সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ২ – অহী

অহীর অর্থ, রূপ ও প্রকারভেদ

শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ

অহীর অর্থ হচ্ছে ইশারা করা, ইঙ্গিত করা, মনের মধ্যে কোনো কথা নিক্ষেপ করা গোপনে কোনো কথা বলা বা বাণী পাঠানো। অহীর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে ‘ত্বরিত ইশারা’ এবং ‘গোপন ইশারা’। অর্থাৎ এমন ইশারা যা ত্বরিত বেগে করা হয় এবং এমনভাবে করা হয় যার ফলে তা কেবলমাত্র যে করে এবং যাকে করে তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ জানতে পারে না। এ শব্দটিকে পারিভাষিক অর্থে এমন হেদায়াতের জন্যে ব্যবহার করা হয়েছে যা বিদ্যুৎ শিখার ন্যায় আল্লাহর পক্ষ তেকে তাঁর কোনো বান্দার মনের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়।

কারও নিকট আল্লাহর স্বয়ং উপস্থিত বা তাঁর নিকট কারও উপস্থিত হয়ে এবং তাঁর সামনাসামনি অবস্থান করে তাঁর সাথে কথা বলার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। তিনি জ্ঞানী ও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। মানব সমাজের হেদায়াত বা তাদেরকে পথ দেখাবার জন্যে যখনই তিনি কোনো বান্দার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে চান তাঁর ইচ্ছার পথে কোনো বাধা, কোনো প্রকার অসুবিধা দেখা দিতে পারে না। নিজের জ্ঞানের মাধ্যমে এ কাজের জন্যে তিনি অহীর পথ অবলম্বন করেন।

অহীর প্রকারভেদ

‘অহী’ শব্দটি যদিও বর্তমানে কেবল নবীগণের নিকট প্রেরিত অহীর জন্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে কিন্তু কুরআনে এ পারিভাষিক পার্থক্যটি দেখা যায় না। কুরআনের বর্ণনা অনুসারে আকাশের ওপরও অহী নাযিল হয় এবং সেই অনুযায়ী তার সমগ্র ব্যবস্থা পরিচালিত হয় (আরবী**********) জমিরেন ওপরও অহী নাযিল হয়, যার ইঙ্গিতে কার বিলম্ব না করেই সে নিজের কাহিনী শুনতে থাকে (আরবী******) ফেরেশতাদের ওপরও অহী নাযিল হয় এবং সে অনুযায়ী তারা কাজ করে (আরবী***********) মৌমাছিদেরকেও তাদের সমস্ত কাজ অহীর (প্রাকৃতির শিক্ষা) মাধ্যমে শেখানো হয়। যেমন সূরা নাহালের ৬৮নং আয়াতে বলা হয়েছে। অবশ্যি এ অহী কেবল মৌমাছি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই। পানিতে মাছের সাঁতরে বেড়ানো, শূন্যে পাখীদের উড়ে বেড়ানো এবং সদ্যজাত শিশুর দুধ পান করা –এসব শিক্ষা আল্লাহর অহীর মাধ্যমেই হয়ে থাকে। আবার চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা-অনুসন্ধান ছাড়াই একজন মানুষ যে সঠিক কৌশল, নির্ভুল রায় অথবা চিন্তা ও কর্মের সঠিক পথ লাভ করে তাও এ অহীর অন্তর্ভুক্ত (আরবী**********) এ অহী থেকে কোন মানুষও বঞ্চিত নয়। দুনিয়ায় যতগুলো আবিষ্কার হয়েছে, মানুষের কল্যাণার্তে যতগুরো নতুন নতুন বস্তু-বিষয় উদ্ভাবিত হয়েছে, বড় বড় চিন্তাশীল, রাষ্ট্রনায়ক, বিজেতা ও লেখকগণ যে সমস্ত বিরাট ও মহৎ কার্য সম্পাদন করেছেন সে সবের মধ্যে এই অহীর কার্যকারিতা দেখা যায়। বরং সাধারণ মানুষ দিনরাত এ ব্যাপারে বহুতর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় বসে বসেই মনের মধ্যে একটি কথার উদয় হয় অথবা মাথায় কোন নতুন কৌশল ও বুদ্ধি গজায় বা স্বপ্নের মধ্যে কিছু দেখা যায় এবং পরবর্তী অভিজ্ঞতায় সেটি একটি সঠিক পথ নিদেৃশ বলে প্রমাণিত হয়, যা অদৃশ্য থেকৈ তাকে দেয়া হয়েছিল। এই বহুবিধ অহীর মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের অহী নবী-রসূলগণের ওপর অবতীর্ণ হতো অন্যান্য অহীর সাথে এর পার্থক্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এখানে যাঁর উপর অহী অবতীর্ণ হয় তিনি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এ অহী অবতীর্ণ হচ্ছে। এ অহী আল্লাহর পক্স থেকে অবতীর্ণ হওয়ার ওপর তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস থাকে। এ ধরনের অহীর মধ্যে থাকে আকীদা-বিশ্বাস, বিধি-বিধান, আইন-কানুন এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিধি-নির্দেশ। নবীর মাধ্যমে মানব জাতিকে পথ দেখানোই হয় এর উদ্দেশ্য।

ভুল ধারণা

সূরা শু’রার (আরবী*******) আয়াতে যে অহীর মাধ্যমে সমস্ত আসমানি গ্রন্থ নবীগণের নিকট পৌঁছেছে তার আগমনের অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তাঁর একজন ফেরেশতার মাধ্যমে রসূলগণের নিকট অহী পাঠান। কেউ কেউ এ আয়াতটির ভুল মর্ম গ্রহণ করে এর অর্থ করেছেনঃ ‘আল্লাহ কোনো রসূল পাঠান যিনি তাঁর নির্দেশে সাধারণ মানুষদের কাছে তাঁর বাণী পৌঁছিয়ে দেন’। কিন্তু কুরএনর এ (আরবী**********) (অতপর সে অর্থাৎ ফেরেশতা অহী অবতীর্ণ করে অথবা পৌঁছায় –তাঁরই নির্দেশে যা কিছূ তিনি চান)। তাঁদের এ অর্থকে সুস্পষ্টরূপে ভুল প্রমাণ করে। সাধারণ মানুষের সামনে নবীদের তাবলীগকে কুরআনের কোথাও ‘অহী’ বলা হয়নি এবং আরবী ভাষায়ও মানুষের প্রকাশ্যে আলোচনাকে ‘অহী’ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করার কোন অবকাশই নেই। অহীর আভিধানিক অর্থই হচ্ছে গোপন ও দ্রুত ইশারা। আরবী ভাষা সম্পর্কে নেহাত অজ্ঞ ব্যক্তিই নবীদের তাবলীগের প্রতিশব্দ হিসেবে এ শব্দটি ব্যবহার করতে পারে।

