সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অধ্যায়ঃ ১৩ – পূর্ববর্তী উম্মতগণের অধঃপতন ও তাদের ধ্বংসাবশেষ

সূচনা

যেসব জাতি দুনিয়াকে নিছক ভোগবিলাস ও লীলাখেলার কেন্দ্র মনে করে নবীগণের প্রচারিত সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে ভ্রান্ত মতবাদের ভিত্তিতে জীবন যাপন করেছে, তারা পর পর কোন ভয়াবহ পরিণামের সম্মুখীন হয়েছে, তা আমরা জানতে পারি মানবজাতির ইতিহাস আলোচনা করে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আম্বিয়া, টীকা – ১৭)

অভিশপ্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি নিছক কৌতুক ও ঔৎসুক্য সহকারে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলো পর্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু তার থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করেনি। এর থেকে বুঝা যায়, আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসীদের দৃষ্টি অবিশ্বাসীদের দৃষ্টি থেকে কতটা আলাদা। একজন তামাশা দেখে অথবা বড় জোর ইতিহাস রচনা করে। আর অন্যজন এসব দেখে নৈতিক শিক্ষা লাভ করে এবং পার্থিব জীবনের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন সব তথ্য ও তত্ত্বের নাগাল পায়। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল ফুরকান, টীকা – ৫৪)

মানুষের সংস্কার সংশোধনের জন্যে যাঁদেরকে পাঠানো হয়েছিল তাঁরা সকলেই আপন আপন জনপদেরই অধিবাসী ছিলেন। হযরত নূহ(আ), হযরত ইবরাহীম(আ), হযরত মুসা (আ)এবং হযরত ঈসা(আ) কে ছিলেন?এখন আপনারা দেখুন, যেসব জাতি তাঁদের দাওয়াত গ্রহণ করেনি, নিজেদের ভিত্তিহীন ধ্যান ধারণা এবং বল্গাহীন প্রবৃত্তির পেছনে ছুটেছে, তাদের পরিণাম কি হয়েছে? অনেকেই ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর করতে গিয়ে আদ, সামুদ, মাদ্‌ইয়ান, লূতজাতি এবং অন্যান্যদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদসমূহ অতিক্রম করেছে। তারা কি সেখানে কিছুই দেখতে পায়নি?যে পরিণাম তারা দুনিয়ায় ভোগ করেছে তা তো এ কথারই ইংগিত বহন করছে যে, পরকালে তারা অধিকতর ভয়াবহ পরিণাম ভোগ করবে। অপরদিকে যারা এ দুনিয়াতে তাদেরকে সংশোধন করে নিয়েছে তারা শুধু দুনিয়াতেই মহৎ ছিল না বরং আখিরাতে তাদের অবস্থা অধিকতর ভালো ও সুখময় হবে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা, ইউসুফ, টীকা- ৭৯)

যে সব জাতি নবীদের কথায় কর্ণপাত করেনি এবং যারা তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাতকে অস্বীকার করে তাদের জীবন পরিচালনা করেছে, তারা অবশেষে অধঃপতন ও ধ্বংসেরই যোগ্য হয়েছে। ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাপুঞ্জ এ কথার সাক্ষ্যদান করে যে, নবীদের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা যেসব নৈতিক বিধান পাঠিয়েছেন এবং তদনুযায়ী আখিরাতে মানুষের কাজকর্মের যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, তা একেবারে মোক্ষম সত্য। কারণ এ নৈতিক বিধানের পরোয়া না করে যে জাতিই নিজেকে সকল দায়িত্বের ঊর্ধ্বে মনে করেছে এবং ধরে নিয়েছে যে, কারো কাচে তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে না, তাদেরকে অবশেষে ধ্বংসের সম্মুখীন হতে হয়েছে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আয যারিয়াত, টীকা-২১)

