সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

খাতামুন্নাবিয়্যীনের আবির্ভাবের পর খ্রিস্টবাদ

[আসমানী কিতাবের বাহক হওয়ার কারণে ইহুদী ও খৃস্টান উভয় দলের উচিত ছিল ইসলামের অতি নিকটবর্তী হওয়া। কারণ মূলত তাদের দ্বীনও ইসলামই ছিল। বিশেষ করে মেষ নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর সাথে খৃস্টানদের সম্পর্ক দুটি কারণে ঘনিষ্টতর হওয়া উচিত ছিল।একঃ নবী মুহাম্মাদ (সা) এর দাওয়াতের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আ ) এর রেখে যাওয়া কাজ পরিপূর্ণ হতো। দ্বিতীয়তঃ শেষ নবীর আবির্ভাবের ভবিষ্যদ্বাণী খৃস্টানদের ধর্মীয় পুস্তকাদিতে ইহুদীদের  চেয়ে অধিক পরিমাণে বিদ্যমান ছিল। এসব যারা জানতো তাদের অনেকেই শেষ নবীর আগমন প্রতীক্ষায় ছিল। প্রখ্যাত খৃস্টান মনীষী ওায়ারাকা বিন নাওফাল তাদেরই একজন ছিলেন। মজার ব্যাপার এই যে, খৃস্টানদের সাথে শেষ নবীর এমন কিছু বিভিন্ন ঘটনা ঘটে যার কারণে শেষ নবী এবং মুসলমানদের সম্পর্কে খৃস্টানদের আচরণ ভিন্ন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ইহুদীদের ইহুদীবাদ এবং খৃস্টানদের খ্রিস্টবাদ মুসলমানদের ব্যাপারে এমন এক ব্যবধান সৃষ্টি করে যা ক্রমশঃ বিরাট আকার ধারণ করতে থাকে। মুসলমানদের সুমহান ব্যবহারের জবাবে তারা চরম আক্রোশ পোষণ করতে থাকে। এ আক্রোশ ক্রুসযুদ্ধগুলোতে রূপান্তরিত হয়। এসব ক্রুসেড বা ক্রুসযুদ্ধের পর মিল্লাতে ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদীসহ খৃস্টানদের বিশ্বব্যাপী নীতি অত্যন্ত ঘৃণার্হ হয়ে পড়ে। -[সংকলকদ্বয়]

