সীরাতে সরওয়ারে আলম – ৫ম খন্ড

সম্পুর্ণ সূচীপত্র

অষ্টম অধ্যায়

ইসলামী দাওয়াত প্রতিরোধের জন্য কুরাইশের ফন্দি-ফিকির

এ আলোচনার পূর্বে প্রথমেই এটা জেনে রাখা দরকার যে, ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (স) এর ব্যাপারে সকল কুরাইশ গোত্রের আচরণ একই রকম ছিলনা। বরঞ্চ তারা বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিল।

একটি শ্রেণী ছিল চরম বিরোধী। এ  ছিল বড়ো বড়ো সমাজপতি বা সর্দারদের নিয়ে। ইবনে সাদ, তাবকাতে তাদের নাম নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেনঃ আবু জাহল, আবু লাহাব, আসওয়াদ বিন আবদে ইয়াগুস ( এ ছিল বনী যোহরার লোক এবং নবীর (স) মামাতো ভাই), হারেস বিন কয়েস বিন আদী ( এ ছিল বনী সাহম গোত্রের এবং ইবনুল গায়তালা নামে পরিচিত), অলীদ বিন মগীরা (বনী মাখযুম), উমাইয়্যা বিন খালাফ এবং উবাইবিন খালাফ (বনী জুমাহ), আবু কায়েস বিন ফাকেহ বিন মগীরাহ (বনী মাখযুম), আস বিন ওয়ালে সাহমী (আমর বিন আসের পিতা), নযর বিন আল হারেস (বনী আবদুল্লাহর), মুনাব্বেহ বিন সায়ফী বিন আবেদ (বনী মাখযুম), আসওয়াদ বিন আবদুল আসাদ মাখযুমী, আস বিন সাঈদ বিন আল আস (বনী উমাইয়া), আবুল বাখতারী আস বিন হিশাম (বনী আসাদ), ওকবা বিন আবি মুয়াইত (বনী উমাইয়া), ইবনুল আসদী আল হুযালী হাকাম বিন আবিল আস (বনী উমাইয়া) এবং সাদী বিন হামরা আসসাকফী।

দ্বিতীয় শ্রেণীটি ছিল ওসব কুরাইশ সর্দারদের নিয়ে যারা দুশমন তো অবশ্যই ছিল, কিন্তু এমন দুশমন ছিলনা যে উপরে উল্লিখিত দলের ন্যায় সর্বশক্তি দিয়ে নবী (স) এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ করছিল। অবশ্যি ইসলামের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপই নেয়া হতো, ওসব দুশমনের এরা সহযোগিতা করতো। ইবনে সাদ’ ওতবা বিন রাবিয়া, শায়বা বিন রাবিয়া এবং আবু সুফিয়ানকে এ ধরনের দুশমনের মধ্যে গণ্য করতেন। তথাপি যারা সকলের চেয়ে বিরোধী ছিল তাদের কাজের ধরন কুরআনে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে-

******************************************************

দেখ, এরা তাদের বক্ষদেশ গুরিয়ে রাখে যাতে তাঁর থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে রাখতে পারে (হুদঃ ৬)।

অর্থাৎ তারা নবী (স) এর দাওয়াতের প্রতি এতো বীতশ্রদ্ধ ছিল যে, তারা তাঁকে এড়িয়ে চলতে চাইতো। কোথাও তাঁকে বসে থাকতে দেখলে তারা কেটে পড়তো। সামনে থেকে আসতে দেখলে অন্যদিকে চলে যেতো অথবা কাপড়ের আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে চলতো। এ ভয়ে যে সামনা সামনি হলে যদি তাদের সম্বোধন করে তিনি কিছু কথা বলে ফেলেন।

এখন রইলো, মক্কার সাধারণ লোক। তো তাদের মধ্যে কিছু ছিল নিরপেক্ষ, কিছু মনে মনে ইসলাম সমর্থন করতো। কিন্তু তাদের ইসলাম গোপন রাখতো। কিছু লোক আবার ইসলাম গ্রহণ করতো। একটি বিরাট সংখ্যক লোক তাদের সর্দারদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পৈত্রক ধর্মের মর্যাদা রক্ষার্থে তাদের ওসব অপতৎপরতায় লিপ্ত  হতো যা ইসলামের বিরুদ্ধে করা হতো।

এখন আমরা এসব ক্রিয়াকৌশল পৃথক পৃথক বর্ণনা করব যা ইসলামী দাওয়াতের পথ রুদ্ধ করার জন্য অবলম্বন করা হতো।

এক. নবী (স) এর সাথে আপোসের চেষ্টা

যেহেতু বিরোধীগণ হুযুর (স) এর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং কুরআনের অপ্রতিহত প্রভাব অনুভব করছিল, সে জন্য তারা বার বার এ চেষ্টা করে যে, নবী (স) এর সাথে আলাপ আলোচনা করে দ্বীন সম্পর্কে তাঁকে কোন প্রকারে একটা আপোসে উপনীত হওয়ার জন্য সম্মত করা যায় কিনা। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতিনিধি দল তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিও তাঁর সাথে কথা বলে।

তাঁর সাথে ওতবা বিন রাবিয়ার সাক্ষাৎ

এসব সাক্ষাৎকারের মধ্যে ওতবা বিন রাবিয়ার সাক্ষাৎকার ছিল গুরুত্বপূর্ণ যা বিভিন্ন মুহাদ্দিসগণ বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ফলাফল সম্পর্কে অধিক মতপার্থক্য ছিলনা। ইবনে আবি শায়বাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে এবং আবদুল্লাহ বিন হামিদ, আবু ইয়ালঅ ও বায়হাকী জাবেদ বিন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করেন যে, একদিন কুরইশের কিছু লোক একত্রে সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরে বলে দেখ, তোমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশী যাদুবিদ্যা, ভব্যিদ্বাণী ও কবিতা রচনায় পারদর্শী। সে এ ব্যক্তির কাছে যাবে যে আমাদের দলে ভাঙন সৃষ্টি করেছে, আমাদের ব্যাপার-স্যাপার ও বিষয়াদিতে অমংগল অঘটন ঘটিয়েছে, আমাদের ধর্মকে কুলষিত করেছে। তার সাথে কথা বলে দেখা যাক সে কি জবাব দেয়। লোকেরা বলে, আমাদের মতে এমন লোক ওতবা বিন রাবিয়া ছাড়া আর কেউ নেই। অতএব সকলে বলে, আমাদের মতে এমন লোক ওতবা বিন রাবিয়অ ছাড়া আর কেউ নেই। অতএব সকলে বলে, আবুল অলীদ! তুমিই এ কাজ কর। অতএব সে নবীর (স) নিকটে যায়। (গ্রন্হকার কর্তৃক পরিবর্ধন।)

