সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

গোটা মানবজগতের উপর সামগ্রিক দৃষ্টি

নবী মুহাম্মাদ (সা) যখন ইসলামী দাওয়াতের জন্যে আদিষ্ট হন, তখন দুনিয়ার বিভিন্ন প্রকারের নৈতিক, তামাদ্দুনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলী সমাধানের দাবী রাখতো। সে সময়ে রোম ইরান সাম্রাজ্যও বিদ্যমান ছিল। শ্রেণিভেদও ছিল, অন্যায় অর্থনৈতিক শোষণ (Economics Exploitation)চলছিল। নৈতিক অনাচারও চড়িয়ে ছিল। স্বয়ং নবীর আপন দেশেও বহু জটিল সমস্যা বিদ্যমান ছিল। ইরাকের উর্বর প্রদেশ সহ ইয়েমেন পর্যন্ত আরবের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চল ইরানের শাসনাধীন ছিল। উত্তরে হেজাজ সীমান্ত পর্যন্ত রোমীয় শাসন বিস্তার লাভ করেছিল। স্বয়ং হেজাজে ইহুদী পুঁজিপতিদের বড়ো বড়ো দুর্গ স্থাপিত ছিল। তারা আরববাসীকে সুদের জালে ফাঁসিয়ে রেখেছিল। পশ্চিম তীরের ঠিক বিপরীত দিকে আবিসিনিয়ার খৃষ্টান সরকার প্রতিষ্ঠিত ছিল,যারা মাত্র কবছর পূর্বেই মক্কার উপর আক্রমণ চালিয়েছিল। তাদের স্ব-ধর্মাবলম্বী এবং তাদের সাথে এক প্রকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে আবদ্ধ একটা গোষ্ঠী হেজাজ ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী নাজরানে বাস করতো।(সূরা আল মারইয়াম,টীকা -১২)

রোম, গ্রীস ও ভারত

রোমের কলোসিয়ামের (Colodseum)গল্প কাহিনী আজও ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সংরক্ষিত আছে। হাজার হাজার হতভাগ্য মানুষ তরবারির মল্লযুদ্ধের(Gladiatory)এবং রোমীয় আমীর ওমরাহদের ক্রীড়া উপভোগের শিকার হতো। আমন্ত্রিতগণের চিত্তবিনোদন অথবা বন্ধু বান্ধবের আপ্যায়নের জন্যে গোলামদেরকে হিংস্র পশুর মুখে ঠেলা দেয়া অথবা তাদেরকে পশুর মতো যবেহ করে দেয়া অথবা তাদেরকে আগুনে জ্বালিয়ে তামাশা দেখা ইউরোপ ও এশিয়ার অধিকাংশ দেশে কোন দূষণীয় কাজ ছিল না। কয়েদী এবং গোলামদেরকে বিভিন্নভাবে শাস্তি দিয়ে মেরে ফেলা সে যুগের সাধারণ প্রথা ছিল। অজ্ঞ ও রক্তপিপাসু আমীর ওমরাহ কেন, গ্রীক ও রোমের বড়ো বড়ো মনীষী ও দার্শনিকদের চিন্তা গবেষণায় নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার বহু পাশবিক পন্থাও বৈধ ছিল। এরিস্টটল এবং প্ল্যাটোর মতো নৈতিক শিক্ষাদাতাগণ মাকে তার দেহের একটা অংশকে (ভ্রূণ বা গর্ভস্থ সন্তান) আলাদা করে দেয়ার অধিকার দান করাকে দূষণীয় মনে করতেন না। অতএব গ্রীক ও রোমে ভ্রূণ হত্যা কোন অবৈধ কাজ ছিল না। পুত্রকে হত্যা করার অধিকার পিতার ছিল এবং রোমীয় আইন প্রণেতাগণ আইনের এ বৈশিষ্ট্যের জন্যে গর্ববোধ করতেন যে, সন্তানদের উপর পিতার অধিকার এতোটা সীমাহীন ছিল। সুখ দুঃখে উদাসীন জেনোর শিষ্যবৃন্দের(Stoics)নিকটে আত্মহত্যায় কোন দোষ ছিল না বরঞ্চ এ ছিল একটা সম্মানজনক কাজ যে, সভা আহবান করে তার মধ্যে আত্মহত্যা করা হতো। এমনকি প্ল্যাটোর মতো মনীষীও একে কোন অপরাধ মনে করতেন না। স্ত্রীকে স্বামীর জবাই করাটা ঠিক তেমনি ছিল যেমন সে তার পালিত পশু জবাই করতে পারতো। গ্রীক আইনে তার জন্যে কোন শাস্তি ছিল না। জীব রক্ষার দোলনা ভারত সকলের চেয়ে এদিক দিয়ে অগ্রসর ছিল। এখানে স্বামীর মৃতদেহের সাথে তার জীবিত বিধবাকে জ্বালিয়ে মারা একটা বৈধ কাজ ছিল। (প্রশ্ন হতে পারে যে, স্বামীর চিতায় স্ত্রীকে জ্বালানো হতো না, বরঞ্চ সে নিজেই নিজেকে জ্বালিয়ে মারতো । কিন্তু ব্যাপার এই যে, বিভিন্ন প্রকারে সমাজের চাপই তাকে এ ভয়াবহ আত্মহত্যা করতে বাধ্য করতো এবং তার জন্যে ধর্মেরও তাকীদ ছিল।) শূদ্রদের জীবনের কোন মূল্যই ছিল না। এ হতভাগারা ব্রহ্মার পা থেকে জন্মগ্রহণ করেছে এ কারণেই তার খুন ব্রহ্মার জন্যে হালাল ছিল, বেদ বানী শ্রবণ করা শূদ্রদের জন্যে এতো বড়ো পাপ যে, তার কানে গলিত ধাতু ঢেলে দিয়ে হত্যা করা শুধু বৈধই ছিল না, বরঞ্চ অপরিহার্য ছিল। জল পর্ব প্রথা ছিল চিরাচরিত এবং সে প্রথা অনুযায়ী পিতা মাতা তাদের প্রথম শিশুকে গঙ্গায় বিসর্জন দিত। এ নিষ্ঠুরতাকে তারা সৌভাগ্যের কারণ মনে করতো।(সূরা আল মারিয়াম, টীকা১৪-১৯,২১)

শিরকের বিশ্বজনীন ব্যাধি

যখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাওহীদের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন তখন দুনিয়ার ধর্মীয় ধারণা কি ছিল? পৌত্তলিক মুশরিকগণ ঐসব খোদা বা দেব দেবীর পূজা করতো যারা কাঠ, পাথর, সোনা, চাঁদি প্রভৃতি বিভিন্ন বস্তু থেকে নির্মিত চি। তারা আকার আকৃতি ও দেহ বিশিষ্ট ছিল। দেব দেবীর রীতিমতো বংশবৃদ্ধি হতো। কোন দেবী স্বামীহীনা এবং দেবতা স্ত্রীহীন ছিল না। তাদের পানাহারেরও প্রয়োজন হতো। তাদের পূজারীগণ তার ব্যবসা করতো। মুশরিকদের বহু সংখ্যক লোক বিশ্বাস করতো যে, খোদা মানুষের আকৃতিতে আবির্ভূত হন এবং কিছু লোক তাঁর অবতার হয়। ঈসায়ীগণ যদিও এক আল্লাহ স্বীকার করার দাবিদার ছিল কিন্তু তাদের আল্লাহরও অন্তত পক্ষে একজন পুত্র ছিল। পিতা পুত্রের সাথে রহুলকুদসেরও খোদায়ীতে অংশীদার হওয়ার গৌরব ছিল। এমন কি খোদার মা এবং শাশুড়ি হতো। ইহুদীরাও এক খোদা স্বীকার করার দাবী করতো। কিন্তু তাদের খোদও পার্থিব, দৈহিক ও অন্যান্য মানবীয় গুণাবলী বিহীন ছিল না। সে চলাফেরা করতো, মানুষের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করতো। নিজের কোন বান্দাহর সাথে কুস্তিও লড়তো। তার এক পুত্রও (ওযায়ের) ছিল। এসব ধর্মীয় দল ছাড়াও মাজুসীগণ অগ্নি উপাসক ছিল এবং সায়েবীগণ নক্ষত্র পূজা করতো।(ইসলামী বিপ্লবের পথঃপৃষ্ঠা(উর্দু) ২৪ -২৫)

মানবতার ভ্রান্ত জাতিভেদের ফেতনা

অতি প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি যুগেই মানুষ সাধারণত মানবতাকে উপেক্ষা করে নিজেদের চারপাশে একটা বৃত্ত অংকন করতো, তার ভেতরে যারা জন্মগ্রহণ করতো তাদেরকে আপন এবং বাইরে জন্মগ্রহণকারীদেরকে পর ভাবতো। এ বৃত্ত কোন বুদ্ধিবৃত্তিকে ও নৈতিক ভিত্তির উপর অংকন করা হতোনা বরঞ্চ আকস্মিক জন্মের ভিত্তিতে। কোথাও একটি পরিবার, গোত্র অথবা বংশে জন্মগ্রহণ ছিল তার ভিত্তি এবং কোথাও এক ভৌগলিক অঞ্চলে, অথবা এক বিশিষ্ট বর্ণের বা বিশিষ্ট ভাষাভাষী জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হতো। অতঃপর এ বুনিয়াদের উপর আপ পরের যে পার্থক্য সৃষ্টি করা হলো, তা শুধু এতটুকু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রইলো না যে, যাকে এ দিক দিয়ে আপন গণ্য করা হলো তার সাথে অন্যের তুলনায় শুধু অধিকতর ভালোবাসা ও সাহায্য সহানুভূতি হতো তাই না বরঞ্চ এ পার্থক্য অপরের সাথে ঘৃণ্য, শত্রুতা, তুচ্ছ তাচ্ছিল্যকরণ এবং অত্যাচার উৎপীড়নের এক নিকৃষ্টতম রূপ ধারণ করলো। এর জন্যে দর্শন রচনা করা হলো, ধর্ম আবিষ্কার করা হলো, আইন তৈরী করা হলো, নৈতিক মূলনীতি বানানো হলো। জাতি ও রাষ্ট্রসমূহ তাকে স্থায়ী মতবাদ হিসেবে গ্রহণ করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাকে কার্যকর করলো। এরই ভিত্তিতে ইহুদীরা বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর নির্বাচিত সৃষ্টি মনে করে এবং নিজেদের ধর্মীয় নির্দেশনামতে পর্যন্ত অইসরাঈলীদের অধিকার ও মর্যাদাকে ইসরাঈলীদের থেকে নিম্নে স্থান দেয়া হয়েছে। এ শ্রেণিভেদ হিন্দুদের মধ্যে বর্ণাশ্রম প্রথার জন্ম দেয়, যার দৃষ্টিতে ব্রাক্ষণের উচ্চমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। উচ্চ জাতির লোকের তুলনায় সকল মানুষকে নীচ ও অপবিত্র গণ্য করা হয় শুভ্রদেরকে চরম লাঞ্ছনার গর্বে নিক্ষেপ করা হয়। সাদা ও কালোর ভেদাভেদ আফ্রিকা ও আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের উপর যে অত্যাচার অবিচার করে তা ইতিহাসের পাতায় অনুসন্ধান করার প্রয়োজন নেই। বর্তমান বিংশ শতাব্দীতে প্রত্যেকেই তার আপন চোখে দেখতে পাচ্ছে। ইউরোপের লোক আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে রেড ইণ্ডিয়ান বংশীয় লোকদের সাথে যে আচরণ করে এবং এশিয়া ও আফ্রিকার দুর্বল জাতির উপর আধিপত্য বিস্তার করে তাদের সাথে যে আচরণ করে তার পশ্চাতে এ দৃষ্টিভঙ্গিই কাজ করছিল যে, আপন দেশ ও জাতির সীমারেখার বাইরে জন্মগ্রহণকারীদের জান মাল ও ইজ্জত আব্রু তাদের জন্যে বৈধ এবং লুঠ করার, দাসে পরিণত করার এবং প্রয়োজন হলে দুনিয়ার বুক থেকে নির্মূল করার অধিকার তাদের আছে। পাশ্চাত্য জাতিগুলোর জাতীয়তাবাদ বা জাতি পূজা একটি জাতিকে অন্যান্য জাতির জন্যে যেভাবে হিংস্র বানিয়ে রেখেছে তার নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিককালের যুদ্ধগুলোতে দেখা গেছে এবং আজও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে নাজী জার্মানির বংশবাদী দর্শন এবং নার্ডুক বংশের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বিগত মহাযুদ্ধে যে বিস্ময় সৃষ্টি করে তা লক্ষ্য করলে সহজেই অনুমান করা যায়, তা কত বিরাট ও ধ্বংসকর গোমরাহি যার সংশোধন সংস্কারের জন্যে কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়েছিল।(****আরবী******)

হে মানবজাতি! আমরাই তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে পয়দা করেছি। তারপর তোমাদেরকে জাতি ও ভ্রাতৃগোষ্ঠী বানিয়ে দিয়েছি যেন তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। বস্তুত আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী মর্যাদাসম্পন্ন সে, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে আল্লাহভীরু নীতিবান। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং সব বিষয়ে অবহিত। -সূরা আল হুজুরাতঃ১৩

