সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

সাম্প্রতিক আবিষ্কার

বর্তমান কালে এ কথা প্রায় নিশ্চয়তার সাথে স্বীকার করা হচ্ছে যে, লূত সাগরের দক্ষিণাংশ এক ভয়ানক ভূমিকম্পে ভূগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার ফলে এরূপ ধারণ করেছে। আর এই তলিয়ে যাওয়া অংশেই লূত জাতির কেন্দ্রীয় শহর সাদুম(Sodom)অবস্থিত চিল। এ অংশে পানির নীচে কিছু নিমজ্জিত জনপদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। সম্প্রতি আধুনিক ডুবারী যন্ত্রাদির সাহায্যে পানির নীচে গমন করে ধ্বংসাবশেষ সন্ধানের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু এ প্রচেষ্টার কোন সুফল জানা যায়নি। (তাফহীমুল কুরআন, সূরা আয যারিয়াত, টীকা-৩৪)

(****আরবী*****)

তারপর সেখানে আমরা এক নিদর্শন তাদের জন্যে রেখে দেই যারা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির ভয় করে। -সূরা আয যারিয়াতঃ৩৭

এ নিদর্শন হচ্ছে লূত সাগর(Dead sea), যার দক্ষিণাংশ এখনো এক বিরাট ধ্বংসের স্বাক্ষর বহন করছে। প্রত্নতত্ত্ববিদগনের ধারণা এই যে, লূত জাতির বড়ো শহর সম্ভবত ভয়ানক ভূমিকম্পে মাটির নীচে তলিয়ে গেছে এবং তার উপর লূত সাগরের পানি ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ এ সাগরের সে অংশ যা আল লিসান নামীয় ছোট দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত তা পরবর্তীকালের সৃষ্টি বলে মনে হংয় এবং প্রাচীন লূত সাগরের যেসব ধ্বংসাবশেষ ঐ দ্বীপটির ভিতরে দেখতে পাওয়া যায়, সেসব দক্ষিণ দিকের ধ্বংসাবশেষ থেকে ভিন্ন ধরনের। এর থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, দক্ষিণাংশ প্রথমে ঐ সাগরের উপরিভাগ থেকে উচ্চ ছিল। পরবর্তীকালে কোন এক সময়ে নিচে তলিয়ে গেছে। আর এই তলিয়ে যাওয়ার সময়টাও যিশুখ্রিস্টের দুহাজার বছর আগে বলেই মনে হয়। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এই হলো হযরত ইবরাহীম (আ) এবং লূত (আ) এর যুগ। ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দে ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধানকারী একটি আমেরিকান দল আল লেসানে এক বিরাট কবরস্থান দেখতে পায়, যার মধ্যে বিশ হাজারেরও অধিক কবর আছে। এর থেকে অনুমান হয় যে, নিকটে অবশ্যই কোন বড়ো শহর অবস্থিত ছিল। কিন্তু আশে পাশে এমন কোন শহরের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান নেই যার সন্নিকটে এতো বড়ো কবরস্থান হতে পারে। এর থেকে সন্দেহ প্রবল হয় চিত্রঃ যে, এটি যে শহরের কবরস্থান ছিল তা সাগরে নিমজ্জিত হয়েছে। সাগরের দক্ষিণে যে অঞ্চলটি রয়েছে তারও চারদিকে ধ্বংসলীলা দেখা যায়। যমীনের মধ্যে গন্ধক, আলকাতরা, প্রাকৃতিক গ্যাস প্রভৃতি এতো পরিমাণে মজুদ দেখতে পাওয়া যায় যে, যা দেখলে মনে হয় কোন এক সময়ে বিদ্যুৎ পতনে অথবা ভূমিকম্পে গলিত পদার্থ বিস্ফোরণে এখানে এক জাহান্নাম সৃষ্টি হয়েছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আযযারিয়াত, টীকা-৩৪)

