সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চতুর্থ অধ্যায়

রেসালাতের সূচনা এবং গোপন দাওয়াতী কাজের প্রথামিক তিন বছর

নবীর মর্যাদায় অধিষ্টিত হওয়ার পূর্বে নবীগণের ধ্যান ও চিন্তা গবেষণা

কুরআন মজিদ একথা বলে যে অহী আসার পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তা সাধারণ মানুষের জ্ঞান থেকে পৃথক ছিলনা। অহী নাযিলের পূর্বে তাঁদের কাছে এমন কোন জ্ঞান লাভের সূত্র ছিলনা যা অন্যের কাছেও ছিলনা। নবী (স) কে বলা হয়-

(আরবী******************)

-হে নবী! তুমি কিছুই জানতেনা যে, কিতাব কাকে বলে এবং ঈমানই বা কোন্‌ বস্তু- (শুরা : ৫২)।

(আরবী*****************)

-এবং আল্লাহ তায়ালা তোমাকে পথ না-জানা পেয়েছেন এবং তারপর পথ দেখিয়েছেন- (দোহা: ৭)।

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা থেকে ইলহামী ঈমান পর্যন্ত

কুরআন আমাদেরকে এ কথাও বলে যে, নবীগণ (আ) নবুয়তের পূর্বে জ্ঞান বিশেষ প্রজ্ঞার ঐসব সাধারণ সূত্রের মাধ্যমেই ঈমান বিল গয়েবের স্তর অতিক্রম করেন যেসব সূত্রে সাধারণ মানুষও লাভ করে থাকে। অহী আসার পর যা কিচু করে তা হলো এই যে, যেসব সত্যের প্রতি তাঁদের মন সাক্ষ্য দিত, সেসব সম্পর্কেই অহী অকাট্য সাক্ষ্য দেয় যে তা একেবারে সত্য এবং তারপর সেসব সত্য তাঁদেরকে বাস্তবে দেখিয়ে দেয়া হয় যাতে করে তাঁরা দৃঢ় প্রত্যয় সহ ‍দুনিয়ার সামনে তার সাক্ষ্য দিতে পারেন। এ বিষয়টি সূলা হুদে বার বার বর্ণনা করা হয়েছে-

(আরবী******************)

-যে ব্যক্তি প্রথমে তার প্রভুর পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাকৃতিক হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তারপর খোদার পক্ষ থেকে এক সাক্ষীও এসে গেল (অর্থাৎ কুরআন) এবং তার পূর্বে মুসার কিতাবও পথ প্রদর্শন ও রহম হিসাবে বিদ্যমান ছিল, তারপর কি সে এ সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতে পারে? –(হুদ: ১৭)।

তারপর এ কথাই হযরত নূহ (আ) এর মুখ দিয়েই বলা হচ্ছে-

(আরবী*******************)

-হে আমার জাতির লোকেরা। একবার চিন্তা করে দেখ দেখি, আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলাম এবং তিনি তাঁর নিজের পক্ষ থেকে আমাকে রহমত (অহী ও নবুয়ত) দ্বারা ভুষিত করেছেন, আর এ জিনিষ তোমরা দেখতে পাওনা, তাহলে এখন কি তা আমরা জবরদস্তি তোমার মাথার উপর চাপিয়ে দেব?

তাপর ৬৩ নং আয়াতে হযরত সালেহ (আ) এবং ৮৮নং আয়অতে হযরত ‍শুয়াইব (আ) এ কথাটির পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে অহীর মাধ্যমে সত্য সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান লাভের পূর্বে আম্বিয় (আ) পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা গবেষণার স্বাভাবিক যোগ্যতাকে সঠিক পথে ব্যবহার করে (******************* যাকে উপরে আয়তে)

এর অর্থ করা হয়েছে তৌহিদ ও আখেরাতের সত্যতায় পৌছে যেতেন। এ সত্যলাভ খোদাপ্রদত্ত নয়, অর্জিত। তারপর আল্লাহতায়ালা তাদেরকে অহীর জ্ঞান দান করেন। আর এটা অর্জিত নয় বরঞ্চ খোদা  প্রদত্ত।

প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী পর্যবেক্ষণ, চিন্তা গবেষণা এবং সাধারণ জ্ঞাওেনর (COMMON SENSE) ব্যবহার ওসব আন্দাজ অনুমান ও দূরকল্পনা (seiculation) থেকে একেবারে এক পৃথক জিনিস আর এ দূরকল্পনা দার্শনিকগণই করে থাকেন। এ ত সেই জিনিস যার প্রতি কুরআন মজিদ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে। বার বার সে মানুষকে বলে, চোখ খুলে খোদার কুদরতের নিদর্শনাবলী দেখ এবং তার থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। এভাবে খোদার নিদর্শনাবলী পর্যবেক্ষণ দ্বারা একজন নিরপেক্ষ সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তি সত্যের নাগাল পেয়ে যায়। (***১)

রসূলুল্লাহ (স) এর নবী জীবনের পূর্বের যে অবস্থা আমরা পূর্বর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি তার থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হুযুর (স) নবী হওয়ার পূর্বেই শির্ক থেকে পাক পবিত্র এবং তৌহীদের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি কখনো তাঁর জাতির শির্কমূলক আকীদা বিশ্বাস মেনে নেননি- তাদের শির্কমূলক পূজা পার্বনে অংশগ্রহণ করেন নি। প্রতিমা ও প্রতিমা পূজা থেকে সর্বদা বিমুখ ছিলেন। দেবদেবীর উদ্দেশ্যে যে কুরবানী দেয়া হতো তার থেকেও দূরে থাকতেন। প্রাক নবী জীবনে তাঁর অবস্থা ঐসব একনিষ্ঠ তৌহীদ পন্থীদের অনুরূপ ছিল যার উল্লেখ আমরা এ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে করেছি। জাহেলিয়াতের যুগে জুরহুম ও কুযায়া গোত্রদ্বয় দ্বীনে ইব্রাহীমিতে যেসব রদবদল করেছিল, তার কোন একটিও তিনি নবুয়তের পূর্বে মেনে নেননি। এমনিভাবে কুরাইশগণ তাদের আমলে ধর্মীয় বিকৃতির মাত্র বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং এ থেকেও তিনি দূরে ছিলেন। যেমন কুরাইশগণ তাদের নিজেদের জন্যে কিছু বৈষম্যমূলক বৈশিষ্ট্য সৃস্টি করে রেখেছিল যার ভিত্তিতে তারা নিজেদেরকে অন্যান্য আরববাসীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর মনে করতো। ইবনে হিশাম ও ইবনে সাদ বলেন যে, তারা হজ্বের সময় আরাফাত যাওয়া এবং সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করার প্রথা পরিত্রাগ করেছিল। শুধু মুযদালফায় গিয়ে সেখান থেকেই ফিরে আসতো, তারা বলতো, আমরা হারামের অধিবাসী। আমাদের এ কাজ নয় যে আমরা সাধারণ হাজীদের মতো হারামের বাইরে গিয়ে আরাফাতে অবস্থান করব। যদি আমরা এমনটি করি তাহলে, হারামের বাইরে বসবাসকারী ও আমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবেন এবং তাতে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।

অথচ তারা জানতো যে, আরাফাতে গিয়ে সেখানে অবস্থঅন করা অতঃপর সেখান থেকে মুযদালফা ও মিনার প্রত্যাবর্তন করা হজ্বের অবশ্য প্রথাগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং দ্বীনে ইব্রাহীমির মধ্যে শামিল। ক্রমশঃ এসব প্রভেদ পার্থক্য ঐসব হারাম বহির্ভূত গোত্রও মেনে চলা শুরু করলো যারা কুরাইশদের সাথে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিল। মেযন বনী কিনানা, খুযায়া ও আমের বিন সা’সায়া। এমনকি কুরাইশের সাথে যাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তাদের মর্যাদাও সাধারণ আরবাবসীদের চেয়ে বেড়ে গেল এবং তারা আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু নবী (স) নবুয়তের পূর্বেই এ বিদআত খন্ডন করেছিলেন। ইবনে ইসহাক জুবাইর বিন মুতয়েম (রা)( এর একটি বর্ণনার উধৃতি দিয়েছেন, তাতে জুবাইর (রা) বলেন, আমি অহী নাযিল হওয়ার পূর্বে হুযুরকে (স) সাধারণ আরবদের সাথে আরাফাতে অবস্থান করতে দেখেছি।

কুরাইশ প্রবর্তিত বিদআতগুলোর মধ্যে একটি ছিল এই যে, হারামের বাইরে বসবাসকারীগণ হজ্ব বা ওমরার জন্যে এলে তরা বাইরে থেকে আনা আহার খেতে পারতো না এবং বাইরে থেকে আনা কাপড় পরিধান করে তাওয়াফও করতে পারতো না। হারাম শরীফেরে খিানা তাদেরকে খেতে হতো এং হারাম শরীফে কাপড় না পাওয়া গেলে উলংগ অবস্থায় তাওয়াফ করতে হতো। বাইরের কাপড় তাওয়াফ করলে তা ফেলে দিতে হতো। সে কাপড় তারা নিজেও পরিধান করতে পারতোনা এবং অন্য কেউ সে কাপড় স্পর্শও করতে পারতো না। আরবাসী এ কুপ্রথা বা বিদআতকে মুখ বুজে দ্বীন হিসাবে মেনে নিয়েছিল এবং এভাবে উলংগ তাওয়াফের প্রথা প্রচলিত হয়। (****২)

হুযুরের (স) নির্জনে এবাদত বন্দেগী

মুহাদ্দিসগণ অহীর ‍সূচনার ঘটনা স্ব স্ব সনদসহ ইমাম যুহরী থেকে, তিনি যুবাইর থেকে এবং তিনি তাঁর খালা হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রা) বচলেন, রসূলুল্লাহ (স) এর উপর অহীর সূচনা হয় সত্য ও সুন্দর স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা এমন হতো যেন তিনি তা প্রকাশ্য দিবালোকে দেখছেন। [বায়হাকী বলেন, অহী নাযিলের ছ মাস পূর্বে তাঁর এ অবস্থা হয়।]

তারপর তিনি নির্জনতা অবলম্বন করা শুরু করেন এবং গারে হেরার এবাদত করা শুরু করেন। [উপরোক্ত অবস্থা সৃষ্টি হওয়াপর পর হুযুর (স) অধিক নির্জনতা অবলম্বন করেন। অবশ্যি এ নির্জনতার প্রতি তাঁর অনুরাগ বহু পূর্বেই শুরু হয়েছিল। ইবনে হিশাম এবং তাবারীর বর্ণনা মতে ইবনে ইসহাক এবং আবদুল্লাহ বিন যুবাইর ওবায়েদ বিন উমারি আল্লায়সীর বর্ণনা উধৃত করে বলেন, হুযুর (স) প্রতি বচর এক মাস হেরায় অতিবাহিত করতেন। কিছুদিনের আহার সাথে করে নিয়ে যেতেন। তাপর ফিরে এসে প্রথমে সাত বার কাবায় তাওয়াফ করতেন এবং আরও কিচুদিনের খাবার বাড়ি থেকে নিয়ে হেরায় ফিরে যেতেন।

উপরন্ত হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এ নির্জনবাস ও এবাদত বন্দেগীর সময় তিনি মিসকীনদের অধিক পরিমাণে খানা খাওয়াতেন। কিন্তু তিনি একথা বলেন না যে হুযুর (স) হেরায় গিয়ে অবস্থান করার কাজ কখন শুরু করেন। তবে অনুমা করা যায় যে েএ কাজ তিনি কয়েক বছর থেকে করতে থাকেন- (গ্রন্থকার)।]

হযরত আয়েশা (রা) নবীর (স) এ কাজকে ‘তাহান্নুস’ শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেন। ইমাম যুহরী এর ব্যাখ্যায় এবাদত বন্দেগী বলেছেন। এ এক ধরনের এবাদত ছিল যা তিনি করতেন। কারণ তখন পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এবাদতের কোন পদ্ধতি তাঁকে বলে দেয়া হয়নি। তিনি কয়েকদিনের পানাহারোর বস্তু বাড়ি থেকে নিয়ে যেতেন। তারপর তিনি হযরত খাদিজার (রা) কাছে আসতেন এবং তিনি তাঁকে আরও কয়েকদিনের আহারের ব্যবস্থা করে দিতেন। (****৩)

গারে হেরায় নির্জন বাসের কারণ

এ সময়ে যেসব কারণে হুযুর আকরাম (স) মক্কার জনবসতি পরিত্যাগ করে পাহাড় কুঞ্জের মধ্যে হেরা গুহায় নির্জনতায় কাটাতেন, তার উপর সূরায়ে ‘আলাম নাশরাহ’-এর নিম্ন আয়াত কিছুটা আলোকপাত করে-

(আরবী****************)

আমরা তোমার উপর থেকে সে ভারি বোঝা নামিয়ে দিলাম যা তোমার কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছিল।

এ আয়াতে (***) শব্দের অর্থ ভারি বোঝা। আপন জাতির অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের কর্মকান্ড দেখে দুঃখ, মনোবেদনা, দুশ্চিন্ত ও উদ্বেগে ভারি বোঝা তাঁর সংবেদনশীল স্বভাব প্রকৃতিকে ভারাক্রান্ত করে ফেলেছিল। তাঁর সামনে মূর্তিপূজা করা হচ্ছিল, শির্ক, কুফর ও কুসংস্কার প্রভৃতির ব্যাপক প্রচলন ছিল। নৈতিক পংকিলতা এবং নগ্নতা অশ্লীতায় সমাজ জীবন নিমজ্জিত ছিল। কন্যা সন্তান জীবন্ত দাফন করা হতো। জুলুম, অনাচার ব্যভিচার সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্বল সবলের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। গোত্রগুলো পরস্পর পরস্পরের উপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসতো। কোন কোন সময়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বিগ্রহ শত শত বছর ধরে চলতো। কারো জান মাল ইজ্জত আবরু নিরাপদ ছিলনা যদি তার পেছনে কোন শক্তি শালী দল না থাকতো। এসব অবস্থা দেখে তিনি মর্মপীড়া ভোগ করতেন। কিন্তু এ চরম নৈতিক অথঃপতন থেকে জাতিকে রক্ষা করার কোন পন্থাই তিনি খুজে পাচ্ছিলেন না। এ দুশ্চিন্তাই তাঁর দেহমনকে ভেঙ্ড়ে ফেলীছল। আল্লাহ তায়ালা হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করে এ ভারি বোঝা তাঁর উপর থেকে নামিয়ে দেন। নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি উপলব্ধি করেন যে তৌহিদ, রেসালাত ও আখেরাতের উপর বিশ্বাসই সকল জীবন সমস্যার সমাধান করতে পারে, জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের পরিপূর্ণ সংস্কার সাধন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালার এ পথ নির্দেশনা নবী মুস্তাফার (স) সকল বোঝা হালকা করে দিল এবং তিনি নিশ্চিন্ত ও নিশ্চিত হলেন  যে এর মাধ্যমে তিনি শুধু আরব দেশেরই নয়, বরঞ্চ দুনিয়ার অন্যান্য দেশেরও মানব গোষ্ঠী যেসব অন্যায় অনাচারে লিপ্ত, তাদরকেও এসব থেকে রক্ষা করা যাবে। (****৪)

