সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৩য় ও ৪র্থ খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

তৃতীয় অনুচ্ছেদ

কুরআন আল্লাহর বাণী এর উপর ঈমানের দাওয়াত

ইসলামী দাওয়াতের তৃতীয় বুনিয়াদী দফা এই যে, মানুষ কুরআন পাককে আল্লাহর কিতাব বলে স্বীকার করবে। তার প্রতিটি কথা সত্য এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে মেনে নেবে। এর মধ্যে আকীদাহ বিশ্বাস, চিন্তাধারা, নৈতিকতা, এবাদত-বন্দেগী ও আচার-আচরণে সম্পর্কে যে শিক্ষাই দেয়া হযেছে তাকে স্বীয় জীবনের জন্যে মৌলিক আইন গণ্য করবে। প্রতিটি সে বস্তুকে প্রত্যাখ্যান করবে যা তার হেদাযেতের পরিপন্থী। এ আকীদার মধ্যে এ কথাও অনিবার্যরূপে মানতে হবে যে, কুরআন অক্ষরে অক্ষরে আল্লাহর বাণী যা অহীর মাধ্যমে নবী (সা) এর উপর নাযিল হয়েছে। এমনটি নয় যে, শুধু অর্থ তাঁর হৃদয়ে গেঁথে দেয়া হয়েছিল এবং তিনি তাঁর নিজের ভাষায় ও শব্দে তা প্রকাশ করেছেন। বরঞ্চ ব্যাপারে এই ছিল যে, এ কিতাব যেসব শব্দ মালায় রসূলুল্লাহর (সা) উপর নাযিল হযেছিল, তা হুবহু সেই শব্দমালয় সংরক্ষিত করা হয়। এতে না কোন রদবদল করা হযেছৈ, না কমবেশী করা হযেছে। আর বাতিল এর মধ্যে অনুপ্রবেশের কোন পথ পাবে না। এছাড়া যেহেতু এ সরাসরি আল্লাহর রাব্বুল আলামীনের কারাম, সেজন্যে এ স্বয়ং রসুলের উপরেও কর্তৃত্বশীল। এ যদিও এসেছে রসূলেরই মাধ্যমে, কিন্তু রসূল তার অধীন। তা মেনে চলার আদেশ তাকে করা হযেছে। এর মধ্যে কিছু কমবেশী করার অধিকার তাঁর নেই। বরঞ্চ তাঁর কাজ এই যে সবচেয়ে বেশী এবং সকলের প্রথমে তাঁকে এর অনুসরণ করত হবে এবং এ কালামে ইলাহীর অভিপ্রায় অনুযায়ী দ্বীন অর্থাৎ পূর্ণ জীবন বিধান কায়েম করবেন।

এ বিশ্বাস সে বিপ্লবকে অদিকতর সুদৃঢ় করেছিল, যা সংঘটিত করা ইসলামের লক্ষ্য ছিল। এ জন্যে যে খোদার পক্ষ থেকে এক শাশ্বত কিতাব সরবরাহ করা হয়েছিল। যার মধ্যে খোদা স্বয়ং নিজস্ব ভাষায় সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছিলেন যে, হক কি এবং বাতিল কি। এখন মানুষ সর্বদা সকল যুগে এর শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারে যে, আপন রবের সন্তুষ্টি লাভের জন্যে তার কি করা উচিত এবং কি করা উচিত নয়। একজন মানুষকে রসুল বানাবার সাথে একটি কিতাবও তার সাথে নাযিল করা এবং মানুষকে উভযের উপর ঈমান আনার এবঙ উভয়কে মেনে চলার আদেশ করর অর্থ এই যে, মানুষ ও সমাজের মধ্যে যেখানেই এ ঈামন ও আনুগত্য করা হবে, সেখান থেকে স্বেচ্ছারিতার স্বাধীনতার লোপ পাবে। ব্যক্তি ব্যক্তি হিসাবে এবং সমাজ সামগ্রিক হিসাবে একজন পথপ্রদর্শক ও আইন গ্রন্থের অধীন হয়ে যাবে। পথপ্রদর্শক দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার পরেও আইনগ্রন্থ (কুরআন) এ কথা বলার জন্যে দুনিয়ার সর্বদা বিদ্যমান থাকবে। যে আল্লাহতায়ালা কোন কাজের নির্দেশ দিয়েছেন এবং কি করতে নিষেধ করেছেন। নবীর (সা) পর তাঁর যে সুন্নত বিদ্যমান থাকবে, (যাকে কুরআনের দৃষ্টিতে কালামে ইলাহীর নির্ভরযোগ্য সরকারী ব্যাখ্যা বলে) তা এ বিষয়ের কোন অবকাশই রাখবে না যে, প্রবৃত্তির দাসগণ অথবা অন্যান্য জীবনর্শনে বিশ্বাসীগণ আইনগ্রন্থের অপব্যাখ্যা করতে থাকবে।

এ সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামী তাবলিগের সূচনাতেই তৌহীদ এবং রেসালাতে মুহাম্মদীর সাথে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার এবং তাকে আল্লাহর কালাম হিসাবে মেনে নেয়ার দাওয়াত দেয়াও কেন জরুরী ছিল এবং তার গুরুত্ব কি ছিল। এখন নামরা বিশধভাবে বর্ণনা করব যে, যখন এ কুরআন পেশ করা হয়েছিল, তখন তার কি মর্যাদা বয়ান করা হয়েছিল এবং যারা এ কিতাব মানতে অস্বীকার করেছিল, তাদের সামনে কুরআন আল্লাহর কালাম হওয়ার কত বলিষ্ঠ যুক্তি প্রমাণ পেশ করা হয়েছিল।

কুরআন খোদার কালাম যার প্রতিটি শব্দই নবীর (সা) উপর অহী করা হয়

এ ছিল প্রাথমিক কথা যা অত্যন্দ দৃঢ়তার সাথে কুরআনে এতো অধিক পরিমাণে বর্ণনা করা হযেছে যে, এ বিষয়ের সমস্ত আয়াত এখানে উদ্দৃত করা সম্ভব নয়। কুরআনের কোথাও এমন একটি শব্দও নেই যার থেকে এ সন্দেহ হতে পারে যে, এ নবী মুহাম্মদের (সা) নিজস্ব কথা। সমগ্র কিতাব এ হিসাবেই পেশ করা হয়েছে যে, এ খোদার নাযিল করা অহী। দৃষ্টান্তস্বরূপ নিম্নে কয়েকটি আয়াত উদ্ধৃত করা হলো।

(আরবী*****************)

এবং হে মুহাম্মদ (সা)! আমরা তোমার প্রতি এ কিতাব পাঠিয়েছি যা সত্য নিয়ে এসেছে এবং আসমানী কিতাবগুলোর মধ্যে যা কিছু ইতিপূর্বে এসেছিল এবং বিদ্যমান আছে এ কিতাব সে সবের সত্যতা স্বীকারকারী ও সংরক্ষক। অতএব তোমাদের মধ্যে তদনুযায়ী বিচার ফয়সালা কর যা আল্লাহর নাযিল করেছেন। এবং যে সব্য তোমাদের কাছে এসেছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে লোকের কামনা বাসনা অনুসারী হয়ো না। (মায়েদা: ৪৮)

এ আয়অতে সুস্পষ্টরূপে শুধু এ কথাই বলা হয়নি যে, আল্লাহতায়ালা এ কিতাব নবী মুহাম্মদের (সা) উপর নাযিল করেছেন যা সঠিকভঅবে সত্য নিয়ে এসেছে, বরঞ্চ অতিরিক্ত ‍দুটি কথা বলা হযেছে। একটি এই যে, প্রত্যেক সে বস্তুর সত্যতা স্বীকার করছে যা পূর্বে অবতীর্ণ কিতাবগুলোর মধ্রে প্রকৃত এবং সঠিক আকারে বিদ্যমান। দ্বিতীয়তঃ এ ঐসব কিতাবের সংরক্ষক, অর্থাৎ ঐসব কিতাবের ম্যধ্যে যে সত্য শিক্ষাসমূহ ছিল তা এর মধ্যে শামিল করে সংরক্ষিত করেছে। তারপর সত্যের পরিপন্থী যেসব কথা সেসবের মধ্যে শামিল করা হয়েছিল তা এ কিতাবের সাহায্যে ছাঁটাই করে পৃথক করে দেয়া হয়েছে।

(আরবী****************)

এবং এ কুরআনকে আমরা সত্যসহ নাযিল করেছি এবং সত্যসহই এ নাযিল হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন জাকের জন্যে রসূল বানিয়ে পাঠানো হয়নি যে, যে মেনে নেবে তাকে সুসংবাদ দেবে এবং যে মানবে না তাকে ভয় দেখাবে। (বনী ইসরাইল: ১০৫)

(আরবী****************)

এবং হে নবী, তোমার রবের যে কিতাব তোমার উপর অহী করা হয়েছে তা পড়ে শুনাও। (কাহাফ: ২৭)

(আরবী*******************)

হে মুহাম্মদ (সা)! আমরা তোমার উপর এ কিতাব মানুষের জন্যে হকসহ নাযিল করেছি। এখন যে হেদায়েত কবুল করবে সে নিজের মংগলের পন্যে তা করবে। আর যে পথভ্রস্ট হবে তার পরিণাম তাকেই ভোগ করতে হবে। তার দায়িত্ব তোমার নয়। (যুমার: ৪১)

(আরবী*****************)

এবং এভাবে, হে নবী, আমরা তোমার প্রতি আরবী ভাষায় কুরআন অহী করেছি, যাতে তুমি জনপদের কেন্দ্র (মক্কা) এবং তার চারধারে বসবাসকারী লোকদের সাবধঅন করতে পর। (মুরা: ৭)

(আরভী**************)

এ কিতাব নাযিল হয়েছে সর্বশক্তিমান ও মেহেরবান আল্লাহর পক্ষ থেকে (আহকা: ১)

(আরবী****************)

এ এক বরকতপূর্ণ কিতাব যা, হে মুহাম্মদ (সা) আমরা তোমার উপর নাযিল করেছি যাতে মানুষ এর উপর চিন্তা-ভাবনা করতে পারে এবং চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমান লোক এর থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে। (সোয়াদ:” ২৯)

(আরবী******************)

এবং হে মুহাম্মদ (সা) তুমি নিশ্চিতরূপে এ কুরআন এক বিজ্ঞ ও জ্ঞানবান সত্তার পক্ষ থেকে লাভ করছ। (নমল: ৬)

(আরবী******************)

এবং নিশ্চিতরূপে এ রাব্বুল আলামীন কর্তক নাযিল করা। একে নিয়ে একজন নির্ভরযোগ্য রুহ [এখানে আমানতদার বা নির্ভরযোগ্য রূহ বলতে জিব্রিলকে (আ) বুঝানো হয়েছে যিনি কুরআন নিয়ে নবী মুহাম্মদের (সা) নিকটে আসতেন। এখানে তাঁর নাম নেয়ার পরিবর্তে আমানতদার বা নির্ভরযোগ্য রূহ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। একথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, তিনি বিশুদ্ধ আত্মা, অশরীরি সত্তা এবং এমন বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য যে আল্লাহ তায়লালা যেভাবে তাঁর কাছে অহী পাঠান ঠিক সেই ভাবেই কোন কম বেশী না করে তা নবী পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন-গ্রন্থকার।] তোমার হৃদয়ে অবতীর্ণ হয় যাতে হে মুহাম্মদ (সা) তুমি সতর্ককারীদের (মানবজাতিকে সতর্ককারী নবীগণ) অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (শুয়ারা: ১৯২-১৯৫)

(আরবী******************)

-হে নবী, এ অহী তাড়াতাড়ি মুখস্ত করার জন্যে জিহবা নাড়াচাড়া করো না। এ মনে করে দেয়া এবং পড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমার। অতএব আমি যখন তা পড়তে থাকি তখন এ পঠন মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাক। তার মর্ম বুঝিয়ে দেয়াও আমার দায়িত্ব। (কিয়ামাহ: ১৬-১৯)

এ আয়াতগুলো শুধু একথাই সুস্পষ্ট করে তুলে ধরছিল না যে, এ গোটা কিতাবখানি আল্লাহর পক্ষ থেকে মুহাম্মদে (সা) প্রতি অহীর মাধ্যমে নাযিল করা হযেছিল, বরঞ্চ শেষোক্ত দুটি আয়াত এ ব্যাপারে অতি সুস্পষ্ট যে, তার অর্থই শুধু হুযুরের (সা) মনে উদঘাটিত করে দেয়অ হয় না যা তিনি তাঁর নিজের ভাষায় প্রকাশ করেন, বরঞ্চ তার শব্দমালাও আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়। রূহুল আমীনের (জিব্রিল (আঃ) রাব্বুল আলামীনের  পক্ষ থেকে আরবী ভাষায় অহী সহ নাযিল হওয়া তা হুযুরে সামনে পাঠ করা, নবীর তা তাড়াতাড়ি মুখস্থ করার চেষ্টা করা এবং আল্লাহ তায়ালার একথা বলা যে, “তুমি মুখস্ত করার চেষ্টা করো না, ব রঞ্চ যখন পড়া হয় তখন তা শুনতে থাক। অতঃপর তা মনে করিয়ে দেয়া, পড়িয়ে দেয়া, তার মর্ম বুঝিয়ে দেয়া, সব কিছুই আমাদের দায়িত্ব” –এসব কথা তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন অহীর শব্দগুলোও আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়। নতুবা নবীর হৃদযে নিছক অর্থ ও ধারণার উদয় হয়ে থাকলে তা পড়ার, শুযনার, মনে করার এবং আরবী ভাষায় তা নাযিল হওয়ার কোনই অর্থ থাকে না।

রসুলুল্লাহ (সা) স্বয়ং কুরআন মেনে চলতে আদিষ্ট

কুরআনে এ কথাও পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে যে, রসুলুল্লাহ )(সা) কুরআনের হুকুমের অধীন। তা মেনে চলতে তাঁকে আদেশ করা হয়েছে। তার মধ্যে কিছু রদবদল করা এবং অধীন। তা মেনে চলতে তাঁকে আদেশ করা হয়েছে। তার মধ্যে কিছু রদবদল করা এবং কিছু কমবেশী করার অধিকার তাঁর নেই।

(আরবী******************)

