সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবীদের দাওয়াত ও মর্যাদা

কুরআন অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, একের পর এক নবী আসছেন এবং তাঁদের জাতিদেরকে সবাই একই দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছেনঃ

(আরবী*********************************পিডিএফ ৫২ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার জাতির লোকেরা, আল্লাহর বন্দগী করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই”।

ব্যবিলনে অথবা সাদুমে, মাদায়েনে অথবা হিজার এলাকায়, নীল নদ উপত্যকায় বা দুনিয়ার যে কোন দেশে, খৃষ্টপূর্ব চল্লিম শতক থেকে দশ শতকে বা তার পরে দুনিয়ার দাস, স্বাধীন, অনুন্নত বা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে উন্নতির উচ্চ শিখরে উন্নীত জাতিদের মধ্যে যখনই যেখানেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নবী এসেছেন তিনি মানুষকে একই দাওয়াত দিয়েছেন। তাঁদের সবার দাওয়াত ছিলঃ আল্লাহর বন্দেগী করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ (যথার্থ মাবুদ বা খোদা) নেই। হযরত ইবরাহীম (আ) নিজের জাতিকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, যতক্ষণ তোমরা এ মূলনীতিকে স্বীকৃতি না দেবে ততক্ষণ তোমাদের ও আামর মধ্যে কোনো প্রকার সহযোগিতা সম্ভবপর নয়।

(আরবী*********************************পিডিএফ ৫২ পৃষ্ঠায়)

অর্থাৎ যে পর্যন্ত তোমরা এক আল্লাহর ওপর ঈমান না আন সে পর্যন্ত তোমাদের ও আমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ চলতে থাকবে এবং হযরত মূসা (আ) ফেরাউনের নিকট গিয়ে (আরবী******) (বনি ইসরাইলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও)-এ দাবী পেশ করার পূর্বে ঘোষণা করেন (আরবী*******) (আমি বিশ্বজগতের প্রভুম নিকট থেকে প্রেরিত) এবং (আরবী********) (মূসা বলেন তুমি কি পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধির জন্যে প্রস্তুত এবং আমি কি তোমাকে তোমার প্রভুর পথ দেখাবো যাতে করে তুমি তাঁকে ভয় কর?) এর দাওয়াত দেন এবং তাকে জানিয়ে দেন যে, তুমি রব ও প্রভু নও বরং যিতি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং সবাইকে জীবন যাপনের পদ্ধীত শিখিয়েছেন তিনিই রব এবং প্রভু। (আরবী********) (তিনিই আমাদের রব ও প্রভু যিনি প্রত্যেকটি বস্তুকে আকৃতি দান করেছেন অতপর তার চলার পথ নির্ধারণ করেছেন।)-[অর্থাৎ হযরত মূসা (আ) ও হযরত হারুন (আ) একই দায়িত্ব পালন করেন, যা পালন করেন হযরত নূহ (আ) থেকে নিয়ে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) পর্যন্ত অন্যান্য নবীগণ। আর এ দায়িত্ব ছিল লোকদেরকে একথা জানানো ও বুঝানো যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহ রাব্বুর আলামীনকে নিজেদের রব ও প্রভু বলে স্বীকার করো এবং এ জীবনের পরে যে জীবন আসছে সেখানে তোমাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে এবং নিজেদের যুগের নবীগণ প্রদত্ত তাওহীদ ও আখেরাতে বিশ্বাসের দাওয়াত গ্রহণ এবং তারই ভিত্তিতে নিজের জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরই নির্ভরশীল।–(গ্রন্থকার)] হযরত ঈসা (আ)-এর জাতি রোমানদের শাসনাধীনে পরাধীন জীবনযাপন করছিল। কিন্তু তিনি বনি ইসরাইল ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন জাতিকে রোমান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনার আমন্ত্রণ জানাননি। বরং তিনি লোকদেরকে দাওয়াত দেন যে, (আরবী***********) (বস্তুত আল্লাহ আমার ও তোমাদের রব। কাজেই তাঁর ইবাদান করো, এটিো সোজা-সরল পথ)। বলাবাহুল্য কুরআনে বর্ণিত এ ঘটনাবলী অন্য কোনো জগতের নয় বরং যে পৃথিবীতে আমাদের বাস সেই মাটির পৃথিবীরই ঘটনা এবং আমাদের ন্যায় রক্ত-মাংসের মানুষদের সাথে এ ঘটনা সম্পর্কিত। এ কথা বলার এখানে কোনো সুযোগই নেই যে –যেসব দেশে ও যেসব জাতির মধ্যে নবীদের আগমন হয়েছিল তাদের কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা ছিল না এবং এ সমস্যাগুলো সমাধানের দিকে তাদেরকে আকৃষ্ট করার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যখন ইসলামী আন্দোলনের প্রত্যেকটি নেতা, প্রত্যেক দেশে ও প্রত্যেক যুগে সর্বপ্রকার সামকি ও স্থানীয় সমস্যা উপেক্ষা করে একটি মাত্র সমস্যাকে সামনে রেখেছেন এবং এরি পেছনে নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করেছেন, তখন আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, তাঁদের নিকট এটিই ছিল সমস্ত সমস্যার মূল এবং এ সমস্যাটির সমাধানের ওপর তাঁরা জীবনের অন্যান্য যাবতীয় সমস্যার সমাধান নির্ভরশীল বলে মনে করতেন।

হযরত ঈসা (আ) বনি ইসরাইলকে সম্বোধন করে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্যে এভাবে বর্ণনা করেনঃ

(আরবী*********************************পিডিএফ ৫৩ পৃষ্ঠায়)

“তোমাদরে ওপর কিচু জিনিস হারাম করে দেয়া হয়েছে সেগুলোকে হালাল করে দেয়ার জন্যে আমি এসেছি। দেখ, তোমাদের রবের নিকট থেকে আমি তোমাদের জন্যে নিদর্শন নিয়ে এসেছি। কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। আল্লাহ আমর রব এবং তোমাদেরও রব। কাজেই তোমরা তাঁর বন্দেগী করো, এটিই সোজা-সরল পথ”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৫০-৫১)

এ থেকে জানা গেল অন্যান্য সকল নবীর ন্যায হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের মূল বক্তব্যও ছিল তিনটি বিষয়।–[হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। কারণ, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের পূর্বে তিনি ছিলেন শেষ নবী এবং তাঁর বাণী, বক্তব্য ও দাওয়াতকে পুরোপুরি বিকৃত করা হয়েছে।–(সংকলক)]

একঃ সার্বভৌমত্ব যা একমাত্র আল্লাহর জন্যে স্বীকৃত। এ জন্যে বন্দেগী তাঁর জন্যে নিবেদিত এবং তাঁরই আনুগত্যের ভিত্তিতে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সমগ্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

দুইঃ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকের প্রতিনিধি হিসেবে নবীর আদেশ মেনে চলতে হবে।

তিনঃ মানুষের জীবনে হালাল-হারাম ও বৈধ-অবৈধের সীমারেখা একমাত্র আল্লাহর আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে অন্যদের প্রতিষ্ঠিত আইন বাতিল করা হবে।–[সূরা আলে ইমরানের ৫১ নং আয়াত দ্রষ্টব্যঃ (আরবী******** ৫৪ পৃষ্ঠার টীকায়)]

