সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সপ্তম অনুচ্ছেদ

নবী ও অনবীর কাজের পার্থক্য

এ আলোচনার শেসে আমরা প্রয়োজনবোধ করছি যে, যা কিছু এ পর্যন্ত বলা হলো, তার উপর একজন নবী এবং একজন অনবীর নেতৃত্ব ও কর্মপদ্ধতির পার্থক্য ভালোভাবে উপলব্ধি করা যেতে পারে।

রসূলুল্লাহ (সা) যখন আরবে ইসলামী দাওয়াতের জন্য আদিষ্ট হন, তখন সমগ্র জগতের এবং তাঁর আপন দেশেও অগণিত নৈতিক তামাদ্দুনিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা ছিল যার সমাধান ছিল অপরিহার্য। রোম ও ইরান সম্রাজ্যদ্বয় স্বৈরাচারের শীর্ষস্থঅননে অবস্থান করছিল। বংশীয় ও শ্রেণী বৈষম্য চরম পর্যায়ে ছিল। দুর্বলের উপর শক্তিমানের অত্যাচার ছিল অসহনীয়। বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অর্থনৈতিক শোষণও চলছিল পুরোদমে। নিকৃষ্ট ধরনের নৈতিক অনাচার ছড়িয়ে পড়েছিল। আরব এসব দেশের তুলনায় অধিকতর সমস্যায় জর্জরিত চিল। একই দেশে বসবাসকারী এবং একই ভাষাভাষী জাতি অসংখ্য গোত্রে বিভক্ত ছিল যদিও তাদের মধ্যে কুল ও বংশের দিক দিয়ে পারস্পরিক আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল। তাদের মধ্যে ‘আরব জাতির’ ধারণাও ছিল না। লোক নিজের গোত্রকেই আপন জাতি মনে করতো। চারিদিকে বিশৃংখলা, গৃহযুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা, অজ্ঞতা নৈতিক অধঃপতন অত্যাচর-নিপীড়ন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য প্রকট ছিল। বিদেশী শক্তিসমূহ আরবের এ সব দুর্বলতার সুযোগে দেশের মধ্যে অনুপ্রবেশ কর চলছিল। উত্তর দিকে হেজাজের সীমান্ত পর্যন্ত দখলদারি পৌঁছে গিয়েছিল। রোম সরকার আরবের অভ্যন্তরে অর্থ ও মিশনারী ছড়িয়ে দিয়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করছিল্ পশ্চিম তীরের বিপরীত দিকে অবস্থিত আবিসিনিয়ার খৃষ্টান নাজ্য বহুকাল যাবত ইয়ামেনের উপর আক্রমণ ও তা হস্তগত করতে থাকে। এমনকি একবার মক্কা পর্যন্ত তার সৈন্যবাহিনী পৌঁছে গিয়েছিল। ইরান আরবের পূর্ব তীর এবং ভেতরের কিছু অঞ্চলের উপর তার আধিপত্য বিস্তার  করে রেখেছিল। পরবর্তীকালে ইয়ামেনে পর্য়ন্ত তার আধিপত্য পৌঁছে গিয়েছিল। হেজাজের অধিকাংশ উর্বর ক্ষেত্রসমূহ বাইর থেকে আগত ইহুদীগণ কয়েক শতাব্দী যাবত তাদরে দলখদারি কায়েম করে রেখেছিল্ তারা তাদের সুদখুরির জালে আরবাবাসীদেরকে আবদ্ধ করে রেখেছিল।

এহেন অবস্থায় যদি কোন সংস্কারক ধরনের নেতার আরবে আবির্ভাব ঘটতো, তাহলে সে তার কাজের সূচনা হয়তো জাহেলী রেসম ও রেওয়াজ, নৈতিক অনাচার এবং পারস্পরিক গৃহযুদ্ধ প্রতিহত করার চেষ্টা  দ্বারা করতো। অথবা ধনী ও দরিদ্রের ধুয়অ তুলে ধনীদের বিরুদ্ধে গরীবদের ক্ষিপ্ত ও উত্তেজিত করে দিত যাতে করে সাধারণ মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্ত হয় এবং দারিদ্র দূল হয়। আর যদি কোন রাজনৈতিক ধরনের নেতার আবির্ভাব হতো, তাহলে সে আরবাসীদেরকে এই বলে প্রলুদ্ধ করে তার অনুগামী করার চেষ্টা  করতো “আমি তোমাদেরকে একটি শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করব, বাইরের লুটেরাদেরকে দেশ থেকে তাড়ি দেব, আরব দেশকে একটি বিরাট রাজ্যে পরিণত করে তোমাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলার উন্নয়ন সাধন করব। তোমাদের অর্থনৈতিক উপা-উপাদান বর্ধিত করব, তোমাদরে ক্ষুধা দূর করব এবং শক্তি অরজন করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর উপর অগ্রাসন চালাবা যাতে তোমাদের ধনদৌলত বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।”

