সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

সপ্তম অধ্যায়

সাধারণ দাওয়াতের সূচনা

আগের দুটো পরিচ্ছদে যা কিছু বলা হয়েছে তার থেকে এ কথা ভালোভাবে বুঝতে পারা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেয়ার পর যখন প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন, তখন তার জন্য কুরাইশ  এবং সাধারণ আরববাসীর এতোটা ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ কি ছিল এবং কেন তারা নবীর বিরুদ্ধে এতো প্রতিবন্ধকতা, শক্রতা ও অভদ্র আচরণে মেতে উঠলো। সেই সাথে এ আলোচনায় এ কথাও ভালোভাবে জানা যায় যে, ইসলামের এ দাওয়াত যুক্তি ও  চরিত্রের কেমন শক্তিশালী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে উপস্থাপিত হয়েছিল যে, তার সামনে পুরাতন জাহেলিয়াত তার সকল কৌশল, ছল-চাতুরী এবং জুলুম নিষ্পেষণ সত্ত্বেও অসহায় হয়ে পড়লো। এখন আমরা ঐতিহাসিক বর্ণনার ধারাবাহিকতা সে স্থান থেকেই শুরু করছি যেখানে চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা ছেড়ে এসেছিলাম।

ইসলামের সর্বপ্রথম প্রকাশ

যদিও ঐতিহাসিক ও সীরাত প্রণেতাগণ এ বিষয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেননি, কিন্তু কুরআন পাকে সূরায়ে আলাকের প্রাথমিক পাঁচ আয়াতের পর যেভাবে হঠাৎ আয়াত ৬-২১ পর্যন্ত এ ঘটনা বয়ান করা হয় যে, এক ব্যক্তি আল্লাহর এক বান্দাহকে নামায পড়তে নিষেধ করে এবং ধমক দিয়ে তাকে বিরত রাখতে চায়। হাদীসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্হগুলোতে এ ঘটনার ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, নামায পাঠকারী স্বয়ং নবী (সা) ছিলেন এবং বাধাদানকারী আবু জেহেল ছিল,  এর উপর চিন্তাভাবনা করলে স্পষ্ট জানা যায় যে, নবী (সা) তাঁর দ্বীনের অভিব্যক্তি সর্বপ্রথম হারামে কাবায় ইসলামী পদ্ধতিতে নামায পড়ে করেন, ঐ সময় পর্যন্ত মুসলমানগণ গোপনে নামায পড়তেন। কেই হারামে কাবা তো দূরের কথা, উন্মুক্ত স্থানেও প্রকাশ্যে নামায পড়ার সাহস করতোনা। শুধু একবার মক্কার এক জনমানবহীন উপত্যকায় হযরত সা’দ বিন আবি ওক্কাস (রা)-এর সাথে মুসলমানদের নামায পড়তে মুশরিকরা দেখে ফেলে। যার ফলে চরম হাংগামা শুরু হয় যেমন আমরা পূর্বে বয়ান করেছি। কিন্তু যখন আল্লাহ তায়ালার এ ইচ্ছা হলো যে, খোলাখুলি ইসলামের প্রচার হোক তখন রাসূলুল্লাহ (সা) নির্ভয়ে ও দ্বিধাহীনচিত্তে হারামে গিয়ে নামায শুরু করেন। এ সাহস তিনি ছাড়া আর কেউ করতে পারতোনা। (গ্রন্হকার কর্তৃক সংযোজন।)

এর থেকে কুরাইশের সাধারণ মানুষ প্রথম এ কথা অনুভব করলো যে, তাদের দ্বীন থেকে মুহাম্মদ (সা) এর দ্বীন ভিন্ন হয়ে গেছে। আর যারা দেখেছিল তারা বিস্মিত ছিল। কিন্তু আবু জেহেলের জাহেলিয়াতের আবেগ উদ্বোলিত হয়ে উঠলো এবং সে নবীকে (সা) ধমক দিয়ে কয়েকবার নামায থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। হযরত আবু হরায়রাহ (রা) বলেন, আবু জেহেল কুরাইশদের জিজ্ঞেস করলো, মুহাম্মদ (সা) কি তোমাদের সামনে যমীনের উপর তার মুখ রাখে? তারা উত্তরে বলে হ্যাঁ, তখন আবু জেহেল বলে, লাত ও ওয্যার কসম। আমি যদি তাকে  এভাবে নামায পড়তে দেখি, তাহলে তার ঘাড়ে পা রেখে দেব এবং তার মুখ মাটিতে র্দন করব। তাপর ঘটনাক্রমে হুযুরকে (সা) নামায পড়তে দেখে সামনে অগ্রসর হলো তাঁর ঘাড়ে পা রাখার জন্য। কিন্তু হঠাৎ লোকেরা দেখলো যে সে পিছু হটছে এবং কোন কিছু দিয়ে মুখ রক্ষার চেষ্টা করছে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, তার কি হলো? সে বল্লো, আমার ও তার মাঝখানে এক আগুনের গর্ত, একটা ভয়ংকর বস্তু এবং পালকও ছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, সে যদি আমার কাছে আসতো তাহলে ফেরেশতাগণ তার মস্তক উড়িয়ে দিত (আহমদ, মুসলিম নাসায়ী, ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতিম, ইবনুল মুনাযের, ইবনে মারদুয়া, নুয়াইম, ইসপাহানী, বায়হাকী)।

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, আবু জাহেল বল্লো, আমি মুহাম্মদকে (সা) কাবার নিকটে নামায পড়তে দেখলে তাঁর ঘাড় পায়ের তলায় নিষ্পোষিত করব। নবীর (সা) নিকটে এ খবর পৌঁছলে তিনি বলেন, যদি তারা এমন করে তাহলে ফেরেশতাগণ প্রকাশ্যে তাকে ধরে ফেলবে (বোখারী, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে জারীর, আবদুর রাজ্জা, আবদ বিন হামীদ, ইবনুল মুনযের, ইবনে মারদুয়া)।

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন যে, নবী (সা) মাকামে ইব্রাহীমে নামায পড়ছিলেন। আবু জেহেল সেদিক দিয়ে যাচ্ছিল। সে বল্লো, মুহাম্মদ (সা) তোমাকে কি আমি নিষেধ করে দিইনি? এই বলে সে ধমক দিতে লাগলো।  তার  জবাবে নবী মুহাম্মদ (সা) কঠোরভাবে তাকে তিরস্কার করলেন। তার উত্তরে আবু জেহেল বলে, হে মুহাম্মদ (সা)! তুমি কার বলে আমাকে ভয় দেখাচ্ছো? খোদার কসমঙ! এ উপত্যকায় আমার সমর্থনকারী সকলের চেয়ে বেশী (ইবনে জারীর, আহমদ, তিরমিযি, নাসায়ী, ইবনে আবি শায়বা, ইবনুল মুনযের, তাবারানী,  ইবনে মারদুয়া)। (তাফহীমুল কুরআন ৬ষ্ঠ খন্ড- ভূমিকা সূরা ‘আলাক’।)

তাপর কুরাইশদের অন্যান্য লোকেরাও দলবদ্ধ হয়ে হারামে কাবায় নবী মুহাম্মদকে (সা) নামায পড়তে বাধা দান করে। কিনতউ তারা ব্যর্থ হয়। কুরআনে বলে-

******************************************************

এবং আল্লাহর বান্দাহ যখন তাঁকে ডাকার জন্য দাঁড়ালো তখন লোক তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে তৈরী হলো (জ্বিনঃ১৯)।

এখানেও তফসীরকারগণ আল্লাহর বান্দাহ বলতে নবী মুহাম্মদকেই (সা) বুঝিয়েছেন। আর আয়াত প্রমাণ করে যে, নবী (সা) প্রকাশ্যে নামায পড়া বন্ধ করেননি, যদিও আবু জেহেল ছাড়াও কুরাইশের অন্যান্য লোকেরও তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত হতে থাকে।

আপন পরিবার বর্গের প্রতি দাওয়াত

নবী মুহাম্মদ (স) দ্বিতীয় যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা এই যে, তিনি আল্লাহ তায়ালার এ নির্দেশ-

******************************************************

অনুযায়ী আপন পরিবারবর্গকে তাঁর বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। তাদের মধ্যে বনী আবদুল মুত্তালিব ও বনী হাশেম ছাড়াও কতিপয় বনী আল মুত্তালিব ও বনি আবেদ মানাফের লোকও ছিল। বালাযূরী ও ইবনে কাসির বলেন, ও দাওয়াতে মোট পয়ঁতাল্লিশ জন শরীক হয়। নবী (স) এর কিছু বলার পূর্বেই আবূ লাহাব বলতে শুরু করে, এখানে তোমার চাচা ও চাচাতো ভাই রয়েছে। যা ইচ্ছা বলতে পার। তবে দ্বীন থেকে ফিরে যাওয়ার কথা বলোনা। তোমার মনে রাখা উচিত যে, তোমার কওম সমস্ত আরবের বিরুদ্ধে লড়বার শক্তি রাখেনা। তোমার হাত ধরে তোমাকে নিবৃত্ত করার সবচেয়ে হকদার তোমার পরিবারের লোকেরা। তুমি যা করছো তার উপর যদি অটল থাক তাহলে কুরাইশদের সকলে তোমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে এবং আরববাসী তাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে। আমি এমন কাউকে দেখিনি যে আপন পরিবারবর্গের উপর এর চেয়ে অধিকতর বিপদ এনে দিয়েছে। যা তুমি এনেছো।

এভাবে আবু লাহাব প্রথম বৈঠক বানচাল করে দেয়। দ্বিতীয় দিন পুনরায় নবী (সা) তার পরিবারের লোকজনকে দাওয়াত করে তাদের সামনে নিজের দ্বীনী দাওয়াত পেশ করেন। আবু তালেব বলেন, আমি আবদুল মুত্তালিবের দ্বীন ছাড়তে চাইনা। তবে যে কাজের আদেশ তোমাকে দেয়া হয়েছে তা তুমি করতে থাকো। আমি তোমার সমর্থন ও হেফাজত করব।

আবু লাহাব বলে, খোদার কসম। এ বড়ো খারাপ কথা। অন্য কেউ তার হাত ধরার আগে তুমি তার হাত ধর। আবু তালেব বলেন, খোদার কসম! যতোক্ষণ জীবন আছে, ততোক্ষণ তার হেফাজত আমি করব। এ বর্ণনা বালাযুরী এবং ইবনে আমীর জাফর বিন আবদুল বিন আবিল হাকামের বরাত দিয়ে উদ্ধৃত করেন যিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী (আনসাবুল আশরাফ লিল বালাযুয়ী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৮-১১৯, তারিখুল কামেল লে- ইবনে আমীর ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯-৪১)।(গ্রন্হকালের সংযোজন।)

