সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

লূত জাতি

বাইবেলের মতে হযরত ইবরাহীম (আ) এর দুই ভাই ছিল নাহুর এবং হারান। হযরত লূত (আ) ছিলেন হারানের পুত্র(ওল্ড টেস্টামেন্ট আদি পুস্তক, অধ্যায় ১১:স্তোত্র ২৬)। সূরা আনকাবূতের ২৬ আয়াতে হযরত ইবরাহীম (আ) এর যে উল্লেখ আছে, তার থেকে স্পষ্ট মনে হয় যে, তাঁর জাতির মধ্যে একমাত্র লূত (আ) তাঁর উপর ঈমান এনেছিলেন।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শুআরা, টীকা -৭৩)

হযরত লূত (আ) হযরত ইবরাহীম (আ) এর ভাইপো ছিলেন। তিনি তাঁর চাচার সাথে ইরাক থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং কিছু কাল যাবত শাম, ফিলিস্তিন ও মিসরে ভ্রমণ করে দাওয়াত ও তাবলীগের অভিজ্ঞতা লাভ করতে থাকেন। তারপর স্থায়ীভাবে নবুওয়াতের পদে বরিত হওয়ার পর পথভ্রষ্ট জাতির সংস্কার সংশোধনের কাজে আদিষ্ট হন। এ জাতি লূত জাতি নামে অভিহিত হয়। সাদুমবাসীদেরকে তাঁর জাতি এ জন্যে বলা হয় যে, সম্ভবত তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ঐ জাতির সাথে ছিল।

লূত জাতির অঞ্চল

এ জাতির ঐ অঞ্চলে বাস করত – যাকে বর্তমানে ট্রান্স জর্দান বলে। এটি ইরাক ও ফিলিস্তিনের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত।বাইবেলে এ জাতির সদর স্থান সাদুম(Sodom)বলা হয়েছে। এ লূত সাগরের (Dead sea)সন্নিকটে কোথাও অবস্থিত ছিল। তালমূদে আছে, যে সাদুম ছাড়াও এ অঞ্চলের আরও বড়ো বড়ো চারটি শহর ছিল। এসব শহরের মধ্যবর্তী অঞ্চলগুলো এমন শোভামণ্ডিত ছিল যে, কয়েক মাইল ব্যাপী একটি মাত্র বাগান ছিল যার সৌন্দর্য্য দেখে মানুষ বিমুগ্ধ হয়ে পড়তো। কিন্তু আজকাল এ জাতির নাম ও অস্তিত্ব দুনিয়ার বুক থেকে একেবারে মুছে গেছে। এখন এটাও নির্দিষ্ট করে বলা যায় না যে, তাদের অধিবাসগুলো টিক কোথায় অবস্থিত ছিল। এখন শুধু (Dead sea)তাদের একমাত্র স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে বিদ্যমান আছে যাকে আজকাল লূত সাগর বলা হয় (ইহুদীদের বিকৃত করা বাইবেলে হযরত লূত (আ) এর জীবন চরিত্রের উপর যেসব কলঙ্ক আরোপ করা হয়েছে তার মধ্যে এও একটি যে, তিনি হযরত ইবরাহীম (আ) এর সাথে ঝগড়া বিবাদ করে সাদুম (Sadom)অঞ্চলে চলে যান(ওল্ড টেস্টামেন্ট, আদি পুস্তক অধ্যায় ১৩, স্তোত্রঃ১-১২)। কিন্তু কুরআন এ উক্তি খণ্ডন করে বলছে যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নবী করে ঐ জাতির মধ্যে পাঠিয়ে দেন।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আম্বিয়া, টীকা -৬৬)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আনকাবূত, টীকা -৪৯)

হেযায থেকে শাম এবং ইরাক থেকে মিসর যাবার পথে এ ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকা দেখা যায়। সাধারণত ভ্রমণকারী দল এসব ধ্বংসাবশেষ দেখে থাকেন যা আজও সুস্পষ্ট রয়েছে। এ অঞ্চলটি লূত সাগরের পূর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। বিশেষ করে এর দক্ষিণাংশ সম্পর্কে ভূগোলবেত্তগণ বলেন যে, এ অঞ্চলে এমন পরিমাণে ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায় যা দুনিয়ার অন্যত্র কোথাও দেখা যায় না। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আম্বিয়া, টীকা -৬৩)

লূত জাতির অধঃপতন

(*****আরবী*****)

এক. তোমরা কি দুনিয়ায় সৃষ্টিজীবের মধ্যে পুরুষের নিকটে গমন কর এবং তোমাদের রব তোমাদের বিবিদের মধ্যে তোমাদের জন্যে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন, তা তোমরা পরিত্যাগ করছ?বরঞ্চ তোমরা তো সীমা অতিক্রম করে গেছ।–সূরা আশ শুয়ারাঃ১৬৫ -১৬৬

(*****আরবী****)

দুইঃ তোমরা কি সেই অশ্লীল কাজ করছো যা দুনিয়ার কোন সৃষ্ট জীব তোমাদের আগে কোন দিন করেনি?সূরা আন কাবুতঃ২৮

(*****আরবী*****)

তিনঃ তোমাদের অবস্থা কি এই যে তোমরা পুরুষের কাছে যাও, রাহাজানি কর এবং নিজেদের বৈঠকাদিতে খারাপ কাজ কর?সূরা আন কাবুতঃ২৯

অর্থাৎ তাদের সাথে যৌন ক্রিয়া কর। যেমন সূরা আল আরাফে বলা হয়েছে-

(*****আরবী*****)

