সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আদ জাতি

নামকরণ

এ ছিল আরবের অতি প্রাচীন জাতি। এ জাতির কাহিনী আরববাসীদের মুখে মুখে শুনা যেতো। তাদের নাম ছোট ছেলেমেয়েদেরও জানা ছিল। তাদের শান শওকত ও প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল দৃষ্টান্তমূলক। আবার দুনিয়া থেকে তাদের নাম নিশানা মুছে যাওয়াও ছিল দৃষ্টান্তমূলক। তাদের এ খ্যাতির জন্যে আরবী ভাষায় প্রত্যেক প্রাচীন জিনিসকে আদি বলা হয়। প্রাচীন নিদর্শনাবলীকেও আদিয়্যাত বলা হয়। যে জমির কেউ মালিক থাকেনা এবং যা অনাবাদী পড়ে থাকে তাকে আদিয়্যুল আরদ বলা হয়। প্রাচীন আরবী কাব্যে এ জাতির উল্লেখ খুব বেশী পাওয়া যায়। আরবের কুলপঞ্জি বিশারদগণ আপন দেশের অতীত জাতিদের সকলের প্রথমে এ জাতির নাম করে। হাদীসে আছে, একবার নবী করীম(সাঃ) এর নিকটে বনী যুহল বিন শায়বানের এক ব্যক্তি এলো, যে ছিল আদ জাতির অঞ্চলে বসবাসকারী। সে নবীকে ঐসব কাহিনী শুনালো যা ঐ জাতি সম্পর্কে বহু প্রাচীন কাল থেকে তার এলাকার লোকেরা লোক পরম্পরা শুনে এসেছে।

আদ জাতির আবাসস্থল

কুরআনের দৃষ্টিতে এ জাতির প্রকৃত আবাসস্থল ছিল আহকাফ(আহকাফ হেকফ শব্দের বহুবচন এবং তার আভিধানিক অর্থ হলো, বালুর লম্বা লম্বা টিলা বা উচ্চতার দিক দিয়ে অবশ্য পাহাড়ের মতো নয়। কিন্তু পরিভাষার দিক দিয়ে এ আরব মরুর(রুবউল খালী) পশ্চিমাংশকে বলে যেখানে কোন বসতি নেই।গ্রন্থকার) অঞ্চল যা হেজায, ইয়ামিন এবং ইয়ামামার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এখান থেকে বিস্তার লাভ করে তারা ইয়ামিনের পশ্চিমাঞ্চল থেকে ইরাক পর্যন্ত তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ইতিহাসের দিক থেকে এ জাতির ধ্বংসাবশেষ দুনিয়া থেকে প্রায়ই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু দক্ষিণ আরবে কোথাও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় যা আদ জাতির প্রতি আরোপ করা হয়।

এক স্থানে হযরত হুদ (আ) এর কবর আছে বলে কথিত আছে। ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর জনৈক অফিসার(james R. Wellested)হিসনে গোরাবে একটা শিলালিপি দেখতে পান যাতে হযরত হুদ (আ) এর উল্লেখ ছিল। লেখা থেকে পরিষ্কার মনে হয় এ ঐসব লোকের লেখা যারা হযরত হুদের (আ) শরিয়তের অনুসারী ছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, ২৫)

ইবনে ইসহাক বলেন, আদ জাতির বসতি ওমান থেকে ইয়ামিন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কুরআন আমাদেরকে বলে যে, তাদের প্রকৃত আবাসস্থল ছিল আহকাফ, যেখান থেকে বের হয়ে তারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং দুর্বল জাতিগুলোর উপর ছেয়ে পড়েছিল। আজ পর্যন্ত দক্ষিণ আরবের লোকদের মধ্যে এ কথা প্রচলিত আছে যে, আদ জাতি এ অঞ্চলেই বসবাস করতো। বর্তমান শহর মুকাল্লা থেকে প্রায় ১২৫ মাইল উত্তরে হাজারামাওতে একটি স্থান আছে, যেখানে রোকে হযরত হুদ (আ)এর কবর বানিয়ে রেখেছে এবং তা হুদের কবর বলে খ্যাত। প্রতি বছর ১৫ই শাবানে সেখানে ওরস অনুষ্ঠিত হয়। আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে জমা হয়। যদিও এ কবর ঐতিহাসিক দিক থেকে প্রমাণিত নয়, তথাপি দক্ষিণ আরবের বহু সংখ্যক লোকের সেখানে একত্র হওয়া সম্ভবতঃ এ কথারই প্রমাণ যে, স্থানীয় কিংবদন্তী এ অঞ্চলেই আদ জাতির বাসস্থান বলে নির্ধারণ করে। উপরন্তু হাজারামাওতে বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ এখন পাওয়া যায় যে, স্থানীয় অধিবাসীগণ এখন পর্যন্ত এটাকেই আদ জাতির বাসস্থান বলে।

আদ জাতির আবাসস্থলের বর্তমান অবস্থা

আহকাফের বর্তমান অবস্থা দেখে কারো পক্ষে এ ধারণা করা সম্ভব নয় যে, কোন কালে একটি সভ্যতামন্ডিত শক্তিশালী জাতি এখানে বসবাস করতো। সম্ভবতঃ হাজার হাজার বছর আগে এটি একটা শস্যশ্যামল অঞ্চল ছিল এবং কালে ভদ্রে আবহাওয়ার পরিবর্তনে তা মরুময় প্রান্তরে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন তার অবস্থা এই যে, এমন এক গ্রাসকারী মরুময় প্রান্তর যে, যার মাঝখানে থাকার দুঃসাহস কারো হতে পারেনা। ১৮৪৩ খৃষ্টাব্দে বাভিরিংয়ার জনৈক সামরিক অফিসার তার দক্ষিণ প্রান্তে পৌঁছেছিল। সে বলে, হাজারমাওতের উত্তরে উচ্চভূমির উপর দাঁড়িয়ে দেখলে এ মরু প্রান্তরকে এক হাজার ফুট নীচে দেখা যায়। তার স্থানে স্থানে এমন সাদা ভূখণ্ড আছে যেখানে কিছু পড়লে তা বালুর সমুদ্রে তলিয়ে যায় এবং তা জরাজীর্ণ হয়ে যায়। আরবের বেদুঈনরা পর্যন্ত এ অঞ্চলকে ভীষণ ভয় করে। কোন রকমেই তারা সেখানে যেতে রাজী হয় না। একবার যখন বেদুঈন সেই সামরিক অফিসারকে সেখানে নিয়ে যেতে রাজী হলো না। তখন সে একাকীই সেখানে গেল। সে বলে, এখানকার বালু পাউডারের মতো সূক্ষ্ম ও মিহি। আমি দূর থেকে একটা বালতি সেখানে নিক্ষেপ করলাম। তারপর পাঁচ মিনিটের মেধ্যে সেটা তলিয়ে গেল। যে রশি দিয়ে বেঁধে তা ফেলে দিয়েছিলাম তাও তৎক্ষণাৎ গলে গেল।(এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে দেখুনঃ 1.Arabia and the Isles, Harold Ingrams, London, 1946.2.The Univeiling of Arabia, R.H Kirman, Lindon, 1937.3.The Empty Quarter, Philby, London, 1933.)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৫১)

