সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ইবরাহীম (আ) এর জাতি

হযরত নূহ (আ) এর পর হযরত ইবরাহীম (আ) প্রথম নবী, যাঁকে আল্লাহ তায়ালা ইসলামের বিশ্বজনীন দাওয়াত প্রচারের জন্যে নিযুক্ত করে। তিনি প্রথমে স্বয়ং ইরাক থেকে মিসর পর্যন্ত এবং শাম ও ফিলিস্তিন থেকে আরব মরুর বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরাফেরা করে আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও বন্দেগীর অর্থাৎ ইসলামের দিকে মানুষকে আহবান জানান। অতঃপর নিজের মিশনের প্রচার কল্পে বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর খলীফা নিযুক্ত করেন। পূর্ব জর্দানে আপন ভাইপো হযরত লুত (আ) কে এবং শাম ও ফিলিস্তিনে আপন পুত্র হযরত ইসহাক (আ) কে এবং আরবের অভ্যন্তরে স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাইল (আ) কে নিযুক্ত করেন। তারপর আল্লাহ তা আলার আদেশে মক্কায় এমন এক ঘর তৈরী করেন, যার নাম কাবা। এ ঘরকেই তিনি আল্লাহর হুকুমে তাঁর মিশনের কেন্দ্রস্থল হিসাবে গণ্য করেন। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা-৭৪)

ইবরাহীম (আ) এর জন্মস্থান

হযরত ইবরাহীম (আ) যে শহরে জন্মগ্রহণ করেন তা শুধু আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ফলেই জানতে পারা যায়নি, বরঞ্চ তাঁর যুগে সে অঞ্চলের মানুষের যে অবস্থা ছিল তার উপরেও আলোকপাত করা হয়েছে। স্যার লিওনার্ড উলী(Sir Leonard woolley) তাঁর Abraham Lindon 1953 নামক গ্রন্থে গবেষণার যে ফল প্রকাশ করেছেন তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে প্রদত্ত হলো।

উর শহর সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও তামাদ্দুনিক জ্ঞাতব্য বিষয়

আনুমানিক ২১০০ খৃষ্টপূর্ব কালে হযরত ইবরাহীম (আ) এর অভ্যুদয় হয়েছিল বরে বিশেষজ্ঞগণ আজকাল সাধারণভাবে স্বীকার করেন। সে সময়ে উর শহরের লোকসংখ্যা আড়াই লক্ষের কাছাকাছি ছিল। হয়তো বা পাঁচ লক্ষও হতে পারে। শহরটি একটি বিরাট ব্যবসা ও শিল্পকেন্দ্র ছিল। একদিকে পামীর এবং নীল গিরি থেকে সেখানে পণ্যদ্রব্যাদি যেতো এবং অন্যদিকে এনাতোলিয়ার সাথেও তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। যে রাজ্যের এ রাজধানী ছিল, তার সীমানা বর্তমান ইরাক থেকে উত্তর দিকে কিছুটা কম এবং পশ্চিমে কিছু বেশী ছিল। দেশের অধিকাংশ লোকেরই পেশা ছিল শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে সে যুগের যেসব শিলালিপি হস্তগত হয়েছে, তা থেকে জানতে পারা যায় যে, জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিকোণ ছিল নির্ভেজাল বস্তুতান্ত্রিক। সম্পদ অর্জন করা এবং বহুল পরিমাণে ভোগ বিলাসের দ্রব্য সামগ্রী সংগ্রহ করা ছিল তাদের জীবনের লক্ষ্য। সুদের বাজার অত্যন্ত গরম ছিল। মানুষ ছিল বেনিয়া মনোভাবাপন্ন। তারা একে অপরকে সন্দেহের চোখে দেখতো এবং পরস্পরের মধ্যে মামলা মোকদ্দমা চলতো খুব বেশী। তাদের দেব দেবীর কাছে তাদের দোয়া বেশীর ভাগ হতো দীর্ঘায়ু, সচ্ছলতা ও ব্যবসার উন্নতির জন্যে। অধিবাসী তিন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল।

একঃ আমীলু। এরা চিল উচ্চশ্রেণীর লোক। পূজারী, সাধারণ বেসামরিক কর্মচারী এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দুইঃ মিশকিনু। এরা ছিল ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও কৃষিজীবী।

তিনঃ আরদু অর্থাৎ ক্রীতদাস।

এ তিন শ্রেণীর মধ্যে প্রথম শ্রেণী বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাদের ফৌজদারী ও দেওয়ানী অধিকার অন্যান্যদের থেকে পৃথক ছিল। তাদের জান মালের মূল্যও অন্যান্যদের থেকে বেশী ছিল।