এ সমুদয় কাজে চরিত্রের কোন প্রশ্নই উঠতো না এবং সে তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব সফলকাম করার জন্যে কোন প্রতারণা, কোন ষড়যন্ত্র, ছলচাতুরী, বলপ্রয়োগন এবং গণহত্যার আশ্রয় গ্রহণ করতে কণামাত্র দ্বিধাবোধ করতো না। তারপর উভয় ধরনের নেতৃত্ব একটি জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বিই হতো। স্বীয় গোত্রের গোঁড়ামির উর্ধে উঠলেও বড়জোর আরব গোঁরামি পর্যন্ত পৌঁছে যেতো। অন্য জাতি ও দেশের প্রতি তার সৃষ্টি পর্যন্ত সে পৌঁছতে পারতো না।

ইসলামী আন্দোলনের বিশিষ্ট কর্মপদ্ধতি

প্রথমে একটু খোদাপ্রেরিত রসূরুল্লাহকে (সা) দেখুন। পরিস্থিতি ও সমস্যাদি তখন তেমনই ছিল যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। আর সবই ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং কোনটাই ‍উপেক্ষা করার মত ছিল না। নবীও (সা) সেসব উপেক্ষার বিষয় মনে করেননি। সময়মত ওসবের একটি একটি করে শুধু সমাধানই করেননি, বরঞ্চ সে বিরাট বিপ্লব সংঘটিত করিয়ে দেখিয়ে দেন যার ধারণা কোন অনবী সংস্কারক অথবা রাজনৈতিক নেতা করতেও পারতো না। কিন্তু তিন তাঁর কাজের সূচনায় এসব কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে শুধু একটি বুনিয়াদী সংস্কারের প্রতি পুরোপুরি মনোযোগ দেন। যা সমুদয় সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি ছিল। যদিও তিনি একটি গোত্রে ও একটি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তথপি ইসলামী আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই তাঁর দৃষ্টি ছিল গোটা মানবতার প্রতি যাকে সিরাতে মুস্তাকীমের দিকে আহ্বান করার জন্য তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। আর সকল সমস্যা পরিহার করে যে বুনিয়াগী সংস্কারের জন্য তাঁর সমগ্র চেষ্টা সাধণা কেন্দ্রীভূত করেন তা ছিল এইঃ-

১। লোক যেন তৌহীদের উপর ঈমান আনে। সকলের বন্দেগী পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর বন্দেগী অবলম্বন করে এবং তাঁর হুকুমকে অবশ্য পালনীয় মনে করে।

২) মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর রসূল বলে মেনে নেয় এবং ওসব হেদায়েত, শিক্ষা ও আইন-কানুন মেনে চলে যা আল্লাহর পথ থেকে তাঁর মাধ্যমে পৌঁছেছে।

৩) কুরআনকে আল্লাহর কালাম হিসাবে মেনে নেবে এবং তার ফরমান সর্বসময়ে জন্যে অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

৪) আখেরাতের উপর ঈমান আনবে এবং এটা মনে করে দুনিয়ার কাজকর্ম করবে যে, অবশেষে মৃত্যুর পর খোদার সামনে হাজির হয়ে আপন ক্রিয়াকান্ডের জবাবদিহি করতে হবে।

৫) চরিত্রের ভালো ও মন্দ দিকগুলোর ঐস অপরিবর্তনীয় নীতি অনুসরণ করে চলতে হবে যা আল্লাহ, তাঁর রসুল ও তার ও তাঁর কিতাব পেশ করেছে।

