সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবুয়াতের প্রয়োজন ও তাৎপর্য

মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন

(আরবী****************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“আর সোজা পথ বলে দেয়ার দায়িত্ব আল্লাহর ওপর, যেখানে বাঁকা পথও  রয়েছে”।

তাওহীদ, রহমত ও আল্লাহর সমগ্র ‘রবুবিয়াতের’ স্বপক্ষে যুক্তি পেশ করতে গিয়ে এখানে ইঙ্গিতে নবুয়াতের স্বপক্ষে যুক্তিও পেশ করা হয়েছে। এ যুক্তির সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছেঃ

দুনিয়ার মানুষের জন্যে চিন্তা ও কর্মের বহুবিধ পথ সম্ভবপর এবং বাস্তবে তা রয়েছেও। বলা বাহুল্য একই সময় এসব পথের প্রত্যেকটির সত্য হতে পারে না। সত্য মাত্র একটিই হয়ে থাকে। একমাত্র সঠিক জীবন পদ্ধতি তাই হতে পারে যা নির্ভুল জীবন দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

এ নির্ভুল মতাদর্শ ও সঠিক পথটি জানা প্রত্যেকটি মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বরং এটিই আসল মৌলিক প্রয়োজন। একটি উচ্চ পর্যায়ের জীব হবার কারণে মানুষের যে সমস্ত বস্তুর প্রয়োজন হয় অন্যান্য যাবতীয় বস্তু তার কেবলমাত্র সেই প্রয়োজনগুলোই পূরণ করে কিন্তু এটি এমন একটি প্রয়োজন যা মানুষ হিসেবে তার জন্য অপরিহার্য এ প্রয়োজনটি পূরণ না হবার অর্থই হচ্ছে মানুষের সমগ্র জীবন ব্যর্থ হয়ে গেছে।

এখন চিন্তার বিষয় হচ্ছে, যে খোদা মানুষকে অস্তিত্ব দান করার পূর্বে তার জন্যে এতসব উপকরণ ও সাজসরঞ্জাম যোগাড় করে রেখেছেন এবং তাকে অস্তিত্ব দান করার পর তার জৈব জীবনের প্রত্যেকটি প্রয়োজন পূরণ করার জন্যে এত নিখুঁতভাবে ব্যাপক পর্যায়ে ব্যবস্থা করেছেন, তিনি মানুষের জীবনের সবচেয়ে এই বড় প্রয়োজন ও আসল প্রয়োজনটি পূরণ করার ব্যবস্থা করেননি, এ কথা কি কল্পনা করা যেতে পারে?

নবুয়াতের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাটি সম্পন্ন করা হয়েছে। যদি কেউ নবুয়াতকে অস্বীকার করতে চান তাহলে মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ আর কি ব্যবস্থা করেছেন –একথা অবিশ্যি তাকে বলতে হবে। এর জবাবে এ কথা বলে কেউ নিষ্কৃতি পেতে পারেন না যে, পথ অনুসন্ধান করার জন্যে আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি দিয়ে রেখেছেন। কারণ মানুষের বুদ্ধি ও চিন্তা পূর্বেই অসংখ্য পথ আবিস্কার করে রেখেছে। এটি তার সরল-সঠিক-সোজা পথের নির্ভুল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। অন্যদিকে এ কথা বলাও সম্ভব নয় যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের পথ প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থাই করেননি। কারন আল্লাহর ব্যাপারে বোধ হয় এর চেয়ে বড় কুধারণা আর কিছুই হতে পারে না যে, জীব হিসেবে আমাদের প্রতিপালন, বুদ্ধি ও বিকাশ সাধনের পুরোপুরি ব্যবস্থা তিনি করেছেন কিনউত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার কোন ব্যবস্থাই তিনি করেননি বরং এক্ষেত্রে আমাদেরকে অন্ধকারে ছেড়ে দিয়েছে।

বাধ্যতামূলক হেদায়াতের পরিবর্তে ইসলামী হেদায়াত

(আরবী**************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ চাইলে তোমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করতেন”।

-(সূরা আন নাহলঃ ৯)

