সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চতুর্থ অনুচ্ছেদ

আখেরাতের প্রতি ঈমানের দাওয়াত

দাওয়াতে ইসলামীর চতুর্থ দফা আখেরাতের উপর ঈমান আনা। এ একটি সংক্ষিপ্ত  কোন দফা নয়, বরঞ্চ এর মধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সন্নিবেশত আছে যা মেনে নেয়ার সামষ্টিক নাম ঈমান বিল আখেরাত (আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস)।

প্রথম কথা এই যে, দুনিয়ায় মানুষকে দায়িত্বহীন করে ছেড়ে দেয়া হয়নি যে, সে যা খুশী তাই করতে থাকবে এবংতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার থাকবে না। বরঞ্চ এ দুনিয়অ হচ্ছে পরীক্ষা ক্ষেত্র। এখানে পরীক্ষার জন্যে মানুষকে পাঠানো হয়েছে। তারপর সে এখানে যা কিছুই করে তার জবাবদিহি তাকে আল্লাহর সামনে করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ এ জবাবদিহির জন্যে আল্লাহ তায়ালা এক বিশেষ সময় নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। দুনিয়ায় কাজ করার জন্যে মানব জাতিকে যতোটা অবকাশ দেয়া হয়েছে , যা শেষ হবার পর কিয়অমত সংঘটিত হবে যখন বিশ্বের এ সকল ব্যবস্থাপনা লন্ডবন্ড হয়ে যাবে। তারপর দ্বিতীয় একটি বিশ্বব্যবস্থা কায়েম করা হবে। সৃষ্টির সূচনা থেকে কিয়অমত পর্যন্ত যত মানুষ অতীত হয়েছে তাদের সকলকে একই সময়ে জীবিত করে নতুন করে সে জগতে উঠানো হবে। এ দ্বিতীয় জীবন দুনিয়ার বর্তমান জীবনের মতো সাময়িক হবে না, বরঞ্চ চিস্থায়ী হবে। এখানে কখনো মৃত্যযুর আগমন হবে না।

তৃতীয়তঃ সে সময়ে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে একত্র করে আল্লাহ তায়ালার আদালতে পেশ করা হবে। সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে কাজকর্মের জবাবদিহি করতে হবে যা সে নিজের দায়িত্বে দুনিয়ার জীবনে করেছে।

চতুর্থতঃ দুনিয়াতে যা কিছুই করছে, যদিও আল্লাহ তা সরাসরি জানেন, সুবিচারের সকল শর্ত পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি তার পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক আমলনামা তৈরী করাচ্ছেন। তার প্রত্যেকটি কথা ও কাজের অসংখ্য সাক্ষ্য ফেরেশতাগণের মাধ্যমে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত করা হচ্ছে, তা সেসব সে (মানুষ) প্রকাশ্যেই করুক অথবা গোপনে করুক। বরঞ্চ যে নিয়ত এবং ইচ্ছায সে কথা বলেছৈ এবং যে ধারণা বাসনা সে তার হৃদয়ে পোষণ করছে সে সবের সাক্ষ্য প্রমাণাদি ত সংরক্ষিত করা হচ্ছে। তারপর এ কথার সাক্ষীও আল্লাহ তায়ালা তৈরী করে রেখেছেন যে, মানুষকে সত্য মিথ্যার পার্থক্য বুঝাবার জন্রে এবং ভ্রান্ত ব্যবস্থাপনা করে দেয়া হয়েছিল। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আল্লাহ তায়ালার আদালতে এমনভাবে পেশ করা হবে যে মানুষ তা অস্বীকার করতে পারবে না।

পঞ্চমতঃ আল্লাহতাযঅলার আদালতে কোন প্রকার ঘুষ, অন্যায় অসংগত সুপারিশ এবং সত্যের পরিপন্থী কোন ওকালতি চলবে না। একের বোঝা অন্যের উপর চাপারো হবে না।ঠ কোন অন্তরঙ্গ ব্ন্ধু এবং অতি নিকটাত্মীয় কোন বন্ধু ও আত্মীয়ের বোঝা নিজের কাঁধে বহন করবে না। যেসব প্রকৃত অথবা কাল্পনিক সত্তাকে মানুষ তার অভিভাবক ও সাহায্যকারী মনে করে তারা তার কোন কাজে আসবে না। মানুষ সেখানে একাকী একেবারে বন্ধুহীন ও সহায়হীন অবস্থায় নিজের কর্মকান্ডের হিসাবে নিজেই দিতে থাকবে।

শেষ কথা এই যে, সিদ্ধঅন্ত পুরোপুরি নির্ভর করবে এ বিষয়ের উপর যে, মানুষ দুনিয়অতে নবীগণের সত্যকে মেনে নেয়অর পর তদনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা সঠিকভাবে হুকুম পালন করে চলেছে কিনা। তারপর আখেরাতে জবাবদির অনুভূতির প্রতি লক্ষ্য রেখে জীবন যাপন করেছে অথবা তা ভুলে গিযে সবকিছু দুনিয়অরই জন্যে করেছে। প্রথম অবস্থায় তার জন্যে বেহেশত এবং দ্বিতীয় অবস্থায় জাহান্নাম।

এ আখেরাতের আকীদাহ ইসলামী দাওয়াতের জন্যে তেমনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যেমন তাওহীদ, রেসালাম ও কুরআন করীমকে মানার আকীদাহ। কারণ যে ধরণের চিন্তা ও কাজের দিকে ইসলাম আহ্বান জানাচ্ছিল এবং যে পথে চলার দাওয়াত দিচ্ছিল, সে পথে এক পা চলাও মানুষের জন্যে সম্ভব নয়, যতোক্ষণ পর্যন্ত সে দুনিয়াকে পরীক্ষাক্ষেত্র এবং নিজেকে খোদার কাছে জবাবদিহিকারী মনে না করেছে এবং যতোক্ষণ পর্য়ন্ত তার মন থেকে এ ধারণা দূর না হয়েছে যে জীবন ত ব্যস শুধু এ দুনিয়অরই জীবন যেখানে প্রকাশিত ফলাফলই ভালো ও মন্দের প্রকৃত মানদন্ড। যতোক্ষণ সে খাঁটি মনে এ কথা মেনে না নিয়েছে সে আসল এবং চিরন্তন জীবন তাই যা মৃত্যুর পর শুরু হবে এবং ভালো ও মন্দের কোন পথে চলে মন্দ  পরিণামের সম্মুখীন হবে; ততোক্ষণ সে সত্য পথে চলতে পারবে না। এ আকীদাহ না হলে মানুষ কিছুতেই তাওহীদ, রেসালাত ও ঈমান বিল কুরআন এর দাওয়াতকে গ্রহণযোগ্যই মনে করবে না। আর যদি কোন কারণে মেনেও নেয় ত খোদার বন্দেগী, রসূলের আনুগত্য এবং কুরআন অনুসরণের ব্যাপারে একনিষ্ঠ হবে না। এ  জন্যে যে, যখন মানুষ একথা মনে করে যে, শেষ পর্যন্ত সকলকে যখন মাটিতে মিশে যেতে হবে এবং তারপর কোন দ্বিতীয় জীবন নেই যেখানে খোদা, রসুল এবং কুরআন অনুসণের জন্যে পুরষ্কার এবং অনুসরণ না করার শাস্তি অবশ্যই হওয়ার কথা, তখন সে কখনো নিষ্ঠাসহ নিজেকে সেই নিয়ম-নীতির বন্ধনে আবদ্থ করতে চাইবে না ইসলাম যার সাথে আবদ্ধ করতে চায়। বরঞ্চ জীবনের প্রতিটি ব্যাপারে সে সে পন্থাই অবলম্বন করে যাতে দুনিয়ায় কোন সুযোগ-সুবিধা, কোন সুখ সম্ভোগ লাভ করা যায় এবং প্রতিটি সে পথ পরিহার করবে, যার কারণে সে দুনিয়ার জীবনের সুখ সম্ভোগ থেকে বঞ্চিত হবে অথবা ক্ষতি ও দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হবে।

কুরাইশগণ আখেরাতকে অযৌক্তিক ও অসম্ভব মনে করতো

এ আখেরাতের আকীদার এই গুরুত্ব ছিল যে কারণে কুরাইশ ও আরবের মুশরিকদের সামনে যখন নবী (সা) এ আকীদাহ পেশ করেন তখন তারা সবচেয়ে বেশী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা অণুভব করে যে, তা মেনে নেয়া হলে তাদের সকল স্বাধীনতা খতম হয়ে যাবে। কোন নিভৃত স্থানে যেখানে দেখার কেউ নেই, সেখানেও আল্লাহ তাঁর রসূলের নিষিদ্ধ কোন কাজ করা যাবে না। তারা মনে করে, যেখানে তারা কোন অন্যায় সুযোগ-সুবিধা অথবা কোন আনন্দ-সম্ভোগ লাভ করতে সম্পূর্ণ সক্ষম, সেখানেও এ আকীদাহ তাদের হাত বেঁধে দেবে। এ আকীদাহ ত একজন অদৃশ্য সিপাহীকে তাদের পত্যেকের পেছনে নিয়োজিত করে দেবে যে কিছুতেই তাদেরকে তাদের ইচ্ছামত কাজ করতে দেবে না। এ  কারণেই তারা এর চরম বিরোধিতা করতে শুরু করে। তারা জোরেশোরে মানুষের মধ্যে এ ধারণা প্রচারের চেষ্টা করে যে, মুহাম্মদ (সা) যা বলেছৈন, তা একেবারে বিবেকের পরিপন্থী এবং অসম্ভব ও অবাস্তব। এ একেবারে পাগলামি এবং হাস্যকার কথা। (৭৪)

আকেরাতের প্রতি যারা সন্দেহ পোষণ করতো তাদের ধারণা

কুরাইশদের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র দল এমনও ছিল যারা বলতো, আমাদের ত অনুমান হয় যে, হয়তো আখেরাত হবে। কিন্তু এর প্রতি আমাদের বিশ্বাস নেই। এ দলের উল্লেখ কুরআনে শুধু এক স্থানে আছে যাতে জানা যায় যে, এ ধারণা পোষণকারী অতি অল্পই ছিল।

(আরবী***************)

যখন বলা হতো যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কিয়ামত যে হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। তখন তোমরা  বলতে, আমরা জানি না যে, কিয়ামত কি। আমাদের ব্যস শুধু একটা ধারণা আছে, কিন্তু এর প্রতি আমাদের বিশ্বাস নেই। (জাসিয়া: ৩২)

দৃশ্যতঃ এ দল এবং আখেরাত অস্বীকারকারীদের মধ্যে একদিক দিয়ে বিরাট পার্থক্য এই যে, তারা আখেরাত একেবারে অস্বীকারকারী এ দলটি তার সম্ভাবনার ধারণা পোষণ করে। কিন্তু ফলাফল ও পরিণামেরদিক দিয়ে উভযেল মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এ জন্যে যে, আখেরাত অস্বীকার করা এবং তার প্রতি বিশ্বাস না থাকার নৈতিক পরিণাম একই । কোন ব্যক্তি আখেরাত অস্বীকারকরে অথবা তার ধারণা রাখে কিন্তু বিশ্বাস করে না, এ উভয় অবস্থায় সে অবশ্যই খোদার কাছে জবাবদিহি অনুভূত থেকে মুক্ত হবে এবং তার এ অনুভূতির অভাব অবশ্যই তাকে ভ্রান্ত চিন্তা ও কাজে লিপ্ত করবে। শুধুমাত্র আখেরাতের বিশ্বাসই দুনিয়ায় মানুষের আচরণকে সঠিক রাখতে পারে। এ না হলে, সন্দেহ এবং অস্বীকার উভয়ই তাকে একই ধরনের দায়িত্বহীন আচরণের দিকে ঠেলে দেবে। যেহেতু এ দায়িত্বহীন আচরণ আখেরাতের ভয়াবহ পরিণামের প্রকৃত কারণ, সে জন্যে জাহান্নামে যাওয়া থেকে না অস্বীকারকারী বাঁচতে পারে আর না তারা, যারা বিশ্বাস রাখে না। (৭৫)

আখেরাত অস্বীকারকারীদের ধারণা

এ একটি স্থান ব্যতীত অন্যান্য সকল স্থানে কুরআনের সুস্পষ্টভাবে আখেরাত অস্বীকারকারীদের বক্তব্য নকল করা হয়েছে।

(আরবী******************)

-এ সব লোক বলে, “জীবন ত ব্যস এ আমাদের দুনিয়অর জীবন মাত্র। এখানেই আমাদের জীবন ও মৃত্যু। কালের চক্র ব্যতীত আর কিছু নেই, যা আমাদের ধ্বংস করতে পারে।” প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এদের কাছে কোন জ্ঞান নেই। এরা শুধু ধারণার ভিত্তিতে এসব কথা বলে। যখন আমাদের সুস্পষ্ট আয়াত তাদেরকে শুনানো হয, তখন এদের নিকটে এ ছাড়া আরে কোন যুক্তি থাকে না যে, তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে আমাদের বাপ-দাদাকে (জীবিত করে) তুলে আন।” (জাসিয়া: ২৪-২৫)

অর্থাৎ জ্ঞানের এমন কোন উপায় নেই যার দ্বারা তারা এ সত্য জ্ঞান লাভ করেছে যে, এ জীবনের পর মানুষের জন্যে আর দ্বিতীয় কোন জীবন নেই এবং এ কথাও তারা জানতে পেরেছে যে, মানুষের রূহ কোন খোদার হুকুমে কবজ করা হয় না। বরঞ্চ মানুষ কালচক্রে মৃত্যুবরণ করে নিঃশেষ হয়ে যায়। আখেরাত অস্বীকার কারীগণ এসব কথা কোন জ্ঞানের ভিত্তিতে বলে না। ব রঞ্চ নিছক অনুমানের ভিত্তিতে বলে। বুদ্ধিবৃত্তির দিক দিযে কথা বলতে গেলে তারা বড়ো জোর এ  কথা  বলতে পারে যে, মুত্যুর পর কোন জীবন আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। তারা এ কথা কিছুতেই বলতে পারে না, আমরা জানি যে এ জীবনের পর কোন দ্বিতীয় জীবন নেই।

এভাবে বৃদ্ধিবৃত্তিক দিক দিযে তারা একথা জানার দাবী করতে পারে না যে, মানুষের রূহ খোদার হুকুমে বের করা হয় না, বরঞ্চ মানুষ নিছক তেমনভাবে মরে শেষ হয়ে যায় যেমন ঘড়ি চলতে  চলতে বন্ধ হয়ে যায। তারা বড়ো জোর একথা বলতে পারে, আমরা এ দুটির মধ্যে কোন একটি সম্পর্কেও একথা জানি না যে, প্রকৃতপক্ষে কি ঘটে থাকে।

এখন প্রশ্ন এই যে, মানবীয় জ্ঞানের নিরিখে যখন মৃত্যুর পর জীবন থাকা বা না থাকার এবং রুহ কবজ হওয়ার অথবা কালচক্রে মৃত্যু সংঘটিত হওয়ার একই রূপ সম্ভাবনা রয়েছে। তখন এর কি কারণ থাকতে পারে যে, তারা আখেরাতের সম্ভাবনা পরিত্যাগ করে নিশ্চিতরূপে আখেরাত অস্বীকারের সপক্ষে সিদ্ধান্ত করে? এর  কারণ এ ছাড়া আর কি কি হতে পারে যে, আসলে বিষয়টির সিদ্ধান্ত তারা যুক্তির ভিত্তিতে না করে আপন প্রবৃত্তির ভিত্তিতে করে? যেহেতু তাদের মন চায় না যে, মৃত্যুর পর কোন জীবন হোক এবং মৃত্যুর পর কোন জীবন হোক এবং মৃত্যুর অর্থ শূন্য বা অস্তিত্বহীনতা নয়, বরঞ্চ রূহের স্থানান্তর, সে জন্যে তারা তাদের মনের চাহিদাকে নিজস্ব আকীদাহ –বিশ্বাস বানিয়ে নেয় এবং অন্য কথা অস্বীকার করে। (৭৬)

(আরবী****************)

-এরা বলে, আমরা যখন মাটি মিশে যাবে এবং হাড়-হাড্ডি কংকালে পরিণত হবে, তখন আবার আমাদেরকে জবিত করে উঠানো হবে? এ সবের ওয়াদা আমরা বহুবার শুনেছি এবং আমাদের পূর্বে আমাদের বাপ-দাদাও শুনেছে। এসব প্রাচীন কাহিনী বই আর কিছু না। (মুমেনুন: ৮২-৮১)

(আরবী******************)

-এবং তোমাদের যদি বিস্ময় প্রকাশ করতে হয়, তাহলে যাদের প্রতি বিস্ময় প্রকাশ করা যায় তাদের কথা, ‘যখন আমরা মরে মাটিতে পরিণত হবো, তখন কি আবার আমাদেরকে নতুন করে পয়দা করা হবে?” এরা ত সেসব লোক যারা তাদের খোদার সাথে কুফরী করেছে। (রা’দ: ৫)

অর্থাৎ তাদের আখেরাত অস্বীকার এবং তাকে অসম্ভব মনে করা প্রকৃতপক্ষে খোদার কুদরত ও হিকমত অস্বীকার করা। তারা শুধু এতোটুকুই বলে না যে, মাতে মিশে যাওয়অর পর দ্বিতীয়বার সৃস্টি করা অসম্ভব, বরঞ্চ তাদের এ বক্তব্যের মধ্যে এ ধারণাও প্রচ্ছন্ন যে, মায়াযাল্লাহ, সে খোদা অক্ষম, দুর্বল ও জ্ঞানহীন যিনি তাদেরকে পয়দা করেছেন। (৭৭)

(আরবী********************)

-কাফেরগণ মানুষকে বলে, আমরা কি তোমাদেরকে এমন একজন লোকের কথা বলব- যে এ খবর দেয় যে, যখন তোমাদের দেহের অনু-পরমাণু বিক্ষিপ্ত হযে পড়বে, তখন তোমাদেরকে নতুন করে পয়দা করাহবে? কি জানি এ ব্যক্তি আল্লাহ নামে মিথ্যা কথা বলছে, অথবা তাকে জ্বিনে ধরেছে। (সাবা: ৭-৮)

কুরাইশ সর্দারগণ নিশ্চিতরূপে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে মিথ্যাবাদী বলার সাহস করতো না।  কারণ গোটা জাতি তাঁকে সত্যবাদী বলে জানতো। তাঁর সমগ্র জীবনে কেউ তাঁর মুখে মিথ্যা কথা শুনেনি। এ  জন্যে তারা লোকের সামনে তাদের অভিযোগ এ আকারে পেশ করতো, “এ ব্যক্তি মুত্যুর পর আবার জীবন রয়েছে এমন অবান্তর কথা যখন মুখ থেকে বের করে তখন তার অবস্থা দুটির কোন একটা অবশ্যই হবে। হয় তো (মায়াযাল্লাহ) এ ব্যক্তি বুঝেই মিথ্যা কথা বলছৈন অথবা পাগল। কিন্তু এ পাগল বলা কথাটিও তেমনি ভিত্তিহীন যেমন মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করা। এ জন্যে যে কোন এক বিবেকহীন ব্যক্তিই একজন পরিপূর্ণ সুস্থ বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিকে পাগল মনে করতে পারে। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা এ বেহুদা কথার জবাবে কোন যুক্তি প্রদর্শন জরুরী মনে করেননি এবং কথা শুধু বলেছেন সেই বিস্ময়কর উক্তির জবাবে যা মৃত্যুর পর জীবনের সম্ভাবনা সম্পর্কে তারা বলতো। (৭৮)

(আরবী***************)

-এসব লোক বলে, সত্যিই কি আমাদেরকে কবর থেকে উঠিয়ে আনা হবে? যখন আমরা জরাজীর্ণ অস্থিপঞ্জরে পরিণত হবো? বলতে লাগলো্যঃ এ প্রত্যাবর্তন ত বড়ো ক্ষতিকর হবে। (নাযিয়াত: ১০-১২)

অর্থাৎ যখন তাদেরকে বলা হলো, হ্যাঁ এমনটিই হবে, তখন তারা ঠাট্টা করে একে অপরকে বলতে লাগলো, “আরে ভাই, সত্যিই সত্যিই যদি আমাদেরকে পূনর্বার জীবন্ত অবস্থায় প্রত্যাবর্তন হতে হয়, তাহলে ত সর্বনাশটা আমাদের হয়েছে। এর পরে ত আমাদের আর কোন মংগল নেই। (৭৯)

(আরবী*****************)

-এবং তারা বলতো, আমরা মরে যখন মাটিতে মিশে যাব এবং শুধু অস্থিপিঞ্জর পড়ে থাকবে, তখন কি পুনরায় আমাদেরকে উঠিয়ে দাঁড় করানো হবে? আমাদের বাপ-দাদাকেও কি এমনি উঠানো হবে যারা পূর্বে অতীত হয়েছেন? (হে নবী) এদেরকে বলে দাও, অবশ্যই আগে ও পরের সকলকেই একদিন একত্রে জিমা করা হবে যার সময় নির্ধারিত করা আছে। (ওয়অকেয়া: ৪৭-৫০)

আখেরাতের সম্ভাবনার যুক্তিপ্রমাণ

আখেরাত অস্বীকারকারীগণ তাদের অস্বীকারের সপক্ষে যেসব কথা বলে সে সবের উল্লেখ করে কুরআন মজিদে স্থানে স্থানে যেসব যক্তি প্রদর্্যশন করা হয়েছে তার থেকে এ কথা প্রমাণিত হয যে, আখেরাত সংঘটিত হওয়া সম্পীর্ণ সম্ভব। তা সম্ভব মনে করা নয়, বরঞ্চ অসম্ভব মনে করাই বিবেকের পরিপন্থী।

(আরবী*****************)

-মানুষ কি দেখে না যে, আমরা তাঁকে এক ফোঁটা শুক্র থেকে পয়দা করেছি এবং তারপর সে ঝগড়াটে হয়ে দাঁড়িযেছে। এখন সে আমাদের উপর দৃষ্টান্ত আরোপ করে অথব নিজের জন্মের কথা ভুলে গেছে। সে বলে, এসব পচে গলে যাওয়া অস্থিপিঞ্জর খে পুনর্জীবিত করবে? তাকে বল, তাকে তিনিই জীবিত করবেন যিনি তাকে প্রথমবার পয়দা করেছেন এবং তিনি সৃষ্টি করার প্রত্যেকটি কাজ ভালভাবে জানেন। (ইয়াসিন: ৭৭০৭৯)

অর্থাৎ সে একথা ভুলে যায় যে, আমরা নিষ্প্রাণ জড় পদার্থ থেকে সে প্রাথমিক জীবাণু (MICRO) সৃষ্টিকারী যা তার সৃষ্টির উপায় হয়ে পড়ে। অতঃপর সে জীবাণু লালন পালন করে তাকে এমন এক উন্নত রূপ দান করা হয়েছে যে আজ সে আমাদর সামনে কথার তুবড়ি ছাড়ার যোগ্য হয়েছে। আমাদেরকে তারা সাধারণত সৃষ্টির ন্যায় অক্ষম মনে করে। তারা এ ভুল ধারণায় লিপ্ত যে মানুষ যেমন মৃতকে জীবিত করতে পারে না তেমনি আমরাও করতে পারি না। এ জন্যে তারা বলে, এসব গলিত অস্থিপিঞ্জর কে জীবিত করবে?

হযরত ইবনে আব্বাস (রা), কাতাদা (র) এবং  সাঈদ বিন জুবাইর (র) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার মক্কায় কুরাইশদের মধ্য থেকে জনৈক ব্যক্তি কবরস্থঅন থেকে একজন মৃত ব্যক্তির একটি গলিত অস্থি নিয়ে আসে এবং সে নবী (সা) এর সামনে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘মুহাম্মদ (সা), তমি বল যে, মৃতকে জীবিত করে উঠানো হবে। এখন বল দেখি, এ গলিত অস্থিগুলোকে কে জীবিত করবে?

তার সংক্ষিপ্ত ও বলিষ্ঠ জবাব দেয়া হলো যে, যিনি তাকে প্রথমবার পয়দা করেছেন তিন তাকে পুনরায় জীবিত করবেন। (৮০)

(আরবী***************)

-তারা বরে, আমরা যখন শুধু অস্থিপিঞ্জর ও মাটি হয়ে যাব, তখন কি আমাদেরকে নতুন করে পয়দা করে উঠানো হবে? তাদের বল, তোমরা পাথর অথবা লোহ হয়ে যাও না কেন, অথবা তার চেয়েও কোন কঠিন বস্তু যা তোমাদের ধারণায় জীবন গ্রহণ সুদূর পরাহত, তথাপি তোমাদের পুনর্জীবিত হয়ে উঠবে। তারা অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে, কে এমন আছে যে, আমাদেরকে পুনরায় জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনবে? জবাবে বল, তিনিই যিনি আমাদেরকে প্রথমবার পয়দা করেছেন। তারা (বিদ্রুপ করে) মাথা হালিয়ে হালিয়ে বলবে, আচ্ছা, তা কখন হবে? তুমি বল আশ্চর্যের কি আছে? সে সময় হয়তো খুবই নিকটবর্তী। যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাক দিবেন, সেদিন তোমরা তাঁর প্রশংসা করতে করতে তাঁর ডাকের জবাবে বের হযে আসবে এবং তোমাদের ধারণা এই হবে যে, “অতি অল্প সময় আমরা এ অবস্থায় পড়েছিলাম। (বনী ইসরাইল : ৪৯-৫২)

অর্থাৎ দুনিয়ায় মৃত্যুর সময় থেকে শুরু করে কিয়ামতে পুনরুত্থানের সময় পর্যন্ত সময়কালতোমরা মাত্র কয়েক ঘন্টার বেশী মনে করবে না। তোমরা তখন এমন মনে করবে, “আমরা দীর্ঘ নিদ্রায় পড়ে ছিলাম। হঠাৎ হাশরের ময়দানে হট্টগোল আমাদেরকে জাগিয়ে দিয়েছে। (৮১)

(আরবী****************)

মানুষ বলে, সত্যি সত্যিই কি মরে যাওয়অর পর পুনরায় আমাদেরকে জীবিত করে বের করে আনা হবে? মানুষেরকি স্মরণ নেই যে, আমরা প্রথমে তাকে পয়দা করেছি, তখন সে কিছুই ছিল না?

(আরবী********************)

-হে লোকেরা! মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে তোমাদের মনে যদি কোন প্রকার সন্দেহ থাকে, তাহলে তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, আমি তোমাদেকে মাটি থেকে পয়দা করেছি, তারপর শুক্রকীট থেকে, তাপর রক্তপিন্ড থেকে, তারপর মাংসপিন্ড থেকে যা আকৃতিসম্পন্নও এবং আকৃতিহীনও হয়। (এসব কথা এ  জন্যে বলীছ) যাতে তোমাদের নিকট প্রকৃত সত্য সুস্পষ্ট করে দিতে পারি। আর আমরা যে শুক্রকীটকেই ইচ্ছা করি একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জরায়ুর মদ্যে স্থিতিশীল করে রাখি।তারপর তোমাদেরকে শিশুরূপে ভূমিষ্ট করি। (তোমাদের লালন-পালন করি) যেন যৌবন পর্যন্ত পৌঁছতে পার। তোমাদের মধ্যে কাউকে আবার পূর্বাহ্নেই ডেকে নেয়া হয় আবার  কাউকে নিকৃষ্টতম জীবনের দিকে প্রত্যাবর্তন করানো হয়, যেন সবকিছু জানার পরও কিছুই না জানে। তোমরা দেখ যে যমীন শুষ্ক হয়ে পড়ে আছে। পরে যখনই তার উপর বৃষ্টি  বর্ষণ করি, তখন সতেজ হয়, ফুল ফুটে এবং সকল প্রকার সুন্দর উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে থাকে। (হজ্ব: ৫)

মাটি থেকে পয়দা করার অর্থ এক ত এই যে, প্রতিটি মানুষকে সেসব উপাদান থেকে পয়দা করা হয় যা সমুদয় মাটি থেকে লাভ করা হয় এবং সৃষ্টির সূচনা শুক্র থেকে হয়। অথবা মানব জাতির সূচনা আদম (আ)  থেকে করা হয়েছৈ যাঁকে সরাসরি মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানব জাতির পরবর্তী বংশধরের ধারাবাহিকতা শুক্রকীট থেকে শুরু হয়েছে। যেমন সুরায়ে সিজাদায় বলা হয়েছে-

(আরবী******************)

-তিনি মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেছেন কাদা মাটি থেকে। তারপর বংশধারা এমন এক বস্তু থেকে চালূ করেছেন যা নিকৃষ্ট পানির মত। (সিজদা: ৭-৮)

উভয় অবস্থাতেই এ কথা প্রমাণিত যে, প্রাণহীন জড় পদার্থ একত্র করেই জীবিত মানুষের সৃষ্টি। এ সত্য বর্ণনা করার পর ঐসব বিভিন্ন স্তরে প্রতি ইংগিত করা হযেছে যার ফলে গর্ভ সঞ্চার হয় এবং মাতৃগর্ভে সন্তান স্থিতি লাভ করে। ওসবের বিশদ বিবরণ দেয়া হয়নি যা আজকাল শক্তিশালী অনুবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়ে। বরঞ্চ ঐসব বড়ো বড়ো বিশিষ্ট পরিবর্তনের উল্লেখ করা হযেছে যে সম্পর্কে সে সময়ের সাধারণ বেদুঈনগণও অবগত ছিল। অর্থাৎ শুক্রকীট স্থিতিশীল হওয়ার পর প্রথমে জমাট রক্তের আকার ধারণ করে। তারপর একটি মাংশ পিন্ডে রূপান্তরিত হয় যার প্রথমে কোন আকার আকৃতি থাকে না। পরে মানুষের আকৃতি সুস্পষ্ট হতে থাকে। গর্ভপাতের বিভিন্ন অবস্থায় যেহেতু মানুষ সৃষ্টির এসব মানুষের পর্যবেক্ষণে আসে,সে জন্যে সে সবের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে। তাপর এ প্রশ্নের জবাবে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি বিবেকের উপর ছেড়ে দেয়া হযেছে যে, যে খোদা মানুষকে এভাবে সৃষ্টি করেন এবং তার বিকাশ সাধন করেন, তাকে পুনর্বার সৃষ্টি করা তাঁর জন্যে কি করে অসম্ভব হতে পারে? (৮২)

(আরবী****************)

এবং এসব লোক বলে, যখন মাটিতে মিশে যাব, তখন কি আবার আমাদেরকে নতুন করে পয়দা করা হবে?

আসল ব্যাপর এই যে, এরা তাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি অস্বীকার করে। তাদেরকে বলঃ মৃত্যুর যে ফেরেশতা তোমাদের জন্যে নির্ধারিত আছে সে পরিপূর্ণরূপে তোমাদেরক তার আয়ত্তে নিয়ে নিবে এবং তারপর তোমাদেরকে তোমাদের প্রবুর দিকে ফিরিয়ে আনা হবে।(সিজদা: ১০-১১)

প্রথম এবং শেষ বাক্যের মাঝে একটি পরিপূর্ণ নতিকাহিনী আছে যা শ্রোতার মনের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কাফেরদের যে প্রতিবাদ আপত্তি প্রথম বাক্যে উদ্ধৃত করা হয়েছে, তা এতোই অর্থহীন যে, তা খন্ডনের কোন প্রয়োজন বোধ করা হয়নি। তা শুধু উদ্ধৃত করে দেয়অই তার অর্থহীনতা প্রকাশের জন্যে যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। এ জন্যে যে তাদের প্রতিবাদ যে দুটি অংশ নিয়ে গঠিত তা দুটিই একেবারে অযৌক্তিক। “আমরা মাটিতে মিশে যাব”- তাদের এ কথাটির কি অর্থ হতে পারে? ‘আমরা’ যে বস্তুর নাম তা কখন মাটিতে মিশে যায়? মাটিতে ত শুধু সে দেহটা মিশে যায়, যার থেকে ‘আমরা’ বেরিয়ে যায়। ঐ দেহের নাম ত ‘আমরা’ নয়। জীবিত অবস্থায় যখন সে দেহের অংগপ্রত্যঙ্গ কাটা হয়, তখন একটির পর একটি করে অংগ অংশ কাটা হতে থাকলেও ‘আমরা’ বস্তুটি পরিপূর্ণরূপে আপন আপন স্থানে বিদ্যমান থাকে। দেহের কর্তিত কোন অংশের সাথে তার কোন অংশ যায় না এবং যখন এ ‘আমরা’ বস্তুটি কোন দেহ থেকে বের হয়ে যায়, তখন সে সমগ্র দেহটি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সে দেহের সাথে ‘আমরা’ বস্তুটির সামান্যতম সম্পর্কও থাকে না। এ জন্যেই ত একজন নিবেদিত প্রাণ প্রেমিক তার প্রিয়তমের মৃতদেহ দাফন করে দেয়। কারণ তার প্রিয়হম সে দেহ থেকে বের হয়ে গেছে। এ জন্যে প্রেমিক তার প্রিয়তমকে নয়, বরঞ্চ এ শুন্যদেহকে দাফন করে যার মধ্যে তার প্রিয়তম অবস্থা করতো। অতএব প্রতিবাদকারীর প্রথম মামলাটিই ভিত্তিহীন হয়ে গেল। এখন রইল তার দ্বিতীয় অংশটি অর্থাৎ “আমাদেরকে কি নতুন করে পয়দা করা হবে?”

