সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

খৃষ্টানদের গোমরাহীর প্রকৃত কারণ

(আরবী)————————

বল, হে আহলে কিতাব! তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে অন্যায় বাড়াবাড়ি করো না এবং তোমাদের পূর্বে যারা স্বয়ং পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে এবং সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের চিন্তাধারা অনুসরণ করো না। – সূরা আল মায়েদাঃ৭৭

খৃষ্টানদের বাড়াবাড়ি এবং অন্যান্যদের অন্ধ অনুসরণের ব্যাধি

এখানে ঐসব পথভ্রষ্ট জাতির দিকে ইংগিত করা হয়েছে, খৃষ্টানগণ যাদের ভ্রান্ত ধারণা বিশ্বাস ও ভুর পদ্ধতি গ্রহণ করে। বিশেষ করে গ্রীক দর্শনের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে, যাদের চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয়ে তারা সেই সীরাতে মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে, যার দিকে প্রথমতঃ তাদেরকে পথনির্দেশ দেয়া হয়েছিল। মসীহের প্রাথমিক অনুসারীগণ যে ধারণা বিশ্বাস পোষণ করতেন, তা অনেকাংশে ঐ সত্যেরই অনুরূপ ছিল যা তাঁরা স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেন এবং যার শিক্ষা তাঁদের পথপ্রদর্শক ও নেতা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালের খৃষ্টানগণ একদিকে মসীহের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনে চরম বাড়াবাড়ি করে এবং অন্যদিকে প্রতিবেশী জাতিসমূহের অন্ধ বিশ্বাস ও দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজেদের আকীদাহ বিশ্বাসের অতিরঞ্জিত দার্শনিক ব্যাখ্যা শুরু করে। তারপর একেবারে এক নতুন ধর্ম বানিয়ে নেয়, যার সাথে মসীহের প্রকৃত শিক্ষার কোন দূরতম সম্পর্কও থাকে না।

জনৈক খৃষ্টান পণ্ডিতের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা

এ বিষয়ে রেভারিন্ড চার্লস এন্ডারসন স্কট নামে জনৈক খৃস্টান ধর্মীয় পণ্ডিতের বর্ণনা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। ঈসু মসীহ(Jesus Christ) 0024462 0923620 শীর্ষক লিখিত তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধ ইনসাইক্লোপ্যাডিয়া বৃটেনিকার চতুর্দশ সংস্করণে দেখতে পাওয়া যায়। এ প্রবন্ধে তিনি বলেনঃ

প্রথম তিন ইঞ্জিলে(মথি, মার্ক,লূক)এমন কিছু নেই যার থেকে এ ধারণা করা যেতে পারে যে এ ইঞ্জিল প্রণেতাগণ ইস্যুকে মানুষ ব্যতীত অন্য কিছু মনে করতেন। তাঁদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন মানুষ। এমন এক মানুষ যিনি খোদার রুহ লাভ করে ধন্য হন এবং খোদার সাথে এমন অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক রাখতেন যার কারণে তাঁকে খোদার পুত্র বললে যথার্থ হবে। স্বয়ং মথি তাঁকে কাঠমিস্ত্রির পুত্র বলে উল্লেখ করেছেন, আর এক স্থানে তিনি বলেন যে, পির্টাস তাঁকে মসীহ মেনে নেয়ার পর একদিকে ডেকে নিয়ে তাঁকে তিরস্কার করে—– (মথি১৬ঃ২২)। লূকে আমরা দেখতে পাই যে, শূলবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার পর ঈসুর দুজন শিষ্য উমাউসের দিকে যাবার সময় তাঁর উল্লেখ এভাবে করেন যে, তিনি ঈশ্বরের ও সকল লোকের সাক্ষাতে কার্যে ও বাক্যে পরাক্রমী ভাববাদী ছিলেন,লূক ২৪ঃ১৯

একথা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, যদিও মার্ক গ্রন্থ প্রণয়নের পূর্বে খৃষ্টানদের মধ্যে খোদাওন্দ(Lord)শব্দটি ইস্যুর জন্যে ব্যবহার করার সাধারণ প্রচলন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মার্কের ইঞ্জিলে আর মথির ইঞ্জিলে ইস্যুকে কোথাও এ শব্দে স্মরণ করা হয়নি। পক্ষান্তরে এ উভয় গ্রন্থে এ শব্দ আল্লাহর জন্যে অধিক পরিমাণে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনটি ইঞ্জিলই ইস্যুর দুর্ভাগ্যের কথা জোরেশোরে ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উল্লেখ করছে। কিন্তু মার্কের মুক্তিপণ সম্পর্কিত কথাগুলো (মার্ক ১০,৪৫) এবং শেষ দিকে কিছু শব্দ বাদ দিলে কোথাও এমন কোন ইংগিত পাওয়া যায় না যে, মানুষের গোনাহ ও তার কাফফারার সাথে ইস্যুর মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে।