এবং হে মুহাম্মদ (সা) তোমার প্রতি তোমার রবের পক্ষ থেকে যা কিছু অহী করা হয়েছে তা মেনে চল। তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত। (আহযাব: ২)

(আরবী***************)

হে মুহাম্মদ (সা), যা কিছু তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রত অহী করা হয়েছে তা মেনে চল। তিনি ছাড়া কোন খোদা নই এবং মুশরিকদের ব্যাপারে বেপরোয়অ হয়ে যাও। (আনয়াম: ১০৬)

(আরবী*******************)

-হে মুহাম্মদ (সা)! তাদেরকে বল, আমি ত শুধু সেই অহীরই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি পাঠানো হয় এবং আমি একজন পরিষ্কার সাবধানকারী ব্যতীত কিছু নই। (আহকাফ: ৯)

(আরবী******************)

এবং (হে নবী!) যখন তুমি এসব লোকের সামনে কোন নিদর্শন (মুজেযা) পেশ করছ না, তখন তারা বলে, তুমি তোমার নিজের জন্যে কোন নিদর্শন কেন বেছে নাওনি? তাদেরকে বল, আমি ত শুধু সে অহীরই অনুসরণ করি যা আমার রবের পক্ষ থেকে আমার প্রতি পাঠানো হয়েছে। এ (কুরআনের  আয়াত) দূরদর্শিতার আলোক তোমার রবের পক্ষ থেকে এবং হেদায়েত ও রহমত ঐসব লোকের জন্যে যারা তাঁর উপর ঈমান আনে। (আ’রাফ: ২০৩)

অর্থাৎ আমার কাজ এ নয় যে, যে জিনিসেরই দাবী করা হবে অথবা যে জিনিসের প্রয়োজন আমি স্বয়ং অনুভব করব তা স্বয়ং আমি আবিষ্কার করে অথবা তৈরী করে পেশ করব। আমি ত একজন রসূল এবং আমার কাজ শুধু এই যে, যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁর হেদায়েত অনুযায়ী কাজ করব। মুজেযার পরিবর্তে আমার প্রেরণকারী আমার কাছে যে জিনিস পাঠিয়েছেন তা এই কুরআন। এর মধ্যে দূরদর্শিতার আলোক রয়েছে এবং এর লক্ষণীয় সৌন্দর্য এই যে, যারা তাকে মেনে নেয় তারা জীবনের সঠিক পথ পেয়ে য৩ায় এবং তাদের সুন্দর স্বভাবচরিত্রে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন সুস্পষ্ট হয়।

(আরবী******************)

এবং যখন তাদেরকে আমাদের পরিষ্কার আয়াতগুলো শুনানো হয়, তখন যারা আখেরাতে আমাদের সাথে মিলিত হওয়ার আশা রাখে না তারা বলে, এছাড়া অন্য কোন কুরআন অথবা এর মধ্যে কিছু রদবদল কর। হে মুহাম্মদ (সা) এদেরকে বলে দাও, আমার পক্ষ থেকে কোন রদবদল করার কোন অধিকার আমার নেই। আমি ত শুধু সেই অহীরই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি পাঠানো হয়। যদি আমার রবের নাফরমানী করি তাহলে এক বিরাট দিনের আযাবের ভয় আমি করি। (ইউনুস: ১৫)

(আরবী******************)

এবং যদি এ (নবী) স্বয়ং নিজের পক্ষ থেকে কিছু তৈরী করে আমাদের প্রতি আরোপ করতো, তাহলে আমরা ডান হাত দিযে ধরে তার গলার রগ কেটে দিতাম। তারপর তোমাদের মধ্যে কেউ এতে বাধাদানকারী হতো না। (আল্‌ হাক্কা: ৪৪-৪৭)

কুরআন সকল দিক দিযে সংরক্ষিত এবং তার প্রতিটি কথা অটল

একথাও কুরআনে সুস্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে যে, কুরআনকে প্রতিটি শব্দসহ সংরক্ষিত রাখার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেছেন। তার প্রতি কথা অটল-অপরিবর্তনীয়। এর মধ্যে মিথ্যা অনুপ্রবেশের কোন পথ পাবে না। আল্লাহতায়ালা দিকচক্রবালে এবং মানুষের মধ্যে ক্রমাগতভাবে এমন সব নিদর্শন দেখাতে থাকবেন যার ফলে তার সত্যতা প্রমাণিত হবে। (আরবী*******************)

আমরাই এ কুরআন নাযিল করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষক। (হাজার: ৯)

অর্থাৎ এ সরাসরি আমাদের হেফাজতে রয়েছে। কেউ নির্মূল করতে চাইলে, অথবা দাবিযে রাখতে চাইলে পারবে না। কারো দোষারোপ ও সমালোচনায় তার মর্যাদাহানি হবে না। তার দাওয়াত কেউ রুখতে চাইলেও পারবে না। তাকে বিকৃত করা ও রদবদল করার সুযোগ কারো হবে না।

(আরবী******************)

-বরঞ্চ কুরআন পাক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, সুরক্ষিত ফলকে অংকিত। (বুরুজ: ২১-২২)

অর্থাৎ এ কুরআনের লেখা মুঝে ফেলা যাবে না। খোদার সেই সংরক্ষিত ফলকে অংকিত যার মধ্যে কোন রদবদল সম্ভব নয়। এর মধ্যে যা লিখে দেয়া হয়েছৈ তা অবশ্যই হবে। সমস্ত দুনিয়া মিলিতভাবে তা নাকচ করতে চাইলেও পারবে না।

(আরবী*****************)

এবং প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এ কুরআন এক শক্তিশালী কিতাব। বাতিল না তার সামনে থেকে আসতে পারে, না পশ্চাৎ থেকে। এ এমন এক সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ যিনি বিজ্ঞ ও আপনাআপনি প্রশংসিত। (হামীম সাজদা: ৪৬)

সম্মুখ থেকে বাতিলের আসতে না পারার অর্থ এই যে, কুরআনের উপর প্রত্যখ্য আক্রমণ করে কেউ তার কোন কথা ভুল এবং কোন শিক্ষঅকে মিথ্যা ও অন্যায় প্রমাণ করতে চাইলে তা করতে পারবে না। পেছন থেকে না আসার অর্থ এই যে, পরবর্তীকালে এমন কোন সত্য উদঘাটিত হবে না যা কুরআনের উপস্থাপিত তথ্যের পরিপন্থী, এমন কোন জ্ঞঅন হতে পারে না যা সত্যিকার অর্থে ‘জ্ঞান’ এবং ক কুরআনে বর্ণিত জ্ঞান খন্ড করে। কোন অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ এমন হতে পারে না যা এ কথা প্রমাণ করতে পারে যে, কুরআন আকীদাহ বিশ্বাস নৈতিকতা, আইন-কানুন, সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সমাজ বিজ্ঞান ও রাজনীতি সম্পর্কে যে সব প্রদর্শন করেছে তা ভুল।

(আরবী*****************)

শিগগির আমরা তাদেরকে আমাদের নিদর্শনাবলী দিকচক্রবালে এবং তাদর মধ্যে দেখাব এবং শেষ পর্যন্ত তাদের নিকটে ঐ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কুরআন প্রকৃতপক্ষে সত্য। (হামীম সাজদা: ৫৩)

এর দুটি অর্থ। এক: এই যে, সত্ত্বর এ কুরআনের দাওয়াত দুনিয়অর এক বিরাট অংশে ছড়িয়ে পড়বে এবং এসব লোক স্বচক্ষে দেখবে যে, তার বদৌলতে মানব জীবনে কি বিরাট ধর্মীয়, নৈতিক, মানসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব সংঘটিত হয়।

দ্বিতীয় অর্থ এই যে, উর্ধজগত এবং স্বয়ং মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের পরিধি যতোই বাড়তে থাকবে, কুরআন যে সত্য, একথা ততোই সুস্পষ্ট হতে থাকবে।

কুরআন অস্বীকার করা কুফরী

ঈমান বিল কুরআন (কুরআনের উপর ঈমান) ইসলামী দাওয়াতের তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ যেমন তৌহীদ ও রেসালাতের উপর ঈমান। এ জন্যে দ্ব্যার্থহীন ভাষায় মানুষকে এ দাওয়াত দেয়া হলো, এ আল্লাহর কালাম, এর উপর ঈমান আন। যে এর উপর ঈমান আনবে না সে কাফের। সূরা বাকাায় প্রাথমিক আয়াতগুলোতে যাদেরকে হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে গণ্য করা হয়েছে তাদের গুণাবলীর মধ্যে একটি গুণ এও বর্ণনা করা হয়েছে।

(আরবী****************)

-আমরা এ কুরআন নাযিল প্রসঙ্গে এমনসব নাযিল করেছি যা এর উপর ঈমান আনয়নকারীদের জন্যে আরোগ্য এবং রহমত এবং (ঈমান আনেনি এমন) জালেমদের জন্যে ক্ষতি ছাড়া আর কিছু নেই। (বনী ইসরাইল: ৮২)

(আরবী****************)

-আমাদের আয়অত অস্বীকার শুধু কাফেরগণই করে থাকে। (আনকাবুত: ৪৭)

কাফেরদের প্রতিক্রিয়া

কুরআনকে তার সঠিক মর্যাদাসহ যখন পেশ করা হলো, তখন কুরাইশ কাফের এবং আরবের সাধারণ মুশরিকগণের পক্ষে তা মেনে নেয়া, নবী মুহাম্মদকে (সা) খোদার রসূল মেনে নেয়া অপেক্ষা অধিকতর কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ মুহাম্মদকে (সা) রসূল মেনে নেয়ার পর তাঁর আনুগত্য মেনে নেয়অ হলেও এমন আশা করা যেতো যে তাঁর দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার পর তারা এ আনুগত্যের বোঝা মাথার উপর থেকে ফেলে দেবে। কিন্তু এখঅনে ত একটি কিতাব এমন মর্যাদাসহ পেশ করা হচ্ছিল যে, তার প্রতিটি শব্দ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। এ কিতাবকে মুসলমানরা অক্ষরে অক্ষরে মুখস্থ করছিল। কারণ নামাযে তার তেলাওয়াত অপরিহার্য। হুযুর (সা) প্রতিটি অহী নাযিল হওয়ার পর তা লিখিয়ে নিতেন। এর থেকে অব্যহতি লাভের কোন আশা তাদের ছিল না। তারা মনে করতো যে, তাকে আল্লাহর কালাম মেনে নেয়ার পর তাদের জীবনকে স্থায়ীভাবে একটা নিয়ম-শৃংখলায় বেঁধে দেয়া হবে যার থেকে বিমুখ হওয়ার অর্থ খোদাওন্দে আলম থেকে বিমুখ হওয়া। এর জন্যে তারা কুরআনকে আল্লাহর কালাম হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করার জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে এবং নবী মুহাম্মদের (সা) এ কথা কিছুতেই বলতে না পারে এ উদ্দেশ্যে তারা সম্ভাব্য সকল কলাকৌশল অবলম্বন করে।

সকল কিতাবে ইলাহীর প্রতি অস্বীকৃতি

এ ব্যাপারে তাদের সর্বপ্রথম কলাকৌশল ছিল তামাম কিাতব ইলাহীকে অস্বীকার করা।

(আরবী******************)

এবং অস্বীকারকারীগণ বল্লো’ আমরা কিছুতেই না এ কুরআনকে মানব আর না এর পূর্বের কোন কিতাবকে। (সাবা: ৩১)

কিন্তু তাদের এ কথা স্বয়ং আরববাসীগণ কিছুতেই মেনে নিতে পারতো না। তারা স্বয়ং এ কথা মানতো যে, হযরত ইব্রাহীমের (আ) সহিফাগুলো খোদার পক্ষ থেকে নাযিল করা ছিল। বস্তুতঃ কুরআনের দুই স্থঅনে তার উল্লেখ এভাবে করা হযেছে যে, তাদের থেকে জানা যায় তা আরববাসীদের কাছে সর্বস্বীকৃত ছিল যদিও তার কোন এক খন্ডও তাদের কাছে সংরক্ষিত ছিল না। এ কথার উল্লেখ আছে সূরা নাজমের ৩৭ আয়াতে এবং সূরা আ’লার ১৯ আয়অতে।

তাছাড়াও আরবে বহুসংখ্যক ইহুদী ও নাসারা বিদ্যমান ছিল যারা কিতাবে ইলাহী বিশ্বাস করতো। আর রসূলুল্লাহ (সা) এর মুকাবিলায় আরবের কাফেরদের প্রয়োজন ছিল এ সব ইহুদী-নাসারার সাহায্য গ্রহণের। সে জন্যে তারা তাদের এ কথার উপর বেশীদিন অবিচল থাকতে পারলো না। (৬০)

নবীল (সা) বিরুদ্ধে এ অভিযোগ যে তিনি স্বয়ং কুরআন রচনা করেছেন

তারপর তারা সবচেয়ে বেশী জোরেসোরে এ অভিযোগ প্রচার করতে থাকে যে, হুযুর (সা) এ কুরআন স্বয়ং রচনা করে আল্লাহর প্রতি আরোপ করেন। এর বিশদ জবাব কুরআনে দেয়া হযেছে এবং বলিষ্ঠ যুক্তিসহ প্রমাণ করেছে যে, এ কালামে ইলাহী।

(আরবী******************)

এ কিতাবের অবতারণ নিঃসন্দেহে রাব্বুল আলামীনর পক্ষ থেকে হয়েছে। (সাজদাহ: ২)

