সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

হযরত ইউনুস (আ) এর জাতি

হযরত ইউনুস (আ) এর জীবনকাহিনী

বাইবেলে হযরত ইউনুস (আ) কে ইউনাহ বলা হয়েছে এবং তাঁর জীবনকাল ৮৬০ -৭৮৪ খৃষ্টপূর্ব।

হযরত ইউনুস(আ) (কুরআনে কোথাও নাম নেয়া হয়েছে এবং কোথাও যুন্নুন এবং কোথাও সাহেবুল হুত বা মাওয়ালা বলা হয়েছে। মাছওয়ালা এ জন্যে বলা হয়নি যে, তিনি মাছ ধরতেন বা মাছে ব্যবসা করতেন, বরঞ্চ এ জন্যে ডে, আল্লাহর নির্দেশে একটি মাছ তাঁকে গিলে ফেলেছিল। সূরা আস সাফফাত ৪২ আয়াত দ্রঃ

যদিও ইসরাইলী ছিলেন, কিন্তু তাঁকে আশিরিয়দের হেদায়াতের জন্যে ইরাকে পাঠানো হয়। সে জন্যে আশিরিয়দেরকে ইউনুসের জাতি বলা হয়েছে। সে কালে এ জাতির কেন্দ্রীয় আবাসস্থল ছিল বিখ্যাত শহর মিওয়া। যার বহু ধ্বংসাবশেষ আজও দেখতে পাওয়া যায় দাজরা নদীর পূর্বতীরস্থ মুসেল নগরের ঠিক বিপরীত দিকে।এ অঞ্চলে ইউনুস নবী নামে একটি স্থানও বিদ্যমান আছে। এ জাতি কতখানি সমৃদ্ধ ছিল তা এর থেকে অনুমান করা যায় যে, তাদের রাজধানী নিমওয়া প্রায় ষাট বর্গমাইল ব্যাপী বিস্তৃত ছিল।

কুরআন ও বাইবেলে ইউনুস (আ) এর উল্লেখ

কুরআনে শুধু চার স্থানে এ কাহিনীর ইংগিত করা হয়েছে। কোন বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়নি। এ জন্যে নিশ্চিত করে বলা যায় না যে, কোন বিশেষ কারণে এ জাতিকে আল্লাহর এ আইনের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছিল যে, আযাব নাযিলের সিদ্ধান্তের পর কারো ঈমান তার জন্যে ফলপ্রদ হয়না। বাইবেলে ইউনাহ নামে যে সংক্ষিপ্ত সহীফা (আসমানী পুস্তক) রয়েছে তাতে কিছু বিবরণ পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ প্রথমতঃ তাকে আসমানী গ্রন্থ বলা যায় না এবংয় তা ইউনুস(আ) এর স্বহস্তে লিখিতও নয়। বরঞ্চ তাঁর চার পাঁচশত বছর পরে কোন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ইউনুসের ইতিহাস বলে তা লিপিবদ্ধ করে বাইবেলে সন্নিবেশিত করেছে। দ্বিতীয়তঃ তার মধ্যে এমন কিছু আজে বাজে কথা রয়েছে যা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তথাপি কুরআনের ইংগিতসমূহ এবং সহীফায়ে ইউনুসের বিবরণ থেকে এ কথাই সুস্পষ্ট হয় যা তাফসীরকারগণ বর্ণনা করেছেন। তাহলো এই যে হযরত ইউনুস (আ) যেহেতু আযাবের সংবাদ প্রাপ্তির পর আল্লাহর অনুমতি ব্যতিরেকে আপন কর্মস্থল পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন।(অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরত করার নির্দেশ আসার পূর্বেই তিনি তাঁর জাতির প্রতি বিরাগভাজন হয়ে দেশ ত্যাগ করেন। নির্দেশ আসার পর কর্মস্থল ত্যাগ করলে তা জায়েয হতো।(সূরা আল আরাফ, টীকা -৭৪)সে জন্যে আযাব দেখার পর যখন আশিরিয়গণ তওবা ইস্তেগফার করলো, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে মাফ করে দিলেন।(এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্যে তাফহীমুল কুরআন, সূরা আস সাফফাত টীকা ৮৫ দ্রষ্টব্য। এতে অনেক অভিযোগের জবাব দেয়া হয়েছে।) কুরআন পাকে খোদার আইনের যে মূলনীতি ও পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে তার একটি স্থায়ী ধারা এই যে, আল্লাহ তায়ালা কোন জাতিকে ততোক্ষণ পর্যন্ত শাস্তি দেন না যতক্ষণ না তাঁর শর্ত পূরণ হয়েছে। অতএব নবী যখন সে জাতিকে প্রদত্ত অবকাশের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর উপদেশদানের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখলেন না এবং আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই আপন ইচ্ছামত হিজরত করলেন, তখন আল্লাহ তায়ালার সুবিচার সে জাতিকে শাস্তি দেয়া পছন্দ করলো না। কারণ সে জাতির উপর ইতমামে হুজ্জত বা আইনগত শর্তগুলো পূরণ হয়েছিল না।

হযরত ইউনুস (আ) এর জাতির সর্বশেষ ধ্বংস

এ জাতি ঈমান আনার পর তাদের জীবন অবকাশ বর্ধিত করা হয়। অতঃপর চিন্তা ও কর্মের দিক দিয়ে তারা পুনরায় গোমরাহিতে লিপ্ত হয়। নাহুম নবী (৭২০ -৬৯৮)খৃষ্টপূর্বে তাদেরকে সতর্ক করে দনে। কিন্তু তাতে কোন ফল হয় না। তারপর সাফনিয়া নবী(৬৪০ -৬০৯খৃষ্টপূর্ব)তাদেরকে শেষবারের মতো সাবধান করে দেন। তাও নিষ্ফল হয়। অবশেষে ৬০২ খৃষ্টপূর্ব নাগাদ আল্লাহ তায়ালা মিডিয়াবাসীদেরকে তাদের উপর বিজয়ী করে দেন। মিডিয়ার বাদশাহ বেবিলনবাসীদের সহায়তায় আশিরিয়দের উপর আক্রমণ চালায়। আশিরিয় সেনাবাহিনী পরাজিত হয়ে নিমওয়াতে অবরুদ্ধ হয়। কিছুকাল যাবত তারা মোকাবেলা করতে থাকে। তারপর দাজলার জলোচ্ছ্বাসে নগর প্রাচীর ভেঙে যায় এবং আক্রমনকারীরা ভেতরে প্রবেশ করে। তারপর আগুন জ্বালিয়ে গোটা শহর ধ্বংস করা হয়। পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ পর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়। আশিরিয়দের বাদশাহ আপন রাজপ্রাসাদে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে আত্ন্যহত্যা করে। তার সাথে সাথে আশিরিয় রাজ্য ও সভ্যতা চিরদিনের জন্যে নির্মূল হয়ে যায়। বর্তমানকালে সে অঞ্চলে যে প্রত্নতাত্ত্বিক খোদাই কার্য করা হয় তাতে বহু অগ্নি প্রজ্বলিত নিদর্শন পাওয়া যায়(তাফহীমুল কুরআন সূরা আল আরাফ, টীকা-৭৫)।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.