আরব মুশরিকদের ধর্ম ও সমাজ রীতি পদ্ধতি

এক নজরে আরবের মুশরিক সমাজ

ঐ অন্ধকার যুগে পৃথিবীর এক প্রান্ত এমন ছিল যেখানে অন্ধকার অধিকতর ঘনীভূত হয়েছিল। সেকালের সভ্যতার নিরিখে যেসব দেশ সভ্যতামন্ডিত ছিল, তাদের মধ্যে আরব দেশ নিভৃতে পড়েছিল। তার আশে পাশে ইরান, রোম ও মিসর দেশগুলোতে জ্ঞান বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সভ্যতা ও ভদ্রতার কিছু আলোক রেখা পাওয়া যেতো। কিন্তু বড়ো বড়ো বালুর সমুদ্র আরবদেরকে তাদের থেকে পৃথক করে রেখেছিল। আরব বনিকগণ উটের পিঠে চড়ে কয়েক মাসের পথ অতিক্রম করে ওসব দেশে ব্যবসার জন্যে যেতো এবং শুধুমাত্র পণ্যদ্রব্যের আদান প্রদান করে চলে আসতো। জ্ঞান ও সভ্যতার কোন আলো তাদের সাথে আসতো না। তাদের দেশে না কোন শিক্ষক ছিল, আর না কোন পুস্তকালয়। মানুষের মধ্যে না কোন শিক্ষার চর্চা ছিল, আর না জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্পকলার প্রতি কোন অনুরাগ। সারা দেশে গণনার যোগ্য কিছু লোক ছিল যারা লেখা পড়া করতে পারতো। তাদের অবশ্যি এক উচ্চাঙ্গের ভাষা ছিল যার ভেতর দিয়ে তাদের উচ্চ ধারণা প্রকাশ করার অসাধারণ যোগ্যতা ছিল। তাদের মধ্যে অতি সুন্দর সাহিত্যিক রুচিবোধও ছিল। কিন্তু তাদের সাহিত্যের যা কিছু অবশিষ্ট জিনিস আমাদের কাচে পৌঁছেছে তা দেখে জানা যায় যে, তাদের জ্ঞান কত সীমিত ছিল, সভ্যতা সংস্কৃতিতে তাদের স্থান কত নীচে ছিল, তারা কতখানি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, তাদের চিন্তাধারা ও স্বভাব প্রকৃতিতে কত অজ্ঞতা ও পাশবিকতার ছাপ এবং তাদের নৈতিক ধ্যান ধারণা কত কুৎসিত ছিল।

সেখানে যথারীতি কোন সরকার ছিল না ও কোন আইন কানুন ছিল না। প্রত্যেক গোত্র আপন স্থানে স্বাধীন ছিল। শুধুমাত্র বন্য আইন (Law ofJungle) চলতো। যে ব্যক্তির যার উপর ক্ষমতা চলতো সে তাকে হত্যা করতো এবং তার সম্পদ হস্তগত করতো। একজন আরব বেদুইন এ কথা বুঝতেই পারতো না যে, যে ব্যক্তি তার গোত্রের নয় তাকে কেন সে মেরে ফেলবে না এবং তার সম্পদেরই বা কেন অধিকারী হবে না।

নৈতিকতা, সভ্যতা ও ভদ্রতার যা কিছু ধারণা তাদের মধ্যে ছিল তা ছিল অত্যন্ত নিম্নস্তরের এবং অসংলগ্ন। পাক নাপাক, জায়েয নাজায়েয এবং ভদ্রতা অভদ্রতার পার্থক্য তাদের প্রায় অজানা ছিল। তাদের জীবনধারা ছিল অত্যন্ত নোংরা। তাদের রীতি পদ্ধতি পাশবিক ছিল। ব্যভিচার, মদ্যপান, চুরি, রাহাজানি, হত্যা ও রক্তপাত তাদের জীবনের সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তারা একে অপরের সামনে বিনা দ্বিধায় উলঙ্গ হতো। তাদের নারীরা পর্যন্ত উলঙ্গ হয়ে কাবাঘরের তওয়াফ করতো। তারা তাদের আপন কন্যা সন্তানকে আপন হাতে জীবিত দাফন করতো শুধু এ অজ্ঞতা প্রসূত ধারণায় যে, কেউ যেন তার জামাই হতে না পারে। বাপের মৃত্যুর পর তারা তাদের সৎ মাকে বিয়ে করতো। আহার বিহার, পোশাক পরিচ্ছদ এবং তাহারাত বা পবিত্রতা সম্পর্কে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানও তাদের ছিল না। ধর্মের ব্যাপারে তারা ঐসব অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার অংশীদার ছিল যার মধ্যে সেকালের দুনিয়া নিমজ্জিত ছিল(আরবের ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে সামনে আলোচনা করা হয়েছে।–সংকলকদ্বয়।) প্রতিমা পূজা, প্রেতাত্মার পূজা, গ্রহ নক্ষত্রের পূজা, মোটকথা এক খোদার ইবাদাত আনুগত্যের পরিবর্তে সেসময়ে দুনিয়ায় যত প্রকারের পূজা উপাসনা ছিল তা সবই তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। অতীতের নবীগণ এবং তাঁদের শিক্ষা দীক্ষা সম্পর্কে তাদের কোন সঠিক জ্ঞান ছিল না। তারা শুধু এতোটুকু জানতো যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন। কিন্তু তারা জানতো না যে, এ দুই পিতা পুত্রের দ্বীন কি ছিল এবং তাঁরা কার ইবাদাত করতেন। আদ এবং সামুদের কাহিনীও তাদের ভালোভাবে জানা ছিল। কিন্তু তাদের যে বিবরণ আরব ঐতিহাসিকগণ লিপিবদ্ধ করেছন তা পড়লে দেখা যাবে যে, তার মধ্যে কোথাও হযরত সালেহ (আ)এবং হযরত হূদ (আ) এর শিক্ষার কোন চিহ্ন পর্যন্ত নেই। ইহুদী এবং ঈসায়ীদের মাধ্যমে তাদের নিকটে বনী ইসরাঈলের নবীগণের জীবন কাহিনীও পৌঁছেছিল। তাঁরা কেমন ছিলেন তা অনুমান করার জন্যে যেসব ইসরাঈলী বর্ণনা ইসলামের তফসীরকারগণ উদ্ধৃত করেছেন, তা এক নজর দেখলেই যথেষ্ট হবে। তাতে জানতে পারা যাবে যে, আরববাসী এবং স্বয়ং বনী ইসরাঈল যে সকল নবী সম্পর্কে অবহিত ছিল তাঁরা কোন ধরনের মানুষ ছিলেন এবং নবুওয়াত সম্পর্কে তাদের ধারণা কতখানি নিকৃষ্ট ধরনের ছিল।(তাফহীমূল কুরআন, সূরা ইখলাস ভূমিকা)

হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ) এর আনুগত্যের গর্ব

জাহিলী যুগের আরববাসী নিজেদেরকে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ) এর অনুসারী মনে করতো। এ জন্যে তাদের ধারণা ছিল যে, যে ধর্ম তারা মেনে চলছে তা ছিল আল্লাহর মনোপূত ধর্ম। কিন্তু তারা হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) এর নিকট থেকে যে দীনের শিক্ষা পেয়েছিল তার মধ্যে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে ধর্মীয় নেতাগণ, গোত্রীয় সরদারগণ, পরিবারে মুরুব্বীগণ এবং অন্যান্য লোক বিভিন্ন ধরনের আকীদা বিশ্বাস, আমর, রসম ও রেওয়াজ সংযোজিত করেছে। পরবর্তী বংশধরগণ তাঁকে প্রকৃত ধর্মেরই অংশ মনে করে ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে তা মেনে চলেছে। যেহেতু বর্ণনাগুলোতে ইতিহাসে অথবা কোন বই-পুস্তকে এমন কোন রেকর্ড সংরক্ষিত ছিল না যার দ্বারা জানতে পারা যেতো যে, প্রকৃত ধর্ম কি ছিল এবং পরবর্তীকালে কখন কে কোন জিনিস কিভাবে তার সথে সংযোজিত করেছে, সে জন্যে আরববাসীর নিকটে তার গোটা দ্বীনই সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়েছিল। না তারা কোন কিছু সম্পর্কে নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারতো যে এটা সেই প্রকৃত দীনের অংশ যা আল্লাহ প্রেরিত । আর না তারা এটাও জানতো যে, এগুলো বেদআত(ধর্মের নামে নতুন আবিষ্কৃত জিনিস) এবং ভ্রান্ত রসম ও রেওয়াজ যা পরবর্তীকালে লোকেরা সংযোজন করেছে।(সূরা আল হুজুরাত,টীকা- ১২)

আরবের মুশরিকদের কতিপয় অতি প্রসিদ্ধ প্রতিমা

লাত

তার মন্দির ছিল তায়েফে। বনী সাকীফ তার এতো ভক্ত ছিল যে, যখন আবরাহা হস্তিবাহিনী সহ কাবাঘর ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে মক্কা আক্রমণের জন্যে অগ্রসর হচ্ছিল তখন বনী সাকীফের লোকজন শুধু তাদের দেবতার আস্তানা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে অত্যাচারী আবরাহাকে মক্কার পথে দেখাবার জন্যে তার সাথে সশস্ত্র প্রহরীর (Escort)ব্যবস্থা করে। যেন সে লাতের গায়ে হাত না লাগায়। অথচ সমগ্র আরববাসীর ন্যায় বনী সাকীফের লোকেরাও এ কথা স্বীকার করতো যে কাবা আল্লাহর ঘর।

লাতের অর্থ সম্পর্কে বিদ্বানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনে জারীর তাবারীর গবেষণায় এটি আল্লাহর স্ত্রী লিঙ্গ। অর্থাৎ আসলে শব্দ ছিল (***আরবী***) (আল্লাহাতুন) যাকে (***আরবী***) (আল লাত) করা হয়েছে। যামাখশরীর মতে এ (***আরবী****) থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ মোড় ফেরানো বা কারো দিকে ঝুঁকে পড়া। যেহেতু মুশরিকরা ইবাদাতের জন্যে তার দিকে মুখ ফেরাতো, তার সামনে ঝুঁকে পড়তো এবং তার তওয়াফ করতো, সে জন্যে তাকে লাত বলা হয়। ইবনে আব্বাস(রা) বলতেন (***আরবী***) তেকে উৎপন্ন। তার অর্থ মথন করা ও মাখা। তিনি এবং মুজাহিদ বলেন, এটি একজন মানুষ চিল, যে তায়েফের নিকটে একটি পর্বতশিলায় বাস করতো এবং হজ্বযাত্রীদেরকে ছাতু ও কানা খাওয়াতো। তার মৃত্যুর পর মানুষ সেই শিলার উপর তার মন্দির নির্মাণ করে এবং তার পূজা করতে থাকে। কিন্তু ইবনে আব্বাস (রা) এবং মুজাহিদের মতো দুজন বুযর্গের লাত সম্পর্কে এ (লাত) বলা হয়েছে, (আরবী) বলা হয়নি। দ্বিতীয়তঃ কুরআন লাত, উয এবং মানাত এ তিনটিকেই দেবী বলে উল্লেখ করেছে আর উপরোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী লাত পুরুষ ছিল, নারী নয়।

উয

উয শব্দটি (***আরবী**) (ইযযত) থেকে উৎপন্ন এবং তার অর্থ ইযযতের অধিকারিণী। এটি ছিল কুরাইশদের বিশিষ্ট দেবী এবং তার মন্দির মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলা উপত্যকায় হুরাজ(***আরবী**) নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। বনী হাশিমের মিত্র বনী শায়বানের লোকেরা এ মন্দিরের খাদেম ছিল। কুরাইশ ও অন্যান্য গোত্রের লোকেরা তার যিয়ারত করতো এবং তার উপরে ভেট চড়াতো। তার নামে কুরবানীও করতো। কবার মতো তার দিকে হাদিয়ার পশু নিয়ে যাওয়া হতো এবং সকল দেব দেবীর চেয়ে তার বেশী সম্মান করা হতো। ইবনে হিশাম বলেন, আবু লুহায়হা যখন মরতে বসলো তখন আবু লাহাব তাকে দেখতে গেল। দেখলো যে, সে কাঁদছে। আবু লাহাব বলল, কাঁদছো কেন ? মরণের ভয়ে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি যে, আমার পরে উয্যার পূজা কিভাবে হবে। আবু লাহাব বললো, তার পূজা না তোমার জীবনে তোমার খাতিরে হতো, আর না তোমার পরে তার পূজা বন্দ হয়ে যাবে। আবু লুহায়হা বললো, এখন আমি নিশ্চিন্ত হলাম যে, আমার পরে কেউ আমার স্থলাভিষিক্ত হবে।

মানাত

তার মন্দির মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী লোহিত সাগরের তীরে কুদায়মা নামক স্থানে ছিল এবং বিশেষ করে বনী খুযায়া এবং আওস ও খাযরাজ্যের লোকেরা তার খুবই ভক্ত ছিল। তার যিয়ারত এবং তওয়াফ করা হতো, তার জন্যে মানতের কুরবানী করা হতো। হজ্জের সময় যখন হাজীগণ বায়তুল্লাহর তওয়াফ এবং আরাফাত ও মিনার কাজ শেষ করতো তখন সেখান থেকে মানাতের যিয়ারতের জন্যে লাব্বায়কা লাব্বায়কা ধ্বনি করতে করতে অগ্রসর হতো। যারা এ দ্বিতীয় হজ্জের নিয়ত করতো তারা সাফা মারওয়ার সায়ী করতো না।