দ্বিতীয় বর্ণনাটি মুহাম্মদ বিন ইসহাক ও বায়হাকী, মুহাম্মদ বিন কায়অব আল কুরাযী থেকে উদ্ধৃত করেছেন যাতে বলা হয়েছে যে, একবার কুরাইশের কতিপয় সর্দার মসজিদে হারামে একত্রে বসেছিল এবং মসজিদের অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ (স) একাকী বসেছিলেন। এ এমন সময়েল কথা যখন হযরত হামযা (রা) ঈমান এনেছেন এবং কুরাইশের লোকেরা মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমশঃ বেড়ে চলছিল দেখে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় ওতবা বিন রাবিয়া (আবু সুফিয়ানের শ্বশুর) কুরাইশ সর্দারদেরকে বলল, তোমরা যদি ভালো মনে কর তাহলে আমি মুহাম্মদ (স) এর সাথে কথা বলি এবং তার কাছে কিছু প্রস্তাব পেশ করি। হয়তো তিনি কোন প্রস্তাব মেনে নিতে পারেন এবং আমরাও তা মেনে নিতে পারি। এভাবে তিনি আমাদের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকতে পারেন। উপস্থিত সকলেই এ ব্যাপারে একমত হয় এবং বলে আবুল অলীদ! তোমার উপর পূর্ণ আস্থা আছে, তুমি অবশ্যই তার সাথে কথা বল।

ওতবা উঠে নবীর কাছে গিয়ে বসলো। তিনি তার প্রতি মনোযোগী হলে সে বলর, ভাতিজা। তুমি আমাদের যে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলে তা তোমার জানা আছে, আর বংশের দিক দিয়েও তুমি এক সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে। এখন তুমি আমাদের কওমের উপর কি বিপদ এনে দিয়েছ? তুমি আমাদের দলে ভাঙন সৃষ্টি করেছ। গোটা কওমকে নির্বোধ মনে কর। আমাদের ধর্ম ও দেব-দেবীদের তুমি গালমন্দ করে থাক। আমাদের মৃত বাপদাদাকে তুমি কাফের মনে কর। এখন তুমি আমার কিছু কথা শুনো। আমি তোমার কাছে কিছু প্রস্তাব রাখছি। চিন্তাভাবনা করে দেখ। হয়তো তার মধ্যে একটা তুমি গ্রহণও করতে পার।

রাসূলুল্লাহ (স) বললেন, আবুল অলীদ! আপনি বলুন, আমি শুনবো।

সে বলল, ভাতিজা! যে কাজ শুরু করেছ, তার উদ্দেশ্য যদি ধন-সম্পদ লাভ করা হয়, তাহলে আমরা সকলে মিলে তোমাকে এতো দিয়ে দেব যে তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী হয়ে যাবে। তুমি যদি শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চাও তো আমরা তোমাকে আমাদের সর্দার বানিয়ে নেব। তুমি ছাড়া আমাদের কোন বিষয়ের ফয়সালা করবনা। আর যদি বাদশাহী চাও, তাহলে তোমাকে আমাদের বাদশাহ বানিয়ে নেব। আর যদি তোমার উপর কোন জ্বিনের ক্রিয়া হয়ে থাকে যা দূর করতে তুমি অক্ষম নও এবং নিদ্রায় ও জাগরণে তুমি কিছু দেখতে পাও তাহলে আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ডেকে আনব এবং সকলে মিলে তোমার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করব। ওতবা বলে যাচ্ছিল এবং হুযুর (স) তা নীরবে শুনে যাচ্ছিলেন।

অতঃপর তিনি বলেন, আবুল অলীদ! আপনার যা কিছু বলার ছিল তা শেষ হয়েছে, না আর কিছু বলার আছে? সে বলল, না, যা কিছু বলার ছিল তা বলেছি। নবী (স) বললেন, আচ্ছা! তাহলে এবার আমার কথা শুনুন। তারপর তিনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলে সূরা- হা-মীম-আস, সাজদাহ তেলাওয়াত করা শুরু করেন। ওতবা তার দু’হাত পেছনের দিকে ঠেস দিয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে। সেজদার আয়াত (আয়াত নং ৩৮) পৌঁছার পর হুযুর (স) সেজদা করেন এবং মাথা উঠাবার পর বলেন, আবুল অলীদ! আমার জবাব তো আপনি শুনলেন। এখন আপনি জানেন এবং আপনার কাজ জানে।

ওতবা উঠে কুরাইশ সর্দারদের বৈঠকের দিকে চলল। দূর থেকে লোক তাকে দেখে মন্তব্য করলো, খোদার কসম! ওতবার চেহারায় পরিবর্তন হয়েছে। যে চেহারা নিয়ে সে গিয়েছিল এখন তা আর নেই। তারপর যখন সে তাদের মধ্যে গিয়ে বসলো, তখন তারা বলল, কি শুনে এলে?

সে বলল, খোদার কসম! আমি এমন কালাম শুনলাম যা আমি পূর্বে কখনো শুনিনি। কসম খোদার, এ না কবিতা, না যাদু আর না ভবিষ্যদ্বাণী, হে কুরাইশের লোকেরা! আমার কথা শুনো এবং তাকে তার অবস্থার উপরেই থাকতে দাও। আমার মনে হয়, এ কথাগুলো বাস্তবে রূপলাভ করবেই। মনে কর, যদি আরববাসী তার উপর জয়লাভ করে তাহলে আপন ভাইয়ের উপর হাত উঠানো থেকে তোমরা বেঁচে যাবে। অন্য লোকই তাকে সামলিয়ে নেবে। কিন্তু যদি সে আরবাসীর উপর বিজয়ী হয়, তাহলে তার বাদশাঞী তো হতে তোমাদের বাদশাহী। তার মানসম্মান হবে তোমাদেরই মানসম্মান।

কুরাইশ সর্দারগণ তার কথা শুনে বলল, অলীদের পিতা! শেষে তার যাদু তোমার উপরেও ক্রিয়অ করলো?