সাবাজাতি

সাবা জাতির অঞ্চল

সাবা দক্ষিণ আরবের সুপ্রসিদ্ধ ব্যবসাজীবি জাতি। তাদের রাজধানী মারেব বর্তমান ইয়েমেনের রাজধানী সানয়ার পঞ্চান্ন মাইল উত্তর পূর্বে অবস্থিত ছিল। মায়ীন রাজ্যের পতনের পর প্রায় ১১০০ খৃষ্টপূর্বে সাবা জাতির উন্নতির অগ্রগতি শুরু হয় এবং এক হাজার বছর পর্যন্ত আরবদেশে তাদের বিরাট প্রতিপত্তি বিদ্যমান থাকে। তারপর ১১৫ খৃষ্টপূর্বে দক্ষিণ আরবের দ্বিতীয় প্রসিদ্ধ জাতি হিমইয়ার তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। পশ্চিমে ইয়েমেন ও হাজারামাওত এবং আফ্রিকায় আবিসিনীয় অঞ্চলের উপর তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

সুপ্রসিদ্ধ বিরাট জাতি

পূর্ব আফ্রিকা, ভারত, দূরপ্রাচ্য এবং স্বয়ং আরব দেশের যত ব্যবসা বাণিজ্য মিসর, শাম, গ্রীক ও রোমের সাথে হতো, তা অধিকাংশই সাবায়ীদের হাতে ছিল। এজন্যে এ জাতি প্রাচীনকালে তাদের ধনসম্পদের জন্যে বিখ্যাত চিল। বরঞ্চ গ্রীক ঐতিহাসিক তাদেরকে দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী জাতি বলে উল্লেখ করেছেন। ব্যবসা ছাড়াও তাদের সাচ্ছল্যের বড়ো কারণ এই ছিল যে, তারা দেশের স্থানে স্থানে বাঁধ নির্মাণ করে সুন্দর সেচকার্যের ব্যবস্থা করেছিল। তার ফলে তাদের গোটা অঞ্চল শস্যশ্যামল ও ফলে ফুলে সুশোভিত ছিল। তাদের দেশের অসাধারণ উর্বরতা ও শস্যশ্যামলতার উল্লেখ গ্রীক ঐতিহাসিকগণও করেছেন। কুরআনে সূরা আস সাবার দ্বিতীয় রুকুতেও এর ইংগিত করা হয়েছে। ইতিহাসের দৃষ্টিতে সাবা দক্ষিণ আরবের এক অতি বিরাট জাতির নাম। এটি ছিল বড়ো বড়ো উপজাতীয় গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। ইমাম আহমাদ, ইবনে জারীর, ইবনে আবী হাতেম, ইবনে আবদুল বারব এবং তিরমিযি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, সাবা আরবের একটি লোকের নাম ছিল, যার বংশ থেকে নিম্নের গোত্রগুলো জন্মলাভ করে। যথা কিন্দাহ, হিমইয়ার, আযদ, আশয়ারিয়্যান, মাযহিজ, আন মার(এর দুটি শাখা খাশউম ও বাযীলা), আমেলা, জুযাম, লাখম এবং গাসসান।

অতি প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীতে আরবের এ জাতির সুখ্যাতি ছিল। ২৪০০ খৃষ্টপূর্বে উরের শিলালিপি সাবুমের নামে এ জাতির উল্লেখ করে। তারপর বেবিলন ও আসিরিয়ার শিলালিপিতে এবং এভাবে বাইবেলেও বার বার তার উল্লেখ করা হয়েছে। (যেমন গীত সংহিতা ৭২:১৫, যিরমিয়৬:২০, যিহিস্কেল২৭:২২, ৩৮:১৩, ইয়োব৬:১৯)।গ্রীস ও রোমের ঐতিহাসিকগণ এবং ভূগোলবেত্তা থিয়োফ্রাস্টিস (Theofrastes)২৮৮ খৃষ্টপূর্ব থেকে যিশুখ্রিস্টের পরবর্তী কয়েক শতক পর্যন্ত ক্রমাগত তার উল্লেখ করেন। তার আবাস ছিল আরবের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে। এখন তা ইয়ামেন নামে অভিহিত। তার স্বর্ণযুগ শুরু হয় ১১০০ খৃষ্টপূর্বে হযরত দাউদ (আ) এবং হযরত সুলায়মান (আ) এর যুগে একটা সমৃদ্ধ জাতি হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ শুয়ারা, টীকা-১১৪)

