সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

ত্রয়োদ্বশ অধ্যায়

মদীনায় হিজরত

সর্ব প্রথম মুহাজির

ইবনে জারীর ও ইবনে হিশাম বলেন, এখনো মদীনায় সাধারণ হিজরতের পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি, শুধুমাত্র আকাবায় দ্বিতীয় বায়আত অনুষ্ঠিত হয়েছে (নবুওতের দ্বাদশ বর্ষ, যিলহজ্ব মাস), এমন সময়ে হুযুরের (স) দুধ ভাই এবং তাঁর ফুফী বাররা বিন্তে আবদুল মুত্তালেবের পুত্র হযরত আবু সালামা (রা) মদীনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত করেন। কারণ হাবশায় হিজরত করার পর পুনরায় মক্কায় ফিরে আসলে মক্কার কাফেরগণ এবং স্বয়ং তাঁর গোত্র বনী মাখযুমের অত্যাচার উৎপীড়নে তিনি অতিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু জালেমরা তাঁকে হিজরতের জন্যে সুস্থ পরিবেশে বেরুতে দেয়নি।

হযরত উম্মে সালামার বিপদ কাহিনী

ইবনে হিশাম মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বরাত দিয়ে স্বয়ং উম্মে সালামার এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, যখন আমর স্বামী মদীনা হিজরত করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন, তো আমিও তাঁর সাথে আমার শিশুর সালামাকে কোলে করে বেরিয়ে পড়ি। তিনি আমাকে ও আমার সন্তানকে উটের উপরে বসিয়ে তার নাকল বা নাকরশি হাতে নিয়ে চলতে শুরু করেন। আমার পিতামাতার পক্ষের লোকেরা (বনী মুগীরা) তাঁকে যেতে দেখে পথ রোধ করে দাঁড়ালো এবং বলতে লাগলো, তুমি স্বয়ং তো আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছ। তুমি যেখানে খুমী চলে যাও। কিন্তু আমাদের এ শিশুকে নিয়ে তোমাকে অসহায়ের মতো ঘুরে বেড়াতে দিতে পারিনা। তারপর তারা উটের নাকল আবু সালামার হাত থেকে কেড়ে নেয় এবং আমাকে ফিরে নিয়ে চলে। ওদিকে আবু সালামার পরিবারের লোকজন (নবী আবদুল আসাদ) রাগান্বিত হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো এবং বলল, তোমরা যখন আমাদের লোকের কাছ থেকে তার শিশুকে কেড়ে নিয়েছ তো আমরা আমাদের শিশু পুত্র সালামাকে এর নিকেট কেন যেতে দেব? এ কথা বলে তারা জোর করে আমার নিকট থেকে আমার শিশুকে কেড়ে নেয়। এই কাড়াকাড়ি ও টানা হেচড়াতে শিশুটির হাত উঠে যায় বা অসংলগ্ন হয় (বালাযুরী বলেন, মৃত্যু পর্যন্ত শিশুটির হাত ঐ অবস্থায় থাকে)। এখন অবস্থা এই হলো যে, শিশু তারা নিয়ে গেল এবং বনী মগীরা আমাকে তাদের ওখানে নিয়ে আমাকে আটক করে রাখলো। বেচারা আবু সালামা একাকী মদীনা রওয়ানা হয়ে যান। প্রায় এক বছর যাবন আমার অবস্থা এ ছিল যে, প্রতিদিন বের হয়ে গিয়ে আবতাহ নামক স্থানে গিয়ে বসে কাঁদতাম। একদিন বনী মগীরার এক ব্যক্তি আমার চাচার দিক দিয়ে আত্মীয়- আমার এ মর্মন্তুদ অবস্থা দেখার পর আমার প্রতি দয়াপরবশ হয়ে পড়েন। তিনি গিয়ে বনী মগীরাকে বলেন এ মিসকীন বেচারীকে তোমরা কেন যেতে দিচ্ছনা? তোমরা তাকে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন করেছ এবং তার শিশু পুত্র থেকেও। অবশেষে তারা আমাকে বলল, তুমি যদি স্বামীর কাছে যেতে চাও তো চলে যাও। আবদুল আসাদ আমার শিশুকেও আমার কাছে ফিরিয়ে দিল। আমি আমার শিশুকে নিয়ে আমার উটে চড়ে একাই মদীনার দিকে রওয়ানা হলাম। আমি যখন তানইমের নিকটে পৌঁচলাম তখন আবদুদ্দারের ওসমান [ইনি কাবার চাবি রক্ষক ছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশের পতাকা তাঁর হাতে থাকতো। মক্কায় শক্তিশালী সর্দারগণের অন্যতম ছিলেন। সে সময়ে তিনি শুধু মুশরেকই ছলেননা, বরঞ্চ ইসলাম ও মুসলমানের চরম দুশমন ছিলেন। তাঁর চাচাতো ভাই মুসআব বিন ওমাইর ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর উপর ভয়ানক নির্যাতন চালায়। হযরত উম্মে সালামার সাথে কোন নিকট আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিলনা। হুদায়বিয়অর সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খালেদ বিন অলীদের সাথে হিজরত করেন- গ্রন্হকার।] বিন তালহা বিন আবি তালহার সাথে পথে আমার দেখা হয়। তিনি বলেন, আবু উমাইয়ার মেয়ে, কোথায় যাচ্ছ? বললাম, মদীনায়- স্বামীর কাছে। তিনি বললেন, তোমার সাথে কেউ নেই? বললাম, খোদা এবং এ শিশু ছাড়া আমার সাথে আর কেউ নেই। তিনি বললেন, খোদার কসম, আমি তোমাকে একা যেতে দেবনা।

তারপর তিনি আমার উটের নাকল ধরে চলতে লাগলেন। খোদার কসম, তাঁর চেয়ে অধিক শরীফ লোক আমি দেখিনি। কোন মনযিলে পৌঁছার পর আমার উটকে বসিয়ে দূরে সরে গিয়ে দাঁড়াতেন। আমার শিশুকে নিয়ে উট থেকে নেমে পড়লে তিনি উটকে কোন গাছে বেঁধে রেখে আমার থেকে দূরে কোন এক গাছতলায় বসে পড়তেন। আবার চলার সময় হলে তিনি উটকে এনে বসাতেন, দূরে সরে যেতেন এবং আমাকে বলতেন, উটে চড়ে বস। চড়ে বসরে তিনি উটের নাকল ধরে  চলতে থাকতেন। মদীনা পর্যন্ত সারা রাস্তা তিনি এভাবে অতিক্রম করেন। যখন কুবায় বনী আওফের বস্তি নজরে পড়লো, তখন তিনি বললেন, তোমার স্বামী ওখানে আছে। তার কাছে চলে যাও। আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন। তারপর যেভাবে তিনি পায়ে হেঁটে এসেছিলেন, সেবাবে পায়ে হেঁটেই মক্কা ফিরে যান। বালাযুরীও এ ঘটনা ‘আনসাবুল আশরাফে’ বয়ান করেছেন।

এর থেকে অনুমান করা যায় যে, কুরাইশ কাফেরগণ যেভাবে মুসলমানদের প্রতি জুলম নির্যাতনে সীমালংঘন করে চলেছিল, তা লক্ষ্য করে স্বয়ং তাদের দলের লোকদের মধ্যে এ জুলুমের কারণে বীতশ্রদ্ধ সৃষ্টি হচ্ছিল এবং মজলুম মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক হচ্ছিল। ঐ সমাজের যাদের মধ্যেই মানবতা ও ভদ্রতার গুণাবলী বিদ্যমান ছিল, তারা ইসলমারে প্রতি শক্রতা পোষণ করা সত্ত্বেও আপন কওমের ওসব মহান চরিত্রের লোকদেরকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে থাকে যাঁরা কোন পার্থিক উদ্দেশ্যে নয়, নিছখ নিজেদের ঈমানের খাতিরে সর্ব প্রকারের জুলুম নিপীড়ন সহ্য করছিলেন এবং কোন প্রকার নির্যাতন দমিত হয়ে যাকে সত্য বলে গ্রগণ করেছেন তার থেকে বিমুখ হতেননা।

হিজরতের সাধারণ নির্দেশ

আকাবায় শেষ বায়আতের পর নবুওতের ত্রয়োদশ বর্ষে, যিলহজ্ব মাসে, নবী (স) মক্কার মুসলমানগণকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, আল্লাহ পাক তোমাদের জন্যে ভাই পয়দা করে দিয়েছেন ও এমন এক শহর ঠিক করে দিয়েছেন যেখানে তোমরা নিরাপদে থাকতে পার (ইবনে ইসহাক বরাতসহ ্বনে হিশাম)। এ নির্দেশ পাওয়া মাত্র সর্ব প্রথম হযরত আমের বিন রাবিয়া আল আনযী (রা) তাঁর বিবি লায়লা বিন্তে আবি হাসমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তারপর আম্মার বিন ইয়াসের (রা), হযতর বেলাল (রা) এবং হযরত সা’দ নিব আবি ওক্কাস (রা) হিজরত করেন। অতঃপর হযরত ওসমান বিন আফফান (রা) তাঁর বিবি রুকাইয়া (রা) বিন্তে রাসূল (রা) সহ রওয়ান হন। এভাবে হিজরতের এক ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে যায় এবং লোক ক্রমাগত এ নতুন হিজরতের স্থলে যেতে শুরু করেন। এমনকি এক এক পরিবারের সকল লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে তিনটি পরিবারের উল্লেখ করেন, যাদের সব লোক হিজরত করেন। তাঁদের ঘরবাড়ি শূণ্য পড়ে থাকে। এক- বনী মাযউন। দ্বিতীয়- বনী আল বুকাইর। তৃতীয়- বনী জাহশ বিন রিয়াব। ইবনে আবদুল বার বলেন, বন জাহশের সাথে বনী আসাদ বিন খুযায়মার নারী-পুরুষ-শিশু সবাই চলে যান। এ দুটি পরিবারের মোট ৩০ জন হিজরত করেন যাঁদরে মধ্যে হুযুর (স)-এর ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন জাহশ (রা) এবং আবু আহমদ জাহশ (রা) (যাঁর নাম ছিল আবদ), তাঁর দুই ভগ্নি- হযরত যয়নব বিন্তে জাহশ (রা) (পরবর্তী কালে উম্মুল মুমেনীন), হাসনা বিন্তে জাহশ (রা)- (হযরত মুসআব বিন উমাইরের বিবি) এবং উম্মে হাবিব বিন্তে জাহশ (রা)- হযরত আবদুর রহমান বিন আওফের (রা) বিবি শামিল ছিলেন। তাঁদের চলে যাওয়ার পর উতবা বিন রাবিয়া, আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব এবং আবু জাহল ঐদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। উতবা বিন রাবিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দুঃখ করে বলে, আজ বনী জাহশের বাড়ি বসতি শূণ্য অবস্থায় রইলো। আবু জাহল বলল, কাঁদছ কেন? এসব আমাদের এ ভাইয়ের (আব্বাস ) ভাতিজার কর্মকাণ্ড। সে আমাদের দলে ভাঙন সৃষ্টি করেছে, আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করে ফাটল ধরিয়েছে। তারপর আবু সফিয়ানের পালা। সে বনী জাহশের বাড়ি দখল করে- তা বিক্রি করে দেয়। উপলক্ষ এ ছিল যে, তার মেয়ে ফারয়া অথবা ফারেয়া আবু আহমদ বিন জাহশের স্ত্রী ছিল। যেন জামাইয়ের গোটা পরিবারের উত্তরাধিকার তার জীবদ্দশায় শ্বশুরের কাছে পৌঁছে গেল। হযরত আবদুল্লাহ বিন জাহশ (রা) আবু সুফিয়ানের এ্ বাড়াবাড়ির অভিযোগ হুযুরের (স) কাছে পেশ করলে তিনি বলেন, তুমি কি তোমার বাড়ির বিনিময়ে জান্নাতে একটি বাড়ি লাভে সন্তুষ্ট নও? মক্কা বিজয়ের পর হযরত আবু আহমদ (রা) হুযুরের (স) নিকটে আবেদন করে বলেন, আমাদের বাড়ি আমাদের ফেরৎ দেয়া হোক। এতে হুযুর (স) নীরব থাকেন। সাহাবা (রা) তাঁকে বলেন, হুযুর (স) এটা পছন্দ করেননা যে, মুহাজেরদের যে সম্পদ খোদার পথে ব্যয় করা হয়েছে তা তাঁরা ফেরৎ নেয়ার চেষ্টা করবেন। হুযুরের (স) আপন বাড়ি যা মক্কায় ছিল, তা হিজরতের পর আকীল বিন আবি তালেব দখল করে নেন। আর তখনো তিনি ঈমান আনেননি। মক্কা বিজয়ের পর হুযুর (স) তাঁর কাছ থেকে সে বাড়ি ফেরৎ নেননি। (আবু দাউদ- কিতাবুল হজ্ব)

মুসলমানগণকে হিজরত থেকে বিরত রাখার জন্যে কুরাইশের চেষ্টা তদবির

হযরত সুহাইব (রা) যখন হিজরতের জন্যে বেরিয়ে পড়েন তখন কুরাইশের লোকেরা তাঁকে বলে, তুমি এমন নিঃস্ব অবস্থায় এসেছিলে এবং আমাদের শহরে থেকে ধনবান হয়েছ। এখন তুমি কি চাও যে- তোমার জানের সাথে তোমার মালও এখান থেকে নিয়ে যাবে? খোদার কসম, তা হতে পারেনা। হযরত সুহাইব বলেন, আমি যদি আমার সমুদয় ধনসম্পদ তোমাদেরকে দিয়ে দেই, তাহলে কি তোমরা আমাকে যেতে দেবে? তারা বলে, হ্যাঁ। হযরত সুহাইব (রা) তাঁর সমুদয় ধনসম্পদ তাদেরকে দিয়ে শূন্য হাতে খোদার পথে বেরিয়ে পড়েন। হুযুর (স) তা জানতে পেরে বললেন, সুহাইব মুনাফার সওদা করেছে, সুহাইব মুনাফার সওদা করেছে। এ ইসহাক বিন রাহওয়াইয়া, ইবনে মারদুইয়া, ইবনে হিশাম ও বালাযুরীর বর্ণনা যা তাঁরা আবু ওসমান আন্নাহদী থেকে উদ্ধৃত করেন।

ইবনে আবদুল বার- ‘আদ্দুরারু ফী ইখতিসারিল মাগাযী ওয়াসসিয়ার’- এ লিখেছেন যে, যখন হযরত সুহাইব (রা) মক্কা থেকে রওয়অনা হন, তখন কুরাইশ তাঁর পশ্চাদ্ধাবন করে তাঁকে হত্যা করে- তাঁর অর্থসম্পদ হস্তগত করার উদ্দেশ্যে। তিনি তাদেরকে আসতে দেখে বললেন, তোমরা তো জান যে আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ তীরন্দাজ। খোদার কসম, তোমাদের মধ্যে কেউ আমার নিকটে পৌঁছতে পারবেনা। যতোক্ষণ পর্যন্ত যার মৃত্যু নির্ধারিত আছে সে না মরেছে। তারা বলল, তোমার মাল সম্পদ ছেড়ে দিয়ে চলে যাও। সুহাইব (রা) বললেন, মালতো আমি মক্কায় ছেড়ে এসেছি। অমুক স্থানে যাও এবং সেখান থেকে মাল বের করে নাও। অতঃপর তারা চলে যায় এবং তাঁর মাল হস্তগত করে। অনুরূপ বর্ণনা বালাযুরী হযরত সাঈদ বিন আল মুসাইয়ার (রা) থেকে উদ্ধৃত করেছেন।

বায়হাকী ও তাবারানী হযরত সাঈদ বিন আল মুসাইয়াব থেকেই স্বয়ং হযরত ‘সুহাইবের’ (রা) এ বর্ননা উদ্ধৃত করেছেন যে, আমি যখন হিজরতের উদ্দেশ্যে বেরুলাম তো কুরাইশের কতিপয় যুবক আমাকে আটক করে রাখে। তারা ঘুমিয়ে পড়লে আমি পালিয়ে আসি। কিন্তু পথে তাদের কয়েকজন আমাকে ধরে ফেলে। আমি তাদেরকে বললাম, আমি যদি মক্কায় গিয়ে তোমাদেরকে কয়েক উকিয়া এক উকিয়া সারে তিন তোলার সমপরিমাণ-গ্রন্হকার।] সোনা দিয়ে দিই, তাহলে আমাকে ছেড়ে দেবে? তারা ছেড়ে দেয়ার ওয়াদা করলো। আমি মক্কায় ফিরে গিয়ে তাদেরকে বললাম, অমুক স্থানে মাটি খনন করে সোনা বের করে নাও এবং অমুক মেয়ে লোক থেকে দু’জোড়া কাপড় নিয়ে নাও। এভাবে তাদের কাছ থেকে মুক্তিলাভ করে কুবায় হুযুরের (স) নিকটে পৌছলাম- তখন তিনি বললেন, এ সওদায় তুমি বড়ো মুনাফা করেছ। আমি বললাম, এ ঘটনা তো আর কারো জানা নেই। জিব্রিল ছাড়া আর কে আপনাকে এ খবর দিতে পারে?

