সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ৩ – নবুয়াতে মুহাম্মদী (সা)-এর প্রয়োজন ও তার প্রমাণ

পূর্ববর্তী নবীগণের পরে রসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রেরন করার কারণ

(আরবী******************************পিডিএফ ৮৯ পৃষ্ঠায়)

“আর প্রকৃতপক্ষে অতীদের লোকদের পরে যাদেরকে কিতাবের উত্তরাধিকারী করা হয়েছে তারা তার পক্ষ থেকে অস্বস্তিকর সন্দেহের মধ্যে পড়ে রয়েছে”। -(সূরা আশ শূরাঃ ১৪)

প্রত্যেক নবী ও তাঁর নিকটবর্তী তাবেয়ীগণের যুগে অতিক্রান্তের পর পরবর্তী বংশধরদের নিকট আল্লাহর কিতাব পৌঁছলে তারা আস্থা ও প্রত্যয়ের সাথে তা গ্রহণ করেনি। বরং সে সম্পর্কে তারা ভীষণ রকমের সংশয় ও মানসিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তাদের এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে বহুবিধ কারণ ছিল। তাওরাত ও ইঞ্জীলের ব্যাপারে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তা অধ্যয়নের পর আমরা এ কারণগুলো অতি সহজেই অনুধাবন করতে পারি। পূর্ববর্তী বংশধররা এ কিতাব দু’টিকে তাদের আসল ভাষা ও বর্ণনা অপরিবর্তিত রেখে এবং মূল কালামের সাথে ব্যাখ্যা, ইতিহাস, কানে শুনা বিভিন্ন বর্ণনা ও ফকীহগণ উদ্ভাবিত আনুসংগিক বিষয়াবলীর আকারে মানুষের কথাও মিশ্রিত করে দেয়। তাদের অনুবাদগুলোকে এতবেশী ছড়ায় যার ফলে মূল অদৃশ্য হয়ে যায় এবং কেবল অনুবাদগুলোই লোক সমক্ষে থেকে যায়। এগুলোর ঐতিহাসিক প্রামাণ্যতাও এমনভাবে নষ্ট করে দেয়া হয় যার ফলে আজ কোনো ব্যক্তি পূর্ণ প্রত্যয় সহকারে এ কথা বলতে পারে না যে, হযরত ঈসা (আ) বা হযরত মূসা (আ)-এর ওপর দুনিয়াবাসীদের জন্যে যে কিতাব নাযিল করা হয়েছিল তার হাতে যে কিতাবটি রয়েছে সেটিও সেই আসল কিতাব। তাদের নেতৃবর্গ ও মনীষীবৃন্দ মাঝে মাঝে ধর্ম, আল্লাহ, দর্শন, আইন, দেহ, আত্মা ও সমাজ সম্পর্কে এমন সব আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন এবং এমন সব চিন্তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন যার গোলক ধাঁধাঁয় আটকা পড়ে হাজারো জটিল পথগুলোর মধ্য থেকে সত্যের সরল সোজা পথটি বেছে নেয়া মানুষের জন্যে অসম্ভব রকমের কঠিন হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে আল্লাহর কিতাবও তার আসল আকৃতিতে ও নির্ভরযোগ্য অবস্থায় বিদ্যমান ছিল না। কাজেই লোকদের জন্যে এমন কোন নির্ভযোগ্য সূত্রের দিকেও দৃষ্টিপাত করা সম্ভব ছিল না, যা হককে বাতিল থেকে আলাদা করার জন্যে তাদেরকে সাহায্য করতে পারতো।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, আরব ভূখণ্ডে হযরত হুদ (আ) ও হযরত সালেহ (আ)-এর মাধ্যমে সর্বপ্রথম সত্য দ্বীনের দাওয়াত এসে পৌঁছেছিল। এটা ছিল প্রাক ঐতিহাসিক যুগের ঘটনা। তাপর এলেন হযরত ইবরাহীম (আ) ও ইসমাঈল (আ)। তাঁরা এসেছিলেন রসূলে করীম (সা)-এর আড়াই হাজার বছর আগে। তাঁদের পরে এবং রাসূলে করীম (সা)-এর পূর্বে আরব ভূখণ্ডে যে সর্বশেষ নবী এসেছিলেন তিনি ছিলেন হযরত শোআইব আলাইহিস সালাম।

