সীরাতে সরওয়ারে আলম – ২য় খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বনী ইসরাঈল

ইবরাহীম (আ) এর বংশের দুটি শাখা

হযরত ইবরাহীম (আ) এর বংশ থেকে দুটি বৃহৎ শাখা উদ্ভূত হয়। একটি শাখায় জন্মগ্রহণ করেন হযরত ইসমাঈল (আ) এর বংশধরগণ। যারা আরবে বসতিস্থাপন করে। কুরাইশ এবং আরবের কিছু অন্যান্য উপজাতি ছিল এ শাখাসম্ভুত। যে সকল আরব উপজাতি হযরত ইসমাঈল (আ) এর বংশধর ছিল না, তারাও যেহেতু তাঁর প্রচারিত দ্বীনের দ্বারা প্রভাবিত ছিল, সে জন্যে তারাও নিজেদেরকে তাঁর সাথেই সম্পর্ক যুক্ত করতো।

দ্বিতীয় শাখাটি হযরত ইসহাক (আ) থেকে উদ্ভূত। এ শাখায় জন্মগ্রহণ করেন হযরত ইয়াকুব (আ), ইউসুফ (আ), মূসা (আ), দাউদ (আ), সুলায়মান (আ), এহিয়া (আ), ঈসা (আ), এবং অন্যান্য বহু নবী। হযরত ইয়াকুব (আ) এর নাম যেহেতু ইসরাঈল ছিল, সেজন্যে এ বংশটি বনী ইসরাঈল নামে অভিহিত হয়। তাঁর তাবলীগের ফলে অন্যান্য যেসব জাতি তাঁর দ্বীন কবুল করে তারা হয়তো স্বকীয়তা তাদের মধ্যে একাকার করে ফেলে, অথবা বংশের দিক দিয়ে পৃথক হলেও ধর্মীয় দিক দিয়ে তাদের অনুগত হয়ে পড়ে। এ শাখাটি যখন লাঞ্ছনা ও অধঃপতনের শিকার হয় তখন তাদের মধ্যে ইহুদীবাদ ও খ্রিস্টবাদ জন্মগ্রহণ করে।(সূরা আশ শূয়ারা, টীকা-১১৭)

সূরা আল মায়েদার ২০ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলের অতীত প্রভাব প্রতিপত্তির দিকে ইংগিত করেন। তাদের এ প্রতিপত্তি ও সমৃদ্ধির যুগ ছিল হযরত মূসা (আ) এর বহু পূর্বে। একদিকে হযরত ইবরাহীম (আ) হযরত ইসহাক (আ), হযরত ইয়াকুব (আ), হযরত ইউসুফ (আ) এর মতো মহান নবীগণ এ জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন এবং অপরদিকে হযরত ইউসুফ(আ) এর যুগে এবং তাঁর পরে মিসরে তাদের বিরাট শাসন কর্তৃত্ব লাভের সৌভাগ্য হয়। দীর্ঘকাল পর্যন্ত তারা তৎকালীন সভ্যতামন্ডিত পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিল। চারপাশে তাদেরই প্রভাব প্রতিপত্তি বিরাজ করতো। সাধারণত মানুষ বনী ইসরাঈলের উন্নতির ইতিহাস হযরত মূসা (আ) থেকে শুরু করে। কিন্তু কুরআন সুস্পষ্টভাবে বলে যে, বনী ইসরাঈলের উন্নতির যুগ হযরত মূসা (আ) এর পূর্বেই অতীত হয়েছে। হযরত মূসা (আ) তাকেই আপন জাতির অতীত ঐতিহ্য হিসেবে পেশ করতেন।(সূরা আল আম্বিয়া,টীকা-৮৩)

ফিলিস্তিনে নিকৃষ্ট ধরনের শিরকের যুগ

হযরত মূসা(আ ) এর মৃত্যুর পর যখন বনী ইসরাঈল ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে তখন সেখানে বিভিন্ন জাতি বাস করতো। যেমন হাত্তা, আম্মেরী, কেনআনী, বিউসী, ফিলিস্তী প্রভৃতি। তাদের মধ্যে অতি নিকৃষ্ট ধরনের শিরক প্রচলিত ছিল। তাদের সর্ববৃহৎ দেবতার নাম ছিল ঈল্‌ যাকে দেবতাদের পিতা বলা হতো। তাকে ষাঁড়ের সাথে তুলনা করা হত। তার স্ত্রীর নাম ছিল আশীরা, তাদের থেকে দেব দেবীর এক বিরাট বংশ বিস্তার লাভ করে, যাদের সংখ্যা সত্তর পর্যন্ত পৌঁছে। তাদের সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল বাল(***আরবী***) বৃষ্টির ও তৃণশস্যের পুষ্টি সাধনকারী খোদা এবং আসমান যমীনের মালিক মনে করা হত। উত্তরাঞ্চলে তারা স্ত্রী উনাস নামে অভিহিত ছিল এবং ফিলিস্তিনে তাকে বলা হতো গেস্তারাতা। এ দুটি নামের স্ত্রী লোক প্রেমপ্রনয় ও বংশবৃদ্ধির খোদা ছিল। তাছাড়া কোন দেবতা ছিল মৃত্যুর মালিক। কারো হাতে স্বাস্থ্য রক্ষার দায়িত্ব ছিল। কোন দেবতাকে মহামারী ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এভাবে সমগ্র খোদায়ী বহু খোদার মধ্যে বণ্টন করা ছিল। এসব দেব দেবীর প্রতি এমন সব ঘৃণ্য বিশেষণ ও কর্মকাণ্ড আরোপ করা হতো যে, নৈতিক দিক থেকে অতি চরিত্রহীন লোকও তাদের সাথে পরিচিত হতে পছন্দ করতো না। এখন একথা পরিষ্কার যে, যারা এ ধরনের অশ্লীল ও ইতর সত্তাগুলোকে খোদা বানিয়ে তাদের পূজা করে তারা নৈতিকতার ঘৃণ্যতম স্তরে নিমজ্জিত হওয়া থেকে কি করে বাঁচতে পারে? এই হলো কারণ যে তাদের যে অবস্থা প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কার্যে প্রকাশ হয়ে পড়েছে তা চরম চারিত্রিক অধঃপতনের সাক্ষ্যদান করে। তাদের সমাজে শিশু কুরবানি করার প্রথা চিল। তাদের উপাসনাগারগুলো ব্যভিচারের আড্ডা ছিল। নারীদেরকে দেবদাসী (Religious Prostitutes) বানিয়ে উপাসনালয়ে রাখা এবং তাদের সাথে ব্যভিচার করা ইবাদতের মধ্যে গণ্য করা হতো। এ ধরনের আরও বহু প্রকারের চরিত্রহীনতা তাদের মধ্যে প্রসার লাভ করেছিল।

