সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হযরত মূসা (আ ) এর পূর্ববর্তী যুগ

হযরত ইসহাক (আ ) এর পুত্র হযরত ইয়াকুব (আ ) এর বংশেই জন্মগ্রহণ করেন হযরত ইউসুফ, হযরত মূসা, হযরত দাউদ, হযরত সুলাইমান, হযরত ঈসা এবং অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুসসালাম। হযরত ইয়াকুব (আ ) এর নাম যেহেতু ইসরাঈল ছিল, সে জন্যে তাঁর বংশধরগণ বনী ইসরাঈল নামে অভিহিত হন। তাঁদের প্রচারের ফলে যেসব জাতি তাঁদের দ্বীন গ্রহণ করে তারা হয়তো তাদের স্বকীয়তা পরিহার করে তাঁদের মধ্যে একাকার হয়ে যায় অথবা তারা বংশগতভাবে তাঁদের থেকে আলাদা হলেও ধর্মের দিক দিয়ে তাঁদের অনুসারী হয়ে পড়ে।(তাফহীমুল কুরআন,সূরা আন নামল,টীকা-৮০)

এ জাতির পৌরাণিক কাহিনী এই যে, তাদের ঊর্ধ্বতন পূর্ব পুরুষ হযরত ইয়াকুব (আ ) এর সাথে আল্লাহ তায়ালা মল্লযুদ্ধ করেন। সারারাত মল্লযুদ্ধ হতে থাকে। ভোরে প্রভাত হয়ে যায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে হারাতে পারলেননা। তারপর আল্লাহ বললেন, এখন আমাকে যেতে দাও। ইয়াকুব (আ ) বললেন, না তোমাকে যেতে দেব না যতক্ষণ না তুমি আমাকে একটা বর দাও। আল্লাহ বললেন, তোমার নাম ইয়াকুব নয় ইসরাঈল হবে। কারণ তুমি খোদা ও মানুষের মধ্যে শক্তি পরীক্ষায় জয়ী হয়েছ।(নাউযুবিল্লাহ)(দেখুন The Holy Sepulchre এর আধুনিক অনুবাদ Jewish Publications Society of America.1954.আদি পুস্তক,অধ্যায় ৩২, স্তোত্র ২৫-২৯। খৃষ্টানদের অনুদিত বাইবেলেও কথাটি এভাবে বলা হয়েছে। ইহুদি অনুবাদের টীকার ইসরাঈল শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে- He who striveth with God-যিনি খোদার সাথে মল্লযুদ্ধ করেন। তারপর বাইবেল সাহিত্যের বিশ্বকোষে খৃষ্টান পণ্ডিতগণ ইসরাঈল শব্দের ব্যাখ্যায় বলেছেন Wrestler with God অর্থাৎ খোদার সাথে মল্ল-যুদ্ধকারী। বাইবেলের কেতাব হোসী(আরবী***) তে হযরত ইয়াকুবের পরিচয় এ ভাষায় দেয়া হয়েছে, তিনি তাঁর শক্তি সামর্থ্য থাকাকালে খোদার সাথে মল্লযুদ্ধ করেন। তারপর ফেরেশতাদের সাথে এবং বিজয়ী হন অধ্যায় ১২, স্তোত্র ৪।৪১৮(সূরা আর রুম,টীকা-৬)

বনী ইসরাঈলের গৌরবময় অতীত

একদিকে যেমন হযরত ইবরাহীম (আ ) হযরত ইসহাক (আ ), হযরত ইউসুফ (আ) প্রমুখ মহান নবীগণ এ বংশে জন্মগ্রহণ করেন, অপরদিকে হযরত ইউসুফ (আ ) এর যুগে এবং তাঁর পরে মিসরে তাঁদের শাসন কর্তৃত্ব লাভের সৌভাগ্য হয়। দীর্ঘকাল যাবত তৎকালীন সভ্যতামন্ডিত পৃথিবীর তারাই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক এবং চারপাশে তাঁদেরই প্রভাব প্রতিপত্তি বিরাজ করছিল।

সাধারণত মানুষ বনী ইসরাঈলের উন্নতি অগ্রগতির ইতিহাস হযরত মূসা(আ ) থেকে শুরু করে। কিন্তু এ বিষয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, বনী ইসরাঈলের সত্যিকার উন্নতি অগ্রগতির যুগ হযরত মূসা (আ ) এর পূর্বেই অতীত হয়েছে। হযরত মূসা (আ ) তাঁর জাতির সামনে তাদের গৌরবময় অতীত তুলে ধরতেন। (সূরা আল মায়েদাঃ২০)-সূরা আল বাকারা,টীকা-১২৩

ইহুদীবাদের সূচনা ও নামকরণ

হযরত মূসা(আ ) এবং পূর্ববর্তী নবীগণ যে দ্বীনে হকে প্রচার করেন তা তো ইসলামই ছিল। এসব নবীদের মধ্যে কেউই ইহুদী ছিলেন না। আর না তাঁদের যুগে ইহুদীবাদের উৎপত্তি হয়।নামের ভিত্তিতে এ ধর্মের উৎপত্তি বহু পরবর্তী যুগের।ইয়াকুব (আঃ)-এর চতুর্থ পুত্র ইয়হুদার প্রতি এ ধর্ম আরোপ করা হয়, তখন এ পরিবার সে রাষ্ট্রের মালিক হয় যা ইয়াহুদীয়া নামে অভিহিত হয়।বনী ইসরায়েলর অন্যান্য গোত্রগুলো পৃথক রাষ্ট্র কায়েম করে, যা সামেরিয়া নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। তারপর আসিরীয়গণ শুধু সামেরিয়াকেই ধ্বংস করে না, বরঞ্চ এসব ইসরাঈলী গোত্রগুলোরও নাম নিশানা মিটিয়ে দেয়, যারা এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিল। তারপর শুধু ইয়াহুদা এবং বিন ইয়ামিনের বংশই অবশিষ্ট রইলো। ইয়াহুদা বংশের প্রভাব প্রতিপত্তির জন্যে এদেরকে ইয়াহুদী বা ইহুদী নামে আখ্যায়িত করা হয়। এ বংশে পাদ্রী পুরোহিত, রিব্বী ও পন্ডিতগন আপন  আপন ধ্যান ধারণা ও ঝোঁক প্রবণতা অনুযায়ী ধারণা বিশ্বাস, প্রথা পদ্ধতি এবং ধর্মীয় রীতিনীতির যে কাঠামো শত শত বছরে তৈরী করে তাকে বলা হয় ইহুদীবাদ বা ইহুদী ধর্ম। এ কাঠামো শুরু হয় খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে এবং পঞ্চম খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত এর গঠন প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

নবীগণের কাছে যে খোদায়ী হেদায়েত এসেছিল তার অতি সামান্য উপকরণই তার মধ্যে সন্নিবেশিত ছিল এবং তার বিশিষ্ট বিষয়গুলো বিকৃত করা হয়েছিল। এ কারণে কুরআনের অনেক স্থানে তাদেরকে(আরবী****) বলে সম্বোধন করা হয়েছে, অর্থাৎ হে লোকেরা যারা ইহুদী হয়ে রয়েছো। তাদের মধ্যে সকলেই ইসরাঈলী ছিল না বরঞ্চ ঐসব লোকও ছিল যারা ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করেছিল। কুরআনে যেখানে বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করা হয়েছে সেখানে বনী ইসরাঈল শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। আর যেখানে ইহুদী ধর্মাবলম্বীদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে সেখানে (আরবী***) শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।(সূরা আল মায়েদা, টীকা-৪২)

হযরত ইউসুফ (আ ) এর যুগে ইহুদী

আধুনিক যুগের গবেষকগণ বাইবেল এবং মিসরীয় ইতিহাসের তুলনামূলক আলোচনার পর এ অভিমত পোষণ করেন যে রাখাল বাদশাহদের (Kykoss Kings)মধ্যে যে শাসকের নাম মিসরীয় ইতিহাসে এপোফিস (Apophis)বলা হয়েছে যে হযরত ইউসুফ (আ ) এর সম সাময়িক ছিল।