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায় যে, নবী (সা) যে ভাষণ দান করেন, তা প্রত্যেকের নাম ধরে ধরে করেন- হে আবদুল মুত্তালিবের সন্তানগণ, হে আব্বাস, হে সুফিয়া (রাসুলুল্লাহর ফুফু), হে ফাতেমা (নবীর কন্যা), তোমরা নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। কারণ, আল্লাহর পাকড়াও থেকে তোমাদের বাঁচাবার কোন অধিকার আমার নেই। অবশ্যি আমার মাল থেকে যা ইচ্ছা কর চাইতে পার। তাঁর ভাষণ নিম্নরূপঃ

******************************************************

তাঁর এ ভাষণ শুধু আপনজনদের কাছে হকের দাওয়াতই ছিলনা। বরঞ্চ এর থেকে এ কথাও প্রকাশ পায় যে, খোদার দ্বীন নিরপেক্ষ। এতে নবীর (স) সত্তা এবং তাঁর নিকটতম আত্মীয়দের জন্যও কোন বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অবকাশ নেই। এখানে যার সাথেই কোন আচরণ করা হোক না কেন, তা করা হবে তার গুণাবলীর প্রতি লক্ষ্য  রেখে। আরো বংশ মর্যাদা এবং কারো াসথে কোন লোকের সম্পর্ক কোন কাজেই আসবেনা। গোমরাহী এবং অসৎ কাজের জন্য খোদার শাস্তির ভয় সকলের জন্যই একই রূপ। এমন নয় যে, অন্যান্য সকলকেও পাকড়াও করা হবে কিন্তু নবীর আত্মীয় স্বজন এর থেকে রেহাই পাবে। এ নীতিতে সুস্পস্ট করে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল বিধায় হুযুর (স) এর ভাষণে স্বয়ং আপন কন্যা হযরত ফাতেমার (রা) নাম উল্লেখ করেন। অথচ তাঁর বয়স তখন দু’আড়াই বছরের বেশী ছিলনা। প্রকাশ থাকে যে, তিনি কিছুতেই এ দায়িত্বে আওতাভুক্ত ছিলেননা যে, তাঁর সম্পর্কে কোন শাস্তি বা সওয়াবের প্রশ্ন সৃষ্টি হতে পারতো। কিন্তু এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এ সত্য তুলে ধরা যে, দ্বীন ইসলামে নবী এবং তাঁর পরিবারের জন্য কোন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নেই যার থেকে অন্যান্যগণ বঞ্চিত। যা জীবনহরণকারী বিষ, সকলের জন্যই বিষ। নবীর কাজ হচ্ছে এই যে, সবার আগে তার থেকে নিজে দূরে থাকবেন এবং তার নিকট আত্মীয়গণকে তার প্রতি ভীতি প্রদর্শন করবেন। তারপর সর্বসাধারণকে সাবধান করে দেবেন যে, যে তা ভক্ষণ করবে সে মৃত্যুবরণ করবে। আর যা উপকারী তা সকলের জন্যই উপকারী। নবীর কাজই হচ্ছে এই যে, সকলের আগে তিনি স্বয়ং তা গ্রহণ করবেন এবং প্রিয়জনকে তা গ্রহণের উপদেশ দেবেন যেন প্রত্যেকে দেখতে পায় যে, এ নহিত উপদেশ অন্যদের জন্যই নয়। বরঞ্চ নবী (স) তাঁর দাওয়াতে একেবারে আন্তরিক। কারণ নিজেও তা মেনে চলেন এবং অপরকেও মেনে চলার উপদেশ দেন। (তাফহীমুল কুরআন-৩য় খন্ড- আশ-শুয়ারা- টিকা ৩৫।)

কুরাইশের সকল পরিবারের প্রতি ইসলামের দাওয়াত

অতঃপর তৃতীয় পদক্ষেপ যা তিনি গ্রহণ করেন তা এই যে, একদিন অতি প্রত্যুষে সাফা পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে ডাক দিলের ‘ইয়া সাবাহা’ (হায় সকাল বেলার বিপদ)। হে কুরাইশের লোকেরা! হে নবী কা’ব বিন লুই। হে বনী মুররা, হে কুসাই এর লোকেরা, হে আবদে মানাফ, হে আবদে শামস, হে আবদুল মুত্তালিবের লোকেরা!  এভাবে কুরাইশের এক এক গোত্র ও পরিবারের নাম ধরে তিনি আওয়াজ দেন। আরবের রীতি ছিল যে, যখন প্রভাতে হঠাৎ কোন আক্রমণের আশংকা হতো, তাহলে যেই তা জানতে পারতো, সে এভাবে আওয়াজ দিত এবং লোক তার আওয়াজ শুনে চারদিক থেকে সেদিকে দৌড় দিত। বস্তুতঃ নবী (স) এর এরূপ আওয়াজ শুনে সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। যে আসতে পারলোনা সে অন্য কাউকে খবর নেয়ার জন্য পাঠিয়ে দিল। সকলে একত্র হওয়ার পর নবী (স( বলেন, হে লোকেরা! যদি আমি তোমাদেরকে বলি যে, পাহাড়ের অন্যদিকে এক বিরাট সৈন্য বাহিনী রয়েছে, যে তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। তাহলে আমার কথা সত্য মনে করবে? সকলে সমস্বরে বলে, আমাদের অভিজ্ঞতা যে তুমি কোনদিন মিথ্যা বলনি। নবী (স) বলেন, তো আমি তোমাদেরকে খোদার আযাব আসার পূর্বে সাবধান করে দিচ্ছি। নিজেদেরকে তার থেকে রক্ষা করার চিন্তা কর। আমি খোদার মুকাবিলায় তোমাদের কোন কাজে লাগবনা। কিয়ামতে আমার আত্মীয় শুধু তারা হবে যারা খোদাকে ভয় করে। এমন যেন না হয় যে, অন্যরা নেক আমল নিয়ে আসবে এবং তোমরা দুনিয়ার সকল শান্তি ও যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে হাযির হবে। সে সময়ে তোমরা ডাকবে, হে মুহাম্মদ! কিন্তু আমি তোমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবো। অবশ্যি দুনিয়াতে তোমাদের আমার রক্তের সম্পর্কে রয়েছে এবং এখানে তোমাদের সাথে আত্মীয়তাসুলভ সধাচরণই করব। বোখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমদ, তিরমিযি, নাসায়ী এবং তাফসীরে ইবনে জারীর-এ হযরত আয়েশা (রা), হযরত আবু হুরায়রাহ (রা), হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা), হযরত যুবাইর বিন আমর (রা), হযরত কাবীসা বিন মুখারেক (রা) প্রমুখ থেকে বর্ণিত)। (তাফহীমুল কুরআন- ৩য় খন্ড- আশ- শুয়ারা- টীকা ৩৫।)

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বিভিন্ন সূত্রে এ বর্ণনা মুহাদ্দিসগণ উদ্ধৃত  করেছেন যে, যখন নবী মুহাম্মদকে (স) সর্বসাধারণকে দাওয়াত দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় এবং কুরআনেই এ হেদায়াত নাযিল হয় যে, তিনি  যেন সর্ব প্রথম নিকট আত্মীয়-স্বজনকে খোদার আযাবের ভয় দেখান, তখন তিনি তিনি অতি প্রত্যুষে সাফা পাহাড়ে উঠে উচ্চস্বরে এভাবে ডাক দেন, ইয়া সাবাহা (হায় প্রাতঃকালীন বিপদ)। আরবে এ ডাক সে ব্যক্তি দিত, যে দেখতে পেত প্রাতঃকালে ঝাপটার বেগে কোন জানতে চাইলে এ ডাক কে দিচ্ছে। বলা হলো, এ ডাক মুহাম্মদ (স) এর। এর ফলে কুরাইশের সকল পরিবারের লোক তাঁর দিকে দৌড় দিল। যে যেতে পারলোনা সে নিজের পক্ষ থেকে অন্য কাউকে পাঠালো। সকলে সমবেত হওয়ার পর, হুযুর (স) কুরাইশের এক এক পরিবারের নাম ধরে ধরে ডাকলেন, হে বনী হাশেম, হে বনী আবদুল মুত্তালিব, হে বনী ফেহর, হে বনী অমুক, হে বনী অমুক। আমি যদি বলি যে, পাহাড়ের পশ্চাৎ দিক থেকে একদল সৈন্য তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত, তাহলে আমার কথায় বিশ্বাস করবে? সকলে বলে, হ্যাঁ (তোমার কথা বিশ্বাস করি)। কারণ, তোমার মিথ্যা কথা বলার কোন অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। হুযুর (স) বলেন, আমি তোমাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছি যে, ভবিষ্যতে কঠিন শাস্তি আসছে। তারঃপর কারো কিছু বলার পূর্বে হুযুরের (স) চাচা আবু লাহাব বলে,

******************************************************

‘তোমার সর্বনাশ হোক, তুমি কি এ জন্য আমাদেরকে এখানে একত্র করেছ?’

আর এক বর্ণনায় আছে যে, হুযুরকে (স) ছুঁড়ে মারার জন্য আবু লাহাব পাথর হাতে তুলে নেয়। (মুসনাদে আহমদ, বোখারী মুসলিম, তিরমিযি, ইবনে জারীর প্রমুখ)।(তাফহীমুল কুরআন- ষষ্ঠ খন্ড- ভূমিকা- সূরা লাহাব।)

ইবনে সা’দ ইবনে আাব্বাস (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে যা বলেন তার মধ্যে এ কথাগুলোও ছিল- কুরাইশদের সম্বোধন করে নবী (স) বলেন, আল্লাহ আমাকে নিকট আত্মীয়দের সাবধান করে দেয়ার আদেশ করেছেন এবং তোমরা কুরাইশের লোকেরা আমার নিকট আত্মীয়, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কিছু দেখাবার এবং আখেরাতে কোন অংশ লাভ করবার অধিকার রাখিনা। অবশ্যি তোমরা যদি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ মেনে নাও, তাহলে আমি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের সপক্ষে সাক্ষ্য দেব। আর এ কালেমার বদৌলতে আরব তোমাদের অনুগত এবং আজম বশীভূত হবে। এর জবাবে আবু লাহাব বলে, তোমার সর্বনাশ হোক। এ জন্য কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছিলে?

