সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

 দ্বিতীয় অধ্যায়

নবী মুহাম্মদের (স) বংশ পরিচয়

হযরত ইব্রাহীম (আ)

একথা ঐতিহাসিক দিক দিয়ে সর্বসম্মত যে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পরিবার হযরত ইবরাহীম (আ) এর বংশের সেই শাখা সম্ভূত যা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাইল (আ) থেকে চলে এসেছে। এ বংশ পরম্পরা বনী ইসমাঈল নামে পরিচিত। নবী মুহাম্মদের (স) জীবন চরিতের সাথে এ বিষয় সম্পর্ক এতো গভীর যে তাঁর সম্পর্কে কিচু আলোচনা কতে হলে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) এর জীবনের ঘটনাবলী থেকেই শুরু করতে হবে। কারণ তাছাড়া এটা বুঝতেই পারা যাবে না যে, ইরাকের এ বংশটি আরবের অভ্যন্তরে এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিভাবে পূণর্বাসিত হলো, এখানে তৌহীদপন্থীরেদ কেবলার ভিত্তি কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো এবং আরবের অধিকাংশ উপজাতীয়দের সাথে নবী মুহাম্মদের (স) কি সম্পর্ক ছিল যে কারণে তিনি কোন অপরিচিত নন, বরঞ্চ অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) ইরাকবাসী ছিলেন। তাঁর জন্মভূমি উর ইরাকের নমরূদ পরিবারের রাজধানী ছিল। খৃঃপূর্ব ২১০০ সালের কাছাকাছি সময়ে গবেষক পন্ডিতগণের মতে হযরত ইবরাহীম (আ) এর আবির্বাব ঘটে। উর ছিল তৎকালীন সভ্যতা সংস্কৃতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের বিরাট কেন্দ্র। সেই সাথে এ ছিল সে জাতির শির্ক কুফুরের ‍দুর্গ। হযরত ইব্রাহীম (আ) যখন এ জাতির শির্কের বিরোধিতা ও তৌহীদের দাওয়াতের সূচনা রেন তখন সরকার, সমগ্র জাতি, তাঁর আপন পরিবচার এমন কি তাঁর পিতা পর্যন্ত তাঁর শত্রু হয়ে গেল। সকলে মিলে তাকে ধমক দিয়ে ও ভীতিপ্রদর্শন করেও যখন তাঁকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হলো, তখন তারা সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে জীবিত জ্বালিয়ে মারার জন্যে এক বিরাট অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করলো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্যে আগুনকে শীতল করে দেন এবং তিনি এ অগ্নিকুন্ড থেকে জীবিত ও সুস্থাবস্থায় বেরিয়ে আসেন। এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে কুরআনে বর্ণিত হযেছে (আম্বিয়া: ৬৮-৬৯, আনকাবুত ২৪, সাফফাত : ৯৭-৯৮) দ্রষ্টব্য।)

কুরআনের বর্ণনা মতে অতপরঃ হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর জন্মভূতি পরিত্যাগ করে শ্যাম ও ফিলিস্তিনের দিকে হিজরত করেন। সে কালে এসব স্থানকে বলা হতো কানয়ান ভূমি। এ প্রসংগে কুরআন বলে:

(আরবী**************)

-তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলো তার জন্যে এক অগ্নিকুন্ড তৈরী কর এবং এ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে তাকে নিক্ষেপ কর। তারা তার বিরুদ্ধে এক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকে লাঞ্ছিত করলাম এবং ইব্রাহীম (আ) বল্লো, আমি আার রবের দিকে চল্লাম অর্থাৎ হিজরত করছি। তিনিই আমাকে সুপথ দেখাবেন- (সাফফাত: ৯৭-৯৮)।

(আরবী**************)

-অতঃপর তার জাতির জবাব এ ছাড়া আর ছিলনা, তারা বল্লো তাকে মেরে ফেল অথবা জ্বালিয়ে দাও। সবেশেষে আল্লাহ তাকে আগুন থেকে রক্ষা করলেন। সে সমযের লূত হযরত ইব্রাহীমকে মেনে নিল। এবং ইব্রাহীম বল্লো, আমার আমার রবের দিকে হিজরত করছি। তিনি মহাপরাক্রা্ত ও বিজ্ঞ (আনকাবুত : ২৪-২৬)।

(আরবী**************)]

-আমরা তাকে (ইব্রাহীম) ও লুতকে রক্ষা করে সেই ভূখন্ডের দিকে নিয়ে গেলাম যার মধ্যে আমরা বিশ্ববাসীর জন্যে অগণিত বরকত রেখে দিয়েছি। (আম্বিয়া-৭১)[বরকতপূর্ণ ভূখন্ড বলতে শাম ও ফিলিস্তিনের এলাকা বুঝানো হয়েছে। সূরা আ’রাফ: ১৩৭, বনীইসরাইল ১ আম্বিয়া : ৮১ আয়াতগুলোতে এ অঞ্চলকে বরকতপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হযেছে (তাফহীম -৪র্থ-সাবা-টীকা ৩১ দ্রঃ)

এবং লূতকে আমরা হুক্‌ম ও এলম অর্থাৎ নবুয়ত দান করেছি –(আম্বিয়া: ৭৪)।

(আরবী**************)

এবং লূতও তাদের মধ্যে ছিল যাদেরকে রসল বানানো হয়েছে (সাফফাত: ১৩৩)

হযরত ইব্রাহীম (আ) এর হিজরতের পর তাঁর জাতির কি দশা হয়েছিল তার কোন বিশদ বিবরণ কুরআনে নেই। তবে সূরা তওবার ৭০ আয়াতে যেসব জাতি শান্তিলাভ করে তাদের সাথেই এ জাতির উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন কথা হচ্ছে এইযে, এ হিজরতে হযরত লূতের সাথে হযরত সারাও হযরত ইবরাহীমের (আ) সাথে ছিলেন। এ বিষয়ে কুরআনে কোন বিশ্লেষণ নেই। কিন্তু কুরআনের কিছু বর্ণনায় এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী হিজরতে তাঁর সহগামিনী ছিলেন। যেমন সূরা সাফফাতে আছে, হিজরতের সময় হযরত ইব্রাহীম (আ) এ দোয়া করতেন।

(আরবী**************)

-হে খোদা আমাকে নেক সন্তান দান কর। এ দোয়া একজন বিবাহিত লোকই করতে পারতো এবং তাও এমন সময়ে যখন তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত কালে এ দোয়া করছিলেন। বাইবেলের ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকেও তার সমর্তন পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে, এ হিজরতে হযরত সারা সাথে ছিলেন। কিন্তু বাইবেলের অন্যান্য বর্ণনা আবার একেবারেই অমূলক। যেমন বলা হযেছে যে, হযরত সারা হযরত লূতের সহোদরা ভগ্নি এবং হযরত ইব্রাহীমের আপন ভাতিজি। পরে তাঁকে তিনি বিয়ে করেন। আও বলা হযেছে যে এ হিজরতের হযরত ইব্রাহীমের সাথে তাঁর পিতাও ছিল (সৃষ্টিতত্ত্ব,Genesis – অধ্যায় ১১ শ্লোক- ২৭- হযরত ইব্রাহীমের (আ) উপর যে জুলুম অত্যাচর করা হয়েছিল, তাতে তাঁর পিতারও হাত ছিল। (তালমূদ থেকে নির্বাচিত –এইস-পোলানো-লন্ডন-পৃঃ ৪০-৪২)। উপরন্তু খোদার কোন শরীয়তেরই আপন ভাতিজিকে বিয়ে করা জায়ে নয়, একজন নবীপর পক্ষে একাজ করা ত দূরের কথা।

হযরত ইব্রাহীম (আ) এর প্রচার তৎপরতা

হযরত নূহের (আ) পর হযরত ইব্রাহীম (আ) ছিলেন প্রথম নবী যাকে আল্লাহ তায়ালা ইসলারেম বিশ্বজনীন দাওয়াত ছড়াবার জন্যে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি প্রথমে স্বয়ং েইরাক থেকে মিশর এবং সিরিয়া ও ফিলিস্তিন থেকে আরব মরুর বিবিন্ন অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে ঘুরাফেরা করে লোকের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার এবাদত বন্দেগী ও আনুগত্যের কথা ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। অতঃপর তাঁর এ মিশরে প্রচারকার্যের জন্যে বিভিনন অঞ্জলে তাঁর খলিফা নিযুক্ত করেন। পূর্ব জর্দানে আপন ভ্রাতুষ্পুত্র লুতকে (আ) সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে আপন কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাককে (আ) এবং আরবের অভ্যন্তরে স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র  ইসমাইলকে (আ) নিযুক্ত করেন। তারপর আল্লাহতায়ালার নির্দেশে মক্কায় সে ঘর নির্মাণ করেন যার নাম কা’বা এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশেই তাঁর মিশনের কেন্দ্র হিসাবে উক্ত ঘকে নির্ধারিত করা হয়।

হযরত ইব্রাহীমের (আ) বং থেকে দুটি বিরাট শাখা উদ্ভূত হয়। একটি হযরত ইসমাইলের (আ) সন্তানগণকে নিয়ে যারা আরবে রয়ে যান। কুরাইশ এবং আরবের কতিপয় গোত্র আ শাখার সাথে সম্পৃক্ত। আরবের যে সকল গোত্র বংশীয় দিক দিযে হযরত ইসমাইলের (আ) বংশধর ছিল না তারাও যেহেতু তাঁর প্রচারিত ধর্মের দ্বারা কমবেশী প্রভাবিত ছিল, সে জন্যে তারা তাদের ধারাবাহিকতা তাদের সাথেই সম্পৃক্ত করেছিল। [নবী আকরামের (স) যুগ পর্যন্ত আড়াইহাজার বছর যাবত নবী ইসমালের বিভিন্ন পরিবার আরবের বহু পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে মানবসুলভ স্বভাব অনুাযায়ী হযরত ইসমাইলের পূতপবিত্র পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করাকে গৌরবজনক মনে করতো এবং বংশতালিকায় এ উল্লেখ করতো- গ্রন্থকার।

[যেহেতু নবী (স) এর যুগ পর্যন্ত আড়াই হাজার বচর যাবত হযরত ইসমাইলের (আ) বিভিন্ন পরিবার আরবাসীর বহু পরিবারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, এ জন্যে মানবীয় স্বভাব প্রকৃতি অনুযায়ী এ সব বিভিন্ন পরিবার এ মহান পরিবারের সাথে আত্মীয়তাকে গৌরবজনক মনে করতো এবং নিজেদের নসব নামায় তার উল্লেখ করতো =-(গ্রন্থকার)।]

দ্বিতীয় হযরত ইসহাকের (আ) বংশধর। এ বংশে জন্মগ্রহণ করেন হযরত ইয়াকুব (আ), হযরত ইউসুফ (আ), মূসা (আ), দাউদ (আ), সুলায়মান (আ), ইয়াহ্‌ইয়া (আ), ঈসা (আ), এবং আরও বহু নবী। হযরত ইয়াকুবের (আ) না ইসরাঈল ছিল বলে এ বংশ বণীইসরাইল নামে অভিহিত হয়। তাঁদের প্রচারের ফলে যে সব জাতি তাঁদের দ্বীন গ্রহণ করে তারা হয়তো তাদের স্বাতন্ত্র তাদর মধ্যেই একাকার করে দেয় অথবা বংশীয় দিক দিযে পৃথক থাকে। তথাপি ধর্মীয় কিদ দিয়ে তাদের অনুসারী হয়ে থাকে। এ শাখাটিতে যখন বিকৃতি অথঃপতন দেখা দেয়, তখন প্রথমে ইহুদীবাদ এবং পরে ‍খৃষ্টবাদ জন্মলাভ করে।

হযরত ইব্রাহীম (আ) এর আসল কাজ ছিল দুনিয়াকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হেদায়েত মুতাবিক মানুষের ব্যক্তি ও সাজ জীবনের ব্যবস্থা সঠিক পথে পরিচালিত করা। তিনি স্বয়ং ছিলেন আল্লাহর অনুগত। তিনি তাঁর প্রদত্ত জ্ঞানের অনুসরণ করতেন। দুনিয়ায় সে জ্ঞান প্রচার করতেন। এ মহান খেদমতের জন্যেই তাঁকে বিশ্ব নেতৃত্বে ভূষিত করা হয়েছির। তাঁর পরে এ নেতৃত্বের পদমর্যাদা তাঁর বংশের সেই শাখার উপর অর্পিত হয় যা হযরত ইসহাক (আ) এবং হযরত ইয়াকুব (আ) থেকে শুরু হয় এবং বণী ইসরাইল নামে অভিহিত হয়। এ বংশেই নবী জন্মলাভ করতে থাকেন। তাঁদের সেই সঠিক পথের জ্ঞান দান করা হয়। তঁঅদের উপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয় যে, দুনিয়ার জাতি সমূহকে তাঁরা সঠিক পথের নেতৃত্ব দিবেন। এ ছিল সে নিয়ামত যার প্রতি আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মাধ্যমে তাঁদেরকে বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ শাখাটি নেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিল। বায়তুল মাকএদস দাওয়াত- ইলাল্লাহর কেন্দ্র এবং খোদা পুরস্তদের কেবলা হয়ে থাকে।

হযরত ইসমাইল (আ) এর জন্ম

ইব্রাহীম (আ) এর সন্তানদের দ্বিতীয় শাখাটি বণী ইসরাইল। এশাখাটির মধ্যে যে দোষত্রুটি ছিল তার মধ্যে একটি যে তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে প্রত্যেক গর্বের বস্তু নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নেয়। ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে যে সব জাতির সাথে তাদের সংঘাত সংঘর্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে, তাদেরকে কলংকিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা তারা করে। বাইবেলে এর বহু দৃষ্টান্তের মধ্যে একটি এই যে, তার দৃষ্টিতে হযরত লূত (আ) মোটেই কোন নবী ছিলেন না। কোন দাওয়াতী কাজের জন্যে হযর ইব্রাহীম (আ) তাঁকে সাদুম ভূখন্ডেও পাঠানটি। বরঞ্চ উভয় চাচা ভাতিজার মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হয় এবং চাচা ভাইপোকে অন্যত্র কোথাও গিয়ে বসবাস করতে বলেন- (সৃষ্টিতত্ত্ব-অধ্যায় ১৩, শ্লোক : ৫-১৩)। এর থেকে অধিকতর ঘৃণার্হ দৃষ্টান্ত এই যে, বাইবেলের দৃষ্টিতে লূত জাতির উপর শাস্তি নেমে এলো, তখন লূত (আ) তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়নে। অতঃপর সাদূমের নিকটবর্তী ফিলিস্তিনের হাবরুন শহরে বসবাসকারী আপন চাচ হযরত ইব্রাহীমের (আ) নিকটে না গিয়ে একটি গুহায় অবস্থান করতে থাকেন। সেখানে –মায়াযাল্লঅহ, তাঁর কন্যাদ্বয় তাঁকে মদ্যপানে মদমত্ত করে তাঁর সাথে জড়িত হয় এবং ফলে উভয়ে গর্ভধারণ করে। একজনের গর্ভ থেকে মুআব জন্মগ্রহণ করে যে মুআবীদের পূর্বপুরুষ এবং অন্যজনের গর্ভ থেকে বিনআম্মী জন্মগ্রহণ করে যে বনী আম্মুনের পূর্বপুরুষ (সৃষ্টিতত্ত্ব-অধ্যায় ১৯, শ্লোক: ৩০-৩৮)। এভাবেই বনী ইসরাইল মুআবী ও আম্মুনীদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করে মনের ঝাল ঝেড়েছে। কারণ পরবর্তীকালের ইতিহাস এ সাক্ষ্য দেয় যে, এদের সাথে বনী ইসরাইলের চরম সংঘাত-সংঘর্ষ চলে।

এ ধরনের আচরণ তারা বনী ইসমাইলের প্রতিও করেছে। বাইবেলে বর্ণীত আছে যে, হযরত ইসমাইলের মাতা হযরত হাজেরা হযরত সারার ক্রীতদাসী ছিলেন। হযরত সারা নিঃসন্তান ছিলেন বলে একদিন হযরত ইব্রাহীম (আ)কে বলেন, আপনি আমার ক্রীতদাসীর সঙ্গে মিলিত হন, যাতে করে আমর পরিবার প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। অতএব তাঁর কথামত হযরত ইব্রাহীম (আ) হযরত হাজেরার সাথে মিলিত হন এবং হযরত ইসমাইলের জন্ম হয় –(সৃষ্টিতত্ত্ব- অধ্যায় ১৬, শ্লোক : ১০৪, ১৫-১৬)। অথচ বাইবেলের এই সৃষ্টিতত্ত্ব অংশে অধ্যায় ১৬ এবং শ্লোক ১৬ বলে, তৎকালীন ফেরাউন বিপুল ধন সম্পদ, গবাদি পশু, চাকর-চাকরানি হযরত ইব্রাহীম (আ)কে উপঢৌকন স্বরূপ দান করে। সে সবের মধ্যে হযরত হাজেরাও ছিলেন। [হযরত হাজেরা (রা) একটি গ্রামের অধিবাসিনী ছিলেন, যাকে উম্মুল আরব অথবা উম্মুল আরীক বলে। এ পূর্ব মিশরে ফারামা অথবা আত্তীনার সামনে রোম গাসরের তীর থেকে দু’মাইল দূরে অবস্থিত। ফেরাউনের যুগে এখানে একটি দূর্গ ছিল, আজকাল তাকে তাল্লুল ফারান বলে- গ্রন্থকার। ] এজন্যে হযরত হাজেরাকে হযরত সারার ক্রীতদাসী বলা স্বয়ং বাইবেলের দৃষ্টিতেও ভুল। তাঁর সাথে যৌনমিলনের জন্যে হযরত সারার অনুমতিরও কোন প্রয়োজন ছিল না।

বাইবেলে আরও আছে যে, হযরত ইসমাইল (আ) ফিলিস্তিনেই হযরত ইব্রাহীম (আ) এর সাথে ছিলেন। এমন কি যখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর, তখন হযরত ইব্রাহীম (আ) এর ঔরসে হযরত সারার গর্ভে হযরত ইসহাক জন্মগ্রহণ করে (সৃষ্টিতত্ত্ব- অধ্যায়, ১৮ শ্লোক: ২৪-২৬, অধ্যায় ২১, শ্লোক : ১-৫। তারপর বাইবেল বলে:-

“এবং সে ছেলে (অর্থাৎ হযরত ইসহাক) বড়ো হয় এবংদুধ ছাড়ানো হয়। তার দুধ ছাড়াবার দিনে ইব্রাহীম (আ) বিরাট খানা পিনা ও আপ্যায়নের আয়োজন করেন। সারা যখন দেখলেন যে হাজেরার মিশরীয়- যে ছিল ইব্রাহীমের ঔরসজাত-হাসি-খুশি করবে। তখন সারা ইব্রাহীমকে বল্লেন- এ ক্রীতদাসী ও তার পুত্রকে বের করে দিন কারণ এ ক্রীতদাসীল পুত্র আমার পুত্রের ওয়ারিশ হবে না। একথা ইব্রাহীমের বড়ো খারাপ লাগলো। খোদা ইব্রাহীমকে বল্লেন, এ পুত্র এবং তোমার ক্রীতদাসীর ব্যাপারে কিছু মনে করো না। সারা তোমাকে যা বলছে তা মেনে নাও – অতঃপর পরদিন সকালে ইব্রাহীম ঘুম থেকে উঠে রুটি এবং পানির মশক হাজেরার কাঁধে তুলে দিয়ে পুত্রসহ তাকে বিদায় করে দিলেন। সে চলে গেল এবং সাবা কূপের বিজন প্রান্তরে ভবঘুরের মতো ঘোরা ফেরা করতে লাগলো। মশকের পানি শেষ হওয়ার পর সে তার পুত্রকে একটি ঝোপের নীচে নিক্ষেপ করলো। সে সামান্য দূরে গিয়ে বসলো এবং বলতে লাগলো- আমি এ ছেলের মৃত্যু দেখবো না। সে তার সামনে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। খোদা ঐ পুত্রের আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং খোদার ফেরেশতাগণ আসমান থেকে হাজেরাকে ডেকে বল্লেন, হাজেরা! তোমার কি হয়েছে? ভয় করোনা, কারণ, যে স্থানে ছেলেটি পড়ে আছে সেখান থেকে খোদা তার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। উঠ এবং ছেলেকে উঠাও। হাত দিয়ে তাকে সামলাও। কারণ তাকে আমি বিরাট জাতিতে পরিণত করব। খোদা তার চোখ খুলে দিলেন। সে একটি পানির কূপ দেখতে পেল। সেখানে গিয়ে মশকে পানি ভরলো। ছেলেকে পান করালো। খোদা সে ছেলের সাথে ছিল। সে বড়ো হলো এবং বিজন প্রান্তরে থাকতে লাগলো। সে তীরন্দাজ হয়ে পড়লো। সে ফারাম প্রান্তরে বসবাস করছিল। তার মা মিশর থেকে তাঁর জন্যে তার স্ত্রী নিয়ে এলো- (সৃষ্টিতত্ত্ব- অধ্যায় ২১, শ্লোক: ৮-২১)।

