সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

পঞ্চম অনুচ্ছেদ

নৈতিক শিক্ষা

ইসলামী দাওয়াত এসব আকীদাহ বিশ্বাস এমন সব যুক্তি প্রমাণসহ হৃদয়গ্রাহী পদ্ধতিতে পেশ করার সাথে সাথে নৈতিকতারও এক অতি স্পষ্ট ধারণা মানুষের সামনে তুলে ধরেছে, যার দরুন কুরআনের শ্রোতা ও পাঠক প্রত্যেকেই পরিস্কার জানতে পেরেছে যে, ইসলাম কোন ধরনের চরিত্র পছন্দ করে এবং কোন ধরনের অপছন্দ করে। মানবতার কোন সে নমুনা বা আদর্শ তার কাছে মন্দ যা সে পরিবর্তন ও বিলোপ করতে চায়। আর মানবতার এমন কোন সে আদর্শ যা ভালো এবং তা সে তৈরী করতে, লালন ও বিকশিত করতে চায়। মন্দ ও অনিষ্ট তার দৃষ্টিতে কি, কি কারণে তা জন্মলাভ করে এবং মানবজীবনে তা কি কি রূপ ধারণ করে। আর কোন জিনিস তাকে বিকশিত করে। ঠিক তার বিপরীত কল্যাণ তার দৃষ্টিতে কি এবং তার উত্সইবা কি? তার প্রকাশ লাভের পথ কিভাবে উন্মুক্ত হয় এবং কি রূপ ও আকৃতিতে তা প্রকাশ লাভ করে?

দাওয়াতে ইসলামী এ কথা বলে যে, ইসলামের উদ্দেশ্যই হচ্ছে অনিষ্ট অকল্যানের যত কারণ তা সমূলে উত্পাটিত করে ফেলা এবং কল্যানের পথ সুগম করে দেয়া। বেশী বেশী প্রশস্ত করে দেয়া এবং ব্যক্তি থেকে সমাজ পর্যন্ত জীবনের সকল বিভাগ অকল্যাণের স্থলে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত করা। এ বর্ণনা ইসলামী দাওয়াতের মধ্যে এতো বিস্তারিত, এতো সুস্পষ্ট, এতো হৃদয়গ্রাহী এবং সাধারণ বিবেক-বুদ্ধির কাছে এতোটা বোধগম্য ভাষায় করা হয়েছে যে, জাহেলিয়াতের সমাজ শত শত বছর ধরে যারা নৈতিক অধঃপতনের অতলতলে নিমজ্জিত ছিল, তাদের জন্যেও একথা উপলব্ধি করা কঠিন ছিল না যে, সত্যি সত্যিই মানবতার সেই নমুনাই সর্বনিকৃষ্ট যাকে ইসলাম মন্দ বলে এবং সেই নমুনাই সর্বোত্কৃষ্ট যার ছাঁচে সে মানুষ ও সমাজকে ঢেলে সাজাতে চায়। (১৪২)

নৈতিকতা সম্পর্কে কিছু মৌলিক বাস্তবতা

এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম কিছু বাস্তবতা লোকের সামনে পেশ করা হয়েছে যাতে নৈতিক সমস্যা মৌলিক দিক দিয়ে তাদের বোধগম্য হয়।

وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا – فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا – قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا- وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا-( الشمس-7-10)

-আর মানুষের নফসের কসম এবং কসম সেই সত্তার যিনি তাকে সুবিন্যস্ত করেছেন। পরে তার পাপ ও পুণ্য উভয়ের প্রবণতা তার মধ্যে ইলহাম করেছেন। নিঃসন্দেহে কল্যাণ লাভ করলো সে যে নফসের পবিত্রতা বিধান করলো এবং ব্যর্থ হলো সে যে তাকে দমিত করে রাখলো। (শামস: ৭-১০)

মানুষের নফসকে সুবিন্যস্ত করার অর্থ স্রষ্টা তাকে এমন দেহদান করেছেন যা সঠিক আকার-আকৃতি। আপন হাত-পা মনমস্তিষ্কের দিক দিয়ে মানুষের মতো জীবন যাপন করার সম্পূর্ণ উপযোগী। তাকে দেখার, শুনার, স্পর্শ করার, স্বাদ গ্রহণ করার এবং ঘ্রাণ গ্রহণ করার এমন সব ইন্দ্রিয় দান করেছেন, যা স্বীয় অনুপাত ও বৈশিষ্ঠ্যের ভিত্তিতে জ্ঞান অর্জনের উত্কৃষ্টতম উপায় হতে পারতো। তাকে জ্ঞান বুদ্ধি ও চিন্তা শক্তি, যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, ধারণা শক্তি, স্মরণশক্তি, ভালোমন্দ নির্ণয়ের শক্তি, ইচ্ছাশক্তি এবং অন্যান্য মানসিক শক্তি দান করা হয়েছে যার মাধ্যমে সে দুনিয়ার সে কাজ করার যোগ্য হয় যা মানুষের করণীয়। তাকে স্বভাবজাত দুর্বৃত্ত এবং জন্মগত পাপী হিসাবে নয় বরঞ্চ সঠিক ও সরল প্রকৃতির উপর সৃষ্টি করা হয়েছে। তার গঠন আকৃতিতে কোন প্রকার বক্রতা ও বিকৃতি রেখে দেয়া হয়নি যে, সে সঠিক পথ অবলম্বন করতে চাইলেও তা পারবে না।

আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে বান্দাহর মন মস্তিষ্কের উপর তার অজ্ঞাতে কোন চিন্তা ধারণা প্রবিষ্ট করা অর্থে ইলহাম শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মানুষের মনের উপর তার পাপ কাজ, সত্কাজ ও পরহেজগারীর প্রবণতা ইলহাম করে দেয়ার দুটি অর্থ হত পারে। এক এই যে, স্রষ্টা তার মধ্যে সত্ কাজ ও পাপ কাজ উভয়ের প্রবণতা ও ইচ্ছা-অভিলাষ রেখে দিয়েছেন। আর এ এমন এক বস্তু যা প্রত্যেক মানুষ তার মধ্যে অনুভব করে। দ্বিতীয় অর্থ এই যে, প্রত্যেক মানুষের অবচেতন অবস্থায় আল্লাহতায়ালা এ ধারণা দান করেছেন যে, চরিত্র ও আচার-আচরণ কোন জিনিস ভালো এবং কোন জিনিস মন্দ রয়েছে। আর ভালো বস্তু এবং তাকওয়া (মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা) একটি মহত্ বস্তু। এ ধারণা মানুষের কাছে অপরিচিত নয়, বরঞ্চ তার স্বভাব প্রকৃতি এসব সম্পর্কে পূর্ন অবহিত। স্রষ্টা ভালো এবং মন্দ নির্ণয়ের শক্তি জন্মগতভাবে তাকে দান করেছেন।

তাযকিয়া’ পাক করা, বর্ধিত করা ও বিকশিত করা অর্থে বলা হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে তাযকিয়া দমিত করা, গোপন করা, প্রলুব্ধ করা ও পথভ্রষ্ট করা অর্থে ব্যবহৃত হয়। আয়াতটিতে এ কথা সিদ্ধান্তকর পদ্ধতিতে বলা হয়েছে যে, মানুষের সাফল্য ও ব্যর্থতা এ প্রশ্নের উপর নির্ভরশীল যে, আল্লাহ যেসব শক্তি তাকে দান করেছেন, তা ব্যবহার করে আপন মনের ভালো ও মন্দ প্রবণতার মধ্যে কোনটি বর্ধিত করে এবং কোনটি দমিত করে রাখে। সাফল্য শুধু সে ব্যক্তির জন্যে যে তার মনকে পাপ থেকে পবিত্র করে রাখে এবং তাকে বর্ধিত করে তাকওয়ার উচ্চ শিখরে নিয়ে যায় এবং তার মধ্যে কল্যাণ বিকশিত করে। বিফল মনোরথ সে ব্যক্তি যে তার মধ্যে বিদ্যমান সত্ প্রবণতাকে দমিত করে এবং আপন মনকে প্রলুব্ধ করে। মন্দ প্রবণতার দিকে নিয়ে যায়। তার পর পাপাচারকে এতোটা শক্তিশালী করে দেয় যে, তাকওয়া তার তলায় এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যেমন একটি মৃতুদেহ কবরে মাটি দেয়ার পর দৃষ্টির অগোচর হয়। (১৪৩)

إِنَّا خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ مِنْ نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ نَبْتَلِيهِ فَجَعَلْنَاهُ سَمِيعًا بَصِيرًا – إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا-(الدهر-2-3)

-আমরা মানুষকে (মা ও বাপের) যুক্ত শূক্র থেকে পয়দা করেছি যাতে তাদের পরীক্ষা নিতে পারি। আর এ উদ্দেশ্যে আমরা তাকে শ্রোতা ও দর্শক বানিয়েছি। আমরা তাকে পথ দেখিয়েছি তা সে কৃতজ্ঞ হোক অথবা অকৃতঞ্জ। (দাহর: ২-৩)

মাতাপিতার যুক্ত শূক্র থেকে এ মানুষের মতো পশুরও জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু মানুষ ‍ও পশুর মধ্যে পার্থক্য এই যে, পশু এ দুনিয়াতে পরীক্ষার জন্যে সৃষ্টি করা হয়নি। মানুষকে পরীক্ষার জন্যে পয়দা করা হয়েছে। এ কারণেই আল্লাহতায়অলার পশুর বিপরীত তাকে শ্রোতা ও দর্শক বানিয়েছেন। অর্থাৎ জ্ঞান বুদ্ধির শক্তি দান করেছেন যাতে সে পরীক্ষার যোগ্য হতে পারে। তারপর এ শক্তি দিযে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়নি। বরঞ্চ, তাকে পথও দেখানো হয়েছে। যাতে সে একথা উপলব্ধি করে যে, খোদার বান্দাহ হিসাবে তার মধ্যে শুকরিয়অ আদায়ের পথ কোনটি এবং অকৃতজ্ঞতা বা নিমকহারামীর পথ কোনটি। এখন তার পরীক্ষা এ বিষয়ে যে, উভয় পথের পার্থক্য জানার পর নিজের এসব শক্তি ব্যবহার করে শোকর আদায়ের পথ অবলম্বন করছে, না  কুফরের। (১৪৪)

(আরবী**************)

আমরা কি তাকে দুটি চক্ষু, একটি জিহ্বা ও দুটি ওষ্ঠ দান করিনি? এবং উভয় সুস্পস্ট পথ কি তাকে দেখাইনি? (বালাদ: ৮-১০)

দুটি চোখের অর্থ গরু-মহিষের চোখ নয়, বরঞ্চ মানবীয় চোখ যা মেলে দেখলে সে চারদিকে সেসব নিদর্শন দেখতে পাবে যা বাস্তবতা সুস্পষ্ট করে দেবে এবং সত্য ও মিথ্যার  পার্থক্য বুঝিয়ে দেবে। জিহ্বা ও ওষ্ঠের অর্থ শুধু কথা বলার যন্ত্রই নয়, বরঞ্চ একটি বিচার বুদ্ধি সম্পন্ন মন (Reasoning mind) যে এ যন্ত্রদ্বয়ের সাহায্যে চিন্তা-ভাবনা করার কাজ করে এবং মনের কথা প্রকাশ করার কাজ করে। তারপর আল্লাহ বলেন, আমরা তাকে জ্ঞান বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি দিয়ে এমনি ছেড়ে দিইনি যে, সে তার পথ নিজেই বেছে নেবে। বরঞ্চ তার পথ নির্দেশনার জন্যে তার সামনে ভালো ও মন্দ, পুণ্য ও পাপ দুটি পথও পরিষ্কার করে রেখে দিয়েছি যাতে সে খুব চিন্তাভাবনা করে এ দুটির যে কোনটি আপন দায়িত্বে গ্রহণ করতে পারে। (১৪৫)

(আরবী**************)

-আমরা মানুষকে সর্বোত্তম কাঠামোসহ পয়দা করেছি। পরে তাকে উলটো দিকে ফিরিয়ে সর্বনিম্ন করে দিয়েছি। ব্যতিক্রম শুধু ঐসব লোক যারা ঈমান এনেছে এবংনেক আমল করেছে। (আত্তীন: ৪-৬)

অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন দেহ দান করেছেন যা অন্য কোন প্রাণীকে দান করেননি। আর তাকে চিন্তাভাবনা ও জ্ঞান বুদ্ধির সর্বোত্তম যোগ্যতা দান করেছেন যা অন্য কোন সৃষ্ট জীবকে দান করেননি। কিন্তু যখন সে ঈমান ও নেক আমলের পথ অবলম্বন করার পরিবর্তে আপন দেহ ও মনের শক্তিকে মন্দ পথে ব্যবহার করে, তখন আল্লাহ তাকে মন্দ কাজেরই তওফীক দেন এবং তাকে এমন চরম অধঃপতনে পৌঁছিয়ে দেন যে, কোন নিকৃষ্টতম সৃষ্টিও সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।

এ এমন এক বাস্তবতা যা মানব সমাজে বহু দেখতে পাওয়া যায়। লোভ লালসা, স্বার্থপরতা, আত্মপ্রচারণা, মাদকাশক্তি, নীচতা, ক্রোধান্মত্তাতা এবং এ ধরনের অন্যান্য স্বভাব প্রকৃতির যার মধ্যেই মানুষ নিমজ্জিত হয়, নৈতিক দিক দিয়ে সে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ শুধু একটিকেই যদি সামনে রাখা যায় তাহলে দেখা যায় যে, একটি জাতি যখন অন্য একটি জাতির প্রতি শত্রুতায় অন্ধ হয়ে পড়ে তখন কিভাবে হিংস্রতহায় সকল হিংস্র প্রাণীকে হার মানায়, হিংস্র পশু ত শুধু আপন আহারের জন্যে অন্য কোন পশু শিকার করে, সকল পশু একত্রে হত্যা করে না। কিন্তু মানুষ স্বয়ং সমজাতীয় মানুষেরই গণহত্যা করে। হিংস্র পশুতার নখর ও দন্তদ্বারা শিকার করে। কিন্তু সর্বোত্তমকাঠামোতে সৃষ্টি করা মানুষ তার বুদিধ ও আবিষ্কার শক্তি দ্বারা একটির পর একটি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র তৈরী করতে থাকে যেন গোটা জনপদ ধ্বংস করতে পারে। হিংস্র পশু শুধু আহত অথবা হত্যা করে। কিন্তু মানুষ, তার নিজের মতো মানুষকে নির্যাতিত করার জন্যে এমন সব মর্মান্তিক পন্থা অবলম্বন করে যার ধারণা কোন হিংস্র পশুর মনে আসতে পারে না। অতঃপর সে তার শত্রুতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার লালসা চরিতার্থ করার জন্য নীচতার এমন নিম্নতম স্তরে পৌঁছে যায় যে, শত্রুর নারীদের উলংগ মিছিল বের করে, এক এক নারীকে দশ বিশজন পুরষ তাদের যৌন ক্ষুধা নিবৃত্ত করার জন্য ধর্ষণ করে। বাপ, ভাই ও স্বামীর চোখের সামনে তাদের কন্যা, ভগ্নি ও স্ত্রীর সম্ভ্রম লুন্ঠন করে। মা বাপের সামনে তাদের শিশুদেরকে হত্যা করে। মাকে তার সন্তানের রক্ত পান করতে বাধ্য করে। জীবিত মানুষকে অগ্নিদগ্ধ করে মারা হয় এবং জীবিত অবস্থায় দাফন করা হয়। দুনিয়ায় এমন কোন হিংস্রতম পশু নেই যে মানুষের এ পশুত্বের কোন পর্যায়ে মুকাবিলা করতে পারে। এ অবস্থা অন্যান্য মন্দ গুণাবলীরও যে সে সবেরমধ্যে যার দিকেই মানুষ ধাবিত হয়, সে নিজেকে এক অতি নিকৃষ্টতম সৃষ্টি প্রমাণ করে। এমনকি মানুষের জন্যে ধর্ম যে, এক পবিত্রতম বস্তু তারও সে এমন অবনতি ঘটায় যে, গাছপালা, জীবজন্তু এবং গ্রন্থরাজির পূজা করতে করতে অধঃপতনের সর্বনিম্নস্তরে পৌঁছার পর নারী ও পুরুষের লিংগ পূজায় লিপ্ত হয়। দেব-দেবীর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যে মন্দিরে দেবদাসী রাখারও প্রচলন করে এবং পূণ্য কাজ মনে তাদের সাথে ব্যভিচার করা হয়। তাদের পুরান বা ধর্মগ্রন্থে এমন সব অশ্লীল কল্পকাহিনী আরোপ করা হয় যা নিকৃষ্টতম মানুষের জন্যেও লজ্জাকর। (১৪৬)

এসব বাস্তবতা বর্ণনা করার সাথে সাথে কুরআন মানব মনের তিনটি পৃথক পৃথক রূপ বর্ণনা করেছে। একটি হলো নফসে আম্মাা যা মানুষকে মন্দ কাজে উত্তেজিত করে। (ইউসুফ: ৫৩)

দ্বিতীয় নফসে লাওয়অমাহ। তার কাজ হলো মানুষের ইচ্ছা বাসনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত একটি স্তরে সে মানুষকে সতর্ক করে দেয়। তারপর মন্দ কাজ করে ফেলার পর তাকে ভর্ৎসনা  করতে থাকে। (কিয়অমাহ: ২) তৃতীয় হচ্ছে নফসে মুতমায়েন্নাহ। সে পূর্ণ নিশ্চিন্ততার সাথে মন্দ পথ পরিহার করে সৎ পথ অবলম্বন করে এবং তার এতে কোন দুঃখ নেই যে, সে অসৎ কাজের স্বাদ ও সুযোগ সুবিধা কেন পরিহার করলো এবং কল্যাণের জন্যে কেন বঞ্চনা, ত্যাগ ও কুরবানী, দুঃখ কষ্ট ও বিপ৩দ মসিবত কেন বরদাশত করলো। এতে দুঃখ করাত দূরের কথা, তার মন এতে সন্তুষ্ট হয় যে, সে মন্দ কাজের আবিলতা ও পংকিলতা থেকে রক্ষা পেয়েছে এবং কল্যাণের পবিত্রতা সে লাভ করেছে। এ তৃতীয় প্রকারের নফসকে কুরআন খোদার পছন্দনীয় নফস বলে অভিহিত করেছে। তাক জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছে। (ফজর: ২৭-৩০)

গোমরাহীল কারণ

তারপর কুরআন মজিদ একটি একটি করে ঐ সব কারণ বর্ণনা করেছে যার বদৌলতে, মানুষ সাধারণত গোমরাহীতে লিপ্ত হয়। আরবের কাফেরগণও এসব কারণে গোমরাহীতে লিপ্ত হয়েছিল। কারণগুলো নিম্নরূপ:-

১. পূর্ব পুরুষের অন্ধ অনুসরণ

এ সবের মধ্যে প্রথম বস্তুটি হচ্ছে, পূল্ব পুরুষের ধর্মের অন্ধ অনুসরণ। শুধুমাত্র এ কারণেই এসব করা হতো যে, বাপ-দাদার সময় থেকে এ রকম হয়ে আসছে। তারা কখনো বুদ্ধিখাটিয়ে এ কথা চিন্তা করার চেষ্টা করেনি যে, বাপ-দাদা যা কিছু করতো তা যুক্তিসংগত ছিল কি না। এ অন্ধ অনুসরণের কোন যুক্তি প্রমাণ এ ছাড়া আর কিছু ছিল না যে, এ হচ্ছে বাপ-দাদার প্রথা। এ প্রসংগে কুরআন ইতিহাস থেকে বহু দৃষ্টান্ত পেশ করেছে।

হযরত হুদ (আ) যখন আদ জাতিকে তাদের বিপথগামী হওয়ার সমালোচনা করে সঠিক পথে আসার পরামর্শ দেন, তখন তারা শুধু এ কথা বলে তাঁর সকল দলিল প্রমাণ ও নসিহত প্রত্যাখ্যান করে যে, তুমি কি আমাদের কাছে এ জন্যে এসেছ যে, আমরা শুধামাত্র আল্লাহর ইবাদত করবো এবং ঐসব খোদাকে পরিহার ক রব, যাদের এবাদত আমাদের বাপ-দাদা করে এসেছেন? (আ’রাফ: ১৭০)

হযরত সালে (আ) যখন সামুদ জাতিকে বুঝাবার চেষ্টা করেন তখন তাদের জবাব এই ছিল- হে সালেহ! এর পূর্বৈ তুমি ত এমন ব্যক্তি ছিলে যার থেকে আমরা অনেক আশা পোষণ করতাম। এখন তুমি কি আমাদেরকে সেসব খোদার পূজা অর্চনা থেকে বিরত রাখতে চাও যাদের পূজা অর্চনা আমাদের বাপ-দাদা করতেন? যে পথের দিকে তুমি আমাদের ডাকছ সে সম্পর্কে বড়ো সন্দেহ-সংশয় রয়েছে যা আমাদের ভয়ানক উদ্বেগ-আশংকার কারণ হয়েছে। (হুদ: ৬২)

হযরত শুয়াইব (আ) যখন মাদয়ানবাসীকে তাদের সুস্পষ্ট গোমরাহীর জন্যে সতর্ক করে দেন, তখন তাদের জবাব এই ছিল-

হে শুয়াইব! তোমার নামায কি তোমাকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের খোদাকে ছেড়ে দেব? (হুদ: ৮৭)

হযরত ইব্রাহীম (আ) যখন তাঁর পিতা ও জাতিকে বল্লেন, এসব কেমন মূর্তি যার প্রতি তোমরা অনুরক্ত হয়ে পড়েছ? তখন তাদের এ ছাড়া আর কোন জবাব ছিল না আমরা আমাদরে বাপ-দাদাকে তাদের পূজা করতে দেখেছি। হযরত ইব্রাহীম (আ) তারপর পরিষ্কার বল্লেন, তোমরাও পথভ্র্ট এবং তোমাদের বাপ-দাদাও সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত ছিল। (আম্বিয়া: ৫২-৫৪)

হযরত ইব্রাহীম (আ) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এরা কি তোমাদের দেয়ার কোন জবাব দেয়? তোমাদের কোন উপকার ও ক্ষতি করে কি?

তাদের জবাব ছিল- এতে আমাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। আমরা ত এসব শুধু এ জন্যে করি যে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এমনই করতে পেয়েছি। (আশ্‌শুয়ারা: ৭২)

হযরত মূসা (আ) যখন সুস্পষট মুজেযাসহ ফেরাউন ও তার সভাজনদের কাছে হকের দাওয়াত দিলেন তখন তারাও এ কথাই বলেছিল- তুমি আমাদের কাছে এ জন্যে এসেছ যে, আমাদেরকে সে পথ থেকে ফিরিয়ে দেবে- যে পথে আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে দেখেছি? (ইউনুস: ৭৮)

এসব দৃষ্টান্ত পেশ করতে গিযে কুরআন মজিদ বলে যে, সকল জাহেল জাতি তাদের নবীগণের দাওয়াত এই  যুক্তিহীন যুক্তি দ্বারা প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রথম জাতিগুলোর উল্লেখ করতে গিয়ে কুরআন বলে যে, এরা সকলে তাদের নবীগণের সুস্পষ্ট যুক্তি প্রমাণ, নসিহত ও সতর্কবাণীর কোন জবাব দিয়ে থাকলে এই দিয়েছে—আমাদের মতো একজন মানুষ ছাড়া তুমি আর কিচু নও। তুমি আমাদেরকে ঐসব খোদার বন্দেগী থেকে দূরে রাখতে চাও যাদের বন্দেগী আমাদের বাপ-দাদা করতে থাকেন। (ইব্রাহীম: ১০)

অন্য এক স্থানে বলা হয়েছে এভাবে, হে নবী! তোমার পূর্বে যে জনপদে আমরা কোন সতর্কবাণী পাঠিয়েছি তার সচ্ছল ব্যক্তিগণ এ কথাই বলেছে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এক পদ্ধতিতে চলতে দেখেছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে চলেীছ। প্রত্যেক নবী তাদেরক জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি সে পথেই চলতে থাকবে যদিও আমি তোমাদেরকে অধিকতর সরল সঠিক পথ বাতিযে দেই? সেই পথ থেকে যে পথে তোমরা তোমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছে? তারা সকল নবীকে এ জবাবই দিয়েছে- যে জিনিসের দিকে ডাকার জন্যে তোমাদেরকে পাঠানে া হয়েছে, আমরা তার অস্বীকারকারী। (যুখরুখ: ২৩-২৪)

এ ‍শুধু অতীত কালের জাতিসমূহের অবস্থাই ছিল না, বরঞ্চ প্রত্যেক যুগের জাহেল লোকদের নিয়মপন্থা এই ছিল এবং আছে যে তারা কোন  জ্ঞঅন এবং আলো ও পথ প্রদর্শনকারী কেতাব ব্যতীত আল্লাহর ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ক করে। যখন তাদেরকে বলা হয়, এসো সেই শিক্ষার দিকে যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। তখন তারা বলে, না, আমরা সেই পথই অবলম্বন করবো যে পথে আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি।

তা শয়তান তাদের বাপ-দাদাকে জাহান্নামের দিকেই ডাকুক না কেন। (লুকমান: ২০-২১)

এসব দৃষ্টান্ত পেশ করার পর কুরআন সরাসরি কুরাইশ ও আরবাসীকে সাবধান করে দেয় যে, তোমরাও তাদের মতোই। তোমরা না তোমাদের জ্ঞান-বুদ্ধির সাহায্যে এ চিন্তা কর যে, যে ধর্মের তোমরা অনুসরণ কর তা সঠিক কি না। আর না যুক্তি প্রমাণসহ তোমাদের ধর্ম ও রেসম-রেওয়াজের ভ্রান্তি তোমাদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে সে সম্পর্কে কোন চিন্তা-ভাবনা করছ। ব্যস শুধু এ কারণেই এক ভ্রান্ত জিনিসের উপর জিদ ধরে বসে আছ যে, এ বাপ-দাদা থেকে চলে আসছে।

সূরায়ে সাফফাতে বলা হয়েছে, এসব লোক তাদের বাপ-দাদাকে পথভ্রষ্ট পেয়েছে। অতেএব, তাদের পেছনেই দ্রুত চলেছে, অথচ তাদের পূর্বে যারা কালযাপন করেছে তাদের অধিকাংশই পথ ভ্রস্ট হয়েছৈ। (আয়াত: ৬৯-৭১)

সূরা হুদে রসূলে করীম (সা)কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, তুমি ওসব মাবুদ বা দেবদেবীর পক্ষ থেকে কোনরূপ সন্দেহে নিপাতিত হয়ো  না যাদের এসব লোক পূজা করছে। এ ঠিক সেভাবেই পুজা করা হচ্ছে যেমন তাদের বাপ-দাদা করতো। (আয়াত: ১০৯)

উলংগতা ও নগ্নতার মতো চরম লজ্জাকর জিনিস থেকে যখন কুরাইশ ও আরববাসীদের বিরত থাকতে বলা হলো এবং বলা হলো যে, তারা পবিত্র কাবাগৃহের চারধারে উলংগ হয়ে তাওয়াফ করতেও কোন দ্বিধাবোধ করে না, যডার চেয়ে ঘৃণ্য কাজ আর কিছু হতে পারে না। অতএব এ ব্যাপারে তাদের লজ্জাবোধ করা উচিত তখন তারা এটাকেও বাপ-দাদাকে অনুসরণ করার ভিত্তিতে বৈধ গন্য করার চেষ্টা করে। বস্তুতঃ সূরায়ে আ’রাফে বলা হয়েছে, যখন এরা কোন লজ্জাজনক কাজ করে তখন তরা বলে- আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এমনটি করতে দেখেছি এবং আল্লাহ আমাদেরকে এ কাজ করার আদেশ দিয়েছেন।