এ অস্বীকার এবং বিস্ময়কর প্রশ্নের উদয়ই হতো না। যদি প্রশ্নকারী প্রশ্ন করার পূর্বে এ ‘আমরা’ এবং তার সৃষ্টি করার অর্থের প্রতি মুহূর্তের জন্যেও চিন্তা-ভাবনা করতো। এ ‘আমরা’ বস্তুটির বর্তমান সৃষ্টি এছাড়া আর কি হতে পারে যে, কোথাও থেকে কয়লা, কোথাও থেকে লোহা, কোথাও থেকে চুন এবং এ ধরনের অন্যান্য উপাদানগুলো একত্র করা হলো এবং এর মাটির দেহে এ ‘আমরা’ বস্তুটি বিরাজমান হয়ে গেল। অতঃপর তার মৃত্যুর পর কি হয়? এ মাটির দেহ বা ঘর থেকে যখন ‘আমরা’ বের হয়ে যায়, ত তার ঘর নির্মাণের জন্যে যে সকল উপাদান যমনের বিভিন্ন অংশ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা সবই সেই যমীনেই ফিরে যায়। প্রশ্ন এই যে, যিনি প্রথমে এ “আমরা” কে এ ঘর বানিয়ে দিয়েছিল, তিনি কি দ্বিতীয়বার ঐসব উপাদান বা মালমশলা থেকে সেই ঘর বানিয়ে তাকে নতুনভাবে সেখানে পুনর্বাসিত করতে পারেন না? এ কাজ যখন প্রথম সম্ভব ছিল, সম্ভব কেন, একেবারে বাস্তবে পরিণত করা হযেছিল, তাহলে দ্বিতীয়বার তা সম্ভব হওয়ার এবং বাস্তবে পরিণত হওয়ার পথে কোন জিনিস প্রতিবন্ধক হতে পারে? এ বিষয়টি এমন যে, সামান্য বুদ্ধি খাটালেই একজন নিজেই বুঝতে পারে। কিন্তু সে তার জ্ঞানবুদ্ধিকে এদিকে ধাবিত হতে দেয় না কেন? কি কারণ থঅকতে পারে যে সে কোন চিন্তাভাবনা না করেই মৃত্যর পরের জীবন এবং আখেরাত সম্পর্কে এ ধরনের আপত্তি উত্থাপন করে? মাঝখানের সকল আলোচনা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহতায়ালা দ্বিতীয় বাক্যে এ প্রশ্নের জবাব এভাবে দিচ্ছেন: “প্রকৃতপক্ষে এরা তাদের প্রভুর সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি অস্বীকার করে।” অর্থাৎ আসল ব্যাপার এ নয় যে, দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কোন বিরাট ও অসম্ভব ব্যাপার যা তাদের বোধগম্য নয়,বরঞ্চ প্রকৃতপক্ষে যে জিনিস এ কথা উপলব্ধি করা থেকে তাদেরকে বিরত রাখে তা হলো তাদের এ অভিলাষ যে, দুনিয়ার সর্বত্র ‘আমরা’ লাগামহীন বিচরণ করব, প্রাণভরে পাপাচার করব এবং নির্বিঘ্নে  এখান থেকে বেরিয়ে যাব, তারপর কেউ যেন আমাদের কোনরূপ জিজ্ঞাসাবাদ না কবরে এবং আমাদের কৃতকর্মের কোন হিসাবও যেন আমাদের দিতে না হয়।”

তাপর বলা হয়েছে যে, তোমাদের ‘আমরা’ যে ঘরে বাস করতো তাতো অবশ্যই মাটিতে মিশেযাবে। কিন্তু স্বয়ং এ ‘আমরা’ মাটিতে মিশে যাবে না। বরং তাকে কাজের যে অবকাশ দেয়া হয়েছিল তা শেষ হতেই খোদার পক্ষথেকে মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যাবে এবং তাকে দেহ থেকে বের করে তার সবটুকু নিজের আয়ত্বে নিয়ে নেবে। তার কোন সামান্যতম অংশও দেহের সাথে মাটিতে যেতে পারবে না। তার সবটুকুই তত্ত্বাবধানে (CUSTODY) নেয়া হবে এবং আপন খোদর সামনে পেশ করা হবে।

এ সংক্ষিপ্ত আয়াতটিতে বহু তথ্যের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। এর উপর ভাসা ভাসা (CURSORY) দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে চলবৈ না। নিম্নের বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য:-

১। এতে বিশদভাবে বলা হয়েছৈ যে, মৃত্যু এমনিই আসে না যে, একটি ঘড়ি চলীছল চাবি দেয়া হয়নি। যার ফলে চলতে চলতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। বরঞ্চ প্রকৃতপক্ষে এ কাজের জন্যে আল্লাহতায়ালা একজন বিশেষ ফেরশতা নিযুক্ত করে রেখেগেছেন। তিনি এসেরূহ ঠিক সেভাবেই যথারীত হস্তগত করে নেন যেভাবে একজন সরকারী কর বা সম্পদ আদায়কারী (OFFICIAL RECEIVER) কোন কিছু নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। কুরআনের বিভিন্ন স্থঅনে এ সম্পর্কে অতিরক্ত যেসব বর্ণনা দেয়া হযেছে তা থেকে জানা যায় যে, মৃত্যুর এ ফেরেশতার অধীনে একটি পূর্ণ কর্মচারী বাহিনী আছে, যারা মৃত্যু সংঘটিত করতে চায়, দেহ থেকে রূহ বহিষ্কৃত করতে, অতঃপর সেগুলোকে নিজের আয়ত্তে রাখবে। সেসব কর্মচারীর আচরণ নেক রূহের সাথে এক ধরনের হবে এবং অপরাধী রূহের সাথে অন্য ধরনের হবে। বিশদ বিবরণের জন্যে সূরা নিসা-আয়অত-৯৭, আনয়াম আয়াত ৯৩, নহল ২৮, ওয়অকেয়অ ৮৩,৯৪ দ্রষ্টব্য।

২। এর থেকে এও জানতে পারা যায় যে, মৃত্যুর দ্বারা মানুষ অস্তিত্বহীন হয়ে যায় না। বরঞ্চ তার রূহ দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর অস্তিত্ববান থাকে। “মওতের ফেরেশতা তোমাদেরকে পুরোপুরি তার আয়ত্বে নেবে” –কুরআনের এ শব্দগুলো এ সত্যকে প্রাণিত করে। কারণ কোন অস্তিত্বহীন বস্তুকে আয়ত্বে নেয়অ যায় না। আয়ত্তে নেয়ার অর্থই ত এই যে, আয়ত্তে নেয়া হলে তা আয়ত্তে আনয়নকারীর কাছে বিদ্যমান থাকবে।

৩। আরও জানতে পারা যায় যে, মৃত্যুর সময় যা আয়ত্তে নেয়া হয় তা মানুষের জীববিজ্ঞঅন সংক্রা্ত ‘আমি’ ‘আমরা’ ‘তুমি’ ‘তোমরা’ শব্দগুলোর দ্বরা প্রকাশকরা হয়। এ ‘আমি’ দুনিয়ারকাজকর্মের মাধ্যমে যে ধরনের ব্যক্তিত্বই লাভ করুক তা পুরোপুরি এবং অবিকল বের করে নেয়অ হয়, তার গুণাবলীর কোন কমবেশী না করেই এবং মৃত্যুর পর তাকে প্রবুর (আল্লাহর) কাছে উপস্থাপিত করা হয়। একেই আখেরাতে নবজীন এবং নতুন দেহ দান করা হয়। এর বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করা হবে, তার কাছথেকে কৃতকর্মের হিসাবনেয়অ হবে এবং তাকেই শাস্তি অথবা পুরষ্কার দেয়া হবে। (৮৩)

(আরবী****************)

-একটু তাদেরকে জিজ্ঞেস করঃ এদেরকে পয়দা করা কি বেশী কঠিন, না, না ঐসব বস্তু যা আমি পয়দা করে রেখেছি? এদেরকে আমরা আটাল মাটি থেকে তৈরী করেছি। (আসসাফফাত: ১১)

এ ছিল মক্কার কাফেরদের সে সন্দেহের জবাব যা তারা আখেরাত সম্পর্কে পেশ করতো। তাদের ধারণা ছিল আখেরাত সম্ভব নয়। কারণ মৃত ব্যক্তির দ্বিতীয়বার পয়দা হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। এর জবাবে আখেরাতের সম্ভাবনার যুক্তি করতে গিযে আল্লহতায়অলার সর্বপ্রথম তাদের সামনে এ প্রশ্ন রাখলেন: তোমাদের দৃষ্টিতে মৃত ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার পয়দা করা বড়ো কঠিন কাজ তোমাদের ধারণায় যার শক্তি আমাদের নেই। তাহলে বল, এ যমীন ও আসমান এবং আসমান যমীনের অসংখ্য বস্তুনিচয় পয়দা করা কি কোন সহজ কাজ? তোমাদের জ্ঞঅন-বুদ্ধি কোথায় হারিয়ে গেল যে, সে খোদর জন্যে এ বিরাট বিশ্ব প্রকৃতি সৃষ্টি কঠিন কাজ ছিল না এবং যিনি তোমাদেরকে একবার পয়দা করেছেন তাঁর সম্পর্কে তোমাদের এ ধারণা যে তিনি তোমাদেরকে দ্বিতয়বার পয়দা করতে অক্ষম? তারপর তিনি বলেন মানুষ ত এমন বিরাট কিছু নয়। তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পুনরায় তাকে সে মাটি থেকে সৃষ্টি করা যেতে পারে। তার অস্তিত্বের সকল উপাদান মাটি থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। যে শুক্র থেকে তার সৃষ্টি তা আহার থেকে তৈরী হয়। গর্ভ সঞ্জারের সময় থেকে মৃত্যু পর্য়ন্ত তার গোটা সত্তা যেসব মিশ্রবস্তুর উপাদান (INGREDIENTS) থেকে তৈরী হয়, তা সবই আহার থেকে সংগৃহীত হয়। এ আহার প্রাণীজ হোক অথবা উদ্ভিদজাত, তার উৎস সেই মাটি থেকে যা পানির সাথে মিশ্রিত হয়ে এমন শক্তি সঞ্চয় করে যে, মানুষের আহারের জন্যে শস্য,তরিতরকারি এবং ফলমূল উৎপন্ন করে এবং ঐসব পশু  লালন-পালন কর যার দুগ্ধ ও মাংস মানুষ খায়। এ জবাবে যুক্তির ভিত্তি এই যে, এ মাটি যদি জীবন গ্রহণেল যোগ্য না হতো তাহলে তোমরা আজ কিভাবে জীবিত বিদ্যমান আছ? আর যদি এর মধ্যে জীবন সৃষ্টি করা আজ সম্ভব হয় যেমন তোমাদের অস্তিত্বই স্বয়ং তার সম্ভাবনার সুস্পষ্ট প্রমাণ, তাহলে আগামীতে এ মাটি থেকে দ্বিতীয়বার তোমাদের সৃষ্টি করা কেন সম্ভব হবে না? (৮৪)

(আরবী****************)

আসমান ও যমীন সৃষ্টি করা মানুষ সৃষ্টি করা অপেক্ষা অধিকতর কঠিন কাজ। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। (মুমেনূন: ৫৭)

এ হচ্ছে কাফেরদের সেই ধারণার জবাব যে মানুষ মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত হবে- এ এক অসম্ভব ব্যাপার। বলা হয়েছে যে, যারা এ ধরনের কথা বলে, তার প্রকৃতপক্ষেনির্বোধ। একটু বুদ্ধি-বিবেকসহ চিন্তা করলে তাদের জন্যে এ কথা উপলব্ধি করা কঠিন হবে না যে, যে খোদা এ বিরাট বিশাল প্রাকৃতিরাজ্য সৃষ্টি করেছেন তার জন্যে মানুষকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কোন কঠিন কাজ নয়। (৮৫)

(আরবী**************)

তোমাদেরকে সৃষ্টি করাই কি বেশী কঠিন কাজ, না আসমান সৃষ্টি করা? আল্লাহ ত তা বানিয়েছেন। (নাযিয়অত: ২৭)

সৃষ্টি করার অর্থ মানুষকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা এবং আসমান বলতে গোটা উর্ধলোককে বুঝায়। তার  মধ্যে রয়েছে অসংখ্য গ্রহ-নক্ষত্র, অগণিত সৌরজগত ও ছায়াপথ। কথা হচ্ছে এই যে, তোমরা মৃত্যুর পরে দ্বিতীয়বার জীবন লাভ অসম্ভ মনে করছ এবং বারবার বলছঃ  এ কি করে সম্ভব যে যখন আমাদের অস্থিপঞ্জর একেবার গলে পচে যাবে, তখন দেহের এ বিচ্ছিন্ন বিক্ষপ্ত অংশগুলো আবার একত্র করে দেয়া হবে এবং তাতে জীবন দিযে দেয়া হবে? তোমরা কি এ বিষয়ে চিন্তা করে দেখেছ, এ বিরাট বিশাল প্রকৃত রাজ্য সৃষ্টি করা অধিকতর কাজ, না তোমাদেরতে এতকার সৃষ্টি করার পর দ্বিতীয়বার ঐ আকৃতিকে সৃষ্টি করা কঠিন? যে খোদার নিকটে এ কোন কঠিন কাজ ছিল না, তাঁর জন্যে এ কাজ কি করে এমন কঠিন হবে, তা তিনি করতে পারবেন না? (৮৬)

(আরবী****************)

এবং তারা বলে: এত সুস্পষ্ট যাদু। আর এমনও কি কখনো হতে পারে যে, আমরা মরে যাব, মাটিতে মিখে যাব। এবং শুধু অস্থিপিঞ্জর রয়ে যাবে। তখন আমাদেরকে পুনরায় জীবিত করে দাঁড় করা নো হবে। আমাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদাকেও কি উঠানো হবে? তাদেরকে বলঃ হ্যাঁ আর তোমরা (খোদার মুকাবিলায়) একেবারে অসহায়। ব্যস একটি মাত্র ধাক্কা এবং তারা স্বচক্ষে সবকিছু দেখতে থাকবে (যার খবর দেয়া হচ্ছে)। সে সময় এরা বলবেঃ হায়! আমাদের কপাল, এতো সেই বিচার দিন। (সাফ্‌ফাত: ১৫-২০)

তাদের বক্তব্য ছিল এই যে, এতো যাদু জগতের কথা। এমন কোন যাদুর জগত আছে এ ব্যক্তি যার উল্লেখ করেছে। সেখানে মৃত ব্যক্তি জীবিত হয়ে উঠবে বিচারালয় হবে, জান্নাত তৈরী হবে, দোজখের আজাব হবে। তাদের কথার অর্থ এটাও হতে পারে যে, এ ব্যক্তি এমন সব কথা বলছৈ যা এ কথার প্রমাণ যে, তাকে কেউ যাদু করেছে যার জন্যে  একজন ভালো মানুষ এমন সব কথা বলছে। তার জবাবে বলা হলো, হ্যাঁ, তাই হবে। তোমরা কোদার সামনে অসহায়। তিনি তোমাদেরকে যা কিছুই বানাতে চান বানাতে পারেন। তিনি যখন চেয়েছিলেন তাঁর একটি ইংগিতে মাত্র তোমরা অস্তিত্ব লাভ করলে। যখন তিন চাইবেন, তার একটি ইংগিতেই তোমরা ‍মৃত্যুবরণ করবে তারপর তিনি যখন চাইবেন, তাঁর ইংগিতেতোমাদের উঠিয়ে দাঁড় করানো হবে। এ কাজের সময় যখন আসবে, তখন দুনিয়া পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করা কোন বিরাট লম্বা-চওড়া কাজ হবে না। ব্যস একটি মাত্র ধাক্কা ও কম্পন নিদ্রিতদেরকে জাগ্রত করার জন্যে যথেষ্ট হবে। “ধাক্কা বা সজোরে ঝাঁকুনি” শব্দটি এখানে অর্থবহ।এর থেকে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে এমন কিছু চিত্র চোখের সামনে ভেসে ওঠে যে মানবের সূচনা থেকে কিয়অমত পর্যন্ত যেসব মৃত্যুবরণ করেছিল,  তারা যেমননিদ্রিত হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কেউ ভর্ৎসনার স্বরে বলছৈ- “উঠে পড়।” আর তক্ষুণি মুহূর্তের মধ্যেই সব উঠে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। (৮৭)

(আরবী*****************)

(এসব লোক আখেরাত মানে না) তারা কি উট দেখে না যে কিভাবে তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে? আকাশ কি দেখে না কিভাবে তা উত্তোলিত হয়েছে? পাহাড় কি দেখে না কিভাবে তা জমাট করা হয়েছে? যমীন দেখে না কিভাবে তা বিছিয়ে রাখা হয়েছে? (গাশিয়অ: ১৭০২০)

অর্থাৎ এসব লোকেরা যদি আখেরাতের এসব কথা শুনে বলে যে এ সবকিছু কিভাবে হতে পারে, তাহলে তারা কি কখনো তাদের চারপাশের দুনিয়ার দিকে তাকিয়ে চিন্তা করে দেখেছে যে. কিভাবে উটের সৃষ্টি হলো, এ আকাশ কিভাবে এতো ঊর্ধে উত্থিত হলো, পাহাড় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো এবং যমীন কিভাবে বিছেয়ে দিয়া হলো। এসব কিছু যদি হতে পারে এবং হওয়ার পর বাস্তব তাদের সামনে বিদ্যমান, তাহলে কিয়ামত কেন হতে পারবে না? আখেরাতে দ্বিতীয় একটি দুনিয়া কেন তৈরী হতে পারবে না? দোযখ এবং জান্নাতই বা কেন তৈরী হতে পারবে না? এত একজন নির্বোধ ও বেখেয়াল লোলের কাজ যে, দুনিয়ায় চোখ খোলার পর যেসব বস্তু সে চোখের সামনে দেখতে পেল সেসব সম্পর্কে সে মনে করলো যে, তাদের অস্তিত্ব লাভ ত সম্ভব, কিন্তু যে সব এখনও তার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতায় আসেনি, সে সব সম্পর্কে সে চোখ বুজে একথা বলবে যে, ওসব সম্ভব নয়। তার মাথায় যদি বুদ্ধি থেকে থাকে, তাহলে তার চিন্তা করা উচিত যে, যা কিছু বিদ্যমান আছে তা কি করে অস্তিত্ব লাভ করলো? এ উট ঐ সব বৈশিষ্ট্যসহ কিভাবে তৈরী হলো, আরবের মরুবাসীদের জন্যে যেসব বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পশুর প্রয়োজন ছিল? এ আকাশ কিভাবে তৈরী হলো যার বায়ুমন্ডলে শ্বাস গ্রহণের জন্যে বায়ু রয়েছে, যার মেঘমালা বৃষ্টি নিয়ে আসে, যার সূর্য দিনের আলো ও উত্তাপ সরবরাহ করে এবং যার চাঁদ ও তারা রাতে ঝকমক করে? এ যমীন কিভাবে বিছানা হলো যার উপর মানুষ বাস করে, যার উত্পান্ন ফসল থেকে তার সকল প্রয়োজন পূরণ হয়, যার ঝর্ণা ও কুপের উপরে তার জীবন নির্ভরশীল? এ পাহাড় কিভাবে যমীনের উপর উত্থিত হলো তা রং বেরঙেয়ের মাটি ও পাথর এবং বিভিন্ন প্রকারের খনিজ সম্পদসহ জমাট হয়ে দাঁড়েয়ে আছে? এসব কি কোন শক্তিমান সত্তা বিজ্ঞ নির্মাতার নির্মাণ কুশলতা ব্যতিরেকেই হয়ে গেল? কোন চিন্তাশীল ও সমঝদার ব্যক্তি এ প্রশ্নের নেতিবাচক জবাব দিতে পারে না। সে যদি একগুয়ে ও হঠকারী না হয় তাহলে তাকে স্বীকার করতে হবে যে, এ প্রতিটি বস্তুই অসম্ভব হতো যদি কোন বিরাট শক্তিমান বিজ্ঞ সত্তা সেগুলোকে সম্ভব বানিয়ে না দিতেন। আর যখন একজন শক্তিমানের শক্তিতে দুনিয়ার এসব কিছু হওয়া সম্ভব, তাহলে কোন কারণ নেই যেসবের ভবিষ্যতে অস্তিত্ব লাভের সংবাদ দেয়া হচ্ছে তা অসম্ভব মনে করা হবে। (৮৮)

أَلَمْ يَكُ نُطْفَةً مِنْ مَنِيٍّ يُمْنَى – ثُمَّ كَانَ عَلَقَةً فَخَلَقَ فَسَوَّى – فَجَعَلَ مِنْهُ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى – أَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَى-( القيامة-40)

-সে কি নিকৃষ্টতম পানির এক ফোঁটা শুক্র ছিল না। যা মাতৃগর্ভে নিক্ষিপ্ত হয়? পরে তা একটি মাংসপিন্ড হলো। তারপর আল্লাহ তার দেহ বানালেন, তার অংগপ্রত্যংগ সুসমঞ্জস করলেন। তার থেকে পুরুষ ও নারী দু‘ধরনের মানুষ বানালেন। তিনি কি মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করতে সক্ষম নন? (কিয়ামত: ৪০)

এ হচ্ছে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সম্ভাবনার আর একটি যুক্তি যা কাফেরদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। যারা এ কথা স্বীকার করে যে, একফোঁটা শক্র থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করে পূর্ণ মানুষ সৃষ্টি পর্যন্ত সমস্ত কাজ আল্লাহতায়ালার সৃষ্টি কৌশলেরই নিদর্শন, তাদের জন্যে প্রকৃতপক্ষে এ যুক্তির কোন জবাবই ছিল না। কারণ তারা যতোই নির্লজ্জ হোক না কেন, তাদের বিবেক এ কথা স্বীকার না করে পারে না যে, যে খোদা এভাবে ‍দুনিয়াতে মানুষ পয়দা করেন, তিনি পুনর্বারও এ মানুষকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম। ‍কিন্তু যে নাস্তিক ও বিজ্ঞতাপূর্ণ কাজকে নিছক দুর্ঘটনার ফল গণ্য করে, সে মুখে যতোই হঠকারিতা প্রকাশ করুন না কেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছে এর কোন ব্যাখ্যা সম্ভব ছিল না যে, মানব সূচনা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দুনিয়ার প্রতিটি অংশে ও প্রত্যেক জাতির মধ্যে কিভাবে একই সৃজনকর্মের ফলে পুত্র ও কন্যার জন্মগ্রহন ক্রমাগতভাবে এমন অনুপাতে হয়ে আসছে সে কোথাও কোনকালে এমন হয়নি যে কোন জনপদ শুধুমাত্র ছেলে অথবা শুধুমাত্র মেয়ে জন্মগ্রহণ করতে থেকেছে যার ফলে ভবিষ্যতে তাদের বংশধারা অব্যাহত থাকার সম্ভবনা বিনষ্ট হয়েছে। তারা যতোই নির্লজ্জ হোক না কেন, তাদের পক্ষে এ দাবী করা সম্ভব ছিল না যে, এ সবই ঘটনাক্রমে চলে আসছে। একবার যদি তাদের মন এ সাক্ষ্য দিত যে, এসব কিছু একজন বিজ্ঞ নির্মাতার নির্মানকুষলতার নির্দশন, তাহলে তাদের কথা স্বীকার করা ব্যতীত উপায় ছিল না যে, সেই বিজ্ঞ নির্মাতা তাঁর নির্মিত বস্তু ভেঙ্গে ফেলে পুনর্বার নির্মাণ করতে পারে না। (৮৯)

فَلْيَنْظُرِ الْإِنْسَانُ مِمَّ خُلِقَ – خُلِقَ مِنْ مَاءٍ دَافِقٍ – يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ – إِنَّهُ عَلَى رَجْعِهِ لَقَادِرٌ-( الطارق-5-8)

-তারপর মানুষ এটুকুও লক্ষ্য করুক না কেন তাকে বন্তু থেকে পয়দা করা হয়েছে, এক লস্ফমান পানি থেকে পয়দা করা হয়েছে যা পৃষ্ঠা ও বক্ষের অস্থির মধ্য থেকে বের হয়। নিশ্চয় সে (সৃষ্টিকর্তা) তাকে দ্বিতীয়বার পয়দা করতে সক্ষম। (তারেক: ৫-৮)

অর্থাত্ মানুষ তার আপন অস্তিত্ব সম্পর্কেই একটু চিন্তা করে দেখুক যে কিভাবে তাকে পয়দা করা হয়েছে। এই যে মা-বাপ বহুবার একত্রে যৌন সংমিলনে মিলিত হচ্ছে তাদের একটি মিলনকে কে গর্ভ সঞ্চারের উপায় বানিয়ে দিচ্ছেন এবং তাকে এক বিশেষ মানুষের জন্মলাভের কারণ বানিয়ে দিচ্ছেন। [এ বিষয়টি সেকালের আরবদের জন্য যতোটা ছিল, তার চেয়ে কয়েকগুণ অধিক জটিল হয়ে পড়েছে বর্তমান যুগের লোকের কাছে আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ফলে। বর্তমানে যে সব আবিস্কার হয়েছে তার দৃষ্টিতে নারী-পুরুষের বৈবাহিক জীবনকালে অসংখ্য অগণিত শুক্রকীট (sperm) পুরুষের দেহ থেকে নির্গত হয়ে নারী দেহে প্রবেশ করে। নারীর মধ্যেও বহুবছর যাবত এমন ডিম্বকোষ বা ভ্রুণ কোষ ক্রমাগত তৈরী হতে থাকে তার মধ্যে থেকে প্রত্যেক ডিম্ব কোষে পুরুষের কোন একটি শুক্রকীট মিলিত হওয়ার ফলে গর্ভ সঞ্চারের শক্তি বিদ্যমান থাকে। আবার এসব একই রকমের হয় না বরঞ্চ প্রতিটি শুক্র কীট ও ডিম্বকোষ পৃথক পৃথক বৈশিষ্টের অধিকারী হয়। তার প্রতিটি জোড়ার সংমিলনে এক বিশেষ ধরনের মানুষ জন্মগ্রহন করতে পারে যা অনিবার্যরূপৈ অন্যান্য জোড়ার সংমিলনে জন্মগ্রহনকরী মানুষ থেকে ভিন্নতর হবে। এখন প্রশ্ন এই যে, এখন এ সিদ্ধান্ত সে করবে যে, পুরুষের অসংখ্য শুক্র কীটের মধ্যে কোনটিকে নারীর অসংখ্য ডিম্বকোষের কোনটির সাথে মিলিত করে কোন সময় কোন ধরনের মানুষ সৃষ্টি করা যায়? পুরুষ ও নারী উভয়েই এ ব্যাপারে একেবারে এখতিয়ার বিহীন। কোন হাকীম বা ডাক্তার এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এ কথা বলাও ভুল যে,কোন শুক্রকীটের কোন ডিম্ব কোষের সাথে মিলিত হওয়ার নিছক এক আকস্মিক ঘটনার ফল (ACCIDENTAL) । কারণ এ বিস্ময়কর সৃজন কর্মের ফলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভিন্ন সময়ে যে ধরণের মানুষ জন্মগ্রহন করে তা মানব ইতিহাসের চড়াই উত্রাইয়ে সিদ্ধান্তকর প্রভাব রাখে। আর এ প্রভাব এমন ধরনের দক্ষতাপূর্ণ বিজ্ঞতাসহ প্রতিষ্ঠিত হয় যার বদৌলতে মানুষের মনে এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে ইতিহাসের কোন দর্শনও হতে পারে। মানুষ যদি কোন হিকমত ব্যতিরেকে এরোপাতাড়ি জন্মগ্রহণ করতো তাহলে তার ইতিহাসের কোন দর্শনের ধারণা কখনো করা যেতো না। অতএব এ স্বীকার করা ছাড়া গত্যন্তর নেই যে, এ লস্ফমান পানি থেকে মানব সৃষ্টি এক বিজ্ঞ খোদাই তাঁর বিশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী করেছেন। (গ্রন্থকার)] তারপর এমন কোন সত্তা রয়েছেন যিনি গর্ভ সঞ্চারের পর থেকে মাতৃগর্ভে স্তরে স্তরে ক্রমবিকাশ দান করে তাকে এমন অবস্থায় পৌছিয়ে দেন যে, সে একটি জীবিত সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহন করে? কোন সে শক্তি যে মাতৃগর্ভেই সে শিশুর দৈহিক গঠন এবং তার দৈহিক ও মানসিক যোগ্যতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত করে দেয়? এমন কোন সত্তা যিনি জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময় কালে তার ক্রমাগত তত্ত্বাবধান করেন? তাকে রোগ থেকে রক্ষা করেন, দুর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। বিভিন্ন রকমের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। তার জন্যে জীবনের এতো উপায় উপাদান সরবরাহ করেন যা গণনা করা যায় না। তার জন্যে প্রতিটি পদক্ষেপে দুনিয়ায় বেঁচে থাকার এমন সব সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করে দেন যে, তা নিজে সরবরাহ করতে সক্ষম হওয়া তো দুরের কথা সে সবের বহু বিষয়ের তার কোন অনুভূতিই নেই। এসব কি কোন এক খোদার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যতীতই হচ্ছে? যদি এ প্রশ্নের জবাব কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তির নেতিবাচক না হয়, তাহলে এ কথা উপলব্ধি করা কঠিন নয় যে, যেভাবে তিনি মানুষকে অস্তিত্ব দান করেন এবং গর্ভসঞ্চারের পর থেকে তাকে মৃত্যুর পর ফিরিয়ে এনে অস্তিত্ব দান করতে পারেন। যদি তিনি প্রথম বস্তুর উপর সক্ষম থেকে থাকেন এবং তাঁরই শক্তির মানুষ এ সময়ে দুনিয়ায় জীবিত বিদ্যমান, তা হলে এমন কো সংগত যুক্তি এ ধারণা করার জন্যে পেশ করা যেতে পারে যে, দ্বিতীয় বস্তুর উপর তিনি সক্ষম নন? এ সক্ষমতা অস্বীকার করার জন্যে মানুষকে এ কথাও একেবারে অস্বীকার করতে হবে যে, খোদা তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন। আর যে ব্যক্তি এ কাথা অস্বীকার করতে পারে, তার জন্যে এটাও অসম্ভব নয় যে, একদিন তা মস্তিস্কবিকৃতি তার মুখ থেকে এ দাবী উত্থাপন করাবে যে দুনিয়ার সকল গ্রন্থাবলী দুর্ঘটনার ফলে ছাপানো হয়েছে, দুনিয়ার সকল শহর-বন্দর দুর্ঘটনার ফলে নির্মিত হয়েছে এবং দুনিয়ার এমন কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে যার ফলে সকল কলকারখানাগুলো তৈরী হয়ে আপনা আপনি চলতে শুরু করেছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মানুষের সৃষ্টি, তার দেহের গঠন এবং তার মধ্যে কাজের শক্তি ও যোগ্যতা পয়দা হওয়া ও একটি জীবন্ত সত্তা হিসাবে তার অস্তিত্ববান থাকা এমন এক কাজ যা ওসব কাজ থেকে বহুগুনে কঠিন যা মানুষের দ্বারা দুনিয়ায় হয়েছে এবং হচ্ছে। এতো বড় জটিল ও কঠিন কাজ এখন বিজ্ঞতা, অনুপাত ও ব্যবস্থাপনাসহ যদি দুর্ঘটনার ফলশ্রুতি স্বরূপ লক্ষ লক্ষ বছর যাবত ধারাবাহিকভাবে চলতে পারে তাহলে এমন কোন বস্তু আছে যাকে একজন মস্তিস্ক বিকৃত লোক দুর্ঘটনা বলতে পারবে না? (৯০)

