সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রথম অধ্যায়

কুরআন তার বাহককে কোন্ মর্যাদায় উপস্থাপিত করে

দুনিয়াতে মানুষের হেদায়েদ ও পথ নির্দেশনার জন্যে সর্বদা এমন সব পুণ্যপূত মনীষী জন্ম গ্রহণ করতে থাকেন যাঁরা তাঁদের কথা ও কাজের দ্বারা মানুষকে সত্য ও সততার সরল সহজ পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু মানুষ অধিকাংশক্ষেত্রে তাঁদের বিরুদ্ধবাদীতাই করেনি যে তারা তঁঅরেদ বাণীর প্রতি অনীহা প্রদর্শন করেছে, তাঁদের উপর জুলুম তাঁদের বিরুদ্ধবাদীরাই করেনি যে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাঁদেরকে দুঃখকষট দিয়ে সত্যপথ থেকে ফেরাবার চেষ্টা করেছে, বরঞ্চ তাঁদের উপর জুলুম তাঁদের ভক্ত অনুরক্তগণও করেছে, এভাবে যে তাঁদের চলে যাওয়ার পর তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা বিকৃত করেছে, তাঁদের হেদায়েত পরিবর্তন করে দিয়েছে। তাঁদের আনীত গ্রন্থাবলীর কদর্থ করেছে এবং স্বয়ং তাঁদের ব্যক্তিত্বকে কৌতূহলের খেলনা বানিয়ে তাঁর মধ্যে খোদায়ী রঙেগর প্রলেপ দিয়েছে। প্রথম ধরনের  জুলুম ত ঐসব পূত-পবিত্র মনীষীদের জীবদ্দায় অথবা বড়োজোর তাঁদের পর কয়েক বৎসর পর্যন্ত সীমিত ছিল। কিন্তু এ দ্বিতীয় প্রকারের জুলুম তাঁদের তিরোধঅনের পর শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত চলতে থাকে েএবং অনেকের সাথে এখন পর্যন্ত এ জুলুম করা হচ্ছে।

দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত যতো সত্যের আহ্বানকারী প্রেরিত হয়েছেন, সকলেই ঐসব মিথ্যা খোদার খোদায়ী নির্মূল করার কাজেই তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন, যাদেরকে মানুষ এক খোদাকে বাদ দিয়ে খোদা বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সর্বদা এটাই হতে থাকে যে তাঁরেদ ইহলোক ত্যাগ করার পর তাঁদের অনুসারীগণ জাহেলী আকীদাহ বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্বয়ং তাঁদেকেই খোদা অথবা খোদার শরীক বানিয়ে নিয়েছে। তাঁদেকেও সেসব প্রতিমার মধ্যে শামিল করে নিয়েছে যেসব চূর্ণ করার জন্যে তাঁরা তাঁদের সসমগ্র জীবনের শ্রম-সাধনা নিয়োজিত করেছিলেন।

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মানুষ কিছুটা এমন সংশয় সন্দেহে ভুগছে যে, মানবতার মধ্যে পবিত্রতা ও ফেরেশতাসুলভ গুণাবলীর সম্ভাবনা ও অসিত্বের প্রতি তার বিশ্বাস খুব কমই রয়েছে। সে নিজেকে নিছক দুর্বলতা ও হীনমন্যতার সমষ্টিই মনে করে। তার মন এ মহাসত্যের জ্ঞান ও বিশ্বাস থেকে বঞ্চিত থাকে যে, মহান স্রষ্টা তার মাটির দেহে এমন সব শক্তিসামর্থ সৃষ্টি করে দিয়েছেন যা তাকে মানুষ এবং মানবীয় গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও পরিত্র উর্ধজগতের আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদের অপেক্ষঅও উচ্চতর মর্যাদায় ভূষিত করতে পারে। এ কারণেই, দুনিয়াতে যখন কোন মানুষ নিজেকে খোর প্রতিনিধি হিসাবে পেশ করেছ, তখন তার স্বজাতির লোকেরা তাকে তাদেরই মতো রক্তমাংসের মানুষরূপে দেখে তাকে খোদা প্রেরিত বলে মেনে নিতে একেবারে অস্বীকার করেছে। অবশেষে যখনত তাঁর সত্তার মধ্যে অসাধারণ মহৎ গুণাবলীর বহিঃপ্রকাশ দেখে শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করেছে, তখন মন্তব্য করেছে, যে ব্যক্তি এমন অসাধারণ গুণাবলীর অধিকারী হন তিনি কখনো মানুষ হতে পারেন না। অতঃপর কোন দল তাঁকে খোদা বানিয়ে দিল, কেউ দেহান্তরের ধারণা আবিষ্কার করে বিশ্বাস করে বসলো যে খোদা তাঁর আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেই আবার তাঁর মধ্যে খোদায়ী গুণাবলী ও খোদাসুলভ এখতিয়ার-অধিকারের ধারণা পোষণ করলো। আবর কেউ ঘোষণা করলো যে তিনি খোদার পুত্র। (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আম্মা ইয়াসেফুন)-।

বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের- তাঁদের ধর্মপ্রবর্তক সম্পর্কে ধারণা

দুনিয়ার যে কোন ধর্মীয় নেতার জীবনী আলোচনা করলে দেখা যায় যে, তাঁর উপরে সব চেয়ে বেশী জুলুম করেছে তাঁর ভক্ত অনুরক্তগণ। তারা তাঁর উপরে অসার কল্পনা ও কুসংস্কারের এতো মোটা আচরণ চড়িয়ে দিযেছে যে, তাঁর প্রকৃত আকার আকার আকৃতি ও অবয়স দৃষ্টিগোচর হওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। শুথু তাই নয় যে তাদের বিকৃত ও পরিবর্তিত গ্রন্থাবীল থেকে এ কথাও জানতে পারি না যে, তিনি স্বয়ং কি ছিলেন। তাঁর জন্ম, শৈশব, যৌবন এবং বার্থক্য সবই চরম বিস্ময়তায় আচ্ছন্ন। তাঁর জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজে বিস্ময় এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বিস্ময়াবিষ্ট। মোটকথা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটাই একটা কল্পিত কাহিনীই মনে হয়। তাঁকে এমন আকার আকৃতিতে উপস্থাপিত করা হয় যেন তিনি স্বয়ং খোদা ছিলেন অথবা খোদার পুত্র। অথবা খোদা তাঁর রূপ ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করেছেন। অথবা নিদেনপক্ষে তিনি খোদায়ীর গুণাবলীতে কিছু পরিমাণে শরীক ছিলেন।

বুদ্ধ

গৌতম বুদ্ধের কথাই ধরা যাক। বৌদ্ধধর্ম গভীরভাবে অধ্যয়ন করার পর এতোটুকু অনুমান করা যায় যে, এ স্থিরসংকল্প ব্যক্তি ব্রাহ্মণ্যবাদের বহু ত্রুটিবিত্যুটি সংশোধন করেছিলেন এবং বিশেষ করে ঐসব অগণিত সত্তার খোদায়ী খন্ডন করেন- যাদেরকে সে যুগের মানুষ তাদের খোদা বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর শতাব্দী কাল অতিবাহিত হতে না হতেই বৈশঅলী সম্মেলনে তাঁর অনুসারীগণ তাঁর সকল শিক্ষাদীক্ষা পরিবর্তন করে ফেলে এবং মূল সূত্রের স্থানে নতুন সূত্র প্রণয়ন করে মূল এবং শাখা প্রশাখায় আপন প্রবৃত্তি ও চিন্তাধারা অনুযায়ী যেমন খুশী তেমন পরিবর্তন পরিবর্ধন করে ফেলে। একদিকে তারা বুধ্ধের নামে নিজেদের ধর্মের এমন সব আকীদা বিশ্বাসে স্থিরাকৃত করলো যার মধ্যে খোদার কোন অস্তিত্বই স্বীকৃত ছিলনা এবং অপরদিকে বুদ্ধকে সর্ববোধী, বিশ্বনিয়ন্তা এবং এমন এক সত্ত্ নির্ণীত করে যে, সর্বযুগে দুনিয়অয় সংস্কারেরর জন্যে বুদ্ধের রূপ ধারণ করে আগমন করে থাকেন। তাঁর জন্ম, জীবন এবং বিগত ও ভবিষ্যৎ জন্ম সম্পর্কে এমন উদ্ভট কাহিনী রচনা করা হয়েছে যা পাঠ করার পর অধ্যাপক উলসনের মতো অনুসন্ধান বিশারদ পন্ডিত ব্যক্তি বিস্ময়ের সাথে মন্তব্য করেছেন যে, ইতিহাসে প্রকৃতপক্ষের বুদ্ধের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। তিন চার শতকের মধ্যে এ সব অলীক কাহিনী বুদ্ধকে খোদায়ীর রঙ্গে রঞ্জিত করেছে। কনিক্ষের রাজত্ববালে বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও নেতৃত্বের  এক সম্মেলন কাশমীরে অনুষ্ঠিত হয়। সেখঅনে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে প্রকৃত পক্ষে ভগবানের অধিভৌতিক বা দৈহিক বহিঃপ্রকাশ। অন্য কথায় ভগবান বুদ্ধের দেহে আত্মপ্রকাশ করেন।

