সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবুয়াত কি?

দুনিয়ার জীবন যাপনের মানুসের যেসব জিনিসের প্রয়োজন, আল্লাহ নিজেই সেসবের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিশু ভূমিষ্ঠ হবার সময় তার প্রয়োজনীয় যাবতীয় বস্তু সঙ্গে দিয়েই তাকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেখার জন্যে তাকে দেয়া হয় চোখ, শোনার জন্যে কান, ঘ্রাণ ও শ্বাস নেবার জন্যে নাক, অনুভব করার জন্যে শরীরের ত্বকের মধ্যে স্পর্শানুভূতি, চলাফেরা করার জন্যে পা, কাজ করার জন্যে হাত, চিন্তা করার জন্যে মস্তিষ্ক এবং এমনি আরও অসংখ্য জিনিস তার প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বাহ্নেই তার ছোট্ট দেহটির সঙ্গে জড়িয়ে রেখে দেয়া হয়। তারপর দুনিয়ার মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই জীবন ধারনের জন্যে এতসব বস্তু সে লাভ করে যা গণনা করেও শেষ করা যায় না। আলো, বাতাস, উত্তাপ, পানি, মাটি সবকিছু তার জন্যে প্রস্তুত রাখা হয়। মায়ের বুকে দুধের ধারা আগে থেকেই তার জন্যে প্রবাহিত রাখা হয়। মা, বাপ, আত্মীয়-স্বজন এমনকি অন্যদের হৃদয়েও তার জন্যে স্নেহ-প্রীতির ফল্গুধারা প্রবাহিত করা হয়, এর সাহায্যেই সে লালিত-পালিত হয়। অতপর সে যত বড় হতে থাকে সেই অনুসারে দিনের পর দিন তার প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্যে সবরকম বস্তু সে লাভ করতে থাকে। অবস্থা দেখে মনে হয় পৃথিবী ও আকাশের সমস্ত শক্তি যেন তার লালন-পালন ও সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছে।

দুনিয়ায় কাজ করার জন্যে যে পরিমাণ যোগ্যতার প্রয়োজন সকল মানুষকে তা দান করা হয়েছে। দৈহিক শক্তি, বুদ্ধি-বিবেক, বাকশক্তি এবং এ ধরনের আরও বহুতর যোগ্যতা কমবেশী প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিধ্যমান। কিন্তু এখানে আল্লাহ একটি সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। সমস্ত যোগ্যতা সকল প্রকার মানুসকে সমানভাবে দান করেননি। এমনকি কররে কেউ কারও মুখাপেক্ষী হত না। কেউ কারও পরোয়া করতো না। এ জন্যে আল্লাহ সমস্ত মানুষের সামষ্টিক প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যাবতীয় যোগ্যতার সৃষ্টি মানুষদের মধ্যেই করেছেন ঠিকই ক্নিতু এমনভাবে করেছেন যার ফলে এক একজনকে এক একটি যোগ্যতা বেশী করে দিয়েছেন। কেউ কারও তুলনায় শারীরিক পরিশ্রমের শক্তি বেশী লাভ করে। অনেক লোকের মধ্যে জন্মগতভাকে কোন বিশেষ পেশা বা শিল্পের যোগ্যতা বেশী থাকে এবং অন্যেরা থাকে তা থেকে বঞ্চিত। অনেক লোকের মধ্যে বুদ্ধি জ্ঞান অন্যের তুলনায় বেশী থাকে। অনেকে হয় জন্মগত সেনাপতি। অনেকের মধ্যে শাসন কর্তৃত্বে বিশেষ যোগ্যতা থাকে। অতেকে অসাধারণ বাগ্মীতার শক্তি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। অনেকের মধ্যে থাকে জন্মগত অসাধারণ লেখনী শক্তি। এমন অনেক ব্যক্তি দেখা গেছে যারা অংকে খুব পাকাপোক্তা। এমনকি এ বিষয়ের জঠিলতম প্রশ্নগুরোর সমাধান তারা এমনভাবে করে যা অন্যের কল্পনাতীত। এক ব্যক্তি অদ্ভুত অদ্ভুত সব জিনিস আবিস্কার করে। তার আবিস্কারে বিশ্ববাসী স্তম্বিত হয়। আবার এক ব্যক্তিকে দেখা যায় আইনে অসাধারণ পারদর্শী। বছরের পর বছর চিন্তা-ভাবনা করার পর আইনের যেসব জঠিলতম বিষয় অনুধাবন করা কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না, সে এক নজরেই তার গভীর তলদেশে পৌঁছে যায়। এসব যোগ্যতা আল্লাহ প্রদত্ত। কোনো ব্যক্তি নিজের চেষ্টায় নিজের মধ্যে এসব যোগ্যতা –[ এখানে অসাধারণ যোগ্যতাসমূহের কথা বলা হয়েছে। মানুসের সাধারণ যোগ্যতাগুলো শিক্ষা অনুশীলন ও অভ্যাসের মাধ্যমে বিকাশ লাভ করতে পারে। আর অসাধারণ যোগ্যতাগুলো অনেক সময় কোন প্রকার অনুশীলন ছাড়াই এবং সামান্য নাম মাত্র অনুশীলনের মাদ্রমে আত্মপ্রকাম করে। এক্ষেত্রে উন্নত শিক্ষা ও অনুশীলনের মাধ্যমে সেগুলোর বিকাশ সাধরেন চেষ্টা করলে তা এক দৃষ্টান্তমূলক উন্নতমানে পৌঁছে যায়। -(সম্পাদক বৃন্দ)] সৃষ্টি করতে পারে না। এমনকি শিক্ষঅ ও অনুশীলনের সাহায্যেও এসব সৃষ্টি করা সম্ভবপর হয় না। আসরে এগুলো হচ্ছে জন্মগত যোগ্যতা; আল্লাহ নিজের সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন।

মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতির জন্যে যেসব যোগ্যতার বেশী প্রয়োজন হয় সেগুলো বেশী সংখ্যক মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়। আর যেগুলোর প্রয়োজন যত কম সেগুলা সৃষ্টি করা হয় তত কমসংখ্যক মানুষের মধ্যে। সৈনিক বহু জন্মগ্রহণ করে। কৃষক, কর্মকার, তাঁতি এবং এ ধরনের অন্যান্য কাজের যোগ্রতাসম্পন্ন লোক বহুসংখ্যক জন্মলাভ করে। কিন্তু তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতাসম্পন্ন এবং রাজনীতি ও সেনাপতির যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব লোকের সংখ্যা দেখা যায় আরও কম। কারণ তাদের অবদান শত শত বছর ধরে চলে এবং  ফরে মানব সমাজ তাদের ন্যায় যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনবোধ করে না।

মানুষের জীবনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন

চিন্তার বিষয় হচ্ছে, দুনিয়ার মানুষের জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে কেবল এ প্রয়োজনগুলোই তো যথেষ্ট নয়। মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র প্রকৌশলী, অংকবিদ, বৈজ্ঞানিক, আইনবিদ, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন পেশার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের জন্মই তো যথেষ্ট নয়। এসবের চেয়ে আর একটি বড় প্রয়োজন মানুষের কাছে। আর তা হচ্ছে মানুষের মধ্যে এমন কোন ব্যক্তির জন্ম হতে হবে যে মানুষকে দেখাবে আল্লাহর পথ। অন্য লোকদের কাজ হচ্ছে শুধুমাত্র এতটুকুন জানানো যে, দুনিয়ায় মানুষের জন্রে কি কি বস্তু আছে এবং সেগুরো কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিরও প্রয়োজন যিনি মানুষকে একথা জানাবেন যে, মানুষকে কার জন্যে সৃষ্টি কর হয়েছে, দুনিয়ায় কে তাকে এতসব সাজসরঞ্জাম দিয়েছে এবং সেই দাতার ইচ্ছা কি –যে ইচ্ছা অনুযায়ী দুনিয়ায় জীবনযাপন করে সে নিশ্চিত ও চিরন্তন সাফল্য লাভ করতে পারে? এটি হচ্ছে মানুষের আসল, সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। বুদ্ধি এ কথা মানতে প্রস্তুত নয় যে, আমাদের ক্ষুদ্রতম প্রয়োজনও যে আল্লাহ পূর্ণ করার ব্যবস্থা করেছেন তিনি আমাদের এতবড় একটি প্রয়োজন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছেন। এটা কখনই সম্ভব নয়।

রসূলগণের মর্যাদা

অন্যান্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পে পারদর্শী লোকের যেমন একটি বিশেষ মন-মস্তিষ্ক ও বিশেষ ধরনের প্রকৃতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে অনুরূপভাবে নবীও একটি বিশেষ প্রকৃতি নিযে দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।

