সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

তৃতীয় অধ্যায়

জন্ম থেকে নবুওতের প্রারম্ভ পর্যন্ত

শুভজন্ম

অবশেষে সে সময় এসে গেলা যার জন্যে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাতু ওয়াস সালাম তাঁর পরিবারে একটি অংশ পানি ও তরুলতাবিহীন বিজন উপত্যকা প্রান্তরে পুনর্বাসিত করেছিলেন এবং খানায়ে কাবা নির্মাণের সময় তিনি ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ) দোয় করেছিলেন-

(আরবী*****************)

-হে আমাদের রব। তুমি এদের মধ্যে স্বয়ং তাদেরই কওম থেকে এমন এক রসূলের আবির্ভাব ঘটাও যে তাদেরকে তোমার আয়াত শুনাবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেবে এবং তাদের জীবন পরিশুদ্ধ পরিমার্জিত করবে। (বাকারা: ১২৯)

এ শুযভ মুহূর্তটি আসার কিছুকাল পূর্বে আবরাহা ষাট হাজার সৈন্যসহ তার ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে এসেছিল। কিন্তু ষাট হাজার কেন, যদি সে ষাট লাখও নিয়ে আসতো, তাহলেও সেই পরিণাম হতো, যা হয়েছিল। যেখানে আল্লাহ তায়ালার এতো বিরাট পরিকল্পনা ক্রিয়াশীল যে এ স্থানে এমন সত্তাকে আনা হবে যিনি দুনিয়ার ইতিহাস বদলে দেবেন, যিনি সকল নবীর শেষ নবী এবং যার আগমনের জন্যে আড়াই হাজার বছর ধরে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে, সেখানে যতো বড়ো মানবীয় শক্তিই হোক না কেন তা আল্লাহর শক্তির সাথে সংঘর্ষে চূর্ণ বিচূর্ণ না হয়েই পারে না।

মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে প্রায় একমত যে আসহাবে ফীলের ঘটনা (মক্কায় আবরাহার আক্রমণ) মুহার্‌রম মাসে সংঘটিত হয়। রসূলুল্লাহর (স) জন্ম রবিউল আউয়াল মাসে হয়। আর তা হয়েছিল সোমবার দিনে। একথা স্বয়ং নবী (স) জনৈক বেদুঈনের প্রশ্নের জবাবে বলেন- (সহীহ মুসলিম, বর্ণনাকারী কাতাদাহ)।

রবিউল আউয়ালের কোন তারিক ছিল এতে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ইবনে শায়বা হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এবং হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) এ উক্তি উধৃত করে বলেন যে, তিনি ১২ই রবিউল আউয়ালে পয়দা হন। এরই ব্যাখ্যা করেছেন মুহাম্মদ বিন ইসহাক এবং অধিকাংশ জ্ঞানীগুণীদের মতে এ তারিখই প্রসিদ্ধ। হাতির ঘটনা এবং হুযুতেরর (স) জন্মের মধ্যে ব্যবধান কতটা এ ব্যাপারেও মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে সর্বজনবিদিত কথা এই যে এঘটনার পঞ্চাশ দিন পর হুযুর (স) জন্মগ্রহণ করেন। সৌর ও চন্দ্র মাস ও বছরের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এক জটিল ব্যাপার। এ জন্যে নিশ্চয়তার সাথে একথা বলা মুশকিল যে জন্মের সৌর সাল ও মাস কি ছিল। সাধারণতঃ তাঁর জন্মমাস ৫৭০ খৃঃ অথবা ৫৭১ খৃঃ বলা হয়। সুহায়লী রওযুল উনুফে ২০ শে এপ্রিল বলেছেন কিন্তু সাল উল্লেখ করেননি। কতিপয় গবেষক বলেছে ২৩শে এপ্রিল ৫৭১ খৃঃ। মাহমুদ পাশা ফালাকী ২০শে এপ্রিল ৫৭১খৃঃ বলেছেন এবং তাঁর মতে তা ছিল ৯ই রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার। কসীন ডি পার্সিতাল (CAUSSIN DE PERCEVAL) তার গ্রন্থ আরবের ইতিহাসে ২০শে আগস্ট ৫৭০ খৃষ্টাব্দে নবীর (স) জন্মতারিখ বলে উল্লেখ করেছেন। হিট্টি বলেন, নবী (স) ৫৭১ খৃঃ অথবা তার কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। কতিপয় প্রাচ্যবিদ দু’বছঠর পেছনে দিয়ে ৫৬৯ খৃষ্টাব্দকে নবীর জন্মকাল বলে উল্লেখ করেছেন। শুভ জন্মকাল নির্ভারযোগ্য সূত্রে সূবহে সাতিক (প্রত্যুষ বা উষাকাল) বলা হয়েছে।

সুসংবাদ ও নাম মুবারক

নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত আছে যে, গর্ভাবস্থায় বিবি আমেনা স্বপ্ন দেখেন যে, তাঁর থেকে এমন এক নূর উদ্ভাসিত হয়েছে যে শাম পর্যন্ত আলোকিত হয়েছে। আর একবার স্বপ্নে তাঁকে বলা হলো, তোমার গর্ভে এ উম্মতের সর্দার রয়েছে। সে পয়দা হলে াতর নাম মুহাম্মদ রাখবে। ইবনে সায়াদ একটি বর্ণা উধৃত করেছেন যে, স্বপ্নে তাঁর নাম আহম রাখতে বলা হয়েছে, [পূর্ব আরবে মুহাম্মদ নাম কদাচিৎ কারো ছিল। কিন্তু কারো নাম আহমদ ছিল এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এর কারণ যা আমরা তাফহীমুল কুরআন, পঞ্চমখন্ড, সূরা সফ, টীকা ৭-৮ এ বিস্তারিত বর্ণনা করেছি তা এই যে, আহলে কিতাবের মাধ্যমে কখনো কখনো আরববাসী একথা জানতে পারতো যে, আর একজন নবী আগমন করবেন যার নাম হবে মুহাম্মদ এবং তিনি ইসমাইল বংশে পয়দা হবেন। এ কথা শুনার পর আরবের কিছু লোক তাদের পুত্রের নাম মুহাম্মদ রাখতো, হয়তো সেই নবী হবে। নবী (স) এর পূর্বে যাদের নাম মুহাম্মদ ছিল কাযী ইয়ায তাদের সংখ্যা ছয় বলেছেন। ইবনে খালাওয়াই ও সুহায়লী বলেছেন তিন এবং আবদানুল মারওয়ারী বলেছেন চার। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে বলেন, আমি অনুসন্ধান করে এমন পনেরো জনের নাম জানতে পেরেছি। তারপর তিনি আল- ইসাবাতে বলেন, তাদের কিছু সংখ্যক নবীর যুগ পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি মুহাম্মদ বিন আদী বিন রাবিয়ার অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখেন যে, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে জাহেলিয়াতের যুগে তাঁর পিতা মুহাম্মদ নাম কিভাবে রাখেন। জবাবে তাঁর পিতা একথা বলেন, আমরা শাম দেশে সফর করছিলাম। এমন ময়ে এক ঈসায়ী খানকায় পৌছলাম। খানকার দায়িত্বশীল বল্লেন, তোমাদের কওমের মধ্যে এক নবীর আগমন হবে- যে হবে আখেরী নবী। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তার নাম কি হবে? তিনি বল্লেন- মুহাম্মদ। তারপর থেকে আমাদের ঘরে যে পুত্র সন্তান পয়দা হয় তার নাম মুহাম্মদ রাখা হয়- গ্রন্থকার।] সম্ভতঃ এ দুটি নাম দুটি ভিন্ন ভিন্ন বলে দেয়া হয়েছিল। কারণ এ উভয় নামই হাদীস থেকে প্রমাণিত। বহু বর্ণনায় বিবি আমেনার একথাও উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি যখন ভূমিষ্ট হন তখন আমি অনুভব করাছিলাম যে আমার ভেতর থেকে একটি নূর উদ্ভাসিত হয়েছে যার দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিম আলোকিত হযেছে। বায়হাকী এবং ইবনে আবদুল বার্ ওসমান বিন আবি আল্‌আস এর মায়ের এ বর্ণনা উধৃত করেন যে, হুযুরের (স) ভূমিষ্ট হওয়ার সময় তিনি বিবি আমেনার কাছে উপস্থিত ছিলেন। সে সময়ে যে দিকেই নজর পড়তো শুথু নূর আর নূরই দেখা যেতো। ভূমিষ্ট কালে ধাত্রীর কাজ করেন হযরত আবদুর রহমান বিন আওফের মাতা শিফা বিন্তে আওফ্‌ বিনতে আবদুল হারেস যুহরী।

জন্মের সপ্তম দিনে হযরত আবদুল মুত্তালিব তার আকীকা করেন এবং লোকদের খানার দাওয়াত দেন। খাওফর পর লোকের জিজ্ঞেস করলো, আবদুল মুত্তালিব তুমি তোমার যে সন্তানের জন্যে আমাদেরকে এ দাওয়াত খাওয়ালে তার নাম কি রাখলে?”

জবাবে তিনি বলেন, আমি তার নাম মুহাম্মদ রেখেছি। লোকেরা বল্লো- তুমি তোমার পরিবারের অন্যান্যদের নাম থেকে পৃথক কেন রাখলে?

জবাবে আবদুল মুত্তালিব বলেন, আমি চাই যে, আসমানে আল্লাহ এবং যমীনে তাঁর সৃষ্টি যেন তার প্রশংসা করে।

দারিদ্রের মধ্যে জীবনে সূচনা

হযরত আবদুল্লাহ বিয়ে কালে যুবকই ছিলেন এবং ব্যবসাররও সূচনা করেন। এমন সময় তাঁর ইন্তেকাল হয়। এজন্যে তিনি তাঁর এতীম শিশু ও স্ত্রীর জন্যে কোন বেশী ধনসম্পদ রেখে যেতে পারেননি। ইবনে সায়াদ বলেন, তিনি পাঁচটি উট, একপাল ছাগল এবং এক ক্রীতদাসী উত্তরাধিকার হিসাবে ছেড়ে যান। ক্রীতদাসী সেই উম্মে- আয়মান (রা) ছিলেন যিনি বড়ো স্নেহ সহকারে নবী (স) কে প্রতিপালন করেন। তাঁর আসল নাম ছিল বারাকা এবং তিনি ছিলেন হাবশী বংশোদ্ভূত। পরবর্তীকালে নবী (স) তাঁর মুক্ত গোলাম হযরত যায়েদ বিন হারিসা (রা) সাথে তাঁর বিয়ে দেন। তাঁদের পক্ষে উসামা বিন যায়েদ (রা) জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পবিত্র জীবনের এক গরীবানা অবস্থার উল্লেখ কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে-

(আরবী*************)

-আল্লাহ তোমাকে দরিদ্র পেয়েছিলেন এবং তারপর তোমাকে ধনশালী বানিয়ে দেন।

স্তন্য পান

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রথমে কিছুদিন আবু লাহাবের ক্রীতদাসী সুয়ায়বার দুধ পান করেন। বুখারী ও মুসলিমে আছে যে, তার দুধ হযরত আবু সালমাও (রা) [উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালমার প্রথম স্বামী], পান করেন। ইবনে সায়াদ ও ইবনে হিশাম বলেন, হযরত হামযা (রা) এবং আবদুল্লাহ বিন জাহশ (রা) তারই দুধ পান করেন। আবদুল্লাহ বিন জাহশ ছিলেন উম্মুল মুমেনীন হযরত যয়নবের (রা) ভাই। একারণেই তাঁরা ছিলেন নবী (স) এর দুধ ভাই। এ খেদমতের বিনিময়ে নবী (স) যৌবনে পদার্পণ করার পর হামেশা সুয়ায়বার সাথে অত্যন্ত সদাচরণ করেন। তাঁর শাদী হওয়ার পর হযরত খাদিজা (রা) তার সম্মান শ্রদ্ধা করেন এবং তার সাথে ভালো ব্যবহার করেন। তাপর হযরত খাদিজা তাকে খরিদ করে আযাদ করে দিতে চাইলেন কিন্তু আবু লাহাব অস্বীকৃতি জানায়। পরে সে নিজেই তাকে আযাদ করে দেয়। হিজরতের পরও নবী (স) তার জন্যে কাপড়-চোপড় ও পয়সা কড়ি পাঠাতেন। সম্পতম হিজরীতে নবী (স) তার মৃত্যু সংসাদ পাওয়ার পর তার পুত্র মাসরুহ-এর হাল হাকীকত জিজ্ঞেস করেন। সেও নবীর দুধভাই ছিল। জানা গেল যে তারও মৃত্যু হয়েছে এবং দুনিয়াতে তার কেউ নেই।

হালিমা সা’দিয়া

মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবার সমূহের এ নিয়ম ছিল যে, তাদের সন্তানদের দুগ্ধপানের জন্যে মরু এলাকার কোন ভালো ঘরে তাদেরকে পাঠিয়ে দিত, যাতে করে তারা সুন্দর ও উন্মুক্ত আবহাওয়অয় প্রতিপালিত হয় এবং বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিক্ষা করতে পারে। এ উদ্দেশ্যে বহিরাঞ্জলের গোত্রগুলো থেকে মেয়েলোক সময়ে সময়ে মক্কায় আসতো। তারা সর্দারদের সন্তানদের নিয়ে যেতো এবং ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক লাভ করতো। পরেও তারা সদাচরণ আশা করতো। এ ব্যাপারে নবী (স) এর জন্মের কিছুদিন পর হাওয়াযেন গোত্রের একটি শাখা বনী সায়াদ বিন বকর-এর কতিপয় স্ত্রীলোক সন্তান লাভের জন্যে মক্কায় এলো। হালিমা বিন্তে আবু যায়াইব স্বামী হারিস বিন আবদুল্লাহ সহ তাদের মধ্যে শামিল ছিলেন। ইবনে হিশাম হালিমার নিজের বর্ণনা উধৃত করেন যাতে হালিমা বলেন, আমারেদ অবস্থা বড়ো শোচনীয় ছিল। আমাদের এলাকা দুর্ভিক্ষ পীড়িত ছিল। অন্যান্য মহিলাদের তুলানয় আমাদের অবস্থা অধিকতর খারাপ ছিল। আমাদের গাধী এতো দুর্বল ছিল যে কাফেলার পেছনে পড়ে থাকতো। আমাদের উটনীও বেশী দুধ দিত না। আমার স্তনেও দুধ এতা কম ছিল যে সন্তানদের পেট ভরাতে পারতাম না। রাতভর কাঁদতো এবং আমরাও ঘুমাতে পারতামনা। মক্কায় পৌঁছে জানতে পারলাম যে কোন মহিলা নবী (স)- কে নিতে রাজী নয়। প্রত্যেকেই বলতো সে এতীম। বাপ থাকলে কিছু ভালো আচরণ আশা করতাম। বিধবা মা ও দাদার থেকে কিছু পাব কি না পাব বলা যায় না।

হযরত হালিমা বলেন, অন্যান্য মেয়েলোক অন্যান্য ছেলেপুলে নিয়ে নিল, আমার ভাগ্যে একটিও জুটলো না। সকলে যখন বাড়ি ফেরার জন্যে তৈরী হলো তখন আমি স্বামীকে বল্লাম, ‘আমি খালি হাতে যাওয়াটা পছন্দ করছিনা। গিয়ে ঐ বাচ্চাকে নিয়ে নিচ্ছি।’

আমার স্বামী বল্লেন, তুমি এমন করলে তাতে আর দোষ কি। হতে পারে যে, আল্লাহ তার বদৌলতে আমাদেরকে বরকত দেবেন।

অতএব আমি গিয়ে সেই বাচ্চাকে এ জন্যে নিলাম যে, আর কোন বাচ্চা আমি পেলাম না। তারপর নিজের অবস্থানের তাঁবুতে গিয়ে ঐ সন্তানের মুখে আমার স্তন রাখলাম ত দেখি যে এতো প্রচুর পরিমাণে দুধ বেরুলো যে, সেও তৃপ্তি সহকারে পান করলো এবং তার শরীক দুধভাই আবদুল্লাহ পেটভরে পান করলো। তারপর আমার স্বামী উটনীর দুধ দুইতে গেলে সে এতো দুধ দিল যে আমরা উভয়ে তৃপ্তি সহ পান করলাম এবং রাতটাও আরামে কাটলো। পরদিন ভোরে আমার স্বামী বল্লো- “খোদার কসম, হালিমা তুমি ত বড়ো মুবারক বাচ্চা নিয়েছ।”

হালিমা আরও বলেন, ফেরার পথে আমাদের গাধীর অবস্থা এই ছিল যে, সে কাফেলার সকল সওয়ারী পশুকে পেছনে ফেলে চলতে লাগলো। আমার সহযাত্রী স্ত্রীলোকগণ বলতে লাগলো, হালিমা। একি তোমার সেই গাধী যার উপর চড়ে তুমি আমাদের সাথে এসেছিলে?

