সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

s-3-4

সীরাতে সারওয়ারে আলম (স)

৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী

অনুবাদ : আব্বাস আলী খান


স্ক্যান কপি ডাউনলোড

চলমান পেজের সূচীপত্র

চলমান পেজের সূচীপত্র

বাংলা তৃতীয় সংস্কারণ সম্পর্কে কিছু কথা

মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (র)-এর বিখ্যাত গ্রন্থ সীরাতে সরওয়ারে আলম দ্বিতীয় খন্ডকে আমরা বাংলা ভাষায় তিন খন্ডে অর্থাৎ ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম খন্ডে প্রকাশ করে আসছিলাম। পাঠকগণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে এখন থেকে আমরা বাংলা ৩য় ও ৪র্থ খন্ডকে এক ভলিউমে প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এ সংস্করণ থেসে সেভাবেই প্রকাশ হলো।

বাংলা প্রথম খন্ডে মূলত নবুওয়ত ও রিসালাত সম্পর্কে তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয়েছে। আর দ্বিতীয় খন্ডে আলোচিত হয়েছে অতীত জাতিগুলোর ধ্বংসের ইতিহাস। তৃতীয় খন্ড থেকে ‍মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাতের ইতিহাস আলোচনা শুরু হয়েছে।

ঢাকাস্থ সাইয়েদ আবুল আ[’লা মওদূদী রিসার্চ একাডেমী মাওলানার সবগুলো গ্রন্থই বাংলাভাষী পাঠকদের সামনে দ্রুত পেশ করার পরিকল্পনা করেছে। ইতোমধ্যে আলহামদুলিল্লাহ তাঁর সবগুলো গ্রন্থই বাংলা ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমান গ্রন্থটি অনুবাদ করেছেন মাওলানার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সুসাহিত্যিক জনাব আব্বাস আলী খান। তাঁর অনুবাদ কাজের পারদর্শীতা, শব্দ প্রয়োগের নিপুণতা এবং ভাষায়র বলিষ্ঠতা সম্পর্কে সুধী পাঠকগণকে নতুন করে বলার আছে বলে আমরা মনে করি না।

গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পারায় আমরা আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করছি। এ গ্রন্থের সকল পাঠককে তিনি নবূওয়তের প্রকৃত মিশন উপলব্ধির তৌফিক দিন। আমীন।

আবদুস শহীদ নাসিম

পরিচালক

সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদীদী রিসার্চ একাডেমী।

১৯.১০.২০০০ইং

ইসলাম প্রকৃতপক্ষে সেই আন্দোলনের নাম যা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের ধারণা-বিশ্বাসের ওপর মানব জীবনের গোটা প্রাসাদ নির্মাণ করতেচায়। এ আন্দোলন অতি প্রাচীনকাল থেকে একই ভিত্তির ওপর এবং একই পদ্ধতিতে চলে আসছে। এর নেতৃত্ব তাঁরা দিয়েছেন, যাঁদেরকে আল্লাহ তায়ালার নবী রসূল বলা হয়। আমাদেরকে যদি এ আন্দোলন পরিচালনা করতে হয়, তাহলে অনিবার্যরূপে সেসব নেতৃবৃন্দের কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ এছাড়া অন্য কোন কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। কারণ এছাড়া অন্য কোন কর্মপদ্ধতি এ বিশেষ ধরনের আন্দোলনের জন্যে না আছে আর না হতে পারে। এ সম্পর্কে যখন আমরা আম্বিয়ায়ে কেরাম (আ) এর পদাংক অনুসন্ধানের চেষ্টা করি, তখন আমরা বিরাট অসুবিধার সম্মুখীন হই। প্রাচীনকালে যেসব নবী তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন, তাঁরেদ কাজকর্ম সম্পর্কে আমরা বেশী কিছু জানতে পারি না। কোরআনে কিছু সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু তার থেকে গোটা পরিকল্পনা উদ্ধার করা যায়না। বাইবেলের নিউ টেষ্টামেন্টে হযরত ঈসা (আ) এর কিছু অনির্ভরযোগ্য বাণী পাওয়া যায় যা কিছু প্রামণে একটি দিকের ওপর আলোকপাত করে এবং তা হলো এই যে, ইসলামী আন্দোলন তার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে কিভঅবে পরিচালনা করা যায় এবং কি কি সমস্রার সম্মুখীন তাকে হতে হয়। কিন্তু হযরত ঈসা (আ)কে পরবর্তী পর্যায়ে সম্মখীন হতে হয়নি এবং সে সম্পর্কে কোন ইঙ্গিতও পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে একটিমাত্র স্থান থেকে আমরা সুস্পষ্ট ও পরিপূর্ণ পথ নির্দেশ পাই এবং তা হচ্ছে নবী মুহাম্মদ মুস্তফা (সা) এর জীবন তাঁর দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন তাঁর প্রতি আমাদের শুধু শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণে নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে এ পথের চড়াই উৎরাই সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করার জন্যে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে আমরা বাধ্য। ইসলামী আন্দোলনের সকল নেতৃবৃন্দের মধ্যে শুধু নবী মুহাম্মদ (সা)ই একমাত্র নেতা যাঁর জীবনে আমরা এ আন্দোলনের প্রাথমিক দাওয়াত থেকে শুরু করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এবং অতঃপর রাষ্ট্রের কাঠামো, সংবিধান, আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-পদ্ধতি পর্যন্ত এক একটি দিকের পূর্ণ বিবরণ এবং অদি নির্ভরযোগ্য বিবরণ আমরা জানতে পারি।

ভূমিকা

আমার বিভিন্ন রচনায় রিাসালাত ও সীরাতে পাক সম্পর্কি আলোচনাসমূহকে চমৎকারভাবে একত্রে সংকলিত করে জনাব নঈম সিদ্দীকী ও জনাব আবদুল ওয়াকীল আলভী এ গ্রন্থের প্রথম (বাংলায় ১ম ও ২য় খন্ড) তৈরী করেন। সেখানে পরিবর্ধন ও পরিমার্জনের তেমন প্রয়োজন অনুভব করিনি।

কিন্তু এ খন্ডের জন্যে তাঁরা আমার যেসব লেখা সংকলন করেছেন,  সেগুলোতে মাঝে মাঝে শূন্যতা রয়ে গেছে। এসব শূন্যতা নিয়ে কিছুতেই একটি সীরাত গ্রন্থ প্রণীত হতে পারে না। তাই, এতে আমি ব্যাপকহারে সংযোজন ও পরিবর্ধন করেছি। এখন একটি অবিচ্ছিন্ন ও ধারাবাহিক সীরাত গ্রন্থে পরিণত হয়েছে।

এই (মূল) দ্বিতীয় খন্ড হিজরতের বর্ণনায় এসে সমাপ্ত হয়েছে। এরপরই শুরু হবে মাদানী অধ্যায়। সে অধ্যায় মূলত অকূল সমুদ্র সম। মহান আল্লাহর কাছে পার্থনা করছি, তিনি যেন আমাকে এ গ্রন্থটি পূর্ণ করার শক্তি ও তৌফিক দান করেন এবং এটিকে যেন তাঁর বান্দাদের জন্যে কল্যাণময় করেন।

আবুল আ’লা

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

প্রথম অধ্যায়

কুরআন তার বাহককে কোন্ মর্যাদায় উপস্থাপিত করে

দুনিয়াতে মানুষের হেদায়েদ ও পথ নির্দেশনার জন্যে সর্বদা এমন সব পুণ্যপূত মনীষী জন্ম গ্রহণ করতে থাকেন যাঁরা তাঁদের কথা ও কাজের দ্বারা মানুষকে সত্য ও সততার সরল সহজ পথ দেখিয়েছেন। কিন্তু মানুষ অধিকাংশক্ষেত্রে তাঁদের বিরুদ্ধবাদীতাই করেনি যে তারা তঁঅরেদ বাণীর প্রতি অনীহা প্রদর্শন করেছে, তাঁদের উপর জুলুম তাঁদের বিরুদ্ধবাদীরাই করেনি যে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তাঁদেরকে দুঃখকষট দিয়ে সত্যপথ থেকে ফেরাবার চেষ্টা করেছে, বরঞ্চ তাঁদের উপর জুলুম তাঁদের ভক্ত অনুরক্তগণও করেছে, এভাবে যে তাঁদের চলে যাওয়ার পর তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা বিকৃত করেছে, তাঁদের হেদায়েত পরিবর্তন করে দিয়েছে। তাঁদের আনীত গ্রন্থাবলীর কদর্থ করেছে এবং স্বয়ং তাঁদের ব্যক্তিত্বকে কৌতূহলের খেলনা বানিয়ে তাঁর মধ্যে খোদায়ী রঙেগর প্রলেপ দিয়েছে। প্রথম ধরনের  জুলুম ত ঐসব পূত-পবিত্র মনীষীদের জীবদ্দায় অথবা বড়োজোর তাঁদের পর কয়েক বৎসর পর্যন্ত সীমিত ছিল। কিন্তু এ দ্বিতীয় প্রকারের জুলুম তাঁদের তিরোধঅনের পর শতাব্দীর পর শতাব্দী যাবত চলতে থাকে েএবং অনেকের সাথে এখন পর্যন্ত এ জুলুম করা হচ্ছে।

দুনিয়ায় আজ পর্যন্ত যতো সত্যের আহ্বানকারী প্রেরিত হয়েছেন, সকলেই ঐসব মিথ্যা খোদার খোদায়ী নির্মূল করার কাজেই তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছেন, যাদেরকে মানুষ এক খোদাকে বাদ দিয়ে খোদা বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সর্বদা এটাই হতে থাকে যে তাঁরেদ ইহলোক ত্যাগ করার পর তাঁদের অনুসারীগণ জাহেলী আকীদাহ বিশ্বাসের ভিত্তিতে স্বয়ং তাঁদেকেই খোদা অথবা খোদার শরীক বানিয়ে নিয়েছে। তাঁদেকেও সেসব প্রতিমার মধ্যে শামিল করে নিয়েছে যেসব চূর্ণ করার জন্যে তাঁরা তাঁদের সসমগ্র জীবনের শ্রম-সাধনা নিয়োজিত করেছিলেন।

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, মানুষ কিছুটা এমন সংশয় সন্দেহে ভুগছে যে, মানবতার মধ্যে পবিত্রতা ও ফেরেশতাসুলভ গুণাবলীর সম্ভাবনা ও অসিত্বের প্রতি তার বিশ্বাস খুব কমই রয়েছে। সে নিজেকে নিছক দুর্বলতা ও হীনমন্যতার সমষ্টিই মনে করে। তার মন এ মহাসত্যের জ্ঞান ও বিশ্বাস থেকে বঞ্চিত থাকে যে, মহান স্রষ্টা তার মাটির দেহে এমন সব শক্তিসামর্থ সৃষ্টি করে দিয়েছেন যা তাকে মানুষ এবং মানবীয় গুণে গুণান্বিত হওয়া সত্ত্বেও পরিত্র উর্ধজগতের আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতাদের অপেক্ষঅও উচ্চতর মর্যাদায় ভূষিত করতে পারে। এ কারণেই, দুনিয়াতে যখন কোন মানুষ নিজেকে খোর প্রতিনিধি হিসাবে পেশ করেছ, তখন তার স্বজাতির লোকেরা তাকে তাদেরই মতো রক্তমাংসের মানুষরূপে দেখে তাকে খোদা প্রেরিত বলে মেনে নিতে একেবারে অস্বীকার করেছে। অবশেষে যখনত তাঁর সত্তার মধ্যে অসাধারণ মহৎ গুণাবলীর বহিঃপ্রকাশ দেখে শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত করেছে, তখন মন্তব্য করেছে, যে ব্যক্তি এমন অসাধারণ গুণাবলীর অধিকারী হন তিনি কখনো মানুষ হতে পারেন না। অতঃপর কোন দল তাঁকে খোদা বানিয়ে দিল, কেউ দেহান্তরের ধারণা আবিষ্কার করে বিশ্বাস করে বসলো যে খোদা তাঁর আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করেছে। কেই আবার তাঁর মধ্যে খোদায়ী গুণাবলী ও খোদাসুলভ এখতিয়ার-অধিকারের ধারণা পোষণ করলো। আবর কেউ ঘোষণা করলো যে তিনি খোদার পুত্র। (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আম্মা ইয়াসেফুন)-।

বিভিন্ন ধর্মালম্বীদের- তাঁদের ধর্মপ্রবর্তক সম্পর্কে ধারণা

দুনিয়ার যে কোন ধর্মীয় নেতার জীবনী আলোচনা করলে দেখা যায় যে, তাঁর উপরে সব চেয়ে বেশী জুলুম করেছে তাঁর ভক্ত অনুরক্তগণ। তারা তাঁর উপরে অসার কল্পনা ও কুসংস্কারের এতো মোটা আচরণ চড়িয়ে দিযেছে যে, তাঁর প্রকৃত আকার আকার আকৃতি ও অবয়স দৃষ্টিগোচর হওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। শুথু তাই নয় যে তাদের বিকৃত ও পরিবর্তিত গ্রন্থাবীল থেকে এ কথাও জানতে পারি না যে, তিনি স্বয়ং কি ছিলেন। তাঁর জন্ম, শৈশব, যৌবন এবং বার্থক্য সবই চরম বিস্ময়তায় আচ্ছন্ন। তাঁর জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজে বিস্ময় এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বিস্ময়াবিষ্ট। মোটকথা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবটাই একটা কল্পিত কাহিনীই মনে হয়। তাঁকে এমন আকার আকৃতিতে উপস্থাপিত করা হয় যেন তিনি স্বয়ং খোদা ছিলেন অথবা খোদার পুত্র। অথবা খোদা তাঁর রূপ ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করেছেন। অথবা নিদেনপক্ষে তিনি খোদায়ীর গুণাবলীতে কিছু পরিমাণে শরীক ছিলেন।

বুদ্ধ

গৌতম বুদ্ধের কথাই ধরা যাক। বৌদ্ধধর্ম গভীরভাবে অধ্যয়ন করার পর এতোটুকু অনুমান করা যায় যে, এ স্থিরসংকল্প ব্যক্তি ব্রাহ্মণ্যবাদের বহু ত্রুটিবিত্যুটি সংশোধন করেছিলেন এবং বিশেষ করে ঐসব অগণিত সত্তার খোদায়ী খন্ডন করেন- যাদেরকে সে যুগের মানুষ তাদের খোদা বানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর শতাব্দী কাল অতিবাহিত হতে না হতেই বৈশঅলী সম্মেলনে তাঁর অনুসারীগণ তাঁর সকল শিক্ষাদীক্ষা পরিবর্তন করে ফেলে এবং মূল সূত্রের স্থানে নতুন সূত্র প্রণয়ন করে মূল এবং শাখা প্রশাখায় আপন প্রবৃত্তি ও চিন্তাধারা অনুযায়ী যেমন খুশী তেমন পরিবর্তন পরিবর্ধন করে ফেলে। একদিকে তারা বুধ্ধের নামে নিজেদের ধর্মের এমন সব আকীদা বিশ্বাসে স্থিরাকৃত করলো যার মধ্যে খোদার কোন অস্তিত্বই স্বীকৃত ছিলনা এবং অপরদিকে বুদ্ধকে সর্ববোধী, বিশ্বনিয়ন্তা এবং এমন এক সত্ত্ নির্ণীত করে যে, সর্বযুগে দুনিয়অয় সংস্কারেরর জন্যে বুদ্ধের রূপ ধারণ করে আগমন করে থাকেন। তাঁর জন্ম, জীবন এবং বিগত ও ভবিষ্যৎ জন্ম সম্পর্কে এমন উদ্ভট কাহিনী রচনা করা হয়েছে যা পাঠ করার পর অধ্যাপক উলসনের মতো অনুসন্ধান বিশারদ পন্ডিত ব্যক্তি বিস্ময়ের সাথে মন্তব্য করেছেন যে, ইতিহাসে প্রকৃতপক্ষের বুদ্ধের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। তিন চার শতকের মধ্যে এ সব অলীক কাহিনী বুদ্ধকে খোদায়ীর রঙ্গে রঞ্জিত করেছে। কনিক্ষের রাজত্ববালে বৌদ্ধ ধর্মের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ও নেতৃত্বের  এক সম্মেলন কাশমীরে অনুষ্ঠিত হয়। সেখঅনে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় যে প্রকৃত পক্ষে ভগবানের অধিভৌতিক বা দৈহিক বহিঃপ্রকাশ। অন্য কথায় ভগবান বুদ্ধের দেহে আত্মপ্রকাশ করেন।

রাম

এ ধরনের আচরণ রামচন্দ্রের সাথেও করা হয়। রামায়ন পাঠে একথা সুস্পষ্ট হয় যে রাজা রামচন্দ্র একজন মানুষ মাত্র ছিলেন। মহানুভবতা, সুবিচার, বীরত্ব, উদারতা, বিনয়, নম্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা ও ত্যাগের গুণাবলীতে ভূষিত ছিলেন বটে। কিন্তু খোদায়ী বা ইশ্বরত্বের লেশমাত্র বিদ্যমান তার মধ্যে ছিলনা। কিন্তু মনুষত্ব ও এ ধরনের গুণাবলীর একত্র সমাবেশ এমন এক প্রহেলিকার রূপ ধারণ করে যে, ভারতবাসীর বিবেকবুদ্ধি তার সমাধানে ব্যর্থ হয়। অতএব রামচন্দ্রের মৃত্যুর কছিুকাল পর এ বিশ্বাস পোষণ করা হয় যে তার মধ্যে বিষ্ণু [হিন্দুদের বর্তমান ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী বিষ্ণু বিশ্বের প্রতিপালক ভগবান বা দেবতা বলে অভিহিত। সম্ভবত: এ ছিল মূলে আল্লাহ তায়ালার রবূবিয়াতের ধারণা যাকে পরবর্তীকালে একটি স্থায়ী ব্যক্তিত্ব হিসাবে গণ্য করা হয়। হিন্দুদের মধ্যে প্রতিমাপূজার সূচনা এভঅবে হয় যে আল্লাহ তায়ালার গুণাবীল প্রতিটিকে তার মূলসত্তা থেকে পৃথক করে এক একটি খোদা বা দেবতা বলে অভিহিত করা হয়।– গ্রন্থকার। ]রূপ পরিগ্রহ করেছেন। আর তিনি ঐসব সত্তার মধ্যে একজন যাদের আকৃতিতে বিষ্ণু মানব সংসারে সংস্কারের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে আত্মপ্রকাশ করতে থাকেন।

কৃষ্ণ

এ ব্যাপারে উপরোক্ত দু’জনের দুলনায় শ্রীকৃষ্ণ অধিকতর মজলুম। ভগবত গীতা বার বার বিৃকত ও কাটাছেঁড়া বা অংগহানীর পর যে আকারে আমাদের কাছে পৌছেছে, তা গভীরভাবে অধ্যয়ন করার পর অন্ততঃ এতোটুকু জানা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ একজন একেশ্বরবাদী ছিলেন এবং তিনি এ কথাই প্রচার করতেন যে মহান স্রষ্টা এক সার্বভৌম ও সর্বশক্তিমান সত্তা। কিন্তু মহাভারত, বিষ্ণু পুরান, ভগবৎপুরান গ্রন্থাবলী এবং স্বয়ং গীতা তঁঅকে এভাবে উপস্থাপিত করে যে, একদিকে তাঁকে বিষ্ণুর দৈহিক প্রকাশ, সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা বলে মনে হয় এবং অপর দিকে এমন সব দুর্বলতা তাঁর প্রতি আরোপিত হয় যে, খোদা ত দূরের কথা একজন পূত চরিত্র মানুষ বলে স্বীকার করাও সুকঠিন হয়ে পড়ে। গীতার শ্রীকৃষ্ণের নিম্নোক্ত বাণীসমূহ পাওয়া যায়:-

আমিই এ জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা। যা কিছু জ্ঞেয় এবং পবিত্র বস্তু তা আমি। আমি ব্রহ্মবাচক, ওংকার, আমিই ঋক, সামু ও খজুর্বেদ। আমিই প্রাণীর পরাগতি ও পরিচালক। আমি প্রভু, সকল প্রাণীর নিবা, তাদের শুভাশুভের দ্রষ্টা। আমিই রক্ষক এবং হিতকারী। আমিই স্রষ্টা এবং সংহর্তা। আমিই আধার প্রলয়স্থান। আমিই জগতের অবিনাশী কারণ। (সূর্যরূপে) আমিই তাপ বিকিরণ করি এবং কল আকর্ষণ বর্ষণ করি। আমি (দেবগণের) অমৃত ও (মর্তগণের) মৃত্যু। আম িঅবিনাশী আত্মা। আমিই নশ্বর জগত। গীতা-৯: ১৭-১৯ দ্রঃ)।

ব্রহ্মাদি দেবগণ এবং ভৃণ্ড প্রভৃতি মহর্ষিগণ কেউ আমার উৎপত্তির তত্ত্ব জানেনা। কেননা আমি সর্বপ্রকারের দেবগণ ও মহর্ষিগণের আদি কারণ। যিনি আমাকে আদিহীন, জন্মহীন এবং সর্বলোকের মহেশ্বর বলে জানেন। মনুষ্য মধ্যে তিনিই মোহশূন্য হয়ে সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হন। (গীতা, ১০: ২-৩)

হে জিতেন্দ্রিয় অর্জূন। আমিই সব প্রাণীর হৃদয়ে অবস্থিত তৈন্যময় আত্মা এবং প্রাণীগণেল উৎপত্তি, স্থিতি এবং সংহার স্বরূপ, দ্বাদশ আদিত্যের মধ্যে আমি বিষ্ণু নামক আদিত্য। জ্যোতিষ্কগণের মধ্যে আমি উজ্জ্বল সূর্য। উপঞ্চাশ বায়ুর মধ্যে আমি মরীচি এবং আমি নক্ষত্রগণের মধ্যে চন্দ্র। (গীতা, ১০: ২০-২১)

আমি নাগগণের মধ্যে নাগরাজ। অনন্ত জলচরগণের মধ্যে রাজা বরুন—আমি এই সমগ্র বিশ্ব মাত্র একাংশের ধারণ করে আছি। (গীতা, ১০: ২৯-৪৪)

গীতার কৃষ্ট এসব বাণীর দ্বারা ভগবান হওয়ার দাবী করেছন। [গীতা যদি এ দাবী করতো যে সে খোদার কেতাব এবং শ্রীকৃষ্ণ তা উপস্থাপনকারী তাহলে উপরোক্ত বাণীগুলো খোদার বলে গণ্য হতো এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি খোদায়ী দাবী আরোপিত হতো না। কিন্তু মুশকিল এই যে, এ গ্রন্থ স্বয়ং নিজেকে শ্রীকৃষ্ণের উপদেশাবলীর সমষ্টি বলে পেশ করছে। সমগ্র গ্রন্থের কোথাও ঘূর্ণাক্ষরেও একথা বলা হয়নি যে তা খোদার বাণী বা অহী ও ইলহামের মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের উপর নাযিল হয়েঝে।– গ্রন্থকার।] কিন্তু অপর দিকে ভগবৎপুরান এই শ্রীকৃষ্ণকে এমন রূপে উপস্থাপিত করছে যে, তিনি স্নানের সময় গোপীনীদের পরিধেয় বস্ত্র লুকিয়ে রাখছেন। তাদের যৌনউপভোগ করার জন্যে যতো গোপিনী তাতে দেহ ধারণ করছেন। রাজা পুরক্ষিত যখন শুকদেবকে জিজ্ঞেস করেন, “ভগবান ত অবতার রূরে এজন্যে আত্মপ্রকাশ করেন যে তিনি সত্য ধর্ম প্রচার করবেন। কিন্তু তিন কেমন ভগবান যে, ধর্মের সকল মূলনীতি লংঘন করে পরস্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করছেন?

এ অভিযোগ খন্ডন করার জন্যে ঋষিকে এ কৌশল অবলম্বন করতে হয় যে স্বয়ং দেবতাগণও কোন কোন ক্ষেত্রে পূণ্যপথ থেকে সরে পড়েন। কিন্তু তাঁদের পাপ তাঁদের ব্যক্তিসত্তার উপর কোন ছাপ রাখেনা যেমন ধারা আগুন সব কিছু জ্বালিয়ে দেয়া সত্ত্বেও তাকে অভিযুক্ত করা যায় না।

 কোন সুস্থ বিবেক সম্পন্ন ব্যক্তি এ কথা স্বীকার করতে পারেননা যে, কোন উচ্চমানের ধর্মগুরুর জীবন এমন অপবিত্র হতে পারে। তিনি এমন ধারণাও করতে পারেননা যে, কোন সত্যিকার ধর্মীয় নেতা প্রকৃতপক্ষে নিজেকে মানুষ ও বিশ্বপ্রকৃতির প্রভু হিসাবে পেশ করে থাকতে পারেন। কিন্তু কুরআন ও বাইবেলের তুলনামূলক অধ্যায় থেকে এ বিষয়টি আমাদের নিকটে সুস্পষ্ট হয়ে পড়ছে যে, বিভিন্ন জাতি তাদের মানসিক ও নৈতিকহ অধঃপতন কালে কিভাবে দুনিয়ার পূণ্যপূত চরিত্র মনীষদের জীবন চরিতকে অতি জঘন্য করে চিত্রিত করেছে যাতে করে তারেদ নিজেদের দুর্বলতার জন্যে বৈধতার কারণ নির্ণয় করতে পারে এবং অপরদিকে তাঁদের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কত অলীক কাহিনী রচনা করেছে। এ জন্যে আমরা মনে করি যে, এ ব্যক্তিত্বকে যেভাবে পেশ করা হয়েছে, তাঁর প্রকৃত শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব তার থেকে ভিনন ধররে হয়ে থাকবে।

হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম

যে সব মনীষীদের নবুয়ত সর্বজনবিদিত ও সর্বস্বীকৃত তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে মজলুম সাইয়েদুনা ঈসা আলায়হিসসালাম। সকল মানুষের মতো হযরত ঈসাও একজন মানুষ ছিলেন মনুষ্যত্বের সকল বৈশিষ্টই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান লি যেমন অন্যান্য মানুষের মধ্যে হয়ে থাকে। পার্থক্য শুধু এতোটুকু যে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে হিকমত, নবুয়ত ও অলৌকিক শক্তি দান করে একটি অধঃপতিত জাতির সংস্কারের জন্যে আদেশ করেছিলেন। কিন্তু প্রথমে ত তার জাতি তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকা করলো এবং পুরো তিনটি বছরও তার ভাগ্যবান অস্তিত্ব তারা বরদাশ্‌ত করলোনা। এমন কি তাঁর যৌবন কালেই তাকে হত্যা করার সিদ্ধানত করলো। অতঃপর তাঁর তিরোধানের পর যখন তারা তাঁর মহত্ব স্বীকার করলো তখন আবার এতোটা সীমালংঘন করলো যে তাঁকে তারা খোদার পুত্র বরঞ্চ একেবারে খোদা বানিয়ে দিল। তারপর তাঁর প্রতি এ ধারণা বিশ্বাস আরোপ করলো যে, খোদা মসীহের আকৃতিতে এজন্যে আত্মপ্রকাশ করেন যে, তিনি ক্রুসবিদ্ধ হয়ে মানবের পাপরাশির কাফ্‌ফারা বা প্রায়শ্চিত্ত করে যানে। কারণ মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই পাপী এবং স্বয়ং নিজের আমল বা ক্রিয়াকর্মের দ্বারা ত্রাণলাভ করতে পারে না। মায়াযাল্লা! একজন সত্যবাদী নবী তাঁর পরওয়ারদেগারের প্রডতি এতোবড়ো মিথ্যা দোষারোপ কি করে করতে পারেন? কিন্তু তাঁর ভক্ত অনুরক্তগণ শ্রদ্ধার ভাবাবেগে তার উপর এ মিথ্যা দোষারোপ করে বসলো। প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে তাঁর শিক্ষাদীক্ষার মধ্যে এমন সব বিকৃতি ঘটালো যে আজ কুরআন ব্যতীত দুনিয়ায় কোন কেতাবে মসীহের প্রকৃত শিক্ষা এবং স্বয়ং তাঁর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে কোন কিছুই খুঁজে পাওয়া যায় না। বাইবেলের নি টেস্টামেন্টে চার ইঞ্জিল নামে যে কেতাবগুলো বিদ্যমান তা অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে যে সেসব ঈসার মধ্যে খোদার আত্মপ্রকাশ করার, খোদার পুত্র হওয়ার এবং একেবারে স্বয়ং খোদা হওয়ার ভ্রান্ত ধারণা পরিপূর্ণ। কোথাও হযরত মরিয়মের প্রতি এ সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে- “তোমার সন্তান খোদা পুত্র বলে অভিহিত হবে” [লিউক (St. LUKE) ১: ২৫] কোথাও খোদার রূহ কবুতর আকারে ইউসুর উপর অবতরণ কর উচ্চস্বরে বলছে এ আমার প্রিয় পুত্র (মেথু St.Mathew: ১৬-১৭)। কোথাও মসীহ স্বয়ং বলছেন- “আমি খোদার পুত্র এবং তোমরা আমাকে সর্বশক্তিমানের ডান পাশে বসে থাকতে দেখবে (মাক্‌স্‌ ১৪: ৬২) শেষ বিচার দিবসে খোদার পরিবর্তে মসীহকে খোদার সিংহাসনে বসানো হচ্ছে এবং তিনি শাস্তি ও পুরস্কারের ফরমান জারী করছেন- (মেথু ১৫: ৩১-৪৬)। কোথাও মসীহের মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছে- ‘পিতা আমার মধ্যে এবং আমি পিতার মধ্যে- (জোন: ১: ৩৮)। কোথাও সে সত্যবকাদী মানবের মুখ থেকে এ ভুল কথাগুলো বের করা হচ্ছে- “আমি খোদার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছি- (জোন : ৮: ৪২) কোথাও খোদা এবং তাঁকে একাকার করে দেয়া হচ্ছে এবং তাঁর প্রতি এ উক্তি আরোপ করা হচ্ছে- “যে আমাকে দেখালো সে পিতাকে দেখলো- এবং পিতা আমার মধ্যে থেকে তাঁর কাজ করেন” (জোন: ১৪: ৯-১০)। কোথাও খোদার সব কিছু মসীহের উপর হস্তান্তর করা হচ্ছে- (জোন ৩: ৩৫) কোথাও খোদা তাঁর সকল দায়িত্ব মসীহের উপর অর্পণ করছেন- (জোন ৫: ২০-২২)।

এ সব বিভিন্ন জাতি তাদের ধর্মীয় গুরুত ও পথ প্রদর্শকদের উপরে যেসব মিথ্যা অপবাদ অভিযোগের জঞ্জাল আবর্জনা চাপিয়ে দিয়েছে, তার প্রকৃত কারণ সেই অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি যার উল্লেখ আমরা প্রথমেই করেছি। তারপর যে জিনিস এ অন্যায় অবিচাপরের সহায়ক হয়েছে তা হলো এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব মনীষীরেদ পথনির্দেশনা ও শিক্ষাদীক্ষা তাঁদের তিরোধঅনের পর লিপিবদ্ধ করা হয়নি। কোন কোন ক্ষেত্রে মনোযোগ দেয়া হলেও তা সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি। এ জন্যে সামান্য কাল অতিবাহিত হওয়ার পর এর মধ্যে এতো পরিমাণে ভেজাল, বিকৃতি, পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংশোধন সংঘটিত হয়েছে যে, আসল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করা সকঠিন হয়ে পড়েছে। এ জন্যে কোন সুস্পষ্ট হেদায়াত ও পথনির্দেশনা বিদ্যমান না থাকার পরিণাম এই হয়েছে যে, যতোই সময়কাল অতিবাহিত হতে থাকে, প্রকৃত সত্যের উপর ততোই অলীক কল্পনা ও কুসংস্কারের জঞ্জাল বাড়তে থঅকে এবং কয়েক শতকের মধ্যে প্রকৃত সত্য বিলুপ্ত হ’য়ে যায়। শুধু মাত্র অলীক গল্প কাহিনীই রয়ে যায়।

সাইয়েদুনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

দুনিয়ার সকল পথপ্রদর্শকের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ‍শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মদ (স) যে, তাঁর শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব বিগত তের চৌদ্দ শতাব্দী যাবত একেবারে তার আসল রূপে সংরক্ষিত আছে। খোদার ফজলে এমন কিছু ব্যবস্থঅ হয়েছে যে এখন তার পরিবর্তন অসম্ভব। কুসংস্কার ও বিস্ময়কর বস্তু ও ঘটনার প্রতি মানুষের অনুরাগ আসক্তি থাকার করণে এটা অসম্ভব ছিল না যে, পূরণতার প্রতীক এ মহান মনোনীত ব্যক্তিত্বকেও তারা অলীক কাহিনীর বস্তু বানিয়ে খোদায়ীর কোন কোন গুণে গুণান্বিত করে ফেলতো এবং তঁকে অনুসরণ করার পরিবর্তে বিস্ময়তা ও পূজাঅর্চনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করতো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার স্থির সিদ্ধান্ত ছিল নবী প্রেরণের শেষ পর্যায়ে এমন এক পথ প্রদর্শক পাঠাবর, যার সত্তা মানব জাতির জন্যে সকল কর্মকান্ডের চিরন্তন নমুনা এবং হেদায়াতের বিশ্বজনীন উৎস হয়ে থাকবে। এজন্যে তিনি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্তাকে ওসব জুলুম অবিচার থেকে রক্ষা করেন, জাহেল ভক্ত অনুরক্তদের হাতে যেসব জুলুম অবিচার অন্যান্য নবী এবং বিভিন্ন জাতির পথ প্রদর্শকদের উপর করা হতে থাকে। প্রথমতঃ নবী মুহাম্মদের (স) সাহাবা ও তাবেঈন এবং পরবর্তীকালে মুহাদ্দিসগণ, পূর্ববর্তী উম্মতগণের বিপরীত, তাঁদের নবীর জীবনচরিত সংরক্ষণ করায় নিজেরাই অসাধারণ ব্যবস্থপনা করেন যার ফলে আমরা তাঁর ব্যক্তিত্বকে চৌদ্দশ’ বছর অতীত হওয়ার পরও আজ প্রায় তেমন নিক থেকে দেখতে পারি যেমন নিক থেকে তাঁর যুগের মানুষ দেখতে পেতো। কিন্তু যদি বই পুস্তকের এ বিপুল ভান্ডার দুনিয়া থেকে নিাশ্চিহ্ন হয়ে যায়, যা ইসলামী নেতৃত্ববৃন্দ হবু বছরের শ্রমসাধনায় সংগৃহীত করেছেন হাদীস ও জীবনচরিতের একটি পৃষ্ঠাও যদি দুনিয়ার বুকে বিদ্যমান না থাকে যার থেকে নবী মুহাম্মদ (স) এর জীবনের কিছু অবগত হওয়া যেতো এবং শুধুমাত্র আল্লাহর কিতাব (কুরআন) রয়ে যায়। তথাপি আমরা এ মহাগ্রন্থ ঐসব বুনিয়াদী প্রশ্নের জবাব পেয়ে যেতে পারতাম, যা তার বাহ্যিক সম্পর্কে একজন ছাত্রের মনে উদয় হতো।

আসুন আমরা দেখি কুরআন তার বাহককে কোন রঙে রঞ্জিত করে পেশ করছে।

রসূলের মানুষ হওয়া

কুরআন মজিদ রেসালাত সম্পর্কে সর্বপ্রথম যে বিষয়টি একেবারে সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেছে তা হচ্ছে এই যে, রসূল মানুষই ছিলেন। কুরআন নাযিলের পূর্বে শত শত বছরের ধারণা বিশ্বাস এ স্থির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে যে, মানুষ কখনো আল্লাহর রসূল ও প্রতিনিধি হতে পারে না। দুনিয়ার সংস্কারে সংশোধনের জন্যে কখনো প্রয়োজন হলে খোদা স্বয়ং মানুষের আকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করে থাকেন। অথবা কোন ফেরেশতা কিংবা দেবতাকে প্রেরণ করেন। মোটকথা যতো মনীষী দুনিয়ার সংস্কারেরর জন্যে আগমন করেছেন তারা সকলেই অতি মানব ছিলেন। এ ধারণা বিশ্বাস মানুষের মনে এতোটা বদ্ধমূল হয়ে ছিল যে, তখন আল্লাহর কোন নেক বান্দাহ মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছিয়ে দিতে আগমন করতেন, তখন সর্বপ্রথম মানুষ বিস্ময় প্রকাশ করে বলতো- “এ কেমন নবী যে আমাদেরই মতো পানাহার করে, ঘুমায় ও চলোফেরা করে? এ কেমন পয়গম্বর যে আমাদের মতো যাবতীয় দোষত্রুটি ও দুর্বলতার শিকার হয় অর্থাৎ রোগাক্রান্ত হয়, দুঃখ কষ্ট ও সুখশান্তি উপভোগ করে। আমাদের হেদায়াতেই যদি আল্লাহর ইচ্ছ হতো, তাহলে তিনি আমাদের মতন একজন দুর্বল মানুষ কেন পাঠাতেন? খোদা কি স্বয়ং আসতে পারতেন না? প্রত্যেক নবীর আগমনের পর এসব প্রশ্ন করা হতো এবং এসবকে বাহানা বানিয়ে মানষ নবীগণকে অস্বীকার করতো। হযরত নূহ (আ) যখন তাঁর জাতির কাছে আল্লহর বাণী নিয়ে এলেন তখন তারা বলল।

(আরবী******************)

-এ ব্যক্তি তোমাদের মতো একজন মানুষ ব্যতীত আর কিছু নয়। সে তোমাদের উপর মর্যাদা লাভ করতে চায়। অথচ খোদা যদি চাইতেন ত ফেরেশতাদেরকে পাঠাতেন। এ উদ্ভট কথা তো আমরা আমাদের বাপদাদার মুখে কখনো শুনিনি(যে পয়গম্বর কখনো মানুষ হয়) –(মুমেনূন: ২৪)

যখন হযরত হুদ (আ) কে তাঁর জাতির হেদায়াতের জন্যে পাঠানো হলো, ত তাঁর বিরুদ্ধেও সর্বপ্রথম এ অভিযোগ করা হলো:

(আরবী******************)

-এ ব্যক্তি তোমাদেরই মতো ইকজন মানুষ ছাড়া আর কিছু নয়। তোমরা যা খাও, সে তাই খায়। তোমরা যা পান কর, সেও তাই পান করে। তোমরা যদি তোমাদেরই মতন একজহন মানুষের আনুগত্য কর তাহলে ভয়ানক ক্ষতির সম্মুখীন হবে (মুমেনুন: ৩৩-৩৪)।

হযরত মূসা (আ) এবং হযরত হারুন (আ) ফেরাউনের নিকটে সত্যের বাণীসহ পৌছেন, তখ তাঁদের কথা এ কারণেই মেনে তে অস্বীকার করা হয় যে, তাঁরা উভয়ে মানুষ ছিলেন: (আরবী******************)

আমরা কি আমাদেরিই মতো দু’জন মানুষের উপর ঈমান আনব? (মুমেনুন: ৪৭)

ঠিক এমনি ধরনের প্রশ্ন সেসময়েও উত্থাপন করা হয়েছিল যখন মক্কার একজন নিরক্ষর মানুষ চল্লিষ বছর যাবত নীরব জীবন যাপন করার পর হঠাৎ ঘোষণা করলেন- “খোদার পক্ষ থেকে আমাকে রসূল নিয়োগ করে পাঠানো হয়েছে।”

মানুষ এটা বুঝতেই পারলো না যে তাদের মত হাত-পা, চোখ, নাক, দেহ ও প্রাণ বিশিষ্ট একজন মানুষ কি করে আল্লাহর রাসূল হতে পারে? তারা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করতো-

(আরবী****************)

-এ আবার কেমর রসূল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফের করে? তার সাথে একজন ফেরেশতা নেমে এলো না কেন যে তার সাথে থেকে মানুষকে সতর্ক করে দিত? অথবা-নিদেনপক্ষে তার জন্যে কোন রত্নভান্ডার নামিয়ে দেয়া হতো অথবা তার সাথে কোন ফলের বাগান থাকতো যার থেকে সে খেতে পারতো- (ফুরকান: ৭-৮)।

যেহেতু ভ্রান্তধারণাই রেসালাত মেনে নেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক ছিল, সেজন্যে কুরআন মজিদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তার খন্ডন করা হয়েছে। অতঃপর যুক্তিসহ বলা হয়েছে যে, মানুষের প্রথপ্রদর্শনের- মানুষ সবচেয়ে বেশী উপযোগী হতে পারে। কারণ নবী পাঠানোর উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষাদানই নয়, বরঞ্চ স্বয়ং কাজ করে দেখানো এবং আনুগত্য অনুসরণের একটা দৃষ্টান্তও পেশ করা। এ উদ্দেশ্যে যদি কোন ফেরেশতা অথবা কোন অতি মানবীয় সত্তাকে পাঠানো হয়, যার মধ্যে মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও দুর্বলতা নেই- তাহলে মানুষ একথা বলতে পারে, “আমরা তার মতো কি করে আমল করব, কারণ আমাদের মতো তার ‍ত প্রবৃত্তি এবং প্রবৃত্তির বাসনা নেই এবং যে সব শক্তি মানুষকে পাপকাজে উদ্বুদ্ধ করে সেসব ত তার স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে নেই?।

(আরবী*****************)

-যদি পৃথিবীতে ফেরেশতারা নিশ্চিন্তে (স্বাভাবিক ভাবে) চলাফেরা করতে পারতো, তাহলে আমরাও তাদের (পৃথিবীবাসীদের) উপর আসমানের কোন ফেরেশতাকে রসূল করে নাযিল করতাম- (বনীইসরাঈল-৯৫)।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা করেন যে, ইতিপূর্বে যতো নবী ও সত্যপথ প্রদর্শক বিভিন্ন জাতির মধ্যে আগমন করেন, তাঁরা ঠিক তেমনিই মানুষ ছিলেন। যেমন মুহাম্মদ রসূলুল্লাহ (স) মানুষ। মানুষ যেমন পানাহার ও চলাফেরা করে তাঁরাও তেমনি পানাহর এবং চলাফেরা করতেন। (আরবী***********************)

-তোমার পূর্বে আরা যেসব রসূল পাঠিয়েছিলাম তারাও মানুষই ছিল যাদের উপর আমরা অহী নাযিল করতাম। তোমরা না জানলে জ্ঞানীরেদকে জিজ্ঞেস করে দেখ। আমরা ওসন নবীকে এমন দেহ দান করিনি যে, তারা আহার করতো না, আর না তারা অমর ছিল- (আম্বিয়া -৭-৮)।

(আরবী******************)

-এবং আমরা তোমার পূর্বে যতো নবী পাঠিয়েছি তারা সকলে আহার করতো এবং বাজারে চলাফেরা করতো- (ফুরকান-২০)।

(আরবী*****************)

-এবং তোমার পূর্বে আমরা বহু রসূল পাঠিয়েছিলাম এবং তাদের জন্য বিবিও পয়দা করেছিলাম এবং সন্তানসন্ততিও দিয়েছিলাম- (রা’দ: ৩৮)।

অতঃপর নবী মুহাম্মদ (স) কে আদেশ করা হলো, “তুমি তোমার মানুষ হওয়ার কথা স্পষ্ট ঘোষণা করে দাও যাতে করে তোমার পরে লোকে তোমাকেও তেমনিভাবে খোদায়ীর গুণে গুণান্বিত না কর, যেমনভাবে তোমার পূর্ববর্তী নবীদের করা হয়েছে।

কুরআনের বিভিন্নস্থানে এ আয়াত এসেছে:

 (আরবী******************)

-হে নবী! বলে দাও- আমি তোমাদের মতো নিছক একজন মানুষ। আমার উপর অহী নাযিল করা হয় যে, তোমাদের খোদা ত একজনই- (কাহাফ: ১১১, হামীম সাজদা: ৬)।

এসব বিশদ বিবরণ থেকে শুধু নবী মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে যাবতীয় ভ্রান্ত ধারণা বিশ্বাসের দ্বারই রুদ্ধ করা হয়নি, বরঞ্চ পূর্ববর্তী সকল নবী ও ইসলামী মনীষীর ব্যক্তিত্ব সমূহকে ভ্রান্ত ধারণা থেকে মুস্ত করা হয়।

রসূলের শক্তি ও অসাধারণ ক্ষমতা

অন্য যে বিষয়টি কুরআনে সুস্পষ্ট করে বয়ান করা হয়েছে তা হলো নবীর শক্তি ও অসাধারণ ক্ষমতার বিষয়টি। অজ্ঞতা ও নির্বুদ্ধিতার বশবর্তী হয়ে মানুষ যখন কোন খোদার প্রেরিত মহাপুরুষকে খোদার সমার্থ বানিয়ে দিল, তখন স্বভাবতঃ এ ধারণা বিশ্বাসও সৃষ্টি হলো যে, খোদাপ্রেরিত লোক অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী হয়। খোদার কর্মক্ষেত্রে তারা বিশেষ অধিকার লাভ করে থাকে। পুরস্কার ও শাস্তিদানের অধিকার তাদের থাকে। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব কিছুই তাদের কাছে সুস্পষ্ট। ভাগ্যের ফয়সালা তাদের মর্জি ও রায় অনুযায়ী রদবদল করা হয়। লাভ ও ক্ষতির উপরেও তাদের ক্ষমতা থাকে। ভালো মন্দেরও তারা মালিক। সৃষ্টজগতের সকল শক্তি তাদের অধীন। তারা একনজরে লোকের মন পরিবর্তন করে দিয়ে তাদের আঁধার ও পথ ভ্রষ্টতা দূর করে দিতে পারে।  এ সব ধারণার বশবর্তী হয়েই লোক রসূলুল্লাহ (স) এর কাছে আজব ধরনের ও উদ্ভট দাবী করতো। কুরআন বলে

(আরবী**************)

-এবং তারা বল্লো: আমর ত কিছুতেই তোমার উপর ঈমান আনবনা যতোক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আমাদের জন্যে জমীনে একটা ঝর্ণা প্রবাহিত করে দিয়েছ, অথবা তোমার জন্যে একটি খুরমা ও আঙ্গুরের বাগান তৈরী হয়েছে এবং তার মধ্যে তুমি স্রোতস্বিনী প্রবাহিত করে দিয়েছ। অথবা তোমার দাবী অনুযায়ী আকাশকে খন্ড বিখন্ড করে আমাদের উপর নিক্ষেপ কর। অথবা আললাহ এবং ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করাও। অথবা তোমার জন্যে একটি সোনার বাড়ি তৈরী হয়ে যায়। অথবা তুমি আকাশে চড়ে যাও এবং আকাশে চড়লেই তোমার উপর আমরা বিশ্বাস স্থাপন করবনা যতোক্ষণ না তুমি আমাদের এমন এক গ্রন্থ অবতরণ না করেছ যা পড়তে পারি।

হে মুহাম্মদ! তুমি তাদেরকে বলে দাও, আমার রব সকল ত্রুটিচিত্যুতি থেকে পাক ও পবিত্র। ইম কি মানুষ পয়গম্বর ব্যতীত অন্য কিছু? –(বনী ইসরাইল: ৯০-৯৩)।

খোদার প্রেরিত মহাপুরুষ ও মনীষীবৃন্দের সম্পর্কে এ ধরনের যতো প্রকার ভ্রান্ত ধারণা লোকের মধ্যে বিদ্যমান ছিল, আল্লাহ তায়ালা তা সবই খন্ডন করেন এবং পরিষ্কর বলেন যে, খোদায়ী শক্তি ও খোদায়ী কাজকর্মে রসূলের তিল পরিমান অংশও নেই। বরঞ্চ একথাও বলা হয় খোদায়ী শক্তি ও খোদায়ী কাজকর্মে রসূলের তিল পরিমাণ অংশও নেই। বরঞ্চ একথাও বলা হয়: আমাদের অনুমতি ব্যতী নবী অন্যকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করা ত দূরের কথা, স্বয়ং নিজের থেকে ক্ষতি দূর করারও শক্তি রাখে না।

(আরবী*****************)

-(হে নবী) খোদা যদি তোমার কোন ক্ষতি করেন, তাহলে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই যে এ ক্ষতি দূর করতে পারে। আর তিনি যদি তোমার কোন সংগল করতে চান ত তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান (আনআম: ১৭)

(আরবকী*******************)

-(হে নবী) বলে দাও, আমি ত আমার নিজেরও কোন লাভ ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখি না। অবশ্যি আল্লাহ চাইলে সে অন্য কথা- (ইউনুস: ৪৯)।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একথাও বলা হয়েছে যে, নবীর কাছে আল্লাহর ভান্ডারের কোন চাবি নেই, নবী ভবিষ্যতের জ্ঞানও রাখেন না এবং না কোন অস্বাভাবিক ক্ষমতার অধিকারী।

(আরবী***********)

আমি ফেরেশতা (অর্থাৎ মানবীয় দুর্বলতার উর্ধে)। আমি ত শুধুমাত্র তাই মেনে চলি যা আমার উপর অহী করা হয় (অর্থাৎ অহীর মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়)। (আনয়াম: ৫০)।

(আরবী*****************)

-যদি আমি অদৃশ্য বা ভবিষ্যতের জ্ঞান রাখতাম, তাহলে আমার নিজের জন্যে বহু সুযোগ সুবিধা লাভ করতাম এবং আমাকে কোন ক্ষতি স্পর্শ করতে পারতো না। আমি ত নিছক একজন সতর্ককারী এবং তার জন্যে সুসংবাদদাতা যে, আমার কথা মেনে নেবে। (আরাফ : ১৮৮)।

আরও বলা হয়, আখেরাতের হিসাব নিকাশ এবং শাস্তি ও পুরুস্কারের ব্যাপারে নবীর কোন হাত নেই। তার কাজ শুধু বাণী পৌছিয়ে দেয়া এবং সোজা পথ দেখিয়ে দেয়া। আখেরাতের হিসাব নিকাশ নেয়া এবং শাস্তি অথবা পুরস্কার দেয়া খোদার কাজ।

(আরবী**************)

-(হে মুহাম্মদ) তাদেরকে বলে দাও: আমি আমার রবের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণসহ এসেছি এবং তোমরা তা মিথ্যা মনে করে অস্বীকার করেছ। এখন এটা আমার এখতিয়ার নেই যে, শাস্তি তোমরা ত্বরান্বিত করতে বলছো তা আমি স্বয়ং তোমাদের উপর নাযিল করব। ফয়সালা একেবারে আল্লাহর হাতে। তিনি প্রকৃত অবস্থা বয়ান করেন এবং তিনি উৎকৃষ্ট ফয়সালা করেন।

এদেরকে বলে দাও, সে শাস্তি যদি আমার এখতিয়ারে থাকতো যার জন্যে তোমরা এতো ব্যস্তমস্ত হয়ে পড়েছ, তাহলে তোমাদের ও আমার মধ্যে কবে ফয়সালা হয়ে যেতো। কিন্তু জালেমদের ব্যাপারে চূড়ান্ত করতে আল্লাহই ভালো জানেন- (আনয়াম: ৫৭-৫৮)। (আরবী**************)

(হে নবী) তোমার কাজ ত শুধু পয়গাম পৌছিয়ে দেয়া। আর হিসাব নেয়ার কাজটা আমার। (রা’দ: ৪০)।

(আরবী**************)

(হে নবী) আমরা লোকের হেদায়অতের জন্যে তোমার উপর সত্যসহ এ কিতাব নাযিল করেছি। এখন যে হেদায়েত কবুল করে, সে তার নিজের জন্যেই ভালো করে। আর যে গোমরাহীতে লিপ্ত হয়, সে নিজেরই জন্যে অন্যায়-অমংগল করে। আর তুমি তাদের উপর কোন হাবিলদার নও। (যুমার: ৪১)।

আরও বলা হয়েছে যে, মানুষের মন পরিবর্তন করে দেয়া এবং যাদের মনে হক গ্রহণ করার আগ্রহ নেই তাদের মধ্যে ঈমান পয়দা করা নবীর সাধ্যে নেই। সে পথপ্রদর্শক এ অর্থে যে, নসিহত করার যে হক, তা সে পুরোপুরি আদায় করে এবং যে পথ দেখতে চায় তাকে সে পথ দেখা।

(আরবী**************)

-তুমি মৃতকে শুনাতে পারনা, আর না বোবার কাছে আওয়াজ পৌঁছাতে পার যখন সে মুখ ফির চলে যায়। আর না তুমি অন্ধকে গোমরাহী থেকে বের করে সোজা পথে এনে দিতে পার। তুমি ত শুধু  তাদেরকেই শুনাতে পার যারা আমাদের নির্দেশনাবলীর উপর ঈমান আনে। অতঃপর আনুগত্যের মস্তক অবনত করে- (নমল: ৮০-৮১)।

(আরবী**************)

-তুমি কবরে মৃত ব্যক্তিদেরকে শুনাতে পার না। তুমি শুধু সতর্ক করে দিতে পার। আমরা তোমাকে সত্যসহ সুসংবাদ দানকারী এবং সতর্ককারী করে পাঠিয়েছি।[কুরআনের এক স্থানে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে-

(আরবী**************)

হে নবী! তুমি যাকে চাও তাকে হেদায়েত করতে পারনা। কিন্তু আল্লাহ যাকে চান হেদায়েত করতে পারেন। তিনি তাদেরকে ভালো করে জানেন যারা হেদায়েত কবুলকার।

সহীহ বুখারী-মুসলিমে বর্ণীত আছে যে, এ আয়াত নবী (স) এর চাচা আবু তালেব সম্পর্কে নাযিল হয়। তাঁর যখন অন্তিম অবস্থা এলো তখন নবী (স) চরম চেষ্টা করলেন যাতে  তিনি (চাচা) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ কালেমা পড়েন এবং তাঁর খাতেমা বিল খায়ের হয় অর্থাৎ ঈমানের সাথে মৃত্যু হয়। কিন্তু তিনি (আবু তালেব) আবদুল মুত্তালিবের ধর্মে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাকেই প্রাধান্য দিলেন। এজন্যে আল্লাহ বলেন, তুমি যাকে ভালোবাস তাকে হেদায়েত করতে পারনা।

কিন্তু মুহাদ্দেসীন ও তাফসীরকারগণের এ পদ্ধতি সুবিদিত যে, একটি আয়াত নবীযুগের যে ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট, সে আয়াতকে শানে নুযূল হিসাবে বর্ণনা করেন। এজন্যৌ এ রওয়ায়েত এবং এ বিষয় সংক্রান্ত অন্যান্য রেওয়ায়েত- যা তিরমিযী, মুসনাদে আহম প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থগলেতে হযরত আবু হুরায়রা (রা), ইবনে আব্বাস (রা), ইবনে ওমর (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণীত- থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছা যায় না যে, সূরা কাসাসের এ আয়াত আবু তালেবের মৃত্যুর সময় নাযিল হয়েছিল। কিন্তু এর থেকে শুধু এতোটুকু জানা যায় যে, এ আয়অতের সত্যতা সবচেয়ে অধিক এ ঘটনার সমফ প্রকাশ পায়। যদিও নবী পাকের (স) আনতিরক বাসনা ছিল প্রত্যেক আল্লাহর বান্দাহকে সত্য পথে নিয়ে আসা। কিন্তু কোন ব্যডিক্তর কুফরের উপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করাটা নবী (স) এর কাছে সবচেয়ে কষ্টকর হয়ে থাকলে এবং ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও সম্পর্কে ভিত্তিতে কোন বক্তির হেদায়েতের জন্যে সবচেয়ে বেশী অভিলাষী হয়ে থাকলে- সে ব্যক্তি ছিলেন আবু তালেব। কিন্তু তাঁকেও হেদায়েতের পথে আনতে নবী (স) সক্ষম হলেন না বলে একথা সুস্পষ্ট হলো যে, কোন ব্যক্তিকে হেদায়েত করা এবং কাউকে হেদায়েতে থেকে বঞ্চিত রাখা নবীর সাধ্যের অতীত। এ ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সম্পদ হেদায়েতের সম্পদ) কোন আত্মীয়তা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে নয় বরঞ্চ মানুষের গ্রহণযোগীতা এবং আন্তরিকতা পূল্ণ সত্য-প্রিয়তার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়ে থাকে।] (ফাতের: ২২-২৪)।

এ কথাও সুস্পষ্ট করে বলে দেয় যে, নবীর যা কিছু সম্মান ও মর্যাদা, তা এ জন্যে যে, তিনি আল্লাহর আনুগত্য করেন, ঠিকমতো তাঁর আদেশ মেনে চলেন, এবং যেসব কথা তাঁর উপর নাযিল করা হয়, তা অবিকল আল্লাহ বান্দাহদের কাছে পৌঁছিয়ে দেন। নতুবা তিনি যদি আনুগত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতেন এবং আল্লাহর কালামের মথ্যে নিজের কল্পিত কোন কথা সংমিশ্রণ করতেন, তাহলে তাঁর কোন স্বাতন্ত্র্য-বৈশিষ্ট্যই অবশিষটট থাকতো না, এমনকি খোদার পাকড়াও থেকে বাঁচতেন না।

(আরবী**************)

এবং (হে নবী) তোমার নিকটে যে জ্ঞান এসেছে তা সত্ত্বেও তুমি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর, তাহলে এমতাবস্থায় তুমি জালিম হয়ে পড়বে। (বাকারা: ১৪৫)।

(আরবী**************)

-(হে নবী) তোমার নিকেট জ্ঞান আসার পর তুমি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ কর, তাহলে আল্লহর শাস্তি থেকে বাঁচাবার জন্যে তোমার কোন অলী ও সাহায্যকারী থাকবে না। (বাকারা: ১২০)।

(আরবী**************)

-(হে মুহাম্মদ) বলে দাও, আমার পক্ষ থেকে এ কালামের মধ্যে কিছু রদবদল করার এখতিয়ার আমার নেই। আমি ত শুধু তাই অনুসরণ করে চলি যা আমার উপর অহীর দ্বারা নির্দেশ করা হয়। আমি আমার রবের নাফলমানী করি তাহলে এক ভয়ানক দিনের শাস্তির আমি ভয় করি-(ইউনুস: ১৫)।

এসব কথা এজন্যে বলা হয়নি যে, মায়াযাল্লাহ, রাসূলে আকরাম (র) এর পক্ষ থেকে নাফরমানী অথবা রদবদলের সামান্যতম কোন আশংকাওছিল। প্রকৃত পক্ষে তার উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়ার সামনে এ সত্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা যে, নবী পাকের (স) এর পক্ষ থেকে নাফরমানী অথবা রদবদলের সামান্যতম কোন আশংকাও ছিল। প্রকৃত পক্ষে এর উদ্দেশ্য হলো, দুনিয়ার সামনে এ সত্য সুস্পষ্ট করে তুলে ধরা যে, নবী পাকের (স) আল্লাহ রব্বুল ইয্যাতের দুরবারে যে নৈকট্য লাভ হয়েছে তা এজন্যে নয় যে, নবীর সত্তার সাথে আল্লাহর কোন আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, বরঞ্চ নৈকট্য লাভের কারণ এই যে, তিনি আল্লাহর চরম ও পরম অনুগত এবং আন্তরিকসতহ তাঁর দাস।

নবী মুহাম্মদ (স) নবীগণেল মধ্যে একজন

তৃতীয় যে বিষয়টি বার বার কুরআন মজিদে বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে তা এই যে, মুহাম্মদ (স) কোন নতুন নবী নন। বরঞ্চ নবীগনের মধ্যে একজন এবং নবুয়তের ধারাবাহিকতার সংযোজক একটি অংশ বা আংটা যা সৃষ্টির সূচনা থেকে তাঁর আগমন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যার মধ্যে প্রত্যেক জাতি ও যুগের নবী-রসূলগণ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কুরআন হাকীম নবুয়ত  ও রেসালাতকে কোন এক ব্যক্তি, দেশ অথবা জাতির  মধ্যে সীমিত বা নির্দিষ্ট করে না। বরঞ্চ সুস্পষ্ট করে একথা ঘোষণা করে যে, আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক জাতি, দেশ ও যুগে এ ধরনের পূতপবিত্র ব্যক্তি পয়দা করেছেন যারা মানব জাতিকে সিরাতে মুস্তাকীমের দিকে দাওয়াত দিযেছেন এবং পথভ্রষ্টতার ভয়াবহ পরিণাম থেকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

(আরবী**************)

-এমন কোন জাতি ছিলনা যার মধ্যে কোন সতর্ককারীর আগমন হয়নি। (ফাতের: ২৪)

(আরবী**************)

-এবং আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে একজন নবী রসূল পাঠিয়েছি (এ বাণীসহ) যে, আল্লাহর দাসত্ব আনুগত্য কর এবং তাগুতের দাসত্ব আনুগত্য থেকে বিরত থাক। (নহল : ৩৬)।

এসব নবী ও সতর্ককারীদের মধ্যে একজন ছিলেন নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বহু স্থানে একথা বলা হয়েছে- (আরবী**************)

-পূর্ববর্তী সতর্ককারীগণের মধ্যে আমি একজন সতর্ককারী (নজম : ৫৬)।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ! তুমি রসূলগণের মধ্যে একজন (ইয়অসীন: ৩)। (আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ, বলে দাও: আমি কোন অভিনব রসূল নই। আমি জানিনা আমর সাথে কি আচরণ করা হবে এবং তোমাদের সাথেইবা কি আচরণ করা হবে। আমি ত সেই জিনিসের অনুসরণ করি যা আমাকে অহীর মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়। আমি ত একজন সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ককারী (আহকাফ: ৯)।

(আরবী**************)

-মুহাম্মদ রসূল ব্যতীত কিছু নয় এবং তাঁর পূর্বেও অনেক রসূল অতিবাহিত হয়েছে- (আলে ইমরান : ১৪৪)।

শুধু এতোটুকুই নয়, বরঞ্চ একথাও বলা হয়েছে যে, রসূলে আরবীর দাওয়াত তাই ছিল যার দিকে মানব জাতির জন্ম-সূচনা থেকে সত্যের আহ্বানকারী প্রত্যেক নবী আহ্বান জানিয়ে এসেছেন। নবী মুহাম্মদ (স) সেই স্বভাব ধর্মের প্রতিই মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন, যার আহ্বান প্রত্যেক নবী রসূল জানিয়েছেন।

(আরবী**************)

-বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপরে এবং সেই শিক্ষার উপরেয যা আমাদের উপর নাযিল করা হয়েছে। ঐসবরে উপরেও যা ইবরাহীম (আ), ইসমাইল (আ), ইসহাক (আ), ইয়াকুব (আ) এবং তাঁদের সন্তানগণের উপর নাযিল হয়েছে এবং যা কিছু দেয়া হয়েছিল মূসা (আ), ঈসা (আ) এবং অন্যান্য নবগীনকে তাদের রবের পক্ষ থেকে। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নির্ণয় করিনা এবং আমরা আল্লাহর অনুগত। অতএব তোমরা যেমন ঈমান এনেছ, তেমনি এ সব লোকও যদি ঈমান আনে, তাহলে তাঁরা সোজা-সরল পথের উপরই হবে। (বাকারা : ১৩৬-১৩৭)

কুরআনের এ বিশ্লেষণ এ সত্য সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ রাখে না যে, নবী মুহাম্মদ (স) কোন নতুন ধর্ম বা দ্বীনসহ আগমন করেননি। অথবা পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে কাউকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যে অথবা কারো আনীত পয়গামন খন্ডন  করার জন্যেও তিনি আসেননি। বরঞ্চ তাঁকে এজন্যে পাঠানো হয়েছিলো যে, যে সত্য দ্বীন প্রথম থেকেই সকল জাতির নবীগণ পেশ করে এসেছেন, এবং যাকে পরবর্তীকালে লোকে্রা ‍বিকৃত করেছে, সে দ্বীনকে সকল ভেজালমুক্ত করে তিনি পেশ করবেন।

নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য

এভাবে কুরআন মজীদ তার বাহকের সঠিক পরিচয় ও মর্যাদা বয়ান করার পর সেসব কর্মচান্ডের বর্ণনা দিচ্ছে, যার জন্য তাঁকে পাঠানো হযেছিল। এ কাজ সামগ্রিকভাবে ‍দুটি বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত। একটি শিক্ষা বিভাগ, অপরটি কর্ম বিভাগ।

নবীর শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যাবলী

এ বিভাগরে কাজ নিম্নরূপ:-

(১) আয়াত তেলাওয়াত, তাযকিয়ায়ে নফস এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষাদান।

(আরবী**************)

প্রকৃতপক্ষে ঈমান আনয়নকারীদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার বিরাট করুণা এই যে, তিনি তাদের জন্যে স্বয়ং তাদের মধ্য থেকে এমন এক রসূলের আবির্ভাব করেছেন, যিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াত শুনায়, তাদের আত্মশুদ্ধি করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। নতুবা তারা ত এর আগে সুস্পষ্ট গোমরাহীর মধ্যে লিপ্ত ছিল- (আলে ইমরান: ১৬৪)।

তেলাওয়াতের আয়াত বা আয়াত পড়ে শুনানোর অর্থ আল্লাহর নির্দেশাবলী অবিকল শুনিয়ে দেয়া। তাযকিয়ার অর্থ লোকের চরিত্র ও তাদের জীবনকে মন্দ গুণাবলী, রীতিনীতি ও ক্রিয়াপদ্ধতি থেকে পরিশুদ্ধ করা  এবং তাদের মধ্যে উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী, আচার আচরণ এবং সঠিক ক্রিয়াপদ্ধতির বিকাশ সাধনা করা। কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর মহান গ্রন্থের সঠিক মর্ম বুঝিয়ে দেয়া, তাদের মধ্যে এমন দূরদৃষ্টি করা যাতে করে তারা আল্লাহর কিতাবের প্রকৃত গূঢ় রহস্য উপলব্ধি করতে পারে। অতঃপর তাদেরকে সে হিকমত বা বিশেষ জ্ঞান শিক্ষা দেয়া, যার ফলে তারা গোটা জীবনের সুদূর প্রসারিত বিভিন্ন দিকগুলোকে আল্লাহর বিতাক অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে পারে।

(২) দ্বীনের পরিপূর্ণতা

(আরবী**************)

-আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে তোমাদের জন্যে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সমাপ্ত করে দিলাম। আর তোমাদের জন্যে ইসলামের বিধিবিধানকে পছন্দ করলাম। (মায়েদা: ৩)।

অন্য কথায় কুরআন প্রেরণকারী তার বাহকের কাছে শুধুমাত্র তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শুনানো, লোকের আত্মশুদ্ধি (তাযকিয়া) করা এবং কিতাব ও হিকমত  শিক্ষা দেয়ার খেধমতটুকুই গ্রহণ করেননি, বরঞ্চ তাঁর সে নেক বান্দাহদের মাধ্যমে এ কাজগুলোকে পূর্ণত্বদান করেছেন। যেসব আয়াত ও কথা মানব জাতির কাছে পৌছাবার ছিল তা তাঁর (নবীর) মাধ্যমে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। যে সব অনাচার অমংগল থেকে মানব জীবনকে পরিশুদ্ধ করা উদ্দেশ্য ছিল সে সব তাঁর হাতে নির্মূল করেছেন। যে সব গুণবৈশিষ্ট্যের বিকাশ যে মর্যাদাসহ মানুষ ও সমাজের মধ্যে হওয়া উচিত ছিল, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নবীর নেতৃত্বে পেশ করেছেন। উপরন্তু কিতাব ও হিকমতের এমন শিক্ষা তাঁর মাধ্যমে দান করিয়েছেন যে, ভবিষ্যতের সকল যুগে মহাগ্রন্থ কুরআন অনুযায়ী মানব জীবন গঠন করা যেতে পারে।

(৩) নবী পাকের তৃতীয় শিক্ষাগত কাজ ছিল সেসব মতপার্থক্যের রহস্য উদঘাটন করে দেয়া, যা পূর্ববর্তী নবীগনের উম্মতদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। উপরন্তু সকল আবরণ উন্মোচর করে, সকল ভেজাল দূর করে সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও জটিলতা নিরসন করে সেই সঠিক পথ আলোকিত করে দেয়অ, যার অনুসরণ হরহামেখা খোদার সন্তুষ্টি অর্জনের একই মাত্র পথ ছিল।

(আরবী**************)

খোদার কসম, হে মুহাম্মদ, তোমার পূর্বে আমরা বিভিন্ন জাতির জন্যে হেদায়েত পাঠিয়েছি। কিন্তু তারপর শয়তান তাদের ভ্রান্ত ক্রিয়াকর্মকে মনোমুগ্ধকর বানিয়ে দিয়েছে। বস্তুতঃ আজ সে-ই তাদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে রয়েছে এবং তারা যন্ত্রণাময় শাস্তির যোগ্য হয়ে পড়েছে। আমরা তোমার উপর এ কিতাব শুধু এজন্যে নাযিল করেছি যে, তুমি সে সত্যকে তাদের সামনে তুলে ধরবে, যে সম্পর্কে তাদের মধ্যে মতানৈক্য পাওয়া যাচ্ছে। আর এজন্যেও যে, এ কিতাব হেদায়েত ও রহমত স্বরূপ হবে তাদের জন্যে যারা তার অনুসরণ মেনে নেবে (নামল: ৬৩-৬৪)।

(আরবী**************)

-হে আহলি কিতাব! তোমাদের নিকটে আমাদের রসূল এসেছে, যে তোমাদের নিকটে অনেক এমন বিষয় বিশদভাবে বয়ান করে, যা তোমরা কিতাব থেকে গোপন কর, আর সে অনেক কিছু মাফ করে দেয়। তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আলোক এবং একটি সুস্পষ্ট গ্রন্থ এসেছে। যারা এ গ্রন্থের আলোকে জীবন যাপন করে, আল্লাহ তাদেরকে এ গ্রন্থের মাধ্যমে সুখশান্তি ও নিরাপত্তার পথ দেখান, তাদেরকে অন্ধাকার থেকে আলোকে নিয়ে আসেন এবং সঠিক সরল পথে পরিচালিত করেন- (মায়েদা: ১৫-১৬)।

(৪) নাফরমানদের শাস্তির ভয় দেখানো, ফরমাবরদারকে আল্লাহ তায়ালা রহমতের সুসংবাদ দান এবং আল্লাহর দ্বীনের প্রচার-প্রসারও ছিল নবীর শিক্ষাদান কাজ।

(আরবী**************)

হে নবী! আমরা তোমাকে সাক্ষ্যতাদা, সুসংবাদদাতা, আল্লাহর নির্দেশে আল্লাহর দিকে আহবানকারী এবং একটি আলোকদানকারী সূর্য বানিয়ে পাঠিয়েছি। (আহযাব: ৪৫-৪৬)

নবীর বাস্তব কাব

বাস্তব জীবনে ও তার কায়কারবারে যে কাজ নবীর দায়িত্বে ছিল তা নিম্নরূপ:-

(১) সৎ কাজের আদেশ করা, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা, হালাল ও হারামের সীমারেখা নির্দিষ্ট করে দেয়া এবং খোদা ব্যতীত অন্যের বাধানিষেধের বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্তস্বাধীন করা েএবং তাদের চাপিয়ে দেয়া বোঝা লাঘ করা।

(আরবী**************)

সে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করে, মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। তাদের জন্যে পাক জিনিস হালাল করে দেয় এবং নাপাক জিনিস হারাম করে দেয়। তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেয় এবং সেসব বাধানিষেধ রহি করে দেয়, যার বন্ধনে আবদ্ধ ও দামিত হয়ে ছিল। অতএব যারা ঈমান আনবে, তার সহযোগিতা করতে এবঙ সেই আলোর অনুসরণ করবে যা তার সাথে নাযিল করা হয়েছে, তারাই সাফল্য লাভকারী (আ’রাফ: ১৫৭)।

(২) খোদার বান্দাহদের মধ্যে সত্য ও সুবিচার সহ ফয়সালা করা।

(আরবী**************)

হে ‍মুহাম্মদ, আমরা তোমার উপর সত্য সহকারে এ গ্রন্থ নাযিল করেছি, যাতে করে তুমি আল্লাহর বলে দেয়া আনি-কানুন অনযায়ী লোকের মধ্যে ফয়সালা কর এবং আত্মসাৎকারীদের উকিল না সাজ-(নিসা: ১০৫)।

(৩) আল্লাহর দ্বীন এমনভাবে কায়েম করা, যাতে মানব জীবনের যাবতীয় ব্যবস্থা তার অধীন হয়ে যায় এবং তার মুকাবিলায় অন্যান্য যাবতীয় রীতিপদ্ধতি দমিত হয়ে যায়।

(আরবী**************)

-তিনি একমাত্র আল্লাহ যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়েত ও দ্বীনে-হকসহ পাঠিয়েছেন, যেন সে যাবতীয় বিধানের উপরে তা বিজয়ী করতে পারে (আলফাত্‌হ : ২৮)।

এভাবে নবীর কাজের এ বিভাগটি রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, নৈতিক ও তামাদ্দুনিক সংস্কার এবং পূতপবিত্র সত্যসতার সকল দিককে পরিবেষ্টন করে রাখে।

নবূয়তে মুহাম্মদী বিশ্বজনীন ও চিরন্তন

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কাজ কোন একটি জাতি, দেশ অথবা যুগের জন্যে নির্দিষ্ট নয়। বরঞ্চ সমগ্র মানবজাতির জন্যে এবং সকল যুগের জন্যে একইভাবে প্রযোজ্য।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ! আমরা তোাকে সকল মানুষের জন্যে ভীতিপ্রদর্শনকারী ও সুসংবাদদাতা করে পাঠিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জনে না (সাবা: ২৮)। (আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ। বলে দাও: হে মানব জাতি, আমি তোমাদের সকলের জন্যে খোদার রসূল হয়ে এসছি সেই খোদার রসূল যিনি আসমান ও যমীরে বাদশাহীর মালিক যিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ বা খোদা নেই- যিনি জীবন ও মৃত্যুর মালিক। অতএব খোদার উপর ঈমান আন এবং তাঁর রসূল-উম্মী নবীর উপর, যে খোদা ও তার ফরমানগুলোর উপর ঈমান রাখে, তার অনুসরণ কর। আশা করা যায় যে, তোমরা সরল সঠিক পথ পেয়ে যাবে। (আ’রাফ: ১৫৮)।

(আরবী**************)।

-হে মুহাম্মদ, বলে দাও! আমার প্রতি এ কুরআন অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, যাতে করে আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে সতর্ক করে দিতে পারি এবং প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার কাছে এ পৌছুবে- (আনয়াম: ১৯)

(আরবী**************)

-এ কুরআন ত একটি ‍উপদেশ মালা সকল দুনিয়াবাসীদের জন্যে। প্রতিটি ঐ ব্যক্তির জন্যে যে তোমাদের মধ্যে সত্য পথের পথিক হতে চায়। (তাকবীর: ২৭-২৮)।

খতমে নবুয়ত

নবুয়তে ‍মুহাম্মদর আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, নবুয়ত ও রেসালাতের ধারাবাহিকতা তাঁর উপর এসেস শেষ করে দেয়া হয়েছে। তাঁর পর দুনিয়ায় আর কোন নবীর প্রয়োজন রইলো না।

(আরবী**************)

মুহাম্মদ (স) তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কারো পিতা নয়। বরঞ্চ সে আল্লাহর রসূল এবং নবীদের ধারাবাহিকতার সমাপ্তকারী (আহযাব: ৪০)।

এ প্রকৃত পক্ষে নবুয়তে মুহাম্মদীর বিশ্বজনীনতার, চিরকালীনতার ও দ্বীনের পরিপূর্ণতার এক অনিবার্য ফল। যেহেতু উপরোক্ত বর্ণার ‍দৃষ্টিতে মুহাম্মদ (স) এর নবুয়ত সমগ্র দুনিয়ার মানুষের জন্যে- কোন একটি জাতির জন্যে নয় এবং চিরকালের জন্যে, কোন একটি যুগের জন্যে নয় এবং যে কাজের জন্যে দুনিয়ায় নবীদের আগমেনর প্রয়োজন ছিল, তা যখন চূড়ান্ত পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে, সে জন্যে দুনিয়ায় নবীদের আগমনের প্রয়োজন ছিল, তা যখন চূড়ান্ত পূর্ণতায় পৌঁছে গেছে, সে জন্যে এ অত্যন্ত সংগত কথা যে তাঁর উপরে নবুয়তের ধারাবাহিকতা শেষ করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টিকে স্বয়ং নবী (স) অতিসুন্দরভাবে একটি হাদীসে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন, আমার দৃষ্টান্ত নবীদের মধ্যে এমন যে, কোন ব্যক্তি একটি সুন্দর গৃহ নির্মাণ করলো। সমস্ত গৃহটি নির্মান করে মাত্র একটিখানি ইটের স্থান খালি রাখলো। এখন যারাই গৃহটির চারদিকে চক্কর দিল তাদের মনে খটকা লাগার ফলে তারা বলতে লাগলো, যদি এ শেষ ইটখানিও এখঅনে রেখে দেয়া হতো তাহলে গৃহখানি একেবারে পূর্ণতা লাভ করতো। এখন নবুয়ত ‍গৃহে যে ইটটির স্থান খালি পড়ে আছে, আমিই সেই ইট।

এ দৃষ্টান্ত থেকে খতম নবুয়তের কারণ পরিষ্কার বুঝতে পারা যায়। যখন দ্বীন পরিপূর্ণ হয়েছে; আল্লাহর আয়াত সমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, আদেশ নিষেধগুলো, আকীদাহ বিশ্বাস সমূহ, এবাদতবন্দেগী, তামাদ্দুন, সামাজিকতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনীতি, মোটকথা মানব জীবনের প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনাবলী বর্ণনা করা হয়েছে এবং দুনিয়ার সামনে আল্লাহর বাণী ও রসূলের উৎকৃষ্ট নমুনা এমনভাবে পেশ করা হযেছে যে, সকল প্রকার বিকৃতি ও এদিক সেদিক করা থেকে তাকে মুক্ত রাখা হয়েছে এবং প্রত্যেক যুগে তার থেকে পথনির্দেশনা লাভ করা যেতে পারে, তখন নবুয়তের আর কোন প্রয়োজন রইলোনা। প্রয়োজন শুধু স্মরণ করিয়ে দেয়অর এবং পুরর্জাগরণের (রেনেসাঁর)। তার জন্যে হাক্কানী ওলামা এবং সত্যনিষ্ঠ মুমেনদের জামায়াতই যথেষ্ট।

নবী মুহাম্মদের (স) প্রশংসনীয় গুণাবলী

শেষ জিজ্ঞাস্য প্রশ্নটি এই যে, এ গ্রন্থের বাহক ব্যক্তিগতভাবে কোন্‌ চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, এ প্রশ্নের জবাবে কুরআন মজীদ অন্যান্য প্রচলিত গ্রন্থাদির ন্যায় তাদের বাহকদের অতিরঞ্জিত প্রশংসার পথ অবলম্বন করেনি। তাঁর প্রশংসাকে কোন স্থায়ী বিষয়বস্তুতও বানানো হয় নি। নিছক কথা প্রসংগে ইংগিতে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্টগুলো বিদ্যমান ছিল।

(১) কুরআন বলে যে, তার বাহক চারিত্রিক গুণাবলীর শীর্ষস্থানে অবস্থান করছিলেন।

(আরবী**************)

-এবং হে মুহাম্মদ (স), তুমি চরিত্রের উচ্চতম মর্যাদার অধিকারী (নূন: ৪)

(২) কুরআন বলে যে, তার বাহক এমন একজন দৃঢ়-সংকল্প, দৃঢ়চিত্ত ও সর্বাবস্থায আল্লাহর উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি ছিলেন যে, যখন তাঁর সমগ্র জাতি তাঁকে নির্মূল করার জন্যে বদ্ধপরিকর হলো এবং তিনি একজন সহযোগীসহ পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন, সেই কঠিন বিপজ্জনক অবস্থায় তিনি সাহস হারিয়ে ফেলেননি বরঞ্চ আপন সংকল্পে অটল ছিলেন।

(আরবী**************)

স্মরণ কর সে  সময়ের কথা যখন কাফেরগণ তাকে বহিষ্কার করে দিয়েছিল, যখন তিনি দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় ছিলেন এবং যখন দুজন গুহায় ছিলেন এবং ‍যখন তিনি তার সাথীকে বলেছিলেন চিন্তা করোনা আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন। (তওবা: ৪০)।

(৩) কুরআন বলে, তার বাহক একজন অত্যন্ত উদার-চেতা ও দয়াশীল ব্যক্তি ছিলেন যিনি তাঁর চরম শত্রুর জন্যেও ক্ষমা করর দোয়া করন এবং অবশেষে আল্লাহকে এ চূড়ান্ত ফয়সালা শুনিয়ে দিতেহয় যে, তিনি তাদেরকে ক্ষমা করবেন না।

(আরবী**************)

-তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর বা না কর, তুমি যদি সত্তর বারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর তথাপি আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না- (তওবা: ৮০)

(৪) কুরআন বলে, তার বাহকের স্বভাবপ্রকৃতি ছিল অত্যন্ত নম্র। তিনি কোন দিন কারো প্রতি কঠোরতা প্রদর্শন করেননি এবং এজন্যে দুনিয়া তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়।

(আরবী**************)

-এ আল্লাহরই রহম যে, তমি তাদের প্রতি বিনয়-নম্র। নতুবা তুমি যদি কর্কষভাষী পাষানহৃদয় হতে, তাহলে এ সব লোক তোমার চারপাশ থেকে কেটে পড়তো। -(তওবা: ১৫১)।

(৫) কুরআন বলে, তার বাহক খোদার বান্দাহদেরকে সত্যসঠিক পথে আনার জন্যে মনের মধ্যে অস্থিরতা বোধ করতেন এবং গোমরাহীর জন্য তারা জিদ ধরে থাকলে মনে বড়ো কষ্ট পেতেন। এম কি তাদের দুঃখে অধীর হয়ে পড়তেন।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ (স), এমন মনে হচ্ছে যে, তুমি তাদের জন্যে দুঃখে অতিভূত হয়ে প্রাণ হারিয়ে ফেলবে যদি তারা এ কথার উপর ঈমান না আনে (কাহাফ: ৬)।

(৬) কুরআন বলে, তার বাহক তাঁর উম্মতের জন্যে গভীর ভালোবাসা পোষণ করতেন। তিনি তাদের শুভাকাংখী ছিলেন। তারা ক্ষগ্রিস্ত হলে মর্মাহত হতেন। তাদরে জন্যে তিনি ছিলেন দয়া ও স্নেহমমতার প্রতীক।

(আরবী**************)

-তোমাদের নিকটে স্বয়ং তোমাদের মধ্যে থেকেই এমন এক রসূল এসেছেন যার কাছে সে প্রতিটি জিনিস কষ্টদায়ক হয় যা তোমাদের ক্ষতিকারক, যে তোমাদের কল্যাণকামী এবং আহলে ঈমানদের জন্যে বড়োই স্নেহশীল ও দয়ালূ –(তওবা: ১২৮)।

(৭) কুরআন বলে, তার বাহক শুধু তাঁর জাতির জন্যেই নয়, বরঞ্চ সমগ্র দুনিয়ার রহমত স্বরূপ ।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ (স), আমরা তোমাকে সারা দুনিয়ার জন্যে রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি- (আম্বিয়া: ১০৭)।

(৮) কুরআন বলে, তার বাহক রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা জেগে জেগে এবাদত করেন এবং খোদার স্মরণে দন্ডয়মান থাকেন।

(আরবী**************)

-হে মুহাম্মদ (স), তোমার রব জানের যে তুমি রাতের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ পর্যন্ত এবং কখনো অর্ধরাত, কখনো এক তৃতীয়াংশ রাত নামাযে দাঁড়িয়েথাক- (মুযাম্মেল : ২০)।

(৯) কুরআন বলে, তার বাহক ছিল সত্যবাদী মানুষ। জীবনে কখনো তিনি সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হননি। অশুভ চিন্তাধারায় প্রভাবিত হননি। আর না কখনো তিনি প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে হকের বিরুদ্ধে টু শব্দ করেচেন।

(আরবী**************)

-(হে লোকেরা) তোমাদের ছাহেব না কখনো সত্য সরল পথ থেকে সরে পড়েছে, না সঠিক চিন্তাধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে। আর না সে প্রবৃত্তির বশীভূত হয়ে কিছু বলে (নজম: ২০৩)।

(১০) কুরআন বলে, তার বাহক সারা দুনিয়ার জন্যে অনুসরণ যোগ্য আদর্শ এবং তাঁর গোটা জীবন পরিপূর্ণ নৈতিকতার সঠিক মানদন্ড। (আরবী**************)

তোমাদের জন্যে রসূলে মধ্যে এক সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ রয়েছে –(আহযাব ২১)।

কুরআন শরীফ অধ্যয়ন করলে তার বাহকের আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করা হয়েছে দেখতে পাওয়া যাবে। কিন্তু এ প্রবন্ধে তার বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ নেই।

যে কেউ কুরআন পড়লে স্বয়ং দেখতে পাবে যে, প্রচলিত অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থাবলীর বিপরীত এ গ্রন্থখানি তার বাহককে যে রঙে রঞ্জিত করে তা কতটা স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট এবং আবিলতা থেকে মুক্ত। এতে খোদায়ী কোন লেশ নেই।  -আর না প্রশংসার কোন অতিরঞ্জন অত্যুক্তি। কোনরূপ অসাধারণ শক্তিও তাঁর প্রতি আরোপিত হয়নি। তাঁকে কাজকর্মে শরীকও বানানো হয়নি। আর না তাঁকে এমন সব দুরবলতা-দোষত্রুটির দ্বারা অভিযুক্ত করা হয়েছে যা একজন পথপ্রদর্শক এবং হকের প্রতি আহবানকারীর মর্যাদার পডরিপন্থী। যদি ইসলামী সাহিত্যের অন্যান্য সকল গ্রন্থাবলী দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং  ‍শুধা কুরআন শরীফ রয়ে যায়, তথাপি নবী পাকের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কোন ভুল বুঝাবুঝি, কোন সন্দেহ, সংশয়, ভক্তি শ্রদ্ধার কোন ত্রুটি হবার কোন অবকাশ থাকবে না। আমরা ভালোভাবে জানতে পারি যে, এ গ্রন্থের বাহক একজন পূরণত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। সর্বোৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণে গুণান্বিত ছিলেন। পূর্ববর্তী নবীগনের সত্যতার স্বীকৃতি দিতেন। কোন নতুন ধর্মের উদ্ভাবক তিনি ছিলেন না। কোন অতিমানব হওয়ার দাবীও তিনি করেননি। তাঁর দাওয়াত ছিল সমগ্র বিশ্বজগতের জন্যে। আল্লাহ তায়ালার পক্ষথেকে কিচু নির্দিষ্ট খেদতের জন্য তাঁকে আদেশ করা হয়েছিল। যখন তিনি এসব খেদমত পুরোপুর আঞ্জাম দিলেন, তখন নবুয়তের ধারাবাহিকতা তাঁর উপর এস সমাপ্তি লাভ করলো। [পকৃত পক্ষে এ প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল ১৯২৭ সালে ‘আলজায়িত’ পত্রিকায় ‘হাবিক সংখ্যার’ জন্যে। ১৯৪৪ সালে সান্নিবেশিত করার পূর্বে তার কিছু পরিবর্দন সাধিত হয়-গ্রন্থকার।]

