সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আরববাসীদের অন্যান্য কিছু ধর্ম

হুনাফা

দ্বীন সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান সে জাহিলিয়াতের যুগে লোকের না থাকলেও একথাও তাদের কাছে গোপন ছিল না যে,প্রকৃত দ্বীন হলো তাওহীদ এবং আম্বিয়া আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো পৌত্তলিক পূজার শিক্ষা দেননি। আরববাসীদের আপন ভূখণ্ডের নবীগণের নিকট থেকে যেসব বিবরণ তাদের নিকটে পৌঁছেছিল, এ সত্য তার মধ্যে সংরক্ষিত ছিল। নিকটবর্তী ভূখণ্ডে আগত হযরত মূসা (আ) হযরত দাউদ (আ), হযরত সুলায়মান (আ) এবং হযরত ঈসা (আ)এর মতো নবীগণের শিক্ষার মাধ্যমেও তারা এ সত্য সম্পর্কে অবহিত ছিল।

আরব ঐতিহ্যের এ কথা অতি প্রসিদ্ধ ছিল যে, প্রাচীন যুগে আরবর প্রকৃত দ্বীন চলি দ্বীনে ইবরাহীম এবং পৌত্তলিক পূজা তাদের ওখানে শুরু হয়েছিল আমর বিন লুহাই নামক এক ব্যক্তির দ্বারা। শিরক ও পৌত্তলিকতার সাধারণ প্রচলন সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে এমন লোক বিদ্যমান ছিল যারা শিরক অস্বীকার করতো, তাওহীদের ঘোষণা করতো এবং পৌত্তলিক পূজার প্রকাশ্যে নিন্দা করতো। নবী (সা) এর যুগের অতি অল্পকাল পূর্বে এমন বহু লোক ছিলেন যাঁদের অবস্থা ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, তাঁরা হুনায়ফা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কুস বিন সায়েদাহ আর ইয়াদী, ওমাইয়া বিন আবি আসসালত, সুয়াইদ বিন আমর আল মুস্তালেকী, ওয়াকী বিন সালাম বিন যুহাইর আল ইয়াদী, আমর বিন জুন্দুর আল জুহানী, আবু কায়স সালমা বিন আবি আনাস, যায়দ বিন আমর বিন আমর বিন জুন্দুব আল জুহানী, আবু কায়স সালমা বিন আবি আনাস, যায়দ বিন আমর বিন আমর বিন নুফাইল, ওয়ারাকা বিন নাওফাল, ওসমান বিন আল হোয়াইরেস ওবায়দুল্লাহ বিন জাহাশ, আমের বিন আযযার্ব আল আদওয়ানী, আল্লাফ বিন শিহাব আততামিমী, আল মুতালাম্মেস বিন উমাইয়া আল কেনানী, যুহাইর বিন আবি সালমা, খালেদ বিন সিনান বিন গায়স আল আবসী, আবদুল্লাহ আল কুযায়ী এবং আরও অনেকে। এসব লোক প্রকাশ্যে তাওহীদকেই আসল দীন বলে ঘোষণা করতেন এবং মুশরিকধর্মের সাথে তাঁদের কোনই সম্পর্ক নেই, এ কথাও পরিস্কার বলতেন। একথা ঠিক যে, তাদের মনের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল নবীগণের শিক্ষার প্রভাবে। উপরন্তু চতুর্থ ও পঞ্চম খৃষ্টীয় শতাব্দীতে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে ইয়ামেনে যে সকল শিলালিপি পাওয়া গেছে তার থেকে জানতে পারা যায় যে, সে যুগে সেখানে তাওহীদী ধর্ম বিদ্যমান ছিল, যার অনুসারীগণ আর রাহমান এবং রাব্বুস সামায়ে ওয়াল আরদকেই একমাত্র ইলাহ বলে মানতো। ৩৭৮ খৃষ্টাব্দের একটা শিলালিপি একটি ইবাদতখানার ধ্বংসস্তূপ তেকে পাওয়া যায়, যার মধ্যে লেখা ছিল এ ইবাদাতখানা (**আরবী**) অর্থাৎ আসমানের ইলাহ বা রবের ইবাদতের জন্যে নির্মাণ করা হয়েছে। ৪৬৫ খৃষ্টাব্দের একটি শিলালিপিতে (**আরবী**) কথাগুলো লেখা ছিল যা তওহীদী আকীদা বিশ্বাসেরই প্রমাণ পেশ করে। এ যুগের আর একটি শিলালিপি একটি কবরে পাওয়া যায় যার মধ্যে (***আরবী***) শব্দগুলো লেখা ছিল। এমনি উত্তর আরবে ফোরাত এবং কিন্নাসরীন নদীর মধ্যবর্তী যাবাদ নামক স্থানে ৫১২ খৃষ্টাব্দের একটা শিলালিপি পাওয়া যায় যার মধ্যে (****আরবী*****)শব্দগুলো লেখা ছিল। এ সবকিছু এটাই প্রমাণ করে যে, নবী মুহাম্মাদ (সা) এর আগমনের পূর্বে নবীগণের শিক্ষার প্রভাব আরবের বুক থেকে একেবারে মুছে যায়নি। অন্ততপক্ষে এতোটুকু কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে বহু উপায় উপাদান ছিল যে, তোমাদের খোদা মাত্র একজন।(সূরা আল আদিয়াত,টীকা-৩)

