সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

পরিশিষ্ট

আরও দুটি বিষয় এ অধ্যায়ের সাথে সম্পর্কিত। একঃ যে, রোম ও ইরানের দ্বন্দ্বে মুসলমানদের নৈতিক সমর্থন খৃস্টানদের পক্ষে ছিল। দ্বিতীয়ঃ এই যে, তবুকে মুসলমানগণ খৃস্টানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

রোম ইরান দ্বন্দ্বের বিস্তারিত বিবরণ রোমের বিজয়লাভের ভবিষ্যদ্বাণী শীর্ষক প্রবন্ধে রয়েছে।(ভবিষ্যদ্বাণী ১ম খন্ড খন্ড)তবুক অভিযানের বর্ণনা তৃতীয় খন্ডে দ্রষ্টব্য।)

বিভিন্ন দেশের সাথে আরববাসীর ব্যাপক যোগসূত্র

প্রাক ইসলামী যুগের আরব দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস এবং বহির্জগতের সাথে তার যে সম্পর্ক ছিল তা লক্ষ্য করলে অনুমান করা যায় যে, আরব দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দেশ ছিল না যার অধিবাসী তাদের উপত্যকা ও মরুভূমির বাইরের দুনিয়ার সাথে অপরিচিত ছিল।

ব্যাপক বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন

প্রাচীন ইতিহাসের যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তার থেকে একথা প্রমাণিত হয় যে সে কালে চীন, ভারত এবং অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর এবং পূর্ব আফ্রিকার যেসব ব্যবসা বাণিজ্য মিসর, সিরিয়া এবং এশিয়া মাইনর, গ্রীক এবং রোমের সাথে চলতো, তা সবই চলতো আরবের মধ্যস্থতায়। এ বাণিজ্য তিনিটি বড়ো বড়ো পতে চলতো। একটি হচ্ছে ইরান থেকে যে মূল পথ ইরাক ও সিরিয়ার উপর দিয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় পারস্য উপ সাগরের সামুদ্রিক পথ। এ পথে সকল পণ্যদ্রব্য আরবের পূর্ব উপকুলে নামতো। তারপর দুমাতুল জান্দাল অথবা তাদমুর (Palmyra)এর উপর দিয়ে সামনের দিকে যতো। তৃতীয় বার মহাসাগরের সামুদ্রিক পথ। এ পথে যতো পণ্যদ্রব্য যাতায়াত করতো তা হাজরামাওত এবং ইয়ামেনের উপর দিয়ে অতিক্রম করতো। এ তিনটি পথ এমন ছিল যার উপর আরববাসীদের বসতি ছিল। আরববাসী একদিক দিয়ে পণ্যদ্রব্য খরিদ করতো এবং অন্য দিকে তা বিক্রি করতো। পরিবহণের কাজও (Carrying Trade) তারা করতো। তাদের এলাকার উপর দিয়ে যাতায়াতকারী ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে মোটা কর আদায় করে তাদের নিরাপদে অতিক্রম করার দায়িত্ব তারা নিত। এ তিন অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক ছিল। খৃস্টপূর্ব ১৭০০ সালের বনী ইসরাঈলের বাণিজ্য তৎপরতার উল্লেখ তাওরাতে পাওয়া যায়। হযরত ঈসা (আ ) এর দেড় হাজার বছর পূর্বে উত্তর হেজাজের মাদইয়ান এবং দেদানে এ ব্যবসা চলতো এবং তারপরেও কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে। হযরত সুলায়মান (আ ) এবং হযরত দাউদ (আ ) এর যুগে (খৃস্টপূর্ব ১০০) ইয়ামেনের সাবাঈ গোত্র এবং তারপর হিমইয়ারী গোত্র খৃস্টীয় প্রথম শতাব্দীগুলোতে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যে যাতায়াত করতো। মসীহ (আ )এর সমসাময়িক কালে ফিলিস্তিনের ইহুদীগণ আরবে আগমন করে খায়বর, ওয়াদিউল কুরা (বর্তমান আলউলা), তায়মা এবং তাবুক প্রভৃতি স্থানে বসতি স্থাপন করে। সিরিয়া ও মিসরে ইহুদীদের সাথে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকে। সিরিয়া ও মিসর থেকে খাদ্যশস্য ও মদ আমদানী বেশীরভাগ ইহুদীরাই করতো। পঞ্চম শতাব্দী থেকে কুরাইশগণ বহির্বাণিজ্যে কার্যকর অংশগ্রহণ শুরু কর। নবী (সা ) এর যুগ পর্যন্ত একদিকে ইয়েমেন ও আবিসিনিয়ার সাথে এবং অন্য দিকে ইরাক এবং মিসর ও সিরিয়ার সাথে তাদের ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পূর্ব আরবে ইরানের যতো ব্যবসা ইয়ামেনের সাথে চলতো তার অধিকাংশ হিরা থেকে ইয়ামামা(বর্তমান রিয়াদ)এবং তারপর বনী তামীমের এলাকার উপর দিয়ে নাজরান এবং ইয়ামেনে পৌছতো।

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক

এসব বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছাড়াও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পার্শ্ববর্তী সভ্যদেশগুলোর সাথে আরবদের গভীর সম্পর্ক ছিল। ষষ্ঠ শতাব্দী খৃস্টপূর্বে উত্তর হেজাজে তায়মারয় ব্যাবিলনের বাদশাহ Naboridus তাঁর গ্রীষ্মকালীন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। এ কি করে সম্ভব ছিল যে, ব্যবিলনের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা হেজাজবাসীদের অজানা ছিল। তৃতীয় শতাব্দী খৃস্টপূর্ব থেকে নবী (সা ) এর যুগ পর্যন্ত প্রথম পেট্রার (Petra)নাবতী রাষ্ট্র, অতঃপর তাদমুরের (Palmyra) সিরিয় রাষ্ট্র এবং তারপর হীরা এবং গাসসানের আরব রাষ্ট্রগুলো ইরাক থেকে মিসরের সীমান্ত পর্যন্ত হেজাজ ও নাজদের সীমান্ত থেকে আলজিরিয়া এবং সিরিয়ার সীমান্ত পর্যন্ত বরাবর কায়েম ছিল। এসব রাষ্ট্রের একদিকে গ্রীক ও রোম এবং অন্যদিকে ইরানের সাথে গভীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক  বিদ্যমান ছিল। তারপর বংশগত সম্পর্কের ভিত্তিতে আরবের অভ্যন্তরীণ গোত্রগুলোও তাদের সাথে ব্যাপক সম্পর্ক রাখতো।মদীনার আনসার এবং গাসসানের শাসক একই বংশোদ্ভূত ছিল এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল নবী (সা ) এর যমানায় তাঁর তাঁর বিশিষ্ট কবি হযরত হাসান বিন সাবেত (রা ) গাসসানী শাসকদের নিকটে যাতায়াত করতেন। হীরার আমীরদের সাথে কুরাইশদের সুসম্পর্ক ছিল। এমন কি কুরাইশগণ তাদেরই নিকটে বিদ্যা শিক্ষা করে এবং হীরপা থেকে যে বর্ণলিপি তারা লাভ করে তা পরবর্তীকালে কুফার বর্ণলিপি নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে।

উপরন্তু আরবদেশের প্রত্যেক অংশে বড়ো বড়ো শেখ, সম্ভ্রান্ত পরিবার ও প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ীদের নিকটে রোম, গ্রীক ও ইরানের বহু সংখ্যক দাস দাসী বিদ্যমান ছিল। ইরান ও রোমের যুদ্ধে উভয় পক্ষের যেসব যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস বানানো হতো, তাদের মধ্যে যাদেরকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মনে করা হতো তাদেরকে খোলা বাজারে বিক্রি করা হতো। আরব ছিল এ মালের বড়ো বাজার। এসব দাসের মধ্যে অনেকে উচ্চ শিক্ষিত ও সভ্য লোক থাকতো। তাদের মধ্যে শিল্প, বাণিজ্য ও পেশাজীবী লোকও থাকতো। আরবের শেখ এবং ব্যবসায়ীগণ তাদের নিকট থেকে বহু কাজ নিতো। মক্কা, তায়েফ, ইয়াসরিব এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় শহরগুলোতে বিরাট সংখ্যক দাস বিদ্যমান ছিল এবং দক্ষ শ্রমিক হিসেবে তাদের মালিকের মূল্যবান খেদমত করতো।

বিশেষ অর্থনৈতিক অবস্থা

এর সাথে আরবের অর্থনৈতিক ইতিহাসের আর একটি দিক লক্ষ্য করতে হবে। আরব কোনো যুগেই খাদ্যের দিক দিয়ে স্বয়ং সম্পূর্ণ ছিল না এবং এমন কোনো শিল্প কারখানাও গড়ে ওঠেনি যার দ্বারা মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা যেতো। এদেশে সর্বদা খাদ্যদ্রব্য বাহির থেকে আমদানি করা হতো এবং সকল প্রকার শিল্পদ্রব্য, এমনকি পরিধানের কাপড় পর্যন্ত বেশীর ভাগ বাহির থেকে আমদানি করা হতো। নবী (সা ) এর কাছাকাছি যুগে এ আমদানি ব্যবসা বেশীর ভাগ দুটি দুলের হাতে ছিল। এক হচ্ছে, কুরাইশ ও বনী সাকীফ এবং দ্বিতীয়, ইহুদী। কিন্তু এরা মাল আমদানি করে শুধু পাইকারী বিক্রি করতো। দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র জনপদে এবং উপজাতীয়দের মধ্যে ফেরী করে বিক্রি করা এদের কাজ ছিল না। উপজাতীয়রাও এ কথা মানতে রাজী ছিল না যে, ব্যবসার সকল মুনাফা এসব লোক ভোগ করুক এবং তাদের এ একচেটিয়া ব্যবসায়ে তাদের নিজেদের লোকজন কোনো সুযোগই লাব না করুক। অতএব পাইকারী বিক্রেতা হিসেবে এসব লোক দেশের অভ্যন্তরে খুচরা বিক্রেতা ব্যবসায়ীদের কাছে লাখ লাখ টাকার মাল বিক্রি করতো এবং যথেষ্ট পরিমাণ মাল ধারে বিক্রি করা হতো।(তাফহীমূল কুরআন,সূরা আত তাহরীম,টীকা ২)

রাজনৈতিক অবস্থার চিত্র

নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় দেশের রাজনৈতিক অবস্থা কি ছিল? সে অবস্থায় তিনি কোন কর্মপন্থা অবলম্বন করেন? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সে সময়ে আরব চারদিক থেকে অত্যাচারী রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। দেশের অভ্যন্তরেও প্রতিবেশী জাতিসমূহের সাম্রাজ্যবাদ প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছিল। নবী (সা ) এর জন্মের কিছুদিন পূর্বেই হাবশী সেনাবাহিনী যে শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন সে শহর পর্যন্ত অগ্রসর হয়। আরবের সবচেয়ে উর্বর প্রদেশ ইয়ামেন প্রথমে হাবশীদের এবং পরে ইরানীদের পদানত হয়। আরবের দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূল ইরানীদের প্রভাবাধীন চিল। নাজদের সীমান্ত পর্যন্ত ইরানী প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তরে আকাবা এবং মায়ান পর্যন্ত বরঞ্চ তাবুক পর্যন্ত রোম সাম্রাজ্যের প্রভাব বিদ্যমান ছিল, প্রতিবেশী রাষ্ট্রদ্বয় তাদের নিজেদের স্বার্থে আরবের উপজাতীয়দেরকে পরস্পর দ্বন্দ্ব সংঘর্ষে লিপ্ত রাখতো। এভাবে আরবের অভ্যন্তরে তাদের প্রভাব বিস্তার করতো। কনস্ট্যন্টিনোপলের কায়সার বিভিন্ন সময়ে মক্কার মতো ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতো। প্রতিটি বৃহৎ শক্তি আরব জাতিকে তাদের কুক্ষিগত করতে চাইতো। কারণ এ জাতির দেশ অনুর্বর হলেও জাতি অনুর্বর ছিল না। বিশ্ব জয়ের জন্যে এ জাতি থেকে সর্বোৎকৃষ্ট যোদ্ধা সংগ্রহ করা যেতো। (সূরা আলে ইমরান,টীকা-২৯)

সীরাতের পয়গাম

[১৯৭৫ সালের ২২ শে অক্টোবর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের  নতুন ক্যাম্পাসে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ কর্তৃক আহূত সমাবেশে প্রদত্ত মাওলানার ভাষণ।]

জনাব ভাইস চ্যান্সেলর,ছাত্র সংসদের সভাপতি এবং ছাত্র ছাত্রীবৃন্দ!

