সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ

রেসালাতে মুহাম্মদীর উপর ঈমানের দাওয়াত

দাওয়াতে ইসলামীর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ ছিল যে, এক ও লা-শরীক আল্লাহকে একমাত্র মাবুদ ও একমাত্র শাসক ও প্রভুত্ব কর্তৃত্বের মালিক মেনে নেয়অর পর একথাও মেনে নিতে হবে যে রসূলই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পয়গম্বর যার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মানুষকে হেদায়েত দান করেন, হুকুম-আহকাম প্রদান করেন, এবাদতের পন্থাপদ্ধতি শিক্ষা দেন, সঠিক আকিদা-বিশ্বাস শিক্ষা দেন, আমল আখলাকের সঠিক ও ভ্রান্ত মূলনীতির পার্থক্য শিক্ষা দেন। তাপর নিজের সেসব আইন-কানুনও পাঠিয়ে দেন যার অনুকরণ-অনুসরণ মানুষকে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে করতে হয়। এজন্যে আল্লাহর তৌহীদের উপর ঈমান আনার পর লোকের জন্যে এ পরিহার্য় যে, তারা রসূলের রেসালাতের উপর ঈমান আনবে। তঁঅকে আল্লাহর মর্জির একাত্র প্রতিনিধি মেনে নেবে। সকলের আনুগত্য পরিহার করে তাঁরিই আনুগত্য করবে। অন্যান্য সকল আনুগত্য পরিত্যাগ করে ঐসব আহকাম ও হেদায়েতের অনুসরণ করবে যা রসুল তাঁর প্রেরণকারী এক খোদার পক্ষ থেকে দেন। এভাবে এ রেসালাতের বিশ্বাস সেই বিরাট বিপ্লবকে বাস্তব রূপ দান করছিল যা আল্লাহর তৌহীদ স্বীকার করিয়ে ইসলাম মানব জীবনে সংঘটিত করতে চাইতো। কারণ তৌহীদ মেনে নেয়ার পর যখন মানুষ এ কথায় নিশ্চিত হয়ে যায় যেঙ, এখন তাকে আল্লাহরই এবাদত বন্দেগী করতে হবে এবং তারই হেদায়েত অনুযায়ী চলতে হবে। তখন প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, সে তার এ বিশ্বাসকে বাস্তাবায়িত করবে কিভাবে? কিভাবে সে জানতে পারবে যে, আল্লাহর এবাদত বন্দেগীর সঠিক পন্থা কি এবং তাঁর সে হেদায়েত কি যা এখন মে চলতে হবে। কুরআন বলে সে পন্থা পদ্ধতি চিরকালই এই ছিল যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে কোন একজনকে তাঁর রসূল বানিয়ে তাঁকে এমন সব বিষয়ের জ্ঞান দান করেন যার উপর আমল করা তাঁরি মর্জি তোমাবেক। তাঁর বন্দেগী করার এ ছাড়া অন্য কোন বাস্তব পন্থা নেই যে, রসূলের রেসালাত মেনে নিয়ে তারেই অনুকরণ-অনুসরণ করতে হবে। এভাবে বিভিন্ন বিশ্বাস ও চিন্তাধারা, কুসংস্কার ও ধ্যান-ধারণা, দ্বীন ও ধর্ম, রেসেম-রেওয়াজ ও রীতিনীতি এবং বিভিন্ন বাতিল খোদার দাসত্ব আনুগত্যে বিভক্ত মানবতা একই কেন্দ্রে একীভূত হয়ে যায় এবং সেই দ্বীন বাস্তবে কায়েম হয়ে যায় যার উপর মানব জাতিকে একত্র ও একীভূত করা ইসলামী দাওয়াতের উদ্দেশ্য।

এ প্রসংগে কুরআন মাজিদের শিক্ষা নিম্নক্রমানুসারে যদি দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি পুরোপুরি হৃদয়ংগম করা হযা।

সৃষ্টির সূচনাকালে নবী প্রেরণের ঘোষণা

নবুয়ত সম্পর্কে প্রথম যে কথাটি কুরআনে বলা হয়েছে, তা এই যে, পৃথিবীতে মানব জাতির সূচনা লগ্নেই আদম সন্তানদের এইবলে সাবধঅন করে দেয়া হয় যে, রসূলগণেল মাধ্যমে যে হেদায়েত তাদের নিকটে পাঠানো হবে তার আনুগত্য তাদেরকে করতে হবে।

(আরবী**************)

-হে আদম সন্তানেরা! যদি তোমাদের কাছে স্বয়ং তোমাদের মধ্য থেকে (অর্থাৎ মানুষের মধ্য থেকে) এমন রসূল আসে যে তোমাদেরকে আমার আয়াত শুনাবে, তাহলে যে কেউ নাফরমানী থেকে দূরে থাকতবে এবং নিজের আচরণ সংশোধন করবে তার জন্যে ভয়ভীতি ও দুঃখ কষ্টের কোন কারণ থাকবে না। আর যারা আমাদের আয়াত প্রত্যাখ্যান করবে এবং তার মুকাবিলায় বিদ্রোহ করবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হবে যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। (আ’রাফ: ৩৫-৩৬)

রসূলদের মানা না মানার উপর মানুষের সাফল্য ও ক্ষতি নির্ভরশীল

একথাই সূরা বাকারা ৩৮-৩৯ আয়াত এবং সূরা তা’হা ১২৩-১২৪ আয়াতে বলা হয়েছে, যেখানে পৃথিবীতে আদম ও হাওয়া আলায়হিসসালামকে পাঠানোর উল্লেখ আছে। এখানে এ খবরই দেয়া হয়নি যে মানুষের হেদায়েতের জন্যে রসূল পাঠানো হবে বরঞ্চ এ সতর্ক বাণীও উচ্চারণ করা হয়েছে যে, তাদের সাফল্য ও ক্ষতি নির্ভর করে এ বিষয়ের উপর যে তারা রসূলগণেল হেতায়ত কবুল করে তাকওয়া ও সংশোধনের পথ অবলম্বন করেছে কি না! না করলে দুনিয়াতেও শাস্তি ভোগ করবে এবং জাহান্নামের শাস্তিও ভোগ করবে। বস্তুতঃ স্থানে স্থানে দুনিয়ায় বিভিন্ন জাতির উপর আযাব আসার কারণ এই বলা হয়েছে যে, তারা তাদের নিকটে আগত রসূলগণের কথা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে যেমন:

(আরবী*****************)

-এবং এরা কি জমিনে চলাফেরা করে দেখেনি যাতে করে তারা ঐসব লোকের পরিণাম দেখতে পেতো যারা এদের পূর্বে অতীত হয়েছে? তারা এদর থেকে (কুরাইশ থেকে) অধিক শক্তিশালী ছিল এবং অনেক বেশী শক্তিশালী নিদর্শনাদি পৃথিবীর বুকে রেখে গেছে। তাপর আল্লাহ তাদের পাপের জন্যে তাদেরকে পাকড়াও করেন এবং তাদেরকে আল্লাহর থেকে বাঁচাবার কেউ ছিল না। এ পরিণাম তাদের এ জন্যে হয়েছিল যে, রসূলগণ তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিল। কিন্তু তারা তা মানতে অস্বীকার করে। অবশেষে আল্লাহ তাদেরকে পাকড়াও করলেন। নিশ্চিতরূপে তিনি বড়ো শক্তিশালী এবং শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর।

প্রায় একই ধরনের কথা সূরা ফাতের ২৫-১৬ আয়াত এবং সূরা তাগাবুন ৫-৬ আয়াতেও বলা হয়েছে। কুরআন ঐসব জাতির গল্প কাহিনীতে ভরপুর যারা তাদের যমনার রসূলগণকে অস্বীকার করেছে এবং অবশেষে দুনিয়াতেই তারা শাস্তির সম্মুখীন হযেছে।

তাপর আখেরাত সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ওখানে মানুষের উপর আল্লাহর যুক্তি প্রমাণ এ কথার উপর প্রতিষ্ঠিত হবে যে, তাদের কাছে রসূল পাঠিয়ে হক ও বাতিলের পার্থক্য এবং সত্য সরল পথ পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছিল। এতদসত্ত্বেও তারা তাদেরকে মানেনি এবং তাঁদের আনুগত্য করেনি। এ জনে তারা এখন শাস্তির যোগ্য।

(আরবী*************)

-হে মুহাম্মদ! আমরা তোমার নিকটে সেভাবেই অহী পাঠিয়েছি যেভাবে নূহ এবং তারপর আগমণকারী নবীদের প্রতি, এসব রসূ সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হিসাবে পাঠানো হয়েছিল যাতে তাদের পাঠিয়ে দেয়ার পর লোকের কাছে আল্লাহর মোকাবিলায় কোন যুক্তি বাকী না থাকে। (নিসা: ১২৩-১২৪)

অর্থাৎ এসব পয়গম্বরেরর কাজ এ ছিল যে, যারা তাদের আনীত শিক্ষার উপর ঈমান এনে নিজের চিন্তাধারা ও কাজকর্ম তদানুযায়ী পরিশুদ্ধথ করেছে এবং তাদেরকে সাফল্য ও সৌভাগ্যের সুসংবাদ দিয়েচেন। আর যারা ঈমান আনেনি এবং চিন্তা ও কাজের ভ্রা্ত পথে চলা পরিত্যাগ করেনি, তাদেকে ভয়াবহ পরিণামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এসব পয়গম্বর পাঠানোর উদ্দেশ্য এই ছিল যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁদের মাধ্যমে সত্য পথ পরিষ্কার করে বলে দিয়ে মানবজাতির উপর তাঁর যুক্তি প্রমাণ চূড়ান্ত করতে চাইতেন যাতে করে বলে দিয়ে মানবজাতির উপর তাঁর যুক্তি প্রমাণ চূড়ান্ত করতে চাইতেন যাতে করে আখেরাতের আদালতে কোন কাফের ও অপরাধী ও ওজর পেশ করতে না পারে যে, তাদের প্রকৃত সত্য বলে দেয়ার কোন ব্যবস্থাপনা করা হয়নি এবং এখন তাদেরকে বেখবর অবস্থায় পাকড়াও করা হচ্ছে।

আখেরাতের উল্লেখ করতে গিয়ে কুরআনে সতর্কবাণী উচ্চার করা হয়েছে যে, রেসালাতের অস্বীকারকারী ও বিরোধীতাকারীদের সকল আমল সেখানেই বিনষ্ট হয়ে যাবে যে আমল তারা নেক মনে করতো। তারপর যখন তাদেরকে জাহান্নামে ঢুকানো হবে তখন তাদেরকে বলা হবে –রসূলগণের মাধ্যমে তোমাদের জন্যে সকল যুক্তি ও দলিল প্রমাণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ জন্যে এখন তোমরা শাস্তি ভোগ করছ এবং প্রকৃত পক্ষে এ শাস্তিরই তোমরা যোগ্য।

(আরবী*****************)

-যারা মেনে নিতে অস্বীকার করেছে [অর্থাৎ রসূল (সা) এবং তার আনীত শিক্ষাকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে-গ্রন্থকার] এবং আল্লাহর পথ থেকে বিরত রেখেছে [মূলত ‘সাদ্দু আন সাবীলল্লিাহ’ বাক্য ব্যবহৃত হয়েছে। ‘সাদ্দ’ শব্দটি আরবী ভাষায় সকর্মক ও অকর্মক দু  অর্থেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ কারণে এ বাক্যের অর্থ এও যে, স্বয়ং আল্লাহর পথ অবলম্বন করা থেকে বিরত থাকে। আবার এ অর্থও হয় যে, তারা অন্যদের এ পথে আসতে বাধা দেয়। বিরত রাখারও কয়েকটি অবস্থা রয়েছে। এক, ব্যক্তি জোরপূর্বক কাউকে ঈমান আনতে বিরত রাখে। দ্বিতীয়ত, ঈামন আনয়ানকারীর উপর এমন যুলুম নির্যাতন চালায় যে, তার ঈমানের ওপর টিকে থাকা এবং অন্যান্যদের এ ধরনের ভীতিজনক অবস্থায় ঈমান আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, তারা আল্লাহর দ্বীন এবং তা উপস্থাতপনকারী রসূলের বিরুদ্ধে লোকদেরকে প্রতা্রত করেও এমন ওয়াসওয়াসা অন্তরে ঢেলে দেয় যে, লোকেরা বিভ্রান্ত হয়ে আল্লাহর পথে আসতে বিরত থাকে। এছাড়া প্রত্যেক কাফির সমাজ আল্লাহর পথে এক বিরাট প্রতিবন্ধক শক্তি। কারণ তারা তাদের শিক্ষা সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো, রসম রেওয়াজ এবং ধর্‌মীয় গোঁড়ামীর দ্বারা দ্বীনে হক সম্প্রসারণে শক্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে- গ্রন্থকার] ও রসুলের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে এমন অবস্থায় সত্য পথ তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়েছিল, তারা আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। বরঞ্চ আল্লাহই তাদের সকল কর্মকান্ড বিনষ্ট করে দেবেন। (মুহাম্মদ: ৩২)

এমন অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন-

(আরবী******************)

-হে জ্বিন ও মানুষের দল! তোমাদের কাছে কি স্বয়ং তোমাদের মধ্য থেকেই সে রসূল আসেননি যে তোমাদেরকে আমার আয়অত শুনাতো এবং এ দিনের পরিণাম সম্পর্কে তোমাদেরকে ভয় দেখাতো? তারা বলবৈ, “আমরা আমাদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দিচ্ছি।”

দুনিয়ার জীবন তাদেরকে প্রবঞ্চিত করে রেখেছিল। কিন্তু আখেরাতে তারা নিজেদের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেবে যে, তাঁরা কাফের। এ সাক্ষ্য তাদের থেকে এ জন্যে নেয়া হবে যেন এ কথা প্রমাণিত হয় যে, তোমাদের রব জুলুম সহকারে জনপদগুলোকে ধ্বংস করেননি এমন অবস্থায় যে জনপদবাসী হক সম্পর্কে বেখবর ছিল। (আনয়াম: ১৩০-১৯১)

(আরবী**********************)

-যখনই কোন একদল মানুষ তার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তার কর্মচারীগণ বলবৈ, তোমাদের নিকটে কি কোন সাবধানকারী আসেনি? [এ প্রশ্রে ধরণটা এমন হবে না যে, জাহান্নামের কর্মচারীগণ তাদেরকে এ কথা জিজ্ঞেস করতে চাইবে যে, তাদের কাছে কোন সাবধানকারী এসছিল কি না। বরঞ্চ প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য তাদেরকে এ কথা বুঝিয়ে দেয়া যে, জাহান্নামে নিক্ষেপ করে তাদের প্রতি কোন অবিচার করা হয়নি। এজন্যে তারা তাদের মুখ দিয়ে এ কথা স্বীকার করাতে চাইবে যে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে বেখবর রেখেছিলেন না তাদের কাছে নবী পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা নবীদের কথা মনেনি। এ জহন্যে যে শাস্ তাদেরকে দেয়া হচ্ছে তার জন্যে তার যোগ্য -(গ্রন্থকারের টীকা)।]  তারা বলবে, হ্যাঁ সনাবধানকারী এসেছিল। কিন্তু আমরা তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহর কিচুই নাযিল করেননি এবং তোমরা বড়োই গোমরাহিতে লিপ্ত আছ। তরপর তারা বলবে, হায়রে, যদি শুনতাম এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করতাম তাহলে এ জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি ভোগ করতে হতো না। এভাবে তরা তাদের পাপের স্বীকৃতি দেবে। এসব জাহান্নামবাসীর উপর অভিসম্পাৎ। (মূরক: ৮-১০)

এ বক্তব্যের সাথে মিলে যায় এমন কথা সূরা যুমারের ৭১-৭২ আয়াতে বলা হয়েছে। এর থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, ইসলামে রেসালাতের গুরুত্ব এতো বেশী যে, তা মানা না মানার উপর দুনিয়া থেকে আখেরাত পর্য়ন্ত মানুষের সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য নির্ভরশীল।

সক

সকল জাতির কাছে কাছে নবী এসেছিলেন এবং তাঁদের দাওয়াত একই ছিল

কুরআনে এ কথাও বলা হয়েছে যে, মানব জাতির সূচনা থেকেই সকল জাহির মধ্যে নবী আগমন করতে থাকেন। তাঁদের সকলের দ্বীন ছিল এক। সকলের দাওয়াতও ছিল এক। সকলের আগতমনের উদ্দেশ্যও ছিল এক। তাঁদের সকলের দাবী এই ছিল যে, মানুষ আল্লাহর নাফরমানী থেকে বাঁচুক এবং তাঁর আনুগত্য করুক।

(আরবী**************)

-কোন উম্মত এমন অতীত হয়নি যার কাছে কোন সাবধানকারী আসেনি। (ফাতের: ২৪)

(আরবী**************)

প্রত্যেক জাতির জন্যে একজন পথ প্রদর্শক ছিল। (রা’দ: ১৭)

(আরবী************)

-আমরা এমন কোন জনপদ ধ্বংস করিনি যার জন্যে সাবধানকারী আসেনি। (শুয়ারা: ২০৮)

(আরবী***************)

আমরা প্রত্যেক জাতির জন্যে একজন রসূল (এ দাওয়াত দেয়ার জন্যে) পাঠিয়েছি যে, আল্লাহর বন্দেগী কর এবং তাগুতের বন্দেগী থেকে দূরে থাক। (নহল: ৩৬)

হযরত নূহ (আ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত প্রত্যেক নবীর মনাম নিয়ে বলা হয়েছে যে, তাদের প্রত্যেকে আপন জাতির কাছে এ কথা বলেছে- (আরবী*********) –আলআহকে ভয় কর এবং আমর আনুগত্য কর। (দেখুন আলে ইমরান: ৫০, শুয়ারা: ১০৮, ১১০, ১২৬, ১৩১, ১৪১২, ১৫০, ১৬৩, ১৭১, যুখরুফ: ৬৩, নূহ: ৩)

নবীগণের আগমেনর উদ্দেশ্য

তারপর বলাহয় সকল নবীর আগমণের উদ্দেশ্য এ ছি:-

(আরবী*************)

-আমরা আমাদের নবীদেরকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সাথে নাযিল করেছি কিতাব ও মীযান যাতে মানুষ ইনসাফের উপর কায়েম হতে পারে। (হাদীদ: ২৫)

ইনসাফের উপর কায়েম হওয়ার অরথ নিজের সাথে, খোদার সাথে এবং এমন প্রতিটি মানুষের সাথে ইনসাফ যার সাথে সম্পৃক্ত হওয়া যায়। আপন সমাজের মধ্যে, প্রতিটি লেনদেন, আপন তাহযিব ও তামাদ্দুনে, রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায়, বিচারালয়ে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্পর্কে ইনসাফ। মোটকথা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে সকল দিক দিয়ে জীবনের প্রতিটি বিভাগ ও দিকে ইনসাফ কায়েম সকল নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য।

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেসালাত

নবুয়ত ও রেসালাতের ইতিহাস এবং তার যথার্থতার এ পটভূমিতে প্রথমে কুরাইশকে, তাপর আরবাসীকে এবং অতঃপর গোটা দুনিয়াকে এ কথা বলা হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা) ঐসব রসূলেরই অন্তর্ভুক্ত যাঁদেরকে তাঁর পূর্বে পাঠানো হতে থাকে। তিনি এমন দ্বীন নিয়ে এসেনে যা মানব জাতির জন্মসূচনা থেকে সকল নবীরই দ্বীন ছিঃল। সেই দ্বীনকে সকল ভেজাল ও বিকৃতি থেকে পাক পবিত্র করে তার প্রকৃত ও খাঁটি রূপ ও আকৃতিসে পেশ করার জন্যে- নবী মুহাম্মদের(সা) আগমন হয়েছিল। এখন খোদার দ্বীন, তাঁর শরীয়ত, তাঁর আইন-কানুনস এবং তাঁর হুকুম-আহকাম এমন যা নবী (সা) নিজের পক্ষ থেকে নয়, বরঞ্চ খোদার প্রেরিত অহীর ভিত্তিতে পেশ করছেন। তাঁর আনুগত্য খোদার আনুগত্য এবং তাঁর নাফরমানী খোদার নাফরমানী। অতএব মানুষের শুধু এ কথার উপর ঈমান আনাই যথেষ্ট নয় যে, তিনি খোদার রসূল। বরঞ্চ ঈমান আনার পর সকলের আনুগত্য পরিহার করে দ্বিধাহীনচিত্তে তাঁর (রসূলেল) আনুগত্য করতে হবে। তারণ, তাঁর হেদায়েত থেকে মুখ ফেরনোর অর্থ সেই খোদার আনুগত্য থেকে মুখ ফেরানো যিনি তাঁকে রসূল হিসাবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।

হুযুরের (সা) আগমনের পূর্বে আরববাসী একজন নবীর প্রতীক্ষা করছিল

উল্লেখ্য যে, আরববাসী তাদের চারপাশের ঈসায়ী, ইহুদী এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের অধঃপতিত নৈতিক অবস্থা ও তাদের অপকর্মাদি লক্ষ্য করে স্বয়ং এ কথা বলতৈা, “এসব জাতির নিকটে যে জিনিস এসেছিল তা যদি আমাদের কাছে আসতো –(অর্থাৎ রেসালাত এবং খোদার প্রেরিত হেদায়েত), তাহলে আমরা এদের সকলের চেয়ে উৎকৃষ্টতর উন্নত হওয়ার পরিচয় দিতাম।”

কুরআনে এ কথা প্রচার করা হয়েছে কিন্তু এমন কেউ ছিল না যে, এ কথা অস্বীকার করে।

(আরবী**************)

এসব লোক (কুরাইশ ও আরববাসী) কড়া কড়া কসম খেয়ে বলতো, যদি কোন সাবধানকারী (অর্থাৎ রসূল) তাদের কাছে আসতো তাহলে তারা দুনিয়ার অন্যান্য জাতি অপেক্ষা অধিক হেদায়াতপ্রাপ্ত হতো। কিন্তু যখন সাবধানকারী তাদের নিকট এসে গেল তখন তার আগমন সত্য দ্বীন থেকে পলায়ন ব্যতীত আর কিছু বৃদ্বিধ করেনি। এরা দুনিয়াতে আরো বেশী গর্ব অহংকার করতে লাগলো (তাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে) নিকৃষ্টতম কলাকৌশল অবলম্বন করতে লাগলো। অথচ এ কলা কৌশল যারা অবলম্বন করে এ তাদেরকেই ধ্বংস করে। (ফাতেরঢ়:৪২-৪৩)

(আরবী****************)

-এসব লোক আগে ত বলতো হায়রে, যদি আমাদের নিকট সে যিকির (আল্লাহর নসিহতের পয়গম) থঅকতো যা অতীতের জাতিগুলো পেয়েছিল, তাহলে আমরা আল্লাহর একনিষ্ঠ বান্দাহ হতাম। কিন্তু তা এলো, এখন এরা তা মাতে অস্বীকার করলো। এখন শীঘ্রই এর পরিণাম এরা জানতে পারবে। (সাফফাত: ১৬৭-১৭০)

এর থেকে জানা গেল যে, রসূলের আগমন তাদের ইম্পিত অভিলাষ ছিল। কিন্তু সে নিয়ামত যখন তাদের কাছে পৌঁছলো তখন তরা বিরোধিতা, জিদ ও হঠকারিতা করা শুরু করলো।

হুযুর (সা) নবীগণের অন্তর্ভুক্ত এবং তাঁর জ্ঞানের উৎস সেই অহী যা ছিল সকল নবীর

এ সত্যতাকে সামনে রেখে দেখুন যে হুযুরের রেসালাতের পরিচিতি কুরআন কিভাবে করালো এবং তাঁর কি মর্যাদা পেশ করলো-

(আরবী************)

-কুরআন হাকিমের কসম, হে মুহাম্মদ, তুমি নিশ্চিতরূপে রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত। সত্য সঠিক পথের উপর। অর্থাৎ তুমি রসূলগণের অন্তর্ভুক্ত এবং তোমার রেসালাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ এই যে, এ বিজ্ঞতাপূর্ণ কুরআন তুমি পেশ কর। (ইয়াসীন:” ১-৪)

(আরবী****************)

-এবং এভাবে আমরা (হে মুহাম্মদ) এ আরবী কুরআন তোমার প্রতি অহী করেছি যাতে তুমি জনপদের কেন্দ্র (মক্কা) এবং তার চার ধারে অবস্থঅনকারীদেরকে সাবধান করতে পার। (শুরা: ৭)

(আরবী***************)

হে মুহাম্মদ, বলে দাও হে মানবজাতি! আমি  তোমাদের সকলের জন্যে খোদার পক্ষ থেকে প্রেরিত রসূল- যে খোদা আসমান ও যমিনের বাদশাহীর মালিক। (আ’রাফ: ১৫৮)

(আরবী*****************)

তিনি বড়ো বরকতপূর্ণ যিনি এ কুরআন (হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী) তাঁর বান্দার উপর নাযিল করেছেন যেন দুনিয়াবাসীদেরকে সাবধান করতে পারে। (ফুরকান: ১)

(আরবী****************)

-হে মুহাম্মদ! আমরা তোমার প্রতি সেভাবেই অহী প্রেরণ করেছি যেভাবে নূহ এবং তার পরবর্তীদের নিকটে প্রেরণ করেছি এবং যেভাবে অহী প্রেরণ করেছি ইব্রাহীম (আ), ইসমাইল (আ), ্বসিহাকত (আ), ইয়াকুব (আ), এবং ইয়াকুব সন্তানদের উপর এবং ঈসা (আ), আইয়ুব (আ), ইসউনুস (আ), হারুন (আ) এবং সুলায়মানের (আ) উপর এবং আমরা দাউদকে (আ) যবুর দান করি। (নিসা: ৬৩)

নবী মুহাম্মদের (সা) প্রেরণের উদ্দেশ্য

ইতিপূর্বে আমরা বলেছি যে, (সূরা হাদীদ আয়াত-২৫) তাঁর প্রেরণের উদ্দেশ্য তাই, যা ছিল সমস্ত নবীর প্রেরণের উদ্দেশ্য। তথাপি কুরআন মজিদে বিশেষভাবে তাঁকে রসূল হিসাবে নিয়োগ করার উদ্দেশ্য বিশদভাবে কুরাইশ ও আরববাসীর কাছে বয়ান করা হয়েছে। তা আমরা ধারাবাহিকভাবে উদ্ধৃত করছি।

তাঁর নবুওয়ত চিরন্তন ও বিশ্বজনীন

তিনি কোন এক বিশেষ জাতির জন্যে নন এবং আপন যুগের সকল মানুষের জন্যেও নন, বরঞ্চ কিয়ামত পর্যনত সকল মানুষের জন্যে রসূল-যাদের যাদের নিকটে তাঁর পয়গাম পৌঁছে।

(আরবী**************)

-এবং এ কুরআন আমার উপর অহীর মাধ্যমে এ জন্যে পাঠানো হযেছে যে, তোমাদেরকে এবং যার যার কাছে এ পৌঁছে তাদেরকে সাবধান করে দেব। (আনয়াম: ১৯)

তিনি সকল বিকৃতি মুক্ত বিশুদ্ধ দ্বীন পেশকারী

তাঁর পূর্ববর্তী নবীগণের আনীত শিক্ষার খন্ডন নয়, বরঞ্চ তার সত্যতা স্বীকারকারী। তাঁর উপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয় যে, পূর্ববর্তী নবীগণের শিক্ষার মধ্যে পরবর্তীকালে যেসব মিশ্রণ ঘটেছিল, তা ছেঁটে ফেলে দিয়ে সেই প্রকৃত দ্বীন তার বিশুদ্ধ আকারে পেশ করবেন যা সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে মানবজাতির জন্যে খোদার নির্ধারিত একই দ্বীনে হক ছিল।

তিনি যে পূর্ববর্তী নবীকগণের শিক্ষঅর খন্ডন করতে নয় বরঞ্চ সত্যতা স্বীকারকারী ছিলেন একথা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বয়ান করা হয়েছে। যেমন:

(আরবী*************)

-বরঞ্চ (মুহাম্মদ সঃ) সত্যসহ আগমন করেছেন এবং তিনি খোদা প্রেরিত সকল নবীর সত্যতা স্বীকার করেন। (সাফফাত: ৩৭)

(আরবী*************)

-এবং এ কুরআন সে জিনিস নয়- যা খোদার অহী ব্যতীত স্বয়ং রচনা করা যায়। বরঞ্চ ইতিপূর্বৈ যা কিছু এসেছিল এ হচ্ছে সে সবের সত্যতার স্বীকৃতি এবং আল বিতাবের (খোদার পক্ষ থেকে আগত প্রত্যেক কিতাব) বিশদ বিবরণ। এর রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে হওয়াতে কোন সন্দেগ নেই। (ইউনুস: ৩৭)