ধ্বংসের পূর্বের সচ্ছলতা

আরববাসীর ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং বর্তমান প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রথম যুগের আদ একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তাদের স্মৃতি চিহ্নগুলোও দুনিয়া থেকে নির্মূল হয়েছে। আরব ঐতিহাসিকগণ তাদেরকে লুপ্ত জাতি বলে গণ্য করে। আবার এটাও আরব ইতিহাসের সর্বসম্মত কথা যে, আদ জাতির শুধু মাত্র ঐ অংশই অবশিষ্ট ছিল যারা ছিল হযরত হুদ (আ) এর অনুসারী। আদ জাতির এই অবশিষ্ট অংশকে দ্বিতীয় আদ বলা হয়েছে। হিসনে গোরাবের যে শিলালিপির উল্লেখ আমরা উপরে করেছি তা তাদেরই স্মৃতি চিহ্নসমূহের একটি। এ শিলালিপি প্রায় আঠারশ বছর খৃষ্ট পূর্বের বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞগণ শিলালিপির যে মূল বচনটি পড়েছেন, তার কয়েকটি বাক্য নিম্নে দেয়া হলোঃ আমরা দীর্ঘকাল যাবত এ দুর্গে এমন প্রভাব প্রতিপত্তিসহ বসবাস করছি যে, দারিদ্র ও সচ্ছলতা আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। আমাদের নদীগুলো কানায় কানায় পূর্ণ থাকতো এবং শাসকগণ এমন বাদশাহ ছিলেন যাদের চিন্তাধারা ছিল পবিত্র পরিশুদ্ধ এবং অনাচার ও দুস্কৃতির প্রতি তাঁরা ছিলেন কঠোর। তাঁরা হুদ (আ) এর শরিয়ত অনুযায়ী আমাদের উপর শাসন চালাতেন এবং সুন্দর সিদ্ধান্তগুলো একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হতো। আমরা অলৌকিক ক্রিয়া কর্ম এবং মৃত্যুর পর পুনর্জীবন বিশ্বাস করতাম।

এ বচন কুরআনের ঐ বর্ণনাকে সত্য বলে সাক্ষ্য দান করে যে আদ জাতির অতীত প্রভাব প্রতিপত্তি ও সচ্ছলতার উত্তরাধিকারী অবশেষে তারাই হয়েছিল যারা হযরত হুদ (আ) এর উপর ঈমান এনেছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আহকাফ, টীকা -২৫)

কুরআনে তাদের সমৃদ্ধি ও গর্ব অহংকারের উল্লেখ

(******আরবী ******)

স্মরণ কর আল্লাহ তায়ালার সেই অনুগ্রহ অনুকম্পাকে যে নূহের জাতির পরে তিনি তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানালেন।সূরা আল আরাফঃ৬৯)

দৈহিক দিক দিয়ে তারা ছিল খুব হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিশালী।

(*****আরবী *****)

শারীরিক দিক থেকে তোমাদেরকে তিনি খুবই স্বাস্থ্যবান ও হৃষ্টপুষ্ট করেছিলেন।

আপন যুগে তারা ছিল নজীর বিহীন জাতি। অন্য কোন জাতি তাদের সমকক্ষ ছিল না।

(*****আরবী******)

যাদের মতো অন্যজাতি দেশে পয়দা করা হয়নি। সূরা আল ফাজরঃ৮

তাদের সভ্যতা ছিল খুব উন্নত ধরনের। তাদের বৈশিষ্ট্য ছিল সুউচ্চ স্তম্ভের উপরে উঁচু উঁচু দালানকোঠা তৈরী করা। আর এ জন্যে তারা দুনিয়ায় খ্যাতি লাভ করেছিল।

(*****আরবী********)

তুমি কি দেখনি তোমার প্রভু উচ্চ স্তম্ভের মালিক আদে এরামের সাথে কি ব্যবহার করেছেন? সূরা আল ফজরঃ৬-৭।)

তাদের এ বৈষয়িক ও দৈহিক শৌর্য বীর্য তাদেরকে গর্বিত করেছিল। তারা শক্তি মদমত্ত হয়ে পড়েছিল।

(*****আরবী******)

এখন আদের কথা। তারা ত দুনিয়ায় সত্যের পথ থেকে সরে গিয়ে গর্ব অহংকারের আচরণ করেছিল এবং বলতে শুরু করেছিল কে আছে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী?সূরা হা মীম আস সাজদাহঃ১৫

তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ছিল কতিপয় বড়ো বড়ো স্বৈরাচারীর হাতে যাদের সামনে কেউ টু শব্দটিও করতে পারতো না।

(*****আরবী *****)

এবং সত্যের দুশমন প্রত্যেক স্বৈরাচারীর হুকুম তারা মেনে চলতো। – সূরা হুদঃ৫৯

ধর্মীয় দিক থেকে তারা আল্লাহকে অস্বীকারকারী ছিল না বরং শিরকে লিপ্ত ছিল। দাসত্ব আনুগত্য একমাত্র আল্লাহর করতে হবে এ কথা তারা মানত না।

