সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

নবী মুহাম্মাদ (সা) এর আগমনের সময় ইহুদীদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা

আরবের ইহুদীদের নির্ভরযোগ্য ইতিহাস নেই

আরবের ইহুদীদের কোন নির্ভরযোগ্য ইতিহাস দুনিয়ার কোথাও বিদ্যমান নেই। তারা কোন পুস্তকে অথবা কোন শিলালিপিতে তাদের এমন কোন বিবরণ লিখে যায়নি, যার থেকে তাদের অতীতের উপর আলোকপাত করা যায়। আরবের বাইরের কোন ইহুদী ঐতিহাসিক এবং গ্রন্থকারও তাদের কোন উল্লেখ করেনি। যে জন্যে বলা হয় যে, তারা আরব ভূমিতে আগমন করে তাদের জাতির লোকদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যার ফলে দুনিয়ার ইহুদীগণ তাদেরকে কিছুতেই নিজেদের মধ্যে গণ্য করতো না। কারণ তারা ইবরানী ভাষা, সভ্যতা এবং নাম পর্যন্ত পরিত্যাগ করে আবর্ত অবলম্বন করেছিল। হেজাজের ধ্বংসাবশেষে যেসব শিলালিপি পাওয়া যায়, তাতে খৃষ্টীয় প্রথম শতাব্দীর পূর্বেকার ইহুদীদের কোন চিহ্নই পাওয়া যায়না বরং পাওয়া যায় কিছু ইহুদী নাম মাত্র। এজন্যে আরববাসীদের মধ্যে যেসব কিংবদন্তী প্রচলিত ছিল আরবের ইহুদীদের ইতিহাসের অধিকাংশ তার উপরেই নির্ভরশীল এবং তার এটা অংশ ইহুদীদের দ্বারা প্রচারিত।

হেজাজের ইহুদীদের দাবী ছিল যে, সর্বপ্রথম তারা হযরত মূসা (আ ) এর শেষ যুগে এখানে এসে বসতি স্থাপন করে। তাদের ঘটনা তারা এভাবে বর্ণনা করে যে, হযরত মূসা (আ ) ইয়াসরিব থেকে আমালিকাদের বহিষ্কার করার জন্যে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। তাদের প্রতি এ নির্দেশও ছিল ডে, তারা যেন সে জাতির একটি লোকও জীবিত না রাখে। বনী ইসরাঈলের ঐ সৈন্যদল এখানে এসে নবীর আদেশ কার্যকর করে। কিন্তু আমালিকার বাদশাহের এক যুবক পুত্র বড়ো সুদর্শন ছিল। তাকে তারা জীবিত রাখে এবং তাকে নিয়ে ফিলিস্তিন প্রত্যাবর্তন করে। সে সময়ে হযরত মূসা (আ ) এর ইন্তেকাল হয়েছিল। তাঁর স্থলাভিষিক্ত যাঁরা ছিলেন, তাঁরা এর কঠোর সমালোচনা করে বলেন যে, একজন আমালিকাকে জীবিত রাখা নবীর ফরমান ও শরীয়তের নির্দেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ কারণে তাঁরা সে সৈন্যদেরকে তাঁদের দল থেকে বহিষ্কার করে দেন এবং তাদেরকে ইয়াসরিব ফিরে এসে এখানেই বসবাস করতে হয়। -কিতাবুল আগানী খন্ড১৯, পৃঃ৯৪।

এভাবে ইহুদীদের দাবী ছিল এই যে, তারা হযরত ঈসা (আ ) এর বারো শত বছর পূর্বে এখানে বসতি স্থাপন করে। কিন্তু এর কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। সম্ভবত ইহুদীরা এ কাহিনী এজন্যে রচনা করে য, এর দ্বারা তারা প্রাচীন সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত বলে আরববাসীদের উপর প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করবে।

ইহুদীদের নিজেদের বিবরণ অনুযায়ী তাদের দ্বিতীয় হিজরত সংঘটিত হয়েছিল খৃষ্টপূর্ব ৫৮৭ সালে, যখন বেবিলনের বাদশাহ বখত নসর বায়তুল মাকদিস ধ্বংস করে ইহুদীদেরকে সারা দুনিয়ায় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছিল। আরবের ইহুদীরা বলতো যে, সে সময়ে তাদের বিভিন্ন গোত্র আরবভূমিতে আগমন করে ওয়াদিউল কুরা, তাইমা এবং ইয়াসরিবে বসতিস্থাপন করে (ফতুহুল বুলদান-বালাযুরী)। কিন্তু এরও কো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। সম্ভবত এর দ্বারাও তারা তাদের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করতে চাইতো।

