সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আরববাসীদের উপর রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অভিযান

ইয়ামেনে শাসনক্ষমতা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করার পর আবরাহা  উদ্দেশ্যেই কাজ শুরু করে যা এ অভিযানের সূচনা থেকেই রোম সাম্রাজ্য এবং তার মিত্র হাবশী খৃস্টানদের অভিপ্রেত ছিল। অর্থাৎ একদিকে আরবে খৃস্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার এবং অন্য দিকে ঐ ব্যবসা বাণিজ্য হস্তগত করা যা প্রাচ্যের দেশগুলো এবং রোমীয় অধিকারভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আরবদের মাধ্যমে চলতো। এ প্রয়োজন তীব্র হয়ে পড়ে[ এ কারণে যে, ইরানের সাসানী রাজ্যের সাথে রোমের ক্ষমতার যে দ্বন্দ্ব চলছিল তার ফলে প্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে রোমীয়দের সকল বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেজন্যে আবরাহা ইয়ামেনের রাজধানী সানআতে এক বিরাট গির্জা নির্মাণ করে। আরব ঐতিহাসিকগণ তাকে আর কালিস, আল কুলাইস অথবা আল কুলাইয়াস নামে অভিহিত করেছেন। এ হচ্ছে গ্রীক শব্দ Ekklesia/Ecclesia এর আরবী উচ্চারণ। উর্দু কালিসা, গ্রীক শব্দ থেকে উদ্ভূত। মোহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন, এ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর সে আবিসিনিয়া সম্রাটকে জানিয়ে দেয় যে, আরবদের হজ্ব কাবা থেকে এ গির্জার দিকে ঘুরিয়ে না দিয়ে সে ছাড়বে না। (ইয়ামেনের উপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব লাভের পর খৃস্টানদের ক্রমাগত প্রচেষ্টা এ ছিল যে, তারা কাবার মুকাবিলায় এক দ্বিতীয় কাবা প্রতিষ্ঠিত করবে এবং তা আরবদের কেন্দ্রীয় স্থল বানাবে। অবশ্যি তারা নাজরানেও একটি কাবা নির্মাণ করে যার উল্লেখ উপরে করা হয়েছে।–গ্রন্থকার) ইবনে কাসীর বলেন, আবরাহা ইয়ামেনে তার অভিলাষ প্রকাশ্যে ঘোষণা  করে এবং তা জনসাধারণ্যে প্রচার করে। তার এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল আরবদেরকে ক্রুদ্ধ করে তোলা, যাতে করে তারা এমন কিছু করে বসে, যাকে বাহানা করে মক্কা আক্রমণ করে কাবাঘর ধ্বংস করে দেয়া যাবে। মুহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন, তার এ ধরনের ঘোষণার পর একজন আরব কোনো প্রকারে তার গির্জার মধ্যে প্রবেশ করে মল-মূত্র ত্যাগ করে। ইবনে কাসীর বলেন, এ কাজ একজন কুরাইশী করে। মুকাতিল বিন সুলাইমান বলেন, কুরাইশদের কতিপয় যুবক গিয়ে গির্জায় আগুন লাগিয়ে ধেয়। এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটে থাকলে তাতে আশ্চর্যের কিছু ছিল না। কারণ আবরাহা এ ধরনের ঘোষণা তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের যুগে এ অবস্থায় কোন আরব, কোন কুরাইশী অথবা কতিপয় যুবকের উত্তেজিত হয়ে গির্জা অপবিত্র করা অথবা তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়া অ-বোধগম্য ছিল না। আবার এমন হওয়াটাও অসম্ভব নয় যে, আবরাহা নিজে কোনো লোককে দিয়ে গোপনে এ কাজ করিয়েছে যাতে করে মক্কা আক্রমণ করার বাহানা সৃষ্টি হয়। এভাবে সে কুরাইশদেরকে ধ্বংস করে এবং সমস্ত আরববাসীকে ভীত সন্ত্রস্ত করে তার উভয় উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে চেয়েছিল। যা হোক, উভয় ঘটনার মধ্যে যে কোনোটাই হোক না কেন, যখন আবরাহা জানতে পারলো যে, কাবার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিগণ তার গির্জার অবমাননা করেছে, তখন সে শপথ করে যে, যতক্ষণ সে কাবা ধূলিসাৎ না করেছে ততোক্ষণ সে নিশ্চিন্তে বসে থাকবে না।