৬) মানুষের মধ্যে যারা এ দাওয়াত কবুল করবে তারা এমন এক উম্মত হয়ে যাবে যে এ দাওয়াতের পতাকাবাহী হিসাব দাঁড়িয়ে যাবে, তাকে বিজয়ী করার জন্য জান ও মালের বিরাট ঝুঁকি নেয়ার জন্য তৈরী হতে হবে। পরস্পর পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ হবে এবং নিজস্ব  এক ভবিষ্যৎ সমাজ গঠন করতঃ কুফর ও কাফেরদের সাথে দুস্তি-মহব্বত ও বাস্তব সামাজিকতার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। (১৭২)

এ কর্মপদ্ধতির গুরুত্ব

প্রথমে সকলদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে, শুধুমাত্র এই একটি বুনিয়াদী সংস্কারে জন্য সকল শক্তি নিয়োগ করার কারণ ত প্রথমতঃ এ ছিল যে, এই হলো সঠিক ও হক কাজ। আর রসূলের প্রকৃত কাজই হলো হক পেশ করা। দ্বিতীয় কারণ এ ছিল যে, ইসলামী আন্দোলনের দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের নৈতিক ও তামাদ্দুনিক জীবনে যতো অনিষ্ট-অনাচারই পয়#দা হয় সে সবের প্রকৃত কারণ মানুষের নিজেকে স্বাধীন ও দায়িত্বহীন মরে করা। নিজেকে নিজের ইলাহ মনে করা এবং বিশ্বজগতের ইলাহকে বাদ দিয়ে অন্যান্যকে খোদায়ী গুণাবল, এখতিয়ার ও অধিকারের হকদার মনে করা। তা তারা কোন মানুষ হোক অথবা অন্য কোন সত্তা হোক। মূলে  যদি এ অনিষ্ট-অনাচার বিদ্যমান থাকে, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে উপর উপর বা ভাসা ভাসা কোন সংস্কার ব্যক্তিগত অবনতি অথবা সামষ্টিক অনিষ্ট-অনাচার দূর করতে পারবে না। একদিক থেকে অনিষ্ট দূর করা হলে অন্যদিক থেকে তা মস্তক উত্তোলন করে দাঁড়াবে। অতএব, সংস্কারের সূচনা হতে হলে শুধু এভাবেই হতে পারে যে, একদিকে ত মানুষের মন থেকে স্বাধীনতা ও জবাবদিহিহীনতার অলীক ধারণা দূর করতে হবে এবং তাকে বলতে হবে যে, সে যে দুনিয়ায় বাস করে তা প্রকৃতপক্ষে কোন শাসকহীন রাজ্য নয়। বরঞ্চ বাস্তবে তার এক সার্বভ্যেম বাদশাহ রয়েছে এবং সে তার জন্মগত প্রজা। তাঁর সে বাদশাহী তার মেনে নেয়ার মুখাপেক্ষী নয়। সে তাঁর বাদশাহীর অবসান ঘটাতে পারবে না, আর না সে তাঁর থেকে বের হয়ে অন্যত্র যেতে পারবে। এ অটল বাস্তবতা বিদ্যমান থাকতে তার স্বাধীনতার অলীক ধারণা এক নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ ভূল ধারণা ছাড়া আর কিছু নয় যার পরিণাম তাকেই বহন করতে হবে। বাস্তবতার দাবী এই যে, সে যেন সোজাসুজি তাঁর আগে মস্তক অবনত করে এবং একজন অনুগত বান্দাহ বা দাস হয়ে থাকে। অপরদিকে তাকে বাস্তবতার এ দিকটাও তুলে ধরতে হবে যে, এ সমগ্র সৃষ্টি জগতে একমাত্র বাদশাহ, একমাত্র মালিক এবং একমাত্র  কর্তৃত্ব প্রভুত্বের অধিকারী বলে একজন রয়েছেন। এখানে অন্য কারো হুকুম করার অধিকার নেই আর না প্রকৃতপক্ষে কারে হুকুম চলে। এ জন্যে সে যেন তিনি ছাড়া আর কারো বান্দাহ না হয়, কারো হুকুম যেন না মানে, কারো সামনে মস্তক অবনত না করে। এখানে কোন হিজ ম্যাজেস্টী (His majisty) নেই,  ম্যাজেস্টীতে একমাত্র ঐ এক সত্তার জন্য নির্দিষ্ট। এখানে কোন His Highness নেই। Highness ত শুধু তারই শোভা পায়। এখানে কোন His Holiness নেই। Holiness সবটাই তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট। এখানে কোন His Lordship নেই। Lordship সমুদয় তাঁরই একটি অংশ। এখানে কোন আইন প্রণেতা নেই। আইন একমাত্র তাঁরই, আইন, প্রণয়নের এবং আইন অমান্য করার অপরাধ শস্তি দেয়ার অধিকার তাঁরই, আইন, প্রণয়নের এবং আইন অমান্য করার অপরাধে শাস্তি দেয়ার অধিকার তাঁরই। এখানে কোন সরকার কোন দাতা-দয়ালু, কোন শাহ্‌ শাহানশাহ, কোন অলী ও কর্মকর্ত কোন বিপদ-মুসিবত দূরকারী, কোন দোয়া শ্রবণকারী কাতর প্রার্থনার কোন প্রতিবিধানকারী নেই। কারো নিকটে শাসন ক্ষমতার চাবি নেই। কেই শ্রেস্ঠত্বের অধিকারী নয়। যমীন থেকে আসান পর্যন্ত সবই দাস ও গোলাম ও আজ্ঞাবহের দল। প্রভু ও মনিব শুধু একজন। অতএব, সকল প্রকার গোলামী, আনুগত্য, বশ্যতাস্বীকার পরিহার করতে হবে এবং একমাত্র তাঁরই গোলাম ও অনুগত হতে হবে এবং একমাত্র তাঁরই হুকুম শাসন মেনে চলতে হবে।

