সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

খ্রিস্টবাদের আবির্ভাব ও বিকাশ

নাসারা শব্দের ব্যাখ্যা

কিছু লোকের এ ধারণা ভুল যে, নাসারা শব্দটি নাসেরা থেকে গৃহীত যা ছিল মসীহ (আ ) এর জন্মভূমি। প্রকৃতপক্ষে এ শব্দটি নুসরাত থেকে গৃহীত। এর ভিত্তি হচ্ছে সে বক্তব্য যা মসীহ (আ ) এর (আরবী*****) (আল্লাহর পথে আমার সাহায্যকারী কে) এ প্রশ্নের জবাবে হাওয়ারীগণ বলেছিল (আরবী***) (আমরা আল্লাহর কাজে সাহায্যকারী)। খৃষ্টান গ্রন্থাকারদের সাধারণত শব্দ দুটির বাহ্যিক সাদৃশ্য দেখেই এ ভ্রান্ত ধারণা হয়েছে যে, খৃষ্টানদের প্রাথমিক ইতিহাসে নাসেরিয়া (Nazarenes)নামে যে দলটি পায়া যেতো এবং যাদেরকে ঘৃণাভরে নাসেরী ও ইবুনী বলা হতো, তাদের নামকেই কুরআন সকল খৃষ্টানদের জন্যে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় বলে যে, তারা স্বয়ং বলেছিল, আমরা নাসারা –(সূরা আলে ইমরানঃ৫২) এবং একথা ঠিক যে, খৃষ্টানরা কখনো নিজেদের নাম নাসেরী রাখেনি।(সূরা আল বাকারা, টীকা-৯৫)

এ ব্যাপারে উল্লেখ্য যে, হযরত ঈসা (আ ) তাঁর অনুসারীদের নাম কখনো ঈসায়ী বা মসীহী রাখেননি। কারণ তিনি তাঁর নিজের নামে কোন নতুন ধর্মের ভিত্তিস্থাপন করতে আসেননি। হযরত মূসা (আ ) এবং আগের ও পরের নবীগণ যে দীন নিয়ে এসেছিলেন, তাকে উজ্জীবিত করাই ছিল তাঁর  দাওয়াতের উদ্দেশ্য। এজন্যে তিনি সাধারণ বনী ইসরাঈল এবং শরীয়াতে মূসার অনুসারীদের থেকে আলাদা কোন জামায়াত গঠন করেননি, আর না তাঁর কোন স্থায়ী নাম তিনি রেখেছেন। তাঁর প্রাথমিক অনুসারীগণ  তাঁদের নিজেদেরকে ইসরাঈলী মিল্লাত থেকে পৃথক মনে করতেন না, তাঁরা কোন স্থায়ী দল হয়েও পড়েননি, আর না তাঁরা নিজেদের জন্যে কোন পার্থক্যসূচক নাম ও নিদর্শন নির্ণয় করেছেন। তাঁরা সাধারণ ইহুদীদের সাথে বায়তুল মাকদিসেরই হায়কালে ইবাদাত করতে যেতেন এবং নিজেদেরকে মূসার শরীয়তের অনুগত মনে করতেন। – প্রেরিতদের কার্য ৩ঃ ১, ১০ ১৪,১৫,২১ঃ২১ দ্রষ্টব্য।

