সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বাইবেল গ্রন্থাবলীর ঐতিহাসিক মর্যাদা

ইহুদীদের ন্যায় খৃষ্টানদের নিকটেও আসমানী গ্রন্থ সংরক্ষিত থাকতে পারেনি। এ কারণেই দ্বীনের মধ্যে  বিকৃতির পথ ধরে ভ্রান্ত ধারণা বিশ্বাস ও নির্দেশাবলী প্রবেশ করেছে। প্রকৃত বাইবেল (ইঞ্জিল) যদি সংরক্ষিত হতো তাহলে খ্রিস্টবাদ তার বর্তমান আকারে প্রকাশ লাভ করতো না। নিম্নে বাইবেল গ্রন্থাবলী সম্পর্কে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদীর গবেষণা পেশ করা হচ্ছে। (সংকলকৃন্দ)

সূত্র সম্পর্কে গবেষণা

আজ  আমরা যে গ্রন্থ সমষ্টিকে ইঞ্জিল বা বাইবেল বলি, আসলে তার মধ্যে চারটি বড়ো বড়ো গ্রন্থ সন্নিবিষ্ট রয়েছে, যথা, মথি(Mathew),মার্ক(Mark),লুক(Luke) এবং যোহন(John)।কিন্তু এ সবের মধ্যে কোন একটিও হযরত ঈসা (আ ) এর উপরে অবতীর্ণ গ্রন্থ নয়। কুরআন শরীফে যেভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সমস্ত আয়াত ও সূরা একত্রে সন্নিবেশিত আছে, যেসব মুহাম্মাদ (সা )এর উপর নাযিল হয়েছিল, তেমনি যেসব অহী হযরত ঈসা (আ ) এর উপর নাযিল হয়েছিল, তা একত্রে কোন গ্রন্থে পাওয়া যায় না, তার পর যেসব সদুপদেশ ও হেদায়াত হযরত ঈসা (আ ) এর হাওয়ারীদের দ্বারা অথবা হাওয়ারীদের শিষ্যবৃন্দের দ্বারা। এসব গ্রন্থে তাঁরা তাঁদের জানামতে হযরত ঈসা (আ ) এর অবস্থা ও তাঁর শিক্ষাদীক্ষা সন্নিবেশিত করেছেন।

মথির প্রতি আরোপিত গ্রন্থ

উপরোক্ত গ্রন্থাবলীর কোন সূত্র জানা নেই বলে সেগুলো তেমন নির্ভরযোগ্য নয়। প্রথম গ্রন্থটি হযরত মসীহের হাওয়ারী মতির প্রতি আরোপ করা হয়েছে এবং ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে, তা মথি কর্তৃক লিখিত নয়। মথির প্রকৃত গ্রন্থ লজিয়া(Ligia)বিলুপ্ত হয়েছে। যে গ্রন্থ মথির প্রতি আরোপ করা হয়, তার গ্রন্থকার একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি। তিনি এ গ্রন্থ প্রণয়নে অন্যান্য পুস্তকের সাথে লুজিয়া গ্রন্থেরও সাহায্য নিয়েছেন। এর মধ্যে স্বয়ং মথির বর্ণনা এভাবে করা হয়েছে যেমন কোন অপরিচিত লোকের করা হয়। (মথি অধ্যায় ৯- স্তোত্র ৯-বলেঃ ইয়াসু সামনে অগ্রসর হয়ে মথি নামে এক ব্যক্তিকে কর আদায়ের ফাঁড়িতে দেখতে পেলেন। একথা ঠিক যে গ্রন্থকার নিজের বর্ণনা এভাবে দিতে পারেন না)।তারপর এ গ্রন্থপাঠে জানা যায় যে, তার অধিকাংশ বিষয়বস্তু মার্কের ইঞ্জিল থেকে গৃহীত হয়েছে। কারণ তার ১০৬৮ স্তোত্রের মধ্যে ৪৭০ টি স্তোত্র অবিকল মার্কের ইঞ্জিলে আছে। এর গ্রন্থকার যদি হাওয়ারী হত, তাহলে এমন এক ব্যক্তির সাহায্য নেয়ার কোনই প্রয়োজন ছিল না, যে না হাওয়ারী ছিল এবং না সে কোনদিন হযরত ঈসা (আ ) কে দেখেছে। খৃস্টান পন্ডিতগন বলেন যে, এ গ্রন্থ ৭০ খৃস্টাব্দে অর্থাৎ হযরত ঈসা (আ )এর ৪১ বছর পর লেখা হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এ গ্রন্থ ৭০ খৃস্টাব্দে প্রণীত হয়েছে।