এ মিথ্যা কাহিনী এ জন্যে রচনা করা হয়েছে, যাতে হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) এর আরব, মক্কা, কাবা এবং যমযম কূপের সাথে কোন সম্পর্ক প্রমাণিত না হয়। কারণ হযরত ইব্রাহীম (আ) এর আরব সফরের উপর যদি আবরণ টেনে দেয়া হয়, হযরত ইসমাইল (আ) এর চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত ফিলিস্তিনে অবস্থান এবং তার পর ফারানের বিজন বিবাহবন্ধন প্রভৃতির উল্লেখ ইসলামী ইতিহাসের সে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিলুপ্ত করে দেয়া যা দ্বীনে ইব্রাহীরে আরব কেন্দ্রের সাথে স্পৃক্ত। ফারানের যে বিজন প্রান্তরের উল্লেখ বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, তার দৃষ্টিতে তা অবস্থিত ছিল ফিলিস্তিনের দক্ষিণে আবাবা উপত্যকার পশ্চিমে, সিনাই মরুভূমির-উত্তরে এবং মিশর ও রোমসাগরের পূর্বে। ফারান পর্বতের সাথে আরবের কোন সম্পর্কই ছিলনা যেখানে মক্কা অবস্থিত। উপরন্তু এ কাহিনীতে হযরত সারা (রা) এবং হযরত ইব্রাহীম (আ) এর যে ঘৃণ্য চরিত্র অংকণ করা হয়েছে যার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালাকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর থেকে স্বয়ং বনী ইসরাইলের নৈতিক ধ্যান ধারণার একটা ঘৃণ্য ও জঘন্য রূপ প্রকাশিত হয়েছে। এতে একজন নবীর (হযরত ইব্রাহীম (আ)) এবং স্ত্রী এবং অন্য একজন নবীর (হযরত ইসহাক) নাম এমনভাবে চিত্রিত হয়েছে যে, মা তার সতীনের ছেলের হাসিও বরদাশত করতে রাজী নয় এবং স্বামীকে বাধ্য করছে পুত্রকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে পরিবার থেকে বহিষ্কার করে দিতে। স্বামী যিনি একজন মহাসম্মানিত নবী, তাঁকে এমনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে যে তিনি তাঁর পনেরো ষোল বছরের পুত্রকে তার মাতামহ শুধুমাত্র রুটি ও এক মশক পানি দিয়ে বিজন প্রান্তরে  নির্বাসিত করেছেন এবং তাদের জীবন মরণের কোন পরোয়া করছেন না। ওদিকে আল্লাহতায়ালার মর্যাদাও এভাবে দেখানো হচ্ছে যে, তিনি বনী ইসরাইলের পূর্বপুরুষ হযরত ইসহাক (আ) এবং তাঁর মায়ের জন্যে হযরত ইব্রাহীম (আ) কে এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, হযরত ইসহাকের মা স্বীয় সতীনের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তার প্রতি যে জুলুম অবিচার করার দাবী তুলেছেন তা যেন তিনি (হযরত ইব্রাহীম) মেনে নেন। এ গোটা কাহিনী মিথ্যা ও অলীক কল্পনারই এক সমষ্টি।

পক্ষান্তরে কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা সঠিক ইতিহাস জানতে পারি। আরববাসীর মধ্যে বংশানুক্রমে চলে আসা চার হাজার বছর যাবত অসংখ্য অগণিত মানুষের বারংবার বর্ণনা বিবৃতি এ ইতিহাসের সাক্ষ্যদান করে।

কুরআন বলে, হযরত ইব্রাহীম জন্মভূমি থেকে হিজরত কালে আল্লাহর দরবারে এ দোয়া করেন-

(আরবী**************)

-হে খোদা! আমাকে নেক সন্তান দান কর। (সাফফাত: ১০০)।

দীর্ঘকাল অতীত হওয়ার পর দোয়া কবুল করা হয় যখন হযরত ইবরাহীম (আ) অতি বার্ধক্যে পৌছেন। কুরআনে হযরত ইব্রাহীম (আ) এর এ উক্তি করা হয়েছে- (আরবী***************)

ঐ আল্লাহর শোকর যিনি আমাকে আমার বার্ধক্য অবস্থায় ইসাইল ও ইসহাক (দুই পুত্র সন্তান) দান করেছেন- (ইব্রাহীম : ৩৯)।

 এ দুই সন্তানের জন্মের আগে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম (আ) কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন। প্রথমে হযরত ইসমাইলের (আ) সুসংবাদ এভাষায় দেয়া হয়: – (***************)

-অতঃপর আমরা তাকে এক দৈর্যশীল পুতের সুসংবাদ দেই( আস সাফ্‌ফাত: ১০১)। তার কয়েক বছর পর যখন ইসাইল (আ) প্রায় যৌবনে পদার্পণ করেন, দ্বিতীয় পুতের সুসংবাদ এভাবে দেয়া হয়-(আরবী***************)

(এবং ফেরেশতাগণ তাকে (অর্থাৎ ইব্রাহীম (আ) কে) একজন জ্ঞানবান পুত্রের সুসংবাদ দেয়- (যারিয়াত : ২৮)। এ দ্বিতীয় সুসংবাদ দেয়া হলে হযরত ইব্রাহীম (আ) বলেন-

(আরবী***************)

-তোমরা কি আমাকে আমার বার্ধক্যের সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছ? একটু ভেবে ত দেখ এ কোন ধরণের সুসংবাদ দিচ্ছ- (হিজর : ৫৪)। এ সুসংবাদে সারার এ অবস্থা হয়েছিল-

(আরবী***************)

-তার স্ত্রী চিৎকার করে সামন এগিযে গেল এবং সে তার মুখ ঢেকে ফেল্লো এবং বল্লো- আমি বৃদ্ধা এবং বন্ধ্যা-(যারিয়াত: ২৯)।

এ সব আয়াতের ভিত্তিতে বাইবেলের নিম্ন বর্ণনা সঠিক মনে করা যেতে পারে যে হযরত ইব্রাহীম (আ) এর ৮৬ বছর বয়সে হযরত ইসমাইল (আ) এবং একশ’ বছর বয়সে হযরত ইসহাক (আ) এর জন্মগ্রহণ করেন- (সৃষ্টিতত্ত্ব-১৬, শ্লোক-১৬, অধ্যায়-২১ শ্লোক-৫)।

হযরত ইসমাইলের (আ) মক্কায় পুনর্বাসন

উপরের আলোচনায় একথা জানতে পারা গেল যে, হযরত ইসমাইল (আ) তাঁর পিতার প্রথমপুত্র এবং পিতার বার্ধক্যাবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এমন বয়সে কোন পিতার সন্তান লাভ এ দাবী রাখতো যে, তিনি তাঁর এ প্রথম পুত্র এবং চৌদ্দ বৎসর পর্যন্ত একমাত্র পুত্রকে স্নেহভরে বুকে জড়িয়ে রাখবেন। চোখের আড়াল হওয়াটাও তিনি সহ্য করবেন না। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ) নবী ছিলেন এবং সে কারণেই তিনি হকের দাওয়াতকেই অগ্রাধিকার দিতেন যার জন্যে আপন জন্মভূতিতে অশেষ জুলুম অবিচার সহ্য করেন, হিজরত করে ভিন্‌দেশে ঘুরে ঘুরে বেড়ান এবং প্রত্যেক স্থানে খোদার পয়গাম পৌঁছাবার কাজে তাঁর শক্তি ও শ্রম ব্যয় করেন। এ প্রিয় সন্তানের জন্মের পর তাঁর সর্বপ্রথম মনের মধ্যে চিন্তার উদয় হয় যে, কি করে আরব দেশে তৌহীদি দাওয়াতের সে কেন্দ্র স্থাপন করা যায় যেখান থেকে শেষ নবীর আবির্ভাব হওয়ার কথা এবং যে কেন্দ্রটি কিয়ামত পর্যন্ত তৌহীদি দাওয়াতের কেন্দ্র হিসাবে অক্ষুন্ন থাকবে। কুরআন আমাদেরকে একথা বলে  যে আল্লাহ তায়ালা প্রথমেই হযরত ইব্রাহীম (আ) কে এ স্থানটি চিহ্হিনত করে দেন যেখানে এ কেন্দ্র নির্মাণ বাঞ্ছিত ছিল্ বস্তুত সূরায়ে হজ্বে বলা হয়েছে- (আরবী***************)

-স্মরণ কর সে সময়ের কথা যখন আমরা ইব্রাহীমের জন্যে এ ঘরের (খানায়ে কাবা) স্থান নির্দিষ্ট করে দিই –(হজ্ব: ২৬)।

এ নির্দেশ অনুযায়ী আল্লাহর এ মহান বান্দাহকে তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু পুত্রকে অসাধারণ ধৈর্যশীলা ও আল্লাহর উপর একান্তভাবে নির্ভরশীলা মাতাসহ ঠিক সেই স্থানে দৃশ্যতঃ একেবারে অসহায় অবস্থায় ফেলে আসেন যেখানে অবশেষে তাঁকে খানায়ে কাবা নির্মাণ হতে হতো।

বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। এ বর্ণনায় যেভাবে ইবনে আব্বাস (রা) স্থানে স্থানে নবী করীমের (স) বক্তব্য উধৃত করেছেন তার থেকে জানা যায় যে, যা কিছু তিনি বয়ান করেছেন তা নবীর কাছে শুনেই করেছন। তিনি বলেন, হযরত ইব্রাহীম (আ) হযরত হাজেরা (রা) ও তাঁর দুগ্ধপোষ্য পুত্রসন্তান ইসমাইল (আ) কে এনে একটি গাছের নীচে এমন স্থানে রেখে গেলেন, যেখানে পরে যমযমের উদ্রেক হলো। মক্কার জনবিরল উপত্যকায় সেকালে কোন মানুষ ছিল না, আর না কোথাও পানি পাওয়া যেতো। হযরত হযরত ইব্রাহীম (আ) চামড়ার থলিতে খেজুর এবং এক মশক পানি হযরত হাজেরা (রা) কে দিয়ে চলে যান। হযরত হাজেরা তাঁর পেছনে চলতে চলতে বলতে থাকেন, হে ইব্রাহীম! আমাদেরকে এ শুষ্ক তরুলতাবিহীন বিজন প্রান্তরে ফেলে কোথায় চল্লেন? একথা হযরত হাজেরা (রা) কয়েকবার বলেন। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ) ফিরেও তাকালেন না। ****১ অবশেষে হযরত হাজেরা (রা) বল্লেন- আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজ করার আদেশ করেছেন? হযরত ইব্রাহীম (আ) শুধু এতোটুকু বল্লেন, হ্যাঁ। একথায় হাজেরা (রা) বল্লেন, যদি তাই হয় তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। একথা বলে তিনি ফিরে এসে সন্তানের কাছে বসে পড়লেন।

হযরত ইব্রাহীম (আ) পাহাড়ের আড়ালে গেলেন যেখান থেকে মা ও পুত্রকে দেখা যায় না েএবং বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে (যেখানে তাঁকে সে ঘর তৈরী করতে হতো) এ দোয়া করলেন

(আরবী***************)

-হে খোদা আমি একটি পানি ও তরুলতাবিহীন প্রান্তরে আমার সন্তানদের একটি অংশ তোমার পবিত্র ঘরের পাশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে রেখে গেলাম, যেন তারা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের মন তাদের জন্যে অনুরক্ত করে দাও এবং তাদেরকে খাবার জন্যে ফলমূলাদি দান কর। সম্ভবতঃ তারা শোকর গোজার হবে –(ইব্রাহীম : ৩৭)।

এদিকে ইসমাইলের (আ) মাতা তাকে ‍দুধ পান করাতে থাকেন এবং নিজেও মশকের পানি পান করতে থাকেন। পানি শেষ হয়ে গেলে তাঁকে ও সন্তানকে পিপাসা লাগলো। তিনি সন্তানকে পিপাসায় ছটফট করতে দেখে ঠিক থাকতে পারলেন না। তিনি উপত্যকার দিকে ছুটে গেলেন যে লোক জন দেখা যায় কিনা। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। তারপর সাফা পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকার মাঝখানে এলেন। তারপর দুই বাহুর উত্তোলন করে এমনভাবে  দৌড় দিলেন, যেমন ধারা কোন বিপন্ন মানুষ দৌড় দেয়। তারপর মারওয়া পাহাড়ে চড়ে দেখতে লাগলেন কোথাও কোন মানুষ নজরে পড়ে কিনা। কিন্তু কাউকে নজরে পড়লো না এভাবে তিনি সাতবার সাফা ও মারওয়ার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করলেন। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন

[ফিরে না তাকাবার অর্থ নির্দয়তা ও অবহেলা- উপক্ষো নয়। হযরত ইব্রাহীম (আ) মহান নবী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ অবশ্যই ছিলেন, আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালনের জন্যে তিনি এতোবড়ো বিপদের ঝুঁকি নিয়েছিলেন যে পাহাড় ঘেড়া জনবিরল প্রান্তরে তাঁর দুগ্ধপোষ্য সন্তান ও তার মাকে ফেলে যাচ্ছেন। তখন তাঁর মনের যে কি অবস্থা ছিল তা এ অবস্থা দৃষ্টে অবশ্য ধারণা করা যেতে পারে। এ অবস্থায় তিনি যদি স্ত্রী ও পুত্রের দিকে তাকিয়ে দেখতেন তাহলে মন ব্যাকুল ও চঞ্চল হয়ে পড়তো। এজন্যে বুকের উপর পাথর রেখে দিযে চল্লেন। পশ্চাদগামিনী স্ত্রীর বার বার প্রশ্নের জবাবে তাঁর দিকে না দেখেই শুধু হাঁ বল্লেন।]

এ কারণেই লোক সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সায়ী করেন। (****১) শেষবার যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে চড়েন, তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পান। তারপর নিজের মনেই বল্লেন “চুপকর” (অর্থাৎ হৈ চৈ করো না) তখন মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। পুনরায় আওয়াজ এলে তিনি বল্লেন, ‘হে মানুষ তোমার আওয়াজ আমাকে শুনালে। এখন আমার আবেদন পূরণের জন্যে তোমার নিকট কি কিছু আছে?

হঠাৎ তিনি যমযমের স্থানে এক ফেরেশতা দেখতে পেলেন, ইব্রাহীম বিন নাফে’ ও ইবনে জুরাইজ এর বর্ণনায় আছে যে, তিনি জিব্রাইলকে দেখলেন যে তিনি পায়ের গোড়ালি দিযে অথবা হাত দিযে মাটি খনন করছেন। তারপর পানি বেরিয়ে পড়লো। হযরত হাজেরা (রা) অঞ্জলিতে করে পানি নিয়ে মশক ভরতে লাগলেন। যতোই তিনি পানি ভরেন, পানি উচ্ছ্বসিত হয়ে উপরে উঠতে থাকে। ইবনে আব্বসা (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, আল্লাহ ইসমাইল-মাতার উপর রহম করুন, যদি তিনি যমযমকে ঐ অবস্থায় ছেড়ে দিতেন, (অর্থাৎ চার দিকে আইল দিয়ে ঘিরে না দিতেন, তাহলে যমযম প্রবাহমান এক ঝর্ণা হতো।।

এভাবে হযরত হাজেরা (রা) পানি পান করতে থাকেন এবং সন্তানকে দুধ খাওয়াতে থাকেন। ফেরেস্তা তাঁকে বল্লেন “পানি নষ্ট হওয়ার ভয় করো না এখানে আল্লাহর ঘর আছে, যা এ শিশু ও তার পিতা নির্মণ করবে। আল্লাহর এ ঘরের লোকদের ধ্বংস করবেন না।”

কিছুকাল এ অবস্থায় চলার পর জুরহুম গোত্রের (***১) কিচু লোক কাদা অঞ্চল থেকে এসে মক্কার নিম্নভূমি অংশে থেমে যায়। তারা ওখান থেকে দেখলো একটি পাখী একটি স্থানের চার পাশে উড়ছে। তারা বল্লো, এ পাখি ত পানির উপর চক্কর দিচ্ছে। এ উপত্যকার উপর দিযে আমরা এর পূর্বেও যাতায়াত করেছি কিন্তু কোথাও পানি ছিল না। তারপর তারা দু একজন লোককে পাঠালো। তারা সেখানে পানি দেখতে পেলো। তারা ফিরে এ সংবাদ অন্যদেরকে দিল। তারা এসে সেখানে ইসমাইলের (আ) মাকে দেখতে পেলো। তারা হযরত হাজেরাকে (রা) বল্লো, তুমি কি আমাদেরকে এখানে থাকার অনুমতি দিতে পার? হাজেরা বল্লেন, হাঁ, তবে তোমাদের নয় আমার অধিকারে থাকবে। তারা এতে সম্মত হলো।

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, ঐ জুরহুম গোত্র ইসমাইলের মাকে অত্যন্ত মিশুক ধেকে পেল। তিনি নিজেও চাচ্ছিলেন, যেন কিছু লোক এখানে বসতি স্থাপন করে। সুতরাং তারা সেখানে রয়ে গেল এবং পরিবারের অন্যান্যকেও সেখানে নিয়ে এলো। কয়েক পরিবার সেখানে বসবাস করতে লাগলো। হযরত ইসমাইল (আ) তাদের মধ্যেই প্রতিপালিত ও বর্ধিত হন এবং তাঁদের নিকটেই আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। (***১) এ ছেলেটিকে জুরহুমীদের বড়ো ভালো  লাগলো এবং তারা এ বাসনা পোষণ করতে থাকলো যেন তাদের বংশেরই ছেলেটি বিবাহ হয়।

(****১) এ ঐ ঘটনার অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণ। কাবা নির্মাণের পর হজ্বের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান হযরত ইব্রাহীরেম (আ) যমানায় শুরু হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত শত শত, হাজার হাজার এবং লক্ষ কোটি মানুষ এ ঘটনার স্মরণে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ী করে আসছে। এ হাজার হাজার বছরের পুনঃপৌনিক আমল যা কোন সময়ে বন্ধ হওয়া ব্যতীত আজ পর্যন্ত চলে আসছে। এ ঘটনার এ এমন কোন প্রমাণ যার থেকে অধিকতর ঐতিহাসিক প্রমাণ দুনিয়ার আর কোন ঘটনায় পাওয়া যায় না। এর বিপরীত ফারানের বিজন প্রান্তরে যে (পূর্ব পৃঃ পর) ঘটনার বর্ণনা দিযেছে, সেখানে বা পূর্বে এ ধরনের কোন সায়ী হয়েছে আর না আজ হয়।

() এ ইয়েমেনের প্রাচীন কাহতানী আরবদের একটি গোত্র।

(১) হযরত ইব্রাহীরেম (আ) ভাষাও আরবী ছিল না। তিনি ছিলেন ইরাকবাসী। তারপর কান্‌আনে বসবাস করতে থাকেন। হযরত হাজেরার ভাষাও আরবী ছিল না। তিনি ছিলেন মিশরীয়।]