অদ্যকার এ সমাবেশে নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর সীরাতের পয়গাম সম্পর্কে কিছু বলার জন্যে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ সম্পর্কে যুক্তির কষ্টিপাথরে কথা বলতে গেলে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে যে, একজন মাত্র নবীর সীরাতের পয়গাম কেন?অন্য কারো পয়গাম কেন নয়? নবীগণের মধ্যে শুধুমাত্র সাইয়েদুনা মুহাম্মাদ (সা )এর সীরাতের উপর প্রথমেই আলোচনা করা এজন্যে প্রয়োজন যে, আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, প্রাচীন ও আধুনিক যুগের কোনো পথপ্রদর্শকের জীবন চরিত নয়, বরঞ্চ শুধুমাত্র একজন নবীর জীবন চরিতই আমরা হেদায়েত বা পথের সন্ধান পেতে পারি। অন্য কোনো নবী অথবা ধর্মীয় নেতার জীবনে নয়, বরঞ্চ নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর জীবন চরিতেই আমরা সে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ হেদায়াত লাভ করতে পারি। যার প্রকৃতপক্ষে আমরা মুখাপেক্ষী।

আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে হেদায়াতের প্রয়োজন

এ সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আল্লাহ তাআলাই জ্ঞানের একমাত্র উৎস। তিনিই এ বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষ পয়দা করেছেন। বিশ্বপ্রকৃতির নিগূঢ় তত্ত্ব এবং স্বয়ং মানুষের স্বভাব প্রকৃতি ও তার তত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান তিনি ছাড়া আর কার থাকতে পারে? স্রষ্টাই তো তাঁর সৃষ্টিকে জানতে পারেন, সৃষ্টি ততোটুকুই জানতে পারে যতোটুকু তার স্রষ্টা তাকে জানাবেন। সৃষ্টির নিজস্ব কোনো মাধ্যম, যার দ্বারা সে প্রকৃত তত্ত্ব জানতে পারে।

এ ব্যাপারে দুটি বিষয়ে পার্থক্য ভালোভাবে উপলব্ধি করা উচিত যাতে করে আলোচনায় কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে না পারে। একটি হচ্ছে, এমন কিছু তথ্য যা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আপনারা লাভ করতে পারেন এবং তার থেকে চিন্তা গবেষণা, যুক্তি ও পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ ও আবিষ্কারের কাজ, এ দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা আপনাদের চারপাশে যা কিছু পান তা অনুসন্ধান করে বের করুন। তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল শক্তিগুলো সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করুন। তাদের মধ্যে যে প্রাকৃতিক বিধি বিধান কার্যকর রয়েছে তা উপলব্ধি করুন। তারপর উন্নতির পথে অগ্রসর হোন। কিন্তু এ ব্যাপারে আপনাদের স্রষ্টা আপনাদেরকে একাকী ছেড়ে দেননি। তিনি ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে অননুভূত উপায়ে পর্যায়ক্রমে তাঁর সৃষ্ট জগতের সাথে আপনাদের পরিচয় করাতে থাকেন। নতুন নতুন তথ্যের দ্বার উন্মুক্ত করতে থাকেন। মাঝে মাঝে ইলহামের পদ্ধতিতে কোনো কোনো মানুষকে এমন ইংগিত দান করতে থাকেন যে, সে নতুন কিছু আবিষ্কার করতে অথবা নতুন কোনো নীতি পদ্ধতি জানতে পারে। তথাপি এ সবকিছু মানুষের জ্ঞানেরই আওতাভুক্ত, যার জন্যে কোনো নবী অথবা কোনো আসমানী কেতাবের প্রয়োজন হয়না। এ ব্যাপারে বাঞ্ছিত তথ্য লাভ করার উপায় উপাদানও মানুষকে দেয়া হয়েছে। দ্বিতীয় প্রকারের বস্তু এমন, যা আমাদের ইন্দ্রয়ানুভূতির ঊর্ধ্বে। তা আমাদের একেবারে নাগালের বাইরে। তা আমরা না পরিমাপ করতে পারি, আর না আমাদের নিজস্ব জ্ঞানের মাধ্যমে তা আমরা জানতে পারি। দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সে সম্পর্কে কোনো অভিমত পেশ করলে তা নিছক আন্দাজ অনুমানের ভিত্তিতে করে থাকেন। তাকে জ্ঞান বলা যেতে পারে না। এ হচ্ছে তাদের চূড়ান্ত তথ্য, যে ব্যাপারে বিতর্কমূলক মতবাদকে স্বয়ং তাঁরাও  সীমারেখা নিশ্চিত বলে ঘোষণা করতে পারেন না যাঁরা সে মতবাদ পেশ করেছেন। যদি তাঁদের জ্ঞানের সীমারেখা জানা থাকে তাহলে না, তাঁরা স্বয়ং তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারেন আর না অন্য কাউকে বিশ্বাস করার আহবান জানাতে পারেন।

নবীগনের আনুগত্যের প্রয়োজন

এখন উপরে বর্ণিত দ্বিতীয় কোনো জ্ঞান লাব হলে, তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার নির্দেশেই হতে পারে। কারণ সকল তত্ত্ব ও তথ্য তাঁর জানা আছে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে যে বস্তুর মাধ্যমে এ জ্ঞানদান করেন তা হচ্ছে অহী যা শুধুমাত্র নবীগণের উপর নাযিল হয়। আল্লাহ তাআলা আজ পর্যন্ত এ কাজ কখনো করেননি যে, একটি কিতাব মুদ্রিত করে প্রত্যেক মানুষের হাতে দিয়েছেন এবং তাদেরকে এ কথা বলে দিয়েছেন, তোমার এবং বিশ্বপ্রকৃতির নিগূঢ় তত্ত্ব কি তা এ কিতাবখানা পড়ে জেনে নাও। বরঞ্চ এ তত্ত্ব  অনুযায়ী দুনিয়ায় তোমার কর্মপদ্ধতি কি হওয়া উচিত তাও জেনে নাও এবং এ জ্ঞান মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাবার জন্যে তিনি সর্বদা নবীগণকেই মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন যাতে করে তাঁরা এ জ্ঞান শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত না হন বরঞ্চ তাদেরকে তা বুঝিয়ে দেবেন, সে অনুযায়ী নিজে কাজ করে দেখাবেন, তার বিরুদ্ধবাদীদেরকে সৎ পথে আনার চেষ্টা করবেন এবং এ জ্ঞান যারা গ্রহণ করবে তাদেরকে এমন একটা সমাজের আকারে সুসংবদ্ধ করবেন যাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে সে জ্ঞানেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটবে।

এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় একথা সুস্পষ্ট হয় যে, পথ-নির্দেশনার জন্যে আমরা শুধুমাত্র একজন নবীর সীরাতেরই মুখাপেক্ষী। কোনো অনবী যদি নবীর অনুসারী না হয়, তাহলে যতো বড়ো মহা পণ্ডিত ও জ্ঞানী গুণী হোক না কেন, সে আমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারে না। কারণ তাঁর কাছে সত্যজ্ঞান নেই এবং যে, সত্য জ্ঞানের অধিকারী নয়। সে আমাদেরকে কোনো সত্য এবং সঠিক জীবনব্যবস্থা দিতে পারে না।

মুহাম্মাদ (সা ) ছাড়া অন্যান্য নবীগণের পক্ষ থেকে হেদায়াত না পাওয়ার কারণ

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, যাঁদেরকে আমরা নবী বলে জানি এবং যে সকল ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে যে, তাঁরা সম্ভবত নবী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে শুধুমাত্র নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর সীরাত থেকে আমরা কেন পয়গাম লাভের চেষ্টা করি এ কি কোনো গোঁড়ামির কারণে, না এর কোনো যুক্তিসংগত কারণ আছে?

আমি বলতে চাই যে, এর অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত কারণ রয়েছে। যেসব নবীর উল্লেখ কুরআনে আছে, তাঁদেরকে যদিও আমরা নিশ্চিতরূপে নবী বলে জানি এবং মানি,কিন্তু তাঁদের মধ্যে কারো শিক্ষা ও জীবন রচিত কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছেনি, যাতে করে তাঁর অনুসরণ আমরা করতে পারি। হযরত নূহ (আ ), হযরত ইবরাহীম (আ ), হযরত ইসহাক(আ ), হযরত ইউসুফ(আ ), হযরত মূসা(আ ) এবং হযরত ঈসা (আ ) নিঃসন্দেহে  নবী ছিলেন। তাঁদের সকলের উপরে আমরা ঈমান রাখি। কিন্তু তাঁদের উপর নাযিল হওয়া কোনো কিতাব সংরক্ষিত আকারে আজ বিদ্যমান নেই যে, তার থেকে আমরা হেদায়াত গ্রহণ করতে পারি। তাঁদের মধ্যে কারো জীবন চরিত এমন সংরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য উপায়ে আমাদের কাছে পৌছেনি যে, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনের বিভিন্ন স্তরে  তাঁদেরকে আমাদের পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করব। এসব নবীগণের শিক্ষা ও জীবন চরিত সম্পর্কে কেউ কিছু লিখতে চাইলে কয়েক পৃষ্ঠার অধিক লিখতে পারবে না এবং তাও কুরআনের সাহায্যে। কারণ কুরআন ছাড়া তাঁদের সম্পর্কে আর কোনো প্রামাণ্য উপকরণ বা মালমসলা বিদ্যমান নেই।