‘কিতাবের বিশদ বিবরণ’ এর মর্ম এই যে, ঐ সব মৌলিক শিক্ষা ও হেদায়েত যা খোদার কিতাবের মাধ্যমে প্রথমে এসেছিল তার সারাংশ এ কিতাবে এসে গেছে। বরঞ্চ এর মধ্যে তা অধিকতর বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ কথাও কুর্ন মজিদের স্থঅনে স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর যারা ওয়ারিস হয়েছিল, তারা নিজেদের পক্ষ থেকে বহু কিছু পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছে। এ জন্যে হুযুর (সা)-এর কাজ এটাও যে তিনি তাদেরকে আলাদা করে খোদার শরিয়তে যা প্রকৃত হারাম তাকে হারাম এবং যা প্রকৃতি হালাল তাকে হালাল করবেন।

(আরবী*************)

-অতএব ধ্বংস তাদের জন্যে যারা স্বয়ং নিজের হাতে একটি কিতাব লেখৈ এবং তারপর বলে যে এ আল্লাহর পক্ষ থেকে। (বাকারাহ: ৭৯)

(আরবী*****************)

-তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা কিতাব পড়ার সময় এমনভাবে জিহ্বা উলটপালট করে যাতে তোমরা বুঝে নাও যে, তারা যা কিছু পড়ছে তা কিতাবেরই মূল বচন। অথচ তা কিতাবের মূল বচন নয়। তারা বলে যে এ আল্লাহর পক্ষ থেকে। অথচ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। তারা জেনেশুনে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। (আল ইমরানস: ৭৮)

এর ভিত্তিতে নবী (সা) এর উপর এ দায়িত্ব আরোপিত হয় যে সকল ভেজাল থেকে মুক্ত বিশুদ্ধ দ্বীনে হকের শিক্ষা পেশ করবেন। আর যা কিচু তার মধ্যে হারাম আছে তাকেই হারাম এবং যা কিচু তার মধ্যে হালাল আছে তাকে হালাল গণ্য করবেন।

(আরবী*************)

-আহলে কিতাব ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফের ছিল তারা (তাদের কুফরী থেকে) বিরত থাকতে প্রস্তুত ছিল না যতক্ষণ না তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ আসে। (অর্থাৎ) আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন এমন রসূল যিনি (সকল ভেজাল থেকে মুক্ত) পবিত্র সহিফা পড়ে শুনাবে যার মধ্যে একেবারে সত্য সঠিক বক্তব্য লিখিত আছে। (বাইয়েনাহ: ১-৩)

(আরবী******************)

-(এ উম্মী নবী) তাদেরকে ভালো কাজের আদেশ করে এবং মন্দ কাজ করতে নিষেধ করে। তাদের জন্যে পাক জিনিস হালাল করে এবং নাপাক জিনিস হারাম করে। (অর্থাৎ তাদের ইচ্ছাকৃত হালাল ও হারাম রহিত করে) এবং তাদের উপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে ফেলে এবং সে বাধাবন্ধন খুলে দেয় যা তাদের  উপর চাপানো ছিল। (আ’রাফ: ১৭৫)

কথা ও কাজের দ্বারা আহকামে ইলাহীর ব্যাখ্যাদান ও তাযকিয়ায়ে নফস

নবী মুহাম্মদ (সা)-এর উপরে শুধু এ দায়িত্বই ছিল না যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে অহীর মাধ্যমে যে জ্ঞঅন তাঁকে দেয়া হয় তা তিনি লোকের মধ্যে পৌঁছিয়ে  দেবেন। বরং এ কাজের দায়িত্বও ছিল যে, স্বয়ং আল্লাহর পক্ষ থেকে ঐ সব হুকুম-আহমামের যে মর্ম তাঁকে বলে দেয়া হয়েছিল তদনুযায়ী  নিজের কথা ও কাজের দ্বারা দ্বীনের আকায়েদ, আহকাম, হেদায়েত, আইন-কানুন প্রবৃতির ব্যাখ্যা করবেন এবং তার ভিত্তিতে লোকের মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে তাদের বিকৃত জীবনধারাকে পরিশুদ্ধ ও সুশৃংখল করবেন।

-এ কুরআন তোমাকে স্বরণ করিয়ে দেয়া এবং পড়িয়ে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। অতএব, হে নবী! আমরা তা পড়ি তখন তুমি তার পাঠ শুনতে থাক। তারপর তার মর্ম বুঝিয়ে দেয়াও আমাদের দায়িত্ব। (কিয়ামাহ: ১৭-২৯)

(আরবী***************)

-এবং (হে নবী) এ যিকির (অর্থাৎস কুরআন) আমরা তোমার প্রতি এ জন্যে নাযিল করেছি যে, তুমি লোকের কাছে সেই শিক্ষা ব্যাখ্যা করতে থাকবে যা তাদের জন্যে নাযিল করা হয়েছে। (নমল: ৪৪) [এ নির্দেশ দানের মাধ্যমে আল্লাহ তায়অলা সেই পলিসি বর্ণনা করেন যার অনিবার্য দাবী এ ছিল যে, যিকর-এর সাথে একজন মানুষকে পয়গম্বর হিসাবে পাঠানো হোক। ‘যিকর’ তো ফেরেশতাদের মাধ্যমেও পাঠানো যেতে পারতো এবং ছাপিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে তা পৌঁছিয়ে দেয়া আল্লাহর সাধ্যের অতীত ছিল না। কিন্তু এতে করে প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারতো না। এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্যে প্রয়োজন ছিল যে, একজন যোগ্যতম ব্যক্তি তা নিয়ে আসবেন। কোন কিছু কেউ বুঝতে না পারলে তা তাকে বুঝিয়ে দেবেন। কারো মনে কোন দ্বিধা-সংকোচ সৃষ্টি হলে তা তিনি দূর করে দেবেন। কারো কোন আপত্তি-অভিযোগ থাকলে তার জবাব দেবেন। যারা মানবে না, বিরোধিতা করবে ও প্রতিবন্ধক হবে তাদের সাথে এমন আচরণ করবেন- যা যিকর আনয়নকারীর জন্যে মাানসই হবে। আর যারা মেনে নেবে তাদেরকে জীবনের প্রতিটি বিভাগ ও দিক সম্পর্কে হেদায়েত দেবেন। তাদের সামনে নিজের জীবনকে নমুনা হিসাবে পেশ করবেন। অতঃপর তাদেরকে তরবিয়ত দিয়ে সমগ্র দুনিয়ার সামনে এমন এক আদর্শ সমাজ গঠন করে দেখাবেন যার সামগ্রিক ব্যবস্থা এ যিকরের ইচ্ছরই প্রতিফলন হবে। -গ্রন্থাকরের টীকা]

(আরবী*************)

-তিনিই সেই আল্লাহ যিনি উম্মীদের মধ্যে একজন রসূল স্বয়ং তাদের মধ্য থেকেই আবির্ভূত করেছেন যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শুনায়, তাদের জীবন পরিশুদ্ধ করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। অথচ এর পূর্বৈ তারা সুস্পষ্ট গোমরাহিতে নিমগ্ন ছিল।ভ জুমুয়া: ২)

(আরবী****************)

-তিনিই সেই আল্লাহ যিনি বান্দাহ (মুহাম্মদগ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেন যাতে তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে বের করে আনতে পারে। (হাদীদ: ৯)

দ্বীনে হককে সমগ্র জীবন ব্যবস্থার উপর বিজয়ী করা

নবী মুহাম্মদের (সা) আগমনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই দ্বীন ও হেদায়েতকে সকল প্রকার আনুগত্য এবং জীবনের সকল পন্থা পদ্ধতির উপর বিজয়ী করা যা তিনি খোদার পক্ষ থেকে এনেছেন। কুরআনের তিনটি স্থঅনে এ উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সূরা তওবা ও সাফ- এ বলা হয়েছে:

-তিনিই সেই আল্লাহ যিনি তাঁর রসূলকে হেদায়েত ও দ্বীনে হকসহ পাঠিয়েছেন যেন সে তা সকল প্রকার দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থাপর উপর বিজয়ী করতে পারে- [আয়অত দু’টি ‘আদ্দীন’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার তরজমা আমরা করেছি –‘সর্বজাতীয় দ্বীন।’ আরবী ভাষায় দ্বীন শব্দটি যে জীবন ব্যবস্থা বা জীবন পদ্ধতির জন্যে ব্যবহুত হয়, যার প্রতিষ্ঠাতাদেরকে কর্তৃত্বশীল ও আনুগত্যের অধিকারী মেনে নিয়ে তাদের আনুগত্য করা হয়। অতএব রসূলের আগমনের উদ্দেশ্য এ আয়অতে এই বলা হয়েছৈ যে, যে হেদায়েত ও দ্বীনে হক খোদার পক্ষথেকে তাঁর রসূল নিয়ে এসেছেন, তাকে দ্বীন জাতীয় সকল পদ্ধতি ও ব্যবস্থার উপর তিনি বিজয়ী করবেন। অন্য কথায় রসূলের আগমন এ জন্যে হয়নি যে, যে জীবন ব্যবকস্থা আল্লাহ ব্যতীত অন্যান্যকে কর্তৃত্বশীল () আনুগত্যের অধিকারী মেনে নিতে চালু আছে, রসূলের আনীত দ্বীন তার অধীন হয়ে তার প্রদত্ব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তুষ্ট থাকবে। বরঞ্চ রসূল তো দুনিয়ঢা ও আসমানের বাদশাহ, প্রতিনিধি এবং সে জন্যে স্বীয় বাদশার সত্য ব্যবস্থাকে সকল পদ্ধতি ও ব্যবস্থার উপর বিজয়ী করতে চান। অ্য কোন ব্যবস্থা দুনিয়ায় থাকলে তাকে খোদায়ী ব্যবস্থার অধীনে তার প্রদত্ব সুযোগ-সুবিধা নিয়েই থঅকতে হবে। যেমন জিযিয়া আদায় করলে যিম্মীগণ তাদের জীবন ব্যবস্থা মেনে চলতে পারে। -গ্রন্থকারের টীকা]

তা মুশরিকদের জন্যে যতোই অসহনীয় হোক না কেন। (তওবা: ৩৩, সাফ্‌ : ১৮)

নবী মুহাম্মদের (সা) উপর ঈমান ও তাঁর আনুগত্যের আদেশ

এ উদ্দেশ্য সমানে রেখে মানুষকে এ আদেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং তাঁর আনুগহত্য করবে এবং এমনসব লোকের আনুগত্য পরিহার করবে যারা আল্লাহর থেকে উদাসীন ও আনুগত্যের সীমা লংঘনকারী।

(আরবী**************)(

-অতএব ঈমান আন আল্লাহ ও তাঁর রসূলের উপর এবং সেই নূরের উপর যা আমরা  নাযিল করেছি। এবং তোমরা যা কিছু করছ সে সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত। (তাগাবুন: ৮)

(আরবী***************)

-অতএব ঈমান আন আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর উপর যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের উপর ঈমান রাখে এবং তাঁর আনুগত্য কর যাতে তোমরা সত্য সঠিক পথ পেয়ে যাও। (আ’রাফ: ১৫৮)

(আরবী************)

-মেনে চল সেই হেদায়েত যা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্যে পাঠানো হয়েছে এবং তিনি ছাড়া অ্যান্য পৃষ্ঠপোষকদের আনুগত্য করো না। [অর্থাৎ দুনিয়অর জীবন যাপনের জন্যে তোমাদের  যে পথ নির্দেশনার প্রয়োজন, নিজের ও সৃষ্টিজগতের রহস্য এবং নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য উপলব্ধি করার জ্যৌ তোমাদের যে জ্ঞঅনের প্রয়োজন। আপন ধর্ম, নৈতিকতা, তাহযিব, সামাজিকতা ও তামাদ্দুন সঠিক বুনিয়াদের উপর কায়েম করার চন্যে যেসব মূলনীতির তোমরা মুখাপেক্ষী সেসবের জন্যে তোমাদের শুধুমাত্র সেই হেদায়েত মেনে চলা উচিত যা আল্লাহ তাঁর রসূলের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন। আল্লাহর নাযিল করা হেদায়েত পরিহার করে অন্য কোন পথপ্রদর্শনের শরণাপন্ন হওয়া এবং নিজেদেরকে তার আনুগত্যের অধীন করে দেয়া মানুষের জন্যে মূলতঃ একটি ভুল পদ্ধতি যার পরিণাম সর্বদা ধ্বংসের রূপপরিগ্রহ করেছে এবং সর্বদা করবে। এখানে আউলিযা (পৃষ্ঠপোষক) শব্দ এ মর্মে ব্যবহার করা হয়েছে যে, মানুষ যার কথায় চলে তাকে প্রকৃত পক্ষে তার অলী বা পৃষ্ঠপোশষক বানানো হয়- (গ্রন্থকারের টীকা)।]

(আরবী*******************)

-আমরা যে রসূল পাঠিয়েছি তা এ জন্যে যে খোদার নির্দেশে তা তাঁর আনুগত্য করতে হবে। (নিসা: ৬৪) [অর্থাৎ খোদার পক্ষ থেকে রসূল এ জন্যে আসেননি যে ব্যস তার রেসালাতের উপর ঈমান আন এবং তারপর আনুগত্য যার ইচ্ছা তার কর। বরঞ্চ রসূলের আগমনের উদ্দেশ্যই এই হয় যে জীবনের যে আইন-কানুন তিনি নিয়ে আসেন, সকল আইন পরিহার করে শুধু আইন মেনে চলতে হবে। খোদার পক্ষ থেকে যে নির্দেশ তিনি দেন, অন্যান্য সকল নির্দেশ পরিহার করে তা মেনে চলতে হবে। যদি কেউ তা না করে তাহলে তার রসূলকে রসূল বলে মেনে নেয়ার কোন অর্থ হয় না। -গ্রন্থাকরের টীকা]

(আরবী****************)

-যে রসূলের আনুগত্য করে সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ আনুগত্য করে। (নিসা: ৮০)

(আরবী***************)

-যা রসূল তোমাদেরকে দেয় তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখে তার থেকে দূরে থাক। (হাশর: ৭)

(আরবী****************)

-এবং যে আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে এবং আল্লাহকে ভয় করে তাঁর নাফরমানি থেকে দূরে থাকে, এমন লোক সফলকাম। (নূর: ৫২)

(আরবী***************)

-কোন ঈমানদার পুরুষ অথবা নারীর এ অধিকার নেই যে, যখন আল্লাহ ও তাঁর রসূল কোন বিষয়ের ফয়সালা করে দেন, তাহলে তাপর নিজের ব্যাপারে তার স্বয়ং (অন্য কোন) ফয়সালা করার অধিকার রাখবে। যারা আল্লাহ ও রসূলের নাফরমানি করলো তারা সুস্পষ্ট গোমরাহিতে নিমজ্জিত হলো। (আহযাব: ৩৬)

(আরবী*************)

-এবং এমন কোন ব্যক্তির আনুগত্য করো না যার মনকে আমরা আমাদের স্মরণ থেকে বিমুখ করে দিয়েছি এবং যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে ও যার কর্মপদ্ধতি সীমালংঘন করে। (কাহাফ: ২৮)

(আরবী****************)

-এবং ঐসব লাগামহীন লোকদের আনুগত্য করো না যারা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে এবং কোন সংস্কার সংশোধন করে না। [অর্থাৎ তোমাদের সেসব আমীর-ওমরা, সমাজপতি, নেতা ও শাসকদের আনুগত্য পরিহার কর যাদের নেতৃত্বে তোমাদের এ ভ্রান্ত জীবন ব্যবস্থা চলছে। এরা সীমালংঘনকারী। নৈতিকতার সকল সীমালংঘন করে লাগামহীন হয়ে পড়েছে। তাদের দ্বারা কোন সংস্কার সংশোধন সম্ভব নয়। তরা যে ব্যবস্থঅ চালাবে তাতে বিশৃংখলা-অরাজকতা অনিবার্য। তোমাদের কল্যাণের কোন পাথ যদি থাকে তাহলে তা হচ্ছে এই যে, তোমরা তোমাদের মধ্যে খোদাভীতি সৃষ্টি কর এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের আনুগত্য পরিহার করে আল্লাহর নবীর আনগত্য কর –(গ্রন্থকারের টীকা)।

(শু’য়ারা: ১৫১-১৫২)

(আরবী**************)

-হে নবী, বলে দাও যে, আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য কর। আর সে যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, (তাহলে সে যেন মনে রাখে) আল্লাহ এমন কাফেরদের পছন্দ করেন না। (আলে ইমরান: ৩২)

এখন আইন কানুন তাই যা আল্লাহ মুহাম্মদ (সা) এর মাধ্যমে দিয়েছেন

এভাবে নবী মুহাম্মদের (সা) রেসালাতের ঘোষণা এবং তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণের সাথে সাথে এও ঘোষণা করা হয় যে, এখন খোদার আইন তাই যঙা মুহাম্মদ (সা) এর মাধ্যমে দেয়া হয়েছে। এতে কারো মতবিরোধ করার অধিকার নেই। এর বিরুদ্ধে যা কিচু তা জাহেলিয়াত এবং তাগুতের বন্দেগী। রসূল (সা) খোদার নিয়োজিত শাসক যাঁর কাজ এই যে, লোকের কায়কারবারের মীমাংসা খোদার নাযিল করা হেদায়েত অনুযায়ী করবেন।

(আরবী****************)

-অতঃপর (বনী ইসরাইলের পর) হে নবী, আমরা তোমাকে দ্বীনের ব্যাপারে একটি সুস্পষ্ট রাজপথের (শরীয়তে) উপর কায়েম করে দিয়েছি। অতএব তুমি এ পথেরই অনুসরণ কর এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না যারা কোন জ্ঞান রাখে না। (জাসিয়া: ১৮)

(আরবী***************)

-প্রত্যেক উম্মতের জন্যে আমরা একটা ইবাদতের পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি-যা তারা অনুসরণ করে। অতএব, হে মুহাম্মদ (সা), এব্যাপারে তারা যেন তোমার সাথে ঝগড়া না করে। তুমি তোমার রবের দিকে দাওয়াত দাও। নিশ্চিতরূপে তুমি সঠিক পথে রয়েছ। (হজ্ব: ৬৭)

(আরবী******************)

-হে নবী! আমরা এ কিতাব সত্যসহ তোমার উপর নাযিল করেছি যাতে যে সঠিক পথ আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন তদনুযায়ী মানুষের মধ্যে ফয়সকালা কর। (নিসা: ১০৫)

কুরআন মজিদে স্থানে স্থানে মানব সমাজের জন্যে যেসব রীতিনীতি বর্ণনা করা হয়েছে তার জন্যে “আল্লাহর সীমারেখা” শব্দগুলো ব্রবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ এ এমন সীমারেখা যার ভেতরে থাকারই নির্দেশ দেয়া হযেছে। অতঃপর কোথাও কঠোরভাবে সাবধানস করে দেয়া হয়েছে যে এসব সীমারেখার নিকটেও যাওয়া না যায়। কোথাও বলা হয়েছে, এসব অতিক্রমকারী জালেম। কোথাও বলা হয়েছে, এসব অতিক্রমকারী নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করে। কোথাও এ সাবধন বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে যে, সীমালংঘনকারীদের জন্যে রছে জাহানানামের আগুন অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা: বাকারার ১৮৭, ২২৯, ২৩০ নং আয়াত, সুরা নিসার ১৩ও ১৪ নং আয়অত, সূরা মুজাদিলার ৪নং আয়অত, সূরা তওবার ৯৭ নং আয়াত এবং সূরা তালাকের ১ নং আয়াত দ্রঃ)

এর থেকে জানা গেল যে, যেসব আইন নবী (সা) এর মাধ্যমে মানব জাতিকে দেয়া হয়েছে তার গুরুত্ব কতখানি। তারপর পরিষ্কার ভাষায় সাবধান করে দেয়া হয়েছে:-

(আরবী***************)

-তবে কি এরা জাহেলিয়াতের ফয়সালা কামনা করে? অথচ যারা আল্লাহর উপর  ‍দৃঢ় বিশ্বাস রাখে তাদের জন্যে আল্লাহর চেয়ে ভালো হুকুম-ফয়সালা আর কার হতে পারে? (মায়েদা: ৫০)

(আরবী**************)

-তারা চায যে তাদের বিষয়াদি ফয়সালা করাবার জন্যে তারা তাগুতের শরণাপন্ন হবে। [এখানে তাগুত বলতে সুস্পষ্টরূপে সেই শাসককে বুঝানো হয়েছে যে আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন অনুযায়ী সিদ্ধঅন্ত করে এবং সে ব্চিার ব্যবস্থাকে বুঝানো হয়েছে যে না আললাহতায়ালার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে আর না আল্লাহর কিতাব এবং রসূলের হেদায়েতকে চূড়ান্ত সনদ বলে মেনে নেয়- গ্রন্থকার।] অথচ তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাগুতকে অস্বীকার করার জন্যে। শয়তান চায় যে তাদের পথভ্রষ্ট করে বহু দূরে নিয়ে যায়। (নিসা: ৬০)

দ্বীনের ব্যাপারে কোন প্রকার আপোস ও নমনীয়তার অবকাশ নেই

রসূলের আনুগত্য ও অনুসরণের সুস্পষ্ট নির্দেশ দেয়ার সাথে সাথে মানুষকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে যে, খোদার দ্বীনের ব্যাপারে কোন আপোস ও নমনীয়তা হতে পপারে না। কোন আকীদাহ-বিশ্বাস, কেজান নীতি, কোন রীতিপদ্ধতি এবং কোন হুকুমের মধ্যে কারো খাতিরে সামান্যতম রদবদলৗ হতে পারে না। যে মানতে চায়, তাকে সেই পরিপূর্ণ দ্বীন মেনে নিতে হবে যা রসূলুল্লাহ (সা) পেশ করেছেন। আর যে মানতে চায় না সে না মানুক। যে মানবে তার নিজেরই মঙ্গল হবে আর না মানলে তার নিজেরই ক্ষতি। এখানে দরকষাকষি ও লেনদেনে বুযঝাপড়ার কোন প্রশ্নই ওঠে না।

(আরবী*********************)

-(অতএব হে নবী), মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যানকারীদের চাপের মুখে কখনো নতি স্বীকার করো না। তারা চায় যে তুমি কিচুটা নমনীয় হও, তাহলে তরাও নমনীয় হবে। (অর্থাৎ তুমি ইসলামের তবলিগের কাজে কিছুটা ঢিল দাও তাহলে তারাও তোমার বিরোধিতায় কিছুটা নমনীয়তা অবলম্বন করবে। অর্থাৎ তুমি তাদের গুমরাহির সুযোগ দিয়ে নিজের দ্বীনের মধ্যে কিছুটা রদবদল কর, তাহলে তারা তোমার সাথে আপোস করে নেবে)।

(আরবী********************)

-এবং যখন তাদেরকে আমাদের আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট করে শুনিয়ে দেয়া হয় তখন যারা আখেরাতে আমাদের সাথে মিলিত হওয়ার আশা রাখে না তারা বলে, এটা বাদ দিয়ে অন্য কোন কুরআন নিয়ে আস অথবা এতে কিছু রদবদল কর। উপরের এ বিশদ বর্ণনায় এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামী আন্দোলনের দ্বিতীয় দফাটি অর্থাৎ মানুষের পক্ষ থেকে নবী মুহাম্মদের (সা) রিসালাতের স্বীকৃতি আদায় করা এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে তৈরী করা যে তারা আকায়েদ ও এবাদত থেকে শুরু করে জীবনে প্রতিটি বিভাগে সকল ব্যাপারে তাঁর পুরোপুরি আনুগত্য করবে- এ  বিষয়টি কতখানি সগুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুত্ব এই যে, এসব ব্যতীত দ্বীন কার্যতঃ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। রসূলের প্রতি ঈমান এবং বাস্তবে তাঁর আনুগত্য ব্যতীত তাওহীদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন অর্থহীন। চিন্তা করলে মানুষ এ কথা বুঝতে পারে যে, আল্লাহর তাওহীদ মেনে নেয়া

[মুশরিকদের এসব বক্তব্য প্রথমতঃ এ ধারণার ভিত্তিতে ছিল যে নবী (সা) যা কিছু পেশ করেছেন তা খোদার পক্ষ থেকে নয়। বরঞ্চ এসব তার নিজের মনগড়া। এসব খোদার প্রতি আরোপ করে পেশ করার অর্থ এই যে তঁঅর কথার গুরুত্ব বাড়বে। দ্বিতীয়তঃ তাদের কথার অর্থ এই, তুমি তাওহীদ, আখেরাত এবং নৈতিক বাধা নিষেধের এসবচ কি বলছ? তুমি যদি পথ দেখাবার জন্যে এসে থাক তাহলে এমন কিছু পেশ কর যার দ্বারা জাতির কল্যাণ হয় এবং তাদের পার্থিব উন্নতি চোখে পড়ে। তথাপি তুমি যদি তোমার এ দাওয়াত একেবারেই বদলাতে না চাও, তাহলে নিদেনপক্ষে এর মধ্যে কিচুটা সহজসাদ্যতা ও উপযোগিতা সৃষ্টি করে দাও, যাতে তোমার ও আমাদের মধ্যে কমবেশী একটা বুঝাপড়া হতে পারে। আমরা তোমাদের কিচু মেনে নেব এবং তুমিও আমাদের কিছু মেনে নেবে। তোমার তাওহীদে আমাদের কিচু শির্কের জন্যে, তোমার খোদা পুরস্তির মধ্যে আমাদের কিছু আত্মপূজা ও দুনিয়া পুরস্তির জন্যে এবং তোমার আখেরাতের আকীদার মধ্যে কিছু আমাদের এসব আশা-আকংখার কিছু অবকাশও যেন থাকে যাতে দুনিয়াতে আমরা যা খুশী করতে পারি। আখেরাতে আমাদের কোন না কোনভাবে অবশ্যই নাজাত হবে। তাপর তোমার এই যে অটল নৈতিক মূলনী, তা ত আমাদের জন্যে অগ্রহণযোগ্য। এসবের মধ্যে কিছু আমার কুসংস্কারের জন্যে, কিছু আমাদের রেসম-রেওয়াজের জন্যে, কিচু আমাদের ব্যক্তি ও জাতীয় স্বার্থের জন্যে এবং কিছু আমাদের মনের অভিলাষের জন্যেও স্থান থাকা উচিত। এমন যেন না হয় যে, দ্বীনের যে সব দাবী, তার একটা যথাযথ পরিমন্ডল তোমাপর ও আমাদের সম্মাতিক্রমে ঠিক হয়ে যায় এবং এতে আমরা খোদার হক আদায় করে দেব। তারপর আমাদের যেন স্বাধীন ছেড়ে দেয়া হয় যেন যেভাবে ইচ্ছা দুনিয়অর কাজ কাম আমরা চালাব। কিন্তু তুমি এ নিষ্ঠুরতা করছ যে, গোটা জীবন ও সকল বিষয়াদি তাওহীদ ও আখেরাতের আকীদাহ এবং শরীয়তের বিধি-বিধানের সাথে বেঁধে দিতে  চাচ্ছ- গ্রন্থকার।]

(হে মুহাম্মদ!) তাদেরকে বল, আমার এ অধিকার নেই যে, আমার পক্ষ থেকে তার মধ্যে কোন পরিবর্তন করি। আমি ত ব্যস্‌ সেই অহীর অুসারী যা আমার নিকটে পাঠানো হয়। (ইউনুস: ১৫)

(আরবী******************)

-এবং বলে দাও, এ হচ্ছে হক তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। এখন যার মন চায় সে মানবে, না চায় না মানচে। (কাহাফ: ২৯)

-তাপর যে হেদায়েত গ্রহণ করবে, সে তার মংগলের জন্যেই করবে এবং যে পথভ্রষ্ট তাকে বলে দাও, আমিত নিছক সাবধানকারী। (নমল: ৯২)

কুরাইশ এবং আরবর মুশরিকদের প্রতিক্রিয়া আরবের সাধারণ মুশরিকদের জন্যে যতোটা কঠিন ছিল, তার চেয়ে ঢের কঠিন ছিল রেসালাত মেনে নেয়অ। প্রথমতঃ এটাত তাদের জন্যে কোন সহজ ব্যাপার ছিল না যে, যে ব্যক্তি চল্লিশ বছর যাবত তাদের ধ্যে একজন সাধারণ মানুষের মতোই জীবন যাপন করে আসছেন, তাঁর সম্পর্কে তারা এ কথা মেনে নেবে যে তিনি হঠাৎ আল্লাহর সলূ নিযুক্ত হয়েছেন এবং তাঁর কাছে অহী আসা শুরু হয়েছে। যারা যুগ যুগ ধরে লাগামহীন স্বাধীনতায় অভ্যস্ত, তাদের জন্যে এখন এক ব্যক্তির নিরংকুশ আনুগত্য এবং তাদের গোটা জীবনে তাঁর প্রদত্ত্ব আইন পুরোপুরি মেনে চলা কম কঠিন ব্যাপর ছিল না। এর চেয়ে অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল ঐসব সর্দারদের জন্যে যারা নিজেদের গোত্র ও দলের সর্বময় কর্তা হয়ে বসেছিল। কঠিন ছিল ঐসব ধর্মীয় নেতাদের জন্যে যারা সারাদেশে বিরাট বিরাট শির্কের কেন্দ্র স্থাপন করে ব্যবসা জমজমাট করে রেখেছিল। কঠিন ছিল ঐসব গণকদের জন্যে যারা ভবিষ্যদ্বক্তার দাবীদার ছিল এবং হারানো বস্তুর সন্ধান পতে এবং ভবিষ্যতের অবস্থা জানতে লোক যাদের শরণাপন্ন হতো। তাদের প্রত্যেকের রেসালাত ছিল সুস্পষ্ট মৃত্যুর পয়গাম। তা কবুল করাত দূরের কথা, ঠান্ডা মাথায় তা শুনাও তাদের জন্যে সম্ভব ছিল না। মোট কথা, যাদের যাদের স্বার্থ পুরাতন জাহেলী ব্যবস্থঅ বহাল থাকার সাথে জড়িত ছিল তাদের জ্যন্যে এ আশংকজা দেখা দিয়েছিল যে, যদি মানুষ নবী মুহাম্মদের (সা) রেসালাত মেনে নেয় এবং এ কথা স্বীকার করে নিয়ে তাঁর অনুগত হয়ে যায় যে, তিন যা কিছু পেশ করছেন তা আসমান ও যমীনের খোদার পক্ষ থেকে, তাহলে সমাজে তাদের বাতি আার কোন দিন জ্বলবে না। অতএব এসব লোক আপন আপন স্বার্থ সংরক্ষণের জন্যে এ ব্যাপারে বদ্ধপরিকর যে, রেসালাতের এ দাওয়াত কিছুতেই চলতে দেয়া যাবে না। কারণ তারা বুঝতে পারছিল যে, একবার যদি জনসাধারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োজিত  পদপ্রদর্শকের অনুসরণ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ দ্বীন ও আইনের আনুগত্য মেনে নেসয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তাদেরকেও অস্ত্রসংবরণ করতে হবে এবং নেতৃত্ব করার পরিবর্তে অনুগত হয়ে থাকতে হবে।

একদিতে ছিল এ অসুবিধাগুলো এবং অন্যদিকে তাদের জন্যে যে ভয়ানসক অসুবিধা ছিল তা হলো এই যে, রেসালাতের দাবী নিয়ে তাদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তি দাঁড়িয়েছেন, যিনি তাদের জাতির মধ্যে সর্বোৎকৃস্ট ব্যক্তি। যার ণেতিক শ্রেষ্ঠত্ব গোটা জাতির স্বীকার করে। যাঁকে পাঁচ বছর আগে সমগ্র জাতি সর্বসম্মাতিক্রমে ‘আল আমীন’ উপাধিতে ভূষিত করে। যিনি রেসালাতের দাবী পেশ করার পূর্বাহ্নে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করে যখন তাদেরকে বলেছিলে ন, যদি আমি তোমাদেরকে এ কথা বলি যে, পাহাড়ের অপর প্রান্তে একটি সৈন্য দল তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্যে প্রস্তুত, তাহলে কি তোমরা আমার কথা সত্য বলে মেনে নেবে? তখন সকলে এক বাক্যে বলেছিল, হাঁ আমরা মেনে নেব, কারণ আমরা তোমাকে কোন দিন মিথ্যা কথা বলতে শুনিনি।

এরপর তাঁকে মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করা এবং মানুষকে এ কথা বিশ্বাস করানো কোন সহজ কাজ ভিল না যে, যে ব্যক্তি জীবনে কোন দিন মিথ্যা কথা বলেননি, তিনি এতো বড়ো মিথ্যা দাবী করবেন যে, খোদা তাঁকে রসূল নিযুক্ত করেচেন এবং খোদার বাণী তাঁর উপর নাযিল হয়?