পুত্র কুরবানীর ঘটনা

হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর প্রিয় পুত্রকে সেই উপত্যকা প্রান্তরে ছেড়ে আসার পর তাকে অযত্নে ফেলে রাখেননি। বরঞ্চ মাঝে মধ্যে খবরাখবর নেয়ার জন্যে আসতেন এবং কিছুদিন স্ত্রীপুত্রের কাছে অবস্থানও করতেন। তিনি স্ত্রী ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে এ স্থানে ছেড়ে যাওয়ার সময় দোয়া করেছিলেন। (আরবী*********************)

-হে আমার রব। এ শহরকে তুমি নিরাপদ করে দাও। ঠিক দোয়া অনুযায়ী এ জনবিরল স্থানটি এখন একটি বস্তিতে পরিণত হযেছে। অনুমান করা যেতে পারে যে হযরত ইব্রাহীম (আ) ইতিমধ্যে জুরহুমীয়দের মধ্যে ইসলাম প্রচারও অবশ্যই করে থাকবেন। তারপর সে ঘটনা সংঘটিত হয় যা মানবীয় ইতিহাসে নজীরবিহীন। অর্থাৎ হযরত ইব্রাহীম (আ) বার্ধক্যের সন্তান, প্রথম ও একমাত্র পুত্রকে নবযৌবন কালে খোদার ইংগিতে কুরবানী করার জন্যে তৈরী হলেন। কুরআনে এ ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

(আরবী*********************)

-তারপর যখন ছেলেটি তার সাথে দৌড়ে চলাফেরার বয়সে পৌছলো তখন একদিন ইব্রাহীম বল্লো, পুত্র। আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, যেন জবেহ করছি। এখন বল, তুমি কি বলছ? সে বল্লো, আব্বা! আপনাকে যে আদেশ করা হচ্ছে তা করে ফেলুন। আপনি ইনশাআল্লাহ আমাকে ধের্যশীল দেখতে পাবেন। অবশেষে তাঁরা উভয়ে যখন খোদার আনুগত্যে মস্তক অবনত করলো এবং ইব্রাহীম  (আ) তার পুত্রকে মাথার উপুর করে ফেল্লো এবং আমরা তাকে ডাক দিয়ে বল্লাম, হে ইব্রাহীম। তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমরা নেক্কার লোকদেরকে এমনি প্রতিদান দিযে থাকি। নিশ্চিত রূপে এ এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা এবং আমরা একটি বড়ো কুরবানী ফিদিয়া স্বরূপ দিয়ে দিলাম এবং এ সন্তানকে রক্ষা করলাম (সাফ্‌ফাত : ১০২-১০৭)। এ ঘটনা মক্কায় সংগটিত হয় [কুরআনে এ স্থানের নাম ‘বাক্কা’ও বলা হয়েছে (আলে ইমরান : ৯৬)। কিন্তু ইবনে হিশামের (প্রথম খন্ড পৃঃ ১১৯) বর্ণনামতে জানা যায় যে এটা তার প্রাচীন নাম নয় বরঞ্চ পরবর্তীতে যখন তার হারামের মর্যাদা লাভ হয় তখন তাকে এ নামেও অবিহিত করা হয়। ইবনে হিশাম বলেন, মক্কাকে বাক্কা এ জন্যে বলা হয় যে, (****************) সে স্বৈচারাবীরেদ ঘাড় ভেঙ্গে দেয়। তিনি অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করে বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে মক্কা কোন জুলুম ও বাড়াবাড়ি বেশীদিন টিকে থাকতে দিত না। যারাই বাড়াবাড়ি করেছে তাদেরকে এ শহর থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছে –(গ্রন্থকার)] এবং হযরত ইব্রাহীম (আ) যে স্থানে পুত্রকে কুরবানী করার জন্যে নিয়ে গিয়েছিলেন তা ছিল মিনা সেখানে আজ পর্যন্ত ঐ তারিখেই (১০ই জিলহজ্ব) করা হচ্ছে[মিনায় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন এ জন্যে ছিল যে সে সময়ে মক্কায় জনবসতি গড়ে উঠেছিল এবং হযরত ইসমাইলের (আ) মাতাও সেখানে অবস্থান করতেন। একারণেই হযরত ইব্রাহীম (আ) মক্কার বাইরে মিনার জনবিরল পাহাড়ী অঞ্চলে পুত্রকে নিয়ে যান।] উপরন্তু তকন ঘটে যখন হযরত ইসমাইলের (আ) বয়স বারো তেরো বছরের বেশী ছিল না। তখন হযরত ইসহাকে জন্ম হয়নি। কারণ এ সূরায়ে সাফ্‌ফাতে এ ঘটনা বিবৃত করার পর আল্লাহ তায়ালা বলেন-

(আরবী*********************)

-এবং আমরা ইব্রাহীমকে নেক নবীগণেল মধ্যে একজনের সুসংবাদ দিই (আয়াত ১১২)

উপরোক্ত আয়াতগুলোর কিচু ব্যাখ্যা প্র্রয়োজন যা নিম্নে দেয়া হলো:-

(১) হযরত ইব্রাহীম (আ) স্বপ্নে এটা দেখেননি যে, তিনি পুত্রকে জবেহ করে ফেলেছেন। বরঞ্চ দেখেন যে জবেহ করছেন। কিন্তু সে সময়ে তিনি স্বপ্নের এ অর্থই বুঝেছিলেন যে, আল্লাহ তাঁর সঠিক ঈমান পরীক্ষা করার জন্যে পুত্রের কুরবানীর নির্দেশ দিচ্ছেন। এজন্যে তিনি ঠান্ডা মাথায় কলিজার টুকরো পুত্রকে করবানী করার জন্যে তৈরী হলেন।

(২) পুত্রকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্য এ ছিলনা যে পুত্র সম্মত হলে তিনি আল্লাহর হুকুম পালন করবেন, সম্মত না হলে করবেন না। বরঞ্চ হযরত ইব্রাহীম (আ) দেখতে চেয়েচিলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকটে যে নেক সন্তানের জন্যে দোয়া করেছিলেন, সে কি পরিমাণ নেক। যদি সে নিজেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে জীবন দিতে তৈরী হয় তাহলে তার অর্থ এই যে, দোয়া পুরোপুরি কবুল হয়েছে এবং পুত্র দৈহিক দিয়েই তাঁর সন্তান নয় বরঞ্চ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও তাঁর প্রকৃত প্রশংসনীয় সন্তান।

(৩) হযরত ইসমাইলের (আ)- “যে জিনিসের আদেশ আপনাকে করা হযেছে তা করে ফেলুন” –একথা বলার অর্থ তিনি তাঁর পয়গম্বর পিতার স্বপ্নকে আল্লাহর হুকুম এবং অহীর স্থলাভিষিক্ত মনে করতেন। তাঁর এ ধারণা সঠিক না হলে হযরত ইব্রাহীম (আ) বলতেন, এ নিছক স্বপ্ন-আদেশ নয় এবং আল্লাহ তায়ালাও এ সব আয়াতে তাঁর ধারণা খন্ডন করতেন। একথা ওসব যুক্তির অন্যতম যার ভিত্তিতে ইসলামে নবীর স্বপ্নকে অহীর প্রকার গুলোর মধ্যে একটি গণ্য করা যায়।

(৪) হযরত ইব্রাহীম (আ) পুত্রকে কুরবানী করার জন্যে চিৎ করে ফেলেননি, বরঞ্চ মুখ উপর করে ফেলেন যাতে সন্তানের মুখ দেখে পুত্রস্নেহে হস্ত কম্পিত না হয়। এজন্য তিনি চেয়েছিলেন নীচে হাত দিয়ে গলায় ছুরি চালাবেন।

(৫) হযরত ইব্রাহীম (আ) কর্তৃক পুত্রকে জবেহ করার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ইব্রাহীম। তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ।” আল্লাহর এ ঘোষণা এজন্যে অত্যন্ত ন্যায় সংগত ছিল যে, স্বপ্নে এ দেখানো হয়নি যে তিনি পুত্রকে জবেহ করে ফেলেছেন। বরঞ্চ এটা দেখানো হয়েছিল যে, তিনি এমন করেছেন। এ জন্যে স্বপ্নে যা দেখানো হয়েছিল তা যখন তিনি পূর্ণ করলেন তখন এরশাদ হলো, “তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ এবং সে বিরাট পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ, যে পরীক্ষায় আমরা তোমাকে ফেলেছিলাম। আমরা তোমাদের নেকবান্দাহদের এ ধরনেরই প্রতিদান দিয়ে থাকি, যেমন তোমাকে দিলাম। তোমার হাতে পুত্রকে কতল না করিয়েও তোমার দ্বাপরা এ বহিঃপ্রকাশ ঘটালাম যে, তুমি আমাদের মহব্বতে নিজের সন্তনকেও কুরবাণী করতে পার।

(৬) ‘বড়ো কুরবানীর’ অর্থ দুম্বাও হতে পারে যা হযরত ইসমাইলের বিনিময়ে জবেহ করার জন্যে আল্লাহর ফেরেশতাগণ হযরত ইব্রাহীমকে এনে দিয়েছিলেন। এর অর্থ সে কুরবানীও হতে পারে যা সে সময় থেকে নবী মুহাম্মদ (স) যুগ পর্যন্ত হয়ে এসেছে এবং নবীর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত হজ্ব ও ঈদুল আযহার সময়ে দুনিয়ার সকল মুসলমান করছে।

কুরবানী হযরত ইসহাককে করা হযেছিল, না ইসমাইলকে?

উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, বনী ইসরাইলের অভ্যাস ছিল প্রত্যেক গেরবজনক বিষয়কে নিজেদের বলে উল্লেখ করা এবং অন্যের জন্যে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করা অথবা অনেক গৌরর নিজের বলে দাবী করা। এ অভ্যাস অনুযায়ী পুত্র ‍কুরবানীর এ ঘটনাকে তারা হযরত ইসমাইলের (আ) পরিবর্তে হযরত ইসহাকের (আ) প্রতি আরোপ করে। বাইবেল বলে:

“খোদা আবরাহামকে পরীক্ষা করেন এবং তাকে বলেন তুমি তোমার প্রিয় ও একমাত্র পুত্র ইসহাককে সাথে নিয়ে মুরিয়া দেশে যাও এবং সেখানে পাহাড় গুলোর মধ্যে একটি পাহারে-যা তোমাকে বলে দিব জ্বালিয়ে কুরবানী কারার জন্যে পেশ কর” (সৃষ্টিতত্ব-অধ্যায়-২২-শ্লোক: ১-২)।

এ বর্ণায় একদিকে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তায়ালা ইসহাকের (আ) কুরবানী চেয়েছিলেন এবং অপরদিকে বলা হচ্ছে তিনি একমাত্র পুত্র ছিলেন। অথচ স্বয়ং বাইবেলের অন্যান্য বর্ণনা থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত যে, হযরত ইসহাক একমাত্র পুত্র চিলেন না। এর জন্যে বাইবেলের নিম্নোক্ত ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য:-

“এবং আবরাহামের বিবি সারার কোন সন্তা্ন ছিল না। তার একজন মিশরীয় ক্রীত দাসী ছিল যার নাম ছিল হাজেরা। এবং সারা আবরামকে বল্লো, দেখ খোতা ত আমাকে সন্তান থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। অতএব তুমি আমর ক্রীতদাসীর কাছে যাও। সম্ভবতঃ তার দ্বারা আমার ঘরে সন্তান লাভ হবে। এবং আবরাম সারার কথায় সম্মত হলো, এবং কানআন দেশে দশ বছর বাস করেন, যেসেময়ে সারা তার মিশরীয় ক্রীতদাসী তাকে (আবরাম) দান করে তার বিবি হাওয়ার জন্যে। এবং সে হাজেরার নিকটে গমন করে এবং সে গর্ভবতী হয়ঃ (সৃষ্টিতত্ব-অধ্যায় ৬৫-শ্লোক: ১-৩)।

“খোদার ফেরেশতা তাকে বল্লো, তুমি গর্ভবতী এবং তোমার ‍পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। তার নাম ইসমাইল রেখো” (সৃষ্টিতত্ত্ব -১৬: ১১)।

“যখন হাজেরার গর্ভে ইসমাইল জন্মগ্রহণ কলো তখন আবরামের বয়স ৮৬ ছিল” (সৃষ্টিতত্ত্ব- ১৬: ১৬) এবং খোদাওন্দ আবরামকে বলেন- তোমার বিবি সারা থেকেও তোমাকে এক পুত্র দান করব তার নাম ইসহাক রাখবে, যে সামনের বছর এ নির্দিষ্ট সময়ে সারার গর্ভে জন্মগ্রহণ করবে- তখন আবরাম তার পুত্র ইসমাইল এবং ঘরের সকল পুরুষকে নিল এবং ঐদিনই খোদার হুকুমে তাদের খাৎনা করলো- খাৎনার সময় আবরামের বয়স ছিল ৯৯ বছর এবং ইসমাইলের খাৎনা হয় তের বছর বয়সে” (সৃষ্টিতত্ব:- অধ্যায় ১৭: ১৫-২৫)।

-এবং যকন তার পুত্র তার থেকে পয়দা হলো তখন আবরামের বয়স ছিল একশত বচর (সৃষ্টিতত্ব:- ২১: ৫)।

এর থেকে বাবেলে স্ববিরোধী বর্ণনা সুস্পষ্ট হযে যায়। একথা সুস্পষ্ট যে, চৌদ্দ বছর পর্যন্ত হযরত ইসমাইল (আ) হযরত ইব্রাহীরেম (আ) একমাত্র পুত্র ছিলেন। কুরবানী যদি একমাত্র পুত্রের চাওয়া হয়ে থাকে, তা হলে তা হযরত ইসহাকের (আ) নয়, হযরত ইসমাইলের (আ) চাওয়া হয়েছিল্। কারণ তিনিই একমাত্র পুত্র ছিলেন। আর যদি ইসহাকের কুরবানী চাওয়া হয়ে থাকে তাহলে একথা ভুল যে একমাত্র পুত্রের কুরবানী চাওয়া হয়েছিল।

তারপর যদি আমরা ইসলামী রেওয়ায়েতগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে বিরাট মতপার্থক্য দেখতে পাই। তফসীলকারগণ সাহাবী ও তাবেঈনের যে সব বর্ণনা উধৃত করেছেন তাঁদের মধ্যে একদলের বর্ণনা এই যে, সে পুত্র হযরত ইসহাক ছিলেন। এ দলের মধ্যে নিম্নের বুযুর্গানের নাম পাওয়া যায়-

হযরত ওমর (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা), হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত আবু হুরায়রা (রা), কাতাদাহ, একরামা, হাসানবাসরী, মুজাহিদ, শ’বী, মাসরূক, মাকহুল, যুহরী, আতা মাকাতিল, সাদ্দী, কা’বাই আহবার, যায়েদ বিন আসলামহ প্রমুখ মনীষীবৃন্দ।

দ্বিতীয় দল বলে যে, তিনি ছিলেন হযরত ইসমালি (আ)। এ দলের মধ্যে নিম্নের বুযর্গান রয়েছেন:

হযরত আবু বকর (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত আবূ হুরায়রাহ (রা) হযরত মায়াবিয়া (রা), একরেমা, মুজাহিদ, ইউসুফ বিন মিহরান, হাসান বাসরী, মুহাম্মদ বিন কায়াব, আল কুরাযী, শা’বী, সাঈদ বিন মুসাইয়াব, তাহ্‌হাক, মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন (ইমাম মুহাম্মদ বাকের), রাবী বিন আনাস, আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ মনীষীগণ।

এ দুটি তালিকা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, কিছু নাম উভয় দলের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তির দুটি পরস্পর বিরোধী উধৃত করা হযেছে। মেযন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে একরেমা এ উক্তি উধৃত করেছেন যে, পুত্র হযরত ্সহাক ছিলেন। কিন্তু তাঁর থেকেই আবার আতা বিন আবি রাবাহ এ উক্তি উধৃত করেচেন যে, “ইহুদীর দাবী যে, তিনি ছিলেন হযরত ইসহাক।” কিন্তু ইহুদী মিথ্যা কথা বলে।” এরূপ হযরত হাসান বাসরী থেকে একটি বর্ণনা এমন পাওয়া যায় যে, তিনি হযরত ইসহাকের (আ) জবেহ হওয়া সমর্থন করেন। কিন্তু আমর বিন ওবায়েদ বলে যে হাসান বাসরীর এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) এর যে, পুত্রকে জবেহ করার হুকুম হয়েছিল তিনি হযরত ইসমাইল (আ)। এ মতানৈক্রের ফল এ হয়েছে যে, আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ অতি বিশ্বস্ততার সাথে হযরত ইসহাকের সপক্ষে রায় দেন। যেমন ইবনে জারীর ও কাজী ইয়ায। কেউ কেউ আবার নিশ্চিত করে বলেন যে, জবেহ হযরত ইসমাইলকে করা হয়। যেমন ইবনে কাসীর, কেউ কেউ আবার দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন, যেমন জালালুদ্দীন সুইউতী। কিন্তু যদি গবেষণা অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে দেখা যায়, তাহলে এ বিষয়ে কোন সন্দেহের লেশ থাকে না যে, হযরত ইসমাইলকেই (আ) জবেহ করা হয়েছিল, তার যুক্তি নিম্নরূপ:-

(১) সূরায়ে সাফ্‌ফাতে আল্লাহ তায়ালার এ এরশাদ দেখতে পাওয়া গেল যে, জন্মভূমি কে হিজরত করার সময় হযরত ইব্রাহীম (আ) একজন নেক পুত্রের দোয়া করেছিলেন। তার জবাবে আল্লাহতায়ালা তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেন। কথার ধরন থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ দোয়া তিনি তখন করেন যখন তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তারপর সুসংবাদ যে পুত্রের দেয়া হয় তা তাঁর প্রথমপুত্রের। তারপর এ সুরার কথার ধারাবাহিকতা একথা প্রকাশ করে যে, সেই পুত্রই যখন পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি করার যোগ্য হলেন তখন তাঁকে জবেহ করার ইংগিত করা হলো। এখন একথা নিশ্চিতরূপে প্রাণিত যে হযারত ইব্রাহীমের (আ) প্রথম সন্তান হযরত ইসমাইল (আ) ছিলেন, হযরত ইসহাক নন।

স্বয়ং কুরআন পাকে পুত্রদ্বয়ের ক্রমি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:-

(আরবী***************)

-শোকর সেই আল্লাহর যিনি আমার বার্ধক্যে আমাকে ইসমাইল ও ইসহাক দান করেন-(ইব্রাহীম: ৩৯)।

(২) কুরআন পাকে যে হযরত ইসহাকের (আ) সংবাদ দেয়া হযেছে, সেখানে গোলামিন আলীম (জ্ঞানবান পুত্র) শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হয়েছে (যারিয়াত : ২৮) এবং সূরায়ে বলা হয়েছে: (আরবী*************)

ভয় করোনা, তোমাকে একজন গোলাম আলীমের সুসংবাদ দিচ্ছি- (হিজ্বর: ৫৩)। কিন্তু সূরায়ে সাফ্‌ফাতে যে পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, সেখানে গোলামিন হালীম- (ধৈর্যশীল পুত্রের) শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হয়েছে। এর থেকে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, উভয় পুত্রের সুস্পষ্ট গুণাবলী পৃথক পৃথক ছিল এবং জবেহের হুকুম গোলামিন আলীমের জন্যে নয়, গোলামিন হালীমের জন্যে ছিল্ কারণ পুত্র কুরবানীর ঘটনা সেই পুত্রের জন্ম হওয়ার এবং যৌবনের কাছাকাছি পৌছার পর ঘটেছে এবং দ্বিতীয় পুত্রের জন্মের সুসংবাদ তার পর দেয়া হয়েছে।

