলেছেনঃ (আরবী**********) “সমগ্র সৃষ্টির জন্যে আমাকে পাঠান হয়েছে আর আমার আগমনের সাথে সাথে নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে”।

আল্লাহর শেষ নবী

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“মানুষের হিসেবের সময় সন্নিকটবর্তী অথচ তারা মুখ ফিরিয়ে গাফলতির মধ্যে রয়েছে”।–(সূরা আম্বিয়াঃ ১)

এর অর্থ হচ্ছে, কিয়ামত নিকটবর্তী। অর্থাৎ যেদিন মানুস তার প্রভু ও প্রতিপালকের কাছে হাজির হয়ে নিজের যাবতীয় কাজের হিসেব পেশ করবে সে দিনটি দূরে নয়। মানবজাতি যে তার ইতিহাসের সর্বশেষ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াত লাভ তারই একটি আলামত। এখন তারা নিজেদের সূচাপর্বের তুলনায় সমাপ্তি পর্বের অধিক নিকটবর্তী। সূচনাকাল ও মধ্যমকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন সমাপ্তিকাল শুরু হয়েছে। এ কথাটিই রসূলে করীম (সা) একটি হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজের দু’টি আঙ্গুল উঠিয়ে বলেনঃ (আরবী************) “আমাকে এমন অবস্থায় পাঠানো হয়েছে যে আমার হাতের এ আঙ্গুল দু’টো পাশাপাশি যে অবস্থায় আছে আমি ও কিয়ামত ঠিক সে অবস্থায় আছি”। অর্থাৎ আমার পর এখন শুধু কিয়ামতের অপেক্ষা। এর মাঝখানে আর কোনো নবী নেই। সৎপথ লাভ করতে চাইলে আমার দাওয়াতের মাধ্যমেই সৎপথ লাভ কর এরপর সৎপর দেখাবার জন্যে আর কোনো পথপ্রদর্শক ও ভীতি প্রদর্শনকারী আসবে না।

খতবে নবুয়াত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৫৯ পৃষ্ঠায়)

“স্মরণ কর, আল্লহ যখন পয়গাম্বরদের থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেনঃ আজ আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি। কাল যদি অন্য কোন রসূল তেমাদের নিকট পূর্ব থেকে রক্ষিত ঐ শিক্ষার সত্যতা ঘোষণা করে তোমাদের কাছে আসে, তাহলে তার ওপর তোমাদের ঈমান আনতে হবে এবং তাকে সাহায্য করতে হবে। এ কথা বলে আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি এর অঙ্গীকার কর এবং এ ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে অঙ্গীকারের গুরুদায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত আছ? তারা জবাবে বললঃ হ্যাঁ, আমরা অঙ্গীকার করছি”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৮১)

এর অর্থ হচ্ছে, প্রত্যেক পয়গাম্বরকে এ অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয়। আর পয়গাম্বরকে যে অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয় তার দায়িত্ব অনিবার্যভাবে তাঁর অনুসারীদের ওপরও বর্তায়। তাদেরকে যে অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয় তা হচ্ছেঃ তোমাদেরকে যে দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারই প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নবী পাঠান হয় তখন তার সাথে তোমাদের সহযোগিতা করতে হবে। তার প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষ পোষণ করতে পারবে না। নিজেদেরকে দ্বীনের ইজারাদার মনে করতে পারবে না। সত্যের বিরোধিতা করতে পারবে না। বরং যেখানে যে ব্যক্তিকে আমার পক্ষ থেকে সত্যের পতাকা উত্তোলন করার জন্যে পাঠান হবে তাঁর পতাকাতলে তোমাদেরকে সমবেত হতে হবে।

এখানে অবশ্যি এতটুকু কথা বুঝে নিতে হবে যে, মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে প্রত্যেক নবীকে এ অঙ্গীকারে আবদ্ধ করা হয়। এ জন্যেই প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতকে পরবর্তীকালে আগমনকার নবীর খবর দেন এবং তাঁর সাথে সহযোহিতা করার নির্দেশ দিয়ে যান। কিন্তু কুরআন-হাদীসের কোথাও এমন কোনো ইশারাও পাওয়া যায় না যে, হযরত মুহাম্মদ (সা) থেকে এ ধরনের কোনো অঙ্গীকার নেয়া হয় অথবা তিনি উম্মতকে তাঁর পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীর খবর দিয়ে তাদেরকে তাঁর অনুসরন করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন।–[নবুয়াতের ব্যাপারটি বড়ই নাজুক, এ কথা ব্যাখ্যা করার অপেক্ষা রাখে না। নবীকে মানা ও না মানার ওপর মানুষের ঈমান ও কুফরী এবং নাজাত অথবা ধ্বংস নির্ভর করে। কিন্তু কুরআন মজীদে রসূলে করীম (সা)-এর পরে অন্য কোনো নবীর আসার খবর দেয়া তো দূরে থাক বরং রসূলে করীম (সা)-কে শেষ নবী বলা হয়েছে। আর রসূলুল্লাহ (সা) নিজের উম্মতকে ডেকে তাদেরকে পরবর্তীকালে আগমনকার কোনো নবীর ওপর ঈমান আনার নির্দেশ দেবার পরিবর্তে অসংখ্য হাদীসে এ কথা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁর পরে আর নবী আসবেন না এবং নবুয়াতের ধারাবাহিকতা তাঁর থেকে শেষ হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দ্বীন ও ঈমানের সাথে কি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কোনো শতুতা ছিল? রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে কোনো নবী আসবেন অথচ আল্লাহ ও তাঁর সূল উভয়ই এমন কথা বলেছেন যার ফলে আমরা তাকে না মেনে কুফরী করছি এবং আখেরাতের আযাবে নিক্ষিপ্ত হচ্ছি? এমনটি কি কোনোক্রমে সম্ভব?-(গ্রন্থকার)]

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬১ পৃষ্ঠায়)

“হে বনী আদম! মনে রেখ, যদি তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকে এমন কোন রসূল আসে যে তোমাদেরকে আমার আয়াত শুনায়, তাহলে যে ব্যক্তি নাফরমানী করা থেকে বিরত থাকবে এবং নিজের সংশোধন করে নেবে তার জন্যে কোনো প্রকার আশংকা ও মর্মবেদনার কোনো প্রশ্নই থাকবে না”।–(সূরা আল আরাফঃ ৩৫)

কুরআন মজীদের যেখানেই আদম (আ) ও হাওয়া (আ)-কে জান্নাত থেকে নির্বাসিত করার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে সেখানেই একথা বলা হয়েছে (এ জন্যে দেখুন সূরা আল বাকারাহঃ ৩৮-৩৯ আয়াত, সূরা আত ত্বহাঃ ১২৩-২৪ আয়াত)। কাজেই এখানেও এ কথাটিকে ঐ একই প্রসঙ্গ সম্পার্কিত মনে করা হবে। অর্থাৎ মানব জীবনের সূছনালগ্নেই এ কথাটি তাকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিল।

খতবে নবুয়াত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে কয়েকটি আয়াতের যুক্তি

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর (হে নবী!) মনে রেখ সেই অঙ্গীকারের কথা যা আমি সকল পয়গাম্বরের কাছ থেকেই নিয়েছি, তোমার কাছ থেকেও নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মরিয়ামের পুত্র ঈসার কাছ থেকে সবার কাছ থেকে পাকাপোক্ত অঙ্গীকার নিয়েছি”।–(সূরা আহযাবঃ ৭)

এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নবী (সা)-কে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, সকল নবীর ন্যায় আপনার কাছ থেকেও আল্লাহ একটি পাকাপোক্ত অঙ্গীকার নিয়েছেন। আপনার কঠোরবাবে এ অঙ্গীকার পালন করা উচিত। এ অঙ্গীকার বলতে কোন অঙ্গীকারটি বুঝাচ্ছে? আগে থেকৈ যে প্রসঙ্গের আলোচনা চলছে সে সম্পর্কে চিন্তা করলে স্পষ্ট জানা যায় নে, এটা এমন একটা অঙ্গীকার যার আওতায় নবী নিজে আল্লহার প্রত্যেকটি হুকুমের অনুগত হবেন এবং অন্যদেরকেও এর অনুগত করবেন। আল্লহার কথাগুরো হুবহু লোকদের কাছে পৌঁছাবেন একং কার্যত সেগুলো প্রবর্তিত করার চেষ্টার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি করবেন না। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। যেমনঃ

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ তোমাদের জন্যে নির্ধারিত করে দিয়েছেন সেই দ্বীনটি যার হেদায়াত তিনি করেছিলেন নূহকে এবং যা নাযিল করা হয়েছিল (হে মুহাম্মদ) তোমার ওপর আর যার হেদায়াত করা হয়েছিল ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই তাকীদ সহকারে যে, তোমরা দ্বীন কায়েম কর এবং তার মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি কর না”।–(সূরা আশ শূরাঃ ১৩)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর (হে মুসলমানরা)! স্মরণ কর আল্লাহর সেই অনুগ্রহকে যা তিনি তোমাদের ওপর তাঁর কিতাব নাযিল করা হয়েছিল এই মর্মে যে, তোমরা এর শিক্ষা বর্ণনা করবে এবং একে গোপন করবে না”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৮৭)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর স্মরণ কর, যখন আমি বনী ইসরাঈলদের কাছ থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদাত করবে না”।–(সূরা আল বাকারাঃ ৮৩)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“তাদের কাছ থেকে কি কিতাবের অঙ্গীকার নেয়া হয়নি? তোমাদের ওপর আমি যা নাযিল করেছি তা শক্ত করে ধর আর তার মধ্যে যে হেদায়াত আছে তা স্মরণ কর। আশা করা যায় তোমরা আল্লাহর নাফরমানী থেকে বাঁচতে পারবে”।–(সূরা আল আরাফঃ ১৬৯-১৭১)

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬২ পৃষ্ঠায়)

“আর হে মুসলমানরা, স্মরণ কর আল্লাহর সেই অনুগ্রহকে যা তিনি তোমাদের ওপর করেছেন আর সেই অঙ্গীকারকে (স্মরণ কর) যা তিনি তোমাদের থেকে নিয়েছেন যখন তোমরা বলেছিলেঃ আমরা শুনেছি ও আনুগত্য করেছি”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ৭)

বিশেষ প্রেক্ষাপটে আল্লাহ তায়ালা এ অঙ্গীকারটি যে কারনে স্মরণ করাচ্ছেন তা হচ্ছে এই যে, নবী (সা) শত্রুদের নিন্দার ভয়ে মুকে ডাকা (রক্তের নয়) সম্পর্কের ব্যাপারে জাহেলী যুগের প্রচলিত রীতি ভাঙ্গতে ইতস্তত করছিলেন। ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি মেয়ের সাথে বিয়ে সংক্রান্ত। তাই তিনি বারবার লজ্জা পাচ্ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, আমি যতই সদিচ্চা সহকারে নিছক সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে এ কাজটি করি না কেন শত্রুরা বলতেই থাকবে, আসলে নিজের ইন্দ্রিয় লালসা চরিতার্থ করার জন্যেই এ কাজ করা হয়েছে এবং এ ব্যক্তি শুধুমাত্র জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্যে সংস্কারকের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। তাই আল্লাহ রসূলুল্লাহ (সা)-কে বলছেনঃ তুমি আমার নিয়োগকৃত পয়গাম্বর। অন্য সব পয়গাম্বরদের ন্যায় তোমার সাথেও আমার পাকাপোক্ত অঙ্গীকার রয়েছে যে, আমি যে নির্দেশ দেব তা তুমি নিজে পালন করবে এবং অন্যদেরকেও তা পালন করার নির্দেশ দেবে। কাজেই তুমি কারোর নিন্দা-অপবাদের পরোয়া করো না। কাউকে লজ্জা কর না। কারও ভয় কর না। তোমাকে দিয়ে আমি যে কাজ করাতে চাই নির্দ্বিধায় তা কর।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পরবর্তী নবীগণ ও তাঁদের উম্মতদের থেকে যে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল এ অঙ্গীকার থেকে একটি দল সেই অর্থ নিয়েছে। তাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল যে, তারা পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীর ওপর ঈমান আনবেন এবং তাঁর সাথে সহযোগিতা করবেন। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ঐ দলটির দাবী হচ্ছে নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পরও নবুয়াতের দরজা খোলা আছে এবং নবী করীম (সা)-এর নিকট থেকেও এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে যে, তাঁর পর যে নবী আসবে তাঁর উম্মত তাঁর ওপর ঈমান আনবে কিন্তু আয়াতের পূর্বপর বক্তব্য দ্ব্যর্থহীনভাবে এ ব্যাখ্যাটির ভ্রান্তি ঘোষণা করছে। যে কথা বর্ণনা প্রসঙ্গে এ আয়াতটি উক্ত হয়েছে তাতে এ কথা বলার কোনো অবকাশ নেই যে, রসূলে করীম (সা)-এর পরেও নবী আসবেন এবং তাঁর উম্মতকে সেইসব নবীর ওপর ঈমান আনতে হবে। এ অর্থ গ্রহণ করলে আয়াতটি এখানে একেবারেই বেখাপ্পা ও সম্পর্কহীন হয়ে পড়বে। তাছাড়া আয়াতের শব্দগুলোর এমন কোনো সুস্পষ্ট অর্থ হয় না যা থেকে এখানে কোন ধরনের অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে তা বুঝা যেতে পারে। কাজেই এখানে কোন ধরনের অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে তা জানার জন্যে আমাদের কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে যেকানে নবীদের কাছ থেকে গৃহীত অঙ্গকিারের উল্লেখ করা হয়েছে। যদি সমগ্র কুরআন মজীদে একটি মাত্র অঙ্গীকারের উল্লেখ থাকত এবং তা হত পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের সম্পর্কে, তাহলে এখানেও অঙ্গীকার প্রসঙ্গে ঐ অঙ্গীকারের কথাই বলা হয়েছে এ কথা সঙ্গতভাবেই চিন্তা করা যেত। কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে কুরআন অধ্যয়নকারী ব্যক্তিমাত্রই জানে, এ গ্রন্থে নবীগণ ও তাঁদের উম্মতদের কাছ থেকে গৃহীত বহু অঙ্গীকারটির অর্থগ্রহণ করা সঙ্গত হবে পূবৃাপর আলোচনার সাথে যার সম্পর্ক রয়েছে। যে অঙ্গীকারের আলোচনার কোন সুযোগই এখানেই নেই, এখানে সেটির অর্থ গ্রহণ করা কোন ক্রমেই সঙ্গত হবে না। এ ধরনের ভুল অর্থ গ্রহণ করার ফলে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কোনো কোনো লোক কুরআন থেকে হেদায়াত গ্রহণ করার পরিবর্তে কুরআনকেই হেদায়াত দান করার প্রচেষ্টা চালায়।

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬৪ পৃষ্ঠায়)

“অতপর তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে –যে একটি মিথ্যা কথা তৈরী করে তাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করে অথবা আল্লাহর যথার্থ আয়াতগুলোকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করে। অবশ্যি অপরাধীরা কখনও সাফল্য লাভ করতে পারে না”। -(সূরা ইউনুসঃ ১৭)

কোনো কোনো নির্বোধ লোক ‘সাফল্য’কে দীর্ঘায়ু, পার্থিব সমৃদ্ধি বা পার্থিব উন্নতি অর্থে গ্রহণ করেছেন। এভাবে তারা এ আয়াতটি থেকে এ অর্থ গ্রহণ করতে চান যে, যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করার পর জীবিত থাকেন অথবা দুনিয়ায় খুব উন্নতি করেন অথবা তাঁর দাওয়াত বিস্তার রাভ করে, তাঁকে সত্য নবী হিসেবে মেনে নেয়া উচিত। কারণ তিনি সাফল্য লাভ করেছেন। যদি তি সত্য নবী না হতেন তাহলে মিথ্যা নবুয়াতের দাবী করার সাথে সাথেই তাকে হত্যা করা হত অথবা অনাহারে তাকে মেরে ফেলা হত এবং তার দাওয়াত দুনিয়ায় ছড়াতে পারত না কিন্তু কুরআন থেকে এ ধরনের অজ্ঞজনোচিত যুক্তি-প্রমাণ একমাত্র সেই ব্যক্তিই উপস্থাপন করতে পারে, যে কুরআনের পারিভাষিক শব্দ ‘ফালাহ’-এর অর্থ জানে না অথবা কুরআনে বর্ণিত বিধি অনুযায়ী আল্লাহ অপরাধীদের জন্যে যে অবকাশ দান –বিধি নির্ধারণ করেছেন সে সম্পর্কে অবহিত নয় এ বর্ণনা প্রসঙ্গে এ শব্দটি কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা বোঝে না।

