সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আরবে খ্রিস্টবাদ

সংকলকদ্বয় কর্তৃক সংযোজন

[এ শিরোনামায় যখন কিছু উপাদান বা মাল মসলা জোগাড় করা হলো, তখন এ অভাব অনুভূত হলো যে, আলোচনা শুরু করার জন্যে যেসব বিষয়বস্তুর প্রয়োজন তা নেই। অন্যান্য গ্রন্থকারের রচনাবলী থেকে উপাদান সংগ্রহ করেই এ শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব ছিল। সে সবকে নিম্নে উদ্ধৃতি হিসেবে প্রদত্ত হলো। -[সংকলকদ্বয়]

একঃ খৃস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে খৃস্টধর্ম আরব দেশে প্রবেশ করে যখন প্রাচ্যের গির্জাগুলোতে অনাচার এবং বেদআত (উদ্ভাবিত নতুন মতবাদ) ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়েছিল। সাধারণ ঐতিহাসিকগণ বলেন, এ ছিল যু নওয়াসের যুগ। কিন্তু আমি এর সাথে একমত নই। কারণ তিনি প্রায় চারশত বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। এ ধর্মের প্রসার নাজরানেই অধিক হয়েছিল। অর আরবে তার বেশী প্রচলন হয়নি।অবশ্যি বনী রাবিয়া, গাসসান গোত্রগুলোর মধ্যে এবং কিছুটা কোযায়ার মধ্যে খৃস্টধর্মের প্রসার হয়েছিল। ইবনে খলদুনের ইতিহাসের উর্দু অনুবাদ প্রথম খন্ড এর টীকা, আল্লামা হাকীম আহমদ হোসাইন এলাহাবাদী।

দুইঃ খৃস্টধর্মের প্রচলন রাবিয়া ও গাসসান এবং কোযায়ার কিছু অংশে হয়েছিল। মনে হয় তারা রোমীয়দের নিকট থেকে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। কারণ, ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যে আরববাসী তাদের দেশে প্রায় যাতায়াত করতো। হীরায় আরবের বিভিন্ন গোত্রগুলো একত্রে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। তাদেরকে আব্বাদ বলা হতো। তাদের মধ্যে আদী বিন যায়দ আব্বাদীও ছিল। বনু আগলেরও আরবের খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ছিল। (বুলুগুল আদবের উর্দু অনুবাদ পীর মুহাম্মাদ হাসান তৃতীয় খন্ড, পৃঃ ১৫২।

তিনঃ বনু গাসসান ৩৩০ খৃস্টাব্দে খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। তারপর ইরান, আরব, বাহরাইন, ফারান মরুভূমি, দুমাতুল জান্দাল এবং ফোরাত ও দাজলার উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে এ ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। এ ধর্ম প্রচারের জন্যে নাজ্জাশী এবং কায়সার সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করেন। ৩৯৫ খৃস্টাব্দ থেকে ৫১৩ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত এ ধর্ম প্রচারে বিশেষ জোর দেয়া হয় এবং ইয়ামেনে বহুসংখ্যক ইঞ্জিল গ্রন্থ ছড়িয়ে পড়ে। -রহমাতুল্লিল আলামীন প্রথম খন্ড, পৃঃ ৩১ টীকা।

চারঃ তাবাবেয়ার পূর্বে সাবার সকল শ্রেণী নক্ষত্র  পূজারী ছিল। তাদের সর্ববৃহৎ দেবতা ছিল শামস এবং আল্‌ মাক্কা। হেমইয়ারী ভাষায় চাঁদকে আল্‌ মাক্কা বলে। ৩৩০ খৃস্টাব্দে ইয়ামেনের পেছনে আফ্রিকার উপকূলে মিসরী রোমীয়দের প্রভাবে খ্রিস্টবাদ উপদ্রব সৃষ্টি করে। সিরিয়ার রোমীয়দের সাহায্যে ইয়ামেন প্রান্তে নাজরান শহর খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। চার পাশের প্রভাবে ইয়ামেনের তাবাবেয়াও খ্রিস্টবাদ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারেনি। নক্ষত্র পূজা বন্ধ হলেও তাদের মূর্তি অপসারিত হয়নি। এখন শামস আল মাক্কা এবং আশতার এর পাশে পাশে রহমানের নামও দেখা যেতে লাগলো, যে নাম প্রাক ইসলাম যুগে ইহুদী নাসারাদের জন্যে নির্দিষ্ট ছিল।