সত্য স্বপ্ন

হাদীসে হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, নবী (স) এর উপর অহী নাযিলের সূচনা সত্য স্বপ্নের আকারে হয় (বুখারী ও মুসলিম)। এ ধারাবাহিকতা নবী যুগের প্রত্যেক স্তরেই অব্যাহত ছিল। হাদীসে তাঁর বহু স্বপ্নের উল্লেখ আছে, যার দ্বারা তাঁকে কোন শিক্ষাদান করা হয়েছে অথবা কোন বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কুরআন পাকেও তাঁর একটি স্বপ্নের সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে (আল ফত্‌হ : ১২৭)। এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে একথারও উল্লেখ আছে যে নবী (স) বলেছৈন, ওমুক বিষয় আমার মনে উদিত করে দেয়া হয়েছে অথবা আমাকে েএ কথা বলা হয়েছে, অথবা আমাকে এক হুকুম দেয়া হয়েছে অথবা এ বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীসে কুদসীগুলো বেশীরভাগ এসব বিষয় সংক্রান্ত। (***৫)

অহীর সূচনা

নবী মুস্তাফার (স) বয়স যখন চল্লিষ বছর ছয় মাস [সাধারণতঃ বলা য় যে চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত লাভ করেন। কিন্তু তাঁর জন্ম হয় প্রথম হাতিবছর রবিউল আওয়াল মাসে এবং নবুয়ত দান করা হয় হাতিবচর রমযান মাসে। এ জন্যৌ অহীর সূচনাকালে তাঁর বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছর ছয়মাস –গ্রন্থকার

আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রা) এবং ইবনে ইসহাক ওবায়দুল্লাহ বিন ওমাইর আললায়সীর বর্ণনা উধৃত করে বলেন নবী (স) বলেন, স্বপ্নে জিব্রীল (আ) এস রেশমী কাপড়ে লিখিত একটা জিনিস আমাকে দেখালেন যাতে সূরায়ে আলাকের প্রথমিক আয়াতগুলো লিখিত ছিল। তারপর আমাকে পড়তে বল্লেন। বল্লাম, আমি পড়তে জানিনা। তখন তিনি আমকে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বল্লেন, পড়ৃন! তারপর (****) পর্যন্ত আমাকে পড়ালেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর আমার মনে হলো কথাগুলো যেন আমার বুকের মধ্যে লেখা হয়ে গেছে (তাবারী, ইবনে হিশাম, সুহায়লী)। ইবনে কাসীর, এ বর্ণনা উধৃত করে বলেন, এ যেন ভূমিকা ছিল। ঐ বিষয়ের যা জাগ্রত অবস্থায় তার সামনে পেশ করা হয়েছিল যার উল্লেখ হযরত আয়েশার (রা)  হাদীসে পাওয়া যাপয়।–গ্রন্থকার]

তখন একদিন রমযান মাসে হেরা গুহায় তাঁর উপর অহী নাযিল হয়। ফেরেশতা তাঁর মুখোমুশি দাড়িয়ে বলেন, *** পড়ুন। বোখারী শরীফের কয়েক স্থানে এ ঘটনা হ৮যরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। তিন স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) এর উক্তি উধৃত করেন যাতে তিনি বলেন, আমি বল্লাম আমি ত পড়তে জানিনা। তখন ফেরেশতা আমাকে এমনভাবে চেপেধরলেন যে, তা আমার অসহ্য হয়ে পড়লো। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমায় বল্লেন, পড়ুন। বল্লাম আমি ত পড়তে জানিনা। তারপর তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার চেপে ধরলেন এবং আমার তা অসহ্য হয়ে পড়লো। তিনি ছেড়ে দিয়ে আবার বল্লেন, পড়ুন। বল্লাম, আমি ত পড়তে জানিনা। তিনি তৃতীয়বার আমাকে চেপে ধরলেন এবং আমার তা অসহ্য হয়ে পড়লো। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বল্লেন, ()আরবী*********************)

(পড় তোমার রবের নামের সাথে যিনি পয়দা করেছেন) এবং তারপর (****) (যা সে জানতোনা) পর্যন্ত পড়ে শুনালেন।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তারপর রসূলুল্লাহ () ভীত কম্পিত অবস্থায় হযরত খাদিজার (রা) নিকটে এসে পৌছলেন এবং বল্লেন, আমাকে উড়িয়ে দাও, আমাকে উড়িয়ে দাও”। তাঁর ভয় ও শংকার ভাবটা যখন কেটে গেল তখন তিনি বল্লেন, হে খাদিজা আমার কি হলো?

তারপর সব ঘটনা তাঁর কাছে বলার পর তিনি বল্লেন, আমার ত জানের ভয় হচ্ছে। এ ভয়ের অনেক কারণ আলেমগণ বর্ণনা করেন যার সংখা বার। কিন্তু আমাদের মতে প্রকৃতি সঠিক ব্যাখ্যা এই যে, নবুয়তের কঠোর দায়িত্বভার গ্রহণের চিন্তা করে তিনি ভীত কম্পিত হচ্ছিলেন এবং বার বার তাঁর একথা মনে হচ্ছিল যে,তিনি কিভাবে এ গুরুভার বহন করবেন। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, হুযুর (স) নিজেকে বিরাট কিছু মনে করতেন না এবং তাঁর মনে এমন কোন অভিলাষও ছিল না যে তাঁর মতো লোকের নবী হওয়া উচিত। তাঁর এ গর্ববোধও ছিলনা যে এ বিরাট কাজ করার শক্তি ও যোগ্যতা তার ছিল- গ্রন্থকার।

 হযরত খাদিজা (রা) বলেন, কখনোই না, আপনি বরঞ্চ খুশী হয়ে যান। খোদার কসম আল্লাহ তায়ালা কখনো আপনার মর্যাদাহানি করবেন না [অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে আল্লাহতায়ালা আপনাকে কখনো দুঃখ কষ্টে ফেলবেন না –গ্রন্থকার।

 আপনি আতমীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ করেন। সত্য কথা বলেন। এক বর্ণনায় আছে, আপনার আমানত আদায় করেন। অসহায় লোকদের বোঝা বহন করেন। অক্ষম লোকদের উপাপর্জন করে দেন। মেহমানদারি করেন, সৎ কাজে সাহায্য করেন। অন্য এক বর্ণনায় একথাও আছে। আপনার চরিত্র অতি মহান। তারপর হযরত খাদিজা (রা) হুযুরকে (স) নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নাওফালের কাছে গেলেন। তিনি জাহেলিয়াতের যুগে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে ঈসায়ী হয়েছিলেন। আরবী ও ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। অনেক বয়োবৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত খাদিজা (রা) তাকে বল্লেন, ভাইজান। আপনার ভাতিজার ঘটনা শুনুন। (*****৩)

আবু নঈমের বর্ণনা মতে খাদিজা (রা) স্বয়ং সম্পূর্ণ ঘটনা ওয়ারাকাকে শুনিয়ে দেন। ওয়ারাকা হুযুরকে (স) বলেন, ভাতিজা, তুমি কি দেখেছিলে? রসূলুল্লাহ (স) যা দেখেচিলেন তা বলে দেন। ওয়ারাকা বলেন, এ হচ্ছে সেই নামুস (উর্ধ আকাশ থেকে অহী আনয়নকারী ফেরেশতা) যাকে মূসা  (আ) এর প্রতি নাযিল করা হয়েছিল। আহা যদি তোমার নবুয়তের সময় আমি শক্তি সামর্থ রাথকাম। আহা! যখন তোমার জাতি তোমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে দেবে তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম।

রসূলুল্লাহ (স) বলেন, এসব লোকেরা আমাকে বের করে দেবে?

ওয়ারাকা বলেন, হা কখনো এমন হয়নি যে, কোন ব্যাক্তি এমন জিনিস নিয়ে এসেছে যা তুমি এনেছ, আর তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। আমি যদি তোমার সে যুগে বেঁচে থাকতাম, তাহলে মনে প্রাণে সাহায্য সহযোগিতা করতাম।

কিন্তু কিছুকাল অতিবাহিত হতে না হতেই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। [হুযুরকে (স) ভাতিজা এজন্য বলা হয় যে তাঁর তৃতীয় পুরুষের আবদুল ওয্যা হুযুরের চতুর্থ পুরুষের আবদুল মান্নাফের ভাই চিলেন- গ্রন্থকার।]

এ ঘটনা থেকে কি বুঝতে পারা যায়?

এ ঘটনা স্বয়ং এ কথা ব্যক্ত করছে যে ফেরেশতার আগমনের এক মুহূর্ত পূর্ব পর্যন্ত নবী (স) এর মনে এ চিন্তাধারণার উদয় হয়নি যে, তাঁকে নবী বানানা হবে। এ জিনিসের অীভলাষী হওয়া ত দূরের কথা এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটবে এমনটিও ছিল তাঁর চিন্তাভাবনার অতীত। অহী নাযিল হওয়া এবং এভাবে ফেরেশতার সামনে উপস্থিত হওয়া থাঁর কাছে এক আকস্মিক ঘটনা ছিল। তাঁর প্রতিক্রিয়া তাঁর উপরে তাই হয়েছিল। একজন বেখবর লোকের উপর এমন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই যা হয়ে থাকে। এজন্যে যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন তখন মক্কাবাসীগণ তাঁর প্রতি বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আরোপ করতে থাকে। কিন্তু কেউ এ কথা বলেনি আমরা প্রথমে আশংকা করেছিলাম যে তুমি কিছু একটা দাবী করে বসবে। কারণ কিছুকাল যাবত তুমি নবী হওয়ার প্রস্তুতি করছিলে।

এ ঘটনা থেকে আর একটি বিষয় জানা যায় যে নবুয়তের পূর্বে নবী মুস্তাফার জীবন কত পাক পবিত্র এবং স্বভাবচরিত্র উন্নত মানের ছিল। হযরত খাদিজা (রা) কোন অল্প বয়স্কা মহিলা ছিলেন না। তাঁর বয়স তখন ছিল পঞ্চান্ন বছর। পনেরো বছর যাবত তিনি নবীর জীবন সংগিনী ছিলেন। বিবির কাছে স্বামীর কোন দুর্বলতা গোপন থাকে না। তিনি তাঁর এর  সুদীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে হুযুরকে (স) এতো উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ পেয়েচিলেন যে, যখন তিনি তাঁকে হেরা গুহায় সংঘটিত ঘটনা শুনালেন, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে এ কথা মেনে নিলেন যে, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর ফেরেশতাই তাঁর নিকটে অহী নিয়ে এসেছিলেন। তেমনি ওয়অরাকা বিন নাওফাল মক্কার একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। শৈশবকাল থেকেই তিনি হুযুরের (স) জীবন লক্ষ্য করে আসছিলেন। পনেরো বছরে নিকট আত্মীয়তার ভিত্তিতে তিনি তাঁর অবস্থা সম্পর্কে আরও গভীর অভিজ্ঞতা পোষণ করতেন। তিনি যখন এ ঘটনা শুনলেন তখন তিনি তা কোন অসঅসা বা প্ররোচরনা মনে করেন নি। বরঞ্চ শুনা মাত্রই বলে ফেলেন যে এ ত অবিকল সেই নামুস যা মুসা (আ) এর প্রতি নযিল হয়েছিল্ এর অর্থ এই যে, তাঁর নিকটেও নবী মুস্তাফা (স) এতো উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন যে, তাঁর নবীর মর্যাদায় ভূষিত হওয়া কোন বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না।[নজীর বিহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া সত্বেও সে সত্তা আত্মগর্ভে ও আত্মম্ভারিত এতো উর্ধে ছিল যে, যখন তাঁকে নবুয়তের পদমর্যাদায় হঠাৎ অধিষ্ঠিত করে দেয়া হলো তখনও বেশ কিছু সময় পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পার্যালোচনা না যে, দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাকে বিশ্বপ্রকৃতির মালিক প্রভু ও পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন।]

ঘটনাটি পর্যালোচনা

অহী নাযিলের অবস্থাটি সঠিকভাবে উপলব্দি করার জন্যে প্রথমে এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নবী (স) নিকটে আকস্মিকভাবে এ ঘটনাটি ঘটে। এর পূর্বে তাঁর ধারণাও ছিল না যে তাকে নবী বানানো হবে। তাঁর মনের কোন স্থানেই এ ধরনের কোন অভিলাষ ছিল না। আর না এর জন্যে কোন প্রস্তুতিও তিনি করেছিলেন। তিনি আশাও করেন নি যে একজন ফেরেশতা তার উপর থেকে পয়গামসহ তাঁর কাছে আগমন করবেন। তিনি নির্জনে বসে মুরাকাবা ও এবাদত বন্দেগী অবশ্যই করছিলেন। কিন্তু নবী হওয়ার কোন ধারণাই তাঁর মনে স্থান পায়নি। এ অবস্থায় যখন হেরা গুহার নির্জন পরিবেশে আকস্মাৎ ফেরেশতা এসে পড়লেন তিনি ঠিক তেমনি হতভম্ব ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন যেমন এ অবস্থায় অবশ্যই একজন মানুষ হয়ে থাকে। তিনি এক বিরাট মহিমান্বিত ব্যক্তি হওয়া সত্বেও তাঁর হতভম্বতা অবিমিশ্র ছিল না। নানান চিন্তার যৌক্তিক সমাবেশ ছিল। অর্থাৎ তাঁর মনে বিভিন্ন প্রশ্নের উদয় হতে লাগলো এবং মন বিরাট উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ভরে গেল। তিনি ভাবছিলেন, সত্যিই কি আমাকে নবী বানানো হয়েছে? আমাকে কোন বিরাট অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়নিত? এ বিরাট দায়িত্বের বোঝা আমি কিভাবে বহন করব? লোকের কাছে কিভাবে এ কথা বলবো যে আমি তোমাদের জন্যে নবী হয়ে এসেছি। মানুষ আমার কথা কিভাবে মেনে নিবো? আজ পর্যন্ত যে সমাজে আমি সম্মানের সাথে বসবাস করে আসছি এখন সে সমাজের লোক আমাকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করবে, আমাকে পাগল বলবে এ জাহেলিয়াতের পরিবেশের বিরুএধ আমি কিভাবে সংগ্রাম করব? মোটকথা এ ধরনের কত প্রশ্ন তাঁর মনে উদিত হয়ে তাঁকে কত বিব্রত করে তুলছিল।

এ কারণেই যখন তিনি বাড়ি পৌছলেন, তিনি কম্পিত হচ্ছিলেন। বাড়ি পৌছামাত্র বল্লেন, “আমাকে (লেপ কম্বল) জড়িয়ে দাও, আমাকে (লেপ কম্বল) জড়িয়ে দাও।”

বাড়ির লোকজন তাঁকে জড়িয়ে দিলেন, কিছুক্ষণ পর যখন তিনি প্রকৃতিস্থ হলেন তখন পুরো ঘটনা হযরত খাদিজাকে (রা) তিনি শুনিযে দিলেন। তিনি বল্লেন, (আরবী********************)

আমার জানের ভয় হচ্ছে।

হযরত খাদিজা (রা) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বল্লেন:-

(আরবী*******************)

কখনই না খোদার কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো দুঃখ কষ্ট দেবেন না। আপনি ত আত্মীয় স্বজনের খেদমত করেন, সত্য কথা বলেন, অসহায়ের সাহায্য করেন, নিঃস্ব অভাবীদের অভাব মোচন করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন, সকল নেক কাজে সাহায্য করেন।