মার্কের প্রতি আরোপিত গ্রন্থ

দ্বিতীয় গ্রন্থ মার্কের প্রতি আরোপিত এবং সাধারণত স্বীকার করা হয় যে, মার্ক স্বয়ং এ গ্রন্থের রচয়িতা। কিন্তু এটা প্রমাণিত যে, তিনি কখনো হযরত ঈসা (আ ) এর সাথে সাক্ষাৎ করেননি এবং তাঁর মুরিদও তিনি হননি।(অনেকে বলেন, হযরত ঈসা (আ ) কে শূলে চড়াবার সময় সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিল। অবশ্যি এরও কোন প্রমাণ নেই।–গ্রন্থকার । তিনি প্রকৃতপক্ষে হাওয়ারী পিটার্সের (St.Peters) মুরিদ ছিলেন। তিনি তাঁর কাছে যা শুনতেন, তাই গ্রীক ভাষায় লিখে রাখতেন। এজন্যে খৃস্টান গ্রন্থকারগণ তাঁকে পিটার্সের মুখপাত্র বলতেন। অনুমান করা হয় যে এ গ্রন্থ ৬৩ খৃষ্টাব্দ থেকে ৭০ খৃষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে রচিত হয়।

লুকের প্রতি আরোপিত গ্রন্থ

তৃতীয় গ্রন্থটি লূকের প্রতি আরোপ করা হয়। একথা বর্জন স্বীকৃত যে, লূক কখনো মসীহকে দেখেননি এবং তাঁর কাছে কোন কিছু লাভও করেননি। তিনি ছিলেন সেন্ট পলের মুরিদ। তিনি সর্বদা পলের সহচর ছিলেন এবং তিনি তাঁর ইঞ্জিলে পলেরেই মুখপাত্র হিসেবে সবকিছু লিপিবদ্ধ করেছেন। অথচ স্বয়ং পল এ ইঞ্জিলকে নিজস্ব ইঞ্জিল বলেন। কিন্তু একথা প্রমাণিত যে, সেন্ট পল স্বয়ং মসীহের সাহচর্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং খৃস্টানদের বর্ণনা মতে মসীহের শূলে চড়ানোর ঘটনার ছ বছর পর তিনি খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেন। এজন্যে লূক মসীহের মাঝখানে বর্ণনা পরস্পরার যোগসূত্র একেবারেই পাওয়া যায়।= না। লূকের ইঞ্জিল রচনার কোন ইতিহাসও নির্ধারিত নেই। কারো মতে এর রচনাকাল ৫৭ খৃষ্টাব্দ এবং কারো মতে ৭৪ খৃষ্টাব্দ। কিন্তু হারিংকে মিকসগিফার্ট এবং প্লুমারের ন্যায় গবেষণা বিশারদগণের মতে এ গ্রন্থ ৮০ খৃষ্টাব্দের পূর্বে লিখিত হয়নি।

ইউহান্নার প্রতি আরোপিত গ্রন্থ

চতুর্থ গ্রন্থ ইউহান্নার প্রতি আরোপিত হয়। আধুনিক গবেষণা মুতাবেক এ গ্রন্থ প্রখ্যাত হাওয়ারী ইউহান্না কর্তৃক রচিত নয়। বরঞ্চ এ এমন অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তির রচনা যার নাম ছিল ইউহান্না (ইয়াহইয়া বা John)এ গ্রন্থটি মসীহের বহু পরে ৯০ খৃষ্টাব্দে অথবা তারও পরে লিখিত হয়। হেরিংক এটাকে বাড়িয়ে ১১০ খৃষ্টাব্দ বলেন। এ বইগুলোর কোন একটিরও বর্ণনা পরস্পরা মসীহন্ত পৌঁছে না। এ সবের সনদ সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, হযরত মসীহ কি বলেছিলেন এবং কি বলেননি। কিন্তু গভীরভাবে গবেষণা করলে জানা যায় যে, এ বইগুলোর দলিল প্রমাণে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।