—————— চিত্রঃ

হযরত ইবরাহীম (আ) এর হিজরতের পথ

এ ছিল সে শহর ও সমাজ যেখানে হযরত ইবরাহীম (আ) চোখ খুলেন। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের যে অবস্থা আমরা তালমুদে দেখতে পাই, তাতে তিনি আমীলু শ্রেণীর একব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পিতা রাজ্যের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। নমরূদের নিকট তিনি রাজ্যের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মচারী(Chief officer of the state)ছিলেন।

দেব দেবী, দেব মন্দির ও পূজাপার্বণ

উরের শিলালিপিতে প্রায় পাঁচ হাজার দেব দেবীর নাম পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন আরাধ্য দেবতা ছিল। প্রত্যেক শহরের একজন রক্ষক থাকতো। তাকে রব্বুল বালাদ বা মহরের রব বলা হতো। তাকে মহাদেব বা রাইসুল আলেহা মনে করা হতো এবং তাকে সকল দেব দেবী থেকে অধিক শ্রদ্ধা করা হতো। উর শহরের রব্বুল বালাদ ছিল নান্নার (চন্দ্রদেবতা)। তার নামানুসারে পরবর্তীকালের লোকেরা এ মহরের নাম কামরিনা বলেছে। দ্বিতীয় বৃহৎ শহর ছিল লারসা যা পরবর্তীকালে উরের পরিবর্তে রাজধানীতে রূপান্তরিত হয়। তার রব্বুল বালাদ ছিল শাম্মাস(সূর্যদেব)। এসব বড়ো দেব দেবীর অধীনে অনেক ছোটো ছোটো খোদা বা দেব দেবীও ছিল। তাদের অধিকাংশ আকাশের গ্রহ নক্ষত্রের মধ্য থেকে এবং অল্পসংখ্যক পৃথিবী থেকে নির্বাচন করা হতো। মানুষের ছোটে ছোটো প্রয়োজনের সম্পর্ক ছিল এদের সাথে। পুতুলের আকারে তাদের প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছিল এবং তাদের সামনে সব রকমের পূজা পার্বণ করা হতো। মানুষের ছোটো খাটো প্রয়োজনের সম্পর্ক ছিল এদের সাথে। পুতুলের আকারে তাদের প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়েছিল এবং তাদের সামনে সব রকমের পূজাপার্বণ করা হতো। নান্নারের প্রতিমূর্তি উর শহরের সর্বোচ্চ পাহাড়ের উপরে একটি সুরম্য অট্টালিকায় স্থাপিত ছিল। তার নিকটে নান্নারের স্ত্রী নানগুলের মন্দির ছিল। নান্নারের মন্দির ছিল রাজপ্রাসাদের মতো। তার শয়নকক্ষে প্রতি রাতে একজন পূজারিণী তার বধূ সাজতো। মন্দিরে বহু স্ত্রীলোক দেবতার নামে উৎসর্গীকৃত চিল। তাদেরকে দেবদাসী(Religious Prostitutes)ধর্মীয় বেশ্যা) বলা হতো। সেসব নারীদেরকে খুব সম্মানের চোখে দেখা হতো যারা তাদের খোদা বা দেবতার নামে তাদের কুমারীত্ব উৎসর্গ করতো। সম্ভবত একবার দেবতার পথে নিজেকে কোন অপরিচিত পুরুষের দেহ সঙ্গিনী করে দেয়াকে মুক্তির পথ মনে করা হত। এ ধর্মীয় বেশ্যাবৃত্তি থেকে আনন্দ সম্ভোগ যে অধিকাংশ পূজারীই করতো তা না বললেও চলে।

নান্নার দেবতার মর্যাদা

নান্নার শুধুমাত্র দেবতাই ছিল না। বরঞ্চ দেশের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ জমিদার, বিরাট ব্যবসায়ী, বড়ো শিল্পপতি এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিরাট শাসক ছিল। বহু সংখ্যক বাগ বাগিচা, জমি ও ঘর বাড়ী এ মন্দিরের নামে ওয়াকফ করা হত। এসবের আয় ছাড়াও কৃষক, জমিদার ও ব্যবসায়ী তাদের সকল প্রকার শস্য, দুধ, সোনাদানা, কাপড় প্রভৃতি মন্দিরে নজর স্বরূপ পাঠাত। মন্দিরের পক্ষ থেকেই বিরাট আকারে ব্যবসা করা হতো। এসব কাজ কর্ম দেবতার নৈকট্য লাভের জন্যে পূজারীগণ এবং তাদের রায় খোদারাই রায় মনে করা হতো। স্বয়ং রাজ পরিবারের শাসন কর্তৃত্বের উৎসও ছিল এ নান্নার দেবতা। প্রকৃত বাদশাহ ছিল নান্নার এবং দেশের শাসক তার পক্ষ থেকেই দেশ শাসন করতো। এ সূত্র অনুযায়ী দেশের বাদশাহ স্বয়ং আরাধ্য দেবতাদের মধ্যে গণ্য হতো এবং দেবতাদের মতো তাদেরও পূজা করা হতো।