মিসরের রাজধানী ছিল মিসফিস। তার ধ্বংসাবশেষ কায়রোর চৌদ্দ মাইল দক্ষিণে দেখতে পাওয়া যায়। হযরত ইউসুফ (আ ) সতেরো আঠারো বছর বয়সে সেখানে পৌঁছেন। দুতিন বছর আযীয মিসরের গৃহে অবস্থান করেন। আট বছর জেলে অতিবাহিত করেন। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি মিসরের শাসনকর্তা হন এবং আশি বছর যাবত একচ্ছত্রভাবে মিসরে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। তাঁর শাসনের নবম অথবা দশম বছরে তিনি তাঁর পিতাকে গোটা পরিবারসহ ফিলিস্তিন থেকে মিসরে নিয়ে আসেন। কায়রো ও দিমইয়াতের মধ্যবর্তী অঞ্চলে তিনি তাঁদেরকে পুনর্বাসিত করেন। বাইবেলে এ অঞ্চলের নাম যুশান বা দুশান বলা হয়েছে।(তালমুদে বলা হয়েছে যে যখন হযরত ইয়াকুব (আ ) এর আগমনের সংবাদ রাজধানীতে পৌঁছে, তখন হযরত ইউসুফ (আ ) রাজ্যের  বিশিষ্ট আমীর ওমরাহ, উচ্চপদস্থ সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে অভ্যর্থনার জন্যে বেরিয়ে পড়েন এবং অত্যন্ত ধুমধামের সাথে রাজধানীতে নিয়ে আসেন। দুদিন যাবত উৎসব পালন করা হয়। উৎসবে শোভাযাত্রায় মেয়ে পুরুষ শিশু নির্বিশেষে সকলে যোগদান করে। সমগ্র দেশে আনন্দ উল্লাসের বন্যা প্রবাহিত হয়।(সূরা আল হাশর,টীকা-৪)হযরত মূসা (আ ) এর যুগ পর্যন্ত তাঁরা এ অঞ্চলে বসবাস করেন। বাইবেলের বর্ণনামতে হযরত ইউসুফ (আ ) একশ দশ বছর জীবিত ছিলেন, মৃত্যুর সময় তিনি বনী ইসরাঈলকে অসিয়ত করেন যে, যখন তারা মিসর ত্যাগ করবে তখন যেন তাদের সাথে তাঁর কংকাল তুলে নিয়ে যায়।(সূরা আল জুমুআ, টীকা-১০)

যাঁর বদৌলতে তারা মিসরে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি অর্থাৎ হযরত ইউসুফ (আ ) স্বয়ং নবী ছিলেন। তাঁর পরে চার পাঁচ শতাব্দী পর্যন্ত মিসরের শাসন ক্ষমতা তাদেরই হাতে ছিল। এ সময়ে অবশ্যই তারা মিসরে ইসলামের ব্যাপক প্রচার কার্য চালিয়ে থাকবে। মিসরবাসীদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করে তাদের শুধু ধর্মই না, বরঞ্চ তাদের তমদ্দুন এবং গোটা জীবন পদ্ধতি অমুসলিম মিসরীয়দের থেকে পৃথক এবং বনী ইসরাঈলের সাথে একই রঙে রঞ্জিত হয়। ভারতের হিন্দুরা যেমন (বিভাগ পূর্বকালে) মুসলমানদেরকে বিদেশী মনে করতো তেমনি মিসরীয়গণও  তাদের সকলকে বহিরাগত মনে করতো। মিসরীয় মুসলমানদেরকে তারা বনী ইসরাঈল নামে অভিহিত করতো, যেমন অনারব মুসলমানদেরকে মুহামেডান বলা হতো। তারা নিজেরাও দ্বীন, সাংস্কৃতিক এবং বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে অমুসলিম মিসরীয়দের থেকে পৃথক এবং বনী ইসরাঈলের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছিল। এ কারণেই যখন মিসরে জাতীয়তাবাদের প্রবল আন্দোলন শুরু হয় তখন অত্যাচার উৎপীড়ন শুধু বনী ইসরাঈলের উপরেই হয়নি, বরঞ্চ তাদের সাথে মিসরীয় মুসলমানরাও তার শিকারে পরিণত হয়। তারপর বনী ইসরাঈল যখন দেশ ত্যাগ করে তখন মিসরীয় মুসলমানরাও তাদের সাথে বেরিয়ে পড়ে এবং তাদেরকে বনী ইসরাইলের মধ্যেই গণ্য করা হয়।(বাইবেলের বিভিন্ন ইশারা ইংগিত থেকে আমাদের এ ধারণার সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন বাইবেল প্রণেতা যাত্রা পুস্তক অধ্যায়ে বনী ইসরাঈলের মিসর পরিত্যাগের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, তাদের সাথে অনুরূপ একটি বিরাট জনগোষ্ঠী ছিল(১২ঃ৩৮)। এসব অ ইসরাঈলী মুসলমানদেরকে বিদেশী বহিরাগত বলা হতো। তাওরাতে হযরত মূসা (আ ) কে যেসব হেদায়েত দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়ঃ তোমাদের জন্যে এবং তোমাদের সাথে অবস্থানকারী এসব বহিরাগতদের জন্যে বংশানুক্রমে একই আইন বলবৎ থাকবে। খোদার নিকটে বহিরাগতরাও সেই মর্যাদার অধিকারী হবে যেমন তোমরা আছ(২৫ঃ১৪-১৫) গ্রন্থকার।(সূরা ইউসুফ,টীকা ৬৯)

মিসরে জাতীয়তাবাদী বিপ্লব

হযরত ইউসুফ(আ ) এর যুগ অতীত হওয়ার পর মিসরে একটি জাতীয়তাবাদী বিপ্লব সাধিত হয়। কিবতীগণ যখন পুনর্বার শাসন ক্ষমতা হস্তগত করে তখন জাতীয়তাবাদী সরকার বনী ইসরাঈলের ক্ষমতা চূর্ণ করার সকল প্রচেষ্টা চালায়। এ ব্যাপারে বনী ইসরাঈলকে হেয় ও লাঞ্ছিত করে এবং তাদেরকে নিম্নস্তরের কাজকর্মে নিযুক্ত করেই তারা ক্ষান্ত হয় না, বরঞ্চ তাদের জনসংখ্যা হ্রাস করার উদ্দেশ্যে তাদের পুত্র সন্তানকে হত্যা করার এবং কন্যা সন্তানকে জীবিত রাখার পলিসিও গ্রহণ করে, যাতে করে তাদের নারী সমাজ ক্রমশঃ কিবতীদের আয়ত্তে আসতে পারে এবং তাদের থেকে ইসরাঈলী বংশের পরিবর্তে কিবতী বংশ পয়দা হতে পারে। তালমুদ এ সম্পর্কে আরও বলে যে, হযরত ইউসুফ(আ ) এর মৃত্যুর এক শতাব্দীর কিছু কাল পরে এ বিপ্লব সংঘটিত হয়। নতুন জাতীয়তাবাদী সরকার প্রথমে ইসরাঈলীদেরকে তাদের উর্বর ভূসম্পত্তি, বাড়িঘর ও অন্যান্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত করে এবং তারপর তাদেরকে সরকারের সকল দায়িত্বপূর্ণ পদ থেকে বেদখল করে। তারপরও যখন কিবতী শাসকগণ অনুভব করে যে, বনী ইসরাঈল এবং তাদের স্বধর্মালম্বী মিসরীয়গণ যথেষ্ট প্রভাবশালী তখন তাদেরকে নানাভাবে হেয় ও লাঞ্ছিত করা শুরু করে। অল্প পারিশ্রমিকে তাদের দ্বারা কঠিন শ্রম গ্রহণ করতে থাকে। এ হচ্ছে কুরআনের ঐ বর্ণনার ব্যাখ্যা যেখানে বলা হয়েছে- ফেরাউন মিসরের অধিবাসীদের একদলকে হেয় ও লাঞ্ছিত করতে থাকে (আরবী****) এবং সূরা বাকারায় যেখানে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন আলে ফেরাউন বনী ইসরাঈলকে কঠিন শাস্তি দিত।(সূরা ইউসুফ,টীকা-৬৮)

হযরত মূসা (আ ) এর আগমন

বনী ইসরাঈল কয়েক শতাব্দী যাবত লাঞ্ছনা ও দারিদ্রের জীবন যাপন করছিল। এ অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তাদের মধ্যে মূসা (আ ) কে পয়দা করেন। তাঁর মাধ্যমে এ জাতিকে গোলামির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেন। তারপর তাদের উপর কিতাব নাযিল করেন এবং তার প্রভাবে সেই পদদলিত ও নিষ্পেষিত জাতি হেদায়াতের আলো লাভ করে দুনিয়ার এক প্রখ্যাত জাতিতে পরিণত হয়।(সূরা ইউসুফ,টীকা-৬৮)

হযরত মুসা (আ ) এর দাওয়াত

হযরত মূসা(আ ) দু বিষয়ের দাওয়াতসহ ফেরাউনের নিকট গমন করেন। একঃ যেন সে আল্লাহর বন্দেগী (ইসলাম) কবুল করে এবং দ্বিতীয়তঃ যারা পূর্ব থেকেই মুসলমান ছিল, সেই বনী ইসরাঈল জাতিকে সে যেন তার অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে মুক্ত করে।(সূরা আল কাসাস,টীকা-৫)

অপরদিকে হযরত মূসা(আ ) বনী ইসরাঈলকে এ শিক্ষা দেনঃ

আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর এবং ধৈর্যধারণ কর।এ যমীন আল্লাহর এবং তিনি যাকে চান তাকে এ যমীনের ওয়ারিশ বানিয়ে দেন। তাঁকে ভয় করে যারা কাজ করে, চূড়ান্ত সাফল্য তাদেরই।