রাম

এ ধরনের আচরণ রামচন্দ্রের সাথেও করা হয়। রামায়ন পাঠে একথা সুস্পষ্ট হয় যে রাজা রামচন্দ্র একজন মানুষ মাত্র ছিলেন। মহানুভবতা, সুবিচার, বীরত্ব, উদারতা, বিনয়, নম্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের গুণাবলীতে ভূষিত ছিলেন বটে। কিন্তু খোদায়ী বা ইশ্বরত্বের লেশমাত্র বিদ্যমান তার মধ্যে ছিলনা। কিন্তু মনুষত্ব ও এ ধরনের গুণাবলীর একত্র সমাবেশ এমন এক প্রহেলিকার রূপ ধারণ করে যে, ভারতবাসীর বিবেকবুদ্ধি তার সমাধানে ব্যর্থ হয়। অতএব রামচন্দ্রের মৃত্যুর কছিুকাল পর এ বিশ্বাস পোষণ করা হয় যে তার মধ্যে বিষ্ণু [হিন্দুদের বর্তমান ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী বিষ্ণু বিশ্বের প্রতিপালক ভগবান বা দেবতা বলে অভিহিত। সম্ভবত: এ ছিল মূলে আল্লাহ তায়ালার রবূবিয়াতের ধারণা যাকে পরবর্তীকালে একটি স্থায়ী ব্যক্তিত্ব হিসাবে গণ্য করা হয়। হিন্দুদের মধ্যে প্রতিমাপূজার সূচনা এভঅবে হয় যে আল্লাহ তায়ালার গুণাবীল প্রতিটিকে তার মূলসত্তা থেকে পৃথক করে এক একটি খোদা বা দেবতা বলে অভিহিত করা হয়।– গ্রন্থকার। ]রূপ পরিগ্রহ করেছেন। আর তিনি ঐসব সত্তার মধ্যে একজন যাদের আকৃতিতে বিষ্ণু মানব সংসারে সংস্কারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন।

কৃষ্ণ

এ ব্যাপারে উপরোক্ত দু’জনের দুলনায় শ্রীকৃষ্ণ অধিকতর মজলুম। ভগবত গীতা বার বার বিৃকত ও কাটাছেঁড়া বা অংগহানীর পর যে আকারে আমাদের কাছে পৌছেছে, তা গভীরভাবে অধ্যয়ন করার পর অন্ততঃ এতোটুকু জানা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ একজন একেশ্বরবাদী ছিলেন এবং তিনি এ কথাই প্রচার করতেন যে মহান স্রষ্টা এক সার্বভৌম ও সর্বশক্তিমান সত্তা। কিন্তু মহাভারত, বিষ্ণু পুরান, ভগবৎপুরান গ্রন্থাবলী এবং স্বয়ং গীতা তঁঅকে এভাবে উপস্থাপিত করে যে, একদিকে তাঁকে বিষ্ণুর দৈহিক প্রকাশ, সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা বলে মনে হয় এবং অপর দিকে এমন সব দুর্বলতা তাঁর প্রতি আরোপিত হয় যে, খোদা ত দূরের কথা একজন পূত চরিত্র মানুষ বলে স্বীকার করাও সুকঠিন হয়ে পড়ে। গীতার শ্রীকৃষ্ণের নিম্নোক্ত বাণীসমূহ পাওয়া যায়:-

আমিই এ জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা। যা কিছু জ্ঞেয় এবং পবিত্র বস্তু তা আমি। আমি ব্রহ্মবাচক, ওংকার, আমিই ঋক, সামু ও খজুর্বেদ। আমিই প্রাণীর পরাগতি ও পরিচালক। আমি প্রভু, সকল প্রাণীর নিবা, তাদের শুভাশুভের দ্রষ্টা। আমিই রক্ষক এবং হিতকারী। আমিই স্রষ্টা এবং সংহর্তা। আমিই আধার প্রলয়স্থান। আমিই জগতের অবিনাশী কারণ। (সূর্যরূপে) আমিই তাপ বিকিরণ করি এবং কল আকর্ষণ বর্ষণ করি। আমি (দেবগণের) অমৃত ও (মর্তগণের) মৃত্যু। আম িঅবিনাশী আত্মা। আমিই নশ্বর জগত। গীতা-৯: ১৭-১৯ দ্রঃ)।

ব্রহ্মাদি দেবগণ এবং ভৃণ্ড প্রভৃতি মহর্ষিগণ কেউ আমার উৎপত্তির তত্ত্ব জানেনা। কেননা আমি সর্বপ্রকারের দেবগণ ও মহর্ষিগণের আদি কারণ। যিনি আমাকে আদিহীন, জন্মহীন এবং সর্বলোকের মহেশ্বর বলে জানেন। মনুষ্য মধ্যে তিনিই মোহশূন্য হয়ে সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হন। (গীতা, ১০: ২-৩)

হে জিতেন্দ্রিয় অর্জূন। আমিই সব প্রাণীর হৃদয়ে অবস্থিত তৈন্যময় আত্মা এবং প্রাণীগণেল উৎপত্তি, স্থিতি এবং সংহার স্বরূপ, দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে আমি বিষ্ণু নামক আদিত্য। জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে আমি উজ্জ্বল সূর্য। উপঞ্চাশ বায়ুর মধ্যে আমি মরীচি এবং আমি নক্ষত্রগণের মধ্যে চন্দ্র। (গীতা, ১০: ২০-২১)

আমি নাগগণের মধ্যে নাগরাজ। অনন্ত জলচরগণের মধ্যে রাজা বরুন—আমি এই সমগ্র বিশ্ব মাত্র একাংশের ধারণ করে আছি। (গীতা, ১০: ২৯-৪৪)

গীতার কৃষ্ট এসব বাণীর দ্বারা ভগবান হওয়ার দাবী করেছন। [গীতা যদি এ দাবী করতো যে সে খোদার কেতাব এবং শ্রীকৃষ্ণ তা উপস্থাপনকারী তাহলে উপরোক্ত বাণীগুলো খোদার বলে গণ্য হতো এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি খোদায়ী দাবী আরোপিত হতো না। কিন্তু মুশকিল এই যে, এ গ্রন্থ স্বয়ং নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশাবলীর সমষ্টি বলে পেশ করছে। সমগ্র গ্রন্থের কোথাও ঘূর্ণাক্ষরেও একথা বলা হয়নি যে তা খোদার বাণী বা অহী ও ইলহামের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের উপর নাযিল হয়েঝে।– গ্রন্থকার।] কিন্তু অপর দিকে ভগবৎপুরান এই শ্রীকৃষ্ণকে এমন রূপে উপস্থাপিত করছে যে, তিনি স্নানের সময় গোপীনীদের পরিধেয় বস্ত্র লুকিয়ে রাখছেন। তাদের যৌনউপভোগ করার জন্যে যতো গোপিনী তাতে দেহ ধারণ করছেন। রাজা পুরক্ষিত যখন শুকদেবকে জিজ্ঞেস করেন, “ভগবান ত অবতার রূরে এজন্যে আত্মপ্রকাশ করেন যে তিনি সত্য ধর্ম প্রচার করবেন। কিন্তু তিন কেমন ভগবান যে, ধর্মের সকল মূলনীতি লংঘন করে পরস্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করছেন?

এ অভিযোগ খন্ডন করার জন্যে ঋষিকে এ কৌশল অবলম্বন করতে হয় যে স্বয়ং দেবতাগণও কোন কোন ক্ষেত্রে পূণ্যপথ থেকে সরে পড়েন। কিন্তু তাঁদের পাপ তাঁদের ব্যক্তিসত্তার উপর কোন ছাপ রাখেনা যেমন ধারা আগুন সব কিছু জ্বালিয়ে দেয়া সত্ত্বেও তাকে অভিযুক্ত করা যায় না।

 কোন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি এ কথা স্বীকার করতে পারেননা যে, কোন উচ্চমানের ধর্মগুরুর জীবন এমন অপবিত্র হতে পারে। তিনি এমন ধারণাও করতে পারেননা যে, কোন সত্যিকার ধর্মীয় নেতা প্রকৃতপক্ষে নিজেকে মানুষ ও বিশ্বপ্রকৃতির প্রভু হিসাবে পেশ করে থাকতে পারেন। কিন্তু কুরআন ও বাইবেলের তুলনামূলক অধ্যায় থেকে এ বিষয়টি আমাদের নিকটে সুস্পষ্ট হয়ে পড়ছে যে, বিভিন্ন জাতি তাদের মানসিক ও নৈতিকহ অধঃপতন কালে কিভাবে দুনিয়ার পূণ্যপূত চরিত্র মনীষদের জীবন চরিতকে অতি জঘন্য করে চিত্রিত করেছে যাতে করে তারেদ নিজেদের দুর্বলতার জন্যে বৈধতার কারণ নির্ণয় করতে পারে এবং অপরদিকে তাঁদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কত অলীক কাহিনী রচনা করেছে। এ জন্যে আমরা মনে করি যে, এ ব্যক্তিত্বকে যেভাবে পেশ করা হয়েছে, তাঁর প্রকৃত শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব তার থেকে ভিনন ধররে হয়ে থাকবে।

হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম

যে সব মনীষীদের নবুয়ত সর্বজনবিদিত ও সর্বস্বীকৃত তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মজলুম সাইয়েদুনা ঈসা আলায়হিসসালাম। সকল মানুষের মতো হযরত ঈসাও একজন মানুষ ছিলেন মনুষ্যত্বের সকল বৈশিষ্টই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান লি যেমন অন্যান্য মানুষের মধ্যে হয়ে থাকে। পার্থক্য শুধু এতোটুকু যে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে হিকমত, নবুয়ত ও অলৌকিক শক্তি দান করে একটি অধঃপতিত জাতির সংস্কারের জন্যে আদেশ করেছিলেন। কিন্তু প্রথমে ত তার জাতি তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকা করলো এবং পুরো তিনটি বছরও তার ভাগ্যবান অস্তিত্ব তারা বরদাশ্‌ত করলোনা। এমন কি তাঁর যৌবন কালেই তাকে হত্যা করার সিদ্ধানত করলো। অতঃপর তাঁর তিরোধানের পর যখন তারা তাঁর মহত্ব স্বীকার করলো তখন আবার এতোটা সীমালংঘন করলো যে তাঁকে তারা খোদার পুত্র বরঞ্চ একেবারে খোদা বানিয়ে দিল। তারপর তাঁর প্রতি এ ধারণা বিশ্বাস আরোপ করলো যে, খোদা মসীহের আকৃতিতে এজন্যে আত্মপ্রকাশ করেন যে, তিনি ক্রুসবিদ্ধ হয়ে মানবের পাপরাশির কাফ্‌ফারা বা প্রায়শ্চিত্ত করে যানে। কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই পাপী এবং স্বয়ং নিজের আমল বা ক্রিয়াকর্মের দ্বারা ত্রাণলাভ করতে পারে না। মায়াযাল্লা! একজন সত্যবাদী নবী তাঁর পরওয়ারদেগারের প্রডতি এতোবড়ো মিথ্যা দোষারোপ কি করে করতে পারেন? কিন্তু তাঁর ভক্ত অনুরক্তগণ শ্রদ্ধার ভাবাবেগে তার উপর এ মিথ্যা দোষারোপ করে বসলো। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তাঁর শিক্ষাদীক্ষার মধ্যে এমন সব বিকৃতি ঘটালো যে আজ কুরআন ব্যতীত দুনিয়ায় কোন কেতাবে মসীহের প্রকৃত শিক্ষা এবং স্বয়ং তাঁর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে কোন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। বাইবেলের নি টেস্টামেন্টে চার ইঞ্জিল নামে যে কেতাবগুলো বিদ্যমান তা অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে যে সেসব ঈসার মধ্যে খোদার আত্মপ্রকাশ করার, খোদার পুত্র হওয়ার এবং একেবারে স্বয়ং খোদা হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা পরিপূর্ণ। কোথাও হযরত মরিয়মের প্রতি এ সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে- “তোমার সন্তান খোদা পুত্র বলে অভিহিত হবে” [লিউক (St. LUKE) ১: ২৫] কোথাও খোদার রূহ কবুতর আকারে ইউসুর উপর অবতরণ কর উচ্চস্বরে বলছে এ আমার প্রিয় পুত্র (মেথু St.Mathew: ১৬-১৭)। কোথাও মসীহ স্বয়ং বলছেন- “আমি খোদার পুত্র এবং তোমরা আমাকে সর্বশক্তিমানের ডান পাশে বসে থাকতে দেখবে (মাক্‌স্‌ ১৪: ৬২) শেষ বিচার দিবসে খোদার পরিবর্তে মসীহকে খোদার সিংহাসনে বসানো হচ্ছে এবং তিনি শাস্তি ও পুরস্কারের ফরমান জারী করছেন- (মেথু ১৫: ৩১-৪৬)। কোথাও মসীহের মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছে- ‘পিতা আমার মধ্যে এবং আমি পিতার মধ্যে- (জোন: ১: ৩৮)। কোথাও সে সত্যবকাদী মানবের মুখ থেকে এ ভুল কথাগুলো বের করা হচ্ছে- “আমি খোদার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছি- (জোন : ৮: ৪২) কোথাও খোদা এবং তাঁকে একাকার করে দেয়া হচ্ছে এবং তাঁর প্রতি এ উক্তি আরোপ করা হচ্ছে- “যে আমাকে দেখালো সে পিতাকে দেখলো- এবং পিতা আমার মধ্যে থেকে তাঁর কাজ করেন” (জোন: ১৪: ৯-১০)। কোথাও খোদার সব কিছু মসীহের উপর হস্তান্তর করা হচ্ছে- (জোন ৩: ৩৫) কোথাও খোদা তাঁর সকল দায়িত্ব মসীহের উপর অর্পণ করছেন- (জোন ৫: ২০-২২)।

এ সব বিভিন্ন জাতি তাদের ধর্মীয় গুরুত ও পথ প্রদর্শকদের উপরে যেসব মিথ্যা অপবাদ অভিযোগের জঞ্জাল আবর্জনা চাপিয়ে দিয়েছে, তার প্রকৃত কারণ সেই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যার উল্লেখ আমরা প্রথমেই করেছি। তারপর যে জিনিস এ অন্যায় অবিচাপরের সহায়ক হয়েছে তা হলো এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মনীষীরেদ পথনির্দেশনা ও শিক্ষাদীক্ষা তাঁদের তিরোধঅনের পর লিপিবদ্ধ করা হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে মনোযোগ দেয়া হলেও তা সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। এ জন্যে সামান্য কাল অতিবাহিত হওয়ার পর এর মধ্যে এতো পরিমাণে ভেজাল, বিকৃতি, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধন সংঘটিত হয়েছে যে, আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করা সকঠিন হয়ে পড়েছে। এ জন্যে কোন সুস্পষ্ট হেদায়াত ও পথনির্দেশনা বিদ্যমান না থাকার পরিণাম এই হয়েছে যে, যতোই সময়কাল অতিবাহিত হতে থাকে, প্রকৃত সত্যের উপর ততোই অলীক কল্পনা ও কুসংস্কারের জঞ্জাল বাড়তে থঅকে এবং কয়েক শতকের মধ্যে প্রকৃত সত্য বিলুপ্ত হ’য়ে যায়। শুধু মাত্র অলীক গল্প কাহিনীই রয়ে যায়।

সাইয়েদুনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

দুনিয়ার সকল পথপ্রদর্শকের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ‍শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মদ (স) যে, তাঁর শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব বিগত তের চৌদ্দ শতাব্দী যাবত একেবারে তার আসল রূপে সংরক্ষিত আছে। খোদার ফজলে এমন কিছু ব্যবস্থঅ হয়েছে যে এখন তার পরিবর্তন অসম্ভব। কুসংস্কার ও বিস্ময়কর বস্তু ও ঘটনার প্রতি মানুষের অনুরাগ আসক্তি থাকার করণে এটা অসম্ভব ছিল না যে, পূরণতার প্রতীক এ মহান মনোনীত ব্যক্তিত্বকেও তারা অলীক কাহিনীর বস্তু বানিয়ে খোদায়ীর কোন কোন গুণে গুণান্বিত করে ফেলতো এবং তঁকে অনুসরণ করার পরিবর্তে বিস্ময়তা ও পূজাঅর্চনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করতো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল নবী প্রেরণের শেষ পর্যায়ে এমন এক পথ প্রদর্শক পাঠাবর, যার সত্তা মানব জাতির জন্যে সকল কর্মকান্ডের চিরন্তন নমুনা এবং হেদায়াতের বিশ্বজনীন উৎস হয়ে থাকবে। এজন্যে তিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তাকে ওসব জুলুম অবিচার থেকে রক্ষা করেন, জাহেল ভক্ত অনুরক্তদের হাতে যেসব জুলুম অবিচার অন্যান্য নবী এবং বিভিন্ন জাতির পথ প্রদর্শকদের উপর করা হতে থাকে। প্রথমতঃ নবী মুহাম্মদের (স) সাহাবা ও তাবেঈন এবং পরবর্তীকালে মুহাদ্দিসগণ, পূর্ববর্তী উম্মতগণের বিপরীত, তাঁদের নবীর জীবনচরিত সংরক্ষণ করায় নিজেরাই অসাধারণ ব্যবস্থপনা করেন যার ফলে আমরা তাঁর ব্যক্তিত্বকে চৌদ্দশ’ বছর অতীত হওয়ার পরও আজ প্রায় তেমন নিক থেকে দেখতে পারি যেমন নিক থেকে তাঁর যুগের মানুষ দেখতে পেতো। কিন্তু যদি বই পুস্তকের এ বিপুল ভান্ডার দুনিয়া থেকে নিাশ্চিহ্ন হয়ে যায়, যা ইসলামী নেতৃত্ববৃন্দ হবু বছরের শ্রমসাধনায় সংগৃহীত করেছেন হাদীস ও জীবনচরিতের একটি পৃষ্ঠাও যদি দুনিয়ার বুকে বিদ্যমান না থাকে যার থেকে নবী মুহাম্মদ (স) এর জীবনের কিছু অবগত হওয়া যেতো এবং শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব (কুরআন) রয়ে যায়। তথাপি আমরা এ মহাগ্রন্থ ঐসব বুনিয়াদী প্রশ্নের জবাব পেয়ে যেতে পারতাম, যা তার বাহ্যিক সম্পর্কে একজন ছাত্রের মনে উদয় হতো।

আসুন আমরা দেখি কুরআন তার বাহককে কোন রঙে রঞ্জিত করে পেশ করছে।

রসূলের মানুষ হওয়া

কুরআন মজিদ রেসালাত সম্পর্কে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি একেবারে সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছে তা হচ্ছে এই যে, রসূল মানুষই ছিলেন। কুরআন নাযিলের পূর্বে শত শত বছরের ধারণা বিশ্বাস এ স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে যে, মানুষ কখনো আল্লাহর রসূল ও প্রতিনিধি হতে পারে না। দুনিয়ার সংস্কারে সংশোধনের জন্যে কখনো প্রয়োজন হলে খোদা স্বয়ং মানুষের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে থাকেন। অথবা কোন ফেরেশতা কিংবা দেবতাকে প্রেরণ করেন। মোটকথা যতো মনীষী দুনিয়ার সংস্কারেরর জন্যে আগমন করেছেন তারা সকলেই অতি মানব ছিলেন। এ ধারণা বিশ্বাস মানুষের মনে এতোটা বদ্ধমূল হয়ে ছিল যে, তখন আল্লাহর কোন নেক বান্দাহ মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিতে আগমন করতেন, তখন সর্বপ্রথম মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে বলতো- “এ কেমন নবী যে আমাদেরই মতো পানাহার করে, ঘুমায় ও চলোফেরা করে? এ কেমন পয়গম্বর যে আমাদের মতো যাবতীয় দোষত্রুটি ও দুর্বলতার শিকার হয় অর্থাৎ রোগাক্রান্ত হয়, দুঃখ কষ্ট ও সুখশান্তি উপভোগ করে। আমাদের হেদায়াতেই যদি আল্লাহর ইচ্ছ হতো, তাহলে তিনি আমাদের মতন একজন দুর্বল মানুষ কেন পাঠাতেন? খোদা কি স্বয়ং আসতে পারতেন না? প্রত্যেক নবীর আগমনের পর এসব প্রশ্ন করা হতো এবং এসবকে বাহানা বানিয়ে মানষ নবীগণকে অস্বীকার করতো। হযরত নূহ (আ) যখন তাঁর জাতির কাছে আল্লহর বাণী নিয়ে এলেন তখন তারা বলল।