পাঁচঃ এ অঞ্চলে ইহুদী ও খৃস্টধর্ম এ দুটিই সভ্য এবং ঐশী ধর্ম ছিল। তারা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। পূর্ববর্তী অধ্যায়ে জানতে পারা গেছে যে, রোমীয় এবং হাবশীদের সাথে হেমইয়ারের সাবা জাতির দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ চলতো। এজন্যে হেমইয়ারের তাবাবেয়া খৃস্টধর্মের চেয়ে ইহুদী ধর্মকে প্রাধান্য দিত। আবদে কালীল ছাড়া আর কোন তোব্বা খৃস্টধর্ম গ্রহণ করেছে তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। আরবদের বর্ণনামতে আবদে কালীলও খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ছিল। একটি প্রস্তরলিপি থেকেও তাদের খৃস্টান হওয়া প্রমাণিত হয়। অবশিষ্ট তাবাবেয়ার মধ্যে অল্প সংখ্যক নক্ষত্র পূজক এবং অধিকসংখ্যক ইহুদী ছিল। তাবারীর ইতিহাস বলে যে, সকলের আগে আসয়াদ আবু কারব (আরবী***) ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করে। রাজকীয় ধর্ম প্রজাসাধারণের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে ইয়ামেনে ইহুদী ও খৃস্টধর্মের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে।

ছয়ঃ রোমীয়গণ সামুদ্রিক পথ  তরী করে সাবার বাজার মন্দা করে দেয়। এতেও সন্তুষ্ট না হয়ে খৃষ্টপূর্ব ২০ সালে তারা ইয়ামেন আক্রমণ করে। হাবশী একসুমী, যে প্রথমে রোমীয় মিসরীয়দের মতো একই দেশে জন্মগ্রহণ করে এবং পরে এই ধর্মাবলম্বী হয়ে পড়ে, রোমীয়দের উত্তেজনা সৃষ্টিতে বার বার বিরক্ত প্রকাশ করতো। হেমইয়ার সুযোগ ছেড়ে দিত না। সুযোগ পেলেই সমুদ্রে রোমীয় বণিকদের লুণ্ঠন করতো। উত্তর আরবে ইরান রোম পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। ইরানীদের সাথে হেমইয়ারের সহানুভূতি হওয়া ছিল স্বাভাবিক।

রোমীয়গণ সন্ধির দ্বারা শেষ করতে চাইলো। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ ভাগে রোমের কায়সার জাস্টি নাইস ইয়ামেনে তোব্বা সমীপে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন। ——- এ সন্ধি প্রস্তাব বিদ্বেষগ্নি নির্বাপিত করতে পারেনি। সে সময়ে যু নোয়াস শাসক ছিল।

সাতঃ রোমীয় বণিকগণ ইয়েমেনের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ব্যবসার পণ্যদ্রব্যসহ পৌছতো এবং যে দিক দিয়ে তারা অতিক্রম করতো পণ্যদ্রব্যের সাথে খৃস্টধর্মের সাওগাতও বিতরণ করতো। খৃস্টান পাদ্রীও বিশেষ উদ্দেশ্যে দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ করতো। প্রথমে আদনে এবং তারপর আদনানে, যেখানে আগে বৃক্ষ পূজা হতো, খৃস্টধর্ম ফুলেফলে সুশোভিত হলো। ইউরোপের যা কলাকৌশল আজ দেখা যাচ্ছে, তা অতীতেও ছিল। ব্যবসার আড়ালে সর্বদাই ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য  হাছিল করা হয়েছে। সে কালেও এ ব্যবসার আড়ালে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাছিল করা হয়েছে। এসব কলাকৌশলের দ্বারা ইয়ামেনে নাজরান খৃস্টধর্মের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ রোমীয় ও হাবশীদের এটি হয়ে পড়েছিল আশা ভরসার স্থল। হেমইয়ারী ইহুদীরা তা দেখে ক্রোধে জ্বলতো।

আসহাবে উখদুদের কাহিনী

(গ্রন্থকারের নিজের লেখা এখান থেকে শুরু হচ্ছে)

গর্তে আগুন জ্বালিয়ে তার মধ্যে ঈমানদারদের নিক্ষেপ করার বিভিন্ন ঘটনা বর্ণিত আছে। তাতে জানা যায় যে,দুনিয়ায় বহুবার এ ধরনের পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।