আরববাসীরা পূর্ব থেকেই একজন নবীর দাবী জানিয়ে আসছিল

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“এরা বড় বড় কসম খেয়ে বলতো যদি কোনো সতর্ককারী তাদের এখানে আসতো, তাহলে তারা দুনিয়ার সকল জাতির চেয়ে বেশী সত্যপথাবলম্বী হতো”।

-(সূরা আল ফাতেরঃ ৪২)

রসূলে করীম (সা)-এর নবুয়াত লাভের পূর্বে ইহুদী ও খৃষ্টানদের বিকৃত নৈতিক অবস্থা দেখে আরবের লোকেরা সাধারণভাবে এবং কুরাইশরা বিশেষভাবে এ কথা বলতো।

অনুরূপভাবে সূরা আন’আমে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“এ কিতাব আসার পর এখন তোমরা এ কথা বলতে পারো না যে, আমাদের আগের দু’টি দলকে তো কিতাব দেয়া হয়েছিল আর তারা কি পড়তো বা পড়াতো তা আমাদের জানা ছিল না। আর এখন তোমরা এ বাহানাবাজীও করতে পারো না যে, আমাদের ওপর কিতাব নাযিল করা হলে আমরা তাদের চেয়ে বেশী সত্যপথাবলম্বী প্রমাণিত হতাম”।–(সূরা আল আন’আমঃ ১৫৬-১৫৭)

সূরা আস সাফফাতে বলা হয়েছেঃ

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“এরা প্রথমে একথা বলে বেড়াতো যে, হায় আমাদের কাছে যদি সেই ‘যিকর’ থাকতো যা আগের জাতিরা লাভ করেছিল তাহলে আমরা আল্লাহর একান্ত নিষ্ঠাবান বান্দাই হতাম”।–(সূরা আস সাফফাতঃ ১৬৭-১৬৯)

একটি উজ্জ্বল প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন

(আরবী******************************পিডিএফ ৯০ পৃষ্ঠায়)

“আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল (তার নিজেদের কুফরী থেকে) বিরত থাকার লোক ছিল না, যতক্ষণ না তাদের নিকট উজ্জ্বল প্রমাণ আসে (অর্থাৎ) আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল আসেন যিনি পবিত্র সহীফা পড়ে শুনান”।–(সূরা আল বাইয়েনাহঃ ১-২)

অর্থাৎ একটি উজ্জ্বল প্রমাণ এসে তাদেরকে কুফরীর প্রত্যেকটি অবস্থার ভ্রান্তি ও তার সত্য বিরোধী হবার বিষয়টি বুঝিয়ে দেবে এবং সরল ও নির্ভুল পথটি সুস্পষ্টভাবে ও যুক্তিসংগত পদ্ধতিতে তাদের সামনে তুলে ধরবে, এ ছাড়া কুফরীর অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার দ্বিতীয় কোনো পথ তাদের কাছে ছিল না। এর অর্থ এ নয় যে, এই সুস্পষ্ট প্রমাণটি এসে গেলেই তারা সবাই কুফরী পরিহার করবে। বরং এর অর্থ হচ্ছে এ প্রমাণটির অবর্তমানে তাদের পক্ষে এ অবস্থাটির প্রভাব এড়িয়ে বের হয়ে আসা কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। আর এখন এর আগমনের পরও তাদের মধ্য থেকে যারা কুফরীর ওপর অবিচল থাকবে তার জন্যে তারা নিজেরাই দায়ী হবে। এপর তারা আল্লাহর নিকট এ বলে অভিযোগ করতে পারবে না যে, তাদের হেদায়াতের জন্যে তিনি কোনো ব্যবস্থা করেননি। কুরআন মজীদে এ কথাটি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরা আন নাহল-এ বলা হয়েছে (আরবী******) “সোজা পথ দেখানো আল্লহার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত”।–(৯ আয়াত) সূরা আল লাইল-এ বলা হয়েছে (আরবী*******) “পথ দেখানোর দায়িত্ব আমার”।–(১২ আয়াত)