নূহের জাতির দেব দেবী

নূহের জাতির দেব দেবীদের মধ্যে সূরা নূহে শুধু ঐসব দেবদেবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তীকালে আরববাসী যাদের পূজা করা শুরু করে। ইসলামের সূচনাকালে আরবের স্থানে স্থানে তাদের মন্দির স্থাপিত ছিল। হতে পারে যে, তুফানে যারা জীবিত রয়ে গিয়েছিল, তাদের মুখে পরবর্তী বংশধরগণ নূহের জাতির প্রাচীন দবে দেবীর কথা শুনেছিল এবং যখন তাঁর বংশধরগেণের মধ্যে নতুন করে জাহেলিয়াত চড়িয়ে পড়ে তখন তারা ঐসব দেব দেবীর প্রতিমা তৈরী করে পুন তাদের পূজা শুরু করে।

নূহের জাতির দেব দেবী

নূহের জাতির দেব দেবীদের মধ্যে সূলা নূহের শুধু ঐসব দেব দেবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তীকালে আরববাসী যাদের পূজা করা শুরু করে। ইসলামের সূচনাকালে আরবের স্থানে স্থানে তাদের মন্দির স্থাপিত ছিল। হতে পারে যে, তুফানে যারা জীবিত রয়ে গিয়েছিল, তাদের মুখে পরবর্তী বংশধরগণ নূহের জাতির প্রাচীন দেব দেবীর কথা শুনেছিল এবং যখন তাঁর বংশধরগণের মধ্যে নতুন করে জাহেলিয়াত ছড়িয়ে পড়ে তখন তারা ঐসব দেব দেবীর প্রতিমা তৈরী করে পুন তাদের পূজা শুরু করে।

একঃ ওয়াদ্দ কুযায়া গোত্রের শাখা বনী কালব বিন ওয়াবরা এর দেবতা ছিল ওয়ার্ড যার মন্দির তারা দুমাতুল জান্দাল এ নির্মাণ করে রেখেছিল। আরবের প্রাচীন শিলালিপিতে তার নাম ওয়াদ্দাম আবাম লিখিত পাওয়া যায়। কালবীর বর্ণনা মতে প্রতিমাটি বিরাট দেহ বিশিষ্ট পুরুষের আকারে নির্মিত ছিল। কুরাইশরাও তাকে খোদা বলে মানতো এবং তাদের নিকটে তার নাম ওদ্দ ছিল। তার নামানুসারে ইতিহাসে আবদে ওদ্দ নামের এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।

দুইঃ সুআ(***আরবী***)

এ ছিল হুযায়ইল গোত্রের দেবী এবং তার প্রতিমা নারী মূর্তি বিশিষ্ট ছিল। ইয়াম্বুর নিকটে রূবীত নামক স্থানে তার মন্দির ছিল।

তিনঃ ইয়াগুস

তাঈ গোত্রের শাখা আনউম এবং মুযহেজ গোত্রের কতিপয় শাখার দেবতা ছিল ইয়াগুস। মুযহেজ গোত্রের লোকরা ইয়ামেন ও হেজাজের মধ্যবর্তী জূর্না নামক স্থানে তার প্রতিমা স্থাপন করে রেখেছিল। সে ছিল বাঘের আকৃতি বিশিষ্ট। কুরাইশদের মধ্যেও কারো কারো নাম আবদে ইয়াগুস পাওয়া যায়।

চারঃ ইয়াউক

এ ছিল ইয়ামেন অঞ্চলের হামদান গোত্রের শাখা খাইওয়ানের দেবতা। সে ছিল ঘোড়ার আকৃতি বিশিষ্ট।

পাঁচঃ নাসর

খিমইয়ার অঞ্চলে খিমইয়ার গোত্রের শাখা যুলকুলা এর দেবতা ছিল নাসর। বালখা নামক স্থানে গাধার আকৃতিতে তার প্রতিমা স্থাপিত ছিল। সাবা জাতির প্রাচীন শিলা লিপিতে তার নাম নাসুর বলে লিখিত পাওয়া যায়। তার মন্দিরকে লোক বায়তে নাসুর এবং পূজারীদেরকে আহলে নাসুর বলতো। প্রাচীন মন্দিরসমূহের যেসব ধ্বংসাবশেষ আরব ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে পাওয়া যায় তাদের মধ্যে অনেক মন্দিরের দরজায় গাধার মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়।(তাফহীমূল কুরআন,সূরা আল আনআম, টীকা ১০৯)

বিখ্যাত প্রতিমা বাল(***আরবী***)

তোমরা কি বালকে ডাকো এবংয় সবচেয়ে ভালো সৃষ্টিকর্তাকে পরিত্যাগ করে চল?-সূরা আস সাফফাতঃ১২৫

বালের আভিধানিক অর্থ প্রভু, সরদার মালিক। স্বামীর জন্যেও এ শব্দ ব্যবহার করা হয়। কুরআনের বিভিন্ন স্থানেও এ শব্দটি শেষোক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন সূরা বাকারাহ, আয়াত ২২৮, সূরা আন নিসা, আয়াত ১২৮, সূরা হুদ, আয়াত ৭২ এবং সূরা আন নূর, আয়ত ৩১। কিন্তু প্রাচীন যুগের সাস বংশীয় জাতিগুলো এ শব্দকে ইলাহ বা খোদা অর্থে ব্যবহার করতো । তারা এক বিশেষ দেবতাকে বাল নামে অভিহিত করে। বিশেষ করে লেবাননের ফিনিকী জাতির (Phoenicians)সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা ছিল বাল এবং তার স্ত্রী এস্তারাত (Ashtoreth)ছিল সকলের বড়ো দেবী। গবেষকদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ আছে যে, বাল বলতে সূর্য বুঝায় । না বৃহস্পতি গ্রহ (Jupiter),আর এস্তারাত বলতে চন্দ্র বুঝায়, না শুক্র গ্রহ (Venus)। যাইহোক, এ কথা ঐতিহাসিক দিক দিয়ে প্রমাণিত যে,বেবিলন থেকে নিয়ে সির পর্যন্ত গোটা মধ্যপ্রাচ্যে বালের পূজা বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের মুশরিক জাতিগুলো মারাত্ন্যকভাবে এতে লিপ্ত ছিল।

বনী ইসরাঈল যখন মিসর থেকে বের হয়ে ফিলিস্তিন এবং পূর্ব জর্দানে পুনর্বাসিত হলো এবং তাওরাতের কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মুশরিক জাতির সাথে বিবাহ ও সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে লাগলো। তখন তারাও এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলো। বাইবেল বলে, মূসা (আ) এর প্রথম খলিফা হযরত ইউশা বিন নুন এর মৃত্যুর পরেই বনী ইসরাঈলের মধ্যে ঐ নৈতিক ও দ্বীনি পতন শুরু হয়।

ইসরায়েল সন্তানগণ সদাপ্রভূর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ, তাহাই করিতে লাগিল, এবং বাল দেবগণের সেবা করিতে লাগিল। —- সেই সদাপ্রভুকে ত্যাগ করিয়া অন্য দেবগণের, অর্থাৎ আপনারদের চতুদ্দিকাস্থিত লোকদের বেদগণের অনুমাগী হইয়া তাহাদের কাছে প্রণিপাত করিতে লাগিল, বিচারকর্ত্তৃগণ ২:১১ – ১৩

ফলে ইসরায়েল সন্তানগণ কনানীয়, হিত্তীয়, ইমোরীয়, পরিকীয়, হিব্বীয় ও যিবূষীয়গণের মধ্যে বসতি করিল, আর তাহারা তাহাদের কন্যাগণকে বিবাহ করিত, তাহাদের পুত্রগণের সহিত আপন আপন কন্যাদের বিবাহ দিত ও তাহাদের দেবগণের সেবা করিত। – বিচারকর্ত্তৃগণ ৩:৫-৬

সে সময়ে বাল পূজা ইসরাঈলীদের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করলো যে, বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী তাদের একটি বস্তিতে বালের কুরবানীগাহ বানানো হয়েছিল যেখানে কুরবানী করা হতো। একজন খোদাপুরস্ত ইসরাঈলী এ অবস্থা সহ্য করতে না পেরে রাত্রি বেলা চুপে চুপে কুরবানীর স্থান ভেঙে ফেলে । পরের দিন এক বিরাট সমাবেশে জনতা ঐ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড দাবী করলো, যে শিরকের এ আড্ডা ভেঙে দিয়েছিল।অবশেষে হযরত সামবিল, তালূত, হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ) এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন করেন। তাঁরা শুধু বনী ইসরাঈলেরই সংশোধন করেননি, বরঞ্চ নিজেদের গোটা রাজ্যেই সাধারণভাবে শিরক ও মূর্তিপূজা দমন করেন। কিন্তু হযরত সুলায়মান (আ) এর মৃত্যুর পর ফেতনা আবার মাথাচাড়া দিল এবংয় বিশেষ করে উত্তর ফিলিস্তিনের ইসরাঈলী রাষ্ট্র বাল পূজায় নিমজ্জিত হলো।(সূরা আন নাজম, টীকা ১৫)

মূর্তিপূজার সাথে আল্লাহ সম্পর্কে উচ্চতর ধারণা

আরবের মুশরিকগণ একথা স্বীকার করতো যে, আসমান ও যমীনের স্রষ্টা আল্লাহ। তিনিই দিন ও রাতের আবর্তন বিবর্তন ঘটান। তিনিই সূর্য চন্দ্রকে অস্তিত্ব দান করেছেন। তাদের মধ্যে কারো এ বিশ্বাস ছিল না যে, এসব কাজ লাত, হুবল, উযযা অথবা অন্য কোন দেবতার ছিল।(সূরা নূহ,টীকা১৭)

আল্লাহ সম্পর্কে আরবের মুশরিকদের ধারণা বিশ্বাস কি ছিল, কুরআনে স্থানে স্থানে তা বলা হয়েছে। যেমন সূরা যুখরুফে আছে, যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, তাদেরকে কে পয়দা করেছে। তাহলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ (আয়াত ৮৭)। সূরা আনকাবুতে আছে, যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর আসমান যমীন কে পয়দা করেছে এবং চন্দ্র ও সূর্যকে কে নিয়ন্ত্রিত করে রেখেছে, তাহলে তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। এবং যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর আসমান থেকে কে পানি বর্ষণ করালেন এবং কে মৃতবৎ পড়ে থাকা যমীনকে জীবিত করলেন। তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ। আয়াত ৬১,৬৩

সূরা মুমিনুনে আছে, তাদেরকে বল, এ যমীন এবং তার সকল অধিবাসী কার বলো দেখি, যদি তোমাদের জানা থাকে? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহর ।——- তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, সাত আসমান এবং বিরাট আরশের মালিক কে? তারা অবশ্য বলবে আল্লাহ। তাদেরকে বল, তোমরা যদি জান তাহলে বলো দেখি,প্রত্যেক বস্তুর উপর কর্তৃত্ব প্রভুত্ব কার? আর কে আছে যে আশ্রয় দেয় এবং তাঁর মুকাবিলায় কেউ আশ্রয় দিতে পারেনা? তারা নিশ্চয় জবাবে বলবে এত সব আল্লাহর জন্যে। -আয়াত ৮৪- ৮৯

সূরা ইউনুসে বলা হয়েছে, তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তোমাদেরকে আসমান ও যমীন তেকে রিযক কে দেয়? এই যে শ্রবণ ও দর্শনশক্তি, যা তোমরা লাভ করেছ, কার এখতিয়ারে ? এবং কে জীবিতকে মৃত থেকে এবং মৃতকে জীবিত থেকে বের করে? এবং কে বিশ্ব শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছে? তারা অবশ্যই বলবে আল্লাহ (আয়াত ৩১)। সূরা ইউনুসে আর এক স্থানে আছে, তোমরা যখন নৌকায় চড়ে অনুকূল হাওয়ায় আনন্দ সহকারে সফর করতে থাক, তারপর প্রতিকূল হাওয়া তীব্র হয়ে আসে, চারদিক থেকে তরঙ্গের আঘাত লাগতে থাকে, আর মুসাফির মনে করে যে, তারা ঝড় ঝঞ্ঝায় পরিবেষ্টিত হয়েছে, তখন তারা নিজেদের দ্বীনকে আল্লাহর জন্যে খালেস করে তাঁরই নিকট দোয়া করে যে, তুমি যদি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর তাহলে আমরা তোমারই কৃতজ্ঞ বান্দাহ হয়ে থাকবো। কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে উদ্ধার করে নেন, তখন তারাই সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে দুনিয়ার বুকে বিদ্রোহ করা শুরু করে(আয়াত ২২-২৩)। একথা সূরা বনী ইসরাঈলে এভাবে বলা হয়েছে, যখন সমুদ্রে তোমাদের উপর বিপদ আসে, তখন ঐ এক আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা আর যাকে যাকে ডাকো তারা সব হারিয়ে যায়,কিন্তু যখন তিনি তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে পৌছিয়ে দেন। তখন তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।(আয়াত ৬৭)।(সূরা আস সাফফাত,টীকা-৭১)