সাবার ধর্মীয় ইতিহাস

প্রথমে এ জাতি একটি সূর্য উপাসক জাতি ছিল। (কুরআন মজিদের সূরা আন নামল, আয়াত ২৪ থেকে জানা যায় যে, হুদহুদ যখন হযরত সুলায়মান (আ) কে সে জাতির অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলো, সে সময়ে তারা সূর্যের পূজা করতো। আরবের প্রাচীন ঐতিহ্য থেকেও জানা যায় যে, তাদের এই ধর্ম ছিল। ইবনে ইসহাক কুলাচার্যদের বিবৃতি উদ্ধৃত করে বলেন যে, সাবা জাতির পূর্ব পুরুষ চিল আবদে শামস(সূর্য পূজারী) এবং উপাধি ছিল সাবা। বনী ইসরাঈলের ঐতিহ্য থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে যে, হুদহুদ যখন সুলায়মান (আ) এর পত্র নিয়ে সাবার রাণীর নিকটে গমন করে তখন সে সুর্য দেবতার পূজার জন্যে যাচ্ছিল। হুদহুদ পথিমধ্যে পত্রখানা রাণীর সামনে নিক্ষেপ করে।) তাদের রাণী যখন হযরত সুলায়মান (আ) এর হাতে ইমান আনে (৯৬৫ -৯২৬ খৃষ্টপূর্ব)। তখন খুব সম্ভব তাদের অধিকাংশ মুসলমান হয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে কোন এক সময়ে তাদের মদ্যে শিরক ও পৌত্তলিকতার প্রসার ঘটে এবং তারা আলমাকা(চন্দ্রদেব), আশতার (জোহরা), যাতে হামীম ও যাতে বাদন (সূর্যদেব), হোবিস, হারসতম, অথবা হারিমত এবং এ ধরনের বহু দেবদেবীর পূজা শুরু করে। তাদের সবচেয়ে বড়ো দেবতা ছিল আলমাকা। তাদের বাদশাহ সে দেবতার উকিল হিসাবে আনুগত্যের হকদার বলে নিজেকে মনে করতো। ইয়েমেনে বহুসংখ্যক এমন শিলালিপি পাওয়া গেছে যার থেকে জানা যায় যে গোটা দেশ এসব দেব দেবীর বিশে করে আল মাকার মন্দিরে ভরপুর থাকতো। প্রত্যেক ব্যাপারে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হতো।(ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, প্রাচীনকালে সাবা জাতির মধ্যে এমন এক দল লোক ছিল যারা দেবদেবীর পরিবর্তে এক আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখতো। সম্প্রতি প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে ইয়েমেনের ধ্বংসস্তূপ থেকে যেসব শিলালিপি পাওয়া গেছে তাতে এ ক্ষুদ্র দলটির চিহ্ন পাওয়া যায়। ৬৫০ খৃষ্টপূর্বের কাছাকাছি সময়ের কিছু শিলালিপি এ স্বাক্ষর বহন করে যে, সাবা রাজ্যের স্থানে স্থানে এমন কিছু উপাসনাগার নির্মিত ছিল যেগুলো আসমানের প্রভুর (রাব্বুস সামায়ে) ইবাদাতের জন্যে নির্দিষ্ট ছিল। কোন কোন স্থানে ঐ খোদার নাম(আরবী*)(এমন বাদশাহ যিনি আকাশের প্রভু)লিখিত পাওয়া গেছে। এ দলটি ক্রমাগত কয়েক শতাব্দী যাবত ইয়েমেনে বিদ্যমান ছিল। ৩৭৮ খৃষ্টাব্দের একটি শিলালিপিতে এ শব্দগুলো লিখিত পাওয়া যায় (*****আরবী***) অর্থাৎ ঐ খোদার সাহায্য সহযোগিতায় যিনি আসমান ও যমীনের মালিক। সে সময়ের আর একটা শিলালিপিতে (৪৫৮ খৃঃ) সেই খোদার জন্যে রহমান শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। মূর শব্দগুলো হচ্ছে (*****আরবী****)অর্থাৎ রহমানের সাহায্যে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আয যারিয়াত, টীকা-৩৫)