হে নবী! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ নির্লজ্জতার আদেশ কখনো দিয়ে থাকেন না। তোমরা কি আল্লাহর নাম নিয়ে সে কথা বল যা তোমরা জান না যে, আল্লাহ এর হুকুম দিয়েছেন? (আয়াত: ২৮)

আরবের কাফেরগণ বিভিন্ন ধরনের অযৌক্তিক জাহেলী রেসম-রেওয়াজের প্রতি অবিচল ছিল এবং কোন প্রমাণ ছাড়াই এ কথা বুঝে বসেছিল যে এসব আল্লাহ কর্তৃক নির্ধরিত। এ সম্পর্কে সূরায়ে মায়েদায় বলা হযেছে- এবং যখন তাদেরকে বলা হয় এসো সেই শিক্ষার দিকে যা আল্লাহ নাযিল করেছেন এবং এসো রসূলের দিকে, তখন তারা বলে, আমাদের জন্যে ত তাই যথেষ্ট যার উপরে আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। এরা কি বাপ-দাদারই অন্ধ অনুসরণ করতে থাকবে, তারা কোন জ্ঞানের অধিকারী না হোক এবং সঠিক পথের উপর না হোক (আয়াত: ১০৪)

এভাবে আরবের কাফেরগণ হালাল হারমের বহু বাধানিষেধ নিজেদের জন্যে বাধ্যতামূলক করে নিয়েছে। এসব তাদের নিজেদের তৈরী এবং এর ভিত্তিতে বাধ্যতামূলক করেছে যে, তা পূর্ব হতে চলে আসছে। এ সবের মধ্যে অনেক হালালকে হারাম এবং অনেক হারাম, লজ্জাকর ও জঘন্য জিনিস হালাল করা হয়। এ সম্পর্কে সূরা বাকারায় বলা হয়- যখন তাদেরকে বলা হয় যে, ঐ হেদায়েত মেনে চল যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তখন তারা বলে, না, আমরা ত সেই পথ অনুসরণ করব যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি এবং তারা কি ওদেরই অনুসরণ করতে আসবে যদিও তাদের বাপ-দাদার কোন বোধশক্তি না থাকে এবং তারা হেদায়েতপ্রাপ্ত না হয়? (আয়অত: ১৭০)

সূরায়ে আনয়ামে এ অন্ধ অনুসরণকে এমন শক্তিশালী যুক্তি প্রমানসহ অসংগত ও যুক্তি বিরুদ্ধ প্রমাণ করা হয়েছে যে, আরবের চরম হঠকারী লোকও হয়তো একবার তার মন থেকে এ কথা মেনে নিয়েছে যে, সত্যি সত্যিই আমরা একটা উদ্ভট জিনিসের অনুসরণ করছি।

উক্ত সূরায় বলা হয়েছে- এ লোকেরা আল্লাহর জন্রে তাঁর নিজেরই সৃষ্ট ক্ষেত-খামারের ফসল ও গৃহ পালিত পশুর মধ্য থেকে একটি নির্দিষ্ট করেছে এবং বলে, এ আল্লাহর জন্যে (এ তাদের স্বীয় ধারণামাত্র) আর এ আমারেদ বানানো শরীকদের জন্যে। কিন্তু যে অংশ তাদের বানানো শরীকদের জন্যে তা আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না। অথচ যা আল্লাহর জন্য তা তাদের বানানো শরীকদের কাছে পৌঁছে যায়। [অর্থাৎ যে ফসল অথবা ফল প্রভৃতি আল্লাহর নামে বের করা হতো তার মধ্য থেকে যদি কিছু পড়ে যেতো তাহলে তা শরীকদের অংশে শামিল করে দেয়া হতো। আর যদি শরীকদের অংশ থেকে পড়ে যেতো অথবা খোদার অংশে পাওয়া যেতো তাহলে তা তাদেরই অংশে ফেরৎ দেয়া হতো। ক্ষেতের যে অংশ শরীকদের নযর-নিয়াজের জন্যে নির্দিষ্ট করা হতো, তার থেকে যদি কখনো পানি প্রবাহিত হয়ে সে অংশের দিকে যেতো যা খোদার নযরের জন্যে নির্দিষ্ট করা হতো, তাহলে তা সমুদয় ফসল শরীকদের অংশে শামিল করা হতো। কিন্তু এর বিপরীত হলে খোদার অংশে অতিরিক্ত কিছু দেয়া হতো না। যদি কখনো অনাবৃষ্টির কারণে নযর-নিয়াযের অংশ নিজেদের ব্যবহার করার প্রয়োজন হতো, তাহলে খোদার অংশ তারা খেয়ে ফেলতো। কিন্তু শরীকদের অংশে হাত লাগাতে তারা ভয় করতো- যে কি জানি কোন বিপদ এসে পড়ে নাকি। যদি কোন কারণে শরীকদের অংশ কিছু কম হতো, তাহলে খোদার অংশ থেকে তা পূরণ করা হতো। কিন্তু খোদার অংশ কম হলে শরীকদের অংশ থেকে একটি দানাও খোদার অংশে দেয়া হতো না। -গ্রন্থকার।]

এবং এমনি ভাবে তাদের শরীকেরা বহু সংখ্যক মুশরিকদের জন্যে তাদের নিজেদের সন্তানদের হত্যা কারার কাজ খুবই আকর্ষণীয় বানিয়ে দিয়েছে যেন তারা তাদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিমজ্জিত করে এবং তাদের নিকট তাদের দ্বীনকে সন্ধিগ্ন বানিয়ে দেয়। [অর্থাৎ তাদেরকে এ বিভ্রান্তির মধ্যে নিক্ষেপ করা যে এটাও ঐ দ্বীনের কোন অংশ যা তারা পেয়ে হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) থেকে। এ স্থঅনে এটা পরিষ্কার যে, শরীক অর্থ দেবদেবী বা অন্য উপাস্য নয় বরঞ্চ ওসব ধর্মীয় নেতা যারা পরবর্তী যুদে মিথ্যঅ আকীদাহ ও ধর্মীয় প্রথার প্রচরণ করে। আর মানুষ তা এমনভাবে মেনে চলে যেমন খোদার আইন মেনে চলা উচিত- গ্রন্থকার।]

তারা বলে, এসব গবাদি পশু ও ফসল সংরক্ষিত। আমরা যাদেরকে খাওয়াই তারা ব্যতীত আর কেউ এ খেতে পারে না। এসব তাদের নিজেদের কল্পিত। আর কিছু পশু এমন আছে যার উপর সওয়ার হওয়অ ও তাদের দ্বারা মাল বচহন করা হারাম করা হয়েছে। আর কিছু পশু এমন আছে যাদের উপর তারা আল্লাহর নাম নেয় না, আল্লাহর প্রতি এ মিথ্যা আরোপ করে যে আল্লাহ তাদের উপর নাম নিতে নিষেধ করেছেন। … এবং তারা আরও বল, এসব পশুর পেটে যেসব বাচ্চা আছে তা আমাদের পুরুষের জন্যে নির্দিষ্ট ও নারীদের জন্যে হারাম। কিন্তু যদি তা মৃত হয় তাহলে নারী পুরুষ সকলেই তাতে অংশীদার। দেখ এই আট নর ও মাদী। দুই ভেড়া শ্রেণীর আর দুই ছাগল শ্রেণীর। হে নবী! তাদের জিজ্ঞেস কর আল্লাহ কি তাদের নর জাতীয়কে হারাম করেছেন, না মাদী বা স্ত্রী জাতীয়কে। অথবা ওসব বাচ্চা যা ভেড়া এবং ছাগলের পেটে আছে? যথার্থ ও নির্ভুল জ্ঞানের ভিত্তিতে আমাকে বল যদি তোমরা সত্যবাদী হও। এবং এমনিভাবে উটের দুই প্রকার আছে এবং গাভীর দুই প্রকার। এদেরকে জিজ্ঞেস কর, এদের নর আল্লাহ হারাম করেছেন না মাদী? অথবা সে বাচ্চা যা উটনী ও গাভীর পেটে আছে? তোমরা কি সে সময় উপস্থিত ছিলে যখন আল্লাহ এসব হারাম হওয়ার হুকুম তোমাদের দেন? তারপর সে ব্যক্তি অপেক্ষা জালেম আর কে হবে যে আল্লাহর প্রতি আরোপ করে মিথ্যা কথা বলে, যাতে জ্ঞান ছাড়াই মানুষকে ভ্রান্ত পথে চালানো যায়। নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন জালেমদের সুপথ দেখান না। (আয়াত: ১৩৬-৪৪)

২. বড়লোক ও নেতাদের ভ্রান্ত অনসরণ

পূর্ব পুরুষের অন্ধ অনুসরণের কাছাকাছি গোমরাহীর আর একটি কারণ কুরআন চিহ্নিত করেছে যা মানুষকে উচ্ছৃংখল ও সমাজকে বিনষ্ট করতে তার চেয়ে কোনদিক দিয়ে কম নয়। তা হচ্ছে আপন জাতির অথবা দুনিয়ার বড়োলোক, নেতা, ধর্মীয় গুরু এবং ধনী সমাজপতিদের অনুসরণ। তারা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এ চিন্তা না করে শুধু এ কারণে তাদের অনুসরণ করে দিয়েছে যে, কিয়ামতের দিন এ ধরনের অনুসারীগণ অনুতপ্ত হয়ে বলবে- হে আমাদরে প্রতি পালক! আমরা আমাদের সরদার ও বড়োলোকদের অনুসরণ করেছি এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রস্ট করেছে। হে আমাদের প্রভু! তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দাও  এবং তাদের উপর কঠিন অভিসম্পাত কর। (আল আহযাব: ৬৭-৬৮)

-হে আমাদের পরোয়ার দেগার! আমাদেরকে ঐসব জিন ও মানুষকে দেখিয়ে দাও যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। তাদেরকে আমরা পদদলিত করব যাতে তারা খুব হেয় ও লাঞ্ছিত হয়। (হামীম আসসাজদা: ২৯)

-(যখন আল্লাহ তায়ালা শাস্তি দেবেন) তখন এমন অবস্থা দেখা দেবে যে, দুনিয়ায় যেসব নেতা ও প্রধান ব্যক্তিকে অনুসরণ করাহতো, তারাই তাদের অনুসারীদের সাথে সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা ঘোষণা করবে। কিন্তু তারা শস্তি দেখতে পাবে এবং তাদের সকল উপায়-উপকরণের ধারাবাহিকতা ছিন্ন হয়ে যাবে। দুনিয়ায় যারা তাদের অনুসরণ করতো তারা বলবে, হায়! আবার যদি আমাদেরকে সযোগ দেয়া হতো, তাহলে আমরা ঐভাবে তাদের কাছ থেকে সরে পড়তাম যেভঅবে আজ তারা আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে সরে পড়ছে। আলআহ অবশ্যই তাদের সকল কাজকর্ম যা তারা এ দুনিয়াতে করছে- তাদের সামনে এমনভাবে নিয়ে আসবেন যে তারা শুধু লজ্জিত হবে ও দুঃখ প্রকাশ করবে। কিন্তু জাহান্নামের আগুন থেকে বেরুবার কোন পথ খুঁজে পাবে না। (বাকারা: ১৬৬-১৬৭)

-হায়, যদি তোমরা এসব জালেমের অবস্থা সে সময় দেখতে যখন তাদেরকে রবের সামনে দাঁড় করানো হবে এবং একে অপরের মুখোমুখী ঝগড়া করবে। যাদেরকে দুনিয়াতে দাবিয়ে রাখা হয়েছিল তারা বড়ো লোকদের বলবে, তোমরা না হলে আমরা মুসলমান হতাম। ওসব বড়ো লোকেরা দাবিয়ে রাখা লোকদের বলবে, আমরা কি তোমাদেরকে হেদায়েতে কুবল করতে বাধা দিয়েছিলাম যখন তা তোমাদের কাছে এসেছিল? তোমরা তো স্বয়ং অপরাধী ছিলে। দাবিয়ে রাখা লোকেরা বড়োলোকদের বলবে- না, বরঞ্চ তা ছিল রাতদিনের প্রতারণা, যখন তোমরা আমাদেরকে বলতে, -আমরা আল্লাহকে অস্বীকার  করবো এবং অন্যদেরকে তাঁর সমকক্ষ বানাবো। (সাবা: ৩১-৩৩)

এ বাস্তবতাকে কুরআন একটি বিশ্বজনীন আইন হিসাবে বর্ণনা করেছে যে, কোন সমাজকে যে জিনিস অবশেষে ধ্বংস করে তাহলে তার সচ্ছল অবস্থাপন্ন ও উচ্চশ্রেণীর লোকের নৈতিক অধঃপতন। কোন জাতির যখন দুর্ভাগ্য আসার সময় হয়, তখন তার ধনী ও প্রভাব প্রতিপত্তিশীল ব্যক্তিগণ পাপাচরে লিপ্ত হয়, অত্যাচার-উৎপীড়ণ, ব্যভিচার প্রভৃতি দুষ্কর্ম করতে শুরু করে, অবশেষে এ অনাচার দুষ্কৃতি গোটা জাতিকে ধ্বংস করে। কুরআন বলে:

(আরবী*****************)

-আমরা যখন জনপদ ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত করি, তখন তার সচ্ছল লোকদের হুকুম দিই এবং তাখন তারা সেখানে সব ধরনের পাপাচার করতে শুরু করে। তখন শাস্তির ফয়সালা সে জনপদের উপর কার্যকর হয়। আর আমরা তাকে ধ্বংস করে দিই। (বনী ইসরাইল: ১৬)

৩. গর্ব অহংকার

পথভ্রষ্টতার তৃতীয় গুরুত্বপূল্ণ কারণ যা কুরআন চিহ্নিত করে তাহলো এই য,  মানুষ সত্য কথা মানতে এজন্যৌ অস্বীকার করে যে, তার দৃষ্টি ভঙ্গী যে ভুল এ কথা স্বীকার করতে নিজকে হেয় মনে করে। অথবা সে এ কথা মমেন করে যে, এ সত্য যদি সে মেনে নেয় তাহলে পথভ্রষ্ট সমাজে তার যে উচ্চ মর্যাদা রয়েছে তা সে হারাবে। অথবা সে মনে করে যে নিজের কথাকে ছেড়ে দিযে অপরের কথা মেনে নেয়া তার উচ্চ মর্যাদার জন্যে হানিকর। তার কথা যতোই ভ্রান্ত হোক এবং অন্যের উপস্থাপিত কথা যতোই সত্য হোক না কেন।

পথভ্রষ্টতার এ কারণ কুরআন মজিদ বারবার মানুষের সামনে তুলে ধরেছে যাতে তার গর্ব অহংকার চূর্ণ হয়, যা সত্য গ্রহণে প্রতিবন্ধক হয়েছিল এবং ওসব গোমরাহীর পতাকাবাহীদের গোমরাহীর কারণ সে জানতে পারে যারা তার আপন যুগে অথবা অতীত যুগে হক পথের প্রতিবন্ধক ছিল।

দৃষ্টান্তস্বরূপ সূরায়ে নূহে হযরত নূহ (আ) এর এ উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে, হে আমার রব! আমি আমার জাতির লোকদেরকে দিবারাত্রি হকের দিকে আসার জন্যে ডেকেছি। আমপার আহ্বানের ফল এ হয়েছে যে তারা আরও দূরে সরে গেছে এবং যখনই আমি তাদেরকে হকের দিকে দাওয়াত দিয়েছি যাতে তুমি তাদেরকে মাফ করে দাও, তা তারা তাদের কাছে অঙ্গুলি ঠেসে দিযেছে, নিজেদের কাপড়ে মুখ ঢেকেছে, নিজেচদের আচার- আচরণে অবিচল রয়েছে এবং গর্ব অহংকার করেছে। (নূহ: ৬-৭) [অহংকারের অর্থ এই যে, তারা সত্যের কাছে মাথা নত করতে এবং খোদার রসূলের নসিহত মেনে নেয়াকে তাদের মানসম্মানের জন্যে হানিকর মনে করেছে। যেমন ধরুন, কোন ভালো মানুষ কোন নীতিভ্রষ্ট লোককে নসিহত করছে এবং সে তার জবাবে মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, মাটিতে ধপ্‌ধপ্‌ করে পা ফেলে চলে যাচ্ছে। এ হচ্ছে অহংকারের সাথে নসিহত প্রত্যাখ্যান করা –(গ্রন্থকার)

সূরায়ে মু’মেনে এ কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে যে, যখন ফেরাউন হযরত মূসাকে (আ) হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলো, তখন তার দরবারে এক সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি সহানুভূতি ও শুভাকাংখাসহ যুক্তিসংগত ভাষায় বুঝঅবার এবং ভ্রানন্ত আচরণ পরিহার করে সঠিক পথ অবলম্বনের উপদেশ দেয়। কিন্তু সে কায় কোন কান না দিযে আপন হঠকারিতায় অবিচল থাকে। এর পর্যালোচনা করে আল্লাহ বলেন-

(আরবী***********)

-এভাবে আল্লাহতায়ালা মোহর মেরে দেন প্রত্যেক অহংকারী ও অত্যাচারীর দিলেরউপর। -(মুমেন: ৩৫)

অর্থাৎ অহংকার ও অত্যাচার উৎপীড়নের হাওয়ায় যে দিল পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তার দুয়ার প্রতিটি উপদেশ বাণী ও সত্য কথার জন্যে বন্ধ হয়ে যায় এবং আল্লাহ অতঃপর তার উপর তাঁর অভিসম্পাতের মোহর এভাবে মেরে দেন য, কেউ তাকে সঠিক পথে আনার যতোই চেষ্টা করুক না কেন, সে কোনভাবেই দুরস্ত হয় না।

সূরায়ে আ’রাফে বলা হয়েছে যে, আল্লাহতায়ালা যখন হযরত মূসাকে (আ) কাষ্ঠ%ফলকের উপর হেদায়েতনামা লিখে দিলেন, তখন সেই সাথে সাবধান করে দিযে বল্লেন,- আমি আমার নিদর্শনগুলো থেকে তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেব, যারা কোন অধিকার ছাড়াই যমীনের উপর গর্ব অগংকার করে বেড়ায়। এসব লোক কোন নিদর্শন দেখলেও কখনো তার উপর ঈমান আনবে না। তাদের সামনে সঠিক পথ এলেও তারা তা অবলম্বন করবে না। যদি বক্র পথ তাদের নজরে পড়ে তাহলে তা অবলম্বন করবে। (আ’রাফ: ১৪৬)

সূরায়ে বাকারায় বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে যার কথা দুনিয়ার জীবনে তোমাদের খুব ভালো লাগে। সে তার নেক নিয়তের উপর বার বার আল্লাহর কসম করে। কিন্ত সে সত্যের বড়ো দুশমন। এসব কথা বলার পর যকন সে ফিরে যায় তখন তার সকল চেষ্টা চরিত্র এ কাজে নিয়োজিত হয় যে, কি করে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, ফসল ও মানব বংশ ধ্বংস করবে। অথচ আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টি পছন্দ করেন না এবং যখন তাকে বলা হয় আল্লাহকে ভয় কর, তার আত্মসম্মানবোধ তাকে পাপ কাজে সুদৃঢ় রাখে। (বাকারা: ২০৪-২০৬)

সূরায়ে মুদ্দাসসেরে স্বয়ং মক্কার একজন সর্দারের আচরণ পেশ করা হয়েছে। যে কুরাইশ সর্দারদেরকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল, তোমরা মুহাম্মদের (সা) উপর যে অভিযোগ আরোপ করছ তা সবই মিথ্যা। কুরআন এক অতি মিষ্টমধুর বাণী। তার মূল অতি গভীরে এবং তার শাখঅ প্রশাকা ফলবান। কিন্তু যকন সে এ প্রশ্নের সম্মুখীন হলো, “এ রসূল মিথ্যা আরোপ করে আমার সর্দারি জবায় রাখবো তখন  সে দ্বিতীয়টিকে অগ্রাধিকার দিল এবং নিজের মনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে অবশেষে এক অভিযোগ তৈরী করে ফেল্লো। কিন্তু তার মন জানতো যে, নিছক তার শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম রাখার জন্যে এক সুস্পষ্ট মিথ্যা সে আরোপ করছে। কুরআন তার এ চিত্র পেশ করে তার গোমর ফঅঁক করে দিচ্ছে:

-সে চিন্তা করলো এবং কিছু কথা বানাবার চেষ্টা করলো। হ্যাঁ কোদার মার তার উপর, সে কেমন কথা বানাবার চেষ্টা করলো পরে লোকদের প্রতি তাকালো। তারপর কপাল সংকুচিত করলো ও মুখ বাঁকা করলো। পরে ফিরে গেল এবং অহংকারের ফাঁদে পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত বল্লো, এ কিছু নয়, শুধু যাদু মাত্র। আর এ পূর্ব থেকেই চলে আসছে। এতো এক মানবীয় কালাম। (মুদ্দাসসের: ১৮-২৫)

৪. দুনিয়ার সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতাকে ভালো ও মন্দের মানদন্ড মনে করা

অতঃপর কুরআন বলে যে, গোমরাহীর আর একটি বড়ো কারণ এ ধারণা যে, দুনিয়ায় যে ফল প্রকাশ হয় তাই ভালো ও মন্দের মানদন্ড। এখানে যদি কেউ সচ্ছল হয়, এবং তার সচ্ছলতা কোন অপকর্মের কারণে হলেও সে সার্থক ও সাফল্যমন্ডিত। আর এখানে যে দুস্থ এবং তারপর দুস্থতা কোন সৎ কর্মসহ হলেও সে অকৃতকার্য। অর্থাৎ মংগল তাই যার পরিণাম এখানে প্রকাশ্যতঃ ভালো দেখা যাচ্ছে এবং অমংগল তাই যার পরিণাম এখানে প্রকাশ্যতঃ মন্দ দেখা যাচ্ছে। এটা দেখা হচ্ছে না য, এ প্রকাশ্য মংগলের পশ্চাতে কতটা অবৈধ জীবিকা এবং দুষ্কর্ম রয়েছে। আর ঐ প্রকাশ্য অমংগলে পশ্চাতে কতটা সৎকর্ম ও চারিত্রিক উন্নত মানের সম্পদ রয়েছে। কুরআন এ ভ্রান্ত দৃষ্টিকোণের দৃষ্টান্ত অতীত ইতিহাস থেকেও পেশ করেছে এবং স্বয়ং মক্কা ও আরবাসীর কথাবার্তা ও আচরণেও তা সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেছে।

হযারত নূহের (আ) কাহিনীতে বলা হয়েছে যে, তাঁর জাতির সমাজপতিগণ এ কথা বলে তাঁর শিক্ষা ও হেদায়েত কবুল করতে অস্বীকার করে যে, তার প্রতি যারা ঈমান এনেছে তারা ছিল গরীব এবং সামাজে তাদের কোন উচ্চ মর্যাদা ছিল না।

(আরবী************)

-তারা বল্লো, আমরা কি তোমাকে মেনে নেব, যেহেতু তোমার আনুগত্য অতি নিম্নশ্রেণীর লোকেরা মেনে নিয়েছে? (আশ শুয়ারা: ১১১)

হযরত সালেহ (আ) এর কাহিনীতেও এ কথার সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, তাঁর জাতির ধনী ও প্রবাবশালী লোকেরা তাঁর গরীব অনুসারীদেরকে জিজ্ঞেস করে-

(আরবী**************)

তোমরা কি সত্যি সত্যি জান যে, সালেহ তাঁর প্রবুর পয়গম্বর?

তারা জবাব দেয়- (আরবী*******************)

আমরা তো সেই জিজিনসের উপর ঈমান এনেছি যা সহ তিনি প্রেরিত হয়েছেন।

জবাবে বড়ো লোকেরা বলে-

(আরবী*************)

-আমরা সে জিনিস মানি না যার ‍উপর তোমরা ঈমান এনেছ। (আ’রাফ: ৭৫-৭৬)

অর্থাৎ তোমাদের মতো নিম্নশ্রেণীর লোক যে জিনিস মেনে নিয়েছ তা আমরা মানি না।

সকল নবীর সম্পর্কে কুরআন এ কথা বলে যে, তাঁদের বিরোধিতা করেছে, তাঁদের জাতির সচ্ছল লোকেরা এবং তাদের দৃষ্টিকোণ এই ছিল যে, দুনিয়ায় খুব ধন সম্পদ ও সন্তানাদি লাভের সৌভাগ্য যার হয়েছে সেই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত।

(আরবী*************)

-এবং কখনো এমন হয়নি যে আমরা কোন জনপদে কোন সাবধানকারী পাঠিয়েছি এবং সে জনপটদের সচ্ছল লোকেরা এ কথা বলেনি যে, যে পয়গামসহ তোমাকে পাঠানো হয়েছে তা আমরা মানি না এবং তারা বলে, আমরা তো তোমাদের অপেক্ষা অধিক ধনসম্পদ ও সন্তানের মালিক এবং আমরা কখনো শস্তিভোগকারী নই। (সাবা: ৩৪-৩৫)

রসূরুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের যামানায় মক্কা ও আরবের কাফেরদের এই ছিল চিন্তা পদ্ধতি। তা যে ভ্রান্ত ছিল এ কথা কুরআন বারবার উল্লেখ করেছে।

সূরায়ে মরিয়ামে বলা হয়েছে, এদেরকে যখন আমাদের সুস্পষ্ট আয়াত শুনানো হয় তখন কাফেরগণ ঈমানদারদেরকে বলে, বল দেখি আমাদের দু’দলের মধ্যে কোনটি ভালো অবস্থায় আছে এবং কার বৈঠকাদি জাঁকজমপূর্ণ?

