সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

পঞ্চম অধ্যায়

দাওয়াতের জন্যে যে হেদায়ত নবী (সা) কে দেয়া হয়

গোপন তাবলিগের প্রাথমিক তিন বছরের অবস্থা আমরা বর্ণনা করেছি। এখন সাধারণ দাওয়ারেত দশ বৎসর কালীন মক্কী যুগের ইতিহাস বর্ণনা করার পূর্বে দুটি বিষয় পরিষ্কার করে বলে দেয়া প্রয়োজনীয় বোধ করছি। এর ফলে পরবর্তীকালের ঘটনাগুলি ভালোভাবে বুঝতে পারা যাবে।

প্রথম হচ্ছে এই যে, নবীকে (সা) রেসালাতের দায়িত্ব পালনের কি হেদায়াত দেয়া হয়েছিল যা এতোটা ফলপ্রসূ ছিল যে তা মানুষের মন জয় করে ফেল্লো, মনের বক্রতা দূর করে দিল এবং একটি অসভ্য বর্বর জাতিকে একেবারে বদলে দিল?

দ্বিতীয় এই যে, ইসলামী দাওয়াতের প্রকৃত ধরনটা কি ছিল যার জন্যে নবী (সা) এর বিরুদ্ধে এমন বিরোধিতার ঝড় উঠলো যা আরবে নিছক শির্ক অস্বীকারকারী এবং তওহীদ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধ কোনদিন উঠেনি? কিন্তু এ দাওয়াতের কিরূপ বলিষ্ঠভাবে পেশ করা হয় যে, জাহেলিয়াতের পতাকাবাহীদেরকে শেষ পর্যন্ত অসহায় ও শক্তিহীন করে ফেলে?

এ অধ্যায়ে আমরা প্রথম বিষয়বস্তুর উপর আলোচনা করব এবং দ্বিতীয় বিষয়বস্তুর উপর পরবর্তী অধ্যায়ে। (১****)

প্রাথমিক দাওয়াত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ

আল্লাহ তায়ালা আরবের বিখ্যাত কেন্দ্রীয় শহর মক্কায় তাঁর এক বান্দাহকে (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম) পয়গম্বরীর কাজে বেছে  নেন এবং আপন শহর ও গোত্রের মধ্যে দাওয়াতী কাজের সূচনা করার নির্দেশ দেন। এ কাজ শুরু করার জন্যে প্রথমে যেসব হেদায়েতের প্রয়োজন ছিল তাই দেয়া হয় এবং তা ছিল তিনটি বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট।

এক-পয়গম্বরকে এ বিষয়ে শিক্ষাদান যে, তিনি স্বয়ং নিজেকে এ বিরাট কাজের জন্যে কিভাবে তৈরী করবেন এবং কোন পদ্ধতিতে কাজ করবেন।

দুই- প্রকৃত ব্যাপারের তত্ত্ব সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান এবং প্রকৃত সত্য সম্পর্কে ঐসব ভুল ধারণার খন্ডন যা আশপাশের লোকের মধ্যে পাওয়া যেতো যার কারণে তাদের আচরণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল।

তিন- সঠিক আচরণেল প্রতি আহ্বান এবং হেদায়াতে- এলাহীর ঐসব বুনিয়াদী নৈতিক মূলনীতির বর্ণনা যার অনসরণে মানুষের কল্যাণ ও সৌভাগ্য লাভ হতে পারে।

 প্রাথমিক পর্যায়ে এসব পয়গাম ছোটো ছোটো ও সংক্ষিপ্ত কথায় দেয়া হতো। ভাষা হতো অত্যন্ত মার্জিত ও সুরুচিপূর্ণ, মিষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী। যাদেরকে সম্বোধন করা হতো তাদের রুচিসম্মত সাহিত্যিক ভাষায় কথা বলা হতো, যাতে করে তা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারে, কথার সুর লালিত্যে কর্ণকুহর আকৃষ্ট হতে পারে এবং তা সুসংহতি ও সুষমতার কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বার বার আবৃত্ত করতে থঅকে। তারপর এসব কথা ও আলোচনায় স্থানীয় পরিবেশ পরিস্থিতির উল্লেখ ছিল খুব বেশী। যদিও প্রচার করা হচ্ছিল বিশ্বজনীন সত্যতা, কিন্তু তার জন্যে যক্তি প্রমাণ সাক্ষ্য ও দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছিল এমন নিকটতম পরিবেশ থেকে যার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিল সেসব লোক যাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলা হচ্ছিল। তাদেরই ইতিহাস ঐতিহ্য, তাদেরই প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ করা পুরনির্শন ও ধ্বংসাশেষ এবং তাদেরই আকীদাহ বিশ্বাস ও নৈতিক এবং সামাজিক অনাচার সম্পর্কেই যাবতীয় আলোচনা হতো যাতে করে তার থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো।

দাওয়াতের এ প্রাথমিক পর্যায় প্রায় চার পাঁচ বছর যাবত ছিল যার প্রথম তিন বছর ছিল গোপন আন্দোলনের স্তর। এ পর্যায়ে নবী (সা) এর দাওয়াত ও তাবলিগের প্রতিক্রিয়া তিনটি আকারে প্রকাশ লাভ করে।

(১) কতিপয় সৎ ব্যক্তি এ দাওয়অত গ্রহণ করে মুসলিম –উম্মাহ হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়।

(২) অজ্ঞতা ও ব্যক্তিস্বার্থের দরুন অথবা পূর্বপুরুষদের দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দরুন বিরাট সংখ্যক লোক বিরোধিতার জন্যে অগ্রসর হয়।

(৩) মক্কা ও কুরাইশদের গন্ডি অতিক্রম করে  এ নতুন দাওয়াতের আওয়াজ অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর পরিমন্ডলে পৌঁছে যায়।

এখন থেকে এ দাওয়অতের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ পর্যায়ে ইসলামের এ আন্দোলন এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মধ্যে এক প্রাণান্তকর সংঘাত সংঘর্ষ শুরু হয় যা আট নয় বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। শুধু মক্কা এবং কুরাইশ গোত্রের মধ্যেই নয়, বরঞ্চ আরবের অধিকাংশ অঞ্চলে যারা প্রাচীন জাহেলিয়াত অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইতো। তারা বল প্রয়োগে এ আন্দোলন নসাৎ করার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়। এ কাজের জন্যে তারা সকল প্রকার অপকৌশল অবলম্বন করে মিথ্যা প্রাচরণা চালায়; অভিযোগ, সন্দেহ সংশয়, ত্রুটি অনুসন্ধান ও কঠোর সমালোচনার ঝড় সৃষ্টি করে। সাদারণ মানুষের মনে বিভিন্ন রকমের প্ররোচনা দান ও ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে। অপরিচিত লোকদেরকে নবী (সা) এর কথা শুনতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হতো। ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর অমানুষীক জুলুম নির্যাতন করা হতো। তাঁদের সাথে আর্থিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়। তাঁদের জীন এতোটা অতীষ্ট করে তোলা হয় যে, দু’বার তাঁরা ঘরদোর ছেড়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে বাধ্য হন। অবশেষে তাঁদের সকলকে তৃতীয়বার মদীনায় হিজরত করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের কঠোর ও নিত্যনতুন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এ আন্দোলন প্রসার লাভ করতে থাকে। মক্কা এমন কোন পরিবার এবং কোন গৃহ ছিলনা যার কোন না কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলনা। অধিকাংশ ইসলাম বিরোধীদের শত্রুতাপূর্ণ আচরণে কঠোরতা ও তিক্ততার কারণ এই ছিল যে তাদের নিজেদের ভাই, ভাইপো, পুত্র, কন্যা, ভগ্নি, জামাতা প্রভৃতি ইসলামী দাওয়াতের অনুসারীই নন বরঞ্চ ইসলামর উৎসর্গীত সহায়ক শক্তি হযে পড়েছিলেন। তাদের রক্তমাংসের আপন জনগণও তাদের বিরুদ্ধে লড়তে তৈরী হলো। মজার ব্যাপার এই যে- যাঁরা পুরাতন জাহেলিয়াতের ঘনো আঁধার থেকে বেরিয়ে এ নতুন আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন, তাঁরা আগেও সমাজের সবচেয়ে সৎলোক ছিলেন এবং এ আন্দোলনে শরীক হওয়ার পর তাঁরা এতোটা সত্যনিষ্ঠ ও পুতপবিত্র চরিত্রের অধিকারী হতেন যে, দুনিয়া সে আন্দোলনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার না করে পারতোনা যে এমন মহৎ ব্যক্তিদেরকে তার দিকে আাকৃষ্ট করতো এবং তাদেরকে এমন মহৎ বানিয়ে দিত।

এ দীর্ঘ ও কঠোর সংঘাত- সংঘর্ষ চলাকালে আল্লাহতায়ালা সুযোগ ও প্রয়োজন মতো এমন উত্তেজনাময়ী ভাষণ নাযিল করতে থাকেন- যার মধ্যে ছিল যেন নদীর প্রবাহ, বন্যার শক্তি এবং প্রচন্ড আগুনের প্রভাব। এসব ভষণে একদিকে আাহলে ঈমানদেরকে তাঁদের প্রাথমিক দায়িত্ব কর্তব্য বলে দেয়া হয়, তাঁদের মতে দলবদ্ধ জীবন যাপনের অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়। তাঁদেরকে তাকওয়া, চরিত্রের মহত্ব এবং পবিত্র জীবন যাপনের শিক্ষা দেওয়া হয়। তাঁদেরকে দ্বীনে হকের প্রচার পদ্ধতি বলে দেয়া হয়। সাফল্যের প্রতিশ্রুতি এবং জান্নাতের সুসংবাদ দ্বারা তাঁদের জন্যে সাহস সঞ্চার করা হয়। তাদেরকে ধৈর্য, দৃঢ়তা  এং বিরাট উৎসাহ উদ্দীপনা সহকারে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়। জীবন বিলিয়ে দেয়ার এমন উদ্দীপনা ও ভাবাবেগ তাদের মধ্যে সৃষ্টি করা হয় যে, তারা যে কোন বিপদের সম্মুখীন হতে এবং  বিরোধিতার বিরাট ঝড়-ঝঞ্জার মুকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুত হয়।

অপরদিকে বিরোধীগণ এবং সত্যপথ প্রত্যাখ্যানকারী ও অবহেলায় কাল যাপনকারীদেরকে ঐসব জাতির পরিণাম থেকে সতর্ক করে দেয়া হয় যাদের ইতিহাস তাদের জানা ছিল। ঐসব ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের ধ্বংসাবশেষ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলা হয় যেসব দিনরাত তাঁদের সফরে তারা অতিক্রম করে যেতো। এমন সব সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী থেকে তাওহীদ ও আখেরাতের যুক্তিপ্রমাণ পেশ করা হতো যা রাতদিন আসমান ও যমীনে তাদের চোখের সামনে ভাসতো। যেগুলোকে তারা স্বয়ং নিজেদের জীবনেও সর্বতা দেখতো এবং অনুভব করতো। শির্ক, স্বেচ্ছাচারিতা, আখেরাতের প্রতি অবিশ্বাস এবং পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ প্রীতির ভ্রান্তিসমূহ সুস্পষ্ট যুক্তি দ্বারা তাদের সামনে তুলে ধরা হতো যা তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতো। তাদের এক একটি সন্দেহ সংশয় দূর করা হয়, এক একটি অভিযোগের ন্যায়সংগত জবাব দেয়া হয়। যেসব বিভ্রান্তিতে তারা ভুগছিল এবং অপরের মধ্যে যেসব বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছিল তার এক একটি দূর করে দেয়া হয়। জাহেলিয়াতকে এমন অন্তঃসারশূন্য প্রতিপন্ন করা হয় যে বুদ্ধি ও বিবেকের দুনিয়ায় কোথাও তার স্থান রইলোনা। সেই সাথে খোদার গজব, কিয়ামতেরও ভয়ংকর অবস্থা এবং জাহান্নামের শাস্তির ভয়ও তাদেরকে দেখানো হয়। তাদের অসৎ চরিত্র, ভ্রান্ত জীবনধারা, জাহেলী রীতিনীতি, সত্যের বিরোধিতার জন্যে এবং ঈমান আনয়নকারীকে কষ্ট দেয়ার জন্যে তাদের ভর্ৎসনা করা হয়। নীতি নৈতিকতা ও তামাদ্দুনের সেসব বুনিয়াদী মূলনীতি তাদের সামনে পেশ করা হয় যার ভিত্তিতে আবহমান কাল থেকে খোদার মনোনীত সৎ ও ন্যায়পরায়ণ সভ্যতার পত্তন হয়ে আসছে।

এ পর্যায়ের বিভিন্ন স্তর ছিল এবং প্রতিটি স্তরে দাওয়াত ব্যাপকতর হতে থাকে। সংগ্রাম ও  প্রতিবন্ধকতা কঠোরতর হতে থাকে। মুসলমানগণ বিভিন্ন আকীদাহ বিশ্বাস ও আচরণের লোকদের সম্মুখীন হতে থাকেন এবং তদনুযায়ী আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত পয়গামগুলোর মধ্যে বিষয়বস্তুর বিভিন্নতাও বাড়তেক থাকে। (*****২)

