সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সর্বশেষ সুযোগদান

যেহেতু ক্রমাগত কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত বনী ইসরাঈল পাপাচারে লিপ্ত ছিল, সেজন্যে বার বার সতর্ক ও ভর্ৎসনা করার পরও তাদের জাতীয় আচার আচরণের অবনতি ঘটছিল। তারা পর পর কয়েকজন নবীকে হত্যা করে এবং যে মহৎ ব্যক্তিই তাদের সৎ কাজ এবং সত্য সঠিক পথের দিকে আহবান জানাতো তারই রক্তপিপাসু তারা হয়ে পড়তো। এজন্যে আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর হুজ্জত পূরণের ও তাদের সামনে সত্যকে চূড়ান্তভাবে পেশ করার জন্যে হযরত ঈসা (আ) এবং হযরত ইয়াহইয়া (আ) এর মতো দুজন মহান নবীকে একই সাথে প্রেরণ করেন। তাঁদের আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হওয়ার এমন সব সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল যা অস্বীকার শুধু ঐসব লোকই করতে পারতো সত্যের প্রতি যাদের অন্ধ আক্রোশ ছিল এবং সত্যের বিরুদ্ধে যাদের স্পর্ধা চরমে পৌঁছেছিল। কিন্তু বনী ইসরাঈল এ সর্বশেষ সুযোগটিও হারিয়ে ফেলে। শুধু তারা তাই করেনি যে, এ দুজন নবীর দাওয়াত তারা প্রত্যাখ্যান করেছে, বরঞ্চ তাদের একজন প্রধান ব্যক্তি হযরত ইয়াহইয়া (আ) এর মতো একজন মনীষীকে এক নর্তকীর আদেশে দ্বিখণ্ডিত করে। তারপর বনী ইসরাঈলের ভর্ৎসনা তিরস্কারের জন্যে অতিরিক্ত সময় ও শক্তি ব্যয় করা ছিল অর্থহীন। এজন্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে তাঁর সান্নিধ্যে ডেকে পাঠান এবং কিয়ামত পর্যন্ত বনী ইসরাঈলের জীবন ললাটে লাঞ্ছনার অভিশাপ লিখে দেন।(সূরা আল বাকার, টীকা ১০৪ -১০৬)

হযরত ইয়াহইয়া (আ) এবং তাঁর সাথে বনী ইসরাঈলের আচরণ

হযরত ইয়াহইয়া (আ) এর যেসব অবস্থা বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে তা একত্র করে তাঁর পবিত্র জীবনের একটা চিত্র এখানে তুলে ধরা হচ্ছেঃ

লিউকের বর্ণনা মতে হযরত ইয়াহইয়া (আ) বয়সে হযরত ঈসা (আ) এর ছ মাসের বড়ো ছিলেন। উভয়ের মা পরস্পর নিকট আত্মীয়া ছিলেন। প্রায় ত্রিশ বছর বয়সে তাঁকে নবুওয়াতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ইউহান্নার (জোন) বর্ণনা মতে, তিনি পূর্ব জর্দানের এলাকায় আল্লাহর দিকে দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। তিনি বলতেন, আমি মরু অঞ্চলে একজন আহ্বানকারীর কণ্ঠ। তোমরা খোদার পথ সরল সহজ কর। জোন ১:২৩