প্রকৃতপক্ষে প্রমাণিত সত্য এই যে, ৭৭ খৃষ্টাব্দে রোমীয়গণ যখন ফিলিস্তিনে ইহুদীদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করে এবং তারপর ১০২ খৃষ্টাব্দে তাদেরকে সেখান থেকে বহিষ্কার করে, তখন সে সময়ে বহু ইহুদী গোত্র পালিয়ে হেজাজে আশ্রয় গ্রহণ করে। কারণ এ ছিল ফিলিস্তিনের দক্ষিণে সংলগ্ন অঞ্চল, এখানে আসার পর যেখানে যেখানে তারা ঝর্ণা ও সুজলা সুফলা ভূমিখণ্ড দেখতে পায় সেখানেই রয়ে যায়। তারপর ক্রমশ তারা ষড়যন্ত্র ও সুদের ব্যবসা দ্বারা সে অঞ্চলের উপর তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তার করে। আইলা, মাকমা, তাবুক, তাইমা, ওয়াদিউল কুরা, ফাদাক এবং খায়বরের উপর সে সময়েই তারা তাদের আধিপত্য কায়েম করে। বনী কুরায়যা, বনী নযীর, বনী বাহদাল এবং বনী কাইনুকা প্রভৃতি গোত্রগুলোও সে সময়ে ইয়াসরিব অধিকার করে বসে।

ইয়াসরিবে বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে বনী নীর ও বনী কুরায়যা গোত্রগুলো ছিল অধিকতর খ্যাতিসম্পন্ন। কারণ তারা পাদ্রী পুরোহিত শ্রেণীভুক্ত ছিল। ইহুদীদের মধ্যে তাদেরকে সম্ভ্রান্ত বলে গণ্য করা হতো। আপন মিল্লাতের মধ্যে তারা ধর্মীয় রাষ্ট্রের অধিকারী ছিল, তারা যখন মদীনায় বসতি স্থাপন করে তখন সেখানে কতিপয় আরব গোত্র বাস করতো। তাদেরকে পরাভূত করে তারা সুজলা সুফলা ভূমির মালিক হয়ে বসে। তার প্রায় তিন শতাব্দীকাল পরে, ৪৫০ অথবা ৪৫১ খৃষ্টাব্দে ইয়ামেনে  এক মহাপ্লাবন হয় যার উল্লেখ সূরা সাবার দ্বিতীয় রুকুতে করা হয়েছে। এ প্লাবনের কারণে সাবা জাতির বিভিন্ন গোত্র ইয়ামেন থেকে বেরিয়ে আরবের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। তাদের মধ্যে গাসসানী সিরিয়ায়, লাখমী হীরাতে (ইরাক), বনী খুযায়া জেদ্দা ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে এবং আওস ও খাযরাজ ইয়াসরিব গিয়ে বসতি স্থাপন করে। ইয়াসরিবের উপরে যেহেতু ইহুদীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেজন্যে তারা প্রথম প্রথম আওস ও খাযরাজকে পায়ে দাঁড়াবার কোন সুযোগই দেয়নি। এ দুটি আরব গোত্র বাধ্য হয়ে অনুর্বর ভূমিখণ্ডের উপরেই বসবাস করতে থাকে। ফলে একদল সৈন্য এনে ইহুদীদের শক্তি চূর্ণ করে। ফলে ইয়াসরিবের উপর আস ও খাযরাজের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহুদীদের দুটি বড়ো গোত্র বনী নযীর ও বনী কুরায়যা শহরের বাইরে গিয়ে বসবাস করতে বাধ্য হয়। তৃতীয় গোত্র বনী কায়নুকার যেহেতু ঐ দুটি গোত্রের সাথে মনোমালিন্য ছিল, সেজন্যে তারা মহরেই রয়ে গেল। কিন্তু এখানে থাকার জন্যে তাদেরকে খাযরাজ গোত্রের আম্রয় নিতে হয়। তার মুকাবিলায় বনী নযীর ও বনী কুরায়যা আওস গোত্রের আশ্রয় গ্রহণ করে, যাতে করে ইয়াসরিবের শহরতলীতে নিরাপদে বসবাস করতে পারে।

নবী (সা ) এর আবির্ভাবের সময়ে ইহুদীদের অবস্থা

রাসূলুল্লাহ (সা ) এর মদীনায় আগমনের পূর্বে হিজরতের সূচনা পর্যন্ত সাধারণত হেজাজে এবং বিশেষ করে ইয়াসরিবে ইহুদীদের অবস্থা ছিল নিম্নরুপঃ