ইসরাঈলী জনগণ থেকে ঈসায়ীদের বিচ্ছিন্ন হওয়া

পরবর্তীকালে বিচ্ছিন্নতার কাজ দুদিক দিয়ে শুরু হয়। একদিকে হযরত ঈসা (আ ) এর অনুসারীদের  মধ্যে সেন্টপল শরীয়াতে বাধ্যবাধকতা রহিত করে ঘোষণা করে যে, শুধু মসীহের উপর ঈমান আনাই মুক্তি জন্যে যথেষ্ট। অপরদিকে ইহুদী পন্ডিতগন মসীহের অনুসারীদেরকে একটা পথভ্রষ্ট দল গণ্য করে তাদেরকে ইসরাঈলী জনগণ  থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিন্তু এ বিচ্ছিন্নতা সত্বেও প্রথমে  এ নতুন দলটি কোন বিশেষ নাম দেয়া হয়নি। স্বয়ং মসীহের অনুসারীগণ নিজেদের জন্যে কখনো শিষ্য( শাগরেদ) শব্দ ব্যবহার করে, কখনো আপন সঙ্গী সাথীদের জন্যে বাই এবং ঈমানদার শব্দ ব্যবহার করে। আবার কখনো মুকাদ্দাস (পূত পবিত্র) নামেও তাদেরকে ডাকা হয়- (প্রেরিতদের কার্য ২ঃ ৪৪ঃ৪ঃ৩২,৯ঃ২৬,১১ঃ২৯,১৩ঃ৫২,১৫ঃ১ -২৩, রোমীয় ১৫ঃ ২৫, কলমীয় ১ঃ২) পক্ষান্তরে ইহুদীরা তাদেরকে কখনো গালিসী বলতো  এবং কখনো নাসেরীয়দের বেদআতী ফের্কা বলতো- (প্রেরিতদের কার্য্য ২৪ঃ৫, লূক ১৩ঃ২)। বিদ্রূপ করে তাদেরকে এ নামে ডাকা হতো, কারণ হযরত ঈসা (আ ) এর জন্মভূমি ছিল নাসেরা যা ফিলিস্তিনের গালীল জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এ বিদ্রূপাত্মক নাম এতেটা প্রচলিত হতে পারেনি যে, মসীহের অনুসারীদের জন্যে মর্যাদা লাভ করতে পারে।

তাদের নাম মসীহী বা খৃষ্টান কিভাবে হলো?

এ দলটির খৃষ্টান নাম সর্বপ্রথম ৪৩ অথবা ৫৪ খৃষ্টাব্দে এন্তাবিয়ার মুশরিক অধিবাসীগণ রাখে যখন সেন্পপল এবং বার্নাবাস সেখানে গিয়ে ধর্মীয় প্রচারকার্য শুরু করে-(প্রেরিতদের কার্য ১১ঃ২৬)। বিরোধীদের পক্ষ থেকে বিদ্রূপ করেই তাদেরকে এ নামে অভিহিত করা হয় এবং মসীহের অনুসারীগণ তাদের জন্যে এ নাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। কিন্তু তাদের শত্রুদল যখন তাদেরকে ঐ নামেই সম্বোধন করতে থাকে তখন তাদের নেতৃবৃন্দ বলে, তোমাদেরকে যদি মসীহের সাথে সম্পৃক্ত করে মসীহী বলে অভিহিত করা হয়, তাহলে তাতে লজ্জার কি আছে?(১-পিতর৪ঃ১৬)। এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্রমশঃ ঐ নামে অভিহিত করতে থাকে যে নাম তাদের দুশমন ঠাট্টা বিদ্রূপ করে তাদের প্রতি আরোপ করে। এমন কি শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্য তেকে এ অনুভূতিই বিলুপ্ত হয় যে, এ একটা বিদ্রূপাত্মক নাম ছিল যে নামে তাদেরকে ডাকা হতো।

এজন্যে কুরআন মজিদ মসীহের অনুসারীদেরকে মসীহ অথবা ইসায়ী নামে আহবান করেনি। বরঞ্চ তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে তারা আসলে ঐসব লোকের বংশধর যাদেরকে ঈসা ইবনে মারইয়াম(আ ) এর সম্বোধন করে বলেছিলেন (আরবী*****) (কে আছ আল্লাহর পতে আমার সাহায্যকারী) এবং তারা জবাবে বলেছিল (আরবী****) (আমরা আল্লাহর পথে সাহায্যকারী) এজন্যে প্রাথমিক বা মৌলিক দিক দিয়ে তারা নাসারা অথবা আনসার। কিন্তু আজকাল ঈসায়ী মিশনারিগণ কুরআনের এ স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার পরিবর্তে অভিযোগ করে যে, কুরআন তাদেরকে মসীহ বা খৃষ্টান বলার পরিবর্তে নাসারা নামে অভিহিত করে।(সূরা আল বাকারা,টীকা-৫৮)