কুরআনের বিভিন্ন সূরা এ ধরনের কোন কোন পরিচয় সূচক বাক্য দিয়ে শুরু হয়। যার উদ্দেশ্য কালামর সূচনাতেই একথা বলে দেয়া যে, এ কালাম কোথা থেকে আসছে। এ প্রকাশ্যতঃ ঐ ধরনেরই একটি ভূমিকাসূলব বাক্য যেমন রেডিওর ঘোষণাকারী কোন প্রোগ্রামের সূচনায় বলে থাকেন যে, অমুক স্টেশন থেকে খবর বলা হচ্ছে। কিন্তু রেডিওর এ মামুলি ধরনের ঘোষণার বিপরীত কুরআনের কোন সূরার সূচনা যখন এ অসাধারণ ঘোষণার দ্বারা করা হয় যে, এ পয়গাম বিশ্বপ্রকৃতির সার্বভৌম প্রভুর পক্ষ থেকে আসছে, তখন এ নিছক ঘোষকের বাণী বর্ণনা করা্ হয় না, বরঞ্চ সেই সাথে তার মধ্যে এক বিরাট দাবী, এক জোরদার চ্যালেঞ্চ এবং এক ভয়ানক সতর্ককীরণ শামিল থাকে। এ জন্যে যে, ঘোষণা সাথে সাথেই এমন খবর দেয় যে, এ মানুষের বাণী নয়- খোদাওন্দে আলমের বাণী। এ ঘোষণার সাথে সাথেই এ বিরাট প্রশ্ন মানুষের সামনে উপস্থপিত করে- এ দাবী মেনে নেব কি নেব না। যদি মেনে নেই তাহলে চিরদিন তার এগ আনুগত্যের শির অবনত করতে হবে। অতঃপর তার মুকাবিলায় আমার কোন স্বাধীনতা থাকবে না। আর যদি মেনে না নিই তাহলে এ বিপদ ঘরে নিতে হবে যে, যদি এ সত্যি সত্যিই আল্লাহর কালাম হয় তাহলে তা প্রত্যাখ্যান করার ফলে চিরকাল দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হতে হবে। এ কারণেই ভূমিকাসূলভ বাক্যটি ব ব্যাতিক্রমধর্মী হওয়ার ফলে মানুষকে বাধ্য করে যাতে সে সতর্ক হয়ে অতি মনোযোগ সহকারে এ কালাম শুনতে থাকে এবং এ সিদ্ধান্ত করে যে, কালামে ইলাহী হিসাবে তা মেনে নেবে কি না।

এখানে শুধু এতোটুকু বলা যথেষ্ট মনে করা হয়নি যে, এ কিতাব রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। বরঞ্চ পূর্ণ বলিস্ঠতার সাথে বলা হয়েছে যে,

(*আরবী******)

নিঃসন্দেহে এ খোদার কিতাব। এ যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। এ জোরালো বাক্যটিকে কুরআনের আনুসাঙ্গিক পটভূমি এবং স্বয়ং কুরআনের পূর্বাপর বর্ণনাকে সামনে রেখে বিচার করলে মনে হয় এর ভেতরে দাবীর সাথে যুক্তিও আছে। আর এ যুক্তি মক্কার ঐসব লোকের অগোচরে ছিল না যাদের সামনে এ দাবী করা হচ্ছিল। এ কিতাব উপস্থাপনকারী গোটা জীবন তাদের সামনে ছিল। কিতাব পেশ করার আগের এবং পরের জীবন। তারা জানতো যে ব্যক্তি দাবীসহ এ কিতাব পেশ করছে, সে তাদের জাতির মধ্যে সবচেয়ে অধিক সৎ, পরম গাম্ভীর্যপূন্ এবং চরিত্রবান লোক। তারা এটাও জানতো  যে, নবুওয়তের দাবী করার পর তঠাৎ সে বলা শুরু করে। তারা এ কিতাবের ভাষা ও  বর্ণনাভঙ্গী এবং স্বয়ং মুহাম্মদ মুস্তাফার (সা) ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গীর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাচ্ছিল। তারা এটাও জানতো যে, একই ব্যক্তির দু’ধরনের বর্ণনাভঙ্গী সুস্পষ্ট পার্থক্য হতে পারে না। তারা এ কিতাবের অলৌকিক সাহিত্য মাধুর্যও লক্ষ্য করছিল এবং আরবী ভাষী হিসাবে তারা স্বয়ং জানতো যে, তাদের সকল সাহিত্যিক ও কবি অনুরূপ কোন সাহিত্য সৃষ্টি করতে অক্ষম। তারা এ কথাও ভালো করে জানতো যে, তাদরে জাতীয় কবি, গণক এবং বক্তাদের বানী এবং এ বাণীর মধ্যে কত আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তারপর এ বাণী যেসব পূত-পবিত্র বিষয় বর্ণনা করা হযেছে তা কত মহজান ও উচ্চাংগের। মিথ্যা দাবীদারের কথা ও কাজের মধ্যে যে ব্যক্তিস্বার্থ জড়িত থাকে, এ কিতাবের মধ্যে এবং তার উপস্থাপনকারীর মধ্যে তার লেশমাত্র পাওয়া যায় না। নবুওয়তের দাবী করে হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে অথবা আপন জাতি ও গোত্রের জন্যে কি লাভ করতে চান এবং এ কাজের জন্যে তাঁর কোন ব্যীক্তস্বার্ত নিহিতম, বিরোধীরা তা কিছুতেই চিহ্নিত করতে পারছিল না। তারা এটাও দেখছিল যে, এ দাওয়াতের প্রতি তাদের জাতির কোন সব লোক আকৃষ্ট হচ্ছিল এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট হবার পর তাদের জীবনে কত বড়ো বিপ্লপ সাধিত হচ্ছিল্ এ সব কিছু মিলে স্বয়ং দাবীর সপক্ষে যুক্তি প্রমাণের রূপ ধারণ করছিল। এ জন্যে এ পটভূমিতে এ কথাই বলা যথেষ্ট ছিল যে, এ কিতাবের রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নাযিল হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। আর অধিক যুক্তিপ্রমাণের কোন প্রয়োজন নেই। (৬১)

(আরবী******************)

এরা কি বলে যে, এ ব্যক্তি স্বয়ং এটি রচনা করেছে? না, বরঞ্চ এ সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে যাতে তুমি সাবধান করে দিতে পার এমন এক জাতিকে যাদের কাছে তোমার পূর্বে সাবধানকারী আসেনি, সম্ভবতঃ তারা হেদায়াত লাভ করবে। (সাজদা: ৩)

পূর্বে যে ভূমিকাসূলভ বাক্যের উল্লেখ করা হয়েছে, তারপর মক্কার মুশরিকদের প্রথম অভিযোগের জবাব দেয়া হচ্ছে তা তারা নবী মুহাম্মদ (সা) এর রেসালাত সম্পর্কে করতো। জবাবে যে প্রশ্ন যেসব কথার ভিত্তিত এ কিতাবের আল্লাহ পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হওয়ার সন্দেহাতীত, তা সত্ত্বেও এসব লোক কি সুস্পষ্ট হঠকারী উক্তি করছে যে মুহাম্মদ (সা) নিজে তা রচনা করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি আরোপ করাছে? এমন বেহুদা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করতে তাদরে লজ্জা করে না? তারা কি একথা  অনুভব করতে পারে না যে, যারা নবী মুহাম্মদকে (সা) তাঁর কাজ ও বাণী সম্পর্কে অবহিত এবং যারা এ কিতাবকে বুঝতে পারে, তারা এ বেহুদা অভিযোগ শুনে কি ধারণা করবে?

যেভাবে প্রথম আয়অতে (আরবী***********) (তাতে সন্দেহ নেই) বলাই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে এবং তারপর কুরআনের কালামে ইলাহী হওয়ার সপক্ষে কোন যুক্তি প্রদর্শন প্রয়োজন মনে করা হয়নি। ঠিক তেমনি, এ আয়াতেও মক্কার কাফেরদের অভিযোগ আরোপের উপর শুধু এতোটুকু বলাই যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে- “এ হচ্ছে এক তোমার রবের পক্ষ থেকে।” এর কারণও তাই যা আমরা ২নং আয়অতের ব্যাখ্যায় বলেছি। কেব কোন্‌ পরিবেশে কোন মর্যাদাসহ এ কিতাব পেশ করেছিলেন, এসব শ্রোতাদের জানা ছিল। এ কিতাবও তার ভাষা, সাহিত্য ও বিষয়বস্তুসহ সকলের সামনে ছিল। তার প্রভাব ও ফলাফলও মক্কার সেই সমাজের সকলে স্বচক্ষে দেখছিল। এ অবস্থায় এ  কিতাবের রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আগত সত্য হওয়াটা এমন এক বাস্তব ঘটনা ছিল যা অল্প কথায় বর্ণনা করাই কাফেরদের অভিযোগ খন্ডনের জন্যে যথেষ্ট ছিল। এর উপর যুক্তি প্রমাণ পেশ করার চেষ্টা করলে বিষয়টিকে বলিষ্ঠ করার পরিবর্তে তাকে দুর্বল করা হতো। যেমন ধরুন দিনের বেলা সূর্য উজ্জ্বল আলো দান করছে, এমন সময কোন গোঁয়ার ব্যক্তি বল্লো যে, এ অন্ধকার রাত। তার জবাবে শুধু এতোটুকু বলাই যথেষ্ট, একে তুমি রাত বলছ? উজ্জ্বল দিন ত চোখের সামনে রয়েছে। তারপর যদি আপনি প্রমাণ করার জন্যে যুক্তসংগত দলিল প্রমাণ পেশ করতে থাকেন তাহলে জবাবে বলিষ্ঠতা বৃদ্ধি করতে পারবেন না। বরঞ্চ হ্রাসই করবেন। (৬২)

(আারবী****************)

এ কুরআন এমন জিনিস নয় যা আল্লাহর অহী ও শিক্ষা ব্যতীত রচিত সহবে।  বরঞ্চ এত যা কিছু পূর্বে এসেছিল তার সত্যতার স্বীকৃতি এবং আল কিতাবের বিশদ বিবরণ। এ যে রাব্বুল আলামীনের পক্ষ তেকে তাতে কোন সন্দেহ নেই। (ইউনুস: ৩৭)

‘যা কিছু পূর্বে এসেছিল তার সত্যতার স্বীকৃতি’ অর্থাৎ সূচনাকাল থেকে যে মৌলিক শিক্ষা নবীগণেল মাধ্যমে মানুষের কাছে পাঠানো হতে থাকে। এ কুরআন তার থেকে সরে গিযে কোন নতুন জিনিস পেশ করছে না। বরঞ্চ ঐসবের স্বীকৃতি দান করছে। যদি এ কোন নতুন ধর্ম প্রবর্তকের মানসিক কল্পনার ফসল হতো, তাহলে অবশ্যই তার মধ্যে এ প্রচেষ্টা দেখা যেতো যে, প্রাচীন সত্যের সাথে কিছু নিজস্ব অভিনব রং মিশিয়ে আপন পৃথক মর্যাদা সুস্পষ্ট করে তুলতো।

‘আল কিতাবের বিশদ বিবরণ এর অর্থ এসব মৌলিক শিক্ষা যা সমস্ত আসমান কিতাবের সারাংশ এর মধ্যে সন্নিবেশিত করে যুক্তি ও সাক্ষ্য প্রমাণসহ। উপদেশ ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণসহ এবং বাস্তব অবস্থঅর সাথে সংগতিশীল করে বর্ণনা করা হয়েছে। (৬৩)

(আরবী******************)

বল যদি মানুষ এবং জ্বিন সকলে মিলিত হযেও এ কুরআনের অনুরূপ কোন কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করে, তবুও তা পারবে না। তারা একে অপরের সাহায্যকারী হোক না কেন। (বনী ইসরাইল: ৮৮)

এ স্থান ব্যতীত কুরআনের অন্যান্য চারটি স্থানেও এ চ্যালেঞ্জ দেয়অ হয়েছে। যথা সূরা বাকারা আয়াত ২৩-২৪, ইউনুস আয়াত ৩৮, হুদ আয়াত ১৩, এবং তুর আয়াত ৩ড, ৩৪। এসব স্থানে এ কথা  কাফেরদের এ অভিযোগের জবাবে বলা হয়েছে যে, মুহাম্মদ (সা) নিজে এ কুরআন রচনা করেছেন এবং অযথা তিনি একে খোদার বাণী বলে পেশ করছেন। উপরন্ত সূরা ইুউনুস ১৬ আয়াতে এ অভিযোগ খন্ডন করে বলা হয়েছে-

(আরবী******************)

হে মুহাম্মদ (সক), এদেরকে বলে দাও, আল্লাহ যদি চাইতেন যে, আমি যেন কুরআন তোমাদেরকে না শুনাই। তাহলে কিছুতেই শুনাতে পারতাম না। বরঞ্চ এর খবর পর্যন্ত তোমাদেরকে দিতেন না। আমি ত তোমাদের এক জীবন অতিবাহিত করেছি। তোমরা এতোটুকুও বুঝ না? (ইউনুস: ১৬)

এ আয়াতগুলো কুরআন কালামে ইলাহী হওয়ার যে যুক্তি পেশ করা হয়েছে তার ‍মধ্যে প্রকৃতপক্ষে তিনটি যুক্তি আছে। প্রথমতঃ কুরআন তার ভাষা, বর্ণনাভংগী, যুক্তি প্রদর্শন পদ্ধতি, বিষয়বস্তু, আলোচনা, শিক্ষা এবং অদৃশ্য জগতের সংবাদ পরিবেশনের দিক দিযে একটি মুজেযা (অলৌকিক বস্তু) যারা অনুরূপ একটি পেশ করা মানুষের সাধ্যের অতীত। তোমরা বলছ যে একে একজন মানুষ রচনা করেছে। কিন্তু আমরা বলছি যে দুনিয়অর সককল মানুষ মিলিত হয়েও এ ধরনের কোন গ্রন্থ রচনা করতে পারবে না। এমনকি যে জিন জাতিকে মুশরিকগণ তাদের মাবুদ বানিয়ে রেখেছে এবং এ কুরআন যে মুবাদ বানাবার মানসিকতাকে চরম আঘাত হেনেছে, ও সে জিন জাতিও যদি কুরআন অস্বীকারকারীরেদ মদদের জন্যে একতাবদ্ধ হয়ে যায়, তথাপি তারাও কুরআনের মর্যাদা সম্পন্ন কোন গ্রন্থ রচনা করে এ চ্যালেঞ্জ খন্ডন করার যোগ্যতা লাভ করতে পারবে না।

দ্বিতীয়তঃ মুহাম্মদ (সা) কোন বহির্জগত থেকে হঠাৎ তোমাদের মধ্যে আবির্ভূত হননি। বরঞ্চ এ কুরআন নাযিলের পূর্বেও চল্লিশবছর তোমাদের মধ্যে ছিলেন। নবুওয়ত দাবী করার একদিন পূর্বেও তাঁর মুখ থেকে এ ধরনের বাণী, এ ধরনের সমস্যা ও বিষয়বস্তু সম্বলিত কোন বাণী তোমরা শুনেছিলে কি? যদি না শুনে থাক এবং নিশ্চয়ই তা শুননি, তাহলে তোমাদের বিবেক কি এ কথা বলে যে কোন ব্যক্তির ভাষা, ধ্যান-ধারণা, তথ্যাদি, চিন্তাধারা ও বৃক্তৃতা বিবৃতিতে হঠাৎ এমন বিরাট পরিবর্তন হতে পারে?

