সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

প্রচলিত চারটি ইঞ্জিলে হযরত ঈসা (আ ) এর শিক্ষা

যে অবস্থা ও পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সাইয়েদুনা মসীহ (আ ) ফিলিস্তিনবাসীদের সমনে হুকুমাতে ইলাহীয়ার দাওয়াত পেশ করেন, যেহেতু সে অবস্থার সাথে আমাদের বর্তমান অবস্থার মিল রয়েছে, সেজন্যে তাঁর কর্মপদ্ধতির মধ্যে আমাদের জন্যে পথনির্দেশ রয়েছে।

তাওহীদের দাওয়াত

আর অধ্যাপকদের একজন —– তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, সকল আজ্ঞার মধ্যে কোনটা প্রথম ? যীশু উত্তর করিলেন, প্রথমটা এই, হে ইসরায়েল, শুন, আমাদের ঈশ্বর প্রভু একই প্রভু, আর তুমি তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ, তোমার সমস্ত মন ও তোমার সমস্ত শক্তি দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করবে।——- অধ্যাপক তাঁহাকে কহিল, বেশ, শুরু, আপনি সত্য বলিয়াছেন যে, তিনি এক, এবং তিনি ব্যতীত অন্য নাই, মার্ক ১২ঃ২৮ – ৩২

তোমার ঈশ্বর প্রভুকেই প্রণাম করিবে, কেবল তাহারই আরাধনা করিবে।–লূক ৪ঃ৮

হুকুমাতে ইলাহী

অতএব তোমরা এই মত প্রার্থনা করিও, হে আমাদের স্বর্গস্থ পিতা তোমার নাম পবিত্র বলিয়া মান্য হউক, তোমার রাজ্য আইসুক, তোমার ইচ্ছা সিদ্ধ হউক, যেমন স্বর্গে তেমনি পৃথিবীতেও হউক, -মথি ৬ঃ ৯ -১০

শেষ আয়াতে হযরত মসীহ (আ ) তাঁর লক্ষ্য সুস্পষ্ট করে দেন। সাধারণ ভ্রান্ত ধারণা এ ছিল যে, খোদার বাদশাহির অর্থ আধাত্নিক বাদশাহি। উপরোক্ত আয়াত তা ভ্রান্ত প্রমাণ করে। তাঁর সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য এ ছিল যে, খোদার আইন ও শরীয়তের হুকুম তেমনি কার্যকর হোক যেমন সমগ্র সৃষ্টিজগতে তাঁর প্রাকৃতিক আইন কার্যকর আছে। এ বিপ্লবের জন্যে তিনি লোক তৈরী করছিলেন।

বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক

মনে করিও না যে, আমি পৃথিবীতে শান্তি দিতে আসিয়াছি, শাস্তি দিতে আসি নাই, কিন্তু খড়গ দিতে আসিয়াছি। কেননা আমি পিতার সহিত পুত্রের, মাতার সহিত কন্যার, এবং শাশুড়ির সহিত বধূর বিচ্ছেদ জন্মাইতে আসিয়াছি, আর আপন আপন পরিজনই মনুষ্যের শত্রু হইবে। যে কেহ পিতা কি মাতাকে আমা হইতে অধিক ভাল বাসে, সে আমার যোগ্য নয়, এবং  যে কেহ পুত্র কি কন্যাকে আমা হইতে অধিক ভাল বাসে, সে আমার যোগ্য নয়।

সত্যের পথে পরীক্ষা অনিবার্য

আর যে কেহ আপন ক্রুশ তুলিয়া লইয়া আমার পশ্চাৎ না আইসে (ক্রুশ হাতে তুলে নেয়ার অর্থ বলে মৃত্যুর জন্যে তৈরী থাকা, যেমন ধারা উর্দুতে বলা হয় মাথা তাতের তালুতে রাখা (অর্থাৎ মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত থাকা)-গ্রন্থকার)সে আমার যোগ্য নয়। যে কেহ আপন প্রাণ রক্ষা করে, সে তাহা হারাইবে, এবং যে কেহ আমার নিমিত্ত আপন প্রাণ হারায়, সে তাহা রক্ষা করিবে।– মথি ১০ঃ৩৮ – ৩৯