খ্রিস্টবাদের আবির্ভাব কাল

ইহুদীবাদ ও খ্রিস্টবাদ পরবর্তীকালের সৃষ্টি। ইহুদীবাদ তার নাম,বৈশিষ্ট্য ও রীতি পদ্ধতিসহ খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীতে জন্মলাভ করে। যে সকল ধারণা-বিশ্বাস ও বিশিষ্ট ধর্মীয় মতবাদের সমষ্টির নাম খ্রিস্টবাদ, তা তো হযরত মসীহ (আ ) এর দীর্ঘকাল পর অস্তিত্ব লাভ করে। এখন আপনা আপনিই এ প্রশ্নের উদয় হয় যে, হেদায়াত বা সত্য পথের উপর থাকা যদি ইহুদীবাদ অথবা খ্রিস্টবাদ,অথবা খ্রিস্টবাদের  উপরই নির্ভরশীল হয়, তাহলে এ দুটি ধর্মের বহু শতাব্দী পূর্বে যে হযরত ইবরাহীম (আ ) এবং অন্যান্য নবীগণ জন্মগ্রহণ করেন এবং যাদেরকে ইহুদী ও খৃষ্টানগণও হেদায়েত প্রাপ্ত বলে স্বীকার করে, তাঁরা তাহলে কোন জিনিস থেকে হেদায়াত লাভ করতেন? একথা ঠিক যে, সে বস্তু ইহুদীবাদ অথবা খ্রিস্টবাদ ছিল না। অতএব এ কথা আপনা আপনিই সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, মানুষের হেদায়াত প্রাপ্ত হওয়া ওসব ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভরশীল নয় যার কারণে এসব ইহুদী ও ঈসায়ী প্রভৃতি বিভিন্ন দল জন্মলাভ করেছে। বরঞ্চ তা প্রকৃতপক্ষে নির্ভরশীল সেই বিশ্বজনীন সিরাতে মুস্তাকীম অবলম্বন করার উপর যার দ্বারা প্রত্যেক যুগে মানুষ হেদায়াত লাভ করতে থাকে।

দ্বিতীয়তঃ স্বয়ং ইহুদী খৃষ্টানদের পবিত্র গ্রন্থাবলী এ কথার সাক্ষ্যদান করে যে, হযরত ইবরাহীম (আ ) এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পূজা অর্চনা , পবিত্রতা বর্ণনা, বন্দেগী ও আনুগত্য স্বীকার করতেন না। তাঁর মিশনও এই ছিল যে, আল্লাহর গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও অংশীদার করা যাবে না। সুতরাং একথা একেবারে সুস্পষ্ট যে, ইহুদীবাদ এবং খৃষ্টবাদ উভয়ই ঐ সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে, যে পথে হযরত ইবরাহীম (আ ) চলতেন। কারণ এ দুটি ধর্মের মধ্যে শিরকের সংমিশ্রণ ঘটেছে। (সূরা আল মায়েদা,টীকা-৩৬)

খৃষ্টানদের হযরত ঈসা (আ ) কে খোদা বলে অভিহিত করা

প্রথমতঃ খৃষ্টানগণ হযরত মসীহের ব্যক্তিত্বকে মনুষ্যত্ব ও ইলাহত্বের (Divinity)এক যৌগিক পদার্থ (Compopund)গণ্য করে এমন এক ভুল করে যে, তার ফলে মসীহের বাস্তবতা তাদের নিকটে একটা প্রহেলিকা হয়ে রয়েছে। তাদের পন্ডিতগন শব্দের বাগাড়ম্বর ও আন্দাজ অনুমানের সাহায্যে এ প্রহেলিকা খণ্ডনের যতোই চেষ্টা করেছে, ততোই অধিকতর জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে যার মনে ঐ যৌগিক ব্যক্তিত্বের মানবীয় অংশ প্রভাব বিস্তার করেছে, সেই হযরত মসীহের খোদার পুত্র হওয়ার উপরে এবং তিন স্থায়ী খোদার একজন হওয়ার উপর জোর দিয়েছে। যার মনে ইলাহত্বের (উলুহিয়াত) অংশ অধিক প্রভাবশালী হয়েছে সে মসীহকে আল্লাহ দৈহিক প্রকাশ বলে গণ্য করে একেবারে আল্লাহ বানিয়ে দিয়ে আল্লাহ হিসেবে তাঁর ইবাদাত বা পূজা অর্চনা করেছে। এ উভয়ের মধ্যবর্তী পথ যারা বের করতে চেয়েছে তারা তাদের সকল শক্তি এমন সব শাব্দিক ব্যাখ্যায় নিয়োজিত করে যে, তার দ্বারা মসীহকে মানুষও বলা হতে থাকে এবং তার সাথে আল্লাহও মনে করা হতে থাকে। আল্লাহ এবং মসীহ দুটি পৃথক সত্তাও, আবার একও।(সূরা আল মায়েদা,টীকা-৩৬)