ইসলামী দাওয়াতের এ বিরাট কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্যে নবীকে (সা) যে বিস্তারিত হেদায়াত দেয়া হয় সে সম্পর্কে চিন্তাভানা করলে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, মক্কার কঠিন বিরোধিতার যুগে কোন্‌ বিরাট নৈতিক শক্তি ইসলামী তাবলিগের জন্যে অগ্রসর হওয়ার পথ পরিষ্কার করে এবং কোন ফলপ্রসূ শিক্ষা ও তবলিগ প্রভাবিত লোকদেরকে খোদার পথে সকল শক্তির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে এবং প্রত্যেক বিপদ মুসিবত বরণ করে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। নিম্নে আমরা এসব হেদায়াত এক একটি বর্ণনা করছি।

দাওয়াতে হিকমত ও উপদেশের প্রতি লক্ষ্য রাখা

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

হে নবী তোমার রবের পথে আহ্বান জানাও হিকমত এবং উত্তম উপদেশসমূহ (নহলঃ ১২৫)। হিকমতের অর্থ এই যে, নির্বোধের ন্যায় কোন বাছবিচার না করেই তবলিগ করা নয়, বরঞ্চ বুদ্ধিমত্তার সাথে দ্বিতীয় পুরুষের মনমানসিকতা, যোগ্যতা ও অবস্থা উপলব্ধি করার পর সুযোগমত কথা বলা। সব ধরনের লোকের সাথে একই ধরনের প্রকাশভংগীতে আলাপ আলোচনা না কবরা। যে ব্যক্তি বা দলের প্রতি তবলিগ করত হবে, প্রথমে তার বা তাদের রোগ নির্ণয় করতে হবে। তারপর এমন যুক্তি প্রমাণসহ সে রেরাগের চিকিৎসা করত হবে যা তাদের অন্তরে গভীর প্রদেশ থেকে সে ব্যাধি নির্মূল করে দিগতে পারে।

উত্তম উপদেশের দুটি অর্থ। এক এই যে দ্বিতীয় পুরুষকে শুধু যুক্তিপ্রমাণ দ্বারা নিশ্চিন্ত করলেই যথেষ্ট হবেনা। বরঞ্চ তার ভাবাবেগের প্রতিও আবেদন রাখতে হবে। পাপাচর, অনাচার ও পথভ্রষ্টতা শুধু যুক্তির মাধ্যমে খন্ডন করা নয় বরঞ্চ মানুষের স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে তার জন্যে যে জন্মগত ঘৃণা দেখতে পাওয়া যায় তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। তার ভয়াবহ পরিণামের ভয় প্রদর্শন করতে হবে। হেদায়েত ও সৎ কাজের সত্যতা ও গুণাবলী শুধু যুক্তিদ্বারা প্রমাণ করাই যথেষ্ট নয়, বরঞ্চ তার প্রতি অনুরাগ ও অভিলাষ সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয় অর্থ এই যে, নসিহত এমন পদ্ধতিতে দিতে হবে যেন তার মধ্যে দুঃখকাতরতা ও শুভাকাংখা প্রকাশ পায়। দ্বিতীয় পুরুষ অর্থাৎ যাকে নসিহত দেয়া হচ্ছে, সে যেন এমন মনে না করে যে তাকে তুচ্ছ নগণ্য মনে করা হচ্ছে এবং উপদেশদাতা আপন শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতিতে আনন্দবোধ করছে। বরঞ্চ দ্বিতীয় পুরুষ যেন অনুভব করে যে উপদেশদাতার অন্তরে তার সংশোধনের জন্যে একটা ব্যাকুলতা ও অস্থিরতা আছে এবং প্রকৃতপক্ষে সে তার মংগলই চায়।

আলাপ আলোচনা যেন তর্কযুদ্ধ ও বুদ্ধির মল্লযুদ্ধে পরিণত না হয়। অন্যায় তর্কবিতর্ক, একে অপরের প্রতি দোষারোপ, পীড়াদায়ক কোন উক্তি ঠাট্টা বিদ্রুপ প্রভৃতি পরিহার করতে হবে। প্রতিপক্ষের মুখ বন্ধ করে দেয়া এবং নিজের বুদ্ধির বাহাদুরি দেখানো যেন উদ্দেশ্য না হয়। বরঞ্চ কথা হবে মিষ্টি মদুর, চরিত্র হতে হবে অতি উন্নত ও সম্ভ্রান্ত মানের। যুক্তি প্রমাণ যেন হয় ন্যায়সংগত ও মনঃপূত। দ্বিতীয় পুরুষের মধ্যে জিদ, আপন প্রভাব প্রতিপত্তির অনুভূতি এবং হঠকারিতা সৃষ্টি যেন না পারে। সহজ কথায় তাকে বুঝাবার চেষ্টা করতে হবে। যদি মনে হয় যে, কুটতর্কে নেমে আসছে তাহলে তাকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে হবে যাতে করে সে অধিকতর গোমরাহিতে লিপ্ত না হয়। (****৩)

দাওয়াতে হকের জন্যে ধীরস্থির ও রুচিসম্মত পদ্ধতি

وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُبِينًا () رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِكُمْ إِنْ يَشَأْ يَرْحَمْكُمْ أَوْ إِنْ يَشَأْ يُعَذِّبْكُمْ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ وَكِيلًا

-এবং হে মুহাম্মদ (সা) আমার বান্দাহদেরকে বলে দাওঃ তরা যেন এমন কথা বলে যা সবচেয়ে উত্তম। আসলে শয়তান সেই, যে মানুষের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। প্রকৃত পক্ষে সে মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। তোমাদের রব তোমাদের অবস্থা খুব ভালোভাবে অবগত রয়েছেন। তিনি চাইলে তোমাদের উপর রহম করতে পারেন এবং চাইলে তোমাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন। আর, হে নবী, আমরা তোমাকে লোকের তত্ত্বাবধায়ক পাঠাইনি। (বনী ইসরাইলঃ ৫৩-৫৪)

অর্থাৎ আহলে ঈমন, কাফের মুশরিক এবং দ্বীনের বিরুদ্ধবাদীদের সাথে কথা বার্তায়, আলাপ আলোচনায় কোন রুক্ষ কর্কশ ভাষা ব্যবহার করবেনা এবং অতিরঞ্জিত করে কোন কথা বলবেনা। বিরুদ্ধবাদীরা যতোই বিরক্তিকর কথা বলুক না কেন মুসলমানদের কোন সময়ের জন্যে সত্যের পরিপন্থী কোন কথা মুখ দিয়ে বের করা উচিত নয় এবং রাগের মাথায় বেহুদা কথার জবাব বেহুদা কথায় দেয়া উচিত নয়, ঠান্ডা মাথায়- মাপজোক করে এমন কথা বলা দরকার যা হবে একেবারে সত্য এবং ইসলামী দাওয়াতের মর্যাদার সাথ সংগতিশীল।

আর যদি তোমরা কখনো অনুভব কর যে, বিরুদ্ধবাদীদের কথার জবাব দেবার সময় নিজের মধ্যে রাগের আগুন জ্বলছে এবং স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে যে শয়তান তোমাকে উস্কানি দিচ্ছে যাতে দাওয়াতে দ্বীনর কাজ নষ্ট হয়ে যায়। তার চেষ্টা হচ্ছে এই যে, তোমরাও বিরোধীদের মতো সংস্কার সংশোধনের কাজ ছেড়ে দিয়ে সেই ঝগাড় বিবাদেই লেগে যাও যার মধ্যে সে (শয়তান) মানব জাতিকে লিপ্ত রাখতে চায়।

আহলে ঈমানের মুখ থেকে একথা বেরুনো ঠিক নয় যে “আমরা বেহেশতী এবং অমুক ব্যক্তি বা দল জাহান্নামী”। এ বিষয়ে ফয়সালা করার এখতিয়ার ত আল্লাহতায়ালা। স্বয়ং নবীর কাজও শুধু দাওয়াত দেয়া। লোকের ভাগ্য তার হাতে দিয়ে দেয়া হয়নি যে তিনি  কারো জন্য রহমত এবং কারো জন্যে শাস্তির ফয়সালা শুনিয়ে দেবেন।(****)

আহ্বায়কের মর্যাদা ও দায়িত্ব

قَدْ جَاءَكُمْ بَصَائِرُ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ أَبْصَرَ فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ عَمِيَ فَعَلَيْهَا وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بِحَفِيظٍ

-দেখ তোমার রবের পক্ষথেকে দৃষ্টিশক্তির আলোক এসে গেছে। এ দৃষ্টিশক্তি যে কাজে লাগাবে সে তার নিজেরই মংগল করবে। আর যে অন্ধ হয়ে থাকবে সে তার নিজেরই ক্ষতি করবে। আর আমি তোমাদের কোন প্রহরী নই (আনয়াম: ১০৪)।

“আমি তোমাদের প্রহরী নই” –কথার অর্থ এই যে আামার কাজ শুধু এতোটুকু যে সেই আলোক তোমার সামনে পেশ করবো যা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে। তারপর চোখ খুলে তা দেখা না দেখার কাজ তোমাদের। আমার উপর এ দায়িত্ব দেয়া হয়নি যে যারা স্বয়ং চোখ বন্ধ করে রেখেছ তাদের চোখ বলপূর্বক খুলে দেব এবং যারা দেখবেনা তাদেরকে জোর করে দেখাবোই।(****৫)

مَنْ يُصْرَفْ عَنْهُ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمَهُ وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْمُبِينُ (16) وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

-হে নবী (সা) সেই অহীর অনুসরণ করে যাও, যা তোমার উপর তোমার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। তিনি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। আর এ মুশরিকদের পেছনে লেগে থেকোনা। যদি আল্লাহর ইচ্ছা এই হতো যে এরা শির্ক না করুক তাহলে এরা শির্ক করতোনা। তোমাকে আমরা তাদের প্রহরা নিযুক্ত করিনি এবং না তুমি তাদের তত্ত্বাবধায়ক। (আনয়াম : ১৬-১৭) – এর অর্থ এই যে তোমাকে আহ্বায়ক ও মুবালিলগ বানানো হয়েছে, কোতওয়াল বা পুলিশের কর্তা বানানো হয়নি। তাদের পেছনে লেগে থাকার তোমার কোন কাজ নেই। তোমার কাজ শুধু এতোটুকু যে লোকের সামনে এ আলোক পরিবেশন কর এবং সত্যকে সুস্ষ্ট করে তুলে ধরার ব্যাপারে তোমার যতোটুকু শক্তি সামর্থ রয়েছে, তার কোন ত্রুটি করোনা। কেউ যদি এ সত্য গ্রহণ না করে তা না করুক। তোমাকে এ কাজের জন্যে আদেশ করা হয়নি যে, মানুষকে সত্যপন্থী করেই ছাড়তে হবে। আর তোমার নবুয়তের গন্ডির ভেতরে কেউ বাতিলপন্থী রয়ে গেলে তার জন্যে তোমাকে জবাদিহিজও করতে হবে না। অতএব কিভাবে অন্ধকে চক্ষুষ্মান বানানো যায় এবং যারা চোখ মেলে দেখতে চায় না তাদেরকে কিভাবে দেখানো যায়, অযথা এসব চিন্তা করে নিজেকে বিব্রত করোনা। যদি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হিকমতের দাবীই এটা হতো যে দুনিয়ায় কাউকে বাতিলপন্থী থাকতে দেয়া হবেনা, তাহলে তোমার দ্বারা এ কাজ নেয়ার কি প্রয়োজন আল্লাহর ছিল? তাঁর কি একটি মাত্র সৃজনী ইংগিত গোটা মানবজাতিকে হকপন্থী বানাতে পারতোনা? কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ত মোটেই তা নয়। উদ্দেশ্য এই যে মানুষের জন্যে হক ও বাতিল বেছে নেয়ার স্বাধীনতা থাকবে। তারপর হকের আলা তার সামনে পেশ করে তার পরীক্ষা করা যে দুটির মধ্যে সে কোনটি বেছে নিচ্ছে। অতএব তোমার জন্য সঠিক কর্মপন্থা এই যে, যে আলোক তোমাকে দেখানো হয়েছে তার আলোতে তুমি সোজাপথে চলতে থাক এবং অপরকেও তার দাওয়াত দিতে থাক। যারা এ দাওয়াত কবুল করবে তাদেরকে আপন করে নেবে এবং তাদেরকে কখনো বিচ্ছিন্ন করবেনা। দুনিয়ার চোখে তারা যতোই নগন্য ও তুচ্ছ হোকনা কেন। আর যারা তোমার দাওয়অত কবুল করবেনা তাদের পেছনে লেগে থেকোনা। যে অশুভ পরিণামের দিকে তার স্বয়ং যেতে চায় এবং যাবার জন্যে বদ্ধপরিকর, তাদেরকে সেদিকে যেতে দাও।(****৬)