তৃতীয়তঃ নবী মুহাম্মদ (সা) তোমাদেরকে কুরআন শুনিয়ে আত্মগোপন করেননি, বরঞ্চ তোমাদের মধ্যেই বসবাস করছেন। তোমরা তাঁর মুখ থেকে কুরআনও শুমনছ এবং অন্যান্য আলাপ-আলোচনা ও বক্তৃতা শুনছ। কুরআনের কথা এবং নবী মুহাম্মদের (সা) কথায় ভাষা ও প্রকাশ ভংগীর এমন বিরাট পার্থক্য যে কোন এক ব্যক্তির এমন ভিন্নতর দু’রকম কথা কখনোই হতে পারে না।এ পার্থক্য শুধুমাত্র সেকালেই সুস্পষ্ট ছিল না যখন নবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর জাতির মধ্যে বসবাস করছিলেন। বরঞ্চ আজও হাদীস গ্রন্থাবলীতে তাঁর অসংখ্য বাণী ও ভাষণ বিদ্যমান আছে। তাঁর ভাষা ও বর্ণনাভংগী কুরআনের ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গী থেকে এতা বিভিন্ন যে, আরবী ভাষা ও সাহিত্যের কোন সূক্ষ্ম সমালোচক এ কথা সাহস বলতে সাহস করবেন না যে এ উভয় ধরনের কথা একই ব্যক্তির । (৬৪)

(আরবী********************)

এরা কি এ কথা বলে যে, পয়গম্বর স্বয়ং এ কিতাব রচনা করেছে? বল, আচ্ছা সেই কথা? তাহলে এ ধরনের রচিত দশটি সূলা তোমরা তৈরী করে আন। আর আল্লাহ ছাড়া যে তোমাদের মা’বুদ রয়েছে তাদেরকে সাহায্যের জন্যে ডেকে আনতে পার ত নিয়ে এসো যদি (তাদের মা’বুদ মনে করার ব্যাপারে) তোমরা সত্যবাদী হও। এখন তারা যদি তোমাদের সাহায্য করতে না আসে তাহলে জেনে রাখ যে, এ আল্লাহর এলম থেকে নাযিল হয়েছে এবং জেনে রাখ আল্লাহ ছাড়া কোন সত্যিকার মাবুদ নেই। তারপর তোমরা কি (এ সত্যের প্রতি) আনুগত্যের শির অবনত করছ? (হুদ: ১৩-১৪)

এখানে একই যুক্তি দ্বারা কুরআনেসর কালামে ইলাহী হওয়ার প্রমাণ দেয়া হয়েছে এবং তাওহীদের প্রমাণও। যুক্ত প্রদর্শনের সারাংশ নিম্নরূপ:

১। যদি তোমাদের নিকটে এ মানুষের কথা হয়ে থাকে, তাহলে ত মানুষের এরূপ কথা বলার যোগ্যতা থাকা উচিত। অতএব আমি, (মুহাম্মদ (সা) এ কিতাব স্বয়ং রচনা করেছি তোমাদের এ দাবী তখনই সত্য হতে পারে যখন তোমরা সকলে মিলে এর অনুরূপ কোন কিতাব রচনা করতে না পার, তাহলে আমার এ দাবী সত্য যে, আমি এ কিতাবের রচয়িতা নই। বরঞ্চ এ আল্লাহর এলম দ্বারা নাযিল হয়েছে।

২। অতঃপর এ কিতাবে তোমাদের খোদাদেরও প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা হযেছে এবং পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, এদের বন্দেগী পরিত্যাগ কর। কারণ খোদায়ীতে তাদের কোনই অংশ নেই। তা যডদি না মান, তাহলে প্রয়োজন এই যে, তোমাদের খোদাদেরও (যদি সত্যিই তারা খোদা হয়) আমার দাবী মিথ্যা প্রমাণ করার জন্যে এবং এ কিতাবের অনুরূপ একটি রচনা করার জন্যেতোমাদের সাহায্য করা উচিত। কিন্তু তারা এ ফয়সালার মুহূর্তে নাতোমারে কোন সাহায্য করতে পারে এবং না তোমাদের মধ্যে এমন শক্তি সঞ্চার করতে পারে যার দ্বারা তোমরা এ কিতাবের অুনুরূপ রচনা করতে পার, তাহলে এ কথা সুস্পস্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, তোমরা অযথা তাদেরকে খোদা বানিয়ে রেখেছ। নতুবা তাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে এমন কোন শক্তি নেই এবং খোদায়র লেশমাত্র নেই যার ভিত্তিতে তারা খোদা হওয়ার যো্য। (৬৫)

(আরবী*******************)

এরা ক এ কথা বলে যে পয়গম্বর (এ কিতাব) স্বয়ং রচনা করেছে? বল, তোমরা যদি তোমাদের অভিযোগে সত্যবাদী হও, তাহলে অনুরূপ একটি সূরাই রচনা করে আন ্ববেং এক খোদাকে বাদ দিয়ে যাকে যাকে ইচ্ছা সাহায্যের জন্যে ডেকে আন। (ইউনুস: ৩৮)

সাধারণতঃ মানুষ মনে করে যে, এ চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে নিছক কুরআনেসর ভাষায় অলংকার ও সাহিত্যিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে। কুরআনের অলৌকিকত্বের উপর যে ধরনের আলোচনা করা হয়েছে তার থেকে এ ভুল ধারণা সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু কুরআনের মর্যাদা এর চেয়ে অনেক উচ্চে। কুরআন তার স্বাতন্ত্র্য স্বকীয়তা  ও তুলনাহীনতার দাবীর বুনিয়াদ নিশক শাব্দিক ও সাহিত্যিক মাধুর্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করেনি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ভাষঅর দিক দিয়ে কুরআন অতুলনীয়। কিন্তু যে কারণে এ কথা বলা হয়েছে যে মানব মস্তিষ্ক এ ধরনের কোন কিতাব রচনা করতে পারে না তাহলে তার আলোচ্য বিষয় ও শিক্ষা। এর মধ্যে অলৌকিকত্বের যে দিক রয়েছে এবং যে কারণে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবঙ এ ধরনের রচনা মানুষের সাধ্যের অতীত, তা কুরআন স্বয়ং বিভিন্নস্থানে বর্ণনা করেছে। (৬৬)

(আরবী*****************)

-এরা কি বলে যে, এ ব্যক্তি স্বয়ং কুরআন রচনা করেছে? আসল কথা এই যে, এরা ঈমান আনতে চায় না। তারা যদি তাদের কথায় সত্যবাদী হয় তাহলে তারা এ মর্যাদাসম্পন্ন একটি কালাম বানিয়ে আনুক। (তূর: ৩৩-৩৪)

অন্য কথায় এ এরশাদের অর্থ এই যে, কুরাইশের যারা কুরআনকে নবী মুহাম্মদের (সা) নিজস্ব রচিত কালাম বলে স্বয়ং তাদের মন এ কথা বলে যে, এ তাঁর কালাম হতে পারে না। অন্যান্যদের মধ্যে যারা ভাষাবিদ, তারা যে শুধু পরিষ্কার অনুভব করে যে এ মানবীয় বাণী অপেক্ষা অতীব উচ্চ ও মহান। বরঞ্চ তাদের মধ্যে যারা নবী মুহাম্মদকে (সা) জানতো, তারাও কখনো কখনো এ ধারণা করতে পারতো না যে, এ তাঁর (নবীর) নিজস্ব কালাম। অতএব পরিষ্কার কথা এই যে, কুরআনকে নবীল মুহাম্মদের (সা) রচিত যারা বলে, তারা প্রকৃতপক্ষে ঈমানই আনতে চায় না। এ জন্যে তারা বিভিন্ন রকমের মিথ্যা বাহানা তৈরী করে যার মধ্যে এ একটি।

কথা শুধু এতোটুকুই নয় যে, এ নবী মুহাম্মদের (সা) কালাম নয়, বরঞ্চ প্রকৃতপক্ষে এ মোটেই কোন মানবীয় বাণী বা কালাম নয়। এ রকম বাণী রচনা করা মানুষের সাধ্যের অতীত। তোমরা যদি এক মানব রচিত কালাম বলতৈ চাও, তাহলে এ মানের কোন বাণী রচনা করে নিয়ে এসো যা কোন মানুষ রচনা করেছে। এ চ্যালঞ্জ না শুধু কুরাইশকে, বরঞ্চ দুনিয়অর সকল অবিশ্বাসকারীকে সর্বপ্রথম এ আয়াতে দেয়া হয়েছিল। অতঃপর তিনবার মক্কা মুয়ায্যামা এবং শেষবার মদীনা মুনাওয়ারায় এ চ্যালেঞ্জের পুনরাবৃত্তি করা হয়। (সূরা ইউনুস আয়াত ৩৮, হুদ: ১৩, বনী ইসরাইল : ৮৮. বাকারা: ২৩৭ দঃ)

কিন্তু এ চ্যালেঞ্জের জবাবচ দেয়ার হিম্মত না সে সমযে কারো হযেছে, আর না আজ কারো হয়েছে যে কুরআনের মুকাবিলায় কোন মানব রচিত কিছু নিয়ে আসে।

কিছু লোক এ চ্যালেঞ্জের প্রকৃত ধরন উপলব্ধি না করার কারণে এ কথা বলে যে, কুরআন কেন, কোন ব্যক্তিরই রচনা পদ্ধতির ন্যায় অন্য কেউ কোন গদ্য বা পদ্য সাহিত্য রচনা করতে পারে না। হোমার, রুমী, শেক্সপীয়র, গেটে, পালেব, রবীন্দ্রনাথ এবং ইকবাল সকলেই এ দিক দিয়ে অতুলনীয়। অবিকল তাদের মতো কোন কিছু রচনা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। কুরআনের চ্যালেঞ্জের জবাবদানকারী প্রকৃতপক্ষে এ ভুল ধারণায় রয়েছে যে,

(আরবী*****************)

এর অর্থ বর্ণনাভঙ্গী অনুযায়ী এ ধরনের কোন রচনা করা। বস্তুতঃ এর অর্থ বর্ণনা ভংগীতে সাদৃশ্য নয়। বরঞ্চ অর্থ এই যে, এ মান ও মর্যাদার কোডন গ্রন্থ রচনা করে আন যা শুধু আারবীতেই নয়, দুনিয়ার কোন ভাষায় সেসব বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে কুরআনের প্রতিদ্বন্দী গণ্য হতে পারে যার ভিত্তিতে এক অলৌকিক বস্তু। সংক্ষেপে কতিপয় বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হচ্ছে যার ভিত্তিতে কুরআন পূর্বেও অলৌকিক ছিল এবং আজও রয়েছে।

১। যে ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে, তার সাহিত্যের এক অতি উচ্চ ও মহান নমুনা এ কুরআন। গোটা কুরআনের মধ্যে কোন একটি শব্দ ও বাক্য এ মানের নিম্নে পাওয়া যাবে না। যে বিষয়বস্তুই আলোচনা করা হয়েছে তা সবচেয়ে উপযোগী ও মানানসই শব্দাবলী ও প্রকাশভঙ্গীতে বর্ণনা করা হয়েছে। একই বিষয় বারবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং প্রত্যেকবার নতুন বর্ণনাভঙ্গী অবলম্বন করা হয়েছে এবং পুনরাবৃত্তির রুচিহীনতা কোথাও দেখা যায় না। আগাগোড়া সমগ্র গ্রন্থে শব্দমালার গাঁথুনি এমন যে মনে হয় যেন মুক্তার মালা নির্মাণ করা হয়েছে। বক্তব্য এতো প্রভাবশালী যে কোন ভাষাবিদ ব্যক্তি তা শুনে আনন্দে আপ্লুত না হযে পারে না। এমনকি অস্বীকারকারী ও বিরোধীর মনেও আনন্দ সঞ্চার করে। চৌদ্দশ’ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও আজ পর্যন্ত এ গ্রন্থ আরবী ভাষা সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা যার সমান ত দূরের  কথা যার ধারে কাছেও এ ভাষার কোন কিতাব তার সাহিত্যিক মর্যাদা ও মূল্যসহ পৌঁছতে পারে না। তাই নয়, বরঞ্চ এ মহাগ্রন্থ হওয়ার পারও এ ভাষার অলংকার মান তাই রয়েছে যা এ গ্রন্থ প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অথচ এতো সুদীর্ঘ সময় ভাষা পরিবর্তিত হয়ে ভিন্নরূপ ধারণ করে। দুনিয়ার কোন ভাষা এমন নেই যা বুহ শতাব্দী যাবত বানান, বাক্য রচনা, প্রকাশভঙ্গী, ব্যাকরণ এবং শব্দমালা ব্যবহারে একই রকম রয়ে গেছে। কিন্তু শুধুমাত্র এ কুরআনেরই শক্তি যা আরবী ভাষাকে তার আপন স্থান হতে বিচ্যুতি হতে দেয়নি। তার একটি শব্দও আজ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়নি। তার প্রতিটি বাগধারা আজও আরবী সাহিত্যে ব্যবহৃত হয়। তার সাহিত্য এখানো আরবী ভাষায় উচ্চমানের সাহিত্য। দুনিয়ার কোন ভাষঅয় কি কোন মানব রচিত গ্রন্থ এ মর্যাদার আছে?