হযরত সুহাইব রোমী (রা ) এর বর্ণনা

এসবের মধ্যে একটি ঘটনা হযরত সুহাইব রোমী (রা) নবী (সা) এর নিকটে বর্ণনা করেন  তা এই যে, এক বাদশাহর এক যাদুকর ছিল। সে তার বার্ধক্যে বাদশাহকে বললো, এমন একটি বালক আমাকে দিন, যে আমার নিকটে যাদু শিক্ষা করবে। বাদশাহ একটি বালকে এ কাজে লাগিয়ে দিল। বালকটি যাদুকরের নিকটে যাতায়াতকালে একজন পাদ্রীর সাথে সাক্ষাৎ করতে থাকে এবং সম্ভবত সে পাদ্রী ছিল হযরত মসীহ (আ ) এর অনুসারী। পাদ্রীর কথায় প্রভাবিত হয়ে বালকটি ঈমান আনে। তারপর পাদ্রীর তরবিয়ত লাভ করে সে কারপামাতের (অলৌকিক শক্তির) অধিকারী হয়। তার দ্বারা অন্ধ দৃষ্টিশক্তি লাভ এবং কুষ্ঠ রোগী আরোগ্য লাভ করতে থাকে। বাদশাহ যখন জানতে পারলো যে, বালকটি তাওহীদের প্রতি ঈমান এনেছে, তখন সে প্রথমে পাদ্রীকে হত্যা করে এবং তারপর বালককে হত্যা করতে চাইলো। কিন্তু কোন যন্ত্র দ্বারাই তাকে হত্যা করা সম্ভব হলো না। অবশেষে বালকটি বললো, যদি আপনি আমাকে কতল করতে চান তাহলে জনসমাবেশে এ বালকের রবের নামে একথা বলে তীর নিক্ষেপ করুন।

বাদশাহ এভাবে বালকটিকে হত্যা করলো। এ ঘটনার পর জনতা সমস্বরে বললো, আমরা এ বালকের রবের উপর ঈমান আনলাম। বাদশাহের পরিষদগণ বললো, এ তো তাই হলো যার থেকে আপনি বাঁচতে চাচ্ছিলেন। মানুষ আপনার দ্বীন পরিত্যাগ করে ঐ বালকের দ্বীন গ্রহণ করেছে। বাদশাহ এ অবস্থা দেখে ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে। তারপর সে রাজপথের ধারে গর্ত খনন করালো এবং তা জ্বলন্ত অগ্নিতে পূর্ণ করলো। তারপর যে ব্যক্তিই ঈমান পরিত্যাগ করতে রাজী হলো না তাকে আগুনে ফেলে দেয়া হলো (আহমদ, মুসলিম, নাসায়ী, তিরমিযি, ইবনে জারীর, আবদুর রাযযাক, ইবনে আবি শায়বা, তাবারানী আবদ বিন হুমাইদ)।

হযরত আলী (রা ) কর্তৃক বর্ণিত ঘটনা

দ্বিতীয় একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন হযরত আলী (রা )। তিনি বলেন, ইরানের এক বাদশাহ মদ পান করে নেশাগ্রস্থ হয়ে আপন ভগ্নির সাথে ব্যভিচার করে। ফলে তাদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে বাদশাহ ঘোষণা করে যে, খোদা ভগ্নির সাথে বিবাহ হালাল করে দিয়েছেন। লোকে সে কথা মানলো না, বাদশাহ তখন বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দ্বারা জনগণকে একথা মেনে নিতে বাধ্য করে। যারা এ কথা মানতে অস্বীকার করলো, তাদেরকে অগ্নিময় গর্তে নিক্ষেপ করা হতে থাকলো। হযরত আলী (রা ) বলেন, তখন থেকে মাজুসীদের (অগ্নী উপাসক) মধ্যে মুহাররাম নারীদের বিয়ে করার প্রচলন শুরু হয়। -ইবনে জারীর

ইসরাঈলী বর্ণনা

তৃতীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন ইবনে আব্বাস (রা )। সম্ভবত তিনি এ ঘটনা ইসরাঈলী বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, বেবিলনবাসী বনী ইসরাঈলকে হযরত মূসা (আ ) এর দ্বীন ত্যাগ করতে বাদ্য করে। যারা এ দ্বীন পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করে তাদেরকে তারা অগ্নিপূর্ণ গর্তে নিক্ষেপ করে। – ইবনে জারীর, আবদ বিন হুমাইদ।

