সীরাতে সরওয়ারে আলম – ১ম খণ্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

রসূলুল্লাহ (সা)-এর নবুয়াতের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণ

কিছুক্ষণের জন্যে চোখ দু’টি বন্ধ করে একবার চিন্তার জগতে বিচরণ করুন। এক হাজার চারশ’ বছর আগের পৃথিবীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখুন। তখনকার পৃথিবীর অবস্থাটা কেমন ছিল?

চৌদ্দশ’ বছর আগের পৃথিবী

সে সময় পৃথিবীর মানুষের পরস্পরের মধ্যে চিন্তার আদান-প্রদানের উপায়-উপকরণ ছিল অতি অল্প। দেশ ও জাতির মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম ছিল অত্যন্ত সীমিত। মানুষের জানার পরিধি ছিল অতি সংকীর্ণ। তার চিন্তা ছিল বড়ই অপরিপক্ক। তার মনোরাজ্যে ছিল কুসংস্কার ও ভীতির রাজত্ব। অজ্ঞানতার সূচীভেদ্য অন্ধকারের বুকে জ্ঞানের রেখাটি ছিল ক্ষীণতর। আঁধার সমুদ্রের পর্বত প্রমান ঢেউগুলোকে সরিয়ে আলোর তরংগটি এগিয়ে যাচ্ছিল অতি কষ্টে। সেদিনের পৃথিবীতে টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, রেডিও, রেলগাড়ি ও উড়োজাহাজের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আজকের মত গ্রন্থ প্রকাশনালয় ও ছাপাখানার সন্দান পাওয়া যেত না। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন প্রকার শিক্ষায়তনের প্রাচুর্য ছিল না। তখন খবরের কাগজ ও সাময়িকী কোনো ব্যাপকতর ব্যবস্থা ছিল না। সে যুগের এজন পণ্ডিতের জানার পরিধি কোনো কোকো ক্ষেত্রে আজকের যুগের একজন সাধারণ লোকের তুলনায়ও কম রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান ছিল। সে যুগের একজন অত্যন্ত স্বচ্ছ ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী ব্যক্তিও আজকের একজ সেকেলের চিন্তার অধিকারী ব্যক্তির চেয়ে অধিক সেকেলে চিন্তার ধারক ছিল। আজকের যুগে যেসব কথা সবাই জানে সে যুগের বছরের পর বছর পরিশ্রম, অনুসন্ধান গবেষণার পর বহু কষ্টে তা জানা সম্ভব হত। আজকের যুগের একটি ছোট্ট শিশু জ্ঞানোদয়ের প্রথম মুহুর্তেই তার চারপাশ থেকে যেসব খবর অনায়াসে জেনে নেয় সেগুলোর জন্যে সে যুগে শত শত মাইল সফর করতে হত। এমনকি অনেক সময় ঐ সামান্য তথ্যটুকু আহরণ করার জন্যে সারা জীবন সাধনা করতে হত। আজকের যুগে যেসব বিষয়কে কুসংস্কার ও উদ্ভট পৌরাণিক গালগল্প মনে করা হয় সে যুগে সেগুলোই ছিল “সত্য”। যেসব কাজকে আজকের যুগে অশালীন ও বর্বর বলা তয় সেগুলোই ছিল সে যুগে সাধারণ কাজ। আজ মানুষের বিবেক যেসব পদ্দতিতে ঘৃণা করে সে যুগের নৈতিকতায় সেগুলো কেবল বৈধই ছিল না বরং এর বিপরীত আর কোনো পদ্ধতি হতে পারে –এ কথা কেউ কল্পনাই করতে পারতো না। অলৌকিক বিষয়ের প্রতি মানুষের মোহ এত বেশী ছিল যে, কোনো বস্তু-বিষয় যতক্ষণ না অতিপ্রাকৃতিক, অসাধারণ ও সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম হত, ততক্ষণ মানুষ তার সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে প্রস্তুতই হত না। এমনকি মানুষ নিজেকে নিতান্ত দীন, হীন ও তুচ্ছ মনে করত। যার ফলে কোনো মানুষের ওলিআল্লাহ হওয়া বা কোনো ওলিআল্লাহর মানুষ হওয়া তাদের নিকট ছিল অচিন্তনীয় ও কল্পনার অতীত।

আরব দেশের অবস্থা

এই অন্ধকার যুগে পৃথিবীর একটি অংশে অন্ধকার আরও ঘনীভূত ছিল। সে যুগের সভ্যতার মানদণ্ডে দুনিয়ার যেসব দেশ সুসব্য বলে পরিচিত ছিল তাদের মধ্যবর্তী এলাকায় আর বদেশটি সবার থেকে আলাদা হয়ে নিরালায় একাকী অবস্থান করছিল। তার চারপাশে ইরান, রোম ও মিসরে জ্ঞান, শিল্প, সভ্যতা ও সংস্কৃতির কিছু আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। কিন্তু বিপুলায়তন মরু সমুদ্রগুলো আরবকে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। আরব সওদাগরেরা মরুভূমির জাহাজ উটের পিঠে চড়ে মাসের পর মাস সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সেসব দেশে ব্যবসা করতে যেতেন। তারা কেবল পণ্য বিনিময় করেই চলে আসতো। জ্ঞান ও সব্যতার কোনো আলো সংগে করে আনত না। তাদের দেশে কোনো শিক্ষায়তন ছিল না। পাঠাগার ছিল অকল্পনীয়। দেশের জনগণের মধ্যে ছিল না জ্ঞানের চর্চা বা জ্ঞান ও শিল্পের প্রতি কোনো প্রকার আগ্রহ। সারা দেশে হাতে গোণা কয়েকজন লোক পড়ালেখা জানত। কিন্তু তাদেরও লেখাপড়ার পরিধি এতই সীমিত ছিল যে, সে যুগের জ্ঞান ও শিল্পের সাথে তারা চিল একেবারেই অপরিচিত। নিঃসন্দেহে তাদের ভাষাটি ছিল উন্নত পর্যায়ের এবং যে কোন উন্নত চিন্তাকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করার অসাধারণ ক্ষমতাও তার চিল। তাদের মধ্যে উন্নত পর্যায়ের সাহিত্য রুচিরও অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু তাদের সাহিত্যের যতটুকু আমরা জানতে পেরেছি, তা থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে, তাদের জানার পরিধি ছিল অত্যন্ত সীমিত। সভ্যতা সংস্কৃতিতে তাদের স্থান ছিল সর্বনিম্নে। কুসংস্কারে তারা কিভাবে আচ্ছন্ন ছিল। তাদের চিন্তা ও স্বভাব প্রকৃতি ছিলমূর্খতা ও বর্বরতার নগ্ন প্রকাশ। তাদের নৈতিক চিন্তা ছিল একেবারেই বস্তাপচা আস্তাকুঁড়ের সামগ্রী।

সেখানে কোনো নিয়মিত শাসন, শৃংখলা, আইন ও সরকার ছিল না। প্রত্যেক উপজাতি ছিল স্বাধীন। জঙ্গলের আইনই ছিল সেখানে একমাত্র আইন। একজন আরব বেদুঈন এ কথা কোনোক্রমে বুঝতে পারত না যে, যে লোকটি তার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত নয় তাকে কেনো মেরে ফেলা হতেব না এবং তার ধন-সম্পদ কেনো হস্তগত করা হবে না?