(আরবী******************)

-এ ব্যক্তি তোমাদের মতো একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছু নয়। সে তোমাদের উপর মর্যাদা লাভ করতে চায়। অথচ খোদা যদি চাইতেন ত ফেরেশতাদেরকে পাঠাতেন। এ উদ্ভট কথা তো আমরা আমাদের বাপদাদার মুখে কখনো শুনিনি(যে পয়গম্বর কখনো মানুষ হয়) –(মুমেনূন: ২৪)

যখন হযরত হুদ (আ) কে তাঁর জাতির হেদায়াতের জন্যে পাঠানো হলো, ত তাঁর বিরুদ্ধেও সর্বপ্রথম এ অভিযোগ করা হলো:

(আরবী******************)

-এ ব্যক্তি তোমাদেরই মতো ইকজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। তোমরা যা খাও, সে তাই খায়। তোমরা যা পান কর, সেও তাই পান করে। তোমরা যদি তোমাদেরই মতন একজহন মানুষের আনুগত্য কর তাহলে ভয়ানক ক্ষতির সম্মুখীন হবে (মুমেনুন: ৩৩-৩৪)।

হযরত মূসা (আ) এবং হযরত হারুন (আ) ফেরাউনের নিকটে সত্যের বাণীসহ পৌছেন, তখ তাঁদের কথা এ কারণেই মেনে তে অস্বীকার করা হয় যে, তাঁরা উভয়ে মানুষ ছিলেন: (আরবী******************)

আমরা কি আমাদেরিই মতো দু’জন মানুষের উপর ঈমান আনব? (মুমেনুন: ৪৭)

ঠিক এমনি ধরনের প্রশ্ন সেসময়েও উত্থাপন করা হয়েছিল যখন মক্কার একজন নিরক্ষর মানুষ চল্লিষ বছর যাবত নীরব জীবন যাপন করার পর হঠাৎ ঘোষণা করলেন- “খোদার পক্ষ থেকে আমাকে রসূল নিয়োগ করে পাঠানো হয়েছে।”

মানুষ এটা বুঝতেই পারলো না যে তাদের মত হাত-পা, চোখ, নাক, দেহ ও প্রাণ বিশিষ্ট একজন মানুষ কি করে আল্লাহর রাসূল হতে পারে? তারা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করতো-

(আরবী****************)

-এ আবার কেমর রসূল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফের করে? তার সাথে একজন ফেরেশতা নেমে এলো না কেন যে তার সাথে থেকে মানুষকে সতর্ক করে দিত? অথবা-নিদেনপক্ষে তার জন্যে কোন রত্নভান্ডার নামিয়ে দেয়া হতো অথবা তার সাথে কোন ফলের বাগান থাকতো যার থেকে সে খেতে পারতো- (ফুরকান: ৭-৮)।

যেহেতু ভ্রান্তধারণাই রেসালাত মেনে নেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক ছিল, সেজন্যে কুরআন মজিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার খন্ডন করা হয়েছে। অতঃপর যুক্তিসহ বলা হয়েছে যে, মানুষের প্রথপ্রদর্শনের- মানুষ সবচেয়ে বেশী উপযোগী হতে পারে। কারণ নবী পাঠানোর উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষাদানই নয়, বরঞ্চ স্বয়ং কাজ করে দেখানো এবং আনুগত্য অনুসরণের একটা দৃষ্টান্তও পেশ করা। এ উদ্দেশ্যে যদি কোন ফেরেশতা অথবা কোন অতি মানবীয় সত্তাকে পাঠানো হয়, যার মধ্যে মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও দুর্বলতা নেই- তাহলে মানুষ একথা বলতে পারে, “আমরা তার মতো কি করে আমল করব, কারণ আমাদের মতো তার ‍ত প্রবৃত্তি এবং প্রবৃত্তির বাসনা নেই এবং যে সব শক্তি মানুষকে পাপকাজে উদ্বুদ্ধ করে সেসব ত তার স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে নেই?।

(আরবী*****************)

-যদি পৃথিবীতে ফেরেশতারা নিশ্চিন্তে (স্বাভাবিক ভাবে) চলাফেরা করতে পারতো, তাহলে আমরাও তাদের (পৃথিবীবাসীদের) উপর আসমানের কোন ফেরেশতাকে রসূল করে নাযিল করতাম- (বনীইসরাঈল-৯৫)।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেন যে, ইতিপূর্বে যতো নবী ও সত্যপথ প্রদর্শক বিভিন্ন জাতির মধ্যে আগমন করেন, তাঁরা ঠিক তেমনিই মানুষ ছিলেন। যেমন মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (স) মানুষ। মানুষ যেমন পানাহার ও চলাফেরা করে তাঁরাও তেমনি পানাহর এবং চলাফেরা করতেন। (আরবী***********************)

-তোমার পূর্বে আরা যেসব রসূল পাঠিয়েছিলাম তারাও মানুষই ছিল যাদের উপর আমরা অহী নাযিল করতাম। তোমরা না জানলে জ্ঞানীরেদকে জিজ্ঞেস করে দেখ। আমরা ওসন নবীকে এমন দেহ দান করিনি যে, তারা আহার করতো না, আর না তারা অমর ছিল- (আম্বিয়া -৭-৮)।

(আরবী******************)

-এবং আমরা তোমার পূর্বে যতো নবী পাঠিয়েছি তারা সকলে আহার করতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো- (ফুরকান-২০)।

(আরবী*****************)

-এবং তোমার পূর্বে আমরা বহু রসূল পাঠিয়েছিলাম এবং তাদের জন্য বিবিও পয়দা করেছিলাম এবং সন্তানসন্ততিও দিয়েছিলাম- (রা’দ: ৩৮)।

অতঃপর নবী মুহাম্মদ (স) কে আদেশ করা হলো, “তুমি তোমার মানুষ হওয়ার কথা স্পষ্ট ঘোষণা করে দাও যাতে করে তোমার পরে লোকে তোমাকেও তেমনিভাবে খোদায়ীর গুণে গুণান্বিত না কর, যেমনভাবে তোমার পূর্ববর্তী নবীদের করা হয়েছে।

কুরআনের বিভিন্নস্থানে এ আয়াত এসেছে:

 (আরবী******************)

-হে নবী! বলে দাও- আমি তোমাদের মতো নিছক একজন মানুষ। আমার উপর অহী নাযিল করা হয় যে, তোমাদের খোদা ত একজনই- (কাহাফ: ১১১, হামীম সাজদা: ৬)।

এসব বিশদ বিবরণ থেকে শুধু নবী মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণা বিশ্বাসের দ্বারই রুদ্ধ করা হয়নি, বরঞ্চ পূর্ববর্তী সকল নবী ও ইসলামী মনীষীর ব্যক্তিত্ব সমূহকে ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুস্ত করা হয়।

রসূলের শক্তি ও অসাধারণ ক্ষমতা

অন্য যে বিষয়টি কুরআনে সুস্পষ্ট করে বয়ান করা হয়েছে তা হলো নবীর শক্তি ও অসাধারণ ক্ষমতার বিষয়টি। অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার বশবর্তী হয়ে মানুষ যখন কোন খোদার প্রেরিত মহাপুরুষকে খোদার সমার্থ বানিয়ে দিল, তখন স্বভাবতঃ এ ধারণা বিশ্বাসও সৃষ্টি হলো যে, খোদাপ্রেরিত লোক অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হয়। খোদার কর্মক্ষেত্রে তারা বিশেষ অধিকার লাভ করে থাকে। পুরস্কার ও শাস্তিদানের অধিকার তাদের থাকে। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কিছুই তাদের কাছে সুস্পষ্ট। ভাগ্যের ফয়সালা তাদের মর্জি ও রায় অনুযায়ী রদবদল করা হয়। লাভ ও ক্ষতির উপরেও তাদের ক্ষমতা থাকে। ভালো মন্দেরও তারা মালিক। সৃষ্টজগতের সকল শক্তি তাদের অধীন। তারা একনজরে লোকের মন পরিবর্তন করে দিয়ে তাদের আঁধার ও পথ ভ্রষ্টতা দূর করে দিতে পারে।  এ সব ধারণার বশবর্তী হয়েই লোক রসূলুল্লাহ (স) এর কাছে আজব ধরনের ও উদ্ভট দাবী করতো। কুরআন বলে

(আরবী**************)

-এবং তারা বল্লো: আমর ত কিছুতেই তোমার উপর ঈমান আনবনা যতোক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমাদের জন্যে জমীনে একটা ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছ, অথবা তোমার জন্যে একটি খুরমা ও আঙ্গুরের বাগান তৈরী হয়েছে এবং তার মধ্যে তুমি স্রোতস্বিনী প্রবাহিত করে দিয়েছ। অথবা তোমার দাবী অনুযায়ী আকাশকে খন্ড বিখন্ড করে আমাদের উপর নিক্ষেপ কর। অথবা আললাহ এবং ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করাও। অথবা তোমার জন্যে একটি সোনার বাড়ি তৈরী হয়ে যায়। অথবা তুমি আকাশে চড়ে যাও এবং আকাশে চড়লেই তোমার উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করবনা যতোক্ষণ না তুমি আমাদের এমন এক গ্রন্থ অবতরণ না করেছ যা পড়তে পারি।

হে মুহাম্মদ! তুমি তাদেরকে বলে দাও, আমার রব সকল ত্রুটিচিত্যুতি থেকে পাক ও পবিত্র। ইম কি মানুষ পয়গম্বর ব্যতীত অন্য কিছু? –(বনী ইসরাইল: ৯০-৯৩)।