বনী ইসরাঈলের হীন মানসিকতা

এ সংকটময়কালে সত্যকে গ্রহণ করা এবং সত্যের পতাকাবাহীকে (মূসা আলাইহিস সালাম) নিজেদের নেতা বলে মেনে নেয়ার সৎসাহস কতিপয় যুবক ও যুবতী প্রদর্শন করে।কিন্তু পিতা মাতা এবং জাতির বয়োজ্যেষ্ঠদের এ সৌভাগ্য হয়নি। সুযোগ সন্ধান, পার্থিব স্বার্থ এবং নির্ঝঞ্জাট ঞ্ঝ জীবন যাপনের মানসিকতা তাদেরকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, তারা এ সত্যকে গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ এ পথকে তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতো। তারা বরঞ্চ যুব শ্রেণীকে বাধা দিয়ে বলতো, মূসা(আ ) এর নিকটবর্তী হয়ো না। নতুবা তোমরা নিজেরা ফেরাউনের রোষানলে পড়বে এবং আমাদের উপরেও বিপদ ডেকে আনবে।(সূরা আস সাজদা,টীকা-৩৬)

তাদের এ ধরনের আচরণের কারণ এ ছিল না যে, হযরত মূসা(আ ) যে একজন সত্যনিষ্ঠ এবং তাঁর দাওয়াতও সে সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত এ সম্পর্কে তাদের কণামাত্র সন্দেহ ছিল। বরঞ্চ কারণ এই যে, তারা এবং তাদের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বীগণ হযরত মূসা (আ ) এর সহযোগিতা করে ফেরাউনের নিষ্ঠুরতার শিকার হতে প্রস্তুত ছিল না। যদিও তারা বংশীয় ও ধর্মীয় দিক দিয়ে ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকুব এবং ইউসুফ (আ ) এর উম্মতভুক্ত ছিল এবং গোলামী জীবনের সৃষ্ট কাপুরুষতা তাদের মধ্যে এমন কোন শক্তিই অবশিষ্ট রাখেনি যে, তারা কুফর ও গোমরাহীর কর্তৃত্বের মুকাবিলায় ঈমান ও হেদায়েতের পতাকাবাহী নিজেরা হবে অথবা পতাকাবাহীর সহায়তা করবে।(সূরা আল আরাফ,টীকা-৮৬)প্রকাশ থাকে যে, অত্যাচার উৎপীড়নের একটা যুগ তখন চিল যখন হযরত মূসা (আ ) এর জন্মের পূর্বে দ্বিতীয় রামাসিস এর শাসনকাল ছিল। উৎপীড়নের দ্বিতীয় যুগ শুরু হয় ফেরাউন মিন ফিতাহ এর সময়ে হযরত মূসার আগমনের পরে। উভয় যুগে এ একই প্রথা ছিল যে, বনী ইসরাঈলের পুত্র সন্তান হত্যা করা হতো এবং কন্যা সন্তান জীবিত থাকতে দেয়া হতো।(সূরা ইউনুস,টীকা-৭৮)

হযরত মূসা(আ ) এবং ফেরাউনের এ দ্বন্দ্বে সাধারণ ইসরাঈলীদের ভূমিকা কি ছিল তা বাইবেলের নিম্নোক্ত পাঠ থেকে অনুমান করা যায়ঃ

যখন তারা (মূসা ও হারুন) ফেরাউনের নিকট থেকে বেরিয়ে এলেন তাঁরা দেখলেন যে তারা (ইসরাঈলীরা)তাঁদের সাক্ষাতের জন্যে রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। তারা বললো, খোদা তোমাদের উপর ইনসাফ করুন, তোমরা ফেরাউন ও তার অনুচরদের কাছে আমাদেরকে ঘৃণ্য বানিয়ে দিয়েছ এবং আমাদেরকে হত্যা করার জন্যে তার হাতে তরবারি তুলে দিয়েছ। যাত্রা পুস্তক ৬ঃ২০ – ২১।

তালমুদে বর্ণিত আছে যে, বনী ইসরাঈল মূসা (আ ) ও হারুন (আ ) কে বলতো আমাদের দৃষ্টান্ত তো এমন যে, একটি নেকড়ে ছাগল ধরেছে এবং রাখাল তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে। তারপর উভয়ের টানা হেঁচড়াতে ছাগল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। ঠিক এমনি তোমাদের এবং ফেরাউনের টানা হেঁচড়াতে আমরা শেষ হয়ে যাব।(সূরা ইউনুস,টীকা-৭৯)

মিসর থেকে বনী ইসরাঈলের হিজরত(হযরত মূসা(আ ) ফেরাউনের সামনে কোন কোন পদ্ধতিতে দাওয়াত পেশ করলেন, তাঁর প্রতি কি কি দোষারোপ করা হলো, তাঁর যুগে ফেরাউনীদের উপর কি কি সতর্কতামূলক শাস্তি নাযিল হলো, স্বয়ং ইসরাঈলীদের কি অবস্থা ছিল এতোসব বিস্তারিত আলোচনা বাদ দিয়ে আমরা ঐতিহাসিক গুরুত্বের এ দিকটা তুলে ধরছি যে, যেহেতু হযরত মূসা (আ ) এর দাওয়াতের জবাবে অস্বীকৃতিই জানিয়েছে সেজন্যে আল্লাহ তাআলার নির্দেশে হযরত মূসা (আ ) নবী ইসরাঈলের মুক্তির জন্যে হিজরতের পথ অবলম্বন করেন। -সংকলকদ্বয়

মূসার জাতির মরুজীবন

হযরত মূসা(আ ) এর বনী ইসরাঈলকে নিয়ে সিনেই উপদ্বীপে মারা, এলিয়াম ও রাফিদিমের পথ ধরে সিনাই পর্বতের দিকে এলেন। তারপর এক বছরের কিছু বেশী সময় সেখানে অবস্থান করেন।(বনী ইসরাঈলের মরুজীবনের কাহিনী অনেক দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে অলৌকিকভাবে তাদেরকে বিশেষ বিশেষ সম্পদে ভূষিত করা হয়। এ সময়ে তাদের অতীত গোলামি জীবনের নিদর্শন বিভ্ন্নি ভ্রান্ত আচরণের দ্বারা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তার সংশোধনের জন্যে হযরত মূসা (আ ) কঠোর পরিশ্রম করেন। এ দিক দিয়ে এ ছিল প্রশিক্ষণের যুগ। – সংকলকদ্বয়।এখানেই তাওরাতের অধিকাংশ নির্দেশাবলী তাঁর উপর নাযিল হয়।

ফিলিস্তিন আক্রমণের নির্দেশ

অতঃপর তাঁকে নির্দেশ দেয়া হয়, বনী ইসরাইলসহ ফিলিস্তিন জয় কর। এ তোমাদের উত্তরাধিকার ভুক্ত করা হয়েছে। অতএব হযরত মূসা (আ )বনী ইসরাইলসহ আবইর এবং হাসিরাতের পথ ধরে দাশতে ফারান পৌঁছেন। ফিলিস্তিনের অবস্থা যাঁচাই করার জন্যে তিনি এখান থেকে একটি প্রতিনিধি দল পাঠান। কাদেস নামক স্থানে এসে সে প্রতিনিধি দল তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। ইউশা এবং কালের ব্যতীত প্রতিনিধি দলের প্রতিবেদন ছিল নিরুৎসাহব্যঞ্জক যা শুনার পর বনী ইসরাঈল আর্তনাদ করে উঠে এবং ফিলিস্তিন অভিযানে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

শাস্তি হিসেবে মরু অঞ্চলে ইতস্ততঃ বিচরণের দ্বিতীয় যুগ

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত হলো যে, বনী ইসরাঈল চল্লিশ বছর পর্যন্ত এ অঞ্চলে দিগভ্রান্তের ন্যায় ঘুরে বেড়াবে এবং ইউশা ও কালের ব্যতীত তাদের বর্তমান বংশধর ফিলিস্তিনের মুখ দেখতে পাবে না। তারপর বনী ইসরাঈল দাশতে ফারান, শুর মরুভূমি ও দাশতে সীনের মধ্যে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে এবং আমালিক, আমুরী, আদুমী, মিদইয়ানী, মুওয়াবের অধিবাসী প্রভৃতির সাথে দ্বন্দ্ব কলহ করতে থাকে।

ফিলিস্তিন বিজয় ও তার পরবর্তী যুগ

ফিলিস্তিন বিজয়

চল্লিশ বছর অতীত হওয়ার কিছু পূর্বে হুর পর্বতে হযরত হারুন (আ ) ইন্তেকাল করেন। তারপর হযরত মূসা (আ ) বনী ইসরাইলসহ মোয়াব অঞ্চলে প্রবেশ করেন এবং ঐ গোটা অঞ্চল জয় করে হাসবুন ও শাতীম পর্যন্ত পৌঁছে যান। এখানে আবারিম পর্বতে হযরত মূসা (আ ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রথম খলীফা হযরত ইউশা পূর্বদিক থেকে জর্দান নদী পার হয়ে ইয়ারিহো বা আরিহা শহর জয় করেন। এ হলো ফিলিস্তিনের প্রথম শহর যা বনী ইসরাঈলের হস্তগত হয় তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই গোটা ফিলিস্তিন তাদের করতলগত হয়।(ফিলিস্তিন বিজয়ের পূর্বে বনী ইসরাঈল বিভ্ন্নি ফেতনায় লিপ্ত ছিল। বিজয়ের পর তাদের মধ্যে অনাচার দুষ্কৃতি মাথাচাড়া দেয়। এর পরিণামও তাদেরকে ভোগ করতে হয়।

