সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বৈরাগ্যবানের আবির্ভাব ও তার কারণ

হযরত ঈসা (আ )এর পর দুশ বছর পর্যন্ত খ্রিষ্টীয় গির্জাগুলোকে বৈরাগ্যবাদ স্পর্শ করেনি। কিন্তু সূচনা থেকে খৃস্টবাদের(বিকৃত) মধ্যে তার বাজ পাওয়া যেতো এবং এর ভেতরে ঐসব কল্পনা বিদ্যমান ছিল যা এ বস্তুর জন্মদান করে। বর্জন ও বস্তু নিরপেক্ষতাকে আদর্শ চরিত্র গণ্য করা, বিবাহ শাদী ও পার্থিব জীবন যাপন থেকে দরবেশী জীবন যাপনকে উৎকৃষ্টতর মনে করাই বৈরাগ্যবাদের ভিত্তি এ উভয় জিনিসই প্রথম থেকে খৃস্টবাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে সৌমার্য্যকে পবিত্রতার সমার্থবোধক মনে করার কারণে যারা গির্জায় ধর্মীয় কাজকর্ম করবে তাদের বেলায় একটা অবাঞ্ছিত ছিল যে, তারা বিয়ে শাদী করবে এবং সন্তানাদির মাতা পিতা হয়ে সংসারের ঝামেলা পোয়াবে।তৃতীয় শতাব্দী নাগাদ এ একটা ফেতনার আকার ধারণ করে এবং বৈরাগ্যবাদ মহামারী রূপে খৃস্টবাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

তিনটি কারণ

ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এর তিনটি বড়ো বড়ো কারণ ছিল:

একঃ প্রাচীন মুশরিক সমাজে যৌন অনাচার, পাপাচার এবং দুনিয়ার প্রতি আসক্তি যে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল তার প্রতিরোধকল্পে খৃষ্টান পন্ডিতগন ভারসাম্য অবলম্বন না করে চরম পন্থা অবলম্বন করে। তারা সতীত্বের প্রতি এতোটা গুরুত্ব দেয় যে, নারী পুরুষের সম্পর্ককে তারা অপবিত্র গণ্য করে, তা সে বিবাহের মাধ্যমেই হোক না কেন। তারা দুনিয়াদারীর বিরুদ্ধে এমন কঠোরতা অবলম্বন করে যে, কোন দ্বীনদার লোকের জন্যে সম্পদ রাখাই পাপ হয়ে পড়ে এবং চরিত্রের মানও হয়ে পড়ে যে, মানুষ কপর্দকহীন ও সবদিক দিয়ে সংসারত্যাগী হবে। এভাবে মুশরিক সমাজের ভোগ বিলাসের জবাবে তারা এমন এক চরমপন্থা অবলম্বন করে যে, ভোগ লিপ্সা পরিহার, প্রবৃত্তি ধ্বংস এবং কামনা বাসনা নির্মুল করা চরিত্রের লক্ষ্য হয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রকারের কৃচ্ছ্র সাধানের দ্বারা শরীরকে কষ্ট দেয়াকে আধ্যাত্ন্যিকতার পূর্ণতা ও তার প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

দুইঃ খ্রিস্টবাদ সাফল্য অর্জন করে যখন জনগণের মধ্যে প্রসার লাভ করতে থাকে, তখন আপন ধর্মের প্রচার ও প্রসারের আশায় গির্জা প্রতিটি পাপ কাজকে তার আওতাভুক্ত করতে থাকে যা জনগণের মনঃপুত ছিল। প্রাচীন মূর্তিপূজার স্থানে অলী দরবেশ বা মনীষীদের পূজা শুরু হয়। হোরাস (Horus)ও আয়েসিস (Isis)এর মূর্তির স্থলে মসীহ ও মারইয়ামের মূর্তিপূজা শুরু হয়। সেটারনালিয়া(Saturnalia) এর পরিবর্তে সামসের উৎসব পালন করা শুরু হয়। প্রাচীন যুগের তাবিজ তুমার, আমলিয়াত, ফালগিরি, ভবিষ্যৎ গণনা এবং জ্বিন ভূত তাড়ানোর আমল সকল খৃষ্টান দরবেশগণ শুরু করে।