(আরবী******************************পিডিএফ ৯১ পৃষ্ঠায়)

“(হে নবী) আমি তোমর দিকে অহী নাযিল করেছি যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীদের প্রতি নাযিল করেছিলাম। এ রসূলদেরকে সুসংবাদদানকারী ও সতর্ককারীদের দায়িত্ব দেয়া হয়, যাতে রসূলদের আগমনের পর লোকদের জন্যে আল্লাহর নিকট কোনো ওজর-আপত্তি পেম করা সম্ভব না হয়”।–(সূরা আন নিসাঃ ১৬৩-১৬৫)

(আরবী******************************পিডিএফ ৯১ পৃষ্ঠায়)

“হে আহলে কিতাব! রসূলদের আগমনের ধারাবাহিকতা দীর্ঘকাল বন্ধ থাকার পর তোমাদের নিকট আমার রসূল এসে গেছেন সত্যকে সুস্পষ্ট করার জন্যে। যাতে তোমরা এ কথা না বলতে পারো যে, তোমাদের কাছে কোনো সুসংবাদদাতা ও কতর্ককারী আসেননি। কাজেই দেখ, এখন তোমাদের কাছে সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এসে গেছে”।–(সূরা আল মায়েদাহঃ ১৯)

(আরবী******************************পিডিএফ ৯১ পৃষ্ঠায়)

“পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল সত্য পথের বর্ণনা সুস্পষ্ট হবার পরই তাদের মধ্যে বিভেদ এসেছিল”।–(সূরা আল বাইয়েনাহঃ ৪)

অর্থাৎ ইতিপূর্বে আহলে কিতাবগণ নানাপ্রকার গোমরাহীর শিকার হয়ে নানা দলে উপদলে বিভক্ত হয়েছে। আল্লাহ তাদের পথনির্দেশের জন্যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাঠাবার ব্যাপারে কোনো প্রকার প্রচেষ্টার ত্রুটি করেছেন বলেই তাদের এই দশা হয়েছে তা নয়। বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পথনির্দেশ আসার পর তারা এ নীতি অবলম্বন করেছিল। তাই তাদের গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতার জন্যে তারা নিজেরাই দায়ী ছিল। কারণ তাদের নিকট সত্যকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছিল। অনুরূপভাবে বর্তমানে যেহেতু তাদের গ্রন্থগুলো অবিকৃত নেই, সেগুলো নির্ভুল শিক্ষা সম্বলিত নয়, তাই আল্লাহ একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে নিজের একজন রসূল পাঠিয়েছেন এবং তাঁর মাধ্যমে নির্ভুল শিক্ষা সম্বলিত পবিত্র ও অবিকৃত গ্রন্থ দান করে তাদের নিকট সত্যকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। কাজেই এর পরও যদি তারা বিভেদে লিপ্ত থাকে তাহলে তার সমস্ত দায়িত্ব তাদের নিজেদের ওপর বর্তাবে। আল্লাহকে তারা কোনো প্রকারে দায়ী করতে পারবে না। কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে এ কথা বিভিন্ন ভাবে বলা হয়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ দেখুন সূরা বাকারাহ ২১৩ ও ২৫৩ আয়াত, আলে ইমরান ১৯ আয়াত, মায়েদাহ ১৬-১৮ আয়াত। এ সংগে তাফহীমুল কুরএন সংশ্লিষ্ট সূরাগুলোর ব্যাখ্যা প্রসংগে আমি যে টীকা সংযোজন করেছি সেগুলো এক নজর দেখে নিলে বিষয়টি বুঝতে আরও সহজ হবে।

রসূল পাঠাবার অবশ্যি প্রয়োজন ছিল। কারণ মুশরিক, আহলি কিতাব নির্বিশেষে দুনিয়ার সমস্ত মানুষ যে ধরনের কুফরীতে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল তা থেকে তাদের বের হয়ে আসা একজন নবীর সহযোগিতা ছাড়া কোনোক্রমেই সম্ভবপর ছিল না। তাদের এমন একজন নবীর সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল যাঁর নিজের অস্তিত্বই হবে তাঁর রিসালাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ। তিনি মানুষের সামনে আল্লাহর কিতাবকে আসল, অবিকৃত ও নির্ভুল অবস্থায় উপস্থি করবেন। ইতিপূর্বেকার আসমানী গ্রন্থগুলোতে যেসব বাতিলের মিশ্রণ ঘটেছিল সেসব থেকে এ গ্রন্থটি হবে মুক্ত। এ গ্রন্থটিতে ঘটবে কেবলমাত্র সঠিক, নির্ভুল ও যথার্থ সত্য শিক্ষার সমাবেশ।

