সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ

বিশ্বজনীন উম্মতে মুসলিমার প্রতিষ্ঠা

দাওয়াতে ইসলামীর একটি গুরুত্বপূন্ণ দফা এ ছিল যে, সমগ্র দুনিয়ার মানষ পকৃতপক্ষে এক এবং মানুষ হিসাবে সকলে সমান। তাদরে মধ্যে আল্লাহতায়ালঅ সৃষ্ট প্রকৃতি জাতি, বংশ, গোত্র, ভাষা আবাসভূমির যে পার্থক্র রয়েছে তা নিছক পরিচয়ের উদ্দেশ্যে যাতে তাদের মধ্যে সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি হতেহ পারে। এ পার্থক্য এ জন্য যে, তাদের মধ্যে মতবিরোধ-মতাণৈক্য সৃষ্টি হতে পারে, শত্রুতা সৃষ্টি হয়, এক দল অন্য দলকে হয়- তুচ্চ ও নীচ মনে করে এবং নিজেকে সম্ভ্রান্ত ও অবিজাত মনে করে, এক দল অন্য দলকে দলিত-মথিত করতে, লুন্ঠন করতে ও নির্মূল করতে বদ্ধপরিকর হবে। এ বুনিয়াদী মানবিয় সাম্যের পরিধির মধ্যে যদি কোন বস্তু লোকরে মধ্যে বৈধ ও ন্যায়ংগত উপায়ে বিক্ষোভের কারণ হয় তাহলে তা হচ্ছে অধিক আকীদাহ ও চিন্তা-যার ভিত্তিতে একত্রে সম্মিলিত হয়ে একটি হয়েছে এবং এ উম্মতের মধ্যে নায্যতঃ কোনো বস্তু যদি শ্রেষ্ঠত্বও মহত্বের কারণ হতে পারে, তা হলো তাকওয়া। অর্থাৎ খোদাকে ভয় করা, তাঁর নাফমানী থেকে বেঁচে থাকা এবং আখেরাতের জবাবদিহি স্মরণ করে ভ্রান্ত পথে চলা থেকে বিরত থাকা।

এ তত্ত্ব বা মতবাদের উপর ইসলাম দুনিয়ার মানুষের মধ্যে শুধু একটি পার্থক্য বাকী রেখেছে এবং তা হচ্ছে ঈমান ও কুফরের পার্থক্য। যে লোকই, তা সে যে কোন দেশ, জাতি গোত্র বর্ণ ও বংশের সাথে সম্পৃক্ত হোক না কেন, এবং কোন ভাষাভাষী হোক না কেন, আল্লাহর তৌহিদকে এমনভাবে মেনে নেয় যেভাবে মুহাম্মদ (সা) তা পেশ করেছেন, মুহাম্মদকে (সা) সমগ্র মানব জাতির জ৮ন্য শেষ রসূল, কুরআনকে আল্লাহর শেষ কিতাব বলে মেনে নেয়, এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান আনে, সে মুমেন এবং মুমেনদের ভাই, মুমেনদের জামায়াতের একজন সদস্য, উম্মতে মুসলিমার এক ব্যক্তি এবং মুসলিম সমাজে তার যাবতীয় অধিকার সকল দিক দিয়ে সমান। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি এ বিশ্বাস পোষণ করবেন না সে কাফেল। একজন মুমেনের বাপ, মা, ভাই, বোন, পুত্র, কন্যা, স্ত্রী অথবা স্বাম-যেই হোক না কেন। একই গোত্র, একই আবাসভূমি অথবা একই বর্ণ হওয়া ত পরবর্তী মর্যাদা দান করে। মুমেন তার সাথে ত মানবীয় সম্পর্ক অক্সুন্ন রাখতে পারে, কিন্তু অন্যান্য সকলদিক দিয়ে তার সমাজ মুসলিম সমাজ থেকে পৃথক হবে। সে দুনিয়ার কাজকর্মে ত তার সাথে সে সব সম্পর্ক সম্বন্ধ রাখতে পারে যা মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে। কিন্তু দ্বীনের ব্যাপারে সে তার সাথে বন্ধুত্ব ভালোভাসা রাখতে পারে না, তার সাথে মিলে এক জামায়াত ও এক সমাজ বানাতে পারে না। এমন কি তার পিতাও যদি কাফের থেকে থাকে, তাহলে তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়াও করতে পারে না। দ্বীনকে কেন্দ্র করে যদি যুদ্ধের স্মুখীন হতে হয়, তাহলে ভাই ভাইযেল বিরুদ্ধে এবং পিতা পুত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করবে না। দেশ ও জাতি যদি দ্বীনের পথে প্রতিবন্ধক হয়, তাহলে সে ঘরবাড়ি জাতি ও দেশ সবকিছু পরিত্যাগ করে হিজরত করবে কিন্তু দ্বীনকে দেশ ও জাতির জন্য কুরবানী করবে না।

এ উম্মতের নাম হর-হামো উম্মতে মুসলিমা ছিল। প্রত্যেক নবীর উম্মত মুসলিম ছিল এবং নাম তাদেরও রাখা হয়েছে যারা মুহাম্মদ (সা) এর উপর ঈমান এনেছে। এর দ্বারা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল, তা সে যে কোন দেশের হোক না কেন, পূর্বের হোক অথবা পশ্চিমের হোক, উত্তরের হোক বা দক্ষিণের হোক। কোন জাতির জন্য এমন কোন বৈশিষ্ট্য ছিল না যা অন্য জাতির ছিল। এর ভিত হঠাৎ কোন জন্মগ্রহণের উপর ছিল না, বরঞ্চ ছিল জেনে বুঝে ঈমান আনার উপর। আর এ ঈমানের যারা দুনিয়ার মানুষ শরীক হতে পারতো, তারা সমান অধিকারসহ এ উম্মতে শরীক হতে পারতো।

অতঃপর শুধু মেনে নিয়ে বসে পড়ার উম্মত এ ছিলনা। বরঞ্চ ছিল একদি দায়ী (আহবানকারী) ও মুবাল্লিগ উম্মত। তার প্রতিটি লোক ছিল একটি আন্দোলনের কর্মী তার সবচেয়ে প্রিয় উদ্দেশ্য ছিল যে, সত্য, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের মাধ্যমে তার কাছে পৌঁছেছে তা অপরের কাছে পৌঁয়ে দেয়া। দুনিয়ায় গোমরাহি থেকে এবং আখেরাতে আল্লাহর আযাব থেকে যতো লোককে বাঁচানো যায় বাঁচাবার চেষ্টা করা।

এ ছিল এমন এক বিষয় যার জন্য শুধু কুরাইশ নয়, আরবের সকল গোত্র বিচলিত হয়ে পড়ে। হাজার হাজার বছর যাবত তাদের গোটা  সামাজিক ব্যবস্থা গোত্রবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। এটাই ছিল তাদের পৃষ্ঠপোষক। রক্তের সম্পর্কই তাদের সম্পর্ক ও সাহায্য-সহযোগিতার বুনিয়াদ। এর উপরেই তাদের আভিজাত্য ও মান-সম্ভ্রম নির্ভর করতো। প্রত্যেক গোত্র অন্য গোত্রের উপর এর ভিত্তিতে গৌরব প্রদর্শন করতো যে, তাদের পূর্ব পুরুষ অমুক অমুক বিষয়ে অবদান রেখেছে। এখন যে তারা দেখলো যে তাদের মধ্যে এমন এক দাওয়ারেত অভ্যত্থান হচ্ছে যা গোত্রবাদের মুলোৎপাটন করছে, যা প্রত্যেক দল ও গোত্রের মধ্য থেকেলৈাক বের করে তাদরেকে নিয়ে পৃথক নামে এক স্থায়ী জামায়াত বানানো হচ্ছে- যারা না কোন কওম বুঝে, না গোত্র বরঞ্চ একটি আকীদাহ-বিশ্বাসের উপর বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধত্বের বুনিয়াদ রচনা করছে যারা গর্ব-আভিজাত্যের সকল প্রাচীন ধারণার অবসান ঘটিয়ে কুলীন-অকুলীণ সককলকে সমান করে দিচ্ছে এবং কুফর ও ঈমানের পার্থক্যকে বন্ধুত্ব ও শত্রুতার বুনিয়াদ গণ্য করে পুত্রকে পিতা থেকে, ভাইকে ভাই থেকে, স্বামীকে স্ত্রী থেকে পৃথক করছে, তখন তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। এ বিরাট সামাজিক বিপ্লব মেনে নেয়া তাদর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তারা সিদ্ধান্ত করলো যে, এ কালকে অংকুরেই বনিষ্ট করতে হবে, যেন তার থেকে কখনো ফুল এবং ফূল থেকে বাগ-বাগিচার সম্ভাবনা না থাকে। কিন্তু যাদের মনমস্তিষ্কে কিছু জ্ঞানবুদ্ধি ছিল যাদের মনের উপর কুসংস্কার ও গোড়ামির তালা লাগানো ছিল না তারা অনুভব করলো যে, এইটাই সেই মহৌষধ যা গোত্রীয় শত্রুতা ও ঘৃণা-বিদ্বেষ শেষ করে সমগ্র আরবকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। অতপর আর অতিক্রম করে সারা দুনিয়ার জাতিগুলোকে একই রশিতে বাঁধতে পারে।

দাওয়অতে ইসলামী এ অংশের যে সংক্ষিপ্তসার উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, তার পূর্ণ গুরুত্ব তখন উপলব্ধি করা যাবে যখন কুরআন থেকে তার বিস্তারিত বিবরণ মানুষ জানতে পারবে। (১৪৮)

এ উম্মতের নাম হর-হামশা উম্মতে মুসলিমা ছিল। প্রত্যেক নবীর উম্মত মুসলিম ছিল এবং নাম তাদেরও রাখা হয়েছে যারা মুহাম্মদ (সা) এর উপর ঈমান আনে। এর দ্বারা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল, তা সে যে কোন দেশের হোক না কেন, পূর্বের হোক অথবা পশ্চিমের হোক, উত্তরের হোক বা দক্ষিনের হোক। কোন জাতি জন্য এমন কোন বৈশিষ্ট্য ছিল না যা অন্য জাতির ছিল। এর ভিত হঠাৎ কোন জন্মগ্রহণের উপর ছিল না, বরঞ্চ ছিল জেনে বুঝে ঈমান আনার উপর। আর এ ঈমানের যারা দুনিয়ার মানুষ শরীক হতে পারতো, তারা সমান অধিকারসহ এ উম্মতে শরীক হতে পারতো।

অতঃপর শুধু মেনে নিয়ে বসে পড়ার উম্মত এ ছিলনা। বরঞ্চ ছিল একটি দায়ী (আহ্বানকারী) ও মুবাল্লিগ উম্মত। তার প্রতিটি লোক ছিল একটি আন্দোলনের কর্মী। তার সবচেয়ে প্রিয় উদ্দেশ্য ছিল যে সত্য, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের মাধ্যমে তার কাছে পৌছেছে তা অপরের কাছে পৌছিয়ে দেয়া। দুনিয়ায় গোমরাহি থেকে এবং আখেরাতে আল্লাহর আযাব থেকে যতো লোককে বাঁচানো যায় বাঁচাবার চেষ্টা করা।

এ ছিল এমন এক বিষয় যার জন্য শুধু কুরাইশ নয়, আরবের সকল গোত্র বিচলিত হয়ে পড়ে। হাজার হাজার বছর যাবত তাদের গোটা সামাজিক ব্যবস্থা গোত্রবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। গোত্র এমন বস্তু ছিল যার সাথে সম্পৃক্ত হয়েই তাদের সমাজ কায়েম ছিল। এটাই ছিল তাদের পৃষ্ঠপোষক। রক্তের সম্পর্কই তাদের সম্পর্ক সম্বন্ধ ও সাহায্য-সহযোগিতার বুনিয়াদ। এর উপরেই তাদের আভিজাত্য ও মান-সম্ভ্রম নির্ভর করতো। প্রত্যেক গোত্র অন্য গোত্রের উপর এর ভিত্তিতে গৌরব প্রদর্শন করতো যে, তাদের পূর্ব পুরুষ অমুক ‍অমুক বিষয়ে অবদান রেখেছে। এখন যে তারা দেখলো যে, তাদের মধ্যে এমন এক দাওয়াতের অভ্যুত্থান হচ্ছে যা গোত্রবাদের মূলোৎপাটন করছে, যা প্রত্যেক দল ও গোত্রের মধ্য থেকে লোক বের করে তাদেরকে নিয়ে পৃথক নামে এক স্থায়ী জামায়াত বানানো হচ্ছ-যারা না কোন কওম বুঝে, না গোত্র বরঞ্চ একটি আকীদাহ বিশ্বাসের উপর বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের বুনিয়াদ রচনা করছে যারা গর্ব-আভিজাত্যের সকল প্রাচীন ধারণার অবসান ঘটিয়ে কুলীন-অকুলীন সকলকে সমান করে দিচ্ছে এবং কুফর ও ঈমানের পার্থক্যকে বন্ধুত্ব ও শত্রুতার বুনিয়াদ গণ্য করে পুত্রকে পিতা থেকে, ভাইকে ভাই থেকে, স্বামীকে স্ত্রী থেকে পৃথক করছে, তখন তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। এ বিরাট সামাজিক বিপ্লব মেনে নেয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা। তারা সিদ্ধান্ত করলো যে, এ কালকে অংকুরেই বিনষ্ট করতে হবে, যেন তার থেকে কখনো ফুল এবং ফুল থেকে রাগ-বাগিচার সম্ভাবনা না থাকে। কিন্তু যাদের মনমস্তিষ্কে কিছু জ্ঞানবুদ্ধি ছিল এবং যাদের মনের উপর কুসংস্কার ও গোড়ামির তালা লাগানো ছিল না তারা অনুভব করলো যে, এইটাই সেই মহৌষধ যা গোত্রীয় শত্রুতা ও ঘৃনা-বিদ্ধেষ শেষ করে সমগ্র আরবকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। অতপর আরব অতিক্রম করে সারা দুনিয়ার জাতিগুলোকে একই রশিতে বাঁধতে পারে।

দাওয়াতে ইসলামী এ অংশের যে সংক্ষিপ্তসার উপরে বর্ণনা করা হয়েছে, তার পূর্ণ গুরুত্ব তখন উপলব্ধি করা যাবে যখন কুরআন থেকে তার বিস্তারিত বিবরণ মানুষ জানতে পারবে। (১৪৮)

সকল মানুষ মৌলিক দিক দিয়ে এক এবং তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মানদন্ড শুধু তাকওয়া

এ প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম মর্মকথা যা কুরআন বর্ণনা করেছে তা ছিল এই যে, গোটা মানবজাতি এক মা ও বাপের সন্তান এবং এর ভিত্তিতে সকল মানুষ মৌলিক দিক দিয়ে এক।

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً – (النساء 1)

-হে লোকেরা! ভয় কর তোমাদের রবকে যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে পয়দা করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া পয়দা করেছেন এবং এ উভয় থেকে বহু পুরুষ ও নারী (দুনিয়ার বুকে) ছড়িয়ে দিয়েছেন। (নিসাঃ১)

তারপর দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ মর্ম কথা কুরআন পেশ করেছে তা ছিল এই যে, মানবীয় একত্বের মধ্যে কওম ও গোত্রের যে আধিক্য পয়দা করেছেন তা শুধু পরিচয়ের উদ্দেশ্যে। তাদের মধ্যে মহত্বের মানদন্ড বংশ, বর্ণ, ভাষা ও জন্মভূমি নয়, বরঞ্চ তাকওয়ার নৈতিক গুণ।

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ –( الحجرات- 13)

-হে লোকেরা! আমরা তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে পয়দা করেছি। তারপর তোমাদের জাতি ও গোত্র বানিয়ে দিয়েছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর নিকটে তোমাদের মধ্যে। অধিক মর্যাদাবান তারা, যারা তোমাদের মধ্যে অধিক পরহেজগার অর্থাৎ আল্লাহর নাফরমানী থেকে আত্মরক্ষাকারী।

