সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

৪র্থ খন্ড আরম্ভ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ষষ্ঠ অধ্যায়

দাওয়অতে ইসলামীর প্রকৃত স্বরূপ

মুশরিকদের শত্রুতার কারণ ও তাদের ব্যর্থার কারণ

এখন আরা সে আলোচনার দ্বিতীয় অংশ পরিবেশন করতে চাই যা পূর্ব অধ্যায়ে শুরু করা হয়েছিল। আমরা বলেছি যে, হুযুর (সা) কে এবং তাঁর মাধ্যমে তাঁর সংগী সাথীদেরকে ইসলামের দাওয়াতে ছড়াবার ব্যাপারে কোন সব হেদায়েত দেয়া হয়েছিল যাতে করে তাঁরা জাহেলিয়াতের ধ্বজাধারীদের বিরোধিতার মুকাবেলা নৈতিকতার হাতিয়ার দিয়ে করতে পারেন। হিকম, উদারতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারা তাদের মন জয় করতে পারেন। হঠকারিতা, অন্ধবিদ্বেষ এবং একগুঁয়েমির পাহাড় ন্যায়সংগত ও হৃদয়গ্রাহী করতে পারেন এবং জনগণের মধ্য থেকে বেছে বেছে তাদেরকে দলে ভিড়াতে পারেন যাদের মধ্যে সত্যের প্রতি অনুরাগ এবং সত্যকে মেনে চলার গুণাবলী পাওয়া যেতো।

তারপর আমরা বলতেচাই যে, নবী (সা) যে দাওয়াত নিয়ে আগমন করেছিলেন তার প্রকৃত স্বরূপ কি ছিল, তার বৈশিস্ট্য পূর্ণ গুণাবলী কি ছিল যার জন্যে সর্বপ্রথম কুরাইশ এবং তারপর আরবের অন্যান্য লোক তার বিরেদিতায় লেগে গেল? তারপর এ দাওয়ঢাতের এমন কোন্‌ শক্তি ছিল যা শেষ পর্য়ন্ত বিরুদ্দবাদীদেরকে স্তব্ধ করে দিয়ে এমন বিরাট সাফল্য লাভ করলো যার নজীর ইতহাসে পাওয়া যায়না।

বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে বিধায় একে আমরা সাতটি শিরোনামায় বর্ণনা করব। তা হলো:-

১। তৌহীদের শিক্ষা এবং শির্কের খন্ডন।

২। রেসালাতে ‍মুহাম্মদীর উপর ঈমানের দাওয়াত।

৩। কুরআন আল্লাহর বাণী-এর উপর ঈমানের দাওয়াত।

৪। াখেরাতের প্রতি ঈমানের দাওয়াত।

৫। নৈতিক শিক্ষা।

৬। বিশ্বজনীন মুসলিম উম্মাহর প্রতিষ্ঠা।

৭। নবী অনবীর কর্মপদ্ধতির পার্থক্য।

প্রথম অনুচ্ছেদ

তৌহীদের শিক্ষা ও শির্কের খন্ডন

দাওয়াতে ইসলমীর দফাগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বুনিয়াদী দফা হচ্ছে তৌহীদের স্বীকৃতি ও শির্কের খন্ডন। যদিও নবী (সা) স্বয়ং নবুয়তের পূর্বে তৌহীদে বিশ্বাসী ও শির্ক অস্বীকারকারী ছিলেন এবং তাঁর সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী আরববাসীদের মধ্যেও এ আকীদার লোক পাওয়া যেত, কিন্তু বিরাট পার্থক্য রয়েছে দু’ধরনের লোকের মধ্যে। এক ধরনের লোক শুধু তৌহীদ মেনে নেয়ার এবং শির্ক অস্বীকার করার আকীদাহ পোষণ করে এবং বড়োজোর তা প্রকাশ করাই যথেষ্ট মনে করে। আর একধদরনের লোক এ আকীদার প্রচার ও প্রসারের জনে দাঁড়িযে যায় এবং শির্ক পরিহার করে তৌহীদ মেনে নেয়ার জেন্য জনসাধারণের মধ্যে দাওয়াত দিতে থাকে। তারপর সে সরল আকীদাহ বিশ্বাস এবং এ প্রকাশ্য দাওয়াত ও তবলীগের মধ্যে যে জিনিস বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি করে তা এই যে, ব্যক্তি এ কাজের দায়িত্ব কাঁধে বহন করে থাকে এবং বিস্তারিতভাবে শুধুমাত্র খোদার একত্বই যুক্তিসহ প্রমাণ করে না, বরঞ্চ এ একত্বের অর্থ ও মর্ম এবং তা মেনে নেয়ার অনিবার্য দাবীগুলিও এক একটি করে বর্ণনা করে মানুষকে এ কথা বলে, “এ বিশদ ব্যাখ্যাসহ আল্লাহর তাওহীদের উপর ঈমান আন।”

এটাই ছিল সে কাজ যা নবী (সা) নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার পর করেছিলেন। আর এটাই কাফেরদেরকে সাথে তাঁর বিরোধিতার প্রথম কারণ। কারণ এর প্রত্যেকটি কথাই তাদের আকীদা, বিশ্বাস, কুসংস্কার এবং শত শত বছরের পুঞ্জীভূত  ধ্যান ধারণার সাথে ছিল সাংঘর্ষিক।

তৌহীদের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা

আরবের মুশরিক সমাজে আসল প্রশ্ন আল্লাহর তায়ালার অস্তিত্ব সম্পর্কে নয় বরঞ্চ তাঁর একত্ব মেনে নেয়াত সম্পর্কে ছিল। তারা আল্লাহকে নিজেদের এবং বিশ্বজগতের স্রষ্টা বলে মানতো। তাঁকে রব এবং ইলাহ মেনে নেতেও তারা অস্বীকার করতো না। তঁর বন্দেগী করাতেও তাদের কোন আপাত্তি ছিল না। অবশ্য যে গোমরাহিতে তারা লিপ্ত ছিল, তা ছিল এই যে, খোদায়ী এবং প্রভুত্ব-কর্তৃত্ব আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট-এ কথা তারা মনে করতোনা। সেই সাথে তারা আরও অনেক উপাস্যকেও খোদার অংশীদার মনে করতো। আল্লাহর এবাদতের সাথে তাদেরও এবাদতের প্রতি তারা বিশ্বাসী ছিল। (****১) তাদের অবস্থা এটাই ছিল যে-

(আরবী***************)

-এবং হ(হে নবী) যখন তুমি কুরআনে তোমার একমাত্র রবের কথা বল, তখন তরা ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। (বনী ইসরাইল: ৫৬)

অর্থাৎ এটা তাদের জন্যে অসহনীয় ছিল যে তুমি শুধু একমাত্র আল্লাহকেই প্রভু গণ্য করছ এবং তাদের বানানো বহু প্রভু ও খোদার কোন উল্লেখই তুমি করছ না। এ ওহাবীসুলভ (আজকালের পরিভাষায়) আচরণ তাদের এক মুহূর্তও মনঃপূত হচ্ছে না যে মানুষ শুধুমাত্র ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জপ করবে। না বুযুর্গানের জন্যে খরচপত্রের কোন উল্লেখ আর না আস্তানায়  ফয়েয হাছিল করার কোন স্বীকৃতি। আর না ঐসব ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রশংসাসূচক অভিনন্দন যাদের প্রতি তাদের ধারণায়, আল্লাহতায়ালা তাঁর খোদায়ী বন্টন করে দিয়েছিলেন। তারা বলে, এতো এক অদ্ভূত লোক যে, তার মতে ভবিষ্যতের জ্ঞান বলতে একমাত্র আল্লাহর, কুদরত বলতে একমাত্র আল্লাহর, কর্মকুশলতা এবং এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর। তাহলে আমাদের এসব আস্তানায় যারা আছে তারা কি কিছুই নয়? অথচ তাদের কাছে আমরা জ্ঞান লাভ করি, তাদের ইচ্ছায় রোগীর আরোগ্য লাভ হয়, ব্যবসা বাণিজ্য জমজমাট হয়, মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। তাহলে এরা কি কিছুতেই নয়? (২)

কুরআনের অন্যত্র তৌহীদের প্রতি তাদের বীতশ্রদ্ধা এবং শির্কে নিমজ্জিত থাকার অবস্থা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:

(আরবী*****************)

এবং যখন একাকী আলআহর উল্লেখ করা হয় তখন আখেরাত অবিশ্বাসকারীরা মর্মজ্বালা অনুভব করে এবং তিনি ছাড়া যখন অন্যান্যদের উল্লেখ করা হয় তখন হঠাৎ আনন্দে তাদের মন নেচে ওঠে। (যুমার: ৫৪)

দুনিয়অতে মুশরিকেসূলব রুচিপ্রকৃতি যাদের তাদের প্রায় সকলের কাছে একথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। তারা মুখে বলে, আমরা আল্লাহকে মানি। কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে, শুধু একমাত্র আল্লাহর উল্লেখ করলে তাদের চেহারা বিকৃত হতে থাকে। তখন তরা বলে. “এ লোকটি বুযুর্গ এবং অলী আল।লাহদের কিছুতেই মানেনা। সে জন্যৌই শুধু আল্লাহ আল্লাহ করে।”

আর যদি অন্যান্যদের নাম ‍উল্লেখ করা হয় তাহলে আনন্দে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাদের এ কর্মকান্ডে একথা প্রকাশ পায় যে তাদের অনুরাগ ও মহব্বত কার প্রতি। (৩)

(আরবী***************)

-তাদের অবস্্যথা ছিল এই যে, যখন তাদের বলা হতো, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তখন তারা গর্ব ভরে বলতো, আমরা কি একজন পাগল কবির খাতিরে আমাদের খোদাদেরকে পরিত্যাগ করব? (সাফ্‌ফাত: ৩৫-৩৬)

নবীল (সা) এ কথার উপর তাদের বড়ো আপত্তি ছিল:

(আরবী*************)

-এ লোকটি কি সকল খোদার পরিবর্তে শুধামাত্র এক খোদাকে গণ্য করে বসলো? এ ত বড়োই আজব কথা! (সোয়াদ: ৫)

 এ সমাজে এবং এ ধরনের চিন্তাধারার লোকদের মধ্যে রসূলুল্লাহ (সা) দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে বারবার ঘোষণা করেন আল্লাহই একমাত্র ইলাহ ও রব। খোদায়ী এবং প্রভুত্ব-কর্তৃত্বে আর কারো অংশীদারিত্ব নেই।

(আরবী**************)

-তোমাদের খোদা ত সেই আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। প্রতিটি বিষয়ের উপর তাঁর জ্ঞান পরিব্যপ্ত। (তাহা: ৯৮)

(আরবী*****************)

-বরঞ্চ তোমাদের রব তিনিই যিনি আসমান ও জমিনের রব এবং যিনি তা পয়দা করেছেন। (আম্বিয়া : ৬৫)

(আরবী****************)

-প্রকৃতপক্ষে তোমাদের রব মাত্র একজন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যে যা কিছু আষে সে সবের তিনি রব এবং পূর্বদিকগুলিরও তিনি রব। (সাফফাত: ৪-৫)

অর্থাৎ যিনি বিশ্ব প্রকৃতির মালিক ও প্রভু তিনিই মানবজাতিরও খোদা (মাবুদ ও ইলাহ) এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি মাবুদ হতে পারেন এবং তাঁরই মাবুদ হওয়া উচিত। একথা একেবারে ভ্রান্ত যে বিশ্ব প্রকৃতি এবং তোমরাসহ বিশ্ব প্রকৃতির রব (অর্থাৎ মালিক, শাসক, মুরব্বী ও প্রতিপালক) ত কেউ হবে এবং ইলাহ (এবাদতের হকদার) হবে আর কেউ।

(আরবী******************)

-(হে নবী!) বলে দাও। আমি ত শুধু সাবধানকারী। এ এক খোদা ছাড়া আর কেউ নেই। তিন সকলের উপরে বিজয়ী, যিনি আসমান, জমিন এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুর রব। তিনি মহা প্রতাপশালী এবং বড়ো ক্ষমাশীল। (হে নবী!) বল য এ এমন এক সংবাদ যার থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। (সোয়াদ: ৪-৫)

(আরবী*******************)

-আল্লাহ বলেছৈন-দু’জন ইলাহ (খোদা ও মাবুদ) বানাইও না। খোদা ত মাত্র একই জন। অতএব তোমরা আমাকেই ভয় কর। (নহল:” ৫১)

(আরবী****************)

এবং তিনিই একজন আসামানেও খোদা এবং জমিনেও খোদা। এবং তিনি বিজ্ঞ ও জ্ঞঅনী। (যুখরুফ: ৫৩)

(আরবী*****************)

-এবং আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোন মাবুদদকে ডেকো না। তিনি ছাড়া আর কেউ খোদা নেই। শুধু তাঁর সত্তা ব্যতীত প্রতিটি বস্তু ধ্বংসশীল। শাসন-কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই। তাঁর দিকেই সবকিছু প্রত্যাবর্তনকারী। (কাসাস: ৮৮)

মুশরিকগণ হুযুরকে (সা) জিজ্ঞেস করে, যে রবের দিকে তুমি আমাদেরকে ডাকছ তাঁর বংশ পরিচয় বলে দাও। তিনি কিসের থেকে হয়েছেন? কার কাছে থেকে তিনি দুনিয়ার উত্তারাধিকার পেয়েছেন? তাঁর পরে এ উত্তরাধিকার কে লাভ করবে?

তার জবাবে তৌহীদের এমন সুস্পষ্ট, সার্বিক অথচ সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা বয়ান করা হয়- যা অন্তর প্রাদে্যেশ তীরবেগে প্রবেশ করে। শির্কের কোন লেশ মনের মধ্যে স্থঅন পেতে পারে না। যার এক একটি শব্দ তৌহীদের ধারণা সুস্পষ্টরূপে পেশ করে। সেই সাথে সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে, চারটি সংক্ষিপ্ত ও অলংকারপূর্ণ বাক্যে বর্ণিত হওয়ার কারণে কোন শ্রোতার সাধ্য ছিল না যে, তা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে দেবে এবং মুখে উচ্চারিত না করে পারবে। এরশাদ হলো:

(আরবী******************)

-(হে নবী তাদের কথার জবাবে) বলে দাও:” তিনি আল্লাহ, এক ও একক। আল্লাহ সবকিছু থেকে মুখঅপেক্ষীহীন এবং সকলে তাঁর কেউ সমকক্ষ নেই।

প্রথম বাক্যের অর্থ এই যে, আমার যে রব সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞেস করছ এবং যাঁকে আমি এক খোদা বলে মানি এবং চাই যে অন্যেও মেনে নিক, তিন কোন অভিনব অথবা আমার কল্পিত খোদা নন। বরঞ্চ তিনিই সে খোদা যাকে তোমরা তোমাদের মুখ দিয়ে আল্লাহ বল, যার এ ঘরকে (কাবা) তোমরা বায়তুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) বল, মাত্র চল্লিশ বছর আগে আবরাহার আক্রমণের সময় যাঁর কাছে তোমরা দোয়া করছিলে যেন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেন এবং সে সময় তোমরা তোমাদের অন্যান্য খোদাকে ভুলে গিয়েছিলে। যাঁর সম্পর্কে তোমরা স্বয়ং স্বীকার কর যে, তোমাদের জমিন ও আসমানেনর এবং দুনিয়অর প্রতিটি বস্তুর তিনি স্রষ্টা।

তাপর আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে বলা হলো যে তিনি এক ও একক। প্রত্যেক আরবাসী জানতো যে এখানে আল্লাহকে ওয়াহেদ (****) বলার পরিবর্তে আহাদ বলার অর্থ কি। (ওয়াহেদ) (***) (এক) শব্দটি আরবী ভাষায় প্রত্যেক ঐ বস্তুটির জন্যে বলা হয়- যা কোন বিশেষ দিক দিয়ে এক হয়, তা অসংখ্য দিক দিয়ে তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের বহুত্ব পাওয়া যাক না কেন। যেমন এক বাড়ী, এক মানুষ, এক পরিবার, এক জাতি, এক দেশ, এক দুনিয়া। তারপর বিপরীত আহাদ শব্দ গুণ হিসাবে কারো জন্যে ব্যবহৃত হওয়া কারো একত্ব বর্ণনা করা এবং সধারণ ব্যবহার ছিল যার কোন নজীর সূরা ইখলাস নাযিলের পূর্বৈ আরবী ভাষায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। [উল্লেখ্য যে, কুরআনে আল্লাহ তায়ালার জন্যে শুধা ওয়াহেদ (***) শব্দ কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। বরঞ্চ তার সাথে অন্য কোন শব্দ সংযোগ করতঃ আল্লাহতায়ালার এক হওয়ার মর্যাদাকে দুনিয়ার অন্যান্য বস্তুর কোন একটির এক হওয়ার মর্যাদা থেকে পৃথক করে দেয়া হযেছৈ। যেমন (******) অথভা (*********) কিন্তু সূরা ইখলাসে (আ****) শব্দ আল্লাহর জন্যে নিরংকুশভাবে গুণ হিসাবে ব্যবহৃত করা হযেছে। এ ব্যবহার আল্লাহর সত্তার জন্যে নির্দিষ্ট- গ্রন্থকার।