ওতবা বলল, আমার অভিমত তোমাদেরকে বললাম। এখন তোমাদের যা খুশী করতে থাক।

বায়হাকী এ ঘটনা সম্পর্কে যে সব বর্ণনা সংগ্রহ করেছেন, তার মধ্যে অতিরিক্ত এ কথা ছিল, যখন হুযুর (স) হা-মীম-সাজদার ১৩ নং আয়াত-

******************************************************

(যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তো তোমাদেরকে সেই ধরনের হঠাৎ আপতিত হওয়া শাস্তির ভয় দেখালাম যেমনটি হয়েছিল আদ ও সামুদের উপর) পর্যন্ত পৌঁছলেন তখন ওতবা স্বতঃস্ফুর্তভাবে হুযুরের (স) মুখের উপর তার হাত রাখলো এবং আত্মীয়তার বরাত দিয়ে বলতে লাগলো, এমন কথা বলোনা। লোকের কাছে সে এরূপ বলার কারণ এই বলল, তোমরাতো জান যে মুহাম্মদ (স) যখন কোন কথা বলে তা বৃথা যায়না। এজন্যে আমার শাস্তির ভয় হয়েছিল।(তাফহীম ৩য় খন্ড- আম্বিয়া- টীকা ৫, ৪র্থ খন্ড০ ভূমিকা- হা-মীম-আস সাজদা।)

আর একটি প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ

মুহাম্মদ বিন ইসহাক ইবনে আব্বাসের (রা) বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে, একবার ওতবা বিন রাবিয়অ শায়বা বিন রাবিয়অ, আবু সুফিয়ান বিন হারাব, নযর বিন হারেস, আবুল বাখতারী বিন হিশাম, আসওয়াদ বিন আল মুত্তালিব, উমাইয়া বিন খালাফ, আস বিন ওয়াইল এবং হাজ্জাজ বিন শাহমীর পুত্র নুবাইয়া ও মুনাব্বে সূর্যাস্তের পর কাবার দেওয়ালের নিকটে সমবেত হলো এবং পরস্পর বলতে লাগলো, মুহাম্মদকে (স) ডেকে কলা বল এবং তার সাথে আলোচনা করে তাকে শেষ কথা বলে দেয়া হোক। এদিকে হুযুর (স) কেও বলে দেয়া হলো যে, তাঁর কওমের সম্ভান্ত্র ব্যক্তিগণ একত্র হয়েছেন তাঁর সাথে কলা বলার জন্য। তিনি যেহেতু তাঁদেরকে সঠিক পথে আনার জন্য খুবই অধীর হয়ে পড়েছিলেন, সে জন্য তিনি সাথে সাথেই তাদের সামনে উপস্থিত হলেন। তাঁরা বললেন, হে মুহাম্মদ (স)! আমরা তোমাকে এ জন্য ডেকেছি যে, তোমার ব্যাপারে শেষ কথা বলে দেয়া হবে। খোদার কসম! আমরা জানিনা যে, আরববাসীর মধ্যে কোন ব্যক্তি নিজের কওমের মধ্যে এমন কোন ফেৎনা সৃষ্টি করেছে যা তুমি তোমার জাতির জন্য করেছ। তুমি বাপ-দাদাকে গালমন্দ করেছ, ধর্মের মধ্যে দোষ বের করেছ, লোকদেরকে বোকা গণ্য করেছ, দেব-দেবীদের বিরুদ্ধে কথা বলছ, দলের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেছ এবং এমন কোন অপ্রীতিকর বিষয় নেই যা তুমি তোমার ও আমাদের মধ্যে সংঘটিত করনি। যদি তুমি এসব অর্থ লাভের উদ্দেশ্যে করে থাক, তাহলে আমরা অর্থ জমা করে তোমাকে এতো পরিমাণে দেব যে, তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনশালী হয়ে যাবে। যদি আমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করতে চাও, তাহলে তোমাকে আমাদের  সর্দার বানিয়ে নিচ্ছি। যদি তুমি বাদশাহী চাও, তাহলে তোমাকে বাদশাহ বানিয়ে দিচ্ছি। আর যদি কোন জ্বিন এসে তোমার উপর চেপে বসে থাকে তাহলে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে তোমার চিকিৎসা করব যাত জ্বিনের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পার। এসব করার পর যেন অন্ততঃপক্ষে আমাদের পক্ষ থেকে ওজর পূর্ণ করা হয়।

জবাবে হুযুর (স) বলেন, আমার সেসব কোন রোগ নেই যার কথা তোমরা বলছ। তোমাদের কাছে আমি যা এনেছি তার জন্য কোন অর্থ দাবী করছি তাও নয়। অথবা তোমাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করি অথবা তোমাদের বাদশাহ হই এমন অভিলাষও আমার নেই। বরঞ্চ আল্লাহ আমাকে তোমাদের জন্য রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন। আমার উপর একটি কিতাব নাযিল করছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাদের জন্য (ঈমান আনার কারণে) সুসংবাদদাতা এবং (ঈমান না আনার জন্য) ভীতি প্রদর্শকারী হওয়ার জন্য, অতএব আমি আমার রবের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েছি এবং তোমাদের উপদেশ দিয়েছি। এখন যে জিনিস আমি এনেছি তা যদি গ্রহণ কর। তাহলে তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যের কারণ হবে। আর যদি তোমরা তা প্রতাখ্যান কর তাহলে আমি আল্লাহর হুকুমে সবর করতে থাকব যতোক্ষণ না আল্লাহ আমার এবং তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেন। এর জবাবে কাফের সর্দারগণ তাঁর কাছে বিভিন্ন প্রকারের মোজেযার দাবী করে। [টীকা-দৃষ্ঠান্ত স্বরূপ কুরআনে বলা হয়েছে-

******************************************************

-যদি আমরা তোমার উপরে কাগজে লেখা কোন কিতাব নাযিল করতাম এবং এ সব লোক তা নিজেদের হস্তদ্বারা স্পর্শ করেও দেখে নিত, তাহলে যারা  মানেনি তারা বলতো এতো সুস্পষ্ট যাদু- (আনয়ামঃ ৭ )