নবী প্রেরণের স্থান নির্বাচন

পৃথিবীর মানচিত্রের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে নজরেই ধরা পড়বে যে, সারা দুনিয়ার পয়গম্বরীর জন্যে পৃথিবীর বুকে আরব ভূখণ্ডের চেয়ে উপযোগী দ্বিতীয় আর কোনো স্থান নেই এবং হতেও পারে না। এ দেশটি এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের একেবারে মধ্যস্থলে অবস্থিত। ইউরোপও এখান থেকে অনেক নিকটে। বিশেষ করে সে যুগে ইউরোপের সুসভ্য জাতিগুলোর অধিকাংশের বসতি ছিল এ মহাদেশটির দক্ষিণ অংশে। আর এ অঞ্চলটি আরবের ঠিক ততটা নিকটবর্তী ছিল যেমন ছিল তৎকালীন হিন্দুস্তান।

সেকালের ইতিহাস পড়লেও জানা যাবে, এ নবুয়াতের জন্যে সে যুগে আরব জাতির চেয়ে উপযোগী আর কোনো জাতিই ছিল না। অন্য বড় বড় জাতিরা নিজদের শক্তি-প্রভাব-প্রতিপত্তির চূড়ান্ত প্রকাশের পর নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে আরব জাতি ছিল নতুন প্রাণ বন্যায় ভরপুর। সভ্যতা সংস্কৃতির উন্নতির ফলে অন্যান্য জাতির অভ্যাস ও প্রকৃতি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আরব তখনো পর্যন্ত কোনো উন্নত সভ্যতার স্পর্শ থেকে দূরে ছিল। যার ফলে এ জাতিটি বিলাসী, আরামপ্রিয় ও নিকৃষ্ট স্বভাবের অধিকারী ছিল না। ঈসায়ী ষষ্ঠ শতকের আরব সমকালীন সভ্য জাতিগুলোর কুপ্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। সভ্যতার আলো থেকে বহুদূরে অবস্থানরত একটি জাতির মধ্যে যতগুলো মৌলিক মানবিক সৎগুণ থাকতে পারে তার সবগুলোই তাদের মধ্যে ছিল। তারা ছিল সাহসী, নির্ভীক, দানশীল, ওয়াদা পালনকারী, স্বাধীন চিন্তাবৃত্তির অধিকারী ও স্বাধীনচেতা। তারা অন্র কোনো জাতির অধীনতাপাশে আবদ্ধ ছিল না। নিজের মর্যাদা রক্ষার্থে প্রাণ দিয়ে দেয়া তাদের জন্যে ছিল অত্যন্ত সহজ। সরল ও অনাড়ম্ব জীবন প্রণালীই ছিল তাদের বৈশিষ্ট্য। বিলাসিতা ও আরামপ্রিয়তার সাথে কোন সম্পর্কই তাদের ছিল না। নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে অনেকগুলো অসৎগুণও ছিল। কারণ আড়াই হাজার বছর থেকে তাদের এলাকায় কোনো নবী আগমন হয়নি।–[হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর যুগ ছিল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। মাঝখানের এ দীর্ঘ সময়ে আরবে আর কোন নবী জন্মেনি।] এমন কোনো জননায়কের আবির্ভাবও সেখানে হয়নি যিনি তাদের স্বভাব-চরিত্র সংমোধন করে তাদেরকে একটি সুসভ্য জাতিরূপে গড়ে তুলতে পারতেন। শত শত বছর ধরে দিগন্ত প্রসারী ধূ ধূ মরুভূমির বুকে মুক্ত স্বাধীন জীবন যাপন করার কারণে তাদের মধ্যে অজ্ঞতা ও মূর্খতা বিস্তার লাভ করেছিল। তাদের মূর্খতা জমাট বেঁধে এমন শক্ত পাষাণে পরিণত হয়েছিল যে, সে পাসাণ ঘষে মসৃণ করে তাদেরকে মানুষ বানানো কোনো সাধারণ মানুষের কাজ ছিল না। কিন্তু এই সঙ্গে তাদেরম মধ্যে অবশ্যি এমন যোগ্যতা ছিল যার ফলে কোনো অসাধারণ ব্যক্তি তাদের সংশোধন করে দিলে এবং তাঁর শিক্ষার প্রভাবে কোনো উন্নত জীবনাদর্শে উদ্ধুদ্ধ হলে সারা দুনিয়াকে তারা ওলট-পালট করে দিতে পারতো। বিশ্ব নবীর শিক্ষাকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে এমনি জীবন রসে পরিপূর্ণ, যৌবনোদ্দীপন্ত শক্তিশালী জাতির প্রয়োজন ছিল।