ওয়ারাকা বিন নাওফাল কর্তৃক নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার(ঐতিহাসিক সূত্রে জানতে পারা যায় যে, ওয়ারাকা বিন নাওফালের পূর্বে পাদ্রী বোহায়রা নবী (সা ) কে যখন তাঁর সিরিয়া সফর কালে দেখেন, তখন তাঁর মধ্যে তিনি নবী নিদর্শনের প্রতিবিম্ব দেখতে পান। এ সম্পর্কে ইবনে খালদুন বলেনঃ নবী (সা) যখন বারো বছর বয়সে পা দেন তখন তিনি আবু তালিবের সাথে সিরিয়া ভ্রমণে যান। পাদ্রী বোহায়রা তাঁর মধ্যে নবীর নিদর্শন দেখতে পেয়ে তাঁর স্বজাতিদেরকে কাছে ডেকে নিয়ে তাদেরকে মুহাম্মাদ (সা ) এর নবুওয়াত সম্পর্কে অবহিত করেন। একথা জীবনী গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান এবং তা সর্বজন বিদিত। তারপর দ্বিতীয় বার তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদিজাতুল কোবরা বিনতে খোয়ায়েলেদ বিন আসাদ বিন আবদুল ওযযার পণ্যদ্রব্য নিয়ে তাঁর গোলাম মায়াসারার সাথে সিরিয়া যান। তিনি যখন পাদ্রী নাসতুরার নিকট দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি (পাদ্রী) তাঁর মধ্যে নবুওয়াতের নিদর্শন দেখতে পেরে মায়সারাকে তাঁর সম্পর্কে অবহিত করেন। মায়সারা প্রত্যাবর্তন করে সকল কথা হযরত খাদিজা (রা ) কে বলে। এসব কথা শুনার পর খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা মুহাম্মাদ (সা ) কে স্বামীত্বে বরণ করার প্রস্তাব দেন। -ইবনে খালদুন উর্দু অনুবাদ ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৬- অনুবাদক আল্লামা হাকীম আহমদ হাসান ওসমানী। ঐতিহাসিক গবেষণার নিরিখে এ বর্ণনার কোনো মর্যাদা দেয়া হোক বা না হোক, কিন্তু হুযুর (সা ) এর চেহারা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব দেখে কেউ যদি এ অভিমত ব্যক্ত করে যে, যে প্রতিশ্রুত নবীর ধারণা প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায় – তিনি এই নবীই, তাহলে তাতে আশ্চর্যের কোনো কারণ থাকেনা। আর দুই দুইজন খৃস্টান পাদ্রী (বোহায়রা এবং নুসতুরা) হুযুর (সা ) কে তাঁর বাল্যকালে দেখে তাঁর মধ্যে যে নবুওয়াতের নিদর্শন দেখতে পান, তা খৃস্টানদের জন্যে কোনো না কোনো পর্যায়ের অকাট্য প্রমাণ বটে। খৃস্টানগণ যদি তাঁদের আপন দুজন পাদ্রীর পক্ষ থেকে মুহাম্মাদ (সা ) এর মধ্যে নবুওয়াতের নিদর্শন দেখতে পাওয়ার বর্ণনা সত্য বলে স্বীকার করে নেন, তাহলে তাঁদের এ কথাও স্বীকার করা উচিত যে, ভবিষ্যতে আগমনকারী যে নবীর উপর অহী নাযিল হবে, তাঁকে কোনো নবীর পক্ষ থেকে নবুওয়াতের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু শিখাবারই প্রয়োজন হতে পারে না। পাদ্রী বোহায়রার বর্ণনাকে ভিত্তি করে খৃস্টানগণ যে ভ্রান্ত বিতর্কের দাঁড় করিয়েছেন তা  খণ্ডন মাওলানা মওদূদী এভাবে করেছেনঃ নবী (সা ) এর সমসাময়িক দুশমনদের মধ্যে কেউ এ কথা বলেনি যে, বাল্যকালে যখন তিনি পাদ্রী বোহায়রার সাথে সাক্ষাৎ করেন তখন এসব কিছু তার কাছে শিখে নিয়েছেন। তারা কেউ এ কথাও বলেনি যে, যৌবনকালে  যখন তিনি ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিদেশ ভ্রমণে করতেন তখন তিনি খৃস্টান পাদ্রী এবং ইহুদী রিব্বীদের নিকট থেকে এসব জ্ঞান লাভ করেছেন। কারণ তাঁর সফরের আগাগোড়া অবস্থা তাদের জানা ছিল। তিনি একাকীও সফর করেননি, বরঞ্চ তাঁর  আপন শহরের শত শত লোক তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলতো। মক্কার প্রতিটি মানুষ তাদেরকে একথা জিজ্ঞেস করতো, যদি এ লোকটি বারো তের বছর বয়সে বোহায়পারার কাছে এসব জ্ঞান লাভ করেছিল, অথবা পঁচিশ বছর বয়সে যখন তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে বিদেশ যাতায়াত শুরু করেন, তখন থেকে এসব জ্ঞান লাভ করা শুরু করেন, তাহলে তোমরা তাঁর চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত এসব কথা গোপন রেখেছিলে কেন। যেহেতু তিনি অন্যত্র কোথাও বাস করতেন না। বরঞ্চ হেতামাদের মধ্যেই বাস করতেন? –সংকলকবৃন্দ)