******************************************************

-আমরা যদি আসমানের কোন দরজা যদি এদের উপর খুলে দিতাম এবং তারা এতে চড়তে লাগতো তাহলে এরা বলতো, আমাদের চোখ প্রতারিত হচ্ছে- বরঞ্চ আমাদের উপর যাদু করা হয়েছে- (হিজ্বর- ১৪-১৫)।]

ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাক থেকে এ ঘটনার যে বিবরণ উদ্ধৃত করেছেন, তাতে এ কথা অতিরিক্ত রয়েছে যে, মোজেযা দাবী করার পর হুযুর (স) বলেন, এ সব কাজের জন্য আমি তোমাদের নিকট আসিনি। যে কথা পেশ করার জন্য আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন, তা আমি তোমাদের কাছে পৌছে দিয়েছি।

অবশেষে তারা হুযুরকে (স) ধমক দিয়ে বলে, কসম খোদার! তোমার এসব কাজ কর্মের জন্য তোমাকে আমরা এমটি ছেড়ে দেবনা। হয় আমরা তোমাকে শেষ করে দেব, অথবা তুমি আমাদেরকে শেষ করে দেবে। (গ্রন্হকার কর্তৃক পরিবর্ধন।)

আপোসের আরও কিছু চেষ্টা

এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে কুরাইশের লোকেরা হুযুর (স) এ নিকটে বিভিন্ন প্রস্তাব পেশ করতে থাকে যাতে কোন একটি গ্রহণ করলে উভয়ের মধ্যকার সংঘাত সংঘর্ষ দূর হতে পারে। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, কুরাইশের লোকেরা হুযুরকে (স) বলল, আমরা আপনাকে এতো ধন-সম্পদ দান করব যে, আপনি মক্কায় সবার চেয়ে ধনী ব্যক্তি হয়ে যাবেন। আপনি যে মেয়েকে পছন্দ করেন তার সাথে আপনার বিয়ে দিয়ে দেব। আমরা আপনার পেছনে চলতে রাজী আছি। আপনি শুধু আমাদের এ কথাটি মেনে নিন যে, আমাদের দেব-দেবী সম্বন্ধে গাল-মন্দ করা থেকে বিরত থাকুন। যদি এ কথা মানতে না চান, তাহলে আর একটা প্রস্তাব পেশ করছি, যাতে আপনারও মংগল আমাদেরও মংগল।

হুযুর (স) বললেন, তা কি?

তারা বলল, এক বছর আপনি আমাদের মাবুদ লাত ও ওয্যঅর এবাদত করুন, আর এক বছর আমরা আপনার মাবুদের এবাদত করব।

হুযুর (স) বললেন, আচ্ছা, তোমরা একটু অপেক্ষা কর, আমি দেখি আমার রবের পক্ষ থেকে কোন হুকুম আসে।[এর অর্থ এ নয় যে, রাসূলূল্লাহ (স) কোন দিক দিয়ে এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য কেন, বিবেচনার যোগ্য মনে করতেন। এবং মায়াযাল্লাহ কাফেরদেরকে এ জবাব এ আশায় দিয়েছিলেন যে, হয়তো আল্লাহর পক্ষ থেকে তার অনুমোদন আসবে। বরঞ্চ প্রকৃত পক্ষে এ কথাটি একেবারে এমনটি ছিল, যেমন কোন অধীন অফিসারের নিকট কোন অসংগত প্রস্তাব পেশ করা হলো এবং তিনি জানেন যে তাঁর সরকার এ দাবী কিছুতেই মেনে নিতে পারেননা। কিন্তু তিনি এ দাবী প্রত্যাখ্যান না করে দাবী উত্থাপনকারীদের বলে দিলেন, আমি আপনাদের আবেদন কর্তৃপক্ষের নিকটে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারপর যে নির্দেশ আসে তা আপনাদের জানিয়ে দেব। এতে পার্থক্য এই যে, নিম্নস্থ কর্মচারী যদি স্বয়ং দাবী প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে লোকে জিদ করতেই থাকবে। কিন্তু তিনি যদি বলেন, কর্তৃপক্ষের জবাব তোমাদের দাবীল বিরুদ্ধে এসেছে, তাহলে তারা নিরাশ হয়ে যাবে।– গ্রন্হকার।] এতে অহী নাযিল হলোঃ

******************************************************

(বলে দাও), হে কাফেরগণ! আমি তাদের এবাদত করিনা, যাদের তোমরা এবাদত কর। আর না তোমরা তাঁর এবাদতকারী যাঁর এবাদত আমি করি। আর না আমি তাদের এবাদতকারী যাদের এবাদত তোমরা করেছ। না তোমরা তাঁর এবাদকারী যাঁর এবাদত আমি করি। তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আর আমার জন্য আমার দ্বীন।

******************************************************

তাদেরকে বল, হে নির্বোধেরা! তোমরা কি আমাকে এ কথা বলছ যে, আল্লাহ ছাড়া আমি আর কারো এবাদত করি (ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম তাবারানী)।

ইবনে আব্বাস (রা) এর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, কুরাইশের লোকেরা হুযুর (স) কে বলল, হে মুহাম্মদ (স)! যদি তুমি আমাদের দেব-দেবীকে চুমো দাও, তাহলে আমরা তোমার মাবুদের বান্দেগী করবো। এর জবাবে সূরা কাফেরুন নাযিল হয় (আবদ বিন হামীদ)।

সাঈদ বিন সীনা (আবুল বাখতারীর আযাদ করা গোলাম) থেকে বর্ণিত আছে যে, অলীদ বিন মুগীরা, আর বিন ওয়াইল, আসওয়াদ বিন আল মুত্তালিব এবং উমাইয়া বিন খালাফ রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে সাক্ষাৎ করে বলে, হে মুহাম্মদ (স)! এসো আমরা তোমাকে আমাদের যাবতীয় কাজকর্মে শরীক করে নিচ্ছি। তুমি যা এনেছ তা যদি আমাদের কাছে যা আছে তার থেকে উত্তম হয়, তাহলে আমরা তার মধ্যে অংশীদার হয়ে যাব এবং আমাদের অংশ পেয়ে  যাব। আর যদি আমাদের কাছে যা আছে তা তোমার আনীত জিনিস থেকে ভালো হয়, তাহলে তুমি আমাদের সাথে তাতে অংশীদার হবে এবং তার থেকে তুমি তোমার অংশ পেয়ে যাবে। এর জবাবে অহী নাযিল হয় ************************************************* (ইবনে জারীর, ইবনে আবি হাতেম,  ইবনে হিশাম এবং বালাযুরীও এ বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন)।