ইহুদী দ্বীনের গ্রন্থাবলী ও নবীগণের অবস্থা

হযরত মূসা(আ ) এবং তাঁর পর আগমনকারী নবীগণ ও তাঁদের শিক্ষা দীক্ষা সম্পর্কে একথা বলা হয়ে থাকে যে, সেসব বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে আছে। কিন্তু ইতিহাসের দিক দিয়ে বাইবেলের পর্যালোচনা করে দেখুন। খৃস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বায়তুল মাকদিসের ধ্বংসের সময় তা বিনষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে অন্যান্য নবীগণের সহীফাগুলোও বিনষ্ট হয়ে যায়, যাঁরা সে যুগের পূর্বে অতীত হয়েছেন খৃস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে যখন ইসরাঈলীগণ বেবিলনে বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করে তখন হযরত উযায়ের (আ ) অন্যান্য বুযর্গানের সাহায্যে হযরত মূসা (আ ) এর সীরাত এবং বনী ইসরাঈলের ইতিহাস সংকলন করেন। তার মধ্যেই ওসব আয়াত সুযোগ মতো সন্নিবেশিত করেন, সেসব তাঁর ও তাঁর সাহায্যকারীগণের হস্তগত হয়েছিল। তারপর খৃস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে খৃস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন লোক (জানি না তারা কে) ঐসব নবীগণের সহীফা সংকলন করেন, যাঁরা তাদের কয়েক শতাব্দী পূর্বে অতীত হয়ে গেছেন। জানি না কোন সূত্রে তারা এসব করছে। যেমন ধরুন, হযরত ঈসা (আ ) এর তিনশ বছর পূর্বে হযরত ইউনুস (আ ) এর নামে কোনো এক ব্যক্তি একখানা বই লিখে বাইবেলের মধ্যে সন্নিবেশিত করে দেয়। অথচ তিনি খৃস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে নবী ছিলেন। যুবর (Psalms)হযরত দাউদ (আ ) এর ইন্তেকালের পাঁচশ বচর পরে লেখা হয় এবং তার মধ্যে হযরত দাউদ (আ ) ছাড়াও একশ অন্যান্য কবিদের কবিতা সন্নিবেশিত করা হয়। জানি না কোন সূত্রে যুবর প্রণয়নকারীগণের কাছে এসব তথ্য পৌঁছে। হযরত সুলায়মান (আ ) মৃত্যুবরণ করেন হযরত ঈসা (আ ) এর ৯৩৩ বছর পূর্বে এবং হযরত সুলায়মান (আ ) এর প্রবাদগুলো লিখিত হয় হযরত ঈসা (আ )এর দুশ পঞ্চাশ বছর পূর্বে। তার মধ্যে অন্যান্য বহু জ্ঞানী ব্যক্তির কথাও সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

মোটকথা বাইবেলের কোনো পুস্তকের সনদই ঐসব নবী পর্যন্ত পৌঁছে না যাদের প্রতি তা আরোপ করা হয়। উপরন্তু ইবরানী ভাষায় লিখিত বাইবেল এসব গ্রন্থ সত্তর খৃস্টাব্দে বায়তুল মাকদিস দ্বিতীয় বার ধ্বংস হবার সময় বিনষ্ট হয়ে যায়। ও সবের শুধু গ্রীক ভাষায় অনুবাদ অবশিষ্ট ছিল। এ অনুবাদ করা হয়েছিল ২৫৮ খৃস্টপূর্ব থেকে প্রথম শতাব্দী খৃস্টপূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে। ইহুদী পন্ডিতগন খৃস্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দীতে ইবরানী বাইবেলে সব পাণ্ডুলিপি থেকে প্রণয়ন করে, যা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল। তার প্রাচীনতম যে বইখানি পাওয়া যায় তা ৯১৬ খৃস্টাব্দের লেখা। এছাড়া অন্য কোনো ইবরানী বাইবেল বিদ্যমান নেই। লূত সাগরের (Dead Sea)সন্নিকটে গারে কামরনে যে ইবরানী তফসিল (Scrolts)পাওয়া যায়, তাও বড়োজোর খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় ও প্রথম শতাব্দীর লেখা। তার মধ্যে বাইবেলের শুধু কিছু বিক্ষিপ্ত অংশই পাওয়া যায়। বাইবেলের প্রথম পাঁচ পুস্তকের যে সমষ্টি সামেরীয়দের (Sammaritans)নিকটে প্রচলিত তার প্রাচীনতম পুস্তক খৃস্টীয় একাদশ শতাব্দীর লেখা। খৃস্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে যে গ্রীক অনুবাদ করা হয় তাতে অসংখ্য ভুলত্রুটি ছিল। তার থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয় খৃস্টীয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে। হযরত মূসা (আ )এবং তাঁর পরবর্তী নবীগণের অবস্থা ও শিক্ষা সম্পর্কে এসব উপাদান ও মালমসলা কিসের মানদণ্ডে প্রামাণ্য(Authentic)বলা যেতে পারে?

তাছাড়া ইহুদীদের মধ্যে লোক পরম্পরা কিছু মৌলিক বর্ণনা পাওয়া যায় যাকে মৌখিক আইন (Oral Law) বলা হয়। তের চৌদ্দশ বছর পর্যন্ত এসব অলিখিত ছিল। খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে এবং তৃতীয় শতাব্দীর প্রারম্ভে রিব্বী ইয়াহুদা বিন শামউন তা মিশনা নামে লিখিত রূপ দান করে। ফিলিস্তিনের ইহুদী পন্ডিতগন হালাকা নামে এবং বেবিলনের পন্ডিতগন হাগগাদা নামে তার ভাষ্য লেখেন খৃষ্টীয় তৃতীয় এবং পঞ্চম শতাব্দীতে। এ তিনটি গ্রন্থের সমষ্টিকে বলা হয় তালমুদ। এ সবের কোনো বর্ণনারই কোনো সনদ নেই যাতে করে বুঝতে পারা যাবে যে, এসব কোন কোন লোকের দ্বারা কোন কোন লোকের কাছে বর্ণিত হয়েছে।

হযরত ঈসা (আ ) এর খৃস্টধর্মের গ্রন্থাবলীর অবস্থা

হযরত ঈসা(আ ) এর সীরাত ও শিক্ষার অবস্থা কিছুটা এ ধরনেরই। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে মূর ইঞ্জিল অহীর মাধ্যমে নাযিল হয়েছিল, তা হযরত ঈসা (আ ) লোকদেরকে মৌখিক শনিয়ে দিতেন। তাঁর শিষ্যগণও সেসব অন্যদের কাছে মুখে মুখে এমনভাবে পৌছিয়ে দিতেন যে, নবীর অবস্থা এবং ইঞ্জিলের আয়াতগুলো একত্রে মিশ্রিত হয়ে যেতো।সে সবের কোনো কিছুই হযরত ঈসা (আ ) এর জীবদ্দশায় অথবা তাঁর পরে লিখিত হয়নি। লেখার কাজ ঐসব খৃস্টানগণ করেন যাদের ভাষা ছিল গ্রীক। অথচ হযরত ঈসা (আ )এর ভাষা ছিল সুরিয়ানী (Syriac) অথবা আরামী (Aramic)।তাঁর শিষ্যগণও এ ভাষা বলতেন। গ্রীক ভাষাভাষী অনেক গ্রন্থকার এ বর্ণনাগুলো আরামী ভাষায় শুনেন এবং তা গ্রীক ভাষায় লেখেন। এসব গ্রন্থকারের লিখিত কোনো গ্রন্থই ৭০ খৃস্টাব্দের পূর্বে লিখিত হয়নি। তাঁদের  কেউই কোনো ঘটনা অথবা হযরত ঈসা (আ ) এর কোনো বাণীর সনদ বর্ণনা করেননি যার থেকে জানা যেতে পারে যে, তাঁরা কোন কথাগুলো কার নিকট থেকে শুনেছেন। তারপর তাঁদের লিখিত গ্রন্থগুলোও সংরক্ষিত নেই। বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের হাজার হাজার গ্রীক ভাষার বই একত্র করা হয়, কিন্তু তার কোনো একটিও খৃস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর পূর্বেকার নয়। বরঞ্চ অধিকাংশ খৃস্টীয় একাদশ থেকে খৃস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর। মিসরে প্যাপিরাসের উপরে লিখিত কিছু বিক্ষিপ্ত অংশ পাওয়া গেছে। তার মধ্যেও কোনোটাই তৃতীয় শতাব্দীর পূর্বেকার নয়। গ্রীক থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ কে কখন এবং কোথায় করেন, সে সম্পর্কে কিছু জানতে পারা যায় না। চতুর্থ শতাব্দীতে পোপের নির্দেশে এসব পুনঃ পরীক্ষা করে দেখা হয়। অতঃপর ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে ওসব পরিত্যাগ করে গ্রীক ভাষা থেকে ল্যাটিন ভাষায় এক নতুন অনুবাদ করা হয়। গ্রীক থেকে সুরিয়ানী ভাষায় চারটি ইঞ্জিলের অনুবাদ সম্ভবত ২০০ খৃষ্টাব্দে করা হয়। কিন্তু তারও যে প্রাচীনতম গ্রন্থ বর্তমানে পাওয়া যায় তা চতুর্থ শতাব্দীর লেখা। পঞ্চম শতাব্দীর কলমে লেখা যে বইটি পাওয়া গেছে তা যথেষ্ট ভিন্ন ধরনের। সুরিয়ানী থেকে আরবী ভাষায় যে অনুবাদ করা হয়েছে তার মধ্যেও কোনোটি অষ্টম শতাব্দীর পূর্বেকার নয়। মজার ব্যাপার এই যে, প্রায়য় সত্তরটি ইঞ্জিল-গ্রন্থ লেখা হয় কিন্তু তার মধ্যে মাত্র চারটি খৃস্টধর্ময় নেতাগণ অনুমোদন করেছেন এবং অবশিষ্টগুলোকে নাকচ করে দিয়েছেন। জানি না অনুমোদন বা কেন করা হলো এবং নাকচই বা কেন করা হলো। এ ধরনের উপকরণ ও মালমসলার ভিত্তিতে লিখিত হযরত ঈসা (আ )এর সীরাত এবং তার শিক্ষা দীক্ষা কোনো পর্যায়ে কি প্রামাণ্য বলে স্বীকার করা যেতে পারে?