(*****আরবী********)

তারা (হুদকে) বললো, তুমি কি আমাদের কাছে এ জন্যে এসেছ যে, আমরা শুধু আল্লাহর বন্দেগী করবো এবং আমাদের বাপ দাদা যাদের ইবাদাত করতো তাদেরকে ছেড়ে দেব?সূরা আল আরাফঃ৭০ (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আহকাফ, টীকা-২৫)

তাদের উপর আযাব নাযিলের কারণ

প্রাচীন আদ জাতি ধ্বংস এ জন্যে হয়নি যে, তাদের সাথে আল্লাহর কোন দুশমনি ছিল এবং তার জন্যে তিনি তাদেরকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। বরঞ্চ তারা নিজেরাই এমন জীবন পদ্ধতি অবলম্বন করে, যা তাদেরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা তো তাদেরকে চিন্তা ভাবনা করার এবং নিজেদেরকে সামলাবার সুযোগ দিয়েছিলেন। তাদের হেদায়েতের জন্যে রাসুল পাঠান। রসূলগণের মাধ্যমে ভ্রান্ত পথে চলার পরিণাম সম্পর্কে তিনি তাদেরকে সতর্ক করে দেন। তাদেরকে সুস্পষ্ট করে বলে দেন যে, তাদের কল্যাণের পথ কোনটা, আর ধ্বংসের পথ কোনটা। কিন্তু তারা যখন সংস্কার সংশোধনের কোন সুযোগ গ্রহণ করলো না এবং ধ্বংসের পথে চলার জন্যেই জিদ ধরে বসলো। তখন অনিবার্যরূপে তাদের যা পরিণাম হবার ছিল তাই হলো।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৫৬

আযাব সম্পর্কে কুরআনের বিবরণ

(*****আরবী****)

অবশেষে আমি কিছু অশুভ দিনে তাদের উপরে ভয়ানক ঝড় ঝঞ্ঝা প্রবাহিত করলাম, যাতে করে দুনিয়ার জীবনেই লাঞ্ছনার স্বাদ গ্রহণ করাতে পারি।– (সূরা হামীম আস সাজদাঃ১৬)

কুরআন মজিদে বিভিন্ন স্থানে এ আযাবের যে বিবরণ এসেছে তা হলো এই যে, প্রবল ঝঞ্ঝা বায়ু সাত রাত এবং আট দিন ধরে ক্রমাগত চলতে থাকে। তার প্রচণ্ডতায় মানুষ এমনভাবে পড়ে পড়ে মরতে থাকে যেন খেজুর গাছে শুল্ক কাণ্ড পড়ে রয়েছে(সূরা আল হাক্কাহঃ৭)।যে সবের উপর দিয়ে এ বায়ু বয়ে গেল, তার সব কিছুকেই জরাজীর্ণ করে গেল(সূরা আয যারিয়াতঃ৪২)।যখন এ বাতাস বইতে শুরু করে, তখন আদ জাতির লোকেরা আনন্দ করছিল। বলছিল, বাঃ। বেশ ঘন মেঘ দেখা দিয়েছে, বৃষ্টি হবে এবং শুকনো জিনিষ সজীব হয়ে উঠবে।

কিন্তু বাতাস এমন প্রচণ্ড বেগে এল যে, গোটা জনপদকে ধ্বংস করে দিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শুয়ারা, টীকা-৮৬)

( *****আরবী******)

আমি একটি অশুভ দিনে প্রচণ্ড তুফান তাদের উপর পাঠালাম।এ তুফান তাদেরকে উপরে তুলে তুলে এমনভাবে নীচে ফেলে দিচ্ছিল যেন তারা মূলোৎপাটিত খেজুর গাছে কাণ্ড।–সূরা আল কামারঃ১৯-২০)

অর্থাৎ এমন একটি দিন যার অনিষ্টকারিতা ক্রমাগতঃ কয়েকদিন ধরে চলেছিল। সূরা হা মীম আস সাজদার ১৬ আয়াতে (*****আরবী***) শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। সূরা আল হাক্কার ৭ আয়াতে বলা হয়েছে এ তুফান সাত রাত এবং আট দিন ধরে চলেছে।(কথিত আছে যে, যে দিন এ আযাব শুরু হয় সে দিনটা ছিল বুধবার। তাতে করে লোকের ধারণা জন্মে যে, বুধবার দিনটা অশুভ দিন এবং এই দিনে কোন কাজ শুরু করা ঠিক না। এর সমর্থনে কিছু দুর্বল হাদিসও উদ্ধৃত করা হয়। যার ফলে সেদিনের অশুভতার ধারণা জনগণের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যায়। যেমন, ইবনে মারদুইয়া এবং খতিব বাগদাদীর বর্ণনা(*****আরবী******) অর্থাৎ মাসের শেষ বুধবার অশুভ দিন, যার অশুভতা চলতেই থাকে। ইবনে জাওযী এ হাদীসকে কাল্পনিক বলেন। ইবনে রজব বলেন, এ হাদীস সহীহ নয়। হাফিজ সাখারবী বলেন, যতভাবে এ হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, তা সবই মনগড়া। এমনিভাবে তাবারানীর এ হাদিসকেও মুহাদ্দিসগণ দুর্বল বলেছেন হাদিসটি হলো(*****আরবী******) অর্থাৎ বুধবার দিন মনহুস বা অশুভ দিন। অন্যান্য কোন কোন রেওয়াতে বলা হয়েছে, বুধবার দিনে সফর করা ঠিক নয়, লেন দেন ও নখ কাটা ঠিক নয়। রোগীর সেবা করাও ঠিক নয়। কারণ কুষ্ঠ রোগ ঐদিন থেকে শুরু হয়। কিন্তু এসব বর্ণনাই দুর্বল ও অনির্ভরযোগ্য এবং তার উপরে কোন আকীদার বুনিয়াদ হতে পারে না। মুহাক্কিক মুনাদী বলেন (*****আরবী****) অর্থাৎ গণকদের মতো ধারণা এ ব্যাপারে পোষণ করা কঠিন হারাম। কারণ সব দিন আল্লাহর। কোন দিনই স্বয়ং মঙ্গল বা অমংগলকারী নয়।