হযরত ঈসা (আ ) এর কালেমাতুল্লাহ হওয়ার অর্থ

(আরবী*****)

মারইয়াম পুত্র মসীহ ঈসা এ চাড়া আর কিছু নয় যে, সে ছিল আল্লাহর রাসূল ও তাঁর একটি ফরমান। – সূরা আন নিসাঃ১৭১

প্রকৃতপক্ষে কালেমা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। মারইয়ামের প্রতি কালেমা প্রেরণের মর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা মারইয়ামের জরায়ুর প্রতি এ ফরমান নাযিল করেন যে, সে যেন কোন পুরুষের শূক্রস্নাত না হয়েই গর্ভসঞ্চার গ্রহণ করে নেয়। খৃষ্টানদেরকে প্রথমে হযরত মসীহ (আ ) এর বিনা বাপে পয়দা হওয়ার এ রহস্যই বলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা গ্রীক দর্শন দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে প্রথমে কালেমা শব্দকে কথা অথবা বাকশক্তির সমার্থবোধক মনে করে। তারপর একথা ও বাকশক্তিকে আল্লাহ তাআলার কথা বলার নিজস্ব গুণের অর্থ হিসেবে গ্রহণ করে। অতঃপর তারা এ আনুমানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, আল্লাহ তাআলার ঐ নিজস্ব গুণটি হযরত মারইয়ামের গর্ভে প্রবেশ করে এক দৈহিক আকার ধারণ করে যা মসীহরূপে আত্মপ্রকাশ করে। এভাবে খৃষ্টানদের মধ্যে মসীহ (আ ) এর আল্লাহ হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয় এবং এ ভ্রান্তি ধারণা বদ্ধমূল হয় যে,আল্লাহ স্বয়ং নিজেকে অথবা তাঁর শাশ্বত গুণাবলীর মধ্যে বাকশক্তির গুণকে মসীহের আকৃতিতে প্রকাশ করেছেন।(সূরা আল বাকারা,টীকা-১৩৫)

ত্রিত্ববাদের ধারণা

সূরা আন নিসার ১৭১ আয়াতে হযরত মসীহকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহ (আরবী**) বলা হয়েছে এবং সূরা আল বাকারায় বিষয়টিকে এভাবে বলা হয়েছে যে, আমরা পাক রুহ দ্বারা তাকে সাহায্য করেছি।(আরবী*****) উভয় মূল বচনের মর্ম এই যে, আল্লাহ তাআলা মসীহ (আ ) কে এমন পবিত্র রুহ দান করেন যা পাপের ঊর্ধ্বে, যা পরিপূর্ণ সত্যনিষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ চরিত্র মহত্বে বিভূষিত। এ সংজ্ঞাই খৃষ্টানদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল। একে তারা অতিরঞ্জিত করে। রহুসিম্ননাল্লাহকে স্বয়ং আল্লাহর রুহ বলে গণ্য করে এবং রুহল কুদুস (Holy Gohost)এর এ অর্থ করে যে, তা চিল আল্লাহর পবিত্র রুহ যা মসীহের মধ্যে রূপ গ্রহণ করে। এভাবে আল্লাহ এবং মসীহের সাথে এক তৃতীয় খোদা রুহুল কুদুসকে বানিয়ে নেয়। এ ছিল খৃষ্টানদের দ্বিতীয় চরম অতিরঞ্জন যার কারণে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। মজার ব্যাপার এই যে, আজ পর্যন্ত ইঞ্জিল মথির মধ্যে একথা বিদ্যমান রয়েছে ফেরেশতা (ইউসুফ নাজ্জারকে) স্বপ্নে বললে, হে ইউসুফ ইবনে দাউদ! তোমার স্ত্রী মারইয়ামকে তোমার নিকটে নিয়ে আসতে ভয় করো না। কারণ তার গর্ভে যা আছে তা রুহুল কুদুসের কুদরতেই আছে। অধ্যায়১ঃ২)।(সূরা আল মায়েদা, টীকা-৩৯)