অথচ এদের পূর্বে এরূপ কত জাতি আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি যারা এদের চেয়ে অধিক সম্পদশালী ছিল এবং প্রকাশ্য জাঁজকমে এদের চেয়ে অগ্রগামী ছিল। (মরিয়ম: ৭৩-৭৪)

সূরায়ে মুমেনূনে বলা হয়েছে, এরা কি মনে করে যে, তাদেরকে আমরা ধনদৌলত ও সন্তানাদি দিয়ে সাহায্য করে যাচ্ছে, তাকি আমরা তাদের কল্যাণ বিধানের জন্যেই করছি? না, তা নয়, প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে এদের কোন চেতনাই নেই। প্রকৃতপক্ষে যারা নিজেদের খোদার ভয়ে ভীত হয়ে থাকে, যারা তাদের খোদার আয়াতসমূহের প্রতি ঈমান আনে, যারা নিজের খোদার সাথে কাউকে শরীক করে না এবং যাদের অবস্থা এই যে, তারা যখন দেয়- যা কিছুই দেয়- এ চিন্তায় তাদের অন্তর কাঁপতে থাকে যে, তাদেরকে তাদের খোদার নিকট ফিরে যেতে হবে, তারাই কল্যাণের দিকে দ্রুত অগ্রসর ও অগ্রসর হয়ে তা লাভ করবে। (আয়াত: ৫৫০৬১)

এ কথা বুঝবার জন্রে সূরা ফজরে প্রওথমে আদ, সামূদ ও ফেরাউনের মতো অতি উন্নত জাতিসমূহের ও সাম্রাজ্যগুলোর সীমালংঘন ও খোদাদ্রোহিতার বর্ণনা করেছে এবং তারপর বলেছে যে, মানুষ এখনও এ ভ্রান্ত ধারণায় মগ্ন রয়েছে যে, দুনিয়ার নিয়ামত ও দৌলতই প্রকৃত সম্মান এবং এখানকার দারিদ্র ও আর্থক অনটনই প্রকৃত অসম্মান। অথচ সম্মান ও অসম্মানের মানদন্ড নয়। (ফজর : ১৫-১৬)

৫. প্রবৃত্তির লালসা ও আন্দাজ-অনুমান অনুযায়ী চলা

গোমরাহীর কারণসমূহ বলতে গিযে কুরআন আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাণ চিহ্নিত করছে এবং তা হচ্ছে এই যে, মানুষ নিছক অনুমান আন্দাজ করে কোন বস্তুকে হক এবং কোনটাকে বাতিল মনে করে বসে। অথবা নিজের প্রবৃত্তিকে খোদা বানিয়ে তার এমন বন্দেগী করে যে, সে দিকেই সে ইচ্ছাকে সে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায। কিন্তু খোদাপ্রদত্ত পথকে অবলম্বন করেছে অথবা নিজের প্রবৃত্তি অনসরণে যে পথে সে চলেছে তা সঠিক ও যুক্তিসংগত কি না, এ ভুলের জন্যে কুরআন বার বার মানুষকে সাবধান করে দিয়েছে যাতে সে আন্দাজ-অনুমান ও প্রবৃত্তির উপত্যকায় পথ হারিয়ে ঘুরাফেরা করার পরিবর্তে বিবেক ও জ্ঞানের সরল পথে আসে।

সূরা আ’রাফ এক ব্যক্তির দৃষ্টান্ত পেশ করা হযেছে, যে জ্ঞান রাখা সত্ত্বেও প্রবৃত্তির দাসত্ব করতে গিয়ে দুনিয়ার কুকুরে পরিণত হয়ে থাকে। অতঃপর তার মতো লোকদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলা হয়, আমরা বহু জ্বিন সও মানুষকে জাহান্নামের জন্যেই পয়দা করেছি। তাদের মন আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা চিন্তা করে না। তাদের চোখ আছে, তা দিয়ে দেখে না। কান আছে, কিন্তু শুনে না। তারা পশুর ন্যায়। বরঞ্চ তার চেয়েও অধম। এরা ঐসব লোক যারা অবহেলা অসাবধানতার নিদ্রায় নিমগ্ন হয়ে আছে। (আয়াত: ১৭৩-১৭৯)

সূরা আনফালে ওসব লোকের উল্লেখ কর হয়েছে যারা সব কিছু শুনার পরও যেন কিছুই শুনতো না। তারপর বলা হয়েছে, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর নিকটে তাঁর সমগ্র প্রাণবস্তু সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্টতম সৃষ্টি সেসব বোবা ও বধির লোক যারা বুদ্ধি-বিবেক কাজে লাগায় না। (আয়াত: ২২) বোবা ও বধিরের অর্থ দৈহিক দিক দিয়ে বোবা ও বধির নয়। বরঞ্চ ওসব লোক, যারা না হক কথা শ্রবণ করে আর না হক কথা বলে।

যেসব দেবদেবীদেরকে মুশরিকগণ খোদায়ীতে বিশ্ব প্রভুর শরীক বানিয়ে রেখেছে তাদের মধ্যে কেউই খোদায়ী গুণাবলী ও এখতিয়ার রাখে না, সূরা ইউনুসে ৩১ থেকে ৩৫ আয়াত পর্যন্ত একটি একটি করে তার যুক্তি প্রমাণ পেশ করার পর পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, কোন জ্ঞানের ভিত্তিতে তাদেরকে খোদা বানানো হয়নি। বরঞ্চ নিছক আন্দাজ-অনুমান করে মানুষ এটা মনে করে রেখেছে যে, তারাও খোদায়ীতে কিছু অংশ রাখে। এদের মধ্যে অধিকাংশ লোক আন্দাজ-অনুমান ব্যতীত কোন কিছু অনুমান করে না। বস্তুতঃ আন্দাজ-অনুমান হকের কোন প্রয়োজনই পূরণ করে না। (আয়াত: ৪৬)

সূরা হজ্বে অতীতের ভ্রান্ত চাতিসমূহের ধ্বংসাবশেষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, এসব লোক কি যমীনে চলাফেরা করে দেখেনি যে, (তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের ধ্বংয়সাবশেষ দেখে) তাদের দিল বুঝতে পারতো এবং কান শুনতে পারতো? প্রকৃত পক্ষে চোখ অন্ধ হয় না, বরঞ্চ সে দিল অন্ধ হয় যা বক্ষে থাকে। (আয়াত: ৪৬)

এভাবে সূরা ফুরকানে নূহের জাতি, আদ, সামুদ, আসহাবে রাস, ফেরাউন জাতি ও লত জাতির পরিণামের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর রসুলুল্লাহকে (সা) সম্বোধন করে বলা হয়েছে, তুমি কি ঐ ব্যক্তির চিন্তা করে দেখেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে তা খোদা বানিয়ে নিয়েছে? এমন লোককে সৎ পথে আনার দায়িত্ব কি তুমি নিতে পার যে, তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ লোক শুতে পায় এবং বিবেক কাজে লাগায়? এরা ত পশুর মতো বরঞ্চ তার চেয়েও নিকৃষ্ট। (আয়াত: ৪৩-৪৪)

এ কথা সূরা জাসিয়াতেও বলা হয়েছে, হে নবী তুমি কি কখনো ঐ ব্যক্তির অবস্থা চিন্তা করে দেখেছ যে, নিজের প্রবৃত্তিকেই তার খোদা বানিয়ে নিয়েছে এবং জ্ঞঅন থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে গোমরাহীতে নিক্ষেপ করেছেন? তার দিল ও কানে মোহর মেরে দেয়া হয়েছে এবং তার চোখের উপর আবরণ দেয়া হয়েছে। এখন আল্লাহ ছাড়া আর কে আছে যে তাকে হেদায়েত দিবে? (আয়াত: ২৩)

৬. মন্দকে সৌন্দর্য মনে করা এবং অসত্যের মধ্যে মগ্ন থাকা

আর একটি বিষয় যাকে কুরআন সমাজের গোমরাহীর বড়ো কারণ গণ্য করে তা এই যে, মানুষ মন্দ কাজকে ভালো মনে করতে থাকে। সত্যের বিরুদ্ধে চলতে গিয়ে কোনরূপ মানসিক অস্বস্তি অনুভব করেনি। বরঞ্চ উল্টো তাতে মগ্ন হয়, এতে গৌরব বোধ করে এবং সত্যকে জানার কোন প্রয়োজনই বোধ করে না। বস্তুতঃ সূরা ফাতেরে বলা হযেছে, যে ব্যক্তির মন্দ কাজগুলোকে সুন্দর ও চাকচিক্যময় বানিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তা সে ভালো মনে করে, তার গোমরাহীর কোন শেষ আছে কি? (আয়াত: ৮)

আর সূরা মুমেনে বলা হয়েছে, জাহান্নামে যখন মানুষকে শাস্তি দেয়া হতে থাকবে তখন তাদেরকে বলা হবে, এ পরিণাম তোমাদের এ জন্যৌ হয়েছে যে, তোমরা দুনিয়ায় অসত্যে মগ্ন ছিলে এবং তার জন্যে গৌরববোধ করতে। (আয়াত: ৭৫া)

৭. এরূপ ধারণা যে সৎ কাজ ও সত্য নিষ্ঠার ফলে মানুষের দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যায়

কুরআন মজিদ এ ধারণাকেও গোমরাহীর বড়ো কারণ বলে উল্লেখ করেছে। সূরা আ’রাফে আছে, যখন হযরত ‍শুয়াইব (আ) তাঁর জাতিকে ওজন কম দেয়া, কাফেলা লুট করা এবং রাহাজানি করা থেকে বিরত থাকতে বল্লেন তখন জাতির সমাজপতিগণ লোকদেরকে বল্লো-

(আরবী************)

-তোমরা যদি শুয়াইবের কথা মেনে চল, তাহলে নিশ্চিতরূপে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। (আয়াত: ৯০) যেন তাদের এ কথা বলার অর্থ এই ছিল যে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ঈমানদারি করতে গেলে ব্যবসা চলে? আর আমরা যে বাণিজ্যিক কাফেলার পথে বাস করি, ত রাহাজানি যদি না করি এবং পথ বিপদসংকুল করে কাফেলাগুলোর নিকট থেকে মোটা টোল আদায় না করি তাহলে আমাদের এ আর্থিক সমৃদ্ধি কিভাবে বহাল থাকতো? একথাই কুরাইশ সর্দারগণ নবী (সা) কে বলতো।

(আরবী**************)

-যদি আমরা তোমার সাথে এ হেদায়েত মেনে চলি, তাহলে যমীন থেকে আমাদেরকে ছোঁ মেরে উৎপটিত করা হবে। (কাসাস: ৭৫) অর্থঅৎ আমাদের যা কিছু প্রভাব প্রতিপত্তি আরববাসীর উপর আছে তা এ কারণে যে, এখানে আমরা আরবের মুশরিকদের ধর্মীয় নেতা হযে রয়েছি। এ কারণেই আমাদের ব্যবসা এতো সমৃদ্ধ। এ কারণেই আমাদের কাফেলাগুলের দেশের সকল পথ প্রান্তরে নিরাপত্তা রয়েছে। আর এ কারণেই আরবের সকল উপজাতি আমাদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আমরা যদি তোমার কথা মেনে নিয়ে সে পথ অবলম্বন  করি, যা তুমি পেশ করছ, তাহলে ত সমগ্র আরব আমাদের বিরোধী হয়ে যাবে। যে মর্যাদা দেশে আমাদের রয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে এবং মক্কাতেও নিরাপদে থাকা সম্ভব হবে না।

৮. শাফায়াতের মুশরেকী ধারণা

প্রাচীনতম কাল থেকে সকল যুগে এ গোমরাহীর একটি বড়ো কারণ ছিল এবং আরবে যখন ইসলামী দাওয়াতের সূচনা হলো, তখন তাকে এ গোমরাহীর সম্মুখীন হতে হলো। মানুষ মনে করতো যে, আল্লাহর কিছু প্রিয় বান্দাহ এমন আছেন, যাদের কথা কিছুতেই টলানো যাবে না। তাঁদের আঁচল যদি মানুষ শক্ত করে ধরে, নযর-নিয়ায ও পূজাপাট দিয়ে তাদেরকে তুষ্ট করে, তাহলে তারপর দুনিয়ায় যা খুশী তাই করা যায়। তাঁদের সুপারিশ মানুষকে সকল অপরাধ ও গুনাহ থেকে রক্ষা করবে। আললাহর মেহেরবাণী হাসিল করার এবং মনের বাসনা পূরণ করার এমন সহজ পন্থা, বিদ্যমান থাকতে কার কি গরজ পড়েছে যে, তাকওয়া পরহেজগারীর বেড়ি পায়ে লাগিয়ে প্রতিটি গোনাহের স্বাদ ও প্রত্যেক জুলুম ও বাড়াবাড়ির সুযোগ-সুবিধা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে? আরবের কাফেরগণ বলতোঃ

(আরবী**************)

-আমরা ত তাদের এবাদত এ জন্য করি যে, তাঁরা আল্লাহ পর্যন্ত আমাদেরকে পৌঁছিয়ে দেবেন। (যুমার: ৩) অর্থাৎ আল্লাহর দরবার এতোট উঁচুতে যে সরাসরি সে পর্যন্ত পৌঁছার শক্তি আমাদের কোথায়? এ জন্যে এসব বুযুর্গ ব্যক্তিকে ঐ পর্যন্ত আমদেরকে পৌঁছাবার জন্যে মাধ্যম বানিয়েছি।

(আরবী**********)

এঁরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারী। (ইউনুস: ১৮)

এ ভ্রান্ত আকীদাহ বিদ্যমান থাকতে নেক কাজের ও কল্যাণের কোন দাওয়াত সফল হতে পারে না। এ জন্যে কুরআনে বারবার এর উপর আঘাত করা হয়েছে এবং এর ভিত্তিহীন হওয়া এমন যুক্তিসহ প্রমাণ করে দেয়া হয়েছে যে, কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে এ ধরনের নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ শাফায়াত সমর্থন করা আর সম্ভব রইলো না।

সূরা মুমেনে বলা হয়েছে- হে নবী! এসব লোককে সে দিনের ভয় দেখাও যা নিকটবর্তী। যখন কলিজা মুখের নিকটে এসে যাবে, আর চুপচাপ দুঃখ হজম করে দাঁড়িয়ে থাকবে। কেউ  জালেমদের দরদী বন্ধু হবে না। আর না এমন কোন শাফায়াতকারী যার কথা মেনে নেয়া হবে। আল্লাহর চাহনীর চুরিও জানেন, আর সে গোপন কথাও যা বুকের তলায় লুকানো রয়েছে। আল্লাহ নিরপেক্ষ ও সঠিক ফয়সালা করবেন। আর এ মুশরিকরা খোদাকে বাদ দিয়ে যাদেরকে ডাকে, তারা ত কোন কিছুরই ফয়সালা করবে না। বস্তুতঃ আল্লাত সবকিছু শুনেন ও জানেন। (আয়াত: ১৮-২০)

এ আয়াতগুলো শাফায়াতের এ মুশরেকী ধারণা বিশ্বাসকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। প্রথমে ত এ কথা বিবেক ও সুবিচারোর পরিপন্থী যে, জালেমের সুপারশ করা হবে তারপর এ খোদার খোদায়ী শানেরও পরিপন্থ যে, তাঁর বান্দহদের মধ্যে কেউ এমন সুপারিশকারী হবে যা রকথা মানতে হবে। অর্থাৎ কোদা তার সুপারিশ মানতে বাধ্য হবেন। এর চেয়ে বড়ো কথা এই যা ধারণাও করা যেতে পারে না, যে খোদার নিকটে এমন সব লোকের সুপারিশ চলবৈ যারা দুনিয়ায় জুলুম করে আসা অপরাদীদের সমর্থনে দাঁড়াবে এবং এটা চাইবে যে, খোদা তাদের খাতিরে জালেম অপরাধীকে মাফ করে দিবেন। এর চেয়েও বড়ো কথা এই যে, একজন বিচারক যিনি কোন ব্যক্তির অপরাধ সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকেফহাল এবং যাঁকে ইনসাফের সাথে তার মামলার ফয়সালা করত হবে, তিনি এমন লোককে তার (অপরাধীর) সুপারিশের অধিকার দিবেন যে জানই না যে, সে ব্যক্তি (অপরাধী) কি করে এসেছে।

অন্যত্র এ শাফায়াতের ধারণা শক্তিশালী যুক্তিসহ খন্ডন করা হয়েছে। বলা হয়েছ, আল্লাহকে বাদ দিয়ে এসব লোক যাদেরকে ডাকছে তারা সুপারিশের কোন অধিকারই রাখে না। তবে কেউ জ্ঞানের ভিত্তিতে সত্যের সাক্ষ্য দিলে সে ভিন্ন কথা। (যুখরুফ: ৮৬)

অর্থাৎ যে ব্যক্তি কোন দেব-দেবীর অথবা বুযুর্গ সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করে যে, তাদের অবশ্যই শাফায়াতের অধিকার আছে এবং তাদের এমন শাফায়াতের এখতিয়ার আছে যা খন্ডন করা যায় না, তাহলে তার সামনে আসা উচিত এবং এলমের ভিত্তিতে এ বিষয়ে সত্য সাক্ষ্য দেয়া উচিত। শুধু কিংবদন্তী অথবা আন্দাজ-অনুমানের উপর নির্ভর করে এমন এক আকীদাহ মেনে নেয়া একেবারে অর্থহীন যার সত্য হওয়া সাক্ষ্য ইলমের ভিত্তিতে দেয়া যায় না। অন্য কথায়, যারা কতিপয় সত্তার জন্যে এ ধরনের এখতিয়া আছে বলে দাবী  করেন তারা কখনো এ কথা বলতে পারে না- “আমরা জানি যে তাদের এ এখতিয়ার আছে এবং আমরা সঠিক সাক্বষ্য দিচ্ছি।”

কিন্তু কুরআন শাফায়াত অস্বীকারও করেনি। বরঞ্চ বারবার এ কথা বলেছে যে, শাফায়অত শুধু সে করতে পারে আল্লাহ যাকে অনুমতি দিয়েছেন এবং শুধু তার সপক্ষেই শাফায়াত করতে পারে যার জন্যে শাফায়াত শুনতে আল্লাহ রাজী হন। এর অতিরিক্ত শর্ত এই যে, সে ব্যক্তি হক অনুযায়ী শাফায়াত করবে এবং হক ও ইনসাফের বিপরীত কোন কথা বলবে না। তারপরও শাফায়াত কবুল করা না করা আল্লাহর এখতিয়ারে রয়েছে। কারো শাফায়অত মানতে  তিনি কখনো বাধ্য নন। এ বিষয়ে কুরআনের বিশদ বিবরণ নিম্নরূপ:-

(আরবী****************)

-কে আছে এমন যে তাঁর সামনে তাঁর সামনে তার অনুমতি ব্যতিরেকে শাফায়াত করতে পারবে? (বাকারা: ২৫৫)

(আরবী**************)

-এবং তার সামনে শাফায়াত কোন কাজে লাগবে না ঐ ব্যক্তি ছাড়া যার জন্যে তিনি অনুমতি দিয়েছেন। (সাবা: ২৩)

(আরবী***************)

-যে দিন রূহ (হযরত জিব্রাইল (আ) এবং ফেরেশতাগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াবে। কেউ কথা বলবে না শুধু সে ব্যতীত যাকে রহমান অনুমতি দিয়ে থাকবেন এবং সে ঠিক কথা বলবে। (নাবা: ৩৮)

(আরবী*****************)

-হে নবী! বল যে শাফায়াত সবটাই আল্লাহর এখতিয়ার। আসমান ও যমীনের বাদশাহী তাঁরই। যুমার: ৪৪)

অর্থঅৎ শাফায়অত শুনা অথবা না শুনা তা কবুল করা অথবা প্রত্যাখ্যান করা বিলকুল আল্লাহর এখতিয়ারে। তিনি বিশ্বজগতের বাদশাহীর মালিক। কারো সাধ্য নেই যে, তার অনুমতি ছাড়া শাফায়াত করে এবং কারো এ মর্যাদা নেই যে, তার শাফায়াত আল্লাহকে অবশ্যই শুনতে ও মানতে হবে।

মানব ইতিহাস থেকে ভালো ও মন্দ আচরণের দৃষ্টান্ত

গোরাহীর যে কারণের বিস্তারিত বিবরণ কুরআন পেশ করেছে কুরাইশ ও আরব সমাজে তা সবই বিদ্যমান ছিল। তাদের এক একজন যখন এব কথা শুনতো, তখন তারা উপলব্ধি করতো যে, প্রকৃতপক্ষে তাদের মধ্যে গোমরাহীর এ সমুদয় কারণই বিদ্যমান ছিল। তারপর কুরআন মজিদে মানবীয় ইতিহাস থেকে এক ইকটি করে এমন চরিত্র ও আচরণের দৃষ্টান্ত পেশকরা হয় যা ছিল উন্নতমানের এবং এমন আচরণের দৃষ্টান্তও তুলে ধরা হয়, যা ছিল নিকৃষ্টমানের যাতে লোক ভালোভাবে বুঝতে পারে যে, ইসলামকোন ধরনের মানুষ তৈরী করতে চায়। আর কোন ধরনের মানুষ তার অপছন্দনীয়যার সংশোধন হওয়া উচিত। অথবা তাদের অস্তিত্ব থেকে সমাজকে পবিত্র করে ফেলা উচিত। অথবা শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং যাদেরকে তার গজবের পাত্র বানিয়ে এ দুনিয়অতে ধ্বংস করে দিয়েছেন। কুরআনের এ বিবরণ ধারাবাহিকভাবে ঐতিহাসিক ক্রমানুসারে আলোচনা করে দেখা যাক।

আদম (আ) এ দুই পুত্রের ঘটনা

সর্বপ্রথম যে শিক্ষণীয় ঘটনা মানব ইতিহাসে পাওয়া যায় তা হযরত আদম (আ) এর দুই পুত্রের ঘটনা। যার মধ্যে দু’ধরনের আচরণ একে অপরের মুকাবিলায় দেখতে পাওয়া যায়। দু’ভাই কুরবানী করছেন। একজনের কুরবানী কবুল করা হয় অপর জনের কবুল করা হয় না। দ্বিতীয় জন হিংসায় ক্রুদ্ধ হয়ে আপন বাইকে বলে আমি তোমাকে মেরে ফেলবো। তার ভাই বলে, আল্লাহ ত খোদাভীরুদের কুরবানী কবুল করে থাকেন। (অর্থাৎ তোমার কুরবানী কবুল না হওয়ার জন্যে আমি দোষী নই। তুমি তোমার চরিত্র ও কাজ কর্মের ত্রুটি দূর করার চেষ্টা কর  যে, কারণে তোমার কুরবানী কবুল হয়নি) কিন্তু তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়ে থাক, আমি তোমাকে হত্যা করব না। কারণ আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে ভয় করি। তোমার সাথে মারামারি করে তোমার সাথে অন্যায় খুনের গোনাহে শরীক হওয়ার পরিবর্তে আমি এ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেব যে আমার এবং তোমার নিজের গোনাহ তুমি স্বয়ং একত্র করে নেবে।

অবশেষে সে জালেম ভাই তার আপন ভাইকে হত্যা করলো। তারপর খুব অনুতাপ করলো।

এ ঘটনা বর্ণনা করার পর এমন এক পরিবেশে যেখানে মানুষের জীবনের কোন মূল্য ছিল না  এবং খুন খারাবী যেখানকার দৈনন্দিন ঘটনা ছিল, কুরআন কত মহান কথা মানুষকে শুনায়। কুরআন বলে, যে ব্যক্তি কাউকে খুনের বদলায় খুন করা ছাড়া অথবা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কোন কারণে খুন করলো, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে খুন করলো। আর যে ব্যক্তি কোন একটি রক্ষা করলো সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন দান করলো। (মায়েদা: ২৭-৩২ দ্রঃ)

হযরত নূহ (আ) ও তাঁর জাতি ইতিহাসে প্রথম যে জাতি দুনিয়ার খোদাদ্রোহিতার ঝড় প্রবাহিত করেছিল সে ছিল হযরত নূহের (আ) জাতি। কুরআনের কয়েক স্থানে সে জাতির কাহিনী বর্ণনা করে একদিকে সে জাতি ও তার সর্দারদের আচরণ বর্ণনা করেছে যার দরুণ শেষে তারা সকলে শাস্তিভোগ করেছে, অপরদিকে স্বয়ং হযরত নূহের (আ) আচরণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করেছে। সূরা আনকাবুতে বলা হয়েছে যে, চরম বিরোধিতার মুকাবিলায় সাড়ে ৯শ বছর পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও সহনশীলতাসহ সে জাতির সংশোধনের চেষ্টা করতে থাকেন (আয়াত: ১৪) তিনি যথাসম্ভব উপায়ে অত্যন্ত দরদসহ মানুষকে সঠিক পথ প্রদর্শনে কোন ত্রুটি করেননি। কিন্তু জাতির সর্দারেরা তাঁর কোন চেষ্টাই সফল হতে দেয়নি। (সমগ্র সূরা নূহ) তাঁকে পাগল বলা হয়েছে এবং তার তিরষ্কার ভর্ৎসনা করা হয়েছে। (কামার: ৯) তাঁকে ও তার গরীব অনুসারীদেরকে হেয় অপদস্থ করা হয়েছে। (হুদ: ২৭) তাঁকে এই বলে ভয় দেখানো হয যে, যদি তুমি বিরত নাহও, তাহলে তোমাকে প্রস্তরাঘাতে নিহত করা হবে। (শুয়ারা: ১১৬) কিন্তু তিনি দৃঢ় কন্ঠে বল্লেন, আমার অস্তিত্ব ও নসিহত যদি তোমাদের অসহনীয় হয় তাহলে আমার বিরুদ্ধে যা কিছু করতে চাও কর, আমাকে অবকাশ দিও না। আমার ভরসা আল্লাহর উপর রয়েছে। (ইউনুস: ৭১) তাপর দ্বন্দ্ব যখন চরম আকার ধারণ করলো তখন তার জাতি বল্লো, তুমি যে তুফপানের ভয় আমাদরে দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। বস্তুত, হযরত নূহ (আ) তাদরে চোখের সামনে সে নৌকা বানাতে শুরু করলেন-যাতে আরোহন করে তিনি এবং তার সাথে ঈমানদারগণ আগামী তুফান থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জাতি তাঁর নৌকা নির্মাণ করা দেখে ঠাট্টা বিদ্রূপ করতে লাগলো। তারা  বলতো, বড়ো মিয়ার পাগলামি শেষ পর্যন্ত ডাঙ্গায় জাহাজ চালাবার প্রস্ততি নিচ্ছিল। তাদের জানা ছিল না যে অতি শীঘঢ়্রই এ ডাঙ্গা এমন এক সমুদ্রে পরিণত হবে যে তার একটি তরংগ পাহাড়ের মতো হবে। তার মধ্যে নূহের (আ) পুত্রসহ গোটা জাতির লোক নিমজ্জিত হয়ে প্রাণ হারাবে। আর যমীনের উপর রাখা নৌকা জুদি পাহাড়ে গিয়ে লাগবে। (হুদ: ৩২-৪৪)

এ কাহিনীর শেষ পর্যায় এভাবে পেশ করা হয়েছে যে, হযরত নূহ (আ) যখন কাফেরদের সাথে তাঁর পুত্রকেও ডুবতে দেখলেন, তখন মানবীয় স্নেহ বাৎসল্যে অভিভূত হয়ে তাকে বাঁচাবার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করেন। আল্লাহ ধমক দিয়ে বলেন, জাহেল হয়ো না। এ তোমার পুত্র বটে; কিন্তু তোমার পরিবার ভুক্ত নয়। বরং এমন আল যা নেক নয়। হযরত নূহ (আ) তাঁর দোয়ার জবাব শুনার সাথে সাথে ক্ষমা ভিক্ষা করেন এবং বলেন, হে আমার পরোয়ারদেগার! আমি এর থেকে তোমার আশ্রয় চাই যে, যার জ্ঞঅন আমার নেই তাই তোমার কাছে চাই। যতি তুমি আমাকে মাফ না কর, তাহলে আমি ধ্বংস হয়ে যাব। (হুদ: ৪৪-৪৭)

আদ জাতি ও হযরত হুদ (আ)