মক্কার উপর আবরাহার আগ্রাসন

তারপর সে ৫৭০ অথবা ৫৭১ খৃস্টাব্দে ষাট হাজার সৈন্য, একত্রিশটি হাতি (মতান্তরে নয়টি হাতি) সহ মক্কার দিকে যাত্রা করে। পথিমধ্যে প্রথমে ইয়ামেনের যু নফর নামক এক সরদার আরবদের একটা সেনাবাহিনী নিয়ে বাধা দান করে। কিন্তু পরাজিত হয়ে গ্রেফতার হয়। অতঃপর খাশয়াম অঞ্চলে নুফাইল বিন হাবীব খাশয়ামী নামক একজন আরব সরদার তার গোত্রীয় লোকজনসহ মুকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুত হয়। কিন্তু সেও  পরাজিত হয় এবং গ্রেফতার হয়। সে তাঁর জীবন রক্ষার জন্যে পথ  দেখাবার কাজ করতে রাজী হয়। তারা যখন তায়েফের নিকটে পৌঁছে তখন বনী সাকীফ মনে করলো যে, এ বিরাট বাহিনীর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের নেই। তাদের আশংকা হলো যে, কি জানি তারা তাদের লাত মন্দির ধ্বংস করে না দেয়। অতএব তাদের সরদার মাসউদ একটি প্রতিনিধি দলসহ আবরাহার সাথে সাক্ষাত করে। সে বলে, আপনি  যে মন্দির ধ্বংস করতে এসেছেন সে তো এটা নয়, তা মক্কায়। আপনি এ মন্দির ধ্বংস করবেন না, আমরা মক্কার পথ দেখাবার জন্যে আপনাকে প্রহরী স্বরূপ লোক (Escort)দিচ্ছি। আবরাহা তাদের কথা মেনে নেয়। তখন বনী সাকীফ আবু রেগাল নামে এক ব্যক্তিকে আবরাহার সাথে দিয়ে দেয়। মক্কা তিন ক্রোশ দূরে থাকতে মুগাম্মাস বা মুগাম্মেস নামক স্থানে আবু রেগাল মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আরববাসী বহুকাল ধরে তার কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করতে থাকে। তারা বছরের পর বচর ধরে বনী সাফীককে ভর্ৎসনা করতে থাকে। কারণ তারা লাত মন্দির রক্ষা করার জন্য মক্কা আক্রমণকারীদের সাহায্য করে।

মক্কাবাসীদের প্রতিক্রিয়া

ইবনে ইসহাক বলেন, আবরাহা মুগাম্মাস থেকে তার অগ্রবর্তী বাহিনীকে সম্মুখে অগ্রসর হতে বলে। তারা  তেহামাবাসী এবং কুরাইশদের বহু গৃহপালিত পশু লুট করে। তার মধ্যে নবী (সা ) এর দাদা আবদুল মুত্তালেবের দুশ উট ছিল। তারপর আবরাহা তার একজন প্রতিনিধি মক্কায় পাঠিয়ে দেয়। তার মাধ্যমে সে এ কথা বলে, আমি তোমাদের সাথে লড়াই করতে আসিনি। কাবার ঐ ঘর ধ্বংস করতে এসেছি। তোমরা যদি লড়াই না কর, তাহলে তোমাদের জান মালে হাত দিব না।

সে তার প্রতিনিধির দ্বারা এ কথাও জানিয়ে দেয় যে, মক্কাবাসীর কিছু বলার থাকলে যেন তাদের সরদারকে তার কাছে পাঠিয়ে দেয়। তৎকালে মক্কার শ্রেষ্ঠ সরদার ছিলেন আবদুল মুত্তালিব। আবরাহার প্রতিনিধি তাঁর সাথে দেখা করে আবরহার পয়গাম পৌছিয়ে দেয়। আবদুল মুত্তালিব বললেন, আবরাহার সাথে লড়াই করার শক্তি আমাদের নেই। এ হচ্ছে আল্লাহর ঘর। তিনি চাইলে তাঁর রক্ষা করবেন। প্রতিনিধি বললো, আপনি আমার সাথে আবরাহার নিকটে চলুন। তিনি রাজী হলেন এবং তার সাথে রওয়ানা হলেন।