এ সকল সংস্কারের মূল ভিত্তি। এর ভিত্তিতেই ব্যক্তিচরিত্র ও সামষ্টিক ব্যবস্থার গোটা প্রাসাদ ভেঙ্গে চুরমার করে নতুন করে এক বিশেস নকশায় তৈরী হয়। আর মানব জীবনে সকল সমস্যা যা আদম (আ) থেকে আজ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়েছে এবং এখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টি হবে। এর ভিত্তিতেই এক নতুন পন্থায় তার সমাধান করা হবে।

নবীর (সা) দাওয়াতের সূচনা পদ্ধতি

মুহাম্মদ (সা) এ বুনিয়াদী সংস্কারের দাওয়াত কোনপ্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ও ভূমিকা ছাড়াই পথ অবলম্বন করেননি যে প্রথমে রাজনৈতিক এবং সামাজিক ধরনের কিছু কাজ কাম করে লোকের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি করবেন। তারপর সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিছু শাসকসুলভ এখতিয়ো হাসিল করা এবং সে এখতিয়ার কাজে লাগিয়ে লোকব পরিচালনা করিয়ে এ পর্যায়ে তাদের টেনে আনবেন। এসব কিছুই না। আমরা দেখে যে, ওখানে একজন শুধুমাত্র লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর ঘোষণা করছেন। এর কম কোন কিছুর উপর তাঁর দৃষ্টি পড়েনি। এর কারণ শুধু পয়গম্বরসুলব সাহসিকতা এবং তাবলিগি আবেগই নয়, প্রকৃতপক্ষে ইসলামী আন্দোলনের কর্মপন্থাই এই। সে প্রভাব ও ক্ষতা যা অন্যকিছুর মাধ্যমে পয়দা করা যায় তা এ সংক্কার  কাজের মোটেই সহায়ক নয়। যারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ছাড়া অন্য কোন কিছুরই ভিত্তিতে লোকের সহযোগিতা করে, তারা এ বুনিয়াদের উপর পুনর্গঠন কাজে নবীর (সা) কোন জাকে লাগবে না। এ কাজেত তাদের যোগদান বেশী ফলপ্রসূ হবে যারা লা ইলহা ইল্লাল্লাহ শুনা মাত্রই আহ্বানকারীর দিকে ছুটে আসবে। এ কাজেই তাদের আকর্ষণ থাকবে। এ বাস্তবতাকেই তারা তাদর যিন্দেগীর বুনিয়াদ বানাবে এবং তার ভিত্তিতেই তারা কাজ করতে অগ্রসর হবে। অতএব ইসলামী আন্দোলন চালাবার জন্য যে বিশেষ কৌশল ও কর্মসূচীর প্রয়োজন তার দাবীই এই যে, কোন ভূমিকা ব্যতিরেকেই কাজের সূচনা তৌহীদের দাওয়াত থেকেই  করতে হবে।