প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের আধুনিক অনুসন্ধানের ব্যাপারে ইয়েমেন থেকে প্রায় তিন হাজার শিলালিপি সংগ্রহ করা হয়েছে যা ঐ জাতির ইতিহাসের উপর আলোকপাত করে।তার সাথে যদি আরব, রোমীয় এবং গ্রীক ইতিহাসের বর্ণনা একত্র করা হয় তাহলে তাদের বিস্তারিত ইতিহাস রচনা করা যায়। এসব বর্ণনা মতে তাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ যুগসমূহ নিম্নরুপঃ

খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ সালের পূর্বেকার যুগ

এ সময়ে সাবারাজদের উপাধি ছিল মুকাররেব (***আরব***) খুব সম্ভব এ শব্দটি (*****আরবী***) শব্দেরই সমার্থবোধক। তার অর্থ এই যে, এ বাদশাহ মানুষ এবং খোদার মধ্যে নিজেকে মাধ্যম বলে মনে করতো অথবা অন্য কথায় তারা ছিল গণক রাজা(Priest King)সে সময়ে তাদের রাজধানী ছিল সিরওয়াহ যার ধ্বংসাবশেষ আজও মারেব থেকে পশ্চিম দিকে একদিনের পথে দেকতে পাওয়া যায় যা খারীবা নামে খ্যাত। এ সময়ে মারেবের প্রখ্যাত বাঁধের ভিত্তি স্থাপন করা হয় এবং বিভিন্ন সময় সাবার বাদশাহগণ তাকে প্রসারিত করেন।

খৃষ্টপূর্ব ৬৫০ থেকে খৃষ্টপূর্ব ১১৫ পর্যন্ত সময়কাল

এ যুগে সাবার বাদশাহগণ মুকারবের উপাধি পরিহার করে মালিক (অর্থাৎ বাদশাহ) উপাধি ধারণ করেন। তার অর্থ এই যে, রাজ্য পরিচালনায় ধর্মের স্থানে রাজনীতি এবং ধর্মহীনতার প্রভাব বেড়ে যায়। সে সময়ে সাবার বাদশাহগণ সিরওয়ার পরিবর্তে মারেবে তাদের রাজধানী স্থাপন করে এবং তার অসাধারণ উন্নতি সাধন করে। এ স্থানটি সমুদ্রের ৩৯০০ ফুট উচ্চে সানয়া থেকে ষাট মাইল পূর্বদিকে অবস্থিত। আজ পর্যন্ত তার ধ্বংসাবশেষ সাক্ষ্য দেয় যে, এ এককালে একটি সুসভ্য জাতি ছিল।

খৃষ্টপূর্ব ১১৫ থেকে ৩০০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল

এ সময়ে সাবা রাজ্যে হিমইয়ার গোত্র বিজয়ী হয়- যা ছিল সাবা জাতিরই একটি গোত্র এবং সংখ্যায় তারা সকল গোত্র থেকে অধিক ছিল। এ সময়ে মারেবকে জনশূন্য করে রায়দানে রাজধানী স্থাপন করা হয়। এটি ছিল ইমইয়ার গোত্রের কেন্দ্রীয় আবাসভূমি। পরে এ শহরটি যাফার নামে অভিহিত হয়। আজকাল বর্তমান শহর ইয়ারিমের নিকটবর্তী একটি গোলাকার পাহাড়ের উপর তার ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। তার নিকটবর্তী অঞ্চলে হিমইয়ার নামে একটি ক্ষুদ্র গোত্র বসবাস করে যাদেরকে দেখে এ ধারণাই করা যায় না যে, এ গোত্রটি তাদেরই স্মৃতি বহন করছে, এক সময়ে যাদের দুনিয়া জোড়া প্রতিপত্তি ছিল। এ সময়ে রাজ্যের একটা অংশ হিসাবে প্রথম (আরবী***)শব্দ ব্যবহৃত হয় এবংয় ক্রমশ গোটা অঞ্চলের নাম ইয়েমেন হয়ে যায়। ইয়েমেন আরবের দক্ষিণপশ্চিম কোণে অবস্থিত আসীর থেকে আদিন পর্যন্ত এবং বাব আলমান্দারব থেকে হাজরমাওত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ যুগেই সাবায়ীদের পতন শুরু হয়।