তিনি আরও বলেন,

ইস্যু নিজেকে যে একজন নবী হিসেবে পেশ করতেন, তা ইঞ্জিলগুলোর বিভিন্ন ভাষণ থেকে সুস্পষ্ট হয়। যেমন, অদ্য, কল্য ও পরশ্ব আমাকে গমন করিতে  হইবে, কারণ এমন হইতে পারে না যে, যিরুশালেমের বাহিরে কোন ভাববাদী বিনষ্ট হয়। — (লূক১৩ঃ৩৩)। তিনি অধিকাংশ সময়ে নিজেকে আদম সন্তান বলে উল্লেখ করেন——- ইস্যু কখনো নিজেকে খোদার পুত্র বলে উল্লেখ করেননি। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য লোক যখন তাঁর সম্পর্কে এ শব্দ ব্যবহার করে তখন তার অর্থ এ ছাড়া আর কিছু নয় যে, তাঁকে মসীহ মনে করা হয়। অবশ্যি তিনি নিজেকে শুধু পুত্র শব্দ দ্বারা বুঝাতে চাইতেন। ——- উপরন্তু, তিনি খোদার সাথে তাঁর সম্পর্ক বর্ণনা করার জন্যেও পিতা শব্দ রূপকার্থে ব্যবহার করেন —— এ সম্পর্কের ব্যাপারে তিনি নিজেকে একক মনে করতেন না। বরঞ্চ খোদার সাথে এ গভীর সম্পর্কে প্রাথমিক যুগের মানুষকেও তিনি তাঁর সাথী মনে করতেন। অবশ্যি পরবর্তী অভিজ্ঞতা ও মানব প্রকৃতির গভীর অধ্যয়ন তাকে একথা মনে করতে বাধ্য করে যে, তিনি এ ব্যাপারে একক ও নিঃসঙ্গ।

এ গ্রন্থকার পুনর্বার বলেন,

পেন্টিকস্ট(Penticost)পর্বের সময় পিটার্সের উচ্চারিত এ শব্দগুলো একজন মানুষ যিনি খোদার পক্ষ থেকে প্রেরিত ঈসুকে সে হিসেবেই পেশ করে যে হিসেবে তাঁর সমসাময়িক লোক তাঁকে জানতো এবং মনে করতো —- ইঞ্জিলগুলো থেকে আমরা জানতে পারি যে, ঈসু শৈশব থেকে যৌবনকাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দৈহিক ও মানসিক ক্রমবিকাশের স্তর অতিক্রম করে চলেছেন। তাঁর ক্ষুধা তৃষ্ণা ছিল, তিনি ক্লান্তিবোধ করতেন এবং ঘুমাতেন। বিস্মিত ও দিশেহারা হতেন। লোকের কাছে হালহকীকত জেনে নেয়ারও  তাঁর দরকার হতো। তিনি দুঃখ কষ্ট ভোগ ও মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সব কিছু শুনতেন ও দেখতে পারতেন এ দাবী তিনি করেননি তাই নয়, বরঞ্চ এ কথা অস্বীকার করেন। ——- প্রকৃতপক্ষে তাঁর হাযের নাযের (সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা) হওয়ার দাবী করা হলে তা সে গোটা ধারণারই পরিপন্থী হবে যা আমরা ইঞ্জিলগুলো তেকে লাভ করি। শুধু তাই নয়, Gathesmane এবং Calvary নামক স্থানগুলোতে অগ্নি পরীক্ষার ঘটনাগুলোর সাথে এ দাবীর কোন সামঞ্জস্যই থাকে না। সামঞ্জস্য দেখাতে হলে এ ঘটনাগুলোকে একেবারে অমূলক বলে গণ্য করতে হবে। এ কথা মানতে হবে যে, মসীহ যখন এসব অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন তখন মানবীয় জ্ঞানের সাধারণ সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তিনি আবদ্ধ ছিলেন। আর এ সীমাবদ্ধতার মধ্যে কোন ব্যতিক্রম থাকলে তা এতোটুকু যে, নবীসূলভ দূরদৃষ্টি এবং খোদা সম্পর্কে নিশ্চিত প্রত্যক্ষ জ্ঞান তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তারপর মসীহকে সর্বশক্তিমান মনে করার অবকাশ ত ইঞ্জিলগুলোতে আর কম। কোথাও এমন কথার ইংগিত পাওয়া যায় না যে, খোদা থেকে বেপরোয়া হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতেন। পক্ষান্তরে তিনি যে বার বার এ ধরনের দোয়া করতেন, দোয়া ছাড়া এ বিপদ থেকে বাঁচার অন্য কোন উপায় নেই- তার দ্বারা তিনি পরিষ্কার একথা স্বীকার করতেন যে, তিনি খোদার উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল। একথা এসব ইঞ্জিলের ঐতিহাসিক দিক দিয়ে নির্ভরযোগ্য হওয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য যে, যখন খৃস্টীয় গির্জা মসীহকে ইলাহ মনে করা শুরু করে তার পূর্বে যদিও এসব ইঞ্জিল প্রণীত হয়নি, তথাপি এসব দলিল পত্রে একদিকে মসীহের প্রকৃতপক্ষে মানুষ হওয়ার সাক্ষ্য সংরক্ষিত আছে এবং অপরদিকে তার মধ্যে এমন কোন সাক্ষ্য এ বিষয়ে পাওয়া যায় না যে, মসীহ নিজেকে খোদা মনে করতেন।