তোমরা যৌন লালসা পরিতৃপ্তি করার জন্যে নারীকে বাদ দিয়ে পুরুষের কাছে যাও। তারপর আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এ অশ্লীল কাজ তোমরা গোপনে কর না বরঞ্চ প্রকাশ্যে নিজেদের আড্ডায় একে অপরের সামনে এ কুকর্ম কর। এ কথাই সূরা নালে বলা হয়েছে (*****আরবী*****) তোমরা কি এতটা অধঃপতিত হয়েছ যে, তোমরা এ অশ্লীল কাজ দর্শকদের সামনে কর?( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা -৬৩)

যে ঘৃণ্য কাজের জন্যে লূত জাতি চিরদিনের জন্যে কুখ্যাত হয়ে থাকবে, তা থেকে দুষ্কর্মকারী চরিত্রবান লোক তো কখনো বিরত থাকেনি। কিন্তু এ গৌরবের(?) অধিকারী শুধু গ্রীক জাতি হয়ে পড়েছে যাদের দর্শন এ ঘৃণ্য অপরাধকে চারিত্রিক সৌন্দর্যের মর্যাদায় ভূষিত করার চেষ্টা করে। তারপর এ ব্যাপারে যেতোটুকু ত্রুটি রয়ে গিয়েছিল তা আধুনিক ইউরোপ ও আমেরিকা পূরণ করেছে। এর সপক্ষে প্রকাশ্যে বিরাট প্রচারণা চালানো হয়েছে। এমনকি জার্মানির মতো একটি দেশের পার্লামেন্ট তাকে বৈধ ঘোষণা করে। অন্যান্য পাশ্চাত্য দেশগুলোতেও একে আইনগত দিক দিয়ে বৈধ করা হয়েছে। অথচ এ এক সুস্পষ্ট সত্য যে, সমমৈথুন প্রাকৃতিক পদ্ধতির একেবারে পরিপন্থী। আল্লাহ তা আলা সকল জীবন্ত সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতির মধ্যে এর আরও একটি উদ্দেশ্য এই যে, স্ত্রী ও পুরুষজাতি মিলে একটা পরিবার গঠন করবে এবং তার থেকে একটা সভ্যতার বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত করবে। এ উদ্দেশ্যেই পুরুষ এবং নারী দুই পৃথক লিঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। তাদের মদ্যে পারস্পরিক যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের দৈহিক গঠন ও মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাসকে পারস্পরিক ইচ্ছাপূরণের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের উদ্দেশ্যের জন্যে পুরোপুরি উপযোগী করা হয়েছে। তাদের আকর্ষণ ও পরিশোধনের মধ্যে এমন এক আস্বাদন রয়েছে যা প্রকৃতির উদ্দেশ্য পূরণের জন্যে একই সাথে আহবায়ক ও ক্রিয়াশীল এবং এ কাজের পুরস্কারও। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রকৃতির এ পদ্ধতির পরিপন্থী কাজ করে সমমৈথুনের দ্বারা যৌন সম্ভোগ করে, সে একই সাথে বিভিন্ন অপরাধ করে বসে। প্রথমতঃ সে তার নিজের এবং তার সার্বজনীন প্রাকৃতিক গঠন ও মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। এভাবে সে তার মদ্যে বিরাট বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ সৃষ্টি করে, যার ফলে উভয়ের দেহ, মন এবং চরিত্রের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয়তঃ সে প্রকৃতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও আত্নসাতের অপরাধ করে বসে। কারণ প্রকৃতি যে যৌন আস্বাদনকে প্রজাতি ও সভ্যতার খেদমতের উপহার বানিয়েছিল, এবং যা লাভ করাকে কর্তব্য, দায়িত্ব এবং অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত করেছিল, তা সে কোন খেদমত ব্যতিরেকেই এবং কোন কর্তব্য, অধিকার এবং দায়িত্ব পালন ছাড়াই চোরা পথে অর্জন করলো। তৃতীয়তঃ সে মানব সমাজের সাথে প্রকাশ্য স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত তামাদ্দুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ফায়দা লাভ তো করে কিন্তু যখন তার নিজের পালা আসে তখন অধিকার, কর্তব্য ও দায়িত্বের বোঝা বহন করার পরিবর্তে সে তার আপন শক্তি সামর্থ্য পুরোপুরি স্বার্থপরতার সাথে এমন পন্থায় ব্যবহার করে যা সমাজ, তমদ্দুন ও নৈতিকতার জন্যে অলাভজনকই নয়, বরঞ্চ নিশ্চিতরূপে ক্ষতিকারক। সে নিজেকে বংশ ও পরিবারের খেদমতের জন্যে অযোগ্য বানায়। নিজের সাথে অন্তত পুরুষকে অস্বাভাবিক স্ত্রীসুলভ কাজে লিপ্ত করে, ফলে অন্তত দুজন নারীর জন্যে যৌন অনাচার ও নৈতিক অধঃপতনের পথ উন্মুক্ত করে দেয়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা -৬৩)

( *****আরবী****)

চারঃ আমাদের ফেরেশতাগণ যখন লূতের নিকটে পৌছলো, তখন তাদের আগমনে লূত হতবুদ্ধি হয়ে গেল এবং মন সংকোচিত হলো। তখন সে বলতে লাগলো, আজ বড়ো বিপদের দিন। (এসব মেহমানদের আসা দেখে) তার জাতির লোকেরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তার বাড়ীর দিকে ছুটলো। আগে থেকেই তো তারা এ ধরনের দুষ্কর্মে অভ্যস্ত ছিল। লূত তাদেরকে বললো, ভাইসব, এই তো আমার মেয়েরা রয়েছে। এরা তোমাদের জন্য সবচেয়ে পাক পবিত্র। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার মেমানদের নিয়ে আমাকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করো না। তোমাদের মধ্যে কি ভাল মানুষ নেই? তারা এই বলে জবাব দিল, তুমি তো জানই যে, তোমার মেয়েদের নিয়ে আমাদের কোন কাজ নেই এবং তুমি এটাও জান যে, আমরা কি চাই। সূরা হুদঃ ৭৭ – ৭৯

এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে দেয়া হয়েছে, তার বর্ণনাভঙ্গি থেকে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, এ ফেরেশতাগণ সুদর্শন বালকের আকৃতিতে হযরত লূত(আ) এর বাড়ী পৌঁছেছিলো। তাঁরা যে ফেরেশতা ছিলেন, তার তার জানা ছিল না। এ কারণেই এসব মেহমানের আগমনে তিনি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং মনে দুশ্চিন্তার উদয় হয়। তিনি জানতেন যে, তাঁর জাতি কতখানি দুশ্চরিত্র ও নির্লজ্জ।

হতে পারে যে, হযরত লূত(আ) তাঁর জাতির কন্যা সম্প্রদায়ের প্রতিই ইংগিত করেন। কারণ নবী তাঁর জাতির পিতা সমতুল্য। আর জাতির কন্যা সম্প্রদায় তাঁর দৃষ্টিতে আপন কন্যার মতো। আবার এটাও হতে পারে যে, তাঁর ইংগিত আপন কন্যাদের প্রতি ছিল। যাহোক উভয় অবস্থাতেই এমন ধারণা করার কোন কারণ নেই যে, হযরত লূত (আ) তাদের সাথে ব্যভিচার করার জন্যে বলেছিলেন। এ তোমাদের জন্যে সবচেয়ে পাক পবিত্র এ কথার কদর্থ করার কোনই অবকাশ নেই। হযরত লূত (আ) এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার এই ছিল যে, তারা তাদের যৌন প্রবৃত্তি ঐ স্বাভাবিক এবং জায়েয পদ্ধতিতে নিবৃত্ত করুক যা আল্লাহ তা আলা নির্ধারিত করে দিয়েছেন এবং তার জন্যে মেয়েলোকের অভাব নেই।

(*****আরবী******) এবং আমার মেহমানদের নিয়ে আমাকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করো না একথা তাদের মানসিকতার পূর্ণ চিত্র অংকিত করে যে, তারা লাম্পট্যে কতদূর নিমজ্জিত চিল। কথা শুধু এতোটুকু নয় যে, তারা প্রকৃতি ও পবিত্রতার পথ পরিহার করে একটা অপ্রাকৃতিক অশ্লীল পথে ধাবিত হয়েছিল, বরঞ্চ তাদের অধঃপতন এতোটা চরমে পৌঁছেছিল যে, তাদের সকল প্রবণতা ও কামনা বাসনা এখন এই একটি মাত্র অপবিত্র অশুচি পথের জন্যেই ছিল। এখন তাদের মনে ঐ অপবিত্রতা অশুচিতার আকাঙ্ক্ষাই রয়ে গিয়েছিল এবং তারা প্রকৃতি এবং পবিত্রতার পথ সম্পর্কে একথা বলতে কোন লজ্জাবোধ করতো না যে, এ পথ তো তাদের জন্যে নয়। এ নৈতিক এবংয় মানসিক অধঃপতনের এমন এক নিম্নতম অবস্থা, যার বেশী চিন্তা করা যায় না। এ ব্যক্তির ব্যাপার তো খুব লঘু, যে মানসিক দুর্বলতার কারণে হারাম কাজে লিপ্ত হয়। কিন্তু সে হালালকে একটা চাওয়ার বস্তু মনে করে এবং হারামকে এমন বস্তু মনে করে যার থেকে বেঁচে থাকার দরকার। এমন ব্যক্তির কোন সময়ে সংশোধনও হয়ে যেতে পারে। আর সংশোধন না হলেও বড়োজোর এতোটুকু বলা যায় যে, সে একজন পথভ্রষ্ট লোক। কিন্তু যখন কোন ব্যক্তির সকল প্রবণতা শুধুমাত্র হারাম কাজের জন্যে হয় এবংয় সে মনে করে যে হালাল তার জন্যে নয়, তখন তাকে মানুষের মদ্যে গণ্য করা যায় না। সে প্রকৃতপক্ষে একটা ঘৃণ্য অপবিত্র কীট যে মলের মদ্যেই লালিত পালিত হয় এবং তার স্বভাব প্রকৃতির সাথে পবিত্রতার কোন সামঞ্জস্যই থাকেনা। এ ধরনের কীট যদি কোন পরিচ্ছন্ন সুরুচিসম্পন্ন লোকের ঘরে জন্মে, তাহলে প্রথম সুযোগেই ফিনাইল ঢেলে তার অস্তিত্ব থেকে সে তার ঘর পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখে। তাহলে আল্লাহেই বা কতদিন তাঁর যমীনের উপরে এসব ঘৃণ্য অপবিত্র কীটের উপদ্রব সহ্য করতে পারেন?(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল হিজর, টীকা ৪২)

(*****আরবী*****)

পাঁচঃ ইত্যবসরে শহরের লোক আনন্দে আত্মহারা হয়ে হযরত লূতের বাড়ীতে উঠে পড়লো। লূত বললেন, ভাইসব, এরা আমার মেহমান। আমাকে কলঙ্কিত করো না। আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করো না। তারা বললো, আমরা কি তোমাকে বার বার নিষেধ করিনি যে, সারা দুনিয়ার ঠিকাদার সেজোনা। লূত অগত্যা বললেন, তোমাদের যদি কিছু করতেই হয় তাহলে এই তো আমার মেয়েরা রয়েছে।–সূরা হিজরঃ৬৬ -৭১