হেরা গুহায় ফেরেশতার সাথে প্রথম সাক্ষাতের পর বীত সন্ত্রস্ত ও কম্পিত অবস্থায় নবী (সা ) বাড়ি পৌছলে প্রথমে হযরত খাদিজা (রা ) তাঁকে সান্ত্বনা দান করেন। তারপর তিনি তাঁকে নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নাওফালের নিকটে যান। জাহেলিয়াতের যুগে ওয়ারাকা খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি আরবী এবং ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। অতিবৃদ্ধ  এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত খাদিজা (রা )তাঁকে বলেন, ভাইজান, আপনার ভাইপোর ঘটনা শুনুন।

ওয়ারাকা হুযুর  (সা ) কে বললেন, ভাইপো, কি দেখলেন বলুন দেখি?

নবী (সা ) যা কিছু দেখেছিলেন তা বলেন। ওয়ারাকা বলেন, এ হচ্ছে সেই নামূস (অহী আনয়নকারী ফেরেশতা) যাকে আল্লাহ তাআলা হযরত মূসা (আ ) এর উপর নাযিল করেন। আহা, যদি আমি আপনার নবুওয়াতের যুগে শক্তিশালী হতাম এবং ঐ সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম যখন আপনার জাতি আপনাকে বের করে দেবে।

নবী (সা ) বলেন, এসব লোক কি আমাকে বের করে দেবে?

ওয়ারাকা বলেন, নিশ্চয়ই, এমন কখনো হয়নি যে, আপনি যা এনেছেন তা যখন কেউ এনেছে, তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। আমি যদি আপনার সে সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তাহলে আপনাকে সর্বশক্তি দিয়ে সাহায্য করবো।

কিন্তু অল্পদিন পরেই ওয়ারাকার মৃত্যু হয়। —- হিতনি ছিলেন মক্কার একজন অতিবৃদ্ধ অধিবাসী, নবীর শৈশবকাল তেকেই তাঁকে দেখে এসেছেন এবং পনেরো বছরের ঘনিষ্ঠ আত্নীয়তার কারণে তাঁর অবস্থা আরও গভীরভাবে নিকট থেকে লক্ষ্য করেছেন। তিনি যখন এ ঘটনা শুনিতে পান তখন তাকে অসঅসা বা মনের প্ররোচনা মনে করেননি। বরঞ্চ ঘটনা শুনার সাথে সাথেই তিনি বলেন, এ হচ্ছে সেই নামূস যা মূসা (আ ) এর উপর আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন। তার অর্থ এই যে, তাঁর দৃষ্টিতে নবী মুহাম্মাদ (সা ) ও এমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন যে তাঁর নবুওয়াতের মর্যাদায় ভূষিত হওয়া কোনো আশ্চর্যজনক ব্যাপার ছিল না। (সূরা আল বুরুজ,টীকা-৪)

খৃস্টান রাজ্যে মুসলমানদের প্রথম হিজরত

মক্কার অবস্থা যখন অসহনীয় হয়ে পড়ে তখন নবুওয়াতের পঞ্চম বছর রজব মাসে নবী (সা ) বলেনঃ (আরবী ******)

তোমরা বের হয়ে আবিসিনিয়া চলে গেলে ভালো হয়। সেখানে এমন এক বাদশাহ আছেন যেখানে কারো উপর যুলুম করা হয় না। সেটা হচ্ছে কল্যাণভূমি। যতক্ষণ  পর্যন্ত না আল্লাহ তোমাদের এ মুসিবত দূর করেন, তোমরা সেখানে থাকবে।–(আবিসিনিয়ার খৃস্টান রাজ্য সম্পর্কে নবী (সা) কত উদারতার সাথে প্রশংসাবাণী উচ্চারণ করেন। সেখানকার শাসকের ন্যায়পরায়ণতা লক্ষ্য করে সেখানে মুসলমানদের হিজরতের এ একটি ঘটনা এজন্যে যথেষ্ট ছিল যে, মুসলমানদের সাথে খৃস্টানদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ও জোরদার হতে পারতো কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, তারা বিদ্বেষের প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দেয়। -সংকলকবৃন্দ)