 

 দ্বিতীয় অধ্যায়

নবী মুহাম্মদের (স) বংশ পরিচয়

হযরত ইব্রাহীম (আ)

একথা ঐতিহাসিক দিক দিয়ে সর্বসম্মত যে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পরিবার হযরত ইবরাহীম (আ) এর বংশের সেই শাখা সম্ভূত যা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হযরত ইসমাইল (আ) থেকে চলে এসেছে। এ বংশ পরম্পরা বনী ইসমাঈল নামে পরিচিত। নবী মুহাম্মদের (স) জীবন চরিতের সাথে এ বিষয় সম্পর্ক এতো গভীর যে তাঁর সম্পর্কে কিচু আলোচনা কতে হলে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) এর জীবনের ঘটনাবলী থেকেই শুরু করতে হবে। কারণ তাছাড়া এটা বুঝতেই পারা যাবে না যে, ইরাকের এ বংশটি আরবের অভ্যন্তরে এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিভাবে পূণর্বাসিত হলো, এখানে তৌহীদপন্থীরেদ কেবলার ভিত্তি কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো এবং আরবের অধিকাংশ উপজাতীয়দের সাথে নবী মুহাম্মদের (স) কি সম্পর্ক ছিল যে কারণে তিনি কোন অপরিচিত নন, বরঞ্চ অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) ইরাকবাসী ছিলেন। তাঁর জন্মভূমি উর ইরাকের নমরূদ পরিবারের রাজধানী ছিল। খৃঃপূর্ব ২১০০ সালের কাছাকাছি সময়ে গবেষক পন্ডিতগণের মতে হযরত ইবরাহীম (আ) এর আবির্বাব ঘটে। উর ছিল তৎকালীন সভ্যতা সংস্কৃতি ও ব্যবসাবাণিজ্যের বিরাট কেন্দ্র। সেই সাথে এ ছিল সে জাতির শির্ক কুফুরের ‍দুর্গ। হযরত ইব্রাহীম (আ) যখন এ জাতির শির্কের বিরোধিতা ও তৌহীদের দাওয়াতের সূচনা রেন তখন সরকার, সমগ্র জাতি, তাঁর আপন পরিবচার এমন কি তাঁর পিতা পর্যন্ত তাঁর শত্রু হয়ে গেল। সকলে মিলে তাকে ধমক দিয়ে ও ভীতিপ্রদর্শন করেও যখন তাঁকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হলো, তখন তারা সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে জীবিত জ্বালিয়ে মারার জন্যে এক বিরাট অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করলো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্যে আগুনকে শীতল করে দেন এবং তিনি এ অগ্নিকুন্ড থেকে জীবিত ও সুস্থাবস্থায় বেরিয়ে আসেন। এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে কুরআনে বর্ণিত হযেছে (আম্বিয়া: ৬৮-৬৯, আনকাবুত ২৪, সাফফাত : ৯৭-৯৮) দ্রষ্টব্য।)

কুরআনের বর্ণনা মতে অতপরঃ হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর জন্মভূতি পরিত্যাগ করে শ্যাম ও ফিলিস্তিনের দিকে হিজরত করেন। সে কালে এসব স্থানকে বলা হতো কানয়ান ভূমি। এ প্রসংগে কুরআন বলে:

(আরবী**************)

-তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলো তার জন্যে এক অগ্নিকুন্ড তৈরী কর এবং এ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুন্ডে তাকে নিক্ষেপ কর। তারা তার বিরুদ্ধে এক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকে লাঞ্ছিত করলাম এবং ইব্রাহীম (আ) বল্লো, আমি আার রবের দিকে চল্লাম অর্থাৎ হিজরত করছি। তিনিই আমাকে সুপথ দেখাবেন- (সাফফাত: ৯৭-৯৮)।

(আরবী**************)

-অতঃপর তার জাতির জবাব এ ছাড়া আর ছিলনা, তারা বল্লো তাকে মেরে ফেল অথবা জ্বালিয়ে দাও। সবেশেষে আল্লাহ তাকে আগুন থেকে রক্ষা করলেন। সে সমযের লূত হযরত ইব্রাহীমকে মেনে নিল। এবং ইব্রাহীম বল্লো, আমার আমার রবের দিকে হিজরত করছি। তিনি মহাপরাক্রা্ত ও বিজ্ঞ (আনকাবুত : ২৪-২৬)।

(আরবী**************)]

-আমরা তাকে (ইব্রাহীম) ও লুতকে রক্ষা করে সেই ভূখন্ডের দিকে নিয়ে গেলাম যার মধ্যে আমরা বিশ্ববাসীর জন্যে অগণিত বরকত রেখে দিয়েছি। (আম্বিয়া-৭১)[বরকতপূর্ণ ভূখন্ড বলতে শাম ও ফিলিস্তিনের এলাকা বুঝানো হয়েছে। সূরা আ’রাফ: ১৩৭, বনীইসরাইল ১ আম্বিয়া : ৮১ আয়াতগুলোতে এ অঞ্চলকে বরকতপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হযেছে (তাফহীম -৪র্থ-সাবা-টীকা ৩১ দ্রঃ)

এবং লূতকে আমরা হুক্‌ম ও এলম অর্থাৎ নবুয়ত দান করেছি –(আম্বিয়া: ৭৪)।

(আরবী**************)

এবং লূতও তাদের মধ্যে ছিল যাদেরকে রসল বানানো হয়েছে (সাফফাত: ১৩৩)

হযরত ইব্রাহীম (আ) এর হিজরতের পর তাঁর জাতির কি দশা হয়েছিল তার কোন বিশদ বিবরণ কুরআনে নেই। তবে সূরা তওবার ৭০ আয়াতে যেসব জাতি শান্তিলাভ করে তাদের সাথেই এ জাতির উল্লেখ করা হয়েছে।

এখন কথা হচ্ছে এইযে, এ হিজরতে হযরত লূতের সাথে হযরত সারাও হযরত ইবরাহীমের (আ) সাথে ছিলেন। এ বিষয়ে কুরআনে কোন বিশ্লেষণ নেই। কিন্তু কুরআনের কিছু বর্ণনায় এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী হিজরতে তাঁর সহগামিনী ছিলেন। যেমন সূরা সাফফাতে আছে, হিজরতের সময় হযরত ইব্রাহীম (আ) এ দোয়া করতেন।

(আরবী**************)

-হে খোদা আমাকে নেক সন্তান দান কর। এ দোয়া একজন বিবাহিত লোকই করতে পারতো এবং তাও এমন সময়ে যখন তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত কালে এ দোয়া করছিলেন। বাইবেলের ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকেও তার সমর্তন পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে, এ হিজরতে হযরত সারা সাথে ছিলেন। কিন্তু বাইবেলের অন্যান্য বর্ণনা আবার একেবারেই অমূলক। যেমন বলা হযেছে যে, হযরত সারা হযরত লূতের সহোদরা ভগ্নি এবং হযরত ইব্রাহীমের আপন ভাতিজি। পরে তাঁকে তিনি বিয়ে করেন। আও বলা হযেছে যে এ হিজরতের হযরত ইব্রাহীমের সাথে তাঁর পিতাও ছিল (সৃষ্টিতত্ত্ব,Genesis – অধ্যায় ১১ শ্লোক- ২৭- হযরত ইব্রাহীমের (আ) উপর যে জুলুম অত্যাচর করা হয়েছিল, তাতে তাঁর পিতারও হাত ছিল। (তালমূদ থেকে নির্বাচিত –এইস-পোলানো-লন্ডন-পৃঃ ৪০-৪২)। উপরন্তু খোদার কোন শরীয়তেরই আপন ভাতিজিকে বিয়ে করা জায়ে নয়, একজন নবীপর পক্ষে একাজ করা ত দূরের কথা।

হযরত ইব্রাহীম (আ) এর প্রচার তৎপরতা

হযরত নূহের (আ) পর হযরত ইব্রাহীম (আ) ছিলেন প্রথম নবী যাকে আল্লাহ তায়ালা ইসলারেম বিশ্বজনীন দাওয়াত ছড়াবার জন্যে নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি প্রথমে স্বয়ং েইরাক থেকে মিশর এবং সিরিয়া ও ফিলিস্তিন থেকে আরব মরুর বিবিন্ন অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে ঘুরাফেরা করে লোকের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার এবাদত বন্দেগী ও আনুগত্যের কথা ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। অতঃপর তাঁর এ মিশরে প্রচারকার্যের জন্যে বিভিনন অঞ্জলে তাঁর খলিফা নিযুক্ত করেন। পূর্ব জর্দানে আপন ভ্রাতুষ্পুত্র লুতকে (আ) সিরিয়া ও ফিলিস্তিনে আপন কনিষ্ঠ পুত্র ইসহাককে (আ) এবং আরবের অভ্যন্তরে স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র  ইসমাইলকে (আ) নিযুক্ত করেন। তারপর আল্লাহতায়ালার নির্দেশে মক্কায় সে ঘর নির্মাণ করেন যার নাম কা’বা এবং আল্লাহ তায়ালার নির্দেশেই তাঁর মিশনের কেন্দ্র হিসাবে উক্ত ঘকে নির্ধারিত করা হয়।

হযরত ইব্রাহীমের (আ) বং থেকে দুটি বিরাট শাখা উদ্ভূত হয়। একটি হযরত ইসমাইলের (আ) সন্তানগণকে নিয়ে যারা আরবে রয়ে যান। কুরাইশ এবং আরবের কতিপয় গোত্র আ শাখার সাথে সম্পৃক্ত। আরবের যে সকল গোত্র বংশীয় দিক দিযে হযরত ইসমাইলের (আ) বংশধর ছিল না তারাও যেহেতু তাঁর প্রচারিত ধর্মের দ্বারা কমবেশী প্রভাবিত ছিল, সে জন্যে তারা তাদের ধারাবাহিকতা তাদের সাথেই সম্পৃক্ত করেছিল। [নবী আকরামের (স) যুগ পর্যন্ত আড়াইহাজার বছর যাবত নবী ইসমালের বিভিন্ন পরিবার আরবের বহু পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে মানবসুলভ স্বভাব অনুাযায়ী হযরত ইসমাইলের পূতপবিত্র পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করাকে গৌরবজনক মনে করতো এবং বংশতালিকায় এ উল্লেখ করতো- গ্রন্থকার।

[যেহেতু নবী (স) এর যুগ পর্যন্ত আড়াই হাজার বচর যাবত হযরত ইসমাইলের (আ) বিভিন্ন পরিবার আরবাসীর বহু পরিবারের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল, এ জন্যে মানবীয় স্বভাব প্রকৃতি অনুযায়ী এ সব বিভিন্ন পরিবার এ মহান পরিবারের সাথে আত্মীয়তাকে গৌরবজনক মনে করতো এবং নিজেদের নসব নামায় তার উল্লেখ করতো =-(গ্রন্থকার)।]

দ্বিতীয় হযরত ইসহাকের (আ) বংশধর। এ বংশে জন্মগ্রহণ করেন হযরত ইয়াকুব (আ), হযরত ইউসুফ (আ), মূসা (আ), দাউদ (আ), সুলায়মান (আ), ইয়াহ্‌ইয়া (আ), ঈসা (আ), এবং আরও বহু নবী। হযরত ইয়াকুবের (আ) না ইসরাঈল ছিল বলে এ বংশ বণীইসরাইল নামে অভিহিত হয়। তাঁদের প্রচারের ফলে যে সব জাতি তাঁদের দ্বীন গ্রহণ করে তারা হয়তো তাদের স্বাতন্ত্র তাদর মধ্যেই একাকার করে দেয় অথবা বংশীয় দিক দিযে পৃথক থাকে। তথাপি ধর্মীয় কিদ দিয়ে তাদের অনুসারী হয়ে থাকে। এ শাখাটিতে যখন বিকৃতি অথঃপতন দেখা দেয়, তখন প্রথমে ইহুদীবাদ এবং পরে ‍খৃষ্টবাদ জন্মলাভ করে।

হযরত ইব্রাহীম (আ) এর আসল কাজ ছিল দুনিয়াকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে আহ্বান করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত হেদায়েত মুতাবিক মানুষের ব্যক্তি ও সাজ জীবনের ব্যবস্থা সঠিক পথে পরিচালিত করা। তিনি স্বয়ং ছিলেন আল্লাহর অনুগত। তিনি তাঁর প্রদত্ত জ্ঞানের অনুসরণ করতেন। দুনিয়ায় সে জ্ঞান প্রচার করতেন। এ মহান খেদমতের জন্যেই তাঁকে বিশ্ব নেতৃত্বে ভূষিত করা হয়েছির। তাঁর পরে এ নেতৃত্বের পদমর্যাদা তাঁর বংশের সেই শাখার উপর অর্পিত হয় যা হযরত ইসহাক (আ) এবং হযরত ইয়াকুব (আ) থেকে শুরু হয় এবং বণী ইসরাইল নামে অভিহিত হয়। এ বংশেই নবী জন্মলাভ করতে থাকেন। তাঁদের সেই সঠিক পথের জ্ঞান দান করা হয়। তঁঅদের উপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয় যে, দুনিয়ার জাতি সমূহকে তাঁরা সঠিক পথের নেতৃত্ব দিবেন। এ ছিল সে নিয়ামত যার প্রতি আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মাধ্যমে তাঁদেরকে বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এ শাখাটি নেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিল। বায়তুল মাকএদস দাওয়াত- ইলাল্লাহর কেন্দ্র এবং খোদা পুরস্তদের কেবলা হয়ে থাকে।

হযরত ইসমাইল (আ) এর জন্ম

ইব্রাহীম (আ) এর সন্তানদের দ্বিতীয় শাখাটি বণী ইসরাইল। এশাখাটির মধ্যে যে দোষত্রুটি ছিল তার মধ্যে একটি যে তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে প্রত্যেক গর্বের বস্তু নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে নেয়। ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে যে সব জাতির সাথে তাদের সংঘাত সংঘর্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে, তাদেরকে কলংকিত করার সর্বাত্মক চেষ্টা তারা করে। বাইবেলে এর বহু দৃষ্টান্তের মধ্যে একটি এই যে, তার দৃষ্টিতে হযরত লূত (আ) মোটেই কোন নবী ছিলেন না। কোন দাওয়াতী কাজের জন্যে হযর ইব্রাহীম (আ) তাঁকে সাদুম ভূখন্ডেও পাঠানটি। বরঞ্চ উভয় চাচা ভাতিজার মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হয় এবং চাচা ভাইপোকে অন্যত্র কোথাও গিয়ে বসবাস করতে বলেন- (সৃষ্টিতত্ত্ব-অধ্যায় ১৩, শ্লোক : ৫-১৩)। এর থেকে অধিকতর ঘৃণার্হ দৃষ্টান্ত এই যে, বাইবেলের দৃষ্টিতে লূত জাতির উপর শাস্তি নেমে এলো, তখন লূত (আ) তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়নে। অতঃপর সাদূমের নিকটবর্তী ফিলিস্তিনের হাবরুন শহরে বসবাসকারী আপন চাচ হযরত ইব্রাহীমের (আ) নিকটে না গিয়ে একটি গুহায় অবস্থান করতে থাকেন। সেখানে –মায়াযাল্লঅহ, তাঁর কন্যাদ্বয় তাঁকে মদ্যপানে মদমত্ত করে তাঁর সাথে জড়িত হয় এবং ফলে উভয়ে গর্ভধারণ করে। একজনের গর্ভ থেকে মুআব জন্মগ্রহণ করে যে মুআবীদের পূর্বপুরুষ এবং অন্যজনের গর্ভ থেকে বিনআম্মী জন্মগ্রহণ করে যে বনী আম্মুনের পূর্বপুরুষ (সৃষ্টিতত্ত্ব-অধ্যায় ১৯, শ্লোক: ৩০-৩৮)। এভাবেই বনী ইসরাইল মুআবী ও আম্মুনীদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করে মনের ঝাল ঝেড়েছে। কারণ পরবর্তীকালের ইতিহাস এ সাক্ষ্য দেয় যে, এদের সাথে বনী ইসরাইলের চরম সংঘাত-সংঘর্ষ চলে।

এ ধরনের আচরণ তারা বনী ইসমাইলের প্রতিও করেছে। বাইবেলে বর্ণীত আছে যে, হযরত ইসমাইলের মাতা হযরত হাজেরা হযরত সারার ক্রীতদাসী ছিলেন। হযরত সারা নিঃসন্তান ছিলেন বলে একদিন হযরত ইব্রাহীম (আ)কে বলেন, আপনি আমার ক্রীতদাসীর সঙ্গে মিলিত হন, যাতে করে আমর পরিবার প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। অতএব তাঁর কথামত হযরত ইব্রাহীম (আ) হযরত হাজেরার সাথে মিলিত হন এবং হযরত ইসমাইলের জন্ম হয় –(সৃষ্টিতত্ত্ব- অধ্যায় ১৬, শ্লোক : ১০৪, ১৫-১৬)। অথচ বাইবেলের এই সৃষ্টিতত্ত্ব অংশে অধ্যায় ১৬ এবং শ্লোক ১৬ বলে, তৎকালীন ফেরাউন বিপুল ধন সম্পদ, গবাদি পশু, চাকর-চাকরানি হযরত ইব্রাহীম (আ)কে উপঢৌকন স্বরূপ দান করে। সে সবের মধ্যে হযরত হাজেরাও ছিলেন। [হযরত হাজেরা (রা) একটি গ্রামের অধিবাসিনী ছিলেন, যাকে উম্মুল আরব অথবা উম্মুল আরীক বলে। এ পূর্ব মিশরে ফারামা অথবা আত্তীনার সামনে রোম গাসরের তীর থেকে দু’মাইল দূরে অবস্থিত। ফেরাউনের যুগে এখানে একটি দূর্গ ছিল, আজকাল তাকে তাল্লুল ফারান বলে- গ্রন্থকার। ] এজন্যে হযরত হাজেরাকে হযরত সারার ক্রীতদাসী বলা স্বয়ং বাইবেলের দৃষ্টিতেও ভুল। তাঁর সাথে যৌনমিলনের জন্যে হযরত সারার অনুমতিরও কোন প্রয়োজন ছিল না।

বাইবেলে আরও আছে যে, হযরত ইসমাইল (আ) ফিলিস্তিনেই হযরত ইব্রাহীম (আ) এর সাথে ছিলেন। এমন কি যখন তাঁর বয়স চৌদ্দ বছর, তখন হযরত ইব্রাহীম (আ) এর ঔরসে হযরত সারার গর্ভে হযরত ইসহাক জন্মগ্রহণ করে (সৃষ্টিতত্ত্ব- অধ্যায়, ১৮ শ্লোক: ২৪-২৬, অধ্যায় ২১, শ্লোক : ১-৫। তারপর বাইবেল বলে:-

“এবং সে ছেলে (অর্থাৎ হযরত ইসহাক) বড়ো হয় এবংদুধ ছাড়ানো হয়। তার দুধ ছাড়াবার দিনে ইব্রাহীম (আ) বিরাট খানা পিনা ও আপ্যায়নের আয়োজন করেন। সারা যখন দেখলেন যে হাজেরার মিশরীয়- যে ছিল ইব্রাহীমের ঔরসজাত-হাসি-খুশি করবে। তখন সারা ইব্রাহীমকে বল্লেন- এ ক্রীতদাসী ও তার পুত্রকে বের করে দিন কারণ এ ক্রীতদাসীল পুত্র আমার পুত্রের ওয়ারিশ হবে না। একথা ইব্রাহীমের বড়ো খারাপ লাগলো। খোদা ইব্রাহীমকে বল্লেন, এ পুত্র এবং তোমার ক্রীতদাসীর ব্যাপারে কিছু মনে করো না। সারা তোমাকে যা বলছে তা মেনে নাও – অতঃপর পরদিন সকালে ইব্রাহীম ঘুম থেকে উঠে রুটি এবং পানির মশক হাজেরার কাঁধে তুলে দিয়ে পুত্রসহ তাকে বিদায় করে দিলেন। সে চলে গেল এবং সাবা কূপের বিজন প্রান্তরে ভবঘুরের মতো ঘোরা ফেরা করতে লাগলো। মশকের পানি শেষ হওয়ার পর সে তার পুত্রকে একটি ঝোপের নীচে নিক্ষেপ করলো। সে সামান্য দূরে গিয়ে বসলো এবং বলতে লাগলো- আমি এ ছেলের মৃত্যু দেখবো না। সে তার সামনে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। খোদা ঐ পুত্রের আওয়াজ শুনতে পেলেন এবং খোদার ফেরেশতাগণ আসমান থেকে হাজেরাকে ডেকে বল্লেন, হাজেরা! তোমার কি হয়েছে? ভয় করোনা, কারণ, যে স্থানে ছেলেটি পড়ে আছে সেখান থেকে খোদা তার আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন। উঠ এবং ছেলেকে উঠাও। হাত দিয়ে তাকে সামলাও। কারণ তাকে আমি বিরাট জাতিতে পরিণত করব। খোদা তার চোখ খুলে দিলেন। সে একটি পানির কূপ দেখতে পেল। সেখানে গিয়ে মশকে পানি ভরলো। ছেলেকে পান করালো। খোদা সে ছেলের সাথে ছিল। সে বড়ো হলো এবং বিজন প্রান্তরে থাকতে লাগলো। সে তীরন্দাজ হয়ে পড়লো। সে ফারাম প্রান্তরে বসবাস করছিল। তার মা মিশর থেকে তাঁর জন্যে তার স্ত্রী নিয়ে এলো- (সৃষ্টিতত্ত্ব- অধ্যায় ২১, শ্লোক: ৮-২১)।

এ মিথ্যা কাহিনী এ জন্যে রচনা করা হয়েছে, যাতে হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) এর আরব, মক্কা, কাবা এবং যমযম কূপের সাথে কোন সম্পর্ক প্রমাণিত না হয়। কারণ হযরত ইব্রাহীম (আ) এর আরব সফরের উপর যদি আবরণ টেনে দেয়া হয়, হযরত ইসমাইল (আ) এর চৌদ্দ বছর বয়স পর্যন্ত ফিলিস্তিনে অবস্থান এবং তার পর ফারানের বিজন বিবাহবন্ধন প্রভৃতির উল্লেখ ইসলামী ইতিহাসের সে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিলুপ্ত করে দেয়া যা দ্বীনে ইব্রাহীরে আরব কেন্দ্রের সাথে স্পৃক্ত। ফারানের যে বিজন প্রান্তরের উল্লেখ বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে, তার দৃষ্টিতে তা অবস্থিত ছিল ফিলিস্তিনের দক্ষিণে আবাবা উপত্যকার পশ্চিমে, সিনাই মরুভূমির-উত্তরে এবং মিশর ও রোমসাগরের পূর্বে। ফারান পর্বতের সাথে আরবের কোন সম্পর্কই ছিলনা যেখানে মক্কা অবস্থিত। উপরন্তু এ কাহিনীতে হযরত সারা (রা) এবং হযরত ইব্রাহীম (আ) এর যে ঘৃণ্য চরিত্র অংকণ করা হয়েছে যার সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালাকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর থেকে স্বয়ং বনী ইসরাইলের নৈতিক ধ্যান ধারণার একটা ঘৃণ্য ও জঘন্য রূপ প্রকাশিত হয়েছে। এতে একজন নবীর (হযরত ইব্রাহীম (আ)) এবং স্ত্রী এবং অন্য একজন নবীর (হযরত ইসহাক) নাম এমনভাবে চিত্রিত হয়েছে যে, মা তার সতীনের ছেলের হাসিও বরদাশত করতে রাজী নয় এবং স্বামীকে বাধ্য করছে পুত্রকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে পরিবার থেকে বহিষ্কার করে দিতে। স্বামী যিনি একজন মহাসম্মানিত নবী, তাঁকে এমনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছে যে তিনি তাঁর পনেরো ষোল বছরের পুত্রকে তার মাতামহ শুধুমাত্র রুটি ও এক মশক পানি দিয়ে বিজন প্রান্তরে  নির্বাসিত করেছেন এবং তাদের জীবন মরণের কোন পরোয়া করছেন না। ওদিকে আল্লাহতায়ালার মর্যাদাও এভাবে দেখানো হচ্ছে যে, তিনি বনী ইসরাইলের পূর্বপুরুষ হযরত ইসহাক (আ) এবং তাঁর মায়ের জন্যে হযরত ইব্রাহীম (আ) কে এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে, হযরত ইসহাকের মা স্বীয় সতীনের প্রতি হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে তার প্রতি যে জুলুম অবিচার করার দাবী তুলেছেন তা যেন তিনি (হযরত ইব্রাহীম) মেনে নেন। এ গোটা কাহিনী মিথ্যা ও অলীক কল্পনারই এক সমষ্টি।

পক্ষান্তরে কুরআন ও হাদীস থেকে আমরা সঠিক ইতিহাস জানতে পারি। আরববাসীর মধ্যে বংশানুক্রমে চলে আসা চার হাজার বছর যাবত অসংখ্য অগণিত মানুষের বারংবার বর্ণনা বিবৃতি এ ইতিহাসের সাক্ষ্যদান করে।

কুরআন বলে, হযরত ইব্রাহীম জন্মভূমি থেকে হিজরত কালে আল্লাহর দরবারে এ দোয়া করেন-

(আরবী**************)

-হে খোদা! আমাকে নেক সন্তান দান কর। (সাফফাত: ১০০)।

দীর্ঘকাল অতীত হওয়ার পর দোয়া কবুল করা হয় যখন হযরত ইবরাহীম (আ) অতি বার্ধক্যে পৌছেন। কুরআনে হযরত ইব্রাহীম (আ) এর এ উক্তি করা হয়েছে- (আরবী***************)

ঐ আল্লাহর শোকর যিনি আমাকে আমার বার্ধক্য অবস্থায় ইসাইল ও ইসহাক (দুই পুত্র সন্তান) দান করেছেন- (ইব্রাহীম : ৩৯)।

 এ দুই সন্তানের জন্মের আগে আল্লাহ তায়ালা হযরত ইবরাহীম (আ) কে সুসংবাদ দিয়েছিলেন। প্রথমে হযরত ইসমাইলের (আ) সুসংবাদ এভাষায় দেয়া হয়: – (***************)

-অতঃপর আমরা তাকে এক দৈর্যশীল পুতের সুসংবাদ দেই( আস সাফ্‌ফাত: ১০১)। তার কয়েক বছর পর যখন ইসাইল (আ) প্রায় যৌবনে পদার্পণ করেন, দ্বিতীয় পুতের সুসংবাদ এভাবে দেয়া হয়-(আরবী***************)

(এবং ফেরেশতাগণ তাকে (অর্থাৎ ইব্রাহীম (আ) কে) একজন জ্ঞানবান পুত্রের সুসংবাদ দেয়- (যারিয়াত : ২৮)। এ দ্বিতীয় সুসংবাদ দেয়া হলে হযরত ইব্রাহীম (আ) বলেন-

(আরবী***************)

-তোমরা কি আমাকে আমার বার্ধক্যের সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছ? একটু ভেবে ত দেখ এ কোন ধরণের সুসংবাদ দিচ্ছ- (হিজর : ৫৪)। এ সুসংবাদে সারার এ অবস্থা হয়েছিল-

(আরবী***************)

-তার স্ত্রী চিৎকার করে সামন এগিযে গেল এবং সে তার মুখ ঢেকে ফেল্লো এবং বল্লো- আমি বৃদ্ধা এবং বন্ধ্যা-(যারিয়াত: ২৯)।

এ সব আয়াতের ভিত্তিতে বাইবেলের নিম্ন বর্ণনা সঠিক মনে করা যেতে পারে যে হযরত ইব্রাহীম (আ) এর ৮৬ বছর বয়সে হযরত ইসমাইল (আ) এবং একশ’ বছর বয়সে হযরত ইসহাক (আ) এর জন্মগ্রহণ করেন- (সৃষ্টিতত্ত্ব-১৬, শ্লোক-১৬, অধ্যায়-২১ শ্লোক-৫)।

হযরত ইসমাইলের (আ) মক্কায় পুনর্বাসন

উপরের আলোচনায় একথা জানতে পারা গেল যে, হযরত ইসমাইল (আ) তাঁর পিতার প্রথমপুত্র এবং পিতার বার্ধক্যাবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এমন বয়সে কোন পিতার সন্তান লাভ এ দাবী রাখতো যে, তিনি তাঁর এ প্রথম পুত্র এবং চৌদ্দ বৎসর পর্যন্ত একমাত্র পুত্রকে স্নেহভরে বুকে জড়িয়ে রাখবেন। চোখের আড়াল হওয়াটাও তিনি সহ্য করবেন না। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ) নবী ছিলেন এবং সে কারণেই তিনি হকের দাওয়াতকেই অগ্রাধিকার দিতেন যার জন্যে আপন জন্মভূতিতে অশেষ জুলুম অবিচার সহ্য করেন, হিজরত করে ভিন্‌দেশে ঘুরে ঘুরে বেড়ান এবং প্রত্যেক স্থানে খোদার পয়গাম পৌঁছাবার কাজে তাঁর শক্তি ও শ্রম ব্যয় করেন। এ প্রিয় সন্তানের জন্মের পর তাঁর সর্বপ্রথম মনের মধ্যে চিন্তার উদয় হয় যে, কি করে আরব দেশে তৌহীদি দাওয়াতের সে কেন্দ্র স্থাপন করা যায় যেখান থেকে শেষ নবীর আবির্ভাব হওয়ার কথা এবং যে কেন্দ্রটি কিয়ামত পর্যন্ত তৌহীদি দাওয়াতের কেন্দ্র হিসাবে অক্ষুন্ন থাকবে। কুরআন আমাদেরকে একথা বলে  যে আল্লাহ তায়ালা প্রথমেই হযরত ইব্রাহীম (আ) কে এ স্থানটি চিহ্হিনত করে দেন যেখানে এ কেন্দ্র নির্মাণ বাঞ্ছিত ছিল্ বস্তুত সূরায়ে হজ্বে বলা হয়েছে- (আরবী***************)

-স্মরণ কর সে সময়ের কথা যখন আমরা ইব্রাহীমের জন্যে এ ঘরের (খানায়ে কাবা) স্থান নির্দিষ্ট করে দিই –(হজ্ব: ২৬)।

এ নির্দেশ অনুযায়ী আল্লাহর এ মহান বান্দাহকে তাঁর দুগ্ধপোষ্য শিশু পুত্রকে অসাধারণ ধৈর্যশীলা ও আল্লাহর উপর একান্তভাবে নির্ভরশীলা মাতাসহ ঠিক সেই স্থানে দৃশ্যতঃ একেবারে অসহায় অবস্থায় ফেলে আসেন যেখানে অবশেষে তাঁকে খানায়ে কাবা নির্মাণ হতে হতো।

বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। এ বর্ণনায় যেভাবে ইবনে আব্বাস (রা) স্থানে স্থানে নবী করীমের (স) বক্তব্য উধৃত করেছেন তার থেকে জানা যায় যে, যা কিছু তিনি বয়ান করেছেন তা নবীর কাছে শুনেই করেছন। তিনি বলেন, হযরত ইব্রাহীম (আ) হযরত হাজেরা (রা) ও তাঁর দুগ্ধপোষ্য পুত্রসন্তান ইসমাইল (আ) কে এনে একটি গাছের নীচে এমন স্থানে রেখে গেলেন, যেখানে পরে যমযমের উদ্রেক হলো। মক্কার জনবিরল উপত্যকায় সেকালে কোন মানুষ ছিল না, আর না কোথাও পানি পাওয়া যেতো। হযরত হযরত ইব্রাহীম (আ) চামড়ার থলিতে খেজুর এবং এক মশক পানি হযরত হাজেরা (রা) কে দিয়ে চলে যান। হযরত হাজেরা তাঁর পেছনে চলতে চলতে বলতে থাকেন, হে ইব্রাহীম! আমাদেরকে এ শুষ্ক তরুলতাবিহীন বিজন প্রান্তরে ফেলে কোথায় চল্লেন? একথা হযরত হাজেরা (রা) কয়েকবার বলেন। কিন্তু হযরত ইব্রাহীম (আ) ফিরেও তাকালেন না। ****১ অবশেষে হযরত হাজেরা (রা) বল্লেন- আল্লাহ কি আপনাকে এ কাজ করার আদেশ করেছেন? হযরত ইব্রাহীম (আ) শুধু এতোটুকু বল্লেন, হ্যাঁ। একথায় হাজেরা (রা) বল্লেন, যদি তাই হয় তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। একথা বলে তিনি ফিরে এসে সন্তানের কাছে বসে পড়লেন।

হযরত ইব্রাহীম (আ) পাহাড়ের আড়ালে গেলেন যেখান থেকে মা ও পুত্রকে দেখা যায় না েএবং বায়তুল্লাহর দিকে মুখ করে (যেখানে তাঁকে সে ঘর তৈরী করতে হতো) এ দোয়া করলেন

(আরবী***************)

-হে খোদা আমি একটি পানি ও তরুলতাবিহীন প্রান্তরে আমার সন্তানদের একটি অংশ তোমার পবিত্র ঘরের পাশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে রেখে গেলাম, যেন তারা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের মন তাদের জন্যে অনুরক্ত করে দাও এবং তাদেরকে খাবার জন্যে ফলমূলাদি দান কর। সম্ভবতঃ তারা শোকর গোজার হবে –(ইব্রাহীম : ৩৭)।

এদিকে ইসমাইলের (আ) মাতা তাকে ‍দুধ পান করাতে থাকেন এবং নিজেও মশকের পানি পান করতে থাকেন। পানি শেষ হয়ে গেলে তাঁকে ও সন্তানকে পিপাসা লাগলো। তিনি সন্তানকে পিপাসায় ছটফট করতে দেখে ঠিক থাকতে পারলেন না। তিনি উপত্যকার দিকে ছুটে গেলেন যে লোক জন দেখা যায় কিনা। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। তারপর সাফা পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকার মাঝখানে এলেন। তারপর দুই বাহুর উত্তোলন করে এমনভাবে  দৌড় দিলেন, যেমন ধারা কোন বিপন্ন মানুষ দৌড় দেয়। তারপর মারওয়া পাহাড়ে চড়ে দেখতে লাগলেন কোথাও কোন মানুষ নজরে পড়ে কিনা। কিন্তু কাউকে নজরে পড়লো না এভাবে তিনি সাতবার সাফা ও মারওয়ার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করলেন। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন

[ফিরে না তাকাবার অর্থ নির্দয়তা ও অবহেলা- উপক্ষো নয়। হযরত ইব্রাহীম (আ) মহান নবী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ অবশ্যই ছিলেন, আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালনের জন্যে তিনি এতোবড়ো বিপদের ঝুঁকি নিয়েছিলেন যে পাহাড় ঘেড়া জনবিরল প্রান্তরে তাঁর দুগ্ধপোষ্য সন্তান ও তার মাকে ফেলে যাচ্ছেন। তখন তাঁর মনের যে কি অবস্থা ছিল তা এ অবস্থা দৃষ্টে অবশ্য ধারণা করা যেতে পারে। এ অবস্থায় তিনি যদি স্ত্রী ও পুত্রের দিকে তাকিয়ে দেখতেন তাহলে মন ব্যাকুল ও চঞ্চল হয়ে পড়তো। এজন্যে বুকের উপর পাথর রেখে দিযে চল্লেন। পশ্চাদগামিনী স্ত্রীর বার বার প্রশ্নের জবাবে তাঁর দিকে না দেখেই শুধু হাঁ বল্লেন।]

এ কারণেই লোক সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সায়ী করেন। (****১) শেষবার যখন তিনি মারওয়া পাহাড়ে চড়েন, তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পান। তারপর নিজের মনেই বল্লেন “চুপকর” (অর্থাৎ হৈ চৈ করো না) তখন মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। পুনরায় আওয়াজ এলে তিনি বল্লেন, ‘হে মানুষ তোমার আওয়াজ আমাকে শুনালে। এখন আমার আবেদন পূরণের জন্যে তোমার নিকট কি কিছু আছে?

হঠাৎ তিনি যমযমের স্থানে এক ফেরেশতা দেখতে পেলেন, ইব্রাহীম বিন নাফে’ ও ইবনে জুরাইজ এর বর্ণনায় আছে যে, তিনি জিব্রাইলকে দেখলেন যে তিনি পায়ের গোড়ালি দিযে অথবা হাত দিযে মাটি খনন করছেন। তারপর পানি বেরিয়ে পড়লো। হযরত হাজেরা (রা) অঞ্জলিতে করে পানি নিয়ে মশক ভরতে লাগলেন। যতোই তিনি পানি ভরেন, পানি উচ্ছ্বসিত হয়ে উপরে উঠতে থাকে। ইবনে আব্বসা (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, আল্লাহ ইসমাইল-মাতার উপর রহম করুন, যদি তিনি যমযমকে ঐ অবস্থায় ছেড়ে দিতেন, (অর্থাৎ চার দিকে আইল দিয়ে ঘিরে না দিতেন, তাহলে যমযম প্রবাহমান এক ঝর্ণা হতো।।

এভাবে হযরত হাজেরা (রা) পানি পান করতে থাকেন এবং সন্তানকে দুধ খাওয়াতে থাকেন। ফেরেস্তা তাঁকে বল্লেন “পানি নষ্ট হওয়ার ভয় করো না এখানে আল্লাহর ঘর আছে, যা এ শিশু ও তার পিতা নির্মণ করবে। আল্লাহর এ ঘরের লোকদের ধ্বংস করবেন না।”

কিছুকাল এ অবস্থায় চলার পর জুরহুম গোত্রের (***১) কিচু লোক কাদা অঞ্চল থেকে এসে মক্কার নিম্নভূমি অংশে থেমে যায়। তারা ওখান থেকে দেখলো একটি পাখী একটি স্থানের চার পাশে উড়ছে। তারা বল্লো, এ পাখি ত পানির উপর চক্কর দিচ্ছে। এ উপত্যকার উপর দিযে আমরা এর পূর্বেও যাতায়াত করেছি কিন্তু কোথাও পানি ছিল না। তারপর তারা দু একজন লোককে পাঠালো। তারা সেখানে পানি দেখতে পেলো। তারা ফিরে এ সংবাদ অন্যদেরকে দিল। তারা এসে সেখানে ইসমাইলের (আ) মাকে দেখতে পেলো। তারা হযরত হাজেরাকে (রা) বল্লো, তুমি কি আমাদেরকে এখানে থাকার অনুমতি দিতে পার? হাজেরা বল্লেন, হাঁ, তবে তোমাদের নয় আমার অধিকারে থাকবে। তারা এতে সম্মত হলো।

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, ঐ জুরহুম গোত্র ইসমাইলের মাকে অত্যন্ত মিশুক ধেকে পেল। তিনি নিজেও চাচ্ছিলেন, যেন কিছু লোক এখানে বসতি স্থাপন করে। সুতরাং তারা সেখানে রয়ে গেল এবং পরিবারের অন্যান্যকেও সেখানে নিয়ে এলো। কয়েক পরিবার সেখানে বসবাস করতে লাগলো। হযরত ইসমাইল (আ) তাদের মধ্যেই প্রতিপালিত ও বর্ধিত হন এবং তাঁদের নিকটেই আরবী ভাষা শিক্ষা করেন। (***১) এ ছেলেটিকে জুরহুমীদের বড়ো ভালো  লাগলো এবং তারা এ বাসনা পোষণ করতে থাকলো যেন তাদের বংশেরই ছেলেটি বিবাহ হয়।

(****১) এ ঐ ঘটনার অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রমাণ। কাবা নির্মাণের পর হজ্বের ধারাবাহিক অনুষ্ঠান হযরত ইব্রাহীরেম (আ) যমানায় শুরু হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত শত শত, হাজার হাজার এবং লক্ষ কোটি মানুষ এ ঘটনার স্মরণে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ী করে আসছে। এ হাজার হাজার বছরের পুনঃপৌনিক আমল যা কোন সময়ে বন্ধ হওয়া ব্যতীত আজ পর্যন্ত চলে আসছে। এ ঘটনার এ এমন কোন প্রমাণ যার থেকে অধিকতর ঐতিহাসিক প্রমাণ দুনিয়ার আর কোন ঘটনায় পাওয়া যায় না। এর বিপরীত ফারানের বিজন প্রান্তরে যে (পূর্ব পৃঃ পর) ঘটনার বর্ণনা দিযেছে, সেখানে বা পূর্বে এ ধরনের কোন সায়ী হয়েছে আর না আজ হয়।

() এ ইয়েমেনের প্রাচীন কাহতানী আরবদের একটি গোত্র।

(১) হযরত ইব্রাহীরেম (আ) ভাষাও আরবী ছিল না। তিনি ছিলেন ইরাকবাসী। তারপর কান্‌আনে বসবাস করতে থাকেন। হযরত হাজেরার ভাষাও আরবী ছিল না। তিনি ছিলেন মিশরীয়।]

পুত্র কুরবানীর ঘটনা

হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর প্রিয় পুত্রকে সেই উপত্যকা প্রান্তরে ছেড়ে আসার পর তাকে অযত্নে ফেলে রাখেননি। বরঞ্চ মাঝে মধ্যে খবরাখবর নেয়ার জন্যে আসতেন এবং কিছুদিন স্ত্রীপুত্রের কাছে অবস্থানও করতেন। তিনি স্ত্রী ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে এ স্থানে ছেড়ে যাওয়ার সময় দোয়া করেছিলেন। (আরবী*********************)

-হে আমার রব। এ শহরকে তুমি নিরাপদ করে দাও। ঠিক দোয়া অনুযায়ী এ জনবিরল স্থানটি এখন একটি বস্তিতে পরিণত হযেছে। অনুমান করা যেতে পারে যে হযরত ইব্রাহীম (আ) ইতিমধ্যে জুরহুমীয়দের মধ্যে ইসলাম প্রচারও অবশ্যই করে থাকবেন। তারপর সে ঘটনা সংঘটিত হয় যা মানবীয় ইতিহাসে নজীরবিহীন। অর্থাৎ হযরত ইব্রাহীম (আ) বার্ধক্যের সন্তান, প্রথম ও একমাত্র পুত্রকে নবযৌবন কালে খোদার ইংগিতে কুরবানী করার জন্যে তৈরী হলেন। কুরআনে এ ঘটনা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

(আরবী*********************)

-তারপর যখন ছেলেটি তার সাথে দৌড়ে চলাফেরার বয়সে পৌছলো তখন একদিন ইব্রাহীম বল্লো, পুত্র। আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, যেন জবেহ করছি। এখন বল, তুমি কি বলছ? সে বল্লো, আব্বা! আপনাকে যে আদেশ করা হচ্ছে তা করে ফেলুন। আপনি ইনশাআল্লাহ আমাকে ধের্যশীল দেখতে পাবেন। অবশেষে তাঁরা উভয়ে যখন খোদার আনুগত্যে মস্তক অবনত করলো এবং ইব্রাহীম  (আ) তার পুত্রকে মাথার উপুর করে ফেল্লো এবং আমরা তাকে ডাক দিয়ে বল্লাম, হে ইব্রাহীম। তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমরা নেক্কার লোকদেরকে এমনি প্রতিদান দিযে থাকি। নিশ্চিত রূপে এ এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা এবং আমরা একটি বড়ো কুরবানী ফিদিয়া স্বরূপ দিয়ে দিলাম এবং এ সন্তানকে রক্ষা করলাম (সাফ্‌ফাত : ১০২-১০৭)। এ ঘটনা মক্কায় সংগটিত হয় [কুরআনে এ স্থানের নাম ‘বাক্কা’ও বলা হয়েছে (আলে ইমরান : ৯৬)। কিন্তু ইবনে হিশামের (প্রথম খন্ড পৃঃ ১১৯) বর্ণনামতে জানা যায় যে এটা তার প্রাচীন নাম নয় বরঞ্চ পরবর্তীতে যখন তার হারামের মর্যাদা লাভ হয় তখন তাকে এ নামেও অবিহিত করা হয়। ইবনে হিশাম বলেন, মক্কাকে বাক্কা এ জন্যে বলা হয় যে, (****************) সে স্বৈচারাবীরেদ ঘাড় ভেঙ্গে দেয়। তিনি অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করে বলেন, জাহেলিয়াতের যুগে মক্কা কোন জুলুম ও বাড়াবাড়ি বেশীদিন টিকে থাকতে দিত না। যারাই বাড়াবাড়ি করেছে তাদেরকে এ শহর থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছে –(গ্রন্থকার)] এবং হযরত ইব্রাহীম (আ) যে স্থানে পুত্রকে কুরবানী করার জন্যে নিয়ে গিয়েছিলেন তা ছিল মিনা সেখানে আজ পর্যন্ত ঐ তারিখেই (১০ই জিলহজ্ব) করা হচ্ছে[মিনায় নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন এ জন্যে ছিল যে সে সময়ে মক্কায় জনবসতি গড়ে উঠেছিল এবং হযরত ইসমাইলের (আ) মাতাও সেখানে অবস্থান করতেন। একারণেই হযরত ইব্রাহীম (আ) মক্কার বাইরে মিনার জনবিরল পাহাড়ী অঞ্চলে পুত্রকে নিয়ে যান।] উপরন্তু তকন ঘটে যখন হযরত ইসমাইলের (আ) বয়স বারো তেরো বছরের বেশী ছিল না। তখন হযরত ইসহাকে জন্ম হয়নি। কারণ এ সূরায়ে সাফ্‌ফাতে এ ঘটনা বিবৃত করার পর আল্লাহ তায়ালা বলেন-

(আরবী*********************)

-এবং আমরা ইব্রাহীমকে নেক নবীগণেল মধ্যে একজনের সুসংবাদ দিই (আয়াত ১১২)

উপরোক্ত আয়াতগুলোর কিচু ব্যাখ্যা প্র্রয়োজন যা নিম্নে দেয়া হলো:-

(১) হযরত ইব্রাহীম (আ) স্বপ্নে এটা দেখেননি যে, তিনি পুত্রকে জবেহ করে ফেলেছেন। বরঞ্চ দেখেন যে জবেহ করছেন। কিন্তু সে সময়ে তিনি স্বপ্নের এ অর্থই বুঝেছিলেন যে, আল্লাহ তাঁর সঠিক ঈমান পরীক্ষা করার জন্যে পুত্রের কুরবানীর নির্দেশ দিচ্ছেন। এজন্যে তিনি ঠান্ডা মাথায় কলিজার টুকরো পুত্রকে করবানী করার জন্যে তৈরী হলেন।

(২) পুত্রকে জিজ্ঞেস করার উদ্দেশ্য এ ছিলনা যে পুত্র সম্মত হলে তিনি আল্লাহর হুকুম পালন করবেন, সম্মত না হলে করবেন না। বরঞ্চ হযরত ইব্রাহীম (আ) দেখতে চেয়েচিলেন যে, তিনি আল্লাহর নিকটে যে নেক সন্তানের জন্যে দোয়া করেছিলেন, সে কি পরিমাণ নেক। যদি সে নিজেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে জীবন দিতে তৈরী হয় তাহলে তার অর্থ এই যে, দোয়া পুরোপুরি কবুল হয়েছে এবং পুত্র দৈহিক দিয়েই তাঁর সন্তান নয় বরঞ্চ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও তাঁর প্রকৃত প্রশংসনীয় সন্তান।

(৩) হযরত ইসমাইলের (আ)- “যে জিনিসের আদেশ আপনাকে করা হযেছে তা করে ফেলুন” –একথা বলার অর্থ তিনি তাঁর পয়গম্বর পিতার স্বপ্নকে আল্লাহর হুকুম এবং অহীর স্থলাভিষিক্ত মনে করতেন। তাঁর এ ধারণা সঠিক না হলে হযরত ইব্রাহীম (আ) বলতেন, এ নিছক স্বপ্ন-আদেশ নয় এবং আল্লাহ তায়ালাও এ সব আয়াতে তাঁর ধারণা খন্ডন করতেন। একথা ওসব যুক্তির অন্যতম যার ভিত্তিতে ইসলামে নবীর স্বপ্নকে অহীর প্রকার গুলোর মধ্যে একটি গণ্য করা যায়।

(৪) হযরত ইব্রাহীম (আ) পুত্রকে কুরবানী করার জন্যে চিৎ করে ফেলেননি, বরঞ্চ মুখ উপর করে ফেলেন যাতে সন্তানের মুখ দেখে পুত্রস্নেহে হস্ত কম্পিত না হয়। এজন্য তিনি চেয়েছিলেন নীচে হাত দিয়ে গলায় ছুরি চালাবেন।

(৫) হযরত ইব্রাহীম (আ) কর্তৃক পুত্রকে জবেহ করার পূর্বেই আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ইব্রাহীম। তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ।” আল্লাহর এ ঘোষণা এজন্যে অত্যন্ত ন্যায় সংগত ছিল যে, স্বপ্নে এ দেখানো হয়নি যে তিনি পুত্রকে জবেহ করে ফেলেছেন। বরঞ্চ এটা দেখানো হয়েছিল যে, তিনি এমন করেছেন। এ জন্যে স্বপ্নে যা দেখানো হয়েছিল তা যখন তিনি পূর্ণ করলেন তখন এরশাদ হলো, “তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ এবং সে বিরাট পরীক্ষায় তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ, যে পরীক্ষায় আমরা তোমাকে ফেলেছিলাম। আমরা তোমাদের নেকবান্দাহদের এ ধরনেরই প্রতিদান দিয়ে থাকি, যেমন তোমাকে দিলাম। তোমার হাতে পুত্রকে কতল না করিয়েও তোমার দ্বাপরা এ বহিঃপ্রকাশ ঘটালাম যে, তুমি আমাদের মহব্বতে নিজের সন্তনকেও কুরবাণী করতে পার।

(৬) ‘বড়ো কুরবানীর’ অর্থ দুম্বাও হতে পারে যা হযরত ইসমাইলের বিনিময়ে জবেহ করার জন্যে আল্লাহর ফেরেশতাগণ হযরত ইব্রাহীমকে এনে দিয়েছিলেন। এর অর্থ সে কুরবানীও হতে পারে যা সে সময় থেকে নবী মুহাম্মদ (স) যুগ পর্যন্ত হয়ে এসেছে এবং নবীর যুগ থেকে আজ পর্যন্ত হজ্ব ও ঈদুল আযহার সময়ে দুনিয়ার সকল মুসলমান করছে।

কুরবানী হযরত ইসহাককে করা হযেছিল, না ইসমাইলকে?

উপরে বর্ণিত হয়েছে যে, বনী ইসরাইলের অভ্যাস ছিল প্রত্যেক গেরবজনক বিষয়কে নিজেদের বলে উল্লেখ করা এবং অন্যের জন্যে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করা অথবা অনেক গৌরর নিজের বলে দাবী করা। এ অভ্যাস অনুযায়ী পুত্র ‍কুরবানীর এ ঘটনাকে তারা হযরত ইসমাইলের (আ) পরিবর্তে হযরত ইসহাকের (আ) প্রতি আরোপ করে। বাইবেল বলে:

“খোদা আবরাহামকে পরীক্ষা করেন এবং তাকে বলেন তুমি তোমার প্রিয় ও একমাত্র পুত্র ইসহাককে সাথে নিয়ে মুরিয়া দেশে যাও এবং সেখানে পাহাড় গুলোর মধ্যে একটি পাহারে-যা তোমাকে বলে দিব জ্বালিয়ে কুরবানী কারার জন্যে পেশ কর” (সৃষ্টিতত্ব-অধ্যায়-২২-শ্লোক: ১-২)।

এ বর্ণায় একদিকে বলা হচ্ছে যে, আল্লাহ তায়ালা ইসহাকের (আ) কুরবানী চেয়েছিলেন এবং অপরদিকে বলা হচ্ছে তিনি একমাত্র পুত্র ছিলেন। অথচ স্বয়ং বাইবেলের অন্যান্য বর্ণনা থেকে নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত যে, হযরত ইসহাক একমাত্র পুত্র চিলেন না। এর জন্যে বাইবেলের নিম্নোক্ত ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য:-

“এবং আবরাহামের বিবি সারার কোন সন্তা্ন ছিল না। তার একজন মিশরীয় ক্রীত দাসী ছিল যার নাম ছিল হাজেরা। এবং সারা আবরামকে বল্লো, দেখ খোতা ত আমাকে সন্তান থেকে বঞ্চিত রেখেছেন। অতএব তুমি আমর ক্রীতদাসীর কাছে যাও। সম্ভবতঃ তার দ্বারা আমার ঘরে সন্তান লাভ হবে। এবং আবরাম সারার কথায় সম্মত হলো, এবং কানআন দেশে দশ বছর বাস করেন, যেসেময়ে সারা তার মিশরীয় ক্রীতদাসী তাকে (আবরাম) দান করে তার বিবি হাওয়ার জন্যে। এবং সে হাজেরার নিকটে গমন করে এবং সে গর্ভবতী হয়ঃ (সৃষ্টিতত্ব-অধ্যায় ৬৫-শ্লোক: ১-৩)।

“খোদার ফেরেশতা তাকে বল্লো, তুমি গর্ভবতী এবং তোমার ‍পুত্র জন্মগ্রহণ করবে। তার নাম ইসমাইল রেখো” (সৃষ্টিতত্ত্ব -১৬: ১১)।

“যখন হাজেরার গর্ভে ইসমাইল জন্মগ্রহণ কলো তখন আবরামের বয়স ৮৬ ছিল” (সৃষ্টিতত্ত্ব- ১৬: ১৬) এবং খোদাওন্দ আবরামকে বলেন- তোমার বিবি সারা থেকেও তোমাকে এক পুত্র দান করব তার নাম ইসহাক রাখবে, যে সামনের বছর এ নির্দিষ্ট সময়ে সারার গর্ভে জন্মগ্রহণ করবে- তখন আবরাম তার পুত্র ইসমাইল এবং ঘরের সকল পুরুষকে নিল এবং ঐদিনই খোদার হুকুমে তাদের খাৎনা করলো- খাৎনার সময় আবরামের বয়স ছিল ৯৯ বছর এবং ইসমাইলের খাৎনা হয় তের বছর বয়সে” (সৃষ্টিতত্ব:- অধ্যায় ১৭: ১৫-২৫)।

-এবং যকন তার পুত্র তার থেকে পয়দা হলো তখন আবরামের বয়স ছিল একশত বচর (সৃষ্টিতত্ব:- ২১: ৫)।

এর থেকে বাবেলে স্ববিরোধী বর্ণনা সুস্পষ্ট হযে যায়। একথা সুস্পষ্ট যে, চৌদ্দ বছর পর্যন্ত হযরত ইসমাইল (আ) হযরত ইব্রাহীরেম (আ) একমাত্র পুত্র ছিলেন। কুরবানী যদি একমাত্র পুত্রের চাওয়া হয়ে থাকে, তা হলে তা হযরত ইসহাকের (আ) নয়, হযরত ইসমাইলের (আ) চাওয়া হয়েছিল্। কারণ তিনিই একমাত্র পুত্র ছিলেন। আর যদি ইসহাকের কুরবানী চাওয়া হয়ে থাকে তাহলে একথা ভুল যে একমাত্র পুত্রের কুরবানী চাওয়া হয়েছিল।

তারপর যদি আমরা ইসলামী রেওয়ায়েতগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে বিরাট মতপার্থক্য দেখতে পাই। তফসীলকারগণ সাহাবী ও তাবেঈনের যে সব বর্ণনা উধৃত করেছেন তাঁদের মধ্যে একদলের বর্ণনা এই যে, সে পুত্র হযরত ইসহাক ছিলেন। এ দলের মধ্যে নিম্নের বুযুর্গানের নাম পাওয়া যায়-

হযরত ওমর (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা), হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত আবু হুরায়রা (রা), কাতাদাহ, একরামা, হাসানবাসরী, মুজাহিদ, শ’বী, মাসরূক, মাকহুল, যুহরী, আতা মাকাতিল, সাদ্দী, কা’বাই আহবার, যায়েদ বিন আসলামহ প্রমুখ মনীষীবৃন্দ।

দ্বিতীয় দল বলে যে, তিনি ছিলেন হযরত ইসমালি (আ)। এ দলের মধ্যে নিম্নের বুযর্গান রয়েছেন:

হযরত আবু বকর (রা), হযরত আলী (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত আবূ হুরায়রাহ (রা) হযরত মায়াবিয়া (রা), একরেমা, মুজাহিদ, ইউসুফ বিন মিহরান, হাসান বাসরী, মুহাম্মদ বিন কায়াব, আল কুরাযী, শা’বী, সাঈদ বিন মুসাইয়াব, তাহ্‌হাক, মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন (ইমাম মুহাম্মদ বাকের), রাবী বিন আনাস, আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ মনীষীগণ।

এ দুটি তালিকা খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে, কিছু নাম উভয় দলের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তির দুটি পরস্পর বিরোধী উধৃত করা হযেছে। মেযন, হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে একরেমা এ উক্তি উধৃত করেছেন যে, পুত্র হযরত ্সহাক ছিলেন। কিন্তু তাঁর থেকেই আবার আতা বিন আবি রাবাহ এ উক্তি উধৃত করেচেন যে, “ইহুদীর দাবী যে, তিনি ছিলেন হযরত ইসহাক।” কিন্তু ইহুদী মিথ্যা কথা বলে।” এরূপ হযরত হাসান বাসরী থেকে একটি বর্ণনা এমন পাওয়া যায় যে, তিনি হযরত ইসহাকের (আ) জবেহ হওয়া সমর্থন করেন। কিন্তু আমর বিন ওবায়েদ বলে যে হাসান বাসরীর এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) এর যে, পুত্রকে জবেহ করার হুকুম হয়েছিল তিনি হযরত ইসমাইল (আ)। এ মতানৈক্রের ফল এ হয়েছে যে, আলেমদের মধ্যে কেউ কেউ অতি বিশ্বস্ততার সাথে হযরত ইসহাকের সপক্ষে রায় দেন। যেমন ইবনে জারীর ও কাজী ইয়ায। কেউ কেউ আবার নিশ্চিত করে বলেন যে, জবেহ হযরত ইসমাইলকে করা হয়। যেমন ইবনে কাসীর, কেউ কেউ আবার দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন, যেমন জালালুদ্দীন সুইউতী। কিন্তু যদি গবেষণা অনুসন্ধানের দৃষ্টিতে দেখা যায়, তাহলে এ বিষয়ে কোন সন্দেহের লেশ থাকে না যে, হযরত ইসমাইলকেই (আ) জবেহ করা হয়েছিল, তার যুক্তি নিম্নরূপ:-

(১) সূরায়ে সাফ্‌ফাতে আল্লাহ তায়ালার এ এরশাদ দেখতে পাওয়া গেল যে, জন্মভূমি কে হিজরত করার সময় হযরত ইব্রাহীম (আ) একজন নেক পুত্রের দোয়া করেছিলেন। তার জবাবে আল্লাহতায়ালা তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দেন। কথার ধরন থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ দোয়া তিনি তখন করেন যখন তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। তারপর সুসংবাদ যে পুত্রের দেয়া হয় তা তাঁর প্রথমপুত্রের। তারপর এ সুরার কথার ধারাবাহিকতা একথা প্রকাশ করে যে, সেই পুত্রই যখন পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি ছুটাছুটি করার যোগ্য হলেন তখন তাঁকে জবেহ করার ইংগিত করা হলো। এখন একথা নিশ্চিতরূপে প্রাণিত যে হযারত ইব্রাহীমের (আ) প্রথম সন্তান হযরত ইসমাইল (আ) ছিলেন, হযরত ইসহাক নন।

স্বয়ং কুরআন পাকে পুত্রদ্বয়ের ক্রমি এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:-

(আরবী***************)

-শোকর সেই আল্লাহর যিনি আমার বার্ধক্যে আমাকে ইসমাইল ও ইসহাক দান করেন-(ইব্রাহীম: ৩৯)।

(২) কুরআন পাকে যে হযরত ইসহাকের (আ) সংবাদ দেয়া হযেছে, সেখানে গোলামিন আলীম (জ্ঞানবান পুত্র) শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হয়েছে (যারিয়াত : ২৮) এবং সূরায়ে বলা হয়েছে: (আরবী*************)

ভয় করোনা, তোমাকে একজন গোলাম আলীমের সুসংবাদ দিচ্ছি- (হিজ্বর: ৫৩)। কিন্তু সূরায়ে সাফ্‌ফাতে যে পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, সেখানে গোলামিন হালীম- (ধৈর্যশীল পুত্রের) শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হয়েছে। এর থেকে একথা সুস্পষ্ট হয় যে, উভয় পুত্রের সুস্পষ্ট গুণাবলী পৃথক পৃথক ছিল এবং জবেহের হুকুম গোলামিন আলীমের জন্যে নয়, গোলামিন হালীমের জন্যে ছিল্ কারণ পুত্র কুরবানীর ঘটনা সেই পুত্রের জন্ম হওয়ার এবং যৌবনের কাছাকাছি পৌছার পর ঘটেছে এবং দ্বিতীয় পুত্রের জন্মের সুসংবাদ তার পর দেয়া হয়েছে।

(৩) কুরআন পাকে হযরত ইসহাকের (আ) জন্মের সুসংবাদ দিতে গিয়ে সাথে সাথে এ সুসংবাদ দেয়া হয় যে, তাদের বংশে ইয়াকুব (আ) এর মতো পুত্রও জন্মগ্রহণ করবেন: (আরবী***************)।

-আমরা তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের এবং ইসহাকের পরে ইয়াকুবের –(হুদ: ৭১)।

একথা সুস্পষ্ট যে, পুত্রের জন্মের সংবাদ দেয়ার সাথে সাথে এ সংবাদ দেয়া হলো যে তার একজন যোগ্য পুত্র পয়দা হবে, সে সম্পর্কে যদি হযরত ইব্রাহীমকে (আ) এ স্বপ্ন দেখানো হতো তিনি তাকে জবেহ করছেন, তাহলে হযরত ইব্রাহীম (আ) তার থেকে একথা কখনো বুঝতে পারতেন না যে, এ পুত্রকে কুরবানী করার ইংগিত করা হচ্ছে। কারণ তাকে কুরবানী করে দেয়ার পর তাঁর ঔরসে পুত্র অর্থাৎ হযরত ইয়াকুব (আ) জন্মগ্রহণ করার প্রশ্নই উঠতোনা।

আল্লামা ইবনে জারীর এ যুক্তির জবাব এভাবে দেন যে, সম্ভবতঃ এ স্বপ্ন হযরত ইব্রাহীমকে সে সময় দেখানো হয়েছিল যখন হযরর ইসহাকের ঘরে হযরত ইয়াকুব (আ) জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু এ এত অত্যন্ত দুর্বল জবাব। কুরআন পাকের শব্দগুলো হচ্ছে: “যখন সে ছেলে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি করার যোগ্য হলো”- তখন এ স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। নিরপেক্ষ মন নিয়ে কেউ এ শব্দগুলো পাঠ করলে তার মনে আট, দশ অথবা বড়ো জোড় বারো তেরো বছরের বালকের চিত্রই ভেসে উঠবে। কেউ এ ধারণাও করতে পারে না যে, যুবক এবং সন্তানের পিতা হয়েছে এমন পুত্রের জন্যে এ শব্দ গুলো ব্যবহার করা হয়েছিল।

(৪) আল্লাহ তায়ালা গোটা কাহিনী বর্ণনা করার পর অবশেষ বলেন: “আমরা তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিই- একজন নেক নবীর”। এর থেকে স্পষ্টই জানতে পারা যায় যে, এ সেই পুত্র নয় যাকে জবেহ করার ইংগিত করা হয়েছিল। বরঞ্চ প্রথমে অন্য কোন ‍পুত্রের সুসংবাদ দেয়া হয়েছিল। তারপর যখন সে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি চলাফেরার যোগ্য হলো, তখন তাকে জবেহ করার হুকুম দেয়া হলো। অতঃপর যখন হযরত ইব্রাহীম (আ) এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তখন তাঁকে আর এরক পুত্র ইসহাক জন্মগ্রহণ করার সুসংবাদ দেয়া হলো। এ ক্রমিক ঘটনাবলী নিশ্চিতরূপে এ সিদ্ধান্ত করে দেয় যে, যে পুত্রকে জবেহ করার হুকুম করা হয়েছিল, হযরত ইসহাক (আ) ছিলেন না, বরঞ্চ সে পুত্র তাঁর কয়েক বছর পূর্বেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আল্লাম ইবনে জারীর এ সুস্পষ্ট যুক্তি  একথা বলে খন্ডন করেন যে, প্রথমে হযরত ইসহাকের (আ) জন্মের সুসংবাদ দেয়া হয়। তারপর যখন তিনি খোদার সন্তুষ্টির জন্যে জীবন দিতে তৈরী হয়ে গেলেন, তখন তাঁর পুরস্কার এ আকারে দেয়া হলো যে, তাঁর নবী হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হলো। কিন্তু তাঁর এ জবাব প্রথম জবাব থেকে অধিকতর দুর্বল। যদি প্রকৃত পক্ষে ব্যাপার তাই হতো তাহলে আল্লাহ তাযালা এ ঘটনা প্রসংগে এমন কথা বলতেন না –“আমরা তাকে ইসহাকের সুসংবাদ দিলাম”। -বরঞ্চ একথা বলতেন- “আমরা তাকে এ সুসংবাদ দিলাম- তোমার এ পুত্রই নবী হবে নেককারদের মধ্য থেকে।”

(৫) নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসূত্রে একথা প্রমাণিত যে, হযরত ইসমাইলের (আ) ফিদিয়া স্বরূপ যে দুম্বা জবেহ করা হয়েছিল, তার শিং হযরত আবদুল্লাহ বিন যাবাইরের (রা) সময় পর্যন্ত খানায়ে কাবায় সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তীকালে যখন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ হেরেমে ইবনে যুবাইরকে (রা) অবরুদ্ধ করেন এবং খানায়ে কাবা ধ্বংস করেন, তখন সে শিং বিনষ্ট হয়। ইবনে আব্বাস (রা) এবং আমের শা’বী (রহ) সাক্ষ্য দেন যে তাঁরা স্বয়ং খানায়ে কাবার এ শিং দেখেছেন (ইবনে কাীর)। একথারই প্রমাণ যে, কুরবানীর এ ঘটনা শাসদেশে সংঘটিতে হয়নি, বরঞ্চ মক্কায় হয়েছে, তা হয়েছে ইসমাইলের (আ) সাতে। এজন্যেই ত হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং ইসমাইল (আ) কর্তৃক নির্মিত খানায়ে কাবায় তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

(৬) বহু শতক যাবত একথা আরব দেশের ঐতিহ্যে সংরক্ষিত ছিল যে কুরবানীর এ ঘটনা মিনায় সংঘটিত হয়। এ শুধু ঐতিহ্যই নয়। বরঞ্চ সে সময় থেকে নবী করীমের (স) যামানা পর্যন্ত হজ্বের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে একাজটিও বরাবর সংশ্লিষ্ট হয়ে এসেছে যে, ঐ মিনার স্থানে গিয়েই লোক কুরবানী করতো যে স্থানে হযরত ইব্রাহীম (আ) কুরবানী করেছিলেন। তারপর যখন নবী মুহাম্মদ (স) শেষ নবী হিসাবে প্রেরিত হলেন, তখন তিনিও সেই প্রথাই চালু রাখলেন। এমন কি আজ পর্যন্ত হজ্বের সময় ১০ই যুলহজ্বে মিনায় কুরবানী করা হয়ে থাকে। সাড়ে চার হাজার বছরের এ ক্রমাগত কাজ একথারই অনস্বীকার্য প্রমাণ যে, হযরত ইব্রাহীমের (আ) এ কুরবানীর উত্তরাধিকারী বনী ইসমাইল হয়েছেন, বনী ইসহাক নয়। হযরত ইসহাকের (আ) বংশে এমন কোন প্রথা প্রচলিত ছিল না যার জনে গোটা জাতি একই নামে সমযে কুরবানী করতো এবং তাকে হযরত ইব্রাহীমের (আ) কুরবানীর স্মৃতি বলে বিবেচিত হতো।

এসব এমন যুক্তি প্রমাণ যা দেখার পর অবাক লাগে যে স্বয়ং উম্মতে মুসলেমার মধ্যে হযরত ইসহাকের (আ) জবেহ হওয়ার ধারণা কিভাবে বিস্তার লাভ করলো। ইহুদীগণ যদি হযরত ইসমাইলকে (আ) মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে তাদের পূর্বপূরুষ হযরত ইসহাকের (আ) প্রতি এ মর্যাদা আরোপিত করার চেষ্টায় থাকে, তাহলে বোধগম্য হয়। কিন্তু মুসলমানদের বিরাট সংখ্যক লোকের একটি দল তাদের এ শঠতা কি করে মেনে নিল। এ প্রশ্নের বড়ো সন্তোষ জনক জবাব দিযেছেন আল্লামা ইবনে কাসীর তাঁর তাফসীর গ্রন্থে। তিনি বরেন: “প্রকৃত পক্ষে হযরত ইসহাকের (আ) জবেহ হওয়ার সপক্ষে যতো কথা বলা হযেছে, তা সব কা’বে আহবার থেকে বর্ণিত। এ ভদ্রলোক যখন ওমরের (রা) যামানায় মুসলমান হন, তখন তিনি ইহুদী ও নাসারাদের প্রাচীন গ্রন্থাবলীতে উল্লেখিত বিষয়গুলো তাঁকে শুনাতেন এবং হযরত ওমর (রা) সেসব শুনতেন। তা জন্যে অন্যান্যগণও তাঁর কথা শুনতে থঅকে এবং আগড়ম বাগড়ম যা কিছুই তিনি বলতেন তা আবার তাঁরা বর্ণনা করতেন। অথচ এ সব বিষয়ের কোন কিছু জানার প্রয়োজন এ উম্মতের ছিলনা।”

এ প্রশ্নের উপর অতিরিক্ত আলোকপাত করে মুহাম্মদ বিন কাব কুরাযীর বর্ণনা। তিনি বলেন, একবার আমার উপস্থিতিতে হযরত ওমর বিন আবদুল আযীযের (র) নিকটে এ প্রসংগ তোলা হয় যে, জবেহ হযরত ইসহাককে (আ) করা হয়েছিল, না হযরত ইসমাইল (আ)কে। সে দরবারে এমন এক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন যিনি প্রথমে ইহুদী আলেমদের মধ্য গণ্য হতেন। পরে তিনি আন্তরিকতাসহ ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, আমীরুল মুমেনীন খোদার কসম (যাঁকে কুরবানী করা হয়েছিল) তিনি ইসমাইল ছিলেন। একথা ইহুদীরাও জানতো। কিন্তু তাঁরা আরবদের সাথে হিংসার বশবর্তী হযে এ দাবী করে যে হযরত ইসহাককে (আ) জবেহ করা হয়েছিল (ইবনে জারীর)।

এদুটি কথা একত্রে মিলিত করে দেখলে জানা যায় যে, প্রকৃত পক্ষে এ ছিল ইহুদী প্রচার প্রোপাগান্ডা যা মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর মুসলমানগণ বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে কোন গোঁড়ামি পোষণ করতোনা। এ কারণে তাদের মধ্যে অনেক ইহুদীদের ঐসব বর্ণনা, যা প্রাচীন গ্রন্থাবলীর সূত্রে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের আবরণে তারা পেশ করতো, বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতা মনে করে মেনে নেয় এবং একথা অনুভব করেনি যে, এতে জ্ঞানের পরিবর্তে ছিল পক্ষপাতিত্ব ও বিদ্বেষ।

কাবার নির্মাণ

প্রথমে এ কথা বলা হয়েছে যে, যমযমের বরকতে জুরহুম গোত্রের বিভিন্ন পরিবার হযরত ইসমাইল (আ) ও হযরত হাজেরার (রা) নিকটে এসে বসতি স্থাপন করে এবং মক্কা একটি শহরে রূপ ধারণ করছিল। এটাও উল্লেখ করা হযেছে যে, হযরত হাজেরার মিশুকতার কারণে নতুন নতুন বসতি স্থাপনাকারীদের সাথে মাতাপুত্রের সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। হযরত ইসমাইল

(কাবা শরীফের মানচিত্র)

(আ) তাদের মধ্যেই পালিত ও বাধিত হন। তিনি যখন যৌবনে পদার্পণ করেন, তখন তাঁর অনুপম চরিত্র ও গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে জুরহুমীয়গণ এ অভিলাষ পোষণ করে যে, তাদের সাথে হযরত ইসমাইলকে (আ) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করবে। বুখারীতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বর্ণনা মতে প্রথম একটি বালিকার সাথে হযরত ইসমাইলের (আ) বিযে হয়। কিন্তু সে পুত্রবধু হযরত ইব্রাহীরেম (আ) পছন্দ হয় না। এজন্যে হযরত ইসমাইল (আ) তাকে পরিত্যাগ করে এমন এক বালিকাকে বিযে করেন যাকে হযরত ইব্রাহীম (আ) পছন্দ করেন। তার পক্ষে তাঁর বারো ‍পুত্র জন্মগ্রহণ করে। বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী হযরত ইসমাইলের (আ) প্রথম বিযের পরই হযরত হাজেরা (রা) জান্নাতবাসিনী হন।

তারপ হযরত ইব্রাহীম (আ) তাঁর আসল কাজ করার জন্যে মক্কা তাশরিফ আনেন, যে উদ্দেশ্যে তিরিশ বছর পূর্বে তাঁর পরিবারের এ অংশকে পানি ও তরুণবিহীন উপত্যকা প্রান্তরে এনে পুনর্বাসিত করেছিলেন। বুখারীতে ইবনে আব্বাস (রা) এর যে বর্ণনার উল্লেখ আমরা উপরে করেছি তাতে তিনি সামনে অগ্রসরত হয়ে বলছেন, একদা যমযমের পাশে গাছের নীচে হযরত ইসমাইল (আ) বসে তীর নির্মাণ করছিলেন। এমন সময়ে হঠাৎ ইব্রাহী (আ) সেখানে পৌছেন। হযরত ইসমাইল (আ) তাঁকে দেখামাত্র দাঁড়িযে গেলেন এবং পিতাপুত্র ইভয়ে এভাবে মিলিত হলেন যেভাবে তার পিতার সাথে এবং পিতা তার পুত্রের সাথে মিলিত হয়। তারপর হযরত ইব্রাহীম (আ) বলেন, ইসমাইল! আল্লাহতায়ালা আমাকে একটি কাজের আদেশ করেছেন। তদুত্তরে হযরত ইসমাইল (আ) বলেন, আপনার রব যে কাজের আদেশ করেছেন তা অবশ্যই করুন। ইব্রাহীম (আ) বল্লেন, তুমি এ কাহে আমাকে সাহায্য করবে? তিনি বলেন, জি হাঁ নিশ্চয় আমি আপনার সাহায্য করব? তারপর হযরত ইব্রাহীম (আ) উপত্যকার সে অংশটির দিকে ইংগিত করলেন যা চারপাশের যমীন থেকে কিছুটা উঁচু ছিল এবং বল্লেন, আল্লাহ আমাকে এখানে একটি ঘর বানাবার নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব দুই পিতাপুত্র মিলে বায়তুল্লাহর ভিত্তি নির্মাণ করেন। হযরত ইসমাইল (আ) পাথর এনে দিতেন এবং ইব্রাহীম (আ) দেয়াল গেঁথে চলেন। দেয়াল যথেষ্ট উঁচু হওয়ার পর হযরত ইব্রাহীম (আ) সে পাথর তুলে আনেন যা মুকামে ইব্রাহীম নামে প্রসিদ্ধ। হযরত ইব্রাহীম (আ) তার উপর উঠে পাথর গাঁথতে থাকেন এবং দেয়াল আরও উঁচু করেন।

আরব এবং সারা দুনিয়ার কাবার মর্যাদা

এ ঘরখানি নিছক একটি এবাদতের স্থানই ছিল না। যেমন মসজিদগুলো হয়ে থাকে। বরঞ্চ প্রথম দিন থেকেই দ্বীন ইসলারেম বিশ্বজনীন আন্দোলনের প্রচার ও প্রসারের কেন্দ্র গণ্য করা হযেছে। উদ্দেশ্য ছিল যে, এক খোদাকে যারা মানে তারা প্রতিটি স্থান থেকে বের হয়ে এখানে এসে সমবেত হবে, সকলে মিলে খোদার এবাদত করবে এবং ইসলামের বাণী সাথে ‍পুনরায় কেনদ্রটি কিভাবে তৈরী হয়েছিল? কোন্‌ ভাবাবেগ ও দোয়ার সাথে উভয় পিতাপুযত্র এ গৃহের দেয়াল নির্মাণ করেছিলেন এবং কিভাবে হজ্বের সূচনা করেন এর বিস্তারিত বিবরণ কুরআন মজীদে এভাবে বয়ান করা হয়েছে।

(আরবী***************)

-বস্তুতঃ প্রথম যে ঘর মানুষের জন্যে নির্ধারিত করা হয়েছিল তা হচ্ছে সেই ঘর যা মক্কায় নির্মাণ করা হয়। এ হচ্ছে বরকতপূর্ণ ঘর এবং সমস্ত দুনিয়াবাসীদের জন্যে হেদায়েতের কেন্দ্র। এতে রয়েছে আল্লাহর সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী এবং মাকামে ইব্রাহীম। যে কেউ এখানে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা পেয়ে যাবে (আলে ইমরান: ৯৬)।

(আরবী***************)

-এরা কি দেখেনি আমরা কি রকম নিরাপদ হারাম বানিয়েছি। অথচ তার চারপাশে মানুষকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাওয়া হয়। (আনকাবুত : ৬৭)

 অর্থাৎ আসবে দুহাজার বছর ধরে চারদিকে লুঠতরাজ, হত্যা, ধ্বংসলীলা, যুদ্ধ বিগ্রহ প্রচন্ডভাবে চলছিল, এ হারামে সর্বদা নিরাপত্তাই বিরাজ করতো। এমন কি অসভ্য বেদুইন পর্যন্ত তার সীমারেখার ভেতরে তার পিতার হত্যাকারীকে দেখতে পেলেও তার গায়ে হাত দিতে সাহস করতোনা।

(আরবী***************)

-এবং স্মরণ কর যখন আমরা এ ঘরকে লোকদের জন্যে কেন্দ্র, প্রত্যাবর্তনের ও নিরাপত্তার স্থান বানালাম এবং হুকুম দিলাম আমার ঘরের তাওয়াফকারী এবং রুকু সিজদাকারীদের জন্যে পাকসাফ রাখ।  এবং যখন ইব্রাহীম দোয়া করলো, পরওয়াদেগার। এ স্থানকে একটা নিরাপত্তাপূর্ণ শহর বানিয়ে দাও এবং এখানকার অধিবাসীদেরকে ফলমূলের রিযিক দান কর যারাই তারেদ মধ্যে আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান আনয়নকারী হবে- এবং ‍যখন ইব্রাহীম ও ইসমাইল এ ঘরের ভিত গড়ছিল তখন দোয়া করছিল –হে আমাদের পরওয়াদেগার! তুডিম আমাদের চেষ্টা কবুল কর। তুমি সবকিছু শ্রবণ কর ও জান। পরওয়াদেগার। তুমি আমাদের উভয়কে তোমার মুসলিম (অনুগত) বানাও। এবং আমাদের বংশ থেকে এমন এক জাতি উত্থিত কর যারা তোমার অনুগত হবে। এবং আমাদেরকে আমাদের এবাদতের পন্থা পদ্ধতি বলে দাও এবং আমাদের উপর তোমার কৃপা দৃষ্টি রাখ, তুমি বড়ো ক্ষমাকারী ও মেহেরবান। হে পরওয়ারদেগার। তুমি এসব লোকদের মধ্যে এদের কওম থেকে এমন এক রসূল পাঠাও যে তাদেরকে তোমার আয়াত শুনাবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদের চরিত্র পরিশুদ্ধ করবে। নিশ্চয়ই তুমি বিরাট শক্তিশালী ও বিজ্ঞ- (বাকারা:ঢ় ১২৫-১২৯)। (আরবী***************)

এবং যখন ইব্রাহীম দোয়া করলো পরওয়ারদেগার। এ শহরকে নিরাপদ শহর বানিয়ে দাও, আমাকে  এবং আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে বাঁচাও। পরওয়ারদেগার। এসব প্রতিমা বহু লোককে গোমরাহ করেছে। অতএব যে কেউ আমার পথ অনুসরণ করবে সে আমার আর যে আমার পথ থেকে সরে পড়বে, তো তুমি ক্ষমাকারী ও মেহেরবান। পরওয়ারদেগার। আমি আমার বংশের একটি অংশ তোমার এ মহিমান্বিত ঘরের পাশে এ পানি ও তরুলতাহীন এপত্যকায় এনে পুনর্বাসিত করেছি যাতে করে হে পারওয়ারদেগার, তারা নামায কায়েম করে। অতএব তুমি মানুষের মনকে এমন অনুরক্ত করে দাও যেন তারা তাদের প্রতি আকৃষ্ট হযে আসে এবং তুমি তাদেরকে ফলমূলের রিযিক দান কর। আশা করা যায় যে তারা কৃতজ্ঞ হবে- (ইব্রাহীম : ৩৫)

(আরবী***************)

এবং যখন আমরা ইব্রাহীমের জন্যে এ ঘরের স্থান নির্ধারিত করে দিলাম এ হেদায়েত সহ যে, কাউকে আমার সাথে শরীক করবেনা এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্যে পাকসাফ রাখবে এবং (হুকুম দিলাম) লোকের মধ্যে হজ্বের সাধারণ ঘোষণা দিয়ে দাও যাতে করে তোমার নিকটে তারা চলে আসে, তা পায়ে হেঁটে আসুক অথবা দূরদূরান্ত থেকে তুর্বল উটনীর উপর চড়ে, যাতে তারা দেখতে পায় যে তাদের জন্যে কত প্রকারের দ্বীনী ও ‍দুনিয়াবঢ লাভ রয়েছে। তারপর এ নির্দিষ্ট দিনগুলেতে আল্লাহ যে সব পশু তাদেরকে দিয়েছেন তাদের উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে অর্থাৎ কুরবানী করবে। সে সবের গোশত তারাও খাবে এবং নিঃস্ব  ও অভাবী লোকেরাও খাবে –(হজ্ব: ২৬-২৮)।

জাহেলিয়াতের যুগে খানায়ে কাবার বরকত

আরব দেশে কাবার মর্যাদা শুদু একটি এবাদতখানা হিসেবেই ছিলনা। বরঞ্চ তার কেন্দ্রীয় মর্যাদা ও পবিত্রতার কারণে তা গোটা দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবলম্বন হয়ে পড়েছিল। হজ্ব ও ওমারা জন্যে সমগ্র দেশ থেকে দলে দলে কাবার উদ্দেশ্যে লোক আসতো এবং এ জনসমাবেশের মাধ্যমে শতধা বিচ্ছিন্ন আরববাসীদের মধ্যে ঐক্যের এক সম্পর্ক স্থাপিত হতো। বিভিন্ন অঞ্চল ও গোত্রের লোক পারস্পরিক তামাগদ্দুনিক সম্পর্ক স্থাপন করতো। কাব্য প্রতিযোগিতার ফলে তাদের ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি বিধান হতো। ব্যবসার লেনদেনের ফলে সারাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ হতো। হারাম মাসগুলোর [ হারাম মাসগুলো হচ্ছে: ওমরার জন্যে রজব মাস এবং হজ্বের জন্যে যিলকদ, যিলহজ্ব ও মহরম মাস। এসব মাসে যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ থাকতো। ওমরা ও হজ্বের উদ্দেশ্য ভ্রমণকারীদের পথে কেউ বিরক্ত করতো না –গ্রন্থাকার।] বদৌলতে বছরের এক তৃতীয়াংশ সময় আরববাসীদের শান্তি ও নিরাপত্তার সুযোগ মিলতো। এ সময়টাই এমন ছিল যে, তাদের বিভিন্ন কাফেলা দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারতো। কুরবানীর জন্যে গলায় পট্টি বাঁধা পশু তাদের সাথে থাকলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতে সুবিধা হতো। কারণ মানতের চিহ্ন স্বরূপ যেসব পশুর গলায় পট্টি বাঁধা থঅকতো, সেসব দেখার পর আরববাসীদের মস্তক শ্রদ্ধায় অবনমিত হতো। সে সবের উপর হস্তক্ষেপ করতে কোন লুন্ঠনকারী গোত্রেরও সাহস হতোনা।

হযরত ইসমাইলে (আ) রেসালাত ও আরববাসীদের উপর তার প্রভাব

যখন হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) খানায়ে কাবা নির্মাণ করেন এবং ঘরকে কেন্দ্র ও আশ্রয়স্থল ঘোষণা করে প্রতি বছর হজ্বের জন্যে খানায়ে কাবার আসার আহ্বান জানানো হয়, খুব সম্ভব সে সময়েই হযরত ইসমাইল (আ) কে নবুওতের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়, যাতে করে তিনি আরব দেশে দ্বীন ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তাঁর সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে : (আরবী***************)

-এবং এ কিতাবে ইসমাইলকে স্মরণ কর। সে ওয়াদা পালনে সত্যবাদী এবং রসূল ও নবী ছিল। সে তাঁর পরিবারস্থ লোকদের নামায ও যাকতের আদেশ করতো এবং আপন রবের কাছে পছন্দনীয় ছিল- (মরিয়ম : ৫৪-৫৫)

ইতিহাসের যদিও হযরত ইসমাইলের (আ) জীবন চরিত ও তাঁর রেসালাত সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না, কিন্তু তাঁর রেসালাত যে সার্থক ছিল তার প্রামাণ এই যে, সমগ্র আরবে খানায়ে কাবার একটা কেন্দ্রী মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হজ্ব ওমরার জন্যে আরবের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে লোক দলে দলে উৎসাহ উদ্দীপনাসহ আসতো। হজ্বের নিয়মনীতি তাই ছিল যা সূচনায় নির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল। সাফা ও মারওয়ার সায়ী এবং যিলহজ্ব তারিখে মিনায় কুরবানী করার প্রথাও আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যা নিঃসন্দেহে হযরত হাজেরার (রা) সায়ী এবং হযরত ইব্রাহীমের (আ) কুরবানীরই স্মারণিক ছিল। হজ্ব ও ওমরার উদ্দেশ্যে চার মাস নিষিদ্ধকারণও সমগ্র আরবে সর্বস্বীকৃত ছিল। দ্বীনে ইব্রাহীরেম অন্যান্য বহু নিদর্শনও আরববাসীদের মধ্যে  প্রচলিত ছিল। যেমন, খাৎনা, নাপাকির গোসল (বীর্যস্খলন কারণে) পশু জবেহ করা, উট নহর করা, মুর্দা দাফন করা, বিবাহ-তালাক, বিধবার শোক পালনের নীতি, মা, বোন ও কন্যকে বিবাহের জন্যে হারাম মনে করা, খুনের বদলা খুন, প্রবৃতি। উপরন্তু কতিপয় জ্ঞানীব্যক্তি অজুও করতেন। কেউ কেউ নামায পড়তেন। যেমন কুস্‌ বিন্‌ সায়েদাতুল ইয়াদী। হযরত ্বু যরও ইসলাম গ্রহণের তিন বছর পূর্বে নামায পড়া শুরু করেন। যদিও জানা যায়নি যে তা কি ধরনের নামযড ছিল। তাছাড়া আরববাসীদের মধ্যে রোযা রাখারও প্রথা প্রচলিত ছিল। তারা এতেকাফও করতো। হাদীসে আছে, হযরত ওমর (রা) জাহেলিয়াতের জীবনে একরাত এতেকাফ করার মানত করেছিলেন। বহু কাজ এমন ছিল যা আরবাসী পুণ্যকাজ মনে করতো এবং তার প্রশংসাও করতো। যেমন মেহমান ও মুসাফিরকে খানা খাওয়ানো, মিসকীনদের সাহায্য করা, স্বজনদের হক আদায় করা প্রবৃতি। যদি হযরত ইসমাইলের (আ) রোসালাত অসাধারণ সাফল্য লাভ না করতো, তাহলে এটা সম্ভব ছিল না যে, আড়াই হাজার বছর যাবত জাহেলিয়াতের আঁধারে নিমজ্জি থাকা সত্ত্বেও নবী পাকের (সা) আগমন পর্যন্ত তাঁর প্রচারিত দ্বীনের নিদর্শনাবলী সমগ্র আরবব্যাপী অবশিষ্ট থাকতো। সবচেয়ে বড়ো  কথা এটা যে তাঁর এবং তার দ্বারা প্রভাবিত লোকদের তবলিগেরই এ প্রভাব যে আরবাসীদের মধ্যে নবীন আগমেনর সময় পর্যন্ত আল্লাহ সম্পর্কে সেসব ধারণাই পাওয়া যেতো, যার উল্লেখ কুরআন মজিদে স্থান করা হয়েছে। (যথা সূরা যুখরুফ: ৮৭, আনকাবুত : ৬১-৬৩, মুমেনুন: ৬১-৬৩, ইউনুস: ২২-২৩ ও ৩১, বনী ইসরাইল : ৬৭ দ্রষ্টব্য)।

এটাও ছিল রেসালাতে ইসমাইলের প্রভাব যে, নবী মুহাম্মদের (স) আগমন পর্যন্ত আরবে এমন সব লোকের একটি দল ছিল ইতিহাসে যাদেকে হানীফ নামে স্মরণ করা হয়। আরবের বিভিন্ন গোত্র বিভিন্ন স্থানে তাঁদেরকে পাওয়া যেতো। তাঁরা শির্ক অস্বীকার করতেন এবং তৌহীদের স্বীকৃতি দিতেন, তাঁরা দ্বীনে ইব্রাহরৈম অনুসরণ করতে আগ্রহী ছিলেন। আমরা তাফহীমুল কুরআনের চতুর্থ খন্ডে তাঁদের একটি তালিকা সন্নিবেশি করেছি। নিম্নে তাঁদের মধ্য থেকে কতিপয় ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করছি:

আন্নাবেগাতুল জা’দী- তিনি ছিলেন বনী আমের বিন সা’সায়া বংশের লোক। জাহেলিয়াতের যুগে তিনি দ্বীনে ইব্রাহীমি এবং হানিফিয়াত অর্থাৎ সকল দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহর আনুগত্যের কথা বলতেন। রোযা রাখতেন এবং ইস্তেগফার করতেন। তাঁর জাহেলিয়াতের যুগের কথাবার্তায় তৌহীদ, মৃত্যুর পরের জীবন, শাস্তি ও পুরস্কার,  জান্নাত, দোযখ প্রভৃতির উল্লেখ থাকতো। পরবর্তীকালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন (আল্‌ ইস্তিয়াব, প্রথম খণ্ড-পৃ. ৩১)।

সিরমা বিন আনাস- ইনি ছিলেন বনী আদী বিন নাজ্জার বংশোদ্ভুত। জাহেলিয়াতের যুগে দরবেশসুলব জীবন যাপন করেন। মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেন। জেনাবাতের গোসল করতেন, ‍ঋতুবর্তী নারী থেকে দূরে থাকতেন। মদ ও অন্যান্য মাদক দব্যাদি ঘৃণা করতেন। প্রথমতঃ ঈসায়ী হতে চেয়ে থেমে যান। মসজিদের মতো একটি ঘর তৈরী করেন। গোসল ফরয হয়েছে এমন কোন ব্যক্তিকে এবং ঋতুবর্তী নারীকে যেতে দিতেন না। তিনি বলতেন-

“আমি ইব্রাহীমের রবের এবাদত করি এবং দ্বীনে ইব্রাহীমির অনুসারী।”

তার কবিতার দুটি ছত্র নিম্নে উধৃত হলো:- (আরবী***************)

-প্রশংসা আমার রব আল্লাহর জন্য যাঁর কোন শরীক নেই।  যে এ কথা মানেনা, সে তার নিজের উপর জুলুম কর।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় তশরিফ আনেন, তখন ঐ ব্যক্তি অতি বার্ধক্য অবস্থায় অবনীত হয়েছিলেন। তিনি নবীর দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন (আল ইস্তিয়াব-১ম খণ্ড-পৃঃ ৩২৩, আল ইসাবা-২য় খণ্ড-পৃঃ ১৭৯, ইবনে হিশাম- ২য় খণ্ড-পৃঃ ১৫৬)।

আমর বিন আবাসা-ইনি বনী সুলাইম বংশের লোক ছিলেন। ইবনে সা’দ বলেন, ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বেই তিনি মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করেন। আহমদ বিন হাম্বাল তাঁর এ বক্তব্য উধৃত করেন, “জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল বলে মনে করতাম এবং প্রতিমা সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল যে এগুলো কিছু নয়।”

তাঁর আর একটি উক্তি নিম্নরূপ:

“আার মনে এ কথা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল যে মূর্তিপূজা ভ্রান্ত। একথা শুনে আমাকে একজন বল্লো, মক্কায় এক ব্যক্তি আছে যে এ ধরনের কথা বলে। অতএব আমি মক্কায় এলাম। নবী মুহাম্মদের (স) সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর শিক্ষা জানতে পারলাম এবং ঈমান আনলাম”- (আল ইস্তিয়াব, ২য় খন্ড পৃ-৪৩১)।

সবচেয়ে শিক্ষণীয় ঘটনা হচ্ছে আমর বিন নুফাইলের, যিনি হযরত ওমরের (রা) চাচাতো ভাই এবং হযরত সাঈদ বিন যায়েদের [হযরত ওমরের (রা) ভগ্নিপতি] পিতা ছিলেন। ইনি তৌহিদী আকীদার উপর অত্যন্ত মজুবত ছিলেন। তিনি মূর্তিপূজা, মৃতজীব, রক্ত এবং প্রতিমার নামে কুরবানী হারাম মনে করতেন। কন্য হত্যা খুব খারাপ মনে করতেন এবং তাদেরকে বাঁচাবার চেষ্টা করতেন। ইহুদী ও নাসারাদের ধর্মও তিনি খণ্ডন করেন। তিনি বলতেন, আমাদের জাতির শির্ক এবং তাদের শির্কের মধ্যে পর্থক্য কোথায়?