আরববাসীদের মধ্যে যে সকল একত্ববাদী পাওয়া যেতো তারা তিনটি গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতো যার মধ্যে অধিকাংশ আরববাসী লিপ্ত ছিলম, সে তিনটি গোনাহ, হলো আল্লাহর সাথে শিরক, অন্যায়ভাবে হত্যা এবং ব্যভিচার।(একথা নবী (সা) বহু হাদীসে বর্ণনা করেছেন। যেমন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, একবার হুজুর (সা) কে জিজ্ঞেস করা হলো, সবচেয়ে বড়ো গোনাহ কোনটি ? নবী (সা) বলেন (*****আরবী****) অর্থাৎ তুমি কাউকে আল্লাহর প্রতিদ্ধন্ধী বানাবে অথচ আল্লাহ তোমাকে পয়দা করেছেন। বলা হলো, তারপর ? নবী (সা) বলেন, (****আরবী*****) তোমার সন্তানকে এ ভয়ে হত্যা কর যে, সে আহারে তোমার সাথে শরীক হবে। তারপর জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর?নবী (সা)বলেন, (****আরবী****)অর্থাৎ তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তুমি ব্যভিচার কর(বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি, নাসায়ী, আহমাদ)। যদিও কবীরা গোনাহ আরও বহু আছে কিন্তু তৎকালীন আরব সমাজে এ তিনটির সবচেয়ে বেশী প্রাধান্য ছিল। এজন্যে মুসলমানদের এ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে যে, গোটা সমাজে কিছু লোক এমন আছে, যারা এসব গোনাহ থেকে বেঁচে আছে।(সূরা আল কুরাইশ,টীকা-৫)

সাবেয়ীন

প্রাচীনকালে সাবেয়ী নামে দুটি শ্রেণী পরিচিত ছিল। এক শ্রেণী ছিল হযরত ইয়াহইয়া আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসারী যাদের বহু সংখ্যক লোক ইরাকের উচ্চ এলাকা জাজিরায় বাস করতো। তারা হযরত ইয়াইয়া (আ) এর অনুসরণে ধর্মে দীক্ষাদান (Baptism) করতো। দ্বিতীয় শ্রেণী তারকার পূজা করতো। তারা বলতো তাদের দীন হযরত শীস (আ) এবং হযরত ইদরীস (আ) তেকে এসেছে। তাদের বিশ্বাস ছিল যে উপাদানসমূহের উপর গ্রহ উপগ্রহের এবং গ্রহ উপগ্রহের উপর ফেরেশতাদের কর্তৃত্ব ছিল, হারবান ছিল তাদের কেন্দ্রস্থল। ইরাকের বিভিন্ন অংশে তাদের শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে ছিল। এ দ্বিতীয় শ্রেণী তাদের দর্শন, বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রভূত উন্নতির কারণে অধিকতর প্রখ্যাত ছিল, খুব সম্ভব এখানে প্রথম শ্রেণীর কথাই বলা হয়েছে। কারণ দ্বিতীয় শ্রেণী সম্ভবত কুরআন নাযিলের সময় এ নামে পরিচিত ছিল না।(এ সম্পর্কে মাহমুদ শুকরী আলুসী নিম্নোক্ত তথ্য সংগ্রহ করেছেনঃ সাবেয়া শ্রেষ্ঠ উম্মতগুলোর মধ্যে একটি। তাদের দ্বীন সম্পর্কে মানুষের যত পরিমাণে জানা আছে ততো পরিমাণে মতভেদও আছে। তারা দুশ্রেনী, মুমিন ও কাফের। তারা ছিল হযরত ইবরাহীম আল খলীল (আ) এর জাতি। হযরত ইবরাহীম (আ) তাদের জন্যেই প্রেরিত হয়েছিলেন। তাদের আবাসস্থল ছিল হারবান এবং এখানেই সাবেয়ীদের বাড়িঘর ছিল। তারা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত এক দ্বীনে হানীফের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং দ্বিতীয় মুশরিক। যারা মুশরিক ছিল তারা সাত তারকা এবং বারো বুযর্গের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং নিজেদের মন্দিরে তাদের প্রতিকৃতি বানিয়ে রাখতো।এসব তারকার জন্যে তাদের বিশেষ বিশেষ মন্দির ছিল। এ ছিল তাদের সর্ববৃহৎ ইবাদতের স্থান, যেমন খৃষ্টানদের গির্জা এবং ইহুদীদের উপাসনালয় বীয়ে(আরবী**) তারা সূর্যের জন্যে এক বিরাট মন্দির নির্মাণ করে রেখেছিল। একটা চাঁদের জন্যে, একটা শুক্র গ্রহ, একটা বৃহস্পতি গ্রহ, একটা বুধ গ্রহ, একটা বুধ গ্রহ, একটা মঙ্গল গ্রহ, একটা শনি গ্রহ এবং একটা আদিকার্য কারণের জন্যেও বানিয়ে রেখেছিল। তাদের নিকটে প্রত্যেক তারকার জন্যে বিশেষ ইবাদাত ও দোয়া নির্দিষ্ট ছিল মুসলমানদের মতো তাদের পাঁচ বার নামাযও ছিল।