মার্ক বলেন, তিনি মানুষকে গোনাহ থেকে তওবা করাতেন এবং তাওবাকারীদেরকে ব্যাপ্টাইজ(Baptize- ধর্মীয় শিক্ষাদান) করতেন অর্থাৎ তওবার পর গোসল করাতেন যেন আত্মা ও দেহ পাক হয়ে যায়। ইয়াহুদিয়া এবং জেরুজালেমের (Jeruzalem)বহু সংখ্যক লোক তাঁর ভক্ত হয়ে পড়ে। তারা তাঁর কাছে গিয়ে ব্যাপ্টাইজ করিয়ে নিত(মার্ক ১:৪ -৫)। এজন্যে ব্যাপ্টাইজকারী ইউহান্না (John the Baptist)বলে তিনি খ্যাতি লাভ করে। সাধারণত বনী ইসরাঈলী তাঁর নবুওয়াত স্বীকার করে নিয়েছিল। মথি(Mathew)২১ -২৬)ঈসা(আ)এর উক্তিঃ নারী গর্ভজাত লোকের মধ্যে ব্যাপ্টাইজকারী ইউহান্না বা জোন থেকে মহান আর কেউ হয়নি(মথি ১১:১১)।তিনি উটের লোমের কাপড় পরতেন এবং কোমরে বাঁধা থাকতো কটি বন্ধ। তাঁর আহার ছিল পঙ্গপাল ও বনের মধু (মথি৩:৪)। তিনি তাঁর এ ফকীরি জীবন যাপনের সাথে ঘোষণা করে বেড়াতেন, তওবা কর। কারণ আসমানের বাদশাহি আসন্ন (মথি৩:২)। অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ) এর দাওয়াতের সূচনা আসন্ন। এ কারণেই তাঁকে হযরত সমীহর (ঈসা) আরহাস (সত্যায়নকারী) বলা হতো। এ কথাই তাঁর সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে(*****আরবী****) আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ফরমানের (হযরত ঈসার আ) সত্যতা প্রমাণকারী।

তিনি মানুষকে নামায রোযার উপদেশ দিতেন। মাথি :৯:১৪, লিউক ৫:৩৩, লিউক ১১:১।

তিনি মানুষকে বলতেন, যার কাছে দুটি জামা আছে, যার নেই তার কাছে স তা বণ্টন করবে। যার কাছে খাদ্য আছে সেও তেমন করবে। মাশুল আদায়কারীগন জিজ্ঞেস করলো, হুজুর আমরা কি করব? তিনি বললেন, তোমাদের জন্যে যা নির্ধারিত তার বেশী নিও না। সিপাইরা জিজ্ঞেস করলো, আমাদের জন্যে কি হুকুম? তিনি বললেন, না করো উপর যুলুম করবে, আর না অন্যায়ভাবে কারো কাছ থেকে কিছু নেবে। নিজের বেতনের উপরেই সন্তুষ্ট থেকো। লিউক৩:১০ -১৪।

বনী ইসরাঈলের বিকৃত আলেমগণ, ফারিসী এবং সাদুকীগণ তাঁর কাছে দীক্ষা গ্রহণের জন্যে এলে তিনি ধমক দিয়ে বললেন, সাপের বাচ্চারা কে তোমাদের মনে করিয়ে দিল যে, আসন্ন গযব থেকে পালাবে? ইবরাহীম আমাদের বাপ এ কথা মনে করার চিন্তাই করো না। —— এখন বৃক্ষমূলে কুঠার রাখা আছে। যে বৃক্ষে ভালো ফল আসবে না তা কেটে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। মথি(Mathew)৩:৭ -১০)

তাঁর যুগের ইহুদী শাসক হিরোদ এন্টিপাস এর রাজ্যে তিনি হকের দাওয়াত পেশ করার খেদমত করছিলেন। হিরোদ এন্টিপাস পুরোপুরি রোমীয় সভ্যতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছিল। তার কারণে সমগ্র দেশে পাপাচার অনাচার বিস্তার লাভ করছিল। সে স্বয়ং তার ভাই ফিলিপের স্ত্রী হিরোদ ইয়াসকে তার আপন গৃহে এনে শয্যা সঙ্গিনী করে রেখেছিল। তার জন্যে হযরত ইয়াহইয়া (আ) হিরোদকে ভর্ৎসনা করেন এবং তার পাপাচারের সমালোচনা করেন। এ অপরাধে হিরোদ তাঁকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। তথাপি তাঁকে একজন পবিত্র ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ মনে করে তাঁকে শ্রদ্ধাও করতো এবং জনসাধারণের মধ্যে তাঁর বিপুল প্রভাব দেখে ভীত সন্ত্রস্তও থাকতো। কিন্তু হিরোদ ইয়াস মনে করতো হযরত ইয়াহইয়া (আ) জাতির মধ্যে যে নৈতিক প্রাণশক্তি সঞ্চার করছেন তা তার মতো একজন নারীকে মানুষের চোখে অতীব হেয় ও ইতর প্রতিপন্ন করছে। সে জন্যে সে তাঁর প্রাণনাশের জন্যে বদ্ধপরিকর হলো। অবশেষে হিরোদের জন্মবার্ষিকী উৎসবে সে তার সুযোগ গ্রহণ করলো। উৎসব অনুষ্ঠানে তার মেয়ে খুব নাচ দেখালো। হিরোদ তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে বললো, তুমি কি চাও বল। মেয়ে ব্যভিচারিণী মাকে জিজ্ঞেস করলো সে কি চাইবে। মা বললো, ইয়াহইয়ার ছিন্ন মস্তক দাবী কর। অতএব সে হাত জোড় করে হিরোদকে বললো, এক্ষণি ইয়াহইয়ার ছ্ন্নি মস্তক একটা থালায় করে আমার সামনে রাখতে বলুন। হিরোদ চিন্তিত হয়ে পড়লো। কিন্তু প্রণয়িনী কন্যার দাবী কি করে প্রত্যাখ্যান করা যায়? সে তৎক্ষণাৎ ইয়াহইয়া নবীর ছিন্ন মস্তক একটা থালায় করে নর্তকীর সামনে উপঢৌকন পেশ করলো।মথি১৪: ৩ -১২, মার্ক ৬:১৭ – ২৯, লিউক ৩:১৯ – ২০।(সূরা ইসরা,টীকা -৮)