খোদার প্রেরিত মহাপুরুষ ও মনীষীবৃন্দের সম্পর্কে এ ধরনের যতো প্রকার ভ্রান্ত ধারণা লোকের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, আল্লাহ তায়ালা তা সবই খন্ডন করেন এবং পরিষ্কর বলেন যে, খোদায়ী শক্তি ও খোদায়ী কাজকর্মে রসূলের তিল পরিমান অংশও নেই। বরঞ্চ একথাও বলা হয় খোদায়ী শক্তি ও খোদায়ী কাজকর্মে রসূলের তিল পরিমাণ অংশও নেই। বরঞ্চ একথাও বলা হয়: আমাদের অনুমতি ব্যতী নবী অন্যকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা ত দূরের কথা, স্বয়ং নিজের থেকে ক্ষতি দূর করারও শক্তি রাখে না।

(আরবী*****************)

-(হে নবী) খোদা যদি তোমার কোন ক্ষতি করেন, তাহলে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই যে এ ক্ষতি দূর করতে পারে। আর তিনি যদি তোমার কোন সংগল করতে চান ত তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান (আনআম: ১৭)

(আরবকী*******************)

-(হে নবী) বলে দাও, আমি ত আমার নিজেরও কোন লাভ ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখি না। অবশ্যি আল্লাহ চাইলে সে অন্য কথা- (ইউনুস: ৪৯)।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একথাও বলা হয়েছে যে, নবীর কাছে আল্লাহর ভান্ডারের কোন চাবি নেই, নবী ভবিষ্যতের জ্ঞানও রাখেন না এবং না কোন অস্বাভাবিক ক্ষমতার অধিকারী।

(আরবী***********)

আমি ফেরেশতা (অর্থাৎ মানবীয় দুর্বলতার উর্ধে)। আমি ত শুধুমাত্র তাই মেনে চলি যা আমার উপর অহী করা হয় (অর্থাৎ অহীর মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়)। (আনয়াম: ৫০)।

(আরবী*****************)

-যদি আমি অদৃশ্য বা ভবিষ্যতের জ্ঞান রাখতাম, তাহলে আমার নিজের জন্যে বহু সুযোগ সুবিধা লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করতে পারতো না। আমি ত নিছক একজন সতর্ককারী এবং তার জন্যে সুসংবাদদাতা যে, আমার কথা মেনে নেবে। (আরাফ : ১৮৮)।

আরও বলা হয়, আখেরাতের হিসাব নিকাশ এবং শাস্তি ও পুরুস্কারের ব্যাপারে নবীর কোন হাত নেই। তার কাজ শুধু বাণী পৌছিয়ে দেয়া এবং সোজা পথ দেখিয়ে দেয়া। আখেরাতের হিসাব নিকাশ নেয়া এবং শাস্তি অথবা পুরস্কার দেয়া খোদার কাজ।

(আরবী**************)

-(হে মুহাম্মদ) তাদেরকে বলে দাও: আমি আমার রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণসহ এসেছি এবং তোমরা তা মিথ্যা মনে করে অস্বীকার করেছ। এখন এটা আমার এখতিয়ার নেই যে, শাস্তি তোমরা ত্বরান্বিত করতে বলছো তা আমি স্বয়ং তোমাদের উপর নাযিল করব। ফয়সালা একেবারে আল্লাহর হাতে। তিনি প্রকৃত অবস্থা বয়ান করেন এবং তিনি উৎকৃষ্ট ফয়সালা করেন।

এদেরকে বলে দাও, সে শাস্তি যদি আমার এখতিয়ারে থাকতো যার জন্যে তোমরা এতো ব্যস্তমস্ত হয়ে পড়েছ, তাহলে তোমাদের ও আমার মধ্যে কবে ফয়সালা হয়ে যেতো। কিন্তু জালেমদের ব্যাপারে চূড়ান্ত করতে আল্লাহই ভালো জানেন- (আনয়াম: ৫৭-৫৮)। (আরবী**************)

(হে নবী) তোমার কাজ ত শুধু পয়গাম পৌছিয়ে দেয়া। আর হিসাব নেয়ার কাজটা আমার। (রা’দ: ৪০)।

(আরবী**************)

(হে নবী) আমরা লোকের হেদায়অতের জন্যে তোমার উপর সত্যসহ এ কিতাব নাযিল করেছি। এখন যে হেদায়েত কবুল করে, সে তার নিজের জন্যেই ভালো করে। আর যে গোমরাহীতে লিপ্ত হয়, সে নিজেরই জন্যে অন্যায়-অমংগল করে। আর তুমি তাদের উপর কোন হাবিলদার নও। (যুমার: ৪১)।

আরও বলা হয়েছে যে, মানুষের মন পরিবর্তন করে দেয়া এবং যাদের মনে হক গ্রহণ করার আগ্রহ নেই তাদের মধ্যে ঈমান পয়দা করা নবীর সাধ্যে নেই। সে পথপ্রদর্শক এ অর্থে যে, নসিহত করার যে হক, তা সে পুরোপুরি আদায় করে এবং যে পথ দেখতে চায় তাকে সে পথ দেখা।

(আরবী**************)

-তুমি মৃতকে শুনাতে পারনা, আর না বোবার কাছে আওয়াজ পৌঁছাতে পার যখন সে মুখ ফির চলে যায়। আর না তুমি অন্ধকে গোমরাহী থেকে বের করে সোজা পথে এনে দিতে পার। তুমি ত শুধু  তাদেরকেই শুনাতে পার যারা আমাদের নির্দেশনাবলীর উপর ঈমান আনে। অতঃপর আনুগত্যের মস্তক অবনত করে- (নমল: ৮০-৮১)।

(আরবী**************)

-তুমি কবরে মৃত ব্যক্তিদেরকে শুনাতে পার না। তুমি শুধু সতর্ক করে দিতে পার। আমরা তোমাকে সত্যসহ সুসংবাদ দানকারী এবং সতর্ককারী করে পাঠিয়েছি।[কুরআনের এক স্থানে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে-

(আরবী**************)

হে নবী! তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়েত করতে পারনা। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান হেদায়েত করতে পারেন। তিনি তাদেরকে ভালো করে জানেন যারা হেদায়েত কবুলকার।

সহীহ বুখারী-মুসলিমে বর্ণীত আছে যে, এ আয়াত নবী (স) এর চাচা আবু তালেব সম্পর্কে নাযিল হয়। তাঁর যখন অন্তিম অবস্থা এলো তখন নবী (স) চরম চেষ্টা করলেন যাতে  তিনি (চাচা) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা পড়েন এবং তাঁর খাতেমা বিল খায়ের হয় অর্থাৎ ঈমানের সাথে মৃত্যু হয়। কিন্তু তিনি (আবু তালেব) আবদুল মুত্তালিবের ধর্মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাকেই প্রাধান্য দিলেন। এজন্যে আল্লাহ বলেন, তুমি যাকে ভালোবাস তাকে হেদায়েত করতে পারনা।

কিন্তু মুহাদ্দেসীন ও তাফসীরকারগণের এ পদ্ধতি সুবিদিত যে, একটি আয়াত নবীযুগের যে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট, সে আয়াতকে শানে নুযূল হিসাবে বর্ণনা করেন। এজন্যৌ এ রওয়ায়েত এবং এ বিষয় সংক্রান্ত অন্যান্য রেওয়ায়েত- যা তিরমিযী, মুসনাদে আহম প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থগলেতে হযরত আবু হুরায়রা (রা), ইবনে আব্বাস (রা), ইবনে ওমর (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণীত- থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছা যায় না যে, সূরা কাসাসের এ আয়াত আবু তালেবের মৃত্যুর সময় নাযিল হয়েছিল। কিন্তু এর থেকে শুধু এতোটুকু জানা যায় যে, এ আয়অতের সত্যতা সবচেয়ে অধিক এ ঘটনার সমফ প্রকাশ পায়। যদিও নবী পাকের (স) আনতিরক বাসনা ছিল প্রত্যেক আল্লাহর বান্দাহকে সত্য পথে নিয়ে আসা। কিন্তু কোন ব্যডিক্তর কুফরের উপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাটা নবী (স) এর কাছে সবচেয়ে কষ্টকর হয়ে থাকলে এবং ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও সম্পর্কে ভিত্তিতে কোন বক্তির হেদায়েতের জন্যে সবচেয়ে বেশী অভিলাষী হয়ে থাকলে- সে ব্যক্তি ছিলেন আবু তালেব। কিন্তু তাঁকেও হেদায়েতের পথে আনতে নবী (স) সক্ষম হলেন না বলে একথা সুস্পষ্ট হলো যে, কোন ব্যক্তিকে হেদায়েত করা এবং কাউকে হেদায়েতে থেকে বঞ্চিত রাখা নবীর সাধ্যের অতীত। এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সম্পদ হেদায়েতের সম্পদ) কোন আত্মীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নয় বরঞ্চ মানুষের গ্রহণযোগীতা এবং আন্তরিকতা পূল্ণ সত্য-প্রিয়তার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়ে থাকে।] (ফাতের: ২২-২৪)।

এ কথাও সুস্পষ্ট করে বলে দেয় যে, নবীর যা কিছু সম্মান ও মর্যাদা, তা এ জন্যে যে, তিনি আল্লাহর আনুগত্য করেন, ঠিকমতো তাঁর আদেশ মেনে চলেন, এবং যেসব কথা তাঁর উপর নাযিল করা হয়, তা অবিকল আল্লাহ বান্দাহদের কাছে পৌঁছিয়ে দেন। নতুবা তিনি যদি আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন এবং আল্লাহর কালামের মথ্যে নিজের কল্পিত কোন কথা সংমিশ্রণ করতেন, তাহলে তাঁর কোন স্বাতন্ত্র্য-বৈশিষ্ট্যই অবশিষটট থাকতো না, এমনকি খোদার পাকড়াও থেকে বাঁচতেন না।

(আরবী**************)