এর থেকে অনুমান করা যায় এ জাতির চরিত্রহীনতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বস্তির একজনের বাড়ীতে কয়েকজন সুদর্শন মেহমান আসলেই আর কথা নেই, তার বাড়ীতে লোকের ভিড় জমবে এবং তারা প্রকাশ্যে দাবী জানাবে, তোমার মেহমানদেরকে আমাদের হাতে তুলে দাও, আমরা তাদের সাথে কুকর্ম করবো।

তাদের গোটা জনপদের মধ্যে এমন কোন লোক নেই যে, তাদের এ দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবে। আর তাদের মধ্যে কোন নৈতিক অনুভূতিও রয়ে যায়নি। যার কারণে প্রকাশ্যে এসব বাড়াবাড়ি দেখে তারা কোনরূপ লজ্জাবোধ করতে পারে। হযরত লূত (আ) এর মতো একজন মহান ব্যক্তি এবং নৈতিকতার শিক্ষাদাতার বাড়ীতেও যখন বদমায়েশরা নির্ভয়ে হামলা করতে পারে, তখন ঐ জনপদে সাধারণ মানুষের সাথে কোন আচরণ হয়ে থাকতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫১ -৫২)

তালমুদের বয়ান

তালমূদ এ জাতির যে অবস্থা লিপিবদ্ধ করেছে তার সংক্ষিপ্ত সার এখানে দেয়া হচ্ছে। তার থেকে পরিষ্কার জানা যাবে যে, এ জাতি নৈতিক অরাজকতার কত নিম্নস্তরে নেমে গিয়েছিল। তালমূদে বলা হয়েছে যে, একবার একজন আয়লামী মুসাফির তাদের জনপদ অতিক্রম করছিল। পথে রাত্রি হয়ে যাওয়ায় সাদুম(Sadom)শহরে তাকে অবস্থান করতে হয়। তার সাথে পাথেয় ছিল। কেউ তাকে আতিথেয়তার জন্যে ডাকলো না। সে একটা গাছের নীচে নেমে পড়লো। পরে একজন সাদুমী তাকে জিদ করে তার বাড়ী নিয়ে গেল।রাতে তাকে তার বাড়ীতে রাখলো। সকাল হবার আগেই তার মালপত্র সমেত তার গাধাকে উধাও করা হলো। সে চিৎকার করা শুরু করলো। কিন্তু কেউ তার কথা শুনলো না। বরঞ্চ তার কাছে আর যা কিছু ছিল বস্তির লোকজন তা কেড়ে নিয়ে তাকে শহর থেকে বের করে দিল।

একবার হযরত ইবরাহীম (আ) এর বিবি হযরত সারা (আ) হযরত লূত (আ) এর খোঁজ খবর নেয়ার জন্যে তাঁর গোলাম আলী ইযরকে সাদুম পাঠালেন। আলী ইযর শহরে প্রবেশ করে দেখলো যে, একজন সাদুমী একজন আগন্তুককে ধরে মারছে। একজন অসহায় মুসাফিরকে কেন মারা হচ্ছে আলী ইযরের একথা বলাতে বাজারের সকলে মিলে তার মস্তক ছিন্ন করে দিল।

একবার একটি গরীব লোক সে শহরে এসেছিল। কোথাও সে কিছু খেতে না পেয়ে ক্ষুধায় অধীর হয়ে একস্থানে পড়ে রইলো। তাকে দেখতে পেয়ে হযরত লূত (আ) এর মেয়ে তাকে খানা এনে দিল। এজন্যে লূত (আ)এবং তাঁর মেয়েকে খুব ভর্ৎসনা করা হলো এবং তাদেরকে ধমক দিয়ে বলা হলো যে, এমন কাজ করলে তাঁদেরকে বস্তিতে থাকতে দেয়া হবে না। এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনা বর্ণনা করার পর তালমূদ প্রণেতা বলেন যে, দৈনন্দিন জীবনে এ লোকেরা বড়ো যালেম, ধোঁকাবাজ এবং লেনদেনে অসৎ ছিল। কোন মুসাফির তাদের এলাকা থেকে নিরাপদে যেতে পারতো না। কোন গরীব লোক তাদের কাছ থেকে এক টুকরা রুটি খেতে পেতো না। এমনও অনেকবার হয়েছে যে, বাইর থেকে তাদের ওখানে এসে না খেয়ে মরে গেল। তখন তারা তার কাপড় খুলে নিয়ে উলঙ্গ দাফন করে ফেললো। বাইরের কোন ব্যবসায়ী দুর্ভাগ্যক্রমে তাদের ওখানে পৌছলে তার সর্বস্ব লুঠ করা হতো। তার কোন ফরিয়াদ কেউ শুনতো না। তাদের উপত্যকায় তারা কয়েক মাইলব্যাপী বাগ বাগিচা তৈরী করে রেখেছিল। এ বাগানের মধ্যে তারা প্রকাশ্যে চরম নির্লজ্জভাবে কুকর্ম করতো। একমাত্র লূত (আ) এর কণ্ঠ ছাড়া অন্য কোন কণ্ঠ তাদের বিরুদ্ধে উচ্চারিত হতো না।

কুরআনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

কুরআন মজিদে এ সমগ্র কাহিনীকে শুধুমাত্র দুটি বাক্যে বর্ণনা করা হয়েছে(*****আরবী****) তার পূর্ব থেকেই বড়ো দুষ্কর্ম করে আসছিল। (*****আরবী******) তোমরা পুরুষের দ্বারা যৌন প্রবৃত্তি নিবৃত্ত কর, মুসাফিরদের রাহাজানি কর এবং নিজেদের বৈঠকে প্রকাশ্যে যৌন ক্রিয়া কর।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আরাফ, টীকা-৬৪)

নবীর দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া

হযরত লূত (আ) যখন তাদেরকে সংশোধনের জন্যে আহবান জানালেন, তখন তাঁর জাতির লোকেরা রাগান্বিত হয়ে বললো,

(*****আরবী*******)

(হে লূত) এ সকল কথা থেকে যদি বিরত না হও তাহলে যাদেরকে এ বস্তি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে তুমিও শামিল হবে। – সূরা শুয়ারাঃ১৬৭

অর্থাৎ তোমার জানা আছে যে, এর পূর্বে যে আমাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে অথবা আমাদের কাজের প্রতিবাদ করেছে অথবা আমাদের মর্জির খেলাপ কাজ করেছে তাকে আমাদের বস্তি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এখন তুমি যদি এমন কর তাহলে তোমারও সেই পরিণাম হবে।

সূরা আল আরাফ এবং সূরা আন নামলে বলা হয়েছে যে, হযরত লূত (আ) কে এ নোটিশ দেয়ার পূর্বে এ জাতির দুষ্ট লোকেরা সিদ্ধান্ত করেছিল যে-(*****আরবী*****) লূত এবং তার পরিবারের লোকজনকে তার বস্তি থেকে বের করে দাও। এরা বড়ো পাক পবিত্র থাকতে চায়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা-৮৬ -৮৮)

ফেরেশতাদের আগমন

(*****আরবী********)

এবং যখন আমাদের ফেরেশতা সুসংবাদসহ ইবরাহীমের নিকট পৌছলো, তখন তাঁরা প্রথমে ইবরাহীম (আ) এর নিকট হাজির হলো। তারা তাঁকে হযরত ইসহাক (আ) এবং তারপর হযরত ইয়াকুব (আ) এর জন্মের সুসংবাদ দিল। তারপর বললো যে, তাদের কে পাঠানো হয়েছে লূত জাতিকে ধ্বংস করার জন্যে। কারণ তার জাতির লোকেরা সীমালঙ্ঘন করেছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল হিজর, টীকা -৩৯)

(*****আরবী*****)

.ইবরাহীম বললেন, সেখানে তো লূত রয়েছে। সূরা আনকাবূতঃ ৩২

সর্বপ্রথম হযরত ইবরাহীম (আ) ফেরেশতাদেরকে মানুষের আকৃতিতে দেখে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ ফেরেশতাদের এমন রূপ ধারণ করে আসার পেছনে কোন ভয়ংকর অভিযান থাকে। অতঃপর যখন তাঁরা তাকে সুসংবাদ দিলেন তখন তাঁর আশংকা দুর হলো। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন যে, এ অভিযান লূত জাতির প্রতি পরিচালিত হবে, তখন সে জাতির জন্যে অনুকম্পার আবেদন জানালেন (*****আরবী********)কিন্তু তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হলো না। বলা হলো, এ ব্যাপারে কিছু বলবেন না। আপনার রবের ফয়সালা হয়ে গেছে এবং এখন তা আর কিছুতেই পরিবর্তন হবে না(*****আরবী**********) এ কথায় যখন হযরত ইবরাহীমের (আ)আর কোন আশা রইলো না, তখন তাঁর হযরত লূত (আ) সম্পর্কে দুশ্চিন্তা হলো। তার জন্যে তিনি বললেন সেখানে লূত রয়েছে। অর্থাৎ এ আযাব যদি হযরত লূত (আ) এর উপস্থিতিতে হয় তাহলে তিনি এবং তাঁর পরিবারবর্গ তার থেকে বাঁচবেন কি করে?(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল হিজর, টীকা-৩৯)

( *****আরবী*******)

তারা বললো, আমরা ভালোভাবে জানি সেখানে কে কে আছে। তার বিবিকে বাদ দিয়ে আমরা তাকে এবং তার পরিবারের অন্যান্য লোকজনকে রক্ষা করবো। তার বিবি পেছনে অবস্থানকারীদের মধ্যে একজন। – সূরা আনকাবূতঃ৩২

হযরত লূত (আ) এর বিবি সম্পর্কে সূরা তাহরীমের আয়াত ১০ এ বলা হয়েছে যে, সে হযরত লূত (আ) এর অনুগত ছিল না। এ জন্যে তার সম্পর্কে ফায়সালা করা হয়েছিল যে, একজন নবীর স্ত্রী হওয়া স্বত্বেও তাকে আযাবে লিপ্ত করা হয়েছে। সম্ভবত হযরত লূত (আ) যখন হিজরত করে জর্দান অঞ্চলে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন, তখন তিনি ঐ জাতির মধ্যে বিয়ে করেন। কিন্তু তাঁর সংস্পর্শে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটাবার পরও সে ঈমান আনেনি এবং তার অনুরাগ তার জাতির প্রতিই ছিল। যেহেতু আল্লাহ তায়ালার নিকটে আত্নীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের কোন মূল্য নেই, সে জন্যে প্রত্যেকের সাথে তার ঈমান ও চরিত্রের ভিত্তিতেই আচরণ করা হয়। এজন্যে নবীর বিবি হওয়া তার জন্যে কোন কাজে লাগলো না এবং তার পরিণাম তার স্বামীর সাথে নাহয়ে হলো সেই জাতির সাথে যাদের সাথে সে দ্বীন ও আখলাক জড়িত রেখেছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশশূয়ারা, টীকা-১১১)