(অতএব আল্লাহকে ‘আহাদ’ বলার একথা প্রকাশ করে যে, তিনি সব দিক দিযে এক ও একক। তিনি দেবদেবীসমূহের কোন একটিরও প্রজাতি নন যে তার সমপ্রজাতি অন্যান্য সত্তআও খোদা হবে। বরঞ্চ অস্তিত্বে তিনি তুলনাবিহীন ও প্রতিদ্বন্দ্বীহীন একাকী এবং খোদায়ী দিক দিয়েও একেবারে একাকী। তাঁর মধ্যে কোন দিক দিয়েই কোন বহুত্ব নেই। তিনি উপাদানমূলক অংশাবলী থেকে গঠিত কোন অস্তিত্ব নন, যা বিভাজ্য ও বন্টনযোগ্য, যার আকার আকৃতি থাকে, যা কোন স্থানে অবস্থানরত, যার থেকে কিছু বের এবং যার মধ্যে কিছু প্রবেশ করে। যার কোন বর্ণ হয়, যার কোন অংগপ্রত্যংগ হয়, যা কোন দিকের মুখাপেক্ষী এব্ং যার মধ্যে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়। সকল প্রকারের বহুত্ব থেকে পাক-পবিত্র তিনি খোদায়ী সত্তা-যিনি সকল দিক দিয়ে এক ও একক। যখন তিনি ‘আহাদ’ তখন খোদায়ী ও প্রভুত্ব কৃর্তৃত্বে তাঁর কোন অংশীদার হতে পারে না। তাঁর সত্তা, গুণাবলী, এখতিয়অর ও অধিকারে কেউ তাঁর অংশীদার নয়। জগতের অসিত্ববান সৃষ্টিনিচয়ের কোনটিই তার সদৃশ বা অনরূপ নয়।

তারপর বলা হয়েছে যে তিন মুখাপেক্ষীহীণ ‘সামাদ’ শভ্দটি আরবী ভাষায় বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত ছিল এবং প্রত্যেক আরববাসী তার অর্থ জানতো। তা এমন একটি ব্যক্তির জন্যে ব্যবহৃত হতো যে কারো মুখাপেক্ষী নয় এবং যার দিকে লোক প্রয়োজন পূরণের জন্যে ধাবিত হতো।

যে ব্যীক্ত অন্যান্য থেকে উচ্চতর এবং কেউ তার চেয়ে উচ্চতর নয়। যার আনুগত্য করা হতো এবং যাকে ব্যতীত কোন সিদ্ধান্ত করা যেতো না। যার মধ্যে কোন দুর্বলতা নেই, যে নির্দোষ, যার উপর বিপদ আসে না, যে আপন মর্জিমত সবকিছু করে, যার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা যায় না এবং কৃত্ত্ব করার গুণাবলী যার মধ্যে তাকেউ ‘সামাদ’ বলা হতো। তা ফাঁপাঁ বা শূন্য গর্ভ নয় এমন দৃঢ় পূর্ণগর্ভ যার থেকে কিছু বেরয় না এবং কিছু প্রবেশও করে না। কিন্তু আল্লাহতায়ারা জন্যে নিছক ‘সামাদ’ নয়, বরঞ্চ ‘আস সামাদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ এই যে, আর যতো কিছু তা ত একদিক দিয়ে হতে পারে এবং অন্য বহু দিক দিযে ‘সামাদ’ নয়। কিন্তু সব দিক দিয়ে পূর্ণ ‘সামাদ’ শুধুমাত্র আল্লাহ।

তারপর বলা হয়েছে যে, তাঁর কোন সন্তান নেই। আর না তিনি কারো সন্তান। এ কথাটি সে সকল মুশারেকী ধ্যান-ধারণা খন্ডন করে যার ভিত্তিতে মনে করা হতো যে, খোদাদেরও কোন প্রজাতি আছে যার মধ্যে সেরূপ বংশবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা চলে যেমন মানুষের চলে থাকে। এ ধারণার মূলোৎপাটন করে চিরকাল থাকবেন। তাঁর পূর্বে কোন খোদা ছিল না যার থেকে তিনি পয়দা হয়েছেন আর না তাঁর পরে কোন খোদা আছে এবং হতে পারে যা তাঁর থেকে পয়দা হয়।

শেষে বলা হয়েছে যে কেউ তার ‘কুফু’ নেই। কুফুর অর্থ তুলনা’ সদৃশ, সমমর্যাদাসম্পন্ন, সমকক্ষ ও সমান। এ কথার দ্বারা লোকদেরকে বলে দেয়া হলো যে, সমগ্র বিশ্বপৃকৃতিতে কেউ নেই, না কখনো ছিল এবং না কখনো হতে পারে যে আল্লাহর মতন অথবা তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন অথবা তাঁর গুণাবলী কাজকর্ম এবং ক্ষমতা এখতিয়ারে তাঁর সাথে কোন প্রকারের সাদৃশ্য রাখে।

তৌহীদের যুক্তি প্রমাণ

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মুশরিক সমাজে তৌহীদের এ সুস্পষ্ট ধারণা পেশ করেই ক্ষঅন্ত হননি, বরঞ্চ বলিষ্ঠতার সাথে অনস্বীকার্য যুক্তিপ্রমাণসহ তা প্রমাণিত করেছেন।

১. সকল নবী তৌহীদের শিক্ষা দিতেন

এ প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ যুক্তি এ ছিল যে, তাঁর পূর্বে দুনিয়ায় যতো নবী এসেছিলেন তাঁরা সকলেই তৌহীদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং শির্ক থেকে দূরে থাকতে আদেশ করেছেন। বস্তুতঃ কুরআনে সামগ্রিকভাবে সকল নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে-

(আরবী***************)

-প্রত্যেক উম্মতের জন্যে আমরা একজন করে নবী পাঠিয়েছি এ শিক্ষাসহ যে- আল্লাহর বন্দেগী কর এবং তাগুতের [তফসীর শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম ইবনে জারীর তাবারী তাগুতের, ব্যাখ্যা নিম্নররূপ করেছেন:

প্রত্যেক সে সত্তা- যে আল্লাহর মুকাবিলায় বিদ্রোহ করে এবং আল্লাহ ব্যতী যার বন্দেগী করা হয়, তা বন্দেগীকারী শক্ত প্রয়োগ দ্বারা বাধ্য হয়ে তার বন্দেগী করুক অথবা স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টিচিত্তে তার বন্দেগী করুক- (অ্থাৎ যার বন্দেগী করা হবে) সে তাগুত। সে কোন মানুষ হোক, শয়তান, দেবদেবী অথবা আর কোন কিছু হোক। (জামেউল বয়ান ফী তাফসীরুল কু্রআন- ৩য় খন্ড, পৃ:১৩)-গ্রন্থকার।] বন্দেগী থেকে দূরে থাকে। (নাহাল: ৩৬)

(আরবী**************)

-এবং (হে নবী) তোমার পূর্বে আমরা এমন কোন রসূল পাঠাইনি যার প্রতি আমরা এ অহী করিনি যে, ‘আমি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। অতএব তোমরা আমারই বন্দেগী করো’ (আম্বিয়অ: ২৫)

অতীতের সমস্ত উম্মত সম্পর্কে বলা হয়েছে-

(আরবী**********************)

-এবং তাদের এছাড়া আর কোন আদেশ করা হয়নি যে, তারা আল্লাহর বন্দেগী করবে- নিজেদের দ্বীনকে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট এবং একেবারে একমুখী হয়ে- এবং নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই হচ্ছে একেবারে একমুখী হয়ে- এবং নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই হচ্ছে একেবারে সঠিক দ্বীন। (আল বাইয়্যেনাহ্‌: ৫)

তারপর এক একজন নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাদের শিক্ষা এই ছিল। হযরত নূহ (আ), হযরত হুদ (আ), হযরত সালে (আ), হযরত শুয়াইব (আ) প্রমুখ নবীগণের প্রত্যেকে তাঁর জাতিকে সর্বপ্রথম এ শিক্ষাই দিতেন-

(আরবী****************)

-হে আমার জাতির লোকেরা! আল্লাহর বন্দেগী কর। তিনি ছাড়া আর কেউ তোমাদের খোদা নেই। (আ’রাফ:  ৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৫, হুদ: ৫০ক, ৬১, ৮৪, আল মুমেনূন: ২৩, ৩২)

হযরত ইয়াকুব মরণের সময় তাঁর সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করছেন- আমার পরে তোমরা কার বন্দেগী করবে? তরা জবাব দেন, আমরা সেই একই খোদার বন্গেী করবো যিনি আপনার, আপনার বাপ দাদা ইব্রাহীম ও ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহ ছিলেন। (বাকারাহ: ১৩৩) হযরত ইউসুফ তাঁর জেলের সাথীদেরকে সম্বোধন করে বলেন-

(আরবী*****************)

-হে আমার জেলখানার সাথীগণ! ভিন্ন ভিন্ন বহু খোদা কি ভালো, না এক আল্লাহ যিনি সকলের উপরে বিজয়ী? তাঁকে বাদ দিয়ে তোমার বন্দেগী করছ। তারা কয়েক নাম ব্যতীত আর কিছুই নয়- যে নাম তোমরা এবং তোমাদের বাপদাদা রেখেছে। আল্লাহ তাদের সপক্ষে কোন সদন নাযিল করেননি। প্রবুত্ব-কর্তৃত্ব করার ক্ষশতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। তাঁর হুকুম এ্ যে, তিন ছাড়া আর কারো বন্দেগী তোমরা করবে না। এটাই সঠিক দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না। (ইউসুফ : ৩৯-৪০)

হযরত মূসা (আ)-এর উপর সর্বপ্রথম অহী নাযিল হয়-

(আরবী******************)

-আমিই আল্লা! আমি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। অতএব, তুমি আমারই এবাদত করো এবং আমার স্মরনের জন্যে নামায কায়েম করো। (তা-হা: ১৪)

তাপর বনী ইসরাইল যখন গোবৎস্য পূজা শুরু করলো তখন হযরত মূসা (আ) তাদের উপর ভয়ানক ক্রোধান্বিত হলেন এবং তাদের তৈরী উপাস্য প্রতিমা জ্বালিয়ে দিয়ে বল্লেন-

(আরবী****************)

-তোমাদরে সত্যিকার মাবুদ তো একমাত্র আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। (তা-হা: ৯৮)

হযরত ঈসা (আ) বনী ইসরাইডলদেরকে বারবার এ কথা বলেন-

(আরবী****************)

প্রকৃত পক্ষে আল্লাহই আমার রব  এবং তোমাদেরও রব। অতএব তোমরা তাঁর এবাদত করো। এটাই সোজা পথ। (আলে ইমরান: ৫১, মরিয়ম: ৩৬, যুখরুফ: ৬৪)

(আরবী******************)

-হে বনী ইসরাইল! আল্লাহর বন্দেগী করো যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলো তার স্থান আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিলেন এবং তার অবস্থঅন জাহান্নাম। আর এমন জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই। (মায়েদাহ: ৭২)

আরবের মুশরকদের জন্যে সাধঅরণতঃ এবং কুরাইশ মুশরিকদের জন্যে বিশেষভাবে সবচেয়ে বলিষ্ঠ যুক্তি তাই ছিল যা কুরআনে হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর কাহিনীতে পেশ করা হয়েছে। কারণ আরবের সকল মুশরিক তাঁকে তাদের নেতা ও পথপ্রদর্শক বলে স্বীকার করতো। তাদের দ্বীনকে তারই প্রদর্শিত দ্বীন গণ্য করতো। তাঁর সাথে তাদের বংশীয় সম্পর্ক থাকার কারণে এবং তাঁর তৈরী বায়তুল্লাহর পৌরহিত্য করার কারণেই কুরাইশদের যতো গর্ব অহংকার ও প্রভাব প্রতিপত্তি। কুরআন পাকে বিশদভাবে কুরাইশ এবং আরববাসীকে বলা হযেছে যে, নমরুদের রাজ্য (ইরাক) থেকে তোমাদের পূর্বপুরুষ ও ধর্মীয় নেতার বেরিয়ে আসা এ বিবাদের ভিত্তিতেই হয়েছিল যে, তাঁর পিতা, তাঁর জাতি এবং  তাঁর দেশের সরকার সকলেই মুশরিক ছিল। তিনি অর্থাৎ হযরত ইব্রাহীম (আ) এ শির্কের প্রকাশ্য খন্ডন করেন, জাতিকে প্রকাশ্য তৌহীদের দাওয়াত দেন, দেবদেবী ভেঙে চুরমার করেন যার জেন্য তাঁকে বিরাট অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তার থেকে জীবিত অবস্থায় ও নিরাপদে বের করে আনেন। তারপর তিনি দেশ ত্যাগ করে কানআন ভূখন্ডের দিকে বেরিয়ে পড়েন। তাপর মক্কায় পৌঁছে এ আল্লাহর ঘর এজন্যে নির্মাণ করেন যে, এখঅনে যেন এক খোদা ব্যতীত আর কারো এবাদত করা না হয়। তিনি তাঁর সন্তানদের জন্যে দোয়া করেন যে, তারা যেন পৌত্তলিক পূজার পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত না হয়। এ কাহিনীর বিশদ বিবরণ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলিষ্ঠ এবং সার্থকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তা পাঠ করে  মানুষ ধারণা রতে পারে যে, মক্কায় যখন রসূলূল্লাহ (সা) তাদেরকে এসব শুনিয়েছিলেন তখন কুরাইশ এবং সাধারণ মুশরিকগণ কতোখানি আলোড়িত হয়ে থাকবে। কথা দীর্ঘায়িত না করে এখানে আমরা শুধু আয়াতগুলো তরজমা সন্নিবেশিত করছি:

-“এবং ইব্রাহীমের ঘটনা স্মরণ কর যখন সে তার পিতা আযরকে বলেছিল, আপনি কি প্রতিমাগুলোকে খোদা বলে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে এবং আপনার  কওমকে সুস্পষ্ট গুমরাহির মধ্যে দেখদে পাচ্ছি।

.. ইব্রাহীম বল্লো, হে  আমার জাতির লোকেরা! আমি সেসব থেকে বিরাগভাজন হয়ে পড়েছি যাদেরকে তোমরা খোদার শরীক বলে গণ্য করো। আমি ত একনিষ্ঠ হযে সেই সত্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি যিনি আসমান জমিন পয়দা করেছেন এবং আমি শির্ককারীদেরকে অন্তর্ভুক্ত কখনোই নাই। তার কওম তার সাথে ঝঘড়া শুরু করে। সে বলে, তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে আমার সাথে ঝগড়া করছো অথচ তিন আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন? আমি তোমাদের নির্ধারিত শরীকদের ভয় করি না। হাঁ তবে আমার রব কিছু করতে চাইলে তা অবশ্যই হতে পারে। আমার রবের জ্ঞান সর্বব্যাপী। তারপরও তোমরা সম্বিৎ ফিরে পাচ্ছ না? তোমাদের নির্ধারিত শরীকদের আমি কেন ভয় করবো যখন তোমরা আল্লাহর সাথে এমন সব জিনিসকে শরীক বানাতে ভয় করছো না অথচ খোদার শরীক হওয়া সম্পর্কে তিনি কোন সনদ নাযিল করেননি? তাহলে বলো, যদি তোমাদের জ্ঞান থাকে, আমাদের উভয় পক্ষের মধ্যে কে অধিকতর ভীতিহীনতা এবং প্রশান্তির অধিকারী?” (আনয়াম: ৭৪-৮১)

-“এবং (হে মুহাম্মদ), এ বিতাকে ইব্রাহীমকে স্মরণ করো। অবশ্যই সে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ও নবী ছিল। (এদেরকে সে সময়ের ঘটনা শুনাও) যখন সে তার পিতাকে বলেছিল, আব্বা! আপনি কেন সে সবের এবাদত করেন, যারা না শুনে এবং না দেখে আর না আপনার কোন কাজ করে দিতে পারে? আব্বা! আামার কাছে এমন এস জ্ঞান রয়েছে যা আপনার কাছে নেই। আপনি আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সোজা পথ বলে দেব। আব্বা! আপনি শয়তানের বন্দেগী করবেন না। শয়তান তো রহমানের অবধ্য। আব্বা! আমার ভয় হয় যে, আপনি রহমানের আযাবে লিপ্ত হয়ে না পড়েন এবং শয়তানের সাথী হয়ে থাকেন।”

“পিতা বলে, ইব্রাহীম! তুমি কি আমাদের খোদাসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ? তুমি বিরত না হলে তোমাকে প্রস্ত্ররাঘাতে মেরে ফেলবো। তুমি চিরদিনের জন্যে আমার থেকে পৃথক হয়ে যাও।”

“ইব্রাহ্রীম বলে, আপনার প্রতি সালাম, আমি আমার রবের কাছে দোয়া করি যেন তিনি আপনাকে মাফ করে দেন। আমার রব আমার উপর বড়ই মেহেরবান। আমি আপনাদেরকেও পরিত্যাগ করছি এবং ঐসব সত্তাকেও যাদেরকে আপনারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে ডাকেন। আমি ত আমার রবকেই ডাকবো। আশা করি আমি আমার রবকে ডেকে বিফলকাম হবো না।” (মরিয়ম: ৪১-৪৮)