বল্লাম- হাঁ

তারা বল্লো, আল্লাহর কসম। তার অবস্থাই ত একেবারে বদলে গেছে।

হালিমা বলেন, আমরা যখন বাড়ি পৌছলাম ত দুনিয়ার বুকের উপর হয়তো বা কোন এলাকা সে সময়ে এতোটা অনুর্বর ছিল না যতোটা ছিল আমাদের। কিনতু ছাগলগুলো যেখানেই চরতে যেতো পেট ভরে ঘাস খেয়ে আসতো এবং প্রচুর দুধ দিত। এভাবে আমরা দিন দিন ঐ শিশুর বরকত বেশী বেশীই দেখতে পেতাম। দুবছর অতীত হওয়ার পর যখন দুধ ছাড়াবার সময় এলো তখন সন্তানটি সকল গোত্রের সন্তানদের অপেক্ষা অধিকতর স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী ছিল।  এমন মনে হতো যেন চার বচরে শিশু। আমরা তাকে মক্কায় তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। কিন্তু আমাদের মন চাইছিল যে সে আমাদের কাছে আরও কাল থাক। আমি তার মাকে বল্লাক, আমার এ বাছাধনকে আমার কাছে আরও কিছুকাল থাকতে দিন যাতে সে আরও বড়ো ও মোটাসোটা হয। আমার ভয় হয়, মক্কার আবহাওয়া তার স্বাস্থ্য খারাপ করে না দেয়।

মোটকথা আমি এতোটা পীড়াপীড়ি করলাম যে, তিনি তাকে আমার সাথে পাঠাতে রাজী হয়ে গেলেন। ইবনে সায়াদ বলেন, এভাবে হুযুর (স) আরও দু’বছর হালিমার ওখানে রয়ে গেলেন।

বক্ষ বিদারণ

হালিমা বলেন, বাড়ি ফেরার পর দু’তিন মাস অতীত হয়েছে। এমন সময় একদিন সে শিশু তার দুধভাইযের সাথে আমাদের বাড়ির পেছনে আমাদের ছাগল দলের সাথে ছিল, তখন হঠাৎ তার দুধভাই দৌড়ে এসে বল্লো, ‘আমার সেই কুরায়শী ভাইয়েল সাদা পোষাকে দুজন লোক এতে তার পেট ফেড়ে ফেল্লো।’ আমি এবং আমার স্বামী দৌড়ে দিয়ে দেখলাম শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে এবং তার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তার বাপ তাকে জড়িয়ে ধরে বল্লো- বাছা, তোমার কি হয়েছে? সে বল্লো, সাদা পোষাক পরিহিত দুজন লোক এসে আমাকে ফেলে আমার পেট চিরে ফেল্লো। তারপর তার মধ্যে থেকে কিছু বের করে ফেলে দিল এবং পেটকে আগের মত করে দিল। অন্য বর্ণনায় আছে, তারা আমার পেটে কোন কিছু তালাশ করতে থাকে। জানিনা তা কি? [উল্লেখ্য যে এক বক্ষ বিদারণের ঘটনা খোদার একটি রহস্য যা মানুষ উদঘাটন করতে পারে না। নবীদের (আ) সাথে এরূপ অসংখ্য আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে যার কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু ব্যাখ্যা না জানা তা অস্বীকার করার কোন সংগত কারণ নয়- গ্রন্থকার।]

হালিমা বলেন, তাকে বাড়িতে আমার পর আমার স্বামী বল্লেন, হালিমা আমার ভয় হচ্ছে তার কিছু না হয়ে যায়। তাকে তার বড়ি পৌঁছে দেয়াই ভালো হবে। সুতরাং আমরা তাকে তার মায়ের কাছে মক্কায় নিতে গেলাম।

তার মা বল্লেন, কি হলো আন্না (স্তন্য দানের জন্যে নিযুক্ত ধাত্রী), একে নিয়ে এলে যে? তুমি ত তাকে তোমার কাছে রাখতে চেয়েছিল। আমি বল্লাম, আল্লাহ বাচ্চাকে বড়ো করে দিয়েছে। আর আমার যে দায়িত্ব ছিল তা পুরো করে দিয়েছি। এখন আমার ভয় হয়, তার কোন দুর্ঘটনা না হয়ে যায়।

বিবি আমেনা বল্লেন, আসল কথাটা কি আমাকে বলো।

তাঁর পীড়াপীড়িতে হালিমা পুরো ঘটনা তার কাছে বলে ফেল্লেন।

বিবি আমেনা বল্লেন, এ বাচ্চার ব্যাপারে কি তোমার শয়তানের ভয় হয়?

হালিমা বল্লেন- হাঁ।

বিবি আমেনা  বল্লেন, খোদার কসম, তার জন্যে শয়তানের পথ খোলা নেই, আমার এ বাচ্চা বিরাট মর্যাদার অধিকারী।

তারপর বিবি আমেনা তাকে গর্ভকালের ও ভূমিষ্ট হওয়ার কালের অবস্থা শুনিয়ে দেন।

শৈশস কালে নবী পাক (স) এর মরুভূমিতে এ অবস্থানের কারণে তার আরবী ভাষা অত্যন্ত বিশুদ্ধ হয়েছিল। কারণ তিন ছিলেন কুরায়শী এবং বনী সায়াদের মধ্যে তিনি তাঁর শৈশব কাল কাটিয়েছেন, যাদের ভাষা ছিল বিশুদ্ধ আরবী। এর ভিত্তিতেই নবী (স) বলেন- (আরবী****************)

-আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আরবী জানি। আমি কুরায়শী এবং আমার স্তন্য পানের সময় কাটিয়েছি বনী সায়াদ বিন বকরে পরিবারের মধ্যে।

সুয়াইবার মতো হালিমার সাথে নবী (স) হামেশা অত্যন্ত মহব্বতের সাথে সদাচরণ করেন। হযরত খাদিজার (রা) সাথে নবী (স) এর বিয়ে হবার পর একবার তিনি (বিবিহালিমা) এসে বল্লেন, আমাদের এলাকায় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়েছে এবং গৃহপালিত পশু সব মরে গেছে।

তাঁর কথা শুনে নবী (স) তাকে চল্লিষটি ছাগল এবং এক উট বোঝাই পণ্যদ্রব্য দান করলে। ইবনে সা’দ বিন মুহাম্মদ বিন মুনকাদারের বর্ণনা উধৃত করে বলেন, একজন মহিলা হুযুরের (স) দরবারে হাজীর হওয়ার অনুমতি চাইলেন, যে তাঁকে শৈশবে স্তন্য দান করেছিল। সে যখন এলো তখন নবী (স) “আম্মা আসুন, আসুন বলতে বলতে তাঁর চাদর বিছিয়ে তাকে বসতে দিলেন।

ফতেহ মক্কার সময় হালিমার ভগ্নি নবীর খেদমতে হাজীর হয়ে হালিমার মৃত্যু সংবাদ দিল। শুনে নবী (স)  এর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাদলো। তারপর নবী (স) তাকে ‍দু’শ দিরহাম, কাপড় চোটড় এবং গদিসহ একটা উট দান করলেন। হাওয়াযেন যুদ্ধে যারা বন্দী হয়ে এলো তাদের মধ্যে হালিমার সে মেয়ে শাইমাও ছিল যে নবী (স) তাঁর শৈশব কালে কোলে করে নিয়ে বেড়াতো। তাকে দেখে নবী (স) চিনতে পারলেন, স্নেহপূর্ণ আচরণ করলেন এবং তাকে সম্মানে তার পরিবার বর্গের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। হাওয়াযেন প্রতিনিধি যখন নবী (স) এর নিকটে করুণা ভিক্ষা চাইলো এবং বল্লো ‘এসব বন্দীদের মধ্যে আপনার খালারাও আছে, দুধমাতারাও আছে’ তখন নবী (স) বল্লেন, যা আমার এবং বনী আবদুল মুত্তালিবের অংশ আছে তা আমি ছেড়ে দিলাম। এভাবে ছ’ হাজার কয়েদী মুক্ত হয়ে গেল্ যে সম্পদ তাদেরকে ফের’ দেয়া হলো তার মূল্য পঞ্চাশ কোটি দিরহাম। নবী (স) এর পরে হযরত আবু বকর (রা) এবং হযরত ওমর (রা) ও এ পরিবারের প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন এবং তাঁদের সাথে ভালো ব্যবহার ও সম্মান প্রদর্শন করতেন।

নবী মাতার ইন্তেকাল

ইবনে সা’দ ও ইবনে ইসহাক বলেন, নবী মুহাম্মদ (স) এর বয়স যখন ছ’বছর এবং ইবনে হাযম ও ইবনুল কাইয়েমের মতে [বিবি হালিমা সম্পর্কে ইবনে কাসীর বলে যে নবী মুহাম্মদ (স) এর নবুয়তের পূর্বে তাঁর (হালিমার) ইন্তেকাল হয়। কিন্তু ইবনুল বারর তাঁর ইস্তিয়অবে আতা বিন ইয়াসারের বর্ণনা উধৃত করে বলেন, নবী (স) এর দুধমাতা হালিমা যখন হুনাইন যুদ্ধের সময় নবীর দরবারে আগমন করেন, তখন তাঁকে দেখামাত্র নবী (স) দাঁড়িয়ে যান এবং স্বীয় চাদর বিছিয়ে বসতে দেন। ইবনুল বার আরও বলেন, যে হযরত হালিমা (রা) নবী (স) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে হযরত আবদুল্লাহ বিন জা’ফর রেওয়ায়েত করেছেন। হাফেজ আবু ইয়ালা ও ইবনে হুব্বান আবদুল্লাহ বিন জাফরের (রা) বরাত দিয়ে হযরত হালিমার রেওয়ায়েত লিপিবদ্ধ করেন। হাফেজ ইবচনে হাজার ইসাবায় হালিমার স্বামী সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, তিনি মক্কায এসে নবী (স) এর খেদমতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু ইবনে সাদ বলেন, ইনি হারেমের পুত্র আবদুল্লাহ নবীর দুধভাই। ইবনে হাজার ইসাবায় উল্লেখ করেন যে শায়মা মুসলমান হয়েছিলেন- গ্রন্থকার।] যখন সাত বছর, তখন বিবি আমেনা নবীর পরদাদীর (আবদুল মুত্তালিবের মাতা) পারিবার বনী আদী বিন নাজ্জারের সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে উম্মে আয়মান সহ শিশু মুহাম্মদগকে নিয়ে মদীনায় যান এবং এক সাম কাল অবস্থান করেন। তিনি শিশু মুহাম্মদকে সে স্থানটি দেখান যেখানে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। যেখানে তাঁকে দাফন করা হয় সে স্থানটিও দেখিয়ে দেন। এ সফরের ঘটনা শিশু মুহাম্মদের (স) পরবর্তীকালে ভালোভাবে স্মরণ থাকে। হিজরতের পর যখন তিনি মদীনায় গমন করেন, তখন তাঁর মায়ের সাথে শৈশব কালের এ ঘটনা তাঁর সংগী সাথীদেরকে শুনাতেন। বনী আদী বিন নাজ্জারের ঘাঁটি দেখামাত্র তিনি চিনতে পারেন। তিনি বলতেন,- “এখানে আমি এক আনসার বালিকা উনায়সার সাথে খেলা করতাম। দাদার নানীবাড়ির ছেলেদের সাথে যেসব পাখী এখানে পড়তো তাদেরকে উড়িয়ে দিতাম।

দারুন্নাবেগা দেখে তিনি বলেন- “এখানে এসে আমি আমার আম্মার সাথে নেমে পড়ি এবং এ ঘরেই আমার আব্বার কবর হয়েছে। আমি বনী আদী বিন নাজ্জারের ঝর্ণাগুলোতে সাঁতার কাটার অভ্যাস করতাম।”

তাপর নবীকে (স) নিয়ে তার আম্মা যখন মক্কা রওয়ানা হলেন এবং আবওয়া নাম স্থানে পৌছলেন তখন তাঁর ইন্তেকাল হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। উম্মে আয়মান নবীকে (স) নিয়ে মক্কায় পৌছেন। ইবনে সা’দ বলেন, যে স্থানে নবীর আম্মাকে দাফন করা হয়েছিল, তাও তাঁর স্মরণ ছিল। সুতরাং ওমরয়ে হুদায়বার সময় যখন তিন আবওয়ার উপর দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন বলেন: (আরবী***********************)

-আল্লাহ মুহাম্মদকে (স) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দেন। তারপর তিনি (নবী (স)) সেখানে গেলেন। কবর ঠিক ঠাক করে দিলেন এবং কেঁদে ফেল্লেন। তাঁর কান্না দেখে মুসলমানগণও কেঁদে ফেল্লেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি ত কাঁদতে নিষেধ করেছেন। তদুত্তরে তিনি বল্লেন- (আরবী******************)

-তাঁর দয়া স্নেহ মমতা আমার মনে পড়লো এবং আমি কেঁদে ফেল্লাম।

হুযুর (স) এর স্বীয় মাতার কবরে যাওয়া এবং কান্নায় ভেঙ্ড়ে পড়া উল্লেখ বিভিন্ন হাদীসে রয়েছে। মুসনাতে আহমাদ, বায়হাকী এবং তাবাকাতে ইবনে সা’দে হযরত বুরায়দাহ (রা) হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এবং হযরত আবু হুরায়রাহ থেকে এসব বর্ণিত আছে।

আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে

বিবি আমিনার মৃত্যুর পর নবী (স) এর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে নিজের নিকটেই রাখলেন এবং তাঁর সকল অপেক্ষা তাঁকেই বেশী চাইতেন। এ জন্যে তাঁকে সর্বদা কাছে রাখতেন। নিকটে বসাতেন এবং যখন খুশী তখন তাঁর কাছে যেতেন- তা একাকীই থাকুক অথবা ঘুমের মধ্যে। তাঁর ভয়ে অন্যান্য সন্তান এ সাহস করতো না। তিনি সাথে না বসলে আবদুল মুত্তালিব খানা খেতেননা কখনো কখনো খাবার সময় তাঁকে কোলে বসিয়ে নিতেন। খানায়ে কাবার দেয়ালের ছায়ায় তার জন্যে একটা বিছানা বিছিয়ে রাখা হতো এবং তাঁর সম্মানের জন্যে সে বিছানায় অন্য কোন সন্তান বরতো না। তার চারপাশে বসতো। সুঠামদেহী বালক মুহাম্মদ (স) সোজাসুজি সে বিছানায় বসে পড়তেন। তাঁর চাচা তাঁকে উঠে যেতে বল্লে, আবদুল মুত্তালিব বলতেন ‘আমার বাছাকে থাকতে দাও। খোদার কসম, তার মর্যাদাই আলাদা। আশা করা যায় সে এমন মর্যদা লাভ করতে ইতঃপূর্বে কোন আরব এমন মর্যাদা লাভ করেনি।

কোন কোন বর্ণনায় পাওয়অ যায় যে, আবদুল মুত্তালিব বলতেন- “তার বড়ো শাহী মেজাজ।” তারপর তাঁকে (শিশু মুহাম্মদকে) কাছে বসিয়ে পিঠে ও মাথায় হাত বুলাতেন, মুখে চুমো দিতেন এবং তাঁর নড়ন চড়ন দেখে বড়ো আনন্দ পেতেন।

ইবনে সা’দ বলেন, বনী মুদলেজ গোত্রের লোক ব্যক্তির চেহারা ও দৈহিক গঠন দেখে তার ভবিষ্যৎ বলতে পারতো। তারা আবদুল মুত্তালিবকে বল্লো “এ শিশুর বিশেষভাবে দেখাশেুনা করবে। কারণ আমরা এমন কোন পদচিহ্ন দেখতে পাইনি যা মাকামে ইব্রাহীমের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আ) পদচিহ্নের অনুরূপম, যেমন এ শিশুর পদচিহ্ন অনুরূপ।”

এ সময়ে সেখানে আবু তালিব উপস্থিত ছিলেন, আবদুল মুত্তালিব তাঁকে বলেন, এরা যা বলছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনে রাখ এবং হেফাজত কর।

কিন্তু দাদার এ স্নেহ বাৎসল্য শিমু মুহাম্মদ (স) বেশী দিন লাভ করতে পারেননি। তাঁর বয়স যখন আট বছর, তখন দাদা ইন্তেকাল করেন। ইবনে সা’দ এবং হাফেজ সাখাবী উম্মে আয়মানের এ বর্ণনা উধৃত করেন। উম্মে আয়মান বলেন, আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর সময় নবী (স) তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।

পরবর্তীকালে নবীকে (স) যখন জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনার দাদার মৃত্যুর  কথা কি আপনার মনে পড়ে?” তিনি বলেন, হাঁ তখন আমার বয়স আট বছর।

হযরত আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে]ৎ

আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর, কোন কোন বর্ণনা মতে তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী এবং কোন কোন বর্ণনা মতে, হযরত আবু তালিব স্বেচ্ছায় নবীর প্রতিপালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল আবদে মানাফ। কিন্তু তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র তালিবের কারণে তাঁর কুনিয়াত আবু তালিব এতোটা প্রসিদ্ধি লাভ করে যে আসল নাম চাপা পড়ে যায়। বালত তালিব নবী (স) এর সমবয়স্ক ছিল এবং ‍উভয়ের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ছিল। কুরাইশগণ যখন বদর যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে বনী হাশিমতে বাধ্য করে তখন তালিবও তাদের মধ্যে ছিল। সে যুদ্ধে অংশগ্রহণও করেনি নিহতদের তালিকায় তার নামও ছিল না এবং সে মক্তায়ও প্রত্যাবর্তন করেনি। তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আবু তালিব নবী (স) এর আপন চাচা ছিলেন। তিনি ভাইপোকে আপন সন্তানদের চেয়ে অধিক ভালো বাসতেন। নিজের কাছেই শয়ন করাতেন এবং যেখানেই যেতেন সাথে করে নিয়ে যেতেন। আহারের সময় তিনি (নবী মুহাম্মদ) এসে শরীক হলেই অন্যান্যগণ খাওয়া শুরু করতো। ওয়াকদী বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু তালিবের পরিবারস্থ লোকজন নবী মুহাম্মদকে (স) ছেড়ে যদি আহার করতো, তা একা একা করুক অথবা একত্রে, তাদের কারো পেটভরতো না। কিন্তু নবী মুহাম্মদ তাদের সাথে আহার করলে পেট ভরে খাওয়ার পর খানা বেঁচে যেতো। তাঁর এ বরকত লক্ষ্য করে আবু তালিব এ নিয়ম করে দেন যে, আহার করতে বসলে বলতেন –“দাড়াও আমার বাছাকে আসতে দাও।” তারপর হুযুর (স) এলে সকলে খানা খাওয়া শুরু করতো। আবু তালিব বলতেন, বাছা, তুমি বড়োই মুবারক (বরকতের অধিকারী। খানা খেতে বসে ছেলেপুলেরা তাদের অভ্যাসমতো কাড়াকাড়ি শুরু করলে হুযুর (স) হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন। এ অবস্থা দেখে আবু তালিব তার জন্যে পৃথক এবং নিজের জন্যে পৃথক খানার ব্যবস্থা করতেন। মাদুর বিছানো হতো এবং সেখানেই আর কেউ বসতো না। শুধু হুযুর (স) তাঁর সাথে বসে যেতেন। আবু তালিব বলতেন, রাবিয়অর খোদার কসম, আমার এ বাছাধনের সর্দারি শোভা পায়।

নবীর ছাগল চরানো

সম্ভবতঃ এ সে সময়ের ঘটনা যখন হুযুর (স) চাচার আর্থিক দুরবস্থা এবং সেই সাথে চাচার বিরাট পরিবার দেখে স্বয়ং কিচু উপার্জনের চিন্তা করে থাকবেন। শৈশব কালে দুধমাতার গৃহে অবস্থান কালে তিনি তাঁর দুধভাই- ভগ্নির সাথে তাদের পরিবারের ছাগল চরাতেন। জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর এ কাজ তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কায় শুরু করেন। হাদীসে ওবাইদ বিন ওমাইরের এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় যে, হুযুর (স) বলেন, কোন নবী এমন ছিলেন না যিনি ছাগল চরান নি। লোকে জিজ্ঞেস করে, আপনিও কি ছাগল চরিয়েছেন? বলেন, হ্যাঁ।