নাজরানের ঘটনা

নাজরানের ঘটনাটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। ইবনে হিশাম, তাবারী, ইবনে খালদুন, মুয়াযামুল বুলদান গ্রন্থ প্রণেতা প্রমুখ ইসলামী ঐতিহাসিকগণ এ ঘটনা বর্ণনা করেন। তার সারকথা এই যে, হেমইয়ারের (ইয়ামেন) বাদশাহ তুব্বান আসয়াদ আবু কারব একবার ইয়াসরেব গমন করে এবং ইহুদীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করেন। তারপর বনী কুরায়যার দুজন আলেমকে ইয়ামেনে নিয়ে যায়। সেখানে সে ব্যাপক আকারে ইহুদী ধর্ম প্রচার করে। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র যু নোয়াস তার স্থলাভিষিক্ত হয়। সে দক্ষিণ আরবে খৃস্টানদের মজবুত দুর্গ নাজরান আক্রমণ করে যাতে করে সেখান থেকে খৃস্টধর্ম নিশ্চিহ্ন করে অধিবাসীদেরকে ইহুদী ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা যায়। ইবনে হিশাম বলেন এসব  এসব লোক হযরত ঈসা (আ ) এর প্রকৃত দ্বীনের অনুসারী ছিল]। সে নাজরান পৌঁছে জনগণকে ইহুদী ধর্ম গ্রহণের আহবান জানায়। কিন্তু তারা অস্বীকার করে। তখন বহু সংখ্যক লোককে অগ্নিপূর্ণ গর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে মারা হয় এবং বহু সংখ্যক লোককে নিহত করা হয়। মোট বিশ হাজার লোক নিহত হয়। নাজরানবাসীর মধ্যে যু সালাবান নামে এক ব্যক্তি পালিয়ে যায়। একটি বর্ণনাতে বলা হয় যে, সে রোমের কায়সারের নিকটে এবং অন্য বর্ণনামতে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকটে গিয়ে এ অত্যাচারের প্রতিকার দাবী করে। প্রথম বর্ণনামতে কায়সার নাজ্জাশীকে জানিয়ে দেয় এবং দ্বিতীয় বর্ণনামতে নাজ্জাশী একটি যুদ্ধ জাহাজ পাঠাবার জন্যে কায়সারকে অনুরোধ জানায়। যা হোক অবশেষে আরইয়াত নামক একজন অধিনায়কের অধীন আবিসিনিয়ার সত্তর হাজার সৈন্য ইয়ামেন আক্রমণ করে। যু নোয়াস নিহত হয়। ইহুদী রাষ্ট্রের অবসান ঘটে এবং ইয়ামেন আবিসিনিয়ার খৃস্টান রাজ্যের একটি অংশে পরিণত হয়।

ইয়ামেনে খৃস্টান মিশনারি

ইসলামী ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রে শুধু সত্যায়িতই হয় না বরঞ্চ তার থেকে অনেক বিশদ বিবরণ জানা যায়। ইয়ামেনের উগ্র খৃস্টান হাবশীদের সর্বপ্রথম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ৩৪ খৃস্টাব্দে এবং তা অক্ষুণ্ণ থাকে ৩৭৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। সে সময় থেকে খৃস্টান মিশনারি ইয়ামেনে প্রবেশ করতে থাকে। তখনকার নিকটবর্তী যুগে ফেমিয়ুন (Faymiyun)নামে একজন খোদভীরু আবেদ এবং কাশফ কারামাতের অধিকারী খৃস্টান পরিব্রাজক নাজরান আগমন করেন। মূর্তিপূজা যে কত খারাপ একথা তিনি সেখানকার লোকজনকে বুঝিয়ে দেন। তাঁর এ প্রচারণায় নাজরানাবাসী খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে। তাদের শাসনব্যবস্থা তিন প্রধান চালাতো। একজন উপজাতীয় দলপতিদের ন্যায় শক্তিশালী প্রধান। বৈদেশিক বিষয়াদি, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সেনাবাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব তার উপর ন্যস্ত থাকতো। দ্বিতীয়জন সংরক্ষক, যে আভ্যন্তরীণ বিষয়াদির দেখাশুনা করতো। তৃতীয়জন ছিল উসকুফ বা বিশপ, তার কাজ ছিল ধর্মীয় নেতৃত্ব দান করা। দক্ষিণ আরবে নাজরান অতি গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। এটি ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্পের কেন্দ্রস্থল ছিল। তসর, চামড়া এবং অস্ত্রের কারখানা এখানে ছিল। প্রসিদ্ধ ইয়ামেনী হোল্লা (পোশাক) এখানে তৈরি হতো। এজন্যে শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়, বরঞ্চ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণেও যু নোয়াস এ গুরুত্বপূর্ণ স্থান আক্রমণ করে। সে নাজরানের প্রধান ব্যক্তি হারেসাকে (সুরিয়ানী ঐতিহাসিকগণের মতে Arethas) হত্যা করে। তার স্ত্রী রুমার সামনে তার দু কন্যাকে হত্যা করা হয় এবং তাদের রক্ত পান করতে তাকে বাধ্য করা হ। তারপর তাকেও হত্যা করা হয়। উসকুফ পলের হাড় কবর থেকে বের করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। অগ্নিপূর্ণ গর্তে নারী পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, পাদ্রী পুরোহিত সকলকে নিক্ষেপ করা হয়। মোট বিশ থেকে চল্লিশ হাজার লোক নিহত হয় বলে বর্ণনা করা হয়। এ ঘটনা সংঘটিত হয় ৫২৩ খৃস্টাব্দে এবং ৫২৫ খৃস্টাব্দে হাবশীগণ ইয়ামেন আক্রমণ করে যু নোয়াসকে হত্যা করে ও তার হেমইয়ারী রাজ্যের অবসান ঘটায়। এর সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদগণ কর্তৃক ইয়ামেনে আবিষ্কৃত হিসনে গোরাবের শিলালিপি থেকে।