২। এ দুনিয়ার মধ্যে একমাত্র কিতাব যা মানব জাতির চিন্তাধারা, নৈতিকতা, সভ্যতা এবং জীবন পদ্ধতিরউপর এতো ব্যাপক, গভীর ও সার্বিক প্রভাব বিস্তার করেছে যে দুনিয়ায় তার কোন নজীর পাওয়া যায় না। প্রথমে তার প্রভাব একটা জাতির মধ্যে বিপ্লব সংঘটিত করে। তার পর সে জাতি দুনিয়ার বৃহত্তর অংশের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত করে। দ্বিতীয় এমন কোন গ্রন্থ নেই যা বিপ্লবাত্মক প্রাণিত হতে পারে। এ গ্রন্থ শুধু কাগজের পৃষ্ঠায় লিখিত রয়ে যায়নি। বরঞ্চ বাস্তব জগতের তার এক একটি শব্দ, চিন্তা-চেতনা ও ধ্যান-ধারণার রূপ দিয়েছে এবং একটি স্থায়ী সভ্যতা সৃষ্টি করেছে। দেড় হাজার বছর যাবত তার এ  প্রভাব অব্যাহত রয়েছে এবং দিন তার এ প্রভাব বিস্তার লাভ করছে।

৩। যে বিষয়বস্তু এ গ্রন্থ আলোচনা করে তা বহুমুখী ও ব্যাপক বিষয়, যার  পরিধি শুরু থেকে আখের পর্য়ন্ত সমগ্র বিশ্বজগতের পরিব্যপ্ত। সে বিশ্বজগতের গুঢ়রহস্য তার সূচনা ও পরিণাম এবং তার আনি-শৃঙ্খলা সম্পর্কে আলোকপাত করে। সে বলে, এ বিশ্বজগতের স্রষ্টা পরিচালক ও নিয়ন্ত্রক কে, কি তাঁর গুণাবল, কি তাঁর এখতিয়ার, প্রকৃত বিষয়ের গুঢ়রহস্য কি যার জন্যে তিনি এ সমগ্র ব্যবস্থাপনা কায়েম করেছেন। সে এ বিশ্বে মানুষের মর্যাদা ও তার স্থঅন সঠিকভাবে বর্ণনা করে বলে দেয এ তার স্বাভাবিক স্থঅন এবং এ তার জন্মগত অধিকার যা পরিবর্তন করার শক্তি তার নেই। সে বলে দেয়, এ স্থান ও মর্যাদার দিক দিযে মানুষের চিন্তা ও কাজের সঠিক পথ কোনটি যা প্রকৃতির সাথে পূর্ণ সংগতিশীল এবং ভ্রান্ত পথগুলো কি যা সত্যের সাথে সংঘর্ষশীল। যমীন ও আসমানের এক একটি বস্তু থেকে, বিশ্বজগতের ব্যবস্থাপনার একটি দিক থেকে, মানুষের আপন সত্তা ও অস্তিত্ব থেকে এবং মানুষের সমগ্র ইতিহাসথেকে অসংখ্য যুক্তি প্রমাণ দিয়ে সত্যপথের সঠিকতা এবং ভ্রান্ত পথের ভ্রান্তি সে প্রমাণ করেছে। সেইসাথে এ কথাও বলে যে, মানুষ ভুল পথে কিভাবে এবং কি কি কারণে পরিচালিত হয় এবং সঠিক পথ, যা হরহামেশা একই ছিল এবং একই থাকবে, কিভাবে জানা যেতে পারে এবং কিভঅবে প্রত্যেক যুগে তা তাকে বলা হতে থাকে। সে সঠিক পথ চিহ্নিত করে নীরব থঅকে না। বরঞ্চ ঐ পথে চলার জ্যে একটি পূর্ণ জীবন ব্যবস্থঅর চিত্র পেশ করে যার মধ্যে আকায়েদ, আখলাক, তাযকিয়ায়ে নফস (আত্মশুদ্ধি) এবাদত বন্দেগী সমাজ ব্যবস্থঅ সভ্যতা-সংস্কৃতি অর্থনীতি রাজনীতি, বিচার ব্যবস্থা, আইন প্রভৃতি মোটকথা, জীবনের প্রতিটি বিভাগ সম্পর্কে একটা অত্যন্ত সামঞ্জস্যশীল নিয়ম-পদধতি বলে দেয়া হয়েছে। উপরন্তু সে বিশদভাবে বলে যে, এ সঠিক পথ অনুসরণের এবং ভুল পথে চলার কি পরিণাম এ দুনিয়াতে হবে। তারপর এ দুনিয়অর বর্তমান ব্যবস্তঅপনা শেষ হওয়ার পর পরবর্তী জগতে পরিণাম কি হবে তাও বলা হয়েছে। সে এ দুনিয়া শেষ হওয়ার এবং দ্বিতীয় জগত শুরু হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ পেশ করে। এ পরিবর্তনের সকল স্তর এক একটি করে সে বলে দেয়। অন্য  জগতটির পূর্ণ চিত্র দৃষ্টি পথে তুলে ধর। তারপর সে বিশদভাবে বর্ণনা করে যে, মানুষ কিভাবে সেখানে এক দ্বিতীয় জীবন লাভ করবে, কিভাবে সেখানে তার পার্থিব জীবনের কর্মকান্ডের হিসাব নেয়া হবে, কি কি বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, কিভাবে অনস্বীকার্য অবস্থায় তার পূর্ণ ‘নামায়ে আমল তার সামনে রেখে দেয়া হবে, সেসব প্রমাণ করার জন্যে কেমন বলিষ্ঠ সাক্ষ্য পেশ করা হবে, পুরষ্কার ও শাস্তি লাভকারীগণ কেন তা লাভ করবে। পুরষ্কার লাভকারীগণ কি ধরনের সম্পরদ লাভ করবে এবং শাস্তি লাভকারীগণ কি কি আকারে তাদের কর্মফল ভোগ করবে। এ ব্যাপক বিষয়বস্তু সম্পর্কে এ গ্রন্থে যে বক্তব্য রাখা হয়েছে তা এর ভিত্তিতে নয় যে, এর প্রণেতা কিছু যুক্তি খাড়া করে কিছু ধারণা-অনুমানের এক প্রাসাদ নির্মাণ করচেন, বরঞ্চ এর ভিত্তিতে যে, তার প্রণেতা প্রত্যক্ষভাবে বাস্তবতার জ্ঞঅন রাখেন। তাঁর দৃষ্টি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত প্রসারিত। সকল বাস্তবতা তাঁর কাছে সুস্পষ্ট। সমগ্র বিশ্বজগত তাঁর সামনে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থের ন্যায়। মানুষ জাতির সূচনা থেকে তার শেষ পর্যন্তই নয়, বরঞ্চ শেষ হওয়ার পর তার দ্বিতীয় জীবন পর্যন্ত সব কিছু তিনি একনজরে দেখচেন এবং ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরঞ্চ জ্ঞানের ভিত্তিতে যে, তার প্রণেতা প্রত্যক্ষভাবে বাস্তবতার জ্ঞান রাখেন। তাঁর দৃষ্টি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত প্রসারিত। সকল বাস্তবতা তাঁর কাছে সুস্পষ্ট। সমগ্র বিশ্বজগত তাঁর সামনে একটি উন্মুক্ত গ্রন্থের ন্যায়। মানুষ জাতির সূজনা থেকে তার শেষ পর্যন্ত নয়, বরঞ্চ শেষ হওয়ার পর তার দ্বিতীয় জীবন পর্যন্ত সব কিছু তিনি একনজরে দেখছেন এবং ধারণা ও অনুমানের ভিত্তিতে নয়, বরঞ্চ জ্ঞঅনের ভিত্তিতে মানুষের পথ নির্দেশনা করছেন। যেসব তথ্য তিনি জ্ঞানের ভিত্তিতে পেশ করেন, তার মধ্যে আজ পর্যন্ত একটিও ভুল প্রমাণিত করা যায়নি। বিশ্বজগত ও মানুষ সম্পর্কে তিনি যে ধারণা পেশ করেন, তা সকল ইন্দ্রিয়গোচর বস্তু ঘটনাপুঞ্জের  পূর্ণ ব্যাখ্যা দান করে এবং প্রত্যেক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখায় গবেষণার বুনিয়াদ হতে পারে। দর্শন, বিজ্ঞঅন ও সমাজ বিজ্ঞানের সকল প্রান্তবর্তী সমস্যাবলীর সমাধান তাঁর কথায় পাওয়া যায় এবং সে সবের মধ্য এমন যুক্তিসংগত সম্পর্ক রয়েছে যে, তার ভিত্তিতে এক পূর্ণাংগ, সংগতিশীল ও সার্বিক চিন্তার ক্ষেত্র তৈরী হয়। তারপর বাস্তব দিক দিয়ে যে পথ-নির্দেশনা তিনি জীবনের প্রতিটি দিকের জন্যে মানুষকে দিযেছেন, তা শুধু অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং অতীব পবিত্রই নয়, বরঞ্চ দেড় হাজার বছর যাবত দুনিয়ার বিভিন্ন অংশে অসংখ্য মানুষ কার্যত তা অনুসরণ করছে। অভিজ্ঞতায় তা সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণিত হয়েছে। এমন মর্যাদাসম্পন্ন কোন মানব রচিত গ্রন্থ দুনিয়ায় বিদ্যমান আছে কি যা এ গ্রন্থের (কুরআনের) মুকাবিলায় উপস্তাপিত করা যেতে পারে?

৪। কিতাব সম্পূর্ণ একই সমযে লিখিত আকারে দুনিয়ার সামনে পেশ করা হয়নি। বরঞ্চ কিছু প্রাথমিক হেদায়েতসহ এক সংস্কার আনোলনের সূচনা করা হয়েছিল এবং তারপর তেইশ বছর পর্যন্ত সে আন্দোলন যে যে স্তর অতিক্রম করে চলতে থাকে সে সবের অবস্থা ও তার প্রয়োজন অনুসারে কিতাবের অংশগুলো আন্দোলনের নেতার মুখে কখনো দীর্ঘ ভাষণে, কখনো বিভিন্ন বাক্যের আকারে প্রকাশ করতে থাকে। অতঃপর এ মিশন সমাপ্তির পর বিভিন্ন সময়ে অবতীর্ণ এ অংশগুলি পূর্ণাংগ আকারে সংকলিত করে দুনিয়ার সামনে পেশ করা হয় যা কুরআন নামে অভিহিত করা হয়। আন্দোলনের অগ্রানায়কের বর্ণনায় এসব ভাষণ ও কথা তাঁর স্বরচিত নয়, বরঞ্চ খোদওন্দে আলমের পক্ষ থেকে তাঁর উপর নাযিল হয়েছে। যদি কেউ তাকে স্বয়ং স্ আন্দোলনের নেতা নজস্ব রচিত গণ্য করে তাহলে সে দুনিয়অর ইতিহাস থেকে এমন কোন নজীর পেশ করুক যে, কোন মানুষ বছরের পর বছর ধরে ক্রমাগত এক বিরাট সামাজিক আন্টেদালনের স্বয়ং নেতৃত্বদানকালে কখনো একজন ওয়ায়জ ও নীতিনৈতিকতার শিক্ষক হিসাবে, কখনো একটি মজলুম জামায়েত নেতা হিসাবে, কখনো একজন রাষ্ট্র প্রধান হিসাবে, কখনো যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসাবে, কখনো একজন বিজয়ী বীরহিসাবে, কখনো একজন শরীয়ত প্রণেতা ও আইন প্রণেতা হিসাবে, কখনো একজন বিচারক হিসাবে মোটকথা বিভিন্ন অবস্থা ও সমযে বিভিন্ন পদমর্যাদার অধিকারী হিসাবে যে বিভিন্ন ভাষণ দিয়েছেন অথবা যেসব বক্তব্য রেখেছেন, সে সবের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাংগ, সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং চিন্তা ও কাজের এক সার্বিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার মধ্যে কোন বৈষম্য ও বৈপরীত্য পাওয়া যায় না। তার মধ্যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই কেন্দ্রীয় চিন্তাধারা কার্যকর আছে। সে ব্যক্তি প্রথম দিন থেকে তাঁর দাওয়াতের যে বুনিয়াদ বর্ণনা করেছেন, শেষ দিন পর্যন্ত সে বুনিয়াদের উপরেই তিনি বিশ্বাস ও কর্মের এমন এক সার্বিক ব্যবস্থা কায়েম করতে থাকেন যার প্রতিটি অংশ অন্যান্য অংশের সাথে পরিপূর্ণ সংগতিশীল। এ সবকিছু দেখার পর কোন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি এ কথা মনে না করে পারেন না যে, আন্দোলনের সূচনায় আন্দোলনকারীর সামনে সর্বশেষ স্তর পর্যন্ত আন্দোলনের পূর্ণ চিত্র প্রকট ছিল। এমন কখনো হয়নি যে, মধ্যবর্তী কোন এক পর্যায়ে তাঁর মনে এমন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যা প্রথমে ছিল না অথবা পরে তা পরিবর্তন করতে হয়েছে। এমন মর্যাদাসম্পন্ন কোন মানুষ যদি কখনা কালাতিপাত করে থাকেন যিনি তাঁর আপন সৃজন শেক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন তাহলে তাকে চিহ্নিত করা হোক।

৫। যে নেতার মুখ থেকে এসব ভাষণ এবং কথা বেরুচ্ছিল তিনি হঠাৎ কোথাও থেকে আবির্ভূত হয়ে শুধু এসব শুনার জন্যে জনসমক্ষে আসতেন না এবং শুনাবার পর কোথাও উধাও হয়ে যেতেন না। তিনি এ আন্দোলনের পূর্বেও মানুষের সমাজে জীবন যাপন করেছেন এবং তাপরও জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হরহামেশা ঐ সমাজেই বসবাস করেছেন। তাঁর আলাপ-আলোচনা ও ভাষণের ভাষা ও প্রকাশ ভঙ্গী সকলে ভালোভাবে জানতো। হাদীসগুলেতে তার একটা বিরাট অংশ এখনো সংরক্ষিত আছে যা পরবর্তীকালে আরবী ভাষাভাষী লোক স্বয়ং অনায়াসে দেখতে পারেন যে, সে নেতা বা পথপ্রদর্শকের কথার ধরণকি ছিল। তাঁর আপন ভাষাভাষী, লোক সে সময়েও পরিষ্কার এ কথা মনে করছিল এবং আজও আরবী ভাষাভাষী লোক এ কথা মনে করে যে, এ কিতাবের ভাষা এবং রচনাশৈলী সেই নেতার (মুহাম্মদ (সা) ভাষা ও রচনাশৈলী থেকে অনেক পৃথক। এমনকি যেখানে তাঁর ভাষণের মধ্যে ঐ কিতাবের কোন অংশ তিনি আবৃত্তি করেন, তখন উভয়ের ভাষায় পার্থক্য একেবারে সুস্পষ্ট বুঝতে পারা যায়। প্রশ্ন এই যে, দুনিয়ার কোন ব্যক্তি কখনো কি এ কাজ করতে সক্ষম হয়েছে বা হতে পারে যে, বছরে পর বছর ধরে সম্পূর্ণ দুটি পৃথক ধরন ও স্টাইলে কথা বলার লৌকিকতা দেখাতে থাকবে এবং এ গোমর কখনো ফাঁক হবে না যে, এ দু’ধরনের কথা একই ব্যক্তির? অবশ্যি সমায়িকবভাবে কিছু সময়ের জন্যে এ ধরনের কৃত্রিমতা প্রদর্শনে সাফল্য লাভ সম্ভব। কিন্ত ক্রমাগত ‍তেই বছর এমনটি হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