বিভিন্ন প্রকার অহী সম্পর্কে আরও কিছু কথা

এক প্রকার অহীকে বলা যেতে পারে জিবিল্লী বা তাবিয়ী (প্রাকৃতিক) অহী। এর মাধ্যমে আল্লাহ প্রত্যেক সৃষ্ট জীবকে তার কাজ শিখিয়ে দেন। এ অহী মানুষের চেয়ে বেশী পশু-পাখীর ওপর এবং সম্ভবতঃ তারও চেয়ে বেশী উদ্ভিদ ও জড় পদার্তের ও পর অবতীর্ণ হয়। দ্বিতীয় প্রকারের অহীকে ‘জুযয়ী’ (আংশিক) অহী বলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে জীবন সংক্রান্ত বিষয়াবলীর মধ্য থেকে কোন কৌশল শিক্ষা দেন। এ অহীটি প্রতিদিন সাধারণ মানুষের ওপর অবতীর্ণ হয়। দুনিয়ার যত বড় বড় আবিষ্কার সবই এই অহীর মাধ্যমে সংঘটিত হয়। বড় বড় তাত্বিক উদ্ভাবনে এই অহী মদদ যোগায়। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর পেছনে এরই কার্যকারিতা দেখা যায়। দেখা যায় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই হঠাৎ একটি বিশেষ ঘটনা ঘটে গেছে এবং ইতিহাসের গতি প্রবাহের ওপর তা একটি সিদ্ধান্তকরী প্রভাব বিস্তার করেছে। এ ধরনের অহী অবতীর্ণ হয়েছিল হযরত মূসার মায়ের ওপর। এ দু’ধরনের অহী থেকে আলাদা আর এক প্রকার আচে যার মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে গায়েবের (অদৃশ্য জগতের) নিগূঢ় তত্ত্ব সম্পর্কে অবহিত করেন এবং জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তাঁকে হেদায়াত দান করেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি এ জ্ঞান ও হেদায়াত সাধারণ মানুষের নিকট পৌঁছাবেন এবং তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের পথে আনবেন। এ অহী একমাত্র নবীদের ওপর অবতীর্ণ হয়। কুরআন থেকে পরিস্কার জানা যায়, এ ধরনের জ্ঞানের নাম ইরকা, ইলহাম, কাশফ বা পারিভাষিক অর্থে অহী –যাই রাখা হোক না কেন, আম্বিয়া ও রসূল ছাড়া কাউকেই তা দেয়া হয় না। এ পর্যায়ের জ্ঞান নবীদেরকে এমনভাবে দেয়া হয় যার ফলে তাঁরা পূর্ণ বিশ্বাসস্থাপন করতে সক্ষম হন যে, এ জ্ঞানটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, শয়তাদের অনুপ্রবেশ থেকে এটি সম্পুর্ণ সংরক্ষিত এবং নিজেদের চিন্তা, কল্পনা ও প্রবৃত্তির প্রভাব থেকেও তা পুরোপুরি মুক্ত। উপরন্তু শরীয়াতের পক্ষ থেকে এ জ্ঞানটিই অকাট্য প্রমাণ রূপে বিবেচিত। এর আনুগত্য করা প্রত্যেকটি মানুষের জন্যে ফরয এবং সমস্ত মানুষকে এর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দেয়ার দায়িত্বেই নবীগণ নিয়োজিত হন। আবার এ অহীর ও পর ঈমান আনা পরকালীন মুক্তির অপরিহার্য শর্ত এবং একে উপেক্ষা করা চূড়ান্তভাবে ধ্বংসের দিকে নির্দেশ করে।

নবীগণ ছাড়া অন্য কোনো মানুষকে যদি এই তৃতীয় ধরনের অহীর কোনো অংশ দান করা হয় তাহলে তা এমন অস্পষ্ট ইঙ্গিতের পর্যায়ে থাকে যাকে পুরোপুরি অনুধাবন করার জন্যে নবুয়াতের অহীর আলোকের সাহায্য গ্রহণ করা (অর্থাৎ তাকে কুরআন ও সুন্নাহর ওপর পেশ করে তার ভ্রান্ত ও অভ্রান্ত হওয়ার ব্যাপারটি যাচাই করা এবং অভ্রান্ত হলে তার উদ্দেশ্য নির্ণয় করা) অপরিহার্য হয়। যে ব্যক্তি নিজের ইলহামকে হেদায়াতের একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম মনে করে এবং নবুয়াতের অহীর মানদণ্ডে তাকে যাচাই না করেই নিজে সেই অনুযায়ী কাজ করতে শুরু করে এবং অন্যদেরকে তার অনুসরণ করার আহবান জানায়, শরীয়াতের দৃষ্টিতে তার এহেন কাজের কোন বৈধতা স্বীকৃত হতে পারে না। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ সত্যটিকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে সূরা জ্বিনের শেষ আয়াতে  এ বিষয়টিকে সব রকমের আড়ষ্ঠতা ও অস্পষ্টতা মুক্ত করে বিকৃত করা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৩ পৃষ্ঠায়)

“তিনি (আল্লাহ) গায়েব (অদৃশ্য) সম্পর্কে জ্ঞাত। নিজের গায়েব সম্পর্কে কাউকেও জ্ঞাত করেন না, তবে একমাত্র সেই রসূলকে জ্ঞাত করেন যাকে তিনি গায়েবের কোনো জ্ঞান দানের জন্যে পছন্দ করেন। তখন তিনি তার সামনে পেছনে সংরক্ষক নিযুক্ত করেন, যাতে তিনি জানতে পারেন যে, তারা নিজেদের প্রতিপালকের বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছে। আর তিনি তাদের সমগ্র পরিবেশ ঘিরে আছেন এবং প্রত্যেকটি বস্তু গুণে রেখেছেন”।–(সূরা জ্বিনঃ ২৭-২৮)

মুসলমানদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ সৎ ব্যক্তি ও উন্নত পর্যায়ের সমাজ সংস্কারক তাঁদেরকে কেন নবীর সমপর্যায়ের কাশফ ও ইলহাম দেয়া হয়নি এবং কেন তাঁদেরকে এর চেয়ে নিম্নমানের এক ধরনের অনুগত কাশফ ও ইলহাম দেয়া হয়েছে, একটুখানি চিন্তা করলে সহজেই এর কারণ অনুধাবন করা যায়। প্রথমটি না দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, এটিই নবী ও সাধারণ উম্মতের মধ্যে পার্থক্যের সীমারেখা নির্দেশ করে। এ সীমারেখা কোনো-ক্রমেই উঠিয়ে দেয়া যেতে পারে না। আর দ্বিতীয়টি দেয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, যাঁরা নবীর পর তাঁর কাজকে জারী রাখার প্রচেষ্টা চালান। তাঁরা অবশ্যি দ্বীনের প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আল্লাহর পক্ষ থেকে সঠিক পথনির্দেশ লাভের মুখাপেক্ষী হন। অবশ্যি অবচেতনভাবে দ্বীনের প্রত্যেকটি একনিষ্ঠ ও নির্ভুল চিন্তার অধিকারী খাদেমকে এ জিনিসটি দান করা হয়। আর যদি কাউকে সচেতনভাবে এটি দান করা হয়, তাহলে তা হবে অবশ্যি আল্লাহর পুরস্কার।

স্বপ্নের মধ্যে অহী

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৪ পৃষ্ঠায়)

“ছেলেটি যখন তার সাথে ছুটাছুটি করার বয়সে উপনীত হল তখন (একদিন) ইবরাহীম তাকে বললঃ পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন তুমি বল এ ব্যাপারে তুমি কি মনে কর। সে বললঃ আব্বাজান, আপনাকে যা হুকুম দেয়া হচ্ছে আপনি তা করে ফেলুন”।–(সূরা আস সাফফাতঃ ১০২)