তাদের মধ্যে কেউ কেউ রমযান মাসে রোযাও রাখতো। কাবার দিকে মুখ করে নামাযও পড়তো। মক্কার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং হজ্বের জন্যে মক্কা গমনও বিশ্বাস করতো। মৃত জীব, রক্ত এবং শুকরের মাংস হারাম মনে করতো। বিয়ের ব্যাপারে মুসলিমগণ যাদেরকে হারাম বলতো, তারাও তাদেরকে হারাম বলতো। বাগদাদের রাজ পরিষদের একদল এ ধর্মাবলম্বী ছিল। বেলাল বিন আল মুহসিন আসসাবী নামের তাদেরেই একজন প্রবন্ধ কবিতা লেখায় দক্ষ ছিল এবং খ্যাতনামা সামরিক পত্রিকার সম্পাদক চিল। সে মুসলমানদের সাথে রোযা রাখতো, তাঁদের সাথে ইবাদাত করতো, যাকাত দিত এবং হারাম বস্তুকে হারাম মনে করতো। মনে করা হয় যে, তাদের দীনের সারবস্তু এই চিল যে, তারা দুনিয়ায় প্রচলিত ধর্মগুলোর ভালো দিকগুলো গ্রহণ করতো। মন্দ দিকগুলো থেকে দূরে থাকতো। এজন্যে তাদেরকে সাবেয়া বলা হয়, বা খারেজ অর্থাৎ যে বের হয়ে গেছে। তারা প্রত্যেক ধর্মের সামগ্রিক রীতি নীতি পরিত্যাগ করে শুধু ততোটুকু মেনে চলতো যতোটুকু তারা হ৮ক মনে করতো।

কুরাইশ কাফেরগণ নবী মুহাম্মাদ (সা) কে সাবী এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদেরকে সুবাত বলতো। যখন কেউ একটা তেকে বের হয়ে অন্যটাতে চলে যেতো তখন এ প্রবাদ বাক্য ব্যবহার করা হতো (****আরবী***) বুলূগুল আদবের উর্দু অনুবাদ থেকে গৃহীত।–সংকলকদ্বয়) (সূরা আস সাজদা,টীকা -৫)

মাজুসী

ইহুদী এবং নাসারা এ দুটি দল ছাড়া আর যেসব জাতির কাছে আসমানী কিতাব পাঠানো হয়েছিল, তারা যেহেতু তাদের কেতাবগুলোকে বিলুপ্ত অথবা বিকৃত করে ফেলেছে এবং তাদের আকীদা বিশ্বাস এবং আমলের মধ্যে নবীগণের শিক্ষার কোন কিছুই পাওয়া যেতো না, তাদেরকে আহলে কিতাব বলা যেতে পারে না। এ কারণেই মাজুসীদেরকে আহলে কেতাব নামে অভিহিত করা হয়নি। অথচ তারা যরদশতকে মানতো যাকে নবী বলে সন্দেহ করা যায়।হাজারের মাজুসীদের সম্পর্কে নবী মুহাম্মাদ (সা) বলে, (****আরবী****) তাদের সাথে আহলে কিতাবের মতো আচরণ কর। তিনি এ কথা বললেন না যে, তারা আহলে কেতাব। তারপর যখন তিনি হাজারের মাজুসীদেরকে পত্র লিখলেন তখন এ কথা সুস্পষ্ট করে লিখলেন,( ****আরবী*****) যদি তোমরা ইসলাম কবুল কর, তাহলে তোমাদের ঐসব অধিকার হবে যা আমাদের আছে এবং তোমাদের উপর ঐসব অপরিহার্য দায়িত্ব আরোপিত হবে যা আমাদের উপর আছে। তোমাদের মধ্যে যারা অস্বীকার করবে তাদের উপর জিযিয়া আরোপ করা হবে। কিন্তু না তাদের জবাই করা কিছু খাওয়া যাবে, আর না তাদের নারীদেরকে বিবাহ করা যাবে।

ইরানের অগ্নি উপাসকগণ (আরবের অগ্নি উপাসকদের সম্পর্কে মাহমুদ শুকরী আলুসী বলেনঃ আরববাসীদের মধ্যে এ ধরনের লোক বিভিন্ন প্রকারের ছিল। এমন মনে হয় যে, এ ধর্ম ইরানী এবং মাজুসীদের মাধ্যমে তাদের ভেতর প্রবেশ করে। বলা ঞয় যে, অগ্নিপূজা কারীদের সময় থেকে দুনিয়ায় চলে আসছে। কাবীল প্রথমব্যক্তি, যে অগ্নিপূজার মন্দির তৈরী করে এবং তার পূজা করে। তারপর এ ধর্ম মাজুসীদের মধ্যে স্থান লাভ করে।তারা অগ্নিপূজার বহু মন্দির তৈরী করে, তার জন্যে ওয়াকফ, রক্ষক, প্রহরী প্রভৃতির ব্যবস্থা করে। এ অগ্নি তারা এক মুহূর্তের জন্যেও নির্যাতিত হতে দিত না। ফরীদীরা এক অগ্নি মন্দির তুলে এবং আর একটি বুখারায় নির্মাণ করে। বাহমন সিজিস্তানে একটি এবং আবু কাতাদাহ বোখারার পাশে একটি করে অগ্নি মন্দির নির্মাণ করে।