প্রথম কথা হচ্ছে, অপরাধী সাফল্য লাভ করতে পারে না। এ কথাটি আয়াতটির আলোচনা প্রসঙ্গে এমন অর্থে বলাই হয়নি যার ফলে এটি কারও নবুয়াতের দাবী যাচাই করার মানদণ্ডে পরিণত হয় এবং সাধারণ লোকেরা নিজেরাই নবুয়াতের দাবীদারদেরকে সেই মানদণ্ডে যাচার করার পর যাকে সাফল্য লাভকারী হিসেবে পেত তার দাবী মেনে নেয়ার এবং যাকে অকৃতকার্য দেখত তার দাবী অস্বীখার করার সিদ্ধান্ত নিত। বরং এ কথা এখানে যে অর্থে বলা হয়েছে তা হচ্ছে, “আমি নিশ্চিতভাবে জানি অপরাধীরা সাফল্য লাভ করতে পারে না। তাই মিথ্যা নবুয়াতের দবী করে আমি নিজেই এ অপরাধ করতে পারি না বরং তোমাদের ব্যাপারে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, তোমরা সত্য নবীকে মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার অপরাধ করছ, তাই তোমরা সাফল্য লাভ করতে পারবে না”।

ফালাহ বা সাফল্য কুরআনের পার্থিব সাফল্যের সীমিত অর্থেও ব্যবহৃত হয়নি। বরং এর অর্থ হচ্ছে এমন একটি নিরবচ্ছিন্ন সাফল্য যার ফলশ্রুতিতে কোনো প্রকার ক্ষতির নামগন্ধও নেই। পার্থিব জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে তার মধ্যে সাফল্যের কোনো দিক না থাকলেও কোনো ক্ষতি নেই। কোনো একজন সুস্পষ্ট গোমরাহীর আহবানকারী দুনিয়ায় আরামের জীবনযাপন করতে পারে, পার্থিব সমৃদ্ধি ও উন্নতির শীর্ষে আরোহন করতে পারে, তার গোমরাহীর দাওয়াত বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করতে এবং চতুর্দিকে বিস্তার লাভ করতে পারে কিন্তু কুরআনের পরিভাষায় যাকে সাফল্য বলা হয়েছে এটা সে সাফল্য নয় রবং এটা সুস্পষ্ট ক্ষতি ও ব্যর্থতা। আবার এমনও হতে পারে, একজন সত্যের আহবায়ক দুনিয়ায় কঠিন বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন, বিপদ-মুসিবত, দুঃখ-কষ্টের চাপে তিনি নিপিষ্ট হয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে পারেন। তাঁর দলে একজন লোকও যোগদান না করতে পারে কিন্তু কুরআনের ভাষায় এটা ক্ষতি ও ব্যর্থতা নয় বরং এটিই যথার্থ সাফল্য।

এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ কতা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহ তায়ালা অপরাধীদের পাকড়াও করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেন না বরং তাদেরকে সংশোধিত হবার জন্যে যথেষ্ট সময়-সুযোগ দেন। আর এই সময়-সুযোগকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে যদি তারা আরও বেশী বিগড়ে গিয়ে থাকে তাহরে আল্লাহর পক্ষ তেকে তাদেরকে অবকাশ (মুহলত) দেয়া হয় এবং অনেক সময় তাদের ওপর অনুগ্রহ ধারা বর্ষণ করা হয়। এর ফলে তারা নিজেদের অন্তর্দেশে লুকানো সমস্ত দুষ্কৃতির পুরোপুরি প্রকাশ করে দেয় এবং নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমন শাস্তির অধিকারী হয় যা অসৎ গুণাবলী সমন্বিত হবার কারণে যথার্থই তাদের প্রাপ্য। কাজেই কোনো মিথ্যা দাবীদারের রশি লম্বা হয়ে গেলে এবং তার হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবার প্রমান মনে করা একটি মারাত্মক ভুল হিসেবে চিহ্নিত হবে। আল্লাহ অবকাশ বা ঢিল দেয়া ও সুযোগ-সুবিধা দানের আইন সমস্ত অপরাধীদের ন্যায় মিথ্যা নবুয়াতের দাবীদারদের জন্যেও সমানভাবে কার্যকর। শেষোক্তদেরকে ঐ আইনের আওতা বহির্ভুত মনে করার পক্ষে কোনো যুক্তি-প্রমাণ নেই। আবার শয়তানকে কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহ যে সুযোগ দিয়েছেন সেখানে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, তুমি যত রকমের প্রতারণা-প্রবঞ্চনা করবে সব চলতে দেয়া হবে কিন্তু নিজের পক্স থেকে তুমি যত রকমের প্রতারনা-প্রবঞ্চনা করবে সব চলতে দেয়া হবে কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে তুমি কোনো মিথ্যা ও ভণ্ড নবী দাঁড় করালে সে প্রতারণাটি কোনোক্রমেই কার্যকর হতে দেয়া হবে না।

আমার এ কথার জবাবে সম্ভবত কোনো ব্যক্তি সূরা আল হক্কার ৪৪ থেকে ৪৭ আয়াতের উদ্ধৃতি দিতে পারে। যেখা বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************** পিডিএফ ১৬৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ ‘যদি মুহাম্মদ আমার নামে কোনো মনগড়া কথা বলে থাকে তাহলে আমি তার হাত ধরে ফেলতাম এবং তার হৃদয়তন্ত্রী কেটে দিতাম’। কিন্তু এ আয়াতগুরোতে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ থেকে যথার্থ নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন তিনি যদি মিথ্যে কথা বানিয়ে আল্লাহর অহী হিসেবে পেশ করেন তাহলে তিনি সাথে সাতেই পাকড়াও হবেন। এ বক্তব্য থেকে যে নবুয়াতের দাবীদার পাকড়াও হচ্ছে না সে নিশ্চয়তা সত্য এ যুক্তি পেশ করা একটি নীতিগত বিভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহর সুযোগদান ও ঢিল দেয়ার বিধানের মধ্যে যে ব্যতিক্রম এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হচ্ছে তা একমাত্র সাচ্চা নবীর জন্যে। এ থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে, যে ব্যক্তি মিথ্যা নবুয়াতের দাবী করে সেও এ ব্যতিক্রমের অন্তর্ভুক্ত। এ কথা সবাই জানে যে, সরকারী কর্মচারীদের জন্যে যে আইন প্রণীত হয় তা কেবল তাদের ওপরই সে আইন প্রযোজ্য হয় না বরং ফৌজদারী দণ্ডবিধি অনুযায়ী সাধারণ বদমাশ ও অপরাধীদের সাথে যে ব্যবহার করা হয় তাদের সাথেও একই ব্যবহার করা হবে। তাছাড়া সূরা আল হাক্কার এ আয়াতগুলোতে যা কিছু বলা হয়েছে তাও লোকরেদকে নবী যাচাই করার মানদণ্ড জানাবার জন্যে বলা হয়নি। অর্থাৎ গায়েবের পর্দা ভেদ করে যদি কোনো হাত বের হয়ে আসে এবং অকস্মাৎ তার হৃদয়তন্ত্রী ছিন্ন করে তাহলে মনে করতে হবে সে মিথ্যা ও ভণ্ড, অন্যথায় তাকে সত্য বলে মেনে নিতে হবে। নবীর চরিত্র, কার্যাবলী এবং তিনি যা কিছু পেশ করেছেন তার মাধ্যমে তাঁকে যাচাই করে তিনি সত্য না ভণ্ড নবী তা নির্ধারণ করা যদি সম্ভব না হত তাহলে হয়ত এ ধরনের অযৌক্তির মানদণ্ড মেনে নেবার প্রয়োজন হত।

শেষ নবীর পর নবুয়াতের দাবী

প্রশ্নঃ তরজমানুল কুরআন (জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী) এর ২৩৬ পৃষ্ঠায় আপনি লিখিছেন, “আামর অভিজ্ঞতা হচ্ছে আল্লাহর তায়ালা কখনও মিথ্যাকে সমৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠা দান করেন না। আমি সবসময় এ নীতি অনুসরণ করে এসেছি যাদেরকে আমি সত্যতা ও বিশ্বস্ততা থেকে বেপরোয়া এবং আল্রাহর ভীতিশূন্য পাই তাদের কথার কখনও জবাব দেই না। আল্লাহ তাদের থেকে বদলা নিতে পারেন…… এবং দুনিয়াতেই ইনশাআল্লাহ তাদের হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে যাবে”।

আমি নিবেদন করছি, আমি আহমদী জামায়াতের বইপত্র পড়েছি এবং তাদের কাজের সাথেও জড়িত থেকেছি। সেই প্রসঙ্গে নিম্নলিখিত প্রশ্ন ক’টি রাখছি।

একঃ এটা কেবল আপনারই অভিজ্ঞতা নয় বরং কুরআন মজীদে আল্লাহ বলেছেন, “আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে ভালবাসেন না”। আর “মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত”। আবার এমন ধরনের মিথ্যাবাদীদের ওপর যে, (আরবী**********) তাদের শাস্তি হচ্ছে তাৎক্ষণিক পাকড়াও এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ (আরবী*************) এ অবস্থায় যদি মীর্জা গোলাম আহাম্মদ মিথ্যুক হয়ে থাকেন তাহলে কি কারণে (ক) এখনও আল্লাহ তায়ালা তাকে পাকড়াও করেননি (খ) দলের সদস্যদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে এবং মীর্জা সাহেবের মিশনের মুসলমানদের কাছে যা গোমরাহ বলে পরিচিত –শক্তি বৃদ্দি হচ্ছে কেন আবার বর্তমানে এ দলটির শিকড় দেশের বাইরেও মজবুত হয়ে গেছে। (গ) মীর্জা সাহেব যে বাণী এনেছিলেন তারপর আজ ষাট বছর অথিবাহিত হয়ে গেচে আমরা কতদিন আল্লহার ফায়সালার অপেক্ষা করব বর্তমানে তারা উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করে চলছে। (ঘ) যেসব দল ও ব্যক্তি এ দলটির বিরোধিতা করছে তারা কেন তাদের বিরোধিতা পরিহার করছে না এবং বিষয়টি আল্লাহর হাতে সোপর্দ করছে না? ৱ

দুইঃ তরজুমানুল কুরআনের ২৪২ পৃষ্ঠায় আপনার দলের একজন জার্মান সমর্থক বার্লিনে আহমদী জামায়াতের সাথে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। যদি আপনিও তাদের ইসলাম প্রচারের কাজকে সঠিক মনে করে থাকেন তাহলে পাকিস্তানে তাদেরসাথে সহযোগিতা করছেন না কেন?

উত্তরঃ আপনি একজন নবুয়াতের দাবীদারের ব্যাপারটিকে এত হালকাভাবে দেখছেন! এতবড় একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি মোটেই উপযোগী নয়। আমি যা কিছু লিখেছিলাম তা ছিল একটি সুস্পষ্ট মিথ্যা অভিযোগ সম্পর্কিত। কতিপয় স্বার্থবাদী লোক আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন। এ কথাকে আপনি প্রযোজ্য করছেন এমন একজন লোকের ব্যাপারে যিনি আসলে নবুয়াতের দাবী করেছেন। আপনার জানা উচিত একজন নবুয়াতের দাবীদারের ক্ষেত্রে দু’টি অবস্তার যে কোনোটি অবশ্যিই সত্য। যদি তার দাবী সত্য হয়ে থাকে তাহলে তাকে যে মানে না সে কাফের। আর যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তাকে যে মানে সে কাফের। এতবড় একটা নাজুক ব্যাপারের সিদ্ধান্ত কি আপনি কেবল এতটুকু কথার ওপর করতে চান যে, আল্লাহ তায়ালা এখনও তাকে পাকড়াও করেননি, তার দলের শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে আর ‘আমরা আর কতদিন আল্লাহর ফায়সালার অপেক্ষা করব?’ এর অর্থ কি তাহলে এটাই ধরে নিতে হবে যে, যে কোনো ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করার পর তার দল যদি উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি লাভ করতে থাকে এবং আপনার প্রস্তাবিত প্রতীক্ষার মেয়াদের মধ্যে আল্লাহ তাকে পাকড়াও না করেন তাহলে কেবল ততটুকু কথাই তাকে নবী হিসেবে মেনে নেবার পক্ষে যথেষ্ট বিবেচিত হবে আপনার মতে নবুয়াতের যাচাই করার মানদণ্ড কি এটাই (আরবী**********) থেকে আপনি যা প্রমাণ করতে চেয়েছেন তা আসলে মূলগতভাবে ভুল। এ আয়াতে যে কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মদ (সা) যিনি আসলে আল্লাহর নবী, যদি আল্লাহর অহী ছাড়া কোনো কথা নিজের পক্ষ তেকে বানিয়ে আল্লাহর নামে পেশ করতে থাকে তাহলে তাঁর শ্বাসনালী কেটে দেয়া হবে। এ থেকে যে ব্যক্তি আসলে নবী নয় এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে নবী বলে পেশ করছে তার শ্বাসনালীও কেটে দেয়া হবে এ অর্থ গ্রহণ করা ঠিক নয়। এ ছাড়াও এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যে নবুয়াতের দাবীদারের শ্বাসনালী কেটে দেয়া হবে না সে সত্য নবী আর যার শ্বাসনালী কেটে দেয়া হবে সে ভণ্ড নবী –এ কথাকে মিথ্যা ও সত্য নবী বেছে নেয়ার মানদণ্ড হিসেবে পেশ করেননি। কুরআনের আয়াতের এভাবে টেনে-হিঁচড়ে বিকৃত অর্থ করার পদ্ধতি  নিশ্চয় আপনার নিজস্ব কায়দা নয়, বরং মীর্জা সাহেবের দলের কাছ থেকেই এটা আপনি রপ্ত করেছেন। এ দলটির দিলে যে আল্লাহর ভয় নেই এ থেকেই তা প্রমাণ হয়।

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করবে তার কথাকে আপনার পেশকৃত মানদণ্ডে যাচাই করা হবে না। বরং তার কথাকে পরম নিশ্চিন্তে প্রত্যাখ্যান করা হবে। কারণ কুরআন ও হাদীস এ ব্যাপারে দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য রেখেছে। সেখানে বলা হয়েছে, রসূলে করীম (সা)-এর পর আর কোনো নবী আসবেন না। মীর্জা সাহেব ও তার অনুসারীরা নবুয়াতের দরজা উন্মুক্ত থাকার স্বপক্ষে যেসব যুক্তি পেশ করে থাকেন সেগুলো সম্পর্কেও আমি অবহিত কিন্তু আপনাকে আমি জানিয়ে দিতে চাই ঐ যুক্তিগুলো কেবলমাত্র একজন অজ্ঞ ও স্বল্পজ্ঞানসম্পন্ন লোককেই প্রভাবিত করতে পারে। একজন তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি তাদের যুক্তিগুলো দেখার পর কেবলমাত্র তাদের মূর্খতা সম্পর্কেই নিসন্দেহ হতে পারে।

তরজুমানুল কুরআনে জার্মানীর যে চিঠি ছাপা হয়েছে –অর্থ এ নয় যে, ঐ চিঠির সব কথাকে আমরা হুবহু সত্য বলে মনে করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ঐ চিঠির মাধ্যমে আমাদের দেশের মুসলমানদের সামনে জার্মানীর যে চিঠি ছাপা হয়েছে –অর্থ এ নয় যে, ঐ চিঠির সব কথাকে আমরা হুবহু সত্য বলে মনে করি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ঐ চিঠির মাধ্যমে এবং তাদেরকে সাহায্য করার জন্যে মুসলমানদের মনে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করা। তারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইসলামী দুনিয়ায় কত ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তা তারা কেমন করে জানবে। তারা তো এখন আমাদের। অন্যথায় অজ্ঞতার কারণে তারা যে কোনো ফিতনার শিকার হয়ে যেতে পারে।

প্রশ্নঃ আপনার জবাব পেয়েছি। দুঃখের বিষয়, তা আমার সংশয় নিরসন করতে পারেনি। আমি তো আপনারই কথা “আল্লাহ নিজেই মিথ্যাবাদীকে শাস্তি দেবেন” তুলে ধরে এর আলোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মীর্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী যাকে সব মুসলমানই মিথ্যাবাদী মনে করে তার ওপর আল্লাহর শাস্তি আসছে না কেন এবং আল্লাহ কিভাবে এতদিন ধরে নিজের বান্দাদের গোমরাহ প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছেন?