এ শব্দগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, নবী-পুত্র পিতার স্বপ্নকে নিছক স্বপ্ন মনে করেননি বরং আল্লাহর নির্দেশ মনে করেছিলেন। আর যদি যথার্থই এটি আল্লহার নির্দেশ না হ’ত। তাহলে অবশ্যই আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বা অন্তত ইশারা ইঙ্গিতে জানিয়ে দিতেন যে, ইবরাহীম পুত্র ভুলে এটিকে আল্লাহর নির্দেশ মনে করে নিয়েছে। কিন্তু এ আয়াতের পূর্বে বা পরের আলোচনায় এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত নেই। এ জন্যে ইসলামে এ আকীদার উদ্ভব হয়েছে যে, নবীদের স্বপ্ন নয় না বরং তা হয় এক ধরনের অহী। বলা বাহুল্য যে কথার ভিত্তিতে আল্লাহর শরীয়াতের মধ্যে এতবড় একটি মূলনীতি অনুপ্রবেশ করতে পারে সেটি যদি যথার্থ হ’ত তাহলে আল্লাহ অবশ্য তার প্রতিবাদ করতেন আল্লাহ এমন কোন ভুল করতে পারেন একথা তাদের পক্ষে মেনে নেয়া কোনোক্রমেই সমার্থক নয় যারা কুরআনকে আল্লাহর বাণী বলে স্বীকার করে।

মৌমাছির প্রতি অহী

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৪ পৃষ্ঠায়)

“আর দেখ, তোমার প্রতিপালক মৌমাছির প্রতি এই মর্মে অহী অবতীর্ণ করেছেন যে, পাহাড়গুলোর মধ্যে নিজেদের ঘর তৈরী কর”।–(সূরা আন নাহালঃ ৬৮)

অহীর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গোপন ও সূক্ষ্ম ইঙ্গিত। ইঙ্গিতকারী ও যার প্রতি ইঙ্গিত করা হয় তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ তা অনুভব করে না। এই সঙ্গতিপূর্ণ অর্থের প্রেক্ষিতে এ শব্দটি ‘ইলকা’ (মনের মধ্যে কথা নিক্ষেপ করা) ও ইলহাম (গোপন শিক্ষা ও নির্দেশ দান) অর্থে ব্যবহার হয়। আল্লাহ তাঁল সৃষ্টিকে যে শিক্ষা দেন তা যেহেতু কোন শিক্ষায়তনে দেয়া হয় না বরং এমন সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে দেয়া হয় যার ফলে বাহ্যতঃ একজন শিক্ষা দান করে ও অন্যজন শিক্ষা গ্রহণ করে এমনটি দেখা যায় না, তাই কুরআনে একে অহী, ইলহাম ও ইলকা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। বর্তমানে এ তিনটি শব্দ তিনটি পৃথক পারিভাষিক রূপ গ্রহণ করেছে। অহী শব্দটি কেবলমাত্র নবীদের জন্যে এবং ইলহাম অলী আউলিয়া ও বিশেষ বুজর্গানের জন্যে ব্যবহার হয় আর ইলকা তুলনামূলকভাবে সাধারনের জন্যে।

মূসার মায়ের প্রতি অহী

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

 “সে সময়ের কথা স্মরণ কর যখন আমি তোমার মাকে ইঙ্গিত করেছিলাম এমন ইঙ্গিত যা অহীর মাধ্যমেই করা হয়”।–(সূরা তা-হাঃ ৩৮)

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

“আমি মূসার মাকে ইশারা করলাম, তাকে দুধ পান করাও। তারপর যখন তার প্রাণের ভয় দেখা দেয় তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ কর”।–(সূরা আল কাসাসঃ৭)

অর্থাৎ আল্লাহর ইশারায় হযরত মূসা (আ)-এর মা এ কাজ করেছিলেন এবং আল্লাহর পূর্বাহ্নেই তাঁকে ভরসা দিয়েছিলেন যে, এ পথ অবলম্বন করলে কেবল তোমার সন্তানের প্রাণ রক্ষা পাবে না বরং আমি সন্তানকে তোমার কোলে ফিরিয়ে আনব এবং তোমার ছেলে হবে পরবর্তীকালে আমার রসূল।

শয়তাদের অহী নিজেদের সাথীদের প্রতি

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

“শয়তানরা তাদের সঙ্গীদের মনের মধ্যে সংশয় ও সন্দেহ নিক্ষেপ করে, যাতে তারা তোমাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়”।–(সূরা আনআমঃ ১২১)

রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর অহী কোন অভিনব ঘটনা নয়

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৫ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! আমি তোমার নিকট ঠিক তেমনিভাবে অহী পাঠিয়েছি যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের নিকট পাঠিয়েছিলাম। আর আমি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইয়াকুবের সন্তানদের ওপরও অহী নাযিল করেছিলাম”।

-(সূরা আন নিসাঃ ১৬৩)

একথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে সবাইকে জানিয়ে দেয়া যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন কোনো নতুন জিনিস আনেননি যা ইতিপূর্বে আর কেউ আনেনি। তিনি একথা দাবী করেননি যে, দুনিয়ার সামনে এ সর্বপ্রথম তিনিই একটি নতুন জিনিস পেশ করেছেন বরং পূর্ববর্তী সকল নবী জ্ঞানের যে উৎস থেকে হেদায়াত লাভ করেছিলেন তিনিও সেই একই উৎস থেকে হেদায়াত লাভ করেছেন। আর দুনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় যে সকল নবীর আবির্ভাব ঘটেছে তারা সর্বদা যে সকল সত্য ও ন্যায়ের বাণী পেশ করে এসেছেন তিনিও সেই একই সত্য ও ন্যায়ের বাণীর পুনরাবৃত্তি করেছেন মাত্র।

রসুলুল্লাহ (সা)-এর ওপর কুরআনের অহী অবতীর্ণ হওয়া

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৬ পৃষ্ঠায়)

“আর এ কুরআন অহীর মাধ্যমে আমার নিকট পাঠানো হয়েছে, যাতে তোমাদেরকে এবং আর যাদের নিকট এটি পৌঁছে তাদের সবাইকে সতর্ক করে দিতে পারি”।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৬ পৃষ্ঠায়)

“যখন তাদেরকে আমর সুস্পষ্ট কথা শুনিয়ে দেয়া হয় তখন যারা আমার সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে না তারা বলে, এটির বদলে অন্য কোনো কুরআন আন অথবা এর মধ্যে কিছু রদবদল করে নাও। হে মুহাম্মদ! এদেরকে বলে দাও, এর মধ্যে আমর নিজের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার পরিবর্তন করা আমার কাজ নয়, আমি কেবলমাত্র সেই অহীর অনুগত যা আমার নিকট আসে”।–(সূরা ইউনুসঃ১৫)

এখানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর “আমি এ কিতাবের রচয়িতা নই। বরং অহীর মাধ্যমে এটি আমার নিকট এসেছে এবং এর মধ্যে কোনো প্রকার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করার অদিকারই আমার নেই” –এ কথা সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। উপরন্তু এ কথাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এ ব্যাপারে সমঝোতা করার কোন সম্ভাবনাই নেই। গ্রহণ করতে হলে সমগ্র দ্বীনকে হুবহু যেমনটি আছে ঠিক তেমনটি গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় তা প্রত্যখ্যান করতে হবে।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৬ পৃষ্ঠায়)

 “কাজেই হে নবী, এমন যেন না হয় যে, তুমি ঐ জিনসগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটি ত্যাগ করবে যা তোমার প্রতি অহী হিসেবে অবতীর্ণ করা হচ্ছে এবং তা থেকে তোমর হৃদয় সংকুচিত হয়ে যাবে”।–(সূরা হুদঃ১২)