নবী (সা ) এর এ নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমে এগারোজন পুরুষ ও চারজন মহিলা আবিসিনিয়া রওয়ানা হন। কুরাইশের লোকজন সমুদ্রকুল পর্যন্ত তাঁদের পেছনে ধাওয়া করে। কিন্তু সৌভাগ্য বশত শুআইবার নৌঘাঁটিতে যথাসময়ে তাঁরা জাহাজ পেয়ে যান। এভাবে তাঁরা ধরা পড়া থেকে বেঁচে যান। তারপর কয়েক মাস পর আরও কিছু লোক হিজরত করেন। তিয়াত্তর-জন পুরুষ এবং এগারজন মহিলা ও সাতজন অকুরায়শী শেষ পর্যন্ত আবিসিনিয়া গিয়ে একত্র হন। মক্কায় নবী (সা ) এর সাথে মাত্র চল্লিশ জন রয়ে যান।(সূরা আল আলাক,ভূমিকা)

আবিসিনিয়ার খৃস্টান বাদশাহর সত্য নিষ্ঠা

হিজরতের ঘটনা সামনে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হবে। এখানে শুধু এতটুকু বলা বাঞ্ছনীয় যে, মক্কার মুশরিকদের কূটনৈতিক প্রতিনিধিগণ মুসলমান মুহাজিরগনের পিছু ধাওয়া করে যখন তাঁদের বিরুদ্ধে নিজেদের দাবী পেম করলো এবং নবী (সা ) এর নবুওয়াত ও তাঁর দাওয়াতের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করলো, তখন খৃস্টান বাদশাহ নাজ্জাশী নবীর উপর অবতীর্ণ বাণীর কিয়দংশ শুনাবার জন্যে হযরত জাফর (রা ) কে অনুরোধ করেন। হযরত জাফর (রা ) সূরা মারইয়ামের প্রথমাংশ পড়ে শুনিয়ে দেন যা হযরত ইয়াহইয়া (আ )এবং হযরত ঈসা (আ ) সম্পর্কিত ছিল। নাজ্জাশী শুনছিলেন এবং কাঁদছিলেন। এমন কি তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। হযরত জাফর (রা ) তাঁর তেলাওয়াত শেষ করলে নাজ্জাশী বলেন, এ বাণী এবং যা কিছু হযরত ঈসা (আ ) এনেছিলেন তা একই উৎস কেন্দ্র থেকে উৎসারিত হয়েছে।(মক্কার মুসলিম মুহাজিরগণ যে বাদশাহের দরবারে হাজির হন, তিনি মুসলমানদের আকীদা এবং দৃষ্টিভঙ্গির সত্যতা স্বীকার করেন। নবী (সা ) এর শিক্ষাকেও সত্য বলে মেনে নে। এ দিক দিয়ে নাজ্জাশী বাদশাহের দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের নিকটতম ছিল। পরবর্তীকালে নবী (সা ) যখন বিভিন্ন বাদশাহ ও শাসকদের নিকটে পত্র দ্বারা ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন, এ ধরনের একটা পত্র আবিসিনিয়ার বাদশাহকেও প্রেরণ করেন। তিনি নবী পাক (সা ) এর দাওয়াত কবুল করেন এবং প্রত্যুত্তরে পত্র প্রেরণ করেন-(রহমাতুল্লিল আলামীন। কাজী সালমান মনসুল পুরী প্রথম খন্ড, পৃঃ ২০৯ -২১২)-সংকলকবৃন্দ।)(সূরা আল ফুরকান,টীকা-১২)

মক্কার ঐ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল রাজ দরবারের ধর্মীয় নেতাদের ঘুষ প্রদান করে নিজেদের দলভুক্ত করে নেয় এবং পরদিন দরবারে আমর বিন আল আস এ প্রশ্ন উত্থাপন করেনঃ

তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন যে, ঈসা বিন মারেইয়াম সম্পর্কে তাদের ধারণা বিশ্বাস কি ?

