সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

আহলে মাদইয়ান ও আসহাবে আয়কাহ

তাফসীরকারগণের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ আছে যে, আহলে মাদইয়ান ও আসহাবে আয়কাহ কি দুটি পৃথক জাতি, না একই জাতির দুটি পৃথক পৃথক নাম। একদলের অভিমত এই যে, এ দুটি আলাদা আলাদা জাতি এবং তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ এই যে, সূরা আল আরাফে হযরত শু্য়াইব(আ) কে আহলে মাদইয়ানের ভাই বলা হয়েছে(*****আরবী****)এবং এখানে আসহাবে আয়কাহ এর উল্লেখ প্রসঙ্গে শুধু এতটুকু বলা হয়েছে (*****আরবী****) যখন শুয়াইব তাদেরকে বললেন। তাদের ভাই কথাটি ব্যবহার করা হয়নি। পক্ষান্তরে কতিপয় তাফসীরকার উভয়কে একই জাতি বলে অভিহিত করেন। কারণ সূরা আল আরাফে এবং হূদে আসহাবে আয়কাহ এর বেলায়ও বলা হচ্ছে। হযরত শুয়াইব (আ) এর দাওয়াত ও নসীহত একই ধরনের এবং অবশেষে তাদের পরিণামেও কোন পার্থক্য নেই।

ঐতিহাসিক তত্ত্বানুসন্ধান

তত্ত্বানুসন্ধানে জানা যায় যে, উভয় উক্তিই ঠিক। আসহাবে মাদইয়ান এবং আসহাবে আয়কাহ নিঃসন্দেহে দুটি পৃথক গোত্র। কিন্তু এই বংশের দুটি পৃথক শাখা। হযরত ইবরাহীম (আ) এর সন্তানগণের মধ্যে যাঁরা তাঁর দাসী কাতুরার গর্ভজাত ছিলেন, তারা আরব ও ইসরাইলী ইতিহাসে বনী কাতুরা নামে অভিহিত হন। তাঁদের মধ্যে একটি অতি প্রসিদ্ধ গোত্র মাদইয়ান বিন ইবরাহীমের বংশোদ্ভূত বিধায় মিদইয়ানী অথবা আসহাবে মাদইয়ান বলে অভিহিত হয়। তাদের জনসংখ্যা উত্তর হেজাজ থেকে ফিলিস্তিনের দক্ষিণাংশ পর্যন্ত এবং সেখান থেকে সিনাই উপত্যকার শেষাংশ পর্যন্ত আকাবা উপসাগর ও লোহিত সাগরের তটভূমির উপরে ছড়িয়ে পড়ে। মাদইয়ান শহর ছিল তাদের প্রধান কেন্দ্রস্থল এবং আবুল ফেদার মতে তা অবস্থিত ছিল আকাবা উপসাগরের পশ্চিম তীর আয়লা (বর্তমান আকাবা) থেকে পাঁচদিনের পথে।বনী কাতুরার বাকী অংশ উত্তর আরবে তাইমা, তাবুক এবং অল উলার মধ্যবর্তীস্থানে বসতিস্থাপন করে। তাদের মধ্যে বনী দেদান(Dedanites)অধিকতর খ্যাতিসম্পন্ন চিল। তাবুক ছিল তাদের প্রধান কেন্দ্রস্থল, যাকে প্রাচীনকালে আয়কাহ বলা হতো। (মুজামুল বুলদানে আয়কাহ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, এ ছিল তবুকের প্রাচীন নাম এবং তবুকবাসীদের মধ্যে এ কথা সাধারণভাবে প্রচলিত আছে যে, কোন এক সময়ে এ স্থানেই আয়কাহ বসবাস করতো)

উভয় গোত্রের জন্যে একই নবী কেন?