তারা ছিল নৈতিকতা, শালীনতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির নেহাতই নিম্ন পর্যায়ের ও অস্বচ্ছ চিন্তাধারার অধিকারী। পাক-নাপাক, জায়েয-নাজায়েজ, শালীন-অশালীন ইত্যাদির পার্থক্যের সাথে তারা প্রায় অপরিচিত ছিল। তাদের জীবনধারা ছিল বড়ই কলুষতাময়। তাদের চাল-চলন ছিল নিতান্তই বর্বর ও অমানবিক। ব্যভিচার করা, জুয়া খেলা, মদ পান, রাহাজানি, হত্যা, লুণ্ঠন ছিল তাদের জীবনের নিত্যকার কাজ। তারা একজন অন্যজনের সামনে নির্দ্বিধায় উলঙ্গ হয়ে যেত। তাদের মেয়েরাও উলঙ্গ হয়ে কাবাঘর তওয়াফ করত। কোনো ব্যক্তি যেন তার জামাতা না হতে পারে নিছক এই জাহেলী বশবর্তী হয়ে তারা নিজেদের শিশু কন্যাকে স্বহস্তে জীবিত কবর দিত। তারা পিতার মৃত্যুর পর নিজেদের বিমাতাকে বিয়ে করত। খাওয়া-দাওয়া, লেবাস-পোশাক ও পাক-পরিচ্ছন্নতার সামান্য ছোটখাটো রীতি পদ্ধতিও তারা জানত না।

ধর্মের ব্যাপারে সমকালীন বিশ্বের অজ্ঞতা ও ভ্রষ্টতার তারাও সমান অংশীদার ছিল। মূর্তি পূজা, জ্বিন-ভূত, নক্ষত্র পূজা, মোটকথা এক আল্লাহর ইবাদাত ছাড়া সমকালীন বিশ্বের যত প্রকারের পূজার প্রচলন ছিল সবগুলোতেই তারা লিপ্ত ছিল। প্রাচীন যুগের নবীগণ ও তাঁদের শিক্ষা সম্পর্কে কোনো সঠিক জ্ঞান তাদের নিকট ছিল না। হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ) তাদের প্রপিতা এতটুকু তারা জানত ঠিকই কিন্তু তাদের পিতা-পুত্রের ধর্ম কি ছিল এবং তারা কার ইবাদাত করত তা তাদের জানা ছিল না। আদ ও সামুদ জাতির কাহিনীও তারা শুনেছিল। কিন্তু আরব ঐতিহাসিকরা তাদের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা পড়ার পর কোথাও হযরত সালেহ (আ) ও হযরত হুদ (আ)-এর শিক্ষার কোনো নামগন্ধ পাওয়া যাবে না। ইহুদী ও ঈসায়ীদের মাধ্যমে তারা বনী ইসরাঈলের নবীদের কাহিনীও জেনেছিল। কিন্তু সেগুলো কেমনতর কাহিনী ছিল তা জানার জন্য শুধুমাত্র মুসরিম মুফাসসিরগণ লিখিত তফসীর গ্রন্থগুলোয় উদ্ধৃত ইসরাঈলী বর্ণনাগুলো ঘাটলেই বুঝা যাবে। এথেকে জানা যাবে আরববাসীরা এবং বনী ইসরাইলীরা যে নবীদের সম্পর্কে অবগত ছিল তাঁরা কোন ধরনের মানুষ ছিলেন। এই সঙ্গে নবুয়াত সম্পর্কে তাদের চিন্তাধারাও যে কেমন নিম্নপর্যায়ে ছিল তাও জানা যাবে।

সামনে এলেন এক ব্যক্তি

এ সময় এ দেশে জন্ম হল এক ব্যক্তির। শৈশবেই মা, বাপ ও দাদার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলেন তিনি। তাই এহেন শোচনীয় অবস্থায় একটি আরব শিশু স্বাভাবিকভাবে যে শিক্ষা লাভ করতে পারত তাও তিনি পেলেন না। বুদ্ধি-জ্ঞান হবার পর বেদুইন ছেলেদের সাথে ছাগল চরাতে বের হলেন। যৌবনে পৌঁছে ব্যবসায়ে নেমে পড়লেন। চলাফেরা ওঠাবসা সব ঐ আরবদের সাথে –যাদের অবস্থা একটু আগেই বলে এসেছি। শিক্ষার নামগন্ধই নেই সেখানে। এমনকি সামান্য পড়া লেখাটুকুই তারা জানে না। কোনো শিক্ষিত পণ্ডিত লোকের অস্তিত্বই ছিল না। কয়েকবার আরবের বাইরে যাবার সুযোগ তাঁর হয়েছিল কিন্তু এ সফর কেবলমাত্র সিরিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর তাও ছিল সে যুগের আর দশটি আর কাফেলার মত নেহাতই ব্যবসায়িক সফর। ধরা যাক এ ধরনের সফরের মধ্যে যদি তিনি কিছু জ্ঞান ও সভ্যতার নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করেও থাকেন এবং কিছু জ্ঞানী, গুণী ও সুসভ্য লোকের সাক্ষাত পেয়েও থাকেন তাহলেও এ ধরনের বিক্ষিপ্ত সাক্ষাতকার  ও পর্যবেক্ষণে কোনো মানুষের জীবন গড়ে ওঠে না। এগুলো কোনো ব্যক্তির এপর এত ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয় না, যার ফলে তিনি নিজের সমাজ-পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও আলাদা হয়ে এক উন্নততর জগতে পৌঁছে যাবেন, যেখানে পৌঁছে যাবার পর তার সাতে তার পরিবেশের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হবে না। এভাবে এমন পর্যায়ের কোনো জ্ঞান অর্জন করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না যা একজন অশিক্ষিত বেদুইনকে কোনো একটি দেশের নয়, সারা দুনিয়ার এবং কোনো এক যুগের নয়, সমস্ত যুগের নেতৃত্বে সমাসীন করে। বাইরের লোকদের থেকে তিনি যদি কোনো রকমের তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করেও থাকেন, তাহলে সে সময় দুনিয়ায় যে তথ্য কারো জানা ছিল না, ধর্ম-নৈতিকতা-সভ্যতা-সংস্কৃতির যে চিন্তাধারা ও নীতির কোথাও কোনো অস্তিত্ব ছিল না, এবং মানব চরিত্রের যে আদর্শ তদানীন্তন দুনিয়ার কোথাও বিদ্যমান ছিল না, তা লাভ করার কোনো উপায়ই ছিল না।

