সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

চতুর্দশ অধ্যায়

মক্কী যুগের সামগ্রিক পর্যালোচনা

আমাদের পেছন দিকে ফিরে মক্কী যুগের সূচনা থেকে হিজরত পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা উচিত যে, ইসলামী আন্দোলন প্রথমে কতটুকু মূলধন নিয়ে শুর হয়েছিল, তের বছরে এ মূলধনের মধ্যে কোন কোন ধরনের পরিবর্ধন হয়েছিল এবং যখন এ আন্দোলন মদীনা যুগে পদার্পন করে তখন তার মূলধন কি ছিল যার সুযোগ গ্রহণ করা মক্কী যুগের অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ এক ভিন্নতর অবস্থায় আপন গন্তব্যপথে অগ্রসর হতে হয়।

এ আন্দোলনের প্রাথমিক অথবা সঠিকতর অর্থে বুনিয়াদী মূলধন একমাত্র মুহাম্মদ বন আবদুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সত্তা, তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং নবুওতপূর্ব কালের চল্লিশ বছরের জীবন।

হুযুরের (স) উচ্চ বংশ মর্যাদা

ব্যক্তি হিসাবে হুযুর (স) আরবের এক অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারে লোক ছিলেন যাঁর বংশ পরিচয় আরববাসী জানতো এবং আরবের অধিকাংশ গোত্র, যারা তাদের বংশ সম্পর্কে গর্ববোধ করতো, এ ব্যাপারে ওয়াকেফহাল ছিল যে, পিতা অথবা মাতার দিক দিয়ে কোথাওনা কোথাও গিয়ে হুযুরের (স) বংশের সাথে মিলিত হয়। এজন্যে হুযুরের (স) মর্যাদা এমন ছিলনা যে, কোন অজ্ঞাত কুলশীল, অপরিচিত, অজ্জাত বা নিম্নবংশীয় কোন লোক হঠাৎ এক বিরাট দাবীসহ আবির্ভূত হলো যাকে দেখা মাত্র লোকে বলে যে, এ ধরনের লোকের এমন দাবী করা মোটেই সাজেনা। গোটা আরবের মধ্যে কোন ব্যক্তিই- হুযুরের (স) বংশ মর্যাদার প্রতি সামান্যতম কটাক্ষও করতে পারতোনা। স্বয়ং মক্কা শহরে যতো পরিবার নিজেদের বংশ মর্যাদার অহংকারে কারো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতোনা।  তাদের সকলের সাথে হুযুরের (স) ও তাঁর পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যেও একথা কেউ বলতে পারতোনা যে, তিনি বংশ ও সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে তার চেয়ে কোন অংশে কম ছিলনে। যে কুরাইশ আরবে নেতৃত্বদানের মর্যাদা রাখতো তার এক ব্যক্তি তিনিও ছিলেন। কুরাইশ ইসমাইল (আ) এর বংশধর ছিল। এতে কোন সন্দেহ ছিলনা। দেশের ভেতরে ও বাইরে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছড়িয়ে ছিল। খানায়ে কাবার অলীগিরি ও হজ্বের আকর্ষণের কারণে তাদের সাথে আরবের দূর-দূরান্তের লোকের যোগাযোগ হতো। এসব কারণে আরবের মধ্যে এ গোত্রের এমন উচ্চ মর্যাদা ছিল যা আর কারো ছিলনা। মক্কার মতো কেন্দ্রীয় শহরে কুরাইশের মতো গোত্রে জন্মগ্রহণ করা আরব দেশের পরিবেশে এ আন্দোলনের নেতার জন্যে বিরাট সুযোগ-সুবিধা ছিল।

বনী ইসমাইলে হুযুরের (স) জন্মগ্রহণ

ইসমাইলী খান্দানের সম্মান শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সাথে এ বিষয়েরও বিশেষ গুরুত্ব ছিল যে, বিগত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে হযরত ইসমাইলের (আ) পর এ বংশের কোন ব্যক্তি কখনো নবুওতের দাবী করেনি। বনী আমের বিন সা’সায়ার জনৈক সম্ভান্ত ব্যক্তি এ বিষয়ের উল্লেখ সে সময়ে করেন যখন তাঁর গোত্রের লোকজন হজ্ব থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূলুল্লাহ (স) সাথে তাদের সাক্ষাৎ ও আলাপ-চারীর উল্লেখ তাঁর কাছে করেন। তারা যখন তাঁকে বলল, কুরাইশের এক ব্যক্তির সাথে আমাদের দেখা হয়- যিনি নিজেকে নবী বলে পরিচয় দেন এবং ইচ্ছা প্রকাশ করেন আমরা যেন তাঁকে আমাদের এলাকায় নিয়ে যাই যাতে আল্লাহর পয়গাম পৌছাতে আমরা তাকে সাহায্য করতে পারি। কিন্তু আমরা তাঁর কথা মেনে নিতে অস্বীকার করি। তখন বয়োবৃদ্ধ ভদ্রলোক দুঃখ করে বলেন, ইসমাইলী মিথ্যা দাবী করেনি। এ ছিল হুযুরের (স) ইসমাইল বংশে জন্মগ্রহণ করার আর এক কল্যাণ। ইতিহাসও এ সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে, হুযুরের (স) নবুওতের দাবী ছল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ এ বংশের কেউ কখনো নবুওতের মিথ্যা দাবীসহ আবির্ভূত হয়নি।