বনী ইসরাঈলকে অধঃপতন থেকে রক্ষার জন্যে হযরত মুসা (আ ) এর সতর্কবাণী

সূরা ইবরাহীমের ৭ আয়াতে হযরত মূসা (আ ) এভাবে অসিয়ত করেনঃ এবং মনে রেখো, তোমাদের রব সাবধান করে দিয়েছিলেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হয়ে থাক তাহলে তোমাদেরকে বেশী বেশী সম্পদে ভূষিত করব, আর যদি আমার নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তাহলে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছে।(এ ধরনের অসিয়াতের প্রয়োজন এ জন্যে ছিল যে, বনী ইসরাঈল আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদে ভূষিত হওয়ার পর বার বার অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে। হযরত মূসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সংশোধনের চেষ্টা করেন এবং তাওবা করার প্রেরণা দেন। তাদের সম্পর্কে এরূপ সন্দেহ পোষণ করা অমূলক ছিল না যে, যদি তারা ফিলিস্তিনের বিজয় শীর্ষে উপনীত হয়, তাহলে শয়তান তাদেরকে সহজেই অবাধ্যতায় মগ্ন করে দিবে। এজন্যে আল্লাহর এ নীতির প্রতি তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয় যা সম্পদপ্রাপ্ত জাতির অবাধ্যতার আকারে কার্যকর হয়।–সংকলকদ্বয়)

এ বিষয়ের উপর প্রদত্ত ভাষণের বিস্তারিত ব্যাখ্যা বাইবেলে তাওরাতের পঞ্চম পুস্তকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। হযরত মূসা (আ ) তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তাঁর এ ভাষণে বনী ইসরাঈলকে তাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী স্মরণ করতে বলেন। তারপর যেসব নির্দেশাবলী তাঁর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলের জন্যে পাঠানো হয়, তাওরাত গ্রন্থ থেকে তিনি তার পুনরাবৃত্তি করেন। তারপর এক দীর্ঘ ভাষণ দান করেন। —- তাঁর ভাষণের কোন কোন অংশ অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ও শিক্ষণীয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ তার কিছু নিম্নে উদ্ধৃত করা হলোঃ

কিন্তু যদি তুমি আপন ঈশ্বর সদাপ্রভূর রবে কর্ণপাত না কর, আমি অদ্য তোমাকে যে সকল আজ্ঞা ও বিধি আদেশ করিতেছি, যত্নপূর্বক সেই সকল পালন না কর, তবে এ সমস্ত অভিশাপ তোমার প্রতি বর্তিবে ও তোমাকে আশ্রয় করিবে। তুমি নগরে শাপগ্রস্ত হইবে ও ক্ষেত্রে শাপগ্রস্ত হইবে। —— যে কোন কার্যে তুমি হস্তক্ষেপ করো, সেই কার্যে সদাপ্রভু তোমার উপর অভিশাপ, উদ্বেগ ও ভর্ৎসনা প্রেরণ করিবেন না। —- তুমি যে দেশ অধিকার করিতে যাইতেছ, সেই দেশ হইতে যাবৎ উচ্ছিন্ন না হও, তাবৎ সদাপ্রভু তোমাকে মহামারীর আশ্রয় করিবেন। —- তোমার মস্তকের উপরিস্থিত আকাশ পিত্তল ও নিম্নস্থিত ভূমি লৌহস্বরুপ হইবে। —- সদাপ্রভু তোমার শত্রুদের সম্মুখে তোমাকে পরাজিত করাইবেন, তুমি এক পথ দিয়ে তাহাদের বিরুদ্ধে যাইবে, কিন্তু সাত পথ দিয়া তাহাদের সম্মুখ হইতে পলায়ন করিবে। তোমার সাথে কন্যার বিবাহ হইবে, কিন্তু অন্য পুরুষ তাহার সহিত সংগম করিবে। তুমি গৃহ নির্মাণ করিবে, কিন্তু তাহাতে বাস করিতে পাইবে না,দ্রাক্ষাক্ষেত্র প্রস্তুত করিবে, কিন্তু তাহার ফল ভোগ করিবে না। তোমার গরু তোমার সম্মুখে জবাই হইবে, — সদাপ্রভু তোমার বিরুদ্ধে যে শত্রুগণকে পাঠাইবেন, তুমি ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, উলঙ্গতায় ও সকল বিষয়ের অভাব ভোগ করিতে করিতে তাহাদের দাসত্ব করিবে, এবং যে পর্যন্ত তিনি তোমার বিনাশ না করেন, সে পর্যন্ত  শত্রুরা তোমার গ্রীবাতে লৌহের জোয়াল দিয়া রাখিবে। — আর সদাপ্রভু তোমাকে পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত সমগ্র জাতির মধ্যে ছিন্ন ভিন্ন করিবেন।–(২৮ঃ১৫ -১৬)(সূরা তোয়াহা,টীকা,৫৩ -৫৪)

হযরত ইউশার সংশোধনী দাওয়াত

মিসর থেকে বেরিয়ে আসার সত্তর বছর পরে (যখন বনী ইসরাঈল পৌত্তলিক পূজায় লিপ্ত হয় সংকলক) হযরত মূসা (আ ) এর প্রথম খলীফা হযরত ইউশা বিন নূন জনসমাবেশে তাঁর শেষ ভাষণে যা কিছু বলেছিলেন তার থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মিসরের গোলামি জীবন যাপন বনী ইসরাঈলের মনমানসিকতা কতখানি বিকৃত করে দিয়েছিল। তাঁর ভাষণ ছিল নিম্নরুপঃ

অতএব এখন তোমরা সদাপ্রভুকে ভয় কর, সরলতায় ও সত্যে তাঁহার সেবা কর, আর তোমাদের পিতৃপুরুষেরা (ফুরাৎ) নদীর ওপারে ও মিসরে যে দেবগণের সেবা করিত, তাহাদিগকে দূর করিয়া দেও, এবং সদাপ্রভূর সেবা কর। যদি সদাপ্রভূর সেবা করা তোমাদের মন্দ বোধ হয়, তবে যাহার সেবা করিবে, তাহাকে অদ্য মনোনীত কর,—- কিন্তু আমি ও আমার পরিজন আমার সদাপ্রভূর সেবা করিব। – যিহোশূয়া ২৪ঃ ১৪ -১৫

এসব তেকে অনুমান হয় যে, চল্লিশ বছর পর্যন্ত মূসা (আ ) এর এবং আটাশ বছর পর্যন্ত হযরত ইউশার হেদায়াত ও তারবিয়তের অধীনে জীবন যাপন করার পরও এ জাতি তাদের মন মস্তিষ্ক তেকে ঐসব প্রভাব দূর করতে পারেনি, যা ফেরাউনের আনুগত্যের যুগে তাদের অস্থিমজ্জায় ছড়িয়ে পড়েছিল।(এ জাতির স্বভাব প্রকৃতির বক্রতা এবং কাপুরুষতা কুরআন পাকে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। মিসরে হযরত মূসা(আ )এর দাওয়াতে সাড়া দিতে অনীহা, মিসর থেকে মুক্তিলাভের পর পরই সামেরীর প্রভাবে গোবৎস পূজা, গরু জবাই করার জন্যে হযরত মূসা (আ ) আদেশ করলে তা আন্তরিকতার সাথে মেনে নেয়ার পরিবর্তে বার বার প্রশ্ন করা, সিনাই প্রান্তরে আল্লাহর নিয়ামত স্বরূপ বিনা মূল্যে মান্না ও সালওয়া লাভ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে শহরের পুরাতন খাদ্যের দাবী উত্থাপন, জিহাদের সময় হুকুম পালনে অস্বীকার, ইয়াওমে সাবতের নির্দেশাবলী লঙ্ঘন, আল্লাহর কিতাব বিকৃতকরণ, নবীগণের হত্যা ও তাঁদের প্রতি মিথ্যা দোষারোপে অর্থের বিনিময়ে জ্ঞানদান, সত্য গোপন করা, মোটকথা বনী ইসরাঈলের গোটা ইতিহাস এভাবে মসীলিপ্ত হয়ে আছে। -সংকলকদ্বয়

ফিলিস্তিন বিজয়ের পর

হযরত মূসা(আ ) এর মৃত্যুর পর যখন বনী ইসরাঈল ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে তখন সেখানে বিভিন্ন জাতির বাস ছিল। যেমন – হিন্ডি, আম্বুরী, কানআনী, হাবী, ইয়াবুসী, ফিলিস্তী প্রভৃতি। অতি নিকৃষ্ট ধরনের শিরক তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। —- সমগ্র খোদায়ী বহু দেব দেবীর মধ্যে বণ্টন করা ছিল। —– এসব দেব দেবীর প্রতি এমন সব ঘৃণ্য বিশেষণ ও কার্যকলাপ আরোপ করা হতো যে, নৈতিকতার দিক দিয়ে অতীব চরিত্রহীন লোকও তাদের সাথে পরিচিত হওয়া পছন্দ করতো না।—– তাদের সমাজে সন্তান বলী দেয়ার প্রথা সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল। তাদের উপাসনালয়গুলো ব্যভিচারের আড্ডায় পরিণত হয়েছিল। নারীদেরকে দেব দেবী বানিয়ে উপাসনালয়ে রাখা এবং তাদের সাথে ব্যভিচার করা  ইবাদাতের মধ্যে গণ্য করা হতো।