তাঁর কর্মকাণ্ড

শুধু আরবের নয়, সারা দুনিয়ার অবস্থা ও পরিবেশ সামনে রাখতে হবে। তাহলে দেখা যাবে, এ ব্যক্তি যাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে শৈশব অতিবাহিত করেন, যাদের সাথে হেসে-খেলে কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেন, যাদের সাথে দিনরাত মেলা-মেশা ও লেনদেন করতে থাকেন, শুরু থেকেই স্বভাবে-চরিত্রে-অভ্যাসে-আচরণে তাদের সবার থেকে আলাদা। তিনি কখনো মিথ্যা বলেন না। সমস্ত জাতি তাঁর সত্যনিষ্ঠার সাক্ষ্য দেয়। তিনি কখনো মিথ্যা বলেছেন তাঁর ঘোরতর শত্রুও কোন দিন অপবাদ দেয়নি। তিনি কাউকে কটুকথা বলেননি। তাঁর মুখ থেকে কেউ কোনো দিন গালি বা অশ্লীল কথা শুনেনি। তিনি লোকদের সাথে সব রকমের কায়কারবার করেন কিন্তু কখনো তাঁকে কারো সাথে তিক্ততা সৃষ্টি, কথা কাটাকাটি বা ঝগড়া করতে দেখা যায়নি। তাঁর কথায় কঠোরতার পরিবর্তে দেখা যায় মাধুর্য। আর এ মাধুর্যে এমন আন্তরিকতার প্রলেপ ছিল যার ফলে যেই তাঁর সাথে মেশে সেই তাঁর ভক্তে-অনুরক্তে পরিণত হয়। তিনি কারও সাথে খারাপ ব্যবহার করেননি। কারও অধিকার হরণ করেননি। বছরের পর বছর ব্যবসা করার পরও তিনি অবৈধভাবে কারও একটি পয়সাও হস্তগত করেননি। যেসব লোকের সাথে তিনি লেনদেন করেন তারা সবাই তাঁর বিশ্বস্ততার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখত। সমস্ত জাতি তাঁকে ‘আল-আমীন’ –বিশ্বাসী আখ্যা দেয়। শত্রুরাও তাদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর নিকট আমানত রাখত নির্দ্বিধায়। তিনি সেগুলো হেফাজত করতেন পূর্ণ আস্থা সহকারে। নির্লজ্জ লোকদের মধ্যে তিনি এমন লজ্জাশীলতার পরিচয় দেন যে, জ্ঞান হবার পর থেকে কেউ তাঁকে কোনো দিন উলঙ্গ হতে দেখেনি। চারদিকের অসচ্চরিত্র লোকদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ পূত চরিত্রের নমুনা পেশ করেন। কেউ কোনো দিন তাঁকে কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত থাকতে দেখেনি। মদ ও জুয়ার ধারেকাছেও তিনি কোনো দিন যাননি। অশালীন লোকদের মধ্যে তিনি চরম শালীনতার পরিচয় দেন। সব রকমের অপকর্ম ও অশ্লীল কাজকে ঘৃণা করতেন এবং তাঁর সব কাজে পবিত্রতা ও শালীনতার ছাপ সুস্পষ্ট থাকত। পাষাণ হৃদয় মরুচারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন মূর্তিমান কোমল হৃদয়। প্রত্যেকের অভাব-দুঃখে দেখা যেত তাঁকে সহযোগী হিসেবে। এতিম ও বিধবাদের সাহায্য করতেন। পথচারী ও মুসাফিরদের আথিথেয়তা করতেন। কাউকে তিনি কষ্ট দেননি। বরং অন্যের জন্যে নিজে কষ্টভোগ করতেন। বর্বর বেদুইনদের মধ্যে তিনি ছিলেন একান্ত শান্তিপ্রিয়। নিজের জাতির মধ্যে দাঙ্গা ও রক্তপাত দেখে তিনি ভীষণ কষ্ট পান। গোত্রীয় ও উপজাতীয় যুদ্ধ থেকে নিজে সরে থাকেন এবং বিবদমান গোত্রগুলোর মধ্যে সন্ধি ও আপোষ করার জন্যে সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মূর্তিপূজারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন চরম ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতির অধিকারী। পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে এমন কোনো জিনিস তিনি খুঁজে পাননি যার পূজা করা যেতে পারে। কোনো সৃষ্টির সামনে তাঁর মাথা নত হয়নি। পূজার প্রসাদ্ তিনি গ্রহণ করতেন না। তিনি স্বতঃস্ফুর্তভাবে শির্ক ও সৃষ্টি-পূজাকে ঘৃণা করতেন।

এ সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশে এ ব্যক্তিকে এমন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন দেখা যায়, যেন মনে হয় নিকষ কালো আঁধারের বুকে একটি উজ্জ্বল প্রদীপ আলো বিকিরণ করে যাচ্ছে অথবা পাথরের স্তূপের মধ্যে একটি মহামূল্যবান রত্ন চমকাচ্ছে।

মানসিক ও আত্মীক পরিবর্তন

প্রায় চল্লিশ বছরকাল এ ধরনের পূত-পবিত্র ভদ্র জীবন যাপন করার পর তাঁর জীবনে আসে এক বিপ্লব। চারদিকের ঘনায়মান নিচ্ছিদ্র অন্ধকার দেখে তিনি সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেন। অজ্ঞতা, অসচ্চরিত্রতা, অসৎকর্মশীলতা, নৈরাজ্য, বিশৃংখলা, শিকৃ ও মূর্তিপূজার এ ভয়ংকর সমুদ্র থেকে তিনি বের হয়ে আসতে চান। এ পরিবেশে কোনো একটি বস্তুও তাঁর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল মনে হয়নি। সবার থেকে আলাদা হয়ে জনবসতি থেকে দূরে পাহাড়ের একান্তে বসে চিন্তা করতে থাকেন তিনি। নির্জনে গভীরে প্রশান্তির মধ্যে কেটে যায় একাধারে কয়েকদিন। রোজা রেখে নিজের আত্মা-মন-মস্তিষ্ককে আরো বেশী পাক-পবিত্র করেন। তিনি চিন্তা-ভাবনা করে যেতে থাকেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। এমন কোনো আলোর সন্ধান করতে থাকেন, যা এ চারদিকের ঘনায়মান আঁধার দূর করতে সক্ষম। এমন কোনো শক্তি অর্জনের প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন, যা এই বিপথে পারিচালিত বিশ্বকে ভেঙ্গে-চুরে আবার নতুন করে গড়তে ও সুসজ্জিত করতে পারে।

বিপ্লবের বাণী

অকস্মাৎ তাঁর অবস্থার মধ্যে দেখা দেয় বিরাট পরিবর্তন। তাঁর মনে হঠাৎ এমন এক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে আগে কোথাও যার লেশমাত্রও ছিল না। ইতিপূর্বে তাঁর মধ্যে যে শক্তির কোনো চিহ্নই ছিল না অকস্মাৎ তা কোথা থেকে এসে তাঁর সমগ্র সত্তাকে ভরে দেয়। গুহার নির্জনতা ছেড়ে তিনি বের হয়ে আসেন। হাজির হন নিজের জাতির সামনে। তাদেরকে বলতে থাকেন, তোমরা এ যেসব মূর্তির পূজা করে চলছো এগুলোর কোনো প্রভাব ক্ষমতা নেই। এদের পূজা কর না। এমন কোনো মানুষ, গাছ, পাথর, আত্মা এবং কোনো নক্ষত্র নেই যার পূজা ও আরাধনা করা যেতে পারে, যার সামনে মাথা নত করা যেতে পারে এবং যার আনুগত্য করা যেতে পারে। এ চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী এ নক্ষত্র এবং এ পৃথিবী ও আকাশের মধ্যকার যাবতীয় বস্তু এক আল্লাহর সৃষ্টি। তিনিই তোমাদেরকে এবং সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই জীবন দান করেন। মৃত্যু দান করার ক্ষমতাও একমাত্র তাঁরই হাতে। একমাত্র তাঁরই বন্দেগী কর। তাঁর হুকুমে মেনে চল। তাঁর সামনে মাথা নত কর। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, লুণ্ঠন, হত্যা, যুলুম-নির্যাতন যা তোমরা করে চলছো –সব গুণাহের কাজ। এগুরো পরিহার কর। আল্লাহ এসব পছন্দ করেন না। সত্য কথা বল। ইনসাফ কর। কাউকে হত্যা কর না। কারো ধন-সম্পদ লুঠ কর না। কিছু নিলে ন্যায়সঙ্গতভাবে নাও। কিছু দিলে ন্যায়সঙ্গতভাবে দাও। তোমরা সবাই মানুষ। সব মানুষ সমান। সাঞ্ছনার কলংক চিহ্ন কপালে এঁকে কেউ জন্মেনি। আবার সম্মান ও মর্যাদার মুকুট মাথায় দিয়েও কেউ দুনিয়ায় পদার্পণ করেনি। শেষ্ঠত্ব, সম্মান ও আভিজাত্য বংশের মধ্যে নিহিত নেই। এগুলো নিহিত রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য, সৎকর্মশীলতা ও পবিত্রতার মধ্যে। যে আল্লাহকে ভয় করে সে সৎকর্মশীল ও পবিত্র। সে শ্রেষ্ঠতম মানব সন্তান। অন্যথায় সে কিছুই নয়। মৃত্যুর পর তোমাদের সবাইকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে। এমন আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে যিনি সবকিছু দেখেন ও জানেন। তোমরা তাঁর কাছ থেকে কিছুই লুকাতে পারবে না। এ কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে তিনি তোমাদের পরিণাম নির্ধারণ করবেন। সেই যথার্থ ন্যায় বিচারকের কাছে কোনো রকম সুপারিশ বা উৎকোচ কাজে লাগবে না। তিনি কারও বংশ পরিচয় নেবেন না। সেখানে একমাত্র ঈমান ও সৎকাজের কথা জিজ্ঞেস করা হবে। যার কাছে এ সম্পদ থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যার কাছে এর কিছুই থাকবে না সে ব্যর্থতার ডালি মাথায় করে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। ইহাই ছিল সেই পয়গাম যা তিনি গুহা থেকে নিয়ে এসেছিলেন।