আমি মীর্জা সাহেবের লেকা ২৫ খানা বই অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করেছি। এপর এর বিরুদ্ধে লেখা মুসলিম আলেমগণের কয়েকখানা বইও পড়েছি, অবশ্য আমি স্বীকার করছি এ প্রসঙ্গে আপনার কোনো বই আমি পড়তে পারিনি। তবে আলেমগণের বইগুরো সম্পর্কে আমার সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া নিম্নরূপঃ

তারা মীর্জা সাহেবের লেখা বিকৃত করে তার ভুল অর্থ গ্রহণ করেছেন এবং তা মীর্জা সাহেবের ওপর আরোপ করেছেন।

যে বিষয়ে তারা লেখনী চালিয়েছেন সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন না। পরে আমি তাদের সাথে পত্র যোগাযোগ করি। কিন্তু তাদের অধকাংশই নীরবতা অবলম্বন করেন। মীর্জা সাহেবের বইপত্র থেকে আমি সাধারনত যা কিছু বুঝেছি তা হচ্ছেঃ মীর্জা সাহেব ‘নিজে এবং তার বাণীসমূহ নবী করীম (সা)-এর প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। এরই ভিত্তিতেই আমি মীর্জা সাহেবের দাবীর দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন আমার কাছে এ কথা প্রমাণিত সত্য যেঃ

একঃ মীর্জা সাহেবের দাবীসমূহ কুরআন ও হাদীসের বিরোধী নয়।

দুইঃ মীর্জা সাহেবের নবুয়াত রসূলে করমি (সা)-এর মর্যাদা লাঘব করছে না বরং যদি মূসা (আ)-এর বদৌলতে নগরে নগরে নবী হতে পারে তাহলে মুহাম্মদ (সা)-এর মর্যাদার বদৌলতে গ্রামে গ্রামে এমন লোক হতে হবে যারা বলবে, “আমরা শরীয়াতে মুহাম্মদীর ওপর আমল করে আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেছি”। মীর্জা সাহেব নিজেই বলেছেনঃ

                                       “আল্লাহ সৃষ্টির প্রতি উৎসারিত এ ঝর্ণাধারাটি

                                    মুহাম্মদী কামালিয়াতের সমুদ্রের একটি বারিককণা মাত্র”।

এখন আপনি আবার আমাকে মীর্জা সাহেবের দাবী যাচাই করার অনুমতি দিয়েছেন। মেহেরবানী করে আপনি কি মীর্জা সাহেবের কোনো একটি দাবীকে কুরআন করীমের আলোকে মিথ্যা প্রমাণ করে আমাকে সঠিক পথ গ্রহণে সাহায্য করবেন?

উত্তরঃ আগের চিঠিটাই আপনার সংশয় নিরসন করতে পারত যদি আপনি যথার্থই সংশয় নিরসন করতে চাইতেন। আমি তরজুমানুল কুরআনে যা কিছু লিখেছিলাম তা ছিল সেইসব লোকদের সম্পর্কে যারা আমার ওপর মিথ্যা দোষারোপ করছে। আর এ ব্যাপারে আল্লাহর ওপর আস্থা প্রকাশ রকা হয়েছিল যে, তিনি নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদীদেরকে শাস্তি দেবেন কিন্তু আপনি একে একজন নবুয়াতের দাবীদারের দাবী যাচাই করার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করছেন। আবার মানদণ্ডও এমনভাবে গ্রহণ করেছেন যে, যদি দেখা যায় নবুয়াতের দাবীদার শাস্তি পাচ্ছে না তাহরে তাকে অবশ্যই সত্য নবী বলতে হবে। দুনিয়ায় যে শাস্তি পেয়ে যাবে সে মিথ্যাবাদী ও গোমরাহ আর যে শা্স্তি পাবে না সে সত্যবাদী ও সৎপথপ্রাপ্ত –সত্যিই কি লোকদের সত্যবাদী বা মিথ্যাবাদী এবং সৎপথপ্রাপ্ত বা গোমরাহ হবার জন্যে এটা কোন সঠিক মানদণ্ড?

আপনি অদ্ভুত কথা বলেছেন যে, মীর্জা সাহেবের নবুয়াতের দাবী করার পর ৬০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে আর কতদিন অপেক্ষা করা যায়। নবুয়াতের দাবীর সত্যতা যাচাই করার জন্যে আপনি একটি অদ্ভুত মানদণ্ড পেশ করেছেন। আপনার মতে, একজন মিথ্যা দাবীদারের কোন ধরনের শাস্তি পাওয়া উচিত –কথাটা একটু বিস্তারিতভাবে বলুন। যদি আপনি মনে করে থাকেন, গায়েব থেকে একটি হাত এসে তার কণ্ঠনালী কেটে দিয়ে যাবে তাহলে আমি বলব, এ শাস্তি তো রসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবদ্দমায় মিথ্যা নবুয়াতের দাবীদার মুসাইলামা কাযযাবকেও দেয়া হয়নি। যদি আপনি মনে করে থাকেন, যে নবুয়াতের দাবীদার মানুষের হাতে নিহত হবে সে মিথ্যাবাদী তাহলে সেসব নবীদের সম্পর্কে আপনি কি বলেন যাদের নবুয়াতের সত্যতা আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন এবং এই সঙ্গে এ কথাও জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের নিজেদের জাতিরাই তাদেরকে হত্যা করেছে? কুরআনে নিশ্চয়ই আপনি নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি পড়েছেনঃ

(আরবী*******************************************পিডিএফ ১৬৯ পৃষ্ঠায়)

এ আয়াতগুলোর আলোকে আপনার নিজের চিন্তাধারার নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি। নবীর দাবীকে এ ধরনের মানদণ্ডে যাচাই করা যায় না। নবীর ব্যাপারে যে বিষয়টির পর্যালোচনা করতে হবে তা হচ্ছে এই যে, তাঁর পূর্বেকার আল্লাহর বাণীর আলোকে তাঁর স্থান কোথায়? তিনি কি এনেছেন? তাঁর জীবনধারা কেমন? এ মানদণ্ডে যে ব্যক্তি পুরোপুরি উতরোবে না তাকে কেবলমাত্র আপনি চর্মচক্ষে এ দুনিয়ায় শাস্তি পেতে দেখছেন না বলেই সত্য নবী বলে মেনে নেবেন, এটা একটা মারাত্মক ভুল।

ওপরে আমি যে তিনটি মানদণ্ডের কথা বলেছি তার মধ্য তেকে প্রথমটির কষ্ঠিপাথরে নবুয়াতের দাবীদারের দাবী যাচাই হয়ে পুরোপুরি নির্ভেজাল প্রমাণিত হয়ে না এলে শেষোক্ত কথা প্রমাণ হয়ে যায় যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নতুন নবী আসতে পারবেন না তখন রসূলে করীম (সা)-এর আগমনকারী নবী কি এনেছেন এবং তিনি কেমন লোক তা দেখার কোনো প্রয়োজনই থাকে না। যদিও আমার দৃষ্টিতে মীর্জা সাহেব দ্বিতীয় ও তৃতীয় মানদণ্ডের প্রেক্ষিতে ও নবুয়াতের মর্যাদা থেকে এত দূর অবস্থান করছেন যে, নবুয়াতের দরজা যদি খোলা থাকত তাহলেও অন্ততঃপক্ষে কোনো সুবিবেচক ব্যক্ত তাঁকে বনী বলে ধারণা করতে পারত না কিন্তু কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্তের পর এ আলোচনাকে আমি অপ্রয়োজনীয় বরং আল্লাহ ও রসূলের (সা) মোকাবিলায় চরম দৃষ্টতা মনে করি।

যদি জিজ্ঞেস করেন, নবুয়াতের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে কুরআন ও হাদীসে এর স্বপক্ষে কি যুক্তি আছে, তাহলে একটি পত্রে এর জবাব দেয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদে সময় সুযোগ দেন তাহলে একটি ইনশাআল্লাহ এ বিষয়বস্তুর ওপর আমি একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ লিখব। অন্যথায় সূরা আহযাবের তাফসীরে তো এ প্রসঙ্গ আসবেই তখন আলোচনা করা যাবে।–[কয়েক পৃষ্ঠা পরেই ‘খতমে নবুয়াতের আকীদা সম্পর্কে গবেষণামূলক আলোচনা’ শীর্ষক নিবন্ধে এ আলোচনা আসছে।–(সংকলক)]

খতমে নবুয়াতের বিরুদ্ধে কাদিয়ানীদের আর একটি যুক্তি

প্রশ্নঃ তাফহীমুল কুরআনে সূরা আলে ইমরানের (আরবী*****) আয়াতের ব্যাখ্যায় ৬৯ নম্বর টীকায় আপনি লিখেছেনঃ “এখানে এতটুকু কথা আরও বুঝে নিতে হবে যে, হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বে প্রত্যেক নবীর কাছ থেকেই এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে আর এরই ভিত্তিতে প্রত্যেক নবীই তাঁর পরবর্তী নবী সম্পর্কে তাঁর উম্মতকে অবহিত করেছেন এবং তাঁকে সমর্থন করার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু নবী মুহাম্মদ (সা)-এর কাছ থেকেও এ ধরনের কোন অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল অথবা তিনি নিজের উম্মতকে পরবর্তীকালে আগমনকারী কোনো নবীর বর দিয়ে তার ওপর ঈমান আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন কুরআন ও হাদীসের কোথাও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায না”।

এ বাক্যগুলো পড়ার পর মনের মধ্যে এ কথার উদয় হলো যে, নবী মুহাম্মদ (সা) এ কথা বলেননি ঠিক কিন্তু কুরআন মজীদের সূরা আহযাবে একটি অঙ্গীকারের উল্লেখ এভাবে করা হয়েছেঃ

(আরবী*******************************)

এখানে ‘মিনকা’ (তোমার নিকট থেকে) শব্দটির মাধ্যমে নবী করমি (সা)-কে সম্বোধন করা হয়েছে। আর একানে যে অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে তা সূরা আলে ইমরানে উল্লেখিত হয়েছে। সূরা আলে ইমরান ও সূরা আহযাব এ উভয় সূরায় উল্লিখিত আয়াগুলোর অঙ্গীকারের উল্লেখ থেকে বুঝা যায়, অন্য নবীদের কাছ থেকে যে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল নবী মুহাম্মদ (সা)-এর থেকেও সেই একই অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে।

আসলে আহমদীয়াদের একটি বই পড়ার পর আমার মনে এ প্রশ্ন জেগেছে। সেখানে ঐ সূরা দু’টোর উল্লিখিত আয়াতগুলোকের একটির সাহায্যে অপরটির ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ সঙ্গে ‘মিনকা’ শব্দটির ওপর বিরাট আলোচনা করা হয়েছে।

উত্তরঃ (আরবী*****************) সূরা আহযাবের এ আয়াতটি থেকে াদিয়ানী সাহেবান যে যুক্তি পেশ করেন তা যদি তারা আন্তরিকতার সাথে পেশ করে থাকেন তাহলে তা তাদের মূর্খতা ও অজ্হতার পরিচায়ক। আর যদি ইচ্ছা করে লোকদেরকে ধোঁকা দেয়ার উদ্দেশ্যে করে থাকেন তাহলে তাদের গোমরাহী সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তারা সূরা আলে ইমরানের (আরবী****************) আয়াতটি থেকে একটি বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। তাতে নবীগণ ও তাদের উম্মতদের কাছ থেকে আগামীতে আগমনকারী কোনো নবীর আনুগত্য করার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে। আবার দ্বিতীয় একটি বক্তব্য নিয়েছেন সূরা আহযাবের উপরোল্লিখিত আয়াতটি থেকে। এখানে অন্যান্য নবীগণের সাথে সাথে রসূলে করীম (সা)-এর থেকেও অঙ্গীকার নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। অতপর দু’টোকে জুড়ে তারা নিজেরাই এ তৃতীয় বক্তব্যটি বানিয়ে ফেলেছেন যে, নবী করীম (সা) থেকেও আগামীতে আগমনকারী কোনো নবীর ওপর ঈমান আনার ও তাকে সাহায্য-সহযোগিতা দান করার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছিল অথচ যে আয়াতে আগামীতে আগমনকারী নবীর থেকে অঙ্গীকার নেয়ার কথা বলা হয়েছে সে আয়াতের কোথাও আল্লাহ তায়ালা এ কথা বলেননি যে, এ অঙ্গীকারটি হযরত মুহাম্মদ (সা) থেক্ নেয়া হয়েছে। আর যে আয়াতে হযরত মুহাম্মদ (সা) থেকে একটি অঙ্গীকার নেয়ার কথা বলা হয়েছে সেখানে কোথাও এ কথা বলা হয়নি যে, এ অঙ্গীকারটি ছিল আগামীতে আগমনকারী কোনো নবীর আনুগত্যের সাথে জড়িত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দু’টো পৃথক বক্তব্যকে জুড়ে তৃতীয় একটি বক্তব্য যা কুরআনের কোথাও ছিল না তৈরী করার যৌক্তিকতা কোথায়? এর তিনটি যুক্তি বা ভিত্তি হতে পারত। একঃ যদি এ আয়াতটি নাযিল হবার পর নবী করীম (সা) সাহাবীদেরকে একত্রিত করে ঘোসণা করতেনঃ “হে লোকেরা! আল্লাহ আমার কাছ তেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, আমার পর যে নবী আসবেন আমি তার ওপর ঈমান আনব এবং তাকে সাহায্য-সহযোগিতা দান করব। কাজেই আমার অনুগত হওয়ার কারণে তোমরাও এ অঙ্গীকার কর”। -কিন্তু সমগ্র হাদীস গ্রন্থগুরোর কোতাও আমরা এ বক্তব্য সম্বলিত একটি হাদীসও দেখি না। বরং বিপরীত পক্ষে এমন অসংখ্য হাদীস দেখি যেখান থেকে নবী করীম (সা)-এর ওপর নবুয়াতের সিলসিলা খতম হয়ে গেচে এবং তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না এ কথা সুস্পষ্টবাবে প্রকাশিত হয়। এ কথা কি কোনো দিন কল্পনাও করা যেতে পারে যে, নবী করীম (সা)-থেকে এমন ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে আর তিনি তাকে এভাবে অবহেলা করে গেছেন, বরং উল্টো এমন সব কথা বলেছেন যার ভিত্তিতে তাঁর উম্মতের বিরাট অংশ আল্লাহ প্রেরিত কোনো নবীর ওপর ঈমান আনা থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে?