“এবং ইব্রাহীমের তাঁর পিতার জন্যে দোয়া সেই ওয়াদা মোতাবিক ছিল যা সে তার কাজে করেছিল। কিন্তু যখন তার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর দুশমন, তখন সে তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে গেল।” (তাওবা:” ১১৪)

“এর আগে আমরা ইব্রাহীমকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং! আমরা তাকে ভালোভাবে জানতাম। সে ঘটনা স্মরণ করো যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বলেছিল, এসব কেমন মূর্তি যার প্রতি তোমরা অনুরুক্ত হয়ে পড়ছো? জবাবে তারা বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এদের এবাদত করতে দেখেছি। সে বলে সতোমরাও পথভ্রষ্ট এবং তোমাদের বাপ-দাদাও সুস্পষ্ট গোমরাহিতে লিপ্ত ছিল। তারা বলে, তুমি কি তোমার আপন চিন্তা-ভাবনা আমাদের সামনে পেশ করছ না ঠাট্টা করছো? সে বলে না, বরঞ্চ তোমাদের রব প্রকৃতপক্ষে সেই যিনি আসমান-জমিনেসর রব এবং যেগুলো তিনি পয়দা করেছেন এবং এ ব্যাপারে তোমাদের সামসে সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং খোদার কসম, তোমাদের অসাক্ষাতে আমি অবশ্যই তোমাদের প্রতিমানের বিরুদ্ধে কিছু করার সিদ্ধঅন্ত করেছি। বস্তুতঃ সে সেগুলোকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর করলো এবং তাদের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড়ো তাকে অক্ষত রাখলো যাতে করে তারা তার দিকে ধাবিত হয়।

“(তারা এসে তাদের প্রতিমাগুলোর দূরবস্থা দেখে) বল্লো, কে আমাদের খোদাদের সাথে এমন আচরণ করলো? বড়ো জালেম ছিল সে।ভ (কতিপয় লোক) বলতে লাগলো, আমরা একটি যুবককে এদের সম্পর্কে কিছু বলতে শুনেছি। আর সে ইব্রাহীম। তারা বল্লো, তাহলে তাকে সকলের সামনে ধরে আন যেন তারা দেখে যে তার কি করা যায়। (ইব্রাহীম এলে পরে) লোকে বল্লো ইব্রাহীম! তুমি কি আমাদের খোদাদের সাথে এ আচরণ করেছ? সে বল্লো, বরঞ্চ এদর এ সর্দারই এ কাজ করেছে। একে জিজ্ঞেস করো না সে যদি কিছু বলে। এ কথা শুনে তরা তাদের বিবেকের তাড়নায় তাদের নিজেদের মনকে বলে, তোমরা নিজেরাই বরড় জালেম (যে এসব অসহায় মূর্তিগুলোর পুজা কর)। তারা হতহভস্ব হয়ে বল্লো, তুমিতো জান যে এরা কথা বলতে পারে না। ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা তাহলে আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পূজা করো যারা তোমাদের কোন উপকারও করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না। তোমাদের উপর এবং তোমাদের এ খোদাদের উপর ধিক্‌ আল্লাহকে ছেড়ে যাদের পূজা করো।”

“তারা বল্লো, জ্বালিয়ে দাও একে এবং সমর্থন করো তোমাদের খোদার যডদি তোমাদের কিছু করতে হয়। আমরা বল্লাম হে আগুন! শীতল হয়ে যাও এবং নিরাপত্তার কারণ হয়ে যাও ইব্রাহীমের জন্যে। তরা চাচ্ছিল ইব্রাহীমের ক্ষতি করতে কিন্তু তাদেরকে ব্যর্থকাম করে দিলাম।” (আম্বিয়া:” ৫১-৭০)

“এবং এদেরকে ইব্রাহীমের কাহিনী শুনিয়ে দাও, যখন সে তার পিতা এবং আপন কওমকে বল্লো, এ তোমরা কোন সব বস্তুর এবাদত করছো?”

“তারা বল্লো- এসব কিছু মূর্তি যেসবের আমরা পূজা করি এবং তাদের সেবায়ই আমরা লেগে থাকি। সে বল্লো, এরা কি তোমাদের কথা শুনতে পায় যখন তোমরা তাদেরকে ডাক? অথবা এ কি তোমাদের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে? তারা জবাব দিল, (এসব তো আমরা জানি না) কিন্তু আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এরূপ করতে দেখেছি। ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা কি কখনো (চোখ খুলে) দেখেছ যে এসব আসলে কি যাদের বন্দেগী তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদা করে আসছ? আমার ত এসব দুশমন, শুধু রাব্বুল আলামীন ব্যতীত, যিনি আমাকে পয়দা করেছেন। তারপর তিনিই আমার পথ প্রদর্শন করেন। যিনি আমাকে পানাহার করান। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন এবং তারপর দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন। আর যার কাছে এ আশা করি যে, বিচারের দিনে তিনি আমার ভুলত্রুটি মাফ করে দেবেন।” (মুয়ারা: ৬৯-৮২)

“এবং আমরা ইব্রাহীমকে পাঠালাম। যখন সে তার কওমকে বল্লো, আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাঁকেই ভয় করো। এ তোমাদের জন্যে মংগলদায়ক যদি তোমরা জান। আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের পূজা করছ তারা তোমাদেরকে কোন রিযিক দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহর কাছে রিযিক চাও। তাঁরই বন্দেগী কর এবং শুকরিয়া আদায় কর। তাঁর দিকেই তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। …. তার জাতির বজাব এ ছাড়া আর কিছু ছিল না, একে মেরে ফেল অথবা জ্বালিয়ে দাও। কিন্তু আল্লাহ তাকে আগুন থেকে বাঁচালেন। নিশ্চিতরূপে এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে ঈমানদারদের জন্যে। এবং ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তিগুলোকে দুনিয়াতে পরস্পরের জন্যে। এবং ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তিগুলোকে দুনিয়াতে পরস্পররের মধ্যে ভালোবাসার উপায় বানিয়ে নিয়েছ। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের প্রতি অভিশাপ করবে। আগুন তোমাদের গন্তব্যস্থল হবে এবং কেউ তোমাদের সাহায্যকারী হবে না। তাপর লুদৎ ইব্রাহীমের কথা মেনে নিল এবং ইব্রাহীম বল্লো, আমি আমার রবের দিকে হিজরত করছি। তিনিই মহাশক্তিশালী ও বিজ্ঞ।” (আনকাবুত: ১৬-২৬)

“এবং নূহেরই পথের অনুসারী ছিল ইব্রাহীম। যখন সে ত্রটিমুক্ত মন নিয়ে তার রবের সামনে এলো। যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বল্লো, এসব কোন বস্তুর এবাদত তোমরা করছ? আল্লাহকে ছেড়ে কি মিথ্যা রচিত খোদা তোমরা চাও? রাব্বুল আলামীন সম্পর্কে তোমাদের কি ধারণা? তারপর সে তারাগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো এবং কওমের লোকদেরকে বল্লো, আমার শরীর খারাপ। তারপর তারা (তাকে ছেড়ে নিজেদের মেলায়) চলে গেল। তাপর সে চুপে চুপে তাদের প্রতিমাগুলোর মন্দিরে ঢুকে পড়ে বল্লো, তোমরা খাওয়া দাওয়া করছ না কেন? তোমাদের কি হয়েছে যে, কথাও বলছ না? তাপর সে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ডান হাতে খুব আঘাত করলো।”

“(ফিরে এসে কওমের) লোকেরা দৌড়ে তার কাছে এলো। সে বল্লো, তোমরা কি তোমাদের নিজেদের খোদাই করা বস্তুর পূজা করো? বস্তুতঃ আল্লাহ তায়ালাই তোমাদেরকে পয়দা করেছেন এবং এসবচ বস্তুকেও যা তোমরা বানাও। তারা বল্লো, এর জন্যে আগুন প্রজ্জলিত কর এবং তাকে সে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করো। তরা তার বিরুদ্ধে এক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চেয়েছিল এবং আমরা তাদেরকে লাঞ্চিত করলাম এবং ইব্রাহীম বল্লো, আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি অর্থাৎ হিজরত করছি। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।” (সাফফাত:” ৮৩-৯৯)

হযরত ইব্রাহীম (আ) কে দেশের বাদশাহের সামনে পেশ করা হলো। কারণ সে রব হওয়াদার দাবীদার ছিল। আর তিনি আল্লাহ ছাড়া আর  কাউকে রব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তা কুরআন এভাবে নকল করছে:

“যখন ইব্রাহীম বল্লো, আমার রব তো তিন যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সে বল্লো, জীবন ও  মৃত্যু আমারই এখতিয়ারে। ইব্রাহীম বল্লো, আচ্ছা, আল্লাহ ত সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো। এ কথা শুনে সে কাফের হতবাক হয়ে রইলো। (বাকারা: ২৫৮)

এভাবে শির্কের বিরোধিতা এবং তৌহীদের দাওয়াতের কারণে ইব্রাহীমের (আ) জন্যে তাঁর জন্মভূমি সংকীর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি তাঁর দেশ, আপন কওম, আপন পরিবার, এমনকি আপন পিতাকে পরিত্যাগ করে হিজরতের জন্যে বেরিয়ে পড়লেন তখন যাবার সময় তিন এবং তার সাথে ঈমানদারগণ পরিষ্কার ভাষায় তাদের কওমকে বলে দিল-

“আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের এসব খোদার প্রতি, যাদেরকে তোমরা খোদাকে ছেড়ে[ পূজা কর, একবারে বিরাগভাজন হয়ে পড়েছি। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছি এবং তোমাদের ও আমাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গেছে, যতোক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান এনেছ। (মুমতাহেনা: ৪)

সেই সাথে কুরআন একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) মক্কায় এসে তাঁর বলে দেয়া স্থানে এ খানায়ে কাবা নির্মাণ করেন ত তা এ জন্যে করা হয়নি  যে, তাকে প্রতিমা মন্দির এবং মুশরিকদের তীর্থস্থান বানানো হবে, এখানে গায়রুল্লাহর এবাদত হবে এবং গায়রুল্লাহর জন্যে কুরবানী করা হবে।

(আরবী******************)

“এবং স্বরণ কর সেই সময়-যখন আমরা ইব্রাহীমের জন্যে এ ঘরের (খানায়ে কাবা) স্থান মনোনীত করে দিই (এ হেদায়েতসহ) যে আমার সাথে অন্য কোন জিনিস শরীক করবে না এবং আমার ঘর তাওয়াফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্যে পাক রাখবে। তারপর মানুষকে হজ্বের জন্যে সাধারণত অনুমতি দেবে যেন তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং উটের পিঠে করে আসতে পারে এবং সে সব সুবিধা লাভ করে যা তাদের জন্যে রয়েছে। তারপর কিছু নির্দিষ্ট দিনে ঐসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নেয়, যা তাদেরকে দেয়া হয়েছে।” (হজ্ব: ২৬-১৮)

উপরন্তু কুরআনে মানুষকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মক্কার অধিবাসীদের জ্যে এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে হযরত ইব্রাহীম (আ) যে দোয়া করেছিলেন তা কি ছিল।

(আরবী****************)

“হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখ। হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো অনেক লোককে গোমরাহ করেছে, অতএব যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার এবং যে আমার বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, তুমি তো ক্ষমাকারী ও রহমকারী।” (ইব্রাহীম:” ৩৫-৩৬)

হযরত ইব্রাহীমের জন্যে এ দৃষ্টান্ত কুরাইশ এবং আরবের মুশরিকদের ধর্মের মেরুদন্ড চূর্ণকারী ছিল। এর জন্যে তারা তো আর্তনাদ করতে পারতো কিন্তু এ অস্বীকার করতে পারতো না। কারণ তাদের মধ্যে এ কথা সর্বস্বীকৃত ছিল যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) মুশরিক ও মূর্তি পূজক ছিলেন না। কাবা তিনি শুধু আল্লাহর এবাদতের জন্যে বানিয়েছিলেন এবং তার বহু পরে শির্ক আরববাসীদের মধ্যে প্রচলিত হয়। তাদের ঐতিহ্যে এ কথা সংরক্ষিত ছিল যে, মক্কায় শির্ক কখন শুরু হয় এবং কোন মূর্তি কখন কোথা থেকে আনা হয়। এ জন্যে কুরআন প্রকাশ্যে মানুষকে দাওয়াত দেয়-

(আরবী****************)

“ইব্রাহীমের সাথে সম্পর্ক রাখার সবচেয়ে বেশী হকদার তারা যারা তার তরিকা অনুসরণ করে এবং নবী (মুহাম্মদ সঃ) এবং তার অনুসারীগণ। আল্লাহর ঈমান আনয়নকারীদের সমর্থক ও সাহায্যকারী।” (আলে ইমরান: ৬৮)

২. মুশরিকদের মনের সাক্ষ্য থেকে প্রমাণ

তৌহীদের জন্যে দ্বিতীয় শক্তিশালী প্রমাণ এ পেশ করা হয়েছে যে, মুশরিকদের উপর কোন কঠিন সংকট এসে পড়লে তরা মৃত্যু অথবা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। তখন তরা তাদের সকল বানাওটি খোদাকে ভুলে যায় এবং একমাত্র আল্লাহর নিকটেই দোয়া করতে থাকে। কুরআন মজিদে তাদের এ অবস্থা ফলপ্রসূ উপায়ে বর্ণনা করে তাদের মধ্যে এ অনুভূতি জাগ্রত করা হয় যে, তোমাদের নিজেদের মনেই শির্ক ভ্রান্ত হওয়ার এবং তৌহীদ সত্য হওয়ার প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে যা বিপদ পরীক্ষার সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে। তারপর সে সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তোমরা তার উপর গাফলতির পর্দা টেনে দাও।(৪)

(আরবী*****************)

-(হে নবী), এদের বল, একটু চিন্তা করে বল, যদি কখনো আল্লাহর আজাব তোমাদের উপর এসে যায়, অথবা শেষ মুহূর্ত তোমাদের উপর এসে যায়, তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে কি তোমরা ডাক? বল যদি তোমরা (তোমাদের শির্কের ব্যাপারে) সত্যবাদী হও। সে সময়ে তোমরা আল্লাহকেই ডাক। তাপর তিনি চাইলে সে বিপদ দূর করে দেন যার থেকে বাঁচার জন্যে তোমরা তাঁকে ডাকছিলে এবং সে ময় তাদেরকে ভুলে যাও যাদেরকে তোমরা খোদায়ীতে শরীক করছিলে। (আনয়াম: ৪০-৪১)

আবু জাহেলর পুত্র একরামা (রা) এসব নিদর্শনাবলীর পর্যবেক্ষণেল পর ঈমান আনার সৌভাগ্য লাভ করেন। যখন মক্কা নবী (সা)-এর হাতে বিজিত হয়, তখন একরামা জিদ্দার দিকে পলায়ন করেন এবং একটি নৌকায় চড়ে আবিসিনিয়ার দিকে রওয়ানা হন। পথে ভয়ানক ঝড় শুরু হয় এবং নৌকাটি বিপদের সম্মুখীন হয়। প্রথম প্রথম ত যতো সব দেবদেবী ছিল তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে কাকুতি মিনতি করা হলো। কিন্তু ঝড়ের গতিবেগ যখন বেড়ে গেল এবং যাত্রাীদের নিশ্চিত বিশ্বাস হলো যে, নৌকাটি ডুবে যাবে। তখন সকলেই বলতে লাগলো যে, এখন এ সমযে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ডাকা যায় না। তিনি চাইলেই আমরা বেঁচে যেতে পারি। সে সময়ে একরামার চোখ খুলে গেল এবং তাঁর মন ঘোষণা করলো যে, যদি এখানে আল্লাহ ছাড়া আর কোন সাহায্যকারী না থাকে, তাহলে অন্যত্রই বা কেন হবে? এটাই ত সেই কথা যা আল্লাহর সে নেক বান্দাহ আমাদেরকে বিশ বছর যাবত বুঝাচ্ছেন্। আর আমরা অযথা তাঁর সাথে বিবাদ করে আসছি।

এ ছিল একরামার (রা) জীবনের এক সিদ্ধান্তকর মুহূর্ত। তিন তখনিই খোদার কাছে এ অংগীকার করেন যে, এ তুফান থেকে বেঁচে গেলে তিনি সোজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে তাঁর হাতে নিজের হাত সমর্পণ করবেন। বস্তুতঃ তিনি তাঁর অংগীকার পালন করেন এবং পরবর্তীতে তিনি শুধু মুসলমানই হলেন না, বরঞ্চ তাঁর অবশিষ্ট জীবন ইসলামের জ্যন্যে জিহাদে অতিবাহিত করেছেন।(৫)

এ যুক্তি প্রমাণ কুরআনের স্থানে স্থানে পেশ করা হয়েছে। প্রবন্ধ দীর্ঘায়িত না করে আমরা শুধু আয়াতগুলোর তরজমা পেশ করবো।

“তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে জলেস্থলে পরিচালিত করেন। বস্তুতঃ যখন তোমরা নৌকায় আরোহণ করে বাতাসের অনুকূলে সানন্দে সফর করতে থাকো, অতঃপর শুরু হয় প্রচন্ড ঝড় এবং চারিদিক থেকে তরংগের আঘাত লাগতে থাকে এবং যাত্রীগণ বুঝতে পারে যে, তারা তুফানের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে তখন সকলেই তাদের দ্বীনকে আল্লাহর জন্যে নির্ভেজাল করে তাঁকে এই বলে ডাকে: “যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করো তাহলে আমরা তোমার কৃতজ্ঞ বান্দাহ হয়ে যাবো।” কিন্তু যখন তাদেরকে বাঁচিয়ে দেন তখন সেসব লোকই সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে জমিনে বিদ্রোহ করা শুরু করে।” (ইউনুস: ২২-২৩)

“তোমাদের সত্যিকার খোদা ত তিনি, যিনি সমুদ্রে তোমাদের নৌকা পরিচালিত করেন যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অর্থাৎ জীবিকা অনুসন্ধান করতে পারো। প্রকৃতপক্ষে তিনি তোমাদের উপর বড়োই মেহেরবান। আর যখন সমুদ্রে তোমাদের উপর বিপদ এসে পড়ে, তখন ঐ একজন ব্যতীত আর যাদেরকে তোমরা ডাক তার সব হারিয়ে যায়। কিন্তু তিন যখন তোমাদেরকে রক্ষা করে স্থলে পৌছিয়ে দেন, তখন তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ প্রকৃতিপক্ষে অকৃতজ্ঞ।” (বনী ইসরাইল: ৬৬-৬৭)

“আর লোকের অবস্থা এই যে, যখন তারা কোন দুঃক্ষ কষ্টের সম্মুখীন হয় তখন নিজেদের রবের দিকে ধাবিত হয়। তারপর যখন তিনি তাঁর রহমতের কিছুটা আস্বাদন তাদেরকে দেন তখন হঠাৎ তাদের মধ্যে কতিপয় লোক তাদের রবের সাথে অন্যকে শরীক করতে শুরু করে। (অর্থাৎ অন্যান্য খোদাদের কাছে তাদের নযর-নিয়ায পৌঁছাতে থাকে)। এতে করে আমার কৃত অনুগ্রহের প্রতি অকৃতঞ্ছতা প্রকাশ করে।” (রূম: ৩২)

“এবং যখন কোন মানুষের উপর কোন বিপদ আসে তখন সে তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করে তাঁকে ডাকে। তারপর যখন তার রব তাঁর নিয়ামত দিয়ে তাকে ভূষিত করে তখন সে সেই বিপদের কথা ভুলে যায় যার জন্যে সেস প্রথমে (তার রবকে) ডাকছিল এবং আল্লাহর সাথে অন্যকে সমকক্ষ গণ্য করতে থাকে যাতে করে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়।” (যুমার : ৮)

অর্থাৎ নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরঞ্চ অন্যান্যকেও এ কথা বলে পথভ্রষ্ট করে যে, ‘যে বিপদ আমার উপর এসেছিল তা অমুক হযরত, অমুক বুযর্গ, অমুক দেবদেবীর সদকা মানত করার ফলে দূর হয়েছে। এতে অন্যান্য অনেক লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য কাল্পনিক খোদার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রত্যেক জাহেল এভাবে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে করে জনসাধারণের পথভ্রষ্টতায় ইন্ধন যোগাতে থঅকে।(৭)

কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এভাবে মুশরিকদের শিরা উপ-শিরায় আঘাত করে তাদের মধ্যে তৌহীদের ‍সুপ্ত অনুভূতি জাগ্রত করা হয়েছে। আরব ভূখন্ড বিপদ আপদে পরিপূর্ণ ছিল। দেশের সাধারণ নিরাপত্তাহীনতা প্রত্যেকের জন্য ছিল অত্যন্ত আশংকাজনক। রোগের জোন ওষুধ ও চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোথাও ছিল না।

মরুভূমির ভয়ানক ধূলিঝড়ে মানুষ জ্ঞানহারা হয়ে পড়তো। এ অবস্থায় প্রত্যেক মুশরিক তার জীবনে কোন না কোন সময়ে এমন বিপদরে সম্মুখীন হতো যে সে সময় সে সকল দিক থেকে নিরাশ হয়ে এক লাশরীক আল্লাহর সামনে তার দোয়ার হাত প্রসারিত করতো এবং মনে করতো যে এ সময়ে সে পবিত্র সত্তাব্যতীত কেউ তার সাহায্য করতে পারে না। বিশেষ করে সামুদ্রিক সফরে ত এ ধরনের ঘটনা প্রায় ঘটতো। স্বয়ং কুরাইশদের উপর আবরাহার হামলার সময় এ অবস্থা দেখা গেছে। সকল বানাওটি খোদাদের পরিত্যাগ করে এক আল্লাহকেই তারা সাহায্যের জন্যে ডেকেছিল। কুরআন নাযিলের সময় এমন বহু লোক জীবিত ছিল যারা এঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল। সূরা ফীলে এদিকেই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, “সে সময়ে তোমাদের সত্যিকার রব ছাড়া আর কে ছিল যে ষাট হাজার আক্রমণকারীদের নির্মূল করে তোমাদেরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছিল?” আর এ দিকেই সূরা কুকরাইশে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, -“সেই মহান খোদার বন্দেগী করো যাঁর ঘরে আশ্রয়গ্রহণ করে তোমরা ধ্বংস থেকে বেঁচে গেছ এবং তোমরা আরবে এ নিরাপত্তা, নির্ভরতা ও সুখসাচ্ছন্দ্য লাভ করেছ। এ নিয়ামতদাতা সেই আল্লাহ, সে সব মাবুদ নয় যাদেরকে তোমরা তাঁর ঘরে একত্র করে রেখেছ এবং যাদের সম্পর্কে তোমরা স্বয়ং জান যে, তারা তোমাদের ধ্বংস থেকে বাঁচাতে পারতো না।

৩. প্রাকৃতিক ব্যবসাথা থেকে যুক্তি প্রমাণ

উপরেরর দু’টি যুক্তি প্রমাণের সাথে কুরআনের স্থানে স্থানে বিস্তারিতভাবে বিশ্ব প্রকৃতির গোটা ব্যবস্থাপনা থেকে এ বিষয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী যক্তি পেশ করা হয়েছে যে, এ গোটা সৃষ্টি জগতের খোদা একই জন এবং একই হতে পারে। এখানেও আমরা শুধু আয়াতসমূহের তরজমা পেশ করছি।

“হে লোকেরা! বন্দেগী করো তোমাদের সেই রবের যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা অতীত হয়েছে তাদেরকে পয়দা করেছেন। আশা রা যায় যে, তোমরা (অন্যান্যদের বন্দেগী করার পরিণাম থেকে) বেঁচে যাবে। সেই প্রভু যিনি তোমাদের জন্যে জমিনকে বিছানা এবং আসমানকে ছাদ বানিয়েছেন। আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। তারপর তার থেকে হরেক রকমের ফসল উৎপন্ন করেছেন- যা তোমাদের জীবিকায় পরিণত হয়েছে। অতএব তোমরা জেনে বুঝে অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ বানায়ো না।” (বাকারা: ২১-২২)

“তাঁর নিদর্শনাবলীর একটি এই যে, তিনি তোমাদের মাটি থেকে পয়দা করেছেন। অতঃপর তোমরা মানুষরূপে দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে থাক এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদেরই প্রজাতি থেকে তোমাদের স্ত্রী বানিয়েছেন যাতে তোমরা তাদের কাছ থেকে প্রশান্তি লাভ খরতে পারো। তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া-অনুকম্পা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চিতরূপে এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তাভাবনা করে। এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি, তোমাদের ভাষা এবং বর্ণের বিভিন্নতা রয়েছে। অবশ্য এ সবের মধ্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্যে। এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে তোমাদের রাত ও দিনের দ্রিা এবং তাঁর অনুগ্রহ জীবিকার অনুসন্ধান। অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্যেযারা (মনোযোগসহ কথা) শুনে। তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও যে, তিনি তোমাদেরকে বিদ্যুত-স্ফূরণ দেখান ভয় ও আশা উভয়ের সাথে। এবং আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। এবং তার দ্বারা মৃত জমিনকে জীবিত করেন। অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে বিবেকবাদনদের জন্যে। তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এও যে আসমান ও জমিন তাঁর আদেশে স্থিতিশীল হয়ে আছে। অতঃপর যখনই তিনি তোমাদের জমিন থেকে ডাক দেবেন, তখন একই ডাকে তোমরা অকস্মাৎ বেরিয়ে আসবে। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর বান্দাহ। সবই তাঁর অনুগত। তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন এবং তিনিই তাঁর পুনরাবৃত্তি করবেন। এবং এটা তাঁর জন্যে সহজতর। আসমান ও জমিনে তাঁর গুণাবলী সর্বোত্তম এবং তিনি অত্যন্ত পরাক্রমশালী এবং বিজ্ঞ।” (রুম: ২০-২৭)

“প্রকৃতিপক্ষে তোমাদের রব সেই আল্লাহ যিনি আসমান ও জমিন চয় দিনে পয়দা করেছেন। অতঃপর আরশে (সৃষ্টি জচগতের সাম্রাজ্যের সিংহাসন) সমাসীন হন। যিনি রাতকে দিনের উপর প্রসারিত করে দেন। তাপর দিন রাতের পেছনে দৌড়ে আসে। যিনি সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি পয়দা করেছেন। সকলেই তাঁর অনুগত। সাবধান! সৃষ্টিও তাঁরই এবং হুকুম শাসনও তাঁরই। আল্লাহ বড়ো বরকতশালী। সমগ্র জাহানের মালিক ও প্রতিপালক।” (আ’রাফ: ৫৪)

“পবিত্র সেই সত্তা যিনি সকল শ্রেণীর জোড়া পয়দা করেছেন। জমিন থেকে উৎপন্নশীল বস্তুগুলোর মধ্যেও অর্থাৎ মানবজাতির মধ্যেও এবং ঐসব বস্তুর মধ্যেও যা মানুষ দেখতে পায় না এবং মানুষের জন্যে একটি নিদর্শন হলো রাত যার উপর থেকে আমরা দিনকে সরিয়ে দিই। তখন আঁধার ছেয়ে যায়। এবং সূর্য তার গন্তব্যের দিকে গতিশীল। এ মহাজ্ঞঅনীর স্থিরীকৃত হিসাব। এবং চাঁদের জন্যে আমরা মনযিলসমূহ নির্ধঅরণ করে দিয়েছি। অবশেষে সে শুষ্ক খেজুর শাখার মতো হয়ে যায়। সূর্যের এমন শক্তি নেই যে, চাঁদকে ধরে ফেলে। আর না রাত দিনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। সবই মহাশূন্যে সাঁতার কাটছে। লোকের জন্যে ইহাও একটি নিদর্শন যে, আমরা তাদের বংশকে যাত্রীপূর্ণ নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম এবং (পরে) এ ধরনের আরো নৌকা পয়দা করে দিই যার উপরে এরা আরোহণ করে। আমরা চাইলে তাদেরকে ডুবিয়ে দিতে পারি। তাপর তাদের আবেদন শুনার কেউ থাকবে না। আর না তাদেরকে কোনভাবে বাঁচাতে পারবে। ব্যাস্‌ আমাদেরই রহমত যা তাদেরকে ওপারে পৌঁছিয়ে দেয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় জীবন উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়।” (ইয়াসীন: ৩৬-৪৪)

“তাঁর কাজ ত শুধু এই যে, যখন তিনি কোন কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন হুকুম দেন- ‘হয়ে যাও’ এবং হয়ে যায়। অতএব পডিবত্র তিনি যাঁর হাতে সব জিনিসের পূর্ণ কর্তৃত্ব রয়েছে এবং তাঁর দিকেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে।” (ইয়াসিন: ৮১-৮৩)

“হে মুহাম্মদ), বল, আল্লাহকে ছাড়া আর কোন রব কি আমি তালাশ করব- অথচ প্রত্যেক জিনিসের রব ত একমাত্র তিনি?” (আনআম: ১৬৪)

“জমিনে বিচরণকারী কোন প্রাণী এমন নেই যার রিযিক আল্লাহর দায়িত্বে নেই এবং যার সম্পর্কে যিনি জানেন না যে, সে কোথায় আছে এবং কোথায় তাকে (মরণের পর) সোপর্দ করা হয়। সব কিছুই একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।” (হুদ: ৬)

“তিনিই আসমান ও জমিনকে ছয় দিনে পয়দা করেনে এবং তারপর আরশে সমাসীন হন। জমিনে যা কিছু যায় এবং যা কিছু তার থেকে বেরোয়, তার জ্ঞান তাঁর রয়েছে এবং যা কিছু আসমান থেকে নামে এবং আসমানে উঠে তার জ্ঞানও তাঁর আছে। তোমরা যেখানেই থাক তিনি তোমাদের সংগে রয়েছেন এবং যে কাজই তোমরা কর তা তিনি দেখেন। আসমান ও জমিনের বাদশাহীর মালিক তিন এবং আল্লাহরই দিকে সমস্ত বিষয় (শেষ মীমাংসার জন্যে) ফিরিয়ে দেয়া হয়। তিনি রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে রূপান্তরিত করেন এবং তিনি মনের অবস্থাও ভালোভাবে জানেন।” (হাদীদ: ৪-৬)

“তিনিই আসমান ও জমিনের সকল কাজকর্মের ব্যবস্থাপনা করেন। তাপর তার রিপোর্ট উপরে তাঁর কাছে এমন এক দিনেস যায় যার পরিমাণ তোমাদের হিসাবে এক হাজার বছর। তিনিই সমস্ত গোপন ও প্রকাশ্য বিষয় জানেন। তিনি প্রবল পরাক্রান্ত ও দয়াবান।

“তিনি যা কিছু বানিয়েছেন তা খুব সুন্দর করে বানিয়েছেন। মানুষের সৃষ্টির সূচনা মাটি থেকে করেছেন। পরে তার বংশধারা এমন এক বস্তু থেকে চালু করেছেন যা নিকৃষ্ট পানির মত।” (সেজদা: ৫-৮)

“বীজ ও ফলের আঁটি (জমীনের অভ্যন্তরে) দীর্ণকারী একমাত্র আল্লাহ। তিন জীবনকে মৃত করে বের করেন এবং মৃতকে জীবন্ত থেকে বের করে আনেন। এ সমস্ত কাজ সম্পাদনকারী ত আল্লাহ। তাহলে কিভাবে তোমরা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছ? রাতের আঁধার বিদীর্ণ করে তিনিই প্রভাত আনয়ন করেন এবং রাতকে তিনি প্রশান্তিময় বানিয়েছেন। তিনি সূর্য ও চাঁদের উদয়াস্তের হিসাব নির্ধারিত করে রেখেছেন। এসবই সেই মহাশক্তিশালী ও মহাজ্ঞানীর স্থির সিদ্ধান্ত। এবং তিনিই তোমাদের জন্যে তারকারাজিকে মরুভূমি ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ জেনে নেয়ার উপায় বানিয়ে দিয়েছেন। দেখ, আমরা নিদর্শনাবলী স্পষ্ট করে বয়ান করেছি তাদের জন্যে যারা জ্ঞান রাখে। এবং তিনিই তোমাদেরকে একই ব্যক্তি থেকে পয়দা করেছেন। তাপর প্রত্যেকের জন্যে আছে একটি অবস্থানের জায়গা এবং একটি ফিরে যাওয়ার স্থান। এসব নিদর্শন আমরা সুস্পষ্ট করে দিয়েছি তাদের জন্য যারা ‍বুঝে যারা বুঝে-সুজে করে।” (আনআম: ৯৫-৯৮)

“(হে নবী), তাদেরকে বল, কে তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহর ফয়সালা রদ করে দেয়ার কোন প্রকার ক্ষমতা এখতিয়ার রাখে যদি তিনি তোমাদের কোন ক্ষতি বা কল্যাণ করতে চান? (ফাত্‌হ: ১১)

“এবং যদি আল্লাহ তোমাকে কোন বিপদে ফেলতে চান, তাহলে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই যে এ বিপদ দূর করতে পারে এবং যদি তিন তোমার জন্যে কল্যাণ করতে চান তাহলে তাঁর কল্যাণ প্রতিরোধ করার কেউ নেই।” ইউনুস:” ১০৭)

“আল্লাহ মানুষের জন্যে যে রহমতের পথ খুলে দেন তা বন্ধ করে দেয়ার কেউ নেই এবং যা তিন বন্ধ করে দেন তা খুলে দেবারও কেই নেই)… আল্লাহ ছাড়া আর কোন স্রষ্টা আছে কি যে তোমার আসমান ও জমিন থেকে রিযিক দেয়? কোন খোদা তিনি ছাড়া নেই। অতঃপর তোমরা কোথা থেকে প্রতারিত হচ্ছে?” (ফাতের: ২-৩)

“যদি আল্লাহ ছাড়া আসমান ও জমিনে অন্যান্য খোদাও হতো, তাহলে জমিন ও আসমানের ব্যবস্থাপনা অচল হয়ে যেতো। আরশের মালিক আল্লাহর ঐসব বিষয় থেকে পাক পবিত্র যা তাঁর প্রতি আরোপ করছে। তিনি তাঁর কাজের জন্যে কারো কাছে দায়ী নন এবং সকলে তাঁর কাছে দায়ী। এরা কি ছাড়া অন্যকে খোদা বানিয়ে রেখেছে? এদের বল, তোমাদের যক্তি প্রমাণ পেশ কর।” (আম্বিয়া : ২২-২৪)