তাঁর ব্যক্তিত্ব

তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে কথা এই যে, তাঁর গঠন আকৃতি, কথাবার্তা, চালচলন, সদাচরণ প্রভৃতি দেখে শৈশবকাল থেকেই আরবের চরিত্র নির্ণয় বিদ্যাবিদ (Physiognomist) এ কথা বলতো যে, এ কোন অসাধারণ সত্তা যা আবদুল মুত্তালিবের পরিবারে জন্মলাভ করেছে। তাঁর মাতা, দাদা, চাচা, দুধ মাতা সকলেরই প্রতিক্রিয়া ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে যার থেকে জানা যায় যে, অল্প বয়সেই তাঁকে যাঁরা নিকট থেকে দেখতেন, তারাই তাঁর মধ্যে এক সুস্পষ্ট মহত্ব অনুভব করতেন। এমন দৃষ্টান্তও আছে যে, একজন একেবারে অপরিচিত ব্যক্তি তাঁকে দেখেই বলে উঠতো, খোদার কসম, এ মুখমন্ডল কোন মিথ্যাবাদী লোকের হতে পারেনা। তিনি যখন যৌবনে পদার্পণ করেন তখন তাঁর মর্যাদাই এমন ছিল যে, শহরের ও পরিবারের লোকজন তাঁর ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকেন। লোকে সতঃপ্রবৃত্ত হয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা করতো কারণ তারা তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে অনেক উচ্চস্তরে মনে করতো। তাঁর মর্যাদা, গাম্ভির্য, পরিচ্ছন্নতা, উদারতা, বিনয় নম্রতা ও নিষ্কলূষ চরিত্র এমন সুস্পষ্ট ছিল যে, যে ব্যক্তিই তাঁর সংস্পর্শে আসতো সে তাঁকে সম্মান শ্রদ্ধা না করে পারতোনা। তাঁর এ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব তখনো প্রভাবশীল ছিল যখন ইসলামী দাওয়াত পেশ করার কারণে কুরাইশের লোক তাঁর দুশমন হয়ে পড়েছিল। শক্রতার অন্ধ আবেগে পাগল হয়ে তারা তাঁর সাথে ভয়ানক অসদাচরণ করে ফেলতো। কিন্তু যে শক্রতা তাদের মনের মধ্যে আগুনের মতো জ্বলতো এবং যে দুশমনীর কারণে তারা তাদের পুত্র ভাই ও নিকট আত্মীয়দেরকে পর্যন্ত যন্তণাদায়ক শাস্তি থেকেও রেহাই দিতনা, এসব সামনে রেখে চিন্তা করলে মনে হয় যে এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল যা তাদেরকে একেবারে অসহায় করে ফেলতো যখন তাঁরা তাঁর মুকাবেলা করতে আসতো। তিনি সাধারণ দাওয়াত শুরু করার পর ভয়ানক প্রতিকূল অবস্থায়ও প্রকাশ্যে তাঁর তবলিগ অব্যাহত রাখেন। শিয়াবে আবি তালেবে অবরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি বারবার অবরোধ থেকে বেরিয়ে দাওয়াতী কাজ করতেন। মক্কায় শেষ তিন বছর ছিল খুবই মারাত্মক এবং এ অবস্থাতেও শুধু মক্কায় আগমনকারীদের সাথেই নয়, বরঞ্চ ওকাজ, মাজান্না, যিলমাজায ও মিনার সমাবেশগুলোতে গোত্রীয় সর্দারদের সাথে প্রকাশ্যে সাক্ষাৎ করে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন। অবশ্যই এ কথা মেনে নিতে হবে যে, তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন বিরাট শক্তি ছিল যার দরুন কেউ তাঁকে রেসালতের দায়িত্ব পালন থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে সে সব দৃষ্টান্তও আপনাদের চোখে পড়েছে যে, তাঁর চরম দুশমন আবু জাহল পর্যন্ত কতকানি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

নবুওত পূর্ব জীবন

এখন লক্ষ্য করতে হবে যে, নবুওতে পূর্বে চল্লিশ বছর যাবত নব (স) মক্কায় যে জীবন অতিবাহিত করেন- তার প্রতিক্রিয়া কি ছিল। এ জীবন শুধু নিষ্কলুষই ছিলনা, অতি উন্নত চরিত্রের নমুনা ছিল। যে সমাজে তিনি শশব থেকে প্রৌঢ় কাল পর্যন্ত জীবন যাপন করলেন- যে সমাজের মানুষের সথে সকল দিক দিয়ে আত্মীয়তা মেলামেশা, বন্ধুত্ব, লেনদেন, প্রতিবেশীসূলভ সম্পর্ক- মোটকথা নানা বিষয়ের সম্পর্ক সম্বন্ধে জড়িত ছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ এমন ছিলনা, যে তাঁর সততা, দিয়ানতদারী, তাঁর ভদ্রতা, নৈতিক পবিত্রতা, সদাচরণ, দয়াশীলতা, সহানুভুতি-সহযোগিতার সপ্রশংস স্বীকারোক্তি করেনা। তিনি ছিলেন মংগল ও কল্যাণের মূর্থপ্রতীক। তাঁর পক্ষ থেকে কারো কোন অন্যায়ের অভিজ্ঞতার তো দুরের কথা কখনো কোন আশংকার হয়নি। তাঁর উপর মানুষের এতোটা দৃঢ় আস্থা ছিল যে, তারা তাঁকে ‘আমীন’বলতো। আর এ আস্থা তখন পর্যন্ত অবিচল যখন ইসলামের দাওয়াত পেশ করার কারণে লোক তাঁর দুশমন হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থাতেও দোস্ত-দুশমন নির্বিশেষে সকলেই তাঁর কাছে তার কাছে আমানত গচ্ছিত রাখতো্ তাঁর দ্বরা খেয়ানতের কোন আশংকা কারো মনে ছিলনা। বধ্যভূমি থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাঁর নিকেট গচ্ছিত আমানত ফেরৎ দেয়ার ব্যবস্তা করে পরিপূর্ণ আস্থাভাজন হওয়ার প্রমাণ পেশ করেন। তাঁর সত্যবাদিতা সমাজে এতোটা সর্বজনস্বীকৃত ছিল যে, যখন তিনি ইসলামের দাওয়াত পেশ করা শুরু করেন এবং কুরাইশের লোকেরা তা জোরেশোরে প্রত্যাখ্যান করে, তখনো বিরোধিগণ তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে সাহস করেনি, বরঞ্চ সে দাওয়াতকেই অসত্য বলতে থাকে যা তিনি পেশ করেন। চরম শক্রতা কালেও কেউ তাঁর চরিত্রের প্রতি কোনরূপ দোষারূপ করতে পারেনি। তার সাথে যাদের অতি নিকট সম্পর্ক ছিল যাদের কাছে কোন দোষ গোপন থাকার কথা নয় যদি মায়াযাল্লাহ যদি কোন দোষ থেকে থাকে, তারাই তাঁর মহান চরিত্র দ্বরা সবচেয়ে বেশী প্রভাবিত ছিল।