তারপর তিনি হুযুরকে (স) ওয়ারাকা বিন নাওফালের নিকটে নিযে গেলেন। কারণ তিনি আহলে কিতাববুক্ত ছিলেন। পূর্ববর্তী নবীগনের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি হুযুরের অবস্থা শুনার পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন, এ হচ্ছে সেই নামুস যা হযরত মুসার (আ) কাছে এসেছিলো।

একথা তিনি এ জন্যে বল্লেন যে, তিনি বনী মুহাম্মদ (স) এর শৈশব থেকে যৌন পর্যন্ত তাঁর পুণ্য পূত চরিত্র সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি একথাও জানতেন যে, এখানে নবুয়তের দাবী করার প্রস্তুতির কোন আভাসও পাওয়া যায়নি। এ ‍দুটি বিষয়ে যখন তিনি এ ঘটনার সাথে মিলিয়ে দেখলেন যে হঠাৎ অদৃশ্য জগত থেকে একজন এসে এ ব্যক্তিকে অবস্থায় এমন সব পয়গাম দিলেন যা নবীগণের শিক্ষারই অনুরূপ, তখন তিনি উপলব্ধি করলেন, এ অবশ্যই সত্য নবুয়ত। (৯)

পূর্ব থেকে যদি নবুয়তের অভিলাষ থাকতো

যদি নবী মুহাম্মদ (স) পূর্ব থেকে নবী হওয়ার চিন্তাভাবনা করতেন, নিজের সম্পর্কে যদি এ চিন্তা করতেন যে, তাঁর নবী হওয়া উচিত এবচং এ প্রতীক্ষায় থেকে মুরাকাবা করে করে আপন মনের উপর এ চাপ সৃষ্টি করতেন যে, কখন কোন ফেরেশতা তাঁর কাছে পয়গামন নিয়ে আসে তাহলে হেরাগুহার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি আনন্দে অধীর হয়ে বিরাট দাবীসহ পাহাড় থেকে নেমে সোজা তাঁর জাতির নিকটে পৌছে তাঁর নবুয়তের ঘোষণা করতেন। কিন্তু ঠিক তার বিপরীত অবস্থা এই ছিল যে তিন যা কিচু দেখলেন, তাতের বিস্মিত ও হতবাক হলেন। তারপর ভীত কম্পিত অবস্থায় বাড়ি পৌছলেন। লেপ মুড়ি দিযে শুয়ে পড়লেন। একটুখানি প্রকৃতিস্থ হবার পর চুপে চুপে বিবিকে বল্লেন, আজ হেরাগুহায় নির্জন পরিবেশে এ ঘটনা ঘটেছে। জানিনা কি হবে। আমার জীবনের কোন মংগল দেখতে পাচ্ছিনা।

এ অবস্থা নবুয়ত প্রার্থীর অবস্থা থেকে কত ভিন্নতর। তারপর স্বামীর জীবন, তার অবস্থা, ধ্যান ধারণা প্রভৃতি তার স্ত্রী থেকে অধিক কে জানতে পারে? অভিজ্ঞতায় যদি এটা জানা যেতো যে, স্বামী নবুয়তের অভিলাষী এবং সর্বদা ফেরেশতা আগমনের প্রতিক্ষায় রয়েছেন তাহলে তার জবাব কখনো তা হতো না যা হযরত খাদিজা (রা) দেন। তিনি বলতেন মিয়া, ঘাবড়াচ্ছেন কেন?

বহুদিন থেকে যার আশায় দিন গুণছিলেন, তা ত পেয়ে গেলেন। চলুন পীরগিরির দোকান সাজিয়ে বসুন, নজর নিয়ায আমি সামলাব।

কিন্তু তিনি পনেরো বছরের সাহচর্যে স্বামী জীবনের যে রূপ লক্ষ্য করেছেন, তার ভিত্তিতে একথা বুঝতে তাঁর এ কুহূর্তও বিলম্ব হয়নি যে এমন নেক এবং নিঃস্বার্থ লোকের নিকটে শয়তান আসতে পারে না, আর না আল্লাহ তাঁকে কোন অশুভ পরীক্ষায় ফেলতে চান। তিনি যা কিছু দেখেছেন তা একেবারে সত্য। এ অবস্থা ওয়ারাকা বিন নাওফালেরও ছিল। তিনি বাইরের কোন লোক ছিলেন না বরঞ্চ হুযুরের (স) আপন জ্ঞাতি গোষ্ঠির লোকই ছিলেন। নিকট আত্মীযের দিক দিয়ে বৈবাহিক ভাই ছিলেন। বয়সে কয়েক বছরের বেশী হওয়ার কারণে নবী মুস্তাফার গোটা জীবন শৈশব থেকে সে সময় পর্যন্ত তাঁর চোখের সামনে ছিল। তিনিও তাঁর মুখে হেরার ঘটনা  শুনামাত্রই বলে ফেল্লেন, আগমনকারী সে ফেরেশতাই যিনি মূসার (আ) কাছে অহী নিয়ে এসেছিলেন। কারণ এখানেও ঠিক সেই অবস্থার সম্মুখীন উনি হয়েছেন যে অবস্থার সম্মুখীন হযরত মূসা (আ) হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একেবারে পূত পবিত্র চরিত্রের একজন সরল সহজ ও পরিচ্ছন্ন মানুষ। নবুয়তের কোন চিন্তাভাবনা করা ত দূরের কথা- তা লাভ করার কোন সামান্যতম ধারণাও কোন দিন মনে স্থান পায়নি। অকস্মাৎ এর সজ্ঞানে ও প্রকাশ্যে এ অভিজ্ঞতা তিনি লাভ করেন। অতএব দুই আর দুই চারের মত তিনি এ নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, এখানে কোন আত্ম প্রবঞ্চনা অথবা শয়তানী ইন্দ্রিয় গোছর কোন ব্যপার নয় বরঞ্চ এ সত্যনিষ্ঠ লোকটি কোন ইচ্ছা অভিলাষ ব্যতিরেকেই যা কিচু দেখেছেন তা প্রকৃত সত্যই দেখেছেন।

এ মুহাম্মদ (স) এর নবুয়তের এমন এক সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এক সত্যপন্থী মানুষের এ সত্য অস্বীকার করা বড়ো কঠিন। এ জন্যে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এটাকে নবুয়তের দলিল হিসাবে পেশ করা হয়েছে। [আল্লাহ বলেন- (আরবী***********************)

-হে মুহাম্মদ বলে দাও- আল্লাহর েইচ্ছা এ হতো, তাহলে এ কুরআন তোমাদেরকে কখনোই শুনাতাম না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে এ সংবাদও দিতেন না। তাছাড়া এর আগে আমি তোমাদের মধ্যে একটি জীবন অতিবাহিত করেছি। তোমরা তোমাদের বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগবেনা? (ইউনুস: ১৬)।

(আরবী******************)

তুমি কিছুই জানতেনা কিতাব কাকে বলে, ঈমান কি জিনিস। কিন্তু সেই রূহকে আমরা একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যার দ্বারা আমরা আমাদের বান্দাহদের মধ্যে যাকে চাই পথ দেখাই (শুরা: ৫২)]

প্রথম অহীর বক্তব্য

রসূলুল্লাহ (স) এর উপর প্রথম যে অহী প্রেরিত হয় তা সূরায়ে আলাকের প্রথম পাঁচটি নিয়ে গঠিত যাতে বলা হয়েছে-

“পড় তোমার রবের নামে যিনি পয়দা করেছেন। একটি মাংসপিন্ড থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। পড়, এবং তোমার রব বড়ো মেহেরবান, যিনি কলম দ্বারা জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা তার জানা ছিলনা।”

এ অহী নাযিলের প্রথম অভিজ্ঞতা যা হুযুর (স) লাভ করেন। এ পয়গামে তাঁকে এ কথা বলা হয়নি যে, কোন বিরাট কাজে তাঁকে নিযুক্ত করা হচ্ছে এবং সামনে তাঁকে কি কি করতে হবে। বরঞ্চ একটি প্রাথমিক পরিচিতর পর তাঁকে কিছুদিনের অবকাশ দেয়া হয়েছিল যাতে করে এ প্রথম অীভজ্ঞায় তাঁর স্বভাব প্রকৃতির উপরে যে বিরাট চাপ পড়েছিল তার প্রভাব দূর হয়ে যায় এবং মানসিক দিক দিযে তিনি আগামীতে অহী লাভ করার এবং নবুয়তের দায়িত্ব পালনের জন্যে তৈরী হতে পারেন। [ বিরতির পর দ্বিতীয়বার যখন অহী নাযিল শুরু হলো, তখন সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম সাত আয়াত নাযিল করা হয়। এতে প্রথমবারে মতো নবীর উপর এ নির্দেশ দেয়া হয়- তুমি উঠ এবং খোদার সৃষ্টি মানুষকে ঐ দৃষ্টিভংগীর পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দাও যার উপর তারা চলছে। এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে- গ্রন্থকার।]

অহীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা

প্রথম অহী যা নবীর উপর নাযিল হয় তার প্রতিটি শব্দের উপর চিন্তাভাবনা করুন:

(আরবী*****************)

পড়ুন (হে নবী) আপন রবের নামের সাথে যিনি পয়দা করেছন (আলাক: ১)

 ফেরেশতা যখন হুযুরকে (স) বলেন যে, হে নবী পড়ুন তার জবাবে তিনি বলেন, আমি ত পড়তে জানিনা। িএর থেকে বুঝা যায় যে, ফেরেশতা অহীর এ শব্দগুলো লিখিত আকারে তাঁর সামনে পেশ করেছিলেন। কারণ ফেরেশতার কথার অর্থ যদি এই হতো যে যেভাবে আমি পড়ছি তেমনি পড়ুন তাহলে হুযুরের কথা বলার কোন প্রয়োজন হতো না যে আমি পড়তে জানি না।

‘আপনি রবের নামের সাথে পড়ৃন’ –অর্থাৎ আপন রবের নাম নিয়ে পড়ুন। অন্য কথায় বিসমিল্লাহ বলুন এবং পড়ুন। এর থেকে এটাও জানা গেল যে, রসূলুল্লাহ (স) এ অহী আসার পূর্বে শুধু আল্লাহ তায়ালাকেই তাঁর প্রবু বা রব জানতে এবং মানতেন। এ জন্যে এ কথা বলা প্রয়োজন হয়নি যে তাঁর রব কে। বরঞ্চ বলা হলো যে আপন রবের নাম নিয়ে পড়ুন। অর্থাৎ যে রবকে আপনি জানে তাঁর নাম নিয়ে পড়ুন।

“যিনি পয়দা করেছন” –একথা বলা হয়নি যে তিনি কাকে পয়দা করেছেন। এর থেকে আপনা আপনি এ অর্থ বেরয় যে ঐ রবের নাম নিয়ে পড়ুন যিনি স্রষ্টা। যিনি সমস্ত সৃষ্টি জগত ও তার প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করেছন।

(আরবী************************)

জমাট রক্তের মাংসপিন্ড থেকে মানুষ পয়দা করেছেন। সৃষ্টিজগতের সাধারণ সৃষ্টির উল্লেখের পর বিশেষ মানুষের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কোন তুচ্ছ অবস্থা থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করে তাকে পূর্ণ মানুষ বানানো হয়েছে। (****) বহু বচর (****)  শবের যার অর্থ রক্তপিন্ড। এ সেই প্রাথমিক অবস্থা যা গর্ভ সঞ্চারের কিছুদিন পর প্রকাশ লাভ করে। তারপর তা গোশতের আকার ধারণ করে। তারপর ক্রমশঃ তার মধ্যে মানুষের আকার ধারণ করার ধারাবাহিকতা শুরু হয়।

(আরবী********************)

-পড়ুন, এবং আপনার রব বড়ো মেহেরবান যিনি কলমের দ্বারা জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। (আলাক: ৩০৪)। অর্থাৎ এ হচ্ছে তাঁর বড়ো মেহেরবানী যে এ তুচ্ছ অবস্থা থেকে সূচনা করে তিনি মানুষকে জ্ঞানবান বানিয়েছেন যা সৃষ্টির সেরা গুণ। শুধু তাকে জ্ঞানবান করেই বানাননি, বরঞ্চ তাকে কলমের সাহায্যে লেখার কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন যা ব্যাপক আকারে জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার, উন্নতি এবং বংশানুক্রমে তার দায়িত্ব ও সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে পড়ে।

যদি তিনি ইলহামী পদ্ধতিতেই মানুষকে কলম ও লেখার বিদ্যা না শিক্ষা দিতেন, তাহলে মানুষের বুদ্ভিবৃত্তিক যোগ্যতা সংকুচিত ও আড়ষ্ট হয়ে যেতো। তার প্রচাপর প্রসারের ও বিকশিত হওয়ার এবং এক পুরুষ থেকে আর এক পুরুষ পর্যন্ত অধিকতর উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়ার কোন সুযোগই থাকতোনা।

(আরবী****************)

মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যার জানা ছিল না।

অর্থাৎ মানুষ মুলতঃ একেবারে জ্ঞানহীন ছিল, সে যা কিছু জ্ঞান লাভ করেছে তা সবই আল্লাহর দেয়া বলেই সে লাভ করেছ। আল্লাহ তায়ালাই যে পর্যায়ে মানুষের জন্যে জ্ঞানের দ্বার খুলে দেন সে পর্যায়ে তা খুলে যেতে থাকে। একথাই আয়াতুল কুরসীতে এভাবে বলা হয়েছে- (আরবী*******************)

-এবং মানুষ তাঁর জ্ঞানের মধ্য থেকে কোন কিছু আয়ত্ব করতে পারে না। অবশ্য তিনি নিজে চাইলে সে অন্য কথা।

যে সব বিষয়কে মানুষ তার জ্ঞানলব্ধ বলে মনে করে, তা প্রকৃত পক্ষে তার জ্ঞানবহির্ভূত ছিল। আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তাঁর জ্ঞান মানুষকে দিয়েছেন। অবশ্যি মানুষ এটা অনুভব করতে পারে না যে যে, আল্লাহ তাকে সে জ্ঞান দান করেছেন।

এ পর্যন্তই সে আয়াতগুলো যা নবী (স) এর উপর নাযিল করা হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা) এর হাদীস থেকে জানতে পারা যায়, এ প্রথম অভিজ্ঞতা এতো কঠিন ছিল যে তার বেশী হুযুর (স) সহ্য করতে পারতেন না। এ জন্যে সে সময়ে এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছিল, যে রবকে পূর্ব থেকে আপনি জানতেন এবং মানতেন তিনি সরাসরি আপনাকে সম্বোধন করছেন। তাঁর পক্ষ থেকে আপনার উপরে অহীর ধারাবাহিকতা শুরু হযেছে এবং আপনাকে তিনি তাঁর নবী বানিয়েছেন।

এর কিছুকাল পরে সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম সাত আয়াত নাযিল হয়। এতে তাঁকে বলা হয়, নবুয়তের অভিষিক্ত হওয়ার পর তাঁকে কোন করতে হবে।[এ প্রসংগে একথাটা জেনে রাখা ভালো যে, রসূলুল্লাহ (স) হযরত জিব্রীলকে (আ) মাত্র দুবার তাঁর আপন আকৃতিতে দেখেছিলেন। তাছাড়া তিনি সর্বদা মানুষের আকৃতিতেই নবীর কাছে আসতেন। বোখারীর কিতাবুল তাওহীদে হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় জানা যায় এবং মুসলিমে কিতাবুল ঈমানে হযরত আয়েশা (রা) স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) থেবে বর্ণনা করেন যে, প্রথমবার হযরত জিব্রীল (আ) পূর্বকাশে প্রকাশিত হন (সূরায়ে নামজে উফুকেল আলা (****) এবং সূরায়ে তাকবীরে উফুকে মবীন (***) বলা হয়েছে এবং ক্রমশঃ হুযুরের (স) দিকে অগ্রসর হন। অবশেষে তাঁর উপরে শূন্যে অবস্থান করেন। তারপর তিনি নবীর দিকে ঝুঁবে পড়েন এবং তাঁর এতো নিকটবর্তী হন যে উভয়ের মধ্যে মাত্র দুটি ধনুকের ব্যবধান রয়ে গেল। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, সে সময়ে জিব্রীল (আ) তাঁর আকৃতিতে ছিলেন এবঙ সমগ্র উর্ধ পরিমন্ডল ছেয়ে থাকেন। (বোখার।) স্বয়ং নবী (স) বলেন, আমি তাঁকে সেই আকৃতিতে দেখেছি, যে আকৃতিতে আল্লাহ তাঁকে পয়দা করেছেন। আকাশ ও জমীনের মধ্যবর্তী সমগ্র শূন্যমার্গ তাঁর বিরাট সত্তায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় (মুসলিম)।

অহী নাযিলের সূচনা কখন হয়?

সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত সম্বলিত এ সর্বপ্রথম অহী কখ নাযিল হয়েছিল? এ সম্পর্কে বর্ণনাকারীঅদের বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ইবনে আবদুল বার এবং মাসউদী বলেন, হুযুরে () নবী হিসাবে নিয়োগের তারিখ ৮ই রবিউল আওয়াল হাতিবর্ষ ৪১। ইবনুল কাইয়েম তাঁর যাদুল মায়অতে একে অধিকাংশের বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু যাঁদের এ বক্তব্য তাঁরা সম্ভবতঃ নবুয়তের ঘোষণা সে সময় থেকে নির্ণীত করেছেন, যখন বায়হাকীর বর্ণনা মতে অহী নাযিলের ছয় মাস পূর্বে নবী (স) সত্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু অহী নাযিলের সম্পর্কে কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে:-

(আরবী******************)

-রমযান এমন এক মাস যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয় (বাকারা: ১৮৫)

কুরআনের এ সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীত অন্য কোন বক্তব্য নির্ভরযোগ্য হতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, রমযানের কোন তারিখ থেকে অহী নাযিলের সূচনা হয় এ ব্যাপারেও বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। কেউ কেউ ৭ই রমযান বলেছেন। ইবসনে সা’দ একস্থঅনে ১২ই রমযান এবং দ্বিতীয় স্থানে ইমাম বাকেরের (রা) বরাত দিয়ে ১৭ই রমযান বলেছেন। বালাযুরী বর্ণনাক করেছেন। তাবারী ও ইবনে আসীর আবু কেলাবাতুল জারমীর বরাত দিয়ে ১৮ই রমযান এবং কতিপয় অন্য লোক ১৯শে রমযান বলেছেন। ওয়াসেলা বিন আল-আসকা জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) এবং আবুল জুলাত ২৪শে রমযান বলেছেন। অথচ কুরআন পাকের এরশাদ হচ্ছে- (আরবী******************)

-আমরা এ কুরআনকে শবে কদরে নাযিল করেছি। ওলামায়ে উম্মতের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ এ মত পোষণ করেন  যে রমযানের শেষ দশ রাতের কোন এক বেজোড় রাত শবে কদর। তাঁদেরও অধিকাংশ আবার ২৭ শে রমযান শবে কদর বলেন। [দ্বিতীয় বার নবী তাঁকে সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে দেখেন।

মুসনাতে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে নবী (স) বলেন, আমি জিব্রীলকে (আ) সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে দেখেছি। তাঁর ছ’শ বাহু ছিল (তাফহীম), সূরা নজম, টীকা-৫, ৭, ৮, ১১ও ১৪)।]

কুরআন নাযিলের তারিখ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হাদীস

আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা এই যে, রসূলুল্লাহ (স) শবে কদর সম্পর্কে বলেন, তা হচ্ছে ২৭শে অথবা ২৯শে রাত (আবু দাউদ ও তায়ালিসী) দ্বিতীয় বর্ণনা হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে এই যে, তা হচ্ছে রমযানের শেষ রাত (মুসনাদে আহমাদ)

যির বিন হুবাইশ হযরত ওবাই বিন কা’বকে (রা) শবে কদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি কসম করে বলেন যে তা ২৭ শে রাত (আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে হিব্বান)

হযরত আবু যরকে (রা) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, হযরত ওমর (রা), হযরত হুযায়ফা (রা) এবং রসূলের সাহাবীদের মধ্যে অনেকেরই এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ ছিল না যে তা রমযানের ২৭ শে রাত (ইবনে আবি শায়বাহ)।

হযরত উবাদাহ বিন সামেত (রা) বলেন যে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, শবে কদর রমযানের শেষ দশ রাতের মধ্যে এক বেজোড় রাত- একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ অথবা উনত্রিশ( মুসনাদে আহমাদ)।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, তাকে (শবে কদর) শেষ দশ রাতের মধ্যে তালাশ কর –মাস শেষ হতে যখন ন’দিন বাকী, অথবা পাঁচ দিন বাকী (বোখারী) অধিকাংশ মনীষী এ মর্ম নিয়েছেন যে, হুযুর (স) বেজোড় রাতগুলোকেই বুঝিয়েছেন।

হযরত আবু বকর (রা) এর বর্ণনায় আছে যে, ন’দিন বাকী থাক সাত দিন বাকী থাক, পাঁচ দিন, তিন দিন অথবা শেষ রাত। অর্থাৎ এ তারিখগুলোতে শবে কদর তালাশ কর( তিরমিযি, নাসায়ী)।

হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় আছে যে, নবী (স) বলেছেন, শবে কদরকে রমযানের শেষ দশরাতের মধ্যে বেজোড় রাতে তালাশ কর (বোখারী, মুসলিম, আহমদ, তিরমিযি)। হযরত আয়েশা (রা) হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) এর বর্ণনায় আছে যে, নবী (স) রমযানের শেষ দশরাতের এতেকাফ করেছেন।

 এ ব্যাপারে যেসব বর্ণনা হযরত মায়াবিয়া (রা) হযরত ওমর (রা) হযরত ইবনে আব্বাস (রা) প্রমুখ বুযুর্গান থেকে পাওয়া যার তার ভিত্তিতে সালফ সালেহীনের বিরাট সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ ২৭শে রমযান কেউ শবে কদর মনে করেছেন।ঠ (**ঁ**১৪)

নবুয়তের পর প্রথম ফরয, নামায

তাবারী বলেন, তৌহীদের প্রতি বিশ্বাসের ঘোষণা এবং মূর্তিপূজা পরিহার করার পর সর্বপ্রথম যে জিনিস ইসলামী শরীয়তে ফরয করা হয়েছে তা নামায। ইবনে হিশাম ও মুহম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে হযরত আয়েশার (রা) এ বর্ণনা নকল করেছন যে, সর্বপ্রথম নবী (স) এর উপর যে জিনিস ফরয করা হয় তা নামায। তা প্রথমে ছিল দু দু রাকায়াত করে। ইমাম আহমদ ইবনে লাহিয়ার একটি বর্ণনা হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) থেকে উধৃত করেছেন যে, নবী (স) এর উপর প্রথম বার অহী নাযিল হওয়ার পর জিব্রীল (আ) তাঁর কাছে অযু করে শিক্ষা দিলেন। ইবনে মাজাহ এবং তাবারানীতেও কিছু সনদের সতভেদ সহ এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তার ব্যাখ্যা ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনা থেকে হয় যে, নবী (স) মক্কার মালভূমি অংশে চিলেন এবং জিব্রীল (আ) সুন্দর আকৃতিতে এবং উৎকৃষ্ট সুগন্ধিসহ তাঁর সামনে আবির্ভূত হন এবং বলেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে আমপি জ্বিন ও মানুষের জন্যে তাঁর পক্ষ থেকে রসূল। এ জন্যে আপনি তাদেরকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর দাওয়াত দিন।

তারপর তিনি জিব্রীল (আ) মাটিতে পায়ের আঘাত করলেন এবং একটি ঝর্ণা বেরিয়ে পড়লো। তারপর তিনি অযু করলেন যাতে করে নবী নামাযের জন্যে পাক হওয়ার পদ্ধতি শিক্ষা করতে পারেন। তারপর বল্লেন, এখন আপনি অযু করুন।

তারপর জিব্রীল (আ) হুযুরকে (স) সাথে করে চার সিজদার সাথে দু’রাকয়াত নামায পড়েন। তারপর হুযুর (স) হযরত খাদিজাকে (রা) সেখানে আনেন, অযু করান এবং তাঁকে সাথে নিয়ে দু’রাকায়াত নামায পড়েন। ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর এবং ইবনে কাসীরও এ ঘটনাবিবৃত করেন।

ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ এবং তাবারানী উসামা বিন যায়েদ (রা) থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) থেকে নকল করেন যে, হুযুর (স) এর উপর অহী নাযিল হওয়ার পর প্রথম যে কাজটি ফরয হয় তা হলো এই যে, জিব্রীল (আ) এসে নবীকে অযুর নিয়ম শিখিয়ে দেন। তারপর তিনি নামাযের জন্যে ‍দাঁড়ান এবং নবীকে বলেন, আপনি আমার সাথে নামায পড়ুন। তারপর নবী (স) ঘরে এসে হযরত খাদিজাকে (রা) এ ঘটনা বলেন। তিনি আনন্দে অধীর হয়ে পড়নে। তখন নবী (স) তাঁকে সেখাবে অযু করতে বলেন এবং তাঁকে নিয়ে সেভাবেই নামায পড়লেন যেভাবে তিনি হযরত জিব্রাইল (আ) এর সাথে পড়েছিলেন অতপর এ ছিল প্রথম ফরয কাজ যা অহী নাযিলের পর নির্ধারিত করা হয়। সম্ভবতঃ সে রাতের প্রাতঃকালের ঘটনা যে রাতে (*****) নাযিল হয়। তারপর থেকে হুযুর (স) এবং খাদিজা (রা) গোপনে নামায পড়তেন।

প্রথম চার মুসলমান

এ কথা সর্বসম্মত যে প্রথম মুসলমান হযরত খাদিজা (রা) তারপর এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, হযরত আলী (রা) হযরত আবু বকর (রা) এবং হযরত যায়েদ বিন হারেসার (রা) মধ্যে সকলের আগে কে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে এ কথা সর্বসম্মত যে হযরত খাদিজা (রা) পর সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন এ তিনজন। *****)

হযরত আলী (রা) সম্পর্কে হাফেজ ইবনে কাসীর আল বেদায়াতে  ইবনে ইসহাকের রেওয়ায়েত এবং বালাযুরী ওয়াকেদীর রেওয়ায়েত নকল করে বলেন যে, যখন হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজা (রা) গোপনে নাময মুরু করেন, তখন একদিন পরেই হযরত আলী (রা) তাঁদেরকে এ অবস্থায় দেখেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এ কি? হুযুর বলেন, এ হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা তিনি নিজের জন্যে মনোনীত করে দিয়েছেন এবং যার সাথে তিনি তাঁর রসূল পাঠিয়েছেন। অতএব আমি তোমাকে দাওয়াত দিচ্ছি যে তুমি এক ও লা শরীক আল্লাহকে মেনে নাও, তাঁর এবাদত কর এবং লাত ও ওয্যাকে অস্বীকা কর।

হযরত আলীর বয়স তখন দশ বছর। তিনি বলেন, একথাত আমি এর পূর্বে কখনো শুনিনি। আমি একবার আব্বাকে জিজ্ঞেস করার আগে কোন ফয়সালা করতে পারি না।

সে সময়ে হুযুর (স) এটা চাইতেন না যে, সময়ের পূর্বেই তাঁর রহস্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। এজন্যে তিনি বলেন, তুমি যদি আমার কথা না মান বিষয়টি গোপন রাখবে। সে রাত হযরত আলী (রা) চুপ থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর অন্তরে ইসলামের প্রেরণা জাগিয়ে দেন এবং সকালে নবীর সামনে হাজীর হয়ে বলেন গতকাল আপনি আমাকে কি বলেছিলেন?

[ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থসমূহ এ প্রাথমিক চারজনকে নাম মুসলমানর নাম করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ কথা মনে করা যায় না যে, হুযুরের (স) যেসব কন্যা সে সময়ে জ্ঞান বুদ্ধি লাভ করেছিলেন তাঁরা তাঁদের মহিয়সি মাতার সাথে ঈমান আনেননি। হযরত যয়নবেচর (রা) বয়স হুযুরের (স) নবুয়ত প্রাপ্তির সময় দশ বছর ছিল্ হযরত উম্মে কুলসূম (রা) এবং হযরত রুকাইয়অর (স) বয়স এতোটা হয়েছিল যে সর্বসাধারণের কাছে দাওয়াতের সূচনার আগে তাদের বিয়ে আবু লাহাবের ছেলেদের সাথে করিয়ে দেন। অবশ্যি হযরত ফাতিমা (রা) নবুয়তের েএক বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী পরিবেশেই চোখ খোলেন। এ জন্যে আমাদের মতে তিন কন্যাকে প্রাথমিক মুসলমানের মধ্যেই শামিল করা উচিত হযরত ফাতেমা সম্পর্কে এটা মনে করা উচিত যে তিনি একজন মুমেনা-মুসলিমা হিসাবেই জ্ঞানচক্ষু উন্মিল করেন- গ্রন্থকার।]

হুযুর (স) বলেন, তুমি এ সাক্ষ্য দাও যে, এক ও লা শরীক আল্লাহ ছাড়ার আর কোন মাবুদ নেই, এবং তুমি লাত ও ওয্যাকে অস্বীকার কর এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য শরীকদের সম্পর্ক ছিন্ন কর।

হযরত আলী (রা) তৎক্ষণাৎ তা মেনে নেন। কিন্তু আবু তালিবের ভয়ে ইসলাম গোপন রাখেন। অবশ্যি তিনিও হুযুরের (স) সাথে নামায শুরু করেন।

ইমাম আহমদ ইবনে জারীর এবং ইবনে আবদুল বার আফীফ কিন্দীর (আশয়াস বিন কায়েসের বৈমাত্রেয় এবং চাচাতো ভাই) বর্ণনা উধৃত করে বলেন, আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব মামার পুরাতন বন্ধু ছিলেন এবং প্রায় ইয়ামেনে এসে আতর খরিদ করতেন এবং হজ্বের সময় তা বিক্রি করতেন। একবার হজ্বের সময় যখন মিনাতে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো, দেখলাম যে একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি এলেন এবং বেশ ভালো করে অযু করলেন, তারপর তিনি নামায পড়তে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর সাবালক হতে বাকী এমন বালক এলো এবং সেও খুব ভালো করে অযু করে নামায পড়তে দাঁড়িযে গেল। আমি বল্লাম হে আব্বাস এ কোন দ্বীন? এতো আমি জানি না।