নমরূদ রাজ্যের সূচনা, উন্নতি ও অবসান

উরের যে শাহী খান্দান হযরত ইবরাহীম (আ) এর জমানায় শাসক ছিল, তার প্রথম প্রতিষ্ঠাতার নাম ছিল উরনামু। সে হযরত ঈসা (আ) এর জন্মের দু হাজার তিনশ বছর আগে এক বিরাট রাজ্য স্থাপন করে। পূর্বে সূসা এবং পশ্চিমে লেবানন পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল। তার থেকে এ পরিবার নামু নাম গ্রহণ করে যা আরবী ভাষায় নমরূদ হয়ে পড়ে। হযরত ইবরাহীম (আ) এর দেশ থেকে হিজরত করার পর এ পরিবারের উপর উপর্যুপরি ধ্বংসলীলা শুরু হয়। প্রথমে আয়লামীনগণ উর শহর ধ্বংস করে এবং নমরূদকে তার দেবতা নান্নারসহ ধরে নিয়ে যায়। অতঃপর লারসায় একটা আয়লামী শাসন কায়েম হয় যার অধীনে উর অঞ্চলের অধিবাসীরা গোলামে পরিণত হয়। অতঃপর আরব বংশোদ্ভূত একটি পরিবার বেবিলনে শক্তিশালী হয় এবং লারসা ও উর উভয়কে অধীনস্থ করে ফেলে। নান্নারের প্রতি উরবাসী যে বিশ্বাস পোষণ করতো, এসব ধ্বংসলীলার পর তা ক্ষুন্ন হয়ে পড়ে। কারণ নান্নার তাদেরকে রক্ষা করতে পারেনি।

পরবর্তী যুগে হযরত ইবরাহীম (আ) এর শিক্ষার প্রভাব

পরবর্তী যুগে সে দেশের লোকের উপর হযরত ইবরাহীম (আ) এর শিক্ষার প্রভাব কতটা পড়েছিল তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু ১৯১০ খৃষ্টপূর্বে বেবিলনের বাদশাহ হামুরাবী(বাইবেলের আমুরাফিল) যে আইন রচনা করেছিলেন তাতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে নবীগণের আলোকবর্তিকা থেকে গৃহীত আলোকেরেই সাহায্য নেয়া হয়েছিল। এসব আইনের বিস্তারিত শিলালিপি ১৯০২ খৃষ্টাব্দে জনৈক ফরাসী প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকের হস্তগত হয়। তিনি তাঁর ইংরেজি অনুবাদ (C.H.W. john The dldest Code of Law নামে ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে প্রকাশ করেন। এসব আইনের মূলনীতি ও খুঁটিনাটি বিষয়ের সাথে হযরত মূসা(আ) এর শরীয়তের সাদৃশ্য রয়েছে।

পরিপূর্ণ মুশরিকী তামাদ্দুনিক ব্যবস্থা

এ যাবত যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করা হয়েছে তা যদি সঠিক হয়, তাহলে তার থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এর জাতি যে শিরকে লিপ্ত ছিল তা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পৌত্তলিক পূজা পার্বণের সমষ্টিই ছিল না। বরঞ্চ প্রকৃতপক্ষে সে জাতির গোটা অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক ব্যবস্থা ঐ আকীদা বিশ্বাসের ভিত্তিতে চলতো। তার মুকাবিলায় হযরত ইবরাহীম (আ)তাওহীদের যে দাওয়া নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তার প্রভাব শুধু প্রতিমা পূজার উপরেই পড়েনি, বরঞ্চ শাহী খান্দানের খোদা হওয়ার দাবী, তাদের কর্তৃত্ব প্রভুত্ব, পূজারী ও উচ্চ শ্রেণীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এবং সমগ্র দেশের সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার উপর তা এক চরম আঘাত হেনেছিল। তাঁর দাওয়াত বহন করার অর্থ এই ছিল যে, নীচ থেকে উপর পর্যন্ত গোটা সমাজ প্রাসাদ চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিতে হবে। তারপর তাকে আবার তুন করে তাওহীদের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্যে হযরত ইবরাহীম (আ) এর আওয়াজ ধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথে সর্বসাধারণ, নমরূদ ও পূজারীগণ সকলে একত্রে সে আওয়াজ স্তব্ধ করে দেয়ার জন্যে বদ্ধপরিকর হলো। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শুয়ারা, টীকা-৯৯)