যরদশতের সীরাত ও শিক্ষার অবস্থা

অন্যান্য ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের অবস্থাও অন্য ধরনের নয়। যেমন ধরুন যরদশত (Zoroaster),যাঁর সঠিক জন্মকাল এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। বড়োজোর একথা বলা যেতে পারে যে, আলেকজান্ডারের ইরান বিজয়ের আড়াইশ বচর পূর্বে তিনি বিদ্যমান ছিলেন, অর্থাৎ হযরত মসীহ (আ ) এর সাড়ে পাঁচশ বছর পূর্বে । তাঁর গ্রন্থ আবেন্তা মূল ভাষায় এখন বিদ্যমান নেই এবং ভাষাও এখন মৃত যে বাসায় তা লিখিত ছিল অথবা মৌখিক বর্ণনা করা হয়েছিল। খৃস্টীয় নবম শতাব্দীতে তার কিছু অংশের অনুবাদ ব্যাখ্যাসহ নয় খন্ডে করা হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে প্রথম দুখণ্ড বিনষ্ট হয়ে যায় এবং এখন তার যে প্রাচীনতম খন্ডটি পাওয়া যায় তা ত্রয়োদশ শতাব্দী মাঝামাঝি সময়ের লেখা। এ হচ্ছে যরদশতের উপস্থাপিত গ্রন্থের অবস্থা। এখন রইলো তার নিজস্ব জীবন চরিতের ব্যাপার। তো এ সম্পর্কে আমারে এরবেশি কিছু জানা নেই যে, তিনি চল্লিশ বছর বয়সে তাবলীগ শুরু করেন। দুবছর পর বাদশাহ গুশতাসপতছার আনুগত্য গ্রহণ করেন এবং তাঁর ধর্ম সরকারী ধর্মে পরিণত হয়। সাতাত্তর বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ততছার মৃত্যুর পর যতোই সময় অতিবাহিত হতে থাকে ততোই তাঁর সম্পর্কে নানান ধরনের আজগুবি গল্প-কাহিনী রচিত হতে থাকে। তার কোনটিকেই কোনো ঐতিহাসিক মর্যাদা দেয়া যায় না।

বৌদ্ধ ধর্মের অবস্থা

দুনিয়ার প্রখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে বুদ্ধ একজন। যরদশতের ন্যায় তাঁর সম্পর্কে এ অনুমান করা যায় যে, সম্ভবত তিনিও নবী ছিলেন। কিন্তু তিনি মোটেই কোনো কিতাব পেশ করেননি। তার অনুসারীগনও এমন কোনো দাবী করেননি যে, তিনি কোনো কিতাব এনেছেন। তাঁর অনুসারীগনও এমন কোনো দাবী করেননি যে, তিনি কোনো কিতাব এনেছেন। তাঁর অনুসারীগনও এমন কোনো দাবী করেননি যে, তিনি কোনো কিতাব এনেছেন। তাঁর মৃত্যুর একশ বচর পর তাঁর কথা ও অবস্থা একত্র করার কাজ শুরু করা হয়। একাজ কয়েক শতাব্দী ধরে চলতে থাকে। কিন্তু এ ধরনের যতো গ্রন্থকেই বৌদ্ধ ধর্মের মূল গ্রন্থ মনে করা হয় তার কোনোটির মধ্যে কোনো সনদ সন্নিবেশিত করা হয়নি, যার দ্বারা এ কথা জানা যেতে পারে যে, বুদ্ধের অবস্থা, বাণী ও শিক্ষা যাঁরা সংকলন করেছেন কোন সূত্রে এসব তাঁদের নিকটে পৌঁছেছে। শুধুমাত্র নবী মুহাম্মাদ (সা )এর সীরাত ও শিক্ষাই সংরক্ষিত আছে।

এর থেকে জানা গেল যে, যদি আমরা অন্যান্য নবী ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের শরণাপন্ন হই তাহলে তাঁদের সম্পর্কে এমন কোনো প্রামাণ্য মাধ্যম পাওয়া যায় না যার দ্বারা আমরা তাঁদের শিক্ষা ও জীবন চরিত থেকে নিশ্চিন্ত ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে কোনো পথ-নির্দেশনা পেতে পারি। অতঃপর আমাদের জন্যে এছাড়া আর অন্য কোনো পথ থাকে না যে, আমরা এমন এক নবীর শরণাপন্ন হবো যিনি নির্ভরযোগ্য ও সকল প্রকার বিকৃতি ও মিশ্রণের ঊর্ধ্বে এক গ্রন্থ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন এবং যাঁর বিস্তারিত অবস্থা, বাণী ও শিক্ষাদীক্ষা নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমাদের নিকটে পৌঁছেছে যার থেকে আমরা পত নির্দেশনা পেতে পারি। এমন ব্যক্তিত্ব সমগ্র দুনিয়ার ইতিহাসে একমাত্র নবী মুহাম্মাদ (সা )এর পবিত্র সত্তা।

কুরআন পরিপূর্ণরূপে সংরক্ষিত আল্লাহর কিতাব

নবী মুহাম্মাদ (সা )একটি গ্রন্থ (আল কুরআন) এ সুস্পষ্ট দাবী সহকারে পেশ করেছেন যে, এ আল্লাহ তাআলার বাণী যা তাঁর উপরে নাযিল হয়েছে। এ গ্রন্থের যখন আমরা পর্যালোচনা করি তখন নিশ্চিতরূপে অনুভব করি যে, তাতে কোনো প্রকার সংমিশ্রণ ঘটেনি। স্বয়ং নবী (সা ) এর কোনো কথা এর সাথে সন্নিবেশিত করা হয়নি। বরঞ্চ তাঁর কথাগুলো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র রাখা হয়েছে। বাইবেলের ন্যায় তাঁর জীবনের অবস্থা ও ক্রিয়াকলাপ এবং আরবের ইতিহাস ও কুরআন নাযিলকালে উদ্ভূত ঘটনাবলী আল্লাহ তাআলার এ কালামের সাথে মিশ্রিত ও সংযোজিত করা হয়নি। এ বিশুদ্ধ আল্লাহর কালাম (Word of God) এর মধ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো একটি শব্দও সন্নিবেশিত করা হয়নি। তার শব্দাবলীর মধ্যে কোনো একটি শব্দও বাদ পড়েনি। রাসূলুল্লাহ (সা )এর যুগ থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত অবিকল চলে আসছে।

যে সময় থেকে এ কিতাব নবী (সা )এর উপর নাযিল হওয়া শুরু হয় তখন থেকে তিনি একে লেখাতে শুরু করেন। যখন একে অহী নাযিল হতো, তক্ষুনি তিনি কোনো না কোনো লেখককে ডেকে নিতেন এবং তাকে লিখিয়ে দিতেন, লেখার পর তা আবার তাঁকে শুনানো হতো এবং যখন তিনি নিশ্চিত হতেন যে, লেখক সঠিকভাবে তা লিখেছে, তখন তিনি তা একটা নিরাপদ স্থানে রেখে দিতেন। নাযিল হওয়া প্রতিটি অহী সম্পর্কে তিনি লেখককে বরে দিতেন তা কোন সূরায় কোন আয়াতের পূর্বে এর কার পরে সংযোজিত করতে হবে। এভাবে তিনি কুরআনকে ক্রমিক পর্যায়ে সাজাতে থাকেন এবং অবশেষে কুরআন পরিপূর্ণতা লাভ করে।

অতঃপর নামায সম্পর্কে ইসলামের সূচনা থেকেই এ নির্দেশ দেয়া হয় যে, তার মধ্যে কুরআন পাঠ করতে হবে। এ জন্যে সাহাবায়ে কিরাম (রা )কুরআন নাযিল হওয়ার সাথে সাথে তা মুখস্থ করতে থাকেন। অনেকে গোটা কুরআন মুখস্থ করেন এবং তাঁদের চেয়ে বৃহত্তর সংখ্যক লোক কমবেশি তার বিভিন্ন অংশ তাঁদের স্মৃতি পটে সংরক্ষিত রাখেন। এতদ্ব্যতীত বিভিন্ন সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা লিখতে ও পড়তে পারতেন তাঁরাও কুরআনের বিভিন্ন অংশ নিজেরা লিখে নিতেন। এভাবে কুরআন নবী (সা ) এর জীবনেই চারটি পদ্ধতিতে সংরক্ষিত হয়েছিলঃ

একঃ তিনি স্বয়ং অহী লেখকদের দ্বারা আগাগোড়া লিখিয়ে নেন।

দুইঃ বহু সাহাবী গোটা কুরআন প্রতিটি শব্দসহ মুখস্থ করে রাখেন।

তিনঃ সাহাবায়ে কেরামের (রা) মধ্যে এমন কেউ ছিলেন না যিনি কুরআনের কোনো না কোনো অংশ, অল্প হোক বেশী হোক, মুখস্থ করে রাখেননি।

চারঃ বহুসংখ্যক শিক্ষিত সাহাবী নিজেদের প্রচেষ্টায় কুরআন লিখে নেন এবং তা রাসূলুল্লাহ (সা ) কে পড়ে শুনিয়ে তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

অতএব এ এক অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক সত্য যে, আজ যে কুরআন আমাদের কাছে রয়েছে এটি অক্ষরে অক্ষরে অবিকল সে জিনিস যা নবী মুহাম্মাদ (সা )আল্লাহর কালাম হিসেবে পেশ করে ছিলেন। নবীর ইন্তেকালের পর তাঁর প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা )সকল হাফেয এবং লিখিত অংশগুলোকে একত্র করেন এবং গ্রন্থের আকারে পরিপূর্ণ কুরআন লিখিয়ে নেন। হযরত ওসমান (রা )এর যুগে তারই সকল সরকারীভাবে ইসলামী বিশ্বের কেন্দ্রীয় স্থানগুলোতে পাঠানো হয়। এর দুটি প্রতিলিপি এখনও দুনিয়ায় বিদ্যমান আছে –একটি ইস্তাম্বুল এবং দ্বিতীয়টি তাশখন্দে। কেউ ইচ্ছা করলে কুরআন মজিদের যে কোনো মুদ্রিত একটি সংখ্যা নিয়ে তার সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন।কোনো পার্থক্যই তিনি দেখতে পাবেন না। আর পার্থক্যই বা হবে কি করে যখন নবী (সা ) এর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বংশানুক্রমে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি হাফেজ বিদ্যমান রয়েছে। একটি শব্দও কেউ পরিবর্তন করলে এসব হাফেয সে ভুল ধরে ফেলবেন। বিগত শতাব্দীর শেষ ভাগে জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইন্সটিটিউট ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন অংশ থেকে প্রত্যেক যুগের লিখিত কুরআন মজিদের হাতে লেখা এবং ছাপানো ৪২ হাজার কুরআন একত্র করে। পঞ্চাশ বছর ধরে তার উপর গবেষণা করা হয়। অবশেষে যে প্রতিবেদন পেশ করা হয় তাতে বলা হয় যে, এসব গ্রন্থে লেখার ত্রুটি ছাড়া অন্য কোনো পার্থক্য নেই। এসব ছিল প্রথম হিজরী শতাব্দী থেকে চতুর্দশ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের কুরআন মজিদ। আর এসব সংগ্রহ করা হয়েছিল দুনিয়ার প্রত্যেক স্থান থেকে । পরিতাপের বিষয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জার্মানির উপর বোমা বর্ষণের ফলে ইন্সটিটিউটটি ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তার গবেষণার ফল দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়নি।

কুরআন সম্পর্কে আর একটি লক্ষণীয় বিষয় এই, যে ভাষায় এটি নাযিল হয়েছিল, তা একটি জীবন্ত ভাষা। ইরাক থেকে মারাকাশ পর্যন্ত প্রায় বারো কোটি মানুষ আরবীকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করে এবং অনারব দুনিয়ার লক্ষ কোটি মানুষ তা পড়ে এবং পড়ায়। আরবী ভাষায় ব্যাকরণ, অভিধান, তার শব্দের উচ্চারণ এবং তার বাগধারা বিগত চৌদ্দশ বছর পূর্বে যেমন ছিল আজও তেমনি আছে। আজও প্রত্যেক আরবী শিক্ষিত লোক তা পড়ে ঐভাবেই বুঝতে পারে যেমন চৌদ্দশ বছর পূর্বের আরববাসী বুঝতে পারতো।