আল্লামা আলুসী বলেন, সব দিন সমান। বুধবারের কোন বৈশিষ্ট্য নেই। রাত ও দিনের মধ্যে এমন কোন মুহূর্ত নেই যা কারো জন্যে ভালো এবং কারো জন্যে মন্দ হয় না। সবসময় আল্লাহ তায়ালা কারো জন্যে উপযোগী এবং কারো জন্যে অনুপযোগী অবস্থা সৃষ্টি করে দেন। গ্রন্থকার(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হামীম আস সাজদাহ, টীকা -২০)

সামুদ জাতি

পরিচয়

আরবের প্রাচীনতম জাতিসমূহের মধ্যে সামুদ জাতি দ্বিতীয়, যারা আদের পর সবচেয়ে বেশী খ্যাতি লাভ করেছিল। কুরআন নাযিলের পূর্বে তাদের গল্প কাহিনী আরবের সকলের মুখে শুনা যেতো। জাহেলিয়াতের যুগের কবিতা ও ভাষণের মধ্যে বেশীর ভাগ তাদের উল্লেখ করা হতো। আসিরিয়ার শিলালিপিতে এবং গ্রীস, আলেকজান্দ্রিয়া ও রোমের প্রাচীন ঐতিহাসিক ও ভূগোল বেত্তাদের বই-পুস্তকেও তাদের উল্লেখ পাওয়া যায়।হযরত মসীহ (আ) এর জন্মের কিছুকাল পূর্ব পর্যন্ত এ জাতির কিছু ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান চিল। রোমীয় ঐতিহাসিকগণ বলেন, এ জাতির লোকেরা রোমীয় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে নাবতীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কারণ নাবতীদের সাথে এদের শত্রুতা ছিল।

সামুদ জাতির অধিবাস

এ জাতির অধিবাস উত্তর পশ্চিম আরবের সেই অঞ্চলে ছিল যা আজও আল হিজ্বর নামে অভিহিত। বর্তমানকালে মদীনা এবং তবুকের মধ্যে স্থাপিত হেজায রেলওয়ের একটি ষ্টেশনের নাম মাদায়েনে মদীনা এবং তবুকের মধ্যে স্থাপিত হেজায রেলওয়ের একটি ষ্টেশনের নাম মাদায়েনে সালেহ। এটাই ছিল সামুদ জাতির সদর বাসস্থান এবং প্রাচীনকালে একে বলা হতো হিজ্বর। আজ পর্যন্ত সেখানে হাজার হাজার একর জুড়ে প্রস্তুর নির্মিত দালান কোঠা দেখতে পাওয়া যায় যেগুলো সামুদ জাতির লোকেরা পাহাড় খোদাই করে বানিয়েছিল। এ নীরব ও বিজন শহরটি দেখলেই অনুমান হয় যে কোন এক কালে এ শহরের জনসংখ্যা চার পাঁচ লাখের কম ছিল না।(হেজাজের উত্তরাঞ্চলে রাবেগ থেকে উকবা পর্যন্ত এবং মদীনা ও খায়বর থেকে তাইমা ও তবুক পর্যন্ত সমগ্র এলাকা আজও সামুদের ধ্বংসাবশেষ পরিপূর্ণ। কুরআন নাযিল কালে এসব ধ্বংসাবশেষ বর্তমান কাল থেকে অধিকতর সুস্পষ্ট থাকারই কথা। গ্রন্থকার(সূরা আল কামার, টীকা-১৬)

কুরআন নাযিলকালে হেজাযের ব্যবসায়ী কাফেলা এসব ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করতো। তবুও অভিযানকালে নবী করীম(সাঃ) যখন এ পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন তিনি মুসলমানদেরকে এসব ধ্বংসাবশেষ দেখান এবং এসব প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলেন। এক স্থানে তিনি একটি কূপের দিকে ইংগিত করে বলেন, এটা সেই কূপ যার থেকে হযরত সালেহের(আ) উটনী পানি পান করতো। তিনি মুসলমানদেরকে শুধু এ কূপ থেকে পানি পান করার নির্দেশ দেন। তিনি একটি পাহাড়ি উপত্যকা দেখিয়ে বলেন, এখান থেকে এসই উটনী পানি পান করতো। এখনো সে স্থানটি ফাজ্জুন্নাকাহ, নামে খ্যাত।(তবুক অভিযানে যাবার পথে মুসলমানগণ সামুদের এ ধ্বংসাবশেষ ঘুরে ফিরে দেখছিলেন। তাঁদেরকে একত্র করে নবী করীম (সা) বলেন, সামুদ জাতির পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর।তিনি আরও বলেন, এ এমন এক জাতির বাসস্থান ছিল, যাদের উপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল। এটা আনন্দ ভ্রমণের স্থান নয়, বরঞ্চ কান্নার স্থান। অতএব শীগগির এ স্থান অতক্রম করে চল। গ্রন্থকার(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৫৯)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল কামার, টীকা -১৬)

সামুদ জাতির ধ্বংসাবশেষ

(*****আরবী******)

সে কথা স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তায়ালা আদ জাতির পর তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করলেন এবং তোমাদেরকে এমন মর্যাদা দান করলেন যে, আজ তোমরা তাঁদের তৈরি উপযোগী ভূমি খণ্ডে বিরাট বিরাট প্রাসাদ নির্মাণ করছ এবং পাহাড় খোদাই করে বসবাস করার দালান কোঠা বানাচ্ছ। – সূরা আল আরাফঃ৭৪

সামুদ জাতির স্থাপত্য (পাহাড় খোদাই) ঠিক সেরূপ ছিল যেমন বারতে ইলোরা, অজন্তা এবং অন্যান্য স্থানে দেখতে পাওয়া যায়। মাদায়েনে সালেহতে এখনো সেসব দালান কোঠা অবিকল বিদ্যমান রয়েছে। সেসব দেখে মনে হয়, এ জাতি প্রকৌশল বিদ্যায় কত উন্নতি করেছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, টীকা – ৬৫)