সম্পদে আল্লাহর সাথে দেব দেবীর অংশ

তারা (মুশরিক) স্বয়ং এ কথা স্বীকার করতো, যে যমীন আল্লাহর এবং শস্য তিনিই উৎপন্ন করেন। ঐসব পশুর স্রষ্টাও আল্লাহ এবং তারা তাদের জীবনে ঐসব পশুর খেদমত গ্রহণ করে। কিন্তু তাদের ধারণা এই ছিল যে, ঐসব দেব দেবী, ফেরেশতা, জ্বিন, আকাশের তারকারাজি এবং মৃত বুযর্গানের আত্মাসমূহ তাদের প্রতি কৃপা দৃষ্টি রাখতেন বলে তাদের মধ্যস্থতায় ও বরকতেই তাদের প্রতি আল্লাহর এ অনুগ্রহ হয়েছে। সে জন্যে তারা তাদের ক্ষেতের ফসল ও পশু থেকে দুটি অংশ বের করতো। এক অংশ আল্লাহর নামে এ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্যে যে, তিনি এ শস্য এবং পশু তাদেরকে দিয়েছেন। দ্বিতীয় অংশ আপন গোত্র বা পরিবারের পৃষ্ঠপোষক দেব দেবীর নযর নিয়াযের জন্যে, যেন তাদের কৃপা তাদের প্রতি বর্ষিত হয়। (সূরা ইখলাস,টীকা -২)

আল্লাহর উপর প্রতিমাদের অগ্রাধিকার দান

তারা আল্লাহর নামে সম্পদের যে অংশ বের করতো, নানান ছলচাতুরী করে তাও হ্রাস করে ফেলতো। সর্বপ্রকারে নিজেদের তৈরী অংশীদারদের অংশ বাড়াবার চেষ্টা করতো। এর থেকে বুঝা যায় যে, তাদের এসব অংশীদারদের প্রতি তারা যতোটা গুরুত্ব দিত ততোটা আল্লাহর প্রতি দিত না। যেমন, যেসব খাদ্যশস্য বা ফল প্রভৃতি আল্লাহর নামে বের করা হতো, তার মধ্য থেকে যদি কিছু পড়ে যেতো, তাহলে তা অংশীদারদের ভাগে দিয়ে দেয়া হতো। আর যদি অংশীদারদের অংশ থেকে কিছু পড়ে যেতো অথবা আল্লাহর অংশে মিশে যেতো, তাহলে তা অংশীদারের ভাগে দিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু এর বিপরীত হলে আল্লাহর অংশে আল্লাহর অংশে কিছু বর্ধিত করা হতো না। যদি খরা হওয়ার কারণে নযর নিয়ামের ফসল নিজেদের খাওয়ার প্রয়োজন হতো। তাহলে আল্লাহর অংশের ফসল খেয়ে ফেলতো। কিন্তু আল্লাহর শরীকদের অংশে হাত দিতে তারা ভয় করতো যে, কি জানি কোন বিপদ না এসে পড়ে। যদি কোন কারণে অংশীদারদের ভাগে কম পড়তো, তাহলে আল্লাহর অংশ থেকে তা পূরণ করা হতো। কিন্তু আল্লাহর অংশে কম পড়লে, শরীকদের অংশ থেকে একটি শস্যদানাও দেয়া হতো না। এ ধরনের আচরণের কেউ সমালোচনা করলে নানান ধরনের মনভুলানো অজুহাত পেশ করা হতো। যেমন, তারা বলতো, আল্লাহ তো ধনবান, তাঁর অংশ থেকে কিছু কম হলে তাতে তাঁর কিছু যায় আসেনা। আর এরা তো বেচারা বান্দাহ আল্লাহর মতো ধনী নয়। সে জন্যে কিছু কম বেশী হলে তারা ধরে বসবে।

এসব কুসংস্কারর মূলে কি ছিল তা বুঝতে হলে জেনে রাখা দরকার যে, অজ্ঞ আরববাসী তাদের সম্পদের যে অংশ আল্লাহর জন্যে বের করতো তা ফকীর, মিসকিন, এতিম, মুসাফির প্রভৃতির সাহায্যে ব্যয়িত হতো। আর যে অংশ আল্লাহর শরীকদের নযর নিয়াযের জন্যে বের করা হতো। তা হয়তো সরাসরি ধর্মীয় পেটে যেতো অথবা আস্তানার ভেট দেয়া হতো। ফলে তা পরোক্ষভাবে পূজারী ঠাকুরদের উদরস্থ হতো। এ জন্যে তাদের স্বার্থান্ধ ধর্মীয় নেতাগণ শত শত বছরের ধর্মীয় উপদেশের মাধ্যমে তাদের মনে এ কথা বদ্ধমূল করে দিয়েছিল যে, আল্লাহর অংশে কিছু কম হলে তাতে কিছু যায় আসেনা। কিন্তু আল্লাহর প্রিয়দের অংশে কম হওয়া উচিত নয়। বরঞ্চ কিছু বেশী হওয়াই ভালো।(সূরা ইখলাস,টীকা -২)

মুশরিকদের সত্যিকার গোমরাহি কি ছিল?

যদিও মক্কার মুশরিকগণ একথা অস্বীকার করতো না যে, সকল সম্পদ আল্লাহরই দেয়া এবং এস সম্পদের উপর আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহও তারা স্বীকার করতো অস্বীকার করতো না। কিন্তু যে ভুল তারা করতো তাহলো এই যে, এসব সম্পদ ও নিয়ামতের জন্যে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করার সাথে সাথে তারা ঐসব অনেক সত্তারও শুকরিয়া কথা ও কাজের দ্বারা আদায় করতো। কারণ তাদেরকে তারা কোন যুক্তি প্রমাণ ব্যতিরেকেই এসব নিয়ামত বা সম্পদ দানে হস্তক্ষেপকারী ও অংশীদার মনে করতো।

এটাকেই কুরআন আল্লাহর অনুগ্রহের অস্বীকৃতি বলে উল্লেখ করেছে। কুরআনে এ কথাকে একটা পরিপূর্ণ বিধি হিসেবে পেশ করা হয়েছে যে, অনুগ্রহকারীর অনুগ্রহের কৃতঘ্নতা প্রদর্শন করা যদি হয় এমন কারো কাছে যে, অনুগ্রহকারী নয়, তাহলে প্রকৃত অনুগ্রহকারীর কৃতজ্ঞতা বা নিমকহারামিই করা হয়। এমনিভাবে কুরআন এটাকেও একটা নীতি হিসেবে পেশ করেছে যে, অনুগ্রহকারী বা সম্পদদাতা সম্পর্কে কোন যুক্তি প্রমাণ ব্যতিরেকে যদি এমন ধারণা করা হয় যে, তিনি তাঁর আপন অনুগ্রহ ও অনুকম্পা বশে এসব দান করেননি, বরঞ্চ করেছেন অমুক ব্যক্তি মাধ্যমে, অথবা অমুকের সম্মানে, অথবা অমুকের সুপারিশক্রমে বা হস্তক্ষেপে, তাহলে তাও হবে প্রকৃতপক্ষে তাঁর দানের অস্বীকৃতি।(সূরা আল আন আম,টীকা-১০৫)

নিজেদের খোদাগুলো সম্পর্কে আরববাসীর ধারণা

আরববাসী যদিও শিরকে লিপ্ত ছিল এবং এ ব্যাপারে তাদের চরম গোঁড়ামী ছিল, তথাপি তাদের শিরকের মূল শুধু উপরিভাগেই সীমিত ছিল, গভীরে পৌছতে পারেনি। দুনিয়ার কোথাও এবংয় কখনোও শিরকের মূল মানব প্রকৃতির গভীরে প্রবেশ করতে পারেনি। পক্ষান্তরে খাঁটি আল্লাহপুরস্তির মহত্ব তার মনের গভীরে বিদ্যমান ছিল। তাকে উদ্বুদ্ধ ও উদ্বেলিত করার জন্যে উপরিভাগকে সজোরে একটু ঘর্ষণ করার প্রয়োজন হয়।

জাহিলিয়াতের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা এ দুটি বিষয়ের সাক্ষ্যদান করে। যেমন আবরাহার আক্রমণের সময় কুরাইশের আবাল বৃদ্ধ বনিতা জানতো যে, কাবাঘরে রক্ষিত প্রতিমাগুলো এ বিপদ ঠেকাতে পারেনা, বরঞ্চ এ ঘর যে আল্লাহর একমাত্র তিনিই ঠেকাতে পারেন। আজও সে সব কবিতা ও প্রশংসাসূচক গীতিকাব্য সংরক্ষিত আছে, যেগুলো আসহাবে ফীলের ধ্বংসের উল্লাসে সমকালীন কবিগণ পাঠ করেন। তাদের প্রতিটি শব্দ সাক্ষ্যদান করে যে, তারা এ ঘটনাকে নিছক আল্লাহ তায়ালার কুদরতের বিস্ময়কর প্রকাশ মনে করতো। তারা সামান্যতম ধারণাও পোষণ করতো না যে, এ ব্যাপারে তাদের দেব দেবীর কোন হাত ছিল।ভ এ ঘটনায় শিরকের এ নিকৃষ্টতম কর্মকাণ্ডও কুরাইশ এবং সকল মুশরিকদের সামনে ধরা পড়লো যে, আবরাহা যখন মক্কার পথে তায়েফ পৌছলো তখন তায়েফবাসী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো,কি জানি তাদের লাত দেবতার মন্দিরও যদি ধ্বংস করে দেয়। সে জন্যে কাবাঘর ধ্বংস করার জন্যে তারাও তাদের খেদমত আবরাহার কাছে পেশ করলো এবং তাদের সাথে তাদের নিজেদের সশস্ত্র প্রহরী বাহিনী পাঠালো যাত পাহাড়ি পথে তাদেরকে নিরাপদে মক্কায় পৌঁছেয়ে দিতে পারে। এ ঘটনার তিক্ত অভিজ্ঞতা বহুদিন যাবত কুরাইশদেরকে পীড়া দিতে থাকে এবং কয়েক বছর যাবত তারা ঐ ব্যক্তির কবরে পাথর ছুড়তে থাকে, যে তায়েফের প্রহরী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিল।

তাছাড়া কুরাইশ এবং অন্যান্য আরববাসী তাদের ধর্মকে হযরত ইবরাহীম (আ) এর সাথে সম্পৃক্ত করতো। নিজেদের বহু ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতিনীতি, বিশেষ করে হজ্জের নিয়ম প্রণালী ইবরাহীম দ্বীনের অংশ বলে তারা গণ্য করতো।

তাদের এ কথাও জানা ছিল যে, হযরত ইবরাহীম (আ) খাটি আল্লাহরপুরস্ত ছিলেন। তিনি কখনো প্রতিমা পূজা করেননি। তাদের ঐতিহ্যের মধ্যে এ বিবরণও লিপিবদ্ধ ছিল যে, প্রতিমাপূজা তাদের মধ্যে কখন প্রচলিত হয় এবং কোন প্রতিমা কে কখন কোথা থেকে এনেছিল।

নিজেদের দেব দেবীর প্রতি সাধারণ আরববাসীর ভক্তি শ্রদ্ধা কতখানি ছিল তার ধারণা এর থেকে করা যায় যে, যখন দোয়া এবং কামনা বাসনার বিপরীত কোন ঘটনা ঘটতো, তখন অনেক সময় তারা তাদের দেবতার অপমানও করতো এবং তার নযর নিয়ায বন্ধ করে দিত। একজন আরববাসী তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল এবং যুল খালাসা দেবতার নিকটে গিয়ে ভাগ্য পরীক্ষার জন্যে গুটি চালালো। জবাব যে গুটি বেরুলো তাতে বলা হলো এ কাজ করো না। এতে সে ক্রুদ্ধ হয়ে বলতে লাগলো(*****আরবী****)

হে যুল খালাসা, আমার স্থানে যদি তুমি হতে এবং তোমার বাপকে মারা হতো, তাহলে তুমি কক্ষনো এ মিথ্যা কথা বলতে না যে, যালিমের প্রতিশোধ নিও না।

আর একজন আরববাসী তার উটের পটাল নিয়ে গেল সাদ নামক এক মন্দিরে এ আশায় যে, সে কিছু বরকত লাভ করবে। কিন্তু প্রতিমাটি ছিল লম্বা চওড়া কিম্ভূতকিমাকার এবং তার গায়ে কুরবানীর রক্ত লেগেছিল। উটগুলো তাকে দেখে ভয়ে এদিক সেদিক পালিয়ে গেল। উটগুলোকে এভাবে চারদিকে পলায়নপর দেখে সে ভয়ানক রেগে গেল এবং সে দেবতাকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে ছুড়তে বলতে লাগলো, আল্লাহ তোমার সর্বনাশ করুন। আমি এসেছিলাম বরকত বোর জন্যে আর তুমি আমার উটগুলো তাড়িয়ে দিলে?( এ বিভিন্ন দিকে প্রতি দৃষ্টিপাত করলে একথা সহজেই বুতে পারা যায় যে, আল্লাহপুরস্তির প্রতি একটা গভীর শ্রদ্ধাবোধ তাদের অন্তরে ছিল । কিন্তু একদিকে তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত রক্ষণশীলতা এবং অন্যদিকে কুরাইশ ঠাকুর পুরোহিত আল্লাহপুরস্তির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াবার কাজে লিপ্ত ছিল। কারণ দেব দেবীর প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা খতম হয়ে গেলে তাদের আশংকা ছিল, আরবে তাদের যে কেন্দ্রীয় মর্যাদা ছিল তা শেষ হয়ে যাবে। উপরন্তু তাদের রুজি রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। এসব অবলম্বনের উপরে যে শিরকের ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা তাওহিদী দাওয়াতের মুকাবিলায় সসম্মানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা। এ কারণেই কুরআন মুশরিকদেরকে সম্বোধন করে বলে, তোমাদের সমাজে নবী মুহাম্মদ (সা) এর অনুসারীগণ যেসব কারণে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে তার প্রধান গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শিরক থেকে মুক্ত থাকা এবং খাঁটি আল্লাহপুরিস্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া। এ দিক দিয়ে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্ব মুশরিকগণ মুখে স্বীকার করুক বা না করুক, কিন্তু অন্তরে তার গুরুত্ব তারা অনুভব করতো।)(সূরা আন নাহল,টীকা -৬৪)