তাওরাতে হযরত মূসা(আ ) এর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে যেসব হেদায়াত দেয়া হয়েছিল, তাতে পরিষ্কার বলা হয়েছিল তারা যেন ঐসব জাতিকে ধ্বংস করে তাদের হাত থেকে ফিলিস্তিন ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের সাথে বসবাস করা থেকে ও তাদের নৈতিক ও বিশ্বাসমূলক দোষত্রুটি থেকে যেন দূরে থাকে।

কিন্তু বনী ইসরাঈল ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে এসব হেদায়েত ভুলে যায়। তারা তাদের কোন অখণ্ড রাষ্ট্র কায়েম করেনি। তারা গোত্রীয় গোঁড়ামিতে লিপ্ত ছিল। তাদের প্রত্যেক গোত্র বিজিত অঞ্চলের একটা অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যাওয়া পছন্দ করতো।(ফিলিস্তিনের ক্ষুদ্র ভূখণ্ড যেসব গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়েছিল তারা ছিলঃ বনী ইয়াদুহা, বনী শামউন, বনী দানী, বনী ইয়ামিন, বনী আফরায়েম, বনী রুবান, বনী জ্ঞাদ্দ, বনী মুনসা, বনী আশকার, বনী যেবুবুন, বনী নিফতালী, বনী আশের প্রভৃতি (গ্রন্থকারের গবেষণা)।

এভাবে পৃথক পৃথক হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের মধ্যে কোন গোত্রই এতোটা শক্তিশালী ছিল না যে, আপন আপন এলাকা মুশরিকদের থেকে পুরোপুরি পবিত্র রাখতে পারতো। অবশেষে তাদের সাথে মুশরিকদের সহাবস্থান তারা মেনে নিয়েছিল। এর প্রথম পরিণাম তাদের ভোগ করতে হয়েছিল এই যে ঐসব জাতির মাধ্যমে তাদের মধ্যে শিরক অনুপ্রবেশ করে এবং তার সাথে অন্যান্য নৈতিক জঞ্জাল আবর্জনার পথ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। (দ্বিতীয় পরিণাম যা তাদের ভোগ করতে হয়েছিল তাহলো এই যে, যেসব জাতির নগর রাষ্ট্র স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে রাখা হয়েছিল তারা এবং ফিলিস্তিগণ (যাদের সমগ্র অঞ্চল অপরাজিত ছিল) বনী ইসরাঈলের বিরুদ্ধে একটা জোট গঠন করে এবং বার বার আক্রমণ  পরিচালনা করে তাদেরকে বৃহৎ অংশ তেকে বেদখল করে দেয়। এমনকি তাদের নিকট থেকে খোদার শপথের সিন্দুক পর্যন্ত কেড়ে নেয়। অবশেষে বনী ইসরাঈল একজন শাসকের অধীনে একটা অখণ্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনবোধ করে। — এ অখণ্ড রাজ্যের তিনজন শাসক ছিলেন, হযরত তালূত, হযরত দাউদ (আ ) এবং হযরত সুলায়মান (আ )। এ শাসকগণ ঐসব কার্য সমাধা করেন যা মূসা (আ ) এর পর বনী ইসরাঈল অসম্পন্ন রেখেছিল।–গ্রন্থকার৪৩৭(সূরা ইবরাহীম,টীকা-১২)

বাইবেল থেকে জানা যায় যে, তালূতের যুগ পর্যন্ত সাইদা, সূর, দূর, মুজাদ্দা, বায়তে শাম, জাযার, জেরুশালেম প্রভৃতি শহরগুলো মুশরিকদের অধিকারে ছিল এবং বনী ইসরাঈলের উপরে এ শহরগুলোর পৌত্তলিক সভ্যতার বিরাট প্রভাব পড়তে থাকে। উপরন্তু, ইসরাঈলী গোত্রগুলোর সীমান্তে ফিলিস্তী, আদুমী, মোয়াবী এবং আমুনীদের রীতিমতো শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা পর পর আক্রমণ করে ইসরাঈলীদের নিকট থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা ছিনিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে বনী ইসরাঈলকে সেখান  থেকে কান ধরে বহিষ্কার করে দেয়া হতো যদি না যথাসময়ে আল্লাহ তাআলা তালুতের নেতৃত্বে ইসরাঈলীদেরকে একত্র করে দিতেন।(সূরা আল আরাফ,টীকা-৯৮)

বনী ইসরাঈলের  প্রথম বিপর্যয়ের যুগ

হযরত সুলায়মান (আ ) এর পর দুনিয়ার লোভ লালসায় ইসরাঈলীগণ ভয়ানকভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তারা পরস্পর যুদ্ধবিগ্রহ করে দুটি পৃথক রাজ্য কায়েম করে। উত্তর ফিলিস্তিন ও পূর্ব জর্দানে ইসরাঈল রাষ্ট্র কায়েম হয়। শেষ পর্যন্ত তার রাজধানী সামেরীয়া নির্ধারিত হয়।  দক্ষিণ ফিলিস্তিন ও আদুম অঞ্চলে ইয়াহুদিয়া রাষ্ট্র কায়েম হয়। জেরুশালেম তার রাজধানী হয়। এ দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দিন তেকেই চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দ্বন্দ্ব কলহ শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত চলতে থাকে।

তাদের মধ্যে ইসরাঈলী রাষ্ট্রের শাসক ও  অধিবাসী প্রতিবেশী জাতিগুলোর মুশরিকী ধারণা বিশ্বাস ও নৈতিক অনাচার দ্বারা সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়ে। —– হযরত ইলিয়াস এবং হযরত আল ইয়াসা আলাইহিমাস সালাম এ বন্যা প্রতিরোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু এ জাতি যে অধঃপতনের দিকে ছুটে চলেছিল তা থেকে আর ফিরে এলো না। অবশেষে আশিরিয়দের রূপে খোদার গযব ইসরাঈলীদের উপর এসে পড়ে এবং খৃষ্টপূর্ব নবম শতাব্দী পর্যন্ত ফিলিস্তিনের উপরে বিজয়ী আশিরিয়দের ক্রমাগত আক্রমণ চলতে থাকে।—–

ছশ বিশ খৃষ্টপূর্বে আশুরের নির্মম শাসক সারগুন সামেরিয়া জয় করে ইসরাঈল রাষ্ট্রের সমাপ্তি ঘটায়।

বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় যে রাষ্ট্রটি দক্ষিণ ফিলিস্তিনে ইয়াহুদিয়া নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাও হযরত সুলায়মান (আ ) এর পর অতি সত্বর শিরক ও চরিত্রহীনতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে।

যদিও ইসরাইলী রাষ্ট্রের ন্যায় তার উপরেও আশুরিয়াগণ ক্রমাগত আক্রমণ চালায়, তাদের শহর ধ্বংস করে এবং রাজধানী অবরোধ করে, তথাপি এ রাষ্ট্রটি আশুরিয়দের হাতে শেষ হয়ে যায়নি। শুধু করদ মিত্র হয়ে রয়েছিল। —- শেষে ৫৮৭ খৃষ্টপূর্বে বেবিলনের বাদশাহ বোখত নসর এক ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে  ইয়াহুদিয়ার ছোটো বড়ো সকল শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। সে জেরুশালেম এবং হায়কালে সুলায়মানি এমনভাবে ধূলিসাৎ করে দেয় যে, তার কোন একটি দেয়ালও দাঁড়িয়ে  থাকতে পারেনি। ইহুদীদের বহু সংখ্যক লোককে তাদের অঞ্চল থেকে বহিষ্কৃত করে বিভিন্ন দেশে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।(সূরা ইসরা,টীকা-৭)

আল্লাহর পক্ষ থেকে আর একটি সুযোগ দান

আশুরিয়দের বিজয়ের পর সামেরিয়া ও ইসরাঈলের লোকজন ঈমান আকীদা ও নৈতিকতার চরম অধঃপতন থেকে আর মাথা তুলতে পারেনি। কিন্তু ইয়াহুদিয়া বাসীদের এমন কিছু সংখ্যক লোকও রয়ে গিয়েছিল। ইয়াহুদিয়ার মধ্যে যারা অবশিষ্ট ছিল, তাদের মধ্যে তারা সংস্কার সংশোধনের কাজ করতে থাকে। বেবিলন এবং অন্যান্য অঞ্চলে যাদেরকে নির্বাসিত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে তাওবা করার প্রেরণা দান করে।অতঃপর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ তাদের সহায়ক হয়। বেবিলন রাষ্ট্রের পতন হয়। খৃষ্টপূর্ব ৫৩১ সনে ইরানী দিগ্বিজয়ী সাইরাস(খুরস অথবা খসরু) বেবিলন অধিকার করে। তার দ্বিতীয় বছর সে এই বলে এক ফরমান জারী করে যে, ইসরাঈলীগণকে আপন দেশে প্রত্যাবর্তন করার এবং সেখানে পুনর্বাসিত হওয়ার অনুমতি দেয়া হলো।