রেভারেন্ড স্কট আরও বলেনঃ

একমাত্র সেন্ট পল একথা ঘোষণা করে যে, উত্তোলনের ঘটনার সময় এ উত্তোলন কার্যের মাধ্যমেই ঈসুকে পূর্ণ ক্ষমতা সহকারে প্রকাশ্যে খোদার পুত্র হওয়ার মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। —- খোদার পুত্র শব্দটি প্রকৃত ঔরসজাত হওয়ার ইংগিতই বহন করে। সেন্টপল অন্যত্র ঈসুকে খোদার আপন পুত্র বলে ব্যাপারটি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। মসীহের জন্যে সম্বোধনমূলক শব্দ খোদাওন্দ(প্রভু) প্রকৃত ধর্মীয় অর্থে কে ব্যবহার করেছিল প্রাথমিক খৃস্টানগণ, না সেন্টপল তার সিদ্ধান্ত এখন করা যায়না। সম্ভবত এ কাজ প্রথমোক্ত দলটিই করে থাকবে। কিন্তু এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পলই পুরোপুরি অর্থে এ সম্বোধন করা শুরু করে। তারপর তিনি প্রভু ঈসু মসীহ সম্পর্কে এমন বহু ধারণা ও পারিভাষিক শব্দ প্রয়োগ করেছেন যা প্রাচীন পবিত্র গ্রন্থসমূহে প্রভু জেহোবার (আল্লাহ) জন্যে নির্দিষ্ট ছিল। এভাবে তিনি তাঁর বক্তব্যকে আরও পরিষ্কার করে দিয়েছেন। সাথে সাথে তিনি মসীহকে খোদার জ্ঞান বুদ্ধি ও মহত্বের সমতুল্য বলে গণ্য করেন এবং সহজ অর্থে খোদার পুত্র বলেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন দিক দিয়ে মসীহকে খোদার সমতুল্য করে দেয়ার পরও তাঁকে একেবারে আল্লাহ বলে প্রচার করতে তিনি বিরত থাকেন।

অন্য একজন খৃস্টান বিশেষজ্ঞের পর্যালোচনা

ইনসাইক্লোপেডিয়া বৃটেনিকায়(Christianity শীর্ষক একটি প্রবন্ধে রেভারেন্ড জর্জ উইলিয়াম ফকস খৃস্টান গির্জার মৌলিক আকীদা আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন-ত্রিত্ববাদের চিন্তামূলক কাঠামো গ্রীকদের তেকে গৃহীত। তার উপরে ইহুদী মতবাদ ঢেলে সাজানো হয়েছে। এ দিক দিয়ে এ আমাদের জন্যে এক আশ্চর্য ধরনের জগাখিচুড়ি। ধর্মীয় চিন্তাধারা বাইবেলের এবং তা ঢেলে সাজানো হয়েছে বিজাতীয় দর্শনের রূপে।