তিনশত খৃষ্টাব্দ থেকে ইসলামের অভ্যুদয় পর্যন্ত সময়কাল

এ যুগ ছিল সাবা জাতির ধ্বংসের যুগ। এ যুগে তাদের মধ্যে ক্রমাগত গৃহযুদ্ধ চললে বাইরের জাতিগুলো হস্তক্ষেপ শুরু করে। ব্যবসা বাণিজ্য ও কৃষিকার্যে চরম অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত সাবা জাতি তাদর স্বাধিনতাও হারিয়ে ফেলে। রায়াদানা, হিমইয়ারী এবং হামদানীদের মধ্যে কলহ বিবাদের সুযোগ নিয়ে ৩৪০ খৃষ্টাব্দ থেকে ৩৭৮ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত হাবশীগণ ইয়েমেন তাদের অধিকারভুক্ত করে রাখে, তারপর আযাদী পুনর্বহাল হলেও মারেবের বিখ্যাত বাঁধে ফাটল শুরু হয়। অবশেষে ৪৫০ অথবা ৪৫১ খৃষ্টাব্দে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে এক বিরাট বন্যা হয় যার উল্লেখ সূরা সাবাতে রয়েছে। যদিও তার পরে আবরাহার যুগ পর্যন্ত এ বাঁধের ক্রমাগত মেরামত হতে থাকে। তথাপি যে জনসংখ্যা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল তা পুনরায় একত্র হতে পারেনি। সেচকার্য এবং কৃষির ব্যবস্থাপনা নষ্ট হবার পর তা আর পুনর্বহাল হতে পারেনি।(সাবা জাতি এমনভাবে ক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যে, তা একটা প্রবাদে পরিণত হয়। আজও যদি কোন আরববাসী কারো বিচ্ছিন্ন হওয়ার উল্লেখ করে তাহলে বলে যে, সাবা জাতির মতো বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। আল্লাহ তা আলার পক্ষ থেকে যখন তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে ভাটা পড়া শুরু হলো, তখন তাদের বিভিন্ন গোত্র নিজেদের আবাসভূমি ছেড়ে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। আওস এবং খাজরাজ গোত্র দুটি ইয়াসরিবে গিয়ে বসতিস্থাপন করে। খুযারা গোত্র জিদ্দার নিকটবর্তী তিহামা অঞ্চলে বসবাস করতে থাকে। আযদ গোত্র ওমানে গিয়ে বসতিস্থাপন করে। লাকম, জুযাম এবং কিম্মাহ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত সাবা বলে কোন জাতির নামই দুনিয়াতে রইলো না। তার উল্লেখ শুধু গল্প কাহিনীর মধ্যেই রয়ে গেল।)(সূরা আন নামল, টীকা–২৯)৫২৩ খৃষ্টাব্দে ইয়েমেনের ইহুদী বাদশাহ যু নোয়াস নাজরানের খৃষ্টানদের উপর চরম অত্যাচার উৎপীড়ন করে, যার উল্লেখ কুরআন মজিদের আসহাবুল উখদুদ নামে করা হয়েছে। তারপর আবিসিনিয়ার খৃষ্টান সরকার প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে ইয়েমেন আক্রমণ করে সমগ্র দেশ জয় করে। তারপর ইয়েমেনের হাবশী ভাইসরয় আবরাহা কাবা ঘরের কেন্দ্রীয় মর্যাদা নষ্ট করার জন্যে এবং মারেবের গোটা পশ্চিমাঞ্চল রোমীর হাবশী প্রভাবাধীন করার জন্যে ৫৭০ অথবা ৫৭১ খৃষ্টাব্দে (নবী (সা) এর জন্মের কিছু দিন পূর্বে) মক্কা আক্রমণ করে। কিন্তু তার গোটা সেনাবাহিনীর উপর এমন ধ্বংসলীলা নেমে আসে যা কুরআন মজিদে আসহাবে ফীল নামে বর্ণিত হয়েছে। অবশেষে ৫৭৫ খৃষ্টাব্দে ইরানীগণ ইয়েমেন অধিকার করে এবং ৬২৮ খৃষ্টাব্দে ইরানী গভর্নর বাযান ইসলাম গ্রহণ করার পর ইয়েমেনে ইরানী অধিকার শেষ হয়ে যায়।