এ হচ্ছে নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যা তিনি ছাড়া অন্য কোনো নবী বা ধর্মগুরুর ছিল না। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানব জাতির হেদায়াতের জন্যে তাঁর উপরে যে কিতাব নাযিল হয়েছিল, তা তার মূল  ভাসায় এবং মূল শব্দাবলীসহ অপরিবর্তিত অবস্থায় বিদ্যমান আছে।

রাসূলের সীরাত ও সুন্নাতের পরিপূর্ণ নির্ভরশীলতা

তাঁর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য করলে  দেখা যায় যে, তিনি সকল আম্বিয়া ও ধর্মীয় গুরুদের মধ্যে এ ব্যাপারে একক। সে বৈশিষ্ট্য এই যে, তাঁর প্রতি প্রদত্ত কিতাবের ন্যায় তাঁর সীরাতও সংরক্ষিত আছে যার থেকে আমরা জীবনের প্রতি বিভাগে পথ-নির্দেশনা পেতে পারি। শৈশব থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যতো লোক তাঁকে দেখেছে, তাঁর জীবনের অবস্থা ও ক্রিয়াকলাপ  দেখেছে, তাঁর বাণী শুনেছে, তাঁর ভাষণ শুনেছে, তাঁকে কোনো আদেশ করতে অথবা কোনো কিছু বিষয়ে নিষেধ করতে শুনেছে, তাদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক লোক সবকিছু হৃদয়ে গেঁথে রেখেছে এবং পরবর্তী বংশধরদের কাছে তা পৌছিয়ে দিয়েছে। কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে এমন লোকের সংখ্যা এক লক্ষ যাঁরা চোখে দেখা এবং কানে শুনা ঘটনাগুলোর বিবরণ পরবর্তী বংশধর পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়েছেন। নবী (সা ) কতিপয় হুকুম আহকাম লিখিয়ে নিয়ে কিছু লোককে দিয়েছেন বা তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন, যা পরবর্তী যুগের লোকেরা পেয়েছে। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে অন্তত ছজন ব্যক্তি এমন ছিলেন, যাঁরা হাদীস লিপিবদ্ধ করে নবী (সা ) কে শনিয়ে দিয়েছিলেন যাতে করে তার মধ্যে কোনো ভুর থাকতে না পারে। এসব লিখিত তথ্যাবলী পরবর্তী কালের লোকেরা লাভ করেছে এবং নবী করীম (সা )এর ইন্তেকালের পর অন্তত পঞ্চাশ-জন সাহাবী নবীর অবস্থা ও কার্যকলাপ এবং তাঁর কথা লিখিত আকারে একত্র করেন এবং এসব জ্ঞানভাণ্ডার তাঁদেরও হস্তগত হয় যাঁরা হাদীস সঞ্চয়ন ও সংকলনের কাজ করেন। তারপর যেসব সাহাবী সীরাত সম্পর্কিত তথ্যাবলী মৌখিক বর্ণনা করেন তাদের সংখ্যা, যেমন আমি একটু আগে বলেছি, এক লক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে। আর এটা কোনো আশ্চর্যজনক ব্যাপারও নয়। কারণ নবী (সা )যে বিদায় হজ্ব সমাধা করেন তাতে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন। এতো বিরাট সংখ্যক লোক তাঁকে হজ্ব করতে দেখেছেন, তাঁর নিকট তেকে হজ্বের নিয়ম পদ্ধতি শিক্ষা করেছেন এবং এ হজ্বের সময় যে ভাষণ তিনি দিয়েছিলেন তা তাঁরা শুনেছেন। কি করে সম্ভব এতো লোক যখন এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নবীর সাথে হজ্বে শরীক হওয়ার পর নিজেদের অঞ্চলে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন সেখানে তাঁদের আত্নীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এবং প্রতিবেশীগণ তাঁদের নিকট থেকে এ হজ্ব ভ্রমরে বিবরণ জিজ্ঞেস করেননি এবং হজ্জ্বের নিয়ম পদ্ধতি জেনে নেননি? এর থেকে অনুমান করুন যে, নবী (সা ) এর মতো মহান ব্যক্তিত্ব দুনিয়া থেকে বিদায় নেবার পর লোক কত আগ্রহের সাথে তাঁর অবস্থা ও কাজ কর্ম, তাঁর কথা, নির্দেশ ও হেদায়াত সম্পর্কে ঐসব লোকের নিকট থেকে জানতে চাইবে যাঁরা তাকে দেখেছেন এবং তাঁর নির্দেশাবলী শুনেছেন।

সাহাবায়েকিরাম (রা) থেকে যেসব বর্ণনা পরবর্তী বংশধরদের কাছে পৌঁছেছে, সে সম্পর্কে প্রথম থেকেই এ পন্থা অবলম্বন করা হয় যে, যে ব্যক্তি নবী (সা )এর প্রতি আরোপ করে কোনো কথা বলতেন তাঁকে এ কথা বলতে হতো যে, তিনি সে কথা কার কাছে শুনেছেন এবং তাঁর আগে ধারাবাহিকতার সাথে সে কার কাছ থেকে সে কথা শুনেছেন। এভাবে নবী (সা )পর্যন্ত বর্ণনা পরম্পরায় গোটা সংযোজন (Link)লক্ষ্য করা হতো, যাতে করে এ নিশ্চয়তা লাব করা যেতো, যে, কথাটি সঠিকভাবে নবী (সা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। যদি বর্ণনার সকল সংযোজক পাওয়া না যেতো, তাহলে তার সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি হতো। আবার বর্ণনা পরম্পরা নবী (সা) পর্যন্ত পৌঁছেছে, কিন্তু মাঝখানের কোনো রাবী (বর্ণনাকারী) অনাস্থা ভাজন হয়েছে, তাহলে এ ধরনের বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এখন একটু চিন্তা করে দেখলে আপনি অনুভব করবেন যে, দুনিয়ার কোনো মানুষের জীবনবৃত্তান্ত এভাবে সংকলিত হয়নি। এ বৈশিষ্ট্য শুধুমাত্র নবী মুহাম্মাদ (সা )এর যে, তাঁর সম্পর্কে কোনো কথা বিনা সনদে মেনে নেয়া হয়নি। আর সনদে শুধু এতোটুকই দেখা হয়নি যে, একটি হাদীসের বর্ণনা পরম্পরা নবী পর্যন্ত পৌঁছেছে কিনা, বরঞ্চ এটাও দেখা হয়েছে যে, এ সম্পর্কিত সকল রাবী (বর্ণনাকারী) নির্ভরযোগ্য কিনা। এ উদ্দেশ্যে রাবীগণের জীবনবৃত্তান্তও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাঁচাই করা হয়েছে এবং এ বিষয়ের উপরে বিস্তারিত গ্রন্থ প্রণয়ন করা হয়েছে। তার থেকে জানা যায় যে, কে নির্ভরযোগ্য ছিল এবং কে ছিল না। কার চরিত্র ও ভূমিকা কি রকম ছিল। কার স্মরণশক্তি প্রকর চিল এবং কার ছিল না। কে ঐ ব্যক্তির সাথে দেখা করে যার থেকে বর্ণনা নকল করা হয়েছে এবং কে তার সাথে সাক্ষাত না করেই তাঁর নামে রেওয়ায়ত লিপিবদ্ধ করেছে। এভাবে এতো ব্যাপক আকারে রাবীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে যে, আজও  আমরা এক একটি হাদীস তা নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে, না অনির্ভরযোগ্য সূত্রে। মানব ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি এমন পাওয়া যেতে পারে কি যাঁর জীবন বৃত্তান্ত এমন নির্ভরযোগ্য সূত্রে। মানব ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি এমন পাওয়া যেতে পারে কি যাঁর জীবন বৃত্তান্ত এমন নির্ভরযোগ্য সূত্রে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে? এমন কোনো দৃষ্টান্ত কি আছে যে, এক ব্যক্তির জীবন চরিতের সত্যতা নির্ণয়ের জন্যে হাজার হাজার লোকের জীবনের উপর গ্রন্থাদি প্রণীত হয়েছে যাঁরা ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করেছেন? বর্তমান যুগে খৃষ্টান ও ইহুদী পন্ডিতগন হাদীসের সত্যতা সন্দিগ্ধ প্রতিপন্ন করার জন্যে যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছেন, তার প্রকৃত কারণ এ বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছু নয় যে, তাঁদের ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মীয় গুরুদের জীবনবৃত্তান্ত সম্পর্কে মোটেই কোনো সনদ বিদ্যমান নেই। তাঁদের মরে এ জ্বালার কারণেই তাঁরা ইসলাম, কুরআন এবং নবী মুহাম্মাদ (সা )এর সমালোচনার ব্যাপারে বুদ্ধিবৃত্তিক সততা(Intellectual honesty)পরিহার করেছেন

নবী মুহাম্মাদ (সা )এর জীবনের প্রতিটি দিক ছিল সুপরিচিত ও সুবিদিত

নবী (সা ) এর সীরাতের শুধু এ একটিমাত্র বৈশিষ্ট্য বৈশিষ্ট্যই নয় যে, তা আমাদের কাছে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে পৌঁছেছে, বরঞ্চ এটাও তাঁর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি দিকের এতো বিশদ বিবরণ পাওয়া যায় যে অন্য কোনো ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে ততোটা পাওয়া যায় না। তাঁর পরিবার কেমন ছিল, নবুয়ত পূর্ব জীবন তাঁর কেমন ছিল, কিভাবে তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হলেন, কিভাবে তাঁর উপর অহী নাযির হতো, কিভাবে তিনি ইসলামী দাওয়াত ছড়ালেন, বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতার মুকাবিলা কিভাবে করলেন, আপন সংগীসাথীদের কিভাবে তরবিয়ত দিলেন, আপন পরিবারের সাথে কিভাবে জীবন  যাপন করতেন, বিবি বাচ্চাদের সাথে তাঁর আচরণ কেমন ছিল, বন্ধু ও শত্রুর প্রতি তাঁর ব্যবহার কেমন ছিল, কোন নৈতিকতার শিক্ষা তিনি দিতেন এবং আপন চরিত্রের মাধ্যমে কোন জিনিসের নির্দেশ তিনি দিতেন, কোন কাজ করতে তিনি নিষেধ করতেন, কোন কাজ হতে দেখে তা নিষেধ করেননি, কোন কাজ হতে দেখে তা নিষেধ করেছেন এসব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থগুলোতে বিদ্যমান রয়েছে। তিনি একজন সামরিক জেনারেলও ছিলেন এবং তাঁর অধিনায়কত্বে যতো যুদ্ধ বিগ্রহাদি হয়েছে তার বিশদ বিবরণ আমরা পাই। তিনি একজন মাসকও ছিলেন এবং তাঁর সামনে উপস্থাপিত সকল মামলা মোকদ্দমার পূর্ণ কার্যবিবরণী আমরা দেখতে পাই। আমরা এটাও জানতে পারি যে কোন মামলায় তিনি কি রায় দিয়েছেন। তিনি বাজার পরিদর্শনেও বেরুতেন এবং দেখতেন মানুষ কেনা বেচার কাজ কিভাবে করতো। ভুল কাজ দেখলে তা করতে নিষেধ করতেন এবং যে কাজ সঠিকভাবে হতে দেখতেন, তা অনুমোদন করতেন। মোটকথা, জীবনের এমন কোনো বিভাগ নেই যে সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত হেদায়াত দান করেননি।