আবু লাহাবের আচরণ

এভাবে আবু লাহাব [এ ব্যক্তির প্রকৃত নাম ছিল, আবদুল ওয্যা বিন আদুল মুত্তালিব। কুনিয়াত ছিল আবু ওতবা। কিন্তু আতর দুধ ও আলতা রঙের উজ্জ্বল চেহারার জন্য আবু লাহাব (জ্বলজ্বলে সৌন্দর্য) নামে খ্যাতি লাভ করে। ইবনে সাদ বলেন স্বয়ং আবদুল মুত্তালিব তাকে আবু লাহাব বলে ডাকতেন। এ জন্যে প্রকৃত নাম চাপা পড়ে যায়-গ্রন্হকার।] প্রথম দিন থেকেই নবী (স) এর বিরোধিতার জন্য বদ্ধপরিকর হয় এবং আমরণ নবীর সাথে এবং তাঁর কারণে আপন পরিবারের সাথে এমন দুশমনী করতে থাকে যা কোন চরম দুশন করে থাকে। যদিও বনী হাশিমের আর একজন আবু সুফিয়ান বিন আল হারেস বিন আবু মুত্তালিবও নবীর বিরোধী হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমতঃ আবু লাহাবের বিরোধিতা থেকে তাঁর বিরোধিতা বেশী ছিলনা। আবু লাহাব বিশ বছর যাবত নবী ও তাঁর সাহাবীদের বিরুদ্ধে বিদ্রুপাত্মক কবিতা লিখে শুনাতো এবং হিজরতের পর যুদ্ধগুলোতে নবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো। আবু লাহাব এবং আবু সুফিয়ানের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য ছিল তা এই যে, দ্বিতীয় জনের মন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বস্তুতঃ মক্কা বিজয়ের পূর্বেই তিনি আবওয়া নামক স্থানে নবীর হাতে বায়আত করেন।[তাবকাত ইবনে সাদ, ৪র্থ খন্ড পৃষ্ঠা ৪৯-৫০ অনুযায়ী ইনি নবী (স) এর চাচতো ভাই ছিলেন। হালিমা সাদীয়ার দুধ পানের কারণে দুধ ভাইও ছিলেন। জাহেলিয়াতের যুগে নবী (স) এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। কিন্তু নবুওতের পর চমর বিরোধী হয়ে যান। বালাযুরী, আনসাবুল আশরাফ প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৬১) এরা একই কথা বলেন। অতিরিক্ত এতোটুকু বলেন যে, হযরত আব্বাস (রা) এর সুপারিশক্রমে নবী (স) তাকে মাফ করে দেন। আবওয়াতে তাঁর উপস্থিতিকে দুর্বল বক্তব্য বলে উল্লেখ করেন। এ বক্তব্যকে প্রাধান্য দেন যে এ ক্ষমা করার আবেদন নিয়ে নিকুল ওকাব (মক্কা মদীনার মধ্যবর্তী হুজফার নিকটই একটি স্থান) নামক স্থানে হাযির হন। মুজামুল বুলদানেও এ কথা বলা হয়েছে। গ্রন্হকার]

কিন্তু আবু লাহাবের ব্যাপার একেবারে ভিন্ন ধরনের সে শুধু মানবতারই নয়, বরঞ্চ আরবের সর্বস্বীকৃত নৈতিক ঐতিহ্যের সকল সীমা লংঘন করে এবং নবীর শক্রতার মানবতা ও ভদ্রতার পরিবর্তে চরম নীচতায় নেমে আসে। অথচ উভয়ের মধ্যে রক্তের সম্পর্কে ছিল। তার এ আত্মীয়তার কারণে অন্যান্যের বিরোধিতার তুলনায় তার বিরোধিতা দ্বীনের পথে বিরাট প্রতিবন্ধক হয়ে পড়ে।(সংযোজন।)

এটাই কারণ যে, সে সময়ের ইসলামের সকল দুশমনের মধ্যে আবু  লাহাবই একমাত্র ব্যক্তি যার নাম নিয়ে কুরআনে তার নিন্দা করা হয়েছে। অথচ মক্কায় এবং হিজরতের পর মদীনাতেও এমন বহু লোক ছিল যারা ইসলাম ও মুহাম্মদ (স) এর শক্রতায় তার চেয়ে কোনদিক দিয়ে কম ছিলনা। প্রশ্ন এই যে, এ ব্যক্তির কি বৈশিষ্ট্য ছিল যার জন্য কুরআনে তার নাম নিয়ে ক্রোধ প্রকাশ করা হয়। এ কথা উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন যে, সে সময়ের আরব সমাজকে জানতে হবে এবং এর প্রেক্ষিতে আবু লাহাবের আচরণ লক্ষ্য করতে হবে।

কুরআনে আবু লাহাবের নাম নিয়ে তার নিন্দা করার কারণ

প্রাচীনকালে যেহেতু সমগ্র আরবে চারদিকে নিরাপত্তাহীনতা, বিশৃংখলা, খুন খারাবি, লুঠতরাজ প্রভৃতি ছড়িয়ে ছিল এবং শত শত বছর যাবত অবস্থা এ ছিল যে, কোন ব্যক্তির জন্য তার আপন পরিবার ও জ্ঞাতি গোষ্ঠকে সমর্থন ছাড়া জানামল ও ইজ্জত আবরুর হেফাজতের কোন নিশ্চয়তা ছিলনা। সে জন্য আরব সমাজের নৈতিক মূল্যবোধের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সদ্ব্যবহার করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। তাদের সম্পর্ক ছিন্ন করা বড়ো পাপ মনে করা হতো। আরবের এসব ঐতিহ্যের প্রভাব এ ছিল যে, রাসূলুল্লাহ (স) যখন ইসলামী দাওয়াতসহ আবির্ভুত হলেন তখন কুরাইশের অন্যান্য পরিবার ও সর্দারগণ হুযুরের (স) চরম বিরোধীনা শুরু করে। কিন্তু বনী হাশেম ও বনী আল মুত্তালিব (হাশিমের ভাই মুত্তালিবের সন্তানগণ) তাঁর বিরোধিতা করেননি, তাই নয, বরঞ্চ প্রকাশ্যে তাঁকে সমর্থন করতে থাকে। অথচ তাদের অধিকাংশ হুযুরের (স) নবুওতের উপর ঈমান আনেনি। কুরাইশের অন্যান্য পরিবারসমূহ স্বয়ং হুযুরের (স) এ সব জ্ঞাতি গোষ্ঠীকে সমর্থন করা আরবের নৈতিক ঐতিহ্রের রীতি পদ্ধতিই মনে করতো। এ কারণে তারা কখনো বনি হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবকে ভৎসনা করেনি যে তারা ভিন্ন  এক দ্বীন প্রচারককে সমর্থন করে আপন পূর্ব পুরুষের দ্বীন থেকে সরে পড়েছে। তারা এ কথা জানতো এবং স্বীকার করতো যে, নিজের পরিবারের এক ব্যক্তিকে তারা কোন অবস্থাতেই দুশমনের হাতে তুলে নিতে পারতোনা এবং তাদের আপন আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য সহযোগিতা করা সকলের জন্য স্বাভাবিক ও প্রকৃতিগত ছিল।

এ নৈতিক মূল্যবোধকে জাহেলিয়াতের যুগেও আরববাসী শ্রদ্ধার চোখে দেখতো। শুধু এক ব্যক্তি ইসলামের প্রতি শক্রতায় অন্ধ হয়ে সব ঐতিহ্য ও নৈতিক মূল্যবোধ চূর্ণ করে।

আর সে ব্যক্তি হলো আবু লাহাব বিন আবদুল মুত্তালিব। সে ছিল নবী (স) এর  চাচা।  হুযুরের (স) পিতা ও আবু লাহাবের পিতা একই ব্যক্তি যদিও মা ছিল ভিন্ন। আরবে চাচাকে পিতার স্থলাভিষিক্ত মনে করা হতো। বিশেষ করে ভাতিজর পিতা যখন মৃত্যু বরণ করতো। আরব সমাজে এটাই আশা করা হতো যে, চাচা ভাতিজাকে আপন সন্তানের মতোই মনে করবে। কিন্তু এ ব্যক্তি ইসলামের প্রতি শক্রতা এবং কুফরের প্রতি ভালোবাসার কারণে সকল আরব ঐতিহ্য ধ্বংস করে।

হুযুরের (স) নিকৃষ্ট প্রতিবেশী

মক্কায় আবু লাহাব ছিল হুযুরের (স) সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী। উভয়ের বাড়ি ছিল একটি প্রাচীরের এপার-ওপারে। উপরস্তু হাকাম বিন আস (মারওয়ানের পিতা) ওকবা বিন আবি মুয়অইত, সাদী বিন হামরায়েখ সাকাফী এবং ইবনুল আসদায়েল হুযালীও হুযুরের প্রতিবেশী ছিল।[ইবনে সাদ বলেন, এদের মধ্যে আবু লাহাব এবং ওকবা সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশী ছিল। তিনি হযরত আয়েশার (রা) বর্ণনা উদ্ধৃতি করে বলেন যে, নবী (স) বলেছেন, আমি দুজন অতি নিকৃষ্ট প্রতিবেশীর মধ্যে বাস করতাম। একজন আবু লাহাব, অন্যজন ওকবা। এর থেকে জানা যায় যে, হুযুর (স) এর বাড়ি এ দুজনের মাঝে ছিল।- গ্রন্হকার] এরা নবীকে (স) বাড়িতে শান্তিতে থাকতে দিতনা। তিনি কখনো নামায পড়ছেন এমন সময়ে এরা উপরে থেকে ছাগলের নাড়ি-ভুঁড়ি নিক্ষেপ করতো। কখনো উঠানে খানা খাক করা হচ্ছে, এমন সময় এরা পাতিলের উপর ময়লা আবর্জনা নিক্ষেপ করতো। হুযুর (স) বাইরে বেরিয়ে তাদেরকে বলতেন, হে আবেদ মানাফ, এ কোন ধরনের প্রতিবেশীসুলভ আচরণ?

আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীল (আবু সুফিয়ানের ভগ্নি) এটাকে তার স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করেছিল যে, রাতে নবীর ঘরের দরজায় কন্টকপূর্ণ গুল্মগুচ্ছ ফেলে দিত যাতে নবী অথবা তাঁর সন্তানগণ বাইরে বেরুতে গেলে তাঁদের পা কাঁটায় জর্জরিত হয়।

-(বায়হাকী, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে জারীর, ইবনে আসাকের, বালাযুরী, ইবনে হিশাম)।

হুযুরের (স) কন্যাদেরকে তালাক দিতে আবু লাহাব তার পুত্রদের বাধ্য করে

নবুওয়াতের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (স) এর দুই কন্যার বিয়ে আবু লাহাবের দুই পুত্র ওতবা ও ওতায়বার সাথে হয়েছিল। [তাবারানীতে কাতাদার একটি বর্ণনায় আছে যে, হযরত উম্মে কুলসুম (রা) এর বিয়ে ওতায়বার সাথে এবং হযরত রোকেয়ার (রা) বিয়ে ওতবার সাথে হয়েছিল। ইবনে কুতায়বা আল মায়ারেফে এবং সুহায়লী রাওযুল উনুকেও এ কথা বলেছেন। কিন্তু ইবনে ইসহাক বলেছেন যে, ওতবার বিয়ে হুরত রোকেয়ার সাথে হয়েছিল, না হযরত উম্মে কুলসুমের (রা) সাথে এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। ইবনে কুতায়বা মায়ারেফে, যুরকানী শরহে মাওয়াহেবে এবং তাবারী তাঁর ইতিহাসে লিখেছেন তাঁল বিয়ে হযরত ওসমান (রা) এর সাথে দেন। -গ্রন্হকার।] নবুওতের পর যখন হুযুর (স) ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন, তখন আবু লাহাব তার দু’ছেলেকে বলে, যদি তোমরা মুহাম্মদের (স) মেয়েদেরকে তালাক না দাও, তাহলে তোমাদের মুখ দেখা আমার জন্য হারাম। অতএব উভয়েই তালাক দিয়ে দেয়। ওতায়বাহ অজ্ঞতার সীমা এতোটা লংঘন করে যে, সে নবীর (স) সামনে এসে বলে, আমি *********************  এবং  ********************* মানিনা। এ কথা বলে সে নবীর (স) প্রতি থুথু নিক্ষেপ করে, যা বনীর (স) গায়ে পড়েনা। নবী (স) বলেন, হে খোদা! তার একটি কুকুরকে তার উপর চাপিয়ে দাও। তারপর ওতায়বাহ তার পিতার সাথে বাণির্জৈল উদ্দেশ্যে শাম দেশ ভ্রমনে বের হয়। ভ্রমণকালে তারা এমন একস্থানে শিবির স্থাপন করে যেখানকার স্থানীয় অধিবাসীগণ বলে যে, এখানে রাতের বেলায় হিংস্র জন্তুর আনাগোনা হয়। আবু লাহাব তার সাথী কুরাইশদেরকে বলে, আমার ছেলের নিরাপত্তার ব্যবস্থা কর। কারণ আমি মুহাম্মদের (স) বদদোয়ায় ভয় করি।[এর অর্থ এই যে কমবখত মনে মনে হুযুরের (স) বুযর্গী মানতো এবং ভয় করতো যে তার মুখ থেকে বের হওয়া বদদোয়া ব্যর্থ হবার নয়। গ্রন্হকার।] তার কাফেলার লোকজন ওতায়বার চারধারে উট বসিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। রাত্রে একটি বাঘ এসে উটের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে ওতায়বাকে খেয়ে ফেলে। (আল ইস্তিয়াব ইবনে আবদুল বারর, আল ইসাবাহ ইবনে হাজার, আসসাবুল আশরাফ বালাযুরী, দালায়েূলুন নবুওয়াত- আবু নাঈম ইসফেহানী, রাওযুল উনুফ-সুহায়লী)।

এ বিষয়ে কিছু মতানৈক্য আছে। কেউ বলেন, তালাকের ঘটনাটি নবুওয়াতের পূর্বে সংঘটিত হয়। আর কেই বলেন, ********************* নাযিল হওয়ার পর। এ বিষয়েও দ্বিমত আছে যে, রাঘে যাকে খেয়ে ফেল্ল সে ওতায়বা, না ওতবা। কিন্তু এ কথা প্রমাণিত যে, মক্কা বিজয়ের পর ওতবা ইসলাম গ্রহণ করে স্বয়ং নবী পাকের (স) হাতে বায়আত করে। অতএব সত্য কথা এই যে, উপরোক্ত পুত্র ওতায়বা ছিল।

নবী পুত্রের মৃত্যুতে আনন্দ প্রকাশ

তার মনের নীচতা ও জঘন্যতা এমন ছিল যে, নবী (স) এর পুত্র হযরত কাসেমের (রা) ইন্তেকালের পর তাঁর দ্বিতীয় পুত্র হযরত আবদুল্লাহও (রা) ইন্তেকাল করেন, তখন আপন ভাতিজার শোকে শরীক হওয়ার পরিবর্তে আনন্দে অধীর হয়ে দৌড়ে কুরাইশ সর্দারদের নিকট পৌঁছে বলে, আজ মুহাম্মদের (স) নাম-নিশানা মুছে গেল।

ইসলামী দাওয়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি

নবী (স) যেখানেই ইসলামী দাওয়াতের জন্য যেতেন, সে তাঁর পেছনে পেছনে যেতো এবং তাঁর কথা শুনতে লোকদের বাধা দিত। রাবিয়অ বিন আববাদ (এবাদ) [ইবনে ইসহাক এবাদ এবং ইবনে হিশাম আববাদ লিখেছেন। গ্রন্হকার] আদ্দিলী বলেন, আমি ছোটবেলায় আমার পিতার সাথে যুলমাজায বাজারে যাই। সেখানে আমি রাসূলুল্লাহকে (স) একথা বলতে শুনি, হে লোকেরা! বল আল্লাহ ছাড়া আর কান মাবুদ নেই। তাহলে তোমরা সাফল্য লাভ করবে। তাঁর পেছনে এক ব্যক্তি এ কথা বলছিল, এ মিথ্যাবাদী, পূর্ব পুরুষের দ্বীন থেকে বেরিয়ে গেছে।

“আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? লোকে বললো, এঁর চাচা- আবু লাহাব”।

(মুসনাদে আহমদ, তাবারানী, বায়হাকী)

সেই হযরত রাবিয়অ থেকে আর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, আমি দেখলাম নবী (স) একটি গোত্রের শিবিরে উপস্থিত হয়ে বলছেন, হে বনী অমুক, আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল হিসেবে এসেছি। তোমাদেরকে হেদায়েত করছিল যে তোমরা একমাত্র আল্লাহর এবাদত কর এবং তাঁর সাথে অন্যকে শরীক করোনা। তোমরা আমাকে সথ্য বলে মান এবং আমার সহযোগিতা কর, যাত আমি সে কাজ সম্পন্ন করি যার জন্য আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন।

তাঁর পেছনে পেছনে আর এক ব্যক্তি আসছে এবং বলছে, হে বনী অমুক! এ তোমাদেরকে লাত ও ওয্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে সেই বেদআতের দিকে নিয়ে যেতে চায় যা নিয়ে সে এসেছে। তার কথা কখনো শুনবেনা এবং তাকে মানবেনা। আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কে? তিনি বল্লেন এ তাঁর চাচা আবু লাহাব (মুসনাদে আহমদ, তাবারানী, ইবনে হিশাম, তাবারী।)

তারেক বিন আবদুল্লাহ আল মুহাবেরী প্রায় এ ধরনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, আমি যুল মাজাযের বাজারে দেখলাম রাসূলুল্লাহ (স) উচ্চস্বরে বলছেন, হে লোকেরা! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল, সাফল্য লাভ করবে। তাঁর পেছনে পেছনে এক ব্যক্তি চলছিল, যে নবীর উপর পাথর নিক্ষেপ করছিল, আর নবীর পদদ্বয় থেকে রক্ত ঝরছিল। সে বলছিল, এ মিথ্যাবাদী, তার কথা শুননা। আমি লোকদের জিজ্ঞেস করলাম, লোকটি কে? তারা বললো, সে তাঁর চাচা আবু লাহাব (ইবনে আবি শঅয়বা, আবু ইয়া’লা, ইবনে হিববান, হাকেম, তাবারানী, নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহ সংক্ষেপে এ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন।)

শিয়াবে আবি তালেব ঘেরাও কালে আবু লাহাবের আচরণ

নবুওয়াতের সপ্তম বর্ষে যখন কুরাইশের সকল পরিবার বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবের সাথে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং এ দুটি পরিবার নবী (স) এর সমর্থনে অবিচল থেকে যখন শিয়াবে আবি তালেবে অবরুদ্ধ থাকে, তখন একমাত্র এই আবু লাহাবই ছিল যে, আপন পরিবারের সাথে না থেকে কুরাইশ কাফেরদের সাথে মিলিত হয়। এ অবরোধ তিন বছর স্থায়ী থাকে এবং এ সময় বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিব অনাহারে দিন কাটাতে থাকে। কিন্তু আবু লাহাবের আচরণ এমন ছিল যে,  মক্কায় কোন ব্যবসায়ী কাফেলা এলে শিয়াবে আবি তালেবের অবরুদ্ধ কোন ব্যক্তি যদি কোন খাদ্য দ্রব্য খরিদ করতে মক্কায় আসতো, তাহলে আবু লাহাব এসব ব্যবসায়ীদের একথা বলতো- এদের কাছে এমন মূল্য চাইবে যেন মোটেও খরিদ করতে না পারে। এতে তোমাদের কোন লোকসান হলে তা আমি পূরণ করব। ব্যবসায়ীরা চরম মূল্য দা করতো এবং খরিদদারগণ ক্ষুধার্ত অবস্থায় শূণ্য হস্তে সন্তানদের নিকটে ফিরে যায়। তাপর আবু লাহাব ঐসব ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে বাজার দরে পণ্যদ্রব্য খরিদ করতো।

তার বিরোধিতা ইসলামী দাওয়াতের কাজে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো

মক্কার বাইরের আরববাসী হজ্বের জন্য মক্কায় আসতো অথবা বিভিন্ন স্থানে যে বাজার বসতো সেখানে জমায়েত হতো। তাদের সামনে যখন নবী (স) এর আপন চাচা তাঁর পেছনে লেগে থেকে বিরোধিতা করতো, তখন আরবের প্রসিদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী এটা আশা করা যেতোনা যে কোন চাচা বিনা কারণে অপরের সামনে আপন ভাইপো সম্পর্কে মন্দ কিছু বলবে, তাকে পাথর মারবে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে। এজন্য তারা আবু লাহাবের কথায় প্রভাবিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়তো এবং বলতো আপনার আপনজনই আপনাকে ভালোভাবে জানে।(তাফহীমুল কুরআন- ষষ্ঠ খন্ড- ভূমিকা- সূরা লাহাব।)