সাবা জাতির বৈষয়িক উন্নতি

সাবা জাতির উন্নতি আসলে দুটি কারণ হয়েছে, এক কৃষি এবং দ্বিতীয় ব্যবসা বাণিজ্য। সেচের সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষির এমন উন্নতি সাধন করা হয়েছিল সে, অতীত কালে এ ধরনের সেচ ব্যবস্থা বেবিলন ছাড়া আর কোথাও ছিল না। তাদের দেশে স্বাভাবিক কোন নদ নদী ছিল না। বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নালা বয়ে পানি আসতো। স্থানে স্থানে এসব নালায় বাঁধ নির্মাণ করেও জলাধার তৈরী করে তার থেকে খাল কেটে কেটে গোটা দেশে এমনভাবে পানি পৌঁছে দেয়া হতো যে, কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী চারদিকে শুধু বাগ বাগিচাই নজরে পড়তো। এ সেচ ব্যবস্থাপনার সর্ববৃহৎ জলাধার ছিল মারেব শহরের নিকটবর্তী বালক পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকায় যা বাঁধ নির্মাণ করে তৈরী করা হয়েছিল। কিন্তু যখন তাদের থেকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর করুণা দৃষ্টি ফিরিয়ে নেন, তখন খৃষ্টীয় পঞ্চ শতাব্দীতে, মধ্যবর্তী সময়ে এ বিরাট বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং তার থেকে যে প্রবল বেগের ন্যায় স্রোত প্রবাহিত হয় তার ফলে একটির পর একটি করে সকল বাঁধ ভেঙ্গে যায়, এভাবে সমগ্র সেচ ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। এ ব্যবস্থাপনা আর বহাল করা সম্ভব হয়নি।(কুরআন মজীদে এ ধ্বংসাত্মক শাস্তির সুস্পষ্ট বিবরণ রয়েছে।)ব্যবসার জন্যে আল্লাহ এ জাতিকে সর্বোত্তম ভৌগলিক ভূখণ্ড দান করেছিলেন যার প্রভূত সুযোগ তারা গ্রহণ করেছে। এক হাজার বছরেরও বেশী সময় পর্যন্ত এ জাতি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে ব্যবসার মাধ্যম হিসাবে কাজ করতো। একদিকে তাদের বন্দরগুলোতে চীনের রেশম, ইন্দোনেশিয়া এবংয় মালাবারের গরম মশলা, ভারতের কাপড় ও তরকারী, পূর্ব আফ্রিকার নিগ্রো ক্রীতদাস, বানর, উটপাখির পালক এবং হাতীর দাঁত পৌঁছতো এবং অন্যদিকে তারা এসব পণ্যদ্রব্যাদি মিসর ও শামের বাজারে পাঠিয়ে দিত এবং সেখান থেকে রোম, গ্রীক প্রভৃতি দেশে পৌঁছে যেতো। উপরন্তু তাদের দেশে লোবান, চন্দনকাঠ, মৃগনাভি এবং আরও বিভিন্ন প্রকারের সুগন্ধি দ্রব্যাদি ও নির্যাস পাওয়া যেতো। এসব দ্রব্যাদি মিসর, শাম, রোম ও গ্রীসের লোক হাতে হাতে নিয়ে যেতো। এ বিরাট ব্যবসা বাণিজ্যের দুটি পথ ছিল। একটি জলপথ এবং অন্যটি স্থলপথ। সমুদ্রপথে ব্যবসা বাণিজ্যের ঠিকাদারি এক হাজার বছর পর্যন্ত সাবায়ীদের হাতে ছিল। কারণ লোহি সাগরে মৌসুমি বায়ু, সাগর গর্ভের পাহাড় পর্বত এবং জাহাজ নোংগরবদ্ধ করার স্থানসমূহের রহস্য একমাত্র তাদেরই জানা ছিল। অন্য কোন জাতি এ ভয়ানক সাগরে জাহাজ চালাতে সাহস করতো না। এ সমুদ্র পথে তারা তাদের পণ্যদ্রব্য জর্দান ও মিসরের বন্দরগুলোতে পৌছিয়ে দিত। স্থলপথ আদন এবং হাজরামাওত থেকে মারেব এ গিয়ে মিলিত হতো। তারপর সেখান থেকে একটি রাজপথ মক্কা, জেদ্দা, ইয়াসরেব, আল উলা, তাবুক এবং আয়লা হয়ে পেট্রা পর্যন্ত পৌছতো। তারপর একটি পথ মিসরের দিকে এবং অন্যটি শামের দিকে যেতো এ স্থলপথে, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে। ইয়েমেন থেকে শাম সীমান্ত পর্যন্ত তাদের উপনিবেশগুলো একটানা বিস্তার লাভ করেছিল এবং দিনরাত এ পথ দিয়েই তাদের ব্যবসায়ী কাফেলা চলাচল করতো। এ অঞ্চলে আজও তাদের অনেক উপনিবেশের ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান আছে এবং এখানে সাবায়ী এবং হুমায়রী ভাষায় শিলালিপি পাওয়া যায়।