­ بَلْ عَجِبُوا أَنْ جَاءَهُمْ مُنْذِرٌ مِنْهُمْ فَقَالَ الْكَافِرُونَ هَذَا شَيْءٌ عَجِيبٌ – أَإِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا ذَلِكَ رَجْعٌ بَعِيدٌ – قَدْ عَلِمْنَا مَا تَنْقُصُ الْأَرْضُ مِنْهُمْ وَعِنْدَنَا كِتَابٌ حَفِيظٌ-( ق-2-4)

-বরং একজন সাবধানকারী স্বয়ং তাদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে এসেছে এটাই এদের জন্যে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। ফলে অমান্যকারীগণ বলতে লাগলো“- এতো বড় আজব কথা। আমরা যখন মরে যাব এবং মাটিতে মিশে যাব (তারপর পুনরায় উত্থিত হবো?) এ প্রত্যাবর্তন ত বিবেকের অগম্য।“ অথচ মাটি তাদের দেহ থেকে যা কিছু ভক্ষণ করে তা সবই আমাদের জ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত। আর আমাদের কাছে একখানি কিতাব আছে যার মধ্যে সব কিছুই সংরক্ষিত আছে। (কাফ: ২-৪)

তাদের প্রথম বিস্ময় ত এ বিষয়ে ছিল যে, তাদের জাতির মধ্য থেকে তাদেরই মতো একজন এ দাবী করেছিল, “আমি খোদার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে সাবধান করে দিতে এসেছি।“ তারপর তাদের কাছে অতিরিক্ত বিস্ময়কর ব্যাপার এই ছিল যে, যে ব্যক্তি তাদেরকে যে বিষয়ে সাবধান করে দিচ্ছিল তা এই যে, মৃত্যুর পর সকল মানুষকে পুনরায় নতুন করে জীবিত করা হবে। আর তাদের সকলকে একত্র করে আল্লাহতায়ালার আদালতে পেশ করা হবে। তারপর সেখানে তাদের কর্মকান্ডের হিসাব নেয়ার পর পুরস্করা এবং শাস্তি করা হবে। তারপর সেখানে তাদের কর্মকান্ডের হিসাবে নেয়ার পর পুরস্কার এবং শাস্তি দেয়া হবে। তারপর বলা হলো যে, এ কথা যদি এসব লোকের বুদ্ধি-বিবেকে না ধরে ত এ তাদের বুদ্ধির সংকীর্ণতা বলতে হবে। এর জন্যে এটা অনিবার্য হয়ে পড়ে না যে, আল্লাহর জ্ঞান ও শক্তি সংকীর্ণ হয়ে পড়বে। এরা মনে করে যে, মানব জাতির সূচনাকাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী অসংখ্য অগণিত মানুষের দেহের অংশাবলী সে মাটি বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে এবং ভবিষ্যতেও বিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। সেগুলো একত্র করা কিছুতেই সম্ভবপর নয়। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারে এই যে, সে সবের প্রতিটি অংশ যে আকারে যেখানেই আছে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যক্ষভাবে তা জানেন। উপরন্তু তার পূর্ণ রেকর্ড আল্লাহতায়ালার দপ্তরে সংরক্ষিত করা হচ্ছে-যার থেকে কোন সামান্যতম অংশও ছুটে যায়নি। যখন আল্লাহর হুকুম হবে তখন সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ফেরেশতাগণ সে রেকর্ড থেকে এক একটি অংশ বের করে আনবেন এবং সকল মানুষের অবিকল সেই দেহ বানিয়ে দেবেন, যে দেহ ধারণ করে তারা দুনিয়ায় জীবন যাপন করেছে।

এ আয়াতটিও ঐসব আয়াতের মধ্যে একটি যেখানে বিশদভাবে বলা হয়েছে যে, আখেরাতের জীবন শুধুমাত্র সেরূপ দৈহিক জীবনই হবে না যেমন এ দুনিয়াতে রয়েছ, বরঞ্চ দেহও প্রত্যেকের তাই হবে যা এ দুনিয়াতে ছিল। প্রকৃত ব্যাপারে যদি তা না হতো, তাহলে কাফেরদের কথার জবাবে এ কথা বলা অর্থহীন হতো যে, মাটি তোমাদের দেহের যা কিছু ভক্ষণ করছে তা আমাদের জানা আছে এবং তার অনু পরমানুর রেকর্ড বিদ্যমান আছে। (৯১)

أَفَعَيِينَا بِالْخَلْقِ الْأَوَّلِ بَلْ هُمْ فِي لَبْسٍ مِنْ خَلْقٍ جَدِيدٍ-( ق-15)

-তাহলে প্রথমবারের সৃষ্টিতে কি আমরা অক্ষম ছিলাম? কিন্তু নতুন সৃষ্টির ব্যাপারে এরা সন্দিহান। (কাফ: ১৫)

কায়েকটি শব্দে সংক্ষিপ্তভাবে এ এমন পরিস্কার ও সোজা কথা আখেরাত অস্বিকারকারীদের মুকাবিলায় বলা হয়েছিল যে, যা প্রতিটি বিবেক সম্পন্ন লোকের হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়ে থাকবে। কেউ যদি খোদা অস্বীকারকারী না হয় এবং নিবুদ্ধিতার এমন সীমায় পৌছে না থাকে যে, এ সুশৃংখল প্রকৃতি রাজ্য এবং তার ভেতরে মানুষের জন্মকে নিছক একটি দুর্ঘটনার ফলশ্রুতি মনে না করে, তার পক্ষে এ কথা স্বীকার করা ছাড়া কোন উপায় থাকবে না যে, একমাত্র খোদাই আমাদেরকে এবং এ বিশ্বজগতকে সৃষ্টি করেছেন। এ বাস্তবতা আমরা এ দুনিয়ায় বিদ্যমান দেখছি এবং যমীন ও আসমানের সকল কারখানা আমাদের চোখের সামনেই চলছে। এ সবই তো এ কথার প্রকৃষ্ট প্রমাণ যে, খোদা আমাদের এ প্রকৃতি রাজ্য সৃষ্টি করতে অক্ষম ছিলেন না। এরপর যদি কেউ বলে যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পর সেই খোদা এক দ্বিতীয় বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না এবং মৃত্যুর পর পুনরায় আমাদের সৃষ্টি করতে পারবেন না। তাহলে বলতে হবে যে, সে বিবেকের পরিপন্থী কথা বলছে। খোদা অক্ষম হলে তা প্রথমবারই সৃষ্টি করতে পারতেন না। যখন তিনি প্রথমবার সৃষ্টি করে ফেলেছেন এবং তাঁর সে সৃষ্টির বদৌলতে আমরা অস্তিত্ব লাভ করেছি, তাহলে এমন ধারণা করার কি যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে যে, নিজের তৈরী জিনিস ভেঙ্গে ফেলে পুনরায় তা বানাতে তিনি অক্ষম? (৯২)

আখেরাতের অনিবার্যতার যুক্তি

কুরআন অনস্বীকার্য যুক্তিসহ আখেরাতের সম্ভাবনা প্রমাণ করাই যথেষ্ট মনে করেনি। বরঞ্চ একথাও প্রমান করেছে যে, তা সংঘটিত হওয়া আবশ্যকও বটে। বিবেকের দাবী, সুবিচারের দাবী এবং নৈতিকতার দাবী এই যে, আখেরাতের হোক যেখানে মানুষের যাবতীয় কর্মকান্ডের হিসাব নেয়া হবে, যা তারা জ্ঞানলাভ করার পর থেকে মৃত্যুর পূর্বে মুহূর্ত পর্যন্ত করেছে এবং তারা তাদের পেছনে ফেলে গেছে তাদের কাজের এমন সব ভালো অথবা মন্দ প্রভাব যা দীর্ঘকাল যাবত ভবিষ্যত্ বংশধরগুলোকে প্রভাবিত করতে থাকে। এ হিসাব নেয়া যদি না হয় এরং ভালো কাজের পুরস্কার এবং মন্দ কাজের শাস্তি না হয়, তাহলে তার অর্থ এ হবে যে, খোদার এ দুনিয়ায় ইনসাফ বলতে কিছু নেই। এখানে মানুষকে বিবেক বুদ্ধি দান করে, ভালো ও মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করার ক্ষমতা দিয়ে এবং অসংখ্য বন্তু নিচয় ও অন্যান্য মানুষের উপর এখতিয়ার দান করে অযথা এবং অর্থহীনভাবে পয়দা করা হয়েছে। দুনিয়ার বর্তমান জীবনে না পরোপুরি হিসাব নেয়া সম্ভব, না পুরোপুরি ইনসাফ আর না পূর্ণ পুরস্কার ও শাস্তি সম্ভব। এ জন্যে অনিবার্যরূপে একটি দ্বিতীয় জগত হওয়া উচিত যেখানে সৃষ্টির সূচনা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত অস্তিত্বলাভকারী সকল মানুষকে যেন একই সময়ে একত্র করা যায়, সকল প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য কাজের এবং তার থেকে সৃষ্ট পরিণাম ফলের হিসাব নিয়ে এক এক ব্যক্তির দায়িত্ব নির্ণয় করা যায় এবং সেখানে জীবন সীমিত না হয়ে যেন চিরন্তন হয় যাতে করে যে ব্যক্তি যতোটুকু শাস্তির যোগ্য তা যেন পুরোপুরি ভোগ করতে পারে এবং যে যতোটুকু পুরস্কারের যোগ্য তা যেন তাকে পুরোপুরি দেয়া যায়। এ বিষয়টিকে কুরআনে বিশদভাবে বিভিন্ন উপায়ে বর্ণনা করা হয়েছে যাতে কাফেরদের নিকটে আখেরাত অস্বীকার করার কোন যুক্তি না থাকে। (৯৩)

أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَنْ يُتْرَكَ سُدًى-( القيامة-36)

-মানুষ কি এ কথা মনে করে রেখেছে যে, তাকে অনর্থক ছেড়ে দিয়ে রাখা হয়েছে? (কিয়ামত: ৩৬)

আরবী ভাষায় ابل سدى সে উটকে বলা হয়, যে এমনি মুক্তভাবে ছুটে বেড়ায়। যেদিক ও যেখানে খুশী চরে বেড়ায়। তা দেখাশুনা করার কেউ থাকে না। এ অর্থে আমরা লাগামহীন উট শব্দগুলো ব্যবহার করে থাকি। অতএব আয়াতের মর্ম এই যে, মানুষ কি নিজেকে লাগামহীন উট মনে করে রেখেছে যে, তার স্রষ্টা তাকে পৃথিবীতে দায়িত্বহীন করে ছেড়ে দিয়েছেন? তার উপর কোন দায়িত্ব আরোপ করা হয়নি? কোন কিছু তার জন্যে নিষিদ্ধ করা হয়নি? এমন সময় কি কখনো আসবে না যে তার কাজের জন্যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না? এ কথাই কুরআনের অন্যত্র এভাবে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা কাফেরদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-

أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ-( المؤمنون-115)

-তোমরা কি এ কথা মনে করে রেখেছিলে যে, আমরা তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছিলাম এবং তোমাদেরকে কখনো আমাদের নিকট ফিরে আসতে হবে না। (মুমিনুন: ১১৫)

এ ‍দুটি স্থানে মৃত্যুর পরের জীবন যে অবশ্যম্ভবী তার যুক্তি প্রশ্নের আকরে পেশ করা হয়েছে। প্রশ্নের অর্থ এই যে, তোমরা কি প্রকৃত পক্ষে নিজেদেরকে পশু মনে করে রেখেছে? তোমাদেরক এ পশুদের মধ্যে কি সুস্পষ্ট পার্থক্য নজরে পড়ে না যে, তাদেরকে ভালোমন্দ নির্ণয়ের কোন এখতিয়ার দেয়া হয়নি, তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে? তাদের কাজের মধ্যে নৈতিক ভালো মন্দের কোন প্রশ্নই ওঠে না, আর তোমাদের কাজ কর্মে অবশ্যই এ প্রশ্ন উত্থাপিত হবে? তাহলে তোমরা নিজেদের সম্পর্কে এ কিভাবে মনে করে নিলে যে, পশু যেমন দায়িত্বহীন এবং তাকে জবাবদিহি করতে হবে না, তোমরাও তদ্রুপ? পশুর দ্বিতীয়বার জীবিত করে না উঠাবার কারণ তো বুঝতে পারা যায় যে, সে শুধুমাত্র তার সহজাত প্রবৃত্তির বিশিষ্ঠ দাবী পূরণ করেছে, নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে কোন দর্শন রচনা করেনি। কোন মাযহাব প্রবর্তন করেনি। কাউকে খোদা বানায়নি এবং স্বয়ং কারো খোদাও সাজেনি। এমন কোন কাজ করেনি যাকে ভালো বা মন্দ বলা যেতে পারে। কোন ভালো অথবা মন্দ সুন্নত জারি করেনি যার প্রভাব বংশানুক্রমে চলতে থেকেছে। অতএব সে যদি মরে লয়প্রাপ্ত হয়ে যায়, তাহলে এ কথা তো প্রণিধানযোগ্য হতে পারে। কারণ তার কোন কাজের কোন দায়িত্বই তার উপর আরোপিত হয় না যে সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য তাকে পুনর্জীবিত করার কোন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পরের জীবন থেকে তোমরা কি করে অব্যাহতি পেতে পার? কারণ আপন মৃত্যুর সময় পর্যন্ত তোমরা এমন সব নৈতিক আচরণ করতে থাক যার ভালো অথবা মন্দ হওয়ার এবং শাস্তি ও পুরস্কারের যোগ্য হওয়ার নির্দেশ তোমাদের বিবেক দিয়ে থাকে। যে ব্যক্তি কোন নিরপরাধ লোককে হত্যা করলো এবং সঙ্গে সঙ্গে কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পড়লো, তোমাদের দৃষ্টিতে কি তার নির্বিঘ্নে নিস্কৃতি পাওয়া উচিত এবং এ জুলুমের কোন বিনিময় নিহত ব্যক্তির পাওয়া উচিত নয়? যে ব্যক্তি দুনিয়ার বুকে বিশৃংখলা ও অনাচারের এমন বীজ বপন করে গেল যার পরিণাম তারপর কয়েক শতক পর্যন্ত মানুষ ভোগ করতে থাকলো। তার সম্পর্কে তোমাদের বিবেক কি দ্বিধাহীনচিত্তে এ কাথা বলে যে, পোকামাকড়ের মতো তারও মরে লয়প্রাপ্ত হওয়া উচিত, পুনর্জীবিত হয়ে তার এসব অপকর্মের জবাবদিহি করা উচিত নয় যার কারণে অসংখ্য মানুষের জীবন বিনষ্ট হয়েছে? যে ব্যক্তি সারাজীবন বিপদ মসিবত ভুগতে থাকে, সেও কি তোমাদের দৃষ্টিতে কীট পতংগের মতো কোন সৃষ্টি? (৯৪)

لَا أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ – وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ اللَّوَّامَةِ-( القيامة-1-2)

-না, আমি কসম করছি কিয়ামতের দিনের এবং না, আমি কসম করছি ভর্ত্সনাকারী নফসের। অর্থাত্ তোমাদের ধারণা ভুল যে, কিয়ামত হবে না। আমি কসম করছি কিয়ামতের এবং ভর্ত্সনাকারী নফসের যে অবশ্যই কিয়ামত সংঘটিত হবে।

এখানে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিনের এবং ভর্ত্সনাকারী নফসের কসম যে নিষয়ের জন্যে করেছেন তা তিনি বলেনেনি। কারণ পরের বাক্য তা বলে দিচ্ছে। কসম এ জন্যে করছেন যে, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তার মৃত্যুর পর পুনরায় তাকে পয়দা করবেন এবং এমন করতে তিনি সম্পূর্ণ সক্ষম। এখন প্রশ্ন এই যে, কোন যৌক্তিকতার খাতিরে এ বিষয় দুটি বস্তুর কসম করা হলো? চিন্তাশীল লোকদের জন্য এ যৌক্তিকতা সে সময়ে যতোটা সুস্পষ্ট ছিল তার চেয়ে আজ অনেক বেশী সুস্পষ্ট।

কিয়ামতের কথাই ধরা যাক। তার কসম খাওয়ার কারণ এই যে, তার আগমন অবশ্যম্ভাবী। গোটা বিশ্ব প্রকৃতির ব্যবস্থাপনা এ কথার সাক্ষ্য দান করছে যে, এ ব্যবস্থাপনা না অনাদি, না অনন্ত। তার ধরণটাই স্বয়ং এ কথা বলে যে, না সে চিরদিন ছিল আর না চিরদিন থাকবে। পূর্বেও মানুষের বিবেকের কাছে এ অমূলক ধারণার জন্যে কোন শক্তিশালী যুক্তি ছিল না যে, এ নিত্য পরিবর্তনশীল দুনিয়া কখনো অনাদি ও অনন্ত হতে পারে। কিন্তু যতোই এ দুনিয়া সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বর্ধিত হচ্ছে, ততো বেশী এ বিষয়টি মানুষের নিকটে সুনিশ্চিত হতে যাচ্ছে যে, এ বিশ্বলোকের একটু সূচনা আছে যার পূর্বে এ ছিল না এবং অনিবার্যরূপে তার এক শেষও আছে যার পর এ থাকবে না। এর ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার জন্যে স্বয়ং কিয়ামতেরই কসম খেয়েছেন। আর এমন এক কসম যা আমরা আপন অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দিহান এমন এক ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলি, তোমার জানের কসম তুমি বিদ্যমান। অর্থাত্ তোমার অস্তিত্ব স্বয়ং তোমার বিদ্যমান হওয়ার সাক্ষ্যদান করছে।

কিন্তু কিয়ামতের দিনের কসম শুধু এ কথার প্রমাণ যে, একদিন এ বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। এখন রইলো এ বিষয় যে, তারপর মানুষকে পুরর্জীবিত করে উঠানো হবে। তাকে তার কাজকর্মের হিসাব দিতে হবে এবং তার ভালোমন্দের পুরস্কর ও শাস্তি পেতে হবে। তো এর জন্যে দ্বিতীয় কসম নফসে আওয়ামার খাওয়া হয়েছে। এমন কোন লোক দুনিয়াতে নেই, যার মধ্যে বিবেক বলে কোন কিছু নেই। এ বিবেকের মধ্যে অবশ্যই ভালো ও মন্দের এক অনুভূতি পাওয়া যায়। মানুষ যতোই বিভ্রান্ত ও বিপদগামী হোক না কেন, তার বিবেক তাকে কোন মন্দ কাজ করতে এবং কোন ভালো কাজ না করার জন্যে অবশ্যই বাধা দেয়। সে ভালো এবং মন্দের যে মানদন্ড নির্ণয় করে রেখেছে তা সঠিক হোক বা না হোক, এ কথারই প্রমাণ যে, মানুষ নিছক পশু নয় বরঞ্চ একটি নৈতিক জীব। তার মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে ভালো ও মন্দ নির্ণয়ের শক্তি আছে। সে স্বয়ং তার ভালো ও মন্দ কাজের জন্যে দায়িত্বশীল মনে করে। ফলে যে অসদাচরণ সে অন্যের সাথে করেছে তার জন্যে সে তার বিবেকের ভর্ত্সনা দমিত করে যদি আত্মতৃপ্তিও লাভ করে এবং পক্ষান্তরে যখন সে অসদাচরণ অন্য কেউ তার সাথে করে, তখন তার মন ভেতর থেকে এ দাবী করে যে, তার সাথে এ বাড়াবাড়ি যে করেছে তার অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। যদি মানুষের মধ্যে এ ধরনের ভর্ত্সনাকারী মন (নফসে লাওয়ামা) এর অস্তিত্ব এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা হয়। তাহলে এ বাস্তবতাও অনস্বীকার্য যে, এ নফসে লাওয়ামাহ মৃত্যুর পরের জীবনের এমন এক সাক্ষ্য যা স্বয়ং মানুষের প্রকৃতির মধ্যেই বিদ্যমান। কারণ মানব প্রকৃতির এ দাবী যে, ভালো ও মন্দ কাজের জন্যে মানুষ দায়ী তার পুরস্কার অথাব শাস্তি অবশ্যই দরকার তা মৃত্যুর পরের জীবন ব্যতীত পূরণ হতে পারে না। কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি এ কথা অস্বীকার করতে পারে না যে, মৃত্যুর পর মানুষ যদি বিলীন হয়ে যায়, তাহলে সে তার বহু ভালো কাজের পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে এবং তার বহু অন্যায় কাজে সুবিচার পূর্ণ শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। এ জন্যে যতোক্ষণ পর্যন্ত মানুষ এ বাজে কথা মেনে না নিয়েছে যে, বিবেক সম্পন্ন মানুষ একটি অবান্তর বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে এবং নৈতিক অনুভূতি সম্পন্ন মানুষ এমন এক দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছে যা বুনিয়াদী দিক থেকে তার গোটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে নৈতিকতার কোন অস্তিত্বই ধারণ করে না, ততোক্ষন পর্যন্ত সে মৃত্যুর পরের জীবন অস্বীকার করতে পারে না। এমনিভাবে পুনর্জন্মবাদ দর্শনও প্রকৃতির এ দাবীর জবাব নয়। কারণ মানুষ যদি নৈতিক কর্মকান্ডের শাস্তি অথবা পুরস্কার লাভের জন্যে পুনরায় এ দুনিয়াতেই জন্মগ্রহণ করতে থাকে, তাহলে প্রত্যেক জন্মেই সে পুনরায় কিছু অতিরিক্ত নৈতিক কর্মকান্ড করতে থাকবে যা নতুন করে শাস্তি অথবা পুরস্কারের দাবী করবে এবং এ অন্তহীন ধারাবাহিকতায় তার হিসাব বুঝিয়ে দেয়ার পরিবর্তে উল্টো তার হিসাব বাড়তেই থাকবে। এ জন্যে প্রকৃতির দাবী শুধু এ অবস্থায় পূরণ হতে পারে যে, এ দুনিয়ায় মানুষের মাত্র একটি জীবনই হতে হবে। অতপর সমগ্র মানব জাতির ধ্বংস হওয়ার পর এক দ্বিতীয় জীবন হতে হবে যেখানে মানুষের কর্মকান্ডের যথাযথ হিসাব করার পর পরিপূর্ণ শাস্তি অথবা পুরস্কার দিতে হবে। (৯৫)

وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ – أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ-(ص-27-28)

-আমরা এ আসমান যমীনকে এবং এর মধ্যবর্তী এ দুনিয়াকে অযথা পয়দা করিনি। এ ত তাদের ধারনা যারা কাফের এবং এমন কাফেরদের জন্যে ধ্বংস রয়েছে জাহান্নামের আগুনের দ্বারা। যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করে তাদেরকে এবং যারা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদেরকে সমান করে দেব? খোদাভীরুদেরকে কি আমরা পাপাচারীর মতো করে দেব? (সোয়াদ: ২৭-২৮)

অর্থাত্ এ বিশ্ব প্রকৃতিকে আমরা নিছক খেলার বস্তু হিসাবে সৃষ্টি করিনি যে এর মধ্যে বিজ্ঞতা নেই। কোন উদ্দেশ্য নেই, কোন সুবিচার হবে, কোন ভালো অথবা মন্দ কাজের কোন পরিনাম ফল প্রকাশিত হবে না। এখানে মানুষকে লাগামহীন উটের মতো ছেড়ে দেয়া হয়নি এবং এ দুনিয়াটা মগের মুল্লুকও নয় যে এখানে যে যা খুশী তাই করবে আর তার কোন বিচার হবে না। যে ব্যক্তি পুরস্কার ও শাস্তি মানতে রাজী নয় এবং এ কথা মনে করে বসে আছে যে, ভালো মন্দ সব মানুষ শেষ পর্যন্ত মরে মাটিতে মিশে যাবে, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না, আর না কেউ ভালো মন্দ কাজের কোন পরিণাম ভোগ করবে, সে প্রকৃত পক্ষে দুনিয়াকে একটা খেলা এবং তার নির্মাতাকে একজন খেলাকারী মনে করছে। তার ধারণা এই যে, জগত স্রষ্টা ও ‍দুনিয়া এবং তার মধ্যে মানুষ সৃষ্টি করে এক বাজে কাজ করেছেন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তোমাদের নিকটে কি এ কথা কি সংগত যে, সত্ এবং অসত্ উভয়ই সমান হয়ে যাক? এ ধারনা কি তোমাদের নিকটে গ্রহণযোগ্য যে, কোন ব্যক্তিকে তার কোন সত্ কাজের কোন প্রতিদান এবং অসত্কাজের কোন শাস্তি দেয়া না হোক? এ কথা সুস্পষ্ট যে, যদি আখেরাত না হয়, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ না হয় আর মানুষের কর্মকান্ডের কোন পুরস্কার ও শাস্তি না হয়, তাহলে আল্লাহতায়ালার হিকমত ও ইনসাফ বলে কিছু থাকে না। ফলে বিশ্ব প্রকৃতির সমগ্র ব্যবস্থাপনা বিশৃংখল হতে বাধ্য। এ ধারনার ভিত্তিতে তো দুনিয়ায় কল্যানের জন্যে কোন প্রেরণা এবং অনাচার থেকে বিরত রাখার কোন বাধা-নিষেধ থাকে না। খোদার খোদায়ী যদি মায়াযাল্লাহ এ ধরনের কান্ডজ্ঞানহীন হয়, তাহলে সে ব্যক্তি অতি নির্বোধ যে এ পৃথিবীতে বহু ‍দু:খকষ্ট স্বীকার করে স্বয়ং সত্জীবন যাপন করে এবং মানব জাতির সংস্কার সংশোধনের জন্যে কাজ করে। আর ঐ ব্যক্তি বুদ্ধিমান যে সুবিধাজনক পরিবেশ পরিস্থিতি লাভ করে বাড়াবাড়ি করার সুযোগ নিবে এবং সকল প্রকার অনাচার পাপাচারে জীবন উপভোগ করবে। (৯৬)

زَعَمَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنْ لَنْ يُبْعَثُوا قُلْ بَلَى وَرَبِّي لَتُبْعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلْتُمْ وَذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ-(التغابن-7)

-অস্বীকারকারীগণ বড়ো গলায় বল্লো যে মৃত্যুর পর কিছুতেই তাদেরকে পুনর্জীবিত করে উঠানো হবে না। তাদেরকে বল: না, আমার রবের কসম, অবশ্যই তোমাদেরকে উঠানো হবে। তারপর অবশ্যই তোমাদেরকে বলা হবে যে, দুনিয়াতে তোমরা কত কিছু করেছে। আর এমনটি করা আল্লাহর জন্য বড়োই সহজ। (তাগাবুন: ৭)

যদিও কোন আখেরাত অস্বীকারকারীর নিকটে পূর্বেও জানার এমন কোন উপায় ছিল না এবং আজও নেই যে মৃত্যুর পর কোন দ্বিতীয় জীবন নেই। কিন্তু এ নির্বোধেরা চিরদিন বড়ো গলায় এ দাবী করেছে। অথচ নিশ্চয়তার সাথে অস্বীকার করার না কোন যুক্তিসংগত আর না কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি আছে।

তাদের এ কথার জাবাবে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে বলেন, তুমি আমার কসম খেয়ে বল তোমাদেরকে অবশ্যই উঠানো হবে এবং অবশ্যই তোমাদেরকে এ কথা বলে দেয়া হবে যে, তোমরা ‍দুনিয়ার বুকে কি করে এসেছ। কুরআনে এ তৃতীয় স্থান যেখানে আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেন, তোমার রবের কসম খেয়ে লোকদেরকে বল যে, অবশ্যই এরূপ হবে। প্রথমে সূরায়ে ইউনূসে বলা হয়েছে, তারা জিজ্ঞাস করে। প্রকৃতই কি একথা সত্য? বল আমার রবের কসম, এ অবশ্যই সত্য এবং তোমাদের এমন শক্তি নেই যে এটা হতে তোমরা বাধা দেবে। (আয়াত: ৫৩)

অতপর সূরা সাবাতে বলা হয়, অস্বীকারকারীগণ বলে, কি হলো যে কিয়ামত আমাদের উপর এসে পড়ছে না? বল কসম আমার রবের, এ তোমাদের উপর অবশ্যই এসে পড়বে।

এখন প্রশ্ন এই যে, আপনি একজন আখেরাত অস্বীকারকারীকে আখেরাতের সংবাদ কসম খেয়েই দিন আর কসম না খেয়েই দিন, তাতে কি পার্থক্য সূচিত হয়? সে যখন এটা স্বীকারই করে না ত নিছক কেন স্বীকার করবে যে আপনি কসম খেয়ে তাকে বলছেন? এর জবাব এই যে, প্রথমত: রসূলুল্লাহ (সা) সেসব লোককে সম্বোধন করে কথা বলেন যারা নিজস্ব জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ কথা জানতো যে, তাঁর মুখ থেকে জীবনে কোন মিথ্যা কথা বেরয়নি। সে জন্যে মুখে তারা যতোই তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাক না কেন, তারা মনের মধ্যে এ ধারণা কিছুতেই করতে পারতো না যে, এমন সত্যবাদী লোক কখনো খোদার কসম করে এমন কথা বলতে পারে যার সত্য হওয়ার উপর তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস নেই? দ্বিতীয়ত: তিনি নিছক আখেরাতের আকীদাই বর্ণনা করছিলেন না, বরঞ্চ তার জন্যে অত্যন্ত যুক্তিসংগত দলিল প্রমাণ পেশ করছিলেন। কিন্তু যে বস্তুটি নবী ও অ-নবীর মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে তা এই যে, একজন অ-নবী আখেরাতের সপক্ষে সে শক্তিশালী যুক্তি পেশ করতে পারে তা লাভ বড়োজোর এটা হতে পারে যে, আখেরাত না হওয়ার তুলনায় হওয়াকেই অধিক সম্ভাবনাময় মনে করা যেতে পারে। এর বিপরীত, নবীর স্থান একজন দার্শনিকের স্থান থেকে বহু উচ্চে। তাঁর প্রকৃত মর্যাদা এটা নয় যে, বিবেক সম্মত যুক্তি প্রদর্শনের দ্বারা তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌছেছেন যে, আখেরাত হওয়া উচিত। বরঞ্চ তাঁর প্রকৃত মর্যাদা এই যে, তিনি এ বিষয়ের জ্ঞান রাখেন যে আখেরাত হবে এবং দৃঢ় বিশ্বাস সহকারে বলেন যে, তা অবশ্যই হবে। এজন্যে একজন নবীই কসম করে এ কথা বলতে পারেন। একজন দার্শনিক তাঁর কোন কথার উপরেই কসম খেতে পারেন না। আর আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস একজন নবীর বর্ণনার পরেই হতে পারে। দার্শনিকের যুক্তি নিজের মধ্যে এ শক্তি রাখে না যে, অন্য লোক তো দূরের কথা, স্বয়ং দার্শনিকও নিজের যুক্তির ভিত্তিতে তাকে নিজের ঈমানী আকীদা বানাতে পারে। দার্শনিক যদি সঠিক চিন্তার অধিকারী হন তাহলে, হওয়া উচিত। এ কথার বেশী বলতে পারেন না এবং অবশ্যই হবে‘ একথা একজন নবীই বলতে পারেন।