তৌহীদের ধারণার ব্যাপকতা

তৌহীদের এ ধারণা শুধু একটা ধর্মীয় বিশ্বাসই নয়। এর থেকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের গোটা ব্যবস্থা যা মানুষের স্বাধীনতা ও গায়রুল্লাহর প্রভুত্ত কর্তৃত্বের বুনিয়াদের উপর গঠিত, তার মূলোৎপাটন হয়ে যায়। আর এক দ্বিতীয় বুনিয়াদের উপর এক নতুন প্রাসাদ নির্মিত হয়। আজ দুনিয়অর মুয়োজ্জেনকে ‘আশহাদু আল্লাহইলাহা ইল্লাল্লাহ’র আওয়াজ বুলন্দ করতে দেখে তা ঠান্ডা মাথায় শুনে যায়। না আহ্বানকারী জানে যে সে কি বলছে আর না শ্রবণকারীগণ তার মধ্যে কোন অর্থ ও উদ্দেশ্য দেখতে পায়। কিন্তু যদি তারা জনাতে পারে যে, এ ঘোষণার উদ্দেশ্য  বর্তমানে প্রচলিত গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং এর স্থলে এক নতুন ব্যবস্থা কায়েম করা, তাহলে বিশ্বাস করুন যে, এ আওয়াজ ঠান্ডা দিলে কোথাও বরদাশত করা হবে না। আপনি কারো সাথে লড়তে যান বা না যান, স্বয়ং দুনিয়া আপনার বিরুদ্ধে লড়তে আসবে। এ আওয়াজ বুলন্দ করার সাথে সাথে এমন মনে হবে যে, হঠাৎ যমীন ও আসমান আপনার দুশমন হয়ে গেছে এবং চারদিকে দেখতে পাবেন সাপ, বিচ্ছু এবং হিংস্র পশু।

এ কর্মপন্থার সাফল্যের কারণ

এ অবস্থাই সে সময়ে দেখা গেল যখন নবী মুহাম্মদ (সা) প্রকাশ্যে এ আওয়াজ বুলন্দ করেন। আহ্বানকারী জেনে বুঝেই আহ্বান জানান, শ্রোতাগণও বুঝতে পারাছিল, তারা এ আওয়াজ বন্ধ করার জন্য বদ্ধপরিকর হলো। পূজারী ও পুরোহিতগণ তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদ ও পোপতন্ত্রের জন্য এতে বিদ দেখতে পেলো, ধনীদের ধনদৌলতের সুদখোরদের তাদের সুদী ব্যবসার,বংশপূজারদৈর তাদের বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বের, রেসম পূজারীদের তাদের রেসম ও রেওয়াজের, জাতি পূজারীরেদ তাদের জাতীয়তাবাদের, পূর্ব পুরুশ পূজারীদের তাদের বাপ-দাদার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পন্থা পদ্ধতির অর্থাৎ প্রত্যেক প্রতিমার পূজারীদের আপন আপন প্রতিমা ধ্বংসের আশংকা দেখা দিল এ একটি আওয়অজের মধ্যে। এ জন্য ্অলকুফরো মিল্লাতুন ওয়াহেদাতুন (*******) অনুযায়ী যারা পরস্পর বিবাদমান ছিল তারা এ নতুন আন্দোলণের বিরুদ্ধে লড়বা জন্য এক হয়ে গেল। এ অবস্থায় শুধুমাত্র তারাই নবী মুহাম্মদের (সা) দিকে এলো যাদের চিন্তাধারা স্বচ্ছ ছিল, যারা বাস্তবতা উপলব্ধি করার ও মেনে নেয়ার যোগ্যতা রাখতো, যাদের মধ্যে এতোটা সততার অনুরাগ বিদ্যমান ছিল যে, যখন একটি বিষয় সম্পর্কে তারা জেনে ফেল্লো যে, তা সত্য, তখন তার জন্য আগুনে ঝাঁপ দিতে এবং মৃত্যুর সাথে খেলা করতে তারা তৈরী হয়ে গেল। এ আন্দোলনের জন্য এমন সব লোকরই প্রয়োজন ছিল। তারা একজন, দুজন, চারজন করতে আসতে থাকে এবং সংঘাত-সংঘর্ষও বাড়তে থাকে। কারো জীবিকা বন্ধ হয়ে গেল বাড়ির লোক কাউকে বাড়ি থেকে বের করে দিল কারো বন্ধু বান্ধব ও প্রিয়জন সম্পর্ক ছিন্ন করলো। কাউকে বন্দী করা হলো, কাউকে উত্তপ্ত বালুকারাশির উপর দিকে টেনে হিচড়ে নেয়া হতে থাকলো, কাউকে প্রকাশ্যে পাথর ও গালি দ্বারা অভ্যর্থনা করা হলো, কারো চক্সু উৎপাটিত করা হলো, কারো মস্তক চূর্ণ করা হলো, কাউকে নারী, ধনদৌলত, বাদশাহী তথা সম্ভাব্য সকল বস্তুর প্রলোভন দিয়ে খরিদ করার চেষ্টা করা হলো। এ সব এলো এবং আসারও প্রয়োজন ছিল। এসব ব্যতীত ইসলামী আন্দোলন না মজবুত হতে পারতো আর না সামনে অগ্রসর হতে পারতো।