নমরূদের মুশরিকী ব্যবস্থার পর্যালোচনা

অ থেকে আজ পর্যন্ত সকল মুশরিক সমাজের এ একই বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, তারা আল্লাহ তা আলাকে রব্বুল আরবাব অর্থাৎ সকল রবের রব এবং সকল খোদার খোদা বলে তো মানে কিন্তু শুধু একাকী সেই রবকে এবং সেই খোদাকে মাবুদ বলে স্বীকার করে না।

মুশরিকগণ সর্বদা খোদার খোদায়িকে দুভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। এক অতি প্রাকৃতিক খোদায়ি যা কার্যকরণ পরম্পরার উপর কর্তৃত্বশীল এবং যার দিকে মানুষ তার প্রয়োজন পূরণ ও বিপদ আপদ দূর করার জন্যে ধাবিত হয়। এ খোদায়ির মধ্যে তারা (মুশরিকগণ) আল্লাহ তায়ালার সাথে আত্মা, ফেরেশতা, জ্বিন এবং অন্যান্য বহু সত্তাকে অংশীদার বানায়। তাদের কাছে দোয়া করে, তাদের সামনে পূজার অনুষ্ঠান করে, তাদের আস্তানায় নজর নিয়ায পেশ করে। দ্বিতীয় হচ্ছে, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে খোদায়ি বা কর্তৃত্ব প্রভুত্ব, যা জীবন যাপনের জন্যে আইন কানুন রচনার এবং আনুগত্য লাভের অধিকারী। দুনিয়ার সকল মুশরিক এ দ্বিতীয় ধরনের খোদায়িকে প্রায় প্রত্যেক যুগেই আল্লাহ তায়ালা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অথবা তাঁর সাথে রাজপরিবার, ধর্মীয় পুরোহিত ও সমাজের পূর্বাপর বড়দের মদ্যে বিভক্ত করে দিয়েছে। অধিকাংশ শাহী খান্দান এ দ্বিতীয় অর্থে খোদায়ির দাবীদার হয়ে পড়েছে। তাদের খোদায়িকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে তারা প্রথম অর্থসূচক খোদার সন্তান হওয়ার দাবী করেছে। এ ব্যাপারে ধর্মীয় শ্রেণী তাদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।

নমরূদের খোদায়ির দাবীও দ্বিতীয় প্রকারের ছিল। সে আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব অস্বীকার করতো না। তার দাবী এ ছিল না যে, যমীন ও আসমানের স্রষ্টা এবং সৃষ্টি জগতের পরিচালক সে নিজে। বরঞ্চ তার দাবী এই ছিল যে, এ ইরাক দেশের এবং তার অধিবাসীদের সে নিরঙ্কুশ শাসনকর্তা। তার কথাই আইন, তার উপরে এমন কোন ঊর্ধ্বতন শক্তি ও সত্তা নেই যার কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। এ দিক দিয়ে ইরাকের যে অধিবাসী তাকে প্রভু বলে স্বীকার করবে না, এবং সে ব্যতীত অন্য কাউকে প্রভু বলে মনে নেবে সে বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক।

হযরত ইবরাহীম (আ) এর তাওহীদি দাওয়াতের আঘাত

যখন হযরত ইবরাহীম (আ) বললেন, আমি এক রব্বুল আলামীনকেই খোদা, মাবুদ ও রব মানি এবং তিনি ছাড়া আর সকল কর্তৃত্ব প্রভুত্ব একেবারেই অস্বীকার করি। তখন প্রশ্ন শুধু এটাই ছিল না যে, জাতীয় ধর্ম এবং ধর্মীয় দেব দেবী সম্পর্কে তাঁর এ নতুন আকীদাহ বিশ্বাস কতদূর গ্রহণযোগ্য বরঞ্চ তার সাথে সাথে এ প্রশ্নও উঠলো যে, জাতীয় রাষ্ট্র এবং তার কেন্দ্রীয় শাসন ক্ষমতার উপরে এ আকীদা বিশ্বাস যে আঘাত হানছে, তা কি করে উপেক্ষা করা যায়। এ কারণেই বিদ্রোহের অভিযোগে হযরত ইবরাহীম (আ) কে নমরূদের সামনে পেশ করা হলো।