ইঞ্জিলসমূহের অনির্ভরযোগ্য হওয়ার ছয়টি কারণ

প্রথম চারটি ইঞ্জিলের বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে। এমন কি যে পর্বতবাসীর ওয়াজ খৃস্টীয় শিক্ষা দীক্ষার মূল তা মথি, মার্ক এবং লূকে এ তিনটিতেই বিভিন্নভাবে এবং বিপরীতার্থে বর্ণনা করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ঃ চারটি ইঞ্জিলেই তাদের প্রণেতাদের চিন্তাধারা ও প্রতিক্রিয়া সুস্পষ্ট। মথি ইহুদীদেরকে সম্বোধন করেছেন বলে মনে হয় এবং তিনি তাদেরকে চূড়ান্ত সুযোগ দান করেছেন দেখা যায়। মার্ক রোমীয়গণকে সম্বোধন করেছেন এবং তাদেরকে ইসরাঈলী মতবাদের সাথে পরিচিত করতে চান। লূক স্নেট পলের মুখপাত্র এবং অন্যান্য হাওয়ারীদের বিরুদ্ধে তাঁর দাবীগুলো সমর্থন করতে চান। প্রথম শতাব্দীর শেষভাগে যেসব দার্শনিক চিন্তাধারা খৃষ্টানদের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল তার দ্বারা তিনি প্রভাবিত বলে মনে হয়। এভাবে এ চার ইঞ্জিলের মধ্যে অর্থগত মতভেদ শাব্দিক মতভেদ থেকে অধিক হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ঃ ইঞ্জিলের সব গ্রন্থগুলোই গ্রীক ভাষায় লিখিত হয়। অথচ হযরত ঈসা (আ ) এবং তাঁর সকল হাওয়ারীর ভাষা ছিল সুরিয়ানী। ভাষার বিভিন্নতার জন্যে চিন্তাধারার ব্যাখ্যায়ও মতভেদ হওয়া অতি স্বাভাবিক।

চতুর্থঃ ইঞ্জিলগুলো লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীর পূর্বে হয়নি। ১৫০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সাধারণ ধারণা এ ছিল যে, মৌখিক বর্ণনা লিখিত বর্ণনা থেকে অধিকতর উপযোগী। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে লিপিবদ্ধ করার বাসনা জাগ্রত হয়। কিন্তু ঐ সময়ের লিখিত জিনিস নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় না। নিউ টেস্টামেন্টের (New testament)প্রথম নির্ভরযোগ্য মূলবচন ৩৯৭ খৃষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত কার্থেজের কাউন্সিলে অনুমোদিত হয়।

পঞ্চমঃ বর্তমানে ইঞ্জিলের যেসব প্রাচীন সংস্করণ পাওয়া যায় তা চতুর্থ খৃস্টীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের। দ্বিতীয় সংস্করণ পঞ্চম শতাব্দীর এবং তৃতীয় অপূর্ণ সংস্করণ যা রোমীয় পোপের লাইব্রেরিতে আছে, তাও চতুর্থ শতাব্দীর অধিক পুরানো নয়। অতএব বলা মুশকিল যে প্রথম তিন শতাব্দীতে যেসব ইঞ্জিল প্রচলিত ছিল তার সাথে বর্তমানে ইঞ্জিলের কতটুকু সামঞ্জস্য রয়েছে।

ষষ্ঠঃ কুরআনের মতো ইঞ্জিল গ্রন্থগুলো হিফয করার কোন চেষ্টা করা হয়নি। এ সবের প্রকাশনা নির্ভর করতো অর্থগত বর্ণনার উপরে। স্মৃতিশক্তির অভাব ও বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত চিন্তাধারার প্রভাব থেকে স্বাভাবিকভাবেই এসব মুক্ত হতে পারে না। পরে যখন লেখার কাজ শুরু হয় তখন তা নকল নবিশদের দয়ার উপর নির্ভর করতো। নকল করার সময়ে প্রত্যেকে যা কিছু তার চিন্তাধারার পরিপন্থী মনে করতো তা সহজেই বাদ দিতে পারতো এবং তার মনঃপুত কোন কিছুর অভাব দেখলে তা সংযোজন করতে পারতো।

এসব কারণেই আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না যে, ইঞ্জিল চারটিতে হযরত মসীহের সত্যিকারের শিক্ষা রয়েছে। এ গোটা আলোচনা নিম্নের গ্রন্থাবলীর আলোকে করা হয়েছেঃ

Dum,ellow – gmmentary on the HOLY BIBLE

W..K Cheyne- ENCYCLOPAEDIA BIBLICA

Willman – History of Christianity

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.