হযরত খাদিজা (রা) কুরাইশের বড়ো বড়ো সর্দারদের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব  প্রত্যাখ্যান করেন এব্ং স্বয়ং স্বেচ্ছায় তাঁর সাথে এ জন্যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন যে, তাঁর মহান চরিত্রের তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবন এ বিষয়ের জন্যে যথেষ্ট যে স্ত্রী তাঁর স্বামীর দোষগুণ সম্পর্কে অবহিত হবেন বিশেষ করে যখন তিনি স্বামী থেকে বয়সে বড়ো, জ্ঞানী ও বুদ্ধিমতী এবং স্বামী তাঁর অর্থেই ব্যবসা বাণিজ্য করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহর (স) ব্যাপারে হযরত খাদিজার (রা) এ দীর্ঘ প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার ফল যা ছিল তা এই যে, তিনি তাঁকে নিছক একজন উচ্চস্তরের  মানুষই নয়, বরঞ্চ এমন মহান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসাবে পান যে, তাঁকে রাব্বাল আলামীনের রাসূল হিসাবে মেন নিতে এবং তাঁর উপর ঈমান আনতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। অথচ একজন বানোয়াট লোকের দুনিয়াদা স্ত্রী তার স্বামীর প্রতারণামূলক কাজকর্মের দরুন যতোই সুযোগসুবিধা ভোগ করুক না কেন, মনে দিক দিয়ে কখনো তাকে বিশ্বাস করতে পারেনা ও তার উপর ঈমান আনতে পারেনা।

হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা) গোলামী অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (স) সংস্পর্শে আসেন। মনিবের প্রতি গোলামের ভালোবাসা থাকলেও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক কদাচিৎ মধুর হয়ে থাকে। কারণ গোলাম হয় অসহায় এবং মনিব তার থেকে যে কোন খেদমত গ্রহণের অধিকার রাখে, সে খেদমত তার জন্যে যতোই কঠিত হোক না কেন। তদুপরি মনিবের জীবনের ভালো-মন্দ সব কিছু দেখার সুযোগ গোলামের হয় এবং একজন এখতিয়ার বিহীন খাদেম হিসাবে তার সামনে তার স্বাধীনচেতা মনিবের জীবনের মন্দ দিকটিই বেশী দেখা যায়। কিন্তু হুযুর (স) এমন মনিব ছিলেন যে, গোলাম তাঁর প্রতি মুগ্ধই হতে থাকেন। এমনকি যখন তাঁর বাপ-চাচা তাঁকে গোলামী থেকে মুক্ত করতে আসেন, তখন তিনি মুক্ত হয়ে পিতার সাথে যাওয়ার পরিবর্তে হুযুরের (স) গোলামী করতে থাকাকেই অগ্রাধিকার দেন। পনেরো বছর হুযুরের (স) খেদমতে থেকে এ গোলাম যাঁকে তিনি আযাদ করে পুত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন- তাঁর সমান আচার- আাচরণে  এতোটা প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, যখন তিনি জানতে পারলেন যে, তাঁর মনিব নবুওতের পদমর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন, তখন তিনি হযরত খাদিজার (রা) মতো তাঁর উপর ঈমান আনতে এক মুহূর্তও ইতঃস্তত করেননি। তিনি কোন অবুঝ শিশু ছিলেননা বরঞ্চ ৩০ বছেরর যুবক ছিলেন এবং এমন মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন যে, অষ্টম হিজরীতে তাঁকে সে সেনাবাহিনীর প্রধান বানিয়ে পাঠানো হয়, যার মধ্যে হযরত জাফর বিন আবি তালেব (রা) এবং খালেদ বিন অলীদের (রা) মতো লোক তাঁর অধীনে ছিলেন। এ জন্যে এ কথা মনে করা উচিত নয় যে, তিনি কোন নির্বোধ সেবক ছিলেননা যাঁর নবুওত ও রেসালাতের গুরুত্ব জানা ছিলনা এবং নিছক তাঁর মনিবের ব্যক্তিত্বের দ্বরা প্রভাবিত হয়ে না বুঝেই ঈমান এনেছিলেন। বরঞ্চ প্রকৃতপক্ষে তিনি তার দীর্ঘ পনেরো বছরের অভিজ্ঞতায় হুযুরকে (স) এমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসাবে পান যে, তাঁর রাসূলে খোদা হওয়ার ব্যাপারে তাঁর মনে কোন সন্দেহের উদ্রেক হয়নি। এই চারিত্রিক মহত্বের কারণেই তিনি আপন পিতার সাথে চলে যাননি।

এমন অবস্থা হযরত আবু বকরেরও (রা) ছিল। তিনি বিশ বছর যাবত হুযুরের () সাথীই ছিলেননা বরঞ্চ পরম বন্ধুও, ঠিক এমন অবস্থা হযরত  আলীর (রা) যিনি হুযুরের (স) গৃহেই প্রতিপালিত হন, ওয়ারাকা বিন নাওফলের- যিনি শিশুকাল থেকেই হুযুরের (স) জীবনযাপন লক্ষ্য করে আসছিলেন এবং হযরত খাদিজার (রা) নিকট আত্মীয় হওয়ার কারণে তাকে বেশী করে জানার ও বুঝার সুযোগ হয়েছিল, হযরত ওসমান (রা) হুযুরের (স) ফুফুর ভাগ্নে ছিলেন। হযরত যুবাইর (রা) তাঁর ফুফাতো ভাই ছিলেন এবং হযরত খাদিজার (রা) ভাইপো। হযরত জা’ফর বিন আবি তালেব (রা) তাঁর আপন চাচাতো ভাই ছিলেন। হযরত আবদুর রহমান বিন আওফ (রা) ও হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) তাঁর মায়ের আত্মীয় ছিলেন। এদের কেউ এমন ছিলেননা, যিনি তাঁর স্বভাব চরিত্র নিকট থেকে দেখেননি এবং এসব লোকই তাঁর নবুওত সকলের আগে মেনে নেন।

নবুওতের পর তাঁর মহৎ গুণাবলীর প্রকাশ

কোন আন্দোলনের সূচনাই যদি হয় এমন মহান সত্তার নেতৃত্বে- তো এ হয় আন্দোলনের বিরাট পূঁজি। কিন্তু শুরু হওয়ার পর থেকে তের বছর পর্যন্ত এ প্রাথমিক পুঁজিতে যে অতিরিক্ত পরিবর্ধন হয়েছে তা এতো মূল্যবান ছিল যে, মানব ইতিহাস তার নজীর পেশ করতে পারেনা। সর্বপ্রথম স্বয়ং রাসূলুল্লাহর সে সব গুণাবলীর প্রতি লক্ষ্য করুন যা এ সময়ে সুস্পষ্টরূপে দেকা যায় এবং যা সবচেয়ে বেশী এ দাওয়াত সম্প্রদারণের কারন।