কেহ যদি আমার পশ্চাৎ আসিতে ইচ্ছা করে, তবে সে আপনাকে (আমিত্ব অর্থ আত্নপূজা ও ব্যক্তিস্বার্থ-গ্রন্থকার।) অস্বীকার করুক, আপন ক্রুশ তুলিয়া লউক, এবং আমার পশ্চাৎগামী হউক।–মথি ১৬ঃ২৪

আর ভ্রাতা ভ্রাতাকে ও পিতা সন্তানকে মৃত্যুতে সমর্পণ করিবে, এবং সন্তানেরা মাতাপিতার বিপক্ষে উঠিয়া তাঁহাদিগকে বধ করাইবে। আর আমার নাম প্রযুক্ত তোমরা সকলের ঘৃণিত হইবে, কিন্তু যে কেহ শেষ পর্যন্ত স্থির থাকিবে, সেই পরিত্রাণ পাইবে। মথি১০ঃ২১-২২

যদি কেহ আমার নিকটে আইসে, আর আপন পিতা, মাতা, স্ত্রী, সন্তানসন্ততি, ভ্রাতৃগণ, ও ভগিনীগণকে এমন কি, নিজ প্রাণকেও অপ্রিয় জ্ঞান না করে, তবে সে আমার শিষ্য হইতে পারে না। যে কেহ নিজের ক্রস বহন না করে ও আমার শিষ্য হইতে পারে না। বাস্তবিক দুর্গ নির্মাণ করিতে ইচ্ছা হইলে তোমাদের মধ্যে কে অগ্রে বসিয়ে ব্যয় হিসাব করিয়া না দেখিবে, সমাপ্ত করিবার সঙ্গতি তাহার আছে কি না? কি জানি ভিত্তিমূল বসাইলে পর যদি সে সমাপ্ত করিতে না পারে, তবে যত লোক তাহা দেখিবে, সকলে তাহাকে বিদ্রূপ করিতে আরম্ভ করিবে, বলিবে, এ ব্যক্তি নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিল,কিন্তু সমাপ্ত করিতে পারিল না। অথবা কোন রাজা অন্য রাজার সহিত যুদ্ধে সমাঘাত করিতে যাইবার সময়ে অগ্রে বসিয়া বিবেচনা করিবেন না, যিনি বিংশতি সহস্য সৈন্য লইয়া আমার বিরুদ্ধে আসিতেছেন, আমি দশ সহস্য লইয়া কি তাঁহার সম্মুখবর্তী হইতে পারি? যদি না পারেন, তবে শত্রু দূরে থাকিতে তিনি দূত প্রেরণ করিয়া সন্ধির নিয়ম জিজ্ঞাসা করিবেন। ভাল, তদ্রূপ তোমাদের মধ্যে যে কেহ আপনার সর্বস্ব ত্যাগ না করে, সে আমার শিষ্য হইতে পারে না।– লূক ১৪ঃ২৬-৩৪

একটি বিপ্লবী আন্দোলন

এসব আয়াত বা স্তোত্রগুলো পরিষ্কার প্রমাণ করে যে, হযরত ঈসা (আ ) শুধু একটা ধর্ম প্রচারের জন্যেই আবির্ভূত হননি। বরঞ্চ গোটা তামাদ্দুনিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করাই তাঁর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, যার জন্যে ইহুদী রাষ্ট্র, ফকীহ এবং ফিরিসীদের শাসনকর্তৃত্ব, মোটকথা যাবতীয় প্রবৃত্তি পূজারী ও স্বার্থ পূজারীদের বিরুদ্ধে সংঘাত সংঘর্ষের আশংকা ছিল। এজন্যে তিনি পরিষ্কার ভাষায় মানুষকে বলে দিতেন যে, যে কাজ তিনি করতে যাচ্ছেন তা ভয়ানক বিপজ্জনক এবং তাঁর সাথে তারাই চলতে পারে যারা যাবতীয় বিপদ আপদের সম্মুখীন হওয়ার জন্যে প্রস্তুত।