আসলে হযরত ঈসা (আ), হযরত মূসা (আ), হযরত মুহাম্মদ (সা) ও অন্যান্য নবীগণের দাওয়াতের মধ্যে তিলাগ্র পার্থক্য নেই। যারা বিভিন্ন নবীর মিশন বিভিন্ন বলে মনে করেছেন এবং উদ্দেশ্য ও প্রকৃতির দিক দিয়ে তাঁদের মিশনের মধ্যে পার্থক্য করেছেন তাঁরা মারাত্মক ভুল করেছেন। সমগ্র সৃষ্টিজগতের সর্বশয় কর্তার নিয়োগপত্র নিয়ে তাঁর প্রজাগনের নিকট যিনিই আসবেন তাঁর আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হবে, তিনি প্রজাদেরকে নাফরমানি ও স্বায়ত্ব শাসন পরিচারনা করা থেকে বিরত রাখবেন, তাঁর সাথে কাউকে শরকি করতে (অর্থাৎ সার্বভৌম শাসন ক্ষমতার ব্যাপারে কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকের সাথে অংশীদার করা এবং নিজের আনুগত্য ও ইবাদাত-বন্দেগীকেও উভয়ের জন্যে বন্টন করে দেয়া) নিসেধ করবেন এবং একমাত্র আসল প্রবুর বন্দেগী; আনুগত্য, পূজা, উপাসনা ও নির্দেশ মেনে চলার দাওয়াত দেবেন।

কুরআন মজীদে নবীদের আগমনের উদ্দেশ্যকে অন্যভাবেও বর্ণনা করা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৪ পৃষ্ঠায়)

“এ রসূলদেরকে সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল এ জন্যে যে, তাঁদেরকে পাঠাবার পর লোকদের নিকট আল্লাহর মোকাবিলায় কোনো কিছু বলার না থাকে।–(সূরা আন নিসাঃ ১৬৫)

অর্থাৎ এসব রসূলদেরকে পাঠাবার একটিই মাত্র উদ্দেশ্য ছিল। সেটি ছিল এই যে, আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির সামনে তাঁর যুক্তি-প্রমাণকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে চাচ্ছিলেন, যাতে শেষ বিচারের দিনে কোনো পথভ্রষ্ট অপরাধী এ কথা বলার সুযোগ না পায় যে, আমরা অনবহিত ছিলাম এবং আপনি আমাদেরকে সত্য ও আসল ব্যাপার সম্পর্কে অবহিত করার কোনো ব্যবস্থা করেননি। এ উদ্দেম্যে আল্লাহ দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এ নবীগণ বিপুর সংখ্যক মানুসের নিকট সত্য জ্ঞান পৌঁছিয়ে দিয়েছেন এবং তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পরও মানুষের জন্যে আসমানী গ্রন্তসমূহ রেখে গেছেন। এ গ্রন্থগুরোর মধ্য থেকে প্রতিযুগে মানুষের সত্য-সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্যে কোনো না কোনো গ্রন্থ অবশ্যি দুনিয়ার বুকে রয়ে গেছে। কাজেই এরপরও কোনো ব্যক্তি পথভ্রষ্ট হয়ে থাকরে সেজন্যে আল্লাহ ও তাঁর নবীগণ অভিযুক্ত হবে না। বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই অভিযুক্ত হবে। কারণ তার নিকট আল্লাহর বাণী পৌঁছেছিল কিন্তু সে তা গ্রহণ করেনি। অথবা সেসব লোক এ জন্যে অভিযুক্ত হবে যারা সত্য-সঠিক পথ জানতো কিন্তু আল্লাহর বান্দাদেরকে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত দেখেও তারা তাদেরকে সত্য-সঠিক পথের সন্ধান দেয়নি।

নবী ও রসূলগণ সত্যের আহবায়ক হওয়ার সাথে সাথে আনুগত্য লাভের অধিকারীও হন। যেমন কুরআনে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৫ পৃষ্ঠায়)

“আমি যে রসূলই পাঠিয়েছি তা এ জন্যে পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে তাঁর আনুগত্য করতে হবে”।–(সূরা আন নিসাঃ ৬৪)

অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল এ জন্যে আসেন না যে, কেবল তাঁর রিসালাতের ওপর ঈমান আনতে হবে অতপর ইচ্ছামতো অন্য কারো আনুগত্য করলে চলবে। বরং রসূল আসার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই যে, জীবন যাপনের জন্যে যে বিধান তিনি আনেন, দুনিয়ার যাবতীয় বিধান ত্যাগ করে একমাত্র সেই বিধানেরই আনুগত্য করতে হবে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি যেসব নির্দেশ দেন দুনিয়ার সমস্ত নির্দেশ ত্যাগ করে একমাত্র সেগুলোই কার্যকর করতে হবে। যে ব্যক্তি এভাবে রসূলের আনুগত্য করে না তার রসূলকে নিছক রসূল মেনে নেয়ার কোন অর্থ নেই।

দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালানোও নবীগনের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৫ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ নিজের রসূলকে হেদায়াত ও সত্যদ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, অন্য সমস্ত দ্বীনের ওপর তাকে বিজয়ী করার জন্যে”।–(সূরা আত তাওবাঃ ৩৩)

মূল আয়াতে ‘আদ-দ্বীন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অনুবাদে আমি লিখেছি ‘সমস্ত দ্বীন’। আসলে দ্বীন শব্দটিকে আরবী ভাষায় এমন জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে যার প্রতিষ্টাকারীকে সনদ ও অণুসরণযোগ্য বরে মেনে নিয়ে তার আনুগত্য করা হয়। কাজেই এ আয়াতে রসূল আগমনের যে উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে তা হচ্ছে এই যে, তিনি আাল্লাহর পক্ষ থেকে যে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন এনেছেন দুনিয়ার অন্যান্য সমস্ত দ্বীন তথা পদ্ধতি ও ব্যবস্থার ওপর তাকে বিজয়ী করতে হবে। অন্য কথায় বলা যায়, রসূলকে কখনো এ উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় না যে, তিনি যে জীবন ব্যবস্থা নিয়ে আসেন তা অন্য কোন জীবন ব্যবস্থায় অধীন ও তার নিকট বিজিত হয়ে তার প্রদত্ত সুযোগসুবিধার মধ্যে মাথা গুঁজে ধুঁকে ধুঁকে দিন কাটাবেন। বরং তিনি আসেন পৃথিবী ও আকাশের বাদশাহের প্রতিনিধি হয়ে। তিনি নিজের বাদশাহের সত্য ব্যবস্থাকে বিজয়ী দেখতে চান। দুনিয়ায় যদি অন্য কোন জীবন ব্যবস্থার প্রচলন থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যি আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থার অধীনে তার দেয়া সুযোগ-সুবিধা ক’টি নিয়ে মাথা গুঁজে থাকতে হবে, যেমন হয় জিজিয়া আদায় করার ক্ষেত্রে যিম্মীদের জীবন ব্যবস্থার অবস্থা।