এ সম্পর্কে কুরআনের এক স্থানে বলা হয়েছে:

(আরবী***************)

-হে মুহাম্মদ (সা)! আমরা জানি যে এসব লোক া বলছৈ তাতে তোমার মনঃকষ্ট হয়। কিন্তু এরা তোমাকে মিথ্যা বলছৈ না, বরঞ্চ এসব জালেমরা আল্লাহর আয়অত অস্বীকার করছে। (আনয়াম: ৩৩)

এ কথা এ সত্যের প্রতিই ইংগিত যে, যতোক্ষণ পর্যন্ত নবী মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর আয়াত শুনানো শুরু করেননি, তাঁর জাতির সকল লোক তঁঅকে বিশ্বস্ত ও সত্যবাদী মনে করতো। তাঁর সততার উপর তাদের পূর্ণ আস্থা ছিল। তারা তাঁকে মিথ্যাবাদী মনে করলো তখন যকন তিনি তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণী পৌঁছাতে শুরু করলেন। এ দ্বিতীয় পর্যায়েরও এমন কেউ ছিল না যে, ব্যক্গিতভাবে তাঁকে মিথ্যা বলার সাহস করতো। তাঁর চরম দুশমনও কোন দিন তাঁর প্রতি এ অীভযোগ করেনি যে, তিনি দুনিয়ার কোন ব্যাপারে কখনো মিথ্যা বলার দোষে দোষী হয়েছেন। তাঁর প্রতি তারা যতো মিথ্যা আরোপ করেছে তা করেছে নবী হওয়ার কারণে। তাঁর সবচেয়ে বড়ো দুশমন ছিল আবু জাহল। হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার সে (আবু জাহল) নবীকে (সা) বলে-

(আরবী***************)

আমরা তো তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি না, বরঞ্চ তুমি যা নিয়ে এসেছো তা মিথ্যা মনে করি। [ইমাম সুফিয়ান সাওরী এবং হাকেম এ রেওয়ায়িত হযরত আলী (রা) থেকে নকল করেছেন- গ্রন্থকার।]

বদর যুদ্ধের সময় আকনাস বিন শরীক নিভৃতে আবু জাহলকে জিজ্ঞেস করলো, এখানে তুমি ও আমি ছাড়া তৃতীয় কোন ব্যীক্ত নেই। সত্যি করে বল দেখি, মুহাম্মদকে (সা) সত্যবাদী মনে কর, না মিথ্যাবাদী?

সে জবাবে বলে, খোদার কসম মুহাম্মদ একজন সত্যবাদী লোক। সারা জীবন কোন মিথ্যা বলেননি। কিন্তু ‘লেওয়া’ (পতাকাবাহীর মর্যাদা), হিজাবাত (খানায়ে কাবার চাবি বহনকারীর মর্যাদা), সিকায়াত (হাজীদের পানি পান করাবার মর্য়াদা) এবং নুবওয়ত সব কিছুই যদি নবী কুসাই-এর অংশে যায় তাহলে বলো, অবশিষ্ট সমগ্র কুরাইশের কাছে আর কি রইলো?[ ইবনে জারীর তাঁর তফসীরে এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। আখনাসে বিন শরীক-নবী করিমের (সা) নানার বংশ বনী যেহরার সাথে বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ ছিল। যদিও সে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে এসেছিল, কিন্তু সে এবং বনী যোহরার কোন লোক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি-গ্রন্থকার]

এ সবের ভিত্তিতে আল্লাহ তায়ালা নবী করিমকে (সা) সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, মিথ্যাবাদী আরোপ তোমার প্রতি নয়, বরঞ্চ আমার প্রতি করা হচ্ছে। আর আমি সহনশীলতার সাথে তা সহ্য করে যাচ্ছি এবং অবকাশের উপর অবকাশ দিচ্ছি, এখন তুমি অস্থির হচ্ছ কেন?

ওজর আপত্তি, অভিযোগ এবং আজিব ধরনের দাবী-দাওয়া

এ দ্বিবিধ অসুবিধার সম্মুখীন হওয়ার পর কুরাইশ এবং অন্যান্য মুশরিকদের জন্যে এ ছাড়া আর কোন পথ ছিল না যে, হুযুরের (সা) রেসালাত না মানার জন্যে নানান ধরনের ওজর আপত্তি করবে, বিভিন্ন প্রকারের ও বিপরীতমুখী অভিযোগ উত্থাপন করবে এবং আজিব আজিব মুজেযা দেখাবার দাবী করবে। কিন্তু যেমন তৌহীদের ব্যাপারে আপনারা দেখেছেন যে, শির্কের খন্ডনের জন্যে বরং খোদার একত্ব প্রমাণের জন্যে এমন সব অকাট্য যুক্তি প্রমাণ পেশ করা হয়েছে যে কোন বিবেকসম্পন্ন ব্যক্তির এসব সত্য অস্বীকার করার কোন অবকাশ রইলো না। ঠিক তেমনি রেসালাতের বিরুদ্ধে মুশরিকদের যাবতীয় কূটকৌশলের মুকাবিলা এমন যুক্তিযুক্ত পন্থায করা হলো যে, যার মধ্যে সামান্য পরিমাণেও বিবেক বুদ্ধি ছিল,ম সে স্বীকার না করে পারলো না, তা সে জিদ ও হঠকারিতার সাথে বিরোধিতা করতে থাক না কেন। (১২)

হুযুরে (সা) মানুষ হওয়ার উপরে আপত্তি

তাদের প্রথম আপত্তি এ ছিল যে, তারা বলতো, আমরা এমন একজন মানুষকে খোদার রসূল কিাভিাবে মেনে নিতে পারে যে, আমাদেরই মত একজন মানুষ? সে খানাপিনা করে, সন্তানাদি রাখে এবং পার্থিব ঐসব কাজকাম করে যা অন্যান্যলোক করে থাকে। কুরআনে তাদের এসব ওজর আপত্তির উল্লেখ করে তার জবাব দেয়া হয়েছে।

(আরবী***************)

আর এ জালেমরা পরস্পর কানাঘুষা করে এবং বলে, এ ব্যক্তি তো তোমাদেরই মতন একজন মানুষ মাত্র। তোমরা কি দেখে শুনে যাদুর ফাঁদে পা দেবে? (আম্বিয়া: ৩)

এসব কানাঘুষা মক্কার কাফেরদের বড়ো বড়ো সর্দারগণ পরস্পর বসে করতো, নবীর দাওয়াতের মুকাবিলা যাদের  করতে হতো, তারা বলতো, এ লোক নবীতো কিছুতেই হতে পারে না। কারণ সেত আমাদেরই মতন একজন মানুষ, খায় দায়, বাজারে ঘুরাফেরা করে, বিবি বাচ্চা রাখে। তার মধ্যে এমন ব্যতিক্রমধর্মী কি আছে যা তার ও আমাদের মধ্যে পারথক্য সৃষ্টি করে এবং আমাদের তুলনায় তাকে খোদার সাথে অসাধারণ সম্পর্কের অধিকারী বানায়? অবশ্যি তার কথাবার্তায় এবং ব্যক্তিত্বের মধ্যে যাদু আছে। সে জন্যে যে ব্যক্তিই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুন এবংতার নিকটে যায়, সে তার অনুরক্ত হয়ে পড়ে। এ জন্যে যদি নিজেদের মঙ্গল চাও, তাহরে তার কোন কথা শুনা এবং তার সাথে মিলামিশাও করো না। কারণ তার কথা শুনা এবং তার নিকটে যাওয়ার অর্থ দেখে শুনে যাদুর ফাঁদে পা দেয়া: (১৩)

(আরবী****************)

-এবং তারা বলে, এ কেমন রসূল যে, খানা খায় এবং বাজারে চলাফেরা করে? কেন তার কাছে একজন ফেরেশতা পাঠানো হলো না যে তার সাথে থাকতো এবং (অস্বীকারকারীদেরকে) ভয় দেখাতো? আর কিছু না হলে তো অন্ততঃপক্ষে তার জন্যে কোন ধন-ভান্ডার অবতীর্ণ করা হতো, অথবা তার কোন বাগান হতো যার থেকে নিশ্চিন্ত মনে রুজি রোজগার করতো?

জালেমরা বলে, তোমরা তো এক যাদুকৃত লোকের পেছনে লেগে গেছো। (ফুরকান: ৭-৮)

তাদের মতলব ছিল এই যে, প্রথমতঃ মানুষের রসূল হওয়াটাই একটা আজব কথা। খোদার পয়গাম নিয়ে এলে ত কোন ফেরেশতা আসতো, না রক্ত-মাংসের কোন মানুষ যার বাঁচার জন্যে আহারের প্রয়োজন হয়। আর যদি মানুষকেই রসূল বানানো হয়ে থাকতো, তাহলে তো নিদেনপক্ষে বাদশাহ ও দুনিয়ার বড়ো লোকদের মতো কোন ব্যক্তিত্ব তার হওয়া উচিত ছিল, যাকে দেখার জন্যে চক্ষু অধীর হতো এবং অতিকষ্টে তার নৈকট্য লাভ ভাগ্যে ঘটতো। তা না হয়ে একজন সাধারণ মানুষকে খোদাওন্দে আলমের পয়গম্বর বানিয়ে দেয়া হলো যে বাজারে ঘুরে ফিরে বেড়ায়? পথ চলতে প্রতিদিন যার সাথে দেখা হয় এবং আমাদের চেয়ে তার মধ্যে অসাধারণ কিছু পাওয়া যায় না, তাকে কে মর্যাদার চোখে দেখবে? অন্য কথায় তাদের মতে, রসুল প্রেরণের প্রয়োজন থঅকলে সাধারণ মানুষের হেদায়েতের জন্যে নয়, বরঞ্চ বিস্ময়কর কিছু দেখবার জন্যে অথবা আড়ম্বর ও ঠাটবাট দ্বারা প্রভাব প্রতিপত্তি সৃষ্টি করার জন্যে।

তারপর তারা বলতো যে, মানুষকেই যদি নবী বানানো হতো তাহলে তার সাথে একজন ফেরেশতা দেয়া হতো যে সর্বদা হাতে ডান্ডা নিয়ে থাকতো এবং মানুষকে বলতো, এর কথা মেনে নাও, নইলে এই দেখ খোদার আযাব বর্ষণ করলাম। এত বড়ো আজব কথা যে, বিশ্বস্রষ্টা একজনকে নবুওয়তের মহান মর্যাদায় ভূষিত করে এমনি একাকী ছেড়ে দেবে আর বেচারা মানুষের গালি আর পাথর খেতে থাকবে। তাদের সর্বশেষ দাবী ছিল এই যে, নিদেনপক্ষে আল্লাহ মিয়া তো এতোটুকু করতে পারতেন যে,. তাঁর রসুলের জীবিকার কোন সুন্দর ব্যস্থঅ করতেন। এ কেমন কথা যে, এ খোদার রসূল আমাদের সাধারণ ধনী  ব্যক্তিদের চেয়েও অনেক অপদার্থ। খরচের জহন্যে না কোন পয়সা কড়ি আছে, আর না ফলমূল খাওয়ার কোন বাগান। আর ওদিক তার দাবী হচ্ছে, আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পয়গম্বর।

এসব আবোল তাবোল বলার পর তারা বলতো, এ  ব্যক্তিকে যাদু করা হয়েছে। অর্থাৎ কেউ তার উপর যাদু করেছে এবং তার ফলে সে পাগল হয়েছে।

আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, উপরে তাদের যেসব কথা বর্ণিত হয়েছে তাতে তারা তাঁকে যাদুকর বলতো। এখন তরা বলছে তাঁকে যাদু করা হয়েছে। কবি হওয়ার অপবাদও ছিল যার উল্লেখ পরে করা হচ্ছে। (১৪)

এসব ওজর আপত্তির জবাব

(আরবী************)

-তোমাদের পূর্বেও আমরা বহু রসূল পাঠিয়েছি এবং তাদের জন্যে বিবি, বাচ্চা-সন্তানাদি দিয়েছিলাম। (রা’দ: ৩৮)

এ হলো ওসব প্রশ্নের জবাব যা তারা নবীর (সা) কাছে করতো যে, এত ভালো নবী যার বিবি-বাচ্চা আছে। আচ্ছা, নবীদেরও কি যৌন বাসনার সাথে কোন সম্পর্ক থাকে নাকি? বলা হলেও আগেও যেসব নবী রসূল পাঠানো হয়েছিল তাদেরও তো বিবি-বাচ্চা ছিল। হযরত নূহকে (আ) স্বয়ং তোমরা তো নবী বলে মান। তার যদি সন্তান-সন্ততি না থাকতো তাহলে তার বংশ থেকে তোমরা জন্মগ্রহণ করলে কিভাবে? হযরত ইব্রাহীম (আ) এবং হযরত ইসমাঈল (আ) এর পয়গম্বর হওয়া তো তোমাদের কাছে সর্বস্বীকৃত। তোমাদের কুল ও বংশ তো তাদের সংশ্লিষ্ট কর। তাদের সন্তান-সন্তুতি যদি না থাকে তোমরা বনী ইসমাঈল কোথা থেকে হতে? (১৫)

(আরবী*************)

-এবং (হে নবী মুহাম্মদ)! তোমার পূর্বেও আমরা মানুষকেই রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছি যাদের উপর আমরা অহী পাঠাতাম। তোমাদের যদি জ্ঞান না থাকে তাহলে আহলে কিতাবকে জিজ্ঞেস কর। তাদেরকে আমরা এমন কোন দেহ দান করিনি যা আহার করতে না এবং না তারা চিরজীবী ছিল। (আম্বিয়া : ৭-৮)

-অর্থাৎ এই যে, ইহুদী সম্প্রদায় যারা ইসলাম দুশমনিতে তোমাদের সাথে একাত্ম এবং তোমাদেরকে ইসলাম বিরোধিতার কলাকৌশল শিক্ষা দেয় তাদেরকেই জিজ্ঞেস কর মুসা (আ) এবং বনী ইসরাঈলের নবী কে ছিলেন? তাঁরা কি মানুষ ছিলেন না অন্য কোন সৃষ্টি? (১৬)

(আরবী***************)

-তোমাদের কাছে তাদের কি কোন খবর পৌঁছেনি যারা এর আগে কুফর করেছে এবং দুষ্কর্মের কুফল ভোগ করেছে? এবং (ভবিষ্যতে) আখেরাতে তোদরে জন্যে যন্ত্রণাদায়কশাস্তি রয়েছে। এ পরিণাম ফলের অধিকারী তারা এ জন্যে হয় যে, তাদের কাছে তাদের রসূল সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ আসতে থাকে, কিন্তু তারা বলে, মানুষ কি আমাদের হেদায়েত দেবে? এভাবে তারা মানতে অস্বীকার করে এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফলে আল্লাহও তাদের থেকে বেপরোয়া হয়ে যান। আর আল্লাহ ত আসলেই বেপরোয়া এবং আপন সত্তায় সপ্রশংসিত। (তাগাবুন: ৫-৬)

অর্থাৎ নবীগণ এমন সব সুস্পষ্ট নিদর্মন নিয়ে এসেছেন যা তাঁদের আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্ত হওয়ার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছিল। তাঁরা যে কথাই বলতেন তা একেবারে বিবেকসম্মত এবং তা পেশ করতেন প্রকৃস্ট যুক্তি প্রমাণসহ। তাঁদের শিক্ষার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা ছিল না। বরঞ্চ তাঁরা পরিষ্কার ভাষায় বলতেন সত্য কি এবং মিথ্যা কি। জায়েয কি এবং না জায়েয কি। কোন্ পথে মানুষের চলা উচিত এবং কোন পথে চল উচিত নয়। কিন্তু এ কথা বলে তাঁদের কথা মানতে অস্বীকার করে- এখন কি মানুষ আমাদের হেদায়েত করবে? এবং এটাই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়। কারণ মানব জাতির সঠিক কর্মপন্থা জানার এ ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না যে তাদের স্রষ্টা তাদেরকে সত্য জ্ঞান দান করবেন। আর স্রষ্টার  পক্ষ থেকে জ্ঞান দানের বাস্তব পন্থা এ ছাড়া দান করে অন্যান্যকে পৌঁছিয়ে দেয়ার খেদমত তাঁদের উপর সোপর্দ করবেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি নবীগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ পাঠান যাতে তাঁদের সত্য হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ করার ন্যায়সঙ্গত কারণ না থাকতে পারে। কিন্তু তারা এ কথা মানতেই একবারে অস্বীকার করে যে, মানুষ খোদার রসুল হতে পারে। তারপর তাদের হেদায়েত লাভের আর কোন উপায় রইলো না। এ ব্যাপারে পথভ্রষ্ট মানুষের অজ্ঞতা ও মুর্খতার এক বিস্ময়কর চিত্র আমাদের সামনে পরিষ্ফূট হয় যে, মানুষের পথ নির্দেশনা গ্রহণ করতে তারা কোন দিন ইতঃস্ততঃ করেনি। এমনকি কতিপয় মানুষের পথ নির্দেশনার কাষ্ট ও প্রস্তর নির্মিত প্রতিমাকে তারা মাবুদ বানিয়ে নেয়। স্বয়ং মানুষকে তারা খোদা, খোদার অবতার এবং খোদার পুত্র বলেও মেনে নিয়েছে। তারপর পথভ্রস্টকারী নেতাদের অন্ধ অনুসরণে তারা এমন সব বিচিত্র পথ অবলম্বন করেছে যারা মানবীয় তাহযিব, তামাদ্দুন ও চরিত্র বিনষ্ট করে রেখেছে। কিন্তু খোদার রসূল যখন তাদের নিকটে সত্য নিয়ে আগমন করলেন এবং তারা সকল ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধে থেকে পক্ষপাতহীনসত্যে তাদের সামনে পেশ করলেন, তখন তারা বল্লো, এখন মানুষ কি আমাদের হেদায়েত দেবে? এর অর্থ ছিল এই যে, মানুষ যদি পথভ্রষ্ট করে তাহলে তা শিরোধার্য। কিন্তু যদি সে সত্য পথ দেখায় তাহলে তার পথ নির্দেশনা গ্রহণযোগ নয়।

অতএব যখন তারা আল্লাহর প্রেরিত হেদায়েত থেকে বিমুখ হলো, তখন আল্লাহরও কোন পরোয়া রইলো না যে তারা কোন্‌ ধ্বংস গহ্বরে পতিত হচ্ছে। তাদের দ্বারা আল্লাহর কোন স্বার্থ আটকা পড়েনি যে, তারা তাঁকে খোদা মানলে তিন খোদা থাকবেন, নইলে খোদায়ী সিংহাসন তাঁর হাতছাড়া হবে। তিনি তাদের এবাদতের না মুখাপেক্ষী ছিলেন, আর না তাদের প্রশংসা গীতির। তিনি তো তাদের নিজেদের মংগলের জন্যে তাদেরকে সুপথ দেখাতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তারা যখন তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, তখন আল্লাহও তাদের থেকে বেপরোয়া হয়ে গেলেন। তারপর না তিনি তাদেরকে হেদায়েত দান করলেন, আর না তাদের হেফাজতের দায়িত্ব দিলেন। না তাদেরকে ধ্বংস গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে বাঁচালেন, আর না তাদের নিজেরদের উপর ধ্বংস আসা থেকে তাদের বিরত রাখলেন। কারণ তারা স্বয়ং তাঁর হেদায়েত ও পৃস্ঠপোষকাতর মুখাপেক্ষী ছিল না। (১৭)

(আরবী***************)

-মানুষের সামনে যখন কোন হেদাযেত এসেছে তখন তার উপর ঈমান আনতে তাদেরকে কোন কিছু বাধা দেয়নি তাদের এ কথা ব্যতীত- “আল্লাহ কি মানবকে পয়গম্বর করে পাঠিয়েছেন?” তাদেরকে বল, যদি পৃথিবতে ফেরেশতাগণ নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতো, তাহলে অবশ্যই আমরা আসমান থেকে কোন ফেরেশতাকে তাদের জন্য পয়গম্বর করে পাঠাতাম। (বণী ইসরাইল: ৯৪-৯৫)

অর্থাৎ পয়গম্বরের কাজ শুধু এতোটুকু নয় যে, এসে শুধু খোদার পয়গাম শুনিয়ে দেবেন। বরঞ্চ তাঁর কাজ এটাও যে, সেই পয়গাম অনুযায়ী মানব জীবনে সংস্কার সংশোধন করবেন। মানুষের অবস্থাকে সেই পয়গামের মূলনীতির সাথে তাঁকে সংগতিশীল করতে হয়। তাঁকে স্বয়ং তাঁর জীবনে ঐসব মূলনীতির বাস্তব বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে হয়। যে বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য অগণিত মানুষ তাঁর পয়গাম শুনার ও বুঝার চেষ্টা করে তাদের মন মানসিকতার গ্রন্থি উন্মোচন করতে হয়। যারা তাঁর পয়গাম মেনে নেয় তাদেরকে সংগঠিত করতে হয় এবং তাদেরকে সংগঠিত করতে হয় এবং তাদর তরবিয়ত দিতে হয় যাতে সে পয়গামের শিক্ষা অনুযায়ী একটি সমাজ অস্তিত্ব লাভ করতে পারে। যারা তা অস্বীকার করে, বিরেধিতা করে এবং প্রতিবন্ধখতা সৃষ্টি করে তাদের মুকাবিলায় সংগ্রাম করতে হয় যাতে অনাচারের সমর্থক শক্তিসমূহ পর্যদুস্ত করা যায় এবং তারা সংস্কার কাজের দিকে ধাবিত হয় যে কাজে আল্লাহ তায়ালা নবী প্রেরণ করেছেন। এ সকল কাজ যখন মানুষের মধ্যেই করণীয তখন তাঁর জন্যে মানুষ ছাড়া আর কাকে পাঠানো যেতো? ফেরেশতা বড়োজোর এতোটুকু করতে যে, আসতো এবং পয়গাম পৌঁছিয়ে চলে যেতো। মানুষের মধ্যে মানুষের মতোই অবস্থঅন করে মানুষের মতো কাজ করা এবং মানব জীবনে খোদার ইচ্ছা অনুযায়ী সংস্কার করে দেখানো ফেরেশতার সাধ্যের কাজ ছিল না। এ কাজের শুধু মানুষই উপযোগী হতে পারতো। (১৮)

(আরবী***************)

-হে মুহাম্মদ (সা), তোমার পূর্বে আমরা যে পয়গম্বর পাঠিয়েছিলাম তারা সকলে এ জনপদেরই অধিবাসী মানুষ ছিল যাদের প্রতি আমরা অহী পাঠিয়েছিলাম। (ইউসুফ: ১০৯)

এখানে একটি বিরাট বিষয়কে একই বাক্যে প্রকাশ করা হয়েছে। তাকে বিশদভাবে বলতে গেলে এমনিভাবে বলা যায়-

হে নবী! এসব লোক তোমার কথায় এ জন্যে মনোযোগ দেয়না যে, কাল যে ব্যক্তি তাদের শহরে জন্মগ্রহণ করলো, তাদেরই মধ্যে শৈশব থেকে যৌবনে পৌঁছলো এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যে পৌঁছলো, তার সম্পর্কে আরা কিভাবে এক কথা মেনে নিতে পারি যে, হঠাৎ একদিন খোদা তাঁকে তাঁর দূত নিযুক্ত করেছেন?