তাবলিগের সহজ পন্থা

وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَى () فَذَكِّرْ إِنْ نَفَعَتِ الذِّكْرَى

-এবং (হে নবী), আমরা তোমাকে সহজ পন্থার সুযোগ দিচ্ছি। অতএব নসিহত কর যার নসিহত ফলপ্রদ হয়-(আল-আলা: ৮-৯)।

অর্থাৎ হে নবী, দ্বীনের দবলিগের ব্যাপারে আমরা তোমাকে অসুবিধায় ফেলতে চাইনা যে, তুমি বোবাকে কথা শুনাও এবং অন্ধকে পথ দেখাও। বরঞ্চ তোমাকে সহজ পন্থা লাভের সুযোগ করে দিচ্ছি। তা এই যে, যদি তুমি অনুভব কর যে, কোথাও নসিহত করল লোক তার থেকে সুযোগ গ্রহণ করতে প্রস্তুত তাহলে সেখানে নসিহত কর। এখন প্রশ্ন এই যে, কে তার থেকে সুযোগ গ্রহণ করার জন্যে প্রস্তুত এবং কে প্রস্তুত নয়? ত এ কথা ঠিক যে, জনসাধারণের মধ্যে তবলিগ বা প্রচারের মাধ্যমেই তা জানা যাবে। এ জন্যে সাধারণের মধ্যে তবলিগ অব্যাহত রাখতে হবে। তবে তার উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, আল্লাহর বান্দাহদের মধ্য থেকে তাদেরকে তালাশ করে বের করতে হবে যারা- এর সুযোগ গ্রহণ করে সত্য পথ অবলম্বন করবে। এসব লোকের প্রতি তোমার বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাদের শিক্ষা দীক্ষার প্রতি তোমার বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে এমন লোকের পেছনে তোমার সময় নষ্ট করা উচিত নয়, যাদের সম্পর্কে তোমার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে যে তারা তোমার নসিহত গ্রহণ করতে চায়না। (****৭)

তাবলিগে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত গুরুত্ব কাদের

وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ

-এবং হে নবী, যারা তাদের রবকে রাত দিন ডাকে এবং তাঁর সন্তোষ লাভের অভিলাষী, তাদেরকে তোমার থেকে দূরে নিক্ষেপ করো না। তাদেরকে যেসব বিষয়ের হিসাব দিতে হবে তার কোনটার বোঝা তোমার উপরে নেই এবং তোমার যেসব বিষয়ে হিসাব দিতে হবে তার কোনটির বোঝা তাদের উপরে নেই। তার পরেও যদি তাদেরকে দূরে নিক্ষে কর তাহলে তুমি জালম হবে- (আনয়ামঃ ৫২)।

যারা প্রথমেই রসূলুল্লাহ (সা) উপর ঈমান এনেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক এমন ছিলেন যারা অত্যন্ত গরীব ও শ্রমজীবী ছিলেন। রসূলুল্লাহর (সা) প্রতি কুরাইশদের বড়ো বড়ো সর্দারদের এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে একটা এই ছিল যে, “তোমার চারধারে আমাদের সমাজের যতোসব দাসদাসী ও নিম্নশ্রেণীর লোক জমা হয়েছে।”

তারা উপহাস করে বলতো, “দেখ তার কেমন সম্মানিত সাথী মিলেছে? যেমন বেলাল (রা), আম্মার (রা), সুহাইব (রা), খাব্বাব (রা)। ব্যাস, আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে কি এসব লোকই পেয়েচিলেন যাদেরকে বেছে নেয়া যেতে পারতো?”

ঈমান এনেছিলেন এমন দরিদ্র লোকের প্রতি ঠাট্টাবিদ্রুপ করেই তারা ক্ষান্ত হতোনা, বরঞ্চ ঈমান আনার পূর্বে তাদের মধ্যে কারো কোন দুর্বলতা থাকলে তার উল্লেখ করে তারা বলতো, “দেখ, অমুক, যে কাল পর্যন্ত এমন ছিল, এবং অমুক  যে এমন এমন কাজ করেছিল আজ তারাও নির্বাচিত সম্মানিত দলভুক্ত”। বস্তুততঃ এ সূরা আনয়ামের ৫৩ আয়াতে তাদের এ উক্তি উধৃত করা হয়েছে- “এরাই কি সেসব লোক আমাদের মধ্যে যাদের উপর আল্লাহর ফযল ও করম হয়েছে?” এ আয়াতে তারই জবাব দেয়া হয়েছে। তার অর্থ এই যে, যারা সত্যের অভিলাষী হয়ে তোমার কাছে আসে তাদেরকে এসব বড়ো লোকদের খাতিরে দূরে ঠেলে দিও না। ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে তারা কোন ভুল ত্রুটি করে থাকলেও তার দায়িত্ব তোমার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। (****৮)

হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনা

একদা রসূলুল্লাহ (সা) এর দরবারে মক্কার কতিপয় প্রভাবশালী সর্দার বসেছিল এবং হুযর (সা) তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন।

[হুযুরের (সা) দরবারে সেসময়ে যারা বসেছিল, বিভিন্ন  বর্ণনায় তাদের নামের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এ তালিকায় ওতবা, শায়বা, আবু জাহেল, উমাইয়া বিন খালফ, উবাপই বিন খালফ প্রমুখ চরম ইসলাম দুশমনদের নাম পাওয়া যায়। এর থেকে জানা যায় যে, এ ঘটনা তখন ঘটে যখন এদের সাথে রসূলুল্লাহ সা এর মেলামেসা হতো এবং সংঘাত-সংঘর্ষ এমন পর্যায়ে পৌছেছিলনা যে তাঁর কাছে তাদের যাতায়াত এবং দেখা সাক্ষাত একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।– (গ্রন্থখার)।]

 এমন সময় ইবনে উম্মে মাকতুম নামে জনৈক অন্ধ হুযরের খেদমতে হাজির হন এবং  ইসলাম সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান।  তাঁর এ হস্তক্ষেপ হুযুরের মনঃপূত হয়না এবং তিনি তাঁর প্রতি একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন এ কারণে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ সূরা আবাসা নাযিল হয়।

عَبَسَ وَتَوَلَّى () أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى

বিরক্ত হলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিল এজন্যে যে সে অন্ধ তার কাছে এলো (আবাসা: ১-২)।

দৃশ্যতঃ যে প্রকাশভংগীর দ্বারা কথার সূচনা করা হয়েছে তা দেখে মনে হয়, অন্ধের প্রতি অবহেলা এবং বড়ো বড়ো সর্দারদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জন্যে এ সূরায় নবী (সা) এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সমগ্র সূরাটি নিয়ে সামগ্রিকভাবে চিন্তাভাবনা করলে জানা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে ঐসব কুরাইশ সর্দারদের উপর যাা গর্ব অহংকার, হঠকারিতা এবং সত্য বিমুখতার কারণে রসূলুল্লাহ (সা) সত্যপ্রচারকে ঘৃণাতরে প্রত্যাখ্যান করছিল। নবীকে (সা) তবলিগের সঠিক পন্থা বলে দেয়ার সাথে সাথে সেই পদ্ধতির ত্রুটিবিচ্যুতিও বুঝিয়ে দেয়া হয় যা তিনি কাজের সূচনায় অবলম্বন করেছিলেন। একজন অন্ধের দিক থেকে তাঁর মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং কুরাইশ সর্দারদের প্রতি মনোযোগ প্রদান এজন্যে ছিলনা যে তিনি বড়ো লোকদেরকে সম্মানিত এবং অন্ধকে তুচ্ছ নগণ্য মনে করতেন, এবং (মায়াযাল্লাহ) কোন রুক্ষতা তাঁর মেজাজের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিল যার জন্যে আল্লাহতায়ালা তাঁকে পাকড়াও করেন। বরঞ্চ ব্যাপারটি প্রকৃতপক্ষে ছিল এই যে, একজন দায়ী (আহ্বায়ক) যখন তার দাওয়াতের সূচনা করে তখন স্বভাবতঃই তার প্রবণতা এই হয় যে সমাজের প্রভাবশালী লোক তার দাওয়াত কবুল করুক যাতে কাজ সহজ হয়ে যায়। নতুবা সাধারণ প্রভাব প্রতিপত্তিহীন, অথর্ব অকর্মণ্য অথবা দুর্বল লোকদের মধ্যে দাওয়ারেত প্রসার ঘটলেও তাকে কিছু যায় আসেনা। দাওয়অতের সূচনায় প্রায় এ কর্মপদ্ধতিই রসূলুল্লাহ (সা) অবলম্বন করেছিলেন। পরিপূর্ণ এখলাস (নিষ্ঠা) এবং দাওয়াতে হকের প্রসার ঘটাবার প্রেরণাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, বড়ো লোকদের সম্মান শ্রদ্ধা করার  এবং ছোটদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার চিন্তাধারণা তাঁর ছিলনা। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে বুঝিয়ে বল্লেন যে, ইসলামী দাওয়াতের সঠিক পদ্ধতি এটা নয়। বরঞ্চ এ দাওয়াতের ‍দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক এমন ব্যক্তির গুরুত্ব রয়েছে যে হকের প্রত্যাশী। সে যে ধরণেরই দুর্বল, প্রভাব প্রতিপত্তিহীন অথবা অকর্মণ্যৗ হোক না কেন। আর এমন ব্যক্তির কোন গুরুত্ব নেই, যে সত্যবিমুখ, তা সে সমাজের যতোবড়ো প্রভাবশালী হোকনা কেন। এজন্যে নবী (সা) প্রকাশ্যে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা ত পরিবেশন করবেনই। কিন্তু তাঁর মনোযোগ আকৃষ্ট করার প্রকৃত হকদার তারাই যাদের মধ্যে সত্যকে গ্রহণ করার আগ্রহ উৎসাহ পাওয়া যায়। নবীর মহান দাওয়াতের মর্যাদা ক্ষণ্ন করা হয় যদি তাঁর দাওয়াত এমন সব গর্বিত লোকের কাছে পেশ করা হয়, যারা গর্বভরে এ কথা মনে করে যে গরজ তাদের নয়, বরঞ্চ তাঁর (নবীর)।

وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى () أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى () أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى () فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى () وَمَا عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّى () وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى () وَهُوَ يَخْشَى () فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَّى () كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ () فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ

-হে নবী (সা), তুমি কি জান, হয়তো তার সংশোধন হবে অথবা নসিহতের প্রতি মনোযোগ দেবে এবং নসিহত তার জন্যে ফলদায়ক হবে? যে কোন পরোয়াই করেনা তাদের প্রতি তুমি মনোযোগ দিচ্ছ। অথচ তাদের সংশোধন না হলে তোমার উপর তার কি দায়িত্ব? আর যে ব্যক্তি স্বয়ংয় তোমার কাছে দৌড়ে আসে এবং ভীত-শংকিত হয়, তুমি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। কখনোও না। এত নসিহত। যার ইচ্ছ সে তা গ্রহণ করুক- (আবাসা: ৩-১২)।

এটা সেই মূল সূক্ষ কৌশল যা নবী (সা) তবলিদে দ্বীনের ব্যাপারে এখঅনে উপেক্ষা করেছিলেন এবং একথা বুঝাবার জন্যে আল্লাহতায়ালা প্রথমে ইবনে মাকতুমের সাথে নকবী (সা) এর আচরণের সমালোচনা করলেন। তারপর বল্লেন যে সত্যের আহ্বায়কের দৃষ্টিতে প্রকৃত গুরুত্ব কার প্রতি দেয়া উচিত এবং কার প্রতি উচিত নয়। এক হচ্ছে, সে ব্যক্তি যার বাহ্যিক অবস্থা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে সে সত্যনুসন্ধিৎসু, সত্যের অভিলাষী। সে সর্বদা শংকিত যে কি জানি বাতিলের অনুসরণ করে সে খোদার বিরাগভাজন হয়ে না পড়ে। এজন্যে সে সত্য ও সঠিক পথের জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে। দ্বিতীয় সে ব্যক্তি যার আচরণ স্পষ্টতঃ বলে দিচ্ছে যে তার মধ্যে সত্যের কোন অনুসন্ধিৎসা নেই। বরঞ্চ সে নিজেকে কারো মুখাপেক্ষীই মনে করেনা যে তাকে সত্য সঠিক পঠ দেখানো হোক। এ দু ধরনের লোকের মধ্যে এটা দেখাবার বিষয় নয় যে কে ঈমান আনলে তা দ্বীনের জন্যে খুবই কল্যাণকর হবে এবং কার ঈমান দ্বীনে প্রচার ও প্রসারে তেমন ফলদায়ক হবেনা। বরঞ্চ দেখার বিষয় এই যে কে হেদায়াত গ্রহণ করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং কে এ অমূল্য সম্পদের প্রতি মোটেটই শ্রদ্ধাশীল নয়। প্রথম ধরনের লোক অন্ধ হোক, খঞ্চ হোক, পংশু অথবা নিঃস্ব হোক অথবা দৃশ্যতঃ দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের ব্যাপারে তেমন উল্লেখযোগ্য খেদমত করার যোগ্য না হোক কিন্তু  সেই হকের  আহ্বায়কের জন্যে এক ‍মূল্যবান ব্যক্তিত্ব।  তার প্রতিই মনোযোগ দেয়া উচিত। কারণ এ  দাওয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহর বান্দাহদের সংস্কার সংশোধন। এ ব্যক্তির অবস্থা এই যে তাকে নসিহত করলে সে সংস্কার সংশোধন মেনে নেবে। এখন রইলো দ্বিতীয় ধরনের ব্যক্তি। ত সে ব্যক্তি সমাজে যতোই প্রভাব প্রতিপত্তিশীল হোক না কেন তার পেছনে লেগে থাকার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ তার আচরণ প্রকাশ্যেই এ কথা ঘোষণা করছে যে, সে নিজেকে সংশোধন করতে চায়না। এজন্যে তার সংশোধনের চেষ্টায় সময় ব্যয় করা সময়ের অপচয় মাত্র। সে যদি পরিশুদ্ধ হতে না চায় ত পরিশুদ্ধ না হোক। পরিণামে ক্ষতি তার হবে, তার কোন দায় দায়িত্ব সত্যের আহ্বায়ককে বহন করতে হবেনা।