জাতির প্রতিক্রিয়া

অজ্ঞ জাতি তাঁর শত্রু হয়ে যায়। তাঁকে গালাগালি করতে থাকে। তাঁর ওপর পাথর নিক্সেপ করে। একদিন দু’দিন নয়, একাধারে তের বছর তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। অবশেষে তাঁকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করে। তাঁকে শুধু দেশান্তরী করেই ক্ষান্ত হয়নি, যেখানে গিয়ে তিনি আশ্রয় নেন সেখানেও তারা তাঁর পেচনে ধাওয়া করে। তাঁকে নানাভাবে কষ্ট দেয়। সমগ্র আরবদেশকে তাঁর বিরুদ্ধে উস্কিয়ে দেয়। পূর্ণ আট বছর ধরে তারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চারাতে থাকে। এসব কষ্ট তিনি হাসিমুখে বরদাশত করে যান কিন্তু নিজের সংকল্প ও মিশন থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হন না।

জাতি তাঁর শত্রু হল কেন? এখানে কি জমি ও ভূখণ্ড দখলের কোনো ব্যাপার ছিল? কোনো রক্তের প্রতিশোধের প্রশ্ন ছিল? তিনি কি তাদের কাছে কোনো পার্থিব বস্তুর দাবী জানাচ্ছিলেন? না, তা নয়। সমস্ত বিরোধের মূলে ছিল –তিনি আল্লাহর ইবাদান, সততা, সত্যনিষ্ঠা ও সৎকর্মশীলতার শিক্ষা দিচ্ছেন কেন? মূর্তি পূজা, শির্ক ও অসৎকর্মের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন কেন? পূজারী ও পুরোহিতদের নেতৃত্বের ওপর আঘাত হানছেন কেন? সরদারদের সরদারীর বিভ্রম থেকে জনগণকে সতর্ক করছেন কেন? মানুষের পরস্পরের মধ্য থেকে উচ্চ-নীচের ভেদাভেদ খতম করতে চাচ্ছেন কেন? গোত্র ও বংশ প্রীতিকে জাহেলিয়োত বলে গণ্য করেছেন কেন? তাঁর জাতি বলে চলছিল, তুমি যা কিছু বলছ, সব আমাদের জাতীয় পদ্ধতি ও বংশীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী, কাজেই এসব পরিত্যাগ কর, নয়তো আমরা তোমার জীবন ধারণ কঠিন করে দেব।

কষ্ট সহ্য কেন

ঐ ব্যক্তি এতসব কষ্ট সহ্য করলেন কেন? তাঁর জাতি তাঁকে বাদশাহী দান করতে প্রস্তুত চিল। সম্পদের স্তূত তাঁর পদতলে জমা করতে চাইছিল। তবে এ জন্যে শর্ত ছিল, তাঁকে ঐ শিক্ষাগুরো পরিত্যাগ করতে হবে। কিন্তু তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজের শিক্ষার বিনিময়ে অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হওা পছন্দ করেন। এসব মেনে নেন কেন? তাঁর জাতির লোকের সৎকর্মশীল ও আল্লাহর অনুগত হয়ে যাওয়ার মধ্যে তাঁর নিজের কি কোন স্বার্থ ছিল? এর মধ্যে কি তাঁর বৃহত্তর কোনো স্বার্থ নিহিত ছিল,যার মোকাবিলায় নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, অর্থ-সম্পদ ও আয়েশ-আরামের লোভ ছিল নিতান্তই তুচ্ছ? অথবা এমন কোনো লাভের সন্ধান এখানে ছিল যার জন্যে এক ব্যক্তি একাধিক্রমে একশ’ বছর ধরে কঠোরতম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে প্রস্তুত হতে পারে? এক ব্যক্তি নিজের কোনো স্বার্থে নয় বরং অন্যের স্বার্থে ও কল্যাণার্থে নিজে কষ্ট স্বীকার করে যাবেন –মানব জাতির জন্যে সৎবৃত্তি, ত্যাগ ও সহানুভূতির এর চেয়ে উন্নততর আর কোনো আদর্শের কথা চিন্তা করা যায় কি? যাদের কল্যাণার্থে তিনি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারাই তাঁকে গৃহহারা ও দেশান্তরী করে। বিদেশেও তারা তাঁর পেছনে ধাওয়া করে। এতসব সত্ত্বেও তিনি তাদের কল্যাণ কামনা থেকে বিরত হন না।

কোনো মিথ্যাবাদী কোনো ভিত্তিহীন বিষয়ের জন্যে কি এ ধরনের বিপদ সহ্য করতে পারে? নিছক আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে কাজ শুরু করে কোনো ব্যক্তি নিজের সংকল্পে এতটা দৃঢ় ও অবিচল থাকতে পারে কি যার ফলে তার ওপর বিপদের পাহাড় ভেঙ্গে পড়লেও সারা দেশ ও সারা দুনিয়া তার বিরুদ্ধে ওঠে পড়ে লাগলেও এবং দুনিয়ার বৃহত্তম সেনাবাহিনী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও সে নিজের সংকল্প থেকে এক চুল পরিমাণ সরে যেতে রাজি হয় না? এ অবিচলতা ও দৃঢ় সংকল্পই এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, নিজের সত্যতার ওপর তার পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। যদি তার মনে এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ ও সংশয় থাকতো তাহলে একাধিক্রমে একুশ বছর বিপদের পর বিপদের মোকাবিলা করা তার পক্ষে সম্ভবপর হত না।

এ ছিল তাঁর অবস্থার পরিবর্তনের একটি দিক। এর অপর দিকটি ছিল এর চেয়েও বিস্ময়কর।

অবস্থার পরিবর্তনের অপর দিক

চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ছিলেন সাধারণ আবরদের মতই একজন আরব। এ সময় এ সওদাগরটিকে একজন অসাধারণ বাগ্মী হিসেবে কেউ জানত না। কেউ তাঁকে দেখেনি ধর্ম, নৈতিকতা, দর্শন, আইন, রাজনীতি ও সমাজনীতির ওপর আলোচনা করতে। তাঁর কাছ থেকে কেউ শুনেনি আল্লাহ, ফেরেশতা, আসমানী গ্রন্থাবলী, পূর্ববর্তী নবী ও উম্মতগণ এবং কিয়ামত, মৃত্যু পরের জীবন ও জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে একটি কথাও। তিনি লোকদের সাতে অত্যন্ত সদ্ব্যবহার করতেন, তাঁর চালচলন ছিল অত্যন্ত শালীন ও মধুর এবং যুগের শ্রেষ্ঠ উন্নত নৈতিক চরিত্রেরও তিনি অধিকারী ছিলেন –এ কথা ঠিক। কিন্তু চল্লিশ বছর বয়স হওয়া পর্যন্ত তার মধ্যে এমন কোনো অস্বাভাবিক বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি যার ফলে লোকেরা এ ধারণা করতে পারতো যে, এবার তিনি একটা কিছু হয়ে যাবেন। এ পর্যন্ত লোকেরা তাঁকে একজন নীরব শান্তিপ্রিয় এবং অত্যন্ত ভদ্র ও শালীন ব্যক্তি হিসেবেই জান। কিন্তু চল্লিশ বছর পর তিনি যখন বের হলেন একটি গুহা থেকে, তখন অকস্মাৎ দেখা গেল তাঁর চেহারাই বদলে গেচে।