অগ্নিপূজক কয়েক প্রকারের। তাদের একটা দল আগুনে কোন জীব নিক্ষেপ করা এবং তার দ্বারা দেহ প্রজ্বলিত করা হারাম গণ্য করে। তাদের আর একটি দল আছে যারা অগ্নি পূজায় এতদূর অগ্রসর যে, তারা নিজেদেরকে এবং সন্তানদেরকে অগ্নিতে উৎসর্গ করে।

অগ্নিপূজকদের মধ্যে কিছু এমনও আছে যারা ধার্মিক। তারা আগুনের পাশে রোযা রেখে বসে থাকে এবং চিল্লা করে। তাদের রীতি এই যে, তারা সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারী, সতীত্ব এবং ন্যায়পরায়ণতার প্রেরণা দেয়।

ইবনে কুতায়বা কিতাবুল মায়ারিফ গ্রন্থে বলেন, মাজুসী ধর্মের প্রথা বনী তামীমের মধ্যে ছিল। যুরারা বিন উদুস আততামীমী ও তার পুত্র হাজেব বিন যুরারা তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে তার কন্যাকে বিয়ে করেছিল।কিন্তু পরে অনুতপ্ত হয়। তাদেরিই এজকজন আকরা বিন হারেস পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবীদের মধ্যে শামিল হন। ওয়াকী বিন হাসসানের দাদা আবুল আসওয়াদও মাজুসী ছিল- বুলূগুল আদবের অনুবাদ থেকে গৃহীত ৩য় খন্ড, পৃঃ১৩৮ -১৪১।)আলো এবং অন্ধকারে দুজন খোদা (আমাদের ধারণা, মাজুসীদের বিভিন্ন অংশ ও তার ধরন আরবে পৌঁছে। আরববাসীদের মধ্যে যরদাশতী দলের দুই খোদা এবং আলো ও অন্ধকারে আকীদাহ বিশ্বাসের বিবরণ শীর্ষক একটা অধ্যায় রচনা করেছেন যা নিম্নরুপঃ-

এসব লোক বলতো যে,স্রষ্টা দুজন। মঙ্গলের স্রষ্টা হলো নূর বা আলো, এবং অমঙ্গলের স্রষ্টা অন্ধকার। তারা অনাদি এবং শাশ্বত, শক্তিমান, অনুভূতিশীল এবং ইন্দ্রিয়ানুভূতি সম্পন্ন, শ্রবণ ও দর্শনকারী।

কিছু লোকের ধারণা খোদা কিছুকাল যাবত একাকী থাকার পর উদাস হয়ে পড়েন এবং মনে খারাপ চিন্তার উদয় হয় (নাউযুবিল্লাহ) এবং দেহ ধারণ করে অন্ধকারে পতিত হন এবং তার থেকে ইবলিস পয়দা হয়।– বুলূগুল আদবের অনুবাদ থেকে গৃহীত, তয় খন্ড, পৃঃ১৩০ – ১৩১)-সংকলকদ্বয়)মানত। তারা নিজেদেরকে যরদশতের অনুসারী বলতো। তাদের ধর্ম ও নৈতিকতাকে মাযদাক সম্প্রদায়ের গোমরাহি বিকৃত করে রেখে দেয়। এমনকি সহোদর ভগ্নিকে বিয়ে করার প্রথাও তাদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে পড়ে।

নাস্তিকতা

নাস্তিকতার মর্মকথা

যারা বস্তুর শুধু উপরিভাগ দেখে, দুনিয়ার জীবন তাদেরকে অনেক বিভ্রান্তিতে লিপ্ত করে। কেউ মনে করে জীবন ও মৃত্যু শুধু দুনিয়ার মধ্যেই সীমিত। তারপর দ্বিতীয় কোন জীবন নেই। অতএব যা কিছু তোমার করার, তা এখানেই করে নাও।(তাফহীমাত ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৩২২ – ৩২৩)।

কিছু লোক একথা কিছুতেই স্বীকার করে না যে, এসব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা। এসব কিছু বস্তুর আলোড়নের ফলশ্রুতি। অথবা একটা দুর্ঘটনার ফল, যার মধ্যে কোন কারিগরের এবং কোন শিল্প নৈপুণ্যের কোন হাত নেই।(উল্লেখ্য কুরআনে নাস্তিকদের সংক্ষিপ্ত বিবরণও আছে এবং তাদের মতবাদের ভ্রান্তিও খণ্ডন করা হয়েছে। তার অর্থ এই যে, এ দলের অস্তিত্বও আরবে ছিল, কিন্তু ছিল অতি অল্প সংখ্যক। এর ভিত্তিতেই মাওলানা মওদূদী এ দলের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। আরবের নাস্তিকদের সম্পর্কে আল্লামা মাহমুদ আলী নিম্নোক্ত মন্তব্য আলোচনা করেছেন। আরবের নাস্তিকদের সম্পর্কে আল্লামা শুকরী আলুসী নিম্নোক্ত মন্তব্য করেছেন- আরবে এক শ্রেণীর নাস্তিক ছিল যারা শিল্পকে শিল্পী থেকে একেবারে আলাদা গণ্য করেছে। তাদের উক্তি, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে,এই যে(আরবী******) অর্থাৎ জীবন তো শুধুমাত্র দুনিয়ার জীবন। (আমরা জন্মগ্রহণ করি এবং মরে যাই) এবং কাল বা কালচক্র ব্যতীত আর কিছু আমাদেরকে ধ্বংস করেনা।