হযরত আসমা বিন্তে আবি বকর (রা) বলেন, আমি যায়েদ বিন আমরকে দেখেছি। তিনি কাবার দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। তিনি বলতেন, “কুরাইশের লোকেরা। খোদার কসম, আমি এমন কোন পশুর গোশ্‌ত খাব না যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ করা হয়েছে। খোদার কসম, ইব্রাহীমের দ্বীনের উপর আমি ছাড়া আর কেউ নেই।”

তিনি আরও বলতেন, “হে খোদা। যদি আমি জানতাম যে, তোমার এবাদতের কোন্‌ পদ্ধতি তোমার নিকটে সবচেয়ে পছন্দনীয় তা হলে সেই পদ্ধতিতেতই তোমার এবাদত করতাম।” তিনি হাতের তালুতে মাথা রেখে সিজদা করতেন। তিনি দ্বীনে ইব্রাহীমির তালাশে শাম পর্যন্ত সফর করেন। কিন্তু তা তিনি ইহুদী ও নাসারাদের ধর্মেরও খুঁজে পাননি। তারপর তিনি হাত তুলে দোয়া করেন,

-হে খোদা! আমি তোমাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি দ্বীনে ইব্রাহীমির উপর আছি।

অবশেষে নবী মুহাম্মদের (স) আবির্ভাবের পাঁচ বছর আগে লাখাম শহরে কে যেন তাঁকে হত্যা করে। তাঁর চাচা এবং বৈমাত্রেয় খাই খাত্বাব, পৈত্রিকম ধর্ম পরিত্যাগ করার জন্যে তাঁকে খুব কষ্ট দিত। অবশেষে তিনি মক্তা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কুরাইশদের গুন্ডাপান্ডপাদের লাগিয়ে দেয়া হয় যাতে তিনি মক্কা শহরে ঢুকতে না পারেন।

ইসলামী যুগে হযরত ওমর (রা) এবং হযরত সাইদ বিন যায়েদ (রা) নবী করীমের (স) কাছে আরজ করেন, “যায়েদের চিন্তাধারা কি আপনার জানা আছে? আমরা কি তার জন্যে মাগফেরাতের দোয়া করতে পারি?”

জবাবে নবী বলেন, হ্যাঁ, কিয়ামতের দিনে যিনি একাই একটি উম্মত হিসাবে উঠবেন-(আল ইস্তয়াব, ২য় খন্ড-পৃঃ ৫৩৯, আল ইসাবা, ১ম খন্ড-পৃঃ ৫৫২, ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড-পৃঃ ২৩৯-৪০)।

তথাপি সাধারণ আরববাসী যে ধরনের শির্কে লিপ্ত ছিল, তা জানতে পারা যায় তাদের সাথে তালবিয়া থেকে যা তারা হজ্বের সময় পাঠ করতো। সে তালবিয়া ছিল নিম্নরূপ:-

(আরবী***************)

-আমি হাজির, হে আমার আল্লাহ আমি হাজির। আমি হাজির, তোমার শরীক কেউ নেই ঐ শরীক ব্যতীত যে তোমারই। তুমি তারও মালিক এবং ঐ বস্তুরও মালিক যার সে মালিক।

এর অর্থ এই যে, তারা তাদের বহু কলিপত খোদাকে মাবুদ মেনে নেয়া সত্ত্বেও একজন সর্বোচ্চ রব হিসাবে আল্লাহকে মানতো এবং এটা মনে করতো যে এ সকল মাবুদ ঐ মহিমান্বিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ সত্তার বান্দাহ ও দাস। এসবকে রেসালাতের ইসমাইলীর প্রভাব ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে যে অতি নিকৃষ্ট জাহেলিয়াত ও শির্কের মধ্যে নিমজ্জিত থেকেও আল্লাহ সম্পর্কে তাদের মনে এ বিশ্বাস ছিল।

হযরত ইসমাইল (আ) এর পর খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব

হযরত ইসমাইল (আ) যতোদিন জীবিত ছিলেন, খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাঁর হাতেই ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র নাবেত এর মুতাওয়াল্লী হন। কিন্তু নাবেতের মৃত্যুর পর জুরহুম গোত্রে লোক যারা হযরত হাজেরার (রা) সময় মক্কায় বসতি স্থাপন করেছিল- খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জোর পূর্বক গ্রহণ করে। কারণ ইসমাইল (আ) এর সন্তানগণ ছিল সংখ্যায় কম এবং মক্কার জুরহুমীয়দের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তাদের সাথে আমালিকের একটি শাখা কাতুরা অথবা বনী কায়তুরও কিচুকাল মক্কার ব্যবস্থাপনায় শরীক ছিল। শহরের বহিরাঞ্চেল থেকে যারা আসতো জুরহুম তাদের থেকে ওশর আদায় করতো। নিম্নাঞ্চল থেকে যারা আসতো আমালিক তাদের ওশর দিতে বাধ্য করতো। অবশেষে কিছুকাল খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনার বহিষ্কার করে দেয়। অতঃপর তারাই পরবর্তী কয়েক শতক পর্যন্ত। খানায়ে কাবা ও মক্কার উপর আধিপত্য করে (মারুজহুস যাহাব) সামউদী ২য় খন্ড পৃঃ৫০ ইবনে হিশাম ১ম খন্ড, পৃঃ১১৮)। তাদের মধ্যে ক্রমশঃ এতোটা বিকৃতি ঘটে যে মক্কার মর্যাদা বিনষ্ট শুরু করে। যেসব ধন-সম্পদ কাবায় হাদিয়া স্বরূপ দেয়া হতো, তা তারা অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করতো। যিয়ারতের জন্যে আগমনকারীকে উত্যক্ত করতো। এমন কি, তাদের মধ্যে কেউ ব্যভিচারে কোন স্থান না পেলে খানায়ে কাবায় গিয়ে এ গোনাহের কাজ করতো। সে সময়ের একটি ঘটনা  এই যে, এসাফ্‌ নামীয় এক ব্যক্তি নায়েলা নাম্নী এক নারীর সাথে খানায়ে কাবায় অবৈধ কাজ করে এবং আল্লাহ তায়ালা উভয়কে বিকলাংগ করে দেন। কিছুকাল পর তাদের মূর্তি বানিয়ে একটি সাফায় এবং অপরটি মারওয়ায় রেখে তাদের পূজা শুরু করলো। খানায়ে কাবার মোতাওয়াল্লী এ ধরনর চরম নীচতায় নেমে আসে।

অবশেষে জুরহুমীয়দের বাড়াবাড়ি যখন চরমে পৌছলো, বনী কেনানা গোত্রের বনী বাকার বিন আব্দে মানাত এবং নবী খুযায়া গোত্রের গুবশান মিলিতভাবে লড়াই করে তাদেরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে। যাবার সময়ে তারা কাবার ধন সম্পদ যমযমের মধ্যে নিক্ষেপ করে তা বন্ধ করে ও নিশ্চিহ্ন করে তাদের স্বদেশ ইয়ামেনের দিকে রওয়ানা হয়। তাপর কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বনী খুযায়ার ঐ শাখাটির হাতে ন্যস্ত হয় যা গুবশান নামে অভিহিত। তিন-চার শতক যাবত তারাই কাবার মোতায়াল্লী থাকে এবং তাদরে যুগেই খানায়ে কাবা একটি পরিপূর্ণ প্রতিমাগৃহে পরিণত হয়। তার সূচনা  এভাবে হয় যে, ঐ গোত্রের সর্দার আমর বিন লুহাই তার ধনদৌলত ও দানশীতার কারণে খুযায়ার মুকুটবিহীন রাজা হয়ে পড়ে এবং  যে কোন অভিনব ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান (বিদআত) সে আবিস্কার করে- সকলে দ্বিধাহীনচিত্তে তার অনুসরণ করে। একবার সে শাম দেশে গমন করে এবং সেখানে সে আমালিকগণকে বিভিন্ন মূর্তির পূজা করতে দেখেন, এ তার বেশ ভালো লাগে এবং সেখান থেকে হুবাল নামে এক প্রতিমা এনে কাবায় স্থাপন করে। ক্রমশঃ নতুন নতুন প্রতিমার সংখ্যা বাড়তে থঅকে। এসবের মধ্যে হযরত ইব্রাহীম (আ), হযরত ইসমাইল (আ( এবং হযরত মরিয়ম (আ) এর মূর্তিও শামিল করা হয়। হযরত মরিয়মের মূর্তি সম্ভবত এ জন্যে রাখা হয়েছিল যাতে করে আরবের খৃস্টানগণ কাবার দিকে ফিরে আসে। বুখারীর কিতাবুল আম্বিয়াতে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) এক বর্ণনায় আছে যে কাবার ঘরে হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং হযরত মরিয়মের (আ) মূর্তিও ছিল। দ্বিতীয় একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) ও হযরত ইসমাইল (আ) এর মূর্ত এ আকৃতিতে ছিল যে তাঁদের হাতে জুয়া বা পাশার ঘূটি ছিল। ইবনে ইসহাক বলেন, বাহিরা, সায়েবা, অসিলা এবং হাম এর বিদআতগুলো আমর বিন লুহাই এর আবিষ্কার, যার খন্ডন করা হয়েছে সূরায়ে মায়েদার ১০৩ আয়াতে। কিন্তু একথা বলা ঠিক নয় যে দ্বীনে ইব্রাহীমির অনুসারীরেদ মধ্যে মূর্তিপূজার সূচনা এ ব্যক্তিই করেছিল। ইবনে ইসহাক বলেন, মক্কা ছেড়ে যারাই আরবের অন্যত্র চলে যেতো তারা সাথে করে মক্কায় একটা পাথর নিয়ে যেতো এবং যেখানেই বসতি স্থাপন করতো সেখানে তা স্থাপন করে তার তাওয়াফ শুরু করতো (ইবনে হিশাম ১ম খণ্ড পৃঃ ৭৯-৮০)।

কাবার অলীগীরি অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার অধিকার খুযায়ীদের তখন শেষ হয়ে যায় যখন কুরাইশ গোত্রের কুসাই বিন কিলার তার শ্বশুরে কাছ থেকে এ দায়িত্ব লাভ করে। পরে এ সম্পর্কে বর্ণনা করা হবে।

ইসমাইল (আ) এর সন্তানগণ

আরবের কুলুজিবিদগণ (GENEOLOGISTS) এবং বাইবেলের সর্বসম্মত বর্ণনা মতের হযরত ইসমাইল (আ) এর বারো পুত্র ছিল। কিন্তু মক্কায় জুরহুমীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসমাইল সন্তানদের অতি অল্পসংখ্যক লোকই মক্কা শহরে রয়ে গিয়েছিল এবং অন্যান সকলে আরবের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস এ সম্পর্কে নীরব যে তাঁর বারো পুত্রের সন্তানগণ কোথায় কোথায় গেল এবং তাদের বংশ থেকে কোন্ কোন্‌ ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করলো। আরবের কুলুজি শাস্ত্রে যা সংরক্ষিত ও নির্বরযোগ্য এবং যার মধ্যে মতপার্থক্য নেই তা হচ্ছে এই যে, আদনান হযরত ইসমাইল (আ) এর জ্যেষ্ঠপুত্র নাবেতের সন্তানগণের মধ্যে একজন। আদনানের পূর্বে হযরত ইসমাইল (আ) পর্যন্ত কত পুরুষ অতীত হয়েছে (সে সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে এবঙ আদনানের উর্ধতন বংশতালিকা সংরক্ষিত নেই। উরওরাহ বিন যুবাইর (রা) বলেন, এমন কোন লোক আমরা পাইনি যে আদনার ও হযরত ইসমাইলের (আ) মধ্যবর্তী বংশ তালিকা জানতো।

ইবনে মাসউদ (রা) এবং ইবনে আব্বাস (রা) উভয়ে বলেন, আদনানের উপরে যারা বংশতালিকা বয়ান করে মিথ্যা বলে। হযরত ওমর (রা) বলেন, আদনানের উপরে যারা বংশতালিকা বয়ান করে তারা মিথ্যা বলেন, নসবনামা (বংশতালিকা) শুধু আদনান পর্যন্ত বয়ান করা উচিত। তাবাকাতে ইবনে সাদ এবং বালাযুবরীর আনসাবুল আশরাফে স্বয়ং নবী পাকের (স) এ উক্তি বর্ণিত আছে যে, তিনি মায়াদ ব্নি আদনান বিন উদাও পর্যন্ত বংশতালিকা বয়ান করার পর বলেন, পরবর্তী উর্ধতন বংশতালিকা বর্ণনাকারী মিথ্যাবাদী। কিন্তু উর্ধমুখী বংশতালিকা সংরক্ষিত না থাকার অর্থ এই নয় যে, ইসমাইল-সন্তানদের মধ্যে আদনানের হওয়ার মধ্যে কোন প্রকারের সন্দেহ রয়েছে। সমগ্র আরববাসী এ ব্যাপার একমত যে আদনান বনী ইসমাইলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরবরা এ ব্যাপারে একমহ হওয়া তার সভ্যতার অনস্বীকার্য প্রমাণ। কারণ আরববাসী কুলুজির বড়ো গুরুত্ব দিত। বংশানুক্রমে ক্রমাগত চলে আসা বর্ণনা পাওয়া না গেলে কারো বংশ সম্পর্কে একমত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

রসূলে আকরামের (স) বংশতালিকা এবং আরব উপজাতীয়দের সাতে তাঁর সম্পর্ক

আদনানের পরে তার সন্তানের মধ্য থেকে যেসব আরব উপজাতীয় দল উদ্ভূত তাদের বংশতালিকা সংরক্ষিত আছে। কুলুজিবিদগণেল মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। আমরা এখানে নবী মুহাম্মদ (স) এর বংশতালিকা সন্নিবেশিত করছি। তারপর বলবো কোন্‌ কোন্‌ পুরুষে গিযে আরবের কোন্‌ কোন্‌ উপজাতি নবীর বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। নবী (স) এর বংশতালিকা নিম্নরূপ:

মুহাম্মদ () বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশেম বিন আব্দে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররা বিন কা’ব বিন লুয়াই বিন গালেব বিন ফিহির বিন মালেক বিন আন্‌নাযুর বিন কিনানা বিন খুযায়মা বিন মুদরেকা বিন আল্‌ইয়াস [কোন কোন গ্রন্থাকর এ নামের উচ্চারণ ইল্‌ইয়াস করেছেন কিন্তু সুহায়লী তাঁর গ্রন্থে উনুফে আলইয়াস-কেই সঠিক বলেছেন। বালাযুরীও তাঁর আনসাবুলি আশরাফে এ নামের উচ্চারণই লিখেছেন-গ্রন্থকার।] বিন মুযার নিযার বিন মায়াদ বিন আদনান।

এ বংশ পরম্পরার মধ্যে প্রত্যেক পুরুষের পূর্বপুরুষ পর্য়ন্ত পৌছে নিম্নের উজাতিগুলো নবীর (স) বংশের সাথে মিলিত যাচ্ছে:-

আদনানের পুত্র আক্ক এর সন্তান সম্ভতির উর্ধমুখী বংশপরম্পরা আদনান পর্যন্ত পৌঁছে নবী (স) এর পূর্বপুরুষের সাথে মিলে যাচ্ছে। আক্ক এর সন্তান-সন্ততি ইয়ামেনে গিয়ে বসবাস করতে থাকে এবং আশয়ারীদের সাথে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। হযরত আবু মূসা আশয়ারী (রা) এ গোত্রেরই লোক ছিলেন।

বনী কুযায়া এবং বনী উপজাতি যার মধ্যে বনী বকর বিন ওয়াইল, তাগবিলব, নাদিলা প্রভৃতি শামিল) বনী আবদুল কায়েস, আনাযা এবং নামির বিন কাসে- নিযারের সাথে মিলিত হয়েছে।

কায়েসের সকল উপজাতি (সুলাইম, মাযেন, ফাযারাহ, আব্স, আশজা, মুররা যাবইয়ান, হাতফান, ওকাইল কুশাইর, যুশাম, সাকীফ, বাহেলা, বনী সায়াদ বনী সায়াদ বিন বকর বংশোদ্ভূত।

বনী তামীস, বনী দাবরাহ, মুযায়না, খুযায়া, আসলাম ওকল তাইম প্রভৃতি আলইয়াসের সাথে মিলিত।

বুযাইল, যে গোত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) জন্মগ্রহণ করেন, মদরেকার সাথে মিলিত।

বনী আসাদ কারা এবং সকল বনী আলহুণ বিন খুযায়মা খুযায়মার সাথে মিলিত।

বনী আব্দে মানাত (যার মধ্যে বনী বকর ও বণী যমিরা শামিল), বনী মালেক, বনী কালকন অতভা মিলকান, বনী হুদাল, বনী ফিরাস বনী ফুকাইম প্রভৃতি কিনানার সাথে মিলিত। হযরত আবু যর গিফারী (রা) এর গোত্র বনী মালকান থেকে উদ্ভূত।

কুরাইশ

কুলুজিবিদগণের একটি দল একথা বলেন যে, আন্‌যনযর বিন কিনানারই উপাধি ছিল কুরাইশ। কিন্তু গবেষক পণ্ডিতগণ বলেন, কুরাইশ প্রকৃত পক্ষে আননযর এর নাতি এবং মালেক বিন নযর এর পুত্র ফিহিরের উপাধি ছিল।

যারা তার বংশধর তারাই কুরাইশের মধ্যে শামিল এবং যারা এর বংশধর নয় তারা কুরাইশের মধ্যে শামিল। [কুরাইশ শব্দের অর্থে মতভেদ রয়েছে। এক অর্থ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হওয়ার পর একত্র হওয়া। কিন্তু এ অর্থের দিক দিযে কুসাই বিন কিলাবেরই উপাধি কুরাইশ হতে পারে। কারণ তার সময়েই কুরাইশের সকল পরিবার মক্কায় একত্র হয়। দ্বিতীয় অর্থ উপার্জন ও ব্যবসা বাণিজ্য যা ছিল কুরাইশদের পেশা। তৃতীয় অর্থ অনুসন্ধান, এ দিক দিযে কুরাইশ নযর বিন কিনানার উপাধি হয় কারণ তার সম্পর্কে আরব ঐতিহ্যে বর্ণিত আছে যে,  সে অভাবীলোকদের অভাব অনুসন্ধান করে বেড়াতো এবং তাদের সাহায্য করতো। আার একটি অর্থ হলো সমুদ্রের বিরাটত্ব যা সবকিচু খেয়ে ফেলে। একটি উক্তি এরূপ আছে যে কুরাইশ বিন বদর বনী নযর বিন কিনানা বংশের এক ব্যক্তি ছিল যে সহযাত্রী () ও মাল সরবরাহের ব্যবস্থা করবো, এ জন্যে আরবাসী এ গোত্রের কাফেলা দেখে বলতো, কুরাইশের কাফেলা এস গেছে। এরূপ বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। কিন্তু গবেষণালব্ধ তথ্য এই যে, কুরাইশ বনী ফিহিরের উপাধি ছিল- গ্রন্থকার।]

কুরাইশদের মক্কায় একত্র হওয়া ও কাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বলাভ

ইতঃপূর্বে আমরা বলেছি যে মক্কায় জুরহুমীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর ইসমাইলে বংশধরগণ আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। কাবার ব্যবস্থাপনার ভার বনী খুযায়ার একটি শাকা ও গুবশানের উপর থাকাকালেও এ অবস্থাই হয়েছিল্ বনী ইসমাইলের অন্যান্য শাখার ন্যায় কুরাইশও বনী কিন্নার বিভিন্ন বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অতি অল্প অংশই মক্কায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। ৪০০ কৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে [ইবনে কাসীরে বর্ণনা মতে কাব বিন লুয়াই (কুসাইয়ের পরদাদা) এর মৃত্যু ও নবী মুহাম্মদরে (স) নবওয়াত প্রাপ্তির মধ্যে ৫৬০ বছরের ব্যবধান ছিল। এদিক দিয়ে সম্ভবঃ গালেব বিন ফিহির হযরত মসীহ (আ) এর সমসাময়িক ছিল। ইবনে কাসীর, সুহায়লী এবং অন্যান্য ইমামগণের বরাত দিয়ে একথাও বর্ণনা করেছেন যে মায়াদ বিন আদনানের যুগেই বখ্‌ত-নসর এরাশালেম (জেরুযালেম) ধ্বংস করে ইহুদীদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এ ৫৮৭ খৃষ্টাপূর্বের ঘটনা বালাযুরী মায়াদ বিন আদনানকে বখতন সরে সমসামিয়ক বলেছেন- গ্রন্থকার।] কুসাই বিন কিলাবের হাতে এ অবস্থার অবসান ঘটে এবং মক্কাও কুরাইশদের অধীনে আসে এবং খানায়ে কাবার ব্যবস্থাপনাও তাদের হাতে ন্যাস্ত হয়।

এর সূচনা এভাবে হয় যে, কুসাই এর পিতা কিলাব বিন মুররার মৃত্যুর পর তা মা ফাতেমা বিন্তে সায়াদ (আযদে শানাও-আ বংশের) বনী কুযায়া-এর একব্যক্তি রাবিয়া বিন হারাম-এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং শাম চলে যায়। সেখানে এ দ্বিতীয় স্বামীর ঔরসে এবং তার গর্ভে যেরাহ বিন রাবিয়া নামে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। কুসাই যৌবনে পদার্পণের পর একবার বনী কুযায়ার এক ব ব্যাক্তির সাথে তাড় লড়াই হয়। সে কুসাইকে এই বলে ভর্ৎসনা করে, “তুই আমাদের মধ্যে পরিপালিত হয়ে আমদের উপরেই গর্জন করছিস। তুই তোর আপন লোকদের মধ্যে কেন যাস্‌না?”

তারপর ‍কুসাই তার মাকে জিজ্ঞেস করে, “আমার পরিচয় কি?” সে বলে, তুমি কিলাবের পুত্র এবং কুরাইশ গোত্রের সন্তান। তোমার কওম বায়তুল হারামের পাশে মক্সা শহর ও তার চারপাশে থাকে। তখন কুসাই চিদ ধরে বলে, “আমি আমার কওমের লোকের কাছে যাব।”

অতঃপর যখন হজ্বের সময় এলো তখন সে বনী কুযায়ার হজ্বযাত্রীদের সাথে মক্কা পৌছলো। এখানে তার সহোদর ভাই যুহরা, কিলাবের মৃত্যুর সময় যে যুবক ছিল, পূর্ব থেকেই প্রতিষ্টিত ছিল। কুসাই তার নিকটেই রয়ে গেল। সে সময়ে হযেইলল বিন হা্বশিয়্যা খুযায়ী কাবার মুতাওয়াল্লী এবং মক্কার শাসক ছির। কুসাই হুলাইল কন্যা হুববাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্রস্তাব দেয়। হুলাইল কুসাইয়ের বংশ আভিজাত্য ও তার মহৎ ব্যক্তিত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সন্তুষ্টিচিত্তে সম্মতি দান করলো। তারপর কাবার ব্যবস্থাপনার ভার ও মক্কার সর্দারি কিভাবে তার হাতে এলো এ ব্যাপারে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা এই য, হুলালি স্বয়ং অসিয়ত করে যায় যে তার মৃতুর পর কুসাই খানায়ে কাবার মুতাওয়াল্লী হওয়ার যোগ্য। অন্য বর্ণনা বলে যে, হুলালের মৃত্যুর পর কুসাই দাবী করে যে, সে এ পদের জন্যে অন্যান্যের তুলনায় অধিক যোগ্য। এতে বনী খুযায়া এবং বনী বকর সম্মত না হওয়ায় সে তার বৈমাত্রেয় ভাই রেযাহ্‌ এবং বনী কিনানা ও খযায়মে সাহায্যের আহ্বান জানায়। তারপর চারপাশে কুরাইশদের যেসব লোক বসবাস করতো তাদেরকেও একত্র করলো। অতঃপর বলপূর্বক খুযায়া এবং বনী বকরকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করে দিল। পরবর্তীকালে উভয় পক্ষ যখন বনী আব্দে মানাত বিন কিনানর গোত্রভুক্ত ইয়ামুর বিন আওফকে মধ্যস্ত মানলো, তখন সে সিদ্ধান্ত করে দিল যে খুযায়ার তুলনায় কুসাই খানায়ে কাবার মুতাওয়াল্লী হওয়ার অধিকতর হকদার। এজন্যে যে তার পরিচয় নিশ্চিতরূপে বনী ইসমাইলে বংশোদ্ভূত।

খুযায়ার বিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার পর কুসাই বনী আল-গওস বিন্‌ মুর-এর প্রতি মনোযোগ দিল। তাদেরকে সূফা বলা হতো। জুরহুম এবং খুযায়ার সময়ে তারা এ মর্যাদা লাভ করেছিল যে, হজ্বের সময় তাদরে অনুমতি ব্যকিরেকে আরাফাত থেকে প্রত্যাবর্তন করা যেতোনা। তাদের অনুমতিক্রমেই মিনায় যেতো। মিনা তেকে লোক বাড়ি রওয়ানা হতে পারতো না যতোক্ষণ না সূফা জুমরাতে পাথর ছুড়েছে। তাদের পরেই অন্যান্য হাজীগণ রামী (পাথর ছুঁড়ে) করে রওয়ানা হতে পারতো। দীর্ঘদিনের আমলের ফলে এ যেন এক দ্বীন হয়ে পড়েছিল যা মেনে চলা অপরিহার্য মনে করা হতো। কুসাই হজ্বের সময় সূফার সাথে যু্দ্ধ করে তাদেরকে পদমর্যাদা থেকে বেদখল করে-(ইবনে হিশাম)।

এভাবে যখন কুসাই কাবার ব্যবস্থাপক ও মক্কার সর্দারি হাসিল করে, তখন সে ফিহরের সকল বংশধরকে, যারা কুরাইশ নামে অভিহিত ছিল, আরবের বিভিন্ন অংশ থেকে মক্কায় একত্র করে এবং মক্কা তাদের বন্টন করে শহরে এক এক অংশে এক এক পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করে। [কুসাই মক্কা শহরকে কুরাইশ পরিবারের মধ্যে এভাবে বন্টন করে দেয় যে হারামের পার্শবর্তী এলাকা সমূহ এবং দু’ধারে পাহাড়ের উপত্যকা ও উচ্চভূমিতে বনী কাব বিন লুয়াই এর বিভিন্ন শাখাকে প্রতিষ্ঠিত করে- যাদের মধ্যে শামিল ছিল বনী আদী, বনী জুমাহ, বনী সাহম, বনী তাইম, বনী মাখযুম, বনী যুহরা, বনী আবদু ওয্যা, বনী আবদুদ্দার, বনী আল মুত্তালিব, বনী হাশিম, বনী আবেদ শামস, এবং বনী নওফাল। তাদেরকে বলা হতো কুরাইশ আলবিতাহ। অর্থাৎ মক্কার অভ্যন্তরীন অংশে বসবাসকারী এবং প্রকৃতি হারাম বাসা। কায়াবের উর্ধ্ধতন পুরুষ ফিহরের বংশধরদের পরিবার সমূহ যথা বনী মুহারিব, বনী আলহারিস, বনী তাইম উলাদুরাম, বনী আমের বিন লূয়াই প্রভৃতি ছিল- ‘কুরাইশুয,-যাত্তাহের’ এবং তাদেরকে মক্কার বাইরের অংশ দেয়া হয়- গ্রন্থকার।] এর ভিত্তিতে কুরাইশ তাদেরকে ‘মুজোম্মে’ বলে।

 খুযাফা বিন্‌ গানেম আদাবী বলেন:-

(আরবী*******************)

-তোমাদের পিতাকে মুজাম্মে বলাহতো। তার দ্বারা আল্লাহ ফিহরের গোত্রদেরকে একত্র করেন।

মক্কার নগর রাষ্ট্র ও হজ্বের ব্যবস্থাপনা

কুসাইয়ের এ বিরাট খেদমতের জন্যে সকল কুরাইশ গোত্র তাকে নিজেদের সর্দার মেনে নেয়। কুরাইশের কোন পরিবারে যে বালিকাই যৌবনে পদর্পণ করতো, তাকে কুসাইয়ের গৃহেই কামিস পরিধান করানো হতো, কোন বিযে শাদি হলে তা হতো কুসাইয়ের গৃহে। কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটলে অথবা কোন গোত্রের সাথে যুদ্ধের উপক্রম হলে, তাঁর গৃহেই সকল পরিবারের সর্দারগণ পরামর্শের জন্যে একত্র হতো। এ কারণে এ বাড়িকে বলা হতো “দারুন্নাদওয়া”। তার একটি দরজা ছিল হারামের দিকে। যুদ্ধের সময় কুসাই এর সন্তানদের মধ্যেই কোন এক জনকে পাতাকাবাহী নিযুক্ত করা হতো। এ পদমর্যাদার নাম ছিল “আল্লেওয়া”। হজ্বের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা কুসাইদের হাতে থাকতো। তাদের একটা কাজ ছিল “অসসিকায়া”। অর্থাৎ হাজীদের পানি পান করানো। দ্বিতীয়টি ছিল “আর রিফাদাহ”- অর্থাৎ হাজীদের আহার করানোর ব্যবস্থাপনা। যার জন্যে কুরাইশদের সকল পরিবার চাঁদা একত্রে জমা করে কুসাইকে দিত। সে হজ্জ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত ঐ সকল হাজীর আহারের ব্যবস্থা করতো যারা নিজেরা ব্যবস্থা করতে পারতো না।

তৃতীয়টি ছিল ‘আলহিজাবাহ’ অর্থাৎ খানায়ে কাবার চাবি রক্ষক। কাজ ছিল যিয়ারত কারীরেদ জন্যে কাবা খুলে দেয়া এবং বন্ধ করা।

কুসাই তার জীবনে মক্কা রাষ্ট্রের একচ্ছত্র মালিক ছিল। যখন কুসাই এর শেষ সময় উপস্থিত হলো তখন সে দেখলো, তার পুত্র আব্দে মানাফ আরবে খ্যাতি অর্ঝন করেছে এবং তার মর্যাদাও স্বীকৃতি লাভ করছে, তখন সে মক্কা রাষ্ট্রের সকল কার্যভার (নাদওয়া, হিজাবাহ, রিফাদাহ, লেওয়া) দ্বিতীয় পুত্র আবদুদ্দারকে অর্পণ করে। কুসাই এর মৃত্যুর পর কিছুকাল-যাবত তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। অতঃপর কোন এক সময়ে এসব পদমর্যদা বন্টন নিয়ে কলহ শুরু হয়। এ কলহে কুরাইশদের কিছু পরিবার আবদুদ্দার এবং কিছু আবদে মানাফের সাথে মিলিত হয়। কুরাইশ পরিবার গুলোর মধ্যে যারা আবদে মানাফের সাথে মিলিত হয় তারা ছিল বনু আসাদ বিন আবদুল ওয্যা, বনু যুহরা বিন কিলাব, বনু তাইম বিন ‍মুররা এবং বনী হারিস বিন ফিহর। তাদের সর্দার ছিল আব্দে শামস। যারা আবদুদ্দারের সাথে মিলিত হয়, তারা ছিল বনু মখযুম, বনু সাহম, বনু জুমাহ এবং বনু আদী। তাদের সর্দার ছিল আমের বিন হাশিম। বনী আমের বিন লুয়াই এবং বনী মুহারিব বিন ফিহর এ ঝগড়ায় নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে।]

এ কলহ দীর্ঘস্থায়ী হতে যাচ্ছিল এবং গৃহযুদ্ধ হওয়ার পূর্বেই আপোস মীমাংসা হয়ে যায়। যার ফলে হিজাবাহ, লেওয়া এবং নাদওয়া আবদুদ্দারের অধীন থাকে এবং সিকায়াহ ও রিফাদাহ আবদে মানাফকে দেয়া হয়। আবদে মানাফের সন্তানগণ পরস্পর পরামর্শ করে এ দুটি পদমর্যাদা হাশিমকে দান করে। [রসূলুল্লাহ (স) এর হতে মক্কা বিজয় হওয়া পর্যন্ত এসব ব্যবস্থাপনা ঠিক সেভাবেই অক্ষুন্ন থাকে যেমনভাবে উভয় পরিবারের উপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। মক্কা বিজয়ের পর হুযর (স) হিজাবাহ ও সিফায়াহ ব্যতী অন্য সব রহিত করেন। হিজাবাহ ত আজ পর্যন্ত আবদুদ্দারের একটি শাখা শায়বাহ-বিন-ওসমানের দ্বারাই পরিচালিত হয়ে আসছে। অবশ্যি সেকায়ার দায়িত্ব অবশেষে হযরত আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের হাতে এসেছিল তা কিছুকাল বনী আব্বাসের হাতেই ছিল। তারপর প্রথম খলিফঅ তা নিজেই ছেড়ে দেন-গ্রন্থকার।]

হাশিম

হাশিমের আসল নাম ছিল আমর। ‘হাশিম’ উপাধি সে তখন লাভ করে যখন মক্কায় একবার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সে সময়ে হাশিম শাম থেকে খাদ্যদ্রব্য এনে রুটি তৈরী করে। বহু উট জবেহ করে তার ছালন তৈরী করে। তার মধ্যে রুটি খন্ড বিখন্ড করে এক প্রকার মালিদা তৈরী করে লোক খাওয়ায়। ‘হাশম’ শব্দের অর্থ ভাঙ্গা ও নিষ্পেষিত করা। রুটি খন্ড বিখন্ড করে ছালনে দিয়ে মালিদা বানাবার কারণে তাকে হাশিম নামে আখ্যায়িত করা হলো।

রিফাদাহ ও সিকায়াহ-এর দায়িত্ব হাশিমের উপর ন্যস্ত হওয়ার পর তার নিয়ম এই ছিল যে, যখন হজ্বের সময় আসতো তখন সে কুরোইশদের লোকজনকে একত্র করে বলতো, “এসব আল্লাহর প্রতিবেশী এবং তার ঘরের লোক এ সময়ে যিয়ারতের উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে আসে। এসব আল্লাহর মেহমান। আল্লাহর মেহমানগণ আপ্যায়নে সবচেয়ে বেশী হকদার।

আল্লাহ তোমাদেরকে এ বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং তার বদৌলতেই তোমাদের মান সম্মানে ভূষিত করেছেন। তিনি তোমাদের এমন হেফাজত করেছেন যা কোন প্রতিবেশিী তার প্রতিবেশীর জন্যে করে না । এ জন্যে আল্লহর মেহমানদরে এবং যিয়ারতে কারীদের সম্মান কর। তারা ধুলা ধুসরিত দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসছে। আসছে কংকালসার দুর্বল উটনীর পিঠে চড়ে। তাদের জামাকাপর ময়লা হয়েছে। তাদের পাথেয় শেষ হয়েছে। অতএব তাদের আহার করাও, পানি পান করাও।”

এ ব্যাপারে কুরাইশের সকল পরিবারের পক্ষ থেকে চাঁদা আসতো। স্বয়ং হাশিম বিরাট অর্থ নিজের পক্ষ থেকে ব্যয় করতো। তারপর মক্কার সকল কূপ থেকে পানি এনে এনে চামড়ার চৌবাচ্চাগুলো ভর্তি করা হতো। কারণ জুরহুমীগণ যমযম ধ্বংস করে তা নিশ্চিহ্ন কর দিয়েছিল। রুটি ছালন একত্রে রান্না করে এবং রুটি দুধ একত্রে রান্না করে খাওয়া হতো। ছাতু, খেজুর প্রভৃতিও খেতে দেয়া হতো। হাজীদের মিনা থেকে বিদায় হওয়া পর্যন্ত তাদের নানানভাবে আপ্যায়িত করা হতো। হাশিমের এ জনসেবা সকল গোত্রের প্রিয়পাত্র হওয়ার কারণ ছিল্ তারা প্রতি বছর হজ্বের সময় তার উদারতা পূর্ণ জনসেবার দ্বারা উপকৃত হওয়ার সুযোগ লাভ করতো।

কুরাইশদের  ব্যবসা ও তার উন্নতি

কুরাইশদের ব্যবসার উল্লেখ সূরায়ে ‍কুরাইশে (আরবী************)

গ্রষ্ম ও শীতের সফরের নামে আল্লাহর এক কৃপা হিসাবে করা হয়েছে। সর্বপ্রথম এ ধারণা হাশিমেই মনেই উদয় হয়। সে তার তিন ভাই আবদে শামস, মুত্তালিব ও নাওফালকে সাথে নিয়ে পরিকল্পনা করে তাদের সে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে হবে যা আরবদের পথ প্রাচ্যের শহরগুলি সাথে শাম ও মিষরের চলছিল। সেই সাথে আরববাসীর প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও খরিদ করে আনতে হবে যেন পথিমধ্যস্থ গোত্রগুলো তা খরিদ করতে পারে এবং মক্কার বাজারে দেশের ব্যবাসায়ীগণ মাল খরিদ করতে আসতে থাকে। এমন এক সময় ছিল যখন ইরানের সাসীন সরকার সে আন্তর্জাতিক ব্যবসার উপরে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছিল। উত্তরাঞ্চল ও পারস্য উপসাগরের পথ দিযে রোম সাম্রাজ্য এবং প্রাচ্যের শহরগুলোর মধ্যে  সে ব্যবসা চলতো। এ কারণে দক্ষিণ আরব থেকে লোহিত সাগরের তীর বরাবর যে ব্যসার রাজপথ শাম ও মিশরে প্রসারিত তার ব্যবসা বড়োই জমজমাট ছিল্ আরবো অন্যান্য ব্যাবসায়ী কাফেলার তুলনায় কুরাইমদের এ সুবিধাটুকু ছিল যে বায়তুল্লাহর খাদেম হওয়ার সাথে কুরাইশগণ হাজীদের খেদমত করতো তার কারণে সকলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। তাদের এ আশংকা ছিল না যে, পথে তাদের কাফেলার উপর কেউ ডাকাতি করবে। পথিমধ্যস্থ উপজাতীয়গণ তাদের নিকট থেকে মোটা পথকরও আদায় করতোনা যা অন্যান্য কাফেলার নিকচে দাবী করা হতো। হাশিম এসব দিক বিবেচনা করে ব্যবসায়ী স্কীম তৈরী করে এবং এ স্কীমে তার তিন ভাইকেই শামিল করে। শঅমের গাস্যানী বাদশাহ থেকে হাশিম, আবিসিনিয়ার বাদশাহ থেকে আবদে শাম্‌স, ইয়ামেনের আমীরদের থেকে মুত্তালিব এবং ইরাক ও পারস্য সরকারদের থেকে নাওফাল ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা লাভ করে।  [তাবারী বলেন, হাশিম রোমের কায়সার এবং শাম ও গাস্যানের বাদশা থেকে, আবদে শামস আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাসী থেকে নাওফাল ইরমের বাদশাহ থেঞকে এবং মুত্তালিব হিমইয়ারের বাদশাহদের থেকে ব্যবসায়িক সুযোগ সুবিধা এবং সফরকালীন নিরাপত্তার পরওয়া হাসিল করে। ইবনে সায়াদ বলেন যে রোমরে কায়সার হাশিমকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতো। ব্যবসার উদ্দেশ্য সে আংকারা পর্যন্ত অগ্রসর হতো- গ্রন্থকার।]  এভাবে তাদের ব্যবসা ‍দ্রুত উন্নতি লাভ করছিল।

এজন্যে এ চার ভাই মাতাজেররীন পেশাগড়ত ব্যবসায়ী) নামে প্রসিদ্ধ লাভ করে। চারধারের গোত্র এবং রাষ্ট্রগুলোর সাথে তারা যে সম্পর্ক স্থাপন করেছিল তার ভিত্তিতে তাদেরকে আসহাবুইলাফ’ ও বলা হতো। যার অর্থ ত বন্ধুত্ব সৃষ্টিকারী। কিন্তু পরিভাষা হিসাবে ‘ইলাফের’ অর্থ এমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যার ভিত্তিতে পথ অতিক্রম করা কালীন নিরাপত্তা এবং বন্ধুগোত্রদের অঞ্চলে অবস্থানের নিরাপত্তাও লাভ করা হয়। এ রাজনৈতিক মৈত্রী (Allianci) থেকে ভিন্ন ধরনের চুক্তি হতো।

ব্যবসার কারণে শাম মিশর, ইরান, ইরাক, ইয়ামেন এবং আবিসিনিয়া দেশগুলোর সাথে কুরাইশদের সম্পর্ক স্থাপনের সেসব সুযোগ হয়েছিল এবং বিভিন্ন দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার কারণে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টি এতোটা উন্নত হয় যে, আরবের অন্য কোন গোত্র তাদের সমকক্ষ ছিলনা। ধনদৌলতের দিক দিয়েও তারা আরবো মধ্যে শর্ষস্থানীয় ছিল। ফলে মক্কা আরব উপদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে পড়ে। এতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একটা বিরাট সুবিধা এই হয়েছিল যে ইরাক থেকে তারা সে বর্নমালা সংগ্রহ করে আনে যা অন্য কোন গোত্র ছিল না। এ কারণেই নবী (স) বলেছেন-

(আরবী**************)

-কুরাশি মানবের নেতা (মুসনাদে আহমদ, আমর বিন আল-আস থেকে বর্ণিত)।

বায়হকীতে হযরত আলীর (রা) একটি বর্ণনা নিম্নরূপ:-

(আরবী**************)

প্রথমে আরবের সর্দারি হিমইয়ারদের হাতে ছিল্ তারপর আল্লাহ তায়ালা তাদের হাত থেকে কেড়ে কুরাইশকে দেন।

কুরাইশ এভাবে উন্নতির পথে চলতে থাকে এমন সময় আবরাহার আকস্মাৎ আক্রমণের ঘটনা ঘটে। সে সময় এ পবিত্র শহর দশর করতে এবং কাবা ধ্বংস করতে আবরাহা যদি সমর্থ হতো, তাহলে আরবে শুধু কুরাইশদের নয় বরঞ্চ স্বয়ং কাবার মর্যাদাও বিনষ্ট হতো। এ ঘর যে প্রকৃতই আল্লাহর-জাহেলিয়াতের যুগের আরবের বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে যেতো। এ ঘরের খাদেম হওয়ার কারণে সারা দেশ কুরাইশদের যে মর্যাদা ছিল তাও একেবারে শেষ হযে যেতো। মক্কা পর্যন্ত হাবশীদের অগ্রসরহ ওয়ার পর রোম সাম্রাজ্য সামনে অগ্রসর হয়ে শাম ও মক্কার মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক রাজপথ অধিকার করে বসতো। কুসাই বিন কিলাবের পূর্বে কুরাইশদের যে দুরবস্থা ছিল, তার চেয়েও অধিক দুরবস্থা তাদের হতো। কিন্তু আল্লাহতায়ালা যখন তাঁর ক্ষমতার এ আলৌকিক বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন যে, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখীর সৈন্য প্রস্তর খন্ডের আঘাতে আঘাতে আবরাহার ষাট হাজার হাবশী সৈন্য ধ্বংস ও নিস্তনাবুদ করে দিল এবং মক্কা থেকে ইয়ামেনে পর্য়ন্ত সমস্ত পথে ঐ ধ্বংসপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর লোক পড়ে পড়ে মরতে লাগলো, তখন কাবা যে আল্লাহর ঘর, সমগ্র আরববাসীর এ বিশ্সাব আরও বহু গুণে মজবুত ও শক্তিশালী হলো। সাথে সাথে সারা দেশে কুরাইশদের মর্যাদও বেড়ে গেল। এখন আরব বাসীরেদ এ দৃঢ়প্রত্যয় সৃষ্টি হলো যে, এদের উপর আল্লাহর বিশেষ করুণা রয়েছে। ফলে কুরাইশগণ দ্বিধাহীন চিত্তে আরবের সর্বত্র তাদের ব্যবসায়ী কাফেলাসহ গমনাগমন করতো। তাদের উত্যক্ত করার কারো সাহস হতোনা। এমনকি কুরাইশী নয় এমন কোন ব্যক্তিকেও যদি নিরাপত্তা দান করতো তাতেও আপত্তি করতোনা।

আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম

হাশিম তার ব্যসসা সংক্রান্ত সফর উপলক্ষ্যে শাম যাবার পথে প্রায় মদীনায় অবস্থান করতেন। মদীনার খযরজ গোত্রের এক মহিলাকে সে ইতঃপূর্বেই বিয়ে করেছিল এবং াতর পক্ষ থেকে হাইয়া নাম্নী এক কন্যা এবং সায়ফী নামে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করে। আর এক সফরে সে খযরজ গোত্রেরই বনী নাজ্জার পরিবারের সাল্‌মা বিন্তে আমর বিন যায়েদ নাম্নী এক যুবতীকে দেখতে পেলো যে, সে বাজারের মধ্যে একটি উচ্চস্থানে বসে আদেশ করছে যে তার জন্যে কি খরিদ করা যায় এবং তার পক্ষথেকে কি বিক্রি করা যায়। হাশিম তার সৌন্দর্য, জাঁকজমক, সূক্ষ্ম বিচার বুদ্ধি ও বুদ্ধিমত্তায় আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়। সে কারো সাথে এ শর্ত ব্যতীত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে সম্মত ছিল না যে সে াতর আপন মর্জিমতো চলবে এবং কাউকে ভালো না লাগলে তার থেকে পৃথক হয়ে যাবে। হাশিম তার শর্ত মেনে নিল। মহিলাটি হাশিমের বংশীয় আভিজাত্য ও তার ব্যক্তিত্ব লক্ষ্য করে বিবাহে সম্মত হলো। মদীনাতেই উভয়ের বিবাহ ক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং এখানেই তার গর্ভ থেকে প্রায় ৪৯৫ খৃস্টাব্দে আব্দুল মুত্তালিব জন্মগ্রহণ করে। এ সফরেই হাশিম যখন গ্যায্যা পৌছে তখন রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যু  বরণ করে। এভাবে যৌবনে পদার্পণ করার পূর্ব পর্যন্ত আবদুল মুত্তালিব মায়ের সাথে মদীনাতেই অবস্থান করে। হাশিম মৃত্যুর সমযে অসিয়ত করে যায় যে, তার মৃত্যুর পর তার ভাই মুত্তালিব তার স্থানে সিকায়াহ ও রিফাদার মুতাওয়াল্লী হবে এবং সেই তার পরিবারবর্গ ও বিষয় সম্পদের দেখাশুনা করবে। সে সময় থেকে বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিব একান্ত হয়ে গেলে এবং শেষ পর্যন্ত ছিল। এর বিপরীত বনী আবদে শামস্‌ (যার থেকে বনী উমাইয়ার উৎপত্তি হয়) এবং বনী নাওফাল একে অপরে মিত্র হয়ে পড়ে এবং পরবর্তী কাল পর্যন্ত ছিল। মুহাম্মদ (স) এর নবুয়ত কালে যখন কুরাইশের সকল গোত্র তাঁর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং শি’বে আবি তালেবে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখে, তখন বনী হাশিমের সাথে বনী আল মুত্তালিবও এ অবরোধে নবীর সাথে ছিল। পক্ষান্তরে বনী নাওফাল ও বনী আবদে শামস বিরোধী দলের সাথে ছিল।

আবদুল মুত্তালিবের আল নাম ছিল শায়বা এবং আপন দৈহিক সৌন্দর্যের জন্যে তাকে “শায়বাতুল হামদ’ও বলা হতো। সে মদীনায় প্রতিপালিত হচ্ছিল এমন সময় একদিন হাস্‌সান বিন সাবিত (রা) এর পিতা সাবিত বিন মুনযের মক্কায় গিয়ে মুত্তালিবের সাথে দেখা করলো। পূর্ব থেকেই তার সাথে সাবিতের মেলামেশা ছিল্ তার সাথে আলাপচারি প্রসংগে সাবিত বল্লো, তোমার ভাইপো শায়বা, একবার দেখনা- তোমার মন আনন্দে ভরে যাবে। বড়ো সুন্দর হাট্টাগোট্টা জোয়ান।

একতা শুনে মুত্তালিব অধীর হয়ে পড়লো এবং মদীনা গিয়ে আপন ভাতিজাকে একসাথে উটের পিঠে বসিয়ে মক্কা নিয়ে এলো। কুরাইশের লোকেরা এ যুবক ছেলেটিকে ‍মুত্তালিবের সাথে আসতে দেখে বলতে লাগলো, “আবদুল মুত্তালিব (অর্থাৎ মুত্তালিবের গোলাম)”। মুত্তালিব তাদেরকে ধমক দিয়ে বল্লো, “এ আমার ভাই হাশিমের পুত্র শায়বা- আমার গোলাম নয়।”

কিন্তু আবদুল মুত্তালিব নামটি এতো মশহুর হয়ে পড়লো যে আসল নাম তলিয়েগেল। কিছুকাল পরে মুত্তালিব এক বাণিজ্যিক সফরের উদ্দেশ্যে ইয়েমেন গিয়ে মৃত্যবরণ করলো। আবদুল মুত্তালিব তার স্থলাভিষিক্ত হলো এবং ‘সিকায়াহ’ ও ‘রিফাদাহ’-এর উভয় পদমর্যাদা সে লাব করলো।

ইবনে সাদ তার প্রশংসা করে বলেন, সে কুরাইশদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান, সবচেয়ে ধীর স্থির ও সহনশীল, সব চেয়ে দাতা এবং ঐসব অনাচার থেকে সব চেয়ে দূরে ছিল যা পুরুষদের অথঃপতন এনে দিত।

ইবনে হিশাম আরও বলেন, সে তার কওমের সম্মান ও শ্রদ্ধার এমন মর্যাদা লাভ করেছিল যা তার পূর্ব পুরুষদের কেউ লাভ করেনি। তার কওম তাকে ভালোবাসতো এবং লোকের মধ্যে সে বিরাট মর্যাদার অধিকারী ছিল। ইবনে আসীর বলেন, আবদুল মুত্তালিবও রমযান মাসে গারে হেরায় গিয়ে তাহান্নুস (এবদাত) করতো এবং মাস ভর মিসকীনদেরকে আহার করাতো।

তাবারী, ইবনে আসীর ও বালাযুরী বলেন, আবদুল মুত্তাফিবের চাচা নাওফাল হাশিমের পরিত্যক্ত সম্পত্তির কিচু অংশ আত্মসাৎ করেছিল। আবদুল মুত্তালিবের প্রতিপত্তিশীল লোকদের কাছে অভিযোগ করে। তারা চাচা ও ভাতিজার কলহে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারপর আবদুল মুত্তালিব- নানার গোষ্ঠীর (মদীনার বনী আদী বিন তুজ্জার) কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। অতঃপর তার মামু আবু সাঈদ বিন আদাস আশিজন লোকসহ মক্কায় পৌছে এবং তারা বলপূর্বক নাওফাল থেকে ভাগিনার অধিকার আদায় করে দেয়। তারপর নাওফালও বনী হাশিমের বিরুদ্ধে বনী আব্দে শামসের সাথে মিলিত হয় এবং নবী (স) এর রেসালাতের যুগ পর্য়ন্ত বনী নাওফাল সে দলভুক্তই থাকে, যে দল বনী হাশিমের বিরোধী ও বনী আবদে শামসের সহযোগী ছিল । আবদুল মুত্তালিব যখন দেখলো যে বনী নাওফাল তার বিরোধী দলে মিলিত হয়েছে তখন সে খুযায়া সর্দারদের সাথে আলাপ আলোচনা করে এবং রীতিমতো চুক্তিনাম লেখেন। ইবনে সায়াদ ও বালায়বীর বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। তাঁরা বলেন, বনী খুযায়া আবদুল মুত্তালিবের কাছে স্বয়ং আবেদন করে পারস্পারিক বন্ধুত্ব সাহায্য সহযোগিতার চুক্তি সম্পন্ন করে। এ চুক্তিতে বনী আবদুল মুত্তালিব ও বনী হাশিম উভয় পরিবার শরীক হয়। বনী আব্দে শামস এবং বনী নাওফাল এর থেকে পৃথক থাকে। এ চুক্তিনামা লিখিত হয় দারুন্নাদওয়াতে এবং কাবাঘরে লটকানো হয়। তদনুযায়ী আবদুল মুত্তালিব তার সন্তানদেরকে অসিয়ত করেন বনী খুযায়ার সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখার। তারই প্রভাব এই ছিল যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ে যখন সন্ধির শর্তগুলোর মধ্যে একটি শর্ত এই ছিল যে, আরব গোত্রগুলোর মধ্যে যদি কেউ চায় ত উভয় পক্ষের যে কোন এক পক্ষের সাথে শরীক হতে পারে, তখন খুযায়া রসূলুল্লাহর (স) সাথে শরীক হওয়ার সিদ্ধান্ত করে।

আবদুল মুত্তালিব কর্তৃক যমযম নতুন করে পুনরুদ্ধার

এ গৌরব আবদুল মুত্তালিবেরই প্রাপ্য যে, যে যমযম জুরহুমীয়গন একেবারে বন্ধ করে দিয়ে তার চিহ্ন পর্যন্ত মিটিয়ে দিয়েছিল, তা তাঁর হাতেই নতুন করে আত্মপ্রকাশ করে। মুহাম্মদ বিন ইসহাক হযরত আলী (রা) এর বরাত দিয়ে বলেন, স্বপ্নে আবদুল মুত্তালিবকে যমযমের স্থান বলে দেয়া হয় এবং তাঁকে ঐ স্থান খনন করে এ পবিত্র কূপ বের করার নির্দেশ দেয়া হয়। সে সময় হারেস ব্যতী আবদুল মুত্তালিবের কোন পুত্র ছিলনা, হারেসকে সাথে নিয়ে কোদাল ও বেলচাসহ তিনি উক্ত স্থানে পৌছলেন এবং খনন কাজ শুরু করলেন। যখন পানি বেরুলো তখন আবদুল মুত্তালিব উচ্চস্বরে নারায়ে তাকবীর বল্লেন। এর থেকে কুরাইশরা জানতে পারলো যে যমযম বের হযেছে। তারা সব একত্র হয়ে বলতে লাগলো, “আবদুল মুত্তালিব! এ ত আমাদের পিতা ইসমাইলের (আ) কূপ এবং এতে আমাদেরও অধিকার রয়েছে। তোমার সাথে আমাদেরও এতে শরীক কর।” তিনি বল্লেন- “আমি তা করতে পারিনা। এ বিশেষ করে আমাকে দেয়া হযেছে, তোমাদের কাউকে দেয়া হয়নি।” তারা এ নিয়ে ঝগড়া করতে চাইলে আবদুল মুত্তালিব বল্লেন-, “আচ্ছা কাউকে সালিশ মান।” তারা বনী সা’দ বিন হুযাইমের গণৎ কারিকার নাম করলো, যে শামদেশের উচ্চতর অঞ্চেলে বাস করতো। আবদুল মুত্তালিব এ প্রস্তাব মেনে নিলেন এবং কিচু  সংগী সাথীসহ বনী উমাইয়া ও প্রতিটি কুরাইশ গোত্রের কিচু সংখ্যক লোকসহ শামের দিকে রওয়ানা হলেন। পথে তারা একটি মরুভূমিতে পৌঁছলো যেখানে আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীদের পানি একেবারে শেষ হয়ে গেল। পানির অভাবে তাদের মৃত্যুর আশংকা হলো। তারা তাদের সফরসাথী অন্যান্য কুরাইশদের নিকটে পানি চাইলো। তারা একথা বলে পানি দিতে অস্বীকার করলো, “দূর-দূরান্ত পর্য়ন্ত কোথাও পানির কোন চিহ্হন দেখা যায় না, এমতাবস্থায় আমাদের পানিতে তোমাদেরকে শরীক করলে আমরাও সে ধ্বংসের শিকার হবো যার আশংকা তোমরা করছো।”

অবশেষে আবদুল মুত্তালিব তার সাথীদেরকে বল্লেন, “এসো আমাদের দেহে এখনো জীবন আছে। আমর প্রত্যেকে আমাদের নিজেদের জন্যে এক একটি গর্ত খনন করি এবং যে মরে যাবে তাকে তার গর্তেই দাফন করা হবে।” অতএব প্রত্যেক গর্ত খনন করলৈা এবং সকলে মৃত্যুর অপেক্ষায় রইলো। তারপর আবদুল মুত্তালিব সাথীদেরকে বল্লেন, “আমরা নিজেদেরকে অযথা মৃত্যুর কাছে সুপর্দ করছি। এসো, সাহক করে চলতে থাকে, সম্ভবতঃ কোথাও পানি পাওয়া যাবে।” তারপর তারা সকলে চলার জন্যে তৈরী হলো, কিন্তু খোরদ কুদরত এই যে, আবদুল মুত্তালিব যখন তাঁর উটকে উঠালেন এবং তাঁর পা মাটিতে পড়লো ত হটাৎ তার নীচে থেকে মিষ্টির পানির ঝর্ণা বের হলো। আবদুল মুত্তালিব ও তার সাথীগণ তার জন্যে উচ্চস্বরে নারায়ে তাকবীর বল্লো। তারা উঠ থেকে নেমে তৃপ্তিসহকারে পানি পান করলো এবং নিজেদের মশকগুলো পানিতে পূর্ণ করে নিল। তারপর অন্যান্য কুরাইশগণ যারা পনি দিতে অস্বীকার করেছিল, তাদেরকে আবদুল মুত্তালিব ডেকে বল্লেনস, “তোমরাও পান কর এবং মশক ভরে ভরে নাও।”

তারা সকলে এসে তৃপ্তি সহকারে পান করে বল্লো, “হে আবদুল মুত্তালিব! খোদাই তোমাদের বিরুদ্দে এবং তোমার সপক্ষে ফয়সালা করে দিয়েছেন। খোদার কসম, একন আর যমযম নিয়ে তোমার সাথে ঝগড়া করবনা। যে খোদা এ মরুভূমিতে তোমাকে পানি দিয়েছেন, সেই খোদা যমযমও তোমাকে দিয়েছেন। এখন নিজের পানির দিকেই ভালোভাবে ফিরে চল।”

এভাবে তারা সেই গণৎকারিকার নিকটে যাওয়ার পরিবর্তে মক্কা ফিরে চল্লো।

এ ‘সিকায়ার’ পদমর্যাদা- যার মধ্যে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যমযমের পানি পান করানো, জীবনভর আবদুল মুত্তালিবের কাছেই রয়ে গেল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আবু তালেব এ মর্যাদা লাভ করেন। কিন্তু আবু তালেত তাঁর উদারতার কারণে তাঁর শক্তি সামর্থেরও অধিক ব্যয় করতে থাকেন হাজীদের পানি, শরবত, দুধ, প্রভৃতি পান করাতে। যার জন্যে তাঁকে কয়েকবার তাঁর ভাই আব্বাসের নিকট থেকের ঋণ গ্রহণ করতে হয় এবং তা তিনি পরিশোধ করতে পারেন নি। অবশেষে হযরত আব্বাস এ শর্ত আরোপ করে বলেন, “এখন যদি আপনি পরিশোধ করতে না পারেন, তাহলে সিকায়ার মর্যাদা আপনাকে আমার জন্যে ছেড়ে দিতে হবে। এভাবে সিকায়াহ হযরত আব্বাস লাভ করেন। এ প্রাক-ইসলাম যুগের কথা। ইসলামর যুগেও এ পদমর্যাদা বনী আব্বাসেরই রয়ে যায়।

আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব

মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, যমযম খনন কালে যখন আবদুল মুত্তালিব দেখলেন যে, তাঁর সাথে শুধু তাঁর এক পুত্র আছে এবং কুরাইশগণ সকলে এসে ঘেরাও করে রইলো তখন তিনি মানত করলেন, যেন আল্লাহ তাঁকে দশপুত্র দান করেন তাঁর সহযোগিতা করার জন্যে। তাহলে তিন তাদের একজনকে কাবার পাশে আল্লাহর পথে কুরবানী করবেন। আল্লাহ তাঁর এ দোয়া পূরেণ করেন এবং দশপুত্র দান করেন। তারা সব যৌবনে পদার্পণ করে। অবশেষে একদিন আবদুল মুত্তালিব সবাইকে একত্র করেন। তারা সব যৌবনে পদার্পণ করে। অবশেষে একদিন আবদুল মুত্তালিব সবাইকে একত্র করেন এবং তাঁর মানতের কথা তাদেরকে বলেন। সকলে বলে, “আল্লাহর নিকটে যে মানত আপনি করেছেন তা পূরণ করুন।” এ কথা শুনে আবদুল মুত্তালিব সকল পুত্রকে নিয়ে কাবায় হুবাল নামে এক প্রতিমার নিকটে গেলেন। এখানে ফাল বের করা হয়। তাঁর দশপুত্রের মধ্যে কোন্‌ পুত্রকে তিনি কুরবানসী করবেন এজন্যে তিনি ফাল বের করলেন এবং তাতে হযরত আবদুল্লাহর নাম বের হলো যিনি সকল পুত্রের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ছিলেন। এবং আবদুল মুত্তালিবের অতি প্রিয় পুত্র ছিলেন। [কোন কোন জীবনী লেখক একথা বলেছেন যে, হযরত আবদুল্লাহ আবদুল মুত্তালিবের সর্বকনিষ্ট পুত্র ছিলেন। একথা ভুল। মুহায়লী বলেন, হযরত আবদুল্লাহর অনেক ছোট হযরত হামযা (রা) এবং হযরত আব্বাস (রা) ছিলেন। হযরত হামযার (রা) বয়স রসূলুল্লাহ (স) থেকে চার বছর বেশী ছিল এবং হযরত আব্বাস (রা) ছিলেন তিন বছরের বড়ো। হযরত আব্বাসের (রা) নিজের বর্ণনা এই যে, হযুর (স) যখন পয়দা হন তখন তিনি তিন বছরের ছিলেন। তিনি বলেন, “আমার মনে আছে যে ঘরের মেয়েরা আমাকে হুযুর (স) এর নিকটে এনে বল্লো, “ভাইকে আদর কর।” তখন আমি আদর করলাম (রওযুল উনুফ)- গ্রন্থকার।]

আবদুল মুত্তালিব বিনা দ্বিধায় আবদুল্লাহর হাত ধরে ছুরি হাতে নিয়ে ইসাফ ও নায়েলা মূর্তি দুটোর নিকটে নিয়ে চলেন তাঁকে জবেহ করার জন্যে। কুরাইশরা এটা দেখতে পেয়ে আপন আপন বৈঠক থেকে উঠে দৌড় দিল এবং বল্লো- “আরে আবদুল মুত্তালিব। এ কর কি? তুমি এমন করলে প্রতিদিনি কেউ না কেউ তার পুত্র এনে জবেহ করতে থাকবে। চল, হিজাযে অমুক মেয়েলোকটির কাছে যাই। সে যা বলে তাই করো। সম্ভবতঃ সে এ সমস্যার কোন সমাধান বলে দেবে।” [সুহায়লী স্ত্রীলোকটি কুত্‌বা বলে উল্লেখ করেছেন। সে মদীনার নিকটে হিজর নামক স্থানে বাস করতো-গ্রন্থকার।]

এ প্রস্তাব অনুযায়ী তারা মদীনায় গিয়ে পৌঁছলো এবং জানতে পারলো যে, সে স্ত্রীলোকটি খয়বরে থাকে। তার কাছে গিয়ে তারা সব কথা বল্লো। সে জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের ওখানে লোকের মুক্তিপণ কত হয়ে থাকে?

তারা বল্লো, দশ উট।

সে বল্লো, “চলে যাও এবং একথার উপর ফাল বের কর যে আবদুল্লাহকে কুরবানী করা হবে, না দশটি উট। যদি ছেলের নামের ফাল রেব হয় তাহলে দশ উট আরও বাড়িয়ে দাও এবং ফাল বের কর। এভাবে দশ দশ উট বাড়িয়ে ফাল বের করতে থাক। তখন উটের নামে ফাল বেরুবে, তখন তার অর্থ এই হবে যে, তোমাদের রব পুত্রের পরিবর্তে এতো সংখ্যক উট কুরবানীর উপর রাজী হয়েছেন।”

আররাফা মহিলাটির একথা মেনে নিয়ে তারা সকলে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করে ফাল বের করতে শুরু করে। দশ বিশ তিরিশ এমনকি নব্বই পর্যন্ত আবদুল্লাহরই নামই উঠতে থাকে। অবশেষে একশত উটে পৌছার পর ফাল উটের উপর বের হয়। কুরাইশের লোকেরা বলে, এখন ত তোমার রবের মর্জি বুঝা গেল। আবদুল্লাহকে ছেড়ে এখন উট জবেহ কর।

কিন্তু আবদুল মুত্তালিব মানলেন না। তিনি বল্লেন আমি আরো তিন বার ফাল বের করাব। অতএব তিনবার পাশার ঘুঁটি ফেলা হলে এবং তিন বারই উটের উপর ঘুঁঠি পড়লো। [এর থেকে জানা গেল যে, আরবে প্রথমে মানুষের মুক্তিপণ ছিল দশ উট। এ ঘটনার পর আরববাসীর একশত উটই স্বায়ীভাবে মানুষের মুক্তিপণ হিসাবে গণ্য করে।] অতঃপর আবদুল মুত্তালিব একশ’ উট জবেহ করলেন এবং জন সাধারণে মধ্যে প্রচার করে দিলেন যে মানুষ, পশু এমনকি হিংস্র জীবনও যতো খুশী গোশ্‌ত নিয়ে যেতে পারে।

এভাবে আর একবার ইব্রাহীমের (আ) বংশধরদের মধ্যে কুরবানীর সেই ঘটনার পুনাবৃত্তি করা হলো যা মক্কার এ সৌভাগ্যবান পরিবারটির পুনর্বাসনের সূচনা ঘটেছিল। যদিওমূলনীতি ও অর্থের দিক দিয়ে উভয় ঘটনার মধ্যে বিরাট তফাৎ রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালার কর্মকান্ডের রহস্য উদ্ভূত। প্রথমে এ পরিবারের সেই প্রথম ব্যক্তির কুরবানী অন্য এক ভাবে চাওয়া হয়েছিল যার থেকে আরবে দ্বীন ইসলামের দাওয়াতের সূচনা করতে হয়েছিল। এখন সেই আখেরী নবী (স) এর পিতার কুরবানী অন্যভাবে চাওয়া হলো, যে নবীকে সমগ্র বিশ্বমানবের কাছে সেই দাওয়াত প্রচার ও প্রসারে কাজ করতে হয়েছিল। প্রথম কুরবানীর মুক্তিপণ ছিল একটি দুম্বা এবং দ্বিতীয়টির একশত উট।

হযরত আবদুল্লাহর বিবাহ

হযরত আবদুল্লাহর বয়স পঁচিশ বছর, তখন তাঁর পিতা বনী যুহরা বিন কিলাবের সর্দার উহাব বিন আবদে মানাফের কন্যা আমেনা খাতুনের সাথে তাঁর বিবাহ দেন। আমেনা ছিলেন তাঁর কওমের সর্বোৎকৃষ্ট মেযে। কয়েক মাস দাম্পত্য জীবন যাপন করার পর হযরত আমেনা গর্ভবতী হন। এমন সময় স্বামী হযরত আবদুল্লাহ বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে ফিলিস্তিনের শহর গায্যায় গমন করেন। সেখান থেকে ফিরে মদীনা আসার পর তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি সংগীসাথীদেরকে বল্লেন, তোমরা সব মক্কায় চলে যাও, আমি আমার দাদীর পরিবার আদী বিন নাজ্জারের ওখানে থাকব। এক মাস পর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। দারুন নাবেগাতেল জুন্দীতে তাঁকে দাফন করা হয়।

তাঁর সাথীগণ মক্কায় পৌছে আবদুল মুত্তালিবকে হযরত আবদুল্লাহর অসুস্থতার কথা বলে। আবদুল মুত্তালিব তৎক্ষণাৎ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হারিসকে মদীনা পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাঁর মদীনা পৌছুবার পূর্বেই হযরত আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন।

 এ অত্যন্ত সহীহ রেওয়ায়েত যা সাধারণতঃ সকল জ্ঞানী ব্যক্তি মেনে নিয়েছেন। অথচ কোন কোন বর্ণনায় একথা বলা হয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহর ইন্তেকাল এমন সময়ে হয় যখন রসূলুল্লাহর (স) বয়স আটাশ মাস। কেউ দু’মাস, কেউ সাত মাসও বলেছেন। কিন্তু অত্যন্ত নির্ভরযোগৗ ও সর্বজন স্বীকৃত কথা এই যে, হুযুর আকরাম (স) যখন মাতৃগর্ভে তখন তাঁর পিতার ইন্তেকাল হয়। এ সত্যের প্রতিই কুরআন ইংগিত করে-

(আরবী**************)

-হে নবী। তিনি (তোমার বর) কি তোমাকে এতীম পাননি এবং তার পর আশ্রয়দান করেন নি?

 

তৃতীয় অধ্যায়

জন্ম থেকে নবুওতের প্রারম্ভ পর্যন্ত

শুভজন্ম

অবশেষে সে সময় এসে গেলা যার জন্যে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাতু ওয়াস সালাম তাঁর পরিবারে একটি অংশ পানি ও তরুলতাবিহীন বিজন উপত্যকা প্রান্তরে পুনর্বাসিত করেছিলেন এবং খানায়ে কাবা নির্মাণের সময় তিনি ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ) দোয় করেছিলেন-

(আরবী*****************)

-হে আমাদের রব। তুমি এদের মধ্যে স্বয়ং তাদেরই কওম থেকে এমন এক রসূলের আবির্ভাব ঘটাও যে তাদেরকে তোমার আয়াত শুনাবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা দেবে এবং তাদের জীবন পরিশুদ্ধ পরিমার্জিত করবে। (বাকারা: ১২৯)

এ শুযভ মুহূর্তটি আসার কিছুকাল পূর্বে আবরাহা ষাট হাজার সৈন্যসহ তার ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে এসেছিল। কিন্তু ষাট হাজার কেন, যদি সে ষাট লাখও নিয়ে আসতো, তাহলেও সেই পরিণাম হতো, যা হয়েছিল। যেখানে আল্লাহ তায়ালার এতো বিরাট পরিকল্পনা ক্রিয়াশীল যে এ স্থানে এমন সত্তাকে আনা হবে যিনি দুনিয়ার ইতিহাস বদলে দেবেন, যিনি সকল নবীর শেষ নবী এবং যার আগমনের জন্যে আড়াই হাজার বছর ধরে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে, সেখানে যতো বড়ো মানবীয় শক্তিই হোক না কেন তা আল্লাহর শক্তির সাথে সংঘর্ষে চূর্ণ বিচূর্ণ না হয়েই পারে না।

মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে প্রায় একমত যে আসহাবে ফীলের ঘটনা (মক্কায় আবরাহার আক্রমণ) মুহার্‌রম মাসে সংঘটিত হয়। রসূলুল্লাহর (স) জন্ম রবিউল আউয়াল মাসে হয়। আর তা হয়েছিল সোমবার দিনে। একথা স্বয়ং নবী (স) জনৈক বেদুঈনের প্রশ্নের জবাবে বলেন- (সহীহ মুসলিম, বর্ণনাকারী কাতাদাহ)।

রবিউল আউয়ালের কোন তারিক ছিল এতে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ইবনে শায়বা হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এবং হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) এ উক্তি উধৃত করে বলেন যে, তিনি ১২ই রবিউল আউয়ালে পয়দা হন। এরই ব্যাখ্যা করেছেন মুহাম্মদ বিন ইসহাক এবং অধিকাংশ জ্ঞানীগুণীদের মতে এ তারিখই প্রসিদ্ধ। হাতির ঘটনা এবং হুযুতেরর (স) জন্মের মধ্যে ব্যবধান কতটা এ ব্যাপারেও মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে সর্বজনবিদিত কথা এই যে এঘটনার পঞ্চাশ দিন পর হুযুর (স) জন্মগ্রহণ করেন। সৌর ও চন্দ্র মাস ও বছরের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এক জটিল ব্যাপার। এ জন্যে নিশ্চয়তার সাথে একথা বলা মুশকিল যে জন্মের সৌর সাল ও মাস কি ছিল। সাধারণতঃ তাঁর জন্মমাস ৫৭০ খৃঃ অথবা ৫৭১ খৃঃ বলা হয়। সুহায়লী রওযুল উনুফে ২০ শে এপ্রিল বলেছেন কিন্তু সাল উল্লেখ করেননি। কতিপয় গবেষক বলেছে ২৩শে এপ্রিল ৫৭১ খৃঃ। মাহমুদ পাশা ফালাকী ২০শে এপ্রিল ৫৭১খৃঃ বলেছেন এবং তাঁর মতে তা ছিল ৯ই রবিউল আউয়াল রোজ সোমবার। কসীন ডি পার্সিতাল (CAUSSIN DE PERCEVAL) তার গ্রন্থ আরবের ইতিহাসে ২০শে আগস্ট ৫৭০ খৃষ্টাব্দে নবীর (স) জন্মতারিখ বলে উল্লেখ করেছেন। হিট্টি বলেন, নবী (স) ৫৭১ খৃঃ অথবা তার কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। কতিপয় প্রাচ্যবিদ দু’বছঠর পেছনে দিয়ে ৫৬৯ খৃষ্টাব্দকে নবীর জন্মকাল বলে উল্লেখ করেছেন। শুভ জন্মকাল নির্ভারযোগ্য সূত্রে সূবহে সাতিক (প্রত্যুষ বা উষাকাল) বলা হয়েছে।

সুসংবাদ ও নাম মুবারক

নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত আছে যে, গর্ভাবস্থায় বিবি আমেনা স্বপ্ন দেখেন যে, তাঁর থেকে এমন এক নূর উদ্ভাসিত হয়েছে যে শাম পর্যন্ত আলোকিত হয়েছে। আর একবার স্বপ্নে তাঁকে বলা হলো, তোমার গর্ভে এ উম্মতের সর্দার রয়েছে। সে পয়দা হলে াতর নাম মুহাম্মদ রাখবে। ইবনে সায়াদ একটি বর্ণা উধৃত করেছেন যে, স্বপ্নে তাঁর নাম আহম রাখতে বলা হয়েছে, [পূর্ব আরবে মুহাম্মদ নাম কদাচিৎ কারো ছিল। কিন্তু কারো নাম আহমদ ছিল এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। এর কারণ যা আমরা তাফহীমুল কুরআন, পঞ্চমখন্ড, সূরা সফ, টীকা ৭-৮ এ বিস্তারিত বর্ণনা করেছি তা এই যে, আহলে কিতাবের মাধ্যমে কখনো কখনো আরববাসী একথা জানতে পারতো যে, আর একজন নবী আগমন করবেন যার নাম হবে মুহাম্মদ এবং তিনি ইসমাইল বংশে পয়দা হবেন। এ কথা শুনার পর আরবের কিছু লোক তাদের পুত্রের নাম মুহাম্মদ রাখতো, হয়তো সেই নবী হবে। নবী (স) এর পূর্বে যাদের নাম মুহাম্মদ ছিল কাযী ইয়ায তাদের সংখ্যা ছয় বলেছেন। ইবনে খালাওয়াই ও সুহায়লী বলেছেন তিন এবং আবদানুল মারওয়ারী বলেছেন চার। কিন্তু হাফেজ ইবনে হাজার ফতহুল বারীতে বলেন, আমি অনুসন্ধান করে এমন পনেরো জনের নাম জানতে পেরেছি। তারপর তিনি আল- ইসাবাতে বলেন, তাদের কিছু সংখ্যক নবীর যুগ পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। তিনি মুহাম্মদ বিন আদী বিন রাবিয়ার অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে লেখেন যে, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে জাহেলিয়াতের যুগে তাঁর পিতা মুহাম্মদ নাম কিভাবে রাখেন। জবাবে তাঁর পিতা একথা বলেন, আমরা শাম দেশে সফর করছিলাম। এমন ময়ে এক ঈসায়ী খানকায় পৌছলাম। খানকার দায়িত্বশীল বল্লেন, তোমাদের কওমের মধ্যে এক নবীর আগমন হবে- যে হবে আখেরী নবী। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, তার নাম কি হবে? তিনি বল্লেন- মুহাম্মদ। তারপর থেকে আমাদের ঘরে যে পুত্র সন্তান পয়দা হয় তার নাম মুহাম্মদ রাখা হয়- গ্রন্থকার।] সম্ভতঃ এ দুটি নাম দুটি ভিন্ন ভিন্ন বলে দেয়া হয়েছিল। কারণ এ উভয় নামই হাদীস থেকে প্রমাণিত। বহু বর্ণনায় বিবি আমেনার একথাও উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি যখন ভূমিষ্ট হন তখন আমি অনুভব করাছিলাম যে আমার ভেতর থেকে একটি নূর উদ্ভাসিত হয়েছে যার দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিম আলোকিত হযেছে। বায়হাকী এবং ইবনে আবদুল বার্ ওসমান বিন আবি আল্‌আস এর মায়ের এ বর্ণনা উধৃত করেন যে, হুযুরের (স) ভূমিষ্ট হওয়ার সময় তিনি বিবি আমেনার কাছে উপস্থিত ছিলেন। সে সময়ে যে দিকেই নজর পড়তো শুথু নূর আর নূরই দেখা যেতো। ভূমিষ্ট কালে ধাত্রীর কাজ করেন হযরত আবদুর রহমান বিন আওফের মাতা শিফা বিন্তে আওফ্‌ বিনতে আবদুল হারেস যুহরী।

জন্মের সপ্তম দিনে হযরত আবদুল মুত্তালিব তার আকীকা করেন এবং লোকদের খানার দাওয়াত দেন। খাওফর পর লোকের জিজ্ঞেস করলো, আবদুল মুত্তালিব তুমি তোমার যে সন্তানের জন্যে আমাদেরকে এ দাওয়াত খাওয়ালে তার নাম কি রাখলে?”

জবাবে তিনি বলেন, আমি তার নাম মুহাম্মদ রেখেছি। লোকেরা বল্লো- তুমি তোমার পরিবারের অন্যান্যদের নাম থেকে পৃথক কেন রাখলে?