একন তিনি একটি বিস্ময়কর বাণী শুনাচ্ছিলেন। এ বাণী শুনে সমস্ত আরববাসী অভিভূত হয়ে গেল। এর অন্তরভেদী প্রভাবের ফলে এর ঘোরতর শত্রুও নিছক এটি শুনতেও ভয় পাচ্ছিল; এ বাণী একবার কানে পড়লে কি জাতি কখন মনের মধ্যে গেঁথে বসবে, এ ভয়েই তারা ছিল ভীত-সন্ত্রস্ত। এর অলংকারিত্ব ও বর্ণনা মাধুর্য ছিল তুলনাবিহীন। তদানীন্তন আরবের বড় বড় কবি, বাগ্মী ও ভাষাতত্বের দাবীদারদের উপস্থিতিতে এ বাণী সমগ্র আরববাসীদের সামনে চ্যালেঞ্জ দিল এবং বার বার এ চ্যালেঞ্জ দিল যে, তোমরা সবাই মিরে এর যে কো একটি বাক্যের মতো বাক্য রচনা করে আন। কিন্তু এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার সাহস কেউ দেখাতে পারলো না। এমন অতুলনীয় বাণী কোনো আরব কোনো দিন শুনেইনি।

এখন রাতারাতি তিনি একজন অতুলনীয় জ্ঞানী, অসাধারণ সমাজ সংস্কারক ও নৈতিক চরিত্র গঠক, একজন বিস্ময়কর রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ও আইন প্রণেতা, একজন উন্নত পর্যায়ের বিচারক ও নজীরবিহীন সিপাহসালার রূপে আত্মপ্রকাশ করলেন। সেই নিরক্ষর মরুচারী এমন সব জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের কথা বলে যেতে লাগলেন, যা ইতিপূর্বে কেউ বলেনি এবং এর পরেও বলতে পারেনি। এ নিরক্ষর ব্যক্তিটি আল্লাহ এবং অদৃশ্য জগতের ও পর পরন নিশ্চিন্তে বক্তৃতা করে যেতে থাকলেন। জাতিদের ইতিহাস থেকে বিভিন্ন জাতির উত্থান-পতদের দর্শন শুনাতে থাকলেন, প্রাচীন সংস্কারকদের কার্যাবলী বিশ্লেষণ, পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের সমালোচনা ও জাতিদের বিরোধ নিষ্পন্ন করতে থাকলেন। চরিত্র, নৈতিকতা, শালীনতা ও সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে লাগলেন।

তিনি সমাজ-সংস্কৃতি, অর্থ ব্যবস্থা, পারস্পরিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাপারে আইন প্রণয়ন করলেন। এমন উচ্চাঙ্গের আইন রচনা করলেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী গুণী ও পণ্ডিত সমাজ বছরের পর বছর বরং সারা জীবন গবেষণা ও অনুসন্ধানের পরই যার অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন। আর দুনিয়ার পরীক্ষা-নিরক্ষা যতই এগিয়ে যেতে থাকলো ততই এর সত্য উজ্জ্বলতর হয়ে ধরা দিতে থাকলো।

এ নীরব শান্তিপ্রিয় সওদাগরটি জীবনে কোনো দিন তরবারি চালাননি, কোনো দিন সামরিক শিক্ষা পাননি, এমনকি জীবনে মাত্র একটি যুদ্ধে একজন নীরব দর্শক হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি একজন বীর সৈনিক হয়ে গেলেন। সংকটপূর্ণ মহাসমর ক্ষেত্রে কোনোদিন তার পা একচুলও নড়েনি। তিনি এখন একজন মহাপরাক্রমশালী সেনানায়ক হয়ে গেলেন। মাত্র নয় বছরের মধ্যে সমস্ত আরব দেশ জয় করে ফেললেন। তিনি এখন একজন শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক ও সমরবিদ হয়ে গেলেন। তাঁর সৃষ্ট সামরিক সংগঠন ও যুদ্ধ প্রেরণার প্রভাবে কপর্দকহীন ও যুদ্দ সরঞ্জামের অভাব পীড়িত আরবরা মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের দু’টি বৃহৎ শক্তিকে পর্যুদস্ত করে দিল।

এ নির্জনবাস শান্তিপ্রিয় মানুষটির মধ্যে চল্লিশটি বছর পর্যন্ত কেউ রাজনীতিত-প্রিয়তার গন্ধ পায়নি। হঠাৎ আজ তিনি বিরাট সংস্কারক ও রাষ্ট্রনায়করূপে আবির্ভূত হলেন। তেইশ বছরের মধ্যে বার লক্ষ বর্গমাইল এলাকায় বিস্তৃত মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশৃংখল, যুদ্ধপ্রিয়, মূর্খ, অরাজক, অসভ্য বর্বর, পরস্পর দ্বন্দ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশৃংখল, যুদ্ধপ্রিয়, মূর্খ, অরাজক, অসভ্য বর্বর, পরস্পর দ্বন্দ্বে সদা লিপ্ত উপজাতিদেরকে আধুনিক সভ্যতার স্পর্শ থেকে দূরে রেলগাড়ী, টেলিফোন, রেডিও ও মুদ্রণযন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়াই এক ধর্ম, এক সংস্কৃতি, এক আইন ও এক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীন করে দিলেন। তিনি তাদের চিন্তাধারার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন। তাদের চরিত্র বদলে দিলেন। তাদের শালীনতা বিবর্জিত জীবনধারাকে উন্নত শ্রেণীর শালীনতায় পরিপূর্ণ করে দিলেন। তাদের বর্বরতা ও অসভ্যতাকে পরিশীলিত নাগরিক জীবনে রূপান্তরিত করলেন। তাদের অসৎবৃত্তি ও অসৎ চরিত্রকে রূপান্তরিত করলেন সৎবৃত্তি, তাকওয়া ও উন্নত নৈতিক চরিত্রে। তাদের অরাজকতা ও নৈরাজ্যকে চূড়ান্ত পর্যায়ের আইনানুগত্য ও নেতার নির্দেশ পালনে সর্বাধিক তৎপর সুশৃংখল জীবন ধারায় পরিবর্তিত করলেন। এ জাতিটি এমনই বন্ধ্যা ছিল যে, শত শত বছরে এর উদরে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির জন্ম হয়নি। কিন্তু এ নির্জনবাসী মানুষটি তাকে এমনই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের উদ্ভব হল। দুনিয়াবাসীকে দ্বীন ও নৈতিকতার শিক্ষা দান করার জন্যে তারা দুনিয়ার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লেন।

নৈতিক কর্মপদ্ধতি

এ কাজ তিনি যুলুম, নির্যাতন, ধোঁকা ও প্রতারণার মাধ্যমে সম্পন্ন করেননি। বরং করেচিলেন হৃদয়জয়ী সদ্ব্যবহার, ভদ্রতা ও মনোমুগ্ধকর শিক্ষার মাধ্যমে। সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করেন। স্নেহ ও অনুগ্রহের দ্বারা মন বিগলিত করেন। ইনসাফ ও ন্যায়ের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। সত্য ও সততা থেকে কখনো এক চুলও সরে যাননি। যুদ্ধক্ষেত্রে কারও সাথে প্রতারণা করেননি। নিজের প্রাণের শত্রুদের ওপরও যুলুম করেননি। যুদ্ধক্ষেত্রে কারও সাথে প্রতারণা করেননি। নিজের প্রাণের শত্রুদের ওপরও যুলুম করেননি। যারা ছিল তাঁর রক্তপিপাসু, যারা তাঁকে প্রস্তরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল, তাঁকে জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে সমগ্র আরবকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছিল, এমনকি শত্রুতা ও আক্রোশের আতিশয্যে তাঁর চাচার কলিজা বের করে চিবিয়েছিল, তাদের ওপর বিজয় লাভ করার পরও তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের সাথে অন্যায় ব্যবহারের কারণে তিনি কারও প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি।