এ কারণেই আমরা পক্ষপাতহীনভাবে পরিপূর্ণ জ্ঞান ও বিশ্বাসের সাথে এ কথা বলি যে, সকল নবী ও ধর্মীয় প্রধানদের মধ্যে নবী মুহাম্মদই (সা ) একমাত্র সত্তা সমগ্র মানবজাতি হেদায়াত ও পথ নির্দেশনার জন্যে যাঁর শরণাপন্ন হতে পারে। কারণ তাঁর উপস্থাপিত কিতাব তার মূল শব্দাবলীসহ সংরক্ষিত আছে এবং হেদায়াতের অত্যাবশ্যক তাঁর সীরাতের বিশদ বিবরণ নির্ভরযোগ্য সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।

এখন লক্ষণীয় এই যে, তাঁর সীরাত পাক আমাদেরকে কোন পয়গাম এবং কোন হেদায়াত দান করছে।

তাঁর পয়গাম সমগ্র মানবজাতির জন্যে

প্রথম যে জিনিসটি তাঁর দাওয়াতে আমাদের চোখে পড়ে তাহলো এই যে, তিনি বর্ণ, বংশ, ভাষা ও মাতৃভূমির স্বাতন্ত্র্য উপেক্ষা করে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্বোধন করেন এবং এমন কিছু মূলনীতি পেশ করেন যা সমগ্র মানবজাতির জন্যে মঙ্গলকর। এ মূলনীতি যে ব্যক্তি মেনে নেবে সেই মুসলমান হবে এবং একটি বিশ্বজনীন উম্মতে মুসলিমার সদস্য হবে, তা সে কৃষ্ণাঙ্গ হোক অথবা শ্বেতাঙ্গ। প্রাচ্যবাসী হোক অথবা পাশ্চাত্যবাসী, আরবী হোক অথবা আযমী। যেখানেই কোনো মানুষ আছে, সে যে দেশে, যে জাতিতে এবং যে বংশেই পয়দা হোক না কেন, যে ভাষা সে বলুক এবং তার গায়ের রং যেমনই হোক না কেন নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর দাওয়াত তারই জন্যে। সে যদি তাঁর উপস্থাপিত মূলনীতি মেনে নেয়, তাহলে সমান অধিকার সহ উম্মতে মুসলিমার মধ্যে শামিল হয়ে যায়। কোনো ছঁৎ ছাঁৎ,কোনো উঁচু নিচু, কোনো বংশীয় বা শ্রেণীগত স্বাতন্ত্র্য, কোনো ভাষাগত, জাতিগত ও ভৌগলিক পার্থক্য, যা বিশ্বাসের ঐক্য স্থাপিত হওয়ার পর একজন মানুষকে অন্যজন থেকে পৃথক করে দেয়, এ উম্মতের মধ্যে নেই।

বর্ণ ও বংশের গোঁড়ামির সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিকার

আপনি চিন্তা করলে অনুধাবন করবেন যে, এ এক বিরাট নিয়ামত যা নবী মুহাম্মাদ আরবী (সা ) এর বদৌলতে মানবজাতি লাভ করেছে। মানুষকে যে জিনিস সবচেয়ে ধ্বংস করেছে তাহলো মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এই স্বাতন্ত্র্য। কোথাও তাকে অপবিত্র ও অচ্ছুৎ করে রাখা হয়েছে। ব্রাক্ষ্মন যে অধিকার ভোগ করে তার থেকে তারা বঞ্চিত। কোথাও তাকে নির্মূল করে দেয়ার যোগ্য বলে স্থির করা হলো কারণ, সে অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকায় এমন সময় জন্মগ্রহণ করে যখন বহিরাগতদের প্রয়োজন হয়েছিল তাকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করায়। কোথাও তাকে ধরে দাসে পরিণত করা হলো এবং তার কাছ থেকে পশুর মতো শ্রম নেয়া হলো। কারণ সে আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তার কাছ থেকে পশুর মতো শ্রম নেয়া হলো। কারণ সে আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেছিল এবং তার গয়ের রং ছিল কালো। মোটকথা মানবতার জন্যে জাতি, মাতৃভূমি, বংশ, বর্ণ ও ভাষার এ স্বাতন্ত্র্য প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত বিরাট বিপদের কারণ হয়ে রয়েছিল। এরই ভিত্তিতে যুদ্ধবিগ্রহ হতে থাকে। এরই ভিত্তিতে এক দেশ আর এক দেশ দখল করে বসেছে। এক জাতি আর এক জাতিকে লুণ্ঠন করেছে এবং বহু বংশ সমূলে ধ্বংস করেছে। নবী মুহাম্মাদ (সা )এ রোগের এমন এক প্রতিকার করেন যা ইসলামের শত্রুগণও স্বীকার করেন। তা এই যে, ইসলাম বর্ণ, বংশ ও জন্মভূমির স্বাতন্ত্র্যের সমাধানে যে সাফল্য অর্জন করেছে তা আর কেউ করতে পারেনি।

আফ্রিকা বংশোদ্ভূত আমেরিকাবাসীদের প্রখ্যাত নেতা এবং শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষ থেকে চরম বিদ্বেষ প্রচারের এককালীন পতাকাবাহী ম্যালকম একস ইসলাম গ্রহণের পর যখন হজ্বে গমন করেন এবং দেখেন যে, পূর্ব পশ্চিম, উত্তর দক্ষিণ সকল দিক থেকে সকল বংশ বর্ণ দেশ ও ভাষার লোক হজ্ব করতে আসছে, সকলে একই  ধরনের এহরামের পোশাক পরিধান করে আছে, সকলে একই স্বরে লাব্বায়ক লাব্বায়ক ধ্বনি উচ্চারণ করছে, একত্রে তাওয়াফ করছে, একই জামায়াতে একই ইমামের পেছনে নামায পড়ছে, তখন তিনি চিৎকার করে বলছেন, বর্ণ ও বংশের যে সমস্যা, তার সুষ্ঠু সমাধান একমাত্র এটাই। আমরা এতদিন যা করে আসছি, তা নয়। এ বেচারাকে তো যালেমরা হত্যা করে কিন্তু তাঁর প্রকাশিত আত্মচরিত এখনো বিদ্যমান আছে। তার থেকে আমরা জানতে পারেন যে, হজ্বের দ্বারা কত গভীরভাবে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন।

হজ্ব তো ইসলামের ইবাদাতগুলোর মধ্যে একটি মাত্র। যদি কেউ চক্ষু উন্মীলিত করে সামগ্রিকভাবে ইসলামের শিক্ষার প্রতি লক্ষ্য করে তাহলে তার কোথাও অঙ্গুলি সংকেত করে এ কথা বলতে পারবে না যে, এ শিক্ষা কোনো বিশেষ জাতি, কোনো গোত্র, কোনো বংশ অথবা কোনো শ্রেণীর স্বার্থের জন্য। গোটা দ্বীন তো এ কথার সাক্ষ্য দান করে যে, এ সমগ্র মানবজাতির জন্যে এবং তার দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান যারা তার মূলনীতি স্বীকার করে নিয়ে তার তৈরী বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের মধ্যে শামিল হয়ে যায়। এ অমুসলিমের সাথেও এমন কোনো আচরণ করে না যা শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গের সাথে করেছে, যা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের শাসনাধীন অকমিউনিস্টদের সাথে এমন কি আপন দলের অবাঞ্ছিত সদস্যদের সাথে করেছে।

এখন আমাদের দেখতে হবে যে, মানবতার কল্যাণের জন্যে সে মূলনীতি কি যা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশ করেছিলেন এবং তার মধ্যে এমন কোন বস্তু রয়েছে যা শুধু মানবতার কল্যাণেরই নিশ্চয়তা দানকারী নয়, বরঞ্চ সমগ্র মানবজাতিকে একই সূত্রে গ্রথিত করে একটি উম্মতও বানাতে পারে।

আল্লাহ তাআলার একত্বের ব্যাপকতম ধারণা

এ মূলনীতির প্রধানতম বিষয় হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার ওয়াহদানিয়াত বা একত্ব স্বীকার করে নেয়া। শুধু এ অর্থে নয় যে আল্লাহ আছেন এবং নিছক এ অর্থেও নয় যে, আল্লাহ শুধু এক। বরঞ্চ এ অর্থে যে, এ বিশ্বজগতের একমাত্র স্রষ্টা, মালিক, নিয়ন্তা এবং শাসক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। সমগ্র সৃষ্টি জগতে দ্বিতীয় এমন কেউ নেই যার শাসনক্ষমতার কর্তৃত্ব অধিকার রয়েছে, যার আদেশ ও নিষেধ করার কোনো অধিকার আছে, যার হারাম করার কারণে কোনো জিনিস হারাম হয়ে যায় এবং যার হালাল করার কারণে কোনো জিনিস হালাল হয়ে যায়। এ অধিকার এখতিয়ার আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। কারণ যিনি স্রষ্টা ও মালিক, প্রভু, একমাত্র তাঁরই এ অধিকার রয়েছে যে, তিনি তাঁর সৃষ্ট দুনিয়ায় তাঁর বান্দাদেরকে যে জিনিসের ইচ্ছা তা করতে আদেশ করতে পারেন এবং যে জিনিসের ইচ্ছা তার থেকে নিষেধ করতে পারেন। ইসলামের দাওয়াত এই যে, আল্লাহ তাআলাকে এ হিসেবে মেনে নাও। তাঁকে এভাবে মেনে নাও যে, তিনি ব্যতীত আর কারো বান্দাহ আমরা নই, তাঁর আইনের বিপরীত আমাদের উপর হুকুম করার অধিকার কারো নেই, আমাদের মাথা তিনি ছাড়া অন্য কারো সামনে অবনত হওয়ার জন্যে সৃষ্টি করা হয়নি, আমাদের জীবন মরণ তাঁরই এখতিয়ারাধীন। যখন ইচ্ছা তখন তিনি আমাদের মৃত্যু দান করতে পারেন।যতদিন ইচ্ছা ততদিন আমাদেরকে জীবিত রাখতে পারেন। তাঁর পক্ষ থেকে যদি মৃত্যু আসে তাহলে দুনিয়ায় এমন কোনো শক্তি নেই যে, আমাদের বাঁচাতে পারে। আর তিনি যদি জীবিত রাখতে চান তাহলে দুনিয়ার কোনো শক্তি আমাদের ধ্বংস করতে পারে না। আল্লাহ সম্পর্কে এই হলো ইসলামের ধারণা।