আরবের বিখ্যাত জাতি আদ, যার সম্পর্কে আরবের শিশুরা পর্য়ন্ত ওয়াকেফহাল ছিল। তাদের সম্পর্কে মানুষ এটাও জানতো যে, তারা খোদার আজাবে ধ্বংস হয়েছিল। এদের প্রসঙ্গে কুরআন বলে শির্ক ও মুর্তি পূজার সাথে তাদের মধ্যে চারিত্রিক দোষ কি ছিল। সূরা হামীম আসসাজদায় আছে, তারা যমীনের উপরে কোন অধিকার ব্যতীতই অহংকারে মেতেছিল এবং বলতো, আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে? (আয়াত: ১৫)। সূরা ফজরে আছে, তারা দুনিয়ায় খোদাদ্রোহিতা করেছে এবং বহু ফাসাদ সৃষ্টি করেছে। (আয়াত: ৬-১২ দ্রঃ) সূরা শুয়ারায় আছে, হযরত হুদ (আ) তাদেরকে বলেন, তোমাদের এ কি আচরণ যে প্রত্যেক উঁচু জায়গায় তোমরা এক স্মারণক অট্টলিকা নির্মাণ কর এবং বিরাট বিরাট প্রাসাদ তৈরী কর যেন তোমরা চিরদিন থাকবে। আর যখন কাউকে পাকড়াও কর ত অত্যাচারী হয়ে কর। (আয়াত ১২৮-৩০) তারা প্রত্যেক অত্যাচারী হকের দুশমনের হুকুম মেনে চলেছৈ। (হুদ:  ৫৯) হযরত হুদ (আ) তাদেরকে বুঝঅবার যতো চেষ্টাই করেন, এ সবের জবাব তারা সীমালংঘন, বিদ্বেষ ও বিরোধিতাপূর্ণ কূটকৌশলসহ দিয়েছে। অবশেষে হযরত নূহের (আ) মতো তাঁকেও তাঁর জাতিকে এ কথা বলতে হয়, তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে যা কিছু করার তা কর এবং আমাকে এতোটুকু অবকাশ দিও না। আমার ভরসা ত আল্লাহর উপর যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব। কোন প্রাণী এমন নেই যার মাথা তার মুষ্টির মধ্যে নেই। (হুদ: ৫৫-৫৬) অবশেষে খোদা পয়গম্বরকে বল্লো, তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে ঠিক আছে যে শাস্তির ভয় তুমি আমাদের দেখাচ্ছ তা নিয়ে এসো। তারপর যখন সে আজাব সম্মুখ দিক থেকে আসতে দেখা গেল, তখন এ নির্বোধেরা মনে করলো যে, এ বাদল যা তাদের উপত্যকা সিক্ত করবে। কিন্তু তা ছিল একটি ধ্বংসকারী ঝড়-ঝাঞ্ঝা যা প্রতিটি বস্তু ধ্বংস করে দিল। (আহকাফ: ২২-২৫)

সামূদ ও হযরত সালেহ (আ)

আদের পর আরবের প্রাচীন জাতিসমূহের মধ্যে সামূদ ছিল অতি বিখ্যাত জাতি। যাদের পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ গোটা উত্তর হেজাযে ছড়িয়ে আছে এবং এখনও তা দেখতে পাওয়া যায়। কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা সে সব অতিক্রম করে শামের(সিরিয়অ) দিকে যেতো। এটাও সকলের জানা ছিল যে, এক ভয়ানক ভূমিকম্প ঐ জাতিকে ধ্বংস করে দেয় যার ফলে সে অঞ্চেলে পাহাড় আজ পর্যন্ত ধসে পড়ছে। কুরআনে বলা হয়েছে যে, এ জাতি খোদার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে শুধু শির্ক ও মূর্তি পূজার অপরাই করেনি। বরঞ্চ খোদার যমীনের উপর বিদ্রোহ ও ফাসাদের তুফান সৃষ্টি করেছে। (ফজর: ৬-১২) আরাফ: ৭৪)। সে জাতির সর্দার বা সমাজপতিরা সীমালংঘনকারী ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী ছিল যাদের দ্বারা কোন সংস্কার সংশোধনের কাজ হতো না। (শুয়ারা: ১৫১-১৫২) তারা ভোগবিলাস করার জন্যে এবং নিজেদের মর্যাদা প্রদর্শনের  জন্যে উন্মুক্ত স্থানে প্রাসাপদ নির্মাণ করতো এবং পাহাড় খোদাই করে অট্টলিকা তৈরী করতো। (আরাফ: ৭৪, শুয়ারা: ১৪৯) এ একটি অধঃপতিত সমাজে বৈশিষ্ট যে একদিকে দরিদ্র লোক মাথা গুঁজবার স্থান পায় না অপরদিকেধনিক শ্রেণী জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ তৈরী করে। এসব ধনশালীদের কাছে হযরত সালেহ (আ) এমন যোগ্য ছিলেন না, যে তাঁর উপর ঈমান আনা যেতে পারতো কারণ তাঁর উপরে গরীব মানুষ ঈমান এনেছিল। (আরাফ: ৭৫-৭৬) হযরত সালেহ (আ) যখন তাদেরকে খোদাপুরস্তির দাওয়াত দিলেন এবং জুলুম, ফাসাদ ও ভোগ বিলাস থেকে বিরত থাকতে বল্লেন, তখন নয়টি বড়ো বড়ো ফাসাদকারী উপজাতীয় জোট আপোসে পরামর্শ করে বল্লো, খোদর কসম করে ফয়সালা কর যে, রাতে সালেহ এবং তাঁর পরিবারের উপর হঠাৎ হামলা করব। তার পর সালেহের অলী অর্থাৎ তাঁর গোত্রের সর্দারকে বলে দেব যে, তাঁর পরিবারের নিহত হওয়ার ঘটনায় সময় আমরা সেখানে ছিলাম না এবং আমরা বিলকুল সত্য কথা বলছি। (নমল: ৪৮-৪৯) আল্লাহ তায়অলা তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেন। তারা হযরত সালেহ (আ) এর কাছে মোজেযার দাবী করে। তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে আল্লাহতায়ালা একটি উটনী তাদের সামনে এনে দেন। তার অস্তিত্বই ছিল স্বয়ং একটি মোজেযা। তারপর হযরত সালেহ (আ) এর মাধ্যমে তাদেরকে সাবধান করে দেয়া হলো যে, এ উটনী তোমাদের মাঠ ময়দানে ক্ষেত খামারে যেখানে খুশী সেখানে চরে বেড়াবে। আর একদিন সে একা পানি পান করবে এবং দ্বিতীয় দিন তোমরা সকলে এবং তোমাদের পশু পানি পান করবে। এর উপর যদি তোমরা খারাপ নিয়তে হাত লগাও তাহলে তোমাদের উপর আযাব এসে পড়বে। (আরাফ: ৭৩, হুদ: ৬৪, শুয়ারা: ১৫৫দ্রষ্টব্য)

কিছু কাল পর্যন্ত তারা সে উটনীকে ভয় করে চলতে থাকে। অবশেষে এ উটনী যে একটি মোজেযা তা জানা সত্ত্বেও তারা তাদের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী সর্দারকে ডেকে বলে এ বিপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা কর। সে এ কাজের দায়িত্ব বহন করে তাকে মেরে ফেলে। এ ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের পর তারা হযরত সালেহকে (আ) চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলে, সে আযাব নয়ে এসো যার ভয় তুমি আমাদেরকে দেখাতে- (আরাফ: ৭৭)। হযরত সালেহ (আ) বলেন, আচ্ছঅ ঠিক আছে, তিন দিন তোমরা তোমাদের ঘরে আনন্দ উল্লাস করে নাও। তার পর বজ্র ধ্বনিসহ এক ভয়াবহ ভূমিকম্প এলো যা হযরত সালেহ (আ) এবং ঈমানদারগণ ব্যতীত গোটা জাতিকে ধ্বংস করে দিল এবং তাদের ঘরদোর এমনভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো যেন সেখানে কোন দিন বসবাস করতো না। -(আরাফ: ৭৮, হুদ: ৬৫, কামার: ৩১দ্রঃ)

হযরত ইব্রাহীম (আ)

সবচেয়ে দৃষ্টান্তমূলক চরিত্র ও আচার-আচরণ ‍কুরআনে পেশ করা হয়েছে হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের। তাঁকে আরবাসী নিজেদের দ্বীনের নেতা বলে মানতো। তাঁর সাথে সম্পর্কযুক্ত হওয়ার কারণেই কুরাইশদের সকল গৌরব অহংকার মান মর্যাদা ও প্রভাব প্রতিপত্তির ভিত্তি রচিত হয়েছিল। কুরআন তাদেরকে বল যে, তার মধ্যে এমন কি সৌন্দর্য বৈশিস্ট ছিল যার জন্যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সে বান্দাহকে আপন খলিল (বন্ধু) গণ্য করেন। (নিসা: ১২৫) আল্লাহ বলন, আমি তোমাকে সমগ্র জাতির নেতা বানাচ্ছি। (বাকারাহ: ১২৪) তাঁর নিকটে যখন এ সত্য প্রকট হয়ে পড়লো যে আল্লাহ ব্যতীত কোন রব ও ইলাহ নেই, এবং তাঁর পিতা ও জাতি সকলেই পথভ্রষ্ট, তখন তিন বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ পরিত্যাগ করেন। স্বীয় জাতীয় ধর্ম পরিত্যাগ করতে, এবং একেবারে একমুখী হয়ে শুধু দুনিয়া ও আসমানের স্রষ্টার আনুগত্য অবলম্বন করতে এক মুহূর্তও বিলম্ব করেননি। শুধু আপন স্থানেই খালেস খোদাপুরস্ত হয়ে রয়ে গেলেন না, বরঞ্চ, প্রকাশ্যে আপন বাপ দাদদা ও আপন জাতির লোকদেরকে বলে দিলেন, আমি তোমাদের এ শির্ক পূর্ণ ধর্মের প্রতি ত্যক্ত বিরক্ত এবং আমর মতে তোমরা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত। (আনয়াম: ৭৪-৮১) তিনি তাঁর পিতাকে পরিষ্কার বলে দিলেন, ‍তুমি অন্ধ বধির এখতিয়ার বিহীন দেব দেবীর বন্দেগী করে প্রকৃতপক্ষে শয়তানের বন্দেগী করছে। পিতা তাঁকে তীব্র ভর্ৎসনা করে বাড়ী থেকে বহিষ্কার করে দেন। (মরিয়াম:ধ ৪৩-৪৬) তিনি তাদেরকে যুক্তিসহ বুঝবার চেষ্টা করার পরও যখন তারা মানলো না, তখন তিনি সুযোগ বুঝে তাদের প্রতিমাগৃহে প্রবেশ করেন এবং তাদের মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলে কার্যত তাদেরকে দেখিয়ে দিলেন যে, যাদের বন্দেগী তার করতেছ তারা বন্দেগীকারী ত দূরের কথা আত্মরক্ষা করতও সক্ষম নয়। (আম্বিয়অ: ৫৩-৬৭, সাফফাত: ৮৫-৯৬) হযরত ইব্রাহীমকে (আ) দেশের বাদশার নিকটে হাযির করা হলো যে রব হওয়ার দাবীদার ছিল। তিনি নির্ভয়ে বল্লেন, আমি আর কাউকে রব বলে মানিনা সেই সত্তা ব্যতীত যার হাতে আমার জীবন ও মৃত্যু রয়েছে। সে বল্লো, জীবন ও মৃত্যু আমারও হাতে রয়েছে। হযরত ইব্রাহীম (আ) বল্লেন, আল্লাহ ও ত ‍সূর্য পূর্ব দিকে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখিয়ে দাও। এ কথা বলে তিনি গর্বিত বাদশাহকে বোকা বানিয়ে দেন। (বাকারা: ২৫৮)

তাঁর জন্যে বিরাট অগ্নিকন্ড তৈরী করা হলো। সিদ্ধান্ত করা হলো যে, এর মধ্যে হযরত ইব্রাহীমকে নিক্ষে করে জীবিত অবস্থায় জ্বালিয়ে মারা হোক। তথাপি তিনি বাতিলের সামনে মস্তক অবনত না করতে এবং হকের জন্যে দগ্ধিভূত হয়ে মারতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। এ ছিল আল্লাহতায়ালার ফযল ও করম  যে তিনি আগুনকে শীতল করে দিলেন এবং তাঁর জন্যে তা অীনষ্টহীন বানিয়ে দিলেন। কিন্তু তিন নিজের পক্ষ থেকে এ কথা প্রমাণ করতে ত্রুটি করলেন না যে, তিনি আগুনে লিপ্ত হওয়াকে মেনে নিতে পারেন কিন্তু হক পরিত্যাগ করে বাতিলের বন্দেগী কবুল করতে পারেন না। (আম্বিয়া:” ৬৮-৭০, সাফফাত: ৯৭-৯৮)

অবশেষে তাঁর কাছে যখন এ প্রশ্ন দেখা দিল যে, দ্বীন ছাড়বেন, না দেশ ছাড়বেন, তখন তিনি দ্বীন পরিত্যাগ করলেন না, বরঞ্চ ঘরবাড়ী, পরিবার, জাতি ও দেশ সবই চিরদিনের জন্যে পরিত্যাগ করে খোদার উপর ভরসা করতঃ বেরিয়ে পড়লেন। তিনি জানতেন যে দেশ পরিত্যাগ করে বিদেশী হওয়া কত ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ করে সেকালে আপন জাতির আশ্রয় থেকে বের হয়ে অপরিচিত অঞ্চলের দিকে রওয়ানা হওয়া যে কত বিপজ্জনক হতে পারে তা তাঁর জানা ছিল। কিন্তু তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বল্লেন, (আরবী***********) আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি, তিনি অবশ্যেই আমাকে পথ দেখাবেন। (সাফফাত: ৯৯)

বৃদ্ধ বয়সে অনেক দোয়া ও কাকুতি মিনতির পর তার এক পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণ করলো, তখন তাঁর রব তাঁকে আর এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন করলেন। তাঁর প্রতি ইংগিত করলেন, “এ দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে তার মা সহ মক্কার সেই জনশ্যন্য ও প্রান্তরের সেস্থানে রেখে এসো যেখানে আমি আমার ঘর বানাতে চাই।” তিনি এ হুকুম পালনের জন্যেও তৈরী হলেন এবং তাঁর আবাস্থল ফিলিস্তিন থেকে শত শত মাইল দূরে স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে গিযে একেবারে খোদার উপর ভরসা করে ছেড়ে আসেন- (হজ্ব: ২৬, ইব্রাহীম : ৩৭)। তারপর তার চেয়েও এক কঠিনতর অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন তাঁকে হতে হয়। যখন সেই পুত্র বড়ো হয়ে এমন বয়সে পৌছেন যে পিতার সাথে দৌড়াদৌ; করতে পারেন, তখন ইংগিত হলো যে, খোদার জন্যে তাকে যবেহ করতে হবে। এ আদেশ পালনেরজন্যেও তিনি প্রস্তুত হলেন। তারপর পুত্রের গলায় ছুরি চলাবেন এমন সময় আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুরবানী কবুল করে এক ‘যবহে আযীম’ কে তার ফিদিয়া স্বরূপ দিলে দিলেন। (সাফফাত: ১০০-১০৭)

খোদা ও তাঁর দ্বীনের ব্যাপারে কারো সাথে কোন পক্ষপাতিত্ব করতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। জন্মভূমি পরিত্যাগ করার সময় তিনি তাঁর জাতিকে পরিষ্কার বলেছেন, আমাদে এবং তোমাদের মধ্যে চিরদিনের জন্যে শত্রুতা হয়ে গেছে এবং ব্যবধান শুরু হয়েছে যতোক্ষণ না তোমরা এক  আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছ- (মুমতাহিনা: ৪)। পিতার মাগফেরাতের জন্যে দোয়া ওয়াদা তিনি করেন এবং দোয়া করেনও। কিন্তু যখন তিনি অনুভব করলেন যে, তাঁর পিতা আল্লাহর দুশমন ছিলেন, তখন তাঁর সাথে ভালোবাসায় সম্পর্কও ছিন্ন করেন (তওবা: ১১৪)। এ ছিল সেই চরিত্র ও সেই আচরণ যাকে ইসলামী দাওয়াত নমুনা হিসাবে লোকের সামনে পেশ করে।

হযরত লূত (আ) ও লূত জাতি

হযরত লূত (আ) হযরত ইব্রাহীম (আ) এর ভাইপো ছিলেন এবং তাঁর সাথেই হিজরত করে ফিলিস্তিনের দিকে যান। এখানে যে স্থঅনটিকে তিন তাঁর বাস্থান বানিয়েছিলেন তার নিকটেই এক অতি দুষ্ট জাতি বাস করতো দুষ্টামি-নষ্টামির দিকে দিয়ে দুনিয়ার তার কোন তুলনা ছিল না। আল্লাহতায়ালা তাদের সংশোধনের এ কঠিন দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পন করেন এবং তাঁকে নবী বানিয়ে তাদের এলাকায় পাঠিয়ে দেন। সে জাতির অবস্থা এই ছিল যে, পুরুষে পুরুষে ব্যভিচার ছিল এক সাধারণ ব্যাপার। তা তারা গোপনে করতে না, বরঞ্চ প্রকাশ্যে একে অপরের সামনে এবং লোকের সমাবেশে। উপরন্তু তারা রাহাজনি করতো। কোন ব্যক্তি অথবা কাফেলার সে অঞ্চল নিরাপদে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। (নমল: আনকাবুত: ২৯)

হযরত লূত (আ) বহু বছর যাবত তাদেরকে খোদার ভয় দেখান এবং ওসব দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকতে বলেন। তাদের জবাব ছিল, “হে লুত! তুমি যদি তুমি যদি এসব কথা বলা বন্ধ না কর, তাহালে তোমাকে এখান থেকে বের করে দেব”-(শুয়ারা: ১৬৭)। হযরত লূত এসব হুমকির কোন পরোয়া না করে নিজের তবলিগ চালু রাখেন। তখন তারা পাস্পরিক আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত করে যে, লূত পরিবারকে তাদের জনপদ থেকে বহিষ্কার করা হোক, তারা নিজেদের বড়ো পবিত্র ও নিষ্পাপ বলে জাহির করছে (আ’রাফ: ৮২) আনকাবুত : ৫৬)। অবশেষে আল্লাহতায়ালা তাদের শাস্তি দেয়ার ফয়সালা করেন এবং কার্যকর করার জন্যে এক আজব পন্থা অবলম্বন করেন। কতিপয় ফেরেশতাকে সুদর্শন বালকের আকৃতিতে হযরত লূতের বাড়ী মেহমানরূপে পাঠিয়ে দেন। তাদের আগমনের সাথে সাথে সমস্ত শহরে এক আনন্দ উল্লাসের স্রোত প্রবাহিত হলো। লোক দলে দলে হযরত লুতের (আ) বাড়ীর দিকে দৌড় দিল ঐসব বালকের সাতে কুকর্ম করার অভিপ্রায়ে। হযরত লূত (আ) বহু অনুরেধ করে বলেন., -মেহমানদের ব্যাপারে আমাকে অপদস্থ করো না। তারা তাঁর কথার কর্ণপাত করলোনা বরঞ্চ উল্টা তাঁকে ভর্ৎসনা করে বল্লো, আমরাক তোমাকে কি বারবার নিষেধ করিনি যে, সারা দুনিয়অর ধিক হয়ে যেয়ো না? (হাজ্বর: ৭০)

তখন ফেরেশতাগণ হযরত লূতকে (আ) বল্লেন, আমরা খোদার প্রেরিত ফেরেশতা এবং এদের উপর আজাব নাযিল করার জন্রে পাঠানো হয়েছে। ভোর হওয়ার আগে আগে আপনি বাড়ীর লোকদেরকে নিয়ে এখান থেকে বেরিয়ে যাবেন। যেসব লোক হযরত লূতের বাড়ীর দিকে চড়াও হয়ে এসেছিল তাদেরকে অন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। তাদের জনপদ ওলট পালট করে দেয়া হয়েছিল, তাদের উপর এমনভাবে প্রস্তর বর্ষণ করা হয়েছিল যে, তাদে প্রত্যেকটি চিহ্নিত ছিল কোন্‌ প্রস্তর কোন্ ব্যকিএক শেষ করে দেবে। (হুদ : ৮২-৮৩) এ এমন এক হতভাগ্য জাতি ছিল যে, ঐ সমগ্র অঞ্চলে এক লূতের (আ) বাড়ী ছাড়া কোন ঈমানদার ব্যক্তির বাড়ী পাওয়া যেতো না। (যারিয়াত: ৩৬) এবং সে একটি বাড়ীতেও স্বয়ং লূত (আ)-এর স্ত্রী বেঈমান ছিল যার সম্পের্কে তাঁকে আদেশ করা হয় যে, তিনি যেন তাকে সাথে নিয়ে না যান। কারণ তারও শস্তি ভোগ করর কথা ছিল। (হুদ : ৮১) কুরআনে এ কাহিনী স্থানে স্থঅনে বর্ণনা করে লোকদেরকে এ কথা বলা হয়েছিল যে, একটি চরিত্রহীন জাতি কেমন হয়ে থাকে এবং তার পরিণাম কি হয়। আর আল্লাহর নবীগণ কোন অবস্থায় কাজ করেছেন।

ইউনুফ (আ) এর কাহিনী

তাপর ঐতিহাসিক দিক দিয়ে হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কাহিনীর পালা আসে যার উপরে কুরআনের একটি পরিপূর্ণ সূরা নাযিল করে ভালা ও মন্দ চরিত্র একে অপরের বিপক্ষে পেশ করা হয়েছে। এতে একদিকে ইউসুফের (আ) ভাইদের চরিত্র দেখানো হযেছে যা শুধু এ কারণে যে যেহেতু সম্মানিত পিতা হযরত ইয়াকুম (আ) তাঁর অল্পবয়স্ক পুত্র ইউসুফকে (আ) অধিক ভালোবাসতেন, সেজন্যে তারা আলোচনার পর সিদ্ধান্ত করে যে, তাকে হত্যা করা হোক অথবা কোথাও নিক্ষেপ করে এসে সৎলোক হওয়া যাক। তারপর তরা পিতাকে ধোঁকা দিয়ে ভাইকে ভ্রমণ ও আমোদ প্রমোদ করার উদ্দে্যেশ্য বাইরে নিয়ে গিযে একটি শুষ্ক কুপে নিক্ষেপ করলো। অতঃপর তার জামায় মিছিমিছি রক্ত লাগিযে নিয়ে এলো এবং পিতাকে বল্লো নেকড়ে বাঘ তাকে ধরে খেয়ে ফেলেছৈ।

ঐ ব্যবসায়ী কাফেলার লোকদের আচরণ এই যে, তারা হযরত ইউসুফকে (আ) শুষ্ক কূপে পেয়ৈ মজলুম বালককে নিজেদের পণ্যদ্রব্য বানিয়ে মিসরে গিয়ে বিক্রি করে দিল।

আযীযে মেসেরে স্ত্রীর চরিত্র দেখুন যার স্বামী হযরত ইউসুফকে (আ) ক্রয় করেছিল এবং যার ঘরে পালিত হয়ে তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন। তার নির্লজ্জতার অবস্থা এই ছিল যে, হযরত ইউসুফকে (আ) পাপ কাজের দিকে ডাকে। তিনি অঙ্গীকার করে পালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তার পিছু লাগে। এমন সময় তার স্বামী এসে পড়ে। তখন সে তাঁর প্রতি এ উল্টা অভিযোগ আরোপ করে যে, তিন তার শ্লীলতাহানি করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মিথ্যা যখন প্রমাণিত হলো এবং উচ্চশ্রেণীর মহিলাদের তার প্রেম সম্পর্কে  চর্চা শুরু হলো তখন সে তারেদকে আমন্ত্রণ করে ডেকে এনে হযরত ইউসুফকে (আ) তাদের সামনে এ কথা বলার জন্যে পেশ করলো, এমন সুশ্রী যুবকের প্রেমিই যদি না পড়লাম ত আর কি করলাম।  তারপর সে সমবেত সকলের সামনে বল্লো- সে যদি আমার সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত না হয়, তাহলে আমি তাকে কয়েক খানায় পাঠাবো।

মিসরের উচ্চশ্রেণীর মহিলাদের আচরণ এই যে, তারা ঐ সমাবেশে হযরত ইউসুফফের (আ) সৌন্দর্য দেখে তাদের হাত কেটে ফেলে। তারাও তাঁর প্রেমে পড়ে এবং তাঁকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করতে থাকে।

মিশরের বিচারকদের আচরণ দেখুন যারা নিজেদের মহলাদের নৈতিক অধঃপতনের শাস্তি হযরত ইউসুফকে (আ) দিল এবং বিনা অপরাধে: কয়েক বছরের জন্যে জেলে প্রেরণ করে।

অপরদিকে হযরত ইউসুফের (্) আচরণের চারিত্রিক পবিত্রতার নমুনা একটি একটি করে সামনে আসে। তিন কারাদন্ড বরদাশত করেন কিন্তু নিজেকে পাপে কলংকিত করা বরদাশত করেননি। এতেও তার মধ্যে তাকওয়ার কোন গর্ব সৃষ্টি হয়নি। তিনি অত্যন্ত বিনয় নম্রতার সাথে আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করেন, হে আমার পরোয়াদর দেগার! কারাদন্ড আমর নিকটে ঐ জিনিস থেকে অধিক প্রিয় যার দিকে এসব লোক আমাকে ডাকছে। তুমি যদি এসব নারীদের পাতানো ফাঁদ থেকে আমাকে রক্ষা না কর তাহলে আমি তাদের দিকে ঝুঁকে পড়বো এবং জাহেলদের শামিল হয়ে যাব।

তিনি জেলখানায়ও খোদার বান্দাহদেরকে ওয়াজ –নসিহত করে সৎপথ দেখাবার চেষ্টা করেন এবং তবলিগে হকের কোন সুযোগ হাতছাড়া হতে দেননি। এরমাত্র একটি ঘটনা সূরা ইউসুফে ৩৬ ঞেকে ৪০ আয়াত পর্যন্ত বয়ান করা হয়েছে যার থেকে জানা যায় যে, তাঁর দীরঘ কারাজীবনে তিনি কিভাবে দাওয়াত-ইলাল্লাহর দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

অতঃপর তিনি যখন মিশর রাজ্যের একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা দান করেন তখন বাদশাহ প্রভাবিত হযে তাঁকে মুক্তি দান  ও সাক্ষাৎ দানের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কিন্তু তিনি মুক্তি লাভে অসম্মতি ব্যক্ত করেন যতোক্ষণ না আযীয মেসের স্ত্রী এবং তার সাথের অন্যান্য মহিলাগণ তাঁর পূত চরিত্রবান হওয়ার এবং তাদের নিজেদের দোষী হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছে।

তারপর এমন এক সময় এলো যখন তিনি মিসরের শাসন ক্ষমতার অধিকারী হলেন। সে সময়ে তাঁর সেসব ভাই যারা তাঁকে শুষ্ক কূপে নিক্ষেপ করেছিল, তাঁর কাছে বারবার খাদ্য শস্য চাইতে আসতে থাকে। তিনি তাদেরকে শস্য দিতেও থাকেন। কিন্তু তাঁর মনে কখনো এ চিন্তা আসেনি যে তিন তাদের অত্যাচারর প্রতিশোধ গ্রহণ করেন যা তারা তাঁর উপর করেছে। প্রথম প্রথম এরা জানতেই পারেনি যে, মিসরে যে শাসকের নিকটে তারা শস্য লাভ করছে তিনি কে। শুধু হযরত ইউসফুই (আ) তাদের চিনতে পারেন। কিন্তু তৃতীয়বার যখন তারা এলেন এবং ইউসুফ (আ) তাদেরকে বল্লেন, আমি তোমাদের সেই ভাই যার প্রতি তোমরা এমন জুলুম করেছে যা তোমরা জান। তখন তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে। তখন ইউসুফের জবাব ছিল:

(আরবী*****************)

-আজ (তোমাদের অপরাধের জন্য) পাকড়াও করা হবে না। আল্লাহ তোমাদের মাফ করুন- তিন সবচেয়ে বড় দয়াশীল। তারপর তিন মুধু তাঁর সম্মানিত পিতা হযরত ইয়াকুব (আ) কেই মিসরে ডেকে পাঠালেন না, বরঞ্চ তাঁর ভাইদেরকেও তাদের পারবার পরিজনসহ ডেকে এনে সসম্মানে পুনর্বাসিত করেন।