এ আয়াতে গোটা মানব জাতিকে সম্বোধন করে সেই বিরাট গোমরাহী চিহ্নিত করা হয়েছে যা দুনিয়াতে সর্বদা বিশ্বজনীন ফেতনা-ফাসাদের করণ হয়েছে। অর্থাৎ বংশ, বর্ণ, ভাষা, জন্মভূমি এবং জাতীয়তাবাদের গোঁড়ামি। প্রাচীনতমকাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক যুগে মানুষ সাধারণতঃ মানুষকে উপেক্ষা করে নিজের চারধারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিধি রচনা করতে থাকে যার মধ্যে জন্মগ্রহণকারীদেরকে আপন এবং তার বাইরে জন্মগ্রহণকারীদেরকে পর গণ্য করেছে। এ পরিধি কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বুনিয়াদের উপর নয়। বরঞ্চ হঠাত্ জন্মগ্রহণের বুনিয়াদের উপর রচনা করা হয়েছে। কোথাও এর বুনিয়াদ একটি পরিবার, গোত্র অথবা এক বিশেষ ভাষাভাষি জাতের মধ্য জন্মগ্রহণ করা।অতঃপর এসব বুনিয়াদের ভিত্তিতে আপন ও পরের যে পার্থক্য করা হয়েছে তা শুধু এতোটুকু পর্যন্ত সীমিত নয় যে, কাকে আপন গণ্য করা হয়েছে তার সাথে অপরের তুলনায় বেশী ভালোবাসার আচরণ ও তার সাহায্য-সহযোগিতা করা হবে। বরঞ্চ এ পার্থক্য ঘৃণা, শত্রুতা, অবজ্ঞা, জুলুম নিষ্পেষনের নিকৃষ্ট রূপ ধারণ করেছে। এর জন্যে দর্শন রচনা করা হয়েছে। ধর্ম আবিস্কার করা হয়েছে। রচনা করা হয়েছে, নৈতিক মূলনীতি তৈরী করা হয়েছে, জাতি ও রাষ্ট্রগুলোর একে তাদের স্থায়ী মতবাদ বানিয়ে শত শত বছর যাবত এ কার্যকর করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে ইহুদীরা বনী ইসরাইলকে খোদার প্রিয় সৃষ্টি বরঞ্চ খোদার পুত্র বলে গণ্য করেছে এবং নিজেদের ধর্মীয় নির্দেশাবলীতে পর্যন্ত যারা বনী ইসরাইল নয় তাদের অধিকার ও মর্যাদা ইসরাইলীদের থেকে নিম্নতর পর্যায়ে পৌছে রেখেছে। হিন্দুদের মধ্যে বর্ণাশ্রম প্রথার জন্ম দিয়েছে এই পার্থক্য-যার দৃষ্টিতে ব্রাক্ষণদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। উচ্চ শ্রেণীর মুকাবিলায় সকল মানুষকে নীচ ও অপবিত্র গণ্য করা হয়েছে। শূদ্রদেরকে ত একেবারে অপমান অবমাননার গর্ভে নিক্ষেপ করা হয়েছে। কালো ও সাদার পার্থক্য আফ্রিকা ও আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের উপর যে নিষ্পেষণ চলেছে তা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তালাশ করার প্রয়োজন নেই। এ বিংশ শতাব্দীতেও প্রত্যেকে স্বচক্ষে তা দেখতে পারে। ইউরোপবাসী আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে রেড ইন্ডিয়ানদের প্রতি যে আচরণ করেছে এবং এশিয়া ও আফ্রিকায় দুর্বল জাতিগুলোর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করে তাদের উপর যে আচরণ করেছে, তা অভ্যন্তরে এ ধারণাই সক্রিয় ছিল যে, আপন দেশ ও জাতির সীমানার বাইরে জন্মগ্রহণকারীদের জানমাল-ইজ্জত-আবরু তাদের জন্য হালাল। তাদের লুণ্ঠন করার ও তাদের গোলাম বানানোর অধিকার তাদের আছে। এমন কি প্রয়োজন হরে দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার অধিকারও তাদের আছে। পাশ্চাত্যের জাতিগুলোর জাতিপূজা একটি জাতিকে অন্যান্য জাতির জন্য যেভাবে হিংস্র পশু বানিয়ে রেখেছে তার নিকৃষ্ট দৃষ্টন্ত সাম্প্রতিককালের যুদ্ধগুলোতে দেখা গেছে এবং আজও দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে নাৎসী জার্মানীর বংশবাদ দর্শন এবং নাৎসী বংশের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা বিগত মহাযুদ্ধে যে হিংস্রতা প্রদর্শন করেছে তার প্রতি দৃষ্টি রাখলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, তা কত মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক গোমরাহী যার সংস্কর সংশোধনের জন্যে কুরআন মজিদের এ আয়াত নাযিল হয়েছিল।

এ সংক্ষিপ্ত আয়াতে আল্লাহতায়ালা সমগ্র মানবজাতিকে সম্বোধন করে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন।

এক. তোমরা সকলে মূলে এক। একই পুরুষ ও একই নারী থেকে তোমাদের গোটা প্রজন্ম অস্তিত্ব লাভ করেছে। আজ তোমাদের যতো বংশই দুনিয়াতে বিদ্যমান তা প্রকৃতপক্ষে একই প্রাথমিক বংশের শাখা-প্রশাখা যা একই বাপ ও একই মা থেকে শুরু হয়েছিল। এ জন্ম ধারাবাহিকতার মধ্যে কোথাও সে পার্থক্য ও উচ্চ-নীচের কোন ভিত্তি বিদ্যমান নেই যে ভ্রান্ত ধারণার তোমরা লিপ্ত আছ। একই খোদা তোমাদের স্রষ্টা। এমন নয় যে, বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন খোদা পয়দা করেছেন। একই জড় পদার্থ ও উপাদান থেকে জন্মলাভ করেছে এবং অন্য কিছু সংখ্যক অপবিত্র ও নিকৃষ্ট পদার্থ থেকে। যার থেকে দুনিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী পৃথক পৃথকভাবে জন্মলাভ করেছে।

দ্বিতীয়তঃ মূলের দিক দিয়ে এক হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জাতি ও গোত্রে বিভক্ত হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। এ সুস্পষ্ট যে, সারা দুনিয়ার সকল মানুষের একই পরিবার তা হতে পারে না। বংশবৃদ্ধির সাথে সাথে অসংখ্য পরিবার অপরিহার্য ছিল তারপর পরিবারসমূহ থেকে গোত্র ও জাতির অস্তিত্ব লাভও ছিল স্বাভাবিক ও অপরিহার্য। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস স্থাপন করার পর বর্ণ, আকার আকৃতি, ভাষা এবং জীবন-যাপন পদ্ধতি অবশ্যম্ভাবীরূপে পৃথক হওয়ারই কথা। আর একই অঞ্চলে বসবাসকারীদের পরস্পর নিকটতর হওয়া এবং দূরবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারীদের অধিক দূর হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্ত এ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক পার্থক্য ও অনৈক্যের দাবী কখনো এ ছিল না যে, এর ভিত্তিতে উঁচু-নীচু ‍কুলীন অকুলীন এবং হীনতর উচ্চতরের পার্থক্য কায়েম করা হবে। এক বংশ অন্য বংশের উপর তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করবে। এক বর্ণের লোক অন্য বর্ণের লোককে হেয় ও তুচ্ছ মনে করবে। এক জাতি অন্য জাতির উপর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্য কায়েম করবে এবং মানবীয় অধিকারে এক দল অন্য দলের উপর অগ্রাধিকার লাভ করবে।

স্রষ্টা যে কারণে মানব দলগুলোকে জাতি ও গোত্রের আকারে সুবিন্যস্ত করেছিলেন তা ছিল শুধু এই যে, তাদের মধ্যে পারস্পারিক পরিচিতি ও সাহায্য-সহযোগিতার স্বাভাবিক পন্থা এটাই ছিল। এ পন্থায় একটি পরিবার, একটি জ্ঞাতিগাষ্ঠী, একটি গোত্র ও একটি জাতির লোক মিলে একটি সার্বজনীন সমাজ ব্যবস্থা গঠন করতে পারতো এবং জীবনের কর্মকান্ডে একে অপরের সাহায্যকারী হতে পারতো। কিন্তু এ নিছক শয়তানী অজ্ঞতা ছিল যে, যে বস্তুকে আল্লাহতায়ালার তৈরী প্রকৃত পরিচয়ের মাধ্যমে বানিয়েছিল, তাকে গর্ব, অহকাংর ও ঘৃণা প্রদর্শনের মাধ্যমে বানানো হলো এবং সবশেষ তাকে জুলুম ও নিষ্ঠুরতায় রূপান্তরিত করা হলো।

তৃতীয়তঃ মানুষ ও মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ যদি কিছু থাকে এবং হতে পারে, তা শুধু নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব। জন্মগ্রহণ দিকে দিয়ে সকল মানুষ সমান। কারণ তাদের স্রষ্টা এক। তাদের জন্ম উপাদান ও জন্ম পদ্ধতি এক এবং তাদের সকলের বংশ তালিকা একই মা-বাপ পর্যন্ত গিয়ে পৌছে। উপরন্তু কোন ব্যক্তির কোন বিশেষ দেশ অথবা জাতি-গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করা এক আকস্মীক ব্যাপার। যার মধ্যে তার ইচ্ছা নির্বাচন এবং তার চেষ্টা চরিত্রের কোনই হাত নেই। কোন ন্যায়সঙ্গত কারণ নেই যে এ দিক দিয়ে কারো উপরে কারো শ্রেষ্ঠত্ব লাভ হবে। প্রকৃত জিনিস যার ভিত্তিতে এক ব্যক্তির অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব লাভ হয় তা এই যে, সে অন্যদের অপেক্ষা অধিকা পরিমাণে খোদাকে ভয় করে। পাপ কাজ থেকে দূরে থাকে এবং নেকী ও পবিত্রতার পথে চলে। এমন ব্যক্তি যে কোন বংশের, যেকোন জাতি ও দেশের হোক না কেন, আপন ব্যক্তিগণ গুণাবলীর ভিত্তিতে শ্রদ্ধার যোগ্য। আর যার আস্থা এর বিপরীত সে ত নিম্নস্তরের মানুষ। তা সে কালো হোক বা সাদা, পূর্বের হোক বা পশ্চিমের।

এসব বাস্তবতা যা কুরআনের একটি সংক্ষিপ্ত আয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা) তা তাঁর বিভিন্ন ভাষণে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময তাওয়াফের পর তিনি যে ভাষণ দেন তাতে বলেন-

(আরবী*******************)

প্রশংসা সেই খোদার যিনি তোমাদের থেকে জাহেলিয়াতের দোষত্রুটি ও তার গর্ব অহংকার দূর করে দিয়েছেন। হে লোকেরা! সকল মানুষ মাত্র দুটি অংশের বিভক্ত হতে পারে। একঃ নেক ও পরহেজগার যে আল্লাহর দৃষ্টিতে সম্মানিত। দ্বিতীয়ঃ পাপী ও হতভাগ্য যে আল্লাহর দৃষ্টিতে নীচ। নতুবা সমগ্র মানবজাতি আদমের সন্তান। আর আদমকে আল্লাহ মাটি থেকে পয়দা করেছেন।

বিদায় হজ্বের সময় আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি এক ভাষণে নবী (সা) বলেন-

(আরবী******************)

-লোকেরা! সাবধান। তোমাদের সকলের খোদ এক। কোন আরবের কোন অনারবের উপর, কোন অনারবের কোন আরবের উপর, কোন সাদার কালোর উপর এবং কোন কালোর কোন সাদার উপর এবং কোন কালোর কোন সাদার উপর শ্রেষ্টত্ব নেই, কিন্তু তাকওয়ার ভিত্তিতে। আল্লাহর নিকটে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি সে যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে পরহেজগার। বল, আমি তোমাদের নিকটে আমার বানী পৌছিয়ে দিয়েছি? (সমবেত জনতা) বলে হ্যাঁ ইয়া রসূলুল্লাহ (সা)। তিনি বলেন, আচ্ছা তাহলে যারা উপস্থিত তারা যেন তাদের কাছে এ বাণী পৌছিয়ে দেয় যারা অনুপস্থিত।

এক হাদীসে তিনি বলেন-

(আরবী***************)

-তোমরা সকলে আদমের সন্তান। আর আদমকে মাটি থেকে পয়দা করা হয়েছে। লোকেরা যেন তাদের পূর্বপুরুষদের জন্যে গর্ব করা ত্যাগ করে। নতুবা তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে তুচ্ছ কীট থেকেও অধিকতর নিকৃষ্ট হবে।

তিনি আরও বলেন-

(আরভী************)

-আল্লাহ কেয়ামতের দিন তোমাদের বংশকুল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন না। আল্লাহর নিকটে তোমাদের মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তি সে যে তোমাদের মেধ্যে সবচেয়ে পরহেজগার।

আরও বলেন-(আরবী****************)

-আল্লাহ তোমাদের চেহেরা সূরত ও ধনদৌলত দেখেন না। দেখেন তোমাদের দিল ও আমলের দিকে।

এসব শিক্ষা শুধু শব্দমালায় সীমিত ছিল না। বরঞ্চ ইসলাম তদনুযায়ী আহলে ঈমানদের এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে বাস্তবে দেখিয়ে দিয়েছে যার মধ্যে বর্ণ, বংশ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার কোন পার্থক্য নেই। যার মধ্যে উঁচু-নীচু, ছুঁৎমার্গ এবং পার্থক্যবোধ ভেদাভেদ ও গোঁড়ামির ধারণা নেই। যাতে শরীক হতে ইচ্ছুক সকল মানুষ, একেবারে সমান অধিকারসহ হতে পারে এবং হয়েছেও- তা তারা যে কোন বংশ, জাতি ও দেশের হোক না কেন। ইসলাম বিরোধীহণকে পর্যন্ত এ কথা স্বীকার করতে হয়েছে যে, মানবীয় সাম্য ও ঐক্যে নীতি সে সফল্যসহ মুসলিম সমাজে বাস্তবে রূপদান করা হয়েছে- তার কোন দৃষ্টান্ত দুনিয়ার কোন ধর্ম ও কোন ব্যবস্থাতে পাওয়া যায় না। আর না কখনো পাওয়া গেছে। শুধু ইসলামই সেই দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা যা দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বংশ ও জাতিকে একত্রে মিলিত করে এক আকীদার ভিত্তিতে এক উম্মত বানিয়ে দিয়েছে। (১৪৯)

এ চিরন্তন নিয়ম আখেরাতেও কার্যকর করা হবে

সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পর কুরআন মানুষকে এ বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত করে যে, বংশ, জাতি ও দেশের পরিবর্তে আকীদাহ ও আমলের ভিত্তিতে মতানৈক্য ও মিলিত হওয়ার এ নিয়ম পদ্ধতি বর্তমান দুনিয়া শেষ হওয়ার পর আখেরাতের দ্বিতীয় জীবনেও এভাবে কার্যকর হবে। অন্যান্য ভিত্তির উপর এ দুনিয়ায় যেসব দল কায়েম আছে তা সব ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাবে।

وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَتَفَرَّقُونَ-( الروم-14)

-যেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে, সকল মানুষ সেদিন ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হবে। (রূমঃ ১৪)