ওহাব বিন মুনাব্বেহ বর্ণনা করেন যে, কুরাইশের লোকেরা নবীকে (স) বলে, যদি তুমি পছন্দ কর তো এক বচর তোমার দ্বীনে আমরা প্রবেশ করব এবং এক বছর তুমি আমাদের দ্বীনে প্রবেশ করতে থাকবে (আবদ বিন হামীদ, ইবনে আবি হাতেম)।

এসব বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, একবার একই বৈঠকে নয়, বরঞ্চ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নবীর (স) সামনে তারা এ ধরনের প্রস্তাবাদি পেশ করে এবং প্রয়োজন ছিল যে, একবার চূড়ান্ত জবাব দিয়ে তাদের এ আশা চিরতরে ব্যর্থ করে দেয়া যে, রাসূল (স) দ্বীনের ব্যাপারে কিছু দেয়া-নেয়অর পদ্ধতি (GIVE AND TAKE POLICY) অবলম্বন করে তাদের সাথে কিছুটা আপোস করে নেবেন। (তাফহীম ৬ষ্ঠ খন্ড- সূরা কাফেরুন- এর ভূমিকা।)

হযরত আবু তালিবের উপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা

রাসূলুল্লাহ (স) এর দাওয়াত রুখবার জন্য কুরাইশদের দ্বিতীয় কৌশল এ ছিল যে,ক্রমাগত আবু তালিবের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করা এবং এ কথা বলা, তাঁর (মুহাম্মদ (স) প্রতি আপনার সমর্থন প্রত্যাহার করুন এবং তাঁর উপরেও চাপ সৃষ্টি করুন যাতে তিনি তাঁর কাজ থেকে বিরত থাকেন।

প্রথম প্রতিনিধি দল

মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, কুরাইশরা যখন দেখলো যে, আবু তালেব হুযুরকে (স) সমর্থন করছেন এবং তাঁকে সেসব কাজ থেকে নিবৃত্ত করছেননা যা তাদের জন্য অসহনীয়, তখন কুরাইশদের সম্ভান্ত্র ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধি দল তাঁর কাছে গেল। তাদের মধ্যে ছিল বনী আবেদ শামস বিন আবেদ মানাফের ওতবা বিন রাবিয়া ও শায়বা বিন রাবিয়া; বনী উমাইয়ার আবু সুফিয়ান; বনী আসাদ বিন আবদুল ওয্যঅর আবুল বাখতারী আস বিন হিশাম ও আসওয়াদ বিন আল মুত্তালেব; বনী মাখযুমের আবু জাহল ও অলীদ বিন মগীরা; বনী সাহমের হাজ্জাজের পুত্র নুবাইয়া ও মুনাব্বেহ। আস বিন ওয়ায়েল ও তাদের মধ্যে শামিল ছিল। তারা বলল, হে আবু তালেব! আপনার ভাইপো আমাদের দেবদেবীর প্রতি গালমন্দ করেছে। আমাদের দ্বীনের প্রতি দোষারোপ করেছে, আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে নিবুদ্ধিতা বলে গণ্য করেছে, আমাদের বাপদাদাকে পথভ্রস্ট বলেছে। এখন আপনি তাকে আমাদের মনে আঘাত দেয়া থেকে বিরত রাখুন, অথবা আমাদের এবং তার মধ্য থেকে সরে পড়ুন। কারণ আপনিও স্বয়ং আমাদের মতো তার আনীত দ্বীনের বিরোধী। তারপর আমরা তাকে দেখে নেব।

আবু তালেব খুব নম্র ভাষায় কথা বলে তাদেরকে শান্ত করেন এবং তারা চলে যায় (ইবনে হিশাম, তাবারী, আল বেদায়া ওয়অন্নেহায়া)।

দ্বিতীয় প্রতিনিধি দল

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) যখন তাঁর কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন, তখন কুরাইশদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তখন দ্বিতীয় একটি প্রতিনিধি দল আবু তালেবের নিকটে যায়। তারা বলে, হে আবু তালেব! আপনি আমাদের মধ্যে সকলের বয়োজ্যেষ্ঠ সম্মানিত ব্যাক্তি। আমরা আপনাকে বলেছিলাম তাকে সমর্থন করা থেকে বিরত থাকুন। কিন্তু বিরত থাকলেননা। আমাদের বাপদাদাকে গালমন্দ করা, আমাদের বুদ্ধিবিবেকের আবমাননা এবং আমাদের দেবদেবীর দোষক্রটি বের করা আমরা কিছুতেই বরদাশত করবনা। হয় তাকে বিরত রাখুন, নতুবা আপনার সাথে আমাদের মুকাবেলা হবে, যতোক্ষণ না এক পক্ষ ধ্বংস হয়েছে। তারপর বর্ণনায় মতভেদ রয়েছে।

ইমাম বুখারী ইতিহাসে এবং হাফেজ আবু ইয়া’লী তাঁর মুসনাদে আকীল বিন আবু তালেবের যে বর্ণনা উদ্ধৃত করেছন তাতে রয়েছে যে, তাদের উপস্থিতিতেই আমার পিতা (আবু তালেব) আমাকে বললেন, মুহাম্মদকে (স) ডেকে আন। আমি প্রচন্ড গরমের মধ্যে তাঁকে খুজে বের করে নিয়ে এলাম। তিনি আসার পর আবু তালেব তাকে বললেন, ভাইপো, তোমার জ্ঞাতিগোষ্ঠীরা তোমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করছে যে, তুমি তাদের বৈঠকাদিতে এবং মসজিদে হারামে তাদের মনে আঘাত কর। তুমি এসব বন্দ কর।