সূরা ইউসুফে এ মহান ব্যক্তির চরিত্রের শেষ মহত্ব এ দেখানো হয়েছে যে, তাঁর এ উন্নত মর্যাদার জন্যে তিনি কোন প্রকার গর্ব অহংকার প্রকাশ করেননি। বরঞ্চ আল্লাহ তায়ালা তার কাছে বন্দেগীল শির নত করে আবেদন করছেন:

-গে খোদা! তুমি আমাকে রাষ্ট্র ক্ষমাতা দান করেছ এবং আমাকে সব বিষয়ের সুক্ষ্ম তত্ত্ব অনুধাবন করার জ্ঞান দিয়েছ। হে আসমান ও যমীনের স্রস্টা! তুমিই তুনিয়া আখেরাতে আমার পৃষ্টপোষক বন্ধু। মুসলমান হিসাবে আমার মৃতু দাও এবং নেকলোকদের সাথে আমাকে মিলিত কর। (ইউসুফ: ১০১)

হযরত শুয়াইব (আ), মাদয়ানবাসী ও আইকাহবাসী

কুরআন মজিদে মাদয়ানবচাসী ও আসহাবুল আইকাহ্‌ সম্পর্কেও বর্ণনা করা হয়েছে, যাদের বসবাস ছিল উত্তর হেজাজ অঞ্চলে। তারেদ সম্পর্কে বলা হয়েছৈ যে, খোদার সাথে অন্যান্যদের এবাদত করার সাথে যেসব নৈতিক ত্রুটি তাদের মধ্যে ছিল তাহলে এই যে, তারা মাপে কম দিত, রাহাজানি করতো এবং বিবাদ-ফাসাদ সৃষ্টি করে রেখেছিল। আল্লাহ তায়ালা হযরত শুয়াইবকে (আ) মাদায়েনে নবী বানিয়ে পাঠিয়ে দেন। আইকাবাসীদের সংশোধনের দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পত হয়। তিনি বহুদিন যাবত তাদেরকে খোদার ভয় দেখিয়ে ঐসব দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকার নসিহত করেন। কিন্তু অতি অল্পসংখ্যক তার উপর ঈমান আনে এবং অবশিষ্ট লোক নিজেদের আচরণে অটল থাকে। মাদয়ানের সর্দারগণ হযরত শুয়াইবকে বলে, তোমার নামায কি তোমাকে এ আদেশ করে যে, আমরা আমাদের বাপ দাদার দেবদেবীরকে পরিত্যগ করি? অথবা আমাদের ধনসম্পদের ব্যাপারে যা কিছু করতে চাই তা না করি। (হুদ : ৮৭) অন্য কথায় তাদের এ জিদ ছিল যে, খোদা ছাড়া অন্যদের বন্দেগী এজন্যে করতে হবে যে, বাপ-দাদা তাদের বন্দেগী করে এসেছে। তারেদ জিদ এ কথার উপরেও ছিল যে, তাদের আপন মর্জি মতো ধনসম্পদ লাভের স্বাধীনতা থাকতে হবে, তা লুন্ঠন করে হোক, ব্যবসা বাণিজ্যে বেঈমানী করে হোক অথবা দুর্বলের উপর জুলুম করে হোক। তারা তাদের লোকদের বলে, তোমরা যদি শুয়ায়েবের কথা মেনে চল তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। (আ’রাফ: ৯) তাদের দৃষ্টিতে জাতির উন্নতি অগ্রগতি এ বিষয়ের উপর নির্ভরশীল যে, তারা সব ধরনের অবৈধ পন্থায় ধনসম্পদ অর্জন করবে। বৈধ পন্থা অবলম্বনের অর্থ এই যে, জাতি ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা হযরত শুয়ায়েবকে (আ) ধমক দিয়ে বলে, আমরা তোমাকে এবং তোমার সাথে ঈমান আনয়নকারীদেরকে বহিষ্কার করে দেব। (আ’রাফ: ৮৮) তারা আরও বলে তোমাকে তো আমাদের মধ্যে একজন দুর্বল লোক মনে করি। তোমার গোত্র না থাকলে ত তোমাকে আমরা প্রস্তরাঘাতে মেরে ফেলতাম। তোমার আপন শক্তি সামর্থ এতোটা নেই যে, তুমি আমাদের উপর শক্তিশালী হতে পার। (তুদ: ৯১) তার জবাবে হযরত শুয়ায়েবের (আ) এ কথা বলে তাদের লজ্জা দিলেন। তোমাদের মুকাবিলায় আমার গোত্র কি আল্লাহ থেকে অধিক শক্তিশালী? তোমরা ত তাঁকে (আল্লাহকে) পেছনে ফেলে রেখেছো। (হুদ: ৯২)

এ ধরনের আচরণ আসহাবে আইকাও হযরত শুয়অয়েবের সাথে করে। তাঁর কোন নসিহতই তারা কবুল করে না এবং এই বলে জবাব দেয়, তুমি সত্যবাদী হও তাহলে আকাশ থেকে কোন এক খন্ড আমাদের উপর নিক্ষেপ কর। (শুয়ারা: ৮৭)

অবশেষে উভয় জাতিই খোদার আযাবের সম্মুখীন হয় এবং তাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। কুরাইশের লোকেরা ব্যবসার সফরে শাম যাবার সময় ঐসব অঞ্চল অতিক্রম করতো যেখানে এ জাতিদ্বয় আযাবে লিপ্ত হয়। এজন্যে কুরআনে এ বর্ণনায় তারা প্রভাবিত না হযে পারতো না।

ফেরাউন ও মূসা (আ) এর কাহিনী

সমগ্র বিশ্বে এ ভয়াবহ ঐতিহাসিকজ ঘটনা সকলের জানা ছিল যে, ফেরাউন ও তাঁর লোক লস্কর খোদার আযাবের শিকার হয়ে সমুদ্রের অতলতলে নিমজ্জিত হয়। আরবে বহুসংখ্যক ইহুদী ও নাসারা বসবাস করতো যাদের মাধ্যমে সকল আরববাসীই জানতো য, হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে নবী হিসাবে তাদের নিকটে পাঠানো হয়েছিল এবং তিনি বিস্ময়কর মুজেযা প্রদর্শন করে তাদেরকে হকের দাওয়াত দেন। কিন্তু তারা কোন মুজেযা দেখার পরও ঈমান আনেনি। স্বয়ং কুরাইশের লোকেরাও হযরত মূসার (আ) এসব মুজেযা সম্পর্কে অবহিত ছিল। বস্তুতঃ নবী (সা) এর বিরুদ্ধে তাদের একটি অভিযোগ এটাও ছিল-

(আরবী***************)

-এ নবীকে সে মুজেযা কেন দেয়া হয়ডনি যা মূসাকে (আ) দেয়া হয়েছিল? (কাসাস: ৪৮)

এর ভিত্তিতেই কুরআনে স্থানে স্থানে হযরত মূসা (আঃ) ও ফেরাউনের কাহিনী বিস্তরিতিভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে ভালো ও মন্দ আচরণ তাদের বৈশিষ্ট্যসহ সুস্পষ্টরূপে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।

ফেরাউনের অপরাধসমূহ একটি একটি করে তার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছ। সে যমীনে ভয়ানক ঔদ্ধত্য প্রদর্মন করেছে, দেশবাসীকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে, তাদের মধ্যে একটি দলকে সে অত্যন্ত হেয় অপদস্থ করতো, তাদের পুত্র সন্তান হত্যা করতো এবং কন্যা সন্তান বেঁচে থাকতে দিত। প্রকৃতপক্ষে সে ফাসাদকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। (কাসাস: ৪) অর্থাৎ তার সরকারের নিয়ম এ ছিল না যে, দেশের সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এবং সকলকে সমান অধিকার দেয়া হবে। কিন্তু সে রাজনীতির এ পন্থা অবলম্বন করেছিল যাতে দেশের অধিবাসীকে বিভিন্ন  দলে বিভক্ত করা যায়। কাউকে সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শাসকদল গন্য করা হতো এবং কাউকে শাসিত গণ্য করে দমিত নিষ্পেষিত করা হতো। এ দ্বিতীয় দলের মধ্যে বিশেষ করে বনী ইসরাইলের উপর  চরম নির্যাতন-নিপীড়ন করা হতো। তাদের পুত্র সন্তানকে হত্যা করতো এবং কন্যা সন্তানকে বেঁচে থাকার জন্যে ছেড়ে দিত যাতে ক্রমশঃ তাদের বংশ নিঃশেষ হয়ে যায় এবং যাতে নারী জাতি মিরসীয়দের আয়ত্তে আসার পর এক মিসরীয় বংশ জন্মদানের মাধ্যমে হয়। এ কারণে হযরত মূসা (আ) যখন ইসরাইলী পরিবারে জন্মগ্রহণ  করেন তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর মায়ের প্রতি ইংগিত করলেন যে, যখন তাঁর সন্তানের হত্যার আশংকা হবে তখন যেন তাকে একটি ঝুড়ির মধ্যে রেখে নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। (কাসাস: ৭)

স্বয়ং তার আপন মিসরীয় জাতির সাথে ফেরাউনের যে আচরণ ছিল তা পূর্ণ চিত্র সূরা যুখরুফের মাত্র একটি বাক্যে সংকলিত করা হয়েছে।

-সে তার আপন জাতিকে তুচ্ছ নগণ্য মনে করতো এবং তারা তাকে মেনে চলতো। তারা ছিল প্রকৃত পক্ষে ফাসেক লোক। (যুখরুফ: ৫৪)

এতে ফেরাউনের রাজনীতি এবং তার জাতিন নৈতিক অধঃপতনের অবস্থা উভয়ের চিত্র পরিস্ফূট হয়।

যখন কোন ব্যক্তি কোন দেশে তার স্বৈচারী শাসন চালাবার চেষ্টা করে এবং তার জন্য সকল প্রকার কৌশল অবলম্বন করে, সকল প্রকার ধোঁকা প্রতারণা করে, খোলা বাজারে বিবেকের কেনাবেচা করে, আর যারা বিক্রি হয় না তাদেরকে নির্মমভাবে নিষ্পেষিত করা হয়, তখন সে একথা মুখে বলুক বা না বলুক, নিজের কর্মকান্ড দ্বারা প্রকাশ করে যে প্রকৃত পক্ষে সে এদেশের অধিবাসীকে বিবেক, চরিত্র ও বীরত্বের দিক দিয়ে নগণ্য মনে করে। সে তাদের সম্পর্কে এ অভিত পোষণ করে ফেলে যে সে এসব নির্বোধ, ভীরু ও বিবেকহীনদের যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে ডেকে নিয়ে যেতে পারে। তারপর যখন তার এ কৌশলসমূহ সাফল্যের সাথে দেশে চালু হয়ে যায় এবং দেশবাসী  কৃতাঞ্জলীপুটে গোলাম হয়ে থাকে, তখন সে নিজের কার্যকলাপ দ্বারা এ কথা প্রমাণ করে যে সে তাদেরকে যেমন মনে করেছিল তারা ঠিক তেমনই। তাদের এ অসম্মানজনক অবস্থা পতিত হওয়ার প্রকৃত কারণ এই হয় যে, মৌলিক দিক দিয়ে তারা ফাসেক। তাদের এতে কোন মাথাব্যাথা নেই যে, হক কি জিনিস এবং বাতিল কোন জিনিস। ইনসাফ কি এবং জুলুম কি। সত্যতা বিশ্বস্ততা এবং ভদ্রতা কি সম্মানের যোগ্য, না মিথ্যা বেঈমানী ও নীচতা। এ সবের পরিবর্তে তাদের নিকটে প্রকৃত গুরুত্ব শুধু আপন ব্যক্তিস্বার্থ যার জন্যে সে প্রত্যেক জালেমের সহযোগিতা করতে, প্রত্যেক শক্তিধরের কাছে মাথা নত করতে, প্রতিটি মিথ্যা কবুল করতে এবং প্রতিটি সত্যের আওয়াজ দাবিয়ে দিতে তৈরী হয়ে যায়।

হযরত মূসা (আ) যখন তাঁর ভাই হযরত হারুন (আ) এর সাথে ফেরাউনের দরবারে আল্লাহর পয়গম্বর হিসাবে পৌঁছালেন এবং যখন তিনি একটির পর একটি এমন সুস্পস্ট মুযেযা পেশ করলেন, যে সম্পর্কে অতি নির্বোধ ব্যক্তিও এ ধারণা করতে পারতো না যে কোন এ যাদুর খেলা। সে তাকে শুধু তার গর্ব-অহংকারের কারণেই যাদু বলতে থাকে। তার সভাসদগণ তার হ্যাঁ- হ্যাঁ বলতে থাকে। লাঠির অজগর হওয়াকে ত তার আমন্ত্রিত দক্ষ যাদুকরগণ মেনে নিয়ে বল্লো যে, এ তাদের নৈপুণ্যের কোন বস্তু নয় বরঞ্চ খোদার মুজেযা।

এখন রইলো অন্যান্য মুজেযাগুলো, যেমন হযরত মূসার (আ) আগাম ঘোষণা মোতাবেক সমগ্র মিসর দুর্ভিক্ষ হওয়া, তাঁর দোয়ার বদৌলতে তা আবার দূর হওয়া, তাঁর ঘোষণার পর সারাদেশে ভয়ানক ঝড় বৃষ্টি হওয়া, আবার তাঁর দোয়ায় তা বন্দ হওয়া, তাঁর ঘোষণার পর পংগপালের ভয়ানক আক্রমণ এবং তাঁর দোয়ায় সব দূর হওয়া। এভাবে তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, উকুন, ক্ষুদ্র কীট, ব্যাঙ এবং রক্তের শস্তি পালাক্রমে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়া এবং শুধু তাঁর দোয়ায় সব দূর হয়ে যাওয়া সন্দেহের কোন অবকাশ রাখতো না যে, এ কোন যাদুকরের যাদু। কারণ এমন কাজ না কখনো কোন যাদুকর করতে পেরেছে না করতে পারতো। এ মুজেযাগুলো থেকে এ কথাই প্রকাশ হচ্ছিল যে, এসব আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুদরতেরই বিস্ময়কর বহিঃপ্রকাশ। এ কারণেই প্রত্যেকটি শাস্তি আসার পর ফেরাউন ও তার সভাসদগণ হযরত মূসাকে (আ) বলতৈা, “আপনার রবের নিকটে “আপনার যে পদমর্যাদা রয়েছে তার ভিত্তিতে দোয়া করুন যেন এ শাস্তি আমাদের দূর হয়ে যায়। তাহলে আমরা আপনার কথা মেনে নিব।” কিন্তু বিপদ চলে যাওয়ার পর তারা তাদের ওয়াদা ভংগ করতো। (আ’রাফ: ১৩৪-১৩৫), যুখরুফ: ৪৯-৫০)

কুরআনে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, তারা মনে মনে এ বিশ্বাস করতো যে হযরত মূসা (আ) সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। তারপর তারা জুলুম ও ঔদ্ধত্যের কারণে অস্বীকার করে চলেছিল। (নমল: ১৪) এ সত্য তখনই একেবারে প্রকট হয়ে পড়লো, যখন ফেরাউন তার সৈন্য সামন্তসহ নিমজ্জিত হতে থাকলো এবং সে চিৎকার করে বল্লো, ‘আমি এ কথা মেনে নিলাম যে, কোন খোদা নেই তিনি ব্যতীত যাঁর উপর বনী ইসরাইল ঈমান এনেছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। (ইউনুস: ৯০)

এভাবে সত্য জানার পরও সে তার সভাসদগণ মিথ্যার পূজারী হয়ে সীমাতিরিক্ত জুলুম ও গর্ব অহংকার করলো। তার সভাসদগণ তাকে বল্লো, হুজুর! এ মূসা ও তার জাতিকে এভাবে কি দেশে ফাসাদ সৃষ্টি এবং আপনার ও আপনার দেবদেবীর বন্দেগী ত্যাগ করার জন্যে প্রশ্রয় দিয়ে রাখবেন?

সে বল্লো, না, আমি এখনই হুকুম করছি যে তাদের পুত্র সন্তান হত্যা করা হোক এবং কন্যা সন্তানকে বেঁচে থাকতে দেয়া হোক। (আ’রাফ: ১২৭)

বস্তুতঃ হযরত মূসার (আ) জন্মের পূর্বে যে আদেশ জারি হয়েছিল তা নতুন করে জারি করা হলো। তারপর নতুন আদেশ এ জারি কর হলো যে যারা মূসার (আ) উপর ঈমান এনেছে তাদের পুত্র সন্তানও হত্যা করা হোক এবং কন্যা সন্তানকে বেঁচে থাকতে দেয়া হোক। (মুমেন: ২৫)

সে হযরত মূসাকে (আ) বল্লো, তুমি যদি আমাকে বাদ দিযে অন্য কাউকে খোদা মেনে নাও তাহলে তোমাকে বন্দী করবো। (শুয়ারা: ২৯) সে তার জনাকীর্ণ দরবারে বল্লো, সর্দারগণ। আমি ত জানি না যে আমি ছাড়া তোমাদের আর কোন খোদা আছে- (কাসাস: ৩৮)। সে নির্ভীকচিত্তে বল্লো, আমি তোমাদের সবচেয়ে বড়ো খোদা- (নাযিয়াত: ২৪)। অত্যন্ত নির্লজ্জের মতো সে তার মন্ত্রী হামানকে বলেলা, এক উঁচু দালান তৈরী কর। তার উপর চড়ে দেখবো যে, মূসার খোদা কোথায় আছে- (কাসাস: ৩৮, মুমেন: ৩৬-৩৭)। এমন কি একবার সে মূসাকে (আ) হত্যা করার সিদ্ধান্ত করে এবং সভাসদগণকে বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, এ মূসাকে আমি হত্যা করব। তারপর সে তার খোদাকে ডেকে দেখুক। (মুমেন: ২৬)

এক ধরনের আচরণ ত এই যা এ কাহিনীগুলোতে ফেরাউন, তার সভাসদবৃন্দ ও তার জাতির দেখতে পাওয়া যায। দ্বিতীয় এক শিক্ষাণীয় আচরণ মিসরের যাদুকরদের যারা নিজেদের দ্বীনের সমর্থনে হযরত মূসার (আ) মুকাবেলা করার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সমবেত হয়েছিল। তারা ফেরাউনকে বলে, আমরা যদি জয়লাভ করি তাহলে কিছু পুরষ্কার পাব ত?

ফেরাউন বলে, শুধু পুরষ্কার নয়, বরঞ্চ তোমরা আমার সান্নিধ্য লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

কিন্তু ঐ যাদুকরগণই যখন হযরত মূসার (আ) মুজেযার দ্বারা তাদরে যাদুতে পরাভূত হতে দেখলো, তখন তারা বুঝে ফেল্লো যে, এখানে যাদু নয় বরঞ্চ খোদায়ী শক্তি কার্যকর। তখন তারা সিজদারত হয়ে যায় এবং চিৎকার করে বলে, আমরা মেনে নিলাম রাব্বুল আলামীনকে, মূসা (আ) ও হারুনের (আ) রবকে।

তাদের মধ্যে হঠাৎ এমন এক বিরাট বিপ্লব সংঘটিত হয় যে, ফেরাউন তাদের হাত-পা কেটে দেয়ার এবং ফাঁসিতে লটকাবার ভয় দেখার পরও এ সবের কোন পরোয়া তারা করে না। তাকে পরিষ্কার বলে দেয়, তোমার যা কিছু করার আছে কর। আমরা তোমার খাতিরে যে সুস্পষ্ট সত্য দেখতে পেয়েছি তার থেকে এবং আমাদেরকে স্রষ্টা থেকে মুখ ফেরাব না। (আ’রাফ: ১১৩-১২৬, তা-হা: ৭০-৭৩, শুয়ারা: ৪১-৫১ দ্রঃ)।

আর এক আচরণ হলো: ফেরাউনে সভাসদগণের মধ্য থেকে একজনের। তিনি অন্তর থেকে ঈমান এনেছিলেন এবং তা গোপন রেখেছিলেন। কিন্তু যখন ফেরাউন হযরত মূসা (আ) কে হত্যা করতে মনস্থ করলো, তখন তিনি পূর্ণ দরবারে উঠে দাঁড়ালেন এবং বল্লেন, তোমরা কি এক ব্যক্তিকে শুধু এ কারণে হত্যা করবে যে সে বলে, আমার রব আল্লাহ?

তারপর তিনি এক দীর্ঘ ও বলিষ্ঠ ভাষণ দেন যা সূরা মুমেনে: ২৮-৪৪ আয়াত পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাঁর ভাষণে তিনি প্রকাশ্যে ফেরাউন,তার রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ও সদস্যবৃন্দ এবং জাতিকে খোদার শাস্তির ভয় প্রদর্শন করেন। তাদের সকলকে সঠিক পথ অবলম্বনের উপদেশ দেন। তিনি এ বিষয়ে কোন পরোয়া করেননি যে, তার এ সত্য কথা বলার কি পরিণাম তাঁকে ভোগ করতে হবে।

এ কাহিনীর মাধ্যমে সবচেয়ে চমৎকার আচরণ হযরত মূসা (আ) এর দেখা যায়। তিনি এমন এক জাতির লোক ছিলেন যারা চরম লজ্জাকর জীবন যাপন করতো। তাদের এতোটুকু সৎ সাহসও ছিল না যে, তাদের সন্তান হত্যার জন্যে একটু বিলাপ করে। স্বয়ং হযরত মূসার (আ) বিরুদ্ধে একজন মিসরীকে হত্যা করার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী ওয়ারেন্টও ছিল। তিনি দেশ ত্যাগ করে কয়েক বছর যাবত মাদয়ানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ অবস্থায় আল্লাহতায়ালা নবী বানিয়ে মুজেযা স্বরূপ একটি লাঠি ও ইয়াদে বায়জাসহ ফেরাউনের মতো একজন অত্যাচারী শাসকের মুকাবিলা করার নির্দেশ দেন। তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে কোন সামরক শক্তি ছাড়াই ফেরাউনের দরবারে গিয়ে পৌঁছেন। তার ভীতি প্রদর্শনে তিনি ভীত হননি। তার জুলুম-অত্যাচারে মাথা নত করেননি। ক্রমাগত বছরের পর বছর যাবত অত্যন্ত কঠিন অবস্থা মুকাবিলা করতে থাকেন। ফেরাউন যখন তাঁকে প্রকাশ্যে হত্যা করার ঘোষণা করে, তখন এ কথা বলে তার মুখ বন্ধ করে দেন-

(আরবী**************)

-আমি আশ্রয় গ্রহণ করেছি আমার এবং তোমাদের রবের, প্রত্যেক ক্ষমতামদমত্ত অহংকারী থেকে যে হিসাবের দিনের উপর ঈমান রাখে না। (মুমেন: ২৭)

অন্যান্য ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

এভাবে কুরআনে অন্যান্য বহু ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পেশ করে এটা সুস্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে যে, ইসলাম কোন্‌ ধরনের আচরণ ও চরিত্রের মানুষ পছন্দ করে এবং কোন ধরনের মানুষ তার অপছন্দনীয়। একদিকে হযরত দাউদ (আ) ও হযরত সুলায়মান (আ) ছিলেন যাঁরা বাদশাহীর সিংহাসনে সমাসীন হওয়া সত্ত্বেও খোদাভীতি ও ও খোদার বন্দেগী থেকে সরে যাননি। গর্ব-অহংকারের পরিবর্তে শোকার ও আনুগত্যের পন্থার উপর কায়েম ছিলেন। যেখানেই তাঁরা অনুভব করেছেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁদেরকে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সে মুহূর্তেই তাঁরা বিনয়-নম্রতাসহ আল্লাহর সামনে নতশির হয়েছেন। (সোয়াদ: ১৭-২৪, ৩৪-৩৫, নমল: ১৯-৪০ দ্রঃ)

সবার রাণী একটি মুশরিক জাতির শাসক হওয়া সত্ত্বেও যখন সত্য সম্পর্কে অবহিত হলেন তখন দ্বিধাহীনচিত্তে তা মেনে নিলেন এবং এ বিষয়ের কোন পরোয়া করণেন না যে, তাঁর মুশরিক জাতি তাঁর সহযোগিতা করবে কি না। (নমল: ৪৪)

সূরা ইয়াসিনে একজন মর্দে হকের উল্লেখ পাওয়া যায় –যাঁর জাতি তিন তিনজন নবীর বিরোধীতা করে এবং তাঁদেরকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ বিপজ্জনক পরিষ্তিতে তিনি শহরের এক প্রান্ত থেকে দৌড়ে আসছেন জাতিকে উদ্বুদ্ধ করছেন, পয়গম্বরগণকে মেনে নেয়ার জন্যে তাদের গোমরাহী যুক্তিসহ প্রমাণ করেছেন, নিজের ঈমানের সুস্পষ্ট ঘোষণা করেছেন এবং পরিণামে নিজেদের জীবনের আশা পরিত্যাগ করছেন। অর্থাৎ তারা তাঁকে নিহত করে। তথাপি জালেমদের জন্যে তাঁর মুখ থেকে কোন বদদোয়া বেরুচ্ছে না। বরঞ্চ তিনি আশা করছেন, আহা, যদি তাঁর জাতি এখনো জানতো পারতো কোন জিনিসের বদৌলতৈ তাঁর রবের পক্ষ থেকে তিনি সম্মান ও মাগফেরাত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করছেন। (ইয়াসিন: ১৩-২৭)

তারপর আসহাবে কাহাফের উল্লেখ আছে যারা একটি মুশরিক জাতির জুলুম থেকে নিজেদের ঈমান রক্ষা করার জন্যে শুধু খোদার উপর ভরসা করে একটি পর্বত গুহায় আত্মগোপন করছেন এবং এ কথা চিন্তা করছেন না যে, এ আশ্রয়স্থলে কতদিন অসহায় অবস্থা কাটাবেন। তাঁদের শুধু চিন্তা এই যে, তাঁরা যেন ঈমানের পথ থেকে সরে না পড়েন। (কাহাফ: ১৩-২০)

অন্য দিকে কারুনেরও উল্লেখ কুরআনে আছে। সে ছিল হযরত মূসার (আ) জাতির এক ব্যীক্ত। কিন্তু সে দুনিয়অর পুরস্তির জন্যে ফেরাউনের ঘনিষ্ট সভাসদগণের মধ্যে শামিল হয়েছিল। সে অবৈধ  উপায়ে অঢেল সম্পদের মালিক হয় এবং এর জন্যে গর্ব প্রকাশ করতে থাকে। সৎ লোকেরা তাকে সৎ জীবন-যাপনের নসিহ করলে সে এই  বলে তাদের প্রচেষ্টা নাকচ করে দিত আমি যা কিছু অর্জন করেছি তা আমার যোগ্যতার ফল। দুনিয়ার মোহবিষ্ট লোকেরা তার জাঁকজমক দেখে তাতে বড়ো ভাগ্যবান মনে করতো এবং এ অভিলাষ পোষণ করতো যে, তারাও যদি এমন ভাগ্যবান হতে পারতো। কিন্তু আল্লাহতায়ালা যখন তাকে তার ধন-দৌলত ও প্রাসাদসহ মাটির নীচে প্রোথিত করে দিলেন, তখন তা তাদের জন্যে শিক্ষণীয় হয়ে পড়লো যারা তার মতো ভাগ্য লাভের অভিলাষ পোষণ করতো। (কাসাস: ৭৬-৮২)