বুখারী কিতাবুল ইজারায় হযরত আবু হুরায়রার (রা) একটি বর্ণনা আছে। তাতে এ প্রশ্নের জবাবে হুযুর (স) বলেন আমি কিছু কারারিতের বিনিময়ে মক্কাসাবীর ছাগল চরাতাম। [ইবনে মাজাহ সুয়াইন বিন সাঈদের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যে, এ বিষয়ে নবী (স)এর ভাষা ছিল:

(আরবী*************)

-আমি কিচু কারারিতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম। এ বর্ণনাটি বুখারীর বর্ণনার এ অর্থ করে যে হুযুর *(স) পারিশ্রমিমের বিনিময়ে মক্কাবসীর ছাগল চরাতেন। কিন্তু ইব্রাহীম আলহারবী দাবী করেন যে কারারিতের অর্থ কোন নগত অর্থ সম্পদ নয়, বরঞ্চ আজইয়াদের নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম যেখানে নবী ছাগল চরাতেন। এ কথা সমর্থন করেছেন ইবনুল জওযী ও আল্লামা আয়নী। কিন্তু প্রথম কথা এই যে মক্কায় ভূগোলে কোন স্থানের নাম কারারিত প্রমাণিত হয় না। দ্বিতীয়তঃ পারিশ্রমিক নিয়ে ছাগল চরানো কোন দুষণীয় ব্যাপার নয় যে এ দোষ থেকে হুযুরকে (স) মুক্ত করার জন্যে এতাসব করতে হবে। -গ্রন্থকার।]

কিররাত শব্দের বহু বচন করারিত (এক দীনারের দশভাগের এক ভাগ এবং বিশভাগের এক ভাগ এক কিররাত বলে)। আবু সালমা বিন আবদুর রহমান বলেন, একবার লোকজন নবী (স) সাথে পিলু বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করেছিলেন। তখন নবী (স) বলেন, এর যে ফলগুলো কালো হয়ে গেছে তা পেড়ে আন। সেকালে যখন আমি ছাগল চরাতাম, তখন এ ফল পারতাম (ইবনে সা’দ-লন্ডন-পৃঃ ৭৯-৮০)।

প্রাথমিক বয়সেই নবীর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ

নবীর জন্মের পর থেকে দশ বারো বছর পর্যন্ত যেসব ঘটনার উল্লেখ করা হলো, তার থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁর সংস্পর্শে যারাই এসেছে তাদের মনে এ ধারণাই বদ্ধমূল হয়েছে যে, তাদরে মধ্যে জন্মগ্রণ করেও তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শুধু তাই নয় যে, তর পক্ষ থেকে বিচিত্র ধরনের বরকত প্রকাশ পেয়েছে, বরঞ্চ তাঁর স্বভাব চরিত্র সাধারণ শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ছিল। তাঁর চেহারা ও মুখমন্ডল থেকেও তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুট হতো।

বায়হাকী এবং ইবনে জারীর হযরত আলীর (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করে বলেন যে, নবী (স) বলেছেন “দু বারের অধিক আমার মধ্যে সেসব কাজ করর আগ্রহ জন্মেনি যা জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ করতো এবং দু’বারই মহান আল্লাহ তায়ালা আমাজে সে জা করা থেকে রক্ষা করেছেন। তারপর সে কাজের কোন ধারণাই আমার মনে জাগেনি। যেসব ছেলেরা আমার সাথে ছাগল চরাতো তাদেরকে একদিন বল্লাম, আমার ছাগলগুলোর দিকে একটু নজর রেখো, আমি মক্কায় গিয়ে রাতের বেলা সেসব আমোদপ্রমোদে অংশগ্রহণ করি যাতে অন্য ছেলেরা অংশগ্রহণ করে। তরা রাজী হলো এবং আমি শহরের দিকে চল্লাম। তারপর প্রথম বাড়িতেই আমি গান বাজনার কোলাহল শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, েএসব কি হচ্ছে? লোকে বল্লো অমুক অমুকে বিয়ে হচ্ছে। আমি বসে পড়লাম এবং সংগে সংগে আমার এমন ঘুম এলো যে প্রভাত হয়ে গেল এবং সূর্যের উত্তাপে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।”

“আরেকদিন আমার সাথীদের ঐ একই কথা বলতেই তরা রাজী হয়ে গেল। তারপর মক্কা প্রবেশ করে দেখলাম সেই গান বাজনাই হচ্ছে। আমি বসে পড়লাম এবং সেদিনও ঘুমে অভিভূত  হয়ে পড়লাম এবং সকাল পর্যন্ত ঘুমেই কাটলাম। সাথীদেরকে গিয়ে বল্লাম যে, আজও কিছুই দেখতে পেলাম না। তারপর থেকে এ ধরনের কোন কিছুর প্রতি আমার আগ্রহই জন্মেনি।” ইবনে সা’দ উম্মে আয়মানের বরাত দিয়ে বলেন, বুয়ানা নামে একটি এতিমা ছিল যার দর্শন লাভের জন্যে কুরাইশরা যেতো। সেখানে নযর নিরাযও দিত। আবু তালিবও এ উদ্দেশ্যে তাঁর পরিবারের লোকজনসহ সেখানে যেতো। তরুন ‍মুহাম্মদকেও তাদের সাথে যেতে বলা হতো। কিন্তু প্রতি বছর এ ঝগড়াই বাধতো যে মুহাম্মদ (স) যেতে অস্বীকৃতি জানাতেন এবং চাচা ও ফুফীগণ ভয়ানক অসন্তুষ্ট হতেন। একবার বাড়ির মুরব্বীদের তিরস্কার ভৎর্সনায় অতীষ্ট হয়ে এ উৎসবের সময় বহুক্ষণ ধরে নবী মুহাম্মদ (স) কোথায় উধাও হয়ে থাকলেন। বাড়িরর সকলেতাঁর জন্যে অস্থির হয়ে পড়লো। তিন যখন ফিরে এলেন তখন তাকে অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত মনে হলো এবং তাঁর মুখমণ্ডলও বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফুফীগণ তাঁকে জড়িয়ে ধরে বল্লো, বাছা, তোমার কি হয়েছিল? তিনি বল্লেন, আমার ভয় হচ্ছে আমার কিছু না হয়ে যায়। ফুফীগণ বল্লেন, আল্লাহ কখনো শয়তানের দ্বারা তোমার অনিষ্ট হতে দেবেন না যেহেতু তোমার মধ্যে এই গুণাবলী আছে। তিনি বল্লেন, যখনই আমি এ প্রতিমা ঘরের কোন প্রতিমার দিকে যাই, তখন এমন মনে হয় যে, একজন গৌরবর্ণের দীর্ঘকায় লোক দাঁড়িয়ে আছে এবং বলছে, মুহাম্মদ, দূরে থাক, ওকে স্পর্শ করোনা। উম্মে আয়মান বলেন, তারপর থেকে তিনি কখনো এ উৎসবে যোগদান করেননি।

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, মুখাকৃতি বিচারপূর্বক চরিত্র নির্ণয় বিদ্যায় বিশেষজ্ঞ (PHYSIOGNOMIST) এক ব্যক্তি মক্কায় আযদে শানুয়ার একটি শাখার লেহাব গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতো এবং মক্কায় যাতায়াত করতো, যখনই সে আসতো কুরাইশের লোকজন তাদের সন্তানদের তার কাছে নিয়ে যেতো, যাতে করে সে বিদ্যার সাহায্যে তাদের সম্পর্কে কিচু বলতে পারে। একবা যখন সে এলো, আবু তালেব তার অন্যান্য সন্তানদের সাথে হুযুরকে (স) তার কাছে নিয়ে গেলন। সে তাঁকে দেখে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কাজ শেষ করে সে বল্লো, একটু আগে যে ছেলেটিকে দেখেছিলাম সে কোথায়? তাকে আন। আবু তালেব যখন দেখলেন যে বালক মুহাম্মদকে দেখার জন্যে বড়ো অস্থির, তখন তিনি তাঁকে সেখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে রাখলেন। সে লোকটি বল্লো, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো, খোদার কসম, সে বিরাট মহাপুরুষ হবে।

মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, নবী (স) বলেছেন, একদিন কুরাইশদের ছেলেদের সাথে খেলা করতে করতে আমি এ পাথর বহন করে আনছিলাম। সকল ছেলে পাথর বহন করার জন্যে তাদের ইজার তহবন্দ খুলে গলায় বেঁধে রেখেছিল যার দরুনস সকলেই উলংগ হয়ে পড়েছিল। যেইমাত্র আমিও এরূপ করলাম, হঠাৎ আমার উপর এক ঘুসি পড়লো এবং কে যেন আমাকে বল্লো, “তোমার ইজার বেঁধে নাও”। সুতরাং আমি আমার ইজার বেঁধে নিলাম।

এভাবে নবী মুহাম্মদকে শৈশব কালেই উলংগ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। ঠিক এ ধরনের একটি ঘটনা তখন ঘটেছিল যখন ৩৫ হাতি বর্ষে  (যখন নবীর বয়স ৩৫ বছর এবং নবুয়ত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বছর বাকী ছিল) কুরাইশগণ নতুন করে কাবা ঘরের নির্মান কাজ শুরু করে। এ সময়ে কুরাইশদের সকলে তাদের ইজার খুলে আপন আপন গলায় বেঁধে পাথর বহন করে আনছিল। বালক ও যুবক বৃদ্ধ নির্বিশেষে কারে মধ্যেই উলংগতার কোন অনুভূতি ছিলনা। হযরত আব্বাস (রা) বালক মুহাম্মদকেও (স) তাই করতে বলেন। তিনি এরূপ করার সাথে সাথেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং আমাশের দিকে নিবদ্ধ হয়। তারপর জ্ঞান ফিরে এলে বলেন, “আমার ইজার কোথায়?” তখন তাঁর ইজার পরিয়ে দেয়া হলো এবং তিনি উঠে পড়লেন। এ ঘটনাটি হযরত জাবের বিন আবুদল্লাহ থেকে বুখারী ও মুসলিমে উধৃত হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক, তাবারানী এবং হাকেম আবু তোফাইলের বরাত দিযে বলেন, গায়েব থেকে আওয়াজ এলো, “হে মুহাম্মদ তোমার সত ঢাক।” কিন্তু বর্ণনা থেকেই একথা প্রমাণিত হয় না যে হুযুর (স) একে বারে উলংগ হয়ে ছিলেন। ইজার খুলে উলংগ হওয়অর পূর্বেই তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়েন।

মূর্তি পূজার প্রতি ঘৃণা

শৈশব কাল থেকেই শির্ক, মূর্তিপূজা এবং এসবের প্রদর্শনী ও করণী কাজের প্রতি তাঁর চরম ঘৃণা ছিল। প্রাক নবুয়ত জীবনেও এসবের মলিনতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বুখারী- আবওয়াবুল মুনাকেবে যায়েদ বিন আমর বিন নুফাইল শীর্ষ হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমরের (রা) একটি হাদীস বর্ণনা পাওয়অ যায়।

তাতে বলা হয়েছে যে, একবার প্রতিমাদের উদ্দেশ্যৌ উৎসর্গীত খানা এবং তাদের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা পশুর গোশত নবীকে (স) খেতে দেয়া হলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন। মুসনাদে আহমাদে ওরওয়া বিন যুবাইর বর্ণনা করেন, “আমার নিকটে হযরত খাদিজার (রা) এক প্রতিবেশিী একথা বলেন, আমি নবীকে (স) হযরত খাদিজা কে (রা) লক্ষ্য করে এ কথা বলতে শুনলাম-

(আরবী******************)

-হে খাদিজা। খোদার কসম লাত ও মানাতের এবাদত কখনো করব না। খোদার কসম আমি তাদের এবাদত কখনো করবনা।

জবাবে খাদিজা (রা) বলেছিলেন, “রাখুন লাত আর রাখুন মানাত।”

এ ঘটনা বর্ণনার পর সে প্রতিবেশী হযরত ওরওয়াকে বলে যে, কুরাইশরা রাতে ঘুমোবার আগে এ প্রতিমা দুটির পূজা করতো। সম্ভবত এ নবী (স) এর দাম্পত্য জীবনে সূচনা কালের ঘটনা।

শাম সফর এবং তাপস বাহিরার ঘটনা

একবার আবু তুলিব একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে শাম দেশ সফরের জন্যে রওয়ানা হন। তখন নবী (স) এর বয়স ছিল বারো বছর। আবু তালিব যখন রওয়ানা হন তখন নবী (স) তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং ইবনে সা’দের বর্ণনামতে বলেন, “চাচাজান, আপনি আমাকে কার কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন। আমার যে মা-বাপ কেউ নেই, যে আমার দেখাশুনা করবে।”

একথায় আবু তালিবের মন বিগলিত হলো এবং তিনি বল্লেন, খোদার কসম, আমি না একে দূরে রাখব আর না আমি তার থেকে দূরে থাকব। এ আমার সাথেই যাবে।

এ কাফেলা যখন শাম এলাকায় বুসরা পৌছালো এবং তাপস বাহিরার গীর্জার নিকটে থাকলো, তখন তিন তার অভ্যাসের খেলাপ গীর্জা থেকে বেরিয়ে িএলেন। অথচ কোন কাফেলার জন্যে তিনি কখনো গীর্জা থেকে বেরিয়ে আসতেন না। তিনি এ গোটা কাফেলার জন্যে আহার তৈরী করেন এবং সকলকে খানার দাওয়াত করেন। কাফেলার সকলেই খানা খেতে গেলেন। শুধু মুহাম্মদ কে (স) অল্পবয়স্ক হওয়ার কারণে অবস্থান শিবিরে রেখে যাওয়অ হলো। বাহিরা জিজ্ঞেস করলেন,

-সবা িকি এসেছেন?

তারা বল্লেন, শুধু একটি অল্পবয়স্ক বালককে লটবহর দেখাশুনার জন্যে অবস্থান শিবিরে রেখে আসা হয়েছে।

বাহিরা বল্লেন, না, তাকেও ডাকুন।

কুরাইশদের মধ্যে একজন বল্লেন, লাত ও ওয্যার কসম, আমাদের জন্যে এটি খুবই খারাপ হবে যদি মুহাম্মদ (স) আমাদের সাথে খানায় শরীক না হয়। তারপর সে গিয়ে মুহাম্মদকে (স) নিয়ে এলো।

তাঁকে আনার পর বাহিরা তাঁকে খুব মনোযোগসহকারে দেখতে লাগলেন এবং তাঁর চেহারা ও মুখমন্ডলের পরীক্ষা করতে লাগলেন।

খাওয়ার পর বাহিরা বালক মুহাম্মদ (স) এর নিকটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ওহে বালক, আমি তোমাকে লাত ও ওয্যার কসম দিয়ে বলছি, যা জিজ্ঞেস করব তার ঠিক ঠিক জবাব দেবে।

হুযুর (স)বল্লেন, আমাকে লাতহ ও ওয্যার কসম দেবেন না। তাদের থেকে বেশী আক্রোশ আমার আর কিছুর জন্যে নেই।

তিনি বল্লেন, আচ্ছা, তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ওসব কথার জবাব দাও যা আমি জিজ্ঞেস করি।

হুযুর (স) বল্লেন, যা খুশী জিজ্ঞেস করুন।

তারপর বাহিরা হুযুরের (স) অবস্থা, তাঁর ঘুম, দৈহিক গঠন এবং অন্যান্য বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং হুযুর (স) জবাব দিতে থাকেন। তারপর বাহিরা তাঁর চারদিকে ঘুরে ফিরে তাঁর দেহ পরীক্ষা করে দেখলেন। তারপর আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন, এ আপনার কে হয়? আবু তালিব বল্লেন, এ আমার পুত্র।

বাহিরা- এর পিতা জীবিত হতেই পারেন না।

আবু তালিব- এর আমার ভাতিজা।

বাহিরা- তার পিতার কি হলো?

আবু তালিব- এ মাতৃগর্ভে থাকতেই তার পিতার মৃত্যু হয়।

বাহিরা- তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার ভাতিজাকে বাড়ি ফিরে নিয়ে যাও। ইহুদীদের থেকে একে রক্ষা করো। আল্লাহর কসম, তারা যদি একে দেখে সেসব আলামত চিনে ফেলতে পারে যা আমি চিনে ফেলেছি, তাহলে তার কিছু অনিষ্ট করবে। কারণ তোমার ভাতিজা বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবে।

অতএব আবু তালিব অতি সত্ত্বর তাঁর ব্যবসার কাজকর্ম সেরে হুযুর )(স) কে নিয়ে দেশে ফিরে যান।

 এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাচ্যবিদগণ অনেক অলীক কল্পনার প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন এব যেসব জ্ঞানগর্ভ কথা নবুয়ত প্রাপ্তির পর হুযুর (স) থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাঁরা সেসবকে খৃস্টান তাপসদের থেকে গৃহীত তথ্যাবলী বলে গণ্য করেন। উপরন্তু স্বয়ং আমাদের কিছু বর্ণনাও এমন আছে যা কিচু এসব কল্পনাকে শক্তি যোগায়। সাধনার মাধ্যমে আপন অধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ সাধন করেছেন এবং একজন সিদ্ধ তাপস যদি কিছু অসামান্য বরকতের নিদর্শন দেখে অনুভব করেন যে, এ কাফেলার মধ্যে এক বিরাট ব্যক্তিত্ব রয়েছে এবং অতঃপর হুযুরকে (স) দেখার পর তাঁর অনমুন সত্য হয়, তাহলে এতে অবকা হবার কিছু নেই। উপরন্তু এটা মনে করে যে ইহুদী একটি হিংসাপরায়ন জাতি এবং আরবের উম্মীরেদ মধ্যে কোন বিরাট ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবকে নিজেদের জন্যে আশংকাজনক মনে করে তার ক্ষতি করতে পারে। যে জন্যে তাদের থেকে রক্ষা করাতে তিনি আবু তালিবকে পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। কিন্তু এ কথা গ্রহণযোগ্য নয় যে, তিনি একথা মনে করে নিয়েছিলেন যে তিনিই হুযুর ((স) সে ভবিষ্যত নবী যাঁর আগমনে সুসংবাদ পূর্ববর্তী গ্রন্থাবলীতে দেয়া হয়েছে। কারণ ভবিষ্যৎ বাণীর দ্বারা অবশ্যই একথা জনা ছিল যে, একজন নবী আসবেন এবং তার নাম হবে মুহাম্মদ। কিন্তু নিশ্চিত রূপে এটা জানা সম্ভব ছিলনা যে বালক মুহাম্মদ (স)-ই সে নবী।

এ সম্পর্কে মুহাদ্দিস এবং জীবনী রচয়িতাগণ যেসব বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন সামগ্রিকভাবে তার উপর একবার দৃষ্টিপাত করা যাক। তিরমিযি, বায়হাকী, ইবনে আসাকির, হাকেম, আবু নঈম, আবু বকর আল খারায়েতী এবং ইবনে আবি শায়বাহ হযরত আবু মূসা আশয়ারী থেকে এ বর্ণনা উধৃত করেছেন যে, বহিরা হুযুরের (স) হাত ধরে বলেন, ইনি সাইয়্যেদুল মুরসালীন, ইনি সাইয়েদুল আলামীন। একে অতিসত্বর আল্লাহতায়লা রাহমাতুল্লিল আলামীন করে পাঠাবেন।

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো (তিরমিযি প্রমুখ কতিপয় মুহাদ্দিসীনের বর্ণনামতে ‍কুরাইশদের সর্দারগণ জিজ্ঞেস করে), আপনি এ সবের জ্ঞান কোথা থেকে লাভ করলেন?