অনেক দেব দেবী এমন ছিল যাদের সম্পর্কে ঘৃণ্য ও অশ্লীল গল্প কাহিনী কথিত ছিল। এসাফ ও নায়েলার মূর্তি সাফা মারওয়া পাহাড় দুটির উপর স্থাপিত ছিল। তাদের সম্পর্কে এ কাহিনী মশহুর ছিল যে, তারা দুই নারী পুরুষ ছিল এবং তারা কবার ঘরে ব্যভিচার করে। এ অপরাধে আল্লাহ তাদেরকে পাথরে পরিণত করে দেন। যেসব দেব দেবীর প্রকৃত পরিচয় এই, পূজারীদের অন্তরে তাদের জন্যে কোন ভক্তি শ্রদ্ধা স্থান পেতে পারে না। (সূরা আন আম,টীকা – ১০৬)

সালফ সালিহীনের মূর্তি পূজা

আরবের বিভিন্ন গোত্র যথা রাবীয়াহ গাসসান, কালব, তাগলীব, কুযায়া, কোনা, হারস, কাব, কিন্দাহ প্রভৃতি গোত্রগুলোর মধ্যে বহু সংখ্যক ইহুদী খৃষ্টান চিল। এ উভয় ধর্মই আম্বিয়া, আউলিয়া এবং শহীদানের পূজা পার্বণে লিপ্ত ছিল। তারপর আরবের মুশরিকদের অধিকাংশ না হলেও বহু উপাস্য এমন ছিল যারা মূলে ছিল মানুষ। পরবর্তী বংশধরগণ তাদেরকে খোদা বানিয়ে নিয়েছে। বুখারীতে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, ওয়ার্ড, সুয়া, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নসর এসব নেক লোকের নাম। পরবর্তীকালের লোকেরা তাঁদেরকে উপাস্য দেবতা বানিয়ে নিয়েছে। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, এসাফ এবং নায়েলা উভয়েই ছিল মানুষ। এ ধরনের বর্ণনা লাত, মানাত এবং উয সম্পর্কেও পাওয়া যায়।মুশরিকদের এ ধারণা বিশ্বাসও বর্ণনা করা হয়েছে যে, লাত ও উয আল্লাহ তায়ালার এমন প্রিয় ছিল যে, আল্লাহ শীতে লাতের নিকটে এবং গরমে উয্যার অবস্থান করতেন। মায়াযাল্লাহ, সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আম্মা ইয়াসিফূন)(সূরা আল ফুরকান,টীকা-৮৪)

কবরবাসীদের পূজা

সূরা আন নাহলের ২১ নং আয়াতে বিশেষ করে যেসব বানোয়াট উপাস্যদের খণ্ডন করা হয়েছে তারা ফেরেশতা, জ্বিন, শয়তান অথবা কাঠ পাথর নির্মিত প্রতিমা নয়। বরঞ্চ তারা কবরবাসী। এজন্যে যে ফেরেশতা ও শয়তান তো জীবিত সত্তা। তাদের জন্যে (*****আরবী****) শব্দাবলীর প্রয়োগ হতে পারে না এবং কাঠ ও পাথরের প্রতিমাগুলোর মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের প্রশ্নই উঠতে পারে না। এ জন্যে (***আরবী****)শব্দগুলোও তাদেরকে ধর্তব্যের বাইরে গণনা করছে। এখন এ আয়াতে (***আরবী****) এর অর্থ অবশ্যম্ভাবীরূপে যেসব আম্বিয়া, আউলিয়া, শুহাদা, সালেহীন এবং অন্যান্য অসাধারণ মুসলমানই হবেন যাঁদেরকে চরমপন্থি ভক্তের দল দাতা, বিপদ ভঞ্জনকারী, ফরিয়াদ শ্রবণকারী, গরীব নওয়ায বা গরীবের ত্রাণকর্তা,গঞ্জবখশ এবং এ ধরনের নানান বিশেষণে ভূষিত করে নিজেদের মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্যে তাদের উদ্দেশ্যে আবেদন নিবেদন করা শুরু করে। এর জবাবে যদি কেউ বলে যে, আরবে এ ধরনের কোন উপাস্যের অস্তিত্ব ছিল না, তাহলে আমরা বলব যে, এ হচ্ছে আরবের জাহিলী যুগের ইতিহাস সম্পর্কে তার অজ্ঞতারই প্রমাণ।(সূরা আল ফুরকান,টীকা-৮৪)

ফেরেশতাদের স্ত্রীমূর্তির পূজা

মৌলিক উপাখ্যান থেকে জানতে পারা যায় যে, আরবে কুরাইশ, জুহানিয়িা, বনী সালমা, খুযায়া, বনী মুলায়াহ এবংয় অন্যান্য গোত্রগুলোর এ বিশ্বাস ছিল যে, ফেরেশতারা আল্লাহ তায়ালার কন্যা ছিলেন।(তাদের অজ্ঞতা প্রসূত ধারণা বিশ্বাসের প্রতিবাদ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে করা হয়েছে। যেমন, সূরা আন নিসা আয়াত ১১৭, সূরা আন নামল ৫৭ – ৫৮, বনী ইসরাঈল৪০, যুখরুফ ১৬ -১৯, নাজম আয়াত ২১ -২৭ দ্রষ্টব্য।) ফেরেশতাদেরকে তারা দেবী মনে করতো এবং নারী আকৃতিতে তাদের প্রতিমা বানিয়ে রাখতো, তাদেরকে নারীর পোশাক এবং অলংকার পরিয়ে দিত এবং বলতো, এরা সব আল্লাহর কন্যা। তারা তদের পূজা করতো, কামনা বাসনা পূরণের জন্যে তাদের নামে মানত করতো।

ভাগ্যের দোহাই

তাদের এ অজ্ঞতার প্রতিবাদ করলে তারা ভাগ্যের দোহাই পারতো। বলতো, আল্লাহ যদি এ কাজ পছন্দ না করতেন, তাহলে আমরা কি করে এসব প্রতিমা পূজা করতাম?

অথচ আল্লাহর পছন্দ অপছন্দ জানার মাধ্যম হচ্ছে তাঁর কেতাবগুলো। কিন্তু ঐসব কাজ নয় যা দুনিয়ায় তাঁর ইচ্ছায় চলছে। দুনিয়ায় তো প্রতিমা পূজা কেন, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ব্যভিচার সবই তাঁর ইচ্ছায় চলছে। এ যুক্তি দিয়ে কি ঐ প্রত্যেকটি মন্দ কাজকে জায়েজ বা ন্যায় সংগত বলা যাবে যা দুনিয়ার বুকে হচ্ছে?দুনিয়ায় কোন কাজ আল্লাহর ইচ্ছায় হওয়ার অর্থ এ নয় যে, এ কাজে আল্লাহ সন্তুষ্ট।

বাপ দাদার অন্ধ অনুসরণ

তাদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হতো, এ ভ্রান্ত যুক্তি ছাড়া আর কোন প্রামাণ্য যুক্তি আছে কি? তদুত্তরে তারা বলতো এতো বাপ দাদা থেকে চলে আসছে। অর্থাৎ তাদের কাছে কোন ধর্মের সত্যতা সম্পর্কে এই হলো যথেষ্ট যুক্তি প্রমাণ। অথচ যে ইবরাহীম (আ) এর বংশধর হওয়াটা ছিল সকল গৌরব অহংকারের কারণ, তিনি তো বাপ দাদার ধর্ম পরিত্যাগ করে বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। তিনি তাঁর পিতৃপুরুষের এ ধরনের অন্ধ অনুসরণ নাকচ করে দিয়েছিলেন। কারণ তার কোন যুক্তিসংগত দলিল প্রমাণ ছিল না। এসব লোকদের যদি পূর্বপুরুষদের অনুসরণই করতে হতো তাহলে তার জন্যে তাদের মহানতম পূর্বপুরুষ হযরত ইবরাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) কে বাদ দিয়ে তাদের অজ্ঞতম বাপ দাদার অনুসরণ করলো কেন?

ঈসায়ীদের গোমরাহি থেকে পৌত্তলিক আরববাসীদের যুক্তি প্রদর্শন

যদি তাদেরকে বলা হতো, কখনো কোন নবী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত কোন কিতাব এ শিক্ষা দিয়েছে কি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য? তাহলে তারা ঈসায়ীদের কর্মকাণ্ড দলিল হিসেবে পেশ করে বলতো যে, তারাও তো ঈসা ইবনে মারইয়ামকে আল্লাহর পুত্র বলে মেনে নিয়েছে এবং তার পূজা করছে। অথচ প্রশ্ন এটা ছিল না যে, কোন নবীর উম্মত শিরক করেছে কি না। বরঞ্চ প্রশ্ন ছিল এই যে, স্বয়ং কোন নবী শিরকের শিক্ষা দিয়েছেন কি না। ঈসা ইবনে মারইয়াম কি কখনো একথা বলেছিলেন, আমি আল্লাহর পুত্র এবং তোমরা আমার পূজা কর?দুনিয়ার প্রত্যেক নবীর যে শিক্ষা ছিল, তাঁরও তাই ছিল। অর্থাৎ আমার ইলাহও আল্লাহ এবং তোমাদের ইলাহও আল্লাহ। অতএব তাঁরই ইবাদাত কর।(সূরা আন নাহল, টীকা ১৯)

মুশরিকদের উপাস্য দেব দেবীর প্রকার

সারা দুনিয়ার মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যে সকল সত্তার নিকটে দোয়া চাইতো এবং আরববাসীও যাদের কাছে দোয়া চাইতো তারা তিন প্রকারের। (গ্রন্থকার একথা অন্য স্থানে আর একভাবে লিখেছেন যে, পৌত্তলিক ধর্মগুলোতে পৃথক পৃথক তিনটি জিনিস পাওয়া যায়। এক হচ্ছে সেসব দেবমূর্তি, প্রতিকৃতি অথবা নিদর্শনাবলী যা পূজার লক্ষবস্তু (Objects of worship)হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়তঃ সেসব লোক, অথবা অর্থ যা প্রকৃতপক্ষে উপাস্য গণ্য করা হয় এবং যে সবের প্রতিনিধিত্ব প্রতিমা, প্রতিকৃতি প্রভৃতির আকারে করা হয়। তৃতীয়তঃ ঐসব ধারণা বিশ্বাস যা এসব পৌত্তলিক পূজা অর্চনা ও কাজ কর্মের নিয়ামক হয়।(সূরা আন নাহল,টীকা-১৯) এক প্রাণহীন ও জ্ঞানহীন সৃষ্টি। দুই. ঐ সকল নেক ও বুযর্গ ব্যক্তি যাঁরা দুনিয়া থেকে চলে গেছেন। তিন. ঐসব পথভ্রষ্ট লোক যারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট ছিল এবং অপরকেও পথভ্রষ্ট করেছে। প্রথম প্রকারের উপাস্য দেবতা বা খোদা যে, তাদের পূজারীদের দোয়া সম্পর্কে একেবারে বেখবর তা অতি সুস্পষ্ট। দ্বিতীয় প্রকারের খোদা, যাঁরা দুনিয়াতে আল্লাহর পিয়ারা ছিলেন তাঁদেরও বেখবর থাকার দুটি কারণ আছে। এক হচ্ছে এই যে, তাঁরা আল্লাহর নিকটে এমন অবস্থায় আছেন যে, মানুষের কোন আওয়াজ তাঁদের কাছে এ সংবাদ পৌছিয়ে দেন না যে, যাঁদেরকে তাঁরা সারাজীবন আল্লাহর নিকটে দোয় চাওয়া শিক্ষা দিলেন, তাঁরা উল্টা তাঁদের কাছেই দোয়া চাইছে। এ খবর তাঁদেরকে পৌঁছানো হয় না এ জন্যে যে, এর চেয়ে দুঃখজনক সংবাদ তাঁদের কাছে আর কিছু হতে পারে না। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর নেক বান্দাহদের আত্মাকে কষ্ট দেয়া কিছুতেই পসন্দ করেন না। তারপর তৃতীয় প্রকারের খোদাদের সম্পর্কে চিন্তা করে দেখলে জানা যাবে যে, তাদেরও বেখবর থাকার দুটি কারণ আছে। একটা হচ্ছে এই যে, তারা অভিযুক্ত হিসেবে খোদার হাজতে বন্দী আছে যেখানে দুনিয়ার কোন আওয়াজই পৌঁছে না। দ্বিতীয়তঃ আল্লাহ তা আলা এবং তাঁর ফেরেশতাগণ তাদেরকে এ সংবাদ পৌঁছান যে, দুনিয়াতে তাদের মিশন খুবই কৃতকার্যতা লাভ করছে এবং তাদের মৃত্যুর পর মানুষ তাদেরকে খোদা বানিয়ে দিয়েছে। এ ধরনের সংবাদ তাদের জন্যে খুবই আনন্দদায়ক হবে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা কিছুতেই জালেম পাপাচারীদের আত্মাকে খুশী করতে চান না।(সূরা আয যুখরুফ, ভূমিকা)