সহনশীলতার প্রেরণা

কিন্তু আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমরা দুষ্টের প্রতিরোধ করিও না, বরং যে কেহ তোমার দক্ষিণ গালে চড় মারে, অন্য গাল তাহার দিকে ফিরাইয়া দেও। আর যে তোমার সহিত বিচার স্থানে বিবাদ করিয়া তোমার আংরাখা লইতে চায়, তাহাকে চোগাও লইতে দেও। আর যে কেহ এক ক্রোশ যাইতে তোমাকে পীড়াপীড়ি করে, তাহার সঙ্গে দুই ক্রোশ যাও।– মথি ৫ঃ৩৯-৪১

আর যাহারা শরীর বধ করে, কিন্তু আত্মা বধ করিতে পারে না, তাহাদিগকে ভয় করিও না, কিন্তু যিনি আত্মা ও শরীর উভয় নরকে বিনষ্ট করিতে পারেন,-মথি ১০ঃ২৮

দুনিয়ার মায়া পরিত্যাগ ও আখিরাতের চিন্তা করার দাওয়াত

তোমরা পৃথিবী আপনাদের জন্যে ধন সঞ্চয় কিরও না, এখানে ত কীটে ও মর্চ্চায় ক্ষয় করে, এবং এখানে চোরে সিধ কাটিয়া চুরি কওরে। কিন্তু স্বর্গে আপনাদের জন্য ধন সঞ্চয় কর, সেখানে কীটে ও মর্চ্চায় ক্ষয় করে না, সেখানে চোরেও সিধ কাটিয়া চুরি করে না। -মথি ৬ঃ১৯-২০

কেহই দুই কর্তার দাসত্ব করিতে পারে না, কেননা সে হয় ত এক জনকে দ্বেষ করিবে, আর এক জনকে প্রেম করিবে, নয় ত এক জনের প্রতি অনুরক্ত হইবে, আর এক জনকে তুচ্ছ করিবে, তোমরা ঈশ্বর এবং ধন উভয়ের দাসত্ব করিতে পার না। এই জন্য আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, কি ভোজন করিব, কি পান করিব বলিয়া প্রাণের বিষয়ে, কিম্বা কি পরিব বলিয়া শরীরের বিষয়ে ভাবিত হইওনা, ভক্ষ্য হইতে প্রাণ ও বস্ত্র হইতে শরীর কি বড় বিষয় নয়? আকাশের পক্ষীদের প্রতি দৃষ্টিপাত কর, তাহারা বুনেও না, কাটেওনা, গোলাঘরে সঞ্চয়ও করে না, তথাপি তোমাদের স্বর্গীয় পিতা তাহাদিগকে আহার দিয়ো থাকেন, তোমরা কি তাহাদের হইতে অধিক শ্রেষ্ঠ নও? আর তোমাদের মধ্যে কে ভাবিত হইয়া আপন বয়স এক হস্তমাত্র বৃদ্ধি করিতে পারে? আর বস্ত্রের নিমিত্ত কেন ভাবিত হও? ক্ষেত্রের কানুড় পুষ্পের বিষয়ে বিবেচনা কর, সেগুলি কেমন বাড়ে, সে সকল শ্রম করে না, সূতাও কাটেনা, তথাপি আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, শলোমনও আপনার সমস্ত প্রতাপে ইহার একটির ন্যায় সুসজ্জিত ছিলেন না। ভাল, ক্ষেত্রের যে তৃণ আজ আছে ও কাল চুলায় ফেলিয়া দেওয়া যাইবে, তাহা যদি ঈশ্বর এরূপ বিভূষিত করেন, তবে হে অল্প বিশ্বাসীরা, তোমাদিগকে কি আরও অধিক নিশ্চয় বিভূষিত করিবেন না ?অতএব ইহা বলিয়া ভাবিত হইওনা যে, কি ভোজন করিব? বা কি পান করিব? বা কি পরিব? কেননা পরজাতীয়েরাই এই সকল বিষয় চেষ্টা করিয়া থাকে, তোমাদের স্বর্গীয় পিতা ত জানেন যে,এই সকল দ্রব্যে তোমাদের প্রয়োজন আছে। কিন্তু তোমরা প্রথমে তাঁহার রাজ্য ও তাঁহার ধার্মিকতার বিষয়ে চেষ্টা কর, তাহা হইলে ঐ সকল দ্রব্যও তোমাদিগকে দেওয়া হইবে। – মথি ৬ঃ২৪-৩৩