এরপর ভাষার আলোচনায় আসলেও দেখা যাবে আরবী ভাষার বৈশিষ্ট্য সহজে চোখে পড়ার মত। এ ভাষাটি এবং এর সাহিত্য অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে, উন্নত চিন্তাকে সহজভাবে প্রকাশ করার, আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয়গুলো বর্ণনা করার এবং মনের গভীরে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এর চেয়ে উপযোগী আর কোনো ভাষাই নেই। অন্তর্নিহিত প্রচণ্ড শক্তির জোরে হৃদয়ের গভীরতম প্রদেশে তা বিদ্ধ হয় তীরের মত। আর তারা মাধুর্য হয় তুলনাবিহীন। মনে হয় যেন রস উপচিয়ে পড়ছে। সুরের লহরীতে হৃদয়-মন আপ্লুত হয়। কুরআনের ন্যায় কিতাবের জন্যে এমনি একটি ভাষার প্রয়োজন ছিল।

কাজেই বিশ্বনবীর জন্যে আরবের ন্যায় একটি দেশকে নির্বাচিত করার পেছনে আল্লাহর বিরাট উদ্দেশ্য কার্যকর ছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

অজ্ঞ জাতির জন্যে সর্বোত্তম নেতা

একটি জাতি শত শত বছর থেকে অজ্ঞতা, মূর্খতা, দুর্দমা ও অবনতির অতল গহবরে মেনে যাচ্ছিল। তারপর অকস্মাৎ একদিন তার ওপর বর্ষিত হল মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ। তার মধ্যে তিনি জন্ম দিলেন তাদের শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম নেতার। তাদেরকে অজ্ঞতার অতলান্ত গহবর থেকে উঠাবার জন্যে ঐ নেতার ওপর অবতীর্ণ করলেন নিজের বাণী।তাদেরকে গাফলতির নিদ্রা থেকে জাগ্রত করা এবং অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের আচ্ছন্নতা মুক্ত করে সত্য-সুন্দর নির্ভুল জীবনের পথে এগিয়ে চলতে সাহায্য করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

কিন্তু জাতির মূর্খ লোকেরা এবং তাদের স্বার্থান্ধ উপজাতীয় সরদাররা নেতার পেছনে উঠেপড়ে লাগে। তাঁকে ব্যর্থ করার জন্যে তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। সময় এগিয়ে যেতে থাকে। এমনকি একদিন তারা তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। এ অবস্থায় মহান আল্লাহ বলেন, তোমাদের বোকামির কারণে আমি কি তোমাদের সংস্কার প্রচেষ্টা রুদ্ধ করে দেবো? উপদেশ প্রদানের এ ধারাবাহিকতা বন্ধ করে দেবো? আর অবনতির যে অতল গহবরে তোমরা নিমজ্জিত ছিরে সেখানে তোমাদেরকে পড়ে থাকতে দেব? এটাই কি আমার রহমতের দাবী হওয়া উচিত বলে তোমরা মনে কর? তোমরা কি ভেবে দেখেছ, আল্লাহর অনুগ্রহকে প্রত্যাখ্যান করা এবং হক সামনে এসে যাওয়ার পরও বাতিলকে আঁকড়ে ধরার জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর পরিণাম কি হতে পারে?

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.