অর্থাৎ আমাদের দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তিকে মূল্য দেয়া যে হবে সৎ এবং যে ধৈর্য, দৃঢ়তা ও অবিচলতার সাথে ন্যায়, সততা ও সৎকর্মশীলতার পথে চলবে। কাজেই যে ধরনের সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ, অবহেলা, বিদ্রুপ ও কটাক্ষ এবং যে ধরনের মূর্খতা প্রসূত আপত্তি ও প্রশ্নের মাধ্যমে তোমর মোকাবিলা করা হচ্ছে তার কারণে তোমর দৃঢ়তা ও অবিচলতার মধ্যে যেন কোনো প্রকার পার্থক্য সূচিত না হয়। অহীর মাধ্যমে তোমার সামনে  যসত্য সুস্পষ্ট করা হয়েছে তার প্রকাশ ও ঘোষণা এবং তার পক্ষ থেকে দাওয়াত দেয়ার ব্যাপারে তোমার কোনো প্রকার ইতস্ততঃ না করা এবং ভীত ও সংকুচিত না হওয়া উচিত। তোমার মনে যেন কখনও  এ ধরনের চিন্তার উদ্রেকই না হয় যে, লোকেরা উমুক কথাটি শোনার সাথে সাথেই যখন বিদ্রুপবান নিক্ষেপ করতে থাকে তখন তা লোকদের সামনে উত্থাপন করিই বা কেমন করে। আর উমুক সত্যটি শোনার জন্যে যখন একেবারে প্রস্তুতই নয় তখন তা তাদের সামনে প্রকাশ করিই বা কেমন করে। কেউ মানুক বা না মানুক তুমি যাকে সত্য বলে জান তাকে কোনো প্রকার কমবেশী না করে নির্ভীক কণ্ঠে বলে যেতে থাকো। পরে যা কিছু হবে বা ঘটবে তা সম্পূর্ণ তো আল্লাহর হাতে।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! এগুরো গায়েবের খবর। অহরি মাধ্যমে আমি এগুলো তোমার নিকট অবতীর্ণ করছি। এর আগে তুমি এগুলো জানতে না এবং তোমার জাতিও জানত না”।–(সূরা হুদঃ ৪৯)

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“আলিফ-লাম-র। এগুলো সেই কিতাবের আয়াত যে নিজের বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। আমি তা নাযিল করেছি কুরআন রূপে আরবী ভাষায়, যাতে তোমরা (আরববাসীরা) তা ভালভাবে বুঝতে পার। হে মুহাম্মদ! আমি এ কুরআনকে তোমর নিকট অহী অবতীর্ণ করে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে তত্ত ও তথ্য তোমার নিকট বর্ণনা করেছি”।–(সূরা ইউসুফঃ ১-২)

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! এ কাহিনী গায়েবের খবরের অন্তর্ভুক্ত যা আমি তোমার ওপর অহী হিসেবে অবতীর্ণ করছি। আর তুমি তখন উপস্থিত ছিলে না যখন ইউসুফের ভাইয়েরা নিজেদের মধ্যে এক জোট হয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল”।–(সূরা ইউসুফঃ ১০২)।

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! এভাবেই আমি তোমাকে রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি এমন এক জাতির মধ্যে যাদের পূর্বে আরও বহু জাতি অতিক্রান্ত হয়েছে, যাতে তুমি তাদেরকে এমন বাণী শোনাও যা আমি তোমার ওপর অহীর মাধ্যমে নাযিল করছি এমন অবস্থায় যখন তারা নিজেদের করুণাময়ের কুফরী করছে”।–(সূরা আর রা’দঃ ৩০)।

রসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি অহী অবতীর্ণ হওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি

কুরআন মজীদে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৭৭ পৃষ্ঠায়)

“কোনো মানুষের অবস্থা এমন নয় যে, আল্লাহ তার সাথে সামনাসামনি কথা বলবেন। তবে তাঁর কথা হয় অহী (ইশারা) হিসেবে বা পর্দার অন্তরাল থেকে অথবা তিনি কোনো বাণীবাহক (ফেরেশতা) পাঠান আর সে তাঁর নির্দেশক্রমে যা কিছু তিনি চান অহীর মাধ্যমে নাযিল করেন। নিসন্দেহে তিনি শ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানী”।–(আশ শূরাঃ ৫১)

কুরআন ও হাদীস থেকে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ (সা)-কে এ তিনটি পদ্ধতিতেই হেদায়াত দান করা হয়।

একঃ হাদীসের বর্ণনায় হযরত আয়েশার যে বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে তা থেকে জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর অহীর সূচনা হয়েছিল সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। (বুখারী ও মুসলিম)। পরবর্তী পর্যায়েও এ ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ ছিল হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা)-এর বহু স্বপ্নের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেগুলোর মাধ্যমে তাঁকে শিক্ষাদান করা হয় বা কোনো কথা জানান হয়। কুরআন মজীদেও তাঁর একটি স্বপ্নের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়।–সূরা আল ফাতহঃ ২৭)। এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, উমুক কথাটি আমার দিললে নিক্ষেপ করা হয়েছে, আমাকে জানান হয়েচে অথবা আমাকে এ হুকুম দেয়া হয়েছে বা আমাকে এ থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এ ধরনের সমস্ত বিষয় প্রথম প্রকারের অহীর অন্তর্ভুক্ত। হাদীসে কুদসীর অধিকাংশই এ শ্রেণীভুক্ত।

দুইঃ মি’রাজের সময় রসূলুল্লাহ (সা)-কে দ্বিতীয় প্রকারের অহী দান করা হয়। বিভিন্ন নির্ভুল হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা)-কে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের নির্দেশ দেয়া এবং এ নিয়ে তাঁর বারবার আবেদন-নিবেদন করার ঘটনা যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা থেকে পরিস্কার জানা যায় যে, সে সময় আল্লাহ ও তাঁর বান্দাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে ঠিক তেমনি কথাবার্তা হয়েছিল যেমন তূর পাহাড়ে হযরত মূসা (আ) ও আল্লাহর মধ্যে হয়েছিল।

তিনঃ তৃতীয় প্রকারের অহী সম্পর্কে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠানো হতো। সূরা বাকারার ৯৭ ও সূরা শূ’আরার ১৯২ থেকে ১৯৫ পর্যন্ত আয়াতে কথা বর্ণনা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি কথা

রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর বিভিন্ন উপায়ে অহী আসত। আল্লামা ইবনে কাইয়েম তাঁর ‘যাদুল মা’আদ’ গ্রন্থে নিম্নোক্তভাবে এর বিস্তারিত বর্ণনা পেশ করেছেনঃ

একঃ সত্য স্বপ্নঃ এটি ছিল রসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর অহী নাযিলের প্রাথমিক অবস্থা। তিনি যেসব স্বপ্ন দেখতেন তা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট ছিল।

দুইঃ তাঁর দিলের মধ্যে ফেরেশতা একটি কথা বদ্ধমূল করে দিত। অথচ তাকে দেখতে পেতেন না। উদাহরণ স্বরূপ একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়, যাতে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, রুহুল কুদুস (জিবরাঈল) আমার মনের মধ্যে এ কথা নিক্ষেপ করেছে (অথবা ফুঁকে দিয়েছে) যে নিজের অংশের সম্পূর্ণ রেজেক লাভ না করা পর্যন্ত কোনো প্রাণী মরবে না। কাজেই আল্লাহকে ভয় করে কাজ কর এবং খাদ্য সংগ্রহের জন্যে ভাল পদ্ধতি অবলম্বন কর। আর খাদ্য লাভের ক্ষেত্রে বিলম্ব দেখে তুমি যেন আল্লহার নাফরমানীর মাধ্যমে তা সংগ্রহে উদ্যোগী হয়ো না। কারণ আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে (অর্থাৎ তাঁর পুরস্কার) তা কেবল তাঁর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমেই অর্জন করা যেতে পারে।