৬। এ মহান নেতা আন্দোলন পরিচালনার সময়ে বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হতে থাকেন। কখনো দীর্ঘকাল যাবত তিনি আপন প্রতিবেশী এবং স্বগোত্রীয়দের পক্ষ থেকে ঠাট্টা বিদ্রূপ, অপমান ও জুলুম-নিষ্পেষণেল শিকার হয়েছেন। কখনো তাঁর সঙ্গী সাথীদের উপর এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে যে, তাঁরা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। কখনো দুশমন তার হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। ক খকনো তাকেও দেশ ত্যাগ করতে হযেছে। কখনো তাঁকে চরম আর্থিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। কখনো যুদ্ধবিগ্রহের সম্মুখীন হতে হয়েছে যাতে জয়-পরাজয় উভয়ই হয়েছৈ। কখনো তিনি দুশমনের উপর বিজয়ী হয়েছেন এবং যারা এক সময়ে তাঁর উপর চরম জুলুম করেছেন তারা নতশির হয়েছে। কখনো তিনি প্রভুত্ব কর্তৃত্ব লাভ করেছেন যার সৌভাগ্য কম লোকরই হয়ে থাকে। এ যাবতীয় পরিস্থিতির স্বয়ং নিজের পক্ষ থেকে যখন কোন কথা বলেছৈন, তখন তার মধ্যে সেই ভাবাবেগ প্রকট হয়ে পড়েছে যা এরূপ অবস্থায় মানুষের হয়ে থাকে। কিন্তু খোদার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ অহীর ভিত্তিতে বিভিন্ন সময়ে তাঁর মুখ থেকে যেসব কথা শুনা গেছে তা একেবারে মানবীয় ভাবাবেগ শূন্য ছিল বলে দেখা গেছে এবং আজও তাই দেখা যায়। কোন বিরাট সমালোচক কুরআনের কোন একটি স্থঅনেও অংগুলি নির্দেশ করে এ কথা বলতে পারবে না যে সেখানে মানবীয় ভাবাবেগ কার্যকর দেখা যায়।

৭। যে ব্যাপক ও সর্বব্যাপী জ্ঞান ও কিতাবে পাওয়া যায় তা সে সময়ের আরব, রোম, গ্রীস ও ইরাম ত দূরের কথা এ বিংশ শতাব্দীর মহাজ্ঞানী ও পন্ডিতগণের কারো মধ্যেই তা পাওয়া যায় না। আজ অবস্থা এই যে, দর্শন, বিজ্ঞঅন ও সমাজ বিজ্ঞানের কোন একটি শাখা অধ্যয়নে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়ার পর জানতে পারে যে, সে জ্ঞানের শাখার সর্বশেষ পারে ঐসব সমস্যার একটি সুস্পষ্ট জবাব এর মধ্যে রয়েছে। এ ব্যাপারটি কোন এক বিশেষ জ্ঞান পর্যন্ত সীমিত নয়। বরঞ্চ ঐ সকল জ্ঞানের জন্যে সঠিকভাবে প্রযোজ্য যা বিশ্বজগত ও মানুষের সাথে সম্পৃক্ত। এ কথা কি করে বিশ্বাস করা যায় যে, দেড় হাজার বছর পূর্বে আরব মরুর এক নিরক্ষর ব্যক্তি জ্ঞানের প্রতিটি বিভাগে এমন ব্যাপক জ্ঞান রাখতেন এবং তিনি প্রত্যেক মৌলিক সমস্যা সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে সুস্পষ্ট ও অকাট্য জবাব স্থির করে নিয়েছিলেন?

কুরআন অলৌকিক হওয়ার যদিও আরও বিভিন্ন কারণ রয়েছে, কিন্তু শুধু এ ক’টি কারণ সম্পর্কেই যদি মানুষচিন্তা গবেষণা করে তাহলে সে জানতে পারবে যে, কুরআনের অলৌকিক হওয়াটা কুরাআন নাযিল হওয়ার সময় যতোটা সুস্পষ্ট ছিল, তার চেয়ে অনেক গুণে এখন বেশী সুস্পষ্ট এবং ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত আরও সুস্পষ্ট হতে থাকবে। (৬৭)

উপরে যা কিছু বর্ণনা করা হয়েছে, তার থেকে যদিও কুরআনের কালামে ইলাহি হওয়া সম্পর্কে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না, কিন্তু কাফেরগণ তাকে মানব রচিত গ্রন্থ গণ্যৗ করার জন্যে বারবার যে যুক্তির দোহাই দিত তা এই যে, যদি এ খোদা কালাম হতো তাহলে একবারেই সম্পূর্ণ নাযিল করে দেয়া হতো। মাঝে মাঝে অল্প অল্প করে আমাদের সামনে তা পেশ করার অর্থ এই যে, তা অনেক চিন্তা ভাবনা করে রচনা করা হতো। কুরআনে তাদের এ অভিযোগ উধৃত করে অথবা তার প্রতি ইঙ্গিত করে অতি হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বলা হয়েছে, কেন ক্রমশঃ নাযিল করা হযেছে এবং  ক্রমশঃ নাযিল কি গুঢ় রহস্য।

(আরবী*******************)

অস্বীকারকারীগণ বলে এ ব্যক্তির উপর সমগ্র কুরআন একই সমযে কে নাযিল করা হয়নি? হ্যাঁ এমনকি এ জন্যে করা হয়েছে যে, (হে নবী) এটা ভাল করে তোমার হৃদয়ে বদ্ধমূল করে দিই এবং এ উদ্দেশ্যে আমরা তা বিশেষ ক্রমবিন্যাসসহকারে পৃথক পৃথক অংশের আকার দিয়েছি। আর (এর মধ্যে বিবেচ্য বিষয় ছিল) এই যে, যদি কখনো তার তোমার কাছে কোন অদ্ভূত কথা বা প্রশ্ন করেছে তখন তার ঠিক ঠিক জবাব যথাসমযে তোমাকে বলে দিয়েছি ৈএবং উৎকৃষ্ট পন্থায় কথা পরিষ্কার করে দিয়েছি। (ফুরকান: ৩২-৩৩)

এ ছিল মক্কার কাফেরদের বড়ো মনঃপুত অভিযোগ। এটাকে তারা খুব শক্তিশালী অভিযোগ মনে করে ঘন ঘন তার পুনরাবৃত্তি করছিল। কিন্তু কুরআনে এর যুক্তিপূর্ণ জবাব দিয়ে অভিযোগ একেবারে খন্ডন করা হযেছে। তাদের প্রশ্ন  বা অভিযোগের অর্থ ছিল এই যে, যদি এ ব্যীক্ত স্বয়ং চিন্তা-ভাবনা করে অথবা কাুকে জিজ্ঞেস করে এবং বই-পুস্তক থেকে নকল করে এসব বিষয় উপস্থাপিত না করতো, বরঞ্চ প্রকৃত পক্ষেই যদি এ খোদার কিতাব হতো, তাহলে একত্রে একই সময়ে কেন আনা হলো না? খোদ ত জানেন পুরো বিষয়টি কি যা তিনি জানাতে চান। তাঁর নাযিল করার ইচ্ছা থাকলে তো সবকিছু এক সাথেই নাযিল করতেন। এই যে, চিন্তা-ভাবনা করে এখন কিচু এবং কখনো কিছু বলা হচ্ছে, তা এ কথারই সুস্পষ্ট আলামত যে, অহী উপর থেকে আসে না। বরঞ্চ এখানে কোথাও থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে অথবা মনগড়াভাবে তৈরী করে আনা হচ্ছে।

এর জবাবে কুরআনকে ক্রমশঃ কিছু কিছু করে নাযিল করার অনেক তাৎপর্য বর্ণনা করা হযেছে:

(১) এমনকি এ জন্য করা হচ্ছে যে, তা যেন প্রতিটি শব্দসহ স্মৃতিপট সংরক্ষিত হয়ে যায়। কারণ তার প্রচার ও প্রসার লিখিত আকারে নয়, বরঞ্চ একজন নিরক্ষর নবীর মাধ্যমে নিরক্ষর শ্রোতাদের মধ্যে মৌখিক বক্তৃতার আকারে করা হচ্ছে।

(২) যেন তার শিক্ষা ভালোভাবে হৃদয়ে বদ্ধমূর হয়ে যায। এ উদ্দেশ্যে থেমে থেমে অল্প অল্প করে কথা বলা এবং ইকই কথাকে বিভিন্ন পন্থায় বর্ণনা করা অধিকতর ফলপ্রদ।

(৩) যাতে তার বলে দেয়া জীবন পদ্ধতির প্রতি মন নিবিষ্ট হয়ে যায। এ উদ্দেশ্যে নির্দেশাবলী ও পথ নির্দেশনা ক্রমশঃ নাযিল করাই অধিকরত বিজ্ঞানভিত্তিক। অন্যথায় যদি এ যাবতীয় আইন-কানুন এবং গোটা জীবন ব্যবস্থা একই সাথে বয়ান করে তা কায়েম করার আদেশ দেয়া হয় তাহলে মানুষ হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। উপরন্তু এও এ বাস্তবতা যে, প্রতিটি আগেশ যদি যথাসমযে করা হয়, তাহলে াতর বিজ্ঞতা ও প্রাণশক্তি ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। পক্ষান্তরে যাবতীয় নির্দেশ দফাওয়ারী সংকলিত করে একই সমযে দিলে তা উপলব্ধি করা যায় না।

(৪) যাতে করে ইসলামী আন্দোলনের সমযে, যখন হক ও বাতিলের ক্রমাগত দ্বন্দব সংঘর্ষ চলতে থঅকে, নবী ও তাঁর অনুসারীগণের মধ্যে সাহস ও উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি কর যায়। এ জন্যে একবার লম্বা-চওড়া হেদায়েতনামা পাঠিয়ে তাঁদেরকে সারা দুনিয়ার বিরোধিতার মোকাবিলা করার জন্যে ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে খোদার পক্ষ থেকে বারবার মাঝে মধ্যে এবং সময়মত পয়গাম আসতে থাকলে তা অধিকতর ফলপ্রদ হয়। এ দ্বিতীয় অবস্থায় মানুষ মনে করে যে, যে খোদা তাদেরকে এ জকাজের জন্যে হুকুম দিয়েছেন তিন তাঁদের প্রদি দৃষ্টি রাখেন। বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টে পথ দেখান  এবং প্রত্যেক প্রয়োজনের সময় সম্বোধন করে তাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক সতেজ করেন। এতে উৎসাহ-উদ্যম বাড়ে এবং সংকল্প সুদৃঢ় হয়। প্রথম অবস্থায় মানুষ মনে করে যে, ব্যস সে এবং তার চার ধ:অরে শুধু ঝড়-ঝাঞ্ঝা।

অবশেষে নাযিলের ব্যাপারে ক্রমিক ধারা অবলম্বনের আর একটি বিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআন মজিদের শানে নুযুল-এ নয় যে, আল্লাহ তায়ালা হেদায়েত সম্বলিত একখানা গ্রন্থ রচনা করতে চান এবং তার প্রচারের জন্যে তিনি নবীকে এজেন্ট বানিয়েছেন। কথা যদি তাই হতো তাহলে সমগ্র গ্রন্থ রচনা করে একেবারেই এজেন্টের হাতে তুলে দেয়ার দাবী ন্যায়সঙ্গত হতো। কিন্তু প্রকৃপক্ষে তার শানে নুযুল এই যে, আল্লাহ তায়ালা কুফর, জাহেলিয়াত এবং ফিসকের মোকবিলায় ঈমান, ইসলাম, ইতায়াত (আনুগত্য) ও তাকওয়ার এক আন্দোলন সৃষ্টি করতে চান এবং এর জন্যে তিন একজন নবীকে আহবায়ক ও নেতা হিসাবে আবির্ভূত করেছেন। এ আন্দোলন চলাকালে, একদিকে নেতা ও তাঁর অনুসারীগণকে প্রয়োজন অণুসারে শিক্ষা ও হেতায়েত দান করে তিনি তাঁর দায়িত্বে নিয়েছেন এবং অপরদিকে এ দায়িত্বও তিনি নিয়েছেন যে, বিরোধীরা কোন ওজর-আপত্তি, কোন সন্দেহ সংশয়ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলে তিনি তা পরিষ্কার করে দিবেন। কোন কথার কদর্থ করলে তার সঠিক ব্যাখ্যা করবেন। এ ধরনের বিভিন্ন প্রয়াজনে আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সব ভাষণ নাযিল হতে থাকে, তার সমষ্টির নাম কুরআন। আর এ আইন গ্রন্থ অথবা চরিত্র ও দর্শন গ্রন্থ নয় বরঞ্চ আন্দোলনের গ্রন্থ। তার অস্তিত্ব লাভের সঠিক স্বাভাবিক পন্থা এই যে, আন্দোলনের সূচনা মুহূর্ত থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন যেমন অগ্রসরে হতে থাকবে, এ কুরআনও সাথে সাথে সময় ও প্রয়োজন মতো নাযিল হতে থাকবে। (৬৮)

(আরবী********************)

-যখন আমরা একটি আয়াতের স্থানে অন্য আয়অত নাযল করি এবং আল্লাহ ভালো জানেন যে, তিনি কি নাযিল কররেন, তখন এ লোকেরা বলে, ‘তুমি এ কুরআন নিজেই রচনা কর।’ আসল কথা এই যে, এদের মধ্যে অধিকাংশ লোক প্রকৃত ব্যাপার সম্পর্কে ওয়াকেফহাল নয়। এদেরকে বল, রুহুল কুদুস সঠিকভাবে আমার প্রভুর পক্ষ থেকে ক্রমশঃ এ নাযিল করেছেন যাতে ঈমান আনয়ানকারীদের ঈমান পাকাপোক্ত করতে পারেন এবং আনুগত্যকারীদেরকে জীবনের বিষয়াদিতে সঠিক পথ দেখান এবং তাদেরকে কল্যাণও সৌভাগ্যের সুসংবাদ দেন। (নহল ১০১-১০২)