কাজের লোক বাছাই করার এবং তাদের তরবিয়তের স্বাভবিক পন্থা

এর অনিবার্য সুফল এ ছিল যে, নিকৃষ্ট ধরনের দুর্বল চরিত্রের এবং দুর্বল ইচ্ছাশক্তির লোক এদিকে আসতেই পারতো না। যারা এসেছিলেন তারা ছিলেন আদম সন্তানদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন এবং প্রকৃতপক্ষে যাদের প্রয়োজন ছিল। কাজের লোক অকর্মন্য লোক থেকে বাছাই করে নেয়ার এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না যে যারাই এলো, অগ্নিপরীক্ষার ভেতর দিয়েই এলো। তারপর যারাই এলো তাদেরকে কোন ব্যক্তিগত স্বার্থে, কোন বংশীয় অথবা জাতীয় উদ্দেশ্যে বিপদের মুকাবেলা করতে হয়নি। বরঞ্চ তাদেরকে যা কিছুই বরদাশত করতে হয়েছে তা শুধু সত্য ও সততার জন্যে, খোদা ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্য বরদাশত করতে হয়েছে। এর জন্যই তারা মার খেয়েছে, ক্ষুৎ পিপাসায় মরেছে। সারা দুনিয়ার অত্যাচার-উৎপীড়নের শিকার হয়েছে। তার ফল এই হয়েছে যে, তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সঠিক ইসলামী মন-মানসিকতা তৈরী হতে থাকে। তাদের মজবুত ও নির্ভরযোগ্য ইসলামী চরিত্র তৈরী হলো। তাদের খোদাপুরস্তির মধ্যে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়ে তা বাড়তে থাকলো। বিপদ মুসিবতের এ শক্তিশালী প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রে ইসলামী হাল-হকিকত বিকশিত হওয়া ছিল এক স্বাভাবিক ব্যাপার। যখন কোন ব্যক্তি কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য দাঁড়িয়ে যায় এবং তার জন্য সংঘাত-সংঘর্ষ, প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট, অস্থিরতা, জেলজুলুম, ক্ষুৎপিপাসা, নির্বাসন দন্ড প্রভৃতি অতিক্রম করে সে অগ্রসর হয়, তখন তাঁর এ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বদৌলত তার সে উদ্দেশ্যের সকল হালহকিকত তার অন্তররাজ্যে ছেয়ে যায়। তারপর তার সমগ্র ব্যক্তিত্ব সে উদ্দেশ্যেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ বিষয়ে পূর্ণতা অর্জনে সহায়ক হিসাবে সর্বপ্রথম নামায তার উপর ফরয করা হয়েছে যাতে দৃষ্টিভ্রম বা দৃষ্টির অস্পষ্টতার সকল আশংকা দূর হয়। আপন লক্ষ্যের প্রতি যেন দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। যাকে সে তার শাসক মেনে নিয়েছে, তার শাসন-ক্ষমতার বার বার স্বীকৃতি দিয়ে আপন আকীদাহয় যেন সুদৃঢ় হয়ে যায়। যার হুকুম অনুযায়ী তাকে দুনিয়ায় কাজ করতে হয়, তাঁর আলেমুল গাইবে ওয়াশশাহাদাহ হওয়া, তার মালেকে হাাত্তমেদ্দান হওয়া তার সমুদয় সৃষ্টির উপর কর্তৃত্বশীল হওয়া, পরিপূর্ণরূপে তার হৃদয়ে যেন দৃঢ়মূল হয়ে যায়, কোন অবস্থাতেই যেন তিনি ছাড়া আর কারো আনুগত্য করার ধারণা তার হৃদয়ে স্থান না পায়।