আসহাবে মাদইয়ান এবং আসহাবে আয়কার জন্যে একই নবী প্রেরণের কারণ সম্ভবত এই ছিল যে, উভয়ে একই বংশোদ্ভূত চিল। তারা একই ভাষায় কথা বলতো এবং তাদের বসবাসের অঞ্চলগুলো পরস্পর মিলিত ছিল। এটাও হতে পারে যে, কোন কোন অঞ্চলে তারা একত্রেই বসবাস করতো এবং বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে তারা একই সমাজভূক্ত হয়ে পড়েছিল। উপরন্তু বনী কাতুরার এসব শাখার লোকদের পেশা ছিল ব্যবসা এবং উভয়ের মধ্যে এই ধরনের দুর্নীতি বিদ্যমান ছিল তাদের ব্যবসা বাণিজ্যে।একই ধরণের ধর্মীয় ও নৈতিক ব্যাধিও তাদের মধ্যে ছিল।বাইবেলের আদি পুস্তকগুলোর স্থানে স্থানে উল্লেখ আছে যে, তারা বালে ফাগুরের পূজা করতো এবং বনী ইসরাইল যখন মিসর থেকে বের হয়ে তাদের অঞ্চলে এলো তখন এদের মধ্যেও তারা শিরক ও ব্যভিচারের মহামারী ছড়িয়ে দেয় (গণনা পুস্তক অধ্যায় ২৫: স্তোত্র ১-৫)। আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের দুটি বড়ো রাজপথে তাদের বসতি ছিল। এ দুটি পথ চলে গিয়েছে ইয়েমেন থেকে সিরিয়া এবং পারস্য উপসাগর থেকে মিসর পর্যন্ত। এ দুটি রাজপথের উপরে তাদের বসতি অবস্থিত হওয়ার বারণে তারা ব্যাপক আকারে রাহাজানি ও লুটতরাজ করতো। ভিন্ন জাতির ব্যবসায়ী কাফেলাগুলোর নিকট থেকে মোটা অংকের খাজনা না নিয়ে যেতে দিত না। আন্তর্জাতিক ব্যবসার উপরে নিজেদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে তারা এ দুটি পতে নিরাপত্তা বিপন্ন করে রেখেছিল। কুরআন মজিদে তাদের অবস্থা সম্পর্কে এরূপ বলা হয়েছে(*****আরবী****) এ দুটি জাতি (লূত ও আয়কাহবাসী) উন্মুক্ত রাজপথে অবস্থান করতো। তাদের রাহাজানির উল্লেখ সূরা আল আরাফে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে(*****আরবী****) প্রতিটি পথে ঘাটে মানুষকে ভয় দেখাবার জন্যে বসে থেকো না। এসব কারণেই আল্লাহ তায়ালা এ দুগোত্রের জন্যে একই নবী পাঠান এবং তাদেরকে একই ধরনের শিক্ষাদান করেন।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আস সাবা, টীকা -৩৫)

মাদইয়ানবাসীদের সম্পর্কে আরও বিশদ বিবরণ(যেহেতু এটি ছিল একটি বৃহত্তর গোত্র এবং কুরআন হযরত শুয়াইব (আ) কে তাদের অতি নিকট সম্পর্কের লোক বলে উল্লেখ করেছে, সে জন্যে তাদের সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।–সংকলক)

মাদইয়ানের প্রকৃত আবাস্থল হেজাজের উত্তর পশ্চিমে এবং ফিলিস্তিনের দক্ষিণে লোহিত সাগর এবং আকাবা উপসাগরের তটভূমিতে অবস্থিত ছিল, যদিও সিনাই উপত্যকার পূর্ব তীরেও তাদের কিছু বসতি ছড়িয়ে ছিল। তারা ছিল একটি ব্যবসাজীবী জাতি। প্রাচীনকালে যে বাণিজ্যিক রাজপথ লোহিত সাগরের তীরে তীরে ইয়েমেন থেকে মক্কা ও ইয়াম্বু হয়ে সিরিয়া (শাম) পর্যন্ত যেতো এবং দ্বিতীয় যে বাণিজ্যিক রাজপথ ইরাক থেকে মিসর যেতো, এ দুটি রাজপথের মোহনায় এ জাতির বসতি ছিল। তারা নির্মূল হওয়ার পরও তাদের খ্যাতি অক্ষুণ্ণ ছিল। কারণ আরববাসীদের বাণিজ্য কাফেলা মিসর ও সিরিয়া যাবার পতে রাতদিন তাদের ধ্বংসাবশেষ অতিক্রম করেই যেতো।