জবাবে আবদুল মুত্তালিব বলেন, আমি চাই যে, আসমানে আল্লাহ এবং যমীনে তাঁর সৃষ্টি যেন তার প্রশংসা করে।

দারিদ্রের মধ্যে জীবনে সূচনা

হযরত আবদুল্লাহ বিয়ে কালে যুবকই ছিলেন এবং ব্যবসাররও সূচনা করেন। এমন সময় তাঁর ইন্তেকাল হয়। এজন্যে তিনি তাঁর এতীম শিশু ও স্ত্রীর জন্যে কোন বেশী ধনসম্পদ রেখে যেতে পারেননি। ইবনে সায়াদ বলেন, তিনি পাঁচটি উট, একপাল ছাগল এবং এক ক্রীতদাসী উত্তরাধিকার হিসাবে ছেড়ে যান। ক্রীতদাসী সেই উম্মে- আয়মান (রা) ছিলেন যিনি বড়ো স্নেহ সহকারে নবী (স) কে প্রতিপালন করেন। তাঁর আসল নাম ছিল বারাকা এবং তিনি ছিলেন হাবশী বংশোদ্ভূত। পরবর্তীকালে নবী (স) তাঁর মুক্ত গোলাম হযরত যায়েদ বিন হারিসা (রা) সাথে তাঁর বিয়ে দেন। তাঁদের পক্ষে উসামা বিন যায়েদ (রা) জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পবিত্র জীবনের এক গরীবানা অবস্থার উল্লেখ কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে-

(আরবী*************)

-আল্লাহ তোমাকে দরিদ্র পেয়েছিলেন এবং তারপর তোমাকে ধনশালী বানিয়ে দেন।

স্তন্য পান

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রথমে কিছুদিন আবু লাহাবের ক্রীতদাসী সুয়ায়বার দুধ পান করেন। বুখারী ও মুসলিমে আছে যে, তার দুধ হযরত আবু সালমাও (রা) [উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালমার প্রথম স্বামী], পান করেন। ইবনে সায়াদ ও ইবনে হিশাম বলেন, হযরত হামযা (রা) এবং আবদুল্লাহ বিন জাহশ (রা) তারই দুধ পান করেন। আবদুল্লাহ বিন জাহশ ছিলেন উম্মুল মুমেনীন হযরত যয়নবের (রা) ভাই। একারণেই তাঁরা ছিলেন নবী (স) এর দুধ ভাই। এ খেদমতের বিনিময়ে নবী (স) যৌবনে পদার্পণ করার পর হামেশা সুয়ায়বার সাথে অত্যন্ত সদাচরণ করেন। তাঁর শাদী হওয়ার পর হযরত খাদিজা (রা) তার সম্মান শ্রদ্ধা করেন এবং তার সাথে ভালো ব্যবহার করেন। তাপর হযরত খাদিজা তাকে খরিদ করে আযাদ করে দিতে চাইলেন কিন্তু আবু লাহাব অস্বীকৃতি জানায়। পরে সে নিজেই তাকে আযাদ করে দেয়। হিজরতের পরও নবী (স) তার জন্যে কাপড়-চোপড় ও পয়সা কড়ি পাঠাতেন। সম্পতম হিজরীতে নবী (স) তার মৃত্যু সংসাদ পাওয়ার পর তার পুত্র মাসরুহ-এর হাল হাকীকত জিজ্ঞেস করেন। সেও নবীর দুধভাই ছিল। জানা গেল যে তারও মৃত্যু হয়েছে এবং দুনিয়াতে তার কেউ নেই।

হালিমা সা’দিয়া

মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবার সমূহের এ নিয়ম ছিল যে, তাদের সন্তানদের দুগ্ধপানের জন্যে মরু এলাকার কোন ভালো ঘরে তাদেরকে পাঠিয়ে দিত, যাতে করে তারা সুন্দর ও উন্মুক্ত আবহাওয়অয় প্রতিপালিত হয় এবং বিশুদ্ধ আরবী ভাষা শিক্ষা করতে পারে। এ উদ্দেশ্যে বহিরাঞ্জলের গোত্রগুলো থেকে মেয়েলোক সময়ে সময়ে মক্কায় আসতো। তারা সর্দারদের সন্তানদের নিয়ে যেতো এবং ন্যায়সংগত পারিশ্রমিক লাভ করতো। পরেও তারা সদাচরণ আশা করতো। এ ব্যাপারে নবী (স) এর জন্মের কিছুদিন পর হাওয়াযেন গোত্রের একটি শাখা বনী সায়াদ বিন বকর-এর কতিপয় স্ত্রীলোক সন্তান লাভের জন্যে মক্কায় এলো। হালিমা বিন্তে আবু যায়াইব স্বামী হারিস বিন আবদুল্লাহ সহ তাদের মধ্যে শামিল ছিলেন। ইবনে হিশাম হালিমার নিজের বর্ণনা উধৃত করেন যাতে হালিমা বলেন, আমারেদ অবস্থা বড়ো শোচনীয় ছিল। আমাদের এলাকা দুর্ভিক্ষ পীড়িত ছিল। অন্যান্য মহিলাদের তুলানয় আমাদের অবস্থা অধিকতর খারাপ ছিল। আমাদের গাধী এতো দুর্বল ছিল যে কাফেলার পেছনে পড়ে থাকতো। আমাদের উটনীও বেশী দুধ দিত না। আমার স্তনেও দুধ এতা কম ছিল যে সন্তানদের পেট ভরাতে পারতাম না। রাতভর কাঁদতো এবং আমরাও ঘুমাতে পারতামনা। মক্কায় পৌঁছে জানতে পারলাম যে কোন মহিলা নবী (স)- কে নিতে রাজী নয়। প্রত্যেকেই বলতো সে এতীম। বাপ থাকলে কিছু ভালো আচরণ আশা করতাম। বিধবা মা ও দাদার থেকে কিছু পাব কি না পাব বলা যায় না।

হযরত হালিমা বলেন, অন্যান্য মেয়েলোক অন্যান্য ছেলেপুলে নিয়ে নিল, আমার ভাগ্যে একটিও জুটলো না। সকলে যখন বাড়ি ফেরার জন্যে তৈরী হলো তখন আমি স্বামীকে বল্লাম, ‘আমি খালি হাতে যাওয়াটা পছন্দ করছিনা। গিয়ে ঐ বাচ্চাকে নিয়ে নিচ্ছি।’

আমার স্বামী বল্লেন, তুমি এমন করলে তাতে আর দোষ কি। হতে পারে যে, আল্লাহ তার বদৌলতে আমাদেরকে বরকত দেবেন।

অতএব আমি গিয়ে সেই বাচ্চাকে এ জন্যে নিলাম যে, আর কোন বাচ্চা আমি পেলাম না। তারপর নিজের অবস্থানের তাঁবুতে গিয়ে ঐ সন্তানের মুখে আমার স্তন রাখলাম ত দেখি যে এতো প্রচুর পরিমাণে দুধ বেরুলো যে, সেও তৃপ্তি সহকারে পান করলো এবং তার শরীক দুধভাই আবদুল্লাহ পেটভরে পান করলো। তারপর আমার স্বামী উটনীর দুধ দুইতে গেলে সে এতো দুধ দিল যে আমরা উভয়ে তৃপ্তি সহ পান করলাম এবং রাতটাও আরামে কাটলো। পরদিন ভোরে আমার স্বামী বল্লো- “খোদার কসম, হালিমা তুমি ত বড়ো মুবারক বাচ্চা নিয়েছ।”

হালিমা আরও বলেন, ফেরার পথে আমাদের গাধীর অবস্থা এই ছিল যে, সে কাফেলার সকল সওয়ারী পশুকে পেছনে ফেলে চলতে লাগলো। আমার সহযাত্রী স্ত্রীলোকগণ বলতে লাগলো, হালিমা। একি তোমার সেই গাধী যার উপর চড়ে তুমি আমাদের সাথে এসেছিলে?

বল্লাম- হাঁ

তারা বল্লো, আল্লাহর কসম। তার অবস্থাই ত একেবারে বদলে গেছে।

হালিমা বলেন, আমরা যখন বাড়ি পৌছলাম ত দুনিয়ার বুকের উপর হয়তো বা কোন এলাকা সে সময়ে এতোটা অনুর্বর ছিল না যতোটা ছিল আমাদের। কিনতু ছাগলগুলো যেখানেই চরতে যেতো পেট ভরে ঘাস খেয়ে আসতো এবং প্রচুর দুধ দিত। এভাবে আমরা দিন দিন ঐ শিশুর বরকত বেশী বেশীই দেখতে পেতাম। দুবছর অতীত হওয়ার পর যখন দুধ ছাড়াবার সময় এলো তখন সন্তানটি সকল গোত্রের সন্তানদের অপেক্ষা অধিকতর স্বাস্থ্যবান ও শক্তিশালী ছিল।  এমন মনে হতো যেন চার বচরে শিশু। আমরা তাকে মক্কায় তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম। কিন্তু আমাদের মন চাইছিল যে সে আমাদের কাছে আরও কাল থাক। আমি তার মাকে বল্লাক, আমার এ বাছাধনকে আমার কাছে আরও কিছুকাল থাকতে দিন যাতে সে আরও বড়ো ও মোটাসোটা হয। আমার ভয় হয়, মক্কার আবহাওয়া তার স্বাস্থ্য খারাপ করে না দেয়।

মোটকথা আমি এতোটা পীড়াপীড়ি করলাম যে, তিনি তাকে আমার সাথে পাঠাতে রাজী হয়ে গেলেন। ইবনে সায়াদ বলেন, এভাবে হুযুর (স) আরও দু’বছর হালিমার ওখানে রয়ে গেলেন।

বক্ষ বিদারণ

হালিমা বলেন, বাড়ি ফেরার পর দু’তিন মাস অতীত হয়েছে। এমন সময় একদিন সে শিশু তার দুধভাইযের সাথে আমাদের বাড়ির পেছনে আমাদের ছাগল দলের সাথে ছিল, তখন হঠাৎ তার দুধভাই দৌড়ে এসে বল্লো, ‘আমার সেই কুরায়শী ভাইয়েল সাদা পোষাকে দুজন লোক এতে তার পেট ফেড়ে ফেল্লো।’ আমি এবং আমার স্বামী দৌড়ে দিয়ে দেখলাম শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে এবং তার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। তার বাপ তাকে জড়িয়ে ধরে বল্লো- বাছা, তোমার কি হয়েছে? সে বল্লো, সাদা পোষাক পরিহিত দুজন লোক এসে আমাকে ফেলে আমার পেট চিরে ফেল্লো। তারপর তার মধ্যে থেকে কিছু বের করে ফেলে দিল এবং পেটকে আগের মত করে দিল। অন্য বর্ণনায় আছে, তারা আমার পেটে কোন কিছু তালাশ করতে থাকে। জানিনা তা কি? [উল্লেখ্য যে এক বক্ষ বিদারণের ঘটনা খোদার একটি রহস্য যা মানুষ উদঘাটন করতে পারে না। নবীদের (আ) সাথে এরূপ অসংখ্য আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটেছে যার কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায় না। কিন্তু ব্যাখ্যা না জানা তা অস্বীকার করার কোন সংগত কারণ নয়- গ্রন্থকার।]

হালিমা বলেন, তাকে বাড়িতে আমার পর আমার স্বামী বল্লেন, হালিমা আমার ভয় হচ্ছে তার কিছু না হয়ে যায়। তাকে তার বড়ি পৌঁছে দেয়াই ভালো হবে। সুতরাং আমরা তাকে তার মায়ের কাছে মক্কায় নিতে গেলাম।

তার মা বল্লেন, কি হলো আন্না (স্তন্য দানের জন্যে নিযুক্ত ধাত্রী), একে নিয়ে এলে যে? তুমি ত তাকে তোমার কাছে রাখতে চেয়েছিল। আমি বল্লাম, আল্লাহ বাচ্চাকে বড়ো করে দিয়েছে। আর আমার যে দায়িত্ব ছিল তা পুরো করে দিয়েছি। এখন আমার ভয় হয়, তার কোন দুর্ঘটনা না হয়ে যায়।

বিবি আমেনা বল্লেন, আসল কথাটা কি আমাকে বলো।

তাঁর পীড়াপীড়িতে হালিমা পুরো ঘটনা তার কাছে বলে ফেল্লেন।

বিবি আমেনা বল্লেন, এ বাচ্চার ব্যাপারে কি তোমার শয়তানের ভয় হয়?

হালিমা বল্লেন- হাঁ।

বিবি আমেনা  বল্লেন, খোদার কসম, তার জন্যে শয়তানের পথ খোলা নেই, আমার এ বাচ্চা বিরাট মর্যাদার অধিকারী।

তারপর বিবি আমেনা তাকে গর্ভকালের ও ভূমিষ্ট হওয়ার কালের অবস্থা শুনিয়ে দেন।

শৈশস কালে নবী পাক (স) এর মরুভূমিতে এ অবস্থানের কারণে তার আরবী ভাষা অত্যন্ত বিশুদ্ধ হয়েছিল। কারণ তিন ছিলেন কুরায়শী এবং বনী সায়াদের মধ্যে তিনি তাঁর শৈশব কাল কাটিয়েছেন, যাদের ভাষা ছিল বিশুদ্ধ আরবী। এর ভিত্তিতেই নবী (স) বলেন- (আরবী****************)

-আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আরবী জানি। আমি কুরায়শী এবং আমার স্তন্য পানের সময় কাটিয়েছি বনী সায়াদ বিন বকরে পরিবারের মধ্যে।

সুয়াইবার মতো হালিমার সাথে নবী (স) হামেশা অত্যন্ত মহব্বতের সাথে সদাচরণ করেন। হযরত খাদিজার (রা) সাথে নবী (স) এর বিয়ে হবার পর একবার তিনি (বিবিহালিমা) এসে বল্লেন, আমাদের এলাকায় ভয়ানক দুর্ভিক্ষ হয়েছে এবং গৃহপালিত পশু সব মরে গেছে।

তাঁর কথা শুনে নবী (স) তাকে চল্লিষটি ছাগল এবং এক উট বোঝাই পণ্যদ্রব্য দান করলে। ইবনে সা’দ বিন মুহাম্মদ বিন মুনকাদারের বর্ণনা উধৃত করে বলেন, একজন মহিলা হুযুরের (স) দরবারে হাজীর হওয়ার অনুমতি চাইলেন, যে তাঁকে শৈশবে স্তন্য দান করেছিল। সে যখন এলো তখন নবী (স) “আম্মা আসুন, আসুন বলতে বলতে তাঁর চাদর বিছিয়ে তাকে বসতে দিলেন।

ফতেহ মক্কার সময় হালিমার ভগ্নি নবীর খেদমতে হাজীর হয়ে হালিমার মৃত্যু সংবাদ দিল। শুনে নবী (স)  এর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাদলো। তারপর নবী (স) তাকে ‍দু’শ দিরহাম, কাপড় চোটড় এবং গদিসহ একটা উট দান করলেন। হাওয়াযেন যুদ্ধে যারা বন্দী হয়ে এলো তাদের মধ্যে হালিমার সে মেয়ে শাইমাও ছিল যে নবী (স) তাঁর শৈশব কালে কোলে করে নিয়ে বেড়াতো। তাকে দেখে নবী (স) চিনতে পারলেন, স্নেহপূর্ণ আচরণ করলেন এবং তাকে সম্মানে তার পরিবার বর্গের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। হাওয়াযেন প্রতিনিধি যখন নবী (স) এর নিকটে করুণা ভিক্ষা চাইলো এবং বল্লো ‘এসব বন্দীদের মধ্যে আপনার খালারাও আছে, দুধমাতারাও আছে’ তখন নবী (স) বল্লেন, যা আমার এবং বনী আবদুল মুত্তালিবের অংশ আছে তা আমি ছেড়ে দিলাম। এভাবে ছ’ হাজার কয়েদী মুক্ত হয়ে গেল্ যে সম্পদ তাদেরকে ফের’ দেয়া হলো তার মূল্য পঞ্চাশ কোটি দিরহাম। নবী (স) এর পরে হযরত আবু বকর (রা) এবং হযরত ওমর (রা) ও এ পরিবারের প্রতি বিশেষ নজর রাখতেন এবং তাঁদের সাথে ভালো ব্যবহার ও সম্মান প্রদর্শন করতেন।

নবী মাতার ইন্তেকাল

ইবনে সা’দ ও ইবনে ইসহাক বলেন, নবী মুহাম্মদ (স) এর বয়স যখন ছ’বছর এবং ইবনে হাযম ও ইবনুল কাইয়েমের মতে [বিবি হালিমা সম্পর্কে ইবনে কাসীর বলে যে নবী মুহাম্মদ (স) এর নবুয়তের পূর্বে তাঁর (হালিমার) ইন্তেকাল হয়। কিন্তু ইবনুল বারর তাঁর ইস্তিয়অবে আতা বিন ইয়াসারের বর্ণনা উধৃত করে বলেন, নবী (স) এর দুধমাতা হালিমা যখন হুনাইন যুদ্ধের সময় নবীর দরবারে আগমন করেন, তখন তাঁকে দেখামাত্র নবী (স) দাঁড়িয়ে যান এবং স্বীয় চাদর বিছিয়ে বসতে দেন। ইবনুল বার আরও বলেন, যে হযরত হালিমা (রা) নবী (স) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর থেকে হযরত আবদুল্লাহ বিন জা’ফর রেওয়ায়েত করেছেন। হাফেজ আবু ইয়ালা ও ইবনে হুব্বান আবদুল্লাহ বিন জাফরের (রা) বরাত দিয়ে হযরত হালিমার রেওয়ায়েত লিপিবদ্ধ করেন। হাফেজ ইবচনে হাজার ইসাবায় হালিমার স্বামী সম্পর্কে ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, তিনি মক্কায এসে নবী (স) এর খেদমতে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু ইবনে সাদ বলেন, ইনি হারেমের পুত্র আবদুল্লাহ নবীর দুধভাই। ইবনে হাজার ইসাবায় উল্লেখ করেন যে শায়মা মুসলমান হয়েছিলেন- গ্রন্থকার।] যখন সাত বছর, তখন বিবি আমেনা নবীর পরদাদীর (আবদুল মুত্তালিবের মাতা) পারিবার বনী আদী বিন নাজ্জারের সাথে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে উম্মে আয়মান সহ শিশু মুহাম্মদগকে নিয়ে মদীনায় যান এবং এক সাম কাল অবস্থান করেন। তিনি শিশু মুহাম্মদকে সে স্থানটি দেখান যেখানে তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। যেখানে তাঁকে দাফন করা হয় সে স্থানটিও দেখিয়ে দেন। এ সফরের ঘটনা শিশু মুহাম্মদের (স) পরবর্তীকালে ভালোভাবে স্মরণ থাকে। হিজরতের পর যখন তিনি মদীনায় গমন করেন, তখন তাঁর মায়ের সাথে শৈশব কালের এ ঘটনা তাঁর সংগী সাথীদেরকে শুনাতেন। বনী আদী বিন নাজ্জারের ঘাঁটি দেখামাত্র তিনি চিনতে পারেন। তিনি বলতেন,- “এখানে আমি এক আনসার বালিকা উনায়সার সাথে খেলা করতাম। দাদার নানীবাড়ির ছেলেদের সাথে যেসব পাখী এখানে পড়তো তাদেরকে উড়িয়ে দিতাম।

দারুন্নাবেগা দেখে তিনি বলেন- “এখানে এসে আমি আমার আম্মার সাথে নেমে পড়ি এবং এ ঘরেই আমার আব্বার কবর হয়েছে। আমি বনী আদী বিন নাজ্জারের ঝর্ণাগুলোতে সাঁতার কাটার অভ্যাস করতাম।”

তাপর নবীকে (স) নিয়ে তার আম্মা যখন মক্কা রওয়ানা হলেন এবং আবওয়া নাম স্থানে পৌছলেন তখন তাঁর ইন্তেকাল হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। উম্মে আয়মান নবীকে (স) নিয়ে মক্কায় পৌছেন। ইবনে সা’দ বলেন, যে স্থানে নবীর আম্মাকে দাফন করা হয়েছিল, তাও তাঁর স্মরণ ছিল। সুতরাং ওমরয়ে হুদায়বার সময় যখন তিন আবওয়ার উপর দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন বলেন: (আরবী***********************)

-আল্লাহ মুহাম্মদকে (স) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দেন। তারপর তিনি (নবী (স)) সেখানে গেলেন। কবর ঠিক ঠাক করে দিলেন এবং কেঁদে ফেল্লেন। তাঁর কান্না দেখে মুসলমানগণও কেঁদে ফেল্লেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি ত কাঁদতে নিষেধ করেছেন। তদুত্তরে তিনি বল্লেন- (আরবী******************)

-তাঁর দয়া স্নেহ মমতা আমার মনে পড়লো এবং আমি কেঁদে ফেল্লাম।

হুযুর (স) এর স্বীয় মাতার কবরে যাওয়া এবং কান্নায় ভেঙ্ড়ে পড়া উল্লেখ বিভিন্ন হাদীসে রয়েছে। মুসনাতে আহমাদ, বায়হাকী এবং তাবাকাতে ইবনে সা’দে হযরত বুরায়দাহ (রা) হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) এবং হযরত আবু হুরায়রাহ থেকে এসব বর্ণিত আছে।

আবদুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে

বিবি আমিনার মৃত্যুর পর নবী (স) এর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে নিজের নিকটেই রাখলেন এবং তাঁর সকল অপেক্ষা তাঁকেই বেশী চাইতেন। এ জন্যে তাঁকে সর্বদা কাছে রাখতেন। নিকটে বসাতেন এবং যখন খুশী তখন তাঁর কাছে যেতেন- তা একাকীই থাকুক অথবা ঘুমের মধ্যে। তাঁর ভয়ে অন্যান্য সন্তান এ সাহস করতো না। তিনি সাথে না বসলে আবদুল মুত্তালিব খানা খেতেননা কখনো কখনো খাবার সময় তাঁকে কোলে বসিয়ে নিতেন। খানায়ে কাবার দেয়ালের ছায়ায় তার জন্যে একটা বিছানা বিছিয়ে রাখা হতো এবং তাঁর সম্মানের জন্যে সে বিছানায় অন্য কোন সন্তান বরতো না। তার চারপাশে বসতো। সুঠামদেহী বালক মুহাম্মদ (স) সোজাসুজি সে বিছানায় বসে পড়তেন। তাঁর চাচা তাঁকে উঠে যেতে বল্লে, আবদুল মুত্তালিব বলতেন ‘আমার বাছাকে থাকতে দাও। খোদার কসম, তার মর্যাদাই আলাদা। আশা করা যায় সে এমন মর্যদা লাভ করতে ইতঃপূর্বে কোন আরব এমন মর্যাদা লাভ করেনি।

কোন কোন বর্ণনায় পাওয়অ যায় যে, আবদুল মুত্তালিব বলতেন- “তার বড়ো শাহী মেজাজ।” তারপর তাঁকে (শিশু মুহাম্মদকে) কাছে বসিয়ে পিঠে ও মাথায় হাত বুলাতেন, মুখে চুমো দিতেন এবং তাঁর নড়ন চড়ন দেখে বড়ো আনন্দ পেতেন।

ইবনে সা’দ বলেন, বনী মুদলেজ গোত্রের লোক ব্যক্তির চেহারা ও দৈহিক গঠন দেখে তার ভবিষ্যৎ বলতে পারতো। তারা আবদুল মুত্তালিবকে বল্লো “এ শিশুর বিশেষভাবে দেখাশেুনা করবে। কারণ আমরা এমন কোন পদচিহ্ন দেখতে পাইনি যা মাকামে ইব্রাহীমের উপর হযরত ইব্রাহীমের (আ) পদচিহ্নের অনুরূপম, যেমন এ শিশুর পদচিহ্ন অনুরূপ।”

এ সময়ে সেখানে আবু তালিব উপস্থিত ছিলেন, আবদুল মুত্তালিব তাঁকে বলেন, এরা যা বলছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনে রাখ এবং হেফাজত কর।

কিন্তু দাদার এ স্নেহ বাৎসল্য শিমু মুহাম্মদ (স) বেশী দিন লাভ করতে পারেননি। তাঁর বয়স যখন আট বছর, তখন দাদা ইন্তেকাল করেন। ইবনে সা’দ এবং হাফেজ সাখাবী উম্মে আয়মানের এ বর্ণনা উধৃত করেন। উম্মে আয়মান বলেন, আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর সময় নবী (স) তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন।

পরবর্তীকালে নবীকে (স) যখন জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনার দাদার মৃত্যুর  কথা কি আপনার মনে পড়ে?” তিনি বলেন, হাঁ তখন আমার বয়স আট বছর।

হযরত আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে]ৎ

আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর, কোন কোন বর্ণনা মতে তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী এবং কোন কোন বর্ণনা মতে, হযরত আবু তালিব স্বেচ্ছায় নবীর প্রতিপালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম ছিল আবদে মানাফ। কিন্তু তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র তালিবের কারণে তাঁর কুনিয়াত আবু তালিব এতোটা প্রসিদ্ধি লাভ করে যে আসল নাম চাপা পড়ে যায়। বালত তালিব নবী (স) এর সমবয়স্ক ছিল এবং ‍উভয়ের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ছিল। কুরাইশগণ যখন বদর যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে বনী হাশিমতে বাধ্য করে তখন তালিবও তাদের মধ্যে ছিল। সে যুদ্ধে অংশগ্রহণও করেনি নিহতদের তালিকায় তার নামও ছিল না এবং সে মক্তায়ও প্রত্যাবর্তন করেনি। তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি।

আবু তালিব নবী (স) এর আপন চাচা ছিলেন। তিনি ভাইপোকে আপন সন্তানদের চেয়ে অধিক ভালো বাসতেন। নিজের কাছেই শয়ন করাতেন এবং যেখানেই যেতেন সাথে করে নিয়ে যেতেন। আহারের সময় তিনি (নবী মুহাম্মদ) এসে শরীক হলেই অন্যান্যগণ খাওয়া শুরু করতো। ওয়াকদী বিভিন্ন সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবু তালিবের পরিবারস্থ লোকজন নবী মুহাম্মদকে (স) ছেড়ে যদি আহার করতো, তা একা একা করুক অথবা একত্রে, তাদের কারো পেটভরতো না। কিন্তু নবী মুহাম্মদ তাদের সাথে আহার করলে পেট ভরে খাওয়ার পর খানা বেঁচে যেতো। তাঁর এ বরকত লক্ষ্য করে আবু তালিব এ নিয়ম করে দেন যে, আহার করতে বসলে বলতেন –“দাড়াও আমার বাছাকে আসতে দাও।” তারপর হুযুর (স) এলে সকলে খানা খাওয়া শুরু করতো। আবু তালিব বলতেন, বাছা, তুমি বড়োই মুবারক (বরকতের অধিকারী। খানা খেতে বসে ছেলেপুলেরা তাদের অভ্যাসমতো কাড়াকাড়ি শুরু করলে হুযুর (স) হাত গুটিয়ে বসে থাকতেন। এ অবস্থা দেখে আবু তালিব তার জন্যে পৃথক এবং নিজের জন্যে পৃথক খানার ব্যবস্থা করতেন। মাদুর বিছানো হতো এবং সেখানেই আর কেউ বসতো না। শুধু হুযুর (স) তাঁর সাথে বসে যেতেন। আবু তালিব বলতেন, রাবিয়অর খোদার কসম, আমার এ বাছাধনের সর্দারি শোভা পায়।

নবীর ছাগল চরানো

সম্ভবতঃ এ সে সময়ের ঘটনা যখন হুযুর (স) চাচার আর্থিক দুরবস্থা এবং সেই সাথে চাচার বিরাট পরিবার দেখে স্বয়ং কিচু উপার্জনের চিন্তা করে থাকবেন। শৈশব কালে দুধমাতার গৃহে অবস্থান কালে তিনি তাঁর দুধভাই- ভগ্নির সাথে তাদের পরিবারের ছাগল চরাতেন। জ্ঞানবুদ্ধি হওয়ার পর এ কাজ তিনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কায় শুরু করেন। হাদীসে ওবাইদ বিন ওমাইরের এরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় যে, হুযুর (স) বলেন, কোন নবী এমন ছিলেন না যিনি ছাগল চরান নি। লোকে জিজ্ঞেস করে, আপনিও কি ছাগল চরিয়েছেন? বলেন, হ্যাঁ।

বুখারী কিতাবুল ইজারায় হযরত আবু হুরায়রার (রা) একটি বর্ণনা আছে। তাতে এ প্রশ্নের জবাবে হুযুর (স) বলেন আমি কিছু কারারিতের বিনিময়ে মক্কাসাবীর ছাগল চরাতাম। [ইবনে মাজাহ সুয়াইন বিন সাঈদের বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যে, এ বিষয়ে নবী (স)এর ভাষা ছিল:

(আরবী*************)

-আমি কিচু কারারিতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম। এ বর্ণনাটি বুখারীর বর্ণনার এ অর্থ করে যে হুযুর *(স) পারিশ্রমিমের বিনিময়ে মক্কাবসীর ছাগল চরাতেন। কিন্তু ইব্রাহীম আলহারবী দাবী করেন যে কারারিতের অর্থ কোন নগত অর্থ সম্পদ নয়, বরঞ্চ আজইয়াদের নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম যেখানে নবী ছাগল চরাতেন। এ কথা সমর্থন করেছেন ইবনুল জওযী ও আল্লামা আয়নী। কিন্তু প্রথম কথা এই যে মক্কায় ভূগোলে কোন স্থানের নাম কারারিত প্রমাণিত হয় না। দ্বিতীয়তঃ পারিশ্রমিক নিয়ে ছাগল চরানো কোন দুষণীয় ব্যাপার নয় যে এ দোষ থেকে হুযুরকে (স) মুক্ত করার জন্যে এতাসব করতে হবে। -গ্রন্থকার।]

কিররাত শব্দের বহু বচন করারিত (এক দীনারের দশভাগের এক ভাগ এবং বিশভাগের এক ভাগ এক কিররাত বলে)। আবু সালমা বিন আবদুর রহমান বলেন, একবার লোকজন নবী (স) সাথে পিলু বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করেছিলেন। তখন নবী (স) বলেন, এর যে ফলগুলো কালো হয়ে গেছে তা পেড়ে আন। সেকালে যখন আমি ছাগল চরাতাম, তখন এ ফল পারতাম (ইবনে সা’দ-লন্ডন-পৃঃ ৭৯-৮০)।

প্রাথমিক বয়সেই নবীর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ

নবীর জন্মের পর থেকে দশ বারো বছর পর্যন্ত যেসব ঘটনার উল্লেখ করা হলো, তার থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাঁর সংস্পর্শে যারাই এসেছে তাদের মনে এ ধারণাই বদ্ধমূল হয়েছে যে, তাদরে মধ্যে জন্মগ্রণ করেও তিনি এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী। শুধু তাই নয় যে, তর পক্ষ থেকে বিচিত্র ধরনের বরকত প্রকাশ পেয়েছে, বরঞ্চ তাঁর স্বভাব চরিত্র সাধারণ শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ছিল। তাঁর চেহারা ও মুখমন্ডল থেকেও তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের পরিস্ফুট হতো।

বায়হাকী এবং ইবনে জারীর হযরত আলীর (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করে বলেন যে, নবী (স) বলেছেন “দু বারের অধিক আমার মধ্যে সেসব কাজ করর আগ্রহ জন্মেনি যা জাহেলিয়াতের যুগে মানুষ করতো এবং দু’বারই মহান আল্লাহ তায়ালা আমাজে সে জা করা থেকে রক্ষা করেছেন। তারপর সে কাজের কোন ধারণাই আমার মনে জাগেনি। যেসব ছেলেরা আমার সাথে ছাগল চরাতো তাদেরকে একদিন বল্লাম, আমার ছাগলগুলোর দিকে একটু নজর রেখো, আমি মক্কায় গিয়ে রাতের বেলা সেসব আমোদপ্রমোদে অংশগ্রহণ করি যাতে অন্য ছেলেরা অংশগ্রহণ করে। তরা রাজী হলো এবং আমি শহরের দিকে চল্লাম। তারপর প্রথম বাড়িতেই আমি গান বাজনার কোলাহল শুনতে পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, েএসব কি হচ্ছে? লোকে বল্লো অমুক অমুকে বিয়ে হচ্ছে। আমি বসে পড়লাম এবং সংগে সংগে আমার এমন ঘুম এলো যে প্রভাত হয়ে গেল এবং সূর্যের উত্তাপে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।”

“আরেকদিন আমার সাথীদের ঐ একই কথা বলতেই তরা রাজী হয়ে গেল। তারপর মক্কা প্রবেশ করে দেখলাম সেই গান বাজনাই হচ্ছে। আমি বসে পড়লাম এবং সেদিনও ঘুমে অভিভূত  হয়ে পড়লাম এবং সকাল পর্যন্ত ঘুমেই কাটলাম। সাথীদেরকে গিয়ে বল্লাম যে, আজও কিছুই দেখতে পেলাম না। তারপর থেকে এ ধরনের কোন কিছুর প্রতি আমার আগ্রহই জন্মেনি।” ইবনে সা’দ উম্মে আয়মানের বরাত দিয়ে বলেন, বুয়ানা নামে একটি এতিমা ছিল যার দর্শন লাভের জন্যে কুরাইশরা যেতো। সেখানে নযর নিরাযও দিত। আবু তালিবও এ উদ্দেশ্যে তাঁর পরিবারের লোকজনসহ সেখানে যেতো। তরুন ‍মুহাম্মদকেও তাদের সাথে যেতে বলা হতো। কিন্তু প্রতি বছর এ ঝগড়াই বাধতো যে মুহাম্মদ (স) যেতে অস্বীকৃতি জানাতেন এবং চাচা ও ফুফীগণ ভয়ানক অসন্তুষ্ট হতেন। একবার বাড়ির মুরব্বীদের তিরস্কার ভৎর্সনায় অতীষ্ট হয়ে এ উৎসবের সময় বহুক্ষণ ধরে নবী মুহাম্মদ (স) কোথায় উধাও হয়ে থাকলেন। বাড়িরর সকলেতাঁর জন্যে অস্থির হয়ে পড়লো। তিন যখন ফিরে এলেন তখন তাকে অত্যন্ত ভীত সন্ত্রস্ত মনে হলো এবং তাঁর মুখমণ্ডলও বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফুফীগণ তাঁকে জড়িয়ে ধরে বল্লো, বাছা, তোমার কি হয়েছিল? তিনি বল্লেন, আমার ভয় হচ্ছে আমার কিছু না হয়ে যায়। ফুফীগণ বল্লেন, আল্লাহ কখনো শয়তানের দ্বারা তোমার অনিষ্ট হতে দেবেন না যেহেতু তোমার মধ্যে এই গুণাবলী আছে। তিনি বল্লেন, যখনই আমি এ প্রতিমা ঘরের কোন প্রতিমার দিকে যাই, তখন এমন মনে হয় যে, একজন গৌরবর্ণের দীর্ঘকায় লোক দাঁড়িয়ে আছে এবং বলছে, মুহাম্মদ, দূরে থাক, ওকে স্পর্শ করোনা। উম্মে আয়মান বলেন, তারপর থেকে তিনি কখনো এ উৎসবে যোগদান করেননি।

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, মুখাকৃতি বিচারপূর্বক চরিত্র নির্ণয় বিদ্যায় বিশেষজ্ঞ (PHYSIOGNOMIST) এক ব্যক্তি মক্কায় আযদে শানুয়ার একটি শাখার লেহাব গোত্রের সাথে সম্পর্ক রাখতো এবং মক্কায় যাতায়াত করতো, যখনই সে আসতো কুরাইশের লোকজন তাদের সন্তানদের তার কাছে নিয়ে যেতো, যাতে করে সে বিদ্যার সাহায্যে তাদের সম্পর্কে কিচু বলতে পারে। একবা যখন সে এলো, আবু তালেব তার অন্যান্য সন্তানদের সাথে হুযুরকে (স) তার কাছে নিয়ে গেলন। সে তাঁকে দেখে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কাজ শেষ করে সে বল্লো, একটু আগে যে ছেলেটিকে দেখেছিলাম সে কোথায়? তাকে আন। আবু তালেব যখন দেখলেন যে বালক মুহাম্মদকে দেখার জন্যে বড়ো অস্থির, তখন তিনি তাঁকে সেখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে রাখলেন। সে লোকটি বল্লো, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো, খোদার কসম, সে বিরাট মহাপুরুষ হবে।

মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, নবী (স) বলেছেন, একদিন কুরাইশদের ছেলেদের সাথে খেলা করতে করতে আমি এ পাথর বহন করে আনছিলাম। সকল ছেলে পাথর বহন করার জন্যে তাদের ইজার তহবন্দ খুলে গলায় বেঁধে রেখেছিল যার দরুনস সকলেই উলংগ হয়ে পড়েছিল। যেইমাত্র আমিও এরূপ করলাম, হঠাৎ আমার উপর এক ঘুসি পড়লো এবং কে যেন আমাকে বল্লো, “তোমার ইজার বেঁধে নাও”। সুতরাং আমি আমার ইজার বেঁধে নিলাম।

এভাবে নবী মুহাম্মদকে শৈশব কালেই উলংগ থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। ঠিক এ ধরনের একটি ঘটনা তখন ঘটেছিল যখন ৩৫ হাতি বর্ষে  (যখন নবীর বয়স ৩৫ বছর এবং নবুয়ত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বছর বাকী ছিল) কুরাইশগণ নতুন করে কাবা ঘরের নির্মান কাজ শুরু করে। এ সময়ে কুরাইশদের সকলে তাদের ইজার খুলে আপন আপন গলায় বেঁধে পাথর বহন করে আনছিল। বালক ও যুবক বৃদ্ধ নির্বিশেষে কারে মধ্যেই উলংগতার কোন অনুভূতি ছিলনা। হযরত আব্বাস (রা) বালক মুহাম্মদকেও (স) তাই করতে বলেন। তিনি এরূপ করার সাথে সাথেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং আমাশের দিকে নিবদ্ধ হয়। তারপর জ্ঞান ফিরে এলে বলেন, “আমার ইজার কোথায়?” তখন তাঁর ইজার পরিয়ে দেয়া হলো এবং তিনি উঠে পড়লেন। এ ঘটনাটি হযরত জাবের বিন আবুদল্লাহ থেকে বুখারী ও মুসলিমে উধৃত হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক, তাবারানী এবং হাকেম আবু তোফাইলের বরাত দিযে বলেন, গায়েব থেকে আওয়াজ এলো, “হে মুহাম্মদ তোমার সত ঢাক।” কিন্তু বর্ণনা থেকেই একথা প্রমাণিত হয় না যে হুযুর (স) একে বারে উলংগ হয়ে ছিলেন। ইজার খুলে উলংগ হওয়অর পূর্বেই তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়েন।

মূর্তি পূজার প্রতি ঘৃণা

শৈশব কাল থেকেই শির্ক, মূর্তিপূজা এবং এসবের প্রদর্শনী ও করণী কাজের প্রতি তাঁর চরম ঘৃণা ছিল। প্রাক নবুয়ত জীবনেও এসবের মলিনতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। বুখারী- আবওয়াবুল মুনাকেবে যায়েদ বিন আমর বিন নুফাইল শীর্ষ হাদীসে হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমরের (রা) একটি হাদীস বর্ণনা পাওয়অ যায়।

তাতে বলা হয়েছে যে, একবার প্রতিমাদের উদ্দেশ্যৌ উৎসর্গীত খানা এবং তাদের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা পশুর গোশত নবীকে (স) খেতে দেয়া হলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন। মুসনাদে আহমাদে ওরওয়া বিন যুবাইর বর্ণনা করেন, “আমার নিকটে হযরত খাদিজার (রা) এক প্রতিবেশিী একথা বলেন, আমি নবীকে (স) হযরত খাদিজা কে (রা) লক্ষ্য করে এ কথা বলতে শুনলাম-

(আরবী******************)

-হে খাদিজা। খোদার কসম লাত ও মানাতের এবাদত কখনো করব না। খোদার কসম আমি তাদের এবাদত কখনো করবনা।

জবাবে খাদিজা (রা) বলেছিলেন, “রাখুন লাত আর রাখুন মানাত।”

এ ঘটনা বর্ণনার পর সে প্রতিবেশী হযরত ওরওয়াকে বলে যে, কুরাইশরা রাতে ঘুমোবার আগে এ প্রতিমা দুটির পূজা করতো। সম্ভবত এ নবী (স) এর দাম্পত্য জীবনে সূচনা কালের ঘটনা।

শাম সফর এবং তাপস বাহিরার ঘটনা

একবার আবু তুলিব একটি বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে শাম দেশ সফরের জন্যে রওয়ানা হন। তখন নবী (স) এর বয়স ছিল বারো বছর। আবু তালিব যখন রওয়ানা হন তখন নবী (স) তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং ইবনে সা’দের বর্ণনামতে বলেন, “চাচাজান, আপনি আমাকে কার কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন। আমার যে মা-বাপ কেউ নেই, যে আমার দেখাশুনা করবে।”

একথায় আবু তালিবের মন বিগলিত হলো এবং তিনি বল্লেন, খোদার কসম, আমি না একে দূরে রাখব আর না আমি তার থেকে দূরে থাকব। এ আমার সাথেই যাবে।

এ কাফেলা যখন শাম এলাকায় বুসরা পৌছালো এবং তাপস বাহিরার গীর্জার নিকটে থাকলো, তখন তিন তার অভ্যাসের খেলাপ গীর্জা থেকে বেরিয়ে িএলেন। অথচ কোন কাফেলার জন্যে তিনি কখনো গীর্জা থেকে বেরিয়ে আসতেন না। তিনি এ গোটা কাফেলার জন্যে আহার তৈরী করেন এবং সকলকে খানার দাওয়াত করেন। কাফেলার সকলেই খানা খেতে গেলেন। শুধু মুহাম্মদ কে (স) অল্পবয়স্ক হওয়ার কারণে অবস্থান শিবিরে রেখে যাওয়অ হলো। বাহিরা জিজ্ঞেস করলেন,

-সবা িকি এসেছেন?

তারা বল্লেন, শুধু একটি অল্পবয়স্ক বালককে লটবহর দেখাশুনার জন্যে অবস্থান শিবিরে রেখে আসা হয়েছে।

বাহিরা বল্লেন, না, তাকেও ডাকুন।

কুরাইশদের মধ্যে একজন বল্লেন, লাত ও ওয্যার কসম, আমাদের জন্যে এটি খুবই খারাপ হবে যদি মুহাম্মদ (স) আমাদের সাথে খানায় শরীক না হয়। তারপর সে গিয়ে মুহাম্মদকে (স) নিয়ে এলো।

তাঁকে আনার পর বাহিরা তাঁকে খুব মনোযোগসহকারে দেখতে লাগলেন এবং তাঁর চেহারা ও মুখমন্ডলের পরীক্ষা করতে লাগলেন।

খাওয়ার পর বাহিরা বালক মুহাম্মদ (স) এর নিকটে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ওহে বালক, আমি তোমাকে লাত ও ওয্যার কসম দিয়ে বলছি, যা জিজ্ঞেস করব তার ঠিক ঠিক জবাব দেবে।

হুযুর (স)বল্লেন, আমাকে লাতহ ও ওয্যার কসম দেবেন না। তাদের থেকে বেশী আক্রোশ আমার আর কিছুর জন্যে নেই।

তিনি বল্লেন, আচ্ছা, তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে ওসব কথার জবাব দাও যা আমি জিজ্ঞেস করি।

হুযুর (স) বল্লেন, যা খুশী জিজ্ঞেস করুন।

তারপর বাহিরা হুযুরের (স) অবস্থা, তাঁর ঘুম, দৈহিক গঠন এবং অন্যান্য বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং হুযুর (স) জবাব দিতে থাকেন। তারপর বাহিরা তাঁর চারদিকে ঘুরে ফিরে তাঁর দেহ পরীক্ষা করে দেখলেন। তারপর আবু তালিবকে জিজ্ঞেস করলেন, এ আপনার কে হয়? আবু তালিব বল্লেন, এ আমার পুত্র।

বাহিরা- এর পিতা জীবিত হতেই পারেন না।

আবু তালিব- এর আমার ভাতিজা।

বাহিরা- তার পিতার কি হলো?

আবু তালিব- এ মাতৃগর্ভে থাকতেই তার পিতার মৃত্যু হয়।

বাহিরা- তুমি ঠিকই বলেছ। তোমার ভাতিজাকে বাড়ি ফিরে নিয়ে যাও। ইহুদীদের থেকে একে রক্ষা করো। আল্লাহর কসম, তারা যদি একে দেখে সেসব আলামত চিনে ফেলতে পারে যা আমি চিনে ফেলেছি, তাহলে তার কিছু অনিষ্ট করবে। কারণ তোমার ভাতিজা বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হবে।

অতএব আবু তালিব অতি সত্ত্বর তাঁর ব্যবসার কাজকর্ম সেরে হুযুর )(স) কে নিয়ে দেশে ফিরে যান।

 এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাচ্যবিদগণ অনেক অলীক কল্পনার প্রাসাদ নির্মাণ করেছেন এব যেসব জ্ঞানগর্ভ কথা নবুয়ত প্রাপ্তির পর হুযুর (স) থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাঁরা সেসবকে খৃস্টান তাপসদের থেকে গৃহীত তথ্যাবলী বলে গণ্য করেন। উপরন্তু স্বয়ং আমাদের কিছু বর্ণনাও এমন আছে যা কিচু এসব কল্পনাকে শক্তি যোগায়। সাধনার মাধ্যমে আপন অধ্যাত্মিক শক্তির বিকাশ সাধন করেছেন এবং একজন সিদ্ধ তাপস যদি কিছু অসামান্য বরকতের নিদর্শন দেখে অনুভব করেন যে, এ কাফেলার মধ্যে এক বিরাট ব্যক্তিত্ব রয়েছে এবং অতঃপর হুযুরকে (স) দেখার পর তাঁর অনমুন সত্য হয়, তাহলে এতে অবকা হবার কিছু নেই। উপরন্তু এটা মনে করে যে ইহুদী একটি হিংসাপরায়ন জাতি এবং আরবের উম্মীরেদ মধ্যে কোন বিরাট ব্যক্তিত্বের আবির্ভাবকে নিজেদের জন্যে আশংকাজনক মনে করে তার ক্ষতি করতে পারে। যে জন্যে তাদের থেকে রক্ষা করাতে তিনি আবু তালিবকে পরামর্শ দিয়ে থাকবেন। কিন্তু এ কথা গ্রহণযোগ্য নয় যে, তিনি একথা মনে করে নিয়েছিলেন যে তিনিই হুযুর ((স) সে ভবিষ্যত নবী যাঁর আগমনে সুসংবাদ পূর্ববর্তী গ্রন্থাবলীতে দেয়া হয়েছে। কারণ ভবিষ্যৎ বাণীর দ্বারা অবশ্যই একথা জনা ছিল যে, একজন নবী আসবেন এবং তার নাম হবে মুহাম্মদ। কিন্তু নিশ্চিত রূপে এটা জানা সম্ভব ছিলনা যে বালক মুহাম্মদ (স)-ই সে নবী।

এ সম্পর্কে মুহাদ্দিস এবং জীবনী রচয়িতাগণ যেসব বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন সামগ্রিকভাবে তার উপর একবার দৃষ্টিপাত করা যাক। তিরমিযি, বায়হাকী, ইবনে আসাকির, হাকেম, আবু নঈম, আবু বকর আল খারায়েতী এবং ইবনে আবি শায়বাহ হযরত আবু মূসা আশয়ারী থেকে এ বর্ণনা উধৃত করেছেন যে, বহিরা হুযুরের (স) হাত ধরে বলেন, ইনি সাইয়্যেদুল মুরসালীন, ইনি সাইয়েদুল আলামীন। একে অতিসত্বর আল্লাহতায়লা রাহমাতুল্লিল আলামীন করে পাঠাবেন।

তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো (তিরমিযি প্রমুখ কতিপয় মুহাদ্দিসীনের বর্ণনামতে ‍কুরাইশদের সর্দারগণ জিজ্ঞেস করে), আপনি এ সবের জ্ঞান কোথা থেকে লাভ করলেন?

বাহিরা বলেন, তোমরা যখন সামনে থেকে আসছিলে তখন গাছপালা পাহাড় পর্বত সিজদারত ছিল। আর এসব নবী ছাড়া আর কারো সামনে সিজদারত হয় না। তাছাড়া আমি সেই মোহরে নবুয়ত দেখতে ও চিনতে পারলাম যা তার পিঠে দুই কাঁধের মাঝখানে রয়েছে। তার উল্লেখ আমর আমাদের কিতাবগুলোতেও পাই।

তারপর বাহিরা আবু তালিবকে বলেন, ইহুদীদের পক্ষ থেকে এর আশংকা রয়েছে। এ জন্যে তাকে ফেরৎ পাঠিয়ে দাও। ইবনে আবি শায়বাহ্ আবু মূসা আশয়ারী থেকে যে বর্ণনা উধৃতি করেন তাতে এ উল্লেখ রয়েছে যে, যখন হুযুর (স) গীর্জার  দিকে আসছিলেন, একটি মেঘ তাঁর উপর ছায়া করছিল। এমন বর্ণাও আছে যে, বাহিরার পীড়াপীড়িতে আবু তালিব হুযুর (স) কে আবু বকর (রা) এবং বেলাল (রা) এর সাথে মক্কা পাঠিয়ে দেন। অথচ আবু বকর (রা) এর বয়স তখন দশ বছর ছিল এবং বেলাল (রা) তাঁর থেকেও ছোট। দ্বিতীয়ত বেলালকে পাঠানো এক আজব ব্যাপার। কারণ সে সময়ে বনী আবদুল মুত্তালিবের সাথে তাঁর কোনই সম্পর্ক ছিলনা যাতে করে আবু তালিব তাঁর কোন খেদমত নিতে পারতেন। এ সফর সম্পর্কে এ কথাও বলা হয়েছে যে, সাতজন রোমীয় হুযুর (স) কে হত্যা করার জন্যে বেরোয় এবং বাহিরার গীর্জায় পৌছে। বাহিরা জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি জন্যে এসেছ? তারা বলে, আমরা জানতে পেরেছি এ নবীর এ মাসে এদিকে আসার কথা। সে জন্যে সবদিকে লোক পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে িএবং আমরা এখানে এসেছি। বাহিরা বলেন, তোমাদের কি ধারণা, যে কাজের ফয়সালা আল্লাহ করেছেন, তা কেউ রুখতে পারে? তারা বলে, না। তারপর তারা তাদের ইচ্ছা পরিহার করে।

এ সবের অর্থ এ দাঁড়ায় যে, বারো বছর বয়সে স্বয়ং হুযুর (স), কুরাইশ এবং রোমের শাসক গোষ্ঠী পর্যন্ত এ কথা জেনে ফেলে যে বালক মুহাম্মদ (স) নবী হতে যাচ্ছেন।

আবু সাঈদ নাইশাপুরীর শারফুল মুস্তাফার বরাত দিয়ে হাফেজ ইবনে হাজার ইসাবা গ্রন্থে একথা বলেন যে, এ ঘটনার তের বছর পর মুহাম্মদ (স) যখন হযরত খাদিজার (রা) ব্যবসার পণ্যদ্রব নিয়ে শাম যান, তখন বাহিরার সাথে তাঁর দ্বিতীয় বার সাক্ষাৎ হয়। এবার তিনি বলেন, (আরবী********************)

-আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি আল্লাহর রসূর, উম্মী নবী যার সুসংবাদ ঈসা ইবনে মরিয়ম দিয়েছেন।

এর ভিত্তিতে ইবনে মান্দাহ এবং আবু নাঈম বাহিরাকে সাহাবীর মধ্যে গণ্য করেছেন। হাফেজ যাহাবী তাজরিদুস সাহাবায় বলেছেন যে, বহিরা নবীন আগমনের পূর্বেই তাঁর উপর ঈমন এনেছিলেন।

দ্বিতীয়বার শামদেশ সফর সম্পর্কে একথাও বলা হয়েছে যে বুসরাতে একটি গাছের তলায় হুযুর (স) অবস্থান কনে যা তাপস নাস্তুরার গীর্জার সন্নিকটে ছিল। নাস্তুরা বাইরে বেরিয়ে এসে হুযুরের (স) সাথেী গোমাল মায়সারাকে জিজ্ঞেস করেন যে গাছের তলায় কে অবস্থান করছেন। সে বলে, হারামবাসী কুরাইশের এক ব্যক্তি। ওয়াকেদী এবং ইবনে ইসহাক বলেন যে, তদুত্তরে নাস্তুরা বলেন, হযরত ঈসা (আ) এর পরে এ দুশ বচর যাবত নবী ছাড়া আর কেউ অবস্থান করেনি। আবু সাঈদ শারফুল মুস্তাফাতে অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, তারপর নাস্তুরা হুযুর (স) এর নিকটে এলেন, তাঁর মাথা ও পায়ে চুমো দিলেন এবং বল্লেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি আল্লাহর রসূল সেই উম্মী নবী যার সুসংবাদ ঈসা (আ) দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, আমার পরে এ গাছতলায় নবী উম্মী হাশেমী আরবী মক্কী, সাহেবুল হাওযে ওয়াশ শাফায়াত এবং সাহেবে লেওয়অযে হাম্‌দ ব্যতীত আর কেউ অবস্থান করবে না।

মায়সারা তাঁর এ উক্তি স্মরণ রাখে। তারপর হুযুর (স) বুসরার বাজারে বেচাকেনার জন্যে বের হন। এ সময়ে এক ব্যক্তির সাথে জিনিসের মূল্য নিয়ে মতবিরোধ হয়। তখন সে বলে, লাত ও মানাতের কসম খেয়ে বলূন। হুযুর (স) বলেন, তাদের কসম আমি কোন দিন খাইনি। তখন সে বলে, আমি আপনার কথাই মেনে নিচ্ছি। তারপর সে মায়সারাকে নিরিবিলি ডেকে নিয়ে বলে, ইনি নবী। সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন, ইনি সেই নবী যার উল্লেখ আমাদের পুরোহিতগণ তাঁদের কিতাবে দেখতে পান। মায়সারা এ কথাও মনে রাখে।

আবু নাঈম বর্ণনা করেন যে, এ সফরে মায়সার দেখেন যে, দুজন ফেরেশতা হুযুর (স) এর উপর ছায়া করে আছেন। এ কাফেলা যখন মক্কা পৌছে তখন বেলা দুপুর। তখন হযরত খাািদজা (রা) তাঁর বালাখানায় ছিলেন। তিনিও দেখে যে হুযুর (স) উটের পিঠে এবং দুজন ফেরেশতা তাঁর উপরে ছায় করে আছেন। আবু নাঈম ছাড়া অন্যান্যগণ অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, হযরত খাদিজা (রা) তার সাথে অন্যান্য নারীদেরকেও এ দৃশ্য দেখান এবং তরা বিস্ময় প্রকাশ করতে থাকে। তারপর মায়সারা হযরত খাদিজা ()রা) এর নিকটে উপস্থিত হয়ে সেসব দৃশ্যের  কথা বল্লো যা সে দেখেছিল। নাস্তুরা যা বলেছিলেন এবং শামের একজন ব্যবসায়ীর সাথে যে ঘটনা ঘটেছিল তাও সে হযরত খাদিজাতকে(রা) বলে। এ সব বর্ণনা যদি মেনে নেয়অ যায়, তাহলে তার অর্থ এই হবে যে, পনেরো বছর পূর্বে মুহাম্মদ (স) জানতে পেরেচিলেন যে তিনি নবী হতে যাচ্ছেন। মায়সারা, খাদিজা (রা) এবং তাঁর সাথে উপবিষ্ট কুরাইশদের বহু মহিলাও একথা জানতো। তারপর কুরাইশের যে কাফেলার সাথে মুহাম্মদ (স) শাম গিয়েছিলেন তারাও এবং মক্কাবাসীও এ বিষয়ে অবহিত ছিল যে, ফেরেশতা তাঁর উপর ছায়া করেছিল। কারণ মায়সারা, হযরত খাদিজা (রা) এবং তাঁর সংগের মহিলাগণ যখন সে দৃশ্য দেখছিলেন, তখন অন্যদের কাছে এ কথা গোপন  থাকে কি করে?

যদিও কথাগুলো বিজ্ঞ মনীষীদের বর্ণনা থেকেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তথাপি কয়েকটি কারণে তা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথমতঃ এসব সুস্পষ্ট কুরআনের পরিপন্থী যাতে নবীকে (স) সম্বোধন করে বলা হয়েছে- (আরবী****************)

-তুমি কখনো এ আশা করতেনা যে তোমার উপর কিতাব নাযিল করা হবে (কাসাস: ৮৬)

(আরবী**********************)

তুমি ত জানতেনা যে, কিতাব কি বস্তু এবং না এটা জানতে যে ঈমান কাকে বলে- (শুরা: ৫২)।

উপরোক্ত আয়াত দুটো একথার অকাট্য প্রমাণ যে, নবুয়তের পদমর্যাদায় ভূষিত হবার পূর্বে তিনি এ বিষয়ে একেবারে বেখবর ছিলেন যে, তাঁকে নবী বানানো হবে। যদি বারো বছর বয়সেই তাঁর একথা জানা থাকতো এবং পঁচিশ বছর বয়সে পুনরায় তার নিশ্চয়তা দান করা হয়ে থাকতো তাহলে তাঁর উপরে কিতাব নাযিল হওয়ার কোন আশা না করার কোন কারণ থাকতে পারতো না। তারপর এক সময়ে তাঁকে মানুষের সামনে ঈমান আনার দাওয়াত দিতে হবে একথাই বা মন থেকে মুঝে ফেলতেন কি করে?

কুরআন মজিদের পর, এসব বর্ণনা ঐসব সহীহ বর্ণনারও খেলাপ যা হুযুর (স) এর প্রতি প্রথম অহী নাযিল হওয়ার সময়, অতঃপর তাঁর দৈহিক ও মানসিক অবস্থা এবং হযরত খাদিজার (রা) সাথে তাঁর কথাবার্তা সম্পর্কে উধৃত করা হয়েছে। সে সময়ে তাঁর যে অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল তা কি করে হতো যদি তিনি পঁচিশ বছর থেকে জানতেন যে তিনি নবী হবেন? এ অবস্থায় ত অহী নাযিল হওয়া তাঁর একেবারে প্রত্যাশা অনুযায়ীই হতো। তারপর হযরত খাদিজা (রা) হেরার ঘটনা শুনার পর যা কিছটু বলেন তা এ অবস্থায় কিছুতেই বলতেন না, যদি পনেরো বছর যাবত তাঁর এ কথা জানা থাকতো যে তিনি নবী হবেন। তাহলে তিনি ত একথাই বলতেন. যা আমার প্রত্যাশা করছিলাম তাইত ঘটেছে।

এভাবে এসব বর্ণনা সে গোটা ইতিহাসেরই পরিপন্থী যা বিপুল ও পুনঃপৌনিক বর্ণা সমষ্টির দৃষ্টিতে তাঁর নবুওয়ত ঘোষণার পর মক্কায় উপস্থাপিত হয়েছিল। কুরাইশের লোকেরা যদি একত্রিশ বছর যাবত এ কথা জানতো যে, তিনি (মুহাম্মদ সঃ) নবী হবেন, তাহলে তাঁর নবুয়দের ঘোষণা তাদের প্রত্যাশার বিপরীত হতোনা এবং একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর তাদের যে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো।

ফিজার যুদ্ধ

এখন আমরা পুনরায় ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো দিকে ফিরে আসছি।

ইবনে হিশাম বলেন, নবীর (স) বয়স যখন চৌদ্দ পনেরো বছর তখন ফিজার যুদ্ধ সংঘটিত হয়।[ইকদুল ফরীদ, আগানী এবং জওহরীর বর্ণনা মতে এতঃপূর্বে তিনবার ফিজার যুদ্ধ হয়। চতুর্থ ফিজার যুদ্ধে হুযুর (স) অংশগ্রহণ করেন। ইবনে সা’দ বলেন, এ যুদ্ধ হাতিবর্ষে সংঘটিত হয়। জওহরী সিহহতে লিখেছেন যে, কুরাশিগণ এ যুদ্ধকে ফিজার নামে এ জন্যে অভিহিত করে যে, এ হারাম মাসে হয়। যেহেতু হারাম মাসে যুদধ করা পাপকাজ সে জন্যে কুরাইশরা বলে –আমরা পাপ কাজ করেছি। এ কারণেই হারাম মাসে সংঘটিত এ চারটি যুদ্ধকেই ‘হিরবে ফিজার’ বলা হয়েছে-(গ্রন্থকার)।

ইবনে ইসহাক, ইবনে সা’দ, বালাযুরী এবং ইবনে জারীর তাবারী বলেন, এ যুদ্ধ ২০ হাতিবর্ষে সংঘটিত হয়ে।[হাতিবর্ষের যে বৎসর আবরাহা মক্কা আক্রমণ করে। এ এমন এক অসাধারণ ঘটনা যে আরবাসী এ বছর থেকে সন তারিখের হিসাব করা শুরু করে- গ্রন্থকার।]

এ হিসাবে হুযুরের (স) বয়স বিশ হওয়া উচিত। এ যুদ্ধে এক পক্ষ ছিল বনী কিনানা যার মধ্যে কুরাইশও শামিল ছিল এবং অপর পক্ষে ছিল কায়স আয়লান যার মধ্যে সাকীফ, হাওয়াযেন প্রভৃতি ছিল। যুদ্ধের কারণ ছিল এই যে, বনী হাওয়াযেনের ওরওয়াতুর রাহহাল নামে এক সর্দার বিন মুনযির এর বাণিজ্যিক কাফেলাকে তার স্বীয় নিরাপত্তায় ওকাজ বাজারে যাওয়ার পথ করে দেয়। বাররাস বিন কায়স নামে বনী কিনানার জনৈক সর্দার বলে, তুমি কি কিনানার মুকাবিলায় তাকে নিরাপত্তা দান করে ছ? সে বল্লো- হাঁ, এবং সমগ্র দুনিয়ার মুকাবিলায়। এতে বাররাস ভয়ানক রাগান্বিত হয়ে পড়ে। তারপর সে নজদের বহিরাগত এলাকায় তায়মান নামক স্থানে ওরওয়াকে হত্যা করে। কুরাইশরা ওকাজ বাজারে ছিল এমন সময়ে তাদের কাছে এ খবর পৌছে। সংগে সংগেই তারা হারামের দিকে রওয়ানা হয়। হারামের সীমানায় প্রবেশ করার পূর্বেই হাওয়াযেন তাদেরকে ধরে ফেলে এবং সারাদিন যুদ্ধ চলতে থাকে। রাতে কুরাইশরা হারামের সীমার ভেতরে প্রবেশ করে েএবং হাওয়াযেন নবী (স) এতোটুকু করতেন যে, দুশমনের পক্ষ থেকে কোন তীর এসে পড়লে তা তিন কুড়িয়ে নিয়ে আপন চাচাদেরকে দিয়ে দিতেন। ইবনে সা’দ বলেন, পরে নবী (স) বলতেন, যদি আমি এতে এতোটুকু অংশ গ্রহণও না করতাম ভালো হতো। সুহায়লী বলেন, নবী (স) এ যুদ্ধে তাঁর চাচাদের সাথে গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু যুদ্ধে কার্যতঃ কোন অংশ গ্রহণ করেননি। নবী হবার পূর্বে এটি ছাড়া তিনি আর কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। এছাড়া কোনো প্রকার সামরিক অভিজ্ঞতাও তিনি অর্জন করেননি। এথেকে জানা যায়, জাহেলী যুগের যুদ্ধ বিগ্রহ থেকে তিনি ছিলেন পবিত্র। এর মাধ্যমে আমরা একথাও জানতে পারে যে, নবী হিসাবে তিনি সামরিক নেতৃত্বের অনন্য যোগ্যতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা ছিল আল্লাহ প্রদত্ত। তিনি পেশাদার সেনাপতি চিলেন না, চিলেন সহজাত সেনাপতি।

‘হিলফুল ফযুল’

নবী পাকের (স) বয়স যখন বিশ বচর তখন কুরাইশের কতিপয় গোত্র একটি চুক্তি সম্পাদিত করে- যাকে বলা হতো ‘হিলফুল ফযুল’। ইবনে আসীর তাঁর নিহায়া গ্রন্থে ‘ফযুল’ শব্দ দ্বারা এ চুক্তির কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, জুরহুমের যুগেও এ ধরনের একটি চুক্তি হয়েছিল যার সম্পানাকারী সকলের নাম ছিল ‘ফযল’। এ জন্যে তা হিলফুল ফযুল নামে অভিহিত হয়। কিন্তু এর সঠিক কারণ তাই, যা হফেজ ইবনে কাসীর হুমাইদীর বরাত দিয়ে হযরত আবু বকরের (রা) পুত্রদ্বয় মুহাম্মদ ও আবদুর রহমান থেকে বর্ণা করেছেন। তিনি বলেন যে, নবী (স) বলেছেন- আমি আবদুল্লাহ বিন জুদআনের বাড়িতে এমন এক চুক্তিতে শরীক হয়েছিলা যে, ইসলামী যুদেও এ ধরনের চুক্তির আহ্বান জানালে তা আমি পছন্দ করব। অতঃপর সে চুক্তির ব্যাখ্যা তিনি এভাবে করেন-

(আরবী********************)

তারা এ বিষয়ে পরস্পর চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে, ফযুলকে তার হকদারের দিকে ফিরিয়ে দেব এবং জালেম মজলুমের প্রতি বাড়াবাড়ি করতে পারবে না। (আল বিদায়া ওয়ান্নিহজায়া, ২য় খন্ড, পৃঃ২৯১)।

‘ফযূলকে তার হকদারের দিকে ফিরানোর’ অর্থ এই যে, যে ফযল কোন জালেম জবরদস্তি হকদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে তা হকদারকে ফিরিয়ে দেয়া হোক এবং জালেমকে তার জুলুমের উপর অবিচল থাকদে দেয়া না হোক।

ইবনে সা’দ এ চুক্তি সম্পর্কে বলেন যে, তারা পরস্পর এ সিদ্ধান্ত করে যে তারা মজলুমের সহযোগিতা করবে এবং তার হক তাকে দিয়েই ছাড়বে।

ইবনে হিশাম চুক্তির বিবরণ বয়ান করতে গিয়ে বলেন যে, মক্কায় শহরের কোন অধিবাসী অথবা বহিরাগত কোন ব্যক্তির প্রতি চুলুম হতে দেবনা এবং জালেমের মুকাবেলায় মজলুমের সাহায্য করব। ইবনে সাদ’দ এ চুক্তির তারিখ বলেছৈন ২০শে যিলকা’দা, আমুলফীল। এর কারণ ছিল এই যে, ইয়ামেনে যুবাইদী নামের একটি গোত্রের জনৈক ব্যক্তি কিচু পণ্যদ্রব্য নিয়ে মক্কায় আসে। মক্কার জনৈক সর্দার আস বিন ওয়ায়েল তার পণ্যদ্রব্য খরিদ করে। কিন্তু মূল্য পরিশোধ করেনা। সে বেচারা বনী আবদুদার, বনী মাখযুম, বনী জুমাহ, বনী সাহম এবং বনী আদীর এক একজনের নিকটে গিয়ে ফরিদ করে। কিন্তু সকলেই কর্কশ ভাষায় তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং আস্‌ বিন ওয়ায়েল সাহমীর মুকাবিলায় তার সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। সকলের পক্ষ থেকে নিরাশ হওয়ার পর প্রত্যুষে সে আবু কুরাইস পাহারে আরোহণ করে উচ্চস্বরে আলে ফিহরকে সম্বোধন করে বলে যে তার প্রতি জুলূম করা হয়েছে। এতে নবীর চাচা যুবাইর বিন আবদুল মুত্তালিব সাড়া দিয়ে বলেন, বিষয়টি এভাবে ছেড়ে দেয়া যাবে না। তারপর তিনি বনী হাশেম, বনী আল মুত্তালিব, বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা, বনী যোহরা এবং বনী তাইমকে আবদুল্লাহ বিন জুদআনের বাড়িতে একত্র করেন। ইনি ছিলেন হযরত আয়েশা (রা) এর চাচাতো ভাই। সেখানে সকলে শপথ করলো যে, মক্কায় শহরের অধিবাসী অথবা বহিরাগত যেই মজলুম হবে, আমরা তার সাহায্য করব এবং জালেমের কাছ থেকে তার হক আদায় করে ছাড়ব। তারপর সকলে মিলে আসের নিকটে গেল এবং তার থেকে যুবায়দীর পণ্যদ্রব ফেরত নিয়ে তাকে দিয়ে দেয়া হলো।

মুহাম্মদ বিন ইসহাক ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে বর্ণনা করেন যে, নবী (স) বলেছেন আমি আবদুল্লাহ বিন জাদআনের বাড়িতে এমন এক চুক্তিতে শরীক হই যে, যদি তার বিনিময়ে একটি লাল উটও পেতাম তাহলে তা আমি গ্রহণ করতামনা। বর্তমানে ইসলামী যুগেও এ ধরনের কোন ‍চুক্তির প্রতি আহ্বান জানানো হলে তা আমি গ্রহণ করব।

হযরত খাদিজার (রা) সাথে ব্যবসায় অংশগ্রহণ

শৈশব কাল থেকে হুযুর (স) এর যে স্বাভাবিক কর্মদক্ষতা একটি সীমিত পরিমন্ডলে সু-পরিচিত ছিল- তাঁর ভদ্রতা, বিশ্বস্ততা ও নির্ভরযোগ্যতা, সত্যপ্রিয়তা, মধুর চরিত্র, সততা. গাম্ভীর্য বুদ্ধিমত্তা, আত্মসংযম, ধৈর্য ও আত্ম-সম্মান, মহানুভবতা, নেতৃত্বের গুণাবলী-মোটকথা তাঁর এক একটি মহৎ গুণেল বিকাশ ঘটতে থাকে যার জন্যে তাঁর প্রতি মানুষের মনে গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা সৃষ্টি হতে থাকে এবং তাঁর প্রভাবও তাদের উপর বিস্তারলাভ করতে থাকে। এ সময়েই হযরত খাদিজা (রা) তাঁর সাথে ব্যবসায় অংশীদারিত্বের সিদ্ধান্ত করেন।

 হযরত খাদিজা (রা) কুরাইশদের মধ্যে তাঁর সতীত্ব ও পুতপবিত্র চরিত্রের জন্যে ‘তাহেরা’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। তাহেরা অর্থ পুত পবিত্র। সমগ্র গোত্রের জন্যে তাঁকে তাঁর বুদ্ধিমত্তা, দুরদুর্শিতা, উন্নত চরিত্র ও বিবিধ গুণাবলীর জন্যৌ অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো। সেই সাতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দৈহিক সৌন্দর্যের সম্মপদও দান করেছিলেন। কুরাইশের কোন রমনীই তাঁর থেকে অধিক নশালিনী ছিলনা। অনেক সময় কুরাইশদের অর্ধের ব্যবসায়ী কাফেলা শুধু তাঁর মালসম্পদের উপরই বিনর্ভর করতো। তাঁর প্রথম বিবাহ হয় আবু হালা বিন যুরারা তামিমীর সাথে। তার ঔরসে দুই পুত্র-হিন্দ ও হালা জন্মগ্রহণ করে। নবীর যুগে উভয়েই মুসলমান হয়। আবু হালার মৃত্যুর পর তিনি উতায়িক বিন আব্দে আলমাখযুমীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার ঔরসে কন্যা হিন্দ জন্মগ্রহণ করে। পরে নবুয়ত যুগে সেও মুসলমান হয। [কারো কারো মতে- উতায়িক প্রথম এবং আবু হালা দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন- গ্রন্থকার।] দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর পর তিন বিধবাই রয়ে যান। অনেক কুরাইশ সর্দার বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করে কিন্তু তিনি তাদের ইচ্ছ পূরণে অস্বীকৃত জানান। তিনি তাঁর মালসম্পদ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করতেন এবং কোন না কোন ব্যক্তিকে তাঁর মাল নিয়ে ব্যবসায়ী কাফেলার সাথে পাঠাতেন এবং সে তার নির্ধারিত অংশ গ্রহণ করতো।

নবী (স) এর সত্যবাদিতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং উন্নত চরিত্রের কথা যখন হযরত খাদিজা (রা) জানতে পারলেন, তখন তিনি তাঁকে বল্লেন, আপনি আমার ব্যবসার মাল নিয়ে শাম দেশে যান। অন্য লোককে মুনাফার যে অংশ দিয়ে থাকি তার চেয়ে বেশী আপনাকে দেব।

এ হচ্ছে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা

দ্বিতীয় বর্ণনা ইবনে সা’দ নুফায়সা বিন্তে মুন্‌ইয়া থেকে উধৃত করেন- যার বিস্তারিত বিবরণ যুরকানী দিয়েছেন। তা হচ্ছে এই যে, আবু তালিব হুযুরকে (স) বলেন, ভাইপো, আমিত মালদার লোক নই। আমাদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। আর আমাদের নিকটে কোন ব্যবসার মালও নেই। তোমার কওম যে কাফেলা শাম পাঠাচ্ছে, তার রওয়ানা হওয়ার সময় আসন্ন। খাদিজাও এ কাফেলার সাথে তার মাল কারো হাতে পাঠাতে চায়। তুমি তার কাছে গেলে অন্যান্যের তুলনায় সে তোমাকে অগ্রাধিকার দেবে। কারণ সে তোমার পুত চরিত্রের কথা জানে।

হুযুর (স) বলেন, আমার ভয় হয়, সে অন্য কাউকে বেছে না নেয়।

চাচা ভাতিজার এ কথাবার্তা হযরত খাদিজা (র) জানতে পারেন। কিন্তু হুযুরে (স)  কথাই ঠিক হলো কারণ তিনি প্রথমেই হুযুরকে (স) সে ব্যবসার পয়গাম পাঠিয়ে দেন যার উল্লেখ ইবনে ইসহাকের মাধ্যমে উপরে করা হয়েছে।

তাবাকাতে ইবনে সাদের একটি বর্ণনায় আছে যা মুহাম্মদ বিন আকীল থেকে উধৃত। বলা হয়েছে যে, আবু তালিব হযরত খাদিজাকে (রা) গিয়ে বলেন, খাদিজা, তুমি কি পছন্দ কর যে তোমার ব্যবসায়য়ে অন্য কারো খেদমত নেয়ার পরিবর্তে মুহাম্মদের (স) সাথে কথা ঠিক করে ফেলবৈ?

খাদিজা জবাবে বলেন, আপনি যদি দূরের কোন অপছন্দনীয় লোকের কথা বলতেন তা মেনে নিতাম। আপনিও এমন লোকের কথা বলেছেন যিনি নিকটের বন্ধু।

মোটকথা হযরত খাদিজার (রা) সাথে হুযুরের (স) ব্যবসার ব্যাপারটি স্থিরকৃত হয়ে যায় এবং তিনি তাঁর গোলাম মায়সারাকে নবী (স) এর সাথে ব্যবসা উপলক্ষ্যে শাম দেশে পাঠিয়ে দেন। এ সফর শুরু হয় ২৫ হাতিবর্ষের জিহলহজ্ব মাসের ১৫/১৬ তারিখে। পথে মায়সারা হুযুরের (স) স্বভাব চারিত্র ও মহৎ গুণাবলী দেখে তাঁর প্রতি অতিশয় মুগ্ধ হয়ে পড়ে। প্রত্যাবর্তনের পর সব কথা বিস্তারিত হযরত খাদিজাকে জানিয়ে দেয়। ব্যবসায় হুযুর (স) বিশেষ সাফল্য লাভ করেন। ইবনে সা’দ নুফায়সা বিন্তে মানইয়ার কথা উধৃত করে বলেন, ইতঃপূর্বে অন্যান্য লোক যে পরিমাণ মুনাফা করে খাদিজাকে দিত, হুযুর (স) তার দ্বিগুণ মুনাফঅ এনে দেন এবং হযরত খাদিজা (রা) যে পরিমাণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তার দ্বিগুণ মুনাফঅ এনে দেন এবং হযরত খাদিজা (রা) যে পরিমাণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, তার ‍দ্বিগুণ হুযুরকে (স) দেন। [এ সফর ছাড়াও হুযুরে (স) অন্যান্য সফরের বিবরণও হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায়। এ সব সফরে আরবের বহু এলাকা স্বচক্ষে দেখার তাঁর সুযোগ হয়। হাকেম তার মুস্তাদরাকে ইয়ামেনে প্রসিদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র জুরাশে হুযুরে (স) দুটি সফরের উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম যাহাবী (র) তার স্বীকৃতি দিয়েছেন। মুসনাতে আহমাদে আছে যে বাহরাইন থেকে আবদুল কায়েসের প্রতিনিধি যখন মক্কা আসে, তখন হুযুর (স) সেখানকার এক একটি স্থানের নাম করে করে সে সবের অবস্থা জিজ্ঞেস করেন। লোক তাতে বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি বলেন, আমি তোমাদের দেশ খুব ঘুরে ফিরে দেখেছি। উল্লেখ্য যে সে সমযে আরবের গোটা পূর্ব সমুদ্র তটভূমিকে বাহরাইন বলা হতো- বর্তমান কালের বাহরাইন নাম দ্বীপ নয়। -গ্রন্থকার।]

হযরত খাদিজার (রা) সাথে বিবাহ

মক্কা থেকে শাম এবং শাম থেকে মক্কা- এ সুদীর্ঘ সফরে মায়সারা নবী মুস্তাফার (স) দিনরাতের সাহচর্য লাভ করে এবং তাঁর জীবনের প্রতিটি দিক দেখার পর তাঁর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। তার কাছে সবকিছু শুনার পর হযরত খাদিজা (রা) হুযুরকে (স) বিয়ের সিদ্ধান্ত করেন। যদিও এর আগে তিন হুযুর (স) সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন না এবং হুযুরের যেসব গুণাবলী কুরাইশদের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল, তার চর্চাও তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু এখন তিনি সিদ্ধান্ত করেন যে, তাঁর চেয়ে উত্তম স্বামী পাওয়া যাবে না। বিবাহের বিষয়টি কিভাবে চূড়ান্ত হয় সে বিষয়ে বর্ণনায় কিচু মতপার্থক্য রয়েছে।

ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত খাদিজা সরাসরি হুযুরের (স) সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, হে ভাতিজা, আপনি আত্মীয় [নবী (স) এর ফুফী হযরত সাফিয়া (হযরত যুবাইরের (রা) মা হযরত খাদিজার ভাইয়ের স্ত্রী ছিলেন- গ্রন্থকার।] এবং আপনার বিশ্বস্ততা, সততা, মহান স্বভাব চারিত্র, আভিজাত্য এবং প্রশংসনীয় গুণাবলীর কারণে আমি চাই যে আপনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই।

দ্বিতীয় বর্ণনাটি ইবনে সা’দ নাফাইসা বিন্তে মুনাইয়া [কোন কোন গ্রন্থকার বিন্তে উমাইয়া বলেছেন। কিন্তু বিন্তে মুন্‌ইয়অ-ই সঠিক। মক্কা বিজয়ের পর তিন মুসলমান হন-গ্রন্থকার।] থেকে উধৃত করেছেন। ‍নুফাইয়া বলেন, হযরত খাদিজা বিয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করার পূর্বে আমাকে মুহাম্মদ (স) এর নিকটে পাঠিয়ে দেন তাঁর মনোভাব জানার জন্যে। আমি গিয়ে তাঁকে বল্লাম, হে মুহাম্মদ (স) আপনি বিয়ে কেন করছেন  না? তিনি বলেন, আমার কাছে কি আছে যে বিয়ে করব?

বল্লাম, তার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আপনাকে এমন স্থানে বিয়ের পয়গাম দেয়া হচ্ছে যেখানে সৌন্দর্যও আছে, সম্পদও আছে, অীভজাত্য এবং যোগ্যতাও আছে। আপনি কি তা কবুল করবেন?

তিনি বল্লেন, কার কথা বলছো?

বল্লাম, খাদিজা।

তিনি বল্লেন, তার সাথে আমার বিয়ে কি করে হতে পারে?