লেবাস পোশাক, ভাষা, সভ্যতা সংস্কৃতি সকল দিক দিয়েই তারা আরববাসীর রঙে রঞ্জিত ছিল। এমন কি তাদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠের নামও আরবী হয়ে পড়েছিল। যে বারোটি ইহুদী গোত্র হেজাজে বসতি স্থাপন করে তাদের মধ্যে একমাত্র বনী যাউরা ছাড়া কোন গোত্রের নাম ইবরানী ছিল না। তাদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন আলেম ছাড়া আর কেউ ইবরানী ভাষা পর্যন্ত জানতো না। জাহেলী যুগের ইহুদী কবিদের যে কাব্যকলা আমাদের চোখে পড়ে তার ভাষা, ভাবধারা ও বিষয়বস্তুর মধ্যে আরব কবিদের থেকে পৃথক এমন কোন বৈশিষ্ট্য নজরে পড়েনা যা তাদের পার্থক্য নির্ণয় করে। তাদের এবং আরববাসীদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তাদের মধ্যে এবং সাধারণ আরববাসীর মধ্যে একমাত্র দীন ছাড়া আর কোন পার্থক্য ছিল না, কিন্তু এতদসত্ত্বেও  তারা আরববাসীর সাথে একাকার হয়ে যায়নি এবং তারা কঠোরভাবে ইহুদী গোঁড়ামি বজায় রাখে। প্রকাশ্যে আরবত্ব তারা এজন্যে অবলম্বন করে যে, এছাড়া তারা আরবে বসবাস করতে পারতো না।

চিত্র ঃ——————–

তাদের এ আরবত্ব অবলম্বনের কারণে প্রাচ্যবিদগণ এ বিভ্রান্তিতে পড়েছেন যে, সম্ভবত এরা বনী ইসরাঈল ছিল না, বরঞ্চ তারা ছিল ইহুদী ধর্মাবলম্বী আরববাসী, অথবা নিদেনপক্ষে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল আরব ইহুদী। কিন্তু এমন কোন ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই যে, ইহুদীরা হেজাজে কখনো তাদের ধর্মীয় প্রচারকার্য চালিয়েছে , অথবা খৃষ্টান পাদ্রী ও মিশনারিদের মতো তাদের আলেম পণ্ডিতেরা আরববাসীকে ইহুদী ধর্মের প্রতি আহবান জানিয়েছে। পক্ষান্তরে আমরা দেখতে পাই যে, তাদের মধ্যে ইসরাঈলী হওয়ার ভয়ানক গোঁড়ামি ও বংশীয় গর্ব অহংকার পাওয়া যেতো। আববাসীকে তারা উম্মী বলতো। উম্মী অর্থ নিরক্ষর নয়, বরঞ্চ বন্য ও বর্বর। তাদের আকীদাহ এই ছিল যে, ইসরাঈলীরা যেসব মানবীয় অধিকার  লাভের যোগ্য , এসব উম্মী তার যোগ্য নয় । তাদের ধন সম্পদ বৈধ অবৈধ উপায়ে লুটে পুটে খাওয়া ইসরাঈলীদের জন্যে হালাল ও পবিত্র। আরব প্রধানগণ ছাড়া সাধারণ আরববাসীকে তারা এমন যোগ্যই মনে করতো না যে, তাদেরকে ইহুদী ধর্মে দীক্ষিত করে তাদেরকে সমান মর্যাদা দেয়া হবে। ঐতিহাসিক এমন কোন প্রমাণ  পাওয়া যায় না,, আর না আরব ঐতিহ্যে এমন কোন সাক্ষ্য পাওয়া যায় যে, কোন আরব গোত্র অথবা কোন বড়ো পরিবার ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করেছে। কিন্তু কিছু লোকের ইহুদী হওয়ার উল্লেখ অবশ্যই পাওয়া যায়। তাছাড়া দ্বীন প্রচারের পরিবর্তে ইহুদীদের শুধু ব্যবসার প্রতিই আকর্ষণ ছিল। এজন্যে হেজাজে ইহুদীবাদ একটি ধর্ম হিসেবে প্রসার লাভ করেনি। বরঞ্চ কতিপয় ইসরাঈলী গোত্রের গর্ব অহংকারই শুধু পুঁজি হয়েছিল। অবশ্যি ইহুদী আলেম পীরেরা তাবিজ তুমার, ফাল ও জাদুগিরি প্রভৃতির ব্যবসা খুব জমজমাট করে রেখেছিল যার জন্যে আরববাসীর উপর তাদের এলম ও আমলের প্রভাব পড়েছিল।(আল জিহাদ ফীল ইসলাম, পৃষ্ঠা৩৮০ -৩৮২)

তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা

আরব গোত্রগুলোর তুলনায় তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব মজবুত ছিল। যেহেতু তারা ফিলিস্তিন ও সিরিয়ার অধিকতর সভ্য অঞ্চল থেকে এসেছিল, এজন্যে তারা এমন বহু কলা কৌশল জানতো যা আরববাসীর জানা ছিল না। বহির্জগতের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কও ছিল, এসব কারণে ইয়াসরিব এবং হেজাজের উত্তরাঞ্চলে যেসব খাদ্যশস্যের আমদানি হতো এবং এখান থেকে যে খেজুর রপ্তানি হতো, তা ছিল এদেরই হাতে। মুরগী চাষ ও মৎস্য চাষের অধিকাংশই ছিল তাদের আয়ত্তে। বস্ত্র নির্মাণ তারা করতো। স্থানে স্থানে তারা মদের দোকান দিয়ে রাখতো এবং সিরিয়া থেকে মদ আমদানি করে সেখান তেকে বিক্রি করা হতো। বনী কায়নুকার বেশীর ভাগ স্বর্ণকার, কর্মকার এবং পাত্র নির্মাতার কাজ করতো। এসব ব্যবসা বাণিজ্যে ইহুদীরা অত্যধিক মুনাফাখুরী করতো। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড়ো ব্যবসা চিল সুদের । এ সুদের জালে তারা চারপাশের আরব অধিবাসীদের আবদ্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে আরব গোত্রগুলোর শায়খ ও সর্দারগণ ঋণ করে করে তাদের জাঁকজমক ও ক্ষমতার দাপট দেখাবার রোগে আক্রান্ত ছিল। তারা ইহুদীদের ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়তো। এরা সুদের চড়া হারে কর্জ দিত এবং তারপর ঋণগ্রহীতা সুদের চক্রবৃদ্ধিতে এমনভাবে ফেঁসে যেতো যে, তার থেকে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন হতো। এভাবে তারা আরববাসীদেরকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একেবারে শূন্যগর্ভ করে রেখেছিল। তার স্বাভাবিক পরিণাম এই ছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে সাধারণতঃ আরববাসীদের মধ্যে ঘৃণা বিরাজ করতো। তাদের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের দাবী এই ছিল যে, তারা আরববাসীদের কারো বন্ধু সেজে অন্য কারো শত্রু না হয়ে পড়ে এবংয় না তাদের পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু অপরদিকে তাদের স্বার্থ এটাও দাবী করতো যে, আরবদেরকে যেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেয়া না হয়। বরঞ্চ একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই ঝগড়ায় লিপ্ত রাখা হয়। কারণ তারা জানতো যে, আরবগোত্রগুলো যদি পরস্পর ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায় তাহলে, সুদী কারবার করে তারা যে বিরাট বিরাট ভূসম্পত্তি, বাগ বাগিচা ও শস্য শ্যামল জমি জমার মালিক হয়ে বসেছে, তা আর তারা থাকতে দেবে না। উপরন্তু আপন নিরাপত্তার জন্যে তাদের প্রত্যেক গোত্রকে কোন না কোন শক্তিশালী গোত্র তাদের গায়ে হাত দিতে না পারে । এর ভিত্তিতে আরব গোত্রগুলোর পারস্পরিক লড়াইয়ে তাদেরকে শুধু অংশগ্রহণই  করতে হতো না, বরঞ্চ অনেক সময় একটি ইহুদী গোত্র তার বন্ধু আরব গোত্রের সাথে মিলিত হয়ে অন্য কোন ইহুদী গোত্রের বিরুদ্ধে খাযরাজ গোত্রের। হিজরতের কিছুকাল পূর্বে বুয়াস নামক স্থানে আওস এবং খাযরাজের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়, তাতে তারা আপন আপন বন্ধুদের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করে।(তাফহীমুল কুরআন,সূরা আলে ইমরান, টীকা-২)

ধার্মিকতার প্রদর্শনীমূলক খোলস

ইহুদীরা তাওহীদ, রিসালাত, অহী, আখিরাত এবং ফেরেশতার প্রতি বিশ্বাস রাখতো। আল্লাহর পক্ষ তেকে তাদের নবী হযরত মূসা (সা) এর উপর যেসব শরীয়াতের বিধি ব্যবস্থা নাযিল হয়েছিল তাও তারা স্বীকার করতো। নীতিগতভাবে তাদের দ্বীনও সেই ইসলাম ছিল যার শিক্ষা নবী মুহাম্মাদ (সা ) দিচ্ছিলেন। কিন্তু কয়েক শতাব্দীর অধঃপতন তাদেরকে আসল দীন থেকে অনেক দূরে নিক্ষেপ করেছিল।(তখন মুসা (আ ) এর অতীত হওয়ার পর প্রায় উনিশ শতাব্দী অতিবাহিত হয়েছিল। ইসরাঈলী ইতিহাস মুতাবেক হযরত মূসা (আ ) এর খৃষ্ট পূর্ব ১২৭২ সালে ইন্তেকাল করেন এবং নবী মুহাম্মাদ (সা ) ৬১০ খৃষ্টাব্দে নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত হন-গ্রন্থকার।–