(৩) কুরআন পাকে হযরত ইসহাকের (আ) জন্মের সুসংবাদ দিতে গিয়ে সাথে সাথে এ সুসংবাদ দেয়া হয় যে, তাদের বংশে ইয়াকুব (আ) এর মতো পুত্রও জন্মগ্রহণ করবেন: (আরবী***************)।

-আমরা তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের –(হুদ: ৭১)।

একথা সুস্পষ্ট যে, পুত্রের জন্মের সংবাদ দেয়ার সাথে সাথে এ সংবাদ দেয়া হলো যে তার একজন যোগ্য পুত্র পয়দা হবে, সে সম্পর্কে যদি হযরত ইব্রাহীমকে (আ) এ স্বপ্ন দেখানো হতো তিনি তাকে জবেহ করছেন, তাহলে হযরত ইব্রাহীম (আ) তার থেকে একথা কখনো বুঝতে পারতেন না যে, এ পুত্রকে কুরবানী করার ইংগিত করা হচ্ছে। কারণ তাকে কুরবানী করে দেয়ার পর তাঁর ঔরসে পুত্র অর্থাৎ হযরত ইয়াকুব (আ) জন্মগ্রহণ করার প্রশ্নই উঠতোনা।

আল্লামা ইবনে জারীর এ যুক্তির জবাব এভাবে দেন যে, সম্ভবতঃ এ স্বপ্ন হযরত ইব্রাহীমকে সে সময় দেখানো হয়েছিল যখন হযরর ইসহাকের ঘরে হযরত ইয়াকুব (আ) জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু এ এত অত্যন্ত দুর্বল জবাব। কুরআন পাকের শব্দগুলো হচ্ছে: “যখন সে ছেলে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি করার যোগ্য হলো”- তখন এ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। নিরপেক্ষ মন নিয়ে কেউ এ শব্দগুলো পাঠ করলে তার মনে আট, দশ অথবা বড়ো জোড় বারো তেরো বছরের বালকের চিত্রই ভেসে উঠবে। কেউ এ ধারণাও করতে পারে না যে, যুবক এবং সন্তানের পিতা হয়েছে এমন পুত্রের জন্যে এ শব্দ গুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।

(৪) আল্লাহ তায়ালা গোটা কাহিনী বর্ণনা করার পর অবশেষ বলেন: “আমরা তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিই- একজন নেক নবীর”। এর থেকে স্পষ্টই জানতে পারা যায় যে, এ সেই পুত্র নয় যাকে জবেহ করার ইংগিত করা হয়েছিল। বরঞ্চ প্রথমে অন্য কোন ‍পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। তারপর যখন সে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি চলাফেরার যোগ্য হলো, তখন তাকে জবেহ করার হুকুম দেয়া হলো। অতঃপর যখন হযরত ইব্রাহীম (আ) এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তখন তাঁকে আর এরক পুত্র ইসহাক জন্মগ্রহণ করার সুসংবাদ দেয়া হলো। এ ক্রমিক ঘটনাবলী নিশ্চিতরূপে এ সিদ্ধান্ত করে দেয় যে, যে পুত্রকে জবেহ করার হুকুম করা হয়েছিল, হযরত ইসহাক (আ) ছিলেন না, বরঞ্চ সে পুত্র তাঁর কয়েক বছর পূর্বেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আল্লাম ইবনে জারীর এ সুস্পষ্ট যুক্তি  একথা বলে খন্ডন করেন যে, প্রথমে হযরত ইসহাকের (আ) জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়। তারপর যখন তিনি খোদার সন্তুষ্টির জন্যে জীবন দিতে তৈরী হয়ে গেলেন, তখন তাঁর পুরস্কার এ আকারে দেয়া হলো যে, তাঁর নবী হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হলো। কিন্তু তাঁর এ জবাব প্রথম জবাব থেকে অধিকতর দুর্বল। যদি প্রকৃত পক্ষে ব্যাপার তাই হতো তাহলে আল্লাহ তাযালা এ ঘটনা প্রসংগে এমন কথা বলতেন না –“আমরা তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম”। -বরঞ্চ একথা বলতেন- “আমরা তাকে এ সুসংবাদ দিলাম- তোমার এ পুত্রই নবী হবে নেককারদের মধ্য থেকে।”

(৫) নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসূত্রে একথা প্রমাণিত যে, হযরত ইসমাইলের (আ) ফিদিয়া স্বরূপ যে দুম্বা জবেহ করা হয়েছিল, তার শিং হযরত আবদুল্লাহ বিন যাবাইরের (রা) সময় পর্যন্ত খানায়ে কাবায় সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীকালে যখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হেরেমে ইবনে যুবাইরকে (রা) অবরুদ্ধ করেন এবং খানায়ে কাবা ধ্বংস করেন, তখন সে শিং বিনষ্ট হয়। ইবনে আব্বাস (রা) এবং আমের শা’বী (রহ) সাক্ষ্য দেন যে তাঁরা স্বয়ং খানায়ে কাবার এ শিং দেখেছেন (ইবনে কাীর)। একথারই প্রমাণ যে, কুরবানীর এ ঘটনা শাসদেশে সংঘটিতে হয়নি, বরঞ্চ মক্কায় হয়েছে, তা হয়েছে ইসমাইলের (আ) সাতে। এজন্যেই ত হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং ইসমাইল (আ) কর্তৃক নির্মিত খানায়ে কাবায় তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

(৬) বহু শতক যাবত একথা আরব দেশের ঐতিহ্যে সংরক্ষিত ছিল যে কুরবানীর এ ঘটনা মিনায় সংঘটিত হয়। এ শুধু ঐতিহ্যই নয়। বরঞ্চ সে সময় থেকে নবী করীমের (স) যামানা পর্যন্ত হজ্বের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে একাজটিও বরাবর সংশ্লিষ্ট হয়ে এসেছে যে, ঐ মিনার স্থানে গিয়েই লোক কুরবানী করতো যে স্থানে হযরত ইব্রাহীম (আ) কুরবানী করেছিলেন। তারপর যখন নবী মুহাম্মদ (স) শেষ নবী হিসাবে প্রেরিত হলেন, তখন তিনিও সেই প্রথাই চালু রাখলেন। এমন কি আজ পর্যন্ত হজ্বের সময় ১০ই যুলহজ্বে মিনায় কুরবানী করা হয়ে থাকে। সাড়ে চার হাজার বছরের এ ক্রমাগত কাজ একথারই অনস্বীকার্য প্রমাণ যে, হযরত ইব্রাহীমের (আ) এ কুরবানীর উত্তরাধিকারী বনী ইসমাইল হয়েছেন, বনী ইসহাক নয়। হযরত ইসহাকের (আ) বংশে এমন কোন প্রথা প্রচলিত ছিল না যার জনে গোটা জাতি একই নামে সমযে কুরবানী করতো এবং তাকে হযরত ইব্রাহীমের (আ) কুরবানীর স্মৃতি বলে বিবেচিত হতো।

এসব এমন যুক্তি প্রমাণ যা দেখার পর অবাক লাগে যে স্বয়ং উম্মতে মুসলেমার মধ্যে হযরত ইসহাকের (আ) জবেহ হওয়ার ধারণা কিভাবে বিস্তার লাভ করলো। ইহুদীগণ যদি হযরত ইসমাইলকে (আ) মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে তাদের পূর্বপূরুষ হযরত ইসহাকের (আ) প্রতি এ মর্যাদা আরোপিত করার চেষ্টায় থাকে, তাহলে বোধগম্য হয়। কিন্তু মুসলমানদের বিরাট সংখ্যক লোকের একটি দল তাদের এ শঠতা কি করে মেনে নিল। এ প্রশ্নের বড়ো সন্তোষ জনক জবাব দিযেছেন আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে। তিনি বরেন: “প্রকৃত পক্ষে হযরত ইসহাকের (আ) জবেহ হওয়ার সপক্ষে যতো কথা বলা হযেছে, তা সব কা’বে আহবার থেকে বর্ণিত। এ ভদ্রলোক যখন ওমরের (রা) যামানায় মুসলমান হন, তখন তিনি ইহুদী ও নাসারাদের প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে উল্লেখিত বিষয়গুলো তাঁকে শুনাতেন এবং হযরত ওমর (রা) সেসব শুনতেন। তা জন্যে অন্যান্যগণও তাঁর কথা শুনতে থঅকে এবং আগড়ম বাগড়ম যা কিছুই তিনি বলতেন তা আবার তাঁরা বর্ণনা করতেন। অথচ এ সব বিষয়ের কোন কিছু জানার প্রয়োজন এ উম্মতের ছিলনা।”

এ প্রশ্নের উপর অতিরিক্ত আলোকপাত করে মুহাম্মদ বিন কাব কুরাযীর বর্ণনা। তিনি বলেন, একবার আমার উপস্থিতিতে হযরত ওমর বিন আবদুল আযীযের (র) নিকটে এ প্রসংগ তোলা হয় যে, জবেহ হযরত ইসহাককে (আ) করা হয়েছিল, না হযরত ইসমাইল (আ)কে। সে দরবারে এমন এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন যিনি প্রথমে ইহুদী আলেমদের মধ্য গণ্য হতেন। পরে তিনি আন্তরিকতাসহ ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, আমীরুল মুমেনীন খোদার কসম (যাঁকে কুরবানী করা হয়েছিল) তিনি ইসমাইল ছিলেন। একথা ইহুদীরাও জানতো। কিন্তু তাঁরা আরবদের সাথে হিংসার বশবর্তী হযে এ দাবী করে যে হযরত ইসহাককে (আ) জবেহ করা হয়েছিল (ইবনে জারীর)।

এদুটি কথা একত্রে মিলিত করে দেখলে জানা যায় যে, প্রকৃত পক্ষে এ ছিল ইহুদী প্রচার প্রোপাগান্ডা যা মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর মুসলমানগণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে কোন গোঁড়ামি পোষণ করতোনা। এ কারণে তাদের মধ্যে অনেক ইহুদীদের ঐসব বর্ণনা, যা প্রাচীন গ্রন্থাবলীর সূত্রে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের আবরণে তারা পেশ করতো, বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতা মনে করে মেনে নেয় এবং একথা অনুভব করেনি যে, এতে জ্ঞানের পরিবর্তে ছিল পক্ষপাতিত্ব ও বিদ্বেষ।

কাবার নির্মাণ

প্রথমে এ কথা বলা হয়েছে যে, যমযমের বরকতে জুরহুম গোত্রের বিভিন্ন পরিবার হযরত ইসমাইল (আ) ও হযরত হাজেরার (রা) নিকটে এসে বসতি স্থাপন করে এবং মক্কা একটি শহরে রূপ ধারণ করছিল। এটাও উল্লেখ করা হযেছে যে, হযরত হাজেরার মিশুকতার কারণে নতুন নতুন বসতি স্থাপনাকারীদের সাথে মাতাপুত্রের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। হযরত ইসমাইল

(কাবা শরীফের মানচিত্র)

(আ) তাদের মধ্যেই পালিত ও বাধিত হন। তিনি যখন যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর অনুপম চরিত্র ও গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে জুরহুমীয়গণ এ অভিলাষ পোষণ করে যে, তাদের সাথে হযরত ইসমাইলকে (আ) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করবে। বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বর্ণনা মতে প্রথম একটি বালিকার সাথে হযরত ইসমাইলের (আ) বিযে হয়। কিন্তু সে পুত্রবধু হযরত ইব্রাহীরেম (আ) পছন্দ হয় না। এজন্যে হযরত ইসমাইল (আ) তাকে পরিত্যাগ করে এমন এক বালিকাকে বিযে করেন যাকে হযরত ইব্রাহীম (আ) পছন্দ করেন। তার পক্ষে তাঁর বারো ‍পুত্র জন্মগ্রহণ করে। বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইসমাইলের (আ) প্রথম বিযের পরই হযরত হাজেরা (রা) জান্নাতবাসিনী হন।

তারপ হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর আসল কাজ করার জন্যে মক্কা তাশরিফ আনেন, যে উদ্দেশ্যে তিরিশ বছর পূর্বে তাঁর পরিবারের এ অংশকে পানি ও তরুণবিহীন উপত্যকা প্রান্তরে এনে পুনর্বাসিত করেছিলেন। বুখারীতে ইবনে আব্বাস (রা) এর যে বর্ণনার উল্লেখ আমরা উপরে করেছি তাতে তিনি সামনে অগ্রসরত হয়ে বলছেন, একদা যমযমের পাশে গাছের নীচে হযরত ইসমাইল (আ) বসে তীর নির্মাণ করছিলেন। এমন সময়ে হঠাৎ ইব্রাহী (আ) সেখানে পৌছেন। হযরত ইসমাইল (আ) তাঁকে দেখামাত্র দাঁড়িযে গেলেন এবং পিতাপুত্র ইভয়ে এভাবে মিলিত হলেন যেভাবে তার পিতার সাথে এবং পিতা তার পুত্রের সাথে মিলিত হয়। তারপর হযরত ইব্রাহীম (আ) বলেন, ইসমাইল! আল্লাহতায়ালা আমাকে একটি কাজের আদেশ করেছেন। তদুত্তরে হযরত ইসমাইল (আ) বলেন, আপনার রব যে কাজের আদেশ করেছেন তা অবশ্যই করুন। ইব্রাহীম (আ) বল্লেন, তুমি এ কাহে আমাকে সাহায্য করবে? তিনি বলেন, জি হাঁ নিশ্চয় আমি আপনার সাহায্য করব? তারপর হযরত ইব্রাহীম (আ) উপত্যকার সে অংশটির দিকে ইংগিত করলেন যা চারপাশের যমীন থেকে কিছুটা উঁচু ছিল এবং বল্লেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাবার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব দুই পিতাপুত্র মিলে বায়তুল্লাহর ভিত্তি নির্মাণ করেন। হযরত ইসমাইল (আ) পাথর এনে দিতেন এবং ইব্রাহীম (আ) দেয়াল গেঁথে চলেন। দেয়াল যথেষ্ট উঁচু হওয়ার পর হযরত ইব্রাহীম (আ) সে পাথর তুলে আনেন যা মুকামে ইব্রাহীম নামে প্রসিদ্ধ। হযরত ইব্রাহীম (আ) তার উপর উঠে পাথর গাঁথতে থাকেন এবং দেয়াল আরও উঁচু করেন।

আরব এবং সারা দুনিয়ার কাবার মর্যাদা

এ ঘরখানি নিছক একটি এবাদতের স্থানই ছিল না। যেমন মসজিদগুলো হয়ে থাকে। বরঞ্চ প্রথম দিন থেকেই দ্বীন ইসলারেম বিশ্বজনীন আন্দোলনের প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্র গণ্য করা হযেছে। উদ্দেশ্য ছিল যে, এক খোদাকে যারা মানে তারা প্রতিটি স্থান থেকে বের হয়ে এখানে এসে সমবেত হবে, সকলে মিলে খোদার এবাদত করবে এবং ইসলামের বাণী সাথে ‍পুনরায় কেনদ্রটি কিভাবে তৈরী হয়েছিল? কোন্‌ ভাবাবেগ ও দোয়ার সাথে উভয় পিতাপুযত্র এ গৃহের দেয়াল নির্মাণ করেছিলেন এবং কিভাবে হজ্বের সূচনা করেন এর বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে এভাবে বয়ান করা হয়েছে।

(আরবী***************)

-বস্তুতঃ প্রথম যে ঘর মানুষের জন্যে নির্ধারিত করা হয়েছিল তা হচ্ছে সেই ঘর যা মক্কায় নির্মাণ করা হয়। এ হচ্ছে বরকতপূর্ণ ঘর এবং সমস্ত দুনিয়াবাসীদের জন্যে হেদায়েতের কেন্দ্র। এতে রয়েছে আল্লাহর সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী এবং মাকামে ইব্রাহীম। যে কেউ এখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা পেয়ে যাবে (আলে ইমরান: ৯৬)।

(আরবী***************)

-এরা কি দেখেনি আমরা কি রকম নিরাপদ হারাম বানিয়েছি। অথচ তার চারপাশে মানুষকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়া হয়। (আনকাবুত : ৬৭)

 অর্থাৎ আসবে দুহাজার বছর ধরে চারদিকে লুঠতরাজ, হত্যা, ধ্বংসলীলা, যুদ্ধ বিগ্রহ প্রচন্ডভাবে চলছিল, এ হারামে সর্বদা নিরাপত্তাই বিরাজ করতো। এমন কি অসভ্য বেদুইন পর্যন্ত তার সীমারেখার ভেতরে তার পিতার হত্যাকারীকে দেখতে পেলেও তার গায়ে হাত দিতে সাহস করতোনা।

(আরবী***************)

-এবং স্মরণ কর যখন আমরা এ ঘরকে লোকদের জন্যে কেন্দ্র, প্রত্যাবর্তনের ও নিরাপত্তার স্থান বানালাম এবং হুকুম দিলাম আমার ঘরের তাওয়াফকারী এবং রুকু সিজদাকারীদের জন্যে পাকসাফ রাখ।  এবং যখন ইব্রাহীম দোয়া করলো, পরওয়াদেগার। এ স্থানকে একটা নিরাপত্তাপূর্ণ শহর বানিয়ে দাও এবং এখানকার অধিবাসীদেরকে ফলমূলের রিযিক দান কর যারাই তারেদ মধ্যে আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান আনয়নকারী হবে- এবং ‍যখন ইব্রাহীম ও ইসমাইল এ ঘরের ভিত গড়ছিল তখন দোয়া করছিল –হে আমাদের পরওয়াদেগার! তুডিম আমাদের চেষ্টা কবুল কর। তুমি সবকিছু শ্রবণ কর ও জান। পরওয়াদেগার। তুমি আমাদের উভয়কে তোমার মুসলিম (অনুগত) বানাও। এবং আমাদের বংশ থেকে এমন এক জাতি উত্থিত কর যারা তোমার অনুগত হবে। এবং আমাদেরকে আমাদের এবাদতের পন্থা পদ্ধতি বলে দাও এবং আমাদের উপর তোমার কৃপা দৃষ্টি রাখ, তুমি বড়ো ক্ষমাকারী ও মেহেরবান। হে পরওয়ারদেগার। তুমি এসব লোকদের মধ্যে এদের কওম থেকে এমন এক রসূল পাঠাও যে তাদেরকে তোমার আয়াত শুনাবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদের চরিত্র পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই তুমি বিরাট শক্তিশালী ও বিজ্ঞ- (বাকারা:ঢ় ১২৫-১২৯)। (আরবী***************)

এবং যখন ইব্রাহীম দোয়া করলো পরওয়ারদেগার। এ শহরকে নিরাপদ শহর বানিয়ে দাও, আমাকে  এবং আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও। পরওয়ারদেগার। এসব প্রতিমা বহু লোককে গোমরাহ করেছে। অতএব যে কেউ আমার পথ অনুসরণ করবে সে আমার আর যে আমার পথ থেকে সরে পড়বে, তো তুমি ক্ষমাকারী ও মেহেরবান। পরওয়ারদেগার। আমি আমার বংশের একটি অংশ তোমার এ মহিমান্বিত ঘরের পাশে এ পানি ও তরুলতাহীন এপত্যকায় এনে পুনর্বাসিত করেছি যাতে করে হে পারওয়ারদেগার, তারা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের মনকে এমন অনুরক্ত করে দাও যেন তারা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হযে আসে এবং তুমি তাদেরকে ফলমূলের রিযিক দান কর। আশা করা যায় যে তারা কৃতজ্ঞ হবে- (ইব্রাহীম : ৩৫)

(আরবী***************)