তারপর কসম খেয়ে শুধু এতোটুকুই বলা হয়নি যে মৃত্যুর পর তোমাদেরকে পুনরায় উঠানো হবে। বরঞ্চ এ কথাও বলা হয়েছে যে, সে সময়ে অবশ্যই তোমাদেরকে বলা হবে যে তোমরা দুনিয়ায় কিকি কাজ করে এসেছো। এটাই হচ্ছে সেই প্রকৃত উদ্দেশ্য যার জন্যে মানবজাতিকে মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার উঠানো হবে। আর এর মধ্যেই এ প্রশ্নের জবাব নিহিত আছে যে, এ রূপ করার প্রয়োজনটা কি। এ সত্য সঠিক বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে যে সৃষ্টিকে কুফর ও ঈমানের মধ্য থেকে যে কোন একটি পথ অবলম্বনের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। যাকে এ দুনিয়াতে বহু কিছু ব্যবহারের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে এবং যে ‍কুফর অথবা ঈমানের পথ অবলম্বন করে সারাজীবন তার এ স্বাধীনতা সঠিকপন্থায় অথবা ভুল পন্থায় ব্যবহার করে বহু কল্যাণকর কাজের অথবা বহু অনিষ্টকর কাজের দায়দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে নিয়েছে তার সম্পর্কে এমন ধারণা করা একেবারে অযৌক্তিক হবে যে, এসব কিছু যখন সে করেই ফেরেছে ত ভালো মন্দের ফলাফলের দরকার নেই এবং কিছুতেই এমন কোন সময় যেন না আসে যাতে তার কাজকর্মের যাঁচাই পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের অবান্তর কথা যে বলে সে অবশ্যই দুটি নির্বূদ্ধিতার একটি অবশ্যই করে। হয়ত সে মনে করে যে, এ বিশ্বপ্রকৃতি ত এক বিজ্ঞতাপূর্ণ বাস্তবতা, তবে এখানে মানুষের মতো এখতিয়ার সম্পন্ন জীবকে দায়িত্বহীন করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অথবা সে মনে করে এ এক এলোমেলো সৃষ্টিরাজ্য যার পেছনে কোন বিজ্ঞতা কার্যকর ছিল না। প্রথম ধারণা ত স্ববিরোধী, কারণ বিজ্ঞতাপূর্ণ এক বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে এক এখতিয়ার সম্পন্ন জীবের দায়িত্বহীন হওয়া বিজ্ঞতা ও ইনসাফের পরিপন্থী। আর দ্বিতীয় ধারণা সম্পর্কে সে ত কোন যুক্তিসংগত বিশ্নেষণ পেশ করতে পারে না যে একটি এলোমেলো বিজ্ঞতাহীন সৃষ্টিরাজ্যে মানুষের মতো বিবেকসম্পন্ন সৃষ্টির অস্তিত্ব কি করে সম্ভব হলো? আর তার মনে ইনসাফের ধারনা কোথা থেকে এলো? বিবেকহীনতা থেকে বিবেকের উন্মেষ এবং বেইনসাফী থেকে সুবিচারের ধারনা সৃষ্টি হওয়া এমন একটি বিষয় যার প্রবক্তা হয়তো একজন হঠকারী হতে পারে অথবা সে ব্যক্তি যে অধিক দর্শনচর্চা করতে করতে মস্তিস্কবিকৃতির রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

অতপর বলা হয়েছে যে, এমনটি করা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ। এ আখেরাতের দ্বিতীয় যুক্তি। প্রথম যুক্তি আখেরাতের আবশ্যকতার জন্যে ছিল এবং এ যুক্তি তার সম্ভবপর হওয়ার, যে খোদার জন্য বিশ্বপ্রকৃতির এ বিরাট ব্যবস্থাপনা বানিয়ে দেয়া কোন কঠিন কাজ নয়, তাঁর জন্যে এ কাজ কি করে কঠিন হবে যে মানুষকে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করে নিজের সামনে হাজির করবেন এবং এবং তার হিসাব নেবেন? (৯৭)

إِنَّ هَؤُلَاءِ لَيَقُولُونَ – إِنْ هِيَ إِلَّا مَوْتَتُنَا الْأُولَى وَمَا نَحْنُ بِمُنْشَرِينَ – فَأْتُوا بِآبَائِنَا إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ – أَهُمْ خَيْرٌ أَمْ قَوْمُ تُبَّعٍ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ أَهْلَكْنَاهُمْ إِنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ – وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ – مَا خَلَقْنَاهُمَا إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ – إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ مِيقَاتُهُمْ أَجْمَعِينَ-(الدخان-34-40)

-এসব লোকেরা বলে: “আমাদের প্রথম মৃত্যু ব্যতীত আর কিছু নেই। তারপর দ্বিতীয়বার আমাদেরকে উঠানো হবে না। তুমি সত্যবাদী হলে আমাদের (মৃত) বাপদাদাকে উঠিয়ে আন দেখি।“

এরা ভালো, না তুব্বা জাতি, না তাদের পূর্ববর্তী লোক? আমরা তাদেরকে এ জন্যে ধ্বংস করেছিলাম যে তারা ছিল পাপাচরী। এ আসমান-যমীন এবং তার মধ্যবর্তী বস্তুসমূহ আমরা খেল তামাশার জন্যে সৃষ্টি করিণি। এগুলো আমরা সত্যতাসহ সৃষ্টি করেছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না। এসব উঠাবার নির্দিষ্ট সময় হবে সিদ্ধান্তের দিন। (দুখান: ৩৪-৪০)

কাফেরদের বক্তব্য ছির এই যে, প্রথমবার যখন তারা মৃত্যুবরণ করবে তখন ব্যস লয় হয়ে যাবে। তারপর আর কোন জীবন নেই। “প্রথম মৃত্যু“ শব্দগুলো দ্বারা এ কথা অনিবার্য হয়ে পাড়ে না যে, তারপর কোন দ্বিতীয় মৃত্যু হবে।

আমরা যখন বলি, অমুক ব্যক্তির প্রথম সন্তান হয়েছে, তখন এ কথা সত্য হওয়ার জন্যে জরুরী নয় যে, তারপর অবশ্যই দ্বিতীয় সন্তান হবে। বরঞ্চ এটাই যথেষ্ট হয় যে, তার পূর্বে কোন সন্তান হয়নি। এ জন্যে কাফেরগণ প্রথম মৃত্যু শব্দগুলো এ অর্থে ব্যবহার করতো না যে তারপর কোন জীবন এবং কোন দ্বিতীয় মৃত্যু হবে। তারা প্রথম মৃত্যুকেই একই এবং শেষ মৃত্যু মনে করতো। তাদের যুক্তি এ ছিল যে, “যেহেতু আমরা মৃত্যুর পর কাউকে দ্বিতীয়বার উঠতে দেখিনি, সেজন্যে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস মৃত্যুর পর দ্বিতীয় কোন হবে না। তোমরা যদি দাবী কর যে, দ্বিতীয় জীবন হবে, তাহলে আমাদের বাপদাদাকে কবর থেকে উঠিয়ে আন যাতে মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস জন্মে। এ যদি তোমরা করতে না পার, তাহলে বুঝবো যে তোমাদের দাবী ভিত্তিহীন।“

এ যেন তাদের দৃষ্টিতে মৃত্যুর পরের জীবন খণ্ডন করার পাকাপোক্ত দলিল ছিল। অথচ তা একেবারে অর্থহীন। তাদেরকে এ কথা কে বলেছিল যে, মৃত্যুবরণকারী দ্বিতীয়বার জীবন লাভ করে এ দুনিয়াতেই ফিরে আসবে? নবী (সা) অথবা কোন মুসলমান এ দাবী কখন করেছেন যে, তাঁরা মৃতকে জীবিত করতে পারেন?

তাদের আপত্তির প্রথম জবাব এ দেয়া হলো যে এসব লোক তোববা জাতি [হিমইয়ার গোত্রের বাদশাহের উপাধি ছিল তব্বা। খৃ: পূর্ব ১১৫ সালে তারা ইয়ামেনে শাসন ক্ষমতা লাভ করে এবং ৩০০ খৃ: পর্যন্ত শাসন করে। -গ্রন্থকার] এবং তাদের পূর্ববর্তী লোকদের অপেক্ষা ভালো নয়। তাদেরকে ত আমরা তাদের পাপের জন্যে ধ্বংস করেছি। অন্য কথায় এ জাবাবের মর্ম এ ছিল যে, আখেরাতকে অস্বীকার করা এমন এক জিনিস যা কোন ব্যক্তি, দল অথবা জাতিকে পাপাচারী না বানিয়ে পারে না। নৈতিক অধ:পতন তার অনিবর্য পরিণতি এবং মানব ইতিহাস সাক্ষী যে, জীবনের এ দৃষ্টিভঙ্গী যে জাতিই অবলম্বন করেছে, সে অবশেষে ধ্বংস হয়েছে। মক্কায় কাফেরগণ সে প্রভাব প্রতিপত্তি ও উন্নতি লাভ করতে পারেনি যা তুব্বা জাতি এবং তাদের পূর্বে সাবা, ফেরাউন জাতি ও অন্যান্য জাতিসমূহ লাভ করেছিল। কিন্তু এ বস্তুগত উন্নতি এবং পার্থিব প্রভাব প্রতিপত্তি নৈতিক অধ:পতনের পরিণাম থেকে তাদেরকে কখন রক্ষা করতে পেরেছিল যে, এরা সামান্য পুঁজি এবং উপায়-উপাদানের সাহায্যে তার থেকে রক্ষা পাবে?

তাদের আপত্তির দ্বিতীয় জবাব এ দেয়া হয়েছিল যে, যে ব্যক্তিই মৃত্যুর পরবর্তী জীবন এবং আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তি অস্বীকার করে সে প্রকৃতপক্ষে এ বিশ্বব্যবস্থাকে একটা খেলনা এবং তার স্রষ্টাকে অবোধ শিশু মনে করে। এর ভিত্তিতেই সে এ সিদ্ধান্তে পৌছেছে যে, মানুষ দুনিয়াতে সকল প্রকার বিশৃংখলা সৃষ্টি করার পর একদিন ব্যস এমনিই মাটিতে মিশে যাবে এবং তার কোন ভালো মন্দ কাজের কোন পরিণাম ফল বেরুবে না। বস্তুত: এ সৃষ্টিজগত কোন ক্রীড়ামোদীর নয় বরঞ্চ এক স্রষ্টার দ্বারা নির্মিত এবং কোন বিজ্ঞের নিকটে এ আশা করা যায় না যে, তিনি বেহুদ কাজ করবেন। আখেরাত অস্বীকারের জবাবে এ যুক্তি কুরআনের বিভিন্ন স্থানে দেয়া হয়েছে।

এখানে রইলো তাদের এ দাবী, “উঠিয়ে আন আমাদের বাপদাদাকে যদি তোমরা সত্যবাদী হও।“ এর জবাব এ দেয়া হয়েছে যে, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন ত কোন তামাশা নয় যে, কেউ তা অস্বীকার করলেই একজন মৃতকে কবর থেকে উঠিয়ে তার সামনে এনে খাড়া করা হবে। এর জন্যে তা রাব্বুল আলামীন একটি সময় নির্ধারন করে দিয়েছেন যখন তিনি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলকে দ্বিতীয়বার জীবিত করে তাঁর আদালতে একত্রে হাজির করবেন এবং তাদের মোকদ্দমার রায় প্রকাশ করে দেবেন। তোমরা মান আর না মানো, একাজ নির্দিষ্ট সময়েই হবে। মানলে তোমরা নিজেদেরই কল্যাণ করবে। কারণ এভাবে সময় থাকতে সাবধান হয়ে সে আদালতে কৃতকর্য হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবে। না তোমাদের জন্যে অবশ্যই সেসব কিছু আছে যা তোমরা পছন্দ কর? অথবা তোমাদের জন্যে আমাদের উপর কিয়ামত পর্যন্ত অবশ্য পালনীয় এমন ওয়াদা প্রতিশ্রুতি আছে যে তোমরা যা বলছ তা সব কিছুই তোমাদেরকে দেয়া হবে? এদেরকে জিজ্ঞেস কর, তোমাদের মধ্যে কে এর জন্যে দায়িত্বশীল। অথবা এদের নির্ধারিত কোন শরীক আছে নাকি (যারা এর দায়িত্ব গ্রহণ করেছে)? তাই যদি হয়, তাহলে তাদের সে শরীকদের ডেকে আনুন যদি তারা সত্যেবাদী হয়। (কলম: ৩৫-৪১)

মক্কায় সর্দারগণ মুসলমানদের বলতো, দুনিয়ায় আমরা যে নিয়ামত লাভ করছি, এ আমাদের খোদার প্রিয় হওয়ার আলামত। আর যে শোচনীয় অবস্থায় আছ তা একথারই প্রমাণ যে তোমরা খোদার নিগৃহীত। অতএব কোন আখেরাত যদি হয়ই, যেমন তোমরা বলছ, তাহলে সেখানেও আমরা আনন্দে থাকব এবং আযাব তোমাদের হবে, আমাদের না। “এর জবাবে বলা হলো, এ কথা বিবেকের পরিপন্থী যে, খোদা অনুগত এবং অপরাধীর মধ্যে কোন পার্থক্য করবেন না। একথা তোমরা কিভাবে বুঝলে যে এ বিশ্বপ্রকৃতির স্রষ্টা একজন অন্ধ রাজা যিনি এটা দেখবেন না যে কারা দুনিয়ায় তাঁর হুকুম মেনে চলেছে এবং মন্দকাজ থেকে বিরত থেকেছে আর কারা তাঁর থেকে নির্ভয় হয়ে সকল প্রকার পাপ ও জুলুম নির্যাতন করেছে? তোমরা ত ঈমানদারদের শোচনীয় অবস্থা এবং নিজেদের সুখ শান্তি ত দেখলে। কিন্তু নিজেদের এবং তাদের চরিত্রের ও কর্মকান্ডের পার্থক্য ত দেখলে না এবং দ্বিধাহীনচিত্তে বলে ফেল্লে যে, খোদার দরবারে অনুগতদের সাথে ত অপরাধীদের মতোই আচরণ করা হবে এবং তোমরাদের মত অপরাধীদেরকে বেহেশত দান করা হবে। কিসের ভিত্তিতে তোমরা একথা বল্লে? তোমাদের নিকটে কি খোদার কোন কিতাব আছে যার মধ্যে একথা লিখা আছে? আথবা খোদার সাথে কি তোমাদের কোন চুক্তি হয়েছে। যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে তোমাদের মধ্যে সামনে এসে কে এ দাবী করতে পারে যে, আল্লাহ এমন কোন প্রতিশ্রুতি নিয়েছে। আসল কথা তোমরা নিজেদের সপক্ষে যেসব মন্তব্য করছ তার কোনই ভিত্তি নেই। এ বিবেকেরও পরিপন্থী। খোদার কোন কিতাবেও একথা লিখিত আছে দেখাতে পারবে না। তোমাদেরও কেউ এ দাবী করতে পারবে না যে, সে খোদার নিকট থেকে এমন কোন প্রতিশ্রুতি নিয়ে রেখেছে। তোমরা যাদেরকে খোদা বানিয়ে রেখেছ তাদের কাউকেউ এ সাক্ষ্য দেয়াতে পারবে না যে, খোদার ওখানে তোমাদেরকে জান্নাত নিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিবে। এ ভুল ধারণা তোমাদের কোথা থেকে হলো? (১০১)

وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ – بِأَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ-(التكوير-8-9)

“এবং যখন জীবিত অবস্থায় প্রোথিত শিশু সন্তানকে জিজ্ঞাস করা হবে যে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। (তাকবীর: ৮-৯)

এ আয়াতের প্রকাশ ভংগীতে এমন প্রচন্ড ক্রোধ প্রকাশ করা হয়েছে যার অধিক ধারণা করা যায় না। কিয়ামতের দিন শিশুকন্যাকে জীবিত প্রোথিতকারী মাতাপিতা আল্লাহতায়ালার দৃষ্টিতে এমন ঘৃণ্য হবে যে তাদেরকে সম্বোধন করে একথা জিজ্ঞেস করা হবে না তোমরা এ নিষ্পাপ শিশুকে কেন হত্যা করেছিলে? বরঞ্চ তাদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে নিষ্পাপ শিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে হতভাগিনী তুমি কোন অপরাধে নিহত হয়েছিলে? সে তার কাহিনী বিবৃত করে বলবে যে জালেম মা বাপ তার উপর কী জুলুমই না করেছিল এবং কিভাবে তাকে মাটির তলায় পুঁতে মেরে ছিল। তাছাড়া এ সংক্ষিপ্ত আয়াতে দুটি বিরাট বিষয়বস্তু সন্নিবেশিত করে দেয়া হয়েছে যা শব্দে প্রকাশ করার পরিবর্তে বর্ণনা ভংগীতেই আপনা আপনা প্রকাশ লাভ করছিল। একটি এই যে, এর দ্বারা আরববাসীদের মধ্যে এ অনুভুতি জাগ্রত করা হয়েছে যে, জাহেলিয়াত তাদেরকে নৈতিক অধ:পতনের কোন অতল তলে নিমজ্জিত করে রেখেছিল যে তারা আপন সন্তানকে স্বহস্তে জীবিত কবরস্থ করতো। তারপরও তাদের এ একগুয়েমী যে তারা এ জাহেলিয়াতের উপরই অবিচল থাকবে ও সে সংস্কার সংশোধন মেনে নেবে না যে নবী মুহাম্মদ (সা) তাদের বিকৃত ও অধ:পতিত সমাজে করতে চাইছিলেন। দ্বিতীয় এই যে, আখেরাত যে অত্যাবশ্যক তার এক সুস্পষ্ট প্রমাণ এতে পেশ করা হয়েছে। যে শিশুকে জীবিত দাফন করা হয়েছে, তার ত কোথাও না কোথাও প্রতিকার লাভের ক্ষেত্রে থাকতে হবে। আর সেসব জালেম এ জুলুম করেছে, তাদের জন্যেও এমন একসময় আসা দরকার যখন যখন তাঁদেরকে এ নির্মম জুলুমের জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দাফনকৃত শিশু কন্যাটির ফরিয়াদ শুনার জন্য দুনিয়ায় ত কেউ ছিল না। জাহেলিয়াতের সমাজে এ অমানবিক কাজটিকে না করবার অবৈধ কাজ বলে গণ্য করা হতো। না মা-বাপ এ কাজের জন্যে লজ্জাবোধ করতো, আর না পরিবারের মধ্যে কেউ কেউ তাদের অর্ত্সনা করার ছিল। সামাজেও এমন কেউ ছিল না যে তাদেরকে পাকড়াও করতে পারতো। তাহলে কি খোদার খোদায়ীর মধ্যেও এ বিরাট জুলুম প্রতিকারহীন হয়েই থাকবে? (১০২)

আখেরাত অস্বীকারের নৈতিক ফল

কুরআন পাক আখেরাতের সম্ভাবনা ও তার অপরিহার্যতা সম্পর্কে এতো শক্তিশালী যুক্তি প্রমাণ উপস্থপন করার সাথে এ কথাও বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র আখেরাতের বিশ্বাসই সেই বস্তু যা মানুষের চরিত্র ও আচার-আচরণ সঠিক ও সুদৃঢ় নৈকিত বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখে। এ নাহলে তাকে অন্যায় অত্যাচার, আনাচার-পাপাচার, চুক্তিভঙ্গ, আত্মসাত্, কুকর্ম প্রভৃতি থেকে নিবৃত্ত করার কোন কিছুই থাকবেনা। এই কারণে যে, আখেরাত অস্বীকারকারী মুখে যতোই যুক্তির বহর দেখাক না কেন তাদের বাস্তব কার্যকলাপে জানা যায় যে, তার প্রকৃতপক্ষে নৈতিক লাগামহীনতার স্বাধীনতা চায় এবং তা অক্ষুন্ন রাখার জন্য আখেরাত অস্বীকার করে। এই সাথে কুরআনে ওসব নৈতিক অনাচার চিহ্নিত করা হয়েছে যা আরব সমাজে সাধারণত বিস্তার লাভ করেছিল। তারপর লোকের সামনে এ প্রশ্ন রাখা হয় যে, এসব অনাচার কি সে অবস্থাতেও অনুষ্ঠিত হতো যদি মানুষের মধ্যে এ অনুভূতি সৃষ্টি হতো যে, একদিন খোদার সামনে হাযির হয়ে নিজের এক একটি কাজের জবাবদিহি করতে হবে। (১০৩)

أَيَحْسَبُ الْإِنْسَانُ أَلَّنْ نَجْمَعَ عِظَامَهُ – بَلَى قَادِرِينَ عَلَى أَنْ نُسَوِّيَ بَنَانَهُ – بَلْ يُرِيدُ الْإِنْسَانُ لِيَفْجُرَ أَمَامَهُ-(القيامة-3-5)

মানলে নিজেদেরই ক্ষতি করবে। কারণ সারাজীবন এ ভুল ধারণায় কাটিয়ে দেবে যে, ভালোমন্দ যা কিছু তা এ দুনিয়ার মধ্যেই সীমিত। মৃত্যুর পর কোন বিচার হবে না যে আমাদের ভালোমন্দদ কাজের কোন স্থায়ী পরিণাম প্রকাশিত হবে। (৯৮)

أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَنْ نَجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءً مَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ- وَخَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ(الجاثية-21-22)

যারা অন্যায় অনাচার করেছে তারা কি একথা মনে করে বসে আছে যে, আমরা তাদেরকে এবং ঈমান আনয়নকারী ও নেক আমলকারীদেরকে একইরূপ করে দেব যে তাদের জীবন ও মৃত্যু একইরূপ হয়ে যাবে? তারা যে সিদ্ধান্ত করেছে তা খুবই খারাপ। আল্লাহ ত আসমান ও যমীনকে সত্যতাসহ সৃষ্টি করেছেন। আর এ জন্যে করেছেন যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে যেন তার কৃতকর্মের প্রতিদান দেয়া যায়, লোকের উপর জুলুম করা না হয়। (জাসিয়া: ২১-২২)

এ আখেরাত সত্য হওয়ার নৈতিক যুক্তি। নৈতিকতার ভালো ও মন্দ এবং কাজের মধ্যে পাপ ও পুণ্যের পার্থক্যর অনিবার্য দাবী এই যে সত্ ও অসত্ লোকের পরিণাম যেন এক না হয়। বরঞ্চ সত্ লোক যেন সত্ কাজের এবং অসত্ লোক অসত্ কাজের প্রতিদান যেন লাভ করে। তা যদি না হয়, এবং পাপ ও পুণ্যের প্রতিদান যদি একই রকম হয় তাহলে নৈতিকতায় ভালো ও মন্দের পার্থক্য একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়বে। এতে খোদার উপর বেইনসাফীর অভিযোগও আরোপ করা হয়। যারা দুনিয়ায় অসত্ কর্মের পথে চলে, তারা ত অবশ্যই চায় যে, কোন শাস্তি অথবা পুরস্কার না হোক। কারণ এ ধারণাই তাদের ভোগের জীবন বাধাগ্রস্ত করে। কিন্তু বিশ্বস্রষ্টা ও বিশ্বপ্রভুর বিজ্ঞতা ও ইনসাফের এ পরিপন্থী যে অসত্ ও সত্ লোকের সাতে তিনি একই আচরণ করবেন এবং তিনি কিছুই দেখবেন না যে নেক মুমিন ব্যক্তি কিভাবে জীবন-যাপন করেছে এবং কাফের ও পাপাচারী এখানে কি বিশৃংখলা সৃষ্টি করেছে। একব্যক্তি সারা জীবন নিজের উপরে নৈতিক বাধা নিষেধ আরোপ করে রাখলো, হকদারের হক আদায় করতে থাকলো, অন্যায় সুযোগ সুবিধা ও ভোগ বিরাস থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখলো, সততা ও সত্যনিষ্ঠার জন্যে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি স্বীকার করলো। অন্যান্য লোক নিজেদের প্রবৃত্তির লালসা প্রত্যেক সম্ভাব্য উপায়ে পূরণ করলো, না খোদার হক চিনতে পারলো আর না মানুষের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকলো, যেভাবেই নিজের সুযোগ সুবিধা লাভ ও ভোগ বিলাস করতে পারতো তা করেছে। এখন খোদার কাছে এ আশা করা যায় যে, এ দু ধরনের মানুষের জীবনের এ পার্থক্য তিনি উপেক্ষা করবেন? মৃত্যু পর্যন্ত যাদের জীবন একরকম ছিল না, মৃত্যুর পর যদি তাদের পরিণাম একই রকম হয়, তাহলে খোদার খোদায়ীতে এর চেয়ে অধিক বেইনসাফী আর কি হতে পারে?

তারপর বলা হয় যে, যমীন ও আসমানের সৃষ্টি কোন খেলা নয়। বরঞ্চ এক উদ্দেশ্যপূর্ণ ও বিজ্ঞতাপূর্ণ ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থাপনায় এ কথা ধারণার অতীত যে আল্লাহর প্রদত্ত এখতিয়ার ও উপায়-উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহার করত যারা ভালো কাজ করেছে এবং ভুল পন্থায় ব্যবহার করে অন্যান্যরা যে জুলুম ও ফাসাদ করেছে, এ উভয় প্রকার মানুষ শেষ পর্যন্ত মৃত্যু বরণ করে মাটিতে মিশে যাবে এবং মৃত্যুর পর দ্বিতীয় কোন জীবন হবে না। যেখানে ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের ভালো ও মন্দ কাজের কোন ভালো ও মন্দ পরিণাম হবে না । যদি তাই হয়, তাহলে এ বিশ্বপ্রকৃতি একজন খেলোয়ারের খেলনা হবে,কোন এক বিজ্ঞ সত্তার তৈরী কোন উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবস্থাপনা হবে না। (৯৯)

সূরা জাসিয়ার আয়াত ২১-২৩ এ সত্যকে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরে যে, আখেরাত অস্বীকার ঐসব লোক যারা প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে চায় এবং আখেরাতের বিশ্বাসকে তাদরে এ স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক মনে করে। তারপর যখন তারা আখেরাত অস্বীকার করে তখন তাদের প্রবৃত্তির দাসত্ব আরও বেড়ে চলে এবং তারা তাদের গোমরাহীতে দিন দিন অধিক মাত্রায় লিপ্ত হতে থাকে। এমন কোন আনাচার থাকে না যার থেকে তারা বিরত হয়। কারো অধিকার হরণ করতে কুণ্ঠিত হয় না। তারা কোন জুলুম ও বাড়াবাড়ির সুযোগ পেলে তাদের কাছ থেকে এ আশা করা যায় না যে, তারা তার থেকে এ জন্যে বিরত থাকবে যে তাদের অন্তরে সত্য ও ইনসাফের প্রতি কোন শ্রদ্ধাবোধ আছে। যেসব ঘটনা দেখার পর মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, তা তারা তাদের চোখের সামনে দেখতে পায়। কিন্তু তারা তার থেকে উল্টো এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে তারা যা করছে ঠিকই করছে এবং তাই তাদের করা উচিত। কোন ভালো কথা তাদের গ্রহণযোগ্য হয় না। যে যুক্তি কোন লোককে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যে উপযোগী হতে পারে, তা তাদের মনে কোন আবেদন সৃষ্টি করতে পারে না। বরঞ্চ তারা যতোসব যুক্তি তালাশ করে বের করে তাদের বল্গাহীন স্বাধীনতার সপক্ষে। তাদের মন-মস্তিষ্ক কোন ভালো চিন্তর পরিবর্তে প্রবৃত্তির লালসা যে কোন উপায়ে চরিতার্থ করার চিন্তায় থাকে। এ একথারই প্রমাণ যে আখেরাত অস্বীকার করাই মানবীয় চরিত্র ধ্বংসের কারণ। মানুষকে মনুষ্যত্বের সীমার মধ্যে কোন কিছু রাখতে পারলে তা শুধু এ অনুভূতি যে আমরা দায়িত্ব হীন নই বরঞ্চ খোদার কাছে আমাদের প্রত্যেক কাজের জন্যে জবাবদিহি করতে হবে। এ অনুভূতি না থাকলে, কেউ বিরাট আলেম হওয়া সত্ত্বেও জঘণ্যতম আচরণ করে পারে না। (১০০)

أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ – مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ – أَمْ لَكُمْ كِتَابٌ فِيهِ تَدْرُسُونَ – إِنَّ لَكُمْ فِيهِ لَمَا تَخَيَّرُونَ – أَمْ لَكُمْ أَيْمَانٌ عَلَيْنَا بَالِغَةٌ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ إِنَّ لَكُمْ لَمَا تَحْكُمُونَ – سَلْهُمْ أَيُّهُمْ بِذَلِكَ زَعِيمٌ – أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ فَلْيَأْتُوا بِشُرَكَائِهِمْ إِنْ كَانُوا صَادِقِينَ-(القلم-35-41)

আমরা কি অনুগত লোকদের অবস্থা অপরাধীদের মত করব? তোমাদের কি হয়েছে? কি রকম মন্তব্য করছ? তোমাদের কি এমন কোন কিতাব আছে যাতে তোমরা পড় যে,

إِنَّ هَؤُلَاءِ يُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ وَيَذَرُونَ وَرَاءَهُمْ يَوْمًا ثَقِيلًا-(الدهر-27)

এরা ত সত্বর লাভ করা যায় এমন বস্তু (দুনিয়া) ভালোবাসে এবং সামনে সে কঠিন দিন আসবে তা উপেক্ষা করে। (দাহর: ২৭)

অর্থাত্ এ কুরাইশ কাফেরগণ যে কারণে নৈতিক ও আকীদাগত গোমরাহীর মধ্যে জিদের বশবর্তী হয়ে নিমগ্ন থাকতে চায় এবং যার ভিত্তিতে আল্লহর রসূলের দাওয়াতের জন্যে তাদের কর্ণ বধির হয়ে গেছে, তা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তাদের দুনিয়া[-পুরস্তি এবং আখেরাতের ঔদাসীন্য। এজন্যে একজন সত্যবন্থী মানুষের পথ এদের পথ থেকে এতো পৃথক যে তাদের মধ্যে আপোসের কোন প্রশ্নই ওঠে না। (১০৬)

أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ – حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ – كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ – ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ – كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ- لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ – ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ – ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ-(التكاثر-1-8)

-অপরের তুলনায় অধিকমাত্রায় দুনিয়ার সুখশান্তি লাভের চিন্তা তোমাদেরকে গাপলতির মধ্যে যা ঔদাসীন্যে নিমজ্জিত করে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত (এ চিন্তায়) তোমরা কবরে পৌছে যাও। কখনো না শিগগির তোমরা জানতে পারবে। তারপর (শুনে রাখ) কখনো না, তোমরা শিগগির জানতে পারবে। যদি তোমরা নিশ্চিতভাবে (এ আচরণের পরিণাম) জানতে পারতে (তাহলে তোমাদের কাজের ধরণ এমন হতো না)। অতপর অবশ্যই তোমাদেরকে এসব নিয়ামতের জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। (তাকাসুর: ১-৮)।

الهكم  শব্দটি لهو থেকে উত্পন্ন। তার আসল অর্থ ঔদাসীন্য। কিন্তু আরবী ভাষায় এ শব্দটি এমন কাজের জন্যে বলা হয় যার দ্বারা মানুষের অনুরাগ এতো বেড়ে যায় যে, এতে নিমগ্ন হয়ে অন্যান্য গুরুত্বপুর্ণ কাজের প্রতি সে উদাসীন হয়ে পড়ে। এ মূল থেকে যখন الهكم শব্দ বলা হয়, তখন তার অর্থ এই হয় যে, কোন ঔদাসীন্য তোমাকে এমন নিমগ্ন করে রেখেছে যে, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে কোন হুশজ্ঞানই থাকে না। তারই চিন্তা-ভাবনা তোমাকে পেয়ে বসে। আর এ নিমগ্নতা তোমাকে একেবারে গাফেল বানিয়ে দেয়।

تكاثر উত্পন্ন كثرت থেকে। তার তিনটি অর্থ: এক, মানুষ আধিক্য লাভের জন্যে চেষ্টা করে। দুই, আধিক্য লাভের জন্যে মানুষ একে অপর থেকে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা করে। তিন, লোক একে অপরের তুলনায় এ বিষয়ে গর্ব করে যে, অপর থেকে সে অনেক আধিক্য লাভ করেছে।

অতএব الهكم التكاثر এর অর্থ হলো, আধিক্য অর্থাত্ অত্যধিক লাভ করার লালসা তোমাদেরকে নিজেদের মধ্যে এমন মগ্ন করে রেখেছে যে, তার থেকে অধিক গুরুত্বপুর্ণ বিষয় থেকে তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে। এখানে এ বিষয়ের ব্যাখ্যা করা হয়নি যে, তাকসুর দ্বারা কোন জিনিসের আধিক্য এবং আলহাকুম দ্বারা-কোন জিনিস থেকে গাফেল করা বুঝানো হয়েছে। এখানে الهاكم বলে কাদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে তাও ব্যাখ্যা করা হয়নি। এ ব্যাখ্যা না থাকার কারণে, এ শব্দগুলো দ্বারা ব্যাপক অর্থ বুঝানো হয়েছে। তাকাসুর’ এর অর্থ সীমিত নয়, বরঞ্চ দুনিয়ার সকল সুযোগ-সুবিধা, মানাফা, ভোগ বিলাসের উপকরণ, শাসন ক্ষমতা ও শক্তি সামর্থ্যের উপকরণ যতো বেশী সম্ভব লাভ করার চেষ্টা চরিত্র করা, এসব লাভ করতে গিয়ে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অন্যান্য থেকে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা এবং একে অপরের মুকাবলায় তার আধিক্যের জন্য গর্ব করা, এর অর্থের অন্তর্ভূক্ত। এভাবে الهاكم বলে যাদেরকে সম্বোধন করা হচ্ছে তাদের সংখ্যাও সীমিত থাকে না। বরঞ্চ প্রত্যেক যুগের লোক ব্যক্তগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে এ সম্বোধনের আওতায় পড়ে। অর্থাত্ যতো বেশী সম্ভব দুনিয়ার স্বার্থ লাভ করা এবং এ ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করে সামনে অগ্রসর হওয়ার মানসিকতা ব্যক্তিবর্গেরও এবং জাতিসমূহেরও।