একজন স্বভাব কবির কবিতা আমরা বুঝতে পারি যে, তিনি কাব্য ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতা নিয়ে জন্মলাভ করেছেন। কারণ অন্য লোকের হাজার চেষ্টা করলেও তার তো কবিতা লিখতে পারবে না। অনুরূপ একজন স্বভাব বাগ্মী, জন্মগত লেখক, জন্মগত আবিষ্কারক এবং জন্মগত নেতাকেও তাদের কার্যাবলীর মাধ্যমে সহজেই চিনে নেয়া যায়। কারণ তাদের প্রত্যেকেই নিজের নিজের কাজে এমন অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ দেয় যা অন্যদের দ্বারা সম্ভব নয়। নবীর অবস্থাও অনুরূপ। তাঁর মন-মস্তিষ্কে এমন সব কথার উদয় করেন যা তিনি ছাড়া অন্য কোনো মানুষের পক্সে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাঁর দৃষ্টি স্বতঃস্ফুর্তভাবে এমন সব সূক্ষ্ম কথার গভীরে প্রবেশ করে যেখানে বছরের পর বছর গবেষণা করার পরও অন্যদের দৃষ্টি পৌঁছে না। তিনি যা কিছু বলেন আমাদের বুদ্ধি তা গ্রহন করে নেয় এবং আমাদের মন তার সাক্ষ্য প্রদান করে, অবশ্যি এমনটিই হওয়া উচিত। দুনিয়ার কথা সত্য প্রমাণিত হয়। কিন্তু আমরা নিজেরা ঐ ধরনের কথা বলতে চাইরেও বলতে পারি না্ উপরন্তু তাঁর প্রকৃতি এতই পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হয় যার ফলে প্রত্যেকটি ব্যাপারেই তিনি সত্যনিষ্ঠ ও ভদ্রজনোচিত পদ্ধতি অবলম্বন করেন। তিনি কখনও ভুল কথা বলেন না। কোনো খারাপ কাজ করেন না। সবসময় সুকৃতি ও সত্যনিষ্ঠার শিক্ষা দিয়ে যান। অন্যকে যা কিছু বলেন নিজে তার ওপর আমল করে দেখিয়ে দেন। তিনি নিজে যা কিছু বলেন কাজের সময় তার বিরুদ্ধাচরণ করেন এমনটি তাঁর জীবনে কোনো দিন দেখা যায়নি। তাঁর কথায় ও কাজে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নিহিত থাকে না। অন্যের ভালোর জন্যে তিনি নিজের ক্ষতি করেন এবং নিজের ভালোর জন্যে অন্যের ক্ষতি করেন না। তাঁর সমগ্র জীবন গঠিত হয় সত্যতা, ভদ্রতা, মানসিক পবিত্রতা, উন্নত চিন্তা ও উচ্চ পর্যায়ের মানবতার আদর্শে। দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও তাঁর মধ্যে কোন ত্রুটি দেখা যাবে না। এসব কিছু দেকে পরিস্কার চিনে নেয়া যায় যে, এ ব্যক্তি আল্লাহর সাচ্চা নবী।

নবীর আনুগত্য

কোন ব্যক্তিকে আল্লাহর সত্য নভী হিসেবে জানার পর তাঁর কথা মানা, তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর পদ্ধতি অনুযায়ী জীবনযাপন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কোন ব্যক্তিকে নবী বরে স্বীকার করার পর তাঁর কথা না মানা সম্পূর্ণ বুদ্ধিবিরোধী কাজ। কারণ নবী বলে মেনে নেবার অর্থই হচ্ছে আমরা এ কথা স্বীকার করে নিলাম যে, তিনি যা কিছু বলছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে বলছেন এবং যা কিছু করছেন আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী করছেন। কাজে এখন আমরা তাঁর বিরুদ্ধে কোনো কথা বা কাজ কখনও সত্য হতে পারে না। কাজেই কাউকে নবী বরে মেনে নেবার পর তাঁর কথা কথাকেও নির্দ্বিধায় মেনে নেয়া এবং তাঁর নির্দেশ মাথা পেতে নেয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ নির্দেশের মৌল তাৎপর্য ও সুফল আমাদের বোধগম্য হওয়া না হওয়ার প্রশ্নই এক্ষেত্রে অবাস্তর। নবীর পক্ষ থেকে যে কথা বলা হয় তা যে নবী কথিত এটিই তাঁর সত্য হওয়া তাঁর মধ্যে সব রকমের জ্ঞান-বিজ্ঞান, কল্যাণ ও সুফল নিহিত থাকার যথেষ্ট প্রমান্ যদি তাঁর কোনো কথার তাৎপর্য আমাদের বোধগম্য না হয় তাহলে এর অর্থ এ নয় যে সে কথার মধ্যে গলদ রয়ে গেছে, বরং এর অর্থ হচ্ছে আমাদের বুদ্ধি ও অনুধাবন শক্তির মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখা দিয়েছে।