“আল্লাহ কাউকে তাঁর পুত্র বানাননি। আর না তাঁর সাথে দ্বিতীয় কোন খোদা আছে। যদি এমনটা হতো তাহলে প্রত্যেক খোদা তাঁর সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেতো। তাপর একে অপরের উপর কর্তৃত্ব চালাতো। তিন পবিত্র ওসব থেকে যা তারা আরোপ করে।” (মুমেনুন: ৯১)

“হে নবী) এদের বল, যদি তাঁর সাথে অন্যান্য খোদা হতো, যেমন তারা বলে, তাহলে তারা আরশে মালিকের স্থানে পৌঁছাবার অবশ্যই চেষ্টা করতো। তিনি পবিত্র, অতি মহান ও উচ্চতর ওসব থেকে যা তারা বলছে।” (বনী ইসরাইল: ৪২-৪৩)

এগুলো হচ্ছে ওসব আয়াতগুলোর কিছু যার মধ্যে তৌহীদের এমন মজবুত দলিল প্রমাণ পেশ করা হয়েছে যে, যার মধ্যে সামান্যতম জ্ঞান-বুদ্ধিও আছে সে স্বীকার না করে পারে না যে, জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত এ সৃষ্টিজগতের বিরাট ব্যবস্থাপনা এক খোদা ব্যতীত চলতে পারে না। তিনি বানিয়েছেন বলে এসব নির্মিত হয়েছে এবং তিনিই চালাচেনছন বিধায় এসব কিছু চলছে। এর মধ্যে যে হিকমত, প্রজ্ঞা, শক্তি, দয়া অনুকম্পা ও প্রতিপালন ক্ষমতা; যে সুশৃংখলা ও নিয়মানুবর্র্তিতা () এবং সৃষ্টি জগতের অসংখ্য অগণিত বস্তু নিচয়ের মধ্যে যে সামনঞ্জস্য পাওয়া যায়, তা স্পষ্ট এ কথা বলে দেয় যে, এসব কিছু এক খোদার খোদায়ী ছাড়া হতে পারে না। এর মধ্যে অন্য কারো সামান্যতম খোদাসূলভ ক্ষমতা এখতিয়ারের কোন সম্ভাবনা নেই। নতুবা এ ব্রবস্থপনা এমন নিয়মিতভাবে এমন বিজ্ঞতা ও সামঞ্জস্য সহকারে কখনোই চলতে পারতো না। এখন এ কথা সুস্পষ্ট যে, স্রষ্টা যখন তিন, রিযিক দাতাও তিনি, লাভ-লোকসান পৌঁছাবার কর্তৃত্বও তাঁরই এবং সকল ক্ষমতা এখতিয়ারের মালিক তিনি। তখন আর কে আছে যার মাবুদ হওয়ার অধিকার আছে? তাপর তাঁর সৃষ্টির অধীনে অন্যের হুকুম-শাসন চলতেই বা পারে কি করে? মানুষ কারো বন্দেগী করলে এটা মনে করেই করে যে, তার কোন প্রকারের ক্ষমতা এখতিয়ার রয়েছে, লাভ-লোকসান পৌঁছাবার ক্ষমতা আছে। কিন্তু যখন সে জানাতে পারে যে তার কোনই ক্ষমতা এখতিয়ার নেই তখন কেউই এমন বোকা গর্দভ হতে পারে না যে অযথা তার বন্দেগী করবে।

৪. শিরক খন্ডনস করার যুক্তি প্রমাণ

যেমন বলিষ্ঠবাবে কুরআনে তৌহীদ প্রমাণ করা হয়েছে, তেমন বলিষ্ঠতার সাথে শির্কেরও খন্ডনস করার দলিল প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। এতে করে শির্ক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়েছে। এখানেও আমরা শুধু কুরআনের আয়াতের তরজমা পেশ করবো।

“সাবধান থাক। আসমানবাসী হোক অথবা পৃথিবীবাসী, সবই আল্লাহতায়ালার মালিকানাধীন। এবং যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য শরীকদেরকে ডাকছে, তারা আন্দাজ-অনুমানের অনুসারী এবং নিছক কল্পনা বিলাসী।” (ইউনুস: ৬৬)

“তাঁকে ছেড়ে আর যাদের বন্দেগী তোমরা করছ তারা কিছু নয়। কিছু নামমাত্র যা তোমরা এবং তোমাদের বাপ-দাদা রেখে দিয়েছ। তাদের খোদার শরীক হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ কোন সনদ নাযিল করেননি।” (ইউসুফ: ১৪০)

“অতএব তুমি, (হে নবী)।যেসব মাবুদদের এরা এবাদত করে তাদের ব্যাপারে কোন সন্দেহ-সংশয় পড়বে না। এরা তো (একেবারে অন্ধের মতো) ঠিক সেভাবেই পূজা পাঠ করে যাচ্ছে যেমনভঅবে তাদের বাপ-দাদা করতো।” (হুদ: ১০৯)

“এবং যখন এদেরকে বলা হয়, ঐ জিনেসের অনুসরণ কর যা আল্লাহ নাযিল করেছেন, তখন তরা বলে, আমরা ত সে জিনিসেরই অনুসরণ করবো যা করতো আমাদের বাপ-দাদাকে দেখেছি। এরা কি বাপ-দাদার (অন্ধ অনুসরণ করতে থাকবে) শয়তান তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের আযাবের দিকে ডাকে না কেন?” (লুকমান: ২১)

“এর পূর্বে আমরা কি এমন কোন কিতাব এদেরকে দিয়েছিলাম যার সনদ (তাদের ফেরেশতা পূজার জন্যে) এরা তাদের কাছে রাখে? না, বরঞ্চ এরা বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এক পদ্ধতিতে চলতে দেখেছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে চলবো। (হে মুহাম্মদ) এভাবে তোমার পূর্বে যে জনপদে আমরা কোন সতর্ককারী পাঠিয়েছি, এর সচ্ছল লোকেরা এ কথাই বলতো, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এক পদ্ধতিতে চলতে দেখেছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করেই চলছি। প্রত্যেক নবী তাদেরকে জিজ্ঞেস করে। তোমরা কি সেই পথেই চলতে থাকবে  যে পথে তোমাদের বাপ-দাদাকে চলতে দেখেছ তার থেকে সঠিক পথ আমি বলে দিই না কেন? তারা সকল নবীকে এ জবাবই দিয়েছে। যে দ্বীনের প্রতি আমাদেরকে ডাকার জন্যে তোমরা প্রেরিত হয়েছ তা আমরা অস্বীকার করছি।” (যুখরুফ ২১-২৪)

“এরা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের বন্দেগী করে যাতের (মাবুদ হওয়া সম্পর্কে) আল্লাহ কোন সনদ নাযিল করেননি। আর না এদের কাছে (তাদের খোদায়ীতে অংশীদার ও এবাদতের হকদার হওয়া) কেজান জ্ঞঅন আছে।” (হজ্ব: ৭১)

এসব আয়াতে এবং অনুরূপ অন্যান্য আয়াতে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, মুশরিকদের নিকটে অন্যান্যদেরকে খোদার শরীক এবং এবাদতের হকদার গণ্য করার কোন দলিল প্রমাণ নেই। তারা নিছক বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ করছে। শুধু আন্দাজ অনুমান দ্বার্ এ কথা মনে করে আছে যে, অমুক অমুক সত্তা খোদায়ীর এখতিয়ার ও ক্ষমতার মধ্যে থেকে কোন অঙশ লাভ করেছে তার কারণে তরা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করে। অথচ খোদা কখনো কোনোভাবেই তাদেরকে একথা বলেননি যে, তিনি তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে অমুক অংশ অমুক সত্তাকে দিয়েছেন। তাদের কাছে সরাসরি এমন কোন জ্ঞান নেই যে, অমুক হযরত বুযর্গ অথবা অমুক দেবদেবী খোদার এখতিয়ারসমূহের এই এখতিয়ার লাভ করেছে। এই সাথে কুরআনে বারবার শির্ক ভ্রানস্ত অবাস্তব হওয়ার দলিলও পেশ করা হয়েছে।

“আচ্ছা তিনি কে যিনি আসমান জমিন পয়দা করেছেন এবং তোমাদের জন্যে আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন অতঃপর তার দ্বারা সুন্দর বাগান উৎপন্ন করেছেন যার বৃক্ষরাজী উৎপন্ন করা তোমাদের সাধ্যে ছিল না? আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন খোদা কি (এসব কাজে) অংশীদার আছে? নেই। বরঞ্চ এসব লোকই সত্য সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে এবং তিনি যিনি জমিনকে আবাসস্থলে বানিয়েছেন এবং তার মধ্যে নদ-নদী প্রবাহিত করছেন এবং তার মধ্যে পাহাড়-পর্বতের পেরেক গেড়ে দিয়েছেন এবং পানির দু’টি ভান্ডারের (মিষ্টি ও লবণাক্ত) মধ্যে পর্দার অন্তরায় সৃষ্টি করে দিয়েছেন? আল্লাহর সাথে অন্য কোন খোদা এসব কাজে শরীক আাছে কি? না, বরঞ্চ এদের মধ্যে অধিকাংশই জ্ঞানহীন। এমন কে আছেন যিনি অসহায়ের দোয়া শুনেন যখন সে তাঁকে ডাকে? এবং কে তার কষ্ট দূর করেন? কে তোমাদের জমিনের খফিলা বানা্ন? আল্লাহর সাথে (এসব কাজে) অন্য কোন খোদা শরীক আছে কি? তোমরা কমই চন্তা-ভঅবনা কর। (কে তোমাদেরকে মরুভূমি ও সমুদ্রের আঁধঅরে পথ দেখান? কে বাতাসকে তাঁর রহমতের (বর্ষণের) আগে সুসংবাদা পাঠান? আল্লাহর সাথে অন্য কোন খোদা কি আছে (যে এসব কাজ করে)? তারা যেসব শির্ক করে তার থেকে আল্লাহ অতি উচ্চ ও মহান। কে সৃষ্টির সূচনা করেন এবং তার পুনরাবৃত্তি করেন। কে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিযিক দেন? আল্লাহর সাথে (এসব কাজে) অন্য কোন খোদা অংশীদার আছে কি? (হে নবী) এদেরকে বল, তোমরা তোমাদের শির্কে যদি সত্যবাদী হও তাহলে প্রমাণ পেশ কর।” (নমল: ৬০-৬৪)

“তিনি বড়ো বরকতশালী যিনি এ ফুরকান তাঁর বান্দার উপর নাযিল করেচেন যাতে করে সে দুনিয়াবাসীদের জন্যে সতর্ককারী হয়। তিনি জমিন ও আসমানের বাদশাহীর মালিক-যিনি কাউকে পুত্র বানাননি। বাদশাহীতে যার সাথে কেউ শরীক নেই। যিনি প্রতিটি বস্তু পয়দা করেচেন। তারপর তার এক তকদীর নির্ধারিত করেচেন। মানুষ তাঁকে ছেড়ে এমন মাবুদ বানিয়ে নিয়েছে যা কিছু পয়দা করে না বরঞ্চ তাদেরকেই পয়দা করা হয়। যে লাভ লোকসানের কোন এখতিয়ার রাখে না। যে না মৃত্যু ঘটাতে পারে, না জীবিত করতে পারে। আর মৃতকে পুনরায় জীবিত করে উঠাতে পারে (ফুরকান: ১-৩)

সূরায়ে নাহলের ৩ থেকে ১৬ আয়াতে আল্লাহতায়ালার বহু সৃষ্টি কৌশল বয়ান করার পর বলা হয়েছে, “যে সৃষ্টি করে এবং যে মোটেই কিছু সৃষ্টি করতে পারে না” উভয়ে কি সমান হতে পারে? তোমরা কি সম্বিত ও চেতনা ফিরে পাবে না? (১৭ আয়াত)

“(হে নবী) এদেরকে জিজ্ঞেস করঃ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর রব কে? বল আল্লাহ। তারপর তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, তঁঅকে ছেড়ে তোমরা কি অন্যান্যকে করিতকর্মা গণ্য করেছ যারা স্বয়ং নিজেদেই লাভ-লোকসান করার এখতিয়ার রাখে না? এদেরকে বলঃ অন্ধ এবং চক্ষুষ্মান কি কখনো সমান হতে পারে? আলো অন্ধকার সমান হতে পরে? এসব লোক যাদেরকে আল্লাহর শরীক গণ্য করে রেখেছে তারাও কি কিছু আল্লাহর মত সৃষ্টি করেছে। যার কারণ এদের জন্যে সৃষ্টির ব্যাপারে সন্দেহজনক হয়েছে? এদেরকে বলঃ আল্লাহ-ই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা এবং তিনি একক-সকলের উপর বিজয়ী।” (রা’দ : ১৬)

“হে নবী! এদেরকে বলঃ তোমরা কি তোমাদের ওসব শরীকদেরকে দেখেছ যাদেরকে তোমরা খোদাকে ছেড়ে ডাক? আমাকে বল তারা জমিনে কি পয়দা করেছে? আসমানে তাদের কি কোন অংশীদারিত্ব আছে? অথবা আমরা কি তাদেরকে কোন কিতাব দিয়েছি যার ভিত্তিতে তারা (তাদের শির্কের জন্যে) কোন সনদ রাখে? কিছুই না। বরঞ্চ এ জালেমরা একে অপরকে নিছক প্রতারণার টোপ দিচ্ছে।” (ফাতের : ৪০)

“এবং যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর যে, আসমানসমূহ ও জমিনকে পয়দা করেছে, তাহলে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ! এদেরকে বলঃ তাহলে তোমাদের কি ধারণা যে ‍যদি আল্লাহ আমার কোন ক্ষতি করতে চান, তাহলে তোমাদের দেবীগণ-আল্লাহকে ছেড়ে যাদেরকে তোমরা ডাক-তাঁর প্রেরিত ক্ষতি থেকে আমাকে বাঁচাতে পারবে? অথবা আল্লাহ যদি আমার উপর মেহেরবাণী করতে চান তাহলে এরা তাঁর মেহেরবাণীকে ঠেকিয়ে রাখবে? (তারা এমনটি করতে পারবে একথা যদি তারা বলতে না পারে) তাহলে তাদেরকে বলঃ আল্লাহ-ই আমার জন্যে যথেষ্ট। ভরসাকারীগণ তার উপরেই ভরসা করে।” (যুমার: ৩৮)

মুশরিকগণ বলতো, আমাদের মাবুদ আল্লাহর নিকটে আমাদের জন্যে নৈকট্য লাভের মাধ্যম এবং আমাদের সুপারিশকারী। এজন্যে আমরা তাদের এবাদত করি। তাদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করি, সাহায্যের জন্যে তাদেকে ডাকি যাতে তারা সাহায্যকারী হয়, আমাদের উপকার করে এবং ক্ষতি থেকে বাঁচায়। তাদের এ ধারণারও বিশদভাবে খন্ডন কুরআনে করা হয়েছে।

“এসব লোক আল্লাহকে ছেড়ে তাদের এবাদত করে যা এদের কোন লাভ-লোকসান করতে পারে না। এরা বলে, এরা আল্লাহর কাছে আমাদের সুপারিশকারি। (হে নবী) এদের বলঃ তোমরা কি আল্লাহকে সে বিষয়ের সংবাদ দিচ্ছ যা তিনি আসমানসমূহেও জানে না এবং জমিননেও জানেন না? তিনি পবিত্র ও ইচ্চতর ঐ শির্ক থেকে যা এসব লোক করে।” (ইউনুস: ১৮)

এবং যারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের জন্যে অন্য কতিপয় পৃষ্ঠপোষক বানিয়ে রেখেছে (তারা বলে”) “আমরাতো তাদের এবাদত এজন্য করি যে, আমাদেরকে তারা আলআহ পর্যন্ত পৌছিয়ে দেবে।” “আল্লাহ অবশ্যই তাদের মধ্যকার ঐসব বিষয়ের ফয়সালা করে দেবেন যে সম্পর্কে তারা মতভেদ করছে। আল্লাহ এমন কাউকে হেদায়াত করেন না যে মিথ্যাবাদী ও সত্য অস্বীকারকারী হয়।” (যুমার: ১৩)

“এসব লোক আল্লাহচে ছেড়ে অন্যান্য খোদা বানিয়ে রেখেছে যাতে করে তারা এদের সাহায্যকারী হয়। কেউ সাহায্যকারী হবে না। তারা সকলে তাদের এবাদত অস্বীকার করবে এবং আখেরাতে উল্টো তাদের বিরোধী হয়ে যাবে।” (মরিয়ম: ৮১-৮২)

“এসব লোক আল্লাহকে ছেড়ে কিছু অন্য খোদা বানিয়ে রেখেছে এবং এরা আশা করে যে, তারা এদের সাহায্য করবে। তারা এদের কোনই সাহায্য করতে পারে না। বরঞ্চ এসব লোক উল্টো তাদের জন্যে সার্বক্ষণিক লস্কর হয়ে আছে (যার বদৌলতে তাদের খোদায়ী চলছে)।” (ইয়াসীন: ৭৪-৭৫)