হুযুরের (স) আর্থিক ত্যাগ

তাঁর সর্বপ্রথম গুণ ছিল তাঁর ত্যাগ যা তিনি এ মহান কাজের জন্যে স্বীকার করেন। নবুওতের সূচনাকালে তিনি ছিলেন একজন সার্থক ও সচ্ছল ব্যবসায়ী। একদিকে ছিল হযরত খাদিজার (রা) অর্থ যা কুরাইশের অন্যান্য ব্যবসায়ীর সর্বমোট অর্থে কম ছিলনা, অন্যদিকে ছিল হুযুরের (স)প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, সুব্যবস্থাপনা ও সততার খ্যাতি যার মুকাবেলা আর কেউ করতে পারতোনা। এ দুটি জিনিসি যে ব্যবসায় একত্রে পাওয়া যায় অনুমান করুন তা কত উন্নতি লাভ করে থাকবে। কিন্তু নবুওতের পূর্বে এ আর্থ হুযুর (স) ও তাঁর জীবন সংগিনী বিলাসিতার জন্যে নির্দিষ্ট করে রাখেননি। বরঞ্চ অভাবগ্রস্থদের সাহায্যে, অসহায়দের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মুসাফিরদের মেহমানদারীর জন্যে ব্যয় করতেন। প্রতিটি সৎ কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখতেন। এ জন্যে নবুওতের সূচনাকালে কোন বিরাট আকারের সঞ্চিত অর্থ তাঁর নিকটে ছিলনা। তারপর যখন নবুওতের দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হয় তখন ক্রমশঃ তাঁর কাছে যাছিল- সবই আল্লাহর পথে ব্যয় করে ফেলেন। তাঁর জন্যে এটা সম্ভবও ছিলনা যে, দ্বীনের তবলিগের সাথে ব্যবসাও পরিচালনা করেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, তায়েফ যাবার সময় তাঁকে পায়ে হেটে যেতে হয়, কোন পরিবহণ সংগ্রহ করতে পারেননি। হিজরত করার সময় তাঁর সমুদয় ব্যয়বার বহন করেত হযরত আবু বকর (রা)। পরিবার পরিজনকে মক্কা থেকে মদীনা আনার জন্যে তাঁকে হযরত আবু বকরে (রা) নিকট ৫০০ দিরহাম নিতে হয়। তাঁর হাতে কোন দিরহাম-দিনার ছিলনা। প্রকাশ থাকে যে, কোন দাওয়াত পেশকারী যখন সে দাওয়াতের কাজে আপন স্বার্থে এভাবে বিলিয়ে দেয়, তো তা দেখার পর প্রত্যেকেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয় যে, সে তার উদ্দেশ্যের দিন দিয়ে একেবারে ঐকান্তিক ও নিঃস্বার্থ। এমনকি দশমনও বিরুদ্ধবাদী পর্যন্ত মুখে কিছুই বলুক না কেন, অন্তর দিয়ে একথা মেনে নেয় যে এ দাওয়াতের সাথে তার কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত নেই। যারা তাঁর দাওয়াত কবুল করে তাঁর সাথে এসে যায়, তাদের জন্যে তাদের নেতার দৃষ্টান্ত এমন শিক্ষণীয় হয় যে, তারা হককে শুধু হক হওয়ার জন্যেই মেনে নেয়, কোন ব্যক্তিগত স্বার্থ তাদের ঈমানের সাথে জড়িত থাকেনা এবং ত্যাগ ও কুরবানীতেও তারা তাদের নেতার অনুসরণ করে।

হুযুরের (স) দৃঢ় সংকল্প

দ্বিতীয় বস্তু ছিল তাঁর সংকল্পের দৃঢ়তা যাকে কোন বিপদ মুসিবত ও বিরোধিতার ঝড়-তুফান পরাভূত করতে পারেনি, কোন ভয়-ভীতি যাকে আপন স্থান থেকে সরাতে পারেনি। কোন প্রলোভন ও সত্য পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। কোন কঠিন প্রাণান্তকর পরিস্থিতিও তাঁকে নিরাশ ও ভগ্ন হৃদয় করতে পারেনি। তার অবিচলতা ছিল পাহাড়ের মতো যার সংঘর্ষে এসে সকল বিরুদ্ধ শক্তি শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে পড়ে যে, কোন ষড়যন্ত্র, কোন প্রকারের শক্তি প্রদর্শন, জুলুম অত্যাচার, প্রলোভন, অপপ্রচার, কোন হীন অপকৌশল দ্বারা তাঁক সে কাজ থেকে নিবৃত্ত করা যাবেনা যা নিয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। বছরের পর বছর ধরে লোকে তাঁর এ দৃঢ় সংকল্প লক্ষ্য করার পর এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বাধ্য হয় যে, যতোক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তির হকের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় না হয়েছে এবং যতেোক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যক্তিস্বার্থ থেকে মুক্ত না হয়েছে, সে তার সংকল্পে এতোটা মজবুত হতে পারেনা। এ বস্তুই তাঁর সাথীদের মধ্যে ঈমানের দৃঢ়তা এবং সত্য পথে অবিচলতা সৃষ্টি করেছে। এ জিনিসই সকল নিরপেক্ষ লোকদের মনে এ দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করেছে যে, তিনি যে দাওয়াত পেশ করছেন তা বিশুদ্ধ হকপুরস্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

হুযুরের (স) নজীর বিহীন বীরত্ব

তৃতীয় বস্তু ছিল হুযুরের (স) নির্ভীকতা ও বীরত্ব যার জন্যে কোন বিরাট শক্তির দ্বরা দমিত হওয়া এবং বিরাট বিপদে ভয় পাওয়া কোন বস্তু তা তাঁর জানা ছিলনা। কুরাইশ কাফেরদের একটি ক্রূদ্ধ জনতা তাঁকে হারামে ঘিরে ধরে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি সেই ব্যক্তি যে একথা বলে, তুমি কি সেই ব্যক্তি যে এ ধরনের কথা বলে? জবাবে তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে বলেন, হ্যাঁ, আমি এ কথা বলি এবং এ কথাও বলি। জীবনের দুশমনের মধ্যে নিজেকে পরিবেষ্টিত দেখেও তিনি সামান্য পরিমাণেও ঘাবড়ে যাননি। গারে সওরের একেবারে মুখে দুশমন পৌঁছে যাচ্ছে এবং তিনি সে সময়ে প্রশান্তচিত্তে নামায পড়ছেন। হযরত আবু বকর (রা) বলছেন, এ জালেম লোক তাদের পায়ের দিকে তাকালেই আমাদেরকে দেখে ফেলবে। তিনি কোন প্রকার পেরেশানী ছাড়াই শান্ত মনে বলেন, আবু বকর (রা), তোমার ঐ দুই ব্যক্তি সম্পর্কে কি ধারণা যাদের মধ্যে একজন আল্লাহ আছেন? ঘাবড়ায়োনা, আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন। দুশমন তাঁর পবিত্র মস্তকের জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করে রেখেছে। পুরস্কার লাভের আশায় চারদিকে লোক ছুটাছুটি করছে। তিনি নিশ্চিন্ত মনে কুরআন তেলাওত করতে করতে পথ অতিক্রম করে চলেছেন। কোন দিকে ফিরেও দেখছেন না যে, কেউ পিছু করেছ কিনা। এমন সাহসী নেতার সাথে সাহসী লোকই আসে। তাঁর সাহসিকতা দেখে দেখে তাদের সাহসিকতা আরও বেড়ে যায়। দুশমন তার শক্রতায় যতোই অন্ধ হোকনা কেন, তাঁর এ গুণের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ না করে পারেনা। সে মনোবল হারিয়ে ফেলে যখন সে জানতে পারে যে, সে এমন এক ব্যক্তির মুকাবেলা করছে যে ভয় কোন বস্তু তা তাঁর জানা নেই। কোন আন্দোলনের জন্যে বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের জন্যে তার নেতার নির্ভীক ও সাহসী হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বড়ো গুণ। নেতার বীরুতা, বরঞ্চ সাহসিকতার মধ্যে সামান্য দুর্বলতা অগ্নি পরীক্ষার সময় গোটা আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দেয়।