পিতা,পুত্র ও রুহুল কুদুসের পরিভাষাগুলো ইহুদী সূত্রে গৃহীত। যদিও ঈসু শেষ পরিভাষাটি খুব কমই ব্যবহার করেছেন এবং সেন্টপল তা ব্যবহার করলেও তার অর্থ একেবারে অস্পষ্ট ছিল। তথাপি ইহুদী সাহিত্যে এ শব্দটি প্রায় ব্যক্তিত্বের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। অতএব এ আকীদার উপাদান ইহুদী ধর্মের (যদিও ঐ যৌগিক পদার্থে শামিল হবার পূর্বে তাও গ্রীক ভাবধারায় প্রভাবিত ছিল) এবং বিষয়টি নির্ভেজাল গ্রীক। যে কথার উপরে ভিত্তি করে এ আকীদার উৎপত্তি তা না ছিল নৈতিক আর না ধর্মীয়। বরঞ্চ তা ছিল একেবারে একটা দার্শনিক প্রশ্ন। অর্থাৎ পিতা, পুত্র ও রুহ এ তিনের পারস্পরিক সম্পর্কের রূপটা কি? গির্জা এর যা জবাব দিয়েছে তা নিকিয়া কাউন্সিলে গৃহীত আকীদাহ অন্তর্ভুক্ত। তা সকল বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে গ্রীক চিন্তাধারারই প্রতীক।

গির্জার ইতিহাসের সাক্ষ্য

এ ব্যাপারে ইনসাক্লোপেডিয়া বৃটেনিকায় (Church History)শীর্ষক প্রবন্ধ বিশেষ প্রণিধানযোগ্য:

তৃতীয় খৃষ্টীয় শতাব্দী শেষ হবার আগেই মসীহকে সাধারণতঃ বাণীর দৈহিক আত্ন্যপ্রকাশ বলে মেনে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু বহু সংখ্যক খৃষ্টান মসীহকে খোদা বলে স্বীকার করতো না। চতুর্থ শতাব্দীতে এ বিষয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়।যার ফলে গির্জার ভিত্তিমূল আলোড়িত হয়। অবশেষ ৩২৫ খৃষ্টাব্দে নিকিয়া কাউন্সিলে মসীহের খোদা হওয়ার ধারণাকে যথারীতি সরকারী পর্যায়ে খৃষ্টীয় আকীদাহ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বিশেষ শব্দ প্রয়োগে তা রচনা করা হয়। যদিও তারপরও কিছুকাল বিতর্ক চলতে থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিকিয়ার সিদ্ধান্তের জয় হয়। পূর্ব ও পশ্চিমে একে এভাবে স্বীকার করে নেয়া হয় যে, সঠিক আকীদাহ পোষণকারী খৃষ্টানদের এর প্রতিই বিশ্বাস করা উচিত। পুত্রকে খোদা বলে স্বীকার করার সাথে রুহকেও খোদা বলে স্বীকার করা হয় এবং একে দীক্ষা দানের (Baptism)বাণী এবং প্রচলিত ধর্মীয় নিদর্শনাবলীর মধ্যে পিতা ও পুত্রের সাথে স্থান করে দেয়া হয়। এভাবে নিকিয়াতে মসীহের যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা হয় তার পরিণামে ত্রিত্ববাদের আকীদাহ খৃস্টান ধর্মের এক অবিচ্ছিন্ন অংশ হয়ে পড়ে। তারপর পুত্রের খোদা হওয়া মসীহের ব্যক্তি সত্তায় রূপ পরিগ্রহ করেছে, এ দাবীও এক দ্বিতীয় সমস্যা সৃষ্টি করে। যা নিয়ে চতুর্থ শতাব্দী ও তার পরে বেশ কিছুকাল যাবত তর্কবিতর্ক চলতে থাকে। প্রশ্ন এ ছিল যে, মসীহের ব্যক্তি সত্তায় খোদা ও মানুষ হওয়ার মধ্যে কি সম্পর্ক ছিল? ৪৫১ খৃস্টাব্দে ক্যালসিডন কাউন্সিল এ সমাধান পেশ করে যে, মসীহের ব্যক্তি সত্তায় দুটি পরিপূর্ণ স্বভাব প্রকৃতি। দুটি একত্র হওয়ার পরও তাদের পৃথক বৈশিষ্ট্যে কোন পরিবর্তন ব্যতিরেকেই অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ৬৮০ খৃস্টাব্দে কনস্টান্টিনোপলে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে এতটুকু যোগ করা হয় যে, উভয় স্বভাব প্রকৃতি তাদের পৃথক পৃথক ইচ্ছাশক্তিও রাখে। অর্থাৎ মসীহ একই সময়ে ইচ্ছাশক্তি ধারণ করেন। —- এ সময়ে পাশ্চাত্য গির্জা গোনাহ এবং অনুগ্রহ বিষয় দুটি নিয়ে বিশেষ চর্চা করে এবং মুক্তি ব্যাপারে খোদার কি ভূমিকা এবং মানুষের কি ভূমিকা এ বিষয় নিয়ে বহুদিন ধরে বিতর্ক চলে। অবশেষে ৫২৯ খৃস্টাব্দে আরেঞ্জার দ্বিতীয় কাউন্সিলে — এ মতবাদ গৃহীত হয় যে, আদমের স্বর্গচ্যুত হওয়ার কারণে প্রত্যেক মানুষের অবস্থা এই যে, সে মুক্তির দিকে এক পাও অগ্রসর হতে পারে না যতক্ষণ না সে খৃস্টীয় দীক্ষা গ্রহণে খোদার অনুগ্রহে নতুন জীবন লাভ করে। এ নতুন জীবন শুরু করার পরও ভালো অবস্থায় স্থিতিশীল হবে না যতক্ষণ না খোদার অনুগ্রহ চিরন্তনের জন্যে তার সহায়ক হয়। আর খোদার এ চিরন্তন অনুগ্রহ একমাত্র ক্যাথলিক গির্জার মাধ্যমেই লাভ করা যেতে পারে।