এভাবে যেহেতু জনসাধারণ এমন লোককে আল্লাহ প্রেরিত মনে করতো যে, নোংরা ও উলঙ্গ থাকতো এবং কোন গর্ত বা পাহাড়ের গুহায় বা করতো, সে জন্যে খৃস্টান গির্জায় আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার এ ধারণাই জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং এ ধরনেরই লোকের অলৌকিক কাহিনীর বই পুস্তক খৃষ্টানদের মধ্যে রচনা করা হয়।

তিনঃ দ্বীনের সীমারেখা নির্ধারণ করার জন্যে খৃস্টানদের নিকটে কোন ব্তিারিত শরীয়ত এবং কোন সুস্পষ্ট সুন্নাত বা ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল না। মূসার শরীয়ত তারা বর্জন করেছিল এবং শুধুমাত্র ইঞ্জিলের মধ্যে কোন পরিপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যেতো না। এজন্যে খৃস্টান পন্ডিতগন বাইরের কিছু দর্শন ও রীতি নীতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং স্বয়ং নিজেদের কিছু ঝোঁক প্রবণতার ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের বেদআত ধর্মের ভেতর প্রবিষ্ট করতে থাকে। এসব বেদআতের মধ্যে বৈরাগ্যবাদও একটি।

বৈরাগ্যবাদের উৎস ও তার নেতৃত্বদানকারী

খৃস্টধর্মের পণ্ডিত ও নেতৃবৃন্দ বৈরাগ্যবাদের দর্শন ও তার কর্মপন্থা গ্রহণ করে বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষু সন্ন্যাসী এবং হিন্দু যোগী ও সন্ন্যাসীদের নিকট থেকে, প্রাচীন মিসরের ফকীর সন্ন্যাসীদের (Anchorites)নিকট থেকে, ইরানের বৈরাগ্যবাদী এবং পেলটো ও তার অনুসারীদের নিকট থেকে। একেই তারা আত্মশুদ্ধির পদ্ধতি, আধ্যাত্মিক উন্নতির উপায় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম গণ্য করে। কোন সাধারণ স্তরের মানুষ এ ভুল করেনি। তৃতীয় শতাব্দী থেকে সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত অর্থাৎ কুরআন নাযিলের যুগ পর্যন্ত যাদেরকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে খৃস্টবাদের উচ্চস্তরের ধর্মীয় পণ্ডিত, মনীষী ও নেতা বলে শ্রদ্ধা করা হেতা যথা সেন্ট, এথানসিয়াস, সেন্ট বাসেরল, সেন্ট গ্রেগরী, সেন্ট ক্রাইসিন্টেম, সেন্ট এমব্রুজ, সেন্ট জেরুন, সেন্ট অগাস্টাস সেন্ট বেনেডিকট, গ্রেগরী দি গ্রেট প্রভৃতি সকলেই সংসার বিরাগী ও বৈরাগ্যবাদের ধ্বজাবাহী ছিল। তাদেরই প্রচেষ্টায় গির্জায় বৈরাগ্যবাদের প্রচলন হয়।

প্রথম সন্ন্যাসী ও প্রথম খানকাহ বা মঠ

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, খৃস্টানদের মধ্যে প্রথম বৈরাগ্যবাদ শুরু হয় মিসর থেকে। তার প্রতিষ্ঠাতা ছিল সেন্ট এন্টনী (২৫০ খৃঃ – ৩৫০ খৃঃ)। সেই প্রথম খৃষ্টান সন্ন্যাসী। সে ফাইয়ুম অঞ্চলে পাসপিয়ার নামক স্থানে (এখন দায়রুল মাইমুন নামে অভিহিত) তার প্রথম খানকাহ কায়েম করে। তারপর সে দ্বিতীয় খানকাহ বা মঠ (Monk)তৈরী করে লোহিত সাগরের তীরে যাকে এখন দায়র মার এন্টনিউস বলা হয়। খৃস্টানদের মধ্যে বৈরাগ্যবাদের বুনিয়াদী নিয়ম পদ্ধতি তার লেখা ও হেদায়াত থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে।