হিজ্বর ছিল সামুদ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসস্থল। তার ধ্বংসাবশেষ মদীনার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত বর্তমান শহর আল উলা থেকে কয়েক মাইল ব্যবধানে দেখতে পাওয়া যায়। মদীনা থেকে তবুক যাবার পথে এ স্থানটি প্রধান সড়কের উপরেই পাওয়া যায়। এ উপত্যকার উপর দিয়েই কাফেলা চলাচল করে। কিন্তু রাসুল(সা) এর নির্দেশ অনুযায়ী কেউ এখানে অবস্থান করে না।

অষ্টম হিজরী শতাব্দীতে ইবনে বতুতা হজ্জে যাবার পথে এখানে পৌঁছেন। তিনি বলেন, এখানে লাল রঙের পাহাড়ে সামুদ জাতির দালান কোঠা বিদ্যমান। পাহাড় খোদাই করে করে তারা এসব বানিয়েছিল। তাদের নির্মিত কারুকার্য এখন পর্যন্ত এতটা জীবন্ত যে, মনে হয় এই এখনই বুঝি তা তৈরী করা হয়েছে। এসব স্থানে এখনো মানুষের গলিত হাড় হাড্ডি দেখা যায়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৫৭)

বস্তুগত উন্নতি ও নৈতিক অধঃপতন

এ জাতি সম্পর্কে কুরআন মজীদে সূরা আরাফের ৭৩-৭৯ আয়াতে, সূরা হুদের ৬১-৬৮, সূরা হিজ্বরের ৮০-৮৪, সূরা নমলের ৪৫-৫৩, সূরা যারিয়াতের ৪৩-৪৫, সূরা কামারের ২৩-৩১, সূরা আল হাক্কার ৪-৫, সূরা আল ফজরের ৯ এবং সূরা আশ শামসের ১১ আয়াতে যেসব বিবরণ দেয়া হয়েছে, তার থেকে জানা যায় যে, আদ জাতির পর যে জাতিকে সমৃদ্ধি দান করা হয়েছিল তা ছিল এই সামুদ জাতি। (*****আরবী****) কিন্তু তাদের তামাদ্দুনিক উন্নতি ও সমৃদ্ধির একই পরিণামই হয়েছিল যা হয়েছিল আদ জাতির। অর্থাৎ জীবন যাপনের মান যতোটা উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করছিল, মানবতার মান ততো নিম্নগামী হচ্ছিল। এক দিকে উন্মুক্ত প্রান্তরে ইলোরা এবং অজন্তার মতো পাথর খোদাই করে করে প্রাসাদের পর প্রাসাদ তৈরী হচ্ছিল। অপরদিকে সমাজে শিরক ও ওপৗত্তলিকতার প্রসার ঘটছিল। যুলুম অত্যাচারে সমাজ জর্জরিত হচ্ছিল। সমাজে চরিত্রহীন লোকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উচ্চ শ্রেণীর লোক গর্ব অহংকারে ধরাকে সরা জ্ঞান করতো। হযরত সালেহ (আ) যে হকের দাওয়াত পেশ করেন, তাতে নিম্ন শ্রেণীর লোকেরাই শুধু সাড়া দেয়। উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা এই বলে নবীর দাওয়াত মেনে নিতে অস্বীকার করে।

(*****আরবী *****)

তোমরা যার উপর ঈমান এনেছ, তাকে আমরা মানি না।

সত্য প্রত্যাখ্যান করার তিনটি কারণ

সামুদ জাতি হযরত সালেহ (আ) কে অনুসরণ করতে অস্বীকার করেছিল তিনটি কারণে। প্রথম এই যে, তিনি ছিলেন একজন মানুষ। তিনি কোন অতি মানব ছিলেন না। বলে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিতে তারা পারেননি। দ্বিতীয়তঃ তিনি তাদের স্বজাতিরই লোক ছিলেন। অতএব তাদের মতে তাদের উপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কোন কারণ থাকতে পারেনা। তৃতীয়তঃ তাদের মতে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে একজন। তিনি কোন শক্তিশালী দলপতি নন, তাঁর সাথে কোন লোক লস্কর বা সেনাবাহিনী নেই, তাঁর কোন প্রভাব প্রতিপত্তি নেই। এজন্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়া যায় না। তারা মনে করতো, নবী কোন অতি মানব হবেন। আর যদি মানুষই হবেন তো, তাদের দেশ এবং জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করবেন না। অন্য কোথাও তেকে আসবেন অথবা বাইর থেকে তাঁকে পাঠানো হবে। এটাও যদি না হয় তো নিদেনপক্ষে তাঁকে কোন ধর্নাঢ্য ব্যক্তি হতে হবে। তাঁর সুখ্যাতি, প্রভাব প্রতিপত্তি থাকবে যার কারণে এ কথা মেনে নেয়া যেতে পারে যে, পথ প্রদর্শনের জন্যে আল্লাহর দৃষ্টি তাঁর উপর পড়েছে তাঁকে নির্ধারিত করার জন্যে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৫৭)

মঙ্গল ও অমঙ্গলের দ্বন্দ্ব

হযরত সালেহ (আ) তাঁর দাওয়াতের সূচনা করার পর তাঁর জাতি দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

(*****আরবী****)

তারা সহসা দুটি বিবদমান দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সূরা আন নামল-৪৫

একদল ঈমান আনে এবং অপর দল ঈমান আনতে অস্বীকার করে। এ মতবিরোধের কারণে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে-

(*****আরবী******)

ঐ জাতির গর্বিত দলপতিরা দুর্বল ঈমানদারদেরকে বলতো, তোমরা সত্যিই কি জান যে, সালেহ তার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত? তারা জবাব দিল, যে সত্যসহ তাঁকে পাঠানো হয়েছে তার উপর আমরা ঈমান রাখি। তখন ঐসব গর্বিত রোকেরা বলে, যে জিনিসের উপর তোমরা বিশ্বাস পোষণ কর তা আমরা মানি না।