আবদুল মুত্তালিব এতোটা আকর্ষণীয় ব্যক্তি ছিলেন যে, আবরহা তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হলো এবং তার আসন থেকে উটে তাঁর কাছে এসে বললো, আপনি কি চান ? তিনি বললেন, আমার যে উটগুলো ধরে এনেছেন তা আমাকে ফেরত দিন। আবরাহা বললো, আপনাকে দেখে তো আমি অত্যন্ত প্রভাবিত  হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনি উট ফেরত পাওয়ার দাবী জানালেন অথচ যে ঘরটি আপনাদের এবং আপনাদের পূর্বপুরুষদের দ্বীনের আশ্রয়স্থল তার সম্পর্কে কিছুই বললেন না। এতে করে আমার কাছে আপনার মর্যাদা কমে গেল। তিনি বললেন, আমি তো শুধু আমার উটের মালিক এবং তার জন্যেই আপনার কাছে আবেদন জানাচ্ছি। তারপর এ ঘরের কথা বলছেন? তো এ ঘরের একজন প্রভু আছেন, তিনি স্বয়ং তার হেফাজত করবেন। আবরাহা বললো, সে আমার আক্রমণ থেকে তার ঘরকে রক্ষা করতে পারবে না। আবদুল মুত্তালিব বললেন, আপনি জানেন এবং তিনি জানেন । এ কথা বলে তিনি উঠে পড়লো, আবরাহা তাঁর উটগুলো তাঁকে ফেরত দিল।

ইবনে আব্বাস (রা ) এর বর্ণনা ভিন্নরূপ। তাতে উট দাবী করার কোন উল্লেখ নেই। আবদ বিন হুমাইদ ইবনুল মুনযের, ইবনে মারদুইয়া, হাকেম, আবু নাঈম এবং বায়হাকী তাঁর থেকে যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে বলা হয়েছে, যখন আবরাহা আসসেফাহ নামক স্থানে পৌছলো এবং এ স্থানটি ছিল আরাফাত ও তায়েফের পাহাড়গুলোর মাঝখানে হারাম সীমার নিকটে অবস্থিত, তখন আবদুল মুত্তলিব স্বয়ং তার কাছে গিয়ে বলেন, এখান পর্যন্ত আসার আপনার কি প্রয়োজন ছিল আপনার কোন কিছুর প্রয়োজন হলে আমাদেরকে জানাতেন, আমরা তা আপনাকে পৌছিয়ে দিতাম। সে বললো, আমি শুনেছি এ ঘরটি শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর। আমি তার নিরাপত্তা শেষ করে দিতে এসেছি। আবদুল মুত্তালিব বলেন, এ হচ্ছে আল্লাহর ঘর। আজ পর্যন্ত তিনি এ ঘরের উপর কাউকে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। আবরাহা বললো, আমরা তাকে ধূলিসাৎ না করে ছাড়বো না। আবদুল মুত্তালিব বললেন, আপনি যা চান, আমাদের থেকে নিন এবং ফিরে যান। কিন্তু আবরাহা তা মানলো না এবং আবদুল মুত্তালিবকে পেছনে ফেলে তার সেনাবাহিনী সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিল।

এ দুটি বর্ণনার গরমিল যদি তার আপন জায়গায় থাকতে দিই এবং কোনটার উপরে কোনোটার প্রাধান্য না দিই, তাহলে এর থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় যে, এমন বিরাট বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে কাবাঘর রক্ষা করার শক্তি শঙ্কা ও তার চারপাশের গোত্রগুলোর ছিল না। অতএব বুঝতে পারা যায় যে, কুরাইশগণ তার প্রতিরোধের কোন চেষ্টাই করেনি। কুরাইশরা তো আহযাব যুদ্ধের সময় মুশরিক ও ইহুদী গোত্রগুলো সমেত মাত্র দশ বারো হাজার লোক সংগ্রহ করতে পেরেছিল। তারা ষাট হাজার সৈন্যের মোকাবেলা কিভাবে করবে?