হযরত লূত (আ) এর দুশ্চিন্তা

(*****আরবী*******)

এবং যখন আমাদের ফেরেশতাগণ লূতের নিকটে পৌছলো, তখন তাদের আগমনে সে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও মনমরা হয়ে পড়লো।–সূরা আনকাবূতঃ৩৩

এ দুশ্চিন্তার কারণ এই ছিল যে, ফেরেশতাগণ অত্যন্ত সুদর্শন তরুণের আকৃতিতে এসেছিলেন।হযরত লূত (আ) তাঁর জাতির চরিত্র সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। এ জন্যে তাঁদের আসা মাত্রই তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন যে, এসব মেহমানদেরকে রাখার ব্যবস্থা করলে, তাঁর পাপিষ্ঠ জাতির হাত থেকে তাঁদেরকে কিভাবে রক্ষা করবেন। আবার যদি তাদেরকে থাকতে দেয়া না হয় তাহলে হবে অত্যন্ত অভদ্রতা। উপরন্তু আশংকা এই যে, এসব মুসাফিরদেরকে আশ্রয় না দিলে স্বয়ং তাদেরকে নেকড়ে বাঘের মুখে নিক্ষেপ করা হবে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫৩)

সূরা হূদে বলা হয়েছে যে, যখন লোকেরা হযরত লূত (আ) এর ঘরে ঢুকতে থাকে তখন তিনি ভাবলেন যে, এখন আর কিছুতেই মেহমানদেরকে বাঁচানো যাবে না। তিনি তখন চিৎকার করে বললেনঃ(*****আরবী*******) হায় তোমাদেরকে দুরস্ত করার শক্তি যদি থাকতো, অথবা কোন শক্তিমানের সহযোগিতা যদি থাকতো তখন ফেরেশতাগণ বললেনঃ(*****আরবী*******) হে লূত! আমরা তোমার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা। এরা তোমার কাছ পর্যন্ত কিছুতেই পৌছতে পারবে না।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫৫)

( *****আরবী********)

তারা বললো, ভয় নেই, কোন চিন্তাও নেই। -সূরা আন কাবূতঃ৩৩

অর্থাৎ আমাদের ব্যাপারে না এ বিষয়ে কোন চিন্তা কর যে, তারা আমাদের কিছু করতে পারবে, আর না এ বিষয়ে যে কেমন করে তাদের থেকে আমাদেরকে রক্ষা করা যাবে। এ সুযোগেই ফেরেশতাগণ হযরত লূত (আ) এর নিকটে এ রহস্য প্রকাশ করে দিলেন যে, তাঁরা মানুষ নন বরঞ্চ ফেরেশতা। এ জাতির উপর আযাব নাযিলের জন্যে তাঁদেরকে পাঠানো হয়েছে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫৬)

এ ঘটনার যে বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে দেয়া হয়েছে তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ফেরেশতারা সুন্দর ছেলেদের ছদ্মবেশে হযরত লূত (আ) এর গৃহে এসেছিলেন। তারা যে ফেরেশতা একথা হযরত লূত (আ) জানতেন না। এ কারণে মেহমানদের আগমনে তিনি খুব বেশী মানসিক উৎকণ্ঠা অনুভব করছিলেন এবং তাঁর মনও সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। তিনি নিজের সম্প্রদায়কে জানতেন। তারা কেমন ব্যভিচারী এবং কি পর্যায়ের নির্লজ্জ হয়ে গেছে তা তাঁর জানা ছিল। (এ মেহমানদের আসার সাথে সাথে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা নির্দ্বিধায় তার ঘরের দিকে ছুটে আসতে লাগলো। আগে থেকেই তারা এমনি ধরনের কুকর্মে অভ্যস্ত ছিল। লূত তাদেরকে বললোঃ ভাইয়েরা!এইযে, এখানে আমার মেয়েরা আছে, এরা তোমাদের জন্য পবিত্রতর।আল্লাহর ভয় ডর কিছু করো এবং আমার মেহমানদের ব্যাপারে আমাকে লাঞ্ছিত করো না, তোমাদের মধ্যে কি একজনও ভালো লোক নেই। তারা জবাব দিলঃ তুমি তো জানোই, তোমার মেয়েদের দিয়ে আমাদের কোন কাজ নেই এবং আমরা কি চাই তাও তুমি জানো। -সূরা হূদঃ ৭৮(সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫৭)

( *****আরবী********)

তারপর তারা হযরত লূতকে তাঁর মেহমানের হেফাজত করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। অবশেষে আমরা তাদের চক্ষু অন্ধ করে দিলাম। (বললাম) এখন আমার আযাব এবং সতর্কবাণীর আস্বাদ গ্রহণ কর। – সূরা আল ক্বামারঃ৩৭

হযরত লূত (আ) উন্মত্ত জনতার কাছে আকুল আবেদন জানালেন, যেন এ ঘৃণ্য পদক্ষেপ থেকে তারা বিরত থাকে। কিন্তু তারা মানলো না। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে বলপূর্বক মেহমানদেরকে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। এই শেষ মুহূর্তে হঠাৎ তারা অন্ধ হয়ে পড়ে। তারপর ফেরেশতাগণ হযরত লুত (আ) কে পরিবার পরিজনসহ ভোর হবার পূর্বেই ঐ বস্তি থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। তাঁদের বের হয়ে যাবার সাথে সাথেই এ জাতির উপর এক ভয়ংকর আযাব নাযিল হলো।