অর্থাৎ যদিও আল্লাহ তায়ালার পক্ষে তাঁর এ দায়িত্ব (বা তিনি নিজে মানুষজাতির হেদায়েতের জন্য নিকের ওপর ন্যস্ত করেছেন) এমনভাবে আদায় করা সম্ভব ছিল, যার ফলে অন্যান্য স্বাধীন ক্ষমতাহীন সৃষ্টির ন্যায় সমস্ত মানুষকে জন্মগতভাবে প্রদপ্রদর্শন করা যেত, কিন্তু একটি আল্লাহর ইচ্ছা মত ভুল নির্বিশেষে যে কোন পথ অবলম্বন করার স্বাধীনতা রাখে। এই স্বাধীনতা ব্যবহার করার জন্য তাকে জ্ঞানের মাধ্যমে দান করা হয়েছে। বুদ্ধি ও চিন্তার ক্ষমতা দান করা হয়েছে। ইচ্ছা ও সংকল্পের শক্তি দান করা হয়েছে। নিজের ভেতরের ও বাইরের অসংখ্য বস্তু ব্যবহার করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এ সঙ্গে ভেতরে বাইরে সর্বত্র এমন অসংখ্য কার্যকারণ রেখে দেয়া হয়েছে যা তার জন্যে সৎপথ লাভ ও পথভ্রষ্ট উভয়েরই কারণ হতে পারে। তাকে জন্মগতভাবে সৎপথ অবলম্বনকারী বানিয়ে দিলে এসব কিছুই অর্থহীন হয়ে যেত। তাহলে উন্নতির উচ্চতম শিখরে আরোহন করা মানুষের পক্ষে সম্ভব হত না, যা কেবলমাত্র স্বাধীনতার যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমেই সে লাভ করতে পারে। তাই মানুষের হেদায়াতের জন্যে আল্লাহ তায়ালা বাধ্যতামূলক হেদায়াতের পন্থা পরিহার করে নবুয়াত ও রিসালাতের পন্থা অবলম্বন করেছেন এভাবে মানুষের স্বাধীনতা বহাল থাকবে, তার পরীক্ষার উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে এবং সরল-সোজা-সৎপথও যুক্তিগত উপায়ে তার সামনে পেশ করা হবে।

 

বৈষয়িক ও নৈতিক জীবনে সৎপথের নিদর্শনের প্রয়োজন

(আরবী**************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“তিনি পৃথিবীতে পথনির্দেশকারী চিহ্নসমূহ রেখে দিয়েছেন এবং তারকার সাহায্যেও লোকেরা পথের সন্ধান পায়”। -(সূরা আন নাহলঃ ১৬)।

অর্থাৎ আল্লাহ সমস্ত পৃথিবীটাকে একই ধরনের তৈরী করেননি। বরং পৃথিবীর প্রত্যেক এলাকাকে বিভিন্ন প্রকারের ও বিশেষ নিদর্শনাদি (Land Marks) দিয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। এর ফলে মানুষ বিভিন্নভাবে উপকৃত হচ্ছে। নিজের পথ ও গন্তব্য চিনে নিতে পারছে। এটি এর বিভিন্ন প্রকার উপকারের অন্যতম। আল্লাহ এ নিয়ামত ও দানটির যথার্থ মূল্য মানুষ একমাত্র তখনই অনুধাবন করতে পারে যখন তার এমন কোন মরুময় এলাকায় যাওয়ার সুযোগ হয় যেখানে এ ধরনের বিশিষ্ট কোন চিহ্নই দেখতে পাওয়া যায় না। ফলে পথ ভুল করার ভয়ে মানুষ সবসময় উৎকণ্ঠিত থাকে। সামুদ্রিক সফরে মানুষ আল্লাহর এ মহান দানটির মূল্য ও মর্যাদা আরও বেশী করে অনুভব করতে পারে। কারণ সেখানে আদতে কোন পথের চিহ্নই থাকে না। কিন্তু মরুভূমি ও সমুদ্রের মধ্যও আল্লাহ মানুষের পথপ্রদর্শনের একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্তা করে রেখেছেন। সে ব্যবস্থাটি হচ্ছে, আকাশের তারকারাজি, যার সাহায্যে মানুষ প্রাচীন যুগ থেকে নিয়ে আজ  পর্যন্ত নিজের পথের সন্ধান লাভ করে যাচ্ছে।