হযরত ইবরাহীম (আ) এর অকাট্য যুক্তি

নমরূদকে যখন হযরত ইবরাহীম (আ) বললেন যে, যে সত্তার হাতে জীবন ও মৃত্যু রয়েছে তিনিই তাঁর প্রভু। তখন নমরূদ বললেন, জীবন এবং মৃত্যু আমার হাতে।

ইবরাহীম (আ) বললেন – বেশ, আল্লাহ তো পূর্ব দিক দিয়ে সূর্য উদিত করেন, তুমি একবার পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও দেখি। এ কথা শুনে সত্র অস্বীকারকারী হতবাক হয়ে রইলো।

যদিও হযরত ইবরাহীম (আ) এর প্রথম কথায় এটা সুস্পষ্ট হয়েছিল যে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ রব বা প্রভু হতে পারে না, তথাপি নমরূদ ধৃষ্টতার সাথে তার জবাব দিয়ে ফেললো। দ্বিতীয় কথার পর অতিরিক্ত ধৃষ্টতার সাথে জবাব দেয়া তার জন্যে কঠিন ছিল।কারণ সে নিজেও জানতো যে, সূর্য এবং চন্দ্র সেই আল্লাহরই হুকুমের অধীন যাঁকে ইবরাহীম (আ) রব বলে মেনে নিয়েছেন। এখন এর জবাবে কিছু বলতে হলে সে কি বলবে? কিন্তু এভাবে যে সত্য তার কাছে পরিস্ফুট হচ্ছিল তা স্বীকার করার অর্থ এই যে, নিজের নিরঙ্কুশ প্রভুত্ব কর্তৃত্ব পরিহার করতে হয়, যার জন্যে তার মনের তাগুত প্রস্তুত ছিল না। অতএব সে শুধু হতবাক হয়েই রয়ে গেল। আত্নপূজার আধার থেকে বের হয়ে সে সত্যের আলোকে এল না।যদি ঐ তাগুতের পরিবর্তে সে আল্লাহকে তার অলী ও মদদগার বলে মনে নিতো তাহলে হযরত ইবরাহীম (আ) এর এ তবলিগের পর তার কাছে সত্য পথ উন্মুক্ত হয়ে যেতো।

নমরূদের অগ্নিকুণ্ড এবং খলীলের ফুলবাগিচা

তালমূদে উল্লেখ আছে যে, তারপর বাদশাহের হুকুমে হযরত ইবরাহীম (আ) কে বন্দী করা হয়, দশদিন তিনি জেলখানায় অতিবাহিত করেন। বাদশাহের পরিষদ তাঁকে জীবিত জ্বালিয়ে মারার সিদ্ধান্ত করে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল বাকার, টীকা – ১২৩)

কুরআনের দৃষ্টিতেও তারা তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। অগ্নিকুণ্ড তৈরী হওয়ার পর তারা তার মধ্যে হযরত ইবরাহীম (আ) কে নিক্ষেপ করে।(হযরত ইবরাহীম (আ) কে আগুনে নিক্ষেপ করা সম্পর্কে কুরআনের নিম্নস্থানগুলো দ্রষ্টব্যঃ সূরা আল আম্বিয়াঃ ৬৮ -৭০, সূরা আনকাবূতঃ ২৪, আস সাফফাতঃ ৯৭ -৯৮। সংকলনদ্বয়।)

তখন আল্লাহ তায়ালা আগুনকে আদেশ করেন, ইবরাহীমের জন্যে শীতল এবং অক্ষতিকর হয়ে যাও।(এটাও সুস্পষ্টরূপে ঐসব মুজিযার মধ্যে একটি যা কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে। যদি কেউ এ সব মুজিযার এ জন্যে ব্যাখ্যা করে যে, তার মতে বিশ্বপ্রকৃতির ব্যবস্থাপনার কর্মধারা (Routine)পরিহার করে কোন অসাধারণ কাজ করা আল্লাহর জন্যেও সম্ভব নয়, তাহলে সে আল্লাহকে মানার কষ্ট পরিহার করে কেন? আর যদি সে এ ধরনের ব্যাখ্যা এ জন্যে করে যে, বর্তমান যুগের তথাকথিত যুক্তিবাদীগণ এ ধরনের কথা মানতে প্রস্তুত নয়, তাহলে তাকে আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, হে আল্লাহর বান্দা তোমার উপর এ বোঝা কে চাপিয়ে দিয়েছে যে, আমাকে কোণ না কোন প্রকারে এ কথা স্বীকার করতেই হবে? কুরআন যেমন, ঠিক অবিকল তাকে মানতে যে প্রস্তুত নয়, তাকে তার অবস্থার উপরেই ছেড়ে দাও। তাকে স্বীকার করাবার জন্যে কুরআনকে তার মর্জি মুতাবেক রূপ দান করা কোন ধরনের ইসলাম প্রচার এবং কোন ধরনের বিবেকবান ব্যক্তিই বা তা ন্যায়সঙ্গত মনে করবে?( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন আম, টীকা -৫২)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল বাকারা, টীকা-২৫৮)