বাইবেলে এ ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছেঃ তখন তাহারা কহিল সরিয়া যা। আরও কহিল, এ একাকী প্রবাস করিতে আসিয়া আমাদের বিচারকর্তা হইল, এখন তাহাদের অপেক্ষা তোর প্রতি আরও কুব্যবহার করিব। ইহা বলিয়া তাহারা লোটের উপরে ভারী চড়াউ হইয়া কবাট ভাঙ্গিতে গেল। তখন সেই দুই ব্যক্তি হস্ত বাড়াইয়া লোটকে গৃহের মধ্যে আপনাদের নিকটে টানিয়া লইয়া কবাট বন্ধ করিলেন, এবং গৃহদ্বারের নিকটবর্তী ক্ষুদ্র ও মহান সকল লোককে অন্ধতায় আহত করিলেন, তাহাতে তাহারা দ্বার খুঁজিতে খুঁজিতে পরিশ্রান্ত হইল। -আদি পুস্তক-১৯: ৯-১১(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫৮)

(*****আরবী********)

তারা বললো, আমাদেরকে পাপিষ্ঠ জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে। আমরা তাদের উপরে পাকা মাটির পাথর বর্ষণ করবো। এসব তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে সীমালংঘনকারীদের জন্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। সূরা আয যারিয়াতঃ ৩২-৩৪

অর্থাৎ এক একটি পাথরকে চিহ্নিত করা হয়েছিল যে তা কোনটা কোন পাপিষ্ঠের উপর নিক্ষেপ করা হবে। (সূরা আল আনকাবূত, টীকা-৫৮)

আযাব অবতরণ

(*****আরবী*********)

তারপর যখন আমাদের নির্ধারিত সময় এসে গেল তখন আমরা ঐ জনপদকে ওলট পালট করে দিলাম এবং তার উপর পাকা মাটির পাথর ক্রমাগত বর্ষণ করতে থাকলাম। এসব পাথরের প্রত্যেকটি তোমার রবের নিকটে চিহ্নিত করা ছিল এবং যালেমদের থেকে এ শাস্তি কিছু দূরে ছিল না। সুরা হুদঃ৮২-৮৩ (*****আরবী********)

এবং আমরা তাদের উপর মুষলধারে বারিবর্ষণ করলাম। এ বর্ষণ তাদের উপর ছিল যাদেরকে আগে সাবধান করে দিয়ো হয়েছিল।– সূরা আশ শুয়ারাঃ১৭৩

সম্ভবত এ শাস্তি এসেছিল ভয়ানক ভূমিকম্প এবং অগ্নি উদগীরণকারী বিস্ফোরণের আকারে। ভূমিকম্প সে জনপদকে ওলট পালট করে দিয়েছিল এবং অগ্নি উদগীরণকারী পদার্থ বিস্ফোরিত হয়ে তাদের উপর প্রস্তর বর্ষণ করেছিল। পাকা মাটির পাথর সম্ভবত ঐসব মাটি যা অগ্নি উদগীরণকারী অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ উত্তাপ ও গলিত পদার্থের সংমিশ্রণে পাথরের আকার ধারণ করে। লূত সাগরের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে প্রস্তর বর্ষণের ধ্বংসাবশেষ আজও চারদিকে দেখা যায়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা -৮৬)

( *****আরবী*******)

যেখানে আমরা একটি ঘর ছাড়া মুসলমানদের আর কোন ঘর পাইনি।

গোটা জাতি এবং সমগ্র অঞ্চলে শুধু একটি মাত্র বাড়ী ছিল যার মধ্যে ঈমান ও ইসলামের আলো পাওয়া যেতো। আর সে একটি মাত্র বাড়ী ছিল হযরত লূত (আ) এর।অবশিষ্ট গোটা জাতি পাপাচারে লিপ্ত ছিল এবং তাদের দেশ পাপ মলিনতায় পূর্ণ ছিল। এজন্য আল্লাহ তায়ালা ঐ একটি বাড়ীর লোকজনকে জীবিত বের করে আনলেন। তারপর সেদেশে এমন ধ্বংস নেমে আসে যে, সে পাপিষ্ঠ জাতির কোন একজনও বেঁচে থাকতে পারেনি।(আল্লাহ তা আলার প্রতিদান বা শাস্তি প্রদানের আইন(Law of Retribution) হচ্ছে এই যে, কোন জাতিকে পরিপূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয় না যতক্ষণ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু মঙ্গল অবশিষ্ট থাকে। অসৎলোকের সংখ্যাধিক্যের তুলনায় যদি এমন একটি মুষ্টিমেয় দলও থাকে যে অনাচার প্রতিরোধ এবং সৎপথে মানুষকে আহবান করার চেষ্টা চালায় তাহলে আল্লাহ তায়ালা তাকে কাজ করার সুযোগ দেন। কিছু অবস্থা যখন এই হয় যে, কোন জাতির মধ্যে সামান্যতম পরিমাণে মঙ্গলও দেখতে পাওয়া যায় না, তখন আল্লাহ তায়ালার নীতি এই হয় যে, জনপদের মধ্যে অনাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে যারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তাদের অল্পসংখ্যক লোককে তিনি তাঁর কুদরতে রক্ষা করেন এবং অবশিষ্ট লোকের প্রতি সেই আচরণই করেন যা একজন বুদ্ধিমান মালিক তার পচে যাওয়া ফলের সাথে করে থাকে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আয যারিয়াত, টীকা -৩২)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা আল ক্বামার, টীকা -২২)