তিনঃ ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণ করে তাঁর সামনে এসে কথা বলত এবং ততক্ষণ পর্যন্ত বলতে থাকত যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার কথা পুরোপুরি মনের মধ্যে গেঁথে নিতে না পারতেন। অবস্থায় কখনও সাহাবাগণ ঐ ফেরেশতাকে দেখে নিয়েছেন।

চারঃ অহী নাযিল হবার পূর্বে তাঁর কানে একটা ঘন্টা বাজতে থাকত এবং এ সঙ্গে ফেরেশতাও কথাব লতে থাকত। এটিই ছিল অহী নাযিলের কঠিনতম পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে অহী নাযিলের সময় প্রচণ্ড শীতের দিনেও রসূলুল্লাহ (সা)-এর শরীর থেকে দরদর করে ঘাম ঝরে পড়ত। তখন তিনি উটের পিঠে চড়ে থাকলে বোজার ভারে উট বসে পড়ত। একবার তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রা)-এর উরুতে মাথা রেখে শুয়েছিলেন এমন সময় অহী নাযিল হতে থাকে। হযরত যাদেয় (রা)-এর উরুতে এত বেশী চাপ পড়ে যে, তা ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়।

পাঁচঃ আল্লাহ যে আকৃতিতে ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি সেই আসল আকৃতিতে তাকে দেখতেন। তারপর আল্লাহ যা কিছু হুকুম করতেন তা তাঁর ওপর অহীর আকারে নাযিল করতেন।

ছয়ঃ সরাসরি আল্লাহ তাঁর ওপর অহী নাযিল করেন। তিনি মি’রাজে আসমানে গেলে এ কার্য সংঘটিত হয়। আল্লাহ সেখানে নামায ফরয করেন এবং অন্যান্য কথাও বলেন।

সাতঃ ফেরেশতাদের মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহ তাঁর সাথে আলাপ করেন। যেমন মূসা আলাইহিস সালামের সাথে করেছিলেন। হযরত মূসা (আ)-এর এ মর্যাদা কুরআন  থেকে প্রমাণিত। আর রসূলুল্লাহ (সা)-এর ব্যাপারে এর উল্লেখ মিরাজ সংক্রান্ত হাদীসে পাওয়া যায়।

এ ছাড়াও কেউ কেউ আর একটি উপায়ও বর্ণনা করেছেন। তা হচ্ছে, “আল্লাহ অন্তরাল বিহীন অবস্থায় তাঁর সাথে কথা বলেছেন। এটা হচ্ছে তাদের বক্তব্য যারা বিশ্বাস করেন রসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহকে দেখেছিলেন। কিন্তু এ প্রশ্নে পূববর্তী ও পরবর্তী আলেমগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে”।–(যাদুল মা’আদঃ ১ম খণ্ড, ২৪-২৫ পৃঃ)।

আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী তাঁর ইতকান গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে সম্পূর্ণ একটি অধ্যায় এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন। তাঁর আলোচনার সংক্ষিপ্ত সার নীচে দেয়া হলঃ

“চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবী হলে প্রথম তিন বছর ইসরাফীল তাঁর শিক্ষা প্রশিক্ষণের কাজে নিযুক্ত থাকেন। তাঁর মাধ্যমে কুরআনের কোনো অংশ নাযিল হয়নি। অতপর জিবরাঈল অহী আনার কাজে নিযুক্ত হন। তিনি ২০ বছর পর্যন্ত কুরআন আনতে থাকেন। নিম্নোক্তভাবে অহী আসতে থাকে।

একঃ কানে ঘন্টা বাজতে থাকতো, তারপর ফেরেশতার ধ্বনি ভেসে আসতো। এ পদ্ধতির সুবিধে ছিল এই যে, ঘন্টা ধ্বনির সাথে সাথেই রসূলুল্লাহ (সা) সব দিক থেকে দৃষ্টি ও মন ফিরিয়ে এনে একমাত্র ফেরেশতার ধ্বনির প্রতি মনোনিবেশ করতে পারতেন। রসূলুল্রাহ (সা) বলেন, এ পদ্ধতিটি ছিল তাঁর জন্যে সবচেয়ে কঠিন।

দুইঃ তাঁর মনে ও দিলে একটি কথা বদ্ধমূল করে দেয়া হত, যেমন তিনি নিজে বলেছেন।

তিনঃ ফেরেশতা মানুসের বেশ ধরে এসে তাঁর সাথে কথা বলতো নবী করীম (সা) বলেন, অহীল এ পদ্ধতি আমার জন্যে সবচেয়ে সহজ ও হালকা হত।

চারঃ ফেরেশতা স্বপ্নের মধ্যে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলত।

পাঁচঃ আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শয়নে বা জাগরণে যে কোনো অবস্থায় সরাসরি কথা বলতেন।

আল্লাহর অহী হবার ব্যাপারে কুরআনে চ্যালেঞ্জ

নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বের চল্লিশ বছরের জীবনে রসূলুল্লাহ (সা) এমন কোনো শিক্ষা, অনুশীলন ও সংসর্গ লাভ করেননি যার ফলে তিনি তথ্যের বিপুল ভাণ্ডার লাভ করতে পারতেন, যার ঝর্ণাধারা নবুয়াত দাবীর সাথে সাথে হঠাৎ তাঁর কণ্ঠ থেকে প্রবাহিত হতে শুরু হয়েছিল। এখন কুরআনের একের পর এক সূরায় যেসব বিষয়ের আলোচনা আসছিল লোকেরা ইতিপূর্বে কোনোদিন তাঁকে সেসব বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করতে, আলোচনা করতে এবং ঐ ধরনের চিন্তাধারা প্রকাশ করতে দেখেনি। এমনকি এই চল্লিশ বছর বয়ঃসীমার কোনো অন্তরঙ্গ বন্ধু এবং কোনো নিকটাত্মীয়ও তাঁর চালচলন ও কথাবার্তায় এমন কোনে জিনিস অনুভব করেনি যাকে ঐ মহান দাওয়াতের ভূমিকা বা পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নেয়া যেতে পারে। এ থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, কুরআন তাঁর নিজের মস্তিষ্ক প্রসূত নয় বরং বাইর থেকে তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮০ পৃষ্ঠায়)

“হে মুহাম্মদ! তুমি সে সময় পশ্চিম কোণে উপস্থিত ছিলে না যখন আমি মূসাকে শরীয়াতের এ ফরমান দিয়েছিলাম। এবং তুমি তা প্রত্যক্ষও করনি। বরং তারপর (তোমার যুগ পর্যন্ত) আমি বহু বংশের উত্থান ঘটিয়েছি এবং তাদের ওপর বহু যুগ অতিক্রান্ত হয়েছে। তুমি মাদায়েনবাসীদের মধ্যেও উপস্থিত ছিলে না যাতে তাদেরকে আর তুমি তূরের পার্শ্বদেশেও সে সময় ছিলে না, যখন আমি (মূসাকে প্রথমবার) আহবান করেছিলাম। কিন্তু এ হচ্ছে তোমার রবের রহমত (যে তোমাকে এ তথ্য সরবহার করা হচ্ছে) যাতে তুমি তাদেরকে সতর্ক করতে পার, যাদের কাছে তোমার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। এর ফলে তাদের জ্ঞান ফিরে আসতে পারে”।