বনী ইসরাঈলের নৈতিক অধঃপতনের কারণ

তাওরাতে মূসা (আ)এর মাধ্যমে বনী ইসরাঈলকে যে হেদায়েত দেয়া হয়েছিল তাতে পরিষ্কার বলা হয়েছিল, এ পৌত্তলিক জাতিগুলোর হাত থেকে ফিলিস্তিন কেড়ে নিতে হবে, তাদের সাথে একত্রে বসবাস ও মেলামেশা করা থেকে এবং তাদের নৈতিক ও ধারণা বিশ্বাসের অমংগলকারিতা থেকে দূরে থাকতে হবে।কিন্তু বনী ইসরাঈল যখন ফিলিস্তিনে প্রবেশ করে তখন তারা উপরোক্ত হেদায়েত ভুলে যায়। তারা তাদের কোন অখণ্ড রাজ্য কায়েম করেনি। তারা চিল উপজাতীয় গোঁড়ামিতে লিপ্ত। তাদের প্রত্যেক গোত্র বিজিত অঞ্চলের একটা করে অংশ নিয়ে পৃথক হয়ে যাওয়াটাই পছন্দ করে। এভাবে পৃথক পৃথক হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের কোন গোত্রই এতোটা শক্তিশালী হতে পারেনি যে, নিজেদের এলাকা মুশরিকদের থেকে পুরোপুরি পবিত্র করে ফেলবে। অবশেষে তাদের সাথে মুশরিকদের বসবাস করাকে তারা মেনে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বরঞ্চ তাদের বিজিত অঞ্চলগুলোর স্থানে স্থানে এসব মুশরিক জাতির ছোটো ছোটো নগর রাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠিত ছিল ইসরাঈলীরা যাদেরকে আয়ত্বে আনতে পারেনি। এ অভিযোগই যবুর গ্রন্থে করা হয়েছে।(হযরত দাউদ (আ) এর মুখে এরূপ অভিযোগ করা হয়ঃ খোদার নির্দেশ অনুযায়ী তারা ঐসব জাতিকে ধ্বংস করেনি বরঞ্চ তাদের সাথে মিশে গেল, তাদের কুকর্ম শিক্ষা করলো, তাদের দেবতার ফূজা করতে লাগলো যা তাদের গলার ফাঁস হয়ে গেল। তারা তাদের কন্যাদেরকে শয়তানের জন্যে কুরবানি করলো। আর তারা তাদের নিষ্পাপ পুত্র কন্যার রক্ত প্রবাহিত করলো——-এ জন্যে খোদার গযব তাদের উপর পড়লো, নিজেদের উত্তরাধিকারের প্রতি ঘৃণ্য হলো এবং তারা তা ঐসব জাতির অধিকারে ছেড়ে দিল এবং তাদের শত্রু তাদের শাসক হলো। যবুর, অধ্যায় ১০৬,স্ত্রোত ৩৪ -৪১))

প্রায়শ্চিত্ত

এর প্রথম প্রায়শ্চিত্ত যা ইসরাঈলীদেরকে ভোগ করতে হয়, তাহলো এই যে, এসব জাতির মাধ্যমে তাদের মধ্যে শিরক প্রবেশ করে এবং তার সাথে অন্যান্য নৈতিক ব্যাধিগুলোরও পথ পরিষ্কার হয়। বাইবেলের বিচারকর্তৃগণ পুস্তকে এভাবে অভিযোগ করা হয়েছে এবং বনী ইসরাঈল খোদার সামনে পাপ করে এবং বারীমের পূজা করতে শুরু করে এবং তাদের বাপ দাদার যে খোদা তাদেরকে মিসর থেকে বের করে আনেন, তাঁকে তারা পরিত্যাগ করে এবং তাদের পার্শ্ববর্তী জাতিগুলোর দেবতাদেরকে সেজদা করতে থাকে এবং খোদাকে রাগান্বিত করে। তারা খোদাকে পরিত্যাগ করে বাল ও গেস্তারিয়াতের পূজা করতে থাকে এবং খেদার রোষবহ্নি বনী ইসরাঈলের উপর পড়ে। অধ্যায় ২:স্তোত্র ১১-১৩

দ্বিতীয় যে প্রায়শ্চিত্ত তাদের ভোগ করতে হয় তাহলো এই যে, যেসব জাতির নগর রাষ্ট্রকে তারা স্বাধীন থাকতে দিয়েছিল তারা এবং ফিলিস্তিনগণ যাদের গোটা অঞ্চল বিজিত ছিল না একত্রে মিলিত হয়ে ইসরাঈলীদের বিরুদ্ধে একটা জোট গঠন করে। তারপর তারা বার বার আক্রমণ চালিয়ে ফিলিস্তিনের বৃহৎ অংশ থেকে তাদেরকে বেদখল করে দেয়। এমন কি তাদের কাছ থেকে খোদার শপথনামার সিন্দুকও (তাবুত) কেড়ে নেয়। অবশেষে ইসরাইলীগণ একজন শাসকের অধীনে একটা যুক্তরাজ্য কায়েমের প্রয়োজন অনুভব করে। তাদের আবেদনে সামুয়েল নবী(১০২০ খৃঃপূঃ) তালুতকে তাদের বাদশাহ বানিয়ে দেন। (এর বিবরণ সূরা বাকারায় ৩২ রুকুতে দেয়া হয়েছে।)