অতীতে যেসব জাতি ধ্বংস হয়েছে, তাদের ধ্বংসের কারণ ছিল এই যে, আল্লাহ তায়ালা যখন তাদেরকে প্রভূত সম্পদ ও প্রতিপত্তি দান করেন, তখন তারা ভোগবিলাস ও ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে দুনিয়ায় বিপর্যয় সৃষ্টি করা শুরু করে। তখন সমাজের সামগ্রিক নৈতিক অধঃপতন এতখানি হয়ে পড়ে যে, তাদের মধ্যে এমন কোন সৎলোকের অস্তিত্বই থাকে না যে, তাদেরকে অসৎকাজে বাধাদান করবে। আর যদি এমন কেউ থেকেও থাকে তো তাদের সংখ্যা এত নগণ্য ছিল যে, তাদের দুর্বল কণ্ঠ তাদেরকে অসৎকাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এসব কারণেই সেসব জাতি আল্লাহ তায়ালার অভিশাপের যোগ্য হয়ে পড়ে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হূদ, টীকা – ১১৫)

যারা সত্যানুসন্ধিৎসু তাদের জন্যে আল্লাহর যমীনে শুধু নিদর্শন আর নিদর্শনই ছড়িয়ে আছে। এসব দেখে তারা সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু যারা হঠকারী তারা এসব দেখার পরও ঈমান আনেনি।আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি না আসা পর্যন্ত তারা সর্বদা গোমরাহির মধ্যেই লিপ্ত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে সূরা শুয়ারায় ইতিহাসের সাতটি জাতির অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। তারা ঠিক তেমনি হঠকারিতা করছিল যেমন নবী মুস্তাফা (স) এর সময় মক্কার কাফেরগণ করছিল। এসব ঐতিহাসিক বিবরণ দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা কয়েকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট করেছেন।

প্রথম কথা এই যে, নিদর্শন দুইপ্রকারের। এক প্রকারের নিদর্শন যা আল্লাহর যমীনে চারদিকে ছড়িয়ে আছে। বিবেকবান ব্যক্তি এসব দেখে নির্ণয় করতে পারে যে, আল্লাহর নবীগণ যে দিকে আহবান করছেন তা ঠিক কিনা। দ্বিতীয় প্রকারের নিদর্শন এমন যা দেখেছিল লূতের জাতি এবং আসহাবে আয়কাহ। এখন মক্কার কাফেরদের সিদ্ধান্ত করার ব্যাপার যে, তারা কোন প্রকারের নিদর্শন দেখতে চায়।

দ্বিতীয়তঃ প্রত্যেক যুগেই কাফেরদের মন মানসিকতা, যুক্তি তর্ক, অভিযোগ ও ওজর আপত্তি একই ধরনের ছিল। ঈমান না আনার জন্যে তাদের কলা কৌশল ও বাহানা একই ধরনের ছিল। অবশেষে তাদের পরিণামও হয়েছে একই ধরনের। পক্ষান্তরে সকল যুগে নবীগণের শিক্ষা ছিল একই ধরনের, তাঁদের চরিত্র ও আচার আচরণ ছিল একই। প্রতিপক্ষের মুকাবিলায় তাঁদের যুক্তি তর্কের ধরন চিল একই এবং সেই সাথে আল্লাহর অনুগ্রহের ব্যাপারও ছিল এক রকমের। এ দুটি দৃষ্টান্ত ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শূয়ারা, ভূমিকা)