ঠিক তেমনি কোন জিনিস থেকে গাফেল করে রেখেছে এর ব্যাখ্যা যেহেতু الهاكم التكاثر এর মধ্যে নেই সে জন্যে এও ব্যাপক অর্থে বলা হয়েছে। অর্থাত্ সে খোদা থেকে বিমুখ হয়েছে, আখেরাতের পরিণাম থেকে বিমুখ হয়েছে। নৈতিক সীমারেখা ও নৈতিক দায়িত্ব থেকে বিমুখ হয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু জীবনের মান বৃদ্ধির চিন্তাই রয়েছে। এ বিষয়ে কোন চিন্তা নেই যে, মনুষ্যত্বের মান কতখানি নীচে নেমে যাচ্ছে। তাদের অধিক মাত্রায় ধনসম্পদ চাই। এ বিষয়ের কোন পরোয়া নেই যে তা কিভাবে লাভ করা হচ্ছে। ভোগ বিলাস ও দৈহিক আনন্দ সম্ভোগ তাদের সর্বাপেক্ষা কামনার বস্তু। এ সুখ সম্ভোগে নিমগ্ন থেকে সে এ বিষয়ে একেবারে গাফেল হয়ে গেছে যে, এ আচরণের কি পরিণাম হতে পারে। তার তো যতো বেশী শক্তি, যতো বেশী সৈন্য সামন্ত, যতো বেশী অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহেরই চিন্তা রয়েছে এবং এ ব্যাপারে তাদের পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তারা এ বিষয়ে চিন্তা করে দেখে না যে, এসব কিছু খোদার যমীনকে জুলুম-অত্যাচারে পূর্ণ করার এবং মনুষ্যত্বেকে ধ্বংস করার সরঞ্জাম। মোট কথা তাকাসূর’ এর বহু ধরণ আছে যা ব্যক্তি ও জাতিকে তার মধ্যে এমন মগ্ন করে রেখেছে যে, দুনিয়া ও তার সুখ সম্ভোগ ব্যতীত অন্য কোন কিছুর চিন্তাই তাদের নেই এবং এ চিন্তা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাদেরকে মগ্ন করে রাখে।

এ ভ্রান্তি থেকে মানুষকে সাবধান করে দেয়ার পর বলা হয়েছে যে, তোমরা এ ভুল ধারণায় রয়েছ যে, দুনিয়ার এ আধিক্য এবং তার জন্যে প্রতিযোগিতা করে সামনে অগ্রসর হওয়াই উন্নতি ও সাফল্য। অথচ এ কিছুতেই উন্নতি ও সাফল্য হতে পারে না। অতিসত্বর এর অশুভ পরিণাম তোমরা জানতে পারবে এবং তোমরা জানতে পারবে যে, এ কত বড়ো ভ্রান্তি ছিল যার মধ্যে সারা জীবন মগ্ন ছিলে। অতিসত্বর বলতে আখেরাতেও হতে পারে। কারণ যে সত্তার দৃষ্টি অনাদি কাল থেকে অনন্তকাল পর্যন্ত প্রসারিত তাঁর জন্যে কয়েক হাজার অথবা কয়েক লক্ষ বছরও কলের একটা ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। কিন্তু এর অর্থ মৃত্যুও হতে পারে। কারণ তা ত কোন মানুষ থেকেই দূরে নয়। আর মৃত্যুর সাথে সাথেই এ কথা মানুষের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, যে কাজ কর্মে সে তার গোটা জীবন কাটিয়ে এসেছে, তা তার সৌভাগ্য, না দুর্ভাগ্যের কারণ। (১০৭)

অতপর কুরআন স্বয়ং আরব সমাজ থেকেই কিছু দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছে যে আখেরাত বিমুখতা মানুষের মধ্যে কি কি অনাচার সৃষ্টি করেছে।

-মানুষ কি মনে করেছে যে আমরা তাদের অস্থিগুলো একত্র করতে পারব না? আমরা তা আদের আঙুলের গিঁটগুলো পর্যন্ত ঠিকমত বানিয়ে দিতে সক্ষম। কিন্তু মানুষ চাচ্ছে যে সামনেও সে অপকর্ম করতে থাকবে। (কিয়ামাহ: ৩-৫)

প্রথম দু আয়াতে অস্বীকারকারীদের উপর কথার জাবাব দেয়া হয়, যেমন তারা বলছিল যে, এ কি করে হতে পারে যে, যাদের মৃত্যুর পর হাজার হাজার বছর অতীত হয়েছে, যাদের দেহের ক্ষুদ্রতিক্ষুদ্র অংশগুলো মাটিতে মিশে বিলীন হয়ে গেছে, যাদের অস্থিগুলো জরাজীর্ণ হয়ে না জানি কোথায় কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যাদের মধ্যে কেউ আগুণে জ্বলে মরেছে, কেউ হিংস্র পশুর উদরস্থ হয়েছে, কেউ সমুদ্র ডুবে মাছের আহারে পরিণত হয়েছে, তাদের দেহের অংশগুলো পুনরায় একত্র হবে এবং প্রত্যেক মানুষ ঠিক অবিকল সে মানুষটি হয়েই উঠবে যেমনটি দশবিশ হাজার বছর পূর্বে ছিল? এর অত্যন্ত যুক্তিসংগত ও অত্যন্ত শক্তিশালী জবাব আল্লাহতায়ালা এ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের আকারে দিয়েছেন। তা এই “মানুষ কি মনে করেছে যে, আমরা তার অস্থিগুলোকে একত্র করতে পারব না? অর্থাত্ তোমাদেরকে যদি একথা বলা হয়ে থাকতো যে, দেহের এ বিক্ষিপ্ত অংশগুলো কোন এক সময়ে আপনাআপনি একত্র হবে এবং তোমরা নিজে নিজেই এ দেহসহ জীবিত হয়ে উঠবে, তাহলে অবশ্য তোমাদের এটা অসম্ভব মনে করা সংগত হতো। কিন্তু তোমাদেরকে ত একথা বলা হয়েছিল যে এ কাজ স্বয়ং হবে না, বরঞ্চ আল্লাহতায়ালা এমনটি করবেন। এখন তাহলে কি তোমরা সত্যিই এ কথা মনে করছ যে, বিশ্বজগতের স্রষ্টা, যাকে তোমরা স্বয়ং স্রষ্টা বলে মান, একাজ করতে অক্ষম?“ এ এমন এক প্রশ্ন যার জবাবে খোদাকে স্রষ্টা বলে মানে এমন কোন ব্যক্তি না সে সময়ে একথা বলতে পারতো আর না আজ বলতে পারে যে খোদাও যদি এ কাজ করতে চান ত পারবেন না। কোন নির্বোধ যদি এমন কথা বলে, তাহলে তাকে জিজ্ঞাস করা যেতে পারে, “তুমি যে দেহসহ এখন বিদ্যমান তার অসংখ্য অংশ বায়ূ, পানি, মাটি এবং নাজানি কত স্থান থেকে একত্র করে ঐ খোদা কিভাবে এ দেহ তৈরী করলেন যাঁর সম্পর্কে তুমি বলছ যে, তিনি এসব অংশ একত্র করতে পারবেন না? তার পর বল হলো, বড়ো বড়ো অস্থিগুলো একত্র করে তোমার দেহ কাঠামো পুনরায় বানিয়ে দেয়া কেন আমরা ত একাজ করতেও সক্ষম যে তোমাদের দেহের সূক্ষ্মতম অংশ এমনকি তোমাদের আঙুলের গিটগুলো পর্যন্ত অবিকল তেমন বানিয়ে দিতে পারি যেমনটি তা আগে ছিল।

শেষবাক্যে আখেরাত অস্বীকারকারীদের প্রকৃত রোগ নির্ণয় করে দেয়া হয়েছে। যে জিনিস আখেরাত অস্বীকার করতে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে তা প্রকৃতপক্ষে এ নয় যে, তারা আখেরাতকে অসম্ভব মনে করে। বরঞ্চ তাদের এ অস্বীকারের প্রকৃত কারণ এই যে, আখেরাত মেনে নিলে অনিবার্যরূপে তাদের উপর কিছু নৈতিক বাধা নিষেধ আরোপিত হয় এবং এ তাদের জন্যে অসহনীয়। তার চায় যে, যেভাবে তারা আজ পর্যন্ত নাকলবিহীন (নাকদড়ি বিহীন) বলদের ন্যায় যত্রতত্র চরে বেড়াচ্ছে, এভাবে ভবিষ্যতেও চরে বেড়াবে। যে জুলুম অত্যাচার, বেঈমানী, পাপাচার অনাচার তারা এখন পর্যন্ত করে চলেছে, তা করার পুরা লাইসেন্স যেন ভবিষ্যতেও পেয়ে যায়। এ ধারণা যেন তাদের এ অন্যায় স্বাধীনতা ভোগ করা থেকে বিরত রাখতে না পারে যে, একদিন তাদেরকে তাদের খোদার সামনে হাজির হয়ে নিজেদের কর্মকান্ডের জবাবদিহি করতে হবে। এজন্যে প্রকৃতপক্ষে তাদের বিবেকে আখেরাতের প্রতি ঈমান আনা থেকে বিরত রাখছে না, বরঞ্চ তাদের প্রবৃত্তির লালসা-বাসনাই এ বিষয়ে প্রতিবন্ধক। (১০৪)

নিম্নের আয়াতে সে কথাটিই বলা হয়েছে?

وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلَّا كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيمٍ-(المطففين-12)

এবং সীমালংঘনকারী দুর্বৃত্ত ব্যতীত তা কেউ মিথ্যা মনে করে না। (মুতাফফেফীন: ১২)

إِنَّ الَّذِينَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ-(ص-26)

-যারা আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যায়, তাদের জন্যে কঠিন শাস্তি রয়েছে। এ জন্যে যে তারা হিসাবের দিন ভুলে গেছে। (সোয়াদ: ২৬)

كَلَّا بَلْ تُحِبُّونَ الْعَاجِلَةَ – وَتَذَرُونَ الْآخِرَةَ-(القيامة-20-21)

কখনো না। আসল কথা এই যে, তোমরা সত্বর লভ্য জিনিস (দুনিয়া) ভালোবাস এবং আখেরাত পরিত্যাগ কর। (কিয়ামাহ: ২০-২১)

এ আখেরাত অস্বীকারকারীদের অস্বীকারের দ্বিতীয় কারণ। প্রথম কারণ ত উপরে বলা হলো যে তারা পাপাচারের পূর্ণ স্বাধীনতা চায় এবং ওসব নৈতিক বাধা নিষেধ থেকে বাঁচাতে চায় যা আখেরাত মেনে নেয়ার পর তাদের উপর অনিবার্যরূপে আরোপিত হয়। এজন্যে প্রকৃত পক্ষে প্রবৃত্তির লালসাই তাদেরকে আখেরাত অস্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং তারপর তারা তাদের এ অস্বীকার প্রমাণ করার জন্যে যুক্তিতর্কের আশ্রয় নেয়।

এখন দ্বিতীয় করণ এ বলা হয়েছে যে, আখেরাত অস্বীকারকারীগণ যেহেতু সংকীর্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন ও অদূরদর্শী সে জন্যে তাদের দৃষ্টিতে সকল গুরুত্ব এ দুনিয়ার সুফলের প্রতি যা এখানে প্রকাশিত হয় এবং সে পরিণাম ফলের প্রতি কোন গুরুত্বইদেয় না যা আখেরাতে প্রকাশিত হবে। তারা মনে করে যে সুযোগ সুবিধা, অথবা ভোগ বিলাস অথবা আনন্দ সুখ এখানে লাভ করা আর তার জন্যই সকল পরিশ্রম ও চেষ্টাচরিত্র নিয়োজিত করা উচিত, কারণ তা লাভ করতে পারলে যেন সব কিছু লাভ করা হলো- আখেরাতে তার পরিণাম যতোই মন্দ হোক না কেন। এভাবে তাদের ধারণা এই যে, এখানে যে ক্ষতি ও দুঃখকষ্ট হতে পারে তার থেকে বেঁচে থাকাই আসল কাজ এদিকে দৃষ্টিপাত না করে যে, এসব সহ্য করার ফলে যতো বড়ো প্রতিদানই আখেরাতে পাওয়া যাক না কেন, তারা চায় নগদ সওদা। আখেরাতের মতো সুদূর ভবিষ্যতের জন্যে তারা না এখনকার কোন মুনাফা ছাড়তে রাজী আর না কোন ক্ষতি স্বীকার করতে রাজী। এ চিন্তাধারার সাথে যখন আখেরাতের বিষয়ের উপর কোন যুক্তিতর্কের অবতারণা করতো, তখন তার মধ্যে কোন বিজ্ঞতা পাওয়া যেতো না বরঞ্চ তার পেছনে এ চিন্তাধারা কাজ করতো যে কারনে তারা এ সিদ্ধান্তে পৌছতো যে, আখেরাত মেনে নেয়া যাবে না যদিও ভেতর থেকে তাদের বিবেক একথাই বলতো যে, আখেরাতের সম্ভাবনা ও অপরিহার্যতার যেসব যুক্তি কুরআনে দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত এবং তার বিরুদ্ধে তারা যেসব যুক্তি পেশ করছে তা একেবারে অবান্তর। (১০৫)

الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا-(الملك-2)

-যিনি মৃত্যু ও জীবন উদ্ভাবন করেছেন তোমাদেরকে পরীক্ষা করে দেখার জন্যে যে, তোমাদের মধ্যে উত্কৃষ্ট আমল কে করতে পারে। (মুলক : ২)

অর্থাত্ দুনিয়ায় মানুষের জীবন মৃত্যুর ধারাবাহিকতা আল্লাহতায়ালা এ জন্যে শুরু করেছেন যাতে তাদের পরীক্ষা নিতে পারেন এবং দেখেন যে কার কাজকর্ম অধিক উত্কৃষ্ট। এ সংক্ষিপ্ত বাক্যে বহু সত্যের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে।

প্রথম কথা এই যে, মৃত্যু ও জীবন তাঁর পক্ষ থেকেই আসে। জীবন ও মৃত্যুদানকারী দ্বিতীয় আর কেউ নেই।

দ্বিতীয়ত: মানুষ একটি সৃষ্টি হিসাবে তাকে ভালো ও মন্দ করার শক্তি দেয়া হয়েছে। না তার জীবন উদ্দেশ্যহীন আর না তার মৃত্যু। স্রষ্টা তাকে এখানে পরীক্ষার জন্যে পয়দা করেছেন। জীবন তার জন্যে পরীক্ষার অবকাশ। মৃত্যুর অর্থ এই যে, তার পরীক্ষার সময় শেষ হয়েছে।

তৃতীয়ত: এ পরীক্ষার উদ্দেশ্য স্রষ্টা প্রত্যেককে কাজের সুযোগ দিয়েছেন যাতে সে দুনিয়ায় কাজের মাধ্যমে ভালো ও মন্দ প্রকাশ করতে পারে এবং বাস্তবে দেখিয়ে দেয়া যে, সে কেমন লোক।

চতুর্থত : স্রষ্টাই এ বিষয়ের সিদ্ধান্তকারী যে কার কাজ ভালো এবং কার মন্দ। অবশ্যি ভালো ও মন্দের মান নির্ণয় করা পরীক্ষার্থীর কাজ নয়। বরঞ্চ পরীক্ষকই মান নির্ণয়কারী। অতএব যেই পরীক্ষায় সাফল্য লাভ করতে চায় তার জানতে হবে যে, পরীক্ষকের নিকটে ভালো কাজ কি।

পঞ্চমত : পরীক্ষার অন্তর্নিহিত অর্থ এই যে, যে ব্যক্তির যেমন কার্য হবে, তেমন তাকে পুরস্কার দেয়া হবে। কারণ ‍পুরস্কার না থাকলে পরীক্ষার কোন অর্থই নয় না। (১১১)

إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا – إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا-( الدهر-2-3)

আমরা মানুষকে যুগ্ম শুক্রকীট থেকে পয়দা করেছি যেন তার পরীক্ষা নিতে পারি এবং এ উদ্দেশ্যেই তাকে শ্রবণকারী ও দর্শনকারী বানিয়েছি। আমরা তাকে পথ দেখিয়েছি। তারপর সে শোকরকারীও হতে পারে। কুফরকারীও হতে পারে। (দাহর:২-৩)

এ হচ্ছে দুনিয়ার মানুষের এবং মানুষের জন্যে দুনিয়ার প্রকৃত মর্যাদা। সে বৃক্ষলতা ও পশুপাখীর মতো নয় যে, তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য এখানেই পূরণ হয়ে যাবে এবং প্রকৃতির আইন অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আপন অংশের কাজ সমাধা করে এখানেই মৃত্যুবরণ করে লয়প্রাপ্ত হবে। উপরন্তু এ দুনিয়া মানুষের জন্যে না শাস্তির স্থান, যেমন সন্ন্যাসীগণ মনে করে, আর না পুরস্কারের স্থান, যেমন পুনর্জন্মবাদীগণ মনে করে। আর এ চারণভূমিও নয় এবং চিত্তবিনোদনের স্থানও নয়, যেমন জড়বাদীরা মনে করে। এ সংগ্রাম ক্ষেত্রও নং যেমন ডারউইন ও মার্কসের অনুসারীগণ মনে করে থাকে। বরঞ্চ এ মানুষের জন্যে এক পরীক্ষা ক্ষেত্র। যাকে সে আয়ু মনে করে, প্রকৃতপক্ষে তা হচ্ছে পরীক্ষার সময় যা তাকে এখানে দেয়া হয়েছে। দুনিয়ায় যে শক্তি সামর্থ্য ও যোগ্যতা তাকে দেয়া হয়েছে, যেসব বস্তু ব্যবহারের সুযোগ তাকে দেয়া হয়েছে যেসব দায়িত্বসহ সে এখানে কাজ করছে, তার মধ্যে এবং অন্যান্য মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক বিদ্যমান এসব প্রকৃতপক্ষে পরীক্ষায় অগণিত প্রশ্নপত্র এবং জীবনের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত এ পরীক্ষা চলতে থাকে। দুনিয়ায় তার ফল প্রকাশিত হওয়ার কথা নয়, বরঞ্চ আখেরাতে এসব প্রশ্নপত্র যাঁচাই করার পর সিদ্ধান্ত করা হবে যে, সে কৃতকার্য হয়েছে, না অকৃতকার্য। তার সাফল্য এবং অসাফল্য এ বিষয়ের উপর নির্ভর করে যে সে নিজেকে কি মনে করে এখানে কাজ করেছে এবং তাকে যে প্রশ্নপত্র দেয়া হয়েছে কিভাবে তার জবাব দিয়েছে। যদি সে নিজেকে কোন খোদারই বান্দাহ মনে করে না থাকে। অথবা বহু খোদার বান্দাহ মনে করেছে এবং সমস্ত প্রশ্নপত্রের জবাব এ মনে করে দিয়েছে যে, আখেরাতে তাকে তার স্রষ্টার কাছে কোন জবাবদিহি করতে হবে না, তাহলে তার জীবনের সকল কর্মকান্ড ভুল হয়েছে। কিন্তু যদি সে নিজেকে এক খোদার বান্দাহ মনে করে সে পন্থায় কাজ করেছে যা খোদার ইচ্ছানুযায়ী হয়েছে এবং আখেরাতের জবাবদিহিকে লক্ষ্য হিসাবে গ্রহন করেছে তাহলে সে পরীক্ষায় পাস করেছে।

তারপর বলা হয়েছে, আমরা তাকে শ্রবণকারী ও দর্শনকারী বানিয়েছি। যদিও আরবী এ দুটি শব্দের سميع ও بصير অর্থ তাই অর্থাত্ শ্রবণকারী ও দর্শনকারী, কিন্তু প্রত্যেক আরবী ভাষাভাষী জানে যে পশুর বেলায় سميع ও بصير শব্দদ্বয় কখনো ব্যবহৃত হয় না। যদিও পশু শ্রবণকারী এবং দর্শনকারী হয়ে থাকে। অতএব শ্রবণ করা এবং দেখার অর্থ এখানে শ্রবণ ও দর্শনের সে শক্তি নয় যা পশুকেও দেয়া হয়েছে। বরঞ্চ এর অর্থ ঐসব উপায় যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান লাভ করে এবং তারপর তার থেকে সুফল লাভ করে। তাছাড়া শ্রবণ ও দর্শন মানুষের জ্ঞানার্জনের উপায়সমূহের মধ্যে যেহেতু অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্যে সংক্ষেপে এ দুটিরই উল্লেখ করা হয়েছে। নতুবা আসল উদ্দেশ্য মানুষকে সকল ইন্দ্রিয় জ্ঞান দান করা যার মাধ্যমে সে জ্ঞান লাভ করে থাকে। অতপর মানুষকে যে ইন্দ্রিয় জ্ঞান দান করা হয়েছে, তা আপন বৈশিষ্ট্যর দিক দিয়ে ঐসব ইন্দ্রিয়ানুভূতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক যা পশুকে দান করা হয়েছে। কারণ তার প্রত্যেক অনুভূতির পেছনে একটি চিন্তাশীল মস্তিষ্ক আছে যা অনুভূতির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যাবলী একত্র করে এবং সেগুলো সুবিন্যস্ত করে তার থেকে ফলাফল বের করে, অভিমত স্থির করে এবং তারপর কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যার উপর তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গী ও আচরণ তৈরী হয়। অতএব মানুষকে পয়দা করে আমরা তার পরীক্ষা নিতে চাই-এ কথা বলার পর বলা হলো, এ উদ্দেশ্যে আমরা তাকে সামী ও বাসীর বানিয়েছি। এর প্রকৃত অর্থ হলো আল্লাহতায়ালা তাকে জ্ঞান বিবেকের শক্তি দান করেছেন যাতে সে পরীক্ষা দেয়ার যোগ্য হতে পারে। একথা ঠিক যে, যদি কালামে ইলাহীর উদ্দেশ্য এ না হয় এবং সামী ও বাসীর বানাবার উদ্দেশ্য নিছক শ্রবণ ও দর্শনের শক্তি বানানো হয়, তাহলে একজন অন্ধ ও বধির ব্যক্তি ত পরীক্ষা থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। অথচ যতোক্ষন পর্যন্ত কোন ব্যক্তি জ্ঞান ও বিবেক থেকে বঞ্চিত না হয়েছে, ততোক্ষন তার পরীক্ষা থেকে অব্যাহতি লাভের কোন প্রশ্নই ওঠে না।

وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِينَ – الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ – وَإِذَا كَالُوهُمْ أَوْ وَزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ – أَلَا يَظُنُّ أُولَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوثُونَ – لِيَوْمٍ عَظِيمٍ – يَوْمَ يَقُومُ النَّاسُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ-( المطففين-1-6)

-ধ্বংস! মাপে প্রতারণাকারীদের জন্যে। তাদের অবস্থা এই যে, যখন তারা লোকের নিকট থেকে গ্রহন করে তখন পূর্ণ মাত্রায় গ্রহন করে। কিন্তু তাদেরকে যখন ওজর করে দেয় তখন (কম দিয়ে) তাদের ক্ষতি করে। এরা কি বোঝে না যে, একটা মহাদিনে তাদেরকে উঠিয়ে আনা হবে? তা এমন একদিন, যেদিন সমস্ত মানুষ রাব্বুল আলামীনের সম্মুখে দাঁড়াবে। (মুতাফফেফীন: ১-৬)

مطففين  শব্দটি طفيف  থেকে উত্পন্ন। আরবী ভাষায় তার অর্থ ছোট ও নগন্য বস্তু। আর تطفيف  শব্দ পরিভষা হিসাবে ওজনে চুরি করে কম দেয়াকে বুঝায়। কারণ এ কাজ যে করে সে ওজন করে দিতে বা নিতে বেশী পরিমাণে মেরে দেয় না। বরঞ্চ হাতছাপাই করে প্রত্যেক খদ্দের থেকে সামান্য পরিমাণ করে ঠকিয়ে নেয় এবং খদ্দের বেচারা বুঝতেই পারে না যে ব্যবসায়ী তার কতটা লোকসান করলেন। একথা ঠিক যে, এই যে অনাচারটি সমাজে প্রচলিত ছিল, তা কখনো প্রসার লাভ করতে পারতো না, যদি মানুষ আখেরাতের কথা মনে করতো। (১০৮)

كَلَّا بَلْ لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ – وَلَا تَحَاضُّونَ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ – وَتَأْكُلُونَ التُّرَاثَ أَكْلًا لَمًّا – وَتُحِبُّونَ الْمَالَ حُبًّا جَمًّا-( الفجر-17-20)

-কখনো না। (দুনিয়ার উন্নতি অথবা দুর্গতি সম্মান ও অসম্মানের মানদন্ড নয়)। কিন্তু তোমরা এতিমের সাথে সম্মানজনক আচরণ কর না। আর মিসকিনকে অন্ন দানের ব্যাপারে তোমরা পরস্পরকে উদ্বুদ্ধ কর না। উত্তরাধিকারের সমস্ত মাল একত্র করে খেয়ে ফেল এবং ধনসম্পদের ভালোবাসায় বা লালসায় তোমরা অধীর। (ফজর: ১৭-২০)

অর্থাত্ এই যে তোমরা দুনিয়ার উন্নতি ও দর্গতিকে সম্মান ও অসম্মানের মানদন্ড মনে করে আছ তা তোমাদের বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি মাত্র। নতুবা প্রকৃত মানদন্ড ত হচ্ছে চারিত্রিক মাধুর্য ও কুস্বভাব। তোমাদের অবস্থা এই যে যতো দিন এতিমের বাপ জীবিত থাকে ততোদিন তার সাথে তোমাদের আচরণ একরকম হয়ে থাকে এবং যখন তার বাপ মৃত্যুবরণ করে তখন প্রতিবেশী ও দূর সম্পর্কের আত্মীয় ত দূরের কথা, চাচা, মামু এমনকি বড়ো ভাই পর্যন্ত তাকে দেখতে পারে না। তোমাদের সমাজে দরিদ্র লোকদেরকে অন্ন দানের কোন প্রচলন নেই। না কেউ স্বয়ং কোন ক্ষুধার্তকে আহার দানে প্রস্তুত হয়, আর না লোকের মধ্যে এ অনুপ্রেরণা দেখতে পাওয়া যায় যে, ক্ষুধার্তদের ক্ষুধা মেটাবার কোন চিন্ত-ভাবনা করে এবং একে অপরকে তার ব্যবস্থাপনার জন্যে উদ্বুদ্ধ করে। উত্তরাধিকারে তোমরা নারী ও শিশুকে ত বঞ্চীত করে রেখেছ। তাছাড়া মৃত ব্যক্তির ওয়ারিসদের মধ্যে যে ব্যক্তি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়, সে দ্বিধাহীন চিত্তে সকল উত্তরাধিকার আত্মসাত্ করে ফেলে। যারা তাদের অংশ লাভ করার শক্তি সামর্থ্য রাখে না, তাদের অংশ মারা যায়। তোমাদের দৃষ্টিতে অধিকার ও দায়িত্বের কোন পার্থক্য নেই যে, ইমানদারির সাথে আপন দায়িত্ব মনে করে হকদারকে তার হক দিয়ে দেবে- সে তা আদায় করার শক্তি রাখুক বা না রাখুক। সম্পদ অর্জনের ব্যাপারে জায়েয না জায়েয এবং হালাল হারামের কোন চিন্তা তোমাদের নেই। যেমন করেই হোক সম্পদ লাভ করতে তোমাদের কোন দ্বিধা নেই। আর যতোই সম্পদ তোমরা লাভ কর না কেন তোমাদের লোভ-লালসার অগ্নি কখনো নির্বাপিত হয় না।

أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ – فَذَلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ – وَلَا يَحُضُّ عَلَى طَعَامِ الْمِسْكِينِ-( الماعون-1-3)

-তুমি কি দেখেছ সেই ব্যক্তিকে যে আখেরাতের পুরস্কার ও শাস্তি মিথ্যা মনে করে? এত সেই যে এতিমকে ধাক্কা (দিয়ে বের করে) দেয় এবং মিসকিনকে খানা দেয়ার জন্যে উদ্বুদ্ধ করে না। (মাউন : ১-৩)

এখানে আল্লাহ তায়ালা দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রকৃত পক্ষে এ কথা বলেছেন যে, আখেরাতের অস্বীকার মানুষের মধ্যে কোন ধরনের নৈতিক কুফল বয়ে আনে। এ দুটি অনাচার ধরে দেয়াটাই আসল উদ্দেশ্য নয় যে, আখেরাত না মানলে শুধু এ দুটি কুফলই দেখা যায় যে, মানুষ এতিমদেরকে তিরস্কার করে এবং মিসকিনকে আহার দানে উদ্বুদ্ধ করে না। বরঞ্চ এ গোমরাহির ফলে যে অসংখ্য অনাচার দেখা দেয়, তার মধ্যে দুটি এমন জিনিস দৃষ্টান্ত হিসাবে পেশ করা হয়েছে যাকে প্রত্যেক সুস্থ প্রকৃতির লোক মেনে নেবে যে, তা অত্যন্ত জঘন্য চরিত্রের কাজ। এর থেকে এ কথাই হৃদয়ে বদ্ধমূল করা উদ্দেশ্য যে, যদি এই ব্যক্তি খোদার সামনে হাজির হয়ে জবাবদিহির কথা মেনে নিত, তাহলে তার দ্বারা এমন জঘন্য আচরণ হতো না যে সে এতিমের হক মারবে, তার উপর জুলুম করবে, তাকে তিরস্কার করবে এবং মিসকিনকে না স্বয়ং খানা খাওয়াবে, আর না কাউকে খাওয়াতে বলবে। আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারীর গুণাবলী ত সূরা বালাদ এবং সূরা আসরে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে, তারা একে অপরের প্রতি খোদার সৃষ্টি জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনের নসিহত করে এবং একে অপরকে সত্যনিষ্ঠা ও অধিকার পূরণ করে দেয়ার নসিহত করে। (১১০)

দুনিয়া মানুষের পরীক্ষা ক্ষেত্র

একদিকে কুরআন আখেরাতের সম্ভাবনা এবং তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষের প্রতিটি সন্দেহ-সংশয় অত্যন্ত যুক্তিসংগত উপায়ে দূর করেছে এবং অপরদিকে সে মানুষকে এ কথাও বলে দিয়েছে যে, সে তার গাফলতির কারনে দুনিয়াকে নিছক চারণভূমি অথবা চিত্তবিনোদনের স্থান মনে করে বসে আছে। অথচ এ হচ্ছে একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র যেখানে সর্বদা আপন জীবনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সামগ্রিক ব্যাপারে সে আসলে পরীক্ষা দিচ্ছে। আর এ পরীক্ষা তার অজ্ঞাতে নেয়া হচ্ছে না, বরঞ্চ আল্লাহতায়ালা তাকে একথা বলে দেয়ার পুরোপুরি ব্যবস্থাপনা করে রেখেছেন যে, এখানে তার সাফল্য এবং অসাফল্য কিসের উপর নির্ভরশীল।

কাজের পার্থক্য এবং তাদের উপস্থাপিত চারিত্রিক মূলনীতি ও আইনানুগ নির্দেশাবলী সম্পর্কে অনবহিত রয়ে যায়নি। তাদের একথা জানা থাক বা না থাক যে এ জ্ঞান তারা আম্বিয়া এবং আল্লাহর কিতাবসমূহের শিক্ষা থেকে লাভ করেছে। আজ যারা আম্বিয়া ও প্রেরিত কিতাবসমূহ অস্বীকার করে, অথবা সে সবের কোন খবর রাখে না, তারাও বহু কিছু মেনে চলে যা প্রকৃতপক্ষে নবী ও কিতাবসমূহের শিক্ষা থেকেই কোন না কোনভাবে তাদের নিকট পৌছেছে এবং তারা জানে না যে, এ সবের আসল উত্স কি। (১১২)

সিদ্ধান্ত গ্রহনের একটি দিন নির্ধারিত আছে

তারপর কোরআনের স্থানে স্থানে একথা বলা হয়েছে যে, পরীক্ষার ফলাফল এ দুনিয়ায় প্রকাশিত হবে না। বরঞ্চ একটা সময় তার জন্যে নির্ধারিত আছে যখন দুনিয়ার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বংশধরদের দ্বিতীয়বার জীবিত করে উঠানো হবে এবং তাদের সকলের হিসাব গ্রহন করা হবে। প্রত্যেককে তার কর্ম অনুযায়ী পুরস্কার অথবা শাস্তি দেয়া হবে।