নাজ্জাশী পুনরায় মুহাজিরগণকে ডেকে পাঠান। তারপর আমর বিন আল আসের উপস্থাপিত প্রশ্ন তাঁদের সামনে রাখেন। তখন হযরত জাফর বিন আবু তালিব দাঁড়িয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে বললেনঃ

(আরবী *******)

নাজ্জাশী একথা শুনে মাটি থেকে একটা তৃণখন্ড তুলে নিয়ে বললেন, আল্লাহর কসম, তুমি যা কিছু বললে, হযরত ঈসা (আ ) এ তৃণখন্ড থেকে বেশী কিছু নন। (সূরা আল মারইয়াম,ভূমিকা)

আবিসিনিয়া সম্পর্কে মুসলমানদের বিশেষ আচরণ

আবু দাউদ এবং মুসনাদে আহমাদে নবী (সা ) এর একটি এরশাদ লিপিবদ্ধ আছে যাতে তিনি আবিসিনিয়া সম্পর্কে এ নীতি নির্ধারিত করে দেন –(আরবী**********) অন্য বর্ণনাতে (আরবী ********) অর্থাৎ আবিসিনিয়াবাসী যতক্ষণ তোমাদেরকে অবাধে থাকতে দেবে, তোমরাও তাদেরকে অবাধে থাকতে দিও।

মনে হয় এ নির্দেশ মুতাবেক খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে আবিসিনিয়ার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এ নির্দেশের তাৎপর্য সম্ভবত এ চিল যে, আবিসিনিয়াবাসী মুসলমানদেরকে বিপদের সময় যে আশ্রয় দিয়েছিল তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং একথা মনে রেখে তাদের বিরুদ্ধে প্রথমে অগ্রসর হওয়া চলবে না, যাতে করে বিশ্ববাসী এ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করতে না পারে যে, মুসলিম একটি অকৃতজ্ঞ দল। এর আর একটি কারণও চোখে পড়ে। তাহলো এই যে, আবিসিনিয়ার ভৌগলিক অবস্থান ও তার অতীত ইতিহাস লক্ষ্য করে নবী (সা ) এ ধারণা করেছিলেন যে, ইসলামের ভৌগলিক কেন্দ্রস্থল হেজাজের প্রতিরক্ষার জন্যে আবিসিনিয়ার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রয়োজন। এ কারণেই তিনি হয়তো এ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, ইসলামী দাওয়াত শান্তিপূর্ণ উপায়ে সে দেশে পৌছাতে হবে এবং যথাসম্ভব যুদ্ধবিগ্রহ থেকে দূরে থাকতে হবে।(সূরা আল মারইয়াম,ভূমিকা)