অতীতের জাতিসমূহেকে তাদের আপন আপন যুগে কাজ করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা অন্যায় অবিচার ও বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করে। তাদেরকে সুপথ দেখাবার জন্যে যেসব নবী পাঠানো হয়, তাঁদের কথার প্রতি তারা কর্ণপাত করেনি। ফলে তারা পরীক্ষায় ব্যর্থকাম হয়েছে এবং তাদেরকে ধরাপৃষ্ঠ হতে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। সব শেষে আরববাসীদের পালা এলো। পরবর্তীদের স্থানে এদেরকে কাজ করার সুযোগ দেয়া হলো। যে পরীক্ষা ক্ষেত্র থেকে তাদের পূর্ববর্তীগণ বহিষ্কৃত হয়েছে, সেখানে এরা (আরববাসী) দণ্ডায়মান। তাদেরকে বলা হলো যে, পূর্ববর্তীদের পরিণাম যদি তারা ভোগ করতে না চায় তাহলে তাদেরকে যে সুযোগ দেয়া হলো তার থেকে তারা কল্যাণ লাভ করুক। তারা যেন অতীত জাতিদের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং যেসব ভুলের কারণে তারা ধ্বংস হয়েছে তার পুনরাবৃত্তি তারা যেন না করে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা ইউনুস, টীকা-১৮)

হযরত নূহ (আ) এর জাতি

কুরআনের ইংগিত এবং বাইবেলের বিবরণ থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, হযরত নূহ (আ) এর জাতি যে দেশে বাস করতো তা আজ ইরাক নামে অভিহিত। ব্যাবিলনের প্রাচীন নিদর্শনাবলীতে বাইবেল পূর্ব যেসব প্রাচীন শিলালিপি ও প্রস্তর ফলক পাওয়া গেছে, সেসব থেকেও এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। এসবের মধ্যে প্রায় এ ধরনের একটা কাহিনী বর্ণিত আছে, যার উল্লেখ কুরআন এবং বাইবেলে পাওয়া যায়, এবং তাতে বলা হয়েছে যে, মুসেলের আশেপাশেই তাদের আবাসস্থল ছিল। আবার যেসব কিংবদন্তী কুর্দিস্তান এবং আর্মেনিয়ায় বংশানুক্রমে চলে আসছে তার থেকেও জানা যায় যে, ঝড় বৃষ্টি ও তুফানের পর হযরত নূহ (আ) এর নৌকা এ অঞ্চলেরই কোন স্থানে এসে ভিড়েছিল। মুসেলের উত্তরে ইবনে ওমর দ্বীপের আশেপাশে এবং আরমেনিয়া সীমান্তে অবস্থিত আরারাত পর্বতের ধারে হযরত নূহ(আ) এর বিভিন্ন নিদর্শন এখনও চিহ্নিত করা হয় এবং নখচিওয়ানের অধিবাসীদের মধ্যে আজও একথা প্রচলিত আছে যে, এ শহরের ভিত্তিস্থাপন হযরত নূহ (আ) করেছিলেন।

চিত্র

(কওমে নূহ এর এলাকা ও জুদী পাহাড়)

এক প্রবল ঝড়ের ঐতিহাসিক প্রমাণ চিত্র

হযরত নূহ (আ) এর উপরোক্ত কাহিনীর সাথে মিলে যায় এমন কিংবদন্তী যা গ্রীক, মিসর, ভারত এবং চীনের প্রাচীন সাহিত্যে পাওয়া যায়। উপরন্তু বার্মা, মালয়েশিয়া, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের কিংবদন্তী প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। এর থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এ কাহিনী এমন এক যুগের যখন গোটা মানব গোষ্ঠী কোন একটি ভূখণ্ডেই বসবাস করতো এবং পরবর্তীকালে তারা সেখান থেকে দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে সকল জাতিই তাদের প্রাথমিক ইতিহাসে এক ব্যাপক ঝড়ের উল্লেখ করে। অবশ্য কালচক্রে তার প্রকৃত বিবরণ তারা ভুলে গেছে এবং প্রকৃত ঘটনার উপরে প্রত্যেকেই তাদের আপন আপন ধ্যান ধারণা অনুযায়ী এক বিরাট কাল্পনিক রঙের প্রলেপ দিয়েছে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা -৪৭)