এবং (হে নবী) তোমার নিকটে যে জ্ঞান এসেছে তা সত্ত্বেও তুমি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর, তাহলে এমতাবস্থায় তুমি জালিম হয়ে পড়বে। (বাকারা: ১৪৫)।

(আরবী**************)

-(হে নবী) তোমার নিকেট জ্ঞান আসার পর তুমি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর, তাহলে আল্লহর শাস্তি থেকে বাঁচাবার জন্যে তোমার কোন অলী ও সাহায্যকারী থাকবে না। (বাকারা: ১২০)।

(আরবী**************)

-(হে মুহাম্মদ) বলে দাও, আমার পক্ষ থেকে এ কালামের মধ্যে কিছু রদবদল করার এখতিয়ার আমার নেই। আমি ত শুধু তাই অনুসরণ করে চলি যা আমার উপর অহীর দ্বারা নির্দেশ করা হয়। আমি আমার রবের নাফলমানী করি তাহলে এক ভয়ানক দিনের শাস্তির আমি ভয় করি-(ইউনুস: ১৫)।

এসব কথা এজন্যে বলা হয়নি যে, মায়াযাল্লাহ, রাসূলে আকরাম (র) এর পক্ষ থেকে নাফরমানী অথবা রদবদলের সামান্যতম কোন আশংকাওছিল। প্রকৃত পক্ষে তার উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়ার সামনে এ সত্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা যে, নবী পাকের (স) এর পক্ষ থেকে নাফরমানী অথবা রদবদলের সামান্যতম কোন আশংকাও ছিল। প্রকৃত পক্ষে এর উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়ার সামনে এ সত্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা যে, নবী পাকের (স) আল্লাহ রব্বুল ইয্যাতের দুরবারে যে নৈকট্য লাভ হয়েছে তা এজন্যে নয় যে, নবীর সত্তার সাথে আল্লাহর কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, বরঞ্চ নৈকট্য লাভের কারণ এই যে, তিনি আল্লাহর চরম ও পরম অনুগত এবং আন্তরিকসতহ তাঁর দাস।

নবী মুহাম্মদ (স) নবীগণেল মধ্যে একজন

তৃতীয় যে বিষয়টি বার বার কুরআন মজিদে বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা এই যে, মুহাম্মদ (স) কোন নতুন নবী নন। বরঞ্চ নবীগনের মধ্যে একজন এবং নবুয়তের ধারাবাহিকতার সংযোজক একটি অংশ বা আংটা যা সৃষ্টির সূচনা থেকে তাঁর আগমন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যার মধ্যে প্রত্যেক জাতি ও যুগের নবী-রসূলগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কুরআন হাকীম নবুয়ত  ও রেসালাতকে কোন এক ব্যক্তি, দেশ অথবা জাতির  মধ্যে সীমিত বা নির্দিষ্ট করে না। বরঞ্চ সুস্পষ্ট করে একথা ঘোষণা করে যে, আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক জাতি, দেশ ও যুগে এ ধরনের পূতপবিত্র ব্যক্তি পয়দা করেছেন যারা মানব জাতিকে সিরাতে মুস্তাকীমের দিকে দাওয়াত দিযেছেন এবং পথভ্রষ্টতার ভয়াবহ পরিণাম থেকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

(আরবী**************)

-এমন কোন জাতি ছিলনা যার মধ্যে কোন সতর্ককারীর আগমন হয়নি। (ফাতের: ২৪)

(আরবী**************)

-এবং আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন নবী রসূল পাঠিয়েছি (এ বাণীসহ) যে, আল্লাহর দাসত্ব আনুগত্য কর এবং তাগুতের দাসত্ব আনুগত্য থেকে বিরত থাক। (নহল : ৩৬)।

এসব নবী ও সতর্ককারীদের মধ্যে একজন ছিলেন নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বহু স্থানে একথা বলা হয়েছে- (আরবী**************)

-পূর্ববর্তী সতর্ককারীগণের মধ্যে আমি একজন সতর্ককারী (নজম : ৫৬)।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ! তুমি রসূলগণের মধ্যে একজন (ইয়অসীন: ৩)। (আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ, বলে দাও: আমি কোন অভিনব রসূল নই। আমি জানিনা আমর সাথে কি আচরণ করা হবে এবং তোমাদের সাথেইবা কি আচরণ করা হবে। আমি ত সেই জিনিসের অনুসরণ করি যা আমাকে অহীর মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়। আমি ত একজন সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ককারী (আহকাফ: ৯)।

(আরবী**************)

-মুহাম্মদ রসূল ব্যতীত কিছু নয় এবং তাঁর পূর্বেও অনেক রসূল অতিবাহিত হয়েছে- (আলে ইমরান : ১৪৪)।

শুধু এতোটুকুই নয়, বরঞ্চ একথাও বলা হয়েছে যে, রসূলে আরবীর দাওয়াত তাই ছিল যার দিকে মানব জাতির জন্ম-সূচনা থেকে সত্যের আহ্বানকারী প্রত্যেক নবী আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। নবী মুহাম্মদ (স) সেই স্বভাব ধর্মের প্রতিই মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন, যার আহ্বান প্রত্যেক নবী রসূল জানিয়েছেন।

(আরবী**************)

-বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপরে এবং সেই শিক্ষার উপরেয যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে। ঐসবরে উপরেও যা ইবরাহীম (আ), ইসমাইল (আ), ইসহাক (আ), ইয়াকুব (আ) এবং তাঁদের সন্তানগণের উপর নাযিল হয়েছে এবং যা কিছু দেয়া হয়েছিল মূসা (আ), ঈসা (আ) এবং অন্যান্য নবগীনকে তাদের রবের পক্ষ থেকে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ণয় করিনা এবং আমরা আল্লাহর অনুগত। অতএব তোমরা যেমন ঈমান এনেছ, তেমনি এ সব লোকও যদি ঈমান আনে, তাহলে তাঁরা সোজা-সরল পথের উপরই হবে। (বাকারা : ১৩৬-১৩৭)

কুরআনের এ বিশ্লেষণ এ সত্য সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ রাখে না যে, নবী মুহাম্মদ (স) কোন নতুন ধর্ম বা দ্বীনসহ আগমন করেননি। অথবা পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে কাউকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যে অথবা কারো আনীত পয়গামন খন্ডন  করার জন্যেও তিনি আসেননি। বরঞ্চ তাঁকে এজন্যে পাঠানো হয়েছিলো যে, যে সত্য দ্বীন প্রথম থেকেই সকল জাতির নবীগণ পেশ করে এসেছেন, এবং যাকে পরবর্তীকালে লোকে্রা ‍বিকৃত করেছে, সে দ্বীনকে সকল ভেজালমুক্ত করে তিনি পেশ করবেন।

নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য

এভাবে কুরআন মজীদ তার বাহকের সঠিক পরিচয় ও মর্যাদা বয়ান করার পর সেসব কর্মচান্ডের বর্ণনা দিচ্ছে, যার জন্য তাঁকে পাঠানো হযেছিল। এ কাজ সামগ্রিকভাবে ‍দুটি বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত। একটি শিক্ষা বিভাগ, অপরটি কর্ম বিভাগ।

নবীর শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যাবলী

এ বিভাগরে কাজ নিম্নরূপ:-

(১) আয়াত তেলাওয়াত, তাযকিয়ায়ে নফস এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষাদান।

(আরবী**************)

প্রকৃতপক্ষে ঈমান আনয়নকারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট করুণা এই যে, তিনি তাদের জন্যে স্বয়ং তাদের মধ্য থেকে এমন এক রসূলের আবির্ভাব করেছেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত শুনায়, তাদের আত্মশুদ্ধি করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। নতুবা তারা ত এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত ছিল- (আলে ইমরান: ১৬৪)।

তেলাওয়াতের আয়াত বা আয়াত পড়ে শুনানোর অর্থ আল্লাহর নির্দেশাবলী অবিকল শুনিয়ে দেয়া। তাযকিয়ার অর্থ লোকের চরিত্র ও তাদের জীবনকে মন্দ গুণাবলী, রীতিনীতি ও ক্রিয়াপদ্ধতি থেকে পরিশুদ্ধ করা  এবং তাদের মধ্যে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী, আচার আচরণ এবং সঠিক ক্রিয়াপদ্ধতির বিকাশ সাধনা করা। কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর মহান গ্রন্থের সঠিক মর্ম বুঝিয়ে দেয়া, তাদের মধ্যে এমন দূরদৃষ্টি করা যাতে করে তারা আল্লাহর কিতাবের প্রকৃত গূঢ় রহস্য উপলব্ধি করতে পারে। অতঃপর তাদেরকে সে হিকমত বা বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দেয়া, যার ফলে তারা গোটা জীবনের সুদূর প্রসারিত বিভিন্ন দিকগুলোকে আল্লাহর বিতাক অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে পারে।

(২) দ্বীনের পরিপূর্ণতা

(আরবী**************)

-আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সমাপ্ত করে দিলাম। আর তোমাদের জন্যে ইসলামের বিধিবিধানকে পছন্দ করলাম। (মায়েদা: ৩)।

অন্য কথায় কুরআন প্রেরণকারী তার বাহকের কাছে শুধুমাত্র তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শুনানো, লোকের আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়া) করা এবং কিতাব ও হিকমত  শিক্ষা দেয়ার খেধমতটুকুই গ্রহণ করেননি, বরঞ্চ তাঁর সে নেক বান্দাহদের মাধ্যমে এ কাজগুলোকে পূর্ণত্বদান করেছেন। যেসব আয়াত ও কথা মানব জাতির কাছে পৌছাবার ছিল তা তাঁর (নবীর) মাধ্যমে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। যে সব অনাচার অমংগল থেকে মানব জীবনকে পরিশুদ্ধ করা উদ্দেশ্য ছিল সে সব তাঁর হাতে নির্মূল করেছেন। যে সব গুণবৈশিষ্ট্যের বিকাশ যে মর্যাদাসহ মানুষ ও সমাজের মধ্যে হওয়া উচিত ছিল, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নবীর নেতৃত্বে পেশ করেছেন। উপরন্তু কিতাব ও হিকমতের এমন শিক্ষা তাঁর মাধ্যমে দান করিয়েছেন যে, ভবিষ্যতের সকল যুগে মহাগ্রন্থ কুরআন অনুযায়ী মানব জীবন গঠন করা যেতে পারে।