ইসলামী দাওয়াতের প্রসার লাভ করার কারণ

একদিকে আগতদের তরবয়িত এভাবে হয়েছিল এবং অপরদিকে এ সংঘাত-সংঘর্ষের কারণে ইসলামী আন্দোলন প্রসার লাভ করছিল। লোক যখন দেখতো যে মুষ্টিমেয় লোক মার খাচ্ছে, বন্দী হচ্ছে, বাড়ি থেকে বহিস্কৃত হচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে নিশ্চিতরূপে এ অনুসন্ধিৎসা সৃষিট হতো এবং তারা জানবার চেষ্টা করতো যে এতোসব হাংগামা কিসের জন্য। যখন তারা জানতে পারতো যে, নারী, অর্থ, ভূসম্পত্তি কোনটার জন্যই নয়, কোন ব্যক্তি স্বার্থ তাদের নেই, এ আল্লাহর বান্দাহগণ শুধু এর মার খাচ্ছে যে, একটি বিষেয়ের সত্যতা তাদের কাছে উদঘাটিত হয়েছে, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মনে এ কথা জানার আগ্রহ সৃষ্টি হতো যে, আসলে সে বস্তুটি কি যার জন্য এসব লোক এমন এমন পিবদ মুসিবত বরদাশত করতে চলেছে। তারপর যখন তারা জানতে পারতো যে, সে বস্তুটি হলো ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং এর ফলে মানব জীবনে এমন ধরনের বিপ্লব সাধিত হয়; এবং এ দাওয়াত নিয়ে এমন সব লোক মাঠে নামছে যারা নিছক সত্যের খাতিরে দুনিয়ার সকল সুযোগ সুবিধা প্রত্যাখ্যান করছে, জান-মাল, সন্তানাদি সব কিছু কুরবান করছে, তখন তাদের চোথ খুলে যেতো, তাদের মনকে যতো আবরণ আচ্ছাদিত করে রেখেছিল, তা উন্মেচিত হতে থাকে। এ পটভূমিতে এ সত্যতা তীরের মতো তার লক্ষ্যস্থলে গিয়ে পৌঁছতো। এটাই ছিল কারণ যে, যাদেরকে  ব্যক্তি মর্যাদার অহংকার, বাপ-দাদার অন্ধ আনুগত্যের অজ্ঞতা অথবা পার্থিব স্বার্থের মোহ অন্ধ বানিয়ে রেখেছিল তারা ব্যতী আর  সকলে এ আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকলো। কেউ তড়িঘরি আকৃষ্ট হলো, কেউ বা এ আকর্ষণকে বহুদিন ধরে প্রতিহত করতে থাকলো। কিন্তু বিলম্বে হোক বা শীঘ্রই হোক, প্রত্যেক সত্যপ্রিয় ও নিঃস্বার্থ ব্যক্তিকে এ সত্যের সাথে সম্পৃক্ত হতে হলো।

হুযুর (সা) এর চরিত্রের অসাধারণ প্রভাব

এ সময়ের মধ্যে আন্দোলনের নেতা নবী (সা) তাঁর জীবন থেকে আন্দোলনের মূলনীতিগুলো এবং যার জন্য এ আন্দোলন তার প্রতিটি বিষয়কে সুস্পষ্ট করে তুলে ধরেন। তাঁর প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ এবং প্রতিটি তৎপরতা থেকে ইসলামের প্রকৃত প্রাণশক্তি উচ্ছলিত হচ্ছিল এবং মানুষ উপলব্ধি করতো ইসলাম কাকে বলে।