এ আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত নাযিল করার অর্থ একটি হুকুমের পর দ্বিতীয় হুকুম পাঠানোও হতে পারে। কারণ কুরআনের হুকুমগুলি ক্রমশঃ নাযিল হয়েছে বারবার একই ব্যাপারে কয়েক বছরের ব্যবধানে পরপর দু’টি তিনটি হুকুম পাঠানো হযেছে। যেমন মদের ব্যাপার অথবা ব্যাভিচারের শাস্তির ব্যাপার। কিন্তুএ অর্থ গ্রহণকরতে আমরা দ্বিধাবোধ করছি। এ জন্যে যে সূরা নহল মক্কী যুগে নাযিল হয়েছে। যতদূর আমাদের জানা আছে, সে যুগে ক্রমিক ধারার হুকুম নাযিলের কোন দৃষ্টান্ত সামনে আসেনি। এ জন্যে আমরা এখঅনে, “এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত নাযিলের’ অর্থ এই মনে করবো যে, কুরআনের বিভিন্ন স্থঅনে কখনো একটি বিষয়কে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝানো হয়েছে এবং কখনো ঐ বিষয়টি বুঝঅবার জন্যে অন্য দৃষ্টান্ত পেশ করা হযেছৈ। আবার কখনো ঐ ব্যাপারে দ্বিতীয় দিকটি সামনে আনা হয়েছে। একই বিষয়ের জন্যে  কখনো এক যুক্তি পেশ করা হয়েছে এবং কখনো অন্য যুক্তি। একই কাহিনী বারবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং প্রত্যেকবার তা অন্য শব্দে বর্ণনা করা হযেছে। একটি ব্যাপারের কখনো কোন একটি দিক পেশ করা হযেছে এবং কখনো সে ব্যাপারের দ্বিতীয় দিক পেশ করা হয়েছে। একটি কথা এক সময় সংক্ষেপে বলা হয়েছে এবং অন্য সময়ে বিস্তারিত। এ জিনিসই ছিল যাকে মক্কার কাফেরগণ এ কথার প্রমাণ গণ্য করতো যে, নবী মুহাম্মদ (সা) মায়াযাল্লাহ, এ কুরআন স্বয়ং রচনা করেছেন। তাদের যুক্তি এই ছিল যে, এ বাণীর উৎস যদি ইলমে ইলাহী হতো, তাহলে সব কথা এক সাথে বলে দেয়অ হতো। আল্লাহ কি মানুষের মতো জ্ঞানের দিক দিয়ে এতোটা কাজা যে চিন্তা করে করে কথা বলবেন? ক্রমশঃ তথ্যাদি সংগ্রহ করবেন এবং একটি কথা ঠিকমতো কাজে লাগলো না মনে হলে অন্য উপায়ে কথা বলবেন? আসলে এসব তো হচ্ছে মানবীয় জ্ঞানের দুর্বলতা যা তোমার কথায় দেখা যাচ্ছে।

এর জবাবে প্রথমে বলা হয়েছিল যে, এ কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘রুহুল কুদুস’ নিয়ে আসছেন। ‘রুহুল কুদুস’ এর শাব্দিক অর্থ পাক রূহ । অথবা পবিত্র রূহ। পরিভাষা হিসাবে এ উপাধি হযরত জিব্রিলকে (আ) দেয়া হয়েছে। অন্য জায়গায় (সূরা শুয়ারা) তাঁর জন্যে ‘রুহুল আমিন’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ আমানতদার রূহ। এখানে অহী আনয়ানকারী ফেরেশতার নাম নেয়ার পরিবর্তে তাঁর উপাধি ব্যবহারের দ্বারা শ্রোতাদেরকে এ সত্যটির প্রতি সজাগ করে দেয়া হচ্ছে যে, এ বাণী এমন এক ‘রূহ’ নিয়ে আসছেন যিনি মানবীয় দুর্বলতা ও দোষত্রুটির ঊর্ধে। তিনি খেয়ানতকারী নন যে, আল্লাহ কিছু পাঠালেন এবং তিনি নিজের পক্ষ থেকে কিছু অদল-বদল করে অন্য কিছু বানিয়ে দিলেন। তিনি মিথ্যাবাদী অথবা মিথ্যা অপবাদকারী নন যে স্বয়ং কিছু রচনা করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেবেন। তিনি কোন অসৎ বা অর্থলিপ্সু ব্যক্তি নন যে, নিজের কোন বক্তিগত স্বার্থের জন্যে ধোঁকা প্রবঞ্জনা করবেন। তিনি পরিপূর্ণরূপে একটি মহান ও পবিত্র আত্মা যা আল্লাহর বাণী পূর্ণ আমানতদারীর সাথে পৌঁছিয়ে দেন।তারপর বলা হয় যে, তাঁর ক্রমশঃ সে বাণী নিয়ে আসার এবং একই সাথে সবটুকু নিয়ে না আসার কারণ এ নয় যে, আল্লাহতায়ালার জ্ঞানের কোন ত্রুটি আছে যেমন তোমর তোমাদের অজ্ঞতার কারণে মনে করে রেখেছে, বরঞ্চ তার কারণ এই যে, মানুষের উপলব্ধি শক্তি ও ধারণশক্তিতে ত্রুটি আছে যে কারণে সে একই সমযে সকল কথা বুঝতে পারে না, আর এক সময়ে সব কথা বুঝলে তা মনে রাখতে পারে না। এ জন্য আল্লাহ তায়াার হিগকমত বা বিজ্্যঞতা এ কথার দাবী করে যে, রুহুল কুদুস (জিব্রিল) এ বাণী অল্প অল্প করে নিয়ে আসবেন। কখনো সংক্ষেপে এবং  কখনো বিস্তারিতভাবে বলবে। কখনো এক পদ্ধতিতে কথা বুঝিয়ে দেবে এবং কখনো অন্য পদ্ধতিতে। কখনো এক ধরনের বর্ণনাভঙ্গী অবলম্বন করবে, কখনো অন্য ধরনের। একই কথাকে বিভিন্ন পন্থায় হৃদয়ে বদ্ধমূল করার চেষ্টা করবে যাতে বিভিন্ন যোগ্যতা ও শক্তিসম্পন্ন সত্য সন্ধানকারীগণ ঈমান আনতে পারে এবং ঈমান আনার পর জ্ঞঅন, বিশ্বাস ও বোধশক্তি মজবুত হয়।

কুরআন ক্রমান্বয়ে অবতরণের দ্বিতীয় তাৎপর্য এই বলা হয়েছে যে, যারা ঈমান আনার পর আনুগত্যের পথে চলছৈ, ইসলামী দাওয়াতের কাজে এবং জীবনের বিভিন্ন সমস্যায় যে ধরনের হেদায়েত তাদের প্রয়োজন হয়তা যথাসময়ে দেয়া হয়। এ কথা ঠিক যে, সমযের পূর্বে এসব হেদায়েত পাঠানো সংগত হতে পারে না, আর না একই সময় সকল হেদায়েত প্রদান ফলপ্রসূ হতে পারে।

তৃতীয় তাৎপর্য এই যে, আনুগত্য লোকেরা যেসব প্রতিবন্ধকতা ও বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে এবং যেভাবে তাদেরকে তিক্ত করে তাদের জীবন দুর্বিসহ করা হচ্ছে, ইসলামী দাওয়াতের পথে বিপদের যে পাহাড় খাড়া করা হচ্ছে, তার কারণে তারা বারবার এ বিষয়ের মুখাপেক্ষী হচ্ছে যে, সুসংবাদ দানের মাধ্যমে তাদের সাহসবল বাড়িয়ে দেয়া হোক এবং তাদেরকে শেষপর্যায়ের সাফল্যের নিশ্চয়তা দান করা হোক যাতে তারা আশান্বিত থাকে এবং মনভাঙ্গা হয়ে না পড়ে। (৬৯)

এ অভিযোগ যে অন্য লোক কুরআন রচনা করে নবীকে দেয়

মক্কায় কাফেরগণ পূর্ববর্তী অভিযোগের একেবারে বিপরীত এক অন্য অভিযোগ এ ধরনের করতো যে, এ কুরআন রচনার কাজে অন্য লোক নবীকে সাহায্য করছে। পুরাতনকালের লিীখত কাহিনী নকল করিয়ে নিয়ে তাদেরকে শুনাচ্ছেন। আর এ কাজ রাত দিন করা হচ্ছে।

(আরবী******************)

যারা (নবীর) কথা মানতে অস্বীকার করেছে, তারা বলে, এ কুরআন এক মনগড়া বস্তু যা এ ব্যক্তি নিজে তৈরী করেছে এবং অন্য কিছু লোক এ কাজে তাকে সাহায্য করেছে। তারা বড়ো জুলুম ও ভয়ানক মিথ্যাবাদিতার পর্য়ায়ে নেমে এসেছে। তারা বলে এ প্রাচীন লোকের লিখিত বিষয় যা এক ব্যক্তি নকল করান এবং তা সকাল-সন্ধ্যা শুনানো হয। (হে মুহাম্মমদ (সা) তাদেরকে বল যে, এক তিনি নাযিল করেছেন যিনি যমীন ও আসমানের রহস্য অবগত আছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তিনি বড়ো ক্ষমাকরী এবং দয়াশীল। (ফুরকান: ৪-৬)

তাদের বক্তব্য ছিল এই যে, এ ব্যক্তি তো স্বয়ং নিরক্ষর ছিলেন। পড়াশুনা করে নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করতে পারেন না, প্রথমেতিনি তো কিছুই শিক্ষা লাভ করেননি। আজ তার মুখ থেকে যেসব কথা বেরুচ্ছে, চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত তার কোন একটিও তার জানা ছিল না। এখেন এসব জ্ঞান কোথা থেকে আসছে? অবশ্যই এ সবের উৎস কতিপয় পূর্ববর্তী লোকের গ্রন্থাদি হবে যার উধৃতি রাতের বেলায় তরজমা ও নকল করানো হয। সেগুলো তিনি কাউকে দিয়ে পড়িয়ে শুনে নে। তারপর তা মুখস্থ করে আমাদরেকে শুনান। কিছু বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, এ সম্পর্কে তারা কতিপয় লোকের নামও বলে যারা ছিল শিক্ষিত এবং মক্কার অধিবাসী। তাদের একজনের নাম ছিল আদ্দাস, যে হুয়ায়তিব বিন আব্দুল ওয্যার মুক্ত দাস ছিল।দ্বিতীয ছিল লায়াব, যে আলা বিন আল হারামীর মুক্ত করা দাস ছিল। তৃতীয় ছিল জাবর, যে আমের বিন রাবিয়অর মুক্ত করা দাস।

দৃশ্যতঃ এ বড়ো অর্থবহ অভিযোগ মনে হয়। অহীর দাবী খন্ডন করার জন্যে নবীর জ্ঞানের উৎস চিহ্নিত করে দেয়া থেকে অর্থবহ অভিযোগ আর কি হতে পারে? কিন্তু মানুষ প্রথমেই এ কথা ভেবে অবাক হয় যে, এমন বিরাট অভিযোগের জবাবে কোন যুক্তি পেশ করার পরিবর্তে শুধু এতটুকু বলেই প্রসঙ্গ শেষ করে দেয়া হচ্ছে যে, “তোমরা সত্যতার উপর আঘাত করছ, সুস্পষ্ট বেইনসাফীর কথা বলছ, মিথ্যার ঝড় প্রবাহিত করছ এব ত এমন খোদার বাণী যিনি যমীন ও আসমানের রহস্য জানেন।”

প্রশ্ন এই যে, সেই চরম প্রতিবন্ধকতার পরিবেশে যখন এমন জোরদার অভিযোগ পেশ করা হলো, তখন তা এমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে কেন খন্ডন করা হলো? বিরোধীরাই বা কেন বিস্তারিত জবাব চাইল না? তারা কেন এ কথা বললো না যে, “আমাদের অভিযোগ নিছক জুলুম এবং মিথ্যা বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে? তারপর নতুন নতুন মুসলমান যারা হচ্ছে তাদের মনে এ অভিযোগের পর কোন সন্দেহের উদ্রেক হচ্ছে না কেন?