বিপর্যয় দূর করাই নবীদের কাজ

মানুষ যখন আল্লাহর আনুগত্য পরিহার করে নিজের নফসের বা অন্যদের আনুগত্য শুরু করে এবং আল্লাহর হেদায়েত ও পথনির্দেম অমান্য করে অন্যের মনগড়া নীতি, আইন ও বিধানের ভিত্তিতে নিজের নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কাঠামো তৈরী করে তখন দুনিয়ার বুকে আসল বিপর্যয় দেখা দেয়, যার ফলে বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অসংখ্য ত্রুটি-বিচ্যুতির সৃষ্টি হয়। এ বিপর্যয় রোধ ও ত্রুটি-বিচ্যুতির সংশোধনই কুরআনের উদ্দেশ্য। এ সংগে কুরআন এ সত্যটিরও দ্বারোদঘাটন করে যে, বিশ্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিপর্যয় আসল নয় এবং সততা, সৎবৃত্তি ও সৎকর্মশীলতাই হচ্ছে আসল এবং নিছক মানুষের মূর্খতা, অজ্ঞতা ও বাড়াবাড়ির কারণে বিপর্যয় সাময়িকভাবে তার ওপর চেপে বসে। অন্যকথায বলা যায়, দুনিয়ার মানুষের জীবন মূর্খতা, অজ্ঞতা, বর্বরতা, শির্ক, বিদ্রোহ ও নৈতিক অরাজকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি এবং এগুলো দূর করার জন্যে পরে পর্যায়ক্রমে সংশোধনের কাজ শুরু হয়নি। বরং প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবন শুরু হয় সততা ও সৎকর্মশীলতার মাধ্যমে এবং পরবর্তীকালে অসৎ লোকেরা নিজেদের নির্বুদ্দিতা ও দুষ্কর্মের মাধ্যমে এই পবিত্র ব্যবস্থাটিকে পংকিল ও আবিলতাময় করতে থাকে। এই বিপর্যয় দূর করে মানুসের জীবন ব্যবস্থাকে নতুন করে সংশোধন করে দেয়ার জন্যে আল্লাহ যুগে যুগে নবীদেরকে পাঠাতে থাকেন। নবীগণ প্রতি যুগে মানুষকে এই একই দাওয়াত দিয়ে এসেছেন যে, যে সততা, সৎবৃত্তি ও সৎকর্মশীলতার ওপর বিশ্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে তার মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে বিরত-[এ ব্যাপারে কুরআনের দৃষ্টিভংগী বিবর্তনবাদীদের দৃষ্টিভংগী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিবর্তনবাদীরা একটি সম্পূর্ণ ভুল চিন্তাধারার ভিত্তিতে এ মতবাদের জন্ম দিয়েছে যে, মানুষ অন্ধকার থেকে বের হয়ে পর্যায়ক্রমে আলোকের দিকে এসেছে। তার জীবনের শুরুতে ছিল বিকৃতি ও বাঙন। তারপর ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে তা সুগঠিত হতে যাচ্ছে। বিপরীত পক্ষে কুরআন বলছে, আল্লাহ পূর্ণ আলোকোজ্জ্বল পরিবেশে মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে ছিলেন এবং একটি কল্যাণময় ব্যবস্থার মাধ্যমে তার জীবনের সূচনা করেছিলেন। অতপর মানুষ নিজেই শয়তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর বার বার অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করেছে এবং এ কল্যাণময় ব্যবস্থাকে বার বার বিকৃত করেছে। মানুষকে এ অন্ধকার থেকে আলোকের পথে আনার এবং বিকৃতি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার দাওয়াত দেয়ার জন্যে আল্লাহ যুগে যুগে তাঁর নবীগণকে পাঠিয়েছেন।] থাক।

নবুয়াতের দাবীর মধ্যে একথা প্রচ্ছন্ন রয়ে গেছে যে, নভী মানুষের সমগ্র জীবন ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তিত করে দিতে চান। নিসন্দেহে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাও এর অন্তর্ভুক্ত। কোনো ব্যক্তি যখন নিজেকে বিশ্বজগতের প্রভুর প্রতিনিধি হিসেবে পেশ করেন তখন এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে এ কথা স্বীকৃত হয় যে, তিনি মানুষের নিকট নিজের জন্যে পরিপূর্ণ আনুগত্যের দাবী করেন। কারণ বিশ্বজগতের প্রভুর প্রতিনিধি কখনো অন্য কারো অধীন প্রজা ও তার অনুগত হয়ে থাকার জন্যে আসেন না। বরং তিনি আসেন সবাইকে অনুগত করার ও তাদের শাসক ও রক্ষণা-বেক্ষণকারী হবার জন্যে। এক্ষেত্রে কোন কাফেরের শাসন কর্তৃত্বের মর্যাদা স্বীকার করে নেয়া তাঁর রিসালাতের মর্যাদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

রসূল পাঠাবার উদ্দেশ্য

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৬ পৃষ্ঠায়)

“(আর এটা আমি এ জন্যে করেছি যে,) এমন যেন না নয় যে, তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের ফলে যখন তাদের ওপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তারা একথা বলতে না পারেঃ হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের নিকট কোন রসূল পাঠাওনি কেন? (রসূল পাঠালে) আমরা তোমার আয়াতের অনুসারী হতাম এবং ঈমানদারদের অন্তুর্ভুক্ত হতাম”।–(সূরা আল কাসাসঃ ৪৭)

কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ কথাটিকেই রসূল প্রেরণের কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনের এ বর্ণনার প্রেক্ষিতে যদি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, এ উদ্দেম্রে সবসময় সকল স্থানেই একজন রসূল আসা উচিত, তাহরে ভুল করা হবে। কারণ যতদিন দুনিয়ায় কোনো রসূলের বাণী অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে এবং সাধারণ মানুষের নিকট তা পৌঁছুবার মাধ্যমও বিদ্যমান থাকে ততদিন কোনো নতুন রসূলের প্রয়োজন থাকে না। তবে যদি আগের বাণীর মধ্যে কোনো প্রকার বৃদ্ধি বা কোনো নতুন বাণী পাঠাবার প্রয়োজন হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে নতুন রসুলের আগমন ঘটে। কোনো ক্ষেত্রে যোগ্যতা হারিয়ে বসে তাহলে সেখানে লোকদের পক্ষে অবশ্যি এ ধরনের ওজর পেশ করার সুযোগ আসে যে, তাদের জন্যে হক ও বাতিলের মদ্যে পার্থক্য অবগত করাবার এবং সঠিক পথ বাতলে দেবার কোনো ব্যবস্থা আদৌ ছিল না, এ অবস্থায সত্য-সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া তাদের পক্ষে কেমন করে সম্ভবপর ছিল? এ ওজর দূর করার জন্যে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আল্লাহ তায়ালা নবী পাঠিয়ে থাকেন। ফলে এর পরে যে ব্যক্তি ভুল পথ অবলম্বন করবে তার ভুলের জন্যে তাকেই দায়ী করা সম্ভব হবে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে রসূল এ জন্যে আসেন না যে, কেবল তাঁর রিসালাতের ওপর ঈমান আনতে হবে অতপর নিজের ইচ্ছামত অন্য কারো আনুগত্য করলে চলবে। বরং রসূল আসার উদ্দেশ্যই এ হয়ে থাকে (যেমন ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে) যে, জীবনযাপনের জন্যে যে বিধান তিনি নিয়ে আসেন অন্য সমস্ত জীবনবিধান ত্যাগ করে একমাত্র সেই জীবনবিধান অবলম্বন করতে হবে এবং রসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশ দান করেন অন্য সব নির্দেশ উপেক্ষা করে একমাত্র সেই নির্দেশ পালন করতে হবে। রসূলকেই মেনে নেবার পর কোনো ব্যক্তি যদি এ কাজ না করে তাহলে তার রসূলকে মানাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