মঙ্গল ও কল্যাণের যুগ

এ যুক্তরাজ্যের তিনজন শাসক ছিলেন। তালুত (১০২০ -১০০৪ খৃষ্ট পূর্ব), হযরত দাউদ (আ) (১০০৪ – ৯৬৫ খৃষ্টপূর্ব) এবং হযরত সুলাইমান (আ) (৯৬৫ – ৯২৬ খৃষ্ট পূর্ব)। এ শাসকগণ সেসব কাজ সম্পন্ন করেন যা বনী ইসরাঈল হযরত মূসা (আ) এর পরে অসম্পন্ন রেখেছিল। শুধু উত্তরে সমুদ্র তীরে ফিনিকীয়দের এবং দক্ষিণ পশ্চিম সমুদ্রে তীরে ফিলিস্তিদের রাজ্য অক্ষুণ্ণ ছিল। এগুলো জয় করা যায়নি, তাদেরকে করদ মিত্রে পরিণত করাকেই যথেষ্ট মনে করা হয়েছিল।

অরাজকতা ও সংকটে যুগ

হযরত সুলায়মান (আ) এর পর বনী ইসরাঈল পুনরায় দুনিয়ার লোভ লালসায় মগ্ন হয়ে পড়ে। পরস্পর দ্বন্দ্ব কলহ করে দুটি পৃথক রাজ্য কায়েম করে। উত্তর ফিলিস্তিন ও পূর্ব জর্দানে ইসরাঈলীদের যে রাজ্য হলো তার রাজধানী সামিরিয়া এবং দক্ষিণ ফিলিস্তিন ও আদুমে প্রতিষ্ঠিত ইয়াহুদিয়া রাজ্যের রাজধানী হলো জেরুজালেম। এ দুটি রাজ্যের মধ্যে প্রথম দিন থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘর্ষ চলতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত চলে। ইজরাঈলী রাজ্যের শাসক ও অধিবাসীবৃন্দ সকলের আগে এবং সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত হয়ে পড়ে প্রতিবেশী জাতিসমূহের মুশরিকী আকীদা বিশ্বাস ও নৈতিক অনাচার দ্বারা। এ অবস্থা চরমে পৌঁছে যখন শাসক আখিআব সাইদার মুশরিক শাহজাদী ইজবেলকে বিবাহ করে। সে সময়ে রাষ্ট্রীয় শক্তি ও তার যাবতীয় উপায় উপাদানের সাহায্যে শিরক ও চরিত্রহীনতা ইসরাঈলীদের মধ্যে প্রবল বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। হযরত ইলিয়াস (আ) এবং হযরত আল আয়াস (আ)এ বন্যা প্রতিরোধে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু এ জাতি যে অধঃপতনের দিকে ছুটেছিল, তা থেকে নিবৃত্ত হলো না। অবশেষে আল্লাহর গজব আশিরিয়দের আকারে ইসরাঈলী রাজ্যের উপর পড়ে এবং খৃষ্টপূর্ব নবম শতাব্দী থেকে ক্রমাগত আশিরিয়দের আক্রমণ চলতে থাকে। এ যুগে আমুস নবী (৭৮৭ -৭৪৭ খৃঃপূঃ) এবংয় তারপর হোসি নবী (৭৪৭ – ৭৩৫ খৃঃপূঃ) ইসরাঈলীদেরকে বার বার সাবধান করে দেন। কিন্তু তারা এমন অবহেলা অমনোযোগিতায় মগ্ন ছিল যে, সতর্কবাণীর উল্টো ফল হলো। অবশেষে ইসরাঈলী শাসক অমুস নবীকে দেশ থেকে বের হয়ে যাবার এবং সামেরিয়া রাজ্যের মধ্যে নবুওয়াতের কাজ বন্ধ করে দেয়ার নোটিশ দান করে। তারপর বেশীদিন যেতে না যেতেই ইসরাঈলী রাজ্য এবং তার অধিবাসীদের উপর আল্লাহর আযাব এসে পড়ে।৭২১ খৃষ্ট পূর্বে আশিরিয়দের দুর্দান্ত শাসক সারগুণ সামেরিয়া জয় করে ইসরাঈলী রাজ্যের অবসান ঘটায়, হাজার হাজার ইসরাঈলীকে হত্যা করা হয়। সাতাশ হাজারেরও অধিক প্রভাবশালী ইসরাঈলীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে আশিরিয় রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য করে। অন্য জাতীয় লোককে বাইরে থেকে এনে ইসরাঈলী অঞ্চলে পুনর্বাসিত করে। ইসরাঈলীদের মুষ্টিমেয় যারা রয়ে গিয়েছিল, তারা নবাগতদের সাথে একত্রে বসবাস করতে করতে আপন জাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি ভুলে গেল।