মিসরের মুকাওকেসের আচরণ

হোদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার পার্শ্বের যেসব শাসকদের (রহমাতুল্লিল আলামীনের গ্রন্থকার বলেন, নবী (সা ) সপ্তম হিজরির পয়লা মুহররম বিভিন্ন শাসকদের নামে পত্র লিখে দূতগণের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেন। তাঁদের অধিকাংশই খৃস্টান ছিলেন তাঁদের প্রতিক্রিয়াও ভালো ছিল। আবিসিনিয়ার নাজ্জাশী বাদশা আসহামা বিন আবজায ইসলাম গ্রহণ করেন। বাহরাইনের শাসক মানযের বিন সাওয়া ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর প্রজাদের মধ্যে অধিকাংশ মুসলমান হয়ে যায়। আম্মানের শাসকবৃন্দ জায়য়ফর এবং আবদ ফরযন্দানে জালিদীও চিন্তা ভাবনার পর ইসলামের প্রতি নতি স্বীকার করেন। দামেস্কের শাসনকর্তা মানযের বিন হারেস বিন আবু শামার নবী (সা ) এর পত্র হাতে নিয়ে খুব ক্রোধ প্রকাশ করেন কিন্তু পরে  নিজেকে সংযত করার পর উপঢৌকনাদিসহ দূতকে বিদায় করেন। ইয়ামামার শাসক হওয়া বিন আলী ইসলামী রাষ্ট্রের অর্ধাংশ দাবী করে। কিন্তু অল্পদিন পরই সে মারা যায়। বায়তুল মাকদিসে কনস্টান্টিনোপলের বাদশাহের অধীনে হেরাক্লিায়াস শাসক ছিলেন। তিনি নবী (সা ) এর পত্র পাওয়ার বিরাট দরবার আহবান করেন। নবী (সা ) সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করেন। ঘটনাক্রমে তখন আবু সুফিয়ান ব্যবসা উপলক্ষে সেখানে যায়। হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে দরবারে ডেকে নবী (সা) সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন, যাতে করে তাঁর নবী হওয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা করতে পারেন। অবশেষে তিনি আবু সুফিয়ানকে সম্বোধন করে তাঁর নিজের প্রতিক্রিয়া নিম্নরুপঃ বর্ণনা করেনঃ

প্রতিশ্রুত নবীর এসব নিদর্শনই আমাদেরকে বলা হয়েছে।ভ আমি মনে করতাম যে, নবীর আবির্ভাব হবে। কিন্তু আরব থেকে হবে তা আমি মনে করিনি। আবু সুফিয়ান। তুমি যদি সঠিক জবাব দিয়ে থাক তাহলে একদিন এ স্থানের উপর তিনি অবশ্যই কর্তৃত্ব করবেন যেখানে আমি বসে আছি (সিরিয়া ও বায়তুল মাকদিস)। কত ভালো হতো যদি তাঁর কাছে আমি পৌছতে পারতাম এবং তাঁর পা ধুয়ে দেয়ার সৌভাগ্য লাভ করতাম।– রহমাতুল্লিল আলামীন, ১ম খন্ড পৃঃ ২০৬ -২২৪) ফরওয়া বিন আমর খোযায়ী সিরিয়া অঞ্চলে রোম সম্রাটের অধীন শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কায়সার তাঁকে ডেকে ইসলাম পরিত্যাগ করতে বলেন। তিনি অস্বীকার করলে তাঁকে শহীদ করে দেয়া হয়। – সংকলকদ্বয়।)নিকটে পত্র প্রেরণ করেন তাঁদের মধ্যে আলেকজান্দ্রিয়ার রোমীয় শাসক Patriarch একজন ছিলেন। আরববাসী তাঁকে মুকাওকেস বলতো, হযরত হাতেব বিন আবি বালতাআ (রা ) যখন নবী (সা ) এর পত্র নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হন, তখন তিনি  পত্রের জবাবে ইসলাম গ্রহণ করেননি। কিন্তু পত্র বাহককে সাদরে গ্রহণ করেন। পত্রের জবাবে তিনি বলেন, আমি জানি যে, একজন নবী আসা বাকী রয়েছে। কিন্তু আমার ধারণা তিনি সিরিয়া থেকে আবির্ভূত হবেন। তথাপি আমি আপনার দূতকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছি এবং আপনার খেদমতে দুটি বালিকা পাঠাচ্ছি। এরা সম্ভ্রান্ত কিবতী বংশের।– ইবনে সায়াদ

এ বালিকা দুটির একজন সিরীন এবং অপর জন মারিয়া কিবতিয়া। (খৃস্টানগণ হযরত মারইয়ামকে মারিয়া বলতো)।