বাহিরা বলেন, তোমরা যখন সামনে থেকে আসছিলে তখন গাছপালা পাহাড় পর্বত সিজদারত ছিল। আর এসব নবী ছাড়া আর কারো সামনে সিজদারত হয় না। তাছাড়া আমি সেই মোহরে নবুয়ত দেখতে ও চিনতে পারলাম যা তার পিঠে দুই কাঁধের মাঝখানে রয়েছে। তার উল্লেখ আমর আমাদের কিতাবগুলোতেও পাই।

তারপর বাহিরা আবু তালিবকে বলেন, ইহুদীদের পক্ষ থেকে এর আশংকা রয়েছে। এ জন্যে তাকে ফেরৎ পাঠিয়ে দাও। ইবনে আবি শায়বাহ্ আবু মূসা আশয়ারী থেকে যে বর্ণনা উধৃতি করেন তাতে এ উল্লেখ রয়েছে যে, যখন হুযুর (স) গীর্জার  দিকে আসছিলেন, একটি মেঘ তাঁর উপর ছায়া করছিল। এমন বর্ণাও আছে যে, বাহিরার পীড়াপীড়িতে আবু তালিব হুযুর (স) কে আবু বকর (রা) এবং বেলাল (রা) এর সাথে মক্কা পাঠিয়ে দেন। অথচ আবু বকর (রা) এর বয়স তখন দশ বছর ছিল এবং বেলাল (রা) তাঁর থেকেও ছোট। দ্বিতীয়ত বেলালকে পাঠানো এক আজব ব্যাপার। কারণ সে সময়ে বনী আবদুল মুত্তালিবের সাথে তাঁর কোনই সম্পর্ক ছিলনা যাতে করে আবু তালিব তাঁর কোন খেদমত নিতে পারতেন। এ সফর সম্পর্কে এ কথাও বলা হয়েছে যে, সাতজন রোমীয় হুযুর (স) কে হত্যা করার জন্যে বেরোয় এবং বাহিরার গীর্জায় পৌছে। বাহিরা জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি জন্যে এসেছ? তারা বলে, আমরা জানতে পেরেছি এ নবীর এ মাসে এদিকে আসার কথা। সে জন্যে সবদিকে লোক পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে িএবং আমরা এখানে এসেছি। বাহিরা বলেন, তোমাদের কি ধারণা, যে কাজের ফয়সালা আল্লাহ করেছেন, তা কেউ রুখতে পারে? তারা বলে, না। তারপর তারা তাদের ইচ্ছা পরিহার করে।

এ সবের অর্থ এ দাঁড়ায় যে, বারো বছর বয়সে স্বয়ং হুযুর (স), কুরাইশ এবং রোমের শাসক গোষ্ঠী পর্যন্ত এ কথা জেনে ফেলে যে বালক মুহাম্মদ (স) নবী হতে যাচ্ছেন।

আবু সাঈদ নাইশাপুরীর শারফুল মুস্তাফার বরাত দিয়ে হাফেজ ইবনে হাজার ইসাবা গ্রন্থে একথা বলেন যে, এ ঘটনার তের বছর পর মুহাম্মদ (স) যখন হযরত খাদিজার (রা) ব্যবসার পণ্যদ্রব নিয়ে শাম যান, তখন বাহিরার সাথে তাঁর দ্বিতীয় বার সাক্ষাৎ হয়। এবার তিনি বলেন, (আরবী********************)

-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি আল্লাহর রসূর, উম্মী নবী যার সুসংবাদ ঈসা ইবনে মরিয়ম দিয়েছেন।

এর ভিত্তিতে ইবনে মান্দাহ এবং আবু নাঈম বাহিরাকে সাহাবীর মধ্যে গণ্য করেছেন। হাফেজ যাহাবী তাজরিদুস সাহাবায় বলেছেন যে, বহিরা নবীন আগমনের পূর্বেই তাঁর উপর ঈমন এনেছিলেন।

দ্বিতীয়বার শামদেশ সফর সম্পর্কে একথাও বলা হয়েছে যে বুসরাতে একটি গাছের তলায় হুযুর (স) অবস্থান কনে যা তাপস নাস্তুরার গীর্জার সন্নিকটে ছিল। নাস্তুরা বাইরে বেরিয়ে এসে হুযুরের (স) সাথেী গোমাল মায়সারাকে জিজ্ঞেস করেন যে গাছের তলায় কে অবস্থান করছেন। সে বলে, হারামবাসী কুরাইশের এক ব্যক্তি। ওয়াকেদী এবং ইবনে ইসহাক বলেন যে, তদুত্তরে নাস্তুরা বলেন, হযরত ঈসা (আ) এর পরে এ দুশ বচর যাবত নবী ছাড়া আর কেউ অবস্থান করেনি। আবু সাঈদ শারফুল মুস্তাফাতে অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, তারপর নাস্তুরা হুযুর (স) এর নিকটে এলেন, তাঁর মাথা ও পায়ে চুমো দিলেন এবং বল্লেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আল্লাহর রসূল সেই উম্মী নবী যার সুসংবাদ ঈসা (আ) দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, আমার পরে এ গাছতলায় নবী উম্মী হাশেমী আরবী মক্কী, সাহেবুল হাওযে ওয়াশ শাফায়াত এবং সাহেবে লেওয়অযে হাম্‌দ ব্যতীত আর কেউ অবস্থান করবে না।

মায়সারা তাঁর এ উক্তি স্মরণ রাখে। তারপর হুযুর (স) বুসরার বাজারে বেচাকেনার জন্যে বের হন। এ সময়ে এক ব্যক্তির সাথে জিনিসের মূল্য নিয়ে মতবিরোধ হয়। তখন সে বলে, লাত ও মানাতের কসম খেয়ে বলূন। হুযুর (স) বলেন, তাদের কসম আমি কোন দিন খাইনি। তখন সে বলে, আমি আপনার কথাই মেনে নিচ্ছি। তারপর সে মায়সারাকে নিরিবিলি ডেকে নিয়ে বলে, ইনি নবী। সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন, ইনি সেই নবী যার উল্লেখ আমাদের পুরোহিতগণ তাঁদের কিতাবে দেখতে পান। মায়সারা এ কথাও মনে রাখে।

আবু নাঈম বর্ণনা করেন যে, এ সফরে মায়সার দেখেন যে, দুজন ফেরেশতা হুযুর (স) এর উপর ছায়া করে আছেন। এ কাফেলা যখন মক্কা পৌছে তখন বেলা দুপুর। তখন হযরত খাািদজা (রা) তাঁর বালাখানায় ছিলেন। তিনিও দেখে যে হুযুর (স) উটের পিঠে এবং দুজন ফেরেশতা তাঁর উপরে ছায় করে আছেন। আবু নাঈম ছাড়া অন্যান্যগণ অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, হযরত খাদিজা (রা) তার সাথে অন্যান্য নারীদেরকেও এ দৃশ্য দেখান এবং তরা বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকে। তারপর মায়সারা হযরত খাদিজা ()রা) এর নিকটে উপস্থিত হয়ে সেসব দৃশ্যের  কথা বল্লো যা সে দেখেছিল। নাস্তুরা যা বলেছিলেন এবং শামের একজন ব্যবসায়ীর সাথে যে ঘটনা ঘটেছিল তাও সে হযরত খাদিজাতকে(রা) বলে। এ সব বর্ণনা যদি মেনে নেয়অ যায়, তাহলে তার অর্থ এই হবে যে, পনেরো বছর পূর্বে মুহাম্মদ (স) জানতে পেরেচিলেন যে তিনি নবী হতে যাচ্ছেন। মায়সারা, খাদিজা (রা) এবং তাঁর সাথে উপবিষ্ট কুরাইশদের বহু মহিলাও একথা জানতো। তারপর কুরাইশের যে কাফেলার সাথে মুহাম্মদ (স) শাম গিয়েছিলেন তারাও এবং মক্কাবাসীও এ বিষয়ে অবহিত ছিল যে, ফেরেশতা তাঁর উপর ছায়া করেছিল। কারণ মায়সারা, হযরত খাদিজা (রা) এবং তাঁর সংগের মহিলাগণ যখন সে দৃশ্য দেখছিলেন, তখন অন্যদের কাছে এ কথা গোপন  থাকে কি করে?

যদিও কথাগুলো বিজ্ঞ মনীষীদের বর্ণনা থেকেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তথাপি কয়েকটি কারণে তা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমতঃ এসব সুস্পষ্ট কুরআনের পরিপন্থী যাতে নবীকে (স) সম্বোধন করে বলা হয়েছে- (আরবী****************)

-তুমি কখনো এ আশা করতেনা যে তোমার উপর কিতাব নাযিল করা হবে (কাসাস: ৮৬)

(আরবী**********************)

তুমি ত জানতেনা যে, কিতাব কি বস্তু এবং না এটা জানতে যে ঈমান কাকে বলে- (শুরা: ৫২)।

উপরোক্ত আয়াত দুটো একথার অকাট্য প্রমাণ যে, নবুয়তের পদমর্যাদায় ভূষিত হবার পূর্বে তিনি এ বিষয়ে একেবারে বেখবর ছিলেন যে, তাঁকে নবী বানানো হবে। যদি বারো বছর বয়সেই তাঁর একথা জানা থাকতো এবং পঁচিশ বছর বয়সে পুনরায় তার নিশ্চয়তা দান করা হয়ে থাকতো তাহলে তাঁর উপরে কিতাব নাযিল হওয়ার কোন আশা না করার কোন কারণ থাকতে পারতো না। তারপর এক সময়ে তাঁকে মানুষের সামনে ঈমান আনার দাওয়াত দিতে হবে একথাই বা মন থেকে মুঝে ফেলতেন কি করে?

কুরআন মজিদের পর, এসব বর্ণনা ঐসব সহীহ বর্ণনারও খেলাপ যা হুযুর (স) এর প্রতি প্রথম অহী নাযিল হওয়ার সময়, অতঃপর তাঁর দৈহিক ও মানসিক অবস্থা এবং হযরত খাদিজার (রা) সাথে তাঁর কথাবার্তা সম্পর্কে উধৃত করা হয়েছে। সে সময়ে তাঁর যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা কি করে হতো যদি তিনি পঁচিশ বছর থেকে জানতেন যে তিনি নবী হবেন? এ অবস্থায় ত অহী নাযিল হওয়া তাঁর একেবারে প্রত্যাশা অনুযায়ীই হতো। তারপর হযরত খাদিজা (রা) হেরার ঘটনা শুনার পর যা কিছটু বলেন তা এ অবস্থায় কিছুতেই বলতেন না, যদি পনেরো বছর যাবত তাঁর এ কথা জানা থাকতো যে তিনি নবী হবেন। তাহলে তিনি ত একথাই বলতেন. যা আমার প্রত্যাশা করছিলাম তাইত ঘটেছে।

এভাবে এসব বর্ণনা সে গোটা ইতিহাসেরই পরিপন্থী যা বিপুল ও পুনঃপৌনিক বর্ণা সমষ্টির দৃষ্টিতে তাঁর নবুওয়ত ঘোষণার পর মক্কায় উপস্থাপিত হয়েছিল। কুরাইশের লোকেরা যদি একত্রিশ বছর যাবত এ কথা জানতো যে, তিনি (মুহাম্মদ সঃ) নবী হবেন, তাহলে তাঁর নবুয়দের ঘোষণা তাদের প্রত্যাশার বিপরীত হতোনা এবং একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর তাদের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো।

ফিজার যুদ্ধ

এখন আমরা পুনরায় ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো দিকে ফিরে আসছি।

ইবনে হিশাম বলেন, নবীর (স) বয়স যখন চৌদ্দ পনেরো বছর তখন ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[ইকদুল ফরীদ, আগানী এবং জওহরীর বর্ণনা মতে এতঃপূর্বে তিনবার ফিজার যুদ্ধ হয়। চতুর্থ ফিজার যুদ্ধে হুযুর (স) অংশগ্রহণ করেন। ইবনে সা’দ বলেন, এ যুদ্ধ হাতিবর্ষে সংঘটিত হয়। জওহরী সিহহতে লিখেছেন যে, কুরাশিগণ এ যুদ্ধকে ফিজার নামে এ জন্যে অভিহিত করে যে, এ হারাম মাসে হয়। যেহেতু হারাম মাসে যুদধ করা পাপকাজ সে জন্যে কুরাইশরা বলে –আমরা পাপ কাজ করেছি। এ কারণেই হারাম মাসে সংঘটিত এ চারটি যুদ্ধকেই ‘হিরবে ফিজার’ বলা হয়েছে-(গ্রন্থকার)।

ইবনে ইসহাক, ইবনে সা’দ, বালাযুরী এবং ইবনে জারীর তাবারী বলেন, এ যুদ্ধ ২০ হাতিবর্ষে সংঘটিত হয়ে।[হাতিবর্ষের যে বৎসর আবরাহা মক্কা আক্রমণ করে। এ এমন এক অসাধারণ ঘটনা যে আরবাসী এ বছর থেকে সন তারিখের হিসাব করা শুরু করে- গ্রন্থকার।]

এ হিসাবে হুযুরের (স) বয়স বিশ হওয়া উচিত। এ যুদ্ধে এক পক্ষ ছিল বনী কিনানা যার মধ্যে কুরাইশও শামিল ছিল এবং অপর পক্ষে ছিল কায়স আয়লান যার মধ্যে সাকীফ, হাওয়াযেন প্রভৃতি ছিল। যুদ্ধের কারণ ছিল এই যে, বনী হাওয়াযেনের ওরওয়াতুর রাহহাল নামে এক সর্দার বিন মুনযির এর বাণিজ্যিক কাফেলাকে তার স্বীয় নিরাপত্তায় ওকাজ বাজারে যাওয়ার পথ করে দেয়। বাররাস বিন কায়স নামে বনী কিনানার জনৈক সর্দার বলে, তুমি কি কিনানার মুকাবিলায় তাকে নিরাপত্তা দান করে ছ? সে বল্লো- হাঁ, এবং সমগ্র দুনিয়ার মুকাবিলায়। এতে বাররাস ভয়ানক রাগান্বিত হয়ে পড়ে। তারপর সে নজদের বহিরাগত এলাকায় তায়মান নামক স্থানে ওরওয়াকে হত্যা করে। কুরাইশরা ওকাজ বাজারে ছিল এমন সময়ে তাদের কাছে এ খবর পৌছে। সংগে সংগেই তারা হারামের দিকে রওয়ানা হয়। হারামের সীমানায় প্রবেশ করার পূর্বেই হাওয়াযেন তাদেরকে ধরে ফেলে এবং সারাদিন যুদ্ধ চলতে থাকে। রাতে কুরাইশরা হারামের সীমার ভেতরে প্রবেশ করে েএবং হাওয়াযেন নবী (স) এতোটুকু করতেন যে, দুশমনের পক্ষ থেকে কোন তীর এসে পড়লে তা তিন কুড়িয়ে নিয়ে আপন চাচাদেরকে দিয়ে দিতেন। ইবনে সা’দ বলেন, পরে নবী (স) বলতেন, যদি আমি এতে এতোটুকু অংশ গ্রহণও না করতাম ভালো হতো। সুহায়লী বলেন, নবী (স) এ যুদ্ধে তাঁর চাচাদের সাথে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু যুদ্ধে কার্যতঃ কোন অংশ গ্রহণ করেননি। নবী হবার পূর্বে এটি ছাড়া তিনি আর কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। এছাড়া কোনো প্রকার সামরিক অভিজ্ঞতাও তিনি অর্জন করেননি। এথেকে জানা যায়, জাহেলী যুগের যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে তিনি ছিলেন পবিত্র। এর মাধ্যমে আমরা একথাও জানতে পারে যে, নবী হিসাবে তিনি সামরিক নেতৃত্বের অনন্য যোগ্যতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত। তিনি পেশাদার সেনাপতি চিলেন না, চিলেন সহজাত সেনাপতি।

‘হিলফুল ফযুল’

নবী পাকের (স) বয়স যখন বিশ বচর তখন কুরাইশের কতিপয় গোত্র একটি চুক্তি সম্পাদিত করে- যাকে বলা হতো ‘হিলফুল ফযুল’। ইবনে আসীর তাঁর নিহায়া গ্রন্থে ‘ফযুল’ শব্দ দ্বারা এ চুক্তির কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, জুরহুমের যুগেও এ ধরনের একটি চুক্তি হয়েছিল যার সম্পানাকারী সকলের নাম ছিল ‘ফযল’। এ জন্যে তা হিলফুল ফযুল নামে অভিহিত হয়। কিন্তু এর সঠিক কারণ তাই, যা হফেজ ইবনে কাসীর হুমাইদীর বরাত দিয়ে হযরত আবু বকরের (রা) পুত্রদ্বয় মুহাম্মদ ও আবদুর রহমান থেকে বর্ণা করেছেন। তিনি বলেন যে, নবী (স) বলেছেন- আমি আবদুল্লাহ বিন জুদআনের বাড়িতে এমন এক চুক্তিতে শরীক হয়েছিলা যে, ইসলামী যুদেও এ ধরনের চুক্তির আহ্বান জানালে তা আমি পছন্দ করব। অতঃপর সে চুক্তির ব্যাখ্যা তিনি এভাবে করেন-

(আরবী********************)

তারা এ বিষয়ে পরস্পর চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, ফযুলকে তার হকদারের দিকে ফিরিয়ে দেব এবং জালেম মজলুমের প্রতি বাড়াবাড়ি করতে পারবে না। (আল বিদায়া ওয়ান্নিহজায়া, ২য় খন্ড, পৃঃ২৯১)।

‘ফযূলকে তার হকদারের দিকে ফিরানোর’ অর্থ এই যে, যে ফযল কোন জালেম জবরদস্তি হকদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে তা হকদারকে ফিরিয়ে দেয়া হোক এবং জালেমকে তার জুলুমের উপর অবিচল থাকদে দেয়া না হোক।