বিতর্কের ফল

খৃস্টান পন্ডিতগনের এসব বর্ণনা থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, প্রথমে যে জিনিস খৃস্টানদেরকে পথভ্রষ্ট করে তা হলো আকীদাহ এবং ভক্তি শ্রদ্ধার বাড়াবাড়ি। এ বাড়াবাড়ির ভিত্তিতেই হযরত মসীহ (আ ) এর জন্যে প্রভু ও খোদার পুত্র মব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। তাঁর প্রতি খোদার গুণাবলী আরোপ করা হয় এবং কাফফারার আকীদাহ উদ্ভাবন করা হয়। অথচ হযরত মসীহের শিক্ষার মধ্যে এসব কথার কোন লেশমাত্র ছিল না। তারপর যখন দর্শনের বিষাক্ত আবহাওয়া খৃস্টানদের মনে প্রাণে লাগে, তখন এ প্রাথমিক গোমরাহি উপলব্ধি করে তার থেকে বাঁচার চেষ্টা না করে তারা তাদের পূর্ববর্তী পেশওয়াদের ভুল সমর্থন করে তার ব্যাখ্যা দান শুরু করে। মসীহের প্রকৃত শিক্ষার দিকে ফিরে না গিয়ে শুধু এক শাস্ত্র ও দর্শনের সাহায্যে নতুন নতুন আকীদাহ উদ্ভাবন করতে থাকে। কুরআন পাকের এ আয়াতগুলোতে এসব গোমরাহী সম্পর্কে খৃস্টানদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।(তাফহীমূল কোরআন,সূরা আস সফ,টীকা-৮)

মানুষের জন্মগত পাপী হওয়ার ধারণা বিশ্বাস

আসমানী কিতাবগুলো মানুষের জন্মগত পাপী হওয়ার কোন ধারনাই পেশ করেনি যাকে খৃস্ট ধর্ম দেড় দু হাজার বছর থেকে তাদের নিজেদের মৌলিক আকীদাহ হিসেবে গণ্য করে আসছে। আজ স্বয়ং ক্যাথলিক পন্ডিতগন বলা শুরু করেছেন যে, এ আকীদার কোন ভিত্তি নেই। বাইবেলের একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত রেভারেন্ড হার্বার্ট হাগ(Haag) তাঁর সাম্প্রতিক“Is Original Sin In Scripture” গ্রন্থে বলেন, প্রাথমিক যুগের খৃস্টানদের মধ্যে অন্ততঃ তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত এ আকীদার কোন অস্তিত্বই ছিল না যে, মানুষ জন্মগত পাপী। এ ধারণা মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করতে থাকে, তখন দু শতাব্দী যাবত খৃস্টান পন্ডিতগন তার প্রতিবাদ করতে থাকেন। অবশেষে পঞ্চম শতাব্দীতে সেন্ট অগাস্টাইন তাঁর প্রতিবাদ করতে থাকেন। অবশেষে পঞ্চম শতাব্দীতে সেন্ট অগাস্টাইন তাঁর তর্কশাস্ত্রের জোরে একে খৃস্টানদের মৌলিক আকীদার মধ্যে শামিল করে দেন যে, মানবজাতি উত্তরাধিকার সূত্রে আদমের পাপের বোঝা লাভ করেছে। এখন মসীহের কাফফারার বদৌলতে মুক্তি লাভ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।(ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুসলমান ২য় খন্ড,পৃষ্ঠা-১৯১ -১৯৯)