মাদইয়ানবাসীদের সম্পর্কে আর একটি প্রয়োজনীয় কথা যা বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে তাহলো এই যে, তারা হযরত ইবরাহীম (আ) এর তৃতীয়া বিবি কাতুরার গর্ভজাত পুত্র মিদইয়ানের বংশধর ছিল। প্রাচীনকালের প্রথা অনুযায়ী যারা কোন মহান লোকের সাথে বংশীয় সম্পর্ক রাখতো তাদেরকে বনী অমুক বলা হতো। হযরত ইয়াকুব (আ) এর সন্তানদের হাতে ইসলাম গ্রহণকারী সকলে বনী ইসরাইল নামে অভিহিত হয়। এভাবে মাদইয়ান অঞ্চলের সকল অধিবাসী যারা মিদইয়ান বিন ইবরাহীম (আ) এর প্রভাবাধীন ছিল বনী মিদইয়ান নামে অভিহিত এবং তাদের দেশের নাম মাদইয়ান অথবা মিদইয়ান হয়ে পড়ে। এ ঐতিহাসিক তত্ত্ব জানার পর এ ধারণা করার কোনই কারণ থাকতে পারে না যে, এ জাতিকে দীনে হকের দাওয়াত সর্বপ্রথম হযরত শুয়াইব (আ) পৌঁছিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে বনী ইসরাইলের মতো সূচনাতে তারাও মুসলমান চিল এবং হযরত শুয়াইব (আ) এর আবির্ভাবের সময় তাদের অবস্থা ছিল একটা অধঃপতিত জাতির ন্যায়, যেমন হযরত মূসা(আ) এর আবির্ভাবের সময় বনী ইসরাঈলের অবস্থা ছিল। হযরত ইবরাহীম (আ) এর পর ছ সাতশ বছর পর্যন্ত মুশরিক ও চরিত্রহীন জাতির মধ্যে বসবাস করতে করতে তারা শিরকের রোগে আক্রান্ত হয় এবং চরিত্রহীনতায় নিমজ্জিত হয়। এর পরেও ঈমানের দাবী ও তার উপর তাদের গর্ব অক্ষুণ্ণ ছিল।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ সাবা, টীকা৩৫)

সংস্কার সংশোধনের আহবানের প্রতিক্রিয়া

(*****আরবী*****)

জাতির সরদারগ যারা তাঁর শুয়াইব (আ) কথা মানতে অস্বীকার করেছিল পরস্পর বলাবলি করতো, তোমরা যদি শুয়াইবের আনুগত্য কর, তাহলে বরবাদ হয়ে যাবে। -সূরা আল আরাফঃ৯০

হযরত শুয়াইব (আ) সংস্কার সংশোধনের যে দাওয়াত পেশ করেছিলেন তার জবাবে মাদইয়ানের সরদার ও নেতাগণ বলতো এবং জাতিকে এ কথার নিশ্চয়তা দান করতো, শুয়াইব (আ) যে ধরনের ঈমানদারি ও সততার দাওয়াত দিচ্ছেন এবং চরিত্র ও বিশ্বস্ততার যে শাশ্বত নীতি মেনে চলতে বলছেন তা যদি মেনে নেয়া হয় তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের ব্যবসা বাণিজ্য কিভাবে চলবে যদি আমরা সততার অনুসরণ করি ও খাঁটিভাবে কেনা বেচা করি? আমরা দুনিয়ার সর্ববৃহৎ ব্যবসার রাজপথের মোহনায় বাস করি এবংয় মিসর ও ইরাকের মতো দুটি বিরাট সভ্যতামন্ডিত রাজ্যের সীমান্তে অবস্থান করি। যদি আমরা বাণিজ্য কাফেলাগুলোকে বেকায়দায় ফেলা বন্ধ করে দেই এবং নিজেরা ভালো মানুষের মতো শান্তিপ্রিয় হয়ে যাই তাহলে বর্তমান ভৌগলিক অবস্থানের কারণে আমরা যেসব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা লাভ করছি তা সব বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর পার্শ্ববর্তী জাতিগুলোর উপর আমাদের যে প্রতিপত্তি রয়েছে তাও থাকবে না।