-(সূরা আর কাসাসঃ ৪৪-৪৬)

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়াতের প্রমাণ স্বরূপ এ তিনটি কথা পেশ করা হয়েছে। যে সময় এ কথাগুরো বলা হয়েছিল সে সময় মক্কার সরদারগণ ও সাধারণ কাফের সমাজ কোনো না কোনো প্রকারে তাঁকে অ-নবী এবং নাউযুবিল্লাহ নবুয়াতের মিথ্যা দাবীদার প্রমাণ করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছিল। তাদেরকে সাহায্য করার জন্যে ছিল হেজাযের বিভিন্ন স্থানে ইহুদী ওলামা ও ঈসায়ী যাজক সমাজ। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এই যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহাশূন্য থেকে এসে এ কুরআন শুনাচ্ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেম মক্কারই অধিবাসী। তাঁর জীবনের কোনো একটি দিকও তাঁর নিজের শহরের ও গোত্রের লোকদের দৃষ্টির অগোচরে ছিল না। এ কারণেই মক্কা, হেজায ও সারা আরব উপদ্বীপের কোনো এক ব্যক্তিও আজদের প্রাচ্যবিদদের ন্যায় এ ধরনের বাজে কথা বলার সাহস করেনি। যদিও মিথ্যা বলার ও মনগড়া দাবী উপস্থাপন করার ব্যাপারে তারা এদের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না কিন্তু দিনদুপুরে এ ধরনের ডাহা মিথ্যা তারা কেমন করেই বা বলতে পারত, যা এক মুহুর্তের জন্যেও কেউ বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল না। তারা কেমন করেই বা বলত, হে মুহাম্মদ, তুমি উমুক ইহুদী আলেম ও খৃষ্টান যাজকদের নিকট থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করে এনেছো। কারণ এ উদ্দেশ্যে সারাদেশ থেকে তারা কোনো এক ব্যক্তির নামও উচ্চারণ করতে পারত না। এ প্রসঙ্গে তারা কারোর নাম উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা প্রমাণ হয়ে যেত যে, রসূলুল্লাহ (সা) তার কাছ থেকে কোনো তথ্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য গ্রন্থাদির একটি বিরাট লাইব্রেরী তোমার নিকট আছে। উক্ত লাইব্রেরীর সংরক্ষিত পুস্তকাদির সাহায্যে তুমি এসব বক্তৃতা দিয়ে চলছ। কারণ লাইব্রের তো দূরের কথা, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধারে কাছে কোথাও একটি কাগজের টুকরাও তারা বের করতে পারত না যাতে এ তথ্যগুলো লিখিত রয়েছে। মক্কার ছেলে-বুড়ো সবাই জানত যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লেখাপড়া জানেন না। কেউ এ কথাও বলতে পারত না যে, তিনি কয়েকজন দোভাষী রেখেছিলেন, তারা হিব্রু, ল্যাটিন ও সুরইয়ানী ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদির অনুবাদ করে তাঁকে দিত। এমনকি তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে

নির্লজ্জ ব্যক্তিও এ দাবী করার সাহস রাখত না যে, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের কোনো খৃষ্টান পাদ্রী বা ইহুদী আলেমের সাথে কোনো আলোচনা করে থাকতেন, তাহলে রোমান সরকার তিলকে তাল বানিয়ে সটান অপপ্রচারে নেমে পড়ত এবং এ কথা প্রচার করতে একটুও দ্বিধা করত না যে, নাউযুবিল্লাহ মুহাম্মদ সবকিছু এখান থেকেই শিখে নিয়ে মক্কায় গিয়ে নবীর ভেক ধরেছিল। কাজেই দেখা যাচ্ছে, যে যুগে কুরআনের চ্যালেঞ্জ মুশরিক-কুরাইশদের জন্যে মৃত্যুর পয়গাম বহন করে আনত এবং তাকে মিথ্যা সপ্রমান করার প্রয়োজনীয়তা বর্তমান যুগের প্রাচ্যবিদদের তুলনায় তাদের জন্যে ছিল অনেক বেশী, সে যুগে কোনো এক ব্যক্তি কোথাও থেকে এমন কোনো কথ্য সংগ্রহ করে আনতে পারেনি, যা থেকে একথা প্রমাণ করা যায় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অহী ছাড়া ঐ তথ্যাবলী সংগ্রহ করার দ্বিতীয় কোনো মাধ্যম ছিল এবং সে মাধ্যমটিকে তারা চিহ্নিত করতেও সক্ষম হয়েছিল।

এ কথাও জেনে রাখা উচিত যে, কুরআন মাত্র এই এক জায়গায় এ চ্যালেঞ্জ করেনি। বরং বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কাহিনী বিবৃতি করে বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮২ পৃষ্ঠায়)

“এ হচ্ছে গায়েবের খবর, যা আমি তোমাকে দিচ্ছি অহীর মাধ্যমে। তুমি তাদের আশেপপাশে কোথাও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা মরিয়মের লালন পালন কে করবে এ ব্যাপারটি স্থিরিকৃত করার জন্যে লটারী করছিল। আর তুমি তখনও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা ঝগড়া করছিল”।–(সূরা আলে ইমরানঃ ৪৪)।

হযরত ইউসুফ (আ)-এর ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮২ পৃষ্ঠায়)

“এ হচ্ছে গায়েবের খবর, যা আমি অহীর মাধ্যমে তোমাকে জানাচ্ছি। তুমি তাদের (অর্থাৎ ইউসুফের ভাইদের) আশেপাশে কোথাও উপস্থিত ছিলে না যখন তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিল এবং যখন তারা নিজেদের কৌশল খাটাচ্ছিল”।

অনুরূপভাবে হযরত নূহের বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করার পর বলা হয়েছেঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮২ পৃষ্ঠায়)

“এ হচ্ছে গায়েবের খবর, যা আমি অহীর মাধ্যমে তোমাকে জানাচ্ছি। ইতিপূর্বে তুমি ও তোমার জাতি এ সম্পর্কে কিছুই জানতে না”।–(সূরা হুদঃ ৪৯)।

এ বিষয়টি বারবার উল্লেখ করায় এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, কুরআন মজীদে নিজের আল্লাহর কিতাব হবার এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আল্লাহর রসূল হবার স্বপক্ষে যেসব বড় বড় প্রমাণ পেশ করে আসছিল তার মধ্যে একটি প্রমাণ ছিল এইযে, শত শত হাজার হাজার বছর আগেকার ঘটনাবলীর যে বিস্তারিত বিবরণ একজন নিরক্ষর ব্যক্তির মুখে শ্রুত হচ্ছে, অহ ছাড়া তাঁর এ তথ্য-জ্ঞানের দ্বিতীয় কোনো মাধ্যম তাঁর কাছে নেই। যেসব কারণে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমসাময়িক লোকেরা তাঁকে আল্লাহর সত্য নবী এবং তাঁর ওপর অহী অবতীর্ণ হয় বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল এটি ছিল সেই গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর অন্যতম। সে যুগে ইসলাম আন্দোলনের বিরুদ্ধবাদীদের জন্যে এ চ্যালেঞ্জের জবাব দেয়া কত যে বেশী গুরুত্বের অধিকারী ছিল এবং এর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করার জন্যে তারা কোনো প্রকার চেষ্টার ত্রুটি করেনি, একথা যে কেউ সহজেই অনুমান করতে পারে। উপরন্তু এ কথাও সহজেই অনুমান করা যেতে পারে যে, এ চ্যালেঞ্জের মধ্যে যদি সামান্য কোনো প্রকার দুর্বলতা থাকত তাহলে একে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যে এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য সংগ্রহ করা সমকালীন লোকদের পক্ষে মোটেই কঠিন ছিল না।