যে অন্ধের এখানে উল্লেখ করা হযেছে তিনি একজন মশহুর সাহাবী হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)। হাফেজ ইবনে আবদুল বার তাঁর ইস্তিয়াবে এবং হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর আল-ইসাবা’তে বলেন যে, ইনি উম্মুল মুনেনীন হযরত খাদিজার (রা) ফুফাতো ভাই ছিলেন। তাঁর মা উম্মে মাকতুম এবং হযরত খাদিজার ()রা) পিতা খুয়াইলিদ পরস্পর ভাইভগ্নি ছিলেন। হুযুরের (সা) সাথে তাঁর এ সম্পর্ক জানার পর সন্দেহের কোন অবকাশ থাকেনা  যে তিনি তাঁকে দরিদ্র অথবা নিম্ন পদমর্যাদার লোক মনে করে তাঁকে উপেক্ষা করেছেন এবং বড়োলোকদের প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। কারণ ইনি ছিলেন হুযুরের (সা) শ্যালক এবং স্বগোত্রীয় লোক। কোন নিম্ন ম্রেণীর লোক ছিলেননা। যে জন্যে হুযুর (সা) তাঁর সাথে এ আচরণ করেছিলেন তার প্রকৃত কারণ (******) শব্দ থেকেই জানা যায়। আর এটাকেই নবীর অযত্ন-অবহেলার কারণ বলে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ হুযুরের (সা) ধারণা এই ছিল যে এখন তিনি যেসব লোককে সৎপথে আনার চেষ্টা করছিলেন তাদের মধ্যে যে কোন একজন হেদায়েত লাভ করলে তা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির বিরাট কারণ হতে পারে। অপর দিকে ইবনে মাকতুম একজন অন্ধব্যক্তি। তিনি তাঁর অপারগতার জন্যে ইসলামের জন্যে ততোটা ফলদায়ক হবেননা যতোটা হতে পারে এসব সর্দারদের মধ্যে কোন একজন মুসলমান হলে। এজন্যে এ সময়ে কথাবার্তায় হস্তক্ষেপ করা তাঁর উচিত নয়। তিনি যা কিছু বুঝাতে ও জানতে চান তা এরপর যে কোন সময়ে জানতে বুঝতে পারেন। (*****৯)

তবলিগের হিকমত

وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

-এবং আহলে কিতাবদের সাথে তর্কবিতর্ক করোনা। কিন্তু (করলে) উত্তম পন্থায় কর (আনকাবুত : ৪৬)। অর্থাৎ তর্কবিতর্ক বা আলাপচারি ন্যায়সংগত যুক্তি প্রমাণসহ এবং অত্যন্ত ভদ্র ও  শালীন ভাষায় হতে হবে। পারস্পরিক বুঝাপড়ারর মনমনাসিকতাসহ হতে হবে। যাতে করে প্রতিপক্ষের চিন্তাচেতনার সংশোধন হয়। মুবাল্লিগের  এ বিষয়ে চিনাত থাকা উচিত য সে যেন দ্বিতীয় পুরুষের মনের দুয়ার উন্মুক্ত করে সেখানে সত্যকথা পৌছিয়ে দিতে পারে এবং তাকে সঠিক পথে আনতে পারে।

একজন পলোয়ানের মতো লড়াই করা তার ঠিক নয় যে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে। বরঞ্চ তাকে একজন চিকিৎসকের মতো রোগের চিকিৎসা করতে হবে। একজন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসাকালে সর্বদা এ বিষয়ের প্রতি বিশেষ দৃষিটি রাখে যে, তার কোন ভুলের কাণে যেন রোগীর রোগ আরও বেড়ে না যায়। সে  অপ্রাণ চেষ্টা করে যে যতো কম কষ্টের মধ্যে সম্ভব যেন রোগী রোগমুক্ত হয়ে যায়। এখানে স্থান কাল পাত্র হিসাবে আহলে কিতাবদের সাথে আলোচনার ব্যাপারে এ হেদায়েত দেয়া হযেছে বটে। কিন্তু এ শুধু আহলে কিতাবের জন্যেই নির্দিষ্ট নয়। বরঞ্চ তবলিগের দ্বীনের ব্যাপারে এ এক সাধারণ হেদায়েত যা কুরআন মজীদের স্থানে স্থানে দেয়া হযেছে। যেমন:-

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

দাওয়াত দাও তোমার বের পথের দিকে হিকমত এবং উত্তম নসিহতের সাথে এবং লোকের সাথে এবং আলাপ আলোচনা কর এমন পন্থায় যা অতি উত্তম (নহল: ১২৫)।

 (আরবী*************)

-ভালো ও মন্দ একরূপ নয়। (প্রতিপক্ষের হামলার জবাবে) প্রতিরোধ এমন পন্থায় করবে যা সর্বোৎকৃষ্ট হবে। ফলে তুমি দেখবে যে, যে ব্যক্তির সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে এমন হয়ে গেছে যেনস সে পরম বন্ধু (হামীম সিজদাহ : ৩৪)।

(আরবী*****************)

-তুমি অন্যায়কে ভালো পন্থায় প্রতিরোধ কর। আমার জনা আছে সেসব কথা যা তারা তোমার বিরুদ্ধে বলছে (মুমেনুন: ৯৬)। (****১০)

দাওয়াতের হকের সঠিক কর্মপন্থা

(আরবী*******************)

(হে নবী) কোমলতা ও ক্ষমার আচরণ কর এবং ভালো কাজের প্রেরণা দিতে থাক এবং জাহেলদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়োনা। যদি শয়তান কখনো তোমাকে উস্কিয়ে দেঃয় ত আল্লাহর আশ্রয় চাও। তিনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। প্রকৃতপক্ষে যারা খোদাভীরু তাদের অবস্থা ত এই হয় যে যদি কখনো শয়তানের কুপ্রভাবে তাদের মধে কোন খারাপ বাসনার উদয় হয়, তখন তৎক্ষণাৎ তারা সজাদ হযে পড়ে এবং তারপর তরা স্পষ্ট দেখতে পায়। (তাদের সঠিক কর্মপন্থা কি)। এখন রইলো তাদের (শয়তানদের) ভাইবন্ধুগণ।ভ তারা তাদেরকে বক্রতার দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করে না- (আ’রাফ: ১৯৯-২০২)

এ আয়াতগুলোতে নবীকে (সা) দাওয়াত ও তবলিগ এবং হেদায়েত এ সংস্কার সংশোধনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল (হিকমত) শিখিয়ে নেয়া হয়েছে। শুধু হুযুরকেই (সা) শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য নয় বরঞ্চ তাঁর মাধ্যমে সকলকে এ হিকমত শিক্ষা দেয়া হয়েছে যাঁরা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দুনিয়াবাসীকেসঠিক পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তা ধারাবাহিকতার নিম্নরূপ:-

(১) সত্যের আহ্বায়কের যেসব গুণাবলরি বিশেষ প্রয়োজন তার মধ্যে একটি এই যে, তাঁকে কোমলপ্রাণ সহনশীল ও উদারচেতা হতে হবে। তাঁকে তার সংগী সাথীদের জন্যে স্নেহশীল, জনসাধারণের জন্যে দয়ালু এবং প্রতিপক্ষের জন্যে সহনশীল হতে হবে। সহযোগীদের দুর্বলতাও উপেক্ষা করত হবে এবং বিরুদ্ধবাদীদের কঠোরতাও। চরম উত্তেহজনাকর পরিস্থিতিতেও মেজাজ প্রকৃতিকে শান্ত ও স্বাভাবিক রাখতে হবে। অত্যন্ত অসহনীয় কথাবার্তাও উদারতার সাথে সহ্য করতে হবে। বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে যতোই শক্ত কথা বলা হোক, অপবাদ অপপ্রচার করা হোক, অন্যায় ও সহিংস প্রতিরোধের ইচ্ছাই প্রকাশ করা হোক না কেন, সবকিছু উপেক্ষা করে চলাই উচিত। কঠোরতা ও রুক্ষতা প্রদর্শন, অভদ্র ও অশোভন উক্তি এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ স্বভাব প্রকৃতি বিষম পরিণাম ডেকে আনে। এতে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়, সফল হয় না। বিষয়টকে নবী (সা)  এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমার রব আমাকে আদেশ করেছেন রাগান্বিত অবস্থায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় যেন আমি সুবিচারপূর্ণ আচরণ করি। যে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তার সাথে যেন আমি সম্পৃক্ত হই। যে আমাকে আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাকে যেন তার অধিকার দিযে দিই। যে আমার উপর জুলুম করে তাকে যেন মাফ করে দিই।

নবী পাক (সা) এসব হেতায়েত তাদেরকেও দিতেন যাদেরকে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে দ্বীনের কাজে পাঠাতেন। তিনি বলেন:-

(আরবী****************)

অর্থাৎ যেখানেই তোমরা যাও তোমাদের আগমন যেন লোকের জন্যে সুসংবাদ বয়ে নিয়ে যায়, ঘৃণার উদ্রেক না করে। লোকের জন্যে তোমরা যেন সুযোগ সুবিধার কারণ হও, সংকীর্ণতা ও কঠোরতার নয়।

আল্লাহতায়ালা এতদসম্পর্কে নবীল (সা) সপক্ষে প্রশংসাবাণীই শুনিয়েছেন-

(আরবী****************)

-এ আল্লাহ তায়ালার রহমত যে তুমি তাদের প্রতি কোমলপ্রাণ। নতুবা তুমি যদি রুক্ষ প্রকতির এবং পাসাণ হৃদয় হতে, তাহলে এসব লোক তোমার চারপাশ থেকে কেটে পড়তো।– (আলে ইমরান: ১৫৯)।

(২) দাওয়াতে হকের সাফল্যের পন্থা এই যে, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে মানুষের সর্বজন পরিচিত অর্থাৎ ঐসব সহজ সরল ও সুস্পষ্ট মংগল ও কল্যাণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে যা সকল মানুষ জানে এবং যে কল্যাণকারিতা উপলব্ধি করার জন্যে সাধাণ জ্বঞান বিবেকই (Common sense) যথেষ্ট। এভাবে হকের আহ্বায়কের আবেদন সর্বশ্রেণীর মানুষকে প্রভাবিত করে এবং শ্রোতার হৃদয়ের গবীর প্রদেশে সে আবেচনদ পৌঁছে যায়। এমন সুপরিচিত দাওয়াতের বিরুদ্ধে যারা বিঘট্ন করে তারা নিজেদের ব্যর্থতাই ডেকে আন এবং দাওয়াতের সাফল্যের পথ সুগম করে। কারণ সাধারণ লোক- যতোই তারা কুসংস্কারে নিমজ্জিত হোক না কেন, যখন দেখে যে একদিকে এক পূণ্যত্মা মহান চরিত্রবান ব্যক্তি সোজাসুজি কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে এবং অপর দিকে বহু লোক তার বিরোধীতার নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত অমানবিক কলাকৌশলী ব্যবহার করছে, তখন ক্রমশঃ তাদের মন স্বতঃস্ফূর্তভাব সত্যের বিরোধিতাকারীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সত্যের আহ্বায়কের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। শেষ পর্য়ন্ত বিরোধীদের ময়দানে শুধু তারাই রয়ে যায় যাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বাতিল ব্যবস্থার সাথে জড়িত। অথবা যাদের অন্তর পূরাবপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ও জাহেলী যুগের বিদ্বেষ কোন সত্যের আলো গ্রহণ করার যোগ্যতাই অবশিষ্ট রাখেনা। এটাই সেই প্রজ্ঞাসম্পন্ন কলাকৌশল যার বদৌলতে নবী (সা) আরবে সাফল্য লাভ করেন। অতঃপর তাঁর পরে অল্পেকালের মধ্যেই ইসলামের প্লাবন অন্যা্য দেশে এমনভাবে ছড়িযে পড়ে যে কোথাও শতকরা একশ এবং কোথাও আশি-নব্বই জন অধিবাসী ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে।