“কে এমন আছে যে, আল্লাহর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করতে পারে?” (বাকারাহ : ৫৫)

“হে নবী! (এ মুশরিকদের) বল: তাদেরকে তোমরা ডেকে দেখ না যাদেরকে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের মাবুদ মনে করে বসে আছ। তারা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন বস্তু মালিকও নয়। না আসমানে না জমিনে, না জনি ও আসমানে খোদায়ীতে তাদের কোন অংশীদারিত্ব আছে। না তাদের মধ্যে কেউ আল্লাহর সাহায্যকারী। এবং আল্লাহর ওখানে শাফায়াত কোন কাজে লাগবে না, অবশ্যি তার কথা আলাদা যাকে শাফায়াত করার এবং যার পক্ষে শাফায়াত করার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন।” (সাবা: ২২-২৩)

“তার থেকে প্রবঞ্চিত আর কে হতে পারে- যে আল্লাহকে ছেড়ে তাদেরকে ডাকে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তাকে কোন জবাব দিতে পারে না, বরঞ্চ তারা এর থেকেও বেখবর যে এসব লোক তাদের কাছে দোয়া প্রার্থনা করে? এবং যখন মানুষকে হাশরে একত্র করা হবে তখন তারা তাদের প্রার্থনাকারীদের দুশমন হবে এবং এবাদত অস্বীকার করবে।” (আহকাফ: ৫-৬)

“আল্লাহকেই ডাকা সঠিক। এখন আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে এরা ডাকছে তারা এদের ডাকের কোন জবাব দিতে পারে না। তাদেরকে ডাকার দৃষ্টান্ত এমন যে কোন ব্যক্তি হাত বাড়িয়ে পানির কাছে আবেদন জানাচ্ছে: “তুমি আমার মুখের মধ্যে এসে যাও।” অথচ পানি তার কাছে পৌঁছতে পারে না। এমনি কাফেরদের দোয়াও অর্থহীন, একটি লক্ষ্যভ্রষ্ট তীর মাত্র।” (রা’দ: ১৪)

“যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যকে পৃষ্ঠপোষক বানিয়ে নিয়েছে তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়। সে তার ঘর বানায এবং সকল ঘর থেকে অধিক দুর্বল হয় মাকড়সার ঘর। হায়, যদি তারা কোন জ্ঞান রাখতো।” (আনকাবুত: ৪১)

“হে লোকেরা! একটি দৃষ্টান্ত দেয়া হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনো। আল্লাহকে ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাক তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করেনি। তারা সকলে মিলে এটা করতে চাইলেও পারবে না। বরঞ্চ মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিয়ে গেলে তা উদ্ধার করতেও পারে না। যারা সাহায্য চায় তারাও দুর্বল এবং যাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হয় তারাও ‍দুর্বল। তারা মোটে আল্লাহর মর্যাদাই বুঝলো না যেমন বুঝা উচিত ছিল। প্রকৃত ব্যাপার এই যে শক্তিমান এবং পরাক্রমশালী ত একমাত্র আল্লাহ।” (হজ্ব: ৭৩-৭৪)

“এরা তাদেরকে খোদার শরীক গণ্য করে যারা কোন কিছুই পয়দা করেনি, বরঞ্চ তাদেরকেই পয়দা করা হয়? তারা না এদেরকে সাহায্য করতে পারে, আর না নিজেদের সাহায্য করতে সক্ষম।” (আ’রাফ: ১৯১-১৯২)

সূরা নহলের আয়াত ৬৫ থেকে আয়াত ৭২ পর্যন্ত মানুষের প্রতি আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ অনুকম্পা ও তাঁর নিয়ামতসমূহের উল্লেখ করার পর বলা হয়েছে:-

“লোক (এসব কিছু দেখে শুনেও) কি বাতিলকে মানে এবং আল্লাহতায়ালার অনুগ্রহ অনুকম্পা অস্বীকার করে? এবং তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের এবাদত করে যাদের আসমান থেকে রিযিক দেয়ার কোন এখতিয়ার নেই, আর না জমিন থেকে। আর এ কাজ তারা করতেই পারে না।” (নহল: ৭২-৭৩)

“আল্লাহকে ছেড়ে এরা কি কতিপয় সত্তাকে শাফায়াতকারী বানিয়ে রেখেছে? এদের বলঃ তারা কি শাফায়াত করবে তাদের এখতিয়ারে কিছু না থাকলেও? এবং তারা না বুঝলেও? বলঃ শাফায়াতের পুরো ব্যাপারটি আল্লাহর এখতিয়ার। আসমান ও জমিনের বাদশাহীর মালিক তিনিই। তাপর তাঁর দিকেই তোমাদের ফিরিয়ে দেয়া হবে।” (যুমার: ৪৩-৪৪)

“তোমাদের আশেপাশে বহু জনপদ আমরা ধ্বংস করেছি। আমরা নিদর্শনাবলী পাঠিয়ে বিভিন্নভাবে তাদেরকে বুঝিয়েছি যাতে করে তারা সৎ পথে ফিরে আসে। তাপর কেনিইবা ওসব সত্তা তাদেরকে মদদ কলো না যাদেরকে তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আল্লাহরই নৈকট্য লাভের উপায় মনে করে মাবুদ বানিয়েছিল? বরঞ্চ (আযাব আসার সময়) তারা তাদের থেকে কেটে পড়েছে। এ ছিল তাদের মিথ্যা ও কাল্পনিক আকীদার পরিণাম যা তারা রচনা করে রেখেছিল।” (আহকাফ: ২৭-২৮)

সূরা ফাতেরে আয়াত ১১ থেকে আয়াত ১৩ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার কুদরতের অলৌকিকত্ব বর্ণনা করার পর বলা হয়েছে: “ঐ আল্লাহ (এসব কাজ যাঁর দ্বারা হচ্ছে) তোমাদের রব। বাদশাহী একমাত্র তাঁরই। তাঁকে বাদ দিয়ে যাদেরকেত তোমরা ডাকছো, তারা তৃণখন্ডের মতো কোন জিনিসেরও মালিক নয়। তোমরা তাদের ডাকলে সে ডাক তারা শুনতে পাবে না। শুনলেও তার কোন জবাব দিতে পারবে না। এবং কেয়ামতের দিন তারা তোমাদের শির্ক অস্বীকার করবে।” ফাতের : ১৩-১৪)

“আল্লাহই সঠিকভাবে ফয়সালা করেন। এখন যাদেরকে (এ মুশরিকরা) আল্লহকে বাদ দিয়ে ডাকে, তারা কোন কিচুর ফয়সালা করতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ-ই সব কিছু শুনেন ও দেখেন।” (মুমেন: ২০)

তাপর লোকদেরকে বলা হয় যে, যারা ইজ্জত (কোন সাহায্যকারী শক্তির সাহায্য চায়, তার কোন সুপারিশকারী, আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম তালাশ করার এবং নযর নিয়ায- পেশ করার প্রয়োজন নেই। তার উপায় মাত্র একটি-

(আরবী*****************)

যে কেউ উজ্জত-সম্মান চায় (তার জেনে রাখা উচিত যে) ইজ্জত পুরোপুরি আল্লাহর। তার দিকে যে জিনিস উপরে উত্থিত হয় তা শুধু পবিত্র কথা এবং নেক আমল তাকে উপরে উঠায়। (ফাতের: ১০)

মুশরিকরা আল্লাহর সন্তানের কথা বলেছৈ এবং ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে গণ্য করে ও তাদের এবাদত করে। এ বিষয়ে কুরআনে কঠোর ভাষায় তার  প্রতিবাদ করে এ বিশ্বাসের অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণ করেছে।

এসব লোকের জ্বিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে পয়দা করেছেন। এবং এরা তাঁর জন্যে না জেনে বুঝেই পুত্র-কন্যা রচনা করেছে। এরা যেসব কথা বলে তার থেকে তিনি পাকপবিত্র ও মহান। তিনি ত আসমান ও জমিনের অস্তিত্বদানকারী। তাঁর সন্তানাদি কি করে হতে পারে যখন তাঁর কোন জীবন সঙ্গিনী নেই। তিনি প্রতিটি বস্তু পয়দা করেছেন এবং প্রতিটি বস্তুর জ্ঞান রাখেন। ইনিই হচ্ছেন আল্লাহ- তোমাদের রব। তিন ছাড়া কোন খোদা নেই- তিনিই সব কিছুর স্রষ্টা। অতএব তোমরা  তাঁরই বন্দেগী কর। তিন সব জিনিসের দায়িত্বশীল। (আনয়াম: ১০০-১০২)

“এরা বলে রহমানের সন্তান রয়েছে। সুবহানাল্লাহ! তারা অর্থাৎ ফেরেশতারা ত বান্দাহ যাদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে তাঁর সামনে তারা উঁচু গলায় কথা বলতে পারে না। বরঞ্চ তঁঅর হুকুম মেনে চলে। যা কিছু তাদের সামনে রয়েছে তাও তিনি জানেন এবং যা তাদের জ্ঞানের অগোচরে সে সম্পর্কেও তিনি অবহিত। যার পক্ষে আল্লাহর সুপারিশ শুনতে রাজী এমন ছাড়া আর কোন সুপারিশ তার করে না। তারা আল্লাহর ভয়ে ভীত। তাদের মধ্যে যদি কেউ এমন কথা বলে বসে: “আল্লাহ ছাড়া আমিও খোদাঃ, তাহলে তাকে আমরা জাহান্নামের শাস্তি দিব। এমন প্রতিদান আমরা জালেমদের দিয়ে থাকি।” (আম্বিয়া: ২৬-২৯)

“এসব লোক তাঁর বান্দাহদের মধ্য থেকে কিছুকে তাঁর অংশ মনে করে নিয়েছে। আসলে মানুষ স্পষ্টতই অকৃতজ্ঞ। আল্লাহ কি তার সৃষ্টিসমূহ থেকে নিজের কন্যা বেছে নিয়েছেন? আর তোমাদের পুত্র সন্তান দিয়ে ধন্য করেছেন? অথচ ব্যাপর এই যে, যাদেরকে এরা দয়ালু খোদার সন্তানস বলে, তাদের জন্মের সুসংবাদত যখন এ লোকদের মধ্যে কাউকে দেয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং ‍দুশ্চিন্তায় ভরে যায়। আল্লাহর ভঅগে কি সেসব সন্তান এলো যাদেরকে অলংকার দিয়ে লালন-পালন করা হয়- এবং তারাও তর্কেও নিজদের বক্তব্য স্পষ্ট করে বলতৈ পারে না। দয়াবান আল্লাহর বান্দাহ ফেরেশতাদেরকে যে এরা মেয়েলোক মনে করেছে, তাদের দেহের গঠন কি দেখেছে? তাদের সাক্ষ্য নেয়া হবে এবং তাদেরকে জবাবদিহি করতে হবে।” (যুখরুফ: ১৫-১৯)

“অদঃপর এদেরকে একটু জিজ্ঞেস কর- তাদের মন একথায় সায় দেয় কিনা যে তোমাদের রবের জন্যে ত হবে কন্যা সন্তান আর এদর (বা তোমাদের) জন্যে হবে পুত্র সন্তান? আমরা ফেরেশতাদেরকে মেয়েলোক বানিয়েছি এবং এরা কি চাক্ষুষ দেখা করা বলছে? ভালোভাবে শুনে রাখ, প্রকৃতিপক্ষে এরা মনগড়া কথা বলছে যে আল্লাহর সন্তান আছে। আর বাস্তবে এরা মিথ্যাবাদী।

আল্লাহ কি পুত্র সন্তানের পরিবর্তে কন্যা সন্তান নিজের জন্যে পছন্দ করেছেন? তোমাদের কি হয়েছে কি? কি ধরনের মতামত ব্যস্ত করছ? তোমাদের কি সম্বিৎ ফিরে আসছে না? তারপর তোমাদের নিকটে এসব কথার কোন সনদ থাকে তাহলে সে গ্রন্থ পেশ কর। (যার মধ্যে এসব লেখা আছে, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সাফফাত: ১৪৯-১৫৭)

“তোমরা কখনো কি এই লাৎ, ওয্যা এবং তৃতীয় আর এক বেদী মানাতের বাস্তবতা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেছ? পুত্র তোমাদের জন্যে আর কন্যা আল্লাহর জন্যে? এতো বড়ো প্রতারণামূলক বন্টন! আসলে এসব কিছুই নয়। ব্যস শুধু কয়েকটি না যা তোমরা এবং তোমাদের বাপদাদার পক্ষ থেকে রাখা হয়েছে। আল্লাহ এদের জন্যে কোন সনদ নাযিল করেননি (যাতে তিনি স্বয়ং বলেছৈন যে এগুলো আমার কন্যা)। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এসব লোক নিছক কুসংস্কার ও আন্দাজ অনামুনের অনুসরণ করছে এবং প্রবৃত্তির দাস হয়ে পড়েছে। অথচ তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের কাছে হেদায়েত এসেছে।” (নজম: ১৯-২৩)

শির্কের এক একটি দিকের খন্ডন করার সাথে মুশরিকদেরকে কুরআনে এ কথাও বলা হয়েছে যে, তোমাদের মাবুদগুলোর জন্যে কাজ এছাড়া আর কিছু নয় যে, তোমরা তাদের সামনে নযর-নিয়ায পেশ করবে এবং পূজা-পার্বন করতে থাকবে এবং তাদের কাছে এ দোয়া চাইবে যেন তারা দুনিয়ায় তোমাদের মনষ্কামনা পূরণ করতে থাকে। তোমাদের এমন কোন মাবুদ নেই য তোমাদের এ হেদায়েত দেবে যে ‍দুনিয়অর জীবন-যাপনের সঠিক মূলনীতি কি এবং ভুযল কি, কোন পন্থা সঠিক এবং কোনটা ভ্রান্ত। অথচ এবাদতের হকদার যদি কেউ হয় তাহলে সেই হতে পারে যে বান্দাহদের ও পূজারীদের পথ প্রদর্শনসও করবে।

“এদেরকে জিজ্ঞেস কর তোমাদের নির্ধারিত শরীকদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে সত্যের দিকে পথ দেখায়? যে হকের দিকে পথ দেখায় সে কি অধিকতর অনুসরণযোগ্য, না সে যে নিজেই পথ পায় না? যদি তাকে পথ দেখানো হয়ত আলাদা কথা। প্রকৃত ব্যাপার এই যে এদের অধিকাংশই আন্দাজ অনুমানের পেছনে চলছে। অথচ অনুমান সত্যের প্রয়োজন কিছুই পূরণ করতে পারে না।” (ইউনুস: ৩৬)

এভাবে যুক্তি প্রমাণ দ্বারা শির্ক একেবারে নির্মূল করে মানুষকে ভালোভাবে সতর্ক করে দেয়া হয় যে, শির্ক এমন গোনাহ যা আল্লাহ কখনো মাফ করেন না, যতক্ষণ না মানুষ তা থেকে তওবা করে। এ গোনাহের সাথে মানুষ তার নিজের ধারণা মতে যতোই নেক কাজ করুক না কেন, সবই বিনষ্ট হয়ে যাবে।

“আল্লাহর সাথে শরীক করার গোনাহ আল্লাহ কখনো মাফ করেন না। এছাড়া আর যতো গোনাহ, তিনি ইচ্ছা করলে তা মাফ করে দিতে পারেন। আল্লাহ সাথে যে আর কাউকে শরীক গণ্য করবে সে বিরাট মিথ্যা আরোপ করলো এবং বিরাট গোনাহের কাজ করলো।” (নিসা: ৪৮)

“হে মুহাম্মদ ! তাদেরকে বলঃ তারপর হে নির্বোধেরা! তোমরা কি আল্লাহকে ছাড়া আর কারো বন্দেগী করতে আমাকে বলছ? অথচ তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি এ অহী পাঠানোহয়েছিল যে, যদি তোমরা শির্ক কর তাহলে তোমার সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবে এবং তোমরা ব্যর্থকাম হয়ে পড়বে। অতএব তোমরা আল্লাহরই বন্দেগহী কর এবং কৃতজ্ঞ বান্দহাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও।” (যুমার: ৬৪-৬৬)

৫. তৌহীদের দাবী

তৌহীদকে সত্য এবং শির্ককে সকল দিক দিয়ে মিথ্যা প্রমাণ করার সাথে সাথে কুরআনে এ কথাও সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহকে এক ও লা শরীক রব ও মাবুদ মেনে নেয়ার পর-

(১) অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারো এবাদত বন্দেগী করা যাবে না।

(আরবী***************)

-আমি জ্বিন ও মানুষকে আর কারো এবাদতের জন্যে নয় বরঞ্চ এ জন্যে পয়দা করেছি যে তারা শুধু আমার এবাদত করবে। (যারিয়াত:” ৫৬)

(আরবী*******************)

-না সূর্যকে সিজদা কর না চাঁদকে। বরঞ্চ সেই আল্লাহকে সিজদা কর যিনি তোমাদের পয়দা করেছেন, যদি প্রকৃতপক্ষে তোমরা একমাত্র তাঁরই এবাদতকারী হও। (হামীম সাজদাহঃ ৩৭)