সাইরাস হায়কালে সুলায়মানী পুনর্নির্মাণের জন্যে ইহুদীদেরকে অনুমতি ধেয়। কিন্তু যে সকল প্রতিবেশী গোত্র ঐ অঞ্চলে বসতিস্থাপন করেছিল তারা কিছুকাল যাবত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে থাকে। অবশেষে প্রথম দারিউস (দারা) ৫২২ খৃষ্টপূর্বে ইয়াহুদিয়ার  সর্বশেষ বাদশাহর পৌত্র যরুবাবেলকে ইয়াহুদিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করে। সে হাজ্জী নবী, যাকারিয়া নবী এবং পুরোহিত প্রধান ইশর তত্ত্বাবধানে পবিত্র হায়কাল পুনর্নির্মাণ করে।

এ সময় ওযায়ের (আ ) হযরত মূসা (আ ) এর দীনের পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্যে বিরাট কাজ করেন। তিনি ইহুদী জাতির সকল সৎ ও কল্যাণকারী লোকদেরকে সকল স্থান থেকে একত্র করে এক সুদৃঢ় সংগঠন কায়েম করেন। তিনি তাওরাতসহ বাইবেলের পুস্তকসমূহ সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। ইহুদীদের দীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। শরীয়াতের আইন জারী করে সেসব মানসিক ও নৈতিক দোষত্রুটি সংশোধন করা শুরু করেন যা ভিন্ন জাতির প্রভাবে ইসরাঈলীদের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। ইহুদীরা যেসব মুশরিক নারীদেরকে বিবাহ করেছিল তাদেরকে তালাক দেয়ানো হলো। বনী ইসরাঈলের নিকট থেকে নতুন করে আল্লাহর বন্দেগী ও তাঁর আইন মেনে চলার শপথ নেয়া হলো।দেড়শ বছর পর বায়তুল মাকদিস নতুন করে বসতিপূর্ণ হলো এবং ইহুদী ধর্ম ও সভ্যতার কেন্দ্র হয়ে পড়লো।

গ্রীক আধিপত্য ও মাক্কাবী আন্দোলন

তৃতীয় এন্টিকাস খৃষ্টপূর্ব ৯৮ সনে ফিলিস্তিন অধিকার করেন।সে ছিল সলুকীরাজ্যের শাসক এবং তার রাজধানী ছিল এন্তাকিয়া। এ গ্রীক দিগ্বিজয়ী ধর্মীয় দিক দিয়ে মুশরিক ছিল এবং ছিল স্বেচ্ছাচারী। সে ইহুদী ধর্ম ও সভ্যতা সংস্কৃতি সহ্য করতো না। তার মুকাবিলায় সে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক  চাপ সৃষ্টি করে গ্রীক সভ্যতার প্রসার শুরু করে এবং স্বয়ং ইহুদীদের মধ্য থেকে একটা বিরাট অংশ তার ক্রীড়ানক হয়ে পড়ে। বাইরের এ হস্তক্ষেপ ইহুদী জাতির মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে। একদল গ্রীক পোশাক পরিচ্ছদ, ভাষা, সমাজব্যবস্থা ও গ্রীক খেলাধুলা আয়ত্ত করে ফেলে এবং অপর দল আপন সভ্যতার উপর অটল থাকে।

খৃষ্টপূর্ব ১৫৭ সনে চতুর্থ এণ্টিউকাস (যার উপাধি ছিল এপিফনিস অর্থাৎ খোদার প্রকাশ) যখন সিংহাসনে  আরোহণ করে, তখন স্বৈরাচারী শক্তি প্রয়োগ করে ইহুদী ধর্ম ও সভ্যতার মূলোৎপাটন করেত চায়( যেসব বিস্তারিত নির্দেশ জারী করে ইহুদীদের সাধারণ ধর্ম  বিশ্বাস, পূজা উপাসনা, ধর্মীয় নিদর্শনাবলী এবং সমাজব্যবস্থার মূল নীতিকে লক্ষ্য বানানো হয়েছিল তার উল্লেখ এখানে করা হয়নি) —— কিন্তু ইহুদীরা এ স্বৈরাচারের নিকট নতি স্বীকার করে না। বরঞ্চ তাদের মধ্যে এক বিরাট আন্দোলন শুরু হয় ইতিহাসে যা মাক্কাবী বিদ্রোহ বলে প্রসিদ্ধ। যদিও গ্রীক প্রভাবিত ইহুদীরা গ্রীকদের প্রতিই সহানুভূতি প্রদর্শন করে এবং মাক্কাবী বিদ্রোহ দমনে এন্তাকীয়ার যালেমদের সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করে, কিন্তু সাধারণ ইহুদীদের মধ্যে  হযরত ওযায়ের দীনদারীর যে প্রাণশক্তি সঞ্চার করেন তা এতটা প্রবল ছিল যে, তারা সকলে মক্কাবাসীদের দলে যোগদান করে। অবশেষে তারা গ্রীকদেরকে বহিষ্কার করে তাদের ধর্মীয় রাষ্ট্র কায়েম করে। এ রাষ্ট্র খৃষ্টপূর্ব ৬৭ সাল পর্যন্ত কায়েম থাকে। এ রাষ্ট্রের সীমা সম্প্রসারিত হয়ে ঐ সমগ্র অঞ্চলকে আয়ত্তাধীন করে যা এক সময়ে ইয়াহুদিয়া এবং ইসরাঈল রাষ্ট্রদ্বয়ের অধীন ছিল। উপরন্তু ফিলিস্তিয়ারও একটা বিরাট অংশ তাদের হস্তগত হয় যা হযরত দাউদ (আ ) এর সময়েও আয়ত্তে আনা যায়নি।(সূরা ইসরা,টীকা-৭)

দ্বিতীয় বিপর্যয় ও তার পরিণাম

যে দীনী ও নৈতিক প্রেরণাসহ মাক্কাবী আন্দোলন চলেছিল, তা ক্রমশ ধ্বংস হতে থাকে। দীনী প্রেরণা, দুনিয়ার লোভ লালসা ও প্রাণহীন বাহ্যিক অনুষ্ঠানাদিতে পর্যবসিত হয়। অবশেষে তাদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি হয় এবং তারা রোমীয় দিগ্বিজয়ী পাস্পীকে ফিলিস্তিন আগমনের আহবান জানায়। অতএব পাস্পী খৃষ্টপূর্ব ৬৩ সনে ফিলিস্তিন বিজয়ে মনোনিবেশ করে এবং বায়তুল মাকদিস অধিকার করে ইহুদীদের স্বাধীনতা বিনষ্ট করে। কিন্তু রোমীয় দিগ্বিজয়ীদের স্থায়ী নীতি এ ছিল যে, তারা বিজিত অঞ্চলে সরাসরি শাসন পরিচালনা করার পরিবর্তে স্থানীয় শাসক নিযুক্ত করে তার দ্বারা আপন কার্যসিদ্ধি করাকেই বেশী পসন্দ করতো। এজন্যে সে ফিলিস্তিনে আপন কর্তৃত্বাধীন একটি স্বদেশীয় রাষ্ট্র কায়েম করে। অবশেষে এ রাষ্ট্রটি খৃষ্টপূর্ব ৪০ সালে হিরো নামীয় একজন চতুর ইহুদীর অধিকারে আসে। সে হিরোদ দি গ্রেট নামে প্রসিদ্ধ ছিল। —– সে একদিকে ধর্মীয় নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে ইহুদীদের সন্তুষ্ট রাখে এবং অন্যদিকে রোমীয় সভ্যতার প্রসার ঘটিয়ে এবং রোম সাম্রাজ্যের আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে কায়সারকে সন্তুষ্ট রাখে। সে সময়ে ইহুদীদের ধর্মীয় ও নৈতিক অধঃপতন চরমে পৌঁছে।

একচল্লিশ খৃষ্টাব্দে হিরোদ দি গ্রেটের পৌত্র হিরোদ আগ্রিয়াপ্পাকে রোমীয়গণ ঐ সকল এলাকার শাসক নিযুক্ত করে যা হিরোদ দি গ্রেটের শাসনাধীন ছিল। হিরোদ আগ্রিয়াপ্পা ক্ষমতা লাভের পর হযরত মাসিহ (আ ) এর অনুসারীদের উপর চরম নির্যাতন চালায়।

সে যুগে ইহুদী ধর্মীয় নেতাদের যে অবস্থা ছিল তার সঠিক ধারণা লাভ করতে হলে হযরত ঈসা (আ ) তাঁর ভাষণে তাদের যে সমালোচনা করেন তা জানা দরকার।

এ জাতির চোখের সামনে হযরত ইয়াহইয়া(আ ) এর মতো একজন নিষ্কলুষ চরিত্রবান লোকের শিরশ্ছেদ করা হয়। কিন্তু এ পৈশাচিকতার বিরুদ্ধে তারা কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। তারপর সমগ্র জাতি হযরত ঈসা (আ ) এর মৃত্যুদণ্ড দাবী করে। —- এমন কি যখন পণ্টিস পিলাতিস এ হতভাগ্য লোকদেরকে জিজ্ঞেস করেন  —– বল, ঈসাকে ছেড়ে দেব, না বরাব্বা ডাকাতকে? সমগ্র জনতা এক বাক্যে বলে, বরাব্বাকে ছেড়ে দিন। এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এ জাতির প্রতি সকল যুক্তি প্রমানের চূড়ান্ত পরিণতি।