ঐসব ফেরেশতা যাদেরকে দুনিয়াতে দেব দেবী মনে করে পূজা করা হয়েছে এবং ঐসব জ্বিন, আত্মা, পূর্ব পুরুষ, আম্বিয়া, আউলিয়া শহীদান প্রভৃতি যাদেরকে খোদার গুণাবলীর অংশীদার মনে করে তাদেরকে ঐসব অধিকার দেয়া হয়েছে যা প্রকৃত পক্ষে ছিল খোদার, তাঁরা সেখানে (আখিরাতে) তাদের পূজারীদের সুস্পষ্ট করে বলে দেবেন, আমাদের তো মোটে জানাই ছিল না যে, তোমরা আমাদের পূজা অর্চনা কর। তোমাদের কোন দোয়া, কাকুতি মিনতি, কোন ফরিয়াদ, কোন আর্তনাদ, কোন নযর নিয়ায, কোন নৈবেদ্য উৎসর্গ, কোন প্রশংসা, আমাদের নামের কোন তপ জপ, কোন সেজদা করণ, আস্তানা চুম্বন, দরগাহ পূজা কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছেনি।(সূরা আল আরাফ,টীকা-১৪৮)

আরবে বেশ্যাবৃত্তির পদ্ধতি

আরবে বেশ্যাবৃত্তির দুরকম পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। এক হচ্ছে ঘরোয়া বেশ্যাবৃত্তির পেশা (Private Prostitution,দ্বিতীয় প্রকাশ্য বেশ্যালয়ে বেশ্যাবৃত্তি। ঘরোয়া বেশ্যাবৃত্তি অধিকাংশ মুক্তিপ্রাপ্ত দাসীরাই করতো যাদের কোন অভিভাবক ছিল না। অথবা এমন কোন স্বাধীন নারী যার পৃষ্ঠপোষকতায় কোন পরিবার বা গোত্র ছিল না। এরা কোন গৃহে এ পশার জন্যে অবস্থান করতো এবং কয়েকজন পুরুষের সাথে এদের চুক্তি হতো যে, তারা এদের ভরণ পোষণ করবে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে থাকবে। সন্তান জন্মগ্রহণ করলে মেয়েলোকটি যে লোকটিকে তার সন্তানের জন্মদাতা বলে ঘোষণা করতো, সেই তাকে তার সন্তান বলে মেনে নিত। এ যেন সমাজের মধ্যে এমন একটা স্বীকৃত সংস্থা ছিল যাকে জাহেলিয়াতবাসী এক ধরনের বিবাহ মনে করতো। আবু দাউদ

দ্বিতীয় পদ্ধতি অর্থাৎ পুরোপুরি বেশ্যাবৃত্তি সকল কৃতদাসীর দ্বারা চলতো। তা আবার দুই প্রকারের। এক এই যে, লোক তাদের যুবতী দাসীদের উপর একটা অংক নির্ধারিত করে দিয়ে বলতো যে, প্রত্যেক মাসে এতোটা পরিমাণে উপার্জন করতে হবে। হতভাগিনীরা বেশ্যাবৃত্তি করে করে তাদের মালিকদের দাবী পূরণ করতো। এ ছাড়া অন্য কোন উপায়ে তারা এতো পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতো। তাছাড়া যুবতী কৃতদাসীদের সাধারণ পারিশ্রমিক থেকে কয়েক গুণ অধিক পারিশ্রমিক গ্রহণের অন্যকোন উপায়ও ছিল না।

দ্বিতীয় এই যে, লোকেরা তাদের যুবতী দাসীদেরকে কুঠিতে বসিয়ে দিত এবং তাদের দরজার উপরে পতাকা লটকিয়ে দেয়া হতো যা দেখে দূর থেকেই বুঝতে পারা যেতো যে, এখানেই মানুষ তাদের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। এসব স্ত্রীলোকদেরকে বলা হতো কালিকিয়াত(***আরবী***) এবং তাদের কুঠিগুলো মাওয়াখীর (***আরবী***) নামে অভিহিত ছিল। বড়ো বড়ো মাজপতিরা এ ধরনের বেশ্যাবাড়ি খুলে রাখতো। মুনাফিকদের প্রধান স্বয়ং আব্দুল্লাহ বিন ওবাই এরও এ ধরনের একটা বেশ্যাবাড়ি বিদ্যমান ছিল। অথচ তাকে নবী করীম (সা) এর মদীনা আগমনের পূর্বে মদীনাবাসী তাদের বাদশাহ বানাবার সিদ্ধান্ত করেছিল এবং সে এ ব্যক্তি, যে হযরত আয়েশা (রা) এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবার ব্যাপারে সকলের অগ্রে ছিল। তার এ বেশ্যাখানায় ছয়জন সুন্দরী ক্রীতদাসী থাকতো। তাদের দ্বারা সে শুধু অর্থ উপার্জনই করতো না, বরঞ্চ আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে থেকে আগত মেহমানদের আপ্যায়নও তাদের দ্বারা করা হতো। তাদের গর্ভে যে সব অবৈধ সন্তান জন্মগ্রহণ করতো, তাদের দ্বারা তার জারি জুরির জন্যে চাকর নফরের সংখ্যা বাড়ানো হতো।(সূরা আল আহকাফ,টীকা-৬)

দেব মন্দিরে ভাগ্য গণনা

মক্কার মুশরিকগণ ফালগিরি করার জন্যে কাবার অভ্যন্তরে অবস্থিত হোবল দেবতাকে নির্দিষ্ট করে রেখেছিল। এর কাছে ভাগ্যের লিখন জিজ্ঞেস করা হতো, ভবিষ্যতের সংবাদ জানা হতো অথবা পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা করা হতো। তার মন্দিরে সাতটি তীর রাখা থাকতো যার মধ্যে বিভিন্ন শব্দ ও বাক্য মুদ্রিত ছিল। কোন কাজ করা না করার প্রশ্ন দেখা দিলে তার জন্যে লোক হোবালের পাশা রক্ষকের নিকটে যেতো। পাশা রক্ষক তীরগুলোর সাহায্যে ভাগ্য নির্ণয় করতো। যে তীর বের হয়ে আসতো তার মধ্যে লিখিত জিনিসকেই হোবলের সিদ্ধান্ত বলে স্বীকার করা হতো।(সূরা ইউনুস,টীকা-৩৭)

নযর – নিয়াযের পদ্ধতি

আরববাসীর প্রথা ছিল যে, তারা কোন পশু অথবা ক্ষেতের ফসল সম্পর্কে মানত কতো যে এ অমুক মন্দির অথবা অমুক দেবতার নিয়াযের জন্যে নির্দিষ্ট। এ নিয়ায সকলে খেতে পারতো না। তার জন্যে কিছু নিয়ম প্রণালী ছিল যার ভিত্তিতে বিভিন্ন নিয়ায নযর বিভিন্ন ধরনের বিশিষ্ট লোকই খেতে পারতো।(সূরা আন নূর,টীকা-৫৯)

আরববাসীদের কিছু বিশেষ মানত ও নযরের পশু এমন হতো,যার উপর আল্লাহর নাম নেয়া জায়েয মনে করা হতো না। তার উপর আরোহণ করে হজ্ব করা নিষিদ্ধ ছিল।কারণ হজ্বের জন্যে লাব্বায়কা আল্লাহুম্মা লাব্বায়কা পড়তে হোত। এভাবে তাদের দুধ দোহন করার সময়, তাদের উপর আরোহণ করার সময়, তাদেরকে জবাই করার সময় অথবা তাদের গোশত খাওয়ার সময় এমন সতর্কতা অবলম্বন করা হতো, যেন আল্লাহর নাম মুখে না আসে।(সূরা আল মায়েদা,টীকা-টীকা১৪)

আরববাসীদের মানতের পশু সম্পর্কে তাদের মনগড়া শরিয়তের বিধিও ছিল যে, ঐ পশুর পেটে কোন বাচ্চা পয়দা হলে তা শুধু পুরুষই খেতে পারতো, মেয়েদের জন্যে খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সে বাচ্চা যদি মৃতে হতো অথবা পরে মরে যেতো তাহলে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের খাওয়া জায়েয ছিল।(সূরা আল আনআম ,টীকা-১১১)

ধর্মের নামে পশু দান করে ছেড়ে দেয়া

জাহিলী যুগে আরববাসী বিভিন্নভাবে ধর্মের নামে পশু ছেড়ে দিত। এভাবে ছেড়ে দেয়া পশুর বিভিন্ন নাম রাখা হতো।

বাহিরা ঐসব উটনীকে বলা হতো, যে পাঁচবার প্রসব করেছে এবং শেষ বারে নর বাচ্চা প্রসব প্রসব করেছে। তার কান চিরে দিয়ে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো। তারপর কেউ তার পিটে চড়তে পারতো না। না তার দুধ পান করা যেতো, না তাকে জবাই করা যেতো, আর না তার পশম উঠানো যেতো। সে যেখানে খুশী সেখানে স্বাধীনভাবে চরতে পারতো এবং যেখানে খুশী সেখান থেকে পানি পান করতে পারতো।

সায়েবা এসব উট বা উটনীকে বলা হতো, যাদেরকে কোন মানত পূরণ হওয়ার পর, অথবা কোন রোগ মুক্তির পর অথবা কোন বিপদ কেটে যাবার পর শুকরিয়া আদায়ের জন্যে ছেড়ে দেয়া হতো। উপরন্তু যে উটনী দশবার প্রসব করেছে এবং প্রত্যেক বার মাদী বাচ্চা প্রসব করেছে তাকেও স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো।

ওয়াসিলা যদি বকরীর প্রথম বাচ্চা নর হতো তাহলে তাকে আল্লাহর নামে জবাই করা হতো। প্রথম বার মাদী বাচ্চা হলে তাকে নিজের জন্যে রেখে দেয়া হতো। কিন্তু যার পেট থেকে এক সাথে নর ও মাদী পয়দা হতো, তাহলে নরকে যবাই না করে তাকে আল্লাহর নামে ছেড়ে দেয়া হতো। তার নাম ছিল ওয়াসিলা।

হাম যদি কোন উটের পৌত্র সওয়ারীর যোগ্য হতো তাহলে সে বৃদ্ধ উটকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো। উপরন্তু যে উটের ঔরসে দশটি বাচ্চা পয়দা হতো তাকেও স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হতো(সূরা আল আন আম,টীকা-১১২)

জাহেলি যুগে আরববাসীদের হজ্জ

মোটকথা যে সকল কুসংস্কারজনিত পূজা পার্বণের প্রথা আরবে প্রচলিত ছিল তার এ একটা ছিল যে, যখন কেউ হজ্জের জন্যে এহরাম বাঁধতো, তখন এসে তার বাড়ীতে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতো না। বরঞ্চ পেছন দিক থেকে প্রাচীর টপকিয়ে অথবা প্রাচীরে ফুটো করে সেদিক দিয়ে প্রবেশ করতো। উপরন্তু সফর থেকে ফিরে এসেও পেছন দিক থেকে প্রাচীর টপকিয়ে অথবা প্রাচীর ফুটো করে সেদিক দিয়ে প্রবেশ করতো। উপরন্তু সফর থেকে ফিরে এসেও পেছন দরজা দিয়ে বাড়ীতে ঢুকতো। (সূরা আল আনআম, টীকা-১১৪)প্রাচীন আরবের এটাও এক অজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা ছিল যে, হজ্জের সময় জীবিকা উপার্জনের জন্যে কোন কিছু করাকে দূষণীয় মনে করা হতো। কারণ তাদের নিকটে জীবিকা উপার্জন করা ছিল দুনিয়াদারী কাজ এবং হজ্জের মতো ধর্মীয় কাজের সময় তা করা খুব নিন্দনীয় ছিল।(সূরা আল মায়েদা,টীকা১১৮)আরববাসী হজ্জ শেষে একত্রে সম্মিলিত হতো এবং সে সম্মেলনে তারা বাপ দাদার কর্মকাণ্ড গর্বের সাথে বর্ণনা করতো এবং নিজের গর্ব অহংকার প্রচার করে বেড়াতো।(সূরা আল বাকার,টীকা -১৯৯)

প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকে শুভ অশুভ লক্ষণ নির্ণয় করা