চেষ্টা করতো যাতে করে তিন তাঁর সংস্কার কার্যে কৃতকার্য না হতে পারেন। এরা ছিল আসলে পথভ্রষ্ট মুসলমান। বেদআত, সত্যকে বিকৃতকরণ, চুলচেরা বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো, দলাদলি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিত্যাগ করে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কালক্ষেপণ (মগজ ফেলে দিয়ে হাড় চিবানো), আল্লাহকে ভুলে দুনিয়ার লোভ লালসায় মগ্ন হওয়া প্রভৃতি কারণে তাদের অধঃপতন এমন চরম সীমায়  পৌঁছে যে, তারা তাদের আসল  নাম মুসলমান পর্যন্ত ভুলে যায় এবং নিজেদেরকে মুসলমান না বলে নিছক ইহুদী হয়েই রয়ে গেল। আল্লাহর দ্বীনকে তারা ইসরাঈলী বংশের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ বানিয়ে রেখে দিল।(সূরা হাশর,ভূমিকা)

ধর্মীয় এবং বংশীয় গোঁড়ামি

ইহুদীদের ধারণা এই ছিল যে, আমানতদারী, দেয়ানতদারি, সততা ও বিশ্বস্ততা শুধু ইহুদীদের পারস্পরিক ব্যাপারে হওয়া উচিত। যারা ইহুদী নয় তাদের ধন সম্পদ আত্মসাৎ করাতে কোন দোষ নেই। এ শুধু ইহুদী জনসাধারণের অজ্ঞতামূলক ধারণাই ছিল না, প্রকৃতপক্ষে ইহুদীবাদের গোটা ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা এমনভাবে তৈরী করা হয় যে, তা নৈতিক বিষয়াদিতে প্রতি পদে পদে ইসরাঈল ও অ ইসরাঈলের মধ্যে পার্থক্য সূচিত করে একই জিনিস যা ইসরাঈলীদের বেলায় অবৈধ, তা অন্যের বেলায় বৈধ। একই জিনিস যা ইসরাঈলীদের হক, অ ইসরাঈলীদের তা হক নয়।  যেমন বাইবেলের নির্দেশ, তুমি বিজাতীয়দের কাছে আদায় করিতে পার, কিন্তু তোমার ভ্রাতার নিকট তোমার যাহা আছে, তাহা তোমার হস্ত ক্ষমা করিবে।দ্বিতীয় বিবরণ১৫ঃ৩ একস্থানে সুদ গ্রহণ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু সুদের জন্য বিদেশীকে ঋণ দিতে পার, কিন্তু সুদের জন্য আপন ভ্রাতাকে ঋণ দিবে না, দ্বিতীয় বিবরণ ২৩ঃ২০) আরো একস্থানে লেখা আছে, কোন মানুষ্য যদি আপন ভ্রাতৃগণের ইসরায়েল সন্তানদের মধ্যে কোন প্রাণীকে চুরি করে, এবং তাহার প্রতি দাসবৎ ব্যবহার করে, বা বিক্রয় করে, এবং ধরা পড়ে, তবে সেই চোর হত হইবে, দ্বিতীয় বিবরণ ২৪ঃ৭)। তালমুদে আছে, যদি ইসরাঈলীদের কোন বলদ অ ইসরাঈলীদের  কোন বলদকে আহ করে, তাহলে তার কোন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না। কিন্তু কোন অইসরাঈলীর বলদ কোন ইসরাঈলীয় বলদকে আহত করলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি কেউ কোথাও কিছু পড়ে থাকতে দেখে, তাহলে দেখতে হবে পার্শ্ববর্তী বস্তি কোন সব লোকের। যদি ইসরাঈলীদের হয় তাহলে তার ঘোষণা দিতে হবে। যদি অ ইসরাঈলীদের হয় তাহলে সে জিনিস গ্রহণ করা উচিত। রিব্বী ইসমাঈল বলেন, যদি উম্মী এবং ইসমাঈলীর কোন মামলা কাজীর নিকটে আসে, তাহলে কাজী যদি ইসরাঈলী আইন অনুযায়ী তার ধর্মীয় ভাইকে জয়ী করতে পারে, তাহলে তাকে জয়ী করে দিয়ে বলবে যে, এ তাদের আইন অনুযায়ী  করা হয়েছে। আর যদি উম্মীদের আইন অনুযায়ী মামলায় তাকে জয়ী করতে পারে, তাহলে জয়ী করে বলবে, এ তোমাদের আইন মুতাবেক করা হয়েছে। কিন্তু কোন আইনেই যদি তাকে জয়ী করা না যায়, তাহলে যে কোন কৌশল অবলম্বন করে তাকে মামলায় জয়ী করে দেবে। রিব্বী শামওয়ায়েল বলেন, অইসরাঈলীর প্রত্যেক ভুলের সুযোগ গ্রহণ করতে হবে।(সূরা আল হাশর, ভূমিকা)