এ ধারণা অনুযায়ী যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত সৃষ্টিজগত আল্লাহর অনুগত, আজ্ঞাবহ এবং এ সৃষ্টিজগতের মধ্যে বসবাসকারী মানুষেরও কাজ এই যে, সেও আল্লাহর অনুগত আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবে। সে যদি স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী হয় অথবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য গ্রহণ করে, তাহলে তার জীবনের গোটা ব্যবস্থা বিশ্বপ্রকৃতির ব্যবস্থার পরিপন্থী হয়ে পড়বে। অন্য কথায় এভাবে বুজবার চেষ্টা করুন যে, সমগ্র বিশ্বপ্রকৃতি আল্লাহর হুকুমের অধীন চলছে এবং এ প্রকৃত সত্যকে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। এখন যদি আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো হুকুমের অধীন চলি অথবা আপন খুশি মতো যে দিক ইচ্ছা সে দিকে চলি, তাহলে তার অর্থ এই হবে যে, আমাদের জীবনের সমগ্র গাড়ীখানি বিশ্বপ্রকৃতির গাড়ীর বিপরীত দিকে চলছে। এতে করে আমাদের এবং বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে এক চিরন্তন সংঘর্ষ চলতে থাকে।

আর একদিক দিয়ে চিন্তা করে দেখুন, ইসলামের ধারণা অনুযায়ী মানুষের জন্যে সঠিক জীবন পদ্ধতি (Way of Life) শুধু এই যে, সে শুধু আল্লাহর আনুগত্য করবে। কারণ সে সৃষ্ট এবং আল্লাহ তার স্রষ্টা। সৃষ্টজীব হওয়ার দিক দিয়ে তার স্বাধীন স্বেচ্ছাচারী হওয়াও ভুল এবং স্রষ্টা ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব আনুগত্য করাও ভুল। এ দুটি পথের মধ্যে যেটিই সে অবলম্বন করবে, তা হবে সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক এবং সত্যের সাথে সংঘর্ষের বিষময় পরিণাম সংঘর্ষকারীকেই ভোগ করতে হয়, তাতে সত্যের কোনো ক্ষতি হয় না।

আল্লাহর বন্দেগীর দাওয়াত

নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর দাওয়াত হলো এ সংঘর্ষ বন্ধ কর। তোমার জীবনের বিধান ও রীতি পদ্ধতি তাই হওয়া উচিত যা সমগ্র বিশ্বপতির। তুমি না স্বয়ং আইন প্রণেতা সাজো, আর না অন্যের এ অধিকার স্বীকার কর যে, সে আল্লাহর যমীনের উপরে আল্লাহর বান্দাহদের উপর তার আইন চালাবে। বিশ্বজগতের স্রষ্টার আইনই হচ্ছে সত্যিকার আইন এবং অন্যসব আইন ভ্রান্ত ও বাতিল।

রাসূলের আনুগত্যের দাওয়াত

এখান পর্যন্ত পৌছুবার পর আমাদের সামনে নবী মুহাম্মাদ (সা) এর দাওয়াতের দ্বিতীয় দফাটির আসছে। তা হচ্ছে তাঁর এ দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা আমি আল্লাহ তাআলার নবী এবং মানবজাতির জন্যে তিনি তাঁর আইন আমারই মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। আমি স্বয়ং সে আইনের অধীন। স্বয়ং আমারও এতে কোনো পরিবর্তন করার এখতিয়ার নেই। আমি শুধু মেনে চলার জন্যে আদিষ্ট হয়েছি। নিজের পক্ষ থেকে নতুন কিছু তৈরী করার অধিকারও আমার নেই। এ কুরআন এমন আইন যা আমার উপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। আমার সুন্নাত এমন আইন যা আমি আল্লাহর নির্দেশে জারী করি। এ আইনের সামনে সকলের প্রথমে মস্তক অবনতকারী স্বয়ং আমি(আরবী****) তারপর আমি সকল মানুষকে আহবান জানাচ্ছি যে, তারা যেন অন্যের আইনের আনুগত্য পরিহার করে এ আইনের আনুগত্য করে।

আল্লাহর পরে আনুগত্য লাভের অধিকারী আল্লাহর রাসূল

কারো মনে যেন এ সন্দেহ না জাগে যে, রাসূলুল্লাহ (সা ) স্বয়ং আপন সুন্নাতের আনুগত্য কিভাবে করতে পারেন যখন সে সুন্নাত হচ্ছে তাঁর নিজের কথা ও কাজ। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, কুরআন যেমন আল্লাহর পক্ষ থেকে, ঠিক তেমনি রসূল হিসেবে তিনি যে হুকুম দিতেন, অথবা যা করতে তিনি নিষেধ করতেন, অথবা যে রীতি পদ্ধতি তিনি নির্ধারিত করতেন তাও আল্লাহর পক্ষ থেকে হতো। একেই বলে সুন্নাতে রাসূল এবং এর আনুগত্য তিনি স্বয়ং সেভাবেই করতেন যেভাবে করা সকল ঈমানদারদের জন্যে ছিল অপরিহার্য। এ কথাটি এমন অবস্থায় পুরোপুরি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যখন সাহাবায়েকিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম কোনো বিষয়ে নবী (সা ) কে জিজ্ঞেস করতেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ কথা কি আপনি আল্লাহর হুকুমে বলছেন, না এ আপনার নিজের অভিমত? নবী জবাবে বলতেন, আল্লাহর হুকুমে নয়, বরঞ্চ এ আমার নিজস্ব অভিমত। এ কথা জনার পর সাহাবায়েকিরাম নবীর কথায় একমত না হয়ে নিজেদের প্রস্তাব পেশ করতেন। তখন নবী (সা ) তাঁর অভিমত পরিহার করে তাঁদের প্রস্তাব মেনে নিতেন। এভাবে এ কথা সে সময়েও পরিষ্কার হয়ে যেতো যখন নবী (সা) সাহাবাকিরামের সাথে পরামর্শ করতেন। এ পরামর্শ একথা প্রমাণ করে যে, এ ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশ আসেনি। কারণ আল্লাহর হুকুম হলে তো সেখানে পরামর্শের কোনো প্রশ্নই আসে না। এ ধরনের নবী (সা ) এর জীবনে বহুবার ঘটেছে যার বিস্তারিত বিবরণ আমরা হাদিসে পাই। বরঞ্চ সাহাবায়েকিরাম (রা ) বলেন, আমরা নবী (সা ) থেকে অধিক পরামর্শকারী আর কাউকে দেখিনি। এ বিষয়ে চিন্তা করলে আপনারা বুঝতে পারবেন যে, এটাও নবীর সুন্নাত ছিল, যে ব্যাপারে আল্লাহর কোনো নির্দেশ নেই সে ব্যাপারে পরামর্শ করতে হবে। অন্য কোনো শাসক তো দূরের কথা আল্লাহর রাসূল পর্যন্ত তাঁর নিজস্ব অভিমতকে অপরের জন্যে শিরোধার্য বলে ঘোষণা করেননি। এভাবে নবী (সা ) উম্মতকে পরামর্শভিত্তিক কাজ করার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন এবং মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, যে ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশ থাকবে তা দ্বিধাহীনচিত্তে মেনে চলতে হবে। আর যেখানে আল্লাহর কোনো নির্দেশ থাকবে না সেখানে স্বাধীন মতামতের অধিকার নির্ভয়ে ব্যবহার করবে।

স্বাধীনতার প্রকৃত চার্টার

এ মানবজাতির জন্যে স্বাধীনতার এমন এক চার্টার যা একমাত্র দীনে হক ছাড়া আর কেউ মানবজাতিকে দান করেনি। আল্লাহর বান্দাহ শুধু এক আল্লাহরই বান্দাহ হবে। অন্য কারো বান্দাহ হবে না। এমন কি আল্লাহর রাসূলের বান্দাহও হবে না। এ চার্টার মানুষকে এক আল্লাহর ছাড়া অন্যান্য সকলের বন্দেগী (দাসত্ব আনুগত্য) থেকে স্বাধীন করে দিয়েছে এবং মানুষের উপর থেকে মানুষের খোদায়ী বা প্রভুত্ব কর্তৃত্ব চিরদিনের জন্যে খতম করে দিয়েছে।

এর সাথে এক মহানতম নিয়ামত যা এ পয়গাম মানুষকে দান করেছে তা এমন এক আইনের শ্রেষ্ঠত্ব যা বাতিল করার, বিকৃত করার এবং রদবদল করার অধিকার কোনো বাদশাহ, ডিক্টেটর অথবা কোনো গণতান্ত্রিক আইন সভা অথবা ইসলাম গ্রহণকারী কোনো জাতির নেই। এ আইন ভালো ও মন্দের এক শাশ্বত মূল্যবোধ (Permanent values)মানুষকে দান করে যা পরিবর্তন করে ভালোকে মন্দ এবং মন্দকে ভালো করা যায় না।

আল্লাহর নিকটে জবাবদিহির ধারণা

তৃতীয় যে জিনিসটি নবী মুহাম্মাদ (সা ) মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন তা এই যে, তোমাকে আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হব। তোমাকে দুনিয়ায় লাগামহীন পশুর মতো ছেড়ে দেয়া হয়নি যে, যা খুশী তাই করবে। খুশি মতো যে কোনো ক্ষেত খামারে চরতে থাকবে এবং তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কেউ থাকবে না। বরঞ্চ তোমার এক একটি কথা এবং তোমার গোটা স্বেচ্ছামূলক জীবনের ক্রিয়াকর্মের হিসেব তোমাকে তোমার স্রষ্টা ও প্রভুকে দিতে হবে। মৃত্যুর পর তোমাকে পুনর্জীবিত হতে হবে এবং আপন প্রভুর সামনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে হাজির হতে হবে। এ এমন এক বিরাট নৈতিক শক্তি যে, তা যদি মানুষের বিবেকের মধ্যে স্থান লাভ করে তাহলে তার অবস্থা এমন হবে যেন তার সাথে সর্বদা একজন চৌকিদার লেগে আছে যে দুস্কৃতির প্রতিটি প্রবণতার জন্যে তাকে সতর্ক করে দেয় এবং প্রত্যেক পদক্ষেপে তাকে বাধা দেয়। বাইরে কোনো পাকড়াওকারী পুলিশ এবং শাস্তিদানকারী সরকার থাকুক বা না থাকুক, তার ভেতরে এমন এক ছিদ্রান্বেষী সমালোচক বসে থাকবে যার দ্বারা ধরা পড়ার ভয়ে সে কখনো নিভৃতে, বন জংগলে, গভীর অন্ধকারে অথবা কোনো জনমানবহীন স্থানেও আল্লাহর নাফরমানী করতে পারবে না। মানুষের নৈতিক সংস্কার সংশোধন এবং তার মধ্যে এক মজবুত চরিত্র তৈরি করার এর চেয়ে উৎকৃষ্টতম উপায় আর কিছু নেই। অন্য যে কোনো উপায়েই চরিত্র গঠনের চেষ্টা করুন না কেন, এর চেয়ে অধিক অগ্রসর হতে পারবেন না যে, সৎকাজ দুনিয়ার জীবনে মঙ্গলকর হবে এবং অসৎকাজ অমঙ্গলকর হবে এবং ঈমানদারী একটা মহৎ নীতি। তার অর্থ এ হলো যে, নীতিগতভাবে যদি অসৎকাজ এবং বেঈমানী মঙ্গলকর হয় এবং তাতে ক্ষতির কোনো আশংকা না থাকে তাহলে বিনা দ্বিধায় তা করে ফেলা যায়। এ দৃষ্টিকোণের পরিণাম তো এই যে, যারা ব্যক্তিগত জীবনে সৎ আচরণের অধিকারী তারাই জাতীয় আচার আচরণে চরম পর্যায়ের বেঈমানী, প্রতারক, লুণ্ঠনকারী, যালেম ও স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে। বরঞ্চ ব্যক্তিগত জীবনেও কোনো কোনো ব্যাপারে তারা সৎ হলেও অন্যান্য ব্যাপারে  চরম অসৎ হয়ে পড়ে। আপনারা দেখতে পাবেন যে, একদিকে তারা লেনদেনে সৎ এবং আচার আচরণে ভদ্র, অপরদিকে মদ্যপায়ী, ব্যভিচারী, জুয়াড়ি, অত্যন্ত চরিত্রহীন এবং কলুষিত ও কলঙ্কিত। তাদের কথা এই যে, মানুষের ব্যক্তি জীবন এক জিনিস এবং সমাজ জীবন বা লোক জীবন (Public Life) অন্য জিনিস। ব্যক্তি জীবনের কোনো দোষ ধরলে তারা ত্বরিত জবাব দেয়, আপন চরকায় তেল দাও।