যে ব্যক্তি কোনো শিল্প-বিশেষজ্ঞ নয় সে ঐ শিল্পের সূক্ষ্মতম বিষয়গুলো  বুঝতে সক্ষম হবে না। কিন্তু শিল্প-বিশেষজ্ঞের কথা যদি সে কেবল এ জন্যে না মানে যে তা তার বোধগম্য হচ্ছে না, তাহলে এটা তার প্রয়োজন হয়। বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করার পর তার কাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা হয় এবং তার কাজে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হয় না। কাজেই সবাই সব কাজে বিশেষজ্ঞ হতে পারে না এবং দুনিয়ার সব বিষয় ও কাজ বুঝার ক্ষমতাও সবার নেই। কোনো ব্যক্তি শিল্প-বিশেষজ্ঞ কিনা কেবল এতটুকুই আমাদের দেখা উচিত এবং এ ব্যাপারে পূর্ণ-নিশ্চিন্ততা অর্জনের জন্যেই আমাদের বুদ্ধি-জ্ঞান ও সর্বপ্রকার সতর্কতা নিয়োজিত হতে হবে। তারপর যখন আমরা জেনে নেই যে, সে একজন ভাল শিল্প-বিশেষজ্ঞ তখন তার কাজের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা উচিত। অতপর তার কাজে হস্তক্ষেপ করা এবং প্রতি পদে পদে একথা বলা যে, প্রথমে আমাকে এটা বুঝিয়ে দাও, না হরে আমি মেনে নিতে প্রস্তুত নই –এটাকে বুদ্ধিমত্তা নয়, নিরেট নির্বুদ্ধিতা বলা যায়। কোনো উকিলের ওপর মামলার ভার দেবার পর তার সাথে এভাবে বিতর্ক করতে থাকলে সে যে এ ধরনের মক্কেলকে তার চেম্বার থেকে বের করে দেবে এতে সন্দেহ নেই। কোনো ডাক্তারের নিকট তার প্রত্যেকটি প্রেসক্রিপশনের কারণ ও যুক্তি জানতে চাইরে সে সংশ্লিষ্ট রোগীর চিকিৎসাই ছেড়ে দেবে। ধর্মের ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। আমাদের আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে। আল্লাহর ইচ্ছে অনুযায়ী জীবনযাপন করার পদ্ধতি কি তা আমরা জানতে চাই। এসব জানার মাধ্যম আমাদের কাছে নেই। কাজেই আল্লাহর সাচ্চা নবীর সন্ধান করা আমাদের কর্তব্য হয়ে পড়ে। নিঃসন্দেহে নবীর সন্ধান করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও সতর্কতার পরিচয় দিতে হবে। কারন এমন কোনো ব্যক্তিকে যদি আমরা নভী মেনে নেই যে আসলে নবী নয়, তাহলে সে আমাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করবে কিন্তু ভালভাবে যাঁচাই পর্যালোচনার পর যখন কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর সাচ্চা নবী বলে আমাদের প্রত্যয় জন্মাবে তখন তাঁর ওপর আমাদের পরিপূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে হবে এবং তাঁর প্রত্যেক নির্দেশ পালন করতে হবে।

নবীদের ওপর ঈমান আনার প্রয়োজন

যখন আমরা এ কথা জানতে পারি যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে আল্লাহর নবী যে পথের সন্ধান দেন সেটিই একমাত্র সত্য ও সোজা পথ, তখন এ কথাও স্বতঃস্ফুর্তভাবে আমাদের বোধগম্য হয় যে, নবীর ওপর ঈমান আনা, তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করা সকল মানুষের জন্য অপরিহার্য এবং যে ব্যক্তি নবীর পথ পরিহার করে নিজের বুদ্ধি-জ্ঞানের সাহায্যে কোনো পথ বের করবে সে নিশ্চয়ই পথভ্রষ্ট হবে।

এ ব্যাপারে লোকের মারাত্মক ধরনের ভুল করে থাকে। অনেক লোক নবীদের সত্যতা স্বীকার করে কিন্তু তাদের ওপর ঈমান আনে না এবং তাদের আনুগত্যও করে না। এরা কেবল কাফের নয়, নির্বোধও। যারা জেনে বুঝে মিথ্যার অনুসার হয় তাদের চেয়ে বড় নির্বোধ আর কে হতে পারে?

অনেকে বলে, আমাদের নবীর আনুগত্য করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাই নিজেদের বুদ্ধির সাহায্যে সত্যপথ জেনে নিতে পারি। এটাও একটা বিরাট ভুল। জ্যামিতি পাঠক মাত্রই জানে, এক বিন্দু থেকে আরেক বিন্দু পর্যন্ত সরল রেখা মাত্র একটি হতে পারে। এছাড়া যত রেখাই টানা হোক না কেন তা সবগুলোই হয় বক্ররেখা হবে আর নয়তো ঐ দ্বিতীয় বিন্দু পর্যন্ত পৌঁছাবেই না। সত্যপথ যাকে ইসলামের পরিভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম (অর্থাৎ সোজা পথ) বলা হয় তার অবস্থাও অনুরূপ। এ পথ মানুষ থেকে শুরু হয়ে আল্লাহ পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। জ্যামিতির উল্লেখিত সূত্র অনুসারে এ পথ একটিই হতে পারে। এ  একটি পথ ছাড়া বাকি যতগুলো পথ হবে তা হবে বক্র রেখা অথবা তা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবে না্ এখন একটু সোজা পথটির ওপর চিন্তা কর যাক। সোজা পথটি তো নবী বাতলে দিয়েছেন। এছাড়া দ্বিতীয় কোনো সিরাতুল মুস্তাকীম বা সোজা পথ হতেই পারে না। এ একমাত্র পথটি বাদ দিয়ে যে ব্যক্তি নিজেই কোনো পথের সন্ধান করবে সে অবশ্যি দু’টি অবস্থার মধ্যে যে কোন একটির সম্মুখীণ হবে। আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার কোনো পথই সে পাবে না অথবা পেলেও তা হবে অনেক বাঁকা পথ, যা সরল রেখা না হয়ে হবে বক্র রেখা। প্রথম অবস্থাটিতে তার ধ্বংস তো সুস্পষ্ট। আর দ্বিতীয় অবস্থাটিতে তার নির্বুদ্ধিতা সম্পর্কে কোনো প্রকার সংশয়ের অবকাশই থাকতে পারে না। একটি ইতর প্রাণীও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার সময় বাঁকা পথ ছেড়ে সোজা পথ ধরে। অথচ সৃষ্টির সেরা বুদ্ধিমান সুচতুর মানুষটির ব্যাপার সত্যিই দেকার মতো। আল্লাহর একজন সৎ বান্দাহ তাকে সোজা পথ দেখাচ্ছে আর সে বলে চলছেঃ না, তোমার দেখানো পথে আমি চলবই না, আমি বাঁকা পথগুলোতেই এগিয়ে যাব, এভাবে পথ ভুল করতে থাকব এবং আমার গন্তব্যের সন্ধান করে যেতে থাকব।