হযরত মারইয়ামকে খোদার মা বলা

চারশ একত্রিশ খৃস্টাব্দে ইফসুসে খৃস্টান জগতের ধর্মীয় নেতাদের এক কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এ অধিবেশনে হযরত ঈসা (আ ) এর খোদা হওয়ার এবং খৃস্টানগণ শুধু হযরত মারইয়ারে খোদার মা হওয়ার আকীদাহ গির্জার সরকারী আকীদায় পরিণত হয়। খৃস্টানগণ শুধু মসীহ এবং রুহুল কুদুসকে খোদা বানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ মসীহের মাতাকেও এক স্থায়ী খোদা বানিয়ে ফেলে। হযরত মারইয়ামের খোদা হওয়ার অথবা তাঁর খোদাসুলভ পবিত্রতা সম্পর্কে বাইবেলে কোন ইংগিত পাওয়া যায় না।মসীহের পর তিনশ বছর পর্যন্ত খৃস্টান জগত এ ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল। তৃতীয় শতকের শেষের দিকে আলেকজান্দ্রিয়ায় কতিপয় ধর্মীয় পণ্ডিত প্রথম মারইয়ামের খোদা হওয়ার আকীদাহ এবং মারইয়াম পূজা বিস্তার লাভ করে। কিন্তু প্রথমে গির্জা তা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। বরঞ্চ মরিয়ম পূজাকে ভ্রান্ত আকীদাহ বলে গণ্য করতো। তারপর মসীহের সত্তার মধ্যে দুটি স্থায়ী পৃথক পৃথক সত্তার সমাবেশ রয়েছে- লাস্তরিয়াসের এ ধারণার উপর যখন খৃস্টজগতে বিতর্কের ঝড় শুরু হয় তখন তার মীমাংসার জন্যে ৪৩১ খৃস্টাব্দে ইফসসু শহরে এ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ অধিবেশনের পর গির্জার মধ্যেই দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করতে থাকে। এমন কি কুরআন নাযিলের সময় পর্যন্ত পৌছতে পৌছতে হযরত মারইয়াম এতো বড়ো দেবী হয়ে পড়েন যে, পিতা, পুত্র এবং রুহুল কুদুস তাঁর কাছে নগণ্য হয়ে পড়েন। স্থানে স্থানে গির্জায় তাঁর মূর্তি স্থাপন করা হয়। তার মূর্তির সামনে পূজা অর্চনার অনুষ্ঠান করা হতে থাকে। তাঁর কাছে দোয়া চাওয়া হতো। তিনিই ফরিয়াদ শ্রবণকারিণী, বিপদ আপদ দূরকারিণী এবং অসহায়ের সহায় ছিলেন। একজন খৃস্টান বান্দার জন্যে বিশ্বস্ততার সবচেয়ে বড়ো উপায় হলো এই যে, খোদার মাতার সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা সে লাভ করেছে। কায়সার জাস্টিনিয়ন এক আইনের ভূমিকায় হযরত মারইয়ামকে তাঁর রাজ্যের সাহায্যকারিনী বলে ঘোষণা করেন। তাঁর খ্যাতনামা জেনারেল নার্সিস যুদ্ধক্ষেত্রে হযরত মারেইয়ামের সাহায্য প্রার্থনা করেন। নবী মুহাম্মাদ (সা) এর সমসাময়িক কায়সার হিরাক্লিয়াস তাঁর বিশ্বাস ছিল যে, এ প্রতিকৃতির বরকতে এ পতাকা অবনমিত হবে না। যদিও পরবর্তীকালে সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে প্রটেস্টান্ট খৃস্টানগণ মারইয়াম পূজার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তথাপি রোমান ক্যাথলিক গির্জা আজও  সেই মতবাদে বিশ্বাসী।(তাফহীমূল কোরআন,সূরা আল মায়েদা টীকা – ১০১)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.