আব্বাস (রা) বল্লেন, এ আমার ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ (স) বিন আবদুল্লাহগ বিন আবদুল মুত্তালিব। তার দাবী হলো, আল্লাহ তাকে রসূল করে পাঠিয়েছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তার দাবী হচ্ছে এই যে, কায়সার ও কিসরার ধনদৌলত তার অধীন হবে। আর এ দ্বিতীয়টি হলো আমার ভাতিজা আলী বিন আবি তালিব। সে তার দ্বীনের অনুসরণ করছে। আর এ হচ্ছে মুহাম্মদের বিবি খাদিজা বিন্তে খুয়ায়লিদ। সেও তার দ্বীনের অনুসারী হয়েছে।

পরবর্তীকালে কিন্দী স্বয়ং যখন মুসলমান হন, তখন দুঃখ করে বলেন, আহা যদি তাদের সাথে আমি চতুর্থ ব্যক্তি হতাম।

ইবনে হিশাম এবং ইবনে জারীর বলেন, পরে এক সময়ে আবু তালিবও হযরত আলীকে নামায পড়তে দেখেন। বলেন, বাছা, এ কোন দ্বীন যার অনুসরণ করছ? তিনি বলেন, আব্বাজান আমি আল্লাহ িএবং তাঁর রসূল (স) এর ‍উপর ঈমানে এনেছি। তাঁর সত্যতা মেনে নিয়েছি এবং তাঁর সাথে নামায পড়েছি।

আবু তালিব বলেন, সে তোমাকে মংগল ছাড়া আর কোন কিছুর দিকে আহ্বান জানাবে না। তুমি তার সাথে লেগে থাক।

ইবনে কাসীর আবু তালিবের এক উক্তি উধৃত করেন, তোমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে থাক এবং তার মদদ কর। হযরত আবু বকর (রা) সম্পর্কে যুরকানী শরহে মুওয়াহেবে লিখেছেন যে, তিনি হযরত খাদিজার (রা) ভাইপো হাকীম বিন হিসামের ওখানে বসে ছিলেন। এমন সময়ে হযরত হাকীমের দাসী তাঁর কাছে এসে বল্লো, আপনার ফুফী আজ বলেছিলেন যে তাঁর স্বামী হযরত মূসা (আ) এর মতো একজন নবী যাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এ শুনা মাত্র হযরত আবু বকর (রা) সোজা নবী (স) এর নিকটে পৌছলেন েএবং সে দাসীর কথা সত্য ছিল এ কথা জানার পর বিনা দ্বিধায় ঈমান আনেন। ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ বিন আলহুসাইন আত্তিমিনী থেকে এ বর্ণনা উধৃত করেন যে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, আমি যার কাছেই ইসলাম পেশ করেছি, সে কিচুনা কিছু ইতস্ততঃ করেছে িএবং চিন্তা ভাবনা করেছে। কিন্তু আবু বকরের কাছে যখন আমি তার উল্লেখ করেছি। তিনি কোন ইতস্ততঃ করেননি এবং মেনে নিতে একটু  বিলম্বও করেননি।

হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বিবরণ বর্ণীত নেই যে, তিনি কিভাবে ঐমান আনেন। কিন্তু পনেরো বছর যাবত তিনি হুযুরের গৃহে তার পরিবারের লোক হিসাবেই বসবাস করেন। নিশ্চয় তিনি হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজাকে (রা) নামায পড়তে দেখেছেন এবং এটাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে থাকবে।

এসব ঘটনা থেকে প্রসংগক্রমে এটাও জানতে পারা যায় যে, যদিও হুযুর (স) প্রথম প্রথম অপ্রকাশ্যভাবে কাজ করচিলেন, তথাপি তাঁর এবং হযরত খাদিজা (রা) এর নিকটাত্মীয়গণ জানতেন যে, হুযুর (স) পৈত্রিক দ্বীনের খেলাপেআর একটি দ্বীন পেশ করছিলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী নিযুক্ত হওয়ার দাবী করেচিলেন। তাঁর এ দাবী তাঁর পরিবারের লোকজন এবং অন্ততঃ পক্ষে তাঁর বন্ধু শুধু মেনেই নেননি, বরঞ্চ তদনুযায়ী এবাতদও অন্য পন্থায় শুরু করেচিলেন। তখাপি যেহেতু এসব কথা তাঁর দুশমনদের জানা ছিলনা শুধু তাঁর শুবাকাংখীদেরই জানা ছিল সেজন্যে তারা এসব গোপনই রাখেন, যেমন হুযুর (স) সূচনাতে তা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। আর এ বিষয়ের কোন আলাপ আলোচনাও করেননি, নইলে সময়ের পূর্বেই বিরোধিতা শুরু হয়ে যেতো।

প্রাথমিক তিন বছরে হুযুরের (স) শিক্ষার জন্যে কি হযরত ইসরাফিলকে (আ) পাঠানো হয়েছিল?

ইবনে জারীর তাঁর ইতিহাসের, ইবনে সা’দ তাবাকাতে, কাসতাল্লামী মওয়াহেবুল্লাদুন্নিয়াতে এবং যুরকানী শরহে মুয়াহেবে প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম শা’বীর এ বর্ণা উধৃত করেছেন যে, নবুয়তের প্রাথমিক তিন বছর যাবত হযরত ইসরাফিল (আ) কে শিক্ষাদানের জন্যে রসূলুল্লাহ (স) সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়। তিনি অহী নিয়ে আসতেননা। কারণ অহী আনয়নের দায়িত্ব হযরত জিব্রিলের (আ) ছিল। অবশ্যি তিনি অহী ব্যতীত অন্য পন্থায় হুযুর (স) কে জ্ঞান শিক্ষা দিতেন। [সম্ভবতঃ এ পন্থা হতে পারে, ইলকা() অথবা সাক্ষাৎ কোন শিক্ষাদান হতে পারে- গ্রন্থকার।]

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইয়াকুব বিন সফিয়া আলহাফেয, এবং বায়হাকী ইমাম শা’বীর এ বর্ণনা নকল করেছেন এবং তিনি পর্যন্ত এ সনদ সঠিক। কিন্তু জানিনা স্বয়ং শা’বী কোন সূত্রে এটা জানলেন। কারণ তিনি ত হুযুর (স) পর্যন্ত এর সনদ বয়ান করেননি। ইবনে সা’দ এবং ইবনে জারীর বলেন যে ওয়াকেদী এর সভ্যতা অস্বীকার করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছৈন যে হুযুর (সা) এর সাথে হযরত জিব্রিল ব্যতী আর কাউকে নিয়োজিত করা হয়নি।

এ এমন একটি ব্যাপার যে, না তাকে একেবারে অস্বীকার করা যায়, আর না নিশ্চিত করে গ্রহণ করা যায়। অস্বীকার করা এজন্যে মুশকিল যে, শা’বী একজন নির্ভযোগ্য মুহাদ্দিস এবং তাঁর মুরসাল রেওয়ায়েতও এতোটা কমজোর নয় যে তা একেবারে প্রত্যাখ্যান করা যায়। কিন্তু তাকে একটা নিশ্চিত ঘটনাও বলা যায় না। কারণ রেওয়ায়েত সনদের দিক দিয়ে এতোটা মজবুতও নয় যে তাকে অবশ্যই মেনে নেয়া যায়। তথাপি বিষয়টি সম্ভাবনার অতীতও নয়। কারণ নবুয়তের পর হুযুরের কথাবার্তায় ও কাজকর্মে জীবনের সকল দিকের জন্যে জ্ঞানের যে অফুরন্ত সম্পদ আমরা পাই যে সম্পদে হাদীস ও সীরাত গ্রন্থগুলো পরিপূর্ণ এবংয় যার কোননজীর অন্য কোন মানুষের কথা ও কাজে সামান্যতম পরিমাণেও পাওয়অ যায়না- তা অবশ্যই অদৃশ্য জগত থেকে নবীর মনের গভীরে ঢেলে দেয়া হয়েছিল। আর জ্ঞান সম্পদ বিতরণেল খেদমত আল্লাহ তায়ালা সম্ভবতঃ হযরত ইসরাফিল (আ) এর দ্বারা নিয়ে থাকবেন।

ফাতরাতুল অহী

প্রথম অহী নাযিলের পর একটা সময় পর্যন্ত জিব্রিল (আ) অহী আনয়নে বিরত থাকেন। এ অবস্থা যতোই দীর্ঘায়িত হতে থাকে, হুযুরে (সা) মনোবেদনা ততোই বাড়তে থাকে। এমনকি, তিনি কখনো অবচেতন মনে মক্কার পাহাড় শাবিরে এবং কখনো হেরার উপরে গিয়ে মনে করতেন যে নিজেকে নীচে নিক্ষেপ করেন। এ অবস্থায় যখন তিনি কোন পাহাড়ের এক কিনারার দিকে যেতে থাকেন তখন তিনি আকাশ থেকে একটি ধ্বনি শুনতে পেয়ে থেমে যান। উপরে তাকিযে দেখেন হযরত জিব্রিল আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে একটি চেয়ারে উপবিষ্ট। তিনি বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আমি জিব্রিল।

ইবনে সা’দ এ কাহিনী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বচাস রা. থেকে ইবনে জারীর তঁঅর তাফসীরে এবং আবদুর রাজ্জাক তাঁর আল-মুসান্নাফে ইমাম যুহরী থেকে নকল করেন। বোখারী, মুসলিম এবং মুসনাদে আহমদেও এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। (****১৫)

ইমাম যুহরীর বর্ণনায় বলা হয়েছৈ-

কিছুকাল যাবত রসূলুল্লাহ (স) উপর অহী নাযিল বন্ধ থাকে। সে সময়ে তিনি এতোটা মানসিক কষ্ট ভোগ করতে থাকেন যে, অনেক সময় তিনি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে নিজেকে উপর থেকে নীচে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হতেন। কিন্তু যখনই তিনি পাহাড়ের চূড়ার কিনারায় পৌছতেন, তখন জিব্রিল (আ) তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বলতেন, আপনি আল্লাহর নবী। একথায় তিনি মনে প্রশান্তি লাভ করতেন এবং তাঁর মনের অস্থিরতা দূর হয়ে যেতো।– (ইবনে জারীর)।

তারপর ইমাম যুহরী হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহর (রা) বর্ণনায় উধৃত করে বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) ফাতরাতুল অহীর (অহী বন্ধ হওয়া) উল্লেখ করে বলেন, একটি আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় হঠাৎ আমি আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলাম। মাথা তুলতেই সেই ফেরেশতাকে দেখতে পেলাম, যাকে আমি গারে হেরায় দেখতে পেয়েছিলাম। তিনি আকাশ ও জমীনের মাঝখানে একটি চেয়ারে উপবিষ্ট ছিলেন। আমি তা দেখে ভয়ানক ভীত বিহ্বল হয়ে পড়লাম এবং ঘরে পৌঁছে বল্লাম, আমাকে লেপ কম্বল জড়িয়ে দাও। তারপর বাড়ির লোকজন আমাকে লেপকম্বল জড়িয়ে দিল, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী নাযিল হয়-

(আরবী*****************)

(হে কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি)। তারপর ক্রমাগত আমার উপর অহী নাযিল হতে থাকে- (বোখারী, মুসলিম, মসনাদে আহমদ –ইবনে জারীর)।

সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক সাত আয়াত নাযিল

এভাবে অহী বন্ধ থাকার সময় উত্তীর্ণ হয় এবং সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক সাত আয়াত নাযিল হয় যার মাধ্যমে হুযুরকে (স) রেসালাতের মর্যাদায় ভূষিত করে জরুরী হেদায়েত দেয়া হয় যা রেসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্যে জরুরী ছিল। এখানে এ পার্থক্য ভালো করে উপলীব্ধ করা উচিত যে, সূরায়ে আলাকের প্রাথমিক পাঁচটি আয়াত একথাই ঘোষণা করছিল যে, হুযুরের (স) উপরে অহী নাযিলের সূচনা হয়েছে এবং তাঁকে আল্লাহ পক্ষ থে নবী বানানো হয়েছে। এখানে সূরায়ে মুদ্দাসসিরের এ আয়াতগুলোর দ্বারা নবুয়তের সাথে রেসালাতের দায়িত্বও তাঁর উপর আরোপিত করা হচ্ছে। তাঁকে আদেশ করা হচ্ছে- ওঠো এবং দায়িত্ব পালন করা শুরু কর। এ আয়াতগুলো সম্পর্কে কিছু বর্ণনাতে এতোদূর পর্যন্ত বলা হয়েছে যে, এগুলোই কুরআন মজিদের সর্বপ্রথম আয়াত। বোখারী, মুসলিম, তিরমিযি, মুসনাদে আহমদ প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থগুলোতে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) থেকে এর বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উম্মতের মধ্যে এ কথা প্রায় সর্ববাদি সম্মত যে, সর্বপ্রথম-

(আরবী*************) থেকে (*************)

পর্যন্ত নাযিল হয়। তারপর ইবনে আসীরের মতে সূরায়ে মুদ্দাসসিরের এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়া পর্যন্ত অহী নাযিল বন্ধ থাকে। তারপর আবার অহী নাযিল নতুন করে শুরু হয়। স্বয়ং হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) থেকে ইমাম যুহরী এ বর্ণনা নকল করেছেন যে, এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পূর্বে রাসূলূল্লাহ (স) সেই ফেরেশতাকেই আসমানে ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে দেখেন যিনি হেরাগুহায় তাঁর কাছে এসেছিলেন। এ বর্ণনায় আমরা উপরে বোখারী, মুসলিম প্রভৃতির বরাত দিয়ে উধৃত করেছি। (****১৭

এ সূরায়ে যে হেদায়েত দেয়া হয়

এখন সূরায়ে মুদ্দাসসের এ আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ্য করুন এবং দেকুন যে এতে কি হেদায়েত দেয়া হয়েছে।

(আরবী***************)

-হে লেব বা কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি। এখানে রসূলুল্লাহকে ‘হে রসূল, হে নবী’- বলে সম্বোধন করার পরিবর্তে ‘হে কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যেহেতু হুযুর (স) জিব্রিলকে আসমান ও যমীনের মাঝখানে চেয়ারে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখতে পেয়ে ভীত বিহ্বল হয়ে পড়েন এবং এ অবস্থায় বাড়ি পৌছে বাড়ির লোক জনকে বলেন- আমাকে জড়িয়ে দাও, আমাকে জড়িয়ে দাও। এ জন্যে আল্লাহতায়ালা তাঁকে ‘মুদ্দাসসির’ বলে সম্বোধন করেন। এ মধুর সম্বোধন থেকে আপনা আপনি যে অর্থ প্রকাশ পায় তাহলো- হে আমার প্রিয় বান্দা, তুমি লেপ কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে কেন? তোমার উপর ত একটা বিরাট কাজের দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং তা পালন করার জন্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ময়দানে নামতে হবে।

(আরবী***********)

-উঠ এবং সতর্ক করে দাও।

এ হচ্ছে সেই ধরনের নির্দেশ যা নূহ (আ) কে নবুয়ত দানের পর করা হয়েছিল। যেমন-

(আরবী*****************)

-তোমার জাতিকে সতর্ক করে দাও- তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আমার পূর্বে- (নূহ: ১)

সূরা মুদ্দাসসিরের উক্ত আয়াতের মর্ম এই: হে কম্বল ‍মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি। উঠে পড় এবং তোমার চারপাশের লোকেরা যে অবহেলায় জীবন যাপন করছে, তাদেরকে সতর্ক করে দাও। এ অবস্থায় যদি তারা লিপ্ত থাকে তাহলে তারা অবশ্যম্ভাবী পরিণাম থেকে তাদেরকে সাবধান করে দাও। তাদেরকে সতর্ক করে দাও যে, তারা কোন মদের মুলুকে বাসকরে না যে, তারা যা খুশী তাই করবে এবং তাদের জন্যে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।