তাদের দুটি শ্রেণীর মধ্যে অধিকতর গ্রহণযোগ্য  মতবাদ এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

বস্তুত একেবারেই কোন উৎপত্তি বা প্রারম্ভকাল নেই। বস্তুত শুধু শক্তি (Energy)থেকে ক্রিয়ার দিকে ধাবিত হয়ে আসে। অতএব যে বস্তু প্রথমে শক্তিসম্পন্ন থাকে এবং ক্রিয়ার দিকে যখন বেরিয়ে আসে, তখন বস্তুর যৌগিক পদার্থ(Compound)ও যোগ্যতা আপনা আপনি সৃষ্টি হয় অন্য কিছু থেকে সৃষ্টি হয় না। উপরন্তু তারা এ কথাও বলে যে জগত আদিকাল থেকেই রয়েছে এবং এভাবে অনন্তকাল চলতে থাকবে। না তার মধ্যে কোন পরিবর্তন হবে, আর না ক্রিয়াশীল হওয়া সত্ত্বেও তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

শাহ রাস্তানীর আল মিলার ওয়ান নাহাল গ্রন্থে নাস্তিকদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নরুপঃ

তারা সৃষ্টির পুনর্জীবন অস্বীকার করে। তারা বলে, প্রকৃতি(Nature)জীবন দান করে এবং কাল ধ্বংস করে।– বুলুগুল আদবের উর্দু অনুবাদ থেকে গৃহীত)-সংকলকদ্বয়

শিরকের সাথে নাস্তিক্যেরও খণ্ডন

এ সম্পর্কে সূরা আন নামলের আয়াত ৬০ দ্রষ্টব্য। বলা হয়েছে তিনি কে, যিনি আসমান ও যমীন পয়দা করেছেন এবং তোমাদের জন্যে আসমান থেকে পানি বর্ষণ করিয়েছেন, তারপর তার সাহায্যে সুন্দর বাগ বাগিচা উৎপন্ন করেছেন, যার গাছপালা উৎপন্ন করা তোমাদের সাধ্য ছিল না। আল্লাহর সাথে (এসব কাজ) অন্য কোন খোদা শরীক আছে কি? (নেই) বরঞ্চ এসব লোক সত্য পথ থেকে সরে যাচ্ছে।– তাফহীমুল কুরআন

এ প্রশ্ন এবং তার পরের প্রশ্নগুলোতে শুধু মুশরিকদের শিরকই খণ্ডন করা হয়নি, বরঞ্চ নাস্তিকতাও খণ্ডন করা হয়েছে। যেমন এ প্রথম প্রশ্নে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, বৃষ্টি-বর্ষণকারী এবং তার থেকে বিভিন্ন প্রকারে তরুলতা উৎপন্নকারী কে? একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বুতে পারা যাবে যে, বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ জীবনের জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদান সঠিক পরিমাণে অথবা কিছু কম পরিমাণে যমীনে সমাবিষ্ট হওয়া, ক্রমাগতভাবে সমুদ্র থেকে উঠিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন সময়ে সঠিকভাবে বর্ষণ করা, উদ্ভিদ জগতের লালন পালন ও বর্ধন এবং পাখী জগতের সকল প্রয়োজন পূরণের উদ্দেশ্যে যমীন, পানি, বাতাস, উষ্ণতা প্রভৃতি শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনুপাত ও সাহায্য সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত করা এগুলোকে একজন মহাজ্ঞানীর সুষ্ঠু পরিকল্পনা, প্রজ্ঞাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা এবং অপরাজেয় শক্তি ও অদম্য ইচ্ছা ছাড়া স্বয়ং আকস্মিকভাবে সংঘটিত হতে পারে কি? এটা কি সম্ভব যে, প্রতিটি আকস্মিক ঘটনা  হাজার হাজার কেন বরঞ্চ লক্ষ কোটি বছর ধরে এমন নিয়ামতও সঠিকভাবে সংঘটিত হতে থাকবে? শুধু এক হঠকারী ব্যক্তি অন্ধ বিদ্বেষের বশবর্তী হয়েই একে আকস্মিক ঘটনা বলে দাবী করতে পারে। কোন সত্যনিষ্ঠ বিবেকবান মানুষের পক্ষে এ ধরনের অর্থহীন দাবী করা এবং তা সত্র বলে মেনে নেয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।(সূরা আশ সাবা,টীকা-৭৬)