আসহাবে উখদুদ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী

খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর বিভিন্ন লেখা ও প্রবন্ধাদিতে আসহাবে উখদূদের এ ঘটনার বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে যার মধ্যে কিছু ঘটনা ঐ কালেরই লেখা এবং প্রত্যক্ষদর্শীর নিকট শুনে লেখা। এদের মধ্যে তিনজন গ্রন্থ প্রণেতা ছিলেন এ ঘটনার সমসাময়িক। একজনের নাম প্রকোপিউম এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি Cosmos Indico-Pleustis।সে নাজ্জাশী Elesboan এর নির্দেশে বাতলিমুসের গ্রীক গ্রন্থাবলীর ইংরেজি অনুবাদ করতো এবং আবিসিনিয়ার উপকূলবর্তী শহর Adolis এ বসবাস করতো। তৃতীয় ব্যক্তি ছিল উইহান্নাস মালালা (Johannes Malala)। তার থেকে পরবর্তীকালের বিভিন্ন  ঐতিহাসিকগণ এ ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন। তারপর Jonannes of Ephesus(মৃত্যু ৫৮৫ খৃঃ) তার লিখিত গির্জার ইতিহাসে নাজরানবাসী খৃস্টানদের নির্যাতনের কাহিনী লিপিবদ্ধ করেন। সমসাময়িক বর্ণনাকারী বিশপ Simeon  এর একখানা পত্র থেকে এ ঘটনা তিনি উদ্ধৃত করেছে। এ পত্র লেখা হয়েছিল Abbot Von Gabula এর নামে। Simeon তাঁর পত্রে এ ঘটনা ইয়ামেনবাসীর চোখে দেখা বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। এ পত্রটি প্রকাশিত হয় ১৮৮১ খৃস্টাব্দে রোম থেকে এবং ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে খৃস্টান শহীদানের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে প্রকাশিত হয়।Patriarch Dionysius এবং Zacharia of Mitylene তাঁদের সুরিয়ানী ইতিহাসেও এ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। Edessa এর উসকুফ Pulusনাজরানে নিহতদের শোকসূচক কবিতা বা মর্সিয়া লিখেছেন যা আজও পাওয়া যায়। সুরিয়ানী ভাষায় লিখিত গ্রন্থ আল হিমইয়ারে এবং ইংরেজি অনুবাদ Book of Himyarites ১৯২৪ খৃস্টাব্দে লন্ডনে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থ মুসলমান ঐতিহাসিকগণের বর্ণনার সত্যতা স্বীকার করে। ব্রিটিশ যাদুঘরে ঐ যুগের এবং তার নিকটবর্তী যুগের কিছু হাবশী হস্তলিপি বিদ্যমান আছে যার থেকে এ কাহিনীর সমর্থন পাওয়া যায়। ফিলবী তাঁর ভ্রমণকাহিনী Arabian Highlands এ লিখেছেন যে, নাজরানের যে স্থানে আসহাবে উখদূদের ঘটনা সংঘটিত হয় তা আজ পর্যন্ত লোকের নিকটে সুবিদিত। উম্মে খারকের নিকটে একস্থানে পাথরে খোদাই করা কিছু ছবি পাওয়া যায় এবং যে স্থানে নাজরানের কাবা (তার নামই তারা কাবা রেখেছিল এবং তা নাজরানের কাবা নামে অভিহিত ছিল।– গ্রন্থকার) অবস্থিত চিল তা বর্তমান কালের নাজরানবাসী জানে।