ফায়সালার সময়ের পূর্বে রসূলদের আগমন

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৭ পৃষ্ঠায়)

“রসূলদেরকে আমি সুসংবাদ দান ও সতর্ক করার কার্য সম্পাদন করা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পাঠাই না কিন্তু কাফেরদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তারা বাতিলের অস্ত্র নিয়ে হককে বিজিত দেখাবার চেষ্টা করে এবং তারা আমার আয়াতগুলো এবং তাদেরকে যেসব বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে সেগুলোকে বিদ্রুপ করে”। -(সূরা কাহাফঃ ৫৬)

অর্থাৎ ফায়সারার সময় আসার পূর্বে লোকদেরকে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার ভাল ও অমান্য করার মন্দ পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়ার জন্যেই আমি রসূল পাঠাই।

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৮ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহর নিকট ইসলামই একমাত্র দ্বীন। যাদেরকে কিতাব দান করা হয়েছিল তাদের পক্ষে এই দ্বীনকে বাদ দিয়ে অন্যান্য পথ অবলম্বন করার এ ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না যে, তাদের নিকট জ্ঞাস এসে যাবার পর তারা পরস্পরের ওপর বাড়াবাড়ি করার জন্যে এমনটি করেছিল”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ১৯)

এর অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ার যেখানে যখনই কোনো রসূল এসেছেন তিনি দ্বীন ইসলামের বাণী বহন করে এনেছেন এবং দুনিয়ার কোনো জাতির মধ্যে ভাষায় যখনই কোনো কিতাব নাযিল হয়েছে তা ইসলামেরই শিক্ষা দান করেছে। এ আসল দ্বীনকে বিকৃত করে এবং এর মধ্যে হ্রাস-বৃদ্ধি করে মানব জাতির মধ্যে যে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে তার কারণ এ ছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, লোকেরা নিজেদের বৈধ অধিকারের সীমা ছাড়িয়ে আরো অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও স্বার্থ লাভ করতে চাচ্ছিল। এ জন্যে তারা নিজেদের খেয়াল খুশীমত আসল দ্বীনের আকীদা-বিশ্বাস মূলনীতি ও বিধানের মধ্যে পরিবর্তন সাধন করে।

নবীগণ একই দ্বনের পতাকাবাহী

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৮ পৃষ্ঠায়)

“আর তারা নিজেদের মধ্যে নিজেদের দ্বীনকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলল, তাদের সবাইকে পিরে আসতে হবে আমার দিকে”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৯৩)

দুনিয়ায় যত নবীর আগমন ঘটেছে সবাই ছিরেন এই দ্বীনের পতাকাবাহী। সেই আসল দ্বীনটির মর্মকথা ছিল, মানুষের রব ও প্রতিপালক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ এবং একমাত্র তারই উপাসনা ও বন্দেগী করা উচিত। পরবর্তীকালে যতগুলো ধর্মের উদ্ভব হয় সবই ঐ আসল দ্বীনটির বিকৃত রূপ। কেউ তার থেকে একটি কথা নিয়েছে, কেউ অন্য একটি কথা নিয়েছে। কেউ তার একটি বিষয় উঠিয়ে নিয়েছে।, কেউ অন্য একটি বিষয়। তারপর তার সাথে নিজেদের পক্ষ থেকে অনেক কিছুই মিশিয়ে দিয়েছে। এভাবে অসংখ্য নবীগণই তাদরকে শতধা বিভক্ত করেছেন, তাহলে একে একটি নির্জলা মিথ্যাই বলা যেতে পারে। কেবলমাত্র এ ধর্মগুলোর বিভিন্ন চেহারা এবং বিভিন্ন যুগে ও দেশে এদেরে বিভিন্ন নবীর সাথে সংশ্লিষ্ট থকা একথা প্রমাণ করে না যে, ধর্মগুলোর এ বিভিন্নতা নবীদের সৃষ্ট। এক আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কোন প্রভুর বন্দেগী করা শিক্ষা দিতে পারেন না।

নবুয়াত লাভের পূর্বে নবীগনের চিন্তাধারা

কুরআন মজীদ থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী অবতরণের পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞান রাখতেন তা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের তুলনায় কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন হতো না। অহী অবতরণের পূর্বে তাঁদের নিকট জ্ঞানের এমন কোনো মাধ্যম ছিল না যা অন্যদের নিকট ছিল না। তাই কুরআন বলে, (আরবী*******) “তুমি জানতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি”। (আশশুরাঃ ৫২) (আরবী*********) “আর আল্লাহ তোমাকে পেলেন পথহারা হিসেবে তারপর তোমাকে পথের সন্ধান দিলেন”।

এর সাথে কুরআন আমাদেরকে একথাও জানায় যে, অন্যান্য লোকের জ্ঞান ও উপলব্ধির যেসব সাধারণ মাধ্যমের অধিকারী নবীগণ নবুয়াত লাভের পূর্বে সেগুলোর সাহায্যেই অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনার স্তর অতিক্রম করে যান। অহীর আগমন তাঁদের অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানকে শক্তিশালী করে দেয়। পূর্বে তাঁদের মন যেসম সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে আসছিল অহী সেগুলোর সত্য হবার ব্যাপারে নিশ্চিত ও চূড়ান্ত সাক্ষ্য প্রদান করে। এবং সে সত্যগুরোর সাথে তাঁদের প্রত্যক্ষ ও চাক্ষুষ পরিচয় ঘটিয়ে দেয়, যার ফলে তাঁরা পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে দুনিয়ার সামনে সেগুলোর সাক্ষ্য দিতে পারেন। সূরা হুদে এ বিষয়বস্তুটি একাধিকবার বর্ণিত হয়েছে। প্রথমে রসূলে করীম (সা) সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৯ পৃষ্ঠায়)

“তারপর কি সেই ব্যক্তি যে পূর্বেই তার রবের পক্ষ থেকে একটি উজ্জ্বল প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল (অর্থাৎ বুদ্ধিগত ও প্রকৃতিগত হেদায়াতের অধিকারী ছিল) অতপর আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাক্ষীও তার নিকট এল (অর্থাৎ কুরআন) এবং এর পূর্বে মূসার কিতাবও পথপ্রদর্শক ও রহমত হিসেবে বিদ্যমান ছিল (এ সত্যটির ব্যাপারে কি তারা সন্দেহ পোষণ করতে পারে?)”।–(সূরা হুদঃ ১৭)