চাঁদের ঘাটতি বাড়তি এমন এক দৃশ্য প্রত্যেক যুগেই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং এ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকারের কুসংস্কার, ধারণা বিশ্বাস ও প্রথা দুনিয়ার জাতিসমূহের মধ্যে প্রচলিত চিল এবং এখনও আছে। আরববাসীদের মধ্যেও এ ধরনের কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। চাঁদ থেকে শুভ শুভ অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা, কোন তারিখ সফরের জন্যে এবং কোন তারিখ কাজ শুরু করার দিন হিসেবে ধার্য করা, কোন তারিখে বিয়ে শাদীর জন্যে শুভ অথবা অশুভ মনে করা, এরূপ ধারণা করা যে চাঁদের উদয় ও অস্ত, বাড়তি ও ঘাটতি, তার গতি ও গ্রহ প্রভৃতি মানুষের ভাগ্যকে প্রভাবিত করে। এ ধরনের ধারণা বিশ্বাস অন্যান্য জাতির ন্যায় আরববাসীদের মধ্যেও ছিল। এ সম্পর্কে বিভিন্ন কুসংস্কারমূলক রীতি পদ্ধতি তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।(সূরা আল বাকারা,টীকা-২২১)

জ্বিনদের সম্পর্কে কুসংস্কার

হযরত ইবনে আব্বাস বলেন, জাহেলী যুগে যখন কোন আরববাসী কোন জন মানবশূন্য প্রান্তরে রাত কাটাতো, তখন চিৎকার করে বলতো, আমরা এ প্রান্তরের মালিকের(জ্বিন) আশ্রয় প্রার্থনা করছি। জাহেলী যুগের অন্যান্য বর্ণনাতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন, কোন স্থানে যদি পানি ও পশুর আহার শেষ হয়ে যেতো, তাহলে যাযাবর বেদুঈন তাদেরই একজনকে পানি ও পশুর চারার তালাশের জন্যে অন্যত্র পাঠয়ে দিত। অতঃপর সে ব্যক্তির চিহ্নিত করা নতুন স্থানে যখন তারা যেতো তখন সেখানে সওয়ারী থেকে অবতরণ করার পূর্বেই তারা চিৎকার করে বলতো, আমরা এ প্রান্তরের প্রভুর আশ্রয় চাইছি যাতে করে আমরা এখানে সকল বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে পারি। তাদের বিশ্বাস এই ছিল যে, যে স্থানে কোন মানুষের বসবাস নেই, তা কোন না কোন জ্বিনের অধিকারে থাকে এবং তার আশ্রয় প্রার্থনা না করে সেখানে অবস্থান করলে সে নিজে উপদ্রব করে অথবা অন্যান্য জ্বিনকে উপদ্রব করতে দেয়। (সূরা আন নিসা,টীকা৮৮)

বহু বিবাহ

জাহেলী যুগে বিবাহের জন্যে কোন সংখ্যা সীমিত ছিল না। এক একজন দশ বারোজন করে স্ত্রী রাখতো। বহু স্ত্রী রাখার কারণে খরচ পত্রাদি বেড়ে গেলে বাধ্য হয়ে এতিম ভাতিজা ও ভাগ্নেদের এবং অন্যান্য অসহায় আত্নীয়দের অধিকারে হস্তক্ষেপ করতো।(সূরা আল বাকারা,টীকা-১৯৮) এমন কি সৎ মাকেও তারা বিয়ে করে বসতো।(সূরা জিন,টীকা -৭)।

ঋতুমতী মেয়েদের সাথে আচরণ

মদীনাবাসী যেহেতু ইহুদীদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল, সে জন্যে তাদের সমাজে ইহুদীদের মতোই স্ত্রীলোকদেরকে তাদের মাসিক ঋতুর সময় অপবিত্র মনে করা হতো। তাদের হাতের পাক করা খাদ্য এবং তাদের হাতে পানি খাওয়া যেতো না। তাদের সাথে এক বিছানায় বসা যেতো না। এমনকি তাদের হাত স্পর্শ করাও খারাপ মনে করা হতো। এ কয়টি দিনে নারী আপন গৃহেই অচ্ছুৎ হয়ে থাকতো।(সূরা আন নিসা,টীকা -৪)

তালাকের পর তালাক দেয়ার রীতি

আরবের জাহেলী যুগে এক বিরাট সামাজিক অবিচার এ ছিল যে, একজন লোক তার স্ত্রীকে বার বার তালাক দেয়ার অধিকার রাখতো। যে স্ত্রীর উপর তার স্বামী অসন্তুষ্ট হতো, তাকে সে বার বার তালাক দিয়ে আবার গ্রহণ করতো। তার ফলে না হতভাগিনী তার স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারতো, আর না তার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে অন্য কোন স্বামী গ্রহণ করতে পারতো।(সূরা নিসা,টীকা -৮৮)

এতিমদের উপর বাড়াবাড়ি

জাহেলী যুগে যেসব কন্যা সন্তান এতিম হয়ে অন্যের পৃষ্ঠপোষকতায় জীবন যাপন করতো, তারা তাদের ধন সম্পদ ও সৌন্দর্য্য দেখে অথবা এটা মনে করে যে তাদের কোন অভিভাবক নেই বলে তাদেরকে ইচ্ছা মতো দাবিয়ে রাখা যাবে, তাদেরকে বিয়ে করতো এবং তাদের উপর যুলুম করতো।(সূরা নিসা,টীকা -৪৯)

হযরত আয়েশা (রা) এর ব্যাখ্যা করে বলেন, যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের এতিম কন্যা সন্তানরা থাকতো এবং যাদের কাছে পিতা মাতার পরিত্যক্ত সম্পদ থাকতো, তাদের সাথে তারা বিভিন্ন প্রকারের অন্যায় অবিচার করতো। মেয়ে যদি মালদার হওয়ার সাথে সাথে সুন্দরীও হতো, তাহলে তারা স্বয়ং এদেরকে বিয়ে করে মাল ও সৌন্দর্য্য উভয়ই উপভোগ করতে চাইতো। আর যদি সে দেখতে কুশ্রী হতো, তাহলে তাকে নিজেরাও বিয়ে করতো না এবং অন্যকেও বিয়ে করতে দিতো না। যেন কেউ তার কোন অভিভাবক সেজে তার অধিকার আদায়ের দাবী করতে না পারে।(সূরা আল বাকারা,টীকা ২৫০)

এতিম কন্যাদের সাথে কি আচরণ করা হতো?

এ সম্পর্কে এক আজব ঘটনা কাজী আবুল হাসান আল মাওয়ারদী তাঁর আলামুন নবুওয়াত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আবু জাহল এক এতিম মেয়ের অলী ছিল। একদিন মেয়েটি তার নিকটে উলঙ্গ অবস্থায় এসে আবেদন করলো যে, তার বাপের পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তাকে কিছু দেয়া হোক। কিন্তু যালেম আবু জাহল তার দিকে ফিরেও তাকালো না। বেচারি তখন দাঁড়িয়ে থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে গেল। কুরাইশ সরদারগণ উপহাস করে তাকে বললো, তুই মুহাম্মাদ (সা) এর নিকট গিয়ে নালিশ কর। তিনি আবু জাহলের কাছে সুপারিশ করে তোকে তোর মাল দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। আবু জাহলের সাথে নবী মুহাম্মাদ (সা) এর কি সম্পর্ক ছিল এবং এসব দুরাচারগণ তাকে কি উদ্দেশ্যে এ পরামর্শ দিচ্ছে তা বেচারির জানা চিল না। সে সরাসরি হুজুর (সা) এর কাছে পৌছলো এবং তার অবস্থা তাঁর কাছে খুলে বললো। নবী (সা) তৎক্ষণাৎ উঠে পড়লেন এবং তাকে নিয়ে তাঁর নিকৃষ্টতম দুশমন আবু জাহলের কাছে গেলেন। আবু জাহল তাঁকে দেখে সম্বর্ধনা জানালো। তারপর নবী (সা) যখন এতিম মেয়েটিকে তার হক আদায় করে দেয়ার জন্যে আবু জাহলকে বলেন, তখন সে তৎক্ষণাৎ সে এতিমের মাল তাকে দিয়ে দিল। কুরাইশ সরদারগণ এ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল যে, উভয়ের মধ্যে কি ঘটে তাই তারা মজা করে দেখবে। কিন্তু যখন তারা এরূপ দেখলো তখন অবাক হয়ে আবু জাহলের নিকটে এলো এবং ভর্ৎসনা করে বললো। তুমি কি তোমার দীন পরিত্যাগ করেছো? আবু জাহল বললো, আল্লাহর কসম, আমি আমার দীন পরিত্যাগ করিনি। কিন্তু আমার যেন মনে হচ্ছিল যে, মুহাম্মাদ (সা) এর ডানে ও বামে এক একটি অস্ত্র ছিল এবং যদি তার কথা না মানতাম তাহলে সে অস্ত্র আমার দেহে প্রবেশ করতো।(সূরা আন নিসা,টীকা -৪)(এ ঘটনা থেকে শুধু এতটুকুই জানা যায় না যে, সেসময়ে আরবের সবচেয়ে উন্নত ও সম্ভ্রান্ত গোত্রের সরদারগণ এতিম ও অন্যান্য অসহায় লোকের সাথে কি আচরণ করতো, বরঞ্চ এও জানা যায় যে, নবী মুহাম্মদ (সা) কোন মহান চরিত্রের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর এ চরিত্র তাঁর চরম দুশমনের মনে কতখানি ত্রাসের সঞ্চার করতো। এ ধরনের আর একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে তাফহীমূল কুরআন, তৃতীয় খন্ড, ১৪৬পৃষ্ঠায়।৩৯০)

সন্তান হত্যার পন্থা

সন্তান হত্যার তিন প্রকার পন্থা আরববাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

১। কন্যা বেঁচে থাকলে কেউ না কেউ জামাই হবে, গোত্রীয় লড়াইয়ে সে দুশমনের হাতে চলে যেতে পারে, অথবা অন্য উপায়ে সে লজ্জার কারণ হতে পারে। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে, কন্যা হত্যা করা হতো।

২। ভরণ পোষণের দায়িত্ব যাতে করে পালন করতে না হয়, উপার্জন কম হওয়ার কারণে তারা অসহনীয় বোঝা হয়ে পড়বে, এ ধারণায় বন্যা সন্তান হত্যা করা হতো।

৩। দেব দেবীর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে সন্তানদের বলী দেয়া হতো।(সূরা আল মাউন,টীকা -৫)

উত্তরাধিকার থেকে নারী ও শিশুদেরকে বঞ্চিত করা

আরবে নারী এবং শিশুদেরকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হতো এবং লোকের ধারণা এ ব্যাপারে এই ছিল যে, উত্তরাধিকার লাভের যোগ্য একমাত্র ঐসব পুরুষ যারা লড়াই করতে পারে এবং পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ করতে সক্ষম। তাছাড়া মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশদের মধ্যে যে সবচেয়ে শক্তিশালী সে বিনা বাধায় সমস্ত উত্তরাধিকার একত্র করে আত্মসাৎ করতো এবং যারা তাদের অংশ আদায় করার শক্তি রাখতো না সে তাদেরকে বঞ্চিত করতো। অধিকার এবং দায়িত্বে কোন গুরুত্ব তাদের কাছে ছিল না যাতে করে ঈমানদারির সাথে আপন দায়িত্ব মনে করে ঐসব লোকের হক আদায় করতে পারে যাদের সে হক হাসিল করার শক্তি থাক বা না থাক।(সূরা আল মাউন,টীকা – ৫)

উত্তরাধিকারের এক প্রথা

আরববাসীদের মধ্যে এ প্রথা ছিল যে, যাদের সাথে বন্ধুত্ব বা ভ্রাতৃত্বের চুক্তি হতো তারা একে অপরের সম্পত্তির অধিকারী হতো। এভাবে পালিত অথবা যাকে পুত্র বলে ডাকা হতো তারাও উত্তরাধিকার লাভ করতো।(সূরা আল আনআম,টীকা-১০৭)