কুরআনে যদি সকল নবী ও তাঁদের উম্মতদের থেকে একটিমাত্র অঙ্গীকার নেয়ার উল্লেখ থাকত তাহলে সেটি এ বক্তব্য গ্রহণের দ্বিতীয় যুক্তি বা ভিত্তি হতে পারত। আর সে অঙ্গীকারটি হচ্ছে পরবর্তকালে আগমনকারী নবীর ওপর ঈমান আনা। সমগ্র কুরআনে এটি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অঙ্গীকারের উল্লেখ থাকত না। এ অবস্থায় এ যুক্তি পেশ করা যেতে পারত যে, সূরা আহযাবের উল্লিখিত আয়াতেও এ একই অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ যুক্তি পেশ করারও কোনো অবকাশ এখানে নেই। কুরআনে একটি নয় বহু অঙ্গীকারের কথা উল্লিখিত হয়েছে। যেমন সূরা বাকারার ১০ রুকূ’তে বনী ইসরাঈল থেকে আল্লাহর বন্দেগী, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার ও পারস্পরিক রক্তপাত থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে। সূরা আলে ইমরানের ১৯ রুকূ’তে সমস্ত আহলে কিতাবদের থেকে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়েছেঃ আল্লাহর যে কিতাব তোমাদের হাতে দেয়া হয়েছে তোমরা তার শিক্ষাবলী গেপান করবে না বরং তাকে সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেবে। সূরা আরাফের ২১ রুকূ’তে নবী ইসরাঈল থেকে অঙ্গীকার নেয়া হয়েছেঃ আল্লাহর নাম হক ছাড়া কোনো কথা বলবে না আর আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং তার শিক্ষাগুরো মনে রাখবে। সূরা মায়েদার প্রথম রুকূ’তে মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসারীদেরকে একটি অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যা তারা আল্লাহর সাথে করেছিল তা হচ্ছে, “তোমরা আল্লাহর সাথে শ্রবণ ও আনুগত্যের অঙ্গীকার করছ”। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সূরা আহযাবের সংশ্লিষ্ট আয়াতে যে অঙ্গীকারের উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে অঙ্গীকারটি কি ছিল তা যখন বলা হয়নি তখন এ অঙ্গীকারটি চিহ্নিত করার জন্যে উল্লিকিত বহু অঙ্গকারের মধ্য থেকে কোনো একটি গ্রহণ না করে বিশেষ করে সূরা আলে ইমরানের ৯ রুকূ’তে উল্লিখিত অঙ্গীকারটি গ্রহণ করা হবে কেন? এ জন্যে অবশ্যই একটি ভিত্তির প্রয়োজন। আর এ ভিত্তি কোথাও নেই। এর জবাবে যদি কেউ বলে যে, উভয় ক্ষেত্রে যেহেতু নবীদের থেকে অঙ্গীকার গ্রহণের কথা রয়েছে তাই একটি আয়াতের সাহায্যে অন্যটির ব্যাক্যা করা হয়েছে, তাহলে আমি বলব নবীদের উম্মতদের থেকে অন্য যতগুলো অঙ্গীকার নেয়া হয়েছে কোনোটাই সরাসরি নেয়া হয়নি বরং নবীদের মাধ্যমেই নেয়া হয়েছে। এছাড়াও গভীরভাবে কুরআন অধ্যয়নকারী ব্যক্তিমাত্রই জানেন, প্রত্যেক নবীর থেকে আল্লহার কিতাব মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার ও তার বিধানসমূহের আনুগত্য করার অঙ্গীকার নেয়া হয়।

তৃতীয় যুক্তি বা ভিত্তি হতে পারতো সূরা আহযাবের পূর্বাপর আলোচনা প্রসঙ্গ। সেখানে যদি এ কথার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকত যে, একানে অঙ্গীকার বলতে পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীদের ওপর ঈমান আনার অঙ্গীকার বুঝাত হয়েছে, তাহরে এ বক্তব্য গ্রহণ করা সঙ্গ হত। কিন্তু এখানে ব্যাপারটি তো সম্পূর্ণ উল্টো। পূর্বাপর আলোচনা প্রসঙ্গ বরং এ অর্থ গ্রহণের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করছে। সূরা আহযাব শুরু করা হয়েছে এ বাক্যটির মাধ্যমেঃ

“হে নবী! আল্লাহকে ভয় কর এবং কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য কর না আর তোমার রব যে অহী পাঠান সেই অনুযায়ী কাজ কর এবং আল্লাহর ওপর আস্থা স্থাপন কর”। এরপর নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, জাহেলিয়াতের যুগ থেকে পালকপুত্র নেয়ার যে পদ্ধতি চলে আসছে তা এবং তার সাথে সম্পর্কিত সব রকমের কুসংস্কার ও রীতি-রসম নির্মূল করে দাও। তারপর বলা হচ্ছে, রক্তহীন সম্পর্কের মধ্যে কেবলমাত্র একটি সম্পর্কই এমন আছে যা রক্ত সম্পর্কের চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন। সেটি হচ্ছে, নবী ও মু’মিনদের মধ্যকার সম্পর্ক। এ সম্পর্কের কারণে নবীর স্ত্রীগণ মু’মিনদের নিকট তাদের মায়েদের ন্যায় মযৃাদাসম্পন্ন এবং মায়েদের ন্যায় তাদের ওপর হারাম। এছাড়া অন্য সমস্ত ব্যাপারে একমাত্র রক্ত সম্পর্কই আল্লাহর কিতাব অনুসারে বিবাহ হারাম হওয়া ও মীরাস লাভের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এ বিধান নির্দেশ করার পর আল্লাহ তায়ালা হামেশা সমস্ত নবীদের থেকে এবং সেই অনুযায়ী নবী করীম (সা) থেকেও যে অঙ্গীকারটি নিয়েছেন সে কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। এখন একজন সাধারণ বিবেকমান ব্যক্তিমাত্রেই দেখতে পারেন যে, এ আলোচনা প্রসঙ্গে কোথায় পরবর্তীকালে আগমনকারী একজন নবীর ওপর ঈমান আনার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার অবকাশ ছিল? একানে বড়জোর সেই অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার অবকাশ ছিল যাতে আল্লাহর কিতাবকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরার, তার বিধানসমূহ মনে রাখার, সেগুরো কার্যকর করার এবং জনসমক্ষে তা প্রকাশ করার জন্যে সকল নবীকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এরপর আর একটু সামনে অগ্রসর হয়ে আমরা দেখছি আল্লাহ তায়ারা নবী করীম (সা)-কে পরিস্কার বরে দিচ্ছেন, আপনি নিজে আপনার পালকপুত্র যায়েদের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করে জাহেলিয়াতের সেই ভ্রান্ত ধারণা নির্মূল করে দিন যার ভিত্তিতে লোকেরা পালক পুত্রকে নিজেদের ওরসজাত পুত্রের ন্যায় মনে করত। কাফের ও মুনাফিকরা এর বিরুদ্ধে একের পর এক আপত্তি উত্থাপন করে অপপ্রচারে লিপ্ত হলে আল্লাহ তায়ালা ধারাবাহিকভাবে সেগুরোর জবাব দেন।

এক. প্রথমত মুহাম্মদ (সা) তোমাদের মধ্য থেকে কোনো পুরুষের পিতা নন, যার ফলে তার (সেই) পুরুষের) তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে তাঁর ওপর হারাম হতে পার্

দুই. আর যদি তোমরা এ কথা বল যে, সে তার জন্যে হালাল হয়ে থাকলেও তাকে বিয়ে করার এমন কী প্রয়োজন ছিল? তাহলে এর জবাবে বলতে হয় যে, তিনি হচ্ছেন আল্লাহর রসূল। আল্লাহ যে কাজটি খতম করতে চান নিজে অগ্রসর হয়ে সেটি খতম করে দেয়াই হচ্চে তাঁর দায়িত্ব।

তিন. এ ছাড়াও এটি করা তাঁর জন্যে আরও বেশী প্রয়োজন ছিল এ জন্যে যে, তিনি নিছক রসূল নন বরং তিনি শেষ রসূল। জাহেলিয়াতের এ রীতি-রসমগুলোর যদি তিনি বিলোপ সাধন না করে যান তাহলে তাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না যিনি এগুলোর বিলোপ সাধন করাবেন।

এই শেষের বক্তব্যটিকে আগের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে পড়লে যে কেউ নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলবে যে, এই পূর্বাপর বক্তব্যের মধ্যে নবী করীম (সা)-কে যে অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয় দেয়া হয়েছে তা নিসন্দেহে পরবর্তীকারে আগমনকার কোনো নবীর ওপর ঈমান আনার অঙ্গীকার নয়।

এবার বিবেচনা করুন, আলোচ্য আয়াতটি থেকে কাদিয়ানীদের বিবৃত অর্থ গ্রহণ করার জন্যে এ তিনটি ভিত্তিই হতে পারত। এ তিনটি ভিত্তির প্রত্যেকটিই তাদের বক্তব্যের সাথে সম্পর্কহীন বরং তার বিপরীত। এছাড়া তাদের কাছে যদি চতুর্থ কোনো যুক্তি ও ভিত্তি থাকে তাহরে তা তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন। আর এ তিনটি যুক্তির জবাবও তাদের কাচে থেকে নিন। অন্যথায় ন্যায়সঙ্গতভাবে এ কথা মনে করা হবে যে, তারা মূর্খতা ও অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে অন্যথায় আল্লাহর ভয়কে মন থেকে সম্পূর্ণরূপে বিদূরিত করে সরল-প্রাণ জনসাধারণকে গোমরাহ করার জন্যে আয়াতের এ অর্থ গ্রহণ করেছে। যা হোক, আমি এটা বুঝতে পারছি না যে, মীর্জা সাহেব যদি নবী হয়ে থাকেন তাহলে এখনও তার ‘সাহাবী’দের যুগ শেষ হয়নি অথচ তার সমগ্র উম্মত বর্তমানে ‘তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈন’-এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এরপরও তাদের অবস্তা হচ্ছে এই যে, তার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত লোকেরা প্রকাশ্যে আল্লাহর কিতাব থেকে এ ধরনের ভুল ও মিথ্যা যুক্তি পেশ করে যাচ্ছে অথচ এ মুর্খতার বিরুদ্ধে সমগ্র উম্মতের মধ্যে একটি আওয়াজ বুলন্দ হচ্ছে না।

খতমে নবুয়াতের আয়াতের তিনটি যুক্তি

(আরবী****************************পিডিএফ ১৭৪ পৃষ্ঠায়)

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্য থেকে কারও পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী। আর আল্লাহ সব জিনিসের জ্ঞান রাখেন”।–(সূরা আহযাবঃ ৪০)

সূরা আহযাবের যে পটভূমিকায় খতমে নবুয়াতের আলোচনা এসেছে তা হচ্ছে নিম্নরূপ। আরবে পালকপুত্রকে সম্পূর্ণরূপে নিজের ঔরসজাত পুত্রের মযৃাদা দেয়া হয়েছিল। সে ঔরসজাত পুত্রের মতো মীরাস পেত। মা-ছেরে ও ভাই-বোন যেভাবে এক সংসারে অবস্থান করত পালকপুত্র তেমনি পালক পিতার স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে মিশেমিশে থাকত। পালকপুত্র হয়ে যাবার পর রক্ত সম্পর্কের কারণে আত্মীয়দের মধ্যে যে সম্পর্ক কায়েম হত পালকপুত্র ও পারক পিতার মধ্যে সে ধরনের সব সম্পর্ক কায়েম হয়ে যেত। আল্লাহ এ রসমটি বিলুপ্ত করতে চাচ্ছিলেন। তা্ই প্রথমে বলে দিলেন, মুখে কাউকে ছেলে বলে দিলেই সে তার প্রকৃত ছেলে হয়ে যায় না। (৪নং আয়াত) কিন্তু শত শত বছরের রেওয়াজ ও প্রচলনের কারণে মনের মধ্যে যে মর্যাদাবোধ ও হারাম হওয়ার ধারনা শিকড় গেড়ে বসেছিল তাকে সহজে মূলোৎপাটিত করা সম্ভবপর ছিল না। তাই কার্যতঃ এ প্রথাটি ভেঙ্গে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। ঘটনাক্রমে এ সময় ঘটে গেল হযরত যায়েদ (রা) ও হযরত যয়নব (রা)-এর ব্যাপারটি। রসূলে করীম (সা)-এর পালকপুত্র হযরত যায়েদ তার স্ত্রী যয়নবকে তারাক দিয়ে দিলেন। রসূলে করীম (সা) অনুবব করলেন, এ মারাত্মক জাহেলী প্রথাটি ভাঙ্গার এটাই হচ্ছে মোক্ষম সুযোগ। যতক্ষণ না তিনি নিজে নিজের পালকপুত্রের তারাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করেন ততক্ষন পালকপুত্রকে প্রকৃত ও ঔরসজাত পুত্রের মতো মনে করার জাহেলী ধারণার অবসান হবে না। কিন্তু তিনি এ কথাও জানতেন যে, মদীনার মুনাফিকগোষ্ঠী এবং মদীনার আশপাশের ইহুদী সম্প্রদায় ও মক্কার কাফের সমাজ তাঁর এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে মহা হুলস্থুল বাধাবে। তারা এ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নাম রটাবার ও ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করবে না। তাই তিনি বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন অনুভব করা সত্ত্বেও ইতস্তত করছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তিনি হযরত যয়নব (রা)-কে বিযে করে নিলেন। ফলে পূর্ব অনুমিত আশংকা অনুযায়ী আপত্তির ঝড় উঠল। নিন্দা ও অপবাদের বন্যা বইতে লাগল। এমনকি নেক মুসলমানের মনেও নানা ধরনের সংশয় ও সন্দেহ জেগে উঠল। এসব আপত্তি, নিন্দাবাদ, অপবাদ ও সংশয়ের জবাবে সূরা আহযাবের পঞ্চম রুকু’র ৩৭ থেকে ৪০ নম্বর পর্যন্ত এ আয়াগুলো নাযিল হয়।

এ আয়াতগুলোর শুরুতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, এ বিয়ে আমার নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে এই যে, মু’মিনদের জন্যে তাদের পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা মোটেই দূষণীয় নয়। তারপর বলেন, আল্লাহর হুকুম কার্যকর করার ব্যাপারে কারও ভয়ে ইতস্তত করা কোনো নবীর কাজ নয়। অতপর নিম্নোক্ত কথাগুলো পেশ করে এ আলোচনার সমাপ্তি টানেনঃ

“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুসদের কারও পিতা নন। কিন্তু তিনি আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী”। এখানে এ বাক্যটি থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা আপত্তিকারীদের জবাবে তিনটি যুক্তি পেশ করতে চান। বিরুদ্ধ পক্ষ রসূলে করীম (সা)-এর বিয়ের বিরুদ্ধে যেসব আপত্তি ও অপপ্রচার চালাচ্ছিলেন এ একটি মাত্র বাক্যের মাধ্যমে সেসবের শিকড় কেটে দেয়া হয়েছে।

তাদের প্রথম আপত্তি ছিল, তাঁরা নিজের শরীয়াতেই ছেলের স্ত্রী বাপের জন্যে হারাম এতদসত্ত্বেও তিনি কেমন করে নিজের ছেলের স্ত্রীকে বিয়ে করলেন? এর জবাবে বলা হয়েছে, এ বিয়ে আপত্তিকর নয়। কারণ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে তিনি মুহাম্মদ (সা)-এর আসল ছেলে ছিলেন না এবং মুহাম্মদ (সা)-ও তার আসল বাপ ছিলেন না। তাই বলা হয়েছে, “মুহাম্মদ (সা) তোমাদের পুরুষদের কারও পিতা নন”। অর্থাৎ যে ব্যক্তির তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা হয়েছে সে তো মুহাম্মদ (সা)-এর ছেলেই ছিল না। কাজেই তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করা হারাম হবে কেন? তোমরা সবাই জানো মুহাম্মদ (সা)-এর কোন ছেলে নেই।

তাদের দ্বিতীয় আপত্তি ছিল, পালকপুত্র যদি প্রকৃত পুত্র না হয়ে থাকে তাহলে তার পরিত্যক্ত স্ত্রীকে বিয়ে করা বড়জোর বৈধ হতে পারে কিন্তু তাঁকে বিয়ে করতেই হবে এমন কি অপরিহার্যতা ছিল? এর জবাবে বলা হয়েছে, “কিন্তু তিনি হচ্ছেন আল্লাহর রসূল”। অর্থাৎ রসূল হবার কারণে এ কাজটি তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে যে, তোমাদের প্রচলিত প্রথা যে হালাল বস্তুটি অনর্থক হারাম করে রেখেছে তার ব্যাপারে যাবতীয় রক্ত সম্পর্কের ধারণার অবসান ঘটিয়ে তিনি তাকে হালাল করে দেবেন এবং এ ব্যাপারে সকল প্রকার সন্দেহ-সংশয় নিরসন করবেন।