একথা ও দৃষ্টিভঙ্গি শুধু শুয়াইব(আ) এর জাতির সরদারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রত্যেক যুগেই প্রত্যেক যুগেই পথভ্রষ্ট লোকেরা হক, সততা ও বিশ্বস্ততার ব্যাপারে এ ধরনেরই আশংকা অনুভব করেছে। প্রত্যেক যুগের দুষ্কৃতিগণের এ ধারণাই ছিল যে, ব্যবসা বাণিজ্য, রাজনীতি এবং অন্যান্য দুনিয়াবি ও বৈষয়িক কর্মকাণ্ড বেঈমানি ও দুর্নীতি ছাড়া চলতে পারেনা। প্রত্যেক স্থানেই দাওয়াতে হকের মুকাবিলায় যে ওজর আপত্তি পেশ করা হয়েছে সে সবের মধ্যে এও একটি যে, দুনিয়ার প্রচলিত পথ ও পন্থা থেকে সরে গিয়ে যদি দাওয়াতে হকের অনুসরণ করা হয় তাহলে জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে।(তাফহীমুল কুরআন, সূরা আশ সাবা, টীকা-৩৭)

মাদইয়ানবাসীর উপর আযাব

মাদইয়ানবাসীর উপর ভয়ানক বিস্ফোরণ ও ভূমিকম্পের(আরবী*) আকারে শাস্তি নেমে এসেছিল। তাদের এ ধ্বংসলীলা দীর্ঘকাল ধরে পার্শ্ববর্তী জাতিসমূহের জন্যে দৃষ্টান্তস্বরূপ ছিল। গীত সংহিতার এক স্থানে আছে, হে খোদা! অমুক অমুক জাতি তোমার বিরুদ্ধে শপথ গ্রহণ করেছে। অতএব তুমি তাদের সাথে সেই আচরণই কর যা তুমি মিদইয়ানের সাথে করেছো-(৮৩:৫-৯)। ইয়াহইয়া নবী এক স্থানে ইসরাইলীদেরকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন, আশিরিয়দেরকে ভয় করো না। যদিও তারা তোমাদের জন্যে মিসরীয়দের মতোই জালেম হয়ে পড়ছে, কিন্তু সত্বরই সকল সৈন্যের প্রভু তাদের উপর তাঁর চাবুক মারবেন এবং তাদের পরিণতি তাই হবে, যা হয়েছিল মিদইয়ানদের। -যিশাইয়১০: ২১-২৬)(সূরা আশ শূয়ারা, টীকা -১১৫)

আয়কাহ বাসীদের উপর আযাব

(*****আরবী*****)

তারা তাকে মিথ্যা মনে করেছিল। অবশেষে ছাতা বিশিষ্ট দিনের আযাব তাদের উপর এসে পড়লো। আর সে ছিল এক ভয়ংকর দিনের আযাব। সূরা শূয়ারাঃ১৮৯

তাদের উপর যে আযাব নাযিল হয়েছিল তার কোন বিবরণ কুরআনে অথবা সহীহ হাদীসে পাওয়া যায় া। বাহ্যিক শব্দগুলো থেকে যা বুঝতে পারা যায় তাহলো এই যে, যেহেতু তারা আসমানী আযাব চেয়েছিল, সে সেজন্য আল্লাহ তায়ালা তাদের উপরে একটি মেঘ পাঠিয়ে দেন যে, তাদের উপর ছাতার মতো ছাড়া দান করতে থাকে যতক্ষণ না আযাব তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কুরআন থেকে একথা সুস্পষ্টরূপে জানতে পারা যায় যে, মাদইয়ান বাসীদের আযাবের ধরন আয়কাহবাসীদের আযাব থেকে আলাদা ছিল। যেমন এখানে বলা হয়েছে যে ছাতাওয়ালা আযাব দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করা হয় এবং তাদের উপর আযাব এসেছিল বিস্ফোরণ ও ভূমিকম্পের আকারে। এজন্যে এ দুটিকে মিলিয়ে একটি কাহিনী রচনা করার প্রচেষ্টা সঠিক নয়। কোন কোন তাফসীরকার ছাতাওয়ালা দিনের আযাবের কিছু ব্যাখ্যা দান করেছেন। কিন্তু আমরা জানি না তাঁদের এ জ্ঞানের উৎস কি। ইবনে জারীর হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস(রা) এর উক্ত উদ্ধৃত করে বলেন- (*****আরবী****)

ছাতাওয়ালা দিনের আযাব কি ছিল, তা যদি আলেমদের মধ্যে কেউ বলে, তাহলে তাকে সঠিক মনে করো না।(তাফহীমুল কুরআন সূরা আল আরাফ, টীকা-৬৯)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.