(আরবি**************)

এবয় নিজের রবের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দাও।

এ হচ্ছে একজন নবীরন সর্বপ্রথম কাজ যা এ দুনিয়ায় তাকে করতে হয়। তার প্রথম কাজ এই যে, জাহেল মানুষ এখানে যাদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিচ্ছে তা সব ‘না’ করে দিতে হবে এবং প্রকাশ্যে সারা দুনিয়ায় এ ঘোষণা দিতে হবে যে, এ বিশ্বজগতে এক খোদা ব্যতীত শ্রেষ্ঠত্ব আর কারো নেই। এ কারণেই ইসলামে “আল্লাহ আকবার” কালেমার সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আযানের সূচনাই হয় আল্লাহু আকবার ঘোষণার দ্বারা। নামাযেও একজন মুসলমান প্রবেশ করে আল্লাহু আকবার বলে। তারপর বার বার আল্লাহু আকবার বলে উঠা বসা করে। পশুর গলায় যখন ছুড়ি চালানো হয় তখন বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার বলে চালানা হয়। তাকবীর ধ্বনি আজ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের সর্বাধিক সুস্পষ্ট ও স্বাতন্ত্রপূর্ণ নিদর্শন। কারণ এ উম্মতের নবী তাঁর কাজই শুরু করেছেন আল্লাহু আকবার দিয়ে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম দিকের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে যা ভালোভাবে উপলব্ধি করা উচিত। এ আয়াতগুলোর শানে নুযুল থেকে জানা গেছে যে, এই সর্বপ্রথম রসূলুল্লাহ (স) কে রেসালাতের বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্যে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটাও সুস্পষ্ট যে, যে শহর ও পরিবেশে এ মিশনসহ দন্ডায়মান হওয়ার আদেশ হচ্ছিল তা ছিল শির্কের লীলাক্ষেত্র। কথা শুদু এতোটুকুই ছিলনা যে, সেখানকার জনসাধারণ সাধারণ আরববাসীর মতো মুশরিক ছিল, বরঞ্চ তার চেয়ে বড়ো কথা এই যে, মক্কা মুয়ায্যামা ছিল মুশরিক আরবের সর্ববৃহত তীর্থস্থা। আর কুরাইশের লোকেরা ছিল এর পুরোহিত। এসব স্থানে কোন ব্যক্তির একাকী আবির্ভাব হওয়া এবং শির্কের মুকাবিলায় তাওহীদের পতাকা উত্তোলন করা বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল। এজন্যে “ওঠো এবং সতর্ক করে দাও” বলার সাথে সাথে বলা হলো, “আপপন রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।” এর মর্ম এই যে, যেসব ভয়ংকার শক্তিকে তুমি এ কাজের প্রতিবন্ধক মনে করছ তাদের মোটেপরোয়াই করোনা। পরিষ্কার ভাষায় বলে দাও, আমার রব সেসব শক্তি থেকে অনেক বড়ো যারা আমার এ দাওয়াতের পথ রুদ্ধ করার জন্যে দাঁড়াতে পারে।

এর চেয়ে অধিক উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি আর কি হতে পারে যা আল্লাহর কাজ শুরু করার জন্যে কোনো ব্যক্তির জন্যে করা যেতে পারে? আল্লাহর জন্যে শ্রেষ্ঠত্বের চিত্র যার মনে গভীরভাবে অংকিত হয়, সে আল্লাহর জন্যে একাকীই সমগ্র দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না।

(আরবী**************)

-এবং তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পাক রাখ।

একথাগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং এসবের মর্মও সুদূরপ্রসারিী। তার একটি মর্ম এই যে, আপন পোষাক পরিচ্ছদ পাক পবিত্র রাখ। কারণ পোষাক পরিচ্ছেদের পবিত্রতা এবং আত্মার পবিত্রতা ওতপ্রোত জড়িত। একটি পবিত্র আত্মা নোংরা ময়লা দেহ ও অপবিত্র পোষাক পরিচ্ছদে থাকতে পারে না। রসূলুললাহ (স) যে পরিবেশে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করেন তা শুধু আকীদা বিশ্বাস এবং চরিত্রের অথঃপতনের অতলতলেই নিমজ্জিত ছিলনা বরঞ্চ তাহারাত এবং পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা থেকেও বঞ্চিত ছিল। আর নবীর কাজ ছিল তাদেরকে সকল দিক দিয়ে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেয়া। এজন্যে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হলো যাতে করে তিনি তাঁর বাহ্যিক জীবনেও তাহারাতের (পবিত্রতা) সর্বোচ্চ মান কায়েম করতে পারেন। অতএব এ সেই হেদায়েতেরই ফলশ্রুটি যে, হুযুর (স) মানব জাতিকে দেহ ও পোষাক পরিচ্ছদের েএমন বিস্তারিত শিক্ষাদান করেনস যা আরব জাহেলিয়াত ত দূরের কথা আধুনিক যুগের সভ্যতম জাতিগুলোও লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেনি। এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ ভাষায় এমন কোন শব্দ যায় না যা তাহারাত শব্দের সমর্থক হতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামের অবস্থা এই যে, হাদীস ও ফেকাহর গ্রন্থগুলোতে ইসলামী হুকুম আহকামের সূচনাই হয় তাহারাত থেকে। এতে পাক নাপাকের পার্থক্য এবং পবিত্রতা পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে বয়ান করা হয়েছে।

এ শব্দ গুলোর দ্বিতীয় মর্ম হলো, নিজের পোষাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখ। বৈরাগ্যের ধারণা দুনিয়ার ধার্মিকতার এ মান নির্ধারিত করে দিয়েছে যে, মানুষ যতোই ময়লা পরিচ্ছন্ন থাকবে সে ততো বেশী ধার্মিক বা সাধুজনোচিত হবে। কেউ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিধান করলে তাকে দুনিয়াদার মনে করা হতো। অথচ মানবীয় স্বভাব প্রকৃতি ময়লা অপরিচ্ছন্নতা ঘৃণা করে। ভদ্রতা ও রুচিজ্ঞানের সাধারণ অনুভূতি যার মধ্যে আছে সে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন  মানুষের সাথেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। এ করণেই যারা আল্লাহ পথে মানুষকে দাওয়াত দেবে তাদের জন্যে এটা জরুরী যে, তার বাহ্যিক দিকটা এমন পবিত্র ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে যাতে করে মানুষ তাকে সম্মানের চোখে দেখে এবং তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে যেন এমন অরুচিকর কিছু না থাকে যা স্বভাবতঃই ঘৃণার উদ্রেক করতে পারে।

এ এরশাদের তৃতীয় মর্ম এই যে, নিজের পোষাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষত্রুটি থেকে পবিত্র রাখ। তোমার পোষাক পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র অবশ্যই হবে। কিন্তু তার মধ্যে গর্ব অহংকার, লোক দেখানোর মনোবৃত্তি, জাঁকজমকজ ও প্রভাব প্রতিপত্তির চিহ্ন যেন না থাকে। পোষাকই সর্বপ্রথম মারুষের ব্যক্তিত্বের পরিচয় করিয়ে দেয়। যে ধরনের পোষাকই কেউ পরিধাণ করুননা কেন, তা দেখে প্রথম নজরেই লোকেরা এ অনুমান করে যে সে কোন ধরনের মানুষ। জমিদার ও নবাব- সুবাদের পোষাক, ধর্ম ব্যবসায়ীদের পোষাক, গুন্ডা বদমায়েশ ও ভবঘুরে লোকের পোষাক- সবই পরিধানকারীরেদ স্বভাবপ্রকৃতির পরিচয় বহন করে থাকে। আল্লাহ প্রতি আহ্বানকারীরেদ স্বভাব প্রকৃতি এসব লোক থেকে স্বভাবতঃই ভিন্ন হয়ে থাকে। অতএব তাঁদের পোষাকও স্বভাবতঃই এসব লোকের থেকে পৃথক হওয়া উচিত। এমন পোষাক পরিধাণ করা উচিত যা দেখে প্রত্যেকেই মনে করতে পারে যে লোকটি বড়ো ভদ্র, বড়ো রুচিবান যে প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত নয় অথবা প্রবৃত্তির অনাচারে লিপ্ত নয়।

চতুর্থ মর্ম এই যে, নিজের পোষাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। উর্দু ভাষার ন্যায় আরবী ভাষাতেও পোষাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখার (পাক দামনী) চারিত্রিক দোষত্রুটির উর্ধে থাকা এবং ইত্তম চরিত্রে ভূষিত হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইবনে আব্বাস (রা) ইমাম নখয়ী, শা’বী, মুজাহিদ, কাতাদাহ, সাঈদ বিন জুবাইর, হাসান বাসরী অন্যান্য প্রখ্যাত তাফসীরকারগণ এ আয়াতের অর্থই করেছেন যে, নিজের চরিত্র পূত পবিত্র রাখ এবং সকল প্রকার অনাচার থেকে দূরে থাক। আরবী প্রকাশভংগী বা বাগধারা (IDIOM) বলা হয়ে থাকে-

(আরবী*********************)

-অমুক ব্যক্তির কাপড় পাক পবিত্র এবং তার পোষাক পরিচ্ছদ পবিত্র। তার অর্থ এই যে, তার স্বভাব চরিত্র উত্তম। পক্ষান্তরে বলা হয়

(*****************)

-তার কাপড় চোপড় ময়লা অর্থাৎ সে বদ প্রকৃতির লোক। তার কথাবার্তার কোন বিশ্বাস নেই।

(আরবী*************************)

ময়লা অপরিচ্ছন্নতা থেকে দূরে থাক। ময়লা বা নোংরামি বলতে এখানে সব রকমের নোংরামি বুঝায়। তা আকীদাহ বিশ্বা ও চিন্তধারার নোংরামির হোক আমল আখলাকের নোংরামি হোক, দেহ ও পোষাক পরিচ্ছদের নোংরামি হোক অথবা জীন পদ্ধতির নোংরামি হোক। অর্থাৎ’ তোমার চারপাশে গোটা সমাজে বিভিন্ন প্রকারের যেসব নোংলামি বিস্তার লাভ করে আছে সেসব থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। কেউ যেন তোমার প্রতি এ অভিযোগ আরোপ করতে না পারে যে, যেসব নোংরামি ও অনাচার থেকে তুমি লোককে বিরত রাখছ সেসবের মধ্যে কোন কোনটার চিহ্ন তোমার মধ্যেও পাওয়া যায়।

(আরবী*****************)

-এবং ইহসান করোনা অধিব লাভ করার জন্যে।

এ শব্দগুলোর মর্ম এতো ব্যাপক যে, কোন একটি বাক্যে এর অনুবাদ করে এর পরিপূর্ণ মর্ম ব্যাখ্যা করা যায়না। এর একটি মর্ম এই যে, যার প্রতিই দয়া অনুগ্রহ করবে, নিঃস্বার্থভাবে করবে। তোমার দান, অনুগ্রহ ও সদাচরণ নিছক আল্লাহর জন্যে হতে হবে। উপকার ও কল্যাণ করর বিনিময়ে তুমি পার্থিব কোনো সুযোগ সুবিধা হাসিল করবে এবং এ ধরনের কণামাত্র কামনা বাসনাও যেন তোমার না থাকে। অন্য কথায় কারো কল্যাণ করলে তা আল্লাহর জন্যে করবে ফায়দা হাসিল করার জন্যে কারো উপকার বা কল্যাণ করবে না।

দ্বিতীয় মর্ম এই যে, নবুয়তের যে কাজ তুমি করছ, যদিও তা এক অতি কল্যাণকর কাজ যে তোমার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টিকুল হেদায়েত লাভ করছে, তার জন্যে মানুষের কাছে গর্ব করে বেড়ায়োনা যে, তুমি তাদের বিরাট কল্যাণ করছ এবং এর থেকে কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করোনা।

তৃতীয় মর্ম এই যে, তুমি যদিও একটা বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছ কিন্তু আপন দৃষ্টিতে নিজের কাজকে বিরাট কাজ মনে করোনা, এ ধারণা তোমার মনে যেন না আসে যে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করে এবং এ কাজে জীবন উৎসর্গ করে তুমি তোমার রবের উপর কোন মেহেরবানী করছ।

(আরবী*************)

-এবং আপন রবের জন্যে সবর কর।

অর্থাৎ যে কাজ তোমার দায়িত্বে দেয়া হযেছে তা এক অীত প্রানন্তকর কাজ। এ কাজের জন্যে তোমাকে কঠিন বিপদ আপদ, দুঃখ কষ্ট ও ভয়ানক অসবিধার সম্মুখীন হতে হবে।

তোমার স্বজাতি তোমার দুশমন হয়ে পড়বে। সমগ্র আরব তোমার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। কিন্তু এ পথে যতো কিছুই আসুক তার জন্যে তোমাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং আপন দায়িত্ব অবিচলতা ও দৃঢ়চিত্ততা সহকারে পালন করতে হবে। এ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যে ভয়ভীতি, প্রলোভন, বন্ধুত্ব শত্রতা, প্রেম প্রীতি সবকিছুই তোমার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। এ সবের মুকাবিলায় দৃঢ়তার সাথে আপন সংকল্পে অটল থাকবে।

এ ছিল সেই প্রাথমিক হেদায়াত যা আল্লাহতায়ালা তাঁর রসূলকে এমন সময়ে দিয়েছিলেন যখন তিনি তাঁকে এ নির্দেশ দেন- উঠ এবং আপন কাজের সূচনা কর। যদি কেউ এ ছোটো ছোটো বাক্যগুলো ও সেসবের অর্থের উপর চিন্তাভাবনা করে তাহলে তার মন সাক্ষ্য দেবে যে, একজন নবীর কাজ শুরু করার সময় এর চেয়ে ভালো উপদেশ নির্দেশ আর কিছু দেয়া যেতে পারতোনা। এতে একথাও বলা হয়েছে যে, কাজটা কি করতে হবে। সেই সাথ এ শিক্ষাও দেয়া হয়েছে যে এ কাজ কোন্‌ নিয়তে, কোনো মানসিকতা ও কোন চিন্তাধারা সহ করত হবে। এ বিষয়েও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে এ কাজে কোন্‌ কোন্‌ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে এবং তার মুকাবিলা কিভাবে করতে হবে। আজ যারা অন্ধ বিদ্বেষে এ কথা বলে যে (মায়াযাল্লাহ) মৃগী রোগাক্রানত হওয়ার পর প্রলাপের ন্যায় এসব কথা রসূলুল্লাহ (সা) এর মখ দিয়ে বেরুতো, তারা একটু চোখ খুলে এ বাক্যগুলো দেখে স্বয়ং চিন্তা করে দেখুক যে এগুলো কি মৃগীরোগে আক্রান্ত অবস্থার কোন প্রলাপ, না খোদার হেদায়াত বা নবুয়তের দায়িত্ব অর্পণ করার সময় তিনি তাঁর বন্দাহকে দগান করেছেন। (******১৮)