(৩) এ দাওয়াতের কাজে কল্যাণকামীদেরকে সৎকাজে প্রেরণা দান যতোটা জরুরী, ততোটা জরুরী অন্ধলোকদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত না হওয়া- তারা বিতর্কে লিপ্ত করার যতোই চেষ্টা করুন না কেন। সত্যের আহ্বায়ক বা পতাকাবাহীকে এ  ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং তিনি শুধু তাদেরকে সম্বোধন করবেন যারা যুক্তিসম্পত পন্থায় বক্তব্য উপলব্ধি করতে আগ্রহী। আর যদি কেউ অজ্ঞালোকের ন্যায় হঠকারিতা, ঝগড়াবিবাধ ও বিদ্রুপাত্মক আচরণ শুরু করে, তাহলে প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করতে সত্যের আহ্বায়কের অস্বীকার করা উচিত। কারণ এ বিতর্কে লিপ্ত হয়ে কোন লাভ নেই। বরঞ্চ ক্ষতি এই যে, যে সময়টুকু তিনি দাওয়াতের প্রচার ও প্রসার এবং ব্যক্তিচরিত্র গঠনে ব্যয় করতে পারবেন, সে সময়টুকু এ বাজে কাজে অপচয় করা হবে।

(৪) উপরে যা বলা হলো সে প্রসংগেই অতিরিক্ত কথা এই যে, যদি কখনো সত্যের আহ্বায়ক প্রতিপক্ষের জুলুম, দুস্কৃতি এবং তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত সমালোচনা ও দোষারোপ নিজের স্বভাব প্রকৃতিতে উত্তেজনা অনুভব করেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাঁর মনে করা উচিত যে, এ শয়তানের পক্ষ থেকে উস্কানি দেয়া হচ্ছে এবং তক্ষুণি খোদার আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত যাতে করে তিনি তার বান্দাহকে ভাবাবেগের স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা  করেন এবং সে এমন বেশামাল হয়ে না পড়ে যাতে করে দাওয়াতে হকের জন্যে ক্ষতিকর কোন পদক্ষেপ করে না বসে। দাওয়াতে হকের কাজ সকল অবস্থাতে ঠান্ডা মাথাই হতে পারে এবং সে পদক্ষেপই সঠিক হতে পারে যা ভাবাবেগে পরিচালিত হয়ে নয়, বরঞ্জ পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে খুব চিন্তা ভাবনা করেই গ্রহণ করা হয়। কিন্তু শয়তান যেহেতু এ কাজের প্রসার বরদাশত করতে পারেনা, সেজন্যে সে সর্বদা তার অনুসারীদের দ্বারা সত্যের পতাকাবাহীর উপর বিভিন্ন ধরনের হামলা চারঅবার চেষ্টা করবে এবং প্রতিটি হামলার দ্বারা সত্যের পতাকাবাহীকে এভাবে উস্কাতে থাকবে যে- হামলার ত জবাব দেয়া উচিত। হকের আহ্বায়কের মনের কাছে শয়তান যে  আবেদন পেশ করে তা অধিকাংশ সময়ে বড়ো বড়ো প্রতারণামূলক ব্যাখ্যাসহ এবং ধর্মীয় পরিভাষার পোষঅকে আবৃত থাকে। কিন্তু তার পেছনে স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছু থাকেনা। এ জন্যে উপরে বর্ণিত শেষ দুট আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা মুত্তকী (অর্থাৎ খোদাভীরু এবং পাপাচার থেকে দূরে থাকার অভিলাষী) তারা তাদের মনের মধ্যে শয়তানী প্ররোচরণার প্রভাব এবং কোন পাপ প্রবণতার স্পর্শ অনুভব করার সাথে সাথেই সজাগ সতর্ক হয়ে যায় এবং তারপর তারা স্পষ্ট বুঝতে পারে এ অবস্থায কোন্‌ কর্মপন্থা অবলম্বন করলে দাওয়াতে দ্বীনের উদ্দেশ্য হাসিল হবে এবং হকপুরন্তির দাবীই বা কি? অপরদিকে স্বার্থপরতাই যাদের কর্মকান্ডে ক্রিয়াশীল এবং   এ কারণে শয়তানদের সাথে যাদের দহরম মহরম, তারা শয়তানী হামলায় টিকে থাকতে পারেনা এবং পরাজয় বরণ করে ভ্রান্ত পথে চলতে থাকে। তারপর শয়তান তাদেরকে যে যে প্রান্তরে নিয়ে যেতে চায়, সেখানে সেখানে নিয়ে যায় এবং কোথাও তাদের অবস্থান সুদৃঢ় হয়না। প্রতিপক্ষের প্রতিটি গালির জবাবে তাদের কাছে একটি করে গালি এবং প্রত্যেকটি কৌশলের জবাবে তাদের কাছে বৃহত্তর কৌশল থাকে।

আল্লাহতায়ালার এ এরশাদের একটা সাধারণ উদ্দেশ্যও আছে। তা হলো এই যে, তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তিদের কর্মপদ্ধতি সাধাণতঃ তাকওয়াহীন ব্যক্তিদের থেকে ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যারা প্রকৃত পক্ষে খোদাকে ভয় করে এবং অন্তর থেকে চায় যে তারা অনাচার পাপাচার থেকে দূরে থাকুক, তাদের অবস্থা এই য, খারাপ ধারণার একটু খানি স্পর্শ মনে লাগতেই, খচখটে ব্যাথা অনুভব করতে থাকে, যেমন আঙুলের কোন তীক্ষ্ণ সূঁচালো বস্তু ঢুকলে অথবা চোখে সামান্য কিছু পড়লে অনুভূত হয়। যেহেতু সেপাপ চিন্তাধারণা ও কামনা বাসনা এবং খারাপ নিয়তে অভস্ত নয়, সেজন্যে  এ সবকিছুই তার স্বভাব প্রকৃতির খেলাপ হয়, যেমন এতকহন রুজিকান ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভিলাষী মানুষের কাপড়ে কোন কালির দাগ অথবা ময়লার ছিটে ফোঁটা তার স্বভাব প্রকৃতির খেলাপ হয়। এ খটকা যখন সে অনুভব করে তখন তার চোখ খুলে যা, এবং তার বিবেক জাগ্রত হযে এসব অন্যায় অনাচারের ধূলিকনা তার থেকে ঝেড়ে  ফেলে নিতে লেগে যায়। তার বিপরীত যারা না খোতাদে ভয় করে আর না মন্দ কাজ থেকে বাঁচতে চায় এবং যাদের শয়তানে সাথে সম্পর্ক রয়েছে, তাদের মনের মধ্যে খারাপ ধারণা বাসনা, অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্য পাকাপাক্ত হতে থাকে এবং এসব নোংরা বিষয়ে তাদের মনে কোন ‍উদ্বেগও সৃষ্টি হয়না। ঠিক যেমন কোন ডেকচীতে শূয়রের মাংস রান্না হচ্ছে কিন্তু ডেকচীর মালিকের খবর নেই তার মধ্যে কি রান্না হচ্ছে। অথবা কোন মেথরের শরীর ও জামাকাপড় মলমূত্রে জবজবা কিন্তু তার কোন অনুভূতিই নেই যে, সে কিসের দ্বারা নোংরা ও অপবিত্র হয়ে আছে। (****১১)

চরম বিরোধিতায় পরিবেশে দাওয়াত ইলল্লাহ

(আরবী******************)

-ঐ ব্যক্তির কথার চেযে উত্তম কথা আর কার হবেচ যে আল্লাহর দিকে ডেকেছে, নেক কাজ করেছে এবং বলেছে “আমি মুসলমান”-(হামীম সিজদাহ: ৩৩)।

এর পূর্বের আয়াতগুলোতে ঈমানদারদেরকে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তারপর এ আয়াতে তাদেরকে সেই আসল কাজের জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে যার জন্যে তারা মুসলমান হয়েছে। পূর্বৈর আয়াতগুলোতে তাদেরকে বলা হযেছে যে তারা নে আল্লাহর দাসত্ব- আনুগত্যে অবিচল থাকে এবং এ পথ অবলম্বন করার পর তার থেকে বিচ্যুত না হওয়াটাই বুনিয়াদী নেক কাজ যা মানুষকে ফেরেশতাদের বন্ধু বেহেশতের অধিকারী বানিয়ে দেয়। এখন তাদেরকে বলা হচ্ছে যে পরবর্তী মর্যাদা, যার চেযে উচ্চতর মর্যাদা মানুষের জন্যে আর নেই, এই যে, সে স্বয়ং নেক আমল করবে এবং অন্যকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে ডাকবে। তারপর যেখানেই ইসলামের ঘোষণা করার অর্থ নিজের উপরে বিপদমুসিবতের আহ্বান জানানো, এমন প্রতিকূল  ও বিরুদ্ধ পরিবেশে নির্ভযে বলবে,- “আমি মুসলমান –আল্লাহর অনুগত।”

এ এরশাদের পুরোপুরি গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্যে সে সময়ের পরিবেশ পরিস্থিতি সামনে রাখতে হবে- যখন এ কথা বলা হয়েছিল। তখন অবস্থা এমন ছিল যে, যে ব্যক্তিই মুসলমান হওয়ার ঘোষণা করতো, সে হঠাৎ অনুভব করতো যে সে যেন হিংস্র পশুর বনে প্রবেশ করেছে এবং প্রতিটি হিংস্র পশু তাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে খেয়ে ফেলার জন্যে দৌড়ে আসছে। এর থেকে অগ্রসর হয়ে যে ব্যক্তি ইসলামের তবলিগের জন্যে মুখ খুলেছে, সে যেন হিংস্র পশুদেরকে আহ্বান জানাচ্ছে- এসে আমাকে চিবিয়ে গিলে খাও। এমন অবস্থায় বলা হলো যে কোন ব্যক্তির  আল্লাহকে প্রভৃ বলে মেন  নিয়ে সোজা পথ অবলম্বন করা এবং তার চেয়ে বিচ্যুত না হওয়া নিঃসন্দেহে বড়ো বুনিয়াগী নেক কাজ। কিন্তু উচ্চতম পর্যায়ের নেক কাজ এই যে, সে ব্যক্তি জনসমক্ষে দাঁড়িযে ঘোষণা করবে- “আমি মুসলমান” এবং পরিণামের কোন পরোয়া না করে মানুষকে আল্লাহর বন্দেগীর দাওয়াত নেবে। আর এ কাজ করতে গিয়ে নিজের আমল এতোটা পূতপবিত্র রাখবে যে ইসলাম তার পতাকাবাহীদের কোন দোষ ধরার সুযোগ না থাকে। (****১২)

মন্দের মুকাবিলা সবচেয়ে ভালো দিয়ে

(আরবী********************)

-হে নবী (সা), পণ্য ও পাপ সমান হয়না। তুমি পাপকে সেই পূণ্য কাজ দিয়ে প্রতিরোথ কর- যা সবচেয়ে ভালো। তাহলে তুমি দেখবে যে, তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে  তোমার প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে- (হামীম সিজদা: ৩৪)।

এ এরশাদের পুরোপুরি মর্ম উপলব্ধি করতে হলে সে অবস্থাকে সামনে রাখতে হবে যে অবস্্যথায় নবীকে (সা) এবং তাঁর মাধ্যমে তাঁর অনুসারীগণকে এ হেদায়েত দেয়া হয়েছিল। অবস্থা এই ছিল যে, দাওয়াতের মুকাবিলা চরম হঠকারিতা এবং চরম আক্রমণাত্বক বিরোধিতার সাথে করা হচ্ছিল। নবী (সা) কে বদনাম করার জন্রে এবং তার প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করার জন্যে সব ধরনের অপকৌশল অবলম্বন করা হচ্ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রারের অবিযোগ আরোপ করা হচ্ছিল। বিরুদ্ধ প্রাচরণাকারীর একটা দল নবীর বিরুদ্ধে মানুষের মনে প্ররোচনা সৃষ্টি করতে থাকে। তাঁকে ও তাঁর সংগী সাথীদের উপর নানাপ্রকার নির্াতন চলতে পারে। অতীষ্ট হযে ‍মুসলমানদের বেশ কিছু সংখ্যক লোক দেশ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন। তারপর নবীর তবলিগ বন্ধ করার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয় যে, তারা হৈ হুল্লোড় করর জন্যে তাঁর দিকে ওঁত পেতে থাকতো। তখনই তিনি দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে মুখ খুলণতেন, তখন তারা এমন হৈ হল্ল করতো যে তাঁর কোন কথাই শুনা যেতোনা। এ এমন এক নিরুৎসাহব্যঞ্জক অবস্থা ছিল যে, দৃশ্যতঃ দাওয়াতের সকল পথই রুদ্ধ বলে মনে হতো। সে সমযে বিরোধিতার শক্তি চূর্ণ করার জন্যে প্রতিকার ব্যবস্থা নবীকে শিখিয়ে দেয়া হয়।