হুযুরের (স) মহানুভবতা

হুযুরর (স) চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ গুণ ছিল- ধৈর্য, সহনশীলতা, প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চাকাংখা। দুশমনের জঘণ্যতম আক্রমণের পরও তিনি ক্রোধে অধীর হয়ে পড়েননি। গালির জবাব গালির দ্বরা দেননি। কোন কটু কথা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাবে তাঁর মুখ থেকে শালীনতা বিরেোধী কোন শব্দ বেরয়নি। দুশমন বার বার এমন আচরণ করে যা অত্যন্ত মর্মান্তিক, অবমাননাকর ও উস্কানীমূলক। কিন্তু তিনি অত্যন্ত মহানুভবতা সহকারে সব নীরবে সহ্য করেন। মন্দের জবাব মন্দের পরিবর্তে ভালোর সাথে দিয়েছেন। মক্কায় সুদীর্ঘ সংকটকালে এমন কোন দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবেনা যাতে ভদ্রতা ও শালীনতার আচরণ তিনি পরিহার করেছেন। এ ছিল সেই মহৎ গুণ যা চারি পার্শ্বের সমাজে তাঁর চারিত্রিক মর্যাদা বর্ধিত করে চলেছিল এবং তার বিরোধিগণকে সে ব্যক্তির দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন করে চলেছিল যার মধ্যে সামান্য পরিমানে নৈতিকতা ও ভদ্রতার কোন গুণ বিদ্যমান ছিল। তায়েফ থেকে কঠিনতর অবস্থার সম্মুখীন তিনি হননি। কিন্তু সে সময়েও তাঁর মুখ থেকে দোয়াই বেরিয়েছে এবং এ কথায় তিনি রাজী হননি যে, জালেমদের প্রতি কোন শাস্তি নাযিল হোক। যুদ্ধের ময়দানের পূর্বেই তিনি নৈতিক ময়দানে তাঁর বিরোধিদেরকে পরাভূত করেন। এ পরাজয়ের উপর শেস মোহর অংকিত হয় সে সময়ে যখন বধ্যভূমি থেকে বের হবার সময় তিনি মক্কাবাসীদের আমানত ফেরৎ দেয়ার চিন্তা করেন। যে ব্যক্তি তাঁর এ আচার-আচরণ ও ভূমিকা দেখার পর মন থেকে এ কথা মেনে নেবনা যে, জাহেলিয়াত পন্হীগণ সেই ব্যক্তির মুকাবেলা করছে যিনি তাদের কওমেরই নয় বরঞ্চ সমগ্র দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত মানুষ, তার বিবেক একেবারে মৃতই হবে। ইসমালী আন্দোলনে যোগদানকারীদের নৈতিক প্রশিক্ষণের জন্যেও হাজার ওয়াজ-নসিহত অপেক্ষাও তাঁদের নেতার এ বাস্তব দৃষ্টান্ত ছিল অধিক প্রভাবসম্পন্ন। এরি এ প্রভাব ছিল যে, যে ব্যক্তিই তাঁর  আনুগত্য গ্রহণ করেছে সে চরিত্রের দিক দিয়ে আপন সমাজে এতোটা উন্নত হয়েছে যে, যে কেউ প্রকাশ্যে মূর্তিপূজক ও খোদা পুরস্তের পার্থক্য দেখতে পেতে।

তাঁর কথা ও কাজে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যতা

পঞ্চম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ এ ছিল যে, তাঁর কথা ও কাজের মধ্যে নামমাত্র বৈপরিত্বও ছিলনা। যা তিনি বলতেন তাই করতেন। যে জিনিসকে তিনি মন্দ বলেন এবং মানুষকে তা করতে নিষেধ করেন, তার সামান্য চিহ্ন ও তাঁর চরিত্র ও আাচর আচরণে পাওয়া যেতোনা। মক্কার লোক তাঁর বাড়ির বাইরের জীবনই নয় বাড়ির ভেতরের জীবনও দেখতে পারতো। কারণ তাদের মধ্যে কত লোক তাঁর পিতার, মাতার এবং বিবির আত্মীয় ছিল। কিন্তু কেউ এ কথা বলতে পারেনি যে, তিনি যে কাজ থেকে অপরকে বিরত থাকতে বলতেন, তা অথবা তার থেকে অতি অল্প পরিমাণের কোন মন্দ কাজও তাঁর মধ্যে পাওয়া যেতো। এভাবে যে সৎ কাজের দিকে তিনি মানুষকে দাওয়াত দিতেন, সবচেয়ে বেশী সে কাজ নিজে করতেন। তাঁর জীবন ছিল তার বাস্তব নমুনা। কেউ কখনো এ বিষয় চিহ্নিত করতে পারেনি যে, সেসব সৎ কাজ করতে সামান্য পরিমাণেও তাঁর কোন ক্রটি ধরা পড়েছে। কোন আন্দোলনের সাফলের জন্যে, বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের, সর্বোৎকৃষ্ট জামানত এই যে, তার নেতা কথা ও কাজের বৈষম্য থেকে মুক্ত হবেন এবং তাঁর শিক্ষা শুধু মুখের কথা হবেনা বরঞ্চ তাঁর বাস্তব জীবন হবে সে শিক্ষার মূর্ত প্রতীক। এ নেতার আনগত্য যারা করে তাদের উপরও তার গভীর প্রভাব পড়বে। আর সেসব লোকও প্রভাবিত না হয়ে পারবেনা যারা নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে সত্যানুসন্ধানের জন্য তাঁকে দেখে। এমনকি বিদ্বেষ পোষণকারী বিরোধীদের মধ্যে থেকেও বিরাট সংখ্যক লোক তাঁর দ্বরা বশীভূত হয়।