শৃঙ্খলা ও সামঞ্জস্য আকস্মিক ঘটনা নয়

যমীনে বিভিন্ন প্রকারের অসংখ্য জনবসতির স্থান হওয়াটাও সহজ ব্যাপার নয়। এ ভূমণ্ডলটি মহাশূন্যে ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। কোন কিছুকে অবলম্বন করে নেই। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এতে কোন অস্থিরতা ও কম্পন নেই। যদি এতে সামান্য পরিমাণেও কম্পন হতো, ভূমিকম্প হলে যার ভয়ানক পরিণাম আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। তাহলে এর উপরে কোন জনবসতি মোটেই সম্ভব হতো না এ ভূমণ্ডলের উপর পাঁচশত মাইল উচ্চতা পর্যন্ত বায়ুর এক সূক্ষ্ম গাঢ় স্তর রক্ষিত আছে, যা মারাত্মক উল্কা পতনের আঘাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রেখেছে। অন্যথায় প্রতিদিন দু কোটি উল্কা যে প্রতি সেকেন্ডে ত্রিশ মাইল গতিতে পৃথিবীর দিকে নিপতিত হচ্ছে, তা পৃথিবীর বুকে এক সর্বনাশা ধ্বংসলীলা সৃষ্টি করতো। এ বায়ুস্তরই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এই সমুদ্র থেকে বাষ্প উত্থিত করে মেঘমালা সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন স্থানে বারি বর্ষণের কাজ করে। এই মানুষ, জীব জানোয়ার ও উদ্ভিদরাজির প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করে।(এই হচ্ছে আমাদের শব্দ প্রেরণ ও গ্রহণের মাধ্যম যার অভাবে কথোপকথন সম্ভব ছিল না।)খনিজ ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি বিপুল পরিমাণে সরবরাহ করে দেয়া হয়েছে যা উদ্ভিদ, জীবজন্তু ও মানুষের জন্যে একান্ত অপরিহার্য। এ ভূলোকের উপর সমুদ্র নদ নদী, বিল ঝিল, ঝর্ণা এবং প্রস্রবণের আকারে ভূগর্ভে পানির অফুরন্ত ভাণ্ডার রাখা আছে। পাহাড়ের চূড়াতেও পানি জমাট করার এবং তা গলিয়ে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপর এ পানি, বাতাস এবং পৃথিবীতে প্রাপ্য সকল দ্রব্যাদি একত্র করে রাখার জন্যে আকর্ষণ রাখা হয়েছে।— তাছাড়া এ পৃথিবীতে প্রাপ্য সকল দ্রব্যাদি একত্র করে রাখার জন্যে আকর্ষণ রাখা হয়েছে। — তাছাড়া এ পৃথিবীকে সূর্য থেকে এক বিশেষ দূরত্বে রাখা হয়েছে যা তার উপর বসবাসকারী সকল জীবের জন্যে অত্যন্ত অনুকূল।—

এখানে শুধুমাত্র কয়েকটি সামঞ্জস্যেরই উল্লেখ করা হলো, যার কারণে পৃথিবী বর্তমানে বসবাসের উপযোগী হয়েছে। কোন বিবেকবান ব্যক্তি যদি এসব বিষয় সামনে রেখে চিন্তা ভাবনা করে, তাহলে সে এক মুহূর্তের জন্যেও ধারণা করতে পারবে না যে, কোন বিজ্ঞ স্রষ্টার পরিকল্পনা ছাড়া এসব সামঞ্জস্য একটি দুর্ঘটনার ফলে আপনা আপনিই কায়েম হয়েছে। আর সে এ ধারণাও করতে পারবে না যে, এ বিরাট সৃজনশীল পরিকল্পনা রচনা ও তা কার্যকর করার ব্যাপারে কোন দেব দেবী, জ্বিন,নবী, অলী কিংবা ফেরেশতার কণামাত্র কর্তৃত্ব আছে।(রাসায়েল ও মাসায়েল, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৮)

জীবন ও তার পুনর্জীবন বা পুনরাবৃত্তি

জীবনের উদগমের জন্যে যেসব কার্যকারণের (Factors)প্রয়োজন সে সবের ঠিক ঠিক পরিমাণসহ একেবারে আকস্মিকভাবে একত্রে সমাবিষ্ট হয়ে জীবনের আপনা আপনি অস্তিত্ব লাব করার মতবাদটি নাস্তিকদের একটা অবৈজ্ঞানিক কল্পনাবিলাস তো অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু অঙ্কশাস্ত্রের হটাৎ ঘটে যাওয়ার নিয়ম (Law of Changes)যদি এর উপর প্রয়োগ করা হয় তাহলে এরূপ ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য ছাড়া আর কিছু হবে না।

জীবন শুধু একটিমাত্র প্রতিকৃতিতে নয় বরঞ্চ অসংখ্য রকমের প্রতিকৃতিতে পাওয়া যায়। বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে জীবের প্রায় দশ লক্ষ এবং উদ্ভিদের প্রায় দুই লক্ষ প্রকারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ লক্ষ লক্ষ প্রকার জীব তাদের গঠন ও প্রজাতীয় বৈশিষ্ট্যে পরস্পর হতে সুস্পষ্টরূপে বিভিন্ন । এ বিভিন্নতা এতো সুস্পষ্ট ও অকাট্য যে, প্রাচীনতম জ্ঞাতকাল থেকে তারা আপন আপন প্রজাতীয় আকার আকৃতিতে এমনভাবে ক্রমাগত অক্ষুণ্ণ রেখেছে যে, এক আল্লাহর সৃজনশীল পরিকল্পনা (Desing) ছাড়া জীবনের এ বিরাট রকম বেরকম প্রজাতীয় পার্থক্যের অন্য কোন প্রকার যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেয়া কোন ডারউইনের পক্ষেও সম্ভব নয়।