কিন্তু এ কোন অভিনব বিষয় নয় যে, দুনিয়ায় প্রথম তাঁকে এর সম্মুখীন হতো হলো। এর পূর্বেও খোদা তাঁর নবী পাঠিয়েছেন এবং তাঁরা সকলে মানুষই ছিলেন। তারপর এটাও কখনো হয়নি যে, হঠাৎ কোন এক অপরিচিত ব্যক্তি কোন শহরে আবির্ভূত হলো এবং সে বল্লো, আমাকে পয়গম্বর করে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু যাদেরকেই মানুষের সংস্কার সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়েছে তাঁরা সকলেই আপন আপন জনপদের অধিবাসী ছিলেন। মসীহ, মূসা, ইব্রাহীম, নূহ আলাইহিমুস সালাম তাহলে কে ছিলেন? সেই সেই শহর থেকেই তাঁরা আবির্ভূত হন যেখানে তাঁরা জন্মগ্রহণ করেন, তার কি অন্য কোথাও থেকে এসেছিলেন? (১৯)

(আরবী****************)

মানুষের জন্যে এ কি বড়ো আশ্চর্যজনক হয়েছে যে আমরা স্বয়ং তাদেরই মধ্যে একজনের প্রতি অহী পাঠিয়েছে মানুষকে সাবধান করার জন্যে এবং ঈমান আনয়নকারীদেরকে এ সুসংবাদ দেবে যে তাদের জন্য তাদের রবের নিকটে সত্যিকার ইজ্জত সম্ভ্রম রয়েছে? (এ জন্যেই কি) অস্বীকারকারীগণ বল্লো, এ ব্যক্তিতো প্রকাশ যাদুকর? অর্থাৎ এতে আশ্চর্যের কি আছে? মানুষকে সাবধান করার জন্যে মানুষ নিযুক্ত করা হবে না তো কি ফেরেশতা, অথবা জিন অথবা পশু নিযুক্ত করা হবে? আর যদি মানুষ সত্যের প্রতি উদাসীন হয়ে ভ্রা্ত উপায়ে জীবনযাপন করে তাহলেতো আশ্চর্যের ব্যাপর এই যে, তার স্রষ্টা ও প্রতিপালক তাকে সেই অবস্থায় ছেড়ে দেবে না বরঞ্চ তার হেদায়েতের কোন ব্যবস্থঅ করবে? অথবা খোদার পক্ষ থেকে তার ইজ্জত-সম্মান হওয়া উচিত যা সে মেনে অথবা প্রত্যাখ্যান করবে? অতেএব যারা বিস্ময় প্রকাশ করছে তাদের বেবে দেখা উচিত যে কোন্ জিনিসের উপর তারা বিস্ময় প্রকাশ করছে।

তারপর সাবধানকারীদের যাদুকর বলে আখ্যায়িত করা তো তাদের চিন্তা করা উচিত যে এ অপবাদ তাঁর উপর খাটে কি না। কোন বক্তি উচ্চাংগের ভাষণদানের মাধ্যমে লোকের মন মস্তিষ্ক জয় করছে, তার উপর এ অভিযোগ করার জন্যে এ কথা যথেষ্ট নয় যে সেন যাদু করছে। এটা দেখা উচিত যে, এ ভাষণে কোন কথা বলছে। কোন্‌ স্বার্থে সে তার বক্তৃতা শক্তি ব্যবহার করছ। তারপর ঈমান আনয়নকারীদের উপর তার ভাষণের যে প্রতিক্রিয়অ হচ্ছে তা কোন ধরনের? যে বক্তা অবৈধ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যাদুকরী ভাষণের শক্তি ব্যবহার করে সে তো একজন বাচাল, লাগামহীন ও দায়িত্বহীন বক্তা। সত্য  ও সততার কোন খেয়াল না করে সে এমন সব কথা বলে ফেলে যা শ্রোতাদের মুগ্ধ করে- তা যতোই মিথ্যা, অতিরঞ্জিত এবং অবান্তর হোক না কেন। তার কথার মধ্যে বিজ্ঞতার পরিবর্তে থাকে এমন কিছু যা জনসাধরণকে প্রতারিত করে। তার কথার মধ্যে সাজানো গোছানো চিন্তার পরিবর্তে থাকে অসংগতি ও অসামঞ্জস্য। তার কথায় ভারসাম্য না হয়ে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়। সে তো তার বাজিমাৎ করার জন্যে বেহায়াপনা করে অথবা তারপর পরস্পর লড়াই ঝগড়া করার  জন্যে এবং একদলকে আর একদলের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার জন্যে বক্তৃতার আফিং খাইয়ে দেয়। তার প্রভাবে লোকের মধ্যে না কোন নৈতিক মান সৃষ্টি হয়, না তাদের জীবনে কোন কল্যাণকর পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। আর ন কোন সৎ চিন্তা অথবা বাস্তব সৎ পরিবেশ পরিস্থিতি অস্তিত্ব লাভ করে। বরঞ্চ মানুষ পূর্বাপেক্ষা অধিকতর নিকৃস্ট চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ করতে থাকে। কিন্তু এখঅনে তোমরা দেখছ পয়গম্বর যে বাণী পেশ করেন, তার মধ্যে বিজ্ঞতা আছে, এক সুসমঞ্জস্য চিন্তা পদ্ধতি আছে, চরম ভারসাম্য এবং সত্য ও সত্যবাদিতার কঠিন বাধ্যবাধকতা আছে। প্রতিটি শব্দ মাপ-জোক করা, প্রতিটি কথা অতি মুল্যবান। তাঁর ভাষণে তোমরা খোদর সৃষ্টির সংস্কার ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য চিহ্নিত করতে পারবে না। তিনি যা বলেন াতর মধ্যে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, জাতীয় অথবা কোন প্রকার দুনিয়াবঢ স্বার্থের লেশমাত্র পাওয়া যায় না। তিনি শুধু চান যে, মানুষ যে অবহেলা ঔদাসিন্যে মগ্ন আছে তার অশুভ পরিণাম সম্পর্কে তাদেরকে সাবধান করে দেন এবং তাদেরকে এমন পথে নিয়ে আসেন যাতে তাদের নিজেদের কল্যাণ রয়েছৈ। তারপর তাঁর ভাষণের যে পতিক্রিয়া হচ্ছে তা যাদুকরী ভাষণদানকারী ভাষণদানকারী ভাষণের প্রতিক্রিয়া থেকে সম্পূল্ণ ভিন্নতর। এখানে যে ব্যক্তিই তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করেছে তার জীবন সুশৃংখল হয়েছে। সে পূর্বাপেক্ষ মহত্তর চরিত্রের লোক হয়েছে। তার কর্মপদ্ধতির মধ্যে কল্যাণের চিহ্ন পরিস্ফূতিট হয়েছে। এখন তোমরাই ভেবে দেখ, যাদুর কি  এ ধরনের কথা বলে এবং তার যাদু কি এমন সুফল সৃষ্টি করতে পারে? (২০)

(আরবী****************)

-আমরা কতিপয় পয়গম্বরকে কতিপয় থেকে উন্নততর মর্যাদা দান করে ছি এবং দাউদকে আমরা যবুর দান করেছি। (বনী ইসরাইল: ৫৫)

যে প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে তাতে হযরত দাউকে (আ) যবুর কিতাব দানের পৃথকভাবে উল্লেখ এ জন্যে করা হয়েছে যে, তিনি বাদশাহ ছিলেন এবং সেই সাথে নবীও ছিলেন। নবী মুহাম্মদেতর (সা) সমসায়িক লোকেরা যে কাণে তাঁর নবুয়ত মানতে অস্বীকার করছিল, তা তাদের নিজেদের মতে এ ছিল যে, তিনি সাধারণ মানুষের মতো বিবি-বাচ্চা রাখতেন, খানাপিনা করতেন, বাজারে চলাফেরা করে কেনাবেচা করতেন এবঙ সে সমুদয় কাজই করতেন যা অন্যান্য দুনিয়াদার লোক মানবীয় প্রয়োজনে করতো। মক্কার কাফেলদের বক্তব্য ছিল এই “তুমি একজন দুনিয়াদার লোক। খোদাপ্রাপ্তির সাথে তোমার সম্পর্ক? খোদার প্রেরিত লোক তো তারা হয় যাদের দৈহিক প্রয়োজনের কোন হুশ থাকে না। ব্যস এক কোণায় বসে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকে। কোথায় সে আর কোথায় ডালভাতের চিন্তা”? এর জবাবে বলা হচ্ছে যে, একটা পরিপূর্ণ বাদশাহী ব্যবস্থাপনা অপেক্ষা দুনিয়াদারী আর কি হতে পারে? এতদসত্ত্বেও হযরত দাউদকে (আ) নবুয়ত এবং কিতাব দান করা হয়েছিল। (২১)

(আরবী***************)

(হে নবী, এদেরকে বলে দাও) আমি তো কোন অভিনব রসূল নই। আমি জানি না যে আমার সাথে কি আচরণ করা হবে। আর না জানি যে তোমাদের সাথে কি আচরণ করা হবে। আমি তো ব্যস সেই অহীর অণুসরণ করি যা আমার প্রতি পাঠানো হযেছে এবং আমি একজন সুস্পষ্ট সাবধানকারী ব্যতীত কিছু নই। (আল-আহকাশ: ৯)

এ এরশাদের পটভূমি এই যে, যখন নবী (সা) নিজেকে খোদার রসূল হিসাবে পেশ করলেন, তখন মক্কাবাসী বিভিন্ন রকমের সমালোচনা শুরু করে। তারা বলতো এ কেমন রসুল যে, তর বিবি বাচ্চা রয়েছে, বাজারে চলাফেরা করে, খানাদান খায়, আমাদের মতোই জীবন যাপন করে। আসলে তার মধ্যে এমন বিশেষ কি আছে যার জ্যন্যে সে সাধারণ মানুষ থেকে ভিন্নতর যাতে আমরা বুঝতে পারি যে, বিশেষভাবে এ  ব্যক্তিকে খোদা তাঁর রসূল বানিয়েছেন। তারপর তারা বলে, যদি এ ব্যক্তিকে খাদা রসূলই বানাতেন তাহলে তিনি তার আর্দালী করে কোন ফেরেশতা পাঠাতেন। সে ঘোষণা করতো যে্‌ হচ্ছে, খোদার রসুল। আর তার সামনে সামান্য বেয়াদবী গোস্তাখী করল তাকে বেত্রাঘাত করতো। এ কেনম করে হতে পারে যে, খোদা কাউকে তাঁর রসুল নিযুক্ত করলেন তারপর তাকে এভাবে মক্কার অলিগলিতে ঘুরাফেরা করতে এবং জুলুম অত্যাচার সহ্য করতে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিলেন? আর কিছু না হোক, অন্ততঃ খোদা তাঁর রসূলের জন্যে এক রাজকীয় প্রাসাদ্ এবং একটি প্রস্ফূটিত বাগান তৈরী করে দিতেন। তাহলে এটা হতো না যে তাঁর রসূলের বিবি অর্থহীন হয়ে অনাহারে রয়েছে অথবা এমন হতো না যে তার তায়েফ যাওয়ার জন্যে কোন সওয়ারী নেই।

তারপর তারা নবী (সা) এর নিকটে বিভিন্ন রকমের মুজেযার দাবী করে। ভবিষ্যতের কথাও তাঁর কাছে জানতে চাইতো। তাদের ধারণায় কোন ব্যক্তির খোদার রসুল হওয়ার অর্থ এই যে, সে অতি মানবীয় ক্ষমতার অধিকারী হবে। তাঁর অঙ্গুলী হেলনৈ পাহাড় স্থানচ্যুত হবে এবং মরুভূমি সবুজ শ্যামল শস্য ক্ষেত্রে পরিণত হবে। অতীত বর্তমান ও ভবিষতের সকল জ্ঞান তার থাকবে এবং অপ্রকাশ্য প্রতিটি বস্তু তার কাছে সুস্পষ্ট হবে।

এসব কথার জবাবে বলা হলেরা, তাদেরকে বলে দাও। আমি অভিনব রসূল তো নই। আমাকে রসূল নিয়োগ করা দুনিয়ার ইতিহাসে কোন প্রথম ঘটনা নয় যে তোমাদের এ কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে যে, রসুল কেমন হয় এবং কেমন হয় না। আমার পূর্বে অনেক রসুল এসেছেন। আমি তাদের থেকে ভিন্নতর নই। দুনিয়অর এমন কোন নবী রসূল এসেছেন যাঁর বিবি-বাচ্চা ছিল না? অথবা তিনি সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করতেন না? কোন রসূলের সাথে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়েছে, যে তাঁর রেসালাতের ঘোষণা করতো এবং তাঁর আগে আগে ডান্ডা হাতে বলতৈা? কোন রসূলের জন্যে রাজপ্রাসাদ ও বাগবাগিচা তৈরী করা হয় এবং কে খোদার দিকে আহ্বান করার জন্যে নির্যাতন ভোগ করেননি যেমন আমি করাছ? এমন কোন রসুল ছিলেন না যিনি আপন এখতিয়ারে মোজেযা দেখাতে পারতেন এবং আপন জ্ঞানে সব কিছু জানতে পারতেন? তাহলে আমার রেসালাত যাচাই করার জন্যে তোমরা কোথা থেকে এ অভিনব মানদন্ড নিয়ে আসছ?

তাপর তাদের জবাবে এ কথাও বলা হলো, আমি জানি না আগামীকাল আমার সাথে কি আচরণ করা হবে এবং তোমাদের সাথেই বা কি করা হবে। ইম তো শুধু সেই অহী মেনে চলি যা আমার নিকটে পাঠানো হয়। অর্থাৎ আমি ভবষ্যদ্বক্ত নই যে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবকিছু আমার নিকটে সুস্পষ্ট হবে এবং দুনিয়ার প্রতিটি বস্তুর জ্ঞঅন আমি লাভ করব। তোমাদের ভবিষ্যত তো দূরের কথা আমার নিজের ভবিষ্যত আমার জানা নেই। অহীর মাধ্যমে যে বস্তুর জ্ঞান আমাকে দেয়া হয় শুধু ততোটুকুই আমি জানি। তার অতিরিক্ত জ্ঞান রাখার দাবী আমি কখন করেছি? এমন ভবিষ্যদ্বাণীর অধিকারী কোন্‌ রসূল দুনিয়ঢঅয় ছিলেন যে, তোমরা আমার রেসালাত যাচাই করার জন্যে আমার ভবিষ্যত জ্ঞানের পরীক্ষা করছ? রসূলের এ কাজ কখন থেকে হয়েছিল যে তিনি হারানো জিনিসের সন্ধান দেবেন এবং বলে বেন গর্ভবতী স্ত্রীলোক ছেলে না মেয়ে প্রসব করবে অথবা এ কথা বলবে রোগী আরোগ্য লাভ করবে, না মরবে? (২২)

হুযুরকে (সা) কেন নবী বানানো হলো?

তাদের দ্বিতীয় অভিযোগ এ ছিল যে, খোদার যদি নবী পাঠাবারই প্রয়োজন ছিল এবং মানুষের মধ্য থেকেই কাউকে পাঠাতে হতো, তাহলে আমাদের মধ্য থেকে মুহাম্মদ (সা) বিন আবদুল্লাহকেই কি পাওয়া গেল? মক্কা এবং তায়েফের বড়ো বড়ো লোক কি সব মরে গিয়েছিল যে, তাদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেয়া গেল না? তাদের বক্তব্য ছিল।

(আরবী***********)

-আমাদের মধ্যে কি শুধু এই এক ব্যক্তিই ছিল যার উপর যিকির (খোদার নসিহত) নাযিল করা হলো? (সোয়অদ: ৮)

(আরবী***************)

-এবং তারা বলে, এ কুরআন দুটি শহরের বড় লোকদের কোন একজনের উপর কেন নাযিল করা হলো না? তোমার রবের রহমত কি এসব লোক বন্টন করে? দুনিয়ার জীবনে তাদের জীবন যাপনের উপকরণ তো তাদের মধ্যে আমরাই বন্টন করি। এবং তাদের মধ্য থেকে কিছু লোককে অন্যান্য লোক থেকে অধিক মর্যাদা দিয়েছি যাতে একে অপরের খেদমত গ্রহণ করতে পারে। এবং তোমার রবের রহমত ঐসব ধনসম্পদ থেকে অধিকতর মূল্যবান যা এসব বড়ো লোকেরা সঞ্চয় করে। (যখরুফ: ৩১০৩২)

দু’টি শহরের অর্থ মক্কা ও তায়েফ। কাফেরদের বক্তব্য ছিল, সত্যিই খোদার যদি কোন রসূল পাঠাবার দরকার থাকতো এবং তিনি যদি তার উপর তাঁর কিতাব নাযিল করার ইচ্ছা রাখতেন, তাহলে আমাদের এ শহর দুটির মধ্যে কোন এক বিরাট ব্যক্তিকে এ াকজের জন্যে বেছে নিতেন। রসূল বানাবার জন্য আল্লাহ মিয়া পেলেন এমন ব্যক্তি যিনি এতিম হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অংশে কোন উত্তরাধিকার ছিল না। ছাগল চড়িয়ে তিনি যৌবন কাটান। এখন তঁঅর দিনকাল চলছে বিবির পয়সায় ব্যবসা করে। তিন কোন গোত্রপতিও নন। অথবা কোন পরিবারের নেতাও নয়। মক্কায় অলীদ বিন মুগীরা এবং ওতবা বিন রাবিয়অর মতো কি কোন খ্যাতনামা সর্দার ছিল না?  তায়েফে ওরওয়া বিন মাসউদ, হাবীব বিন আমর, কিনানা বিন আবেদ আমর এবং আবেদ ইয়ালীলের মতো ধনবার ব্যীক্ত কি ছিল না? এসব তাদের যুক্তি। প্রথমে তো তারা এ কথাই মানতে রাজি ছিল না যে, কোন মানুষ রসূল হতে পারে। কিন্তু যখন কুরআন বারবার যুক্তি দিয়ে তাদের এ ধারণা খন্ডন করলো এবং তাদেরকে বলা হলো যে ইতিপূর্বেও বরাবর মানুষই রসূল হয়ে আসতে থাকেন এবং মানুষের হেদায়াতের জন্যে মানুষই রসূল হতে পারে। মানুষ ছাড়া অন্য কেউ নয়। আর যে রসুলই দুনিয়অতে এসেছেন, হঠাৎ আসমান থেকে অবতরণ করেননি। বরঞ্চ মানুষর জনপদেই জন্মগ্রহণ করেছেন। বাজারে চলাফেরা করতেন। বিবি বাচ্চা রাখতেন। পানাহার থেকে মুক্ত ছিলেন না। এ সব কথার পর তারা পাঁয়তারা বদল করে বলতে লাগলো আচ্ছা ঠিক আছে, মানুষই রসূল হোক। কিন্তু নিশ্চয়ই তার কো বড়ো লোক হওয়া উচিত। ধনবান হবে, প্রভাবশালী হবে, দলপতি হবে। মানুষের মধ্যে তার ব্যক্তিত্বের বিরাট প্রবাব হবে। মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ সাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এ মর্যাদার জন্যে কিভাবে উপযোগী হতে পারে?

এসব অভিযোগের জবাবে কয়েকটি শব্দে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা হয়েছে।

প্রথম কথা এই যে, তোমার রবের রহমত বন্টন করার দায়িদ্ব করে এদের উপর অর্পণ করা হয়? আল্লাহ তার রহমত কার উপর বর্ষণ করবেন, কার উপর  করবেনস না, এ বিষয়টি কি এরা নির্ধারণ করে দেবে? (এখানে রহমত বলতে তাঁর সাধারণ রহমত যার মধ্য থেকে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু পায়।)

দ্বিতীয়ত নুওয়ত তো এক বিরাট গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। দুনিয়অর জীবন যাপনের যে সব সাধারণ উপায় উপকরণ রয়েছে, তার বন্টনের দায়িত্বও আমরা নিজ হাতে রেখেছি। অন্য কারো দায়িত্বে দিইনি। আমরা কাউকে সুন্দর কাউকে কুশ্রীঃ কাউকে মিষ্টভাষী, কেউকে কর্কশভাষী, কাউকে সুস্থ, কাউকে বিকলাংগ, অথবা অন্ধ অথবা বধির, কাউকে ধনী কাউকে গরীব, কাউকে উন্নত জাতির এক ব্যক্তি কাউকে গোলামে অথবা অুনন্নত জাতির এক ব্যক্তি হিসেবে সৃষ্টি করি। এ জন্মগত ভাগ্য নির্ধারণে কেউ সামান্যতম হস্তক্ষেপও কতে পারে না। যাকে আমরা যা কিছু বানিয়ে দিয়েছি, তাই সে হতে বাধ্য। আর এ বিভিন্ন জন্মগত অবস্থার যে প্রতিক্রিয়াই কারো ভাগ্যে হোক, তা পরিবর্তন করার সাধ্য কারো নেই। তার মানুষের মধ্যে জীবিকা, শক্তি, সম্ব্রম, খ্যাতি, ধন সম্পদ, শাসন ক্ষমতা প্রভৃতির বন্টনও আমরা করছি। আমাদের পক্ষথেকে যার ভাগ্রের উন্নয়ন হবে তার ভাগ্য বিপর্যয় কেউ করাতে পারবে না। আবার আমাদের পক্ষ থেকে যার অধঃপতন এসে যায়, তাকে কেউ বাঁচাতে পারে না। আমাদের সিদ্ধান্তের মোকাবিলায় মানুষের সকল কলাকৌশল ও চেষ্টা তদবীর ব্যর্থ হয়ে যায়। এ বিশ্বজনীন খোদায়ী ব্যবস্থাপনায় কি এরা সিদ্ধান্ত করতে চলেছে যে বিশ্ব জগতের মালিক কাকে তাঁর নবী বানাবেন আর কাকে বানানে না?

তৃতীয়  কথা এই যে, এ খোদায়ী ব্যবস্থাপনার এ স্থায়ী নিয়ম পদ্ধতি বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে যে, সবকিছু একজনকে অথবা সবকিচু সকলকে যেন না দেয়া হয। চোখ খুলে দেখ, তোমরা সকল দিকেই মানুষের মধ্যে শুধু বৈষম্যই দেখতে পাবে। কাউকে আমরা কোন কিছু দিয়ে থাকলে, অন্য কোন জিনিস থেকে তাকে বঞ্চিত রেখেছি, তা অন্য কাউকে দান করেছি? এটা এ বিজ্ঞতার ভিত্তিতে করা হয়েছে যে, কোন মানুষ যেন অন্য মানুষ থেকে মুখাপেক্ষীহীন না থাকে। বরঞ্চ প্রত্যেক কোন না কোন ব্যাপারে অপরে মুখাপেক্ষী হয়। এখন এ নির্বুদ্ধিতার ধারণা কেমন করে তোমাদের পেয়ে বসলো যে, যাকে আমরা রাষ্ট্র ও কর্তৃত্ব ‍দিয়েছি তাকে নবুওয়তও দান করতে হবে? এভাবে তোমরা কি একথাও বলবে যে, বিবেক, জ্ঞঅন, সম্পদ, সৌন্দর্য, ক্ষমতা, রাষ্ট্র শক্তি এবং অন্যান্য সকল গুণাবলী একই ব্যক্তির মধ্যে একত্রে সমাবেশ কর হোক এবং যে ব্যক্তি একটি জিনিসও পায়নি, তাকে অন্য কোন কিছুও যেন দেয়া না হয়?

শেষ বাক্যে রবের রহমত এর অর্থ তার বিশেষ অর্থাৎ নবুওয়ত। এর অর্থ এই যে, তোমরা তোমাদের যসব ধনাঢ্য ব্যীক্তদেরকে তাদের ধনদৌলত, ব্যক্তিত্ব ও প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে বিরাট কিছু মনে করছ, তার সে ধন-দৌলতের যোগ্য নয় যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেয়া হয়েছৈ। এ ধনদৌলত তাদের সে ধন-দৌলত অপেক্ষা অতি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং এ যোগ্যতার মানদন্ড অন্য কিছু। তোমরা যদি এ কথা মনে করে থাক যে, তোমাদরে প্রত্যেকে প্রভাব প্রতিপত্তিশীল ব্যক্তি এবং শ্রেষ্ঠ নবী হওয়ার যোগ্য তাহলে এ তোমাদের মানসিকতার চরম অবনতি। আল্লাহর কাছে এমন নির্বুদ্ধিতার আশা কেন করছ। (২৩)

(আরবী*******************)

-প্রকৃত ব্যাপার এই যে, যারা তাদের নিকটে আগত কোন সনদ ও দলিল প্রমাণ ব্যকীত আল্লাহর আয়অত নিয়ে বিতর্ক করে, তাদের মন গর্ব অহংকারে পরিপূর্ণ। কিন্তু যে বড়ত্বের গর্ব তারা করে সে পর্যন্ত তারা পৌঁছতে পারবে না। অতএব আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর। তিনি সব দেখেন ও শুনেন। (মু’মিন: ৬=৫৬)

অ্থাৎ এদের অযৌক্তিক বিরোদিতা এবং অসংগত কূটতর্কের প্রকৃত কারণ এ নয়ঢ যে, আল্লাহতায়অলার আয়অতসমূহের যেসব সত্যতা ও কল্যাণকর কথা তাদের সামনে পেশ করা হচ্ছে তা তারা বুঝতে পারছিল না বিধায় নেক নিয়তের সাথে তা বুঝঅর জন্যে তারা আলোচনা করছে। বরঞ্চ তাদের এ আচরণের প্রকৃত কারণ এই যে, তাদের আত্ম-অহংকার এটা বরদাশত করা প্রস্তুত নয় যে, তারা বিদ্যমান থাকতে আরবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নেতৃত্ব মেনে নিতে হবে, যার তুলনায় তারা নিজেরা নিজেদেরকে নেতৃত্বদানের অধিকতর হকদার মনে করে। এ জন্যে তারা তাদরে সর্বশক্তি প্রয়োজ করছে যাতে নবী মুহাম্মদের (সা) কথা কিছুতেই চলতে না পারে। এ উদ্দেশ্যে যে কোন জঘন্যতম পন্থা অবলম্বর করতেও তারা দ্বিধাবোধ করবে না। কিন্তু আল্লাহ যাকে বড়ো বানিয়েছেন সে বড়ো হয়েই থাকবে। আর এ ছোটো লোকেরা তাদের বড়ত্ব কায়েম রাখার যে চেষ্টা করছে তা অবশেষে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। (২৪)

(আরবী*****************)

-তিনি এ রূহ অর্থাৎ নবুওয়তের অহী যার উপরে ইচ্ছা করেন আপন নির্দেশে ফেরেশতাদের মাধ্যমে নাযিল করেন। (নাহল: ২)

এ কথা কাফেরদের সেসব ওজর আপত্তির জবাব যা তারা হুযুর (সা) সম্পর্কে করতো। তারা বলতো যদি খোদাকে কোন বীই পাঠাতে হতো, তাহলে মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ (সা) কি একমাত্র ব্যক্তি ছিল? মক্কা ও তায়েফৈর বড়ো বড়ো সর্দারগণ কি মৃত্যুবরণ করেছিল যে, তাদের কারো উপর নজর পড়লো না? এ ধরনের বেহুদা আপত্তি অভিযোগের জবাব এ ছাড়া আর কি হতে পারতো? আর এ ধরনের জবাবই কুরআনের বিভিন্ন স্থানে দেয়া হয়েছে যে, খোদা তার কাজ স্বয়ং জানেন। তেহামাদের সাথে পরামর্শ করার তার প্রয়োজন নেই। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে উপযুক্ত মনে করেন, তাকেই তিনি নিজের কাজের জন্যে বেছে নেন। (২৫)

তাঁর কথা সত্য হলে জাতির মহান ব্যক্তিগণ ঈমান আনতেন

(আরবী***************)

-যার মানতে অস্বীকার করেছে তারা ঈমানদারদেরকে বলে, এ ব্যক্তি যদি সত্য হতো, তাহলে এসব লোক এ ব্যাপারে আমাদের আগে যেতে পারতো না। যেহেতু তারা হেদায়েত গ্রহণ করতে পারলো না, সেজন্যে তারা এখন ত অবশ্যই বলবে, এ ত সেই পুরানো মিথ্যা কথা। (আহাকফ: ১১)

নবী (স ) এর বিরুদ্ধে জনসাধঅরণকে ক্ষিপ্ত করে তোলার জন্যে কুরাইশ সর্দারগণ যে যুক্তি পেশ করতো, এ তার মধ্যে একটি। তাদের বক্তব্য ছিল এই যে, এ কুরআন যদি সত্য হতো এবং নবী (সা) সত্য বিষয়ের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানাতে থাকতেন, তাহলে কওমের সর্দার, গোত্রপতি এবং সম্মানিত ব্যক্তিগণ সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তা গ্রহণ করতেন। এ কি করে হয় যে, কিছু অনভিজ্ঞ ছেলে ছোকরা এবং কিছু নিম্নমানের গোলাম ত একটা সংগত জিনিস মেনে নিল, কিন্তু জাতির মহান ব্যক্তিগণ, যাঁরা বিজ্ঞ ও বিশ্ববিশ্রুত এবং যাঁদের জ্ঞান ও বুদ্ধ বিবেচনার উপর জাতি আস্থাশীল তারা প্রত্যাখ্যান করলো? এ প্রতারণামূলক যুক্তি দিযে তারা জনসাধারণের মধ্যে এ প্রত্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করছিল যে, এ নতুন দাওয়াতের মধ্যে অবশ্যই খারাপ কিছু আছে। এ জন্যেই ত জাতির মহান ব্যক্তিগণ তা মেনে নিচ্ছেন না। অতএব তোমরাও তার থেকে দূরে থাক।

এসব পর্যালোচনা যা বলা হলো তার অর্থ এই যে, এসব লোক তাদের নিজেদেরকে হক ও বাতিলের মানদন্ড স্থির করে রেখেছে। তারা মনে করে য, যে হেদায়েত তারা মেনে নেবে না, তা অবশ্যিই গোমরাহী হওয়া উচিত। কিন্তু তারা একে অভিনব মিথ্যা বলার সাহস করতো না। কারণ এর আগেও আম্বিয়া (আ) এ শিক্ষাই পেশষ করতে থাকেন। আর যেসব আসমানী কিতাব আহলে কিতাবের নিকটে রয়েছে তা সব এ আকীদাগ বিশ্বাস ও হেদায়েতেই পরিপূর্ণ। এ জন্যে এসব লোক একে প্রাচীন বা জরাজীর্ণ মথ্যা বলে। যারা হাজার হাজার বছর যাবত এসব তত্ত্ব পেশ করে তা মেনে চলেছেন তাঁরা যেন এদের দৃষ্টিতে জ্ঞান বিবেক বর্জিত ছিলেন। জ্ঞান বুদ্ধি বিবেকের অধিকারী যেন একমাত্র এরাই। (২৬)

ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা অনুযায়ী কুরাইশ সর্দারগণ নবী (সা) কে বলতো, বেলাল (রা), সুহাইব (রা) আম্বার (রা), খাব্বাব (রা) এবং ইবনে মাসউদ (রা) এর মতো লোক তোমার কাছে উঠা-বসা করে। তাদের সাথে ত আমরা বসতে পারি না। এদের তাড়িয়ে দাও। তাহলে আমরা তোমার কাছে এসে জানতে পারি যে, তুমি কি বলতে চাও। রোমের কায়সার হারকিউলাস নবী পাক (সা) এর পত্র পাওয়অর পর আবু সুফিয়ানকে ডেকে নব (সা) সম্পর্কে কিচু প্রশ্ন করেন। জবাবে আবু সুফিয়ান যা বলেন তার মধ্যে এ কথাও ছিল

(আরবী*************)

আমাদের মধ্যে দুর্বল ও অতি দরিদ্র শ্রেণীর লোক তার আনুগত্য মেনে নেয়। অর্থাৎ তাদের যেন চিন্তার ধরনটাই এ ছিল যে, জাতির বড়ো লোকেরা যা সত্য বলে স্বীকার করে তাই শুধু সত্য। কারণ, তাদের দৃষ্টিতে তারাই একমাত্র জ্ঞঅন-বুদ্ধির অধিকারী ছিল। এখন রইলো দরিদ্র ও বিত্তহীন লোক। ত এদের বিত্তহীন হওয়াই এ কথার প্রমাণ যে, তারা নির্বোধ ও অবিবেচক। এ জন্যে তাদের কোন কথা মেনে নেয়া এবং বড়োলোকদের তা প্রত্যাখ্যান করার অর্থ এই যে, তা একেবারে অর্থহীন।

ঠিক এ ধরনেরর কথাই হযরত নূহের (আ) জাতির সর্দারগণ তাকে বলেছিল। যেমন, সমাজের নিকৃষ্টতম শ্রেণীর লোক তোমাকে মেনে চলছে। এমন অবস্থায় কি আমরা তোমাকে মানতে পারি? সূরা হুদের ২৭ নং আয়অতে তাদের এ কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে, আমরা ত দেখছি যে তোমাকে ত শুধুমাত্র ঐসব লোক না বুঝেই মেনে  চলছে যারা আমাদের মধ্যে সবচেযে নিকৃষ্ট ধরনের। (২৭)

(হুযুরের (সা) প্রতি এ অভিযোগ যে তিনি তাঁর প্রাধান্য চান

সূরা সোয়াদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একবার যখন নবী (সা) কুরাইশ সর্দারদের কাছে তাঁর দাওয়াত পেশ করেন ত সমবেচত লোকজন অন্যান্য অভিযোগের সাথে এ কথাও বলে:

(আরবী*************)

-এ কথা ত অন্য কোন উদ্দেশ্যেই বলা হচ্ছে। অর্থাৎ এ দাওয়াত এ জন্যে দেয়া হচ্ছে যে আমরা যেন মুহাম্মদের (সা) অনুগত হয়ে যাই এবং তিনি আমাদের উপর তার হুকুম শাসন চালান। (২৮)

প্রকাশ থাকে যে, এ ছিল নিছক একটা অভিযোগ অবিশ্বাস ব্যতী যার কোন ভিত্তি ছিল না। সে জন্যে তার কোন জবাব না দিয়ে কুরআনে বলা হয়েছে যে, প্রাচীনকালেও যেসব আল্লাহর বান্দাহ মানুষের সংস্কার সংশোধনের জন্যে আবির্ভূত হয়েছেন তাদের প্রতিও এ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে। যেমন হযরত মূসা (আ) এবং হযরত হারুন (আ) কে ফেরাউনের পারিষদগণ বলেছিল:

(আরবী******************)

-(হে মূসা!) তুমি কি এ জন্যে এসেছ যে, ‍তুমি আমাদেরকে সেসব রীতিপদ্ধতি থেকে ফিরিয়ে দিতে চাও যার উপরে আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি এবং যমীনে তোমাদের দু’ভাইয়ের আধিপত্য কায়েম হয়ে যাক। (ইউনুস: ৭)

এ কথা হযরত নূহকে (আ) তার জাতির সমাজপতিগণ বলেছিল-

(আরবী**************)

-এ ব্যক্তি ত তোমাদের মতোই একজন মানুষ মাত্র। সে চায় তোমাদের উপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে। (মুমেনুন: ২৪)

সত্যের বিরোধী যারা তাদের বিরোধিতার এক অতি প্রাচীন অস্ত্র এই যে, যে ব্যক্তিই সংস্কার সংশোধনের চেষ্টা করেছে তার প্রতিই এ অভিযোগ আরোপ করেছে- “আর কিছু না, এ শুধু ক্ষমতা লাভের অভিলাষী”।

এ অীভযোগই ফেরাউন হযরত মূসা (আ) এবং হযরত হারুন (আ) এর বিরুদ্ধে করেছে। সে বলতো, তোমরা এ জন্যে ময়দানে নেমেছ, যেন দেশে তোমাদের আধিপত্য কায়েম হয়। হযরত ঈসা (আ( এর বিরুদ্ধেও এ অভিযোগ করা হয় যে, এ বক্তি ইহুদীর বাদশাহ হতে চায়। কুরাইশ সর্দারগণ নবী মুহাম্মদের (সা) সম্পর্কে এ সন্দেহই পোষণ করতো। বস্তুতঃ তারা কয়েকবার নবী (সা) এর সাথে এ ধরনের দরকষাকষি করেছে যে, যদি তমি ক্ষমতা লাভের অভিলাষী হয়ে থঅক তাহলে বিরোধিতার ছেড়ে দাও এবং ক্ষমতাসীনদের দলভুক্ত হয়ে যাও। তাহলে তোমাকে আমরা বাদশাহ বানিয়ে দিচ্ছি।

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, যারা সারা জীবন দুনিয়া ও তার আনন্দ সম্ভোগ এবং প্রভাবপ্রতিপত্তির জন্যে সকল শক্তি নিয়োজিত করে তাদের এ ধারণা করা বড়ো কঠিন বরঞ্চ অসম্ভব যে, এ দুনিয়ার বুকে কোন মানুষ নিষ্ঠার সাথে এবং নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণের জন্যে জীবন উৎসর্গ করতে পারে। তারা যেহেতু আপন ক্ষমতা ও প্রভাবপ্রতিপত্তি কায়েমের জন্যে প্রতারণামূলক ও মুখরোচক শ্লোগানসহ জনকল্যাণের মিথ্যা ওয়াদা দিনরাত জনগণের সামনে করতে থাকে, এ জন্যে এ মিথ্যাচার ও ধোঁকাবাজি তাদের কাছে স্বভাবসিদ্ধ বস্তু হয়ে পড়ে এবং তারা মনে করে ধোঁকা প্রতারণা ব্যতীত সত্যতা ও নিষ্ঠা সহকারে জনকল্যাণের নামই নেয়া যেতে পারে না। এ নাম যে ব্যকিস্তই নেয় সে নিশ্চয়ই তাদের মত একজন। মজার ব্যাপার এই যে, ‘ক্ষমতার অভিলাষ’-এ অবিযোগ সমাজ সং্কারকদের বিরুদ্ধে হরহামেশা ক্ষমতাসীন দল ও তাদের তোষামোদকারী সেবাদাসরাই করে এসেছে। তারা যে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে আছে তা যেন তাদের জন্মগত অধিকার। তা লাভ করার জন্যে এবং গদিতে টিকে থাকার জন্যে তারা যা কিচু করভে তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করা যেতে পারে না।

এখানে এ কথা ভালোভাবে উপলব্ধি করা উচিত যে, যে ব্যক্তি প্রচলিত জীবন ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার জন্যে সংগ্রাম করবে এবং তা মোকাবিলায় সংস্কারমূলক দৃষ্টিভংগী ও ব্যবস্থা পেশ করবে, তার জন্যে এ অপরিহারয যে, সংস্কারের পথে যে শক্তিই প্রতিবন্ধক হতে তা দূর করার চেষ্টা করবে এবং সেসব শক্তিকে ক্ষমতাসীন করবে যা সংস্কারমূলক দৃষ্টিভংগী ও ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারবে। উপরন্তু এ ধলনের লোকের দাওয়াত যখন সাফল্যমন্ডিত হবে, তখন তার স্বাভাবিক ফল এ হবে যে, সে তখন জনগণের নেতৃত্বদানের মর্যাদা লাভ করবে। তখন নতুন ব্যবস্থার ক্ষমাতর চাবিকাঠি হয় তার নিজের হাতে হবে অথবা তার সমর্থক ও অনুসারীদের হাতে। নবীগণ এবং দুনিয়ার সংস্কারকদের মধ্যে এমন কে আছে, যাঁর উদ্দেশ্য তার দাওয়াতকে কার্যত বাস্তবায়িত করা ছিল না? এমনই বা কে আছেন, যাঁর দাওয়অতের সাফল্য প্রকৃতপক্ষে তাঁকে নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেনি? তাহলে এটাই কি তার উপর এ অভিযোগ আরোপ করার জন্যে যথেষ্ট যে, সে ক্ষমতা লাভের অভিলাষী ছিল এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল নেতৃত্ব লাভ যা সে এখন লাভ করেছে? একমাত্র বিদ্বেষাত্মক হকের দুশমন ব্যতীত আর কেউ এর হাঁ-সূচক জবাব দিতে পারবে না। সত্য কথা এই যে, ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে ক্ষমতা হসা্তগত করা  এবং কোন মহান উদ্দেশ্যের জন্য ক্ষমতা হস্তগত করায় আকাশ পাতাল ফারাক রয়েছে, যেমন ফারাক ডাকাতের ছোরা এবং ডাক্তার-সার্জনের চাকুর মধ্যে। যদি কেউ ডাকাত ও উভযের অর্থ হস্তগত করে, তাহলে এটা তার মস্তিষ্কের ত্রুটিই বলতে হবে। নতুবা উভযেল নিয়ত, কর্মপদ্ধতি এবং উভযের ভূমিকার এতো বিরাট পার্থক্য থাকে যে, কোন বিবেকসম্পন্ন লোক ডাকাতকে ডাকাত এবং ডাক্তারকে ডাক্তার মনে করতে ভুল করতে পারে না। (৩০)

ঠিক এই আচরণ হযরত হুদ (আ), এর সাথে করা হয়। তাঁর জাতির সমাজপতিগণও জনগণকে সম্বোধন করে বলে-

(আরবী*****************)

-এ ব্যক্তি তোমাদর মতোই একজন মানুষ ব্যতীত কিছু নয়। তোমরা যা খাও, সেও তাই খায়, তোমরা যা পান কর, তাই সে পান করে। এখন তোমরা যদি তোমাদেরই মতন একজন মানুষের আনুগত্য কর তাহলে তোমরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে। (মুমেনূন: ৩৩-৩৪)

জাতির সমাজপতিগণ যখন আশংকা বোধ করলো যে, জনসাধঅরণ পয়গম্বরের পুতঃপবিত্র ব্যক্তিত্ব এবং মনমুদ্ধকর কথায় প্রভাবিত হয়ে পড়বে। তখন আর আমাদের জারিজুরি কর উপর চলবে? সে জন্রে তারা এ ধরনের কথঅ বলে বলে জনসাধারণকে বিভ্রা্ত করতে থঅকে। তরা বলতো, এ খাদার পক্ষ থেকে পয়গম্বরি –টয়গম্বরি কিছু না, শুধু ক্ষমতার লালসা যার জন্যে এসব কথঅ বলছে। ভাইয়েরা, একটুখানি ভেবে দেখ দেখি, এ ব্যক্তি তোমাদের থেকে কোন্‌ দিক দিযে ভিন্নতর? তোমাদের মতোই রক্ত মাংসের মানুষ। তোমাদের  এবং তার মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। তাহলে কেন সে লাঠসাহেব হবে আর তোমরা তর হুকুম মতো চলবে?

তাদের এসব প্রচারণায় একথা যেন সর্বস্বীকৃত, মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আমরা তোমাদের সর্দার বা সমাজপতি তা ত হওয়াই উচিত। আমাদের রক্ত-মাংস ও খানাপিনার দিকে লক্ষ্য করার কোন প্রশ্নই আসে না। আলোচ্য বিষয় আমাদের মাতব্বরী নয়। কারণ তা ত আপনা আপনিই কায়েম আছে এবং সর্বস্বীকৃত। আলোচ্য বিষয় হলো এ নতুন সর্দারি সমাতব্বরি যা এখন কায়েম হতে চলেছৈ বলে দেখা যা।

এভাবে তাদের কথা নূহের জাতির-সমাজপতিদের থেকে ভিন্নতর কিছু নয়। তাদের নিকটে আপত্তিকর কিছু থাকলে তা “ক্ষমতার ক্ষুধা” যা কোন নবাগতের মধ্যে অনুভূত হচ্ছে অথবা যা হওয়ার আশংকা হচ্ছে। এখন রইলো তাদের পেট। ত তারা মনে করতো, ক্ষমতা তাদের স্বাভাবিক ক্ষুধা। তাতে যদি বদহজমও হয় ত তাতে দোষ নেই। (৩১)

নবীর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ যে তিন গণক ছিলেন এবং শয়তান তার নিকটে আসতো

মক্কার কাফেরগণ এ অভিযোগ করতো যে, মুহাম্মদ (সা) একজন গণক ছিলেন। আর যে কুরআন তিনি পেশ করছেন, তা ফেরেশতা নয় বরঞ্চ শয়তান তার কাছে নিয়ে আসে। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এর জবাব দেয়া হয়েছে।

(আরবী****************)

-অতএব, হে নবী! তুমি সদুপদেশ দিতে থাক। তোমার রবের মেহেরবানীতে না তুমি গণক, না পাগল। (তুর: ২৯)

আরবী ভাষায় কাহেন (***) জ্যোতিষী, ভবিষ্যদ্বক্তা, অতি চালাক প্রভৃতি অর্থে ব্যবহৃত হয়। জাহেলিয়াতের যুগে এ ছিল এক স্থায়ী পেশা। কাহেনদের দাবী ছিল এবং দুর্বলচিত্ত লোকও মনে করতো যে, তারা ছিল জ্যোতিষী, অথবা আত্মা এবং জ্বিন-শয়তানের সাথে বিশেষ সম্পর্ক ছিল যার ফলে তারা ভবিষ্যৎ অথবা গোপন খর জানতে পারতো। কোন কিচু হারিয়ে গেলে তারা বলতে পারতো যে, তা কোথায় আছে। কারো কিছু চুরি হলে বলে দিত কে চুরি করছে। কেউ তার ভাগ্য জিজ্ঞেস করলে তার ভাগ্যে কি লেখা আছে তা বলে দেয়া হতো। এসব উদ্দেশ্য মানুষ তাদের নিকটে যেতো এবং তারা কিছু নযর নিয়ায নিয়ে তাদেরকে অদৃশ্য খর বলে দিত। তরা (কাহেন) স্বয়ং বস্তির মধ্যে আওয়াজ দিয়ে বেড়াতো। যাতে মানুষ তাদের শরণপডনন হতে পারে। তাদের এক বিশেষ ধরণের সাজ-পোষাক হতো যার থেকে তাদেরকে পৃথকভাবে চিনতে পারা যেতো। তাদের ভাষাও সাধারণ কথ্য ভাষা থেকে পৃথক হতো। কিছু কবিতার ছন্দমধুর কন্ঠে তারা কথা বলতো এবং সাধারণতঃ এমন অস্বষ্ট ভাষা ব্যবহার করতা যার থেকে প্রত্যেক তাদের নিজ নিজ মনের কথা বুঝে ফেলতো। কুরাইশ সর্দারগণ জনসাধারণকে ধোঁকা দেয়ার জন্যে নবী (সা) এর উপর কাহেন বা গণক হওয়ার অভিযোগ এ জন্যে করতো যে, তিনি এমন সব গোপন তথ্য ও তত্ত্ব বলে দিতেন যা মানুষের দৃষ্টি বহির্ভূত। নবী (সা) এর দাবী ছিল খোদার পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা এসে তার ওপর অহী নাযিল করতেন এবং খোদার যে বাণী তিনি পেশ করতেন তাও ছিল ছন্দমধুর। কিন্তু আরবের কোন ব্যক্তিও তাদের এ অভিযোগদের দ্বারা বিভ্রান্ত হতো না। এ জন্যে  যে, গণক বা জ্যোতিষীদের পেশা, তাদের সাজ-পোশাক, তাদের ভাষা, তাদের কায়কারবার কারো অজানা ছিল না। সকলেই জানতো যে, তারা কি কাজ করে। কোন্‌ উদ্দেশ্যে মানুষ তাদের কাছে যায়। কি কথা তারা তাদেরকে বলে। তাদের ছন্দমিম্রিত কথা কেমন হয়ে থাকে এবং কি বিষয়ের সাথে তা সংশ্লিষ্ট। সবচেয়ে বড়ো কথা এই যে, গণকের কাজ এ মোটেই হতে পারে না যে, সমাজে প্রচলিত একটা ধর্ম বিশ্বাসের বিপরীত অন্য এক ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে আবির্ভূত হব, দিন রাত তার প্রচার প্রসারের জন্যে আত্মনিয়োগ করবে এবং পরিণামে সমগ্র জাতি তার শত্রু হয়ে পড়বে। এ জন্যে রসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি গণক বা জ্যোতিষী হওয়ার অভিযোগ কিছুতেই বিভ্রন্ত হতে পারতো না। এ কারণেই এ অভিযোগ খন্ডনের জন্যে কোন যুক্তি পেশ করার প্রয়োজন বোধ করা হয়নি। কারণ এ ছিল স্ববিরোধী। এ শুধু এতোটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে-, হে নবী! তুমি তাদের অভিযোগের কোন পরোয়া না করে মানুষকে তাদের কর্তব্যের প্রতি উদাসীনতার জন্যে সাবধান করে দাও এবং প্রকৃত সত্র সম্পর্কে অবহিত কর। কারণ তুম গণকও নয় এবফ পাগলও নও। (৩২)

(আরবী****************)

-এবং এ কোন বিতাড়িত শয়তানের কথা নয়। অতঃপর তোমরা কোনদিকে চলেছ? (তাকবীর: ২৫-২৬)

অর্থাৎ তোমাদের এ ধারণা ভুল যে, কোন শয়তান এসে নবী মুহাম্মদের (সা) কানে এসব কথা ফুঁকে দেয়। শয়তানের এ কাজ কি করে হতে পারে যে, সে মানুষকে শির্ক, পৌত্তলিকতা, বস্তুবাদ ও নাস্তিকতা থেকে মুক্ত করে খোদা পরস্তি ও তৌহীদের শিক্ষা দেবে? মানুষের বল্গাহীন হয়ে থাকার পরিবর্তে তাদের মধ্যে খোদার কাছে দায়িত্ব-কর্তব্য ও জবাবদিহির অনুভূতি শয়তান সৃষ্টি করে দেবে? জাহেলী রেসেম রেওয়াজ, জুলুম, চরিত্রহীনতা, দুষ্কৃতি প্রভৃতি থেকে বিরত রেখে পবিত্র জীবন যপন, সুবিচার, খোদাভীতি এবং মহৎ চরিত্রের পথ নির্দেশনা দেবে?(৩৩)

(আরবী***************)

-এ কিতাব শয়তান নিয়ে অবতীর্ণ হয়নি। না এ কাজ তার শোভা পায়, আর না সে তা করতে পারে। তাকে ত এ শোনার থেকেও দূরে রাখা হয়েছে। (শুয়ারা : ২১০-২১২)

কুরাইশ কাফেরগণ নবী (সা) এর বিরুদ্ধে যে মিথ্যার অভিযান শুরু করেছিল, তাতে বিরাট অসুবিধা ছিল এই যে, কুরআনের আকারে বিস্ময়কর বাণী মানুষের সামনে পেশ করা হচ্ছিল এবং যা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করছিল; তা কি ব্যাখ্যা করা যায়। জনগণের মধ্যে তার প্রচার বন্ধ করার কোন সাদ্য তাদের ছিল না। এখন বিরাট সমস্যা এই যে, কুরআন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করার এবং তার প্রভাব থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্যে কি অবলম্বন করা যায়। তাদের এ বিব্রতকর অবস্থায় তারা জনসারণের মধ্যে যেসব অভিযোগ ছড়াচ্ছিলো তার মধ্যে একটি এই যে, মুহাম্মদ (সা) মায়াযাল্লা, একজন গণক এবং সাধারণ গণকের ন্যায় এসব বাণী শয়তান তার মনের মধ্যে অনুবিষ্ট করে দেয়। এ অভিযোগ তারা সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র বলে মনে করতো। তাদের ধারণা ছিল এই যে, সে বাণী ফেরেশতা নিয়ে আসছে, না শয়তান, তা যাঁচাই করার কোন উপায় কারো নিকটে ছিল না। আর শয়তানের পক্ষ থেকে অনুপ্রবিষ্ট করাহচ্ছে, তা কেউ খন্ডন করতে চাইলেই বা কিভাবে করবে?

এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, এসব বাণী এবং এ বিষয়বস্তু শয়তানের মুখ থেকে বেরুবেই না। যার জ্ঞঅন বিবেক আছে, সে স্বয়ং বুঝতে পারে যে, যেসব কথা কুরআন থেকে বলা হচ্ছে তা কি কখনো শয়তানের পক্ষ হতে পারে? তোমাদের বস্তিতে গণক নেই? সে জ্বিন শয়তানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে যেসব কথা বলে তা তোমরা শুন না? তোমরা কি কোন দিন এ কথা শুনেছো যে, কোন শয়তান কোন গণকের মাধ্যমে মানুষকে খোদা পরস্তি ও খোদাভীতির শিক্ষা দিয়েছে? শির্ক ও পৌত্তলিকতা থেকে বিরত রেখেছে? সততা, সত্যনিষ্ঠা এবং মানুষের সাথে সদাচরণের সদুপদেশ দিযেছে? এ ধরনের মেজাজ প্রকৃতি কি শয়তানের কোনদিন হয়ে থাকে? শয়তানদের মেজাজ প্রবৃতি ত এই যে, মানুষের মধ্যে অশান্তি বিপর্যয় সৃষ্টি করবে, পাপাচারের প্রতি উৎসাহিত করবে। শয়তানের সাথে  সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষাকারী গণক ও জ্যোতিষীদের কাছে মানুষ ত এ জন্য যায় যে, প্রেমিক তার প্রেমিকাকে পাবে কি না। জুয়া খেলায় কোন পদক্ষেপ লাভজনক হবে। দুশমনকে পরাখভূত করতে হলে কোন কৌশল অবলম্বন করা দরকার। তারা এ কথা জানতে চায় অমুকের উট কে চুরি করেছে। এসব কায়কারবার ছাড়া গণক ও তাদের পৃষ্ঠপোষক শয়তানগণ কি কোন দিন মানুষের সংস্কার সংশোধন, নেক কাজের শিক্ষা, অনাচাপর নির্মূল করার কোন চিন্তা করেছে কি? শয়তান চাইলেও এ কাজ তাদের সা্ধ্যের অতীত যে, কিছুক্ষণের জন্যেও নিজেদেরকে মানুষের সত্যিকার শিক্ষক ও সংস্কারকের স্থানে অধিষ্ঠিত করে সত্য ও কল্যাণের শিক্ষা দেবে যা কুরআন দিচ্ছে। তারা ধোঁকা দেয়ার জন্যেও যদিও এ রূপ ধারণ করে, তথাপি কাজকর্ম এমন নির্ভেজাল হতে পারে না যা তাদের অজ্ঞতা এবং লুকানো শয়তানী স্বভাব প্রকৃতির পরিচয় দেবে না।

যে শয়তানের পক্ষ থেকে প্রেরণা লাভ করে ধর্মীয় নেতা হয়েছে, তার জীবনে এবং শিক্ষার মধ্যেও অসৎ] অীভপ্রায়, অসৎ উদ্দেশ্য ও চারিত্রিক নোংরামির পরিস্ফূরণ ঘটবেই। নির্ভেজাল সত্যনিষ্ঠা এবং খালেস নেকি কখনো শয়তান কারো মধ্যে অনুবিষ্ট করতে পারে না এবং শয়তানের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ যারা রাখে তারাও এসব গুণাবলীর অধিকারী হতে পারে না।

অতঃপর বলা হয়েছে যে, কুরআন যখন অহীর মাধ্যমে অন্তরে পবিষ্ট করে দেয়া হয়, তাতে শয়তানের হস্তক্ষেপ করা ত দূরের কথা, যে সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) কুরআনসহ চলতে থাকেন এবং ‍যখন নবী মুহাম্মদ (সা) এর অন্তরে তা নাযিল করেন এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন এক সময়ে এবং কোন এক স্থান থেকেও শয়তানের কান পেতে শুনার কোন সুযোগই হয় না। সে আশপাশ কোথাও থেকে উঁকিঝুঁকি মারতেও পারে না যে, কিছু কথা শুনে নিয়ে বন্ধুদের কাছে আগে ভাগেই বলে দেবে যে, আজ মুহাম্মদ (সা) এ পয়গাম শুনাচ্ছেন অথবা তাঁর ভাষণে অমুক বিষয়ের উল্লেখ থাকবে। (৩৪)

এ অভিযোগ যে তাঁকে কেউ শিখিয়ে পড়িয়ে দেয়

কুরাইশ কাফেরগণ একদিকে এ কথা বলতো যে, মায়াযাল্লাহ শয়তান নবী (সা) এর মনে কুরআন সঞ্চারিত করে দেয় এবং অপরদিকে ঠিক তার বিপরীত এ অভিযোগ করতো যে, তিনি কারো নিকট থেকে শিখে পড়ে এ কুরআন পেশ করছেন।

(আরবী*****************)

-অতঃপর তারা রসূলের দিক থেমে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলতে লাগলো, এ তো শিখানো পড়ানো পাগল।” –(দুখান: ১৪)

 তাদের কথার অর্থ ছিল এই যে, বেচারা ত সাদাসিদা মানুষ ছিলেন। কতিপয় অন্য লোকে তাঁকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছৈ। গোপনে তরা কুরআনের আয়াতের নামে কিছু রচনা করে একে পড়িয়ে দেয়। তিনি তারপর সাধারণ মানুষের সামনে এসে তা পেশ করেন। তারা ত মজা করে বসে থাকে, আর এ বেচারা গালি ও পাথর খেতে থাকেন। এভাবে এটা বিভ্রান্তিকর কথা বলে দিয়ে তারা সেসব যুক্তি-প্রমাণ, সদুপদেশ, শিক্ষা-দীক্ষা নস্যাৎ করে দিত যা রসুলুল্লাহ (সা) বছরের পর বছর ধরে তাদের সামনে পেশ করতেন। কুরআনে যেসব ন্যায়সঙ্গত কথা বলা হতো তার প্রতি তারা কোন মনোযোগ দিত না, আর না তারা এদিকে লক্ষ্য করতো যে, যে ব্যক্তি এসব বিষয় পেশ করছেন তিনি কোন স্তরের লোক, আর না অভিযোগ করার সময় একথা চিন্তা করার কষ্ট স্বীকার করতো যে তারা কি সব আজেবাজে কথা বলছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তাকে যদি পর্দার আড়ালে থেকে শেখাবার এবং পড়াবার কোন লোক থাকতো তাহলে কি করে তা হযরত খাদিজা (রা), হযরত আবু বকর (রা), হযরত আলী (রা). হযরত যায়দ বিন হারেসা (রা) এবং অন্যান্য বহু প্রাথমিক মুসলমানের নিকটে গোপন থাকতো? তাঁদের থেকে নিকটতর এবং সার্বক্ষণিক সাথ রসূল (সা) এর আর কেউ ছিল না। তাহলে কি কারণ থাকতে পারে যে, এসব লোকই নবী পাকের (সা) সবচেয়ে বেশী ভক্ত অনুরক্ত হয়ে পড়েন? আসলে পর্দার আড়াল থেকে অন্য লোকের শিখানো পড়ানোর দ্বারা যদি নবুয়তের কাজকর্ম চালানো হতো তাহলে এসব লোকই তাঁর সবচেয়ে বেশী বিরোধিতা করতেন।

(আারবী******************)

-আমাদের জানা আছে, তারা একথা বলে, এ ব্যক্তিকে কেউ শেখায় পড়ায়। অথচ তাদের ইঙ্গিত যে ব্যক্তির প্রতি তার ভাষা কিন্তু আজমী আর এ হচ্ছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষী। (নহল: ১০৩)