তার স্ত্রীর আচরণ

আবু লাহাবের স্ত্রীর বনী উমাইয়া গোত্রের আবু সুফিয়ানের ভগ্নি ছিল। কুরআনে তাকে  ********************* (কাষ্ঠ বহনকারী, চোগলখোর) বলে অভিহিত করা হয়েছে। তার প্রকৃত নাম ছিল, আরওয়া এবং উম্মে জামিল ছিল কুনিয়াত। নবীর শক্রতায় সে স্বামী থেকে কোন দিক দিয়ে কম ছিলনা। হযরত আবু বকরের (রা) কন্যা হযরত আসমা (রা) বলেন, যখন সুরায়ে লাহাব নাযিল হলো এবং উম্মে জামিল তা শুনলো, তখন সে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে রাসূলুল্লাহকে (স) খুঁজতে বেরুলো। তার হাতে ছিল এক মুষ্টি পাথর যা সে নবীকে ছুঁড়ে মারবে। নবীর প্রতি বিদ্রুপাত্মক কিছু কবিতা পড়তে পড়তে সে যাচ্চিল। হেরমে কাবায় পৌঁছার পর সে দেখলো হযরত আবু বকরের (রা) সাথ হুযুর (স) বসেছিলেন। আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল। ঐ দেখুন সে আসছে। আমার ভয় হয় সে আপনার প্রতি কোন কটুক্তি করবে। হুযুর (স) বললেন, সে আমাকে দেখতে পাবেনা। আর তাই হলো, হুযুরের (স) উপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে সে দেখতে পেলনা এবং সে আবু বকরকে (রা) বললো, শুনতে পেলাম, তোমার সাহেব নাকি আমার প্রতি বিদ্রুপ করেছে? হযরত আবু বকর (রা) বললেন, এ ঘরের খোদার কসম, তিনি তো তোমার প্রতি কোন বিদ্রুপ করেননি। তাপর সে ফিরে গেল (ইবনে আবি হাতেম, ইবনে হিশা, বাযযার হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) থেকে এরা একই ধরনের ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন)।(তাফহীমুল কুরআন- ষষ্ঠ খন্ড- টীকা ৩।)

আবু লাহাবের পরিণাম

যদিও কুরআন মজিদ সূরায়ে লাহাব নাযিল হওয়াবে আবুল লাহাব ও তার স্ত্রী অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে, কিন্তু তার মধ্যে যা বলা হয়েছিল তা ছিল, প্রস্তর রেখা। বলা হলো, “ভেঙে গেল আবু লাহাবের হাত”। এ ছিল এক ভবিষ্যদ্বানী যা ক্রিয়অর অতীত কালে এ জন্য ব্যবহার করা হয়েছে যে, তা কার্যকর হওয়া ছিল অতি নিশি।চত এবং তা হয়েছেও। হাত ভাঙার অর্থ দেহের হাত ভাঙা নয় বরঞ্চ কোন ব্যক্তির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়া, যার জন্য সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। প্রকৃত পক্ষে এই হয়েছে যে, হুযুরের (স) বিরোধিতা শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যেই আবু লাহাব এমন ব্যর্থতার সম্মুখীন হয় যা ছিল অত্যন্ত দৃষ্টান্তমুলক। বদর যুদ্ধে কুরাইশের প্রধান প্রধান সর্দারদের মধ্যে অধিকাংশই নিহত হয় যারা ইসলাম দুশমনীতে তার সহযোগী ছিল। মক্কায় এ পরাজয়েরর সংবাদ  যখন পৌঁছলো তখন সে এতোটা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়েছিল যে, সে এক সপ্তাহকালও জীবিত থাকতে পারেনি। আদামা (MALIGNANT PUTULE) নামক রোগে তার মৃত্যু হয় যা ছিল প্রায় প্লেগের মত। তার পরিবারের লোকজন তার মৃত্যুর সময় দূরে সরে ছিল। কারণ তাদের উক্ত রোগের ছোঁয়া লাগার ভয় ছিল। মৃত্যুর পরও তিনদিন তার কাছে কেউ যায়নি। তার লাশ পঁচে দুর্গন্ধ বেরুতে থাকে। অবশেষে মহল্লার লোকজন তার পুত্রদেরকে ভৎসনা করতে থাকে, তখন একটি বর্ণনা এমন যে, তারা কতিপয় হাবশী শ্রমিককে পারিশ্রমিক দিয়ে তার লাশ উঠিয়ে দাফন করে। অন্য বর্ণনায় আছে যে, তারা একটি গর্ত খনন করে কাঠের সাহায্যে ঠেলে তার লাশ গর্তে ফেলে দিয়ে মাটি ও পাথর দিয়ে তা ঢেকে দেয়। অতঃপর তার চূড়ান্ত পরাজয় এভাবে হয় যে, যে দ্বীন নির্মূল করার জন্য সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে, সে দ্বীন তার আপন সন্তানগণ গ্রহণ করে। সর্ব প্রথম তার কন্য দুররা (রা) হিজরত করে, মক্কা থেকে মদীনায় পৌঁছে এবং ইসলাম কবুল করে। অতঃপর মক্কা বিজয়ের পর তার দুই পুত্র ওতবা (রা) ও মুয়াত্তেব (রা) হযরত আব্বাসের (রা) মাধ্যমে হুযুরের (স) সামনে হাযির হয়ে তাঁর মুবারক হাতে বায়আত করেন।

সর্ব সাধারণের মধ্যে ইসলাম প্রচার

আপন পরিবার ও গোত্রের কাছে খোদার পয়গাম পৌঁছাবার পর রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা ও আরবের লোকদের মধ্যে সাধারণ তবলীগের ধারাবাহিকতা শুরু করেন এবং যতোদিন তিনি মক্কায় ছিলেন, দশ বছর ক্রমাগত প্রত্যেক অবস্থায় এবং প্রত্যেক স্থানে লোককে কুরআন শুনাতেন ও আল্লাহর দ্বীন কবুল করার দাওয়াত দিতেন। এ দাওয়াতের কাজ তিনি করতেন বিশেষ বৈঠকাদিতে, জনসমাবেশে এবং হেরমে কাবায়। তিনি এ কাজ অব্যাহত রাখেন এবং কোন শক্তিই তাঁকে এ কাজ থকে বিরত রাখতে পারেনি। বাহির থেকে যারা ব্যবসা, ওমরা, যিয়ারত অথবা অন্য যে কোন উদ্দেশ্যে মক্কায় আসতো, তাদের সাথেও তিনি সাক্ষাৎ করতেন। ওকাজ, মাজান্না এবং যিলমাজাযের [মিনা ছাড়াও এ তিনটি স্থানে এমন ছিল যেখানে আরবের প্রত্যেক অঞ্চলের লোক আসতো এবং বড়ো বড়ো মেলা বসতো। সবচেয়ে বড়ো মেলা ওকাজের ছিল যেখানে উটের গতিতে গেলে তায়েফ থেকে একদিন এবং মক্কা থেকে তিনদিন লাগতো। এখানে শওয়ালের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিরাট লোক সমাগত হতো। এখানে শুধু কেনাবেচাই হতোনা, বরঞ্চ কবি, বক্তা, আমীর-ওমরা সকলেই আসতো। কবিতা পাঠের ও ভাষণদানের প্রতিযোগিতা হতো। উপজাতীয়দের পরস্পরের ঝগড়া বিবাদেরও মীমাংসা হতো। বন্দীদের মুক্ত করাবার জন্য মুক্তিপণও আদায় করা হতো। একে অপরের বিরুদ্ধে লোকের দাবীও পঞ্চায়েতের নিকটে পেশ করা হতো। অতঃপর পয়লা যিলকাদ থেকে মাররুয যাহিরান (বর্তমান ফাতেমা উপত্যকা)- এ লোক জমায়েত হওয়া শুরু হতো। যিলকাদের শেষ দশ দিনের মধ্যে মাজান্না নামক পাহাড়ের নিকটে মেলা লাগতো। অতঃপর যিলহজ্বে প্রথম আট দিনের মধ্যে মিনা ও আরাফাতের মধ্যবর্তী স্থানে যিল মাজাযের মেষ মেলা লাগতো। তারপর হজ্বের দিনগুলো শুরু হতো। গোটা আরব থেকে হজ্বের উদ্দেশ্যে লোকেরা মিনায় একত্র হতো।-গ্রন্হকার] মেলাগুলোতে গিয়ে উপজাতীয় লোকদেরকে তিনি দ্বীনে হকের দিকে ডাকতেন। হজ্বের সময় যখন লোক মিনায় অবস্থান করতো, তখনও তিনি এক এক গোত্রের শিবিরে যেতেন এবং বিশেষ ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ সকলের সামনে হকের দাওয়াত পৌঁছাতে তিনি কোন ক্রটি করতেননা। তারা কবুল করুক বা না করুক, নীরবে শুনুক অথবা কঠোর জবাব দিক, কঠোরতাসহ সামনে আসুক অথবা কুরাইশ দুর্বৃত্তগণ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করুক-সকল অবস্থায় তিনি তাঁর নিজের কাজ করে যেতেন। এর থেকে কেউ তাঁকে বিরত রাখতে পারেনি।

ইবনে জারীর তাবায়ী তাঁর ইতিহাসে লিখেছেন এবং ইবনুল আমীরও লিখেছেন যে, কুরাইশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং শিয়াবে আবি তালেবে অবরুদ্ধ থাকার কঠিন অবস্থাতেও নবী (স) দাঁওয়অত ও তাবলিগের কাজ থেকে বিরত থাকেননি। বরঞ্চ প্রকাশ্যে ও গোপনে, দিনে ও রাতে দাওয়াত দানের কাজ অব্যাহত রেখেছেন। কুরআনের সূরা ও আয়াতসমূহ যা বৃষ্টি ধারার  মতো নাযিল হচ্ছিল, সেসব তিনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিতেন। কাফেরদের যুক্তি তর্কের দাঁত ভাঙা জবাব দিতেন এবং সত্যকে মেনে নেয়অর জন্য তাদেরকে সম্মত করার চেষ্টাও তিনি অব্যাহত রাখেন।

ইবনে সা’দ বলেন, গোপনে দাওয়াত দেয়ার কাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর দশ বছর যাবত তাঁর কর্মপন্হা এ ছিল যে, তিনি মিনা, ওকাজ ও যিল মাজাযে এক একটি গোত্রের শিবিরে তশরিফ নিয়ে যেতেন এবং বলতেন-

******************************************************

-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল, সাফল্য লাভ করবে। আর এ কালেমার বদৌলতে আরবের শাসক হয়ে যাবে এবং আজমবাসী তোমাদের অনুগত হবে। আর যখন তোমরা ঈমান আনবে, তখন জান্নাতে তোমরা বাদশাহ হবে।