মুহাম্মাদ বিন ইসহাক বলেন, আবদুল মুত্তলিব আবরহার সেনাবাহিনীর স্থান থেকে ফিরে এসে কুরাইশদেরকে আপন আপন বাল বাচ্চাসহ পাহাড়ে আশ্রয় নিতে বলেন, যেন তাদেরকে পাইকারীভাবে হত্যা করতে না পারে। তারপর তিনি এবং কয়েকজন কুরাইশ সরদার মিলে হারামে হাজির হন এবং কাবার দরজার শিকল ঘরে আল্লাহ তাআলার দরবারে দোয়া করতে থাকেন যে, তিনি যেন তাঁর  ঘর ও তার খাদেমদেরকে রক্ষা করেন। তখন কাবার মধ্যে ৩৬০টি প্রতিমা ছিল । কিন্তু এ চরম মুহূর্তে তারা তাদেরকে ভুলে গেল এবং শুধুমাত্র আল্লাহর দরবারে দোয়ার জন্যে হাত উঠালো। তাদের যেসব দোয়া ইতিহাসে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাতে এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম উচ্চারণ করা হয়নি। ইবনে হিশাম আবদুল মুত্তালিবের জীবন চরিত থেকে যেসব কবিতা নকল করেছেন তা নিম্নরুপঃ (আরবী**********)

হে আল্লাহ! বান্দাহ নিজের ঘরের হেফাজত করে, তুমিও তোমার ঘরের হেফাজত কর।

(আরবী *******)

কাল তাদের ক্রুসেড  ও কলাকৌশলের উপর যেন বিজয়ী না হয়।

(আরবী*******)

যদি তুমি তাদেরকে ও আমাদের কেবলাকে আপন অবস্থায় ছেড়ে দিতে চাও, তাহলে তুমি যা চাও তাই কর।

সুহায়লী রাওদুল আনফে এ সম্পর্কে একটি কবিতা উদ্ধৃত করেছেন।ঃ

(আরবী ******)

ক্রুসেডের বংশধর ও তার পূজারীদের মুকাবিলায় তুমি আজ নিজের বংশধরের সাহায্য কর।

ইবনে জারীর আবদুল মুত্তালিবের নিম্নলিখিত কবিতা উদ্ধৃত করেন যা তিনি (আবদুল মুত্তালিব) দোয়া করার সময় পড়েছিলেন:

(আরবী******)

হে ঘরের দুশমন তোমার দুশমন। আপন বস্তি ধ্বংস করা থেকে তাদেরকে প্রতিরোধ কর।

কাবার রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে আল্লাহর মোজেজা

উপরের দোয়াগুলো করে আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর সঙ্গী সাথী পাহাড়ের উপর চলে যান। পরদিন আবরাহা মক্কা প্রবেশের জন্যে সম্মুখে অগ্রসর হয়। কিন্তু মাহমুদ নামক তার যে বিশেষ হাতি সকলের সামনে চলছিল সে হঠাৎ বসে পড়লো, তাকে খুব মারপিট করা হলো, চোখে পিঠে আঘাত করে ক্ষত বিক্ষত করা হলো। কিন্তু সে মোটেই নড়লো না। তাকে পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর দিকে চালাতে গেলে দৌড়ে চলে। কিন্তু মক্কার দিকে চালাতে গেলে বসে পড়ে এবং কিছুতেই সামনে অগ্রসর হতে চায় না। ইতিমধ্যে ঠোটে এবং পায়ে ছোট ছোট পাথর নিয়ে লোহিত সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে আবরাহার সেনাবাহিনীর উপর তা ছুঁড়ে মারতে থাকে। এ পাথর যার উপরেই পড়তো তার শরীর গলে যেতো। মুহাম্মাদ বিন ইসহাক এবং ইকরিমা বলেন, যার উপরেই পাথর পড়তো, তার গা চুলকাতে শুরু করতো। যে স্থান চুলকানো হতো তা কেটে গোশত পড়ে যেতো। ইবনে আব্বাসের অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, গোশত এবং রক্ত পানির মতো বয়ে পড়তো এবং হাড় বেরিয়ে আসতো। আবরহার নিজের অবস্থাও তাই হয়েছিল। তার শরীরের গোশত খন্ড বিখন্ড হয়ে পড়তে থাকে। যেখানে থেকেই কোন খন্ড পড়ে যেতো সেখান থেকে পুঁজ এবং রক্ত পড়-তো। এ হুলস্থূল ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে তারা ইয়েমেনের দিকে পালাতে থাকে। খাশায়াম থেকে যে নুফাইল বিন হাবীবকে তারা পথ দেখাবার জন্যে ধরে এনেছিল তাকে তারা খুঁজে বের করে বললো, এখন ফিরে যাওয়ার পথ দেখাও। সে স্পষ্ট অস্বীকার করে বললো- (আরবী*****) এখন আর পালাবার স্থান কোথায় যখন আল্লাহ পেছনে ধাওয়া করেছেন। নির্লজ্জ (আবরাহা) এখন পরাজি বিজয়ী নয়।