হযরত ঈসা (আ) এবং তাঁর সাথে বনী ইসরাঈলের আচরণ (**********আরবী*******)

এবং(হে মুহাম্মাদ) এ কিতাবে মারইয়ামের অবস্থা স্মরণ কর, যখন সে নিজেদের লোকদের থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব দিকে নিরালা নিঃসঙ্গ হয়ে রইলো এবং পর্দা লটকিয়ে তাদের থেকে নিজকে লুকিয়ে রাখলো।– সূরা মারইয়ামঃ১৬

সূরা আলে ইমরানে বলা হয়েছে যে, হযরত মারইয়ামের মা তাঁর মানত অনুযায়ী মারইয়ামকে বায়তুল মাকদিসে ইবাদাতের জন্যে বসিয়ে দিয়েছিলেন এবং হযরত যাকারিয়া (আ) তাঁর দেখা শুনা ও ভরণ পোষণের ভার নিয়েছিলেন। ওখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, যে মেহরাবে হযরত মারইয়াম এতেকাফ করেছিলেন তা চিল বায়তুল মাকদিসের পূর্বাংশ। তিনি সাধারণ রীতি অনুযায়ী একটা পর্দা লটকিয়ে লোকের দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। যারা শুধু বাইবেলের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্যে (*****আরবী*****) এর অর্থ নাসেরা করেছ, তারা ভুল করেছে। কারণ নাসেরা জেরুজালেম থেকে উত্তরদিকে, পূর্বদিকে নয়।(*****আরবী********)

এ অবস্থায় আমি তার কাছে আমার রুহ (ফেরেশতা) পাঠালাম। সে তার সামনে একজন পরিপূর্ণ মানুষের আকৃতিতে আবির্ভূত হলো। মারইয়াম হঠাৎ বলে উঠলো, তুমি যদি কোন আল্লাহভীরু মানুষ হও তাহলে তোমার থেকে রহমানের আশ্রয় চাই। সে বললো, আমি তো তোমার রবের ফেরেশতা। আমাকে এজন্যে পাঠানো হয়েছে যে, আমি তোমাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তান দান করবো। মারইয়াম বললো, আমার থেকে কি করে পুত্র সন্তান হবে – যখন আমাকে কোন মানুষ স্পর্শ করেনি এবং আমি কোন বদকার মেয়েলোকও নই? ফেরেশতা বললো, এমনি করেই হবে। তোমার রব বলেছেন, এমন করা আমার জন্যে খুবই সহজ এবং এটা এজন্যে করছি যে, এ ছেলেটিকে আমি লোকের জন্যে একটা নিদর্শন বানিয়ে রাখবো এবং আমার পক্ষ থেকে একটা রহমত। আর এটা হবেই। – সূরা মারইয়ামঃ১৭ -২১)