কাবার আকৃতিতে একটি প্রাসাদ নির্মাণ

হাবশী খৃস্টানগণ নাজরান অধিকার করার পর সেখানে কাবার আকৃতিতে একটি অট্টালিকা নির্মাণ করে। তাকে তারা মক্কায় অবস্থিত কাবা ঘরের স্থলে কেন্দ্রীয় মর্যাদা দিতে চেয়েছিল। তার পুরোহিতগণ পাগড়ী বাঁধতো এবং একে তারা হেরেম বলে গণ্য করতো। রোম সাম্রাজ্য থেকে এ কাবার জন্যে আর্থিক সাহায্য পাঠানো হতো। এ নাজরানের কাবায় পাদ্রীগণ তাদের প্রধান বিশপ প্রভৃতির নেতৃত্বে তর্ক বিতর্ক করার উদ্দেশ্যে নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর দরবারে হাজির হয় এবং মুবাহেলার সেই প্রসিদ্ধ ঘটনা ঘটে যা সূরা আলে ইমরানের ৬১ আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে।(সূরা আস সফ,টীকা – ৭)

ইয়ামেনে খৃস্টানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা

নাজরানে ইয়ামেনের ইহুদী শাসক যু নোয়াস মসীহ (আ ) এর অনুসারীদের উপর যে নির্যাতন চালিয়েছিল  তার প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে আবিসিনিয়ার  খৃস্টান সরকার ইয়ামেন আক্রমণ করে হিমসইয়ারী শাসনের অবসান ঘটায় এবং ৫২৫ খৃস্টাব্দে এ গোটা অঞ্চলের উপরে হাবশী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব কিছু হয়েছিল কনস্টান্টিনোপলের রোমীয় সরকার এবং আবিসিনিয়া সরকারের পারস্পরিক সহযোগিতায়। কারণ হাবশীদের নিকটে সে সময়ে কোন উল্লেখযোগ্য সামুদ্রিক রণতরী ছিল না। রোমীয়গণ রণতরী সরবরাহ করে এবং হাবশীগণ সে রণতরীর সাহায্যে সত্তর হাজার সৈন্যসহ ইংয়ামেন উপকূলে অবতরণ করে। প্রথমেই জেনে রাখা দরকার যেসব কিছু নিছক ধর্মীয় প্রেরণার ফলশ্রুতি নয়। বরঞ্চ এসবের পশ্চাতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিহিত ছিল। আর এটাই তাদেরকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উৎপীড়িত  খৃস্টানদের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ একটা বাহানা ব্যতিরেকে আর কিছুই ছিল না। রোম সাম্রাজ্য যে দিন থেকে মিসর ও সিরিয়ার উপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে, সে দিন তেকেই তার প্রচেষ্টা এ ছিল যে, পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশসমূহ এবং রোম সাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যে ব্যবসা বাণিজ্যের উপর আরবগণ কয়েক শতাব্দী যাবত একচেটিয়া অধিকার ভোগ করে আসছিল, তা আরবদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে নিজেদের হাতে গ্রহণ করবে। ফলে তার পুরোপুরি মুনাফা সে ভোগ করতে পারবে এবং আরব ব্যবসায়ীদের মধ্যস্থতা বিনষ্ট হবে। এ উদ্দেশ্যে খৃস্টপূর্ব ২৪ অথবা ২৫ সালে কায়সার অগাস্টাস জেনারেল আলিয়াস গালুস ( Aelius Gallus) এর নেতৃত্বে এক বিরাট রণতরী আরবের পশ্চিম উপকূলে প্রেরণ করে, যাতে করে দক্ষিণ আরব থেকে সিরিয়া পর্যন্ত যে স্থল ভাগ রয়েছে তা আপন  অধিকারভুক্ত করতে পারে। কিন্তু আরবের কঠিন ভৌগলিক অবস্থা এ চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। অতঃপর রোমীয়গণ তাদের রণতরী লোহিত সাগরে স্থাপন করে, যার ফলে আরবদের সমুদ্র পথে যাবতীয় ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। শুধুমাত্র স্থল পথেই তাদের ব্যবসার সুযোগ রয়ে গেল। এ স্থল পথও অধিকার করার জন্যে তারা আবিসিনিয়ার খৃস্টান সরকারের সাথে জোট গঠন করে এবং রণতরী দিয়ে তাদেরকে ইয়ামেন অধিকার করতে সাহায্য করে।