এদিকে আবু লাহাব পেছনে পেছনে গিয়ে যখন তাঁর বিরোধিতা করতো তখন তারা বলতো, তোমার পরিবার, গোত্র ও বস্তির লোক তোমাকে ভালোভাবে জানে। তারাই যখন তোমার আনুগত্য মেনে নেয়নি, তো আমরা কি করে নেব? এ জবাব শুনার পর হুযুর (স) ব্যস এতোটুকু বলতেন-

******************************************************

-হে খোদওন্দ! যদি তুমি চাইতে তো তারা এমনটি হতোনা।

তাবারী হারস বিন আল হারস এবং মনবেতু আযদী থেকে প্রায় একই ধরনের বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন যাতে বলা হয়েছে, আমরা একস্থানে দেখলাম রাসূলুল্লাহ (স) লোকদেরকে তৌহীদের দাওয়াত দিচ্ছেন এবং বলছেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বল সাফল্য লাভ করবে।

আমরা দেখতাম যে লোকে তাঁকে নানান ভাবে কষ্ট দিচ্ছে। কেউ থুথু এবং কেউ মাটি নিক্ষেপ করছে, কেউ তাঁকে গালি দিচ্ছে। তারপর বেলা দুপুর হওয়ার পর তারা সব চলে গেল। তারপর দেখলাম একটি মেয়ে পানির একটি বড়ো পাত্র ও রুমাল নিয়ে এলো। তার গলা সামনের দিক থেকে খোলা ছিল। রাসূলুল্লাহ (স) পানি পান করলেন এবং অযু করলেন। তারপর মেয়েটিকে বললেন, বেটি, তোমার গলা ঢাক। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, মেয়েটি তাঁর কন্যা হযরত যয়নব (রা)।

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের বরাত দিয়ে বলেন, হুযুর (স) প্রত্যেক মেলাও সমাবেশে গিয়ে দাওয়াত পেশ করতেন। এভাবে আরবের কোন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি মক্কায় এলে তার সাথে দেখা করে তিনি খোদার দ্বীনের দাওয়াত তার নিকটে পৌঁছাতেন।

ইবনে কাসীর আল বেদায়া ওয়ান্নেহায়ায় লিখেছেন যে, হুযুর (স) দিন রাত গোপনে এবং প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে থাকেন এবং কারো বাধাদানে তিনি বিরত হননি। লোকের সমাবেশে গিয়ে তিনি দাওয়াত দিতেন। মেলায় এবং হজ্বের সময় হজ্বযাত্রীগণ যেসব স্থানে থাকতো, সেসব স্থানে গিয়ে তিনি দাওয়াত পেশ করতেন। স্বাধীন, গোলা, দুর্বল, সবল, ধনী, গরীব  সকল শ্রেণীর লোকের সাথে মিলিত হয়ে তাদেরকে তিনি আল্লাহর দিকে ডাকতেন।

এসব ঐতিহাসিক বর্ণনার পূর্ণ সমর্থন কুরআন পাকের মক্কী সূরাগুলোতে পাওয়া যায় যা কুরাইশদের বিভিন্ন আপত্তি অভিযোগের জবাবে পরিপূর্ণ। একথা সুস্পষ্ট যে, যদি কুরআন তাদেরকে প্রকাশ্যে শুনানো না হতো এবং মুহাম্মদ মুস্তাফা(স) তাঁর নবুওত মেনে নেয়ার প্রকাশ্য দাওয়াত যদি না দিতেন, তাহলে তারা তাঁর বিরুদ্ধে কুরআন ও আখেরাতের এবং ইসলামের শিক্ষার বিরুদ্ধে আপত্তি অভিযোগ ও সংশয় সন্দেহের ঝড় সৃষ্টি হবে কেন এবং কিভাবে করতো? তারপর তাদের জবাব কুরআনে দেয়ার কি অর্থ হতো, যদি বিরোধিদেরেক তা শুনানো না হতো?

নবী পাক (স) এর নৈতিক প্রভাব

প্রশ্ন এই যে, এমন কি কারণ ছিল যার জন্য কুরাইশের লোকেরা না হুযুরকে (স) হেরেমে নামায পড়া থেকে বিরত রাখতে পেরেছে আর না প্রকাশ্যে কুরআন শুনানো থেকে বিরত রাখতে পেরেছে। বস্তুতঃ এ দুটি জিনিসই তাদের ছিল অসহনীয়। অন্য কোন মুসলমান এ দুটির একটিও করার সাহস করতোনা। আর কেউ তা করার সাহস করলে প্রচন্ড মার খেতে হতো, প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তার আসল কারণ শুধু এ ছিলনা যে, বনী হাশেম ও বনু আল মুত্তালিব নবীর সমর্থনে জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল এবং কুরাইশের লোকেরা এ জন্য ভীত ছিল, বরঞ্চ তার কারণ হুযুর (স) এর বিরাট প্রভাব ছিল যা কুরাইশের লোকদেরকে অভিভূত করে রেখেছিল। তারা তাঁর দাওয়াতে বেশামাল হয়ে পড়তো, গালি দিত, পাথর মারতো, নানানভাবে তাঁর মনে কষ্ট দিত। কিন্তু তাঁর সে নৈতিক প্রভাব তাদেরকে ভেতর থেকে এতোটা শূণ্য গর্ভ করে দিয়েছিল যে, তারা তাঁকে রেসালাতের কাজ থেকে বিরত রাখতে পারতোনা।

ভীতি সঞ্চারকারী এ প্রভাবের কয়েকটি কারণ ছিল। একটি কারণ এ ছিল যে, তাঁর শৈশবকাল থেকে ক্রমাগত তাঁর সম্পর্কে তাদের জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার দ্বারা তারা এ সত্য অবগত ছিল যার দরুন গোটা জাতি প্রথম থেকেই তাঁর সম্পর্কে এটা জানতো যে, এ এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব যা তাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে। এ জন্য নবুওতের পূর্বেও মক্কায় তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো। দ্বিতীয় কারণ ও ছিল যে, তাঁর পবিত্র মুখ থেকে কেউ কোনদিন কোন ভুল কথা শুনেনি। আর লোকে মনে করতো যে, যে কথা তাঁর মুখ থেকে বেরুতো, তা সত্যে পরিণত হয়। এ জন্য তারা ভয় করতো যে তাঁর মুখ থেকে তাদের সম্পর্কে এমন কথা যেন না বের হয় যাতে তাদের কোন দুর্ভাগ্য ডেকে আনে। একটু উপরে এ কাহিনী বয়ান করা হলো যে, আবু লাহাবের মতো দুশমন যখন তার পুত্রের প্রতি হুযুরের (স) বদদোয়ার কথা শুনলো, তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। শামদেশ ভ্রমণ কালে সে তার সাথীদেরকে তার পুত্রের হেফাজতের জন্য তাকে সাহায্য করার আবেদন জানালো। কারণ নবী মুহাম্মদ (স) তার পুত্র সম্পর্কে যে কথা বলেছিলেন তাতে সে তার পুত্রের প্রাণের আশংকা করছিল। কিন্তু তার সকল সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়ে যায়। তার সে পুত্রকে খোদার এক ‘কুকুর’ উটের আবেষ্টনী অতিক্রম করে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে খেয়ে ফেল্লো।

তৃতীয় কারণ হচ্ছে, নবী পাকের (স) নিষ্কুলষ চরিত্র যার প্রতি দোষারোপ করার কোন অবকাশই ছিলনা। সমগ্র জাতি তাঁর এ মহৎ চরিত্র সম্পর্কে অবগত ছিল এবং তার স্বীকৃতিও দিয়েছিল। তাঁর মন জয়কারী আচরণে মক্কা ও তার চতুষ্পার্শস্থ অঞ্চলের শত শত লোক অভিভূত হয়ে পড়েছিল, তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর জন্য দুশমনও তার প্রতি আস্থা পোষণ করতো। এমনকি মদীনায় হিজরত করার সময় পর্যন্ত ইবনে জারীরের বর্ণনা অনুযায়ী অবস্থা এমন ছিল যে, মক্কায় এমন কোন ব্যক্তি ছিলনা যে তার মূল্যবান সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের অভিলাষী ছিল এবং তার জন নবী মুহাম্মদ (স) ব্যতীত অন্য কারো প্রতি আস্থা পোষণ করতে পারতো।এ নৈতিক প্রভাবের কারণেই তাঁর চরম দুশমণও তাঁর মুকাবিলায় এসে সকল মনোবল হারিয়ে ফেলতো এবং তাঁর সামনে কথা বলার সাহস করতোনা। আবু জাহেলের সাথে হুযুরের (স) সংঘটিত দুটি ঘটনা এ কথার সত্যতা প্রমাণ করে।(সংযোজন।)

আবু জাহলের আতংকিত হওয়ার ঘটনা

ইবনে ইসহাক বলের, একবার ‘এরাশ’ নামক স্থানের [এ একটি স্থানের নাম মায়াজেমুল বুলদানে বলা হয়েছে। সম্ভবতঃ সেখানে বসবাসকারী গোত্রের নামও এরাশ- গ্রন্হকার।] এক ব্যক্তি কয়েকটি উট নিয়ে বিক্রি করার জন্য মক্কায় আসে। আবূ জাহল তার উট খরিদ করে। বিক্রেতা তার মূল্য চাইতে এলে আবু জাহল নানান টালবাহানা করতে থাকে। এরাশী নিরাশ হয়ে অবশেষে একদিন হেরমে কা’বায় কুরাইশ সর্দারদের কাছে গিয়ে সব কথা বললো এবং সমবেত লোকদের কাছে প্রতিকারের জন্য আকুল আবেদন জানালো। অন্যদিকে হারামে এক কোণে নবী (স) বসেছিলেন। কুরাইশ সর্দারগণ লোকটিকে বললো, আমরা কিছু করতে পারবনা। ঐ দেখ কোণায় যে লোকটি বসে আছে তার কাছে গিয়ে বল, সে তোমার পাওনা আদায় করে দেবে।

এরাশী নবী (স) এর দিকে চললো। এদিকে কুরাইশ সর্দারগণ পরস্পর বলাবলি করতে লাগলো, আজ মজা দেখা যাবে। এরাশী নবী (স) তার অভিযোগ করার সাথে সাথে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং লোকটিকে সাথে নিয়ে আবু জাহলের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। নবী পাক (স) সোজা আবু জাহলের দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে শুরু করলেন। ভেতর থেকে সে বললো, ‘কে’? হুযুর (স) জবাব দিলেন, মুহাম্মদ (স)। সে হতবুদ্ধি হয়ে বাইরে এলো। নবী (স) তাকে বললেন, এ ব্যক্তির পাওনা পরিশোধ কর। সে কোন কথা না বলে ভেতরে চলে গেল এবং উটের মূল্য এনে লোকটির হাতে দিয়ে দিল।