আইয়াশ বিন আবি রাবিয়ার (রা) বিবরণ

অন্যান্য মুহাজিরগণ চুপে চুপে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু হযরত ওমর (রা) প্রকাশ্যে বিশ জন আরোহীসগ রওয়ানা হন। তাঁর সাথে ছিলেন তার ভাই যায়েদ বিন আল খাত্তাব (রা), তাঁর ভগ্নিপতি সাঈদ বিন যায়েদ বিন আরম বিন নুফাইল, তাঁর জামাই খুনাইস বিন হুযাফা (রা), (হযরত হাফসার প্রাক্তন স্বামী) এবং আরও অনেক সংগী সাথী। বাযযার ও ইবনে ইসহাক সঠিক সনদসহ স্বয়ং হযরত ওমরের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করেন- যাতে তিনি বলেন, আমি আইয়াশ বিন আবি রাবিয়া এবং হিশাম বিন আস বিন ওয়াইলের সাথে এ কথা স্থির করেছিলাম যে, মক্কা থেকে দশ মাইল দূরে তানাদিব নামক স্থানে এসে তারা আমাদের সাথে মিলিত হবে। নির্দিষ্ট সময়ে তারা সেখানে না পৌঁছলে মনে করা হবে যে- তাদেরকে আটক করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট লোক তাদের প্রতীক্ষায় না থেকে সামনে অগ্রসর হবে। হিশাম মক্কাতেই ধরা পড়েন এবং আইয়াশ আমাদের সাথে মদীনায় পৌঁছে যান। পেচনে পেছনে আবু জাহল বিন হিশাম এবং হারেস বিন হিশাম (যারা ছিল আইয়অশের চাচাতো ভাই এবং বৈপিত্র ভাই ও) [আবু জাহল ও হারেস উভয়ে সহোদর ভাই। তাদের পিাত হিশাম বিন মুগীরার মৃত্যুর পর তার ভাই আবু রাবিয়া বিন হিশামের সাথে তাদের মায়ের বিয়ে। আইয়াশ একই মায়ের গরর্ভে আবু রাবিয়ার উরসে জন্মগ্রহণ করেন। এভাবে আবু জাহল ও হারেস তাঁর চাচাতো ভাই এবং বৈপিত্র ভাইও।] মদীনায় পৌঁছে এবং বহু চালাকি চাতুরি করে আইয়াশকে বশ করে বলে, আম্মা কসম করেছে যে যতোক্ষণ না তুমি তার সাথে সাক্ষাৎ করেছ- সে মাথায় চিরুণীও দেবেনা এবং রৌদ্র থেকে চায়ায় যাবেনা। আমি তাকে অনেক বুঝালাম যে, এরা তোমাকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে চায়। এ ফাঁদে পা দিওনা। তোমার মাকে যখন উকুন জ্বালাতন করবে তখন সে আপনা-আপনি মাথায় চিরুণী দেবে এবং মক্কায় রৌদ্র তাপ যখন সহ্য হবেনা তখন ছায়ায় যাবে। কিন্তু আইয়াশের মায়েল ভালোবাসা এতোটা বিজয়ী হলো যে, সে আমাকে বলতে লাগলো, আমি মায়ের কসম পূর্ণ করে এবং নিজের মালসম্পদ নিয়ে ফিরে আসব। আমি বললাম, আমি আমার অর্ধেক সম্প তোমাকে দিচ্ছি, তুমি তাদের সাথে যেয়োনা। কিন্তু সে আমার কথা মানলোনা। আমি তখন বললাম, তুমি যখন যাবেই দু’জনের নিয়ত যদি খারাপ মনে কর তো তক্ষণি এ উটনী নিয়ে পালিয়ে আসবে। একথা সে মেনে নিল।

পথে এক স্থানে আবু জাহল তাকে বলল, ভাই, আমার উট তেমন ভাল চলতে পারছেনা। তোমার উটনীর উপরে কি আমাকে নেবেনা? আইয়অশ বলে,কেন নেবনা? তারপর উভয়ে উট থেকে নেমে পড়ে যাতে আবু জাহল আইয়অশের উটনীর পিঠে উঠতে পারে, হারেসও তার উট বসিয়ে নেমে পড়ে। তারপর উভয়ে মিলে আইয়াশকে বেঁধে ফেলে।

ইবনে ইসহাক বলেন, আইয়াশ বিন আবি রাবিয়ার (রা) পরিবারের লোকেরা আমাকে বলেছে, আবু জাহল এবং হারেস আইয়াশকে নিয়ে এমন অবস্থায় দিবালোকে মক্কায় পৌঁছে যে, রশি দিয়ে তাঁকে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং দু’ভাই ঘোষণা করছিল- হে মক্কাবাসী। তোমরা তোমাদের অবাধ্য ছেলে-ছোকরাদেরকে এবাবে সোজা কর, যেভাবে আমরা করেছি।

ইবনে হিশাম বরেন, আমাকে নির্ভরযোগ্য লোকেরা বেলেছেন যে, নব (স) হিশাম বিন আস (রা) এবং আইয়াশ বিন আবি রাবিয়া (রা) সম্পর্কে উদ্বিগ্ন ও পেরেশান ছিলেন। তিনি বলেন, কে এ দু’জনকে আমার কাছে নিয়ে আসতে প্রস্তুত” অলীদ বিন মগীরা (খালেদ বিন অলীদের ভাই) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ খেদমত আঞ্জাম দেয়ার জন্যে আমি হাযির। তারপর তিনি মক্কায় যান। গোপনে এ দু’আটক ব্যক্তির সন্ধানে রইলেন। যখন তিনি জানতে পারলেন যে তাঁরা একটি ছাদবিহীন চত্বরে বন্দী আছেন, তখন রাতের বেলা দেওয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন, তাঁদের বেড়ি কেটে দেন এবং তাঁর উটের পিঠে চড়িয়ে মদীনায় নিয়ে আসেন।

হযরত আবদুল্লাহ বিন সুহাইলের বিপদ

যাঁদরেকে বলপ্রয়োগে হিজরত থেকে আটকে রাখা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ বিন সুহাইল বিন আমর। বালাযুরী বলেন যে, তিনি মদীনায় হিজরতের কথা শুনে হাবশা থেকে মক্কায় আসেন এ উদ্দেশ্যে যে রাসূলুল্লাহর (স) সাথে নতুন দারুণ হিজরতের যাবেন। কিন্তু তাঁর পিতা সুহাইল বিন আমর তাঁকে জোর করে বন্দী করেন। তিনি এ কৌশল অবলম্বন করে পিতাকে সন্তুষ্ট করেন যে, তিনি পৈত্রিক দ্বীনে ফিরে এসেছেন। এ বিশ্বাসে তিনি বদরের যুদ্ধে তাঁকে সংগে নিয়ে যান। যখন সৈনিকগণ এসে অপরের সামনা-সামনি হলো তখন হযরত আবদুল্লাহ মুসলমানদের সাথে মিলিত হন। এর কয়েক বছর পর মক্কা বিজয়ের সময়ে তাঁর পিতা মুসলমান হয়ে বলতেন, আল্লাহ আমার পুত্র আবদুল্লাহর ঈমানে আমার জন্যে বড়ো মংগল রেখেছিলেন।

শেষ সময় পর্যন্ত হুযুরের (স) মক্কায় অবস্থান

ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী সামগ্রিকভাবে হাবশা থেকে মদীনায় হিজরতের জন্যে যাঁরা মক্কায় এসেছিলেন- তাঁদের মধ্যে সাতজনকে বন্দী করা হয় এবং তাঁরা হিজরত করতে পারেননি। এতদ্ব্যতীত মক্কায় বেশ কিছু সংখ্যক লোক এমন ছিলেন- যাঁরা হিজরত করতে গিয়ে ধরা পড়েন, অথবা যাঁরা এমন অপারগ ছিলেন যে, হিজরত করতে পারতেননা, অথবা যাঁরা- মনে ঈমান তো রাখতেন- কিন্তু নিজেদের দুর্বলতার কারণে হিজরত করার সাহস রাখতেননা। এসব ব্যতীত যাঁরাই হিজরত করতে সক্ষম ছিলেন তাঁরা সকলেই চলে যান এবং মক্কায় শুধু নবী (স), হযরত আবু বকর (রা) এবং হযরত আলী (রা) রয়ে যান।

বোখারীতে হযরত আয়েশার (রা) একটি বর্ণনা আছে যে, যখন হযরত আবু বকর (রা) মদীনায় হিজরতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন তখন হুযুর (স) বলেন, একটু আপন স্থানে আবস্থান কর। কারণ আশা করি যে, আমাকে হিজরতের অনুমতি দেয়া হবে। হযরত আবু বকর (রা) বলেন, আমর মা বাপ আপনার জন্যে কুরআন হোক, আপনি কি এমন আশা করেন? হুযুর (স) বলেন, হ্যাঁ। এ জন্যে হযরত আবু বকর (রা) রয়ে যান যাতে হুযুরের (স) সাথে হিজরত করতে পারেন। দুটি উটি কিনে তা পালতে থাকেন। ইবনে হিশাম ও ইবনে জারীর ইবনে ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, আবু বকর (রা) যখনই হুযুরের (স) নিকট থেকে অনুমতি চাইতেন, তিনি বলতেন, তাড়াহুড়ো করোনা, হয়তো আল্লাহ তোমাকে এজন সাথী দান করবেন। এতে হযরত আবু বকর (রা) আশা করতেন যে, সে সাথী স্বয়ং হুযুরই (স) হবেন। হাকেম হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, নবী (স) জিব্রিলকে (আ) জিজ্ঞেস করেন, হিজরতে আমার সাথী কে হবে? তিনি বলেন- আবু বকর (রা) ইবনে জারীর ওরওয়া বিন যুবাইরের (রা) বরাত দিয়ে বলেন, হযরত আবু বকর (রা) অন্যান্য হিজরতকারী সাহাবীদের সাথে যাওয়ার জন্যে দুটি উটনী খরিদ করে রেখেছিলেন। যখন তিনি আশা করছিলেন যে, তিনি হুযুরের (স) সাহচর্য লাভ করবেন, তখন তিনি সে দুটি উটনীকে ভালোভাবে খাইয়ে-দাইয়ে তৈরী করেন।

ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে ইবনে হিশাম ও ইবনে জারীর বলেন, হযরত আলীকে (রা) হুযুর (স) এ জন্যে যেতে দেননি যাতে তিনি হুযুরের (স) পরে মক্কায় থেকে ওসব লোকের আমানত ফেরৎ দিতে পারেন যারা তাদের মূল্যবান ধনসম্পদ সংরক্ষণের জন্যে হুযুরের (স) নিকটে জমা রেখেছিল। এ প্রসংগে ইবনে ইসহাক বলেন, মক্কায় এমন কেউ ছিলনা যার কাছে এমন কোন জিনিস আছে যা চুরি হওয়ার আশংকা আছে- আর সে তা হুযুরের (স) কাছে আমানত হিসাবে রেখে দিতনা। কারণ তাঁর আমানত ও দিয়ানতের উপর দোস্ত-দুশমন সকলের আস্থা ছিল।

এবাবে আকাবায় শেষ বায়আত (১২ ই যিলহজ্ব, নবুওতের ত্রয়োদশ বর্ষ) থেকে সফর নবুওতের ১৪শ বর্ষ) পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাস হুযুর (স) এমন অবস্থায় আপন স্থানে অবস্থান করেন- যখন মদীনায় হিজরতকারীদের এক স্রোত চলছিল এবং শেষের কয়েক দিন এমন অবস্থায় অতিবাহিত করেন যখন তাঁর সকল সাথী মক্কা ছেড়ে চলে গেছেন। তিনি একাকী দু’সাথীসহ দুশমনদের মধ্যে এ জন্যে অবস্থান করেন যে, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হিজরতের হুকুম আসার পূর্বে নিজের কর্মক্ষেত্র পরিত্যাগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। চিন্তা করলে অনুমান করা যায় যে, এ কত বিরাট দায়িত্ববোধ ছিল- যা তাঁকে এ চরম বিপদ সংকুল অবস্থায় আপন স্থানে অবিচল রেখেছিল তাঁরাও কতটা নির্ভীকচিত্ত ছিলেন যাঁরা মানবরূপী হিংস্র পশুদের মাঝে নির্ভয়ে ও নিঃশংকে হুযুরের (স) সাথে অবস্থান করেন। (গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

কুরাইশের পেরেশানী

কুরাইশ কাফেরগণ এখন নিশ্চিত যে, যে কোন সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনায় হিজরত করবনে। এর পরিণামও তাদের ভালোভাবে জানা ছিল। তাঁর বিরাট ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ যোগ্যতা, কুরআনের মন জয়কারী শক্তি তাদের অজনা ছিলনা। এখন তারা দেখছিল যে একটি নিরাপদ বসবাসের স্থান তিনি লাভ করেছেন। দুটি শক্তিশালী ও রণঅভিজ্ঞ গোত্র তাঁর সহায়ক শক্তি হিসাবে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বয়ং কুরাইশের এমন সব সাহসী ও নিবেদিত প্রাণ লোক তাঁর সাথে মিলিত হয়েছে- যারা তের বছর যাবত নানান ধরনের বিপদ মুসিবত বরদাশত করে তাদের দৃঢ় সংকল্প ও অবিচলতার প্রমাণ দিয়েছে এবং বার বার হিজরত করে এ কথারও প্রমাণ দিয়েছে যে, নিজেদের খাতিরে আপন ঘরবাড়ি, ধনসম্পদ, আত্মীয়স্বজন, কওম ও জন্মভূমি সব কিছুই কুরবান করতে পারে। নবীর (স) বিরাট নেতৃত্বে এমন নিবেদি প্রাণদের একটি নগর রাষ্ট্র তাঁর হস্তগত হওয়া প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় মৃত্যুরই নামান্তর। তারপর বিশেষ করে মদীনার পরিস্থিতি এমন ছিল যে, মুসলমানদের শক্তি এখানে সুসংহত হওয়ায় তা কুরাইশের জন্যে আশংকার কারণ হয়ে পড়ে। এ জন্যে যে ইয়ামেন থেকে সিরিয়ার দিকে যে বাণিজ্য রাজপথ লোহিত সাগরের তটভুমির উপর দিয়ে চলেছে তার নিরাপত্তার উরেই কুরাইশ ও অন্যান্য বড়ো বড়ো মুশরিক গোত্রগুলো অর্থনৈতিক জীবন নির্ভরশীল ছিল। তা এখন মুসলমানদের আওতায় এসে যাবে, এর উপর হস্তক্ষেপ করে মুসলমান জাহেলী ব্যবস্থার জীবন পদ্ধতি সুকঠিন করে দেবে। শুধু মক্কাবাসীদের যে ব্যবসা বাণিজ্য এ রাজ পথের উপর দিয়ে মক্কা তেকে সিরিয়অ, রোম ও মিসর পর্যন্ত চলতো তার বার্ষিক প্রায় আড়াই লক্ষ আশারাফীর অধিক ছিল। তায়েফ ও অন্যান্য স্থানে ব্যবস্থা ছিল এর অতিরিক্ত। এ জন্যে আকাবায় বায়আতের সংবাদে কুরাইশের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। প্রথমে তো তারা মদীনাবাসীদের নবী (স) থেকে বিচ্ছিন্ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়। তারপর মক্কা থেকে মুসলমানদের হিজরত প্রতিরোধ করার সকল কলাকৌশল অবলম্বন করে। কিন্তু অতি মুষ্টিমেয় লোককেই তারা ধরে রাখতে পেরেছে এবং আহলে ঈমানের বিরাট সংখ্যক মদীনায় গিয়ে পৌঁছেছে। তারপর তারা এ আশংকা রোধ করার জন্যে শেষ উপায় অবলম্বনের জন্যে প্রস্তুত হলো। (তাফহীমুল কুরআন,  ২য় খন্ড, সূরা আনফালের ভূমিকা।)

হুযুরকে (স) হত্যা করার সিদ্ধান্ত

ইবনে হিশাম, ইবনে সা’দ, ইবনে জারীর এবং বালাযুরী বলেন, শেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে, ‘দারুন-নাদওয়ায়’ সকল কওম প্রধানদের এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ আশংকার পথ রুদ্ধ কিভাবে করা যায়- তার উপর আলোচনা হয়। এক পক্ষের মত ও ছিল যে, এ ব্যক্তিকে শিকল পরিয়ে এক স্থানে বন্দী করে রাখা হোক। জীবদ্দশায় তাকে আর মুক্ত করা হবেনা। কিন্তু এ অভিমত গ্রহণ করা হয়নি। কারণ অনেকের মতে তাকে বন্দী করে রাখলে যারা বাইরে আছে তারা ক্রমাগত তাদের কাজ করে যাবে এবং কিছু শক্তি অর্জন করলে তাকে মুক্ত করার জন্যে জীবনের ঝুঁকি নিতেও কোনরূপ ইতস্ততঃ করবেনা।কেউ বলে যে তাকে এখান থেকে বহিস্খার করা হোক। আর সে যখন আমাদের মধ্যে থাকবেনা তখন আমাদের মাথা ব্যথা থাকবেনা যে, সে কোথায় থাকে আর কি করে। সে থাকলে আমাদের জীবন ব্যবস্থায় যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হতো তাতো বন্দ হবে। কিন্তু এ প্রস্তাবও এই বলে প্রত্যাখ্যান করা হলো যে, তার কথাবার্তা তো যাদুর মতো ক্রিয়াশীল এবং মন জয় করার কৃতিত্ব তার বিরাট। যদি সে এখান থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে না জানি কোন কোন গোত্রকে সে আপন করে নেবে এবং তারপর এমন শক্তি অর্জন করবে এবং আরবের কেন্দ্রস্থলকে তার অধীনে আনার জন্যে তোমদের উপর আক্রমণ করবে। অবশেষে আবু জাহল বলে, আমরা আমাদের সকল গোত্র থেকে এক একজন সম্ভ্রান্ত বংশীয় চালাক চতুর লোক বেছে নেই এবং সকলে মিলে এক সাথে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি ও তাকে হত্যঅ করে ফেলি। এভাবে মুহাম্মদের (স) খুন সকল গোত্রের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে। তারপর বনু আবদে মানাফের জন্যে অসম্ভব হয়ে পড়বে, সকলের বিরুদ্ধে লড়াই করা। এ জন্যে বাধ্য হয়ে রক্তপণ (BLOOD MONEY) গ্রহণ করতে রাজী হয়ে যাবে।

এ অভিমত সকলে পছন্দ করলো এবং হত্যার জন্যে লোকও মনোনয়ন করা হলো। হত্যার সময় ও নির্ধারিত হলো। এ সকল কার্যবিবরণী এমন গোপন রাখা হলো যে, কানে কানেও যেন এ খবর কোথাও না পৌঁছে।