বল্লাম, আমার উপর এ দায়িত্ব ছেড়ে দিন।

বল্লেন, তাই যদি হয় ত রাজী আছি।

তারপর হযরত খাদিজা পয়গাম পাঠান এবং বিয়ের জন্যে নির্দিষ্ট সময়ে আসতে বলেন। তিনি চাচা আমর বিন আসাদকে বিযে করিয়ে দেয়ার জন্যে আসতে বলেন।

হযরত খাদিজার পিতা খুয়াইলেদ এন্তেকাল করেছিলেন সে জন্যে তাঁর পক্ষ থেকে আমর বিন আসাদ এলেন এবং নবী (স) তাঁর চাচা হযরত হামজা এবং আবু তালিবকে নিয়ে এলেন।

তারপর বিবাহ কার্য সম্পন্ন হয় [ইবনে সা’দ বলেন, আমাদের গবেষণা অনুযায়ী সেসব বর্ণনা সবই ভুল- যাতে বলা হয়েছে যে খাদিজার বিবাহ তার পিতা খুয়াইলিদ পড়িয়ে দেন। তার চেয়ে অধিক অবাস্তব বর্ণনা এই যে খুয়অইলিদকে মদ্য পান করা হয়েছিল এবং নেশার অবস্থায় তিনি বিয়ে পড়িয়ে দেন। পরে জ্ঞান হওয়ার পর তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। আমাদের মতে জ্ঞানীগণের পক্ষ থেকে যে কথা প্রমাণিত ও সংরক্ষিত তা এই যে খুয়াইলিদ হিরবে ফিজারের পূর্বে মারা যান এবং খাদিজার চাচা আমর বিন আসাদ তাঁর বিয়ে পড়িয়ে দেন। গ্রন্থকার।]

বিয়েতে হযরত আবু বকর (রা) এবং মুদার গোত্রের প্রধানগণ এবং কুরাইশ সর্দারগণ শরীক ছিলেন। মোহর হিসাবে হুযুর (স) বিশ ‍উট দেন। [কিছু বর্ণনামতে মোহর ছিল ৮- দীনার এবং কিছু বর্ণনা মতে ৫০০দিরহাম- গ্রন্থকার।

ইবনে আবদুল বার বলেন, শাম সফর থেকে হুযুরের (স) প্রত্যাবর্তনের দুমাস পঞ্চান্ন দিন পর এ বিয়ে হয়। তাঁর বয়স তখন পঁচিশ বছর ছিল এবং হযরত খাদিজার চল্লিষ বছর।

[ইস্তেদেরাক পৃঃ ১২৮ দ্রষ্টব্য।

(বিবাহের সময় হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজার চল্লিশ বছর ছিল। কিন্তু কদাচিৎ কোন বর্ণনায় হুযুর (স) এর বয়স একুশ, উনত্রিশ, ত্রিশ এবং সাঁইত্রিশ বছর এবং হযরত খাদিজার (রা) পঁচিশ, আটাশ, ত্রিশ, পয়ত্রিশ এবং পঁয়তাল্লিশ বছর বলা হয়েছে। অধিকাংশ জ্ঞানীগণ তা মেনে নেননি। কিন্তু কেউ কেউ হযরত খাদিজার বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরে বর্ণনাকে এ কারণ অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে, চল্লিষ বছরের মহিলার ছয়টি সন্তান প্রসব করা সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেক সন্তানের মাঝে গড়ে যদি দেড় বছরো ব্যবদান হয় তাহলে শেষসন্তান উনপঞ্চাশ বছর বয়সে ভূমিষ্ট হওয়া উচিত। আর যদি ঐসব বর্ণনাও মেনে নেয়া যায় যাতে বলা হয়েছে যে নবুয়তের পর হযরত খাদিজার গর্ভে সন্তান জন্মগ্রহণের উল্লেখ করা হয়েছে তাহলে সে সময়ে তাঁর বয়স ছাপ্পান্য হওয়া উচিত। তা একেবারে ধারণার অতীত। আমাদের মতে এ অভিমত বুদ্ধিবৃত্তিক দিয়ে সঠিক নয়। নারী চিকিৎসা শাস্ত্রে (GYNAECOGY) একটি প্রমাণ্য গ্রন্থ যা এ শাস্ত্রের দশ জন শিক্ষক () এর তত্ত্বাবধানে রচিত হয়েছে, এ গ্রন্থের দ্বাদশ সংস্করণে এ বিষয়েই নিম্নোক্ত গবেষণা মূলক অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে:-

আটচল্লিশ ও বায়ান্ন বছর বয়সে সাধারণতঃ মাসিক ঋতু বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় ঋতু বন্ধের সময় পঞ্চান্ন চছর বরঞ্চ তারও অধিক কাল বিলম্বিচত হয়। পক্ষান্তরে কোন কোন অবস্থায় চল্লিশ বছর এমন কি তার চেয়েও কম বয়সে ঋতু বন্ধ হয়ে যায়। নারী সত্বর বালেগ হলে তার ঋতু বন্ধ বিলম্বে হয় এবং ঋতু বিলম্বে শুরু হলে তা সত্বর বন্ধ হয়ে যায়। উক্ত গ্রন্থ-পৃ.১০১।

এ শাস্ত্রীয় অভিমতের ভিত্তিতে এ কোন আশ্চর্য জনক ব্যাপার নয় যে হযরত খাদিজার (রা) গর্ভে পঞ্চাশ-ছাপ্পান্ন বছর বয়সে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। বর্ণনায় বলা হয়েছে যে হযরত ফাতিমা (রা) যখন জন্মগ্রহণ কনে তখন নবী মুস্তাফার (স) বয়স ছিল একচল্লিষ বছর এবং হযরত খাদিজার (রা) বয়স-ছাপ্পান্ন বছর।]

হযরত খাদিজার গর্ভে নবী (স) এর সন্তান

নবী (স) এর সমস্ত সন্তান হযরত খাদিজার (র) গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। শুধুামাত্র হযরত ইব্রাহীম (রা) মারিয়া কিবতিয়া (রা) এর গর্ভজাত ছিলেন। খাদিজার (রা) গর্ভে দুইপুত্র এবং চার কন্যা সন্তান, যথা (১) কাসেম (রা) যার জন্যে হুযুরকে (রা) আবুল কাসেম বলা হতো (২) আবদুল্লাহ (রা) যাঁকে তাইয়েব ও তারেও বলা হতো। (৩) হযরত যয়নব (রা) (৪) হযরত রুকাইয়া (রা) (৫) হযরত উম্মে কুলসূম (রা) এবং হযরত ফাতিা (রা)। তাঁরে মধ্যে কে কার বড়ো ছিলেন এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু একথা জানা আছে যে, হযরত যয়নব (রা) যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন হুযুরে (স) বয়সব পঁচিশ বছর ছিল (ইসাবা) এবং নবীর একচল্লিষ ছর বয়সে হযরত ফাতেমা (রা)পয়দা হন (শহে মুযাহির)। একথাও ইতিহাসে প্রমাণিত আছে যে নবুয়তের পঞ্চাশ বৎসরে যখন প্রথম আবিসিনয়ায় হিজরত হয় তখন হযরত রুকাইয়া (রা) তাঁর স্বামী হযরত ওসমান (রা) এর সাথে হিজরত করেন। তার অর্থ এই যে, তিনি হযরত যয়নব (রা) থেকে দুবছর ছোট ছিলেন তাই ত  নবুয়তের পঞ্চম বৎসরে তিনি বিবাহিতা ছিলেন।

একটি মহলের ঘৃণ্য স্পর্ধা

কিচুলোক খোদার ভয় না করে স্পষ্ট দাবী করে বলে যে, হযরত খাদিজার (রা) নবী (স) এর একটি মাত্র সন্তান হযরত ফাতিমা (রা) ছিলেন এবং অন্যান্য কন্যাগণ হুযুরের ঔরসে নয়, হযরত খাদিজার (রা) অন্য স্বামীর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন। অথচ কুরআনে এর দ্বারা সুস্পষ্ট অস্বীকার করা হয়েছৈ।

(আরব********************)

হে নবী, আপন বিবিগণ ও কন্যাগণ বল, (আহযাব)। -এ কথা ইতিহাস থেকে অকাট্যরূপে প্রমাণিত যে মারিয়া কিবতিয়া (রা) হুযুরে (স) ঔরসে তাঁর অন্যান্য বিদের কোন সন্তান হয়নি। এ শব্দগুলো একথাই প্রকাশ করছে যে, হুযুর (স) এর একজন নয় বরঞ্চ একাধিক কন্যা ছিলেন। ইতিহাস থেকেও এ কথা প্রমাণিত যে, মারিয়া কিবতিয়অ (রা) ব্যতীত নবী পাকের ঔরস থেকে অন্য কোন বিবির কোন সন্তানই হয়নি। অতএব এ সকল কন্যা অবশ্যই হযরত খাদিজার (রা) গর্ভেই জন্মগ্রণ করেনন। বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে এসব লোক চিন্তা করেনা যে- রসূলের ঔরসজাত সন্তানদের অস্বীকার করে তারা কত বড়ো পাপ করছে এবং তার জন্যে কত কঠোর জবাবদিহি আখেরাতে তাদেরকে করতে হবে। সকল নির্ভরযোগ্য বর্ণনা সূত্রে সকলেই একমত যে, হযরত খাদিজার (রা) গর্ভ থেকে হুযুরের (স) শুধুমাত্র এককন্য হযরত ফাতিমা (রা) ছিলেন না, বরঞ্চ আরও তিন কন্যা ছিলেন। নবী (স) এর প্রাচীনতম জীবন চরিত রচয়িতা মুহাম্মদ বিন ইসহাক হযরত খাদিজার (রা) সাথে হুযুরের (স) বিবাহের উল্লেখ করার পর বলেন, ইব্রাহীম (রা) ব্যতী নবী (স) এর সকল সন্তান তাঁর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন। তা৭দের নাম, তাহের (তাইয়েব), যয়নব (রা) রুকাইয়অ (রা), উম্মে কুলসূম (রা) এবং ফাতিমা (রা), (সীরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খন্ড পৃঃ২০২)।

প্রসিদ্ধ কুলাচার্য (GENEALOGIST ) হিশাম বিন মুহাম্মদ বিন আস সায়ের কালীব হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে একথা উধৃত করেছেন যে, মক্কায় নবূয়তের পূর্বে বনী (স) এর ঔরসে সকলের আগে কাসে (রা)পয়দা হন। অতঃপর যয়নব (রা) রুকাইয়া (রা), ফাতেমা (রা) এবং উম্মে কুলসূম (রা) পর পর পয়দা হন। নবুয়তের পর আবদুল্লাহ (রা) পয়দা হন যাঁকে তাইয়েব এবং তাহেরও বলা হতো, এ সবের মা ছিলেন হযরত খাদিজা (রা)- তাবাকাতে ইবনে সা’দ, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৩৩)।

ইবনে হাযম জাওয়ামেউস সীরাতে বলেছেন, হযরত খাদিজার গর্ভে হুযুরের চার কন্যা পয়দা হয়। সকলের বড়ো হযরত যয়নব (রা), তাঁর ছোটো রুকাইয়া (রা), তাঁর ছোটো ফাতেমা (রা), তার ছোট উম্মে কুলসূম (রা) (পৃঃ ৩৮-৪০)।

তাবারী, ইবনে সা’দ, কিতাবরূ মুজাস্‌সার গ্রন্থ প্রণেতা আবু জাফর বিন হাবীব এবং আল ইস্তিয়াব গ্রন্থ প্রণেতা ইবনে আবদুল বার নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (স) এর পূর্বে হযরত খাদিজার দুজন স্বামী অতীত হয়েছে। একজন হালা তামিমী যার ঔরসে হিন্দ ও হালা জন্মগ্রহণ করে। দ্বিতীয় স্বামী ছিল আতীক বিন আবেদ মাখযুমী যার থেকে হিন্দ নামে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। তাডপর তাঁর বিয়ে হয হুযুর (স) এর সাথে। সকল বংশবৃত্তান্ত বিশারদ এ বিষয়ে একমত যে, তাঁর ঔরসে উপরোক্ত চারজন কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। (তাবারী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃঃ১১, তাবাকাত ইবনে সা’দ, ৮ম খন্ড, পৃঃ ১৪-১৬, কিতাবুল মুজাসসার, পৃঃ ৭৮, ৭৯, ৪৫২, আল ইস্তিয়াব, ২য় খন্ড, পৃঃ ৭১৮ দ্রঃ)। বায়হাকী মুসআব বিন আবদুল্লাহ আয্‌যুবাইরীর বরাত দিয়ে বলেন যে, রসূলুল্লাহ (স) সর্ব জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন কাসেম (রা), অতঃপর যথাক্রমে যয়নব (রা), আবদুল্লাহ (রা), উম্মে কুলসূম (রা) ফাতেমা (রা) এবং রুকাইয়অ (রা), ইউনুস বিন বুকাইর ইবনে আব্বাসের (রা) বর্না উধৃত করে বলেন, হযরত খাদিজার গর্ভে নবী (স) থেকে দুই পুত্র এবং চার কন্যা জন্মগ্রহণ করে। যথা আল কজাসেম (রা), আবদুল্লাহ (রা), উম্মে কুলসূম (রা), যয়নব (রা), এবং রুকাইয়অ (রা), ফাতেমা (রা) আবদুর রাজ্জাক তাঁর গ্রন্থ আল মুসান্নাফে ইবনে জুরাইহ-এর বরাত দিয়ে বলেন, হযরত খাদিজার গর্ভে হুযুর )(স) এর দুপুত্র আবদুল্লাহ (রা) এবং কাসেম (রা) এবং চার কন্যা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বগ যয়নব (রা) এবং সবচেয়ে ছোট ফাতেমা (রা)।

 এর সকল বর্ণা কুরআন পাকের বিবরণকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত করে যে, হুযুরের (স) একমাত্র কন্যা ছিলনা বরঞ্চ ছিল চারজন ।

দাম্পত্য জীবন

যদিও নবী (স) এবং খাদিজার (রা) বয়সের মধ্যে পনেরো বছরের পার্থক্য ছিল তথাপি হযরত খাদিজার ওফাতের পর নবী (স) তাঁকে সারা জীবন স্মরণ করতে থাকেন।

বুখারীতে হযরত আলী (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, নবী (স) বলেন-

(আরবী***************)

এর একটা অর্থ তা এই যে, স্বীয় উম্মতের মহোত্তমা নারী ছিলেন মরিয়ম এবং এ উম্মতের মহোত্তমরা নারী খাদিজা (রা)। কিন্তু মুসলিম শরীফে ওয়অকীর বরাত দিয়ে একথা বলা হয়েছে এবং ওয়াকী একথা বলার সময়ে আসমান ও যমীনের দিকে ইংগিত করে নবী (স) এর এ কথাগুলো উধৃত করেন। তার মর্ম এই যে, ওয়াকী অথবা যাদের মাধ্যমে একথা তাঁর কাছে পৌছে তাঁরা সকলেই এ মর্ম গ্রহণ করেন যে, দুনিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম নারী এ দুজন। বুখারীতে হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা আছে যাতে তিনি বলেন, নবী (স) এর বিবিগণের মধ্যে হযরত খাদিজার প্রতি আমার যেমন হিংসা হয় তেমন আর কারো প্রতি হয় না। অথচ আমার বিয়ের আগেই তিন ইন্তেকাল করেছেন। কারণ এই যে, আমি প্রায়ই নবীকে তাঁর নাম উল্লেখ করতে শুনতাম। নবী (স) কখনো কোন ছাগল জবেহ করলে অবশ্যই তার কিছু গোশত হযরত খাদিজার বান্ধবীদের নিকটে পাঠিয়ে দিতেন। বুখারীর অন্য একটি হাদীসে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, একবার হযরত খাদিজার ভগ্নি হযরত হালা বিন্তে খুয়ায়লিদ এসে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তাঁর আওয়াজ শুনে নবী (স) অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং বল্লেন (**********)

(আল্লাহ এই ত হালা) কারণ তাঁর কন্ঠস্বর হযরত খাদিজার (রা) কণ্ঠস্বরের অনুরূপ ছিল।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এতে আমি খুব বিরক্ত হয়ে বল্লাম, কুরাইশদের একজন বৃদ্ধা নারীকে আপনি এতো স্মরণ করেন? অথচ বহু পূর্বে তিনি ইন্তেকাল করেছেন এবং আল্লাহ আপনাকে তাঁর থেকে ভালো বিবি দান করেছেন।

মুসনাদে আহমাদ ও তাবারানীর একটি বর্ণনায় আছে যে হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এতে হুযুর রাগান্বিত হলেন এবং তাঁর রাগ থেকে আমি কসম করে বল্লা, সেই খোদার কসম যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, আমি ভবিষ্যতে তাঁর উল্লেখ করলে শুভাকাংখা সহই করব।

ইবনে সা’দ বলেন, বদর যুদ্ধে রসূলুল্লাহ (স) জামাই আবুল আ’সও গ্রেফতার হন। নবী কন্যা হযরত যয়নব তখন মক্কায় ছিলেন। তিনি স্বামীকে মুক্ত করাবার জন্যে ফিদিয়া পাঠিয়ে দেন, যর মধ্যে হযরত খাদিজার (রা) সে হারখানা ছিল যা তিন আবুল আসের সাথে হযরত যয়নবের বিয়ের সময় জাহেলিয়াতের যুগে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। সে হারখানা দেখামাত্র নবী (স) স্নেহ বিগলিত হয়ে পড়েন। তিনি আপন লোকদেরকে বলেন, তোমরা যদি ভালো মনে কর ত যয়নবের কায়েদীকে এমনিতেই ছেড়ে দাও এবং তার ফিদিয়াও ফেরৎ দাও। সকলেই তাতে সম্মত হলো এবং আবুল আসকে বিনা ফিদিয়াতেই ছেড়ে দেয়া হলো।

বালাযূরী ‘আনসাবুল আশরাফে’ হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করে বলেন, একজন কালো রঙ্গের স্ত্রীলোক নবীর দরবারে এলো। নবী (স) তাকে খুব সন্তুষ্ট চিত্তে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। তার চলে যাওয়ার পর আমি (হযরত আয়েশা) জিজ্ঞেস করলাম, তার আগমনে আপনার এতো খুশী হওয়ার কি কারণ? নবী (স) বল্লেন, সে প্রায়শ খাদিজার (রা) কাছে আসতো। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, হযরত খাদিজার (রা) প্রতি নবী (স) এর কত গভীর ভালবাসা ছিল যা তাঁর মৃত্যুর পারও আজীবন নবীর হৃদয়ে অক্ষুণ্ণ ছিল।

হযরত খাদিজা (রা) নবুয়তের পূর্বে পনেরো বচর এবং নবুয়তের পর দশ বচর নবী পত্নী হিসেবে জীবন যাপন করেন। নবুয়তের দশ বছরে তাঁর ইন্তেকাল হয় যখন নবীর বয়স পঞ্চাশ বছর এং তার বয়স ছিল পঁয়ষট্টি বছর। কিন্তু নবী পাক তাঁর সমগ্র যৌবনকাল ঐ একজন বয়স্কা বিবির সাথেই কালাতিপাত করেন। সে সময়ে অন্য কোন নারীর চিন্তাও তাঁর মনে উদয় হয়নি। অথচ সে সময়ে আরববাসীদের কোন ব্যক্তির একাধিক পত্নী গ্রহণ কোন দিক দিয়েই দূষণীয় ছিল না। আর নারীরাও এতে প্রতিবন্ধক হতো না। স্বয়ং হযরত খাদিজার পরিবার সহ কুরাশের সকল পরিবারে এক জনের একাধিক স্ত্রী হওয়ার বহু দৃষ্টান্টত পাওয়অ যায়। এতদসত্বেও নবীর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত এমন একজন স্ত্রীসহ দাম্পত্য জীবন যাপন করাতে সন্তুস্ট ও পরিতৃপ্ত থাকা, যাঁর বয়স পঁয়ষট্টি বছর হয়েছিল- ওসব সমালোচকদের দাঁতভাঙ্গা জবাব যারা নবী পাকের শেষ দশ বছরের জীবনে বহু পত্নী গ্রহণকে মায়াযাল্লাহ তাঁর প্রবৃত্তির অভিলাষ চরিতার্ত বলে আখ্যায়িত করে। এ বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করব যে কি কি কারণে তিনি শেষ জীবনে বিভিন্ন নারীর পাণিগ্রহণ করেন।

সচ্ছলতার যুগ ও নবীপাকের চারিত্রিক মহত্ব

হযরত খাদিজার (রা) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর নবী পাকের (স) অসচ্ছলতা দূর হয়। প্রথমে হযরত খাদিজা অপরের সাহায্যে ব্যবসা করতেন এবং তাতে লাভ কম হতো। কারণ অন্যান্যরা যে ধরনের চরিত্রের অধিকারী ছিল তাতে এ আশা করা যেতোনা যে, তারা অপরের পণ্যদ্রব্য পূর্ণ বিশ্বস্ততা ও শুভাকাংখী সহ কেনা বেচা করবে। কিন্তু তাঁর ব্যবসা যখন নবী (স) এর মতো একজন অতি বিশ্বস্ত বিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে এলো এবং তার স্বামী হওয়ার কারণে স্বভাবতকঃই স্ত্রীর জন্যে তিনি অত্যন্ত শুভাকাংখী ছিলেন, তখন তাঁর ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠলো আল্লাহ তায়ালার এ এরশাদ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হলোঃ-

(আরবী*******************)

এবং তিনি তাঁকে দরিদ্র পেয়েছিলেন এবং পরে তাঁকে ধনশালী বানিয়ে দিলেন (আদ্দোহা ৮)।

এ সময়ে নবী পাকের সততা, বিশ্বস্ততা, কাজকর্ম ও লেনদেনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সত্যপরায়নতা, দান-খয়রাত, আত্মীয় স্বজনের সাহায্য ও সেবাযত্ন, অসহায় মানুষের সাহায্য, দরিদ্রের ভরণ পোষণ, বিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতির সে সকল গুণাবলী গোটা কুরাইশ এবং চতুষ্পার্শ্বস্থ গোত্রাবলীর কাছে এমনভাবে উদ্ভাসিত হয়ে পড়লো যা প্রথমে প্রকাশ লাভের সুযোগ অভাবে লুপ্ত ছিল। এখন সমাজে তাঁর মর্যাদা শুধু নৈতিকতার দিক দিয়েই নয়, বরঞ্চ বৈষয়িক দিক দিয়েও এতোটা উন্নীত হলো যে তিন কুরাইশদের অন্যতম সরদার হিসেবেই বিবেচিত হতে লাগলেন। তাঁর উপরে মানুষের এতোটা আস্থা সৃষ্ট হলো যে, তারা তাদের মূল্যবান সম্পদ তাঁর কাছে গচ্ছিত রাথকে লাগলো। এমন কি এ অবস্থা তখন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল যখন নবুয়ত ঘোষণার পর মক্কার জনসাধারণ নবীর রক্ত পিপাসু হয়ে পড়ছিল। তাঁর প্রতি চরম দুশমনি পোষণ করা সত্ত্বেও তারা তাদের সকল আমানত তাঁর হেফাজতেই রেখে দিত। এ কারণেই হিজরতের সময়ে হযরত আলী (রা) কে মক্কায় রেখে যেতে হয়েছিল যাতে করে তিনি সকলের আমানতের সম্পদ ফেরত দিয়ে আসতে পারেন। এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, নবুয়তের পূর্বেই শুধু নয় তার পরেও ইসলাম দুশমনদের অন্তরে তাঁর দিয়ানতদারী  ও আমানতদারীর চিত্র অংকিত হয়েছিল এবং তারা তাঁকে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী নির্ভরযোগ্য লোক মনে করতো।

ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে তিনি এতোটা নিষ্ঠাবান ছিলেন যে জাহেলিয়াতের যুগে তাঁর ব্যবসার জনৈক অংশীদার সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ছিলেন সর্বোত্তম অংশীদার। সে ব্যক্তি আরও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি কখনো প্রতারণা করেননি, জালিয়াতি করেননি এবং ঝগড়াঝাটিও করেননি। তার নাম বিভিন্ন বর্ণনায় বিভিন্ন বলা হয়েছে। ইবনে আবদুল বার- এর ইস্তিয়াবে তার নাম বলা হয়েছে কায়েস বিন আসসায়েব উয়াইমের মাখযুমী। মুসনতে আহমাদের কোন বর্ণনায় সায়েব বিন আলদুল্লাহ আলমাখযুমী এবং কোন বর্ণনায় সায়েব বিন আবিস সায়েব। আবু দাউদ (কিতাবুল উদম- বাব ফী কিরাহিয়াতিল মিরা) তে তার নাম সায়েবই বলা হয়েছে। স্বয়ংয় তার এ বর্ণনা উধৃত করা হয়েছে- আমি রসূলুল্লাহর খেদমতে হাজীর হলে লোক আমার প্রশংসা করতে থাকে। তিনি বলেন, আমি একে তোমাদের থেকে কুব ভালো জানি। আমি বল্লাম আমার মা বাপ আপনার জন্যে কুরবান হোক আপনি ঠিকই বলেছেন। আপনি আমার ব্যবসায় অংশীদার ছিলেন, কিন্তু সর্বদা কাজ কারবার পরিষ্কার রেখেছেন। না কখনো প্রতারণা করেছেন, আর না ঝগঝাটি করেছেন।

আবু দাউদেই অন্য এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ বিন আবিল খামসের একটি বর্ণনা আছে। তিনি বলেন, একবার আমি জাহেলিয়াতের যুগে নবী (স) এর সাথে কেনা- বেচার ব্যবস্থাপনা করলাম। কিছু বিষয় স্থিরকৃত হলো এবং কিছু রয়ে গেল। আমি বল্লাম আমি এস্থানে এসে আপনার সাথে দেখিা করব। তারপর আমি সে কথা ভুলে গেলাম। তিন দিন পর আমার সে কথা মনে পড়লো। তারপর আমি সেস্থানে এসে দেখলাম তিনি সেখানেই রয়েছেন। তিনি বল্লেন, হে যুবক। তুমি আমাকে বড়ো কষ্ট দিলে, তিন দিন থেকে আমি এখানে তোমার অপেক্ষা করছি। (কিতাবুল আদব –বাবু ফিল ইদাত)।

যায়েদ বিন হারেসার ঘটনা

যে ঘটনা নবী পাকের মহান চরিত্রের সবচেয়ে বড়ো সাক্ষ্য দান করে- তা যায়েদ বিন হারেসার ঘটনা। তিনি চিলেন কাল্‌ব গোত্রের হারেসা বিন শুরাহবিল (অথবা শারাহবিল) নামক জনৈক ব্যক্তির পুত্র। তাঁর মা সু’দা বিন্তে সা’লাবাহ তাই গোতের শাখা মায়ানা গোত্র সম্ভূত ছিলেন। তাঁর আটবছর বয়সের সময় তাঁরা মা তাকে নিয়ে তাঁর বপের বাড়ি যান। সেখানে বনী কায়ন বিন জাসর এক লোকজন তাদের তাঁবুর উপর হঠাৎ আক্রমণ করে। তারপর লূটতরাজ করে যাদেরকে ধরে নিয়ে গেল তাদের মধ্যে যায়েদও ছিলেন। তারপর তারা তায়েফের নিকটবর্তী ওকাজ মেলায় তাঁকে বিক্রি করে দেয়, খরিদকারী চিলেন খাদিজার ভাতিজা হাকীম বিন হিসাম। তিনি তাঁকে মক্কায় এনে তাঁর ফুফী হযরত খাদিজাকে উপহার দেন। নবী (স) এর সাথে হযরত খাদিজার যখন বিয়ে হয় তখন যায়েদকে হুযুর (স) সেখানে রেখতে পান। তাঁর স্বভাব চরিত্র ও আচার আরণ নবীর এমন ভালো লাগে যে তিনি তাঁকে হযরত খাদিজার নিক থেকে চেয়ে নেন। এভাবে এ সৌভাগ্যবান বালক সেরা এমন এক সত্তার খেদমতে এসে যান যাঁকে আল্লাহ তায়ালা কয়েক বছরের মধ্যেই নবী বানাতে চান। তখন হযরত যায়েদের বয়স পনোরো বছর ছিল। কিছুকাল পর তাঁর বাপ-চাচা জানতে পারেন যে, তাঁদের ছেলে মক্কায় রয়েছে।

তাঁরা অনুসন্ধান করতে করতে নবীর কাছে তাকে পেয়ে যান। তাঁরা নবীকে বল্লেন, আপনি যে পরিমাণ ফিদিয়া চান নিয়ে আমাদের সন্তানদের ফেরৎ দিন।

নবী (স) বলেন, ঠিক আছে আমি তাকে ডেকে দিচ্ছি এবং তাকে তার মর্জির উপর ছেড়ে দিচ্ছি যে সে তোমাদের সাথে যেতে চায়, না আমার কাছে থাকতে চায়। যদি সে তোমাদের সাথে যেতে চায় ত আমি কোনই ফিদিয়া নেবনা, তাকে এমনিই ছেড়ে দেব। কিন্তু সে যদি আমার কাছে থাকতে চায় তাহলে আমি এমন লোক নই যে, আমার কাছে থাকতে চায় তাকে খামাখা বের করে দেব।

তাঁরা বল্লেন, এ ত আপনি ইনসাফ তেকেও বড়ো ভালোকথা বলেছেন, আপনি বালকটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন।

নবী (স) যায়েদকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন- তুমি এ ‍দুব্যক্তিকে চেন?

যায়েদ বল্লেন, জি হাঁ উনি আমার পিতা এবং উনি চাচা। নবী (স) বল্লেন, ভালোকথা, তুমি তাদেরকেও চেন এবং আমাকেও চেন। এখন তুমি পূর্ণ স্বাধীন। চাইলে তাদের সাথে চলে যাও, আর চাইলে আমার সাথে থাক। যায়েদ বলেন, আমি আপনাকে ছেড়ে কারো কাছে যেতে চাই না।

যায়েদের বাপ-চাচা বল্লেন, যায়েদ। তুমি কি স্বাধীনতা থেকে গোলামিকে প্রাধান্য দিচ্ছ? আর আপন মা-বাপ ছেড়ে অন্যের কাছে থাকতে চাচ্ছ?

যায়েদ বল্লেন, আমি এ মহান ব্যক্তির গুণাবলী দেখেছি এবং তার অভিজ্ঞতার আলোকে দুনিয়অর কাউকে তাঁর উপর প্রাধান্য দিতে পারি না।

যায়েদের জবাব শুনে তাঁর বাপ-চাচা সম্মত হয়ে গেলেন। নবী (স) তখরই যায়েদকে স্বাধীন করে দিলেন। অতঃপর হারাম শরীফে গিয়ে জনতার সামনে ঘোষণা করলেন, তোমরা সাক্ষী থাক আজ থেকে যায়েদ আমার ছেলে সে আমার ওয়ারিস হবে এবং আমি তার হবো।

এ ঘোষণার ভিত্তিতে লোকে তাঁকে যায়েদ বিন মুহাম্মদ (স) বলা শুরু করলো। এসব ঘটনা নবুয়তের পূর্বেকার। হুযুর যখন নবুয়তের পদমর্যাদায় ভূষিত হন, তখন হযরত যায়েদের নবীর খেদমতে পরেন বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ঈমান আনার সময় তাঁর বয়স ছিল ত্রিশ বছর।

হুযুর (স) এর তত্ত্বাবধানে হযরত আলী (রা)

চাচা আবু তালিব হুযুরের (স) শৈশব কাল থেকে যৌবন কাল পর্যন্ত তাঁর প্রতি যে দয়া স্নেহমমতা প্রদর্শন করেছেন তা তিনি স্মরণ রেখেছেন। ইবনে ইসহাক বলেন, একবার মক্কা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় দ্রব্যমূল্য চরমভাবে বৃদ্ধি পায়। হুযুর (স) মনে করলেন যে, তাঁর চাচার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ এবং তার সন্তানসন্ততিও অনেক। তাঁর বোঝা লাঘব করার জন্যে কিছু করা উচিত। অতএব তিনি তাঁর অপর অর্থশালী চাচা হযরত আব্বাসের কাছে গিয়ে বল্লেন, আপনার ভাইয়ের পরিবার খুব বড়ো, তাঁর আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বর্ধিত দ্রব্যমূল্যের কারণে লোক যে চরম দুরাবস্থায় আছে তা আপনি দেখছেন। চলুন আমরা তাঁর বোঝা লাঘব করার জন্যে তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা করি। তাঁর এক ছেলের ভরণপোষণের দায়িত্ব আপনি নিন এবং একটার আমি নিই।

হযরত আব্বাস এ কথায় রাজী হলেন এবং চাচা ভাতিজা উবয়ে আবু তালিবের নিকটে গিয়ে তাঁদের মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি বল্লেন, আকীলকে অথবা ইবনে হিশামের মতে তালিবকে আমার কাছে রেখে অন্যদের মধ্যে যে যাকে পছন্দ কর নিয়ে যাও। অতএব নবী (স) হযরত আলীকে তাঁর কাছে নিয়ে এলেন এবং হযরত আব্বাস (রা) হযরত জাফরকে (রা) নিয়ে এলেন। হযরত আলী (রা) ছিলেন সকলের ছোট। তাঁর থেকে জাফর ‘আকীল’ তালীব সকলেই দশ বছরের বড়ো, তাঁদের ছাড়াও আবু তালিবের অন্যান্য সন্তানও ছিল।

এভাবে হযরত আলী (রা) শৈশব কালেই হুযুরের তত্ত্বাবধানে এলেন। হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজা (রা) তাকে আপন সন্তানের মতোই লালন পালন করেন। সম্ভবতঃ হযরত আলীর বয়স তখন চার পাঁচ বছরের বেশী ছিলনা।

কাবা ঘরের পুননির্মাণ

হুযুর (স) এর বয়স যখন পয়ত্রিশ বছর এবং নবুয়ত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বছর বাকী তখন কুরাইশগণ কাবা ঘর নতুন করে নির্মাণ করার ইচ্ছা করে। কারণ ঘরখানি অত্যন্ত জরাজীর্ণ এবং বন্যার কারণে ধ্বংসান্মুখ হয়ে পড়েছিল। দেয়ালগুলো ছিল খুব নীচু এবং উপরে কোন ছাদও ছিল নার আর গাঁথুনি এভাবে করা হয়েছিল যে শুধু পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। কোন কিচু দিয়ে সেগুলোকে একটি অন্যটির সাথে জোড়া দেয়া ছিলনা। দরজাও ছিল জমিন বরাবর। কাবা ঘরের ধন সম্পদ ঘরে মধ্যে খনন করা একটা গর্তের মধ্যে ছিল। কিছুলোক দেয়াল টপকিয়ে সেখানে পৌছৈ সম্পদ চুরি করে নিয়ে যেতো। নতুন করে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত হওয়অর পূর্বে বনী মুলায়হের এক গোলাম দুয়াইক কাবার ধন চুরি করেছিল অথবা চোর চুরি করে তার কাছে রেখে দিয়েছিল। তার কাছ থেকে চুরির মাল উদ্ধার করা হয়। [ইবনে আসীর বলেন, চুরির জন্যে তিন জনের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা হয়। তাদের মধ্যে একজন আবু লাহাবও ছিল কিন্তু মাল যেহেতু দুয়াইকের নিকট থেকে উদ্ধার করা হয় সে জন্যে তাকেই শাস্তি দেয়া হয়- গ্রন্থকার]

এসব কারণে কুরাইশরা চাচ্ছিল যে উঁচু এবং মজবুত ঘর করে উপরে ছাদ দেয়া হোক। সে কালে জনৈক রোমীয় বাণিকের বাণিজ্য জাহাজ সমুদ্রের উত্তাল তরংগ ও প্রচণ্ড ঝড়ে, ইবনে ইসহাকের বর্ণনামতে জিদ্দা পোতাশ্রয়ে এবং ইবনে সা’দের বর্ণনামতে- শায়ইবাহ পেতাশ্রয়ে যা জিদ্দার পূর্বে পোতাশ্রয় ছিল, আঘাত খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যা। তার মধ্যে বাকুম নাম একজন রোমীয় স্থপতি ছিল। কাঠের কাজ করার জন্যে মক্কায় একজন কিবতী সূত্রধরও  ছিল। জাহাজ ধ্বংস হওয়ার সংবাদ শুনে আলীদ বিন মগীরা কুরাইশের কিছু লোকজন সহ সেখানে গিয়ে জাহাজের কাঠ খরিদ করে। বাকুমের সাথে কথাবার্তা বলে তাকে সম্মত করলো যে, কাবা নির্মাণের কাজ সে সমাধা করবে। তারপর বনী মাখযুমের জনৈক ব্যক্তি আবু ওহাব বিন আমর বিন আয়েস (যিনি নবী পিতার মামু ছিলেন) উঠে কাবা ঘরের একটা পাথর খুলে পুনরায় যথাস্থানে রেখে বল্লেন, হে কুরাইশগণ এ নির্মাণ কাজে তোমাদের হালাল উপার্জনের অর্থ লাগাবে, এতে ব্যভিচার দ্বারা লব্ধ অর্থ, সুদের অর্থ, জুলুমের দ্বার উপার্জিত অর্থ যেন নির্মাণ কাজে কেউ লাগাতে না পারে।

অন্য একটি বর্ণনা এরূপ আছে- এ ঘর নির্মাণে এমন কোন অর্থ লাগাবে না যা তোমরা বলপূর্বক অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে অথবা পারস্পরিক দায়িত্ব লংঘন করে অর্জন করেছ।[এ হচ্ছে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা। মূসা বিন ওকবা মাগাযী গ্রেএথ বলেছেন যে উপরোক্ত বক্তব্য ছিল অলীদ বিন মুগীরার –গ্রন্থকার।]

কিন্তু কুরাইশের লোকজন কাবার ঘর ভেঙে ফেলতে বড়ো ভয় পাচ্ছিল। অবশেষে অলীদ বিন মুগীরা পুরাতন ঘর ভাঙার জন্যে কোদাল হাতে নিয়ে বল্লো, হে আল্লাহ! আমরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত হইনি। আমরা মংগল ছাড়া ঘর ভাঙছিনা। -এ কথা বলে সে কাবা ঘরের এক অংশে আঘাত করলে। তারপর সে থেমে গেল। তারপর লোক সারারাত এ অপেক্ষায় রইলো যে, অলীদৈর উপর কোন বিপদ আসেকিনা। তারা বল্লো, কোন বিপদ এলে আমরা কাজ বন্ধ করে দেব এবং যে পাথর খুলে ফেলা হয়েছে তা যথাস্থানে রেখে দেবো। কোন বিপদ না এলে কাজ চলতে থাকবে। সকাল পর্যন্ত অলীদের উপর কোন বিপদ যখন এলোনা, তখন ধরভাঙ্গার দায়িত্ব বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন গোত্র গ্রহণ করলো। ইব্রাহীম (আ) এর তৈরী ভিত্তি পর্যন্ত দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলা হলো। তারপর সকল গোত্রের লোক পাথর তুলে তুলে- নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করলো। [এ নতুন নির্মাণকাজে জিনিস পত্রের স্বল্পতা হেতু কাবার একটি অংশ বাইরে ফেলে রাখা হয় এবং তার পাশে প্রাচীর নির্মাণ করা হয় যাতে করে বুঝতে পারা যায় যে এ কাবারই একটি অংশ। একে হেজাসও বলে এবং হাতীমও বলে। এ স্থানে হযরত হাজেরা এবং হযরত ইসমাইল (আ) কে দাফন করা হয়েছিল (ইবনে হিশাম)। ইবনে সা’দ বলে, কুরাইশ বায়তুল্লাহর দরজা এতো বড়ো করে রাখে যা এখনো আছে। তরা সোম ও বৃহস্পতিবার দরজা খুলতৈা এবং দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকতো। যকন লোক সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকতো, তখন সে যাকে খুশী ভেতরে যেতে দিত এবং যাকে খুশী তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত- গ্রন্থকার।] তাপর যে স্থানে ‘হাজরে আসওাদ’ লাগানো হবে সে স্থান পর্যন্ত গাঁথুনি হওয়ার পর প্রত্যেক গোত্রই চাইছিল যে এ পাথর বসানোর মর্যাদা সেই লাভ করবে। এ নিয়ে এমন বাবিতন্ডা চলে যে লড়াইয়েল উপক্রম হয়ে গেল। চার পাঁচ দিন ধরে এরূপ ঝগড়া বিবাধ চল্লো। অবশেষে এদনি সকলে পরামর্শ করার জন্যে হারমে সমবেত হলো। বনী মখযুমের এক ব্যক্তি আবু উমাইয়অ বিন সগীরা (অলীদ বিন মগীরার ভাই) সকলের বায়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে প্রস্তাব করেন  হে কুরাইশের লোকেরা। নিজেদের এ মতানৈক্যের মীমাংসার লক্ষ্যে এ কথায় একমত হও যে, সকলের আগে যে ব্যক্তি এ সমজিদের দরজা, [দরজা বলতে বাবে বনী শায়বা বুঝানো হয়। একটি বর্ণনায় আছে, যে ব্যীক্ত সকলের আগে বাবুস সাফা দিয়ে প্রবেশ করে সে মীমাংসা করে দেবে। মুসা বিন ওকবা বলেন, এ পরামর্শ স্বয়ং অলীদ দেয়। কিন্তু আল ফাকেহীরা, ওয়াকেদী এবং ইবনে ইসহাক আবু উমাইয়ার নাম বলেন- গ্রন্থকার।]  দিয়ে প্রবেশ করবে সে বিষয়ে মীমাংসা করে দেবে।

তাঁর এর প্রস্তাব সকলে মেনে নিল। আল্লাহ তায়ালার করণীয় এই ছিল যে, সকলের আগে যিনি প্রবেশ করেন তিনি ছিলেন রসূলুল্লাহ(স)। লোক তাঁকে দেখামাত্র বলে উঠলো- (আরবী******************)

-এ আমীন, আমরা রাজী আছি এ ত মুহাম্মদ। মুসনাতে আহমাদের বর্ণনায় আছে যে, লোক তাঁকে দেখামাত্র বল্লো (************)

তোমাদের নিকটে আমীন(অতি বিশ্বস্ত লোক) এসে গেছে।

রসূলুল্লাহ (স) যখন যানতে পারলেন যে, এ বিবাদের মীমাংসা তাঁকে করে দিতে হবে তখন তিনি একখানা কাপড় আনতে বল্লেন। লোক কাপড় এনে দিল। তিনি তখন সে কাপড়ের উপরে ‘হাজরে আসওয়াদ’ রেখে দিলেন। তারপর তিনি প্রত্যেক গোত্রকে সে কাপড়ের এক এক দিক ধরে হাজরে আসওয়াদ উঠাতে বল্লেন। যে স্থানে পাথরটি লাগানো সে স্থানে পৌছার পর তিনি পাথরটিকে আপন হাত দিযে উঠিয়ে যথাস্থানে লাগিয়ে দিলেন।

এ নবুয়তের মাত্র পাঁচ বছর আগের ঘটনা। সে সয়ে গোটা জাহি হুযুরের (স) আমীন বা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত হওয়ার সাক্ষ্য দান করে। সমগ্র জাতি এটাও প্রত্যক্ষ করে যে, তিনি কত বিজ্ঞ ছিলেন যে এমন মারাত্মক বিবাদের অতি সুন্দরভাবে সমাধান করে তাঁর জাতিকে গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করলেন। ইবনে সা’দ বলেন শুদু এ একটি ঘটনাই নয় যে, হুযুর (স) কুরাইশদের একটি বিবাদের মীমাংসা করে দিয়েছিলেন বরঞ্চ নবুয়তের পূর্বে অধিকাংশ তাদের বিষয়োদির মীমাংসার জন্যে তাঁর স্মরণাপন্ন হতো।

নবুয়তের পূর্বে যাঁরা নবীকে নিকট থেকে দেখেছেন

নবুয়তের পূর্বে সবচেয়ে নিক থেকে নবী মুহাম্মদের (স) জীবন দেখার ও তাঁর সার্বিক অবস্থা জানার যাদের সুযোগ হয়েছিল তাঁদের মধ্যে তাঁর পরিবারের লোক ছিলেন অর্থাৎ এক. হযরত খাদিজা (রা) যিনি পনেরো বছর যাবত তাঁর স্ত্রী হিসাবে জীবন যাপন করেন। দুই, হযরত আলী (রা) যিনি শৈশবকাল থেকেই নবী পরিবারের প্রতিপালিত হন এবং তিন. হযরত জায়েদ বিন হারেসা যিনি মাতাপিতাকে ছেড়ে নবীর সাথে থাকাকে প্রাধান্য দেন এবং যাকে নবী (স) আপন পুত্র বানিয়ে নেন। তারপর ছিলেন উম্মে আয়মান (রা) যিনি নবীকে শৈশবে লালন পাল করেন এবং পরিবারে একজন সদস্য হিসাবে সর্বদা নবীর (স) সাথে থাকেন। তাঁর সম্পর্কে নবী (স) বলতেন আমার মায়ের পর উনিই আমার মা। তাঁকে ‘আম্মা’ বলেই সম্বোধন করতেন। এসব লোক ছাড়াও পরিবার বহির্ভূত এমন অনেক ছিলেনৈ যারা নবীর সাহচর্য লাভের মর্যাদা লাভ করেন এবং বেশ কিছুকাল যাবত তারা নবীর সাথে উঠাবসা করেন।

তাদের মধ্যে নবীর নিকটতম বন্ধু ছিলেন হযরত আবু বকর (রা)। ইবনে মাদ্দাহ ইবনে আব্বাসের (রা) একটি বর্ণনা উধৃত করে বলেন, আঠার বছর বয়স থেকে হযরত আবু বকর (রা) নবীর সাথে উঠাবসা করতেন যখন নবী পাকের (স) বয়স ছিল বিশ বছর। সে সময় থেকে উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্ব বিরাজ করছিল। কারণ মক্কায় দুই ব্যক্তি এমন ছিলনা যাদের স্বভাব প্রকৃতি, চালচলন ও আচার আচরণের মধ্যে এমন সাদৃশ্য ছিল যা ছিল নবী (স) এবং হযরত আবু বকরের মধ্যে। জাহেলিয়াতের যুগে হযরত আবু বকর ছিলেণ অত্যন্ত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এবং জাতীয় সর্দারগণের অন্যতম সর্দার ছিলেন। তাঁর পেশা ছিল ব্যবসা। স্বভাব চরিত্রের জন্যে তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ঐসব লোকের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন যাঁরা কোন দিন মদ স্পর্শ করেন নি। কুরাইশের লোকেরা দিয়াত অর্থাৎ খুনের বদলায় যে অর্থ দন্ড নির্ধারিত হতো সে বিষয়টি তাঁর উপরে ছেড়ে দিত। সে দিয়াতের দায়িত্বও তিনি স্বীকার করে নিতেন। সমস্ত গোত্র মিলে তা পরিশোধ করতে সম্মত হতো। অন্য কেউ এ দায়িত্ব নিলে তাকে কেউ স্বীকার করতো না।

কুশনামা সম্পর্কে কুরাইশের লোকেরা তাঁর জ্ঞানের উপরে সবচেয়ে বেশী আস্থা স্থাপন করতো। তাঁর নৈতিক প্রভাব শুধু কুরাইশ নয়, বরঞ্চ চারপাশের গোত্রগুলোর উপরেও ছিল- তাঁর অনুমান এর থেকে করা যায় যে, মক্কায় যখন মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন শুরু হয়, তখন আবু বকরও হিজরতের জন্যে তৈরী হন। দু একদিনের পথ চলার পর আহাবিশেস সর্দার[তিনটি গোত্রের সমষ্টির নাম ছিল আহাবিশ। তাদের মধ্যে বনু আল হারেস বিন আব্দে মানাত বিন কিনানা, বনী আলহুন বিন খুযায়মা বিন মুদারেকা (অর্থাৎ আদাল, কারা এবং দিশ এর গোত্রগুলো) এবং কুাযায়ার মধ্যে বনু আলমুস্তালিক শামিল ছিল। তারা মিলে মক্কার নিম্ন এলাকায় আহবাশ নাম এক উপত্যকা প্রান্তরে পারস্পরিক বর্ধুত্ব ও সাহায্য সহযোগিতার চুক্তি সম্পাদন করে। এ জন্যে তাদেরকে আহাবিশ বলা হতো- গ্রন্থকার।]  ইবনুদ্দুগুণ্ণার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে জিজ্ঞেস করে, আবু বকর কোথায় যাও?

আবু বকর (রা) বলেন, আমার জাতি আমাকে বহিষ্কার করে দিয়েছে, বহু দুঃখ কষ্ট দিয়ে আমার জীবন দুর্বিসহ করে দিয়েছে, বহু দুঃখ কষ্ট দিয়ে আমার জীবন দুর্বিসহ করে দিযেছৈ।

সেক বলে, খোদার কসম, তুমি ত সমাজের সৌন্দর্য। বিপদে মানুষের সাহায্য করতে। ভালো কাজ কর। গরীবের উপকার কর। চল আমি তোমাকে আশ্রয় দেব।

তারপর সে তাঁকে নিয়ে মক্কায় এলো এবং ঘোষণা করলো, আমি ইবনে আবি কুহাফাকে আশ্রয় দিয়েছি। এখন যেন কেউ তার ভাল ছাড়া কিছু মন্দ না করে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন হযরত সুহাইব বিন সিনান রুমী। আসলে তিনি ছিলেন বনী নামের বিন কাসেতের বংশোদ্ভূত। তিনি ইরান  রাষ্ট্রের অধীন মুসেলের নিকটবর্তী স্থানের বাসিন্দা ছিলেন। শৈশব কালে ইরান ও রোমের মধ্যে যুদ্ধের সময় তিনি গ্রেফতার হন এবং কিছুকাল যাবত রোমীয়দের অধীন গোলামীর জীবন যাপন করেন। এভাবে হাত বদল হতে হতে মক্কায় পৌছেন এবং এখানে আবদুল্লাহ বিন জুদআন তাঁকে খরিদ করেন। ইবনে জুদআন যেহেতু হযরত আবু বকরের (রা) নিকটাত্মীয় ছিলেন, এজন্যে তাঁর মাধ্যমে নবী (স) এর সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে। তিনি প্রায়ই নবীর সাহচর্যে সময় কাটাতেন। তিনি এতোখানি মর্যাদা লাভ করেছিলেন যে, যখন হযরত ওমর (রা) মৃত্যুশয্যায় শায়িত তখন তিনি অসিয়ত করেন যে যতোক্ষণ পর্যন্ত শুরা কোন ব্যক্তিকে খলিফা মনোনীত করতে একমত না হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত তিনি মসজিদে নববীতে নামায পড়াবেন।

তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রা)। তাঁর নিজের বক্তব্য বায়হাকী উধৃত করেন। তাতে বলা হয়েছে যে তিনি বলেন, হযরত খাদিজার সাথে রাসূলুল্লাহ (স) এর বিয়ের ব্যাপারে আমার চেয়ে অধিক আর কে জানে?

হযরত সুহাইব (রা) এবং হযরত আম্মার (রা) একসাথে ইসলাম গ্রহণ করেন।

চতুর্থ ব্যক্তি ছিলেন হযরত হাকীম বিন হেযাম (রা)। কুরাইশের অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। রিফাদার অর্থাৎ হাজীদের পানাহার করাবার মর্যাদা তিনি লাভ করেন। তিনি হযরত খাদিজা (রা) এর ভাতুষ্পুত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন নবী (স) এর পাঁচবছরের বড়ো। মুসনাতে আহমাদে এরাক বিন মালেকের বর্ণনায় জানতে পারা যায় যে তিন বলেন, নবীকে (স) আমি সবচেয়ে বেশী ভালোবাসতাম। যুবাইর বিন বাক্কার বলেন, নবুয়তের পরেও তাঁদের ভালোবাসা অটল ছিল যদিও তিনি মক্কা বিজযের ঈমান আনেন।

পঞ্চম ব্যক্তি ছিলেন, আযদে শানুয়া গোত্রের দিমা বিন সা’লাহাবাহ। তিনি এক অস্ত্রচিকিৎসকের কাজ করতেন। ইবনে আবদুল বার তাঁর ইস্তিয়াবে বলেন, তিনি জাহেলিয়াতের যুগেও হুযুরের (স) বন্ধু ছিলেন। মুসনাতে আহমাদে ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, যখন নবুয়তের সময় মক্কায় আসেন, তখন লোকে তাঁকে বলে যে মুহাম্মদ (স) পাগল হয়েছেন।

তখন তিনি সোজা তাঁর কাছে গিয়ে বলেন, বলুন আপনার কি অসুখ হয়েছে আমি চিকিৎসা করব।

জবাবে নবী (স) তাকে কয়েকিট প্রভাব বিস্তারকারী আয়াত বা বাক্য শুনালেন যা মসনূন কুতবায় পাঠ করা হয়। এসব শুনে তিন মুসলমান হয়ে যান।

তারপর এমন কিছু লোক ছিলেন যাঁরা নিকট আত্মীয় হওয়ার কারণে নবীকে (স) কুব ভালোভাবে জানতেন এবং যাদের কাছে নবী জীবনের কোন কিছুই গোপন ছিলনা। যেমন হযরত উসমান বিন আফফান (রা)। তিনি নবী (স) এর ফুফী উম্মে হাকীম আল বায়দার জামাই ছিলেন। হযরত যুবাইর বিন আওয়াম নবীর ফুফী হযরত সাফিয়ার (রা) পুত্র ছিলেন। হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা) হযরত সা’দ বিন আবি ওককাস (রা) এবং হযরত উমাইর বিন আবি ওককাস (রা) নবী মাতার আত্মীয় ছিলেন। হযরত আবু সালমা (রা) নবী (স) এর ফুফাতো ভাই এবং ‍দুধ ভাই ছিলেন।ঠ হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহশ নবীর ফুফু উমাইয়ার পুত্র ছিলেন। হযরত জাফর বিন আবি তালিব তাঁর চাচাতো ভাই ছিলেন।

তাঁরা সকলের আগে ঈমান আনেন। তাদের ঈমান আনার অর্থ এই যে হুযুরের জীবনকে নিকট থেকে দেখার পর তাদের হৃদয়ে হুযুরের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব এমনভাবে অংকিত হয়ে যায় যে, তাঁকে নবী বলে গ্রহণ করতে তারা বলামাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। এ ঈমানকে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব অথবা ব্যক্তিগত ভালোবাসার কারণ বলা যেতে পারেনা। কারণ এসবের কারণে কেউ তার ধর্ম বিশ্বাস বা দ্বীন পরিবর্তন করতে পারে না।

হুলিয়া শরীফ

নবুয়তের পূর্ব যুগের অবস্থার পরিসমাপ্তির পূর্বে আমরা ন্যায়সংগত মনে করি যে, নবী (স) এর হুলিয়া শরীফও বর্ণনা করা হোক। কারণ মানুষের ব্যক্তিত্বের উপরে তার গঠ আকৃতি ও মুখমন্ডলের (হুলিয়ার) গভীর সম্পর্ক থাকে। বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, তিরমিযি, নাসায়ী, বায়হাকী, দার কাতনী প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থগুলোতে হযরত আলী (রা), আবু হুরায়রাহ (রা), হযরত আনাস (রা), হযরত বারা বিন আযেব (রা), হযরত হিন্দগ বিন আবি হালা (রা) এবং আরও কতিপয় সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যে বর্ণনা পাওয়া যায় সে সবের দৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে নবী পাকের (স) হুলিয়া মুবারক এখানে আমরা বর্ণনা করছি। তাঁর দৈহিক উচ্চতা না খুব বেশী ছিল আর না খর্বাকৃতির, বরঞ্চ মধ্যম আকৃতি থেকে এটকু বাড়ন্ত। কোন সমাবেশে তিনি থাকলে তাঁকে স্পষ্ট চোখে পড়তো। মুখাকৃতি না লম্বা ধরনের, না সম্পূর্ণ গোলগাল, বরঞ্চ কিংঞ্চিত গোলাকার বিশিষ্ট। দেহের বর্ণন না বাদামী, না লাল, না একেবারে সাদা, বরঞ্চ উজ্জ্বল গৌর বর্ণ এবং দীপ্তিমান। মাথা ছিল বড়ো, বক্ষ প্রশস্ত, দুই স্কন্দের মাঝখানে বেশ ব্যবসধান, দেখতে হাট্টাগোট্টা তবে মোটা নয়। দেহের জোড়াগুলো খুবই মজবুত ছিল। বাহু ছিল মাংশল এবং হাঁটুর নিম্নভাগ দেহের সাথে সামঞ্জস্যশীল। বাহু ও হাঁটুর নিম্নাংশে হালকা লোম রাশি দেখা যেতো। দেহের বাকী অংশ ছিল লোমহীন। বক্ষ থেকে নাভী পর্য়ন্ত একটি কেশ রেখার মতো মনে হতো। মাথা ও দাড়ির চুল ঘনো ছিল। চুল হাবশীদের মতো কোঁকড়ানো ছেলনা এবং একেবারে সোজাও ছিলনা। কিছুটা ঢেউ তোলার মতো। মৃত্যু পর্যন্ত মাথা ও দাড়িতে বড়োজোর বিশটি চুল শ্বেতবর্ণ ধারণ করেছিল। আর তা শুধু তেল নাগালেই দেখা যেতো। মাথার চুল কখনো কানের অর্ধেক পর্যন্ত কখনো কানের তলা পর্যন্ত এবং কখনো তার নীচ পর্যন্ত রাখা হতো। চক্ষুদ্বয় বড়ো এবং সুন্দর ছিল। সুরমা না লাগালেও মনে হতো যেনো সুরমারঞ্চিত। অক্ষিগোলকে বা চোখের লাটাইয়ের ঈষৎ লাল রেখা ছিল। চোখের পাতার লোম ঘনো ও দীর্ঘ ছিল। ভুরু একটি অপরটি থেকে পৃথক ছিল, জোড়া ছিল না। মুখ বড়ো ছিল। আরবাসীগণ একে সৌন্দর্যের নিদর্শন মনে করতো। ছোট মুখ তারা পছন্দ করতো না। পায়ের তালূ হালকা ছিল, হাত পায়ের আঙুল লম্বাও মাংশল ছিল। পায়ের মধ্যম আঙুলি বুড়ো আঙুল থেকে একটু বাড়ন্ত ছিল। হাতের তালু ছিল মাংসল। প্রথম নজরে মানুষ একটু ভয় পেতো। কিন্তু যতোই তার নিকটবর্তী হতো, তাঁর বিনয় নম্রতা ও মহান চরিত্রে প্রভাবিত হয়ে আপন হয়ে যেতো। চলবার সময় এমন দৃঢ় পদক্ষেপে চলতেন যেন নীচে নামছেন অথবা উপরে উঠছেন। কোন দিকে তাকালে পুরোপুরি তাকাতেন এবং কোন দিক থেক মুখ ফেরাতে হলে পুরোপুরি ফেরাতেন। আড় নয়নে অথবা শুধু ঘাড় ফিরিয়ে দেখার অভ্যাস ছিলনা। তাঁর মুখে মুচকি হাসি দেখা যেতো। হাসবার সময় অট্টহিাস্য করতেন না।তাঁর দৈহিক শক্তি এমন ছিল যে, কুরাইশদের মধ্যে শক্তিশালী পলোয়ান রুকানা যাকে কেউ কোনদিন পরাজিত করতে পারেনি, নবীর সাথে কুস্তি লড়তে আসে। নবী তাকে আছাড় দিয়ে কুপোকাত করেনে। সে পুনরায় উঠে কুস্তি লড়তে সাহস করেনি। নবী (স) পুনরায় তাকে আছাড় দিয়ে ফেল্লেন। সে বল্লো, মুহাম্মদ! আশ্চর্য তুমি আমাকে আছাড় মারছ? তার অর্থ এই যে নবী না কোনদিন ব্যায়ম করেছেন, আর না পালোয়ানগিরি করেছেন। তথাপি তিনি রুকানা পলোয়অনকে দুবার আছাড় মেরে ফেলে দিয়েছেন। এ ব্যক্তি পরে মুসলমান হয়ে যান- রাদিআল্লাহ আনহু।

নবী (স) এর শৈশব কালের একটি ঘটনা এই যে, একবার আবদুল্লাহ বিন জুদআনের বাড়িতে খানার দাওয়াত ছিল। আবু জেহেল হুযুরের সাথে ঝগড়া করতে লাগে। তারও তখন শৈশব কাল ছিল। হুযুর (স) কাতে এমন জোড়ে আছাড় মেরে ফেলে দেন যে তার হাঁটু ক্ষতবিক্ষত হয়- যার দাগ সারা জীবন রয়ে যায়। ইবনে হিশাম বলেন, বদর যুদ্ধে আবু জেহেল নিহত হলে হুযুর বলেন, নিহতদের মধ্যে আবু জেহেলের লাশ রেব করে দেখ তাঁর হাঁটুতে ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যাবে। সত্য সত্যই তার লাশ তাঁটুতে ক্ষতচিহ্ন দেখা গেল। তার এ ক্ষতিচিহ্নের কাহিনী নবী (স) বর্ণনা করেন।

এ বিশদ আলোচনায় বুঝতে পারা যায় যে, নবী (স) শুধু মহান চরিত্রেরই প্রতীক ছিলেন না, বরঞ্চ পুরুষোচিত গুণাবলী এবং বীরত্বেরও প্রতীক ছিলেন।

 

চতুর্থ অধ্যায়

রেসালাতের সূচনা এবং গোপন দাওয়াতী কাজের প্রথামিক তিন বছর

নবীর মর্যাদায় অধিষ্টিত হওয়ার পূর্বে নবীগণের ধ্যান ও চিন্তা গবেষণা

কুরআন মজিদ একথা বলে যে অহী আসার পূর্বে নবীগণ যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তা সাধারণ মানুষের জ্ঞান থেকে পৃথক ছিলনা। অহী নাযিলের পূর্বে তাঁদের কাছে এমন কোন জ্ঞান লাভের সূত্র ছিলনা যা অন্যের কাছেও ছিলনা। নবী (স) কে বলা হয়-

(আরবী******************)

-হে নবী! তুমি কিছুই জানতেনা যে, কিতাব কাকে বলে এবং ঈমানই বা কোন্‌ বস্তু- (শুরা : ৫২)।

(আরবী*****************)

-এবং আল্লাহ তায়ালা তোমাকে পথ না-জানা পেয়েছেন এবং তারপর পথ দেখিয়েছেন- (দোহা: ৭)।

বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা থেকে ইলহামী ঈমান পর্যন্ত

কুরআন আমাদেরকে এ কথাও বলে যে, নবীগণ (আ) নবুয়তের পূর্বে জ্ঞান বিশেষ প্রজ্ঞার ঐসব সাধারণ সূত্রের মাধ্যমেই ঈমান বিল গয়েবের স্তর অতিক্রম করেন যেসব সূত্রে সাধারণ মানুষও লাভ করে থাকে। অহী আসার পর যা কিচু করে তা হলো এই যে, যেসব সত্যের প্রতি তাঁদের মন সাক্ষ্য দিত, সেসব সম্পর্কেই অহী অকাট্য সাক্ষ্য দেয় যে তা একেবারে সত্য এবং তারপর সেসব সত্য তাঁদেরকে বাস্তবে দেখিয়ে দেয়া হয় যাতে করে তাঁরা দৃঢ় প্রত্যয় সহ ‍দুনিয়ার সামনে তার সাক্ষ্য দিতে পারেন। এ বিষয়টি সূলা হুদে বার বার বর্ণনা করা হয়েছে-

(আরবী******************)

-যে ব্যক্তি প্রথমে তার প্রভুর পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাকৃতিক হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, তারপর খোদার পক্ষ থেকে এক সাক্ষীও এসে গেল (অর্থাৎ কুরআন) এবং তার পূর্বে মুসার কিতাবও পথ প্রদর্শন ও রহম হিসাবে বিদ্যমান ছিল, তারপর কি সে এ সত্যতা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতে পারে? –(হুদ: ১৭)।

তারপর এ কথাই হযরত নূহ (আ) এর মুখ দিয়েই বলা হচ্ছে-

(আরবী*******************)

-হে আমার জাতির লোকেরা। একবার চিন্তা করে দেখ দেখি, আমি আমার রবের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলাম এবং তিনি তাঁর নিজের পক্ষ থেকে আমাকে রহমত (অহী ও নবুয়ত) দ্বারা ভুষিত করেছেন, আর এ জিনিষ তোমরা দেখতে পাওনা, তাহলে এখন কি তা আমরা জবরদস্তি তোমার মাথার উপর চাপিয়ে দেব?

তাপর ৬৩ নং আয়াতে হযরত সালেহ (আ) এবং ৮৮নং আয়অতে হযরত ‍শুয়াইব (আ) এ কথাটির পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে অহীর মাধ্যমে সত্য সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান লাভের পূর্বে আম্বিয় (আ) পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা গবেষণার স্বাভাবিক যোগ্যতাকে সঠিক পথে ব্যবহার করে (******************* যাকে উপরে আয়তে)

এর অর্থ করা হয়েছে তৌহিদ ও আখেরাতের সত্যতায় পৌছে যেতেন। এ সত্যলাভ খোদাপ্রদত্ত নয়, অর্জিত। তারপর আল্লাহতায়ালা তাদেরকে অহীর জ্ঞান দান করেন। আর এটা অর্জিত নয় বরঞ্চ খোদা  প্রদত্ত।

প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলী পর্যবেক্ষণ, চিন্তা গবেষণা এবং সাধারণ জ্ঞাওেনর (COMMON SENSE) ব্যবহার ওসব আন্দাজ অনুমান ও দূরকল্পনা (seiculation) থেকে একেবারে এক পৃথক জিনিস আর এ দূরকল্পনা দার্শনিকগণই করে থাকেন। এ ত সেই জিনিস যার প্রতি কুরআন মজিদ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে। বার বার সে মানুষকে বলে, চোখ খুলে খোদার কুদরতের নিদর্শনাবলী দেখ এবং তার থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। এভাবে খোদার নিদর্শনাবলী পর্যবেক্ষণ দ্বারা একজন নিরপেক্ষ সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তি সত্যের নাগাল পেয়ে যায়। (***১)

রসূলুল্লাহ (স) এর নবী জীবনের পূর্বের যে অবস্থা আমরা পূর্বর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করেছি তার থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, হুযুর (স) নবী হওয়ার পূর্বেই শির্ক থেকে পাক পবিত্র এবং তৌহীদের প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পর তিনি কখনো তাঁর জাতির শির্কমূলক আকীদা বিশ্বাস মেনে নেননি- তাদের শির্কমূলক পূজা পার্বনে অংশগ্রহণ করেন নি। প্রতিমা ও প্রতিমা পূজা থেকে সর্বদা বিমুখ ছিলেন। দেবদেবীর উদ্দেশ্যে যে কুরবানী দেয়া হতো তার থেকেও দূরে থাকতেন। প্রাক নবী জীবনে তাঁর অবস্থা ঐসব একনিষ্ঠ তৌহীদ পন্থীদের অনুরূপ ছিল যার উল্লেখ আমরা এ গ্রন্থের দ্বিতীয় অধ্যায়ে করেছি। জাহেলিয়াতের যুগে জুরহুম ও কুযায়া গোত্রদ্বয় দ্বীনে ইব্রাহীমিতে যেসব রদবদল করেছিল, তার কোন একটিও তিনি নবুয়তের পূর্বে মেনে নেননি। এমনিভাবে কুরাইশগণ তাদের আমলে ধর্মীয় বিকৃতির মাত্র বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং এ থেকেও তিনি দূরে ছিলেন। যেমন কুরাইশগণ তাদের নিজেদের জন্যে কিছু বৈষম্যমূলক বৈশিষ্ট্য সৃস্টি করে রেখেছিল যার ভিত্তিতে তারা নিজেদেরকে অন্যান্য আরববাসীদের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর মনে করতো। ইবনে হিশাম ও ইবনে সাদ বলেন যে, তারা হজ্বের সময় আরাফাত যাওয়া এবং সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করার প্রথা পরিত্রাগ করেছিল। শুধু মুযদালফায় গিয়ে সেখান থেকেই ফিরে আসতো, তারা বলতো, আমরা হারামের অধিবাসী। আমাদের এ কাজ নয় যে আমরা সাধারণ হাজীদের মতো হারামের বাইরে গিয়ে আরাফাতে অবস্থান করব। যদি আমরা এমনটি করি তাহলে, হারামের বাইরে বসবাসকারী ও আমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবেন এবং তাতে আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে।

অথচ তারা জানতো যে, আরাফাতে গিয়ে সেখানে অবস্থঅন করা অতঃপর সেখান থেকে মুযদালফা ও মিনার প্রত্যাবর্তন করা হজ্বের অবশ্য প্রথাগুলোর অন্তর্ভুক্ত এবং দ্বীনে ইব্রাহীমির মধ্যে শামিল। ক্রমশঃ এসব প্রভেদ পার্থক্য ঐসব হারাম বহির্ভূত গোত্রও মেনে চলা শুরু করলো যারা কুরাইশদের সাথে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ ছিল। মেযন বনী কিনানা, খুযায়া ও আমের বিন সা’সায়া। এমনকি কুরাইশের সাথে যাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তাদের মর্যাদাও সাধারণ আরবাবসীদের চেয়ে বেড়ে গেল এবং তারা আরাফাতে যাওয়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু নবী (স) নবুয়তের পূর্বেই এ বিদআত খন্ডন করেছিলেন। ইবনে ইসহাক জুবাইর বিন মুতয়েম (রা)( এর একটি বর্ণনার উধৃতি দিয়েছেন, তাতে জুবাইর (রা) বলেন, আমি অহী নাযিল হওয়ার পূর্বে হুযুরকে (স) সাধারণ আরবদের সাথে আরাফাতে অবস্থান করতে দেখেছি।

কুরাইশ প্রবর্তিত বিদআতগুলোর মধ্যে একটি ছিল এই যে, হারামের বাইরে বসবাসকারীগণ হজ্ব বা ওমরার জন্যে এলে তরা বাইরে থেকে আনা আহার খেতে পারতো না এবং বাইরে থেকে আনা কাপড় পরিধান করে তাওয়াফও করতে পারতো না। হারাম শরীফেরে খিানা তাদেরকে খেতে হতো এং হারাম শরীফে কাপড় না পাওয়া গেলে উলংগ অবস্থায় তাওয়াফ করতে হতো। বাইরের কাপড় তাওয়াফ করলে তা ফেলে দিতে হতো। সে কাপড় তারা নিজেও পরিধান করতে পারতোনা এবং অন্য কেউ সে কাপড় স্পর্শও করতে পারতো না। আরবাসী এ কুপ্রথা বা বিদআতকে মুখ বুজে দ্বীন হিসাবে মেনে নিয়েছিল এবং এভাবে উলংগ তাওয়াফের প্রথা প্রচলিত হয়। (****২)

হুযুরের (স) নির্জনে এবাদত বন্দেগী

মুহাদ্দিসগণ অহীর ‍সূচনার ঘটনা স্ব স্ব সনদসহ ইমাম যুহরী থেকে, তিনি যুবাইর থেকে এবং তিনি তাঁর খালা হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রা) বচলেন, রসূলুল্লাহ (স) এর উপর অহীর সূচনা হয় সত্য ও সুন্দর স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা এমন হতো যেন তিনি তা প্রকাশ্য দিবালোকে দেখছেন। [বায়হাকী বলেন, অহী নাযিলের ছ মাস পূর্বে তাঁর এ অবস্থা হয়।]

তারপর তিনি নির্জনতা অবলম্বন করা শুরু করেন এবং গারে হেরার এবাদত করা শুরু করেন। [উপরোক্ত অবস্থা সৃষ্টি হওয়াপর পর হুযুর (স) অধিক নির্জনতা অবলম্বন করেন। অবশ্যি এ নির্জনতার প্রতি তাঁর অনুরাগ বহু পূর্বেই শুরু হয়েছিল। ইবনে হিশাম এবং তাবারীর বর্ণনা মতে ইবনে ইসহাক এবং আবদুল্লাহ বিন যুবাইর ওবায়েদ বিন উমারি আল্লায়সীর বর্ণনা উধৃত করে বলেন, হুযুর (স) প্রতি বচর এক মাস হেরায় অতিবাহিত করতেন। কিছুদিনের আহার সাথে করে নিয়ে যেতেন। তাপর ফিরে এসে প্রথমে সাত বার কাবায় তাওয়াফ করতেন এবং আরও কিচুদিনের খাবার বাড়ি থেকে নিয়ে হেরায় ফিরে যেতেন।

উপরন্ত হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এ নির্জনবাস ও এবাদত বন্দেগীর সময় তিনি মিসকীনদের অধিক পরিমাণে খানা খাওয়াতেন। কিন্তু তিনি একথা বলেন না যে হুযুর (স) হেরায় গিয়ে অবস্থান করার কাজ কখন শুরু করেন। তবে অনুমা করা যায় যে েএ কাজ তিনি কয়েক বছর থেকে করতে থাকেন- (গ্রন্থকার)।]

হযরত আয়েশা (রা) নবীর (স) এ কাজকে ‘তাহান্নুস’ শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেন। ইমাম যুহরী এর ব্যাখ্যায় এবাদত বন্দেগী বলেছেন। এ এক ধরনের এবাদত ছিল যা তিনি করতেন। কারণ তখন পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এবাদতের কোন পদ্ধতি তাঁকে বলে দেয়া হয়নি। তিনি কয়েকদিনের পানাহারোর বস্তু বাড়ি থেকে নিয়ে যেতেন। তারপর তিনি হযরত খাদিজার (রা) কাছে আসতেন এবং তিনি তাঁকে আরও কয়েকদিনের আহারের ব্যবস্থা করে দিতেন। (****৩)

গারে হেরায় নির্জন বাসের কারণ

এ সময়ে যেসব কারণে হুযুর আকরাম (স) মক্কার জনবসতি পরিত্যাগ করে পাহাড় কুঞ্জের মধ্যে হেরা গুহায় নির্জনতায় কাটাতেন, তার উপর সূরায়ে ‘আলাম নাশরাহ’-এর নিম্ন আয়াত কিছুটা আলোকপাত করে-

(আরবী****************)

আমরা তোমার উপর থেকে সে ভারি বোঝা নামিয়ে দিলাম যা তোমার কোমর ভেঙ্গে দিচ্ছিল।

এ আয়াতে (***) শব্দের অর্থ ভারি বোঝা। আপন জাতির অজ্ঞতা ও জাহেলিয়াতের কর্মকান্ড দেখে দুঃখ, মনোবেদনা, দুশ্চিন্ত ও উদ্বেগে ভারি বোঝা তাঁর সংবেদনশীল স্বভাব প্রকৃতিকে ভারাক্রান্ত করে ফেলেছিল। তাঁর সামনে মূর্তিপূজা করা হচ্ছিল, শির্ক, কুফর ও কুসংস্কার প্রভৃতির ব্যাপক প্রচলন ছিল। নৈতিক পংকিলতা এবং নগ্নতা অশ্লীতায় সমাজ জীবন নিমজ্জিত ছিল। কন্যা সন্তান জীবন্ত দাফন করা হতো। জুলুম, অনাচার ব্যভিচার সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। দুর্বল সবলের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। গোত্রগুলো পরস্পর পরস্পরের উপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসতো। কোন কোন সময়ে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বিগ্রহ শত শত বছর ধরে চলতো। কারো জান মাল ইজ্জত আবরু নিরাপদ ছিলনা যদি তার পেছনে কোন শক্তি শালী দল না থাকতো। এসব অবস্থা দেখে তিনি মর্মপীড়া ভোগ করতেন। কিন্তু এ চরম নৈতিক অথঃপতন থেকে জাতিকে রক্ষা করার কোন পন্থাই তিনি খুজে পাচ্ছিলেন না। এ দুশ্চিন্তাই তাঁর দেহমনকে ভেঙ্ড়ে ফেলীছল। আল্লাহ তায়ালা হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করে এ ভারি বোঝা তাঁর উপর থেকে নামিয়ে দেন। নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি উপলব্ধি করেন যে তৌহিদ, রেসালাত ও আখেরাতের উপর বিশ্বাসই সকল জীবন সমস্যার সমাধান করতে পারে, জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের পরিপূর্ণ সংস্কার সাধন করতে পারে। আল্লাহ তায়ালার এ পথ নির্দেশনা নবী মুস্তাফার (স) সকল বোঝা হালকা করে দিল এবং তিনি নিশ্চিন্ত ও নিশ্চিত হলেন  যে এর মাধ্যমে তিনি শুধু আরব দেশেরই নয়, বরঞ্চ দুনিয়ার অন্যান্য দেশেরও মানব গোষ্ঠী যেসব অন্যায় অনাচারে লিপ্ত, তাদরকেও এসব থেকে রক্ষা করা যাবে। (****৪)

সত্য স্বপ্ন

হাদীসে হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, নবী (স) এর উপর অহী নাযিলের সূচনা সত্য স্বপ্নের আকারে হয় (বুখারী ও মুসলিম)। এ ধারাবাহিকতা নবী যুগের প্রত্যেক স্তরেই অব্যাহত ছিল। হাদীসে তাঁর বহু স্বপ্নের উল্লেখ আছে, যার দ্বারা তাঁকে কোন শিক্ষাদান করা হয়েছে অথবা কোন বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। কুরআন পাকেও তাঁর একটি স্বপ্নের সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে (আল ফত্‌হ : ১২৭)। এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে একথারও উল্লেখ আছে যে নবী (স) বলেছৈন, ওমুক বিষয় আমার মনে উদিত করে দেয়া হয়েছে অথবা আমাকে েএ কথা বলা হয়েছে, অথবা আমাকে এক হুকুম দেয়া হয়েছে অথবা এ বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে। হাদীসে কুদসীগুলো বেশীরভাগ এসব বিষয় সংক্রান্ত। (***৫)

অহীর সূচনা

নবী মুস্তাফার (স) বয়স যখন চল্লিষ বছর ছয় মাস [সাধারণতঃ বলা য় যে চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নবুয়ত লাভ করেন। কিন্তু তাঁর জন্ম হয় প্রথম হাতিবছর রবিউল আওয়াল মাসে এবং নবুয়ত দান করা হয় হাতিবচর রমযান মাসে। এ জন্যৌ অহীর সূচনাকালে তাঁর বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছর ছয়মাস –গ্রন্থকার

আবদুল্লাহ বিন যুবাইর (রা) এবং ইবনে ইসহাক ওবায়দুল্লাহ বিন ওমাইর আললায়সীর বর্ণনা উধৃত করে বলেন নবী (স) বলেন, স্বপ্নে জিব্রীল (আ) এস রেশমী কাপড়ে লিখিত একটা জিনিস আমাকে দেখালেন যাতে সূরায়ে আলাকের প্রথমিক আয়াতগুলো লিখিত ছিল। তারপর আমাকে পড়তে বল্লেন। বল্লাম, আমি পড়তে জানিনা। তখন তিনি আমকে এমনভাবে চেপে ধরলেন যে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বল্লেন, পড়ৃন! তারপর (****) পর্যন্ত আমাকে পড়ালেন। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পর আমার মনে হলো কথাগুলো যেন আমার বুকের মধ্যে লেখা হয়ে গেছে (তাবারী, ইবনে হিশাম, সুহায়লী)। ইবনে কাসীর, এ বর্ণনা উধৃত করে বলেন, এ যেন ভূমিকা ছিল। ঐ বিষয়ের যা জাগ্রত অবস্থায় তার সামনে পেশ করা হয়েছিল যার উল্লেখ হযরত আয়েশার (রা)  হাদীসে পাওয়া যাপয়।–গ্রন্থকার]

তখন একদিন রমযান মাসে হেরা গুহায় তাঁর উপর অহী নাযিল হয়। ফেরেশতা তাঁর মুখোমুশি দাড়িয়ে বলেন, *** পড়ুন। বোখারী শরীফের কয়েক স্থানে এ ঘটনা হ৮যরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করা হয়েছে। তিন স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) এর উক্তি উধৃত করেন যাতে তিনি বলেন, আমি বল্লাম আমি ত পড়তে জানিনা। তখন ফেরেশতা আমাকে এমনভাবে চেপেধরলেন যে, তা আমার অসহ্য হয়ে পড়লো। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে আমায় বল্লেন, পড়ুন। বল্লাম আমি ত পড়তে জানিনা। তারপর তিনি আমাকে দ্বিতীয়বার চেপে ধরলেন এবং আমার তা অসহ্য হয়ে পড়লো। তিনি ছেড়ে দিয়ে আবার বল্লেন, পড়ুন। বল্লাম, আমি ত পড়তে জানিনা। তিনি তৃতীয়বার আমাকে চেপে ধরলেন এবং আমার তা অসহ্য হয়ে পড়লো। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বল্লেন, ()আরবী*********************)

(পড় তোমার রবের নামের সাথে যিনি পয়দা করেছেন) এবং তারপর (****) (যা সে জানতোনা) পর্যন্ত পড়ে শুনালেন।

হযরত আয়েশা (রা) বলেন, তারপর রসূলুল্লাহ () ভীত কম্পিত অবস্থায় হযরত খাদিজার (রা) নিকটে এসে পৌছলেন এবং বল্লেন, আমাকে উড়িয়ে দাও, আমাকে উড়িয়ে দাও”। তাঁর ভয় ও শংকার ভাবটা যখন কেটে গেল তখন তিনি বল্লেন, হে খাদিজা আমার কি হলো?

তারপর সব ঘটনা তাঁর কাছে বলার পর তিনি বল্লেন, আমার ত জানের ভয় হচ্ছে। এ ভয়ের অনেক কারণ আলেমগণ বর্ণনা করেন যার সংখা বার। কিন্তু আমাদের মতে প্রকৃতি সঠিক ব্যাখ্যা এই যে, নবুয়তের কঠোর দায়িত্বভার গ্রহণের চিন্তা করে তিনি ভীত কম্পিত হচ্ছিলেন এবং বার বার তাঁর একথা মনে হচ্ছিল যে,তিনি কিভাবে এ গুরুভার বহন করবেন। এর থেকে অনুমান করা যায় যে, হুযুর (স) নিজেকে বিরাট কিছু মনে করতেন না এবং তাঁর মনে এমন কোন অভিলাষও ছিল না যে তাঁর মতো লোকের নবী হওয়া উচিত। তাঁর এ গর্ববোধও ছিলনা যে এ বিরাট কাজ করার শক্তি ও যোগ্যতা তার ছিল- গ্রন্থকার।

 হযরত খাদিজা (রা) বলেন, কখনোই না, আপনি বরঞ্চ খুশী হয়ে যান। খোদার কসম আল্লাহ তায়ালা কখনো আপনার মর্যাদাহানি করবেন না [অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে আল্লাহতায়ালা আপনাকে কখনো দুঃখ কষ্টে ফেলবেন না –গ্রন্থকার।

 আপনি আতমীয় স্বজনের সাথে সদাচরণ করেন। সত্য কথা বলেন। এক বর্ণনায় আছে, আপনার আমানত আদায় করেন। অসহায় লোকদের বোঝা বহন করেন। অক্ষম লোকদের উপাপর্জন করে দেন। মেহমানদারি করেন, সৎ কাজে সাহায্য করেন। অন্য এক বর্ণনায় একথাও আছে। আপনার চরিত্র অতি মহান। তারপর হযরত খাদিজা (রা) হুযুরকে (স) নিয়ে তাঁর চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নাওফালের কাছে গেলেন। তিনি জাহেলিয়াতের যুগে মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে ঈসায়ী হয়েছিলেন। আরবী ও ইবরানী ভাষায় ইঞ্জিল লিখতেন। অনেক বয়োবৃদ্ধ ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। হযরত খাদিজা (রা) তাকে বল্লেন, ভাইজান। আপনার ভাতিজার ঘটনা শুনুন। (*****৩)

আবু নঈমের বর্ণনা মতে খাদিজা (রা) স্বয়ং সম্পূর্ণ ঘটনা ওয়ারাকাকে শুনিয়ে দেন। ওয়ারাকা হুযুরকে (স) বলেন, ভাতিজা, তুমি কি দেখেছিলে? রসূলুল্লাহ (স) যা দেখেচিলেন তা বলে দেন। ওয়ারাকা বলেন, এ হচ্ছে সেই নামুস (উর্ধ আকাশ থেকে অহী আনয়নকারী ফেরেশতা) যাকে মূসা  (আ) এর প্রতি নাযিল করা হয়েছিল। আহা যদি তোমার নবুয়তের সময় আমি শক্তি সামর্থ রাথকাম। আহা! যখন তোমার জাতি তোমাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে দেবে তখন যদি আমি জীবিত থাকতাম।

রসূলুল্লাহ (স) বলেন, এসব লোকেরা আমাকে বের করে দেবে?

ওয়ারাকা বলেন, হা কখনো এমন হয়নি যে, কোন ব্যাক্তি এমন জিনিস নিয়ে এসেছে যা তুমি এনেছ, আর তার সাথে শত্রুতা করা হয়নি। আমি যদি তোমার সে যুগে বেঁচে থাকতাম, তাহলে মনে প্রাণে সাহায্য সহযোগিতা করতাম।

কিন্তু কিছুকাল অতিবাহিত হতে না হতেই ওয়ারাকা ইন্তেকাল করেন। [হুযুরকে (স) ভাতিজা এজন্য বলা হয় যে তাঁর তৃতীয় পুরুষের আবদুল ওয্যা হুযুরের চতুর্থ পুরুষের আবদুল মান্নাফের ভাই চিলেন- গ্রন্থকার।]

এ ঘটনা থেকে কি বুঝতে পারা যায়?

এ ঘটনা স্বয়ং এ কথা ব্যক্ত করছে যে ফেরেশতার আগমনের এক মুহূর্ত পূর্ব পর্যন্ত নবী (স) এর মনে এ চিন্তাধারণার উদয় হয়নি যে, তাঁকে নবী বানানা হবে। এ জিনিসের অীভলাষী হওয়া ত দূরের কথা এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটবে এমনটিও ছিল তাঁর চিন্তাভাবনার অতীত। অহী নাযিল হওয়া এবং এভাবে ফেরেশতার সামনে উপস্থিত হওয়া থাঁর কাছে এক আকস্মিক ঘটনা ছিল। তাঁর প্রতিক্রিয়া তাঁর উপরে তাই হয়েছিল। একজন বেখবর লোকের উপর এমন ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই যা হয়ে থাকে। এজন্যে যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করলেন তখন মক্কাবাসীগণ তাঁর প্রতি বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আরোপ করতে থাকে। কিন্তু কেউ এ কথা বলেনি আমরা প্রথমে আশংকা করেছিলাম যে তুমি কিছু একটা দাবী করে বসবে। কারণ কিছুকাল যাবত তুমি নবী হওয়ার প্রস্তুতি করছিলে।

এ ঘটনা থেকে আর একটি বিষয় জানা যায় যে নবুয়তের পূর্বে নবী মুস্তাফার জীবন কত পাক পবিত্র এবং স্বভাবচরিত্র উন্নত মানের ছিল। হযরত খাদিজা (রা) কোন অল্প বয়স্কা মহিলা ছিলেন না। তাঁর বয়স তখন ছিল পঞ্চান্ন বছর। পনেরো বছর যাবত তিনি নবীর জীবন সংগিনী ছিলেন। বিবির কাছে স্বামীর কোন দুর্বলতা গোপন থাকে না। তিনি তাঁর এর  সুদীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে হুযুরকে (স) এতো উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ পেয়েচিলেন যে, যখন তিনি তাঁকে হেরা গুহায় সংঘটিত ঘটনা শুনালেন, তখন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে এ কথা মেনে নিলেন যে, প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর ফেরেশতাই তাঁর নিকটে অহী নিয়ে এসেছিলেন। তেমনি ওয়অরাকা বিন নাওফাল মক্কার একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন। শৈশবকাল থেকেই তিনি হুযুরের (স) জীবন লক্ষ্য করে আসছিলেন। পনেরো বছরে নিকট আত্মীয়তার ভিত্তিতে তিনি তাঁর অবস্থা সম্পর্কে আরও গভীর অভিজ্ঞতা পোষণ করতেন। তিনি যখন এ ঘটনা শুনলেন তখন তিনি তা কোন অসঅসা বা প্ররোচরনা মনে করেন নি। বরঞ্চ শুনা মাত্রই বলে ফেলেন যে এ ত অবিকল সেই নামুস যা মুসা (আ) এর প্রতি নযিল হয়েছিল্ এর অর্থ এই যে, তাঁর নিকটেও নবী মুস্তাফা (স) এতো উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন যে, তাঁর নবীর মর্যাদায় ভূষিত হওয়া কোন বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল না।[নজীর বিহীন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়া সত্বেও সে সত্তা আত্মগর্ভে ও আত্মম্ভারিত এতো উর্ধে ছিল যে, যখন তাঁকে নবুয়তের পদমর্যাদায় হঠাৎ অধিষ্ঠিত করে দেয়া হলো তখনও বেশ কিছু সময় পর্যন্ত এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পার্যালোচনা না যে, দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাকে বিশ্বপ্রকৃতির মালিক প্রভু ও পদের জন্য নির্বাচিত করেছেন।]

ঘটনাটি পর্যালোচনা

অহী নাযিলের অবস্থাটি সঠিকভাবে উপলব্দি করার জন্যে প্রথমে এ কথাটি মনে রাখতে হবে যে, নবী (স) নিকটে আকস্মিকভাবে এ ঘটনাটি ঘটে। এর পূর্বে তাঁর ধারণাও ছিল না যে তাকে নবী বানানো হবে। তাঁর মনের কোন স্থানেই এ ধরনের কোন অভিলাষ ছিল না। আর না এর জন্যে কোন প্রস্তুতিও তিনি করেছিলেন। তিনি আশাও করেন নি যে একজন ফেরেশতা তার উপর থেকে পয়গামসহ তাঁর কাছে আগমন করবেন। তিনি নির্জনে বসে মুরাকাবা ও এবাদত বন্দেগী অবশ্যই করছিলেন। কিন্তু নবী হওয়ার কোন ধারণাই তাঁর মনে স্থান পায়নি। এ অবস্থায় যখন হেরা গুহার নির্জন পরিবেশে আকস্মাৎ ফেরেশতা এসে পড়লেন তিনি ঠিক তেমনি হতভম্ব ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন যেমন এ অবস্থায় অবশ্যই একজন মানুষ হয়ে থাকে। তিনি এক বিরাট মহিমান্বিত ব্যক্তি হওয়া সত্বেও তাঁর হতভম্বতা অবিমিশ্র ছিল না। নানান চিন্তার যৌক্তিক সমাবেশ ছিল। অর্থাৎ তাঁর মনে বিভিন্ন প্রশ্নের উদয় হতে লাগলো এবং মন বিরাট উদ্বেগ উৎকন্ঠায় ভরে গেল। তিনি ভাবছিলেন, সত্যিই কি আমাকে নবী বানানো হয়েছে? আমাকে কোন বিরাট অগ্নি পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়নিত? এ বিরাট দায়িত্বের বোঝা আমি কিভাবে বহন করব? লোকের কাছে কিভাবে এ কথা বলবো যে আমি তোমাদের জন্যে নবী হয়ে এসেছি। মানুষ আমার কথা কিভাবে মেনে নিবো? আজ পর্যন্ত যে সমাজে আমি সম্মানের সাথে বসবাস করে আসছি এখন সে সমাজের লোক আমাকে ঠাট্টা বিদ্রুপ করবে, আমাকে পাগল বলবে এ জাহেলিয়াতের পরিবেশের বিরুএধ আমি কিভাবে সংগ্রাম করব? মোটকথা এ ধরনের কত প্রশ্ন তাঁর মনে উদিত হয়ে তাঁকে কত বিব্রত করে তুলছিল।

এ কারণেই যখন তিনি বাড়ি পৌছলেন, তিনি কম্পিত হচ্ছিলেন। বাড়ি পৌছামাত্র বল্লেন, “আমাকে (লেপ কম্বল) জড়িয়ে দাও, আমাকে (লেপ কম্বল) জড়িয়ে দাও।”

বাড়ির লোকজন তাঁকে জড়িয়ে দিলেন, কিছুক্ষণ পর যখন তিনি প্রকৃতিস্থ হলেন তখন পুরো ঘটনা হযরত খাদিজাকে (রা) তিনি শুনিযে দিলেন। তিনি বল্লেন, (আরবী********************)

আমার জানের ভয় হচ্ছে।

হযরত খাদিজা (রা) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বল্লেন:-

(আরবী*******************)

কখনই না খোদার কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো দুঃখ কষ্ট দেবেন না। আপনি ত আত্মীয় স্বজনের খেদমত করেন, সত্য কথা বলেন, অসহায়ের সাহায্য করেন, নিঃস্ব অভাবীদের অভাব মোচন করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন, সকল নেক কাজে সাহায্য করেন।

তারপর তিনি হুযুরকে (স) ওয়ারাকা বিন নাওফালের নিকটে নিযে গেলেন। কারণ তিনি আহলে কিতাববুক্ত ছিলেন। পূর্ববর্তী নবীগনের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি হুযুরের অবস্থা শুনার পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠলেন, এ হচ্ছে সেই নামুস যা হযরত মুসার (আ) কাছে এসেছিলো।

একথা তিনি এ জন্যে বল্লেন যে, তিনি বনী মুহাম্মদ (স) এর শৈশব থেকে যৌন পর্যন্ত তাঁর পুণ্য পূত চরিত্র সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তিনি একথাও জানতেন যে, এখানে নবুয়তের দাবী করার প্রস্তুতির কোন আভাসও পাওয়া যায়নি। এ ‍দুটি বিষয়ে যখন তিনি এ ঘটনার সাথে মিলিয়ে দেখলেন যে হঠাৎ অদৃশ্য জগত থেকে একজন এসে এ ব্যক্তিকে অবস্থায় এমন সব পয়গাম দিলেন যা নবীগণের শিক্ষারই অনুরূপ, তখন তিনি উপলব্ধি করলেন, এ অবশ্যই সত্য নবুয়ত। (৯)

পূর্ব থেকে যদি নবুয়তের অভিলাষ থাকতো

যদি নবী মুহাম্মদ (স) পূর্ব থেকে নবী হওয়ার চিন্তাভাবনা করতেন, নিজের সম্পর্কে যদি এ চিন্তা করতেন যে, তাঁর নবী হওয়া উচিত এবচং এ প্রতীক্ষায় থেকে মুরাকাবা করে করে আপন মনের উপর এ চাপ সৃষ্টি করতেন যে, কখন কোন ফেরেশতা তাঁর কাছে পয়গামন নিয়ে আসে তাহলে হেরাগুহার ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই তিনি আনন্দে অধীর হয়ে বিরাট দাবীসহ পাহাড় থেকে নেমে সোজা তাঁর জাতির নিকটে পৌছে তাঁর নবুয়তের ঘোষণা করতেন। কিন্তু ঠিক তার বিপরীত অবস্থা এই ছিল যে তিন যা কিচু দেখলেন, তাতের বিস্মিত ও হতবাক হলেন। তারপর ভীত কম্পিত অবস্থায় বাড়ি পৌছলেন। লেপ মুড়ি দিযে শুয়ে পড়লেন। একটুখানি প্রকৃতিস্থ হবার পর চুপে চুপে বিবিকে বল্লেন, আজ হেরাগুহায় নির্জন পরিবেশে এ ঘটনা ঘটেছে। জানিনা কি হবে। আমার জীবনের কোন মংগল দেখতে পাচ্ছিনা।

এ অবস্থা নবুয়ত প্রার্থীর অবস্থা থেকে কত ভিন্নতর। তারপর স্বামীর জীবন, তার অবস্থা, ধ্যান ধারণা প্রভৃতি তার স্ত্রী থেকে অধিক কে জানতে পারে? অভিজ্ঞতায় যদি এটা জানা যেতো যে, স্বামী নবুয়তের অভিলাষী এবং সর্বদা ফেরেশতা আগমনের প্রতিক্ষায় রয়েছেন তাহলে তার জবাব কখনো তা হতো না যা হযরত খাদিজা (রা) দেন। তিনি বলতেন মিয়া, ঘাবড়াচ্ছেন কেন?