(আরবী***************)

(হে মুহাম্মদ)! আমরা এ কিতাব সত্যরূপে তোমার প্রতি নাযিল করেছি। অতএব তুমি আল্লাহরই এবাদত কর দ্বীনকে তাঁর জন্যে বিশুদ্ধ করে। সাবধান! বিশুদ্ধ দ্বীন আল্লাহরই অধিকার। (যুমার: ২-৩)

(আরবী*****************)

-বলে দাও, আমাকে নিষেধ করা হয়েছে তাদের এবাদত করতে যাদেরকে তোমরা আল্লাহকে ছাড়া ডাক। (মুমেন: ৬৬)

(২) এও অপরিহার্য হয়ে পড়ে যে আল্লাহকে ছাড়া আর কারো কাছে দোয়া করা যাবে না। অতি প্রাকৃতিক হিসাবে অভাব পূরণকারী কাজ সম্পন্নকারী মনে করে কারো সাহায্য ভিক্ষা করা যাবে না।

(আরবী**************)

-হে আল্লাহ! একমাত্র তোমারই আমরা এবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য ভিক্ষা করি।

(আরবী****************)

-এবং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সাহায্যের জন্যে ডেকো না, যে তোমার উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না।

(আরবী****************)

-এবং আল্লাহর সাথে আর কোন মাবুদকে সাহায্যের জন্যে ডেকো না। তিন ছাড়া প্রকৃত মাবুদ আর কেউ নেই।

(আরবী****************)

-আর তোমাদের যে রব বলেন, -আমাকে ডাক, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব। যারা গর্বভরে আমার এবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তারা লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (মুমেন-৬০)[এ আয়অত থেকে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, দোয়া এবং এবাদতের মর্ম একই । যে ব্যক্তি কারো কাছে যদি দোয়া প্রার্থনা করে, তাহলে প্রকৃত পক্ষে সে তার এবাদত করে গ্রন্থকার]

(আরবী*****************)

এবং যখন আমার বান্দাহ আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে তখন তাকে বলো যে আমি নিকটেই আছি।[অর্থাৎ আমার কাছে দোয়া করার জন্যে কোন মাধ্যমের প্রয়োজন নেই। আমি সরাসরি দোয়া ‍শুনি- গ্রন্থকার।] দোয়াকারী যখন আমাকে ডাকে তখন আমি তার দোয়ার জবাব দিই। (বাকারাহ: ১৮৬) [জবাবের অর্থ এ নয় যে, দোয়াকারী সে জবাব শুনতে পাবে। বরঞ্চ তার অর্থ এই যে, সকল আবেদন-নিবেদনের প্রত্যুত্তরে পদক্ষেপ গ্রহণ আমিই করি।– গ্রন্থকার]

(৩) এটাও অপরিহার্য যে, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ‘আলেমুল গায়েব”। অন্য কারো সম্পর্কে এমন ধারণা করা যাবে না যে সে সৃষ্টিজগতের গোপন প্রকাশ্য সকল রহস্য অবগত আছে এবং অতীত থেকে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ের জ্ঞঅন তার রয়েছে।
(আরঈ**************)

বল, আসমান ও জমিনে যারা আছে তাদের মধ্যে কেউই একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অপ্রকাশ্য বিষয়ের জ্ঞঅন রাখে না। (নামল: ৬৫)

(আরবী****************)

-তাঁরই হাতে রয়েছে অদৃশ্যের চাবিকাঠি যা তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না। স্থলভাগে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে তা তিনিই জানেন। কোন গাছের একটি পাতা ঝড়ে পড়লে তা তিনি জানেন। জমিনে গভীর অন্ধকারে কোন বীজ এমন নেই আর কোন শুষ্ক ও শিক্ত এমন নেই যা একটি  সুস্পষ্ট দপ্তরে সন্নিবেশিত নেই। (আনয়াম: ৫৯)

(৪) এটাও অনিবার্য যে আল্লাহ ছাড়া আর কারো নামে অথবা কোন আস্তানায় কোন পশু জবাই অথবা কুরবাণী করা যাবে না। এমন প্রতিটি পশু হারাম হবে যা জবাই করার সময় আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি। অথব আল্লাহর সাথে আর কারো নাম নেয়া হয়েছে। কুরআনে চার স্থানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, যে পশু জবাই করার সময় আল্লাহ ছাড়া আর কারো নাম নেয়া হয়েছে তা হারাম (বাকরাহ: ১৭৩, মায়েদা-৩, আনয়াম: ১৪৫, নহল: ১১৫)। সূরা মায়েদায় একথারও বিশদ বর্ণনা আছে যে, গায়রুল্লাহর জন্যে নজর হিসাবে কুরবানী করার জন্যে মুশরিকরা যেসব আস্তানা বানিয়ে রেখেছিল, সেখানেই জবাই করা পশুও হারাম। (আয়াত : ৩)

অতঃপর আনয়ামে পরিষ্কার বলা হয়েছে-

(আরবী******************)

-অতএব খাও ঐ পশুর গোশত থেকে যা (জবাই করার সময়) আল্লাহর নাম নেয়া হয়েছে।

(আরবী****************)

-এবং খেয়োনা এমন কোন পশুর গোশত যার উপর (জবাইয়ের সময়) আল্লাহর নাম নেয়া হয়নি। কারণ এ খোদাদ্রোহিতা।

(৫) এটাও অপরিহার্য় যে, যে খোদা সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব মানুষের যাবতীয় ব্যাপারে (নৈতিকতা, তাহযিব, তামাদ্দুন, সামাজিকতা, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন ও বিচার বিভাগ, যুদ্ধ সন্ধি প্রভৃতি ব্যাপারে) মেনে নিতে হবে। তঁঅর আইনই হবে আইন, তাঁর মুকাবিলায় অন্য কারো আইন রচনার এখতিয়ার থাকবে না। তিনি যা হারাম করেছেন তাই হারাম এবং তিনি যা হালাল করেছেন তাই হালাল। কারো এমন অধিকার নেই যে, সে নিজের পক্ষ থেকে হালাল ও হারাম নির্ধারণ করবে। মানুষ ব্যক্তি এবং দল হিসাবে না স্বাধীনভাবে তার মর্জি চালাবে, আর না এক খোদা ব্যতীত অন্য কারো মর্জিমত রচিত আইন-কানুন মেনে নেবে। মানুষের সকল ব্যাপারে ফয়সালা করার এখতিয়ার আল্লাহর, বান্দাহর নয়।

(আরবী**************)

তোমাদের মধ্যে যে বিষয়েই মতানৈক্য হোক, তা ফয়সালা করা আল্লাহর কাজ। (শুরা: ১০)

(আরবী****************)

-এসব লোক কি খোদার এমন শরীক রাখে যারা তাদের দ্বীনেরই অনুরূপ এমন শরীয়ত নির্ধারিত করে দিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? (শুরা: ২১)

এ আয়াত থেকে একথা সুস্পষ্ট যে, এখানে শরীক বলতে তাদেরকে বুঝানো হয়নি যাদের কাছে দোয়া করা হয়, যাদেরকে নযর-নিয়ায দেয়া হয়, যাদের সামনে পূজাপার্বন করা হয়। বরঞ্চ অনিবার্যরূপে এর অর্থ হচ্ছে সেইসব মানুষ যাদেরকে লোক হুকুম শাসনে শরীক বলে গণ্য করে। যাদের বর্ণিত চিন্তাধারা, আকীদাহ-বিশ্বাস, মতবাদ ও দর্শনের প্রতি মানুষ বিশ্বাস করে, যাদের দেয়া মূল্যবোধকে তারা মেনে চলে, যাদের উপস্থাপিত নৈতিক মূলনীতি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির মানদন্ড স্বীকার করে নেয় এবং যাদের রচিত আইন, কর্মপদ্ধতি ও ঐতিহ্য নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে, ব্যক্তিগত জীবনে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেন-দেনে, বিচারালয়ে, রাজনীতিক ও সরকার পরিচালনায় এমনভাবে অবলম্বন করে যেন এটাই তাদের শরীয়ত যার অনুসরণ তাদের করতে হবে। (৮)

(আরবী****************)

-তারা আল্লাহ ছাড়া তাদের আলেম ও পীর দরবেশদেরকে তাদের রব বানিয়ে নিয়েছে এবং এভাবে মসীহ ইবনে মরিয়মকেও। অথচ এক আল্লাহ ব্যতীত আর কারো বন্দেগী করার হুকুম তাদেরকে দেয়া হয়নি, যে আল্লাহ ছাড়া বন্দেগী পাওয়ার অধিকারী আর কেউ নেই। তারা যেসব শিরক করে তার থেকে তিনি পাক পবিত্র। (তওবা: ২১)

হাদীসে আছে হযরত আদী (রা) বিন হাতেম পূর্বে ঈসায়ী ছিলেন। তিনি যখন নবী (সা)-এর দরবারে হাজির হয়ে মুসলমান হলেন তখন অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্ন এও করেন “এ আয়াতে অীভযোগ করা হয়েছে যে,  আমরা আমাদের আলেম ও দরবেশগণকে খোদা বানিয়ে নিয়েছি- এর প্রকৃত মর্ম কি?”

জবাবে হুজুর (সা) বলেন, এ কি ঠিক নয় যে,  তারা যা হারাম গণ্য করতে তা তোমরা হারাম মেনে নিতে এবং যা হালাল গণ্য করতো তা হালাল মেনে নিতে? তিনি বলেন, এ ত আমরা অবশ্যই করতাম। নবী (সা) বলেন, ব্যস্‌ এটাই তাদেরকে খোদা মেনে নেয়া হলো।

এর থেকে জানা যায় যে, আল্লাহর কিতাবের সনদ ব্যতী যারা মানুষের জীবনের জন্যে জায়েয নাজায়েযের সীমারেখা নির্ধারণ করে তারাই প্রকৃতপক্ষে খোদায়ীর আসনে আপন গর্বভরে সমাসীন হয়। যারা তাদের এ শরীয়ত রচনার অধিকার স্বীকার করে নেয়, তারা তাদেরকে খোদা বানিয়ে নেয়। (৯)

(আরবী****************)

-হে নবী তাদেরকে বল, তোমরা কখনো চিন্তা করে দেখেছ কি যে যেসব জীবিকা আল্লাহ তোমাদের জন্যে নাযিল করেছিলেন তার মধ্যে তোমরা স্বয়ং কিছু হারাম এবং কিছু হালাল গণ্য করে নিয়েছ? এদেরকে জিজ্ঞেস কর, আল্লাহ কি তোমাদেরকে এর অনুমতি দিয়েছেন, না আল্লাহর প্রতি তোমরা মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করছ? (ইউনুস: ৫৯)

(আরবী*****************)

আর এই যে তোমাদের মুখ থেকে এ মিথ্যা হুকুম জারি করা হচ্ছে যে এ হারাম, এ হালাল, ত এ ধরনের হুকুম জারি করে আল্লাহ উপর মিথ্যা আরোপ করো না। যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে তারা কখনো সাফল্য লাভ করবে না। (নমল: ১১৬)

(আরবী******************)

এবং যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার ফয়সালা করে না তারাই কাফের…. তারাই জালেম….. তারাই ফাসেক। (মায়েদা: ৪৪-৪৭)

(আরবী*******************)

তুমি কি দেখেছ সে ব্যক্তিকে যে তার প্রবৃত্তিকে তার খোদা বানিয়ে নিয়েছে (অর্থাৎ স্বেচ্ছাচারী হয়েছে এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব করা শুরু করেছে)। (জাসিয়া: ২৩)

এভঅবে রসূলুল্লাহ (সা) যে তৌহীদের শিক্ষা পরিবেশন করছিলেন তার দাবী শুধু এই ছিল যে, মানুষ যেন এক খোদা ব্যতী আর কারো পূজা অর্চনা না করে। কারো কাছে দোয়া না চায় এবং কারো নামে কুরবানী না করে, তার শিক্ষা এটাও ছিল যে, লোকে যেন তাদের সকল রসম-রেওয়াজ, সকল নিজের রচিত অথবা অপরের রচিত আইন-কানুন ও নিয়মনীতি পরিহার করে একমাত্র আল্লাহকে আইনদাতা মেনে নেয়। এবং তাঁর প্রদত্ত আইন মেনে চলে। এ ব্যাপারে স্বয়ং নবী (সা) কোন ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর প্রতিও এ আদেশ ছিল যে, তিনও যেন আল্লাহর নাযিল করা আিইন মেনে চলেন এবং নিজের মর্জি মতো কোন কিছুকে হালাল অথবা হারাম না করেন।

(আরবী*************)

হে মুহাম্মদ (সা), আনুগত্য কর ঐ জিনিসের যা অহীর মাধ্যমে তোমার রবের কাছ থেকে তোমার প্রতি পাঠানো হয়েছে।

(আরবী*************)

-হে নবী, তুমি কেন সে জিনিসকে হারাম করছ যা আল্লাহ তোমার জন্যে হালাল করেছেন?

এ ছিল এক সার্বিক বিপ্লবের দাওয়াত যা শুধু ধর্মই নয়, বরঞ্চ যা গোটা জীবন ব্যবস্থঅকে বদলাতে চাচ্ছিল। এতে আরবের মুশরিকদের মধ্যে ত চাঞ্চল্য সৃষ্টি হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু বিশেষ করে কুরাইশদের স্বার্থে যে বিরাট আঘাত লাগছিল তাতে তারা বিচলিত হয়ে পড়ে। কারণ স্বয়ং তাদের গোত্র এবং আপন শহর থেকে এ দাওয়াত উত্থিত হওয়ায় তারা তাদের ধ্বংসই দেখতে পাচ্ছিল। (১০)

কুরাইশদের বিরোধিতার বড়ো ও বুনিয়াদী কারণ

কুরআন মজিদে বলা হয়েছে যে রসূলুল্লাহ (সা)-এর দাওয়াত কবুল করতে কুরাইশরা যে বিপদের আশংকা করছিল তা ছিল নিম্নরূপ:ঢ়-

(আরবী***************)

তারা বলে, যদি আমরা তোমাদের সাথে এ হেদায়েত অনুযায়ী চলা শুরু করি তাহলে আমাদেরকে দেশ থেকে উচ্ছেদ করা হবে)। (কাসাস: ৫৭)

গভীরভাবে চিন্তা করলে জানতে পারা যায় য, এটাই ছিল কুরাইশদের সত্যকে অস্বীকার করার বুনিয়াগী কারণ। একথা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের দেখা দরকার যে, ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে সে সময় কুরাইশদের মর্যাদা কি ছিল যা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশংকা তারা করছিল।

প্রথমতঃ যে জিনিসটি আরব দেশে তাদেরকে গুরুত্ব দান করেছিল তা হচ্ছে এই যে, আরবের বংশ তালিকা অনুযায়ী তারা হযরত ইসমাঈল (আ) এর বংশধর বলে প্রমাণিত ছিল। এর ভিত্তিতে তাদের পরিচয় আরববাসীদের দৃষ্টিতে পীরজাদাদের পরিবারের মর্যাদা লাভ করতো। অতঃপর কুসাই বিন কিলাবের চেষ্টা তদবীরে যখন তারা কাবা ঘরের মুতাওয়াল্লাী হয়ে পড়লো এবং মক্কা তাদের আবাসভূমি হলো, তখন তাদের গুরুত্ব আগের থেকে অনেক বেড়ে গেল। কারণ এখন তারা আরবের সর্ববৃহৎ তীর্থ স্থানের পুরোহিত হয়ে পড়লো। সকল আরব গোত্রের ধর্মীয় নেতৃত্বের আসন তারা লাভ করলো। আরবের কোন গোত্র এমন ছিল না যে, হজ্বের কারণে তাদের সাথে কোন সম্পর্ক রাখতো না। এই কেন্দ্রীয় মর্যাদানুযোগে তারা ক্রমশঃ ব্যবসায় উন্নতি করতে থাকে। সৌভাগ্যক্রমে রোম ও ইরামেন পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক ব্যবসা ক্ষেত্রে তাদেরকে এক বিশেষ মর্যাদা দান করে। সে সময়ে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার সাথে রোম, গ্রীস, মিসর ও শাম দেশের যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো তার সকল ইরান অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। সর্বশেষ পথ ছিল লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ইরান-ইয়ামেন অীধকার করার পর সে পথও বন্ধ হয়ে যায়। তাপর ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রাখার এছাড়া আর কোন পথ রইলো না যে, আরব ব্যবসায়ীগণ একদি রোমের অধিকৃত অঞ্চলের পণ্য দ্রব্যাদি আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরের বন্দরে পৌঁছাবে এবং অন্যদিকে এসব বন্দর থেকে প্রাচ্যের পণ্য দ্রব্য রোমের অধিকৃত অঞ্চলে পৌঁছাবে। এর ফলে মক্কা আন্তর্জাতিক ব্যবসা-কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ ব্যবসার একচেটিয়া তখন কুরাইশদের ছিল। কিন্তু আরবের বিশৃংখল ও অরাজকতাপূর্ণ পরিবেশে পণ্য দ্রব্যাদির অবাধ চলাচল সম্ভব ছিল না। তবে যেসব উপজাতি অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের রাজপথ গিয়েছে, তাদের সাথে কুরাইশদের গভীর সম্পর্ক থাকলেও শুধু এসব পথে পণ্য দ্রব্যাদি চলাচল সম্ভব ছিল। এ উদ্দেশ্যে কুরাইশ সর্দারগণ শুধু নিজেদের ধর্মীয় প্রভাবকে যথেষ্ট মনে করত না। এজন্যে তারা সকল উপজাতির সাথে চুক্তি সূত্রে আবদ্ধ ছিল। ব্যবসার মুনাফার একটা অংশ তাদেরকে দেয়া হতো এবং উপজাতি শায়খ ও সর্দারদের উপঢৌকন দিয়েও খুশী রাখা হতো। সুদী কারবারের এমন এক জালও বিস্তার করে রাখা হয়েছিল যার ফলে সকল প্রতিবেশী উপজাতিদের ব্যবসায়ী মহল ও সর্দারণগণ জড়িত হয়ে পড়েছিল।