তৃতীয়তঃ এর অপরিহার্যতার আরও একটি কারণ ছিল এই যে, মুহাম্মদ (সা) নিছক নবী নন বরং তিনি সর্বশেষ নবী”। অর্থাৎ তাঁর পর আর কেনো রসূল তো দূরের কথা কোনো নবীই আসবেন না। আইন বা সামাজিক প্রথার কোনো একটির সংস্কার যদি তাঁর জামানায় সম্ভব না হয়ে থাকে তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তাঁর এ আরব্ধ কাজটি সম্পন্ন করে দেবেন –এর কোনো সম্ভাবনাই নেই। কাজেই জাহেলিয়াতের এ গুরুত্বপূর্ণ প্রথাটি তিনি নির্মূল করে যাবেন এটা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। কারণ এখন তাঁর হাতে জাহেলিয়াতের এ প্রথাটির মৃত্যু না ঘটলে কিয়ামত পর্যন্ত এর মৃত্যুর কোনো সম্ভাবনা নেই। তাঁল পরে আর কোনো নবী আসবেন না। তিনি যে কাজটুকু রেখে যাবেন সেটুকু সম্পন্ করার আর কেউ থাকবে না।

এর ওপর অতিরিক্ত জোর দিয়ে বলা হলো, “আল্লাহ সব বিষয়ের জ্ঞান রাখেন”। অর্থাৎ আল্লাহ জানেন এ সময় জাহেলিয়াতের এ প্রথাটিকে মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে নির্মূল করার কেন প্রয়োজন ছিল, অন্যথায় কি ক্ষতি হত আল্লাহ জানেন, এখন তাঁর পক্ষ থেকে আর কোনো নবী আসবেন না। কাজেই তাঁর শেষ নবীর মাধ্যমে তিনি যদি এখনই এ প্রথাটিকে নির্মূল করে না দেন তাহলে ভবিষ্যতে এমন আর কোনো ব্যক্তিত্ব থাকবে না যিনি এ প্রথাটির বিরুদ্দাচরণ করলে সারা দুনিয়ার মুসলিম সমাজে এটি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পরবর্তীকালের সংস্কারকগণ এর বিরুদ্ধাচরণ করলেও তাঁদের কারও কর্মকাণ্ডও এমন চিরন্তন ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী হবে না যার ফলে প্রত্যেক দেশের ও প্রত্যেক যুগের লোকেরা তা নির্দ্ধিধায় মেনে নেবে এবং তার অনুসারী হবে। তাছাড়া তাঁদের কোনো একজনও এমন ধরনের কোনো পবিত্র ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবেন না যার ফলে তিনি যে এ কাজটি করেছেন অর্থাৎ এটি যে তাঁর সুন্নাত –এ ধরনের কোনো চিন্তাই লোকদের মন থেকে এর বিরুদ্ধে উদ্ভূত যাবতীয় ঘৃণা ও অস্বস্তিকর মনোভাব খতম করে দিয়ে সক্ষম হবে না।

দুঃখের বিষয়, বর্তমান যুগে একটি দল এ আয়াতটির ভুল অর্থ করে একটি বিরাট ফিতনার দরজা খুলে দিয়েছে। তাই খতবে নবুয়াত প্রসঙ্গটির ওপর পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করে এই দলটি যেসব বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে সেগুরো দূর করার জন্যে আমি পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তারিতভাবে খতমে নবুয়াতের আলোচনায় প্রবৃত্ত হবো।

 

খতমে নবুয়াতের আকীদা সম্পর্কে গবেষণামূলক আলোচনা

বর্তমান যুগে একটি দল নতুন নবুয়াতের বিরাট ফিতনা সৃষ্টি করেছে। তারা (আরবী****************************) আয়াতটিতে উল্লেখিত ‘খতামান নাবিয়্যিন’ শব্দের অর্থ করে নবীদের মোহর। এরা বুঝাতে চায়, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর তাঁর মোহরাঙ্কিত হয়ে আরও অনেক নবী দুনিয়ায় আসবেন। অথবা অন্য কথায় বলা যায, রসূলুল্লাহ (সা)-এর মোহরাঙ্কিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ নবী হবেন না।

কিন্তু যে বর্ণনা পরম্পরায় এ আয়াতটি বিবৃত হয়েছে সেই বিশেষ পরিবেশে রেখে একে বিচার করলে সংশ্লিষ্ট শব্দের এ অর্থ গ্রহণের কোন অবকাশই দেখা যায় না। বরং এ অর্থ গ্রহণ করলে এ পরিবেশে শব্দটির ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাই বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তা বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। যয়নব (রা)-এর বিয়ের বিরুদ্ধে উত্থিত প্রতিবাদ ও তা থেকে সৃষ্টি নানা প্রকার সন্দেহ-সংশয়ের জবাব দিতে দিতে হঠাৎ মাঝখানে বলে দেয়াঃ ‘মুহাম্মদ নবীদের মোহর’, অর্থাৎ যত নবী আসবেন তারা সবাই মুহাম্মদ (সা)-এর মোহরাঙ্কিত হয়ে আসবেন; এটা কি নিছক অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক কথা নয়? আগে-পিছের এ বর্ণনার মাঝখানে এ কথাটির আকস্মিক আগমন শুধু অবান্তর নয়, এর মাধ্যমে প্রতিবাদকারীদের জবাবে যে যুক্তি পেশ করা হচ্ছিল তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় প্রতিবাদকারীদের হাতে একটা চমৎকার সুযোগ এসে গিয়েছিল। তারা সহজেই বলতে পারত, আপনার জীবনকালে এ কাজটা সম্পন্ন না করলে ভালই করতেন, কোনো বিপদের সম্ভাবনা থাকত না। এ বদ রসমটা বিলুপ্ত করার এতই যদি প্রয়োজন হয়ে থাকে তাহলে আপনার পরে আপনার মোহরাঙ্কিত হয়ে যেসব নবী আসবেন তাদের যে কেউ এটা বিলুপ্ত করতে পারবেন।

উল্লিখিত দলটি শব্দটির আরেকটি বিকৃত অর্থ নিয়েছে। অর্থাৎ ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ অর্থ ‘আফযালুন নাবীয়্যীন’। এর অর্থ হলো, নবুয়াতের দরজা খোলাই রয়েছে, তবে নবুয়াত পূর্ণথা লাভ করেছে রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর। কিন্তু এ অর্থ গ্রহণ করতে গিয়েও পূর্বোল্লিখিত বিভ্রান্তির পুনরাবির্ভাবের হাত থেকে নিস্তার নেই। পূর্বাপর আলোচনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এটি পূর্বাপরের ঘটনা পরম্পরার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থবহ কাফের ও মুনাফিকরা বলতে পারতঃ জনাব, আপনার চেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন হলেও আপনার পরে আরও নবী তো আসতে থাকতেন, কাজেই এ কাজটা তাদের ওপর না হয় ছেড়ে দিতেন। এ বদ রসমটা নির্মূল করার দায়িত্ব যে আপনাকেই পালন করতে হবে –এরই বা কি এমন অপরিহার্যতা আছে?

খাতামান নাবীয়্যীন শব্দের আভিধানিক অর্থ

পূর্বাপর আলোচনার সাথে সম্পর্কের দিক দিয়ে চূড়ান্তভাবে এ কথা বলা যেতে পারে যে, এখানে খাতামান নাবীয়্যীন শব্দের অর্থ সিলসিলার পরিসমাপ্তি। অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে আর কোনো নবী আসবেন না। কিন্তু শুধু পূর্বাপর সম্বন্ধের দিক দিয়েই নয়, আভিধানিক দিক দিয়েও এটিই এর একমাত্র যথার্থ অর্থ। আরবী অভিধান ও প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী ‘খাতাম’ শব্দের অর্থ হলোঃ মোহর লাগান, বন্ধ করা, শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া এবং কোনো কাজ শেষ করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করা।

খাতামাল আমল (আরবী***) অর্থ হলঃ ফারাগা মিনাল আমাল (আরবী*****) অর্থাৎ কাজ শেষ করে ফেলেছে।

খাতামাল ইনাআ (আরবী****) অর্থ হলঃ পাত্রের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, যাতে তার ভেতর থেকে কোনো জিনিস বাইরে না আসতে পার এবং বাইরে থেকে কিছু ভেতরে যেতে না পারে।

খাতামাল কিতাব (আরবী******) অর্থ হলঃ পত্র বন্ধ করে তার মুখে মোহর লাগিয়ে দিয়েছে, ফলে পত্রটি সংরক্ষিত হবে।

খাতামা আলাল কালব (আরবী*******) অর্থ হলঃ কোন পানীয় পান করার পর সব শেষে যে স্বাদ অনুভূত হয়।

খাতিাতু কুল্লি শাইয়িন আকিবাতুহু ওয়া আখিরাতুহু (আরবী**********) অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিসের খাতিমা অর্থ হল তার পরিণাম ও শেষ।

খাতামাশ শাইয়ে বালাগা আ-খেরাহ (আরবী*********) অর্থাৎ কোনো জিনিসকে খতম করার অর্থ হল তার শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া। খতমে কুরআন বলতে এ অর্থই গ্রহণ করা হয় এবং এ অর্থের ভিত্তিতেই প্রত্যেক সূরার শেষ আয়াতকে বলা হয় ‘খাওয়াতিম’।

খাতামুল কওমে আখেরুহুম (আরবী*******) অর্থাৎ জাতির শেষ ব্যক্তিই হচ্ছে খাতামুল কওম। (দ্রষ্টব্যঃ লিসানুল আরব, কামুস ও আকরাবুল মাওয়ারিদ)।–[এখানে আমি মাত্র তিনটি অভিধানের উল্লেখ করলাম। কিন্তু শুধু এ তিনটি অভিধানই কেন, আরবী ভাষার যে কোন নির্ভরযোগ্য অভিধান খুলে দেখলে সেখানে ‘খাতাম’ শব্দের উপরোল্লিখিত অর্থ ও ব্যাখ্যাই পাওয়া যাবে কিন্তু খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা আল্লাহর দ্বীনের সুরক্ষিত দূর্গে সিদকাটার জন্যে এর আভিধানিক অর্থকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। তারা বলতে চান, কোনো ব্যক্তিকে ‘খাতামুশ শোয়ারা’, ‘খাতামুল ফোকাহা’ অথবা ‘খাতামুল মুফাসসিরীন’ বললে এ অর্থ গ্রহণ করা হয় না যে, যাকে ঐ পদবী দেয়া হয় তারপর আর কোনো শায়ের, ফকীহ বা মুফাসসির পয়দা হয়নি। বরং এর অর্থ হয়, ঐ ব্যক্তির উপর উল্লিখিত বিদ্যা বা শিল্পের পূর্ণতার পরিসমাপ্তি ঘটেছেঃ অথচ কোনো বস্তুকে অত্যধিক ফুটিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে এ ধরনের পদবী ব্যবহারের ফলে কখনও খাতাম-এর আভিধানিক অর্থ ‘পূর্ণ’ অথবা ‘শ্রেষ্ঠ’ হয় না এবং শেষ অর্থে এর ব্যবহার ত্রুটিপূর্ণ গণ্য হয় না।

একমাত্র ব্যাকরণ রীতি সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তিই এ ধরনের কথা বলতে পারেন। কোনো ভাষারই নিয়ম এ নয় যে, কোনো একটি শব্দ তার আসল অর্থের পরিবর্তে কখনও কখনও পরোক্ষভাবে অন্য কোনো অর্থে ব্যবহৃত হলে সেটাই তার আসল অর্থে পরিণত হবে এবং আসল আভিধানিক অর্থে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কোনো আরবের সামনে যখন বলা হবে, ‘জাআ খাতামুল কওম’ (আরবী*****) তখন কখনও সে মনে করবে না যে, গোত্রের শ্রেষ্ঠ অথবা কামেল ব্যক্তিটি এসে গেছে বরং সে মনে করবে গোত্রের সবাই এসে গেছে, এমনকি শেষ ব্যক্তিটি পর্যন্তও।

এই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, মানুষের পক্ষ থেকেই কিছু লোককে খাতামুশ শোয়ারা, খাতামুল ফোকাহা, খাতামুল মুহাদ্দিসীন ইত্যাদি উপাধি দেয়অ হয়েছে। আর যে ব্যক্তিকে সে খাতামুশ শোয়ারা বা খাতামুল ফোকাহা উপাধি দিচ্ছে তারপর এ গুণের অধিকারী আর কোনো ব্যক্তির জন্ম হবে কিনা এ কথা জানার কোনা ক্ষমতাই মানুষের নেই। তাই তার গুণটিকে অথ্যধিক বড় করে দেখবার এবং তার কামালিয়াতের স্বীকৃতি দেয়ার জন্যেই মানুষের ভাষায় এ ধরনের উপাধি বিশিষ্ট শব্দ ব্যবহার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই কিন্তু যখন আল্লাহ তায়ালা কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো একটি বিশেষ গুণ তার ওপর খতম হয়ে গেছে বলে চিহ্নিত করে দেন, তখন তাকেও মানুষের প্রয়োগকৃত শব্দের ন্যায় পরোক্ষ অর্থে ব্যভহার করার কোনো কারণ দেখি না। আল্লাহ যদি কাউকে খাতামুশ শোয়ারা বলতেন, তাহলে নিসন্দেহে তার অর্থ হতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পর আর কোনো নবীর জন্ম হওয়া অসম্ভব। কারণ আল্লাহ গায়েব এবং ভবিষ্যতের কথা জানেন কিন্তু মানুষ গায়েব এবং ভবিষ্যতের কথা জানে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে কাউকে খাতামুন নাবীয়্যীন বলে দেয়া আর মানুষের পক্ষ থেকে কাউকে খাতামুশ শোয়ারা উপাধি কেমন করে এক পর্যায়ে হতে পারে?-(গ্রন্থকার)]

এ জন্যেই সমস্ত অভিধান বিশারদ ও তাফসীরকারগণ একযোগে খাতামুন নবীয়্যীন শব্দের অর্থ করেছেন ‘আখেরুন নাবীয়্যীন’ –অর্থাৎ নবীদের শেষ। আরবী অভিধান ও প্রবাদ অনুযায়ী ‘খাতাম’ –এর অর্থ ডাকঘরের মোহর নয়, চিঠির ওপর যার ছাপ লাগিয়ে চিঠি পোস্ট করা হয়, বরং এর অর্থ হচ্ছে সেই মোহর যা খামের মুখে এ উদ্দেশ্যে লাগানো হয় যে, তার ভেতর থেকে কোনো জিনিস বাইরে আসতে পারবে না এবং বাইরের কোনো জিনিস ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণী

কুরআনের পূর্বাপর আলোচনা ও আভিধানিক দিক দিয়ে শব্দটির যে অর্থ হয় রসূলুল্লাহ (সা)-এর বিভিন্ন ব্যাখ্যাও তা সমর্থন করে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এখানে কতিপয় হাদীসের উল্লেখ করছিঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৭৯ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ বনী ইসরাঈলীদের নেতৃত্ব করতেন আল্লাহর রসূলগণ। যখন কোনো নবী ইন্তেকাল করতেন তখন অন্য নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন কিন্তু আমার পরে কোনো নবী হবে না, হবে শুধু খলীফা”।–(বুখারী, মানাকিব অধ্যায়)

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৭৯ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত হল এই যে, এক ব্যক্তি একটি দালান তৈরী করল এবং খুব সুন্দর ও শোভনীয় করে সেটি সজ্জিত করল। কিন্তু তার এক কোণে একটি ইটের স্থান শূণ্য ছিল। দালানটির চতুর্দিকে মানুস ঘুরে ঘুরে তার সৌন্দর্য দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছিল এবং বলছিল, এ স্থানে একটা ইট রাখা হয়নি কেন? কাজেই আমিই সেই ইট এবং আমিই সেই নবী। (অর্থাৎ আমার আসার পর নবুয়াতের দালান পূর্ণতা লাভ করেছে, এখন এর মধ্যে এমন কোনো শূন্য স্থান নেই যাকে পূর্ণ করার জন্যে আবার কোনো নবীর প্রয়োজন হবে”।–(বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, বাবু খাতামুন নাবীয়্যীন)।