মূল বিষয় ছেড়ে দিয়ে খুঁটিনাটি বিষয় আঁকড়ে ধরা

ইহুদী পণ্ডিতগণ শরীয়তের ছোটখাটো বিষয়গুলো বড়ো যত্নের সাথে পালন করতো। বরঞ্চ খুঁটিনাটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায়  সকল সময় অতিবাহিত করতো। তাদের শাস্ত্রবিদগণ বহু চিন্তা ভাবনা করে এসব খুঁটিনাটি বিষয়ের সিদ্ধান্ত করেছে। কিন্তু শিরক তাদের নিকটে এমন তুচ্ছ বিষয় ছিল যে, তার থেকে না নিজেরা বাঁচবার কোন চিন্তা করতো, আর না জাতিকে মুশরিকী চিন্তাধারা ও কাজকর্ম থেকে বাঁচাবার কোন চেষ্টা করতো। মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব করতে এবং তাদের সাহায্য সহযোগিতা করতেও তাদের বিবেকে বাধতো না।(সূরা আল বাকারা,ভূমিকা)

সম্ভ্রান্ত লোকের জন্যে শরীয়াত বিকৃতকরণ

ইহুদীরা তাদের ধর্মীয় অনুশাসন থেকে যেভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় সেই মামলায়, যা ফায়সালার জন্যে  খায়বরের ইহুদীরা নবী (সা ) এর দরবারে পেশ করেছিল। মামলার বিবরণ এই ছিল যে, খায়বরের সম্ভ্রান্ত বংশীয় জনৈক নারী  একজন পুরুষের সাথে অবৈধ যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। তাওরাত অনুযায়ী তাদের শাস্তি ছিল রজম করা অর্থাৎ প্রস্তরাঘাতে মেরে ফেলা –( দ্বিতীয় বিবরণ ২২ঃ২৩-২৪)। কিন্তু ইহুদীরা এ শাস্তি কার্যকর করতে চাচ্ছিল না। অতএব তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে স্থির করে যে, এ মামলায় নবী মুহাম্মাদ (সা ) কে মধ্যস্থ  মানা হোক । তিনি যদি রজম ছাড়া অন্য কোন রায় দেন তাহলে তা মানা হবে। আর যদি রজমেরেই রায় দেন তাহলে তা মানা হবে না। অতঃপর মামলাটি নবীর সামনে পেশ করা হলো। তিনি রজম করার নির্দেশ দেন, তারা তা মানতে অস্বীকার করে। নবী (সা ) তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের ধর্মে এর কি শাস্তি রয়েছে? তারা বলে, বেত মারা এবং মুখে চুনকালি দিয়ে গাধার পিটে চড়িয়ে দেয়া। নবী (সা ) তাদের আলেমদেরকে কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, তাওরাতে কি বিবাহিত  ব্যভিচারী ব্যভিচারিণীর এ শাস্তি রয়েছে? তারা পুনরায় মিথ্যা জবাবিই দেয়। কিন্তু ইবনে সুরিয়া নামক এক ব্যক্তি স্বয়ং ইহুদীদের বর্ণনামতেই তাওরাতের তৎকালীন বড়ো আলেম ছিল এবং সে চুপ করেছিল। তাকে সম্বোধন করে নবী (সা ) বলেন, যে আল্লাহ তোমাদেরকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্ত করেছেন এবং যিনি তূর পর্বতে তোমাদেরকে শরিয়ত দান করেছেন তাঁর কসম দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি, সত্যিকারভাবে তাওরাতে ব্যভিচারের কি শাস্তি লেখা আছে? সে বলে, আপনি যদি এমন কসম না দিতেন তাহলে আমি বলতাম না। ব্যাপার এই যে, ব্যভিচারের শাস্তি রজমই বটে। কিন্তু আমাদের সমাজে যখন ব্যভিচার বেড়ে গেল, তখন আমাদের শাসকরা এ রীতি অবলম্বন করে যে, সম্ভ্রান্ত লোক ব্যভিচার করলে তাকে ছেড়ে দেয়া হতো। নিম্ন শ্রেণীর লোক ব্যভিচার করলে তাকে রজম করা হতো। তারপর জনগণের মধ্যে যখন অসন্তোষ দেখা দিতে থাকে, তখন আইন পরিবর্তন করে এমন করা হয়ে যে, ব্যভিচারী ব্যভিচারিণীকে বেত্রাঘাতের পর মুকে চুনকালি দিয়ে উল্টোমুখে গাধার পিঠে সওয়ার করে দিতে হবে।(সূরা আলে ইমরান,টীকা-৬৪)

শরীয়তের হালাল হারামে রদবদল

আল্লাহ তাআলার নাযিল করা শরীয়াতের বিরুদ্ধে যখন ইহুদীরা বিদ্রোহ করলো এবং তারা নিজেরাই শরীয়াত প্রণেতা হয়ে বসলো, তখন তারা অনেক পাক ও হালাল জিনিসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ফেললো। এসবের মধ্যে এক হচ্ছে ক্ষুর বিশিষ্ট প্রাণী, অর্থাৎ উটপাখি, রাজহাঁস প্রভৃতি। দ্বিতীয়তঃ গরু ছাগলের চর্বি। বাইবেলে এ দুধরনের হারামের হুকুম তাওরাতে সন্নিবেশিত করা হয়। অথচ এ জিনিসগুলো তাওরাতে হারাম ছিল না, বরঞ্চ হযরত মূসা (আ ) এর পরে হারাম করা হয়েছে। ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় যে, বর্তমানের ইহুদী শরীয়াত দ্বিতীয় খৃষ্টীয় শতাব্দীর শেষদিকে রিব্বী ইয়াহুদীর দ্বারা প্রণীত হয়।(সূরা আন নিসা,টীকা-৮০)