যে জুদী পাহাড়ে হযরত নূহ (আ) এর নৌকা এসে থেমেছিল, তা কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইবনে ওমর দ্বীপের উত্তর পূর্বে অবস্থিত। বাইবেলে এ নৌকার তটস্থ হওয়ার স্থান বলা হয়েছে আরারাত যা আর্মেনিয়ার একটি পর্বতের নাম। এ হচ্ছে একটা পর্বতমালা। আরারাত নামীয় এ পর্বতমালার অর্থ হচ্ছে, তা আর্মেনিয়ার উচ্চ শীর্ষ থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণে কুর্দিস্তান পর্যন্ত চলেছে। এ পর্বত পুঞ্জের একটি পাহাড়ের নাম জুদী যা আজও জুদী নামে খ্যাত। প্রাচীন ইতিহাসগুলোতে বলা হয়েছে নৌকা এ স্থানে এসেই থেমেছিল। বস্তুত হযরত ঈসা(আ) এর জন্মের আড়াইশ বছর পূর্বে বেরাসাস(Berasus)নামে ব্যাবিলনের জনৈক ধর্মীয় নেতা প্রাচীন পরম্পরাগত বর্ণনার ভিত্তিতে আপন দেশের যে ইতিহাস রচনা করেন, তার মধ্যে তিনি হযরত নূহ (আ) এর নৌকার তটস্থ হওয়ার স্থান জুদী পাহাড়ই বলেছেন। এরিস্টটলের শিষ্য আবিদেনুসও (Abydenus)তাঁর ইতিহাসে এর সত্যায়ন করেছেন। উপরন্তু তিনি সে যুগের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন, ইরাকের বহু লোকের কাছে সে নৌকার খণ্ডিত অংশগুলো সংরক্ষিত আছে, যেগুলো ধুয়ে ধুয়ে তারা রোগীদেরকে পানি পান করায়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা-৪৬)

নূহের জাতির নৈতিক অধঃপতন

হযরত নূহ (আ) এবং তাঁর জাতির যে অবস্থা কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে, তার থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, এ জাতি না আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করতো, আর না তাঁর সম্পর্কে তারা অজ্ঞ ছিল। আল্লাহর ইবাদাত করতেও তাদের আপত্তি ছিলা। কিন্তু যে গোমরাহিতে তারা লিপ্ত ছিল তা ছিল শিরকের গোমরাহি। অর্থাৎ তারা আল্লাহর সাথে অন্যান্য সত্তাকেও খোদায়ীর অংশীদার মনে করতো এবং তাদেরও স্তবস্তুতি ও ইবাদাত পাবার অধিকার আছে বলে তারা বিশ্বাস করতো। অতঃপর এ মৌলিক গোমরাহি থেকে বহু প্রকারে অনাচার এ জাতির মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে। যেসব স্বনির্মিত দেব দেবীকে তারা খোদায়ীর অংশীদার মনে করতো তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে জাতির মধ্য থেকে এক বিশেষ শ্রেণী সৃষ্টি হলো। তারা যাবতীয় ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার মালিক হয়ে বসলো। তারা মানুষের মধ্যে উচ্চ নীচের ভেদাভেদ সৃষ্টি করলো। সামাজিক জীবন অবিচার অনাচারে ভরে দিল এবং নৈতিক অনাচার ও পাপাচার মানবতার মূল অন্তঃসারশূন্য করে দিল।