অতপর এ বিষয়বস্তুটি আবার তৃতীয় রুকূ’তে হযরত নূহ আলাইহিস সালামের মুখে এভাবে ব্যক্ত হয়েছেঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৫৯ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার জাতির লোকেরা চিন্তা কর, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি উজ্জ্বল প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকে থাকি এবং তারপর তিনি নিজের পক্ষ থেকে আমার ওপর রহমতও (অহী ও নবুয়াত) বর্ষণ করে থাকেন আর সে বস্তু তোমাদের দৃষ্টিগোচর না হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কি জোরপূর্বক তা তোমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেব?”-(সূরা হুদঃ ২৮)

আবার ষষ্ঠ রুকূ’তে হযরত সালেহ (আ) এবং অষ্টম রুকূ’তে হযরত শো’আইব (আ) এই একই বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি করেছেন। এ থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অহীর মাধ্যমে বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি করেছেন। এ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অহীর মাধমে সরাসরি সত্যজ্ঞান লাভ করার পূর্বে নবীগণ চিন্তা-গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের প্রকৃতিগত যোগ্যতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে (ওপরের আয়াতে যাকে (আরবী********) বলা হয়েছে) তাওহীদ ও আখেরাত তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করতেন। সত্যের গভীরে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাঁদের এ সাফল্য আল্লাহ প্রদত্ত (আরবী) নয় বরং এটি হতো তাঁদের সোপার্জিত (আরবী***)। এরপর আল্লাহ তাঁদেরকে অহীর জ্ঞান দান করতেন। এটি সোপার্জিত নয় একটি হতো আল্লাহ প্রদত্ত।

এ প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলীর পর্যবেক্ষণ, চিন্তা, গবেষণা সাধারণ জ্ঞানের (Commonsense) ব্যবহার দার্শনিকদের আন্দাজ, অনুমান ও অনুধ্যান (Speculation) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। এ জিনিসটি ব্যবহারের দিকে কুরআন মজীদ নিজেই প্রত্রেকটি মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। কুরআন বার বার বলেছে, চোখ খুলে আল্লাহর প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলো দেখ এবং তা থেকে নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা কর।

রসূলের ইলমে গায়েব

যতটুকু ইলমে গায়েব বা অদৃশ্য জ্ঞান মানুষকে পৌঁছিয়ে দেয়া আল্লাহর উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র ততটুকু ইলমে গায়েব রসূলদেরকে দান করা হয়েছিল –এ ধারণা ভুল। এ ধারণা কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট বর্ণনার পরিপন্থী। কুরআন মজীদে হযরত ইয়াকুব (আ) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, নিজের ছেলেদেরকে তিনি বলেছেনঃ (আরবী*******) “আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন সব বিষয় জানি যা তোমরা জান না”।–(সূরা ইউসুফঃ ১১)

এ ছাড়াও কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে জানা যায়, বিভিন্ন জাতির ওপর শাস্তি প্রেরণের পূর্বে তাদের নবীদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল কিন্তু তাঁরা শাস্তি আসার সময়ও তার বিস্তারিত অবস্থা সম্পর্কে নিজেদের জাতিদেরকে অবহিত করেননি। হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে এত পূর্বে শাস্তির কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, তিনি সে সময়ের মধ্যে জাহাজ বানিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজের জাতিকে এ কথা বলেননি যে, তাদের ওপর বন্যার শাস্তি আসছে। আবার হাদীস থেকেও একথা জানা যায় যে, রসূলে করীম (সা)-কে গায়েবের এমন সব অবস্থা জানানো হয়েছিল যা তিনি উম্মতকে জানিয়ে যাননি। একবার এক ভাষণে রসূরে করীম (সা) বলেনঃ

(আরবী****************** পিডিএফ ৬০ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মত! আল্লাহর কছম, আমি যা জেনেছি তা যদি তোমরা জানতে তাহলে তোমরা খুব কমই হাসতে এবং বেশী করে কাঁদতে”।–(বুখারীঃ সাদকা ফিল কাসূফ অধ্যায়)

আর এক সময় রসূলে করীম (সা) বলেনঃ (আরবী**********) “আমি তোমাদেরকে পেছনে ঠিক তেমনিভাবে দেখি যেমন সামনে দেখি”।–(বুখারীঃ আযমাতু ইমামিন নাস অধ্যায়)।

মোটকথা এমনি আরো বহু হাদীস ও আয়াত থেকে একথা জানা যায় যে, রসূলদের মাধ্যমে যে পরিমাণ গায়েবের ইলম বান্দাদের নিকট পৌঁছেছে তার চাইতে অনেক বেশী পরিমাণে গায়েবের ইলম তাদেরকে দান করা হয়েছিল। স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধিও এ কথাই সমর্থন করে। কারণ গায়েবের যে ব্যাপারটুকু ঈমান ও আকীদার সাথে সম্পর্কিত কেবলমাত্র সেটুকু জানাই সাধারন মানুষের প্রয়োজন। কিন্তু রসূলদের কেবলমাত্র এতটুকু গায়েবের ইলম জানলে চলে না। তাঁদের আরো বহু কিছু জানার প্রয়োজন হয় যা রিসালাতের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের জন্যে সহায়ক হয়।যেমন রাষ্ট্রের নীতি ও গোপন রহস্য সম্পর্কে এক বিশেষ পর্যায় পর্যন্ত উপ-রাষ্ট্রপ্রধান ও গভর্ণরদের জানা থাকা প্রয়োজন। এ রহস্যগুরো সাধারণ প্রজাদের নিকট জানাজানি হয়ে গেলে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তেমনিভাবে আল্লাহর রাজ্য ব্যবস্থাপনারও বহু গোপন রহস্য আছে যেগুলো জানেন কেবলমাত্র আল্রাহর বিশেষ প্রতিনিধি ও তাঁর রসূলগণ। সাধারণ প্রজা অর্থাৎ সাধারণ মানুষেরা সে সবের বিন্দুবিসর্গও জানে না। এ গায়েবের ইলম রসূলদেরকে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সাহায্য করে কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্যে এর কোনো প্রয়োজন নেই এবং তারা এটি বরদাশত করারও ক্ষমতা রাখে না। অতি সংক্ষেপে এতটুকু বলা হয় যে, নবীর ইলম আল্লাহর ইলম থেকে কম এবং সাধারণ মানুষের ইলম থেকে বেশী হয়। তবে এ ইলমের পরিমাণ কতটুকু? কত বেশী বা কত কম? অবশ্যি এবাবে একে পরিমাপ করার মতো কোনো যন্ত্র আমাদের কাছে নেই।

নবীদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি

মানুসের সমাজে নবীগণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নাজুক মর্যাদার অধিকারী। একজন সাধারন মানুষের জীবনে সাধারণ একটি ঘটনা বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন করে না। কিন্তু ঐ একই ঘটনা নবীর জীবনে সংঘটিত হলে তা আইনে পরিণত হয়। এজন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদের জীবনের প্রতিটি ঘটনার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা হয়। যার ফলে তাঁদের সামান্যতম কোনো পদক্ষেপ এবং তাঁদের কোনো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজও আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিকূলে সংঘটিত হতে পারে না। নবী যদি কখনো এমন কোনো কাজ করেও থাকেন তাহলে সংগে সংগে তা সংশোধন করে দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী আইন ও তার মূলনীতিগুলো কেবলমাত্র আল্লাহর কিতাবেই নয় বরং নবীর উত্তম জীবনাদর্শ হিসেবেও মানুষের নিকট পৌঁছে যাবে এবং এমন সামান্যতম বস্তুও তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না যা আল্লাহর ইচ্ছার অনুসারী নয়।

প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ

নবীগণের মধ্যে থেকে প্রত্যেককে আল্লাহ তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী পৃথিবী ও আকাশের পরিচালন ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়েছেন এবং জড় ও অদৃশ্য জগতের মধ্যবর্তী পর্দা সরিয়ে দিয়ে এমন সব গোপন তত্ত্বেরও চাক্ষুষ পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যেগুলোর ওপডর সাধারণ মানুষকে ঈমান বিলগায়েব আনার আহবান জানাবার জন্যে তাঁরা নিযুক্ত হয়েছিলেন। এভাবে দার্শনিকদের থেকে তাঁদের মর্যাদা পৃথক সত্তার চিহ্নিত হয়ে গেছে। দার্শনিকরা আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কথা বলে থাকেন। তাঁরা যদি নিজেদের অবস্থা ও মর্যাদা সঠিক অবগত হতেন তাহলে কখনো নিজেদের কোনো মতের সত্যতার সাক্ষ্য দিতেন না। বিপরীতপক্ষে নবীগণ প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই সব কথা বলে থাকেন। তাঁরা মানুষের সামনে এভাবে সাক্ষ্য দিতে পারেনঃ আমরা যা কিছু বলছি তা আমারা ভালভাবে জাতি এবং আমরা তা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি।

অস্বাভাবিক শক্তি –[নবীদের অস্বাভাবিক শক্তি ও যোগ্যতা এবং তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্পর্কে “ব্যক্তি ও নবী হিসেবে রসূরে করীমের মর্যাদা” অধ্যায়ের “রিসালাত ও তার বিধান” অনুচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।]

(আরবী****************** পিডিএফ ৬২ পৃষ্ঠায়)

“যখন এ কাফেলা (মিসর থেকে) রওয়ানা হলো, তখন তাদের পিতা (কেনানে স্বগৃহে বসে) বললেনঃ আমি ইউসুফের খোশবু অনুভব করছি তোমরা (গৃহের বাসিন্দারা) যেন আবার এ কথা না বলে বসো যে, বুড়ো হয়ে গিয়ে আমার মতিভ্রম ঘটেছে”।–(সূরা ইউসুফঃ ৯৪)

এ থেকে নবীদের অস্বাভাবিক শক্তি আন্দাজ করা যেতে পারে। কাফেলা হযরত ইউসুফ (আ)-এর জামা নিয়ে সবেমাত্র মিসর থেকে যাত্রা করেছে এমন সময় শত শত মাইল দূরে বসে হযরত ইয়াকুব (আ) তার গন্ধ পেয়ে গেছেন। কিন্তু এ থেকে একথাও জানা যায় যে, এ শক্তি নবীদের নিজস্ব ছিল না। আল্লাহ তাঁদেরকে এ শক্তি দান করেছিলেন। তবে আল্লাহ যখন এবং যে পরিমাণ চাইতেন একমাত্র তখনই তাঁরা সেই পরিমাণ এ শক্তি কাজে লাগাতে পারতেন। হযরত ইউসুফ (আ) বছরের পর বছর মিসরে থাকলেন ক্নিতু হযরত ইয়াকুব (আ) কখনো তাঁর খোশবু পেলেন না। আর এখন তাঁর জামা মিসর থেকে চলা শুরু হবার সাথে সাথে হঠাৎ হযরত ইয়াকুব (আ)-এর ঘ্রাণ শক্তি এত বেড়ে গেলো যে, তিনি তার খোশবু পেতে লাগলেন।

নবীদের মানবিক সত্তা

পূর্ববর্তী সকল নবীই মানুষ-[নবীদের মানবিক সত্তা ও বিষয়বস্তুর উপর পরবর্তী আলোচনা একটি অনুচ্ছেদ সংযোজিত হয়েছে।] ছিলেন। তাঁরা আল্লাহর কোনো অভিনব সৃষ্টি ছিলেন না। একজন মুনষকে রসূল বানিয়ে পাঠানো একটা ইতিহাসের কোনো অভিনব ঘটনা নয়।

মুহাম্মদ (সা) এখন যে কাজ করছেন পূববর্তী নবীগণও ঐ একই কাজের জন্যে এসেছিলেন্ মুহাম্মদ (সা)-এর ন্যায় তাঁদের মিশন ও শিক্ষা একই ছিল। নবীদের সাথে আল্লাহ বিশেষ ব্যবহার করেছেন। তাঁদের ওপর বড় বড় বিপদ এসেছে। বছরের পর বছর তাঁরা বিপদের মধ্যে অবস্থান করেছেন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাঁদের ওপর বিপদ এসেছে আবর শত্রুরাও তাঁদেরকে বিপদে ফেলেছে। কিন্তু অবশেষে তাঁদের জন্যে এসেছে দো’য়া কুবল করেছেন। তাঁদের কষ্ট দূর করেছেন। তাঁদের শত্রুদেরকে পরাজিত করেছেন এবং অলৌকিকভাবে তাঁদেরকে সাহায্য দান করেছেন।

আল্লাহর প্রিয় ও মনঃপূত হওয়া সত্ত্বেও এবং তাঁর পক্ষ থেকে বড় বড় বিস্ময়কর শক্তি লাভ করার পরও তাঁরা ছিলেন আল্লাহর বান্দাহ ও মানুষ। তাঁদের একজনও খোদায়ী ক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন না।

নবীদের নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ

নবীরাও মানুষ। কোনো মানুষই মু’মিনের জন্যে নির্ধারিত পূর্ণমানে সর্বক্ষণ অবস্থান করার ক্ষমতা রাখে না। কোনো কোনো সময় কোনো নাজুক আবেগময় পরিস্থিতিতে নবীর ন্যায় শ্রেষ্ঠতম মানুষও সামান্যতম সময়ের জন্যে নিজের মানবিক দুর্বলতার নিকট হার মানেন। কিন্তু যখনই তিনি অনুভব করেন বা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর মধ্যে এ অনুভূতি সৃষ্টি করানো হয় যে, তিনি আকাংখিত মানের নীচে চলে যাচ্ছেন, তখনই তিনি তওবা করেন। নিজের ভুলের সংশোধন করার ব্যাপারে তিনি এক মুহুর্তের জন্যেও ইতস্ততঃ করেন না। হযরত নূহ (আ)-এর চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে যে, তাঁর যুবক পুত্র তাঁর চোখের সামনে অথৈ পানির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে, এ দৃশ্য তিনি চোখ দিয়ে দেখছেন, দৃশ্যের ভয়াবহতায় তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু যখনই আল্লাহ তাঁকে সতর্ক করে দিলেন যে, যে পুত্র হককে ত্যাগ করে বাতিলকে আঁকড়ে ধরেছে তাকে কেবলমাত্র নিজের ঔরসজাত বরে নিজের মনে করা নিছক একটি জাহেলী আবেগ নির্ধারিত চিন্তাধারার দিকে ফিরে এলেন।