এ কথা শুনার পর, হুযুর (স) আসমানের দিকে তাকিয়ে কুরাইশ সর্দারদের বললেন, আপনারা কি এ সূর্য দেখছেন? তারা বলল- হ্যাঁ। হুযুর (স) বললেন, এ সূয্য যেমন তার আলোক রশ্মি বন্ধ করতে সক্ষম নয়, তেমনি আমিও এ কাজ ছেড়ে দিতে সক্ষম নই। এ কথা বলে তিনি উঠে গেলেন। তারপর আবু তালেব বলেন, আমার ভাইপো কখনো মিথ্যা কথা বলেনি। অতএব আপনারা চলে যেতে পারেন। তাবারানী আওসাত এবং কবীর এ বর্ণনা উদ্ধৃতি করেছেন এবং আবু ইয়া’লা সংক্ষেপে এর উল্লেখ করেছেন।

ইবনে হিশাম, তাবারী, বায়হাকী এবং বালাযুরী এ ঘটনা এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, লোকেরা চলে যাওয়ার পর আবু তালিব হুযুরকে (স) ডেকে বলেন, ভাইপো! তোমার কওম আমার কাছে এসে এসব কথা বলেছৈ। তুমি আমার জন্যও এবং তোমার জন্যও বেঁচে থাকার কিছু অবকাশ রাখ। তুমি আমার উপর এমন বোঝা চাপিয়ে দিওয়া যা বহন করার শক্তি আমার নেই এবং তোমারও নেই। অতএব তুমি এমন সব কথা বলা বন্ধ করা যা তাদের নিকট অসহনীয়। আবু তালিবৈর কথা শুনে হুযুর (স) মনে করলেন যে, আমাকে আমার নিজের দায়িত্বে ছেড়ে দিতে তৈরী হচ্ছেন। তারপর তিনি বললেন, চাচাজান! যদি সূর্য আমার ডান হাতে এবং চন্দ্র বাম হাত দিয়ে দেয়া হয় তথাপি আমি এ কাজ পরিত্যাগ করবনা। আল্লাহ হয় এ কাজ সফল করবেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব। অতঃপর হুযুর (স) ব্যাথিত হয়ে কেঁদে ফেল্লেন এবং চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলেন। আবু তালিব অনুভব করলেন যে, তাঁর তথায় হুযুর (স) কত ব্যাথা পেয়েছেন। তারপর তিনি তাঁকে ডাকলেন এবং ফিরে এল বললেন, তুমি তোমার কাজ করতে থাক এবং যা করতে চাও কর। খোদার কসম! আমি কোন কারণেই তোমাকে দুশমনের হাতে তুলে দেবনা।

আবু জাহল হুযুরকে (স) হত্যা করার ইচ্ছা করে

মুহাম্মদ বিন ইসহাক বলেন, আবু জাহেল কুরাইশের লোকদেরকে বলে, হে কুরাইশ দল! তোমরা দেখলে তো মুহাম্মদ (স) কেমন পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে, আমাদের দ্বীনের অবমাননা করা, আমাদের বাপদাদাকে পথভ্রষ্ট বলা, দেবদেবীদের গালি দেয়া প্রভৃতি কাজ থেকে সে কিছুতেই বিরত থাকবেনা। এখন আমি আল্লাহর কসম করে বলছি যে, আগামীকাল আমি একটি পাথর নিয়ে বসে থাকবো এবং যখন সে নামাযের সিজদায় যাবে, তখন তার মস্তক চূর্ণ করে দেব। তারপর বনী আবেদ মানাফ যা ইচ্ছা করুক।

দ্বিতীয় দিন পাথর নিয়ে সে হুযুরের (স) প্রতীক্ষায় রইলো। অভ্যাস মত নবী (স) এসে নামাযে মশগুল হয়ে পড়লেন। কুরাইশের লোকেরাও কি হয় তা দেখার জন্য সমবেত হলো। হুযুর (স) সিজদায় যাওয়অর পর আবু জাহল পাথরসহ সম্মুখে অগ্রসর হয়। কিন্তু সে তাঁর নিকটবর্তী হয়ে হঠাৎ পেছনে ফিরে এলো। সে ভয়ানক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লো। তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। পাথরও তার হাত থেকে পড়ে গেল। কুরাইশের লোকেরা উঠে তার কাছে গেল এবং বলল, আবুল হাকাম! তোমার এ কি হলো? সে বলল, যে কাজের কথা তোমাদেরকে বলেছিলাম তা করার জন্য সম্মুখে অগ্রসর হয়েছিলাম। কিন্তু যখন নিকটবর্তী হলাম তখন আমার সামনে এমন এক বিরাট উট এসে গেল। এতা বড়ো মাথা, এমন গলা ও এমন কুঁজধারী উট আমি কখনো দেখিনি। সে আমাকে চাবিয়ে খাওয়ার জন্য উদ্যত হলো।

পরে হুযুর (স) বলেছিলেন যে, হযরত জিব্রিল (আ) এ আকিৃতিতে এসেছিলেন।

তৃতীয় প্রতিনিধি দল

ইবনে সা’দ বলেন, কুরাইশ দলপতিরা আর একবার আবু তালিবৈর কাছে এসে বলে, আপনি আমাদের সকলের বড়ো এবং সর্দার। আপনার নিকটে আমরা ইনসাফ করার কথা বলছি। আপনিও আমাদের ও তার মধ্যে সুবিচার করুন। আপনার ভাইপোকে ডেকে পাঠান এবং বলূন যে, সে যেন আমাদের দেবদেবীর বিরুদ্ধে কটু কথা বলা পরিত্যাগ করে। আর আমরাও তাকে এবং তার খোদাকে তার অবস্থার উপরেই ছেড়ে দিচ্ছি। তারপর আবু তালিব হুযুরকে (স) ডেকে পাঠালেন। তিনি তাঁকে বললেন, ভাইপো! এই যে তোমার চাচারা, তোমার কওমের সম্ভ্রান্ত দলপতিগণ এসেছেন এবং তোমার সাথে একটা ইনসাফ পূর্ণ মীমাংসা করতে চান।

হুযুর (স) বললেন, আপনারা বলূন, আমি শুনছি। তারা বলল, তুমি আমাদেরকে ও আমাদের দেবদেবীকে আপন আপন অবস্থায় থাকতে দাও এবং তাদের প্রতি গালমন্দ করা থেকে বিরত থাক। আমরা তোমাকে এবং তোমার খোদাকে তোমাদের অবস্থায় ছেড়ে দিচ্ছি।

আবু তালিব বলেন, এ তো তারা সুবিচার পূর্ণ কথাই বলছেন, এ কথা মেনে নাও।

হুযুর (স) বললেন, চাচাজান! আমি কি তাদেরকে এর থেকে উৎকৃষ্টতর বিষয়েল দিকে আহবান জানাব আবু তালিব বললেন, তা কি?