তারপর অল্পকাল অতীত হতে না হতেই ইহুদী ও রোমীয়দের মধ্যে চরম সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৬৪ ও ১৬৬ খৃষ্টাব্দের মাঝামাঝি ইহুদীরা প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে।——

অবশেষে রোম সাম্রাজ্য কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিদ্রোহ গমন করে এবং ৭০ খৃষ্টাব্দে টিটাস বলপ্রয়োগে জেরুশালেম জয় করে। এ সময়ে গণহত্যায় এক লক্ষ তেত্রিশ হাজার লোক নিহত হয়। ছিয়াত্তর হাজারকে বন্দী করে দাসে পরিণত করা হয়। হাজার হাজার লোককে বলপূর্বক মিসরীয় খনিতে কাজের জন্যে পাঠানো হয়। বিভিন্ন শহরে এম্পিথিয়েটার ও কারোসিয়ামে হিংস্র পশুদের মুখে ঠেলে দেয়ার জন্যে অথবা তরবারির খেলার শিকারে পরিণত করার জন্যে হাজার হাজার লোককে ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘদেহী সুন্দরী বালিকাদেরকে বিজয়ীদের জন্যে বেছে নেয়া হয়। জেরুশালেম শহর ও হায়কাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। তারপর ফিলিস্তিনে ইহুদী প্রভাব এমনভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় যে দু হাজার বছর ধরে তাদের আর মাথা তুলবার সুযোগ হয়নি।(সূরা ইসরা,টীকা-৭)

তাওরাতের মধ্যে রদবদল(তাওরাতে কালামে ইলাহীর মধ্যে ইহুদী ধর্মপ্রচারক, ভাষ্যকার, বক্তা ও শাস্ত্রবিদগণ যেসব পরিবর্তন পরিবর্ধন নিজেদের পক্ষ থেকে সংযোজন করেছে, তার থেকে ইহুদীবাদের কাঠামো তৈরী হয়েছে।– সংকলকদ্বয়

তাওরাতের পঞ্চম পুস্তকে হযরত মুসা (আ ) এর যে সর্বশেষ ভাষণ উদ্ধৃত হয়েছে তাতে বার বার বনী ইসরাঈলের নিকট থেকে নিম্নোক্ত শপথ গ্রহণ করা হয়ঃ

যেসব নির্দেশ আমি তোমাদের নিকটে পৌঁছিয়েছি, তা হৃদয়ে বদ্ধমূল করে নাও, ভবিষ্যৎ বংশধরকে তা শিক্ষা দাও, উঠতে বসতে, শয়নে স্বপনে তার চর্চা কর, ঘরের চৌকাঠে সেসব লিখে রাখ।

অতঃপর তিনি তাঁর অসিয়তে এ কথা বলেন, ফিলিস্তিন সীমান্তে প্রবেশ করার পর তোমাদের প্রথম কাজ হবে আয়বাল পর্বতের উপর বড়ো বড়ো পাথর স্থাপন করে তার উপর তাওরাতের নির্দেশাবলী খোদাই করা।

উপরন্তু হযরত মূসা(আ ) বনী লাবীকে একখণ্ড তাওরাত দিয়ে নির্দেশ দেন, সাত বছর পর পর খাইয়ামের ঈদের দিনে নারী পুরুষ, শিশু নির্বিশেষে সকলকে স্থানে স্থানে একত্র করে সমস্ত কেতাব (তাওরাত) প্রতিটি শব্দে শব্দে তাদেরকে যেন তারা শুনিয়ে দেয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আল্লাহর কিতাবের প্রতি বনী ইসরাঈলের অনীহা ক্রমশ এতোটা বেড়ে গেল যে, হযরত মূসা (আ ) এর সাতশ বচর পর হায়কালে সুলায়মানীর উত্তরাধিকারী ও জেরুশালেমের ইহুদী শাসকের জানাই ছিল না যে, তাওরাত নামে কোন কিতাব তাদের কাছে রয়েছে।

ইহুদী আলেমদের সবচেয়ে বড়ো দোষ এ ছিল যে, আল্লাহর কিতাবের জ্ঞান বিতরণের পরিবর্তে তাকে রিব্বী ও ধর্মীয় ব্যবসায়ীদের এক বিশেষ শ্রেণীর মধ্যে গোপন রেখেছিল এবং সাধারণ মানুষ তো দুরের কথা স্বয়ং ইহুদী জনসাধারণের স্পর্শ থেকেও তা দূরে রেখেছিল।তারপর যখন সর্বসাধারণের অজ্ঞতার কারণে তাদের মধ্যে অনাচার প্রসার লাভ করতে থাকে, তখন আলেমগণ শুধু যে তাদের সংস্কার সংশোধনের চেষ্টাই করলো না তাই নয়, বরঞ্চ জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে যে গোমরাহী ও বেদয়াত জনগণের মধ্যে প্রচলিত হতো, কথা ও কাজের দ্বারা অথবা নীরব ভূমিকা পালনের দ্বারা তার বৈধতার সনদ দান করতো।(সূরা ইসরা,টীকা-৯)

তার শুধু কালামে ইলাহীর অর্থই নিজেদের ইচ্ছা মতো পরিবর্তন করেনি, বরঞ্চ বাইবেলে নিজেদের ভাষ্য, জাতীয় ইতিহাস, কুসংস্কার ও আন্দাজ অনুমান, কাল্পনিক দর্শন এবং নিজেদের চিন্তা ভাবনা প্রসূত আইন কানুন কালামে ইলাহীর সাথে মিশ্রিত করে ফেলে।(কুরআনের ভাষায় ইহুদী পণ্ডিতদের অবস্থা নিম্নরূপ ছিলঃ অধিকাংশ ইহুদী আলিম,পীর, দরবেশ মানুষের ধন সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ করতো এবং তাদেরকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে রাখতো- (সূরা তাওবাঃ৩৪)।যালেমরা ফতোয়া বিক্রি করতো, ঘুষ খেতো, নযর নিয়ায লুট করতো, এমন সব ধর্মীয় রীতিনীতি আবিষ্কার করতো যাতে মানুষ তাদের যুক্তি তাদের কাছ থেকে খরিদ করতে পারে। এবং তাদের জীবন মরণ, বিয়ে শাদী কিছুই তাদেরকে খুশী না করে হতে পারতো না এবং তাদের ভাগ্য নির্ণয়ের ঠিকাদার তাদেরকেই মনে করতো। শুধু তাই ই নয়, বরঞ্চ আপন স্বার্থের জন্যে এ ধর্ম ব্যবসায়ীরা মানুষকে পথ ভ্রষ্টতার জালে আবদ্ধ করতো। যদি কোন সত্যের আওয়াজ উঠতো, তাহলে তারা সকলের আগে তাদের প্রতারণার জাল বিস্তার করে তাদের পথ রুদ্ধ করার জন্যে বদ্ধপরিকর হতো।)এসব কিছু মানুষের সামনে এভাবে পেশ করতো যেন এ সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। প্রত্যেক ঐতিহাসিক দর্শন, প্রত্যেক ভাষ্যকারের ব্যাখ্যা, প্রত্যেক দার্শনিক পণ্ডিতের আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণা বিশ্বাস এবং প্রত্যেক শাস্ত্রবিদের আইনসংক্রান্ত গবেষণা বাইবেলে স্থান লাভ করেছে এবং এসব আল্লাহর বাণীতে(Word of God)পরিণত হয়েছে। তার উপরে ঈমান আনা অপরিহার্য এবং তার থেকে মুখ ফেরানোর অর্থ হলো দ্বীন তেকে মুখ ফেরানো।