তাঁর বিবি হযরত খাদিজা (রা)( হেজাজের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী মহিলা ছিলেন। নবী (সা) তাঁর মাল নিয়ে ব্যবসা করতেন। যখন ইসলামের দাওয়াত শুরু হলো, তখন তাঁর যাবতীয় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেল। কারণ পুরোপুরি আপন দাওয়াতী কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এবং সমগ্র আরবকে নিজের দুশমন বানাবার পর  ব্যবসার কাজ আর চলতে পারতো না। আগের দিনগুলোর যা কিছু অবশিষ্ট ছিল, তার সবটুকু স্বামী-স্ত্রী মিলে এ আন্দোলন ছড়াবার কাজে কয়েক বছরে নিঃশেষ করে ফেল্লেণ। অবশেষে অবস্থা তায়েফ গমন করেন, তখন যে ব্যক্তি এক সময় হেজাজের ব্যবসায়ী প্রধান ছিলেন, তিনি তাঁর বাহনে জন্য একটি গাধাও সংগ্রহ করতে পারেননি।

কুরাইশগণ নবী করিমকে (সা) হেজাজ সরকারের সিংহাসন পেশ করে। তারা বলে, আমরা আপনাকে আমাদের বাদশাহ বানিয়ে নেব, আরবের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে দিয়ে আপনার বিয়ে দেব, ধন সম্পদের পাহাড় আপনার পদতলে লুটিয়ে দেব, শর্ত এই যে, আপনি এ আন্দোলন থেকে বিরত থাকুন, কিন্তু যে ব্যক্তি মানবতার মুক্তি ও কল্যাণেল জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি এসব প্রস্তাবদি প্রত্যাখ্যান করে গালি ও পাথর খাওয়ার জন্য রাজী হলেন।

কুরাইশ ও আরব সর্দারগণ বল্লো, মুহাম্মদ (সা) আমরা কি করে তোমার কাছে এসে বসতে পারি এবং তোমার কথা কি করে শুনতে পারি, যখন তোমার মজলিসে সর্বদা গোলাম, বিত্তহীন ও (মায়াযাল্লাহ) নিম্ন জাতের লোক বসে? আমাদর নিকটে যারা সবচেয়ে নিম্নশ্রেণীর লোক তাদেরকে তুমি তোমার চারপাশে একত্র করে রেখেছ। এদেরকে দূর করে দাও যাতে তোমার সাথ আমরা মিলিত হতে পারি। কিন্তু যে ব্যক্তি মানুষের উঁচু-নীচুকে সমান করতে এসেছিলেন, তিনি ধনীদের খাতিরে গরীবদের তাড়িয়ে দিতে অস্বীকার করেন।

আন্দোলনের স্বার্তে নবী (সা) আপন দেশ, জাতি, গোত্র, পরিবার কারো স্বার্থের কোন পরোয়া করেননি। ঈমান আনয়নকার পর ছিল তাঁর আপন। ঈমান যারা আনেনি তারাই ছিল তাঁর পর। এ জিনিসই দুনিয়াবাসীর মনে এ দৃঢ় প্রত্যয় দান করে যে, তিনি মানুষ হয়ে মানুষের কল্যাণের জন্যই আবির্ভূত হয়েছেন, আর এ জিনিসই তাঁর দাওয়াতের প্রতিটি দেশ ও জাতিকে আকৃষ্ট করে। যদি তিনি তাঁর পরিবারের জন্য চিন্তা করতেন, তাহলে এ চিন্তার প্রতি যারা হাশেমী নয়, তাদের কি অনুরাগ থাকতো? যদি তিনি এ জন্য অধীর হতেন যে, কোন প্রকারে কুরাইশদের প্রবুত্ত কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন রাখা হোক, তাহলে অকুরাইশীদের কোন মাথা ব্যাথা হয়েছিল এ কাজে শরীক হওয়ার? যদি তিনি আরবদের শ্রেস্ঠত্বের জন্য কাজ করতেন, তাহলে আবিসিনিয়ার বেলাল (রা) রোমের সুহাইব (রা) এবং ইরানের সালমানের (রা) কি প্রয়োজন ছিল তাঁর কাজে সহযোগিতা করার? প্রকৃতপক্ষে যে বস্তু সকলকে আকৃষ্ট করছিল তা ছিল খালেস খোদাপুরস্তি এবং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও জাতীয় স্বার্থের ঊর্ধে অবস্থান। (১৭৩)

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.