বর্ণনায় বিভিন্ন লোকের নাম বলা হযেছে যাদের মধ্যে কোন একজন সম্পর্কে মক্কার কাফেরগণ এ ধারণা পোষণ করতো য সে নবী (সা) কে শেখাতো পড়াতো। এক রেওয়য়েতে তার নাম জাবার বলা হয়েছে, যে ছিল আমের বিন হাদরামীর এক রোমীয় গোলাম। অন্য রেওয়ায়েতে হুয়াইতিব বিন আব্দুল ওয্যার এক গোলামের কথা বলা হয়েছে, যার নাম ছিল আয়েশ অথবা ইয়াইশ। অন্য এক বর্ণনায় ইয়অসার এর নাম বলা হযেছৈ যার কুনিয়াত ছিল আবু ফুকাইহা। সে ছিল মক্কার জনৈকা মহিলার ইহুদী গোলাম। অন্য এক বর্ণনায় বালআন অথবা আলআম নামের এক রোমীয় গোলামের উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে যে কেউই হোক না কেন, মক্কায় কাফেরগণ দেখতো যে সে তাওরাত এবং ইনজিল পড়তো এবং নবী মুহাম্মদ (সা) এর সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ হতো। এজন্য তারা বিনা দ্বিধায় এ অভিযোগ করতো যে, প্রকৃতপক্ষে কুরআন সেই রচনা করতো এবং মুহাম্মদ (সা) তা নিজের পক্ষ থেকে খোদার  নামে পেশ করতেন। এর থেকে শুধু এ ধারণাই করা যায় না যে, নবী বিরোধীগণ তাঁর প্রতি অপবাদ রচনায় কতটা নির্ভীক ছিল, বরঞ্চ এটাও জানা যায় যে, মানুষ আপন সমসাময়িক লোকের মর্যাদা নির্ধারণে কতটা অবিচার করে। তাদের সামনে মানবীয় ইতিহাসের এমন এক বিরাট ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁর নজীর না তৎকালনি দুনিয়ার কোন স্থানে পাওয়া যেত আর না আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁর মুকাবিলায় এসব জ্ঞান বুদ্ধি বিবেকহীন লোকের কাছে একজন আজমী গোলাম তাওরাত-ইনজিলের যা কিছু পড়তে পারতো সেই ছিল যোগ্যতর। তারা ধারণা করতো যে, এ দুষ্প্রাপ্য রত্ন এ কয়লা থেকে আলোকচ্ছটা করছে। (৩৬)

নবী পাকের অহীর অধিকারী হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ

কুরআন মজিদে হযরত মূসার (আ) কাহিনী বর্ণনা করার পর একস্থঅনে আল্লাহ পাক বলেন:-

হে নবী! তুমি সে সময়ের পশ্চিম  কোণে (তুরে সীনার পাদদেশে) উপস্থিত ছিলে না যখন আমরা মূসাকে এ শরীয়তী ফরমান দান করি, আর না তুমি এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে একজন ছিলে। কিন্তু তারপর থেকে তোমার কাল পর্যন্ত আমরা বহু মানব বংশ সৃষ্টি করেছি এবং তাদের পরে অনেককাল অতিবাহিত হয়েছে। তুমি মাদইয়ানবাসীরেদ মধ্যেও ছিলে না যে, তাদেরকে আমাদের আয়াত শুনাতে। কিন্তু (সে সময়ের এসব খবর) আমিই পৌঁছাচ্ছি। তুমি তূরের পাদদেশে তখনা ছিলে না যখন আমরা প্রথমবার ‍মূসাকে ডেকেছিলাম। কিন্তু তোমার রবের এ মেহেরবাণী যে, (তোমাকে এসব তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে) যাতে তুমি এমন এক জাতিকে সাবধান করে ডদিতে পার যাদের নিকটে তোমার পূর্বে কোন সাবধানকারী আসেনি। (কাসাস: ৪৪-৪৬)

এ তিনটি কথা রসূলুল্লাহ (সা) এর নবুয়তের প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হয়েছে যে, আল্লাহর অহী ছাড়া এসব তথ্য জানার আর কোন উপায় নেই। এ কথা যখন কুরআনে বলা হয়েছিল, তখন মক্কার সকল সমাজপতি ও সাধারণ কাফের এ ব্যাপারে বদ্ধ পরিকর ছিল যে, যে কোন উপায়ে তারা তাঁকে অনবী এবং মায়াযাল্লাহ মিথ্যা নবী প্রমাণিত করবে। তাদের সহযোগিতার জন্যে ইহুদী ওলামা এবং খৃস্টান সন্ন্যাসীগণ হেজাজের জনপদগুলোতে বিদ্যমান ছিলেন। কিনতু নবী মুহাম্মদ (সা) উর্ধ আকাশ থেকে এসে এ কুরআন শুনিয়ে যেতেন না, বরঞ্চ তিনি এ মক্কারই অধিবাসী ছিলেন। তাঁর জীবনের কোন একটি দিকও তঁঅর বস্তি ও গোত্রের লোকদের অজ্ঞাত ছিল না, এটাই কারণ যে, যখন এ ধরনের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জের ভাষায় রসূলুল্লাহ (সা) নবুয়তের প্রমাণস্বরূপ এ তিনটি কথা বলো হলো তখন মক্কা, হিজাজ এবং গোটা আরবের কোন একটি লোকও দাঁড়িয়ে সে বেহুদা কথা বলতে পারে নি যা আজ ইসলামবৈরী প্রাচ্যবিদগণ বলছেন। যদিও মিথ্যা রচনায় তারা এদের থেকে কিছু কম ছিল না। কিন্তু এমন নির্জলা মিথ্যা তারা কি করে বলতে পারতো যা এক মুহূর্তের জন্যেও চলতো না। তারা কি করে বলতো হে মুহাম্মদ (সা), তুমিতো অমুক অমুক ইহুদী আলেম ও খৃস্টান সন্যাসীদের নিকট থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করে এনেছ। কারণ তারা সারদেশের মধ্যে এ উদ্দেশ্যে কারো একজনের নাম বলতো পারতো না। কারো নাম নেয়ার সাথে সাথেই প্রমাণ হয়ে যেতো যে, হুযুর (সা) তার কাছ থেকে কোন তথ্য সংগ্রহ করেননি। তারা কি করে বলতো হে মুহাম্মদ (সা) তোমার নিকটে৬ তো অতীত ইতিহাস-জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এক লাইব্রেরী রয়েছে যার সাহায্যে তুমি এসব ভাষণ দিচ্ছ। কারণ লাইব্রেরী ত দূরের কথা, মুহাম্মদ (সা) এর আশপাশ কোথাও থেকে এক টুকরা কাগজও বের করতে পারতো না যার মধ্যে এসব তথ্য লিখিত। মক্কার আবাল বৃদ্ধবণিতা জানতো যে, মুহাম্মদ (সা) ছিলেন নিরক্ষর এবং কেউ এ কথা বলতে পাতো না যে, তিনি কিছু দোভাষীর সাহায্য নিয়েচেন যারা ইরানী, সুরিয়ানী এবং গ্রীক ভাষার বই পুস্তক তরজমা করে করে তাঁকে দিত। তহারপর তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো নির্লজ্জ ব্যক্তিও এ দাবী করার সাহস করতো না যে, সাম ও ফিলিস্তিনের বানিজ্যিক সফরে তিনি এসব তথ্য হস্তগত করে এসেছেন। কারণ এ সফর একাকী হয়নি। মক্কারই বাণিজ্যিক কাফেলা প্রত্যেক সফরে মুহাম্মদ (সা) এর সাথে থাকতো। কেউ এমনটি দাবী করলে শত শত জীবিত সাক্ষ্যদাতা এ সাক্ষ্য দিত যে, তিনি সেখানে কারো নিকট থেকে কোন শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তাছাড়া তাঁর ইন্তেকালের দু’বছরের মধ্যেই রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলমানগণ যুদ্ধ শুরু করেন। মিথ্যা মিথ্যি একথা যদি কেউ বলতো যে শাম ও ফিলিস্তিনের কোন খৃস্টান সন্ন্যাসী অথবা ইহুদী রাব্বীর সাথে হুযুর (সা) আলাপ আলোচনা করছেন, তাহলে ত রোম সাম্রাজ্য তিলকে তাল বানিয়ে এ প্রাচারণা করতে সামান্য দ্বিধাবোধও করতো না যে, মুহাম্মদ () মায়অযাল্লাহ সব কিছু এখঅনে শিক্ষা করে যান এবং মক্কায় গিয়ে নবী হয়ে পড়েন। মোটকথা, সেকালে যখন কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ কুরাইশ কাফের এবং মুশকিরদের জন্যে মৃত্যু ঘন্টার সমতুল্য ছিল এবং তা মিথ্যা বলে চালিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা আধুনিক প্রাচ্যবিদগণ অপেক্ষা অনেকগুণে  বেশী ছিল, তাদের এমন অবস্থায় কোন ব্যক্তিই কোথাও থেকে এমন কোন তথ্য সংগ্রহ করে আনতে পারে নি যার দ্বারা সে প্রমাণ করতে পারতো যে, মুহাম্মদ (সা) এর নিকটে অহী ব্যতীত এসব তথ্য জানার অন্য কোন উপায় ছিল যা চিহ্নিত করা যায়। (৩৭)

পাগল হওয়ার অভিযোগ

যেসব ভিত্তিহীন অভিযোগ হুযুর (সা) এর বিরুদ্ধে করা হচ্ছিল তার মধ্যে একটি এ ছিল যে, তিনি মায়াযাল্লাহ। পাগল ছিলেনৈ।  এ অর্থে তারা তাঁকে যাদুকৃতও বলতো। (তাঁর উপর যাদু করা হয়েছে) তাদের কথার অর্থ এটাও ছিল যে, তাঁর উপর জিনের আসর বা প্রভাব পড়েছে। কুরআনে তাদের এ কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে-

(আরবী****************)

“এবং তারা বলে, আমরা কি একজন পাগল কবির খাতিরে আমাদের মাবুদদের পরিত্যাগ করব?” (সাফফাত: ৩৬)

অন্যত্র বলা হয়েছে

(আরবী***************)

“এবং এ জালেমরা বলে, তোমরা ত যাদুকরা এক ব্যক্তির পেছনে ছুটেছ। (ফুরকান: ৮)

আর এক স্থানে বলা হয়েছে-

(আরবী****************)

“তারা কি বলে যে, এর উপর জ্বিন সওয়ার হয়েছে?

(অর্থাৎ জ্বিনের প্রভাবে সে পাগল হয়েছে।) (মুমেনূন: ৭০)

এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য ছিল একই। কারণ আরবাসীর কাছে পাগল হওয়ার কারণ ছিল দু’টি। হয় কেউ তাকে যাদু করে পাগল বানিয়ে দেবে, অথবা তার উপর জ্বিন সওয়ার হয়েছে। (৩৮)

কুরআন পাকে অভিযোগগুলো উদ্ধৃত করা হয়েছে একথা বলার জন্যে যে, অভিযোগকারীগণ কতটা অন্ধ বিদ্বেষ পোষণ করতো। তাদের যেসব অভিযোগ এখানে এবং অন্যান্য স্থানে বর্ণনা করা হয়েছে, তার মধ্যে একটিও এমন নয় যা গুরুত্বসহকারে আলোচনার মতো। তার উল্লেখ এ কথা বলার জন্যে করা হয়েছে যে, বিরোধীদের কাছে কোন যুক্তি প্রমাণ ছিল না এবং কেমন অর্থহীন বেহুদা কথায় একটি যুক্তিপূর্ণ সংস্কারমূলক দাওয়াতের মুকাবিলা করছে। একজন বলছে ভাইসব! যে শির্কের উপর তোমাদের ধর্ম ও তামাদ্দুনের বুনিয়াদ কায়েম আছে একটা ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং তা ভ্রান্ত হওয়ার এই এই যুক্তি। জবাবে শির্ক সত্য ও সঠিক হওয়ার কোন যুক্তি প্রমাণ দেয়া হচ্ছে না। ব্যস্‌ শুধু বলা হচ্ছে, এ লোকটির উপর যাদু প্রমাণ বড়ো ক্রিয়া করেছে। তিনি বলছেন, তোমাদেরকে দুনিয়ার বুজে লাগামহীন করে ছেড়ে দেয়া হয়নি। বরঞ্চ তোমাদেরকে তোমাদের প্রভুর নিকটে ফিরে যেতে হবে এবং আপন আপন কর্মকান্ডেরন হিসাব দিতে হবে। আর এ সত্যকে প্রমাণ করছে এই এই নৈতিক, ঐতিহাসিব, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত কার্যকলাপ। জবাবে বলা হচ্ছে, এ কবির কথা। তিনি বলছেন, আমি খোদার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে সত্য শিক্ষা দেয়ার জন্যে এসেছি। আর এ হচ্ছে সেসব শিক্ষা। জবাবে সেসব শিক্ষার উপর কোন আলোচনা হয় না। ব্যস্‌ বিনা প্রামণে এ অভিযোগ করা হয় যে, এসব কোথাও থেকে নকল করে বলা হচ্ছে। তিনি তাঁর রেসালাতের প্রমাণস্বরূপ খোদার অলৌকিক বাণী পেশ করছেন। স্বয়ং নিজের জীবন, সীরাত ও কর্মকান্ড পেশ করছেন। সেই সাথে সেই নৈতিক বিপ্লব পেশ করছেন যা তাঁর প্রভাবে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে সূচিত হচ্ছে। বিরোধীরা তার কোনটির প্রতিও লক্ষ্য করছে না। ব্যস্‌ জিজ্ঞেস করছে, তুমি খানাপিনা কর কেন? বাজারে ঘুরাফেরা কর কেন? তোমার আর্দালী হিসাবে কোন ফেরেশতা নেই কেন? তোমার কাছে কোন ধন ভান্ডার অথবা বাগান নেই কেন? এসব কথা স্বয়ং প্রমাণ করছ যে, এ দু’পক্ষের মধ্যে সত্যের উপর প্রতিষিঠত কে এবং কে মুকাবিলায় অপারগ হয়ে আবোল তাবোল বকছে। (৩৯)

(আরবী****************)

-হে নবী (সা)! এদেরকে বলে দাও, আমি তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি। খোদার ওয়াস্তে তোমরা একা একা এবং দুই জন মিলে তোমার মস্তিষ্ক চালনা ক এবং ভেবে দেখ যে, তোমাদের সাথীর মধ্যে এমন কি আছে যাকে পাগলামি বলে। সে ত এক কঠিন আযাব আসার পূর্ব তোমাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছে। (সাচবা: ৪৬)

অর্থাৎ সকল প্রকার স্বার্থপরতা, প্রবৃত্তির অভিলাষ এবং বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে নিষ্ঠাসহকারে আল্লাহর জন্যে চিন্তা-ভাবনা করে দেখ। প্রত্যেক পৃথক পৃথকভাবে নেক নিয়তের সাথে এবং দুই দুই চার চারজন একত্রে মিলে ভালোভাবে আলাপ, আলোচনা করে যাচাই করে দেখ যে, এমন কি ঘটলো যে, তার ভিত্তিতে তোমরা আজ ঐ ব্যক্তিকে পাগল বলছ যাকে তোমরা কাল পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করতে? নবুওয়তের কিচুকাল পূর্বেই ত ঘটনা যে কাবা নির্মাণের পর হিজ্বরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে যখন কুরাইশ গোত্রগুলো পরস্পরে ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়, তখন তোমরারই তো সর্বসম্মতিক্রমে মুহাম্মদকে (সা) সালিস মেনে নিলে। তারপর সে এমনভাবে সে ঝগড়া মিটিয়ে দিল যে তোমরা সকলে সন্তুষ্ট হলে। যে ব্যক্তির জ্ঞান বুদ্ধি প্রজ্ঞা সম্পর্কে সমগ্র জাতির এ অভিজ্ঞতার পর হঠাৎ এমন কি হলো যে এখন তোমরা তাকে তাগল বলছ? জিদ ও হঠকারিতা ত পৃথক বিষয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই তোমরা অন্তর থেকে কি তাই মনে কর যা তোমরা মুখে বলছ? সে তোমাদেরকে এক কঠিন শাস্তি আসার পূর্বে সাবধান করে দিচ্ছে। এটাই কি তার অপরাধ যা জন্যে তোমরা আজ তাকে পাগল বলছ? তোমাদের দৃষ্টিতে সেই জ্ঞঅনী ব্যক্তি যে তোমাদেরকে ধ্বংসের পথে যেতে দেখে বলে, বাহ শাবাশ! বড়ো ভালো কাজ করছ? আর পাগল কি সে ব্যক্তি যে তোমাদের মন্দ অবস্থা আসার পূর্বে সাবধান করে দেয় এবং অশান্তি অনাচারের স্থলে সংস্কারে সংশোধনের পথ বলে দেয়? (৪০)

(আরবী*****************)

তারা কি এ কথা বলে যে এ ব্যক্তিকে জ্বিনে ধরেছে? (মুমেনূন: ৭০)

অর্থাৎ নবী মুহাম্মদকে (সা) অস্বীকার করার কারণ কি তাদের এই যে, তারা সত্যি সত্যিই তাঁকে পাগল মনে করতো? নিশ্চয়ই এ তাদের প্রকৃত কারণ ছিল না। কারণ মুখে তারা যা কিছুই বলুক না কেন, অন্তরে অন্তরে তারা তাঁর বিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা স্বীকার করতো। তাছাড়া, একজন পাগল এবং সুস্থ মস্তিষ্ক লোকের পার্থক্য কোন গোপন ব্যাপার নয় যে, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। আসলে একজন হঠকরী ও নির্লজ্জ লোক ছাড়া কে এমন হতে পারে যে, এ কালাম শুনার পর এ কথা বলতে পারে যে এ পাগলের উক্তি? আর এ ব্যক্তির জীবন দেখার পর কে এ অভিমত ব্যক্ত করতে পারে যে, এ একজন মস্তিষ্কবিকৃত লোকের জীবন> আজব ধরনের এ মস্তিষ্কবিকৃতি (অথবা পাশ্চাতের ইসলাম বিদ্বেষীদের মতে মৃগী রোগ যে সে ব্যক্তির মুখ থেকে কুরআনের মতো মহান বথা বেরয় এবং তিন এমন এক সফল আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন যা আপন দেশেরই নয়, বরঞ্চ গোটা দুনিয়ার ভাগ্য পরিবর্তন করে। (৪১)

(আরবী******************)

-হে নবী তুমি তোমার রবের কৃপায় পাগল নও। এবং নিশ্চতরূপে এমন পুরষ্কার রয়েছে যা অফুরন্ত। এবং নিঃসন্দেহে তমি চরিত্রের মহান মর্যাদায় ভূষিত। (কলম : ২-৪)

লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, এখানে সম্বোধন প্রকাশ্যতঃ করা হচ্ছে নবী মুহাম্মদকে (সা)। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কাফেরদের অপবাদের জবাব দেয়া। অতএব, কারো মন এ সন্দেহ যেন না হয় যে,  এ আয়অত নাযিল হয়েছিল হুযুরকে (সা) এ সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে যে তিনি পাগল ছিলেন না। আসলে নবীর মনে এ ধরণের কোন সন্দেহ ছিল না যা দূর করার জন্যে তাঁকে সান্ত্বনা দেয়ার প্রয়োজন ছিল। প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কাফেরদেরকে একথা বলে দেয়া যে, “তোমরা যে কুরআনের কারণে তার উপস্থঅপনকারীকে পাগল বলছ, সেটাই তোমাদের এ অভিযোগ মিথ্যা হওয়ার প্রমাণ।

অবশ্যি হুযুরকে (সা) যে বিষয়ে সান্ত্বনা দেয়া হয় তা এই যে, তাঁর জন্যে অফুরন্ত ও অগণিত প্রতিদান রয়েছে। কারণ তিনি মানব জাতির হেদায়েতের জন্যে যে চেষ্টা করছেন, তার জন্যে তাঁকে এমন এমন দুঃখজনক কথা শুনতে হচ্ছে। এর পরেও তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

তারপর এ কথা বলা হয়েছে যে, তাঁর মহান চরিত্র এ কথার সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, কাফের মুশরিকগণ তার প্রতি পাগল হওয়ার যে অপবাদ আরোপ করছে তা একেবারে মিথ্যা। কারণ চারিত্রিক মহত্ব ও মস্তিষ্কবিকৃত এ উভয়বস্তু একত্র হতে পারে না। পাগল তাকেই বলা হয় যার মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে এবং যার মেজাজ প্রকৃতির মথ্যেও ভারসাম্য থাকে না। পক্ষঅন্তরে মানুষের উচ্চ ও মহান চরিত্র এ কথার সাক্ষ্যদান করে যে, সে সুস্থ মস্তিষ্টক ও সুস্থ প্রকৃতির লোক। তার মনমস্তিষ্ক ও মেজাজ-প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য রয়েছে। রসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্র কেমন ছিল তা মক্কাবাসীদের অজানা ছিল না। এ জন্যে তাদের প্রতি শুধু ইংগিত করাই যথেষ্ট যে মক্কায় প্রতিটি বিবেকসম্পন্ন লোক যেন চিন্তা করতে বাধ্য হয় যে, তারা কতটা নির্লজ্জ যারা এমন মহান চরিত্রের অধিকারী লোককে পাগল বলছে। তাদের এ প্রগলভতা রসূলুল্লাহর (সা) জন্যে নয়, বরঞ্চ স্বয়ং তাদের জন্যেই ক্ষতিকর ছিল যে, অন্ধ বিরোধিতায় নেশাগ্রস্ত হয়ে তারা নবী (সা) সম্পর্কে এমন সব কথা বলছিল যা কোন বিজ্ঞ ব্যক্তি ধারণাই করতে পারতো না। আধুনিক যুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণার দাবীদারগণের ব্যাপারও ঠিক তেমিনি যারা নবী মুহাম্মদের (সা) প্রতি মৃগীরোগে আক্রান্ত হওয়ার অপবাদ করে। কুরআন পাক দুনিয়ার সর্বত্রই পাওয়া যায় এবং নবী পাকের সরাতও বিশদ বিবরণসহ লিখিত পাওয়া যায়। প্রত্যেকে স্বয়ং দেখতে পারে যে, যারা এ অতুলনীয় গ্রন্থ উপস্থঅপনকারীকে এবং এমন মহান চরিত্রের অধিকারীকে মস্তিষ্টক বিকৃত বলে, তারা শত্রুতার অন্ধ বিদ্বেষে দিশেহারা হয়ে কি সব প্রগলভ উক্তি করছে। (৪২)

(আরবী****************)

এরা কখনো কি চিন্তা করে দেখেনি? তাদের সাথীর উপরে পাগলামির কোনই প্রভাব নেই। তিনি ত একজন সুস্পষ্ট সাবধানকারী। (আ’রাফ: ১৮৪)

সাথী অর্থ নবী মুহাম্মদ (সা)। কারণ তিন মক্কার লোকদের মধ্যেই জন্মগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যেই জীবন যাপন করেন। শৈশব থেকে যৌবনে এবং যৌবন থেকে বার্ধক্যে পৌছেন। নবুওয়তের আগে সমগ্র জাতি তাঁকে একজন সুস্থ প্রকৃতি ও সুস্থ মস্তিষ্ক লোক হিসাবে জানতো। নবওয়তের পর যখন তিনি খোদার পয়গাম পৌঁছাতে শুরু করলেন, তখন হঠাৎ তারা তাঁকে পাগল বলা শুরু করে। উল্লেখ্য যে, এ পাগল আখ্যা ঐসব কাজের উপর দেয়া হয়নি, যা তিনি  নবী হওয়ার পূর্বে করতেন। কিন্তু শুধু ঐসব কথার পর দেয়া হয় যার প্রচার তিনি নবী হওয়ার পর শুরু করেন। এ জন্যে বলা হচ্ছে যে, তারা কি কখনো এসব চিন্তা করো দেখেছে? এসব কথার মধ্যে কোনটি পাগলের উক্তি? কোন কথাটি তাঁর অন্যায়, অসংগত ও ভিত্তিহীন? যদি এরা আসমান ও যমীনের ব্যবস্থাপনার উপর চিন্তা-ভাবনা করতো অথবা খোদার সৃষ্ট কোন বস্তু বিশেষ চিন্তা-গবেষণাসহ দেখতো, তাহলে স্বঢং জানতে পারতো যে, শির্কের খন্ডন, তৌহীদের স্বীকৃতি, খোদার বন্দেগীর দাওয়াত এবং মানুষের দায়িত্ব ও জবাবদিহি সম্পর্কে যা কিছু তাদের ভাই (নবী মুহাম্মদ) তাদেরকে বুঝঅচ্ছেন, তার সত্যতা সম্পর্কে এ বিশ্বপ্রকৃতির ব্যবস্থাপনা এবং খোদার সৃষ্টির প্রতিটি অনুপরমাণু সাক্ষ্য দিচ্ছে। (৪৩)

কবি হওয়ার অভিযোগ

কুরাইশ কাফেরগণ হুযুরের (সা) বিরুদ্ধে কবি হওয়ার অভিযোগও আরোপ করতো এই বলতো, আমি কি একজন পাগল কবির কথায় আমাদের মাবুদদেরকে পরিত্যাগ করবো? তার জবাবে বলা হল-

(আরবী**************)

-এবং কবিদের পেছনে ত পথভ্রষ্ট লোকের চলে। (শুয়ারা: ২২৪)

অর্থাৎ কবিদের সাথে সংশ্লিষ্ট লোক তাদের স্বভাব চরিত্রের দিক দিয়ে তাদের থেকে একেবারে ভিন্নতর হয় যাদেরকে তোমরা নবী মুহাম্মদের (সা) সাথে দেখছ। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য এতো প্রকট যে, এক নজরেই বুঝা যায় যে,এর কেমন লোক এবং তারা কেমন। একদিকে দেখা যায় চরম গাম্ভীর্য, ভদ্রতা, সভ্যতা, সততা ও খোদাভীতি। কথায় কথায় দায়িত্বের অনুভূতি। আচরণে লোকের অধিকার সংরক্ষণ। কাজে-কর্মে পরিপূর্ণ আমানতদারী ও দিয়ানতদারী। মুখ খুল্লে মঙ্গল ও কল্যঅণের জন্যেই খোলে। মন্দ কথা মুখ দিয়ে কখনো বেরয় না। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, তাদের দেখে পরিষ্কার মনে হয়, এদের জীবনে একটা পূতঃ পবিত্র ও মহান লক্ষ্য আছে যার চিন্তায় তারা দিনরাত মগ্ন রয়েছে। তাদের সমগ্র জীবন এক মহান উদ্দেশ্যের জন্যে উৎসর্গীত।

অন্যদিকে অবস্থঅ এই যে, কোথাও প্রেমপ্রণয় নিবেদন ও মদ্যপানের বিষয় আলোচিত হচ্ছে এবং শ্রোতাগণ উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বাহবা দিচ্ছে। কোথঅও কোন বারাংগনা অথবা কোন গৃহবধূর রূপসৌন্দর্য আলোচ্য বিষয় হয়ে পড়েছে এবং শ্রাতাগণ তা প্রাণভরে উপভোগ করছে। কোথাও যৌন সহবাসের কাহিনী বর্ণনা করা হচ্ছে এবং শ্রোতাদের মনে কামাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হচ্ছে। কোথাও ভাঁড়ামি করা হচ্ছে অথবা বিদ্রূপাত্মক কথা বলা হচ্ছে এবং চারিদিকে হসি-ঠাট্টার ঢল নেমেছে। কোথাও কারো প্রতি বিদ্রূপ করা হচ্ছে এবং শ্রোতাগণ তা উপভোগ করছে। কোথাও কারো অসংগত প্রশংসা করা হচ্ছে এবং হাততালি দিয়ে তা সমর্থন করা হচ্ছে। কোথাও কারো বিরুদ্ধে ঘৃণা, আক্রোষ, শত্রুতা প্রকাশ করে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রেরেণা সৃষিট করা হচ্ছে এবং শ্রোতাদের মনে তার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। এসব সমাবেশে কবিদের কথা শুনার জন্যে ভয়ানক ভিড় জমে। এ ধরনের বড় বড় কবিদের পেছনে যারা লেগে থাকে, তাদের দেখে কেউ এ কথা মনে না করে পারে না যে, এরা নৈতিক বন্ধদন থেকে মুক্ত, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা স্রোতে প্রবাহিত। এরা সুখ-সম্ভোগের পূজারী এবং পশু সদৃশ। তাদের মনে কখনো এ ধারণা ছোঁয়া লাগে না যে, দুনিয়ার মানুষের জন্যে জীবনের কোন মহান উদ্দেশ্য আছে না কি। এ উভয় দলের সুস্পষ্ট পার্থক্য যদি নজরে না পড়ে তাহলে সে অন্ধ। আর সব কিছু দেখার পর শুধা সত্যকৈ হেয় করার মানসে যদি বলে যে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সঙ্গী সাথীগণ কবি ও তাদের অনুচরদের মতোই, তাহলে বলতৈ হবে তারা মিথ্যা বলার জন্যে সকল সীমাংলঘন করেছে। (৪৪)

(আরবী****************)

-তোমরা কি দেখছ না যে, তারা (কবিগণ প্রত্যেক উপত্যকায় পথহারা হয়ে ঘুরেছে? (শুয়ারা: ২২৫)

অর্থাৎ কোন একটি নির্দিষ্ট পথ নেই যে সম্পর্কে তারা চিন্তা-ভাবনা করে এবং যার জন্যে তারা তাদের কাব্য প্রতিভা নিয়োজিত করে। বরঞ্চ তাদের চিন্তা রাজ্যের ঘোড়া লাগামহীন ঘোড়ার মতো প্রত্যেক উপত্যকায় পথ হারিয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। কামনা, বাসনা, স্বার্থ ও উদ্দেশ্যের প্রত্যেক নতুন প্রবাহ তাদের মুখ থেকে এক নতুন বিষয়বস্তু বের করে আনে যে সম্পর্কে কোন চিন্তা করতে এবং তা বর্ণনা করতে এ বিষয়ের প্রতি মোটেই লক্ষ্য রাখা হয় না যে, এ কথা সঠিক ও সত্য কিনা। কখনো চিন্তার এক তরঙ্গ উঠলো ত বিজ্ঞতা ও সদুপদেশের কথা চল্লো। আবার কখনো দ্বিতীয় তরঙ্গ উঠলো ত ঐ একই মুখ থেকে চরম অশ্লীল ও জঘন্য কামনা লালসার মধু বর্ষণ হতে লাগলো। কারো প্রতি সন্তুষ্ট হলে তাকে আকাশে উঠানো হয় এবং কারো প্রতি ক্ষুণ্ণ হলে তাকে পাতালপুরিতে পাঠানো হয়। একজন কৃপণকে হাতেমের এবং একজন ভীরু কাপুরুষকে রুস্তম ও ইসকান্দারয়েঅরের মর্যাদা দানেও তারা দ্বিধাবোধ করে না, যদি এতে তাদের কোন স্বার্থ জড়িত থাকে। ঠিক এর বিপরীত কারো দ্বারা মনে ব্যাথা পেলে, তার পবিত্র জীবনের উপর  কলংক আরোপ করতে, তার মান সম্ভ্রম বিনষ্ট করতে এমনকি তার বংশের প্রতি উপহাস করতেও তারা লজ্জাবোধ করে না। খোদা পরস্তি ও খোদাদ্রোহিতা, বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মিকতা, চারিত্রিক মহত্ব ও চরিত্রহীনতা, পবিত্রতা ও নোংরামি-মলিনতা, গাম্ভীর্য এবং ছেলেমি, তোষামোদ ও বিদ্রূপ সব কিছুই একই কবির কবিতার পাশাপাশি দেখতে পাওয়া যায়। কবিদের এসব সুপরিচিত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যে ব্যক্তি অবহিত ছিল, তার মস্তিষ্কে অবান্তর কথা কি করে প্রবেশ করতে পারতো যে, এ কুরআন উপস্থাপনকারীর উপর কবি হওয়ার অপবাদ আরোপ করা হোক। অথচ তাঁর কথা ছিল একেবারে মাপাজোকা এবং সুস্পষ্ট। তাঁর পথ ছিল সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট। তিনি সত্য ও সততা এবং কল্যাণের আহ্বান থেকে দূরে সরে গিয়ে একটি কথাও মুখ থেকে বের করেননি।

কুরআনের অন্য এক স্থানে নবী (সা) সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, তঁঅর স্বভাব-প্রকৃতির সাথে কবিতা রচনার কোন সামঞ্জস্যই ছিল না।

(আরবী*****************)

আমরা তাকে কবিতা শিক্ষা দেইনি। আর না এ তার করার কাজ। (ইয়াসিন: ৬৯)

এ এমন একব সত্য যে যারাই নবী মুহাম্মদকে (সা) ব্যক্তিগতভাবে জানতো, তারা সকলেই এ জানতো। নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে, কোন কবিতাই পুরাপুরি হুযুরের (সা) মনে ছিল না। কথাবার্তায় কখনো কোন কবির কোন ভঅলো কবিতা তাঁর মুখ থেকে বেরুলেও তা বেমানানভাবে পড়তেন অথবা তার মধ্যে শব্দের হেরফের হতো।

হযরত হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন, একবার বক্তৃতা করতে গিযে হুযুর (সা) কবির কবিতা এভাবে আওড়ালেন।

(আরবী**************)

হযরত আবু বকর (রা) বলেন, ইয়অ রাসূলুল্লাহ! কবিতার শ্লোক আসলে এমন হবে।

(আরবী*************)

একবার আব্বাস বিন মিরদাস সুলামীকে নবী (সা) জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এ কবিতা লিখেছ?