ইবনে সা’দ এ চুক্তি সম্পর্কে বলেন যে, তারা পরস্পর এ সিদ্ধান্ত করে যে তারা মজলুমের সহযোগিতা করবে এবং তার হক তাকে দিয়েই ছাড়বে।

ইবনে হিশাম চুক্তির বিবরণ বয়ান করতে গিয়ে বলেন যে, মক্কায় শহরের কোন অধিবাসী অথবা বহিরাগত কোন ব্যক্তির প্রতি চুলুম হতে দেবনা এবং জালেমের মুকাবেলায় মজলুমের সাহায্য করব। ইবনে সাদ’দ এ চুক্তির তারিখ বলেছৈন ২০শে যিলকা’দা, আমুলফীল। এর কারণ ছিল এই যে, ইয়ামেনে যুবাইদী নামের একটি গোত্রের জনৈক ব্যক্তি কিচু পণ্যদ্রব্য নিয়ে মক্কায় আসে। মক্কার জনৈক সর্দার আস বিন ওয়ায়েল তার পণ্যদ্রব্য খরিদ করে। কিন্তু মূল্য পরিশোধ করেনা। সে বেচারা বনী আবদুদার, বনী মাখযুম, বনী জুমাহ, বনী সাহম এবং বনী আদীর এক একজনের নিকটে গিয়ে ফরিদ করে। কিন্তু সকলেই কর্কশ ভাষায় তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং আস্‌ বিন ওয়ায়েল সাহমীর মুকাবিলায় তার সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। সকলের পক্ষ থেকে নিরাশ হওয়ার পর প্রত্যুষে সে আবু কুরাইস পাহারে আরোহণ করে উচ্চস্বরে আলে ফিহরকে সম্বোধন করে বলে যে তার প্রতি জুলূম করা হয়েছে। এতে নবীর চাচা যুবাইর বিন আবদুল মুত্তালিব সাড়া দিয়ে বলেন, বিষয়টি এভাবে ছেড়ে দেয়া যাবে না। তারপর তিনি বনী হাশেম, বনী আল মুত্তালিব, বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা, বনী যোহরা এবং বনী তাইমকে আবদুল্লাহ বিন জুদআনের বাড়িতে একত্র করেন। ইনি ছিলেন হযরত আয়েশা (রা) এর চাচাতো ভাই। সেখানে সকলে শপথ করলো যে, মক্কায় শহরের অধিবাসী অথবা বহিরাগত যেই মজলুম হবে, আমরা তার সাহায্য করব এবং জালেমের কাছ থেকে তার হক আদায় করে ছাড়ব। তারপর সকলে মিলে আসের নিকটে গেল এবং তার থেকে যুবায়দীর পণ্যদ্রব ফেরত নিয়ে তাকে দিয়ে দেয়া হলো।

মুহাম্মদ বিন ইসহাক ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যে, নবী (স) বলেছেন আমি আবদুল্লাহ বিন জাদআনের বাড়িতে এমন এক চুক্তিতে শরীক হই যে, যদি তার বিনিময়ে একটি লাল উটও পেতাম তাহলে তা আমি গ্রহণ করতামনা। বর্তমানে ইসলামী যুগেও এ ধরনের কোন ‍চুক্তির প্রতি আহ্বান জানানো হলে তা আমি গ্রহণ করব।

হযরত খাদিজার (রা) সাথে ব্যবসায় অংশগ্রহণ

শৈশব কাল থেকে হুযুর (স) এর যে স্বাভাবিক কর্মদক্ষতা একটি সীমিত পরিমন্ডলে সু-পরিচিত ছিল- তাঁর ভদ্রতা, বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা, সত্যপ্রিয়তা, মধুর চরিত্র, সততা. গাম্ভীর্য বুদ্ধিমত্তা, আত্মসংযম, ধৈর্য ও আত্ম-সম্মান, মহানুভবতা, নেতৃত্বের গুণাবলী-মোটকথা তাঁর এক একটি মহৎ গুণেল বিকাশ ঘটতে থাকে যার জন্যে তাঁর প্রতি মানুষের মনে গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা সৃষ্টি হতে থাকে এবং তাঁর প্রভাবও তাদের উপর বিস্তারলাভ করতে থাকে। এ সময়েই হযরত খাদিজা (রা) তাঁর সাথে ব্যবসায় অংশীদারিত্বের সিদ্ধান্ত করেন।

 হযরত খাদিজা (রা) কুরাইশদের মধ্যে তাঁর সতীত্ব ও পুতপবিত্র চরিত্রের জন্যে ‘তাহেরা’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। তাহেরা অর্থ পুত পবিত্র। সমগ্র গোত্রের জন্যে তাঁকে তাঁর বুদ্ধিমত্তা, দুরদুর্শিতা, উন্নত চরিত্র ও বিবিধ গুণাবলীর জন্যৌ অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো। সেই সাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দৈহিক সৌন্দর্যের সম্মপদও দান করেছিলেন। কুরাইশের কোন রমনীই তাঁর থেকে অধিক নশালিনী ছিলনা। অনেক সময় কুরাইশদের অর্ধের ব্যবসায়ী কাফেলা শুধু তাঁর মালসম্পদের উপরই বিনর্ভর করতো। তাঁর প্রথম বিবাহ হয় আবু হালা বিন যুরারা তামিমীর সাথে। তার ঔরসে দুই পুত্র-হিন্দ ও হালা জন্মগ্রহণ করে। নবীর যুগে উভয়েই মুসলমান হয়। আবু হালার মৃত্যুর পর তিনি উতায়িক বিন আব্দে আলমাখযুমীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার ঔরসে কন্যা হিন্দ জন্মগ্রহণ করে। পরে নবুয়ত যুগে সেও মুসলমান হয। [কারো কারো মতে- উতায়িক প্রথম এবং আবু হালা দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন- গ্রন্থকার।] দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তিন বিধবাই রয়ে যান। অনেক কুরাইশ সর্দার বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করে কিন্তু তিনি তাদের ইচ্ছ পূরণে অস্বীকৃত জানান। তিনি তাঁর মালসম্পদ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করতেন এবং কোন না কোন ব্যক্তিকে তাঁর মাল নিয়ে ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে পাঠাতেন এবং সে তার নির্ধারিত অংশ গ্রহণ করতো।

নবী (স) এর সত্যবাদিতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং উন্নত চরিত্রের কথা যখন হযরত খাদিজা (রা) জানতে পারলেন, তখন তিনি তাঁকে বল্লেন, আপনি আমার ব্যবসার মাল নিয়ে শাম দেশে যান। অন্য লোককে মুনাফার যে অংশ দিয়ে থাকি তার চেয়ে বেশী আপনাকে দেব।

এ হচ্ছে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা

দ্বিতীয় বর্ণনা ইবনে সা’দ নুফায়সা বিন্তে মুন্‌ইয়া থেকে উধৃত করেন- যার বিস্তারিত বিবরণ যুরকানী দিয়েছেন। তা হচ্ছে এই যে, আবু তালিব হুযুরকে (স) বলেন, ভাইপো, আমিত মালদার লোক নই। আমাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। আর আমাদের নিকটে কোন ব্যবসার মালও নেই। তোমার কওম যে কাফেলা শাম পাঠাচ্ছে, তার রওয়ানা হওয়ার সময় আসন্ন। খাদিজাও এ কাফেলার সাথে তার মাল কারো হাতে পাঠাতে চায়। তুমি তার কাছে গেলে অন্যান্যের তুলনায় সে তোমাকে অগ্রাধিকার দেবে। কারণ সে তোমার পুত চরিত্রের কথা জানে।

হুযুর (স) বলেন, আমার ভয় হয়, সে অন্য কাউকে বেছে না নেয়।

চাচা ভাতিজার এ কথাবার্তা হযরত খাদিজা (র) জানতে পারেন। কিন্তু হুযুরে (স)  কথাই ঠিক হলো কারণ তিনি প্রথমেই হুযুরকে (স) সে ব্যবসার পয়গাম পাঠিয়ে দেন যার উল্লেখ ইবনে ইসহাকের মাধ্যমে উপরে করা হয়েছে।

তাবাকাতে ইবনে সাদের একটি বর্ণনায় আছে যা মুহাম্মদ বিন আকীল থেকে উধৃত। বলা হয়েছে যে, আবু তালিব হযরত খাদিজাকে (রা) গিয়ে বলেন, খাদিজা, তুমি কি পছন্দ কর যে তোমার ব্যবসায়য়ে অন্য কারো খেদমত নেয়ার পরিবর্তে মুহাম্মদের (স) সাথে কথা ঠিক করে ফেলবৈ?

খাদিজা জবাবে বলেন, আপনি যদি দূরের কোন অপছন্দনীয় লোকের কথা বলতেন তা মেনে নিতাম। আপনিও এমন লোকের কথা বলেছেন যিনি নিকটের বন্ধু।

মোটকথা হযরত খাদিজার (রা) সাথে হুযুরের (স) ব্যবসার ব্যাপারটি স্থিরকৃত হয়ে যায় এবং তিনি তাঁর গোলাম মায়সারাকে নবী (স) এর সাথে ব্যবসা উপলক্ষ্যে শাম দেশে পাঠিয়ে দেন। এ সফর শুরু হয় ২৫ হাতিবর্ষের জিহলহজ্ব মাসের ১৫/১৬ তারিখে। পথে মায়সারা হুযুরের (স) স্বভাব চারিত্র ও মহৎ গুণাবলী দেখে তাঁর প্রতি অতিশয় মুগ্ধ হয়ে পড়ে। প্রত্যাবর্তনের পর সব কথা বিস্তারিত হযরত খাদিজাকে জানিয়ে দেয়। ব্যবসায় হুযুর (স) বিশেষ সাফল্য লাভ করেন। ইবনে সা’দ নুফায়সা বিন্তে মানইয়ার কথা উধৃত করে বলেন, ইতঃপূর্বে অন্যান্য লোক যে পরিমাণ মুনাফা করে খাদিজাকে দিত, হুযুর (স) তার দ্বিগুণ মুনাফঅ এনে দেন এবং হযরত খাদিজা (রা) যে পরিমাণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তার দ্বিগুণ মুনাফঅ এনে দেন এবং হযরত খাদিজা (রা) যে পরিমাণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তার ‍দ্বিগুণ হুযুরকে (স) দেন। [এ সফর ছাড়াও হুযুরে (স) অন্যান্য সফরের বিবরণও হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায়। এ সব সফরে আরবের বহু এলাকা স্বচক্ষে দেখার তাঁর সুযোগ হয়। হাকেম তার মুস্তাদরাকে ইয়ামেনে প্রসিদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র জুরাশে হুযুরে (স) দুটি সফরের উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম যাহাবী (র) তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। মুসনাতে আহমাদে আছে যে বাহরাইন থেকে আবদুল কায়েসের প্রতিনিধি যখন মক্কা আসে, তখন হুযুর (স) সেখানকার এক একটি স্থানের নাম করে করে সে সবের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন। লোক তাতে বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি বলেন, আমি তোমাদের দেশ খুব ঘুরে ফিরে দেখেছি। উল্লেখ্য যে সে সমযে আরবের গোটা পূর্ব সমুদ্র তটভূমিকে বাহরাইন বলা হতো- বর্তমান কালের বাহরাইন নাম দ্বীপ নয়। -গ্রন্থকার।]

হযরত খাদিজার (রা) সাথে বিবাহ

মক্কা থেকে শাম এবং শাম থেকে মক্কা- এ সুদীর্ঘ সফরে মায়সারা নবী মুস্তাফার (স) দিনরাতের সাহচর্য লাভ করে এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি দিক দেখার পর তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। তার কাছে সবকিছু শুনার পর হযরত খাদিজা (রা) হুযুরকে (স) বিয়ের সিদ্ধান্ত করেন। যদিও এর আগে তিন হুযুর (স) সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন না এবং হুযুরের যেসব গুণাবলী কুরাইশদের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল, তার চর্চাও তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি সিদ্ধান্ত করেন যে, তাঁর চেয়ে উত্তম স্বামী পাওয়া যাবে না। বিবাহের বিষয়টি কিভাবে চূড়ান্ত হয় সে বিষয়ে বর্ণনায় কিচু মতপার্থক্য রয়েছে।

ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত খাদিজা সরাসরি হুযুরের (স) সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, হে ভাতিজা, আপনি আত্মীয় [নবী (স) এর ফুফী হযরত সাফিয়া (হযরত যুবাইরের (রা) মা হযরত খাদিজার ভাইয়ের স্ত্রী ছিলেন- গ্রন্থকার।] এবং আপনার বিশ্বস্ততা, সততা, মহান স্বভাব চারিত্র, আভিজাত্য এবং প্রশংসনীয় গুণাবলীর কারণে আমি চাই যে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই।

দ্বিতীয় বর্ণনাটি ইবনে সা’দ নাফাইসা বিন্তে মুনাইয়া [কোন কোন গ্রন্থকার বিন্তে উমাইয়া বলেছেন। কিন্তু বিন্তে মুন্‌ইয়অ-ই সঠিক। মক্কা বিজয়ের পর তিন মুসলমান হন-গ্রন্থকার।] থেকে উধৃত করেছেন। ‍নুফাইয়া বলেন, হযরত খাদিজা বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করার পূর্বে আমাকে মুহাম্মদ (স) এর নিকটে পাঠিয়ে দেন তাঁর মনোভাব জানার জন্যে। আমি গিয়ে তাঁকে বল্লাম, হে মুহাম্মদ (স) আপনি বিয়ে কেন করছেন  না? তিনি বলেন, আমার কাছে কি আছে যে বিয়ে করব?

বল্লাম, তার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপনাকে এমন স্থানে বিয়ের পয়গাম দেয়া হচ্ছে যেখানে সৌন্দর্যও আছে, সম্পদও আছে, অীভজাত্য এবং যোগ্যতাও আছে। আপনি কি তা কবুল করবেন?

তিনি বল্লেন, কার কথা বলছো?

বল্লাম, খাদিজা।

তিনি বল্লেন, তার সাথে আমার বিয়ে কি করে হতে পারে?

বল্লাম, আমার উপর এ দায়িত্ব ছেড়ে দিন।

বল্লেন, তাই যদি হয় ত রাজী আছি।

তারপর হযরত খাদিজা পয়গাম পাঠান এবং বিয়ের জন্যে নির্দিষ্ট সময়ে আসতে বলেন। তিনি চাচা আমর বিন আসাদকে বিযে করিয়ে দেয়ার জন্যে আসতে বলেন।

হযরত খাদিজার পিতা খুয়াইলেদ এন্তেকাল করেছিলেন সে জন্যে তাঁর পক্ষ থেকে আমর বিন আসাদ এলেন এবং নবী (স) তাঁর চাচা হযরত হামজা এবং আবু তালিবকে নিয়ে এলেন।

তারপর বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয় [ইবনে সা’দ বলেন, আমাদের গবেষণা অনুযায়ী সেসব বর্ণনা সবই ভুল- যাতে বলা হয়েছে যে খাদিজার বিবাহ তার পিতা খুয়াইলিদ পড়িয়ে দেন। তার চেয়ে অধিক অবাস্তব বর্ণনা এই যে খুয়অইলিদকে মদ্য পান করা হয়েছিল এবং নেশার অবস্থায় তিনি বিয়ে পড়িয়ে দেন। পরে জ্ঞান হওয়ার পর তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। আমাদের মতে জ্ঞানীগণের পক্ষ থেকে যে কথা প্রমাণিত ও সংরক্ষিত তা এই যে খুয়াইলিদ হিরবে ফিজারের পূর্বে মারা যান এবং খাদিজার চাচা আমর বিন আসাদ তাঁর বিয়ে পড়িয়ে দেন। গ্রন্থকার।]

বিয়েতে হযরত আবু বকর (রা) এবং মুদার গোত্রের প্রধানগণ এবং কুরাইশ সর্দারগণ শরীক ছিলেন। মোহর হিসাবে হুযুর (স) বিশ ‍উট দেন। [কিছু বর্ণনামতে মোহর ছিল ৮- দীনার এবং কিছু বর্ণনা মতে ৫০০দিরহাম- গ্রন্থকার।

ইবনে আবদুল বার বলেন, শাম সফর থেকে হুযুরের (স) প্রত্যাবর্তনের দুমাস পঞ্চান্ন দিন পর এ বিয়ে হয়। তাঁর বয়স তখন পঁচিশ বছর ছিল এবং হযরত খাদিজার চল্লিষ বছর।

[ইস্তেদেরাক পৃঃ ১২৮ দ্রষ্টব্য।

(বিবাহের সময় হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজার চল্লিশ বছর ছিল। কিন্তু কদাচিৎ কোন বর্ণনায় হুযুর (স) এর বয়স একুশ, উনত্রিশ, ত্রিশ এবং সাঁইত্রিশ বছর এবং হযরত খাদিজার (রা) পঁচিশ, আটাশ, ত্রিশ, পয়ত্রিশ এবং পঁয়তাল্লিশ বছর বলা হয়েছে। অধিকাংশ জ্ঞানীগণ তা মেনে নেননি। কিন্তু কেউ কেউ হযরত খাদিজার বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরে বর্ণনাকে এ কারণ অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, চল্লিষ বছরের মহিলার ছয়টি সন্তান প্রসব করা সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেক সন্তানের মাঝে গড়ে যদি দেড় বছরো ব্যবদান হয় তাহলে শেষসন্তান উনপঞ্চাশ বছর বয়সে ভূমিষ্ট হওয়া উচিত। আর যদি ঐসব বর্ণনাও মেনে নেয়া যায় যাতে বলা হয়েছে যে নবুয়তের পর হযরত খাদিজার গর্ভে সন্তান জন্মগ্রহণের উল্লেখ করা হয়েছে তাহলে সে সময়ে তাঁর বয়স ছাপ্পান্য হওয়া উচিত। তা একেবারে ধারণার অতীত। আমাদের মতে এ অভিমত বুদ্ধিবৃত্তিক দিয়ে সঠিক নয়। নারী চিকিৎসা শাস্ত্রে (GYNAECOGY) একটি প্রমাণ্য গ্রন্থ যা এ শাস্ত্রের দশ জন শিক্ষক () এর তত্ত্বাবধানে রচিত হয়েছে, এ গ্রন্থের দ্বাদশ সংস্করণে এ বিষয়েই নিম্নোক্ত গবেষণা মূলক অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে:-

আটচল্লিশ ও বায়ান্ন বছর বয়সে সাধারণতঃ মাসিক ঋতু বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় ঋতু বন্ধের সময় পঞ্চান্ন চছর বরঞ্চ তারও অধিক কাল বিলম্বিচত হয়। পক্ষান্তরে কোন কোন অবস্থায় চল্লিশ বছর এমন কি তার চেয়েও কম বয়সে ঋতু বন্ধ হয়ে যায়। নারী সত্বর বালেগ হলে তার ঋতু বন্ধ বিলম্বে হয় এবং ঋতু বিলম্বে শুরু হলে তা সত্বর বন্ধ হয়ে যায়। উক্ত গ্রন্থ-পৃ.১০১।