বহুদিন থেকে যার আশায় দিন গুণছিলেন, তা ত পেয়ে গেলেন। চলুন পীরগিরির দোকান সাজিয়ে বসুন, নজর নিয়ায আমি সামলাব।

কিন্তু তিনি পনেরো বছরের সাহচর্যে স্বামী জীবনের যে রূপ লক্ষ্য করেছেন, তার ভিত্তিতে একথা বুঝতে তাঁর এ কুহূর্তও বিলম্ব হয়নি যে এমন নেক এবং নিঃস্বার্থ লোকের নিকটে শয়তান আসতে পারে না, আর না আল্লাহ তাঁকে কোন অশুভ পরীক্ষায় ফেলতে চান। তিনি যা কিছু দেখেছেন তা একেবারে সত্য। এ অবস্থা ওয়ারাকা বিন নাওফালেরও ছিল। তিনি বাইরের কোন লোক ছিলেন না বরঞ্চ হুযুরের (স) আপন জ্ঞাতি গোষ্ঠির লোকই ছিলেন। নিকট আত্মীযের দিক দিয়ে বৈবাহিক ভাই ছিলেন। বয়সে কয়েক বছরের বেশী হওয়ার কারণে নবী মুস্তাফার গোটা জীবন শৈশব থেকে সে সময় পর্যন্ত তাঁর চোখের সামনে ছিল। তিনিও তাঁর মুখে হেরার ঘটনা  শুনামাত্রই বলে ফেল্লেন, আগমনকারী সে ফেরেশতাই যিনি মূসার (আ) কাছে অহী নিয়ে এসেছিলেন। কারণ এখানেও ঠিক সেই অবস্থার সম্মুখীন উনি হয়েছেন যে অবস্থার সম্মুখীন হযরত মূসা (আ) হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একেবারে পূত পবিত্র চরিত্রের একজন সরল সহজ ও পরিচ্ছন্ন মানুষ। নবুয়তের কোন চিন্তাভাবনা করা ত দূরের কথা- তা লাভ করার কোন সামান্যতম ধারণাও কোন দিন মনে স্থান পায়নি। অকস্মাৎ এর সজ্ঞানে ও প্রকাশ্যে এ অভিজ্ঞতা তিনি লাভ করেন। অতএব দুই আর দুই চারের মত তিনি এ নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌছেন যে, এখানে কোন আত্ম প্রবঞ্চনা অথবা শয়তানী ইন্দ্রিয় গোছর কোন ব্যপার নয় বরঞ্চ এ সত্যনিষ্ঠ লোকটি কোন ইচ্ছা অভিলাষ ব্যতিরেকেই যা কিচু দেখেছেন তা প্রকৃত সত্যই দেখেছেন।

এ মুহাম্মদ (স) এর নবুয়তের এমন এক সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, এক সত্যপন্থী মানুষের এ সত্য অস্বীকার করা বড়ো কঠিন। এ জন্যে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এটাকে নবুয়তের দলিল হিসাবে পেশ করা হয়েছে। [আল্লাহ বলেন- (আরবী***********************)

-হে মুহাম্মদ বলে দাও- আল্লাহর েইচ্ছা এ হতো, তাহলে এ কুরআন তোমাদেরকে কখনোই শুনাতাম না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে এ সংবাদও দিতেন না। তাছাড়া এর আগে আমি তোমাদের মধ্যে একটি জীবন অতিবাহিত করেছি। তোমরা তোমাদের বিবেক বুদ্ধি কাজে লাগবেনা? (ইউনুস: ১৬)।

(আরবী******************)

তুমি কিছুই জানতেনা কিতাব কাকে বলে, ঈমান কি জিনিস। কিন্তু সেই রূহকে আমরা একটি আলো বানিয়ে দিয়েছি যার দ্বারা আমরা আমাদের বান্দাহদের মধ্যে যাকে চাই পথ দেখাই (শুরা: ৫২)]

প্রথম অহীর বক্তব্য

রসূলুল্লাহ (স) এর উপর প্রথম যে অহী প্রেরিত হয় তা সূরায়ে আলাকের প্রথম পাঁচটি নিয়ে গঠিত যাতে বলা হয়েছে-

“পড় তোমার রবের নামে যিনি পয়দা করেছেন। একটি মাংসপিন্ড থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। পড়, এবং তোমার রব বড়ো মেহেরবান, যিনি কলম দ্বারা জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দান করেছেন যা তার জানা ছিলনা।”

এ অহী নাযিলের প্রথম অভিজ্ঞতা যা হুযুর (স) লাভ করেন। এ পয়গামে তাঁকে এ কথা বলা হয়নি যে, কোন বিরাট কাজে তাঁকে নিযুক্ত করা হচ্ছে এবং সামনে তাঁকে কি কি করতে হবে। বরঞ্চ একটি প্রাথমিক পরিচিতর পর তাঁকে কিছুদিনের অবকাশ দেয়া হয়েছিল যাতে করে এ প্রথম অীভজ্ঞায় তাঁর স্বভাব প্রকৃতির উপরে যে বিরাট চাপ পড়েছিল তার প্রভাব দূর হয়ে যায় এবং মানসিক দিক দিযে তিনি আগামীতে অহী লাভ করার এবং নবুয়তের দায়িত্ব পালনের জন্যে তৈরী হতে পারেন। [ বিরতির পর দ্বিতীয়বার যখন অহী নাযিল শুরু হলো, তখন সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম সাত আয়াত নাযিল করা হয়। এতে প্রথমবারে মতো নবীর উপর এ নির্দেশ দেয়া হয়- তুমি উঠ এবং খোদার সৃষ্টি মানুষকে ঐ দৃষ্টিভংগীর পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দাও যার উপর তারা চলছে। এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে- গ্রন্থকার।]

অহীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা

প্রথম অহী যা নবীর উপর নাযিল হয় তার প্রতিটি শব্দের উপর চিন্তাভাবনা করুন:

(আরবী*****************)

পড়ুন (হে নবী) আপন রবের নামের সাথে যিনি পয়দা করেছন (আলাক: ১)

 ফেরেশতা যখন হুযুরকে (স) বলেন যে, হে নবী পড়ুন তার জবাবে তিনি বলেন, আমি ত পড়তে জানিনা। িএর থেকে বুঝা যায় যে, ফেরেশতা অহীর এ শব্দগুলো লিখিত আকারে তাঁর সামনে পেশ করেছিলেন। কারণ ফেরেশতার কথার অর্থ যদি এই হতো যে যেভাবে আমি পড়ছি তেমনি পড়ুন তাহলে হুযুরের কথা বলার কোন প্রয়োজন হতো না যে আমি পড়তে জানি না।

‘আপনি রবের নামের সাথে পড়ৃন’ –অর্থাৎ আপন রবের নাম নিয়ে পড়ুন। অন্য কথায় বিসমিল্লাহ বলুন এবং পড়ুন। এর থেকে এটাও জানা গেল যে, রসূলুল্লাহ (স) এ অহী আসার পূর্বে শুধু আল্লাহ তায়ালাকেই তাঁর প্রবু বা রব জানতে এবং মানতেন। এ জন্যে এ কথা বলা প্রয়োজন হয়নি যে তাঁর রব কে। বরঞ্চ বলা হলো যে আপন রবের নাম নিয়ে পড়ুন। অর্থাৎ যে রবকে আপনি জানে তাঁর নাম নিয়ে পড়ুন।

“যিনি পয়দা করেছন” –একথা বলা হয়নি যে তিনি কাকে পয়দা করেছেন। এর থেকে আপনা আপনি এ অর্থ বেরয় যে ঐ রবের নাম নিয়ে পড়ুন যিনি স্রষ্টা। যিনি সমস্ত সৃষ্টি জগত ও তার প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করেছন।

(আরবী************************)

জমাট রক্তের মাংসপিন্ড থেকে মানুষ পয়দা করেছেন। সৃষ্টিজগতের সাধারণ সৃষ্টির উল্লেখের পর বিশেষ মানুষের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কোন তুচ্ছ অবস্থা থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করে তাকে পূর্ণ মানুষ বানানো হয়েছে। (****) বহু বচর (****)  শবের যার অর্থ রক্তপিন্ড। এ সেই প্রাথমিক অবস্থা যা গর্ভ সঞ্চারের কিছুদিন পর প্রকাশ লাভ করে। তারপর তা গোশতের আকার ধারণ করে। তারপর ক্রমশঃ তার মধ্যে মানুষের আকার ধারণ করার ধারাবাহিকতা শুরু হয়।

(আরবী********************)

-পড়ুন, এবং আপনার রব বড়ো মেহেরবান যিনি কলমের দ্বারা জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। (আলাক: ৩০৪)। অর্থাৎ এ হচ্ছে তাঁর বড়ো মেহেরবানী যে এ তুচ্ছ অবস্থা থেকে সূচনা করে তিনি মানুষকে জ্ঞানবান বানিয়েছেন যা সৃষ্টির সেরা গুণ। শুধু তাকে জ্ঞানবান করেই বানাননি, বরঞ্চ তাকে কলমের সাহায্যে লেখার কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন যা ব্যাপক আকারে জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার, উন্নতি এবং বংশানুক্রমে তার দায়িত্ব ও সংরক্ষণের মাধ্যম হয়ে পড়ে।

যদি তিনি ইলহামী পদ্ধতিতেই মানুষকে কলম ও লেখার বিদ্যা না শিক্ষা দিতেন, তাহলে মানুষের বুদ্ভিবৃত্তিক যোগ্যতা সংকুচিত ও আড়ষ্ট হয়ে যেতো। তার প্রচাপর প্রসারের ও বিকশিত হওয়ার এবং এক পুরুষ থেকে আর এক পুরুষ পর্যন্ত অধিকতর উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়ার কোন সুযোগই থাকতোনা।

(আরবী****************)

মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যার জানা ছিল না।

অর্থাৎ মানুষ মুলতঃ একেবারে জ্ঞানহীন ছিল, সে যা কিছু জ্ঞান লাভ করেছে তা সবই আল্লাহর দেয়া বলেই সে লাভ করেছ। আল্লাহ তায়ালাই যে পর্যায়ে মানুষের জন্যে জ্ঞানের দ্বার খুলে দেন সে পর্যায়ে তা খুলে যেতে থাকে। একথাই আয়াতুল কুরসীতে এভাবে বলা হয়েছে- (আরবী*******************)

-এবং মানুষ তাঁর জ্ঞানের মধ্য থেকে কোন কিছু আয়ত্ব করতে পারে না। অবশ্য তিনি নিজে চাইলে সে অন্য কথা।

যে সব বিষয়কে মানুষ তার জ্ঞানলব্ধ বলে মনে করে, তা প্রকৃত পক্ষে তার জ্ঞানবহির্ভূত ছিল। আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তাঁর জ্ঞান মানুষকে দিয়েছেন। অবশ্যি মানুষ এটা অনুভব করতে পারে না যে যে, আল্লাহ তাকে সে জ্ঞান দান করেছেন।

এ পর্যন্তই সে আয়াতগুলো যা নবী (স) এর উপর নাযিল করা হয়েছিল। হযরত আয়েশা (রা) এর হাদীস থেকে জানতে পারা যায়, এ প্রথম অভিজ্ঞতা এতো কঠিন ছিল যে তার বেশী হুযুর (স) সহ্য করতে পারতেন না। এ জন্যে সে সময়ে এতটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছিল, যে রবকে পূর্ব থেকে আপনি জানতেন এবং মানতেন তিনি সরাসরি আপনাকে সম্বোধন করছেন। তাঁর পক্ষ থেকে আপনার উপরে অহীর ধারাবাহিকতা শুরু হযেছে এবং আপনাকে তিনি তাঁর নবী বানিয়েছেন।

এর কিছুকাল পরে সূরা মুদ্দাসসিরের প্রথম সাত আয়াত নাযিল হয়। এতে তাঁকে বলা হয়, নবুয়তের অভিষিক্ত হওয়ার পর তাঁকে কোন করতে হবে।[এ প্রসংগে একথাটা জেনে রাখা ভালো যে, রসূলুল্লাহ (স) হযরত জিব্রীলকে (আ) মাত্র দুবার তাঁর আপন আকৃতিতে দেখেছিলেন। তাছাড়া তিনি সর্বদা মানুষের আকৃতিতেই নবীর কাছে আসতেন। বোখারীর কিতাবুল তাওহীদে হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় জানা যায় এবং মুসলিমে কিতাবুল ঈমানে হযরত আয়েশা (রা) স্বয়ং রসূলুল্লাহ (স) থেবে বর্ণনা করেন যে, প্রথমবার হযরত জিব্রীল (আ) পূর্বকাশে প্রকাশিত হন (সূরায়ে নামজে উফুকেল আলা (****) এবং সূরায়ে তাকবীরে উফুকে মবীন (***) বলা হয়েছে এবং ক্রমশঃ হুযুরের (স) দিকে অগ্রসর হন। অবশেষে তাঁর উপরে শূন্যে অবস্থান করেন। তারপর তিনি নবীর দিকে ঝুঁবে পড়েন এবং তাঁর এতো নিকটবর্তী হন যে উভয়ের মধ্যে মাত্র দুটি ধনুকের ব্যবধান রয়ে গেল। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, সে সময়ে জিব্রীল (আ) তাঁর আকৃতিতে ছিলেন এবঙ সমগ্র উর্ধ পরিমন্ডল ছেয়ে থাকেন। (বোখার।) স্বয়ং নবী (স) বলেন, আমি তাঁকে সেই আকৃতিতে দেখেছি, যে আকৃতিতে আল্লাহ তাঁকে পয়দা করেছেন। আকাশ ও জমীনের মধ্যবর্তী সমগ্র শূন্যমার্গ তাঁর বিরাট সত্তায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় (মুসলিম)।

অহী নাযিলের সূচনা কখন হয়?

সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত সম্বলিত এ সর্বপ্রথম অহী কখ নাযিল হয়েছিল? এ সম্পর্কে বর্ণনাকারীঅদের বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ইবনে আবদুল বার এবং মাসউদী বলেন, হুযুরে () নবী হিসাবে নিয়োগের তারিখ ৮ই রবিউল আওয়াল হাতিবর্ষ ৪১। ইবনুল কাইয়েম তাঁর যাদুল মায়অতে একে অধিকাংশের বক্তব্য বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু যাঁদের এ বক্তব্য তাঁরা সম্ভবতঃ নবুয়তের ঘোষণা সে সময় থেকে নির্ণীত করেছেন, যখন বায়হাকীর বর্ণনা মতে অহী নাযিলের ছয় মাস পূর্বে নবী (স) সত্য স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু অহী নাযিলের সম্পর্কে কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে:-

(আরবী******************)

-রমযান এমন এক মাস যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয় (বাকারা: ১৮৫)

কুরআনের এ সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিপরীত অন্য কোন বক্তব্য নির্ভরযোগ্য হতে পারে না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে, রমযানের কোন তারিখ থেকে অহী নাযিলের সূচনা হয় এ ব্যাপারেও বিভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। কেউ কেউ ৭ই রমযান বলেছেন। ইবসনে সা’দ একস্থঅনে ১২ই রমযান এবং দ্বিতীয় স্থানে ইমাম বাকেরের (রা) বরাত দিয়ে ১৭ই রমযান বলেছেন। বালাযুরী বর্ণনাক করেছেন। তাবারী ও ইবনে আসীর আবু কেলাবাতুল জারমীর বরাত দিয়ে ১৮ই রমযান এবং কতিপয় অন্য লোক ১৯শে রমযান বলেছেন। ওয়াসেলা বিন আল-আসকা জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) এবং আবুল জুলাত ২৪শে রমযান বলেছেন। অথচ কুরআন পাকের এরশাদ হচ্ছে- (আরবী******************)

-আমরা এ কুরআনকে শবে কদরে নাযিল করেছি। ওলামায়ে উম্মতের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ এ মত পোষণ করেন  যে রমযানের শেষ দশ রাতের কোন এক বেজোড় রাত শবে কদর। তাঁদেরও অধিকাংশ আবার ২৭ শে রমযান শবে কদর বলেন। [দ্বিতীয় বার নবী তাঁকে সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে দেখেন।

মুসনাতে আহমদে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে নবী (স) বলেন, আমি জিব্রীলকে (আ) সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে দেখেছি। তাঁর ছ’শ বাহু ছিল (তাফহীম), সূরা নজম, টীকা-৫, ৭, ৮, ১১ও ১৪)।]

কুরআন নাযিলের তারিখ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হাদীস

আবু হুরায়রার (রা) বর্ণনা এই যে, রসূলুল্লাহ (স) শবে কদর সম্পর্কে বলেন, তা হচ্ছে ২৭শে অথবা ২৯শে রাত (আবু দাউদ ও তায়ালিসী) দ্বিতীয় বর্ণনা হযরত আবু হুরায়রাহ (রা) থেকে এই যে, তা হচ্ছে রমযানের শেষ রাত (মুসনাদে আহমাদ)

যির বিন হুবাইশ হযরত ওবাই বিন কা’বকে (রা) শবে কদর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি কসম করে বলেন যে তা ২৭ শে রাত (আহমদ, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ী ও ইবনে হিব্বান)

হযরত আবু যরকে (রা) এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, হযরত ওমর (রা), হযরত হুযায়ফা (রা) এবং রসূলের সাহাবীদের মধ্যে অনেকেরই এ সম্পর্কে কোন সন্দেহ ছিল না যে তা রমযানের ২৭ শে রাত (ইবনে আবি শায়বাহ)।

হযরত উবাদাহ বিন সামেত (রা) বলেন যে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, শবে কদর রমযানের শেষ দশ রাতের মধ্যে এক বেজোড় রাত- একুশ, তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ অথবা উনত্রিশ( মুসনাদে আহমাদ)।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, তাকে (শবে কদর) শেষ দশ রাতের মধ্যে তালাশ কর –মাস শেষ হতে যখন ন’দিন বাকী, অথবা পাঁচ দিন বাকী (বোখারী) অধিকাংশ মনীষী এ মর্ম নিয়েছেন যে, হুযুর (স) বেজোড় রাতগুলোকেই বুঝিয়েছেন।

হযরত আবু বকর (রা) এর বর্ণনায় আছে যে, ন’দিন বাকী থাক সাত দিন বাকী থাক, পাঁচ দিন, তিন দিন অথবা শেষ রাত। অর্থাৎ এ তারিখগুলোতে শবে কদর তালাশ কর( তিরমিযি, নাসায়ী)।

হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনায় আছে যে, নবী (স) বলেছেন, শবে কদরকে রমযানের শেষ দশরাতের মধ্যে বেজোড় রাতে তালাশ কর (বোখারী, মুসলিম, আহমদ, তিরমিযি)। হযরত আয়েশা (রা) হযরত আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা) এর বর্ণনায় আছে যে, নবী (স) রমযানের শেষ দশরাতের এতেকাফ করেছেন।

 এ ব্যাপারে যেসব বর্ণনা হযরত মায়াবিয়া (রা) হযরত ওমর (রা) হযরত ইবনে আব্বাস (রা) প্রমুখ বুযুর্গান থেকে পাওয়া যার তার ভিত্তিতে সালফ সালেহীনের বিরাট সংখ্যক ব্যক্তিবর্গ ২৭শে রমযান কেউ শবে কদর মনে করেছেন।ঠ (**ঁ**১৪)

নবুয়তের পর প্রথম ফরয, নামায

তাবারী বলেন, তৌহীদের প্রতি বিশ্বাসের ঘোষণা এবং মূর্তিপূজা পরিহার করার পর সর্বপ্রথম যে জিনিস ইসলামী শরীয়তে ফরয করা হয়েছে তা নামায। ইবনে হিশাম ও মুহম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে হযরত আয়েশার (রা) এ বর্ণনা নকল করেছন যে, সর্বপ্রথম নবী (স) এর উপর যে জিনিস ফরয করা হয় তা নামায। তা প্রথমে ছিল দু দু রাকায়াত করে। ইমাম আহমদ ইবনে লাহিয়ার একটি বর্ণনা হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) থেকে উধৃত করেছেন যে, নবী (স) এর উপর প্রথম বার অহী নাযিল হওয়ার পর জিব্রীল (আ) তাঁর কাছে অযু করে শিক্ষা দিলেন। ইবনে মাজাহ এবং তাবারানীতেও কিছু সনদের সতভেদ সহ এ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তার ব্যাখ্যা ইবনে ইসহাকের এ বর্ণনা থেকে হয় যে, নবী (স) মক্কার মালভূমি অংশে চিলেন এবং জিব্রীল (আ) সুন্দর আকৃতিতে এবং উৎকৃষ্ট সুগন্ধিসহ তাঁর সামনে আবির্ভূত হন এবং বলেন, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ আপনাকে সালাম দিয়েছেন এবং বলেছেন যে আমপি জ্বিন ও মানুষের জন্যে তাঁর পক্ষ থেকে রসূল। এ জন্যে আপনি তাদেরকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর দাওয়াত দিন।

তারপর তিনি জিব্রীল (আ) মাটিতে পায়ের আঘাত করলেন এবং একটি ঝর্ণা বেরিয়ে পড়লো। তারপর তিনি অযু করলেন যাতে করে নবী নামাযের জন্যে পাক হওয়ার পদ্ধতি শিক্ষা করতে পারেন। তারপর বল্লেন, এখন আপনি অযু করুন।

তারপর জিব্রীল (আ) হুযুরকে (স) সাথে করে চার সিজদার সাথে দু’রাকয়াত নামায পড়েন। তারপর হুযুর (স) হযরত খাদিজাকে (রা) সেখানে আনেন, অযু করান এবং তাঁকে সাথে নিয়ে দু’রাকায়াত নামায পড়েন। ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর এবং ইবনে কাসীরও এ ঘটনাবিবৃত করেন।

ইমাম আহমদ, ইবনে মাজাহ এবং তাবারানী উসামা বিন যায়েদ (রা) থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) থেকে নকল করেন যে, হুযুর (স) এর উপর অহী নাযিল হওয়ার পর প্রথম যে কাজটি ফরয হয় তা হলো এই যে, জিব্রীল (আ) এসে নবীকে অযুর নিয়ম শিখিয়ে দেন। তারপর তিনি নামাযের জন্যে ‍দাঁড়ান এবং নবীকে বলেন, আপনি আমার সাথে নামায পড়ুন। তারপর নবী (স) ঘরে এসে হযরত খাদিজাকে (রা) এ ঘটনা বলেন। তিনি আনন্দে অধীর হয়ে পড়নে। তখন নবী (স) তাঁকে সেখাবে অযু করতে বলেন এবং তাঁকে নিয়ে সেভাবেই নামায পড়লেন যেভাবে তিনি হযরত জিব্রাইল (আ) এর সাথে পড়েছিলেন অতপর এ ছিল প্রথম ফরয কাজ যা অহী নাযিলের পর নির্ধারিত করা হয়। সম্ভবতঃ সে রাতের প্রাতঃকালের ঘটনা যে রাতে (*****) নাযিল হয়। তারপর থেকে হুযুর (স) এবং খাদিজা (রা) গোপনে নামায পড়তেন।

প্রথম চার মুসলমান

এ কথা সর্বসম্মত যে প্রথম মুসলমান হযরত খাদিজা (রা) তারপর এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, হযরত আলী (রা) হযরত আবু বকর (রা) এবং হযরত যায়েদ বিন হারেসার (রা) মধ্যে সকলের আগে কে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে এ কথা সর্বসম্মত যে হযরত খাদিজা (রা) পর সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন এ তিনজন। *****)

হযরত আলী (রা) সম্পর্কে হাফেজ ইবনে কাসীর আল বেদায়াতে  ইবনে ইসহাকের রেওয়ায়েত এবং বালাযুরী ওয়াকেদীর রেওয়ায়েত নকল করে বলেন যে, যখন হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজা (রা) গোপনে নাময মুরু করেন, তখন একদিন পরেই হযরত আলী (রা) তাঁদেরকে এ অবস্থায় দেখেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, এ কি? হুযুর বলেন, এ হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন যা তিনি নিজের জন্যে মনোনীত করে দিয়েছেন এবং যার সাথে তিনি তাঁর রসূল পাঠিয়েছেন। অতএব আমি তোমাকে দাওয়াত দিচ্ছি যে তুমি এক ও লা শরীক আল্লাহকে মেনে নাও, তাঁর এবাদত কর এবং লাত ও ওয্যাকে অস্বীকা কর।

হযরত আলীর বয়স তখন দশ বছর। তিনি বলেন, একথাত আমি এর পূর্বে কখনো শুনিনি। আমি একবার আব্বাকে জিজ্ঞেস করার আগে কোন ফয়সালা করতে পারি না।

সে সময়ে হুযুর (স) এটা চাইতেন না যে, সময়ের পূর্বেই তাঁর রহস্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। এজন্যে তিনি বলেন, তুমি যদি আমার কথা না মান বিষয়টি গোপন রাখবে। সে রাত হযরত আলী (রা) চুপ থাকেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর অন্তরে ইসলামের প্রেরণা জাগিয়ে দেন এবং সকালে নবীর সামনে হাজীর হয়ে বলেন গতকাল আপনি আমাকে কি বলেছিলেন?

[ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থসমূহ এ প্রাথমিক চারজনকে নাম মুসলমানর নাম করা হয়ে থাকে। কিন্তু এ কথা মনে করা যায় না যে, হুযুরের (স) যেসব কন্যা সে সময়ে জ্ঞান বুদ্ধি লাভ করেছিলেন তাঁরা তাঁদের মহিয়সি মাতার সাথে ঈমান আনেননি। হযরত যয়নবেচর (রা) বয়স হুযুরের (স) নবুয়ত প্রাপ্তির সময় দশ বছর ছিল্ হযরত উম্মে কুলসূম (রা) এবং হযরত রুকাইয়অর (স) বয়স এতোটা হয়েছিল যে সর্বসাধারণের কাছে দাওয়াতের সূচনার আগে তাদের বিয়ে আবু লাহাবের ছেলেদের সাথে করিয়ে দেন। অবশ্যি হযরত ফাতিমা (রা) নবুয়তের েএক বছর পর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী পরিবেশেই চোখ খোলেন। এ জন্যে আমাদের মতে তিন কন্যাকে প্রাথমিক মুসলমানের মধ্যেই শামিল করা উচিত হযরত ফাতেমা সম্পর্কে এটা মনে করা উচিত যে তিনি একজন মুমেনা-মুসলিমা হিসাবেই জ্ঞানচক্ষু উন্মিল করেন- গ্রন্থকার।]

হুযুর (স) বলেন, তুমি এ সাক্ষ্য দাও যে, এক ও লা শরীক আল্লাহ ছাড়ার আর কোন মাবুদ নেই, এবং তুমি লাত ও ওয্যাকে অস্বীকার কর এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য শরীকদের সম্পর্ক ছিন্ন কর।

হযরত আলী (রা) তৎক্ষণাৎ তা মেনে নেন। কিন্তু আবু তালিবের ভয়ে ইসলাম গোপন রাখেন। অবশ্যি তিনিও হুযুরের (স) সাথে নামায শুরু করেন।

ইমাম আহমদ ইবনে জারীর এবং ইবনে আবদুল বার আফীফ কিন্দীর (আশয়াস বিন কায়েসের বৈমাত্রেয় এবং চাচাতো ভাই) বর্ণনা উধৃত করে বলেন, আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব মামার পুরাতন বন্ধু ছিলেন এবং প্রায় ইয়ামেনে এসে আতর খরিদ করতেন এবং হজ্বের সময় তা বিক্রি করতেন। একবার হজ্বের সময় যখন মিনাতে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো, দেখলাম যে একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি এলেন এবং বেশ ভালো করে অযু করলেন, তারপর তিনি নামায পড়তে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর সাবালক হতে বাকী এমন বালক এলো এবং সেও খুব ভালো করে অযু করে নামায পড়তে দাঁড়িযে গেল। আমি বল্লাম হে আব্বাস এ কোন দ্বীন? এতো আমি জানি না।

আব্বাস (রা) বল্লেন, এ আমার ভাতুষ্পুত্র মুহাম্মদ (স) বিন আবদুল্লাহগ বিন আবদুল মুত্তালিব। তার দাবী হলো, আল্লাহ তাকে রসূল করে পাঠিয়েছেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তার দাবী হচ্ছে এই যে, কায়সার ও কিসরার ধনদৌলত তার অধীন হবে। আর এ দ্বিতীয়টি হলো আমার ভাতিজা আলী বিন আবি তালিব। সে তার দ্বীনের অনুসরণ করছে। আর এ হচ্ছে মুহাম্মদের বিবি খাদিজা বিন্তে খুয়ায়লিদ। সেও তার দ্বীনের অনুসারী হয়েছে।

পরবর্তীকালে কিন্দী স্বয়ং যখন মুসলমান হন, তখন দুঃখ করে বলেন, আহা যদি তাদের সাথে আমি চতুর্থ ব্যক্তি হতাম।

ইবনে হিশাম এবং ইবনে জারীর বলেন, পরে এক সময়ে আবু তালিবও হযরত আলীকে নামায পড়তে দেখেন। বলেন, বাছা, এ কোন দ্বীন যার অনুসরণ করছ? তিনি বলেন, আব্বাজান আমি আল্লাহ িএবং তাঁর রসূল (স) এর ‍উপর ঈমানে এনেছি। তাঁর সত্যতা মেনে নিয়েছি এবং তাঁর সাথে নামায পড়েছি।

আবু তালিব বলেন, সে তোমাকে মংগল ছাড়া আর কোন কিছুর দিকে আহ্বান জানাবে না। তুমি তার সাথে লেগে থাক।

ইবনে কাসীর আবু তালিবের এক উক্তি উধৃত করেন, তোমার চাচাতো ভাইয়ের সাথে থাক এবং তার মদদ কর। হযরত আবু বকর (রা) সম্পর্কে যুরকানী শরহে মুওয়াহেবে লিখেছেন যে, তিনি হযরত খাদিজার (রা) ভাইপো হাকীম বিন হিসামের ওখানে বসে ছিলেন। এমন সময়ে হযরত হাকীমের দাসী তাঁর কাছে এসে বল্লো, আপনার ফুফী আজ বলেছিলেন যে তাঁর স্বামী হযরত মূসা (আ) এর মতো একজন নবী যাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এ শুনা মাত্র হযরত আবু বকর (রা) সোজা নবী (স) এর নিকটে পৌছলেন েএবং সে দাসীর কথা সত্য ছিল এ কথা জানার পর বিনা দ্বিধায় ঈমান আনেন। ইবনে ইসহাক আবদুল্লাহ বিন আলহুসাইন আত্তিমিনী থেকে এ বর্ণনা উধৃত করেন যে, রসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, আমি যার কাছেই ইসলাম পেশ করেছি, সে কিচুনা কিছু ইতস্ততঃ করেছে িএবং চিন্তা ভাবনা করেছে। কিন্তু আবু বকরের কাছে যখন আমি তার উল্লেখ করেছি। তিনি কোন ইতস্ততঃ করেননি এবং মেনে নিতে একটু  বিলম্বও করেননি।

হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) সম্পর্কে কোন বিস্তারিত বিবরণ বর্ণীত নেই যে, তিনি কিভাবে ঐমান আনেন। কিন্তু পনেরো বছর যাবত তিনি হুযুরের গৃহে তার পরিবারের লোক হিসাবেই বসবাস করেন। নিশ্চয় তিনি হুযুর (স) এবং হযরত খাদিজাকে (রা) নামায পড়তে দেখেছেন এবং এটাই তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে থাকবে।

এসব ঘটনা থেকে প্রসংগক্রমে এটাও জানতে পারা যায় যে, যদিও হুযুর (স) প্রথম প্রথম অপ্রকাশ্যভাবে কাজ করচিলেন, তথাপি তাঁর এবং হযরত খাদিজা (রা) এর নিকটাত্মীয়গণ জানতেন যে, হুযুর (স) পৈত্রিক দ্বীনের খেলাপেআর একটি দ্বীন পেশ করছিলেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী নিযুক্ত হওয়ার দাবী করেচিলেন। তাঁর এ দাবী তাঁর পরিবারের লোকজন এবং অন্ততঃ পক্ষে তাঁর বন্ধু শুধু মেনেই নেননি, বরঞ্চ তদনুযায়ী এবাতদও অন্য পন্থায় শুরু করেচিলেন। তখাপি যেহেতু এসব কথা তাঁর দুশমনদের জানা ছিলনা শুধু তাঁর শুবাকাংখীদেরই জানা ছিল সেজন্যে তারা এসব গোপনই রাখেন, যেমন হুযুর (স) সূচনাতে তা গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। আর এ বিষয়ের কোন আলাপ আলোচনাও করেননি, নইলে সময়ের পূর্বেই বিরোধিতা শুরু হয়ে যেতো।

প্রাথমিক তিন বছরে হুযুরের (স) শিক্ষার জন্যে কি হযরত ইসরাফিলকে (আ) পাঠানো হয়েছিল?

ইবনে জারীর তাঁর ইতিহাসের, ইবনে সা’দ তাবাকাতে, কাসতাল্লামী মওয়াহেবুল্লাদুন্নিয়াতে এবং যুরকানী শরহে মুয়াহেবে প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম শা’বীর এ বর্ণা উধৃত করেছেন যে, নবুয়তের প্রাথমিক তিন বছর যাবত হযরত ইসরাফিল (আ) কে শিক্ষাদানের জন্যে রসূলুল্লাহ (স) সাথে লাগিয়ে দেয়া হয়। তিনি অহী নিয়ে আসতেননা। কারণ অহী আনয়নের দায়িত্ব হযরত জিব্রিলের (আ) ছিল। অবশ্যি তিনি অহী ব্যতীত অন্য পন্থায় হুযুর (স) কে জ্ঞান শিক্ষা দিতেন। [সম্ভবতঃ এ পন্থা হতে পারে, ইলকা() অথবা সাক্ষাৎ কোন শিক্ষাদান হতে পারে- গ্রন্থকার।]

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইয়াকুব বিন সফিয়া আলহাফেয, এবং বায়হাকী ইমাম শা’বীর এ বর্ণনা নকল করেছেন এবং তিনি পর্যন্ত এ সনদ সঠিক। কিন্তু জানিনা স্বয়ং শা’বী কোন সূত্রে এটা জানলেন। কারণ তিনি ত হুযুর (স) পর্যন্ত এর সনদ বয়ান করেননি। ইবনে সা’দ এবং ইবনে জারীর বলেন যে ওয়াকেদী এর সভ্যতা অস্বীকার করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছৈন যে হুযুর (সা) এর সাথে হযরত জিব্রিল ব্যতী আর কাউকে নিয়োজিত করা হয়নি।

এ এমন একটি ব্যাপার যে, না তাকে একেবারে অস্বীকার করা যায়, আর না নিশ্চিত করে গ্রহণ করা যায়। অস্বীকার করা এজন্যে মুশকিল যে, শা’বী একজন নির্ভযোগ্য মুহাদ্দিস এবং তাঁর মুরসাল রেওয়ায়েতও এতোটা কমজোর নয় যে তা একেবারে প্রত্যাখ্যান করা যায়। কিন্তু তাকে একটা নিশ্চিত ঘটনাও বলা যায় না। কারণ রেওয়ায়েত সনদের দিক দিয়ে এতোটা মজবুতও নয় যে তাকে অবশ্যই মেনে নেয়া যায়। তথাপি বিষয়টি সম্ভাবনার অতীতও নয়। কারণ নবুয়তের পর হুযুরের কথাবার্তায় ও কাজকর্মে জীবনের সকল দিকের জন্যে জ্ঞানের যে অফুরন্ত সম্পদ আমরা পাই যে সম্পদে হাদীস ও সীরাত গ্রন্থগুলো পরিপূর্ণ এবংয় যার কোননজীর অন্য কোন মানুষের কথা ও কাজে সামান্যতম পরিমাণেও পাওয়অ যায়না- তা অবশ্যই অদৃশ্য জগত থেকে নবীর মনের গভীরে ঢেলে দেয়া হয়েছিল। আর জ্ঞান সম্পদ বিতরণেল খেদমত আল্লাহ তায়ালা সম্ভবতঃ হযরত ইসরাফিল (আ) এর দ্বারা নিয়ে থাকবেন।

ফাতরাতুল অহী

প্রথম অহী নাযিলের পর একটা সময় পর্যন্ত জিব্রিল (আ) অহী আনয়নে বিরত থাকেন। এ অবস্থা যতোই দীর্ঘায়িত হতে থাকে, হুযুরে (সা) মনোবেদনা ততোই বাড়তে থাকে। এমনকি, তিনি কখনো অবচেতন মনে মক্কার পাহাড় শাবিরে এবং কখনো হেরার উপরে গিয়ে মনে করতেন যে নিজেকে নীচে নিক্ষেপ করেন। এ অবস্থায় যখন তিনি কোন পাহাড়ের এক কিনারার দিকে যেতে থাকেন তখন তিনি আকাশ থেকে একটি ধ্বনি শুনতে পেয়ে থেমে যান। উপরে তাকিযে দেখেন হযরত জিব্রিল আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে একটি চেয়ারে উপবিষ্ট। তিনি বলেন, হে মুহাম্মদ! আপনি অবশ্যই আল্লাহর রসূল এবং আমি জিব্রিল।

ইবনে সা’দ এ কাহিনী হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বচাস রা. থেকে ইবনে জারীর তঁঅর তাফসীরে এবং আবদুর রাজ্জাক তাঁর আল-মুসান্নাফে ইমাম যুহরী থেকে নকল করেন। বোখারী, মুসলিম এবং মুসনাদে আহমদেও এর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। (****১৫)

ইমাম যুহরীর বর্ণনায় বলা হয়েছৈ-

কিছুকাল যাবত রসূলুল্লাহ (স) উপর অহী নাযিল বন্ধ থাকে। সে সময়ে তিনি এতোটা মানসিক কষ্ট ভোগ করতে থাকেন যে, অনেক সময় তিনি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে নিজেকে উপর থেকে নীচে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হতেন। কিন্তু যখনই তিনি পাহাড়ের চূড়ার কিনারায় পৌছতেন, তখন জিব্রিল (আ) তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বলতেন, আপনি আল্লাহর নবী। একথায় তিনি মনে প্রশান্তি লাভ করতেন এবং তাঁর মনের অস্থিরতা দূর হয়ে যেতো।– (ইবনে জারীর)।

তারপর ইমাম যুহরী হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহর (রা) বর্ণনায় উধৃত করে বলেন, রসূলুল্লাহ (সা) ফাতরাতুল অহীর (অহী বন্ধ হওয়া) উল্লেখ করে বলেন, একটি আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় হঠাৎ আমি আকাশ থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলাম। মাথা তুলতেই সেই ফেরেশতাকে দেখতে পেলাম, যাকে আমি গারে হেরায় দেখতে পেয়েছিলাম। তিনি আকাশ ও জমীনের মাঝখানে একটি চেয়ারে উপবিষ্ট ছিলেন। আমি তা দেখে ভয়ানক ভীত বিহ্বল হয়ে পড়লাম এবং ঘরে পৌঁছে বল্লাম, আমাকে লেপ কম্বল জড়িয়ে দাও। তারপর বাড়ির লোকজন আমাকে লেপকম্বল জড়িয়ে দিল, তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী নাযিল হয়-

(আরবী*****************)

(হে কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি)। তারপর ক্রমাগত আমার উপর অহী নাযিল হতে থাকে- (বোখারী, মুসলিম, মসনাদে আহমদ –ইবনে জারীর)।

সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক সাত আয়াত নাযিল

এভাবে অহী বন্ধ থাকার সময় উত্তীর্ণ হয় এবং সূরা মুদ্দাসসিরের প্রাথমিক সাত আয়াত নাযিল হয় যার মাধ্যমে হুযুরকে (স) রেসালাতের মর্যাদায় ভূষিত করে জরুরী হেদায়েত দেয়া হয় যা রেসালাতের দায়িত্ব পালনের জন্যে জরুরী ছিল। এখানে এ পার্থক্য ভালো করে উপলীব্ধ করা উচিত যে, সূরায়ে আলাকের প্রাথমিক পাঁচটি আয়াত একথাই ঘোষণা করছিল যে, হুযুরের (স) উপরে অহী নাযিলের সূচনা হয়েছে এবং তাঁকে আল্লাহ পক্ষ থে নবী বানানো হয়েছে। এখানে সূরায়ে মুদ্দাসসিরের এ আয়াতগুলোর দ্বারা নবুয়তের সাথে রেসালাতের দায়িত্বও তাঁর উপর আরোপিত করা হচ্ছে। তাঁকে আদেশ করা হচ্ছে- ওঠো এবং দায়িত্ব পালন করা শুরু কর। এ আয়াতগুলো সম্পর্কে কিছু বর্ণনাতে এতোদূর পর্যন্ত বলা হয়েছে যে, এগুলোই কুরআন মজিদের সর্বপ্রথম আয়াত। বোখারী, মুসলিম, তিরমিযি, মুসনাদে আহমদ প্রভৃতি হাদীসগ্রন্থগুলোতে হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) থেকে এর বিশদ বিবরণ দেয়া হয়েছে। কিন্তু উম্মতের মধ্যে এ কথা প্রায় সর্ববাদি সম্মত যে, সর্বপ্রথম-

(আরবী*************) থেকে (*************)

পর্যন্ত নাযিল হয়। তারপর ইবনে আসীরের মতে সূরায়ে মুদ্দাসসিরের এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়া পর্যন্ত অহী নাযিল বন্ধ থাকে। তারপর আবার অহী নাযিল নতুন করে শুরু হয়। স্বয়ং হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) থেকে ইমাম যুহরী এ বর্ণনা নকল করেছেন যে, এ আয়াতগুলো নাযিল হওয়ার পূর্বে রাসূলূল্লাহ (স) সেই ফেরেশতাকেই আসমানে ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে দেখেন যিনি হেরাগুহায় তাঁর কাছে এসেছিলেন। এ বর্ণনায় আমরা উপরে বোখারী, মুসলিম প্রভৃতির বরাত দিয়ে উধৃত করেছি। (****১৭

এ সূরায়ে যে হেদায়েত দেয়া হয়

এখন সূরায়ে মুদ্দাসসের এ আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ্য করুন এবং দেকুন যে এতে কি হেদায়েত দেয়া হয়েছে।

(আরবী***************)

-হে লেব বা কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি। এখানে রসূলুল্লাহকে ‘হে রসূল, হে নবী’- বলে সম্বোধন করার পরিবর্তে ‘হে কম্বল মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যেহেতু হুযুর (স) জিব্রিলকে আসমান ও যমীনের মাঝখানে চেয়ারে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখতে পেয়ে ভীত বিহ্বল হয়ে পড়েন এবং এ অবস্থায় বাড়ি পৌছে বাড়ির লোক জনকে বলেন- আমাকে জড়িয়ে দাও, আমাকে জড়িয়ে দাও। এ জন্যে আল্লাহতায়ালা তাঁকে ‘মুদ্দাসসির’ বলে সম্বোধন করেন। এ মধুর সম্বোধন থেকে আপনা আপনি যে অর্থ প্রকাশ পায় তাহলো- হে আমার প্রিয় বান্দা, তুমি লেপ কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে কেন? তোমার উপর ত একটা বিরাট কাজের দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং তা পালন করার জন্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ময়দানে নামতে হবে।

(আরবী***********)

-উঠ এবং সতর্ক করে দাও।

এ হচ্ছে সেই ধরনের নির্দেশ যা নূহ (আ) কে নবুয়ত দানের পর করা হয়েছিল। যেমন-

(আরবী*****************)

-তোমার জাতিকে সতর্ক করে দাও- তাদের উপর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি আমার পূর্বে- (নূহ: ১)

সূরা মুদ্দাসসিরের উক্ত আয়াতের মর্ম এই: হে কম্বল ‍মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি। উঠে পড় এবং তোমার চারপাশের লোকেরা যে অবহেলায় জীবন যাপন করছে, তাদেরকে সতর্ক করে দাও। এ অবস্থায় যদি তারা লিপ্ত থাকে তাহলে তারা অবশ্যম্ভাবী পরিণাম থেকে তাদেরকে সাবধান করে দাও। তাদেরকে সতর্ক করে দাও যে, তারা কোন মদের মুলুকে বাসকরে না যে, তারা যা খুশী তাই করবে এবং তাদের জন্যে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।

(আরবি**************)

এবয় নিজের রবের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দাও।

এ হচ্ছে একজন নবীরন সর্বপ্রথম কাজ যা এ দুনিয়ায় তাকে করতে হয়। তার প্রথম কাজ এই যে, জাহেল মানুষ এখানে যাদের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিচ্ছে তা সব ‘না’ করে দিতে হবে এবং প্রকাশ্যে সারা দুনিয়ায় এ ঘোষণা দিতে হবে যে, এ বিশ্বজগতে এক খোদা ব্যতীত শ্রেষ্ঠত্ব আর কারো নেই। এ কারণেই ইসলামে “আল্লাহ আকবার” কালেমার সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আযানের সূচনাই হয় আল্লাহু আকবার ঘোষণার দ্বারা। নামাযেও একজন মুসলমান প্রবেশ করে আল্লাহু আকবার বলে। তারপর বার বার আল্লাহু আকবার বলে উঠা বসা করে। পশুর গলায় যখন ছুড়ি চালানো হয় তখন বিসমিল্লাহে আল্লাহু আকবার বলে চালানা হয়। তাকবীর ধ্বনি আজ সারা দুনিয়ার মুসলমানদের সর্বাধিক সুস্পষ্ট ও স্বাতন্ত্রপূর্ণ নিদর্শন। কারণ এ উম্মতের নবী তাঁর কাজই শুরু করেছেন আল্লাহু আকবার দিয়ে।

এখানে একটি সূক্ষ্ম দিকের প্রতি ইংগিত করা হয়েছে যা ভালোভাবে উপলব্ধি করা উচিত। এ আয়াতগুলোর শানে নুযুল থেকে জানা গেছে যে, এই সর্বপ্রথম রসূলুল্লাহ (স) কে রেসালাতের বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্যে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এটাও সুস্পষ্ট যে, যে শহর ও পরিবেশে এ মিশনসহ দন্ডায়মান হওয়ার আদেশ হচ্ছিল তা ছিল শির্কের লীলাক্ষেত্র। কথা শুদু এতোটুকুই ছিলনা যে, সেখানকার জনসাধারণ সাধারণ আরববাসীর মতো মুশরিক ছিল, বরঞ্চ তার চেয়ে বড়ো কথা এই যে, মক্কা মুয়ায্যামা ছিল মুশরিক আরবের সর্ববৃহত তীর্থস্থা। আর কুরাইশের লোকেরা ছিল এর পুরোহিত। এসব স্থানে কোন ব্যক্তির একাকী আবির্ভাব হওয়া এবং শির্কের মুকাবিলায় তাওহীদের পতাকা উত্তোলন করা বিরাট ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল। এজন্যে “ওঠো এবং সতর্ক করে দাও” বলার সাথে সাথে বলা হলো, “আপপন রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।” এর মর্ম এই যে, যেসব ভয়ংকার শক্তিকে তুমি এ কাজের প্রতিবন্ধক মনে করছ তাদের মোটেপরোয়াই করোনা। পরিষ্কার ভাষায় বলে দাও, আমার রব সেসব শক্তি থেকে অনেক বড়ো যারা আমার এ দাওয়াতের পথ রুদ্ধ করার জন্যে দাঁড়াতে পারে।

এর চেয়ে অধিক উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি আর কি হতে পারে যা আল্লাহর কাজ শুরু করার জন্যে কোনো ব্যক্তির জন্যে করা যেতে পারে? আল্লাহর জন্যে শ্রেষ্ঠত্বের চিত্র যার মনে গভীরভাবে অংকিত হয়, সে আল্লাহর জন্যে একাকীই সমগ্র দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না।

(আরবী**************)

-এবং তোমার পোশাক পরিচ্ছদ পাক রাখ।

একথাগুলো ব্যাপক অর্থবোধক এবং এসবের মর্মও সুদূরপ্রসারিী। তার একটি মর্ম এই যে, আপন পোষাক পরিচ্ছদ পাক পবিত্র রাখ। কারণ পোষাক পরিচ্ছেদের পবিত্রতা এবং আত্মার পবিত্রতা ওতপ্রোত জড়িত। একটি পবিত্র আত্মা নোংরা ময়লা দেহ ও অপবিত্র পোষাক পরিচ্ছদে থাকতে পারে না। রসূলুললাহ (স) যে পরিবেশে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করেন তা শুধু আকীদা বিশ্বাস এবং চরিত্রের অথঃপতনের অতলতলেই নিমজ্জিত ছিলনা বরঞ্চ তাহারাত এবং পরিচ্ছন্নতার প্রাথমিক ধারণা থেকেও বঞ্চিত ছিল। আর নবীর কাজ ছিল তাদেরকে সকল দিক দিয়ে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা দেয়া। এজন্যে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হলো যাতে করে তিনি তাঁর বাহ্যিক জীবনেও তাহারাতের (পবিত্রতা) সর্বোচ্চ মান কায়েম করতে পারেন। অতএব এ সেই হেদায়েতেরই ফলশ্রুটি যে, হুযুর (স) মানব জাতিকে দেহ ও পোষাক পরিচ্ছদের েএমন বিস্তারিত শিক্ষাদান করেনস যা আরব জাহেলিয়াত ত দূরের কথা আধুনিক যুগের সভ্যতম জাতিগুলোও লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেনি। এমনকি দুনিয়ার অধিকাংশ ভাষায় এমন কোন শব্দ যায় না যা তাহারাত শব্দের সমর্থক হতে পারে। পক্ষান্তরে ইসলামের অবস্থা এই যে, হাদীস ও ফেকাহর গ্রন্থগুলোতে ইসলামী হুকুম আহকামের সূচনাই হয় তাহারাত থেকে। এতে পাক নাপাকের পার্থক্য এবং পবিত্রতা পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে বয়ান করা হয়েছে।

এ শব্দ গুলোর দ্বিতীয় মর্ম হলো, নিজের পোষাক পরিচ্ছদ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখ। বৈরাগ্যের ধারণা দুনিয়ার ধার্মিকতার এ মান নির্ধারিত করে দিয়েছে যে, মানুষ যতোই ময়লা পরিচ্ছন্ন থাকবে সে ততো বেশী ধার্মিক বা সাধুজনোচিত হবে। কেউ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিধান করলে তাকে দুনিয়াদার মনে করা হতো। অথচ মানবীয় স্বভাব প্রকৃতি ময়লা অপরিচ্ছন্নতা ঘৃণা করে। ভদ্রতা ও রুচিজ্ঞানের সাধারণ অনুভূতি যার মধ্যে আছে সে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন  মানুষের সাথেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। এ করণেই যারা আল্লাহ পথে মানুষকে দাওয়াত দেবে তাদের জন্যে এটা জরুরী যে, তার বাহ্যিক দিকটা এমন পবিত্র ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে যাতে করে মানুষ তাকে সম্মানের চোখে দেখে এবং তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে যেন এমন অরুচিকর কিছু না থাকে যা স্বভাবতঃই ঘৃণার উদ্রেক করতে পারে।

এ এরশাদের তৃতীয় মর্ম এই যে, নিজের পোষাক পরিচ্ছদ নৈতিক দোষত্রুটি থেকে পবিত্র রাখ। তোমার পোষাক পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র অবশ্যই হবে। কিন্তু তার মধ্যে গর্ব অহংকার, লোক দেখানোর মনোবৃত্তি, জাঁকজমকজ ও প্রভাব প্রতিপত্তির চিহ্ন যেন না থাকে। পোষাকই সর্বপ্রথম মারুষের ব্যক্তিত্বের পরিচয় করিয়ে দেয়। যে ধরনের পোষাকই কেউ পরিধাণ করুননা কেন, তা দেখে প্রথম নজরেই লোকেরা এ অনুমান করে যে সে কোন ধরনের মানুষ। জমিদার ও নবাব- সুবাদের পোষাক, ধর্ম ব্যবসায়ীদের পোষাক, গুন্ডা বদমায়েশ ও ভবঘুরে লোকের পোষাক- সবই পরিধানকারীরেদ স্বভাবপ্রকৃতির পরিচয় বহন করে থাকে। আল্লাহ প্রতি আহ্বানকারীরেদ স্বভাব প্রকৃতি এসব লোক থেকে স্বভাবতঃই ভিন্ন হয়ে থাকে। অতএব তাঁদের পোষাকও স্বভাবতঃই এসব লোকের থেকে পৃথক হওয়া উচিত। এমন পোষাক পরিধাণ করা উচিত যা দেখে প্রত্যেকেই মনে করতে পারে যে লোকটি বড়ো ভদ্র, বড়ো রুচিবান যে প্রবৃত্তির দ্বারা পরিচালিত নয় অথবা প্রবৃত্তির অনাচারে লিপ্ত নয়।

চতুর্থ মর্ম এই যে, নিজের পোষাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। উর্দু ভাষার ন্যায় আরবী ভাষাতেও পোষাক পরিচ্ছদ পবিত্র রাখার (পাক দামনী) চারিত্রিক দোষত্রুটির উর্ধে থাকা এবং ইত্তম চরিত্রে ভূষিত হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইবনে আব্বাস (রা) ইমাম নখয়ী, শা’বী, মুজাহিদ, কাতাদাহ, সাঈদ বিন জুবাইর, হাসান বাসরী অন্যান্য প্রখ্যাত তাফসীরকারগণ এ আয়াতের অর্থই করেছেন যে, নিজের চরিত্র পূত পবিত্র রাখ এবং সকল প্রকার অনাচার থেকে দূরে থাক। আরবী প্রকাশভংগী বা বাগধারা (IDIOM) বলা হয়ে থাকে-

(আরবী*********************)

-অমুক ব্যক্তির কাপড় পাক পবিত্র এবং তার পোষাক পরিচ্ছদ পবিত্র। তার অর্থ এই যে, তার স্বভাব চরিত্র উত্তম। পক্ষান্তরে বলা হয়

(*****************)

-তার কাপড় চোপড় ময়লা অর্থাৎ সে বদ প্রকৃতির লোক। তার কথাবার্তার কোন বিশ্বাস নেই।

(আরবী*************************)

ময়লা অপরিচ্ছন্নতা থেকে দূরে থাক। ময়লা বা নোংরামি বলতে এখানে সব রকমের নোংরামি বুঝায়। তা আকীদাহ বিশ্বা ও চিন্তধারার নোংরামির হোক আমল আখলাকের নোংরামি হোক, দেহ ও পোষাক পরিচ্ছদের নোংরামি হোক অথবা জীন পদ্ধতির নোংরামি হোক। অর্থাৎ’ তোমার চারপাশে গোটা সমাজে বিভিন্ন প্রকারের যেসব নোংলামি বিস্তার লাভ করে আছে সেসব থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। কেউ যেন তোমার প্রতি এ অভিযোগ আরোপ করতে না পারে যে, যেসব নোংরামি ও অনাচার থেকে তুমি লোককে বিরত রাখছ সেসবের মধ্যে কোন কোনটার চিহ্ন তোমার মধ্যেও পাওয়া যায়।

(আরবী*****************)

-এবং ইহসান করোনা অধিব লাভ করার জন্যে।

এ শব্দগুলোর মর্ম এতো ব্যাপক যে, কোন একটি বাক্যে এর অনুবাদ করে এর পরিপূর্ণ মর্ম ব্যাখ্যা করা যায়না। এর একটি মর্ম এই যে, যার প্রতিই দয়া অনুগ্রহ করবে, নিঃস্বার্থভাবে করবে। তোমার দান, অনুগ্রহ ও সদাচরণ নিছক আল্লাহর জন্যে হতে হবে। উপকার ও কল্যাণ করর বিনিময়ে তুমি পার্থিব কোনো সুযোগ সুবিধা হাসিল করবে এবং এ ধরনের কণামাত্র কামনা বাসনাও যেন তোমার না থাকে। অন্য কথায় কারো কল্যাণ করলে তা আল্লাহর জন্যে করবে ফায়দা হাসিল করার জন্যে কারো উপকার বা কল্যাণ করবে না।

দ্বিতীয় মর্ম এই যে, নবুয়তের যে কাজ তুমি করছ, যদিও তা এক অতি কল্যাণকর কাজ যে তোমার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টিকুল হেদায়েত লাভ করছে, তার জন্যে মানুষের কাছে গর্ব করে বেড়ায়োনা যে, তুমি তাদের বিরাট কল্যাণ করছ এবং এর থেকে কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করোনা।

তৃতীয় মর্ম এই যে, তুমি যদিও একটা বিরাট খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছ কিন্তু আপন দৃষ্টিতে নিজের কাজকে বিরাট কাজ মনে করোনা, এ ধারণা তোমার মনে যেন না আসে যে নবুয়তের দায়িত্ব পালন করে এবং এ কাজে জীবন উৎসর্গ করে তুমি তোমার রবের উপর কোন মেহেরবানী করছ।

(আরবী*************)

-এবং আপন রবের জন্যে সবর কর।

অর্থাৎ যে কাজ তোমার দায়িত্বে দেয়া হযেছে তা এক অীত প্রানন্তকর কাজ। এ কাজের জন্যে তোমাকে কঠিন বিপদ আপদ, দুঃখ কষ্ট ও ভয়ানক অসবিধার সম্মুখীন হতে হবে।

তোমার স্বজাতি তোমার দুশমন হয়ে পড়বে। সমগ্র আরব তোমার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবে। কিন্তু এ পথে যতো কিছুই আসুক তার জন্যে তোমাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং আপন দায়িত্ব অবিচলতা ও দৃঢ়চিত্ততা সহকারে পালন করতে হবে। এ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্যে ভয়ভীতি, প্রলোভন, বন্ধুত্ব শত্রতা, প্রেম প্রীতি সবকিছুই তোমার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। এ সবের মুকাবিলায় দৃঢ়তার সাথে আপন সংকল্পে অটল থাকবে।

এ ছিল সেই প্রাথমিক হেদায়াত যা আল্লাহতায়ালা তাঁর রসূলকে এমন সময়ে দিয়েছিলেন যখন তিনি তাঁকে এ নির্দেশ দেন- উঠ এবং আপন কাজের সূচনা কর। যদি কেউ এ ছোটো ছোটো বাক্যগুলো ও সেসবের অর্থের উপর চিন্তাভাবনা করে তাহলে তার মন সাক্ষ্য দেবে যে, একজন নবীর কাজ শুরু করার সময় এর চেয়ে ভালো উপদেশ নির্দেশ আর কিছু দেয়া যেতে পারতোনা। এতে একথাও বলা হয়েছে যে, কাজটা কি করতে হবে। সেই সাথ এ শিক্ষাও দেয়া হয়েছে যে এ কাজ কোন্‌ নিয়তে, কোনো মানসিকতা ও কোন চিন্তাধারা সহ করত হবে। এ বিষয়েও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে এ কাজে কোন্‌ কোন্‌ অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে এবং তার মুকাবিলা কিভাবে করতে হবে। আজ যারা অন্ধ বিদ্বেষে এ কথা বলে যে (মায়াযাল্লাহ) মৃগী রোগাক্রানত হওয়ার পর প্রলাপের ন্যায় এসব কথা রসূলুল্লাহ (সা) এর মখ দিয়ে বেরুতো, তারা একটু চোখ খুলে এ বাক্যগুলো দেখে স্বয়ং চিন্তা করে দেখুক যে এগুলো কি মৃগীরোগে আক্রান্ত অবস্থার কোন প্রলাপ, না খোদার হেদায়াত বা নবুয়তের দায়িত্ব অর্পণ করার সময় তিনি তাঁর বন্দাহকে দগান করেছেন। (******১৮)

অহী ধারণ করার অভ্যাস

ইতিপূর্বে আমরা হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) বরাত দিয়ে বলেছি যে, সূরা মুদ্দাসসিরের পর হুযুরের (সা) উপর ক্রমাগত অহী নাযিল হওয়ার শুরু হয়। কিন্তু প্রাথমিক কালে অহী নাযিলের সময় নবী পাকের এ অসুবিধা হতো যে ভুলে যাওয়ার আশংকায় তিন তা (মুখস্ত করে) মনে রাখার চেষ্টা করতেন। আবার কখনো অহী নাযিল কালে কোন কিছুর অর্থ জিজ্ঞেস করতেন। এজন্যে এ ময়ে নবীকে অহী ধারণ করার পন্থা ভালো করে শিখিয়ে দেয়ারও প্রয়োজন ছিল। সূরা তা-হা-য় বলা হয়েছে-

فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا

উচ্চ ও মহান আল্লাহ। তিনি সত্যিকার বাদশাহ। আর দেখ (হে নবী) কুরআন পড়তে তাড়াহুড়া করোনা যতোক্ষণ না তোমার উপর অহী পুরোপুরি পৌঁছে গেছে। এবং দোয়া কর, হে পরদেগার আমাকে বেশী বেশী ইলম দান কর (তা-হা: ১১৪)

বক্তব্যের ধারা পরিষ্কার এ কথা বলছে যে, (আরবী*******************) পর্যন্ত এসে ভাষণ শেষ হয়ে গেছে। তারপর বিদায় কালে ফেরেশতা আল্লাহর নির্দেশে নবীকে (সা) সতর্ক করে দিচ্ছেন এমন বিসয়ে যা অহী নাযিল কালে তিনি প্রত্যক্ষ করেন। মাঝখানে টিপ্পনী কাটা সংগত মনে করা হয়নি। তাই পয়গাম প্রেরণ সমাপ্ত করার পর তিনি হুযুরকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দেন। এমন কি ছিল যার জন্যে সতর্ক করে দেয়া হলো? স্বয়ং সতর্ককরণের শব্দগুলোই তা প্রকাশ করছে। নবী (সা) অহীর পয়গাম গ্রহণ করা কালে তা মনে রাখার জন্যে তা আবৃত্তি করার চেষ্টা করছিলেন। এ চেষ্টার ফলে বার বার তাঁর মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটছিল হয়তো। হয়তো অহী গ্রহণের ধারাবাহিকতা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল। পয়গাম শুনার ব্যাপারে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়া না হয়ে থাকবে। এ অবস্থা দৃষ্টে প্রয়োজন বোধ করা হয় যে তাঁকে অহী গ্রহণ করার সঠিক পদ্ধতি বুঝিয়ে দেয়া হোক এবং মাঝে মাঝে মনে রাখার যে চেষ্টা তিনি করছিলেন তা নিষেধ করে দেয়া হোক।

সূরা কিয়ামাহ নাযিলের সময়েও এ অবস্থা হয়েছিল। এ জন্যে বক্তব্যের ধারাবাহিকতা ছিন্ন করে তাকে সতর্ক করে দেয়া হলো।

(আরবীঁ*******************)

এ স্বরণ রাখার জন্যে তাড়াহুড়া করে নিজের জিহ্বা বার বার চালনা করোনা। এটা মনে করিয়ে দেয়া এবং পড়িয়ে দেয়া আমাদেরই দায়িত্ব। অতএব যখন আমরা তা শুনাচ্ছি তখন মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাক তারপর তার মর্ম বুঝিয়ে দেয়াও আমাদের দায়িত্ব। [সূরায়ে কিয়ামার মধ্যে এ বাক্যটি প্রাসংগিকক্রমে আসায় যে ব্যাখ্যা আমা করেছি তা নিছক অনুমান ভিত্তিক ন। বরঞ্চ নির্ভযোগ্য বর্ণনাগুলোতে এ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মুসনাদে আহমাদ, বুখারি, মুসলিম, তিরযিমিযি, নাসায়ী, ইবনে তাবারানী, বায়হাকী এবং অন্যান্য মুহাদ্দেসীন বিভিন্ন সূত্রে হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাসের (রা) বর্ণনা নকল করে বলেন যে যখন হুযুর )স) এর উপর কুরআন নাযিল হচ্ছিল তখন তিনি ভূলে যাওয়ার আশংকায় জিব্রাইল (আ) এর সাথে অহীর কথাগুলো আবৃত্তি করতে থাকতেন। একে বলা হলো………..

لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ (16) إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ (17) فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ (18) ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ

এ কথাই শা’বী, ইবনে যায়েদ, যুহহাক, হাসান বাসরী, কাতাদাহ, মুজাহিদ এবং অন্যান্য প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ থেকে বর্ণিত আছে। ]

সূরায়ে আ’লা তেও নবীকে (সা) এ নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে যে, আমরা তোমাকে পড়িয়ে দেব এবং তারপর আর তা ভুলে যাবেনা। [হাকেম সা;দ বিন আবি ওক্কাস (রা) থেকে এবং ইবনে মাুইয়া হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা নকল করেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের শব্দগুলো এ আশংকায় পুনরাবৃত্তি করতেন পাছে তিনি ভুলে না যান। মুজাহিদ এবং কালবী বলেন, জিব্রীল (আ) অহী শুনিয়ে বিদায় না হতেই হুযুর (সা) ভুলে যাওয়ার আশংকায়ই প্রথমাংশ পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করতেন। এ জন্যে আল্লাহ তায়ালা নবী (সা)  নিশ্চয়তা দেন যে অহী নাযিলের সময় তুমি চুপ করে শুনতে থাকবে। আমরা তা তোমাকে পড়িযে দেব এবং চিকালের জন্যে তোমার মনে থাকবে। এ আশংকা তুমি করবেনা যে তার কোন একটি শব্দ তুমি ভুলে যাবে।]

سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى

পরে যখন অহীর পয়গাম গ্রহণ করার অভিজ্ঞতা নবীর হয়ে গেল তখন এ ধরনের অবস্থা সৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। এজন্যে পরবর্তী সূরাগুলোতে এ ধরনের সতর্কবাণী আমরা দেখতে পাইনা।

গোপন তাবলিগের তিন বচর

আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে রেসালাতের বাণী পৌঁছাবার যে হিকমত শিক্ষা দেন তদনুযায়ী তনি নবুয়তের ঘোষণা ও জন সাধারণের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেননি। বরঞ্চ প্রথম তিন  বছর এমন মহৎ ব্যক্তিদের কাঝে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকেন যাঁরা দলিল প্রমাণ ও বুঝাপড়ার মাধ্যমে তাওহীদ কবুল করতে এবং শির্ক পরিহার করতে উদ্যত ছিলেন। সেই সাথে তাঁদের কাছেও দাওয়াত পৌঁছান যাঁদের প্রতি এ আস্থা পোষণ করা যেতো যে যতোক্ষণ আল্লাহ তায়অলার নির্দেশে তিনি জনসাধারন্যে ঘোষণা দিয়ে প্রকাশে দাওয়াত ইলাল্লাহর কাজ শুরু করার ফয়সালা না করেন, ততোক্ষণে তারা গোপনীয়তা রক্ষা করে চলবে। এ কাজে হযরত আবু বরক (রা) তার প্রকৃত নাম ছিল আবদুল্লাহ বিন ওসমান। কিন্তু তাঁর কুনিয়াত আবু বকর এতোটা প্রসিদ্ধি লাভ করে যে প্রকৃত নাম চাপা পড়ে যায়। যামাখশারী বলেন, পূত পবিত্র স্বভাব চরিত্রের দিকে সকলের অগ্রবর্তী হওয়ার কারণে তাঁকে আবু বকর বলা হতো। জাহেলিয়াতের যুগেই তাঁর এ নাম প্রসিদ্ধি লাভ করে –গ্রন্থকার।] এর প্রভাব সবচেয়ে অধিক কার্যকর ছিল। তাবারী ও ইবনে হিশাম তার কারণ এই বরেন যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক ও সৌহার্দপূর্ণ স্বভাবের লোক, তাঁর গুণাবলীর জন্যে তিনি তাঁর স্বজাতির অতি প্রিয়পাত্র ছিলে। কুরাইশদের মধ্যে তাঁর চেয়ে অধিক বংশবৃত্তান্ত (Genealogy) আর কারো জানা ছিলনা।  কে ভালো কে মন্দ এবং কার কি গুণাবলী এসও তাঁর চেয়ে অধিক আর কারো জানা ছিলনা। তিনি ছিলেন ব্যবসায়ী এবং সদাচরণের জন্যে প্রখ্যাত ছিলেন। তাঁর স্বজাতি তাঁর জ্ঞান বুদ্ধির, জন্যে তাঁর ব্যবসা ও সদাচরণেল জন্যে অধিক সময় তাঁর সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতো এবং তাঁর কাছে এসে বসতো। এ সুযোগে তিনি যাদের প্রতি আস্থা পোষণ করতেন তাদের কাছে ইসলারেম দাওয়াত পৌছাতেন। তাঁর তাবলিগে প্রভাবিত হয়ে বিরাট সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর যাঁরাই মুসলমান হতেন তাঁরা তাঁদের বন্ধু মহল থেকে তালাশ করে ভালো লোকেদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতেন। সে সময়ে মুসলমানগণ গোপনে মক্কার জনহীন প্রান্তরে নামায পড়তেন যাতে কারে তাঁদের ধর্মান্তর গ্রহণ কেউ টের না পায়।

দারে আরকামে প্রওচার কেন্দ্র ও বৈঠকিাদি কায়েম

আড়াই বছরের পর বেশ কিছুর কাল অতীত হওয়ার পরপরই এমন এক ঘটনা ঘটে যার ফলে এ আশংকা হয় যে অসময়ে মক্কার  কাফেরদের সাথে সংঘর্ষ শুরু হয়ে না যায়।

ইবনে ইসহাক বলেন যে, একদিন মুসলমানগণ মক্কার এক প্রান্তরে নামায পড়ছিলেন। এমন সময় একদল মুশরিক তাদেরকে দেখে ফেলে এবং ধর্মোদ্রোহী বলা শুরু করে। কথায় কথায় লড়াইয়ের উপক্রম হয় এবং হযরত সা’দ বিন আবি ওক্কাস (রা) একজনের প্রতি একটি উটের হাড় ছুড়ে মারে এবং তার মাথা ফেটে যায়। ইবন জারীর ও ইবনে হিশাম এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। কিন্তু হাকেম উমারী তাঁর মাগাযী গ্রন্থে এর বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ  করেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তির মাথা ফেটে যায় সে ছিল বনী তাইমের আবদুল্লাহ বিন খাতাল। তারপর নবী (সা) অবিলম্বে সাফার নিকটবর্তী হযরত আরকাম বিন আবি আরকামের গৃহকে বৈঠকাদি এবং দাওয়াত ও তাবলিগের কেন্দ্রে পরিণত করেন। এতে করে লোক এখানে একত্র হয়ে নামাযও পড়তে পারবে এবং যারা গোপনে মুসলমান হতে থাকবে তারা এখঅনে আসতেও থাকবে। ইসলামের ইতিহাসে এ দারে আরকাম চিরন্তন খ্যাতি লাভ করে। তিন বছরের গোপন দাওয়াতের কাল উত্তীর্ণ হয়ে প্রকাশ্যে জন সাধাণের মধ্যে দাওয়াত শুরু হওয়ার পরও এ মুসলমানদের কেন্দ্র হয়ে থাকে। হুযুর (সা) এখঅনেই অবস্থান করতেন। এ্যখানে এসে মুলমানগণ তাঁর সাথে মিলিত হতেন। শিয়া’বে আবি তালিবের বন্দী থাকার পূর্ব পর্যন্ত এ ছিল ইসলামী দাওয়াতের কেন্দ্র।

তিন বছরের গোপন দাওয়াতের ফলাফল

প্রকাশে  ইসলামী দাওয়াতের সময়কালের উপর আলোচনা করার আগে আমাদের দেখা উচিত যে এ তিন বছরে কতটুকু কাজ হয়েছে। কুরাইশদের কোন্ কোন্‌ গোত্রের কারা কারা কতজন মুসলমান হয়েছিল। কুরাইশের বারে থেকে কতলোক, কত মাওয়ালী, গোলাম, বাঁদী ইসলাম গ্রহণ করেছিল নিম্নে তার তালিকা দেয়া হলো, বহু চেষ্টা চরিত্র ও অনুসন্ধানের পর এ কাজ সম্ভব হয়েছে। কারণ এর পূর্ণ তালিকা কোথাও একত্রে পাওয়া যায়না।

বনী হাশিম গোত্র

১। জাফর বিন আবি তালিব

২। তাঁর বিবি আসমা বিন্তে উমাইস খাশআমিয়্যা (কুরাইশ গোত্র বর্ভিূত এ মহিলা)

৩। সাফিয়্যঅ (রা) বিন্তে আবদুল মুত্তালিব [নবীর ফুফী হযরত যুবাইরের (রা) মাতা।]

৪। আরওয়া (রা) বিন্তে আবদুল মুত্তালিব [তুলাইব (রা) বিন উমাইরে মা এবং হুযুরের ফুফী।]

বনী আল মুত্তালিব গোত্র

৫। উমায়দাহ (রা) বিন আল হারিস বিন মুত্তালিব।

বনী আব্দে শামস বিন আবদুল মানাফ গোত্র

৬। আবু হুযায়ফা (রা) বিন ওতবা বিন রাবিয়অ

৭। তাঁর বিবি সাহলা (রা) বিন্তে সুহাইল বিন আমর

বণী উমাইয়অ গোত্র

৮। উসমান (রা) বিন আফফান

৯। তাঁর মা আরওয়া (রা) বিন্তে কুরাইয

১০। খালিদ (রা) বিন সাঈদ বিন আল আস বিন উমাইয়া

১১। তাঁর বিবি উমায়মা (রা) বিন্তে খালাফ আল খুযাইয়অ (কেউ কেউ তার নাম উমায়না বলেছেন।)

১২। উম্মে হাবীবা (রা) বিন্তে আবি সুফিয়ান (প্রথমে তিনি উমায়তা বিন জাহশের বিবাহ বন্ধনে ছিলেন, পরে উম্মুল মুমেনীন হওয়ার মর্যাদা লাভ করন।)

হুলাফায়ে বনী উমাইয়অ গোত্র (বনী উমাইয়অর সাথে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ)।

১৩। আবদুল্লাহ বিন জাহশ

১৪। আবু আহমদ বিন জাহশ

১৫। উবায়দুল্লাহ বিন জাহশ [ইনি তাঁর স্ত্রী হযরত উম্মে হাবীবা সহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখানে ‍খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে মারা যান। -গ্রন্থকার।]

এ তিন জন ছিলেন বনী গানাম বিন দূদান বংশোদ্ভূত। হুযুরের (রা) ফূফী ইমায়মা বিন্তে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র এবং উম্মুল মুমেনীন হযরত যয়নবের ভাই।]

বণী তাইম গোত্র

১৬। আসমা বিন্তে আবি বকর (রা)

১৭। উম্মে রুমান (রা) [হযরত আবু বকর (রা) স্ত্রী এবং হযরত আয়েশা (রা) এবং হযরত আবদুর রহমান বিন আবু বকরের (রা) মা।]

১৮। তালহা (রা) বিন উবায়দুল্লাহ

১৯। তাঁর মা সা’বা (রা) বিন্তে আল হাদরামী।

২০। হারেস (রা) বিন খালেদ

বনী তাইমের সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ গোত্র

২১ সুহাইব (রা) বিন সিনান রুমী

বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যা গোত্র

২২। যুবাইর (রা) বিন আল আওয়াম (হযরত খাদিজার ভাতিজা এবং হুযুরের (সা) ফুফাতো ভাই।

২৩। খালিদ (রা) বিন হিযাম (হাকীম বিন হিযামের ভাই এবং হযরত খাদিজার (রা) ভাতিজা)।

২৪। আসওয়াদ (রা) বিন নাওফাল

২৫। আমর (রা) বিন উমাইয়া

বণী আবদুল ওয্যা বিন কুসাই গোত্র

২৬। ইয়াযিদ (রা) বিন যামায়া বিন আল আসওয়াদ

বনী যোহরা গোত্র

২৭। আবদুর রহমান (রা) বিন আওফ

২৮। তাঁর মা শিফা (রা) বিন্তে আওফ

২৯। সা’দ বিন আবি ওক্কাস (রা)। আবু ওক্কাসের আসল নাম মালিক বিন ওসাইব ছিল।

৩০। তাঁর ভাই ওমাইর (রা) বিন আবি ওক্কাস।

৩১। তাঁর ভাই আমের (রা) বিন আবি ওক্কাস

৩২। মুত্তালিব (রা) বিন আযহার (আবদুর রহমান বিন আওফের চাচাতো ভাই)

৩৩। তাঁর বিবি রামলা (রা) বিন্তে আবি আওফ সাহমিয়া

৩৪। তুলাইব (রা) বিন আযহার

৩৫। আবদুল্লাহ (রা) বিন শিহাব।

বণী যোহরার সাথে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ গোত্র

৩৬। আবদুল্লাহ (রা) বিন মাসউদ। ইনি ছিলেন হুযাল গোত্রের এবং মক্কার বনী যোহরার সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ।

৩৭। ওতবা (রা) বিন মাসউদ (আবদুল্লাহ বিন মাসউদের ভাই)

৩৮। মিকদাদ (রা) বিন আমর আল কিন্দী

৩৯। খাব্বাব (রা) বিন আল আরাত

৪০। শুরাহবিল (রা) হাসানাত আল কিন্দী

৪১। জাবের (রা) বিন হাসানাত (শুরাহবিলের ভাই)

৪২। জুনাদা (রা) বিন হাসানাত (ঐ)

বণী আদী গোত্র

৪৩। সাঈদ (রা) বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফাইল [হযরত ওমরের (রা) চাচাতে ভাই ও ভগ্নিপতি]

৪৪। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা (রা) বিন্তে আল খাত্তাব [হযরত ওমরের (রা) ভগ্নি]

৪৫। যায়েদ (রা) বিন খাত্তাব (হযরত ওমরের বড়ো ভাই)

৪৬। আমের (রা) বিন রাবিয়অ আল আনযী (খাত্তাব তাকে পুত্র বলে গ্রহণ করেছিল।)

৪৭। তাঁর স্ত্রী লায়লা (রা) বিন্তে আবি হাসমা

৪৮। মা’মার (রা) বিন আবদুল্লাহ বিন নাদলা

৪৯। নুয়াইম (রা) বিন আবদুল্লাহ বিন আল্লাখখাম।

৫০। আদী (রা) বিন নাদলা

৫১। উরওয়া (রা) বিন আবি উসাস (আমর বিন আসের বৈমাত্রেয় ভাই)

৫২। মাুস (রা) বিন সায়াইদ বিন হারেসা বিন নাদলা।

বণী আদীর সাথে বন্ধুত্বসূত্রে আবদ্ধ গোত্র।

৫৩। ওয়অকেদ বিন আবদুল্লাহ (খাত্তাব তাঁকে পুত্র বানিয়ে নেয়)।

৫৪। খালিদ বিন বুকাইর বিন আবদের ইয়অলিল আলালায়লী

৫৫। ইয়াস (রা) বিন বুকাইর বিন আবদে ইয়ালিস আল্লায়সী

৫৬। ইয়অস (রা) বিন বুকাইর বিন আবদে ইয়ালিস আল্লায়সী

৫৬। আমের (রা)

৫৭। আকেল (রা)

বণী আবদুদ্বার গোত্র

৫৮। মুসয়াব (রা) বিন উমাইর

৫৯। তাঁর ভাই আবু রুম (রা) বিন উমাইর

৬০। ফেরাস (রা) বিন আন্নাদর

৬১। জাহম (রা) বিন কায়েস

৬২। উসমান (রা) বিন মাযউন

৬৩। তাঁর ভাই কুদামা (রা) বিন মাযউন

৬৪। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ (রা) বিন মাযউন

৬৫। সায়েব বিন উসমা (রা) বিন মাযউন

৬৬। মা’মার (রা) বিন আল হারেস বিন মা’মার

৬৭। তাঁর ভাই হাতেব (রা) বিন আল হারেস

৬৮। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা (রা) বিন্তে মুজাল্লিল আল আমেরিয়া

৬৯। মা’মারের ভাই হাত্তাব (রা) বিন আল হারেস

৭০। তাঁর স্ত্রী ফুকাইহা বিন্তে ইয়াসার

৭১। সুফিয়ান বিন মা’মার (রা)

৭২। নুবায়না (রা) বিন ওসমান

বনী সাহম গোত্র

৭৩। আবদুল্লাহ (রা)বিন হুযাফা

৭৪। খুনাইস (রা) বিন হুযাফঅ (হযরত ওমরের (রা) জামাই। (উম্মুল মুমেনীন হযরত হাফসার (রা) প্রথম স্বামী।

৭৫। হিশাম (রা) বিন আল আসা বিন ওয়ায়েল

৭৬। হারেস (রা) বিন কায়েস

৭৭। তাঁর পুত্র বশীর বিন হারেস (রা)

৭৮। তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মা’মার বিন হারেস (রা)

৭৯। কায়েস  (রা) বিন হুযাফা (আবদুল্লাহ বিন হুযাফার ভাই)

৮০। আবু কায়েস (রা) বিন আল হারেস

৮১। আবদুল্লাহ (রা) বিন আল হারেস

৮২। সায়েব (রা) ঐ

৮৩। হাজ্জাজ (রা)            ঐ

৮৪। বিশার (রা) ঐ

৮৫।সাঈদ (রা)   ঐ

বনী সাহমের বন্ধু গোত্র

৮৬। উমাই (রা) বিন রিয়াব

৮৭। মাহমিয়্যা (রা) বিন আল জাযু [হযরত আব্বাস (রা) এর বিবি উম্মুল ফযল (রা) এর বৈমাত্রেয় ভাই।]

বনী মাখযুম গোত্র

৮৮। আবযু সালমা (আবদুল্লাহ (রা) বিন আবদুল আসাদ (হুযুরের (সা) ফুফাতের এবং দুধ ভাই, উম্মুল মুমেনীন উম্মে সালমার (রা) প্রথম স্বামী।]

৮৯। তাঁর বিনি উম্মে সালমা (রা) (ইনি ও তাঁর স্বামী আবু সালমা আবু জেহেলের নিকট আত্মীয় ছিলেন।)

৯০। আরকাম (রা) বিন আবিল আরকাম (যার দারে আরকামের উল্লেখ আগে করা হয়েছে।]

৯১। আইয়াশ (রা) বিন আবি রাবিয়া (আবু জেহেলর বৈমাত্রেয় ভাই। হযরত খালেদ বিন অলীদের চাচাতো ভাই)।

৯২। তাঁর বিনি আসমা (রা) বিন্তে সালামা তামিমিয়্যা।

৯৩। অলীদ (রা) বিন অলীদ বিন মুগীরা।

৯৪। হিশমাম (রা) বিন আবি হুযায়ফা

৯৫। সালমা (রা) বিন হিশাম

৯৬। হাশিম (রা) বিন আবি হুযায়ফা

৯৭। হাববার (রা) বিন সুফিয়ান

৯৮। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ বিন সুফিয়ান

বনী মাখযুমের মিত্র গোত্র

৯৯। ইয়াসের (রা) (আম্বার বিন ইয়অসেরের পিতা)।

১০০। আ্ম্বার বিন ইয়াসের (রা)।

১০১। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ বিন ইয়াসের (রা)।

বনী আমের বিন লুহাই গোত্র

১০২। আবু হাবরা (রা) বিন আবি রুইম (হুযুরে ফুফী বার রা বিন্তে আবুদল মুত্তালিবের পুত্র)।

১০৩। তাঁর বিনি উম্মে কুলসূম (রা) বিন্তে সুহাইল বিন আমর। (আবু জান্দাল (রা) এর ভগ্নি।

১০৪। আবদুল্লাহ (রা) বিন সাহাইল বিন আমর।

১০৫। হাতেব (রা) বিন আমর (সুহাইল বিন আমরের ভাই)

১০৬। সালীত (রা) বিন ্‌ামর

১০৭। সাকরান (রা) বিন আমর (সুহাইল বিন আমরের ভাই। ইনি উম্মুল মুমেনীন সাওদা (রা) বিন্তে যাময়ার প্রথম স্বামী)

১০৮। তাঁর বিনি সাওদা (রা) বিন্তে যামায়া (সাকরানের মৃত্যুর পর উম্মুল মুমেনীন হওয়ার সৌভাগ্যলাভ করেন)।

১০৯। সালীত বিন আমরে বিবি ইয়াকাযা (রা) বিন্তে আলকামা (ইসাবায় উম্মে ইয়াকাযা বলা হয়েছৈ এবং ইবনে সা’দ ফাতেমা বিন্তে আলকামাহ বলেছেন।

১১০। মালেক (রা) বিনে যামায়া (হযরত সাওদার ভাই)।

১১১। ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)।

বনী ফহর বিন মালেক গোত্র

১১২অ আবু ওবায়দাহ (রা) বিন আল জাররাহ্‌

১১৩। সাহাইল (রা) বিন বায়দা

১১৪। সাঈদ (রা) বিন কায়েস

১১৫। আমর (রা) বিন আল হারেস বিন যুহাইর

১১৬। ওসমান (রা) বিন আবদ গানাম বিন যুহাইর (হযরত আবদুর রহমান বিন আউফের (রা) ফুফাতো ভাই)।

১১৭। হারেস (রা) বিন সাঈদ

বনী আব্দে কুসাই গোত্র

১১৮। তুশাইব (রা) বিন উমাইর (হুযুরের ফুফু আরওয়া বিন্তে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র) এ গোত্রের লোকেরা কুরাইশদের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সাথে সম্পর্ক রাখতো। তাছাড়া তাদের বিরাট সংখ্যক দাসদাসীও ছিল। তিন বছরের গোপন দাওয়াতী কাজের ফলে এরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের নাম নিম্নরূপ:

১১৯। উম্মে আয়মান বারাকাহ (রা) বিন্তে সালাবাহ যিনি শৈশব থেকেই হুযুরকে কোলে মানুষ করেন।

১২০। যিন্নির রুমিয়অ (রা) (আমর বিন আল মুয়াম্মিল এর মুক্ত দাসী)।

১২১। বেলাল (রা) বিন রাবাহ।

১২২। তাঁর মা হামামা (রা)

১২৩। আবু ফুকাইহা (রা) বিন ইয়াসার আল জুহমী (সাফওয়ান বিন উমাইয়ার মুক্ত দাস)

১২৪। লাবীবা (রা) (মুয়াম্মেল বিন হাবীবের দাসী)।

১২৫। উম্মে উবাইস (রা) (বনী তামি বিন মুনরা অথবা বনী যুহরার দাসী। প্রথম উক্তি যুবাইর বিন বাক্কারের এবং দ্বিতীয় উক্তি বালাযুরীর)।

১২৬। আমের বিন ফাহাইরা (তুফাইল বিন আবদুল্লাহর দাস)।

১২৭। সুমাইয়অ (রা) (হযরত আম্মার বিন ইয়াসেরের মাতা এবং আবু হুযায়ফঅ বিন মুীরা মাখযুমীর দাসী।)

অকুরাইশদের মধ্যে যাঁরা মক্কায় প্রাথমিক কালে ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁদের নাম নিম্নে দেয়া হলো

১২৮। মিহজান (রা) বিন আল আদরা আল আসলামী।

১২৯। মাসউদ (রা) বিন রাবিয়া বিন আমর। ইনি ছিলেন বনী আলহুন বিন খুযায়মার কারা গোত্রীয়।

এভাবে প্রাথমিক চারজন মুসলমানের সাথে ১২৯ জন যোগ করলে তাঁদের সংখ্যা দাঁড়াবে একশত তেত্রিশ (১৩৩)। হুযুর (সা) প্রকাশে দাওয়াত দেয়া শুরু করার পূর্বেই এ সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তি মুসলমানদের দলভুক্ত হন।

[আবদুল বার ইস্তিয়াবে এবং ইবনে আসীর উসদুল গাবায় লিখেছেন –“বলা হয়ে থাকে যে হযরত আব্বাস (রা) এর বিবি উম্মুল ফযল (রা) প্রথম মহিলা যিনি হযরত খাদিজার (রা) পর মুসলমান হন।” একথা সত্য হলে এ প্রাথমিক মুসলমানদের সংখ্যা ১৩৪ হয়। এ মহিলার প্রকৃত নাম লুবাবা বিন্তে আল হারেস। ইনি উম্মুল মুমেনীন হযরত মায়মুনার (রা) ভগ্নি। হযরত খঅলেদ[ বিন অলীদের (রা) খালা এবং হযরত জাফর (রা) বিন আবি তালিবের স্ত্রী আসমা বিন্তে উমাইসের বৈমাত্রেয় ভগ্নি। আমরা এ তালিকায় তাঁর নাম এ জন্যে সন্নিবেশিত করিনি যে, ‘বলা হয়ে থাকে বা কথি আছে দুর্বলভাবে তা  বর্ণনা করা হয়েছে- গ্রন্থকার]

সঠিক চিন্তা ও সুস্থ প্রকৃতির লোক তাঁরা ছিলেন। তাঁরা নিছক যুক্তি প্রমাণ ও পারস্পরিক বুঝাপড়ার মাধ্যমে শির্কের অনিষ্টকারিতা উপলব্ধি করেন, তাওহীদের সত্যতা মেনে নেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহি ওয়া সাল্লামকে খোদার রসূল বলে স্বীকার করেন, কুরআনকে  আল্লাহর বাণী হিসাবে নিজেদের জন্যে হেদায়েতের উৎস বলে গণ্য করেন এবং আখেরাতের জীবনকে অকাট্য সত্য বলে মেনে নেন। এ পরিমাণ নিষ্ঠাবান এবং দ্বীনি প্রজ্ঞাসম্পন্ন কর্মী তৈরী হওয়অর পর হুযর (সা) আল্লাহ তায়ালা নির্দেশে প্রকাশে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করেন। (****২১)

নির্দেশিকা

১। রাসায়েল ও মাসায়েল- প্রথম খন্ড পৃঃ ২৯

২। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

৩। তাফহীমুল কুরআন- সূরায়ে আলাকের ভূমিকা

৪।         ঐ         -আলাম নাশরাহ, টীকা-২

৫।        ঐ –শূরা, -টীকা ৮৩

৬।         ঐ         -সূরায়ে আলাকের ভূমিকা

৭।        ঐ         সূরায়ে আলাকের ভূমিকা

৮। রাসায়েল ও মাসায়েল ৩য় খন্ড পৃঃ ২৩২

৯। ঐ     ঐ পৃঃ ২২৯-৩২

১০। তাফহীমুল কুরআন –কাসা, টীকা ১০৯

১১।       ঐ         সূরা মুদ্দাসসিদেরর ভূমিকা

১২। ঐ   আলাকা, টীকা ১-৬

১৩। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

১৪। তাফহীমুল কুরআন    -কদর, টীকা-১

১৫। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

১৬। তাফহীমুল কুরআন    -সূরা মুদ্দাসসিরের ভূমিকা

১৭। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

১৮। তাফহীমুল কুরআন, কিয়ামার টীকা-১১

১৯। ঐ –আ’লা, টীকা-৭

২০।      ঐ         তা-হা. টীকা, কিয়ামা-১১, আ’লা-৭

২১। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন।

 

পঞ্চম অধ্যায়

দাওয়াতের জন্যে যে হেদায়ত নবী (সা) কে দেয়া হয়

গোপন তাবলিগের প্রাথমিক তিন বছরের অবস্থা আমরা বর্ণনা করেছি। এখন সাধারণ দাওয়ারেত দশ বৎসর কালীন মক্কী যুগের ইতিহাস বর্ণনা করার পূর্বে দুটি বিষয় পরিষ্কার করে বলে দেয়া প্রয়োজনীয় বোধ করছি। এর ফলে পরবর্তীকালের ঘটনাগুলি ভালোভাবে বুঝতে পারা যাবে।

প্রথম হচ্ছে এই যে, নবীকে (সা) রেসালাতের দায়িত্ব পালনের কি হেদায়াত দেয়া হয়েছিল যা এতোটা ফলপ্রসূ ছিল যে তা মানুষের মন জয় করে ফেল্লো, মনের বক্রতা দূর করে দিল এবং একটি অসভ্য বর্বর জাতিকে একেবারে বদলে দিল?