হযরত নূহ(আ) এর জাতি

হযরত নূহ (আ) এর সংস্কার প্রচেষ্টা

*****আরবী*******

তারা বিরাট প্রতারণার জাল বিস্তার করে রেখেছিল।-সূরা আন নূহঃ২২

প্রতারণা হলো ঐসব নেতৃবৃন্দের কলাকৌশল যার দ্বারা তারা জনসাধারণকে হযরত নূহ (আ) এর শিক্ষার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করার চেষ্টা করতো। যেমন তারা বলতো, নূহ তো তোমাদেরই মতো একজন মানুষ। এ কথা কি করে মেনে নেয়া যায় যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার উপর অহী এসেছে (সূরা আল আরাফঃ৬৩, সূরা হুদঃ২৭) নূহের আনুগত্য তো আমাদের নীচ শ্রেণীর লোকেরা না বুঝেই মেনে নিয়েছে। তার কথায় সত্যিই যদি কোন গুরুত্ব থাকতো, তাহলে আমাদের মুরব্বীগণ তা অবশ্যই মেনে নিত।(সূরা হুদঃ২৭)কোন নবী রাসুল পাঠাবার দরকার আল্লাহর হলে, কোন ফেরেশতাকেই তিনি পাঠাতেন(সূরা মুমিনূনঃ২৪) সে যদি আল্লাহর প্রেরিতই হতো, তাহলে তার সাথে অর্থ ভাণ্ডার থাকতো, গায়েবের এলম তার জানা থাকতো। আর ফেরেশতাদের মতো সে যাবতীয় মানবীয় অভাব থেকে বেপরোয়া হতো(সূরা হুদঃ৩১)।নূহ এবং তার অনুসারীদের মধ্যে এমন কি কারামত দেখা যায় যার জন্যে তার মর্যাদা স্বীকার করা যায়(সূরা হুদঃ২৭)? এ ব্যক্তি আসলে তোমাদের উপরে তার সর্দারি মাতব্বরি চালাতে চায়(সূরা মুমিনুনঃ২৪)। তার প্রতি কোন জ্বিনের ছায়া লেগেছে যে তাকে পাগল বানিয়ে দিয়েছে(সূরা মূমিনুনঃ২৫)।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা – ৪৮)

হযরত নূহ (আ) এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্যে দীর্ঘকাল ধরে ধৈর্য ও হিকমতের সাথে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা জনসাধারণকে প্রতারণার জালে এমনভাবে ফাঁসিয়ে রেখেছিল যে, সংস্কারের কোন চেষ্টাই কাজে লাগলোনা। অবশেষে হযরত নূহ (আ) আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, হে প্রভু!এ কাফেরদের একটিকেও পৃথিবীতে জীবিত ছেড়ে দিওনা। কারণ তুমি যদি তাদেরকে ছেড়ে দাও, তাহলে তারা তোমার বান্দাদেরকে গোমরাহ করবে এবং তাদের বংশ থেকে যারাই পয়দা হবে, বদকার এবং কাফের নিমকহারাম হয়েই পয়দা হবে।(এখানে হযরত নুহ (আ) এর ঐ দোয়ার দিকে ইংগিত করা হয়েছে যা তিনি করেছিলেন সুদীর্ঘ কাল পর্যন্ত তাঁর জাতির সংস্কার সংশোধনের জন্যে ক্রমাগত চেষ্টা করার পর। তিনি দোয়া করেছিলেনঃ *****আরবী ***** আল্লাহ আমি আর পারছিনা, আমাকে সাহায্য কর(সুরা কামারঃ১০) *****আরবী ****** পরওয়ারদেগার! দুনিয়ার একজন কাফেরকেও তুমি ছেড়ে দিওনা।–(সূরা নূহঃ২৬) (তাফহীমুল কুরআন, সূরা নূহ, টীকা -১৬)