নবী মুহাম্মাদ (সা) সম্পর্কে ইহুদীদের অযৌক্তিক আচরণ

কুরআন বলে- (আরবী****) এবং এখন যে একখানি কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের কাছে এল, তখন তার প্রতি তাদের কান ধরনের আচরণ দেখতে পাওয়া যায়? অথচ এ কিতাব তাদের নিকটে পূর্বে থেকে যা বিদ্যমান আছে তারই সভ্যতার সাক্ষ্য দেয় এবং এ কিতাবের আগমনের পূর্বে তারা কাফেরদের মুকাবিলায় বিজয় ও সাহায্য প্রার্থনা করতো। এতদসত্ত্বেও সে জিনিস যখন তাদের সামনে এসে গেল এবং তাকে তারা চিনতেও পারলো, তথাপি তাকে মেনে নিতে তারা অস্বীকার করলো। – সূরা আল বাকারাঃ৮৯

নবী (সা ) এর আগমনের পূর্বে ইহুদীরা অধীর হয়ে ঐ নবীর প্রতিরক্ষা করছিল, যার ভবিষ্যদ্বাণী তাদের নবীগণ করেছিলেন। তারা এ দোয়া করছিল যে, তিনি সত্বর এসে পড়লে কাফেরদের আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে এবং তাদের উন্নতির যুগ শুরু হবে। স্বয়ং মদীনাবাসী এ কথার সাক্ষী যে, নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর আগমনের পূর্বে ইহুদীরা ভবিষ্যতে আগমনকারী নবীর আশায় দিন গুনত এবং তারা কথায় কথায় বলতো, আচ্ছা, ঠিক আছে, যাদের উপর খুশী যুলুম করে যাও। তারপর যখন সে নবী আসবেন তখন যালেমদের দেখে নেব। মদীনাবাসী এসব কথা শুনতো। এজন্যে যখন তারা নবী (সা ) এর হাল হকিকত জানতো পারলো, তখন পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, দেখ, এ ইহুদীরা তোমাদের উপর যেন টেক্কা মেরে না যায়। চল, আগেভাগেই তাঁর উপর আমরা ঈমান ফেলি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ঐসব ইহুদী, যারা আগমনকারী নবীর প্রতীক্ষায় প্রহর গুনত, তাঁর আগমনের পর তাঁর সবচেয়ে বিরোধী হয়ে পড়ে।

এবং তাকে তারা চিনতেও পারলো- কুরআনের এ কথাটিও বিভিন্ন প্রমাণাদি সে সময়েই পাওয়া গেছে। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য উম্মুল মুমিনীন হযরত সুফিয়া (রা ) এর । তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত ইহুদী আলেমের কন্যা এবং অন্য এক আলেমের ভাতিজি। তিনি বলেন, যখন নবী (সা ) মদীনায় তশরিফ আনেন, তখন আমার পিতা এবং চাচা উভয়েই তাঁর সাথে দেখা করতে যান, তাঁরা অনেকক্ষণ ধরে তাঁর সাথে আলাপ করেন। তাঁদের বাড়ী ফিরে আসার পর আমি আপন কানে তাঁদেরকে এরূপ কথাবার্তা বলতে শুনিঃ

চাচাঃ সত্যিই কি ইনি সেই নবী যাঁর সুসংবাদ আমাদের কিতাবগুলোতে দেয়া হয়েছে?

পিতাঃ আল্লাহর কসম, তাই।

চাচাঃ তোমার তাতে বিশ্বাস হয়?

পিতাঃ হাঁ, হয়।

চাচাঃ তাহলে, এখন কি করতে চাও?

পিতাঃ যতদিন জীবন আছে, তার বিরোধিতা করতে থাকবো এবং তাকে কোন কথা বলতে দিব না।(ইবনে হিশাম ২য় খন্ড,পৃঃ ১৬৫, নতুন সংস্করণ)(সূরা আল মায়েদা,টীকা-৭০)