হযরত মারইয়ামের বিস্মিত হওয়াতে ফেরেশতা বলেন, এমনই হবে। এটা কখনো এ অর্থে হতে পারে না যে, মানুষ তোমাকে স্পর্শ করবে এবং তার থেকে তোমার গর্ভে পুত্র সন্তান পয়দা হবে। বরঞ্চ এর পরিষ্কার অর্থ এই যে, কোন মানুষ তোমাকে স্পর্শ না করা সত্বেও তোমার পুত্র সন্তান হবে। এরূপ ভাষায় হযরত যাকারিয়া (আ) এর বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানেও ফেরেশতা এ জবাবই দিয়েছেন। এটা পরিষ্কার কথা যে, যে অর্থ সেখানে করা হয়েছে, তাই এখানেও হবে। এভাবে সূরা আয় যারিয়াতে (আয়াত ২৮ -৩০) যখন ফেরেশতা হযরত ইবরাহীম (আ) কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেন তখন হযরত সারা বলেন, আমার মতো বন্ধ্যা বৃদ্ধার আবার পুত্র ক করে হবে? তখন ফেরেশতা তাঁকে এ জবাবই দেন (*****আরবী*****) এমনিই হবে। তার অর্থ হলো, বৃদ্ধা এবং বন্ধ্যা হওয়া সত্বেও তার সন্তান হবে। তাছাড়া যদি (*****আরবী*****)এর অর্থ এরূপ করা হয় যে, মানুষ তোমাকে স্পর্শ করবে এবং তোমার থেকে সেভাবেই পুত্র পয়দা হবে যেমণভাবে সারা দুনিয়ার নারীদের হয়ে থাকে তাহলে পরবর্তী দুটি বাক্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাহলে এ কথা বলার কি প্রয়োজন ছিল যে, তোমার রব বলছেন, এমনটি করা আমার পক্ষে বড়ো সহজ এবং এ ছেলেটিকে আমি একটি নিদর্শন বানাতে চাই? নিদর্শন শব্দটি এখানে সুস্পষ্ট মোজেজার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে এবং এ অর্থের দিকেই এ বাক্যটি ইংগিত করে এমনটি করা আমার পক্ষে খুবই সহজ। অতএব আল্লাহ তায়ালার এ এরশাদের অর্থ এ ছড়া আর কিছু না যে, এ ছেলেটিকেই আমি একটি মুজিযা হিসেবে বনী ইসরাঈলের সামনে পেশ করতে চাই। পরবর্তী বিবরণ স্বয়ং একথা সুস্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, হযরত ঈসা (আ) এর সত্তাকে কিভাবে মুজিযা হিসেবে পেশ করা হচ্ছে।(*****আরবী****) মারইয়াম ঐ বাচ্চা গর্ভে ধারণ করলো এবং সে গর্ভাবস্থায় এক দূরবর্তী স্থানে চলে গেল। তারপর প্রসব বেদনা তাকে একটি খেজুর গাছের তলায় পৌছিয়ে দিল। সে বলতে লাগলো, হয়! এর আগেই আমি যদি মরে যেতাম এবং আমার নাম চিহ্ন পর্যন্ত না থাকতো। ফেরেশতা তার পাদদেশ থেকে ডেকে বললো, চিন্তা করো না, তোমার রব তোমার নীচে একটি ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছেন। আর তুমি এ খেজুর গাছটির কাণ্ড ধরে ঝাঁকি দাও, তোমার উপর তাজা তাজা খেজুর টপটপ করে পড়বে। তুমি (খেজুর) খাও আর (ঝর্ণার) পানি পান কর। আর চোখ ঠাণ্ডা কর। তারপর যদি কোন মানুষ তুমি দেখতে পাও, তাহলে তাকে বল, আমি রহমানের জন্যে রোযার মানত করেছি। এজন্যে আজ আমি কারো সাথে কথা বলবো না। তারপর সে তার সন্তানকে নিয়ে তার জাতির লোকের কাছে গেল। তারা বলতে লাগলো, হে মারইয়াম! তুমি তো বড়ই পাপের কাজ করে ফেলেছ। হে হারুনের বোন! তোমার পিতা তো কোন খারাপ লোক ছিলেন না এবং তোমার মাও চরিত্রহীনা ছিল না। সূরা মারইয়ামঃ ২২ -২৮