বনী ইসরাঈলের দ্বিতীয় রাষ্ট্র যা ইয়াহুদিয়া নামে দক্ষিণ ফিলিস্তিনে কায়েম হয়েছিল তাও হযরত সুলায়মান (আ) এর পরে অতিসত্বর শিরক ও চরিত্রহীনতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে তাদের অধঃপতনের গতি ইসরাঈলী রাজ্য থেকে মন্তর ছিল। এ জন্যে তাদেরকে কিছু অধিক অবকাশ দেয়া হয়। যদিও ইসরাঈলী রাজ্যের ন্যায় আশিরিয়গণ বার বার তাদের উপরও আক্রমণ চালায়, তাদের শহরগুলো ধ্বংস করে, তাদের রাজধানী অবরোধ করে, কিন্তু তথাপি এ রাষ্ট্র আশিরিয়দের হাতে ধ্বংস হয়নি। শুধু করদ মিত্র হিসেব টিকে থাকে। অতঃপর যখন হযরত ইয়াসইয়া এবং হযরত ইয়ারমিয়ার ক্রমাগত চেষ্টার পরেও ইয়াহুদিয়ার অধিবাসী প্রতিমা পূজা এবং চরিত্রহীনতা থেকে নিবৃত্ত হলো না, তখন ৫৯৮ খৃষ্টপূর্বে বেবিলনের বাদশাহ বখত নসর জেরুজালেম সহ গোটা ইয়াহুদিয়া রাজ্য অধিকার করে নেয় এবং ইয়াহুদিয়ার বাদশাহ বন্দী হয়। এতে করেও তাদের দুষ্কর্ম শেষ হয় না। হযরত ইয়ারমিয়ার নসিহত সত্ত্বেও তারা তাদের চরিত্রের সংশোধন করার পরিবর্তে বেবিলনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করে। অবশেষে ৫৮৭ খৃষ্ট পূর্বে বখত নসর অকস্মাৎ আক্রমণ চালিয়ে ইয়াহুদিয়ার চোট বড়ো সকল শহর ধ্বংস করে দেয়। জেরুজালেম এবংয় হায়কালে সুলায়মানী এমনভাবে ধূলিসাৎ করে দেয় যে, তার কোন একটি দেওয়ালও অবশিষ্ট থাকেনি। বহুসংখ্যক ইহুদীকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। যারা রয়ে গেল তারাও প্রতিবেশী জাতিসমূহের হাতে লাঞ্ছিত ও পদানত হয়ে থাকলো।(সূরা ইউনুস,টীকা-৯৮ – ১০০)

বেবিলনের অধীনে বন্দী জীবন যাপন কালে বনী ইসরাঈলের ভূমিকা (**********আরবী***************)

এবং শয়তান সুলায়মানের রাজত্বের নাম নিয়ে যেসব পেশ করছিল, সেসব তারা মানতে লাগলো । অথচ সুলায়মান কখনো কুফরী অবলম্বন করেনি। কুফরী করছিল এ শয়তানরা যারা লোকদেরকে যাদু শিক্ষা দিচ্ছিল। বাবেলের (বেবিলন) হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছিল, তারা তার প্রতিই বিশেষ আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অথচ তারা (ফেরেশতারা) যখনই কাউকে এ জিনিস শিক্ষা দিত তখন তারা স্পষ্ট করে সতর্ক করে দিত যে, দেখে আমরা কিন্তু নিছক একটা পরীক্ষা মাত্র। তোমরা কুফরীতে মগ্ন হয়ো না। তা সত্ত্বেও তারা ফেরেশতাদের নিকট থেকে সে জিনিসই শিখছিল যার দ্বারা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানো যায়। অথচ এ কথা সুস্পষ্ট যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া এ উপায়ে তারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না। কিন্তু তথাপি তারা এমন জিনিস শিক্ষা করতো যা তাদের জন্যে কল্যাণকর ছিল না, বরঞ্চ ক্ষতিকর ছিল এবং তারা ভালোভাবেই জানতো যে, যারা এ জিনিসের খরিদ্দার হবে তার জন্যে আখিরাতে কল্যাণের কোন অংশ নেই। তারা যে জিনিসের বিনিময়ে নিজেদের জীবন বিক্রি করছে, তা কত নিকৃষ্ট। হায়! তারা যদি এটা জানতে পারতো। – সূরা আল বাকারাঃ১০২

শয়তান বলতে জ্বিন শয়তান এবং মানুষ শয়তান উভয়কেই বুঝায়। এখানে উভয়কেই বুঝানো হয়েছে। যখন ইসরাঈলীদের নৈতিক এবং বৈষয়িক অধঃপতনের যুগ এলো, গোলামী, অজ্ঞতা, দুর্ভাগ্য, দারিদ্র্য এবং লাঞ্ছনা গঞ্জনা, তাদের মধ্যে কোন উৎসাহ উদ্দীপনা ও দৃঢ় সংকল্প অবশিষ্ট রাখলো না। তখন তাদের মনোযোগ যাদু টোনা, তেলেসমাত আমালিয়াত ও তাবিজ তুমারে দিকে আকৃষ্ট হলো। তারা এমন সব পন্থা পদ্ধতি তালাশ করতে লাগলো যার দ্বারা কোন পরিশ্রম অথবা চেষ্টা চরিত্র ব্যতিরেকে শুধু ফুঁক এবং মন্ত্রতন্ত্রের বরে সকল কাজ সমাধা করা যেতে পারে। সে সময় শয়তান তাদেরকে এভাবে প্রতারিত করতে থাকে যে, সুলায়মান (আ) এর বিরাট বিশাল রাজ্য ও তাঁর বিস্ময়কর শক্তিমত্তা তো সবই কিছু নকশা ও মন্ত্রেরই ফল ছিল। আর সেসব আমরা তোমাদেরকে বলে দিচ্ছি। তারা এসবকে অপ্রত্যাশিত নিয়ামত মনে করে এসবের প্রতি উন্মত্ত হয়ে পড়ে। অতঃপর না আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের কোন আগ্রহ অনুরাগ রইলো, আর না সত্যের আহ্বানকারীর কোন আওয়াজ তাদের কানে পৌছলো।

উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বিভিন্ন উক্তি করা হয়েছে। কিন্তু আমি যা বুঝতে পেরেছি, তাহলো এই যে, যে সময়ে ইসরাঈলীদের গোটা জাতি বেবিলনে বন্দী ও গোলামীর জীবন যাপন করছিল, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের পরীক্ষার জন্যে দুজন ফেরেশতা মানুষের আকৃতিতে তাদের নিকট পাঠিয়ে দিয়ে দিয়ে থাকবেন। যেভাবে লূত জাতির নিকটে ফেরেশতারা সুদর্শন বালকের আকৃতিতে গিয়েছিল, ঠিক তেমনি এসব ইসরাঈলীদের নিকটে এ দুজন ফেরেশতা পীর ফকীরের আকৃতিতে গিয়ে থাকবেন। ওখানে একদিকে তাঁরা যাদুর বাজার খুলে বসলেন এবংয় অন্যদিকে চূড়ান্ত দলীল প্রমাণস্বরুপ তাদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলতেন, দেখ, আমরা কিন্তু তোমাদের পরীক্ষার জন্যে এসেছি। তোমরা নিজেদের পরকাল নষ্ট করো না। কিন্তু এতদসত্বেও তারা ফেরেশতাদের পেশ করা আমালিয়াত ও তাবিজ তুমার গ্রহণ করার জন্যে পাগল হয়ে পড়লো।

ফেরেশতাদের মানুষের আকৃতি ধারণ করে কাজ করাতে কারো আশ্চর্যান্বিত হবার কিছু নেই। তাঁরা আল্লাহ তায়ালার বিশাল সাম্রাজ্যের কর্মচারী। নিজেদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে যে সময়ে যে পন্থা অবলম্বন করার প্রয়োজন হয় তা তাঁরা করতে পারেন। এ সময়ে আমাদের চার পাশে কত ফেরেশতা মানুষের আকৃতি ধারণ করে কাজ করে যাচ্ছেন, তার কতটা খবরই বা আমরা রাখি। তবে হ্যাঁ ফেরেশতাদের এমন এক জিনিস শিক্ষা দেয়া যা মূলতই খারাপ, তার দৃষ্টান্ত এই যে, যেমন ধরুন, পুলিশের উর্দি না পরা কোন সিপাই কোন ঘুষখোর কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা নোট ঘুষ হিসাবে দিচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো এ অপরাধ করার সময় তাকে হাতেনাতে ধরা হবে এবং তারপর তার নির্দোষিতার কোন সাফাই পেশ করার আর কোন অবকাশই থাকবে না।

তখনকার দিনে লোকের মধ্যে যে জিনিসের সবচেয়ে বেশী চাহিদা ছিল তাহলো আমালিয়াত ও তাবিজ তুমার, যার দ্বারা এক ব্যক্তি অন্য কারো স্ত্রীকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের প্রতি প্রণয়াসক্ত করে ফেলতো। এ ছিল নৈতিক অধঃপতনের নিম্নতম স্তর, যেখানে তারা পৌঁছে গিয়েছিল। একটি জাতির লোকের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস যদি এই হয় যে, তারা পরস্ত্রীকে ভোলাবার চেষ্টা করবে, কারো বিবাহিতা স্ত্রীকে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করবে এবং এ কাজকেই তারা তাদের জন্যে বিরাট বিজয় মনে করবে, তাহলে এর চেয়ে অধিকতর নৈতিক অধঃপতন আর কি হতে পারে?

দাম্পত্য সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে মানবসভ্যতার ভিত্তি। নারী পুরুষের সম্পর্ক সুষ্ঠু ও সঠিক হলে মানব সভ্যতা সুষ্ঠু ও সঠিক হবে। পক্ষান্তরে নারী ও পুরুষের সম্পর্কে ফাটল ধরলে মানব সভ্যতাও চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে। অতএব ঐ ব্যক্তি নিকৃষ্টতম দুস্বৃতিকারী ও অরাজকতা সৃষ্টিকারী যে এমন বৃক্ষের উপর কুঠারাঘাত করে, যার সঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকার উপরে তাঁর নিজের এবং গোটা সমাজের অস্তিত্ব নির্ভরশীল। হাদীসে আছে, ইবলিস তার কেন্দ্রীয় কর্মস্থল থেকে পৃথিবীর প্রত্যেক স্থানের জন্যে তার প্রতিনিধি পাঠায়। তারপর সেসব প্রতিনিধি ফিরে গিয়ে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। কেউ বলে, আমি অমুক ফেতনা বা বিপর্যয় সৃষ্টি করেছি। কেউ বলে, আমি অমুক পাপাচার চালু করেছি। কিন্তু ইবলিস প্রত্যেককেই বলে, তুমি কিছুই করনি। তারপর একজন এসে বলে, আমি স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছি। একথা শুনে ইবলিস তাকে গলায় জড়িয়ে ধরে বলে, তুমিই কাজের মতো কাজ করেছ।

এ হাদিসটি সম্পর্কে চিন্তা করলে সুস্পষ্টরূপে বুঝতে পারা যায়, বনী ইসরাঈলের পরীক্ষার জন্যে যে ফেরেশতা পাঠানো হয় তাদেরকে কেন এ আদেশ করা হয়েছিল যে, স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টির আমল যেন তারা তাদেরকে শিক্ষা দেয়।(সূরা আল বাকার, টীকা-১০০)