তিনি ছিলেন সকল প্রকার গোঁড়ামির উর্ধ্বে

যে ষষ্ঠগুণটি অন্যান্য গুণাবী থেকে নিম্নতর ছিলনা তা এই যে, তিনি সকল গোঁড়ামি থেকে মুক্ত ছিলেন। গোত্র, কওম, জন্মভূমি, ভাষা, বর্ণ, বংশ মোটকথা কোন কিছুরই গোঁড়ামি তাঁর মধ্যে ছিলনা। ধন ও দারিদ্রের ভিত্তিতে তিনি মানুষের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতেননা। সামাজিক মর্যাদার দিক দিয়ে কেউ উচ্চ শ্রেণীর এবং কেউ নিম্ন শ্রেণীর- এ ছিল তাঁর নিকটে অর্থহীন। তিনি মানুষকে শুধু মানুষের মর্যাদায়র দেখতেন এবং মানুষের যে কেউই সত্যকে গ্রহণ করতো, সে তাঁর দল একেবারে সমান মর্যাদা লাভ করতো। তা সে কুরাইশী হোক অথবা অকুরাইশী , আরব হোক অথবা হাবশী অথবা রোমীয়, কালো হোক অথবা সাদা, গরীব হোক অথবা ধনী, জাহেলিয়াতের সমাজ ব্যবস্থার দৃষ্টিতে ভদ্র হোক অথবা ইতর। এটাই সেই বস্তু ছিল যা ইসলামী আন্দোলনের সূচনা লগ্ন থেকেই তার একটি বিশ্বজনীন আন্দোলন হওয়ার ভিত্তি রচনা করেছিল। উম্মতে মুসলিমাকে একটি আন্তর্জাতিক উম্মতের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছিল। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্য থেকে ইসলাম ও কুফর ব্যতীত অন্য আর সব কিছুর ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে পার্থক্যের অনুভূতি তিনি দুল করে দেন এব্ং তাঁর দলে গোলাম ও আযাদ, গরীব ও আমীর, উচ্চ ও নীচ,আরব ও অনারব, সকলে একেবারে সমান মর্যাদাসহ শরীক ছিল। আর শরীক হতে পারতো যদি তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনতো্ আরবের মুষ্টিমেয় অহংকারী লোক ব্যতীত জনসাধারণের জন্যে এ জিনিস নিজের মধ্যে এক স্বাভাবিক আকর্ষণ পোষণ করতো যা অবশেষে কার্যকর প্রমাণিত হয়।

এ ছিল নবী পাকের (স) ওসব গুণাবলী যা তের বছরের মক্কী জীবনে প্রকাশ লাভ করে- যার প্রভাবে দুশমনের সকল চেষ্টা চরিত্র সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন সম্মুখেই অগ্রসর হয়েছে। অতিরিক্ত গুণাবলী তাঁর মধ্যে লুক্কায়িত ছিল ও তার বহিঃপ্রকাশের জন্যে অন্য পরিস্থিতির দাবী রাখতো যা ইসলামী আন্দোলন সামনে অগ্রসর হয়ে মদীনায় প্রসার লাভ করে।

কুরআনের বশীকরণ শক্তি

এ আন্দোলনের অন্য বৃহত্তম মূলধন ছিল কুরআন মজিদ। তার দু’তৃতীয়াংশের কিছু কম মক্কায় নাযিল হয়। আরববাসী অলংকারপূর্ণ ভাষা ও বাকপটুতা ভালোবাসতো। এ ভালোবাসা তাদেরকে ওকাজের মতো মেলায় কবি ও বাগ্মীদের কথা শুনার জন্যে টেনে নিয়ে যেতো। কিন্তু কুরআন শুনার পর তাদের দৃষ্টিতে বড়ো বড়ো ভাষাবিদদের কোন মর্যাদাই আর রইলোনা। কবি ও বাগ্মী তার সামনে হতবাক হয়ে পড়ে। সাহিত্যের দিক দিয়ে তার ভাষা এতো উচ্চাংগের যে, কেউ তার থেকে উচ্চতর তো দূরের কথা সমপর্যায়ের উচ্চ  সাহিত্যের ধারণাও করতে পারতোনা। তার বর্ণনা এতো শ্রুতিমধুর যে, লোক তা শুনার পর এ নিয়ে মাথা ঘামাতে থাকে। বিরোধীগণ তাকে যাদু বলে অবিহিত করে। নিরপেক্ষ লোক বলতে থাকে- এ মানুষের বানী হতে পারেনা। তার যাদুকরী প্রভাব এমন ছিল যে, হযরত ওমরের (রা) মতো চরম ইসলাম দুশমনের মনও বিগলিত করে এবং তাঁকে এনে রাসূলে আকরামের (স) কদম মোবারকে সমর্পণ করে। কুরাইশের একজন খ্যাতিমান সর্দার জুবাইর বিন মুতয়েম- বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি সম্পর্কে আলাপ আালোচনার জন্যে মদীনা যান। তখন নবী (স) মগরেবের নামায পড়াচ্ছিলেন এবং সূরা তূর তেলাওত করছিলেন। বোখারী ও মুসলিমে জুবাইর বিন মুতয়েমের নিজস্ব বর্ণনা এভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে- হুযুর (স) যখন ৩৫ থেকে ৩৯ আয়াত পড়ছিলেন, তখন আামার বক্ষ থেকে মন উড়ে উঠছিল।