(৩) নবী পাকের তৃতীয় শিক্ষাগত কাজ ছিল সেসব মতপার্থক্যের রহস্য উদঘাটন করে দেয়া, যা পূর্ববর্তী নবীগনের উম্মতদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। উপরন্তু সকল আবরণ উন্মোচর করে, সকল ভেজাল দূর করে সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও জটিলতা নিরসন করে সেই সঠিক পথ আলোকিত করে দেয়অ, যার অনুসরণ হরহামেখা খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের একই মাত্র পথ ছিল।

(আরবী**************)

খোদার কসম, হে মুহাম্মদ, তোমার পূর্বে আমরা বিভিন্ন জাতির জন্যে হেদায়েত পাঠিয়েছি। কিন্তু তারপর শয়তান তাদের ভ্রান্ত ক্রিয়াকর্মকে মনোমুগ্ধকর বানিয়ে দিয়েছে। বস্তুতঃ আজ সে-ই তাদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে রয়েছে এবং তারা যন্ত্রণাময় শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়েছে। আমরা তোমার উপর এ কিতাব শুধু এজন্যে নাযিল করেছি যে, তুমি সে সত্যকে তাদের সামনে তুলে ধরবে, যে সম্পর্কে তাদের মধ্যে মতানৈক্য পাওয়া যাচ্ছে। আর এজন্যেও যে, এ কিতাব হেদায়েত ও রহমত স্বরূপ হবে তাদের জন্যে যারা তার অনুসরণ মেনে নেবে (নামল: ৬৩-৬৪)।

(আরবী**************)

-হে আহলি কিতাব! তোমাদের নিকটে আমাদের রসূল এসেছে, যে তোমাদের নিকটে অনেক এমন বিষয় বিশদভাবে বয়ান করে, যা তোমরা কিতাব থেকে গোপন কর, আর সে অনেক কিছু মাফ করে দেয়। তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলোক এবং একটি সুস্পষ্ট গ্রন্থ এসেছে। যারা এ গ্রন্থের আলোকে জীবন যাপন করে, আল্লাহ তাদেরকে এ গ্রন্থের মাধ্যমে সুখশান্তি ও নিরাপত্তার পথ দেখান, তাদেরকে অন্ধাকার থেকে আলোকে নিয়ে আসেন এবং সঠিক সরল পথে পরিচালিত করেন- (মায়েদা: ১৫-১৬)।

(৪) নাফরমানদের শাস্তির ভয় দেখানো, ফরমাবরদারকে আল্লাহ তায়ালা রহমতের সুসংবাদ দান এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রচার-প্রসারও ছিল নবীর শিক্ষাদান কাজ।

(আরবী**************)

হে নবী! আমরা তোমাকে সাক্ষ্যতাদা, সুসংবাদদাতা, আল্লাহর নির্দেশে আল্লাহর দিকে আহবানকারী এবং একটি আলোকদানকারী সূর্য বানিয়ে পাঠিয়েছি। (আহযাব: ৪৫-৪৬)

নবীর বাস্তব কাব

বাস্তব জীবনে ও তার কায়কারবারে যে কাজ নবীর দায়িত্বে ছিল তা নিম্নরূপ:-

(১) সৎ কাজের আদেশ করা, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, হালাল ও হারামের সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং খোদা ব্যতীত অন্যের বাধানিষেধের বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্তস্বাধীন করা েএবং তাদের চাপিয়ে দেয়া বোঝা লাঘ করা।

(আরবী**************)

সে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করে, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তাদের জন্যে পাক জিনিস হালাল করে দেয় এবং নাপাক জিনিস হারাম করে দেয়। তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেয় এবং সেসব বাধানিষেধ রহি করে দেয়, যার বন্ধনে আবদ্ধ ও দামিত হয়ে ছিল। অতএব যারা ঈমান আনবে, তার সহযোগিতা করতে এবঙ সেই আলোর অনুসরণ করবে যা তার সাথে নাযিল করা হয়েছে, তারাই সাফল্য লাভকারী (আ’রাফ: ১৫৭)।

(২) খোদার বান্দাহদের মধ্যে সত্য ও সুবিচার সহ ফয়সালা করা।

(আরবী**************)

হে ‍মুহাম্মদ, আমরা তোমার উপর সত্য সহকারে এ গ্রন্থ নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি আল্লাহর বলে দেয়া আনি-কানুন অনযায়ী লোকের মধ্যে ফয়সালা কর এবং আত্মসাৎকারীদের উকিল না সাজ-(নিসা: ১০৫)।

(৩) আল্লাহর দ্বীন এমনভাবে কায়েম করা, যাতে মানব জীবনের যাবতীয় ব্যবস্থা তার অধীন হয়ে যায় এবং তার মুকাবিলায় অন্যান্য যাবতীয় রীতিপদ্ধতি দমিত হয়ে যায়।

(আরবী**************)

-তিনি একমাত্র আল্লাহ যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়েত ও দ্বীনে-হকসহ পাঠিয়েছেন, যেন সে যাবতীয় বিধানের উপরে তা বিজয়ী করতে পারে (আলফাত্‌হ : ২৮)।

এভাবে নবীর কাজের এ বিভাগটি রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, নৈতিক ও তামাদ্দুনিক সংস্কার এবং পূতপবিত্র সত্যসতার সকল দিককে পরিবেষ্টন করে রাখে।

নবূয়তে মুহাম্মদী বিশ্বজনীন ও চিরন্তন

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কাজ কোন একটি জাতি, দেশ অথবা যুগের জন্যে নির্দিষ্ট নয়। বরঞ্চ সমগ্র মানবজাতির জন্যে এবং সকল যুগের জন্যে একইভাবে প্রযোজ্য।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ! আমরা তোাকে সকল মানুষের জন্যে ভীতিপ্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা করে পাঠিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জনে না (সাবা: ২৮)। (আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ। বলে দাও: হে মানব জাতি, আমি তোমাদের সকলের জন্যে খোদার রসূল হয়ে এসছি সেই খোদার রসূল যিনি আসমান ও যমীরে বাদশাহীর মালিক যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ বা খোদা নেই- যিনি জীবন ও মৃত্যুর মালিক। অতএব খোদার উপর ঈমান আন এবং তাঁর রসূল-উম্মী নবীর উপর, যে খোদা ও তার ফরমানগুলোর উপর ঈমান রাখে, তার অনুসরণ কর। আশা করা যায় যে, তোমরা সরল সঠিক পথ পেয়ে যাবে। (আ’রাফ: ১৫৮)।

(আরবী**************)।

-হে মুহাম্মদ, বলে দাও! আমার প্রতি এ কুরআন অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, যাতে করে আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করে দিতে পারি এবং প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার কাছে এ পৌছুবে- (আনয়াম: ১৯)

(আরবী**************)

-এ কুরআন ত একটি ‍উপদেশ মালা সকল দুনিয়াবাসীদের জন্যে। প্রতিটি ঐ ব্যক্তির জন্যে যে তোমাদের মধ্যে সত্য পথের পথিক হতে চায়। (তাকবীর: ২৭-২৮)।

খতমে নবুয়ত

নবুয়তে ‍মুহাম্মদর আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, নবুয়ত ও রেসালাতের ধারাবাহিকতা তাঁর উপর এসেস শেষ করে দেয়া হয়েছে। তাঁর পর দুনিয়ায় আর কোন নবীর প্রয়োজন রইলো না।

(আরবী**************)

মুহাম্মদ (স) তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নয়। বরঞ্চ সে আল্লাহর রসূল এবং নবীদের ধারাবাহিকতার সমাপ্তকারী (আহযাব: ৪০)।

এ প্রকৃত পক্ষে নবুয়তে মুহাম্মদীর বিশ্বজনীনতার, চিরকালীনতার ও দ্বীনের পরিপূর্ণতার এক অনিবার্য ফল। যেহেতু উপরোক্ত বর্ণার ‍দৃষ্টিতে মুহাম্মদ (স) এর নবুয়ত সমগ্র দুনিয়ার মানুষের জন্যে- কোন একটি জাতির জন্যে নয় এবং চিরকালের জন্যে, কোন একটি যুগের জন্যে নয় এবং যে কাজের জন্যে দুনিয়ায় নবীদের আগমেনর প্রয়োজন ছিল, তা যখন চূড়ান্ত পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে, সে জন্যে দুনিয়ায় নবীদের আগমনের প্রয়োজন ছিল, তা যখন চূড়ান্ত পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে, সে জন্যে এ অত্যন্ত সংগত কথা যে তাঁর উপরে নবুয়তের ধারাবাহিকতা শেষ করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টিকে স্বয়ং নবী (স) অতিসুন্দরভাবে একটি হাদীসে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, আমার দৃষ্টান্ত নবীদের মধ্যে এমন যে, কোন ব্যক্তি একটি সুন্দর গৃহ নির্মাণ করলো। সমস্ত গৃহটি নির্মান করে মাত্র একটিখানি ইটের স্থান খালি রাখলো। এখন যারাই গৃহটির চারদিকে চক্কর দিল তাদের মনে খটকা লাগার ফলে তারা বলতে লাগলো, যদি এ শেষ ইটখানিও এখঅনে রেখে দেয়া হতো তাহলে গৃহখানি একেবারে পূর্ণতা লাভ করতো। এখন নবুয়ত ‍গৃহে যে ইটটির স্থান খালি পড়ে আছে, আমিই সেই ইট।