إِنَّ يَوْمَ الْفَصْلِ مِيقَاتُهُمْ أَجْمَعِينَ-( الدخان-40)

-সকলের জন্যে সিদ্ধান্তের একটা নির্ধারিত সময় আছে। (দুখান : ৪০)

قُلْ إِنَّ الْأَوَّلِينَ وَالْآخِرِينَ – لَمَجْمُوعُونَ إِلَى مِيقَاتِ يَوْمٍ مَعْلُومٍ-( الواقعة-49-50)

-তাদেরকে বল, নিশ্চিতরূপে আগের এবং পরের সকলকেই একদিন অবশ্যই একত্রে জমা করা হবে যার সময় নির্ধারিত আছে। (ওয়াকেয়া : ৪৯-৫০)

وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ-( الزمر-68)

-এবং সেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে এবং সেসব মরে পড়ে যাবে যা আসমান ও যমীনে আছে তারা ব্যতীত যাদেরকে আল্লাহ জীবিত রাখতে চান (যেমন ফেরেশেতাগণ)। অতপর দ্বিতীয়বার শিংগা ফুঁকানো হবে এবং তখন হঠাত্ সকলে উঠে দেখতে থাকবে। (যুমার: ৬৮)

وَقِيلَ لِلظَّالِمِينَ ذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْسِبُونَ-( الزمر-24)

-এবং জালেমদের বলা হবে তোমাদের কৃতকর্মের স্বাদ গ্রহন কর। (যুমার: ২৪)

উপরে كسب  শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনের পরিভষায় তার অর্থ পুরস্কার ও শাস্তির সে অধিকার যা মানুষ তার কর্মের দ্বারা লাভ করে। নেক আমলকারীর প্রকৃত উপার্জন এই যে, সে আল্লাহর প্রতিদানের অধিকারী হয়। যারা ‍কুপথ অবলম্বন করবে তাদের উপার্জন হলো সে শাস্তি যা তারা আখেরাতে লাভ করবে। (১১৩)

الْيَوْمَ تُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ-(المؤمن-17)

-(সে সময়ে বলা হবে) আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার সে উপার্জনের প্রতিদান দেয়া হবে যা সে দুনিয়ায় করেছে। আর কারো প্রতি জুলুম করা হবে না। (মুমেন: ১৭)

অর্থাত্ কোন প্রকার জুলুমই করা হবে না। উল্লেখ্য যে, প্রতিদানের ব্যাপারে জুলুমের কয়েক ধরন হতে পারে। এক: এই যে, মানুষ কোন প্রতিদানের অধিকারী হলো এবং তা তাকে দেয়া হলো না। দ্বিতীয়: সে যতোখানি প্রতিদানের অধিকারী তা পুরোপুরি দেয়া হলো না। তৃতীয়: শাস্তির অধিকারী নয়, কিন্তু শাস্তি দেয়া হলো। চতুর্থ: সে শাস্তির অধিকারী কিন্তু শাস্তি দেয়া হলো না। পঞ্চম: কেউ অল্প শাস্তির যোগ্য কিন্তু তাকে বেশী শাস্তি দেয়া হলো। ষষ্ঠ: মজলুম চেয়ে রইলো এবং তার সামনে জালেম অব্যাহতি পেয়ে বেরিয়ে গেল। সপ্তম: একজনের অপরাধে অন্যজনকে ধরা হলো। আল্লাহতায়ালা চান জুলুম যতো প্রকারের হতে পারে তার কোন একটিও যেন তাঁর আদালত থেকে না হয়। (১১৪)

মানুষ যা কিছুই দুনিয়ায় করে আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে সরাসরি অবগত

কুরআন পাকে একথাও বলা হয়েছে যে, এ পরীক্ষা ক্ষেত্রে মানুষ যা কিছুই করছে, আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে সরাসরি অবগত। মানুষের কোন কাজ, এমনকি তার মনের কোন ধারণা-বাসনাও আল্লাহর কাছে গোপন থাকতে পারে না। এজন্যই বিচার দিবসে মানুষ সেই খোদার সামনে হাজির হবে যিনি তার জীবনের সকল কর্মকান্ড সম্পর্কে অবহিত।

وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ-( الملك-13)

-তোমরা চুপে ‍চুপে কথা বল অথবা উচ্চস্বরে (তাঁর কাছে সমান) তিনি ত মনের অবস্থাও জানেন। (মুলক:১৩

أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ-( الزخرف-80)

-তারা কি মনে করছে আমরা তাদের গোপন কথা এবং কানাঘুষা শুনছি না? আমরা সবই শুনছি। (উপরন্তু) আমাদের ফেরেশতাগণ তাদের নিকটে থেকে সব লিখে নিচ্ছে। (যুখরুফ: ৮০)

وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ-( ق-16)

তার মনের মধ্যে উদ্ভুত কুচিন্তাগুলো (অসঅসা) পর্যন্ত আমরা জানি। আমরা তার গলার শিরা থেকেও অধিক নিকটবর্তী। (কাফ:১৬)

তারপর বলা হয়েছে, আমরা তাকে শুধুমাত্র জ্ঞান ও বিবেকের শক্তি দান করেই ছাড়িনি, বরঞ্চ সেই সাথে তাকে পথ প্রদর্শনও করেছি যাতে সে জানতে পারে শোকর করার পথ কোনটা এবং কুফর করার পথ কোনটা। তারপর যে পথই সে অবলম্বন করুক, তার দায়-দায়িত্ব তারই হবে। সূরায়ে বালাদে এ বিষয়টি এভাবে বলা হয়েছে-

وَهَدَيْنَاهُ النَّجْدَيْنِ

আমরা তাকে উভয় পথই (ভালো ও মন্দ) সুস্পষ্ট করে বরে দিয়েছি।

আবার সূরায়ে শামসে একথাই এভাবে বলা হয়েছে-

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا – فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا

-এবং কসম (মানুষের) মনের এবং সে সত্তার যিনি তাকে (সকল প্রকাশ্য ও গোপন শক্তিসহ) সুবিন্যস্ত করেছেন। অতপর তার উপর ইলহাম করে দিয়েছেন তার পাপ প্রবণতা ও খোদাভীতি।

এসব কিছু সামনে রেখে যদি দেখা যায় এবং সেই সাথে কুরআন মজিদের ঐসব বিশদ বিবরনের প্রতি লক্ষ্য করা যায়, যেখানে বলা হয়েছে যে, আল্লাহতায়ালা মানুষের হেদায়েতের জন্যে কি কি ব্যবস্থাপনা করেছেন, তাহলে জানা যায় যে, এ আয়াতে পথ দেখানো, এর অর্থ পথ দেখানোর কোন একই পস্থা নয় বরঞ্চ অগণিত পন্থা রয়েছে। যেমন:

১। প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান বিবেকের যোগ্যতা দেয়ার সাথে সাথে এক নৈতিক অনুভূতিও দেয়া হয়েছে যার বদৌলতে সে ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে, কিছু কাজ ও গুণাবলী সে মন্দ মনে করে যদিও তার মধ্যে সে লিপ্ত হয় এবং কিছু কাজ ও গুণাবলী সে ভালো মনে করে যদিও সেসব থেকে সে দূরে থাকে। এমনকি যারা তাদের স্বার্থ ও প্রবৃত্তির লালসার খাতিরে এমন সব দর্শন আবিস্কার করেছে যার ভিত্তিতে বহু পাপাচার অনাচার তাদের জন্যে হালাল করে নিয়েছে, তাদের অবস্থাও এই যে, এসব অনাচারই যদি অন্য কেউ তাদের সাথে করে, তাহলে তখন আর্তনাদ করে উঠে এবং তখন জানতে পারা যায় যে, তাদের নিজেদের ভ্রান্ত দর্শন সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে তারা তা মন্দ মনে করে। ঠিক তেমনি সত্ কাজ ও গুণাবলীকে কেউ যতোই অজ্ঞতা, মুর্খতা এবং সেকেলে গণ্য করুক না কেন, কোন লোকের সত্ আচরনের দ্বারা নিজে উপকৃত হলে তার প্রকৃতি তাকে মর্যাদার যোগ্য মনে করতে বাধ্য হয়।

২। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে আল্লাহতায়ালা বিবেক (তিরস্কারকারী মন সফসে লাওয়ামা) বলে একটি বস্তু রেখে দিয়েছেন যে তাকে কোন মন্দ কাজ করার সময় বাধা দেয়। এ বিবেককে মানুষ যতোই আদর করে ঘুমিয়ে দিক অথবা যতোই অনুভূমিহীন বানাবার চেষ্টা করুক, তাকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হবে না। সে নির্লজ্জ সেজে নিজেকে একেবারে বিবেকহীন প্রমান করতে পারে, বানোয়াট দলিল প্রমান দ্বারা সে দুনিয়াকে প্রতারিত করার সকল চেষ্টা করতে পারে, সে নিজের মনকেও ধোঁকা দেয়ার জন্যে স্বীয় কাজকর্মের অসংখ্য ওজর পেশ করতে পারে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আল্লাহতায়ালা তার স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে যে দোষদর্শক (CRITIC) বসিয়ে রেখেছেন সে এতো জীবন্ত সে কোন অসত্ লোকের নিকটেও একথা গোপন থাকবে না যে, সে প্রকৃতপক্ষে কি। এ কথাটিই সূরায়ে কিয়ামাতে এভাবে বলা হয়েছে-

-বরঞ্চ মানুষ নিজেই নিজেকে খুব ভালোভাবে জানে, সে যতোই ওজর-আপত্তি পেশ করুক না কেন।

৩। মানুষের আপন অস্তিত্বের মধ্যে, তার চারপাশের যমীন থেকে নিয়ে আসমান পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ব প্রকৃতির চতুর্দিক এমন অগণিত নিদর্শন ছড়িয়ে আছে যারা এ সাক্ষ্য দেয় যে, এসব খোদা ব্যতীত অস্তিত্ব লাভ করতে পারে না। আর না বহু খোদা এ বিশ্ব কারখানার নির্মাণ ও পরিচালনাকারী হতে পারে। এভাবে উর্ধজগত ও অন্তর্জগতের এসব নিদর্শন কিয়ামত এবং আখেরাতের যুক্তি প্রমাণ পেশ করে। মানুষ যদি এসব থেকে চক্ষু বন্ধ করে নেয় অথবা বিবেক দ্বারা চালিত হয়ে এ সবের উপর চিন্তা-ভাবনা না করে অথবা এসব যে সত্যাবলীকে চিহ্নিত করেতা মেনে নিতে যদি সে ইতস্তত করে, তাহলে এটা হবে তার নিজের দোষ। আল্লাহতায়ালা তাঁর পক্ষ থেকে সত্যের সংবাদ দানকারী নিদর্শনাবলী মানুষের সামনে তুলে ধরতে কোন কিছু বাকী রাখেননি।

৪। মানুষের নিজের জীবনে, তার সমসাময়িক দুনিয়ায় এবং অতীত ইতিহাসের অভিজ্ঞতার অসংখ্য অগণিত এমন ঘটনা দেখতে পাওয়া যায় যা একথা প্রমান করে যে, একটি উচ্চতর সরকার তার এবং সমগ্র বিশ্ব প্রকৃতির শাসন চালাচ্ছে যার সামনে মানুষ একেবারে অসহায়, যার ইচ্ছা প্রতিটি বিষয়ের উপর বিজয়ী এবং মানুষ যার সাহায্যের মুখাপেক্ষী। এসব অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ শুধু বহির্জগতেই এ সত্যের সংবাদ দান করে না, বরঞ্চ মানব প্রকৃতির মধ্যেও সেই উচ্চতর শাসন কর্তৃত্বের অস্তিত্বের সাক্ষ্য বিদ্যমান যার ভিত্তিতে বড়ো বড়ো নাস্তিকও চরম বিপদের সময় খোদার সামনে দোয়ার হস্ত প্রসারিত করে।

৫। মানুষের বিবেক ও তার প্রভাব প্রকৃতি পরিপূর্ণ নির্দেশ দেয় যে, অপরাধের শাস্তি এবং ভালো কাজের পুরস্কার লাভের প্রয়োজন আছে। এর ভিত্তিতেই তো প্রত্যেক সমাজে কোন না কোন আকারে বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং যে কাজ প্রশংসনীয় মনে করা হয় তার জন্যে পুরস্কারেরও ব্যবস্থা করা হয়। এ একথারই সুস্পষ্ট প্রমান যে, নৈতিকতা এবং প্রতিদান প্রতিশোধ আইনের (LAW OF RETRIBUTION) মধ্যে এমন এক অপরিহার্য সম্পর্ক রয়েছে যে, তা অস্বীকার করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এখন যদি এ কথা সর্বস্বীকৃত হয় যে, দুনিয়ায় এমন অসংখ্য অপরাধ আছে তার পূর্ণ শাস্তি ত দূরের কথা, কোন শাস্তিই দেয়া যায় না এবং অসংখ্য ভালো কাজ এমন আছে যার যথাযথ পুরস্কার তো দূরের কথা কোন পুরস্কারই সত্কর্মশীল ব্যক্তি লাভ করেনা। তাহলে আখেরাতকে স্বীকার করা ব্যতীত কোন উপায় থাকে না। অবশ্যি এমন কোন নির্বোধ যদি এটা মনে করে অথবা কোন হঠকারী এ সিদ্ধান্ত করতে চায় যে, সুবিচারের ধারণা পোষণকারী লোক এমন এক দুনিয়ায় জন্মগ্রহন করেছে যে নিজেই কোন সুবিচারের ধারণা রাখেনা। তাহলে অন্য কথা। তারপর এ প্রশ্নের জবাব তার দায়িত্ব থেকে যায় যে, এমন দুনিয়ায় জন্মগ্রহনকারী মানুষের মনে সুবিচারের ধারণা এলো কোথা থেকে?

৬। আল্লাহ তায়ালা মানুষের সুস্পষ্ট পথ প্রদর্শনের জন্যে দুনিয়ায় নবী পাঠিয়েছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন যাতে পরিস্কার বলা হয়েছে, শোকরের পথ কোনটি এবং কুফরের পথ কোনটি এবং তারপর এই দুই পথে চলার পরিণাম কি। নবীগণ এবং আল্লাহর কিতাবসমূহের আনীত এসব শিক্ষা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এমন ব্যাপকভাবে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে আছে যে, কোন মনুষ্য জনপদ খোদার ধারণা, আখেরাতের ধারণা, সত্ ও অসত্

وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ-( الحديد-4)

-তিনি (আল্লাহ) তোমাদের সাথেই রয়েছেন তোমরা যেখানেই থাক। আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা দেখেছেন। (হাদীদ: ৪)

يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ – وَاللَّهُ يَقْضِي بِالْحَقِّ-( المؤمن-19-20)

আল্লাহ (তোমাদের) চোরা চাহনী পর্যন্ত জানেন এবং সে সব রহস্যও জানেন যা বুকে লুকায়িত আছে। আল্লাহ হক ফয়সালা করবেন। (মুমেন: ১৯-২০)। (১১৫)

আখেরাতে অনস্বীকার্য সাক্ষ্য দ্বারা তার কাজের প্রমাণ পেশ করা হবে

কুরআন মজিদে বিশদভাবে বলা হয়েছে যে, আখেরাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজস্ব জ্ঞানের ভিত্তিতে ফয়সালা করবেন না। বরঞ্চ তিনি প্রত্যেকের কাজ কর্মের পরিপূর্ণ, বিস্তারিত এবং সঠিক রেকর্ড তৈরী করাচ্ছেন। তারপর আদালতে আখেরাতে মানুষের কর্মকান্ডের এমন সব সাক্ষ্য পেশ করা হবে যা অস্বীকার করার কোন উপায় থাকবে না।

إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ – مَا يَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ-( ق-17-18)

দুজন লেখক তার ডানে ও বামে বসে সব কিছু লিখে রাখছে। তার মুখ থেকে এমন কোন কথা বেরুচ্ছে না যা সংরক্ষণ করার জন্যে একজন সদ্য উপস্থিত সংরক্ষক সেখানে থাকে না। (কাফ: ১৭-১৮)

এসব কথার মর্ম এই যে, একদিকে ত আল্লাহতায়ালা স্বয়ং সরাসরি মানুষের চলাফেরা, চালচলন ও অংগভংগী এবং মনের হাবভাব জানেন, অপরদিকে প্রত্যেক মানুষের জন্যে দুজন ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন যাঁরা তার এক একটি কথা লিপিবদ্ধ করছেন।  তার কোন কথা ও কাজ তাঁদের রেকর্ড থেকে বাদ পড়ে না। তার অর্থ এই যে, যে সময়ে আল্লাহ তায়ালার আদালতে মানুষকে পেশ করা হবে, তখন স্বয়ং আল্লাহ অবগত থাকবেন যে কেকি করে এসেছে। সাক্ষাত্  দেয়ার জন্যে দুজন ফেরেশতাও থাকবেন যাঁরা তার কাজকর্মের দলিল দস্তাবিজ প্রমানস্বরূপ সামনে রাখবেন। এসব দলিল প্রমাণাদি কি ধরনের হবে তা সঠিক অনুমান করা আমাদের জন্যে বড়ো কঠিন। কিন্তু যেসব তথ্য আমাদের সামনে উদঘাটিত হচ্ছে তা দেখার পর একথা নিশ্চিতরূপে জানতে পারা যায় যে, যে পরিবেমে মানুষ বাস করে এবং কাজকর্ম করে, সেখানে চারদিকে তা ধ্বনি, ছবি, নড়ন চড়ন, ভাবভংগীর ছাপ প্রতিটি অনু-পরমাণুর উপরে অংকিত হচ্ছে তার মধ্যে থেকে একটিকে অবিকল সেই আকুতিতে ও ধ্বনিতে দ্বিতীয়বার এমনভাবে পেশ করা যেতে পারে যে আসল ও নকলের মধ্যে বিন্দুমাত্র পার্থক্য থাকবে না। আজ মানুষ একেবারে সীমিত আকারে যন্ত্রের সাহায্যে এ কাজ করছে। কিন্তু খোদার ফেরেশতাগণ না এসব যন্ত্রের মুখাপেক্ষী, আর না এসব বিধিবন্ধনে আবদ্ধ। মানুষের আপন দেহ এবং তার চারিধারের প্রতিটি বস্তু তাঁদের ফিল্ম যার ওপর তাঁরা প্রত্যেক ধ্বনি ও ছবিকে তার অতি সুক্ষ্ণ ও পুংখানুপুংখ অবস্থাসহ অবিকল অংকিত করতে পারেন এবং কিয়ামতের দিন মানুষকে তার আপন কানে ও তার আপন ধ্বনিতে তার সে সব কিছু শুনাতে পারেন যা সে দুনিয়ায় করছিল। তার আপন চোখ তার সকল কর্মকান্ডের চলমান ছবি দেখাতে পারেন যার সত্যতা অস্বীকার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

এখানে একথাও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা আখেরাতের আদালতে কোন ব্যক্তিকে তাঁর স্বীয় জ্ঞানের ভিত্তিতে শাস্তি দেবেন না। বরঞ্চ সুবিচারের সকল শর্ত পূরণ করে শাস্তি দেবেন। এ জন্যে দুনিয়ায় প্রত্যেক ব্যক্তির কথা ও কাজের পরিপূর্ণ রেকর্ড তৈরী করানো হচ্ছে যাতে তার কর্মকান্ডের পরিপূর্ণ প্রমাণ অনস্বীকার্য সাক্ষ্য দ্বারা সরবরাহ করা হয়। (১১৬)

وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ – كِرَامًا كَاتِبِينَ – يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ-( الانفطار-10-12)

(তোমাদের তদারককারী নিযুক্ত আছে। তারা এমন সম্মানিত লেখক যারা তোমাদের প্রত্যেকটি কাজ সম্পর্কে অবহিত। (ইনফিতার: ১০-১২)

অর্থাত্ তোমরা বিচার দিবসকে অস্বীকার কর অথবা তা মিথ্যা মনে কর অথবা তার প্রতি বিদ্রুপ কর, তাতে সত্যের কোন পরিবর্তন হয় না। প্রকৃত সত্য এই যে, তোমাদের রব তোমাদেরকে দুনিয়ায় লাগামহীন উট বানিয়ে ছেড়ে দেননি। বরঞ্চ তিনি তোমাদের প্রত্যেকের জন্যে অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠ তদারককারী নিযুক্ত করছে। তোমাদের কোন কাজ তাদের কাছে গোপন নেই, তা তোমারা অন্ধকারে, কোন নিভৃত স্থানে জনমানবশূন্য বন জংগলে, অথবা এমন কোন অবস্থায় তা কর না যেখানে তোমরা নিশ্চিত যে তোমরা যা কিছু করেছ তা লোকের দৃষ্টিগোচর থেকে লুকিয়ে আছে।

এসব তদারককারী ফেরেশতাদের জন্যে আল্লাহ তায়ালা كراما كاتبين  শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন। অর্থাত্ তারা এমন লেখক যাঁরা অত্যন্ত সম্মানিত। কারো সাথে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা শত্রুতা নেই যে, কারো প্রতি অন্যায়ভাবে করুণা প্রদর্শন করবেন এবং কারো অন্যায় বিরোধিতা করে ঘটনার বিপরীত রেকর্ড তৈরী করবেন। তাঁরা খিয়ানতকারীও নন যে, কাজে হাজির না হয়েও নিজে নিজেই বানোয়াট রিপোর্ট লিপিব্ধ করলেন। তাঁরা ঘুষখোরও নন যে, কিছু নিয়ে কারো পক্ষে বা কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা রিপোর্ট করলেন। তাদের স্থান এ সকল নৈতিক দুর্বলতার উর্ধে। এ জন্যে সত্ ও অসত্ উভয় প্রকারের মানুষের নিশ্চিত থাকা উচিত যে, প্রত্যেকের সত্কাজ কোন কমিকমা না করে রেকর্ড করা হবে এবং কারো উপর এমন কোন পাপ কাজ আরোপ করা হবে না যা সে করেনি।

অতপর সেসব ফেরেশতার দ্বিতীয় গুণ এ বর্ণনা করা হয়েছে যে, যা কিছু তোমরা করছ তা তারা জানে।” অর্থাত্ তাঁদের অবস্থা দুনিয়ার সিআইডি ডিআইবি বিভাগের লোকদের মত নয় যে, সকল চেষ্টা চরিত্র সত্ত্বেও বহু কিছু তাদের অজানা থেকে যায়। তাঁরা প্রত্যেকের কাজকর্ম সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত থাকেন। প্রত্যেক স্থানে, প্রত্যেক অবস্থায় প্রতিটি মানুষের সাথে তাঁরা এমনভাবে লেগে থাকেন যে সেও জানতে পারে না যে কেউ তার তদারকি করছে। তাঁরা এটাও জানতে পারেন কোন ব্যক্তি কোন নিয়তে কোন কাজ করেছে। এ জন্যে তাঁদের তৈরী রেকর্ড একটি পরিপূর্ণ রেকর্ড যাতে কোন কিছু লিপিবদ্ধ হওয়া থেকে ছুটে যায় না। এ সম্পর্কে সূরায়ে কাহাফের ৪৯ আয়াতে বলা হয়েছে যে, কিয়ামতের দিন পাপীগণ দেখে বিস্মিত হবে যে, তাদের যে নামায়ে আমল (কৃতকর্মের রেকর্ড) পেশ করা হচ্ছে তার মধ্যে ছোটো বড়ো কোন কিছুই সন্নিবেশিত হওয়া থেকে বাদ পড়েনি। যা কিছু তারা করেছে তা অবিকল তাদের সামনে তারা দেখতে পাচ্ছে। (১১৭)

وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا – وَقَالَ الْإِنْسَانُ مَا لَهَا – يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا – بِأَنَّ رَبَّكَ أَوْحَى لَهَا-( الزلزلة-2-5)

-এবং যমীন তার ভেতরের সকল বোঝা বের করে বাইরে ফেলে দেবে। এবং মানুষ বলবে: এ তার কি হচ্ছে? সেদিন সে (যমীন) তার উপর সংঘটিত সকল অবস্থা বর্ণনা করবে। কারণ তোমার রব তাকে এরূপ করার হুকুম দিয়ে থাকবেন। (যিলযাল: ২-৫)

এ হচ্ছে সেই বিষয় যা সুরা ইনশিকাক ৪ আয়াতে এভাবে বলা হয়েছে-

وَأَلْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْ

-এবং যা কিছু তার মধ্যে আছে তা বাইরে ফেলে দিয়ে খালি হয়ে যাবে।

এর কয়েকটি অর্থ। এক: মৃত মানুষ যমীনের মধ্যে যেখানে যেখানে যে আকৃতিতে যে অবস্থায় পড়ে থাকবে সেসব বের করে বাইরে ফেলে দেবে। পরবর্তী বাক্য এ কথা বুঝাবে যে, সে সময়ে তাদের দেহের যাবতীয় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত অংশগুলো একত্রে জমা হয়ে নতুন করে সেই আকার আকুতিতে জীবিত হবে যেমন তারা প্রথম জীবনের অবস্থায় ছিল। কারণ এমন যদি না হয়, এবং তারা যদি একেবারে নতুন লোক হয় তাহলে তারা কি করে বলবে যমীনের এ কি হলো? নতুন লোক যমীনের প্রথম অবস্থা দেখলেই বা কখন যে তারা এমন কথা বলবে?

দ্বিতীয় অর্থ এই যে, শুধু মৃত ব্যক্তিদেরকেই বাইরে নিক্ষেপ করেই সে ক্ষান্ত হবে না। বরঞ্চ তাদের প্রথম জীবনের কাজ কর্ম অংগভংগী, চলাফেরা ও আচার-আচরণের সাক্ষ্যসমুহের যে স্তুপ তার মধ্যে দাবানো ছিল, সে সবকেও সে বের করে বাইরে ফেলে দেবে।

তারপর বরবর্তী বাক্যেদ্বারা একথাই বুঝানো হয়েছে, যমীন তার উপর সংঘটিত অবস্থা বর্ণনা করবে।

তৃতীয় অর্থ, কোন তাফসীরকার একথাও বলেছেন যে, সোনা, রৌপ্য, রত্ন এবং বিভিন্ন প্রকারের সম্পদ যা মাটির তলায় হয়ে থাকে, তারও স্তুপ বের করে বাইরে নিক্ষেপ করা হবে এবং মানুষ দেখবে যে এই হলো সেসব বস্তু যার জন্যে সে পৃথিবীতে জীবনপাত করতো, যার জন্যে সে কত খুন করেছে, হকদারদের হক মেরেছে, চুরি ডাকাতি করেছে, জলে স্থলে লুটতরাজ করেছে, যুদ্ধবিগ্রহ সৃষ্টি করেছে এবং কত জাতিকে ধ্বংস করেছে। আজ সেসব কিছু সম্মুখে বিদ্যমান যা তার কোন কল্যাণ করবে না, বরঞ্চ শাস্তিরই কারণ হবে।

দ্বিতীয় বাক্যে মানুষ বলতে প্রত্যেক মানুষও হতে পারে। কারণ জীবিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া এ হবে যে এসব কি হচ্ছে।

পরে তাদের কাছে এ সত্য উদঘাটিত হবে যে, এ রোজে হাশর। আবার মানুষ বলতে আখেরাত অস্বীকারকারী মানুষও হতে পারে। কারণ যে জিনিস তারা অসম্ভব মনে করতো তা তাদের চোখের সামনেই সংঘটিত হচ্ছে। এর ফলে তারা হয়রান পেরেশান পড়বে। অবশ্যি যারা ইমানদার তাদের হয়রানির কোন কারণ থাকবে না। এ জন্যে যে এসব কিছু তাদের আকীদাহ ও বিশ্বাস অনুযায়ীই হচ্ছে।

তৃতীয় আয়াত বা বাক্যে বলা হয়েছে, যমীন তার অবস্থা বর্ণনা করবে। কারণ তার প্রভু তাকে এমনটি করার হুকুম দিয়ে থাকবেন। হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী (সা) এ আয়াত পাঠ করে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান তার এ অবস্থা কি ছিল? সাহাবীগণ বল্লেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। নবী (সা) বল্লেন, সে অবস্থা এই যে, যমীন প্রত্যেক নর ও নারীর সেসব কাজকর্মের সাক্ষ্য দেবে যা তারা তার পৃষ্টদেশে করেছে। সে বলবে, সে অমুক দিনে অমুক কাজ করছে। এ হচ্ছে সে অবস্থা যা যমীন বর্ণনা করবে- (মসনদে আহমদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে জারীর আবদ বিন হামীদ, আবুল মুনযের, হাকেম, ইবনে মারদুইয়া, বায়হাকী)।

হযরত রাবিয়াতুল জুরাশী বলেন যে, নবী (সা) বলেছেন, যমীন থেকে গা বাঁচিয়ে চলবে। কারণ এ তোমাদের মূল বুনিয়াদ। এর উপর কার্য সম্পাদনকারী এমন কেউ নেই যার কাজের খবর এ দেবে না, তা ভালো হোক বা মন্দ হোক- (মু‘জামুত্তাবারানী)।

হযরত আনাস (রা) বলেন যে, নবী (সা) বলেছেন, কিয়ামতের দিন যমীন সেই প্রতিটি আমল নিয়ে আসবে যা তার পিঠের উপর করা হয়েছে। তারপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করেন- (মারদুইয়া, বায়হাকী)।

হযরত আলী (রা) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যখন তিনি বায়তুল মালের সমদুয় বিতরণ করে কোষাগার খালি করতেন তখন দুরাকায়াত নামায পড়তেন এবং বলতেন, তোমাকে সাক্ষ্য দিতে হবে যে, আমি তোমাকে হকের সাথে পরিপূর্ণ করেছিলাম এবং হকের সাথে খালি করলাম। যমীন সম্পর্কে একথা বলা হলো যে, তার উপরে সংঘটিত সকল অবস্থা সে বয়ান করবে। প্রাচীনকালের লোকের কাছে ত এ বড়ো বিস্ময়কর মনে হবে যে, যমীন কিভাবে কথা বলবে। কিন্তু আজকাল পদার্থ বিজ্ঞানের (physical science) আবিষ্কার, সিনেমা, লাউডস্পীকার, রেডিও, টেলিভিশন, টেপরেকর্ড, ইলেকট্রোনিক্স প্রভৃতির ‍যুগে এ বুঝতে পারা কোন কঠিন ব্যাপার নয় যে, যমীন তার অবস্থা কিভাবে বয়ান করবে। মানুষ তার মুখ দিয়ে যা কিছু বলে তার ছাপ বাতাসে, আলোকে তরংগে, ঘরে দেয়ালে, মেঝেতে, ছাদের কণিকায় কণিকায় এবং মাঠে ময়দানে, ক্ষেতে খামারে অংকিত হয়ে যায়। আল্লাহ যখনই ইচ্ছা করবেন এ সকল ধ্বনিকে অবিকল সেভাবেই আবৃত্তি করাতে পারেন যেভাবে তা মানুষের মুখ থেকে বেরিয়েছিল। মানুষ আপন কানে সে সময় ‍শুনতে পাবে যে এ তার নিজেরই ধ্বনি এবং তারি পরিচিত। সকলেই চিনে ফেলবে যে যা কিছু তারা শুনছে তা সেই ব্যক্তিরই ধ্বনি ও তারই স্বর। তারপর মানুষ যমীনের উপর যেখানে যে অবস্থান কোন কাজ করেছে তার এক একটি গতির ছাপ তার চার ধারের প্রতিটি বস্তুর উপর পড়েছে এবং তার ছবিও তার উপর চিত্রিত হয়ে গেছে। ঘনো অন্ধকারেও কোন কাজ সে করে থাকলে খোদার কুদরতে এমন আলোক রশ্মি বিদ্যমান রয়েছে যে, আলো ও আঁধারের প্রশ্নই ওঠে না। তিনি সকল অবস্থাতেই তার চিত্র গ্রহন করতে পারেন। এ সমুদয় চিত্র কিয়ামতের দিন এক চলমান ফিলমের ন্যায় মানুষের সামনে প্রতিভাত হয়ে দেখিয়ে দেবে যে, সে জীবনভর কখন কোথায় কোথায় কি কাজ করেছ।

সত্যকথা এই যে, যদিও আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি মানুষের কার্যকলাপ সরাসরি স্বয়ং জানেন, কিন্তু আখেরাতে যখন তিনি আদালত কায়েম করবেন, তখন যাকেই শাস্তি দিবেন, সুবিচারের সকল দাবী পুরণ করেই দিবেন। তাঁর আদালতে প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধে যে মামলা পেশ করা হবে, তা এমন প্রকাশ্য সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ করা হবে যে তার অপরাধী হওয়া সম্পর্কে কথা বলার কোন অবকাশই থাকবে না।