আবরাহা কিভাবে ইয়ামেনের শাসক হলো

ইয়ামেনে যে হাবশী সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায় সে সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন কথা বলেছেন। ইবনে কাসীর বলেন যে, আক্রমণ অভিযান দুজন অধিনায়কের নেতৃত্বে হয়েছিল। একজন আরইয়াত এবং অপরজন আবরাহা। মুহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন, এ উভয়ে এ বিষয়ে একমত যে, পরে আরইয়াত ও আবরাহা পরস্পরে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় এবং আরইয়াত নিহত হয়। আবরাহা দেশের উপর শাসনক্ষমতার অধিকারী হয়। অতঃপর সে নিজকে ইয়ামেনে আবিসিনিয়া সম্রাটের প্রতিনিধি নিযুক্ত করার জন্যে সম্রাটকে রাজী করে। পক্ষান্তরে গ্রীক ও সুরিংয়ানী ঐতিহাসিকগণ বলেন, ইয়ামেন বিজয়ের পর হাবশিরা যখন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী ইয়েমেনী সরদারদেরকে একে একে হত্যা করা শুরু করে, তখন জনৈক সরদার (গ্রীক ঐতিহাসিকগণ তার নাম Esymphaesus বলেছেন) হাবশীদের অনুগত্য স্বীকার করে কর দিতে রাজী হয় এবং আবিসিনিয়ার সম্রাটের নিকট থেকে তার জন্যে ইয়ামেনের গভর্নর পদের নিয়োগপত্র লাভ করে। কিন্তু হাবশী সেনাবাহিনী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবংয় তার স্থলে আবরাহাকে গভর্নর বানিয়ে দেয়। এ ব্যক্তি ছিল আবিসিনিয়ার বন্দর উদুলিসের জনৈক গ্রীক ব্যবসায়ীর ক্রীতদাস। ইয়েমেন আক্রমণকারী হাবশী সেনাবাহিনীতে সে তার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। তাকে দমন করার জন্যে আবিসিনিয়া সম্রাট যে সেনাবাহিনীই পাঠায়,তারা হয় তার সাথে মিলিত হয় অথবা পরাজিত হয়। অবশেষে আবিসিনিয়া সম্রাটের মৃত্যুর তার স্থলাভিষিক্ত আবরাহাকে ইয়ামেনে তার প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকার করে নেয়। গ্রীক ঐতিহাসিকগণ তাকে আবরামিস(Abrames) এবং সুরিয়ানী ঐতিহাসিকগণ আবরাহাম (Abraham) বলে উল্লেখ করেছেন। আবরাহা সম্ভবত হাবশী উচ্চারণ, আরবীতে তার উচ্চারণ ইবরাহীম।

ক্রমশ এ ব্যক্তি (আবরাহা) ইয়েমেনের স্বাধীন বাদশাহ হয়ে পড়ে।কিন্তু আবিসিনিয়া সম্রাটের নামমাত্র আধিপত্য স্বীকার করে। সে নিজেকে সম্রাটের প্রতিনিধি বলে প্রকাশ করতো। সে যে কতখানি তার প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল তার অনুমান এ ঘটনা থেকে করা যায় যে, যখন সে মারেব প্রাচীর মেরামতের কাজ সম্পন্ন করার পর এক বিরাট উসব পালন করে, তখন সে উৎসবে রোম সম্রাট, ইরান সম্রাট, হীরার শাসক, গাসসানের শাসক প্রভৃতির রাষ্ট্রদূতগণ যোগদান করে। তার বিবরণ মারেব প্রাচীরে স্থাপিত শিলালিপিতে পাওয়া যায়। এ শিলালিপি এখনও বিদ্যমান এবং গ্লেজার (Glaser) তা উদ্ধৃত করেছেন।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.