যাঞ্চা কর, তোমাদিকে দেওয়া যাইবে, অন্বেষণ কর, পাইবে, দ্বারে আঘাত কর, তোমাদের জন্য খুলিয়া দেওয়া যাইবে। – মথি ৭ ঃ৭

কষ্ট সহিষ্ণুতা শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্য

সাধারণ ভ্রান্ত ধারণা এই যে, হযরত ঈসা (আ ) বৈরাগ্যবাদ বর্জন ও বস্তু নিরপেক্ষতার শিক্ষা দেন। অথচ এ বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনাতে মানুষকে ধৈর্য, সহনশীলতা, আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল প্রভৃতির শিক্ষা দীক্ষা দেয়া ব্যতীত উপায় ছিল না। যেখানে একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সর্বশক্তি দিয়ে দুনিয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তার লাব করে আছে এবং জীবন যাপনের সমুদয় উপায় উপাদান যার মুষ্টিতে, এমন স্থানে কোন দল বিপ্লবের জন্যে দাঁড়াতে পারে না, যতক্ষণ না সে জান ও মালের মহব্বত মন থেকে দূর করে দেবে, কষ্ট স্বীকার করার জন্যে তৈরী না থাকবে এবং বহু ক্ষতি স্বীকার করার জন্যে প্রস্তুত না হবে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার অর্থ প্রকৃতপক্ষে নিজের উপরে সকল প্রকার বিপদ মুসিবত আহবান করা। এ কাজ যাদের করতে হয়, তাদেরকে এক চড় খেয়ে দ্বিতীয় চড়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। পড়নের জামা হাত ছাড়া হলে, চোগা ছেড়ে দেয়ার জন্যেও তৈরী থাকতে হবে। ভাত কাপড়ের চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলতে হবে। রেযেকের ধনভাণ্ডার যাদের হাতে তাদের সাথে লড়াই করে রেযেক হাসিল করার আশা করা যায় না। অতএব যে উপায় উপাদান থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু  আল্লাহর উপর ভরসা করে এ পথে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, সেই তাদের বিরুদ্ধে লড়তে পারে।

হুকুমাতে ইলাহীয়ার ব্যাপক মেনিফেষ্টো

হে পরিশ্রান্ত ও ভারাক্রান্ত লোক সকল, আমার নিকটে আইস, আমি তোমাদিগকে বিশ্রাম দিব। আমার ষোঁয়ালী আপনাদের উপরে তুলিয়া লও, এবং আমার কাছে শিক্ষা কর, কেননা আমি মৃদুশীল ও নম্রচিত্ত তাহাতে তোমরা আপন আপন প্রাণের জন্য বিশ্রাম পাইবে। কারণ আমার যোঁয়ালি সহজ ও আমার ভার লঘু।– মথি১১ঃ২৮-৩০

এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ হ্রদয়গ্রাহী ভাষায় হুকুমাতে ইলাহীয়ার মেনিফেষ্টো সম্ভবত রচনা করা যেতে পারেনা। মানুষের উপর মানুষের শাসনের জোয়াল বড়োই কঠিন ও ভারী। এ কঠিন ও ভারী বোঝার তলে পিষ্ট মানুষকে হুকুমাতে ইলাহীয়ার নকীব যে পয়গাম দিতে পারেন তাহলো এই যে, যে হুকুমতের জোয়াল বা গুরুদায়িত্ব তিনি তাদের উপর চাপাতে চান তা যেমন কোমল, তেমনি হালকাও।

শাসন ক্ষমতা বিরাট সেবা

কিন্তু তিনি তাঁহাদিগকে কহিলেন, জাতিগণের রাজারাই তাহাদের উপরে প্রভুত্ব করে, এবং তাহাদের শাসনকর্তারাই হিতকারী বলিয়া আখ্যাত হয়। কিন্তু তোমরা সেই রূপ হইওনা, বরং তোমাদের মধ্যে যে শ্রেষ্ঠ, সে কনিষ্ঠের ন্যায় হউক, এবং যে প্রধান, সে পরিচারকের ন্যায় হউক। – লুক ২২ঃ২৫-২৬

হযরত মসীহ এসব উপদেশ তাঁর হাওয়ারী এবং সাহাবীদেরকে দিতেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন বাণী ইঞ্জিলগুলোতে রয়েছে। সে সবের মর্ম এই যে, ফেরাউন নমরূদকে তাড়িয়ে তোমরা নিজেরা যেন ফেরাউন নমরূদ না হয়ে পড়।

ইহুদী আলেম পীরদের সমালোচনা

তখন যীশু লোকসমূহকে ও নিজ শিষ্যদিগকে কহিলেন, অধ্যাপক ও ফরীশীরা মোশির আসনে বসে। অতএব তাহারা তোমাদিগকে যাহা কিছু বলে, তাহা পালন করিও, মানিও, কিন্তু তাহাদের কম্মের মত কর্ম করিও না, কেননা তাহারা বলে, কিন্তু করে না। তাহারা ভারী দুর্বহ বোঝা বাঁধিয়া লোকদের কাঁধে চাপাইয়া দেয়, কিন্তু আপনারা অঙ্গুলি দিয়াও তাহা সরাইতে চাহে না। তাহারা লোককে দেখাইবার জন্যই তাহাদের সমস্ত কর্ম করে, কেননা তাহারা আপনাদের কবচ প্রশস্ত করে, এবং বস্ত্রের থোপ বড় করে, আর ভোজে প্রধান স্থান, সমাজগৃহে প্রধান প্রধান আসন, হাটে বাজারে মঙ্গলবাদ, এবং লোকের কাচে রব্বি(গুরু) বলিয়া সম্ভাষণ, এ সকল ভাল বাসে।– মথি২৩ঃ২-৭

কিন্তু হা অধ্যাপক ও ফরীশীগণ, কপটীরা, ধিক তোমাদিগকে! কারণ তোমরা মনুষ্যদের সম্মুখে স্বর্গরাজ্য রুদ্ধ করিয়া থাক, আপনারাও তাহাতে প্রবেশ কর না, এবং যাহারা প্রবেশ করিতে আইসে, তাহাদিগকেও প্রবেশ করিতে দেও না। হা অধ্যাপক ও ফরীশীগণ, কপটীরা, ধিক তোমাদিগকে! কারণ এক জনকে যিহুদী ধর্মাবলম্বী করিবার জন্য তোমরা সমুদ্রে ও স্থলে পরিভ্রমণ করিয়া থাক, আর যখন কেহ হয়, তখন তাহাকে তোমাদের অপেক্ষা দ্বিগুণ নারকী করিয়া তুল।–মথিঃ২৩ঃ১৩-১৫