এ বিষয়ের প্রতি সূরা আনফালে ইংগিত করা হয়েছে-

*****************************************************

(এবং হে নবী, সে সময়ও স্মরণযোগ্য) যখন কাফেরগণ তোমার বিরুদ্ধে নানা অপকৌশল চিন্তা করছিল- তোমাকে বন্দী করবে অথবা মেরে ফেলবে অথবা বহিষ্কার করবে। তারা তাদের ষড়যন্ত্রের চাল চালতেছিল এবং আল্লাহ তাঁর চাল চালছিলেন। অবশ্য আল্লাহর চাল সবচেয়ে ভালো (আয়াত- ৩০)। (তাফহীমুল কুরআন ২য় খন্ড, টীকা ২৫।)

হুযুরের (স) প্রতি হিজরতের অনুমতি ও তার প্রস্তুতি

তিরমিযি ও হাকেম ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, পরিস্থিতি যখন এতোদূর পৌঁছে গেল তখন আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে মক্কা থেকে হিজরত করার অনুমতি দিলেন এবং বললেন-

*****************************************************

(এবং হে নবী) দোয়াক কর, এই বলে, হে আমার রব, আমাকে সত্যসহ প্রবেশ করাও প্রবেশ করার স্থানে এবং সত্যসহ আমাকে বের কর বের হওয়ার স্থান থেকে এবং কোন শক্তিকে আমার মদদগার বানিয়ে দাও (বনী ইসরাইলঃ ৮০)। [এখানে কারো এ আপত্তি পেশ করা ঠিক নয় যে, উল্লেখিত আয়াততো বনী ইসরাইলের হিজরতের বহু পূর্বে নাযিল হয়েছিল। অতঃপর এখানে তা হিজরতের অনুমতি হিসাবে পেশ করা কিভাবে সঠিক হতে পারে? প্রকৃতপক্ষে ও বিষয়ের অনেক দৃষ্টান্ত আছে যে, একটি আয়াত প্রথমে নাযিল হয়েছে। পরবর্তীকালে কোন বিশেষ পরিস্থিতিতেতার পুনরাবৃত্তি এজন্যে করা হয় যাতে হুযুর (স) জানতে পারেন যে, এ আয়াতের হুকুম এ অবস্থার জন্যে করা হয়েছে- গ্রন্হকার।]

এ অনুমতি সেদিন পাওয়া যায়- যার পরবর্তী রাত হুযুরকে (স) হত্যা করার জন্যে নির্ধারিত করা হয়েছিল। [এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা নবীকে (স) এ সময় পর্যন্ত মক্কায় আটকিয়ে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য যে কুরাইশ কাফেরগণ হক দুশমনির শেষ সীমায় পৌঁছে যাক এবং তখন তাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুকুম নবীকে দেয়া হবে-গ্রন্হকার।] ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে এবং ইবনে  জারীর ও ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরতা দিয়ে বলেন, ঐদিনই জিব্রিল (আ) এসে হুযুরকে (স) কুরাইশের অভিপ্রায় সম্পর্কে অবিহত করেন এবং বলেন, আজ রাতে আপনি নিজের বিছানায় শুবেননা।

তারপর দুপুর বেলায় কাপড়ে মুখ ঢেকে তিনি হযরত আবু বকরের (রা) বাড়ি যান। বোখারীতে ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে হযরত ওরওয়া বিন যুবাইরের – এ বর্ণনা আছে যে, হযরত আয়েশা (রা) বলেছেন, দুপুরে আমরা বাড়িতে বসেছিলাম, এমন সময় একজন হযরত আবু বকরকে (রা) বলে, রাসূলুল্লাহ (স) মুখ ঢেকে এমন সমময়ে এখানে এসেছেন যে এমন সময়ে তিনি কখনো আসতেননা। তাবারানীতে হযরত আসমা বিন্তে আবু বকরের (রা) বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, হুযুর (স) রোজ আমাদের এখানে সকাল সন্ধ্যায় আসতেন। এ বর্ণনা বোখারীতে ‘বাবুল হিজরতে’ হযরত আয়েশা (রা) থেকেও উদ্ধৃত আছে। ইবনে হিশামে ইবনে ইসহাকের বরাতসহ হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনা এই যে, হুযুর (স) প্রতিদিন সকালে অথবা সন্ধ্যায় আমাদের এখানে তশরিফ আনতেন। কিন্তু ঐদিন তিনি যোহরের সময় তশরিফ আনেন যা সাধারণতঃ তাঁর আসার সময় ছিলনা। হযরত আবু বকর (রা) সংগে সংগে বলেন, আমার মা- বাপ তাঁর জন্যে কুরবান হোক, নিশ্চয় এমন কোন বিষয় আছে যার জন্যে তিনি এ সময়ে এসেছেন। তারপর হুযুর (স) ভেতরে আসার অনুমতি চান। অনুমতিক্রমে ভেতরে এসে বললেন, এখান থেকে সবাইকে সরিয়ে দাও। হযরত আবু বকর (রা) বলেন, এতো আপনার বাড়িরই সব লোক। (হযরত আয়েশা (রা) থেকে মূসা বিন ওকবায় এ বর্ণনা আছে যে, তিনি বলেন, সে সময়ে আমি এবং আমার বোন আসমা (রা) ব্যতীত হযরত আবু বকরের (রা) কাছে আর কেউ ছিলনা। ইবনে ইসহাকের এরূপ বর্ণনাই ইবনে হিশামে আছে। অবশ্যি ইবনে ওকবার বর্ণনায় অতিরিক্ত এ কথা আছে, আবু বকর (রা) বলেন, এখানে শুধু আমার মেয়েরা আছে। কোন গুপ্তচর- আপনার খবর নেয়ার জন্যে নেই)।তখন হুযুর (স) বলেন, আমাকে এখান থেকে চলে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। হযরত আবু বকর (রা) বলেন, আমর মা-বাপ আপনা জন্যে কুরবান, আমি কি আপনার সাহচর্য লাভ করতে পারব? হুযুর (স) বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, আমার এ দু’ উটনীর একটি আপনি নিন। হুযুর (স) বলেন, কিন্তু মূল্য দিয়ে নেব। ইবনে ইসহাক বলেন, হুযুর (স) বলেন, যে মূল্যে তুমি খরিদ করেছ সেই মূল্যই নেব। আবু বকর (রা) মূল্য বললে হুযুর (স) বলেন, এ মূল্য আমি তোমাকে দেব। তারপর হুযুর (স) ও আবু বকর (রা) বনী আদ্দীলর এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ বিন উরায়কেতকে [কেউ সে ব্যক্তির নাম আরকাদ এবং কেউ আরকাত বলেছে। সঠিক নাম উরায়কেত। মূসা বিন ওকবা, বালাযুরী ও ইবনে সাদ তাই বলেছেন। এ সেই ব্যক্তি যাকে তায়েফ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূলুল্লাহ (স) বানী বাহক হিসাবে মক্কায় সর্দারদের নিকটে পাঠিয়েছিলেন। যদিও সে মুশরিক ছিল কিন্তু এতোটা বিশ্বস্ত যে, হিজ্বরতের এ নাজুক পরিস্থিতিতে সে একেবারে বিশ্বস্ত প্রমাণিত হয। অথচ কুরাইশ হুযুরের (স) সন্ধান জানার জন্যে মোটা অংকের পুরস্কার করেছিল- গ্রন্হকার।

] পারিশ্রমিকসহ পথ দেখাবার জন্যে নিযুক্ত করেন। সে ছিল পথঘাট বিশারদ। উটনী দুটো তার তত্ত্বাবধানে দেয়া হলো এ শর্তে যে, যখন যে স্থানে ডাকা হবে তখন সে স্থানে পৌঁছতে হবে।

হত্যার রাতের ঘটনা

তারপর নবী (স) নিজের বাড়ি তশরিফ নিয়ে যান এবং রাত পর্যন্ত থাকেন যাতে দুশমনের সামান্য পরিমাণ সন্দেহ না হয় যে, তিনি তাদের অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত। রাতে নির্দিষ্ট সময়ে সবাই পৌঁছে যায় যাদেরকে হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। ইবনে সাদের বর্ণনা অনুযায়ী তারা মোট ১২ জন ছিল। আবু জাহল হাকাম বিন আবিল আস, ওকবা বিন আবি মুয়াইত, নদর বিন আল হারেস, উমাইয়া বিন খালাফ, হারেস বিন কায়েস বিন আল গায়তালা, যামায়া বিন আল আসওয়াদ, তুয়ায়মা বিন আদী, আবু লাহাব, উবাই বিন খালাফ, নুবায়া বিন আল হাজ্জাজ ও মুনাবেব বিন হাজ্জাজ। কিন্তু এদের আসার পূর্বেই হুযুর (স) তাঁর বিছানায় হযরত আলীকে (রা) তাঁর (হুযুরের) সবুজ হাদরামাওতী চারদ উড়িয়ে শুইয়ে দেন। এ জন্যে দুশমন বাইর থেকে উঁকি ঝুঁকি মেরে যখনই দেখতো এটাই মনে করতো যে, ইনি রাসূলু্ল্লাহ (স) যিনি তাঁর বিছানায় ঘুমুচ্ছেন। সুহায়লী কোন কোন সীরাত প্রণেতা আলেমের বরাত দিয়ে বলেন যে, তারা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকবার চেষ্টা করে। কিন্তু  ভেতর থেকে কোন মেয়েলোকের চিৎকার ধ্বনি শুনে তারা ভয় পেয়ে যায় এবং পরস্পর বলাবলি করে, খোদার কসম! সারাদেশে আমাদের এক ভয়ানদ বদনাম হবে যে আমরা আমাদের গোত্রের মেয়েদের ইজ্জৎ-আবরুর প্রতিও লক্ষ্য রাখিনি। এ কারণে তারা সারা রাত বাইরে বসে থাকে। তারা এ প্রতীক্ষায় থাকে যে, খুব সকালে যখন রাসূলুল্লাহ (স) উঠবেন তখন এক সাথে সকলে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

হযরত আলীর (রা) গ্রেফতারী ও মুক্তি

দুশমন বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল এমন অবস্থায় রাতের কোন এক সময়ে হুযুর (স) নিশ্চিন্ত মনে বাইরে আসেন এবং তাদের উপর মাটি নিক্ষেপ করতে করতে তাদের মধ্য দিয়েই বেরিয়ে যান। তখন তিনি সূরায়ে ইয়াসীনের প্রাথমিক আয়াতগুলো পাঠ করছিলেন। ভোর হলে তারা হযরত আলীকে (রা) হুযুরের (স) বিছানা থেকে উঠতে দেখে। তখন তারা বুঝতে পারে রাসূলুল্লাহ (স) তো কবে চলে গেছেন (ইবনে সা’দ, ইবনে হিশাম, বালাযুরী, ইবনে জারীর, যাদুল মায়াদ)।

ইবনে জারীর ও ইবনে আসীর লিখেছেন যে, তারা হযরত আলীকে (রা) জিজ্ঞেস করে, তোমার সাহেব কোথায়? তিনি বলেন, আমি কিছুই জানিনা যে তিনি কোথায় গেছেন। আমি তাঁর পাহারাদার নই। তোমরা তাঁকে বের করে দিয়েছ এবং তিনি বেরিয়ে গেছেন। এতে রক্ত পিপাসু দুশমন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁকে বকাঝকা করে, মারপিট করে এবং মসজিদে হারামে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ বন্দী করে রাখে। কিন্তু কঠোর আচরণের পরেও যখন হুযুরের (স) কোন সন্ধান জানা গেলনা তখন বাধ্য হয়ে তারা তাঁকে ছেড়ে দিল। অসম্ভব নয় যে তাঁকে ছেড়ে দেয়ার কারণ হয়তো এ ছিল যে, হুযুর (স) মক্কাবাসীর আমানতসমূহ ফেরৎ দেয়ার জন্যে তাঁকে রেখে গিয়েছিলেন। কাফেরগণ হয়তো জানতে পেরেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) হযরত আলীকে (রা) এ কাজের দায়িত্ব দিয়ে গেছেন, সে জন্যে আমানতের মাল ফেরৎ পাওয়ার লোভে তারা তাকে মুক্তি দিয়েছিল। তাদের কিছুটা লজ্জাও হয়ে থাকতে পারে যে, যাকে তারা হত্যা করতে এসেছিল- তিনি এমন উন্নত চরিত্রের মানুষ যে হত্যার স্থান থেকে বেরিয়ে যাবার সময়েও দুশমনের আমানত ফেরৎ দেয়ার চিন্তায় অধীর।

হযরত আবু বকরের (রা) বাড়িতে আকস্মিক আক্রমণ

হযরত আলীকে (রা) মুক্তি দেয়ার পর জালেমেরা আবু বকরের (রা) বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। ইবনে ইসহাক হযরত আসমা বিন্তে আবি বকর (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করেন। বলা হয়েছে, দ্বিতীয় দিনে কুরাইশের কতিপয় লোক আমাদের বাড়ি আসে। তাদের সাথে আবু জাহলও ছিল। দরজায় দাঁড়িয়ে তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার পিতা কোথায়? বললাম, আমার জানা নেই। এতে আবু জাহল আমাকে এমন জোরে থাপ্পড় মারে যে, আমার কানের চালি ভেঙে দূরে গিয়ে পড়ে। তারপর তারা চলে যায়। (ইবনে হিশাম ও ইবনে জারীর)।

মক্কা থেকে বেরিয়ে সওর গুহায় আশ্রয়

রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা হযরত আবু বকরের (রা) বাড়ি আসেন। অতঃপর দু’জন রাতেই মক্কা থেকে দু’তিন মাইল দূরে সওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেন। মুসনাদে আহমদ ও তিরমিযিতে আছে যে, মক্কা থেকে বেরুবার সময় হুযুর (স) ‘হাযওয়ারা’ নামক স্থানে দাঁড়ান, বাড়তুল্লাহর দিকে মুখ করেন এবং দরদ ভরা কন্ঠে বলেন-

হে মক্কা! খোদার কসম। খোদার যমীনে তুমি আমার নিকটে সবচেয়ে প্রিয়। আর খোদার নিকটেও তাঁর যমীনে তুমি সবচেয়ে প্রিয়। যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বহিষ্কার করে না দিত, তাহলে তোমাকে ছেড়ে বেরুতামনা।

তারপর তিনি সওরের দিকে রওয়ানা হন।

‘সওরে’ আশ্রয় গ্রহণের রহস্য

এখানে এ বিষয়টি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, কোন যক্তিসংগত কারণে আশ্রয় গ্রহণের জন্যে সওর পর্বত নির্বঅচন করা হলো। এ পর্বতটি মক্কার দক্ষিণে ইয়ামেনের পথে অবস্থিত। অথচ মদীনা তাইয়েবা মক্কার উত্তরে সিরিয়ার পথে অবস্থিত। মক্কার কাফেরদের জানা ছিল যে, হুযুর (স) হিজরত করে মদীনা যেতে চান। এ কারণে তাঁর

খুঁজে বের করে ধরে ফেলতে, উত্তরগামী পথগুলোতে তালাশ করে ব্যর্থ হওয়ার পরই তারা পূর্ব-দক্ষিণ ও পশ্চিমের দিকে তালাশে বেরুতো। এজন্যে আশা করা হচ্ছিল যে, সওর গুহায় তাদের পৌঁছতে পৌঁছতে যথেষ্ট সময় লেগে যাবে।