দুনিয়ার যেসব দল জাতি, বংশ, জন্মভুমি, ভাষা, গোত্র জ্ঞাতিগোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছে, তা সব সেদিন ভেঙ্গে যাবে এবং বিশুদ্ধ আকীদাহ, চরিত্র ও আচার আচরণের ভিত্তিতে নতুন করে এক দ্বিতীয় দলবদ্ধকরণ হবে। একদিকে মানব জাতির পূর্ববর্তী পরবর্তী জাতিসমূহের মধ্যে থেকে মুমেন ও সৎ মানুষ পৃথক করে বেছে নেয়া হবে এবং তাদের একটি দল হবে। অপরদিকে, এক এক ধরনের বিপদগামী মতবাদ ও বিশ্বাসপোষনকরী এবং এক এক প্রকারের অন্যায় কর্ম ও অপরাধকারীদেরকে ঐ বিরাট জনসমুদ্র থেকে বেছে পৃথক করা হবে এবং তাদের পৃথক পৃথক দল হবে। অন্য কথায় এমন মনে করা হবে যে, ইসলাম যে জিনিসকে এ দুনিয়ায় পৃথক করণ ও একত্রে মিলনের প্রকৃত বুনিয়াদ গণ্য করে এবং যাকে জাহেলিয়াতের পূজারীগণ ইহজগতে মানতে অস্বীকার করে, আখেরাতে সে বুনিয়াদের উপরেই পৃথক পৃথকও হবে এবং একত্রে মিলিতও হবে। ইসলাম বলে যে, মানুষকে ছিন্নকারী ও যুক্তকারী প্রকৃত জিনিস হলো আকীদাহ ও আখলাক। ঈমান আনয়নকারী এবং খোদার হেদায়েতের উপর জীবন ব্যবস্থার ভিত্তিস্থাপনকারী এক উম্মত, তা তারা দুনিয়ার যে কোন আঞ্চলের হোক না কেন। আর কুফর ও পাপাচারের পথ অবলম্বনকারী এক ভিন্ন উম্মত, তারা যে কোন দেশ ও বংশের হোক না কেন। এ উভয়ের জাতীয়তা এক হতে পারে না। না এরা দুনিয়ার এক সর্বজনীন জীবন পথ গঠন করে এক সাথে চলতে পারে, আর না আখেরাতে তাদের পরিণাম এক হতে পারে। দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্যন্ত তাদের পথ ও গন্তব্য একে অপর থেকে পৃথক। জাহেলিয়াতের পূঁজারীগণ এর সর্বকালে দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করতে থাকে এবং আজও এ কথার উপর অবিচল যে, দলবদ্ধতা বংশ, দেশ ও ভাষার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। এসব বুনিয়াদের দিক দিয়ে যারা এক, তাদের ধর্ম ও আকীদাহ উপেক্ষা করেও এক জাতি হয়ে অন্যান্য এ ধরনের জাতির মুকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। আর এ জাতীয়তার এক এমন জীবন বিধান হওয়া উচিত যার মধ্যে তৌহিদ, শির্ক, ও নাস্তিক্যের অনুসারীগণ সকলে এক সাথে মিলে চলতে পারে। এ ধারণা আবু জেহেল, আবু লাহাব এবং দায়িত্বশীল কুরাইশদের ছিল। তারা বার বার মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি এ অভিযোগ আরোপ করতো এ ব্যক্তির আগমনে আমাদের জাতির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। এ ধারনার বিরুদ্ধে কুরআন এখানে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, তোমাদের এ সব দলবদ্ধতা যা তোমরা এ দুনিয়ায় প্রাপ্ত বুনিয়াদের উপর কায়েম করে রেখেছো, অবশেষে ভেঙ্গে যাবে। মানব জাতির মধ্যে স্থায়ী বিভেদ নেই আকীদাহ, জীবন দর্শন, চরিত্র ও আচার আচরণের বুনিয়াদের উপরেই হবে যার উপর ইসলাম দুনিয়ার এ জীবনে করতে চায়। যাদের গন্তব্য এক নয়। তাদের জীবনের পথ এক হতে পারে কিভাবে? (১৫০)

উম্মতে মুসলিমা

উপরের বর্ণনা অনুযায়ী সকল মানুষকে এক গণ্য করার পর ইসলাম তাদের মধ্যে শুধু তাকওয়াকে পার্থক্যের কারণ বলেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে তাকওয়ার অর্থ আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং তাঁর কিতাবে বর্নিত আকীদাহ ও নির্দেশাবলী মেনে চলা। সেই সাথে আখেরাতের জবাবদিহিকে সামনে রেখে নাফরমানির আচরণ পরিহার করে হুকুম মেনে চলার আচরণ অবলম্বন করা। এ কারণে ইসলাম সমগ্র মানবজাতিকে দুটি অংশে বিভক্ত করে। একঃ যারা ইমান এনেছে এবং দ্বিতীয়ঃ যারা ইমান আনেনি। ইমান আনয়নকারীদেরকে সে এক উম্মত বানায় এবং তার নাম রাখে উম্মতে মুসলিমা যার মধ্যে দুনিয়ার সকল মুমেন শরীক হতে পারে। আর এ কোন নতুন নাম নয় যা শুধু মুহাম্মদ (সা) তাঁর উপর ইমান আনয়নকারীদের জন্য রেখেছেন। বরঞ্চ প্রাচীনতম যুগ থেকে সকল নবীর উম্মতের এ নামই আল্লাহ রেখেছেন।

هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا-( الحج-78)

-আল্লাহ প্রথমেও তোমাদের নাম রেখেছিলেন মুসলমান এবং এ কুরআনেও। (হজ্ব: ২৮)

তোমাদের’ সম্বোধন বিশেষ করে শুধু সেসব আহলে ঈমানের প্রতিই করা হয়নি যারা এ আয়াত নাযিলের সময় বিদ্যমান ছিলেন। অথবা তারপর আহলে ঈমানের কাতারে শামিল হয়েছেন। বরঞ্চ এ সম্বোধনের দ্বিতীয় পুরুষ সে সকল লোক যারা মানব ইতিহাসের সূচনা থেকেই তৌহিদ, আখেরাত, রেসালাম ও আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস ছিলেন। মোদ্দাকথা এই যে, এ মিল্লাতে হক যারা মানতেন তাঁরা অতীতেও নূহী, ইব্রাহীমী, মুসাবী, প্রভৃতি নামে অভিহিত ছিলেন না, বরঞ্চ তাঁদের নাম মুসলিম (আল্লাহর অনুগত) ছিল। আর আজও তারা মুহাম্মদী নন বরঞ্চ মুসলিম। এ কথা না বুঝার কারণে লোকের জন্যে এ প্রশ্ন প্রহেলিকা হয়ে রয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা) এর অনুসারীদের নাম কুরআনের পূর্বে কোন কিতাব রাখা হয়েছে। জরুরী নয় যে, প্রত্যেক ভাষায় এই আরবী শব্দ মুসলিম ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু নবীগণকে যাঁরা মেনে নিয়েছেন তাঁদের যে নামই কোন ভাষায় রাখা হয়েছে তা মুসলিমেরই সমার্থক। (১৫১)

উম্মতে মুসলিমার বিশ্বজনীনতা সর্বকালীনতা

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِهِ هُمْ بِهِ يُؤْمِنُونَ – وَإِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ قَالُوا آمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ-( القصص-52-53)

-যাদেরকে আমি ইতিপূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এ (কুরআনের) উপর ঈমান আনছে। আর যখন এ তাদেরকে শুনানো হয় তখন তারা বলে, আমরা এর উপর ঈমান এনেছি। এ প্রকৃতপক্ষে হক আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আমরা ত প্রথম থেকেই মুসলিম। (কাসাস: ৫২-৫৩)

অর্থাত্ এর আগেও আমরা আম্বিয়া ও আসমানি কেতাবের প্রতি বিশ্বাসী ছিলাম এজন্য সে সময়েও ইসলাম ব্যতীত আমাদের আর কোন দ্বীন ছিল না। তারপর এখন যে নবী আল্লাহর পক্ষ থেকে কিতাব নিয়ে এসেছেন, তাও আমরা মেনে নিয়েছি। অতপর প্রকৃতপক্ষে আমাদের দ্বীনের কোন পরিবর্তন হয়নি। বরঞ্চ যেমন আমরা প্রথমে মুসলমান ছিলাম সেরূপ এখনো মুসলমান।

ঈমান আনয়নকারী আহলে কিতাবের এ উক্তি যা কুরআনে উদ্বৃতি করা হয়েছে এ কথার সুস্পস্ট বিশ্লেষণ করে যে, ইসলাম শুধু ঐ দ্বীনের নাম নয় যা নবী মুহাম্মদ (সা) নিয়ে এসেছেন এবং মুসলিম শব্দের পরিভাষার প্রয়োগ নিছক হুযুর (সা) এর অনুসারী পর্যন্তই সীতিম নয়। বরঞ্চ সর্বকাল থেকে সকল নবীর দ্বীনই এই ইসলাম ছিল এবং সর্বকালেই তাঁদের অনুসারী মুসলমানই ছিলেন। এ মুসলমান যদি কখনো কাফের হয়ে থাকে তা শুধু সে সময়ে যখন পরবর্তীকালে আগত কোন সত্য নবী মানতে তারা অস্বীকার করেছে। কিন্তু যারা প্রথমে নবীকে মানতো এবং পরবর্তীকালে আগমনকারী নবীর উপর ঈমান এনেছে তাদের ইসলামে কোন ছেদ ঘটেনি তারা যেমন মুসলমান পূর্বে ছিল, তেমনি পরেও রয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় যে, কতিপয় বড় বড় বিদ্বান ব্যক্তিও এ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনকি এ সুস্পষ্ট আয়াত দেখার পরও তাঁদের পরিতৃপ্তি হয়নি। আল্লামা সিউতি এ বিষয়ের উপর একটি বিস্তারিত পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। তিনি বলেন, মুসলিম, পরিভষা শুধু উম্মতে মুহাম্মদ (সা) এর জন্য নির্দিষ্ট। অতপর এ আয়াত যখন তার সামনে এলো, তখন স্বয়ং বলেন, আমার যুক্তি প্রমাণ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বলেন, আমি আবার খোদার কাছে দোয়া করলাম যেন এ ব্যাপারে তিনি আমাকে শরহে সদর প্রত্যয় দান করেন। অবশেষে আপন মত পরিবর্তন করার পরিবর্তে তিনি তার উপরই অবিচল রইলেন এবং এ আয়াতের বিভিন্ন প্রকার ব্যাখ্যা করেন যার একটি থেকে আরেকটি অধিকতর গুরুত্বহীন। যেমন তাঁর একটি ব্যাখ্যা এই যে, ان كنا من قبله مسلمين  এর অর্থ আমরা কুরআন আগমনের পূর্বেই মুসলমান হওয়ার সংকল্প পোষণ করতাম। কারণ আমাদের কিতাব থেকে তার আগমনের খবর আমরা পেয়েছিলাম এবং আমাদের ইচ্ছাও ছিল যে যখন তা আসবে তখন আমরা ইসলাম কবুল করবো।

তাঁর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা এই যে, এ বাক্যে مسلمين  এর পর به  শব্দ উহ্য আছে। অর্থাত্ প্রথম থেকেই আমরা কুরআনকে মানতাম। কারণ তার আসার ব্যাপারে আমরা আশাবদী ছিলাম এবং আগাম তার উপর ঈমান এনেছিলাম। এজন্য তাওরাত ও ইঞ্জিল মেনে নেয়ার ভিত্তিতে নয় বরঞ্চ কুরআনকে তার নাযিল হওয়ার পূর্বে মেনে নেয়ার ভিত্তিতে আমরা মুসলিম ছিলাম।

তৃতীয় ব্যাখ্যা তাঁর এই ছিল যে, প্রথম থেকে আমাদের তকদীরে এ লেখা ছিল যে, মুহাম্মদ (সা) এবং কুরআন আগমনের পর আমরা ইসলাম কবুল করবো। এজন্য আমরা আসলে প্রথমেই মুসলিম ছিলাম। এসব ব্যাখ্যার কোনটি দেখেও মনে হয় না যে খোদা প্রদত্ত শরহে সদরের’ কোন প্রভাব তার মধ্যে আছে।

ব্যাপার এই যে, কুরআনে শুধু এই একস্থানেই নয়, বরঞ্চ বহুস্থানে এ মৌলিক সত্য বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রকৃত শুধু ইসলাম (আল্লাহর আনুগত্য)। আর খোদার সৃষ্ট রাজ্যে খোদার বান্দাহদের জন্য এছাড়া অন্য কোন দ্বীন হতেই পারে না। মানব জাতির সূচনা থেকে যে নবীই মানুষের হেদায়েতের জন্য এসেছেন তিনি এই দ্বীন নিয়েই এসেছেন। আর আম্বিয়া (আ) সর্বদা স্বয়ং মুসলিম ছিলেন। নিজেদের অনুসারীদেরকে তাঁরা মুসলিম হয়ে থাকারই তাকীদ করেছেন। তাঁদের সেসব অনুসারী যারা নবুওয়াতের মাধ্যমে ঘোষিত খোদার ফরমানের সামনে নতশির হয়েছেন তাঁরা সকল যুগে মুসলিমই ছিলেন। এ সম্পর্কে কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে পেশ করা হলোঃ

إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ-( آل عمران-19)

-প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিকটে দ্বীন তো একমাত্র ইসলামই।

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ-( آل عمران-85)

-আর যে কেউ ইসলাম ছাড়া আর কোন দ্বীন চায়, তা তার থেকে কখনোই কবুল করা হবে না। (আলে ইমরান: ৮৫)

হযরত নূহ (আ) বলেন:

إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ-( يونس-72)

-আমার প্রতিদান তো আল্লাহর দায়িত্ব। আর আমাকে হুকুম করা হয়েছে আমি যেন মুসলিমের মধ্যে শামিল হয়ে থাকি। (ইউনুস: ৭২)

হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে:

إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ – وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ – أَمْ كُنْتُمْ شُهَدَاءَ إِذْ حَضَرَ يَعْقُوبَ الْمَوْتُ إِذْ قَالَ لِبَنِيهِ مَا تَعْبُدُونَ مِنْ بَعْدِي قَالُوا نَعْبُدُ إِلَهَكَ وَإِلَهَ آبَائِكَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ إِلَهًا وَاحِدًا وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ-( البقرة-131-133)

-যখন তার প্রভু তাকে বল্লেন, মুসলিম হয়ে যাও, তখন সে বল্লো আমি রাব্বুল আলামীনের মুসলিম (অনুগত) হয়ে গেলাম। আর এ বিষয়ের অসিয়ত ইব্রাহীম (আ) তার সন্তানদের করে এবং ইয়াকুবও (আ): হে আমার সন্তানেরা! আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দ্বীন পছন্দ করেছেন। অতএব তোমাদের মৃত্যু যেন না আসে, কিন্তু এ অবস্থায় যে তোমরা ”মুসলিম”।

(হে ইহুদীগণ) তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে যখন ইয়াকুবের মৃত্যুর সময় এসেছিল? যখন সে তার সন্তানদের জিজ্ঞেস করলেন, আমার পরে তোমরা কার বন্দেগী করবে? তারা জবাব দেয় আমরা বন্দেগী করব আপনার মা’বুদের এবং আপনার বাপদাদা ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের মা’বুদের তাঁকে এক মাবুদ মেনে নিয়ে এবং আমরা তাঁরই মুসলিম। (বাকারাহ: ১৩১-১৩৩)

مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا-( آل عمران-67)

-ইব্রাহীম না ইহুদী ছিল, না নাসরানী, বরঞ্চ একনিষ্ঠ মুসলিম ছিল। (সহল ইমরান: ৬৭)

হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ) স্বয়ং দোয়া করছেন-

رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُسْلِمَةً لَكَ-( البقرة-128)

-হে আমাদের খোদ! আমাদেরকে তোমার মুসলিম বানাও এবং আমাদের বংশ থেকে এক উম্মত পয়দা কর যে তোমার মুসলিম হবে। (বাকারাহ: ১২৮)

হযরত লূতের (আ) কাহিনীতে বলা হয়েছে:

فَمَا وَجَدْنَا فِيهَا غَيْرَ بَيْتٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ-(الذاريات-36)

-আমরা কওমে লূতের বস্তিতে একটি ঘর ব্যতীত মুসলমানদের কোন ঘর পেলাম না (স্বয়ং হযরত লূতের (আ) ঘর)।  (যারিয়াত: ৩৬)

হযরত ইউসূফ খোদার দরবারে দোয়া করছেন-

تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ-(يوسف-101)

-আমাকে মুসলিম থাকা অবস্থায় মৃত্যু দাও এবং আমাকে সালেহীনের মধ্যে শামিল কর। (ইউসূফ: ১০১)

হযরত মূসা (আ) তাঁর জাতিকে বলছেন :

يَا قَوْمِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِنْ كُنْتُمْ مُسْلِمِينَ-(يونس-84)

-হে আমার জাতির লোকেরা! যদি তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো তাহলে তাঁর উপরেই ভরসা কর যদি তোমরা মুসলিম হও। (ইউনূস : ৮৪)

বনী ইসরাইলের প্রকৃত ধর্ম ইহুদীবাদ নয়, বরঞ্চ ইসলাম ছিল। দোস্ত-দুশমন সকলেই এ কথা জানতো। বস্তুত ফেরাউন সমুদ্রে ডুবে মরার সময় শেষ কথা যা বলে তা এই:

آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ-( يونس-90)