দ্বিতীয় এই যে, ইসলামী দাওয়াতের প্রকৃত ধরনটা কি ছিল যার জন্যে নবী (সা) এর বিরুদ্ধে এমন বিরোধিতার ঝড় উঠলো যা আরবে নিছক শির্ক অস্বীকারকারী এবং তওহীদ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধ কোনদিন উঠেনি? কিন্তু এ দাওয়াতের কিরূপ বলিষ্ঠভাবে পেশ করা হয় যে, জাহেলিয়াতের পতাকাবাহীদেরকে শেষ পর্যন্ত অসহায় ও শক্তিহীন করে ফেলে?

এ অধ্যায়ে আমরা প্রথম বিষয়বস্তুর উপর আলোচনা করব এবং দ্বিতীয় বিষয়বস্তুর উপর পরবর্তী অধ্যায়ে। (১****)

প্রাথমিক দাওয়াত সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ

আল্লাহ তায়ালা আরবের বিখ্যাত কেন্দ্রীয় শহর মক্কায় তাঁর এক বান্দাহকে (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়া সাল্লাম) পয়গম্বরীর কাজে বেছে  নেন এবং আপন শহর ও গোত্রের মধ্যে দাওয়াতী কাজের সূচনা করার নির্দেশ দেন। এ কাজ শুরু করার জন্যে প্রথমে যেসব হেদায়েতের প্রয়োজন ছিল তাই দেয়া হয় এবং তা ছিল তিনটি বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট।

এক-পয়গম্বরকে এ বিষয়ে শিক্ষাদান যে, তিনি স্বয়ং নিজেকে এ বিরাট কাজের জন্যে কিভাবে তৈরী করবেন এবং কোন পদ্ধতিতে কাজ করবেন।

দুই- প্রকৃত ব্যাপারের তত্ত্ব সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান এবং প্রকৃত সত্য সম্পর্কে ঐসব ভুল ধারণার খন্ডন যা আশপাশের লোকের মধ্যে পাওয়া যেতো যার কারণে তাদের আচরণ ত্রুটিপূর্ণ ছিল।

তিন- সঠিক আচরণেল প্রতি আহ্বান এবং হেদায়াতে- এলাহীর ঐসব বুনিয়াদী নৈতিক মূলনীতির বর্ণনা যার অনসরণে মানুষের কল্যাণ ও সৌভাগ্য লাভ হতে পারে।

 প্রাথমিক পর্যায়ে এসব পয়গাম ছোটো ছোটো ও সংক্ষিপ্ত কথায় দেয়া হতো। ভাষা হতো অত্যন্ত মার্জিত ও সুরুচিপূর্ণ, মিষ্ট ও হৃদয়গ্রাহী। যাদেরকে সম্বোধন করা হতো তাদের রুচিসম্মত সাহিত্যিক ভাষায় কথা বলা হতো, যাতে করে তা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে পারে, কথার সুর লালিত্যে কর্ণকুহর আকৃষ্ট হতে পারে এবং তা সুসংহতি ও সুষমতার কারণে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বার বার আবৃত্ত করতে থঅকে। তারপর এসব কথা ও আলোচনায় স্থানীয় পরিবেশ পরিস্থিতির উল্লেখ ছিল খুব বেশী। যদিও প্রচার করা হচ্ছিল বিশ্বজনীন সত্যতা, কিন্তু তার জন্যে যক্তি প্রমাণ সাক্ষ্য ও দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছিল এমন নিকটতম পরিবেশ থেকে যার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিল সেসব লোক যাদেরকে সম্বোধন করে কথা বলা হচ্ছিল। তাদেরই ইতিহাস ঐতিহ্য, তাদেরই প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ করা পুরনির্শন ও ধ্বংসাশেষ এবং তাদেরই আকীদাহ বিশ্বাস ও নৈতিক এবং সামাজিক অনাচার সম্পর্কেই যাবতীয় আলোচনা হতো যাতে করে তার থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো।

দাওয়াতের এ প্রাথমিক পর্যায় প্রায় চার পাঁচ বছর যাবত ছিল যার প্রথম তিন বছর ছিল গোপন আন্দোলনের স্তর। এ পর্যায়ে নবী (সা) এর দাওয়াত ও তাবলিগের প্রতিক্রিয়া তিনটি আকারে প্রকাশ লাভ করে।

(১) কতিপয় সৎ ব্যক্তি এ দাওয়অত গ্রহণ করে মুসলিম –উম্মাহ হওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়।

(২) অজ্ঞতা ও ব্যক্তিস্বার্থের দরুন অথবা পূর্বপুরুষদের দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দরুন বিরাট সংখ্যক লোক বিরোধিতার জন্যে অগ্রসর হয়।

(৩) মক্কা ও কুরাইশদের গন্ডি অতিক্রম করে  এ নতুন দাওয়াতের আওয়াজ অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর পরিমন্ডলে পৌঁছে যায়।

এখন থেকে এ দাওয়অতের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। এ পর্যায়ে ইসলামের এ আন্দোলন এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মধ্যে এক প্রাণান্তকর সংঘাত সংঘর্ষ শুরু হয় যা আট নয় বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। শুধু মক্কা এবং কুরাইশ গোত্রের মধ্যেই নয়, বরঞ্চ আরবের অধিকাংশ অঞ্চলে যারা প্রাচীন জাহেলিয়াত অক্ষুণ্ণ রাখতে চাইতো। তারা বল প্রয়োগে এ আন্দোলন নসাৎ করার জন্যে বদ্ধপরিকর হয়। এ কাজের জন্যে তারা সকল প্রকার অপকৌশল অবলম্বন করে মিথ্যা প্রাচরণা চালায়; অভিযোগ, সন্দেহ সংশয়, ত্রুটি অনুসন্ধান ও কঠোর সমালোচনার ঝড় সৃষ্টি করে। সাদারণ মানুষের মনে বিভিন্ন রকমের প্ররোচনা দান ও ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি করে। অপরিচিত লোকদেরকে নবী (সা) এর কথা শুনতে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হতো। ইসলাম গ্রহণকারীদের উপর অমানুষীক জুলুম নির্যাতন করা হতো। তাঁদের সাথে আর্থিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়। তাঁদের জীন এতোটা অতীষ্ট করে তোলা হয় যে, দু’বার তাঁরা ঘরদোর ছেড়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে বাধ্য হন। অবশেষে তাঁদের সকলকে তৃতীয়বার মদীনায় হিজরত করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের কঠোর ও নিত্যনতুন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এ আন্দোলন প্রসার লাভ করতে থাকে। মক্কা এমন কোন পরিবার এবং কোন গৃহ ছিলনা যার কোন না কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলনা। অধিকাংশ ইসলাম বিরোধীদের শত্রুতাপূর্ণ আচরণে কঠোরতা ও তিক্ততার কারণ এই ছিল যে তাদের নিজেদের ভাই, ভাইপো, পুত্র, কন্যা, ভগ্নি, জামাতা প্রভৃতি ইসলামী দাওয়াতের অনুসারীই নন বরঞ্চ ইসলামর উৎসর্গীত সহায়ক শক্তি হযে পড়েছিলেন। তাদের রক্তমাংসের আপন জনগণও তাদের বিরুদ্ধে লড়তে তৈরী হলো। মজার ব্যাপার এই যে- যাঁরা পুরাতন জাহেলিয়াতের ঘনো আঁধার থেকে বেরিয়ে এ নতুন আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন, তাঁরা আগেও সমাজের সবচেয়ে সৎলোক ছিলেন এবং এ আন্দোলনে শরীক হওয়ার পর তাঁরা এতোটা সত্যনিষ্ঠ ও পুতপবিত্র চরিত্রের অধিকারী হতেন যে, দুনিয়া সে আন্দোলনের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার না করে পারতোনা যে এমন মহৎ ব্যক্তিদেরকে তার দিকে আাকৃষ্ট করতো এবং তাদেরকে এমন মহৎ বানিয়ে দিত।

এ দীর্ঘ ও কঠোর সংঘাত- সংঘর্ষ চলাকালে আল্লাহতায়ালা সুযোগ ও প্রয়োজন মতো এমন উত্তেজনাময়ী ভাষণ নাযিল করতে থাকেন- যার মধ্যে ছিল যেন নদীর প্রবাহ, বন্যার শক্তি এবং প্রচন্ড আগুনের প্রভাব। এসব ভষণে একদিকে আাহলে ঈমানদেরকে তাঁদের প্রাথমিক দায়িত্ব কর্তব্য বলে দেয়া হয়, তাঁদের মতে দলবদ্ধ জীবন যাপনের অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়। তাঁদেরকে তাকওয়া, চরিত্রের মহত্ব এবং পবিত্র জীবন যাপনের শিক্ষা দেওয়া হয়। তাঁদেরকে দ্বীনে হকের প্রচার পদ্ধতি বলে দেয়া হয়। সাফল্যের প্রতিশ্রুতি এবং জান্নাতের সুসংবাদ দ্বারা তাঁদের জন্যে সাহস সঞ্চার করা হয়। তাদেরকে ধৈর্য, দৃঢ়তা  এং বিরাট উৎসাহ উদ্দীপনা সহকারে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়। জীবন বিলিয়ে দেয়ার এমন উদ্দীপনা ও ভাবাবেগ তাদের মধ্যে সৃষ্টি করা হয় যে, তারা যে কোন বিপদের সম্মুখীন হতে এবং  বিরোধিতার বিরাট ঝড়-ঝঞ্জার মুকাবিলা করার জন্যে প্রস্তুত হয়।

অপরদিকে বিরোধীগণ এবং সত্যপথ প্রত্যাখ্যানকারী ও অবহেলায় কাল যাপনকারীদেরকে ঐসব জাতির পরিণাম থেকে সতর্ক করে দেয়া হয় যাদের ইতিহাস তাদের জানা ছিল। ঐসব ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদের ধ্বংসাবশেষ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলা হয় যেসব দিনরাত তাঁদের সফরে তারা অতিক্রম করে যেতো। এমন সব সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী থেকে তাওহীদ ও আখেরাতের যুক্তিপ্রমাণ পেশ করা হতো যা রাতদিন আসমান ও যমীনে তাদের চোখের সামনে ভাসতো। যেগুলোকে তারা স্বয়ং নিজেদের জীবনেও সর্বতা দেখতো এবং অনুভব করতো। শির্ক, স্বেচ্ছাচারিতা, আখেরাতের প্রতি অবিশ্বাস এবং পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ প্রীতির ভ্রান্তিসমূহ সুস্পষ্ট যুক্তি দ্বারা তাদের সামনে তুলে ধরা হতো যা তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতো। তাদের এক একটি সন্দেহ সংশয় দূর করা হয়, এক একটি অভিযোগের ন্যায়সংগত জবাব দেয়া হয়। যেসব বিভ্রান্তিতে তারা ভুগছিল এবং অপরের মধ্যে যেসব বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছিল তার এক একটি দূর করে দেয়া হয়। জাহেলিয়াতকে এমন অন্তঃসারশূন্য প্রতিপন্ন করা হয় যে বুদ্ধি ও বিবেকের দুনিয়ায় কোথাও তার স্থান রইলোনা। সেই সাথে খোদার গজব, কিয়ামতেরও ভয়ংকর অবস্থা এবং জাহান্নামের শাস্তির ভয়ও তাদেরকে দেখানো হয়। তাদের অসৎ চরিত্র, ভ্রান্ত জীবনধারা, জাহেলী রীতিনীতি, সত্যের বিরোধিতার জন্যে এবং ঈমান আনয়নকারীকে কষ্ট দেয়ার জন্যে তাদের ভর্ৎসনা করা হয়। নীতি নৈতিকতা ও তামাদ্দুনের সেসব বুনিয়াদী মূলনীতি তাদের সামনে পেশ করা হয় যার ভিত্তিতে আবহমান কাল থেকে খোদার মনোনীত সৎ ও ন্যায়পরায়ণ সভ্যতার পত্তন হয়ে আসছে।

এ পর্যায়ের বিভিন্ন স্তর ছিল এবং প্রতিটি স্তরে দাওয়াত ব্যাপকতর হতে থাকে। সংগ্রাম ও  প্রতিবন্ধকতা কঠোরতর হতে থাকে। মুসলমানগণ বিভিন্ন আকীদাহ বিশ্বাস ও আচরণের লোকদের সম্মুখীন হতে থাকেন এবং তদনুযায়ী আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত পয়গামগুলোর মধ্যে বিষয়বস্তুর বিভিন্নতাও বাড়তেক থাকে। (*****২)

ইসলামী দাওয়াতের এ বিরাট কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্যে নবীকে (সা) যে বিস্তারিত হেদায়াত দেয়া হয় সে সম্পর্কে চিন্তাভানা করলে সহজেই বুঝতে পারা যায় যে, মক্কার কঠিন বিরোধিতার যুগে কোন্‌ বিরাট নৈতিক শক্তি ইসলামী তাবলিগের জন্যে অগ্রসর হওয়ার পথ পরিষ্কার করে এবং কোন ফলপ্রসূ শিক্ষা ও তবলিগ প্রভাবিত লোকদেরকে খোদার পথে সকল শক্তির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে এবং প্রত্যেক বিপদ মুসিবত বরণ করে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। নিম্নে আমরা এসব হেদায়াত এক একটি বর্ণনা করছি।

দাওয়াতে হিকমত ও উপদেশের প্রতি লক্ষ্য রাখা

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ

হে নবী তোমার রবের পথে আহ্বান জানাও হিকমত এবং উত্তম উপদেশসমূহ (নহলঃ ১২৫)। হিকমতের অর্থ এই যে, নির্বোধের ন্যায় কোন বাছবিচার না করেই তবলিগ করা নয়, বরঞ্চ বুদ্ধিমত্তার সাথে দ্বিতীয় পুরুষের মনমানসিকতা, যোগ্যতা ও অবস্থা উপলব্ধি করার পর সুযোগমত কথা বলা। সব ধরনের লোকের সাথে একই ধরনের প্রকাশভংগীতে আলাপ আলোচনা না কবরা। যে ব্যক্তি বা দলের প্রতি তবলিগ করত হবে, প্রথমে তার বা তাদের রোগ নির্ণয় করতে হবে। তারপর এমন যুক্তি প্রমাণসহ সে রেরাগের চিকিৎসা করত হবে যা তাদের অন্তরে গভীর প্রদেশ থেকে সে ব্যাধি নির্মূল করে দিগতে পারে।

উত্তম উপদেশের দুটি অর্থ। এক এই যে দ্বিতীয় পুরুষকে শুধু যুক্তিপ্রমাণ দ্বারা নিশ্চিন্ত করলেই যথেষ্ট হবেনা। বরঞ্চ তার ভাবাবেগের প্রতিও আবেদন রাখতে হবে। পাপাচর, অনাচার ও পথভ্রষ্টতা শুধু যুক্তির মাধ্যমে খন্ডন করা নয় বরঞ্চ মানুষের স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে তার জন্যে যে জন্মগত ঘৃণা দেখতে পাওয়া যায় তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। তার ভয়াবহ পরিণামের ভয় প্রদর্শন করতে হবে। হেদায়েত ও সৎ কাজের সত্যতা ও গুণাবলী শুধু যুক্তিদ্বারা প্রমাণ করাই যথেষ্ট নয়, বরঞ্চ তার প্রতি অনুরাগ ও অভিলাষ সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয় অর্থ এই যে, নসিহত এমন পদ্ধতিতে দিতে হবে যেন তার মধ্যে দুঃখকাতরতা ও শুভাকাংখা প্রকাশ পায়। দ্বিতীয় পুরুষ অর্থাৎ যাকে নসিহত দেয়া হচ্ছে, সে যেন এমন মনে না করে যে তাকে তুচ্ছ নগণ্য মনে করা হচ্ছে এবং উপদেশদাতা আপন শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতিতে আনন্দবোধ করছে। বরঞ্চ দ্বিতীয় পুরুষ যেন অনুভব করে যে উপদেশদাতার অন্তরে তার সংশোধনের জন্যে একটা ব্যাকুলতা ও অস্থিরতা আছে এবং প্রকৃতপক্ষে সে তার মংগলই চায়।

আলাপ আলোচনা যেন তর্কযুদ্ধ ও বুদ্ধির মল্লযুদ্ধে পরিণত না হয়। অন্যায় তর্কবিতর্ক, একে অপরের প্রতি দোষারোপ, পীড়াদায়ক কোন উক্তি ঠাট্টা বিদ্রুপ প্রভৃতি পরিহার করতে হবে। প্রতিপক্ষের মুখ বন্ধ করে দেয়া এবং নিজের বুদ্ধির বাহাদুরি দেখানো যেন উদ্দেশ্য না হয়। বরঞ্চ কথা হবে মিষ্টি মদুর, চরিত্র হতে হবে অতি উন্নত ও সম্ভ্রান্ত মানের। যুক্তি প্রমাণ যেন হয় ন্যায়সংগত ও মনঃপূত। দ্বিতীয় পুরুষের মধ্যে জিদ, আপন প্রভাব প্রতিপত্তির অনুভূতি এবং হঠকারিতা সৃষ্টি যেন না পারে। সহজ কথায় তাকে বুঝাবার চেষ্টা করতে হবে। যদি মনে হয় যে, কুটতর্কে নেমে আসছে তাহলে তাকে সে অবস্থায় ছেড়ে দিতে হবে যাতে করে সে অধিকতর গোমরাহিতে লিপ্ত না হয়। (****৩)

দাওয়াতে হকের জন্যে ধীরস্থির ও রুচিসম্মত পদ্ধতি

وَقُلْ لِعِبَادِي يَقُولُوا الَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْزَغُ بَيْنَهُمْ إِنَّ الشَّيْطَانَ كَانَ لِلْإِنْسَانِ عَدُوًّا مُبِينًا () رَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِكُمْ إِنْ يَشَأْ يَرْحَمْكُمْ أَوْ إِنْ يَشَأْ يُعَذِّبْكُمْ وَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ وَكِيلًا

-এবং হে মুহাম্মদ (সা) আমার বান্দাহদেরকে বলে দাওঃ তরা যেন এমন কথা বলে যা সবচেয়ে উত্তম। আসলে শয়তান সেই, যে মানুষের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। প্রকৃত পক্ষে সে মানুষের প্রকাশ্য দুশমন। তোমাদের রব তোমাদের অবস্থা খুব ভালোভাবে অবগত রয়েছেন। তিনি চাইলে তোমাদের উপর রহম করতে পারেন এবং চাইলে তোমাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন। আর, হে নবী, আমরা তোমাকে লোকের তত্ত্বাবধায়ক পাঠাইনি। (বনী ইসরাইলঃ ৫৩-৫৪)

অর্থাৎ আহলে ঈমন, কাফের মুশরিক এবং দ্বীনের বিরুদ্ধবাদীদের সাথে কথা বার্তায়, আলাপ আলোচনায় কোন রুক্ষ কর্কশ ভাষা ব্যবহার করবেনা এবং অতিরঞ্জিত করে কোন কথা বলবেনা। বিরুদ্ধবাদীরা যতোই বিরক্তিকর কথা বলুক না কেন মুসলমানদের কোন সময়ের জন্যে সত্যের পরিপন্থী কোন কথা মুখ দিয়ে বের করা উচিত নয় এবং রাগের মাথায় বেহুদা কথার জবাব বেহুদা কথায় দেয়া উচিত নয়, ঠান্ডা মাথায়- মাপজোক করে এমন কথা বলা দরকার যা হবে একেবারে সত্য এবং ইসলামী দাওয়াতের মর্যাদার সাথ সংগতিশীল।

আর যদি তোমরা কখনো অনুভব কর যে, বিরুদ্ধবাদীদের কথার জবাব দেবার সময় নিজের মধ্যে রাগের আগুন জ্বলছে এবং স্বভাব প্রকৃতির মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে, তাহলে বুঝতে হবে যে শয়তান তোমাকে উস্কানি দিচ্ছে যাতে দাওয়াতে দ্বীনর কাজ নষ্ট হয়ে যায়। তার চেষ্টা হচ্ছে এই যে, তোমরাও বিরোধীদের মতো সংস্কার সংশোধনের কাজ ছেড়ে দিয়ে সেই ঝগাড় বিবাদেই লেগে যাও যার মধ্যে সে (শয়তান) মানব জাতিকে লিপ্ত রাখতে চায়।

আহলে ঈমানের মুখ থেকে একথা বেরুনো ঠিক নয় যে “আমরা বেহেশতী এবং অমুক ব্যক্তি বা দল জাহান্নামী”। এ বিষয়ে ফয়সালা করার এখতিয়ার ত আল্লাহতায়ালা। স্বয়ং নবীর কাজও শুধু দাওয়াত দেয়া। লোকের ভাগ্য তার হাতে দিয়ে দেয়া হয়নি যে তিনি  কারো জন্য রহমত এবং কারো জন্যে শাস্তির ফয়সালা শুনিয়ে দেবেন।(****)

আহ্বায়কের মর্যাদা ও দায়িত্ব

قَدْ جَاءَكُمْ بَصَائِرُ مِنْ رَبِّكُمْ فَمَنْ أَبْصَرَ فَلِنَفْسِهِ وَمَنْ عَمِيَ فَعَلَيْهَا وَمَا أَنَا عَلَيْكُمْ بِحَفِيظٍ

-দেখ তোমার রবের পক্ষথেকে দৃষ্টিশক্তির আলোক এসে গেছে। এ দৃষ্টিশক্তি যে কাজে লাগাবে সে তার নিজেরই মংগল করবে। আর যে অন্ধ হয়ে থাকবে সে তার নিজেরই ক্ষতি করবে। আর আমি তোমাদের কোন প্রহরী নই (আনয়াম: ১০৪)।

“আমি তোমাদের প্রহরী নই” –কথার অর্থ এই যে আামার কাজ শুধু এতোটুকু যে সেই আলোক তোমার সামনে পেশ করবো যা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে। তারপর চোখ খুলে তা দেখা না দেখার কাজ তোমাদের। আমার উপর এ দায়িত্ব দেয়া হয়নি যে যারা স্বয়ং চোখ বন্ধ করে রেখেছ তাদের চোখ বলপূর্বক খুলে দেব এবং যারা দেখবেনা তাদেরকে জোর করে দেখাবোই।(****৫)

مَنْ يُصْرَفْ عَنْهُ يَوْمَئِذٍ فَقَدْ رَحِمَهُ وَذَلِكَ الْفَوْزُ الْمُبِينُ (16) وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يَمْسَسْكَ بِخَيْرٍ فَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

-হে নবী (সা) সেই অহীর অনুসরণ করে যাও, যা তোমার উপর তোমার রবের পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। তিনি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। আর এ মুশরিকদের পেছনে লেগে থেকোনা। যদি আল্লাহর ইচ্ছা এই হতো যে এরা শির্ক না করুক তাহলে এরা শির্ক করতোনা। তোমাকে আমরা তাদের প্রহরা নিযুক্ত করিনি এবং না তুমি তাদের তত্ত্বাবধায়ক। (আনয়াম : ১৬-১৭) – এর অর্থ এই যে তোমাকে আহ্বায়ক ও মুবালিলগ বানানো হয়েছে, কোতওয়াল বা পুলিশের কর্তা বানানো হয়নি। তাদের পেছনে লেগে থাকার তোমার কোন কাজ নেই। তোমার কাজ শুধু এতোটুকু যে লোকের সামনে এ আলোক পরিবেশন কর এবং সত্যকে সুস্ষ্ট করে তুলে ধরার ব্যাপারে তোমার যতোটুকু শক্তি সামর্থ রয়েছে, তার কোন ত্রুটি করোনা। কেউ যদি এ সত্য গ্রহণ না করে তা না করুক। তোমাকে এ কাজের জন্যে আদেশ করা হয়নি যে, মানুষকে সত্যপন্থী করেই ছাড়তে হবে। আর তোমার নবুয়তের গন্ডির ভেতরে কেউ বাতিলপন্থী রয়ে গেলে তার জন্যে তোমাকে জবাদিহিজও করতে হবে না। অতএব কিভাবে অন্ধকে চক্ষুষ্মান বানানো যায় এবং যারা চোখ মেলে দেখতে চায় না তাদেরকে কিভাবে দেখানো যায়, অযথা এসব চিন্তা করে নিজেকে বিব্রত করোনা। যদি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হিকমতের দাবীই এটা হতো যে দুনিয়ায় কাউকে বাতিলপন্থী থাকতে দেয়া হবেনা, তাহলে তোমার দ্বারা এ কাজ নেয়ার কি প্রয়োজন আল্লাহর ছিল? তাঁর কি একটি মাত্র সৃজনী ইংগিত গোটা মানবজাতিকে হকপন্থী বানাতে পারতোনা? কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ত মোটেই তা নয়। উদ্দেশ্য এই যে মানুষের জন্যে হক ও বাতিল বেছে নেয়ার স্বাধীনতা থাকবে। তারপর হকের আলা তার সামনে পেশ করে তার পরীক্ষা করা যে দুটির মধ্যে সে কোনটি বেছে নিচ্ছে। অতএব তোমার জন্য সঠিক কর্মপন্থা এই যে, যে আলোক তোমাকে দেখানো হয়েছে তার আলোতে তুমি সোজাপথে চলতে থাক এবং অপরকেও তার দাওয়াত দিতে থাক। যারা এ দাওয়াত কবুল করবে তাদেরকে আপন করে নেবে এবং তাদেরকে কখনো বিচ্ছিন্ন করবেনা। দুনিয়ার চোখে তারা যতোই নগন্য ও তুচ্ছ হোকনা কেন। আর যারা তোমার দাওয়অত কবুল করবেনা তাদের পেছনে লেগে থেকোনা। যে অশুভ পরিণামের দিকে তার স্বয়ং যেতে চায় এবং যাবার জন্যে বদ্ধপরিকর, তাদেরকে সেদিকে যেতে দাও।(****৬)

তাবলিগের সহজ পন্থা

وَنُيَسِّرُكَ لِلْيُسْرَى () فَذَكِّرْ إِنْ نَفَعَتِ الذِّكْرَى

-এবং (হে নবী), আমরা তোমাকে সহজ পন্থার সুযোগ দিচ্ছি। অতএব নসিহত কর যার নসিহত ফলপ্রদ হয়-(আল-আলা: ৮-৯)।

অর্থাৎ হে নবী, দ্বীনের দবলিগের ব্যাপারে আমরা তোমাকে অসুবিধায় ফেলতে চাইনা যে, তুমি বোবাকে কথা শুনাও এবং অন্ধকে পথ দেখাও। বরঞ্চ তোমাকে সহজ পন্থা লাভের সুযোগ করে দিচ্ছি। তা এই যে, যদি তুমি অনুভব কর যে, কোথাও নসিহত করল লোক তার থেকে সুযোগ গ্রহণ করতে প্রস্তুত তাহলে সেখানে নসিহত কর। এখন প্রশ্ন এই যে, কে তার থেকে সুযোগ গ্রহণ করার জন্যে প্রস্তুত এবং কে প্রস্তুত নয়? ত এ কথা ঠিক যে, জনসাধারণের মধ্যে তবলিগ বা প্রচারের মাধ্যমেই তা জানা যাবে। এ জন্যে সাধারণের মধ্যে তবলিগ অব্যাহত রাখতে হবে। তবে তার উদ্দেশ্য এই হওয়া উচিত যে, আল্লাহর বান্দাহদের মধ্য থেকে তাদেরকে তালাশ করে বের করতে হবে যারা- এর সুযোগ গ্রহণ করে সত্য পথ অবলম্বন করবে। এসব লোকের প্রতি তোমার বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে এবং তাদের শিক্ষা দীক্ষার প্রতি তোমার বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে এমন লোকের পেছনে তোমার সময় নষ্ট করা উচিত নয়, যাদের সম্পর্কে তোমার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে যে তারা তোমার নসিহত গ্রহণ করতে চায়না। (****৭)

তাবলিগে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত গুরুত্ব কাদের

وَلَا تَطْرُدِ الَّذِينَ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجْهَهُ مَا عَلَيْكَ مِنْ حِسَابِهِمْ مِنْ شَيْءٍ وَمَا مِنْ حِسَابِكَ عَلَيْهِمْ مِنْ شَيْءٍ فَتَطْرُدَهُمْ فَتَكُونَ مِنَ الظَّالِمِينَ

-এবং হে নবী, যারা তাদের রবকে রাত দিন ডাকে এবং তাঁর সন্তোষ লাভের অভিলাষী, তাদেরকে তোমার থেকে দূরে নিক্ষেপ করো না। তাদেরকে যেসব বিষয়ের হিসাব দিতে হবে তার কোনটার বোঝা তোমার উপরে নেই এবং তোমার যেসব বিষয়ে হিসাব দিতে হবে তার কোনটির বোঝা তাদের উপরে নেই। তার পরেও যদি তাদেরকে দূরে নিক্ষে কর তাহলে তুমি জালম হবে- (আনয়ামঃ ৫২)।

যারা প্রথমেই রসূলুল্লাহ (সা) উপর ঈমান এনেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেক এমন ছিলেন যারা অত্যন্ত গরীব ও শ্রমজীবী ছিলেন। রসূলুল্লাহর (সা) প্রতি কুরাইশদের বড়ো বড়ো সর্দারদের এবং সচ্ছল ব্যক্তিদের অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে একটা এই ছিল যে, “তোমার চারধারে আমাদের সমাজের যতোসব দাসদাসী ও নিম্নশ্রেণীর লোক জমা হয়েছে।”

তারা উপহাস করে বলতো, “দেখ তার কেমন সম্মানিত সাথী মিলেছে? যেমন বেলাল (রা), আম্মার (রা), সুহাইব (রা), খাব্বাব (রা)। ব্যাস, আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকে কি এসব লোকই পেয়েচিলেন যাদেরকে বেছে নেয়া যেতে পারতো?”

ঈমান এনেছিলেন এমন দরিদ্র লোকের প্রতি ঠাট্টাবিদ্রুপ করেই তারা ক্ষান্ত হতোনা, বরঞ্চ ঈমান আনার পূর্বে তাদের মধ্যে কারো কোন দুর্বলতা থাকলে তার উল্লেখ করে তারা বলতো, “দেখ, অমুক, যে কাল পর্যন্ত এমন ছিল, এবং অমুক  যে এমন এমন কাজ করেছিল আজ তারাও নির্বাচিত সম্মানিত দলভুক্ত”। বস্তুততঃ এ সূরা আনয়ামের ৫৩ আয়াতে তাদের এ উক্তি উধৃত করা হয়েছে- “এরাই কি সেসব লোক আমাদের মধ্যে যাদের উপর আল্লাহর ফযল ও করম হয়েছে?” এ আয়াতে তারই জবাব দেয়া হয়েছে। তার অর্থ এই যে, যারা সত্যের অভিলাষী হয়ে তোমার কাছে আসে তাদেরকে এসব বড়ো লোকদের খাতিরে দূরে ঠেলে দিও না। ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে তারা কোন ভুল ত্রুটি করে থাকলেও তার দায়িত্ব তোমার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়নি। (****৮)

হযরত ইবনে উম্মে মাকতুমের ঘটনা

একদা রসূলুল্লাহ (সা) এর দরবারে মক্কার কতিপয় প্রভাবশালী সর্দার বসেছিল এবং হুযর (সা) তাদেরকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন।

[হুযুরের (সা) দরবারে সেসময়ে যারা বসেছিল, বিভিন্ন  বর্ণনায় তাদের নামের বিবরণ দেয়া হয়েছে। এ তালিকায় ওতবা, শায়বা, আবু জাহেল, উমাইয়া বিন খালফ, উবাপই বিন খালফ প্রমুখ চরম ইসলাম দুশমনদের নাম পাওয়া যায়। এর থেকে জানা যায় যে, এ ঘটনা তখন ঘটে যখন এদের সাথে রসূলুল্লাহ সা এর মেলামেসা হতো এবং সংঘাত-সংঘর্ষ এমন পর্যায়ে পৌছেছিলনা যে তাঁর কাছে তাদের যাতায়াত এবং দেখা সাক্ষাত একেবারে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।– (গ্রন্থখার)।]

 এমন সময় ইবনে উম্মে মাকতুম নামে জনৈক অন্ধ হুযরের খেদমতে হাজির হন এবং  ইসলাম সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান।  তাঁর এ হস্তক্ষেপ হুযুরের মনঃপূত হয়না এবং তিনি তাঁর প্রতি একটু বিরক্তি প্রকাশ করলেন এ কারণে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ সূরা আবাসা নাযিল হয়।

عَبَسَ وَتَوَلَّى () أَنْ جَاءَهُ الْأَعْمَى

বিরক্ত হলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিল এজন্যে যে সে অন্ধ তার কাছে এলো (আবাসা: ১-২)।

দৃশ্যতঃ যে প্রকাশভংগীর দ্বারা কথার সূচনা করা হয়েছে তা দেখে মনে হয়, অন্ধের প্রতি অবহেলা এবং বড়ো বড়ো সর্দারদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জন্যে এ সূরায় নবী (সা) এর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু সমগ্র সূরাটি নিয়ে সামগ্রিকভাবে চিন্তাভাবনা করলে জানা যায় যে, প্রকৃতপক্ষে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে ঐসব কুরাইশ সর্দারদের উপর যাা গর্ব অহংকার, হঠকারিতা এবং সত্য বিমুখতার কারণে রসূলুল্লাহ (সা) সত্যপ্রচারকে ঘৃণাতরে প্রত্যাখ্যান করছিল। নবীকে (সা) তবলিগের সঠিক পন্থা বলে দেয়ার সাথে সাথে সেই পদ্ধতির ত্রুটিবিচ্যুতিও বুঝিয়ে দেয়া হয় যা তিনি কাজের সূচনায় অবলম্বন করেছিলেন। একজন অন্ধের দিক থেকে তাঁর মুখ ফিরিয়ে নেয়া এবং কুরাইশ সর্দারদের প্রতি মনোযোগ প্রদান এজন্যে ছিলনা যে তিনি বড়ো লোকদেরকে সম্মানিত এবং অন্ধকে তুচ্ছ নগণ্য মনে করতেন, এবং (মায়াযাল্লাহ) কোন রুক্ষতা তাঁর মেজাজের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছিল যার জন্যে আল্লাহতায়ালা তাঁকে পাকড়াও করেন। বরঞ্চ ব্যাপারটি প্রকৃতপক্ষে ছিল এই যে, একজন দায়ী (আহ্বায়ক) যখন তার দাওয়াতের সূচনা করে তখন স্বভাবতঃই তার প্রবণতা এই হয় যে সমাজের প্রভাবশালী লোক তার দাওয়াত কবুল করুক যাতে কাজ সহজ হয়ে যায়। নতুবা সাধারণ প্রভাব প্রতিপত্তিহীন, অথর্ব অকর্মণ্য অথবা দুর্বল লোকদের মধ্যে দাওয়ারেত প্রসার ঘটলেও তাকে কিছু যায় আসেনা। দাওয়অতের সূচনায় প্রায় এ কর্মপদ্ধতিই রসূলুল্লাহ (সা) অবলম্বন করেছিলেন। পরিপূর্ণ এখলাস (নিষ্ঠা) এবং দাওয়াতে হকের প্রসার ঘটাবার প্রেরণাই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, বড়ো লোকদের সম্মান শ্রদ্ধা করার  এবং ছোটদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার চিন্তাধারণা তাঁর ছিলনা। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে বুঝিয়ে বল্লেন যে, ইসলামী দাওয়াতের সঠিক পদ্ধতি এটা নয়। বরঞ্চ এ দাওয়াতের ‍দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক এমন ব্যক্তির গুরুত্ব রয়েছে যে হকের প্রত্যাশী। সে যে ধরণেরই দুর্বল, প্রভাব প্রতিপত্তিহীন অথবা অকর্মণ্যৗ হোক না কেন। আর এমন ব্যক্তির কোন গুরুত্ব নেই, যে সত্যবিমুখ, তা সে সমাজের যতোবড়ো প্রভাবশালী হোকনা কেন। এজন্যে নবী (সা) প্রকাশ্যে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা ত পরিবেশন করবেনই। কিন্তু তাঁর মনোযোগ আকৃষ্ট করার প্রকৃত হকদার তারাই যাদের মধ্যে সত্যকে গ্রহণ করার আগ্রহ উৎসাহ পাওয়া যায়। নবীর মহান দাওয়াতের মর্যাদা ক্ষণ্ন করা হয় যদি তাঁর দাওয়াত এমন সব গর্বিত লোকের কাছে পেশ করা হয়, যারা গর্বভরে এ কথা মনে করে যে গরজ তাদের নয়, বরঞ্চ তাঁর (নবীর)।

وَمَا يُدْرِيكَ لَعَلَّهُ يَزَّكَّى () أَوْ يَذَّكَّرُ فَتَنْفَعَهُ الذِّكْرَى () أَمَّا مَنِ اسْتَغْنَى () فَأَنْتَ لَهُ تَصَدَّى () وَمَا عَلَيْكَ أَلَّا يَزَّكَّى () وَأَمَّا مَنْ جَاءَكَ يَسْعَى () وَهُوَ يَخْشَى () فَأَنْتَ عَنْهُ تَلَهَّى () كَلَّا إِنَّهَا تَذْكِرَةٌ () فَمَنْ شَاءَ ذَكَرَهُ

-হে নবী (সা), তুমি কি জান, হয়তো তার সংশোধন হবে অথবা নসিহতের প্রতি মনোযোগ দেবে এবং নসিহত তার জন্যে ফলদায়ক হবে? যে কোন পরোয়াই করেনা তাদের প্রতি তুমি মনোযোগ দিচ্ছ। অথচ তাদের সংশোধন না হলে তোমার উপর তার কি দায়িত্ব? আর যে ব্যক্তি স্বয়ংয় তোমার কাছে দৌড়ে আসে এবং ভীত-শংকিত হয়, তুমি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ। কখনোও না। এত নসিহত। যার ইচ্ছ সে তা গ্রহণ করুক- (আবাসা: ৩-১২)।

এটা সেই মূল সূক্ষ কৌশল যা নবী (সা) তবলিদে দ্বীনের ব্যাপারে এখঅনে উপেক্ষা করেছিলেন এবং একথা বুঝাবার জন্যে আল্লাহতায়ালা প্রথমে ইবনে মাকতুমের সাথে নকবী (সা) এর আচরণের সমালোচনা করলেন। তারপর বল্লেন যে সত্যের আহ্বায়কের দৃষ্টিতে প্রকৃত গুরুত্ব কার প্রতি দেয়া উচিত এবং কার প্রতি উচিত নয়। এক হচ্ছে, সে ব্যক্তি যার বাহ্যিক অবস্থা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে সে সত্যনুসন্ধিৎসু, সত্যের অভিলাষী। সে সর্বদা শংকিত যে কি জানি বাতিলের অনুসরণ করে সে খোদার বিরাগভাজন হয়ে না পড়ে। এজন্যে সে সত্য ও সঠিক পথের জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছে। দ্বিতীয় সে ব্যক্তি যার আচরণ স্পষ্টতঃ বলে দিচ্ছে যে তার মধ্যে সত্যের কোন অনুসন্ধিৎসা নেই। বরঞ্চ সে নিজেকে কারো মুখাপেক্ষীই মনে করেনা যে তাকে সত্য সঠিক পঠ দেখানো হোক। এ দু ধরনের লোকের মধ্যে এটা দেখাবার বিষয় নয় যে কে ঈমান আনলে তা দ্বীনের জন্যে খুবই কল্যাণকর হবে এবং কার ঈমান দ্বীনে প্রচার ও প্রসারে তেমন ফলদায়ক হবেনা। বরঞ্চ দেখার বিষয় এই যে কে হেদায়াত গ্রহণ করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে প্রস্তুত এবং কে এ অমূল্য সম্পদের প্রতি মোটেটই শ্রদ্ধাশীল নয়। প্রথম ধরনের লোক অন্ধ হোক, খঞ্চ হোক, পংশু অথবা নিঃস্ব হোক অথবা দৃশ্যতঃ দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের ব্যাপারে তেমন উল্লেখযোগ্য খেদমত করার যোগ্য না হোক কিন্তু  সেই হকের  আহ্বায়কের জন্যে এক ‍মূল্যবান ব্যক্তিত্ব।  তার প্রতিই মনোযোগ দেয়া উচিত। কারণ এ  দাওয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য আল্লাহর বান্দাহদের সংস্কার সংশোধন। এ ব্যক্তির অবস্থা এই যে তাকে নসিহত করলে সে সংস্কার সংশোধন মেনে নেবে। এখন রইলো দ্বিতীয় ধরনের ব্যক্তি। ত সে ব্যক্তি সমাজে যতোই প্রভাব প্রতিপত্তিশীল হোক না কেন তার পেছনে লেগে থাকার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ তার আচরণ প্রকাশ্যেই এ কথা ঘোষণা করছে যে, সে নিজেকে সংশোধন করতে চায়না। এজন্যে তার সংশোধনের চেষ্টায় সময় ব্যয় করা সময়ের অপচয় মাত্র। সে যদি পরিশুদ্ধ হতে না চায় ত পরিশুদ্ধ না হোক। পরিণামে ক্ষতি তার হবে, তার কোন দায় দায়িত্ব সত্যের আহ্বায়ককে বহন করতে হবেনা।

যে অন্ধের এখানে উল্লেখ করা হযেছে তিনি একজন মশহুর সাহাবী হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম (রা)। হাফেজ ইবনে আবদুল বার তাঁর ইস্তিয়াবে এবং হাফেজ ইবনে হাজার তাঁর আল-ইসাবা’তে বলেন যে, ইনি উম্মুল মুনেনীন হযরত খাদিজার (রা) ফুফাতো ভাই ছিলেন। তাঁর মা উম্মে মাকতুম এবং হযরত খাদিজার ()রা) পিতা খুয়াইলিদ পরস্পর ভাইভগ্নি ছিলেন। হুযুরের (সা) সাথে তাঁর এ সম্পর্ক জানার পর সন্দেহের কোন অবকাশ থাকেনা  যে তিনি তাঁকে দরিদ্র অথবা নিম্ন পদমর্যাদার লোক মনে করে তাঁকে উপেক্ষা করেছেন এবং বড়োলোকদের প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন। কারণ ইনি ছিলেন হুযুরের (সা) শ্যালক এবং স্বগোত্রীয় লোক। কোন নিম্ন ম্রেণীর লোক ছিলেননা। যে জন্যে হুযুর (সা) তাঁর সাথে এ আচরণ করেছিলেন তার প্রকৃত কারণ (******) শব্দ থেকেই জানা যায়। আর এটাকেই নবীর অযত্ন-অবহেলার কারণ বলে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ হুযুরের (সা) ধারণা এই ছিল যে এখন তিনি যেসব লোককে সৎপথে আনার চেষ্টা করছিলেন তাদের মধ্যে যে কোন একজন হেদায়েত লাভ করলে তা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির বিরাট কারণ হতে পারে। অপর দিকে ইবনে মাকতুম একজন অন্ধব্যক্তি। তিনি তাঁর অপারগতার জন্যে ইসলামের জন্যে ততোটা ফলদায়ক হবেননা যতোটা হতে পারে এসব সর্দারদের মধ্যে কোন একজন মুসলমান হলে। এজন্যে এ সময়ে কথাবার্তায় হস্তক্ষেপ করা তাঁর উচিত নয়। তিনি যা কিছু বুঝাতে ও জানতে চান তা এরপর যে কোন সময়ে জানতে বুঝতে পারেন। (*****৯)

তবলিগের হিকমত

وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَابِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

-এবং আহলে কিতাবদের সাথে তর্কবিতর্ক করোনা। কিন্তু (করলে) উত্তম পন্থায় কর (আনকাবুত : ৪৬)। অর্থাৎ তর্কবিতর্ক বা আলাপচারি ন্যায়সংগত যুক্তি প্রমাণসহ এবং অত্যন্ত ভদ্র ও  শালীন ভাষায় হতে হবে। পারস্পরিক বুঝাপড়ারর মনমনাসিকতাসহ হতে হবে। যাতে করে প্রতিপক্ষের চিন্তাচেতনার সংশোধন হয়। মুবাল্লিগের  এ বিষয়ে চিনাত থাকা উচিত য সে যেন দ্বিতীয় পুরুষের মনের দুয়ার উন্মুক্ত করে সেখানে সত্যকথা পৌছিয়ে দিতে পারে এবং তাকে সঠিক পথে আনতে পারে।

একজন পলোয়ানের মতো লড়াই করা তার ঠিক নয় যে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হবে। বরঞ্চ তাকে একজন চিকিৎসকের মতো রোগের চিকিৎসা করতে হবে। একজন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসাকালে সর্বদা এ বিষয়ের প্রতি বিশেষ দৃষিটি রাখে যে, তার কোন ভুলের কাণে যেন রোগীর রোগ আরও বেড়ে না যায়। সে  অপ্রাণ চেষ্টা করে যে যতো কম কষ্টের মধ্যে সম্ভব যেন রোগী রোগমুক্ত হয়ে যায়। এখানে স্থান কাল পাত্র হিসাবে আহলে কিতাবদের সাথে আলোচনার ব্যাপারে এ হেদায়েত দেয়া হযেছে বটে। কিন্তু এ শুধু আহলে কিতাবের জন্যেই নির্দিষ্ট নয়। বরঞ্চ তবলিগের দ্বীনের ব্যাপারে এ এক সাধারণ হেদায়েত যা কুরআন মজীদের স্থানে স্থানে দেয়া হযেছে। যেমন:-

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

দাওয়াত দাও তোমার বের পথের দিকে হিকমত এবং উত্তম নসিহতের সাথে এবং লোকের সাথে এবং আলাপ আলোচনা কর এমন পন্থায় যা অতি উত্তম (নহল: ১২৫)।

 (আরবী*************)

-ভালো ও মন্দ একরূপ নয়। (প্রতিপক্ষের হামলার জবাবে) প্রতিরোধ এমন পন্থায় করবে যা সর্বোৎকৃষ্ট হবে। ফলে তুমি দেখবে যে, যে ব্যক্তির সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে এমন হয়ে গেছে যেনস সে পরম বন্ধু (হামীম সিজদাহ : ৩৪)।

(আরবী*****************)

-তুমি অন্যায়কে ভালো পন্থায় প্রতিরোধ কর। আমার জনা আছে সেসব কথা যা তারা তোমার বিরুদ্ধে বলছে (মুমেনুন: ৯৬)। (****১০)

দাওয়াতের হকের সঠিক কর্মপন্থা

(আরবী*******************)

(হে নবী) কোমলতা ও ক্ষমার আচরণ কর এবং ভালো কাজের প্রেরণা দিতে থাক এবং জাহেলদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়োনা। যদি শয়তান কখনো তোমাকে উস্কিয়ে দেঃয় ত আল্লাহর আশ্রয় চাও। তিনি সব কিছু শুনেন ও জানেন। প্রকৃতপক্ষে যারা খোদাভীরু তাদের অবস্থা ত এই হয় যে যদি কখনো শয়তানের কুপ্রভাবে তাদের মধে কোন খারাপ বাসনার উদয় হয়, তখন তৎক্ষণাৎ তারা সজাদ হযে পড়ে এবং তারপর তরা স্পষ্ট দেখতে পায়। (তাদের সঠিক কর্মপন্থা কি)। এখন রইলো তাদের (শয়তানদের) ভাইবন্ধুগণ।ভ তারা তাদেরকে বক্রতার দিকে টেনে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে পথভ্রষ্ট করার ব্যাপারে কোন ত্রুটি করে না- (আ’রাফ: ১৯৯-২০২)

এ আয়াতগুলোতে নবীকে (সা) দাওয়াত ও তবলিগ এবং হেদায়েত এ সংস্কার সংশোধনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল (হিকমত) শিখিয়ে নেয়া হয়েছে। শুধু হুযুরকেই (সা) শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য নয় বরঞ্চ তাঁর মাধ্যমে সকলকে এ হিকমত শিক্ষা দেয়া হয়েছে যাঁরা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দুনিয়াবাসীকেসঠিক পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তা ধারাবাহিকতার নিম্নরূপ:-

(১) সত্যের আহ্বায়কের যেসব গুণাবলরি বিশেষ প্রয়োজন তার মধ্যে একটি এই যে, তাঁকে কোমলপ্রাণ সহনশীল ও উদারচেতা হতে হবে। তাঁকে তার সংগী সাথীদের জন্যে স্নেহশীল, জনসাধারণের জন্যে দয়ালু এবং প্রতিপক্ষের জন্যে সহনশীল হতে হবে। সহযোগীদের দুর্বলতাও উপেক্ষা করত হবে এবং বিরুদ্ধবাদীদের কঠোরতাও। চরম উত্তেহজনাকর পরিস্থিতিতেও মেজাজ প্রকৃতিকে শান্ত ও স্বাভাবিক রাখতে হবে। অত্যন্ত অসহনীয় কথাবার্তাও উদারতার সাথে সহ্য করতে হবে। বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে যতোই শক্ত কথা বলা হোক, অপবাদ অপপ্রচার করা হোক, অন্যায় ও সহিংস প্রতিরোধের ইচ্ছাই প্রকাশ করা হোক না কেন, সবকিছু উপেক্ষা করে চলাই উচিত। কঠোরতা ও রুক্ষতা প্রদর্শন, অভদ্র ও অশোভন উক্তি এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ স্বভাব প্রকৃতি বিষম পরিণাম ডেকে আনে। এতে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়, সফল হয় না। বিষয়টকে নবী (সা)  এভাবে বর্ণনা করেছেন, আমার রব আমাকে আদেশ করেছেন রাগান্বিত অবস্থায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় যেন আমি সুবিচারপূর্ণ আচরণ করি। যে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়, তার সাথে যেন আমি সম্পৃক্ত হই। যে আমাকে আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাকে যেন তার অধিকার দিযে দিই। যে আমার উপর জুলুম করে তাকে যেন মাফ করে দিই।

নবী পাক (সা) এসব হেতায়েত তাদেরকেও দিতেন যাদেরকে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে দ্বীনের কাজে পাঠাতেন। তিনি বলেন:-

(আরবী****************)

অর্থাৎ যেখানেই তোমরা যাও তোমাদের আগমন যেন লোকের জন্যে সুসংবাদ বয়ে নিয়ে যায়, ঘৃণার উদ্রেক না করে। লোকের জন্যে তোমরা যেন সুযোগ সুবিধার কারণ হও, সংকীর্ণতা ও কঠোরতার নয়।

আল্লাহতায়ালা এতদসম্পর্কে নবীল (সা) সপক্ষে প্রশংসাবাণীই শুনিয়েছেন-

(আরবী****************)

-এ আল্লাহ তায়ালার রহমত যে তুমি তাদের প্রতি কোমলপ্রাণ। নতুবা তুমি যদি রুক্ষ প্রকতির এবং পাসাণ হৃদয় হতে, তাহলে এসব লোক তোমার চারপাশ থেকে কেটে পড়তো।– (আলে ইমরান: ১৫৯)।

(২) দাওয়াতে হকের সাফল্যের পন্থা এই যে, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক আলোচনার পরিবর্তে মানুষের সর্বজন পরিচিত অর্থাৎ ঐসব সহজ সরল ও সুস্পষ্ট মংগল ও কল্যাণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে হবে যা সকল মানুষ জানে এবং যে কল্যাণকারিতা উপলব্ধি করার জন্যে সাধাণ জ্বঞান বিবেকই (Common sense) যথেষ্ট। এভাবে হকের আহ্বায়কের আবেদন সর্বশ্রেণীর মানুষকে প্রভাবিত করে এবং শ্রোতার হৃদয়ের গবীর প্রদেশে সে আবেচনদ পৌঁছে যায়। এমন সুপরিচিত দাওয়াতের বিরুদ্ধে যারা বিঘট্ন করে তারা নিজেদের ব্যর্থতাই ডেকে আন এবং দাওয়াতের সাফল্যের পথ সুগম করে। কারণ সাধারণ লোক- যতোই তারা কুসংস্কারে নিমজ্জিত হোক না কেন, যখন দেখে যে একদিকে এক পূণ্যত্মা মহান চরিত্রবান ব্যক্তি সোজাসুজি কল্যাণের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে এবং অপর দিকে বহু লোক তার বিরোধীতার নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত অমানবিক কলাকৌশলী ব্যবহার করছে, তখন ক্রমশঃ তাদের মন স্বতঃস্ফূর্তভাব সত্যের বিরোধিতাকারীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সত্যের আহ্বায়কের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। শেষ পর্য়ন্ত বিরোধীদের ময়দানে শুধু তারাই রয়ে যায় যাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বাতিল ব্যবস্থার সাথে জড়িত। অথবা যাদের অন্তর পূরাবপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ ও জাহেলী যুগের বিদ্বেষ কোন সত্যের আলো গ্রহণ করার যোগ্যতাই অবশিষ্ট রাখেনা। এটাই সেই প্রজ্ঞাসম্পন্ন কলাকৌশল যার বদৌলতে নবী (সা) আরবে সাফল্য লাভ করেন। অতঃপর তাঁর পরে অল্পেকালের মধ্যেই ইসলামের প্লাবন অন্যা্য দেশে এমনভাবে ছড়িযে পড়ে যে কোথাও শতকরা একশ এবং কোথাও আশি-নব্বই জন অধিবাসী ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে।

(৩) এ দাওয়াতের কাজে কল্যাণকামীদেরকে সৎকাজে প্রেরণা দান যতোটা জরুরী, ততোটা জরুরী অন্ধলোকদের সাথে বিতর্কে লিপ্ত না হওয়া- তারা বিতর্কে লিপ্ত করার যতোই চেষ্টা করুন না কেন। সত্যের আহ্বায়ক বা পতাকাবাহীকে এ  ব্যাপারে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং তিনি শুধু তাদেরকে সম্বোধন করবেন যারা যুক্তিসম্পত পন্থায় বক্তব্য উপলব্ধি করতে আগ্রহী। আর যদি কেউ অজ্ঞালোকের ন্যায় হঠকারিতা, ঝগড়াবিবাধ ও বিদ্রুপাত্মক আচরণ শুরু করে, তাহলে প্রতিপক্ষের ভূমিকা পালন করতে সত্যের আহ্বায়কের অস্বীকার করা উচিত। কারণ এ বিতর্কে লিপ্ত হয়ে কোন লাভ নেই। বরঞ্চ ক্ষতি এই যে, যে সময়টুকু তিনি দাওয়াতের প্রচার ও প্রসার এবং ব্যক্তিচরিত্র গঠনে ব্যয় করতে পারবেন, সে সময়টুকু এ বাজে কাজে অপচয় করা হবে।

(৪) উপরে যা বলা হলো সে প্রসংগেই অতিরিক্ত কথা এই যে, যদি কখনো সত্যের আহ্বায়ক প্রতিপক্ষের জুলুম, দুস্কৃতি এবং তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত সমালোচনা ও দোষারোপ নিজের স্বভাব প্রকৃতিতে উত্তেজনা অনুভব করেন, তাহলে তৎক্ষণাৎ তাঁর মনে করা উচিত যে, এ শয়তানের পক্ষ থেকে উস্কানি দেয়া হচ্ছে এবং তক্ষুণি খোদার আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত যাতে করে তিনি তার বান্দাহকে ভাবাবেগের স্রোতে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা  করেন এবং সে এমন বেশামাল হয়ে না পড়ে যাতে করে দাওয়াতে হকের জন্যে ক্ষতিকর কোন পদক্ষেপ করে না বসে। দাওয়াতে হকের কাজ সকল অবস্থাতে ঠান্ডা মাথাই হতে পারে এবং সে পদক্ষেপই সঠিক হতে পারে যা ভাবাবেগে পরিচালিত হয়ে নয়, বরঞ্জ পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে খুব চিন্তা ভাবনা করেই গ্রহণ করা হয়। কিন্তু শয়তান যেহেতু এ কাজের প্রসার বরদাশত করতে পারেনা, সেজন্যে সে সর্বদা তার অনুসারীদের দ্বারা সত্যের পতাকাবাহীর উপর বিভিন্ন ধরনের হামলা চারঅবার চেষ্টা করবে এবং প্রতিটি হামলার দ্বারা সত্যের পতাকাবাহীকে এভাবে উস্কাতে থাকবে যে- হামলার ত জবাব দেয়া উচিত। হকের আহ্বায়কের মনের কাছে শয়তান যে  আবেদন পেশ করে তা অধিকাংশ সময়ে বড়ো বড়ো প্রতারণামূলক ব্যাখ্যাসহ এবং ধর্মীয় পরিভাষার পোষঅকে আবৃত থাকে। কিন্তু তার পেছনে স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছু থাকেনা। এ জন্যে উপরে বর্ণিত শেষ দুট আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা মুত্তকী (অর্থাৎ খোদাভীরু এবং পাপাচার থেকে দূরে থাকার অভিলাষী) তারা তাদের মনের মধ্যে শয়তানী প্ররোচরণার প্রভাব এবং কোন পাপ প্রবণতার স্পর্শ অনুভব করার সাথে সাথেই সজাগ সতর্ক হয়ে যায় এবং তারপর তারা স্পষ্ট বুঝতে পারে এ অবস্থায কোন্‌ কর্মপন্থা অবলম্বন করলে দাওয়াতে দ্বীনের উদ্দেশ্য হাসিল হবে এবং হকপুরন্তির দাবীই বা কি? অপরদিকে স্বার্থপরতাই যাদের কর্মকান্ডে ক্রিয়াশীল এবং   এ কারণে শয়তানদের সাথে যাদের দহরম মহরম, তারা শয়তানী হামলায় টিকে থাকতে পারেনা এবং পরাজয় বরণ করে ভ্রান্ত পথে চলতে থাকে। তারপর শয়তান তাদেরকে যে যে প্রান্তরে নিয়ে যেতে চায়, সেখানে সেখানে নিয়ে যায় এবং কোথাও তাদের অবস্থান সুদৃঢ় হয়না। প্রতিপক্ষের প্রতিটি গালির জবাবে তাদের কাছে একটি করে গালি এবং প্রত্যেকটি কৌশলের জবাবে তাদের কাছে বৃহত্তর কৌশল থাকে।

আল্লাহতায়ালার এ এরশাদের একটা সাধারণ উদ্দেশ্যও আছে। তা হলো এই যে, তাকওয়া সম্পন্ন ব্যক্তিদের কর্মপদ্ধতি সাধাণতঃ তাকওয়াহীন ব্যক্তিদের থেকে ভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। যারা প্রকৃত পক্ষে খোদাকে ভয় করে এবং অন্তর থেকে চায় যে তারা অনাচার পাপাচার থেকে দূরে থাকুক, তাদের অবস্থা এই য, খারাপ ধারণার একটু খানি স্পর্শ মনে লাগতেই, খচখটে ব্যাথা অনুভব করতে থাকে, যেমন আঙুলের কোন তীক্ষ্ণ সূঁচালো বস্তু ঢুকলে অথবা চোখে সামান্য কিছু পড়লে অনুভূত হয়। যেহেতু সেপাপ চিন্তাধারণা ও কামনা বাসনা এবং খারাপ নিয়তে অভস্ত নয়, সেজন্যে  এ সবকিছুই তার স্বভাব প্রকৃতির খেলাপ হয়, যেমন এতকহন রুজিকান ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভিলাষী মানুষের কাপড়ে কোন কালির দাগ অথবা ময়লার ছিটে ফোঁটা তার স্বভাব প্রকৃতির খেলাপ হয়। এ খটকা যখন সে অনুভব করে তখন তার চোখ খুলে যা, এবং তার বিবেক জাগ্রত হযে এসব অন্যায় অনাচারের ধূলিকনা তার থেকে ঝেড়ে  ফেলে নিতে লেগে যায়। তার বিপরীত যারা না খোতাদে ভয় করে আর না মন্দ কাজ থেকে বাঁচতে চায় এবং যাদের শয়তানে সাথে সম্পর্ক রয়েছে, তাদের মনের মধ্যে খারাপ ধারণা বাসনা, অভিপ্রায় ও উদ্দেশ্য পাকাপাক্ত হতে থাকে এবং এসব নোংরা বিষয়ে তাদের মনে কোন ‍উদ্বেগও সৃষ্টি হয়না। ঠিক যেমন কোন ডেকচীতে শূয়রের মাংস রান্না হচ্ছে কিন্তু ডেকচীর মালিকের খবর নেই তার মধ্যে কি রান্না হচ্ছে। অথবা কোন মেথরের শরীর ও জামাকাপড় মলমূত্রে জবজবা কিন্তু তার কোন অনুভূতিই নেই যে, সে কিসের দ্বারা নোংরা ও অপবিত্র হয়ে আছে। (****১১)

চরম বিরোধিতায় পরিবেশে দাওয়াত ইলল্লাহ

(আরবী******************)

-ঐ ব্যক্তির কথার চেযে উত্তম কথা আর কার হবেচ যে আল্লাহর দিকে ডেকেছে, নেক কাজ করেছে এবং বলেছে “আমি মুসলমান”-(হামীম সিজদাহ: ৩৩)।

এর পূর্বের আয়াতগুলোতে ঈমানদারদেরকে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তারপর এ আয়াতে তাদেরকে সেই আসল কাজের জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে যার জন্যে তারা মুসলমান হয়েছে। পূর্বৈর আয়াতগুলোতে তাদেরকে বলা হযেছে যে তারা নে আল্লাহর দাসত্ব- আনুগত্যে অবিচল থাকে এবং এ পথ অবলম্বন করার পর তার থেকে বিচ্যুত না হওয়াটাই বুনিয়াদী নেক কাজ যা মানুষকে ফেরেশতাদের বন্ধু বেহেশতের অধিকারী বানিয়ে দেয়। এখন তাদেরকে বলা হচ্ছে যে পরবর্তী মর্যাদা, যার চেযে উচ্চতর মর্যাদা মানুষের জন্যে আর নেই, এই যে, সে স্বয়ং নেক আমল করবে এবং অন্যকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে ডাকবে। তারপর যেখানেই ইসলামের ঘোষণা করার অর্থ নিজের উপরে বিপদমুসিবতের আহ্বান জানানো, এমন প্রতিকূল  ও বিরুদ্ধ পরিবেশে নির্ভযে বলবে,- “আমি মুসলমান –আল্লাহর অনুগত।”

এ এরশাদের পুরোপুরি গুরুত্ব উপলব্ধি করার জন্যে সে সময়ের পরিবেশ পরিস্থিতি সামনে রাখতে হবে- যখন এ কথা বলা হয়েছিল। তখন অবস্থা এমন ছিল যে, যে ব্যক্তিই মুসলমান হওয়ার ঘোষণা করতো, সে হঠাৎ অনুভব করতো যে সে যেন হিংস্র পশুর বনে প্রবেশ করেছে এবং প্রতিটি হিংস্র পশু তাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে খেয়ে ফেলার জন্যে দৌড়ে আসছে। এর থেকে অগ্রসর হয়ে যে ব্যক্তি ইসলামের তবলিগের জন্যে মুখ খুলেছে, সে যেন হিংস্র পশুদেরকে আহ্বান জানাচ্ছে- এসে আমাকে চিবিয়ে গিলে খাও। এমন অবস্থায় বলা হলো যে কোন ব্যক্তির  আল্লাহকে প্রভৃ বলে মেন  নিয়ে সোজা পথ অবলম্বন করা এবং তার চেয়ে বিচ্যুত না হওয়া নিঃসন্দেহে বড়ো বুনিয়াগী নেক কাজ। কিন্তু উচ্চতম পর্যায়ের নেক কাজ এই যে, সে ব্যক্তি জনসমক্ষে দাঁড়িযে ঘোষণা করবে- “আমি মুসলমান” এবং পরিণামের কোন পরোয়া না করে মানুষকে আল্লাহর বন্দেগীর দাওয়াত নেবে। আর এ কাজ করতে গিয়ে নিজের আমল এতোটা পূতপবিত্র রাখবে যে ইসলাম তার পতাকাবাহীদের কোন দোষ ধরার সুযোগ না থাকে। (****১২)

মন্দের মুকাবিলা সবচেয়ে ভালো দিয়ে

(আরবী********************)

-হে নবী (সা), পণ্য ও পাপ সমান হয়না। তুমি পাপকে সেই পূণ্য কাজ দিয়ে প্রতিরোথ কর- যা সবচেয়ে ভালো। তাহলে তুমি দেখবে যে, তোমার সাথে যার শত্রুতা আছে সে  তোমার প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে- (হামীম সিজদা: ৩৪)।

এ এরশাদের পুরোপুরি মর্ম উপলব্ধি করতে হলে সে অবস্থাকে সামনে রাখতে হবে যে অবস্্যথায় নবীকে (সা) এবং তাঁর মাধ্যমে তাঁর অনুসারীগণকে এ হেদায়েত দেয়া হয়েছিল। অবস্থা এই ছিল যে, দাওয়াতের মুকাবিলা চরম হঠকারিতা এবং চরম আক্রমণাত্বক বিরোধিতার সাথে করা হচ্ছিল। নবী (সা) কে বদনাম করার জন্রে এবং তার প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করার জন্যে সব ধরনের অপকৌশল অবলম্বন করা হচ্ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রারের অবিযোগ আরোপ করা হচ্ছিল। বিরুদ্ধ প্রাচরণাকারীর একটা দল নবীর বিরুদ্ধে মানুষের মনে প্ররোচনা সৃষ্টি করতে থাকে। তাঁকে ও তাঁর সংগী সাথীদের উপর নানাপ্রকার নির্াতন চলতে পারে। অতীষ্ট হযে ‍মুসলমানদের বেশ কিছু সংখ্যক লোক দেশ পরিত্যাগ করতে বাধ্য হন। তারপর নবীর তবলিগ বন্ধ করার জন্য এ ব্যবস্থা করা হয় যে, তারা হৈ হুল্লোড় করর জন্যে তাঁর দিকে ওঁত পেতে থাকতো। তখনই তিনি দাওয়াত দেয়ার উদ্দেশ্যে মুখ খুলণতেন, তখন তারা এমন হৈ হল্ল করতো যে তাঁর কোন কথাই শুনা যেতোনা। এ এমন এক নিরুৎসাহব্যঞ্জক অবস্থা ছিল যে, দৃশ্যতঃ দাওয়াতের সকল পথই রুদ্ধ বলে মনে হতো। সে সমযে বিরোধিতার শক্তি চূর্ণ করার জন্যে প্রতিকার ব্যবস্থা নবীকে শিখিয়ে দেয়া হয়।

প্রথম কথা এই বলা হয় যে, নেকী ও বাদী বা পাপুণ্য সমান হতে পারেনা। প্রকাশ্যতঃ তোমার বিরুদ্ধবাদীরা অনাচার পাপাচরের যতো প্রচন্ড ঝড়ই সৃষ্ট করুকনা কেন, যার মুকাবিলায় নেকী বা সততা সৎকর্ম একেবারে অসহায়-শক্তিহীন মনে হয়, কিন্তু মানুষ যতোক্ষণ মানুষ বলে বিবেচিত হবে, তার স্বভাব প্রকৃতি অনাচর পাপাচরের প্রতি ঘৃণ্য প্রদর্শন না করে পারে না। পাপাচারে সহযোগীই নয়, বরঞ্চ তার পতাকাবাহী স্বয়ং অন্তরে এ কথা বিশ্বাস করে যে সে মিথ্যাবাদী এবং জালেম এবং আপন স্বার্থের জন্যৌই হঠকারিতা করে চলেছে। এতে করে অপরের অন্তরে তার জন্যে শ্রদ্ধা সৃষ্টি করা ত দূরের কথা, স্বয়ংয় নিজেদের চোখেই নিজেদেরকে হেয় করা হয় এবং তাদের নিজেদের মনের মধ্যেই একটা ভীতি লুক্কায়িত থাকে যা বিরোধিতার পদক্ষেপ গ্রহণ করার সময় তাদের সাহস ও সংকল্পকে ভেতর থেকে ্‌াঘাত করতে থাকে। এ দুস্কর্মের মুকাবিলায় যাদি সেই সৎকর্ম অনবরত অব্যাহত থাকে, তাহলে অবশেষে তা বিজয়ী হয়েই থাকে। কারণ সৎকর্মের মধ্যে স্বয়ং একটি শক্তি থাকে যা মনকে বশীভূত করে এবং মানুষ যতোই অধঃপতিত হোক না কেন, আপন মনে তার জন্যে শ্রদ্ধা অনুভব না হয়েই পারেনা। তারপর যখন পাপ ও পুণ্য সংগ্রামরত হয় ইবয় উভয়ের গুণাগুণ জনসাধারণের মধ্যে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়ং, তখন এমতাবস্থায় কিছুকাল যাবত সংঘাত সংঘর্ষের পর এমন লোক খুব কমই থাকে যে পাপের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও পুণ্যের প্রতি অনুরুক্ত হয় না।

দ্বিতীয় কথা এ বলা হয়েছে যে, পাপের মুকাবিলা শুধু পুণ্যের দ্বারা নয়, এমন পুণ্যের দ্বারা করতে হবে- যা খুবই উচ্চমানের হয়। অর্থাৎ কেউ যদি আপনার সাথে অসৎ ব্যবহার করে এবং আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন তাহলে এ নিছক একটা নেক কাজ হলো। অতি উচ্চমানের নেক কাজ এই যে, যে আপনার সাথে অসাদাচরণ করলো, আপনি সুযোগ হলে তার সাথে সদাচরণ করুন।

তার সুফল এই বলা হয়েছে যে, চরম দুশমনও পরম বন্ধু হয়ে যাবে। কারণ, এই হলো মানবীয় প্রকৃতি। গালির জবাবে নীরব থাকলে নিঃসন্দেহে একটি  নেক কাজ হবে। কিন্তু এতে গালিদানকারীর মুখ বন্ধ করা যাবেনা। কিন্তু যদি আপনি গালির জবাবে তার জন্যে দোয়া করেন তাহলে আপনার চর নির্লজ্জ দুশমনও লজ্জিত হয়ে পড়বে এবং কদাচিৎ হয়তো সে আপনার বিরুদ্ধে মুখ খুলেবে। ধরুন, কোন ব্যক্তি আপনার ক্ষতি করার জন্যে কোন সুযোগই হাতছাড়া করেনা এবং আপনি তার বাড়াবাড়ি বরদাশ্‌ত করেই চল্লেন, তাহলে এমনও হতে পারে যে সে আপনার ক্ষতি করার জন্যে অধিকতর সাহসী হয়ে পড়বে। কিন্তু যদি কখনো এমন হয় যে সে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এবং আপনি তাকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করলেন, তাহলে সে আপনার পায়ে পড়ে যাবে। কেনন কোন দুস্কৃতি এ সুকৃতির মুকাবিলায় খুব কমই টিকে থাকতে পারে। তথাপি এ সাধারণ নীতি পদ্ধতি এ অর্থে গ্রহণ করা সঠিক হবেনা যে এ উচ্চ পর্যায়ের সুকর্ম-সুকৃতি অবশ্য অবশ্যই প্রত্যেক চরম দুশমনকে পরম বন্ধতে পরিণত করবে। দুনিয়ায় এমন ইতর প্রকৃতির লোকও আছে যে, আপনি তার বাড়াবাড়ি ক্ষমা করার এবং তার মন্দের জবাব সদাচরণ সহ দেয়ার যতোই মহত্ত্ব প্রদর্শন করুন না কেন, সে বিচ্ছুর ন্যায় বিষাক্ত হুল ফুটাতে ক্ষুণ্ণ হবেনা।

কিন্তু এ ধরনের দুষ্কৃতির মূর্তপ্রতীক মানুষ খুবই কমই পাওয়া যায় যেমন কল্যাণের মূর্ত প্রতীক মানুষের অস্তিত্ব অতি নগণ্য হয়ে থাকে। (***১৩)

দাওয়াতে হকে ধৈর্যের গুরুত্ব

(আরবী***********************)

অতঃপর এরশাদ হলো-

-“এ গুণাবলীর সৌভাগ্য হয়ে শুধু তাদের যারা সবর করে এবং এ মর্যাদালাভ শুধু তারাই করতে পারে- যারা বড়ই সৌভাগ্যবান- (আয়াত: ৩৫)।

অর্থাৎ এ ব্যবস্থাপত্রও বড়ো ফলপ্রসূ। কিন্তু তার প্রয়োগ যেমন তেমন কথা নয়। তার জন্যে প্রয়োজন বিরাট মনোবলের। তার জন্যে বিরাট সংকল্প, সাহসিকজতা, ধৈর্যশক্তি এবং আপন প্রবৃত্তির উপর বিরাট আধিপত্যের প্রয়োজন। সাময়িকভাবে এক ব্যক্তি কোন দুষ্কৃতির মুকাবিলায় ভালো কাজ করতে পারে। এ অসাধঅরণ কিছু নয়, কিন্তু যেখঅনে কাউকে বছরের পর বছর ধরে এমন সব বাতিল পন্থী দুষ্কৃতিকারীদের মুকাবিলায় সত্যের জন্যে লড়তে হয় যারা নৈতকতার কোন সীমা লংঘন করতে ইতস্ততঃ করেনা এবং ক্ষমতা মদমত্ত হয়ে থাকে, সেখানে দুষ্কর্মের মুকাবিলা সৎকর্ম দিয়ে করে যাওয়া এবং তাও উচ্চমানের সৎকর্ম দিয়ে, এবং একবারও ধৈর্যচ্যুত না হওয়া- কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কাজ সে ব্যক্তিই করতে পারে, যে ঠান্ডা মাথায় হকের সমুন্নতির জন্যে কাজ করার দৃঢ় সংকল্প পোষণ করে। যে ব্যক্তি পুরোপুরি তার প্রবৃত্তিকে জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেকের কোন দুষ্কৃতি নোংরামি তাকে তার উচ্চ স্থান থেকে নীচে নামিযে আনতে এবং ধৈর্যহারা করে ফেলতে পারেনা।

তারপর এই যে বলা হয়েছে, “এ মর্যাদা শুধু তারাই লাভ করতে পারে যারা বড়ো সৌভাগ্যবান।” ত এ হলো প্রাকৃতিক বিধান। বিরাট মর্যাদাশীল লোকই এসব গুণে গুনান্বিত হয়। আর যাদের এসব গুণাবলী থাকে, দুনিয়ার কোন শক্তিই তাদেরকে সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌছতে রুখতে পারেনা। এটা কিছুতেই সম্ভব নয় যে, ইতর শ্রেণরি লোক তাদের ইতরামি, ঘৃণ্য কলাকৌশল এবং অভদ্র আচরণের দ্বারা তাকে পরাভূত করতে পারবে। (****১৪)

শয়তানের উস্কানি থেকে খোদার আশ্রয়

শেষে বলা হয়েছে (আরবী*****************)

আর শয়তানের পক্ষ থেকে যদি কোন উস্কানি অনুভব কর তাহলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর (আয়াত: ৩৬)

শয়তান ভয়ানক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে যখন সে দেখে যে হক ও বাতিলের দ্বন্দে ইতরামির মুকাবিলা ভদ্রদ্বারা এবং দুষ্কৃতির মুকাবিলা সুকৃতির দ্বারা করা হচ্ছে। সে চায় যে কোন প্রকারে একবার হলেও সত্যের জন্য সংগ্রামকারী তাদের নেতৃবৃন্দ এবং বিশেষ করে তাদের প্রধান পরিচালক কোন না কোন ভুল করে ফেলুক যার ভিত্তিতে জনগণকে বলা যবে যে, দেখ তালি এক হাতি বাজেনা। এক পক্ষ থেকে যদি কিছু মন্দ আচরণ করা  হয়েই থাকে, ত অন্য পক্ষও এমন ভালো মানুষ নয়। অমুক অভদ্র আচরণ ত তারাও করেছে। সাধারণ মানুষের এ যোগ্যতা নেই , তারা সুবিচারের দৃষ্টিকণে থেকে একপক্ষের বাড়াবাড়ি এবং অপরপক্ষের পাল্টা পদক্ষেপের মধ্যে কোন তুলনামূলক বিচার বিবেচনা করতে পারবে। যতোক্ষণ তারা দেখতে থাকে যে, বিরুদ্ধবাদীরা সবরকমের নীচতা অবলম্বন করছে, কিন্তু প্রতিপক্ষ ভদ্রতা, শালীনতা ও সততা ধার্মিকতার পথ থেকে এতটুকুও বিচ্যুত হচ্ছে না, ততোক্ষণ পর্যন্ত জনগণ এর দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে। কিন্তু যদি কোথাও এদের পক্ষ থেকে কোন অন্যায় আচরণ অথবা এদের মর্যাদর হানিকর কোন আচরণ করা হয়, তা চরমবাড়াবাড়ির জবাবেই করা হোক না কেন, তাহলে তাদের দৃষ্টিতে উভয় পক্ষই সমান বলে বিবেচিত হয়। ফলে বিরুদ্ধবাদীরাও একটি কথার জবাবে হাজারটি গালি দেয়ার বাহানা পেয়ে যায়। এ জন্যেই এরশাদ হচ্ছে- শয়তানের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাক। সে বড়ো দরদী ও শুভাকাংখী সেজে তোমাদের উস্কানি দেবে এই বলে যে, “অমুক বাড়াবাড়ি ত কিছুতেই বরদাশত করা যায়না, অমুক কথার দাঁতভাঙা জবাব দেয়া উচিত, এ হামলার জবাবে পাল্টা হামলা করা উচিত। নতুবা তোমাদেরকে কাপুরুষ মনে করা হবে এবং তোমাদে ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে প্রত্যেক ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে যখন এ ধরনের উস্কানি অনুভব করবে, তখন সাবধান হয়ে যাবে যে শয়তান তার উস্কানি দ্বারা তোমাদের উত্তেজিত ও রাগান্বিত করে তোমাদের দ্বারা কোন ভুল পদক্ষেপ করাতে চায়। সাবধঅন হওয়ার পর, তোমরা যেন এ অহমিকার শিকার হয়ে একথা না বল “আমাদের নিজেদের উপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। শয়তান আমাদের দ্বারা ভুল করাতে পারবেনা।” নিজেদের উপরোক্ত ইচ্ছ ও সিদ্ধান্ত শক্তির অহমিকাহ শয়তানের দ্বিতীয় বৃহত্তর ভয়াবহ প্রতারণা হবে। তার পরিবর্তে তোমপাদের খোদার আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিত। কারণ একমাত্র তিনিই যদি তওফিক দান করেন এবং হেফাজত করেন তাহলেই মানুষ ভুল করা থেকে বাঁচতে পারে।

এ বিষয়ে অতি সুন্দর ব্যাখ্যা এমন এক ঘটনা থেকে পাওয়া যায় ইমাম আহমদ হযরত আবু হুরায়রা (রা) বরাত দিয়ে তাঁর মুসনাদে উধৃত করেছেন। তিনি বলেন যে, একদা এ ব্যক্তি নবী (সা) এর উপস্থিতিতে হযরত আবু বকরকে (রা) চরম গালি দিতে থাকে। হযরত আবু বরক (রা) নীরবে তার গালি শুনতে থাকে। নবীও (সা) তা দেখে মৃদু হাস্য করতে থাকেন। অবশেষে হযরত আবু বকরের (রা) ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং তিনিও প্রতুত্তরে একটি শক্ত কথা বলে ফেলেন। তাঁর মুখ থেকে সে কথাটা বেরুতেই নবী (সা) ভয়ানক অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন এবং তা তাঁর মুখমন্ডলে প্রতিভাত হয়ে পড়লো। তারপর তিনি সেখান থেকে উঠে গেলেন। আবু বকরও (রা) তাঁর পেছনে পেছনে চলতে থাকেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “একি ব্যাপার” সে আমাকে গালি দিচ্ছিল এবং আপনি মুচকি মুচকি হাসছিলেন তারপর আমি জবাব দিতেই আপনি অসন্তুষ্ট হয়ে পড়লেন।

নবী (সা) বল্লেন, যতোক্ষণ তুমি নীরব ছিলে, একজন ফেরেশতা তোমার সাথে ছিল, যে তোমার পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছিল। তারপর তুমি যখন মুখ খুল্লে তখন ফেরেশতার জায়গায় শয়তান এসে গেল। আমি ত শয়তানের সাথে বসেথাকতে পারি না। (১৫)

হকের আহ্বায়ককে হতে হবে নিঃস্বার্থ

হকের দাওয়াতে তার আহ্বায়ককে তার ব্যক্তিগত স্বার্থের উর্ধে থাকতে হবে এবং এটই হবে তার সততা ও নিষ্ঠার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কুারআন পাকে বার বার বলা হযেছে যে নবী (সা) দাওয়াতে ইলাল্লাহর যে কাজ করছেন তাতে তাঁর কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। বরঞ্চ তিনি খোদার সৃষ্ট জীবের কল্যাণের জন্যেই তিনি তাঁর উৎসর্গী করেছেন। সূরায়ে আনয়ামে বলা হয়েছে-

(আরবী***************)

-হে নবী (সা), বলে দাও- আমি এ তবলিগ ও হেদায়েতের কাজে তোমাদের কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক চাই না। এত এক সাধারণ নাসিহত সমস্ত দুনিয়াবাসীদের জন্যে- (আনয়াম: ৯০)।

-এবং হে নবী (সা), তুমি এ কাজের জন্যে তাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইছনা। এ ত একটি উপদেশ যা দুনিয়াবাসীদের জন্যে সাধারণ (ভাবে দেয়া হচ্ছে) (ইউসুফ: ১০৪)।