এসব সত্ত্বেও তাঁর আত্মসংযম ছিল তুলনাবিহীন। পার্থিব স্বার্থের প্রতি তাঁর নির্মোহ এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে, সারা দেশের বাদশাহ হবার পরও তিনি আগের মতো ফকিরই রয়ে গেলেন। ঘাস-পাতার ছাউনিতে থাকতেন। চাটাই ছিল বিছানা। মোটা পোশাক পরতেন। গরীবের খাবার খেতেন। অনেক সময় অনাহারে থাকতেন। সারারাত আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। দরিদ্র ও বিপদগ্রস্তদের সাহায্য ও সেবা করতেন। একজন শ্রমিকের মতো কায়িক পরিশ্রম করতে ইতস্তত করতেন না কখনো। শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর মধ্যে রাজকীয় শান-শওকত বিত্তশালীদের জৌলুস ও বড়লোকদের অহংকারের সামান্যতম গন্ধ পাওয়া যায়নি। একজন সাধারণ লোকের মতো তিনি সবার সাথে মেলামেশা করতেন। তাদের বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্টে শরকি হতেন। সাধারণ লোকদের মধ্যে এমনভাবে বসতেন যাতে বাইরে থেকে আগত লোকের পক্ষে ঐ মাহফিলে জাতির নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধানকে খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়ত। এত বিরাট ব্যক্তি হবার পরও সামান্য নগণ্য লোকদের সাথে এমন ব্যবহার করতেন যেন মনে হত তারাও তাঁরই মত। সারাজীবন সংগ্রাম সাধনার পর তিনি নিজের জন্যে কিছুই রেখে যাননি। নিজের সমগ্র পরিত্যক্ত সম্পত্তি জাতির জন্যে ওয়া্কফ করে গেছেন। নিজের অনুসারীদের ওপর নিজের বা নিজের সন্তানদের কিছু মাত্র অধিকার কায়েম করেননি। এমনকি ভবিষ্যতে তাঁর অনুসারীরা সমস্ত যাকাত তাঁর সন্তানদেরকেই না দিয়ে দেয় এ ভয়ে নিজের সন্তানদেরকে যাকাত গ্রহণ করার অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছেন।

আধুনিক যুগের নির্মাতা

এ মহান ব্যক্তির মহান কার্যাবলীর শেষ নেই। তাঁর উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা লাভ করার জন্যে বিশ্ব ইতিহাসের ওপর সামগ্রিকভাবে এবার নজর দিতে হবে। সেখানে দেখা যাবে আরব মরুর এ নিরক্ষর ব্যক্তিটি, চৌদ্দশ’ বছর আগে অন্ধকার যুগে যার জন্ম, আসলে আধুনিক যুগের প্রতিষ্ঠাতা ও সারা দুনিয়ার নেতা। তিনি কেবল তাদের নেতা নন যারা তাঁকে নেতা বলে মানে বরং তাদেরও নেতা যারা তাঁকে নেতা বলে মানে না। তাদের এ অনুভূতিই নেই যে, যার বিরুদ্ধে তারা প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে তাঁর নেতৃত্ব কিভাবে তাদের চিন্তাধারা, জীবন পদ্ধতি, কর্মনীতি এবং তাদের আধুনিক যুগের প্রাণ সত্তায় জড়িত রয়েছে।

এ ব্যক্তিই বিশ্ববাসীর চিন্তাধারার মোড় পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তাদেরকে ভাববাদিতা, কুসংস্কার, বিস্ময়কর বস্তুর পূজা ও বৈরাগ্যবাদ থেকে যুক্তিবাদ, বাস্তববাদ ও যথার্থ আল্লাহ ভীতি ভিত্তিক ধার্মিকতার দিকে ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি অনুভূত অলৌকিক ঘটনাবলীর দাবী উত্থাপনকার বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তিক অলৌকিকত্বকে অনুধাবন করার এবং তাকেই সত্যের মানদণ্ড হিসেবে মেনে নেবার প্রবণতার জন্ম দিয়েছেন। তিনি প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রমের মধ্যে আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন অনুসন্ধানকারীদের চোখ খুলে দিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক নিদর্শনসমূহের (Natural Phenomena) মধ্যে আল্লাহর নিদর্শন দেখার অভ্যাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি কল্পনা বিলাসীদেরকে অনুধ্যানের (Speculation) পরিবর্তে যুক্তিবাদিতা, চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও গভেষণার পথে অগ্রসর করেছেন। তিনি মানুষকে জানিয়েছেন বুদ্ধি ও অনুভূতির পার্থক্যকারী সীমারেখা। বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মাবাদের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। ধর্মের সাথে জ্ঞান ও কর্মের এবং জ্ঞান ও কর্মের সাথে ধর্মের সম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন। ধর্মীয় শক্তির সাহায্যে দুনিয়ায় বৈজ্ঞানিক শক্তি এবং বৈজ্ঞানিক সাহায্যে যথার্থ ধার্মিকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি পূজা ও শির্কের ভিত্তিমূল উৎপাটিত করেছেন এবং জ্ঞান-শক্তি বরে তাওহীদ বিশ্বাসকে এমন মজবুদ করে কায়েম করেছেন যার ফলে মুশরিক ও মূর্তিপূজারীদের ধর্ম ও একাত্মবাদের রঙ্গে রঙ্গীন হতে বাধ্য হয়েছে। তিনি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার মৌলিক ধারণাগুলোই বদলে দিয়েছেন। যারা বৈরাগ্য ও কৃচ্ছ্রসাধনাকে যথার্থ নৈতিকতা মনে করতো, যাদের মতে দেহ ও প্রবৃত্তির হক আদায় করলে এবং পার্থিব জীবনের বিষয়াবলীতে অংশ নিলে আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পরকালীন মুক্তি সম্ভব নয়, তাদেরকে তিনিই সমাজ-সংস্কৃতি ও পার্থিব কর্মজীবনের মধ্যে নৈতিকতার মাহাত্ম্য, আধ্যাত্মিকতার উন্নতি ও পরকালীন মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তিনিই মানুষকে তার যথার্থ মূল্য ও মর্যাদা সম্পকেৃ অবগত করেছেন। যারা ভগবান, অবতার ও আল্লাহর পুত্রকে ছাড়া অন্য কাউকে হেদায়াতদানকারী ও নেতা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না তাদেরকে তিনিই জানিয়েছেন যে, তাদেরই মতো মানুষ আসমানী সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি ও বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর খলীফঅ হতে পারে। যারা প্রত্যেক শক্তিশালী ব্যক্তিকে নিজেদের খোদা মনে করতো তাদেরকে তিনিই বুঝিয়েছেন যে, মানুস নিছক মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। কোন ব্যক্তি জন্মগতভাবে পবিত্রতা, শাসন কর্তৃত্ব ও প্রভুত্বের অধিকার নিয়ে আসেনি। কেউ অপবিত্রতা, গোলামী, দাসত্ব ও অধীনতার কলংক নিয়ে জন্মগ্রহণ করেনি। এ শিক্ষাই বিশ্বে মানবতার একাত্মতা, সাম্য, গণতন্ত্র ও চিন্তার স্বাধীনতার জন্মদাতা।