সর্বপ্রথম ত মানুষের সেই নামায়ে আমল যার মধ্যে সার্বক্ষণিকভাবে তার সাথে লেগে থাকা কেরামান-কাতেবীন’ প্রতিটি কথা ও কাজ সন্নিবেশিত করে যাচ্ছেন। এ নামায়ে আমল তার হাতে দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবে, পড় তোমার জীবনের কর্মকান্ডে। নিজের হিসাব নেয়ার জন্যে তুমিই যথেষ্ট। (বনী ইসরাইল: ১৪) মানুষ তা পড়ে হতভম্ব হয়ে পড়বে যে কোন ছোটো এবং বড়ো এমন কোন জিনিস নেই যা এর মধ্যে সন্নিবেশিত করা হয়নি। তারপর মানুষের দেহ যার সাহায্যে সে দুনিয়ায় কাজ করেছে। আল্লাহর আদালতে তার নিজের জিহ্বা সাক্ষ্য দেবে যে, তার দ্বারা সে কত কিছু বলেছে। তার নিজের হাত-পা সাক্ষ্য দেবে যে, তাদের দ্বারা সে কোন কোন কাজ করিয়ে নিয়েছে। (নুহ: ২৪) তার চোখ সাক্ষ্য দেবে যে, তার দ্বারা সে কতকিছু দেখেছে। তারা কান সাক্ষ্য দিবে যে, তার দ্বারা সে কতকিছু শুনেছে। তার দেহের গোটা চামড়া তার কর্মকান্ডের সাক্ষ্য দেবে। সে দিশেহারা হয়ে তার অংগ-প্রত্যংগকে বলবে তোমরাও আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ? তার অংগ-প্রত্যাংগ জবাবে বলবে আজ আল্লাহর হুকুমে প্রতিটি বস্তু কথা বলছে। তাঁর হুকুমে আমরাও কথা বলছি। (হা-মীম-সাজদাহ: ২০-২২) তারপর অতিরিক্ত সাক্ষ্যদান করা হবে যমীন ও তার পারিপার্শ্বিক বস্তুসমূহ থেকে, যখন মানুষ নিজের স্বরধ্বনি নিজের কানে শুনবে এবং তার কর্মকান্ডের হুবহু ছবি স্বচক্ষে দেখবে।

এতোসবের পরও মানুষের অন্তরে যে সকল ধারণা-বাসনা, ইচ্ছা এবং উদ্দেশ্য লুকায়িত ছিল এবং যে নিয়তে সে কাজকর্ম করেছে, তা বের করে সামনে রেখে দেয়া হবে। যেমন সূরায়ে আদিয়াতে বলা হয়েছে, এটাই কারণ যে, এতোসব অকাট্য, সুস্পষ্ট এবং অনস্বীকার্য প্রমাণাদি উপস্থাপিত হওয়ার পর মানুষ হতভম্ভ হয়ে পড়বে এবং তা পক্ষে কৈফিয়ত্ পেশ করার কোন সুযোগই থাকবে না। (সূরা মুরসিলাত আয়াত: ৩৫-৩৬ দ্র:)(১১৮)

وَوُضِعَ الْكِتَابُ فَتَرَى الْمُجْرِمِينَ مُشْفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَا وَيْلَتَنَا مَالِ هَذَا الْكِتَابِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةً وَلَا كَبِيرَةً إِلَّا أَحْصَاهَا وَوَجَدُوا مَا عَمِلُوا حَاضِرًا وَلَا يَظْلِمُ رَبُّكَ أَحَدًا-( الكهف-49)

এবং নামায়ে আমল সামনে রেখে দেয়া হবে। সে সময়ে তুমি দেখবে যে, অপরাধী লোকেরা তাদের জীবন গ্রন্থে সন্নিবেশিত বিষয়সমূহ দেখে ভিতসন্ত্রস্ত হবে এবং বলতে থাকবে “হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! এ কোন ধরনের কিতাব যে আমাদের ছোট বড়ো ক্রিয়াকর্ম এমন নেই যা এর মধ্যে সন্নিবেশিত করা হয়নি।“ যা কিছু তারা করেছে তা সবই নিজের সামনে দেখতে পাবে এবং তোমার রব কারো উপর জুলুম করবেন না। (কাহাফ: ৪৯)

অর্থাত্ এমন কখনো হবে না যে, কেউ কোন অপরাধ করেনি, অথচ অযথা তা তার নামায়ে আমলে লিখে দেয়া হবে। আর এমন কিছুও হবে না যে, কাউকে তার অপরাধ থেকে অধিকতর শাস্তি দেয়া হবে অথবা নিরপরাধেকে শাস্তি দেয়া হবে। (১১৯)

وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوهُ فِي الزُّبُرِ – وَكُلُّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ مُسْتَطَرٌ-( القمر-52-53)

যা কিছু তারা করেছে তা খাতার লিপিবদ্ধ আছে। প্রত্যেক ছোট ও বড়ো বিষয় লিপিবদ্ধ আছে। (কামার: ৫২-৫৩)

অর্থাত্ এসব লোক যেন এ ভুল ধারণায় লিপ্ত না থাকে যে, তাদের কৃতকর্ম কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। না, প্রতিটি ব্যক্তি, দল ও জাতির পূর্ণ রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। সময়মত সামনে আসবে। (১২০)

يَوْمَ يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا أَحْصَاهُ اللَّهُ وَنَسُوهُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ-( المجادلة-6)

(এ অবমাননাকর শাস্তি হবে) সেইদিন যখন আল্লাহতায়ালা তাদের সকলকে জীবিত করে উঠাবেন এবং তাদেরকে বলে দিবেন তারা যা কিছু করেছে। তারা ভুলে গেছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম গুণে গুণে সংরক্ষিত করে রেখেছেন এবং আল্লাহ এক একটি বিষয়ের সাক্ষী। (মুজাদিলা: ৬)

অর্থাত্ তারা ভুলে গেলেও মামলা দফারফা হয়ে যায়নি। তাদের জন্যে খোদার নাফরমানি এবং তাঁর হুকুম-আহকাম লংঘন করা এমন সাধারণ জিনিস হতে পারে যে তা করার পর মনেও রাখে না। বরঞ্চ তাকে কোন আপত্তিকর জিনিসই মনে করে না যে, তার জন্যে কোন পরোয়া করবে। কিন্তু খোদার নিকটে এ যেমন তেমন জিনিস নয়। তাঁর খাতায় তার প্রতিটি কাজকর্ম লিখিত হয়ে গেছে। কোন ব্যক্তি, কখন কোন উদ্দেশ্য কোন ক্রিয়াকর্ম করেছে তারপর তার নিজের কি প্রতিক্রিয়া ছিল এবং তার পরিণাম কোথায় কোথায় কি আকারে দেখা দিয়েছে- এসব কিছু তাঁর খাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। (১২১)

الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ-( يس-65)

-আজ আমরা তাদের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছি। তাদের হাত আমাদের সাথে কথা বলবে, তার পাগুলো সাক্ষ্য দেবে তারা দুনিয়ায় কি কামাই করছিল। (ইয়াসিন: ৬৫)

এ আদেশ দেয়া হবে ঐসব তুখোড় অপরাধীদের বেলায় যারা তাদের দোষ স্বীকার করতে অস্বীকার করবে, সাক্ষ্যগুলো মিথ্যা মনে করবে এবং নামায়ে আমলের সত্যতাও স্বীকার করবে না। তখন আল্লাহ হুকুম দিবেন আচ্ছা, তোমাদের বাচালতা বন্ধ কর এবং দেখ তোমাদের দেহের অংগপ্রত্যংগ তোমাদের কর্মকান্ডের কি কার্যবিবরণী পেশ করে। (১২২)

يَوْمَ تَشْهَدُ عَلَيْهِمْ أَلْسِنَتُهُمْ وَأَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ-(النور-24)

(তারা সেদিনকে যেন ভুলে যায়) যেদিন তাদের মুখ, তাদের হাত-পা তার কাজ কর্মের সাক্ষ্য দেবে। (নুর: ২৪)

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, সূরায়ে ইয়াসিনের উপর উল্লেখিত আয়াতে আল্লাহ বলেন, আমরা তাদের মুখ বন্ধ করে দেব। অপরদিকে সূরায়ে সূরে বলেন, তাদের মুখ সাক্ষ্য দেবে। এ দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা যায় কিভাবে?

এর জাবাব এই যে, মুখ বন্ধ করার অর্থ তাদের কথা বলার এখতিয়ার কেড়ে নেয়া। অর্থাত্ তারপর তারা আর আপন মর্জিমত কথা বলতে পারবে না। মুখের দ্বারা সাক্ষ্যদানের অর্থ এই যে, তাদের মুখ স্বয়ং এ কাহিনী বর্ণনা করা শুরু করবে যে, এ জালেমরা কি কাজ তাদের দ্বারা নিয়েছিল, কেমন কেমন কুফরী করেছিল। কিকি মিথ্যা বলেছিল। কি কি ফেতনা সৃষ্টি করেছিল এবং কোন কোন সময়ে মুখের সাহায্যে কি কথা বলেছিল। (১২৩)

حَتَّى إِذَا مَا جَاءُوهَا شَهِدَ عَلَيْهِمْ سَمْعُهُمْ وَأَبْصَارُهُمْ وَجُلُودُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ-وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ وَهُوَ خَلَقَكُمْ أَوَّلَ مَرَّةٍ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ-(حم السجده-20-21)

-তারপর যখন তারা সকলে সেখানে পৌছে যাবে, তখন তাদের কান চোখ এবং দেহের চামড়া তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা দুনিয়ায় কত কিছু করছিল। তারা নিজের দেহের চামড়াকে জিজ্ঞাস করবে, তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে কেন সাক্ষ্য দিলে?  তারা জবাব দেবে, আমাদেরকে সে খোদাই কথা বলার শক্তি দিয়েছেন যিনি প্রত্যেক বস্তুকে বাকশক্তি দান করেছেন। তিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাঁর দিকেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। (হামীম সাজদা: ২০-২১)

হাদীসগুলোতে এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, যখন কোন তুখোড় হঠকারী অপরাধী তার অপরাধ অস্বীকার করতে থাকবে এবং সকল সাক্ষ্য প্রমান মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে থাকবে, তখন আল্লাহতায়ালার হুকুম তার দেহের অংগপ্রত্যংগ এক এক করে সাক্ষ্য দেবে যে, সে তাদের দ্বারা কোন কোন কাজ নিয়েছিল। এ বিষয়টি হযরত আনাস (রা), হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা), হযরত আবু সাইদ খুদরী (রা) এবং হযরত ইবনে আব্বাস (রা) নবী (সা) থেকে রেওয়ায়েত বরেছেন এবং মুসলিম, ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম, বাযযার প্রমুখ মুহাদ্দেসগণ এ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন।

এ আয়াতটি ঐসব আয়াতের মধ্যে একটি যার দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আখেরাত শুধুমাত্র একটি আধ্যাত্মিক জগত নয়, বরঞ্চ মানুষকে সেখানে পুনর্বার সেভাবেই দেহ ও আত্মাসহ জীবিত করা হবে যেভাবে এখন দুনিয়ায় রয়েছে। বরঞ্চ তাদের দেহ তাই দেয়া হবে যে দেহে এখন তারা বিরাজ করছে। যেসব অংগপ্রত্যংগ ও অনুপরমাণু দ্বারা এ ‍দুনিয়ায় তাদের দেহ তৈরী, সেসব কিয়ামতের দিন একত্র করে দেয়া হবে এবং তাদেরকে তাদের পূর্ববর্তী দেহসহ উঠানো হবে, যে দেহসহ তারা ‍দুনিয়ায় কাজকর্ম করেছে। একথা ঠিক যে, মানুষের অংগপ্রত্যংগ সেখানে এমন অবস্থাতেই ত সাক্ষ্য দিতে পারে যদি তারা সেসব অংগপ্রত্যংগই হয় যার দ্বারা সে তার দুনিয়ার জীবন অপরাধ সংঘটিত করেছে। নিম্নলিখিত আয়াতগুলোও এ বিষয়ে অকাট্য যুক্তি পেশ করে, বনী ইসরাইলধ: ৪৯-৫১, ৯৮; মুমেনুন: ৩৫-৩৮, ৮২-৮৩; নূর: ২৪ সিজদাহ: ১০; ইয়াসীন: ৬৫, ৭৮-৭৯; আসসাফফাত: ১৬-১৮; ওয়াকেয়া: ৪৭-৫০; নাযেয়াত: ১০-১৪। (১২৪)

إِنَّا نَحْنُ نُحْيِي الْمَوْتَى وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُبِينٍ-(يس-12)

আমরা নিশ্চিতরূপে একদিন মৃতকে জীবিত করব। যেসব কাজ তারা করেছে তা সব আমরা লিপিবদ্ধ করে যাচ্ছি। আমরা যেসব নিদর্শন তারা পেছনে রেখে গেছে, সেগুলোও আমরা সুরক্ষিত করে রাখছি। প্রত্যেকটি বিষয় আমরা একটি প্রকাশ্য গ্রন্থে সন্নিবেশিত করে রেখেছি। (ইয়াসিন: ১২)

এর থেকে জানা গেল যে, মানুষের নামায়ে আমল তিন প্রকার পন্থায় সন্নিবেশিত করা হবে। এক হচ্ছে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি যা কিছুই ভালো ও মন্দ করে, তা আল্লাহতায়ালা খাতায় লিখে নেয়া হয়। দ্বিতীয়: নিজের চতুষ্পার্শস্থ বস্তুসমূহ এবং আপন দেহের অংগপ্রত্যংগের উপর মানুষ যেসব চাপ অংকিত করে, তার সবটুকুই সুরক্ষিত হয়ে যায়। তারপর এ সমুদয় চিত্র এ সময়ে এমনভাবে প্রকাশিত হয়ে পড়বে যে তার নিজস্ব ধ্বনি শুনতে পাওয়া যাবে। তার নিজস্ব ধারনা, ইচ্ছা ও অভিলাষের পূর্ণ বিবরণ হৃদয়পটে অংকিত দেখতে পাবে। তৃতীয়ত: মৃত্যুর পরে ভবিষ্যত্ বংশধরদের উপরে, আপন সমাজের উপরে এবং গোটা মানবতার উপরে ভালো ও মন্দ কাজের যে প্রভাব সে ফেলে গেছে তা যে সময় পর্যন্ত এবং যেখানে যেখানে পর্যন্ত কার্যকর থাকবে সে সব তার হিসাবের খাতায় লেখা হতে থাকবে। সে তার সন্তানাদিকে যে যে ভালো বা মন্দ শিক্ষা দিয়ে গেছে, আপন সমাজে যে কল্যান বা অনাচার সে ছড়িয়েছে এবং মানবতার সপক্ষে সে ফুল অথবা কন্টক সে বপণ করে গেছে, সে সবের পূর্ণ রেকর্ড সে সময় পর্যন্ত তৈরী করা হতে থাকবে যতোদিন পর্যন্ত তার লাগানো এ ফসল দুনিয়ায় তার ভালো অথবা মন্দ ফল দান করতে থাকবে। (১২৫)

وَتَرَى كُلَّ أُمَّةٍ جَاثِيَةً كُلُّ أُمَّةٍ تُدْعَى إِلَى كِتَابِهَا الْيَوْمَ تُجْزَوْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ – هَذَا كِتَابُنَا يَنْطِقُ عَلَيْكُمْ بِالْحَقِّ إِنَّا كُنَّا نَسْتَنْسِخُ مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ-(الجاثية-28-29)

-সেদিন তুমি সকল দুলকে হাঁটু গেড়ে থাকতে দেখবে। প্রত্যেক দলকে ডেকে বলা হবে, এসো এবং নিজের নামায়ে আমল দেখ। তাদেরকে বল হবে, আজ তোমাদেরকে সেসব কাজের প্রতিদান দেখানো হবে যা তোমরা করছিলে। এ হচ্ছে আমাদের তৈরী করা নামায়ে আমল যা তোমাদের ব্যাপারে নির্ভুল সাক্ষ্য দিচ্ছে। যা কিছুই তোমরা করছিলে তা আমরা লেখাতেছিলাম। (জাসিয়া: ২৮-২৯)

লেখাবার শুধু এ একটিমাত্র উপায়ই নয় যে, তা কাগজের উপর লেখানো যায়। মানুষের কথা ও কাজ চিত্রিত করার এবং পুনর্বান তা অবিকল সেই আকার-আকৃতিতে পেশ করার আরও বিভিন্ন পন্থা ও দুনিয়াতেই স্বয়ং মানুষ আবিস্কার করে ফেলেছে এবং আমরা ধারণাও করতে পারি না যে, ভবিষ্যতে তার আরও কি কি সম্ভাবনা লুকায়িত আছে যা মানুষই আয়ত্ত করতে পারবে। এখন এ কথা কে জানতে পারে যে, আল্লাহতায়ালা কোন কোন পন্থায় মানুষের এক একটি কথা, চাল-চলন ও অংগভংগীর এক একটি এবং তার ধারণা-বাসনা, ইচ্ছা ও অভিলাষের প্রতিটি অতি গোপন বিষয় অংকিত করিয়ে রাখছেন। (১২৬)

وَإِذَا الرُّسُلُ أُقِّتَتْ-(المرسلات-11)

-এবং যখন রসূলগনের হাযিরি দেয়ার সময় এসে যাবে। (মুরসিলাত: ১১)

কুরআন মজিদের বিভিন্ন স্থানে এ কথা বলা হয়েছে যে, হশরের ময়দানে যখন মানব জাতির মোকদ্দমা পেশ করা হবে তখন প্রত্যেক জাতির রসূলকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যে পেশ করা হবে যেন তাঁর এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে পারেন যে তাঁরা আল্লাহতায়ালার পয়গাম তাদের কাছে পৌছিয়েছেন। এ হবে গোমরাহ এবং গোনাহগারদের বিরুদ্ধে আল্লাহতায়ালার সবচেয়ে প্রথম এবং সবচেয়ে খারাপ দলিল প্রমাণ যার থেকে এ কথা প্রমাণ করা হবে যে, তারা তাদের ভ্রান্ত আচরণের জন্যে নিজেরাই দায়ী। আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তাদেরকে সাবধান করে দেয়ার জন্যে কোন কিছু বাকী রাখা হয়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ নিম্নের আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য: সূরা আরাফ: ১৭২-৭৩; যুমার: ৬৯; মূলক: ৮। (১২৭)

وَوُضِعَ الْكِتَابُ وَجِيءَ بِالنَّبِيِّينَ وَالشُّهَدَاءِ وَقُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْحَقِّ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ-(الزمر-69)

-এবং নামায়ে আমল এনে রেখে দেয়া হবে। আম্বিয়া এবং সকল সাক্ষী হাযির করা হবে। মানুষের মধ্যে ঠিক ঠিক হকের সাথে ফয়সালা করে দেয়া হবে এবং তাদের উপর কোন জুলুম হবে না। (যুমার: ৬৯)

নবীগণ ত এ কথার সাক্ষ্য দেবেন যে, তাঁরা খোদার পয়গাম পৌছিয়েছিলেন। তাঁরা ব্যতীত অন্যান্য সাক্ষীর অর্থ ঐসব লোক যাঁরা এ কথার সাক্ষ্য দেবেন যে, নবীগণের পর তাঁরা লোকের কাছে খোদার পয়গাম পৌছিয়ে দিয়েছেন। ওসব সাক্ষীও হতে পারে যারা মানুষের কাজ-কর্মের সাক্ষ্য দেবে। এটা জরুরী নয় যে, এসব সাক্ষী শুধু মানুষই হবে। ফেরেশতা, জ্বীন, পশুপাখী এবং মানুষের অংগপ্রত্যংগ, ঘরদোর, বৃক্ষলতা, মাটি পাথর সবই সে সবের সাক্ষীর অন্তর্ভূক্ত। (১২৮)

أَفَلَا يَعْلَمُ إِذَا بُعْثِرَ مَا فِي الْقُبُورِ-وَحُصِّلَ مَا فِي الصُّدُورِ-( العاديات-9-10)

-সেকি সে সময়টি জানে না যখন কবরগুলোতে যা সমাহিত আছে তা বের করে আনা কবে? এবং বুকে যা কিছু লক্কায়িত আছে তা বের করে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হবে? (আদিয়াত: ৯-১০)

অর্থাত্ মরার পর মৃত মানুষ যেখানে যে অবস্থায় পড়ে থাকবে সেখান থেকে তাকে বের করে জীবিত মানুষের আকারে উঠিয়ে আনা হবে। মনের মধ্যে যেসব ইচ্ছা বাসনা, নিয়ত, উদ্দেশ্য, ধারণা, চিন্তা এবং প্রকাশ্য কাজকর্মের পেছনে যেসব উদ্দেশ্য (MOTIVE) লক্কায়িত ছিল তা উদঘাটিত করে রেখে দেয়া হবে। তারপর সেসব যাঁচাই বাছাই করে ভালো ও মন্দ পৃথক করা হবে। অন্য কথায় সিদ্ধান্ত শুধু বাইরের দিকটা দেখেই করা হবে না যে মানুষ বাস্তবে কি করেছে, বরঞ্চ মনের মধ্যে লুকায়িত রহস্যাবলীও বের করে এটা দেখানো হবে যে, যে কাজ মানুষ করেছে তা কোন অভিপ্রায়ে এবং কোন উদ্দেশ্য করেছে। এ বিষয়ের উপর চিন্তা করলে মানুষ এ কথা স্বীকার না করে পারে না যে, প্রকৃত এবং পরিপূর্ণ ইনসাফ খোদার আদালত ব্যতীত অন্য কোথাও পাওয়া যেতে পারে না।

দুনিয়ার ধর্মহীন আইনও নীতিগত দিক দিয়ে এটা জরুরী মনে করে যে, কোন ব্যক্তির শুধু বাহ্যিক কাজের আইনও ভিত্তিতে তাকে যেন শাস্তি দেয়া না হয়। বরঞ্চ এও দেখতে হবে যে, সে কোন নিয়তে সে কাজ করেছে। কিন্তু দুনিয়ায় কোন আদালতের নিকটেও সেসব উপায়-উপাদান নেই যার দ্বারা সে নিয়তের যথাযথ তথ্য অবগত হতে পারে। এ শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালাই করতে পারেন যে, মানুষের প্রতিটি বাহ্যিক কাজের পেছনে যে গোপন প্রেরণা কার্যকর থাকে তাও তিনি যাঁচাই করতে পারেন এবং তারপর এ সিদ্ধন্ত করবেন যে সে কোন শাস্তি বা পুরস্কারের যোগ্য।

অতপর আয়াতটির শব্দাবলী একথা প্রকাশ করে যে, এ সিদ্ধান্ত নিছক আল্লাহতায়ালার সে জ্ঞানের ভিত্তিতে হবে না, যে জ্ঞান তিনি মনের ইচ্ছা ও নিয়ত সম্পর্কে রাখতেন। বরঞ্চ কিয়ামতের দিন এসব রহস্য উদঘাটন করে প্রকাশ্যে সামনে রেখে দেয়া হবে এবং প্রকাশ্য আদালতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এ দেখা হবে যে তার মধ্যে কল্যান কতোটুকু ছিল আর অকল্যাণ কতোটুকু। এ কারণেই تحصيل  শব্দাবলী ব্যবহার করা হয়েছে। حصل ما فى الصدور  শব্দের অর্থ কোন কিছুকে বের করে বাইরে আনাও হয়। যেমন ছোবড়া বা খোসা ছড়িয়ে মগজ বের করা। তারপর বিভিন্ন জিনিস ছেঁটে একটিকে অন্যটি থেসে পৃথক করাও হয়। অতএব মনের রহস্যবলী অবগত হওয়ার জন্যে এ উভয় অর্থ ব্যবহৃত হয়। তা খুলে প্রকাশ করাও এবং বাছাই করে ভালো ও মন্দকে আলাদাও করা। (১২৯)

يَوْمَ تُبْلَى السَّرَائِرُ – فَمَا لَهُ مِنْ قُوَّةٍ وَلَا نَاصِرٍ – وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الرَّجْعِ  وَالْأَرْضِ ذَاتِ الصَّدْعِ – إِنَّهُ لَقَوْلٌ فَصْلٌ – وَمَا هُوَ بِالْهَزْلِ-(الطارق-9-14)

-যেদিন গোপণ রহস্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবেন সেদিন না মানুষের নিজস্ব কোন শক্তি থাকবে আর না তার কোন সাহায্যকারী। কসম বৃষ্টিবর্ষণকারী আকাশের এবং (শস্য উত্পাদনের সময়) বিদীর্ণ হওয়া যমীনের, এ এক মাপাজোঁকা কথা, হাসিঠাট্টা নয়। (তারেক: ৯-১৪)

গোপণ রহস্য অর্থ প্রত্যেক মানুষের ওসব কাজ কর্ম যা দুনিয়ায় এক গোপন রহস্য হিসাবে রয়ে গেছে এবং ওসব কার্যকলাপও যা বহ্যিক আকার আকৃতিতে ত ‍দুনিয়ার সামনে প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু তার পেছনে তার যেসব নিয়ত, উদ্দেশ্য ও অভিলাষ কার্যকর ছিল, তার যে অভ্যন্তরীণ আবেগও প্রেরণাসৃষ্টিকারী ছিল তা মানুষের কাছে লুকায়িত ছিল। কিয়ামতের দিন এসব কিছু উন্মুক্ত হয়ে সামনে এসে যাবে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিছক এ বিষয়েরই হবে না যে, কোন মানুষ কি কাজ করেছে। বরঞ্চ কি জন্য করেছে, কিসের স্বার্থে, কোন নিয়তে এবং কোন উদ্দেশ্যে করেছে। এভাবে একথাও সমগ্র দুনিয়ার এমনকি কার্যসম্পাদনকারী ব্যক্তির নিকটেও গোপন রয়ে গেছে যে, যে কাজ সে করেছে তার কি প্রতিক্রিয়া দুনিয়ায় হয়েছে, কোথায় কোথায় তা পৌছেছে এবং কতকাল তা অব্যাহত থেকেছে এ রহস্যও কিয়ামতের দিন উদঘাটিত হবে এবং এ বিষয়ে পুরোপুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে যে, যে বীজ কোন ব্যক্তি দুনিয়ায় বপণ করে গিয়েছিল, কোন কোন খামারে এবং কতকাল পর্যন্ত তার ফসল উত্পন্ন হচ্ছিল এবং কে কে ঘরে আনছিল।

শেষ বাক্যটির অর্থ এই যে, আকাশ থেকে বর্ষণ এবং মাটি বিদীর্ণ হয়ে তার মধ্য থেকে উদ্ভিদ অংকুরিত হওয়া যেমন কোন হাসি-ঠাট্টার বিষয় নয়, বরঞ্চ এক বাস্তব সত্য, তেমনি কুরআন যে বিষয়ের কথা বলছে যে, মানুষকে পুনরায় তার খোদার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে, এ কোন হাসি-ঠাট্টার বিষয় নয়, বরঞ্চ একটি অতি সুনিশ্চিত কথা, একটি অকাট্য বাস্তবতা এবং শাশ্বত সত্য যা অনিবার্যরূপে কার্যকর হবে। (১৩০)

يُنَبَّأُ الْإِنْسَانُ يَوْمَئِذٍ بِمَا قَدَّمَ وَأَخَّرَ – بَلِ الْإِنْسَانُ عَلَى نَفْسِهِ بَصِيرَةٌ – وَلَوْ أَلْقَى مَعَاذِيرَهُ-(القيامة-13-15)

-সেদিন মানুষকে তার আগে পিছের সকল কর্মকান্ড বলে দেয়া হবে। বরঞ্চ মানুষ স্বয়ং নিজেকে ভালোভাবে জানে, যতোই সে ওজর-আপত্তি পেশ করুক না কেন। (কিয়ামাহ: ১৩-১৫)

প্রকৃত শব্দাবলী হচ্ছে بما قدم واجر এ এক ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য যার কয়েকটি অর্থ হতে পারে। সম্ভবত সকল অর্থেই তা বলা হয়েছে। একটি অর্থ তার এই যে, মানুষকে সেদিন এ কথাও বলে দেয়া হবে যে, নিজের দুনিয়ার জীবনে মৃত্যুর আগে কি কি সত্ অথবা অসত্ কাজ করে তা আখেরাতের জন্যে অগ্রিম পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং এ হিসাবও তার সামনে রেখে দেয়া হবে যে তার ভালো অথবা মন্দ কাজের কি প্রভাব সে তার পেছনে ছেড়ে এসেছিল যা দীর্ঘকাল পর্যন্ত ভবিষ্যত্ বংশধরদের মধ্যে বলবত্ ছিল।

দ্বিতীয় অর্থ এই যে, তাকে সেসব কিছুই বলে দেয়া হবে যা তার করা উচিত ছিল কিন্তু করেনি এবং যা কিছু না করার ছিল তা করেছে।

তৃতীয় অর্থ এই যে, যা কিছু সে প্রথমে করেছে এবং যা কিছু পরে করেছে তার পুংখানুপূংখ হিসাবসহ তারিখ সন সামনে রেখে দেয়া হবে।

চতুর্থ অর্থ এই যে, যে সৎ কাজ অথবা অসৎ কাজ সে করেছে তাও বলে দেয়া হবে এবং সৎ কাজ অথবা অসৎ কাজ করা থেকে সে বিরত ছিল সে সম্পর্কেও তাকে অবহিত করা হবে।

কিন্তু মানুষের নামায়ে আমল তার সামনে রাখার উদ্দেশ্য আসলে এ হবে না যে, অপরাধীকে তার অপরাধ বলে দেয়া হবে। বরঞ্চ এমন করা এ জন্যে জরুরী হবে যে, ইনসাফের দাবী আদলত সমক্ষে অপরাধ প্রামাণিত করা ব্যতীত পূরণ হয় না। নতুবা প্রত্যেকেই ভালোভাবে জানে যে সে স্বয়ং কি। একজন মিথ্যাবাদী সমগ্র ‍দুনিয়াকে ধোঁকা দিতে পারে। কিন্তু তার নিজের জানা আছে যে, সে মিথ্যা বলছে। একজন চোর তার চুরি গোপন করার জন্যে অগনিত কৌশল অবলম্বন করতে পারে। কিন্তু তার নিজের মনের কাছে ত একথা গোপন থাকে না যে সে চোর। একজন পথপ্রষ্ট লোক হাজার যুক্তি-প্রমাণ পেশ করে মানুষকে এ নিশ্চয়তা দান করতে পারে যে, যে কুফর, নাস্তিক্য অথবা শির্কে সে বিশ্বাসী, তা প্রকৃতপক্ষে তার আন্তরিক অভিমত। কিন্তু তার আপন বিবেক ত এ বিষয়ে অজ্ঞাত নয় যে, এসব বিশ্বাসের উপর সে কোন অনুরক্ত এবং এ সবের ভ্রান্তি উপলব্ধি করতে এবং তা মেনে নিতে প্রকৃতপক্ষে কোন বস্তু তাকে বিরত রাখছে। একজন জালেম, একজন অবিশ্বস্ত লোক, একজন লম্পট এবং একজন হারামখোর তার অপর্মের জন্যে বিভিন্ন ধরনের ওজর-আপত্তি পেশ করে আপন বিবেকের মুখও বন্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। যাতে সে তাকে তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকতে পারে এবং এ কথা মেনে নেয় যে, সত্যি সত্যিই কোন বাধ্যবাধকতা, কিছু উপযোগিতা এবং কিছু প্রয়োজন এমন আছে যে কারণে সে এসব কিছু করছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সে ত অবশ্যই জানে যে, সে কার উপর কি জুলুম করেছে, কার হক করেছে। এ জন্যে আখেরাতের আদালতে পেশ হওয়ার সময় প্রত্যেক কাফের, প্রত্যেক মুনাফিক, প্রত্যেক পাপী ও অপরাধী স্বয়ং জানতে পারবে যে সে কি হিসাবে খোদার সামনে দন্ডায়মান। (১৩১)

فَإِذَا جَاءَتِ الطَّامَّةُ الْكُبْرَى – يَوْمَ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ مَا سَعَى-(النازعات-34-35)

-অতপর যখন সে বিরাট বিপর্যয় সংঘটিত হবে, সেদিন মানুষ তার সকল কর্মকান্ড স্বরণ করবে। (নাযিয়াত: ৩৪-৩৫)