আযাব

হযরত নূহ (আ) এর দোয়া আল্লাহর দরবারে (হযরত নূহ (আ) এর দাওয়াত এবং তাঁর জাতির কুফরীর উপরে অটল থাকার ব্যাপার নিয়ে কয়েক শতক ধরে যে দীর্ঘ সংঘাত সংঘর্ষ চলছিল তার উল্লেখ কুরআনে পাওয়া যায়। সূরায়ে আনকাবুতে বলা হয়েছে, এ সংঘাত সংঘর্ষ সাড়ে নয় শত বছর ধরে চলে। *****আরবী****** হযরত নূহ (আ) এর বংশ পরস্পরা ক্রমে তাদের এ সামগ্রিক ক্রিয়াকাণ্ড দেখে শুধু এতটুকু ধারণাই করেননি যে, সত্যকে গ্রহণ করার যোগ্যতাই তাদের মধ্যে নেই, বরং এ অভিমত ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতে তাদের বংশ থেকে সৎ থেকে সৎ ও ঈমানদার লোক পয়দা হওয়ারও কোন সম্ভাবনা নেই। *****আরবী ******* হে আল্লাহ ! তুমি যদি তাদেরকে ছেড়ে দাও তাহলে তারা তোমার বান্দাদেরকে গোমরাহ করবে এবং তাদের বংশ থেকে যারাই পয়দা হবে তারা পাপাচারী ও সত্যের বিরোধী হবে। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং হযরত নূহের এ অভিমত সঠিক মনে করেন এবং তাঁর পরিপূর্ণ ও অভ্রান্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে বলেন *****আরবী ****** তোমার জাতির মধ্যে যারা ঈমান আনার তারা ঈমান এনেছে। আর কেউ ঈমান আনার নেই। অতএব তাদের পরিণামের জন্যে দুঃখ করা ছেড়ে দাও।(সূরা আশ শূয়ারা টীকা – ৮৫) কবুল হলো। অতঃপর সে জাতির উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়লো। কুরআনের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, প্লাবনের সূচনা হয়েছিল একটি বিশেষ চুলা থেকে, যার নীচ থেকে পানির ঝর্ণা উৎক্ষিপ্ত হয়। তারপর একদিকে আকাশ থেকে মুষলধারে বর্ষণ শুরু হয় এবং অন্যদিকে স্থানে স্থানে যমীনের মধ্যে ঝর্ণার সৃষ্টি হয়। সূরা হুদে শুধুমাত্র চুলা থেকে গরম পানি উৎক্ষিপ্ত হওয়ার উল্লেখ আছে। পরে অবশ্য বৃষ্টিপাতের ইংগিত করা হয়েছে। কিন্তু সূরা কামারে তার বিবরণ দেয়া হয়েছেঃ

(*****আরবী******)

আমি আসমানের দরজা খুলে দিলাম যার থেকে অবিরাম বর্ষণ হতে থাকলো। আর যমীনকেও বিদীর্ণ করলাম যার ফলে চারদিকে শুধু ঝর্ণা আর ঝর্ণা বেরুতে থাকলো। এ উভয় প্রকারের পানি আল্লাহর লিখন পূরণের জন্যে লেগে গেল।

উপরন্তু কুরআনে তন্নুর শব্দের (*****আরবী***) (আলিফ –লাম) ব্যবহারের তাৎপর্য এটা মনে হয় যে, আল্লাহ তায়ালা একটি বিশেষ চুলাকে এ কাজের জন্যে বেছে নিয়েছিলেন। তারপর ইংগিত মাত্রই যথা সময়ে তার থেকে গরম পানি উপরে উঠতে লাগলো। পরে এটাই ঝড় ও প্লাবন সৃষ্টিকারী চুলা নামে অভিহিত হয়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা – ৪৮)

প্লাবন কি বিশ্ব জুড়ে ছিল?