অহী ধারণ করার অভ্যাস

ইতিপূর্বে আমরা হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) বরাত দিয়ে বলেছি যে, সূরা মুদ্দাসসিরের পর হুযুরের (সা) উপর ক্রমাগত অহী নাযিল হওয়ার শুরু হয়। কিন্তু প্রাথমিক কালে অহী নাযিলের সময় নবী পাকের এ অসুবিধা হতো যে ভুলে যাওয়ার আশংকায় তিন তা (মুখস্ত করে) মনে রাখার চেষ্টা করতেন। আবার কখনো অহী নাযিল কালে কোন কিছুর অর্থ জিজ্ঞেস করতেন। এজন্যে এ ময়ে নবীকে অহী ধারণ করার পন্থা ভালো করে শিখিয়ে দেয়ারও প্রয়োজন ছিল। সূরা তা-হা-য় বলা হয়েছে-

فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا

উচ্চ ও মহান আল্লাহ। তিনি সত্যিকার বাদশাহ। আর দেখ (হে নবী) কুরআন পড়তে তাড়াহুড়া করোনা যতোক্ষণ না তোমার উপর অহী পুরোপুরি পৌঁছে গেছে। এবং দোয়া কর, হে পরদেগার আমাকে বেশী বেশী ইলম দান কর (তা-হা: ১১৪)

বক্তব্যের ধারা পরিষ্কার এ কথা বলছে যে, (আরবী*******************) পর্যন্ত এসে ভাষণ শেষ হয়ে গেছে। তারপর বিদায় কালে ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে নবীকে (সা) সতর্ক করে দিচ্ছেন এমন বিসয়ে যা অহী নাযিল কালে তিনি প্রত্যক্ষ করেন। মাঝখানে টিপ্পনী কাটা সংগত মনে করা হয়নি। তাই পয়গাম প্রেরণ সমাপ্ত করার পর তিনি হুযুরকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দেন। এমন কি ছিল যার জন্যে সতর্ক করে দেয়া হলো? স্বয়ং সতর্ককরণের শব্দগুলোই তা প্রকাশ করছে। নবী (সা) অহীর পয়গাম গ্রহণ করা কালে তা মনে রাখার জন্যে তা আবৃত্তি করার চেষ্টা করছিলেন। এ চেষ্টার ফলে বার বার তাঁর মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটছিল হয়তো। হয়তো অহী গ্রহণের ধারাবাহিকতা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। পয়গাম শুনার ব্যাপারে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়া না হয়ে থাকবে। এ অবস্থা দৃষ্টে প্রয়োজন বোধ করা হয় যে তাঁকে অহী গ্রহণ করার সঠিক পদ্ধতি বুঝিয়ে দেয়া হোক এবং মাঝে মাঝে মনে রাখার যে চেষ্টা তিনি করছিলেন তা নিষেধ করে দেয়া হোক।

সূরা কিয়ামাহ নাযিলের সময়েও এ অবস্থা হয়েছিল। এ জন্যে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা ছিন্ন করে তাকে সতর্ক করে দেয়া হলো।

(আরবীঁ*******************)

এ স্বরণ রাখার জন্যে তাড়াহুড়া করে নিজের জিহ্বা বার বার চালনা করোনা। এটা মনে করিয়ে দেয়া এবং পড়িয়ে দেয়া আমাদেরই দায়িত্ব। অতএব যখন আমরা তা শুনাচ্ছি তখন মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাক তারপর তার মর্ম বুঝিয়ে দেয়াও আমাদের দায়িত্ব। [সূরায়ে কিয়ামার মধ্যে এ বাক্যটি প্রাসংগিকক্রমে আসায় যে ব্যাখ্যা আমা করেছি তা নিছক অনুমান ভিত্তিক ন। বরঞ্চ নির্ভযোগ্য বর্ণনাগুলোতে এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মুসনাদে আহমাদ, বুখারি, মুসলিম, তিরযিমিযি, নাসায়ী, ইবনে তাবারানী, বায়হাকী এবং অন্যান্য মুহাদ্দেসীন বিভিন্ন সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) বর্ণনা নকল করে বলেন যে যখন হুযুর )স) এর উপর কুরআন নাযিল হচ্ছিল তখন তিনি ভূলে যাওয়ার আশংকায় জিব্রাইল (আ) এর সাথে অহীর কথাগুলো আবৃত্তি করতে থাকতেন। একে বলা হলো………..

لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (16) إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ (17) فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ (18) ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ

এ কথাই শা’বী, ইবনে যায়েদ, যুহহাক, হাসান বাসরী, কাতাদাহ, মুজাহিদ এবং অন্যান্য প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ থেকে বর্ণিত আছে। ]

সূরায়ে আ’লা তেও নবীকে (সা) এ নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যে, আমরা তোমাকে পড়িয়ে দেব এবং তারপর আর তা ভুলে যাবেনা। [হাকেম সা;দ বিন আবি ওক্কাস (রা) থেকে এবং ইবনে মাুইয়া হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা নকল করেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের শব্দগুলো এ আশংকায় পুনরাবৃত্তি করতেন পাছে তিনি ভুলে না যান। মুজাহিদ এবং কালবী বলেন, জিব্রীল (আ) অহী শুনিয়ে বিদায় না হতেই হুযুর (সা) ভুলে যাওয়ার আশংকায়ই প্রথমাংশ পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করতেন। এ জন্যে আল্লাহ তায়ালা নবী (সা)  নিশ্চয়তা দেন যে অহী নাযিলের সময় তুমি চুপ করে শুনতে থাকবে। আমরা তা তোমাকে পড়িযে দেব এবং চিকালের জন্যে তোমার মনে থাকবে। এ আশংকা তুমি করবেনা যে তার কোন একটি শব্দ তুমি ভুলে যাবে।]

سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى

পরে যখন অহীর পয়গাম গ্রহণ করার অভিজ্ঞতা নবীর হয়ে গেল তখন এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এজন্যে পরবর্তী সূরাগুলোতে এ ধরনের সতর্কবাণী আমরা দেখতে পাইনা।

গোপন তাবলিগের তিন বচর

আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে রেসালাতের বাণী পৌঁছাবার যে হিকমত শিক্ষা দেন তদনুযায়ী তনি নবুয়তের ঘোষণা ও জন সাধারণের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেননি। বরঞ্চ প্রথম তিন  বছর এমন মহৎ ব্যক্তিদের কাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন যাঁরা দলিল প্রমাণ ও বুঝাপড়ার মাধ্যমে তাওহীদ কবুল করতে এবং শির্ক পরিহার করতে উদ্যত ছিলেন। সেই সাথে তাঁদের কাছেও দাওয়াত পৌঁছান যাঁদের প্রতি এ আস্থা পোষণ করা যেতো যে যতোক্ষণ আল্লাহ তায়অলার নির্দেশে তিনি জনসাধারন্যে ঘোষণা দিয়ে প্রকাশে দাওয়াত ইলাল্লাহর কাজ শুরু করার ফয়সালা না করেন, ততোক্ষণে তারা গোপনীয়তা রক্ষা করে চলবে। এ কাজে হযরত আবু বরক (রা) তার প্রকৃত নাম ছিল আবদুল্লাহ বিন ওসমান। কিন্তু তাঁর কুনিয়াত আবু বকর এতোটা প্রসিদ্ধি লাভ করে যে প্রকৃত নাম চাপা পড়ে যায়। যামাখশারী বলেন, পূত পবিত্র স্বভাব চরিত্রের দিকে সকলের অগ্রবর্তী হওয়ার কারণে তাঁকে আবু বকর বলা হতো। জাহেলিয়াতের যুগেই তাঁর এ নাম প্রসিদ্ধি লাভ করে –গ্রন্থকার।] এর প্রভাব সবচেয়ে অধিক কার্যকর ছিল। তাবারী ও ইবনে হিশাম তার কারণ এই বরেন যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক ও সৌহার্দপূর্ণ স্বভাবের লোক, তাঁর গুণাবলীর জন্যে তিনি তাঁর স্বজাতির অতি প্রিয়পাত্র ছিলে। কুরাইশদের মধ্যে তাঁর চেয়ে অধিক বংশবৃত্তান্ত (Genealogy) আর কারো জানা ছিলনা।  কে ভালো কে মন্দ এবং কার কি গুণাবলী এসও তাঁর চেয়ে অধিক আর কারো জানা ছিলনা। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী এবং সদাচরণের জন্যে প্রখ্যাত ছিলেন। তাঁর স্বজাতি তাঁর জ্ঞান বুদ্ধির, জন্যে তাঁর ব্যবসা ও সদাচরণেল জন্যে অধিক সময় তাঁর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতো এবং তাঁর কাছে এসে বসতো। এ সুযোগে তিনি যাদের প্রতি আস্থা পোষণ করতেন তাদের কাছে ইসলারেম দাওয়াত পৌছাতেন। তাঁর তাবলিগে প্রভাবিত হয়ে বিরাট সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর যাঁরাই মুসলমান হতেন তাঁরা তাঁদের বন্ধু মহল থেকে তালাশ করে ভালো লোকেদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতেন। সে সময়ে মুসলমানগণ গোপনে মক্কার জনহীন প্রান্তরে নামায পড়তেন যাতে কারে তাঁদের ধর্মান্তর গ্রহণ কেউ টের না পায়।

দারে আরকামে প্রওচার কেন্দ্র ও বৈঠকিাদি কায়েম

আড়াই বছরের পর বেশ কিছুর কাল অতীত হওয়ার পরপরই এমন এক ঘটনা ঘটে যার ফলে এ আশংকা হয় যে অসময়ে মক্কার  কাফেরদের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়ে না যায়।

ইবনে ইসহাক বলেন যে, একদিন মুসলমানগণ মক্কার এক প্রান্তরে নামায পড়ছিলেন। এমন সময় একদল মুশরিক তাদেরকে দেখে ফেলে এবং ধর্মোদ্রোহী বলা শুরু করে। কথায় কথায় লড়াইয়ের উপক্রম হয় এবং হযরত সা’দ বিন আবি ওক্কাস (রা) একজনের প্রতি একটি উটের হাড় ছুড়ে মারে এবং তার মাথা ফেটে যায়। ইবন জারীর ও ইবনে হিশাম এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু হাকেম উমারী তাঁর মাগাযী গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ  করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তির মাথা ফেটে যায় সে ছিল বনী তাইমের আবদুল্লাহ বিন খাতাল। তারপর নবী (সা) অবিলম্বে সাফার নিকটবর্তী হযরত আরকাম বিন আবি আরকামের গৃহকে বৈঠকাদি এবং দাওয়াত ও তাবলিগের কেন্দ্রে পরিণত করেন। এতে করে লোক এখানে একত্র হয়ে নামাযও পড়তে পারবে এবং যারা গোপনে মুসলমান হতে থাকবে তারা এখঅনে আসতেও থাকবে। ইসলামের ইতিহাসে এ দারে আরকাম চিরন্তন খ্যাতি লাভ করে। তিন বছরের গোপন দাওয়াতের কাল উত্তীর্ণ হয়ে প্রকাশ্যে জন সাধাণের মধ্যে দাওয়াত শুরু হওয়ার পরও এ মুসলমানদের কেন্দ্র হয়ে থাকে। হুযুর (সা) এখঅনেই অবস্থান করতেন। এ্যখানে এসে মুলমানগণ তাঁর সাথে মিলিত হতেন। শিয়া’বে আবি তালিবের বন্দী থাকার পূর্ব পর্যন্ত এ ছিল ইসলামী দাওয়াতের কেন্দ্র।

তিন বছরের গোপন দাওয়াতের ফলাফল

প্রকাশে  ইসলামী দাওয়াতের সময়কালের উপর আলোচনা করার আগে আমাদের দেখা উচিত যে এ তিন বছরে কতটুকু কাজ হয়েছে। কুরাইশদের কোন্ কোন্‌ গোত্রের কারা কারা কতজন মুসলমান হয়েছিল। কুরাইশের বারে থেকে কতলোক, কত মাওয়ালী, গোলাম, বাঁদী ইসলাম গ্রহণ করেছিল নিম্নে তার তালিকা দেয়া হলো, বহু চেষ্টা চরিত্র ও অনুসন্ধানের পর এ কাজ সম্ভব হয়েছে। কারণ এর পূর্ণ তালিকা কোথাও একত্রে পাওয়া যায়না।

বনী হাশিম গোত্র

১। জাফর বিন আবি তালিব

২। তাঁর বিবি আসমা বিন্তে উমাইস খাশআমিয়্যা (কুরাইশ গোত্র বর্ভিূত এ মহিলা)

৩। সাফিয়্যঅ (রা) বিন্তে আবদুল মুত্তালিব [নবীর ফুফী হযরত যুবাইরের (রা) মাতা।]

৪। আরওয়া (রা) বিন্তে আবদুল মুত্তালিব [তুলাইব (রা) বিন উমাইরে মা এবং হুযুরের ফুফী।]

বনী আল মুত্তালিব গোত্র

৫। উমায়দাহ (রা) বিন আল হারিস বিন মুত্তালিব।

বনী আব্দে শামস বিন আবদুল মানাফ গোত্র

৬। আবু হুযায়ফা (রা) বিন ওতবা বিন রাবিয়অ

৭। তাঁর বিবি সাহলা (রা) বিন্তে সুহাইল বিন আমর

বণী উমাইয়অ গোত্র

৮। উসমান (রা) বিন আফফান

৯। তাঁর মা আরওয়া (রা) বিন্তে কুরাইয

১০। খালিদ (রা) বিন সাঈদ বিন আল আস বিন উমাইয়া

১১। তাঁর বিবি উমায়মা (রা) বিন্তে খালাফ আল খুযাইয়অ (কেউ কেউ তার নাম উমায়না বলেছেন।)

১২। উম্মে হাবীবা (রা) বিন্তে আবি সুফিয়ান (প্রথমে তিনি উমায়তা বিন জাহশের বিবাহ বন্ধনে ছিলেন, পরে উম্মুল মুমেনীন হওয়ার মর্যাদা লাভ করন।)

হুলাফায়ে বনী উমাইয়অ গোত্র (বনী উমাইয়অর সাথে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ)।

১৩। আবদুল্লাহ বিন জাহশ

১৪। আবু আহমদ বিন জাহশ

১৫। উবায়দুল্লাহ বিন জাহশ [ইনি তাঁর স্ত্রী হযরত উম্মে হাবীবা সহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখানে ‍খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে মারা যান। -গ্রন্থকার।]

এ তিন জন ছিলেন বনী গানাম বিন দূদান বংশোদ্ভূত। হুযুরের (রা) ফূফী ইমায়মা বিন্তে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত যয়নবের ভাই।]

বণী তাইম গোত্র

১৬। আসমা বিন্তে আবি বকর (রা)

১৭। উম্মে রুমান (রা) [হযরত আবু বকর (রা) স্ত্রী এবং হযরত আয়েশা (রা) এবং হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকরের (রা) মা।]