চিন্তাধারার জগত থেকে বাইরে আসরে দেখা যাবে এ নিরক্ষর ব্যক্তির নেতৃত্বের বাস্তব ও কার্যকর ফলশ্রুতি দুনিয়ার আইন, পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত ব্যাপক ও সীমাহীন। নৈতিকতা, সভ্যতা, সংস্কৃতি শালীনতা, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতার অসংখ্য নীতি ও পদ্ধতি আর শিক্ষা থেকে বের হয়ে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি যে সামাজিক বিধি প্রবর্তন করেছিলেন সারা দুনিয়া তাকে ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে এবং এখনো গ্রহণ করে চলেছে। তিনি যে অর্থনৈতিক বিধান দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে দুনিয়ার বহু অর্থনৈতিক আন্দোলনের উদ্বব হয়েছে ও এখানে হচ্ছে। তিনি যে রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন তার মাধ্যমে আজ পর্যন্ত দুনিয়ার রাজনৈতিক চিন্তাদারায় কতগুলো বিপ্লব সংঘটিত হয়ে গেছে এবং এখনো হয়ে চলছে। ইনসাফ ও আইনের যেসব মূলনীতি তিনি রচনা করেছিলেন, সেগুরো বিশ্বের বিচার ব্যবস্থা ও আইন চিন্তাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এখনো তার প্রভাব নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। যুদ্ধ, সন্ধি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুসভ্য রীতি ও ব্যবস্থা বাস্তবে তিনিই প্রবর্তন করেছিলেন। যুদ্ধের আবার কোনো সুসভ্য রীতি ও নীতি থাকতে পারে এবং বিভিন্ন জাতির মধ্যে মানবতার ভিত্তিতে সম্পর্ক কায়েম ও লেনদেন হতে পারে, তাঁর পূর্বে দুনিয়া এ সম্পর্কে অবগতই ছিল না।

সমস্ত উন্নত গুণের সমাহার

বিশ্ব মানবতার ইতিহাসে এ অত্যাশ্চর্য ব্যক্তিটির উন্নত ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এত বেশী সুস্পষ্ট ও উজ্জ্বল যে, শুরু থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত আগত ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদেরকে –যাদেরকে লোকেরা মনীষী (Heroes) আখ্যায়িত করেছে –তাঁর মোকাবিলায় দাঁড় করালে তাঁর সামনে তাদেরকে খুদে বামুনটি মনে হবে। বিশ্ব মনীষীবৃন্দের মধ্যে একজনও এমন নেই যার শ্রেষ্ঠ উন্নত গুণাবলী জীবনের একটি বা দু’টি বিভাগ ছাড়িয়ে আরো বিস্তৃত হতে সক্ষম হয়েছে। তাদের কেউ কেউ মতবাদ পেশ করেছেন কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা তার ছিল না। কেউ কর্মে সুপটু কিন্তু চিন্তায় দুর্বল। কারও কর্তৃত্ব রাজনৈতিক গুণাবলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কেউ নিছক সামরিক কৃতিত্বের অধিকারী। কারও দৃষ্টি সমাজ জীবনের একটি দিকের এত গভীরে প্রসারিত যার ফলে অন্য দিকগুরো সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষিত হয়েছে। কেউ নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার পথে এগিয়ে গেছেন আর অর্থনীতি ও রাজনীতিকে একেবারেই উপেক্ষা করেছেন। কেউ অর্থনীতি ও রাজনীতির পথে এগিয়েছেন এবং নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতাকে একেবারেই দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন। মোটকথা ইতিহাসে কেবল এক তরফা মনীষীই দেখা যায়। কিন্তু এই ব্যক্তিই এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম। তাঁর মধ্যে সমস্ত গুণাবলীই একত্রিত হয়েছে। তিনি নিজেই দার্শনিক ও পণ্ডিত। নিজের দর্শনকে তিনি নিজেই বাস্তব জীবনে কার্যকর করেন। তিনি রাষ্ট্রনায়ক আবার সমরনায়কও। তিনি আইন প্রণেতা আবার নৈতিকতার শিক্ষকও। অন্যদিকে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক নেতাও। তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত হয় মানুষের জীবনের সমস্ত দিকের ওপর, জীবনের ছোট ছোট বিষয়কেও তা উপেক্ষা করে না। পানাহারের আদব ও শারীরিক পরিচ্ছন্নতার পদ্ধতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পর্যন্ত প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে তিনি বিধান ও নির্দেশ দেন। নিজের মতবাদের ভিত্তিতে একটি সভ্যতার (Civilization) জন্ম দেন এবং জীবনের বিভিন্ন বিভাগে নির্ভুল ভারসাম্য (equilibrium) কায়েম করেন। কোথাও প্রান্তিকতার নামগন্ধই পাওয়া যায় না। এ ধরনের সর্ভগুণের অধিকার দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির নাম ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

পরিবেশের ঊর্ধ্বে

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের একজনও এমন নেই যিনি কমবেশী নিজের পরিবেশের সৃষ্টি নন। কিন্তু এ ব্যক্তিটির অবস্থা সবার থেকে আলাদা। তাঁর পরিবেশ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনের ক্ষেত্রে সামান্যতমও প্রভাব বিস্তার করেনি। কোনো যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে এ কথা প্রমাণ করা সম্ভব হবে না যে, আরবের ক্ষেত্র ও পরিবেশ সে সময় ঐতিহাসিকভাবে এমন এক ব্যক্তির জন্মদানের জন্যে প্রস্তুত ছিল। অনেক টেনে হিঁচড়ে বড়জোর এতটুকু বলা যায় যে, ঐতিহাসিক কারণে আরবে সেকালে এমনি একজন নেতার প্রয়োজন ছিল। তিনি উপজাতীয় বিশৃংখলা ও অরাজকতা খতম করে তাদেরকে এক জাতিত্বের শৃংখলে আবদ্ধ করতেন এবং দেশের পর দেশ জয় করে আরববাসীদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সাধনের পথ প্রশস্ত করতেন। অর্থাৎ এমন একজন জাতীয়তাবাদী আরব নেতা, যিনি হতেন সেকালের সবরকম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। যুলুম, নির্যাতন, রক্তপাত, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা তথা সম্ভাব্য যাবতীয় কৌশল খাটিয়ে নিজের জাতিকে সমৃদ্ধিশালী করতেন। একটি সাম্রাজ্য গঠন করে নিজের অনুন্নত দেশবাসীর জন্যে রেখে যেতেন। এ ছাড়া সে যুগের আরব ইতিহাসের আর কোনো চাহিদাই প্রমাণ করা যাবে না। হেগেলের ইতিহাস দর্শন ও মার্কসের ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার দৃষ্টিতে বড় জোর এ কথা বলা যেতে পারে যে, আরবের তদানীন্তন পরিবেশে জাত গঠন ও সাম্রাজ্য স্থাপন করার যোগ্যতাসম্পন্ন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হওয়ার প্রয়োজন ছিল অথবা আবির্ভাব হওয়া সম্ভবপর ছিল। কিন্তু আসলে যা ঘটে গেল হেগেলীয় ও মার্কসীয় দর্শন তার কি ব্যাখ্যা দেবে? সে সময় এ পরিবেশে এমন এক ব্যক্তির জন্ম হলো যিনি সর্বোত্তম নৈতিকতার শিক্ষা দিয়েছেন, মানবতাকে সুসজ্জিত ও সুসংগঠিত করেছেন। যার দৃষি।ট বংশ-গোত্র-জাতি-দেশের সীমানা পেরিয়ে সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্যে একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরী করেছেন। যিনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রনৈতিক বিধি-বিধান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কল্পনার জগতে নয় বাস্তবে নৈতিক ভিত্ততে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়ে দিয়েছেন এবং আধ্যাত্মিক ও বস্তুবাদের এমন ভারসাম্য মিশ্রণ ঘটিয়েছেন যা সেদিনের ন্যায় আজও জ্ঞান ও বিচক্ষণতার শ্রেষ্ঠতম কৃতিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এমন এক ব্যক্তিত্বকে কি তদানীন্তন আরবের জাহেলী পরিবেশের সৃষ্টি বলা যেতে পারে।