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, খৃষ্টানগণ একই সাথে তাওহীদ স্বীকার করে এবং ত্রিত্ববাদও স্বীকার করে। মসীহ (আ ) এর যেসব সুস্পষ্ট বাণী ইঞ্জিলগুলোতে পাওয়া যায়, তার ভিত্তিতে কোন খৃষ্টান একথা অস্বীকার করতে পারবে না যে, আল্লাহ মাত্র একজন এবং তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কোন আল্লাহ নেই। একথা স্বীকার করা ছাড়া তাদের কোন উপায় নেই যে, তাওহীদ হলো প্রকৃত দ্বীন। কিন্তু প্রথমেই তারা এ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে পড়ে যে, আল্লাহর কালাম মসীহের আকারে প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং আল্লাহর রুহ তাঁর মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করে। এ কারণে তারা বিশ্ব স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার উলুহিয়াতের সাথে মসীহ এবং রুহল কুদুসের উলুহিয়াতকে স্বীকার করে নেয়াকে অযথা নিজেদের জন্যে অপরিহার্য করে নেয়। বলপূর্বক নিজেদের উপরে চাপিয়ে নেয়ার  কারণে এ বিষয়টি তাদের জন্যে এক অসমাধানযোগ্য প্রহেলিকায় পরিণত হয় যে, তাওহীদী আকীদাহ সত্বেও ত্রিত্ববাদের আকীদাহকে এবং ত্রিত্ববাদের আকীদাহ সত্বেও তাওহীদের আকীদাহকে কিভাবে মেনে নেয়া যায়। নিজেদের দ্বারা সৃষ্ট এ সমস্যা সমাধানের জন্যে খৃষ্টান পন্ডিতগন প্রায় আঠারশ বছর ধরে মাথা ঘামাচ্ছেন। বিভিন্ন ব্যাখ্যার কারণ বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল সৃষ্টি হয়েছে, একদল অন্য দলকে অবিশ্বাসী বা কাফের আখ্যায় আখ্যায়িত করে এবং এ নিয়ে কলহ বিবাদ করে গির্জার পর গির্জা পৃথক হতে থাকে। তাদের কালাম শাস্ত্রের সর্বশক্তি এ কাজে নিয়োজিত হয়। অথচ এ সমস্যা না খোদা সৃষ্টি করেছেন, আর না তাঁর প্রেরিত মসীহ এবং এ সমস্যার না কোন সমাধান আছে যে, তিন খোদাও মানতে হবে এবং তারপর খোদার একত্বও অক্ষুণ্ণ থাকবে। তাদের অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি এ সমস্যা সৃষ্টি করেছে। এর একমাত্র সমাধান এই যে, তারা অতিরঞ্জন ও অতিশয়োক্তি পরিহার করুক, মসিহ এবং রুহুল কুদুসের উলুহিয়াতের(Divinity)ধারণা পরিত্যাগ করত। শুধুমাত্র আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ মেনে নিক এবং মসীহকে তাঁর পয়গম্বর মনে করুক, কোন দিক দিয়েই ইলাহত্ব উলুহিয়াতের অংশীদার মনে না করুক।(সূরা আন নিসা,টীকা-২১২)