সওরে অবস্থান কালের জন্যে আবু বকরের (রা) ব্যবস্থাপনা

সওর গুহার জন্যে রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই হযরত আবু বকর (রা) যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন।[মুসনাদে আহমদে, তাবারানী ও সীরাতে ইবনে হিশামে ইবনে ইসহাকের বরাতে হযরত আসমা বিন্তে আবি বকরের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে। হযরত আসমা (রা) বলেন, আমাদের পিতা যাবার সময় তাঁর সমুদয় অর্থ- প্রায় পাঁচ ছয় হাজার দিরহাম- সাথে নিয়ে যান। (বালাযুরীর মতে ইসলমা কবুল করার পূর্বে তার নিকটে ৪০ হাজার দিরহাম ছিল)। তারপর আমাদের দাদা আবু কুহাফা- যিনি অন্ধ ছিলেন এবং তখন পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেননি, আমাদেরকে বলেন, আমার মনে হয়, সে তার জানের সাথে সমুদয় মালও নিয়ে গেছে। বললাম, না, দাদাজান, তিনি আমাদের জন্যে অনেক মংগল রেখে গেছেন। তারপর যে তাকের মধ্যে আব্বাজান তাঁর মাল রাখতেন- খোনে কিচু পাথর রেখে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিই, তারপর দাদাজানকে নিয়ে গিয়ে বলি, আপনি হাত দিয়ে দেখুন, তিনি তার উপর হাত রেখে বলেন, এ সব যদি সে তোমাদের  জন্যে রেখে গিয়ে থাকে তো যথেষ্ট। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আমাদের পিতা আমাদের জন্যে কোন অর্থই রেখে যাননি। আমি শুধু দাদাকে সান্ত্বনা দিতে চাচ্ছিলাম–গ্রন্হকার।] বোখারীতে হযরত আয়েশার (রা) এ বর্ণনা আছে যে, তিনি বলেন, আমরা তাড়াতাড়ি দু’মুসাফিরের জন্যে সফরের সরঞ্জাম তৈরী করলাম এবং একটি থলিয়াতে পাথেয় স্বরূপ প্রয়োজনীয় বস্তু রাখলাম। হযরত আবু বকর তাঁর বুদ্ধিমান ও চতুর যুবক পুত্র আবদুল্লাহকে এ নির্দেশ দেন, দিনের বেলা মক্কাবাসীদের সাথে থেকে খবর সংগ্রহ করবে এবং রাতে আমাদের সাথে সাথে সাক্ষাৎ করে সারাদিনের খবরাখবর জানাবে। তাঁর আযাদ করা গোলাম ফুহায়রাকে (রা) হুকম করলেন, দিনের বেলা যথারীতি আমাদের ছাগল চরাবে এবং মক্কাবাসীদের খবরাখবর নিতে থাকবে। তারপর রাতে আমাদেরকে দুধও দিয়ে যাবে এবং যাবতীয় খবর জানাবে। ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত আসমা (রা) প্রতি রাতে টাটকা খাদ্য পাঠাতেন [এখানে একটি সন্দেহের উদ্রেক হয় যা দূর হওয়া জরুরী। উপরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাফেরগণ যখন হযরত আলীকে (রা) জিজ্ঞেস করে, তোমার সাহেব কোথায়? তখন জবাবেতিনি বলেন, আমার জানা নেই। তারপর উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত আবু বকরের (রা) বাড়িতে গিয়ে তিনি কেথায় জানতে চাইলে হযরত আসমা (রা) বলেন, আমার জানা নেই। অথচ পরবর্তী অবস্থা থেকে জানা যায় যে, সওর গুহায় যাবার পূর্বে হযরত আবু বকর (রা) যে সব ব্যবস্থা করেন সে সবের মধ্যে কিছু খেদমতের দায়িত্ব হযতর আসমার (রা) উপর অর্পিত হয়। এটাও উল্লেখ করা হয়েছৈ যে, হযরত আবু বকর (রা) সমুদয় অর্থ বাড়ি থেকে নিয়ে গেছেন। কিন্তু হযরত আসমা (রা) দাদাকে বলেন, তিনি অনেক কিছু রেখে গেছেন। এ সব্য ব্যাপারে মনে প্রশ্ন জাগে যে, এসব কি মিথ্যা নয়? তার জবাব এই যে, প্রথম দুটি ব্যাপার সম্পর্কে কথা এ যে, এতে দুটি একই ধরনের সম্ভাব্যতা রয়েছে। একটি সম্ভাব্যতা এই যে, হযরত আলী (রা) এবং হযরত আসমা (রা) হুযুর (স) এবং আবু বকর (রা) কোথায় তা তাঁদের সে সময়ে জানা ছিলনা, যখন তাঁদেরকে এ প্রশ্ন করা হয়। দ্বিতীয় ন্যায়সংগত হওয়ার সম্ভব্যতা এই যে, তাঁদের জানা তো ছিল কিন্তু তাঁরা দুশমনকে তা বলতে এ জন্যে অস্বীকার করেন যে, ঘটনার বিপরীত কথা না বলে সত্য কথা বলে জালেমকে জুলুম করতে সাহায করা বহু গুণে মন্দ কাজ। আর ঘটনার বিপরীত কথা বলে মজলুমকে জুলুম থেকে রক্ষা করা মোটেই কোন খারাপ কাজ নয় বরঞ্চ শরিয়ত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে একেবারে জায়েয। একজন নির্বোধই এক নাজায়েয বলতে পারে এবং দুঢ়তা সহকারে বলতে পারে হত্যঅকারীদেরকে গারে সওরের ঠিকানা বলে দেয়া উচিত ছিল। অথবা এ কথা বলা উচিত ছিল, তাদের ঠিকানা জানা আছে কিন্তু বলবনা। যার ফলে হত্যাকারী তাদেরকে নির্যাতন করে সত্য কথা ফাঁস করে নিত। এখন রইলো হযরত আসমার (রা) সে কথা যা তিনি তাঁল দাদাকে বলেছিলেন। এ হচ্ছে, ‘তাওরিয়ার’ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ‘তাওরিয়া-এর অর্থ সুস্পষ্ট মিথ্যা বলার পরিবর্তে কোন মুসলেহাৎ বা সময়োপযোগির জন্যে প্রকৃত বিষয়কে পর্দাবৃতকরে রাখা। শরীয়তে এ জায়েয। হযরত আসমা (রা) একথা বলেননি যে, তাঁর পিতা বহু ধন রেখে গেছেন, বরঞ্চ বলেছেন, তিনি বহু মংগল রেখে গেছেন। তারপর তাকের উপর রাখা স্তুপের উপর তাঁর দাদার হাত রাখতে দেন। দাদা মনে করলেন এ অর্থের স্তুপ। কিন্তু হযরত আসমা (রা) এ কথা বলেননি যে এ স্তুপের মধ্যে অর্থসম্পদ আছে। এভাবে তিনি মিথ্যা না বলে, তাঁর বৃদ্ধ ও অন্দ দাদাকে সে পেরেশানী থেকে রক্সা করেন- নিঃস্ব হওয়ার আশংকায় যার মধ্যে তিনি মগ্ন ছিলেন- গ্রন্হকার।] (ইবনে হিশাম)।

সওর গুহার বিবরণ

বায়হাকী হযরত মুহাম্মদ বিন সিরীনের বরাত দিয়ে একটি মুরসাল রেওয়ায়েত উদ্ধৃত করেন- যাতে বলা হয়েছে যে- একবার হযরত ওমরের (রা) বৈঠকে কিছু লোক এ ধরনের কথা বলেন যার থেকে সুস্পষ্ট হয় যে, তাঁরা হররত ওমরকে (রা) হযরত আবু বকর (রা) থেকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করছেন। এতে হযরত ওমর (রা) বলেন, কসম খোদার, আবু বকরের (রা) একরাত ওমর পরিবার থেকে শ্রেয়ঃ এবং আবু বকরের (রা) একদিন ওমর পরিবার থেকে শ্রেয়ঃ

তারপর তিনি বয়ান করেন, যে রাতে হুযুর (রা) গুহায় তশরিফ নিয়ে যান এবং আবু বকর (রা) তাঁর সাথে ছিলেন, তখন অবস্থা এমন ছিল যে, আবু বকর (রা) কখনো সামনে চলতেন এবং কখনো পেছনে চলতেন। হুযুর (স) এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার যখন পশ্চাদ্ধাবনকারীদের কথা মনে পড়তো তখন পেছনে চলতে লাগতাম এবং যখন আশংকা হতো যে কি জানি সামনে কোন বিপদের আশংকা নেই তো তখন সামনে যেতাম। হুযুর (স) বললেন, তোমার মতলব এই যে, কোন বিপদ এলে তা আমার উপরে না এসে যেন তোমার উপরে আসে। তাই না? তিনি বলেন, জি হ্যাঁ। তারপর যখন তাঁরা গুহায় পৌঁছলেন তখন আবু বকর (রা) আরজ করলেন, আপনি একটু দাঁড়ান আমি ভেতরে গিয়ে গুহা আপনার জন্যে পরিষ্কার ও সংরক্ষিত করি। তারপর তিনি ভেতরে গিয়ে গুহা সংরক্ষিত করে বাইরে এলেন। কিন্তু তাঁর মনে পড়ে গেল যে, আর একটি ছিদ্র রয়ে গেছে। তারপর আবার ভেতরে গিয়ে তা বন্ধ করে এলেন। তখন হুযুরকে (স) ভেতরে যেতে অনুরোধ করলেন। কোন কোন রেওয়াতে অতিরিক্ত এ বয়ান করা হয়েছে যে, হযরত আবু বকর (রা) অন্ধকারে হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে এক এক করে ছিদ্র তালাশ করে তা চাদর ছিঁড়ে ছিঁড়ে বন্ধ করতে থাকেন। অনুরূপ বর্ণনা হাফেজ আবুল কাসেম বাগাবী ইবনে আবি মুলায়কা থেকে উদ্ধৃত করেছেন। তার শেষে নাফে বিন ওমর আলজুমাহীর এ বয়ান উদ্ধৃত করেন যে, গুহায় একটি গর্ত রয়ে গিয়েছিল। আবু বকর (রা) তাঁর পায়ের গোড়ালী দিয়ে সে গর্ত চেপে ধরেন যাতে করে কোন বিষধর প্রাণী বরে হয়ে হুযুরকে (স) দংশন করতে না পারে। এ কথাই বাযযার হযরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) থেকে এবং তাবারানী হযরত আসমা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন।

সওর গুহার চরম মর্মান্তিক মুহূর্ত

ওদিকে কুরাইশ নবীর (স) সন্ধানে মক্কা ও তার পাশ্ববর্তী স্থঅনের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়ে। বালাযুরী বলেন যে, তারপর তারা দু’জন দক্ষ অনুসন্ধানকারী নিয়োগ করে যাতে তারা পদচিহ্ন ধরে ধরে হুযুরের (স) সন্ধান পেতে পারে। এভাবে এরা সওর গুহা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু সেখানে তারা দেখতে পেলো যে, গুহার মুখে মাকড়সার জাল বুনানো রয়েছে। একজন অনুসন্ধানী কুর্য বিন আলকামা বলল, এর থেকে সম্মুখে যাওয়ার কোন চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছেনা। সন্ধানীদের সাথে যারা এসেছিল তাদের মধ্যে একজন বলল, গুহার মধ্যে গিয়ে দেখা যাকনা কেন। কিন্তু উমাইয়া বিন খালাফ বলল, এখানে কি পাবে? এ গুহায় যে মাকড়সার জাল তাতো মুহাম্মদের (স) জন্মের পূর্বে বুনানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এর পরে সকলে পেছনে ফিরে চলে যায়। এ এমন এক পরিস্থিত ছিল যখন হযরত আবু বকর (রা) দুশমনদেরকে গুহার একেবারে মুখের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন এবং হুযুরকে (স) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এদেকর কেউ যদি তাদের পায়ের নীচে তাকায় তাহলে আমাদেরকে দেখে ফেলবে। হুযুর (স) একেবারে নিশ্চিন্ত মনে জবাব দেন, হে আবু বকর! তোমার কি ধারণা ঐ দুটি লোক সম্পর্কে যাদের মধ্যে তৃতীয় আল্লাহ? (বোখারী কিতাব- ফাদায়েল- আসহাবু-ন্নবী, কিতাবুত তফসীর ও বাবুল হিজরত, মুসলিম-ফিল, ফাদায়েল, তিরমিযি ফিত তফসীর, মুসনাদে আহমদ, মুরবিয়্যাতে আবি বকর)।

হাফেজ আবু বকর আহমদ বিন আলী আল উসাবী মুসনাদে আবি বকর সিদ্দীকে এ সম্পর্কে যে সব বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তার একটিতে বলা হয়েছে, যে সময়ে তারা গুহার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন নবী (স) নামায পড়ছিলেন এবং হযরত আবু বকর (রা) দুশমনের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন। হুযুর (স) নামায শেষ করলে হযরত আবু বকর (রা) আরজ করেন, আমার মা বাপ আপনার জন্যে কুরবান, এই যে আপনার কওম আপনার তালাশে এসে পৌঁছেছে। খোদার কসম। আমি নিজের জন্যে কাঁদছিনা, বরঞ্চ এ ভয়ে কাঁদছি যে, আমার চোখের সামনে আপনার উপর কোন আঘাত না পৌঁছে। হুযুর (স) বলেন- *****************************   -ভয় করোনা, আল্লাহ আমাদের সাথে রয়েছেন।

আল্লাহ কুরআন পাকে এ জিনিসেরই উল্লেখ করেছেন-

*********************************************************

-যদি তোমরা (মুসলমান) তার (আল্লাহর নবীর) সাহায্য না কর তাহলে তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তার মদদ সে সময়ে করেছিলেন- যখন সে দু’জনের মধ্যে একজন ছিল যখন তারা দু’জন গুহার মধ্যে ছিল, যখন সে তার সাথীকে বলছিল ভয় করোনা আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। (তওবাঃ ৪০)

হুযুর (স) এবং হযরত আবু বকরকে (রা) হত্যা অথবা গ্রেফতারের জন্যে পুরস্কারের সাধারণ ঘোষণা

এ ছিল শেষ চেষ্টা যার দরুন দুশমন নবীকে (স) পাওয়ার আশা করতে পারতো। এখানে (গুহায়) যখন তাঁকে পাওয়া গেলনা তখন তারা বুঝে ফেলল যে, হুযুর (স) তাদের নাগালের বাইরে চলে গেছেন। তারপর তারা সাধারণ ঘোষণা করলো যে, যে কেউ মুহাম্মদকে (স) এবং আবু বকরকে (রা) ধরে আনবে অথবা হত্যঅ করবে তাদেরকে একশত করে উট পুরস্কার দেয়া হবে। এ হলো বালাযুরীর বর্ণনা এবং ইবনুল কাইয়েম যাদুল মায়াদে এটা গ্রহণ করেছেন। ইবনে হিশাম ও ইবনে জারীর শুধু ধরে আনার  জন্যে একশত উট পুরস্কারের উল্লেখ করেছেন। বালাযুরী একে দুর্বল বক্তব্য বলে উদ্ধৃত করেন।

গুহা থেকে রওয়ানা

বোখারীতে হযরত আয়েশার (রা) এ বর্ণনা আছে যে, হুযুর (স) এবং হযরত আবু বকর (রা) তিনদিন-তিনরাত গুহায় অবস্থান করেন।তাবারানীতে হযরত আসমার (রা) এরূপ বর্ণনাই আছে এবং ইবনে আবদুল বার, ইবনে সা’দ ও ইবনে ইসহাকের বর্ণনাও তাই। এ জন্যে সে বর্ণনা গ্রহণযোগ্য নয়- যা মুসনাদে আহমদ ও হাকেমে তালহাতুল বাসারী থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, গুহায় অবস্থান দশ দিনের বেশী সময় পর্যন্ত ছিল। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তিনদিন-তিনরাত পর্যন্ত হুযুরের (স) তালাশে কুরাইশের তৎপরতা শিথিল হয়ে পড়েছিল। অতএব আবদুল্লাহ বিন উরায়কেত তার দায়িত্বে দেয়া দুটি উটনীকে নিয়ে তৃতীয় রাতের শেষ প্রহরে ‘গারে সওরে’ পৌঁছে। ঠিক সময়ে হযরত আসমাও (রা) একটি থলিয়ায় পাথেয় নিয়ে পৌঁছে যান। কিন্তু তা বেঁধে নেয়ার জন্যে কোন কিছু আনার খেয়াল তিনি করেননি। অবশেষে তিনি তাঁর ‘নেতাক’ খুলে তা ছিঁড়ে ফেলেন। সে যুগে মহিলাগণ যে কাপড় তাদের কোমরে পেঁচিয়ে রাখতো তাকে ‘নেতাক’ বলা হতো। তিনি নেতাকের এক অংশ দিয়ে খাবার জিনিস বেঁধে উটনীর হাউদায় ঝুলিয়ে রাখেন এবং অন্য অংশটি কোমরে বাঁধার জন্যে যথেষ্ট করেন করেন- (ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর, ইবনে ইসহাকের বরতাসহ)। এর ভিত্তিতে হযরত আসমাকে (রা) ‘যাতুল নেতকাইন’ বলা হয়। অর্থাৎ দুই কোমরবন্দওয়ালী।

বোখারীতে হযরত আসমার (রা) নিজস্ব বর্ণনা এরূপ আছে যে, যখন (তোশাদান) খাদ্য রাখার পাত্র বাঁধার  প্রয়োজন হলো, তখন আবু বকর (রা) আসমাকে তাঁর ‘নেতাক’ ছেঁড়ার নির্দেশ দেন। তারপর এ কাফেলা এভাবে রওয়ানা হয় যে, একটি উটনীর পিঠে নবী (স) ছিলেন এবং অন্যটির পিঠে হযরত আবু  বকর (রা)। তিনি খেদমতের জন্যে আমের বিন ফুহায়ারাকে (রা) তাঁর পেছনে বসিয়ে নেন। আগে আগে আবদুল্লাহ বিন উরায়কেত রাস্তা দেখাবার জন্যে  পায়ে হেঁটে চলছিল। এভাবে সে মহান হিজরতের সফর শুরু হয়, যা দুনিয়ার, ইতিহাসে বিপ্লব আনয়ন করে। ইবনে সা’দ ও বালাযুরী নিশ্চয়তাসহকারে বলেন, গারে সওর থেকে এ মুবারক কাফেলার যাত্রা ৪ঠা রবিউল আউয়াল সোমবার শুরু হয়। ইমাম আহমদ ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, হুযুর (স) রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার দিন গুহা থেকে রওয়ানা হন, কিন্তু তিনি তারিখ বলেননি। কাসতাল্লানী মাওয়াহিবুল- লাদুন্নিয়াতে লিখেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) জুমা, শনি ও রবি ও তিন রাত গুহায় অতিবাহিত করে সোমবার রাতে সেখান থেকে রওয়ানা হন। ইবনে জারীর বলেন, রবিউল আউয়ালে (৫৪ হাতি বর্ষ) নবী (স) মক্কা থেকে মদীনা হিজরত করেন।

সফরের বিবরণ

সীরাতে ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আবদুল্লাহ বিন উরায়কেত যখন এ কাফেলা নিয়ে চলল তখন সে সাধারণ পথ পরিহার করে মদীনা যাওয়ার জন্যে অন্য পথ অবলম্বন করলো যাতে দুশমন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ইবনে সা’দ বলেন, যেহেতু আবু বকর (রা) ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যে প্রায় চলাফেরা করতেন, সে জন্যে লোক তাঁকে দেখে চিনে ফেলতো এব্ং জিজ্ঞেস করতো, আপনার সাথে এ ব্যক্তি কে? তিনি বলতেন, **********************************************

-এ এমন ব্যক্তি যিনি আমাকে পথ দেখাচ্ছেন। তাবারানীতে হযরত আসমা থেকে এবং মুসনাদে আহমদ মারবিয়্যাতে আনাস বিন মালেক (রা), বোখারী বাবুল হিজরতে হযরত আনাস(রা) থেকেও প্রায় অনুরূপ বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।[এটাও ‘তাওরিয়ার’ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হযরত আবু বকর (রা) বলেননি যে, ইনি মুহাম্মদ (স)। বরঞ্চ বলেছেন- আমার পথ প্রদর্শক। প্রশ্নকারী বুঝলো ইিন পথ দেখাচ্ছেন। আবু বকর (রা) একেবারে সত্য কথা বলেছেন- ইনি আমার হাদী গ্রন্হকার।]