-আমি মেনে নিলাম যে, কোন মাবুদ তিনি ছাড়া আর কেউ নেই যাঁর উপর বনী ইসরাঈল ঈমান এনেছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভূক্ত। (ইউনুস: ৯০)

বনী ইসরাইলের সকল নবীর দ্বীনও ছিল এই ইসলাম।

إِنَّا أَنْزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا-( المائدة-44)

-আমরা তাওরাত নাযিল করেছি, যার মধ্যে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। তদনুযায়ী সে নবী যে মুসলিম ছিল তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে ফয়সালা করতো যারা ইহুদী হয়ে দিয়েছিল। (মায়েদাহ: ৪৪)

এই ছিল সুলায়মান (আ) এর দ্বীন। বস্তুত রাণী সাবা তার উপর ঈমান আনতে গিয়ে বলে:

أَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ-( النمل-44)

-আমি সুলায়মানের সাথে রাব্বুল আলামীনের মুসলিম হয়ে গেলাম। (নমল: ৪৪)

এই ছিল হযরত ঈসা (আ) ও তাঁর হাওয়ারীদের দ্বীন:

وَإِذْ أَوْحَيْتُ إِلَى الْحَوَارِيِّينَ أَنْ آمِنُوا بِي وَبِرَسُولِي قَالُوا آمَنَّا وَاشْهَدْ بِأَنَّنَا مُسْلِمُونَ-( المائدة-111)

-যখন আমি হাওয়ারীদের অহী করলাম যে ঈমান আন আমার উপর ও আমার রসূলের উপর, তখন তারা বল্লো আমরা আনলাম এবং সাক্ষী থাক যে আমরা মুসলিম। (মায়েদাহ: ১১১)

এ ব্যাপারে কেউ যদি এর ভিত্তিতে সন্দেহ পোষণ করে যে, আরবী ভাষায়র শব্দ ইসলাম ও মুসলিম বিভিন্ন দেশ ও ভাষায় ব্যবহার করা কিভাবে সম্ভব ছিল, তাহলে এ এক সুস্পষ্ট অজ্ঞতাপূর্ণ উক্তি হবে। কারণ আসল ধর্তব্য বিষয় এ আরবী শব্দগুলোর নয় বরঞ্চ ঐ অর্থের- যার জন্য এ শব্দগুলো আরবীতে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যে কথা এ আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে তা এই যে, খোদার পক্ষ থেকে প্রেরিত প্রকৃত দ্বীন খৃষ্টবাদ অথবা মুসাবাদ অথবা মহাম্মদীয়তাবাদ নয়, বরঞ্চ নবী ও আসমানী কিতাবের মাধ্যমে যে খোদার ফরমান এসেছে তার প্রতি আনুগত্যের মস্তক অবনত করা এবং এ আচরণ যেখানেই যে খোদার বান্দাই যে কালেই অবলম্বন করেছে সে একই বিশ্বজনীন সর্বকালীন দ্বীনের হকের অনুসারী হয়েছে। এ দ্বীন যারাই যথার্থ অনুভুতি ও নিষ্ঠার সাথে অবলম্বন করেছে তাদের জন্য মূসার (আ) পর ঈসাকে (আ) এবং ঈসার (আ) পর মুহাম্মদ (সা) মেনে নেয়া ধর্ম পরিবর্তন করা নয় বরঞ্চ সত্যিকার দ্বীনের অনুসরণের প্রাকৃতিক ও যুক্তিসংগত দাবী। এর বিপরীত যারা নবীগণের দলে কোন চিন্তাভাবনা না করেই ঢুকে পড়েছে অথবা জন্মগ্রহণ করেছে এবং জাতীয় বংশীয় ও দলীয় গোঁড়ামি যাদের জন্য প্রকৃত ধর্মের রূপ গ্রহণ করেছে তারা ইহুদী ও খ্রষ্টান হয়ে রয়ে গেছে এবং মুহাম্মদ (সা) এর আগমনের পর তাদের অজ্ঞতার গুমর ফাঁক হয়ে গেল। কারণ শেষ নবীকে অস্বীকার করে শুধু এই নয় যে, ভবিষ্যতে মুসলিম থাকা কবুল করলো না বরঞ্চ তাদের এ আচরণে এ কথা প্রমাণ করলো যে তারা পূর্বেও মুসলিম ছিল না। নিছক এক নবী অথবা কোন কোন নবীর ব্যক্তিত্বের প্রতি অনুরক্ত ছিল। অথবা পূর্ব পুরুষদের অন্ধ আনুগত্যকে দ্বীন বানিয়ে রেখেছিল। (১৫২)

উম্মতে মুসলিমার গঠন প্রক্রিয়া

এভাবে রসূলুল্লাহ (সা) না শুধু দ্বীনকে সজীব করেন যা পূর্ব থেকে চলে আসছিল। বরঞ্চ সে উম্মতকেও নতুন করে কায়েম করেন যা সকল নবীর যমানা থেকে উম্মতে মুসলিমা নামে অভিহিত হয়ে আসছিল। এ উম্মতের মধ্যে বিভিন্ন গোত্র, পরিবার ও অঞ্চল থেকে বের হয়ে যারা শামিল হয়ে চলেছিল, তিনি তাদের সকলকে একে অপরের সহযোগী ও সাহায্যদাতা, একে অপরের ভাই, একে অপরের সহানুভূতিশীল ও দুঃখকাতর বানিয়ে দেন। সকলের জানমাল, ইজ্জত-আবরু সমভাবে নিষিদ্ধ করেদেন, সকলের অধিকার ও দায়িত্ব একইরূপ গণ্য করেন এবং কারো জন্য এমন কোন স্বাতন্ত্র রাখেন না যা অন্যের নেই। এ আরবের গোত্র পূজারী ও গোঁড়ামি পীড়িত পরিবেশের জন্য এক বিস্ময়কর বস্তু ছিল যা মেনে নিতে তাদের মন-মস্তিষ্ক কিছুতেই প্রস্তুত ছিল না। (১৫৩)

ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত আছে যে, রসূলের (সা) চাচা আবু লাহাব একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি তোমার দ্বীন মেনে নিলে আমার কি লাভ হবে? হুযুর (সা) বল্লেন, যা অন্যান্য ঈমান আনয়নকারী লাভ করবে। তিনি বল্লেন, আমার জন্যও (রসূলের চাচার জন্য) কোন বিশেষ মর্যাদা নেই? হুযুর (সা) বলেন, আপনি আর কি চান?

আবু লাহাব বলে- (আরবী******************)

-এ দ্বীনের সর্বনাশ হোক যার মধ্যে আমি এবং অন্যান্য লোক সমান। (ইবনে জারীর) (১৫৪)

এ গোঁড়ামির ধারনার বিপরীত কুরআন পরিস্কার বলে দিল,

لَنْ تَنْفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

-কিয়ামতের দিন না তোমাদের আত্মীয়তা কোন কাজে আসবে, না সন্তানাদি। (মুমতাহেনা: ৩)

এ রক্তের সম্পর্কে এখানে পুরাপুরি রয়ে যাবে এবং ওখানে তার দ্বারা কোন লাভ হবে না। আসল বস্তু ঈমান যা কেয়ামতে কাজে লাগবে। এ জন্য দুনিয়াতেও তোমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ঈমানের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।

إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ-( المائدة-55)

-তোমাদের বন্ধু ত সত্যিকার অর্থে আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং ওসব আহলে ঈমান যারা নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং খোদার সামনে মস্তক অবনতকারী। (মায়েদাহ: ৫৫)

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ-( الحجرات-10)

-মুমেন ত একে অপরের ভাই। অতএব নিজের ভাইদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো কর। (হুজরাত: ১০)

এ এবং এ ধরনের অন্যান্য আয়াত ‍দুনিয়ার সকল মুসলমানের এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃসংঘ কায়েম করে দিয়েছে। এ শিক্ষায় এই বরকত যে, অন্য কোন ধর্ম অথবা মতবাদের অনুসারীদের মধ্যে সে ভ্রাতৃত্ব পাওয়া যায় না যা মুসলমানদেন মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তা পাওয়া যায়। এর গুরুত্ব ও দাবী নবী পাক (সা) তাঁর বহু ভাষনে বয়ান করেছেন যার থেকে তার গোটা প্রাণ শক্তি অধিকতর জাগ্রত হয়েছে।

হযরত জারীর বিন আব্দুল্লাহ বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) তিনটি বিষয়ে আমার বয়আত গ্রহণ করেন। এক, যেন নামায কায়েম করি, দ্বিতীয়, যেন যাকাত দিতে থাকি এবং তৃতীয়, যেন প্রত্যেক মুসলমানের শুভাকাংখী হয়ে থাকি- (বুখারী, কিতাবুল ঈমান)।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বলেন, নবী (সা) বলেছেন, মুসলমানকে গালি দেয়া ফিসক (পাপ কাজ) এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী (বুখারী-কিতাবুল ঈমান)। মুসনাদে আহমদে এ বিষয়টি বর্ণনা করছেন- হযরত বিন মালক (রা) তাঁর পিতার উদ্বৃতি দিয়ে।

হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) বলেন, নবী (সা) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম- (মুসলিম-কিতাবুল বিরর ওয়াস সিলাহ)।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) ও হযরত হুরায়রাহ (রা) বলেন, হুযুর (সা) বলেছেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই, সে তার উপর জুলুম করে না, তার হাত ছাড়ে না, তাকে হেয় করেনা। একজন লোকের জন্য এ অনিষ্ট অনেক বেশী যে সে তার মুসলমান ভাইকে হেয় করবে। (মুসনাদে আহমদ)

হযরত সহিল বিন সাদ সায়েদী (রা) নবী (সা) এর উক্তি উদ্বৃতি করে বলেন, আহলে ঈমান দলের সাথে একজন মুমেনের সম্পর্ক, মাথার সাথে দেহের সম্পর্কের মতো। সে আহলে ঈমানের একটি দুঃখকষ্ট ঠিক তেমনি অনুভব করে যেন মাথা দেহের প্রত্যেক অংশের কষ্ট অনুভব করে-মুসনাদে আহমদ। (১৫৫)

হযরত নু’মান বিন বশীর (রা) নবীর (সা) এ হাদীস বর্ণনা করেন।

(আরবী***************************)

-মুমেনদের দৃষ্টান্ত পরস্পর দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির ব্যাপারে একটি দেহের ন্যায়। যদি দেহের কোন অংশে কষ্ট হয়, তাহলে সমস্ত দেহ তার জন্য অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।

হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা) বলেন যে নবী (সা) বলেছেন, (আরবী**********************)

-মুমেন অন্য মুমেনের জন্য ঐ দেয়ালের মতো যার প্রত্যেক অংশ অন্য অংশকে সুদৃঢ় করে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা) হুযুরের এ হাদীসটি উদ্বৃত করেন (আরবী***************)

-মুসলমান মুসলমানের ভাই, না তার উপর জুলুম করে, আর না তাকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকে। যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের কোন অভাব পূরণ করার জন্য লেগে থাকে। আল্লাহ তার অভাব পূরনের জন্য লেগে যান। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে কোন বিপদ থেকে বাঁচাবে, আল্লাহ তাকে কেয়ামতের দিনের বিপদ থেকে বাঁচাবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষত্রুটি গোপন রাখবে, আল্লাহ কেয়ামতের দিন তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন।(১৫৬)

হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রা) এবং আবু তালহা বিন সাহল আনসারী (রা) হুযুরের (সা) এ হাদীস বর্ণনা করেন।

(আরবী***********************)

-যখন কোন মুসলমানকে হেয় অপদস্থ করা হচ্ছে, তার সম্মানের উপর আঘাত করা হচ্ছে, তখন তার সাহায্যে যদি কেউ এগিয়ে না আসে, তাহলে আল্লাহ তায়ালাও তাকে এমন অবস্থায় সাহায্য করবেন না, যখন সে আল্লাহর সাহায্যের মুখাপেক্ষী হবে। আর যদি কেউ কোন মুসলমানকে এমন অবস্থায় সাহায্য করে যখন তার সম্মানের উপর আঘাত করা হচ্ছে এবং তাকে হেয় করা হচ্ছে, তাহলে আল্লাহ তায়ালাও তাকে এমন অবস্থায় সাহায্য করবেন যখন সে চাইবে যে আল্লাহ তার মদদ করুন। (১৫৭)

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা) বলেন যে, নবী (সা) বলেছেন, (আরবী****************)

-মুসলমান সে ব্যক্তি যার মুখ ও হাত থেকে মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে।

হযরত আবু বকরা নুফাই বিন আল হারেস (রা) বলেন যে, বিদায় হজ্বের সময় কুরবানীর দিনের ভাষণে নবী (সা) বলেন,

(আরবী******************)

-সাবধান! আমার পরে কাফেরদের মতো হয়ো না যে একজন আর একজনের গর্দান মারতে থাকবে।

হযরত আনাস (রা) বলেন, হুযুর (সা) একবার বলেন, (আরবী******************)

-তোমার ভাই জালেম হোক আ মজলুম, তার সাহায্য কর। একজন প্রশ্ন করে মজলুম হলে তার সাহায্য ত আমি করব কিন্তু জালেম হলে কিভাবে তার সাহায্য করব?

নবী বলেন, (আরবী************************)

-তাকে জুলুম থেকে নিবৃত্ত কর এবং দূরে রাখ। কারণ এটাই তার সাহায্য করা হবে। (বুখারী)

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস (রা) বলেন, নবী (সা) বলেছেন- (আরবী******************)

-মুমেনদের খুন সমান মূল্যের। আর দুশমনের মুকাবিলায় তারা সকলে একটি হাতের ন্যায়।

হযরত আনাস বিন মালেক (রা) নবীর (সা) এ হাদীস উদ্বৃত করেন- (আরবী****************)

-লোকের সাথে লড়াই করার হুকুম আমাকে দেয়া হয়েছে যতোক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দেয় আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রসূল। তারপর যখন তারা এ সাক্ষ্য দেয় এবং আমাদের কেবলার দিকে মুখ করে, আমাদের যবেহ করা খায়, আমাদের মতো নামায পড়ে তখন তাদের খুন এবং মাল আমাদের জন্য হারাম হয়ে যায়। অবশ্য তাদের উপর কোন হক থাকলে আলাদা কথা। তাদের জন্য সেই অধিকার যা মুসলমানদের জন্য। আর তাদের উপর সেই দায়িত্ব যা মুসলমানদের-

একটি দাওয়াত ও আন্দোলনের পতাকাবাহী উম্মত

কিন্তু এ উম্মত সে ধরনের নয় যে কিছু লোক ঈমান আনার পর ব্যস নিজের জায়াগায় আল্লাহ’ আল্লাহ’ করবে, নেক কাজ করবে, পরস্পর একে অপরের সমর্থক, সাহায্যকারী, শুভাকাংখী ও সহানুভুতি সম্পন্ন হবে। কিন্তু এর থেকে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে এ উম্মতের কাজ এ ছিল যে তারা প্রতিটি ব্যক্তি, লোকের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত ছাড়াবে। ভালো কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখবে। এ গোটা উম্মত সকল জাতি ও গোত্রের মধ্য থেকে বেছে এ জন্য বের করা হয়েছে যে, এ খোদার বান্দাহদের সংস্কার সংশোধন করবে। সকল জাতির সাথে এর সম্পর্ক হবে হক ও ইনসাফের সম্পর্ক এবং কারো সাথে নাহক ও বেইনসাফীর সম্পর্ক হবে না। ব্যাপার যদি প্রথম অবস্থাটির মধ্যে সীমিত থাকতো, তাহলে আরবের কুরাইশ ও মুশরিকরা কোন না কোন পরিমাণে তা বরদাশত করতে প্রস্তুত থাকতো। কিন্তু এ দ্বিতীয় অবস্থা এমন ছিল যে, তারা দেখছিল যে এ উম্মত বর্ধিত ও প্রসারিত হওয়ার ইচ্ছাই পোষণ করতো না বরঞ্চ ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে এবং সমষ্টিগতভাবে এ গোটা জামায়াত নিজেদের আন্দোলন ছড়াবার কাজে খুবই সক্রিয়। এতে তাদের (কুরাইশদের) আশংকা ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে। কারণ তারা দেখছিল যে, প্রতিদিন তাদের লোক দলে ত্যাগ করে নতুন দলে শামিল হচ্ছিল। (১৫৮)

وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ-(همالسجده-33)