অন্যত্র এ জাতির দলপতিদের উক্তি এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ হে সালেহ তুমি যে শাস্তির ভয় দেখাচ্ছ, তা এনে দাও না দেখি, যদি সত্যিই তুমি রাসুলদের মধ্যে একজন হয়ে থাক। সূরা আল আরাফঃ৭৭।

মোজেজা প্রদর্শনের দাবী

(*****আরবী****)

আমরা উটনীকে তাদের জন্যে পরীক্ষা হিসাবে পাঠাচ্ছি। এখন তুমি ধৈর্য সহকারে দেখ যে, তাদের কি পরিণাম হচ্ছে। তাদেরকে জানিয়ে দেবে যে, পানি তাদের এবং উটনীর মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। প্রত্যেক পক্ষ তার পালার দিন পানি পান করতে আসবে। -সূরা আল ক্বামারঃ২৭ -২৮।

আমরা উটনীকে তাদের জন্যে পরীক্ষা হিসাবে পাঠাচ্ছি এ কথার ব্যাখ্যা এই যে, হঠাৎ একটি উটনী তাদের সামনে এনে হাজির করা হলো এবং তাদেরকে বলা হলো, এ একা একদিন পানি পান করবে এবং তোমরা ও তোমাদের পশু অন্যদিন পানি পান করতে পারবে। তার পালার দিনে তোমরা কেউ কোন কূপ অথবা ঝর্ণাতে পানি নিতে আসবে না এবং তোমাদের পশুকেও পানি পান করাতে আসবে না। এ চ্যালেঞ্জ ঐ ব্যক্তির পক্ষ থেকে দেয়া হলো যার সম্পর্কে তারা নিজেরা বলতো, তার কোন সৈন্য সামন্ত নেই অথবা তার পক্ষে কোন দল বলও নেই।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল কামার, টীকা -১৭)

সিদ্ধান্তকর নিদর্শন

সূরা আশ শুয়ারার ১৫৪ – ১৫৬ আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে যে, সামুদের লোকজন হযরত সালেহ (আ) এর নিকটে এমন এক নিদর্শনের দাবী জানায় যা তাঁর আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হওয়ার প্রত্যক্ষ প্রমাণ হবে। তার জবাবে হযরত সালেহ (আ) এ উটনী পেশ করেন।(এ কথাই বলা হয়েছে সূরা আরাফের – ৭৩ আয়াতে। গ্রন্থকার) এর থেকে এটা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয়ে যে, মোজেজা হিসাবেই উটনীর আবির্ভাব হয়েছিল। আর এ ছিল ঐ ধরনের মোজেজা যা কোন কোন নবী অস্বীকারকারীদের দাবী পূরণের জন্যে নবুয়তের প্রমাণ স্বরূপ পেশ করেছেন। উপরন্তু উটনীর অলৌকিকভাবে আত্মপ্রকাশের এটাও প্রমাণ যে, হযরত সালেহ (আ) তাকে পেশ করে কাফেরদেরকে ধমক দিয়ে বলেন, এ উটনীর জীবনের সাথে তোমাদের জীবন ওতপ্রোত জড়িত। এ স্বাধীনভাবে তোমাদের ক্ষেত খামারে চরে বেড়াবে। একদিন সে পানি পান করবে আর পর দিন তোমাদের সকলের পশু পানি পান করবে। তোমরা যদি তার গায়ে হাত দাও, তাহলে তৎক্ষণাৎ তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়বে। এটা ঠিক যে, এ ধরনের পূর্ণ নিশ্চয়তা ও প্রত্যয়ের সাথে শুধু মাত্র সে জিনিসই পে করা যায়, যা মানুষ স্বচক্ষে দেখতে পায় যে, তা একটা অসাধারণ কিছু। তারপর উটনী বেশ কিছুকাল যাবত যেখানে সেখানে স্বাধীনভাবে চরে বেড়াতে থাকলো এবং একদিন সে একাই পানি পান করে এবং আর একদিন অন্যান্য পশু। এসব কিছুই তারা নেহায়েৎ অনিচ্ছা সত্ত্বেও বরদাশত করতে থাকলো। অবশেষে অনেক শলাপরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করে তারা উটনীকে মেরে ফেললো অথচ হযরত সালেহ (আ) এর নিকটে আর কোন শক্তি ছিল না, যার জন্যে তারা তাঁকে ভয় করতে পারতো। এ সত্যটির আরও প্রমাণ এই যে, তারা উটনীর জন্যে ভীত সন্ত্রস্ত চিল এবং তারা জানতো যে তার পেছনে অবশ্যই কোন শক্তি আছে যার বলে সে তাদের মধ্যে বেপরোয়া ভাবে চলাফেরা করতো।(কুরআন কোন বিশদ ব্যাখ্যা দেয়নি যে উটনী কেমন ছিল এবং কিভাবে তার আবির্ভাব হলো। কোন সহীহ হাদিসেও এর বিবরণ পাওয়া যায় না। এজন্যে তাফসীরকারকগণ যেসব রেওয়ায়তের ভিত্তিতে উটনীর জন্মবৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন তা মেনে নেয়া জরুরী নয়। কিন্তু অলৌকিকভাবে যে উটনীর আবির্ভাব হয়েছিল তা কুরআন থেকে প্রমাণিত)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নামল, টীকা – ৫৮)

উটনীর হত্যা

(*****আরবী******)

তারা উটনীকে মেরে ফেলো এবং তাদের রবের আদেশ লঙ্ঘন করলো। – সূরা আল আরাফঃ৭৭

বেশ কিছু কাল যাবত উটনী গোটা জাতির জন্যে এক সমস্যা হয়ে পড়েছিল। লোকেরা মনে মনে এর উপর বিরক্ত হয়ে পড়েছিল। তারপর শলাপরামর্শ চলতে থাকে অবশেষে এক গোঁয়ার দলপতি জাতিকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সূরা আশ শামসে সে ব্যক্তির উল্লেখ এভাবে করা হয়েছে(*****আরবী******) হঠাৎ জাতির সবচেয়ে দুষ্কৃতিকারী এক ব্যক্তি এ দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত হলো। সূরা আল ক্বামারে বলা হয়েছে(*****আরবী*****) তারা তাদের সাথীকে অনুরোধ জানালো এবং সে এ দায়িত্ব গ্রহণ করলো। তারপর সে উটনীর কুজ কেটে ফেললো।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল কামার, টীকা – ১৯)