বোখারী ও মুসলিম হযরত আবু বকরের (রা) এরূপ বর্ণনা আছেঃ আমরা দ্বিতীয় দিন দুপুর পর্যন্ত চলতে থাকি। যখন রৌদ্র তাপ প্রখর হলো তখন চারদিকে দেখতে লাগলাম কোথাও ছায়া পাওয়অ যায় কিনা। দেখলাম একটি বিরাট প্রস্তরের নীচে এখানে ছায়া রয়েছে। সেখানে গিয়ে নবীর (স) জন্যে বিছানা বিছিয়ে দিয়ে আরজ করলাম, একটু জিরিয়ে নিন। তারপর চারদিকে দেখতে থাকলাম আমাদের তালাশে কেউ আসছে নাতো। এমন সময় একটি বালক ছাগল চরাতে চরাতে ছায়াতে আশ্রয় নেয়ার জন্যে এ শিলা খন্ডের দিকে এলো। আমি তাকে বললাম, তোমার কোন বকরীর দুধ বের করে আমাদের দেবে? সে রাজী হয়ে গেল। আমি সে বকরীর স্তন ও সে বালকের হাত পরিস্কার করে একটি পাত্রে দুধ দোহন করালাম। তারপর তাতে সামান্য পানি দিয়ে ঠান্ডা করলাম। তারপর নিয়ে গিয়ে নবীকে (স) পান করালাম।

তারপর হযরত আবু বকর (রা) সুরাকা বিন মালেক বিন জুশমের ঘটনা বয়ান করল- যা ইমাম বোখারী মুনাকেবুল মুহাজেরীন ও বাবে হিজরতে এবং ইমাম মুসলিম কিতাবুয- যুহদ- বাবুল হিজরতে সংক্ষেপে উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তার বিশদ বিবরণ বোখারী বাবুল হিজরতের একটি বর্ণনায় স্বয়ং সুরকার ভাষায় তার ভাইপো আবদুর বরহমান বিন মালেকের[ইবনে হিশাম তার নাম শুদ্ধ করে বলেছেন- আবদুর রহমান বিন হারেস বিন মালে বিন জু’শুমা’ গ্রন্হাকার।] বরাত দিয়ে ইমাম যুহরী বয়ান করেন- তার বিশদ বিবরণ সীরাতে ইবনে হিশাম, তাবাকাতে ইবনে সা’দ প্রভৃতিতে পাওয়া যায়।

সুরাকার ঘটনা

সুরাকা বনী মুদরেসের প্রধান ছিল। কুদাইদের নিকেট তার এলাকা ছিল। তার বর্ণনা এমন- আমদের নিকটে কুরাইশের এক ব্যক্তি এ পয়গাম নিয়ে এলো যে, যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকরকে (রা) হত্যা অথবা গ্রেফতার করবে তাদের প্রত্যেকের দিয়াত অর্থাৎ একশ উট দেয়া হবে। তারপর একদিন আমি আমার কওমের এক বৈঠকে বসে ছিলাম এমন সময় এক ব্যক্তি এসে আমাকে বলল, এখনি আমি সমুদ্র তীর ধরে কিছু লোক যেতে দেখলাম। আমার মনে হয়- তারা মুহাম্মদ (স) ও তাঁর সাথী। আমি বুঝেঝ ফেললাম ঠিক তারাই হবে। কিনতউ আমি তাকে বললাম, তারা নয় বরঞ্চ তুমি অমুক অমুককে দেখেছ যারা এখনই আমাদের সামনে দিয়ে গেল। তারপর আমি এ বৈঠকে কিছুক্ণ থাকার পর উঠে বাড়ি গেলাম। তারপর ঘোড়ায় চড়ে তখন চুপে চুপে বেরিয়ে গেলাম যেন অন্যান্যরা আমার যাওয়া জানতে না পারে। ইবনে শায়বায় বর্ণনা আছে, সুরাকা বলে, আমি এ আশংকা করে এমন করলাম যাতে বস্তিবাসী আমার পুরস্কারে অংশীদার হতে না পারে। আমি তাদের নিকটে পৌঁছলে হঠাৎ আমি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলাম। আমি ফালের তীর বের করে ফাল দেখলাম তো তা আমার ইচ্ছার বিপরীত বেরুলো। আমি তার পারোয়া না করে বলতে থাকলাম। তারপর তাদের এমন নিকটে গেলাম যে, রাসূলুল্লাহর (স) কেরাত পরিষ্কার শুনতে পেলাম। হুযুর (স) কোন  দিদে মুখ ফিরিয়ে দেখতেননা। আবু বকর (রা) চারদিক বার বার তাকিয়ে দেখতেন। এমন সময় হঠাৎ আমার ঘোড়ার পা হাঁটু পর্যন্ত মাটির মধ্যে বসে গেল এবং আমি তার পিঠ থেকে পড়ে গেলাম। হযরত বারা বিন আযেবের (রা) বর্ণনা স্বয়ং আবু বকর (রা) থেকে এরূপ যে আবু বকর (রা) বলেন, আমরা তখন কঠিন যমীনে অতিক্রম করছিলাম। আমি আরজ করলাম, আমাদের এ পশ্চাদ্ধাবনকারী খুব নিকটে এসে গেছে। হুযুর (স) দোয়া করলেন এবং সে মাটির মধ্যে তার পেট পর্যন্ত বসে গেল। হযরত আনেস (রা) বলেন, হুযুর(স) বলেন, হে খোদা! একে ফেলে দাও। সুরাকা বলে, আামি পুনরায় ফাল বের করলাম তো আমার ইচ্ছার বিপরীত বেরুলেঅ। তখন আমি চিৎকার করে নিরাপত্তা চাইলাম। তখন তাঁরা থেমে গেলেন। আমি ঘোড়ায় চড়ে তাঁদের কাছে গেলাম। আমার সাথে যা কিছু ঘটলো তার থেকে বুঝে নিলাম যে রাসূলুল্লাহর (স) কাজ সাফল্যমন্ডিত হবেই।  (ইবনে হিশামে মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনা ইমাম যুহরীর বরাতে এমন আছে যে, সুরাকা চিৎকার করে বলে- আমি সুরাকা বিন জু’শুম। আপনারা সুযোগ দেন কথা বলব। খোদার কসম। আমি আপনাদের কোন আঘাত করবনা, আর না আমার মুখ থেকে এমন কোন কথা বেরুবে যা আপনাদের অসহনীয় হবে)। সুরাকা বলে, আমি রাসূলুল্লাহকে বল্লাম, আপনার কওম আপনার জন্যে দিয়াতের ঘোষণা করেছে- আর মানুষ এ আশায় ঘোরাফেরা করছে যে- তার পুরস্কার মিলে যাবে। অতঃপর আমি সফরের পাথেয় ও সরঞ্জাম দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। তিনি এ ছাড়া আর কিচু চাইলেননা যে, আমি যেন তার সন্ধান কাউকে না দিই। আমি আবেদন করলাম, আমাকে অভয়নামা লিখে দিন। তিনি আমের বিন ফুহায়রাকে (রা) হুকুম দিলেন এবং তিনি চামড়ার এক টুকরার উপরে লেখা (অভয়নামা) আমাকে দিলেন। হযরত আনাস বিন মালেক (রা) বলেন, সুরাকা আবেদন করে, হে আল্লাহর নবী! আপনি যা চান, সে হুকুম আমাকে করুন। হুযুর (স) বলেন, ব্যস নিজের জায়গায় থাক এবং আমাদের পর্যন্ত কাউকে পৌঁছতে দিওনা। এভাবে যে ব্যক্তি কয়েক মুহূর্ত পূর্বে জানের দুশমন ছিল, সে রক্ষক হয়ে গেল। ইবনে সা’দ বলেন, তারপর যে ব্যক্তিই হুযুরের (স) পেছনে পেছনে তার সন্ধানে আসতো সুরাকা বলতো, ফিরে যাও। আমি নিশ্চিত যে তিনি এদিকে নেই। আর তোমরা তো জান যে, আমি কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখি এবং গোয়েন্দাগিরিতে কতটা পাকাপোক্ত।

ইবনে ইসহাক ও মূসা বিন ওকবা সুরাকার এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যে, সুরাকা বলেন, যে লিখিত নিরাপত্তা আমি লাভ করেছিলাম- তা সংরক্ষণ করি এবং কয়েক বছর পর যখন রাসূলুল্লাহ (স) হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করে জে’রানায় অবস্থান করছিলেন, তখন আমি হুযুরের (স) খেদমতে হাযর হলাম এবং সে লেখাটা পেশ করে আরজ করলাম, আমি সুরাকা বিন জু’শুম এবং এ আপনার লিখিত আমলনামা বা অভয়নামা। তিনি বলল, আজ শপথ পূরণ করার এবং হক আদায় করার দিন। নিকটে এসো। আমি হুযুরের (স) নিকটে গেলাম এবং ইসলাম গ্রহণ করলাম। তাবারানী সুরাকার এ সমগ্র ঘটনার সংক্ষিপ্ত সার হযরত আসমা বিন্তে আবু বকর (রা) থেকে বর্ণনা করেন।

ইস্তিয়াবে ইবনে আবদুল বার এবং ইসাবায় ইবনে হাজার হযরত হাসানা বাসরীর মুরসাল রেওয়ায়েত হযরত মুফইয়ান বিন উরায়নার বরাতে উদ্ধৃত করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) এই হযরত সুরাকা বিন মালেকের সম্বোধন করে বলেন, সে কেমন সময় হবে যখন তুমি কিসরার বালা পরিধান করবে? এ এরশাদের কয়েক বছর পর যখন হযরত ওমরের (রা) নিকটে শাহ ইরানের বালা, তার কোমরপাট্টা এবং মুকুট আনা হলো তখন তিনি হযরত সুরাকাকে ডাকলেন এবং এসব তাকে পরিয়ে দিয়ে বললেন, হাত উঠাও এবং বল, প্রশংসা সেই খোদার- যিনি এসব জিনিস কিসরা বিন হুরমুয থেকে কেড়ে নিয়েছেন যে বলতো- আমি মানুষের রব এবং এসব জিনিস বনী মুদলেজের এক বেদুইন সুরাকা বিন মালেক বিন জু’শুমকে পরিয়ে দিয়েছেন। সুহায়লী রাওদুল উনুফে এ ঘটনার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। প্রবন্দের কলেবরে বৃদ্ধি অপ্রয়োজনীয় মনে করে তা পহিার করা হলো।

উম্মে মা’বাদের কাহিনী

কুদাইদ এলাকা অতিক্রম করেই এ মহান কাফেলাটি বনী খুযায়ার একটি স্ত্রীলোক উম্মে মা’বাদের বাসস্থানে গিয়ে পৌঁছে। কোন কোন গ্রন্হপ্রণেতা এ ঘটনাকে সুরাকার ঘটনার পূর্ববর্তী বলে উল্লেখ করেছেন এবং কেউ পরবর্তী। আমরা সুরাকার ঘটনাকে এজন্যে পূর্ববর্তী মনে করি যে- হযরত আবু বকর (রা) গুহা থেকে রওয়ানা হওয়ার পর পরবর্তী ঘটনাগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমেই এ ঘটনার উল্লেখ করেন। সম্ভবতঃ এ কারণেই হাফেজ ইবনুল কাইয়েম যাদুল মায়াদে এ ঘটনাকেই অগ্রবর্তী গণ করেছেন।

ইবনে খুযায়মা, হাকেম, বায়হাকী, বাগাবী, ইবনে আবদুল বার, তাবারানী, ইবনে সা’দ  প্রমুখ বিভিন্ন সনদে এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন এবং ইমাম বোখারী তাঁর ইতিহাসে স্বয়ং উম্মে মা’বাদের বরাত দিয়ে এ কথা সন্নিবেশিত করেছেন যে, যখন এ কাফেলা কুদাইদ অতিক্রম করছিল তখন পথে উম্মে মা’বাদের (আতেকা বিন্তে খালেদ) তাঁবুতে পৌঁছেন। খুযায়া গোত্রের একটি শাখা বনী কা’বের যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। উম্মে মা’বাদ একজন সম্ভ্রমশীলা বয়স্কা মহিলা ছিলেন। এদিক দিয়ে যারা ভ্রমণ করতো তাদের মেহমানদারী করতো এ পরিবার। রাসূলুল্লাহ (স) ও তাঁর সাথী যখন ওখানে পৌঁছলেন- তকন তিনি তাঁর তাঁবুর সামনে উঠানে বসেছিলেন। তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল এবং গোটা এলাকা দুর্দশাগ্রস্ত ছিল। আগন্তুকগণ, উম্মে মা’বাদকে বললেন, তোমার কাছে দুধ, গোশত অথবা খেজুর যাই থাক আমাদেরকে খেতে দাও। আমরা তার দাম দিয়ে দেব। তিনি বললেন, খোদার কসম, আমাদের কাছে কিচু থাকলে আপনাদের মেহমানদারী করতে মোটেই কুণ্ঠাবোধ করতামনা। এমন সময় তাঁবুর এক কাণায় একটি ছাগীর উর রাসূলুল্লাহর (স) নজর পড়লো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, মা’বাদের মা, এ বকরীটি কেমন? তিনি বললেন, এ বেচারী তার শীর্ণতা ও দুর্বলতার কারণে অন্যান্য ছাগলের সাথে চরতে যেতে পারেনি। হুযুর (স) জিজ্ঞেস করেন, এ কি কিছু দুধ দিতে পারে? তিনি বলেন, এ দুধ দেয়ার অবস্থা থেকে অনেক দুর্বল। হুযুর (স) বলেন, তুমি অনুমিত দিলে আমি তার দুধ দুইতে পারি। তিনি বললেন, আমার মা-বাপ আপনার জন্যে কুরবান, আপনি যদি তার কিছু দুধ বরে করতে পারেন তো অবশ্যই করুন। হুযুর (স) বকরীটি নিকটে আনিয়ে তার পা বাঁধলেন, তার স্তনে অথবা মতান্তরে তার পিঠে হাত বুলালেন এবং দোয়া করলেন, হে আল্লাহ! এ স্ত্রীলোকটির ছাগলগুরোতে বকরত দান কর। তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে দুধ দোয়া শুরু করেন। খোদার কি শান! বকরী তার ঠ্যাং ছড়িয়ে জাবর কাটতে থাকে। তার স্তন থেকে দুধ শ্রোতধারায় বেরুতে লাগলো। হুযুর (স) এমন বড়ো একটা পাত্র চাইলেন যা একটি দলের তৃপ্তিসহ পান করার মত দুধ ধারণ করতে পারে। তিনি দুধ দুয়ে চললেন এবং পাত্রটি কানায়-কানায় দুধে পূর্ণ হয়ে গেল। দুধের উপর ফেনা পড়লো, তিনি প্রথমে দুধ উম্মে মা’বাদকে তৃপ্তিসহকারে পান করালেন, সাথীগণ তৃপ্তিসহকারে পান করলেন এবং শেষে তিনি স্বয়ং পান করলেন। অতঃপর বললেন-  **************************

-যে অন্য লোককে পান করায় সে স্বয়ং শেষে পান করে।

তারপর তিনি দ্বিতীয় বার সে পাত্র দুধে পূর্ণ করে উম্মে মা’বাদকে দিয়ে বলেন, মা’বাদের বাপ এলে এ দুধ তাকে দেব।

উম্মে মা’বাদ হুযুরের (স) হুলিয়া শরীফ বয়ান করেন

অনতিবিলম্বে তাঁর স্বামী জীর্ণ শীর্ণ ছাগলের পাল নিয়ে বাসস্থানে ফিরে এলেন। পাত্র ভরা দুধ দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, মা’বাদের মা এ দুধ কোথা থেকে এলো? তিনি বললেন, খাদার কসম, এক মুবারক লোক এদিক দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন- তিনিই এসব করে গেছেন। তারপর তিনি স্বামীর কাছে সব ঘটনা বিবৃত করেন। স্বামী বলেন, তুমি তাঁর একটু হুলিয়া বয়ান করত শুনি। তিনি (উম্মে মাবাদ) বলতে থাকেন, আমি এমন ব্যক্তিকে দেখলাম যিনি বড়ো সুন্দর ছিলেন। মুখমন্ডল উজ্জ্বল, চরিত্র পাক  পবিত্র, দেহ না মোটা,  না পাতলা। সুন্দর ও হাসি খুশী। দুটি কালো চোখ, অক্ষিপক্ষ বা চোখর পাতার লোম দীর্ঘ, আওয়াজ উচ্চ কিন্তু কর্কশ নয়, চোখের  পুত্তলি কালো, অক্ষিগোলক সাদা, ভুরু দুটি না যুক্ত, না পৃথক, উভয়ের মাঝে সামান্য কেশ, চুল একেবারে কৃষ্ণবর্ণের, ঘাড় প্রশ্বস্ত, ঘনো দাড়ি, নীরব থাকলে মর্যাদা সম্পন্ন, কথ বললে আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো, কথাবার্তায় মনে হতো মণিমুক্তা ঝরে পড়ছে, কথা মিষ্টি ও সুস্পষ্ট, কথা কমও বলতেননা- বেশীও না, দূর থেকে তাঁর কথা শুনলে আওয়াজ খুব উচ্চ মনে হয় কিন্তু সন্তোষজনক। নিকট থেকে শুনলে মিষ্টি  মধুর ও সুরুচিপুর্ণ মনে হয়। দৈহিক গঠন মধ্যম ধরনের- খুব লম্বা চওড়াও নয়, আবার ছোটোখাটোও নয় সাথীদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন এবং সবচেয়ে বেশী মর্যাদাসম্পন্ন। সাথীগণ তাঁকে ঘিরে রেখেছিলেন। তাঁর কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তার হুকুম পালনে দৌড় দিতেন। সকলের খেদমতের পাত্র, প্রিয়, না খিটখিটে মেজাজী আর কর্কশভাষী।