মক্কার যে পরিবেশে এ অভিযোগ করা হয়েছিল সে সম্পর্কে কিছু চিন্তা-ভাবনা করলে এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়। প্রথশ কথা এই যে, মক্কার যেসব জালেম সর্দার সে সমযে একজন মুসলমানের উপর দৈহিক নির্যাতন চালাতো এবং তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলতো তাদের জন্যে এ কাজ মোটেই কঠিন ছিল না যে, তাদের বিরুদ্ধে তারা এ অভিযোগ করতো যে তারা এসব প্রাচীন কেতাবের তরজমা করে নবী মুহাম্মদকে (সা) শুনাতো, তাদের বাড়ীঘর হঠাৎ ঘেড়াও করে সেসব মাল-মশলা বের করে আনতে পারতো এবং জনগণের সামনে এনে হাজির করতে পারতো। এমনকি ঠিক তরজমা করে নবীর শিক্ষা দেয়াও সময়েও তারা ধরে ফেলতে পারে। কিন্তু তারা একদিনের জন্যেও এ কাজ করে তাদের অভিযোগের প্রমাণ পেশ করেনি। তারপর এ প্রসঙ্গে যেসব লোকের নাম তারা করতো তারা তো মক্কা শহরেরই অধিবাসী ছিল। তাদের যোগ্যতাও কারো অজানা ছিল না। কোন বিবেকবান ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করতে পারতো না যে, কুরআন যে মানের গ্রন্থ, তা রচনা করার জন্যে এসব লোক কোন পর্য়ায়ের কোন যোগ্যতা রাখতো।

উপরন্তু এসব লোক মক্কা শহরেরই কতিপয় সর্দারের মুক্ত করা গোলাম ছিল্ আরবের উপজাতীয় জীবনে একজন গোলাম স্বাধীন হওয়ার পরও তার প্রাক্তন প্রভুর পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত বাঁচতে পারতো না। এখন এ কথা কি করে কল্পনা করা যায় যে, এসব দুর্বল লোক তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরাগভাজন হয়ে জুলুম নির্যাতের সে ভয়াবহ পরিবেশে নবী মুহাম্মাদের (সা) সাথে (মায়াযাল্লাহ) নমুওয়তের এ যড়যন্ত্রে শরীক হওয়ার সাহস করতে পারতো।

এর চেয়েও অধিকতর বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, উপরে বর্ণিত তিন ব্যক্তি নবী মুহাম্মদের (সা) উপর ঈমান এনেছিলেন এবং নবীর প্রতি সেই শ্রদ্ধাই পোষণ করতেন যা অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম করতেন।  এ ঈমান আনার কারণে তারাও অন্যান্য সাহাবীদের সাথে নির্যাতন নিষ্পেষনের শিকার হয়েছিলেন। এমন অবস্থায় কে এ কথা বিশ্বাস করতে পারতো যে যারা স্বয়ং কুরআন রচনায় অংশগ্রহণ করতো তারা সে কুরানের উপর এবং কুরআন আনয়নকারীর উপর ঈমান আনবে এবং সে অপরাধে নির্যাতন-নিষ্পেষণ সহ্য করবে। (৭০)

কাফেরদের হঠকারিতার এক আজব নমুনা

তাদের প্রত্যেক অভিযোগের যুক্তি সংগত জবাব পাওয়ার পর কাফেরদের হঠকারিতা এক অভিনব রূপ ধারণ করে। তা এই যে, তারা বলে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে আমরা নবী বলে মেনে নিতাম যদি তিনি এমন ভাষায়, অনর্গল কুরআন শুনাতেন যে ভাষা তাঁর জানা নেই। তার জবাবে  বলা হলো:-

(আরবী*)

-যদি আমরা এক আজমী কুরআন বানিয়ে পাঠাতাম, তাহলে এসব লোক বলতো, কেন এর আয়াতগুলো পরিষ্কার করে বয়ান করা হয়নি? কি আজব কথা যে, কথা হলো আজমী ভাষায়, আর বলা হচ্ছে আরবী ভাষঅ-ভাষীদেরকে, এদের বলে দাও, এ কুরআন ঈমান আনয়নকারীদের জন্যে ত হেদায়েত এবং আরোগ্য। কিন্তু যারা ঈমান আনে না, তাদের জন্যে এ কানের ছিপি এবং চোখের পট্টি। তাদের অবস্থা এমন যে, যেন তাদেরকে দূর থেকে ডাকা হচ্ছে। (হা-মিম আস-সাজদা: ৪৪)

হঠকারিতার এ এক নমুনা যার দ্বারা নবী মুহাম্মদের(সা) মুকাবিলা করা হচ্ছিল। কাফেরগণ বলতো, মুহাম্মদ (সা) একজন আরব। আরবী তার মাতৃভাষা। তিনি যদি আরবীতে কুরআন পেশ করেন তাহলে কি করে বিশ্বাস করা যায় যে, তিনি তা নিজে রচনা করেননি, বরঞ্চ খোদার পক্ষ থেকে নাযিল করা? তাঁর এ বাণী খোদার নাযিল করা বাণ হিসাবে তখনই মেনে নেয়া যেতে পারে, যদি তিনি এমন ভাষায় অনর্গল ভাষণ দেয়া শুরু করতেন, যে ভাষা তিনি জানতেন না। যেমন ফার্সী অথবা রোমীয় অথবা গ্রীখ। এর জবাবে আল্লাহ বলেন, এখন তাদের আপন ভাষায় কুরআন পাঠানো হয়েছে যা তারা বুঝতে পারে, কিন্তু তাদের অভিযোগ এই যে, একজন আরবের মাধ্যমে আরবদের জন্যে আরবী ভাষায় এ কুরআন কেন নাযিল করা হলো, কিন্তু অন্য কোন ভাষায় যদিও পাঠানো হতো তাহলে তারা আপত্তি তুলতো, বাঃ মজার ব্যাপর, আরব জাতির মধ্যে একজন আরবকে রসূল বানিয়ে পাঠানো হচ্ছে কিন্তু বাণী তার উপর এমন ভাষায় নাযিল করা হয়েছে যা না রসূল নিজে বুঝেন আর না জাতি। (৭১)

তাদের এ অর্থহীন প্রতিবাদ খন্ডন করাই যথেষ্ট মনে করা হয়নি। বরঞ্চ তাদের একথাও বুঝিয়ে দেয়া হযেছৈ যে, এ আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ যে তিনি তোমাদের নিজস্ব ভাষায় এমন এক কিতাব নাযিল করেছেন যা তোমরা ভালোভাবে বুঝতে পার এবং সত্য ও মিথ্যা কি তাও জানতে পার।

(আরবী******************)

এ রহমান ও রহীম খোদার পক্ষ থেকে নাযিল করা। এ এমন এক কিতাব যার আয়াত সুস্পষ্ট করে বয়ান করা হয়েছে। আরবী ভাষার কুরআন তাদের জন্যে যারা জ্ঞান রাখে। এ সুসংবাদ দানকারী এ ভয় প্রদর্শনকারী। কিন্তু তাদের মধ্যে অধিকাংশই তা প্রত্যাখ্যান করে এবং তারা কথা শুনতে চায় না। (হামীম সাজদা: ২-৪)

এখানে প্রথমে একথা বলা হয়েছে যে, এ বাণী খোদার পক্ষথেকে নাযিল হচ্ছে। অর্থাৎ তোমরা যতোদিন ইচ্ছা বকবক করতে থাক যে এ মুহাম্মদ (সা) স্বয়ং রচনা করেছেন, কিন্তু প্রকৃত ব্যপার এই যে, এ বাণী রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকেই নাযিলকৃত। উপরন্তু এ কথা বলে শ্রোতাদের সাবধান করে দেয়া হয়- তোমরা যদি এ বাণী শুনার পর ভ্রুকুটি কর, তাহলে নবী মুহাম্মদের (সা) বিরুদ্ধে করা যাবে না, বরঞ্চ, খোদার বিরুদ্ধেই করা হবে। যদি একে প্রত্যাখ্যান কর তাহলে একজন মানুষের নয় বরঞ্চ খোদার কথাই প্রত্যাখ্যান করছ। আর যদি এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে একজন মানুষের থেকে নয় খোদা থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ।

দ্বিতীয় কথা এ বলা হয়েছে যে, এর নাযিলকারী সেই খোদা যিনি তাঁর সৃষ্টির উপরে বড় মেহেরবান। নাযিলকারী খোদার অন্যান্য গুণাবলীর পরিবর্তে রহমতের গুণের উল্লেখ এ সত্যের দিকে ইংগিত করে যে, তিনি তাঁর দয়া-অনুগ্র গুণের দাবী পুরণের জন্যে এ বাণী নাযিল করেছেন। এর দ্বারা শ্রোতদেরকে সাবধান করে দেয়া হয় যে, এ বাণী থেকে যদি কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিংবা যদি তাকে কেউ প্রত্যাখ্যান করে অথবা তাঁর প্রতি ভ্রুকটি করে, তাহলে সে নিজের প্রতিই শত্রুতা করছে। এ ত এক বিরাট দান যা খোদা সরাসরি তাঁর রহমতের ভিত্তিতে মানুষের হেদায়েত ও  কল্যাণের জন্যে নাযিল করেছেন। খোদা যদি মানুষের প্রতি বিমুখ হতেন, তাহলে তাকে আঁধারে ঘুরে বেড়াবার জন্যে ছেড়ে দিতেন এবং তার দেখার বিষয় ছিল না যে সে মানুষ কোথায় কোন গহ্বরে গিয়ে পতিত হচ্ছে। কিন্তু এ তার দয়া অনুগ্রহ যে, সৃষ্টি এবং জীবিকা দানের সাথে তার জীবনকে সঠিকভাবে বিন্যস্ত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্যে জ্ঞানের আলো প্রদর্শন করাও তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করেন। আর এর ভিত্তিতেই এ বাণী তিনি তাঁর এক বান্দাহর উপর নাযিল করেছেন। এখন সে ব্যক্তি অপেক্ষা  অকৃতজ্ঞ এবং নিজে নিজের দুশমন আার কে হতে পারে যে , এ রহমতের সুযোগ গ্রহণ করার পরিবর্তে তার বিরুদ্ধেই লড়াই করতে অগ্রসর হয়?

তৃতীয় কথা এই বলা হয়েছে যে, এ কিতাবের আয়াতগুলো সুস্পষ্ট করে বয়ান করা হয়েছে। অর্থাৎ তার মধ্যে কোন কথা এমন অবোধগম্য ও জটিল নেই যে, কেউ তা গ্রহণ করতে এই বলে আপত্তি জানাবে যে, এ গ্রন্থের বিষয়বস্তু তার মাথায় ঢুকছে না। এর মধ্যে ত পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, সত্য কি এবং মিথ্যা কি। সঠিক আকীদাহ বিশ্বাস কোনটি এবং ভ্রান্ত কোনটি। সৎ চরিত্র কোন্‌টি এবং অসৎ কোনটি। নেবী বা সৎকর্ম কি এবং অসৎ কর্ম কি। কোন্‌ পন্থা অবলম্বন করলে মানুষের কল্যাণ হবে এবং কোন পন্থা অবলম্বনে অকল্যাণ হবে। এমন সুস্পষ্ট হেদায়েত যদি কেউ প্রত্যাখ্যান করে অথবা তার প্রতি কোন আগ্রহ প্রদর্শন না করে, তাহলে সে কোন ওজর দেখাতে পারে না। তার পরিষ্কার অর্থ এই যে, সে ভুলের মধ্যেই থাকতে চায়।

চতুর্থ কথা এই যে, এ হলো আরবী ভাষার কুরআন। অর্থাৎ যদি এ কুরআন অন্য কোন ভাষায় অবতীর্ণ হলে আরববাসী এ ওজর পেশ করতে পাতো যে, খোদা যে ভাষায় এ কিতাব পাঠিয়েছেন, সে ভাষায় ত তারা অজ্ঞ। কিন্তু এত তাদের নিজেরদেরই ভাষা একে না বুঝার বাহানা তারা করতে পারতো না।

পঞ্চম কথা এ বলা হয়েছে যে, এ কিতাব তাদের জন্যে যারা জ্ঞান রাখে। অর্থাৎ এর থেকে জ্ঞানিবানলোকই উপকৃত হতে পারে। অজ্ঞ লোকদের জন্যে তা তেমনি অকেজো যেমন একটি মূল্যবান রত্ন সেই ব্যক্তির জন্যে অকেজো যে পাথর ও রত্নের পার্থক্য জানে না।

ষষ্ঠ কথা এই যে, এ কিতাব সুসংবাদদানকারী এবং ভীতি প্রদর্শনকারী। অর্থাৎ এমন নয় যে, এ নিছক একটি কল্পনা, একটি দর্শন এবং একটি রচনার নমুনা পেশ করছে যা মানা না মানায় কিছু যায় আসে না। বরঞ্চ ও প্রকাশ্যে সমগ্র দুনিয়াকে হুশিয়ার করে দিচ্ছে যে, একে মেনে নিলে পরিণাম হবে বড়ো চমৎ]কার এবং না মানলে পরিণাম হবে অতীব ভয়াবহ। এমন কিতাবকে একজন নির্বোধই প্রত্যাখ্যান করতে পারে। (৭২)

কুরআনের দাওয়অতে বাধঅদানের জন্যে কাফেরদের কৌশল

উপরে বর্ণিত কলাকৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের শেষ কৌশল এই ছিল যে, তারা প্রকাশ্য হঠকারিতায় নেমে পড়েব। কুরআনের দাওয়াতে বলপূর্বক বাধাদানের চেষ্টা করবে। কুরআন যখন শুনাতে থাকা হবে তখন ভয়ানক হট্টগোল সৃষ্টি করা হবে এবং চারদিকে থেকে বিদ্রূপবান নিক্ষেপ করা হবে। কুরআনে তাদের এসব আচরণ এক একটি করে বর্ণনা করা হযেছে, যার ফলে প্রত্যেক বিবেকবান ব্যক্তি উপলীব্ধ করেছে যে, এমন কাফেরদেরনিকটে যুক্তির জবাবে যক্তি নেই। তারা এখন পরাজিত হযে বলপ্রয়োগ করে সত্যের আওয়াজ স্তব্ধ দেয়ার জন্যে বদ্ধ পরিকর হয়েছে।

(আরবী***************)

-এবং তারা বল্লো, যে জিনিসের দিকে তুমি আমাদেরকে ডাকছ তার জন্যে আমাদের উপর আবরণ পড়ে রয়েছে। (অর্থাৎ আমাদের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছার কোন পথ খোলা নেই, আমাদের কানে ছিপি রয়েছে। (অর্থাৎ আমরা তা শুনব না।) এবং তোমার ও আমাদের মধ্যে এক যবনিকা বিদ্যমান (অর্থাৎ আমরা বিচ্ছিন্ন)।

অতএব তুমি তোমার নিজের কাজ কর, আমরা আমাদের কাজ করছি (অর্থাৎ তোমার বিরোধিতায় তৎপর রয়েছি। ) (হামীম সাজদা: ৫)

(আরবী********************)

-যখন এসব কাফের নসিহতের বাণী (কুরআন) শ্রবণ করে তখন এমন মনে হয় তারা তাদের (ক্রোধান্ধ) দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তোমাকের পশ্চাৎপদ করে দেবে। তারা বলে, এ ব্যক্তি ত পাগল। অথচ এ ব্যক্তি সমগ্র জগতবাসীর জন্যে এক নসিহত। (কলম: ৫১-৫২)

(আরবী*******************)

-এ  কাফেরগণ বলে, এ কুরআন কখনো শুনবে না এবং হট্টগোল সৃষ্টি করে বিঘ্ন সৃষ্টি কর, সম্ভবতঃ তোমরা বিজয়ী হবে। (হামীম-সাজদা: ২৬)

(আরবী*)

-অতএব হে নবী! কি ব্যাপর কাফেরগণ ডান ও বাম দিক থেকে তোমার দিকে দৌড়ে আসছে? (অর্থাৎ কুরআন তেলাওয়অতের আওয়াজ শুনে বিদ্রুপ করার জন্যে ছুটে আসছে)। (৭৩) (মায়অরিজ: ৩৬-৩৭)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.