আমাদের জানা মতে ওল্ড টেস্টামেন্টের পঞ্চম পুস্তক (Pentateuch)প্রকৃত তাওরাত নংয়। প্রকৃত তাওরাত দুনিয়ার বুক থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। এ মতবাদের সমর্থন স্বয়ং ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকেই পাওয়া যায়। তার থেকে আমরা জানতে পারি যে, হযরত মূসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ জীবনে হযরত ইউশার সাহায্যে তাওরাত সংকলন করে একটি সিন্দুকে রেখে দেন (আদি পুস্তক ৩১ঃ২৪ -২৭)। তাঁর ইন্তেকালের পর খৃষ্ট পূর্ব ষাট শতাব্দীতে যখন। বখত নসর বায়তুল মাকদিসে আগুন লাগিয়ে দেয় তখন হযরত মূসা (আ ) এর পরে তাঁর শরীয়তের মুজাদ্দিদগণ যেসব বই পুস্তক প্রণয়ন করেন সেগুলো সমেত সে পবিত্র সিন্দুকও পুড়ে যায়। এ ধ্বংসকাণ্ডের দুশ আড়াইশ বছর পর হযরত ওযায়ের (আ ) স্বয়ং বাইবেলের বর্ণনামতে বনী ইসরাঈলের পাদ্রী পুরোহিতদের সাথে মিলে আসমানী ইলহামের সাহায্যে এ গ্রন্থ নতুন করে প্রণয়ন করেন। কিন্তু কালচক্র এ নতুন প্রণীত গ্রন্থকেও তার প্রকৃত অবস্থায় থাকতে দেয়নি। আলেকজান্ডার দি গ্রেট এর বিশ্বজনীন দিগ্বিজয়ের প্লাবন যখন গ্রীক সাম্রাজ্যের সাথে জ্ঞান বিজ্ঞান ও সাহিত্যসহ মধ্যপ্রাচ্যে সম্প্রসারিত হয়, তখন খৃষ্টপূর্ব ২৮০ সালে তাওরাতের সকল গ্রন্থ গ্রীক ভাষায় ভাষান্তরিত হয়। তারপর ক্রমশ ইবরানী অনুলিপিগুলো পরিত্যক্ত হয় এবং গ্রীক অনুবাদ প্রচলিত হয়ে পড়ে। অতএব আজকাল আমাদের সামনে যে তাওরাত রয়েছে তার সনদ কিছুতেই হযরত মূসা (আ ) পর্যন্ত পৌঁছে না। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে, বর্তমান তাওরাতের মধ্যে প্রকৃত তাওরাতের কোন অংশই শামিল নেই অথবা এ একবারেই জাল। আসলে যা কিছু আমরা বলতে চাই তাহলো এই যে, এ তাওরাতে আসল তাওরাতের সাথে আরও অনেক কিছু আমরা বলতে চাই তাহলো এই যে, এ তাওরাতে আসল তাওরাতের সাথে আরও অনেক কিছু সংমিশ্রিত হয়েছে। আর এটাও অসম্ভব নয় যে, আসল তাওরাতের বহু কিছু এতে সন্নিবেশিত করা হয়নি। আজ যদি কেউ গভীর অন্তর্দৃষ্টি সহকারে এ গ্রন্থ অধ্যয়ন করে তাহলে সে সুস্পষ্টভাবে অনুভব করবে যে, এ গ্রন্থে আল্লাহর বাণীর সাথে ইহুদী পণ্ডিতদের ভাষ্য, বনী ইসরাঈলের জাতীয় ইতিহাস, ইসরাঈলী শাস্ত্রবিদগণের আইন সংক্রান্ত গবেষণা এবং অন্যান্য বহু কিছু এমনভাবে সংমিশ্রিত হয়ে আছে যে, যার থেকে বেছে আল্লাহর বাণী আলাদা করে দেখানো বড়োই কঠিন ব্যাপার। আছে যে, যার থেকে বেছে আল্লাহর বাণী আলাদা করে দেখানো বড়োই কঠিন ব্যাপার।

এই সাথে আমরা একথাও সুস্পষ্ট করে দিতে চাই যে, কুরআনের দৃষ্টিতে তাওরাতের দীন এই ছিল যা কুরআনের দীন, আর মুহাম্মদ(সা) যেমন ইসলামের নবী, ঠিক হযরত মূসা (আ ) ও ছিলেন ইসলামের নবী। বনী ইসরাঈল সূচনাতে এ দীনেরই অনুসারী ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তারা আসল দীনের মধ্যে আপন প্রবৃত্তি অনুযায়ী অনেক কমবেশি করে ইহুদীবাদের নামে এক নতুন ধর্মীয় ব্যবস্থা রচনা করে নিয়েছে।(অর্থাৎ বর্তমান তাওরাত হযরত মূসা(আ ) এর আনিত ইসলামের নয়, বরঞ্চ ঐ দীন ইসলামের বিকৃত রূপ ইহুদীবাদের বহিঃপ্রকাশ। -সংকলকদ্বয়)(সূরা আল বাকারা,টীকা -১৬)

প্রকৃতপক্ষে তাওরাত বলতে ঐসব নির্দেশাবলী বুঝায় যা হযরত মূসা(আ ) এর নবুয়াতের পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তাঁর উপর নাযিল হয়। তাঁর মধ্যে দশটি নির্দেশনামা তো এমন ছিল যা প্রস্তর ফলকে খোদিত করে তাঁকে দেয়া হয়। অবশিষ্ট নির্দেশাবলী হযরত মূসা (আ ) লিখিয়ে নিয়ে তার বারোটি অনুলিপি করে বনী ইসরাঈলের বারোটি গোত্রের মধ্যে বণ্টন করে দেয়। একটা অনুলিপি বনী লাবীকেও দেয়া হয়, যাতে করে তারা তার সংরক্ষণ করতে পারে। এ গ্রন্থের নামই হচ্ছে তাওরাত। এ একটা স্থায়ী গ্রন্থ হিসেবে বায়তুল মাকদিসের প্রথম ধ্বংসকাল পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিল। তার যে অনুলিপি বনী লাবীকে দেয়া হয়, তা প্রস্তর ফলকসহ শপথের সিন্দুকে রাখা হয়। বনী ইসরাঈল  একে তাওরাত বলেই জানতো। এর প্রতি তাদের অবহেলা এতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে, ইয়াহুদিয়ার বাদশাহ ইউসিয়ার শাসনকালে যখন হায়কালে সুলায়মানীর মেরামত করা হয়, তখন হঠাৎ পুরোহিত প্রধান (অর্থাৎ হায়কালের স্থলাভিষিক্ত এবং জাতির প্রধানতম ধর্মীয় নেতা) একস্থানে রক্ষিত তাওরাত গ্রন্থ দেখতে পায়। সে তাকে একটা বিস্ময়কর বস্তু মনে করে শাহী মুন্সীকে দিয়ে দেয়। মুন্সী আবার তা বাদশাহের সামনে এমনভাবে উপস্থাপিত করে যেন একটা বিস্ময়কর কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে। এই হলো কারণ যে, যখন বখত নসর জেরুশালেম জয় করে এবং হায়কালসহ গোটা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, তখন বনী ইসরাঈলের বিস্মৃত আসল তাওরাত গ্রন্থ যার সংখ্যায় ছিল অতি অল্প, চিরদিনের জন্যে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তারপর হযরত ওযায়েরের সময়ে বনী ইসরাঈলের অবশিষ্ট লোকজন বেবিলনের বন্দিজীবন তেকে মুক্ত হয়ে জেরুশালেমে প্রত্যাবর্তন করে এবং বায়তুল মাকদিস পুনর্নির্মাণ করা হয়, তখন ওযায়ের জাতির কতিপয় প্রবীণদের সহায়তায় বনী ইসরাঈলের গোটা ইতিহাস প্রণয়ন করেন। এসব এখন বাইবেলের প্রথম সতেরটি পুস্তকে সন্নিবেশিত রয়েছে। এ ইতিহাসের চারটি অধ্যায়ে (অর্থাৎ দ্বিতীয় পুস্তক(Expdus),তৃতীয় পুস্তক (Leviticus),চতুর্থ পুস্তক (Number)এবং পঞ্চম পুস্তক (Deuteronomy)হযরত মূসা (আ ) এর জীবন চরিত্র বর্ণনা করা হয়েছে এবং তাওরাতের সে সকল বাণী হযরত ওযায়ের এবংয় তাঁর সহযোগী প্রবীণদের হস্তগত হয় সেগুলোও অবতীর্ণ হওয়ার ইতিহাসের ক্রমানুসারে এ জীবন চরিত্রের যথাস্থানে সন্নিবেশিত করা হয়। এখন মূসা (আ ) এর জীবন চরিতের মধ্যে তাওরাতের যে অংশগুলো বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে তারই সমষ্টির নাম তাওরাত। সেগুলো চিনবার নিদর্শন এই যে ইতিহাস বর্ণনাকালে যেখানে জীবন চরিত্র লেখক বলেছেন, খোদা মূসা (আ )কে একথা বলেন অথবা মূসা (আ ) বলেন, তোমাদের খোদা একথা বলেন, সেখান থেকে তাওরাতের একটা অংশ শুরু হচ্ছে। যেখানে আবার জীবন চরিত্রের প্রসঙ্গ শুরু হচ্ছে, সেখানে তাওরাতের অংশ শুরু হচ্ছে। যেখানে আবার জীবন চরিতের প্রসঙ্গ শুরু হচ্ছে, সেখানে তাওরাতের অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে, মাঝখানে যেখানে বাইবেল প্রণেতা ভাষ্য ও ব্যাখ্যা হিসেবে যা কিছু সংযোজন করেছেন, তা সাধারণ মানুষের নির্ণয় করা বড়ো কঠিন যে, তা কি আসল তাওরাতের কোন অংশ বিশেষ, না তার ব্যাখ্যা ও ভাষ্য।এ বিকৃত তাওরাতই ইহুদীবাদের উৎস। কিন্তু শিক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, ইহুদীরা তাওরাতকে তার যেরূপ ও আকৃতিতেই মানতো, সেরূপে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার তারা কোন দিনই চেষ্টা করেনি। আর না তারা নিষ্ঠার সাথে তার নির্দেশাবলীর প্রচার করেছে এবং না সেগুলো কার্যকর করেছে। এজন্যেই কুরআন প্রশ্ন তুলেছিল। (আরবী *****) (সূরা আল বাকারা,টীকা-৯০)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.