আবু মা’বাদ এসব শুনে বললেন, খোদার কসম, ইনি তো সেই কুরাইশের লোক যাঁর উল্লেখ আমরা শুনে আসছি। তাঁর সাথে আমার দেখা হলে তাঁর সাথে যাওয়ার আবেদন জানাতাম। এমন সুযোগ পেলে অবশ্যই সে চেষ্টা করব- (বায়হাকী ও ইবনে সা’দ আবদুল মালেক বিন ওয়াহাব আল মাযজেহীর এ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন যে, তিনি বলেন, আমার নিকটে সংবাদ পৌঁছেছে যে আবু মা’বাদ মুসলমান হন এবং হিজরত করে নবীর (স) খেদমতে হাযির হন। হাফেজ আবু নুয়াইম আবদুল মালেকের যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন- তার মধ্যে অতিরিক্ত এ কথা আছে যে, উম্মে মা’য়াদও মুসলমান হন এবং হিজরত করে হুযুরের (স) খেদমতে পৌঁছেন)।

মদীনায় হুযুরের (স) আগমন প্রতীক্ষা

রাসূলুল্লাহর (স) মক্কা থেকে বের হওয়ার খরব মদীনায় পৌঁছে গিয়েছিল। বোখারী- বাবুল হিজরতে যুহরী বিন ওরওয়া বিন যুবাইরের সনদে এ বর্ণনা করা হয়েছে। ইবনে ইসহাকও একথা উদ্ধৃত করেছেন। হাকেম ও মূসা বিন ওকবা ব্যাখ্যা করেছেন যে এ ঘটনা হযরত ওরওয়া (রা) স্বয়ং তাঁর সম্মানিত পিতা হযরত যুবাইর বিন আল আওয়াম (রা) এর মুখে শুনেছেন যে মুসলমান রোজ সকালবেলা বেরিয়ে মক্কার পথে বসে পড়নে এবং রোধে উত্তাপ অসহ্য না হওয়া পর্যন্ত বসে থাকার পর বাড়ি ফিরতেন। ইবনে সা’দ ওয়াকেদীর বরাতে বলেন, হুযুরের (স) আগমনে বিলম্ব হওয়াতে মুহাজেরগণ পেরেশান থাকতেন। প্রতিদিন আনসার ও মুহাজেরীন হাররাতুল আসাবায় [ভুগর্ভ থেকে গলিত পদার্থ উদগীরণের ফলে বিরাট প্রস্তরখন্ড জ্বলে পুড়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করলে তাকে ‘হাররা’ বলে। মদীনার চতুষ্পার্শে এ ধরনের বিরাট পাথর পাওয়া যায়। ‘হাররাতুল আসাবা’ সে পাথরখন্ডের নাম যা কুবার বাইরে মক্কার পথে পাওয়া যায়। তাকে খাররা কুবাও বলে-গ্রন্হকার।] গিয়ে বসতেন এবং সূর্য তাপ প্রকর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। ইবনে জারীর ও ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে আবদুর রহমান বিন উয়াইম বিন সায়েদার এ বয়ান উদ্ধৃত করেন যে, আমকে আমার কওমের বিভিন্ন সাহাবা বলেছেন যে, হুযুরের (স) মক্কা থেকে বেরুবার সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা তাঁর আগমনের প্রতীক্ষা করতে থাকলাম। গরমের সময় ছিল। সে জন্যে সূর্যের উত্তাপ তীব্রতর হলে এবং কোথাও ছায়া না থাকলে দুপুরের মধ্যে বাড়ি ফিরতাম। বাযযার হযরত ওমর (রা) থেকেও এরূপ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন।

এটা তারই বড় নিদর্শন যে, রাসূল (স) তাঁর প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে একজন আশ্রয় প্রার্থীর মতো কোনো নতুন জায়গায় যাচ্ছিলেননা। বরঞ্চ আল্লাহর অনুগ্রহে তিনি হিজরতের জন্যে এমন স্থান লাভ করেছিলেন যেখানকার লোকেরা তাঁর আগমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকতে ব্যাকুল ছিল।

হুযুরের (স) কুবায় পৌঁছানো

দুপুরের সময় ছিল এবং লোক হুযুরের (স) প্রতীক্ষায় থাকার পর বাড়ি চলে গিয়েছিল। এমন সময় তিনি তাঁর সাথীগণসহ কুবায় পৌঁছেন। মদীনার পার্শ্ববর্তী বস্তিগুলোর মধ্যে কুবা ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। কুবায় হুযুরের (স) আগমন সম্পর্কে দুটি বর্ণনা আছে যা প্রকাশ্যতঃ পরস্পর বিরোধী মনে হয়, একটি বর্ণনা এমন যে, হুযুর (স) হাররায়ে কুবার নিকটে পৌঁছে তার একধারে নেমে পড়েন। তারপর আনসারকে সংবাদ দেয়ার জন্যে একজনকে পাঠানো হয়। খবর পাওয়া মাত্র লোক এসে হুযুর (স) ও হযরত আবু বকরকে (রা) সালাম দিয়ে বললেন, আপনি নিশ্চিন্ত মনে তশরিফ আনুন, আমরা আপনার অনুগত। এ বোখারীতে হযরত আনাসের (রা) বর্ণনা এবং ইবনে সা’দও একে তাঁর বরাত দিয়েই উদ্ধৃত করেছেন। মুসনাদে আহমদ ও বায়হাকীতে হযরত আনাসের (রা) যে বর্ণনা এসেছে, তাতে অতিরিক্ত একথা আছে যে, হুযুরের (স) আগমন সংবাদ শুনা মাত্র ৫০০ লোক সংবর্ধনার জন্যে দৌড় দেন।

অন্য একটি বর্ণনা এরূপ আছে  যে, হুযুর (স) কুবার নিকটে পৌঁছার পর একজন ইহুদী, যে কোন কাজের জন্যে তার ক্ষুদ্র দুর্গের উপর উঠেছিল, হুযুরকে (স) আসতে দেখে উচ্চস্বরে বলল, হে বনী কায়লা এই যে, তোমাদের সর্দার এসে পৌঁছেছেন। [আউস এবং খাযরাজ যেহেতু একই মায়ের সন্তান ছিল যার নাম ছিল কায়লা। এ জন্যে তাদেরকে বনী কায়লা বলা হতো। ইহুদীর এ ঘোষণা- “তোমাদের সর্দার এসে পৌঁছেছেন”- একথা সুস্পষ্ট করে দেয়া যে, মদীনার মুমেন, মুশরিক, ইহুদী সবাই পূর্ব থেকেই জানতো যে, রাসূলুল্লাহ (স) আশ্রয় প্রার্থী হিসাবে নয়, বরঞ্চ মদীনার আনসারদের নেতা ও শক্তিশালী শাসক হিসাবে আগমন করছেন। ইহুদীর এ ঘোষণা বিভিন্ন বর্ণনাকারী বিভিন্ন শব্দ প্রয়োসে উদ্ধৃত করেছেন। আমরা মুধু একটি বর্ণনার শব্দাবলী গ্রহণ করেছি। কারণ সব উদ্ধৃতি দিয়ে প্রবন্ধ দীর্ঘায়িত করে লাভ নেই- (গ্রন্হকার)।] এ কথা শুনা মাত্র কুবায় বসবাসকারী বনী আমর বিন আওফ সমস্বরে- না’রায়ে তাকবীর বুলন্দ করে এবং অস্ত্রসজ্জিত হয়ে- হুযুরের (স) সাদর অভ্যর্থনার জন্যে এগিয়ে চলে। ওদিকে রাসূলুল্লাহ (স) ও হযরত আবু বকর (রা) আপন আপন সওয়ারী থেকে নেমে একটি খেজুর গাছের ছায়ায় অবস্থঅন করছিলেন। আনসারের বিরাট ভিড় প্রচন্ড আবেগ-উদ্দীপনা সহ হুযুরের ৰঅবতরণস্থলে গিয়ে হাযির হয়। অদম্য ভাবাবেগে লোক গায়ের উপর এসে পড়ছিল। কিন্তু তাঁরা জানতেননা যে এ দু’জনের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স) কে ছিলেন। এজন্যে প্রথমে তো তারা হযরত আবু বকরকে (রা) সালাম করতে থাকে। কিন্তু যখন হুযুরের ( স) গায়ে রোদ এসে লাগছিল, তখন আবু বকর (রা) উঠে তাঁর চাদর দিয়ে হুযুরের (স) ছায়া করলেন।  তখন লোক জানতে পারলেন হুযুর (স) কোন ব্যক্তি। তখন সকলে তাঁকে সালাম করতে লাগলেন। এ বর্ণনা বোখারী হযরত ওরওয়া বিন যুবাইর থেকে, মুহাম্মদ বিন ইসহাক আবদুর রহমান বিন ওয়াইম বিন সায়েদা থেকে এবং ইবনে সা’দ ওয়াকেদী থেকে উদ্ধৃত করেন। হাকেম, মূসা বিন ওকবা, ইবনে জারীর তাবারী, বালাযুরী প্রমুখ সবাই এ ঘটনা বয়ান করেন।

এ দুটি বর্ণনায় দৃশ্যতঃ যে মতভেদ দেখা যায় তা প্রকৃতপক্ষে কোন মতভেদ নয়। মনে হয় যে একদিকে হুযুর (স) ওখানে পৌঁছার পর সম্ভবতঃ আমের বিন ফুহায়রা অথবা আবদুল্লাহ বিন উরায়কেতকে তাঁর আগমনের খবর দেয়ার জন্যে পাঠিয়ে থাকবেন এবং অপরদিকে তাঁকে দেখে ইহুদীও চিৎকার করে বলে থাকবে যে তিনি এসেছেন।

কুবা পৌঁছার তারিখ

হুযুরের (স) কুবা পৌঁছার তারিখ নিয়ে রাবীগণের বহু মতভেদ আছে। ইবনে সা’দ এক স্থানে সোমবার দিন এবং দুসরা রবিউল আউয়াল উল্লেখ করেছেন। অন্যত্র তিনি গারে সওর থেকে বেরুবার তারিখ ৪ঠা রবিউল আউয়াল এবং মদীনা পৌঁছার তারিখ নিশ্চয়তার সাথে ১২ই রবিউল আউয়াল বলেছেন। বোখারীতে ওরওয়া বিন যুবাইরের বর্ণনায় তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে সোমবার দিন এবং রবিউল আউয়াল মাস। মূসা বিন ওকবা ইমাম যুহরীর বরাত দিয়ে ১লা রবিউল আউয়াল কুবা পৌঁছার তারিখ বলেছেন। অথচ রাবীগণের অধিকাংশ তাকে মক্কা থেকে বেরুবার তারিখ বলেছেন। ইবনে ইসহাক থেকে জারীর  বন হাযেমের বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, হুযুর (স) দুসরা রবিউল আউয়াল কুবায় পৌঁছেন। কিন্তু তাবারানী আসেম বিন আদী এবং ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর ও ইব্রাহীম বিন সা’দ ইবনে ইসহাকের যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তাতে ১২ই রবিউল আউয়াল বলা হয়েছে। বালাযুরী ও ইবনে কুতায়বা বলেন, এটাই সঠিক তারিখ। ইবনুল কাইয়েম যাদুল মায়াদে ও ইবনে আবদুল বার আদ্দুরারেও এই তারিখ উল্লেখ করেছেন। কোন কোন বর্ণনায় ৮, ১৩, ও ১৫ই রবিউল আউয়াল বলা হয়েছে। কিন্তু সঠিক ও নির্ভরযোগ্য কথা এই যে, হুযুর (স) পয়লা রবিউল আউয়াল মক্কা থেকে বেরিয়ে পারে সওরে যান। তিনদিন তিনরাত সেখানে অবস্থান করেন এবং ৪ঠা রবিউল আউয়াল শেষ রাতে মদীনা রওয়ানা হন। ১২ই রবিউল আওয়াল মদীনায় (কুবায়) পৌঁছেন। [প্রকাশ থাকে যে, চন্দ্র মাসের হিসাবে রাত দিনের পূর্বে হয় এবং সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর নতুন তারিখ শুরু হয়। এ জন্যে ১লা রবিউল আউয়ারের রাতের অর্থ দিনের আগের রাত, দিন শেষে রাত নয়। উপরন্তু এটা জানা দরকার যে, হযরত ওমরের (রা) খেলাফত কালে হিজরী তারিখের সূচনা করা হয়- তখন তা হিজরতের দিন থেকে করা হয়নি। বরঞ্চ পয়লা মহররম (১৬ ই জুলাই, ৬২২ খৃঃ) থেকে সূচনা করা হয়। হিজরত হিজরী সনের তৃতীয় মাসে হয়েছিল। -(গ্রন্হকার।)] সৌর মাসও বছর হিসেবে ২৪শে সেপ্টেম্বর, ৬২২ খৃঃ।

কুবায় অবস্থান

এ কথা সর্বসম্মত যে –কুবায় হুযুরের (স) অবস্থান আউস গোত্রের শাখা বনী আমর বিন আওফের বস্তিতে ছিল। এও প্রমাণিত যে ওখানে তাঁর মেহমানদারীর সৌভাগ্য লাভ করেন কুলসুম বিন হিদাম।[ইনি একজন বয়োবৃদ্ধ বুযুর্গ ছিলেন। হুযুরের তশরিফ আনয়নের অল্পদিন পর তার ইন্তেকাল হয়। জানিনা এ কথা কিভাবে কোন কোন বর্ণনায় এলো যে- হুযুরের (স) অবস্থানকালে তিনি মুশরিক ছিলেন। ইবনে আবদুল বার ইন্তিয়াবে এবং ইবনে হাজার ইসাবায় সুস্পষ্ট করে বলেছেন যে, হিজরতের পূর্বে তিনি মুসলমান হন।– (গ্রন্হকার।)] কিন্তু হুযুর (স) তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্যে হযরত সা’দ বিন খায়সামার বাড়ি থাকতেন। কারণ তাঁর ছেলেমেয় ছিলনা এবং সমস্ত বাড়ি পুরুষদের জন্যে মুক্ত ছিল। এর ভিত্তিতে লোকের মধ্যে একথা সুবিদিত হয়ে পড়ে যে হুযুর (স) সাদের বাড়িতে অবস্থার করেছেন। বালাযুরী ফতহুল বুলদানেও একথা বিশদভাবে লিখেছেন। তিনি  বলেছেন, আমি হাদীস, সীরাত এবং যুদ্ধবিগ্রহাদির জ্ঞানসম্পন্ন একদল লোকের কাছে একথা শুনেছি।

এখানে অবস্থানকালে হুযুর (স) কুবা মসজিদ নির্মাণ করেন। ইমাম বোখারী হযরত ওরওয়া বিন যুবাইর (রা) থেকে এবং ইবনে হিশাম ও ইবনে জারীর মুহাম্মদ বিন ইসহাক থেকে একথা উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে জারীর এ সম্পর্কে ইবনে ইসহাকে গোটা সনদ সন্নিবেশিত করেন যার থেকে জানা যায় যে, এ প্রকৃতপক্ষে হযরত আলীর (রা) বর্ণনা। হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, এ ছিল প্রথম মসজিদ যা ইসলামী যুগে নির্মাণ করা হয় এবং এ ছিল প্রথম মসজিদ যার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স) সাহাবীগণসহ প্রকাশ্যে জামায়াতে নামায পড়ান।[মসজিদে কুবা এখনও মদীনার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। তার কেবলা সংলগ্ন যেস্থানে এখন মকামুল ওমরা নামে একটি কুবরা আছে এখানে হযরত কুলসুম বিন হিদমের বাড়ি ছিল। তার নিকটে দ্বিতীয় কুবারা যা মসজিদ সংলগ্ন এবং বায়তে ফাতেমা নামে খ্যাত তা ছিল হযরত সা’দ বিন খায়সামার বাড়ি-গ্রন্হকার।]

এ সময়ে হযরত আলী (রা) মক্কা থেকে হুযুরের (স) খেদমতে পৌঁছেন। তাঁর সাথে তিনি কুলসূম বিন হিদমের ওখানেই অবস্থঅন করেন। ইবনে হিশাম ও ইবনে জারীর মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, তিনি তিন দিন মক্কায় অবস্থান করেন এবং মক্কাবাসীদের সেসব আমানত ফেরৎ দেন যা তার হুযুরের (স) নিকটে রেখেছিল। তারপর তিনি সেখান থেকে হিজরত করেন। এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে যে, কুবায় হুযুর (স) কতদিন ছিলেন। বোখারী, মুসলিম ও ইবনে সাদে হযরত আনাস বিন মালেকের (রা) বর্ণনা আছে যে, তিনি সেখানে ১৪ দিন ছিলেন। ওয়াকেদীও ১৪ দিনের কথা বলেন। হযরত আয়েশা (রা) এবং ওরওয়া বিন যুবাইর (রা) থেকে কথিত আছে যে, হুযুর (স) ১০ দিন পর আরও কিছুদিন ছিলেন। বনী আমর বিন আওফের কেউ কেউ বলেন, হুযুর (স) সেখানে ১৮ দিন ছিলেন। ইমাম যুহরী এবং মুজাম্মে বিন ইয়াযিদ বিন হারেসা থেকে মূসা বিন ওকবা বর্ণনা করেন যে, হুযুর (স) সেখানে ২২ দিন ছিলেন আর এটাই ছিল যুবাইর বিন বাক্কারের বর্ণনা যার তিনি বনী আমর বিন আওফের বিভিন্ন লোকের কাছে শুনেছেন। বালাযুরী ২৩ দিনেরও এক বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু ইবনে সা’দ, ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর, বালাযুরী ও ইবনে হিব্বান নিশ্চয়তার সাথে বলেছেন যে, হুযুর (স) কুবায় সোম, মংগল, বুধ ও বৃহস্পতি অবস্থান করেন এবং জুমার দিন সেখান থেকে মদীনা রওয়ানা হন। এ বক্তব্যই মাগাযী ও সিয়ারের আলেমগণের নিকটে সুবিদিত। যদিও ইবনে হিব্বান কুবায় হুযুরের (স) অবস্থান তিনদিন বলেছেন এবং মূসা বিন ওকবাও একথা বলেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁরা হুযুরের (স) কুবায় পৌঁছার এবং  কুবা থেকে রওয়ানার দিন অবস্থানের দিনগুলোর মধ্যে ধরেননি। এ জন্যে তাঁদের বক্তব্যও মশহুর বক্তব্যের অনুরূপ।