এবং যখন আমরা ইব্রাহীমের জন্যে এ ঘরের স্থান নির্ধারিত করে দিলাম এ হেদায়েত সহ যে, কাউকে আমার সাথে শরীক করবেনা এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্যে পাকসাফ রাখবে এবং (হুকুম দিলাম) লোকের মধ্যে হজ্বের সাধারণ ঘোষণা দিয়ে দাও যাতে করে তোমার নিকটে তারা চলে আসে, তা পায়ে হেঁটে আসুক অথবা দূরদূরান্ত থেকে তুর্বল উটনীর উপর চড়ে, যাতে তারা দেখতে পায় যে তাদের জন্যে কত প্রকারের দ্বীনী ও ‍দুনিয়াবঢ লাভ রয়েছে। তারপর এ নির্দিষ্ট দিনগুলেতে আল্লাহ যে সব পশু তাদেরকে দিয়েছেন তাদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে অর্থাৎ কুরবানী করবে। সে সবের গোশত তারাও খাবে এবং নিঃস্ব  ও অভাবী লোকেরাও খাবে –(হজ্ব: ২৬-২৮)।

জাহেলিয়াতের যুগে খানায়ে কাবার বরকত

আরব দেশে কাবার মর্যাদা শুদু একটি এবাদতখানা হিসেবেই ছিলনা। বরঞ্চ তার কেন্দ্রীয় মর্যাদা ও পবিত্রতার কারণে তা গোটা দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবলম্বন হয়ে পড়েছিল। হজ্ব ও ওমারা জন্যে সমগ্র দেশ থেকে দলে দলে কাবার উদ্দেশ্যে লোক আসতো এবং এ জনসমাবেশের মাধ্যমে শতধা বিচ্ছিন্ন আরববাসীদের মধ্যে ঐক্যের এক সম্পর্ক স্থাপিত হতো। বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রের লোক পারস্পরিক তামাগদ্দুনিক সম্পর্ক স্থাপন করতো। কাব্য প্রতিযোগিতার ফলে তাদের ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি বিধান হতো। ব্যবসার লেনদেনের ফলে সারাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ হতো। হারাম মাসগুলোর [ হারাম মাসগুলো হচ্ছে: ওমরার জন্যে রজব মাস এবং হজ্বের জন্যে যিলকদ, যিলহজ্ব ও মহরম মাস। এসব মাসে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকতো। ওমরা ও হজ্বের উদ্দেশ্য ভ্রমণকারীদের পথে কেউ বিরক্ত করতো না –গ্রন্থাকার।] বদৌলতে বছরের এক তৃতীয়াংশ সময় আরববাসীদের শান্তি ও নিরাপত্তার সুযোগ মিলতো। এ সময়টাই এমন ছিল যে, তাদের বিভিন্ন কাফেলা দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারতো। কুরবানীর জন্যে গলায় পট্টি বাঁধা পশু তাদের সাথে থাকলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতে সুবিধা হতো। কারণ মানতের চিহ্ন স্বরূপ যেসব পশুর গলায় পট্টি বাঁধা থঅকতো, সেসব দেখার পর আরববাসীদের মস্তক শ্রদ্ধায় অবনমিত হতো। সে সবের উপর হস্তক্ষেপ করতে কোন লুন্ঠনকারী গোত্রেরও সাহস হতোনা।

হযরত ইসমাইলে (আ) রেসালাত ও আরববাসীদের উপর তার প্রভাব

যখন হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) খানায়ে কাবা নির্মাণ করেন এবং ঘরকে কেন্দ্র ও আশ্রয়স্থল ঘোষণা করে প্রতি বছর হজ্বের জন্যে খানায়ে কাবার আসার আহ্বান জানানো হয়, খুব সম্ভব সে সময়েই হযরত ইসমাইল (আ) কে নবুওতের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়, যাতে করে তিনি আরব দেশে দ্বীন ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তাঁর সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে : (আরবী***************)

-এবং এ কিতাবে ইসমাইলকে স্মরণ কর। সে ওয়াদা পালনে সত্যবাদী এবং রসূল ও নবী ছিল। সে তাঁর পরিবারস্থ লোকদের নামায ও যাকতের আদেশ করতো এবং আপন রবের কাছে পছন্দনীয় ছিল- (মরিয়ম : ৫৪-৫৫)

ইতিহাসের যদিও হযরত ইসমাইলের (আ) জীবন চরিত ও তাঁর রেসালাত সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না, কিন্তু তাঁর রেসালাত যে সার্থক ছিল তার প্রামাণ এই যে, সমগ্র আরবে খানায়ে কাবার একটা কেন্দ্রী মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হজ্ব ওমরার জন্যে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোক দলে দলে উৎসাহ উদ্দীপনাসহ আসতো। হজ্বের নিয়মনীতি তাই ছিল যা সূচনায় নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল। সাফা ও মারওয়ার সায়ী এবং যিলহজ্ব তারিখে মিনায় কুরবানী করার প্রথাও আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যা নিঃসন্দেহে হযরত হাজেরার (রা) সায়ী এবং হযরত ইব্রাহীমের (আ) কুরবানীরই স্মারণিক ছিল। হজ্ব ও ওমরার উদ্দেশ্যে চার মাস নিষিদ্ধকারণও সমগ্র আরবে সর্বস্বীকৃত ছিল। দ্বীনে ইব্রাহীরেম অন্যান্য বহু নিদর্শনও আরববাসীদের মধ্যে  প্রচলিত ছিল। যেমন, খাৎনা, নাপাকির গোসল (বীর্যস্খলন কারণে) পশু জবেহ করা, উট নহর করা, মুর্দা দাফন করা, বিবাহ-তালাক, বিধবার শোক পালনের নীতি, মা, বোন ও কন্যকে বিবাহের জন্যে হারাম মনে করা, খুনের বদলা খুন, প্রবৃতি। উপরন্তু কতিপয় জ্ঞানীব্যক্তি অজুও করতেন। কেউ কেউ নামায পড়তেন। যেমন কুস্‌ বিন্‌ সায়েদাতুল ইয়াদী। হযরত ্বু যরও ইসলাম গ্রহণের তিন বছর পূর্বে নামায পড়া শুরু করেন। যদিও জানা যায়নি যে তা কি ধরনের নামযড ছিল। তাছাড়া আরববাসীদের মধ্যে রোযা রাখারও প্রথা প্রচলিত ছিল। তারা এতেকাফও করতো। হাদীসে আছে, হযরত ওমর (রা) জাহেলিয়াতের জীবনে একরাত এতেকাফ করার মানত করেছিলেন। বহু কাজ এমন ছিল যা আরবাসী পুণ্যকাজ মনে করতো এবং তার প্রশংসাও করতো। যেমন মেহমান ও মুসাফিরকে খানা খাওয়ানো, মিসকীনদের সাহায্য করা, স্বজনদের হক আদায় করা প্রবৃতি। যদি হযরত ইসমাইলের (আ) রোসালাত অসাধারণ সাফল্য লাভ না করতো, তাহলে এটা সম্ভব ছিল না যে, আড়াই হাজার বছর যাবত জাহেলিয়াতের আঁধারে নিমজ্জি থাকা সত্ত্বেও নবী পাকের (সা) আগমন পর্যন্ত তাঁর প্রচারিত দ্বীনের নিদর্শনাবলী সমগ্র আরবব্যাপী অবশিষ্ট থাকতো। সবচেয়ে বড়ো  কথা এটা যে তাঁর এবং তার দ্বারা প্রভাবিত লোকদের তবলিগেরই এ প্রভাব যে আরবাসীদের মধ্যে নবীন আগমেনর সময় পর্যন্ত আল্লাহ সম্পর্কে সেসব ধারণাই পাওয়া যেতো, যার উল্লেখ কুরআন মজিদে স্থান করা হয়েছে। (যথা সূরা যুখরুফ: ৮৭, আনকাবুত : ৬১-৬৩, মুমেনুন: ৬১-৬৩, ইউনুস: ২২-২৩ ও ৩১, বনী ইসরাইল : ৬৭ দ্রষ্টব্য)।

এটাও ছিল রেসালাতে ইসমাইলের প্রভাব যে, নবী মুহাম্মদের (স) আগমন পর্যন্ত আরবে এমন সব লোকের একটি দল ছিল ইতিহাসে যাদেকে হানীফ নামে স্মরণ করা হয়। আরবের বিভিন্ন গোত্র বিভিন্ন স্থানে তাঁদেরকে পাওয়া যেতো। তাঁরা শির্ক অস্বীকার করতেন এবং তৌহীদের স্বীকৃতি দিতেন, তাঁরা দ্বীনে ইব্রাহরৈম অনুসরণ করতে আগ্রহী ছিলেন। আমরা তাফহীমুল কুরআনের চতুর্থ খন্ডে তাঁদের একটি তালিকা সন্নিবেশি করেছি। নিম্নে তাঁদের মধ্য থেকে কতিপয় ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করছি:

আন্নাবেগাতুল জা’দী- তিনি ছিলেন বনী আমের বিন সা’সায়া বংশের লোক। জাহেলিয়াতের যুগে তিনি দ্বীনে ইব্রাহীমি এবং হানিফিয়াত অর্থাৎ সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের কথা বলতেন। রোযা রাখতেন এবং ইস্তেগফার করতেন। তাঁর জাহেলিয়াতের যুগের কথাবার্তায় তৌহীদ, মৃত্যুর পরের জীবন, শাস্তি ও পুরস্কার,  জান্নাত, দোযখ প্রভৃতির উল্লেখ থাকতো। পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন (আল্‌ ইস্তিয়াব, প্রথম খণ্ড-পৃ. ৩১)।

সিরমা বিন আনাস- ইনি ছিলেন বনী আদী বিন নাজ্জার বংশোদ্ভুত। জাহেলিয়াতের যুগে দরবেশসুলব জীবন যাপন করেন। মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেন। জেনাবাতের গোসল করতেন, ‍ঋতুবর্তী নারী থেকে দূরে থাকতেন। মদ ও অন্যান্য মাদক দব্যাদি ঘৃণা করতেন। প্রথমতঃ ঈসায়ী হতে চেয়ে থেমে যান। মসজিদের মতো একটি ঘর তৈরী করেন। গোসল ফরয হয়েছে এমন কোন ব্যক্তিকে এবং ঋতুবর্তী নারীকে যেতে দিতেন না। তিনি বলতেন-

“আমি ইব্রাহীমের রবের এবাদত করি এবং দ্বীনে ইব্রাহীমির অনুসারী।”

তার কবিতার দুটি ছত্র নিম্নে উধৃত হলো:- (আরবী***************)

-প্রশংসা আমার রব আল্লাহর জন্য যাঁর কোন শরীক নেই।  যে এ কথা মানেনা, সে তার নিজের উপর জুলুম কর।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় তশরিফ আনেন, তখন ঐ ব্যক্তি অতি বার্ধক্য অবস্থায় অবনীত হয়েছিলেন। তিনি নবীর দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন (আল ইস্তিয়াব-১ম খণ্ড-পৃঃ ৩২৩, আল ইসাবা-২য় খণ্ড-পৃঃ ১৭৯, ইবনে হিশাম- ২য় খণ্ড-পৃঃ ১৫৬)।

আমর বিন আবাসা-ইনি বনী সুলাইম বংশের লোক ছিলেন। ইবনে সা’দ বলেন, ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বেই তিনি মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেন। আহমদ বিন হাম্বাল তাঁর এ বক্তব্য উধৃত করেন, “জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল বলে মনে করতাম এবং প্রতিমা সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল যে এগুলো কিছু নয়।”

তাঁর আর একটি উক্তি নিম্নরূপ:

“আার মনে এ কথা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল যে মূর্তিপূজা ভ্রান্ত। একথা শুনে আমাকে একজন বল্লো, মক্কায় এক ব্যক্তি আছে যে এ ধরনের কথা বলে। অতএব আমি মক্কায় এলাম। নবী মুহাম্মদের (স) সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর শিক্ষা জানতে পারলাম এবং ঈমান আনলাম”- (আল ইস্তিয়াব, ২য় খন্ড পৃ-৪৩১)।

সবচেয়ে শিক্ষণীয় ঘটনা হচ্ছে আমর বিন নুফাইলের, যিনি হযরত ওমরের (রা) চাচাতো ভাই এবং হযরত সাঈদ বিন যায়েদের [হযরত ওমরের (রা) ভগ্নিপতি] পিতা ছিলেন। ইনি তৌহিদী আকীদার উপর অত্যন্ত মজুবত ছিলেন। তিনি মূর্তিপূজা, মৃতজীব, রক্ত এবং প্রতিমার নামে কুরবানী হারাম মনে করতেন। কন্য হত্যা খুব খারাপ মনে করতেন এবং তাদেরকে বাঁচাবার চেষ্টা করতেন। ইহুদী ও নাসারাদের ধর্মও তিনি খণ্ডন করেন। তিনি বলতেন, আমাদের জাতির শির্ক এবং তাদের শির্কের মধ্যে পর্থক্য কোথায়?

হযরত আসমা বিন্তে আবি বকর (রা) বলেন, আমি যায়েদ বিন আমরকে দেখেছি। তিনি কাবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। তিনি বলতেন, “কুরাইশের লোকেরা। খোদার কসম, আমি এমন কোন পশুর গোশ্‌ত খাব না যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়েছে। খোদার কসম, ইব্রাহীমের দ্বীনের উপর আমি ছাড়া আর কেউ নেই।”

তিনি আরও বলতেন, “হে খোদা। যদি আমি জানতাম যে, তোমার এবাদতের কোন্‌ পদ্ধতি তোমার নিকটে সবচেয়ে পছন্দনীয় তা হলে সেই পদ্ধতিতেতই তোমার এবাদত করতাম।” তিনি হাতের তালুতে মাথা রেখে সিজদা করতেন। তিনি দ্বীনে ইব্রাহীমির তালাশে শাম পর্যন্ত সফর করেন। কিন্তু তা তিনি ইহুদী ও নাসারাদের ধর্মেরও খুঁজে পাননি। তারপর তিনি হাত তুলে দোয়া করেন,

-হে খোদা! আমি তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি দ্বীনে ইব্রাহীমির উপর আছি।

অবশেষে নবী মুহাম্মদের (স) আবির্ভাবের পাঁচ বছর আগে লাখাম শহরে কে যেন তাঁকে হত্যা করে। তাঁর চাচা এবং বৈমাত্রেয় খাই খাত্বাব, পৈত্রিকম ধর্ম পরিত্যাগ করার জন্যে তাঁকে খুব কষ্ট দিত। অবশেষে তিনি মক্তা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কুরাইশদের গুন্ডাপান্ডপাদের লাগিয়ে দেয়া হয় যাতে তিনি মক্কা শহরে ঢুকতে না পারেন।

ইসলামী যুগে হযরত ওমর (রা) এবং হযরত সাইদ বিন যায়েদ (রা) নবী করীমের (স) কাছে আরজ করেন, “যায়েদের চিন্তাধারা কি আপনার জানা আছে? আমরা কি তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করতে পারি?”

জবাবে নবী বলেন, হ্যাঁ, কিয়ামতের দিনে যিনি একাই একটি উম্মত হিসাবে উঠবেন-(আল ইস্তয়াব, ২য় খন্ড-পৃঃ ৫৩৯, আল ইসাবা, ১ম খন্ড-পৃঃ ৫৫২, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড-পৃঃ ২৩৯-৪০)।

তথাপি সাধারণ আরববাসী যে ধরনের শির্কে লিপ্ত ছিল, তা জানতে পারা যায় তাদের সাথে তালবিয়া থেকে যা তারা হজ্বের সময় পাঠ করতো। সে তালবিয়া ছিল নিম্নরূপ:-

(আরবী***************)

-আমি হাজির, হে আমার আল্লাহ আমি হাজির। আমি হাজির, তোমার শরীক কেউ নেই ঐ শরীক ব্যতীত যে তোমারই। তুমি তারও মালিক এবং ঐ বস্তুরও মালিক যার সে মালিক।

এর অর্থ এই যে, তারা তাদের বহু কলিপত খোদাকে মাবুদ মেনে নেয়া সত্ত্বেও একজন সর্বোচ্চ রব হিসাবে আল্লাহকে মানতো এবং এটা মনে করতো যে এ সকল মাবুদ ঐ মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ সত্তার বান্দাহ ও দাস। এসবকে রেসালাতের ইসমাইলীর প্রভাব ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে যে অতি নিকৃষ্ট জাহেলিয়াত ও শির্কের মধ্যে নিমজ্জিত থেকেও আল্লাহ সম্পর্কে তাদের মনে এ বিশ্বাস ছিল।

হযরত ইসমাইল (আ) এর পর খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব

হযরত ইসমাইল (আ) যতোদিন জীবিত ছিলেন, খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাঁর হাতেই ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র নাবেত এর মুতাওয়াল্লী হন। কিন্তু নাবেতের মৃত্যুর পর জুরহুম গোত্রে লোক যারা হযরত হাজেরার (রা) সময় মক্কায় বসতি স্থাপন করেছিল- খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জোর পূর্বক গ্রহণ করে। কারণ ইসমাইল (আ) এর সন্তানগণ ছিল সংখ্যায় কম এবং মক্কার জুরহুমীয়দের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তাদের সাথে আমালিকের একটি শাখা কাতুরা অথবা বনী কায়তুরও কিচুকাল মক্কার ব্যবস্থাপনায় শরীক ছিল। শহরের বহিরাঞ্চেল থেকে যারা আসতো জুরহুম তাদের থেকে ওশর আদায় করতো। নিম্নাঞ্চল থেকে যারা আসতো আমালিক তাদের ওশর দিতে বাধ্য করতো। অবশেষে কিছুকাল খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার বহিষ্কার করে দেয়। অতঃপর তারাই পরবর্তী কয়েক শতক পর্যন্ত। খানায়ে কাবা ও মক্কার উপর আধিপত্য করে (মারুজহুস যাহাব) সামউদী ২য় খন্ড পৃঃ৫০ ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃঃ১১৮)। তাদের মধ্যে ক্রমশঃ এতোটা বিকৃতি ঘটে যে মক্কার মর্যাদা বিনষ্ট শুরু করে। যেসব ধন-সম্পদ কাবায় হাদিয়া স্বরূপ দেয়া হতো, তা তারা অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতো। যিয়ারতের জন্যে আগমনকারীকে উত্যক্ত করতো। এমন কি, তাদের মধ্যে কেউ ব্যভিচারে কোন স্থান না পেলে খানায়ে কাবায় গিয়ে এ গোনাহের কাজ করতো। সে সময়ের একটি ঘটনা  এই যে, এসাফ্‌ নামীয় এক ব্যক্তি নায়েলা নাম্নী এক নারীর সাথে খানায়ে কাবায় অবৈধ কাজ করে এবং আল্লাহ তায়ালা উভয়কে বিকলাংগ করে দেন। কিছুকাল পর তাদের মূর্তি বানিয়ে একটি সাফায় এবং অপরটি মারওয়ায় রেখে তাদের পূজা শুরু করলো। খানায়ে কাবার মোতাওয়াল্লী এ ধরনর চরম নীচতায় নেমে আসে।