হুযুর (স) বললেন, তাহলে বলূন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।

এতে তারা ক্রোধান্বিত হয়ে ঘৃণাভরে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলল-

*****************************************************

নিজেদের দেবদেবীর পূজা আর্চনায় অচল থাক। এ কথার তো অন্য কিছু অর্থ হয়। (পরিবর্ধন গ্রন্হকার।)

এ ঘটনা সম্পর্কে বর্ণনায় মতপার্থক্য আছে। ইবনে সা’দ তাবকাতে এবং তাবারী ইতিহাস তার সময়কাল নির্দিষ্ট না করেই বর্ণনা করেছেন। ইবনে ইসহাক এটাকে হযরত হামযা (রা) এবং হযরত ওমরের (রা) ইসলাম গ্রহণের পরবর্তী ঘটনা বলে বর্ণনা করেছেন। আর এ মতই অবলম্বন করেছেন যামাখশারী, রাযী ও নায়াশাপুরী প্রমুখ তাফসীরকারগণ। কিন্তু অন্যান্য বর্ণনায় এটাকে সে সময়ের ঘটনা বলা হয়েছে, যখন আবু তালিব মৃত্যু শয্যায় শায়িত ছিলেন।  ইমাম আহমদ, নাসায়ী, তিরমিযি, বায়হাকী, ইবনে আবি শায়বাহ এবং ইবনে জারীর তাবারী তাদের তাফসীর ও ইতিহাসে যে ঘটনা বিবৃত করেছেন তা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ

যখন আবু তালিব পীড়িত হয়ে পড়েন এবং কুরাইশ সর্দারগণ অনুভস করলো যে, এ তাঁর শেষ সময় তখন তারা পরামর্শ করে ঠিক করলো যে এখন তাঁল সাথে কথা বলা দরকার। তিনি আমাদের ও তাঁল ভাইপোর মধ্যকার ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা করে যান তো ভালো কথা। এমন যেন না হয় যে, তাঁর মৃত্যু হলো এবং তারপর আমরা মুহাম্মদের (স) ব্যাপারে কোন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলাম। আর আরববাসী আমাদের এই বলে তিরস্কার করা শুরু করলো যে, যতোদিন মুরুব্বী জীবিত ছিলেন ততোদিন এরা তাঁকে সম্মান করে চলেছে। এখন তাঁর মৃত্যুর পর তারা তাঁর ভাইপোর উপর হস্তক্ষেপ করে বসলো। একথার প্রতি সকলেই একমত হলো এবং প্রায় পঁচিশ জন কুরাইশ দলপতি আবু তালিবের নিকট হাযির হলো। তাদের মধ্যে, উল্লেখযোগ্য আবু জাহল, আবু সুফিয়ান, উমাইয়া বিন খালাফ, আস বিন ওয়াইল, আসওয়াদ বিন আল মুত্তালিব, উকবা বিন আবি মুয়াইত, ওতবা ও মায়বাহ। তারা প্রথমে নবী (স) এর বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ উত্থাপন করে। তারপর বলে, আমরা আপনার কাছে একটি সুবিচারের কথা বলতে এসেছি। তা এই যে, আপনার ভাইপো আমাদেরকে আমাদের দ্বীনের উপর থাকতে দিক এবং আমরাও তাকে তার দ্বীনের উপর থাকতে দেব। সে যে মাবুদেরই এবাদত করতে চায় করুক, তাতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু সে যেন আমাদের দেবদেবীর সমালোচনা না করে। আর এ চেষ্টা করে না বেড়ায় যে আমরা যেন আমাদের দেবদেবীল সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করি। এ শর্তে আপনি তার সাথে আমাদের আপোস করিয়ে দিন।

আবু তালিব নবীকে (স) ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, ভাতিজা, তোমার কওমের লোকেরা আমার কাছে এসেছে। তাদের ইচ্ছা এই যে, তুমি একটি সুবিচারপূর্ণ কথায় তাদের সাথে একমত হয়ে যাও। যাতে তোমার ও তাদের ভেতেরর ঝগড়া বিবাদ খতম হয়ে যায়। তারপর তিনি নবীকে (স) সে কথাটি বললেন, যা কুরাইশ সর্দারগণ তাঁকে বলেছিল।

নবী (স) জবাবে বলেন, চাচাজান! আমি তো তাদের সামনে এমন একটি কালেমা পেশ করেছি, তা যদি তারা মেনে নেয় তাহলে আরব দেশ তাদের অনুগত এবং আজম (অনারব) কর দাতা হবে। [ হুযুরের (স) এ কথা বিভিন্ন বর্ণনাকারী বিভিন্ন শব্দাবলী প্রয়োগে উদ্ধৃত করেছেন। এসব শাব্দিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সকলের উদ্দেশ্য একটাই ছিল। অর্থাৎ হুযুর (স) তাদেরকে বলেন, যদি আমি তোমাদের সামনে এমন এক কালেমা পেশ করি এবং তা যদি তোমরা মেনে নাও তাহলে  আরব ও আজম তোমাদের অধীন হয়ে যাবে। তাহলে বল- এটা কি অধিকতর ভাল কথা, না ইনসাফের কথা বলে যেটা তোমরা আমার সামনে পেশ করছ? তোমাদের মংগল কি এ কালেমা মেনে নেয়ার মধ্যে নিহিত, না এতে যে অবস্থায় তোমরা আছ সে অবস্থায় তোমাদের থাকতে দেব এবং  নিজের বেলায় শুধু খোদার এবাদত করতে থাকব?](তাফহীম ৪র্থ খন্ড- সূরা সোয়াত- এর ভূমিকা।) এ কথা শুনে তারা তো প্রথমে একটু বেশামাল হয়ে পড়লো। তারা বুঝতে পারছিলনা যে কোন কথা বলে এমন এক কল্যাণকর কালেমা প্রত্যাখ্যান করবে। পরে কিছুটা শামলে নিয়ে বললো, তুমি একটি কালেমার কথা বলছ? আমরা এমন দশটি কালেমা বলতেও প্রস্তুত আছি। কিন্তু বল তো সে কালেমাটা কি?