এখন একটু সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি সম্পর্কে চিন্তা করে দেখা যাক। স্রষ্টা প্রতিটি জীব ও উদ্ভিদ প্রজাতির আকার আকৃতি ও সংযোজনে এমন এক যান্ত্রিক ব্যবস্থা(Mechanism) স্থাপিত রেখেছেন যা তার অসংখ্য ব্যক্তি সত্তা থেকে অগণিত বংশ ঠিক তারই মতো প্রজাতীয় প্রতিকৃতি, স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যসমূহ ক্রমাগত বের করে যাচ্ছে। এ কোটি কোটি ক্ষুদ্র কারখানাগুলোতে কোন এক প্রকারের প্রজাতি সৃষ্টির কারখানা ভুল করেও ভিন্ন প্রকারের নমুনা উৎপাদন করে না। আধুনিক প্রজনন বিজ্ঞানের (Genetics) পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ এ ব্যাপারে বিস্ময়কর তথ্য পেশ করেছে। প্রত্যেকটি বৃক্ষ চারার মধ্যে এ যোগ্যতা রেখে দেয়া হয়েছে যে, সে তার আপন প্রজাতির ধারাবাহিকতা পরবর্তী বংশধর পর্যন্ত অব্যাহত রাখার এমন পুরোপুরি ব্যবস্থা করবে যার ফলে পরবর্তী বংশধরেরা তাদের প্রজাতীয় সকল পার্থক্যমূলক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারবে এবং তাদের প্রতিটি ব্যক্তিসত্তাই অন্যান্য সকল প্রকার প্রজাতীয় ব্যক্তিদের তুলনায় আপন প্রজাতীয় আকার প্রকৃতিতে স্বতন্ত্র রূপ সঠিকভাবে বজায় রাখতে পারবে। এ প্রজাতীয় স্থিতি ও প্রজননের উপাদান প্রত্যেকটি চারার একটি কোষের (Cell) একাংশে সুরক্ষিত থাকে। একটা অধিক শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্র ছাড়া তা কিছুতেই দেখা যেতে পারে না। এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ইঞ্জিনিয়ারটি চারা গাছটির লালনপালন ও বিকাশকে নির্ভুলভাবে এমন পথে নিয়ন্ত্রিত করে বা তার প্রজাতীয় প্রতিকৃতির নিজস্ব পথ!— জীবজগত ও মানব জাতির বেলায়ও অনুরূপ অবস্থা দেখা যায়।

তাদের মধ্যে কারো সৃষ্টি একবার হয়েই থেমে যায়নি। বরঞ্চ ধারণা করা যায় না সে কত ব্যাপকভাবে চারদিকে সৃষ্টি পুনরাবৃত্তির এক বিরাট  কারখানা চলছে। সেখানে প্রত্যেক প্রজাতির বিভিন্ন ব্যক্তিসত্তা থেকে অনুরূপ প্রজাতীয় অসংখ্য সত্তা অস্তিত্ব লাভ করে চলেছে।—-

এসব ব্যবস্থাপনার সূচনা এক সুবিজ্ঞ ও সুক্ষজ্ঞাণী স্রষ্টার অস্তিত্বই শুধু অনিবার্য নয়, বরঞ্চ প্রতিমুহূর্তে তা সঠিকভাবে অব্যাহত থাকার জন্যে এক পরিচালক ও নিয়ন্ত্রণকারী এবং এক চিরঞ্জীব শাশ্বত সত্তার (খোদার ) একান্তই প্রয়োজন, যিনি এক মুহূর্তের জন্যেও এ কারখানা পরিচালনার ব্যাপারে গাফেল হবেন না।

এসব মহাসত্য ও তত্ত্ব যেভাবে নাস্তিকের নাস্তিকতার মুলোৎপাটন করে দেয়, তেমনি মুশরিকের শিরকেও মূলোৎপাটন করে(তাফহীমুল কোরআন,সূরা আন নামল,টীকা- ৭৩)

বিশ্ব প্রকৃতির মর্মকথার দুটি দিক

(আরবী*****)

তারা কি কখনো নিজেদের মধ্যে চিন্তা ভাবনা করে দেখেনি? আল্লাহ যমীন ও আসমান এবং তাদের মধ্যস্থিত সকল কিছু সত্যতা সহকারে এবং একটি নির্দিষ্ট মুদ্দৎ পর্যন্ত সৃষ্টি করেছেন। – সূরা আর রুমঃ৮

এ বাক্যাংশ আখিরাত সম্পর্কে অতিরিক্ত দুটি দলিল পেশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মানুষ যদি তার আপন সত্তা অস্তিত্বের বাইরের বিশ্ব-ব্যবস্থা গভীর দৃষ্টিতে দেখে তাহলে দুটি তত্ত্ব উদঘাটিত হবে।