প্রথম কথা এই বলা হয় যে, নেকী ও বাদী বা পাপুণ্য সমান হতে পারেনা। প্রকাশ্যতঃ তোমার বিরুদ্ধবাদীরা অনাচার পাপাচরের যতো প্রচন্ড ঝড়ই সৃষ্ট করুকনা কেন, যার মুকাবিলায় নেকী বা সততা সৎকর্ম একেবারে অসহায়-শক্তিহীন মনে হয়, কিন্তু মানুষ যতোক্ষণ মানুষ বলে বিবেচিত হবে, তার স্বভাব প্রকৃতি অনাচর পাপাচরের প্রতি ঘৃণ্য প্রদর্শন না করে পারে না। পাপাচারে সহযোগীই নয়, বরঞ্চ তার পতাকাবাহী স্বয়ং অন্তরে এ কথা বিশ্বাস করে যে সে মিথ্যাবাদী এবং জালেম এবং আপন স্বার্থের জন্যৌই হঠকারিতা করে চলেছে। এতে করে অপরের অন্তরে তার জন্যে শ্রদ্ধা সৃষ্টি করা ত দূরের কথা, স্বয়ংয় নিজেদের চোখেই নিজেদেরকে হেয় করা হয় এবং তাদের নিজেদের মনের মধ্যেই একটা ভীতি লুক্কায়িত থাকে যা বিরোধিতার পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় তাদের সাহস ও সংকল্পকে ভেতর থেকে ্‌াঘাত করতে থাকে। এ দুস্কর্মের মুকাবিলায় যাদি সেই সৎকর্ম অনবরত অব্যাহত থাকে, তাহলে অবশেষে তা বিজয়ী হয়েই থাকে। কারণ সৎকর্মের মধ্যে স্বয়ং একটি শক্তি থাকে যা মনকে বশীভূত করে এবং মানুষ যতোই অধঃপতিত হোক না কেন, আপন মনে তার জন্যে শ্রদ্ধা অনুভব না হয়েই পারেনা। তারপর যখন পাপ ও পুণ্য সংগ্রামরত হয় ইবয় উভয়ের গুণাগুণ জনসাধারণের মধ্যে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ং, তখন এমতাবস্থায় কিছুকাল যাবত সংঘাত সংঘর্ষের পর এমন লোক খুব কমই থাকে যে পাপের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও পুণ্যের প্রতি অনুরুক্ত হয় না।

দ্বিতীয় কথা এ বলা হয়েছে যে, পাপের মুকাবিলা শুধু পুণ্যের দ্বারা নয়, এমন পুণ্যের দ্বারা করতে হবে- যা খুবই উচ্চমানের হয়। অর্থাৎ কেউ যদি আপনার সাথে অসৎ ব্যবহার করে এবং আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন তাহলে এ নিছক একটা নেক কাজ হলো। অতি উচ্চমানের নেক কাজ এই যে, যে আপনার সাথে অসাদাচরণ করলো, আপনি সুযোগ হলে তার সাথে সদাচরণ করুন।

তার সুফল এই বলা হয়েছে যে, চরম দুশমনও পরম বন্ধু হয়ে যাবে। কারণ, এই হলো মানবীয় প্রকৃতি। গালির জবাবে নীরব থাকলে নিঃসন্দেহে একটি  নেক কাজ হবে। কিন্তু এতে গালিদানকারীর মুখ বন্ধ করা যাবেনা। কিন্তু যদি আপনি গালির জবাবে তার জন্যে দোয়া করেন তাহলে আপনার চর নির্লজ্জ দুশমনও লজ্জিত হয়ে পড়বে এবং কদাচিৎ হয়তো সে আপনার বিরুদ্ধে মুখ খুলেবে। ধরুন, কোন ব্যক্তি আপনার ক্ষতি করার জন্যে কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনা এবং আপনি তার বাড়াবাড়ি বরদাশ্‌ত করেই চল্লেন, তাহলে এমনও হতে পারে যে সে আপনার ক্ষতি করার জন্যে অধিকতর সাহসী হয়ে পড়বে। কিন্তু যদি কখনো এমন হয় যে সে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং আপনি তাকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করলেন, তাহলে সে আপনার পায়ে পড়ে যাবে। কেনন কোন দুস্কৃতি এ সুকৃতির মুকাবিলায় খুব কমই টিকে থাকতে পারে। তথাপি এ সাধারণ নীতি পদ্ধতি এ অর্থে গ্রহণ করা সঠিক হবেনা যে এ উচ্চ পর্যায়ের সুকর্ম-সুকৃতি অবশ্য অবশ্যই প্রত্যেক চরম দুশমনকে পরম বন্ধতে পরিণত করবে। দুনিয়ায় এমন ইতর প্রকৃতির লোকও আছে যে, আপনি তার বাড়াবাড়ি ক্ষমা করার এবং তার মন্দের জবাব সদাচরণ সহ দেয়ার যতোই মহত্ত্ব প্রদর্শন করুন না কেন, সে বিচ্ছুর ন্যায় বিষাক্ত হুল ফুটাতে ক্ষুণ্ণ হবেনা।

কিন্তু এ ধরনের দুষ্কৃতির মূর্তপ্রতীক মানুষ খুবই কমই পাওয়া যায় যেমন কল্যাণের মূর্ত প্রতীক মানুষের অস্তিত্ব অতি নগণ্য হয়ে থাকে। (***১৩)

দাওয়াতে হকে ধৈর্যের গুরুত্ব

(আরবী***********************)

অতঃপর এরশাদ হলো-

-“এ গুণাবলীর সৌভাগ্য হয়ে শুধু তাদের যারা সবর করে এবং এ মর্যাদালাভ শুধু তারাই করতে পারে- যারা বড়ই সৌভাগ্যবান- (আয়াত: ৩৫)।

অর্থাৎ এ ব্যবস্থাপত্রও বড়ো ফলপ্রসূ। কিন্তু তার প্রয়োগ যেমন তেমন কথা নয়। তার জন্যে প্রয়োজন বিরাট মনোবলের। তার জন্যে বিরাট সংকল্প, সাহসিকজতা, ধৈর্যশক্তি এবং আপন প্রবৃত্তির উপর বিরাট আধিপত্যের প্রয়োজন। সাময়িকভাবে এক ব্যক্তি কোন দুষ্কৃতির মুকাবিলায় ভালো কাজ করতে পারে। এ অসাধঅরণ কিছু নয়, কিন্তু যেখঅনে কাউকে বছরের পর বছর ধরে এমন সব বাতিল পন্থী দুষ্কৃতিকারীদের মুকাবিলায় সত্যের জন্যে লড়তে হয় যারা নৈতকতার কোন সীমা লংঘন করতে ইতস্ততঃ করেনা এবং ক্ষমতা মদমত্ত হয়ে থাকে, সেখানে দুষ্কর্মের মুকাবিলা সৎকর্ম দিয়ে করে যাওয়া এবং তাও উচ্চমানের সৎকর্ম দিয়ে, এবং একবারও ধৈর্যচ্যুত না হওয়া- কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কাজ সে ব্যক্তিই করতে পারে, যে ঠান্ডা মাথায় হকের সমুন্নতির জন্যে কাজ করার দৃঢ় সংকল্প পোষণ করে। যে ব্যক্তি পুরোপুরি তার প্রবৃত্তিকে জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেকের কোন দুষ্কৃতি নোংরামি তাকে তার উচ্চ স্থান থেকে নীচে নামিযে আনতে এবং ধৈর্যহারা করে ফেলতে পারেনা।

তারপর এই যে বলা হয়েছে, “এ মর্যাদা শুধু তারাই লাভ করতে পারে যারা বড়ো সৌভাগ্যবান।” ত এ হলো প্রাকৃতিক বিধান। বিরাট মর্যাদাশীল লোকই এসব গুণে গুনান্বিত হয়। আর যাদের এসব গুণাবলী থাকে, দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদেরকে সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌছতে রুখতে পারেনা। এটা কিছুতেই সম্ভব নয় যে, ইতর শ্রেণরি লোক তাদের ইতরামি, ঘৃণ্য কলাকৌশল এবং অভদ্র আচরণের দ্বারা তাকে পরাভূত করতে পারবে। (****১৪)

শয়তানের উস্কানি থেকে খোদার আশ্রয়

শেষে বলা হয়েছে (আরবী*****************)

আর শয়তানের পক্ষ থেকে যদি কোন উস্কানি অনুভব কর তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর (আয়াত: ৩৬)

শয়তান ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যখন সে দেখে যে হক ও বাতিলের দ্বন্দে ইতরামির মুকাবিলা ভদ্রদ্বারা এবং দুষ্কৃতির মুকাবিলা সুকৃতির দ্বারা করা হচ্ছে। সে চায় যে কোন প্রকারে একবার হলেও সত্যের জন্য সংগ্রামকারী তাদের নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষ করে তাদের প্রধান পরিচালক কোন না কোন ভুল করে ফেলুক যার ভিত্তিতে জনগণকে বলা যবে যে, দেখ তালি এক হাতি বাজেনা। এক পক্ষ থেকে যদি কিছু মন্দ আচরণ করা  হয়েই থাকে, ত অন্য পক্ষও এমন ভালো মানুষ নয়। অমুক অভদ্র আচরণ ত তারাও করেছে। সাধারণ মানুষের এ যোগ্যতা নেই , তারা সুবিচারের দৃষ্টিকণে থেকে একপক্ষের বাড়াবাড়ি এবং অপরপক্ষের পাল্টা পদক্ষেপের মধ্যে কোন তুলনামূলক বিচার বিবেচনা করতে পারবে। যতোক্ষণ তারা দেখতে থাকে যে, বিরুদ্ধবাদীরা সবরকমের নীচতা অবলম্বন করছে, কিন্তু প্রতিপক্ষ ভদ্রতা, শালীনতা ও সততা ধার্মিকতার পথ থেকে এতটুকুও বিচ্যুত হচ্ছে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত জনগণ এর দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। কিন্তু যদি কোথাও এদের পক্ষ থেকে কোন অন্যায় আচরণ অথবা এদের মর্যাদর হানিকর কোন আচরণ করা হয়, তা চরমবাড়াবাড়ির জবাবেই করা হোক না কেন, তাহলে তাদের দৃষ্টিতে উভয় পক্ষই সমান বলে বিবেচিত হয়। ফলে বিরুদ্ধবাদীরাও একটি কথার জবাবে হাজারটি গালি দেয়ার বাহানা পেয়ে যায়। এ জন্যেই এরশাদ হচ্ছে- শয়তানের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাক। সে বড়ো দরদী ও শুভাকাংখী সেজে তোমাদের উস্কানি দেবে এই বলে যে, “অমুক বাড়াবাড়ি ত কিছুতেই বরদাশত করা যায়না, অমুক কথার দাঁতভাঙা জবাব দেয়া উচিত, এ হামলার জবাবে পাল্টা হামলা করা উচিত। নতুবা তোমাদেরকে কাপুরুষ মনে করা হবে এবং তোমাদে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে প্রত্যেক ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে যখন এ ধরনের উস্কানি অনুভব করবে, তখন সাবধান হয়ে যাবে যে শয়তান তার উস্কানি দ্বারা তোমাদের উত্তেজিত ও রাগান্বিত করে তোমাদের দ্বারা কোন ভুল পদক্ষেপ করাতে চায়। সাবধঅন হওয়ার পর, তোমরা যেন এ অহমিকার শিকার হয়ে একথা না বল “আমাদের নিজেদের উপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। শয়তান আমাদের দ্বারা ভুল করাতে পারবেনা।” নিজেদের উপরোক্ত ইচ্ছ ও সিদ্ধান্ত শক্তির অহমিকাহ শয়তানের দ্বিতীয় বৃহত্তর ভয়াবহ প্রতারণা হবে। তার পরিবর্তে তোমপাদের খোদার আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ একমাত্র তিনিই যদি তওফিক দান করেন এবং হেফাজত করেন তাহলেই মানুষ ভুল করা থেকে বাঁচতে পারে।

এ বিষয়ে অতি সুন্দর ব্যাখ্যা এমন এক ঘটনা থেকে পাওয়া যায় ইমাম আহমদ হযরত আবু হুরায়রা (রা) বরাত দিয়ে তাঁর মুসনাদে উধৃত করেছেন। তিনি বলেন যে, একদা এ ব্যক্তি নবী (সা) এর উপস্থিতিতে হযরত আবু বকরকে (রা) চরম গালি দিতে থাকে। হযরত আবু বরক (রা) নীরবে তার গালি শুনতে থাকে। নবীও (সা) তা দেখে মৃদু হাস্য করতে থাকেন। অবশেষে হযরত আবু বকরের (রা) ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং তিনিও প্রতুত্তরে একটি শক্ত কথা বলে ফেলেন। তাঁর মুখ থেকে সে কথাটা বেরুতেই নবী (সা) ভয়ানক অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন এবং তা তাঁর মুখমন্ডলে প্রতিভাত হয়ে পড়লো। তারপর তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন। আবু বকরও (রা) তাঁর পেছনে পেছনে চলতে থাকেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “একি ব্যাপার” সে আমাকে গালি দিচ্ছিল এবং আপনি মুচকি মুচকি হাসছিলেন তারপর আমি জবাব দিতেই আপনি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লেন।