এটা এমন একটা কাজ সত্য কথা যা প্রথম দৃষ্টিতেই যে কোন ব্যক্তি বুঝতে পারে। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলে বুঝা যাবে যে, নবীর ওপর ঈমান আনতে অস্বীকার করে কোনো ব্যক্তি আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছবার সোজা বা বাঁকা কোনো পথই পেতে পারে না। কারণ যে ব্যক্তি সত্যবাদী ও সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তির কথা মেনে নিতে পারছে না তার মস্তিষ্কে এমন কোনো গলদ দেখা দিয়েছে যার ফলে সে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তার জ্ঞান-বুদ্ধির অভাব হতে পারে, তার মনে অহংকার বাসা বাঁধতে পারে, তার প্রকৃতিই এমন বক্র হতে পারে যার ফলে সৎ ও সত্যতার বাণী গ্রহণ করতে তার মন প্রস্তুত হয় না সে বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণের মদ্যে ডুবে থাকতে পারে ফলে আগে থেকেই রেওয়াজ হিসেবে যেসব কথা চলে আসছে সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো কথা মানতে প্রস্তুত হয় না অথবা সে প্রবৃত্তির দাস হতে পারে এবং নবীর শিক্ষা মেনে নিতে এ জন্য অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতে পারে যে, এরপরে অবৈধ ও পাক কাজ করার স্বাধীনতা সে হারিয়ে ফেলবে। এ কারণগুলোর মধ্যে থেকে যে কোন একটি কারণও যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যায় তাহলে তার পক্ষে আল্লাহর পথের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আর যদি কোনো একটি কারণও তার মধ্যে না থাকে তাহলে একজন সাচ্চা, সৎ ও নিষ্কলুষ ব্যক্তি একজন সাচ্চা নবীর শিক্ষা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে, এটা একেবারেই অসম্ভব।

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হয়ে থাকেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার ও তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশও আল্লাহ দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি নবীর প্রতি ঈমান আনে না সে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। মানুষ যে সরকারের প্রজা সেই সরকারের পক্ষ থেকে যে প্রমাসক নিযুক্ত হবে তাকে অবশ্য তার আনুগত্য করতে হবে। যদি সে ঐ ব্যক্তিকে প্রশাসক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে তাহলে এর অর্থ দাঁড়াবে সে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। সরকারকে মেনে নেয়া এবং তার নিযুক্ত প্রশাসককে না মানা –দু’টো কথা সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী। আল্লাহ ও তার প্রেরিত নবীর দৃষ্টান্তটিও অনুরূপ পর্যায়ের। আল্লাহ মানুষের আসল বাদশাহ। তিনি যে ব্যক্তিকে পাঠিয়েছেন মানুসকে পথ দেখার জন্য এবং তার আনুগত্য করার হুকুম দিয়েছেন তাঁকে নবী বলে স্বীকার করা এবং সবার আনুগত্য ত্যাগ করে একমাত্র তাঁর আনুগত্য করা প্রত্যেকটি মানুসের কর্তব্য। যে ব্যক্তি তাঁর প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করে সে অবশ্যি অস্বীকারকারী –কাফের। এ ক্ষেত্রে তার আল্লাহকে মেনে নেয়া বা না মানা সবই অর্থহীন।

এক নজরে নবুয়াতের ধারাবাহিকতার ইতিহাস

মানব জাতির মধ্যে কিভাবে নবীদের আগমন শুরু হল এবং কিভাবে উন্নতি করতে করতে শেষ নবী ও শ্রেষ্টতম নবীর ওপর এ ধারা শেষ হল, এবার আমরা সে আলোচনায় প্রবৃত্ত হব।

আল্লাহ সর্বপ্রথম একজন মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর সে মানুষটি থেকে জোড়া সৃষ্টি করেন। অতপর ঐ জোড়ার বংশধারা চালু করেন। শত শত হাজার হাজার বছর ধরে তা চলতে চলতে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে যত মানুষ জন্ম নিয়েছে সবাই ঐ প্রথম জোড়াটির সন্তান। সকল জাতির ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনা ধারা এক বাক্যে এ কথা ঘোষণা করে যে, একজন মানুষ থেকেই মানব জাতির বংশধারার সূচনা হয়। বিজ্ঞানের অনুসন্ধান থেকেও এ কথা প্রমাণ হয়নি যে, পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় পৃথক পৃথক মানুষ তৈরী করা হয়েছিল। বরং অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক এ ধারণা পোষণ করেন যে, প্রথমে একজন মানুষই জন্মে থাকবে এবং দুনিযার যেখানেই যত মানুষ পাওয়া যায় সবাই ঐ একজন মানুষেরই সন্তান।