ঠিক এর বিপরীত হচ্ছে, আখিরাতের আকীদাহ বিশ্বাস। তাহলো এই যে, পাপ সব সময়েই পাপ দুনিয়ার জীবনে তা কল্যাণকর হোক অথবা অনিষ্টকারী। যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে জবাবদিহির অনুভূতি পোষণ করে তার জীবনে ব্যক্তি ও সমাজের দুটি বিভাগ স্বতন্ত্র হতে পারে না। সে ঈমানদারী অবলম্বন করলে এ জন্যে করে না যে, এ একটা উত্তম নীতি। বরঞ্চ তার অস্তিত্বের মধ্যেই ঈমানদারী শামিল হয়ে যায় এবং সে চিন্তাই করতে পারে না যে, বেঈমানী করাটা তার পক্ষে কখনো সম্ভব হতে পারে। তার আকীদাহ বিশ্বাস তাকে এ কথা শিক্ষা দিয়ে যে, যদি সে বেঈমানী করে তাহলে সে পশুরও নিম্নস্তরে গিয়ে পৌঁছুবে। যেমন কুরআনে এরশাদ হয়েছে- (আরবী******)

আমরা মানুষকে সর্বোৎকৃষ্ট আকার আকৃতিতে পয়দা করেছি। অতঃপর তাকে উল্টিয়ে ফিরিয়ে সর্ব নিম্নস্তরের করে দিয়েছি।

এভাবে নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর নেতৃত্বে মানুষ শুধু শাশ্বত নৈতিক মূল্যবোধ সম্বলিত একটা অপরিবর্তনীয় আইনই লাভ করেনি, বরঞ্চ ব্যক্তিগত ও জাতীয় চরিত্র ও আচার আচরণের জন্যে এমন একটি বুনিয়াদও লাভ করেছে যা একেবারে অনড় ও অটল। এ আইন জিনিসের মুখাপেক্ষী নয় যে, কোনো সরকার, কোনো পুলিশ, কোনো আদালত যদি থাকে তাহলে আপনি সৎ পথে চলতে পারবেন, নতুবা অপরাধী হয়ে থাকতে হবে।

বৈরাগ্যবাদের পরিবর্তে দুনিয়াদারীতে চরিত্রের ব্যবহার

নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর দাওয়াত আমাদেরকে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দান করে। তা এই যে, চরিত্র সংসারবিরাগীদের নিভৃত কক্ষের জন্যে নয়, দরবেশদের খানকাহর জন্যে নয়, বরঞ্চ দুনিয়ার জীবনের সকল বিভাগে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যে। দুনিয়া ফকীর এবং দরবেশদের মধ্যে যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নতি তালাশ করে, আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে রাষ্ট্রীয় মসনদে এবং বিচারালয়ের আসনে এনে রেখেছিলেন। তিনি ব্যবসা বাণিজ্যে আল্লাহভীতি ও দিয়ানতদারীর সাথে কাজ করার শিক্ষা দিয়েছেন, পুলিশ ও সৈনিককে তাকওয়া ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষের এ ভ্রান্ত ধারণা দূর করে দিয়েছেন যে, আল্লাহর অলী সেই হতে পারে যে দুনিয়াকে বর্জন করে শুধু আল্লাহ আল্লাহ করতে থাকবে। তিনি বলেন অলীত্ব এটার নাম নয়, বরঞ্চ প্রকৃত অলীত্ব হচ্ছে এই যে, মানুষ একজন শাসক, একজন বিচারক, একজন সেনাধ্যক্ষ, একজন থানার দারোগা, একজন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি এবং অন্যান্য সকল দিক দিয়ে এক পুরো দুনিয়ার হলেও প্রতি মুহূর্তে আল্লাহভীরু এবং সৎ ও বিশ্বস্ত হওয়ার প্রমাণ দেবে যেখানে তার ঈমান অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। এভাবে তিনি চরিত্র ও আধ্যাত্মিকতাকে বৈরাগ্যবাদের নিভৃত কোণ থেকে টেনে বের করে অর্থনীতিতে ও সামাজিকতায়, রাজনীতিতে ও বিচারালয়ে এবং যুদ্ধ ও সন্ধির ময়দানে নিয়ে এসেছেন। তারপর এসব স্থানে পুণ্য পূতঃচরিত্রের শাসন কায়েম করেছেন।

নবী (সা ) এর হেদায়াতের উত্তম প্রভাব

এ ছিল তাঁরই হেদায়াত ও পথ-নির্দেশনার মহৎ প্রভাব (আরবী***) যে, নবুওয়াতের সূচনালগ্নে যারা ছিল ডাকাত তাদেরকে তিনি এমন অবস্থায় রেখে গেলেন যে, তারা আমানতদার এবং মানুষের জান মাল ও ইজ্জত আব্রুর রক্ষক হয়ে পড়লো। যাদেরকে তিনি পেয়েছিলেন পরসম্পদ হরণকারী। তাদেরকে অধিকার দানকারী, অধিকার রক্ষক এবং অন্যান্যকে অপরের অধিকার প্রদানে উদ্ধুদ্ধকারী হিসেবে রেখে গেলেন। তাঁর পূর্বে  দুনিয়া শুধু ঐসব শাসকদের সম্পর্কে অবগত ছিল যারা যুলুম নিষ্পেষণের মাধ্যমে প্রজাদেরকে দমিত করে রাখতো এবং আকাশচুম্বী প্রাসাদে বসবাস করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রভুত্ব খাটাতো। নবী মুহাম্মাদ (সা ) সে দুনিয়াকেই এমন সব শাসকের সাথে পরিচিত করে দিলেন, যারা হাটে বাজারে সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতেন এবং ন্যায় নীতি ও সুবিচার দিয়ে মানুষের মন জয় করতেন। তাঁর পূর্বে দুনিয়া ঐসব সৈনিককে জানতো যারা কোনো দেশে প্রবেশ করলে চারদিকে হত্যাকাণ্ড চালাতো, জনপদগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত এবং বিজিত জাতির নারীদের সম্ভ্রম সতীত্ব বিনষ্ট করতো, তিনি সেই দুনিয়াকেই আবার এমন সেনাবাহিনীর সাথে পরিচিত করে দিলেন যারা কোনো শহরে বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলে দুশমনের সেনাবাহিনী ছাড়া কারো উপর কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতো না এবং বিজিত শহর থেকে আদায়কৃত কর পর্যন্ত তাদেরকে ফেরৎ দিয়ে দিত। মানব ইতিহাস  বিভিন্ন দেশ ও নগর বিজয়ের কাহিনীতে ভরপুর। কিন্তু মক্কা বিজয়ের কোনো দৃষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। যে শহরের লোকেরা তের বছর যাবত নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর উপর যুলুম নিষ্পেষণ করেছে সে শহরেই বিজয়ীর বেশে তাঁর প্রবেশ এমনভাবে হয়েছিল যে, আল্লাহর সামনে অবনত মস্তকে তিনি চলছিলেন। তাঁর কপাল উটের হাওদা ছোঁয়া ছোঁয়া হচ্ছিল এবং তাঁর আচরণে গর্ব অহংকারে কোনো লেশ ছিল না। ঐসব লোক, যারা তের বছর ধরে অত্যাচার উৎপীড়ন করতে থাকে, যারা রাসূলকে হিজরত করতে বাধ্য করে এবং হিজরতের পরও তাঁর বিরুদ্ধে আট বছর পর্যন্ত যুদ্ধ করে, তারা পরাজিত হয়ে যখন তাঁর সামনে হাজির হয়ে করুণা ভিক্ষা করে, তখন নবী মুহাম্মাদ (সা ) প্রতিশোধ নেয়ার পরিবর্তে বলেন,(আরবী*****) আজ তোমাদের কোনো পাকড়াও নেই। যাও, তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হলো।

নবী মুহাম্মাদ (সা ) এর আদর্শের যে প্রভাব মুসলিম উম্মাহর উপর পড়েছে, তা যদি কেউ ধারণা করতে চায় তাহলে ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন। সে দেখতে পাবে যে, মুসলমান যখন বিজয়ীর বেশে স্পেনে প্রবেশ করে তখন তাদের আচরণ কিরূপ ছিল এবং খৃস্টানগণ যখন তাদের উপর বিজয়ী হয় তখন তারা কোন ধরনের আচরণ করেছিল। ক্রুসেড যুদ্ধকালে যখন খৃষ্টানগণ বায়তুল মাকদিস প্রবেশ করে তখন তারা মুসলমানদের সাথে কিরূপ আচরণ করে এবং মুসলমানগণ যখন বায়তুল মাকদিস খৃস্টানদের নিকট থেকে পুনর্দখল করে তখন খৃস্টানদের প্রতি তাদের আচরণ কিরূপ ছিল।

নবী করীম (সা ) এর সীরাত এমন এক মহাসমুদ্র যা কোনো গ্রন্থেও সমাবিষ্ট করা সম্ভব নয়। আর একটি বক্তৃতায় তার চিন্তাও করা যায় না। তথাপি আমি যথাসম্ভব সংক্ষেপে তার কিছু উল্লেখযোগ্য দিকের প্রতি আলোকপাত করলাম। তাঁরাই ভাগ্যবান যাঁরা এই একমাত্র হেদায়াতের মাধ্যমে জীবনের পথ-নির্দেশনা লাভ করবে। (আরবী*****)

— সমাপ্ত —

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.