নবী (সা) বল্লেন, যতোক্ষণ তুমি নীরব ছিলে, একজন ফেরেশতা তোমার সাথে ছিল, যে তোমার পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছিল। তারপর তুমি যখন মুখ খুল্লে তখন ফেরেশতার জায়গায় শয়তান এসে গেল। আমি ত শয়তানের সাথে বসেথাকতে পারি না। (১৫)

হকের আহ্বায়ককে হতে হবে নিঃস্বার্থ

হকের দাওয়াতে তার আহ্বায়ককে তার ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধে থাকতে হবে এবং এটই হবে তার সততা ও নিষ্ঠার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কুারআন পাকে বার বার বলা হযেছে যে নবী (সা) দাওয়াতে ইলাল্লাহর যে কাজ করছেন তাতে তাঁর কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। বরঞ্চ তিনি খোদার সৃষ্ট জীবের কল্যাণের জন্যেই তিনি তাঁর উৎসর্গী করেছেন। সূরায়ে আনয়ামে বলা হয়েছে-

(আরবী***************)

-হে নবী (সা), বলে দাও- আমি এ তবলিগ ও হেদায়েতের কাজে তোমাদের কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক চাই না। এত এক সাধারণ নাসিহত সমস্ত দুনিয়াবাসীদের জন্যে- (আনয়াম: ৯০)।

-এবং হে নবী (সা), তুমি এ কাজের জন্যে তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইছনা। এ ত একটি উপদেশ যা দুনিয়াবাসীদের জন্যে সাধারণ (ভাবে দেয়া হচ্ছে) (ইউসুফ: ১০৪)।

এ সম্বোধন প্রকাশ্যতঃ নবী (সা) এর প্রতি কিন্তু এর প্রকৃত দ্বিতীয় পুরষ কাফেরদের জনতা, তাদেরকে এভাবে জুখানো হচ্ছে, আল্লাহর বান্দারা, একটু চিন্তা করে দেখ! তোমাদের এ হঠকারিতা এত অসংগত। পয়গম্বর যদি তাঁর কোন ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে দাওয়াত ও তবলিগের এ কাজ করতেন অ্যথবা যদি তিনি তাঁর নিজের জন্যে কিছু তাইতেন, তাহলে তোমাদের এ কথা অবশ্যই বলার সুযোগ থাকতো- এ স্বার্থবাদী লোকের কথা আমরা কেন মানব? কিন্তু তোমরা দেখছ যে এ ব্যক্তি নিঃস্বার্থ। তোমাদের জন্যে এবং দুনিয়াবাসীদের কল্যাণের জন্যে সে নসিহত করছে। এতে তার নিজের কোন স্বার্থ নেই। হঠকারিতার সাথে তার মুকাবিলা করার কি সংগত কারণ থাকতে পারে? যে ব্যক্তি সকলের মংগলের জন্যে নিঃস্বার্থভাবে কোন কথা বলে, অকারণে তার বিরুদ্ধে তোমরা জিদ ধরে বসেআছ কেন? খোলামনে তার কথা শোন। মনে লাগে ত মান, না লাগলে মেননা। (১৬)

সূরায়ে মূমেনূনে বলা হয়েছে:-

(আরবী***************)

-হে নবী (সা), তুমি কি তাদের নিকটে কিছু চাইছ? তোমার জন্যে তোমার রবের দানই উৎকৃষ্টতর এবং তিনি সর্বোত্তম রিযিকদাতা- (মুমনূন: ৭২)।

অর্থাৎ কোন ব্যক্তিই ঈমানদারীর সাথে নবীর (সা) উপরে এ অভিযোগ করতে পারেনা যে, তিনি যতোকিছু করছেন তার পশ্চাতে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে। একদা তাঁর বিরাট ব্যবসা বাণিজ্য ছিল। এখন তিনি দরিদ্র পীড়িত। একসমযে জাতি তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো, প্রত্যেকে পরম শ্রদ্ধা জানাতো। এখন তিন গালি ও পাথরের আঘাত ভোগ করছেন। এখন তাঁর জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এক সময়ে তিনি বিবি বাচ্চাসহ আনন্দে জীবন যাপন করছিলেন। এখন এমন এক দ্বন্দ্বসংঘর্ষে জড়িত হয়ে পড়েছেন যা তাঁকে একমুহূর্তেও শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেনা। উপরন্তু তিনি এখন এমন এক বাণী নিয়ে অবির্ভূত হয়েছেন যে, সমগ্র দেশ তাঁর দুশমন হয়ে পড়েছে। এমনকি স্বয়ং তাঁর আপনজনও তার রক্তপিপাসু হয়ে পড়ছে। কে বলতে পারে যে এসব একজন স্বার্থপর লোকের কাজ? স্বার্থবাদী ত তার জাতি ও গোত্রের কুসংস্কারের পতাকাবাহী হয়ে নানা লোকের কাজ? স্বার্থবাদী ব্যক্তি ত তার জাতি ও গোত্রের কুসংস্কারের পতাকাবাহী হয়ে নানা কলাকৌশলে নেতৃত্ব লাভের চেষ্টা করে। স্বার্থপর ব্যক্তি এমন আদর্শের প্রচার করেনা যা শুধু গোত্রীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জই নয়, বরঞ্জ তা নির্মূল করে দেয়  যার ভিত্তিতে আরবের মুশরিকদের প্রভুত্ত নেতৃত্ব কায়েম রয়েছে। (১৭)

সূরায়ে সাবায় বলা হয়েছে-

(আরবী*****************)

-হে নবী (সা), বলে দাও, যদি আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চেয়ে থাকি, তা তোমাদেরই জন্যে। আমার পারিশ্রমিক ত আল্লাহর দায়িত্বে। তিনি ত সবকিছুর সাক্ষী –(সাবা:ঢ় ৪৭)।

আয়াতের প্রথমাংশের দুটি অর্থ হতে পারে। এক এই যে, আমি যদি তোমাদের কাছে কিছু পারিশ্রমিক চেয়ে থাকি, তা তোমাদের ভাগ্যেরই ঘটুক। ‍দ্বিতীয় অর্থ এই যে, আমি তোমাদের নিকটে কোন পারিশ্রমিক চেয়ে থাকলে তা তোমাদের মংগল ছাড়া আর কিছু নয়। শেষাশের অর্থ এই যে, অভিযোগকারীরা যতো খুশি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করুক। কিন্তু আল্লাহ সবকিছুই জানেন। তিনিই সাক্ষী যে আমি এ কাজ নিঃস্বার্থভাবে করছি, কোন ব্যক্তিস্বার্থে করছিনা। (১৮)

(আরবী*****************)

-হে নবী (সা), বলে দাও আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইনা। আর না আমি কৃত্রিম- বানোয়াট লোকের একজন- (সা’দ: ৮৬)।

অর্থাৎ আমি তাদের মধ্যে একজন নই যারা তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্যে মিথ্যা দাবী সহ ময়দানে নামে এবং সে এমন কিছু সাজে যা সে প্রকৃত পক্ষে নয়।

একথা শুধু মক্কায় কাফেরদেরকে জানিয়ে দেবার জন্যে নবীর (সা) মুখ দিয়ে বলানো হয়নি। বরঞ্চ এর পশ্চাতে হুযুরের (সা) গোটা জীবন সাক্ষ্য দেয় যা চল্লিষ বছর যাবত তিনি এসব কাফেরদের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন। মক্কায় প্রতিটি শিশু পর্যন্ত এ কথা জানতো যে মুহাম্মদ  (সা) কোন বানোয়াটি লোক নন। সমগ্র জাতির মধ্যে কোন ব্যক্তিই তার মুখ থেকে এমন কোন কথা শুনেনি যার থেকে এ সন্দেহ করা যেতো যে তিনি কিছু হতে চান এবং নিজেকে খ্যাতনামা বানাবার প্রচেষ্টায় আছেন। (১৯)

সূরায়ে তূর ও কলমে বলা হয়েছে-

(আরবী****************)

-হে নবী (সা), তুমি কি তাদের কাঝে কোন পারিশ্রমিক চাইছ যে তারা জবরদস্তিমূলক জরিমানার বোঝার তলে নিষ্পেষিত হয়ে আছে?- (তূর : ৪০, কলম: ৪৬)।

এ প্রশ্নে আসলে সম্বোধন করা হচ্ছে কাফেরদেরকে। তার অর্থ এই যে, যদি রসূল  তোমাদের কাছ থেকে কোন উদ্দেশ্যে হাসিল করতে চাইতেন এবং যদি আপন স্বার্থের জন্যে এ সব চেষ্টা চরিত্র করছেন, তাহরে তার থেকে তোমাদের দূরে সরে যাওয়ার ত অন্ততঃ পক্ষে একটা সংগত কারণ থাকতো। কিন্তু তোমরা স্বয়ং জান যে তিনি তার এ দাওয়াতে একেবারে নিঃস্বাথ এবং নিছক  তোমাদের কল্যাণের জন্যেই তিনি জীবনপাত করছেন। তারপর কি কারণ থাকতে পারে যে তোমরা শান্তমনে তার কথা শুনতে পর্যন্ত তৈরী নও। এ প্রশ্নের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম  ইংগিত প্রচ্ছন্ন আাছে। সারা দুনিয়ার কৃত্রিম ও বানাওটি নেতাদের এবং ধর্মীয় আস্তানার পুরোহিতদের মতো আরবেও মুশরিকদের ধর্মীয় নেতা, পন্ডিত ও পুরোহিতগণ প্রকাশে ধর্মীয় ব্যবসা চালাতো। সে জন্যে এ প্রশ্ন তাদের সামনে রাখা হলো যে এক দিকে এসব ধর্মব্যবসায়ী রয়েছৈ যারা প্রকাশে তোমার কাছে নযর-নিয়াযা চাইছে এবং প্রতিটি ধর্মীয় খেদমতের জন্যে পারিশ্রমিক দাবী করছে। অপরদিকে এ ব্যক্তি একেবারে নিঃস্বার্থভাবে, বরঞ্চ নিজের ব্যবসা বাণিজ্য বরবাদ করে তোমাদের ন্যায়সংগত যুক্তিসহ দ্বীনের সোজা পথ দেখাবার চেষ্টা করছে। এখন এ সুস্পষ্ট অজ্ঞতা ছাড়া আর কি হতে পারে যে তোমরা তার থেকে পলায়ন করছ এবং ধর্মব্যবসায়ীদের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছ? (২০)

এ প্রসংগে শুধু একটি আয়াত পাওয়া যায় যা নিয়ে কিছু বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। তা হলো:-

(আরবী***************)

-হে নবী (সা), বল- আমি তোমাদের নিকটে কোনই পারিশ্রমিক চাইনা চাই শুধু নৈকট্যের ভালোবাসার জন্যে –(শূরা: ২৩)।

এ আয়াতে (*****)

শ্বদ যে ব্যবহৃত হয়েছে তার অর্থ করতে গিযে তফসীরকারদের মধ্যে বিরাট মতানৈক্য হয়েছে। এক দল একে আত্মীয়তার অর্থে নিয়েছেন। তারা আয়াতের অর্থ এরূপ বলেছৈন: -“এ কাজের জন্যে আমি তোমাদের নিকটে কোন পারিশ্রমিক চাইনা। কিন্তু এটা অবশ্যই চাই যে তোমরা (অর্থাৎ কুরাইশগণ) অন্ততঃ সে আত্মীয়তার প্রতি ত খেয়ালা রাখবে যা তোমাদের ও আমার মধ্যে রয়েছে। তোমাদের ত উচিত ছিল আমার কথা মেনে নেয়া। কিন্তু যদি না-ই মান,  ত এই অন্যায় করোনা যে সমগ্র আরবের মধ্যে সবচেয়ে অধিক তোমরাই আমার শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগেছে।”

এ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর তফসীর। একে অনেক রাবীর বরাত দিয়ে ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি, ইবনে জারীর, তাবারানী, বায়হাকী, ইবনে সা’দ প্রমুখ মনীষীগণ নকল করেছেন। আর এ তফসীর করেছেন মুজাহিদ, ইকরাম, কাতাদাহ, সুদ্দী, আবু মালেক, আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম, দাহ্‌হাক, আতা বিন দীনার এবং অন্যান্য প্রখ্যাততফসীরকারগণ।

অন্য একটি দল (আরবী**********)

কে নৈকট্যের অর্থে গ্রহণ করেছেন। তারা এ আয়াতের অর্থ এ ভাবে করেছেন: আমি এ কাজের জন্যে তোমাদের নিকটে এ ছাড়া অন্য কোন পারিশ্রমিক চাইনা যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের অভিলাষ সৃষ্টি হোক। অর্থাৎ তোমরা ঠিক হয়ে যাও। এই হলো আমার পারিশ্রমিক। এ তাফসীর হযরত হাসান বসরী থেকে বর্ণিত। এর সমর্থনে কাতাদার একটা উক্তিও উধৃত আছে। বরঞ্চ তাবারানীর এক বর্ণনায় এ ধরনের উক্তি ইবনে আব্বাসের (রা) প্রতিও আরোপ করা হযেছে। স্বয়ং কুরআন মজিদের অন্য এক স্থানে এ বিষয়টিই এভাবে বলা হয়েছে:-