এ শাস্ত্রীয় অভিমতের ভিত্তিতে এ কোন আশ্চর্য জনক ব্যাপার নয় যে হযরত খাদিজার (রা) গর্ভে পঞ্চাশ-ছাপ্পান্ন বছর বয়সে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। বর্ণনায় বলা হয়েছে যে হযরত ফাতিমা (রা) যখন জন্মগ্রহণ কনে তখন নবী মুস্তাফার (স) বয়স ছিল একচল্লিষ বছর এবং হযরত খাদিজার (রা) বয়স-ছাপ্পান্ন বছর।]

হযরত খাদিজার গর্ভে নবী (স) এর সন্তান

নবী (স) এর সমস্ত সন্তান হযরত খাদিজার (র) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। শুধুামাত্র হযরত ইব্রাহীম (রা) মারিয়া কিবতিয়া (রা) এর গর্ভজাত ছিলেন। খাদিজার (রা) গর্ভে দুইপুত্র এবং চার কন্যা সন্তান, যথা (১) কাসেম (রা) যার জন্যে হুযুরকে (রা) আবুল কাসেম বলা হতো (২) আবদুল্লাহ (রা) যাঁকে তাইয়েব ও তারেও বলা হতো। (৩) হযরত যয়নব (রা) (৪) হযরত রুকাইয়া (রা) (৫) হযরত উম্মে কুলসূম (রা) এবং হযরত ফাতিা (রা)। তাঁরে মধ্যে কে কার বড়ো ছিলেন এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু একথা জানা আছে যে, হযরত যয়নব (রা) যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন হুযুরে (স) বয়সব পঁচিশ বছর ছিল (ইসাবা) এবং নবীর একচল্লিষ ছর বয়সে হযরত ফাতেমা (রা)পয়দা হন (শহে মুযাহির)। একথাও ইতিহাসে প্রমাণিত আছে যে নবুয়তের পঞ্চাশ বৎসরে যখন প্রথম আবিসিনয়ায় হিজরত হয় তখন হযরত রুকাইয়া (রা) তাঁর স্বামী হযরত ওসমান (রা) এর সাথে হিজরত করেন। তার অর্থ এই যে, তিনি হযরত যয়নব (রা) থেকে দুবছর ছোট ছিলেন তাই ত  নবুয়তের পঞ্চম বৎসরে তিনি বিবাহিতা ছিলেন।

একটি মহলের ঘৃণ্য স্পর্ধা

কিচুলোক খোদার ভয় না করে স্পষ্ট দাবী করে বলে যে, হযরত খাদিজার (রা) নবী (স) এর একটি মাত্র সন্তান হযরত ফাতিমা (রা) ছিলেন এবং অন্যান্য কন্যাগণ হুযুরের ঔরসে নয়, হযরত খাদিজার (রা) অন্য স্বামীর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। অথচ কুরআনে এর দ্বারা সুস্পষ্ট অস্বীকার করা হয়েছৈ।

(আরব********************)

হে নবী, আপন বিবিগণ ও কন্যাগণ বল, (আহযাব)। -এ কথা ইতিহাস থেকে অকাট্যরূপে প্রমাণিত যে মারিয়া কিবতিয়া (রা) হুযুরে (স) ঔরসে তাঁর অন্যান্য বিদের কোন সন্তান হয়নি। এ শব্দগুলো একথাই প্রকাশ করছে যে, হুযুর (স) এর একজন নয় বরঞ্চ একাধিক কন্যা ছিলেন। ইতিহাস থেকেও এ কথা প্রমাণিত যে, মারিয়া কিবতিয়অ (রা) ব্যতীত নবী পাকের ঔরস থেকে অন্য কোন বিবির কোন সন্তানই হয়নি। অতএব এ সকল কন্যা অবশ্যই হযরত খাদিজার (রা) গর্ভেই জন্মগ্রণ করেনন। বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে এসব লোক চিন্তা করেনা যে- রসূলের ঔরসজাত সন্তানদের অস্বীকার করে তারা কত বড়ো পাপ করছে এবং তার জন্যে কত কঠোর জবাবদিহি আখেরাতে তাদেরকে করতে হবে। সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সূত্রে সকলেই একমত যে, হযরত খাদিজার (রা) গর্ভ থেকে হুযুরের (স) শুধুমাত্র এককন্য হযরত ফাতিমা (রা) ছিলেন না, বরঞ্চ আরও তিন কন্যা ছিলেন। নবী (স) এর প্রাচীনতম জীবন চরিত রচয়িতা মুহাম্মদ বিন ইসহাক হযরত খাদিজার (রা) সাথে হুযুরের (স) বিবাহের উল্লেখ করার পর বলেন, ইব্রাহীম (রা) ব্যতী নবী (স) এর সকল সন্তান তাঁর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন। তা৭দের নাম, তাহের (তাইয়েব), যয়নব (রা) রুকাইয়অ (রা), উম্মে কুলসূম (রা) এবং ফাতিমা (রা), (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড পৃঃ২০২)।

প্রসিদ্ধ কুলাচার্য (GENEALOGIST ) হিশাম বিন মুহাম্মদ বিন আস সায়ের কালীব হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে একথা উধৃত করেছেন যে, মক্কায় নবূয়তের পূর্বে বনী (স) এর ঔরসে সকলের আগে কাসে (রা)পয়দা হন। অতঃপর যয়নব (রা) রুকাইয়া (রা), ফাতেমা (রা) এবং উম্মে কুলসূম (রা) পর পর পয়দা হন। নবুয়তের পর আবদুল্লাহ (রা) পয়দা হন যাঁকে তাইয়েব এবং তাহেরও বলা হতো, এ সবের মা ছিলেন হযরত খাদিজা (রা)- তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৩৩)।

ইবনে হাযম জাওয়ামেউস সীরাতে বলেছেন, হযরত খাদিজার গর্ভে হুযুরের চার কন্যা পয়দা হয়। সকলের বড়ো হযরত যয়নব (রা), তাঁর ছোটো রুকাইয়া (রা), তাঁর ছোটো ফাতেমা (রা), তার ছোট উম্মে কুলসূম (রা) (পৃঃ ৩৮-৪০)।

তাবারী, ইবনে সা’দ, কিতাবরূ মুজাস্‌সার গ্রন্থ প্রণেতা আবু জাফর বিন হাবীব এবং আল ইস্তিয়াব গ্রন্থ প্রণেতা ইবনে আবদুল বার নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (স) এর পূর্বে হযরত খাদিজার দুজন স্বামী অতীত হয়েছে। একজন হালা তামিমী যার ঔরসে হিন্দ ও হালা জন্মগ্রহণ করে। দ্বিতীয় স্বামী ছিল আতীক বিন আবেদ মাখযুমী যার থেকে হিন্দ নামে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। তাডপর তাঁর বিয়ে হয হুযুর (স) এর সাথে। সকল বংশবৃত্তান্ত বিশারদ এ বিষয়ে একমত যে, তাঁর ঔরসে উপরোক্ত চারজন কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। (তাবারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃঃ১১, তাবাকাত ইবনে সা’দ, ৮ম খন্ড, পৃঃ ১৪-১৬, কিতাবুল মুজাসসার, পৃঃ ৭৮, ৭৯, ৪৫২, আল ইস্তিয়াব, ২য় খন্ড, পৃঃ ৭১৮ দ্রঃ)। বায়হাকী মুসআব বিন আবদুল্লাহ আয্‌যুবাইরীর বরাত দিয়ে বলেন যে, রসূলুল্লাহ (স) সর্ব জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন কাসেম (রা), অতঃপর যথাক্রমে যয়নব (রা), আবদুল্লাহ (রা), উম্মে কুলসূম (রা) ফাতেমা (রা) এবং রুকাইয়অ (রা), ইউনুস বিন বুকাইর ইবনে আব্বাসের (রা) বর্না উধৃত করে বলেন, হযরত খাদিজার গর্ভে নবী (স) থেকে দুই পুত্র এবং চার কন্যা জন্মগ্রহণ করে। যথা আল কজাসেম (রা), আবদুল্লাহ (রা), উম্মে কুলসূম (রা), যয়নব (রা), এবং রুকাইয়অ (রা), ফাতেমা (রা) আবদুর রাজ্জাক তাঁর গ্রন্থ আল মুসান্নাফে ইবনে জুরাইহ-এর বরাত দিয়ে বলেন, হযরত খাদিজার গর্ভে হুযুর )(স) এর দুপুত্র আবদুল্লাহ (রা) এবং কাসেম (রা) এবং চার কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বগ যয়নব (রা) এবং সবচেয়ে ছোট ফাতেমা (রা)।

 এর সকল বর্ণা কুরআন পাকের বিবরণকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত করে যে, হুযুরের (স) একমাত্র কন্যা ছিলনা বরঞ্চ ছিল চারজন ।

দাম্পত্য জীবন

যদিও নবী (স) এবং খাদিজার (রা) বয়সের মধ্যে পনেরো বছরের পার্থক্য ছিল তথাপি হযরত খাদিজার ওফাতের পর নবী (স) তাঁকে সারা জীবন স্মরণ করতে থাকেন।

বুখারীতে হযরত আলী (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, নবী (স) বলেন-

(আরবী***************)

এর একটা অর্থ তা এই যে, স্বীয় উম্মতের মহোত্তমা নারী ছিলেন মরিয়ম এবং এ উম্মতের মহোত্তমরা নারী খাদিজা (রা)। কিন্তু মুসলিম শরীফে ওয়অকীর বরাত দিয়ে একথা বলা হয়েছে এবং ওয়াকী একথা বলার সময়ে আসমান ও যমীনের দিকে ইংগিত করে নবী (স) এর এ কথাগুলো উধৃত করেন। তার মর্ম এই যে, ওয়াকী অথবা যাদের মাধ্যমে একথা তাঁর কাছে পৌছে তাঁরা সকলেই এ মর্ম গ্রহণ করেন যে, দুনিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম নারী এ দুজন। বুখারীতে হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা আছে যাতে তিনি বলেন, নবী (স) এর বিবিগণের মধ্যে হযরত খাদিজার প্রতি আমার যেমন হিংসা হয় তেমন আর কারো প্রতি হয় না। অথচ আমার বিয়ের আগেই তিন ইন্তেকাল করেছেন। কারণ এই যে, আমি প্রায়ই নবীকে তাঁর নাম উল্লেখ করতে শুনতাম। নবী (স) কখনো কোন ছাগল জবেহ করলে অবশ্যই তার কিছু গোশত হযরত খাদিজার বান্ধবীদের নিকটে পাঠিয়ে দিতেন। বুখারীর অন্য একটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একবার হযরত খাদিজার ভগ্নি হযরত হালা বিন্তে খুয়ায়লিদ এসে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তাঁর আওয়াজ শুনে নবী (স) অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং বল্লেন (**********)

(আল্লাহ এই ত হালা) কারণ তাঁর কন্ঠস্বর হযরত খাদিজার (রা) কণ্ঠস্বরের অনুরূপ ছিল।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এতে আমি খুব বিরক্ত হয়ে বল্লাম, কুরাইশদের একজন বৃদ্ধা নারীকে আপনি এতো স্মরণ করেন? অথচ বহু পূর্বে তিনি ইন্তেকাল করেছেন এবং আল্লাহ আপনাকে তাঁর থেকে ভালো বিবি দান করেছেন।

মুসনাদে আহমাদ ও তাবারানীর একটি বর্ণনায় আছে যে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এতে হুযুর রাগান্বিত হলেন এবং তাঁর রাগ থেকে আমি কসম করে বল্লা, সেই খোদার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আমি ভবিষ্যতে তাঁর উল্লেখ করলে শুভাকাংখা সহই করব।

ইবনে সা’দ বলেন, বদর যুদ্ধে রসূলুল্লাহ (স) জামাই আবুল আ’সও গ্রেফতার হন। নবী কন্যা হযরত যয়নব তখন মক্কায় ছিলেন। তিনি স্বামীকে মুক্ত করাবার জন্যে ফিদিয়া পাঠিয়ে দেন, যর মধ্যে হযরত খাদিজার (রা) সে হারখানা ছিল যা তিন আবুল আসের সাথে হযরত যয়নবের বিয়ের সময় জাহেলিয়াতের যুগে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। সে হারখানা দেখামাত্র নবী (স) স্নেহ বিগলিত হয়ে পড়েন। তিনি আপন লোকদেরকে বলেন, তোমরা যদি ভালো মনে কর ত যয়নবের কায়েদীকে এমনিতেই ছেড়ে দাও এবং তার ফিদিয়াও ফেরৎ দাও। সকলেই তাতে সম্মত হলো এবং আবুল আসকে বিনা ফিদিয়াতেই ছেড়ে দেয়া হলো।

বালাযূরী ‘আনসাবুল আশরাফে’ হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করে বলেন, একজন কালো রঙ্গের স্ত্রীলোক নবীর দরবারে এলো। নবী (স) তাকে খুব সন্তুষ্ট চিত্তে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। তার চলে যাওয়ার পর আমি (হযরত আয়েশা) জিজ্ঞেস করলাম, তার আগমনে আপনার এতো খুশী হওয়ার কি কারণ? নবী (স) বল্লেন, সে প্রায়শ খাদিজার (রা) কাছে আসতো। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, হযরত খাদিজার (রা) প্রতি নবী (স) এর কত গভীর ভালবাসা ছিল যা তাঁর মৃত্যুর পারও আজীবন নবীর হৃদয়ে অক্ষুণ্ণ ছিল।

হযরত খাদিজা (রা) নবুয়তের পূর্বে পনেরো বচর এবং নবুয়তের পর দশ বচর নবী পত্নী হিসেবে জীবন যাপন করেন। নবুয়তের দশ বছরে তাঁর ইন্তেকাল হয় যখন নবীর বয়স পঞ্চাশ বছর এং তার বয়স ছিল পঁয়ষট্টি বছর। কিন্তু নবী পাক তাঁর সমগ্র যৌবনকাল ঐ একজন বয়স্কা বিবির সাথেই কালাতিপাত করেন। সে সময়ে অন্য কোন নারীর চিন্তাও তাঁর মনে উদয় হয়নি। অথচ সে সময়ে আরববাসীদের কোন ব্যক্তির একাধিক পত্নী গ্রহণ কোন দিক দিয়েই দূষণীয় ছিল না। আর নারীরাও এতে প্রতিবন্ধক হতো না। স্বয়ং হযরত খাদিজার পরিবার সহ কুরাশের সকল পরিবারে এক জনের একাধিক স্ত্রী হওয়ার বহু দৃষ্টান্টত পাওয়অ যায়। এতদসত্বেও নবীর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত এমন একজন স্ত্রীসহ দাম্পত্য জীবন যাপন করাতে সন্তুস্ট ও পরিতৃপ্ত থাকা, যাঁর বয়স পঁয়ষট্টি বছর হয়েছিল- ওসব সমালোচকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব যারা নবী পাকের শেষ দশ বছরের জীবনে বহু পত্নী গ্রহণকে মায়াযাল্লাহ তাঁর প্রবৃত্তির অভিলাষ চরিতার্ত বলে আখ্যায়িত করে। এ বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করব যে কি কি কারণে তিনি শেষ জীবনে বিভিন্ন নারীর পাণিগ্রহণ করেন।

সচ্ছলতার যুগ ও নবীপাকের চারিত্রিক মহত্ব

হযরত খাদিজার (রা) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নবী পাকের (স) অসচ্ছলতা দূর হয়। প্রথমে হযরত খাদিজা অপরের সাহায্যে ব্যবসা করতেন এবং তাতে লাভ কম হতো। কারণ অন্যান্যরা যে ধরনের চরিত্রের অধিকারী ছিল তাতে এ আশা করা যেতোনা যে, তারা অপরের পণ্যদ্রব্য পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও শুভাকাংখী সহ কেনা বেচা করবে। কিন্তু তাঁর ব্যবসা যখন নবী (স) এর মতো একজন অতি বিশ্বস্ত বিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে এলো এবং তার স্বামী হওয়ার কারণে স্বভাবতকঃই স্ত্রীর জন্যে তিনি অত্যন্ত শুভাকাংখী ছিলেন, তখন তাঁর ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠলো আল্লাহ তায়ালার এ এরশাদ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হলোঃ-

(আরবী*******************)

এবং তিনি তাঁকে দরিদ্র পেয়েছিলেন এবং পরে তাঁকে ধনশালী বানিয়ে দিলেন (আদ্দোহা ৮)।

এ সময়ে নবী পাকের সততা, বিশ্বস্ততা, কাজকর্ম ও লেনদেনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সত্যপরায়নতা, দান-খয়রাত, আত্মীয় স্বজনের সাহায্য ও সেবাযত্ন, অসহায় মানুষের সাহায্য, দরিদ্রের ভরণ পোষণ, বিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতির সে সকল গুণাবলী গোটা কুরাইশ এবং চতুষ্পার্শ্বস্থ গোত্রাবলীর কাছে এমনভাবে উদ্ভাসিত হয়ে পড়লো যা প্রথমে প্রকাশ লাভের সুযোগ অভাবে লুপ্ত ছিল। এখন সমাজে তাঁর মর্যাদা শুধু নৈতিকতার দিক দিয়েই নয়, বরঞ্চ বৈষয়িক দিক দিয়েও এতোটা উন্নীত হলো যে তিন কুরাইশদের অন্যতম সরদার হিসেবেই বিবেচিত হতে লাগলেন। তাঁর উপরে মানুষের এতোটা আস্থা সৃষ্ট হলো যে, তারা তাদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছে গচ্ছিত রাথকে লাগলো। এমন কি এ অবস্থা তখন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যখন নবুয়ত ঘোষণার পর মক্কার জনসাধারণ নবীর রক্ত পিপাসু হয়ে পড়ছিল। তাঁর প্রতি চরম দুশমনি পোষণ করা সত্ত্বেও তারা তাদের সকল আমানত তাঁর হেফাজতেই রেখে দিত। এ কারণেই হিজরতের সময়ে হযরত আলী (রা) কে মক্কায় রেখে যেতে হয়েছিল যাতে করে তিনি সকলের আমানতের সম্পদ ফেরত দিয়ে আসতে পারেন। এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, নবুয়তের পূর্বেই শুধু নয় তার পরেও ইসলাম দুশমনদের অন্তরে তাঁর দিয়ানতদারী  ও আমানতদারীর চিত্র অংকিত হয়েছিল এবং তারা তাঁকে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য লোক মনে করতো।

ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি এতোটা নিষ্ঠাবান ছিলেন যে জাহেলিয়াতের যুগে তাঁর ব্যবসার জনৈক অংশীদার সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ছিলেন সর্বোত্তম অংশীদার। সে ব্যক্তি আরও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি কখনো প্রতারণা করেননি, জালিয়াতি করেননি এবং ঝগড়াঝাটিও করেননি। তার নাম বিভিন্ন বর্ণনায় বিভিন্ন বলা হয়েছে। ইবনে আবদুল বার- এর ইস্তিয়াবে তার নাম বলা হয়েছে কায়েস বিন আসসায়েব উয়াইমের মাখযুমী। মুসনতে আহমাদের কোন বর্ণনায় সায়েব বিন আলদুল্লাহ আলমাখযুমী এবং কোন বর্ণনায় সায়েব বিন আবিস সায়েব। আবু দাউদ (কিতাবুল উদম- বাব ফী কিরাহিয়াতিল মিরা) তে তার নাম সায়েবই বলা হয়েছে। স্বয়ংয় তার এ বর্ণনা উধৃত করা হয়েছে- আমি রসূলুল্লাহর খেদমতে হাজীর হলে লোক আমার প্রশংসা করতে থাকে। তিনি বলেন, আমি একে তোমাদের থেকে কুব ভালো জানি। আমি বল্লাম আমার মা বাপ আপনার জন্যে কুরবান হোক আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনি আমার ব্যবসায় অংশীদার ছিলেন, কিন্তু সর্বদা কাজ কারবার পরিষ্কার রেখেছেন। না কখনো প্রতারণা করেছেন, আর না ঝগঝাটি করেছেন।

আবু দাউদেই অন্য এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ বিন আবিল খামসের একটি বর্ণনা আছে। তিনি বলেন, একবার আমি জাহেলিয়াতের যুগে নবী (স) এর সাথে কেনা- বেচার ব্যবস্থাপনা করলাম। কিছু বিষয় স্থিরকৃত হলো এবং কিছু রয়ে গেল। আমি বল্লাম আমি এস্থানে এসে আপনার সাথে দেখিা করব। তারপর আমি সে কথা ভুলে গেলাম। তিন দিন পর আমার সে কথা মনে পড়লো। তারপর আমি সেস্থানে এসে দেখলাম তিনি সেখানেই রয়েছেন। তিনি বল্লেন, হে যুবক। তুমি আমাকে বড়ো কষ্ট দিলে, তিন দিন থেকে আমি এখানে তোমার অপেক্ষা করছি। (কিতাবুল আদব –বাবু ফিল ইদাত)।

যায়েদ বিন হারেসার ঘটনা

যে ঘটনা নবী পাকের মহান চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো সাক্ষ্য দান করে- তা যায়েদ বিন হারেসার ঘটনা। তিনি চিলেন কাল্‌ব গোত্রের হারেসা বিন শুরাহবিল (অথবা শারাহবিল) নামক জনৈক ব্যক্তির পুত্র। তাঁর মা সু’দা বিন্তে সা’লাবাহ তাই গোতের শাখা মায়ানা গোত্র সম্ভূত ছিলেন। তাঁর আটবছর বয়সের সময় তাঁরা মা তাকে নিয়ে তাঁর বপের বাড়ি যান। সেখানে বনী কায়ন বিন জাসর এক লোকজন তাদের তাঁবুর উপর হঠাৎ আক্রমণ করে। তারপর লূটতরাজ করে যাদেরকে ধরে নিয়ে গেল তাদের মধ্যে যায়েদও ছিলেন। তারপর তারা তায়েফের নিকটবর্তী ওকাজ মেলায় তাঁকে বিক্রি করে দেয়, খরিদকারী চিলেন খাদিজার ভাতিজা হাকীম বিন হিসাম। তিনি তাঁকে মক্কায় এনে তাঁর ফুফী হযরত খাদিজাকে উপহার দেন। নবী (স) এর সাথে হযরত খাদিজার যখন বিয়ে হয় তখন যায়েদকে হুযুর (স) সেখানে রেখতে পান। তাঁর স্বভাব চরিত্র ও আচার আরণ নবীর এমন ভালো লাগে যে তিনি তাঁকে হযরত খাদিজার নিক থেকে চেয়ে নেন। এভাবে এ সৌভাগ্যবান বালক সেরা এমন এক সত্তার খেদমতে এসে যান যাঁকে আল্লাহ তায়ালা কয়েক বছরের মধ্যেই নবী বানাতে চান। তখন হযরত যায়েদের বয়স পনোরো বছর ছিল। কিছুকাল পর তাঁর বাপ-চাচা জানতে পারেন যে, তাঁদের ছেলে মক্কায় রয়েছে।

তাঁরা অনুসন্ধান করতে করতে নবীর কাছে তাকে পেয়ে যান। তাঁরা নবীকে বল্লেন, আপনি যে পরিমাণ ফিদিয়া চান নিয়ে আমাদের সন্তানদের ফেরৎ দিন।

নবী (স) বলেন, ঠিক আছে আমি তাকে ডেকে দিচ্ছি এবং তাকে তার মর্জির উপর ছেড়ে দিচ্ছি যে সে তোমাদের সাথে যেতে চায়, না আমার কাছে থাকতে চায়। যদি সে তোমাদের সাথে যেতে চায় ত আমি কোনই ফিদিয়া নেবনা, তাকে এমনিই ছেড়ে দেব। কিন্তু সে যদি আমার কাছে থাকতে চায় তাহলে আমি এমন লোক নই যে, আমার কাছে থাকতে চায় তাকে খামাখা বের করে দেব।

তাঁরা বল্লেন, এ ত আপনি ইনসাফ তেকেও বড়ো ভালোকথা বলেছেন, আপনি বালকটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন।

নবী (স) যায়েদকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি এ ‍দুব্যক্তিকে চেন?

যায়েদ বল্লেন, জি হাঁ উনি আমার পিতা এবং উনি চাচা। নবী (স) বল্লেন, ভালোকথা, তুমি তাদেরকেও চেন এবং আমাকেও চেন। এখন তুমি পূর্ণ স্বাধীন। চাইলে তাদের সাথে চলে যাও, আর চাইলে আমার সাথে থাক। যায়েদ বলেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কারো কাছে যেতে চাই না।

যায়েদের বাপ-চাচা বল্লেন, যায়েদ। তুমি কি স্বাধীনতা থেকে গোলামিকে প্রাধান্য দিচ্ছ? আর আপন মা-বাপ ছেড়ে অন্যের কাছে থাকতে চাচ্ছ?

যায়েদ বল্লেন, আমি এ মহান ব্যক্তির গুণাবলী দেখেছি এবং তার অভিজ্ঞতার আলোকে দুনিয়অর কাউকে তাঁর উপর প্রাধান্য দিতে পারি না।

যায়েদের জবাব শুনে তাঁর বাপ-চাচা সম্মত হয়ে গেলেন। নবী (স) তখরই যায়েদকে স্বাধীন করে দিলেন। অতঃপর হারাম শরীফে গিয়ে জনতার সামনে ঘোষণা করলেন, তোমরা সাক্ষী থাক আজ থেকে যায়েদ আমার ছেলে সে আমার ওয়ারিস হবে এবং আমি তার হবো।

এ ঘোষণার ভিত্তিতে লোকে তাঁকে যায়েদ বিন মুহাম্মদ (স) বলা শুরু করলো। এসব ঘটনা নবুয়তের পূর্বেকার। হুযুর যখন নবুয়তের পদমর্যাদায় ভূষিত হন, তখন হযরত যায়েদের নবীর খেদমতে পরেন বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ঈমান আনার সময় তাঁর বয়স ছিল ত্রিশ বছর।

হুযুর (স) এর তত্ত্বাবধানে হযরত আলী (রা)

চাচা আবু তালিব হুযুরের (স) শৈশব কাল থেকে যৌবন কাল পর্যন্ত তাঁর প্রতি যে দয়া স্নেহমমতা প্রদর্শন করেছেন তা তিনি স্মরণ রেখেছেন। ইবনে ইসহাক বলেন, একবার মক্কা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় দ্রব্যমূল্য চরমভাবে বৃদ্ধি পায়। হুযুর (স) মনে করলেন যে, তাঁর চাচার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ এবং তার সন্তানসন্ততিও অনেক। তাঁর বোঝা লাঘব করার জন্যে কিছু করা উচিত। অতএব তিনি তাঁর অপর অর্থশালী চাচা হযরত আব্বাসের কাছে গিয়ে বল্লেন, আপনার ভাইয়ের পরিবার খুব বড়ো, তাঁর আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বর্ধিত দ্রব্যমূল্যের কারণে লোক যে চরম দুরাবস্থায় আছে তা আপনি দেখছেন। চলুন আমরা তাঁর বোঝা লাঘব করার জন্যে তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা করি। তাঁর এক ছেলের ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনি নিন এবং একটার আমি নিই।

হযরত আব্বাস এ কথায় রাজী হলেন এবং চাচা ভাতিজা উবয়ে আবু তালিবের নিকটে গিয়ে তাঁদের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি বল্লেন, আকীলকে অথবা ইবনে হিশামের মতে তালিবকে আমার কাছে রেখে অন্যদের মধ্যে যে যাকে পছন্দ কর নিয়ে যাও। অতএব নবী (স) হযরত আলীকে তাঁর কাছে নিয়ে এলেন এবং হযরত আব্বাস (রা) হযরত জাফরকে (রা) নিয়ে এলেন। হযরত আলী (রা) ছিলেন সকলের ছোট। তাঁর থেকে জাফর ‘আকীল’ তালীব সকলেই দশ বছরের বড়ো, তাঁদের ছাড়াও আবু তালিবের অন্যান্য সন্তানও ছিল।

এভাবে হযরত আলী (রা) শৈশব কালেই হুযুরের তত্ত্বাবধানে এলেন। হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজা (রা) তাকে আপন সন্তানের মতোই লালন পালন করেন। সম্ভবতঃ হযরত আলীর বয়স তখন চার পাঁচ বছরের বেশী ছিলনা।

কাবা ঘরের পুননির্মাণ

হুযুর (স) এর বয়স যখন পয়ত্রিশ বছর এবং নবুয়ত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বছর বাকী তখন কুরাইশগণ কাবা ঘর নতুন করে নির্মাণ করার ইচ্ছা করে। কারণ ঘরখানি অত্যন্ত জরাজীর্ণ এবং বন্যার কারণে ধ্বংসান্মুখ হয়ে পড়েছিল। দেয়ালগুলো ছিল খুব নীচু এবং উপরে কোন ছাদও ছিল নার আর গাঁথুনি এভাবে করা হয়েছিল যে শুধু পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। কোন কিচু দিয়ে সেগুলোকে একটি অন্যটির সাথে জোড়া দেয়া ছিলনা। দরজাও ছিল জমিন বরাবর। কাবা ঘরের ধন সম্পদ ঘরে মধ্যে খনন করা একটা গর্তের মধ্যে ছিল। কিছুলোক দেয়াল টপকিয়ে সেখানে পৌছৈ সম্পদ চুরি করে নিয়ে যেতো। নতুন করে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হওয়অর পূর্বে বনী মুলায়হের এক গোলাম দুয়াইক কাবার ধন চুরি করেছিল অথবা চোর চুরি করে তার কাছে রেখে দিয়েছিল। তার কাছ থেকে চুরির মাল উদ্ধার করা হয়। [ইবনে আসীর বলেন, চুরির জন্যে তিন জনের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা হয়। তাদের মধ্যে একজন আবু লাহাবও ছিল কিন্তু মাল যেহেতু দুয়াইকের নিকট থেকে উদ্ধার করা হয় সে জন্যে তাকেই শাস্তি দেয়া হয়- গ্রন্থকার]

এসব কারণে কুরাইশরা চাচ্ছিল যে উঁচু এবং মজবুত ঘর করে উপরে ছাদ দেয়া হোক। সে কালে জনৈক রোমীয় বাণিকের বাণিজ্য জাহাজ সমুদ্রের উত্তাল তরংগ ও প্রচণ্ড ঝড়ে, ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে জিদ্দা পোতাশ্রয়ে এবং ইবনে সা’দের বর্ণনামতে- শায়ইবাহ পেতাশ্রয়ে যা জিদ্দার পূর্বে পোতাশ্রয় ছিল, আঘাত খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যা। তার মধ্যে বাকুম নাম একজন রোমীয় স্থপতি ছিল। কাঠের কাজ করার জন্যে মক্কায় একজন কিবতী সূত্রধরও  ছিল। জাহাজ ধ্বংস হওয়ার সংবাদ শুনে আলীদ বিন মগীরা কুরাইশের কিছু লোকজন সহ সেখানে গিয়ে জাহাজের কাঠ খরিদ করে। বাকুমের সাথে কথাবার্তা বলে তাকে সম্মত করলো যে, কাবা নির্মাণের কাজ সে সমাধা করবে। তারপর বনী মাখযুমের জনৈক ব্যক্তি আবু ওহাব বিন আমর বিন আয়েস (যিনি নবী পিতার মামু ছিলেন) উঠে কাবা ঘরের একটা পাথর খুলে পুনরায় যথাস্থানে রেখে বল্লেন, হে কুরাইশগণ এ নির্মাণ কাজে তোমাদের হালাল উপার্জনের অর্থ লাগাবে, এতে ব্যভিচার দ্বারা লব্ধ অর্থ, সুদের অর্থ, জুলুমের দ্বার উপার্জিত অর্থ যেন নির্মাণ কাজে কেউ লাগাতে না পারে।

অন্য একটি বর্ণনা এরূপ আছে- এ ঘর নির্মাণে এমন কোন অর্থ লাগাবে না যা তোমরা বলপূর্বক অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে অথবা পারস্পরিক দায়িত্ব লংঘন করে অর্জন করেছ।[এ হচ্ছে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা। মূসা বিন ওকবা মাগাযী গ্রেএথ বলেছেন যে উপরোক্ত বক্তব্য ছিল অলীদ বিন মুগীরার –গ্রন্থকার।]

কিন্তু কুরাইশের লোকজন কাবার ঘর ভেঙে ফেলতে বড়ো ভয় পাচ্ছিল। অবশেষে অলীদ বিন মুগীরা পুরাতন ঘর ভাঙার জন্যে কোদাল হাতে নিয়ে বল্লো, হে আল্লাহ! আমরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হইনি। আমরা মংগল ছাড়া ঘর ভাঙছিনা। -এ কথা বলে সে কাবা ঘরের এক অংশে আঘাত করলে। তারপর সে থেমে গেল। তারপর লোক সারারাত এ অপেক্ষায় রইলো যে, অলীদৈর উপর কোন বিপদ আসেকিনা। তারা বল্লো, কোন বিপদ এলে আমরা কাজ বন্ধ করে দেব এবং যে পাথর খুলে ফেলা হয়েছে তা যথাস্থানে রেখে দেবো। কোন বিপদ না এলে কাজ চলতে থাকবে। সকাল পর্যন্ত অলীদের উপর কোন বিপদ যখন এলোনা, তখন ধরভাঙ্গার দায়িত্ব বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন গোত্র গ্রহণ করলো। ইব্রাহীম (আ) এর তৈরী ভিত্তি পর্যন্ত দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলা হলো। তারপর সকল গোত্রের লোক পাথর তুলে তুলে- নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করলো। [এ নতুন নির্মাণকাজে জিনিস পত্রের স্বল্পতা হেতু কাবার একটি অংশ বাইরে ফেলে রাখা হয় এবং তার পাশে প্রাচীর নির্মাণ করা হয় যাতে করে বুঝতে পারা যায় যে এ কাবারই একটি অংশ। একে হেজাসও বলে এবং হাতীমও বলে। এ স্থানে হযরত হাজেরা এবং হযরত ইসমাইল (আ) কে দাফন করা হয়েছিল (ইবনে হিশাম)। ইবনে সা’দ বলে, কুরাইশ বায়তুল্লাহর দরজা এতো বড়ো করে রাখে যা এখনো আছে। তরা সোম ও বৃহস্পতিবার দরজা খুলতৈা এবং দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকতো। যকন লোক সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকতো, তখন সে যাকে খুশী ভেতরে যেতে দিত এবং যাকে খুশী তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত- গ্রন্থকার।] তাপর যে স্থানে ‘হাজরে আসওাদ’ লাগানো হবে সে স্থান পর্যন্ত গাঁথুনি হওয়ার পর প্রত্যেক গোত্রই চাইছিল যে এ পাথর বসানোর মর্যাদা সেই লাভ করবে। এ নিয়ে এমন বাবিতন্ডা চলে যে লড়াইয়েল উপক্রম হয়ে গেল। চার পাঁচ দিন ধরে এরূপ ঝগড়া বিবাধ চল্লো। অবশেষে এদনি সকলে পরামর্শ করার জন্যে হারমে সমবেত হলো। বনী মখযুমের এক ব্যক্তি আবু উমাইয়অ বিন সগীরা (অলীদ বিন মগীরার ভাই) সকলের বায়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে প্রস্তাব করেন  হে কুরাইশের লোকেরা। নিজেদের এ মতানৈক্যের মীমাংসার লক্ষ্যে এ কথায় একমত হও যে, সকলের আগে যে ব্যক্তি এ সমজিদের দরজা, [দরজা বলতে বাবে বনী শায়বা বুঝানো হয়। একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যীক্ত সকলের আগে বাবুস সাফা দিয়ে প্রবেশ করে সে মীমাংসা করে দেবে। মুসা বিন ওকবা বলেন, এ পরামর্শ স্বয়ং অলীদ দেয়। কিন্তু আল ফাকেহীরা, ওয়াকেদী এবং ইবনে ইসহাক আবু উমাইয়ার নাম বলেন- গ্রন্থকার।]  দিয়ে প্রবেশ করবে সে বিষয়ে মীমাংসা করে দেবে।

তাঁর এর প্রস্তাব সকলে মেনে নিল। আল্লাহ তায়ালার করণীয় এই ছিল যে, সকলের আগে যিনি প্রবেশ করেন তিনি ছিলেন রসূলুল্লাহ(স)। লোক তাঁকে দেখামাত্র বলে উঠলো- (আরবী******************)

-এ আমীন, আমরা রাজী আছি এ ত মুহাম্মদ। মুসনাতে আহমাদের বর্ণনায় আছে যে, লোক তাঁকে দেখামাত্র বল্লো (************)