নবী (স) বললেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। এরপর তারা একত্রে উঠ পড়লো এবং একথা বলতে বলতে বের হয়ে গেল যা সূরা- সোয়াদের প্রথম অংশে বলা হয়েছে।(তাফহীম ৪র্থ খন্ড- সূরা সোয়াত- এর ভূমিকা।)

চতুর্থ প্রতিনিধি দল

ইবনে হিশাম, ইবনে জারীর তাবারী, ইবনে সা’দ বালাযুরী এবং ইবনে কাসীর বলেন, কুরাইশরা যখন দেখলো যে, আবু তালিব কিছুতেই হুযুরকে (স) ছাড়তে রাজী নয়, এবং তিনি কওমের শক্রতা ও তার থেকে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও আপন ভাইপোর জন্য নিতে প্রস্তুত, তখন তারা অলীদ বিন মগীরার পুত্র উমারাহ বিন অলদিকে তাঁর কাছে নিয়ে গেল এবং বলল, হে আবু তালেব, এ হচ্ছে উমারাহ বিন অলীদ, কুরাইশের প্রসিদ্ধ ও সুদর্শন যুবক। একে পুত্র বানিয়ে নিন এবং তার বিনিময়ে আপনার এ ভাইপোকে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। কারণ সে আপনার ও আপনার বাপদাদার দ্বীনের বিরোধিতা করেছে, আপনার কওমের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের সবাইকে নির্বোধ বলে গণ্য করছে। আমরা একজনকে দিয়ে অন্য একজন নিচ্ছি যেন তাকে হত্যা করতে পারি।

আবু তালিব জবাবে বললেন, খোদার কসম! তোমরা আমার সাথে অতি নিকৃষ্ট দর কষাকষি করেছ। নিজের পুত্র আমাকে দিচ্ছ যে, আমি তাকে লালনপালন করি এবং আমার পুত্র তোমরা চাচ্ছ তাকে হত্যা করার জন্য। এ কখনো হতে পারেনা। হাশিমের ভাই নাওফেলের বংশধর মুতয়েম বিন আদী বলল, খোদার কসম, হে আবু তালিব, তোমার কওম তোমার সাথে ইনসাফ করেছে এবং তুমি যে বিপদে পড়েছ তার থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমি দেখছি যে তুমি তাদের কোন কথাই মানছনা।

আবু তালিব জবাবে বলেন, খোদার কসম, তারা আমার প্রতি কোনই সুবিচার করেনি, কিন্তু তুমি আমাকে ছেড়ে আমার বিরুদ্ধে তাদের সাথে চলে গেছ। ঠিক আছে যা ইচ্ছে করগে।

ইবনে ইসহাক বলেন, এতে কথা কাটাকাটি হওয়ার পর লড়াইয়ের পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং একে অপরের মুকাবেলা করার সিদ্ধান্ত করে।

আবু তালিব বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবকে একত্রে সমবেত করেন

ইবনে ইসহাক বলেন, তারপর আবু তালিব বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবকে একত্রে সমবেত করে এ বিষয়ে উদ্বদ্ধ করেন যে, সকলে একমত হয়ে রাসূলুল্লাহ (স) কে সমর্থন ও হেফাজন করতে হবে। এ কথা সকলে মেনে নেয় এবং আবু তালিবকে সাহায্য করার জন্য তৈরী হয়, শুধু লাহাব ভিন্ন মত পোষণ করে।

কুরাইশদের প্রতি আবু তালিবের হুমকি প্রদর্শন

ইবনে সা’দ বলেন, যখন নবী পাকের (স) চরম বিরোধিতা করা হচ্ছিল, কিন্তু তখনো আবিসিনিয়ায় হিজরত শুরু হয়নি, এমন সময়ে একদিন আবু তালিব এবং পরিবারের অন্যান্যরা হুযুরের (স) বাড়ি এসে তাঁকে দেখতে পেলেননা। আবু তালিবের সন্দেহ হলো যে, হুযুরকে (স) হত্যা করা হয়েছে। তক্ষুণি তিনি বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবের যুবকদেরকে একত্র করলেন। অতঃপর তাদেরকে বললেন, প্রত্যেকে এক একটি তলোয়ার বা অন্য কোন অস্ত্র কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে রেখে আমার পেছনে পেছনে আস। যখন আমি মসজিদে হারামে প্রবেশ করব, তখন তোমরা দেখবে কুরাইশ দলপতিদের কোন বৈঠকে ইবনুল হানযালিয়্যা (আবু জাহল) বসে আছে। ব্যস তারপর সে বৈঠকের কাউকে জীবিত ছেড়ে দেবনা। কারণ অবশ্যই তারা মুহাম্মদকে (স) হত্যা করেছে।

এ অভিপ্রায়ে আবু তালিব রওয়ানা হন এবং পথিমধ্যে যায়েদ বিন হারেসার (রা) সাথে দেখা হয়। তিনি জানতে পারেন হুযুর (স)ভালো আছেন।

দ্বিতীয় দিন আবু তালিব সকাল বেলা হুযুরের (স) বাড়ি এলেন এবং তার হাত ধরে বনী হাশিম ও বনী আল মুত্তালিবের যুবক বৃদ্ধসহ কুরাইশ দলপতিদের বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে বললেন, হে কুরাইশের লোকেরা! তোমরা কি জান আকি কি করতে চেয়েছিলাম? তারা বলল, না জানিনা। আবু তালিব সমস্ত ঘটনা বিবৃত করলেন এবং যুবকদেরকে বললেন, তোমাদের চাদর সরিয়ে ফেল। তাদের চাদর সরাবার পর সকলে দেখতে পেল প্রত্যেকের হাতে একটি করে ধারালো অস্ত্র। আবু তালিব বললেন, খোদার কসম! যদি তোমরা মুহাম্মদকে (স) হত্যা কর, তাহলে তোমাদের কাউকেও জীবিত রাখবনা। তারপর আমরা লড়াই করতে করতে খতম হয়ে যাব।

এ ঘটনার পর কুরাইশদেরকে জানিয়ে দেয়া হলো যে, মুহাম্মদের (স) প্রতি কোন রূপ হস্তক্ষেপ করা সহজ কাজ নয়। আর এ ঘটনাটি সবচেয়ে বেশী আবু জাহেলের জন্য নৈরাশ্যজনক ছিল।

About সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী রহ.