বৃষ্টির সাথে অহীর তুলনা

কুরআনের দু’টি স্থানে নবী করীম (সা)-এর ওপর অবতীর্ণ রহমতের বারিধারার সাথে তুলনা করার ইঙ্গিত পাওয়া যায়ঃ

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৩ পৃষ্ঠায়)

“আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন আর প্রত্যেক নদী-নালা নিজের গ্রহণ ক্ষমতা অনুযায়ী তাকে গ্রহণ করে প্রবাহিত হয়েছে”।–(সূরা আর রা’আদঃ ১৭)

এ উপমায় রসূলুল্লাহর ওপর অবতীর্ণ অহীকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে আর ঈমান আনয়নকারী ভারসাম্যপূর্ণ অধিকারী লোকদেরকে তুলনা করা হয়েছে এমন সব নদী-নালার সাথে যেগুলো রহমতের বারিধারার কানায় কানায় ভরপুর হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষীয়তরা যে হৈ-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে রেখেছিল তাকে এমন ফেনাপুঞ্জ ও খড়কুটোর সাথে তুলনা করা হয়েছে যা সর্বদা বন্যার প্রবাহের সাথে পানির উপরিভাবে উঠে এসে বিপুর গর্জন সহকারে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দেয়।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৩ পৃষ্ঠায়)

“তুমি কি দেখছ না, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন এবং তার বদৌলতে ভূমি সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে?”-(সূরা আল হাজ্বঃ ৬৩)

এখানেও বাহ্যিক অর্থের একটি ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে। বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে নিছক আল্রাহর কুদরাত বর্ণনা করা। কিন্তু এর মধ্যে যে সুক্ষ্ম ইঙ্গিত লুকিয়ে রয়েছে তা হচ্ছে, আল্লাহ যে বৃষ্টিবর্ষণ করেন তার একটি ফোঁটা মাটিতে পড়ার সাথে সাথেই যেমন তোমরা দেখতে পাও শুষ্ক অনাবাদি জমিতে হঠা৭ চতুর্দিকে সবুজের সমরোহ, ঠিক তেমনি আজ অহীর আকারে আল্লাহর রহমতের যে বারিধারা বর্ষিত হচ্ছে তা শিঘ্রই তোমাদের সামনে এমনই একটি দৃশ্যের অবতারনা করবে। অর্থাৎ আরবের এ শুষ্ক অনুর্বর মরু এলাকা শিঘ্রই জ্ঞান, নৈতিকতা, চরিত্র ও সৎ সংস্কৃতির এমন এক গুলবাগে পরিণত হবে ইতিপূর্বে মানবেতিহাসে যার কোনো নজীর ছিল না।

রসূলের ওপর অবতীর্ণ অহী আল্লাহর রহমত

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৩ পৃষ্ঠায়)

“হে আমার জাতি! ভেবে দেখ, আমি রবের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট সাক্ষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলাম, তারপর তিনি নিজের পক্ষ থেকে আমার ওপর বিশেষ রহমত বর্ষণ করেছেন”।–(সূরা হুদঃ ২৮)

এ কথাটিই আগের রুকূ’তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্রামের মুখ দিয়ে উচ্চারণ করানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রথমে আমি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহর নিশানীসমূহ দেখে তাওহীদের নিগূঢ় তত্ত্বের মর্মোদ্ধার করেছিলাম। তারপর আল্লাহ নিজের রহমত (অর্থাৎ অহী) আমার ওপর বর্ষণ করলেন এবং আমার মন-প্রাণ পূর্ব থেকে যেসব সত্যের সাক্ষ্য দিয়ে আসছিল তিনি  আমাকে সরাসরি সেগুরোর জ্ঞানদান করলেন। এ থেকে এ কথাও জানা গেল যে, নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বে প্রত্যেক নবী নিজের চিন্তা, অনুসন্ধান ও নিরীক্ষার মাধ্যমে গায়েবের ওপর ঈমান লাভ করতেন। অতপর আল্লাহ তাঁদেরকে নবুয়াতের মর্যাদা দান করার সময় প্রত্যক্ষ বা চাক্ষুষ ঈমান দান করতেন।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৪ পৃষ্ঠায়)

“সালেহ বললোঃ হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা কি একতা চিন্তা করছ, যদি আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট সাক্ষ্য রাখতাম এবং তিনি আমার ওপর তাঁর রহমতও বর্ষণ করতেন”।–(সূরা হুদঃ ৬৩)।

রসূলের অহীর জন্যে রূহ শব্দের ব্যবহার

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৪ পৃষ্ঠায়)

“তিনি এই রূপ বা প্রাণসত্তাকে নিজের যে বান্দার ওপর চান নিজের হুকুমে ফেরেশতাদের মাধ্যমে নাযিল করে দেন (এ হেদায়াত সহকারে যে, লোকদেরকে) জানিয়ে দাও, আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন মাবুদ নেই, কাজেই তোমরা আমাকে ভয় কর”।–(সূরা আন নাহলঃ ২)

ওপরে বর্ণিত রূহের অর্থ নবুয়াতের প্রাণসত্তা, যাতে ভরপুর হয়ে নবী কাজ করেন ও কথা বলেন। এ অহী ও নবুয়াতের প্রাণসত্তা নৈতিক জীবনে এমনি এক গুরুত্ব ও মর্যাদার অধিকারী যেমন পার্থিব জীবনে প্রাণের গুরুত্ব ও মর্যাদাঃ এ জন্যে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এ অর্থ প্রকাশের জন্যে রূহঃ (প্রাণসত্তা) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

(আরবী*************************পিডিএফ ৮৪ পৃষ্ঠায়)

“এরা তোমাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। (এদেরকে) বলে দাও, রূহ আসে আমার রবের হুকুমে। কিন্তু তোমরা জ্ঞানের অতি অল্প অংশই লাভ করছ”।

-(সূরা বনি ইসরাইলঃ ৮৫)

সাধারণভাবে মনে করা হয়, এখানে রূহ অর্থ প্রাণ। অর্থাৎ লোকেরা রসূলুল্লাহ (সা)-কে জীবন প্রাণের তাৎপর্য জানার জন্যে প্রশ্ন করেছিল। আর এর জবাবে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহর হুকুমে আসে। কিন্তু এ অর্থ মেনে নিতে আমি একেবারেই প্রস্তুত নই। কারণ একমাত্র পূর্বাপর আলোচনা পরম্পরা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ আয়াতটিকে একটি পৃথক ও একক বাক্যরূপে গ্রহণ করার পরই এ অর্থ করা সম্ভব। অন্যথায় যে প্রসঙ্গের আলোচনা এখানে চলছিল তার মধ্যে রেখে বিচার করলে রূহকে প্রাণশব্দের প্রতিশব্দ অর্থে গ্রহণ করায় বিপত্তি দেখা দেবে অনেক বেশী। বাক্যের মধ্যে মারাত্মক অসংলগ্নতা দেখা দেবে। যেখানে পূর্ববর্তী তিনটি আয়াতে কুরআনকে বর্ণনা করা হয়েছে রোগ মুক্তির ব্যবস্থাপত্র হিসেবে এবং কুরআন অস্বীকারকারীদেরকে জালেম, অকৃতজ্ঞ ও আল্লাহর দান অস্বীকারকারীরূপে চিত্রিত করা হয়েছে এবং যেখানে আবর পরের আয়াতগুলোতে কুরআনের আল্লাহর কালাম হবার স্বপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ পেশ করা হয়েছে, সেখানে জীবদের মধ্যে প্রাণসঞ্জার হয় আল্লাহর হুকুমে –এ ধরনের বাক্য হঠাৎ মাঝখানে কিভাবে আসতে পারে? এর কোনো যক্তিসঙ্গ কারণ অনুধাবন করতে আমি অক্ষম।