বাণিজ্যিক পতনের সূচনা

প্রথম খৃষ্টীয় শতাব্দী নাগাদ তাদের ব্যবসা বাণিজ্যের পতন শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যে গ্রীক এবং পরে রোমীয়দের শক্তিশালী রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো তখন তাদের পক্ষ থেকে এ দাবী উঠতে থাকলো যে, যেহেতু আরব ব্যবসায়ীগণ ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার লাভ করে প্রাচ্যের পণ্যদ্রব্যের খুশীমতো মূল্য আদায় করছে, সেজন্যে এখন প্রয়োজন হলো, সম্মুখে অগ্রসর হয়ে আমরাই এ ব্যবসা হস্তগত করব। এ উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম মিসরের গ্রীক বংশোদ্ভূত শাসক দ্বিতীয় বাতলিমুস (২৮৫-২৪৬খৃঃ পূঃ) সে পুরাতন খাল নতুন করে উন্মুক্ত করে যা সতেরোশ বছর পূর্বে ফেরাউন সেসুসিতরিকস নীলনদকে লোহিত সাগরের সাথে মিলিত করার জন্যে কেটেছিল। এ খালের মধ্য দিয়েই প্রথম মিসরীয় রণতরী লোহিত সাগরে প্রবেশ করে। কিন্তু সাবায়ীদের মুকাবিলায় এ চেষ্টা বিশেষ ফলবতী হয় না। অতঃপর রোমীয়গণ মিসরের উপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে। তখন রোমীয়গণ অধিকতর শক্তিশালী বাণিজ্যপোত লোহি সাগরে প্রেরণ করে এবং তার পেছনে একটা যুদ্ধ জাহাজও পাঠায়। এ শক্তির মোকাবেলা করা সাবাযীদের সাধ্যের অতীত ছিল। রোমীয়গণ স্থানে স্থানে পোতাশ্রয়গুলোতে তাদের বাণিজ্যিক উপনিবেশ কায়েম করে। এগুলোতে জাহাজের সকল প্রয়োজন মেটাবার ব্যবস্থা করে। তারপর যেখানে তারা প্রয়োজন মনে করে সেখানে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করে। অবশেষে আদনে তাদের সামরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ব্যাপারে রোমীয় এবং হাবশী শাসকগণ একজোট হয়ে সাবায়ীদের স্বাধীনতা হরণ করে।