এ পলায়নের সময় তারা যেখানে সেখানে পড়ে মরতে লাগলো। আতা বিন ইয়াসার বলেন, সকলে তখনই মরেনি। কিছু সেখানেই মরে এবং কিছু পলায়নের সময় রাস্তায় পড়ে মরে। আবরাহা খাশয়াম পৌছার পর মারা যায়।( আল্লাহ তাআলা হাবশিদেরকে শুধু এ শাস্তি দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বরঞ্চ তিন চার বছরের মধ্যে ইয়েমেন থেকে হাবশীদের শাসন ক্ষমতা চিরতরে নির্মূল করে দেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, হাতির ঘটনার পর ইয়েমেনে তাদের শক্তি একেবারে চূর্ণ হয়ে যায়। স্থানে স্থানে ইয়েমেনী সরদার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারপর সাইক বিন যি ইংয়াযন নামে একজন ইয়েমেনী সরদার ইরানের নিকট সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করে। ছটি জাহাজে ইরান থেকে মাত্র এক হাজার সৈন্য আসে। হাবশী শাসন নির্মূল করার জন্যে এ ছিল যথেষ্ট। এ ছিল ৪৭৫ খৃস্টাব্দের ঘটনা।–গ্রন্থকার।)

এ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল মুযদালাফা এবংয় মিনার মধ্যবর্তী মুহাসসাব উপত্যকার নিকটস্থ মুহাসসির নামক স্থানে। সহীহ মুসলিম ও আবু দাউদের বর্ণনামতে নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর বিদায় হজ্বের যে কাহিনী ইমাম জাফর সাদেক তাঁর পিতা ইমাম বাকের থেকে এবং তিনি হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন তাতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ(সা ) যখন মুযদালিফা থেকে মিনার দিকে যাচ্ছিলেন, তখন মুহাসসের উপত্যকায় তাঁর চলার গতি দ্রুত করেন। ইমাম নাওয়াদী তার ব্যাখ্যায় বলেন যে, আসহাবে ফীলের ঘটনা এখানে সংঘটিত হয়েছিল। এজন্যে এ স্থান দ্রুত অতিক্রম করা সুন্নাত। ইমাম মালেক মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন যে, নবী (সা ) বলেন, গোটা মুযদালিফা অবস্থানের জায়গা। কিন্তু মুহাসসের উপত্যকায় অবস্থান করবে না।

আরবী সাহিত্যে এ ঘটনার সাক্ষ্য

নুফাইল বিন হাবীবের যে কবিতা মুহাম্মাদ বিন ইসহাক উদ্ধৃত করেছেন তাতে সে এ ঘটনার চাক্ষুষ বর্ণনা দিয়েছেঃ (আরবী********)

হে রুদায়না! আহা যদি তুমি দেখতে! আর আমরা মুহাসসাব উপত্যকার নিকটে যা দেখেছি তা তো তুমি দেখতে পাবে না।

(আরবী******)

আমি আল্লাহর শোকর আদায় করছি যখন আমি পাখিগুলো দেখলাম এবং আমার ভয় হচ্ছিল যে, পাথর আমাদের উপর না পড়ে।

(আরবী*******)

তাদের মধ্যে সবাই নুফাইলকে খুঁজছিল, যেন তার উপরে হাবশীদের কোন কর্জ ছিল।

এ তো বড়ো ঘটনা ছিল যে, তা সমগ্র আরবে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং তা নিয়ে কবিগণ কবিতা রচনা করে। এসব কবিতায় একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সকলে এ ঘটনাকে আল্লাহ তাআলার কুদরতের অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করে। একথা কেউ ইশারা ইংগিতেও বলেনি যে, এর মধ্যে ঐসব দেব দেবীর কোনো হাত ছিল কাবাঘরে যাদের পূজা করা হতো। দৃষ্টান্তস্বরূপ আবদুল্লাহ ইবনে আয়যিবারা বলেনঃ

(আরবী ******)

তারা ছিল ষাট হাজার যারা নিজেদের যমীনে ফিরে যেতে পারেনি। আর না ফিরে যাওয়ার পর তাদের রোগী (আবরাহা) জীবিত ছিল।

(আরবী *******)