অন্ধ পথ দর্শকেরা তোমরা মশা ছাঁকিয়া ফেল, কিন্তু উট গিলিয়া থাক।– মথি ২৩ঃ২৪

হা অধ্যাপক ও ফরীশীগণ, কপটীরা, ধিক তোমাদিকে ! কারণ তোমরা চূর্ণ কাম করা কবরের তুল্য তাহা বাহিরে দেখিতে সুন্দর ভিতরে মরা মানুষের অস্থি ও সর্বপ্রকার অশুচিতা ভরা। তদ্রূপ তোমারাও বাহিরে লোকদের কাছে ধার্মিক বলিয়া দেখাইয়া থাক, কিন্তু ভিতরে তোমরা কাপট্য ও অধর্মে পরিপূর্ণ। -মথি ২৩ঃ২৭-২৮

এ ছিল সে সময়ের শরীয়াতের ধারক ও বাহকদের অবস্থা। দ্বীনের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও প্রবৃত্তি পূজার কারণে নিজেরাও পথভ্রষ্ট করছিল। এ বিপ্লবের পথে রোমীয় শাসকদের চেয়ে তারাই ছিল অধিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী।

হযরত ঈসা (আ ) এর বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের ষড়যন্ত্র

তখন ফরীশীরা গিয়া মন্ত্রণা করিল, কিরূপে তাঁহাকে কথার ফাঁদে ফেলিতে পারে। আর তাহারা হেরোদীয়দের (হযরত ঈসার যুগে ফিলিস্তিনের এক অংশে দেশীয় রাজ্যের ন্যায় একটি ইহুদী রাষ্ট্র ছিল যা রোম সাম্রাজ্যের বশ্যতা স্বীকার করতো। তার প্রতিষ্ঠাতা হিরোদরে নামানুসারে সাধারণত তাকে হিরোদী রাষ্ট্র বলা হতো। এখানে হিরোদী অর্থে রাষ্ট্রের পুলিশ ও সি আই ডির লোক।–গ্রন্থকার।)সহিত আপনাদের শিষ্যগণকে দিয়া তাঁহাকে বলিয়া পাঠাইল, গুরো, আমরা জনি, আপনি সত্য , এবং সত্যরূপে ঈশ্বরের পথের বিষয় শিক্ষা দিতেছেন, এবং আপন কাহারও বিষয়ে ভীত নহেন, কেননা আপনি মনুষ্যের মুখাপেক্ষা করেন না। ভাল, আমাদিগকে বলুন, আপনার মত কি? কৈসরকে কর দেওয়া বিধেয় কি না? কিন্তু যীশু তাহাদের দুষ্টামি বুঝিয়ো কহিলেন, কপটীরা, আমার পরীক্ষা কেন করিতেছ? সেই করের মুদ্রা আমাকে দেখাও। তখন তাহারা তাঁহার নিকটে একটি দীনার আনিল। তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, এই মূর্তি ও এই নাম কাহার? তাহারা বলিল, কৈসরের। তখন তিনি তাহাদিগকে কহিলেন, তবে কৈসরের যাহা যাহা, কৈসরেকে দেও, আর ঈশ্বরের যাহা যাহা, ঈশ্বরকে দেও।– মথি২২ ঃ১৫ -২১