পুনর্জাগরণের যুগ

সামেরীয় এবং ইসরাইলীগণ নৈতিক ও আকীদা বিশ্বাসের দিক দিয়ে যে অধঃপতনের অতল তলে নিমজ্জিত হয়েছিল সেখান থেকে তারা আর উঠতে পারেনি। কিন্তু ইয়াহুদিয়াবাসীদের মধ্যে যারা টিকে ছিল তাদের মধ্যে এমন একজন ছিল যে কল্যাণের উপরে কায়েম থেকে কল্যাণের আহ্বানকারী ছিল। অবশিষ্ট ইয়াহুদিয়াদের মধ্যে সে সংস্কার সংশোধনের কাজ করতে থাকে। বেবিলন এবং অন্যান্য অঞ্চলে যারা নির্বাসিত হয়েছিল তাদেরকেও সে তওবা করার প্রেরণা দান করে। অবশেষে আল্লাহ তায়ালার রহমত তাদের সহায়ক হয়। বেবিলন রাজ্যের পতন ঘটে। ৫৩৯খৃষ্টপূর্বে ইরানী দিগবিজয়ী সাইরাস(অথবা খসরু) বেবিলন জয় করে। তার পরের বছর সে এই বলে ফরমান জারী করে যে, ইসরাঈলীদেরকে নিজস্ব আবাসভূমিতে প্রত্যাবর্তন করার এবং সেখান পুনর্বাসিত হওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। তারপর দলে দলে ইহুদীরা ইয়াহুদিয়ায় যেতে থাকে। এ কাজ অনেকদিন ধরে চলে। সাইরাস ইহুদীদেরকে পুনরায় হায়কালে সুলায়মানী নির্মাণের অনুমতি দেয়। কিন্তু কিছু কাল যাবত যেসব প্রতিবেশী জাতি সেখানে বসতিস্থাপন করেছিল তারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অবশেষে প্রথম দারিউস (দারা) ৫২২ খৃষ্ট পূর্বে ইয়াহুদীয়ার শেষ বাদশাহের পৌত্র যারুবাবেলকে ইয়াহুদিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করে। সে হাজ্জী নবী, যাকারিয়া নবী এবং ইয়াশুর তত্ত্বাবধানে নতুন করে পবিত্র হায়কাল নির্মাণ করে। তারপর ৪৫০ খৃস্ট পূর্বে নির্বাসিত একটি দলের সাথে হযরত ওযায়ের নবী ইয়াহুদিয়া এসে পৌঁছেন। ইরান সম্রাট ইর্দশীর এক ফরমান বলে তাঁকে নিম্নের অধিকার দান করেনঃ তুমি তোমার খোদার দেয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে শাসক এবং বিচারক নিযুক্ত কর যেন সমুদ্র পারের যারা খোদার শরীয়ত জানে তাদের সকলের প্রতি ইনসাফ কায়েম হয়। যারা জানে না তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং যারা তোমার খোদার শরীয়ত এবং বাদশাহের ফরমান অমান্য করবে তাদেরকে অবিলম্বে আইনগত শাস্তি দেবে, তা মৃত্যুদণ্ড হোক, নির্বাসন হোক, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত অথবা কারাদণ্ড হোক। এযরা অধ্যায় ৮: স্তোত্র ২৫- ২৬।

এ ফরমানের সুযোগে হযরত ওযায়ের মূসা (আ) এর দীন পুনর্জীবিত করার বিরাট কাজ করেন। তিনি ইহুদী জাতির সৎ ব্যক্তিদেরকে চারদিক থেকে একত্র করে একটা মজবুত সংগঠন কায়েম করেন। বাইবেলের পঞ্চম পুস্তক, যার মধ্যে তাওরাত সন্নিবেশিত আছে, তিনি সম্পাদনার পর প্রকাশ করেন। ইহুদীদের দীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। আকীদা ও নৈতিকতার দিক দিয়ে যে দোষ ত্রুটি অন্য জাতির প্রভাবে বনী ইসরাঈলের মধ্যে প্রবেশ করেছিল, শরীয়াতের আইন জারী করে তিনি তা দূর করার চেষ্টা করেন। যেসব মুশরিক নারীদেরকে ইহুদীরা বিবাহ করেছিল তাদেরকে তালাক দেয়ার নির্দেশ দেন। বনী ইসরাঈলের নিকট থেকে আল্লাহর বন্দেগী এবং তার আইন মেনে চলার নতুন শপথ গ্রহণ করেন।

খৃষ্টপূর্ব ৪৪৫ সালে নাহমিয়ার নেতৃত্বে আর একটি নির্বাসিত দল ইয়াহুদিয়ায় প্রত্যাবর্তন করে। ইরান সম্রাট নাহমিয়াকে জেরুজালেমের শাসক নিযুক্ত করে এবং বসবাসের জন্য শহর নির্মাণের অনুমতি দেয়। এভাবে দেড়শ বছর পর বায়তুল মাকদিস আবার বসতিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং ইয়াহুদী ধর্ম ও সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু উত্তর ফিলিস্তিন এবং সামেরিয়া ইসরাঈলীরা হযরত ওযায়েরের সংস্কার ও পূনর্জাগরণ কাজের কোনই সুফল লাভ করেনি। বরঞ্চ বায়তুল মাকদিসের বিরুদ্ধে জাযরিম পাহাড়ের ওপর নিজেদের একটা ধর্মীয় কেন্দ্র নির্মাণ করে এবং তাকে আহলে কিতাবদের কেবলা বানাবার চেষ্টা করে। এভাবে ইহুদী ও সামেরীয়দের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