তাদের আগে এখানে আদ এবং জুরহুম ছিল। আর আল্লাহ বান্দাহদের উপর বর্তমান রয়েছেন। তিনি তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন।

আবু কুবাইস বিন আসলাত বলেন-

(আরবী*******)

 উঠ এবং তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং মক্কা ও মিনার পাহাড়ের মাঝে বায়তুল্লাহর কোণগুলো মাসেহ কর।

(আরবী********) যখন আরশের মালিকের সাহায্য তোমাদের কাছে পৌছলো তখন সে বাদশাহের সেনাবাহিনী ঐসব লোকদেরকে এমন অবস্থায় তাড়িয়ে দিল যে, কেউ মাটিতে পড়ে রইলো এবং কাউকে পাথর মেরে হত্যা করা হলো।

এ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা

উপরন্তু হযরত উম্মে হানী (রা) এবং হযরত যুবাইর বিন আওয়াম (রা) বলেন, নবী (সা) বলেছেন, কুরাইশগণ দশ বছর মতান্তরে সাত বছর) লা শরীক আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করেনি। উম্মে হানীর বর্ণনা ইমাম বুখারী তাঁর ইতিহাসে এবং তাবারানী, হাকেম, ইবনে মারদুইয়া এবং বায়হাকী তাঁদের আপন আপন হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। হযরত যুবায়ের (রা ) এর বর্ণনা তাবারানী, ইবনে মারদুইয়া এবং ইবনে আসাফে উদ্ধৃত করেছেন। তার সমর্থন পাওয়া যায় হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়েবের ঐ মুরসাল রাওয়ায়াত থেকে যা খতীব বাগদাদী তাঁর ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করেছেন।

নবী (সা ) এর জন্ম

যে বছর এ ঘটনা ঘটে আরববাসী তাকে আমুল ফীল বা হাতির বছর নামে অভিহিত করে। এ বছরই নবী (সা ) জন্মগ্রহণ করেন। মুহাদ্দেসীন এবং ঐতিহাসিকগণ এ ব্যাপারে প্রায় একমত যে, উক্ত ঘটনা ঘটেছিল মুহররম মাসে এবং নবী (সা ) এর জন্ম হয় রবিউল আওয়াল মাসে। অধিকাংশের মতে হস্তী ঘটনার পঞ্চাশ দিন পর নবী (সা )এর জন্ম হয়।

কুরআনে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত উল্লেখ কেন করা হয়েছে?

যে ঐতিহাসিক বিশদ বিবরণ উপরে দেয়া হয়েছে তা সামনে রেখে সূরা ফীল সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ সূরায় কেন এতো সংক্ষেপে শুধু আসহাবে ফীলের উপর আল্লাহর আযাবের উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি মোটেই পুরাতন ছিল না। মক্কার বালক শিশু সকলেই তা জানতো। সাধারণভাবে আরববাসীও তা জানতো। সমগ্র আরববাসী একথা বলতো যে, আবরাহার আক্রমণ থেকে কাবা ঘরকে কোনো দেব দেবী রক্ষা করেনি। বরঞ্চ রক্ষা করেছেন আল্লাহ তাআলা কুরাইশ সরদারগণ আল্লাহ তাআলার নিকটে সাহায্য প্রার্থনা করে। কয়েক বছর পর্যন্ত কুরাইশগণ এ ঘটনার দ্বারা এতোটা প্রভাবিত হয়ে পড়ে যে তারা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করেনি। এজন্যে সূরা ফীলে এর বিস্তারিত উল্লেখের কোনো প্রয়োজন ছিল না। বরঞ্চ এ ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়াই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে, যাতে বিশেষভাবে কুরাইশ এবং সাধারণভাবে আরববাসী মনে মনে চিন্তা ভাবনা করতে পারে যে, নবী মুহাম্মাদ (সা) যে জিনিসের প্রতি আহবান জানাচ্ছেন তা এছাড়া আর কিছু নয় যে, সকল দেব দেবী পরিত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করতে হবে। উপরন্তু তারা যেন এটাও চিন্তা করে দেখে যে, এ সত্যের আহবানকে নিস্তব্ধ করে দেয়ার জন্যে তারা যদি জোর জবরদস্তি করে তাহলে যে শাস্তি আসহাবে ফীলকে তছনছ করে দিয়েছে, সে আযাবের সম্মুখীন তারাও  হবে।(সূরা আস সফ,টীকা-৮)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.