ইবরাহীম (আ) এর জাতি দুনিয়ার বুক থেকে এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়েছে যে, কোথাও তার কোন নামনিশানা নেই। তাদের মধ্যে বিদ্যমান থকার সৌভাগ্য কারো হয়ে থাকলে, তা হয়েছে শুধু হযরত ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর সৌভাগ্যবান পুত্রদ্বয়ের (হযরত ইসমাঈল (আ), ও হযরত ইসহাক (আ) এর বংশধরদের।(আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম (আ) কে সম্বোধন করে এ ঘোষণা করেন (*****আরবী*****) অর্থাৎ আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির নেতৃত্বের পদে বরিত করছি। আজকাল দুনিয়াতে অহীভিত্তিক সকল ধর্মের অনুসারীগণ (মুসলিম, ইহুদী, নাসারা) হযরত ইবরাহীম (আ) এর সাথে একইভাবে সংশ্লিষ্ট। সংকলকবৃন্দ।হযরত ইবরাহীম (আ) এর দেশ ত্যাগের পর তাঁর জাতির উপর যে আযাব এসেছিল, তা যদিও কুরআনে বর্ণিত নেই, কিন্তু তাদেরকে শাস্তিপ্রাপ্ত জাতিগুলোর মধ্যেই গণ্য করা হয়েছে। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল বাকার, টীকা, ২৯১-২৯২)

বেবিলনের যে সব শাসক এবং পণ্ডিত পুরোহিত হযরত ইবরাহীম (আ) এর দাওয়াতকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন এবং যেসব মুশরিক অধিবাসী ঐসব যালিসের আনুগত্য করেছিল তারা দুনিয়ার বুক থেকে এমনভাবে বিলুপ্ত হয়েছে যে, তাদের নাম নিশানা কোথাও নেই। কিন্তু যে ব্যক্তিকে তারা আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার অপরাধে জ্বালিয়ে।ভস্ম করতে চেয়েছিল এবং যাঁকে অবশেষে রিক্ত হস্তে জন্মভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল। তাঁকে আল্লাহ তায়ালা এ অনুগ্রহ দান করেন যে, চার হাজার বছর থেকে দুনিয়ায় তাঁর নাম সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। দুনিয়ার সকল মুসলিম, ইহুদী ও ঈসায়ী রব্বুল আলামীনের এ প্রিয় ব্যক্তিকে সর্বসম্মতভাবে ধর্মীয় নেতা বলে স্বীকার করে। বিগত চল্লিশ শতকে দুনিয়ায় যতটুকু হেদায়াতের আলোকই এসেছে, ঐ এক ব্যক্তি এবং তাঁর পূতপবিত্র সন্তানদের বদৌলতেই এসেছে। আখিরাতে তাঁরা যে বিরাট প্রতিদান লাভ করবেন, তাতো করবেনই। কিন্তু এ দুনিয়ার বুকেও তাঁরা এমন সম্মান লাভ করেছেন, দুনিয়া হাসিল করার জন্যে ভ্রান্তিকর সংগ্রামকারীদের মধ্যে সে সম্মান লাভের সৌভাগ্য কারো হয়নি।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আম্বিয়া, টীকা -৬২)