ঐ প্রথম মানুষটিকে আমাদের ভাষায় আদম (আ) বলা হয়। এ থেকেই ‘আদম সন্তান’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হয় মানুষ জাতি। আল্লাহ হযরত আদম (আ)-কে করেন প্রথম নবী। নিজের সন্তানদেরকে ইসলামের শিক্ষাদান করার জন্যে তাঁকে নির্দেশ দেন। অর্থাৎ তাদেরকে এ কথা জানাবার নির্দেশ দেনঃ তোমাদের ও সারা দুনিয়ার প্রভু হচ্ছেন এক আল্লাহ। তোমাদেরকে একমাত্র তাঁরই বন্দেগী করতে হবে। একমাত্র তাঁর সামনে মাথানত করবে। তাঁর কাছে সাহায্য চাইবে। তাঁরই ইচ্ছা অনুযায়ী দুনিয়ায় সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবন যাবন করবে। এভাবে চলরে তোমরা পরিণামে বিপুর পুরস্কার লাভ করবে। আর তাঁর আনুগত্য থেকে সরে আসরে ভয়াবহ শাস্তির অধিকারী হবে। হযরত আদম (আ)-এর সন্তানদের মধ্যে যারা ছিল ভাল ও সৎ তারা পিতার নির্দেশিত সোজা পথে চলতে থাকে কিন্তু যারা অসৎ ছির তারা এ পথ ত্যাগ করে। ধীরে ধীরে সব রকমের অন্যায় ও দুষ্কৃতি জন্ম নেয়। কেউ চাঁদ, সূর্য ও তারকার পূজা করতে থাকে। কেউ বৃক্ষ, পশু ও নদ-নদীর উপাসনায় মগ্ন হয়। আবার অনেকে মনে করতে থাকে বায়ু, পানি, অগ্নি, রোগ, সুস্থতা এবং প্রকৃতির অন্যান্য শক্তিগুলোর আল্লাহ পৃথক। কাজেই এদের প্রত্যেকটিকে পূজা করা উচিত। তাহরে সবার আল্লাহ খুশী হয়ে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে। এ ধরনের মুর্খতার কারণে শিরক ও মূর্তিপূজার বিভিন্ন ধারার প্রচলন হয়, যার ফলে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ঘটে। এ সময় হযরত আদম (আ)-এর বংশধররা দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন বিভিন্ন জাতির উদ্ভব হয়েছিল। প্রত্যেক জাতি নিজের জন্যে একটা নতুন ধর্ম তৈর করে নিয়েছিল। প্রত্যেকের রসম-রেওয়াজ, রীতিনীতি আলাদা ছিল। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষ তার আদি পিতা হযরত আদম (আ) তাঁর সন্তানদেরকে যে বিধি-বিধান শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন তাও ভুলে যায়। লোকেরা নিজেদের প্রবৃত্তির আনুগত্য শুরু করে দেয়। সব রকমের খারাপ রীতিনীতির প্রচলন শুরু হয়ে যায়। সব ধরনের অজ্ঞতাপ্রসূত চিন্তার প্রসার ঘটে। ভাল ও মন্দের পার্থক্য করার ব্যাপারে মানুষ ভুল করতে থাকে। অনেক খারাপ জিনিসকে ভাল মনে করে নেয়া হয় এবং অনেক ভাল জিনিসকে খারাপ মনে করে নেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদের নিম্নোক্ত আয়াতটি নবুয়াতের তাৎপর্য ও গুরুত্ব বর্ণনা করেঃ

(আরবী*********************************পিডিএফ ৪৯ পৃষ্ঠায়)

“শুরুতে সব মানুষ একই পথে চলছিল। (তারপর এ অবস্থা অব্যাহত থাকল না এবং মতবিরোধ দেখা দিল) অতপর আল্লাহ নবী পাঠালেন। তাঁরা ছিলেন (সত্য-সোজা পথ অবলম্বনকারীদের জন্যে) সুসংবাদদানকারী এবং (বক্র-ভুল পথ অবলম্বনের পরিণাম সম্পর্কে) ভীতি প্রদর্শনকার। তাঁদের সাথে নাযিল করেন সত্য গ্রন্থ। যাতে সত্যের ব্যাপারে লোকদের মধ্যে যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল সে সম্পর্কে ফায়সালা করা যায়। আর এ মতবিরোধ দেখা দেবার কারণ এটা নয় যে, শুরুতে তাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছিল। তারা সুস্পষ্ট হেদায়াত লাভের পর নিছক এক কারণে সত্যকে ছেড়ে বিভিন্ন পথে পা বাড়িয়েছিল যে তারা নিজেদের মধ্যে যুলুম ও বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছিল।–[“শুরুতে সব মানুষ একই পথে চলছিলো” এরপর মতবিরোধের উল্লেখ উহ্য রয়ে গেছে। আয়াতের শেষে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে ] –(সূরা আল বাকারাঃ ২১৩)।