যদিও এক ব্যক্তি উটনীকে মেরে ফেলেছিল, যেমন সূরা আশ শামস এবং আল ক্বামারে বলা হয়েছে, তথাপি যেহেতু গোটা জাতি তার পেছনে ছিল এবং সে প্রকৃতপক্ষে এ অপরাধে গোটা জাতির মর্জি পূরণ করে, সেজন্যে গোটা জাতিকে অপরাধী করা হয়েছে। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা -৫৮) (জাতির ইচ্ছা অনুযায়ী যে অপরাধ করা হয় অথবা যে অপরাধের জন্যে জাতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে, তা একটা জাতীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়ে যদিও অপরাধ সংঘটনকারী কোন এক ব্যক্তি হয়। বরঞ্চ কুরআন এ কথাও বলে যে, প্রকাশ্য ঘোষণা করে যে অপরাধ করা হয় যেটা জাতি মেনে নেয়, তাও জাতীয় অপরাধ বলে গণ্য। -গ্রন্থকার-)

হযরত সালেহ (আ) এর বিরুদ্ধে দুষ্কৃতকারীদের ষড়যন্ত্র

(*****আরবী******)

ঐ শহরের নয়জন দলপতি ছিল যারা দেশের মধ্যে অরাজকতা ছড়াতো এবং কোন সংস্কারমূলক কাজই তারা করতো না। তারা পরস্পরে বলাবলি করলো, আল্লাহর কসম করে প্রতিজ্ঞা কর যে, আমরা সালেহ এবং তার পরিবারের উপরে রাতে হঠাৎ হামলা করবো। তারপর তার দায়িত্বশীলকে বলবো যে, তার পরিবারের ধ্বংসের সময় আমরা মোটেই সেখানে হাজির ছিলাম না। আমরা একেবারে সত্য কথাই বলছি।

এ অপকৌশল তো তারা চালালো। কিন্তু আমরাও একটা কৌশল অবলম্বন করলাম, যা তারা মোটেই টের পেলো না। এখন দেখে নাও যে, তাদের অপকৌশলের কি পরিণাম হলো। আমরা তাদেরকে এবং তাদের গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিলাম। – সূরা আন নমলঃ৪৮-৫১

তারা তাদের নির্ধারিত সময়ে হযরত সালে (আ) এর উপর চড়াও হবার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে এবং তাদের গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিলেন।

মনে হয় এ ষড়যন্ত্র তারা উটনীর কুঁজ কেটে দেয়ার পর করেছিল। সূরা হুদে উল্লেখ আছে যে, যখন তারা উটনীকে মেরে ফেললো তখন হযরত সালেহ (আ) তাদেরকে এই বলে হুশিয়ার করে দিলেন যে, ঠিক আছে, এখন তিনি দিন তোমরা ঘরে বসে খুব মজা করে নাও, তারপর তোমাদের উপর আল্লাহর আযাব আসছে(*****আরবী****) তারপর তারা হয়তো মনে করছিল, সালেহের প্রতিশ্রুত আযাব আসুক আর নাই আসুক, আমরা সবাই মিলে উটনীর সাথে তারও দফা রফা শেষ করে দিই না কেন? খুব সম্ভব তারা সে রাতেই আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত করেছিল, যে রাতে তাদের উপর আযাব নাযিল হওয়ার কথা। তারপর হলো এই যে, হযরত সালেহ (আ) এর গায়ে হাত দেয়ার আগেই, আল্লাহর কঠিন হাত তাদের উপর এসে পড়লো।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৫৮)

আযাবের বিবরণ

(*****আরবী*****) তাদের উপর আযাব এসে পড়লো।

কুরআনের অন্যত্র এ আযাবের যে বিবরণ দেয়া হয়েছে তা হলো এই যে, যখন উটনীকে মেরে ফেললো তখন হযরত সালেহ (আ) বললেন

(*****আরবী***)

মাত্র তিনটি দিন নিজেদের ঘরে আরও বসবাস করে লও।

এ নোটিশের মুদ্দৎ খতম হওয়ার পর শেষ রাতের দিকে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটলো এবং তার সাথে এমন ভূমিকম্প শুরু হলো যে, মুহূর্তের মধ্যে গোটা জাতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিল। পরদিন সকালে দেখা গেল, নিষ্পেষিত মৃতদেহগুলো পড়ে আছে। যেন বেড়ায় লাগানো ঝোপ জাড় পশুদের যাতায়াতে দলিত মথিত ও বিনষ্ট হয়ে গেছে। না, তাদের প্রস্তর নির্মিত প্রসাদগুলো, আর না তাদের পাহাড়ের মধ্যে খোদাই করা গৃহগুলো তাদেরকে রক্ষা করতে পারলো।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৬১)(সূরা আল কামার আয়াত ৩১, সূরা আল আরাফ আয়াত ৭৮ এবং সূরা আল হিজর আয়াত ৮৩-৮৪ দ্রষ্টব্য।গ্রন্থকার।

আহলে ঈমানকে রক্ষা করা হলো

(*****আরবী****)

অবশেষে যখন আমাদের ফয়সালার সময় এসে গেলো, তখন আমার রহমত দ্বারা সালেহকে এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখলাম এবং সেদিনের লাঞ্ছনা থেকে তাদেরকে রক্ষা করলাম। সূরা হুদঃ৬৬

সিনাই উপদ্বীপে যেসব কিংবদন্তী প্রচলিত আছে তার থেকে জানা যায় যে, যখন সামুদ জাতির উপর আযাব আসে, তখন হযরত সালেহ(আ) হিজরত করে সেখানে চলে যান। হযরত মূসা (আ) এর পাহাড়ের নিকটেই আর একটি পাহাড় আছে, যাকে সালেহ নবীর পাহাড় বলা হয়। কথিত আছে যে, এখানেই তাঁর বাসস্থান ছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নামল, টীকা- ৬৫)