তালমুদের বয়ান

হযরত ইবরাহীম (আ) এর জীবনের এ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কোন উল্লেখ বাইবেলে নেই। এমনকি তাঁর ইরাকী জীবনের কোন ঘটনাও এ কিতাবে স্থান পায়নি। নমরূদের সাথে তাঁর মুখোমুখি সাক্ষাত, পিতা ও জাতির সাথে তাঁর সংঘাত সংঘর্ষ, পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে তাঁর চেষ্টা চরিত্র, আগুনে নিক্ষেপ করার ঘটনা অবশেষে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া, প্রভৃতি প্রত্যেকটি বিষয়ই ওল্ড টেস্টামেন্টের আদি পুস্তক প্রণেতার দৃষ্টিতে অনুল্লেখযোগ্য ছিল। তিনি শুধু তাঁর হিজরতের উল্লেখ করেন। তা আবার এমনভাবে যেন একটি পরিবার জীবিকার সন্ধানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে বসতিস্থাপন করছে। কুরআন এবং বাইবেলের মধ্যে এর চেয়ে বিরাট মতভেদ এই যে, কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আ) এর মুশরিক পিতা তাঁর উপর যুলুম করার ব্যাপারে অগ্রগামী ছিল। আর বাইবেল বলে যে, তাঁর পিতা স্বয়ং তার পুত্র পৌত্র এবং পুত্র বধুদেরকে নিয়ে হারানে বসতিস্থাপন করে, ওল্ড টেষ্টামেন্ট, আদিপুস্তক, অধ্যায় ১১:স্তোত্র ২৭ -৩২। তারপর হঠাৎ খোদা হযরত ইবরাহীম (আ) কে বলছেন, তুমি হারান ছেড়ে নেয়ানে গিয়ে বসবাস কর আমি তোমা হইতে এক মহাজাতি উৎপন্ন করিব, এবং তোমাকে আশীর্বাদ করিব, তাহাতে তুমি আশির্বাদের আকর হইবে। যাহারা তোমাকে আশীর্বাদ করিবে, তাহাদিগকে আমি আশীর্বাদ করিব, যে কেহ তোমাকে অভিশাপ দিবে, তাহাকে আমি অভিশাপ দিব, এবং তোমাতে ভূমণ্ডলের যাবতীয় গোষ্ঠী আশীর্বাদপ্রাপ্ত হইবে। (ঐ আদি পুস্তক, অধ্যায় ১২:স্তোত্র ২-৩)। বুঝতে পারা যায় না হঠাৎ হযরত ইবরাহীম (আ) এর উপর এ অনুগ্রহ দৃষ্টি পড়লো কেন? তালমূদে অবশ্যি ইবরাহীম চরিতের ইরাকী যুগের ঐসব অধিকাংশ বিবরণ পাওয়া যায়, যা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত হয়েছে।কিন্তু উভয়ের মধ্যে তুলনা করলেন, কাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশে শুধু পার্থক্যই দেখা যায় না, বরঞ্চ একজন ভালোভাবে অনুভব করতে পারে যে, তালমূদের বিবরণ অধিকাংশই অসংগত এবং অচিন্তনীয় কথার দ্বারা পরিপূর্ণ। পক্ষান্তরে কুরআনে হযরত ইবরাহীম (আ) এর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে। তার মধ্যে কোন আজেবাজে কথা নেই। অবগতির জন্যে এখানে আমরা তালমূদে বর্ণিত কাহিনীর সংক্ষিপ্ত সার উদ্ধৃত করছি। তাতে করে ঐসব লোকের ভ্রম সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যারা কুরআনকে বাইবেল এবং ইহুদী সাহিত্যের উপর নির্ভরশীল মনে করে।

তালমূদ বলে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) এর জন্মের সময় জ্যোতিষীগণ আসমানে কিছু নিদর্শন দেখে নমরূদকে পরামর্শ দেয় যে, তারেহের ঘরে যে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে তাকে হত্যা করা হোক। নমরূদ তাকে হত্যা করতে প্রস্তুত হলো। কিন্তু তারেহ তার দাসের একটা শিশুকে তার আপন শিশুর পরিবর্তে পেশ করলো এবং এভাবে আপন শিশু রক্ষা করলো। তারপর তারেহ তার বিবি এবং শিশুপুত্রকে একটি গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখলো। সেখানে তারা দশ বছর অতিবাহিত করে। একাদশ বছরে তারেহ হযরত ইবরাহীম (আ) কে হযরত নূহ (আ) এর নিকটে পাঠিয়ে দিল। হযরত ইবরাহীম (আ) উনচল্লিশ বছর ধরে হযরত নূহ (আ) এবং তাঁর আপন ভাতিজি সারাকে বিবাহ করেন যে বয়সে তাঁর চেয়ে বিয়াল্লিশ বছরের ছোট ছিল। সারা যে ইবরাহীম (আ) এর ভাতিজি ছিল এ কথা বাইবেলে নেই। বাইবেল অনুযায়ী উভয়ের মধ্যে বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র দশ বছর।ওল্ড টেস্টামেন্ট, আদি পুস্তক, অধ্যায় ১১স্তোত্র ২৯ এবং অধ্যায় ১৭ স্তোত্র১৭।