অবশেষে জুরহুমীয়দের বাড়াবাড়ি যখন চরমে পৌছলো, বনী কেনানা গোত্রের বনী বাকার বিন আব্দে মানাত এবং নবী খুযায়া গোত্রের গুবশান মিলিতভাবে লড়াই করে তাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে। যাবার সময়ে তারা কাবার ধন সম্পদ যমযমের মধ্যে নিক্ষেপ করে তা বন্ধ করে ও নিশ্চিহ্ন করে তাদের স্বদেশ ইয়ামেনের দিকে রওয়ানা হয়। তাপর কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বনী খুযায়ার ঐ শাখাটির হাতে ন্যস্ত হয় যা গুবশান নামে অভিহিত। তিন-চার শতক যাবত তারাই কাবার মোতায়াল্লী থাকে এবং তাদরে যুগেই খানায়ে কাবা একটি পরিপূর্ণ প্রতিমাগৃহে পরিণত হয়। তার সূচনা  এভাবে হয় যে, ঐ গোত্রের সর্দার আমর বিন লুহাই তার ধনদৌলত ও দানশীতার কারণে খুযায়ার মুকুটবিহীন রাজা হয়ে পড়ে এবং  যে কোন অভিনব ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান (বিদআত) সে আবিস্কার করে- সকলে দ্বিধাহীনচিত্তে তার অনুসরণ করে। একবার সে শাম দেশে গমন করে এবং সেখানে সে আমালিকগণকে বিভিন্ন মূর্তির পূজা করতে দেখেন, এ তার বেশ ভালো লাগে এবং সেখান থেকে হুবাল নামে এক প্রতিমা এনে কাবায় স্থাপন করে। ক্রমশঃ নতুন নতুন প্রতিমার সংখ্যা বাড়তে থঅকে। এসবের মধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত ইসমাইল (আ( এবং হযরত মরিয়ম (আ) এর মূর্তিও শামিল করা হয়। হযরত মরিয়মের মূর্তি সম্ভবত এ জন্যে রাখা হয়েছিল যাতে করে আরবের খৃস্টানগণ কাবার দিকে ফিরে আসে। বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়াতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) এক বর্ণনায় আছে যে কাবার ঘরে হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং হযরত মরিয়মের (আ) মূর্তিও ছিল। দ্বিতীয় একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) এর মূর্ত এ আকৃতিতে ছিল যে তাঁদের হাতে জুয়া বা পাশার ঘূটি ছিল। ইবনে ইসহাক বলেন, বাহিরা, সায়েবা, অসিলা এবং হাম এর বিদআতগুলো আমর বিন লুহাই এর আবিষ্কার, যার খন্ডন করা হয়েছে সূরায়ে মায়েদার ১০৩ আয়াতে। কিন্তু একথা বলা ঠিক নয় যে দ্বীনে ইব্রাহীমির অনুসারীরেদ মধ্যে মূর্তিপূজার সূচনা এ ব্যক্তিই করেছিল। ইবনে ইসহাক বলেন, মক্কা ছেড়ে যারাই আরবের অন্যত্র চলে যেতো তারা সাথে করে মক্কায় একটা পাথর নিয়ে যেতো এবং যেখানেই বসতি স্থাপন করতো সেখানে তা স্থাপন করে তার তাওয়াফ শুরু করতো (ইবনে হিশাম ১ম খণ্ড পৃঃ ৭৯-৮০)।

কাবার অলীগীরি অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার অধিকার খুযায়ীদের তখন শেষ হয়ে যায় যখন কুরাইশ গোত্রের কুসাই বিন কিলার তার শ্বশুরে কাছ থেকে এ দায়িত্ব লাভ করে। পরে এ সম্পর্কে বর্ণনা করা হবে।

ইসমাইল (আ) এর সন্তানগণ

আরবের কুলুজিবিদগণ (GENEOLOGISTS) এবং বাইবেলের সর্বসম্মত বর্ণনা মতের হযরত ইসমাইল (আ) এর বারো পুত্র ছিল। কিন্তু মক্কায় জুরহুমীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসমাইল সন্তানদের অতি অল্পসংখ্যক লোকই মক্কা শহরে রয়ে গিয়েছিল এবং অন্যান সকলে আরবের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস এ সম্পর্কে নীরব যে তাঁর বারো পুত্রের সন্তানগণ কোথায় কোথায় গেল এবং তাদের বংশ থেকে কোন্ কোন্‌ ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করলো। আরবের কুলুজি শাস্ত্রে যা সংরক্ষিত ও নির্বরযোগ্য এবং যার মধ্যে মতপার্থক্য নেই তা হচ্ছে এই যে, আদনান হযরত ইসমাইল (আ) এর জ্যেষ্ঠপুত্র নাবেতের সন্তানগণের মধ্যে একজন। আদনানের পূর্বে হযরত ইসমাইল (আ) পর্যন্ত কত পুরুষ অতীত হয়েছে (সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে এবঙ আদনানের উর্ধতন বংশতালিকা সংরক্ষিত নেই। উরওরাহ বিন যুবাইর (রা) বলেন, এমন কোন লোক আমরা পাইনি যে আদনার ও হযরত ইসমাইলের (আ) মধ্যবর্তী বংশ তালিকা জানতো।

ইবনে মাসউদ (রা) এবং ইবনে আব্বাস (রা) উভয়ে বলেন, আদনানের উপরে যারা বংশতালিকা বয়ান করে মিথ্যা বলে। হযরত ওমর (রা) বলেন, আদনানের উপরে যারা বংশতালিকা বয়ান করে তারা মিথ্যা বলেন, নসবনামা (বংশতালিকা) শুধু আদনান পর্যন্ত বয়ান করা উচিত। তাবাকাতে ইবনে সাদ এবং বালাযুবরীর আনসাবুল আশরাফে স্বয়ং নবী পাকের (স) এ উক্তি বর্ণিত আছে যে, তিনি মায়াদ ব্নি আদনান বিন উদাও পর্যন্ত বংশতালিকা বয়ান করার পর বলেন, পরবর্তী উর্ধতন বংশতালিকা বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী। কিন্তু উর্ধমুখী বংশতালিকা সংরক্ষিত না থাকার অর্থ এই নয় যে, ইসমাইল-সন্তানদের মধ্যে আদনানের হওয়ার মধ্যে কোন প্রকারের সন্দেহ রয়েছে। সমগ্র আরববাসী এ ব্যাপার একমত যে আদনান বনী ইসমাইলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরবরা এ ব্যাপারে একমহ হওয়া তার সভ্যতার অনস্বীকার্য প্রমাণ। কারণ আরববাসী কুলুজির বড়ো গুরুত্ব দিত। বংশানুক্রমে ক্রমাগত চলে আসা বর্ণনা পাওয়া না গেলে কারো বংশ সম্পর্কে একমত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

রসূলে আকরামের (স) বংশতালিকা এবং আরব উপজাতীয়দের সাতে তাঁর সম্পর্ক

আদনানের পরে তার সন্তানের মধ্য থেকে যেসব আরব উপজাতীয় দল উদ্ভূত তাদের বংশতালিকা সংরক্ষিত আছে। কুলুজিবিদগণেল মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। আমরা এখানে নবী মুহাম্মদ (স) এর বংশতালিকা সন্নিবেশিত করছি। তারপর বলবো কোন্‌ কোন্‌ পুরুষে গিযে আরবের কোন্‌ কোন্‌ উপজাতি নবীর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। নবী (স) এর বংশতালিকা নিম্নরূপ:

মুহাম্মদ () বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম বিন আব্দে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররা বিন কা’ব বিন লুয়াই বিন গালেব বিন ফিহির বিন মালেক বিন আন্‌নাযুর বিন কিনানা বিন খুযায়মা বিন মুদরেকা বিন আল্‌ইয়াস [কোন কোন গ্রন্থাকর এ নামের উচ্চারণ ইল্‌ইয়াস করেছেন কিন্তু সুহায়লী তাঁর গ্রন্থে উনুফে আলইয়াস-কেই সঠিক বলেছেন। বালাযুরীও তাঁর আনসাবুলি আশরাফে এ নামের উচ্চারণই লিখেছেন-গ্রন্থকার।] বিন মুযার নিযার বিন মায়াদ বিন আদনান।

এ বংশ পরম্পরার মধ্যে প্রত্যেক পুরুষের পূর্বপুরুষ পর্য়ন্ত পৌছে নিম্নের উজাতিগুলো নবীর (স) বংশের সাথে মিলিত যাচ্ছে:-

আদনানের পুত্র আক্ক এর সন্তান সম্ভতির উর্ধমুখী বংশপরম্পরা আদনান পর্যন্ত পৌঁছে নবী (স) এর পূর্বপুরুষের সাথে মিলে যাচ্ছে। আক্ক এর সন্তান-সন্ততি ইয়ামেনে গিয়ে বসবাস করতে থাকে এবং আশয়ারীদের সাথে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা) এ গোত্রেরই লোক ছিলেন।

বনী কুযায়া এবং বনী উপজাতি যার মধ্যে বনী বকর বিন ওয়াইল, তাগবিলব, নাদিলা প্রভৃতি শামিল) বনী আবদুল কায়েস, আনাযা এবং নামির বিন কাসে- নিযারের সাথে মিলিত হয়েছে।

কায়েসের সকল উপজাতি (সুলাইম, মাযেন, ফাযারাহ, আব্স, আশজা, মুররা যাবইয়ান, হাতফান, ওকাইল কুশাইর, যুশাম, সাকীফ, বাহেলা, বনী সায়াদ বনী সায়াদ বিন বকর বংশোদ্ভূত।

বনী তামীস, বনী দাবরাহ, মুযায়না, খুযায়া, আসলাম ওকল তাইম প্রভৃতি আলইয়াসের সাথে মিলিত।

বুযাইল, যে গোত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) জন্মগ্রহণ করেন, মদরেকার সাথে মিলিত।

বনী আসাদ কারা এবং সকল বনী আলহুণ বিন খুযায়মা খুযায়মার সাথে মিলিত।

বনী আব্দে মানাত (যার মধ্যে বনী বকর ও বণী যমিরা শামিল), বনী মালেক, বনী কালকন অতভা মিলকান, বনী হুদাল, বনী ফিরাস বনী ফুকাইম প্রভৃতি কিনানার সাথে মিলিত। হযরত আবু যর গিফারী (রা) এর গোত্র বনী মালকান থেকে উদ্ভূত।

কুরাইশ

কুলুজিবিদগণের একটি দল একথা বলেন যে, আন্‌যনযর বিন কিনানারই উপাধি ছিল কুরাইশ। কিন্তু গবেষক পণ্ডিতগণ বলেন, কুরাইশ প্রকৃত পক্ষে আননযর এর নাতি এবং মালেক বিন নযর এর পুত্র ফিহিরের উপাধি ছিল।

যারা তার বংশধর তারাই কুরাইশের মধ্যে শামিল এবং যারা এর বংশধর নয় তারা কুরাইশের মধ্যে শামিল। [কুরাইশ শব্দের অর্থে মতভেদ রয়েছে। এক অর্থ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার পর একত্র হওয়া। কিন্তু এ অর্থের দিক দিযে কুসাই বিন কিলাবেরই উপাধি কুরাইশ হতে পারে। কারণ তার সময়েই কুরাইশের সকল পরিবার মক্কায় একত্র হয়। দ্বিতীয় অর্থ উপার্জন ও ব্যবসা বাণিজ্য যা ছিল কুরাইশদের পেশা। তৃতীয় অর্থ অনুসন্ধান, এ দিক দিযে কুরাইশ নযর বিন কিনানার উপাধি হয় কারণ তার সম্পর্কে আরব ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে যে,  সে অভাবীলোকদের অভাব অনুসন্ধান করে বেড়াতো এবং তাদের সাহায্য করতো। আার একটি অর্থ হলো সমুদ্রের বিরাটত্ব যা সবকিচু খেয়ে ফেলে। একটি উক্তি এরূপ আছে যে কুরাইশ বিন বদর বনী নযর বিন কিনানা বংশের এক ব্যক্তি ছিল যে সহযাত্রী () ও মাল সরবরাহের ব্যবস্থা করবো, এ জন্যে আরবাসী এ গোত্রের কাফেলা দেখে বলতো, কুরাইশের কাফেলা এস গেছে। এরূপ বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। কিন্তু গবেষণালব্ধ তথ্য এই যে, কুরাইশ বনী ফিহিরের উপাধি ছিল- গ্রন্থকার।]

কুরাইশদের মক্কায় একত্র হওয়া ও কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বলাভ

ইতঃপূর্বে আমরা বলেছি যে মক্কায় জুরহুমীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর ইসমাইলে বংশধরগণ আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। কাবার ব্যবস্থাপনার ভার বনী খুযায়ার একটি শাকা ও গুবশানের উপর থাকাকালেও এ অবস্থাই হয়েছিল্ বনী ইসমাইলের অন্যান্য শাখার ন্যায় কুরাইশও বনী কিন্নার বিভিন্ন বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অতি অল্প অংশই মক্কায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। ৪০০ কৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে [ইবনে কাসীরে বর্ণনা মতে কাব বিন লুয়াই (কুসাইয়ের পরদাদা) এর মৃত্যু ও নবী মুহাম্মদরে (স) নবওয়াত প্রাপ্তির মধ্যে ৫৬০ বছরের ব্যবধান ছিল। এদিক দিয়ে সম্ভবঃ গালেব বিন ফিহির হযরত মসীহ (আ) এর সমসাময়িক ছিল। ইবনে কাসীর, সুহায়লী এবং অন্যান্য ইমামগণের বরাত দিয়ে একথাও বর্ণনা করেছেন যে মায়াদ বিন আদনানের যুগেই বখ্‌ত-নসর এরাশালেম (জেরুযালেম) ধ্বংস করে ইহুদীদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এ ৫৮৭ খৃষ্টাপূর্বের ঘটনা বালাযুরী মায়াদ বিন আদনানকে বখতন সরে সমসামিয়ক বলেছেন- গ্রন্থকার।] কুসাই বিন কিলাবের হাতে এ অবস্থার অবসান ঘটে এবং মক্কাও কুরাইশদের অধীনে আসে এবং খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনাও তাদের হাতে ন্যাস্ত হয়।

এর সূচনা এভাবে হয় যে, কুসাই এর পিতা কিলাব বিন মুররার মৃত্যুর পর তা মা ফাতেমা বিন্তে সায়াদ (আযদে শানাও-আ বংশের) বনী কুযায়া-এর একব্যক্তি রাবিয়া বিন হারাম-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং শাম চলে যায়। সেখানে এ দ্বিতীয় স্বামীর ঔরসে এবং তার গর্ভে যেরাহ বিন রাবিয়া নামে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। কুসাই যৌবনে পদার্পণের পর একবার বনী কুযায়ার এক ব ব্যাক্তির সাথে তাড় লড়াই হয়। সে কুসাইকে এই বলে ভর্ৎসনা করে, “তুই আমাদের মধ্যে পরিপালিত হয়ে আমদের উপরেই গর্জন করছিস। তুই তোর আপন লোকদের মধ্যে কেন যাস্‌না?”

তারপর ‍কুসাই তার মাকে জিজ্ঞেস করে, “আমার পরিচয় কি?” সে বলে, তুমি কিলাবের পুত্র এবং কুরাইশ গোত্রের সন্তান। তোমার কওম বায়তুল হারামের পাশে মক্সা শহর ও তার চারপাশে থাকে। তখন কুসাই চিদ ধরে বলে, “আমি আমার কওমের লোকের কাছে যাব।”

অতঃপর যখন হজ্বের সময় এলো তখন সে বনী কুযায়ার হজ্বযাত্রীদের সাথে মক্কা পৌছলো। এখানে তার সহোদর ভাই যুহরা, কিলাবের মৃত্যুর সময় যে যুবক ছিল, পূর্ব থেকেই প্রতিষ্টিত ছিল। কুসাই তার নিকটেই রয়ে গেল। সে সময়ে হযেইলল বিন হা্বশিয়্যা খুযায়ী কাবার মুতাওয়াল্লী এবং মক্কার শাসক ছির। কুসাই হুলাইল কন্যা হুববাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রস্তাব দেয়। হুলাইল কুসাইয়ের বংশ আভিজাত্য ও তার মহৎ ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সন্তুষ্টিচিত্তে সম্মতি দান করলো। তারপর কাবার ব্যবস্থাপনার ভার ও মক্কার সর্দারি কিভাবে তার হাতে এলো এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা এই য, হুলালি স্বয়ং অসিয়ত করে যায় যে তার মৃতুর পর কুসাই খানায়ে কাবার মুতাওয়াল্লী হওয়ার যোগ্য। অন্য বর্ণনা বলে যে, হুলালের মৃত্যুর পর কুসাই দাবী করে যে, সে এ পদের জন্যে অন্যান্যের তুলনায় অধিক যোগ্য। এতে বনী খুযায়া এবং বনী বকর সম্মত না হওয়ায় সে তার বৈমাত্রেয় ভাই রেযাহ্‌ এবং বনী কিনানা ও খযায়মে সাহায্যের আহ্বান জানায়। তারপর চারপাশে কুরাইশদের যেসব লোক বসবাস করতো তাদেরকেও একত্র করলো। অতঃপর বলপূর্বক খুযায়া এবং বনী বকরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে দিল। পরবর্তীকালে উভয় পক্ষ যখন বনী আব্দে মানাত বিন কিনানর গোত্রভুক্ত ইয়ামুর বিন আওফকে মধ্যস্ত মানলো, তখন সে সিদ্ধান্ত করে দিল যে খুযায়ার তুলনায় কুসাই খানায়ে কাবার মুতাওয়াল্লী হওয়ার অধিকতর হকদার। এজন্যে যে তার পরিচয় নিশ্চিতরূপে বনী ইসমাইলে বংশোদ্ভূত।

খুযায়ার বিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার পর কুসাই বনী আল-গওস বিন্‌ মুর-এর প্রতি মনোযোগ দিল। তাদেরকে সূফা বলা হতো। জুরহুম এবং খুযায়ার সময়ে তারা এ মর্যাদা লাভ করেছিল যে, হজ্বের সময় তাদরে অনুমতি ব্যকিরেকে আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করা যেতোনা। তাদের অনুমতিক্রমেই মিনায় যেতো। মিনা তেকে লোক বাড়ি রওয়ানা হতে পারতো না যতোক্ষণ না সূফা জুমরাতে পাথর ছুড়েছে। তাদের পরেই অন্যান্য হাজীগণ রামী (পাথর ছুঁড়ে) করে রওয়ানা হতে পারতো। দীর্ঘদিনের আমলের ফলে এ যেন এক দ্বীন হয়ে পড়েছিল যা মেনে চলা অপরিহার্য মনে করা হতো। কুসাই হজ্বের সময় সূফার সাথে যু্দ্ধ করে তাদেরকে পদমর্যাদা থেকে বেদখল করে-(ইবনে হিশাম)।

এভাবে যখন কুসাই কাবার ব্যবস্থাপক ও মক্কার সর্দারি হাসিল করে, তখন সে ফিহরের সকল বংশধরকে, যারা কুরাইশ নামে অভিহিত ছিল, আরবের বিভিন্ন অংশ থেকে মক্কায় একত্র করে এবং মক্কা তাদের বন্টন করে শহরে এক এক অংশে এক এক পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করে। [কুসাই মক্কা শহরকে কুরাইশ পরিবারের মধ্যে এভাবে বন্টন করে দেয় যে হারামের পার্শবর্তী এলাকা সমূহ এবং দু’ধারে পাহাড়ের উপত্যকা ও উচ্চভূমিতে বনী কাব বিন লুয়াই এর বিভিন্ন শাখাকে প্রতিষ্ঠিত করে- যাদের মধ্যে শামিল ছিল বনী আদী, বনী জুমাহ, বনী সাহম, বনী তাইম, বনী মাখযুম, বনী যুহরা, বনী আবদু ওয্যা, বনী আবদুদ্দার, বনী আল মুত্তালিব, বনী হাশিম, বনী আবেদ শামস, এবং বনী নওফাল। তাদেরকে বলা হতো কুরাইশ আলবিতাহ। অর্থাৎ মক্কার অভ্যন্তরীন অংশে বসবাসকারী এবং প্রকৃতি হারাম বাসা। কায়াবের উর্ধ্ধতন পুরুষ ফিহরের বংশধরদের পরিবার সমূহ যথা বনী মুহারিব, বনী আলহারিস, বনী তাইম উলাদুরাম, বনী আমের বিন লূয়াই প্রভৃতি ছিল- ‘কুরাইশুয,-যাত্তাহের’ এবং তাদেরকে মক্কার বাইরের অংশ দেয়া হয়- গ্রন্থকার।] এর ভিত্তিতে কুরাইশ তাদেরকে ‘মুজোম্মে’ বলে।

 খুযাফা বিন্‌ গানেম আদাবী বলেন:-

(আরবী*******************)