যেখানে সেখানে মঠ নির্মাণ

এ সূচনার পর সমগ্র মিসরে মঠ নির্মাণের হিড়িক শুরু হয় এবং স্থানে স্থানে সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর মঠ নির্মিত। এ সবের কোন কোনটি একত্রে তিন হাজার সন্ন্যাসীর উপযোগী করে তৈরী করা হয়। ৩২৫ খৃস্টাব্দে মিসরে খুমিউস নামে এক খৃস্টান সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয় যে সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীর জন্যে দশটি বড়ো বড়ো মঠ তৈরী করে। তারপর এর ধারাবাহিকতা সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রসার লাভ করে। এ বৈরাগ্যবাদের ব্যাপারে গির্জার ব্যবস্থাপকগণ প্রথম প্রথম ভয়ানক জটিলতার সম্মুখীন হয়। কারণ তারা সংসার ত্যাগ, কৌমার্য এবং দারিদ্র ও কপর্দকহীনতাকে তো আধ্যাত্মিক জীবনের আদর্শ মনে করতো কিন্তু সন্ন্যাসীদের মতো বিয়ে শাদী করা, সন্তান জন্ম দেয়া ও সম্পদ রাখাকে পাপ মনে করতো না। অবশেষে এথানসিয়াস (মৃত্যু ৩০৩ খৃঃ) সেন্ট বাসেরল(মৃত্যু ৩৭৯ খৃঃ) সেন্ট অগাস্টিন (মৃত্যু: ৪৩০ খৃঃ) এবং গ্রেগরী দি গ্রেট (মৃত্যু ৬০৯ খৃঃ) প্রমুখ লোকদের প্রভাবে বৈরাগ্যবাদের বহু রীতি পদ্ধতি গির্জার ব্যবস্থাপনার মধ্যে যথারীতি প্রবেশ করে।

বৈরাগ্যবাদের ধারাবাহিকতার বৈশিষ্ট্য

এ বৈরাগ্যবাদী বিদআতের কিছু বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে নিম্নে বিবৃত হলোঃ

একঃ তার প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কঠোর তপস্যা এবং নতুন নতুন উপায়ে শরীরকে কষ্ট দেয়া।

দুইঃ সর্বদা নোংরা ও অপরিষ্কার থাকা দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য। তারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা থেকে দূরে তাকে। গোসল করা বা শরীরে পানি লাগানো তাদের নিকটে আল্লাহপুরস্তির পরিপন্থী। শরীরের পরিচ্ছন্নতাকে তারা মনের অপবিত্রতা মনে করে।

তিনঃ বৈরাগ্যবাদ দাম্পত্য জীবনকে কার্যত একেবারে হারাম করে দিয়েছে এবং বৈবাহিক সম্পর্ক নির্মমভাবে নির্মূল করেছে। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীর যাবতীয় প্রবন্ধ রচনা এ কথায়  ভরপুর যে, কৌমার্য সর্বশ্রেষ্ঠ নৈতিক মান এবং সতীত্বের অর্থ এই যে, মানুষ যৌন সম্পর্ক একেবারে বর্জন করে চলবে, তা স্বামী স্ত্রীর ব্যাপারই হোক না কেন। পবিত্র জীবনের পূর্ণতা এটা মনে করা হতো যে মানুষ তার নফসকে একেবারে ধ্বংস করবে এবং তার মধ্যে দৈহিক ভোগের কোন লিপ্সাই বাকী থাকবে না। তাদের মতে কামনা বাসনা নির্মূল করা প্রয়োজন এজন্যে যে, তার দ্বারা পাশবিক প্রবৃত্তি সবল হয়। ভোগ ও পাপ তাদের নিকটে একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। এমন কি আনন্দ উপভোগ করাই  তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহ বিস্মৃতির অনুরূপ। সেন্ট বাসেল হাসি ও মৃদু হাসি উভয়কেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এসব ধারণার ভিত্তিতে নারী পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্ক তাদের নিকটে অপবিত্র বলে বিবেচিত হয়। একজন সন্ন্যাসীর বিয়ে করা তো দূরের কথা, নারী মূর্তি দর্শনও নিষিদ্ধ। বিবাহিত হলে স্ত্রীকে ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়তে হবে। নারীদের মনেও এ ধারণা বদ্ধমূল করা হতো যে, যদি তারা আকাশ রাজ্যে প্রবেশ করতে চায় তাহলে আজীবন কুমারী থাকবে, সে মসীহের দুলহীন বা পাত্রী হবে এবং সে নারীর খোদার মায়ের অর্থাৎ মসীহের শাশুড়ি (Mother in Law of God) হওয়ার সৌভাগ্য হবে। তিনি আর এক স্থানে বলেন, এ পথের পথিকের (সালেকের) প্রথম কাজ হলো, সতীত্বের কুঠার দিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কের কাঠ কেটে ফেলা। এসব শিক্ষার ফলে ধর্মীয় প্রেরণা জাগ্রত হবার পর একজন খৃস্টান পুরুষ ও একজন খৃস্টান নারীর উপর প্রথম প্রতিক্রিয়া এ হয় যে, তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন চিরতরে শেষ হয়ে যায়।