এখানে আবার তাওহীদ, রহম ও ‘নবুবিয়াত’ স্বপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করতে গিয়ে রিসালাতের প্রমাণের প্রতিও সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এ আয়াতটি পড়ার সময় মন স্বতস্ফুর্তভাবে এ বিষয়বস্তুর প্রতি ঝুঁকে পড়ে যে, যে আল্লাহ মানুষের বৈষয়িক জীবনের পথ নির্দেশের এত ব্যাপক ব্যবস্থা করেছেন তিনি কি মানুষের নৈতিক জীবন সম্পর্কে এতই উদাসীন থাকেন? মানুষের নৈতিক জীবনের সামান্যতম পথনির্দেশ দেবার প্রয়োজনও তিনি বোধ করেন না? বলা বাহুল্য, বৈষয়িক জীবনের পথ ভুল করার ক্ষতি যত বড়ই হোক না কেন নৈতিক জীবনে এ ধরনের ভুলের ক্ষতি থেকে তা অনেক গুণে কম। আবার যে করুণাময় মহান আল্লহা মানুষের কল্যাণের প্রতি এত তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন যে পাহাড়ের মধ্য দিয়েও তাদের জন্যে পথ তৈরী করে রেখেছেন, বিরাট বিস্তীর্ণ ধুধু প্রান্তরের মধ্যেও নিশানী দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, মরুভূমি ও সমুদ্রের মধ্যে দিক ভুল করার হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে আকাশে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন, তাঁর সম্পর্কে কেমন করে এ কুধারণা পোষণ করা যেতে পারে যে, তিনি মানুষের নৈতিক কল্যাণের জন্যে কোন পথের সন্ধান দেননি? আর সে পথকে সুস্পষ্ট করার জন্যে কোন নিশানী দাঁড় করিয়ে রাখেননি এবং কোন আলো জ্বালিয়ে তাকে উজ্জ্বল করেননি?

মানুষের জন্যে সচেতন প্রথনির্দেশের গুরুত্ব

(আরবী**************পিডিএফ ৩৯ পৃষ্ঠায়)

“মূসা ফেরাউনকে জবাব দিলেনঃ আমাদের রব হচ্ছেন তিনি যিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে তার গঠনাকৃতি দান করেছেন অতপর তাকে পথনির্দেশ দিয়েছেন”। -(তা-হাঃ ৫০)

অর্থাৎ দুনিয়ার প্রত্যেকটি বস্তুর আকার, আকৃতি, শক্তি, সামর্থ, গুণ, বৈশিষ্ট্য, সবকিছু তিনিই দান করেছেন। যে আকার-আকৃতি লাভ করে হাত দুনিয়ার কাজ করার উপযোগী হতে পারে সেই আকার-আকৃতি দিয়ে তাকে তৈরী করেছেন। পা-কেও তিনি তার উপযোগী আকৃতি দান করেছেন। মানুষ, পশু, উদ্ভীদ, জড় পদার্থ, বাতাস, পানি, আলো ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার বস্তু যে ধরনের আকৃতি লাভ করে পৃথিবীতে নিজেদের অংশের কাজ যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারে তা তিনি তাদেরকে দান করেছেন।

আবার তিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে কেবল তার বিশেষ আকৃতি দান করেই ছেড়ে দেননি বরং এই সঙ্গে তাদরে চলার জন্যে পথনির্দেশও দিয়েছেন। দুনিয়ার এমন কোন বস্তুর সন্ধান পাওয়া যাবে না যে ব্স্তুটি তৈরী করে তাকে বিশেষ আকৃতি দান করার পর তার দেহ সৌষ্ঠবের মাধ্যমে কাজ করে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করার পদ্ধতি তিনি তাকে শেখাননি। কানকে শোনার ও চোখকে দেখার কাজ তিনিই শিখিয়েছে। মাছকে সাঁতার কাটার, পাখিকে উড়ার, গাছকে ফুল ও ফল দেবার এবং মাটিকে উদ্ভিদ, শাক-সবজি ও ফসল দান করার শিক্ষা তিনিই দিয়েছেন। এক কথায় বলা যায়, তিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রত্যেকটি বস্তুর কেবলমাত্র স্রষ্টাই নন, তাদের শিক্ষক এবং পথপ্রদর্শকও।

উপরন্তু এ ছোট্ট একটি বাক্যের মধ্যে হযরত মূসা (আ) ইঙ্গিতে রিসালাতের যুক্তিও পেশ করেছেন। অবশ্য ফেরাউন তা মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল। তাঁর যুক্তির মধ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আল্লাহ সমগ্র বিশ্বজগতের পথপ্রদর্শক, তিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে তার অবস্থা ও প্রয়োজন অনুসারে পথ দেখাচ্ছেন। তাঁর বিশ্বব্যাপী পথনির্দেশকের মর্যাদার অপরিহার্য দাবী হচ্ছে এই যে, তিনি মানুষের সচেতন জীবনে তার পথপ্রদর্শনের জন্যে এমন পদ্ধতি অবলম্বন করবেন না যা মাছ ও পাখির জন্য উপযোগী হতে পারে। এর সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতি হচ্ছে, একজন সচেতন মানুষ তাঁর পক্ষ থেকে সমস্ত মানুষকে পথ দেখাবার জন্য নিযুক্ত হবেন। তিনি মানুষের বুদ্ধি, জ্ঞান ও সচেতনতার প্রতি আবেদন জানিয়ে তাদেরকে সোজা পথ দেখাবেন।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.