১৮। তালহা (রা) বিন উবায়দুল্লাহ

১৯। তাঁর মা সা’বা (রা) বিন্তে আল হাদরামী।

২০। হারেস (রা) বিন খালেদ

বনী তাইমের সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ গোত্র

২১ সুহাইব (রা) বিন সিনান রুমী

বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা গোত্র

২২। যুবাইর (রা) বিন আল আওয়াম (হযরত খাদিজার ভাতিজা এবং হুযুরের (সা) ফুফাতো ভাই।

২৩। খালিদ (রা) বিন হিযাম (হাকীম বিন হিযামের ভাই এবং হযরত খাদিজার (রা) ভাতিজা)।

২৪। আসওয়াদ (রা) বিন নাওফাল

২৫। আমর (রা) বিন উমাইয়া

বণী আবদুল ওয্যা বিন কুসাই গোত্র

২৬। ইয়াযিদ (রা) বিন যামায়া বিন আল আসওয়াদ

বনী যোহরা গোত্র

২৭। আবদুর রহমান (রা) বিন আওফ

২৮। তাঁর মা শিফা (রা) বিন্তে আওফ

২৯। সা’দ বিন আবি ওক্কাস (রা)। আবু ওক্কাসের আসল নাম মালিক বিন ওসাইব ছিল।

৩০। তাঁর ভাই ওমাইর (রা) বিন আবি ওক্কাস।

৩১। তাঁর ভাই আমের (রা) বিন আবি ওক্কাস

৩২। মুত্তালিব (রা) বিন আযহার (আবদুর রহমান বিন আওফের চাচাতো ভাই)

৩৩। তাঁর বিবি রামলা (রা) বিন্তে আবি আওফ সাহমিয়া

৩৪। তুলাইব (রা) বিন আযহার

৩৫। আবদুল্লাহ (রা) বিন শিহাব।

বণী যোহরার সাথে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ গোত্র

৩৬। আবদুল্লাহ (রা) বিন মাসউদ। ইনি ছিলেন হুযাল গোত্রের এবং মক্কার বনী যোহরার সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ।

৩৭। ওতবা (রা) বিন মাসউদ (আবদুল্লাহ বিন মাসউদের ভাই)

৩৮। মিকদাদ (রা) বিন আমর আল কিন্দী

৩৯। খাব্বাব (রা) বিন আল আরাত

৪০। শুরাহবিল (রা) হাসানাত আল কিন্দী

৪১। জাবের (রা) বিন হাসানাত (শুরাহবিলের ভাই)

৪২। জুনাদা (রা) বিন হাসানাত (ঐ)

বণী আদী গোত্র

৪৩। সাঈদ (রা) বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফাইল [হযরত ওমরের (রা) চাচাতে ভাই ও ভগ্নিপতি]

৪৪। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা (রা) বিন্তে আল খাত্তাব [হযরত ওমরের (রা) ভগ্নি]

৪৫। যায়েদ (রা) বিন খাত্তাব (হযরত ওমরের বড়ো ভাই)

৪৬। আমের (রা) বিন রাবিয়অ আল আনযী (খাত্তাব তাকে পুত্র বলে গ্রহণ করেছিল।)

৪৭। তাঁর স্ত্রী লায়লা (রা) বিন্তে আবি হাসমা

৪৮। মা’মার (রা) বিন আবদুল্লাহ বিন নাদলা

৪৯। নুয়াইম (রা) বিন আবদুল্লাহ বিন আল্লাখখাম।

৫০। আদী (রা) বিন নাদলা

৫১। উরওয়া (রা) বিন আবি উসাস (আমর বিন আসের বৈমাত্রেয় ভাই)

৫২। মাুস (রা) বিন সায়াইদ বিন হারেসা বিন নাদলা।

বণী আদীর সাথে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ গোত্র।

৫৩। ওয়অকেদ বিন আবদুল্লাহ (খাত্তাব তাঁকে পুত্র বানিয়ে নেয়)।

৫৪। খালিদ বিন বুকাইর বিন আবদের ইয়অলিল আলালায়লী

৫৫। ইয়াস (রা) বিন বুকাইর বিন আবদে ইয়ালিস আল্লায়সী

৫৬। ইয়অস (রা) বিন বুকাইর বিন আবদে ইয়ালিস আল্লায়সী

৫৬। আমের (রা)

৫৭। আকেল (রা)

বণী আবদুদ্বার গোত্র

৫৮। মুসয়াব (রা) বিন উমাইর

৫৯। তাঁর ভাই আবু রুম (রা) বিন উমাইর

৬০। ফেরাস (রা) বিন আন্নাদর

৬১। জাহম (রা) বিন কায়েস

৬২। উসমান (রা) বিন মাযউন

৬৩। তাঁর ভাই কুদামা (রা) বিন মাযউন

৬৪। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ (রা) বিন মাযউন

৬৫। সায়েব বিন উসমা (রা) বিন মাযউন

৬৬। মা’মার (রা) বিন আল হারেস বিন মা’মার

৬৭। তাঁর ভাই হাতেব (রা) বিন আল হারেস

৬৮। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা (রা) বিন্তে মুজাল্লিল আল আমেরিয়া

৬৯। মা’মারের ভাই হাত্তাব (রা) বিন আল হারেস

৭০। তাঁর স্ত্রী ফুকাইহা বিন্তে ইয়াসার

৭১। সুফিয়ান বিন মা’মার (রা)

৭২। নুবায়না (রা) বিন ওসমান

বনী সাহম গোত্র

৭৩। আবদুল্লাহ (রা)বিন হুযাফা

৭৪। খুনাইস (রা) বিন হুযাফঅ (হযরত ওমরের (রা) জামাই। (উম্মুল মুমেনীন হযরত হাফসার (রা) প্রথম স্বামী।

৭৫। হিশাম (রা) বিন আল আসা বিন ওয়ায়েল

৭৬। হারেস (রা) বিন কায়েস

৭৭। তাঁর পুত্র বশীর বিন হারেস (রা)

৭৮। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মা’মার বিন হারেস (রা)

৭৯। কায়েস  (রা) বিন হুযাফা (আবদুল্লাহ বিন হুযাফার ভাই)

৮০। আবু কায়েস (রা) বিন আল হারেস

৮১। আবদুল্লাহ (রা) বিন আল হারেস

৮২। সায়েব (রা) ঐ

৮৩। হাজ্জাজ (রা)            ঐ

৮৪। বিশার (রা) ঐ

৮৫।সাঈদ (রা)   ঐ

বনী সাহমের বন্ধু গোত্র

৮৬। উমাই (রা) বিন রিয়াব

৮৭। মাহমিয়্যা (রা) বিন আল জাযু [হযরত আব্বাস (রা) এর বিবি উম্মুল ফযল (রা) এর বৈমাত্রেয় ভাই।]

বনী মাখযুম গোত্র

৮৮। আবযু সালমা (আবদুল্লাহ (রা) বিন আবদুল আসাদ (হুযুরের (সা) ফুফাতের এবং দুধ ভাই, উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালমার (রা) প্রথম স্বামী।]

৮৯। তাঁর বিনি উম্মে সালমা (রা) (ইনি ও তাঁর স্বামী আবু সালমা আবু জেহেলের নিকট আত্মীয় ছিলেন।)

৯০। আরকাম (রা) বিন আবিল আরকাম (যার দারে আরকামের উল্লেখ আগে করা হয়েছে।]

৯১। আইয়াশ (রা) বিন আবি রাবিয়া (আবু জেহেলর বৈমাত্রেয় ভাই। হযরত খালেদ বিন অলীদের চাচাতো ভাই)।

৯২। তাঁর বিনি আসমা (রা) বিন্তে সালামা তামিমিয়্যা।

৯৩। অলীদ (রা) বিন অলীদ বিন মুগীরা।

৯৪। হিশমাম (রা) বিন আবি হুযায়ফা

৯৫। সালমা (রা) বিন হিশাম

৯৬। হাশিম (রা) বিন আবি হুযায়ফা

৯৭। হাববার (রা) বিন সুফিয়ান

৯৮। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ বিন সুফিয়ান

বনী মাখযুমের মিত্র গোত্র

৯৯। ইয়াসের (রা) (আম্বার বিন ইয়অসেরের পিতা)।

১০০। আ্ম্বার বিন ইয়াসের (রা)।

১০১। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ বিন ইয়াসের (রা)।

বনী আমের বিন লুহাই গোত্র

১০২। আবু হাবরা (রা) বিন আবি রুইম (হুযুরে ফুফী বার রা বিন্তে আবুদল মুত্তালিবের পুত্র)।

১০৩। তাঁর বিনি উম্মে কুলসূম (রা) বিন্তে সুহাইল বিন আমর। (আবু জান্দাল (রা) এর ভগ্নি।

১০৪। আবদুল্লাহ (রা) বিন সাহাইল বিন আমর।

১০৫। হাতেব (রা) বিন আমর (সুহাইল বিন আমরের ভাই)

১০৬। সালীত (রা) বিন ্‌ামর

১০৭। সাকরান (রা) বিন আমর (সুহাইল বিন আমরের ভাই। ইনি উম্মুল মুমেনীন সাওদা (রা) বিন্তে যাময়ার প্রথম স্বামী)

১০৮। তাঁর বিনি সাওদা (রা) বিন্তে যামায়া (সাকরানের মৃত্যুর পর উম্মুল মুমেনীন হওয়ার সৌভাগ্যলাভ করেন)।

১০৯। সালীত বিন আমরে বিবি ইয়াকাযা (রা) বিন্তে আলকামা (ইসাবায় উম্মে ইয়াকাযা বলা হয়েছৈ এবং ইবনে সা’দ ফাতেমা বিন্তে আলকামাহ বলেছেন।

১১০। মালেক (রা) বিনে যামায়া (হযরত সাওদার ভাই)।

১১১। ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)।

বনী ফহর বিন মালেক গোত্র

১১২অ আবু ওবায়দাহ (রা) বিন আল জাররাহ্‌

১১৩। সাহাইল (রা) বিন বায়দা

১১৪। সাঈদ (রা) বিন কায়েস

১১৫। আমর (রা) বিন আল হারেস বিন যুহাইর

১১৬। ওসমান (রা) বিন আবদ গানাম বিন যুহাইর (হযরত আবদুর রহমান বিন আউফের (রা) ফুফাতো ভাই)।

১১৭। হারেস (রা) বিন সাঈদ

বনী আব্দে কুসাই গোত্র

১১৮। তুশাইব (রা) বিন উমাইর (হুযুরের ফুফু আরওয়া বিন্তে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র) এ গোত্রের লোকেরা কুরাইশদের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখতো। তাছাড়া তাদের বিরাট সংখ্যক দাসদাসীও ছিল। তিন বছরের গোপন দাওয়াতী কাজের ফলে এরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের নাম নিম্নরূপ:

১১৯। উম্মে আয়মান বারাকাহ (রা) বিন্তে সালাবাহ যিনি শৈশব থেকেই হুযুরকে কোলে মানুষ করেন।

১২০। যিন্নির রুমিয়অ (রা) (আমর বিন আল মুয়াম্মিল এর মুক্ত দাসী)।

১২১। বেলাল (রা) বিন রাবাহ।

১২২। তাঁর মা হামামা (রা)

১২৩। আবু ফুকাইহা (রা) বিন ইয়াসার আল জুহমী (সাফওয়ান বিন উমাইয়ার মুক্ত দাস)

১২৪। লাবীবা (রা) (মুয়াম্মেল বিন হাবীবের দাসী)।

১২৫। উম্মে উবাইস (রা) (বনী তামি বিন মুনরা অথবা বনী যুহরার দাসী। প্রথম উক্তি যুবাইর বিন বাক্কারের এবং দ্বিতীয় উক্তি বালাযুরীর)।

১২৬। আমের বিন ফাহাইরা (তুফাইল বিন আবদুল্লাহর দাস)।

১২৭। সুমাইয়অ (রা) (হযরত আম্মার বিন ইয়াসেরের মাতা এবং আবু হুযায়ফঅ বিন মুীরা মাখযুমীর দাসী।)

অকুরাইশদের মধ্যে যাঁরা মক্কায় প্রাথমিক কালে ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলো

১২৮। মিহজান (রা) বিন আল আদরা আল আসলামী।

১২৯। মাসউদ (রা) বিন রাবিয়া বিন আমর। ইনি ছিলেন বনী আলহুন বিন খুযায়মার কারা গোত্রীয়।

এভাবে প্রাথমিক চারজন মুসলমানের সাথে ১২৯ জন যোগ করলে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়াবে একশত তেত্রিশ (১৩৩)। হুযুর (সা) প্রকাশে দাওয়াত দেয়া শুরু করার পূর্বেই এ সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মুসলমানদের দলভুক্ত হন।

[আবদুল বার ইস্তিয়াবে এবং ইবনে আসীর উসদুল গাবায় লিখেছেন –“বলা হয়ে থাকে যে হযরত আব্বাস (রা) এর বিবি উম্মুল ফযল (রা) প্রথম মহিলা যিনি হযরত খাদিজার (রা) পর মুসলমান হন।” একথা সত্য হলে এ প্রাথমিক মুসলমানদের সংখ্যা ১৩৪ হয়। এ মহিলার প্রকৃত নাম লুবাবা বিন্তে আল হারেস। ইনি উম্মুল মুমেনীন হযরত মায়মুনার (রা) ভগ্নি। হযরত খঅলেদ[ বিন অলীদের (রা) খালা এবং হযরত জাফর (রা) বিন আবি তালিবের স্ত্রী আসমা বিন্তে উমাইসের বৈমাত্রেয় ভগ্নি। আমরা এ তালিকায় তাঁর নাম এ জন্যে সন্নিবেশিত করিনি যে, ‘বলা হয়ে থাকে বা কথি আছে দুর্বলভাবে তা  বর্ণনা করা হয়েছে- গ্রন্থকার]

সঠিক চিন্তা ও সুস্থ প্রকৃতির লোক তাঁরা ছিলেন। তাঁরা নিছক যুক্তি প্রমাণ ও পারস্পরিক বুঝাপড়ার মাধ্যমে শির্কের অনিষ্টকারিতা উপলব্ধি করেন, তাওহীদের সত্যতা মেনে নেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহি ওয়া সাল্লামকে খোদার রসূল বলে স্বীকার করেন, কুরআনকে  আল্লাহর বাণী হিসাবে নিজেদের জন্যে হেদায়েতের উৎস বলে গণ্য করেন এবং আখেরাতের জীবনকে অকাট্য সত্য বলে মেনে নেন। এ পরিমাণ নিষ্ঠাবান এবং দ্বীনি প্রজ্ঞাসম্পন্ন কর্মী তৈরী হওয়অর পর হুযর (সা) আল্লাহ তায়ালা নির্দেশে প্রকাশে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। (****২১)

নির্দেশিকা

১। রাসায়েল ও মাসায়েল- প্রথম খন্ড পৃঃ ২৯

২। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

৩। তাফহীমুল কুরআন- সূরায়ে আলাকের ভূমিকা

৪।         ঐ         -আলাম নাশরাহ, টীকা-২

৫।        ঐ –শূরা, -টীকা ৮৩

৬।         ঐ         -সূরায়ে আলাকের ভূমিকা

৭।        ঐ         সূরায়ে আলাকের ভূমিকা

৮। রাসায়েল ও মাসায়েল ৩য় খন্ড পৃঃ ২৩২

৯। ঐ     ঐ পৃঃ ২২৯-৩২

১০। তাফহীমুল কুরআন –কাসা, টীকা ১০৯

১১।       ঐ         সূরা মুদ্দাসসিদেরর ভূমিকা

১২। ঐ   আলাকা, টীকা ১-৬

১৩। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

১৪। তাফহীমুল কুরআন    -কদর, টীকা-১

১৫। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

১৬। তাফহীমুল কুরআন    -সূরা মুদ্দাসসিরের ভূমিকা

১৭। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

১৮। তাফহীমুল কুরআন, কিয়ামার টীকা-১১

১৯। ঐ –আ’লা, টীকা-৭

২০।      ঐ         তা-হা. টীকা, কিয়ামা-১১, আ’লা-৭

২১। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন।

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.