সমুদ্র পথে ব্যবসা বাণিজ্য হাত ছাড়া হওয়ার পর শুধু স্থলপথের বাণিজ্যই সাবায়ীদের হাতে রয়ে যায়। কিন্তু এমন বহু বারণ ছিল যার ফলে ক্রমশ তাদের শক্তি চূর্ণ হয়। প্রথমতঃ নাবতীগণ পেট্রা থেকে আলউলা পর্যন্ত হেজাজের মালভূমি এবং জর্দানের যাবতীয় উপনিবেশ থেকে সাবায়ীদের বহিষ্কৃত করে। তারপর ১০৬ খৃষ্টাব্দে রোমীয়গণ সাবায়ী সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায় এবং হেজাজের সীমান্ত বরাবর শাম ও জর্দানের সমস্ত অঞ্চল তাদের হস্তগত করে। তারপর আবিসিনিয়া এবং রোমের যুগ্ন প্রচেষ্টা ছিল সাবায়ীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহের সুযোগে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য ধ্বংস করা। এ জন্যে বার বার আবিসিনিয়া ইয়েমেনের উপর হস্তক্ষেপ করতে থাকে। অবশেষে তারা গোটা দেশটিকে তাদের অধিকারভুক্ত করে ফেলে।

আযাব নাযিলের পূর্বে তাদের বিলাস বহুল সভ্যতা

এভাবে আল্লাহ তায়ালার গজব এ জাতিকে উন্নতির শিখর থেকে এমন এক ধ্বংস গহ্বরে নিক্ষেপ করে যে, সেখান থেকে কোন অভিশপ্ত জাতি আর মস্তক উত্তোলন করতে পারেনি।এমন এক সময় ছিল যখন তাদের ধন দৌলতের গল্প শুনে শুনে গ্রীক এবং রোমীয়দের জিহ্বায় পানি আসতো। স্ট্রাবো বলেন যে, তারা স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈজসপত্র ব্যবহার করতো। তাদের বাড়ীর ছাদ, দেওয়াল ও দরজা হাতীর দাঁত, স্বর্ণ, রৌপ্য ও মণি মাণিক্য খচিত ছিল। প্লিনি বলেন, রোম ও পারস্যের ধন সম্পদ তাদের দিকে প্রবাহিত হতো। এ জাতি তৎকালীন দুনিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী ছিল এবং তাদের সুজলা সুফলা দেশ, বাগ বাগিচা, শস্যক্ষেত্র ও গৃহপালিত পশুতে পরিপূর্ণ ছিল। আর.টি. মিডোরাস বলেন, তারা ভোগবিলাসে বিভোর থাকতো এবং জ্বালানী কাঠের পরিবর্তে দারুচিনি, চন্দন এবং অন্যান্য সুগন্ধ কাঠ জ্বালাত। এমনিভাবে অন্যান্য রোমীয় ঐতিহাসিক-গন বর্ণনা করেন যে, তাদের অঞ্চলের নিকটস্থ সমুদ্রতীর ধরে বাণিজ্য জাহাজগুলো চলার সময় সে সব সুগন্ধ কাঠের ঘ্রাণ পাওয়া যেতো। ইতিহাসে তারাই প্রথম সানআর উচ্চ মালভূমিতে গগনচুম্বী অট্টালিকা (Sky Scrapers)নির্মাণ করে যা কাসরে গুমদান (গুমদান প্রাসাদ) নামে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করে। আরব ঐতিহাসিকগণ বলে, অট্টালিকাটি ছিল বিশতলা বিশিষ্ট এবং প্রত্যেক তলার উচ্চতা ছিল ৩৬ ফুট।

যতদিন আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ ছিল ততদিনই তাদের এ সুখের দিন ছিল। তারা যখন আল্লাহর দেয়া সম্পদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরিবর্তে কৃতঘ্নতা ও নিমকহারামির সীমালঙ্ঘন করে তখন শক্তিমান প্রভু আল্লাহ তায়ালার কৃপাদৃষ্টি তাদের থেকে চিরদিনের জন্যে উঠে যায় এবং তাদের নাম নিশানাও মিটে যায়।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আন নামল, টীকা-৩০)

চিত্র – সামুদ জাতির এলাকা।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.