এ প্লাবন কি সারা বিশ্ব জুড়ে ছিল, না শুধু ঐ অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল যেখানে নূহের জাতি বসবাস করতো?এ এমন এক প্রশ্ন যার জবাব আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইসরাইলী বর্ণনামতে সাধারণ ধারণা এই যে, প্লাবন সমগ্র দুনিয়া জুড়ে হয়েছিল (আদি পুস্তক ৭: ১৮-২৪)। কিন্তু কুরআনে এ কথা কোথাও বলা হয়নি। কুরআনের ইশারা ইঙ্গিত হতে একথা অবশ্যই বুজা যায় যে, তুফান পরবর্তী সময়ের মানব গোষ্ঠী নূহের প্লাবন হতে বাঁচিয়ে রাখা মানব গোষ্ঠী হতেই সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা একথা বুঝা জরুরী নয় যে, নূহের প্লাবন বিশ্বজোড়া হয়েছিল। কারণ একথা এভাবেও ঠিক বলে বলা যেতে পারে যে, তখন বনী আদমের গোষ্ঠী বিশ্বের ঐ ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো যেখানে তুফান সংগঠিত হয়েছিল।আর তুফানের পর যে মানব বংশ জন্ম নিয়েছিল ক্রমান্বয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এ ধারণার সমর্থন দুটি বিষয় থেকে পাওয়া যায়। একটা এই যে, দাজলা ও ফোরাত বিধৌত ভূখণ্ডে এক মহাপ্লাবনের প্রমাণ ঐতিহাসিক বর্ণনা, প্রাচীন নিদর্শনাবলী এবং যমীনের ভিন্ন স্তর থেকে পাওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর অধিকাংশ জাতির মধ্যে এক মহাপ্লাবনের কিংবদন্তী প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে।এমনকি অসেট্রলিয়া, আমেরিকা, নিউ গিনির মতো সুদূর দেশগুলোর প্রাচীন কিংবদন্তীতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এর থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছা যায় যে, কোন এক সময়ে হয়তো এসব জাতির পূর্ব পুরুষ একই জনপদে বসবাস করতো যেখানে এ প্লাবন এসেছিল। তারপর যখন তারা দুনিয়ায় বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে তখন এসব কিংবদন্তী তারা তাদের সাথে বহন করে নিয়ে যায়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা -৪২)।

নূহের নৌকা একটা শিক্ষণীয় নিদর্শন হয়ে পড়ে

*****আরবী *******

আমি তাকে বিশ্ববাসীর জন্যে একটা শিক্ষণীয় নিদর্শন বানিয়ে রাখলাম।-সূরা আনকাবূতঃ ১৫

এর অর্থ এও হতে পারে যে, এ ভয়ানক শাস্তি অথবা এ বিরাট ঘটনাকে পরবর্তী বংশধরদের জন্যে শিক্ষণীয় নিদর্শন বানানো হয়েছে। কিন্তু এখানে সূরা কামারে (১১৫ আয়াত) এটাকে যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে তার থেকে এটাই মনে হয় যে, শিক্ষণীয় নিদর্শন স্বয়ং ঐ নৌকাটি ছিল যা পর্বতশীর্ষে বিদ্যমান রইলো এবং পরবর্তী বংশধরদের জন্যে এ সংবাদ বহন করতে থাকলো যে, দুনিয়ায় এমন ধরনের একটি প্লাবন এসেছিল যার ফলে এ নৌকাটি পাহাড়ের উপরে আটকে গিয়েছিল। সূরা আল কামারের আয়াতের তাফসীরে ইবনে জারির কাতাদার এ বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, সাহাবীদের যুগে যখন মুসলমানগণ আলজাযিরা অঞ্চলে গমন করেন, তখন, তাঁরা জুদী পাহাড়ের উপরে (মতান্তরে বাকেরওয়া নামে একটি বস্তির নিকটে) ঐ নৌকাটি দেখতে পান। বর্তমান সময়েও কখনো কখনো শুনতে পাওয়া যায় যে নূহের নৌকার সন্ধানে মাঝে মাঝে অভিযান পাঠানো হয়। কারণ স্বরূপ বলা হয় যে, অনেক সময় আরারাত পর্বতমালার উপর দিয়ে যখন কোন বিমান চলে তখন বৈমানিকগণ পাহাড়ের মাথায় নৌকার মত কিছু একটা দেখতে পান। ইমাম বুখারী, ইবনে আবি হাতেম, আবদুর রাজ্জাক এবং ইবনে জারির কাতাদা থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, মুসলমানদের ইরাক এবং আলজাযিরা বিজয়ের সময় এ নৌকা জুদী পাহাড়ের উপরে (মতান্তরে বাকেরওয়া বস্তির নিকটে) বিদ্যমান ছিল যা প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ দেখতে পান।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা – ৪৬)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.