বাক্যের পূর্বাপর আলোচনা পরস্পরাকে সামনে রেখে বিচার করলে পরিস্কার অনুভূত হবে যে, এখানে রূহ অর্থ ‘অহী’ অথবা ‘অহী বহনকারী ফেরেশতা’ ছাড়া অন্যকিছুই হতে পারে না। আসলে মুশরিকদের প্রশ্ন ছিল, তোমরা এ কুরআন কোথায় থেকে আনছো? এর জবাবে আল্লাহ বললেনঃ হে মুহাম্মদ! তোমাকে লোকেরা রূহ অর্থাৎ কুরআনের উৎস বা কুরআন লাভের মাধ্যম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে। তাদেরকে জানিয়ে দাও, এ রূহ আসে আমার রবের নির্দেশে। কিন্তু তোমরা এত স্বল্প পরিমাণ জ্ঞান রাখো, যার ফলে তোমরা মানুষের মুখের কথা ও আল্লাহর অহীর মাধ্যমে নাযিলকৃত কথার পার্থক্য বুঝতে পারো না এবং আল্লাহর কালাম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করে থাকো যে, কোনো মানুস এ কালাম তৈরী করছে।

এ ব্যাখ্যা কেবল এ জন্যেই অগ্রগণ্য নয় যে, পূর্বাপর বক্তব্যের সাথে আয়াতের সম্পর্ক এখানে এ ব্যাখ্যাই দাবী করে বরং কুরআন মজীদের অন্যান্য স্থানেও এ বিষয়বস্তুটি প্রায় এই একই শব্দের মাধ্যমে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা মুমিনে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৫ পৃষ্ঠায়)

“তিনি নিজের হুকুমে নিজের যে বান্দার ওপর চান রূহ নাযিল করেন, যাতে লোকদেরকে একত্রিত হবার দিনটি সম্পর্কে অবহিত করতে পারেন”।–(আয়াতঃ ১৫)

এবং সূরা শূরায় বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৫ পৃষ্ঠায়)

“আর এভাবেই আমি তোমার দিকে নিজের হুকুমে একটি রূহ পাঠালাম, তুমি জানতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি”।–(সূরা শূরাঃ ৫২)

পূর্ববর্তী মনীষীগণের মধ্যে ইবনে আব্বাস (রা), কাতাদাহ (রা) ও হাসান বসরী (রা) এই তাফসীর বর্ণনা করেছেন। ইবনে জারীর এ বক্তব্যটি কাতাদার বরাত দিয়ে ইবনে আব্বাসের সাথে সম্পর্কিত করেছেন। কিন্তু তিনি একটি অদ্ভূত কথা লিখেছেন যে, ইবনে আব্বাস এ কথাটি গোপনে বর্ণনা করতেন। রহুল মা’আনী তাফসীর গ্রন্থের লেখক হাসানও কাতাদার এ কতাটি উদ্ধৃতি করেছেন যে, “রূহ বলতে জিবরাঈল (আ)-কে বুঝানো হয়েছে। আর প্রশ্ন ছিল, তিনি কেমন করে নাযিল হন এবং কেমন করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে অহী নাযিল হয়।

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৫ পৃষ্ঠায়)

“আর এভাবে (হে মুহাম্মদ)! আমি নিজের হুকুমে একটি রূহ তোমর দিকে পাঠিয়ে দিয়েছি”।–(সূরা আশ শূরাঃ ৫২)

রূহ বলতে এখানে অহী বা এমন শিক্ষাকে বুঝানো হয়েছে যা অহীর মাধ্যমে রসূলুল্লাহ (সা)-কে দান করা হয়েছিল।

অহী হিসেবে অবতীর্ণ বাণীর পক্ষে যুক্তি-প্রমাণাদি

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যে বাণী অবতীর্ণ হয় তা মূলত আল্লাহরই বাণী। এ সত্যটি প্রমাণ করার জন্যে কুরআনের সাক্ষ্য হিসেবে চারটি কথা পেশ করা হয়েছে।

একঃ এ গ্রন্থটি বিপুল কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ। অর্থাৎ মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি সাধনার্থে এতে সর্বোত্তম নীতি সন্নিবেশিত হয়েছে। এতে আছে নির্ভুল আকীদা-বিশ্বাসের শিক্ষা। সৎকাজের উদ্দীপনা সৃষ্টি ও উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী অবলম্বনের নির্দেশ এর অঙ্গীভূত। পুত-পবিত্র জীবনযাপনের বিধান এর বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে মূর্খতা, স্বার্থান্ধতা, সংকীর্ণতা, যুলুম, অন্যায়, অশ্লীলতা ও অন্যান্য অসৎ কাজ –যেগুলো তোমরা পবিত্র আসমানী কিতাবগুলোর মধ্যে স্তূপিকৃত করে রেখে দিয়েছো –সেসব থেকে এ গ্রন্থটি সম্পূর্ণ মুক্ত।

দুইঃ এর আগে আল্লাহর পক্ষ থেকে যেসব হেদায়াতনামা এসেছিল এ গ্রন্থটি তার থেকে আলাদা কোনো হেদায়াত পেশ করে না। বরং সেই আগের গ্রন্থগুলোর মধ্যে যা কিছু পেশ করা হয়েছিল তার সত্যতা প্রমাণ করে বা তার প্রতি সমর্থন যোগায়।

তিনঃ প্রত্যেক যুগে যে উদ্দেশ্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসমানী গ্রন্থগুরো নাযিল করা হয়েছিল এ গ্রন্থটিও সেই একই উদ্দেম্যে অবতীর্ণ হয়েছে। এ উদ্দেশ্যটি ছিল গাফেল লোকদেরকে সজাগ করে দেয়া এবং ভুল ও বক্র পথে অগ্রসর হবার পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে অবগত করানো।

চারঃ এ গ্রন্থটি তার দাওয়াতের মাধ্যমে দুনিয়াপূজারী ও প্রবৃত্তির দাসদেরকে একত্রিত করেনি। বরং এমন সব লোকদেরকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ করেছে, যাদের দৃষ্টি পার্থিব জীবনের সংকীর্ণ সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আবার এ গ্রন্থের প্রভাবে তাদের মধ্যে এমন এক বিপ্লব সাধিত হয়েছে যার সবচেয়ে বড় চিহ্ন হচ্ছে, মানব জাতির মধ্যে আল্লাহ পরস্তির দিক দিয়ে তারা বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন। কোনো ভণ্ড ও মিথ্যুকের লেখা গ্রন্থ যা সে নিজে রচনা করে আল্লাহর রচিত বলে দাবী করার মতো জঘন্যতম অপরাধ করার দুঃসাহস করে কি কোনো দিন এ ধরনের বৈশিষ্ট্য ও ফলাফলের অধিকারী হতে পারে।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.