অজ্ঞ লোকেরা নিজেদের ধারণা ও কল্পনার ভিত্তিতে ‘ধর্মের’ ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেন, শিরকের অন্ধকারময় আবর্তে মানুষের ধর্মীয় জবিনের সূত্রপাত হয় অতপর ধারাবাহিক বিবর্তনের মাধ্যমে এ অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং আলোর রেখা উজ্জ্বল হতে থাকে। এভাবে অবশেষে মানুষ তাওহীদ বা এক আল্লাহর ধারণায় উপনীত হয়। কুরআন এর সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য পরিবেশন করে বলছে, দুনিয়ার পরিপূর্ণ আলোকে মানুষের দীর্ঘদিন পর্যন্ত আদমের বংশধররা সত্য-সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং একই দলভুক্ত থাকে। অতপর লোকেরা নতুন নতুন পথ বের করতে থাকে এবং বিভিন্ন পদ্ধতির উদ্ভাবন করে। তাদেরকে সত্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি বলে তারা এমনটি করেছিল তা নয়্ বরং এর কারণ ছিল এই যে, সত্য জানা সত্ত্বেও অনেক লোক নিজের বৈধ অধিকারের চেয়ে বেশী লাভ ও সুবিধা আদায় করতে চাচ্ছিল। তারা নিজেদের মধ্যে যুলুম, নিপীড়ন ও বাড়াবাড়ি করার ব্যাপারে আগ্রহশীল ছিল। এ ত্রুটিগুলো দূর করার জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নবী পাঠাতে শুরু করলেন। এ নবীগণ প্রত্যেকে নিজেদের নামে এক একটি নতুন ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং এক একটি উম্মত গড়ে তুলবেন –এ জন্যে তাদেরকে পাঠানো হয়নি। বরং তাঁদেরকে পাঠাবার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এই যে, তাঁরা মানুষের সামনে এ হারিয়ে যাওয়া সত্য পথটি আবার সুস্পষ্ট করে তুলে ধরবেন, তাদেরকে পুনর্বার একটি উম্মতে পরিণত করবেন।

নবীদের কাজ

নবীগণ প্রত্যেকেই তাঁদের নিজেদের জাতিকে ভুলে যাওয়া পাঠ স্মরণ করিয়ে দেন। তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদাত করার শিক্ষা দান করেন। শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে তাদেরকে দূরে রাখেন। তাদের জাহেলী ও অজ্ঞতাপূর্ণ রসম ও রীতি-রেওয়াজগুলো রহিত করেন। আল্লহার ইচ্ছা অনুযায়ী জীবনযাপন করার পদ্ধতি শেখান এবং নির্ভুল ও সঠিক আইনের প্রচলন করে তা মেনে চলার নির্দেশ দেন। বাংলা-পাক-ভারত, চীন, ইরাক, ইরান, মিসর, আফ্রিকা, ইউরোপ তথা দুনিয়ার এমন কোন দেশ নেই যেখানে আল্লাপর পক্ষ থেকে কোন সত্র নবী আসেননি। তাঁদের সবার ধর্ম ছিল এক। আমাদের নিজেদের ভাষায় এ ধর্মকে আমরা ‘ইসলাম’ বরে থাকি।–[সাধারণত লোকেরা এ ভুল ধারণা পোষণ করে যে, ইসলামের সূচনা হয়েছে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে, এমনকি তাঁকে ইসলাম প্রবর্তক পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে। আসলে এটা একটা বড় রকমের ভুল ধারণা। মনের পাতা থেকে এ ধারনা একেবারেই মুছে ফেলতে হবে। একথা ভালোভাবে জেনে নেয়া উচিত যে, ইসলামই হচ্ছে সর্বকারে সর্ব দেশে মানবজাতির একমাত্র ও আসল ধর্ম এবং দুনিয়ার যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে যত নবী এসেছেন সবাই এ ধর্মটিরই বার্তা বহন করে এসেছেন।–(গ্রন্থকার)] তবে প্রত্রেকের শিক্ষা পদ্ধতি ও জীবন যাপনের আইন-কানুন কিছুটা বিভিন্ন ছিল। প্রত্যেক জাতির মধ্যে যেসব মূর্খতা, অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও অনাচার ছড়িয়ে পড়েছিল সেুগলো খতম করার ওপর জোর দেয়া হয়। যেসব ভ্রান্ত চিন্তাদারার প্রচলন চির সেগুলো সংশোধনের প্রতি বেশী নজর দেয়া হয়। সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক দিয়ে জাতিরা যখন প্রথমিক পর্যায়ে ছিল তখন তাদেরকে সহজ সরল শিক্ষা ও শরীয়ত দান করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে যেমন তারা উন্নতির পথে এগিয়ে গেছে তেমনি শিক্ষা ও শরয়িতকেও ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর করা হয়েছে। কিন্তু এ বিরোধ ছিল কেবলমাত্র বাহ্যিক চেহারা-আকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। আত্মা ও প্রাণ ছিল সবার এক। অর্থাৎ সবার আকীদা-বিশ্বাস ছিল তাওহীদ নির্ভর এবং আমল বা কর্ম ছিল সততা, সুকৃতি, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আখেরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের ওপর প্রত্যয় নির্ভর।