গির্জার ব্যবস্থাপনা তিন শতক ধরে তাদের সাধ্যানুযায়ী এ চরম প্রান্তিক ধারণার প্রতিবন্ধকতা করতে থাকে। চতুর্থ শতকে ক্রমশঃ এ ধারণা বদ্ধমূল হয় যে, যে ব্যক্তি গির্জায় দায়িত্ব পালন করবে তার বিবাহিত হওয়াটা অতীব ঘৃণ্য কাজ। ৩৬২ খৃস্টাব্দে গেংরা কাউন্সিল (Council of Gengra)ছিল সর্বশেষ সংস্থা বা সভা সেখানে এ ধরনের ধারণা বিশ্বাসকে ধর্মের পরিপন্থী মনে করা হয়। কিন্তু তার অল্পকাল পরেই ৩৮৬ খৃস্টাব্দে Roman Synod সকল পাদ্রীকে পরামর্শ দেয় যে, তারা যেন দাম্পত্য সম্পর্ক থেকে দূরে থাকে। দ্বিতীয় বছর Siricius নির্দেশ দেয় যে, যে পাদ্রী বিবাহ করবে অথবা বিবাহের পর স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখবে তাকে পদচ্যুত করা হবে।

চারঃ বৈরাগ্যবাদের সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় এই যে, এ পিতা মাতা, ভাই বোন, সন্তান সন্ততির সম্পর্কও ছিন্ন করে দিয়েছে। খৃস্টান সাধু সন্ন্যাসীদের দৃষ্টিতে মাতা পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, ভাই ভগ্নির প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসা এবং সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসাও পাপ ছিল। তাদের কাছে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্যে এটি অপরিহার্য্য যে, মানুষ যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এ ব্যাপারে বৈরাগ্যবাদের দৃষ্টিকোণ এ ছিল যে, যে খোদা প্রেম কামনা করবে, সে মানব প্রেমের সকল বন্ধন ছিন্ন করবে যা দুনিয়ায় তাকে পিতা মাতা, ভাই ভগ্নি ও সন্তান সন্ততির সাথে আবদ্ধ করে।

পাঁচঃ নিকট আত্নীয়দের সাথে নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও কঠোরতা করার যে অভ্যাস তারা করতো, তার ফলে তাদের মানবীয় অনুভূতি বিলুপ্ত হয়ে যেতো। তার পরিণাম এ ছিল যে, যাদের সাথে তাদের ধর্মীয় মতবিরোধ হতো, তাদের উপর চরম অত্যাচার নির্যাতন চালাতো। চতুর্থ শতাব্দী অবধি খ্রিস্টবাদ আশি নব্বইটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেন্ট অগাস্টাইন তার আপন যুগে এ দলের সংখ্যা ৮৮ গণনা করে। এ দলগুলো একে অপরের প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করতো। সন্ন্যাসীগণই এ ঘৃণার অগ্নি প্রজ্বলিত করতো। মতবিরোধ পোষণকারী প্রতিপক্ষকে আগুনে জ্বালিয়ে মারার ব্যাপারেও সন্ন্যাসীগণ অগ্রগামী ছিল। এ দলীয় সংঘর্ষের শীর্ষস্থান চিল এস্কান্দরিয়া বা আলেকজান্দ্রিয়া।