সাবা জাতি যে দেশে বাস করতো আল্লাহ তাকে দুনিয়ার বেহেশত বানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহর নাফরমানীর পথ অবলম্বন করলো, তখন আল্লাহ তাদেরকে এক ভংকর বন্যার দ্বারা ধ্বংস করে দিলেন। তাদের বাগ-বাগিচা বন্টকমুক্ত গুল্মগুচ্ছে পরিণত হলো এবং তারা এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল যে, এটা আরবে তারা এক দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো। (সাবা; ১৫-১৯)

সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ইহুদীদের পেশ করা হয়েছে। তারা খোদার নফরমানী করে ইতিহাসে দুইবার বিরাট ফাসাদ সৃষ্টি করে, যার শাস্তিও তাদেরকে ভোগ করতে হয়। একবার বেবিলনীয় ও আশুরিয়দের কঠোর শাসকগণ তাদেরকে উৎকাত করে দেয়। দ্বিতীয়বার রোমীয়গণ তাদের ফিলিস্তিন থেকে সারা দুনিয়ায় বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত করে দেয়্ এই শেষবারের মতো তাদেরকে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তারা আরবে পৌছে। তাদের এক একটি নৈতিক দোষত্রুটি আরবদের জানা ছিল। এসব চিহ্নিত করে কুরআন লোকদেরকে বলে যে, আল্লাহতায়ালা এ ধরনের দোষত্রুটিপূর্ণ লোকদেরকে অত্যন্ত অপছন্দ করে। তারা জেনে বুঝে তাদের পার্থিব স্বার্থ ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে ধর্মের শিক্ষার পরিপন্থী ও ভরসায় গোনাহে লিপ্ত হতো যে, তাদেরকে ত মাফ করেই দেয়া হবে। (আ’রাফ: ১৬৯)

তারা বলতো, অইহুদীদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করতে এবং তাদের সাথে অসদাচরণে আমাদের কোন গোনাহ হয় না। (আলে ইমরান: ১৭৫) তাদের আলেম-পীর-দরবেশ অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ ভক্ষণ করতো। (তওবা: ৩৪) সুদখুরী তাদের মধ্যে সাধারণ ভাবে প্রচলিত ছিল। অথচ তাদের ধর্মে এসব নিষিদ্ধ ছিল। (নিসা: ১৬১)

তারা যাদু টোনা ও ভূত প্রেতের সাহায্য নিয়ে যেসব শয়তানী কাজ কর্মের ব্যবসা জমজমাট করে রেখেছিল তা হযরত সুলায়মান (আ) উপর অন্যায়ভাবে আরোপ করতো। (বাকারা: ১০২)

তাদের মধ্যে সকল প্রকার অনাচার-পাপাচারের প্রসার ঘটেছিল এবং তারা একে অপররকে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার পথ পরিহার করেছিল। এ কারণে তারা নৈতিক অধঃপতনের অতলতলে নিমজ্জিত হচ্ছিল। (মায়েদা: ৭৯) এসব এমন সোধ-ত্রুটি যাকে কুরআন সকল জতির ধ্বংসের সাধারণ কারণ বলে বর্ণনা করেছে। বস্তুতঃ সূরা হুদে অতীত জাতিগুলোর বার বার আযাবে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা বয়ান করার পর বলা হয়েছিল, তামাদের পূর্বে যেসব জাতি অতীত হয়েছে তাদের মধ্যে এমন লোক ছিল না যারা মানুষকে দুনিয়ার ফাসাদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতো? এমন লোক থাকলেও তারা ছিল নগণ্য-যাদেরকে আমরা সেসব জাতির মধ্যে থেকে রক্ষা করেছি। নতুবা জালেম লোকেরা ঐসব ভোগ-বিলাসে লিপ্ত ছিল যার সরঞ্জাম আমরা অধিক পরিমাণে তাদেরকে দিয়েছিলাম এবং তারা অপরাধী ছিল। (আয়াত: ১১৬-১১৭)

কুরআন যেসব অনাচারের নিন্দা করেছে

এ এক প্রকাশভংগী ছিল যার দ্বারা কুরআন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বর্ণনা প্রসঙ্গে তার নৈতিক শিক্ষা বর্ণনা করেছে। তারপর দ্বিতীয় বর্ণনাভঙ্গী এই যে, সে প্রত্যক্ষভাবে মন্দ আচরণ, কর্ম ও চরত্রের নিন্দা করেছে যা কুরাইশ, আরব এবং সাধারণ মানব সমাজে পাওয়া যেত। এ এমন সব মন্দ কাজ যাকে ভালো বলার সাহস কারো ছিল না। এদের মুকাবিলায় কুরআন বলে সৎ গুণাবলী, চরিত্র ও কাজ কি কি যার দ্বারা ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজকে ভূষিত দেখতে চায়। এ এমন সদগুণাবলী যা নৈতিক মহত্ব বলে অস্বীকার করা কারো মধ্যে ছিল না।

এখন আমরা যেসব দোষত্রুটি বয়ান করব যার নিন্দা কুরআন করেছে এবং মানুষকে বলেছে যে, ইসলাম এসব থেকে মানব জীবনকে পাকপবিত্র করতে  চায়।

-নিশ্চিত ধ্বংস এমন প্রত্যেকের জন্যে যে সামনা-সামনি লোকদের গালমন্দ করে এবং পেছনে দোষ প্রচারে অভ্যস্ত। যে ধনসম্পদ সঞ্চিত করেছে এবং তা গুণে গুণে রেখেছে। সে মনে করে তার ধন চিরদিন তার সাথে থাকবে। (হুমাযাহ: ১-৩)

-তুমি কি দেখেছ তাকে যে আখেরাতের পুরষ্কার ও শাস্তি অবিশ্যাস করে? এতো সেই যে এতিমকে ধাক্সা দিয়ে সরিয়ে দেয় এবং মিসকীনকে আহার দিতে উদ্বুদ্ধ করে না। (অর্থাৎ না সে স্বয়ং তার নিজেকে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করে, আর না অন্যকে এ জন্যে উদ্বুদ্ধ করে যে গরীব ও অভাবগ্রস্তের ক্ষুধা নিবারণের জন্যে কিছু করে)। তারপর ধ্বংস সে নামাযীর জন্যে যে তার নিজের নামাযের ব্যাপারে অবজ্ঞা-অবহেলা দেখায়, যে রিয়াকারী রিয়া করে এবং মামুলী প্রয়োজনীয় জিনিস মানুষকে দেয়া থেকে বিরত থাকে। (মাউন)

মানুষের অবস্থা এই যে, তার রব যখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন এবং পরীক্ষার খাতিরে তাকে ইজ্জত ও নিয়ামত দগান করে, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর তিনি যখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন এবং এর ভিত্তিতে তার রিযিক সংকীর্ণ করে দেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে হেয় করেছেন। কখনোই না (অর্থাৎ এ সম্মান ও অসম্মানের মানদন্ড নয়) বরঞ্চ তোমরা এতিমদের সাথে সম্মানজনক আচরণ কর না। মিসকীনকে খানা খাওয়াবার জন্যে একে অপরকে উৎসাহিত কর না, মীরাসের সমুদয় মাল একত্র করে খেয়ে ফেলো। তারপর মালের মোহে পুরোপুরি লিপ্ত হয়ে যাও। (ফজর: ১৫-২০)

-যারা জুলুম সহকারে এতিমের মাল ভক্ষণ করে-তারা তাদের পেট আগুনে পরিপূর্ণ করে। (নিসা: ১০)

-অধিক থেকে অধিকতর এবং একে অপর থেকে বেশী দুনিয়া হাসিল করার চিন্তা তোমাদেরকে গাফলতীর মধ্যে নিমজ্জিত রেখেছে। অবশেষে তোমরা ঐ চিন্তায় কবরে গিয়ে পৌঁছে যাও। কখনো না ( অর্থাৎ এ কোন কল্যাণ নয়) –অতি শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে। (তাকাসুর; ১-৩)

-তুমি কখনো এমন ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যে খুব বেশী কসম করে এবং যে গুরুত্বহীন ব্যক্তি। যে গালমন্দ করে, অভিশাপ দেয় ওচোগলখুরি করে বেড়ায়। ভালে কাজের প্রতিবন্ধক, জুলুম ও সীমালংঘনমূলক কাজে লিপ্ত। বড়ো অসৎ কর্মশীল, দুর্দম, চরিত্রহীন আর সেই সাথে অসৎ বংশজাতও। (তার চাপে নতিস্বীকার করো না শুধু এ কারণে যে) সে বহু ধনসম্পদ ও সন্তানে মালিক। (কলম: ১০-১৪)

-ধ্বংস হীন প্রতারকদের জন্যে, যাদের অবস্থা এই যে, লোকদের থেকে নেবার সয় পুরা মাত্রায় নেয় এবং তাদেরকে যখন ওজর করে দেয় তখন তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এরা কি বুঝে না যে, এক মহাদিনে এদেরকে উঠিয়ে আনা হবে? তা সেই দিন যেদিন সকল মানুষ রাব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়াবে। (মুতাফফেফীন: ১-৬)

-ইনসাফের সাথে ঠিকভাবে পরিমাপ কর এবং পাল্লার দাঁড়ি (গ্রাহককে প্রতারণা করার জন্যে) উপর-নীচ করো ন। (রাহমান: ৯)

-(কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসী) অপরাধী জাহান্নামবাসীদের জিজ্ঞেস করবে, কোন জিনিস আমাদেরকে জাহান্নামে নিয়ে গেছে? তারা বলছৈ, আমরা নামাযীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। এতিমদের খানা খাওয়াতাম না, সত্যের পরিপন্থী কথা রচনাকারীদের মধ্যেও শামিল হয়ে যেতাম এবং প্রতিফল দানের দিনকেও অস্বীকার করতাম। (মুদ্দাসসির: ৪০-৪৬)

-(কিয়ামতের দিন জাহান্নামীকে শৃংখল পরিয়ে নিয়ে যাবার সময় বলা হবে) না এ ব্যক্তি মহান খোদার উপর ঈমান রাখতো, আার না মিসকীনকে খানা খাওয়াবার জন্যে উৎসাহিত করতো। অতএব আজ এখানে না তার কোন সহানুভূতিশীল বন্ধু আছে আর না আছে ক্ষতি-নিঃসৃত রস ছাড়া কোন খাদ্য যা অপরাধী লোক ছাড়া আর কেউ খায় না। (হাক্কাহ: ৩৩-৩৭)

-সে বলে, আমি অঢেল সম্পদ উড়িয়ে দিয়েছি। সে কি মনে করে কেউ তাকে দেখেনি? (বালাদ: ৬-৭)

-অঢেল সম্পদ উড়িয়ে দেয়ার অর্থ এই যে, তার ধনশলীতার প্রদর্শনী এবং নিজের গর্ব অহংকার প্রকাশের জন্যে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা। শেষ বাক্যের অর্থ এই যে, এ গর্ব অহংকার প্রদর্শনকারী কি মনে করে যে, কেউ তা দেখার নেই যে কিভাবে সে ধন অর্জন করেছে এবং কোন কাজে কোন নিয়তে তা উড়িয়ে দিয়েছে?)

-যারা তাদের ধন আল্লাহর পথে খরচ করে এবং খরচের পর কারো কাছে কোন প্রতিদান চেয়ে বেড়ায় না, আর না অনুগৃহীত ব্যক্তিকে কোন মনঃকষ্ট দেয়, তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে এবং তাদের জন্যে কোন দুঃখ ও ভয়ের কারণ নেই।

একটি মিষ্টি কথা এবং কোন অসহনীয় ব্যাপারে উদারতা প্রদর্শণ সেই খয়রাত থেকে উৎকৃষ্টতর যার পেছনে মনঃকষ্ট দেয়া হয়।(বাকারাহ: ১৬২-১৬৩)

-প্রতিদান চেয়ে এবং কষ্ট দিয়ে নিজের দান খয়রাতকে ঐ ব্যক্তির ন্যায় বিনষ্ট করো না, যে লোক দেখানোর জন্যে নিজের ধন খরচ করে। (বাকারাহ: ২৬৪)

-যে ব্যক্তি সেই মাল খরচ করতে কৃপণতা করে যা আল্লাহ অনুগ্রহ করে তাকে দিয়েছেন, সে যেন এ কথা মনে না করে যে, এ তার জন্যে মংগলকর, বরঞ্চ এ তার জন্যে অত্যন্ত অমংগলকর। যা কিছু সে কৃপণতা করে সঞ্চিত করে তা কিয়ামতের দিন তাদের গলায় শিকল বানিয়ে দেয়া হবে। (আলে ইমরান: ১৮০)

কৃপণতা শুধু এটাই নয় যে, লোক তার ধনসম্পদ না তার নিজের জন্যে ব্যয় করে আর না তার সন্তানাদির জন্যে। বরঞ্চ কৃপণতা এটাকে বলে যে, সে তার সবকিছু তার ভোগবিলাস, আমোদপ্রমোদ ও আপন ধনদৌলতের প্রদর্শনীল জন্যে উড়িয়ে দিতে থাকে। কিন্তু কোন সৎকাজে ব্যয় করার জন্য তার মন চায় না।

-আল্লাহতায়ালা এমন লোককে কখনো পছন্দ করেন না, যে আত্মগর্বে গর্বিত এবং আপন শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব করে। যে কৃপণতা করে অপরকেও কৃপণতা করতে বলে এবং আল্লাহ অনুগ্রহ করে, যা কিছু তাকে দিয়েছেন তা গোপন করে। (নিসা: ৩৬-৩৭)

-যারা মনের সংকীর্ণতা থেকে বেঁচে আছে তারাই সাফল্য লাভ করবে।(তাগাবুন: ১৬)

-লোকের মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না এবং যমীনে গর্ব ভরে চলো না। আল্লাহ কোন আত্মহংকারী দাম্ভিক ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। চালচলনে মধ্যম পন্থা অবলম্বন কর এবং নিজের কন্ঠস্বর কিছুটা মৃদু রাখ। সব আওয়অজের মধ্যে গাধার আওয়াজ সবচেয়ে কর্কশ। (লোকমান: ১৮-১৯)

-যা কিছু আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে অন্যের তুলনায় বেশী দিয়েছেন তার অভিলাষ পাষণ করো না। (নিসা: ৩২)

কাউকে নিজের তুলনায় কোন দিক দিয়ে উন্নত দেখে অস্থির হয়ে যাওয়াই হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কারণ, যার জন্যে মানুষ অন্তর্দাহ ভোগ করতে থাকে। নিজের মঙ্গলের জন্যে তার অমঙ্গল কামনা করে। আর সে উন্নতি সে বৈধ পন্থায় লাভ করতে পারে না, তার জন্যে সে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে।

-হে নবী! লোকদেরকে বলে দাও, আমার রব ত হারাম করে দিয়েছেন অশ্লীল কাজ- প্রকাশ্য অথবা গোপন, গোনাহের কাজ, হকের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করার কাজ। আর হারাম করেছেন এ কাজ যে আল্লাহর সাথে তোমরা কাউকে শরীক মনে করবে যার সপক্ষে তিনি কোন সনদ নাযিল করেননি এবং আল্লাহর নামে এমন কথা বলবৈ যা আল্লাহর পক্ষ থেকে হওয়ার কোন জ্ঞান তোমাদের নেই। (আ’রাফ: ৩৩)

-আল্লাহর নাম এমন কসম খাওয়ার কাজে ব্যবহার করো না যার উদ্দেশ্য নেক কাজ. তাকওয়া এবং লোকের মধ্যে সংস্কার-সংশোধনের কাজ থেকে বিরত থাকা। (বাকারাহ: ২২৪)

-এবং আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ কর, যখন তোমরা তাঁর সাথে কোন চুক্তি করেছ। আর নিজেদের কসম পাকাপোক্ত করার পর তা ভংগ করো না যখন তোমরা আল্লাহকে নিজেদের উপর সাক্ষী বানিয়ে নিয়েছ। আল্লাহ তোমাদের সকল কাজ কর্ম সম্পর্কে ওয়াকেফহাল। তোমাদের অবস্থা সেই নারীর মতো যেন না হয়, যে নিজের মেহনত করে সূতা কেটেছে এবং নিজেই তা টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। তোমরা তোমাদের কসমকে নিজেদের ব্যাপারে ধোঁকা প্রতারণার হাতিয়ার বানাও যেন একটি দল অপরটি থেকে অধিব সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারে। বস্তুতঃ আল্লাহ ত তোমাদেরকে এ  কসমও চুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। (নাহল: ৯১-৯২)

-এবং যারা আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুটি দৃঢ়ভাবে করার পর ভংগ করে, ও সব সম্পর্ক ছিন্ন করে যা স্থাপন করার হুকুম আল্লাহ দিয়েছেন এবং যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে তাদের জন্যে অভিসম্পাৎ এবং আখেরাতে তাদের জন্যে অত্যন্ত মন্দ বাসস্থান হবে। (রাদ: ২৫)

-বাদশাহ যখন কোন দেশে প্রবেশ করে তখন সে তার লন্ডভন্ড করে দেয় এবং তার সম্মানিত লোকদেরকে অপমানিত করে। তারা এমনটিই করে থাকে। (নমল: ৩৪)

-সূরায়ে হুজুরাতে যেসব নৈতিক দোষত্রুটির নিন্দা করা হয়েছে তা হচ্ছে- একে অপরের প্রতি বিদ্রূপ করা, গালমন্দ করা, খারাপ নামে ডাকা, অন্যায়ভাবে খারাপ ধারণা পোষণ করা, অপরের অবস্থা সম্বন্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করা এবং পশ্চাতে এসে অপরের অপপ্রচার করা। (আয়াত: ১১-১২ দ্রঃ)

-নিশ্চিতরূপে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তারা যারা অজ্ঞতার কারণে তাদের সন্তান হত্যা করেছে। (আনয়াম: ১৪০)

-তাদের মধ্যে কাউকে যখন কন্যা ভূমিষ্ট হওয়ার সংবাদ দেয়া হয় তখন তাদের মুখমন্ডল কালিমায় ছেয়ে যায় এবং সে ব্যস, রক্তের মতো এক ঢোক পান করে রয়ে যায়। সে মানুষ থেকে নিজেকে লুকিয়ে লুকিয়ে চলে যে এ দুঃসংবাদের পর মানুষের কাছে মুখ দেখাব কি করে। চিন্তু করে যে, লাঞ্ছনাসহ কনাকে নিয়ে থাকবে’ না মাটির মধ্যে দাবিয়েদেবে। (নাহল: ৫৮-৫৯)

-(কিয়ামতের দিন যখন খোদার সামনে লোক হাযির হবে তখন) জীবিত কবরস্থান কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞেস করা হবে কোন্‌ অপরাধে তোমাকে মেরে ফেলা হয়েছে? (তাকবীর: ৮-৯)

-যে ব্যীক্ত স্বয়ং কোন অপরাধ বা গোনহ করলো এবং তার অভিযোগ কোন নির্দোষ ব্যক্তির উপর আরোপ করলো সে বড়ো বোহতান ও গোনাহের বোঝা কাঁধে নিল। (নিসা: ১১২)

-তুমি কোন খেয়ানতকারীর সমর্থক হয়ো না। আল্লাহ কোন খেয়ানতকারী ও অপরাধে অভ্যস্থ ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না। (নিসা: ১০৫-১০৭)

-খেয়ানতকারী তার খেয়ানতসহ কিয়ামতের দিন হাযির হবে। তারপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার কামাইয়ের পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং লোকদের উপর জুলুম হবে না। (আলে ইমরান: ১৬১)

-জেনেশুনে অন্যের আমানত খেয়ানত করো না। (আনফাল: ২৭)

-যে সুদ তোমরা দাও যাতে লোকের মাল বর্ধিত হয়, তা আল্লাহর নিকটে বর্ধিত হয় না। আর যে যাকাত তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে দাও, প্রকৃতপক্ষে এ যাকাতদাতাগণ তাদের মাল বর্ধিত করে। (রোম: ৩৯)

-পরস্পর একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। তবে লেনদেন পরস্পরের সম্মতিতে হলে ভিন্ন কথা। একে অপরকে হত্যা করো না। … তোমাদের মধ্যে কেউ যদি জুলুম ও বাড়াবাড়িসহ এমন করবে, তাকে আমরা অবশ্যই জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। (নিসা: ২৯-৩০)

-পরস্পর একে অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না। আর না তা বিচারকের কাছে এ উদ্দেশ্যে পেশ কর যাতে লোকের মালের কোন অংশ জেনে বুঝে ভক্ষণ কর। (বাকারাহ: ১৮৮)

-এর অর্থ এটাও যে বিচারককে ঘুষ দিয়ে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার চেষ্টা করো না। মাল প্রকৃতপক্ষেঅন্র ব্যক্তির এ কথা জানা সত্ত্বেও নিছক এ উদ্দেশ্যে মামলা আদালতে নিও না যে সে ব্যক্তি তার মালিকানার প্রমাণ দিতে পারবে না অথবা তুমি কোন হেরফের করে মামলায় জয়লঅভ করবে।

-সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করা উচিত যখন তাদেরকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য তলব করা হবে এবং সাক্ষ্য গোপন করো না। যে তা গোপন করবে তার দিল গোনাহের কালিমায় লিপ্ত হবে। (বাকারাহ: ২৮২-৮৩)

-মিথ্যা বলা দূরে থাক। (হজ্ব: ৩০)

এর মধ্যে মিথ্যা সাক্ষ্যও এসে যায়, যে সম্পর্কে নবী (সা) বলেন, মিথ্যা সাক্ষ্য আল্লাহর সাথে শির্কের সমান।

-যে ভালো কাজের জন্যে সুপারিশ করবে সে তার অংশ পাবে এবং যে মন্দ কাজের সুপারিশ করবে সে তার অংশ পাবে। (নিসা: ৮৫) অর্থাৎ ভালো অথবা মন্দ কাজের সেও অংশীদার হবে।

-সূরায়ে নূরে ৪ থেকে ২৩ পর্যন্ত আয়াতে সতীসাধ্বী নারীরেদ ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপের, তা শুনে প্রচার করার এবং সমাজের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচারের তীব্র নিন্দা করা হয়েছে। তার বিস্তারিত বিবরণ না দিয়ে শুধু আয়াতসমূহের বরাত দেয়াই যথেষ্ট মনে করি। আর এ ব্যাপারে শুধু নারীরেদ জন্যেই নির্দিষ্ট নয়, পুরুষদের উপর বোহতান বা মিথ্যা অপবাদ আরোপ করাও গোনাহের কাজ।

-স্ত্রীদের সাথে উত্তম পন্থায় জীবন যাপন কর। (নিসা: ১৯)

-যদি নারবীদের তালাক দাও এবং তাদের ইদ্দত পূরণ হয়ে আসছে এমন  সময় তাদেরকে উত্তম পন্থায় রেখে দাও অথবা উত্তম পন্থায় বিদায় করে দাও। তাদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্যে আটক রেখো না যাতে তাদের উপর বাড়াবাড়ি করতে পার। যারা এমন করবে তারা নিজেদের উপর জুলুম করবে। (বাকারাহ: ২৩১)

-নারীদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং তাদের মোহর সুবিদিত পন্থায় পরিশোধ কর যেন বিবাহ বন্ধওেন সংরক্ষিত হয়ে থাকে। স্বাধীনভা্বে যৌন আচরণ করে বেড়ায়ো না অথবা গোপনে গোপনে অবৈধ যৌণ সম্পর্ক স্থাপন করো না। (নিসা; ২৫)

-হে নবী! নারীদের নিকট থেকে এ কথার প্রতিশ্রুতি নাও যে তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, ব্যভিচার করবে না, আপন সন্তান হত্যা করবে না, নিজেদের সামনে কোন মিথ্যা অপবাদ রচনা করে আনবে না এবং সর্বজনবিদিত কোন ন্যায্য ব্যাপার তোমার নাফরমানী করবে না। (মুমতাহেনা: ১২)

-মিথ্যা অপবাদ রচনা করে আনার অর্থ সম্বন্ধে দুটি কথা। এক. এই যে, কোন নারী অন্যান্য নারীদের উপর পর পুরুষের সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে অভিযোগ আরোপ করবে এবং তার চচর্চা করবে। দ্বিতীয় এই য, সন্তান ত অন্য কারো ঔরসে পয়দা হলো এবং স্বামীকে এভবে প্রতারিত করা হলো যে, এ সন্তান তারই।

-হে বনী আদম! আমরা তোমাদের উপর পোশাক নাযিল করেছি তোমাদের দেহের লজ্জাস্থানগুলো ঢেকে রাখার জন্যে। আর এ সৌন্দর্য বন্ধনের উপায়ও বটে। হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে ফেৎনার মধ্যে নিক্ষেপ না করে যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে (হযরত আদম (আ) ও হাওয়া (আ) জান্নাত থেকে বহিষ্কার করেছিল-

এবং তাদের পোশাক তাদের থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল যাতে তাদের লজ্জাস্থান একে অপর থেকে উন্মুক্ত হয়ে যায়। (আ’রাফ: ২৬-২৭)

-হে নবী (সা)! তাদেরকে বল কে হারাম করেছে আল্লাহর সে সৌন্দর্য যা তিনি তাঁর বান্দাহদের জন্যে বের করেছেন এবং কে হারাম করেছে পানাহারের পাক জিনিসগুলো। (আ’রাফ: ৩২)

-রাহবানিয়াতের বেদআত (ঈসায়ীগণ) স্বয়ং আবিষ্কার  করেছে। আমরা তা তরেদ উপরে ফরয করিনি। (হাদীদ: ২৭)

-খেজুর ও আঙ্গুর ফল থেকে তোমরা মাদকদ্রব্যও বানাও এবং ভালো রিযিকও অর্জন কর। (নহল: ৬৭) অর্থাৎ আল্লাহ যে ভালো রিযিক দিয়েছিলেন তাকে তোমরা এক মন্দ কাজ তথা মাদকতা সৃষ্টিকারী একবস্তু বানাতে ব্যবহার কর।

এসব মন্দ চরিত্র, গুণ ও কাজের নিন্দা কুরআনে করা হয়েছৈ। এ সবের অনিষ্টকারিতা অস্বীকার করা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। কুরাইশ ও আরববাসীর মধ্যে কোন ব্যক্তিরই এ দাবী করার সাহ ছিল না যে, তার সমাজ এসব অনাচার থেকে পবিত্র ছিল। আর না কেউ এ কথা বলতে পারতো যে সব অনাচার-অনিষ্ট থেকে কুরআন বিরত রাখছে তার কোন একটি রসূলুল্লাহ () অথবা তাঁর সাহাবীদের মধ্যে পাওয়া যেতো। একগুঁয়ে এ হঠকারী লোক ব্যতীত যারাই পরিচ্ছন্ন ও কুসংস্কারহীন মানসিকতা পোষণ করতো তাদের পক্ষে এ কথা মেনে নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না যে, এসব অনিষ্ট থেকে প্রকৃতপক্ষেলোকও সমাজের দূরে থাকা উচিত এবং ঐ ব্যক্তি কোন অপরাধ করছেন না যিনি মানব জীবনকে  এসব থেকে পাক পবিত করতে চান।

ব্যাপক নৈতিক হেদায়েত

এসব মন্দ কাজ চিহ্নিত করার সাথে সাথে কুরআনে বারবার এমন ব্যাপক নৈতিক হেদায়েত দেয়া হয়েছে যার মহৎ গুণাবলী হৃদয়মন প্রভাবিত করতো এবং কোন সুস্থ প্রকৃতির লোকের পক্ষে এগুলোকে সত্য বলে মেনে নেয়া ছাড়া উপায়ন্তর ছিল না। বিশেষ করে এ কারণে আরো আকর্ষণীয় ছিল যে, তা শুধু বর্ণনা করাই হয়নি। বরঞ্চ এ সবের উপস্থাপনকারী রসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর উপর ঈমান আনয়নকারীগণ এসব পুরোপুরি মেনে চলতেন। নিম্নে তা ধারাবাহিকভাবে উদ্ধৃত করা হচ্ছে:-