এ দৃষ্টান্ত থেকে খতম নবুয়তের কারণ পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়। যখন দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে; আল্লাহর আয়াত সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, আদেশ নিষেধগুলো, আকীদাহ বিশ্বাস সমূহ, এবাদতবন্দেগী, তামাদ্দুন, সামাজিকতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনীতি, মোটকথা মানব জীবনের প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে এবং দুনিয়ার সামনে আল্লাহর বাণী ও রসূলের উৎকৃষ্ট নমুনা এমনভাবে পেশ করা হযেছে যে, সকল প্রকার বিকৃতি ও এদিক সেদিক করা থেকে তাকে মুক্ত রাখা হয়েছে এবং প্রত্যেক যুগে তার থেকে পথনির্দেশনা লাভ করা যেতে পারে, তখন নবুয়তের আর কোন প্রয়োজন রইলোনা। প্রয়োজন শুধু স্মরণ করিয়ে দেয়অর এবং পুরর্জাগরণের (রেনেসাঁর)। তার জন্যে হাক্কানী ওলামা এবং সত্যনিষ্ঠ মুমেনদের জামায়াতই যথেষ্ট।

নবী মুহাম্মদের (স) প্রশংসনীয় গুণাবলী

শেষ জিজ্ঞাস্য প্রশ্নটি এই যে, এ গ্রন্থের বাহক ব্যক্তিগতভাবে কোন্‌ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাবে কুরআন মজীদ অন্যান্য প্রচলিত গ্রন্থাদির ন্যায় তাদের বাহকদের অতিরঞ্জিত প্রশংসার পথ অবলম্বন করেনি। তাঁর প্রশংসাকে কোন স্থায়ী বিষয়বস্তুতও বানানো হয় নি। নিছক কথা প্রসংগে ইংগিতে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্টগুলো বিদ্যমান ছিল।

(১) কুরআন বলে যে, তার বাহক চারিত্রিক গুণাবলীর শীর্ষস্থানে অবস্থান করছিলেন।

(আরবী**************)

-এবং হে মুহাম্মদ (স), তুমি চরিত্রের উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী (নূন: ৪)

(২) কুরআন বলে যে, তার বাহক এমন একজন দৃঢ়-সংকল্প, দৃঢ়চিত্ত ও সর্বাবস্থায আল্লাহর উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি ছিলেন যে, যখন তাঁর সমগ্র জাতি তাঁকে নির্মূল করার জন্যে বদ্ধপরিকর হলো এবং তিনি একজন সহযোগীসহ পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন, সেই কঠিন বিপজ্জনক অবস্থায় তিনি সাহস হারিয়ে ফেলেননি বরঞ্চ আপন সংকল্পে অটল ছিলেন।

(আরবী**************)

স্মরণ কর সে  সময়ের কথা যখন কাফেরগণ তাকে বহিষ্কার করে দিয়েছিল, যখন তিনি দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন এবং যখন দুজন গুহায় ছিলেন এবং ‍যখন তিনি তার সাথীকে বলেছিলেন চিন্তা করোনা আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন। (তওবা: ৪০)।

(৩) কুরআন বলে, তার বাহক একজন অত্যন্ত উদার-চেতা ও দয়াশীল ব্যক্তি ছিলেন যিনি তাঁর চরম শত্রুর জন্যেও ক্ষমা করর দোয়া করন এবং অবশেষে আল্লাহকে এ চূড়ান্ত ফয়সালা শুনিয়ে দিতেহয় যে, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।

(আরবী**************)

-তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর, তুমি যদি সত্তর বারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর তথাপি আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না- (তওবা: ৮০)

(৪) কুরআন বলে, তার বাহকের স্বভাবপ্রকৃতি ছিল অত্যন্ত নম্র। তিনি কোন দিন কারো প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেননি এবং এজন্যে দুনিয়া তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়।

(আরবী**************)

-এ আল্লাহরই রহম যে, তমি তাদের প্রতি বিনয়-নম্র। নতুবা তুমি যদি কর্কষভাষী পাষানহৃদয় হতে, তাহলে এ সব লোক তোমার চারপাশ থেকে কেটে পড়তো। -(তওবা: ১৫১)।

(৫) কুরআন বলে, তার বাহক খোদার বান্দাহদেরকে সত্যসঠিক পথে আনার জন্যে মনের মধ্যে অস্থিরতা বোধ করতেন এবং গোমরাহীর জন্য তারা জিদ ধরে থাকলে মনে বড়ো কষ্ট পেতেন। এম কি তাদের দুঃখে অধীর হয়ে পড়তেন।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ (স), এমন মনে হচ্ছে যে, তুমি তাদের জন্যে দুঃখে অতিভূত হয়ে প্রাণ হারিয়ে ফেলবে যদি তারা এ কথার উপর ঈমান না আনে (কাহাফ: ৬)।

(৬) কুরআন বলে, তার বাহক তাঁর উম্মতের জন্যে গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন। তিনি তাদের শুভাকাংখী ছিলেন। তারা ক্ষগ্রিস্ত হলে মর্মাহত হতেন। তাদরে জন্যে তিনি ছিলেন দয়া ও স্নেহমমতার প্রতীক।

(আরবী**************)

-তোমাদের নিকটে স্বয়ং তোমাদের মধ্যে থেকেই এমন এক রসূল এসেছেন যার কাছে সে প্রতিটি জিনিস কষ্টদায়ক হয় যা তোমাদের ক্ষতিকারক, যে তোমাদের কল্যাণকামী এবং আহলে ঈমানদের জন্যে বড়োই স্নেহশীল ও দয়ালূ –(তওবা: ১২৮)।

(৭) কুরআন বলে, তার বাহক শুধু তাঁর জাতির জন্যেই নয়, বরঞ্চ সমগ্র দুনিয়ার রহমত স্বরূপ ।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ (স), আমরা তোমাকে সারা দুনিয়ার জন্যে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি- (আম্বিয়া: ১০৭)।

(৮) কুরআন বলে, তার বাহক রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা জেগে জেগে এবাদত করেন এবং খোদার স্মরণে দন্ডয়মান থাকেন।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ (স), তোমার রব জানের যে তুমি রাতের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ পর্যন্ত এবং কখনো অর্ধরাত, কখনো এক তৃতীয়াংশ রাত নামাযে দাঁড়িয়েথাক- (মুযাম্মেল : ২০)।

(৯) কুরআন বলে, তার বাহক ছিল সত্যবাদী মানুষ। জীবনে কখনো তিনি সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হননি। অশুভ চিন্তাধারায় প্রভাবিত হননি। আর না কখনো তিনি প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে হকের বিরুদ্ধে টু শব্দ করেচেন।

(আরবী**************)

-(হে লোকেরা) তোমাদের ছাহেব না কখনো সত্য সরল পথ থেকে সরে পড়েছে, না সঠিক চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আর না সে প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে কিছু বলে (নজম: ২০৩)।

(১০) কুরআন বলে, তার বাহক সারা দুনিয়ার জন্যে অনুসরণ যোগ্য আদর্শ এবং তাঁর গোটা জীবন পরিপূর্ণ নৈতিকতার সঠিক মানদন্ড। (আরবী**************)

তোমাদের জন্যে রসূলে মধ্যে এক সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ রয়েছে –(আহযাব ২১)।

কুরআন শরীফ অধ্যয়ন করলে তার বাহকের আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করা হয়েছে দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু এ প্রবন্ধে তার বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই।

যে কেউ কুরআন পড়লে স্বয়ং দেখতে পাবে যে, প্রচলিত অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থাবলীর বিপরীত এ গ্রন্থখানি তার বাহককে যে রঙে রঞ্জিত করে তা কতটা স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট এবং আবিলতা থেকে মুক্ত। এতে খোদায়ী কোন লেশ নেই।  -আর না প্রশংসার কোন অতিরঞ্জন অত্যুক্তি। কোনরূপ অসাধারণ শক্তিও তাঁর প্রতি আরোপিত হয়নি। তাঁকে কাজকর্মে শরীকও বানানো হয়নি। আর না তাঁকে এমন সব দুরবলতা-দোষত্রুটির দ্বারা অভিযুক্ত করা হয়েছে যা একজন পথপ্রদর্শক এবং হকের প্রতি আহবানকারীর মর্যাদার পডরিপন্থী। যদি ইসলামী সাহিত্যের অন্যান্য সকল গ্রন্থাবলী দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং  ‍শুধা কুরআন শরীফ রয়ে যায়, তথাপি নবী পাকের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কোন ভুল বুঝাবুঝি, কোন সন্দেহ, সংশয়, ভক্তি শ্রদ্ধার কোন ত্রুটি হবার কোন অবকাশ থাকবে না। আমরা ভালোভাবে জানতে পারি যে, এ গ্রন্থের বাহক একজন পূরণত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। সর্বোৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণে গুণান্বিত ছিলেন। পূর্ববর্তী নবীগনের সত্যতার স্বীকৃতি দিতেন। কোন নতুন ধর্মের উদ্ভাবক তিনি ছিলেন না। কোন অতিমানব হওয়ার দাবীও তিনি করেননি। তাঁর দাওয়াত ছিল সমগ্র বিশ্বজগতের জন্যে। আল্লাহ তায়ালার পক্ষথেকে কিচু নির্দিষ্ট খেদতের জন্য তাঁকে আদেশ করা হয়েছিল। যখন তিনি এসব খেদমত পুরোপুর আঞ্জাম দিলেন, তখন নবুয়তের ধারাবাহিকতা তাঁর উপর এস সমাপ্তি লাভ করলো। [পকৃত পক্ষে এ প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল ১৯২৭ সালে ‘আলজায়িত’ পত্রিকায় ‘হাবিক সংখ্যার’ জন্যে। ১৯৪৪ সালে সান্নিবেশিত করার পূর্বে তার কিছু পরিবর্দন সাধিত হয়-গ্রন্থকার।]

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.