অর্থাত্ মানুষ যখন দেখবে যে সেই পরীক্ষার দিন এসে গেছে যার খবর ‍দুনিয়ায় দেয়া হচ্ছিল। তখন তার নামায়ে আমল হাতে দেয়ার আগেই একএক করে তার সে সব কিছুই মনে পড়তে থাকবে যা সে দুনিয়ায় করে এসেছে। কতিপয় লোকের দুনিয়াতেই এ অভিজ্ঞতা হয় যে, যখণ হঠাত্ সে এমন কোন আশংকাজনক অবস্থার সম্মুখীন হয় যে মৃত্যু অতি সন্নিকট মনে হয়, তখন তার গোটা জীবনের চিত্র হৃদয়পটে হঠাত্ প্রতিফলিত হয়। (১৩২)

وَجِيءَ يَوْمَئِذٍ بِجَهَنَّمَ يَوْمَئِذٍ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ وَأَنَّى لَهُ الذِّكْرَى-يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي-(الفجر-23-24)

-এবং জাহান্নাম সেদিন সম্মুখে আনা হবে। ঐ দিন মানুষ সবই বুঝতে পারবে। কিন্তু বুঝতে পেরে লাভ কি হবে? সে বলবে হায়রে যদি আমি এ জীবনের জন্যে কিছু অগ্রিম পাঠিয়ে দিতাম। (ফজর: ২৩-২৪)

-প্রথম আয়াত বা বক্যের দুটি অর্থ হতে পারে। এক এই যে, সেদিন মানুষ স্মরণ করবে যে, সে দুনিয়ায় কতকিছু করে এসেছে এবং তার জন্যে অনুতপ্ত হবে। কিন্তু তাতে কোন লাভ হবে না। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, সেদিন মানুষ তার সম্বিত্ ফিরে পাবে, সে উপলব্ধি করবে যে, যা কিছু নবীগণ বলেছিলেন তা সঠিক ছিল এবং তাঁদের কথা না মেনে সে নির্বুদ্ধিতা করেছে। কিন্তু সেদিন সম্বিত্ ফিরে ফেয়ে এবং ভুল বুঝতে পেরে কোনই লাভ হবে না।

عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ-( الانفطار-5)

-সে সময়ে প্রতিটি মানুষ তার আগে পিছের সকল কৃতকর্ম জানতে পারবে। (ইনফিতার: ৫)

– مَا قَدَّمَتْ وَأَخَّرَتْ –এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। সব অর্থেই তা এখানে ব্যবহৃত। যেমন:

১। যা ভালো অথবা মন্দ কাজ মানুষ করে অগ্রিম পাঠিয়ে দিয়েছে তা مَا قَدَّمَتْ এবং যা করা থেকে সে বিরত থেকেছে তা  أَخَّرَتْ  مَاএ দিক দিয়ে এ শব্দগুলো ইংরেজী শব্দ COMMISSION ও OMMISSION এর সমর্থবোধক।

২। যা কিছু প্রথমে করেছে তা হলো ما قدمت  এবং যা কিছু পরে করেছে তা ما اخرت  অর্থাত্ মানুষের গোটা কর্মকান্ডের ফিরিস্তি ক্রমানুসারে এবং সন তারিখসহ প্রকাশিত হবে।

৩। যা ভালো ও মন্দ কাজ মানুষ তার জীবনে করেছে, তা ما قدمت এবং ওসব কাজের যেসব প্রভাব সে মানব সমাজে তার পেছনে ছেড়ে গেছে তা (১৩৪) ما اخرت

يَوْمَئِذٍ يَصْدُرُ النَّاسُ أَشْتَاتًا لِيُرَوْا أَعْمَالَهُمْ – فَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ – وَمَنْ يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ-( الزلزلة-6-8)

-সেদিন মানুষ বিভিন্ন অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করবে যাতে তাদের কাজকর্ম তাদেরকে দেখানো যায়। তারপর যে ব্যক্তি অতি সামান্য পরিমাণ নেকি করেছে সে তা দেখতে পাবে। আর যে ব্যক্তি অতি সামান্য পরিমাণ পাপ কাজ করেছে সে তা দেখতে পাবে। (যিলযাল: ৬-৮)

প্রথম বাক্যের দুটি অর্থ হতে পারে। এক এই যে, প্রত্যেকে একাকী একজন ব্যক্তি হিসাবে উপস্থিত হবে। পরিবার, দল, জোট, জাতি, সব বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এ কথা কুরআনের অন্যান্য স্থানেও বলা হয়েছে। যেমন সূরায়ে আনয়ামে বলা হয়েছে যে আল্লাহ সেদিন লোকদেরকে বলবেন, ”নাও তোমরা ঠিক তেমনি এককী আমাদের সামনে হাযির হয়েছ যেমন প্রথমবার আমরা তোমাদেরকে পয়দা করেছিলাম।” (আয়াত- ৯৪) সূরায়ে মরিয়মে বলা হয়েছে- ” এরা একাকী আমাদের নিকটে আসবে” আয়াত-৮০। “তাদের প্রত্যেকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে একাকী হাযির হবে।” (আয়াত-৯৫)

দ্বিতীয় অর্থ এই যে, হাজার হাজার বছর যাবত যারা বিভিন্ন স্থানে মৃত্যুবরণ করেছিল, তারা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে দলে দলে আসতে থাকবে। যেমন সূরায়ে নাবাতে বলা হয়েছে- যেদিন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে সেদিন তোমরা দলে দলে আসবে। (আয়াত: ১৮)

তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম দেখানোর অর্থ এই যে, প্রত্যেক সত্ ও অসত্ ব্যক্তিকে তার নামায়ে আমল দিয়ে দেয়া হবে যাতে সে দেখতে পায় যে, সে দুনিয়ায় কি করে এসেছে। কুরআন পাকের বিভিন্ন স্থানে এর বিশগদ বিবরণ দেয়া হয়েছে যে, কাফের ও মুমেন, নেককার ও পাপী, অনুগত ও নাফরমান সকলকেই তাদের নামায়ে আমল দিয়ে দেয়া হবে। (আল হাক্কা-আয়াত ১৯, ২৫ এবং ইনশিকাক আয়াত: ৭-১০ দ্রষ্টব্য)

প্রকাশ থাকে যে, কাউকে তার কৃতকর্ম দেখানো এবং নামায়ে আমল দিয়ে দেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উপরন্তু যমীন যখন তার উপর সংঘটিত অবস্থাসমূহ পেশ করবে, তখন হক ও বাতিলের যে সংঘর্ষ আদিকাল থেকে কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল তার পূর্ণ চিত্র সকলের সামনে উদ্ভাসিত হবে। তাতে সকলেই দেখবে যে, হকের জন্যে সংগ্রামকারীগণ কি করেছে এবং বাতিলের সমর্থকগণ তাদের মুকাবিলায় কি কি তত্পরতা প্রদর্শন করেছে। এটাও অসম্ভব নয় যে, হেদায়াতের দিকে আহবানকারীগণের এবং পথভ্রষ্টতা বিস্তারকারীগণের সকল বক্তব্য ও কথাবর্তা লোক তাদের নিজ কানে ‍শুনতে পাবে। উভয়পক্ষের প্রচারপত্র ও সাহিত্যের পূর্ণ রেকর্ড অবিকল সকলের সামনে রেখে দেয়া হবে। হকপন্থীদের উপর বাতিলপন্থীদের অত্যাচার-নির্যাতন, উভয়ের মধ্যে সংঘটিত দ্বন্দ্ব সংঘর্ষের সকল চিত্র হাশরের ময়দানের জনতা স্বচক্ষে দেখতে পাবে।

তারপর বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি যতকিঞ্চিত সত্ কাজ করেছে সেও তা দেখতে পাবে এবং যে যতকিঞ্চিত অসত্কাজ করেছে সেও তা দেখতে পাবে। এর এক সাদাসিদে অর্থ এই যে, এবং তা একেবারে সঠিক, তা হলো এই যে, মানুষের সামান্যতম সত্ অথবা অসত্ কাজও এমন হবে না যা তার নামায়ে আমলে সন্নিবেশিত হওয়া থেকে বাদ পড়বে। তাকে সে অবশ্যই দেখেতে পাবে। কিন্তু যদি দেখার অর্থ তার পুরস্কার অথবা শাস্তি দেখা গ্রহণ করা হয়, তাহলে এ অর্থে একেবারে ভুল হবে যে আখেরাতে একটি তুচ্ছ নেকির পুরস্কার এবং একটি তুচ্ছ পাপের শাস্তি প্রত্যেককে পৃথক পৃথকভাবে দেয়া হবে। সেখানে কোন ব্যক্তিই তার সত্ কাজের পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবে না এবং পাপের শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না। কারণ প্রথমত তার অর্থ এই হবে যে, এক একটি মন্দ কাজের শাস্তি এবং এক একটি ভালো কাজের পুরস্কার পৃথকভাবে দেয়া হবে। দ্বিতীয়ত তার অর্থও এটাও হবে যে, কোন বড়ো নেককার মুমেনও তার কোন ছোটোখাটো ত্রুটির শাস্তি থেকে বাঁচতে পারবে না এবং কোন নিকৃষ্টতম কাফের, জলেম ও দুর্বৃত্তও তার কোন ক্ষুদ্রতম ভালো কাজের পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবে না। এ উভয় অর্থ কুরআন ও হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষনেরও পরিপন্থী এবং বিবেকও তা স্বীকার করে না যে, তা ইনসাফের দাবী। বিবেক-বুদ্ধিসহ বিবেচনা করে দেখুন যে এ কথা কি করে গ্রহনযোগ্য হতে পারে যে, আপনার কোন খাদেম বা কর্মচারী অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং নিবেদিতপ্রাণ, কিন্তু তার কোন অতি তুচ্ছ ত্রুটি আপনি ক্ষমা করেননা এবং এক একটি খেদমতের পারিশ্রমিক ও পুরস্কার দেয়ার সাথে সাথে তার এক ত্রুটি গুণে গুণে তার প্রত্যেকটির শাস্তিও তাকে দেবেন। এমনি এটাও বিবেকের কাছে প্রণিধানযোগ্য নয় যে, আপনার কোন লালিত-পালিত গৃহভৃত্য যার প্রতি আপনার বহু দায়াদাক্ষিণ্ণ রয়েছে, আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং আপনার দয়া অনুগ্রহের প্রতিদান নিমকহারামির দ্বারা দেয়, কিন্তু আপনি তার সামগ্রিক আচরণ উপেক্ষা করে এক এক বিশ্বাসঘাতকতার পৃথক শাস্তি এবং এক এক খেদমতের (তা যে কোন সময় একটু পানি এনে দিয়ে থাক অথবা পাখা টানার খেদমত করে থাকুক) পৃথক পুরস্কার দেবেন। এখন রইলো কুরআন-হাদীসের কথা। এ কুরআন ও হাদিস বিশদভাবে মুমেন, মুনাফিক, কাফের, নেককার মুমেন, গোনাহগার মুমেন, জালেম ও ফাসেক মুমেন, নিছক কাফের, ফাসাদ সৃষ্টিকারী কাফের, জালেম প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের লোকের পুরস্কার ও শাস্তির এক বিস্তারিত আইন বর্ণনা করে এবং এ পুরস্কার ও শাস্তি দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত মানুষের গোটা জীবনকে নিয়ন্ত্রন করে।

এ সম্পর্কে কুরআন নীতিগতভাবে কিছু কথা বিশদভাবে বর্ণনা করে। প্রথম কথা এই যে, কাফের, মুশরিক ও মুনাফেকের কাজকর্ম (যেগুলোকে নেকি মনে করা হয়) বিনষ্ট করে দেয়া হবে। আখেরাতে তারা তার কোনই প্রতিদান পাবেনা। তাদের কোন প্রতিদান প্রাপ্য থাকলে তা তারা এ দুনিয়াতেই পেয়ে যাবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ দেখুন সুরায়ে আ’রাফ: ১২৭; তওবা: ১৭, ৬৭-৬৯; হুদ: ১৫-১৬; ইব্রাহিম: ১৮; কাহাফ: ১০৪-১০৫; নূর: ৩৯; ফুরকা: ২৩; আহযাব: ১৯; যুমার: ৬৫; আহকাফ: ২০।

দ্বিতীয়ত: পাপের শাস্তি ততোটুকুই দেয়া হবে যতোটুকু পাপ করা হয়েছে। কিন্তু নেকির পুরস্কার আসল কাজ থেকে অধিক দেয়া হবে। বরঞ্চ কোথাও এব্যাখ্যা রয়েছে যে প্রত্যেক নেকির প্রতিদান তার থেকে দশগুণ দেয়া হবে। কোথাও একথাও বলা হয়েছে যে, আল্লাহ যতোটা চান নেকীর প্রতিদান বাড়িয়ে দেবেন। (দেখুন- বাকারাহ: ২৬১; আনয়াম: ১৬; ইউনুস: ৬৬-৬৭; নূর: ৩৮; কাসাস: ৪৮; সাবা: ৩৭; মুমেন: ৪০)।

তৃতীয়ত: মুমেন যদি গোনাহে কবিরা থেকে বিরত থাকে, তাহলে তার ছোটো ছোটো গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (দেখুন- নিসা: ৩১; শুরা: ৩৭; নজম: ৩২)।

চতুর্থত: নেককার মুমেনের সহজ হিসাব নেয়া হবে। তার মন্দ কাজ উপেক্ষা করা হবে এবং তার সর্বোত্কৃষ্ট কাজ হিসেবে তাকে পুরস্কার দেয়া হবে। (দেখুন- আনকাবুত: ৭; যুমার: ৩৫; আহকাফ: ১৬; ইনশিকাক: ৮)।

হাদীসগুলো বিষয়টিকে আরো সুস্পস্ট করে দেয়। হযরত আনাস (রা) বলেন, একবার হযরত আবু বকল (রা) নবী (সা) এর সাথে খানা খাচ্ছিলেন। এমন সময় এ আয়াত নাযিল হয়। (যিলযালের শেষ আয়াত)। হযরত আবু বকর (রা) আহার থেকে হাত গুটিয়ে নিয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা), আমি কি সেই অতি তুচ্ছ ত্রুটি-বিচ্যুতির প্রতিফল দেখতে পাব যা আমার দ্বারা হয়েছে? হুযুর (সা) বল্লেন, হে আবু বকর (রা), তুমি এমন কিছু বিষয়ের সম্মূখীন হও যা তোমার কাছে অসহনীয়, তাহলে তা ঐসব তুচ্ছ ত্রুটি বিচ্যুতির বদলা যা তোমার দ্বারা সংঘটিত হয়েছে আর যেসব সামান্য পরিমাণ নেকীও তোমার রয়েছে তা আল্লাহ তায়ালা আখেরাতে তোমার জন্যে সংরক্ষিত করে রেখেছেন-(ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম, তাবারানী ফিলআওসাত্, বায়হাকী ফশশুয়াব, ইবনুল মুনযির, হাকেম, ইবনে মারদুইয়া, আবদ বিন হামীদ)।

এ আয়াত সম্পর্কে রসূলুল্লাহ (সা) হযরত আবু আইয়ুব আনসারীকে (রা) বলেন, তোমাদের মধ্যে যে কেউ নেকী করবে, তার পুরস্কার আখেরাতে রয়েছে। আর যে কোন প্রকারের পাপ করবে সে এ দুনিয়াতেই তার শাস্তি বিপদাপদ ও রোগের আকারে ভোগ করবে (ইবনে মারদুইয়া)। কাতাদাহ হযরত আনাস (রা) এর বরাত দিয়ে রসূলুল্লাহ (সা) এর এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা মুমেনের উপর কোন জুলুম করেন না। দুনিয়ায় তার নেক কাজের বিনিময়ে জীবিকা দান ভালো কাজের বিনিময় চুকিয়ে দেয়া হয়ে থাকে। তারপর যখন কিয়ামত হবে, তখন তার হিসাবে কোন পূন্য কাজ থাকবে না। (ইবনে জারীর)।

মসরুক হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহকে (সা) জিজ্ঞাস করেন, আব্দুল্লাহ বিন জুদআন জাহেলিয়াতের যুগে আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করতো, মিসকিনদেরকে খানা খাওয়াতো, মেহমানদারী করতো, কয়েদীদেরকে মুক্ত করে দিত। এসব কি তার জন্যে আখেরাতে লাভজনক হবে?

নবী (সা) বলেন, না। সে মরণের আগে কখনো একথা বলেনি

(আরবী***********৩৪৪*************)

-হে খোদা! বিচারদিনে তুমি আমার গুনাহ মাফ করে দিও। (ইবনে জারীর)

এ ধরনের জাবাব নবী (সা) কতিপয় অন্যান্য লোকের সম্পর্কেও বলেন, যারা জাহেলিয়াতের যুগে সত্ কাজ করতো। কিন্তু তারা মৃত্যুবরণ করেছে কুফর ও শির্কের অবস্থয়। কিন্তু নবী (সা) এর কিছু বক্তব্য থেকে জানা যায় যে, কাফেরের সত্ কাজ তাকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাচাতে পারবে না, কিন্তু তাকে তেমন কঠিন শাস্তি দেয়া হবে না যা জালেম, পাপাচারী ও অসত্কর্মশীল কাফেরদেরকে দেয়া হবে। যেমন হাদীসে আছে, হাতেম তাইকে তার দানশীলতার জন্যে লঘু শাস্তি দেয়া হবে। (রুহুল মায়ানী)

তথাপি এ আয়াত মানুষকে এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার প্রতি সজাগ সচেতন করে দেয়। তা এই যে, প্রত্যেক তুচ্ছ তুচ্ছ নেকী তার নিজস্ব একটা গুরুত্ব ও মর্যাদা রাখে। এ অবস্থা পাপ কাজরও যে, সামান্য পাপ কাজও হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এমনিতেই উপেক্ষা করার বস্তু নয়। এজন্যে ক্ষুদ্র নেকীকে ক্ষুদ্র মনে করে তা পরিত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ এমন ধরনের বহু নেকী একত্রে মিলিত হয়ে আল্লাহতায়ালার হিসাবের খাতায় একটি অনেক বড় নেকী বলে গণ্য হতে পারে। তেমনি ছোটো খাটো পাপ করাও উচিত নয়। কারণ এ ধরনের ছোটো ছোটো পাপ একত্রে হয়ে পাপের এক স্তুপে পরিণত হতে পারে। এ কথাটিই নবী (সা) বিভিন্ন হাদীসে এরশাদ করেছেন। বোখারী ও মুসিলমে হযরত আদী বিন হাতেমের (রা) এ বর্ণনায় উদ্বৃত আছে যে, নবী (সা) বলেছেন, দোজখের আগুন থেকে আত্মরক্ষা কর তা খেজুরের এক টুকরা দান করে হোক অথবা একটি ভালো কথা বলার দ্বারাই হোক। আদী বিন হাতেম (রা) থেকে নবী (সা) এর আর একটি বক্তব্য সঠিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। তা এই যে, নবী (সা) বলেন, কোন নেক কাজকে তুচ্ছ মনে করো না তা পানি চায় এমন কোন ব্যক্তির পাত্রে কিছু পানি ঢেলে দেয়া হোক অথবা এই নেকী যে তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে মিলিত হও।

বোখারীতে হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) এর একটি বর্ণনা আছে এবং তা এই যে হুযুর (সা) মহিলাদের সম্বোধন করে বলেন- হে মুসিলম মহিলাগণ! কোন প্রতিবেশীনী যেন তার প্রতিবেশীনির কাছে কোন কিছু পাঠাতে ছোটো কাজ মনে না করে তা সে ছাগলের একটা খরই হোক না কেন।

মুসনাদে আহমদ, নাসায়ী এবং ইবনে মাজায় হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা আছে যে, নবী (সা) বলতেন, হে আয়েশা (রা) সে সব গোনাহ থেকেও দূরে থাকবে যেগুলো ছোটো মনে করা হয়, কারণ আল্লাহর নিকট সেসব সম্পর্কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মুসনাদে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) বর্ণনা আছে যে, হুযুর (সা) বলেছেন, খবরদার, ছোটো গোনাহগুলো থেকে দূরে থাকবে। কারণ সেসব মানুষের জন্যে একত্র করা হবে। এমনকি মানুষকে ধ্বংস করে দেবে। (১৩৫)

আখেরাতে কেউ কারো কাজে আসবেনা

শেষ গুরুত্বপূর্ণ কথা যা কুরআনে আখেরাত সম্পর্কে বলা হয়েছে, তা এই যে, সেখানে কেউ কারো কাজে লাগবে না। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়েই উদ্বিগ্ন থাকবে। পিতা, পুত্র, ভাই, স্বামী, স্ত্রী, বন্ধুবান্ধব, মুরীদ অথবা পীরকে বাঁচাবার কারো কোন চিন্তা থাকবে না। প্রত্যেকে তার নিজের কর্মকান্ডের বোঝা বহন করবে। কেউ অন্যের তিল পরিমাণ বোঝাও বহন করবে না। খোদার ইনসাফপূর্ণ নীতি একের বোঝা অন্যের উপর চাপিয়ে দেবে না। সে সময় ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে যিনি বিচার দিনের মালিক। সেদিন কথা বলার শক্তি কারো হবে না। অবশ্যি আল্লাহ কাউকে অনুমতি দিলে সেঠিক কথাই বলবে।

وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِنْ تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى-( فاطر-18)

-কোন বোঝা বহনকারী অন্য কারো বোঝা বহন করবে না। বোঝা চাপানো হয়েছে এমন কোন ব্যক্তি তার বোঝা উঠাবার জন্যে যদি কাউকে ডাকে, তাহলে তার সামান্য পরিমাণ বোঝা উঠাবার জন্যে কেউ আসবেনা, তা সে অতি নিকটাত্মীয় হোক না কেন। (ফাতির: ১৮)

বোঝার অর্থ কর্মকান্ডের দায়িত্বের বোঝা। অর্থাত্ প্রত্যেক ব্যক্তি তার কাজের জন্যে স্বয়ং দায়ী। প্রত্যেকের উপরে তার আপন কাজের দায়িত্বই আরোপিত হয়। এ বিষয়ের কোন সম্ভাবনা নেই যে, এক ব্যক্তির দায়িত্বের বোঝা আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্য কারো ওপরে চাপানো হবে। আর না এটাও সম্ভব যে, কোন ব্যক্তি অন্য কারো দায়িত্বের বোঝা আপন স্কন্ধে নেবে এবং তাকে বাচাবার জন্যে নিজেকে তার অপরাধে ধরা দেবে। একথা এখানে এজন্যে বলা হয়েছিল যে, মক্কায় যারা ইসলাম গ্রহণ করছিল, তাদেরকে তাদের আত্মীয়-স্বজন ও জ্ঞাতি গোষ্ঠীর লোক বলতো, তোমরা আমাদের কথায় এ নতুন ধর্ম পরিত্যাগ কর এবং বাপ-দাদার ধর্মে অটল থাক। তার শাস্তি ও পুরস্কার আমাদের ঘাড়ে।“

প্রথম বাক্যে আল্লাহ তায়ালার সুবিচার আইনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যে, তা একের পাপের জন্যে অপরকে পাকড়াও করবে না। বরঞ্চ প্রত্যেককে তার নিজের পাপের জন্যে দায়ী গণ্য করা হবে। পরের বাক্যে এ কথা বলা হয়েছে যে, যারা আজ এ কথা বলছে, “তোমরা আমাদের দায়িত্বে কুফরি ও গোনাহের কাজ করতে থাক, কিয়ামতের দিন তোমাদের পাপের বোঝা আমরা বহন করবো“- তারা আসলে এক মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে। যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে এবং মানুষ দেখবে যে তারা নিজেদের কর্মকান্ডের জন্যে কোন পরিণামের সম্মুখীন, তখন প্রত্যেক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। ভাই ভাই থেকে এবং পিতা পুত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। কেউ কারো তিল পরিমাণ বোঝা আপন কাঁধে নেয়ার জন্যে তৈরী হবে না। (১৩৬)

يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ – وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ – وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ – لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ-( عبس-34-37)

-ঐ দিন মানুষ আপন ভাই,মা, বাপ, স্ত্রী এবং সন্তান থেকে পলায়ন করবে। তাদের মধ্যে সকলেই ঐদিন এমন অবস্থার সম্মুখীন হবে যে নিজের ছাড়া অন্য কারো জন্যে (চিন্তাভাবনা করার) কোন হুশজ্ঞান থাকবে না। (আসাবা : ৩৪-৩৭)

পলায়ন করার অর্থ এই যে, মানুষ সেদিন তাদের প্রিয়তম বন্ধুদেরকে বিপন্ন দেখে তাদের কোন সাহায্য করার পরিবর্তে পলায়ন করবে যেন তারা সাহায্যের জন্যে ডাকতে না পারে। এর অর্থ এটাও হতে পারে ‍যে, দুনিয়াতে তারা খোদা থেকে নির্ভয় হয়ে এবং আখেরাতের প্রতি উদাসীন থেকে একে অপরের খাতিরে পাপ কাজ করতো এবং একে অপরকে পথভ্রষ্ট করতো। এখন তার পরিণাম সামনে দেখতে পেয়ে তাদের প্রত্যেকেই একে অপর থেকে পলায়ন করবে যেন তারা তাদের পাপাচার ও গোমরাহীর দায়িত্ব তাদের উপর চাপাতে না পারে। ভাই ভইয়ের থেকে, সন্তান মা-বাপ থেকে, স্বামী স্ত্রী থেকে এবং মা-বাপ সন্তান থেকে এ আশংকা করবে যে, এসব হতভাগ্যের দল তাদের বিরুদ্ধে মোকদ্দমায় সাক্ষী হবে। (১৩৭)

وَلَا يَسْأَلُ حَمِيمٌ حَمِيمًا- يُبَصَّرُونَهُمْ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ – وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ – وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ – وَمَنْ فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُنْجِيهِ-( المعارج-10-14)

-কোন অন্তরংগ বন্ধু কোন অন্তরংগ বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করবে না। অথচ একে অপরকে দেখানো হবে। অপরাধী চাইবে যে ঐদিনের আযাব থেকে বাঁচার জন্যে নিজের সন্তানকে আপন স্ত্রীকে, আপন ভাইকে এবং আশ্রয়দাতা অতি নিকট পরিবার পরিজনকে এবং পৃথিবীর সকল মানুষকে মুক্তি পণ হিসাবে দিয়ে দিবে এবং এ কৌশল তাকে মুক্তি দান করবে। (মায়ারিজ: ১০-১৪)

অর্থাত্ এমন হবে না যে, তারা একে অপরকে দেখতে পাবে না। এজন্যে জিজ্ঞাসা করবেনা। বরঞ্চ স্বচক্ষে দেখতে পাবে যে তারা কোন বিপদে পতিত। তারপর আর জিজ্ঞাসা করবে না কারণ নিজের ঘাড়েই তো বিপদ। পক্ষান্তরে তারা চাইবে সকলকে মুক্তিপণ হিসাবে দিয়ে নিজে মুক্তি হবে। (১৩৮)

مَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ حَمِيمٍ وَلَا شَفِيعٍ يُطَاعُ-(المؤمن-18)

-জালেমদের জন্যে না কোন বন্ধু হবে আর না কোন সুপারিশকারী যার সুপারিশ শুনা হবে। (মুমেন: ১৮৭)

জালেম বলতে সে প্রত্যেক ব্যক্তিকেই বুঝায় যে হকের উপর জুলুম করে অসত্যের পন্থা অবলম্বন করেছে।

উক্ত আয়াতের حميم  শব্দের অর্থ কোন ব্যক্তির এমন বন্ধু যে তাকে আক্রান্ত দেখে উত্তেজিত হয়ে তাকে রক্ষা করার জন্যে দ্রুত অগ্রসর হয়। শেষ কথাটি বলা হয়েছে কাফেরদের শাফায়াতের ধারণা বিশ্বাস খন্ডন করে। আসল কথা এই যে, ওখানেতো জালেমদের কোন শাফায়াতকারী মোটেই থাকবে না। কারণ কেউ শাফায়াতের কোন অনুমতি লাভ করলে তো আল্লাহর নেক বান্দাহগণই করতে পারেন। আর আল্লাহর নেক বান্দাহগণ কখনো কাফের মুশরিক ও পাপাচারীদের বন্ধু হতে পারেন না যে তাঁরা তাদেরকে রক্ষা করার জন্যে সুপারিশ করার কোন খেয়াল করবেন। কিন্তু যেহেতু কাফের, মুশরিক এবং গোমরাহ লোকদের সাধারণত: এ ধারণা ছিল এবং কখনো রয়েছে যে, তারা যেসব বুযর্গের আঁচল ধরে আছে তারা কখনো তাদেরকে দোযখে যেতে দেবে না বরঞ্চ আড়াল করে দাঁড়িয়ে যাবে এবং তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে ছাড়বে এবং তাদের সুপারিশ অবশ্যই মানতে হবে। (১৩৯)

يَوْمَ يَقُومُ الرُّوحُ وَالْمَلَائِكَةُ صَفًّا لَا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنْ أَذِنَ لَهُ الرَّحْمَنُ وَقَالَ صَوَابًا-( النبأ-38)

-সেদিন যখন রূহ (জিব্রিল) এবং ফেরেশতাগণ সারি বেঁধে দাঁড়াবেন তখন কেউ কথা বলবে না তারা ব্যতীত যাদেরকে আল্লাহ রহমানুর রহীম অনুমতি দেবেন এবং তারা ঠিক কথা বলবে। (নাবা: ৩৮)

অর্থাত্ হাশরের ময়দানে দরবারে ইলাহীর ভয়ানক প্রভাব প্রতিপত্তি এমন হবে যে, দুনিয়াবাসী অথবা আসমানবাসী কারো এমন  দুঃসাহস হবে না যে স্বেচ্ছায় আল্লাহর সামনে মুখ খুলবে, অথবা বিচারকার্যে হস্তক্ষেপ করবে। কথা বলার অর্থ সুপারিশ করা এবং বলা হয়েছে যে, তা দুটি শর্তের অধীনে সম্ভব হবে। এক এই যে, যে ব্যক্তিকে যে গোনাহগারের সপক্ষে সুপারিশের অনুমতি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া হবে, সেই ব্যক্তি সেই ব্যক্তির সপক্ষেই সুপারিশ করতে পারবে। দ্বিতীয় শর্ত এই যে, সুপারিশকারী স্বয়ং সঠিক কথা বলবে, অন্যায় কোন সুপারিশ করবে না। এর মধ্যে অতিরিক্ত এ শর্তও পাওয়া যায় যে, যার সপক্ষে সুপারিশ করা হবে সে দুনিয়াতে অন্তত: কালেমা পাঠকারী হবে, অর্থাত্ নিছক গোনাহগার, কাফের নয়। (১৪০)

يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِنَفْسٍ شَيْئًا وَالْأَمْرُ يَوْمَئِذٍ لِلَّهِ-( الانفطار-19)

-এ হচ্ছে সেই দিন যখন কোন মানুষের জন্যে কিছু করা কারও সাধ্য হবে না এবং ফয়সালা সেদিন পুরোপুরি আল্লাহর এখতিয়ারে হবে। (ইনফিতার: ১৯)

আলোচনার সারাংশ

এ ছিল দাওয়াতে ইসলামীর চতুর্থ দফা যা এমন জোর দিয়ে যৌক্তিকতা সহকারে এমন বিশদভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে যে, তার সামনে কাফেরদের ঠাট্টা বিদ্রূপ এবং এ ধরনের নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ দাবী “উঠিয়ে আন আমাদের বাপ-দাদাকে” কিছুতেই টিকতে পারে না। যারা তাদের আপন স্বার্থের খাতিরে লড়াই করছিল এবং যাদেরকে অবশ্য লড়তেই হতো, তাদেরকে ছাড়া প্রত্যেক বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তি চিন্তা না করে পারতো না যে, আখেরাত সংঘটিত হওয়া না অসম্ভব আর না বিবেকের পরিপন্থী। আর না এটা সম্ভব যে, খোদার কাছে জাবাবদিহির অনুভূতি থেকে মুক্ত হয়ে দুনিয়ায় মানুষের কর্মপদ্ধতি সত্য ও সুবিচারের স্থায়ী মূলনীতির উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, আর না মানুষ সত্যিকার এবং পরিপূর্ণ ইনসাফ এছাড়া  অন্য কোন উপায়ে পেতে পারে যে, বর্তমান দুনিয়ার ব্যবস্থা শেষ হওয়ার পর কিয়ামত সংঘটিত হবে, সকল আগে ও পরের মানব বংশধরদেরকে একত্র করে বিশ্বপ্রকৃতির মালিকের সামনে হাযির করা হবে এবং একেবারে নিরপেক্ষভাবে প্রত্যেকের দায়িত্ব চিহ্নিত করে শাস্তি এবং পুরস্কারের যোগ্য যে হবে তাকে তা দেয়া হবে। (১৪১)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.