মিসর থেকে প্রত্যাবর্তনকালে পথে হযরত হাতেম উভয়ের নিকটে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং তাঁরা উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী (সা )এর দরবারে তাঁদেরকে পেশ করা হলে সিরীনকে হযরত হাসসান বিন সাবেতের মালিকানায় দেয়া হয় এবং হযরত মারিয়া (রা ) কে নবী (সা ) এর পবিত্র অন্দর মহলে গ্রহণ করা হয়। ৮ম হিজরী সনে তাঁর পবিত্র গর্ভে রাসূল (সা )এর ছেলে হযরত ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করে। -(আল-ইসতিয়াব আল আসাবা)(সূরা আর মারইয়াম,ভূমিকা)

নবী (সা ) এবং নাজরানের খৃস্টানগণ

নবম হিজরিতে নাজরানের একটি খৃস্টান প্রতিনিধি দল নবী (সা ) এর খেদমতে হাজির হয়। নাজরানে হেজাজ ও ইয়েমেনের মাঝে অবস্থিত। সে সময়ে ঐ অঞ্চলে তিয়াত্তরটি জনপদ ছিল এবং বলা হয় যে, তাদের মধ্যে যুদ্ধের উপযোগী এক লক্ষ বিশ হাজার পুরুষ পাওয়া যেতো। অধিবাসী সকলেই ছিল খৃস্টান এবং তারা তিনজন সরদারের নেতৃত্বাধীন ছিল। একজনকে আকেব বলা হতো যাকে জাতির নেতার মর্যাদা দেয়া হতো। দ্বিতীয়জনকে বলা হতো সাইয়েদ। সে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখাশুনা করতো। তৃতীয় ব্যক্তি ছিল উসকুফ (বিশপ) যার কাজ ছিল ধর্মীয় নেতৃত্ব দান। মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরববাসীর এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে দেশের ভবিষ্যৎ এখন নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর হাতে। অতএব দেশের বিভিন্ন স্থান নবীর দরবারে প্রতিনিধি দল আসা শুরু হলো। নাজরানের তিনজন সরদার ব্যক্তি ও চল্লিশজন প্রতিনিধিসহ মদীনায় পৌঁছেন।(এ সময়ে প্রতিনিধিদের সামনে নবী (সা )কুরআনে বর্ণিত তাওহীদের দাওয়াত পেশ করেন এবং নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা বর্ণনা করতে গিয়ে হযরত ঈসা (আ ) কে খোদায়ীর আসনে ভূষিত করার এবং খৃস্টানদের অন্যান্য ভ্রান্ত আকীদার খণ্ডন করেন। এ দাওয়াতে প্রতিনিধিবৃন্দের কেউ কেউ প্রভাবিত হয়ে পড়ে কিন্তু বিশপ ও পাদ্রীদের হঠকারিতা প্রতিবন্ধক হয়ে পড়ে। অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে নবী (সা ) তাদেরকে মুবাহেলার আহবান দিয়ে বলে, যদি তোমাদের আকীদার সত্যতার উপর তোমাদের পূর্ণ বিশ্বাস থাকে তাহলে এসো একত্রে আল্লাহর কাছে এই বলে দোয়া করি, আমাদের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী তার উপর আল্লাহর লানৎ হোক। কিন্তু তাদের কেউ এতে রাজী হলো না। এর ফলে প্রতিনিধিদের মধ্যে সরলমনা সদস্যবৃন্দ ছাড়াও সাধারণ খৃস্টান অখৃস্টান জনসাধারণের নিকটে এ সত্য সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, নাজরানের খৃস্টান নেতাগণ এমন আকীদা পোষণ করে যার উপর তাদের নিজেদেরই বিশ্বাস নেই।

অবশেষে নাজরানবাসীদের আবেদনে নবী (সা ) একটি চুক্তিপত্র লিখে তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তী অংশে তা আমরা লিপিবদ্ধ করবো।– সংকলকদ্বয়)(রাসায়েল ও মাসায়েল,১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৯০)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.