নবীর নিষ্পাপ হওয়ার অর্থ এ নয় যে, তাঁর নিকট থেকে গুনাহ ও ভুল করার ক্ষমতা ও যোগ্যতা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, এমন কি তাঁর দ্বারা গুনাহ সংঘটিত হওয়ার কোন সম্ভাবনাই আই নেই। বরং এর অর্থ হচ্ছে, নবী গুনাহ করার ক্ষমতা রাখেন কিন্তু যাবতীয় মানবিক গুণাবলী, মানবিক আবেগ, অনুভূতি ও ইচ্ছা-অভিলাষের অধিকারী হওয়ার পরও তিনি এমনই সৎ ও খোদাভীরু হন যে, কখনো জেনে বুঝে গুনাহের সংকল্প করেন না। তাঁর বিবেকের মধ্যে নিজের প্রতিপালকের এত বিরাট ও শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণ মওজুদ থাকে যার মোকাবিলায় তাঁর প্রবৃত্তির আকাংখা কখনো সফলকাব হতে পারে না। এর পরও তাঁর অজ্ঞাতে যদি কখনো কোনো ভুল হয়েও যায় তাহলে সংগে সংগেই আল্লাহ প্রকাশ্য অহীর মাধ্যমে তাঁর সংশোধন করে দেন। কারণ তাঁর পদঙ্খলন মাত্র এক ব্যক্তির পদঙ্খলন নয় বরং একটি উম্মতের পদঙ্খলন। তিনি সত্যপথ থেকে এক চুল পরিমাণ সরে গেলে সারা দুনিয়া গোমরাহীর পথে কয়েক মাইল দূরে এগিয়ে যায়।

নবীদের গুণাবলী সম্পর্কিত কতিপয় আয়াত

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৩ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কিতাবে ইবরাহীমের কথা বর্ণনা কর নিশ্চয়ই সে ছিল একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি ও একজন নবী”-(সূরা মরিয়মঃ ৪১)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৩ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কিতাবে মূসার কথা আলোচনা কর। সে ছিল একজন মনঃপূত ব্যক্তি এবং একজন রসূল-নবী। আর আমি তাকে ডাক দিয়েছি তূরের ডান দিক থেকে এবং গোপন আলাপের মাধ্যমে তাকে নৈকট্য দান করেছি”।–(সূরা মরিয়মঃ ৫১-৫২)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৩ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কিতাব ইসমাঈলের কথা আলোচনা কর। তিনি ছিলেন ওয়াদা পূরণকারী এবং একজন রসূল-নবী। তিনি নিজের পরিবার-পরিজনকে নামায ও যাকাতের নির্দেশ দিতেন এবং নিজের রবের নিকট তিনি ছিলেন একজন পছন্দনীয় মানুষ। আর এ কিতাবে আলোচনা কর ইদরিসের কথা। অবশ্যি তিনি ছিলেন একজন সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি ও নবী এবং আমি তাকে উন্নত স্থানে উঠিয়েছিলাম”।–(সূরা মরিয়মঃ ৫৪-৫৭)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“এ নবীগণকে আল্লাহ পুরস্কৃত করেন, এরা ছিলেন আদমের বংশজাত আর তাদের বংশজত আর তামের বংশজাত যাদেরকে আমি নূহের সাথে নৌকায় উঠিয়েছিলাম এবং ইবরাহীমের বংশজাত ও ইসরাইলের বংশজাত আর এরা তাদের অন্তর্গত ছিল যাদেরকে আমি হেদায়াত দান করেছিলাম এবং নির্বাচিত করেছিলাম। তাদের অবস্থা ছিল এই যে, যখন রহমানের আয়াত তাদেরকে শুনানো হতো তখন তারা কান্নারত অবস্থায় সিজদায় ঝুঁকে পড়তো”।–(সূরা মরিয়মঃ ৫৮)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“আর এর পূর্বে আমি ইবরাহীমকে বিবেক-বুদ্ধি দান করেছিলাম এবং আমি তাকে খুব ভাল করেই জানতাম”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৫১)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“আর আ মি তাকে ও লূতকে বাঁচিয়ে এমন ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে গেলাম যেখানে আমি বিশ্ববাসীর জন্যে বরকত রেখেছি। আর আমি তাকে ইসহাক ও ইয়াকুব দান করেছি তার ওপর আরো অতিরিক্ত এবং তাদের প্রত্যেককে বানিয়েছি সৎ। আর আমি তাদেরকে নেতৃত্বের আসন দিয়েছি, যারা আমার হুকুমে পথ দেখায় এবং আমি তাদেরকে অহীর মাধ্যমে সৎকাজের, নামায কায়েম করার ও যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। আর তারা ছিল আমার ‘ইবাদাতকারী’।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭১-৭১)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৪ পৃষ্ঠায়)

“আর লূতকে আমি হুকুম ও তত্ত্বজ্ঞান দান করেছি এবং তাকে সেই জনপদ থেকে উদ্ধার করে এনেছি যার লোকেরা বদকাজ করতো। আসলে তারা অত্যন্ত খারাপ পর্যায়ের ফাসেক জাতি ছিল। লূতকে আমি আমার রহমত দান করেছি, এ জন্যে যে, সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭৪-৭৫)

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৫ পৃষ্ঠায়)

“আর এই একই নিয়ামত আমি নূহকে দান করেছি। স্মরণ করুন, এসবের আগে সে আমাকে ডেকেছিল আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ও তার পরিবারবর্গকে বিরাট মর্ম-বেদনা থেকে মুক্তি দিয়েছিলাম আর সেই জাতির মোকাবিলায় তাকে সাহায্য করেছিলাম যে আমার আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল। তারা ছিল অত্যন্ত বদ লোক। কাজেই তাদের সবাইকে আমি জলমগ্ন করেছিলাম”।

(আরবী****************** পিডিএফ ৬৫ পৃষ্ঠায়)