পরবর্তীকালে তাঁর মুসলমান হওয়ার বড়ো কারণ এ ছিল যে, সেদিন এ আয়াতগুলো শুনার পর তাঁর মনের মধ্যে ইসলামের ভিত্তি রচিত হয়। এ জন্যে দুশমন চেষ্টা করতো যাতে মানুষ তা না শুনে। কিন্তু স্বয়ং তিনি বিরত থাকতে পারেননি। চুপে চুপে তিনি তা শুনতেন। এ চরম প্রভাব সৃষ্টিকারী বাণীর মাধ্যমে শির্ক ও জাহেলিয়াতের এক একটি দিকের এমন যুক্তিপূর্ণ সমালোচনাকরা হয়েছে যে, কোন বিবেকবান লোকের পক্ষে সম্ভব ছিলনা যে সেসব আকীদা বিশ্বাস, প্রথা ও নৈতিক অনাচারের সপক্ষে টু শব্দ করে, যে সবের উপর আরবের ধর্ম ও সংস্কৃতির ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারপর এ বাণীর মাধ্যমে অতীব হৃদয়গ্রাহী ভংগীতে ইসলামের আকীদাহ, তার সভ্যতা সংস্কৃতির মূলনীতি ও তার নৈতিক শিক্ষা পেশ করা হয় যার সমালোচনায় চরম বিরোধীরও মুখ খোলার কোন অবকাশ রইলোনা। তারপর ইসলামের ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে মারপিট, জুলুম নির্যাতন, গালিগালাজ, মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ রচনা, হৈহল্লা প্রভৃতির হাতিয়ার ব্যবহার করতে কাফেরগণ বাধ্য হয়। কিন্তু এ ছিল স্বয়ং তাদের পক্ষ থেক যুক্তি প্রমাণ এবং নৈতিকতা ও ভদ্রতার ক্ষেত্রে স্বীয় পরাজয়ের বাস্তব স্বীকৃতি। যার মধ্যে যৌক্তিকতার সামান্যতম লেশ পাওয়া যায় এমন প্রতিটি ব্যক্তি এ সংগ্রামে উভয় পক্ষকে দেখার পর এরূপ অনুবব করতে থাকে যে, অস্বীকার ও বিরোধীতাকারীদের নিকটে কুরআনের যুক্তি ও তার মহান শিক্ষার কোন জবাবহীন অপকৌশল ও অমানবিক ফাঁকিবাড়ি ছাড়া কিছু নেই। এ প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব শুধুমাত্র মক্কাবাসীদের সামনেই চলছিলনা। সমগ্র আরব তার প্রতি লক্ষ্য রাখছিল। মক্কায় তো দিনরাত সকল শ্রেণীর লোক কোন না কোন ভাবে কুরআন শুনছিল এবং কুরআনের জবাবে কুরাইশ সর্দারগণ ও তাদের অধীন ব্যক্তিগণ যে কর্মকান্ড করছিল তাও তারা দেখছিল। কিন্তু দশ বছর যাবত প্রতিবছর রাসূলুল্লাহ (স) ওকাজ থেকে মিনা পর্যন্ত স্থানগুলোতে অনুষ্ঠিত সকল সমাবেশ করে আরবের প্রত্যেক অঞ্চল থেকে আগত লোকদেরকে কুরআন শুনাতে থাকেন। অপরদিকে আবু জাহল ও আবু লাহাবের মতো লোকেরা জনসমক্ষে নবীকে (স) পাথর মেরে ও তাঁর উপর ধূলা-মাটি নিক্ষেপ করে তাদেরকে এ কথা বলতো যে- এ বাণীর জবাব তাদের নিকটে কি আছে। এর পরিণাম এই হলো যে, মক্কাতেও সকল প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইসলামের অগ্রগতি হতে থাকলো এবং আরব ভূখন্ডেও কোন গোত্র এমন ছিলনা যার কেউ না কেউ ইসলামের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েনি। মক্কী যুগে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণকারী সংখ্যা অল্প ছিল। কিন্তু তার বিশ গুণ লোক এমন ছিল, যাদের অন্তরে কুরআনের শিক্ষা, রাসূলের (স) প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁর মজলুম সংগীসাথীদের প্রতি সহানুভূতি কুরাইশের অন্যায় অত্যাচারের প্রতি ঘৃণা স্থান লাভ করে। এ যুগের এ কাজ পুরোপুরি ফলপ্রসূ হওয়ার জন্যে এক মদীনার প্রত্যাশী ছিল যা যথাসময়ে অবগুণ্ঠন উন্মোচন করে সামনে এলো।

হুযুরের (স) প্রতি ঈমান আনয়নকারীদের গুণাবলী

তৃতীয় বিরাট মূলধন ছিল ঈমান আনয়নকারী মুসলমানদের সে বাছাই করা দল যা তের বছর ব্যাপী আন্দোলন লাভ করেছিল। তাঁর পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ মন মস্তিষ্ক ও চিন্তাধারার লোক ছিলেন যাঁরা শির্ক ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার পরিবেশে লালিত পালিত হওয়া সত্ত্বেও কুরআনের বানী শ্রবণ করে স্বীয় পূর্ব পুরুষের দ্বীনকে ভ্রান্ত ও দ্বীন ইসলামকে সত্য বলে মেনে নেন এবং কোন গোঁড়ামি তাঁদের ঈমান আনার পথে প্রতিবন্ধক হয়নি। তাঁরা জানতেন যে, নিজের পরিবার, গোত্র এবং শহরের জনগণের মতের বিপরীত ইসলাম গ্রহণ এবং নবী মুহাম্মদের (স) আনুগত্য করার অর্থ কি। ঈমান আনয়নকারীদেরকে যে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল তা তাঁরা স্বচক্ষে দেখতেন। কিন্তু তারা এমন নির্ভীক চিত্ত লোক ছিলেন যে, কোন ভয়-ভীতি তাঁদেরকে বাতিলকে প্রত্যাখ্যান এবং হককে গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তাঁরা সকল প্রকার অত্যাচার এজন্যে সহ্য করেন যে, যা তারা ভ্রান্ত মনে করেছে তার অনুসরণ কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর যা সত্য হওয়া তাঁরা জারতে পেরেছেন, তা ছাড়তে তাঁরা প্রস্তুত নন। তাঁদেরকে নির্মমভাবে মারপিট করা হয়েছে, উল্টা লটকানো হয়েছে, ক্ষুধা তৃষ্ণায় কষ্ট দেয়া হয়েছে, তাঁদেরকে শৃংখলিত করে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের উপর ঠেসে ধরা হয়েছে, উত্তপ্ত বালূকারাশির উপর দিয়ে ছিচড়ে নেয়া হয়েছে, তাঁদের ব্যবসা বাণিজ্য নষ্ট করা হয়েছে, তাঁদের সম্মানিত ব্যক্তিগণকে জনসমক্ষে হেয়-অপদস্ত করা হয়েছে। কিন্তু এসব কিছু তাঁরা শুধু হকের জন্যে বরদাশত করেছন এবং তাদের মধ্যে কোন নারী ও পুরুষকে ঈমান থেকে কুফরে দিকে নিয়ে যাওয়া যায়নি। তাঁরা তাঁদের ঈমান রক্ষার জন্যে দু’বার হাবশায় এবং শেষে মদীনায় হিজরত করেন। বাড়িঘর, ক্ষেত-খামার, ধনসম্পদ, আত্মীয় স্বজন সব কিছু পরিত্যাগ করে- খোদার পথে বেরিয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে বহু সংখ্যক এমন ছিলেন-যাঁরা পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছু নিয়ে যেতে পারেননি।তাঁদের এ কর্মপদ্ধতি প্রমাণ করে যে, ইসলামী আন্দোলন ওসব অত্যন্ত একনিষ্ট নিবেদিতপ্রাণ লোক পেয়েছে, যাঁরা যদিও মুষ্টিমেয় কিন্তু এমন নির্ভীক যে, স্বীয় দ্বীনের জন্যে যে কোন কুরবানী দিতে পারেন, সকল মুসিবত হাসি মুখে বরণ করতে পারেন, সকল দুঃখ কষ্ট বরদাশত করতে পারেন এবং যে কোন বিরাট শক্তির মুকাবেলা করতে পারেন। এসব গুণাবলীর সাথে এমন বিরাট নৈতিক বিপ্লব কুরআনের শিক্ষা ও নবী পাকের (স) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের জীবনে রূপলাভ করে যে, তাঁদের সততা, দিয়ানতদারী, পরহেজগারী, পাক পবিত্রতা, খোদাভীরুতা ও খোদ পুরস্তি, নিষ্কুলষ চরিত্র, ভদ্রতা ও শালীনতা, মজবুত ও আস্থাভাজন জীবন চরিতের দিক দিয়ে শুধু আরবেই নয়, গোটা দুনিয়ায় তার কোন নজীর পাওয়া যেতোনা। নবী মুহাম্মদ (স) যেভাবে সে সমাজে আলোকস্তম্বের ন্যায় ছিলেন, তেমনি তাঁর সাহাবীগণের জীবনে নৈতিক বিপ্লবও এতোটা সুস্পষ্ট ছিল যে,তা দেখে প্রত্যেকে কাফেরদের নৈতিক অবস্থা এবং তাঁদের নৈতিক অবস্তার পার্থক্য সুস্পষ্ট দেখতে পেতো। গোঁড়ামি ও আক্রোশের ভিত্তিতে বিরোধিগণ মুখে তা স্বীকার করতে পারতো, কিন্তু তাদের অন্তর জানতো যে, প্রাচীন জাহেলিয়াত কোন চরিত্র তৈরী করতো এবং এ নতুন দ্বীন কোন চরিত্রের লোক তৈরী করছে।