নবীদের সাথে কেমন ব্যবহার করা হয়

নবীদের সাথে লোকেরা অদ্ভুত ব্যবহার করে। প্রথমে তাঁদেরকে দৈহিক কষ্ট দেয়া হয়। তাদের সদুপদেশ মানতে অস্বীকার করা হয়। অনেককে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয় অনেককে হত্যা করা হয়। অনেকে সারা জীবন ধরে শিক্ষা ও উপদেশ দানের পর মাত্র পাঁচ দশজন লোককে সত্য ধর্মের অনুসারী করতে সক্ষম হন। কিন্তু আল্লাহর এ প্রিয় বান্দাগণ নিরলস পরিশ্রম করে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। এমনকি এক সময় তাঁদের শিক্ষা প্রভাব বিস্তার করে। অনেক বড় বড় জাতি তাঁদের অনুসারী হয়। অতপর মানুষের পথভ্রষ্টতা নতুন রূপ ধারণ করে। নবীদের ইন্তেকালের পর তাঁদের উম্মতরা তাঁদের শিক্ষার মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে। আল্লাহর নিকট থেকে তাঁরা যে গ্রন্থগুলো আনেন উম্মতরা তার মধ্যে সব রকমের চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটায়। ইবাদতের নতুন নতুন পথ উদ্ভাবন করে। অনেকে নিজেরাই নিজেদের নবীর পূজা শুরু করে। অনেকে নিজেদের নবীদেরকে আল্লাহর অবতার (অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই মানুষের বেশ ধরে নেমে এসেছেন) গণ্য করে। অনেকে নিজেদের নবীকে আল্লাহর পুত্র আখ্যা দেয়। অনেকে তাদের নকীকে আল্লাহর কর্তৃত্বের ও সার্বভৌমত্বে অংশীদার বলে ঘোষণা করে। এভাবে বিভিন্ন পন্থায় মানুষের অদ্ভুত ও বিকলাঙ্গ মানসিকতার প্রকাশ ঘটতে থাকে। যাঁরা মূর্তি ভাংতে এসেছিলেন এবং মূর্তি ভেংগেছিলেন তাঁদের মূর্তি গড়ে মানুষ পূজা করতে থাকে। তারপর এ নবীগণ তাঁদের উম্মতদেরকে যে শরীয়াত দিয়ে গিয়েছিরেন তাকেও বিভিন্ন প্রকারে বিকৃত করা হয়। সব রকমের জাহেলী রীতিনীতি, মুখরোচক গল্প ও মিথ্যা বর্ণনা তার সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। তার মধ্যে কি কি বিষয় মিশ্রিত করেছে-[নবীদের উম্মতরা এভাবেই নিজেদের আসল ধর্মকে (অর্থাৎ ইসলাম) বিকৃত করে নতুন নতুন ধর্মের উদ্ভব ঘটায়। দুনিয়ার বুকে বিভিন্ন নামে আজ এগুলোরই অস্তিত্ব বিরাজিত। যেমন হযরত ঈসা (আ) যে ধর্মের শিক্ষা দিয়েছিলেন তা আসলে ইসলাম ছিল কিন্তু তাঁর অনুসারীরা নিজেরাই হযরত ঈসাকে খোদা বানিয়ে নিয়েছে এবং তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা ও শরীয়াতের সাথে নিজেদের মনগড়া অনেক কথা মিশিয়ে দিয়ে এক নতুন ধর্ম তৈরী করেছে, যা আজ খৃষ্ট ধর্ম নামে দুনিয়ায় পরিচিত।–(গ্রন্থকার)] তা জানার কোনো উপায়ই থাকেনি। নবীদের জীবনের অবস্থাও লোকদের বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে এমনভাবে হারিয়ে গেছে যে, তাদের ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য কিছুই পাওয়া যায় না।

তবুও নবীদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। সব রকমের মিশ্রণ সত্ত্বেও প্রত্যেক জাতির মদ্রে কিছু না কিছু সত্য রয়ে গেছে। আল্লাহর চিন্তা ও আখেরাতের জীবনের চিন্তা প্রত্যেক জাতির মধ্যে কোনো না কোনো পযৃায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সৎবৃত্তি, সততা, ন্যায় ও নৈতিকতা কতিপয় মূলনীতি সাধারণভাবে সারা বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সমস্ত জাতি ও গোত্রের নবীগণ আলাদা আরাদাভাবে নিজেদের জাতিদেরকে এমনভাবে তৈরী করে গেছেন যার ফরে সারা দুনিয়ার বর্ণ-গোত্র-জাতি নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বমানবতার উপযোগী একটি বিশ্ব-ধর্মের শিক্ষা বিস্তার করা সম্ভবপর হয়।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.