-আল্লাহ ইনসাফ অনুগ্রহ ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি দান করার নির্দেশ দিচ্ছেন। অনাচার-পাপাচর, নির্লজ্জতা, জুলুম ও বাড়াবাড়ি কর তে নিষেধ করছেন। তিনি তোমাদেরকে নসিহত করছেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পার। (নহল: ৯০)

-হে মুহাম্মদ (সা)! লোকদেরকে বলে দাও, এসো আমি তোমাদেরকে শুনিয়ে দিচ্ছি তোমাদের রব তোমাদের উপর কি কি বাধানিষেধ আরোপ করেছেন। তা এই য, তাঁর খোদায়ীর সাথে আর কাউকে শরীক করো না। বাপ-মার সাথে সদাচরণ করবে। নিজেদের সন্তান দারিদ্রের ভয়ে হত্যা করবে না। আমরা তোমাদেরকে রিযিক ত দিচ্ছিই। তাদেরকেও দেব। নির্লজ্জতার কাজের নিকটবর্তীও হবে না তা প্রকাশ্য হোক অথবা গোপন। কোন মানুষ যাকে আল্লাহ সম্মানীয় করেছেন, হত্যা করবে না। কিন্তু করলে সত্য ও ন্যায় সহকারে। এসব কথা যা তিনি মেনে চলার জন্যে তোমাদরকে হেদায়েত দিয়েছেন যাতে তোমরা বুঝে শুনে কাজ করতে পার। আর এতিমের মালের নিকটবর্তী হয়ো না। তবে যদি এমন নিয়ম ও পদ্ধতিতে হলে, যা সবচেয়ে ভালো তাতে কোন দোষ নেই, যতোদিন না সে জ্ঞানবুদ্ধি লাভের বয়সে পৌঁছেছে। আর ইনসাফের সাথ ওজন ও পরিমাপ কর, আমরা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর দায়িত্বের বোঝা তত পরিমাণে চাপিয়ে দেই যা বহন করার সাধ্য আর তার আছে। যখন কথা বলবে ইনসাফের কথা বলবে। এ ব্যাপার তার নিজের আত্মীয়ের হোক না কেন। আর খোদার সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ কর।

[খোদার সাথে কৃত ওয়াদার অর্থ যা মানুষ খোদার সাথে করে। সেসব ওয়াদাও যা খোদার নাম নিয়ে মানুষের সাথে করা হয়। আর সে ওয়াদা যা মানুষ এবং খোদা, মানুষ এবং মানুষের মধ্যে সে সময়ে আপনাআপনি হয়ে যায় যখন কোন মানুষ খোদার যমীনে এক মানব সমাজে পয়দা হয়। এ সর্বশেষ ও প্রাকৃতিক চুক্তি  () যা করতে যদিও মানুষের ইচ্ছা ও অনুভূীত কোন কাজ করে না, তথাপি এ সম্মানযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে অনুভূতিসহ কৃত ওয়াদা চুক্তি অপেক্ষা কোন দিক দিযে কম নয়। -গ্রন্থকার।]

এসব বিষয়ের নসিহত আল্লাহ তোমাদেরকে করেছেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পার। (আনয়াম: ১৫১-১৫২)

-তোমাদের খোদা ফয়সালা করে দিয়েছেন যে, এক : তোমরা কারো এবাদত করবে না। বরঞ্চ করবে শুধু তাঁরই।

দুই : পিতামাতার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তোমাদের নিকট তাদের মধ্যে কোন একজন অথবা উভয়েই যদি বার্ধক্যে পৌঁছে যায় তাহলে তাদেরকে ‘উচ’ পর্যন্ত বলবৈ না। তাদেরকে ভর্ৎসনা করবে না। তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলবে। বিনয়-নম্রতার সাথে তাদের সামনে নত হয়ে থাকবে। আর দোয়া করতে থাকবে, “হে খোদা তাদের উপর রহম কর- যেভাবে তারা দয়া ও স্নেহ বাৎসল্যসহ বাল্যকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন।” তোমাদের খোদা ভালোভাবে জানেন যে তোমাদের মনে কি আছে। যদি তোমরা সৎ চরত্রবান হয়ে থাক তাহলে তিন এরূপ সকল মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল যারা নিজেদের অপরাধ সম্পর্কে সচেতন হয়ে বর্দেগীর আচরণ অবলম্বন করে।

তিন: আত্মীয়-স্বজনকে তাদের হক দিয়ে দাও এবং মিসকীন ও মুসাফিরকে তাদের হক।

চার: বাহুল্য খরচ করো না। বাহুল্য খরচকারী শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার রবের অকৃতজ্ঞ।

পাঁচ: আর যদি তোমাদেরকে তাদের (অর্থাৎ অভাবীদের) এজন্য এড়িযে চলতে হয় যে, আল্লাহর যে রহমতের তোমরা আশাবাদী তা তালাশ করছ, তাহলে তোমরো তাদেরকে ভদ্র ও নরম ভাষায় জবাব দাও।

ছয়: নিজেদের হাত গলার সাথে বেঁধে রেখো না (কৃপণতা করো না) এবং তা করলে তোমরা তিরষ্কৃত ও অক্ষম হয়ে যাবে। তোমার খোদা যার জন্যে চার রুজি বাড়িয়ে দেন। আর যান জন্যে তার সংকীর্ণ করে দেন। তিন তাঁর বান্দাহদের সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকেফহাল এবং তাদেরকে দেখছেন।

সাত: নিজেদের সন্তানদের দারিদ্রের ভয়ে হত্যা করো না। আমরা তাদের রিযিক দেব এবং তোমাদেরকও। বস্তুত: তাদের হত্যা করা বিরাট ভুল কাজ।

আট: এবং ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না। তা অত্যন্ত অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত খারাপ পথ।

নয়: এবং জীবন হত্যার অপরাধ করো না যা আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন। অবশ্য ন্যায়সঙ্গত কারণে কর যায়। আর যে অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছে তার অলীকে আমরা কেসাসের অধিকার দিয়েছি। তার উচিত সে যেন হত্যার ব্যাপারে সীমালংঘন না করে। তাকে সাহায্য করা হবে।

দশ: এতিমদের মালের নিকটবর্তী হয়ো না। কিন্তু উত্তম পন্থায় যতোদিন না সে যৌবনে পৌঁছে।

এগারো : আর ওয়াদা প্রতিশ্রুটি পূরণ করবে। ওয়াদা ব্যাপারে (কিয়ামতে) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

বারো: কোন পাত্র দ্বারা মাপ করলে তা ভর্তি করে দেবে। আর পাল্লা দ্বারা পরিমাপ করলে ত্রুটিহীন পাল্লা দ্বারা করবে। এ হচ্ছে উত্তম পন্থা এবং পরিণামের দিক দিয়েও তা উত্তম।

তেরো: এমন বিষয়ের পেছনে লেগৈ যেয়ো না যে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চিত জেনে রেখো যে, চোখ, কান ও মন সবকিছুর জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

চৌদ্দ: যমীনে গর্ব ভলে চলো না। তোমরা না যমীনকে দীর্ণ করতে পারবে আর না পাহাড়ের মতো উঁচু হতে পারবে।

এ আদেশগুলোর প্রতি প্রত্যেকটির মন্দ ও দিক তোমার রবের নিকট অপছন্দনীয়। এসব সে বিজ্ঞতাপূর্ণ কথা যা তোমার খোদা তোমার প্রতি অহী করেছেন (বনী ইসরাইল: ২৩-৩০)

-আল্লাহর বন্দেগী কর এবং এ বন্দেগীতে অন্য কোন কিছুকে শরীক করো না। মা বাপের সাথে সদ্ব্যবহার কর। আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও মিসকীনদের সাথে সদাচরণ কর। প্রতিবেশী আত্মীয়, অপরিচিত প্রতিবেশী, পার্শ্বস্থ সাথী, মুসাফির, দাসদাসী যা তোমাদের মালিকানাধীন, এদের সাথে দয়া অনুগ্রহসগ আচরণ কর। (নিসা: ৩৬)

-এ নেক কাজ নয় যে, তোমরা তোমাদের মুখ পূর্ব দিকে করলে না পশ্চিম দিকে। বরঞ্চ নেক কাজ এটা যে মানুষ আল্লাহ, আখেরাতের দিন, ফেরেশতা, কিতাব এবং পয়গম্বরদের খাঁটি দেলে মেনে নেবে এবং আল্লাহর মহব্বতে নিজের প্রিয় মাল আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকীন, মুসাফির এবং সাহায্যপ্রার্থীদেরকে দান করবে। গোলামী যিন্দেগী থেকে মুক্ত করার জন্যে ব্যয় করবে। নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। নেক ওসব লোক যারা চুক্তি করলে তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে, দারিদ্র্য ও বিপদ-আপদে সবর  করবে এবং (হক ও বাতিলের) সংগ্রামে অবিচল থাকবে। এরাই হচ্ছে সত্যনিষ্ঠ ও মুত্তাকী লোক। (বাকারাহ: ১৭৭)

-নিশ্চিরূপে সাফল্য লাভ করেছে ওসব ঈমানদার যারা নিজেদের নামাযে বিনয় নম্রতা অবলম্বন করে, যারা (নগ্নতা ও যৌন অনাচর থেকে ) নিজেদের লজ্জাস্থঅন সংরক্ষণ করে অবশ্য আপন স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসী ব্যতীত যাদের বেলায় (লজ্জাস্থান সংরক্ষণ না করলে) ভর্ৎসনাযোগ্য হবে না। অবশ্যি যারা এসব ব্যতীত অতিরিক্ত কিছু চায় তারা বাড়াবাড়ি করে। আর সাফল্য লাভ করেছে ওসব ঈমানদার যারা নিজেদের আমানত ও ওয়াদাচুক্তি সংরক্ষণ করে এবং নিজেদের নামাযের সংরক্ষণ করে। (মুমেনুন: ১-৯)

-রহমানের প্রকৃত বান্দাহ তারা যারা যমীনে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং জাহেল তাদের সাথে (বিতর্কমুলক) কথা বলতে এলে তখন বলে তোমাদেরকে সালাম। যারা তাদের সামনে সেজাদ ও দাঁড়িয়ে নামাযরত অবস্থায় রাত কাটায়। যারা দোয়া করে, “হে আমাদের রব! জাহান্নামের আযাব থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। তার আযাব তো জীবননাশকারী হয়ে থাকে। অবস্থান ও বাসস্থান সিহাবে তা অতি জঘন্য। যারা খরচ করলে অবব্যয় করে না এবং পৃপণতাও করে না। বরঞ্চ তার খরচ দুই প্রান্ত সীমার মধ্যবর্তী ভারসাম্যপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত। যারা আল্লাহর সাথে আর কাউকে ডাকে না, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না যা আল্লাহ হারাম করেছেন এবং ব্যাভিচার করে না। এ কাজ যে করবে সে তার গোনাহের বদলা পাবে। কিয়ামতের দিন তাকে বার বার আযাব দেয়া হবে এবং তার মধ্যে সে লাঞছনাসহ পড়ে থঅকবে। তবে যদি কেউ এসব গোনার পর তওবা করেছে এবং ঈমান এনে সৎ কাজ করা শুরু করেছে এ ধরনের লোকের পাপকাজগুলোকে আল্লাহ নেক কাজে পরিবর্তি করে দেবেন। তিনি বড়োই ক্ষমাশীল। সে ব্যক্তি তওবা করে নেক আমল করা শুরু করে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে যেমন ফিরে আসা উচিত।

রহমানের প্রকৃত বান্দাহ তারা যারা মিথ্যা সাক্ষী হয় না এবং কোন বেহুদা কর্মকান্ডের পাশ দিয়ে যাবার সময় অত্যন্ত ভদ্রতা ও শালীনতাসহ পাশ কাটিয়ে যায়। যাদেরকে তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে নসিহত করা হলে সে বিষয়ে তারা অন্ধ ও বোবা হয়ে থাকে না। যারা এ দোয়অ করে, হে আমাদের রব! আমাদের বিবি ও সন্তানাদির দ্বারা আমাদের চক্ষের শীলতা দান কর এবং আমাদেরকে পরহেজগারদের নেতা বানিয়ে দাও। (ফুরকান: ৬৩-৭৪)

-যা কিছুই তোমাদেরকে এখানে দেয়া হয়েছে তা নিছক দুনিয়াতে কিছুদিনের জীবন যাপনের সরঞ্জাম। আর যা কিছু আল্লাহর নিকটে আছে তাই উৎকৃষ্ট ও চিরস্থায়। তা সেসব লোকের জন্যে যারা ঈমান এনেছে এবং নিজেদের রবের উপর ভরসা করে। [অর্থাৎ নিজেদের শক্তি, বুদ্ধি, যোগ্যতা এবং উপায়-উপাদানের উপর নয়, বরঞ্চ আল্লাহর অনুগ্রহের উপর ভরসা করে এবং এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, তাঁরই দেয়া হেদায়েতই সত্য ও সঠিক। এ বিশ্বাসও রাখে যে, তাঁর নিকটে কোন নেক কাজের প্রতিদান নষটট হবে না- গ্রন্থকার।]

যারা বরড় বড় গোনাহ এবং লজ্জাকর কাজ থেকে দূরে থাকে। কখনো রাগান্বিত হলে মাফ করে দেয়। যারা তাদের রবের হুকুম মেনে চলে। নামায কায়েম করে। নিজেদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শরে ভিত্তিতে করে। যে রিযিক তাদেরকে আমরা দিয়েছি তার থেকে খরচ করে। [রিযিকের অর্থ হালাল রিযিক। কুরআনে কোথাও হারাম মালকে আল্লাহর রিযিকক বলা হয়নি। আয়াতের অর্থ এই যে,

ক. যে হালাল রিযিক আমরা তাকে দিয়েছি, তার থেকে সে খরচ করে।

খ. সে রিযিক যে স্থানে সঞ্চিত করে রাখে না  বরঞ্চ খরচ করে।

গ. এর থেকে সে খোদর পথেও খরচ করে। সব কিছুই নিজের জন্যে দান করে দেয় না।]

তার উপর বাড়াবাড়ি করা হলে তার মুকাবিলা করে। মন্দ কাজের প্রতিদান ততোটুকু যতোটুকু  মন্দ কাজ। তারপর যে মাফ করে দেবে এবং সংশোধন করে নেবে তার প্রতিদান আল্লাহর দায়িত্বে। আল্লাহ জালেমদের পছন্দ করেন না। আর যারা নিজেদের উপর জুলুম হওয়ার পর প্রতিশোধ নেয় তাকে ভর্ৎসনা করা যাবে না। ভর্ৎসনার যোগ্য তো তারাই যারা অন্যের উপর ‍জুলুম করে এবং যমীনের উপর অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করে। এমন লোরেক জন্যে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। অবশ্যি যে সবর করে এবং ত্রুটি উপেক্ষা করে চলে তা বড় সাহসিকতাপূর্ণ কাজের মধ্যে একটি। (শুরা: ৩৬-৪৩)

-মানুষকে সংকীর্ণমনা করে পয়দা করা হয়েছে। তাই যখন তার উপরে কোন বিপদ আপদ আসে তখন ভয়ানক ঘাবড়ে যায় এবং যখন সচ্ছলতা লাভ করে তখন কৃপণতা করতে শুরু করে। কিন্তু তারা এসব দোষ থেকে মুক্ত যারা নামায পড়ে, যারা সর্বদা নামাযের পাবন্দী করে (সঠিকভাবে নামাযের নিয়মনীতি মেনে চলে।) যাদের মালের মধ্যে সাহায্যপ্রার্থ ও বঞ্চিতদের নির্দিষ্ট হক আছে [অর্থাৎ তারা ফয়সালা করে রেখেছে যে, তাদের মালের মধ্যে থেকে এতোটা সাহায্যপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে যা তারা দিতে থাকবে। সাহায্যপ্রার্থ অর্থ এমন অভাবী লোক যে তার সাহায্যপ্রার্থী। বঞ্চিত অর্থ এমন ব্যক্তি যার সম্পর্কে সে জানতে পারে যে, এ বেচারা তার প্রয়োজন পূরণে জীবিকা থেকে বঞ্চিত। সে চাইতে আসুক বচা না আসুক। কিন্তু তার অবস্থা জানার পর সে স্বয়ং তাকে সাহায্য করে। -গ্রন্থকার।] যারা বিচারের দিনকে সত্য বলে মানে এবং নিজেদের রবের আযাবকে ভয় করে। কারণ তাদের রবের আযাব এমন নয় যার থেকে নির্ভিক হওয়া যায়। যারা (নগ্নতা ও ব্যভিচার থেকে) তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষিত রাখে নিজেদের বিবি ও কৃতদাসী ব্যতীত (যাদের থেকে লজ্জাস্থান সংরক্ষিত না রাখলে) তাদের ভর্ৎসনা করা হবে না। অবশ্যি যারা এসব ছাড়া অন্য কিছু চায় তারাই সীমালংঘনকারী- যার তাদের কৃত ওয়াদা প্রতিশ্রুতি পূরণ করে, যারা তাদের সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে সত্যনিষ্ঠার উপর কায়েম থাকে এবং যারা নিজেদের নামাযের রক্ষণাবেক্ষণ করে। (মায়ারেজ: ১৯-৩৪)

-দৌড়ে চল সে পথে যা তোমাদের রবের মাগফিরাত এবং ঐ জান্নাতের দিকে নিয়ে যার প্রশস্ততা যমীন ও আসমানের মতো। যা ঐ খোদাভীরু লোকদের জন্যে তৈরী করে রাখা হয়েছে।

যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় নিজেদের মাল (খোদার পথে) খরচ করে, ক্রোধ সংবরণ করে, অপরের দোষত্রুটি ক্ষমা করে। এমন নেক লোকই আল্লাহর পছন্দনীয়। তাদের অবস্থা এই যে, যদি কোন মন্দ কাজ তাদের দ্বারা হয়ে যায় (অর্থাৎ কোন গোনাহের কাজ হয়ে যায।) এবং নিজের উপর জুলুম করে, তাহলে আল্লাহকে ইয়াদ করে এবং গোনাহের জন্যে মাফ চায়। আল্লাহ ছাড়া কে গোনাহ মাফ করতে পারে? আর ইচ্ছাকৃতভাবে নিজর কৃতকর্মের উপর জিদ ধরে না। (আলে ইমরান: ১৩৩-১৩৫)

-জান্নাতবাসী তারা যারা নিজেদের নযর পূরণ করে [নযরের অর্থ এই যে, এমন নেক কাজ যা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে করার জন্যে মানুষ স্বয়ং শপথ করেছে-গ্রন্থকার।] এবং ঐদিনকে ভয় করে যার বিপদ চারদিকে ছড়িয়ে থঅকতে দেখা যাবে। যারা আল্লাহর মহম্বতে এতিম মিসকীন ও কয়েদীদের আহার করায় এবং বলে, আমরা তোমাদেরকে শুধু আল্লাহর জন্যে খাওয়াচ্ছি। তোমাদের পক্ষ থেকে কোন প্রতিদান অথবা কৃতজ্ঞতা লাভের আশায় করি না। আমরা ত ঐদিনের আযাবের জন্যে আল্লাহকে ভয় করি যা বিপদের ভয়কর দীর্ঘ দিন হবে। (দাহর: ৭-১০)

দৌড়ে চল সে পথে যা তোমাদের মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে নিয়ে যার যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের মতো। আর এ জান্নাত ঐসব খোদাভীরু লোকদের জন্যে তৈরী করে রাখা হয়েছে যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থাতে আপন ধনসম্পদ ব্যয় করে, ক্রোধ প্রশমিত করে, অন্যের ত্রুটি ক্ষমা করে এবং এ ধরনের সৎ লোক আল্লাহ পছন্দ করেন। যাদের অবস্থা এই যে, যদি কোন সময় কোন অশ্লীল কাজ তাদের দ্বারা হয়ে যায়, অথবা (কোন পাপ কাজ দ্বার) নিজেদের উপর জুলুম করে তাহলে আল্লাহকে স্মরণ করে পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থী হয়। আর আল্লাহ ব্যতীত আর কে গোনাহ মাফ করতে পারে। তার জ্ঞাতসারে নিজেদের কৃতকর্মের উপরে জিদ ধরে থাকে না। (আলে ইমরান: ১৩৩: ১৩৫)

চারিত্রিক মহত্বের শিক্ষা

এসব বিস্তারিত ণেতিক হেদায়েত এমন যে কোন সংস্কারমনা মানুষ, যার মধ্যে কিছু নৈতিক অনুভূতি ও ভালো মন্দের জ্ঞান বিদ্যমান প্রভাবিত না হয়েই পারে না। কুরআন শুধু এতোটুকু যথেষ্ট মনে করেনি। বরঞ্চ নৈতিক মহত্বের এক একটিকে সুস্পষ্ট করে বলে যে ইসলাম মানুষকে কোন কোন গুণাবলীর দ্বারা ভূষিত করতে চায় এবং রসূলুলআহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ কার্যত দেখিয়ে দিয়েছেন যে এ গুণাবলী শুধু মুখে বলার জিনিস নয় বরঞ্চ ইসলাম যে জীবনেই প্রবেশ করার পথ পেয়েছে তাকে এ গুণাবলীর দ্বার ভূষিত করেছে। এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দান সম্ভব নয় বিধায় দৃষ্টান্ত স্বরূপ কিছু উদ্ধৃত করছি।

-নেক কাজ ও তাকওয়া পরহেজগারীর সাথে সহযোগিতা কর। আর পাপা কা ও বাড়াবাড়িতে সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। কারণ আল্লাহতায়ালা শাস্তিদানকারী। (মায়েদাহ: ২)

-(হযরত মূসা আলাইহিস সালাম) বল্লেন, হে খোদা! তুমি যে অনুগ্রহ আমার প্রতি করেছে তারপর আমি কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হবো না। (কাসাস: ১৭)

-মন্দের প্রতিশোধ এমন মংগল দ্বারা কর যা সর্বোৎকৃষ্ট। তারা তোমার বিরুদ্ধে যেসব রচনা করছে তা আমাদের ভালোভাবে জানা আছে। তুমি দোয়া কর, হে আমার খোদা! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং সে আমার নিকটে আসুক তার থেকেও তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। [অর্থাৎ খোদার কাছে  আশ্রয় চাও যেন শয়তান কখনো তোমাকে গালির জবাব গালিতে, মিথ্যার জবাব মিথ্যার দ্বারা, জুলুমের জবাব জুলুম দ্বারা, বেইনসাফি ও হক নষ্ট করার জবাব বেইনসাফি ও হক নষ্ট করে দেয়ার জন্যে উৎসাহিত করতে না পারে- গ্রন্থকার।] (মুমেনুন: ৯৬-৯৮)

-তারা মন্দকে ভালোর দ্বারা প্রতিহত করে এবং যে রিযিক আমরা দিয়েছি তার থেকে খরচ করে। যখন কোন বেহুদা কথা তারা শুনে তার জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকে এবং বলে, আমারেদ কৃতকর্ম আমাদের জন্যে আর তোমাদের কৃতকর্ম তোমাদের জন্যে। তোমাদেরকে সালাম। আমরা জাহেলদের মতো পন্থা অবলম্বন করতে চাই না। (কাসাস: ৫৪-৫৫)

-সে আখেরাতের ঘর (জান্নাত) আমরা ঐসব লোকের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেব যারা যমীনে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব চায় না এবং ফাসাদ সৃষ্টি করতেও চায় না। (কাসাস: ৮৩)

-(ঈমানদার তারা) যাদেরকে দুনিয়ায় রাষ্ট্রশক্তি দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত ব্যবস্থা  চালু করবে। সৎ কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। (হজ্ব: ৪১)

-(আল্লাহর নূরের দিকে হেদায়েতপ্রাপ্ত) লোক সেসব ঘরে পাওয়া যায় যেগুলোকে উন্নত করার এবং যার মধ্যে আল্লাতর তাঁর নাম ইয়াদ করার অনুমতি দিয়েছেন। সেখানে এসব লোক সকাল সন্ধ্যা তাঁর তসবিহ করে যাদেরকে ব্যবসা বাণিজ্য ও কেনাবেচা আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায কায়েম করা থেকে যাকাত দেয়া থেকে গাফেল করে রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে যেদিন দিল উল্টে যাওয়া এবং চক্ষুর পাথর হয়ে যাওয়অর অবস্থা দেখা দেবে। (নূর: ৩৬: ৩৭)

-হে লোকেরা যারা ঈমান এনেছ, তোমার মাল ও সন্তানাদি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ইয়াদ থেকে গাফেল করে না দেয়। যারা এমন করবে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (মুনাফেকুন: ৯)

-হে লোকেরা যারা ঈমান এনেছো! ইনসাফের পতাকাবাহজী এবং খোদার জন্যে সাক্ষী হয়ে যাও। তোমাদের ইনসাফ ও তোমাদের সাক্ষ্যের আঘাত তোমাদের নিজেদের উপর, তোমাদের পিতামাতা এবং নিকটাত্মীয় স্বজনদে উপরই পড়ুকনা কেন।

এ সম্পর্কিত ব্যক্তি ঘনী হোক অথবা গরীব, আল্লাহ তোমাদের অপেক্ষা তাদের অধিকতর শুভাকাংখী। অতএব প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে গিযে তাদের প্রতি ইনসাফ করা থেকে বিরত থেকো না। আর তোমরা যদি তাদের মন রাখার জন্যে কথা বল অথবা সত্যবাদি থেকে সরে থাক, তাহলে জেনে রাখ যে, তোমরা যা কিছুই করছ আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। (নিসা: ১৩৫)

-হে লোকেরা যারা ঈমান এনেছো! আল্লাহর সন্যে সত্যের উপর কায়েম থাকো এবং ইনসাফের সাক্ষ্যদাতা হয়ে যাও এবং কোন দলের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে এতোটা উত্তেজিত না  করে যাতে ইনসাফ করতে না পার। ইনসাফ কর কারণ এ হচ্ছে তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবহিত। (মায়েদা: ৮)

-যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে লড়াই কর এবং সীমালংঘন করো না। সীমালংঘনকারীদেরকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। (বাকারাহ: ১৯৪)

-যে কেউ তোমাদের উপর বাড়াবাড়ি করলে, তার উপরেও ততোটুকু বাড়াবাড়ি কর যতোটুকু সে করেছে এবং আল্লাহকে ভয় কর। আর জেনে রাখ যে, মন্দ কাজ থেকে যারা সরে থাকে আল্লাহ তাদের সাথে আছেন। (বাকারাহ: ১৯৪)

-যদি প্রতিশোধ নিতে চাও তাহলে সেই পরিমাণে নাও যে পরিমাণে তোমাদের উপর বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। কিন্তু তোমরা যদি সবর কর, তাহলে তা সবরকারীদের জন্যে উত্তম। (নহল: ১২৬)

-তোমরা আহলে কিতাব ও মুশরিকদের পক্ষ থেকে বড়ো দুঃখজনক কথা শুনতে পাবে। এমন (উত্তেজনাকর) কথায় তোমরা যদি সবর কর এবং খোদাভীতির উপর কায়েম থাক তাহলে এ হবে বড়ো সাহাকিকতার কাজ। (আলে ইমরান: ১৮৬)