এমন অবস্থায় যখন নবী (সা)-এর পক্ষ থেকে তৌহীদের দাওয়াত দেয়া হয়, তখন পূর্বপুরুষদের ধর্ময় গোঁড়ামি অপেক্ষা যে জিনিসটি নবীর বিরুদ্ধে কুরাইশদের উত্তেজনার কারণ ছিল তা এই যে, এ দাওয়ারেত কারণে তারা তাদের স্বারথকে বিপন্ন মনে করছিল। তারা মনে করছিল যে, ন্যায়সঙ্গত যুক্তিপ্রমাণেল দ্বারা শির্ক ও পৌত্তলিকতা ভ্রা্ত এবং তৌহীদ সঠিক প্রমাণিত হলেও ওসব পরিত্যাগ করে এটা গ্রহণ করা তাদের জন্যে মারাত্মক হবে। এমন করলে তৌহীদ গ্রহণ করলে সমগ্র আরব তাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। তকাদেরকে কাবার পৌরহিত্য থেকে বেদখল করা হবে। পৌত্তলিক গোত্রদের সাথে চুক্তিকৃত সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে। যাবে বদৌলতে তাদের ব্যবসায়ী দিনরাত তাদের বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করে। এভাবে এ নতুন দ্বীন তাদের ধর্মীয় প্রভাব প্রতিপত্তিও বিনষ্ট করবে এবং সেই সাথে অর্থনৈতিক সাদৃশ্যও। বরঞ্চ এটাও অসম্ভব নয় যে সকল আরব উপজাতি তাদেরকে মক্কা ছেড়ে চলে যেতেও বাধ্য করবে।

এখানে দুনিয়অ পূজারীদের অদূরদর্শিতার আজব চিত্র মানুষের সামনে ফুটে ওঠে। রসূলুল্লাহ (সা) বার বার এ আশ্বাস দেন যে, আমার উপস্থাপিত কালেমা তোমরা মেনে নিলে আরব আজম তোমাদের অধীন হয়ে যাবে। কিন্তু তারা এর মধ্যে তাদের মরণই দেখতে পায়- তারা মনে করতো, যে ধনদৌলত ও প্রভাব প্রতিপত্তি তাদের রয়েছে, এ দাওয়াত কবুল করার সাথে সাথেই তা শেষ হয়ে যাবে-আরব ও আজম তাদের পদানত হওয়া তো দূরের কথা। তাদের আশংকা ছিল যে, এ কালেমা কবুল করা মাত্র এ ভূখন্ডে তারা এমন সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়বে যে, চিল ও কাক যেভাবে গোশত ছোঁ মেরে নিয়ে যায়, তেমন এ ভুখন্ড থেকে তাদেরকে উৎখাত করে দেয়া হবে এবং কোথাও তাদের আশ্রয় জুটবে না। তাদের দৃষ্টির সংকীর্ণতা সে অবস্থঅ দেখতে পারতো না যখন মাত্র ক’বছর পরই সমগ্র আরব মুহাম্মদ (সা) এর অধীন একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীন হতে যাচ্ছিল। অতঃপর উক্ত পুরুষের জীবনে ইরান, ইরাক, শাম, মিশর সবই এক একটি করে এ রাজ্যের অধীন হতে যাচ্ছিল এবং এ কথার পর এক শতাব্দী অতীত হওয়ার পূর্বেই কুরাইশদের প্রতিনিধিগণ সিন্ধু থেকে স্পেন পর্যন্ত এবং কাফকাজ থেকে ইয়অমেনের সমুদ্রতীর পর্যন্ত দুনিয়ার একটি বিরাট অংশের উপর শাসনস করতে থাকে।

তার আপত্তির জবাবে কুরআন

কুরআন মজিদ তাদের ওসব ওজর আপত্তির যে জবাব সূরায়ে কাসাসে দিয়েছে তা দেখুন যে তা ছিল কত প্রভাব বিস্তারকারীঃ

(আরবী***************)

-ব্যাপার কি এ নয় যে, আমরা একটি নিরাপদ হারামকে তাদের বাসস্থান বানিয়ে দিয়েছি যেখানে সব রকমের ফল আমদানি হয় আমাদের পক্ষ থেকে রিযিক হিসাবে? তাদের অধিকাংশিই তা জানে না। (কাসাস: ৫৭)

 এ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাদের ওজরের প্রথম জবাব। এর অর্থ এই যে, হেরেমের পূর্ণ নিরাপত্তা ও তার কেন্দ্রীয় মর্যাদার বদৌলতে সারা দুনিয়ার পণ্যদ্রব্য এ অনুর্বর উপতকায় আমদানি হচ্ছে, তা কি তোমাদের কোন চেষ্টা তদবীরের ফলে হয়েছে? আড়াই হাজার বছর পূর্বে প্রস্তরময় পর্বতপুঞ্জের মাঝে এ পানি ও তৃণ লতাহীন উপত্যকার জনৈক আল্লাহর বান্দাহ তাঁর বিবি ও দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন। তিন পাথরের উপর পাথর রেখে একটি হুজরা নির্মাণ করে উচ্চস্বরে বলেন, “আল্লাহ এটাকে হেরেম বানিয়ে দিযেছে। এ ঘরের দিকে আস এবং তাওয়াফ করো।’

এখন আল্লাহর প্রদত্ত বরতক ছাড়া আর কি হতে পারে যে, পঁচিশ শতাব্দী যাবত এ স্থানটি আরবের কেন্দ্রস্থল হয়ে আছে। ভয়ানক নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশেও দেশের মধ্যে এ স্থানটিই এমন যেখানে নিরাপত্তা আছে। আরবর প্রতিটি শিশু পর্যন্ত তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তার তওয়াফের জন্যে আসে। এ নিয়ামতের সুফল তো এই যে, তোমরা আরববাসীদের সর্দার হয়ে পড়েছ এবং দুনিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের এক বিরাট অংশ তোমাদের হাতে রয়েছে। তোমরা কি মনে কর যে, যে খোদা তোমাদেরকে এ নিয়ামত দান করেছেন, তার থেকে বিমুখ ও তাঁর বিদ্রোহী হয়ে তোমরা ত উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করবে, কিন্তু তাঁর দ্বীনের অনুসরণ করা মাত্রই ধ্বংস হয়ে যাবে? তারপর বলা হলো:

(আরবী******************)

-এবং কত জনপদ আমরা ধ্বংস করেছি যার লোকজন তাদের জীবন-জীবিকার জন্যে ভয়ানক গর্বিত ছি। এখন দেখ, তাদের ঘরদোর খালি পড়ে আছে যার মধ্যে তাদের পরে কম লোকই বসবাস করেছে। অবশেষে আমরাই এসবের উত্তরাধিকারী হলাম।” (কাসাস: ৫৮)

এ ছিল তাদের ওজর আপত্তির দ্বিতীয় জবাব। এর অর্থ এই যে, যে ধন দৌলত ও স্বাচ্ছন্দে তোমরা গর্বিত এবং হারাবার আশংকায় তোমরা বাতিলের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে এবং সত্য পথ থেকে মুখ ফেরাতে চাচ্ছ, এসব কিছু এক সময়ে আদ, সামুদ, সাবা. মাদইয়ান এবং কওমে লূতের লোকেরাও লাভ করেছিল। এসব কি তাদেরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পেরেছে? আসলে জীবনের মান উন্নয়নই তো একটি লক্ষ্যবস্তু নয় যে মানুষ হক ও বাতিল থেকে বেপরোয়া হয়ে ব্যস শুধু তার পেছনেই লেগে থাকবে এবং সত্য পথ এজন্যে কবুল করতে অস্বীকার করবে যে, তা করলে এ লক্ষ্যবস্তু হাতছাড়া হয়ে যাবার আশংকা রয়েছে। তোমাদের নিকটে এর কি কোন নিশ্য়তা আছে যে, যে গোমরাহি ও পাপাচার অতীতের সচ্ছল জাতিগুলোকে ধ্বংস করেছে, তার উপরে জিদ ধরে বসে থেকে তোমরা বেঁচে যাবে? তাদের মতো পরিণাম কি তোমাদের হবে না? তারপর বলা হচ্ছে:

(আরবী***************)

-এবং তোমার রব জনপদগুলো ধ্বংস করেননি যতোক্ষণ না তাদের কেন্দ্রে একজন রসূল পাঠিয়েছি যে তাদেরকে আমাদের আয়াত শুনায়। ওসব জনপদের অধিবাসী জালেম না হলে আমরা জনপদ ধ্বংস করি না। (কাসাস: ৫৯)

এছিল তাদের ওজরের তৃতীয় জবাব। আগে যেসব জাতি ধ্বংস হয়েছে তাদের লোকজন জালেম ছিল কিন্তু খোদা তাদের ধ্বংসের পূর্বে তাঁর রসূল পাঠিয়ে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। তাঁর সতর্ক করে দেয়া সত্ত্বেও যখন তরা তাদের ভ্রষ্টতা থেকে বিরত হলো না তখন তাদেরকে ধ্বংস করা হয়। এ অবস্থায় সম্মুখীন এখন তোমরা হয়েছে তোমরাও জালেম হয়ে পড়েছ। তোমাদের সতর্ক করে দেয়ার জন্যে একজন রসূলও এসে গেছেন। এখন তোমরা কুফর ও নাস্তিকতা অবলম্বন করে তোমাদের সুখ সম্ভোগে ও সচ্ছলতা রক্ষা করতে পারবে না, বরঞ্চ উল্টো বিপন্ন করবে। যে ধ্বংসের আশংকা তোমরা করছ তা ঈামন আার কারণে হবে না, হবে অস্বীকার করার কারণে। তারপর এরশাত হলো:

(আরবী***************)

-তোমাদেরকে যা কিছুই দেয়া হয়েছে তা নিছক দুনিয়ার জীবনের সামগ্রী ও তার সৌন্দর্য শোভা। আর যা কিছু আল্লাহর কাছে রয়েছে যাত এর থেকে উৎকৃষ্টতর এবং অধিকতর স্থায়ী। তোমরা কি বিবেক বুদ্ধি খাটাও না? যাকে আমরা প্রতিশ্রুটি দিয়েছি এবং যে প্রতিশ্রুতি বস্তু অবশ্যই লাভ করবে সে কি তার মত হতে পারে যাকে আমরা শুধু দুনিয়ার সামগ্রী দিয়েছি এবং যাকে কিয়ামতের দিন শাস্তির জন্যে উপস্থাপিত করা হবে? (কাসা: ৬০-৬১)

 এ হলো তাদের ওজরের চতুর্থ জবাব। এ জবাব বুঝবার জন্যে প্রথমে দু’টি জিনিস হৃদয়ংগম করতে হবে।

প্রথম এই যে, দুনিয়অর জীবনের মেয়াদ কয়েক বছওেরর বেশী নয়। নিছক একটি সফরের সাময়িক স্তর। প্রকৃত চিরস্থায়ী জীবন ভবিষ্যতে আসবে। বর্তমান সাময়িক জীবনে মানুষ যতোই সামগ্রী জমা করুক এবং যতোই আনন্দ-সম্ভোগের জীবন যাপন করুক না কেন, তা অবশ্যই শেষ হবে এবং এখানকার যাবতীয় সামগ্রী এখানেই ছেড়ে যেতে হবে। এ আনন্দ-সম্ভোগের মুকাবিলায় একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এটাকেও্ ছেড়ে যেতে দেবে যে, এখানে কয়েক  বছর বিপদ মুসবিত ভোগ করবে কিন্তু এখান থেকে এমন পুণ্য অর্জন করে যাবে যা পরবর্তী চিরন্তন জীবনের চিরস্থায়ী হওয়ার কারণ হবে।

দ্বিতীয় কথা এই যে, আল্লাহর দ্বীন মানুষর কাছে এ দাবী করে না যে, এ দুনিয়ার জীবনের সামগ্রী থেকে কোন ফায়দা হাসিল করবে না এবং তারা সৌন্দর্যশোভা অযথা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করবে। তার দাবী শুধু এই য, দুনিয়ার উপরে আখেরাতকে অগ্রাধিকার দেবে। কারণ দুনিয়া ধ্বংসশীলণ এবং আখেরাত অনন্তকালীন। দুনিয়অর সুখ-সম্ভোগ নিকৃ্ট এবং আখেরাতের সুখ শান্তি উৎকৃষ্ট। এজন্যে দুনিয়ার সে সব সামগ্রী ও সৌন্দর্যশোভা মানুষের অবশ্যই লাভ করা উচিত যা আখেরাতের স্থায়ী জীবনের সাফল্য দান কতরে। অথবা নিদেরপক্ষে তাকে যেন সেখানকার স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হতে না হয়। কিন্তু উভযেল মধ্যে প্রতিযোগিতার প্রশ্ন যদি এসে যায় অর্থঅৎ দুনিয়অর সাফল্য এবং আখেরাতের সাফল্য যদি একে অপরের প্রতিদ্বন্দবী হয়, তখন মানুষ দুনিয়অকে আখেরাতের জন্যে কুরবান করবে এবং এ দুনিয়অর সাময়িক সুখ সম্ভোগের খাতিরে সে পথ কখনোই অবলম্বন করবে না যার দ্বারা চিরকালের জন্যে তার পরিণাম মন্দ হয়।

এ দু’টোকে সামনে রেখে দেখুন, আল্লাহর উপরের বাক্যগুলোতে কি বলছৈন। তিনি কথা বলছেন না ব্যবসা-বাণিজ্য উঠিয়ে ফেল, কারবার বন্ধ করে দাও। আমাদের পয়গম্বরকে মেনে নিয়ে দারিদ্রবরণ কর। বরঞ্চ তিনি বলছেন, এ দুনিয়ার যে ধন দৌলতের মধ্যে ডুবে আছ তা অতি অল্প এবং অল্প সময়ের জন্যে এ দুনিয়ার জীবনে তার থেকে ফায়দা হাসিল করতে পার। তার বিপরীত আল্লাহর কাছে যা আছে তা এর তুলনায় গুণ ও পরিমাণের দিক দিয়ে উৎকৃস্ট এবং চিরস্থায়ী। এজন্যে তোমরা বোকামি করবে যদি সাময়িক জীবনের সীমিত নিয়ামত ভোগ করার জন্যে এমন আচরণ কর যার পরিণাম আখেরাতের চিরন্তন ক্ষতির আকারে তোমাদের ভোগ করতে হয়। তোমরা স্বয়ং তুলনা করে দেখ, সাফল্যলাভকারী কি সে ব্যক্তি যে কঠোর পরিশ্রম ও প্রাণান্তকর চেষ্টাসহ তার রবের আনুগত্য করে এবং তারপর চিরদিনের জন্যে তার নিয়ামত দ্বারা ভূষিত হয়, অথব সে যাকে অপরাধী হিসাবে গ্রেফতার করে খোদার আদালতে পেশ করা হবে- তা সে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে কিছু দিনের জন্য অবৈধ উপায়ে অর্জিত স্পদ উপভোদ করার সুযোগ লাভ করুক না কেন। শেষে বলা হয়েছে:

(আরবী*************)

-এবং (এরা যেন ভুলে না যায়) সেদিন যখন তিনি এদেরকে ডেকে বলবেন, কোথায় আমার সেসব শরীক যাদেরকে তোমরা ধারণা করেছিলে? (কাসাস: ৬৩)

এ কথাও এ চতুর্থ জবাব প্রসংগেই বলা হযেছৈ। এর সম্পর্ক উপরের আয়অতের শেষ বাক্যের সাথে। এতে বলা হয়েছে যে, নিছক নিজের দুনিয়াবী স্বার্থের খাতিরে শির্ক, পৌত্তলিকতা এবং নবুয়ত অস্বীকারের যে গোমরাহীতে পড়ে থাকার এরা জিদ ধরেছে, আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে তার কি ভয়াবহ পরিণাম তাদের দেখতে হবে। এর থেকে এ অনুভূতি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য যে, মনে কর দুনিয়ারয় তোমাদের উপর কোন বিপদ যদি নাই আসে এবং এখানকার ক্ষণস্থায়ী জীবনে খুব আনন্দ সম্ভোগ করলে, তারপরও যদি আখেরারেত তার পরিণাম এ ধরনের হয়, তাহলে নিজে নিজেই চিন্তা করে দেখ এটা কি মুনাফার সওদা যা তোমরা করছ, না একেবারে লোকসানের সওা? (১১)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.