মদীনার আনসারের গুণাবলী

চতুর্থ বিরাট ও মূল্যবান পূঁজি যা মক্কী যুগের শেষ তিন বছরে ইসলামী আন্দোলন লাভ করে, তা মদীনার আনসাররের ঈমানের এখলাস বা আন্তরিকতা। তাঁদের নবী পাকের (স) সাহচর্য ও তরবিয়তের সুযোগ হয়নি, না তাঁর ও তাঁর সাহাবীগণের পবিত্র জীবন যাপন দেখার সুযোগ হয়েছে। মক্কার ঈমানদারদের মতো কুরআন পাকের অতটা জ্ঞানও তাঁরা লাভ করেননি। কিন্তু তাঁরা এমন সত্যনিষ্ঠ ও সুস্থ মস্তিষ্ক লোক ছিলেন যে, তাঁরা হকের এক ঝলক দেখা মাত্র শতাব্দীর জমাট বাঁধা মুশরেকী জাহেলিয়াতের ধুলি আবর্জনা ঝেঁটিয়ে বের করে ফেলেন। তাঁরা পাকা ফলের মতো ইসলামের ঝুলিতে এমনভাবে টপাটপ পড়তে থাকেন যে, তের বছরে মক্কায় যতো লোক ঈমান এনেছেন, তিন বছরে তার চেয়ে অনেক বেশী পুরুষ, নারী, যুবক, বৃদ্ধ মদীনায় ঈমান আনেন। এতেই তারা ক্ষান্ত্ হননি, বরঞ্চ এমন আন্তরিকতাসহ ঈমান আনেন যে, রাসূলুল্লাহকে(স) এবং তাঁর সাথী সকল মুসলমানকে তারা তাদের ওখানে হিজরত করার দাওয়াত দেন। অথচ এ দাওয়াত দেবার সময় তাঁরা ভালো করে জানতেন যে, তার পরিণামে তাঁদেরকে গোটা আরবের দুশমনী খরিদ করতে হবে, যেমন আকাবায় শেষ বায়আতের সময় তাঁদের ভাষণে প্রকাশ পায়। কথা শুধু এতোটুকুই নয় যে- তাঁরা হুযুর (স) ও তাঁর মক্কী সাহাবীদের জন্যে নিজের শহরকে দারুল হিজরত স্বরূপ পেশ করেন, বরঞ্চ সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁকে তাঁদের শাসক হিসাবে স্বীকার করে নেন। তাঁরা তাঁর বিশ্বস্ত প্রজা ও নিবেদিতপ্রাণ সেনাবাহিনী হয়ে যান। হুযুরের (স) সাথে হিজরত করে আগমনকারী মুসলমানগণকে নিজেদের শহরে নিজেদের সাথে সমান অধিকার দেন এবং নিজেদের বাড়ি, ধনসম্পদ, এমনকি ভূসম্পত্তি পর্যন্ত তাঁদের জন্যে পেশ করেন।

এ জিনিসই ইতিহাসের মোড় বদলে দিয়েছে। ইসলামকে একটি দাওয়াত ও আন্দোলনের স্থান থেকে উঠিয়ে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের মর্যাদায় ভূষিত করেছে। সেই সাথে নবীকে (স) এ সুযোগ দান করে যে- তিনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দারুল ইসলামে ইসলামের এক একটি দিক বাস্তবায়িত করে দুনিয়ার সামনে যেন এ নমুনা পেশ করতে পারেন যে, লা শরীক আল্লাহর প্রেরিত দ্বীন কেমন লোক তৈরী করে, কেমন সমাজ গঠন করে, কোন ধরনের সভ্যতা সংস্কৃতির জন্ম দেয়,কেমন চারিত্রিক প্রাণশক্তি গোটা সমাজে সঞ্চারিত করে। অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা, শিক্ষা, রাজনীতি, আইন ও বিচার বিভাগের কেমন ব্যবস্থা কায়েম করে। যুদ্ধে তার নীতি ক,ি বিজয় লাভের পর বিজিতদের সাথে কেমন  আচরণ করে, চুক্তি করার পর কিভাবে তা মেনে চলে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তার দৃষ্টিভংগী কি, তার নমুনার উপাদান কি ছিল এবং বাস্তবে তা পেশ করার পর কি সুফল হলো- এ বিষয়বস্তু আলোচনা করা হবে তৃতীয় খন্ডে।

—  সমাপ্ত —

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.