তোমাদের নিকটে আমীন(অতি বিশ্বস্ত লোক) এসে গেছে।

রসূলুল্লাহ (স) যখন যানতে পারলেন যে, এ বিবাদের মীমাংসা তাঁকে করে দিতে হবে তখন তিনি একখানা কাপড় আনতে বল্লেন। লোক কাপড় এনে দিল। তিনি তখন সে কাপড়ের উপরে ‘হাজরে আসওয়াদ’ রেখে দিলেন। তারপর তিনি প্রত্যেক গোত্রকে সে কাপড়ের এক এক দিক ধরে হাজরে আসওয়াদ উঠাতে বল্লেন। যে স্থানে পাথরটি লাগানো সে স্থানে পৌছার পর তিনি পাথরটিকে আপন হাত দিযে উঠিয়ে যথাস্থানে লাগিয়ে দিলেন।

এ নবুয়তের মাত্র পাঁচ বছর আগের ঘটনা। সে সয়ে গোটা জাহি হুযুরের (স) আমীন বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত হওয়ার সাক্ষ্য দান করে। সমগ্র জাতি এটাও প্রত্যক্ষ করে যে, তিনি কত বিজ্ঞ ছিলেন যে এমন মারাত্মক বিবাদের অতি সুন্দরভাবে সমাধান করে তাঁর জাতিকে গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করলেন। ইবনে সা’দ বলেন শুদু এ একটি ঘটনাই নয় যে, হুযুর (স) কুরাইশদের একটি বিবাদের মীমাংসা করে দিয়েছিলেন বরঞ্চ নবুয়তের পূর্বে অধিকাংশ তাদের বিষয়োদির মীমাংসার জন্যে তাঁর স্মরণাপন্ন হতো।

নবুয়তের পূর্বে যাঁরা নবীকে নিকট থেকে দেখেছেন

নবুয়তের পূর্বে সবচেয়ে নিক থেকে নবী মুহাম্মদের (স) জীবন দেখার ও তাঁর সার্বিক অবস্থা জানার যাদের সুযোগ হয়েছিল তাঁদের মধ্যে তাঁর পরিবারের লোক ছিলেন অর্থাৎ এক. হযরত খাদিজা (রা) যিনি পনেরো বছর যাবত তাঁর স্ত্রী হিসাবে জীবন যাপন করেন। দুই, হযরত আলী (রা) যিনি শৈশবকাল থেকেই নবী পরিবারের প্রতিপালিত হন এবং তিন. হযরত জায়েদ বিন হারেসা যিনি মাতাপিতাকে ছেড়ে নবীর সাথে থাকাকে প্রাধান্য দেন এবং যাকে নবী (স) আপন পুত্র বানিয়ে নেন। তারপর ছিলেন উম্মে আয়মান (রা) যিনি নবীকে শৈশবে লালন পাল করেন এবং পরিবারে একজন সদস্য হিসাবে সর্বদা নবীর (স) সাথে থাকেন। তাঁর সম্পর্কে নবী (স) বলতেন আমার মায়ের পর উনিই আমার মা। তাঁকে ‘আম্মা’ বলেই সম্বোধন করতেন। এসব লোক ছাড়াও পরিবার বহির্ভূত এমন অনেক ছিলেনৈ যারা নবীর সাহচর্য লাভের মর্যাদা লাভ করেন এবং বেশ কিছুকাল যাবত তারা নবীর সাথে উঠাবসা করেন।

তাদের মধ্যে নবীর নিকটতম বন্ধু ছিলেন হযরত আবু বকর (রা)। ইবনে মাদ্দাহ ইবনে আব্বাসের (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করে বলেন, আঠার বছর বয়স থেকে হযরত আবু বকর (রা) নবীর সাথে উঠাবসা করতেন যখন নবী পাকের (স) বয়স ছিল বিশ বছর। সে সময় থেকে উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব বিরাজ করছিল। কারণ মক্কায় দুই ব্যক্তি এমন ছিলনা যাদের স্বভাব প্রকৃতি, চালচলন ও আচার আচরণের মধ্যে এমন সাদৃশ্য ছিল যা ছিল নবী (স) এবং হযরত আবু বকরের মধ্যে। জাহেলিয়াতের যুগে হযরত আবু বকর ছিলেণ অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এবং জাতীয় সর্দারগণের অন্যতম সর্দার ছিলেন। তাঁর পেশা ছিল ব্যবসা। স্বভাব চরিত্রের জন্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ঐসব লোকের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন যাঁরা কোন দিন মদ স্পর্শ করেন নি। কুরাইশের লোকেরা দিয়াত অর্থাৎ খুনের বদলায় যে অর্থ দন্ড নির্ধারিত হতো সে বিষয়টি তাঁর উপরে ছেড়ে দিত। সে দিয়াতের দায়িত্বও তিনি স্বীকার করে নিতেন। সমস্ত গোত্র মিলে তা পরিশোধ করতে সম্মত হতো। অন্য কেউ এ দায়িত্ব নিলে তাকে কেউ স্বীকার করতো না।

কুশনামা সম্পর্কে কুরাইশের লোকেরা তাঁর জ্ঞানের উপরে সবচেয়ে বেশী আস্থা স্থাপন করতো। তাঁর নৈতিক প্রভাব শুধু কুরাইশ নয়, বরঞ্চ চারপাশের গোত্রগুলোর উপরেও ছিল- তাঁর অনুমান এর থেকে করা যায় যে, মক্কায় যখন মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন শুরু হয়, তখন আবু বকরও হিজরতের জন্যে তৈরী হন। দু একদিনের পথ চলার পর আহাবিশেস সর্দার[তিনটি গোত্রের সমষ্টির নাম ছিল আহাবিশ। তাদের মধ্যে বনু আল হারেস বিন আব্দে মানাত বিন কিনানা, বনী আলহুন বিন খুযায়মা বিন মুদারেকা (অর্থাৎ আদাল, কারা এবং দিশ এর গোত্রগুলো) এবং কুাযায়ার মধ্যে বনু আলমুস্তালিক শামিল ছিল। তারা মিলে মক্কার নিম্ন এলাকায় আহবাশ নাম এক উপত্যকা প্রান্তরে পারস্পরিক বর্ধুত্ব ও সাহায্য সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করে। এ জন্যে তাদেরকে আহাবিশ বলা হতো- গ্রন্থকার।]  ইবনুদ্দুগুণ্ণার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে জিজ্ঞেস করে, আবু বকর কোথায় যাও?

আবু বকর (রা) বলেন, আমার জাতি আমাকে বহিষ্কার করে দিয়েছে, বহু দুঃখ কষ্ট দিয়ে আমার জীবন দুর্বিসহ করে দিয়েছে, বহু দুঃখ কষ্ট দিয়ে আমার জীবন দুর্বিসহ করে দিযেছৈ।

সেক বলে, খোদার কসম, তুমি ত সমাজের সৌন্দর্য। বিপদে মানুষের সাহায্য করতে। ভালো কাজ কর। গরীবের উপকার কর। চল আমি তোমাকে আশ্রয় দেব।

তারপর সে তাঁকে নিয়ে মক্কায় এলো এবং ঘোষণা করলো, আমি ইবনে আবি কুহাফাকে আশ্রয় দিয়েছি। এখন যেন কেউ তার ভাল ছাড়া কিছু মন্দ না করে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন হযরত সুহাইব বিন সিনান রুমী। আসলে তিনি ছিলেন বনী নামের বিন কাসেতের বংশোদ্ভূত। তিনি ইরান  রাষ্ট্রের অধীন মুসেলের নিকটবর্তী স্থানের বাসিন্দা ছিলেন। শৈশব কালে ইরান ও রোমের মধ্যে যুদ্ধের সময় তিনি গ্রেফতার হন এবং কিছুকাল যাবত রোমীয়দের অধীন গোলামীর জীবন যাপন করেন। এভাবে হাত বদল হতে হতে মক্কায় পৌছেন এবং এখানে আবদুল্লাহ বিন জুদআন তাঁকে খরিদ করেন। ইবনে জুদআন যেহেতু হযরত আবু বকরের (রা) নিকটাত্মীয় ছিলেন, এজন্যে তাঁর মাধ্যমে নবী (স) এর সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। তিনি প্রায়ই নবীর সাহচর্যে সময় কাটাতেন। তিনি এতোখানি মর্যাদা লাভ করেছিলেন যে, যখন হযরত ওমর (রা) মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তিনি অসিয়ত করেন যে যতোক্ষণ পর্যন্ত শুরা কোন ব্যক্তিকে খলিফা মনোনীত করতে একমত না হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত তিনি মসজিদে নববীতে নামায পড়াবেন।

তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রা)। তাঁর নিজের বক্তব্য বায়হাকী উধৃত করেন। তাতে বলা হয়েছে যে তিনি বলেন, হযরত খাদিজার সাথে রাসূলুল্লাহ (স) এর বিয়ের ব্যাপারে আমার চেয়ে অধিক আর কে জানে?

হযরত সুহাইব (রা) এবং হযরত আম্মার (রা) একসাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।

চতুর্থ ব্যক্তি ছিলেন হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা)। কুরাইশের অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। রিফাদার অর্থাৎ হাজীদের পানাহার করাবার মর্যাদা তিনি লাভ করেন। তিনি হযরত খাদিজা (রা) এর ভাতুষ্পুত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন নবী (স) এর পাঁচবছরের বড়ো। মুসনাতে আহমাদে এরাক বিন মালেকের বর্ণনায় জানতে পারা যায় যে তিন বলেন, নবীকে (স) আমি সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতাম। যুবাইর বিন বাক্কার বলেন, নবুয়তের পরেও তাঁদের ভালোবাসা অটল ছিল যদিও তিনি মক্কা বিজযের ঈমান আনেন।

পঞ্চম ব্যক্তি ছিলেন, আযদে শানুয়া গোত্রের দিমা বিন সা’লাহাবাহ। তিনি এক অস্ত্রচিকিৎসকের কাজ করতেন। ইবনে আবদুল বার তাঁর ইস্তিয়াবে বলেন, তিনি জাহেলিয়াতের যুগেও হুযুরের (স) বন্ধু ছিলেন। মুসনাতে আহমাদে ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, যখন নবুয়তের সময় মক্কায় আসেন, তখন লোকে তাঁকে বলে যে মুহাম্মদ (স) পাগল হয়েছেন।

তখন তিনি সোজা তাঁর কাছে গিয়ে বলেন, বলুন আপনার কি অসুখ হয়েছে আমি চিকিৎসা করব।

জবাবে নবী (স) তাকে কয়েকিট প্রভাব বিস্তারকারী আয়াত বা বাক্য শুনালেন যা মসনূন কুতবায় পাঠ করা হয়। এসব শুনে তিন মুসলমান হয়ে যান।

তারপর এমন কিছু লোক ছিলেন যাঁরা নিকট আত্মীয় হওয়ার কারণে নবীকে (স) কুব ভালোভাবে জানতেন এবং যাদের কাছে নবী জীবনের কোন কিছুই গোপন ছিলনা। যেমন হযরত উসমান বিন আফফান (রা)। তিনি নবী (স) এর ফুফী উম্মে হাকীম আল বায়দার জামাই ছিলেন। হযরত যুবাইর বিন আওয়াম নবীর ফুফী হযরত সাফিয়ার (রা) পুত্র ছিলেন। হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা) হযরত সা’দ বিন আবি ওককাস (রা) এবং হযরত উমাইর বিন আবি ওককাস (রা) নবী মাতার আত্মীয় ছিলেন। হযরত আবু সালমা (রা) নবী (স) এর ফুফাতো ভাই এবং ‍দুধ ভাই ছিলেন।ঠ হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহশ নবীর ফুফু উমাইয়ার পুত্র ছিলেন। হযরত জাফর বিন আবি তালিব তাঁর চাচাতো ভাই ছিলেন।

তাঁরা সকলের আগে ঈমান আনেন। তাদের ঈমান আনার অর্থ এই যে হুযুরের জীবনকে নিকট থেকে দেখার পর তাদের হৃদয়ে হুযুরের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব এমনভাবে অংকিত হয়ে যায় যে, তাঁকে নবী বলে গ্রহণ করতে তারা বলামাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। এ ঈমানকে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব অথবা ব্যক্তিগত ভালোবাসার কারণ বলা যেতে পারেনা। কারণ এসবের কারণে কেউ তার ধর্ম বিশ্বাস বা দ্বীন পরিবর্তন করতে পারে না।

হুলিয়া শরীফ

নবুয়তের পূর্ব যুগের অবস্থার পরিসমাপ্তির পূর্বে আমরা ন্যায়সংগত মনে করি যে, নবী (স) এর হুলিয়া শরীফও বর্ণনা করা হোক। কারণ মানুষের ব্যক্তিত্বের উপরে তার গঠ আকৃতি ও মুখমন্ডলের (হুলিয়ার) গভীর সম্পর্ক থাকে। বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি, নাসায়ী, বায়হাকী, দার কাতনী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থগুলোতে হযরত আলী (রা), আবু হুরায়রাহ (রা), হযরত আনাস (রা), হযরত বারা বিন আযেব (রা), হযরত হিন্দগ বিন আবি হালা (রা) এবং আরও কতিপয় সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যে বর্ণনা পাওয়া যায় সে সবের দৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে নবী পাকের (স) হুলিয়া মুবারক এখানে আমরা বর্ণনা করছি। তাঁর দৈহিক উচ্চতা না খুব বেশী ছিল আর না খর্বাকৃতির, বরঞ্চ মধ্যম আকৃতি থেকে এটকু বাড়ন্ত। কোন সমাবেশে তিনি থাকলে তাঁকে স্পষ্ট চোখে পড়তো। মুখাকৃতি না লম্বা ধরনের, না সম্পূর্ণ গোলগাল, বরঞ্চ কিংঞ্চিত গোলাকার বিশিষ্ট। দেহের বর্ণন না বাদামী, না লাল, না একেবারে সাদা, বরঞ্চ উজ্জ্বল গৌর বর্ণ এবং দীপ্তিমান। মাথা ছিল বড়ো, বক্ষ প্রশস্ত, দুই স্কন্দের মাঝখানে বেশ ব্যবসধান, দেখতে হাট্টাগোট্টা তবে মোটা নয়। দেহের জোড়াগুলো খুবই মজবুত ছিল। বাহু ছিল মাংশল এবং হাঁটুর নিম্নভাগ দেহের সাথে সামঞ্জস্যশীল। বাহু ও হাঁটুর নিম্নাংশে হালকা লোম রাশি দেখা যেতো। দেহের বাকী অংশ ছিল লোমহীন। বক্ষ থেকে নাভী পর্য়ন্ত একটি কেশ রেখার মতো মনে হতো। মাথা ও দাড়ির চুল ঘনো ছিল। চুল হাবশীদের মতো কোঁকড়ানো ছেলনা এবং একেবারে সোজাও ছিলনা। কিছুটা ঢেউ তোলার মতো। মৃত্যু পর্যন্ত মাথা ও দাড়িতে বড়োজোর বিশটি চুল শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল। আর তা শুধু তেল নাগালেই দেখা যেতো। মাথার চুল কখনো কানের অর্ধেক পর্যন্ত কখনো কানের তলা পর্যন্ত এবং কখনো তার নীচ পর্যন্ত রাখা হতো। চক্ষুদ্বয় বড়ো এবং সুন্দর ছিল। সুরমা না লাগালেও মনে হতো যেনো সুরমারঞ্চিত। অক্ষিগোলকে বা চোখের লাটাইয়ের ঈষৎ লাল রেখা ছিল। চোখের পাতার লোম ঘনো ও দীর্ঘ ছিল। ভুরু একটি অপরটি থেকে পৃথক ছিল, জোড়া ছিল না। মুখ বড়ো ছিল। আরবাসীগণ একে সৌন্দর্যের নিদর্শন মনে করতো। ছোট মুখ তারা পছন্দ করতো না। পায়ের তালূ হালকা ছিল, হাত পায়ের আঙুল লম্বাও মাংশল ছিল। পায়ের মধ্যম আঙুলি বুড়ো আঙুল থেকে একটু বাড়ন্ত ছিল। হাতের তালু ছিল মাংসল। প্রথম নজরে মানুষ একটু ভয় পেতো। কিন্তু যতোই তার নিকটবর্তী হতো, তাঁর বিনয় নম্রতা ও মহান চরিত্রে প্রভাবিত হয়ে আপন হয়ে যেতো। চলবার সময় এমন দৃঢ় পদক্ষেপে চলতেন যেন নীচে নামছেন অথবা উপরে উঠছেন। কোন দিকে তাকালে পুরোপুরি তাকাতেন এবং কোন দিক থেক মুখ ফেরাতে হলে পুরোপুরি ফেরাতেন। আড় নয়নে অথবা শুধু ঘাড় ফিরিয়ে দেখার অভ্যাস ছিলনা। তাঁর মুখে মুচকি হাসি দেখা যেতো। হাসবার সময় অট্টহিাস্য করতেন না।তাঁর দৈহিক শক্তি এমন ছিল যে, কুরাইশদের মধ্যে শক্তিশালী পলোয়ান রুকানা যাকে কেউ কোনদিন পরাজিত করতে পারেনি, নবীর সাথে কুস্তি লড়তে আসে। নবী তাকে আছাড় দিয়ে কুপোকাত করেনে। সে পুনরায় উঠে কুস্তি লড়তে সাহস করেনি। নবী (স) পুনরায় তাকে আছাড় দিয়ে ফেল্লেন। সে বল্লো, মুহাম্মদ! আশ্চর্য তুমি আমাকে আছাড় মারছ? তার অর্থ এই যে নবী না কোনদিন ব্যায়ম করেছেন, আর না পালোয়ানগিরি করেছেন। তথাপি তিনি রুকানা পলোয়অনকে দুবার আছাড় মেরে ফেলে দিয়েছেন। এ ব্যক্তি পরে মুসলমান হয়ে যান- রাদিআল্লাহ আনহু।

নবী (স) এর শৈশব কালের একটি ঘটনা এই যে, একবার আবদুল্লাহ বিন জুদআনের বাড়িতে খানার দাওয়াত ছিল। আবু জেহেল হুযুরের সাথে ঝগড়া করতে লাগে। তারও তখন শৈশব কাল ছিল। হুযুর (স) কাতে এমন জোড়ে আছাড় মেরে ফেলে দেন যে তার হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়- যার দাগ সারা জীবন রয়ে যায়। ইবনে হিশাম বলেন, বদর যুদ্ধে আবু জেহেল নিহত হলে হুযুর বলেন, নিহতদের মধ্যে আবু জেহেলের লাশ রেব করে দেখ তাঁর হাঁটুতে ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যাবে। সত্য সত্যই তার লাশ তাঁটুতে ক্ষতচিহ্ন দেখা গেল। তার এ ক্ষতিচিহ্নের কাহিনী নবী (স) বর্ণনা করেন।

এ বিশদ আলোচনায় বুঝতে পারা যায় যে, নবী (স) শুধু মহান চরিত্রেরই প্রতীক ছিলেন না, বরঞ্চ পুরুষোচিত গুণাবলী এবং বীরত্বেরও প্রতীক ছিলেন।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.