-তোমাদের পিতাকে মুজাম্মে বলাহতো। তার দ্বারা আল্লাহ ফিহরের গোত্রদেরকে একত্র করেন।

মক্কার নগর রাষ্ট্র ও হজ্বের ব্যবস্থাপনা

কুসাইয়ের এ বিরাট খেদমতের জন্যে সকল কুরাইশ গোত্র তাকে নিজেদের সর্দার মেনে নেয়। কুরাইশের কোন পরিবারে যে বালিকাই যৌবনে পদর্পণ করতো, তাকে কুসাইয়ের গৃহেই কামিস পরিধান করানো হতো, কোন বিযে শাদি হলে তা হতো কুসাইয়ের গৃহে। কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটলে অথবা কোন গোত্রের সাথে যুদ্ধের উপক্রম হলে, তাঁর গৃহেই সকল পরিবারের সর্দারগণ পরামর্শের জন্যে একত্র হতো। এ কারণে এ বাড়িকে বলা হতো “দারুন্নাদওয়া”। তার একটি দরজা ছিল হারামের দিকে। যুদ্ধের সময় কুসাই এর সন্তানদের মধ্যেই কোন এক জনকে পাতাকাবাহী নিযুক্ত করা হতো। এ পদমর্যাদার নাম ছিল “আল্লেওয়া”। হজ্বের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা কুসাইদের হাতে থাকতো। তাদের একটা কাজ ছিল “অসসিকায়া”। অর্থাৎ হাজীদের পানি পান করানো। দ্বিতীয়টি ছিল “আর রিফাদাহ”- অর্থাৎ হাজীদের আহার করানোর ব্যবস্থাপনা। যার জন্যে কুরাইশদের সকল পরিবার চাঁদা একত্রে জমা করে কুসাইকে দিত। সে হজ্জ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত ঐ সকল হাজীর আহারের ব্যবস্থা করতো যারা নিজেরা ব্যবস্থা করতে পারতো না।

তৃতীয়টি ছিল ‘আলহিজাবাহ’ অর্থাৎ খানায়ে কাবার চাবি রক্ষক। কাজ ছিল যিয়ারত কারীরেদ জন্যে কাবা খুলে দেয়া এবং বন্ধ করা।

কুসাই তার জীবনে মক্কা রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিক ছিল। যখন কুসাই এর শেষ সময় উপস্থিত হলো তখন সে দেখলো, তার পুত্র আব্দে মানাফ আরবে খ্যাতি অর্ঝন করেছে এবং তার মর্যাদাও স্বীকৃতি লাভ করছে, তখন সে মক্কা রাষ্ট্রের সকল কার্যভার (নাদওয়া, হিজাবাহ, রিফাদাহ, লেওয়া) দ্বিতীয় পুত্র আবদুদ্দারকে অর্পণ করে। কুসাই এর মৃত্যুর পর কিছুকাল-যাবত তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। অতঃপর কোন এক সময়ে এসব পদমর্যদা বন্টন নিয়ে কলহ শুরু হয়। এ কলহে কুরাইশদের কিছু পরিবার আবদুদ্দার এবং কিছু আবদে মানাফের সাথে মিলিত হয়। কুরাইশ পরিবার গুলোর মধ্যে যারা আবদে মানাফের সাথে মিলিত হয় তারা ছিল বনু আসাদ বিন আবদুল ওয্যা, বনু যুহরা বিন কিলাব, বনু তাইম বিন ‍মুররা এবং বনী হারিস বিন ফিহর। তাদের সর্দার ছিল আব্দে শামস। যারা আবদুদ্দারের সাথে মিলিত হয়, তারা ছিল বনু মখযুম, বনু সাহম, বনু জুমাহ এবং বনু আদী। তাদের সর্দার ছিল আমের বিন হাশিম। বনী আমের বিন লুয়াই এবং বনী মুহারিব বিন ফিহর এ ঝগড়ায় নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে।]

এ কলহ দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছিল এবং গৃহযুদ্ধ হওয়ার পূর্বেই আপোস মীমাংসা হয়ে যায়। যার ফলে হিজাবাহ, লেওয়া এবং নাদওয়া আবদুদ্দারের অধীন থাকে এবং সিকায়াহ ও রিফাদাহ আবদে মানাফকে দেয়া হয়। আবদে মানাফের সন্তানগণ পরস্পর পরামর্শ করে এ দুটি পদমর্যাদা হাশিমকে দান করে। [রসূলুল্লাহ (স) এর হতে মক্কা বিজয় হওয়া পর্যন্ত এসব ব্যবস্থাপনা ঠিক সেভাবেই অক্ষুন্ন থাকে যেমনভাবে উভয় পরিবারের উপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের পর হুযর (স) হিজাবাহ ও সিফায়াহ ব্যতী অন্য সব রহিত করেন। হিজাবাহ ত আজ পর্যন্ত আবদুদ্দারের একটি শাখা শায়বাহ-বিন-ওসমানের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে আসছে। অবশ্যি সেকায়ার দায়িত্ব অবশেষে হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের হাতে এসেছিল তা কিছুকাল বনী আব্বাসের হাতেই ছিল। তারপর প্রথম খলিফঅ তা নিজেই ছেড়ে দেন-গ্রন্থকার।]

হাশিম

হাশিমের আসল নাম ছিল আমর। ‘হাশিম’ উপাধি সে তখন লাভ করে যখন মক্কায় একবার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সে সময়ে হাশিম শাম থেকে খাদ্যদ্রব্য এনে রুটি তৈরী করে। বহু উট জবেহ করে তার ছালন তৈরী করে। তার মধ্যে রুটি খন্ড বিখন্ড করে এক প্রকার মালিদা তৈরী করে লোক খাওয়ায়। ‘হাশম’ শব্দের অর্থ ভাঙ্গা ও নিষ্পেষিত করা। রুটি খন্ড বিখন্ড করে ছালনে দিয়ে মালিদা বানাবার কারণে তাকে হাশিম নামে আখ্যায়িত করা হলো।

রিফাদাহ ও সিকায়াহ-এর দায়িত্ব হাশিমের উপর ন্যস্ত হওয়ার পর তার নিয়ম এই ছিল যে, যখন হজ্বের সময় আসতো তখন সে কুরোইশদের লোকজনকে একত্র করে বলতো, “এসব আল্লাহর প্রতিবেশী এবং তার ঘরের লোক এ সময়ে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে আসে। এসব আল্লাহর মেহমান। আল্লাহর মেহমানগণ আপ্যায়নে সবচেয়ে বেশী হকদার।

আল্লাহ তোমাদেরকে এ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং তার বদৌলতেই তোমাদের মান সম্মানে ভূষিত করেছেন। তিনি তোমাদের এমন হেফাজত করেছেন যা কোন প্রতিবেশিী তার প্রতিবেশীর জন্যে করে না । এ জন্যে আল্লহর মেহমানদরে এবং যিয়ারতে কারীদের সম্মান কর। তারা ধুলা ধুসরিত দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসছে। আসছে কংকালসার দুর্বল উটনীর পিঠে চড়ে। তাদের জামাকাপর ময়লা হয়েছে। তাদের পাথেয় শেষ হয়েছে। অতএব তাদের আহার করাও, পানি পান করাও।”

এ ব্যাপারে কুরাইশের সকল পরিবারের পক্ষ থেকে চাঁদা আসতো। স্বয়ং হাশিম বিরাট অর্থ নিজের পক্ষ থেকে ব্যয় করতো। তারপর মক্কার সকল কূপ থেকে পানি এনে এনে চামড়ার চৌবাচ্চাগুলো ভর্তি করা হতো। কারণ জুরহুমীগণ যমযম ধ্বংস করে তা নিশ্চিহ্ন কর দিয়েছিল। রুটি ছালন একত্রে রান্না করে এবং রুটি দুধ একত্রে রান্না করে খাওয়া হতো। ছাতু, খেজুর প্রভৃতিও খেতে দেয়া হতো। হাজীদের মিনা থেকে বিদায় হওয়া পর্যন্ত তাদের নানানভাবে আপ্যায়িত করা হতো। হাশিমের এ জনসেবা সকল গোত্রের প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ ছিল্ তারা প্রতি বছর হজ্বের সময় তার উদারতা পূর্ণ জনসেবার দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ লাভ করতো।

কুরাইশদের  ব্যবসা ও তার উন্নতি

কুরাইশদের ব্যবসার উল্লেখ সূরায়ে ‍কুরাইশে (আরবী************)

গ্রষ্ম ও শীতের সফরের নামে আল্লাহর এক কৃপা হিসাবে করা হয়েছে। সর্বপ্রথম এ ধারণা হাশিমেই মনেই উদয় হয়। সে তার তিন ভাই আবদে শামস, মুত্তালিব ও নাওফালকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনা করে তাদের সে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে হবে যা আরবদের পথ প্রাচ্যের শহরগুলি সাথে শাম ও মিষরের চলছিল। সেই সাথে আরববাসীর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও খরিদ করে আনতে হবে যেন পথিমধ্যস্থ গোত্রগুলো তা খরিদ করতে পারে এবং মক্কার বাজারে দেশের ব্যবাসায়ীগণ মাল খরিদ করতে আসতে থাকে। এমন এক সময় ছিল যখন ইরানের সাসীন সরকার সে আন্তর্জাতিক ব্যবসার উপরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিল। উত্তরাঞ্চল ও পারস্য উপসাগরের পথ দিযে রোম সাম্রাজ্য এবং প্রাচ্যের শহরগুলোর মধ্যে  সে ব্যবসা চলতো। এ কারণে দক্ষিণ আরব থেকে লোহিত সাগরের তীর বরাবর যে ব্যসার রাজপথ শাম ও মিশরে প্রসারিত তার ব্যবসা বড়োই জমজমাট ছিল্ আরবো অন্যান্য ব্যাবসায়ী কাফেলার তুলনায় কুরাইমদের এ সুবিধাটুকু ছিল যে বায়তুল্লাহর খাদেম হওয়ার সাথে কুরাইশগণ হাজীদের খেদমত করতো তার কারণে সকলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। তাদের এ আশংকা ছিল না যে, পথে তাদের কাফেলার উপর কেউ ডাকাতি করবে। পথিমধ্যস্থ উপজাতীয়গণ তাদের নিকট থেকে মোটা পথকরও আদায় করতোনা যা অন্যান্য কাফেলার নিকচে দাবী করা হতো। হাশিম এসব দিক বিবেচনা করে ব্যবসায়ী স্কীম তৈরী করে এবং এ স্কীমে তার তিন ভাইকেই শামিল করে। শঅমের গাস্যানী বাদশাহ থেকে হাশিম, আবিসিনিয়ার বাদশাহ থেকে আবদে শাম্‌স, ইয়ামেনের আমীরদের থেকে মুত্তালিব এবং ইরাক ও পারস্য সরকারদের থেকে নাওফাল ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা লাভ করে।  [তাবারী বলেন, হাশিম রোমের কায়সার এবং শাম ও গাস্যানের বাদশা থেকে, আবদে শামস আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাসী থেকে নাওফাল ইরমের বাদশাহ থেঞকে এবং মুত্তালিব হিমইয়ারের বাদশাহদের থেকে ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা এবং সফরকালীন নিরাপত্তার পরওয়া হাসিল করে। ইবনে সায়াদ বলেন যে রোমরে কায়সার হাশিমকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতো। ব্যবসার উদ্দেশ্য সে আংকারা পর্যন্ত অগ্রসর হতো- গ্রন্থকার।]  এভাবে তাদের ব্যবসা ‍দ্রুত উন্নতি লাভ করছিল।

এজন্যে এ চার ভাই মাতাজেররীন পেশাগড়ত ব্যবসায়ী) নামে প্রসিদ্ধ লাভ করে। চারধারের গোত্র এবং রাষ্ট্রগুলোর সাথে তারা যে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল তার ভিত্তিতে তাদেরকে আসহাবুইলাফ’ ও বলা হতো। যার অর্থ ত বন্ধুত্ব সৃষ্টিকারী। কিন্তু পরিভাষা হিসাবে ‘ইলাফের’ অর্থ এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যার ভিত্তিতে পথ অতিক্রম করা কালীন নিরাপত্তা এবং বন্ধুগোত্রদের অঞ্চলে অবস্থানের নিরাপত্তাও লাভ করা হয়। এ রাজনৈতিক মৈত্রী (Allianci) থেকে ভিন্ন ধরনের চুক্তি হতো।

ব্যবসার কারণে শাম মিশর, ইরান, ইরাক, ইয়ামেন এবং আবিসিনিয়া দেশগুলোর সাথে কুরাইশদের সম্পর্ক স্থাপনের সেসব সুযোগ হয়েছিল এবং বিভিন্ন দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার কারণে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টি এতোটা উন্নত হয় যে, আরবের অন্য কোন গোত্র তাদের সমকক্ষ ছিলনা। ধনদৌলতের দিক দিয়েও তারা আরবো মধ্যে শর্ষস্থানীয় ছিল। ফলে মক্কা আরব উপদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে পড়ে। এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটা বিরাট সুবিধা এই হয়েছিল যে ইরাক থেকে তারা সে বর্নমালা সংগ্রহ করে আনে যা অন্য কোন গোত্র ছিল না। এ কারণেই নবী (স) বলেছেন-

(আরবী**************)

-কুরাশি মানবের নেতা (মুসনাদে আহমদ, আমর বিন আল-আস থেকে বর্ণিত)।

বায়হকীতে হযরত আলীর (রা) একটি বর্ণনা নিম্নরূপ:-

(আরবী**************)

প্রথমে আরবের সর্দারি হিমইয়ারদের হাতে ছিল্ তারপর আল্লাহ তায়ালা তাদের হাত থেকে কেড়ে কুরাইশকে দেন।

কুরাইশ এভাবে উন্নতির পথে চলতে থাকে এমন সময় আবরাহার আকস্মাৎ আক্রমণের ঘটনা ঘটে। সে সময় এ পবিত্র শহর দশর করতে এবং কাবা ধ্বংস করতে আবরাহা যদি সমর্থ হতো, তাহলে আরবে শুধু কুরাইশদের নয় বরঞ্চ স্বয়ং কাবার মর্যাদাও বিনষ্ট হতো। এ ঘর যে প্রকৃতই আল্লাহর-জাহেলিয়াতের যুগের আরবের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যেতো। এ ঘরের খাদেম হওয়ার কারণে সারা দেশ কুরাইশদের যে মর্যাদা ছিল তাও একেবারে শেষ হযে যেতো। মক্কা পর্যন্ত হাবশীদের অগ্রসরহ ওয়ার পর রোম সাম্রাজ্য সামনে অগ্রসর হয়ে শাম ও মক্কার মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক রাজপথ অধিকার করে বসতো। কুসাই বিন কিলাবের পূর্বে কুরাইশদের যে দুরবস্থা ছিল, তার চেয়েও অধিক দুরবস্থা তাদের হতো। কিন্তু আল্লাহতায়ালা যখন তাঁর ক্ষমতার এ আলৌকিক বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন যে, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীর সৈন্য প্রস্তর খন্ডের আঘাতে আঘাতে আবরাহার ষাট হাজার হাবশী সৈন্য ধ্বংস ও নিস্তনাবুদ করে দিল এবং মক্কা থেকে ইয়ামেনে পর্য়ন্ত সমস্ত পথে ঐ ধ্বংসপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর লোক পড়ে পড়ে মরতে লাগলো, তখন কাবা যে আল্লাহর ঘর, সমগ্র আরববাসীর এ বিশ্সাব আরও বহু গুণে মজবুত ও শক্তিশালী হলো। সাথে সাথে সারা দেশে কুরাইশদের মর্যাদও বেড়ে গেল। এখন আরব বাসীরেদ এ দৃঢ়প্রত্যয় সৃষ্টি হলো যে, এদের উপর আল্লাহর বিশেষ করুণা রয়েছে। ফলে কুরাইশগণ দ্বিধাহীন চিত্তে আরবের সর্বত্র তাদের ব্যবসায়ী কাফেলাসহ গমনাগমন করতো। তাদের উত্যক্ত করার কারো সাহস হতোনা। এমনকি কুরাইশী নয় এমন কোন ব্যক্তিকেও যদি নিরাপত্তা দান করতো তাতেও আপত্তি করতোনা।

আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম

হাশিম তার ব্যসসা সংক্রান্ত সফর উপলক্ষ্যে শাম যাবার পথে প্রায় মদীনায় অবস্থান করতেন। মদীনার খযরজ গোত্রের এক মহিলাকে সে ইতঃপূর্বেই বিয়ে করেছিল এবং াতর পক্ষ থেকে হাইয়া নাম্নী এক কন্যা এবং সায়ফী নামে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। আর এক সফরে সে খযরজ গোত্রেরই বনী নাজ্জার পরিবারের সাল্‌মা বিন্তে আমর বিন যায়েদ নাম্নী এক যুবতীকে দেখতে পেলো যে, সে বাজারের মধ্যে একটি উচ্চস্থানে বসে আদেশ করছে যে তার জন্যে কি খরিদ করা যায় এবং তার পক্ষথেকে কি বিক্রি করা যায়। হাশিম তার সৌন্দর্য, জাঁকজমক, সূক্ষ্ম বিচার বুদ্ধি ও বুদ্ধিমত্তায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। সে কারো সাথে এ শর্ত ব্যতীত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্মত ছিল না যে সে াতর আপন মর্জিমতো চলবে এবং কাউকে ভালো না লাগলে তার থেকে পৃথক হয়ে যাবে। হাশিম তার শর্ত মেনে নিল। মহিলাটি হাশিমের বংশীয় আভিজাত্য ও তার ব্যক্তিত্ব লক্ষ্য করে বিবাহে সম্মত হলো। মদীনাতেই উভয়ের বিবাহ ক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং এখানেই তার গর্ভ থেকে প্রায় ৪৯৫ খৃস্টাব্দে আব্দুল মুত্তালিব জন্মগ্রহণ করে। এ সফরেই হাশিম যখন গ্যায্যা পৌছে তখন রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু  বরণ করে। এভাবে যৌবনে পদার্পণ করার পূর্ব পর্যন্ত আবদুল মুত্তালিব মায়ের সাথে মদীনাতেই অবস্থান করে। হাশিম মৃত্যুর সমযে অসিয়ত করে যায় যে, তার মৃত্যুর পর তার ভাই মুত্তালিব তার স্থানে সিকায়াহ ও রিফাদার মুতাওয়াল্লী হবে এবং সেই তার পরিবারবর্গ ও বিষয় সম্পদের দেখাশুনা করবে। সে সময় থেকে বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিব একান্ত হয়ে গেলে এবং শেষ পর্যন্ত ছিল। এর বিপরীত বনী আবদে শামস্‌ (যার থেকে বনী উমাইয়ার উৎপত্তি হয়) এবং বনী নাওফাল একে অপরে মিত্র হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী কাল পর্যন্ত ছিল। মুহাম্মদ (স) এর নবুয়ত কালে যখন কুরাইশের সকল গোত্র তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং শি’বে আবি তালেবে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে, তখন বনী হাশিমের সাথে বনী আল মুত্তালিবও এ অবরোধে নবীর সাথে ছিল। পক্ষান্তরে বনী নাওফাল ও বনী আবদে শামস বিরোধী দলের সাথে ছিল।

আবদুল মুত্তালিবের আল নাম ছিল শায়বা এবং আপন দৈহিক সৌন্দর্যের জন্যে তাকে “শায়বাতুল হামদ’ও বলা হতো। সে মদীনায় প্রতিপালিত হচ্ছিল এমন সময় একদিন হাস্‌সান বিন সাবিত (রা) এর পিতা সাবিত বিন মুনযের মক্কায় গিয়ে মুত্তালিবের সাথে দেখা করলো। পূর্ব থেকেই তার সাথে সাবিতের মেলামেশা ছিল্ তার সাথে আলাপচারি প্রসংগে সাবিত বল্লো, তোমার ভাইপো শায়বা, একবার দেখনা- তোমার মন আনন্দে ভরে যাবে। বড়ো সুন্দর হাট্টাগোট্টা জোয়ান।

একতা শুনে মুত্তালিব অধীর হয়ে পড়লো এবং মদীনা গিয়ে আপন ভাতিজাকে একসাথে উটের পিঠে বসিয়ে মক্কা নিয়ে এলো। কুরাইশের লোকেরা এ যুবক ছেলেটিকে ‍মুত্তালিবের সাথে আসতে দেখে বলতে লাগলো, “আবদুল মুত্তালিব (অর্থাৎ মুত্তালিবের গোলাম)”। মুত্তালিব তাদেরকে ধমক দিয়ে বল্লো, “এ আমার ভাই হাশিমের পুত্র শায়বা- আমার গোলাম নয়।”