-এবং ঐ ব্যক্তির কথা থেকে ভালো কথা আর কার হতে পারে যে, আল্লাহর দিকে ডাকলো, নেক আমল করলো এবং বল্লো, আমি মুসলমান। (হামীম আসসাজদা: ৩৩)

ইতিপূর্বে ৩০-৩২ নং আয়াতে মুসলমানদেরকে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর বন্দেগীর উপর অবিচল থাকা এবং এ পথ অবলম্বন করার পর তার থেকে মুখ না ফেরানো স্বয়ং সেই দুনিয়াবী নেকী যা মানুষকে ফেরেশতাদের বন্ধু এবং জান্নাতের হকদার বানিয়ে দেয়। তারপর এ আয়াতে তাদেরকে বলা হলো যে আমলের মর্যাদা যার থেকে উচ্চতর মর্যাদা আর কিছু হতে পারে না- তা এই যে, তোমরা স্বয়ং নেক আমল কর এবং অন্যকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে ডাক। চরম বিরোধিতার পরিবেশেও নির্ভয়ে বল আমি মুসলমান, যে পরিবেশে ইসলামের ঘোষণা ও তা প্রকাশ করার অর্থ নিজের জন্য বিপদের আহ্বান জানানো। এ এরশাদের পূর্ণ গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্য সেই পরিবেশ চোখের সামনে রাখা প্রয়োজন যখন একথা বলা হয়েছিল। সে সময় অবস্থা এই ছিল যে, যে ব্যক্তিই মুসলমান হওয়ার কথা প্রকাশ করতো, সে অনুভব করতো যে সে যেন হিংস্র পশুর বনে পদার্পন করছে যেখানে প্রত্যেকে তাকে ফেঁড়ে খাওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছে। এর থেকে সামনে অগ্রসর হয়ে যে ব্যক্তি ইসলামের তবলিগের জন্য মুখ খুললো সে যেন হিংস্র পশুদেরকে ডেকে বল্লো- এসো আমাকে ছিন্নভিন্ন করে খেয়ে ফেলো। এ অবস্থায় বলা হলো যে, কোন লোকের আল্লাহকে রব মেনে নিয়ে সোজা পথ অবলম্বন করা এবং তার থেকে সরে না পড়া বড়ো এবং বুনিয়াদী নেকী। কিন্তু উচ্চস্তরের নেকী এই যে, সে দাঁড়িয়ে বলবে, আমি মুসলমান। আর পরিণামের পরোয়া না করে আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকবে। একাজ করার সময় নিজের আমল এতো পাক পবিত্র রাখবে যে, করো যেন ইসলাম ও তার পতাকাবাহীর উপর কোন অভিযোগ করার অবকাশ না থাকে।(১৫৯)

বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ

وَكَذَلِكَ جَعَلْنَاكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا-( البقرة-143)

-এবং এভাবে আমরা তোমাদেরকে একটি সর্বোত্তম উম্মত বানিয়েছি যাতে তোমরা বিশ্ববাসীর প্রতি সাক্ষী হতে পার এবং রসূল তোমাদের সাক্ষী হন। (বাকারাহ: ১৪৩)

এ ছিল উম্মতে মুহাম্মদের (সা) বিশ্ব নেতৃত্বের ঘোষণা। এভাবে এর ইংগিত আল্লাহর সেই পথ নির্দেশনার দিকেও ছিল যার থেকে নবী মুহাম্মদের (সা) অনুসরণকারীদের সোজা পথ লাভ করা সম্ভব হয় এবং তারা উন্নতি করতে করতে এমন মর্যাদা লাভ করে যে, তাদেরকে ”উম্মতে ওয়াসাত” বলে গণ্য করা হয়। এ ইংগিত কেবলা পরিবর্তনের দিকেও করা হয়েছে যাকে অজ্ঞ লোকেরা এক দিক থেকে আর একদিকে মুখ ফেরানো মনে করে থাকে। বস্তুত বায়তুল মাকদেস থেকে কাবার দিকে কেবলা পরিবর্তনের অর্থ এই ছিল যে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে দুনিয়ার নেতৃত্বের মর্যাদাকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অপসারিত করেন এবং উম্মতে মুহাম্মদীকে উক্ত পদ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন।

উম্মতে উয়াসাত” শব্দটি এমন ব্যাপক অর্থবোধক যে কোন দ্বিতীয় শব্দ দ্বারা তার তারজমার হক আদায় করা সম্ভব নয়। এর অর্থ এমন এক মহান ও সম্ভ্রান্ত দল যে ইনসাফ ও সুবিচার এবং মধ্যমপস্থা অবলম্বন করত। দুনিয়ার জাতিসমূহের মধ্যে সভাপতির মর্যাদা লাভ করবে। সকলের সাথে তার সম্পর্ক হবে একই রকম এবং সে সম্পর্ক হবে সততার, অসত্য ও অন্যায়ের নয়।

তার এই যে বলা হলো, তোমাদেরকে উম্মতে ওয়াসাত এ জন্যে বানানো হলো যে, তোমরা লোকদের সাক্ষী হবে এবং রসূল হবেন তোমাদের সাক্ষী- ত এর অর্থ এই ছিল এবং এখনো আছে যে, আখেরাতে যখন গোটা মানব জাতির একত্রে হিসাব নেয়া হবে তখন রসূল (সা) আল্লাহর দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসাবে তোমাদের প্রতি সাক্ষ্য দেবেন যে, সঠিক চিন্তা, সত্ কাজ এবং সুবিচারমূলক ব্যবস্থার যে শিক্ষা আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন তা তিনি তোমাদের কাছে অবিকল পুরোপুরি পৌছিয়ে দিয়েছেন এবং কার্যত তদনুযায়ী কাজ করে দেখিয়েছেন। তারপর রসূলের স্থালাভিষিক্ত হওয়ার কারণে তোমাদেরকে সাধারণ মানুষের জন্য সাক্ষী হিসাবে দাঁড়াতে হবে এবং এ সাক্ষ্য দিতে হবে যে, রসূল যা কিছু তোমাদের নিকটে পৌছিয়েছেন তা তোমরা তাদের কাছে পৌছাতে এবং যা কিছু রসূল তোমাদেরকে দেখিয়েছেন তা তাদেরকে দেখাতে নিজেদের সাধ্যমত কোন ত্রুটি করনি।

এভাবে কোন ব্যক্তি অথবা দলের এ দুনিয়াতে খোদার পক্ষ থেকে সাক্ষ্যর পদমর্যাদায় ভূষিত হওয়া প্রকৃত পক্ষে তার নেতৃত্বের পদমর্যাদায় ভূষিত হওয়াই বুঝায়। এর মধ্যে একদিকে রয়েছে মর্যাদা ও কর্তৃত্ব, অপরদিকে দায়িত্বের গুরুভার। এর অর্থ এই যে, যেভাবে রসূলল্লাহ (সা) এ উম্মতের জন্য খোদাভীতি, সত্যনিষ্ঠা, সুবিচার ও হকপরস্তির জীবন্ত সাক্ষী হলেন, তেমনি এ উম্মতকেও সমগ্র দুনিয়ার জন্য জীবন্ত সাক্ষী হতে হবে। এমনকি তার কথা ও কাজ, চরিত্র ও আচার আচরণ সব কিছু দেখে দুনিয়া জানতে পারে যে, খোদা ভীতি এর নাম, সত্য নিষ্ঠা হচ্ছে এই। সুবিচার একেই বলে, হক পরস্তি এমনি হয় এবং ইসলাম দুনিয়ার মানুষকে এমন কিছু বানাবার জন্য এসেছে। (১৬০)

উম্মতে মুসলিমার বৈশিষ্ট্য

كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ-( آل عمران-110)

তোমরা ত দুনিয়ার সর্বোত্তম উম্মত যাদের অভ্যুদয় হয়েছে (মানুষের হোদায়েত ও সংস্কার সংশোধনের জন্য)। তোমরা নেক কাজের হুকুম দাও এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখ এবং আল্লাহর উপর ঈমান আন। (আলে ইমরান: ১১০)

এ আয়াতে নবীর (সা) অনুসারীদেরকে বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার নেতৃত্ব ও পথ প্রদর্শনের যে পদমর্যাদা থেকে বনী ইসরাইলকে তাদের অযোগ্যতার কারণে অপসারিত করা হয়েছে, যে পদমর্যাদায়, এখন তোমাদেরকে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। এ জন্য যে আখলাক ও আমলের দিক দিয়ে এখন তোমরা দুনিয়ার সর্বোত্কৃষ্ট দল হয়ে পড়েছ এবং তোমাদের মধ্যে সে গুণাবলী সৃষ্টি হয়েছে যা সুবিচারপূর্ণ নেতৃত্বের জন্য জরুরী। অর্থাত্ সত্কর্ম প্রতিষ্ঠার এবং দুষ্কর্ম নির্মূল করার প্রেরণা ও কাজ এবং আল্লাহ লাশারীকালাহুকে বিশ্বাস ও আমলের দিক দিয়ে নিজের ইলাহ ও রব মেনে নেয়া। অতএব বিশ্ব নেতৃত্বের এ কাজ তোমাদের উপর সোপর্দ করা হলো। (১৬১)

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ-( التوبة71)

-মুমেন পুরুষ ও মুমেন নারী একে অপরের সাথী। তারা ভালো কাজের আদেশ দেয় এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামায কায়েম করে যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। (তাওবা: ৭১)

অর্থাত্ মুমেন নারীপুরষ এমন দলে পরিণত হয়েছে যার সদস্যদের মধ্যে এ সব বৈশিষ্ট্য সমভাবে বিদ্যমান যে সত্ কর্মের প্রতি তারা এতোটা অনুরাগ রাখে যে, দুনিয়াবাসীকে তা করার আদেশ দেয়। দুষ্কর্মকে তারা এতোটা ঘৃণা করে যে, দুনিয়াকে তার থেকে নিবৃত্ত করে। খোদার ইয়াদ বা স্মরণ তাদের জন্য সাহাবায়ের ন্যায় জীবনের অপরিহার্য প্রয়োজনগুলোর শামিল রাহে খোদায় মাল খরচ করার জন্য তাদের মন ও হাত উন্মুক্ত। খোদা ও রসূলের আনুগত্য তাদের জীবনের স্বভাব। এ সার্বজনীন নৈতিক স্বভাব প্রকৃতি ও জীবন পদ্ধতি তাদের পরস্পরকে ‍যুক্ত করে দিয়েছে। (১৬২)

জীবন বিলিয়ে দেয়ার প্রেরণা

এ উম্মতের লোকেদের মধ্যে এ প্রেরণাও সৃষ্টি করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের দ্বীনকে সকল বস্তুর উপর অগ্রাধিকার দেবে। প্রতিটি বস্তু তার (দ্বীনের) জন্য কুরবাণী করতে প্রস্তুত থাকবে। কিন্তু কোন কিছুর জন্য তাকে কুরবানী করতে প্রস্তুত হবে না।

যদি আপন দেশ, পরিবার ও ঘরবাড়িতে থেকে খোদার বন্দেগী করা সম্ভব হয় ত কোন কথাই নেই। কিন্তু যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তার পরীক্ষা এ বিষয়ে হবে যে, সে তার ঘরবাড়ি, সন্তানাদি, পরিবার ও দেশপ্রেমে খোদার বন্দেগী পরিহার করছে, না খোদার বন্দেগীর জন্য এসব ছেড়ে হিজরত ও নির্বাসনের ঝুঁকি গ্রহণ করছে।

وَالَّذِينَ هَاجَرُوا فِي اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا لَنُبَوِّئَنَّهُمْ فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَلَأَجْرُ الْآخِرَةِ أَكْبَرُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ-( النحل-41)

যারা অত্যাচার সহ্য করার পর হিজরত করে চলে গেছে তাদেরকে আমরা দুনিয়াতেই উত্তম বসবাসের স্থান দেব এবং আখেরাতের প্রতিদান ত অনেক বড়ো। (নহল: ৪১)

يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ أَرْضِي وَاسِعَةٌ فَإِيَّايَ فَاعْبُدُونِ-كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ-وَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُبَوِّئَنَّهُمْ مِنَ الْجَنَّةِ غُرَفًا تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا نِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ-الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ-وَكَأَيِّنْ مِنْ دَابَّةٍ لَا تَحْمِلُ رِزْقَهَا اللَّهُ يَرْزُقُهَا وَإِيَّاكُمْ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ-(العنكبوت56-60)

-হে আমার বান্দাগণ যারা ঈমান এনেছো। আমার যমীন প্রশস্ত। অতএব তোমরা আমারই বন্দেগী কর। প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতপর তোমাদের সকলকেই আমার দিকে ফিরে আনা হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, তাদেরকে আমরা জান্নাতের সুউচ্চ বালাখানায় রাখবো যার নিম্নদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবহামান হবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। কিন্তু সুন্দর প্রতিদান আমলকারীদের জন্য। এসব তাদের জন্য যারা সবর করেছে এবং নিজেদের রবের উপর ভারসা করেছে। এমন বহু প্রাণী আছে যারা তাদের জীবিকা নিয়ে চলাফেরা করে না। আল্লাহ তাদেরকে রিযিক দেন এবং তোমাদের রিযিকদাতাও তিনি। তিনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। (আনকাবুত: ৫৬-৬০)

সুরায়ে আনকাবুত থেকে এ কথা জানতে পারা যায় যে, তা কোন প্রেরণা ছিল যা সে সময়ে উম্মতে মুসলিমার মধ্যে ফুত্কারিত হয়েছিল।

প্রথম আয়াতে ইংগিত ছিল হিজরতের প্রতি অর্থাত্ যদি মক্কায় খোদার বন্দেগী করা কষ্টকর হয়ে থাকে, তাহলে দেশ ছেড়ে চলে যাও। খোদার যমীন সংকীর্ণ নয়। যেখানেই তোমরা খোদার বান্দা হয়ে থাকতে পারবে সেখানে চলে যাও। তোমাদের জাতি ও দেশের নয় বরঞ্চ নিজেদের খোদার বন্দেগী করা উচিত। এর থেকে জানা গেল যে, আসল বস্তু জাতি, জন্মভূমি ও দেশ নয়। বরঞ্চ আল্লাহর বন্দেগী। যদি কখনো জাতি, জন্মভূমি ও দেশের ভালোবাসার দাবী খোদার বন্দেগীর দাবীর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে সে সময় মুমেনের ঈমানের অগ্নি পরীক্ষার সময়। যে সাচ্চা মুমেন সে খোদার বন্দেগীই করবে এবং দেশ ও জাতি প্রত্যাখ্যান করবে। যারা ঈমানের মিথ্যা দাবীদার তারা ঈমান পরিত্যাগ করবে এবং আপন দেশ ও জাতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকবে। এ আয়াত এ প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট যে, একজন সাচ্চা খোদাপরস্ত মানুষ দেশপ্রেমিক ও জাতি প্রেমিক ত হতে পারে, কিন্তু জাতি পুজারী ও দেশ পুজারী হতে পারে না, তার কাছে খোদার বন্দেগী প্রত্যেক বস্তু থেকে অধিক প্রিয় এবং তার জন্য সে দুনিয়ার প্রত্যেক বস্তু কুরবান করে দেবে কিন্তু তাকে দুনিয়ার কোন কিছুর জন্য কুরবান করবে না।

দ্বিতীয় আয়াতটির অর্থ এই যে, জীবনের চিন্তা করো না। কারণ এ ত যে কোন সময়ে যাবেই। চিরকাল থাকার জন্য দুনিয়ায় কেউ আসে না। অতএব তোমাদের জন্য চিন্তার বিষয় এ নয় যে, কিভাবে জীবন বাঁচানো যাবে। কিন্তু প্রকৃত চিন্তার বিষয় এই যে, ঈমান কিভাবে বাঁচানো যায়। এবং খোদা পুরস্তির দাবী কিভাবে মেটানো যায়। অবশেষে তোমাদেরকে ফিরে আমার কাছেই আসতে হবে। যদি দুনিয়াতে জান বাঁচানোর জন্য ঈমান হারিয়ে আস, তাহলে তার পরিণাম অন্য কিছু হবে। আর ঈমান বাঁচানোর জন্য জীবন হারিয়ে আস তাহলে তার পরিণাম ভিন্ন কিছু হবে। অতএব চিন্তা যা কিছু করার তা এ বিষয়ে কর যে, আমার যখন ফিরে আসবে তখন কি নিয়ে ফিরে আসবে। জানের উপর কুরবান করা ঈমান নিয়ে, না ঈমানের উপর কুরবান করা জান নিয়ে।