ইহুদীদের শত্রুতামূলক ফেতনা সৃষ্টি

আরববাসী সাধারণত নিরক্ষর ছিল। তাদের তুলনায় এমনিতেই ইহুদীদের ভেতরে শিক্ষার চর্চা বেশী ছিল। ব্যক্তিগতভাবে তাদের মধ্যে এমন বড়ো বড়ো পণ্ডিত ব্যক্তি ছিল যাদের খ্যাতি আরবের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এজন্যে আরবের মধ্যে ইহুদীদের শিক্ষাগত প্রভাব খুব বেশী ছিল। তারপর তাদের আলেম ও পীর পুরোহিতগণ তাদের ধর্মীয় দরবারের বাহ্যিক জাঁকজমক এবং ঝাড়ফুঁক ও তাবিজ তুমারের ব্যবসা দ্বারা তাদের সে প্রভাব দৃঢ়তর ও ব্যাপকতর করে। বিশেষ করে মদীনাবাসী তাদের দ্বারা বেশী প্রভাবিত ছিল। কারণ, তাদের আশেপাশে বড়ো বড়ো ইহুদী গোত্রের বাস ছিল। রাতদিন তাদের সাথে মেলামেশা ছিল। এ মেলামেশার দ্বারা তারা ঠিক তেমনি গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল, যেমন নিরক্ষর জনগোষ্ঠী অধিকতর শিক্ষিত, অধিকতর সভ্য ও বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী প্রতিবেশীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। এ অবস্থায় যখন নবী (সা ) নিজেকে নবী হিসেবে পেশ করেন এবং ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন তখন স্বাভাবিকভাবেই নিরক্ষর লোকেরা আহলে কিতাব ইহুদীদের নিকটে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে, আপনারা একজন নবীর অনুসারী এবং একটি কিতাব মেনে চলেন, আপনারা বলুন এই যে আমাদের মধ্যে একজন নবীর দাবী করছেন, তাঁর সম্পর্কে এবং তাঁর শিক্ষাদীক্ষা সম্পর্কে আপনাদের অভিমত কি? নবী (সা ) যখন মদীনায় তশরিফ আনেন, তখনও বহু লোক এভাবে ইহুদী আলেমদের নিকটে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে। কিন্তু ঐসব ইহুদী আলেম তাদেরকে কখনও সত্য কথা বলেনি। তাদের একথা বলা তো মুশকিল ছিল যে, তিনি যে তাওহীদ পেশ করছেন, তা ঠিক নয়। অথবা আম্বিয়া, আসমানী কিতাব, ফেরেশতা ও আখিরাত সম্পর্কে তিনি যা কিছু বলছেন তার মধ্যে কিছু ভুল আছে। অথবা যেসব নৈতিক মূলনীতি তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন, তার মধ্যে কোনটা ভুল। কিন্তু তারা পরিষ্কারভাবে এ সত্যও স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না যে, তিনি যা কিছু পেশ করছেন তা সত্য। তারা না সত্যকে খোলাখুলি অস্বীকার করতে পারতো আর না সহজভাবে সত্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল। এ দুটি পথের মধ্যে তারা এ পদ্ধতি অবলম্বন করলো যে, প্রত্যেক প্রশ্নকারীর মনে নবী (সা ) এর বিরুদ্ধে, তাঁর দলের বিরুদ্ধে এবং তাঁর মহান কাজের  বিরুদ্ধে কোন না কোন কুমন্ত্রণা দিয়ে দিতো, তাঁর উপরে কোন অভিযোগ আরোপ করতো, এমন এক অমূল ক অপবাদ চড়াতো যাতে করে মানুষের মনে সন্দেহ ও দ্বিধা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের বিব্রতকর প্রশ্নের অবতারণা করতো, যাতে করে লোকেরাও বিব্রত বোধ করে এবং নবী ও তাঁর সংগী সাথীদেরকেও বিব্রত করার  চেষ্টা করে। এ ছিল তাদের আচরণ যার জন্যে সূরা আল বাকারায় তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হলো, হককে বাতিলের পর্দা দিয়ে আবৃত করো না, মিথ্যা প্রচারণা এবং দুষ্টামিসূলভ সন্দেহ সৃষ্টি ও অভিযোগ আরোপ করে সত্যকে দমিত ও গোপন করার চেষ্টা করো না এবং হক ও বাতিলকে একত্রে মিশিয়ে দুনিয়াকে ধোঁকা দেবার চেষ্টা করো না। – সূরা আল বাকারাঃ৪২(ইহুদীদের অনিষ্টকারিতার পরিধি বড়ো ব্যাপক। তাদের কুমন্ত্রণার জালে আবদ্ধ হয়ে ইসলামী জামায়াতের মধ্যে মুনাফিক সৃষ্টি হয়েছে। তারা নবী (সা ) এর বিরুদ্ধে প্রত্যেক ব্যাপারে কোন না কোন ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে, তাঁকে হত্যা করার বার বার চেষ্টা করেছে এবং তাদের চরম ধৃষ্টতা এই যে, যুদ্ধের সিদ্ধান্তকর মুহূর্তে তারা ধ্বংসাত্ন্যক কাজে লিপ্ত হয়েছে। তাদের এসব ধৃষ্টতার উল্লেখ যথা স্থানে করা হবে। -গ্রন্থকার)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.