(আরবী***************)

-তাদেরকে বলে দাও: এ কাজের জন্যে আমি তোমাদের নিকটে কোন পারিশ্রমিক চাইনা, আমার পারিশ্রমিক এই যে, যার ইচ্ছা সে যেন তার রবের পথ অবলম্বন করে- (ফুরকান: ৫৭)।

অপর একটি দল

(******) কে আত্মীয় স্বজনের অর্থে গ্রহণ করেছেন। আয়াতের অর্থ তাঁদের মতে : আমি এ কাজের জন্যে তোমাদের নিকটে এ ছাড়া আর কোন পারিশ্রমিক চাইনা যে, তোমরা আমার আত্মীয় স্বজনকে ভালোবাসবে। তারপর এ দলের কিছু লোক আত্মীয় স্বজন বলতে গোটা বনী আবদুল মুত্তালিবকে বুঝিয়েছেন?। কেউ কেউ আবার একে হযরত আলী (রা), হযরত ফাতেমা (রা) এবং তাঁদের সন্তানদের মধ্যেই সীমিত রেছেখেন। এ তফসীর সাঈদ বিন জুবাইর এবং আমার বিন শুয়াইব করেছেন বলে বর্ণিত আছে কোন কোন বর্ণনায় একে ইবনে আব্বাস (রা) এবং আলী বিন হুসাইন (রা) অর্থাৎ যয়নুল আবেদীনের তফসীর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এ তফসীর গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। প্রথম কথা এই যে যখন মক্কায় এ সূরা শুরা নাযিল হয়, তখন হযরত আলী (রা) ও হযরত ফাতেমার (রা) মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। সন্তানাদির ত প্রশ্নই ওঠেনা। তারপর বনী আবদুল মুত্তালিবের সকলেই নবীর (সা) সহযোগী ছিলনা। বরঞ্চ তাদের মধ্যে কতিপয় ত প্রকাশে দুশন ছিল। আবু লাহাবের দুশমনি ত দুনিয়ার সবাই জানে। দ্বিতীয়তঃ নবী (সা) এর আত্মীয়তা শুধু বনী আবদুল মুত্তালব পর্য়ন্তই সীমিত ছিলনা। তার মাতা পিতা এবং বিবির দিক দিয়ে কুরাইশদের সকল পরিবারে তার  আত্মীয়তা ছিল। আর এসব পরিবারে তার উন্নতমানের সাহাবীও ছিলেন এবং চরম দুশমনও ছিল। অতএব হুযুরের (সা) জন্যে এ কি করে সম্ভব ছিধল যে এসব আত্মীয় বর্গের মধ্যে শুধু বনী আবদুল মুত্তালিবকে তাঁর আত্মীয় বলে উল্লেখ করে ভালোবাসার দাবী তাদের জন্যেই নির্দিষ্ট করে রাখতেন? রাদিয়াল্লাহু আহু।

তৃতীয় কথা যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এই যে, একজন নবী যে উচ্চস্থানে দাঁড়িযে দাওয়াত ইলাল্লাহর আওয়াজ বুলন্দ করেন, যেস স্থান থেকে এ পারিশ্রমিক চাওয়া- “আর আত্মীয়দেরকে ভালোবাস’ –এমন এক নিম্নস্তরের দাবী যে কোন রুচিবান লোক এ ধারণাও করতে পারেনা যে আল্লাহতায়ালা তার নবীকে এমন কথা শিখিয়ে দিযেছেন এবং নবী কুরাইশদের মধ্যে দাঁড়িযে একথা ঘোষণা করেছেন। কুরআন পাকে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের যেসব কাহিনী বর্ণিত আছে, সেসবের মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে, নবীর পর নবী আগমন করতঃ তাদের জাতিকে সম্বোধন করে একথাই বলেছৈন: আমি তোমাদের কাছে কোনই পারিশ্রমিক চাইনা, আমার পারিশ্রমিক ত আল্লাহর দায়িত্বে। (ইউনুস “ ৭২, হুদ: ১৯, ৫১, শুয়ারা: ১০৯, ১১৭, ১৪৫, ১৬৪, ১৮০ দ্রষ্টব্য)।

সূরায়ে ইয়াসিনে নবীর সত্যতা পরীক্ষার মানদন্ড এ বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর দাওয়াতে একেবারে নিঃস্বার্থ (আয়াত-২১)। স্বয়ং নবী (সা) এর যবান মুবারক দিয়ে একথা বার বার বলানো হযেছে, -“আমি তোমাদের নিকটে কো পারিশ্রমিক চাইনা।” উপরে আমরা তা উধৃত করেছি। অতঃপর এ কথা বলার আর অবকাশ কোথায, “আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে দাওয়াত দেয়ার যে কাজ করছি তার বিনিময়ে তোমরা আমর আত্মীয় স্বজনকে ভালোবাস?” এ কথা আরও প্রাসংডিগক মনে হয় যখন আমরা দেখি যে এ ভাষণে আহল ঈমাকে সম্বোধন করা হচ্ছেনা, বরঞ্চ করা হচ্ছে কাফেরদেরকে। আগাগোড়া তাদেরকে সম্বোধন করেই বলা হচ্ছে এবং সামনেও তাদেরকে লক্ষ্য করেই কথা বলা হয়েছে। এ ধারাবাহিক ভাষণে বিরুদ্ধবাদীদের নিকটে কোন রকমের পারিশ্রমিক চাওয়ার প্রশ্নই বা কি করে উঠতে পারে? পারিশ্রমিক ত তাদের কাছে চাওয়া যায় যারা সে কাজের কিছু আদর-কদর করে যা তাদরে জন্যে করা হয়। কাফেরগণ হুযুরে এ কাজের কি মর্যাদাই বা দিচ্ছিল যার জন্যে তিনি তাদেরকে বলতৈ পারতেন, “যে খেদমত আমি করছি তার জন্যে আমার আত্মীয় স্বজনকে ভালোবাসবে।” তার ত বরঞ্চ এটাকে অপরাধ গণ্য করে তার জীবন নাশের চেষ্টা করছি। (***২১)

দাওয়াতের সূচনায় আখেরাত বিশ্বাসের প্রতি গুরুত্ব

মক্কা মুয়ায্যামায় প্রথম যখন নবী (সা) ইসলাম তবলীগের সূচনা করেন তখন তার বুনিয়াদ ছিল তিনটি বিষয়। এক: আল্লাহর সাথে আর কাউকে খোদায়ীতে শরীক মানা যাবেনা। দ্বিতীয়তঃ মুহাম্মদকে (সা) আল্লাহতায়ালা তাঁর রসূল মনোনীত করেছেন । তৃতীয়তঃ এ দুনিয়অ একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তারপর এক দ্বিতীয় জগত অস্তিত্ব লাভ করবে। সেখানে শুরু থেকে শেষ পর্য়ন্ত সকল মানুষকে পুনর্জীবিত করে সে দেহসহ পুনরুথিত করা হবে যে দেহসহ তারা দুনিয়ার কাজকর্ম করেছে। তাপর তাদের আকীদাহ- বিশ্বাস ও কাজকর্মের হিসাব নেয়া হবে। এ হিসাব নিকাশে যারা মুমেন ও সৎ প্রমাণিত হবে, তারা চিরকালের জন্যে বেহেশতে যাবে এবং যারা কাফের ও ফাসেক প্রমাণিত হবে তারা চিরকালের জন্যে দোজখে থাকবে।

এর মধ্যে প্রথমটি যদিও মক্কাবাসীদের জন্যে বড়ো অসহনীয় ছিল, তথাপি তারা কখনো আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি। তারা একথা মানতো যে তিনি মহান রব, স্রষ্টা এবং রিজিকদাতা ছিলেন। তারা একথাও মানতো যে যাদেরকে তার দেবদেবী বলে গণ্য করতো তারাও আল্লাহরই সৃষ্ট। এজন্যে বিতর্ক শুধু এ ব্যাপার ছিল যে খোদার গুণাবলীতে, এখতিয়ার এবং খোদায়ীতে এসব দেবদেবীর অংশীদারিত্ব ছিল কিনা।

দ্বিতীয় বিষয়টি মক্কাবাসী মানদন্ডে মাতে প্রস্তুত ছিলনা। কিন্তও এ কথা অস্বীকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা যে, নবুয়ত দাবী কারার পূরেব হুযুর (সা) যে চল্লিষ বছর তাদেই মধ্যে অতিবাহিত করেছেন, এ সময়ের মধ্যে তারা কখনো তাকে মিথ্যাবাদী, প্রতারক অথবা ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে অন্যায় পথ অবলম্বনকারী পায়নি। তারা স্বয়ং তার বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং চারিত্রিক মহত্ব স্বীকার করতো। এ জন্যে তার বিরুদ্ধে শত বাহানা তালাশ এবং অভিযোগ আরোপ করা সত্ত্বেও একথা অন্যকে বিশ্বাস করানো ত দূরের কথা নিজের পক্ষেও বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে তিন অন্যান্য ব্যাপারে ত সত্যবাদী কিন্তু শুধু রেসালাতের দাবীতে (মাযায়াল্লাহ) মিথ্যাবাদী। এভাবে প্রথম দুটি বিষয় তাদের জনে ততোটা জটিল ছিলনা যেমন ছিল, ‍তৃতীয় বিষয়টি। এ বিষয়টি যখন তাদের সামনে পেশ করা হলো, তখন সবচেয়ে বেশী তার জন্যে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হলো এতে সবচেযে বেশী বিস্ময় প্রকাশ করা হলো এবং অবান্তর ও অবাস্তব বলে সর্বত্র চর্চা শুরু হলো। কিন্তু তাদেরকে ইসলামের পথে আনার জন্যে তাদের মনে আখেরাতের বিশ্বাস বদ্ধমূল করা একেবারে অপরিহার্য ছিল্ কারণ এ বিশ্বাস ব্যতীত হক ও বাতিলের ব্যাপারে তাদের চিন্তাচেতনা সঠিক হওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিলনা। এছাড়া ভালো ও মন্দের মানদন্ড বদলানো এবং দুনিয়া পূজার পথ পরিত্যাগ করে সৎ পথে এক ধাপ অগ্রসর হওয়াও সম্ভব ছিলনা, যে পথে ইসলাম চালাতে চাইতো। এ কারণেই মক্কায় প্রাথমিক যুগের সূরাগুলোতে বেশীর ভাগ আখেরাতের বিশ্বাস মনে বদ্ধমূল করার জন্যে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। অবশ্যি তার জন্যে যুক্তি প্রমাণ এমনভাবে পেশ করা হয়েছে যার জন্যে তাওহীদের ধারণাও আপনাআপনি হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়েছে। সেইসাথে মাঝে মাঝে রসূল (সা) এবং কুরআন সত্য হওয়ার প্রামাণও সংক্ষেপে পেশ করা হয়েছে। (****২২)

নির্দেশিকা

১। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

২। তাফহীমুল কুরআন, ১ম খন্ড, ভূমিকা

৩। তাফহীমুল কুরআন, ২য় খন্ড, নহল, টীকা ১২২-১২৩

৪। তাফহীমুল কুরআন, বনী ইসরাইল, টীকা ৫৭-৬১

৫। তাফহীমুল কুরআন, আনয়অম, টীকা-৬৯

৬। তাফহীমুল কুরআন, আনয়অম, টীকা-৭১

৭। তাফহীমুল কুরআন আলা, টীকা-১০

৮। তাফহীমুল কুরআন, আনয়াম, টীকা ২৪-২৫

৯। তাফহীমুল কুরআন, আবাসা, ভূমিকা, ও টীকা-২০১

১০। তাফহীমুল কুরআন, আনকাবুত, টীকা- ৮১

১১। তাফহীমুল কুরআন, আ’রাফ, টীকা-১৫

১২। তাফহীমুল কুরআন, হাীম সিজদা, টীকা-৩৬

১৩। তাফহীমুল কুরআন, হামীম সিজদা, টীকা-৩৭

১৪। তাফহীমুল কুরআন, হামীম সিজদা, টীকা-৪০

১৬। তাফহীমুল কুরআন, ইউসুফ, টীকা-৭৩

১৭। তাফহীমুল কুরআন, মুমেনীন, টীকা-৭০

১৮। তাফহীমুল কুরআন, সাবা. টীকা-২৮-২৯

১৯। তাফহীমুল কুরআন, সোয়াদ, টীকা-৭২

২০। তাফহীমুল কুরআন, তূর, টীকা-৩১

২১। তাফহীমুল কুরআন, শুরা, টীকা-৪১

২২। তাফহীমুল কুরআন, সূরা নাবার ভূমিকা

মক্কা মুকাররামার মানচিত্র

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.