এ সম্বোধন প্রকাশ্যতঃ নবী (সা) এর প্রতি কিন্তু এর প্রকৃত দ্বিতীয় পুরষ কাফেরদের জনতা, তাদেরকে এভাবে জুখানো হচ্ছে, আল্লাহর বান্দারা, একটু চিন্তা করে দেখ! তোমাদের এ হঠকারিতা এত অসংগত। পয়গম্বর যদি তাঁর কোন ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে দাওয়াত ও তবলিগের এ কাজ করতেন অ্যথবা যদি তিনি তাঁর নিজের জন্যে কিছু তাইতেন, তাহলে তোমাদের এ কথা অবশ্যই বলার সুযোগ থাকতো- এ স্বার্থবাদী লোকের কথা আমরা কেন মানব? কিন্তু তোমরা দেখছ যে এ ব্যক্তি নিঃস্বার্থ। তোমাদের জন্যে এবং দুনিয়াবাসীদের কল্যাণের জন্যে সে নসিহত করছে। এতে তার নিজের কোন স্বার্থ নেই। হঠকারিতার সাথে তার মুকাবিলা করার কি সংগত কারণ থাকতে পারে? যে ব্যক্তি সকলের মংগলের জন্যে নিঃস্বার্থভাবে কোন কথা বলে, অকারণে তার বিরুদ্ধে তোমরা জিদ ধরে বসেআছ কেন? খোলামনে তার কথা শোন। মনে লাগে ত মান, না লাগলে মেননা। (১৬)

সূরায়ে মূমেনূনে বলা হয়েছে:-

(আরবী***************)

-হে নবী (সা), তুমি কি তাদের নিকটে কিছু চাইছ? তোমার জন্যে তোমার রবের দানই উৎকৃষ্টতর এবং তিনি সর্বোত্তম রিযিকদাতা- (মুমনূন: ৭২)।

অর্থাৎ কোন ব্যক্তিই ঈমানদারীর সাথে নবীর (সা) উপরে এ অভিযোগ করতে পারেনা যে, তিনি যতোকিছু করছেন তার পশ্চাতে তার ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে। একদা তাঁর বিরাট ব্যবসা বাণিজ্য ছিল। এখন তিনি দরিদ্র পীড়িত। একসমযে জাতি তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতো, প্রত্যেকে পরম শ্রদ্ধা জানাতো। এখন তিন গালি ও পাথরের আঘাত ভোগ করছেন। এখন তাঁর জীবনও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এক সময়ে তিনি বিবি বাচ্চাসহ আনন্দে জীবন যাপন করছিলেন। এখন এমন এক দ্বন্দ্বসংঘর্ষে জড়িত হয়ে পড়েছেন যা তাঁকে একমুহূর্তেও শান্তিতে থাকতে দিচ্ছেনা। উপরন্তু তিনি এখন এমন এক বাণী নিয়ে অবির্ভূত হয়েছেন যে, সমগ্র দেশ তাঁর দুশমন হয়ে পড়েছে। এমনকি স্বয়ং তাঁর আপনজনও তার রক্তপিপাসু হয়ে পড়ছে। কে বলতে পারে যে এসব একজন স্বার্থপর লোকের কাজ? স্বার্থবাদী ত তার জাতি ও গোত্রের কুসংস্কারের পতাকাবাহী হয়ে নানা লোকের কাজ? স্বার্থবাদী ব্যক্তি ত তার জাতি ও গোত্রের কুসংস্কারের পতাকাবাহী হয়ে নানা কলাকৌশলে নেতৃত্ব লাভের চেষ্টা করে। স্বার্থপর ব্যক্তি এমন আদর্শের প্রচার করেনা যা শুধু গোত্রীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জই নয়, বরঞ্জ তা নির্মূল করে দেয়  যার ভিত্তিতে আরবের মুশরিকদের প্রভুত্ত নেতৃত্ব কায়েম রয়েছে। (১৭)

সূরায়ে সাবায় বলা হয়েছে-

(আরবী*****************)

-হে নবী (সা), বলে দাও, যদি আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চেয়ে থাকি, তা তোমাদেরই জন্যে। আমার পারিশ্রমিক ত আল্লাহর দায়িত্বে। তিনি ত সবকিছুর সাক্ষী –(সাবা:ঢ় ৪৭)।

আয়াতের প্রথমাংশের দুটি অর্থ হতে পারে। এক এই যে, আমি যদি তোমাদের কাছে কিছু পারিশ্রমিক চেয়ে থাকি, তা তোমাদের ভাগ্যেরই ঘটুক। ‍দ্বিতীয় অর্থ এই যে, আমি তোমাদের নিকটে কোন পারিশ্রমিক চেয়ে থাকলে তা তোমাদের মংগল ছাড়া আর কিছু নয়। শেষাশের অর্থ এই যে, অভিযোগকারীরা যতো খুশি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করুক। কিন্তু আল্লাহ সবকিছুই জানেন। তিনিই সাক্ষী যে আমি এ কাজ নিঃস্বার্থভাবে করছি, কোন ব্যক্তিস্বার্থে করছিনা। (১৮)

(আরবী*****************)

-হে নবী (সা), বলে দাও আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাইনা। আর না আমি কৃত্রিম- বানোয়াট লোকের একজন- (সা’দ: ৮৬)।

অর্থাৎ আমি তাদের মধ্যে একজন নই যারা তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্যে মিথ্যা দাবী সহ ময়দানে নামে এবং সে এমন কিছু সাজে যা সে প্রকৃত পক্ষে নয়।

একথা শুধু মক্কায় কাফেরদেরকে জানিয়ে দেবার জন্যে নবীর (সা) মুখ দিয়ে বলানো হয়নি। বরঞ্চ এর পশ্চাতে হুযুরের (সা) গোটা জীবন সাক্ষ্য দেয় যা চল্লিষ বছর যাবত তিনি এসব কাফেরদের মধ্যে অতিবাহিত করেছেন। মক্কায় প্রতিটি শিশু পর্যন্ত এ কথা জানতো যে মুহাম্মদ  (সা) কোন বানোয়াটি লোক নন। সমগ্র জাতির মধ্যে কোন ব্যক্তিই তার মুখ থেকে এমন কোন কথা শুনেনি যার থেকে এ সন্দেহ করা যেতো যে তিনি কিছু হতে চান এবং নিজেকে খ্যাতনামা বানাবার প্রচেষ্টায় আছেন। (১৯)

সূরায়ে তূর ও কলমে বলা হয়েছে-

(আরবী****************)

-হে নবী (সা), তুমি কি তাদের কাঝে কোন পারিশ্রমিক চাইছ যে তারা জবরদস্তিমূলক জরিমানার বোঝার তলে নিষ্পেষিত হয়ে আছে?- (তূর : ৪০, কলম: ৪৬)।

এ প্রশ্নে আসলে সম্বোধন করা হচ্ছে কাফেরদেরকে। তার অর্থ এই যে, যদি রসূল  তোমাদের কাছ থেকে কোন উদ্দেশ্যে হাসিল করতে চাইতেন এবং যদি আপন স্বার্থের জন্যে এ সব চেষ্টা চরিত্র করছেন, তাহরে তার থেকে তোমাদের দূরে সরে যাওয়ার ত অন্ততঃ পক্ষে একটা সংগত কারণ থাকতো। কিন্তু তোমরা স্বয়ং জান যে তিনি তার এ দাওয়াতে একেবারে নিঃস্বাথ এবং নিছক  তোমাদের কল্যাণের জন্যেই তিনি জীবনপাত করছেন। তারপর কি কারণ থাকতে পারে যে তোমরা শান্তমনে তার কথা শুনতে পর্যন্ত তৈরী নও। এ প্রশ্নের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম  ইংগিত প্রচ্ছন্ন আাছে। সারা দুনিয়ার কৃত্রিম ও বানাওটি নেতাদের এবং ধর্মীয় আস্তানার পুরোহিতদের মতো আরবেও মুশরিকদের ধর্মীয় নেতা, পন্ডিত ও পুরোহিতগণ প্রকাশে ধর্মীয় ব্যবসা চালাতো। সে জন্যে এ প্রশ্ন তাদের সামনে রাখা হলো যে এক দিকে এসব ধর্মব্যবসায়ী রয়েছৈ যারা প্রকাশে তোমার কাছে নযর-নিয়াযা চাইছে এবং প্রতিটি ধর্মীয় খেদমতের জন্যে পারিশ্রমিক দাবী করছে। অপরদিকে এ ব্যক্তি একেবারে নিঃস্বার্থভাবে, বরঞ্চ নিজের ব্যবসা বাণিজ্য বরবাদ করে তোমাদের ন্যায়সংগত যুক্তিসহ দ্বীনের সোজা পথ দেখাবার চেষ্টা করছে। এখন এ সুস্পষ্ট অজ্ঞতা ছাড়া আর কি হতে পারে যে তোমরা তার থেকে পলায়ন করছ এবং ধর্মব্যবসায়ীদের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছ? (২০)

এ প্রসংগে শুধু একটি আয়াত পাওয়া যায় যা নিয়ে কিছু বিতর্কের সৃষ্টি হতে পারে। তা হলো:-

(আরবী***************)

-হে নবী (সা), বল- আমি তোমাদের নিকটে কোনই পারিশ্রমিক চাইনা চাই শুধু নৈকট্যের ভালোবাসার জন্যে –(শূরা: ২৩)।

এ আয়াতে (*****)

শ্বদ যে ব্যবহৃত হয়েছে তার অর্থ করতে গিযে তফসীরকারদের মধ্যে বিরাট মতানৈক্য হয়েছে। এক দল একে আত্মীয়তার অর্থে নিয়েছেন। তারা আয়াতের অর্থ এরূপ বলেছৈন: -“এ কাজের জন্যে আমি তোমাদের নিকটে কোন পারিশ্রমিক চাইনা। কিন্তু এটা অবশ্যই চাই যে তোমরা (অর্থাৎ কুরাইশগণ) অন্ততঃ সে আত্মীয়তার প্রতি ত খেয়ালা রাখবে যা তোমাদের ও আমার মধ্যে রয়েছে। তোমাদের ত উচিত ছিল আমার কথা মেনে নেয়া। কিন্তু যদি না-ই মান,  ত এই অন্যায় করোনা যে সমগ্র আরবের মধ্যে সবচেয়ে অধিক তোমরাই আমার শত্রুতায় উঠে পড়ে লেগেছে।”

এ হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর তফসীর। একে অনেক রাবীর বরাত দিয়ে ইমাম আহমদ, বুখারী, মুসলিম, তিরমিযি, ইবনে জারীর, তাবারানী, বায়হাকী, ইবনে সা’দ প্রমুখ মনীষীগণ নকল করেছেন। আর এ তফসীর করেছেন মুজাহিদ, ইকরাম, কাতাদাহ, সুদ্দী, আবু মালেক, আবদুর রহমান বিন যায়েদ বিন আসলাম, দাহ্‌হাক, আতা বিন দীনার এবং অন্যান্য প্রখ্যাততফসীরকারগণ।

অন্য একটি দল (আরবী**********)

কে নৈকট্যের অর্থে গ্রহণ করেছেন। তারা এ আয়াতের অর্থ এ ভাবে করেছেন: আমি এ কাজের জন্যে তোমাদের নিকটে এ ছাড়া অন্য কোন পারিশ্রমিক চাইনা যে তোমাদের মধ্যে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের অভিলাষ সৃষ্টি হোক। অর্থাৎ তোমরা ঠিক হয়ে যাও। এই হলো আমার পারিশ্রমিক। এ তাফসীর হযরত হাসান বসরী থেকে বর্ণিত। এর সমর্থনে কাতাদার একটা উক্তিও উধৃত আছে। বরঞ্চ তাবারানীর এক বর্ণনায় এ ধরনের উক্তি ইবনে আব্বাসের (রা) প্রতিও আরোপ করা হযেছে। স্বয়ং কুরআন মজিদের অন্য এক স্থানে এ বিষয়টিই এভাবে বলা হয়েছে:-

(আরবী***************)

-তাদেরকে বলে দাও: এ কাজের জন্যে আমি তোমাদের নিকটে কোন পারিশ্রমিক চাইনা, আমার পারিশ্রমিক এই যে, যার ইচ্ছা সে যেন তার রবের পথ অবলম্বন করে- (ফুরকান: ৫৭)।

অপর একটি দল

(******) কে আত্মীয় স্বজনের অর্থে গ্রহণ করেছেন। আয়াতের অর্থ তাঁদের মতে : আমি এ কাজের জন্যে তোমাদের নিকটে এ ছাড়া আর কোন পারিশ্রমিক চাইনা যে, তোমরা আমার আত্মীয় স্বজনকে ভালোবাসবে। তারপর এ দলের কিছু লোক আত্মীয় স্বজন বলতে গোটা বনী আবদুল মুত্তালিবকে বুঝিয়েছেন?। কেউ কেউ আবার একে হযরত আলী (রা), হযরত ফাতেমা (রা) এবং তাঁদের সন্তানদের মধ্যেই সীমিত রেছেখেন। এ তফসীর সাঈদ বিন জুবাইর এবং আমার বিন শুয়াইব করেছেন বলে বর্ণিত আছে কোন কোন বর্ণনায় একে ইবনে আব্বাস (রা) এবং আলী বিন হুসাইন (রা) অর্থাৎ যয়নুল আবেদীনের তফসীর বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এ তফসীর গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। প্রথম কথা এই যে যখন মক্কায় এ সূরা শুরা নাযিল হয়, তখন হযরত আলী (রা) ও হযরত ফাতেমার (রা) মধ্যে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। সন্তানাদির ত প্রশ্নই ওঠেনা। তারপর বনী আবদুল মুত্তালিবের সকলেই নবীর (সা) সহযোগী ছিলনা। বরঞ্চ তাদের মধ্যে কতিপয় ত প্রকাশে দুশন ছিল। আবু লাহাবের দুশমনি ত দুনিয়ার সবাই জানে। দ্বিতীয়তঃ নবী (সা) এর আত্মীয়তা শুধু বনী আবদুল মুত্তালব পর্য়ন্তই সীমিত ছিলনা। তার মাতা পিতা এবং বিবির দিক দিয়ে কুরাইশদের সকল পরিবারে তার  আত্মীয়তা ছিল। আর এসব পরিবারে তার উন্নতমানের সাহাবীও ছিলেন এবং চরম দুশমনও ছিল। অতএব হুযুরের (সা) জন্যে এ কি করে সম্ভব ছিধল যে এসব আত্মীয় বর্গের মধ্যে শুধু বনী আবদুল মুত্তালিবকে তাঁর আত্মীয় বলে উল্লেখ করে ভালোবাসার দাবী তাদের জন্যেই নির্দিষ্ট করে রাখতেন? রাদিয়াল্লাহু আহু।

তৃতীয় কথা যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এই যে, একজন নবী যে উচ্চস্থানে দাঁড়িযে দাওয়াত ইলাল্লাহর আওয়াজ বুলন্দ করেন, যেস স্থান থেকে এ পারিশ্রমিক চাওয়া- “আর আত্মীয়দেরকে ভালোবাস’ –এমন এক নিম্নস্তরের দাবী যে কোন রুচিবান লোক এ ধারণাও করতে পারেনা যে আল্লাহতায়ালা তার নবীকে এমন কথা শিখিয়ে দিযেছেন এবং নবী কুরাইশদের মধ্যে দাঁড়িযে একথা ঘোষণা করেছেন। কুরআন পাকে আম্বিয়া আলায়হিমুস সালামের যেসব কাহিনী বর্ণিত আছে, সেসবের মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে, নবীর পর নবী আগমন করতঃ তাদের জাতিকে সম্বোধন করে একথাই বলেছৈন: আমি তোমাদের কাছে কোনই পারিশ্রমিক চাইনা, আমার পারিশ্রমিক ত আল্লাহর দায়িত্বে। (ইউনুস “ ৭২, হুদ: ১৯, ৫১, শুয়ারা: ১০৯, ১১৭, ১৪৫, ১৬৪, ১৮০ দ্রষ্টব্য)।

সূরায়ে ইয়াসিনে নবীর সত্যতা পরীক্ষার মানদন্ড এ বলা হয়েছে যে, তিনি তাঁর দাওয়াতে একেবারে নিঃস্বার্থ (আয়াত-২১)। স্বয়ং নবী (সা) এর যবান মুবারক দিয়ে একথা বার বার বলানো হযেছে, -“আমি তোমাদের নিকটে কো পারিশ্রমিক চাইনা।” উপরে আমরা তা উধৃত করেছি। অতঃপর এ কথা বলার আর অবকাশ কোথায, “আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদেরকে দাওয়াত দেয়ার যে কাজ করছি তার বিনিময়ে তোমরা আমর আত্মীয় স্বজনকে ভালোবাস?” এ কথা আরও প্রাসংডিগক মনে হয় যখন আমরা দেখি যে এ ভাষণে আহল ঈমাকে সম্বোধন করা হচ্ছেনা, বরঞ্চ করা হচ্ছে কাফেরদেরকে। আগাগোড়া তাদেরকে সম্বোধন করেই বলা হচ্ছে এবং সামনেও তাদেরকে লক্ষ্য করেই কথা বলা হয়েছে। এ ধারাবাহিক ভাষণে বিরুদ্ধবাদীদের নিকটে কোন রকমের পারিশ্রমিক চাওয়ার প্রশ্নই বা কি করে উঠতে পারে? পারিশ্রমিক ত তাদের কাছে চাওয়া যায় যারা সে কাজের কিছু আদর-কদর করে যা তাদরে জন্যে করা হয়। কাফেরগণ হুযুরে এ কাজের কি মর্যাদাই বা দিচ্ছিল যার জন্যে তিনি তাদেরকে বলতৈ পারতেন, “যে খেদমত আমি করছি তার জন্যে আমার আত্মীয় স্বজনকে ভালোবাসবে।” তার ত বরঞ্চ এটাকে অপরাধ গণ্য করে তার জীবন নাশের চেষ্টা করছি। (***২১)

দাওয়াতের সূচনায় আখেরাত বিশ্বাসের প্রতি গুরুত্ব

মক্কা মুয়ায্যামায় প্রথম যখন নবী (সা) ইসলাম তবলীগের সূচনা করেন তখন তার বুনিয়াদ ছিল তিনটি বিষয়। এক: আল্লাহর সাথে আর কাউকে খোদায়ীতে শরীক মানা যাবেনা। দ্বিতীয়তঃ মুহাম্মদকে (সা) আল্লাহতায়ালা তাঁর রসূল মনোনীত করেছেন । তৃতীয়তঃ এ দুনিয়অ একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তারপর এক দ্বিতীয় জগত অস্তিত্ব লাভ করবে। সেখানে শুরু থেকে শেষ পর্য়ন্ত সকল মানুষকে পুনর্জীবিত করে সে দেহসহ পুনরুথিত করা হবে যে দেহসহ তারা দুনিয়ার কাজকর্ম করেছে। তাপর তাদের আকীদাহ- বিশ্বাস ও কাজকর্মের হিসাব নেয়া হবে। এ হিসাব নিকাশে যারা মুমেন ও সৎ প্রমাণিত হবে, তারা চিরকালের জন্যে বেহেশতে যাবে এবং যারা কাফের ও ফাসেক প্রমাণিত হবে তারা চিরকালের জন্যে দোজখে থাকবে।

এর মধ্যে প্রথমটি যদিও মক্কাবাসীদের জন্যে বড়ো অসহনীয় ছিল, তথাপি তারা কখনো আল্লাহ তায়ালার অস্তিত্ব অস্বীকার করেনি। তারা একথা মানতো যে তিনি মহান রব, স্রষ্টা এবং রিজিকদাতা ছিলেন। তারা একথাও মানতো যে যাদেরকে তার দেবদেবী বলে গণ্য করতো তারাও আল্লাহরই সৃষ্ট। এজন্যে বিতর্ক শুধু এ ব্যাপার ছিল যে খোদার গুণাবলীতে, এখতিয়ার এবং খোদায়ীতে এসব দেবদেবীর অংশীদারিত্ব ছিল কিনা।

দ্বিতীয় বিষয়টি মক্কাবাসী মানদন্ডে মাতে প্রস্তুত ছিলনা। কিন্তও এ কথা অস্বীকার করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিলনা যে, নবুয়ত দাবী কারার পূরেব হুযুর (সা) যে চল্লিষ বছর তাদেই মধ্যে অতিবাহিত করেছেন, এ সময়ের মধ্যে তারা কখনো তাকে মিথ্যাবাদী, প্রতারক অথবা ব্যক্তিস্বার্থের জন্যে অন্যায় পথ অবলম্বনকারী পায়নি। তারা স্বয়ং তার বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা এবং চারিত্রিক মহত্ব স্বীকার করতো। এ জন্যে তার বিরুদ্ধে শত বাহানা তালাশ এবং অভিযোগ আরোপ করা সত্ত্বেও একথা অন্যকে বিশ্বাস করানো ত দূরের কথা নিজের পক্ষেও বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে তিন অন্যান্য ব্যাপারে ত সত্যবাদী কিন্তু শুধু রেসালাতের দাবীতে (মাযায়াল্লাহ) মিথ্যাবাদী। এভাবে প্রথম দুটি বিষয় তাদের জনে ততোটা জটিল ছিলনা যেমন ছিল, ‍তৃতীয় বিষয়টি। এ বিষয়টি যখন তাদের সামনে পেশ করা হলো, তখন সবচেয়ে বেশী তার জন্যে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা হলো এতে সবচেযে বেশী বিস্ময় প্রকাশ করা হলো এবং অবান্তর ও অবাস্তব বলে সর্বত্র চর্চা শুরু হলো। কিন্তু তাদেরকে ইসলামের পথে আনার জন্যে তাদের মনে আখেরাতের বিশ্বাস বদ্ধমূল করা একেবারে অপরিহার্য ছিল্ কারণ এ বিশ্বাস ব্যতীত হক ও বাতিলের ব্যাপারে তাদের চিন্তাচেতনা সঠিক হওয়া কিছুতেই সম্ভব ছিলনা। এছাড়া ভালো ও মন্দের মানদন্ড বদলানো এবং দুনিয়া পূজার পথ পরিত্যাগ করে সৎ পথে এক ধাপ অগ্রসর হওয়াও সম্ভব ছিলনা, যে পথে ইসলাম চালাতে চাইতো। এ কারণেই মক্কায় প্রাথমিক যুগের সূরাগুলোতে বেশীর ভাগ আখেরাতের বিশ্বাস মনে বদ্ধমূল করার জন্যে বেশী জোর দেয়া হয়েছে। অবশ্যি তার জন্যে যুক্তি প্রমাণ এমনভাবে পেশ করা হয়েছে যার জন্যে তাওহীদের ধারণাও আপনাআপনি হৃদয়ে বদ্ধমূল হয়েছে। সেইসাথে মাঝে মাঝে রসূল (সা) এবং কুরআন সত্য হওয়ার প্রামাণও সংক্ষেপে পেশ করা হয়েছে। (****২২)

নির্দেশিকা

১। গ্রন্থকার কর্তৃক পরিবর্ধন

২। তাফহীমুল কুরআন, ১ম খন্ড, ভূমিকা

৩। তাফহীমুল কুরআন, ২য় খন্ড, নহল, টীকা ১২২-১২৩

৪। তাফহীমুল কুরআন, বনী ইসরাইল, টীকা ৫৭-৬১

৫। তাফহীমুল কুরআন, আনয়অম, টীকা-৬৯

৬। তাফহীমুল কুরআন, আনয়অম, টীকা-৭১

৭। তাফহীমুল কুরআন আলা, টীকা-১০

৮। তাফহীমুল কুরআন, আনয়াম, টীকা ২৪-২৫

৯। তাফহীমুল কুরআন, আবাসা, ভূমিকা, ও টীকা-২০১

১০। তাফহীমুল কুরআন, আনকাবুত, টীকা- ৮১

১১। তাফহীমুল কুরআন, আ’রাফ, টীকা-১৫

১২। তাফহীমুল কুরআন, হাীম সিজদা, টীকা-৩৬

১৩। তাফহীমুল কুরআন, হামীম সিজদা, টীকা-৩৭

১৪। তাফহীমুল কুরআন, হামীম সিজদা, টীকা-৪০

১৬। তাফহীমুল কুরআন, ইউসুফ, টীকা-৭৩

১৭। তাফহীমুল কুরআন, মুমেনীন, টীকা-৭০

১৮। তাফহীমুল কুরআন, সাবা. টীকা-২৮-২৯

১৯। তাফহীমুল কুরআন, সোয়াদ, টীকা-৭২

২০। তাফহীমুল কুরআন, তূর, টীকা-৩১

২১। তাফহীমুল কুরআন, শুরা, টীকা-৪১

২২। তাফহীমুল কুরআন, সূরা নাবার ভূমিকা

মক্কা মুকাররামার মানচিত্র

 

৪র্থ খন্ড আরম্ভ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ষষ্ঠ অধ্যায়

দাওয়অতে ইসলামীর প্রকৃত স্বরূপ

মুশরিকদের শত্রুতার কারণ ও তাদের ব্যর্থার কারণ

এখন আরা সে আলোচনার দ্বিতীয় অংশ পরিবেশন করতে চাই যা পূর্ব অধ্যায়ে শুরু করা হয়েছিল। আমরা বলেছি যে, হুযুর (সা) কে এবং তাঁর মাধ্যমে তাঁর সংগী সাথীদেরকে ইসলামের দাওয়াতে ছড়াবার ব্যাপারে কোন সব হেদায়েত দেয়া হয়েছিল যাতে করে তাঁরা জাহেলিয়াতের ধ্বজাধারীদের বিরোধিতার মুকাবেলা নৈতিকতার হাতিয়ার দিয়ে করতে পারেন। হিকম, উদারতা, ধৈর্য ও সহনশীলতার দ্বারা তাদের মন জয় করতে পারেন। হঠকারিতা, অন্ধবিদ্বেষ এবং একগুঁয়েমির পাহাড় ন্যায়সংগত ও হৃদয়গ্রাহী করতে পারেন এবং জনগণের মধ্য থেকে বেছে বেছে তাদেরকে দলে ভিড়াতে পারেন যাদের মধ্যে সত্যের প্রতি অনুরাগ এবং সত্যকে মেনে চলার গুণাবলী পাওয়া যেতো।

তারপর আমরা বলতেচাই যে, নবী (সা) যে দাওয়াত নিয়ে আগমন করেছিলেন তার প্রকৃত স্বরূপ কি ছিল, তার বৈশিস্ট্য পূর্ণ গুণাবলী কি ছিল যার জন্যে সর্বপ্রথম কুরাইশ এবং তারপর আরবের অন্যান্য লোক তার বিরেদিতায় লেগে গেল? তারপর এ দাওয়ঢাতের এমন কোন্‌ শক্তি ছিল যা শেষ পর্য়ন্ত বিরুদ্দবাদীদেরকে স্তব্ধ করে দিয়ে এমন বিরাট সাফল্য লাভ করলো যার নজীর ইতহাসে পাওয়া যায়না।

বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবী রাখে বিধায় একে আমরা সাতটি শিরোনামায় বর্ণনা করব। তা হলো:-

১। তৌহীদের শিক্ষা এবং শির্কের খন্ডন।

২। রেসালাতে ‍মুহাম্মদীর উপর ঈমানের দাওয়াত।

৩। কুরআন আল্লাহর বাণী-এর উপর ঈমানের দাওয়াত।

৪। াখেরাতের প্রতি ঈমানের দাওয়াত।

৫। নৈতিক শিক্ষা।

৬। বিশ্বজনীন মুসলিম উম্মাহর প্রতিষ্ঠা।

৭। নবী অনবীর কর্মপদ্ধতির পার্থক্য।

প্রথম অনুচ্ছেদ

তৌহীদের শিক্ষা ও শির্কের খন্ডন

দাওয়াতে ইসলমীর দফাগুলির মধ্যে সর্বপ্রথম, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও বুনিয়াদী দফা হচ্ছে তৌহীদের স্বীকৃতি ও শির্কের খন্ডন। যদিও নবী (সা) স্বয়ং নবুয়তের পূর্বে তৌহীদে বিশ্বাসী ও শির্ক অস্বীকারকারী ছিলেন এবং তাঁর সমসাময়িক ও পূর্ববর্তী আরববাসীদের মধ্যেও এ আকীদার লোক পাওয়া যেত, কিন্তু বিরাট পার্থক্য রয়েছে দু’ধরনের লোকের মধ্যে। এক ধরনের লোক শুধু তৌহীদ মেনে নেয়ার এবং শির্ক অস্বীকার করার আকীদাহ পোষণ করে এবং বড়োজোর তা প্রকাশ করাই যথেষ্ট মনে করে। আর একধদরনের লোক এ আকীদার প্রচার ও প্রসারের জনে দাঁড়িযে যায় এবং শির্ক পরিহার করে তৌহীদ মেনে নেয়ার জেন্য জনসাধারণের মধ্যে দাওয়াত দিতে থাকে। তারপর সে সরল আকীদাহ বিশ্বাস এবং এ প্রকাশ্য দাওয়াত ও তবলীগের মধ্যে যে জিনিস বিরাট পার্থক্য সৃষ্টি করে তা এই যে, ব্যক্তি এ কাজের দায়িত্ব কাঁধে বহন করে থাকে এবং বিস্তারিতভাবে শুধুমাত্র খোদার একত্বই যুক্তিসহ প্রমাণ করে না, বরঞ্চ এ একত্বের অর্থ ও মর্ম এবং তা মেনে নেয়ার অনিবার্য দাবীগুলিও এক একটি করে বর্ণনা করে মানুষকে এ কথা বলে, “এ বিশদ ব্যাখ্যাসহ আল্লাহর তাওহীদের উপর ঈমান আন।”

এটাই ছিল সে কাজ যা নবী (সা) নবুয়তের মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার পর করেছিলেন। আর এটাই কাফেরদেরকে সাথে তাঁর বিরোধিতার প্রথম কারণ। কারণ এর প্রত্যেকটি কথাই তাদের আকীদা, বিশ্বাস, কুসংস্কার এবং শত শত বছরের পুঞ্জীভূত  ধ্যান ধারণার সাথে ছিল সাংঘর্ষিক।

তৌহীদের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা

আরবের মুশরিক সমাজে আসল প্রশ্ন আল্লাহর তায়ালার অস্তিত্ব সম্পর্কে নয় বরঞ্চ তাঁর একত্ব মেনে নেয়াত সম্পর্কে ছিল। তারা আল্লাহকে নিজেদের এবং বিশ্বজগতের স্রষ্টা বলে মানতো। তাঁকে রব এবং ইলাহ মেনে নেতেও তারা অস্বীকার করতো না। তঁর বন্দেগী করাতেও তাদের কোন আপাত্তি ছিল না। অবশ্য যে গোমরাহিতে তারা লিপ্ত ছিল, তা ছিল এই যে, খোদায়ী এবং প্রভুত্ব-কর্তৃত্ব আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট-এ কথা তারা মনে করতোনা। সেই সাথে তারা আরও অনেক উপাস্যকেও খোদার অংশীদার মনে করতো। আল্লাহর এবাদতের সাথে তাদেরও এবাদতের প্রতি তারা বিশ্বাসী ছিল। (****১) তাদের অবস্থা এটাই ছিল যে-

(আরবী***************)

-এবং হ(হে নবী) যখন তুমি কুরআনে তোমার একমাত্র রবের কথা বল, তখন তরা ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। (বনী ইসরাইল: ৫৬)

অর্থাৎ এটা তাদের জন্যে অসহনীয় ছিল যে তুমি শুধু একমাত্র আল্লাহকেই প্রভু গণ্য করছ এবং তাদের বানানো বহু প্রভু ও খোদার কোন উল্লেখই তুমি করছ না। এ ওহাবীসুলভ (আজকালের পরিভাষায়) আচরণ তাদের এক মুহূর্তও মনঃপূত হচ্ছে না যে মানুষ শুধুমাত্র ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জপ করবে। না বুযুর্গানের জন্যে খরচপত্রের কোন উল্লেখ আর না আস্তানায়  ফয়েয হাছিল করার কোন স্বীকৃতি। আর না ঐসব ব্যক্তিত্বের প্রতি প্রশংসাসূচক অভিনন্দন যাদের প্রতি তাদের ধারণায়, আল্লাহতায়ালা তাঁর খোদায়ী বন্টন করে দিয়েছিলেন। তারা বলে, এতো এক অদ্ভূত লোক যে, তার মতে ভবিষ্যতের জ্ঞান বলতে একমাত্র আল্লাহর, কুদরত বলতে একমাত্র আল্লাহর, কর্মকুশলতা এবং এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহর। তাহলে আমাদের এসব আস্তানায় যারা আছে তারা কি কিছুই নয়? অথচ তাদের কাছে আমরা জ্ঞান লাভ করি, তাদের ইচ্ছায় রোগীর আরোগ্য লাভ হয়, ব্যবসা বাণিজ্য জমজমাট হয়, মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। তাহলে এরা কি কিছুতেই নয়? (২)

কুরআনের অন্যত্র তৌহীদের প্রতি তাদের বীতশ্রদ্ধা এবং শির্কে নিমজ্জিত থাকার অবস্থা এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:

(আরবী*****************)

এবং যখন একাকী আলআহর উল্লেখ করা হয় তখন আখেরাত অবিশ্বাসকারীরা মর্মজ্বালা অনুভব করে এবং তিনি ছাড়া যখন অন্যান্যদের উল্লেখ করা হয় তখন হঠাৎ আনন্দে তাদের মন নেচে ওঠে। (যুমার: ৫৪)

দুনিয়অতে মুশরিকেসূলব রুচিপ্রকৃতি যাদের তাদের প্রায় সকলের কাছে একথাটি সমানভাবে প্রযোজ্য। তারা মুখে বলে, আমরা আল্লাহকে মানি। কিন্তু তাদের অবস্থা এই যে, শুধু একমাত্র আল্লাহর উল্লেখ করলে তাদের চেহারা বিকৃত হতে থাকে। তখন তরা বলে. “এ লোকটি বুযুর্গ এবং অলী আল।লাহদের কিছুতেই মানেনা। সে জন্যৌই শুধু আল্লাহ আল্লাহ করে।”

আর যদি অন্যান্যদের নাম ‍উল্লেখ করা হয় তাহলে আনন্দে তাদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাদের এ কর্মকান্ডে একথা প্রকাশ পায় যে তাদের অনুরাগ ও মহব্বত কার প্রতি। (৩)

(আরবী***************)

-তাদের অবস্্যথা ছিল এই যে, যখন তাদের বলা হতো, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তখন তারা গর্ব ভরে বলতো, আমরা কি একজন পাগল কবির খাতিরে আমাদের খোদাদেরকে পরিত্যাগ করব? (সাফ্‌ফাত: ৩৫-৩৬)

নবীল (সা) এ কথার উপর তাদের বড়ো আপত্তি ছিল:

(আরবী*************)

-এ লোকটি কি সকল খোদার পরিবর্তে শুধামাত্র এক খোদাকে গণ্য করে বসলো? এ ত বড়োই আজব কথা! (সোয়াদ: ৫)

 এ সমাজে এবং এ ধরনের চিন্তাধারার লোকদের মধ্যে রসূলুল্লাহ (সা) দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে বারবার ঘোষণা করেন আল্লাহই একমাত্র ইলাহ ও রব। খোদায়ী এবং প্রভুত্ব-কর্তৃত্বে আর কারো অংশীদারিত্ব নেই।

(আরবী**************)

-তোমাদের খোদা ত সেই আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। প্রতিটি বিষয়ের উপর তাঁর জ্ঞান পরিব্যপ্ত। (তাহা: ৯৮)

(আরবী*****************)

-বরঞ্চ তোমাদের রব তিনিই যিনি আসমান ও জমিনের রব এবং যিনি তা পয়দা করেছেন। (আম্বিয়া : ৬৫)

(আরবী****************)

-প্রকৃতপক্ষে তোমাদের রব মাত্র একজন। আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যে যা কিছু আষে সে সবের তিনি রব এবং পূর্বদিকগুলিরও তিনি রব। (সাফফাত: ৪-৫)

অর্থাৎ যিনি বিশ্ব প্রকৃতির মালিক ও প্রভু তিনিই মানবজাতিরও খোদা (মাবুদ ও ইলাহ) এবং প্রকৃতপক্ষে তিনি মাবুদ হতে পারেন এবং তাঁরই মাবুদ হওয়া উচিত। একথা একেবারে ভ্রান্ত যে বিশ্ব প্রকৃতি এবং তোমরাসহ বিশ্ব প্রকৃতির রব (অর্থাৎ মালিক, শাসক, মুরব্বী ও প্রতিপালক) ত কেউ হবে এবং ইলাহ (এবাদতের হকদার) হবে আর কেউ।

(আরবী******************)

-(হে নবী!) বলে দাও। আমি ত শুধু সাবধানকারী। এ এক খোদা ছাড়া আর কেউ নেই। তিন সকলের উপরে বিজয়ী, যিনি আসমান, জমিন এবং উভয়ের মধ্যস্থিত সব কিছুর রব। তিনি মহা প্রতাপশালী এবং বড়ো ক্ষমাশীল। (হে নবী!) বল য এ এমন এক সংবাদ যার থেকে তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ। (সোয়াদ: ৪-৫)

(আরবী*******************)

-আল্লাহ বলেছৈন-দু’জন ইলাহ (খোদা ও মাবুদ) বানাইও না। খোদা ত মাত্র একই জন। অতএব তোমরা আমাকেই ভয় কর। (নহল:” ৫১)

(আরবী****************)

এবং তিনিই একজন আসামানেও খোদা এবং জমিনেও খোদা। এবং তিনি বিজ্ঞ ও জ্ঞঅনী। (যুখরুফ: ৫৩)

(আরবী*****************)

-এবং আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোন মাবুদদকে ডেকো না। তিনি ছাড়া আর কেউ খোদা নেই। শুধু তাঁর সত্তা ব্যতীত প্রতিটি বস্তু ধ্বংসশীল। শাসন-কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই। তাঁর দিকেই সবকিছু প্রত্যাবর্তনকারী। (কাসাস: ৮৮)

মুশরিকগণ হুযুরকে (সা) জিজ্ঞেস করে, যে রবের দিকে তুমি আমাদেরকে ডাকছ তাঁর বংশ পরিচয় বলে দাও। তিনি কিসের থেকে হয়েছেন? কার কাছে থেকে তিনি দুনিয়ার উত্তারাধিকার পেয়েছেন? তাঁর পরে এ উত্তরাধিকার কে লাভ করবে?

তার জবাবে তৌহীদের এমন সুস্পষ্ট, সার্বিক অথচ সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা বয়ান করা হয়- যা অন্তর প্রাদে্যেশ তীরবেগে প্রবেশ করে। শির্কের কোন লেশ মনের মধ্যে স্থঅন পেতে পারে না। যার এক একটি শব্দ তৌহীদের ধারণা সুস্পষ্টরূপে পেশ করে। সেই সাথে সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে, চারটি সংক্ষিপ্ত ও অলংকারপূর্ণ বাক্যে বর্ণিত হওয়ার কারণে কোন শ্রোতার সাধ্য ছিল না যে, তা স্মৃতি থেকে মুছে ফেলে দেবে এবং মুখে উচ্চারিত না করে পারবে। এরশাদ হলো:

(আরবী******************)

-(হে নবী তাদের কথার জবাবে) বলে দাও:” তিনি আল্লাহ, এক ও একক। আল্লাহ সবকিছু থেকে মুখঅপেক্ষীহীন এবং সকলে তাঁর কেউ সমকক্ষ নেই।

প্রথম বাক্যের অর্থ এই যে, আমার যে রব সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞেস করছ এবং যাঁকে আমি এক খোদা বলে মানি এবং চাই যে অন্যেও মেনে নিক, তিন কোন অভিনব অথবা আমার কল্পিত খোদা নন। বরঞ্চ তিনিই সে খোদা যাকে তোমরা তোমাদের মুখ দিয়ে আল্লাহ বল, যার এ ঘরকে (কাবা) তোমরা বায়তুল্লাহ (আল্লাহর ঘর) বল, মাত্র চল্লিশ বছর আগে আবরাহার আক্রমণের সময় যাঁর কাছে তোমরা দোয়া করছিলে যেন তিনি তোমাদেরকে রক্ষা করেন এবং সে সময় তোমরা তোমাদের অন্যান্য খোদাকে ভুলে গিয়েছিলে। যাঁর সম্পর্কে তোমরা স্বয়ং স্বীকার কর যে, তোমাদের জমিন ও আসমানেনর এবং দুনিয়অর প্রতিটি বস্তুর তিনি স্রষ্টা।

তাপর আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে বলা হলো যে তিনি এক ও একক। প্রত্যেক আরবাসী জানতো যে এখানে আল্লাহকে ওয়াহেদ (****) বলার পরিবর্তে আহাদ বলার অর্থ কি। (ওয়াহেদ) (***) (এক) শব্দটি আরবী ভাষায় প্রত্যেক ঐ বস্তুটির জন্যে বলা হয়- যা কোন বিশেষ দিক দিয়ে এক হয়, তা অসংখ্য দিক দিয়ে তার মধ্যে বিভিন্ন প্রকারের বহুত্ব পাওয়া যাক না কেন। যেমন এক বাড়ী, এক মানুষ, এক পরিবার, এক জাতি, এক দেশ, এক দুনিয়া। তারপর বিপরীত আহাদ শব্দ গুণ হিসাবে কারো জন্যে ব্যবহৃত হওয়া কারো একত্ব বর্ণনা করা এবং সধারণ ব্যবহার ছিল যার কোন নজীর সূরা ইখলাস নাযিলের পূর্বৈ আরবী ভাষায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। [উল্লেখ্য যে, কুরআনে আল্লাহ তায়ালার জন্যে শুধা ওয়াহেদ (***) শব্দ কোথাও ব্যবহৃত হয়নি। বরঞ্চ তার সাথে অন্য কোন শব্দ সংযোগ করতঃ আল্লাহতায়ালার এক হওয়ার মর্যাদাকে দুনিয়ার অন্যান্য বস্তুর কোন একটির এক হওয়ার মর্যাদা থেকে পৃথক করে দেয়া হযেছৈ। যেমন (******) অথভা (*********) কিন্তু সূরা ইখলাসে (আ****) শব্দ আল্লাহর জন্যে নিরংকুশভাবে গুণ হিসাবে ব্যবহৃত করা হযেছে। এ ব্যবহার আল্লাহর সত্তার জন্যে নির্দিষ্ট- গ্রন্থকার।

(অতএব আল্লাহকে ‘আহাদ’ বলার একথা প্রকাশ করে যে, তিনি সব দিক দিযে এক ও একক। তিনি দেবদেবীসমূহের কোন একটিরও প্রজাতি নন যে তার সমপ্রজাতি অন্যান্য সত্তআও খোদা হবে। বরঞ্চ অস্তিত্বে তিনি তুলনাবিহীন ও প্রতিদ্বন্দ্বীহীন একাকী এবং খোদায়ী দিক দিয়েও একেবারে একাকী। তাঁর মধ্যে কোন দিক দিয়েই কোন বহুত্ব নেই। তিনি উপাদানমূলক অংশাবলী থেকে গঠিত কোন অস্তিত্ব নন, যা বিভাজ্য ও বন্টনযোগ্য, যার আকার আকৃতি থাকে, যা কোন স্থানে অবস্থানরত, যার থেকে কিছু বের এবং যার মধ্যে কিছু প্রবেশ করে। যার কোন বর্ণ হয়, যার কোন অংগপ্রত্যংগ হয়, যা কোন দিকের মুখাপেক্ষী এব্ং যার মধ্যে কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়। সকল প্রকারের বহুত্ব থেকে পাক-পবিত্র তিনি খোদায়ী সত্তা-যিনি সকল দিক দিয়ে এক ও একক। যখন তিনি ‘আহাদ’ তখন খোদায়ী ও প্রভুত্ব কৃর্তৃত্বে তাঁর কোন অংশীদার হতে পারে না। তাঁর সত্তা, গুণাবলী, এখতিয়অর ও অধিকারে কেউ তাঁর অংশীদার নয়। জগতের অসিত্ববান সৃষ্টিনিচয়ের কোনটিই তার সদৃশ বা অনরূপ নয়।

তারপর বলা হয়েছে যে তিন মুখাপেক্ষীহীণ ‘সামাদ’ শভ্দটি আরবী ভাষায় বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত ছিল এবং প্রত্যেক আরববাসী তার অর্থ জানতো। তা এমন একটি ব্যক্তির জন্যে ব্যবহৃত হতো যে কারো মুখাপেক্ষী নয় এবং যার দিকে লোক প্রয়োজন পূরণের জন্যে ধাবিত হতো।

যে ব্যীক্ত অন্যান্য থেকে উচ্চতর এবং কেউ তার চেয়ে উচ্চতর নয়। যার আনুগত্য করা হতো এবং যাকে ব্যতীত কোন সিদ্ধান্ত করা যেতো না। যার মধ্যে কোন দুর্বলতা নেই, যে নির্দোষ, যার উপর বিপদ আসে না, যে আপন মর্জিমত সবকিছু করে, যার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা যায় না এবং কৃত্ত্ব করার গুণাবলী যার মধ্যে তাকেউ ‘সামাদ’ বলা হতো। তা ফাঁপাঁ বা শূন্য গর্ভ নয় এমন দৃঢ় পূর্ণগর্ভ যার থেকে কিছু বেরয় না এবং কিছু প্রবেশও করে না। কিন্তু আল্লাহতায়ারা জন্যে নিছক ‘সামাদ’ নয়, বরঞ্চ ‘আস সামাদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যার অর্থ এই যে, আর যতো কিছু তা ত একদিক দিয়ে হতে পারে এবং অন্য বহু দিক দিযে ‘সামাদ’ নয়। কিন্তু সব দিক দিয়ে পূর্ণ ‘সামাদ’ শুধুমাত্র আল্লাহ।

তারপর বলা হয়েছে যে, তাঁর কোন সন্তান নেই। আর না তিনি কারো সন্তান। এ কথাটি সে সকল মুশারেকী ধ্যান-ধারণা খন্ডন করে যার ভিত্তিতে মনে করা হতো যে, খোদাদেরও কোন প্রজাতি আছে যার মধ্যে সেরূপ বংশবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা চলে যেমন মানুষের চলে থাকে। এ ধারণার মূলোৎপাটন করে চিরকাল থাকবেন। তাঁর পূর্বে কোন খোদা ছিল না যার থেকে তিনি পয়দা হয়েছেন আর না তাঁর পরে কোন খোদা আছে এবং হতে পারে যা তাঁর থেকে পয়দা হয়।

শেষে বলা হয়েছে যে কেউ তার ‘কুফু’ নেই। কুফুর অর্থ তুলনা’ সদৃশ, সমমর্যাদাসম্পন্ন, সমকক্ষ ও সমান। এ কথার দ্বারা লোকদেরকে বলে দেয়া হলো যে, সমগ্র বিশ্বপৃকৃতিতে কেউ নেই, না কখনো ছিল এবং না কখনো হতে পারে যে আল্লাহর মতন অথবা তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন অথবা তাঁর গুণাবলী কাজকর্ম এবং ক্ষমতা এখতিয়ারে তাঁর সাথে কোন প্রকারের সাদৃশ্য রাখে।

তৌহীদের যুক্তি প্রমাণ

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম মুশরিক সমাজে তৌহীদের এ সুস্পষ্ট ধারণা পেশ করেই ক্ষঅন্ত হননি, বরঞ্চ বলিষ্ঠতার সাথে অনস্বীকার্য যুক্তিপ্রমাণসহ তা প্রমাণিত করেছেন।

১. সকল নবী তৌহীদের শিক্ষা দিতেন

এ প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ যুক্তি এ ছিল যে, তাঁর পূর্বে দুনিয়ায় যতো নবী এসেছিলেন তাঁরা সকলেই তৌহীদের শিক্ষা দিয়েছেন এবং শির্ক থেকে দূরে থাকতে আদেশ করেছেন। বস্তুতঃ কুরআনে সামগ্রিকভাবে সকল নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে-

(আরবী***************)

-প্রত্যেক উম্মতের জন্যে আমরা একজন করে নবী পাঠিয়েছি এ শিক্ষাসহ যে- আল্লাহর বন্দেগী কর এবং তাগুতের [তফসীর শাস্ত্রের প্রখ্যাত ইমাম ইবনে জারীর তাবারী তাগুতের, ব্যাখ্যা নিম্নররূপ করেছেন:

প্রত্যেক সে সত্তা- যে আল্লাহর মুকাবিলায় বিদ্রোহ করে এবং আল্লাহ ব্যতী যার বন্দেগী করা হয়, তা বন্দেগীকারী শক্ত প্রয়োগ দ্বারা বাধ্য হয়ে তার বন্দেগী করুক অথবা স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টিচিত্তে তার বন্দেগী করুক- (অ্থাৎ যার বন্দেগী করা হবে) সে তাগুত। সে কোন মানুষ হোক, শয়তান, দেবদেবী অথবা আর কোন কিছু হোক। (জামেউল বয়ান ফী তাফসীরুল কু্রআন- ৩য় খন্ড, পৃ:১৩)-গ্রন্থকার।] বন্দেগী থেকে দূরে থাকে। (নাহাল: ৩৬)

(আরবী**************)

-এবং (হে নবী) তোমার পূর্বে আমরা এমন কোন রসূল পাঠাইনি যার প্রতি আমরা এ অহী করিনি যে, ‘আমি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। অতএব তোমরা আমারই বন্দেগী করো’ (আম্বিয়অ: ২৫)

অতীতের সমস্ত উম্মত সম্পর্কে বলা হয়েছে-

(আরবী**********************)

-এবং তাদের এছাড়া আর কোন আদেশ করা হয়নি যে, তারা আল্লাহর বন্দেগী করবে- নিজেদের দ্বীনকে তাঁর জন্য নির্দিষ্ট এবং একেবারে একমুখী হয়ে- এবং নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই হচ্ছে একেবারে একমুখী হয়ে- এবং নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে। এটাই হচ্ছে একেবারে সঠিক দ্বীন। (আল বাইয়্যেনাহ্‌: ৫)

তারপর এক একজন নবী সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তাদের শিক্ষা এই ছিল। হযরত নূহ (আ), হযরত হুদ (আ), হযরত সালে (আ), হযরত শুয়াইব (আ) প্রমুখ নবীগণের প্রত্যেকে তাঁর জাতিকে সর্বপ্রথম এ শিক্ষাই দিতেন-

(আরবী****************)

-হে আমার জাতির লোকেরা! আল্লাহর বন্দেগী কর। তিনি ছাড়া আর কেউ তোমাদের খোদা নেই। (আ’রাফ:  ৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৫, হুদ: ৫০ক, ৬১, ৮৪, আল মুমেনূন: ২৩, ৩২)

হযরত ইয়াকুব মরণের সময় তাঁর সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করছেন- আমার পরে তোমরা কার বন্দেগী করবে? তরা জবাব দেন, আমরা সেই একই খোদার বন্গেী করবো যিনি আপনার, আপনার বাপ দাদা ইব্রাহীম ও ইসমাইল ও ইসহাকের ইলাহ ছিলেন। (বাকারাহ: ১৩৩) হযরত ইউসুফ তাঁর জেলের সাথীদেরকে সম্বোধন করে বলেন-

(আরবী*****************)

-হে আমার জেলখানার সাথীগণ! ভিন্ন ভিন্ন বহু খোদা কি ভালো, না এক আল্লাহ যিনি সকলের উপরে বিজয়ী? তাঁকে বাদ দিয়ে তোমার বন্দেগী করছ। তারা কয়েক নাম ব্যতীত আর কিছুই নয়- যে নাম তোমরা এবং তোমাদের বাপদাদা রেখেছে। আল্লাহ তাদের সপক্ষে কোন সদন নাযিল করেননি। প্রবুত্ব-কর্তৃত্ব করার ক্ষশতা আল্লাহ ছাড়া আর কারো নেই। তাঁর হুকুম এ্ যে, তিন ছাড়া আর কারো বন্দেগী তোমরা করবে না। এটাই সঠিক দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না। (ইউসুফ : ৩৯-৪০)

হযরত মূসা (আ)-এর উপর সর্বপ্রথম অহী নাযিল হয়-

(আরবী******************)

-আমিই আল্লা! আমি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। অতএব, তুমি আমারই এবাদত করো এবং আমার স্মরনের জন্যে নামায কায়েম করো। (তা-হা: ১৪)

তাপর বনী ইসরাইল যখন গোবৎস্য পূজা শুরু করলো তখন হযরত মূসা (আ) তাদের উপর ভয়ানক ক্রোধান্বিত হলেন এবং তাদের তৈরী উপাস্য প্রতিমা জ্বালিয়ে দিয়ে বল্লেন-

(আরবী****************)

-তোমাদরে সত্যিকার মাবুদ তো একমাত্র আল্লাহ যিনি ছাড়া আর কোন খোদা নেই। (তা-হা: ৯৮)

হযরত ঈসা (আ) বনী ইসরাইডলদেরকে বারবার এ কথা বলেন-

(আরবী****************)

প্রকৃত পক্ষে আল্লাহই আমার রব  এবং তোমাদেরও রব। অতএব তোমরা তাঁর এবাদত করো। এটাই সোজা পথ। (আলে ইমরান: ৫১, মরিয়ম: ৩৬, যুখরুফ: ৬৪)

(আরবী******************)

-হে বনী ইসরাইল! আল্লাহর বন্দেগী করো যিনি আমারও রব এবং তোমাদেরও রব। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করলো তার স্থান আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিলেন এবং তার অবস্থঅন জাহান্নাম। আর এমন জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই। (মায়েদাহ: ৭২)

আরবের মুশরকদের জন্যে সাধঅরণতঃ এবং কুরাইশ মুশরিকদের জন্যে বিশেষভাবে সবচেয়ে বলিষ্ঠ যুক্তি তাই ছিল যা কুরআনে হযরত ইব্রাহীম (আ)-এর কাহিনীতে পেশ করা হয়েছে। কারণ আরবের সকল মুশরিক তাঁকে তাদের নেতা ও পথপ্রদর্শক বলে স্বীকার করতো। তাদের দ্বীনকে তারই প্রদর্শিত দ্বীন গণ্য করতো। তাঁর সাথে তাদের বংশীয় সম্পর্ক থাকার কারণে এবং তাঁর তৈরী বায়তুল্লাহর পৌরহিত্য করার কারণেই কুরাইশদের যতো গর্ব অহংকার ও প্রভাব প্রতিপত্তি। কুরআন পাকে বিশদভাবে কুরাইশ এবং আরববাসীকে বলা হযেছে যে, নমরুদের রাজ্য (ইরাক) থেকে তোমাদের পূর্বপুরুষ ও ধর্মীয় নেতার বেরিয়ে আসা এ বিবাদের ভিত্তিতেই হয়েছিল যে, তাঁর পিতা, তাঁর জাতি এবং  তাঁর দেশের সরকার সকলেই মুশরিক ছিল। তিনি অর্থাৎ হযরত ইব্রাহীম (আ) এ শির্কের প্রকাশ্য খন্ডন করেন, জাতিকে প্রকাশ্য তৌহীদের দাওয়াত দেন, দেবদেবী ভেঙে চুরমার করেন যার জেন্য তাঁকে বিরাট অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তার থেকে জীবিত অবস্থায় ও নিরাপদে বের করে আনেন। তারপর তিনি দেশ ত্যাগ করে কানআন ভূখন্ডের দিকে বেরিয়ে পড়েন। তাপর মক্কায় পৌঁছে এ আল্লাহর ঘর এজন্যে নির্মাণ করেন যে, এখঅনে যেন এক খোদা ব্যতীত আর কারো এবাদত করা না হয়। তিনি তাঁর সন্তানদের জন্যে দোয়া করেন যে, তারা যেন পৌত্তলিক পূজার পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত না হয়। এ কাহিনীর বিশদ বিবরণ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলিষ্ঠ এবং সার্থকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তা পাঠ করে  মানুষ ধারণা রতে পারে যে, মক্কায় যখন রসূলূল্লাহ (সা) তাদেরকে এসব শুনিয়েছিলেন তখন কুরাইশ এবং সাধারণ মুশরিকগণ কতোখানি আলোড়িত হয়ে থাকবে। কথা দীর্ঘায়িত না করে এখানে আমরা শুধু আয়াতগুলো তরজমা সন্নিবেশিত করছি:

-“এবং ইব্রাহীমের ঘটনা স্মরণ কর যখন সে তার পিতা আযরকে বলেছিল, আপনি কি প্রতিমাগুলোকে খোদা বলে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে এবং আপনার  কওমকে সুস্পষ্ট গুমরাহির মধ্যে দেখদে পাচ্ছি।

.. ইব্রাহীম বল্লো, হে  আমার জাতির লোকেরা! আমি সেসব থেকে বিরাগভাজন হয়ে পড়েছি যাদেরকে তোমরা খোদার শরীক বলে গণ্য করো। আমি ত একনিষ্ঠ হযে সেই সত্তার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি যিনি আসমান জমিন পয়দা করেছেন এবং আমি শির্ককারীদেরকে অন্তর্ভুক্ত কখনোই নাই। তার কওম তার সাথে ঝঘড়া শুরু করে। সে বলে, তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে আমার সাথে ঝগড়া করছো অথচ তিন আমাকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন? আমি তোমাদের নির্ধারিত শরীকদের ভয় করি না। হাঁ তবে আমার রব কিছু করতে চাইলে তা অবশ্যই হতে পারে। আমার রবের জ্ঞান সর্বব্যাপী। তারপরও তোমরা সম্বিৎ ফিরে পাচ্ছ না? তোমাদের নির্ধারিত শরীকদের আমি কেন ভয় করবো যখন তোমরা আল্লাহর সাথে এমন সব জিনিসকে শরীক বানাতে ভয় করছো না অথচ খোদার শরীক হওয়া সম্পর্কে তিনি কোন সনদ নাযিল করেননি? তাহলে বলো, যদি তোমাদের জ্ঞান থাকে, আমাদের উভয় পক্ষের মধ্যে কে অধিকতর ভীতিহীনতা এবং প্রশান্তির অধিকারী?” (আনয়াম: ৭৪-৮১)

-“এবং (হে মুহাম্মদ), এ বিতাকে ইব্রাহীমকে স্মরণ করো। অবশ্যই সে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষ ও নবী ছিল। (এদেরকে সে সময়ের ঘটনা শুনাও) যখন সে তার পিতাকে বলেছিল, আব্বা! আপনি কেন সে সবের এবাদত করেন, যারা না শুনে এবং না দেখে আর না আপনার কোন কাজ করে দিতে পারে? আব্বা! আামার কাছে এমন এস জ্ঞান রয়েছে যা আপনার কাছে নেই। আপনি আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সোজা পথ বলে দেব। আব্বা! আপনি শয়তানের বন্দেগী করবেন না। শয়তান তো রহমানের অবধ্য। আব্বা! আমার ভয় হয় যে, আপনি রহমানের আযাবে লিপ্ত হয়ে না পড়েন এবং শয়তানের সাথী হয়ে থাকেন।”

“পিতা বলে, ইব্রাহীম! তুমি কি আমাদের খোদাসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ? তুমি বিরত না হলে তোমাকে প্রস্ত্ররাঘাতে মেরে ফেলবো। তুমি চিরদিনের জন্যে আমার থেকে পৃথক হয়ে যাও।”

“ইব্রাহ্রীম বলে, আপনার প্রতি সালাম, আমি আমার রবের কাছে দোয়া করি যেন তিনি আপনাকে মাফ করে দেন। আমার রব আমার উপর বড়ই মেহেরবান। আমি আপনাদেরকেও পরিত্যাগ করছি এবং ঐসব সত্তাকেও যাদেরকে আপনারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে ডাকেন। আমি ত আমার রবকেই ডাকবো। আশা করি আমি আমার রবকে ডেকে বিফলকাম হবো না।” (মরিয়ম: ৪১-৪৮)

“এবং ইব্রাহীমের তাঁর পিতার জন্যে দোয়া সেই ওয়াদা মোতাবিক ছিল যা সে তার কাজে করেছিল। কিন্তু যখন তার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর দুশমন, তখন সে তার থেকে দায়মুক্ত হয়ে গেল।” (তাওবা:” ১১৪)

“এর আগে আমরা ইব্রাহীমকে জ্ঞান দান করেছিলাম এবং! আমরা তাকে ভালোভাবে জানতাম। সে ঘটনা স্মরণ করো যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বলেছিল, এসব কেমন মূর্তি যার প্রতি তোমরা অনুরুক্ত হয়ে পড়ছো? জবাবে তারা বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এদের এবাদত করতে দেখেছি। সে বলে সতোমরাও পথভ্রষ্ট এবং তোমাদের বাপ-দাদাও সুস্পষ্ট গোমরাহিতে লিপ্ত ছিল। তারা বলে, তুমি কি তোমার আপন চিন্তা-ভাবনা আমাদের সামনে পেশ করছ না ঠাট্টা করছো? সে বলে না, বরঞ্চ তোমাদের রব প্রকৃতপক্ষে সেই যিনি আসমান-জমিনেসর রব এবং যেগুলো তিনি পয়দা করেছেন এবং এ ব্যাপারে তোমাদের সামসে সাক্ষ্য দিচ্ছি এবং খোদার কসম, তোমাদের অসাক্ষাতে আমি অবশ্যই তোমাদের প্রতিমানের বিরুদ্ধে কিছু করার সিদ্ধঅন্ত করেছি। বস্তুতঃ সে সেগুলোকে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর করলো এবং তাদের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বড়ো তাকে অক্ষত রাখলো যাতে করে তারা তার দিকে ধাবিত হয়।

“(তারা এসে তাদের প্রতিমাগুলোর দূরবস্থা দেখে) বল্লো, কে আমাদের খোদাদের সাথে এমন আচরণ করলো? বড়ো জালেম ছিল সে।ভ (কতিপয় লোক) বলতে লাগলো, আমরা একটি যুবককে এদের সম্পর্কে কিছু বলতে শুনেছি। আর সে ইব্রাহীম। তারা বল্লো, তাহলে তাকে সকলের সামনে ধরে আন যেন তারা দেখে যে তার কি করা যায়। (ইব্রাহীম এলে পরে) লোকে বল্লো ইব্রাহীম! তুমি কি আমাদের খোদাদের সাথে এ আচরণ করেছ? সে বল্লো, বরঞ্চ এদর এ সর্দারই এ কাজ করেছে। একে জিজ্ঞেস করো না সে যদি কিছু বলে। এ কথা শুনে তরা তাদের বিবেকের তাড়নায় তাদের নিজেদের মনকে বলে, তোমরা নিজেরাই বরড় জালেম (যে এসব অসহায় মূর্তিগুলোর পুজা কর)। তারা হতহভস্ব হয়ে বল্লো, তুমিতো জান যে এরা কথা বলতে পারে না। ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা তাহলে আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পূজা করো যারা তোমাদের কোন উপকারও করতে পারে না এবং কোন ক্ষতিও করতে পারে না। তোমাদের উপর এবং তোমাদের এ খোদাদের উপর ধিক্‌ আল্লাহকে ছেড়ে যাদের পূজা করো।”

“তারা বল্লো, জ্বালিয়ে দাও একে এবং সমর্থন করো তোমাদের খোদার যডদি তোমাদের কিছু করতে হয়। আমরা বল্লাম হে আগুন! শীতল হয়ে যাও এবং নিরাপত্তার কারণ হয়ে যাও ইব্রাহীমের জন্যে। তরা চাচ্ছিল ইব্রাহীমের ক্ষতি করতে কিন্তু তাদেরকে ব্যর্থকাম করে দিলাম।” (আম্বিয়া:” ৫১-৭০)

“এবং এদেরকে ইব্রাহীমের কাহিনী শুনিয়ে দাও, যখন সে তার পিতা এবং আপন কওমকে বল্লো, এ তোমরা কোন সব বস্তুর এবাদত করছো?”

“তারা বল্লো- এসব কিছু মূর্তি যেসবের আমরা পূজা করি এবং তাদের সেবায়ই আমরা লেগে থাকি। সে বল্লো, এরা কি তোমাদের কথা শুনতে পায় যখন তোমরা তাদেরকে ডাক? অথবা এ কি তোমাদের কোন উপকার বা ক্ষতি করতে পারে? তারা জবাব দিল, (এসব তো আমরা জানি না) কিন্তু আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এরূপ করতে দেখেছি। ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা কি কখনো (চোখ খুলে) দেখেছ যে এসব আসলে কি যাদের বন্দেগী তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী বাপ-দাদা করে আসছ? আমার ত এসব দুশমন, শুধু রাব্বুল আলামীন ব্যতীত, যিনি আমাকে পয়দা করেছেন। তারপর তিনিই আমার পথ প্রদর্শন করেন। যিনি আমাকে পানাহার করান। যখন আমি রোগাক্রান্ত হই তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন এবং তারপর দ্বিতীয়বার জীবিত করবেন। আর যার কাছে এ আশা করি যে, বিচারের দিনে তিনি আমার ভুলত্রুটি মাফ করে দেবেন।” (মুয়ারা: ৬৯-৮২)

“এবং আমরা ইব্রাহীমকে পাঠালাম। যখন সে তার কওমকে বল্লো, আল্লাহর বন্দেগী করো এবং তাঁকেই ভয় করো। এ তোমাদের জন্যে মংগলদায়ক যদি তোমরা জান। আল্লাহকে ছেড়ে তোমরা যাদের পূজা করছ তারা তোমাদেরকে কোন রিযিক দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। আল্লাহর কাছে রিযিক চাও। তাঁরই বন্দেগী কর এবং শুকরিয়া আদায় কর। তাঁর দিকেই তোমাদেরকে প্রত্যাবর্তিত করা হবে। …. তার জাতির বজাব এ ছাড়া আর কিছু ছিল না, একে মেরে ফেল অথবা জ্বালিয়ে দাও। কিন্তু আল্লাহ তাকে আগুন থেকে বাঁচালেন। নিশ্চিতরূপে এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে ঈমানদারদের জন্যে। এবং ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তিগুলোকে দুনিয়াতে পরস্পরের জন্যে। এবং ইব্রাহীম বল্লো, তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে মূর্তিগুলোকে দুনিয়াতে পরস্পররের মধ্যে ভালোবাসার উপায় বানিয়ে নিয়েছ। কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং একে অপরের প্রতি অভিশাপ করবে। আগুন তোমাদের গন্তব্যস্থল হবে এবং কেউ তোমাদের সাহায্যকারী হবে না। তাপর লুদৎ ইব্রাহীমের কথা মেনে নিল এবং ইব্রাহীম বল্লো, আমি আমার রবের দিকে হিজরত করছি। তিনিই মহাশক্তিশালী ও বিজ্ঞ।” (আনকাবুত: ১৬-২৬)

“এবং নূহেরই পথের অনুসারী ছিল ইব্রাহীম। যখন সে ত্রটিমুক্ত মন নিয়ে তার রবের সামনে এলো। যখন সে তার পিতা ও তার কওমকে বল্লো, এসব কোন বস্তুর এবাদত তোমরা করছ? আল্লাহকে ছেড়ে কি মিথ্যা রচিত খোদা তোমরা চাও? রাব্বুল আলামীন সম্পর্কে তোমাদের কি ধারণা? তারপর সে তারাগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো এবং কওমের লোকদেরকে বল্লো, আমার শরীর খারাপ। তারপর তারা (তাকে ছেড়ে নিজেদের মেলায়) চলে গেল। তাপর সে চুপে চুপে তাদের প্রতিমাগুলোর মন্দিরে ঢুকে পড়ে বল্লো, তোমরা খাওয়া দাওয়া করছ না কেন? তোমাদের কি হয়েছে যে, কথাও বলছ না? তাপর সে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ডান হাতে খুব আঘাত করলো।”

“(ফিরে এসে কওমের) লোকেরা দৌড়ে তার কাছে এলো। সে বল্লো, তোমরা কি তোমাদের নিজেদের খোদাই করা বস্তুর পূজা করো? বস্তুতঃ আল্লাহ তায়ালাই তোমাদেরকে পয়দা করেছেন এবং এসবচ বস্তুকেও যা তোমরা বানাও। তারা বল্লো, এর জন্যে আগুন প্রজ্জলিত কর এবং তাকে সে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করো। তরা তার বিরুদ্ধে এক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চেয়েছিল এবং আমরা তাদেরকে লাঞ্চিত করলাম এবং ইব্রাহীম বল্লো, আমি আমার রবের দিকে যাচ্ছি অর্থাৎ হিজরত করছি। তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন।” (সাফফাত:” ৮৩-৯৯)

হযরত ইব্রাহীম (আ) কে দেশের বাদশাহের সামনে পেশ করা হলো। কারণ সে রব হওয়াদার দাবীদার ছিল। আর তিনি আল্লাহ ছাড়া আর  কাউকে রব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তা কুরআন এভাবে নকল করছে:

“যখন ইব্রাহীম বল্লো, আমার রব তো তিন যিনি জীবন ও মৃত্যু দান করেন। সে বল্লো, জীবন ও  মৃত্যু আমারই এখতিয়ারে। ইব্রাহীম বল্লো, আচ্ছা, আল্লাহ ত সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো। এ কথা শুনে সে কাফের হতবাক হয়ে রইলো। (বাকারা: ২৫৮)

এভাবে শির্কের বিরোধিতা এবং তৌহীদের দাওয়াতের কারণে ইব্রাহীমের (আ) জন্যে তাঁর জন্মভূমি সংকীর্ণ হয়ে গেল এবং তিনি তাঁর দেশ, আপন কওম, আপন পরিবার, এমনকি আপন পিতাকে পরিত্যাগ করে হিজরতের জন্যে বেরিয়ে পড়লেন তখন যাবার সময় তিন এবং তার সাথে ঈমানদারগণ পরিষ্কার ভাষায় তাদের কওমকে বলে দিল-

“আমরা তোমাদের প্রতি এবং তোমাদের এসব খোদার প্রতি, যাদেরকে তোমরা খোদাকে ছেড়ে[ পূজা কর, একবারে বিরাগভাজন হয়ে পড়েছি। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছি এবং তোমাদের ও আমাদের মধ্যে শত্রুতা ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে গেছে, যতোক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর উপর ঈমান এনেছ। (মুমতাহেনা: ৪)

সেই সাথে কুরআন একথাও বলা হয়েছে যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) মক্কায় এসে তাঁর বলে দেয়া স্থানে এ খানায়ে কাবা নির্মাণ করেন ত তা এ জন্যে করা হয়নি  যে, তাকে প্রতিমা মন্দির এবং মুশরিকদের তীর্থস্থান বানানো হবে, এখানে গায়রুল্লাহর এবাদত হবে এবং গায়রুল্লাহর জন্যে কুরবানী করা হবে।

(আরবী******************)

“এবং স্বরণ কর সেই সময়-যখন আমরা ইব্রাহীমের জন্যে এ ঘরের (খানায়ে কাবা) স্থান মনোনীত করে দিই (এ হেদায়েতসহ) যে আমার সাথে অন্য কোন জিনিস শরীক করবে না এবং আমার ঘর তাওয়াফকারী, রুকু ও সিজদাকারীদের জন্যে পাক রাখবে। তারপর মানুষকে হজ্বের জন্যে সাধারণত অনুমতি দেবে যেন তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং উটের পিঠে করে আসতে পারে এবং সে সব সুবিধা লাভ করে যা তাদের জন্যে রয়েছে। তারপর কিছু নির্দিষ্ট দিনে ঐসব পশুর উপর আল্লাহর নাম নেয়, যা তাদেরকে দেয়া হয়েছে।” (হজ্ব: ২৬-১৮)

উপরন্তু কুরআনে মানুষকে এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মক্কার অধিবাসীদের জ্যে এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্যে হযরত ইব্রাহীম (আ) যে দোয়া করেছিলেন তা কি ছিল।

(আরবী****************)

“হে আমার রব! এ শহরকে নিরাপত্তার শহর বানিয়ে দাও এবং আমাকে ও আমার সন্তানদের মূর্তি পূজা থেকে দূরে রাখ। হে আমার রব! এ মূর্তিগুলো অনেক লোককে গোমরাহ করেছে, অতএব যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার এবং যে আমার বিপরীত পথ অবলম্বন করবে, তুমি তো ক্ষমাকারী ও রহমকারী।” (ইব্রাহীম:” ৩৫-৩৬)

হযরত ইব্রাহীমের জন্যে এ দৃষ্টান্ত কুরাইশ এবং আরবের মুশরিকদের ধর্মের মেরুদন্ড চূর্ণকারী ছিল। এর জন্যে তারা তো আর্তনাদ করতে পারতো কিন্তু এ অস্বীকার করতে পারতো না। কারণ তাদের মধ্যে এ কথা সর্বস্বীকৃত ছিল যে, হযরত ইব্রাহীম (আ) মুশরিক ও মূর্তি পূজক ছিলেন না। কাবা তিনি শুধু আল্লাহর এবাদতের জন্যে বানিয়েছিলেন এবং তার বহু পরে শির্ক আরববাসীদের মধ্যে প্রচলিত হয়। তাদের ঐতিহ্যে এ কথা সংরক্ষিত ছিল যে, মক্কায় শির্ক কখন শুরু হয় এবং কোন মূর্তি কখন কোথা থেকে আনা হয়। এ জন্যে কুরআন প্রকাশ্যে মানুষকে দাওয়াত দেয়-

(আরবী****************)

“ইব্রাহীমের সাথে সম্পর্ক রাখার সবচেয়ে বেশী হকদার তারা যারা তার তরিকা অনুসরণ করে এবং নবী (মুহাম্মদ সঃ) এবং তার অনুসারীগণ। আল্লাহর ঈমান আনয়নকারীদের সমর্থক ও সাহায্যকারী।” (আলে ইমরান: ৬৮)

২. মুশরিকদের মনের সাক্ষ্য থেকে প্রমাণ

তৌহীদের জন্যে দ্বিতীয় শক্তিশালী প্রমাণ এ পেশ করা হয়েছে যে, মুশরিকদের উপর কোন কঠিন সংকট এসে পড়লে তরা মৃত্যু অথবা ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। তখন তরা তাদের সকল বানাওটি খোদাকে ভুলে যায় এবং একমাত্র আল্লাহর নিকটেই দোয়া করতে থাকে। কুরআন মজিদে তাদের এ অবস্থা ফলপ্রসূ উপায়ে বর্ণনা করে তাদের মধ্যে এ অনুভূতি জাগ্রত করা হয় যে, তোমাদের নিজেদের মনেই শির্ক ভ্রান্ত হওয়ার এবং তৌহীদ সত্য হওয়ার প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে যা বিপদ পরীক্ষার সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে। তারপর সে সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তোমরা তার উপর গাফলতির পর্দা টেনে দাও।(৪)

(আরবী*****************)

-(হে নবী), এদের বল, একটু চিন্তা করে বল, যদি কখনো আল্লাহর আজাব তোমাদের উপর এসে যায়, অথবা শেষ মুহূর্ত তোমাদের উপর এসে যায়, তাহলে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে কি তোমরা ডাক? বল যদি তোমরা (তোমাদের শির্কের ব্যাপারে) সত্যবাদী হও। সে সময়ে তোমরা আল্লাহকেই ডাক। তাপর তিনি চাইলে সে বিপদ দূর করে দেন যার থেকে বাঁচার জন্যে তোমরা তাঁকে ডাকছিলে এবং সে ময় তাদেরকে ভুলে যাও যাদেরকে তোমরা খোদায়ীতে শরীক করছিলে। (আনয়াম: ৪০-৪১)

আবু জাহেলর পুত্র একরামা (রা) এসব নিদর্শনাবলীর পর্যবেক্ষণেল পর ঈমান আনার সৌভাগ্য লাভ করেন। যখন মক্কা নবী (সা)-এর হাতে বিজিত হয়, তখন একরামা জিদ্দার দিকে পলায়ন করেন এবং একটি নৌকায় চড়ে আবিসিনিয়ার দিকে রওয়ানা হন। পথে ভয়ানক ঝড় শুরু হয় এবং নৌকাটি বিপদের সম্মুখীন হয়। প্রথম প্রথম ত যতো সব দেবদেবী ছিল তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে কাকুতি মিনতি করা হলো। কিন্তু ঝড়ের গতিবেগ যখন বেড়ে গেল এবং যাত্রাীদের নিশ্চিত বিশ্বাস হলো যে, নৌকাটি ডুবে যাবে। তখন সকলেই বলতে লাগলো যে, এখন এ সমযে আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ডাকা যায় না। তিনি চাইলেই আমরা বেঁচে যেতে পারি। সে সময়ে একরামার চোখ খুলে গেল এবং তাঁর মন ঘোষণা করলো যে, যদি এখানে আল্লাহ ছাড়া আর কোন সাহায্যকারী না থাকে, তাহলে অন্যত্রই বা কেন হবে? এটাই ত সেই কথা যা আল্লাহর সে নেক বান্দাহ আমাদেরকে বিশ বছর যাবত বুঝাচ্ছেন্। আর আমরা অযথা তাঁর সাথে বিবাদ করে আসছি।

এ ছিল একরামার (রা) জীবনের এক সিদ্ধান্তকর মুহূর্ত। তিন তখনিই খোদার কাছে এ অংগীকার করেন যে, এ তুফান থেকে বেঁচে গেলে তিনি সোজা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে তাঁর হাতে নিজের হাত সমর্পণ করবেন। বস্তুতঃ তিনি তাঁর অংগীকার পালন করেন এবং পরবর্তীতে তিনি শুধু মুসলমানই হলেন না, বরঞ্চ তাঁর অবশিষ্ট জীবন ইসলামের জ্যন্যে জিহাদে অতিবাহিত করেছেন।(৫)

এ যুক্তি প্রমাণ কুরআনের স্থানে স্থানে পেশ করা হয়েছে। প্রবন্ধ দীর্ঘায়িত না করে আমরা শুধু আয়াতগুলোর তরজমা পেশ করবো।

“তিনিই আল্লাহ যিনি তোমাদেরকে জলেস্থলে পরিচালিত করেন। বস্তুতঃ যখন তোমরা নৌকায় আরোহণ করে বাতাসের অনুকূলে সানন্দে সফর করতে থাকো, অতঃপর শুরু হয় প্রচন্ড ঝড় এবং চারিদিক থেকে তরংগের আঘাত লাগতে থাকে এবং যাত্রীগণ বুঝতে পারে যে, তারা তুফানের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে তখন সকলেই তাদের দ্বীনকে আল্লাহর জন্যে নির্ভেজাল করে তাঁকে এই বলে ডাকে: “যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করো তাহলে আমরা তোমার কৃতজ্ঞ বান্দাহ হয়ে যাবো।” কিন্তু যখন তাদেরকে বাঁচিয়ে দেন তখন সেসব লোকই সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে জমিনে বিদ্রোহ করা শুরু করে।” (ইউনুস: ২২-২৩)

“তোমাদের সত্যিকার খোদা ত তিনি, যিনি সমুদ্রে তোমাদের নৌকা পরিচালিত করেন যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অর্থাৎ জীবিকা অনুসন্ধান করতে পারো। প্রকৃতপক্ষে তিনি তোমাদের উপর বড়োই মেহেরবান। আর যখন সমুদ্রে তোমাদের উপর বিপদ এসে পড়ে, তখন ঐ একজন ব্যতীত আর যাদেরকে তোমরা ডাক তার সব হারিয়ে যায়। কিন্তু তিন যখন তোমাদেরকে রক্ষা করে স্থলে পৌছিয়ে দেন, তখন তোমরা তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও। মানুষ প্রকৃতিপক্ষে অকৃতজ্ঞ।” (বনী ইসরাইল: ৬৬-৬৭)

“আর লোকের অবস্থা এই যে, যখন তারা কোন দুঃক্ষ কষ্টের সম্মুখীন হয় তখন নিজেদের রবের দিকে ধাবিত হয়। তারপর যখন তিনি তাঁর রহমতের কিছুটা আস্বাদন তাদেরকে দেন তখন হঠাৎ তাদের মধ্যে কতিপয় লোক তাদের রবের সাথে অন্যকে শরীক করতে শুরু করে। (অর্থাৎ অন্যান্য খোদাদের কাছে তাদের নযর-নিয়ায পৌঁছাতে থাকে)। এতে করে আমার কৃত অনুগ্রহের প্রতি অকৃতঞ্ছতা প্রকাশ করে।” (রূম: ৩২)

“এবং যখন কোন মানুষের উপর কোন বিপদ আসে তখন সে তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করে তাঁকে ডাকে। তারপর যখন তার রব তাঁর নিয়ামত দিয়ে তাকে ভূষিত করে তখন সে সেই বিপদের কথা ভুলে যায় যার জন্যে সেস প্রথমে (তার রবকে) ডাকছিল এবং আল্লাহর সাথে অন্যকে সমকক্ষ গণ্য করতে থাকে যাতে করে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেয়।” (যুমার : ৮)

অর্থাৎ নিজেই পথভ্রষ্ট হয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরঞ্চ অন্যান্যকেও এ কথা বলে পথভ্রষ্ট করে যে, ‘যে বিপদ আমার উপর এসেছিল তা অমুক হযরত, অমুক বুযর্গ, অমুক দেবদেবীর সদকা মানত করার ফলে দূর হয়েছে। এতে অন্যান্য অনেক লোক আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য কাল্পনিক খোদার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রত্যেক জাহেল এভাবে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে করে জনসাধারণের পথভ্রষ্টতায় ইন্ধন যোগাতে থঅকে।(৭)

কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এভাবে মুশরিকদের শিরা উপ-শিরায় আঘাত করে তাদের মধ্যে তৌহীদের ‍সুপ্ত অনুভূতি জাগ্রত করা হয়েছে। আরব ভূখন্ড বিপদ আপদে পরিপূর্ণ ছিল। দেশের সাধারণ নিরাপত্তাহীনতা প্রত্যেকের জন্য ছিল অত্যন্ত আশংকাজনক। রোগের জোন ওষুধ ও চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোথাও ছিল না।

মরুভূমির ভয়ানক ধূলিঝড়ে মানুষ জ্ঞানহারা হয়ে পড়তো। এ অবস্থায় প্রত্যেক মুশরিক তার জীবনে কোন না কোন সময়ে এমন বিপদরে সম্মুখীন হতো যে সে সময় সে সকল দিক থেকে নিরাশ হয়ে এক লাশরীক আল্লাহর সামনে তার দোয়ার হাত প্রসারিত করতো এবং মনে করতো যে এ সময়ে সে পবিত্র সত্তাব্যতীত কেউ তার সাহায্য করতে পারে না। বিশেষ করে সামুদ্রিক সফরে ত এ ধরনের ঘটনা প্রায় ঘটতো। স্বয়ং কুরাইশদের উপর আবরাহার হামলার সময় এ অবস্থা দেখা গেছে। সকল বানাওটি খোদাদের পরিত্যাগ করে এক আল্লাহকেই তারা সাহায্যের জন্যে ডেকেছিল। কুরআন নাযিলের সময় এমন বহু লোক জীবিত ছিল যারা এঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী ছিল। সূরা ফীলে এদিকেই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, “সে সময়ে তোমাদের সত্যিকার রব ছাড়া আর কে ছিল যে ষাট হাজার আক্রমণকারীদের নির্মূল করে তোমাদেরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছিল?” আর এ দিকেই সূরা কুকরাইশে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে, -“সেই মহান খোদার বন্দেগী করো যাঁর ঘরে আশ্রয়গ্রহণ করে তোমরা ধ্বংস থেকে বেঁচে গেছ এবং তোমরা আরবে এ নিরাপত্তা, নির্ভরতা ও সুখসাচ্ছন্দ্য লাভ করেছ। এ নিয়ামতদাতা সেই আল্লাহ, সে সব মাবুদ নয় যাদেরকে তোমরা তাঁর ঘরে একত্র করে রেখেছ এবং যাদের সম্পর্কে তোমরা স্বয়ং জান যে, তারা তোমাদের ধ্বংস থেকে বাঁচাতে পারতো না।

৩. প্রাকৃতিক ব্যবসাথা থেকে যুক্তি প্রমাণ

উপরেরর দু’টি যুক্তি প্রমাণের সাথে কুরআনের স্থানে স্থানে বিস্তারিতভাবে বিশ্ব প্রকৃতির গোটা ব্যবস্থাপনা থেকে এ বিষয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী যক্তি পেশ করা হয়েছে যে, এ গোটা সৃষ্টি জগতের খোদা একই জন এবং একই হতে পারে। এখানেও আমরা শুধু আয়াতসমূহের তরজমা পেশ করছি।

“হে লোকেরা! বন্দেগী করো তোমাদের সেই রবের যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা অতীত হয়েছে তাদেরকে পয়দা করেছেন। আশা রা যায় যে, তোমরা (অন্যান্যদের বন্দেগী করার পরিণাম থেকে) বেঁচে যাবে। সেই প্রভু যিনি তোমাদের জন্যে জমিনকে বিছানা এবং আসমানকে ছাদ বানিয়েছেন। আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। তারপর তার থেকে হরেক রকমের ফসল উৎপন্ন করেছেন- যা তোমাদের জীবিকায় পরিণত হয়েছে। অতএব তোমরা জেনে বুঝে অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষ বানায়ো না।” (বাকারা: ২১-২২)

“তাঁর নিদর্শনাবলীর একটি এই যে, তিনি তোমাদের মাটি থেকে পয়দা করেছেন। অতঃপর তোমরা মানুষরূপে দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে থাক এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে একটি এই যে, তিনি তোমাদেরই প্রজাতি থেকে তোমাদের স্ত্রী বানিয়েছেন যাতে তোমরা তাদের কাছ থেকে প্রশান্তি লাভ খরতে পারো। তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া-অনুকম্পা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। নিশ্চিতরূপে এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তাভাবনা করে। এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি, তোমাদের ভাষা এবং বর্ণের বিভিন্নতা রয়েছে। অবশ্য এ সবের মধ্যে অনেক নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্যে। এবং তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে তোমাদের রাত ও দিনের দ্রিা এবং তাঁর অনুগ্রহ জীবিকার অনুসন্ধান। অবশ্যই এর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্যেযারা (মনোযোগসহ কথা) শুনে। তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এটাও যে, তিনি তোমাদেরকে বিদ্যুত-স্ফূরণ দেখান ভয় ও আশা উভয়ের সাথে। এবং আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। এবং তার দ্বারা মৃত জমিনকে জীবিত করেন। অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে বিবেকবাদনদের জন্যে। তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এও যে আসমান ও জমিন তাঁর আদেশে স্থিতিশীল হয়ে আছে। অতঃপর যখনই তিনি তোমাদের জমিন থেকে ডাক দেবেন, তখন একই ডাকে তোমরা অকস্মাৎ বেরিয়ে আসবে। আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সবই তাঁর বান্দাহ। সবই তাঁর অনুগত। তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন এবং তিনিই তাঁর পুনরাবৃত্তি করবেন। এবং এটা তাঁর জন্যে সহজতর। আসমান ও জমিনে তাঁর গুণাবলী সর্বোত্তম এবং তিনি অত্যন্ত পরাক্রমশালী এবং বিজ্ঞ।” (রুম: ২০-২৭)

“প্রকৃতিপক্ষে তোমাদের রব সেই আল্লাহ যিনি আসমান ও জমিন চয় দিনে পয়দা করেছেন। অতঃপর আরশে (সৃষ্টি জচগতের সাম্রাজ্যের সিংহাসন) সমাসীন হন। যিনি রাতকে দিনের উপর প্রসারিত করে দেন। তাপর দিন রাতের পেছনে দৌড়ে আসে। যিনি সূর্য, চন্দ্র ও তারকারাজি পয়দা করেছেন। সক