দূরবর্তী স্থান অর্থ বায়তে লাহম। হযরত মারইয়ামের এতেকাফ থেকে বের হয়ে এখানে যাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। বনী ইসরাঈলের অতি পবিত্র পরিবার বনী হারুনের কন্যা বায়তুল মাকদিসে আল্লাহর ইবাদতের জন্যে উৎসর্গীকৃত হয়ে বসে ছিলেন। তিনি হঠাৎ গর্ভবতী হয়ে পড়লেন। এ অবস্থায় তিনি যদি তাঁর এতেকাফের স্থানেই বসে থাকতেন এবং তাঁর গর্ভ মানুষ জানতে পারতো, তাহলে শুধু পরিবারের লোকজনই নয়, বরঞ্চ সমাজের অন্যান্য লোকও তাঁর বেঁচে থাকা কঠিন করে দিত। এজন্যে বেচারি এ কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় লিপ্ত হওয়ার পর চুপচাপ তাঁর এতেকাফের কুঠরি ছেড়ে বের হয়ে পড়লেন। তারপর যতক্ষণ আল্লাহর মর্জি হবে, তিনি জাতির তিরস্কার ভর্ৎসনা এবং সাধারণ দুর্নাম থেকে রক্ষা পাবেন। এ ঘটনা স্বয়ং এ কথার বড়ো প্রমাণ যে, হযরত ঈসা (আ) বিনা বাপে পয়দা হয় যদি হযরত মারইয়াম বিবাহিতা হতেন এবং স্বামীর ঔরসে যদি তাঁর গর্ভে সন্তান পয়দা হতো, তাহলে বাপের বাড়ী অথবা শ্বশুর বাড়ী না গিয়ে সব ছেড়ে ছুড়ে প্রসবের জন্যে একাকিনী এক দূরবর্তী স্থানে তিনি চলে যাবেন এর কোনই কারণ থাকতে পারেনা।

এসব থেকে সেই পেরেশানি অনুমান করা যায় যাতে তিনি ভুগছিলেন। পরিস্থিতির নাজুকতার প্রতি দৃষ্টি রাখলে প্রত্যেকেই বুঝতে পারে যে, তাঁর মুখ থেকে এ কথাগুলো গর্ভবেদনার জন্যে বের হয়নি। বরঞ্চ এ চিন্তায় তিনি কাতর হয়ে পড়েছিলেন যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে মারাত্মক পরীক্ষায় ফেলেছেন, তার থেকে কি করে তিনি ভালভাবে পরিত্রাণ পাবেন। গর্ভ তো তিনি এখনো কোন না কোন প্রকারে গোপন রাখলেন। কিন্তু এখন এ শিশুকে নিয়ে কোথায় যাবেন? হযরত মারইয়াম ও কথাগুলো কেন বলেছিলেন, ফেরেশতার পরবর্তী চিন্তা করো এ কথাটি তা সুস্পষ্ট করে দিচ্ছে। বিবাহিতা মেয়ের যখন প্রথম বাচ্চা হয়, তখন সে গর্ভবেদনায় যতোই ছটফট করুক না কেন, তার কোন দুশ্চিন্তা হবার কথা নয়। চিন্তা করো না কথার অর্থ এই যে, বাচ্চার ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলতে হবে না। তার জন্ম সম্পর্কে যদি কেউ প্রশ্ন তোলে তাহলে তার জবাব দেয়ার দায়িত্ব আমাদের (প্রকাশ থাকে যে , বনী ইসরাঈলের সমাজে কথা না বলে চুপ থাকার রোযা রাখার প্রথা ছিল।এ কথাগুলোর দ্বারা পরিষ্কার বুঝা যায় যে, হযরত মারইয়ামের আসল দুশ্চিন্তার কারণ কি ছিল।উল্লেখ যে, বিবাহিতা মেয়ের প্রথম বাচ্চা যদি দুনিয়ার চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী হয় তাহলে চুপ থাকার রোযা রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল?