(আরবী*************)

তিনি বল্লেন, শেষ কথাটুকু অমন না হয়ে এমন হবে।

(আরবী***********)

নবী (সা) বল্লেন, উভয়ের অর্থ ত একই রকম।

হযরত আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবী (সা) কখনো তাঁর ভাষণে কবিতা ব্যবহজার  করতেন কি না। তিনি বলেন, কবিতা অপেক্ষঅ অন্য কোন জিনিসের প্রতি তাঁর ঘৃণা ছিল না। অবশ্যি কখনো কখনো বনী কায়েসের কবির দু’এক ছত্র পড়তেন। কিন্তু শেষটুকু আকে এবং আগেরটুকু শেষে পড়তেন। হযরত আবু বকর (রা) বলতেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ও রকম না এ রকম হবে।

নবী (সা) বলতেন, ভাই, আমিত কবি নই। আর কবিতা রচনা করা আমার কাজও নয়।

আরবের কাব্য সাহিত্য যেসব বিষয়ে পরিপূর্ণ ছিল তাহলো যৌন কামনা-বাসনা, প্রেম-প্রণয়, মদ্যপান, গোত্রীয় হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-কলহ, অথবা গর্ব-অহংকার। ধার্মিকতা এবং কল্যাণেল কথা তার মধ্যে খুব কমই পাওয়া যেতো। তারপর মিথ্যা, অতিরঞ্জন, অপবাদ, বিদ্রূপ, অসংগত প্রশংসা, আত্মম্ভরিতা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ এবং পৌত্তলিক পৌরণিক কাহিনী এ কাব্য সাহিত্যের অঙ্গীভূত। এ জন্যে নবী (সা) এ কাব্য সাহিত্য সম্পর্কে এ রূপ মন্তব্য করেন-

(আরবী*****************)

তোমাদের মধ্যে কারো পেট কবিতায় পূর্ণ হওয়া অপেক্ষা পুঁজে পূর্ণ হওয়া ভালো।

তথাপি কোন কবিতায় ভালো কথা থাকলে নবী (সা) তার প্রশংসা করতেন। তিনি বলতেন-

(আরবী*************)

কোন কোন কবিতা বিজ্ঞতাপূর্ণ হয়।

উমাইয়অ বিন আবিস সালাতের কবিতা শুনে তিনি বলেন-

(আরবী**************)

তার কবিতা মুমেন কিন্তু তার মন কাফের।

একবার জনৈক সাহাবী শত খানেক উৎকৃষ্ট কবিতা নবীকে (সা) শুনিয়ে দেন এবঃং তিনি বলতে থাকেন, বাহ ভারি সুন্দর, আরও শুনাও। (৪৫)

(আরবী*****************)

এবং তার এমন কথা বলে যা করে না। (শুয়ারা:ঢ় ২২৬)

এ ছিল কবিদের আর এক বৈশিষ্ট্য যা নবী (সা) এর কর্মপদ্ধতির পরিপন্থী ছিল। যারা তঁঅকে জানতো তাদের এটা জানা ছিল যে, তিনি যা বলেন তা করেন এবং যা করেন তাই বলেন। তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য এমন এক সুস্পষ্ট সত্য ছিল যা তঁঅর পারিপার্শ্বিক সমাজের কেউ অস্বীকার করতে পারতো না। পক্ষান্তরে কবিদের সম্পর্কে কার এ কথা জনা ছিল না যে, তাদের বলা একরূপ এবং করা অন্যরূপ? দান-দক্ষিণা সম্পর্কে এমন জোরালো বয়ান করবে যে মানুষ মনে করবে যে তার চেয়ে দরিয়া-দিল আর কেউ হবে না কিন্তু কার্যকলাপ দেখলে দেখা যাবে যে ভয়ানক কৃপণ। বীরত্বের কথা বলবে কিন্তু স্বয়ং ভীর-কাপুরুষ। মুখাপেক্ষীহীনতা, তুষ্টি এবং আত্মমর্যাদার কথা বলবে কিন্তু স্বয়ং লোভ-লালসায়ঢ নীচতার সর্বনিম্নস্তরে পতিত হবে। অপরের সামান্য দুর্বলতা পাকড়াও করবে কিন্তু স্বয়ং চরম দুর্বলতায় লিপ্ত হবে। (৪৬)

বিরোধীদের অভিযোগে সামঞ্জস্যহীনতা এবং কুরআনের প্রতিবাদ

পূর্বে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হযে যায় যে, মক্কার কাফেরগণ নবী (সা) এর উপরে বিপরীতমুখী অভিযোগ আরোপ করতো এবং কোন একটি অভিযোগও সুনির্দিষ্ট করে করতে পারে নি। কুরআন পাকে তাদের এ দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

(আরবী*******************)

(অতএব হে নবী)! তুমি নসিহত করতে থাক। তোমার রবের অনুগ্রহে না তুমি গণক, আর না পাগল। লোকে কি বলে যে এ ব্যক্তি কবি যার সপক্ষে আমরা কালের বিবর্তনের অপেক্ষা করছি? তাদেরকে বল, আচ্ছা, অপেক্ষা কর। আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষা করছি। তাদের বিবেক কি তাদেরকে এ ধরনের কথা বলতে বলছে? অথবা প্রকৃত পক্ষে তারা বিদ্বেষে সীমা অতিক্রম করে গেছে? (তুর : ২৯-৩২)

এ কয়েকটি বাক্য বিরোধীদের সকল প্রচারণার গোমর ফাঁক করে দিচ্ছে। যুক্তি প্রমাণের সার কথা এই যে, কুরাইশ সর্দার ও গোত্রপতিগণ বড় বিবেকবান হওয়ার দাবী করে। কিন্তু তাদের বিবেক কি এ কথা বলে যে, যে ব্যক্তি কবি নয় তাকে কবি বল? যাকে সমগ্র জাতি একজন বিজ্ঞ হিসাবে জানে, তাকে পাগল বল। ভাগ্য গণনার সাথে যে ব্যক্তির দূরতম সম্পর্কও নেই, তাকে অযথা গণক বল। বুদ্ধি-বিবেকের ভিত্তিতেই তারা যদি কোন নির্দেশ দান করে, ত কোন একটি নির্দেশ দিবে। কিন্তু পরস্পর বিরোধী অনেক নির্দেশ ত এক সাথে দিতে পারে না। এক ব্যক্তি একই সাথে কবি, পাগল এবং ভবিষ্যদ্বক্তা কেমন করে হতে পারে? পাগল হলে ত না গণক হতে পারে আর না কবি। গণক হলে কবি হতে পারে না এবং কবি হলে গণক হতে পারে না। কারণ কবিতার ভাষা এবং তার বিষয়বস্তু পৃথক হয়ে থাকে এবং গণকের ভাসঅ ও তার বিষয়বস্তু পৃথক। একই কথাকে একই  সমায়ে কবিতাও বলা এবং গণকের কথাও বলা এমন লোকের কাজ হতে পারে না যে কবিতা এবং গণকের কথার পার্থক্য জানে। অতএব এ পরিষ্কার কথা যে, নবী মুহাম্মদের (সা) বিরোধিতায় এ পরস্পর বিরোধী কথা কোন বিবেকসম্মত কথা নয়। শুধু জিদ ও হঠকারিতার বশবর্তী হয়ে এসব বলা হচ্ছে। জাতির বড় বড় সর্দার ও দলপতিগণ বিদ্বেষবশতঃ নিছক ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে বিবেকবান লোক যার প্রতি কোন গুরুত্বই দেয় না। (৪৭)

(আরবী******************)

(হে নবী)! দেখ কোন্‌ ধরনের কথা এরা তোমার বিরুদ্ধে বলছে? এরা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তারা পথ পাচ্ছে না। (বনী ইসরাইল: ৪৮)

অর্থাৎ এরা তোমার সম্পর্কে কোন একটি অভিমত প্রকাশ করে। বরঞ্চ একেবারে বিভিন্ন ধরনের এবং পরস্পর বিরোধী কথা বলে। কখনো বলে যে তুমি স্বয়ং যাদুকর। কখনো বলে, তোমার প্রতি অন্য কেউ যাদু করেছে। কখনো বলে, তুমি কবি, কখনো বলে তুমি পাগল এবং কখনো বলে তুমি গণক। তাদের এ পরস্পর বিরোধী কথা স্বয়ং এ কথারই প্রমাণ যে, প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। নতুবা তারা এক এক দিন এক এক বলার পরিবর্তে কোন একটি সুস্পষ্ট অভিমত প্রকাশ করতো। উপরন্তু এর থেকে এটাও বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, তারা কোন একটি বিষয় সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। একটা অভিযোগ করার পর নিজেরাই মনে করে যে, এটা ঠিক হলো না। তখন অন্য আর একটি অভিযোগ আরোপ করছে। (৪৮)

(আরবী******************)

এরা ত যখনই সত্য এদের কাছে এলা, একেবারে তা মিথা বলে উড়িয়ে দিল। এ কারণেই এখন তারা দ্বিধাদ্বন্দেব পড়ে আছে। (কাফ: ৫)

এ সংক্ষিপ্ত বাক্যে এক বিরাট বিষয় বর্ণিত হয়েছে। এর মর্ম এই যে, এরা শুধু বিস্ময় প্রকাশ এবং ধারণাতীত বলে বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরঞ্চ সে সময় নবী মুহাম্মদী (সা) তাঁর সত্য দাওয়াত পেশ করলেন, তক্ষুণি বিনা দ্বিধায় তাকে মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করলো। তার ফল এই হবার ছিল এবং তাই হলো যে, তারা এ দাওয়াত এবং দাওয়াত উপস্থাপনকারী সম্পর্কে কোন একটি অভিমতে স্থির থাকলো না। কখনো তাকে কবি বলে, কখনো পাগল, কখনো গণক। কখনো বলে, সে তার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা জন্যৌ এসব স্বয়ং রচনা করে এনেছে। কখনো এ অভিযোগ করে যে, তার পেছনে অন্য লোক আছে যারা এসব রচনা করে তাকে দেয়। এ ধরনের পরস্পর বিরোধী এ কথা প্রমাণ করে যে, তারা তাদের নীতি বা  করণীয় সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছ। এ দ্বিধাদ্বন্দ্বে তারা কখনোই পড়তো না যদি তাড়াহুড়া করে প্রথমেই নবীকে (সা) মিথ্যা মনে করে দ্বিধাহীন চিত্তে আগাম সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পূর্বে গুরুত্ব সহকারে চিন্তা-ভাবনা করে দেখতো যে এ দাওয়াত কোন্‌ ব্যক্তি পেশ করছে। কোন্‌ কথঅ বলছৈ এবং তার কি যুক্তি পেশ করছে। এ কথা ঠিক যে সে ব্যক্তি তাদের অপরিচিত ছিল না। কোথাও থেকে হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। সে তাদের আপন  জাতিরই একজন। তাদের নিজস্ব পরীক্ষিত লোক। তার চরিত্রও, আচার-আচরণ ও যোগ্যতা তাদের অজানা ছিল না। এমন ব্যক্তির পক্ষ থেকে যখন কোন কথা বলা হলো ত সঙ্গে সঙ্গেই তা গ্রহণ করা  না হোক, কিন্তু এমনটিও হওয়া উচিত ছিল না যে, শুনামাত্রই তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর সে কথা যুক্তি প্রমাণহীনও ছিল না। তার জন্যে সে রীতিমত যুক্তিপ্রমাণও পেশ করছিল। তা শুনা উচিত ছিল এবং যাচাই করা উচিত ছিল যে, তা কতটা যুক্তিসংগত। কিন্তু এ আচরণ অবলম্বন করার পরিবর্তে যখন তরা জিদের বশবর্তী হয়ে প্রথমে তা মিথ্যা মনে করলো। তখন তার ফল এ হলো যে, প্রকৃত সত্যে উপনীত হওয়ার দরজা নিজেরাই নিজেদের জন্যে বন্ধ করে দিল এবং চারদিকে পথহারা হয়ে ঘুরাফিরার বহু পথ খুলে দিল। এখন তারা প্রাথমিক ভুলের সপক্ষে দশটি পরস্পর বিরোধী কথা ত বলতে পারে। কিন্তু এ একটি কথা চিন্তা করতেও প্রস্তুত নয় যে, নবী সত্য হতে পারেন কিনা এবং তিনি যে কথা পেশ করছেন তা সত্য হতে পারে কিনা। (৪৯)

(আরবী*****************)

হে নবী, এসব লোক যখন তোমাকে দেখে তখন ব্যস তোমার বিদ্রূপ করা শুরু করে দেয় এবং বলে, এই ব্যক্তি যাকে খোদা রসূল বানিয়ে পাঠিয়েছেন? এতো আমাদেরকে আমাদের দেব-দেবীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে ফেলতো যদি আমরা তাদের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধায় অটল না হতাম। (কুরআন: ৪১-৪২)

কাফেরদের এ দুটি কথা পরস্পর বিরোধী। প্রথম কথা থেকে জানা যায় যে, তারা নবঃীকে (সা) হেয় মনে করছে। তঁঅকে বিদ্রূপ করে তাঁর মর্যাদাহানি করতে  চায়। তাদের দৃষ্টিতে নবী মুহাম্মদ (সা) খুব বড় দাবী করে ফেলেছেন।

দ্বিতীয় কথায় জানতে পারা যায় যে, তারা তাঁর যুক্তি প্রমাণের বলিষ্ঠতা এবং তার ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিচ্ছে এবং অজ্ঞাতসারে এ স্বীকারোক্তি করছে, আমরা যদি বিদ্বেষ এবং হঠকারিতার বশবর্তী হয়ে আমাদের খোদাদের বন্দেগীর উপর অবিচল না হতাম, তাহলে এ ব্যক্তি আমাদের পদস্খলন করে ফেলতো। এ ধরনের পরস্পর বিরোধী কথা স্বয়ং এ কথা প্রমাণ করছে যে, ইসলামী আন্দোলন তাদেরকে কতখঅনি বেসামাল করে ফেলেছে। হেয় প্রতিপন্ন হয়ে বিদ্রূপও করছে, আবার হীনমন্যতা তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুখ থেকে এমন কথা বের করাচ্ছে যার থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে এ শক্তির দ্বারা তাদের কতখানি প্রভাবিত হয়েছে। (৫০)

বিভিন্ন ধরনের মোজেযার দাবী

অভিযোগের ঝড়-ঝাপটার সাথে সাথে কুরাইশ কাফেরগণ বার বার মোজেযা দেখাবার দাবী করতো। বস্তুতঃ কুরআনের স্থানে স্থানে এ সব  দাবীর উল্লেখ আছে এবং তার জবাবও দেয়া হয়েছে।

(আরবী******************)

এবং তারা বল্লো, “আমরা তোমার কথা শুনব না, যতোক্ষণ না তুমি যমীনের বিদীর্ণ করে একটি ঝর্ণনা প্রবাহিত করেছে। অথবা তোমার জন্যে খেজুর ও আঙুরের একটি বাগান তৈরী হয়ে যায় এবং তুমি তাতে ঝর্ণনা প্রবাহিত করেছ। অথবা তুমি আকাশকে টুকরো টুকরো মকরে  আমাদের উপর ফেলে দিয়েছ যেমন তোমার দাবী। অথবা খোদা ও ফেরেশতাদেরকে মুখোমুখি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছ অথবা তোমার জন্যে সোনার একটি বাড়ি হয়ে যায়। অথবা তুমি আসমানে চড়ে যাবে এবং তোমার চড়াটাও আমরা বিশ্বাস করব না যত্ষেণ না তুমি আমাদের জন্যে লিখিত কিছু নিয়ে আস যা আমরা পড়তে পারব।” (হে নবী) বল, আমর রব সকল দোষত্রুটির উর্ধে। আমি একজন বাণী বাহক ছাড়া কি আর কিছু? (বনী ইসরাঈল: ৯০-৯৩)

মোজেযার দাবীর জবাব এ সূরায় এ আয়াত- (আরবী**************)

দেওয়া হয়েছে। [সে জবাব ছিল, যে সব মোজেযা কোন নবীর নবুওয়তের প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হয়েছে তা দেখার পরও কোন জাতি নবীকেব মিথ্যা মনে করে, তাহলে তাদের উপর অবশ্যই আযান নাযিল হয়। তার বহু দৃষ্টান্ত ইতিহাসে পাওয়া যায়। এখন আল্লাহর রহমত যে তিনি এমন কোন মোজেযা পাঠাচ্ছেন না। কিন্তু  তোমরা এমন নির্বোধ যে তার দাবী করছ। -গ্রন্থকার] এখন এ দাবীর দ্বিতীয় জবাব এখানে দেয়া হয়েছে। এ সংক্ষিপ্ত জবাবের বাপটুতা প্রশংসার ঊর্ধ্বে। বিরোধদের দাবী ছিল, যদি তুমি পয়গম্বর হয়ে থাক তাহলে মাটির দিকে নজর কর এবং সংগে সংগে তা ফেটে গিয়ে ঝর্না বেরিয়ে পড়ুক। অথবা অবিলম্বেই একটি সবুজ-শ্যামল নবীন ও যৌবচনোচ্ছল বাগান অস্তিত্ব লাভ করুক এবং তাতে ঝর্ণা প্রবাহিত হোক। আসামনের দিকে ইশারা কর এবং তোমাকে যারা মিথ্যা মনে  করছে তাদে উপর আসমান ভেঙে পড়ুক। একটা ফুঁক মার এবং চোখের পলকে একটি স্বর্ণপ্রাসাদ তৈরী হয়েযাক। এক আওয়াজ দাও এবং সংগে সংগে আমাদের সামনে খোদা ও ফেরেশতারা এসে দাঁড়িয়ে যাক এবং এ কথা বলুক যে, তারা মুহাম্মদকে (সা) পয়গম্বর বানিয়ে পাঠিয়েছে। অথবা আমাদের চোখের সামনে আসমানে চড়ে যাও এবং আল্লাহ মিয়ার নিকট থেকে আমাদের নামে একটা চিঠি লিখিয়ে আন যা আমরা হাত দিয়ে ছূঁতে পারি এবং বোছ দিয়ে দেখতে পারি।

এমন লম্বা চওড়া দাবীর এ একটি মাত্র জবাব দিয়েই ছেড়ে দেয়া হলো- ওরে বোকার দল। আমি কি কখনো খোদা হওয়ার দাবী করেছিলাম যে তোমরা আমার কাছে এসব দাবী করছ? কখন তোমাদের এ কথা বলেছিলাম যে আমি অসীম ক্ষমতাবান? কখন বলেছিলাম যে যমীন আসমান আমার হুকুমের অধীনে চলছে। আমার দাবী ত আগাগোড়া এই ছিৎল যে আমি খোদার পক্ষ থেকে বানী বাহক একজন মানুষ। তোমাদের যাচাই করার থাকলে আমার পয়গাম যাচাই করে দেখ। ঈমান আনতে হলে এ পয়গামের সত্যতা ও  যৌক্তিকতা দেখে ঈমান আন। অস্বীকার করতে হলে এ পয়গামের ত্রুটি বিচ্যুতি বের করে দেখাও। আমার সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে একজন মানুষ হিসাবে আমার জীবন ও কাজকর্ম দেখ। এসব ছেড়ে তোমরা আমার কাছে এ কি দাবী করছ যে, যমীন বিদীর্ণ কর, আসমান নামিযে আন? পয়গম্বরীর সাথে এসব কাজের কি সম্পর্ক? (৫১)

(আরবী****************)

এসব লোকেরা বলে’ এ লোকটির প্রতি কেন নিদর্শনাবলী (মোজেযা) অবতীর্ণ করা হয়নি? হে নবী, বলে দাও, “নিদর্শনাবলী ত আল্লাহর নিকটে আর আমি একজন সুস্পষ্ট সাবধানকারী।” এ লোকদের জন্যে এ নিদর্শন কি যথেষ্ট নয় যে, আমরা তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি যা তাদের পড়ে শুনানো হয? প্রকৃতপক্ষে এর মধ্যে রয়েছে রহমত এবং নসিহত ঐসব লোকের জন্যে যারা ঈমান আনে। (আনকাবুত: ৫০-৫১)

অর্থাৎ উম্মী হওয়া সত্ত্বেও নবী মুহাম্মদের (সা) উপর কুরআনের মতো মহাগ্রন্থ নাযিল হওয়া কি স্বয়ং একটি বড় মোজেযা নয় যে তাঁর রেসালাতের উপর ঈমান আনাই যথেষ্ট হবে।

এর পরে আর কোন মোজেযার প্রয়োজন বাকী থাকে কি? পূর্বে মোজেযা যারা দেখেছে তাদের জন্যে ত তা মোজেযা ছিল। কিন্তু এ মোজেযা ত হরহামেশা তোমাদের চোখের সামনে রয়েছে। প্রতিদিন তোমাদেরকে পড়ে শুনানো হচ্ছে। হরহামেশা তোমরা তা দেখতে পার।(৫২)

(আরবী******************)

কিন্তু তাদের প্রত্যেকে চায় যে তার নামে প্রকাশে চিঠি পাঠানো হোক। কখনো না। আসল কথা এই যে, এরা আখেরাতের ভয় করে না। কখনো না। এ ত একটি নসিহত। এখন যার ইচ্ছা এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক। (মুদ্দাসসির: ৫২-৫৫)

অর্থাৎ এরা যায় যে, যদি আল্লাহ তায়ালা সত্যি সত্যিই মুহাম্মদকে (সা) নবী নিযুক্ত করে থাকেন তাহলে তিনি মক্কার এক একজন সর্দার ও গোত্রপতির নিকটে এই বলে চিঠি লিখে পাঠান যে, মুহাম্মদ (সা)আমাদের নবী। তোমরা তার আনুগত্য স্বীকার কর। আর এ চিঠি এমন হওয়া চাই যে তা দেখলে যেন এ বিশ্বাস জন্মে যে এ আল্লাহ তায়ালাই লিখে পাঠিয়েছেন।

কুরআনের অন্য এক স্থানে মক্কার কাফেরদের এ উক্তি নকল করা হয়েছে, আমরা মানব না, যতোক্ষণ না সে জিনিস স্বয়ং আমাদেরকে দেয়া হয়েছৈ যা আল্লাহর রসূলগণকে দেয়া হয়েছে। (আনয়াম: ১২৪)[সূরা আনয়অমে তার সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়া হয়েছে-

(আরবী***************)

আল্লাহ স্বয়ং ভালো জানেন কার দ্বারা এবং কিভাবে তিনি পয়গম্বরীর কাজ নেবেন। (গ্রন্থকার)]

অন্য এক স্থানে তাদের এ দাবী উধৃত করা হয়েছে, তুমি আমাদের সামনে আসমানে উঠে যাও এবং সেখান থেকে লিখিত একটি কিতাব এনে দাও যা আমরা পড়ব। (আরবী**************)

জবাবে বলা হয়েছিল যে তাদের এ দাবী কখনো পূরণ করা হবে না।তাদের ঈমান না আনার আসল কারণ এ মোটেই নয় যে তাদের দাবী পূরণ করা হচ্ছে না। বরঞ্চ আসল কারণ এই যে তারা আখেরাতের ভয়ে ভীত নয়। তারা দুনিয়অকেই সবকিছু মনে করে রেখেছে। তাদের এ ধারণা নেই যে, দুনিয়অর জীবনের পর আর একটি জীবনও আছে যেখানে তাদেরকে তাদের কর্মকান্ডের হিসাব দিতে হবে। এ জিনিসটিই তাদেরকে দুনিয়ায় বেপরোয়া এবং দায়িত্বহীন বানিয়ে দিয়েছে। হক ও বাতিলের প্রশ্নকে তারা একেবারে অর্থহীন মনে করে। কারণ দুনিয়অতে এমন কোন হক তাদের চোখে পড়ে না যা অনুসরণের ফল অবশ্যই ভাল হয়ে থাকে। কোন বাতিলও এমন চোখে পড়ে না যার পরিণাম দুনিয়ায় অবশ্যই মন্দ হয়। অতএব প্রকৃত হক কি এবং বাতিল কি এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা তারা নির্থক মনে করে। বিষয়টি চিন্তার বিষয় হলে শুধু তাদের জন্যে হবে যারা দুনিয়ার বর্তমান জীবনকে এক অস্থায় জীবন মনে করে এবং কথা স্বীকার করে যে প্রকৃত এবং চিরস্থায়ী জীবন হচ্ছে আখেরাতের জীবন যেখানে হকের পরিণাম অবশ্যই ভালো হবে এবং বাতিলের পরিণাম অবশ্যই মন্দ হবে। এমন লোক ত ঐসব যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ ও মহান শিক্ষা দেখে ঈমান আনবে যা কুরআন যে আকীদাহ বিশ্বাস ও কর্মকান্ডকে ভ্রান্ত বলছে তার মধ্যে প্রকৃতই কি ভুল আছে? কিন্তু যে আখেরাত অস্বীকারকারী এবং যে সত্য অনুসন্ধানে মোটেই আগ্রহী নয়, সে ঈমান না আনার জন্যে একদিন নিত্য-নতুনি দাবী পেশ করবে। তার কোন দাবী যদি পূরণও করা হয়; তথাপি সে অস্বীকার করার জন্যে অন্য কোন বাহানা তালাশ করবে। এ কথাই সূরা আনয়ামে বলা হযেছৈ- হে নবী, যদি আমরা তোমাদের উপরে কাগজে লিখিত কোন কিতাবও নাযিল করি; এবং মানুষ সেগুলো যদি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখে, তথাপি যারা সত্য অস্বীকার করেছে তারা এ কথাই বলতো যে এ ত সুস্পষ্ট যাদু। (আনয়াম: ৭) (৫৩)