গ্রীক আধিপত্য ও তার বিরুদ্ধে দ্বন্দ্ব সংগ্রাম

ইরানী সাম্রাজ্যের পতন, আলেকজান্ডারের দিগ্‌বিজয় এবংয় পুনরায় ইরানীদের উত্থানের ফলে কিছুকাল পর্যন্ত ইহুদীদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে। আলেকজান্ডারের মৃত্যুর পর তাঁর সাম্রাজ্য তিনটি রাজ্যে বিভক্ত হয়। তার মধ্যে সিরিয়ার অঞ্চল এ সালুকী রাজ্যের ভাগে পড়ে যার রাজধানী এন্তকিয়া ছিল। তার শাসক তৃতীয় এন্টিউকাস খৃষ্টপূর্ব ১৯৮ সালে ফিলিস্তিন অধিকার করে। সে ধর্মের দিক দিয়ে মুশরিক ছিল এবং ইহুদী ধর্ম ও সভ্যতা সে বরদাশত করতে পারতো না। সে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে গ্রীক সভ্যতার বিস্তার শুরু করে। স্বয়ং ইহুদীদের মধ্য থেকেও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ তার হাতের পুতুল হয়ে পড়ে। এই বাইরের হস্তক্ষেপ ইহুদী জাতির মেধ্য বিভেদ সৃষ্টি করে। একদল গ্রীক পোশাক পরিচ্ছদ, ভাষা, জীবন পদ্ধতি এবং গ্রীক খেলাধুলা রপ্ত করে। দ্বিতীয় দল,আপন সভ্যতার উপরে অটল থাকে। খৃষ্ট পূর্ব ১৭৫ সালে চতুর্থ এন্টিউকাস (যার উপাধি ছিল এপি ফানিস অর্থাৎ খোদার বহিঃপ্রকাশ) যখন সিংহাসনে আরোহণ করে, তখন সে তার স্বৈরাচারী শক্তি দিয়ে ইহুদী ধর্ম ও সভ্যতার মূলোৎপাটনের চেষ্টা করে। সে বায়তুল মাকদিসের হায়কালে (ইবাদাতখানা) এক বিরাট প্রতিমা স্থাপন করায় এবং তাকে সিজদা করার জন্যে ইহুদীদেরকে বাধ্য করে। সে কুরবানীগাহে কুরবানী বন্ধ করে দেয়। তার পরিবর্তে মুশরিকদের কুরবানীগাহে কুরবানী করার জন্যে ইহুদীদেরকে আদেশ করে। যারা তাদের ঘরে তাওরাত গ্রন্থ রাখবে, সাবতের হুকুমাবলী পালন করবে অথবা শিশুদের খাৎনা করাবে, তাদের সকলের জন্যে মৃত্যুদণ্ড প্রস্তাব করে। কিন্তু ইহুদীরা এ স্বৈরাচারের নিকট নতি স্বীকার করেনা। তাদের মধ্যে এক বিরাট আন্দোলন শুরু হয় যা ইতিহাসে মাক্কাবী বিদ্রোহ বলে অভিহিত হয়। যদিও এ দ্বন্দ্বে গ্রীক মনোভাবাপন্ন ইহুদীরা গ্রীকদের প্রতি তাদের সকল প্রকার সহানুভূতি প্রদর্শন করে এবং কার্যত মাক্কাবী বিদ্রোহ বানচাল করার জন্যে এন্তাকিয়ার যালেমদের সাহায্য করে, কিন্তু সাধারণ ইহুদীদের অন্তরে হযরত ওযাযের যে দীনদারীর প্রাণশক্তি সঞ্চার করেন তার প্রভাব এতো বিরাট ছিল যে, সকলে মাক্কাবীদের দলে যোগদান করে এবং অবশেষে গ্রীকদের বিতাড়িত করে নিজেদের একটি স্বাধীন দীনী রাষ্ট্র কায়েম করে যা খৃষ্ট পূর্ব ৬৭ সাল পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। এ রাষ্ট্রের সীমানা বিস্তার লাভ করে ঐ গোটা ভূখণ্ডকে তার আওতাভুক্ত করে, যা এককালে ইয়াহুদিয়া এবং ইসরাঈলী রাষ্ট্রগুলোর অধীন ছিল। বরঞ্চ ফিলিস্তিয়ার একটা বিরাট অংশও তার আওতায় আসে যা হযরত দাউদ (আ) এবং হযরত সুলায়মান (আ) এর যুগেও অধীনতার স্বীকার করেনি।(সূরা মায়েদা,টীকা -৪২)

দ্বিতীয় বিপর্যয়ের যুগ

মাক্কাবী আন্দোলন যে নৈতিক ও দ্বীনি প্রাণশক্তি নিয়ে শুরু হয়েছিল, তা ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে। তারপর দুনিয়াপুরস্তি তাদেরকে পেয়ে বসে। অবশেষে তাদের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি হয় এবংয় তারা স্বয়ং রোমীয় দিগবিজয়ী পাম্পীকে ফিলিস্তিন অধিকারের আমন্ত্রণ জানায়। অতএব খৃষ্ট পূর্ব ৬৩ সালে পাম্পী বায়তুল মাকদিস অধিকার করে ইহুদীদের স্বাধীনতা হরণ করে। রোমীয় বিজয়ীদের এ স্থায়ী পলিসি ছিল যে, বিজিত অঞ্চলগুলোতে সরাসরি আইন শৃঙ্খলা কায়েম করার পরিবর্তে স্থানীয় শাসকদের দ্বারা আপন কার্যসিদ্ধি করা পছন্দ করতো। এজন্যে তারা ফিলিস্তিনে নিজের তত্ত্বাবধানে এক দেশীয় রাষ্ট্র কায়েম করে যা খৃষ্টপূর্ব ৪০ সালে হিরোদ নামে এক সুচতুর ইহুদীর অধিকারে আসে। সে হিরোদ দি গ্রেট নামে খ্যাত। তার শাসন কর্তৃত্ব গোটা ফিলিস্তিন এবং পূর্ব জর্দানের উপরে খৃষ্টপূর্ব ৪০ সাল থেকে খৃষ্ট পূর্ব ৪ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকে। সে একদিকে ধর্মীয় নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে ইহুদীদেরকে সন্তুষ্ট রাখে এবং অপরদিকে রোমীয় সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করে রোমীয় সাম্রাজ্যের অনুগত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে। এভাবে সে রোম সম্রাট কায়সারের সন্তুষ্টি অর্জন করে। এ সময়ে ইহুদীদের দ্বীনি ও নৈতিক অধঃপতন চরমে পৌঁছে।

হিরোদের পর তার রাজ্য তিনভাগে বিভক্ত হয়ঃ

তার এক পুত্র আরখেলাউস সামেরিয়া, ইয়াহুদিয়া এবং উত্তর আদুমিয়ার শাসক হয়। কিন্তু ৬ খৃষ্টাব্দে রোম সম্রাট আগাষ্টাস তাকে পদচ্যুত করে তার সমগ্র রাষ্ট্র আপন গভর্নরের অধীনে দিয়ে দেয় এবং এ ব্যবস্থাপনা ৪১খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বহাল থাকে। এ সময়েই বনী ইসরাঈলের সংস্কার সংশোধনের জন্যে হযরত ঈসা (আ) আবির্ভূত হন। ইহুদীদের সকল ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সম্মিলিতভাবে তাঁর বিরোধিতা করে এবং রোমীয় গভর্নর পন্টিস পিলাটিস তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার চেষ্টা করে।