এই একই বিষয়বস্তু সম্বলিত চারটি হাদীস শরীফে কিতাবুল ফাযায়েলের ‘বাবু খাতামুন নাবীয়্যীন’-এ উল্লেকিত হয়েছে। শেষ হাদীসটিতে নিম্নোক্ত অংশটুকু বর্ধিত হয়েছে (আরবী********) অর্থাৎ ‘তারপর আমি এসে নবীদের সিলসিলা খতম করে দিলাম’। ৱ

এই হাদীসটি তিরিমিযী শরফে একই শব্দ সম্বলিত হয়ে কিতাবুল মানাকিবের ‘বাবু ফাযালিন নবী’ এবং কিতাবুল আদাবের ‘বাবুল আমসালে’ বর্ণিত হয়েছে।

মুসনাদে আবু দাউদ তায়ালাসীতে হাদীসটি জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণিত হাদীসের সিলসিলায় উল্লেখিত হয়েছে। এর শেষ অংশটুকু হল (আরবী******) অর্থাৎ আামর মাধ্যমে নবীদের সিলসিলা খতম করা হল।

মুসনাদে আহমদ সামান্য শাব্দিক হেরফেরের সাথে এ ধরনের হাদীস হযরত উবাই ইবনে কা’ব, হযরত আবু সাঈদ খুদরী এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮০ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ ছ’টা ব্যাপারে অন্যান্য নবীদের ওপর আমাকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করা হয়েছে। (ক) আমাকে পূর্ণ অর্থব্যঞ্জক সংক্ষিপ্ত কথা বলার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। (খ) আমাকে শক্তিমত্তা ও প্রতিপত্তি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে। (গ) গণীমতের অর্থ-সম্পদ আমার জন্য হালাল করা হয়েছে। (ঘ) পৃথিবীর যমীনকে আমার জন্যে মসজিদে (অর্থাৎ আমার শরীয়াতে নামায কেবল বিশেষ ইবাদতগাহে নয়, দুনিয়ার প্রত্যেক স্থানে পড়া যেতে পারে) এবং মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যমে (অর্থাৎ শুধু পানিই নয়, মাটির সাহায্যে তায়াম্মুম করেও পবিত্রতা হাসিল অর্থাৎ অযু ও গোসলের কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে) পরিণত করা হয়েছে। (ঙ) আমাকে সারা দুনিয়ার জন্যে রসূল বানানো হয়েছে এবং (চ) আমার ওপর নবীদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে”।–(মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮০ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ রিসালাত ও নবুয়াতের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে। কাজেই আমার পর আর কোনো রসূল ও নবী আসবে না”।–(তিরমিযী, কিতাবুল রুইয়া, বাবু যিহাবিন নবুয়াহ, মুসনাদে আহমদ, আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণিত)।

 

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেনঃ আমি মুহাম্মদ এবং আমি আহমদ। আমি বিলুপ্তকারী, আমার সাহায্যে কুফরকে বিলুপ্ত করা হবে। আমি সমবেতকারী, আমার পরে লোকদেরকে হাশরের ময়দানে সমবেত করা হবে। (অর্থাৎ আমার পরে শুধু কিয়ামতই বাকি আছে) আমি সবার শেষে আগমনকারী (এবং সবার শেষ আগমনকারী হচ্ছে সেই) যার পরে আর নবী আসবে না”।–(বুখারী ও মুসলিম, কিতাবুল ফাযায়েল, বাবু আসমাইন নবী; তিরমিযী, কিতাবুল আদাব, বাবু আসমাইন নবী মুয়াত্তা, কিতাবু আসমাইন নবী; মুসতাদরাক হাকেম, কিতাবুত তারিখ, বাবু আসমাইন নবী)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আল্লাহ নিশ্চয়ই এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি তার উম্মতকে দাজ্জাল সম্পর্কে ভীতি প্রদর্শন করেননি। (কিন্তু তাদের যুগে সে বহির্গত হয়নি) এখন আমিই শেষ নবী এবং তোমরা শেষ উম্মত। দাজ্জাল নিসন্দেহে এখন তোমাদের মধ্যে বহির্গত হবে”।–(ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতানা, বাবুদ দাজ্জাল)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“আবদুর রহমান ইবনে জুবাইর বলেনঃ আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আসকে বলতে শুনেছি, একদিন রসূলুল্লাহ (সা( নিজের ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের মধ্যে তাশরীফ আনলেন। তিনি এভাবে আসলেন যেন আমাদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তিনবার বললেন, আমি উম্মী নবী মুহাম্মদ। তারপর বললেন, আমার পর আর কোনো নবী নেই”।–(মুসনাদে আহমদ, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা)-এর বর্ণনা)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮১ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমার পরে আর কোনো নবুয়াত নেই। আছে কেবল সুসংবাদদানকারী কথার সমষ্টি। জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রসূল! সুসংবাদদানকারী কথাগুলো কি? জবাবে তিনি বললেন, ভাল স্বপ্ন। অথবা বললেন, কল্যাণময় স্বপ্ন। অর্থাৎ আল্লাহর অহী নাযিল হবার এখন আর কোনো সম্ভাবনা নেই। বড়জোর এতটুকু বলা যেতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যদি কাউকে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয় তাহলে শুধু ভাল স্বপ্নের মাধ্যমেই তা দেয়া হবে”।–(মুসনাদে আহমদ, আবুত তোফায়েল বর্ণিত, নাসাঈ, আবু দাউদ)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮২ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেনঃ আমার পর যদি কোনো নবী হত তাহলে উমর ইবনে খাত্তাব সে সৌভাগ্য লাভ করত”।–(তিরমিযী, কিতাবুল মানাকিব)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮২ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-কে বলেনঃ আমার সাথে তোমার সম্পর্ক মূসা (আ)-এর সাথে হারুন (আ)-এর সম্পর্কের মত। কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবী নেই”।–(বুখারী ও মুসলিম, কিতাবু ফাযায়েলিস সাহাবা)।

বুখারী ও মুসলিম তাবুক যুদ্ধের বর্ণনা প্রসঙ্গে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমদে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত দু’টি হাদীস হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে একটি হাদীসের শেষাংশ হল (আরবী********) ‘মনে রেখো আমার পর আর কোনো নবুয়াত নেই’। আবু দাউদ তিয়ালিসী, ইমাম আহমদ এবং মুহাম্মদ ইসহাক এ সম্পর্কে যে বিস্তারিত হাদীস উদ্ধৃত করেছেন তা থেকে জানা যায় যে, তাবুক যুদ্ধে রওয়ানা হবার পূর্বে রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আলী (রা)-কে মদীনা তাইয়েবার হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে রেখে যাবার সিদ্ধান্ত করেন। এ ব্যাপারটি নিয়ে মুনাফিকরা তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে থাকে। তিনি গিয়ে রসূলুল্লাহ (সা)-কে বলেন, “হে আল্লহার রসূল! আপনি কি আমাকে শিশু ও মেয়েদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন? তখন রসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেনঃ ‘আমার সাথে তোমার সম্পর্ক তো মূসা (আ)-এর সাথে হারুণের সম্পর্কের মতো”। অর্থাৎ তুর পাহাড়ে যাবার সময় হযরত মূসা (আ) যেমন নবী ইসরাঈলদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে হযরত হারুন (আ)-কে পেছনে রেখে গিয়েছিলেন তেমনি মদীনার হেফাজতের জন্যে আমি তোমাকে পেছনে রেখে যাচ্ছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রসূলুল্লাহ (সা)-এর মনে সন্দেহও জাগে যে, হযরত হারুন (আ)-এর সঙ্গে এবাবে তুলনা করার ফলে হয়ত পরে এ থেকে কোন ফিতনার সৃষ্টি হতে পারে।তাই পরমুহুর্তেই তিনি কথাটা স্পষ্ট করে বলে দেনঃ ‘তবে মনে রেখ, আমার পরে কোনো ব্যক্তি নবী হবে না’।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮২ পৃষ্ঠায়)

“হযরত সাওবান বর্ণনা করেছেন, রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ …..আর কথা হচ্ছে এই যে, আমার উম্মতের মধ্যে তিরিশ জন মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হবে। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমার পর আর কোনো নবী নেই”।–(আবু দাউদ, কিতাবুল ফিতান)।

এই বিষয়বস্তু সম্বলিত আর একটি হাদীস আবু দাউদ ‘কিতাবুল মালাহিম’-এ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী ও হযরত সাওবান এবং হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে এ হাদীস দু’টি বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় হাদীসটির শব্দ হলঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“অর্থাৎ এমনকি তিরিশ জনের মত প্রতারক আসবে। তারা প্রত্যেকেই নিজেকে আল্লাহর রসূল বলে দাবী করবে”।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“নবী (সা) বলেনঃ তোমাদের পূর্বে যেসব বনী ইসরাঈল অতীত হয়েছে তাদের মধ্যে অনেক লোক এমন ছিলেন যাদের সঙ্গে কালাম করা হয়েছে (আল্লাহ কথা বলেছেন), তাঁরা নবী ছিলেন না। আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ হয় তবে সে হবে উমর”।–(বুখারী, কিতাবুল মানাকিব)।

মুসলিমে এ বিষয়বস্তু সম্বলিত যে হাদসি উল্লেখিত হয়েছে তাতে (আরবী****) এর পরিবের্ত (আরবী****)শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু মুকাল্লাম ও মুহাদ্দাস শব্দ দু’টি সমার্থক। অর্থাৎ এমন ব্যক্তি যার সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা কালাম করেছেন অথবা যার সাথে পর্দাল আড়াল থেকে কথা বলা হয়। এ থেকে জানা যায়, নবুয়াত ছাড়াও যদি এ উম্মতের মধ্যে কেউ আল্লাহর সাথে কালাম করার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারতেন তবে তিনি হতেন একমাত্র হযরত উমর (রা)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমার পর আর কোনো নবী নেই আর আমার উম্মতের পর আর কোনো উম্মত নেই”।–(বায়হাকী, কিতুবর রুইয়া; তাবারানী)।

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৩ পৃষ্ঠায়)

“রসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ আমি শেষ নবী এবং আমর মসজিদ (অর্থাৎ মদীনার মসজিদে নববী) শেষ মসজিদ”।–[খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা এ হাদীস থেকে প্রমাণ করে যে, রসূলুল্লাহ (সা) যেমন তাঁর মসজিদকে শেষ মসজিদ বলেছেন, অথচ এটি মেষ মসজিদ নয়; এর পর দুনিয়ায় বেমুমার মসজিদ নির্মিত হয়েছে –অনুরূপভাবে তিনি বলেছেন, তিনি শেষ নবী। এর অর্থ হলো এই যে, তাঁর পরেও নবী আসবে। অবশ্যি শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে তিনি হচ্ছেন শেষ নবী এবং তাঁর মসজিদ শেষ মসজিদ। কিন্তু আসলে এ ধরনের বিকৃত অর্থই এ কথা প্রমাণ করে যে, এ লোকগুলো আল্লাহ ও রসূল (সা)-এর কালামের অর্থ অনুধাবন করার যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। মুসলিম শরীফের যে স্থানে এ হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে সেখানে এ বিষয়ের সমস্ত হাদীস সামনে রাখলেই এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রসূলুল্লাহ (সা( তাঁর মসজিদ কোন অর্থে বলেছেন। এখানে হযরত আবু হুরাইরা (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত মায়মুনা (রা)-এর বর্ণনা ইমাম মুসলিম উদ্ধৃত করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, দুনিয়ায় মাত্র তিনটি মসজিদ এমন রয়েছে যেগুলো সাধারণ মসজিদগুলোর ওপর শ্রেষ্ঠত্বের দাবীদার। সেখানে নামায পড়লে অন্যান্য মসজিদের তুলনায় হাজার গুণ বেশী সওয়াব পাওয়া যায়। এ জন্যে একমাত্র এ তিনটি মসজিদে নামায পড়ার জন্যে সফর করা জায়েয। এ তিনটি ছাড়া দুনিয়ার আর যত মসজিদ আছে সেগুলোর সব ক’টিকে বাদ দিয়ে বিশেষ করে একটিতে নামায পড়ার জন্যে সেদিকে সফর করা জায়েয নয়। এ বিশেষ তিনিট মসজিদের মধ্যে ‘মসজিদুল হারাম’ হচ্ছে প্রথম মসজিদ। হযরত ইবরাহীম (আ) এটি বানিয়েছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো ‘মসজিদে আকসা’। হযরত সুলাইমান (আ) এটি নির্মাণ করেছিলেন। আর তৃতীয়টি হচ্ছে মদীনার ‘মসজিদে নববী’। এটি নির্মাণ করেন রসূলুল্লাহ (সা)। রসূলুল্লাহ (সা)-এর বক্তব্যের অর্থ হলো, এখন যেহেতু আমার পর আর কোনো নবী আসবে না, সেহেতু আমার মসজিদের পর আর দুনিয়ায় আর চতুর্থ এমন কোনো মসজিদ নির্মিত হবে না, যেখানে নামায পড়ার সওয়াব অন্যান্য মসজিদের তুলনায় বেশী হবে এবং সেখানে নামায পড়ার উদ্দেম্যে সেদিকে সফর করা জায়েয হবে।–(গ্রন্থকার)] (মুসলিম, কিতাবুল হজ্জ, মক্কা ও মদীনার মসজিদে নামায পড়ার ফযিলত সম্পর্কিত অনুচ্ছেদ)।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট থেকে বহুসংখ্যক সাহাবী হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন বহু মুহাদ্দিস অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সনদসহ এগুলো উদ্ধৃত করেছেন। এগুলো অধ্যয়ন করার পর স্পষ্ট জানা যায়, রসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে এ কথা পরিস্কার করে দিয়েছেন যে, তিনি শেষ নবী। তাঁর পর আর কোনো নবী আসবে না। নবুয়াতের সিলসিলা তাঁর ওপর খতম হয়ে গেছে এবং তাঁর পরে যে ব্যক্তি রসূল বা নবী হবার দাবী করবে সে হবে দজ্জাল ও কাজ্জাব।–[খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা নবী করীম (সা)-এর এ সমস্ত হাদীসের মোকাবিলায় হযরত আয়েশা বলে কথিত নিম্নোক্ত বর্ণনার উদ্ধৃতি দেয়। এতে বলা হয়েছেঃ (আরবী**************) অর্থাৎ “বলো, নিশ্চয়ই তিনি খাতামুন নাবীয়্যীন, তবে এ কথা বলো না যে, তাঁর পর আর নবী নেই। কিন্তু প্রথমতঃ নবী করীম (সা)-এ সুস্পষ্ট আদেশের মোকাবিলায় হযরত আয়েশা (রা)-এর কোনো কথা পেশ করা চরম ধৃষ্টতা ও বেআদবী ছাড়া আর কিছুই নয়। অধিকন্তু হযরত আয়েশা (রা)-এর উপরোক্ত উক্তির উল্লেখ নেই। কোনো বিখ্যাত হাদীস লিপিবদ্ধকারী হাদীসটি তাঁর গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেননি। উপরোক্ত উক্তিটি ‘দুররে মনসুর’ নামক তাফসীর গ্রন্থ এবং ‘তাকমিলায়ে মাজমাউল বাহার’ নামক হাদীস অভিধান থেকে উদ্ধৃত করা হয়। কিন্তু এর সনদের কোনো উল্লেখ নেই।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর অসংখ্য সুস্পষ্ট হাদীস, যেগুলো শ্রেষ্ঠ ও নেতৃস্থানীয় মুহাদ্দিসগণ নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য সনদ সহকারে বর্ণনা করেছেন, সেগুলো অস্বীকার করার জন্যে একজন মহিলা সাহাবীর বলে কথিত দুর্বলতম উক্তি পেশ করা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।] কুরআনের ‘খাতামুন নাবীয়্যীন’ শব্দ এর চেয়ে বেশী শক্তিশালী, নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা আর কি হতে পারে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর বাণীই এখানে সনদ ও চূড়ান্ত প্রমাণ। তদুপরি যখন তা কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা করে তখন তা আরও অধিক শক্তিশালী প্রমাণে পরিণত হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর চেয়ে বেশী কে কুরআনকে বুঝেছে এবং এর তাফসীর করার অধিকারী তিনি ব্যতীত আর কে হতে পারে? এমন কে আছে যে খতমে নবুয়াতের অন্য কোনো অর্থ বর্ণনা করবে এবং তা মেনে নেয়া তো দূরের কথা, সে সম্পর্কে চিন্তা করতেও আমরা প্রস্তুত।