কুবা থেকে রওয়ানা এবং প্রথম জুমার নামায

ইবনে হিশামও ইবনে ইসহাকের বর্ণনা উদ্ধৃত করেন এবং ইবনে সা’দ ও বালাযুরীর বর্ণনাও তাই যে, হুযুর (স) জুমার দিন কিছুটা বেলা হলে কুবা থেকে রওয়ানা হন। বনী সালেম বিন আওফের বস্তিতে পৌঁছতেই জুমার নামাযের সময় হয়ে যায়। সেখানে তিনি নেমে পড়েন এবং তাদের মসজিদে জুমা পড়িয়ে দেন ১০০ লোক এতে শরীক হয় এবং এ ছিল প্রথম জুমা যা হুযুরের (স) ইমামতিতে পড়া হয়। বনী সালেমের এ মসজিদ রানুনা প্রান্তরে ছিল [ইয়াকুত মু’জামুল বুলদানে রানুনা’ শব্দের নীচে লিখেছেন, রানুনা প্রান্তরে- মসজিদে উল্লেখ ইবনে ইসহাকের সীরাতের সে সারাংশে আছে যা ইবনে হিশাম লিখেছেন, অন্যথায় অন্যান্য সকলে লিখেছেন, হুযুর (স) বনী সালেমের বস্তিতে জুমার নামায আদায় করেন- গ্রন্হকার।] এবং প্রথম তাকে মসজিদে খুবাইব বলা হতো। হুযুরের (স) ওখানে জুমা পড়াবার পর তা জুমা সমজিদ নানে অভিহিত হয় এবং আজ পর্যন্ত সে নামেই সুবিদিত। মদীনা থেকে কুবা যাবার পথে এ রাস্তার বাম ধারে পড়ে।

এ জুমার হুযুর (স) যে খোৎবা দিয়েছিলেন তা সাঈদ বিন আবদুর রহমান আল জমহীর বরাত দিয়ে ইবনে জারীর তাবারী তাঁর ইতিহাসে প্রতিটি শব্দসহ সন্নিবেশিত করেছেন। কিন্তু তাতে কুরআনের এমন সব আয়াত পাওয়া যায় যা হিজরতের পর নাযিল হয়। এ জন্যে সন্দেহ হয় যে- হুযুরের (স) প্রতি যে ভাষণ আরোপ করা হয়- তা সঠিক শব্দাবলীসহ উদ্ধৃত করা হয়েছে কিনা।

মদীনায় প্রবেশ

জুমার নামাযের পর হুযুর (স) যখন মদীনা যাবার জন্যে তৈরী হন তখন হযরত ইতবান বিন মালেক (রা) ও হযরত আব্বাস বিন উবাদাহ নাদলীর নেতৃত্বে জনতা হুযুরের (স) সামনে আাসে এবং উটনীর নাকল ধরে তাঁরা আরজ করেন- হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের এখানে অবস্থান করুন। আমরা সংখ্যায়ও যথেষ্ট, যুদ্ধের সরঞ্জামও রাখি এবং প্রতিরক্ষার শক্তিও। হুযুর (স) বলেন, আমার উটনীর পথ ছেড়ে দাও। কারণ সে আদিষ্ট। অর্থাৎ এ আল্লাহর হুকুমে চলছে। সে সে স্থানেই থামবে- যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে থামার হুকুম হবে। সামনে অগ্রসর হলেন তো, বনী বায়াদা, বনী সায়েদা, বনী আল হারেস, বনী আদী বিন নাজ্জারের মহল্লা পথে পড়লো। প্রত্যেক স্থানে এসব গোত্রের লোক তাঁদের সর্দারদের নেতৃত্বে সামনে এসে সেখানে অবস্থানের অনুরোধ জানায়। হুযুর (স) তাঁদের সবাইকে এ জবাবই দিতেন- আমার উটনীর পথ ছেড়ে দাও। কারণ সে আদিষ্ট। তিনি তাঁর উটনীর নাকল ঢিলা করে রেখেছিলেন এবং সে কোথায় যাবে, কোথায় দাঁড়াবে এ জন্যে সামান্যতম ইংগিতও তিনি করতেননা। যখন সে বনী মালেক বিন নাজ্জারের [এ সেই পরিবার- যার এক মহিলা- সালমা বিন্তে আমরের সাথে হুযুরের (স) পরদাদা হাশেমের বিয়ে হয়। আবদুল মুত্তালেব তাঁর গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেন। এ পরিবারেই আবদুল মুত্তালিব যৌবনকাল পর্যন্ত পালিত- বর্ধিত হন। এ পরিবারের লোকেরা সে সময়ে আবদুল মুত্তালেবের সাহয্যে মক্কায় পৌঁছেন- যখান তাঁর চাচা তাঁর উত্তরাধিকার হস্তগত করেন। এ পরিবারের সাথে হুযুরের (স) পরিবারের এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যে, তাঁর পিতা জনাব আবদুল্লাহ তাঁর জীবনের শেষ ভাগে এখানেই অতিবাহিত করেন। এখানেই তাঁকে কবরস্থ করা হয়। হুযুরের (স) মা তাঁকে তাঁর শৈশব অবস্থায় তাঁদেরকে দেকাবার জন্যে মদীনা নিয়ে যান- গ্রন্হকার।] মহল্লায় পৌঁছে তো ঠিক সে স্থানে গিয়ে বসে পড়ে আজ যেখানে মসজিদে নববী- মতান্তরে রাসূলের মিম্বার রয়েছে। হুযুরের (স) তার পিঠে বসেই ছিলেন। সে উঠে পড়ে কিছুদূর চলার পর ফিরে এসে ঠিক ঐ স্থানেই বসে পড়ে এবং বিশ্রামের জন্যে গা এলিয়ে দেয়, তখন হুযুর (স) তার পিঠ থেকে নেমে পড়েন।[এতে আল্লাহ তায়ালার বিরাট হিকমত এ ছিল যে,তিনি হুযুরের থাকার স্থান বেছে নেয়ার দায়িত্ব স্বয়ং হুযুরের উপর দেননি, বরঞ্চ তাঁর হুকুমে এ খেদমত উটনী থেকে নেন। হুযুর (স ) নিজের পছন্দমত থাকার স্থান বেছে নিলে আনসারের অন্যান্য গোত্রের মধ্যে এ অনুভূতি সৃষ্টি হতো যে, তিনি বনী  নাজ্জারকে অন্যান্যদের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন- গ্রন্হকার।] এ ইবনে ইসহাকের বর্ণনা ইবনে হিশাম বিশদভাবে এবং ইবনে জারীর সংক্ষেপে উদ্ধৃত করেছেন। ইবনে সা’দ ও বালাযুরীও সংক্ষেপে বয়ান করেছেন।

হযরত আবু আইয়ুবের বাড়ি অবস্থান

পরবর্তী বিবরণে কিছু মতভেদ আছে। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আছে যে, যখন হুযুর (স) উটনী থেকে নামলেন তো সামনেই হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা)- (খারেদ বিন যায়েদ) বাড়ি ছিল। তিনি হাযির হন এবং হুযুরের (স) জিনিসপত্র নামিয়ে নিয়ে নিজের বাড়ি নিয়ে যান। হুযুর (স) তাঁর ওখানেই অবস্থান করেন।

বোখারী ও মুসনাদে আহমদে আছে যে, হুযুর (স) উটনী থেকে নেমে জিজ্ঞেস করেন- আমাদের লোকের মধ্যে কার বাড়ি সবচেয়ে নিকটে। হযরত আবু আইয়ূব (রা) বলেন- আমার, হে আল্লাহর রাসূল। এই যে সামনে আমার বাড়ি এবং এ আামার দরজা। হুযুর (স) বলেন, যাও এবং আামার বিশ্রামের ব্যবস্থা কর।

ইবনে সা’দও হযরত আনাসের (রা) বরাত দিয়ে এ কথা বলেছেন। ওয়াকেদীর বরাত দিয়ে ইবনে সা’দও বালাযুরী অতিরিক্ত এ কথা বলেন যে, হযরত আসয়াদ বিন যুরারা হুযুরের উটনী তার বাড়িতে নিয়ে দেখাশুনা করতে থাকেন।

কোন কোন বর্ণনায় আছে, হুযুর (স) উটনী থেকে নেমে বলেন-

******************************************

-আল্লাহ চাইলে এই থাকার স্থান। আবু আইয়ুব (রা) এসে আরজ করেন, আমা বাড়ি সবচেয়ে নিকটে। অনুমতি দিলে আমি আপনার জিনিসপত্র আমার বাড়ি নিয়ে যাই। হুযুর (স) অনুমতি দেন এবং তিনি জিনিপত্র তুলে নিয়ে যান। তাবারানী আবদুল্লাহ বিন যুবাইর থেকে এ কথাই বলেছেন।

বোখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমদে হযরত বারা বিন আযেবের (রা) এ বর্ণনা আছে যে, হুযুর (স) কোথায় থাকবেন এ নিয়ে লোকের মধ্যে ঝগড়া হয়। শেষে হুযুর (স) বলেন, আমি ব্নী নাজ্জারের ওখানে থাকব যা আবদুল মুত্তালিবের নানার পরিবার। হাফেজ ইবনে হাজার ইসাবায় মুসনাদে আহমদের বরাতে স্বয়ং আবু আইয়ূবের এ বয়ান উদ্ধৃত করেন যে- এ নিয়ে যখন আনসারের মধ্যে ঝগড়া বেড়ে যায়, তখন অবশেষে লটারী করা হলো এবং তাতে আবু আইয়ুবের (রা) নাম উঠলো।

এসব বিভিন্ন ধরনের বর্ণনা দেখে এমন মনে হয় যে, প্রথমে তো হুযুর (স) আবু আইয়ুবের (রা) ওখানে নেমে থাকবেন এর পরে অন্যান্য গোত্রের লোক এ অভিলাষ ব্যক্ত করে থাকবে- যে এ মর্যাদা লাভে তারাও অংশীদার হোক। এর ফলে ভাগ্য পরীক্ষার (লটারীর) প্রয়োজন দেখা দেয়। আর হুযুর (স) এ বলে লোকদেরকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন যে, ঐ পরিবরের প্রথম থেকেই তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল এবং আরববাসী আত্মীয়তার অধিকারকে অগ্রাধিকার দিত।[হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা) এ বাড়ি এখানো মসজিদে নববীর দক্ষিণ পূর্ব দিকে বিদ্যমান এবং তার সন্নিকট ‘বাবে জাফর সাদেক’ আছে সেখানে এখন মসজিদে নববীর ইমাম এ খতিব থাকেন-গ্রন্হকার।]

ইমাম আবু ইউসূফ কিতাবুযু যিকির ওয়াদ্দোয়াতে হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যাতে আবু আইয়ুব বলেছেন, হুযুর (স) যখন আর এখানে নামলেন তো তিনি নীচ তলায় রইলেন এবং আমি ও আইয়ুবের মা উপর তলায় রইলাম। রাতে আমি আইয়ুবের মাকে বল্লাম, হুযুর (স) উপর তলায় থাকার বেশী হকদার। কারণ তাঁর কাছে ফেরেশতাগণ আসেন এবং তাঁর উপর অহী নাযিল হয়। এ চিন্তায় আমি ও আইয়ুবের মা রাতে ঘুমোতে পারিনি। সকালে হুযুরের (স) কাছে সব কথা বল্লাম। তিনি বললেন, নীচ তলা আমার জন্যে আরামপ্রদ। আমি বল্লাম, কসম সেই সত্তার- যিনি আপনাকে হকসহ পাঠিয়েছেন। আমি এমন দালান বাড়িতে থাকতে পারিনা যার নীচ তলায় আপনি থাকেন। আমি এমন কাকুতি মিনিতি করলাম যে- তিনি উপর তলায় থাকতে রাজী হলেন।

ইবনে হিশাম মুহাম্মদ বিন ইসহাক থেকে হযরত আবু আইয়ুবের যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন তা এর চেয়ে একটু ভিন্ন ধরনের। তাতে এ কথা আছে যে- হুযুর (স) নীচ তলা এ জন্যে পছন্দ করেন যে,  তা সাক্ষাৎকারীদের জন্যে বেশী সুবিধাজনক। এ জন্যে আবু আইয়ুব (রা) অনিচ্ছা সত্ত্বেও উপর তলায় থাকতে রাজী হন। কিন্তু একদিন এমন হলো যে, উপর তলায় একটি  পানির পাত্র ভেঙে যায়। হযরত আবু আইয়ুব (রা) আশংকা করেন যে, হয়তো পানি গড়ে নীচে পড়লে হুযুরের কষ্ট হবে। এ জন্যে দুই মিয়া-বিবির জন্যে যে একটি মাত্র লেপ ছিল তা পানির উপর ফেলে দিয়ে তা শুকিয়ে ফেলেন। বায়হাকী এবং ইবনে আবি শায়বাও হযরত আবু আইয়ুব (রা) থেকে এ ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করেছেন।

ইবনে সা’দ হযরত যায়েদ বিন সাবেত (রা)- এর বরাত দিয়ে বলেন, হযরত আবু আইয়ুবের ওখানে হুযুরের (স) অবস্থানকালে এমন দিন যায়নি যেদিন তিন চার বাড়ির লোক তাঁর দরজার সামনে খাবার জিনিসপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়নি।

মদীনায় হুযুরের (স) সংবর্ধনা

যদিও উপরের বর্ণনায় একথা ভালোভাবে অনুমান করা যায় যে- মদীনাবাসীগণ কেমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে হুযুরকে (স) মাথায় তুলে নিয়েছিল, কিন্তু শহরে তাঁর সংবর্ধনা যে উৎসাহ উদ্যম ও গভীর ভক্তি শ্রদ্ধাসহকারে করা হয় তা ছিল নজীরবিহীন। আরবে এ ধরনের সংবর্ধনা না অতীতে কখনো হয়েছে না পরবর্তীকালে। বোখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমদে বারা বিন আযেবের মধ্যস্থতায় হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা) এরূপ বর্ণনা আছে। তিনি বলেন, আমরা যখন মদীনা পৌঁছলাম তখন দেখলাম- জনতা আমাদের সংবর্ধনার জন্যে রাজপথে বেরিয়ে পড়েছে। ছাদের উপর মানুষের প্রচন্ড ভিড়। খাদেম ও বালকেরা রাস্তায় আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে দৌঁড়াদৌড়ি করছিল এবং স্লোগান দিচ্ছিল- আল্লাহু আকবার, রাসূলুল্লাহ (স) তশরিফ এনেছেন, মুহাম্মদ (স) তশরিফ এনেছেন। বোখারীতে হযরত আনাস বিন মালেকের (রা) বর্ণনা আছে যে, হুযুর (স) এবং হযরত আবু বকরকে (রা) সশস্ত্র জনতা ঘিরে রেখেছিল। উঁচু জায়গায় উঠে মানুষ হুযুরকে (স) দেখার চেষ্টা করছিল এবং সমগ্র শহরে এসেছেন নবীউল্লাহ- এসেছেন রাসূলুল্লাহ- ধ্বনি গুঞ্জরিত হচ্ছিল। তাবকাতে ইবনে সাদে হযতর আনাসের (রা) বর্ণনায় যে  শব্দাবলী পাওয়া যায় তাতে তিনি বলেন, আমি কখনো এমন উজ্জ্বল ও মর্যাদাপূর্ণ দিন দেখিনি। মুসনাদে আহমদে হযরত আনাসের (রা) বর্ণনা এরূপ-মদীনাবাসী সংবর্ধনার জন্যে প্রচন্ড উৎসাহ-উদ্দীপনাসহ বেরিয়ে এসেছিল, মহিলাগণ ছাদের উপর সমবতে হন এবং তাঁরা লোকের কাছে জিজ্ঞেস করছিলেন, এ দু’জনের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (স) কে? এমন দৃশ্য আমরা কখনো দেখিনি। অনুরূপ বর্ণনা হযরত আনাস (রা) থেকে দারেমী, তিরমিযি, ইবনে মাজা, আবু দাউদ ও বায়হাকীতে উদ্ধৃত করা হয়েছে। বোখারীতে বারা বনি আযেবের (রা) বর্ণনা আছে যাতে তিনি বলেন, আমি মদীনাবাসীকে কখনো এমন আনন্দিত দেখিনি- যেমনটি দেখেছিলাম- হুযুরের (স) মদীনা আগমনের দিন।

বায়হাকী দালায়েলে, মু’জামুল কাবীর প্রণেতা আবূ বকর আল মুকরী কিতাবুশ মামায়েলে এ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন যে, মহিলাগণ ছাদের উপর উঠে এ গীত গাইছিলেনঃ

*************************************************

*************************************************

-আমাদের উপর পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে ওয়াদীর পাহাড়ী পথ থেকে, শোকর করা আমাদের ওয়াজেব যতোক্ষণ আল্লাহকে ডাকার লোক বাকী থাকবে।

রাযীন এর সাথে আর একটি কবিতা যোগ করেছেন-

*******************************************

-হে আমাদের মধ্যে আগত মাবউস! তুমি এমন পদমর্যাদা নিয়ে এসেছ যার আনুগত্য করা আমাদের জন্যে ওয়াজেব।