তৃতীয় আয়াতে বলা হয়েছে যে, যদি ঈমান ও নেকীর পথে চলার কারণে তোমরা দুনিয়ার সকল নিয়ামত থেকে বঞ্চিত রয়ে যাও এবং পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যর্থতাসহ মৃত্যুবরণ করলে, তাহলে বিশ্বাস করে যে, তার ক্ষতিপূরণ অবশ্যই হবে। শুধু ক্ষতিপূরণই নয়, বরঞ্চ সর্বোত্কৃষ্ট প্রতিদানও পাবে।

চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে, আখেরাতে এ উত্কৃষ্টতম প্রতিদান তাদের জন্য যারা সকল প্রকার বিপদ মুসিবত, দু:খকষ্ট ও উত্পীড়নের মুকাবিলা করে ঈমানের উপর অটল থাকে, যারা ঈমানের ঝুঁকি গ্রহণ করে এবং তার থেকে মুখ ফিরায় না, ঈমান পরিহার করার সুযোগ-সুবিধা ও লাভ স্বচক্ষে দেখেও তার প্রতি দৃকপাত করলো না, কাফের ও ফাসেক ফাজেরদেন উন্নতি ও সমৃদ্ধ দেখেও তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করলো না, যারা নিজেদের ধনদৌলত, ব্যবসা বাণিজ্য ও গোত্র পরিবারের উপর ভারসা না করলো নিজের রবের উপর ভারসা করোনা, যারা পার্থিব উপায়-উপাদান উপেক্ষা করে নিছক শক্তির সংঘাত-সংঘর্ষের মুকাবিলা করতে প্রস্তুত হয়ে গেল এবং প্রয়োজনে ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো, যারা তাদের রবের উপর এ বিশ্বাস স্থাপন করলো যে, ঈমান ও নেকীর উপর কায়েম থাকার প্রতিদান কখনো বিনষ্ট হবে না। আর এ আস্থাও পোষণ করলো যে তিনি তাঁর মুমেন ও নেক বান্দাহদেরকে এ দুনিয়াতেও সাহায্য করবেন এবং আখেরাতেও তাদের কাজের উত্কৃষ্ট প্রতিদান দেবেন।

শেষ আয়াতে বলা হয়েছে যে, হিজরত করার পর তোমাদের জানের চিন্তার সাথে জীবিকার চিন্তা করাও উচিত নয়। এই যে, অসংখ্য পশু-পাখী, জলচর জীব তোমাদের চোখের সামনে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে চলাফেরা করছে। তারা যেখানেই যাক, আল্লাহর ফজলে তারা কোন না কোন জীবিকা পেয়ে যাচ্ছে। এ জন্যে তোমরা এ বিষয়ে চিন্তা করে করে সাহস হারিয়ে ফেলনা যে ইমানের খাতিরে যদি ঘরদোর ছেড়ে চলে যাই ত কোথা থেকে খেতে পাব। যেখানে থেকে আল্লাহ তাঁর অসংখ্য সৃষ্টি জীবকে রিযিক দিচ্ছেন, তোমাদেরকেও দিবেন। (১৬৩)

ঈমানদারদের সাথে কাফেরদের সম্পর্কের ধরন

একদিকে উম্মতে মুসলিমার মধ্যকার লোকদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দ্বীন ও ঈমানের সাথে তাদের ওতপ্রোত জড়িত হওয়ার কথা পরিস্কার বলে দেয়া হয়েছে। অপরদিকে বলা হয়েছে যে, কাফেরদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক কোন ধরনের হওয়া উচিত।

لَا يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ-( آل عمران-28)

-মুমেন ইমানদারদেন ছেড়ে কাফেরদেরকে তাদের বন্ধু কখনো বানাবে না। (আলে-ইমরান-২৮)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ-( النساء-144)

-হে লোকেরা যারা ঈমান এনেছো! মুমেনদের ছেড়ে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানায়ো না। (নিসা: ১৪৪)

أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تُتْرَكُوا وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَلَمْ يَتَّخِذُوا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلَا رَسُولِهِ وَلَا الْمُؤْمِنِينَ وَلِيجَةً-( التوبة-16)

-তোমরা কি মনে করে রেখেছো যে তোমাদেরকে এমনিতেই ছেড়ে দেয়া হবে অথচ আল্লাহ এখনো দেখেননি যে, তোমাদের মধ্যে কে সেই লোক যারা তাঁর পথে সংগ্রাম করেছে এবং আল্লাহ-রসূল ও মুমেনীন ছাড়া কাউকে পরম বন্ধু বানায়নি। (তাওবা:১৬)

সুরা তাওবার এ আয়াতে সম্বোধন সে সব লোককে করা হয়েছে, যারা নতুন নতুন মুসলমান হয়েছিল। তাদেরকে বলা হলো যে, যতোক্ষণ না তোমরা এ অগ্নি পরীক্ষা অতিক্রম করে প্রমাণ করেছ যে সত্যিকার অর্থে তোমরা খোদা ও তার দ্বীনকে নিজের জানমাল ও ভাই-বন্ধু থেকে অধিক প্রিয় মনে করে ততোক্ষণ তোমরা সাচ্চা মুমেন বলে গণ্য হবে না। এখন পর্যন্ত ত প্রকাশ্যত:। তোমাদের অবস্থা এই যে, ইসলাম যেহেতু সত্যিকার মুমেনীন ও সাবেকুনাল আওয়ালুন এর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় বিজয়ী হয়েছে এবং সারা দেশে বিস্তার লাভ করেছে, তাই তোমরা মুসলমান হয়েছ।(১৬৪)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ – قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ-( التوبة-23-24)

-হে লোকেরা যারা ঈমান এনেছো, নিজেদের বাপ-ভাইকেও আপন বন্ধু বানায়ো না, যদি তারা ঈমানের উপর কুফরকে অগ্রাধিকার দেয়। তোমাদের মধ্যে যারা তাদেরকে বন্ধু বানাবে তারাই জালেম হবে। হে নবী! তুমি তাদেরকে বলে দাও, যদি তোমাদের বাপ-তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের বন্ধু-বান্ধব এবং তোমাদের সেসব ধন যা তোমরা উপার্জিত করেছ আর তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের বন্ধু-বান্ধব এবং তোমাদের সেসব ধন যা তোমরা উপার্জিত করেছ আ তোমাদের সে ব্যবসা-বানিজ্য যার মন্দা হওয়া তোমরা ভয় কর এবং তোমাদের সে ঘরদোর যা তোমাদের ভালো লাগে, তোমাদের নিকটে আল্লাহ, তাঁর রসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিকতর প্রিয় হয়, তাহলে অপেক্ষা কর যতোক্ষণ না আল্লাহ তাঁর সিদ্ধন্ত তোমাদের জন্য গ্রহণ করেন। আর আল্লাহ ফাসেক লোকদের পথ প্রদর্শন করেন না।

قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ-( الممتحنة-4)

-তোমাদের জন্য ইব্রাহীম (আ) ও তাঁর সাথীদের মধ্যে এক উত্কৃষ্ট আদর্শ রয়েছে যে তারা নিজেদের জাতিকে স্পষ্ট বলে দিল, আমরা তোমাদের এবং তোমাদের ঐসব মাবুদ যাদের তোমরা খোদাকে ছেড়ে পূজাকর- তাদের থেকে বিরাগভাজন হয়ে পড়েছি। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছি এবং তোমাদের এ আমাদের মধ্যে চিরদিনের শত্রুতা কায়েম হয়ে গেছে এবং বিরোধ শুরু হয়ে গেছে, যতোক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। (মুমতাহেনা: ৪)

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنْتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي-( الممتحنة-1)

-হে ইমানদার লোকেরা! যদি তোমরা আমার পথে জিহাদ করার জন্য এবং আমার সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্য (ঘরবাড়ি ছেড়ে) বের হয়ে পড়েছ, তাহলে আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু বানায়ো না। তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্বসূলভ আচরণ কর। অথচ যে হক তোমাদের নিকট এসেছে তা মানতে তারা অস্বীকার করেছে। তারা রসূলকে এবং তোমাদেরকে এ জন্যে ঘর থেকে বহিষ্কার করে দেয় যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর উপর ঈমান এনেছ। (মুমতাহেনা: ১)

لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ أُولَئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُمْ بِرُوحٍ مِنْهُ-( المجادلة-22)

-তোমরা কখনো এমনটি দেখতে পাবেনা যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখে তারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করেছে, তা তারা তার বাপ হোক, পুত্র হোক, ভাই হোক, পরিবারের লোকজন হোক। এ এমন সব লোক যাদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান অংকিত করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে এক রুহ দান করে তাকে শক্তি ও সাহায্য দানে ধন্য করেছেন। (মুজাদিলা:২২)

সুরায়ে মুজাদিলার এ আয়াতে দুটি কথা বলা হয়েছে। একটি নীতিগত এবং অপরটি বাস্তব ঘটনার বিবরণ।

নীতিগতভাবে এ কথা বলা হয়েছে যে, দ্বীনে হকের প্রতি ঈমান এবং দ্বীনের দুশমনের সাথে ভালোবাসা দুটি পরস্পর বিরোধী জিনিস। এ ‍দুটির একত্রীকরণ কিছুতেই চিন্তা করা যায় না। এ একেবারে অসম্ভব যে, ঈমান এবং খোদা ও রসূলের দুশমনদের ভালোবাসা এ হৃদয়ে একত্র হতে পারে না। যেমন ধারা এক ব্যক্তির মনে আপন ব্যক্তিসত্তার প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের দুশমনদের প্রতি ভালোবাসা উভয়ই একই সময়ে একত্রে মিলিত হতে পারে না। এতএব তোমরা যদি কাউকে এমন দেখ যে, সে ঈমানের দাবীও করছে এবং সেই সাথে সে এমন সব লোকের সাথে ভালোবাসার সম্পর্কও রাখে যারা ইসলাম বিরোধী, তাহলে তোমাদের এ বিভ্রান্তির শিকার হওয়া উচিত হবে না যে, সম্ভবত সে তার এমন আচরণ সত্ত্বেও ঈমানের দাবীতে সত্যবাদী। এভাবে যেসব লোক ইসলাম ও ইসলাম বিরোধীদের সাথে একই সাথে একই সম্পর্ক স্থাপন করে রেখেছে, তারা স্বয়ং নিজেদের মর্যাদা সম্পর্কে যেন ভালোভাবে চিন্তা করে দেখে যে, প্রকৃতপক্ষে তারা কি। মুমেন, না মুনাফিক? যদি তাদের মধ্যে কিছুমাত্র সততাও থাকে এবং নিজেদের মধ্যে কিছুটা এ অনুভূতিও রাখে যে, নৈতিক দিক দিয়ে মুনাফেকী মানুষের জন্য নিকৃষ্টতম আচরণ তাহলে তাদের এ সাথে দুই নৌকায় আরোহন করার চেষ্টা পরিহার করা উচিত। ঈমান ত তাদের কাছে স্থির সিদ্ধান্ত চায়। মুমেন থাকতে চায় ত সে প্রত্যেক আত্মীয়তা ও সম্পর্ক পরিহার করতে হবে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। ইসলামের সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্ক অধিকতর প্রিয় বলে গ্রহণ করলে, ঈমানের মিথ্যা দাবী পরিহার করতে হবে।

এত হলো নীতিগত কথা। কিন্তু আল্লাহতায়ালা এখানে শুধু নীতি বয়ান করাই যথেষ্ট মনে করেননি। বরঞ্চ এ প্রকৃত ঘটনাও ঈমানের দাবীদারদের সামনে দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করেছেন যে, যারা সত্যিকার মুমেন ছিলেন- তাঁরা প্রকৃতপক্ষে সকলের চোখের সামনে সকল ওসব সম্পর্ক ছিন্ন করেন যা আল্লাহর দ্বীনের সাথে প্রতিবন্ধক ছিল। এ এমন এক বাস্তব ঘটনা যা বদর ও ওহোদের যুদ্ধে সমগ্র আরব দেখতে পেয়েছিল। মক্কা থেকে যেসব সাহাবায়ে কেরাম হিজরত করে মদীনায় এসেছিলেন, তাঁরা শুধু খোদা ও তাঁর দ্বীনের খাতিরে স্বয়ং আপন আপন গোত্র ও নিকট আত্মীয়দের সাথে লাড়াই করেন।

হযরত আবু ওবায়দাহ (রা) তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ বিন জাররাহকে কতল করেন। হযরত মাসয়াব বিন ওমাইর (রা) আপন ভাই ওবাইদ বিন ওমাইরকে কতল করেন। হযরত ওমর (রা) তাঁর মামু আস বিন হিশাম বিন মুগীরাকে কতল করেন। হযরত আবু বক (রা) আপন পুত্র আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে লাড়াইয়ে তৈরী হন। হযরত আলী (রা) হযরত হামযাহ (রা) এবং হযরত ওবায়দাহ বিন আল হারেস ওতবা, শায়বা ও অলীদ বিন ওকবাকে হত্যা করেন, যারা তাঁদের নিকট আত্মীয় ছিল। হযরত ওমর (রা) বদর যুদ্ধ বন্দীদের ব্যাপারে নবীর (সা) কাছে আবেদন জানান যে, এ সকলকে হত্যা করা হোক এবং আমাদের মধ্যে প্রত্যেকে তার আত্মীয়কে হত্যা করবে। এ বদর যুদ্ধে মাসয়াব বিন উমাইরের সহোদর ভাই আবু আযীয বিন উমাইরকে একজন আনসারী ধরে বাঁধছিলেন। হযরত মাসয়াব তা দেখে চিত্কার করে বল্লেন, তাকে শক্ত করে বাঁধ। তার মা বড়ো মালদার। মুক্তির জন্য তোমাকে প্রচুর মুক্তিপণ দেবে। আবু আযীয বলে, তুমি ভাই হয়ে এমন কথা বলছ? হযরত মাসয়াব জবাবে বলেন, এ সময়ে তুমি আমার ভাই নও। বরঞ্চ এ আনসারী আমার ভাই সে তোমাকে গ্রেফতার করছে। এ বদর যুদ্ধেই স্বয়ং নবী (সা) এর চাচা আব্বাস এবং জামাই আবুল আস (নবীকন্যা হযরত যয়নবের (রা) স্বমী) বন্দী হন। কিন্তু তাদের সাথে রসূলের (সা) আত্মীয়তার ভিত্তিতে কোন প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়নি যা অন্যান্য বন্দীদের থেকে কিছুটা ভিন্নরূপ হতো। এভাবে বাস্তব ঘটনার জগতে দুনিয়াবাসীকে দেখিয়ে দেয়া হয় যে, খাঁটি মুসলমান কেমন হয়ে থাকে এবং আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন হয়ে থাকে।

দায়লামী হযরত মুয়ায (রা) থেকে রসূলুল্লাহ (সা) এর এ দোয়াটি উধৃত করেছেন-

-হে খোদা! কোন ফাজেরকে (অন্য এক বর্ণনায় কোন ফাসেককে) আমার উপর দয়া প্রদর্শন করতে দিওনা-যাতে আমার মনে তার জন্য কোন ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। কারণ তোমরা নাযিল করা অহীতে আমি একথা পেয়েছি যারা আল্লাহ ও আখেরাতের দ্বীনের উপর ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধীদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করতে পাবে না। (১৬৫)

কারো খাতিরে ঈমান পরিত্যাদ করা যায় না

وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ – وَإِنْ جَاهَدَاكَ عَلَى أَنْ تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا-( لقمان-14-15)

-আমরা মানুষকে পিতা-মাতার হক জানার জন্য স্বয়ং তাকীদ করেছি। তার মা বহু কষ্ট স্বীকার করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। দুবছর তার দুধ ছাড়াতে লেগেছে। (এ জন্য আমরা তাকে নসিহত করেছি যে) আমার এবং পিতামাতার শুকরিয়া আদায় কর। আমার কাছেই তোমাদের ফিরে আসতে হবে। কিন্তু যদি তারা তোমার উপর চাপ সৃষ্টি করে যে, আমার সাথে এমন কাউকে শরীক বানাবে-যাকে তুমি আমার শরীক জাননা, তাহলে তাদের কথা কখনো মানবে না। অবশ্যি দুনিয়ায় তাদের সাথে সদাচরণ করবে। (লোকমান: ১৪-১৫)

وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِنْ جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا-( العنكبوت-8)

-আমরা মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদাচরণের হেদায়েত দিয়েছি। কিন্তু যদি তারা তোমার  উপর চাপ সৃষ্টি করে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করার জন্য যাকে আমার শরীক হিসাবে তুমি জান না, তাহলে তাদের কথা মেনে নিও না। (আনকাবুত:৮)

সূরায়ে আনকাবুতের এ আয়াত সম্পর্কে মুসলিম, তিরমিযী, আহমদ, আবু দাউদ এবং নাসায়ীর বর্ণনা এই যে, এ হযরত সা‘দ বিন আবি ওক্কাস (রা) সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। তিনি ১৮/১৯ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর মা হামনা বিনতে সুফিয়ান বিন উমায়্যা। (আবু সুফিয়ানের ভাতিজি) যখন জানতে পারলেন যে তার পুত্র মুসলমান হয়েছে, তখন তিনি বল্লেন, যতোক্ষণ না ‍তুমি মুহাম্মদকে (সা) অস্বীকার না করেছ, আমি পানাহার করব না। ছায়াতে গিয়েও বসবো না। মায়ের হক আদায় করা ত আল্লাহর হুকুম। আমার কথা না মানলে ত আল্লাহরও নাফরমানী করা হবে।

হযরত সা‘দ এতে ভয়ানক বিব্রত হয়ে পড়েন এবং রসূলুল্লাহর (সা) খেদমতে হাজির হয়ে সব কথা বল্লেন, এব্যাপারে এ আয়াত নাযিল হলো। সম্ভবত এ অবস্থার সম্মুখীন অন্যান্য যুবকারাও হয়েছিলেন যারা মক্কায় প্রাথমিক যুগে মুসলমান হয়েছিলেন। এ জন্য এ বিষয়টি সূরা লোকমানের ঐ আয়াতেও অত্যন্ত জোরালোভাবে পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যা আমরা উপরে উধৃত করেছি।

আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, সৃষ্টিকূলের মধ্যে মানুষের উপর যদি কারো সবচেয়ে বড়ো হক থাকে, তাহলে তো মা বাপের কিন্তু মা বাপও যদি শির্ক করতে বাধ্য করে তাহলে তাদের কথা মেনে নেয়া চলবে না। অন্য কারো কথায় এমনটি করাত দূরের কথা। নির্দেশের শব্দগুলো ছিল وان جاهدك অর্থাত্ তারা উভয়ে যদি তোমাকে বাধ্য করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। এর থেকে জানা গেল যে, অপেক্ষাকৃত কমস্তরের চাপ সৃষ্টি অথবা মা বাপের মধ্যে কোন এ জনে চাপ সৃষ্টি ত প্রত্যাখ্যানযোগ্য। এই সাথে ماليس لك به علم প্রণিধানযোগ্য। এর অর্থ যাকে তুমি আমার শরীক হিসাবে জান না। মা বাপের কথা না মানার এক ন্যায়সংগত যুক্তি দেয়া হয়েছে। মা বাপের এ হকও অবশ্যই রয়েছে যে, সন্তান তাদের খেদমত করবে। তাদের সম্মান শ্রদ্ধা করবে। তাদের জায়েয কথা মেনে চলবে। কিন্তু এ অধিকার কারো নেই যে, তার জ্ঞানের পরিপন্থী মা বাপের অন্ধ অনুসরণ করবে। পুত্র অথবা কন্যা শুধু এ কারণে একটি ধর্মের অনুসরণ করবে যে, এ তাদের পিতার ধর্ম এ কখনো সংগত হতে পারে না। সন্তানেরা যদি জানতে পারে যে, মা বাপের ধর্ম ভ্রান্ত, তাহলে সে ধর্ম পরিত্যাগ করে কোন সঠিক ধর্ম গ্রহণ করা তাদের উচিত। পিতামাতার চাপ সৃষ্টির পরও সে পদ্ধতি মেনে চলা উচিত নয়- যার পথভ্রষ্টতা সুস্পষ্ট। আর এ আচরণ যখন পিতামাতার সাথে, তখন দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তির সাথেই হতে পারে। কোন ব্যক্তিরই অন্ধ অনুসরণ ঠিক নয়। যতোক্ষণ না জানা যায় যে, সে ব্যক্তি হকের উপর প্রতিষ্ঠিত। (১৬৬)

وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُمْ بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ – وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ-( العنكبوت-12-13)

-এ কাফেরেরা ঈমানদারদেরকে বলে, তোমরা আমাদের তরিকা অনুসরণ কর এবং তোমাদের ভুলত্রুটির বোঝা আমরা বহন করব। অথচ তাদের ভুল-ত্রুটির কোন কিছুই তারা বহন করবে না। তারা একেবারে মিথ্যা কথা বলছে। হ্যাঁ অবশ্যই তারা নিজেদের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে অন্যান্য বহু বোঝাও। আর কিয়ামতের দিন তারা যেসব মিথ্যাপ্রচারণা চালাচ্ছে তার জন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। (আনকাবুত: ১২-১৩)

কাফেরদের এ উক্তির অর্থ এ ছিল যে, মৃত্যুর পরের জীবন, হাশর, হিসাব দান, ‍পুরস্কার প্রভৃতি কথাগুলো ধোকা প্রতারণা, কিন্তু যদি কোন মরনোত্তর জীবন থেকেই থাকে এবং সেখানে যদি কোন জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়, তাহলে আমরা এ দায়িত্ব গ্রহণ করছি যে, খোদার সামনে সকল শাস্তি আমরা নিজের কাঁধে গ্রহণ করছি। আমরা বলছি তোমরা এ নতুন ধর্ম ছেড়ে দাও এবং পূর্ব পুরুষের ধর্মে ফিরে আস।

বিভিন্ন কুরাইশ সর্দার সম্পর্কে এ কথা বর্ণিত আছে যে, প্রথমদিকে যারা ইসলাম কবুল করতেন। তাদের সাথে দেখা করে এসব লোক এ ধরনের কথাই বলতো। হযরত উমর (রা) সম্পর্কেও বলা হয়েছে যে, যখন তিনি ঈমান আনেন, আবু সুফিয়ান ও হারব বিন উমায়্যা বিন খালাফ তাঁর সাথে দেখা করে এমন কথাই বলেছিল।

এ কারনেই বলা হয়েছে যে, প্রথমত এ ত সম্ভবই নয় যে, কোন ব্যক্তি খোদার সামনে অন্য কারো দায়িত্ব নিজের উপর গ্রহণ করবে এবং কারো বলার দরুন গোনাহগার ব্যক্তি স্বয়ং নিজের গোনাহের শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। কারণ ওখানে ত প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কর্মের জন্য নিজে দায়ী হবে। (আরবী************************)

কিন্তু যদি এমন হয়ও তথাপি যখন ‍কুফর ও শির্কের পরিণাম একটি প্রজ্জ্বলিত জাহান্নামের আকারে সামনে আসবে, তখন কার এ সাহস হবে যে দুনিয়াতে যে ওয়াদা করেছিল তার জন্য চক্ষুলজ্জার খাতিরে এ কথা বলবে, হুজুর! আমার কথায় যে ব্যক্তি ঈমান পরিত্যাগ করে ইরতিদাদ বা ধর্মত্যাগের পথ অবলম্বন করেছিল আপনি তাকে মাফ করে দিয়ে জান্নাতে পাঠিয়ে দিন। আর আমি আমার কুফরের সাথে তার কুফরের শাস্তিও ভোগ করতে প্রস্তুত আছি। (১৬৭)

কাফেরদের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা নিষিদ্ধ

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَنْ يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ-( التوبة-113)

-নবী ও ঈমানদারদের এ কাজ নয় যে তারা মুশরিকদের মাগফিরাতের দোয়া করবে। তা তারা তাদের আত্মীয় হোন না কেন, যখন তাদের কাছে এটা সুস্পষ্ট যে, তারা জাহান্নামের যোগ্য। (তওবা: ১১৩)

কোন ব্যক্তির জন্য ক্ষমার আবেদন করার অর্থ এই যে, প্রথমত: তার প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা পোষণ করা হয়। দ্বিতীয়ত: তাঁর ত্রুটি ক্ষমার যোগ্য মনে করা হয়না। একথাগুলোতে সে ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে আনুগত্যকারীদের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু শুধু গোনাহগার। কিন্তু যে ব্যক্তি প্রকাশ্য বিদ্রোহী, তার প্রতি সহানুভূতি ও ভালোবাসা পোষণ করা এবং তার অপরাধ ক্ষমারযোগ্য মনে করা শুধু নীতিগতভাবেই ভুল নয়, বরঞ্চ এর থেকে আমাদের (ক্ষমা প্রার্থনাকরী) আনুগত্যই সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা যদি শুধু আত্মীয়তার কারণে এটা চাই যে, তাকে মাফ করে দেয়া হোক, তাহলে তার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, আমাদের নিকটে আত্মীয়তার সম্পর্ক খোদার আনুগত্যের দাবীর তুলনায় অধিক মূল্যবান। তার অর্থ এটাও যে, খোদাও তাঁর দ্বীনের সাথে আমাদের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ও পক্ষপাতশূন্য নয়। আর যে সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক আমরা খোদাদ্রোহীদের সাথে রাখি আমরা চাই যে, খোদা স্বয়ং সে সম্পর্ক কবুল করে নিন এবং আমাদের আত্মীয় স্বজনদেরকে অবশ্যই যেন ক্ষমা করে দেন, তা সে একই অপরাধে অপরাধী অন্যান্যদেরকে তিনি জাহান্নামে ঠেলে দিন না কেন। এ সব কিছুই ভ্রন্ত। নিষ্ঠা ও আনুগত্যের পরিপন্থী। আর সে ঈমানেরও পরিপন্থী যার দাবী এই যে, খোদা ও তাঁর দ্বীনের সাথে আমাদের ভালোবাসা হবে একেবারে পক্ষপাতহীন। খোদার বন্ধু আমাদের বন্ধু এবং তাঁর দুশমন আমাদের দুশমন। এ জন্যই আল্লাহতায়ালা এ কথা বলেননি, “মুশরিকদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করো না” – বরঞ্চ এভাবে বলেছেন, “তোমাদের জন্য এ শোভনীয় নয়, তোমাদের এ কাজ নয় যে, তোমরা তাদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবে। অর্থাত্‌ আমার নিষেধ করার পর তোমরা যদি বিরত থাক, তাহলে তা কোন কাজের কাজ হলো না। তোমাদের মধ্যে আনুগত্যের অনুভুতি এতো তীব্র হওয়া উচিত যে, যারা আমার বিদ্রোহী তার প্রতি সহানুভূতি পোষণ করা এবং তার অপরাধ ক্ষমার যোগ্য মনে করা তোমাদের কাছে স্বয়ং নিজের জন্যই অশোভনীয় মনে হবে।

এখানে এতোটুকু আরও বুঝে নেয়া উচিত যে, খোদাদ্রোহীদের সাথে সহানুভূতি পোষণ যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তা সেই সহানুভূতি যা শুধু দ্বীনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু মানবিক সহানুভূতি, পার্থিব সম্পর্কে ঘনিষ্ট আত্মীয়ের প্রতি দয়া অনুগ্রহ প্রদর্শন, দয়া দাক্ষিণ্য, স্নেহপূর্ণ আচরণ নিষিদ্ধ নয়। বরঞ্চ প্রশংসনীয়। আত্মীয় কাফের হোন অথবা মুমেন, তার পার্থিব অধিকার অবশ্যই পূরণ করতে হবে। বিপন্ন লোককে সাহায্য করতে হবে। অভাগ্রস্তদের জীবিকা অর্জনের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। রোগী ও আহতদের প্রতি সাহায্য সহানুভূতির কোন ত্রুটি করা চলবে না। এতিমদের কথায় স্নেহ বাত্সল্যের হাত রাখতে হবে। এসব ব্যাপারে কখনো কখনো পার্থক্য রাখা যাবে না যে কে মুসলিম এবং কে অমুসলিম।

তাদের সাথে বিবাহ এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কও নিষিদ্ধ

لَا هُنَّ حِلٌّ لَهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ-( الممتحنة-10)

-না মুসলিম নারী কাফেরদের জন্য হলাল, আর না কাফের তাদের জন্য হলাল। (মুমতাহেনা: ১০)

وَلَا تُمْسِكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ-( الممتحنة-10)

-আর (তোমরাও স্বয়ং কাফের নারীদেরকে নিজেদের বিবাহ বন্ধনে বেঁধে রেখোনা। (মুমতাহেনা: ১০)

অবশ্য এ নির্দেশে এ পার্থক্য রয়েছে যে, আহলে কিতাবের নারীদেরকে মুসলমান পুরষ বিয়ে করতে পারে, যেমন সূরায়ে মায়েদার ৫নং আয়াতে বলা হয়েছে এখন মুসলিম নারীদের ব্যাপারে কথা এই যে, তারা মুসলমান পুরুষ ব্যতীত কারো জন্যেই হালাল বা জায়েয নায়।

وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَأَمَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ وَلَا تُنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَلَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ-( البقرة-221)

-তোমরা মুশরিক নারীকে কখনো বিয়ে করবে না। যতোক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন মুমেন বাঁদী, একজন সম্ভ্রান্ত মুশরিক বংশের নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তাকে তোমাদের খুব ভালো লাগে। মুশরিক পুরষের নিকট নিজেদের মেয়েদেরকে কখনো বিয়ে দিও না যতোক্ষণ না তারা ঈমান আনে। একজন মুমেন গোলাম একজন একজন সম্ভ্রান্ত মুশরিক থেকে শ্রেয় যদি তাকে তোমাদের খুব পছন্দ হয়। (বাকারাহ: ২২১)

হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে রসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন- (আরবী*****************)

-না মুসলমান কাফেরের উত্তরাধিকারী হতে পারে আর না কাফের মুসলমানের উত্তরাধিকারী হতে পারে। (বোখারী, মুসলিম, নাসায়ী, আহমদ, তিরমিযি, ইবনে মাজা, আবু দাউদ)।

কাফের দুধরনের এবং তাদের সাথে আচরণে পার্থক্য

এভাবে উম্মতে মুসলেমাকে কাফেরদের থেকে পুরোপুরি পৃথক করে দেয়ার পর শুধু একদিক দিয়ে দু ধরনের কাফেরদের মধ্যে মুসলমানদের আচরণে পার্থক্য করা হয়েছে। তাহলো এই যে, আল্লাহ তোমাদেরকে এ কাজে বাধা দেয় না যে, তোমরা ঐ সব লোকের সাথে সদাচার ও সুবিচার করবে, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং সে তোমাদের গৃহ থেকে বহিস্কার করে দেয়নি। যারা ইনসাফ করে আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন। তিনি তোমাদেরকে যে কাজ করতে বাধা দেন তাহলো এই যে, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে যারা দ্বীনের জন্যে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে গৃহ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদের বহিষ্কারে একে অপরের সাহায্য করেছে, এদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করবে তারা জালেম। (মুমতাহেনা: ৮-৯)

অন্য কথায় মুসলমানদেরকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, শত্রু কাফের এবং অশত্রু কাফেরের মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তিতে আচরণ করতে হবে। ঐসব কাফেরের সাথে সদাচরণ করতে হবে যারা তাদের সাথে কখনো মন্দ আচরণ করেনি। এর উত্কৃষ্ট বিশ্লেষণ একটি ঘটনায় পাওয়া যায়। তা এই যে, হযরত আবু বকর (রা) এর স্ত্রী ছিলেন কাফের যাঁর গর্ভে হযরত আসমা বিনতে আবি বকর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মক্কাতেই রয়ে যান। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর যখন মক্কা মদীনার লোকদের মধ্যে যাতায়াত শুরু হয় তখন হযরত আবু বকরের (রা) কাফের স্ত্রী মেয়ের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মদীনায় আসেন। সাথে কিছু উপঢৌকনও নিয়ে আসেন।