(*****আরবী****) (হে হারুনের বোন) এর দুটি তাৎপর্য হতে পারে। একটি এই যে, এর বাহ্যিক অর্থই গ্রহণ করা হবে এবং মনে করা হবে য, হারুন নামে মারইয়ামের কোন ভাই ছিল। দ্বিতীয় এই যে, আরবী ভাষার ব্যবহার পদ্ধতি অনুযায়ী হারুনের বোন এর অর্থ হারুন পরিবারের মেয়ে গ্রহণ করতে হবে। করণ আরবী ভায়ার এ ধরনের বর্ণনাভঙ্গি প্রচলিত আছে।যেমন মুদার গোত্রেই লোককে (*****আরবী***)(হে হামদানের ভাই) বলে ডাকা হতো। প্রথম অর্থ গ্রহণের সাক্ষ্য প্রমাণ এই যে, নবী (সা)থেকেও এরূপ অর্থ বর্ণিত আছে। দ্বিতীয় অর্থের সমর্থনে দলিল এই যে, পরিস্থিতি ও পরিবেশ এ অর্থ গ্রহণের দাবী রাখতো। কারণ এ ঘটনার ফলে জাতির জনগণের মধ্যে যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল, বাহ্যত তার কারণ এটা মনে হয় না যে, হারুন নামে এক অজ্ঞাত নামা লোকের কুমারী বোন কোলে বাচ্চা নিয়ে এসেছে। বরঞ্চ যে কারণে মারইয়ামের চারদিকে লোকের ভিড় জমেছিল তা এটাই হতে পারে যে, বনী ইসরাঈলের এক পবিত্রতম পরিবারে হারুন বংশের একটি মেয়েকে এ অবস্থায় পাওয়া গেছে। যদিও একটি মরফু হাদীস বর্তমান থাকতে অন্য কোন ব্যাখ্যা নীতিগতভাবে মেনে নেয়া যায় না, কিন্তু মুসলিম, নাসায়ী ও তিরমিযি প্রভৃতি গ্রন্থাবলীতে এ হাদীস যে ভাষায় উদ্ধৃত হয়েছে, তার অর্থ এ করা যায় না যে, এ শব্দগুলোর অর্থ হারুনের বোন ই হবে। হযরত মুগীরা বিন শুবার বর্ণনায় যা কিছু বলা হয়েছে তাহলো এই যে, নাজরানের খৃষ্টানরা হযরত মুগীরাকে প্রশ্ন করেছিল, কুরআনে হযরত মারইয়ামকে হারুনের বোন বলা হয়েছে। অথচ হারুন তাঁর কয়েকশ বছর পূর্বে অতীত হয়েছেন। কুরআনের এ কথার অর্থ কি?

হযরত মুগীরা (রা) এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি। পরে তিনি ব্যাপারটি নবী (সা) এর নিকটে পেশ করেন। নবী (সা) বলেন, তুমি কেন জবাবে এ কথা বললে না যে, বনী ইসরাঈলের লোকেরা নবী ও নেক লোকের নাম অনুসারে নিজেদের নাম রাখতো। নবী (সা) এর এ উক্তি থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, নিরুত্তর হওয়ার পরিবর্তে এ ধরণের জবাব দিয়ে প্রশ্নের মুকাবিলা করা যেতে পারে। (*****আরবী****) মারইয়াম, বাচ্চার দিকে ইংগিত করলো। লোকেরা বললো, তার সাথে কি কথা বলবো? সে তো দোলনায় শায়িত একটা শিশু মাত্র। শিশুটি তখন বলে উঠলো আমি আল্লাহর বান্দাহ। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন। আমি যেখানেই থাক না কেন, তিনি আমাকে বরকতওয়ালা করেছেন। তিনি নামায ও যাকাত নিয়মিত আদায়ের হুকুম দিয়েছেন যতদিন আমি জীবিত থাকবো। আমাকে মায়ের হক আদায়কারী বানিয়েছেন। আমাকে স্বৈরাচারী ও চরিত্রহীন করে বানাননি। আমার প্রতি সালাম যখন আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছি, যখন আমি মরব এবং যখন পুনরুজ্জীবিত হবো। এ হচ্ছে মারইয়াম পুত্র ঈসা, আর এ হচ্ছে তার সম্পর্কে সত্য কথা যে সম্পর্কে লোক সন্দেহ পোষণ করে। – সূরা মারইয়ামঃ ২৯ -৩৪