শিরক এবং ধর্মীয় মনীষীদের পূজা অর্চনা

পঞ্চম খৃষ্টীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ খৃষ্টানদের মধ্যে এবং বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক গির্জাগুলোতে শিরক, ধর্মীয় মনীষীদের পূজা অর্চনা এবং কবর পূজা প্রবল আকার ধারণ করে। বুযর্গদের আস্তানায় পূজা হতে থাকে এবং মসীহ, মারইয়াম ও স্বর্গীয় অপ্সরীদের মূর্তি গির্জায় রাখা হয়। অসহাবে কাহায়েফরন অভ্যুদয়ের কিছুকাল পূর্বে ৪৩১ খৃষ্টাব্দে সমগ্র খৃষ্টান জগতের ধর্মীয় নেতাদের একটি কাউন্সিল অধিবেশন এফিসুস নামক স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনে হযরত মসীহের উলুহিয়াত এবং হযরত মারইয়ামের আল্লাহর মা হওয়ার ধারণা বিশ্বাস স্থিরীকৃত হয়। এ ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টি রাখলে স্পষ্ট বুতে পারা যায় যে,(আরবী***) কুরআনের এ বাক্যে ঐসব লোকের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে, যারা হযরত মসীহের একনিষ্ঠ অনুসারীদের মুকাবিলায় সে সময়ে খৃষ্টান জনসাধারণের নেতা ও কর্মকর্তা হয়ে পড়েছিল এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তাদের হাতে ছি। এরাই ছিল প্রকৃতপক্ষে শিরকের ধ্বজাবাহী। তারই সিদ্ধান্ত করেছিল যে, আসহাবে কাহফের উপর সমাধিস্তম্ভ নির্মাণ করে তার পূজা অর্চনা করা হবে।(সূরা নিসা,টীকা-২১২)

বর্তমান খ্রিস্টবাদ ও সেন্টপল

হযরত ঈসা (আ ) এর প্রাথমিক অনুসারীগণ তাকে নবী বলেই মানতো। তারা মূসার শরীয়াতের অনুসারী ছিল। আকীদা বিশ্বাস, হুকুম, আহকাম ও ইবাদাত বন্দেগীর ব্যাপারে তারা অন্যান্য ইসরাঈলীদের থেকে কিছুতেই পৃথক মনে করতো না। ইহুদীদের সাথে তাদের মতভেদ শুধু এ ব্যাপারে ছিল যে, এরা হযরত ঈসাকে মসীহ স্বীকার করে নিয়ে তাঁর উপরে ঈমান এনেছিল এবং তারা তাঁকে মসীহ মানতে অস্বীকার করে। পরবর্তীকালে সেন্টপল যখন এ দলে (ঈসার অনুসারীদের দলে) যোগদান করে, তখন সে রোমীয়, গ্রীক এবং অন্যান্য অইহুদী ও অ ইসরাঈলী লোকদের মধ্যে এ ধর্মের প্রসার শুরু করে। এ উদ্দেশ্যে সে নতুন ধর্মের প্রবর্তন করে যার আকীদা বিশ্বাস, মৌলনীতি ও নির্দেশাবলী ঐ দ্বীন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা যা হযরত ঈসা (আ ) পেশ করছিলেন। সেন্টপল হযরত ঈসা (আ ) এর কোন সাহচর্য লাভ করেনি। বরঞ্চ তার সময়ে সে ছিল তার চরম বিরোধী। তাঁর পরেও সে কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁর অনুসারীদের পরম দুশমন ছিল। তারপর সে এ দলে যোগদান করে যখন এক নতুন ধর্ম প্রবর্তন শুরু করলো তখনও সে হযরত ঈসা (আ ) এর কোন বাণীকে সনদ হিসেবে পেশ করেনি। বরঞ্চ এ নতুন ধর্মের ভিত্তিই ছিল তার কাশফ ও ইলহাম বা স্বতঃপ্রবৃত্ত ভাবাবেগ ও উচ্ছ্বাস অনুপ্রেরণা। তার এ নতুন ধর্ম প্রবর্তনের লক্ষ্য ছিল এই যে, ধর্ম এমন হতে হবে যা দুনিয়ার অ ইহুদী জনসাধারণ (Gentilie)গ্রহ করবে। সে ঘোষণা করে যে, একজন খৃষ্টান ইহুদী শরীয়তের সকল বন্ধন থেকে মুক্ত। সে পানাহারে হালাল হারামের নিষেধাজ্ঞা রহিত করে। খাৎনা প্রথাও সে উচ্ছেদ করে যা দুনিয়ার অ ইহুদী লোকেরা অপছন্দ করতো। শেষ পর্যন্ত সে মসীহের উলুহিয়াত, খোদার পুত্র হওয়ার এবং শূলবিদ্ধ হয়ে সমগ্র মানব সন্তানের গোনাহের কাফফারা হওয়ার ধারণা বিশ্বাসও প্রণয়ন করে। কারণ সাধারণ মুশরিকদের স্বভাব প্রকৃতির সাথে এ ছিল সামঞ্জস্যশীল। সমীহের প্রাথমিক যুগের অনুসারীগণ এ নতুন বেদআত বা ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধিতা করে। কিন্তু সেন্টপল যে দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল তার মধ্য দিয়ে অ ইহুদী খৃস্টানদের এমন এক বিরাট প্লাবন এ নতুন ধর্মে প্রবেশ করে যে, তার মুকাবিলায় ঐসব মুষ্টিমেয় লোক টিকে থাকতে পারেনি। তথাপি তৃতীয় খৃস্টাব্দে শেষ পর্যন্ত এমন বহু সংখ্যক লোক ছিল যারা মসীহের উলুহিয়াতের আকীদা অস্বীকার করতো।