ছয়ঃ বর্জন ও বস্তু নিরপেক্ষতা এবং ফকীরি দরবেশীর সাথে দুনিয়ার সম্পদ অর্জনও কম করা হয়নি। পঞ্চম শতাব্দীর প্রারম্ভে অবস্থা এই হয়েছিল যে, রোমের বিশপ রাজারহালে আপন প্রসাদে বাস করতো। তার যানবাহন যখন রাস্তায় বেরুতো তখন তার আড়ম্বর ও জাঁকজমক  রোম সম্রাট অপেক্ষা কোনোদিক দিয়ে কম চিল না। মঠ ও গির্জাগুলোতে সম্পদের প্রবাহ সপ্তম শতাব্দী(কুরআন নাযিলের যুগ) পর্যন্ত পৌছতে পৌছতে প্রবল প্লাবনের  আকার ধারণ করে।—– বিশেষ করে যে জিনিস এ অধঃপতনের কারণ ছিল তাহলো এই যে, সন্ন্যাসীদের অসাধারণ  সাধনা ও তাদের প্রবৃত্তি নিধনের পরাকাষ্ঠা দেখে জনসাধারণ যখন তাদের প্রতি অতি মাত্রায় শ্রদ্ধা পোষণ করতে থাকে, তখন বহু ধনলিপ্সু ব্যক্তি দরবেশী পোশাক পরিধান করে সন্ন্যাসীদের দলে যোগদান করে এবং তারা সংসার বর্জনের ছদ্মবেশে দুনিয়া লাভের ব্যবসা এমন জমজমাট করে যে, বড়ো বড়ো দুনিয়া লিপ্সু তাদের কাছে হার মানে।

সাতঃ সতীত্বের ব্যাপারেও প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বৈরাগ্যবাদ বার বার পরাজয় বরণ করে।—- মঠগুলোতে রিপুদমনের কিছু কঠোর সাধনা এমনও ছিল যে, বৈরাগ্যবাদী পাদ্রী একত্রে মিলিত হয়ে বাস করতো এবং কখনো কখনো কঠোরতর অনুশীলনের জন্যে উভয়ে একই শয্যায় রাত্রি যাপন করতো।সেন্ট ইভাগ্রিয়াস (St.Evagrius)ফিলিস্তিনের এ ধনের পাদ্রীদের রিপু দমনের প্রশংসা করে বলেন, তারা অনুশীলনকারিনী নারীদের সাথে মিলিত হয়ে স্নান করতো, তারা পরস্পরকে দেখতো, স্পর্শ করতো এবং কোলাকোলিও করতো। কিন্তু তথাপি প্রকৃতি তার উপর জয়ী হতে পারতো না। —– প্রকৃতির বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করে, প্রকৃতি তাদের প্রতিশোধ না নিয়ে ছাড়ে না। বৈরাগ্যবাদ প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে অবশেষে চরিত্রহীনতার যে গভীর গহ্বরে পতিত হয়, তার লজ্জাকর কাহিনী অষ্টম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের ধর্মীয় ইতিহাসের এক দুরপনেয় কলঙ্ক। —- মধ্যযুগের গ্রন্থকারদের লিখিত গ্রন্থাবলীতে এমন বহু অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে পাদ্রিনিদের খানকাহ বা মঠগুলো চরিত্রহীনতার লীলাক্ষেত্র হয়ে পড়েছিল। তাদের চার প্রাচীরের মধ্যে নবজাত শিশুদের বেপরোয়া হত্যাযজ্ঞ চলতো। পাদ্রী ও গির্জার ধর্মীয় কর্মীগণ যাদের সাথে বিবাহ সম্পর্ক নিষিদ্ধ  তাদের সাথেও অবৈধ  সম্পর্কস্থাপন করতো। মঠগুলোর প্রকৃতি বিরুদ্ধ অপরাধও ব্যাপক আকার ধারণ করে।(সূরা আল কাহাফ,টীকা-২০)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.