ইবনুল কাইয়েম- যাদুল  মায়াদে এ বর্ণনাকে এর ভিত্তিতে নাকচ করেন যে, সানিয়্যাতুল ওয়দা- শামের দিকে ছিল- না তার বিপরীত মক্কার দিক। আর কবিতাগুলো মেয়রা তখন গেয়েছিলেন যখন হুযুর (স) তবুক থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছিলেন। বোখারী, আবু দাউদ ও তিরমিযিতে এরূপ বলা হয়েছে। অথচ এ অসম্ভব কিছু নয় এবং বিবেক বিরুদ্ধও নয় যে, মক্কামুখী মুসাফিরগকে যে পাহাড়ী পথ পর্যন্ত বিদায় দেয়ার জন্যে মদীনাবাসী যেতো তাকেও ************************** বলা হতো। সানিয়্যা ********** তো প্রত্যেক সে পথকে বলে যা পাহাড়গুলোর ভেতর দিয়ে গেছে এবং কোন পথকে ‘সানিয়্যাতুল ওয়াদা’ বলার অর্থ পাহাড়ী পথ যার উপর দিয়ে অতিক্রমকারীদের বিদায় দেয়া হয়।

হুযুর (স) যখন বনী নাজ্জারের মহল্লায় পৌছেন তখন বালিকারা দফ বাজাতে বাজাতে বেরিয়ে আসে এবং এ গান গায়ঃ

***********************************************

-আমরা বনী নাজ্জারের মেয়েরা, কত ভালো প্রতিবেশী মুহাম্মদ (স)! এ কথাগুলো হাকেম ও বায়হাকী হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। হুযুর (স) মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি আমাকে ভালোবাস? তারা বলে, হ্যাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! হুযুর (স) তিনবার বলেন, খোদার কসম, আমি তোমাদেরকে অর্থাৎ আনসারকে ভালোবাসি।

“তাবারানী- মু’জামুস সাগীরে’ হুযুরের (স) এ শব্দগুলি উদ্ধৃত করেছেন। আল্লাহ জানেন যে- আমার মন তোমাদেরকে ভালোবাসে”।

বায়হাকী এবং ইবনে মাজাও একথা হযরত আনাস (রা) থেকে  উদ্ধৃত করেছেন। বোখারীতে হযরত আনাসের (রা) এরূপ বর্ণনা আছে, হুযুর (স) মেয়েদের ও মহিলাদের আসতে দেখে দাঁড়িয়ে যান এবং তিনবার একথা বলেন, খোদার কসম‍! তোমরা আমার নিকটে সবচেয়ে প্রিয়।(গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

কুরাইশের অস্বস্তিকর অবস্থা

রাসূলুল্লাহ (স) নিরাপদে মদীনা পৌঁছে যাওয়াটাই কুরাইশের জন্যে অত্যন্ত বিব্রতকর ছিল। কিন্তু যখন মদীনায় হুযুরের (স) রাজকীয় সংবর্ধনার সংবাদ তাদের কাছে পৌঁছলো তখন তারা অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে এবং মদীনার সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের নিকটে পত্র পাঠায়- যাকে হিজরতের পূর্বে মদীনাবাসী তাদের বাদশাহ বানাবার প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং হুযুরের (স) মদীনায় পৌঁছে যাওয়ার এবং আউস ও খাযরাজের অধিকাংশ মুসলমান হওয়ার কারণে যার আশা চূর্ণবিচুর্ণ হয়েছিল। পত্রে বলা হয়ঃ

তোমরা আমাদের লোককে তোমাদের ওখানে আশ্রয় দিয়েছ। আমরা খোদার কসম করে বলছি যে, তোমরা তার সাথে লড়াই কর অথবা তাকে বের করে দাও। নতুবা আমরা সকলে তোমাদের উপর আক্রমণ চালাবো এবং তোমাকের হত্যা করব এবং স্ত্রী লোকদেরকে বাঁদী বানাবো।

আবদুল্লাহ বিন উবাই পত্র পাওয়ার পর কিচু দুষ্কৃতি করার উদ্যোগী হলো। কিন্তু নবী (স) যথাসময়ে এ দৃষ্কৃতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। অতঃপর মদীনার সর্দার হযরত সা’দ বিন মুয়ায (রা) ওমরার জন্যে মক্কা যান। ওখানে একেবারে হারামের দরজার উপর আবু জাহল তাঁকে বাধা দিয়ে বসে-

************************************

তোমরা আমাদের দ্বীনের মুরতাদেরকে আশ্রয় দেবে এবং তাদের সাহায্য সহযোগিতা করবে আর আমরা তোমাদেরকে নিশ্চিন্ত মনে মক্কায় তাওয়াফ করতে দেব? খোদার কসম যদি তুমি আবু সাফওয়ানের (অর্থাৎ উমাইয়া বিন খালাফ) সাথে না হতে তাহলে এখান থেকে জীবিত যেতে পারতেনা।

হযরত সা’দ জবাবে বলেন-

******************************************

খোদার কসম, তোমরা যদি আমাকে এ কাজে বাধা দাও, তাহলে আমি তোমাদেরকে সে জিনিসে বাদা দেব যা তোমাদের জন্যে কঠিনতর হবে- অর্থাৎ মদীনার উপর দিয়ে তোমাদের বাণিজ্যের জন্যে চলাচল।[এ হলো বোখারীতে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) বর্ণনা, যা তিনি স্বয়ং হযরত সা’ব নিব মুয়ায (রা) থেকে শুনেই করেছেন। এতে এ কথা সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, জাহেলিয়াতের যুগ থেকেই তাঁর এবং উমাইয়ার বিন খালাফের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। সে মদীনায় এলে সা’দের বাড়িতেই উঠতো। আর ইনি যখন মক্কায় যেতেন তো তার বাড়িতেই উঠতেন। এ বন্ধুত্বের ভিত্তিতে হযরত সা’দ বিন মুয়ায (রা) ওমরা করতে মক্কায় যান এবং তাকে বলেন, আমাকে এমন সময়ে হারামে নিয়ে যাবে যখন কেউ না থাকে। অতএব দুপুরে ওমাইয়া তাকে তাওযাফের জন্যে নিয়ে গেল। কিন্তু সেখানে আবু জাহলকে পাওয়া গেল। তার সাথে হযরত সা’দের সেসব কথাবার্তা হয়- যা উপরে আমরা উল্লেখ করেছি। এ বর্ণনায় এ কথাও আছে যে, যখন হযরত সা’দ (রা) আবু জাহলকে শক্ত জবাব দিলেন, তখন উমাইয়া বলে, আবুল হাকামের সাথে রূঢ় কথা বলেণানা। সে এ উপত্যকার সর্দার। হযরত সা’দ বলেন, রাখ ভাই, আমি রাসূলুল্লাহ (স) থেকে শুনেছি যে, এরা তোমাকে হত্যার করবে। একথা শুনে উমাইয়া খুব পেরেশান হলো। সে জিজ্ঞেস করলো- এরা আমাকে মক্কায় হত্যার করবে? হযরত সা’দ (রা) বলেন- তা জানিনা। মুসনাদে আহমদে এ কাহিনীর যে বর্ণনা আছে তাতে অতিরিক্ত একথা এছ যে, উমাইয়া সা’দের (রা) এ কথা তার বিবিকে বলল- সে বলল, খোদার কসম, মুহাম্মদ (স) মিথ্যা বলেননা।

হাফেজ আবু বকর বাযযার তাঁর মুসনাদে আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন- তাতে উমাইয়া বিন খালাফের স্থলে উতবা বিন রাবিয়ার উল্লেখ আছে। বলা হয়েছে যে, হযরত সা’দকে যখন সে আবু জাহলের সাথে রূঢ় ব্যবহার করতে নিষেধ করলো- তখন তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে (স) এ কথা বলতে শুনেছি যে- তিনি তোমাকে হত্যা করবেন। এ কথা শুনে উতবা হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং বলে, মুহাম্মদের (স) কথা মিথ্যিা হতে পারেনা। যদিও বাযযারের এ হাদীসের রাবী নির্ভরযোগ্য- তথাপি সত্য কথা তাই যা বোখারীতে বয়ান করা হয়েছে। উমাইয়া বিন খালাফ বদরের যুদ্ধে যেতে প্রস্তু তছিলনা। কুরাইশের লোকেরা তাকে ভর্ৎসনা দিয়ে দিয়ে যুদ্ধে এনেছিল সে গ্রেফতার হওয়ার পর হুযুরের (স) হাতে নয় হযরত বেলারের (রা) হাতে নিহত হয়। এখন রইলো সে ব্যক্তি যাকে স্বয়ং হুযুর (স) হত্যার করার কথা বলেছিলেন, তো সে উমাইয়া বিন খালাফ নয় বরঞ্চ উবাই বিন খালাফ ছিল। সে ওহোদের যুদ্ধে হুযুরের (স) হাতে নিহত হয়। গ্রন্হকার।] ব্যাপারটা এমন যে মক্কাবাসীর পক্ষ থেকে ঘোষণা যে- বায়তুল্লাহর পথ মুসলমানদের জন্যে নিষিদ্ধ এবং তার জবাব মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে এ ছিল যে, শামদেশে ব্যবসার পথ ইসলাম বিরোধীদের জন্যে আশংকাজনক। এ ব্যাপারটি সুস্পষ্ট ইংগিত করে যে অবস্থা কোন দিকে গড়াবে। (তাফহীমুল কুরআন- ২য় খন্ড, সূরা আনফালের ভূমিকা।)

মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ

হযরত আবু আইয়ুব আনসারীর (রা) ওখানে হুযুরের (স) অবতরণের পর তিনি যে বিষয়ের চিন্তা করছিলেন তা এই যে, একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। তাঁর উটনী যে স্থানে গিয়ে থেমেছিল। ইবনে সা’দের বর্ণনা মতে সেখানে পূর্ব থেকে মুসলমান, নামাযের জন্যে সমবেত হতেন। আসয়াদ বিন যুরারা (রা) ওখানে জামায়াত করাতেন এবং জুমাও সেখানে হতো। এ দু’জন এতিম- সাহল এবং সুহাইলের যমীন ছিল- যা আসয়াদ বিন যুরায়রার (রা) তত্ত্বাবধানে ছিল। এই ছিল বোখারীতে ওরওয়া বিন যুবাইর এবং সীরাতে ইবনে হিশামে মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনা। বালাযুরী ফতহুল বুলদানে একে সুবিদিত বক্তব্য হিসাবে উদ্ধৃত করেন। (ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় হযরত মুয়ায বিন আফরাকে (রা) তার পৃষ্ঠপোষক বলা হয়েছে)। বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা) ও ওরওয়া বিন যুবাইরেরর বর্ণনা আছে এবং সীরাতে ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বর্ণনাও এরূপ যে, এ যমীনের উপর খেজুর শুকানো হতো। বোখারী, মুসলিম, আবু দাউদ এবং ইবনে জারীরের বর্ণনায় আছে যে, এতে কিছু খেজুর গাছ ছিল, কিছু চাষাবাদের জমি (এবং কোন কোন বর্ণনায় কিছু অকেজো জমি) আর কিছু মুশরেকদের পুরাতন কবর। হযরত আয়েশা (রা) এবং ওরওয়া বিন যুবাইরের বর্ণনামত হুযুর (স) ছেলে দুটোর সাথে জমির মূল্য সম্পর্কে কথা বলেন। তারা বলে, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এ জমি হেবা করে দিচ্ছি। কিন্তু হুযুর (স) হেবাতে রাজী না হয়ে মূল্য দিয়ে খরিদ করেন। ইমাম যুহরী থেকে মূসা বিন ওকবার বর্ণনা মতে হুযুর (র্স) তা দশ দিনারে খরিদ করেন। ওয়াকেদী থেকে ইবনে সা’দ এরূপ বর্ণনাই করেন এবং তাতে অতিরিক্ত এ কথা আছে যে, মূল্য হযরত আবু বকর (রা) পরিশোধ করেন। ফতহুল বুলদানে বালাযুরীও একথা বলেছেন।

ইবনে ইসহাক বলেন, হযরত মুয়ায বিন আফরা (রা) আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এখানে মসজিদ তৈরী করুন। আমি এ বালকদেরকে রাজী করাব (একথা বলা হয়নি যে, তিনি স্বয়ং মূল্য দিয়ে রাজী করাবেন, অথবা হুযুরের (স) নিকট থেকে মূল্য নিয়ে তার কাছে বিক্রি করার জন্যে রাজী করাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন)।

বোখারী ও আবু দাউদে হযরত আনাসের (রা) এ বর্ণনা আছে যে, হুযুর (স) বনী নাজ্জারকে ডেকে পাঠান এবং বলেন, তোমরা এ বাগানের [মূলতঃ ****** শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এ এমন বাগানকে বরা হয় যা প্রাচীর ঘেরা থাকে। এতে মনে হয় প্রথমে তা বাগান ছিল এবং পরে তা নষ্ট হয় এবং অন্য কাজে ব্যবহার হতে থাকে যেমন উপরের বর্ণনা থেকে জানা যায়- গ্রন্হকার।] মূল্য নির্ধারণ করে দাও। তাঁরা বলেন, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মূল্য চাইনা। এ বর্ণনায় এ বিশদ বিবরণ নেই যে, জমি মূল্য দিয়ে খরিদ করা হয়, না হেবা করে নেয়া হয়। কিন্তু অন্যান্য সকল বর্ণনা সর্বসম্মত যে- মসজিদে নববীর জমি বিনামূল্যে নেয়া হয়নি।

জমি নেয়ার পর তা পরিষ্কার করা হয়, গর্ত ও উঁচু-নীচু সমান করা হয়, কবরগুলো উৎপাটিত করা হয়, খেজুর গাছ কেটে তার কান্ড মসজিদের খুঁটি বানানো হয়। খেজুর পাতার ছাদ করা হয়। ইট ও কাদার গলা দিয়ে দেয়াল তৈরী করা হয়। খালি জমি নামাযের জন্যে রাখা হয়। বর্ষায় কাদা হওয়ার পর মেঝেতে পাথরকুচি বিছিয়ে দেয়া হয়। খেজুর পাতার ছাদের নীচে প্রচন্ড গরম হলে খেজুর পাতায় কাদার লেপ দেয়া হয়। বোখারীতে হযরত আয়েশা (রা) ও ওরওয়া বিন যুবাইর, আবু দাউদে হযরত আনাস (রা) এবং সীরাতে ইবনে হিশামে মুহাম্মদ বিন ইসহাকের বর্ণনা আছে যে, এ মসজিদ নির্মাণে রাসূলুল্লাহ (স) স্বয়ং অন্যান্যদের সাথে ইট ও কাদা বহনে অংশগ্রহণ করেন।

হুযুরের (স) হুজরা নির্মাণ

মসজিদে নববী সংলগ্ন এধারে হুযুর (স) তাঁর জন্যে দুটি কামরা তৈরী করেন- একটি হযরত সাওদার (রা) জন্যে এবং অন্যটি হযরত আয়েশার (রা) জন্যে। ইবনে সা’দ বলেন, এ দুটি কামরাও কাঁচা ইটের ছিল। খেজুর পাতার বেড়ার উপর কাদার প্রলেপ দিয়ে কামরা পৃথক পৃথক করা হয়। ছাদও খেজুর পাতার। দরজার উপর কম্বল লটকিয়ে দেয়া হয়। হযরত হাসান বসীর বলেন, আমি ছোটো বেলায় নাবালক অবস্থায় হুযুরের (স) ঘরে গিয়েছিলাম, ঘরের ছাদ এতো নীচু ছিল যে, হাত দিয়ে স্পর্শ করা যেতো। ইমাম বোখারী ইতিহাসে এবং হাফেজ আবু ইয়ালা তাঁর মুসনাদে লিখেছেন যে, হুযুরের (স) দরজায় আঙুলের নখ দিয়ে টোকা দেয়া হতো। কারণ তাতে কোন কড়া বা আংটা  ছিলনা।

পরিবার পরিজনকে মক্কা থেকে ডেকে পাঠানো

হযরত যায়েদ বিন সাবেত থেকে ওয়াকেদীর বর্ণনা আছে যে, হুযুর (স) আবু আইয়ুবের (রা) ওখানে সাত মাস থাকেন। ইবনে সা’দ ও বালাযুরী তা উদ্ধৃত করেন এবং হাফেজ ইবনে হাজার এর সত্যতা স্বীকার করেন।

হুযুর (স) তাঁর নতুন ঘরে স্থানান্তরিত হওয়ার পূর্বে হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) এবং তাঁর আযাদ করা গোলাম আবু রাফেকে (রা) পাঁচশ’ দিরহাম [বালাযুরী বলেন, হুযুর (স) এ পাঁচশ’ দিরহমা হযরত আবু বকর (রা) থেকে গ্রহণ করেন- গ্রন্হকার।] ও দুটি সজ্জিত উটসহ মক্কায় পাঠান যাতে তাঁর পরিবার-পরিজন ও সংশ্ণিষ্ট লোকদেরকে নিয়ে আসতে পারেন। এ দু’জনের সাথে হযরত আবু  বকর (রা) আবদুল্লাহ বিন উরায়কেতকে তাঁর ছেলে আবদুল্লাহর নামে পত্র দিয়ে পাঠান যেন তিনি তাঁর মা ও বোনদের নিয়ে আসেন। যায়েদ বিন হারেসা (রা) উম্মুল মুমেনীন হযরত সাওদা (রা), হুযুরের (স) দুই কন্যা হযরত ফাতেমা (রা) ও উম্মে কুলসূম (রা) এবং তাঁর (যায়েদ বিন হারেসার ( স্ত্রী উম্মে আইমান (রা) ও তাঁর পুত্র উসামা বিন যায়েদকে (রা) নিয়ে আসেন। কিন্তু হযরত যয়নবকে (রা) আনতে পারেননা। কারণ তাঁর স্বাসী আবুল আস বিন রাবী তাঁকে আসতে দেয়নি। হযরত আবদুল্লাহ বিন আবি বকর (রা)  তাঁদের সাথে উম্মে রুমান (রা), হযরত আসমা (রা) ও হযরত আয়েশাকে (রা) নিয়ে আসেন (তাবারানী, ইবনে সা’দ, বালাযুরী ও ইবনে আবদুল বার)।

এখানে ইসলামী আন্দোলনের মক্কী যুগ শেষ হলো। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে আমরা এর উপর পর্যালোচনা করব।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.