বাইবেলে আযাবের বিবরণ

বাইবেলের বর্ণনা, গ্রীস ও ইতালির প্রাচীন কাগজ-পত্রাদি, আধুনিক যুগের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ পর্যবেক্ষণে সে আযাবের বিবরণের উপরে যে আলোকপাত করা হয় তার সংক্ষিপ্ত সার নিম্নে প্রদত্ত হলো।

লূত সাগরের (Dead sea)পূর্ব এবং দক্ষিণের যে অঞ্চলটি জনমানবহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সেখানে বহুসংখ্যক প্রাচীন জনপদের ধ্বংসাবশেষ এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে যে, এটি কোন এক কালে বসতি পূর্ণ অঞ্চল ছিল। আজও সেখানে শত শত ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের নিদর্শন পাওয়া যায়। এখন এ অঞ্চলটি এমন উর্বর নয় যে, এতটা জনসংখ্যার বোঝা বহন করতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে, এ অঞ্চলটির বসতি ও সাচ্ছল্য ২৩০০ – ১৯০০ খৃষ্টপূর্ব পর্যন্ত ছিল এবং হযরত ইবরাহীম (আ) সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের ধারণা এই যে, তিনি যিশুখ্রিস্টের দু হাজার বছর পূর্বে জীবনযাপন করেন। এদিক দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সাক্ষ্য দেয় যে এ অঞ্চলটি হযরত ইবরাহীম (আ) এবং তাঁর ভাইপো হযরত লূত (আ) এর যুগেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

এ অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা অধিক বসতি পূর্ণ ও শস্যশ্যামল অংশকে বাইবেলে সাদ্দিম উপত্যকা বলা হয়েছে। এ খোদাওন্দের বাগান (আদান) এবং মিসরের মতো অতীব শস্যশ্যামল ছিল (আদি পুস্তক ১৩:১০)। আধুনিক যুগের বিশেষজ্ঞদের অভিমত এই যে, সে উপত্যকাটি এখন লূত সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষ থেকে এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে লূত সাগর দক্ষিণ দিকে এতোখানি প্রসারিত ছিল না যতোটা এখন রয়েছে। ট্রান্স জর্দানের বর্তমান শহর আল কার্ক এর সম্মুখে পশ্চিম দিকে এ সাগরে আল লিসান নামে যে ছোটো একটি দ্বীপ ছিল প্রাচীন কালে এ ছিল পানির শেষ সীমান্ত। তার নিম্নাংশে যেখানে এখন পানি ছড়িয়ে আছে, পূর্বে একটা শস্যশ্যামল উপত্যকা হিসাবে বিদ্যমান ছিল। আর এটাই ছিল সাদ্দিম উপত্যকা যার মধ্যে লূত জাতির বড়ো বড়ো শহর, সাদুম, আমুরা, আদমা, সানবুয়েম এবং দুগার অবস্থিত ছিল। যিশুখ্রিস্টের প্রায় দু হাজার বচর পূর্বে এক ভয়ানক ভূমিকম্পে এ উপত্যকা ফেটে তলিয়ে যায় এবং লূত সাগরের পানি তার উপর এসে পড়ে। আজও এটি লূত সাগরের সর্বাপেক্ষা অধিক উদ্বেলিত অংশ। কিন্তু রোমীয় শাসন কালে এ এতোটা উদ্বেলিত উচ্ছলিত ছিল না যার ফলে লোক আল লিসান থেকে যাত্রা করে পশ্চিম তীর পর্যন্ত পানির উপর দিয়ে পৌঁছে যেতো। সে সময় পর্যন্ত দক্ষিণ তীরের সাথে সাথে পানিতে নিমজ্জিত বনজঙ্গল পরিষ্কার দেখা যেতো। এ সন্দেহও পোষণ করা হতো যে, পানিতে নিমজ্জিত কিছু দালান কোঠাও রয়েছে।

বাইবেল এবং গ্রীক ইতালির প্রাচীন গ্রন্থাবলী থেকে জানা যায় যে, এ অঞ্চলের স্থানে স্থানে পেট্রোল এবং Sphalerite এর কূপ ছিল এবং কোন কোন স্থানে যমীন থেকে দাহ্য গ্যাসও বের হতো। এখনো সেখানে ভূগর্ভে পেট্রোল এবং গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার দ্বারা অনুমান করা হয়েছে যে, ভূমিকম্পের প্রবল আলোড়নের সাথে পেট্রোল, গ্যাস এবং Sphalerite যমীন থেকে বিস্ফোরিত হয় এবং সে বিস্ফোরণে গোটা অঞ্চল উড়ে যায়। বাইবেল বলে যে, এ ধ্বংসের সংবাদ পেয়ে হযরত ইবরাহীম (আ) যখন হিব্রন থেকে এ উপত্যকার অবস্থা দেখতে এলেন, তখন তিনি দেখলেন যে, যমীন থেকে এমনভাবে ধুম্র উদগীরণ হচ্ছে যেমন ভাটা থেকে হয়। (আদি পুস্তক অধ্যায় ১৯:স্তোত্র ২৮)( তাফহীমুল কুরআন, সূরা হুদ, টীকা-৯১)

( *****আরবী****)

আমরা এ জনপদে এক সুস্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি।

এ সুস্পষ্ট নিদর্শন বলতে লূত সাগর (Deas sea)বুঝানো হয়েছে। কুরআন মজিদের বিভিন্ন স্থানে মক্কায় কাফেরদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে এ যালেম জাতির কৃতকর্মের জন্যে যে শাস্তি এসেছিল তার এক নিদর্শন এখনো সাধারণ রাজপথে বিদ্যমান রয়েছে যা তোমরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে শাম যাবার পথে দিনরাত দেখতে পাও

(*****আরবী*****)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.