কুরাইশের গুপ্তচর এ অবস্থা দেখার পর হেরমে কাবার দিকে দ্রুতপদে ছুটে গিয়ে কুরাইশ সর্দারদের কাছে ঘটনা বিবৃত করলো। সে বললো, কসম খোদার, আজ যা দেখলাম তা আর কোনদিন দেখিনি। আবু জাহল বাইরে এসে মুহাম্মদকে (স) দেখা মাত্র তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তারপর মুহাম্মদ (স) যখন তাকে বললেন যে, তার পাওনা পরিশোধ কর, তখন মনে হলো তার দেহ প্রাণহীন হয়ে পড়েছে- (ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৯-৩০, বালাযুরীর আনসাবুল আশরাফ- ১ম খন্ড, পৃঃ ১২৮-১২৯)।(তাফহীমুল কুরআন- ৩য় খন্ড- মাউন, টীকা-৫)

দ্বিতীয় ঘটনা

দ্বিতীয় ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন কাজী আবুল হাসান আল মাওয়ারদী তাঁর ‘আ’ৰলামুন্নাবুওত’ ******************* গ্রন্হে। তিনি বলেন, আবু জাহেল একটি এতিম শিশুর অসি ছিল, এই শশুটি একেবারে বিবস্ত্র অবস্থায় আবু জাহলের নিকটে এসে বললো, আমার পিতার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে আমাকে কিছু দিয়ে দেন। কিন্তু জালেম তার দিকে মোটেও ফিরে তাকালেননা। সে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে হতাশ হয়ে ফিরে গেল। কুরাইশ সর্দারগণ দুষ্টামির নিয়তে তাকে বললো, তুমি মুহাম্মদের (স) নিকটে গিয়ে নালিশ কর। তিনি আবু জাহলের কাছে সুপারিশ করে তোমার জন্য কিছু আদায় করে দেবেন। হতভাগা শিশুটির জানা ছিলনা যে আবু জাহলের সাথে মুহাম্মদের (স) সম্পর্কে কিরূপ ছিল এবং এ জঘন্য লোকগুলো কোন উদ্দেশ্যে এ পরামর্শ দিচ্ছে, সে সোজা হুযুরের (স) নিকটে গিয়ে তার অবস্থা বর্ণনা করলো। তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে সাথে নিয়ে আবু জাহলের বাড়ি গেলেন। আবু জাহল হুযুরকে (স) সাদরে গ্রহণ করলো। তিনি বললেন, এ শিশুটির হক আদায় করে দাও। সে সংগে সংগে রাজী হয়ে গেল এবং তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এনে এতিম শিশুকে দিয়ে দিল।

এদিকে কুরাইশ সর্দারগণ এ প্রতীক্ষায় ছিল যে, দেখা যাক তাদের উভয়ের মধ্যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কিন্তু তারা যখন প্রকৃত ঘটনা জানতে পারলো তখন বিস্ময়ের সাথে আবু জাহলের নিকটে এসে এই বলে ভৎসনা করতে লাগলো, তুমি আপন দ্বীন পরিত্যাগ করলে? সে বললো, খোদার কসম, আমি আমার দ্বীন পরিত্যাগ করিনি। কিস্তু আমার এমন মনে হলো যে, তার ডানে ও বামে এক একটি মারাত্মক অস্ত্র। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করলেই তা আমার দেহ দ্বিখন্ডিত করবে।

এসব ঘটনা থেকে জানা যায় যে, হুযুরের (স) প্রভাব কতখানি তার দুশমনদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রেখেছিল।(তাফহীমুল কুরআন- ষষ্ঠ খন্ড- মাউন, টীকা-৫।)

তৃতীয় ঘটনা

বালাযুরীর বর্ণনা মতে একদিন নবী (স) হযরত আবু বকর (রা(, হযরত ওমর (রা) ও হযরত সা’দ বিন ওক্কাস (রা) মসজিদে হারামে বসেছিলেন। এমন সময়ে বনী যুবায়েদের এক ব্যক্তি এলো। সে বলল, হে কুরাইশের লোকেরা! তোমাদের এখানে কে পণ্য দ্রব্য নিয়ে আসবে? কারণ বাইর থেকে যারা আসে তাদেরকে তোমরা লুঠপাট করে নিয়ে নাও। হুযুর (স) বললেন, তোমার উপর কে জুলুম করেছে? সে বললো, আবুল হাকাম অর্থাৎ আবু জাহল। সে আমার সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট তিনটি উট খরিদের ইচ্ছা করে তার অতি সামান্য মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। এখন তার চেয়ে অধিক মূল্য দিতে কেউ রাজী নয়। আর এ মূল্যে বিক্রি করলে আমার ভয়ানক লোকসান হয়। হুযুর  (স) তার তিনটি উটই খরিদ করলেন। আবু জাহল দুর থেকে চুপচাপ এসব দেখছিল। হুযুর (স) তার নিকটে গিয়ে বললেন, তুমি এ বেদুইনের সাথে যে আচরণ করেছ, খবরদার, এমনটি আর কারো সাথে করবেনা। নতুবা তোমার সাথেও এমন আচরণ করব। সে বলতে থাকলো, ভবিষ্যতে আর এমন কখনো করবনা। উমাইয়া বিন খালফ এবং আরও যেসব মুশরিক সেখানে উপস্থিত ছিল, আবু জাহলকে এই বলে ধিক্কার দিতে লাগলো, তুমি মুহাম্মদের (স) সামনে এমন দুর্বলতা প্রদর্শন করলে যে আমাদের সন্দেহ হয়, তুমি বুঝি তার অনুগত হয়ে পড়েছ। সে বললো, খোদার কসম! আমি কখনো তার আনুগত্য করবনা। কিন্তু আমি দেখলাম তার ডানে ও বামে কয়েকজন বল্লমধারী দাঁড়িয়ে আছে। মুহাম্মদের (স) হুকম একটু অমান্য করলেই তারা আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে মনে হলো (আন সাবুল আশরাফ ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩)।

বিরুদ্ধবাদিগণ নবীর (স) সততা ও সত্যবাদিতা স্বীকার করতো

উপরন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটাও ছিল যে, নবীর (স) চরম বিরোধীও মনে মনে তাঁর সততা ও সত্যবাদিতা স্বীকার করতো এবং নিজেদেরকে মিথ্যা মনে করতো। কিন্তু দুরভিসন্ধি, জাহেলী, আত্মমর্যাদা, পূর্ব পুরুষের ধর্মের গোড়ামি ও ব্যক্তি স্বার্থের কারণে বিরোধিতা করতো। যাদের মনে এ দুর্বলতা ছিল, তারা তার পথ রুদ্ধ করার সকল প্রকার কারণে সামনা সামনি তাঁর মুকাবিলা করার সাহস তাদের ছিলনা। এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ আমরা করবো। এখানে শুধু আবু জাহল সম্পর্কে বলতে চাই যে, নবীর (স) সবচেয়ে বড়ো দুশমন কিভাবে বার বার তাঁর সততা ও সত্যবাদিতার স্বীকৃতি দিয়েছে এবং নিজের বিরোধিতায় প্রকৃত কারণ কত কদর্য পন্হায় বর্ণনা করছে।

বায়হাকী যায়েদ বিন আসলামের বরাত দিয়ে হযরত মুগীরা বিন শা’বার বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, শির্কের যমানায় তার প্রথম সাক্ষাৎ কিভাবে নবীর (স) সাথে হয়েছিল। তিনি বলেন, আমি এবং আবু জাহল মক্কার একটি পথ দিয়ে চলছিলাম। এমন সময়ে নবীর (স) সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। তিনি আবু জাহলকে বললেন, “হে আবুল হাকাম! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে এসো। আমি তোমাকে আল্লাহর দিকে ডাকছি”। সে বললো, হে মুহাম্মদ (স)! তুমি কি আমাদের মাবুদদের গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকছ? তুমি তো এটাই চাও যে আমরা এ সাক্ষ্য দেই যে, তুমি তোমার কথা পৌঁছে দিয়েছ। তো আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি তোমার কথা পৌঁছে দিয়ে। কিন্তু খোদার কসম! আমি যদি জানতাম যে, তুমি হকের উপর আছ, তাহলে তোমার আনুগত্য করতাম।

তারপর নবী (স) সামনে অগ্রসর হয়ে গেলেন। তারপর আবু জাহল আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো, খোদার কসম! আমি জানি যে, এ ব্যক্তি যা বলে তা সত্য। কিন্তু একটি জিনিস আমাকে বাধা দেয়। কুসাইয়ের সন্তানগণ বলল, (হক্বের সময়) হাজীদের আহার করাবার দায়িত্ব আমাদের থাকবে তো? বললাম, হ্যাঁ।

তারা বলল- পানি পান করারবার দায়িত্ব আমাদের থাকবে তো?

বললাম-হ্যাঁ।

-নাদওয়া আমাদের?

-হ্যাঁ

-পতাকা আমাদের নিকটে থাকবে তো?

-হ্যাঁ।

তারপর তারা আমাদেরকে আহার করালো। আমরাও করালাম। তারপর আমাদের হাঁটুর সাথে তাঁদের হাটুঁ মিলিত হলো, তখন তারা বলল- আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন।

বললাম, খোদার কসম, এ আমি মানবোনা।

ইবনে আবি হাতেম আর ইয়াযিদ মাদানীর বরাত দিয়ে বলেন যে, একবার আবু জাহলের সাতে নবী (স) এর সাক্ষাৎ হয় এবং সে তাঁর সাথে মুসাফা করে। একজন তাকে বলল- একি আমি তোমাকে যে একজন সাবীর (দ্বীন থেকে বিমুখ) সাথে মুসাফা করতে দেখছি। আবু জাহল তাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে চুপে চুপে বলে, খোদার কসম! আমি জানি এ প্রকৃতপক্ষে নবী। কিন্তু আমরা কখন বনী আবদে মানাফের অধীন হলাম?