হিরোদের দ্বিতীয় পুত্র হিরোদ এন্টিপাস উত্তর ফিলিস্তিনে গালীল অঞ্চল এবং পূর্ব জর্দানের শাসক হয়ে পড়ে। এ ছিল সেই ব্যক্তি যে একজন নর্তনীর নির্দেশে হযরত ইয়াহিয়া(আ) এর মস্তক ছিন্ন করে তাকে উপঢৌকন দেয়।

তার তৃতীয় পুত্র ফিলিপ হরমুন পর্বত থেকে ইয়ারমুক নদী পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার বাদশাহ হয়। সে তার পিতা এবং ভাইদের অপেক্ষা রোমীয় ও গ্রীস সভ্যতার অধিকতর ভক্ত অনুরক্ত ছিল। ফিলিস্তিনের অন্যান্য অঞ্চলে কোন কল্যাণময় বাণী প্রচারের যতোটুকু অবকাশ ছিল, ততোটুকুও ছিল না তার অঞ্চলে।

একচল্লিশ খৃষ্টাব্দে হিরোদ দি গ্রেট এর পৌত্র হিরোদ এগ্রিপ্পাকে রোমীয়গণ ঐসব অঞ্চলের শাসনকর্তা বানায়, যেসব অঞ্চলের শাসক ছিল হিরোদ দি গ্রেট। সে ক্ষমতা লাভের পর হযরত ঈসা (আ) এর অনুসারীদের উপর চরম নির্যাতন শুরু করে এবং হাওয়ারীদের নেতৃত্বে যে আল্লাহভীরুতা ও চারিত্রিক সংশোধনের আন্দোলন চলছিল তা নির্মূল করার জন্যে তার সকল শক্তি নিয়োজিত করে।

এ যুগে সাধারণ ইহুদী এবং তাদের ধর্মীয় নেতাদের যে অবস্থা ছিল তার সঠিক আন্দাজ করতে হলে হযরত ঈসা (আ) এর ঐসব সমালোচনা পাঠ করা দরকার যা তিন তাঁর প্রদত্ত ভাষণে করেছিলেন। এসব ভাষণ ইঞ্জিল চতুষ্টয়ে লিপিবদ্ধ আছে। অবশ্যি তা আন্দাজ করার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে,যখন, যখন সে জাতির চোখের সামনে হযরত ইয়াহইয়া (আ) এর মতো একজন পবিত্র ও পুণ্যবান মনীষীর মস্তক ছিন্ন করা হলো, তখন এ চরম অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটি টু শব্দও হলো না। শুধু তাই নয় গোটা জাতির ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ হযরত ঈসা (আ) এর মৃত্যুদণ্ড দাবী করে। কিন্তু মুষ্টিমেয় সত্যনিষ্ঠ লোক ছাড়া এ দুর্ভাগ্যের জন্যে বিলাপ করার কেউ ছিল না। চরম দুর্ভাগ্য এই যে, পন্টিস পিলটিস যখন ঐসব ভাগ্য বিড়ম্বিত লোকদের জিজ্ঞেস করলো, আজ তোমাদের খুশীর দিন, নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড যোগ্য লোকদের মধ্যে একজন মুক্তি দেয়ার অধিকার আমার আছে। বল, ঈসাকে ছেড়ে দেব, না ডাকাত বরাব্বাকে? জনতা সমস্বরে বলে, বরাব্বাকে ছেড়ে দিন। এ যেন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সত্য গ্রহণ করার সর্বশেষ সুযোগ যা এ জাতিকে দেয়া হয়েছিল।

বিপর্যয়ের শাস্তি

তার অল্পকাল পরে ইহুদী এবংয় রোমীয়দের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব সংঘাত শুরু হয়। ৬৪ – ৬৬ খৃষ্টাব্দের মাঝামাঝি ইহুদীরা প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় হিরোদ এগ্রেপ্পা এবং রোমীয় প্রকিউরেটর ফ্লোরাস উভয়ে এ বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হয়। অবশেষে রোম সাম্রাজ্য এক কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বিদ্রোহ নির্মূল করে এবং টিটাস ৭০ খৃষ্টাব্দে তরবারির সাহায্যে জেরুজালেম জয় করে। তারপর যে গণহত্যা চলে তাতে এক লক্ষ ত্রিশ হাজার লোক নিহত হয়। ৬৭ হাজার লোককে বন্দী করে গোলামে পরিণত করা হয়। হাজার হাজার মানুষকে ধরে ধরে মিসরের খনিতে কাজ করার জন্যে পাঠানো হয়। হাজার হাজার মানুষকে ধরে ধরে বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়, এম্পিথিয়েটার ও কলোসিয়ামে হিংস্র বন্য পশুর সামনে তাদেরকে ঠেলে দিয়ে অথবা তরবারির খেলায় লাগিয়ে দিয়ে আনন্দ উৎসব করা হয়। দীর্ঘাকৃতি ও সুন্দরী সকল বালিকাকে বিজয়ীদের উপভোগের জন্যে বেছে নেয়া হয়। জেরুজালেম শহর এবং হায়কাল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তারপর ফিলিস্তিন থেকে ইহুদীদের প্রভাব প্রতিপত্তি এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় যে, দু হাজার বছর পর্যন্ত তাদের আর মাথা উঁচু করার সুযোগ হয়নি। জেরুজালেমের পবিত্র হায়কালও আর পুনঃ নির্মিত হতে পারেনি। পরে কাইসার হিড্রিয়ান শহরটি পুনরায় বসতিপূর্ণ করে এবং তখন তার নাম দেয়া হয় ইলিয়া। তারপর দীর্ঘকাল পর্যন্ত সেখানে ইহুদীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। (সূরা ইসরা,টীকা :৬ -৭)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.