সাহাবীদের ইজমা

কুরআন ও সুন্নাহর পর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা বা মতৈক্য হচ্ছে তৃতীয় গুরুত্বের অধিকারী। সমস্ত নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে প্রমাণ হয় যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের অব্যবহিত পরেই যেসব লোক নবুয়াতের দাবী করে এবং যারা তাদের নবুয়াত স্বীকার করে নেয় তাদের সবার বিরুদ্ধে সাহাবায়ে কেরাম ঐকমত্যের ভিত্তিতে যুদ্ধ করেন।

এ প্রসঙ্গে মুসাইলামা কাজ্জাবের ব্যাপারটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াত অস্বীকার করেনি বরং তার দাবী ছিল, তাকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াতের অংশীদার করা হয়েছে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের পূর্বে সে তাঁর কাছে যে চিঠি লিখেছিল তাতে বলা হয়েছিলঃ

(আরবী***************************************পিডিএফ ১৮৫ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “আল্লাহর রসূল মুসাইলামার তরফ হতে আল্লাহর রসূল মুহাম্মদের নিকট। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি জেনে রাখুন, আমাকে আপনার সাথে নবুয়াতের কাজে শরীক করা হয়েছে”।–(তারারী, ২য় খণ্ড, ৩৯৯ পৃষ্ঠা, মিসরে মুদ্রিত)। এছাড়াও তাতে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ’ বাক্যটিও বলা হত।

এভাবে সুস্পষ্ট ভাষায় রিসারাতে মুহাম্মদীকে স্বীকার করে নেয়ার পরও তাঁকে কাফের ও ইসলাম বহির্ভূত গণ্য করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে। ইতিহাস থেকে এ কথাও প্রমাণিত যে, বনু হুনায়ফা সরল অন্তঃকরণে (in good faith)  তাঁর ওপর ঈমান এনেছিল। অবশ্যি তারা এ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েছিল যে, নবী মুহাম্মদ (সা) নিজেই তাকে তাঁর নবুয়াতের কাজে শরীক করেছেন। এ ছাড়াও আর একটা কথা হল এই যে, এমন এক ব্যক্তি তাদের সামনে কুরআনের আয়াতকে মুসাইলামার ওপর অবতীর্ণ আয়াত হিসেবে পেশ করেছিল যে, মদীনা তাইয়েবা থেকে কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করে গিয়েছিল। (ইবনে কাসীর লিখিত আল বেদয়া ওয়ান নেহায়া, ৫ম খণ্ড, ৫১ পৃষ্ঠা)। এতদসত্ত্বেও সাহাবায়ে কেরাম (রা) তাদেরকে মুসলমান বলে স্বীকার করেননি। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। এরপর মুরতাদ হওয়ার কারণে নয়, বরং বিদ্রোহের অপরাধে সাহাবীগণ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, এ কথা বলার সুযোগ নেই বিদ্রোহী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যদি কখনও যুদ্দ করতে হয় তাহলে ইসলামী আইন অনুযায়ী তাদের যুদ্ধবন্দীদেরকে গোলাম বানান যাবে না। মুসলমানই বা কেন জিম্মীর বিদ্রোহ ঘোসনা করলে, গ্রেফতার হওয়ার পর তাদেরকেও গোলাম বানান যাবে না। কিন্তু মুসাইলামা ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) ঘোষনা করেনঃ তাদের মেয়েদের ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেদেরকে গোলাম বানান হবে। গ্রেফতার করার পর দেখা গেলো সত্যিই তাদেরকে গোলাম বানানো হয়েছে। হযরত আলী (রা) তাদের মধ্য থেকেই এক যুদ্ধবন্দিনীর মালিক হন। এ যুদ্ধবন্দিনীর গর্ভজাত পুত্র মুহাম্মদ হানাফীয়া-[হানাফীয়া অর্থ হানাফীয়া গোত্রের মেয়ে।] হলেন পরবর্তীকালে ইসলামের সর্বজন পরিচিত ব্যক্তি।–(আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৩১৬-৩২৫ পৃঃ)।

এ থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সাহাবায়ে কেরাম যে অপরাধের কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন তা বিদ্রোহজনিত অপরাধ ছিল না বরং সে অপরাধ ছিল এই যে, এক ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা)-এর পর নবুয়াতের দাবী করে এবং লোকেরা তাঁর ওপর ঈমান আনে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের পরপরই এ পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা) আর সাহাবীদের সমগ্র দলটি একযোগে তাঁর সহায়তা করেন। সাহাবীদের ইজমার এর চেয়ে সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত কি হতে পারে!

আলেম সমাজের ইজমা

শরয়াতে সাহাবীদের ইজমার পর চতুর্থ পর্যায়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হচ্ছে সাহাবীদের পরবর্তীকালের আলেম সমাজের ইজমা। এদিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় হিজরী প্রথম শতক থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগের সমগ্র মুসরিম জাহানের প্রত্যেক এলকার আলেম সমাজ হামেশাই এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যেঃ

মুহাম্মদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে কোনো ব্যক্তি নবী হতে পারে না এবং তাঁর পর যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করবে বা যে ব্যক্তি এ মিথ্যা দাবী মেনে নেবে, সে কাফের। মিল্লাতে ইসলামীয়ার মধ্যে তার স্থান নেই।

এ ব্যাপারে কতিপয় প্রমাণ উপস্থাপন করছিঃ

একঃ ইমাম আবু হানিফার (৮০-১৫০ হিঃ) যুগে এক ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করে।

সে বলেঃ আমাকে সুযোগ দাও, আমি আমার নবুয়াতের সাংকেতিক চিহ্ন পেশ করব। এ কথা শুনে ইমাম সাহেব বলেনঃ যে ব্যক্তি এর কাছ থেকে কোনো সাংকেতিক চিহ্ন তলব করবে সেও কাফের হয়ে যাবে। কেননা রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, (আরবী*******) “আমার পর আর কোনো নবী নেই”। (মানাকিব ইমাম আযম আবু হানিফা, ইবনে আহমদ মক্কী লিখিত, ১ম খণ্ড, ১৬১ পৃঃ, হায়দ্রাবাদে প্রকাশিত ১৩২১ হিঃ)।

দুইঃ আল্লামা ইবনে জারীর তাবার (২২৪-৩১০ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত কুরআনের তাফসীরে (আরবী***********) আয়াতটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ (আরবী***************) অর্থাৎ “যিনি নবুয়াতকে খতম করে দিয়েছেন এবং তার ওপর মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। কাজেই কিয়ামত পর্যণ্ত এর দরজা আর কারো জন্যে খুলবে না”।–(তাফসরে ইবনে জারীর, ২২ খণ্ড, ১২ পৃষ্ঠা)।

তিনঃ ইমাম তাহাবী (২৩৯-৩২১ হিঃ) তাঁর ‘আকীদায়ে সালফীয়া’ গ্রন্থে পূর্ববর্তী নেতৃস্থানীয় আলেমগণ বিশেষ করে ইমাম আবু হানিফা (র), ইমাম আবু ইউসুফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র)-এর আকীদা বর্ণনা প্রসঙ্গে নবুয়াত সম্পর্কিত নিম্নোক্ত আকীদা লিপিবদ্ধ করেছেনঃ “আর মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর প্রিয় বান্দা, তাঁর বাছাই করা নবী ও প্রিয় রসূল। আর তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মুত্তাকীদের ইমাম, রসূলদের নেতা ও রব্বুল আলামীদের বন্ধু। তাঁর পরে নবুয়াতের প্রত্যেকটি দাবী গোমরাহী ও স্বার্থপূজারী নামান্তর”।–(শারহুত তাহাবীয়া ফিল আকীদাতিস সালফিয়া, দারুল মা’আরিফ, মিসর, পৃষ্ঠা ১৫, ৮৭, ৯৬,৯৭,১০০ ও ১০২)।

চারঃ আল্লামা ইবনে হাযম আন্দালুসী (৩৮৪-৪৫৬ হিঃ) লিখেছেনঃ “নিসন্দেহে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পরে অহীর সিলসিলা খতম হয়ে গেছে। এর স্বপক্ষে যুক্তি হচ্ছে এই যে, অহী আসে একমাত্র নবীর কাছে এবং মহান আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারও পিতা নয় কিন্তু সে আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী”।–(আল মুহাল্লা, ১ম খণ্ড, ২৬ পৃঃ)।

পাঁচঃ ইমাম গাজ্জালী (৪৫০-৫০৫ হিঃ) বলেনঃ –[ইমাম গাজ্জালীর বক্তব্য তাঁর আসল ভাসায় একানে হুবহু উদ্ধৃত করলাম। এর কারণ হচ্ছে খতমে নবুয়াত অস্বীকারকারীরা অত্যন্ত জোরেশোরে এ বরাতটির নির্ভূলতাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।–(গ্রন্থকার)]

(আরবী***********************************************************************************পিডিএফ ১৮৭ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ “যদি এ দরজা (ইজমাকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করার দরজা) খুলে দেয়া হয়, তাহলে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ। যেমন, কোনো ব্যক্তি যদি বলে আমাদের নী মুহাম্মদ (সা)-এর পরে অন্য কোন নবীর আগমন সম্ভব, তাহলে তাকে কাফের আখ্যা দেয়ার ব্যাপারে ইতস্ততঃ করাজে জায়েয প্রমাণ করতে হলে নিসন্দেহে ইজমার আশ্রয় নিতে হবে। কারণ বুদ্ধি তার নাজায়েয হবার সিদ্ধান্ত দেয় না। আর কুরআন ও হাদীসের ব্যাপারে বলা যায়, এ আকীদা সম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেঃ ‘আমার পরে আর নবী নেই’ এবং ‘শেষ নবী’ এ বাক্য দু’টির মনগড়া অর্থ করা মোটেই কঠিন হবে না। সে বলতে পারে ‘শেষ নবী’ অর্থ শ্রেষ্ঠ পয়গন্বরদের আগমনের সমাপ্তি। আর যদি বলা হয় ‘নাবীয়্যীন’ শব্দ সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তাহলে এ সাধারনকে বিশ্লেষণ করা তার পক্ষে মোটেই কঠিন হবে না। আমার পরে আর নবী নেই –এ বাক্যটি সম্পর্কে সে বলতে পরে, ‘এ কথা তো বলা হয়নি যে আমার পরে আর রসূল নেই’। রসূল ও নবীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নবীর মর্যাদা রসূলের চেয়ে বেশী। মোটকথা এ ধরনের বহু আজেবাজে কথা বলা যেতে পারে। আর নিছক শাব্দিক বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন মনগড়া অর্থ করার পথ বন্ধ করা সম্ভবও নয়। বরং উপমায় বহিরঙ্গের (মনগড়া) অর্থ করার ব্যাপারে এর চেয়েও দূরবর্তী অর্থের সম্ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। আর এ ধরনের অর্থ গ্রহণকারীদের সম্পর্কে আমরা এ কথা বলতে পারি না যে, তারা কুরআন ও হাদীস অস্বীকার করছে। কিন্তু এদর বক্তব্যের প্রতিবাদে আমরা বলবো, সমগ্র মুসলিম উম্মত সর্বসম্মিলিতভাবে এ শব্দ (অর্থাৎ আমার পরে আর নবী নেই) ও নবী করীম (সা)-এর অবস্থা থেকে এ কথাই বুঝেছে যে, নবী করীম (সা)-এর বক্তব্যের অর্থ ছিলঃ তাঁর অবস্থা থেকে এ কথাই বুঝেছে যে, নবী করীম (সা)-এর বক্তব্যের অর্থ ছিলঃ তাঁর পরে না আর কোনো নবী আসবে, না রসূল। তাছাড়া সমগ্র মুসলিম উম্মত একযোগে সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, এ ব্যাপারে কোনো প্রকার তা’বীল, মনগড়া বা দূরবর্তী অর্থ গ্রহণের কোনো অবকাশ নেই। কাজেই এহেন ব্যক্তিকে ইজমা অস্বীকারকারী ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না”। -(আল ইকতিসাদ ফিল ইতিকাদ, আল মাতবা’আতুল আবদীয়া, মিসর, ১১৪ পৃষ্ঠা)।

ছয়ঃ মুহীউস সুন্নাহ বাগাবী (মৃত্যুঃ ৫১০ হিঃ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থ মা’আলিমুত তানযীল-এ লিখেছেনঃ রসূলুল্লাহ (সা)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা নবুয়াতের সিলসিলা খতম করেছেন। কাজেই তিনি সর্বশেষ নবী …… ইবনে আব্বাস বলেন, আল্লাহ তায়ালা (এ আয়াতে) ফায়সালা করে দিয়েছেন যে, মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী হবে না।–(৩য় খণ্ড, ১৫৮ পৃঃ)।

সাতঃ আল্লামা যামাখশারী (৪৬৭-৫৩৮ হিঃ) তাফসীরে কাশশাফে লিখেছেন যদি তোমরা বল, রসূলুল্লাহ (সা) শেষ নবী কেমন করে হলেন, যেখানে হযরত ঈসা (আ) শেষ যুগে অবতীর্ণ হবেন, তাহলে আমি বলব, রসূলুল্লাহ (সা)-এর শেষ নবী হওয়ার অর্থ হল, তাঁর পরে আর কাউকে নবীর পদে প্রতিষ্ঠিত করা হবে না। হযরত ঈসা (আ)-কে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পূর্বে নবী বানান হয়েছে। পরবর্তীকালে অবতীর্ণ হওয়ার পর তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীয়াতের অনুসারী হবেন এবং তাঁর কিবলার দিকে মুক করে নামায পড়বেন। অর্থাৎ তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত”।–(২য় খণ্ড, ২১৫ পৃঃ)।

আটঃ কাজী ইয়ায (মৃত্যুঃ ৫৪৪ হিঃ) লিখেছেন, যে ব্যক্তি নিজে নবুয়াতের দাবী করে অথবা নিজের প্রচেষ্টায় নবুয়াত অর্জন করা এবং অন্তত পরিশুদ্ধির মাধ্যমে নবীর পর্যায়ে উন্নীত হওয়া সম্ভব মনে করে (যেমন কোনো কোনো দার্শনিক ও বিকৃতমনা সুফী মনে করেন), এভাবে যে ব্যক্তি নবুয়াতের দাবী করে না অথচ তার ওপর অহী নাযিল হবার দাবী করে –এ ধরনের সমস্ত লোক কাফের এবং রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। কেননা তিনি খবর দিয়েছেন যে, তিনি শেষ নবী এবং তাঁর পরে আর কোনো নবী আসবে না। আবার তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে খবর দিয়েছেন যে, তিনি নবুয়াতের পরিসমাপ্তি টেনেছেন এবং সমগ্র মানব জাতির জন্যে তাঁকে পাঠান হয়েছৈ। সমগ্র মুসলিম সমাজ এ ব্যাপারে একমত যে, এখানে কথাটির বাহ্যিক অর্থই গ্রহণীয় এবং এর দ্বিতীয় কোনো অর্থ গ্রহণ করার সুযোগই এখানে নেই। কাজেই উল্লিখিত দলগুলোর কাফের হওয়া সম্পর্কে কুরআন, হাদীস ও ইজমার দৃষ্টিতে কোনো সন্দেহ নেই।–(শিফা, ২য় খণ্ড, ২৭০-২৭১ পৃঃ)।