সামুদের তামাদ্দুনিক উন্নতি ও তার ধ্বংসাবশেষ

আদ জাতির যেমন সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তারা সুউচ্চ স্তম্ভের উপর অট্টালিকা নির্মাণ করতো, তেমনি সামুদ জাতিরও সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, তারা পাহাড় খোদাই করে তার মধ্যে অট্টালিকা নির্মাণ করতো। এজন্যে প্রাচীন জাতিগুলোর মধ্যে তারা ছিল প্রসিদ্ধ। সূরা ফজরে যেমন আদকে যাতুল ইমাদ (স্তম্ভের মালিক) উপাধি দেয়া হয়েছে, তেমনি সামুদ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তারা উপত্যকায় পাহাড় খোদাই করেছে(*****আরবী******) উপরন্তু কুরআনে আরও বলা হয়েছে যে, তারা প্রস্তর ভূমিতে বড়ো বড়ো প্রাসাদ নির্মাণ করতো (*****আরবী******) তাদের এ ধরনের প্রাসাদ নির্মাণের কারণ কি ছিল? কুরআন (*****আরবী***) শব্দের দ্বারা আলোকপাত করেছে। অর্থাৎ এসব কিছু তারা করেছিল গর্ব অহংকার, সম্পদ ও শক্তিমত্তা এবং স্থাপত্য শিল্পের প্রদর্শনীর জন্যে। তাছাড়া সত্যিকার কোন প্রয়োজন তাদেরকে এ কাজের জন্যে উদ্বুদ্ধ করেনি। একটা উচ্ছৃঙ্খল সভ্যতার অবস্থা এই হয়ে তাকে। এক দিকে সমাজে যখন বিত্তহীনগণ মাথা গুঁজবার এতটুকু স্থান পায় না এবং অপরদিকে আমীর ওমরা ও সম্পদশালীগণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করে, তখন তারা প্রদর্শনীমূলক স্মারণিক প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করতে থাকে।

সামুদ জাতির এসব প্রাসাদের মধ্যে এখনও কিছু বিদ্যমান আছে। সেগুলো আমি ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বয়ং প্রত্যক্ষ করে। তাদের কিছু চিত্র এতদসহ দেয়া হলো। এ স্থানটি মদীনা এবং তবুকের মাঝখানে হেজাজের প্রসিদ্ধ স্থান আল উলার কয়েক মাইল উত্তরে অবস্থিত। নবী (সা) এর জমানায় তাকে ওয়াদিউল কুরা বলা হতো। আজও সে স্থানের অধিবাসীগণ তাকে আল হিজর এবং মাদায়েনে সালেহ স্মরণ করে।

এ অঞ্চলে আল উলা এখনো একটা শস্যশ্যামল উপত্যকা। তার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ঝর্ণা ও বাগ বাগিচা দেখা যায়। কিন্তু আল হিজরের আশে পাশে ভয়ানক অশুভসূচক পরিবেশ দেখতে পাওয়া যায়। লোক সংখ্যা নামমাত্র। উর্বরতার অভাব। সেখানে কয়েকটি কূপ আছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এর একটি কূপ সম্পর্কে এ কিংবদন্তী চলে আসছে জীর্ণ সামরিক ক্যাম্পের মধ্যে বর্তমানে সে কূপ দেখতে পাওয়া যায়, তা একেবারে শুল্ক। তার ছবিও দেয়া হলো।

এ এলাকায় যখন আমরা প্রবেশ করলাম, তখন আল উলার নিকট পৌছতেই এমন পাহাড় নজরে পড়লো যা একেবারে জ্বলে পুড়ে ভাজা ভাজা হয়ে আছে। স্পষ্ট মনে হচ্ছিল যে, কোন ভয়ংকর ভূমিকম্পে তার নীচ থেকে উপর পর্যন্ত ওলট পালট করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে রেখে গেছে। এসব পাহাড়ের চিত্রও দেয়া হলো। এ ধরনের পাহাড় পূর্ব দিকে আল উলা থেকে খায়বার যাবার পথে প্রায় চল্লিশ মাইল পর্যন্ত এবং উত্তর দিকে জর্দানের ভেতরে ত্রিশ চল্লিশ মাইল পর্যন্ত দেখতে পাওয়া গেল। তার অর্থ এই যে, দৈর্ঘ্যে তিন চারশ মাইল এবং প্রস্থে একশ মাইল একটি এলাকা ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড করে রেখেছে। আল হিজর সামুদদের যেসব দালানকোঠা আমরা দেখলাম, এ ধরনের কিছু দালানকোঠা আমরা আকাবা উপসাগরের তীরে মাদয়ানে এবং জর্দান রাজ্যের পেট্রো নাম স্থানেও দেখলাম। বিশেষ করে পেট্রাতে (petra)সামুদদের দালানকোঠা এবং নাবতিদের তৈরী দালানকোঠা পাশাপাশি বিদ্যমান রয়েছে। তাদের কারুকার্য ও গঠন পদ্ধতির মধ্যে এতটা সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে যে, যে কেউ এক নজরে বুঝতে পারে যে, এসব এক যুগেরও নয় এবং এক জাতের নয়।

ইংরেজ প্রাচ্যবিদ (Dayghty)কুরআনকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যে আল হিজরের দালানকোঠা সম্পর্কে এ দাবী করেন যে, এসব সামুদদের নয় নাবতিদের তৈরী। কিন্তু উভয় ধরনের দালান কোঠার মধ্যে পার্থক্য এতো সুস্পষ্ট যে, একজন অন্ধই সেগুলোকে একই জাতির দালানকোঠা মনে করতে পারে। আমার ধারণা এই যে, পাহাড় খোদাই করে দালানকোঠা তৈরীর শিল্পনৈপুণ্য সামুদ জাতি থেকেই শুরু হয়। তার কয়েক হাজার বছর পরে নাবতিগণ খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় এবং প্রথম শতাব্দীতে এ স্থাপত্য শিল্পকে উন্নীত করে। তারপর ইলোরাতে এ স্থাপত্যশিল্প উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে। অবশ্যি ইলোরার গুহা পেট্রার প্রায় সাতশ বছর পরের।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শুয়ার, টীকা-১০৬)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.