“আর দাউদ ও সুলাইমানকে আমি এই নিয়ামতই দান করেছি। সে সময়খার কথা স্মরণ কর যখন তারা দু’জন একটি ক্ষেতের মামলার মীমাংসা করছিল, যার মধ্যে রাতের বেলা অন্য লোকদের ছাগল ঢুকে পড়েছিল। আর আমি নিজেই তাদের বিচার দেখছিলাম। সে সময় আমি সুলাইমানকে সঠিক বিচার শিখিয়ে দিয়েছিলাম। অথচ দু’জনকে আমি সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি ও ইলম দান করেছিলাম। আর দাউদের সাথে আমি পাহাড় ও পক্ষীকূলকে বাধ্যানুগত করে দিয়েছিলাম, যারা তাসবীহ করতো। এ কাজটি আমিই করেছিলাম। আর তোমাদের উপকারার্থেই আমি তাকে বর্ম তৈরী করার শিল্পকারিতা শিখিয়েছিলাম, যাতে তোমাদেরকে পরস্পরের আঘাত থেকে রক্ষা করা যায়। তাহলে তোমরা কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারী হলে? আর সুলাইমানের জন্যে আমি দ্রুতগতিসম্পন্ন বাতাসকে বাধ্যানুগত করে দিয়েছিলাম, যা তার হুকুমে প্রবাহিত হতো এমন ভূখণ্ডের দিকে যার মধ্যে আমি বরকত রেখেছিলাম। এবং আমি সব জিনিসের জ্ঞান রাখি। আর শয়তাদের মধ্য থেকে এমন অনেককে তার অনুগত করে দিয়েছিলাম যারা তার জন্যে ডুবুরির কাজ করতো এবং এছাড়া অন্য কাজও করতো। আমিই ছিলাম এদের সবার রক্ষণাবেক্ষণকারী”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৭৮-৮২)

এ প্রসঙ্গে হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলাইমান (আ)-এর এ বিশেষ ঘটনার উল্লেখের পেছনে একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তা হচ্ছে, এ বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করানো যে, নবী ও আল্লাহর পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক শক্তি ও যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও নবীগণ আসলে মানুষই ছিলেন। খোদায়ী ক্ষমতার নামগন্ধও তাঁদের মধ্যে ছিল না। এ মামলায় অহীর মাধ্যমে হযরত দাউদ (আ)-কে সাহায্য করা হয়নি এবং তিনি রায় দেবার ব্যাপারে ভুল করে ফেলেছিলেন। হযরত সুলাইমান (আ)-কে সাহায্য করা হলো। ফলে তিনি সঠিক রায় দিলেন। অথচ তাঁরা উভয়েই নবী ছিলেন। তাঁদের দু’জনের যেসব গুণের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো বর্ণনার উদ্দেশ্যও হচ্ছে এ কথা বুঝানো যে, এগুলো ছিল আল্লাহ প্রদত্ত গুনাবলী এবং এ ধরনের গুণাবলী কাউকে আল্লাহর আসনে বসিয়ে দেয় না।

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৬ পৃষ্ঠায়)

“আর এই বস্তুই (বিবেক-বুদ্ধি এবং বিচার শক্তি ও জ্ঞানের নিয়ামত) আমি আইয়ুবকে দিয়েছিলাম। স্মরণ কর যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিলেন, ‘আমি রোগাক্রান্ত হয়েছি এবং তুমি সবচেয়ে বেশী করুণাশীল’। আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তার কষ্ট দূর করে দিয়েছিলাম। আর তাকে কেবলমাত্র তার পরিবার-পরিজন দান করেছিলাম তাই নয় বরং এই সংগে সমসংখ্যায় আরো দিয়েছিলাম আমার নিজের বিশেষ রহমত এবং এ জন্যে যে, এটা একটা শিক্ষণীয় বিষয় হবে ইবাদাতকারীদের জন্যে”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৩-৮৪)

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৬ পৃষ্ঠায়)

“আর এই একই নিয়ামত ইসমাঈল, ইদরিস ও যুলকিফলকেও দিয়েছিলাম। এরা সবাই ছিল সরকারী এবং এদেরকে আমি নিজেই রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম কেননা তারা ছিল সৎকর্মশীল”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৫-৮৬)

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৬ পৃষ্ঠায়)

“আর মৎসধারীকেও আমি আমার দানে ভূষিত করেছিলাম এবং মনে করেছিল আমি তাকে পাকড়াও করবো না। অবশেষে সে অন্ধকারের মধ্য থেকে ডেকে বলেছিলামঃ ‘তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, তোমর সত্তা পবিত্র, নিঃসন্দেহে আমি অপরাধ করেছি’। তখনই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং মর্মবেদনা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম এবং এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্দার করে থাকি”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৭-৮৮)

(আরবী*************************পিডিএফ ৬৭ পৃষ্ঠায়)

“আর যাকারিয়াকে, যখন সে তার প্রতিপালককে ডেকে বলেছিলঃ ‘হে আমর প্রতিপালক! আমাকে একাকী ছেড়ে দিয়ো না আর তুমি হচ্ছ সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী’। কাজেই আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম এবং তাকে ইয়াহইয়া দান করেছিলাম আর তার স্ত্রীকে তার জন্যে ত্রুটিমুক্ত করে দিয়েছিলাম। তারা সৎকাজে তৎপরতা দেখাত এবং আমাকে ডাকতো ভীতি ও আগ্রহ সহকারে আর আমার সামনে নত ছিল”।–(সূরা আল আম্বিয়াঃ ৮৯-৯০)

হযরত যাকারিয়া (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার উদ্দেশ্যই হচ্ছে এ কথা বুঝানো যে, এই নবীগণ সবাই ছিলেন নিছক আল্লাহর বান্দাহ ও মানুষ। তাঁদের মধ্যে খোদায়ীর নাম-গন্ধও ছিল না। অন্যদেরকে সন্তান দান করার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না, বরং তাঁরা নিজেরাই আল্লাহর নিকট সন্তান ভিক্ষা চাইতেন। হযরত ইউনুস (আ)-এর উল্লেক করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, একজন মহিমান্বিত নবীর বিরাট ব্যক্তিত্ব সত্ত্বেও ভুল করার সাথে সাথেই তাঁকে পাকড়াও করা হয়েছে। আর যখন তিনি নিজের প্রতিপালক প্রভুর সামনে নত হয়েছেন তাঁর প্রতি অস্বাভাবিক করুণাও প্রকাশ করা হয়েছে। তাকে মাছের পেট থেকে জীবন্ত অবস্থায় বের করে আনা হয়েছে। হযরত আইয়ুব (আ)-এর প্রসঙ্গে টানার উদ্দেশ্যই হচ্ছে একথা জানানো যে, বিপদাক্রান্ত হওয়া নবীদের জন্যে কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। আর নবী যখন বিপদে এবং রোগে আক্রান্ত হন তা থেকে উদ্ধারের জন্যে আল্লাহর কাছে রোগমুক্তির প্রার্থনা করেন। তাঁরা অন্যকে রোগমুক্ত করতে পারেন না। বরং বিপরীত পক্ষে তাঁরা আল্লাহর নিকট রোগমুক্তি চান। উপরন্তু এসব বর্ণনার আর একটা উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বাস্তব সত্যটিকে প্রতিষ্ঠিত করা যে, নবীদের সকলেই তাওহীদকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং এক আল্লহ ছাড়া আর কারোর সামনে নিজেদের প্রয়োজনের অবতারণা করতেন না। অন্যদিকে এ কতা প্রকাশ করাও এর উদ্দেশ্যের অন্তর্গত যে, আল্লাহ সবসময় তাঁর নবীদেরকে সাহায্য করেছেন অস্বাভাবিকভাবে। শুরুতে তাঁরা যতই পরীক্ষার সম্মুখীন হন না কেন, অবশেষে অলৌকিকভাবে তাঁদের দোয়া কবুল হয়েছে ও পূর্ণতা লাভ করেছে।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.