একটা এই যে, এ বিশ্ব প্রকৃতি সত্যতা সহকারে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ কোন বালকের খেলা নয় যে, শুধু মন ভুলাবার জন্যে সে কাদামাটি দিয়ে খেলাঘর বানালো। তার এ ঘর বানানো এবং তা ভেঙে ফেলা উভয়ই অর্থহীন। বরঞ্চ এ বিশ্বপ্রকৃতি একটা দায়িত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। এর প্রতিটি অনুপরমাণু সুস্পষ্টরূপে সাক্ষ্য দেয় যে, তা পরিপূর্ণ বুদ্ধিমত্তা ও সূক্ষ্ম বিবেচনা সহকারে তৈরী করা হয়েছে। তার প্রত্যেক বস্তুতে একটা আইন ও রীতিনীতি কার্যকর রয়েছে। তার প্রতিটি জিনিস উদ্দেশ্যপূর্ণ। মানুষের গোটা তমদ্দুন, তার সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সকল জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্পকলা স্বয়ং এ কথার সাক্ষ্যদান করে যে, দুনিয়ার প্রতিটি জিনিসের পেছনে সক্রিয় নিয়ম নীতি জানার পর এবং প্রত্যেক বস্তুর সৃষ্টিরে উদ্দেশ্যহীন খেলনায় যদি তাকে একটা পুতুলের মতো করে রাখা হতো, তাহলে এখানে কোন বিজ্ঞান ও কোন সভ্যতা সংস্কৃতির ধারণাই করা সম্ভব হতো না। যে মহাজ্ঞান এ সূক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সহকারে এ দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন এবং তার বুকে মানুষের মতো একটা সৃষ্টিকে উচ্চমানের মানসিক ও দৈহিক শক্তি দিয়ে ক্ষমতা এখতিয়ার দিয়ে বাছাই করার স্বাধীনতা দিয়ে, নৈতিক অনুভূতি দিয়ে নিজের তৈরী দুনিয়ার অসংখ্য দ্রব্য সামগ্রী তার হাতে  তুলে দিয়েছেন, তিনি মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি করেছেন এ কথা কি করে মানুষের বিবেক বুদ্ধিতে আসতে পারে?মানুষ দুনিয়ার বুকে গঠনমূলক বা ধ্বংসাত্মক কাজ করবে, পাপ অথবা পুণ্য, ন্যায় অথবা অন্যায় করবে এবং সততা অথবা  মিথ্যাচারিতা অবলম্বন করবে, তারপর এমনিই মৃত্যুবরণ করে মাটিতে মিশে যাবে, তার ভালো বা মন্দ কাজের কোন প্রতিফলন হবে না? সে তার এক একটি কাজের দ্বারা তার ও তার মতো অসংখ্য মানুষের জীবনে এবং দুনিয়ায় অসংখ্য জিনিসের উপরে ভালো বা মন্দ প্রভাব রেখে চলে যাবে এবং তারপর মৃত্যুর সাথে সাথেই তার কর্মকাণ্ডের গোটা দপ্তরখানা গুটিয়ে নদীতে বাসিয়ে দেয়া হবে? এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কি হতে পারে?এ বিশ্বজগতের ব্যবস্থাপনা গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দ্বিতীয় তত্ত্বটি পরিস্ফুট হয়ে পড়ে।তাহলো এই যে, এখানে কোন জিনিসই চিরস্থায়ী নয়। প্রত্যেক জিনিসের একটা সময় সীমা নির্ধারিত আছে এবং সে সীমায় পৌছলেই তা শেষ হয়ে যায়। সামগ্রিকভাবে গোটা সৃষ্টি জগতের ব্যাপারটাও তাই। এখানে যতো শক্তিই সক্রিয় তা সবই সীমিত। একটা সময় পর্যন্ত তা কার্যকর থাকে। কোন এক সময়ে অনিবার্যরূপে তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে এ ব্যবস্থাপনারও শেষ হয়ে যায়। প্রাচীনকালে যেসব দার্শনিক ও বিজ্ঞানী পৃথিবীকে অনাদি ও অবিনশ্বর বলতো, জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে তাদের কথা কিছুটা  চলতো। কিন্তু পৃথিবীর নিত্য নতুনত্ব ও প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নাস্তিক ও আল্লাহ বিশ্বাসীদের মধ্যে দীর্ঘকাল যাবত যে বিতর্ক চলতো, আধুনিক বিজ্ঞান এ ব্যাপারে চূড়ান্তভাবে আল্লাহ বিশ্বাসীদের মতকেই সমর্থন করেছে। নাস্তিকদের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের নামে এ কথা বলার আর কোন অবকাশই রইলো না যে, দুনিয়া অনন্তকাল তেকে আছে, অনন্তকাল পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে এবং কেয়ামত কখনোই সংঘটিত হবে না। প্রাচীন বস্তুবাদ এ ধারণার উপর নির্ভরশীল ছিল যে, বস্তু কখনো ধ্বংস হয় না, শুধু তার রূপ পরিবর্তন হতে পারে। এর ভিত্তিতে একথা বলা যেতো যে, এ বস্তুজগতের না কোন শুরু আছে, আর না কোন শেষ। কিন্তু বর্তমানে আণবিক শক্তি(Atomic energy)আবিষ্কারের ফলে সে ধারণা একেবারে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে। এখন এটা আবিষ্কৃত হয়েছে যে, শক্তি বস্তুতে এবং বস্তু শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এমন কি তখন তার না থাকে আকার আকৃতি আর না কোন নিরাকার  রূপ। এখন থার্মো ডাইনামিকস এর দ্বিতীয় আইন (second Law of Thermo Dynamics)এ কথা প্রমাণ করেছে যে, এ বস্তু জগত না অনাদি আর না চির শাশ্বত ও অবিনশ্বর। অনিবার্যরূপে তার শুরু এবং শেষ থাকতেই হবে। এজন্যে বিজ্ঞানের ভিত্তিতে কেয়ামত অস্বীকার করা আর সম্ভব নয়। বিজ্ঞানই যখন এ ব্যাপারে আত্মসমর্পণ করেছে, তখন দর্শন কোন যুক্তিতে কেয়ামত অস্বীকার করবে।(তাফহীমূল কুরআন,সূরা আন নামল,টীকা-৭৪)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.