স্বয়ং হযরত আসমা (রা) বলেন, তারপর আমি স্বয়ং রসূলুল্লাহকে (সা) গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমার মায়ের সাথে দেখা করতে পারি কিনা এবং আত্মীয়তাসুলভ আচরণ করতে পারি কিনা। হুযুর (সা) বল্লেন, হ্যাঁ, দেখাও কর এবং আত্মীয়সূলভ আচরণও কর (মুসনদে আহমদ, বোখারী, মুসলিম) এর থেকে এ সিদ্ধান্তই হয় যে, একজন ‍মুসলমানের জন্য তার কাফের মা বাপ, ভাইবোন ও আত্মীয় স্বজনের সাহায্য করা জায়েয যদি তারা ইসলামের দুশমন না হয়। এভাবে একজন যিম্মী মিসকিনকে সদকা দান করাও যেতে পারে (আহকুমুল কুরআন, রুহুল মায়ানী)। (১৬৯)

উম্মতে মুসলিমার সত্যিকার মর্যাদা

এভাবে যে জামায়াত (দল) অস্তিত্ব লাভ করেছিল তা কোন অর্থেই জাতি ছিল না। তার প্রকৃত মর্যাদা সেসব শব্দ ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায় যা কুরআন ও হাদীসে ব্যবহার করা হয়েছে।

হিযব

একটি শব্দ হিযব” যা দুটি স্থানে মুসলমানদের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে (মায়েদা আয়াত ৫৬, মুজাদালা আয়াত ২২)। এ শব্দটি যথার্থই পার্টি বা দলের সমার্থক। উভয় স্থানেই মুসলমানদেরকে হিযবুল্লা” (আল্লাহর দলের লোক) বলা হয়েছে। অর্থাত্ সেইদলের লোক যারা নিজেদেরক আল্লাহর কাজের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছে। জাতি গঠিত হয় বংশ ও পরিবারের ভিত্তিতে এবং দল গঠিত হয় নীতি ও মতাদর্শের ভিত্তিতে। এ দিক দিয়ে মুসলমান প্রকৃতপক্ষে কোন জাতি নয়, বরঞ্চ একটি দল। কারণ তাদেরকে সমগ্র দুনিয়া থেকে পৃথক করে একে অপরের সাথে শুধু এ জন্য সম্পৃক্ত করা হয়েছে যে, এ একটি নীতি ও মতবাদের বিশ্বাসীও তার অনুসারী। আর যেসব লোকের সাথে তাদের নীতি ও মতবাদের মিল নেই, তারা এদের অতি নিকট আত্মীয় হলেও তাদের সাথে এদের কোন মিল নেই।

কুরআন পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে মাত্র দুটি দলই দেখে। একটি আল্লাহর দল (হিযবুল্লাহ), অপরটি শয়তানের দল (হিযবুশ শয়তান)। শয়তানের দলে নীতি ও মতবাদের দিক দিয়ে যতোই মতপার্থক্য থাক না কেন, কুরআন তাদের সকলকে একই বলে গণ্য করে। কারণ, তাদের চিন্তা ও কর্মপদ্ধতি ইসলামী নয় এবং ছোটখাটো মতপার্থক্য সত্ত্বেও সকলে শয়তানের আনুগত্যে একমত। কুরআন বলে

اسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنْسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ أُولَئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ أَلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ-(المجادلة-19)

-শয়তান তাদের উপর কর্তৃত্বশীল হয়েছে এবং সে তাদের দিল থেকে খোদার স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। তারা হলো শয়তানের দলের লোক। সাবধান থেকো। শয়তানের দলের লোকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। (মুজাদালা: ১৯)

ঠিক এর বিপরীত আল্লাহর দলের লোক বংশ, জন্মভূমি, বর্ণ, ভাষা ও ইতিহাস- ঐতিহ্যের দিক দিয়ে পরস্পর যতোই ভিন্ন হোক না কেন, বরঞ্চ তাদের পিতৃপুরুষদের মধ্যে পারস্পরিক খুনাখুনির শত্রুতা থাক না কেন যখন তারা খোদা বর্ণিত চিন্তা ও জীবন পদ্ধতিতে একমত হয়ে গেল, তখন তারা যেন খোদায়ী সূত্রে (হাবলুল্লাহ) একত্রে আবদ্ধ হয়ে গেল এবং এ নতুন দলে শামিল হওয়ার সাথে সাথে তাদের সকল সম্পর্ক শয়তানের দলওয়ালাদের সাথে ছিন্ন হয়ে গেল।

উম্মত

দ্বিতীয় শব্দ যা দলের অর্থে কুরআনের চার স্থনে (বাকারা  : ১২৮, ১৪৩, আলে ইমরান : ১০৪, ১১০) ব্যবহৃত হয়েছে, সে শব্দটি হচ্ছে উম্মত। হাদীসেও এ শব্দটি বহু স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। উম্মত ঐ দলকে বলে যাকে কোন ব্যাপক বিষয়াদি একত্রে মিলিত করেছেন। যেমন এক সময়কালর লোককে ‘উম্মত’ বলা হতো। এক বংশ বা এক দেশের লোককেও উম্মত বলা হতো। কিন্তু মুসলমানদের যে প্রকৃত সার্বজনীনতার ভিত্তিতে উম্মত বলা হয়, তা বংশ, জন্মভূমি অথবা অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, বরঞ্চ তা হচ্ছে তাদের ‘জীবনের মিশন, তাদের মূলনীতি এবং  জীবনের চলার পথ। বস্তুত কুরআন বলে-

(আরবী***************)

-তোমরা সেই উৎকৃষ্ট উম্মত যাকে মানবজাতির জন্য  আবিভূত করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের হুকুম কর এবং অসৎ কাজে বাধা দাও এবং খোদার উপর ঈমান রাখ। (আলে ইমরান: ১১০)

(আরবী***************)

-এবং এভাবে আমরা তোমাদেরকে এক মধ্যবর্তী উম্মত বানিয়েছি- যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য তত্ত্বাবধায়ক হতে পার এবং রসূল তোমাদের তত্ত্বাবধায়ক হোন। (বাকার: ১৪৩)

এ আয়াতদ্বয় থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ‘মুসলমান’ প্রকৃতপক্ষে একটি আন্তর্জাতিক দল। দুনিয়ার সকল জাতি থেকে সেসব লোক বেছে বের করা হয়েছে যারা এক বিশেষ নীতি মেনে চলতে, এক বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়নে এবং একটি মিশন আঞ্জামন দেয়ার জন্য তৈরী। এসব লোক যেহেতু প্রত্যেক জাতি থেকে বের হয়ে এসেছে এবং একটি দলে পরিণত হওয়ার পর কোন জাতির সাথে সম্পর্ক থাকে না, সে জন্য এসব মধ্যকার উম্মত। কিন্তু সকল জাতি থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর সকল জাতির সাথে এদের এক দ্বিতীয় সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। তা এই যে, এরা দুনিয়ার খোদায়ী সিপাহসালারের দায়িত্ব পালন করবে। “তোমরা মানব জাতির তত্ত্বাবধায়ক” শব্দগুলো এ কথা বলে যে, মুসলমানকে খোদার পক্ষ থেকে দুনিয়ায় সিপাহসালার নিযুক্ত করা হয়েছে এবং “মানবজাতির জন্য আবির্ভূত করা হয়েছে” শব্দগুলো স্পষ্ট এ কথা বলছে যে, মুসলমানদের মিশন এক আন্তর্জাতিক মিশন। এ মিশনের সার কথা এই যে, ‘হিযবুল্লাহর’ নেতা সাইয়েদুনা মুহাম্মদকে (সা) চিন্তা ও কাজের যে বিধান খোদা দিয়েছিলেন- তাকে সমগ্র মানিসিক, নৈতিক ও বৈষয়িক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যম তিনি যেন দুনিয়ায় কার্যকর করতে পারেন এবং তার মুকাবেলায় অন্যান্য সকল বিধান ও পদ্ধতি পরাভূত করতে পারেন- (আরবী****************) এ হচ্ছে সেই বস্তু, যার ভিত্তিতে মুসলমানকে এক উম্মত বানানো হয়েছে।

জামায়াত

তৃতীয় পারিভাষিক শব্দ যা মুসলমানদের সামষ্টিক পদমর্যাদা তুলে ধরার জন্য নবী (সা) বহু স্থানে ব্যবহার করেছেন, সে শব্দটি হচ্ছে ‘জামায়াত’ আর এ শব্দটিও ‘হিযব’ এর মতো দলের সমার্থক। (****) এবং (******)

এবং এ ধরনের বহু হাদীসের প্রতি মনোনিবেশ করলে জানা যায় যে, রসূলুল্লাহ (সা) ‘কওম’ অথবা শা’ব (***) অথবা তার সমার্থক অন্য কোন শব্দ ব্যবহার করা থেকে দূরে থেকেছেন এবং তার পরিবর্তে জামায়াত পরিভাষাটিই ব্যবহার করেছেন। তিনি কখনো এ কথা বলেননি যে, হামেশা কওমের সাথে থাক। অথবা কওমের উপর খোদার হাত রয়েছে। বরঞ্চ এ ধরনের সকল ক্ষেত্রে তিনি ‘জামায়াত” শব্দই ব্যবহার করতেন। তার কারণ শুধিু এই যে, এবং এই হতে পারে যে,  ‍মুসলমানদের একত্রে মিলিত হওয়ার ধরন প্রকাশ করার জন্য অধিকতর ন্যায়সঙ্গত। ‘কওম’ শব্দটি সাধারণতঃ যে অর্থে ব্যবহৃত হয় যেস দিক দিযে এক ব্যক্তি যে কোন মতবাদ ও যে কোন নীতির অনুসারীহোক না কেন, একটি জাতির সাথে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে যদি সে ঐ জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করে থাকে এবং নিজের নাম, জীবন পদ্ধতি এবং সামাজিক সম্পর্কের দিক দিযে সে জাতির সাথে সম্পৃক্ত হয।

আদর্শিক দল ও জাতীয় দলের মধ্যে পার্থক্য

এখন এক দল ত এমন যার ‍দৃষ্টিতে একটি জাতি অথবা দেশের বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক কর্মকৌশলের এক বিশেষ মতবাদ ও কর্মসূচী থাকে। এ ধরনের দল নিছক একটি রাজনৈতিক দল হয়ে থাকে। এ জন্য সে জাতির অংগ অংশ হয়ে কাজ করতে পারে এবং করে যার মাধ্যমে সে জন্মগ্রহণ করে।

দ্বিতীয় দল হচ্ছে এমন, যে বিশ্বজনীন মতবাদ ও ধারণা নিয়ে আবির্ভীত হয়। যার কাছে সমগ্র মানব জাতির জন্যে জাতি ও জন্মভূমি নির্বিশেষে থাকে এক বিশ্বজনীন মতবাদ। যে গোটা জীবনকে এক বিশেষ ধরনের গড়ে তুলতে চায়। যার মতবাদ ও  জীবনপদ্ধতি, আকীদাহ ও চিন্তাধারা এবং নীতি-নৈতিকতা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত আচার-আচরণ ও সামাজিক সমস্টিক ব্যবস্থাপনার বিশদ বিবরণ, পর্যন্ত প্রতিটিকে নিজস্ব ছাঁচে ঢেলে সাজাতে চায়। যে একটি স্থায়ী সংস্কৃতি এবং এক বিশেষ সভ্যতা প্রতিষ্টার ইচ্ছা পোষণ করে। এটাও ‍যদিও একটি দল, কিন্তু এ ধরনের দল নয় যা কোন জাতির অঙ্গ হিসাবে কাজ করতে পারে। এ সীমিত জাতীয়তাবার উর্ধে হয়ে থাকে। এর মিশনই এ হয় যে, সে ঐসব অন্ধ গোঁড়ামি উৎখাত করবে যার দরুন দুনিয়ায় বংশ, বর্ণ, ভাষা, জন্মভূীম ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতির সৃষ্টি হয়েছে। এ দল নিজেকে ওসব জাতির সাথে কিভাবে সম্পৃক্ত করতে পারে? এত বংশজাত ও ঐতিহাসিক জাতীয়তার পরিবর্তে একটি বিচার বুদ্সিম্পন্ন জাতীয়তা () স্থবির করে। সৃষ্টির জাতীয়তার স্থলে এ এক সম্প্রসারণশীল () সৃষ্টি করে। এ স্বয়ং এমন এক জাতীয়তার রূপান্তরিত হয় যা চিন্তা ও সংস্কৃতির ঐকের ভিত্তিতে বিশ্বের সকল জনশক্তিকে আপন পরিবেষ্টনে আনতে তৈরী হয়। কিন্তু এ অর্থে একটি জাতীযতা হওয়া সত্ত্বেও এ একটি দলই রয়ে যায়। কারণ এতে শামিল হওয়াটা আকস্মিক জনগণের উপর র্ভির করে না। বরঞ্চ নির্ভর করে সেই মতবাদ ও জীবন পদ্ধতি জ্ঞাতসারে অনুসরণের উপর যার ভিতিএত এ দল গঠিত হয়।

মুসলমান প্রকৃতপক্ষে এ দ্বিতীয প্রকার দলের নাম। এ ঐ ধরনের দল নয় যেমন একটি জাতির মধ্যে গঠিত হয়ে থাকে। বরঞ্চ এ এমন এক ধরনের দল যা একটি সার্বিক জীবন ব্যবস্থা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির এক স্থায়ী ব্যবস্থা প্রতিষ্টার উদ্দেশ্যে আবির্ভূত হয় এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতীয়তাগুলোর সংকীর্ণ সীমান্ত অতিক্রম করে বুদ্ধি বিবেকসম্পন্ন বুনিয়াদের উপর একটি বৃহৎ বিশ্বজনীন জাতীয়তা () গঠন করতে চায়। একে জাতি বলা এ দিক দিয়ে ঠিক হবে যে, সে নিজেকে দুনিয়ার  বংশগত ও ইতিহাস-ঐতিহ্যগত জাতিগুলোর মধ্যে কোন একটির সাথে ভাবাবেগবশতঃ সম্পৃক্ত হতে তৈরী নয়। বরঞ্চ আপন জীবনের দৃষ্টিভঙ্গী ও সমাজদর্শন অনুযায়ী স্বয়ং আপন সাংস্কৃতিক প্রাসাদ পৃথকভাবে নির্মাণ করে। কিন্তু এ অর্থে একটি পৃথক জাতি হওয়া সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে এ একটি দলই রয়ে যায়। কারণ নিছক আকস্মিক জন্মগ্রহণ () কোন ব্যক্তিকে এ দলের সদস্য বানাতে পারে না, যতোক্ষণ না সে এর মতবাদে বিশ্বাসী ও তার অনুসারী হয়। এভাবে কোন ব্যক্তির অন্য কোন জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ এ বিষয়ে প্রতিবন্ধক হয় না যে, সে আপন জাতি থেকে বেরিয়ে এসে দলে যোগদান করবে যদি এর মতবাদে বিশ্বাস স্থাপন করতে প্রস্তুত হয়। অতএব, আমরা যা কিচু বল্লাম, প্রকৃতপক্ষে তার অর্থ এই যে, মুসলমানদের জাতীয়তা তাদের একটি দল হওয়ার ভিত্তিতেই হয়ে থাকে। দলীয় মর্যাদা হলো মূল এবং জাতীয়তার মর্যাদা তার শাখা, দলীয় মর্যাদা তার থেকে পৃথক করা হলে এ নিছক একটি জাতি হয়ে থাকে এবং সেটা হয় হয় তার অধঃপতন। বরঞ্চ এ প্রকৃতপক্ষে মুসলমান হওয়ার ব্যাপারে তার অস্তিত্বের অস্বীকৃতি। (১৭০)

আলোচনার সারসংক্ষেপ

রসূরুল্লাহ (সা) এর নেতৃত্বে উম্মতে মুসলেমার এ পৃথক সংগঠন এবং অমুসলিম সমাজ থেকে একটি সম্পূর্ণ পৃথক সমাজ গঠন যদিও রাতারাতি না হয়ে ক্রমশঃ কয়েক বছরে সম্ভব হয়, তথাপি ইসলামী দাওয়াতের রচনা যে ধরনের হয়েছিল, তাতে লোক ধরে নিয়েছিল যে, এ আন্দোলন কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং অবশেষে এ কোন বিপ্লব আনয়ন করবে। এ জন্য প্রাচীন জাহেলী সমাজকে যারা সংরক্ষিত করতে চাইছিল, তারা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লো এবং নিজেদের মধ্য থেকে এ নতুন উম্মতের আবির্ভাব প্রতেোধ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করলো। (১৭১)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.