এ ঘটনা থেকে জানা যায় যে, এ চিল প্রকৃতপক্ষে একটা অপকৌশল। এ আন্দোলন বানচাল করার জন্যে ফিরিসীয়গণ চাচ্ছিল যে, সময়ের পূর্বেই সরকারের সাথে হযরত ঈসা (আ ) এর সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেয়া যাক এবং আন্দোলন শক্তিশালী হবার পূর্বেই সরকারের শক্তি দিয়ে তা চূর্ণ করে দেয়া হোক। এ কারণেই হিরোদী সি আই ডির সামনে এ প্রশ্ন উত্থাপন করা হলো যে, কায়সারকে কর দেয়া যাবে কিনা। জবাবে হযরত মসীহ যে অর্থবহ কথাটি বলেন তাকে খৃস্টান অ খৃস্টান নির্বিশেষে সকলে এ অর্থেই গ্রহণ করে আসছেন যে, ইবাদাত খোদার কর এবং আনুগত্য কর সরকারের যে তোমাদের মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে না তিনি একথা বলেন যে, কায়সারকে কর দেয়া সংগত, কারণ, তাহলে এটা হতো তাঁর দাওয়াতের পরিপন্থী কথা। আর না তিনি একথা বলেন যে, তাকে কর দেয়া যাবে না। কারণ ঐ সময় পর্যন্ত তাঁর আন্দোলন এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যে, কর বন্ধ করার আদেশ তিনি করবেন। এজন্যে তিনি এ সূক্ষ্ম কথাটি বলেন যে, কায়সারের নাম ও তার প্রতিকৃতি ত তাকেই ফিরিয়ে দাও এবং যে স্বর্ণ আল্লাহ পয়দা করেছেন তা তাঁর পথেই ব্যয় কর। তাদের এ ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর ফিরিসীগণ স্বয়ং মসীহের হাওয়ারীদের মধ্য থেকে আরেকজনকে ঘুষ দিয়ে এ কথায় রাজী করে যে, এমন এক সময়ে মসীহকে গ্রেফতার করতে হবে যখন কোন গণ সংঘর্ষের আশংকা না থাকে। এ কৌশল কাজে লাগে। ইহুদী স্ক্রিউতি মসীহকে গ্রেফতার করিয়ে দেয়।

হযরত ঈসা (আ ) এর বিরুদ্ধে গণ্যমাণ্য ইহুদীদের মোকদ্দমা

পরে তাহারা দল শুদ্ধ সকলে উঠিয়া তাঁহাকে পীলাতের কাছে লইয়া গেল। আর তাহারা তাঁহার উপরে দোষারোপ করিয়া বলিতে লাগিল, আমরা দেখিতে পাইলাম যে, এ ব্যক্তি আমাদের জাতিকে বিগড়িয়া দেয়, কৈসরকে রাজস্ব দিতে বারণ করে, আর বলে যে, আমিই খ্রিষ্ট রাজা- লুক২৩ঃ১-২ তখন পীলাত প্রধান যাজকগণকে ও সমাগত লোকদিগকে কহিলেন, আমি এই ব্যক্তির কোন দোষই পাইতেছি না। কিন্তু তাহারা আরও জোর করিয়া বলিতে লাগিল, এ ব্যক্তি সমুদয় যিহূদিয়ায় এবং গালীল অবধি এই স্থান পর্যন্ত শিক্ষা দিয়া প্রজাদিগকে উত্তেজিত করে (লূক২৩ঃ৪-৫)। —- কিন্তু তাহারা উচ্চ রবে উগ্র ভাবে চাহিতে থাকিল, যেন তাঁহাকে ক্রুশে দেওয়া হয়, আর তাহাদের রব প্রবল হইল।–লূক ২৩ঃ২৩

নবী মুহাম্মাদ (সা) এর মক্কী যুগের দাওয়াতের সাথে সাথে সাদৃশ্য

এভাবে দুনিয়াতে হযরত মসীহের মিশন ঐসব লোকের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয় যারা নিজদেরকে হযরত মূসা (আ ) এর ওয়ারিশ মনে করতো। ঐতিহাসিক সাক্ষ্য প্রমাণের নিরিখে হযরত মসীহ (আ) এর নবুওয়াতের মোট সময়কাল দেড় বছর থেকে তিন বছরের মধ্যে ছিল। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে তিনি অতটুকু কাজই করেছিলেন, যতোটুকু নবী মুহাম্মাদ(সা ) তাঁর মক্কী জীবনের প্রাথমিক তিনি বছরে করেন। যদি কেউ ইঞ্জিলের উপরোক্ত কথাগুলো কুরআনের মক্কী সূরাগুলো এবং মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ের হাদীসগুলোর সাথে তুলনামূলকভাবে আলোচনা করেন, তাহলে উভয়ের মধ্যে যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখতে পাবেন।(আল জিহাদ ফীল ইসলাম,পৃষ্ঠা৪০৭ – ৪১০)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.