ইমাম সুফিয়ান সাওরী, তিরমিযি এবং হাকেম হযরত আলী (রা) এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন, আবু জাহল নবী (স) কে বলে, আমরা তোমাকে মিথ্যাবদী মনে করিনা। কিন্তু তুমি যা নিয়ে এসেছ তা মিথ্যা মনে করি।

বায়হাকী ও ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাক থেকে এবং তিনি ইমাম যুহরি থেকে এ মজার ঘটনাটি উদ্ধৃত করেছন যে, একদিন রাতে আবু জাহেল, আবু সুফিয়ান এবং আখনাস বিন শুরাইক- পৃথক পৃথক ভাবে বেরিয়ে পড়লো-রাতে নবী (স) নামাযে যে কুরআন পড়তেন তা শুনার জন্য। তিন জনের মধ্যে কেউ কারো খবর জনতোনা। সকাল হলে তারা একে অপরকে দেখে ফেলে। পরস্পরকে তিরস্কার করলো এবং শপথ করলো যে, এমনটি তারা আর করবেনা। কারণ যদি লোকে তাদেরকে এভাবে কুরআন শুনতে দেখে ফেলে তাহলে এ জিনিস তাদের মনের মধ্যে স্থান করে নেবে। দ্বিতীয় দিনেও এরূপ ঘটলো। তারা একে অপরকে দেখার পর আবার শপথ করলো যে, এমনটি আর তারা করবেনা। তৃতীয় দিন যখন একই ঘটনা ঘটালো এবং যা না করার তারা শপথ করেছিল, তখন আখনাস লাঠি হাতে নিয়ে আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে বলল, আবু হানযালা! তুমি আমাকে সত্য কথা বলবে-মুহাম্মদের (স) নিকটে তুমি যা শুনেছ, সে সম্পর্কে তোমার অভিমত কি?

সে বলল, আবু সা’লাবা! খোদার কসম, আমি এমন সব কথা শুনেছি যা আমি বুঝতে পারি এবং এটাও বুঝি যে তার অর্থ কি, আর কিছু কথা এমনও আছে যার অর্থ আমি বুঝতে পারিনি। আখনাস বলে, আমার অবস্থাও তাই। [হাফেজ ইবনে হাজার ইসাবাতে ইমাম যুহরীর যে বর্ণনা এ ঘটনা সম্পর্কে হযরত সাঈদ বিন আল মুসায়্যাব থেকে উদ্ধৃত করেছেন তাতে বলা হয়েছে যে, আবু সুফিয়ান আখনাসকে জিজ্ঞেস করে, তোমরার কি মত? সে বলে আমি তো তাকে সত্য মনে করি। এ কথার অতিরিক্ত সমর্থন হযতর মুয়াবিয়ার (রা) বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়- যা তাবারানী আওসাতে উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, একবার আমার পিতা আবু সুফিয়ান আমার মা হিন্দাকে একটি গাধার উপর বসিয়ে মরু অঞ্চলের দিকে যাচ্ছিলের। আমি অন্য একটি গাঘার পিঠে চড়ে তাদের আগে আগে যাচ্ছিলাম। এমন সময় পথে নবী (স) এর সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। আমার পিতা আমাকে বললেন, মুয়াবিয়া! তুমি নেমে যাও যাতে মুহাম্মদ (স) তোমার গাঘায় সওয়ার হতে পারে। অতএব আমি নেমে পড়লাম এবং নবী (স) তার পিঠি উঠে বসলেন। তাপর তিনি আমার পিতা ও মাতাকে সম্বোধন করে বললেন, হে আবু সুফিয়ান এবং হে হিন্দ বিনতে ওতবা। খোদার কসম, তেমরা সকলে এক সময় মরে যাবে। তারপর পুনরায় জীবত করে উঠানো হবে। তারপর যে সৎ হবে সে জান্নাতে যাবে এবং যে পাপী হবে সে জাহান্নামে যাবে। তারপর তিনি সূরা- হা-মীম- আসসাজদাহর প্রথম এগার আয়াত পড়ে শুনালেন। তারপর তিনি গাধার পৃষ্ঠ থেকে নেমে পড়লেন এবং আমি চড়ে বসলাম। পথে আমার মা আমার পিতাকে বললেন, তুমি আমার ছেলেকে গাধঅর উপর থেকে নামিয়ে এ মিথ্যাবাদী ও যাদুকরকে বসালে? আমার পিতা বললেন, খোদার কসম, এ ব্যক্তি না যাদুকর, না মিথ্যাবাদী।-গ্রন্হকার] তারপর সে আবু জাহেলের নিকটে গিয়ে বলল, আবুল হাকাম, তুমি মুহাম্মদের (স) নিকটে যা কিছু শুনলে, সে সম্পর্কে তোমার অভিমত কি? সে বলল, কি শুনেছি? আমাদের এবং নবী আবেদ মানাফের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা চলছিল যে আমাদের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে বড়ো কে। তারাও আহার করায়, আমরাও করায়। তারাও দায়িত্বের বোঝা বহন করে, আমরাও করি। তারাও অর্থ সম্পদ দান করে, আমরাও করি। শেষ পর্যন্ত যখন সব বিষয়ে আমরা সমান সমান হয়ে যাই তখন তারা বলতে থাকে, আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন যার কাছে আসমান থেকে অহী আসে। এখন এ আমরা কোথা থেকে পাব। খোদার কসম! আমরা তাকে মানবনা এবং তার সত্যতাও স্বীকার করবনা। প্রায় একই রকম কথা আবু জাহল আখনাস বিন শুরাইককে সে সময়ে বলে যখন বদর যুদ্ধের সময় আখনাস নির্জনে তার সাথে দেখা করে। ইবনে জারীর তাবারী র্তার তফসীরে সুদ্দীর বরাত দিয়ে এ কথা উদ্ধৃত করেছেন যে, আখনাস আবু জাহলকে বলে, এ সময়ে এখাতে তুমি ও আমি ছাড়া আর কেউ নেই। তুমি আমাকে সত্য কথা বল যে মুহাম্মদ (স) মিথ্যাবাদী, না সত্যবাদী। সে বলে, কসম খোদার! মুহাম্মদ (স) সত্যবাদী। সে কখনো মিথ্যা বলেনি। কিন্তু যখন বনী কুসাই লেওয়া, হেজাবাত ও সেকায়েতসহ {ঘারের কর্তৃত্ব বনী কুসাইয়ের হাতে আসার পর হজ্বের সময় তাদের কিছু দায়িত্ব পালন করতে হতো। তাদের মধ্য থেকেই একজন পতাকাবাহী হতো। এ পদের নাম ছিল আল্লেওয়া। তাদের একটি দায়িত্ব ছিল হাজীদেরকে পানি পান করানো। একে বলা হতো আসসেকায়াহ। কাবা ঘরের চাবি তাদের হাতে থকতো হাজীদের জন্য থানায়ে কাবা খুলে দেয়া ও বন্ধ করা তাদের দায়িত্ব ছিল। একে বলা হতো আল হেজাবাহ। এ কথা এ গ্রন্হে উল্লিখিত হয়েছে।- অনুবাদক} নবুওতও নিয়ে যায়, তাহলে কুরাইশের নিকটে অবশিষ্ট কি রইলো?

আবু জাহলের মতো কট্টর ইসলাম দুশনের অবস্থাই যখন এমন ছিল, তখন অন্যান্যদের অব্স্থা কেমন ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়।

নবী (স) সম্পর্কে কুরাইশদের ধারণা বিশ্বাস

এ সম্পর্কে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে, কুরাইশের ওসব লোকই, যারা তাঁর বিরোধিতায় সোচ্ছার ছিল,নবীর (স) শ্রষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত ছিল। যখন নবী (স) এবং মুসলমানদের সাথে তাদের চরম সংঘাত সংঘর্ষ চলছিল, ঠিক সে সময়ে মক্কায় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। তখন সকল অধিবাসী আর্তনাদ শুরু করে দেয়। তখন মক্কার সর্দারগণ নবীকে (স) অনুরোধ করে- এ বিপদ থেকে তাঁর জাতিকে রক্ষা করার জন্য দোয়া করতে। ইমাম বোখারী এবং বায়হাকী কিছু শাব্দিক  পার্থক্যসহ মাসরুকের বরাত দিয়ে হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদের (রা) এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ (স) দেখলেন য, কুরাইশ তাঁর মুকাবেলায় বিদ্রোহ করার জন্য বদ্ধপরিকর, তখন তিনি দোয়া করেন, হ খোদা! হযরত ইউসুফের (আ) সাত বছর ব্যাপী দুর্ভিক্ষের ন্যায় এসব লোকের মুকাবেলায় আমাকেও সাত বছরের দুর্ভিক্ষ দ্বারা সাহার্য কর। ফলে এমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয় যে, লোক মৃতজীব, হাড়হাড্ডি এবং পশুর চামড়াও খেতে থাকে। অবশেষে আবু সুফিয়ান এবং মক্কার বিভিন্ন লোক হুযুর (স) এর নিকটে এসে আবেদন জানালো, হে মুহাম্মদ (স)! আপনি দাবী করেন যে, আপনাকে রহমত স্বরূপ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন অবস্থা এই যে, আপনার কাওম ধ্বংস হতে চলেছে। আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন।

এ আবেদনের পর হুযুর (স) দোয়া করেন এবং এতো অধিক বৃষ্টি হয় যে, লোক অতি বর্ষণ থেকে বাঁচার জন্য আবার তাকে দোয়া করতে বলতে থাকে। তিনি দোয়া করলেন, হে খোদা! আমাদের উপরে না হয়ে চারদিকে হোক। তারপর আকাশ মেঘমুক্ত হয়।

ইমাম বোখারী হযরত ইবনে আব্বা (রা) থেকে এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, আবু সুফিয়ান অনাহার থেকে বাঁচার আবেদন নিয়ে নবীর (স) কাছে এলো। তাঁর দোয়ায় দুর্ভিক্ষের বিপদ দূর হয়।

এসব ঘটনা থেকে এ কথা পরিস্কার হয়ে যায় কুরাইশ সর্দারগণ সরাসরি নবীর সাথে সংঘর্ষে আসতে এবং বলপুর্বক তাঁর প্রচার বন্ধ করতে কেন সাহস করতোনা। কিন্তু সেই সাথে তাঁরা এটাও বরদাশত করতোনা যে, তাঁর প্রচার হতে থাক, তাদের পূর্ব পুরুষদের দ্বীন নির্মূল হয়ে যাক, তাদের জীবন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত অন্য একটি জীবন ব্যবস্থা প্রসার লাভ করুক এবং মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাক। এ জন্য তাদের সিদ্ধান্ত এই ছিল যে, তাঁর দাওয়াত যেন কিছুতেই প্রসার লাভ করতে না পারে এবং যে কোন মূল্যে তা বাধাগ্রস্ত করতে হবে। এ আক্রোশে তারা কোন কোন সময়ে তার প্রতি অত্যাচারও করে বসতো।(সংযোজন।)

 

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.