কন্যা সন্তানদের জীবিত কবর দেয়া

আরবে কন্যা সন্তানদের জীবিত দাফন করার নির্মম প্রথা প্রাচীনকালে বিভিন্ন কারণে প্রচলিত ছিল। প্রথম কারণ হলো আর্থিক দুরবস্থা, যে জন্যে লোক চাইতো যে, আহার গ্রহণকারীর সংখ্যা যেন কম হয় এবং অধিক সন্তান প্রতিপালনের গুরুদায়িত্ব তাদের উপর না পড়ে। পুত্র সন্তানদের এ আশায় প্রতিপালন করা হতো যে, পরবর্তীকালে তারা জীবিকা অর্জনে সাহায্য করবে। কন্যা সন্তানদেরকে এজন্যে মেরে ফেলা হতো যে, যৌবন পর্যন্ত তাদেরকে প্রতিপালন করতে হবে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা, যার জন্যে পুত্র সন্তান প্রতিপালন করা হতো, কারণ যার যতো বেশী পুত্র সন্তান হবে তার ততোই সাহায্যকারী হবে। পক্ষান্তরে মেয়েদেরকে এজন্যে মেরে ফেলা হতো যে, গোত্রীয় লড়াইয়ের সময় তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হতো। প্রতিরক্ষার ব্যাপারে তারা কোনই কাজে লাগতো না। তৃতীয়তঃ সাধারণ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে একটা আশংকা এই ছিল যে দুশমন গোত্রগুলো যখন একে অপরের উপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসতো তখন যেসব মেয়েলোক তাদের হস্তগত হতো তাদেরকে নিয়ে গিয়ে দাসী বানিয়ে রাখতো অথবা কোথাও কারো নিকটে বিক্রি করে দিত। এসব কারণে আরবে এ প্রথা প্রচলিত হয়ে পড়েছিল যে, প্রসব বেদনার সময়েই সে স্ত্রীলোকের সামনে একটা গর্ত খনন করে রাখা হতো যেন মেয়ে পয়দা হলে তাকে সেই গর্তে ফেলে দিয়ে উপরে মাটি চাপা দেয়া যায়। মা এতে রাজী না হলে, কিংবা তার পরিবারের লোকজন বাধা দিলে বাপ অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু দিন তার প্রতিপালন করতো। তারপর কোন এক সময় তাকে মাঠের মধ্যে নিয়ে গিয়ে জীবিত দাফন করে দিত। এ ব্যাপারে যে দুর্বৃত্ততা চলতো সে সম্পর্কে এক ব্যক্তি তার জাহেলিয়াত যুগের একটি ঘটনা নবী (সা) এর সামনে বর্না করে। সে বলে, আমার একটি মেয়ে ছিল, যে আমার প্রতি খুব অনুরক্ত ছিল। তাকে ডাকলে সে গৌড় আমার কাছে আসতো। একদিন তাকে ডেকে আমার সাথে নিয়ে চললাম। পথে একটা কূপ পেলাম, আমি তার হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে কূপের মধ্যে ফেলে দিলাম। তার শেষ শব্দ যা কানে এল তা ছিল, হায় আব্বা! হায় আব্বা! এ কথা শুনে নবী (সা) কেঁদে ফেললেন এবং তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়তে পড়তে লাগলো। উপস্থিত লোকদের মধ্যে একজন বললো, হে লোক তুমি হুজুর (সা) কে কষ্ট দিলে? নবী (সা) বললেন, তাকে বাধা দিয়ো না, তার যে বিষয়ে কঠিন অনুভূতি আছে সে সম্পর্কে তাকে প্রশ্ন করতে দাও। তারপর তিনি তাকে বললেন, তুমি তোমার ঘটনা বর্ণনা কর। সে পুনরায় তার কাহিনী বর্ণনা করলো। এবার রহমতের নবী (সা) এতো কাঁদলেন যে, তাঁর দাড়ি মুবারক অশ্রুতে ভিজে গেল। তারপর তিনি বললেন, জাহেলী যুগে যা কিছু হয়েছে, আল্লাহ তা মাফ করে দিয়েছেন, তুমি এখন নতুন করে নিজের জীবন শুরু কর( সুনানে দারেমী, প্রথম অধ্যায়)।

এরূপ ধারণা করা ঠিক হবে না যে, আরববাসী এ ধরনের চরম অমানুষিক নৃশংসতার কোনই অনুভূতি রাখতো না। এটা ঠিক যে কোন সমাজ যতোই অধঃপতিত হোক না কেন, এ ধরনের উৎপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডে মানুষ অনুভূতিহীন হতে পারে না। এ কারণে কুরআন পাক এ কর্মকাণ্ডের নৃশংসতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেনি। কিন্তু শরীর রোমাঞ্চিতকারী ভাষায় শুধু এতটুকু বলা হয়েছে যে, এমন এক সময় আসবে যখন এসব জীবিত কবরস্থ মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে কোন অপরাধে তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছিল।(এবং যখন জীবিত কবরস্থ মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে কোন অপরাধে তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছিল।–সূরা আত তাকভীরঃ৮ – ৯।এ আয়াতের বর্ণনাভঙ্গিতে এমন ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে যে, তার অধিক চিন্তা করা যায় না। আপন কন্যাকে যেসব পিতা মাতা জীবিত কবরস্থ করেছে আল্লাহর চোখে তারা এতোটা ঘৃণ্য যে, তাদেরকে সম্বোধন করে এ কথা জিজ্ঞেস করা হবে না, তোমরা এসব নিষ্পাপ সন্তানদেরকে কেন মেরে ফেলেছ? বরঞ্চ তাদের তেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিষ্পাপ শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা হতভাগিনীর দল, কোন অপরাধে মারা গেলে? তারা তখন তাদের লোমহর্ষক কাহিনী বর্ণনা করবে যে, যালেম বাপ মা তাদের উপর কতখানি অন্যায় করেছে এবং কিভাবে জীবিত দাফন করেছে। তাছাড়া এ সংক্ষিপ্ত আয়াতটিতে দুটি বিরাট বিষয় নিহিত রয়েছে যা ভাষায় বর্ণনা করা না হলেও কথার ধরন থেকেই জানা যায়। এক হচ্ছে এই যে, আরববাসীদের মধ্যে এ অনুভূতির সঞ্চার করা হয়েছে যে, জাহেলিয়াত তাদেরকে নৈতিক অধঃপতনের কোন চরম সীমায় পৌছিয়ে দিয়েছে যে, তারা আপন হাতে তাদের আপন সন্তানদেরকে জীবিত কবরস্থ করে মেরে ফেলে। তারপরও তাদের একগুঁয়েমি যে তারা তাদের এ জাহেলিয়াতের উপরিই অটল থাকবে এবং ঐ সংস্কার কিছুতেই গ্রহণ করতে রাজী না, বা নবী মুহাম্মদ (সা) তাদের পথভ্রষ্ট ও অধঃপতিত সমাজে করতে চান। দ্বিতীয়ত এই যে, এতে আখিরাতের অনিবার্যতার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ পেম করা হয়েছে। যেসব শিশুদেরকে জীবিত দাফন করে মারা হয়েছে তাদের তো কোথাও না কোথাও প্রতিকার হওয়া উচিত এবং যেসব যালেম এ ধরনের অমানুষিক যুলুম করেছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্যেও তো কোন এক সময় আসা উচিত। যেসব শিশুদেরকে জীবিত দাফন করা হয়েছে তাদের ফরিয়াদ শ্রবণ করার তো দুনিয়ায় কেউ নেই। জাহেলী সমাজে তাকে তো একেবারে বৈধ করা হয়েছে। না মা বাপের এতে কোন লজ্জার কারণ আছে, না পরিবারে এমন কেউ আছে যে তাদের ভর্ৎসনা করবে। আর না সমাজে এমন কেউ আছে যে, এ কাণ্ডের জন্যে পাকড়াও করবে। তাহলে খোদার রাজত্বে এ যুলুম কি প্রতিকারহীন হয়ে থাকবে।(সূরা আন নিসা,টীকা-৫৫))

আরবের ইতিহাস থেকেও জানতে পারা যায় যে, জাহেলী যুগেও অনেকের মধ্যে এ নৃশংস প্রথার অনুভূতি ছিল। তাবারানী বলেন, ফারযওয়াক কবির সাসায়া বিন নাজেতী আল মুজাশেয়ী রসূল (সা) এর খেদমতে হাজির হয়ে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! জাহেলী যুগে আমি কিছু ভালো কাজও করেছি। তার মধ্যে একটা এই যে, আমি ৩৬০ জন কন্যা সন্তানকে জীবিত কবরস্থ হওয়া থেকে রক্ষা করেছি। প্রত্যেকের জীবনরক্ষার জন্যে দুটি করে উপ ফিদিয়া স্বরূপ দিয়েছি। এর কোন প্রতিদান আমি পাব কি? নবী (সা) বললেন, নিশ্চয় তার জন্যে তোমার প্রতিদান রয়েছে এবং তাহলো এই যে, আল্লাহ তায়ালা তোমাকে ইসলামের নিয়ামত দান করেছেন।

হত্যার প্রতিশোধ

জাহেলী যুগে নিয়ম এই ছিল যে, কোন দল বা গোত্রের লোক তাদের নিহত ব্যক্তির খুন যতোখানি মূল্যবান মনে করতো,ততোখানি মূল্যের খুন সেই পরিবার, গোত্র বা দলের থেকে নিতে চাইতো যার লোক নিহত ব্যক্তির হন্তা। শুধুমাত্র নিহত ব্যক্তির প্রতিশোধ গ্রহণের জন্যে হত্যাকারীর প্রাণনাশ করাতেই তাদের দিল ঠাণ্ডা হতো না। তারা একজনের জীবনের পরিবর্তে শত শত জীবন নিতে প্রস্তুত হতো। তাদের কোন সম্মানিত ব্যক্তি যদি অন্য দলের কোন নিম্নস্তরের লোকের দ্বারা নিহত হতো, তাহলে তারা প্রকৃত ব্যক্তি হত্যাকারীকে হত্যা করাই যথেষ্ট মনে করতো না। বরঞ্চ তাদের বাসনা এই হতো যে,হত্যাকারী গোত্রের কোন সম্মানিত ব্যক্তিকে হত্যা করা হোক। অথবা প্রতিপক্ষের কয়েকজনকে নিহত ব্যক্তির বিনিময়ে হত্যা করা হোক। পক্ষান্তরে তাদের দৃষ্টিতে নিহত ব্যক্তি যদি কোন নিম্নস্তরের লোক হতো এবং হত্যাকারী অধিকতর শ্রদ্ধাভাজন হতো, তাহলে তারা এটা কিছুতেই বরদাশত করতো না যে, নিহত ব্যক্তির বিনিময়ে হত্যাকারীকে নিহত করা হবে।(সূরা আদ তানভীর, টীকা -৯)

পোষাকের ধারণা ও নগ্নতা

আরববাসী শুধু সৌন্দর্য ও আবহাওয়ার প্রভাব থেকে দেহকে রক্ষা করার জন্যে পোশাক ব্যবহার করতো।কিন্তু তার সর্বপ্রথম বুনিয়াদী উদ্দেশ্য অর্থাৎ দেহের লজ্জাজনক অংশকে আবৃত রাখাকে তারা কোন গুরুত্ব দিত না। নিজেদের সতরকে অপরের সামনে অনাবৃত করতে তারা কোন প্রকার ভয় বা লজ্জা করতো না। প্রকাশ্য স্থানে উলঙ্গ হয়ে গোসল করা, পথ চলতে চলতে পেশাব পায়খানার জন্যে বসে যাওয়া, পরিধেয় বস্ত্র খুলে গেলে সতর বেপর্দা হয়ে যাওয়ার কোন পরোয়া না করা তাদের নিত্য নৈমিত্তিক সাধারণ কাজ ছিল। অধিকতর লজ্জাকর ব্যাপার এই যে, তাদের মধ্যে অধিকাংশ লোক হজ্বের সময় কাবার চারদিকে উলঙ্গ হয়ে তওয়াফ করতো এবং এ ব্যাপারে তাদের মেয়ে লোকেরা তাদের চেয়ে অধিকতর নির্লজ্জ ছিল। তাদের দৃষ্টিতে এ ছিল একটা ধর্মীয় কাজ এবং সৎ কাজ মনে করে তারা এসব করতো।(সূরা আত তানভীর,টীকা -৯)

আরবের সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতা ও অরাজকতা

আরবের সর্বত্র নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করতো, যার ফলে সারাদেশে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছিল, চারদিকে খুন খারাবি ও লুঠতরাজ চলতো। গোত্রগুলো পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে হঠাৎ আক্রমণ চালাতো। কেউ নিরাপদে রাত কাটাতে পারতো না। কারণ প্রত্যেকেই আশংকা করতো যে কখন কোন মুহূর্তে দুশমন তাদের বস্তি আক্রমণ করে বসে। এ এমন এক অবস্থা ছিল, যে সম্পর্কে সকরেই অবহিত ছিল এবং এর ভয়াবহতা সকলেই অনুভব করতো। যাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা হলো তারা যদিও বিলাপ করতো এবং লুণ্ঠনকারী উল্লাস করতো, কিন্তু লুণ্ঠনকারীর যখন দুর্ভাগ্যের পালা আসতো তখন সেও অনুভব করতো যে, এ এমন এক গর্হিত কাজ যার মধ্যে তারা লিপ্ত।(সূরা আল বাকারা,টীকা-১৭৭)

আরববাসীদের নিয়ম ছিল যে, যখন কোন বস্তির উপর তাদের আক্রমণ চালাতে হতো, তখন তারা রাতের অন্ধকারে অগ্রসর হতো যাতে করে দুশমন সর্তক হতে না পারে এবং প্রত্যুষে হঠাৎ দুশমনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো যেন বোরের আলোতে সব কিছু দেখতে পাওয়া যায় এবং দিনের আলোও এতোটা উজ্জ্বল না হয় যে, দুশমন তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করতে পারে এবং সতর্ক হয়ে মুকাবিলা করতে পারে।(সূরা আল আরাফ,টীকা -১৫)

তখনকার যুগে আরবের অবস্থা এই চিল যে, গোটা দেশে এমন কোন জনপদ ছিল না যার অধিবাসী শান্তিতে থাকতে পারতো। কারণ সর্বদা তারা সন্ত্রস্ত থাকতো যে, কখন কোন লুণ্ঠনকারী দল হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। এমন কোন ব্যক্তি ছিল না, যে তার গোত্রের সীমানার বাইরে যেতে পারতো। কারণ একজন, দুজন লোকের পক্ষে জীবিত ফিরে আসা, এবং গ্রেফতার হয়ে গোলাম হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার চিল। কোন কাফেলা এমন ছিল না যে নিরাপদে সফর করতে পারতো। কারণ পথে বিভিন্ন স্থানে তাদের উপর ডাকাতি হওয়ার আশংকা থাকতো। কিন্তু সমস্ত পথে প্রভাবশালী গোত্রীয় সরদারকে ঘুষ দিয়ে কাফেলা নিরাপদে পথ অতিক্রম করতে পারতো।(সূরা আল আদিয়াত,ভূমিকা)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.