(আরবী*******************)

-তারা বলে, এ নবীর উপরে কোন ফেরেশতা নাযিল করা হলো না কেন? যদি আমরা ফেরেশতা নাযিলও করতাম, তাহলে এখন পর্যন্ত সকল বিষয়ে ফয়সালা করে দেয়া হতো এবং তাদের আর কোন অবকাশ দেয়া হতো না। আর যদি আমরা ফেরেশতাও নামিয়ে দিতাম ত মানুষের আকৃতিতে দিতাম। এভাবে তাদেরকে সেই সন্দেহেই ফেলতো যাতে তারা এখন লিপ্ত আছে। (আনয়াম: ৮-৯)

তাদের বক্তব্য ছিল এই যে, এ ব্যক্তিকে যখন পয়গম্বর করে পাঠানো হয়েছে, তখন আসমান থেকে একজন ফেরেশতা অবতীর্ণ করা উচিত ছিল। সে মানুষকে বলতৈা এ খোদার পয়গম্বর। এর কথা শুন, নইলে তোমাদের শাস্তি দেয়া হবে। জাহেল অভিযোগকারীদের কাছে এটা বিস্ময়কর মনে হয়েছে যে, আসমান-যমীনের স্রষ্টা কাউকে পয়গম্বর নিযুক্ত করবেন এবং এমন অসহায় মানুষের পাথর ও গালি খাওয়ার জন্যে ছেড়ে দেবেন। এমন শক্তিশালী বাদশহার দূত এক বিরাট গ্রুপসহ না এলেও নিদেনপক্খে একজন ফেরেশতা ত তার আর্দালি হিসাবে আসা উচিত ছিল য তার হেফাজত করতো, তার ব্যক্তিত্বের প্রভাব সৃষ্টি করতো, তার নিয়েঅগের নিশ্চয়তা দিত এবং অতি প্রাকৃকি পন্থায় তার কাজকাম আঞ্জাম দিত।

এর প্রথম জবাব এ দেয়া হয় যে, যদি ফেরেশতা প্রকৃত আকৃতিতে পাঠান হতো; তাহলে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার সময় এসে যেতো এবং তখন আর অবকাশ দেয়া হতো না। ঈমান আনার এবং নিজের কর্মপদ্ধতির সংশোধন করার জন্যে যে অবকাশ তোমাদের দেয়া হয়েছে তা ততক্ষণ পর্যন্তই যতক্ষণ বাস্তব সত্য অদৃশ্য যবনিকার অন্তরলে লুক্কায়িত আছে। নতুবা যখন অদৃশ্যের যবনিকা উন্মোচিত হবে তখন অবকাশের আর কোন সুযোগ থাকবে না। তারপর তো শুধু হিসাব গ্রহণের কাজই বাকী থঅকবে। এ জন্যে যে দুনিয়ার জীবন তোমাদের জন্যে এক পরীক্ষা কাল এবং পরীক্ষা  এ বিষয়ের যে প্রকৃত সত্যকে না দেখে শুধু বিবেক ও চিন্তার সঠিক প্রয়োগ দ্বারা তা প্রত্যক্ষ করতে পারছ কিনা প্রত্যক্ষ করার পর আপন প্রবৃত্তি ও তার কামনা-বাসনসাকে আয়ত্ব করে আপন কাজকর্ম সে সত্য অনুযায়ী সঠিক রাখ কিন্। এ পরীক্ষার জন্যে অদৃশ্য থাকাই অনিবার্য শর্ত। তোমার দুনিয়ার জীবন-যা পরীক্ষার নিমিত্ত অবকাশ, সে সময় পর্যন্তই টিকে থাকবে যতোক্ষণ অদৃশ্যই থাকবে। অদৃশ্য যখন প্রকাশ রূপ ধারণ করবে, তখন এ অবকাশ অবশ্যই শেষ হয়ে যাবে এবং পরীক্ষার পরিবর্তে পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার সময় আসবে। সে জন্যে তোমাদের দাবীর জবাবে এ সম্ভব নয় যে, তোমাদের সামনে তোমাদের পরীক্ষার মুদ্দৎ খতম করতে চান না।

তারপর দ্বিতীয় জবাব এ দেয়া হলো যে, যদি ফেরেশতা মানুষের আকৃতি নিয়ে আসতো তাহলে তোমাদের মধ্যে সে সন্দেহেরই উদ্রেক হতো যা এখন নবী সম্পর্কে হচ্ছে, অবশ্যি ফেরেশতাদের আগমনের এ এক রূপ হতে পারতো যে তারা লোকের সামনে তাদের প্রকৃত অদৃশ্য আকৃতিতেই প্রকাশিত হতো। কিন্তু উপরে বলা হযেছে যে, এখনও সে সময় আসেনি। এখন দ্বিতীয় পন্থা এই রয়ে গেছে যে, তারা মানুষের আকৃত ধারণ করেই আসবে। এ সম্পর্কে বলা হচ্ছে, যদি তারা মানুষের আকৃতি ধারণ করে আসে, তাহলে তাদের পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে আসাব সম্পর্কেও তোমাদের মধ্যে সে সন্দেহের উদ্রেক হবে যেমন মুহাম্মদ  (সা) এর আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে আসা সম্পর্কে হচ্ছে। (৫৪)

(আরবী***************)

এসব লোক বলে, এ নবীর উপরে তার রবের পক্ষ থেকে কোন নিদর্শন (অনুভূত মোজেযা) কোন নাযিল করা হয়নি? এদেরকে বল, আল্লাহর নিদর্শন অবতীর্ণ করার পূর্ণ করার পূর্ণ শক্তি রাখেন। কিন্তু এদের অধিকাংশই অজ্ঞতায় লিপ্ত। যমীনে বিচরণকারী কোন প্রাণী এবং ডানায় ভর করে শূন্যে উড়ন্ত কোন পাখী দেখ, এ সব তোমাদেই মত সৃষ্ট  জীব। আমরা তাদের ভাগ্য লিখনে কিছু কম করিনি। অতঃপর এ সকলকে তাদের প্রভুর সমীকে একত্র করা হয়। কিন্তু যারা আমাদের নিদর্শনাবলী মিথ্যা গণ্য করে তারা বধির ও বোবা হয়ে অন্ধকারে পড়ে রয়েছে। (আনয়াম: ৩৭-৩৯)

এ এরশাদের অর্থ এই যে, মুজেযা না দেখাবার অর্থ এ নয় যে, আল্লাহ তা দেখাবার শক্তি রাখেন না। বরঞ্চব তার কারণ আর কিচু যা তোমাদের অজ্ঞতার  কারণে বুঝতে পরছ না। তোমাদের যদি নিছক খেল-তামাশার শখ না থাকে, বরঞ্চ প্রকৃতই এ বিষয়টি জানার জন্যে নিদর্শন দেখতে চাইতে যে, নবী (সা) যে জিনিসের দিকে ডাকছেন তা সত্য কিনা তাহলে চোখ মেলে দেখ, তোমাদের চারধারে অসংখ্য নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে। যমীনের প্রাণী এবং শুন্যে উড্ডীয়মান পাখীর কোন একটির জীবন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে দেখ। কিভাবে তার গঠন কাঠামো তার অবস্থঅর সাথে সামঞ্জস্যশীল করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিভাবে তার সহজাত প্রবৃত্তির মধ্যে তার স্বাভাবিক প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তি দান করা হয়েছে। কিভাবে তাদের জীবিকার ব্যবস্থঅ হচ্ছে। কিভাতে তার এক ভাগ্য নির্ধারিত যার সীমারেখার না আগে পা বাড়াতে পারে আর না পেছনে হটতে পারে। কিভাবে তাদের প্রতিটি প্রাণী এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীট-পতঙ্গের স্ব স্ব স্থানে তাদের যথাযথ যত্ন নেয়া হচ্ছে। দেখাশুনা রক্ষণাবেক্ষণ ও পথ প্রদর্শন করা হচ্ছে। কিভাবে তাদের থেকে একটা নির্ধারিত স্কীম অনুযায়ী কাজ নেয়া হচ্ছে। কিভাবে তাদেরকে একটা নিয়ম পদ্ধতির অধীন করে রাখা হয়েছে এবং কিভাবে তাদের জন্ম, বংশবৃদ্ধি এবং মৃত্যুর ধারাবাহিকতা একটা পরিপূর্ণ নিয়ম অনুযায়ী চলছে। যদি খোদার অসংখ্য নিদর্শনাবলরি মধ্যে শুধু একটি নিদর্শন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা কর, তাহলে তোমরা জানতে পারবে যে, খোদার তৌহীদ এবং গুণাবলরি যে ধারণা এ নবীঅ তোমাদের সামনে পেশ করছেন এবং এ ধঅরণা অনুযায়ী দুনিয়ায় জীবন যাপন করার যে দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতি তিনি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছেন, তা একেবারে মোক্ষম সত্য। কিন্তু তোমরা না চোখ খুলে দেখছ, আর না কারো কথা তোমরা শুনতে চাও। অকৃতজ্ঞতার অন্ধকারে পড়ে আছ এবং চাচ্ছ যে প্রকৃতির বিস্ময়কর দৃশ্য দেখিয়ে তোমাদের মন ভুলানো যাক। (৫৫)

(আরবী***************)

এবং কি হতো যদি কুরআন এভাবে অবতীর্ণ করা হতো। যার দ্বারা পাহাড় চলতে শুরু করতো। অথবা যমীন বিদীর্ণ হতো অথবা মুর্দা কবর থেকে উঠে কথা বলতে শুরু করতো? (রা’দ: ৩১)

এ আয়াতের মর্ম বুঝতে হলে এ কথা মনে রাখতে হবে যে, এখঅনে সম্বোধন কাফেরদের করা হয়নি, বরঞ্চ করা হয়েছে মুসলমানদেরকে। তারা যখন বারবার কাফেরদের পক্ষ থেকে নিদর্শন দেখবার দাবী শুনছিল তখন তাদের মনের মধ্যে এ অস্থিরতা হচ্ছিল যে, হায় যদি তাদেরকে এমন কোন নিদর্শন দেখানো হতো যার দ্বারা তারা নিশ্চিন্ত হতো। তাপর যখন তারা মনে করছিল যে, এ ধরনের কোন নিদর্শন না আসার কারণে নবী (সা) এর রেসালাত সম্পর্কে মানুষের মনে সন্দেহ সৃষ্টির সুযোগ কাফেররা পাচ্ছে। তখন তাদের এ অস্থিরতা আরও বেড়ে যাচ্ছিল। এ জন্যে মুসলমানদেরকে বলা হলো যে, কুরআনের কোন সূরার সাথে হঠাৎ এমন এমন নিদর্শন যদি দেখানোও হতো, তাহলে কি তোমরা মনে কর এসব লোক ঈমান আনতো? তাদের সম্পর্কে তোমাদের কি এ ভালো ধারণা আছে যে, তারা হক কবুল করার জন্যে একেবারে তৈরী হয়ে আছে, শুধুমাত্র একটা নিদর্শনের অভাব? কুরআনের শিক্ষায়, প্রকৃতি রাজ্যের নিদর্শনাবলী, নবীর পূতপবিত্র জীবনে এবং নবীর সাহাবীগণেল বিপ্লবী জীবনে যারা সত্যের আলা দেখতে পেলো না, তোমরা কি মনে কর তারা পাহাড়ের গতি ও যমীন বিদীর্ণ হওয়া দেখে এবং মত ব্যক্তির কবর থেকে বের হওয়া থেকে কোন আলো লাভ করবে? (৬৫)

হুযুরের (সা) রেসালাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ

নবী মুহাম্মদের (সা) বিরুদ্ধে কাফেরগণ এ ধরনের যতো অভিযোগ করেছে এবং তার প্রমাণস্বরূপ মুজেযা দেখাবার জন্যে যতো দাবী করেছে, তার প্রত্যেকটির অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত জবাব দেয়া হয়েছে। যার পর আর এ অবকাশ রাখা হয়নি যে, কোন ব্যক্তি বুদ্ধি বিবেক ও যুক্তি প্রমাণ দ্বারা রেসালাত সন্দেহযুক্ত প্রমাণিত করবে। তারপর রেসালাতের সপক্ষে এমন তিনটি সুস্পষ্ট প্রমাণ পেশ করা হয়েছে যে, মক্কা এবং তার চারপাশে বসবাসকারী লোকদের পক্ষে তা অস্বীকার করা সম্্যভব হয়নি। নিম্নে তার ধারাবাহিক বর্ণনা দেয়া হচ্ছে।

(আরবী**************)

হে নবী। তুমি এর আগে কোন বই-পুস্তক পড়তে না এবং আপন হাত দিয়ে কিছু লিখতেও না। এমন হলে বাতিলপন্থীরা সনের্দহ পোষণ করতে পারতো। (আনকাবুত: ৪৮)

এ আয়অতে যুক্তি প্রমাণের ভিত্তি এই যে, নবী (সা) ছিলেন নিরক্ষর। তাঁর দেশবাসী, প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন যাদের সামনে তাঁর শৈশব থেকে বার্ধক্যে পৌঁছা পর্যন্ত গোটা জীবন অতিবাহিত হযেছে, তহারা সকলেই ভালভাবে জানতো যে, তিনি জীবনে কোনদিন কোন বই-পুস্তক পড়েননি এবং কলমও হাতে নেননি। এ প্রকৃত ঘটনা পেশ করে আল্লাহতায়ালা বলেন, এ কথারই প্রকৃষ্ট প্রমাণ যে, আসমানী কিতাবসমূহের শিক্ষা, পূর্ববর্তী নবীগণের অবস্থা, বিভিন্ন ধর্মীয় আকীদা বিশ্বাস, প্রাচীন জাতিসমূহের ইতিহাস, তামাদ্দুন, নৈতিকতা এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক ও গভীর জ্ঞান এ নিরক্ষর ব্যক্তির মুখ থেকে বেরুচ্ছে, তা অহী ব্যতীত অন্য কোন উপায়ে তিন লাভ করতে পারতেন না। তাঁর যদি লেখাপড়ার জ্ঞান থাকতো এবং মুনুষ যদি কখনো তাকে কোন বই-পুস্তক পড়তে ও গবেষণা করতে দেখতো, তাহলে বাতিল পন্থীদের সন্দেহ করার কিছু ভিত্তি থাকতো যে এ অহী  প্রদত্ত জ্ঞঅন নয় বরঞ্চ চর্চা ও সাধনার দ্বারা অর্জন করা হযেছে। কিন্তু তাঁর এ নিরক্ষরতা কণামাত্র কোন সন্দেহের বুনিয়াদও রেখে যায়নি। এখন চরম হঠকারিতা ছাড়া তার নবুওয়ত অস্বীকার করার কোন কারণ নেই যাকে কোন দিক দিয়েই সংগত বলা যেতে পারে না। (৫৭)

(আরবী******************)

হে নবী (সা), এদেরকে বল, আল্লাহর ইচ্ছা যদি এই হজতো যে, আমাকে নবী করা না হোক, তাহলে এ কুরআন আমি তোমাদের কখনোই শুনাতাম না এবং আল্লাহ তোমাদেরকে এর কোন সংবাদও দিতেন না। এর আগে তোমাদের ভেতরে একটা জীবন অতিবাহিত করেছি। তোমরা কি একটু বুদ্ধি বিবেক খাটাবে না? (ইউনুস: ১৬)

নবী মুহাম্মদ (সা) কুরআন তাঁর নিজের মন থেকে রচনা করে খোদার প্রতি আরোপ করেছেন, মক্কার কাফেরদের এ ধারণা খন্ডনের এ এক বলিষ্ঠ যুক্তি এবং সেই সাথে নবীর এ দাবীও সমর্থন করছে যে, তিনি স্বয়ং এর রচনাকারী নন, বরঞ্চ খোদার পক্ষ থেকে অহীর মাধ্যমে তাঁর প্রতি নাযিল হচ্ছে। অন্যান্য সকল যুক্তি প্রমাণ ছেড়ে দিলেও নবী মুহাম্মদের (সা) জীবন ত তাদের সামনেই রয়েছে। তিনি নবুওয়তের পূর্বে পূর্ণ চল্লিশ বছর তাদের সামনেই অতিবাহিত করেছেন। তাদের শহরেই জন্মগ্রহণ করেছেন। তাদের চোখের সামনে শৈশব কাটিয়েছেন, যৌবনে পদার্পণ করেছেন এবং প্রৌঢ়ত্ব লাভ  করেছেন। বসবাস, দেখা সাক্ষাৎ, লেনদেন, বিয়েশাদী মোটকথা সকল প্রকার সামাজিক সম্পর্ক সম্বন্ধ তাদের সাথেই ছিল। তাঁর জীবনের কোন একটি দিকও তাদের কাছে গোপন ছিল না। এমন জানা বুঝা, দেখাশুনা বস্তু থেকে অধিকতর সুস্পষ্ট সাক্ষ্য আর কি হতে পারে?

নবী পাকের (সা) জীবনে দু’টি বিষয় এতো সুস্পষ্ট যে, মক্কার প্রতিটি মানুষ তা জানতো। এক: এই যে, নবুওয়তের পূর্বে পূর্ণ চল্লিশ বছরের জীবনে তিনি এমন কোন শিক্ষাদীক্ষা ও সাহচর্য লাভ করেননি। যার থেকে এসব জ্ঞঅন তিনি অর্জন করছিলেন এবঙ এ জ্ঞানের ঝর্ণনাধারা হঠাৎ নবুওয়তের দাবীসহ তার মুখ থেকে উৎসারিত হতে থাকে। এখন কুরআনের ক্রমাগত অবতীর্ণ সূরাগুলোতে যেসব বিষয় আলোচিত হচ্ছে ইতিপূর্বে এসব বিষয়ে কোন আগ্রহ প্রকাশ করতে এ সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করতে  এবং মতামত প্রকাশ করতে তাঁকে কোনদিন দেখা যায়নি। এমনকি এ পূর্ণ চল্লিশ বছরের জীবনে তাঁর অতি অঙ্গরঙ্গ বন্ধু এবং অতি নিকট আত্মীয় পর্যন্ত তাঁর কথাবার্তায়, চলাফেরায় এমন কিছু অনুভব করেননি যাকে এ মহান দাওয়াতের ভূমিকা স্বরূপ বলা যেতে পারে, যা তিনি হঠাৎ চল্লিশ বছর বয়সে পেশ করা শুরু করেন। তা এ কথারই সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল যে, কুরআন তাঁর স্বকল্পিত বা মনগড়া ছিল না, বরঞ্চ বাইরে থেকে তাঁর হৃদয়ের মধ্যে প্রবিষ্ট এক বস্তু। এ জন্যে য মানব মস্তিষ্ক তার বয়সের কোন এক স্তরেও এমন জিনিস পেশ করতে পারে না যার পরিবর্ধন ও ক্রমবিকাশের সুস্পষ্ট চিহ্ন তার পূর্ববর্তী স্তরগুলোতে পাওায়া যায় না। এ কারণেই মক্কার কিছু চতুর লোক যখন স্বয়ং অনুভব করলো যে, কুরআনকে নবী মুহাম্মদের (সা) মস্তিষ্কপ্রসূত গণ্য করা একেবারে  বাজে অভিযোগ, তখন অবশেষে তরা এ কথা বলা শুরু করলো যে, অন্য কোন লোক আছে যে মুহাম্মদকে (সা) এ কথা গুলো শিখিয়ে দেয়। কিন্তু এ দ্বিতীয় কথাটি প্রথম কথা থেকে অধিকতর অর্থহীন ছিল। কারণ মক্কা কেন, সমগ্র আরবে এমন যোগ্যতাসম্পন্ন কোন লোক ছিল না যার প্রতি আঙ্গুলি নির্দেশ করে এ কথা বলা যেতো যে, এ  বক্তি এ কালামের রচয়িতা অথবা হতে পারে। এমন যোগ্যতাসম্পন্ন লোক সমাজে কিভাবে লুক্কায়িত থাকতে পারে?

দ্বিতীয় বিষয়টি যা তাঁর পূর্ববর্তী জীবনে বিশেষ লক্ষণীয় ছিল তা এই যে, মিথ্যা, ধোঁকা-প্রতারণা, জালজুয়াচুরি, চালাকি-চতুরি এ ধরনের কোন স্বভাবচরিত্রের কোন লেশমাত্র তাঁর মধ্যে পাওয়া যেতো না। সমাজের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যে একথা বলতে পারতো যে এ চল্লিশ বছরের একত্রে বসবাসকালে তাঁর মধ্যে এ ধরনের কোন আচরণের অভিজ্ঞতা তার হযেছে। পক্ষানতরে যার যার সংস্পর্শেই তিনি এসেছেন, সে তাঁকে একজন অত্যন্ত সত্যবাদী, নিষ্কলংক, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত লোক হিসাবেই জানতো। এখন যে ব্যক্তি তাঁর সমগ্র জীবন কখনো ছোটো খাটো ব্যাপারেও মিথ্যা ও ধোঁকা প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেননি তিনি হঠাৎ এতোবড়ো মিথ্যা এবং জালিয়াতির অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িযে গেলেন যে নিজের মন থেকে কিছু রচনা করলেন এবং জোরে সোরে তা খোদার প্রতি আরোপ করতে থাকলেন, এমন ধারণা করার কোন অবকাশ ছিল কি? এসবেচর ভিত্তিতেই আল্লাহ বলেন, তাদের  এ বেহুদা অভিযোগের জবাবে তাদেরকে বলো, আল্লাহর বান্দাহসব! একটু বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে দেখঝ, আমি বাইর থেকে আগত কোন অপরিচিত লোক নই। বরঞ্চ তোমাদের মধ্যেই এর আগে একটা জীবন অতিবাহিত করেছি। আমার পূর্ববচর্তী জীন দেখার পর তোমরা কিভাবে আমার কাছে এ আশা করতে পার যে, আমি খোদার হুকুম ও শিক্ষা ছাড়া এ কুরআন তোমাদের সামনে পেশ করতে পারতাম? (৫৮)]

(আরবী***************)

হে নবী: তুমি ত কখনোই এ আশা করনি যে তোমার উপর কিতাব নাযিল করা হবে। এত নিছক তোমার রবের মেহেরবানী (যে এ তোমার উপর নাযিল হয়েছে।) (কাসাস: ৮৬)

এর আর একটি যুক্তি যা নবী মুহাম্মদের (সা) নবুওয়তের সপক্ষে পেশ করা হয়েছে। হযরত মূসাকে (আ) নবী বানানো হবে এ ব্যাপারে তিন একেবারে বেখবর ছিলেন এবং এক বিরাট ও মহান মিশনের জন্যে তাঁকে নিয়োজিত করা হবে, এর কোন ইচ্ছা বাসনা তাঁর মনে থাকা ত দূরের কথা, তার ধারণাও তিনি কখনো করেননি। ব্যস হঠাৎ পথ চলা অবস্থায় তাঁতে টেনে নিয়ে নবী বানিয়ে তাঁর দ্বারা এমন বিস্ময়কর কাজ নেয়া হলো, যা তাঁর পূর্ববর্তী জীবনের সাথে কোন সামঞ্জস্যই ছিল না। ঠিক এ অবস্থা ছিল নবী মুহাম্মদ (সা) এর। মক্কার লোকেরা স্বয়ং জানতো হেরা গুহা থেকে যে দিন তিনি নবুওয়তের পয়গাম নিয়ে নামলেন, তার একদিন আগে তাঁর জীবন কি ও কেমন ছিল। তাঁর কাজকাম ও পেশা কি ছিল। তাঁর কথাবার্তা কি ছিল। তাঁর আলাপ-আলোচনার বিষয় কি ছিল। তাঁর আগ্রহ অনুরাগ ও কর্মতৎপরতা কোন ধরনের ছিল। তাঁর এ গোটা জীবন সততা, বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতায় পরিপূর্ণ ছিল। তার মধ্যে চরম মহত্ব ও আভিজাত্য, শান্তিপ্রিয়তা, প্রতিজ্ঞা পালন, অধিকার আদায এবং জনসেবার প্রেরণা অতিমাত্রায় উল্লেখযোগ্য ছিল। কিন্তু তার মধ্যে এমন কিছু ছিল না যার ভিত্তিতে এ অনুমান করা যেতো যে, এ মহান ব্যক্তিটি নবুওয়তের দাবী নিয়ে আবির্ভূত হবেন। তাঁর সাথে যারা ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখতো, তাঁর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং বন্ধুবান্ধব এদের মধ্যে কেউ একথা বলতে পারতো না যে, তিনি প্রথম থেকেই নবী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হেরা গুহার সেই বিপ্লবী মুহূর্তটির পর হঠাৎ তাঁর মুখ থেকে যেসব বিষয় ও সমস্যাবলীর কথা বেরুতে শুরু হলো, তা কেউ পূর্বে এসব সম্পর্কে একটিও শব্দও তাঁর মুখ থেকে শুনতে পায়নি। কেউ তাঁকে সে বিশিষ্ট ভাষা, সেসব শব্দ এবং পরিভাষা ব্যবহার করতে শুনেনি যা কুরআনের আকারে মানুষ তাঁর কাছে শুনতে থাকে। তিনি কখনো ওয়াজ করতে দাঁড়াননি। কখনো কোন দাওয়াত এবং আন্দোলন নিয়ে মাঠে নামেননি, বরঞ্চ তাঁর কোন কর্মতৎপরতায় এ অনুমানও করা যেতো না যে, তিনি জনসমস্যা সমাধান অথবা ধর্মীয় সংস্কার অথবা নৈতিক সংস্কারের কোন কাজ করার চিন্তা করছেন। ঐ বিপ্লবী মুহূর্তের একদিন আগেও তাঁর জীবন এমন এক ব্যবসায়ীর জীবন হিসাবে দেখা যেতো যা সাদাসিদে এবং জায়েয পন্থায় জীবিকা অর্জন করছে। আপন সন্তানদের সাথে হাসিখুশি অবস্থায় থাকতেন। মেহমানদের খাতির তাজিম করতেন। গরীবদের সাহায্য এবং আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করতেন। কখনো কখনো এবাদত করার উদ্দেশ্যে নির্জনে বসে পড়তেন। এমন ব্যক্তি হঠাৎ প্রলয় সৃষ্টিকারী ভাষণসহ আবির্ভূত হবেন। এক বিপ্লবী দাওয়াত শুরু করবেন। এক অভিনব সাহিত্য সৃষ্টি করবেন, এক স্থায়ী জীবনদর্শন, চিন্তাধারা, নৈতিকতা ও তামাদ্দুন নিয়ে সম্মুখে আসবেন-এ এমন এক পরিবর্তন ও বিপ্লপ যা মানব মনস্তত্ত্বের দিক দিয়ে কোন কৃত্রিমতা, প্রস্তুতি এবং চেষ্টাচরিত্রের ফলে কিছুতেই সাধিত হতে পারত না। এ জন্যে যে, এ ধরনের প্রত্যেক প্রচেষ্টা ও প্রস্তুতি ক্রমবিকাশের স্তরগুলো অতিক্রম করে এবং এসব স্তর সেসব লোকের অগোচরে থাকে না যাদের মধ্যে সে ব্যক্তি দিনরাত তার জীবন অতিবাহিত করে। যদি নবী (সা) এর জীবন এসব স্তর অতিক্রম করতো, তাহলে মক্কার শতসহস্র মুখ থেকে এ কথা শুনা যেতো- আমরা না বলতাম যে, এ ব্যক্তি একদিন বিরাট কিছু একটা দাবী করে বসবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে, মক্কায় কাফেরগণ তাঁর উপর হরেকরকমের অভিযোগ করেছে, কিন্তু শেষোক্ত অভিযোগ করার কোন একজনও ছিল না।

তারপর তিনি যে নবুওয়তের অভিলাষী অথবা প্রত্যাশী ছিলেন না, বরঞ্চ তাঁর অজ্ঞাতে হঠাৎ তিনি এ অবস্থার সম্মুখীন হন তার প্রমাণ সে ঘটনা থেকে পাওয়া যায় যা হাদিসের গ্রন্থগুলোতে অহীর সূচনাকালীন অবস্থায় বর্ণিত আছে। ইতিপূর্বৈ রেসালাতের সূচনা শীর্ষক অধ্যায়ে তার বিবরণ দেয়া হয়েছে এখানে তার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন মনে করছি। (৫৯)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.