অতঃপর তালমুদ বলে যে, হযরত ইবরাহীম (আ) পঞ্চাশ বছর বয়সে হযরত নূহ (আ) এর গৃহত্যাগ করে পিতার নিকটে আসেন। তিনি দেখলেন যে, পিতা একজন পৌত্তলিক এবং তার ঘরে বছরে বারো মাসের হিসাবে বারোটি প্রতিমা রয়েছে। তিনি তাঁর পিতাকে বুঝবার অনেক চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলেন তখন একদিন সুযোগ বুঝে তাঁর পারিবারিক মন্দিরের সকল প্রতিমা ভেঙ্গে ফেলেন। তারেহ তার দেব দেবীর এ দুরবস্থা দেখে সোজা নমরূদের কাছে গিয়ে অভিযোগ করে বললো, পঞ্চাশ বছর আগে আমার ঘরে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে সে আমার বাড়ীতে এ কাণ্ড করেছে। এখন আপনি বিচার করুন।

নমরূদ হযরত ইবরাহীম (আ) কে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তিনি কঠোর ভাষায় জবাব দেন। নমরূদ তৎক্ষণাৎ তাঁকে জেলে পাঠিয়ে বিষয়টি তার পরিষদের সামনে পেশ করে। পরিষদ আলোচনার পর তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার পরামর্শ দেয়। তদনুযায়ী এক বিরাট বহ্নিৎসবের(Bonjire)ব্যবস্থা করা হয় এবং তার মদ্যে হযরত ইবরাহীম (আ) কে নিক্ষেপ করা হয়। হযরত ইবরাহীম (আ) এর সাথে তাঁর ভাই এবং শ্বশুর হারানকেও আগুনে ফেলা হয়। কারণ নমরূদ যখন তারেহকে জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার ঐ শিশুপুত্রকে তো জন্মের দিনই হত্যা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তার পরিবর্তে অন্য শিশুকে হত্যার জন্যে কেন পেশ করেছো?

তদুত্তরে তারেহ বলে, হারানের কথায় আমি এ কাজ করেছিলাম। এ কথার পর এ কাজ স্বয়ং যে ব্যক্তি করেছিল তাকে তো ছেড়ে দেয়া হলো, কিন্তু পরামর্শদাতাকে ইবরাহীম (আ) এর সাথে আগুনে ফেলে দেয়া হলো। আগুনে পড়া মাত্রই হারান জ্বলে পুরে ছাই হয়ে গেল। কিন্তু লোক দেখলো ইবরাহীম (আ) নিশ্চিন্ত মনে পায়চারি করছেন। নমরূদকে তা জানানো হলো। অতঃপর নমরূদ এসে যখন এ অদ্ভুত ব্যাপার স্বচক্ষে দেখতে পেলো, তখন চিৎকার করে বললো, আসমানী খোদার বান্দা! আগুন থেকে বেরিয়ে এসো। তারপর আমার সামনে দাঁড়াও। হযরত ইবরাহীম (আ) আগুন থেকে বেরিয়ে এলেন। নমরূদ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলো এবং বহু মূল্যবান উপঢৌকন দিয়ে তাঁকে বিদায় করলো।

তারপর, তালমূদের বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইবরাহীম (আ) দু বছর সেখানে অবস্থান করলেন। এ দিকে নমরূদ এক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখলো। জ্যোতিষীগণ তার ব্যাখ্যা করে বললো যে, ইবরাহীম (আ) এ রাজ্যের অধঃপতনের কারণ হবেন। অতএব তাঁকে হত্যা করা হোক। তাঁকে হত্যা করার জন্যে লোক পাঠানো হলো। কিন্তু স্বয়ং নমরূদ হযরত ইবরাহীম (আ) কে যে গোলাম উপঢৌকন দিয়েছিল, সেই গোলাম আলাইয়াযর সময়ের পূর্বেই হত্যার পরিকল্পনা ফাঁস করে দিল। ফলে হযরত ইবরাহীম (আ) পালিয়ে হযরত নূহ (আ) এর ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে তারেহ গোপনে তাঁর সাথে দেখা করতে থাকে। তারপর পিতা পুত্র মিলে এ সিদ্ধান্ত হলো যে, দেশত্যাগ করাই উচিত। হযরত নূহ (আ) এবং সাম এ প্রস্তাব পছন্দ করেন। অতঃপর তারেহ তার পুত্র ইবরাহীম (আ), পৌত্র লূত(আ) এবং পুত্রবধূ সারাকে নিয়ে উর থেকে হারান চলে যায়। – তালমূদ থেকে নির্বাচিত এইচ পুলানেভ লন্ডন পৃঃ৩০-৪২)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আম্বিয়া, টীকা -৬২)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.