পুলুসী ধারণা বিশ্বাসের প্রসার

চতুর্থ শতাব্দীর প্রারম্ভে (৩২৫ খৃঃ) নিকিয়া কাউন্সিল (Nicaea Council)পুলুসী ধারণা বিশ্বাসকে খৃস্টবাদের অকাট্য ও সর্বজন স্বীকৃত ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করে। অতঃপর রোমীয় সম্রাট খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে এবং কায়সার বিওডেসিয়াস এর সময়ে এ ধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়। স্বাভাবিকভাবেই যে সকল গ্রন্থ এ ধারণা বিশ্বাসের পরিপন্থী ছিল তা পরিত্যক্ত হলো এবং ঐসব নির্ভরযোগ্য বলে গৃহীত হলো যা এ নতুন ধারণা বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যশীল। ৩৬৭ খৃস্টাব্দে প্রথম এথানীসিয়াস (এর একটি পত্রের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য ও সর্বজন স্বীকৃত গ্রন্থ সমষ্টির নাম ঘোষণা করা হয়। অতঃপর ডেমাসিয়াস (Damasias)এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় তা অনুমোদিত করা হয়। পঞ্চম শতাব্দীর শেষে পোপ গেলাসিয়াস (Gelasius)এ গ্রন্থ সমস্টোক সর্বজন স্বীকৃত বলে ঘোষণা করায় সাথে ঐসব গ্রন্থেরও তালিকা প্রস্তুত করে যা অ গ্রহণযোগ্য। অথচ যে পুলুসী ধারণা বিশ্বাসকে ভিত্তি করে ধর্মীয় গ্রন্থাবলীর নির্ভরযোগ্য হওয়া না হওয়ার সিদ্ধান্ত করা হয়, সে সম্পর্কে কখনো কোন খৃস্টীয় পণ্ডিত এ দাবী করতে পারেনি যে, তার মধ্যে কোন একটি আকীদা বিশ্বাসের শিক্ষা হযরত ঈসা(আ ) দিয়েছিলেন। বরঞ্চ নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সমষ্টির মধ্যে যেসব বাইবেল গ্রন্থ শামিল তন্মধ্যস্থ হযরত ঈসা (আ ) এর কোন উক্তি থেকেও এ নতুন ধারণা বিশ্বাসের প্রমাণ পাওয়া যায় না।(সূরা আন নিসা, টিকা-২১৫)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.