-আল্লাহ পছন্দ করেন না যে মানুষ মন্দ কথা বলুক। অবশ্যি যার উপর জুলুম করা হয়েছে তার ব্যাপারে আলাদা। [অর্থাৎ জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের আওয়াজ তোলার অধিকার আছে- গ্রন্থকার।][ (নিসা: ১৪৮)

-আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করেছেন যে, তোমরা আমানত আমানতদারকে সুপর্দ করবে। [খোদার এ ইরশাদে মুসলিম সমাজের নাগরিকদের এ হেদায়েত দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন আমানত খেয়ানত না করে। বরঞ্চ যে আমানতই তাদের উপর আস্থা স্থাপন করে তাদের কাছে সোপর্দ করা হযেছে, তা যেন ভালোভাবে পরিশোধ  করে। সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজ ও তার কর্ণধারদেরকে এ হেদায়েত দেয়া হয়েছে যে, দায়িত্বের পদমর্যাদা (positions of trust) এমন লোকের উপর অর্পণ করতে হবে যারা এ দয়েতের বোঝা বনহ করতে সক্ষম। ধর্মীয় নেতৃত্ব, জাতীয় নেতৃত্ব এবং দেশ পরিচালনার পদমর্যাদা অযোগ্য, দুর্নীতিপরায়ণ, সংকীর্ণমনা এবং চরিত্রহীন লোককে দিওনা। কারণ অসৎ লোকের নেতৃত্ব গোটা সমাজকে বিনষ্ট করে দেয়- গ্রন্থকার।]

আর মানুষের মধ্যে কোন ফয়সালা করবে, তা ইনসাফের সাথে করবে।

-উপদেশ ত বুদ্ধিমান লোকেরাই গ্রহণ করে থাকে (তাদের আচরণ এ হয় যে) আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করে এবং চুক্তি ভংগ করে না। যেসব সম্পর্ক সম্বন্ধ আল্লাহর স্থাপন করার হুকুম দিয়েছে তা স্থাপন করে। নিজেদের রবকে ভয় করে এবং ভয় করে কি জানি তার কঠোরভাবে হিসাব নেয়া হয় নাকি। যারা তাদের রবের সন্তুষ্টির জন্যে সবর করে, নামায কায়েম করে, যা কিছু রিযিক তাদের আমরা দিয়েছি তার থেকে প্রকাশ্যে  ও গোপনে খরচ করে এবং মন্দ কাজকে ভালো কাজের দ্বারা প্রতিরোধ করে। (রাদ: ১৯-২২)

-তোমরা নেক কাজের মর্যাদা লাভ করতে পার না যতোক্ষণ না সেসব বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করেছে যা তোমাদের প্রিয়। আর তোমরা যা কিছুই খরচ কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। (আলে ইমরান: ৯২)

-হে ঈমানদারগণ! যে ধন তোমরা অর্জন করেছে এবং যা কিছু আমরা যমীন থেকে তোমাদের জন্যে বের করেছি, তার মধ্য থেকে উৎকৃষ্ট অংশ খোদার পথে বয় কর এবং বেছে বেছে অতি মন্দ জিনিস দিও না। কারণ এসব জিনিস তোমরা স্বয়ংয় কখনো গ্রহণ করবে না। তা গ্রহণ করার ব্যাপারে উপেক্ষা প্রদর্শন করবে। আল্লাহ তোমাদের এমন খরচের মুখাপেক্ষী নন। তিনি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট গুণে ‍গুণান্বিত। (বাকারাহ: ২৬৭)

-যদি প্রকাশ্যে দান কর, তাহলে এ ভালো কাজ। আর তা যদি গোপন রাখ এবং গরীবদের মধ্যে বিরতণ কর তাহলে তোমাদের জন্যে উৎকৃষ্টতর। এসব কাজের জন্যে তোমাদের অনেক পাপ মিটে যায় এবং তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তা জানেন। (বাকারাহ: ২৭১)

-ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি আর্থিক কষ্টে থাকলে তার সচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি সদকা করে দাও (অর্থাৎ কর্জ মাফ করে দাও) তাহলে এ তোমার জন্যে বেশী ভালো যদি তুমি বুঝে থাক। (বাকারাহ: ২৮০)

-জাহান্নামের আগুন থেকে) সেই অত্যন্ত পরহেজগার ব্যক্তিকে দূরে রাখা হবে যে পবিত্রতা অর্জনের জন্যে নিজের সম্পদ দান করে। তার উপর কারো এমন কোন অনুগ্রহ নেই যার বদলা তাকে দিতে হতে পারে। সে তো মহান ও শ্রেষ্ঠ খোদার সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এ কাজ করে থাকে। (লাইল : ১৭-২০)

-তোমাদেরকে যে ধন দিয়েছি তার থেকে খরচ কর তোমাদের কারো মৃত্যু আসার পূর্বে, এবং সে বলে, হায়রে আমার রব যদি আমাকে একটু অবকাশ দিতেন তাহলে আমি দান করতাম এবংয় সৎ লোকের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। (মুনাফেকুন: ১০)

-এতিমের মাল তাদেরকে দিয়ে দাও। ভালো মাল মন্দ মালের দ্বারা বদল করো না। আর তাদের মাল নিজরে মালের সাথে মিশিয়ে খেয়ে ফেলো না। এ বড় গোনাহের কাজ। (নিসা: ২)

-হে নবী, মুমিন পুরুষদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনমিত রাখে এবং (নগ্নতা ও ব্যাভিচার থেকে) লজ্জাস্থঅন সংরক্ষিত রাখে।… মুমেন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃস্টি অবনমিত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজর করে। আর নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে শুধু ঐ সৌন্দর্য ব্যতীত যা আপনাআপনি প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাদের বুকের উপর যেন ওড়নার আঁচল ফেলে দেয় এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে এ সকল লোক ব্যতীত যথা, স্বামী, পিতা, শশুর, পুত্র প্রভৃতি যা সূরা নূরে বলা হয়েছে। আর তারা যেন পথ চলার সময় এমন পদধ্বনি না করে যাতে তাতের অপ্রকাশিত সৌন্দর্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। (নূর: ৩০-৩১)

-যদি তোমরা খোদাকে ভয় কর তাহলে মিষ্টিমধুর স্বরে কথা বলোনা যাতে দুষ্ট প্রকৃতির কোন ব্যক্তি লালসা করতে পারে। বরঞ্চ পরিষ্বজার সোজা সোজা কথা বল। নিজেদের ঘরে অবস্থান কর এবং পুরাতন জাহেলী যুগের মতো সাজ সজ্জা ও বেশভূষা করে বেড়ায়ো না। (আহযাব: ৩২-৩৩)

-হে লোকেরা! ওসব পাক জিনিস হারাম করো না যা আল্লাহ তোমাদের জন্যে হালাল করেছে। আর সীমালংঘন করোনা, সীমালংঘনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাদেরকে যে পাক এবং হালাল জিনিস দিয়েছেন তা খাও। আর যে খোদার উপর তোমরা ঈমান এনেছ তাঁর নাফরমানি থেকে দূরে থাক। (মায়েদা: ৮৭-৮৮)

-মুমেন পুরুষ ও নারী একে অপরের বন্ধু। ভাল কাজের আদেশ করে, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামায কায়ে করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তার রসূলের আনুগত্য করে। (তাওবা: ৭১)

-যারা ইজ্জত সম্মান চায় (তাদের জেনে রাখা উচিত যে) সমস্ত ইজ্জতের মালিক আল্লাহ। যে জিনিস উর্ধে উত্থিত  হয় তা পবিত্র কথা। আর আমলে সালেহ (সৎ কাজ) তাকে উপরে উঠিয়ে দেয়। (ফাতের: ১০)

-এবং আমরা তোমাদেরকে সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থার সম্মুখীন করে তোমাদের পরীক্ষা করছি।  (আম্বিয়া: ৩৫)

[অর্থাৎ এ বিষয়ে পরীক্ষা করি যে, সচ্ছল অবস্থায় তোমরা অহংকারী, জালেম, খোদা বিস্মরণকারী ও প্রবৃত্তির দাস হয়ে যাও না ত এবং অসচ্ছল বা মন্দ অবস্থায় ইতর, হেয় ও অবৈধ পন্থা অবলম্বনস কর নাতো। এ একজন সংকীর্ণমনা লোকের কাজ যে, ভালো অবস্থায় সে ফেরাউন হয়ে যাবে এবং দুরবস্থায় মাটিতে না ঘষতে থাকবে এবং অবস্থার পরিবর্তনের জন্যে বৈধ-অবৈধ যে কোন পন্থা অবলম্বন করবে। মুমেনের কাজ হচ্ছে সকল অবস্থায় সত্যনিষ্ঠার উপর অবিচল থাকা- গ্রন্থকার।]

সৎ ব্যর্তিবর্গই শুধু নয়, সৎ সমাজও বাঞ্ছিত

উপরোক্ত চারিত্রিক মহত্বের সাথে কুরআনে এ কথাও বলা হয়েছে যে, ইসলামের উদ্দেশ্য শুধু সৎ লোক তৈরী করাই নয়, বরঞ্চ তাদেরকে একত্র একটি সৎ সমাজ গঠন করাও। কারণ এ ছাড়া মানব জাতির ক্ষতি থেকে বাঁচা এবং সমৃদ্ধি লাভ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। এ বিষয়টি যদিও বহুস্থানে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, কিন্তু আমরা মাত্র দুটি স্থান দৃষ্টান্ত স্বরূপ পেশ করছি।

(আরবী****************)

-আমরা কি মানুষকে দুটি চোখ, একটি জিহ্বা ও দুটি ওষ্ঠ দান করিনি? এবং (ভালো ও মন্দের) দুটি সুস্পষ্ট পথ দেখায়নি? কি সে দুর্গম ঘাঁটি অতিক্রম করার সাহস করেনি এবং তুমি কি জান যে সে দুর্গম ঘাঁটি কি? কারো গলা গোলামীর শিকল থেকে মুক্ত করা, কিংবা আহারের দিনে কোন নিকটবর্তী এতম ও ধুলোমলিন মিসকীনকে খানা খাওয়ানো। অতঃপর সেই সাথে সে লোকদের সাথে শামিল হওয়া যারা ঈমান এনেছে। যারা পরস্পরকে সবর করার ও দয়া প্রদর্শনের নসিহ কবরে। (বালাদ: ৮-১৭)

সৎ সমাজের বৈশিষ্ট্য

এসবের মধ্যে গোলাম আযাদ করে দেয়া, অথবা নিকববর্তী এতিম ও ধূলোমলিন মিসকীনকে খানা খাওয়ানো, ব্যকিা্তগত নেকির কাজ যা অগণিত ব্যক্তির নেকীর অন্তর্ভুক্ত দুই একটিকে নমুনসা হিসাবে পেশ করা হয়েছে যা ব্যক্তির মধ্যে হওয়া উচিত।

কিন্তু সেই সাতে এও প্রয়োজন বলে গণ্য করা হয়েছে যে, এ ধরনের সৎ ব্যক্তিবর্গ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত হয়ে থাকবে না। বরঞ্চ এ সব লোকের সাথে মিলিত হয়ে জামায়াতবদ্ধ হয়ে যারা ঈমান আনয়নকারী এবং পরস্পর পরস্পরকে সবর করায় খোদার সৃষ্টজীবের প্রদি দয়া প্রদর্মন করার নসিহতকারী যাতে করে তাদের দ্বার একটি ধৈর্যশীল ও দয়াবান সমাজ অস্তিত্বলাভ করতে পারে। এমন একটি সমাজ যা পবিত্র নৈতিকতার উপর অবিচল থাকবে। পাপ কাজ ও পাপের প্ররোচনা থেকে নিজেদের ‍দূরে রাখবে, সত্য পথে চলার কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতার সাহসিকতার সাথে মুকাবিলা করবে। সত্য পথে দৃঢ়ভাবে কায়েম থাকবে এবং খোদার সৃষ্ট জীবের প্রতি অত্যাচারী ও পাষান হৃদয় হবে না, বরঞ্চ দয়াশীল ও স্নেহশীল হবে এ ধরনের সমাজ খোদা ও আখেরারেত উপর ঈমান এবং  তাঁর আনীত আইনের উপর অদম্য বিশ্বাস ও আস্থা ব্যতিরেকে গঠন করা যেতে পারে না। এ কারণে অবশ্যম্ভাবীরূপে এ গুণাবলী একটি মুসলিম সমাজেই এখন মজবুত বুনিয়াদের উপর কায়েম হতে পারে যা দুনিয়ার জীবনে সংঘটিত কোন পরীক্ষায়ও আপন গুণাবলী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে না।

(আরবী******************)

কালের কসম। মানুষ প্রকৃতপক্ষে বড়ো ক্ষতির মধ্যে। ঐবস ব্যতীত যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করতে থাকে এবং একে অপরকে হকের উপদেশ এবং সবরের নসিহত করতে থাকে।

এখানে কাল অর্থ অতীত কাল বা ইতিহাসও হতে পারে। অথবা অতিক্রমকারী কালও হতে পারে- যা প্রতি মুহূর্তে আক্রান্ত হচ্ছে। তার কসম খাওয়া অর্থ এই যে, সে এ বাস্তবতার সাক্ষী যা সামনে বলা হচ্ছে।

এখানে মানুষ শব্দটি তার পরিপূর্ণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এ জন্যে এর অর্থ এক একজন মানুষও হতে পারে। মানব সমষ্টিও হতে পারে এবং গোটা মানবজাতিও হতে পারে।

খুসর শব্দের অর্থ ক্ষতি-লোকসান এবং ব্যর্থতা হতে পারে- যা সমৃদ্ধির, মুনাফা ও সাফল্যের বিপরীত।

সে চারটি গুণ যার উপর মানব জাতির সাফল্য সমৃদ্ধি নির্ভরশীল

এ কয়টি সংক্ষিপ্ত বাক্যে কসম খেয়ে নিশ্চয়তার সাথে এ কথা বলা হয়েছে যে, যে ইতিহাস অতিক্রান্ত হয়েছে এবং যে অবস্থা এখন চলছে, উভয়ই এ কথার সাক্ষী যে, মানুষ ব্যক্তি হিসাবে, জাতি হিসাবে এবং প্রজাতি হিসাবে সমৃদ্ধি নয় বরঞ্চ ক্ষতির মধ্যেই নিমজ্জিত আছে। এ ক্ষতি থেকে শুধু তারাই নিরাপদ রয়েছৈ যাদের মধ্যে নিম্নের চারটি গুণ পাওয়া যায়।

ঈমান

অর্থাৎ এ কথার উপর দৃঢ় প্রত্যয় যে, শুধুমাত্র আল্লাহ ওয়াইদাহু লা শরীকই স্রষ্ঠা, মালিক, রেযকদাতা, অভাব পূরণ কারী, মাবুদ ও শাসক যার বন্দেগী, আনুগত্য ও স্তবস্বুবি করা উচিত। আর আল্লাহর রসূল কর্তৃক আনীত হেদায়েতই সত্য যা মেনে চলা উচিত। আর জীবন বলতে শুধু এ দুনিয়ার সাময়িক জীবন নয় বরঞ্চ তারপর এক চিরন্ত জীবনও শুরু হবে যেখানে নামাদেরকে এ দুনিয়ার কৃত সকল কর্মাকন্ডের হিসাব নিতে হবে। তারপর তার পুরষ্কার অথবা শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ঈমান সাফল্য ও সমৃদ্ধ লাভের প্রথম শর্ত। কারণ এ ছাড়া দ্বিতীয় কোন ব্স্তু এমন নেই যা সীরাত, আখলাক ও আচার-আচরণের জন্য একটি মজবুদ বুনিয়াগ গড়তে পারে। যার মউপর এক পূণ্য পূত জীবনের প্রাসাদ নির্মিত হতে পারে।

এ ব্যতিরেকে মানবজীবন দৃশ্যতঃ যতোই সুন্দর দেখাক না কেন, তার অবস্থা হয় একটি নোঙ্গরবিহীন জাহাজের মত যা স্বার্থ, অভিলাষ ও কল্পনা বিলাসের তরঙ্গের সাথে বয়ে যায়। কোথাও তটস্থ হয় না।

সৎ কাজ

ঈমানের সাথে এ গুণের সম্পর্ক বীজ ও বৃক্ষের ন্যায়। ঈমান এমন এক বীজ যার অভাবে নেক আমলের বৃক্ষ পয়দা হতে পারে না। তা কিছু লোকের জীবনে ঈমান ব্যতিরেকে কিছু প্রকাশ্য ও অস্থায়ী গুণ  ও নেকী পাওয়া যাক না কেন। আর বৃক্ষ সে সব নেক আমল যা সেই মানুষের জীবনের অংকুরিত ও বিকশিত হওয়া বিব্কে ও যৌক্তিকতার দাবী-যার জীবনে ঈমানের বীজ বপন করা হয়েছে। কোথাও এ বীজ বপন করা হয়েছে, কিন্তু নেক আমলের বৃক্ষ পয়দা হলো না, তাহলে বুঝতে হবে যে, সে মানুষের দিল বীজের কবরে পরিণত হয়েছে এবং ক্ষতি থেকে বাঁচার আার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ঈমানের সাথে নেক আমল হচ্ছে ক্ষতি থেকে বাঁচার দ্বিতীয় শর্ত।

উপরোক্ত দুটি গুণ ব্যক্তিগতভাবে মানুষের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। এবং তা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের নিশ্চয়তাদানকারী হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিক সাফল্য এ ছাড়া সম্ভব নয় যে, এমন সব গুণ নিয়ে মএক সমাজ গঠিত হবে এবং তার মধ্যেও ঐ অতিরিক্ত দটি গুণ পাওয়া যাবে যাকে এ সূরাতে ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য শর্ত বলা হয়েছে।

একে অপরের প্রতি হকের নসিহত

হক শব্দটি বাতিলের বিপরীত। এ সাধারণতঃ দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। এক সঠিক, সত্য, সুবিচারপূর্ণ এবং বাস্তবতার সাথে সংগতিশীল বিষয় তা ঈমান আকীদাহ ও ধারণা সম্বন্ধে হোক অথবা দুনিয়ার কাজকর্ম সম্পর্কে। এমন হক যা সম্পাদন করা মানুষের উপর ওয়াজেব। তা সে খোদার হক হোক, মানুষের অথবা নিজের হোক না কেন। অতএবং হকের নসিহত করার অর্থ এই যে, সৎ ঈমানদারদের সমাজ এমন অনুভূতিহীন হবে না যে বাতিল মস্তক উত্তোলন করে মানুষের হক (অধিকার) বিনষ্ট করছে এবং মানুষ নীরবে তামাশা দেখছে। বরঞ্চ তার সামগ্রক বিবেক এমন জীবনন্ত হবে এবং তার  ব্যক্তিবর্গ এটাকে তাদের দায়িত্ব মনে করবে যে যেখানেই বাতিল তার মস্তক উত্তোলন করবে অথবা যেখানেই হক বিনষ্ট হতে দেখা যাবে, সেখানেই বাতিলের বিরোধিতা এবং হকের সমর্থনে লোক ময়দানে নেমে পড়বে। কোন ব্যক্তি শুধু নিজে হকপন্থী, সত্য নিষ্ঠ ও সুবিচারকারী হওয়া এবং হকদারদের হক আদায় করে দেয়াই যথেষ্ট মনে করবে না।বরঞ্চ অপরকেও এ ধরনের কাজের নসিহত করবে। এটাই সেই বস্তু যা সমাজকে নৈতিক অধঃপতন থেকে রক্ষা করার গ্যারান্তি বা জামিনদার হয়। যদি কোন সমাজে এ মহৎ গুণাবীল পাওয়া না যায়, তাহলে তা ক্ষতি থেকে বাঁচতে পারবে না। বরঞ্চ সামগ্রিক বিশৃংখলা বাড়তে থাকলে ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত থাকাও কঠিন হয়ে যায়।

একে অপরকে সবরের উপদেশ

‘সবর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রতিরোধ ও বাধা অথবা নিবৃত্ত করা ও বিরত থাকা। আরবী ভাষায় এ শব্দের সহনশীলতা ধৈর্য, নিয়ন্ত্রণ অব্চিলতা, ইচ্ছার দৃঢ়তা, সাহকিকতার সাথে কোন প্রতিবন্ধক শক্তির মুকাবিলায় দৃঢ়তার সাথে আত্মনিয়োগ করা অর্থে ব্যবতৃহ হয়। কিন্তু ‍কুরআন মজিদে এ শব্দকে এমন ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত করা হয়েছে যে মুমেনের সমগ্র জীবন সবরের জীবনে পরিণত হয়।

সবরের কুরআন সম্মত অর্থ

কুরআনে এক শতেরও অধিকস্থানে  এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এসব স্থানের উপর চিন্তাভাবনা করলে জানতে পারা যায় যে, নিম্নলিখিত অর্থ সমূহে তা ব্যবহৃত হয়েছে।

নিজের ভাবাবেগ, প্রবণতা, অভিলাষ ও ঝোঁক প্রবণতাকে আল্লাহতায়ালার সীমারেখার মধ্যে সীমিত রাখা।

খোদার নাফরমানি দ্বারা যতোই লাভ ও ভোগ বিলাসের সুযোগ আসুক না কেন, তার লোভের পথভ্রষ্ট না হওয়া এবং খোদার আনুগহত্য করার কারণে যে সব ক্ষতি, ‍দুঃখ কষ্ট ও বঞ্চনার শিকার হতে হয় তা হাসিমুখে বরণ করা।

সারাজীবন প্রবৃত্তিকে বশীভূত রেখে গোনাহের প্রতি শয়তানের একটি প্ররোচনা ও প্রবৃত্তির অভিলাশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। প্রতিটি প্রলোভন ও ভয়ের মুকবেলায় হক পুরস্তির উপর কায়েম থাকা। দুনিয়ার বুকে সততা অবলম্বনের ফলে যেসব ক্ষতি ও দুঃখকষন্ আসবে তা বরদাশত করা। অবৈধ পন্থা অবলম্বনে যে সব সুযোগ-সুবিধা লাভ করা যেতে পারে তা প্রত্যাখ্যান করা।

হারামখোরদের জাঁকজমক দেখে হিংসা ও অভিলাষের ভাবাবেগে অধীর হওয়া ত দূরের কথা, তার প্রতি দৃষ্টিপাত  ও না করা এবং ঠান্ডা মাথায় এ কথা উপলব্ধি করা যে, ঐ চাকচিক্যময় নোংরামি ও পংকিলতা থেকে চাকচিক্যহীন পবিত্রতাই উৎকৃষ্ট যা আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে তাকে দান করেছেন।

ঈমান আসার সকল প্রকার ভুঁকি গ্রহণ করা। হকের দুশমনদের জুলুম অত্যাচার বীরত্ব সহকারে বরদাশত করা। বিরোধিতার তুফান এবং বিপদ মুসিবতের অগ্রাসনে হকের সমর্থনে অবিচল থাকা। বাতিলের কাছে নতি স্বীকার করা এবং তার সাথে আপোসকামিতার ধারণা মনে স্থান না দেয়া।

বিরোধীদের বাড়াবাড়ি ঠাট্টাবিদ্রুপ ও অপপ্রচার স্বতঃস্ফূর্তভাবে উত্তেজিত না হওয়া, বরঞ্চ নীরব ভাবাবেগেমুক্ত হয়ে ঠিকমতের সাথে তবলিগ ও সংস্কার কাজ করে যাওয়া, তা ফলপ্রসূ হওয়ার কোন সম্ভাবনা দূর ভবিষ্যতে দেখা না গেলেও।

চরম উস্কানিমূলক আচরণে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে তড়িঘড়ি এমন ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ না করা যা দাওয়াতে হকের উপযোগী কৌশলের পরিপন্থী এবং দাওয়াতের উদ্দেশ্যের জন্য ক্ষতিকর।

বছরের পর বছর ধরে, বাহিলপন্থীরেদ মুকাবিলায় সংগ্রাম করতে থাকা যারা নীতিনৈতিকতার সকল সীমা লংঘন করে চলে এবং শক্তি ও  ক্ষমতার নেশায় বুদ হয়ে থাকে। কিন্তু কোন অবস্থাতেও সততা পরিহার  করে তাদের মতো অন্যায় কৌশল অবলম্বন না কর।

বাতিলের মুকাবেলায় হকের দুর্বলতা ও হক প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামকারীদের ক্রমাগত ব্যর্থতা এবং বাতিল নেতৃবৃন্দের সাফল্য দেখে হতাশ ও মনমরা না হওয়া। কখনো হতভস্বতা, নিরুৎসাহিতা এবং মনোবলহীনতার শিকার হয়ে এটা মনে না করা যে, হক প্রতিষ্ঠার সংগ্রামহীন অর্থহীন এবং এখন এটাই ঠিক যে ঐ সামান্য দ্বীনদারীতে সন্তুষ্ট থেকে বসে পড়ে যা কুফরী ও ফাসেকী শাসন বচ্যবসাথায় পাওয়া যাচ্ছে। চরম দুরবস্থার মধ্যেও সংকল্প ও সাহসিকতার সাথে হক সমুন্বত রাখার চেষ্টা অব্যাহত রাখা।

একজন মুমেন সবরকারী এসব কিছু এজন্য করে না যে, তার সুফল সে এ দুনিয়াতেই লাভ করবে। বরঞ্চ এ বিশ্বাস করে যে মরণের পর যে দ্বিতীয় জীবন শুরু হবে সেখানে সে এর সুফল লাভ করবে।

সে এতোটা ছেবলাও হয়ে পড়ে না যে, যদি সুদিন আসে এবং দুনিয়অতে সে সাফল্য লাভ করে, তখন গর্ব অহংকারে ফেরাউন হয়ে পড়ে না। আর যখন দুঃসময় আসে, তখন বিলাপ করতে থাকে এবং দুঃসময় কাটাবার জন্য কোন হীনতম পন্থা অবলম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

সে সর্বাবস্থায় নিজের ভারসাম্য বজায় রাখে। সমযের পরিবর্ত করে না। বরঞ্চ হর হামেশা এক ন্যায় সংগত ও সঠিক আচরণের উপর কায়েম থাকে। অবস্থা অনুকুল হলে এবং ধন দৌলত ও সম্মান সুখ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করলেও নিজের শেষ্ঠত্বের নেশায় মত্ত হয় না। কোন সময়ে বিপদ-মুসিবত ও দুঃখকষ্টের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হলে তার কারণে মানবীয় গুণ বিনষ্ট হতে দেয় না। খোদার পক্ষ থেকে পরীক্ষা কোন দানের আকারে অথবা বিপদের আকারে আসুক, তার সহনশীলতা অক্ষুন্ন থাকে।

সূরা ‘আসর’ এর উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ ক্ষতি থেকে শুধুমাত্র সে অবস্থায় বাঁচতে পারে যখন মানুষ ব্যক্তিগতভাবেও মুমেন, সৎ, হকপন্থী ও সবরকারী হবে এবং তাদের দ্বারা এমন এক সমাজ অস্তিত্ব লাভ করবে যেখানে প্রত্যেক অপরকে হক ও সবরের উপদেশ দেবে।

নৈতিক শিক্ষার এ হাতিয়ার এমন এক শক্তিশালী হাতিয়ার ছিল যার কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা কুরাইশ মুশরিকদের এবং আরবের কাফেরদের ছিল না। নবী (সা) এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যারা যত প্রকারের অভিযোগ আরোপ করুক না কেন, কোন বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি  এক কথা বিশ্বাসক  করতো না যে, এমন উচ্চ মানের নৈতিক শিক্ষা কোন স্বারথপর, পাগল অথবা কোন যাদুকর দিতে পারে। (১৪৭)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.