এ হচ্ছে সেই নিদর্শন যা হযরত ঈসা রূপে বনী ইসরাঈলের সামনে পেশ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে তাদের ক্রমাগত দুষ্কৃতি ও অনাচার পাপাচারের জন্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার পূর্বে মূল সত্যকে তাদের সামনে চূড়ান্তভাবে পেশ করে সংশোধনের সর্বশেষ সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। সে জন্যে তিনি এ পদ্ধতি অবলম্বন করলেন যে, বনী হারুনের যে সতীসাধ্বী ও ইবাদাতকারীনী মেয়েটি বায়তুল মাকদিসে এতেকাফে নিমগ্ন ছিল এবং হযরত যাকারিয়া (আ) এর লালন পালনাধীন ছিল। তাকে অবিবাহিতা অবস্থায় গর্ভবতী করে দিলেন। এ উদ্দেশ্যে যে সে যখন নবপ্রসূত শিশুকে নিয়ে লোকালয়ে ফিরে আসবে তখন সমগ্র জাতির মধ্যে হৈচৈ পড়ে যাবে এবং সকলের দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ হবে। অতঃপর এ ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী যখন হযরত মারইয়ামের সামনে জনতার ভিড় জমতে লাগলো, তখন নবপ্রসূত সন্তানের মুখ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা কথা বলালেন। এজন্যে যে, এ সন্তান বড়ো হয়ে যখন নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত হবে, তখন যেন জাতির মধ্যে অসংখ্য লোক এ সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে বর্তমান থাকে যে, তারা এ ব্যক্তি মধ্যে শৈশবেই এক বিস্ময়কর মুজিযা দেখতে পেয়েছে। তারপরও যদি এ জাতি তাঁর নবুওয়াত মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং তাঁর আনুগত্য স্বীকার করার পরিবর্তে তাঁকে নবুওয়াত মেনে অস্বীকার করে এবংয় তাঁর আনুগত্য স্বীকার করার পরিবর্তে তাঁকে অপরাধী সাজিয়ে শূলে বিদ্ধ করার চেষ্টা করে তাহলে তাদেরকে এমন কঠোর শিক্ষামূলক শাস্তি দেয়া হবে যা দুনিয়ার কোন জাতিকে দেয়া হয়নি।(সূরা ইসরা,টীকা -৯)

(বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্যে তাফহীমুল কুরআন প্রথম খন্ড, সূরা আলে ইমরান, টীকা ৪৪,৫৩, সূরা আন নিসা, টীকা ২১২,২১৩ তৃতীয় খন্ড, আম্বিয়া, টীকা ৮৮ – ৯০, সূরা আল মুমিনুন, টীকা ৪৩ দ্রষ্টব্য।)এদের উল্লেখ প্রথমে সূরা আল ফুরকান ৩৮ আয়াতে করা হয়েছে। তারপর সূরা কাফ এর ১২ আয়াতে দ্বিতীয়বার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উভয় স্থানেই যারা নবীগণকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে তাদের সাথে এদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কোন বিবরণ দেয়া হয়নি।(আসহাবুর রাস সম্পর্কে কোন তথ্যানুসন্ধান করা যায়নি যে, তারা কে ছিল। তাফসীরকারগণ বিভিন্ন বর্ণনা পেশ করেছেন কিন্তু তার কোনটাই নিশ্চিত রূপে গ্রহণযোগ্য নয়। বড়ো জোর কিছু বলা যায় তা হচ্ছে এই যে, এ এমন এক জাতি ছিল যে, তাদের নবীকে কূপের মধ্যে ফেলে দিয়ে অথবা লটকিয়ে রেখে হত্যা করেছিল। রাস আরবী ভাষায় পুরাতন কূপকে বলা হয়। -তাফহীমুল কুরআন, ৩য় খন্ড, আল ফুরকান, টীকা ৫২।)

আরব ঐতিহ্য অনুযায়ী রাস নামে দুটি স্থান প্রসিদ্ধ আছে। একটি নজদে এবং দ্বিতীয়টি উত্তর হেজাজে। এখন এটা নির্ণয় করা কঠিন যে, আসহাবুর রাস এ দুটি স্থানের মধ্যে কোনটির অধিবাসী ছিল। তাদের কাহিনীর কোন নির্ভরযোগ্য বিবরণ কোন বর্ণনায় পাওয়া যায় না। বড়ো জোর এতোটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, এটি এমন এক জাতি ছিল যে, তাদের নবীকে কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল। কিন্তু কুরআন মজীদে যেভাবে তাদের দিকে একটি ইংগিত মাত্র করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তাতে করে এ ধারণা করা যায় যে, কুরআন নাযিলের সময় আরববাসী সাধারণত এ জাতি সম্পর্কে অবহিত ছিল। পরবর্তীকালে তাদের বর্ণনা ইতিহাসে সংরক্ষিত করা যায়নি।(সূরা আল ইমরান,টীকা -৫১)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.