ইতিহাস স্রষ্টা

এ ব্যক্তি কেবল তার পরিবেশের সৃষ্টি নয় বরং তাঁর কার্যাবলী বর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখতে পাই তিনি স্থান-কালের সীমানা ও প্রভাব মুক্ত। তাঁর দৃষ্টি সময় ও অবস্থার বাঁধন ছিন্ন করে শতাব্দী ও সহস্রাব্দের (Millenniuns) সীমানা পেরিয়ে সামনে অগ্রসর হয়েছে। তিনি মানুসকে দেখেছেন সকল যুগ ও পরিবেশের আলোকে। এই সংগে তার জীবন যাবনের জন্যে এমন সব নৈতিক ও কার্যকর নির্দেশ দিয়েছেন, যা সর্বাবস্থায় যথাযথভাবে খাপ খেয়ে যায়। ইতিহাস যাদেরকে প্রাচীনদের তালিকাভুক্ত করেছে তিনি তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। তাঁর যথার্থ পরিচয় কেবল এভাবে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি তাদের যুগের শ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন সবার থেকে আলাদা ও বৈশিষ্ট্যময়। তিনি মানবতার এমন নেতা ছিলেন যাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসের চলমান ধারার সাথে গতিশীল (March) হয় এবং প্রত্যেক যুগে তেমনি আধুনিক দেখা যায় তার পূর্বের যুগে ছিল।

যাদেরকে ঢালাওভাবে ইতিহাস স্রষ্টা বলা হয়ে থাকে তারা আসলে ইতিহাসের সৃষ্টি। মানবতার সমগ্র ইতিহাসে প্রকৃত ইতিহাস স্রষ্টা মাত্র এই একজনই পাওয়া যাবে। ইতিহাসে যারাই বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে সে সময় আগে থেকেই বিপ্লবের উপাদানগুলো তৈরী হচ্ছিল। এ উপাদানগুলোই তাদের চাহিদামত বিপ্লবের দিক ও পত নির্ণয় করছিল। বিপ্লবী নেতা এ ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা পালন করেছেন? তিনি অবস্থা ও পরিবেশের চাহিদাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্যে এমন একজন অভিনেতার ভূমিকা পালন করেছেন যার জন্য মঞ্চ ও অভিনয়ের যাবতীয় কাজ আগে থেকেই তৈর ও নির্দিষ্ট হয়েই ছিল। কিন্তু ইতিহাস ও বিপ্লব সৃষ্টিকারীদলের মধ্যে তিনি একাই ছিলেন ব্যতিক্রম। তাঁর জন্যে বিপ্লবের উপাদান ও কারণগুলো অনুপস্থিত ছিল। সেক্ষেত্রে তিনি নিজেই বিপ্লবের উপাদান ও কারণগুলো উদ্ভাবন ও প্রস্তুত করেন। যেখানে লোকদের মধ্যে বিপ্লবের প্রাণসত্তা ও কার্যকর যোগ্যতা পাওয়া যেতো না সেখানে তিনি নিজের প্রচেষ্টায় বিপ্লব সৃষ্টির উপযোগী জনশক্তি গড়ে তোলেন। নিজের প্রচণ্ড ব্যক্তিত্বকে দ্রবীভূত করে হাজার হাজার লোকের মনের মধ্যে ঢেলে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিজের মনের মতো বানিয়ে নিয়েছেন। তার ক্ষমতা ও ইচ্ছাশক্তিই বিপ্লবের যাবতীয় উপাদান তৈরী, তার আকৃতি ও প্রকৃতি নির্ধারণ করেছে এবং নিজের সংকল্পের জোরে তিনি অবস্থার গতি পরিবর্তন করে তাকে নিজের অভীষ্টপথে পরিচালিত করেছেন। এমনি একজন ইতিহাস স্রষ্টা এবং এ ধরনের বিপ্লবী দুনিয়ার কোথাও কোনো যুগে পাওয়া গেছে কি?

পরিপূর্ণ সত্যনিষ্ঠা

চৌদ্দশো বছরের আগের অন্ধকার পৃথিবীতে, আরবের মতো একটি ঘনান্ধকার দেশের এ প্রত্যন্ত প্রদেশে একজন মরুচারী নিরক্ষর মেষপালক ও ব্যবসায়ীর মধ্যে অকস্মাৎ এত বিপুল পরিমাণ জ্ঞান, আলো, শক্তি ও উন্নত গুণাবলী এবং এত উন্নত পর্যায়ের অনুশীলিত শক্তির পাহাড় সৃষ্টি হবার কি উপায় ছিল? বলা হয় এগুলো সবই তাঁর মন ও মস্তিষ্কের সৃষ্টি। আমি বলবো, এগুলি যদি তাঁর মন ও মস্তিষ্কের সৃষ্টি থাকে, তাহলে তাঁর উচিত ছিল নবুয়াতের নয়, খোদায়ীর দাবী করা। যদি তিনি সত্যিই এমন দাবী করতেন তাহলে তাঁর মতো সর্ব গুণান্বিত ব্যক্তিকে খোদা বলে মেনে নিতে এক ধরনের লোকেরা মোটেই অস্বীকার করতো না। কারণ তারা ইতিপূর্বে রামকে খোদা বানিয়েছে, শ্রী কৃঞ্চকে ভগবান বলে মেনে নিতে ইতস্ততঃ করেনি, গৌতম বুদ্ধকে নিজেরাই খোদার আসনে বসিয়েছে, ঈসা আলাইহিস সালামকে স্বেচ্ছায় আল্লাহর পুত্র বানিয়েছে, তারা অগ্নি, পানি এবং বায়ুরও পূজা করেছে। কিন্তু তিনি নিজে কি বলেছেন তা সত্যিই প্রণিধানযোগ্র। তিনি নিজের এ সমস্ত গুণের জন্যে কোনো প্রকার কৃতিত্বের দাবীদার নন। তিনি বলেন, আমি একজন মানুষ, তোমাদের মতো মানুষ। আমার যা কিছু আছে তার কোনোটাই আমার নিজের নয়, সবই আল্লারহ এবং সবই তাঁর পক্ষ থেকে আমাকে দান করা হয়েছে। আমি যে বাণী এনেছি, সমগ্র বিশ্বমানবতা যার নজীর আনতে অক্ষম, তাও আমার নিজের নয়, আমার বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্রতার ফলশ্রুতি নয়। এর প্রত্যেকটি শব্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে এসেছে। এ জন্যে একমাত্র আল্লাহ প্রশংসা লাভের যোগ্য। আমি যা কিছু কৃতিত্ব দেখিয়েছি, যা কিছু আইন প্রণয়ন করেছি, যা কিছু নীতি-নৈতিকতা মানুষকে শিখিয়েছি, তার মধ্যে কোনো একটিও আমি নিজে তৈরী করিনি। নিজের ব্যক্তিগত যোগ্যতা থেকে কোনো কিছু পেশ করার শক্তি আমার নেই। প্রত্যেকটি ব্যাপারেই আমি আল্লাহর নেতৃত্ব ও নির্দেশ দানের মুখাপেক্ষী। ওদিক থেকে যা ইংগিত আসে আমি তা-ই বলি এবং তা-ই করি।

কী বিস্ময়কর সত্য! কেমন অত্যাশ্চর্য আমানতদারী ও সত্যবাদিতা! মিথ্যুকরা বড় হবার জন্যে অন্যদের শ্রেষ্ঠ কার্যাবলীকে নিজেদের কৃতিত্বের খাতায় লিখিয়ে নিতে একটুও ইতস্ততঃ করে না। অথচ সেগুরোর মূলের সন্ধান পেতে মোটেই বেগ পেতে হয় না। কিন্তু এ ব্যক্তি এমন সব গুণাবলীকেও নিজের বলে দাবী করছেন না যেগুলোকে নিজের কৃতিত্ব বললে কেউ মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারতো না। কারণ সেগুলোর মূলের সন্ধান করার কোনো উপায়ই কারো জানা নেই। সত্যবাদিতার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে? যে ব্যক্তি কোনো একটি অত্যন্ত গোপন উৎস থেকে এমন নজীরবিহীন গুণাবলী লাভ করেছেন এবং তিনি নির্দ্ধিধায় নিজের আসল উৎসের সন্ধান জানিয়ে দিচ্ছেন তাঁর চেয়ে বড় সত্যবাদী আর কে হতে পারে? তাঁকে আমরা সত্যবাদী বলবো না তো আর কাকে বলবো?

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.