কিন্তু আবদুল মুত্তালিব নামটি এতো মশহুর হয়ে পড়লো যে আসল নাম তলিয়েগেল। কিছুকাল পরে মুত্তালিব এক বাণিজ্যিক সফরের উদ্দেশ্যে ইয়েমেন গিয়ে মৃত্যবরণ করলো। আবদুল মুত্তালিব তার স্থলাভিষিক্ত হলো এবং ‘সিকায়াহ’ ও ‘রিফাদাহ’-এর উভয় পদমর্যাদা সে লাব করলো।

ইবনে সাদ তার প্রশংসা করে বলেন, সে কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান, সবচেয়ে ধীর স্থির ও সহনশীল, সব চেয়ে দাতা এবং ঐসব অনাচার থেকে সব চেয়ে দূরে ছিল যা পুরুষদের অথঃপতন এনে দিত।

ইবনে হিশাম আরও বলেন, সে তার কওমের সম্মান ও শ্রদ্ধার এমন মর্যাদা লাভ করেছিল যা তার পূর্ব পুরুষদের কেউ লাভ করেনি। তার কওম তাকে ভালোবাসতো এবং লোকের মধ্যে সে বিরাট মর্যাদার অধিকারী ছিল। ইবনে আসীর বলেন, আবদুল মুত্তালিবও রমযান মাসে গারে হেরায় গিয়ে তাহান্নুস (এবদাত) করতো এবং মাস ভর মিসকীনদেরকে আহার করাতো।

তাবারী, ইবনে আসীর ও বালাযুরী বলেন, আবদুল মুত্তাফিবের চাচা নাওফাল হাশিমের পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিচু অংশ আত্মসাৎ করেছিল। আবদুল মুত্তালিবের প্রতিপত্তিশীল লোকদের কাছে অভিযোগ করে। তারা চাচা ও ভাতিজার কলহে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারপর আবদুল মুত্তালিব- নানার গোষ্ঠীর (মদীনার বনী আদী বিন তুজ্জার) কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। অতঃপর তার মামু আবু সাঈদ বিন আদাস আশিজন লোকসহ মক্কায় পৌছে এবং তারা বলপূর্বক নাওফাল থেকে ভাগিনার অধিকার আদায় করে দেয়। তারপর নাওফালও বনী হাশিমের বিরুদ্ধে বনী আব্দে শামসের সাথে মিলিত হয় এবং নবী (স) এর রেসালাতের যুগ পর্য়ন্ত বনী নাওফাল সে দলভুক্তই থাকে, যে দল বনী হাশিমের বিরোধী ও বনী আবদে শামসের সহযোগী ছিল । আবদুল মুত্তালিব যখন দেখলো যে বনী নাওফাল তার বিরোধী দলে মিলিত হয়েছে তখন সে খুযায়া সর্দারদের সাথে আলাপ আলোচনা করে এবং রীতিমতো চুক্তিনাম লেখেন। ইবনে সায়াদ ও বালায়বীর বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা বলেন, বনী খুযায়া আবদুল মুত্তালিবের কাছে স্বয়ং আবেদন করে পারস্পারিক বন্ধুত্ব সাহায্য সহযোগিতার চুক্তি সম্পন্ন করে। এ চুক্তিতে বনী আবদুল মুত্তালিব ও বনী হাশিম উভয় পরিবার শরীক হয়। বনী আব্দে শামস এবং বনী নাওফাল এর থেকে পৃথক থাকে। এ চুক্তিনামা লিখিত হয় দারুন্নাদওয়াতে এবং কাবাঘরে লটকানো হয়। তদনুযায়ী আবদুল মুত্তালিব তার সন্তানদেরকে অসিয়ত করেন বনী খুযায়ার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখার। তারই প্রভাব এই ছিল যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ে যখন সন্ধির শর্তগুলোর মধ্যে একটি শর্ত এই ছিল যে, আরব গোত্রগুলোর মধ্যে যদি কেউ চায় ত উভয় পক্ষের যে কোন এক পক্ষের সাথে শরীক হতে পারে, তখন খুযায়া রসূলুল্লাহর (স) সাথে শরীক হওয়ার সিদ্ধান্ত করে।

আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক যমযম নতুন করে পুনরুদ্ধার

এ গৌরব আবদুল মুত্তালিবেরই প্রাপ্য যে, যে যমযম জুরহুমীয়গন একেবারে বন্ধ করে দিয়ে তার চিহ্ন পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়েছিল, তা তাঁর হাতেই নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। মুহাম্মদ বিন ইসহাক হযরত আলী (রা) এর বরাত দিয়ে বলেন, স্বপ্নে আবদুল মুত্তালিবকে যমযমের স্থান বলে দেয়া হয় এবং তাঁকে ঐ স্থান খনন করে এ পবিত্র কূপ বের করার নির্দেশ দেয়া হয়। সে সময় হারেস ব্যতী আবদুল মুত্তালিবের কোন পুত্র ছিলনা, হারেসকে সাথে নিয়ে কোদাল ও বেলচাসহ তিনি উক্ত স্থানে পৌছলেন এবং খনন কাজ শুরু করলেন। যখন পানি বেরুলো তখন আবদুল মুত্তালিব উচ্চস্বরে নারায়ে তাকবীর বল্লেন। এর থেকে কুরাইশরা জানতে পারলো যে যমযম বের হযেছে। তারা সব একত্র হয়ে বলতে লাগলো, “আবদুল মুত্তালিব! এ ত আমাদের পিতা ইসমাইলের (আ) কূপ এবং এতে আমাদেরও অধিকার রয়েছে। তোমার সাথে আমাদেরও এতে শরীক কর।” তিনি বল্লেন- “আমি তা করতে পারিনা। এ বিশেষ করে আমাকে দেয়া হযেছে, তোমাদের কাউকে দেয়া হয়নি।” তারা এ নিয়ে ঝগড়া করতে চাইলে আবদুল মুত্তালিব বল্লেন-, “আচ্ছা কাউকে সালিশ মান।” তারা বনী সা’দ বিন হুযাইমের গণৎ কারিকার নাম করলো, যে শামদেশের উচ্চতর অঞ্চেলে বাস করতো। আবদুল মুত্তালিব এ প্রস্তাব মেনে নিলেন এবং কিচু  সংগী সাথীসহ বনী উমাইয়া ও প্রতিটি কুরাইশ গোত্রের কিচু সংখ্যক লোকসহ শামের দিকে রওয়ানা হলেন। পথে তারা একটি মরুভূমিতে পৌঁছলো যেখানে আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীদের পানি একেবারে শেষ হয়ে গেল। পানির অভাবে তাদের মৃত্যুর আশংকা হলো। তারা তাদের সফরসাথী অন্যান্য কুরাইশদের নিকটে পানি চাইলো। তারা একথা বলে পানি দিতে অস্বীকার করলো, “দূর-দূরান্ত পর্য়ন্ত কোথাও পানির কোন চিহ্হন দেখা যায় না, এমতাবস্থায় আমাদের পানিতে তোমাদেরকে শরীক করলে আমরাও সে ধ্বংসের শিকার হবো যার আশংকা তোমরা করছো।”

অবশেষে আবদুল মুত্তালিব তার সাথীদেরকে বল্লেন, “এসো আমাদের দেহে এখনো জীবন আছে। আমর প্রত্যেকে আমাদের নিজেদের জন্যে এক একটি গর্ত খনন করি এবং যে মরে যাবে তাকে তার গর্তেই দাফন করা হবে।” অতএব প্রত্যেক গর্ত খনন করলৈা এবং সকলে মৃত্যুর অপেক্ষায় রইলো। তারপর আবদুল মুত্তালিব সাথীদেরকে বল্লেন, “আমরা নিজেদেরকে অযথা মৃত্যুর কাছে সুপর্দ করছি। এসো, সাহক করে চলতে থাকে, সম্ভবতঃ কোথাও পানি পাওয়া যাবে।” তারপর তারা সকলে চলার জন্যে তৈরী হলো, কিন্তু খোরদ কুদরত এই যে, আবদুল মুত্তালিব যখন তাঁর উটকে উঠালেন এবং তাঁর পা মাটিতে পড়লো ত হটাৎ তার নীচে থেকে মিষ্টির পানির ঝর্ণা বের হলো। আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীগণ তার জন্যে উচ্চস্বরে নারায়ে তাকবীর বল্লো। তারা উঠ থেকে নেমে তৃপ্তিসহকারে পানি পান করলো এবং নিজেদের মশকগুলো পানিতে পূর্ণ করে নিল। তারপর অন্যান্য কুরাইশগণ যারা পনি দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদেরকে আবদুল মুত্তালিব ডেকে বল্লেনস, “তোমরাও পান কর এবং মশক ভরে ভরে নাও।”

তারা সকলে এসে তৃপ্তি সহকারে পান করে বল্লো, “হে আবদুল মুত্তালিব! খোদাই তোমাদের বিরুদ্দে এবং তোমার সপক্ষে ফয়সালা করে দিয়েছেন। খোদার কসম, একন আর যমযম নিয়ে তোমার সাথে ঝগড়া করবনা। যে খোদা এ মরুভূমিতে তোমাকে পানি দিয়েছেন, সেই খোদা যমযমও তোমাকে দিয়েছেন। এখন নিজের পানির দিকেই ভালোভাবে ফিরে চল।”

এভাবে তারা সেই গণৎকারিকার নিকটে যাওয়ার পরিবর্তে মক্কা ফিরে চল্লো।

এ ‘সিকায়ার’ পদমর্যাদা- যার মধ্যে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যমযমের পানি পান করানো, জীবনভর আবদুল মুত্তালিবের কাছেই রয়ে গেল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আবু তালেব এ মর্যাদা লাভ করেন। কিন্তু আবু তালেত তাঁর উদারতার কারণে তাঁর শক্তি সামর্থেরও অধিক ব্যয় করতে থাকেন হাজীদের পানি, শরবত, দুধ, প্রভৃতি পান করাতে। যার জন্যে তাঁকে কয়েকবার তাঁর ভাই আব্বাসের নিকট থেকের ঋণ গ্রহণ করতে হয় এবং তা তিনি পরিশোধ করতে পারেন নি। অবশেষে হযরত আব্বাস এ শর্ত আরোপ করে বলেন, “এখন যদি আপনি পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে সিকায়ার মর্যাদা আপনাকে আমার জন্যে ছেড়ে দিতে হবে। এভাবে সিকায়াহ হযরত আব্বাস লাভ করেন। এ প্রাক-ইসলাম যুগের কথা। ইসলামর যুগেও এ পদমর্যাদা বনী আব্বাসেরই রয়ে যায়।

আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব

মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, যমযম খনন কালে যখন আবদুল মুত্তালিব দেখলেন যে, তাঁর সাথে শুধু তাঁর এক পুত্র আছে এবং কুরাইশগণ সকলে এসে ঘেরাও করে রইলো তখন তিনি মানত করলেন, যেন আল্লাহ তাঁকে দশপুত্র দান করেন তাঁর সহযোগিতা করার জন্যে। তাহলে তিন তাদের একজনকে কাবার পাশে আল্লাহর পথে কুরবানী করবেন। আল্লাহ তাঁর এ দোয়া পূরেণ করেন এবং দশপুত্র দান করেন। তারা সব যৌবনে পদার্পণ করে। অবশেষে একদিন আবদুল মুত্তালিব সবাইকে একত্র করেন। তারা সব যৌবনে পদার্পণ করে। অবশেষে একদিন আবদুল মুত্তালিব সবাইকে একত্র করেন এবং তাঁর মানতের কথা তাদেরকে বলেন। সকলে বলে, “আল্লাহর নিকটে যে মানত আপনি করেছেন তা পূরণ করুন।” এ কথা শুনে আবদুল মুত্তালিব সকল পুত্রকে নিয়ে কাবায় হুবাল নামে এক প্রতিমার নিকটে গেলেন। এখানে ফাল বের করা হয়। তাঁর দশপুত্রের মধ্যে কোন্‌ পুত্রকে তিনি কুরবানসী করবেন এজন্যে তিনি ফাল বের করলেন এবং তাতে হযরত আবদুল্লাহর নাম বের হলো যিনি সকল পুত্রের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন। এবং আবদুল মুত্তালিবের অতি প্রিয় পুত্র ছিলেন। [কোন কোন জীবনী লেখক একথা বলেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ট পুত্র ছিলেন। একথা ভুল। মুহায়লী বলেন, হযরত আবদুল্লাহর অনেক ছোট হযরত হামযা (রা) এবং হযরত আব্বাস (রা) ছিলেন। হযরত হামযার (রা) বয়স রসূলুল্লাহ (স) থেকে চার বছর বেশী ছিল এবং হযরত আব্বাস (রা) ছিলেন তিন বছরের বড়ো। হযরত আব্বাসের (রা) নিজের বর্ণনা এই যে, হযুর (স) যখন পয়দা হন তখন তিনি তিন বছরের ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার মনে আছে যে ঘরের মেয়েরা আমাকে হুযুর (স) এর নিকটে এনে বল্লো, “ভাইকে আদর কর।” তখন আমি আদর করলাম (রওযুল উনুফ)- গ্রন্থকার।]

আবদুল মুত্তালিব বিনা দ্বিধায় আবদুল্লাহর হাত ধরে ছুরি হাতে নিয়ে ইসাফ ও নায়েলা মূর্তি দুটোর নিকটে নিয়ে চলেন তাঁকে জবেহ করার জন্যে। কুরাইশরা এটা দেখতে পেয়ে আপন আপন বৈঠক থেকে উঠে দৌড় দিল এবং বল্লো- “আরে আবদুল মুত্তালিব। এ কর কি? তুমি এমন করলে প্রতিদিনি কেউ না কেউ তার পুত্র এনে জবেহ করতে থাকবে। চল, হিজাযে অমুক মেয়েলোকটির কাছে যাই। সে যা বলে তাই করো। সম্ভবতঃ সে এ সমস্যার কোন সমাধান বলে দেবে।” [সুহায়লী স্ত্রীলোকটি কুত্‌বা বলে উল্লেখ করেছেন। সে মদীনার নিকটে হিজর নামক স্থানে বাস করতো-গ্রন্থকার।]

এ প্রস্তাব অনুযায়ী তারা মদীনায় গিয়ে পৌঁছলো এবং জানতে পারলো যে, সে স্ত্রীলোকটি খয়বরে থাকে। তার কাছে গিয়ে তারা সব কথা বল্লো। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের ওখানে লোকের মুক্তিপণ কত হয়ে থাকে?

তারা বল্লো, দশ উট।

সে বল্লো, “চলে যাও এবং একথার উপর ফাল বের কর যে আবদুল্লাহকে কুরবানী করা হবে, না দশটি উট। যদি ছেলের নামের ফাল রেব হয় তাহলে দশ উট আরও বাড়িয়ে দাও এবং ফাল বের কর। এভাবে দশ দশ উট বাড়িয়ে ফাল বের করতে থাক। তখন উটের নামে ফাল বেরুবে, তখন তার অর্থ এই হবে যে, তোমাদের রব পুত্রের পরিবর্তে এতো সংখ্যক উট কুরবানীর উপর রাজী হয়েছেন।”

আররাফা মহিলাটির একথা মেনে নিয়ে তারা সকলে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে ফাল বের করতে শুরু করে। দশ বিশ তিরিশ এমনকি নব্বই পর্যন্ত আবদুল্লাহরই নামই উঠতে থাকে। অবশেষে একশত উটে পৌছার পর ফাল উটের উপর বের হয়। কুরাইশের লোকেরা বলে, এখন ত তোমার রবের মর্জি বুঝা গেল। আবদুল্লাহকে ছেড়ে এখন উট জবেহ কর।

কিন্তু আবদুল মুত্তালিব মানলেন না। তিনি বল্লেন আমি আরো তিন বার ফাল বের করাব। অতএব তিনবার পাশার ঘুঁটি ফেলা হলে এবং তিন বারই উটের উপর ঘুঁঠি পড়লো। [এর থেকে জানা গেল যে, আরবে প্রথমে মানুষের মুক্তিপণ ছিল দশ উট। এ ঘটনার পর আরববাসীর একশত উটই স্বায়ীভাবে মানুষের মুক্তিপণ হিসাবে গণ্য করে।] অতঃপর আবদুল মুত্তালিব একশ’ উট জবেহ করলেন এবং জন সাধারণে মধ্যে প্রচার করে দিলেন যে মানুষ, পশু এমনকি হিংস্র জীবনও যতো খুশী গোশ্‌ত নিয়ে যেতে পারে।

এভাবে আর একবার ইব্রাহীমের (আ) বংশধরদের মধ্যে কুরবানীর সেই ঘটনার পুনাবৃত্তি করা হলো যা মক্কার এ সৌভাগ্যবান পরিবারটির পুনর্বাসনের সূচনা ঘটেছিল। যদিওমূলনীতি ও অর্থের দিক দিয়ে উভয় ঘটনার মধ্যে বিরাট তফাৎ রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কর্মকান্ডের রহস্য উদ্ভূত। প্রথমে এ পরিবারের সেই প্রথম ব্যক্তির কুরবানী অন্য এক ভাবে চাওয়া হয়েছিল যার থেকে আরবে দ্বীন ইসলামের দাওয়াতের সূচনা করতে হয়েছিল। এখন সেই আখেরী নবী (স) এর পিতার কুরবানী অন্যভাবে চাওয়া হলো, যে নবীকে সমগ্র বিশ্বমানবের কাছে সেই দাওয়াত প্রচার ও প্রসারে কাজ করতে হয়েছিল। প্রথম কুরবানীর মুক্তিপণ ছিল একটি দুম্বা এবং দ্বিতীয়টির একশত উট।

হযরত আবদুল্লাহর বিবাহ

হযরত আবদুল্লাহর বয়স পঁচিশ বছর, তখন তাঁর পিতা বনী যুহরা বিন কিলাবের সর্দার উহাব বিন আবদে মানাফের কন্যা আমেনা খাতুনের সাথে তাঁর বিবাহ দেন। আমেনা ছিলেন তাঁর কওমের সর্বোৎকৃষ্ট মেযে। কয়েক মাস দাম্পত্য জীবন যাপন করার পর হযরত আমেনা গর্ভবতী হন। এমন সময় স্বামী হযরত আবদুল্লাহ বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে ফিলিস্তিনের শহর গায্যায় গমন করেন। সেখান থেকে ফিরে মদীনা আসার পর তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি সংগীসাথীদেরকে বল্লেন, তোমরা সব মক্কায় চলে যাও, আমি আমার দাদীর পরিবার আদী বিন নাজ্জারের ওখানে থাকব। এক মাস পর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। দারুন নাবেগাতেল জুন্দীতে তাঁকে দাফন করা হয়।

তাঁর সাথীগণ মক্কায় পৌছে আবদুল মুত্তালিবকে হযরত আবদুল্লাহর অসুস্থতার কথা বলে। আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হারিসকে মদীনা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাঁর মদীনা পৌছুবার পূর্বেই হযরত আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন।

 এ অত্যন্ত সহীহ রেওয়ায়েত যা সাধারণতঃ সকল জ্ঞানী ব্যক্তি মেনে নিয়েছেন। অথচ কোন কোন বর্ণনায় একথা বলা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহর ইন্তেকাল এমন সময়ে হয় যখন রসূলুল্লাহর (স) বয়স আটাশ মাস। কেউ দু’মাস, কেউ সাত মাসও বলেছেন। কিন্তু অত্যন্ত নির্ভরযোগৗ ও সর্বজন স্বীকৃত কথা এই যে, হুযুর আকরাম (স) যখন মাতৃগর্ভে তখন তাঁর পিতার ইন্তেকাল হয়। এ সত্যের প্রতিই কুরআন ইংগিত করে-

(আরবী**************)

-হে নবী। তিনি (তোমার বর) কি তোমাকে এতীম পাননি এবং তার পর আশ্রয়দান করেন নি?

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.