নয়ঃ আল্লামা শাহারিস্তান (মৃত্যুঃ ৫৪৮ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত আলমিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থে লিখেছেনঃ আর এভাবে যে ব্যক্তি বলে …..মুহাম্মদ (সা)-এর পর কোনো নবী আসবে [হযরত ঈসা (আ) ছাড়া], তার কাফের হবার ব্যাপারে দু’জন লোকের মধ্যেও কোনো মতবিরোধ নেই।–(৩য় খণ্ড, ২৪৯ পৃঃ)।

দশঃ ইমাম রাযী (৫৪৩-৬০৬ হিঃ) তাঁর তাফসীরে কবীর গ্রন্থে ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেনঃ এ বর্ণনা প্রসঙ্গে ‘খাতামান নাবীয়্যীন’ শব্দ বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, যে  নবীর পরে অন্য কোনো নবী আসবেন তিনি যদি উপদেশ ও নির্দেশাবলীর ব্যাপারে কিছু অপূর্ণ রেখে যান তাহলে তাঁর পরে আগমনকারী নবী তা পূর্ণ করতে পারবেন কিন্তু যাঁর পর আর কোনো নবী আসবেন না তিনি নিজের উম্মতের ওপর খুব বেশী স্নেহশীল হন এবং তাদেরকে সুস্পষ্ট নেতৃত্ব দান করেন। কারণ তাঁর দৃষ্টান্ত এমন একজন পিতার ন্যায় যিনি জানেন তাঁর মৃত্যুর পর পুত্রের আর কোনো অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষক থাকবে না।–(৬ষ্ঠ খণ্ড, ৫৮১ পৃঃ)।

এগারঃ আল্লামা বায়যাবী (মৃঃ ৬৮৫ হিঃ) তাঁর তাফসীরে ‘আনওয়ারুত তানযীল’ গ্রন্থে লিখেছেনঃ অর্থাৎ তিনিই শেষ নবী। তিনি নবীদের সিলসিলা খতম করে দিয়েছেন। অথবা তাঁর কারণেই নবীদের সিলসিলার ওপর মোহর লাগান হয়েছে। আর তাঁর পরে হযরত ঈসা (আ)-এর নাযিল হওয়ার কারণে খতমে নবুয়াতের ওপর কোনো দোষ আসছে না। কারণ তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর দ্বীনের অনুসারী হয়ে নাযিল হবেন।–(৪র্থ খণ্ড, ১৬৪ পৃঃ)।

বারঃ আল্লামা হাফেজ উদ্দীন নাসাফী (মৃঃ ৮১০ হিঃ) তাঁর তাফসীরে মাদারেকুত তানযীল গ্রন্থে লিখেছেনঃ আর রসূলুল্লাহ (সা) হচ্ছেন খাতামুন নাবীয়্যীন। অর্থাৎ তিনিই সর্বশেষ নবী। তাঁর পরে আর কোনো ব্যক্তিকে নবী করা হবে না। হযরত ঈসা (আ) এর ব্যাপারটি হচ্ছে এই যে, তাঁকে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পূর্বে নবীর পদে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। পরে যখন তিনি নাযিল হবেন তখন তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীয়াতের অনুসারী। অর্থাৎ তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর উম্মত।–(৪৭১ পৃঃ)।

তেরঃ আল্লামা আলাউদ্দীন বাগদাদী (মৃঃ ৭২৫ হিঃ) তাঁর তাফসীরে খাযেন গ্রন্থে লিখেছেনঃ (আরবী******) অর্থাৎ আল্লাহ রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর নবুয়াত খতম করে দিয়েছেন। কাজেই তাঁর পরে আর কোনো নবুয়াত নেই এবং তাঁর পরে তাঁর নবুয়াতের কোনো অংশীদারও নেই। (আরবী**********) অর্থাৎ আল্লাহ এ কথা জানেন যে, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই।–(৪৭১-৪৭২ পৃষ্ঠা)।

চৌদ্দঃ আল্লামা ইবনে কাসীর (মৃঃ ৭৪ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত তাফসীরে লিখেছেন অতপর আলোচ্য আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই। আর যখন তাঁর পরে কোনো নবী নেই তখন রসূলের প্রশ্নই ওঠে না। কেননা রিসালাত একটা বিশেষ পদপর্যাদা এবং নবুয়াতের পদমর্যাদা সাধারণধর্মী প্রত্যেক রসূল নবী হন কিন্তু প্রত্যেক নবী রসূল হন না। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর যে ব্যক্তি এ পদমর্যাদার দাবী করবে সে হবে মিথ্যাবাদী, প্রতারক, দাজ্জাল, গোমরাহ এবং অন্যকে গোমরাহকারী। সে যতই প্রাকৃতিক নিয়মে বিপর্যয় সৃষ্টি করে ও জাদুর তেলেসমতী দেখিয়ে মানুষের চোখে ধুম্রজাল সৃষ্টি করুক না কেন তার দাবী মানা যেতে পারে না। …. কিয়ামত পর্যন্ত এ পদমর্যাদার দাবীদার প্রত্যেকটি ব্যক্তির অবস্থা একই ধরনের হবে।–(৩য় খণ্ড, ৪৯৩-৪৯৪ পৃঃ)

পনেরঃ আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী (মৃঃ ৯১১ হিঃ) তাঁর তাফসীরে জালালায়েন গ্রন্থে লিখেছেনঃ (আরবী*************) অর্থাৎ আল্লাহ জানেন যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর আর কোনো নবী নেই এবং হযরত ঈসা (আ) নাযিল হওয়ার পর রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীয়াত অনুযায়ী আমল করবেন”।–(৭৬৮ পৃঃ)।

ষোলঃ আল্লামা ইবনে নুজাইম (মৃঃ ৯৭০ হিঃ) উসূলে ফিকাহর মহুর কিতাব আল আশবাহ ওয়ান নাযায়ের-এর ‘কিতাবুস সিয়ারের বাবুর রিদ্দা’য় লিখেছেনঃ যদি কেউ নবী মুহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী মনে না করে, তাহলে সে মুসলমান নয়। কেননা এ কথাগুলো জানা ও এগুলোকে স্বীকার করে নেয়া দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত।–(১৭৯ পৃষ্ঠা)।

সতেরঃ শায়খ ইসমাঈল হাক্কী (মৃত্যু ১১৩৭ হিঃ) তাফসীরে রুহুল বয়ান গ্রন্থে উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লিখেছেনঃ আসেম-[তাজবীদ শাস্ত্রের বিখ্যাত ইমাম।–(অনুবাদক)] ‘খাতাম’ শব্দটির ‘তা’ এর ওপর জবর লাগিয়ে পড়েছেন। এর অর্থ হয় খতম করার যন্ত্র, যার সাহায্যে মোহর লাগান হয়।

অর্থাৎ রসূলুল্লাহ (সা) সকল নবীর শেষে এসেছেন এবং তাঁর সাহায্যে নবীদের সিলসিলার ওপর মোহর লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। ফারসীতে একে বলা হবে ‘মোহরে পয়গম্বঁরা’। অর্থাৎ তাঁর সাহায্যে নবুয়াতের দরজা মোহর লাগিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং পয়গম্বরদের সিলসিলা খতম করে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য ক্বারীগণ ‘তা’ এর নীচে জের লাগিয়ে পড়েছেন ‘খাতিমুন নাবীয়্যীন’। এর অর্থ হয়, তিনি ছিলেন মোহরকারী। অন্য কথায় বলা যায়, পয়গম্বরদের ওপর মোহরকারী। এভাবে এ শব্দটিও ‘খাতাম’-এর সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর তাঁর উম্মতের আলেম সমাজ এখন উত্তরাধিকার সূত্রে পাবেন একমাত্র তাঁর প্রতিনিধিত্ব। তাঁর ইন্তেকালের সাথে সাথেই নবুয়াতের উত্তরাধিকারেরও পরিসমাপ্তি ঘটেছে এবং তাঁর পরে হযরস ঈসা (আ)-এর নাযিল হওয়ার ব্যাপারটি তাঁর নবুয়াতকে ত্রুটিযুক্ত করবে না। কেননা খাতিমুন নাবীয়্যীনের অর্থ হচ্ছে এই যে, তাঁর পরে আর কাউকে নবী বানান হবে না এবং হযরত ঈসা (আ)-কে তাঁর পূর্বে নবী বানান হয়েছে। কাজেই তিনি রসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসারীদের মধ্যে শামিল হবেন, রসূলুল্লাহ (সা)-এর কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়বেন এবং তাঁরই উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হবেন। তখন হযরত ঈসা (আ)-এর ওপর অহী নাযিল হবে না এবং তিনি কোনো নতুন আহকাম জারি করবেন না। বরং তিনি হবেন রসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতিনিধি। …..আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সর্বসম্মত বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের নবীর পরে কোনো নবী নেই। কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ (আরবী********************) অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রসূল ও শেষ নবী। আর রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ (আরবী*****) “আমার পরে আর কোনো নবী নেই”। কাজেই বর্তমানে যে ব্যক্তি বলবে, মুহাম্মদ (সা)-এর পরে নবী আছে, তাকে কাফের বলা হবে। কারণ সে কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট ঘোষণাকে অস্বীকার করবে। কারণ সুস্পষ্ট যুক্তি প্রমাণের পর হক বাতিল থেকে পৃথক হয়ে গেছে। আর যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা)-এর নবুয়াদের দাবী করবে তার দাবী বাতিল হয়ে যাবে।–(২২ খণ্ড, ১৮৮ পৃষ্ঠা)।

ঊনিশঃ ফতওয়া-ই-আলমগীরীঃ হিন্দুস্তানের বাদশাহ আলমগীরের নির্দেশে বারশ’ হিজরীতে উপমহাদেশের বিশিষ্ট আলেমগণ সম্মিলিতভাবে এ কিতাবটি লিপিবদ্ধ করেন। এতে বলা হয়েছেঃ যদি কেউ মনে করে মুহাম্মদ (সা) শেষ নবী নয়, তাহলে সে মুসলিম নয়। আর যদি সে নিজেকে আল্লাহর রসূল বা পয়গম্বর বলে দাবী করে তাহলে তাকে কাফের বলে আখ্যায়িত করা হবে।–(২য় খণ্ড, ২৬৩ পৃষ্ঠা)।

বিশঃ আল্লামা শওকানী (মৃত্যু ১২৫৫ হিজরী) তাঁর তাফসীর ফাতহুল কাদীরে লিখেছেনঃ সমগ্র মুসলিম সমাজ ‘তা’ এর নীচে যের লাগিয়ে ‘খাতিম’ শব্দটি পড়েছেন। একমাত্র আসেব যবর লাগিয়ে পড়েছেন। প্রথমটার অর্থ হল, রসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত নবীদের ধারাবাহিকতা খতম করেছেন অর্থাৎ তিনি সবার শেষে এসেছেন। আর দ্বিতীয়টার অর্থ হল, তিনি সমস্ত পয়গম্বরদের জন্যে মোহরের ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর অর্থ হল, তিনি সমস্ত পয়গম্বরদের জন্যে মোহরের ভূমিকা পালন করেছেন এবং তাঁর সাহায্যে নবীদের সিলসিলা মোহর এঁটে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর ফলে তাদের দলটি সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়েছে।–(৪র্থ খণ্ড, ২৭৫ পৃষ্ঠা)।

একুশঃ আল্লামা আলুসী (মৃত্যু ১২৮০ হিজরী) তাফসীরে ‘রুহুল মা’আনী’তে লিখেছেনঃ নবী শব্দটি রসূলের চেয়ে বেশী সাধারণ অর্থব্যঞ্জক। কাজেই রসূলের খাতামুন নাবীয়্যীন হবার অর্থ হল এই যে, তিনি খাতামুল মরসালীনও। তিনি শেষ নবী এবং শেষ রসূল এ কথার অর্থ হলো, এ দুনিয়ায় তাঁর নবুয়াতের গুণে গুণান্বিত হওয়ার পরেই মানুষ ও জ্বিনের মধ্য থেকে এ গুণটি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।–(২২ খণ্ড, ৩২ পৃষ্ঠা)। রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর যে ব্যক্তি নবুয়াতের অহী লাভ করার দাবী করবে তাকে কাফের বলে গণ্য করা হবে। এ ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে দ্বিমতের অবকাশ নেই।–(২২ খণ্ড, ৩৮ পৃষ্ঠা)। রসূলুল্লাহ (সা) শেষ নবী –এ কথাটি কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ (সা) শেষ নবী –এ কথাটি কুরআন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছে। রসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত এটিকে সুস্পষ্টরূপে ব্যাখ্যা করেছে এবং সমগ্র মুসলিম সমাজ এর ওপর আমল করেছে। কাজেই যে ব্যক্তি এর বিরোধী কোন দাবী করবেন, তাকে কাফের গণ্য করা হবে।–(২২ খণ্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা)

হিন্দুস্তান থেকে মরক্কো ও আন্দালুসিয়া এবং তুরস্ক থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত মুসলিম জাহানের শ্রেষ্ঠ আলেম, ফকীহ, মুফাসসির ও মুহাদ্দিসগণের ব্যাখ্যা এবং মতামত আমি এখানে উল্লেখ করলাম। তাঁদের নামের সাথে সাথে তাঁদের জন্ম ও মৃত্যু তারিখও উল্লেখ করেছি। এ থেকে প্রথম দৃষ্টিতেই যে কোন ব্যক্তি আন্দাজ করতে পারবেন যে, হিজরীর প্রথম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আলেমগণ এর মধ্যে শামিল আছেন। হিজরী চতুর্দশ শতকের আলেম সমাজের মতামতও আমি এখানে উল্লেখ করতে পারতাম। কিন্তু ইচ্ছা করেই তাদের মতামতের উদ্ধৃতি দেইনি। কারণ তাদের মতামত ও ব্যাখ্যার জবাবে কেউ হয়তো এ কথা বলতে পারেন যে, তাঁরা এ যুগের নবুয়াতের দাবীদারের প্রতি জিদের বশবর্তী হয়ে খতমে নবুয়াতের এ অর্থ বিবৃত করেছেন। তাই আমি পূর্ববর্তী যুগের আলেম সমাজের মতামতের উদ্ধৃতি দিয়েছি। বলা বাহুল্য আজকের যুগের কারও সাথে তাদের কোন বিরোধের প্রশ্নই উঠে না। এসব মতামত থেকে এ কথা চুড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, হিজরীর প্রথম শতক থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম জাহান একযোগে খাতামুন নাবীয়্যীন শব্দের অর্থ নিয়েছে শেষ নবী। প্রত্যেক যুগের মুসলমানরা এ একই আকীদা পোষণ করেছে যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর পর নবুয়াতের দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। মুসলমানদের মধ্যে এ ব্যাপারেও কোনোকারে কোনো মতবিরোধ হয়নি যে, নবী মুহাম্মদ (সা)-এর পরে যে ব্যক্তিই রসূল অথবা নবী হবার দাবী করবে আর যে ব্যক্তি তার দাবী মেনে নেবে তারা কাফের হয়ে যাবে।

এ আলোচনার প্রেক্ষিতে প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তিই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন যে, খাতামান নাবীয়্যীন শব্দের যে অর্থ আরবী অভিধান থেকে প্রমাণিত হয়, কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনা থেকে যে অর্থ প্রতীয়মান হয়, রসূলুল্লাহ  (সা)-এর যা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সাহাবায়ে কেরাম যে ব্যাখ্যার মতৈক্য প্রকাশ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামের পর থেকে আজ পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম সমাজ দ্ব্যর্থহীনভাবে যা স্বীকার করে আসছেন, তার বিপক্ষে দ্বিতীয় কোনো অর্থ গ্রহণ অর্থাৎ কোনো নতুন দাবীদারের জন্যে নবুয়াতের দরজা উন্মুক্ত করার অবকাশ ও সুযোগ থাকে কি? আর সেই সব লোককেও বা কেমন করে মুসলমান বলে স্বীকার করে নেয়া যায় যারা নবুয়াতের দ